রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ



চলতি মে মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্ম হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ যখন আট বছরে পা দিল, ঠিক তখনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমরা পেয়েছি। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুল আলোচিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই ইসরাইল সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানি ঘাঁটিগুলোর ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এই বিমান হামলা কার্যত সিরিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের এক ধরনের যুদ্ধের শামিল। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আমরা যদি বিষয়টি বিশ্লেষণ করি, তাহলে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! সিরিয়া সংকটে ইরান প্রথম থেকেই আসাদ সরকারকে সমর্থন করে আসছে, যা প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরোধী ছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই আসাদ সরকারের বিরোধিতা করে আসছে এবং এটা মোটামুটিভাবে সবাই জানে যে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ‘রেজিম চেঞ্জ’ এর পক্ষপাতি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র চায় সিরিয়ায় একটি আসাদবিরোধী সরকার। আইএস সিরিয়া থেকে উৎখাতের পরও সিরিয়ায় যেসব ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুুদ্ধ’ করে আসছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ ও অস্ত্র পেয়ে আসছে। উপরন্তু সিরিয়ার কুর্দি অঞ্চলে চার হাজারের মতো মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। বলা হচ্ছে, এরা কুর্দি গ্যারিলাদের ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে কাজ করছে! এমনই একটি পরিস্থিতিতে ইরান পারমাণবিক চুক্তি ট্রাম্প কর্তৃক বাতিল ঘোষণা এবং ইসরাইলের সিরিয়ার ভেতরে ইরানি অবস্থানের ওপর হামলা এ অঞ্চলে যে ‘ছায়াযুদ্ধের’ জন্ম দিয়েছে, তা শুধু উত্তেজনাই বাড়াবে না, বরং একটি বড় ধরনের যুদ্ধেরও সূচনা করতে পারে। এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ এখন অনেকগুলো সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। ইসরাইল এখন সরাসরি ইরানের ভেতরে অবস্থিত ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে, যেমনটি তারা করেছিল ইরাকে সাদ্দামের জীবিতকালে। এমনকি ইরানি বন্দর ‘পোর্ট অব খারগ’ এ বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে, যেখান থেকে ইরান তার জ্বালানির শতকরা ৯০ ভাগ (গ্যাস ও তেল) বিদেশে রপ্তানি করে। তেল পরিশোধনের জন্য ইরানের যে বড় বড় রিফাইনারি আছে, তা ধ্বংস করে দিতে পারে ইসরাইল। এক্ষেত্রে ইসরাইলি উদ্দেশ্য পরিষ্কার, ইরানি অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে ইরানকে দুর্বল করা। ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। ‘আরব বসন্ত’ সময়কালে ‘সরকার পরিবর্তনের’ একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানের ক্ষেত্রেও এই সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান চুক্তিটি বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি বিমান সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী ছোট শহর কিসভেতে বিমান হামলা চালিয়ে সেখানে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গ্রুপের একটি কনভয়কে ধ্বংস করে দিয়েছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলি বিমান হামলা এখন নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পষ্টই ইসরাইল এখন সিরিয়ার যুদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপে তার বন্ধুদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটা দূরত্ব তৈরি করে দিতে পারে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ইউরোপীয় মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, ÔTogether we Emphasize our Continuing Commitment to the JCPOA. This Agreement reaming Important for our shared Security’। পরিষ্কার মেসেজ। পশ্চিমা দেশগুলো ইরান চুক্তিতে থাকতে চায়। তারা এই চুক্তিকে তাদের নিরাপত্তার প্রতি এক ধরনের গ্যারান্টি বলে মনে করছে। এর অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র JCPOA  বা ইরান চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেও অপর তিন ইউরোপীয় শক্তির (জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স) এই চুক্তির প্রতি কমিটমেন্ট থাকছে। এর ফলে দূরত্ব তৈরি হবে। এর আগে ইউরোপীয় স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।
ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথাও বলেছেন। এতে চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীন ও ভারত ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ইরান প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। চীন হচ্ছে তার বড় ক্রেতা। ২০১৭ সালে চীন ইরানের রপ্তানিকৃত জ্বালানি তেলের শতকরা ২৪ ভাগ একাই ক্রয় করেছিল। ভারত কিনেছিল শতকরা ১৮ ভাগ, আর দক্ষিণ কোরিয়া ১৪ ভাগ। এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে Us National Defense Authorization Act অনুযায়ী কোনো কোম্পানি যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যবসা করতে পারবে না। এর অর্থ চীনা ও ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো এরপরও যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, যা নিউইয়র্ক টাইমসের নিকোলাস ক্রিসটফ Nicholas Kristof) ÔvandalismÕহিসেবে আখ্যায়িত করেছেন  (Trump’s move on Iran Deal : Simple Vandalism, May, 2018),, ২০১৮), তা বিশ্বকে আবারও একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন একট নতুন দিকে মোড় নিল। সেখানে নতুন একটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ হলো। বিশ্ব নয়া স্নায়ুযুদ্ধের যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছে, এখন এতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। ইরানি পার্লামেন্টে মার্কিন পতাকায় আগুন দেওয়ার দৃশ্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এই দৃশ্য ১৯৭৯ সালের একটি দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিল, যখন ইরানি ছাত্ররা তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নিয়েছিল। সিরিয়ার সংকটকে কেন্দ্র করে মস্কো-বেইজিং-তেহরান অক্ষ গড়ে উঠেছিল। এখন এই অক্ষ আরও শক্তিশালী হবে মাত্র। ইরান সমঝোতা চুক্তি বাতিল করে ট্রাম্প বিশ্বে উত্তেজনার মাত্রা বাড়ালেন মাত্র। ওয়াশিংটনের নিউ কনজারভেটিভরা এখন একটা যুদ্ধ চায়। এই যুদ্ধটি হবে ইরানের বিরুদ্ধে! এতে ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে একের পর এক যে ‘অভিযোগ’ উঠছে এবং একটি সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে যে, তিনি হয়তো আর দ্বিতীয় টার্মের জন্য রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পাবেন না। এ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারবেন। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন নাÑ এটা আইনের বিধান। তাকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশ এই অনুমোদন নেননি ইরাকের ক্ষেত্রে ২০০৩ সালে। প্রেসিডেন্ট ওবামা নেননি লিবিয়ায় বোমা বর্ষণের সময় ২০১১ সালে। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি নেবেন ইরানের ক্ষেত্রে? এটা ভবিষ্যতের ব্যাপার। তবে ইসরাইল এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই ‘যুদ্ধ’ শুরু করল। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, ইসরাইল চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘যুদ্ধে’ যোগ দিক। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল লরেন্স উইলকারসন গত মার্চ মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল এটা চাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তাহলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র তার ভাবমূর্তি হারাবে (mintpressnews.com, 12 March 2018)| Popular Resistance.org নামে একটি ভিন্নধর্মী নিউজ পোর্টাল আমাদের এই তথ্য দিচ্ছে যে, ইসরাইলি লবি আসলে এই যুদ্ধটি চাচ্ছে। কেভিন জেমে ও মার্গারেট ফ্লাওয়ার ওই নিউজ পোর্টালে লিখিত এক প্রতিবেদনে (১৩ মে ২০১৮) আমাদের জানাচ্ছেন, কীভাবে ইহুদি লবি ট্রাম্পকে উদ্বুদ্ধ করছে যুদ্ধে যেতে। তারা একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলডন আডেলসন ট্রাম্পের প্রচারণা তহবিলে ৮৩ মিলিয়ন ডলার দান করেছিলেন। ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনে যে ফান্ড জোগাড় করা হয়েছিল, তাতে তিনি দিয়েছিলেন ৫ মিলিয়ন ডলার। তিনি ইহুদি লবির প্রতিনিধিত্ব করেন। এরাই চেয়েছিলেন ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিবের পরিবর্তে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়া হোক। এই কাজটি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে, বিশেষ করে গাজা এলাকায় পরিস্থিতি জটিল করেছে।
আলজাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে (২৩ এপ্রিল ২০১৮), ইরানের আশপাশে কয়েক ডজন মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ওমান, আরব আমিরাত, কুয়েত, তুরস্ক, ইসরাইল, এমনকি কাতারে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যে-কোনো যুদ্ধে (সিরিয়া অথবা ইরান) ওইসব যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে একটি ম্যাপও দেখানো হয়, যাতে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোথায় কোথায় মার্কিনি ঘাঁটি রয়েছে। ম্যাপে স্পষ্ট দেখা যায়, ওই ঘাঁটি এবং বিমান মোতায়েন এক রকম চারদিকে ইরানকে ঘিরে রেখেছে। ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সেখানে সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ)। সাম্প্রতিককালে ইরানে যে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন আছে বলে কোনো কোনো গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এতে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যায় করেছে বলেও গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি লিংক ট্যাংক Brookings Institute ২০০৯ সালে তাদের এক প্রতিবেদনে(Wich path to persia? Options for A New American Strategy For Iran) ইরানে সরকার পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এখন ট্রাম্প প্রশাসন সেদিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নানা মাত্রার সংকট আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি। সিরিয়া সংকটের সমাধানের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কুর্দিস্তান কার্যত এখন সিরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে! সেখানে তুরস্কের সেনাবাহিনী কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনা করছে। কুর্দি অঞ্চল আফরিন, যা কিনা সিরিয়ার অংশ, সেখানে মার্কিন সৈন্য ‘উপদেষ্টা’ হিসেব নিয়োজিত রয়েছে। ইসরাইল সিরীয় সংকটে ততদিন নির্লিপ্ত তাকলেও এখন সরাসরি সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধে শরিক হয়ে গেল। এদিকে সৌদি আরব ইসরাইল সমঝোতার একটি লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করছে। ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব বাড়ছে। বলা হচ্ছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ওপর যে নিয়মিত বিমান হামলা চালাচ্ছে, তার পেছনে ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে। রাশিয়ার ভূমিকাও এখানে লক্ষ রাখার মতো। প্রকাশ্যে আসাদ সরকারকে রাশিয়া সমর্থন করলেও ইসরাইল সিরিয়ায় ইরানি অবস্থানের ওপর বিমান হামলা চালালে, রাশিয়া তাতে নীরব ভূমিকা পালন করে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি ও জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের ঘটনা ঘটল। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সেখানে আরেকটি যুদ্ধের জন্ম দেয় কি না, স্টোই দেখার বিষয় এখন। 
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
20.05.2018

কী বার্তা দিয়ে গেল কেসিসি নির্বাচন


খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মঙ্গলবার। এই নির্বাচন নানা কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, নির্বাচনটি যদি পূর্ণ সুষ্ঠু হতো, তাহলে সরকার তার জনসমর্থন বেড়েছে এটা প্রমাণ করতে পারত। দ্বিতীয়ত, দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, তা প্রমাণ করা সহজ হতো। তৃতীয়ত, সামনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। কেসিসি নির্বাচনের ফলাফল গাজীপুরে প্রভাব ফেলত। চতুর্থত, ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনকে বিতর্কহীন করতে নিঃসন্দেহে কেসিসি ও গাজীপুরের নির্বাচন একটা প্রভাব ফেলবে। পঞ্চমত, সরকার মনে করছে তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মানুষ খুশি। তারাই পুনর্বার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাবে। ষষ্ঠত, বিদেশি বন্ধুদেরও সরকারের দেখানোর প্রয়োজন ছিল যে বিএনপি কেসিসি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেবে। মোটামুটি এসব সমীকরণকে সামনে রেখেই সরকার কেসিসি নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। এখন কেসিসি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর এর ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে।
একটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনটি সুষ্ঠু হয়েছে, এটা বোধকরি বলা যাবে না। ভোট কেন্দ্র দখল, প্রিসাইডিং অফিসারদের কোথাও কোথাও অসহায়ত্ব, সিল মারা সংস্কৃতি, পুনরায় ভোট গ্রহণের আহ্বান- নির্বাচনের এসব দৃশ্য আবার ফিরে এসেছে। তবে এ প্রবণতা যে ব্যাপক, তা বোধহয় বলা যাবে না। ভোটের ফলাফলের ব্যবধান বিশাল। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এটা অবশ্য একদিক থেকে ভালো হয়েছে। খুলনায় মানুষ এখন কিছুটা হলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখতে পাবেন। বিএনপি প্রার্থী যদি বিজয়ী হতেন(?) তাহলে হয়তো তাকে কোর্টের বারান্দাতেই থাকতে হতো কিছুটা সময়। এমনকি বরখাস্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল! আমাদের অভিজ্ঞতা তো তা-ই বলে। এদিক থেকে অন্তত খুলনাবাসী আশ্বস্ত হতে পারেন এই ভেবে যে, তারা এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখতে পাবেন। খুলনা বিভাগীয় শহর হলেও সেখানে তেমন উন্নয়ন হয়নি বিগত বছরগুলোয়। খুলনা বরাবরই অবহেলিত ছিল। অথচ এ শহরের অনেক সম্ভাবনা ছিল। মংলা সমুদ্রবন্দর এখান থেকে কাছে হওয়ায় এ অঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়ন হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। তৈরি পোশাক শিল্পও (আরএমজি) এখানে বিকশিত হতে পারত। তাও হয়নি। এ অঞ্চলের বেকার ও আধা বেকার জনশক্তিকে কাজে লাগানো যেতে পারত শিল্পায়নের মাধ্যমে। তাও হয়নি। এখন সরকারদলীয় প্রার্থী এখানে বিজয়ী হওয়ায় খুলনাবাসী নিশ্চয়ই এটা প্রত্যাশা করবেন যে, এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হবে। নির্বাচিত মেয়র আবদুল খালেক নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন, মানুষ তার কাছ থেকে এখন অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। তিনি দলীয় বৃত্তের বাইরে থেকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করবেন, এটাই মানুষের প্রত্যাশা।
নির্বাচন কেমন হয়েছে এটা আলোচনা করা অর্থহীন। কেননা ভোটের ব্যবধানটা অনেক বেশি। তবে প্রত্যাশিত নির্বাচন যে হয়নি, তা বলাই যায়। এর তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। দুই বছরের একটি শিশুর ভোট দেয়া, ৪০টি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে ঢুকতে না দেয়া, ভোট কেন্দ্র দখল করে নৌকা মার্কায় সিল মারা, জাল ভোট, অনিয়মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়ক ভূমিকা ইত্যাদি যে চিত্র আমরা কেসিসি নির্বাচনে দেখলাম, এটা নির্বাচন কমিশনকে ‘সন্তুষ্ট’ করলেও এই নির্বাচন একটা প্রশ্ন রেখে গেছে। আর সেটি হচ্ছে, নির্বাচনী সংস্কৃতির কি তাহলে ‘মৃত্যু’ হতে যাচ্ছে এ দেশে? ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’- নির্বাচনের এই যে সনাতন চিত্র, তা কি হারিয়ে গেল? কেন একটা দু’বছর বয়সের শিশুকে ভোট দিতে দেয়া হল? ভোট কেন্দ্রে যারা ছিলেন, তাদের দায়িত্বটা তাহলে পালিত হল কোথায়? এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল।
৪০টি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে না দেয়ার যে অভিযোগ, এর পেছনে সত্যতা কতটুকু? ইসি এরও একটা ব্যাখ্যা দিতে পারত? নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য যারা ছিলেন, তাদের ভূমিকাই বা কী? তারা কি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন? কোনো কোনো ভোট কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারার দৃশ্য তো টিভি ফুটেজে আমরা দেখেছি। এটা অস্বীকার করি কীভাবে? এর আদৌ প্রয়োজন ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যথার্থ ছিল, এটাও বলতে পারছি না। বিএনপি তো নির্বাচনের আগেই দাবি তুলেছিল এদের প্রত্যাহারের। এটা যদি করা হতো, তাহলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা আরও নিশ্চিত হতো। খুলনায় আবদুল খালেক নিঃসন্দেহে জনপ্রিয়। আমার ধারণা সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও তিনি জিততেন। তারপরও কেন এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটল? এ নির্বাচনও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কেসিসির নির্বাচন দিয়ে আমি জাতীয় নির্বাচনকে বিবেচনা করব না। তারপরও কথা থেকে যায়। এ নির্বাচন কতগুলো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসবে এখন, যে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকেই। এক. দলীয় সরকারের অধীনে যখন ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তখন অতি উৎসাহী কর্মীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারেন। সেক্ষেত্রে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখন সংবিধান যেভাবে আছে অর্থাৎ বর্তমান প্রধানন্ত্রীকে রেখে, যিনি দলীয় প্রধান, নির্বাচনটি হবে। একইসঙ্গে বর্তমানে যিনি সংসদ সদস্য, তাকে স্বপদে বহাল রেখেই তার এলাকায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে করে সংসদ সদস্য নিজে এবং তার সমর্থকরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করবেন। এটা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। বর্তমান সংসদ সদস্যকে রেখে নির্বাচন করলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ‘নিরপেক্ষ’ থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। যদিও বলা হচ্ছে, ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি নির্বাচন কমিশনের আওতায় থাকবেন। বাস্তব চিত্র হচ্ছে, তারা ওই সময় থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। আর প্রশাসন থাকবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। এদের পক্ষে কি তখন নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব? সবারই চাকরি হারানো, শাস্তি, বদলির ভয় থাকে।
একটি শক্ত নির্বাচন কমিশন আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। আর বর্তমান সিইসিকে নিয়ে তো ‘বিতর্ক’ আছেই। তিনি যত ভালো ভালো কথাই বলুন না কেন, তার পক্ষে ‘নিরপেক্ষ’ থাকা সত্যিকার অর্থেই কষ্টকর। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। এর খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা তা পারল না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন বলেন, ‘সেনাবাহিনী থাকলে খুলনায় এই দশা হতো না’, তখন তার এ কথাকে অস্বীকার করি কীভাবে? নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সুষ্ঠু ভোট প্রয়োগের সংস্কৃতি আমরা ফিরিয়ে আনব কীভাবে? সরকারি দলকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’- এই মানসিকতা নিয়ে আমরা যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি, আমরা ভুল করব। গাজীপুরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছি। তাই সরকারের দায়িত্বটা এখানে বেশি।
আমার কাছে কেসিসি নির্বাচনের চেয়ে জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যে কথা বলা হচ্ছে, তার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বিএনপি এ নিশ্চয়তাটুকু চায়। দাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও এটা চায়। প্রায়ই তাদের প্রতিনিধিদের মুখ থেকে এ ধরনের কথা উচ্চারিত হয়। গত ১৫ মে জাতিসংঘের ঢাকায় নিযুক্ত আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পু এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক শুনানিতে শেখ হাসিনার মানবিকতার যেমন প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি ওই শুনানিতে অংশ নেয়া জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের তাগিদ দিয়েছেন। গত ১৪ মে জেনেভায় এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয় (মানবজমিন, ১৬ মে ২০১৮)। এ ধরনের বক্তব্য এই প্রথম নয়, আগেও আমরা দেখেছি। বিএনপি বারবার বিদেশি দূতাবাসে যাচ্ছে। অভিযোগ করছে। তাদের অভিযোগের তালিকায় কেসিসি নির্বাচন যে যুক্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য।
কেসিসি নির্বাচনের আয়োজন করে সরকার তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে প্রমাণ করতে চাইলে তা কতটুকু সফল হবে, এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। বাস্তবতা হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি এখনও একটি ফ্যাক্টর। দলটিকে কোনোমতেই বাদ দেয়া যাবে না। নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীও ছিলেন। কিন্তু মূল প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা থেকে তিনি ছিটকে পড়েছেন। এটাই বাস্তব চিত্র। জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই ফ্যাক্টর। সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য তাই এ দুটি বড় দলের মাঝে ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কেসিসি নির্বাচনে আবারও প্রমাণিত হল এই ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ বড় ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি নিয়ে জাতীয় নির্বাচন কতটুকু সফল হবে, আমি বলতে পারব না। তবে বলতে পারি, সরকার যদি আবারও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তাতে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে না। সরকার আরও একবার এ ধরনের ঝুঁকি গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। কেসিসি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির যে দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে, তা সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। তাই আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাটা জরুরি। জাতীয় নির্বাচনের এখনও বাকি আছে সাত মাস। সময়টা একেবারে কম নয়। এখনও একটা ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যায়। মনে রাখতে হবে, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় জাতীয় নির্বাচন। আর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে সরকারের লাভটা সেখানেই। এখন কেসিসি নির্বাচন বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কী দলটি এই পথে হাঁটছে?
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Jugantor
19.05.2018

বাংলাদেশের নির্বাচন, ভারতীয় ভাবনা



রাজনীতি সচেতন পাঠকরা বিবিসি বাংলা প্রচারিত (১৮ এপ্রিল) একটি সংবাদ নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন। বিবিসি বাংলা তাদের প্রচারিত সংবাদে নয়াদিল্লির একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো মনোজ যোশীর উদ্ধৃতি দিয়েছিল। মনোজ যোশী বলেছেন ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দিতে পারে। মনোজ যোশী বিবিসির সঙ্গে আলাপে বিএনপি, সেনাবাহিনী, জঙ্গিবাদের উত্থান ইত্যাদি নানা প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেছেন। যোশীর কথা যে ভারত সরকারের কথা তেমনটা নয়। তবে বিবিসি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন অনেক সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা গুরুত্বপূর্ণ ‘রাইসীনা ডায়লগ’ আয়োজন করে থাকে। বিবিসি এই অনুষ্ঠান প্রচার করল এমন এক সময় যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টিম বিজেপির আমন্ত্রণে এর পরপরই ভারত সফরে যায়। আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় এবং ডিসেম্বরে যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে আওয়ামী লীগ আবারো বিজয়ী হবে- এমন কথা এখন আওয়ামী লীগের নেতাদের মুখ থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির নেতৃত্বাধীন একটি জোট এখন ভারতে ক্ষমতায়। ২০১৯ সালে সেখানে লোকসভার নির্বাচন। সুতরাং বিজেপির আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগের একটি দল যখন ভারতে যায়, তখন তাতে মানুষের আগ্রহ থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। এখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটি বিষয়কে নিয়ে- আর তা হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। একাধিক কারণে এই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ভারত সফর এমন একটি ধারণার জন্ম দিতে পারে যে, বিজেপি বোধহয় আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করছে! যদিও ওবায়দুল কাদের এটা স্পষ্ট করেছেন যে, মোদির সঙ্গে তার আলোচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এটা স্বাভাবিক। ওবায়দুল কাদের একজন সিনিয়র মন্ত্রী। তিনি ভালো করে জানেন বাংলাদেশের মানুষের মনের কথা। বর্তমান সরকার বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিলেও এটা তো ঠিক বেশকিছু ইস্যু রয়ে গেছে, যার সমাধান হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে এসব সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত ছিল। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ এসব বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি ফ্যাক্টর। চলতি বছরের মার্চে ভারতীয় কংগ্রেসের যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতেও আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ কংগ্রেস ও বিজেপি দুটো দলের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলেছে। কিন্তু দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার কী হবে? শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় মোদি নিজে বলেছিলেন, মোদি ও শেখ হাসিনার সরকারের সময়েই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তার ওই বক্তব্য ওই সময় সংবাদপত্রে ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের তেমন উদ্যোগ আমরা দেখিনি। ২০১৯ সালে ভারতে লোকসভার নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গেও বিধান সভার নির্বাচন আগামীতে। এক্ষেত্রে তিস্তার পানি বণ্টন একটি ফ্যাক্টর। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে পাশ কাটিয়ে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আদৌ কোনো তিস্তা চুক্তি করবেন বলে মনে হয় না। যদিও সংবিধান তাকে অধিকার দিয়েছে- তিনি চুক্তি করতে পারেন। এখন ওবায়দুল কাদের যখন বলেন, ‘ভেরি ভেরি পজিটিভ আউটকাম’, তখন আশ্বস্ত হই কিভাবে? নাকি এটা কথার কথা! নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বিজেপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের ছবিও ছাপা হয়েছে। তবে বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠকের কোনো খবর সংবাদপত্র দেয়নি। বিজেপি-আওয়ামী লীগ আলোচনার পর এক শীর্ষ বিজেপি নেতার কথায় ‘আওয়ামী লীগকে এই আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আমরা এটাই বোঝাতে চাই যে, বাংলাদেশে আমাদের সমর্থন গণতন্ত্রের প্রতি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতি।’ অর্থাৎ, বিজেপি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে সমর্থন করে! এটাই স্বাভাবিক। ভারত একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশ। বিজেপি একটি ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল হলেও জনগণের ভোটে তারা ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশের জনগণ, সিভিল সোসাইটি মনে করে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে ভারত তথা ভারতের ক্ষমতাসীন দল একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনো একটি ‘বিশেষ দলকে নয়, বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতিই ভারতের কমিটমেন্ট থাকা উচিত। তবে এই সফরে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি। গুরুত্বপূর্ণ হলো ঢাকায় ফিরে এসে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে ভারতের নাক গলানোর কিছু নেই। ভারত নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। এবারো করবে না। কিন্তু তার এই বক্তব্যে রাজনৈতিক মহল কতটুকু আশ্বস্ত হতে পেরেছে আমি নিশ্চিত নই। বিএনপি প্রায় প্রতিদিনই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। রিজভী প্রায় প্রতিদিনই প্রেস ব্রিফিং করছেন। এই একটি ক্ষেত্রে দেখলাম বিএনপি কোনো কথা বলল না। সাধারণত আওয়ামী লীগকে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জির খুব ঘনিষ্ঠ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু ভারত সফরে আওয়ামী লীগ কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করল না। এতে করে আওয়ামী লীগ ভারতে ক্ষমতাসীন পার্টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়- এটা প্রমাণিত হতে পারে। রাজনৈতিকভাবে বিজেপি আর আওয়ামী লীগ এক নয়। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করলেও বিজেপি ধর্মনির্ভর একটি রাজনৈতিক দল। হিন্দুত্ববাদে তারা বিশ্বাসী। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিজেপির মধ্যে মিল হওয়ার কথা নয়। তবু হয়েছে। কারণ ওখানে তাদের স্বার্থের প্রশ্নটি জড়িত।
বাংলাদেশে ভারতের প্রচুর স্বার্থ রয়েছে। মোদি সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ যত বেশি উন্নতি হয়েছে, অতীতে কোনো সরকারের আমলেই সম্পর্ক এত উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কোন সরকার ক্ষমতায়, এটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বিবেচ্য নয়। তারা তাদের স্বার্থ দেখে। এক্ষেত্রে বিজেপি সরকার আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কতটুকু আদায় করে নিতে পেরেছে? সীমান্ত চুক্তিটি এই মোদি সরকারের সময়েই চূড়ান্ত হয়েছে। সীমানা চিহ্নিত হয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে। আমরা ভারত থেকে কিছু বিদ্যুৎ পাচ্ছি- এসবই অর্জন। কিন্তু আমরা অনেক কিছুই পাইনি। তিস্তার চুক্তি তো বহুল আলোচিত। এই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমান মোদি সরকার কেন, অতীতের সব সরকারই আমাদের আশ্বাস দিয়ে গেছে। কিন্তু চুক্তি হয়নি। আমরা মমতা ব্যানার্জির ব্যাপারে আগ্রহান্বিত ছিলাম। মমতা ঢাকায় এসে বলে গিয়েছিলেন ‘তিনি কাঠ-বিড়ালি হয়ে কাজ করবেন!’ অর্থাৎ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ‘গো-বিটুইন’ হিসেবে কাজ করবেন- এমনটাই বোঝায় তার কথায়। কিন্তু কই? কেন্দ্র তো রাজি তিস্তা চুক্তিতে। রাজি নয় মমতা ব্যানার্জি। গত বছরের জানুয়ারি মাসে তিন ধরনের বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর ভারত শুল্কারোপ করেছে। জুন মাসে শুল্কারোপ করা হয় হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ওপর। বাংলাদেশে তৈরি ফিশিং নেটও শুল্কারোপের আওতায় এসেছে। পাটপণ্যের (পাট সুতা, বস্তা ও চট) ওপর শুল্কারোপে সাফটা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। ভারত তার স্বার্থ দেখে। বড় দেশ হিসেবে ভারত প্রভাব খাটাতে চায়। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে পারছি না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না।
এখন ওবায়দুল কাদেরের ভারত সফরের পর বিএনপির নেতৃবৃন্দের মুখেও শুনছি একই কথা- আমন্ত্রণ পেলে তারাও ভারতে যেতে চান। ভারত সফরে তাদেরও আপত্তি নেই। বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমনটাই বলেছিলেন মিডিয়াকে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা বিদেশি দূতদের সঙ্গে ঢাকায় বসবেন। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচনটাই হলো মুখ্য বিষয়। নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা এখনো আছে। বেগম জিয়া জেলে। বিএনপি এখনো একটি নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে অনড়। একটি সমঝোতার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় এখনো অন্ধকার। তাই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন অনেক। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য তিনটি ক্ষমতার কেন্দ্র আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত। বাংলাদেশের জন্য এই তিনটি ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এরা সবাই মূলত চাচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবাই দেখতে চায়। ২০১৪ সালের নির্বাচন আয়োজন করা যেমনি ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, ঠিক তেমনি ওই নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হয়নি। সেটাও বাস্তব। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন হলো একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনের নামে যদি ভোটকেন্দ্র দখল আর সিলমারার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে, সেই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আমাদের অর্থনীতির স্বার্থে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর স্বার্থে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। আর এর জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে একটি ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’, একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু তা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থেই দুটি বড় দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা বর্তমানে নেই। তাই বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির বৈঠক, আমাদের আশাবাদী করে না। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেউ ‘হস্তক্ষেপ’ করুক, তাও আমরা চাই না। ভারত বড় দেশ। তাদের ভূমিকা আছে এবং থাকবেও। ভারতের নিজের স্বার্থেও বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily BangladesherKhobor
13.05.2018

ইরান চুক্তি বাতিল করে বিশ্বে উত্তেজনা ছড়ালেন ট্রাম্প




শেষ পর্যন্ত যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা-ই হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। ১২ মে পর্যন্ত তাঁর কাছে সময় ছিল। কিন্তু এর আগেই তিনি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিলেন। তিনি যে এই কাজটি করবেন, সে ব্যাপারে অনেক আগেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি এই চুক্তি মানেন না। এখানে বলা ভালো, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো একরকম আতঙ্কে ছিল। তাদের সবার ধারণা ছিল, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে! আর ইরান যদি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলে, তাহলে তা এ অঞ্চলে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। এ লক্ষ্যেই ইরানের সঙ্গে ছয় জাতি পারমাণবিক আলোচনা শুরু করে। এই জাতির মধ্যে ছিল—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন। একমাত্র জার্মানি বাদে বাকি দেশগুলোর সবাই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। পরমাণু চুক্তি আলোচনায় জার্মানিকে নেওয়া হয়েছিল এ কারণে যে জার্মানির সঙ্গে তেহরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কেননা ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে জার্মানি। জার্মান ফার্ম সিমেন্স এ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছিল। প্রায় ৫০টির মতো জার্মান ফার্ম ইরানে কাজ করত। এটা বিবেচনা করেই ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি আলোচনায় জার্মানিকে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে একটি পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করেছিল। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে যে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে যে ইরানের সম্পদ ‘ফ্রিজ’ করা হয়েছিল, তা ‘ওপেন’ করে দেওয়া হয়। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও শুরু হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় যাত্রীবাহী বিমানের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ কেনারও সুযোগ পায় ইরান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। গত তিন বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। মোটামুটি সবাই সন্তুষ্ট ছিল যে ইরান শর্ত মেনে চলছে। কিন্তু গেল সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে। তিনি সংবাদ সম্মেলনে একটি ম্যাপ ও কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে দাবি করেন, ইরান এসব জায়গায় তার পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর এই দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলনের পরপরই International Atomic Energy Agency (IAEA) এক বিবৃতিতে এটি নিশ্চিত করেছিল যে ইরান চুক্তির সব ধারা অনুসরণ করে আসছে। ইরানের সঙ্গে ওই পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তিটি Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) নামে অভিহিত হয়ে আসছে। এটি অনেকেই জানেন যে পদত্যাগকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক ধরনের মতবিরোধ ছিল। টিলারসন কিছুটা নমনীয় ছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প একটি শক্ত অবস্থানে গিয়েছিলেন। ফলে টিলারসনকে চলে যেতে হয়েছিল।
এখন পরমাণু সমঝোতা কর্মসূচি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে গেল। যদিও ফ্রান্স ও জার্মানি বলছে, তারা এই কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এতে চুক্তিটির কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। কেননা যুক্তরাষ্ট্র বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে এই চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা একটি প্রশ্নের মুখে থাকবে। ট্রাম্প কর্তৃক এই চুক্তি বাতিলের আগেই ব্রাসেলসে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত হামিদ বাইদিনেজাদ বলেছিলেন, ট্রাম্প চুক্তিটি বাতিল করলে ইরান আবার তার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাঁর কথায়, ‘Without US, there is no deal left.’ এটিই হচ্ছে আসল কথা। যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ওই সমঝোতার কোনো মূল্য নেই। চুক্তিটি বাতিল করার সময় ট্রাম্প ইরান পারমাণবিক সমঝোতাকে ‘ক্ষয়ে যাওয়া’ ও ‘পচা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ওটি একটি বাজে চুক্তি! ট্রাম্পের ওই একগুঁয়েমি মনোভাব পরিবর্তন করতে অতি সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এসেছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। এমনকি ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন। তাঁরা সবাই চেষ্টা করেছেন ট্রাম্পকে বোঝাতে যে এই সমঝোতা চুক্তিটির প্রয়োজন কত বেশি। কিন্তু ইসরায়েলি লবির কারণেই ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ওই চুক্তিটি বাতিল করলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়েল ও সৌদি আরব। ইরান-সৌদি আরব দ্বন্দ্ব ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রিন্স সুলতানের সখ্যের খবর সবাই জানেন। ইরান পারস্য অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে চায়—এ অভিযোগ সৌদি আরবের। ইয়েমেনে সৌদি আরবের অব্যাহত বোমা হামলার পেছনে কাজ করছে এই সৌদি মানসিকতা। ইরান ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন করছে—এ অভিযোগ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত যেকোনো ‘অবরোধে’ খুশি হবে। ইসরায়েলের অবস্থানও অনেকটা তেমনই। ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড সিরিয়ায় নিয়োজিত রয়েছে। এ ধরনের একটি ক্যাম্পে ইসরায়েলের বিমানবাহিনী গত সপ্তাহে হামলা চালিয়েছে। সুতরাং ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন, তাতে ইসরায়েল খুশি হবে। কিন্তু ইরান এখন কী করবে? ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা হলেও বিশ্বের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে তাঁর দেশ। চুক্তিটি বাতিলের আগে তেহরানে এক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় দু-তিন মাস কিছু সমস্যা হলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে। একই সঙ্গে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সৃষ্টি করলে ইরান বসে থাকবে না।
মার্কিন মিডিয়ায় এখন নানা খবর। কী করতে পারে ইরান এখন? ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, (৯ মে) ইরানি হ্যাকাররা এখন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সাইবার অ্যাটাক’ করতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অকার্যকর করে ফেলার উদ্যোগ নিতে পারে সীমিত সময়ের জন্য। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে সুসান ই রাইস লিখেছেন, ‘Trumps Most Foolish Decision Yet.’ সুসান রাইস ওবামা প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মে প্রেসিডেন্ট ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মতে, ‘Iran will be able to resume its nuclear activities without being blamed for violating the agreement.’ শক্ত যুক্তি। ইরান চুক্তি অনুযায়ী ইরান দায়বদ্ধ ছিল। তখন যদি ইরান আবার পরমাণু কার্যক্রম শুরু করে ইরানকে দোষ দেওয়া যাবে না। একটি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আশঙ্কাও দেখছেন কেউ কেউ। বলা হচ্ছে ইসরায়েলি যুদ্ধ বিমানগুলো একসঙ্গে হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। এসব পারমাণবিক প্রকল্প থেকে ইরান তার প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ৬০ শতাংশ উৎপাদন করে। ইসরায়েলের একই সময় টার্গেট হতে পারে খারগ পোর্টকে (Port of Kharg) ধ্বংস করে দেওয়া, যার মাধ্যমে ইরান তার জ্বালানির ৯০ শতাংশ (গ্যাস ও তেল) বিদেশে রপ্তানি করে। তেল পরিশোধনের জন্য যেসব বড় রিফাইনারি আছে (যেমন—কেরমানশাহ, লাভাগ, তাবরিজ, আরভান্দ, বাহমান-গেন ইত্যাদি), তা-ও ধ্বংস করে দিতে পারে। উদ্দেশ্য ইরানি অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে ইরানকে দুর্বল করা। ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। ‘আরব বসন্ত’ সময়কালে ‘সরকার পরিবর্তনের’ একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানের ক্ষেত্রেও এই সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান চুক্তিটি বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি বিমান সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী ছোট্ট শহর কিসভেতে বিমান হামলা চালিয়ে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গ্রুপের একটি কনভয়কে ধ্বংস করে দিয়েছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বিমান হামলা এখন নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পষ্টতই ইসরায়েল এখন সিরিয়ার যুদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপে তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটা দূরত্ব তৈরি করে দিতে পারে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ইউরোপীয় মিত্র দেশ—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, Together we emphasize our continuing commitment to the JCPOA. This agreement remains important for our shared security. পরিষ্কার মেসেজ। পশ্চিমা দেশগুলো ইরান চুক্তিতে থাকতে চায়। তারা এই চুক্তিকে তাদের নিরাপত্তার প্রতি এক ধরনের গ্যারান্টি বলে মনে করছে। এর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র JCPOA বা ইরান চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেও অপর তিন ইউরোপীয় শক্তি (জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স) চুক্তির প্রতি কমিটমেন্ট থাকছে। এর ফলে দূরত্ব তৈরি হবে। এর আগে ইউরোপীয় স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।
ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথাও বলেছেন। এতে চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীন ও ভারত ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ইরান প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। চীন হচ্ছে তার বড় ক্রেতা। ২০১৭ সালে চীন ইরানের রপ্তানি করা জ্বালানি তেলের ২৪ শতাংশই একাই ক্রয় করেছিল। ভারত কিনেছিল ১৮ শতাংশ আর দক্ষিণ কোরিয়া ১৪ শতাংশ। এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে US National Defense Authorization Act অনুযায়ী কোনো কম্পানি যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যবসা করতে পারবে না। এর অর্থ চীনা ও ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কম্পানিগুলো এর পরও যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, যা কিনা নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিকোলাস ক্রিসটফ (Nicholas Kristof) Vandalism হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (Trums Move on Iran Deal : Simple Vandalism, May 9, 2018), তা বিশ্বকে আবারও একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন একটি নতুন দিকে মোড় নিল। সেখানে নতুন একটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ হলো। বিশ্ব নয়া স্নায়ুযুদ্ধের যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছে, এখন এতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। ইরানি পার্লামেন্টে মার্কিন পতাকায় আগুন দেওয়ার দৃশ্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এই দৃশ্য ১৯৭৯ সালের একটি দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিল, যখন ইরানি ছাত্ররা তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নিয়েছিল। সিরিয়ার সংকটকে কেন্দ্র করে মস্কো-পেইচিং-তেহরান অক্ষ গড়ে উঠেছিল। এখন এই অক্ষ আরো শক্তিশালী হবে মাত্র। ইরান সমঝোতা চুক্তি বাতিল করে ট্রাম্প শুধু বিশ্বে উত্তেজনার মাত্রা বাড়ালেন।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Kalerkontho
14.05.2018

অসম্ভবকে সম্ভব করলেন মাহাথির



অসম্ভবকে সম্ভব করলেন মাহাথির মোহাম্মদ। ইতিহাসের খাতায় নাম লেখালেন তিনি। ৯২ বছর বয়সে তিনি আবারও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। এ কাজটি তার জন্য সহজ ছিল না। চার-চারবার জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শুধু মালয়েশিয়ার জন্যই নয়, বরং মুসলিমবিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন একটি অবিস্মরণীয় নাম। একসময় জাতীয় রাজনীতি থেকে বিদায়ও নিয়েছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তার আর ফিরে আসার কথাও ছিল না। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। স্বেচ্ছায় তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের মতো তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে। গত ক’বছর তাকে আবার সক্রিয় হতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ব্যক্তিগত দুর্নীতি নিয়ে তিনি কথা বলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হন। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে নিজের পুরানো দল উমনোতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। এই উমনোতেই ১৯৪৬ সালে যোগদান করে তিনি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। উমনোতে যোগ দিতে না পেরে তিনি আলাদা একটি দলও গঠন করেছিলেন। কিন্তু ওই দলের অনুমোদন তিনি পাননি প্রথম দিকে। পরে পেয়েছিলেন এবং তিনি আনোয়ার ইবরাহিমের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট পাকাতন হারাপানে যোগ দেন। তার নেতৃত্বাধীন এই জোট গত ৯ মে মালয়েশিয়ার চর্তুদশ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। দীর্ঘ ৬০ বছরের উপরে ক্ষমতায় থাকা বারিসোআ নাসিওনাল জোট পরাজিত হয়। নির্বাচনের ফলে দেখা গেছে, মাহাথির মোহাম্মদ নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারপান জোট ২২২ আসনের সংসদে ১২২টি আসন পেয়েছে। আর নাজিব রাজাকের নেতৃত্বাধীন বারিসোআ নাসিওনাল পেয়েছে ৭৯টি আসন। ইসলামি দল পাস পেয়েছে ১৮টি আসন। বাকি তিনটি আসন পেয়েছে অন্যরা। বলা ভালো, পাকাতন হারপানের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন আনোয়ার ইবরাহিম, যিনি এখন সমকামিতার অভিযোগে জেলে এবং সম্পর্কে তিনি মাহাথিরের শ্যালিকা ডা. আজিজানের স্বামী। ডা. আজিজান এখন উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। পাকাতন হারাপান মূলত বিরোধী দলের একটি জোট। এই জোটে আছে আনোয়ার ইবরাহিমের পিকেআর, তাদের আসন ৪৯, কিয়াকের ডিএপি ৪২, মাহাথিরের পিপিবিএম ১২, ম্যাট সাবুরের আসানাহ ১০, শফি আবদালের ওয়ারিসান ৮ আসন পেয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি রাজ্যগুলোয়ও স্থানীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে দেখা যায় জহুর মালাক্কা, কেদাহ, পেনাং, সেলাঙ্গার, নেগেরি সেম্বিলান, পোরাক রাজ্যে পাকাতন সরকার গঠন করতে পারবে। সাবাহতে সরকার গঠনের জন্য স্বতন্ত্র দুই সদস্যের এবং পেরাকে সরকার গঠনের জন্য পাসের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
মাহাথির মোহাম্মদের এই বিজয় নিঃসন্দেহে মালয়েশিয়ার রাজনীতির জন্য একটি বড় ঘটনা। তবে তার প্রধান কাজ এখন পিকেআর-প্রধান আনোয়ার ইবরাহিমকে জেল থেকে বের করে আনা। এজন্য রাজার ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আনোয়ার ইবরাহিমই হবেন ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী। আনোয়ার ইবরাহিম জেল থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। অথচ মাহাথির যখন এর আগে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে তিনি আনোয়ার ইবরাহিমের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। সমকামিতার অভিযোগ এনে তাকে তিনি জেলেও পাঠিয়েছিলেন। সেই আনোয়ারই কিনা এখন তার শত্রু থেকে মিত্র। আনোয়ারই জেলে থাকা অবস্থায় পাকাতান হারপানের নেতৃত্বে দেওয়ার জন্য মাহাথির মোহাম্মদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একসময় আনোয়ার ইবরাহিম মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন সরকারে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
মাহাথির মোহাম্মদ এই ৯২ বছর বয়সে এসেও যে ‘সাহস’ দেখিয়েছেন, তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় কিছু ভুল করেছিলেন। এই ভুল শোধরানো ও মালয়েশিয়াকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্যই তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বটি নিতে চান। তিনি ভুল করেছেনÑ এই যে স্বীকারোক্তি, এই স্বীকারোক্তিকে মানুষ সম্মান দেখিয়েছে। তার প্রতি মানুষ আস্থা রেখেছে। তার ফল নির্বাচনে তার জোটের বিজয়। তার জন্য বিষয়টা সহজ ছিল না। কেননা মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বারিসোআ নাসিওনালের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘ ৬০ বছরের উপরে এই জোট ক্ষমতায়। উপরন্তু পুরানো সব দলই এই জোটে আছে। যেমন উমনো বা ইউনাইটেড ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের পাশাপাশি রয়েছে মালয়েশিয়ান চাইনিজ অর্গানাইজেশন, মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান কংগ্রেস, সারওয়াক ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, সাবাহ ইউনাইটেড পার্টি। চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে স্বাধীনতার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এদের সহযোগিতা নিয়েই উমনো দীর্ঘ ৬০ বছর একটি জোট বা ফ্রন্ট গঠন করে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিল। এরা যে নির্বাচনে হেরে যাবে, এটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদ এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করলেন। 
পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে আমরা ২০১৩ সালের ৫ মে যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার একটি ফল দিলাম। পাঠকরা মিলিয়ে দেখতে পারেন ২০১৩ সালে বারিসোআ নাসিওনালের কী অবস্থান ছিল। ওই নির্বাচনে বারিসোআ নাসিওনাল পেয়েছিল ১৩৩ আসন (মোট আসন ২২২)। এর মাঝে উমনো ৮৮, মালয়েশিয়ান চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ৭, মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান কংগ্রেস ৪, ভূমিপুত্র পার্টি ১৪, পিপলস মুভমেন্ট ১, ইউনাইটেড সাবাহ পার্টি ৪, সারওয়াক পিপলস পার্টি ৭, সারওয়াক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ৪, পাসোকমমগুন মুরুট অর্গানাইজেশন ৩, ইউনাইটেড সাবাহ পিপলস পার্টি ১টি আসন পেয়েছিল। আর বিরোধী পাকাতান রাকায়েত জোট পেয়েছিল ৮৯ আসন। এর মাঝে ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন পার্টি ৩৮, পিপলস জাস্টিস পার্টি ৩০, প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি ২১ আসন পেয়েছে। এই জোটে অন্য ছোট ছোট দল ওই নির্বাচন কোনো আসন পায়নি। 
মালয়েশিয়ায় এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তনকে অনেকে ‘রাজনৈতিক সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অনেক প্রশ্ন এখন সামনে আছে। কী হতে পারে মালয়েশিয়ায় এখন কিংবা মাহাথির কি আবারও তার আগের ক্যারিশমা দেখাতে পারবেন? প্রথমত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাহাথির যে ডাক দিয়েছিলেন, তা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছে। মানুষ বিশ্বাস করেছে, ক্ষমতার শীর্ষপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী (নাজিব রাজাক) নিজে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন। 1 Malaysian Development Berhad নামে একটি বিনিয়োগ সংস্থা গঠন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। ওই বিনিয়োগ সংস্থা থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার নাজিব রাজাকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বরাতে এই দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছিল। এই তথ্য নাজিব রাজাককে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেয়। তিনি এর জবাব দিতে পারেননি। শুধু বলেছেন, এই অর্থ এক সৌদি যুবরাজ তাকে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ এটা বিশ্বাস করেনি। একসময় নাজিব রাজাক ছিলেন মাহাথিরের ভাবশিষ্য। ২০০৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। একসময় রাজাক যাকে গুরু মানতেন, সেই মাহাথির মোহাম্মদই তার পতন ডেকে আনেন। দ্বিতীয়ত, এখন কি মাহাথির দুর্নীতির অভিযোগে নাজিব রাজাককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবেন? এ প্রশ্নটি উঠেছে এরই মধ্যে। মাহাথির বলেছেন, তিনি কোনো প্রতিশোধ নেবেন না। তবে তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এর অর্থ পরিষ্কার। নাজিব রাজাককে এখন ওই ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হবে। মাহাথির মোহাম্মদকে এই বিষয়টির ফয়সালা করতেই হবে। কেননা তিনি নির্বাচনি প্রচারে এই দুর্নীতির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছিলেন। তৃতীয়ত, আনোয়ার ইবরাহিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সেটাও দেখার বিষয়। আনোয়ার ইবরাহিমকে জেল থেকে মুক্তি, তার জন্য সংসদে একটি আসন দেওয়া অর্থাৎ একটি উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে আসাÑ এসবই এখন মাহাথিরকে করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, সংসদে মাহাথিরের নিজ দলের আসনসংখ্যা কম। তাকে সরকার পরিচালনায় আনোয়ার ইবরাহিমের দলের ওপর নির্ভর করতে হবে। চূড়ান্ত বিচারে আনোয়ার ইবরাহিমের সঙ্গে তিনি যদি কোনো বিষয়ে ‘বিবাদে’ জড়িয়ে যান, তাহলে তা তার জন্য ভালো কোনো সংবাদ বয়ে আনবে না। তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আগের মতো কর্মক্ষম নন তিনি। অনেকেই ধারণা করছেন, তিনি হয়তো আনোয়ার ইবরাহিমের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ফের ‘অবসরে’ যাবেন। তিনি যদি এদিকে অগ্রসর হন, তার নিজের জন্যও তা ভালো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের অনেক নেতাই ক্ষমতা ধরে রাখতে চান শেষ বয়সে এসেও (জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে)। এখন মাহাথির এটি করবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। চতুর্থত, সংসদের বর্তমান বিরোধী জোট হচ্ছে বারিসোআ নাসিওনাল। সুষ্ঠু সংসদ পরিচালনার জন্য মাহাথিরকে বারিসোআ নাসিওনাল অথবা তার আগের দল উমনোর সঙ্গে একটা আস্থার সম্পর্কে যেতে হবে। এই দুটি বড় জোটের সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক না থাকলে তিনি সরকার পরিচালনা করতে পারবেন না। পঞ্চমত, দীর্ঘ ৬০ বছর যে দলটি অথবা জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, প্রশাসনের সর্বত্র তার একটি সমর্থক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। মাহাথিরকে এদের আস্থা অর্জন করতে হবে। কাজটি মাহাথিরের জন্য খুব সহজ নয়। ষষ্ঠত, মালয়েশিয়ার অর্থনীতি আর আগের অবস্থানে নেই। অর্থনীতিকে আগের জায়গায় নিয়ে যেতে হলে সেখানে একটি সুষ্ঠু নীতি ও স্থিতিশীলতা দরকার। মাহাথিরের একটা প্লাসপয়েন্ট হচ্ছে, তিনি তার সঙ্গে তার পুরানো অনেক সহকর্মীকে পেয়েছেন, যারা যোগ্য। ফলে সরকার পরিচালনায় নতুনদের পাশাপাশি পুরানোদের সহযোগিতাও তিনি পাবেন। সপ্তমত, মালয়েশিয়ার এই নির্বাচন প্রমাণ করল, নেতৃত্ব যদি সৎ হয়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। এক্ষেত্রে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়। মাহাথির সেটা দেখিয়ে দিলেন। 
আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হচ্ছেন মাহাথির মোহাম্মদ। দীর্ঘ ১৫ বছর পর তিনি আবার দায়িত্ব পেলেন সরকার পরিচালনার। তবে এই ১৫ বছরে তার নিজের যেমন পরিবর্তন হয়েছে, ঠিক তেমনই পরিবর্তন এসেছে দেশটিতেও। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগে ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের। তার দুই ছেলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল দুর্নীতির। তিনি নিজে স্বীকার করেছেন, তিনি কিছু ভুল করেছিলেন। ১৫ বছর পর সেই আগের শক্তি, স্পিরিট তার আর নেই। এই ৯২ বছর বয়সে এসে তার কিছু পাওয়ারও নেই। এখন মানুষের প্রত্যাশা তিনি কতটুকু পূরণ করবেনÑ সেটাই বড় প্রশ্ন। 
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
পুনশ্চ : 
পিকেআর : পিপলস জাস্টিস পার্টি
ডিএপি : ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন পার্টি
পিপিবিএম : মালয়েশিয়ান ইউনাইটেড ইনডিজেনিয়াস পার্টি
আমানাহ : ন্যাশনাল ট্রাস্ট পার্টি
ওয়ারিসান : সাবাহ হেরিটেজ পার্টি
জিএস : গাসাসান সেজাহ্টেরা (জোট)
পাস : মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি
Daily Alokito Bangladesh
13.05.2018

এসএসসির ফলাফল ও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ


 প্রিন্ট সংস্করণ
১২ মে ২০১৮, ০০:০০ | 
এসএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ৬ মে। এবারে ৮টি সাধারণ বোর্ডের পাসের হার ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৪৫ জন। মাদ্রাসা বোর্ড আর কারিগরি বোর্ডের পাসের হার যথাক্রমে ৭০.৮৯ ও ৭১.৯৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৩৭১ ও ৪ হাজার ৪১৩। এ পাসের হারে ও জিপিএ বৃদ্ধিতে আনন্দিত ছোট ছোট বাচ্চারা। রোববার ফেসবুকে দেখেছি তাদের ছবি- কার মেয়ে, কার ভাই জিপিএ-৫ পেয়েছে- ফেসবুকে এসবেরই ছড়াছড়ি। দোয়া চেয়েছে সবাই ফেসবুকে- এটাই স্বভাবিক। আর শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিলেন পরীক্ষার খাতা ভালোভাবে দেখা হয়েছে! তাই তারপ্রভাব ফলাফলে পড়েছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ফলাফলে আদৌ প্রভাব ফেলেছে কিনা, এ সম্পর্কে অবশ্যি শিক্ষামন্ত্রী কিছুই বলেননি। তিনি বোধকরি এটাকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখেছেন! যারা ভালো ফলাফল করেছে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও যে প্রশ্নটি আমাকে ভাবিত করে, তা হচ্ছে এ জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা আগামী দু’বছর পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছবে, ওদের মাঝে কতজন তখন জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হতে পারবে? অভিজ্ঞতা তো আমাদের ভালো নয়।.
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার একদিন আগে একটি জনপ্রিয় দৈনিকে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে সংখ্যাগত উন্নয়ন হলেও, গুণগত উন্নতি হয়নি (বণিক বার্তা, ৫ মে)। প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে শিক্ষার মানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার মানের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় বৈশ্বিকভাবে ভারতের অবস্থান ২৭। শ্রীলংকার অবস্থান ৩৮, পাকিস্তানের ৬৬, আর নেপালের অবস্থান ৭০তম। এর অর্থ শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা নেপালের নিচে অবস্থান করছি! অথচ নেপালি ছেলে-মেয়েরা কিনা বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে! তাদের মান আমাদের চেয়েও বেশি! আমি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্টকে হালকাভাবে নিতে চাই না। এই রিপোর্ট পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, সে কথাটাও আমি বলব না। এই রিপোর্টের ভিত্তি আছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তা শিকারও করি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দি হিউম্যান ক্যাপিটাল রিপোর্ট-২০১৭’ এ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে জনবহুল দেশটিতে পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ বেকার থাকে। দেশটির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও নিুমানের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত বিষয়ের সংখ্যা খুবই কম। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যাল পর্যায়ে পড়াই, এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করতে পারি না।
তিন.
আমরা মানি, আর নাই মানি আমরা এদেশে জিপিএ-৫ মার্কা একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও উচ্ছ্বসিত হন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বেড়েছে দাবি করে! কিন্তু শিক্ষার মান তো আদৌ বাড়েনি। এটা সত্য দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি আর বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন অনেক। মানুষ বেড়েছে। এদের উচ্চশিক্ষা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। সরকার তাই একের পর এক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি প্রধানমন্ত্রী কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে কখনই করা হয় না- তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না। প্রতিষ্ঠানের হয়তো প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা। ভালো শিক্ষক আমরা তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যর্থতা একজন শিক্ষক হিসেবে আমারও। যারা টেক্সাসে এসেছেন, তারা দেখবেন ডালাস, অস্ট্রিন বা হিউস্টনে প্রচুর ভারতীয় বাস করেন। এরা কিন্তু সবাই অভিবাসীর সন্তান নন। এরা সরাসরি রিক্রুট হয়েই এদেশে এসেছেন। ভারত তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করেছে, যুুগোপযোগী করেছে। বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আইটি সেক্টরে প্রতি বছর ভারত যত গ্রাজুয়েট তৈরি করে, তা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরও বিদেশে এই দক্ষ জনশক্তি ‘রফতানি’ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞরা একটি বড় স্থান দখল করে আছেন। এরা সরাসরি ভারত থেকেই রিক্রুট হয়ে আসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চাচ্ছেন বটে। কিন্তু আইটি ফার্মগুলোর চাহিদা এত বেশি যে এটা বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হবে না। ইউরোপে আইটি জগতে জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করছে ভারতীয় ও চীনা ছাত্ররা। আমাদের এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম রয়েছে। এই তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও এদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে দিতে পারি। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট নীতি। এই নীতিটি প্রণয়ন করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু আমরা তা পারিনি। নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে যেসব বিষয় চালু করা হয়েছে, তার আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এতে করে বরং শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়ছে। আমি অবাক হয়ে যাই যখন দেখি নতুন নতুন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু ‘দলীয় ও ব্যক্তিগত’ স্বার্থ রক্ষায় এমন সব বিষয় চালু করা হয়েছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল শুধু প্রান্তিক জনপদকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে। গোপালগঞ্জ কিংবা পাবনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ লক্ষেই। কিন্তু সেখানে সাধারণ বিষয় চালু করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু যারা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান, তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের খাতিরে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে চলেছে। আমি অবাক হয়ে যাই এটা দেখে যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সাধারণ বিষয় চালু করার অনুমতিও দিয়েছে। দেশের বড় বড় যে ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে সাধারণ বিষয় রয়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয় চালু করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের অভ্যন্তরীণ মার্কেটের জন্য সাধারণ বিষয়ে পাস করা গ্রাজুয়েটরা চাহিদা মেটাতে সম্ভব। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় চালু করে আমরা শিক্ষিত বেকার সমস্যা বাড়াচ্ছি মাত্র। রাষ্ট্র তো এত বিপুল সংখ্যক সাধারণ গ্রাজুয়েটদের চাকরি দিতে পারবে না। আর বেসরকারি পর্যায়ে দরকার বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত গ্রাজুয়েট। প্রয়োজন আইটি সেক্টরের গ্রাজুয়েট। আমরা তা পারছি না। আমাদের শিক্ষানীতির দুর্বলতা এখানেই। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি নামে একটি কমিটি আছে। এই কমিটির সঙ্গে মাঝে মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী মিটিং করেন। তারা তাকে কী পরামর্শ দেন জানি না। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। আসলে দলীয় লোকদের নিয়ে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করলে, তা দিয়ে তেমন কোনো ‘ফল’ আশা করা যায় না। এরা তো শিক্ষামন্ত্রীর তোষামোদ করেই ব্যস্ত! নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত! শিক্ষামন্ত্রীকে তোষামোদেই ব্যস্ত! নিজেদের আগের গোছাতে ব্যস্ত। শিক্ষামন্ত্রীকে সঠিক পরামর্শ দেয়ার ইচ্ছে তাদের কৈ?
চার.
দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আর দক্ষ জনশক্তি দরকার এ কারণে যে আমাদের এর মধ্যে প্রথম ধাপে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। ২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যায়েও আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব। আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব শর্ত পূরণে সক্ষম হব। ফলে অনেক সুবিধা আমরা হারাব। আমাদের বিশ্ববাজার ধরে রাখতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ, আইটিনির্ভর ব্যবসা, কৃষি ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য দরকার হবে দক্ষ জনশক্তি। এ দক্ষ জনশক্তি আমরা গড়ে তুলতে পারব কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা আমাদের তৈরি করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক বিষয় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে একটি শক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে দক্ষ জনশক্তি আমরা তৈরি করতে পারব। এ জন্য দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক আমাদের দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যরা বাদ পড়ছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অর্থ। টিআইবি তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে! দুদক টিআইবির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে পারে। কিন্তু দুদক তা করেনি। ফলে এই প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা জানেন বিষয়টি। এই প্রবণতা যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে আমরা বিশাল জনগোষ্ঠীকে কখনই দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। এজন্য আমার আবারও সুপারিশ শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মঞ্জুরি কমিশনের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। অথবা পিএসসির মডেলে শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। সরকারি কলেজের শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা হবেন না কেন? এক সময় এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না, এটা সত্যি। কিন্তু তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক, প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭টি। নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ও হতে যাচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন যখন জড়িত, তখন প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষকের। ব্যক্তি পরিচয়, সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড হতে পারে না। দুই. বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বিবিএ আর এমবিএ’র ‘মাকাল ফল’ আমাদের উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব বিবিএ গ্রাজুয়েটের নামে শিক্ষিত কেরানি তৈরি করছি! ‘স্যুটেড-ব্যুটেড’ হয়ে এসব অর্ধশিক্ষিত তরুণরা কোনোক্রমে বাবার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একখানা বিবিএর সার্টিফিকেট নিচ্ছেন! বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিকসহ) একাধিক নামের এমবিএ কোর্স আছে। যিনি কোনোদিন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তিনি অর্থের বিনিময়ে আবার ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সার্টিফিকেট কিনছেন! একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে যেসব শিক্ষার চাহিদা রয়েছে (আইটির বিভিন্ন শাখা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, কৃষি ইত্যাদি), সেসব বিষয় চালু করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করারও প্রস্তাব করছি। তিন. আমাদের অনেক সিনিয়র শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পরও ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী থাকেন। তাদের স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে। বিশেষ করে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝেমধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট আর পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটের মান এক নয়। ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার মানের উন্নতি করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। চার. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো ভেঙে সাতটি বিভাগে সাতটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিভাগে অন্তর্ভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে সিলেবাস প্রণয়ন করবেন। নিজেরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোতে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। পাঁচ. মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় এখানে নিয়োগ হচ্ছে। ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন সরকারের তোষামোদে। পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লিখে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ আদায় করছেন।
পাঁচ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়েও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা তখন একশ’ অতিক্রম করেছে। এটা ভালো কী মন্দ, আমি সেই বিতর্কে যাব না। এরা জনশক্তি গড়তে একটা ভূমিকা রাখছে, এটা অস্বীকার করি না। তবে এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ। দরকার আধুনিক উপযোগী বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন। ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অনুচিত। এক্রিডিটেশন কাউন্সিল নিজেদের স্বার্থেই করা দরকার। প্রয়োজন ভালো ও সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ। সেই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলাদা একটি ইউজিসি টাইপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। একুশ শতকে আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের জন্য একটা বড় সংকট তৈরি করবে আগামী দিনে।
(ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র)
Jugantor
12.05.2018

এখনো প্রশ্নের মুখে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ



+
দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিক এলাকা পানমুনজসে দুই কোরিয়ার নেতা মুন জে ইন (দক্ষিণ কোরিয়া) ও কিম জং উনের (উত্তর কোরিয়া) মধ্যকার শীর্ষ বৈঠক গেল সপ্তাহে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে বড় ধরনের আলোচনার ঝড় তুললেও এ অঞ্চলে পারমাণবিক উত্তেজনা কতটুকু হ্রাস পেল, সে প্রশ্ন থেকেই গেল। সারা বিশ্বের মানুষ টিভি পর্দায় দেখেছে কিম জং উন ও মুন জে ইন সম্প্রতি লাগানো একটি পাইনগাছে মাটি দিচ্ছেন, পানি দিচ্ছেন। গাছের জন্য মাটি এসেছে দুই কোরিয়ার দুই পাহাড় থেকে। আর পানি এসেছে উত্তর কোরিয়ার তায়েদং নদী থেকে, আর এ পানি গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে দেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন। একই প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার হান নদীর পানি ছিটিয়ে দেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। দুজনে মিলে গাছের সম্মুখে লাগানো একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। স্মৃতিফলকে কোরিয়ার ভাষায় লেখা আছে—‘শান্তি ও সমৃদ্ধির বীজ বপন।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোরীয় উপদ্বীপে আদৌ কি শান্তি ও সমৃদ্ধি আসবে? কিংবা একসময়ে পশ্চিমা বিশ্ব যাকে স্বৈরাচারী বলত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাঁকে ‘রকেটম্যান’ বলেছেন, সেই কিম জং উনের সঙ্গে প্রস্তাবিত ট্রাম্পের বৈঠকটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে? আর হলে তা কবে হবে—মে অথবা জুন মাসে?
হঠাৎ করেই কেমন যেন বদলে গেলেন কিছুটা খেপাটে স্বভাবের উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। যিনি দীর্ঘদিন দক্ষিণ কোরিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন, তিনি হঠাৎ করেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিলেন কোরিয়া অঞ্চলকে পরিপূর্ণভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের। যৌথ ঘোষণাপত্রে সে কথাই আছে। ঘোষণাপত্রে বলা আছে, ‘ভবিষ্যতে কোরীয় উপত্যকায় আর কোনো যুদ্ধ হবে না। এবং শান্তির নতুন একটি দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে।’ শুধু তা-ই নয়, দুই পক্ষ (উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া) রাজি হয়েছে শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে উভয় পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রাখবে। চলতি মে মাসে উভয় দেশের সেনা নেতৃত্বও একটি বৈঠকে বসবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হচ্ছে কিম জং উনের একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেছেন, তিনি আশা করছেন দুই কোরিয়া একত্র হবে!
বদলে যাওয়া কিমের প্রতি কতটুকু আস্থা রাখা যায়, এ প্রশ্ন এখন অনেকের। আমি প্রতিদিন মার্কিন মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা হতে দেখছি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে কিম একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। গুয়ামে উত্তর কোরিয়া একটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে—এ ধরনের একটি ভুয়া খবরে ওই সময় বড় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তবে এর পেছনে কারণও ছিল। উত্তর কোরিয়া ওই সময় পর পর কয়েকটি আন্ত মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। একটি হাইড্রোজেন বোমারও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল দেশটি ওই সময়। সুতরাং দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যে আতঙ্কের মধ্যে ছিল, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। উত্তর কোরিয়ার ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড (THAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল। এই যখন পরিস্থিতি, তখন হঠাৎ করে উত্তর কোরিয়া তার সুর নরম করে কোরিয়া উপদ্বীপে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে রাজি হলো—এটা অনেক বিশ্লেষককেই অবাক করেছে। কিম একটি বৃহত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রের কথা, অর্থাৎ পুনরেকত্রীকরণের কথা বলছেন, এটাও বা কী করে সম্ভব?
কিম কেন নরম হলেন? এটা কি চীনের জন্য? কিম বহুল আলোচিত এক সফরে চীনে গিয়েছিলেন মার্চের শেষের দিকে। শীর্ষ পর্যায়ে কী কী আলোচনা হয়েছে, তার পুরোটুকু জানা না গেলেও, এতটুকু জানা গেছে, চীনা নেতারা তাঁকে সংযত আচরণ করতে বলেছিলেন। এটা কি তারই ফল? সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ালেও চীন তাতে সম্মতি দেয়। চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছিল। উত্তর কোরিয়া অনেক ক্ষেত্রেই চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীনের অসহযোগিতা উত্তর কোরিয়াকে বিপদেই ফেলেছিল। শেষ অবধি কিম জং উন বুঝতে পেরেছিলেন, চীন যদি তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতা না করে, তাহলে তাঁর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। ট্রাম্প সম্প্রতি তাঁর এশিয়া সফরে চীনে গিয়েছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, জাপানও উত্তর কোরিয়ার পারস্পরিক কর্মসূচিতে আতঙ্কিত ছিল। ট্রাম্প জাপানসহ এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সুতরাং চীনের ওপর ‘চাপ’ ছিল। প্রকারান্তরে সেই চাপ গিয়ে পড়ে উত্তর কোরিয়ার ওপর। দ্বিতীয়ত, কিম দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পেরেছেন। এতে করে কিম-ট্রাম্প বৈঠকটি আরো সহজ হলো। তৃতীয়ত, দুই কোরিয়ার বৈঠকে উত্তর কোরিয়ায় অর্থনৈতিক সাহায্যের পথটি আরো সুগম হলো। উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। খাদ্য ঘাটতি সেখানে রয়েছে। দুর্ভিক্ষের কথাও শোনা যায়। এমনি এক পরিস্থিতিতে দুই কোরিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ কোরিয়া আবার উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিক সাহায্য দেবে। সেই সঙ্গে জাপানসহ অন্যান্য দেশের সাহায্যও পাওয়া যাবে। এটা কিমের বিবেচনায় ছিল। চতুর্থত, উত্তর কোরিয়াকে পারস্পরিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে সেখানে পারস্পরিক স্থাপনায় সীমিত পাল্লার পারস্পরিক হামলার কথা কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছিল। পেন্টাগনের অনেক সিনিয়র জেনারেল এ ধরনের একটি হামলার ছক প্রয়োগ করেছিলেন বলে কোনো কোনো মার্কিন গণমাধ্যমে এটা প্রকাশিত হয়েছিল। কিম জং উন এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচের’ ব্যবস্থা করলেন। পঞ্চমত, অতি সম্প্রতি গোপনে উত্তর কোরিয়া গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও। পম্পেও সাবেক সিআইএপ্রধান। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে তাঁর যথেষ্ট ধারণা আছে। যদিও বলা হচ্ছে, তাঁর ওই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প-কিম বৈঠকের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করা। তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে যে বিষয় নিয়েই আলোচনা করে থাকুন না কেন, দুই কোরিয়ার মধ্যে সংলাপের বিষয়টি যে ছিল, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। পম্পেও এ ক্ষেত্রে সফল। তবে এটাও ঠিক, এর বিনিময়ে পম্পেও উত্তর কোরিয়াকে কিছু একটা ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে এসেছেন। সেই ‘প্রতিশ্রুতি’ যে কী, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কোরিয়া একটি বিভক্ত সমাজ। দুই কোরিয়ায় দুই ধরনের সমাজব্যবস্থা রয়েছে। একসময় যুক্ত কোরিয়া চীন ও জাপানের উপনিবেশ ছিল। ১৯০৪-০৫ সালে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যকার যুদ্ধের পর কোরিয়া প্রকৃতপক্ষে জাপানের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর মার্কিন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী কোরিয়ায় ঢুকে পড়ে ও জাপানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কৌশলগত কারণে কোরিয়াকে দুই ভাগ করে। এক অংশে মার্কিন বাহিনী, অন্য অংশে সোভিয়েত বাহিনী অবস্থান নেয়। সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতিতেই কোরিয়ার উত্তরাঞ্চলে (আজকে যা উত্তর কোরিয়া) একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে নিউ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে নবগঠিত কোরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি একীভূত হয়ে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে। ১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তার অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করলে যুদ্ধ বেধে যায়। জাতিসংঘ এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করার জন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ বাহিনী মাঞ্চুরিয়া সীমান্তে উপস্থিত হলে ১৯৫০ সালের ২৬ নভেম্বর চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় এবং চীনা সৈন্যরা দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ১৯৫১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা পুনরুদ্ধার করে। ১৯৫১ সালের ২৩ জুন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কার্যকর হয় দুই বছর পরে, ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই। এরপর থেকে কার্যত উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া দুটি রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখে আসছে।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু এই অঞ্চল নয়, বরং বিশ্বের জন্যও অনেকটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবরে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর থেকেই দেশটি আলোচনায় আছে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর এই অঞ্চলে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়। এরপর থেকেই আলোচনা শুরু হয় কিভাবে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণুমুক্ত করা সম্ভব। একপর্যায়ে চীনের উদ্যোগে ২০০৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি উত্তর কোরিয়া একটি চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া তার Yongbyon পারমাণবিক চুল্লিটি বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তার পারমাণবিক চুল্লি পরিদর্শনেরও সুযোগ করে দেয়। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে ৫০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এর পরপরই ২০০৭ সালের অক্টোবরে দুই কোরিয়ার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোহ মু হিউম ২ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া যান এবং সেখানকার প্রেসিডেন্ট ও আজকের উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বাবা কিম জং ইলের (প্রয়াত) সঙ্গে বৈঠক করেন। এটা ছিল দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠক। প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালের ১২ জুন। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কিম দাই জং মিলিত হয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং ইলের সঙ্গে। এখন ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল কিম জং ইলের ছেলে কিম জং উন মিলিত হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনের সঙ্গে। এটা তৃতীয় শীর্ষ বৈঠক।
এই বৈঠক কতটুকু বদলে দিতে পারবে উত্তর কোরিয়াকে? কতটুকু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ করতে পারবে উত্তর কোরিয়াকে—এসব প্রশ্নের জবাব এই মুহূর্তে কারো কাছেই নেই। দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ আদৌ সম্ভব, এটাও এই মুহূর্তে দেখছেন না কেউ। তবে দুই কোরিয়ার শীর্ষ বৈঠক নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। এর রেশ ধরে হয়তো ট্রাম্প-কিম বৈঠকটিও অনুষ্ঠিত হবে মে অথবা জুন মাসে। কোরীয় উপদ্বীপে পারমাণবিক উত্তেজনা কারো জন্যই কোনো ভালো খবর নয়। এখন এই উত্তেজনা কমে আসবে বলেই সবার ধারণা।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Kalerkontho
07.05.2018

দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ : সম্ভাবনা ও বাস্তবতা


আন্তর্জাতিক


২৭ এপ্রিল দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যকার বৈঠকে একটি সম্ভাবনা সামনে চলে এসেছে; আর তা হচ্ছে দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ। এই একত্রীকরণ কতটুকু সম্ভব, আদৌ সম্ভব কি না কিংবা কী প্রক্রিয়ায় এই একত্রীকরণ সম্ভব হবেÑ এসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, স্বয়ং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মুখ থেকে বিষয়টি উচ্চারিত হয়েছে। দুই কোরিয়ার শীর্ষ বৈঠকের পর কিম জং উনের বক্তব্য ছাপা হয়েছে এভাবেÑ তিনি চান দুই কোরিয়া একত্রিত হোক! কিন্তু আসলেই কি তিনি চান? কিংবা বাস্তবতা কী বলে? দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ কী সম্ভব? ২০০০ সালে প্রথম বৈঠক, ২০০৭ সালে দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকের পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ। কিন্তু একত্রীকরণ আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। তাই ২০১৮ সালে তৃতীয় শীর্ষ বৈঠকের পরও যে এ ব্যাপারে অগ্রগতি হবে, তা বিশ্বাস হয় না।
সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিতে দুটি দেশের কথা বলা যায়, যেখানে দেশ দুইটি একত্রিত হয়েছে। ইয়েমেন ও জার্মানির একত্রীকরণ আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত। ইয়েমেন ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন। ১৯৭৮ সালে দেশ দুইটি একত্রিত হয়। যদিও ‘আরব বসন্ত’পরবর্তী সময়ে সেখানে একধরনের গৃহযুদ্ধ লক্ষ করা গেছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ভাগ হয়ে গিয়েছিলÑ পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি। পূর্ব জার্মানি ছিল সমাজতান্ত্রিক, আর পশ্চিম জার্মানি ছিল পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। ৯ নভেম্বর (১৯৮৯) বার্লিন দেয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে দুই জার্মানির একত্রীকরণের পথ সুগম হয়েছিল। আর একত্রীকরণ সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। তা হলে এখন বাকি রইল কোরিয়া। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? দুই কোরিয়ার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। বলা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। ব্লুমবার্গ কোন কোন খাতে উত্তর কোরিয়ায় বিনিয়োগের জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে, তার একটি ধারণা দিয়েছে। যেমন নেটওয়ার্ক খাতে ৬১.২ বিলিয়ন, কয়লা সেক্টরে ১৩.১ বিলিয়ন, গ্যাস সেক্টরে ৭.৪ বিলিয়ন, পারমাণবিক খাতে ৩০.২ বিলিয়ন, অন্যান্য খাতে ১০.৪ বিলিয়ন ডলার। সবমিলিয়ে প্রয়োজন হবে ১২২.৪ বিলিয়ন ডলার (ব্লুমবার্গ মার্কেটস, ২৬ এপ্রিল ২০১৮)। এই অর্থ কোত্থেকে আসবে? এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মার্কিন ব্যবসায়ীরা এখন তাকিয়ে আছেন ট্রাম্প-কিম বৈঠকের দিকে। মে অথবা জুন মাসে এ বৈঠকটি হতে পারে। আর বেঠকটি যদি সফল হয়, তাহলে একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে মার্কিন ব্যবসায়ীদের জন্য উত্তর কোরিয়ায় বিনিয়োগে। কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন আছেই। কিম জং উন কি উত্তর কোরিয়াকে উন্মুক্ত করে দেবেন? উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী কি তাতে রাজি হবে?
কোরিয়া একটি বিভক্ত সমাজ। দুই কোরিয়ায় দুই ধরনের সমাজব্যবস্থা রয়েছে। একসময় যুক্ত কোরিয়া চীন ও জাপানের উপনিবেশ ছিল। ১৯০৪-০৫ সালে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যকার যুদ্ধের পর কোরিয়া প্রকৃতপক্ষে জাপানের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর মার্কিন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী কোরিয়ায় ঢুকে পড়ে ও জাপানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কৌশলগত কারণে কোরিয়াকে দুই ভাগ করে। এক অংশে মার্কিন বাহিনী, অন্য অংশে সোভিয়েত বাহিনী অবস্থান নেয়। সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতিতেই কোরিয়ার উত্তরাঞ্চলে (আজকে যা উত্তর কোরিয়া) একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে নিউ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে নবগঠিত কোরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি একীভূত হয়ে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে। ১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তার অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করলে যুদ্ধ বেধে যায়। জাতিসংঘ এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করার জন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ বাহিনী মাঞ্চুরিয়া সীমান্তে উপস্থিত হলে ১৯৫০ সালের ২৬ নভেম্বর চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় এবং চীনা সৈন্যরা দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ১৯৫১ সালে এপ্রিলে জাতিসংঘ বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা পুনরুদ্ধার করে। ১৯৫১ সালের ২৩ জুন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কার্যকর হয় দুই বছর পর, ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই। এরপর থেকে কার্যত উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া দুইটি রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখে আসছে।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু এই অঞ্চল নয়, বরং বিশ্বের জন্যও অনেকটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবরে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর থেকেই দেশটি আলোচনায় আছে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর এই অঞ্চলে একধরনের নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়। এর পর থেকেই আলোচনা শুরু হয়, কীভাবে উত্তর কোরিয়াকে পরমাণুমুক্ত করা সম্ভব। একপর্যায়ে চীনের উদ্যোগে ২০০৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি উত্তর কোরিয়া একটি চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া তার Yongbyon পারমাণবিক চুল্লিটি বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তার পারমাণবিক চুল্লি পরিদর্শনেরও সুযোগ করে দেয়। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে ৫০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এর পরপরই ২০০৭ সালের অক্টোবরে দুই কোরিয়ার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোহ মু হিউম ২ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া যান এবং সেখানকার প্রেসিডেন্ট ও আজকের উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বাবা কিম জং ইলের (প্রয়াত) সঙ্গে বৈঠক করেন। এটা ছিল দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠক। প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালের ১২ জুন। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কিম দাই জং মিলিত হয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং ইলের সঙ্গে। এখন ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল কিম জং ইলের ছেলে কিম জং উন মিলিত হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে। এটা তৃতীয় শীর্ষ বৈঠক।
এখন এই তৃতীয় বৈঠকটি কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়। একত্রীকরণের ফল কী হতে পারে, তা উত্তর কোরিয়ার নেতাদের জানার কথা। ইয়েমেনে একত্রীকরণ সেখানে গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। জার্মানি একত্রীকরণে সাবেক পূর্ব জার্মানির প্রদেশগুলো খুব লাভবান হয়নি; বরং সেখানে একত্রীকরণের ২৮ বছর পার হওয়ার পরও দারিদ্র্য আছে। মার্চ মাসে আমার সুযোগ হয়েছিল জার্মানি যাওয়ার। আমি সাবেক পূর্ব জার্মানির একটি শহর ব্রান্ডেনবার্গেও গিয়েছিলাম। সেখানকার দারিদ্র্য আমি দেখেছি। ফলে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া যদি কোনোদিন একত্রিত হয়ও, তাতে লাভবান হবে দক্ষিণ কোরিয়া। সমাজব্যবস্থাইবা কী হবে? একটি হংকং মডেল? যেখানে হংকং চীনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির পরও সেখানে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা বজায় রেখেছে। এখন সে রকমটি কী হতে পারে কোরিয়া একত্রীকরণের পর, অর্থাৎ উত্তর কোরিয়া তার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বহাল রাখবে? তত্ত্বগতভাবে এটা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবগত কারণেই এটা সম্ভব হবে না। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলইÑ একত্রীকরণের পর কোরিয়া কোন অর্থনীতি গ্রহণ করবেÑ সমাজতান্ত্রিক নাকি পুঁজিবাদী?
দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘ঐক্য’ কী করে সম্ভব? দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘শত্রু’ হিসেবেই এতদিন গ্রহণ করেছে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী। সেই মানসিকতা পরিত্যাগ করা কি সম্ভব? যৌথ শিক্ষা কার্যক্রমইবা কীভাবে পরিচালিত হবে? উত্তর কোরিয়ায় কোনো দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল নেই। সেখানে কি দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল গড়তে দেওয়া হবে? এ ধরনের শত শত প্রশ্ন এখন উঠবে। তবে ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় রেখেই দুই কোরিয়ার মধ্যে একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। একধরনের কনফেডারেশন? এক কোরিয়ার পতাকাতলে তো খেলোয়াড়রা অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন। তেমনই একধরনের রাজনৈতিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে কোরিয়ার একত্রীকরণ সম্ভব। তবে ভয়টা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের উদ্দেশ্য নিয়ে। বিখ্যাতForeign Policy ম্যাগাজিনে উত্তর কোরীয় নেতার সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মিসাইল জে. গ্রিন তার একটি প্রবন্ধে ((Pyongyang is Playing Washington and Seoul, April 27, 2018) ) এ ধরনের একটি আশঙ্কাই করছেন। তার মতে, উত্তর কোরিয়ার নেতারা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এই উদ্যোগকে (উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়া সংলাপ) কাজে লাগাতে পারে। এটা একটা আশঙ্কা। তবে বলাই বাহুল্য, এই সংলাপ যদি সফল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনকারীদের জন্য তা হবে দুঃসংবাদ। ইতোমধ্যে তাদের কোম্পানির শেয়ার মার্কেটে দরপতন হয়েছে। যেমন লকহিড মার্টিনের শেয়ারবাজারের পতন হয়েছে ২.৫ ভাগ, যার পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯২.১ বিলিয়ন ডলার। নর্থবোরা গ্রুমম্যানের শেয়ারের পতন ঘটেছে ৩.২০ ভাগ, যার বাজারমূল্য ৬২.৫ বিলিয়ন; জেনারেল ডায়নামিকস ৩.৮ ভাগ, যার বাজারমূল্য ৬০.৭ বিলিয়ন; রেথিউন ৩.৬ ভাগ, বাজারমূল্য ৫০.৮ বিলিয়ন ডলার এবং বোয়িং শতকরা ১ ভাগ, বাজারমূল্য ২০০.২ বিলিয়ন ডলার। এটা একটা চিন্তার কারণ। তারা কি এই সফলতা দেখতে চাইবে? এতে তো অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসব অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানি। বিশেষ করে THAAD বা Termind High Altitude Area Defense ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলা যায়। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উৎপাদন করে লকহিড মার্টিন। অব্যাহত উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলার মুখে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ায় এই  THAAD ক্ষেপণাস্ত্র বসায়। এক-একটি  THAAD ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমে ছয়টি করে রকেট থাকে, যা মহাশূন্যে যে-কোনো শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দিতে পারে। এক-একটি  THAAD ক্ষেপণাস্ত্রের দাম এক বিলিয়ন ডলার। এখন যদি কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আর  THAAD ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে না। এটা কি লকহিড মার্টিন চাইবে? তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাব খাটাতে চাইবে। তাই দেখা যায়, দুই কোরিয়ার শীর্ষ বৈঠকের ব্যাপারে ট্রাম্প খুব একটা আশাবাদী হননি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সৈন্য রয়েছে। আর উত্তর কোরিয়ার কাছে রয়েছে ৬০টির মতো পারমাণবিক বোমা। শীর্ষ বৈঠকের পর উত্তর কোরিয়া তার একটি পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এসব সংবাদ আশাবাদী হওয়ার মতো; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস। এই শীর্ষ বৈঠক আমাদের কতটুকু আশাবাদী করতে পারবে, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলবে। তাই খুব সংগত কারণেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি থাকবে কোরীয় উপদ্বীপের দিকে।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
06.05.2018

সিরীয় সঙ্কট : ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ


সিরিয়ার সঙ্কটকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্প্রতি পশ্চিমা সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। সংবাদটি হচ্ছে, আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোটেলের ইসরাইল সফর। সিরিয়া এই সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। একজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ইসরাইল সফরে যেতেই পারেন। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশের বিমানগুলো সরাসরি সিরিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সিরিয়ার রাসায়নিক স্থাপনাগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তা ধ্বংস করে দিয়েছে। এই বিমান হামলা সরাসরি সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল। জেনারেল ভোটেলের এই সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসরাইলকে এই যুদ্ধে জড়িত করা। যদিও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসরাইল এই যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। ইসরাইলি বিমানগুলো এর আগে সিরিয়ায় বোমাবর্ষণ পর্যন্ত করেছিল।
সিরিয়ার যুদ্ধ কোিদকে এখন মোড় নেবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এই যুদ্ধ একটি বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের (গ্রেটার ইসরাইল) জন্য পরিকল্পনার অংশ কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে কোনো কোনো মহলে আলোচনা হচ্ছে। জেনারেল ভোটেলের ইসরাইল সফর এ লক্ষ্যে হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। সঙ্গত কারণেই তাই বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। বলা হয়, ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই এই বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার সঙ্গে যার নাম জড়িত, তিনি হচ্ছেন ওডেড ইনন (Oded Yinon) নামে একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট। তিনি যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন, তা ‘ইনন পরিকল্পনা’ নামে খ্যাত। প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিকল্পনাকারী থিওডোর হার্জেল, যিনি জিওনবাদের প্রবক্তা, তিনি একসময় যে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেছিলেন, ওডেড ইনন সেই পরিকল্পনার একটি বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। ইনন পরিকল্পনায় রয়েছে, লেবানন ও সিরিয়াকে ভেঙে একাধিক রাষ্ট্রে পরিণত করা (দেখুন Oded Yinon, A Strategy for Israel in the Nineteen Eighties, Belment, Massachusetts, 1982)। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও, আজ পর্যন্ত এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে স্ট্র্যাটেজিতে নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। আরব বিশ্বে যদি বিভক্তি জিইয়ে রাখা যায়, তাতেই লাভ ইসরাইলের। আজ এত বছর পর ইসরাইল অনেক অংশে সফল। আরব বিশ্বে বিভক্তি এত বেশি স্পষ্ট এখন, অতীতে তেমনটি ছিল না। কাতার-সৌদি আরব দ্বন্দ্ব, সৌদি আরব-ইয়েমেন দ্বন্দ্ব কিংবা সৌদি আরব ও ইরান কর্তৃক এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা, কুর্দিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সিরিয়া-ইরাকে আইএসএর উত্থান ও পতন, সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্বে এত বেশি বিভক্তি যে, এই বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলের এই পরিকল্পনা যদি সফল হয়, তাহলে এই একুশ শতকেই নতুন এক আরব বিশ্বকে আমরা দেখতে পাব। ইনন পরিকল্পনায় একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্মের কথা যেমনি বলা হয়েছে, ঠিক তেমনি বলা হয়েছে একটি ‘গ্রেটার ইসরাইল’ রাষ্ট্রের কথাও। যেমন বলা হয়েছে গ্রেটার ইসরাইলি রাষ্ট্রটি গঠিত হবে পুরো ফিলিস্তিনি এলাকা, দক্ষিণ লেবানন থেকে সিডন (Sidon) এবং লিটানি (Litani River) নদী, সিরিয়ার গোলান উপত্যকা, (যা এখন ইসরাইলের দখলে), হাওরান (Howran) ও দেরা (Deraa) উপত্যকা, হিজাজ (Hijaz) রেলপথ দেরা থেকে আম্মান জর্দান পর্যন্ত। এবং সেই সঙ্গে Gulf of Aquaba-এর নিয়ন্ত্রণভার। কোনো কোনো ইসরাইলি স্ট্র্যাটেজিস্ট আরো ইহুদি এলাকা সম্প্রসারণের পক্ষে- পশ্চিমে নীল নদ থেকে পূর্বে ইউফ্রেতিস নদী পর্যন্ত, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ফিলিস্তিনি এলাকা, লেবানন, পশ্চিম সিরিয়া ও দক্ষিণ তুরস্ক। স্টেফান লেন্ডম্যানের (Stephen Lendman) বই Greater Israel-এ এমন ধারণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখন এই বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের ধারণা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, সেটা একটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু ট্রাম্প তার নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সিরিয়ায় আরো কিছু সৈন্য প্রেরণ করা, সিরিয়ার সঙ্কটে ইসরাইলের জড়িয়ে যাওয়া, স্বাধীন একটি কুর্দি রাষ্ট্র গঠনে (সিরিয়া ও ইরাকের অংশ বিশেষ নিয়ে) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমর্থন প্রমাণ করে ইসরাইল তার সেই পুরনো ধারণা এখনো পরিত্যাগ করেনি। ইসরাইল এটাকে তার নিরাপত্তার সঙ্গে এক করে দেখছে। যদি আরব বিশ্বকে ছোট ছোট রাষ্ট্রে ভাগ করা যায়, তাতে করে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেও আমরা হালকাভাবে দেখতে পারি না। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল এক স্বার্থ রয়েছে। সিরিয়ায় জ্বালানি তেলের (গ্যাস ও তেল) বিশাল ভান্ডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আকৃষ্ট করেছে এ অঞ্চলে একটি ‘ঘাঁটি’ করার ও অনেক দিনের জন্য সেখানে থেকে যাওয়ার। পাঠক মাত্রেই লক্ষ করে থাকবেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে শুধু একটি কারণেই; আর তা হচ্ছে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুর্দি এলাকায় মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অবস্থান। মার্কিন সেনাবাহিনী সেখানে অবস্থান করছে কুর্দি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য! তুরস্ক ইতোমধ্যে সিরিয়ার অভ্যন্তরে সেনা অভিযান পরিচালনা করেছে এবং কুর্দি শহর আফরিন দখল করে নিয়েছে। কুর্দিদের পার্শ্ববর্তী শহর মানবিজ, সেখানে অবস্থান করছে মার্কিন বাহিনী। কোনো কোনো মার্কিন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সিরিয়ার ৩০ শতাংশ এলাকা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে (মিন্ট প্রেস, ১৬ এপ্রিল ২০১৮)। এই ৩০ শতাংশ এলাকাতেই রয়েছে সিরিয়ার তেল, গ্যাস আর সুপেয় পানির আধার। গুরুত্বপূর্ণ দাইর এজর (Deir Ezzor, Al-Hasakah, Raqqa), আল হাসাকা ও রাকা অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। রাকা ও দাইর এজর এ রয়েছে তেলের বিশাল ভান্ডার। একই সঙ্গে হামা, হোমসসহ রাকা অঞ্চলেও রয়েছে গ্যাসের ভান্ডার। সিরিয়ার তেল ও গ্যাসের শতকরা ৯৫ ভাগ রয়েছে এই এলাকায়। সিরিয়ার বিখ্যাত তেল রিফাইনারি ‘আল ওমর’ও এ এলাকায় অবস্থিত। সিরিয়া সঙ্কটের আগে প্রতিদিন এই অঞ্চল থেকে ৩,৮৭,০০০ ব্যারেল তেল ও ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস উত্তোলিত হতো। সিরিয়ায় তেলের রিজার্ভ ধরা হয় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল, যা কিনা এই অঞ্চলে অবস্থিত এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা এখন মার্কিন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সিরিয়ার বিখ্যাত কনোকো গ্যাস ফিল্ডও (Conoco) এই এলাকায় অবস্থিত, যেখান থেকে প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস উত্তোলিত হয়। বিখ্যাত কনোকো ফিলিপ এই গ্যাস আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ সিরিয়ার ব্যাপারে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, কনোকো ফিলিপ এই গ্যাস ফিল্ড ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এই তেল ও গ্যাস ফিল্ডের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় গিয়েছিল। আর ওই সমঝোতার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিমাসে কুর্দি নেতৃত্বকে ১০ মিলিয়ন ডলার করে দিয়ে আসছে। কুর্দিরা এই তেল উত্তোলন করে ইরাকি কুর্দিদের সরবরাহ করে। সেখানে ওই তেল পরিশোধিত হয়ে তুরস্কের কাছে বিক্রি করা হয়। মজার ব্যাপার, এই তেল বিক্রি ও সরবরাহে মধ্যস্থতা করে একদল আন্তর্জাতিক ‘তেল বিশেষজ্ঞ’! এক্ষেত্রে কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক সরকারের কোনো ভূমিকা নেই।
সিরিয়া সঙ্কটের সঙ্গে কাতার-তুরস্ক প্রস্তাবিত পাইপলাইন এবং ইরান-ইরাক-সিরিয়া পাইপলাইনেরও একটা সম্পর্ক আছে। ইউরোপের প্রচণ্ড গ্যাসের চাহিদা মেটাতে উদ্যোগ নিয়েছিল আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো। তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিল। কাতার-তুরস্ক পাইপলাইন, যার উদ্যোক্তা হলো যুক্তরাষ্ট্র, এ রকম একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। কাতারের গ্যাস দীর্ঘ পাইপলাইনে সিরিয়া ও তুরস্কের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হবে ইউরোপে। বড় বড় কোম্পানি (১১টি), যেমন- টোটাল, কনোকো ফিলিপস, বিএইপি, সেভরন এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। কিন্তু সিরিয়া এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এর বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার একটি প্রস্তাব ছিল। যাতে ইরানি গ্যাস সিরিয়ার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ইউরোপে। একই সঙ্গে রাশিয়া Turkstream Project-এর মাধ্যমে গ্যাস তুরস্কের সহযোগিতায় নিয়ে যেতে চায় ইউরোপ। রাশিয়ার গজপ্রম কৃষ্ণ সাগরের নিচ দিয়ে এই গ্যাস তুরস্কে সরবরাহ করবে, যা ২০১৯ সালে ইউরোপে যাবে। ইতোমধ্যে তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে এ ব্যাপারে একটি চুক্তিও করেছে। ফলে সিরিয়া সঙ্কটের সঙ্গে এই জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি সুপেয় পানির প্রশ্নটিও আছে। যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তিনটি রিজার্ভিয়ার রয়েছে, যেখানে সুপেয় পানি ধরে রাখা হয়। এই সুপেয় পানির ওপর নির্ভরশীল সিরিয়ার একটি বড় অংশ। বিশেষ করে আলেপ্পো শহর ও আশপাশের সুপেয় পানির অন্যতম উৎস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থিত তিনটি জলাধার- লেক আসাদ, তারকা বাঁধ ও তিসরিব বাঁধ। আলেপ্পোর বিদ্যুৎও আসে এখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে। বাঁধের পানি দিয়ে যে শস্য ফলানো হয়, তা সিরিয়ার খাদ্য চাহিদার অনেকাংশ পূরণ করে। শুধু তারকা বাঁধের ওপর ৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ নির্ভরশীল। ইউফ্রেটিস নদীর পানি সরবরাহও এই তিনটি পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল। স্ট্র্যাটিজিক্যালি এই তিনটি বাঁধের গুরুত্ব অনেক বেশি।
আরো একটা কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। আর তা হচ্ছে, গোলান উপত্যকায় বিশাল তেলের রিজার্ভ। এটি সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যে রেজিস্ট্রিকৃত একটি কোম্পানি Genie Oil and Gas গোলান উপত্যকার ১৫৩ বর্গমাইল এলাকার তেল ও গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব পেয়েছে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে এই এলাকাটি ইসরাইল দখল করে নেয়। এরপর আর এই এলাকাটি সিরিয়াকে ফেরত দেয়নি ইসরাইল। বলা হচ্ছে, সৌদি আরবের পরেই এই এলাকায় সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভ রয়েছে। লক্ষ করে দেখবেন Genie Oil and Gas কোম্পানির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যুক্তরাষ্ট্রে নিউকন হিসেবে পরিচিত এবং ইসরাইলের পক্ষে এরা কাজ করছেন। যেমন- জেমস উলসে, রিচার্ড চেনি, রুপার্ট মারডক, বিল রিচার্ডসন, জেকস রথশিল্ড প্রমুখ। জেমস উলসে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সিআইএ প্রধান ছিলেন। তিনি ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক Foundation for Defence of Democracy-এর চেয়ারম্যান। এই থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত বিষয়ে উপদেশ দিয়ে থাকে। ডিক চেনি ছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। বিল রিচার্ডসন ছিলেন ক্লিনটনের বন্ধু ও মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর। রুপার্ড মারডক মিডিয়া টাইকন। এদের প্রায় সবাই ইহুদি ও ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করছেন। গোলান উপত্যকা তাই একই সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল পানির আধারও রয়েছে গোলান উপত্যকায়। এই এলাকা আর সিরিয়ার তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ উত্তর-পূর্বাঞ্চল (কুর্দি এলাকা) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে স্ট্র্যাটেজি রচনা করছে তাতে সহসা সিরিয়ায় যুদ্ধ থেমে যাবে না। তাই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘যুদ্ধ’ আসন্ন! এ ধরনের একটি আশঙ্কার কথাই বলেছেন মোসেস অ্যাপোসট্যাটিকুস (Moses Apostaticus) তার প্রবন্ধে Genie oil : The Real Reason Syria is A World War III Flashpoint (XYZ, May 23, 2017. XYZ একটি অনলাইন ম্যাগাজিন)।
সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে কত বড় স্বার্থ আছে, তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে পেন্টাগনের আর্থিক সহায়তায় সিরিয়ার ভেতরে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম হয়েছে, যারা এখনো আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। যেমন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স, ‘ফুরসান আল হাক’, কুর্দি এলাকায় ‘পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট’ বা YPA, ‘সুকুর আল জাবেল ব্রিগেড’ ইত্যাদি। আল কায়দার সঙ্গে সম্পৃক্ত নুসরা ফ্রন্টও সিআইএর কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্র পাচ্ছে। এমন অভিযোগও আছে যে, ইসলামিক স্টেট বা আইএসের জন্ম দিয়েছিল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালে জন্ম নেওয়া এই সংগঠনটির অস্তিত্ব এখন নেই বললেই চলে। কিন্তু নুসরা ফ্রন্ট এখনো যুদ্ধ করে চলছে। আর এদের অর্থ ও অর্থের উৎস হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং সিরিয়া নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র।
Daily Bangladesher Khobor
05.05.2018