রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

উদ্যোগ আছে, শৃঙ্খলা নেই



বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। দলটিকে নিয়ে আলাপ-আলোচনার যেন শেষ নেই। ২০১৯ সালের প্রথমদিকেই নির্বাচনটি হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত করেছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। ইতিমধ্যে খালেদা জিয়া একটি ভিশন-২০৩০ উপস্থাপন করেছেন। সেটা নিয়েও কম বিতর্ক হচ্ছে না। টকশোগুলোতে দেখেছি সেখানে সমালোচনার ঝড়। আর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তো হরহামেশাই ভিশন-২০৩০-এর সমালোচনা করে আসছেন। এসব সমালোচনার মধ্য দিয়ে অন্তত একটা জিনিস আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে, আর তা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল এই ভিশন-২০৩০-কে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিশেষ করে তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দ আশরাফ কিংবা ওবায়দুল কাদের যখন ভিশন-২০৩০-এর কঠোর সমালোচনা করেন, তখন বুঝতে হবে আওয়ামী লীগের ভেতরে এক ধরনের ভয় ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএনপি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। একটি দল তা করতেই পারে। আওয়ামী লীগও করেছিল রূপকল্প-২০২১। এখন জাতীয় পার্টিও বলছে তারাও একটা রূপকল্প উপস্থাপন করবে। এগুলো ভালো দিক। কেননা একটি দল, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে বা আগামীতে যেতে চায় তাদের দেশ পরিচালনার ব্যাপারে একটি চিন্তা-ভাবনা বা পরিকল্পনা থাকা উচিত। তবে এ পরিকল্পনা হওয়া উচিত বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যাপারে কতগুলো বিষয় থাকা উচিত। যেমন জনসংখ্যা। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে আমাদের। এ জনগোষ্ঠীর মাঝে আবার তরুণ প্রজন্মের রয়েছে আধিক্য। পরিকল্পনা হওয়া উচিত এ তরুণ প্রজন্মকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারব। তাদের তথাকথিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ধরিয়ে দিয়ে তাদের যে শক্তি, তা কি আমরা ব্যবহার করতে পারব? স্বাধীনতার ৫০ বছর আমরা পালন করব ২০২১ সালে। খুব বেশি দিন আমাদের বাকি নেই। প্রবৃদ্ধি সরকারি হিসাবে ৭-এর ওপরে হলেও আন্তর্জাতিকভাবে তা ৬ দশমিক ৫-এর মতো। এটাও বড় অর্জন। এ অর্জন ধরে রাখতে হলে অর্থনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে হবে? দলগুলোর এ ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত। দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামীতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে? জোটবদ্ধতা (সৌদি সামরিক জোট), ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা (ভারতকেন্দ্রিক নীতি), চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্যের শরিক হওয়া (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড)? বিষয়গুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। একটি রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখবে। এতে করে পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু খুব নগ্নভাবে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে বৈকি। ভিশন-২০৩০ উপস্থাপিত হয়েছে। এটি বিএনপির একটি পরিকল্পনা, একটি রূপকল্প, যে রূপকল্প বিএনপি যদি ক্ষমতায় যেতে পারে, তাহলে বাস্তবায়ন করবে বলে কথা দিয়েছে। একটি বড় দলের কাছ থেকে এ ধরনের একটি পরিকল্পনা আশা করাই যায়। ভিশন-২০৩০-এর অর্থ হচ্ছে বিএনপি ২০৩০ সালকে টার্গেট করেছে। অর্থাৎ বিএনপি আমার বিবেচনায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নিবাচন সামনে রেখে বিএনপি এই ভিশন দিল। এটা নির্বাচনী ইশতেহার নয়। এটা বিএনপির একটি মহাপরিকল্পনা। বাংলাদেশকে বিএনপি কীভাবে দেখতে চায়, এই ভিশন-২০৩০-এ তা প্রতিফলিত হয়েছে। আওয়ামী লীগও এ ধরনের একটি মহাপরিকল্পনা দিয়েছিল। রূপকল্প-২০২১। সেই রূপকল্পেও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে ২০২১ সালে কীভাবে দেখতে চায়, তা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিল। এ ধরনের যে কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যে কোনো বিবেচনায় প্রশংসার দাবি রাখে।

সুতরাং বিএনপি যখন ভিশন-২০৩০ উপস্থাপন করল, আমরা তাকে স্বাগত না জানিয়ে পারি না। বিএনপি বড় দল। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার দাবিদার। সুতরাং ভিশন-২০৩০ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। আমার বিবেচনায় ভিশন-২০৩০-এ অনেক ইতিবাচক দিক আছে। তবে কিছু কিছু নেতিবাচক দিক যে নেই, তা বলা যাবে না। আছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট একটি সংসদের কথা বিবেচনায় নেয়ার প্রস্তাব করেছে বিএনপি। সরাসরি প্রস্তাব করেননি খালেদা জিয়া। বলেছেন বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এটি কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। এতে করে নানা জটিলতা তৈরি হবে। সংসদীয় এলাকায় কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নানা প্রশ্ন তৈরি হবে এবং দু’জন সংসদ সদস্যকে নিয়েও বিতর্ক তৈরি হবে। এটা নিয়ে সুস্পষ্ট আইন তৈরি করলেও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে বাধ্য। অন্য যেসব দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ রয়েছে, (ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি) তার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে মেলানো যাবে না। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। হতে পারে জনসংখ্যা বেশি; কিন্তু এই ছোট দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কাম্য নয়। খালেদা জিয়া যে যুক্তি দেখিয়েছেন, অর্থাৎ পেশাজীবীদের উচ্চকক্ষে স্থান দেয়া, এটা তত্ত্বগতভাবে ভালো; কিন্তু এককক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় রাজনীতিতেও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বিএনপি পেশাজীবীদের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে করে সংসদীয় রাজনীতির মান আরও বাড়বে। বাংলাদেশে কোনো প্রদেশ নেই। জাতিগতভাবেও তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ফলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করারও কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করা একটি অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এতে করে সরকারি খাতের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে চায় বিএনপি। ভিশন-২০৩০-এ আছে সে কথা। কিন্তু এ ভারসাম্য কীভাবে আনা যাবে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এটা অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব নিশ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অতি ক্ষমতাবান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এটা কীভাবে কমানো যায়, কীভাবে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য আনা যায়, তা যদি খালেদা জিয়া নিশ্চিত করতেন, তাতে করে সাধারণ মানুষ একটা স্পষ্ট ধারণা পেত। ভিশন-২০৩০-এ বলা হয়েছে, ‘অন্য কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলবে বিএনপি।’ এ বক্তব্য অনেকটা সাদামাটা। বর্তমান সরকারও অনেকটা একই সুরে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য নেই। খালেদা জিয়া বলেছেন, চীনের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগের সঙ্গে সংযুক্তির ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ উদ্যোগ তো ইতিমধ্যে চীন নিয়েছে। এ নিয়ে মে মাসের মাঝামঝি চীনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাতে বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রীসহ একটি প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল। চীনের সঙ্গে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাপারে ভিশন-২০৩০-এ বিশেষ কিছু বলা নেই। ভিশন-২০৩০-এর এটা একটা দুর্বল দিক। পররাষ্ট্র ও দেশরক্ষা নীতি এখানে বিস্তারিত আলোচিত হয়নি। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ভিত্তি রচিত হয়েছে, সে ব্যাপারেও তেমন কোনো কথা নেই। তবে ভিশন-২০৩০-এ অনেক ভালো ভালো কথা আছে।

খালেদা জিয়া থ্রিজি, অর্থাৎ সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও সুসরকারের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে থ্রিজির গুরুত্ব অনেক। এখন এই থ্রিজিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বাংলাদেশে এ তিনটি সমস্যাই মূল- অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতিরোধ করা আর সুসরকার প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রেও যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কীভাবে এটি করবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বিএনপির প্রস্তাবে সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা প্রবর্তন, সংসদে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ও পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের পার্লামেন্টে এমনটি আছে। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নেয়া হবে এমন কথাও বলা হয়েছে। এমন নজিরও অনত্র আছে। আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পরিচালনার ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করা, ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা, দেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ডলারে উন্নীত করাসহ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে উন্নীত করা, খালখনন কর্মসূচি আবারও চালু করা, স্বাস্থ্যবীমা চালুসহ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি পুনঃপরীক্ষা ইত্যাদিসহ আরও বেশকিছু প্রস্তাব রয়েছে ভিশন-২০৩০-এ। খালেদা জিয়া গ্রিন এনার্জির কথা বলতে পারতেন। তা বলেননি। এমনকি সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে যে বিতর্ক, সে ব্যাপারেও খালেদা জিয়া কোনো মন্তব্য করেননি। আসলে ভিশন-২০৩০ নিয়ে মূল বিতর্ক কেন্দ্রীভূত এক জায়গায়- আর তা হচ্ছে এটি এক ধরনের নির্বাচনী ইশতেহার।

আমি ভিশন-২০৩০ পড়ে দেখেছি। আরও অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রেই ভাসা ভাসা মন্তব্য রয়েছে। তথ্য ও উপাত্তের বড় অভাব। অর্থনীতি সেক্টরটা উপেক্ষিত থেকেছে। বিএনপির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দলটির কোনো থিঙ্ক ট্যাংক নেই। যাদের থিঙ্ক ট্যাংকের সঙ্গে জড়িত বলা হয় (যেমন- ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী), তাদের আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তারা এটা অস্বীকার করেছেন। অনেকেই বলেছেন কোনো ধরনের রিসার্চ ছাড়াই এটি উপস্থাপন করা হয়েছে। একজন অর্থনীতিবিদ, যাকে থিঙ্ক ট্যাংকের সদস্য বলে ধরা হয়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে এক টেবিলে বসেনও, তিনি থাকতে অর্থনীতি সেক্টরটা উপেক্ষিত থাকল কেন? পররাষ্ট্র সচিব আর রাষ্ট্রদূত, সাবেক সচিবদের দিয়ে যদি ভিশন-২০৩০ তৈরি করা হয়, তার পরিণতি এমনই হবে। অনেক বিষয় অনুপস্থিত থেকে যাবে। বিএনপির মতো বড় দলের কাছ থেকে তা কাম্য নয়। তড়িঘড়ি করে উপস্থাপনের প্রয়োজন ছিল না। খালেদা জিয়া বিএনপির কাউন্সিলে একটা ধারণা দিয়েছিলেন। তারপর আদৌ বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া হয়েছিল বলে আমার মনে হয়নি। প্রয়োজন ছিল বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ করা। সেখানে থাকা উচিত ছিল বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের। দলীয় কর্মীদের দিয়ে ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’ হলে, তাতে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

বিএনপি ১৩ মে একটি জাতীয় সেমিনার করেছে। বিষয় বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা। ধারণা করছি, ভিশন-২০৩০-কে সমৃদ্ধ করার জন্যই এ ধরনের আরও সেমিনারের আয়োজন করবে বিএনপি। এটা ভালো দিক। এতে করে একটা দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে; কিন্তু সেমিনারে উপস্থাপিত বক্তব্য কি একুশ শতক উপযোগী? যারা বক্তব্য দিলেন, লেখা পাঠ করলেন, তারা কি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখাতে পেরেছেন ২০৩০ কিংবা তারপর কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দরকার? শিক্ষাব্যবস্থা দেশে সার্টিফিকেটসর্বস্ব জনগোষ্ঠী তৈরি করবে না বরং কর্মক্ষম একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করবে, সে ব্যাপারে উপস্থিত শিক্ষাবিদরা কিংবা প্রবন্ধ পাঠকারীরা কি কোনো প্রস্তাব দিয়েছিলেন? কোনো রূপরেখা দিয়েছিলেন? বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সমস্যা এখানেই। এরা সবাই সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। বিএনপির এটাই বড় সমস্যা। আর একটা কথা। এ ধরনের সেমিনার হওয়া উচিত শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্য। তাদের জন্যই এ সেমিনার। খালেদা জিয়াসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা থাকবেন। এর বাইরে সিনিয়র নেতারা থাকতে পারেন। তারা প্রশ্ন করবেন, বিষয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে অবহিত হবেন এবং পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন। প্রয়োজনে ভিশন-২০৩০-এ সংশোধনী আনবেন। শত শত নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে কোনো সেমিনার হয় বলে আমার জানা নেই। খালেদা জিয়ার সঙ্গে একই টেবিলে যাদের দেখলাম, তাদের কাউকে কাউকে আমি জেনারেল মঈনের বই-এর প্রকাশনা উৎসবে দেখেছি। ছবিও আছে। এরা সব জায়গাতেই থাকেন। তবুও ভালো। শিক্ষা নিয়ে কিছু বক্তব্য এসেছে। আরও সেমিনার হোক এবং তা যেন হয় বিষয়ভিত্তিক।

বিএনপি সক্রিয় হয়েছে। এটা ভালো দিক। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যদি আরও সক্রিয় হয়, যদি খালেদা জিয়া বিভাগীয় শহরগুলোতে যান, আমার ধারণা বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে।
Daily Jugantor
22.05.2017

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

সম্প্রতি চীনের উদ্যোগে বেইজিংয়ে নতুন সিল্ক রুটখ্যাত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিসংক্রান্ত একটি শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। এ শীর্ষ সম্মেলনে ৩০ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মাঝে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও মধ্য এশিয়ার সরকারপ্রধানরা। দক্ষিণ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের সরকারপ্রধানরাও এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। তবে ভারত এ সম্মেলনে যোগ দেয়নি। আন্তর্জাতিক আসরে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ (ওবিওআর) মহাপরিকল্পনা একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যাবে এবং বিশ্বে চীন অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। অনেক কারণের জন্য ওবিওআরের গুরুত্ব রয়েছে অনেক। প্রথমত, এ মহাপরিকল্পনার আওতায় চীনকে একদিকে মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা এবং অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে সড়ক, রেলপথ ও সামুদ্রিক পথে সংযুক্ত করছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটা বড় পরিবর্তন আসবে। এর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে- এটা সত্য। কিন্তু ওবিওআরের সঙ্গে সংযুক্ত দেশগুলোও উপকৃত হবে। দ্বিতীয়ত, ৬০ থেকে ৬৫টি দেশ এ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। বিশ্বের অর্থনীতির তিন ভাগের এক ভাগ এর আওতায় আসবে। বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক বসবাস করে এ অঞ্চলে এবং একই সঙ্গে বিশ্বে যে জ্বালানি সম্পদের রিজার্ভ রয়েছে, তার মাঝে শতকরা ৭৫ ভাগ এ এলাকায় রয়েছে। ফলে চীনের নেতৃত্বে ওবিওআর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে যাবে। তৃতীয়ত, ওবিওআর একটি মহাপরিকল্পনা। এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একটি বিশ্ব দর্শন। এতে প্রাথমিকভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ওবিওআরের যে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, তাতে এ খাতে শি জিনপিং এক বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বিশাল এক এলাকায় চীনা অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ আমরা প্রত্যক্ষ করব একুশ শতকে। চীনা পণ্যের এক বিশাল বাজার গড়ে উঠবে ওবিওআরভুক্ত দেশগুলোয়। চীনা বিনিয়োগ বাড়ার কারণে চীনের ওপর নির্ভলশীলতা বাড়বে এসব দেশের। চতুর্থত, ওবিওআরভুক্ত দেশগুলো সুযোগ পাবে চীনের সঙ্গে শুল্কমুক্ত এক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। চীনের সঙ্গে বর্তমানে ১২টি দেশের ‘ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এফটিএ) রয়েছে। এ দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, চিলি, পেরু, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হংকং ও তাইওয়ান। আরও আটটি দেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা চলছে। এ দেশগুলো হচ্ছে জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, নরওয়ে ও কয়েকটি আঞ্চলিক সংস্থা। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ওবিওআর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেননি। কিন্তু সিনিয়র মন্ত্রিপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব হয়েছে। বাংলাদেশ ওবিওআর কর্মসূচিকে সমর্থন করছে। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনা তৈরি হলো আগামীতে চীনের সঙ্গে একটি এফটিএ করার। বলা ভালো, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য চীনের অনুকূলে। ফলে এফটিএ স্বাক্ষরিত হলে এ থেকে বাংলাদেশ ফায়দা নিতে পারবে ভবিষ্যতে। পঞ্চমত, প্রস্তাবিত ওবিওআরে মোট ছয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে চীনের সংযুক্তি রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ওইসব অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে চীন এগিয়ে আসবে। যেমন বলা যেতে পারে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) কথা। সিপিইসিতে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ করিডোর চীনের খাসগরকে (জিয়াং জিয়াং প্রদেশ) পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করেছে। এ করিডোর পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ‘আজাদ কাশ্মীরের’ গিলগিট-বালটিস্তান হয়ে খাইবার পাখতুনখোয়া, পাঞ্জাব ও বেলুচিন্তান প্রদেশের ভেতর দিয়ে গাওদারের সমুদ্রবন্দরে মিলিত হয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোরে সড়ক ও রেলপথ ছাড়াও গ্যাসের পাইপলাইন থাকবে।
চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। মধ্য এশিয়ায় রয়েছে প্রচুর জ্বালানি সম্পদ। চীন এ জ্বালানি সম্পদ নিয়ে যেতে চায় ইউনান প্রদেশে। এজন্যই চীন বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলে সোনাদিয়ায় একটি গভীর বন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল, ভারতের আপত্তির কারণে যা সম্ভব হয়নি। এখন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত না হওয়ায় মিয়ানমারে এটা নির্মিত হবে। অথবা মিয়ানমারের কোনো বন্দর ব্যবহার করে চীন ‘কানেকটেড’ হবে, যাতে গাওদার বন্দর ব্যবহার করে ইউনান প্রদেশে (কুনমিং যার রাজধানী) পণ্য নিয়ে যাওয়া যায় এবং একই পথ অনুসরণ করে চীনা পণ্য রফতানি করাও সম্ভব হবে। এতে সময় কম লাগবে এবং চীনা পণ্যের দামও কমে যাবে। বাংলাদেশও এ থেকে উপকৃত হতে পারে। কেননা বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বিসিআইএমের (বাংলাদেশ-চীন, ইউনান প্রদেশ, ভারত ও মিয়ানমার) সদস্য। বিশ্বের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৪০ ভাগ মানুষ এখানে বাস করে। বিশ্বের ৯ ভাগ এলাকা বিসিআইএমের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব জিডিপির ৭ দশমিক ৩ ভাগ এ অঞ্চলের। ভারত এবং বাংলাদেশ এ জোট থেকে লাভবান হতে পারে। কুনমিং থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিসিআইএমের আওতায় সড়কপথ হবে। কুনমিং থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত সড়ক আছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক তৈরি করছে বাংলাদেশ। ভারতের সাতবোন রাজ্যগুলো কীভাবে বিসিআইএম করিডোর থেকে লাভবান হবে, তার একটি দৃষ্টান্ত দিই। সাতবোন রাজ্যের পণ্য কলকাতা সমুদ্রবন্দরে পৌঁছতে লাগে ৭ দিন। সেখান থেকে চীনের গন্তব্যে পৌঁছতে লাগে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ। এখন বিসিআইএম করিডোর ব্যবহার করে ভারত মাত্র ২ দিনে তার পণ্য ইউনান প্রদেশে পৌঁছে দিতে পারবে। এতে শতকরা ৩০ ভাগ খরচ কমে যাবে। ষষ্ঠ, ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এ আরও পাঁচটি অর্থনৈতিক করিডোর রয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোরগুলো ব্যবহার করে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও উপকৃত হবে। বিসিআইএম ও সিপিইসির বাইরে আরও যে চারটি অর্থনৈতিক করিডোর রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে চীন-মঙ্গোলিয়া-রাশিয়া-ইকোনমিক করিডোর, নিউ ইউরো এশিয়ান ব্রিজ, চীন-মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অর্থনৈতিক করিডোর এবং চীন-ইন্দোচায়না পেনিনসুলা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে তার পার্শ¦বর্তী দেশগুলোকে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এভাবেই চীন দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরো-এশিয়াসহ সুদূর ইউরোপের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে সংযুক্ত হবে। এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। একদিকে সড়কপথে যখন চীন সংযুক্ত হবে, তখন অন্যদিকেও ইউরোপ থেকে চীনের অন্য অঞ্চলে সমুদ্রপথে সংযুক্ত হবে। প্রথম ক্ষেত্রে (বেল্ট) চীনের জি’আন শহর থেকে সড়কপথে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। অপরদিকে রটারডাম থেকে ইতালির ভেনিস স্থলপথ এবং ভেনিস থেকে সমুদ্রপথে চীনের সমুদ্রবন্দর যুজউ পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। বিশাল এক কর্মযজ্ঞ, যা চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু চীনের বর্তমান নেতৃত্ব এ অসাধ্য কাজটি হাতে নিয়েছে এবং দেশটি যখন ২০৪৯ সালে তার বিপ্লবের ১০০ বছরে পা দেবে, তখন এ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর মহাকর্মযজ্ঞ শেষ হবে।
পশ্চিমা গবেষকরা চীনের এ উদ্যোগকে চিহ্নিত করেছেন চীনের মার্শাল প্লান হিসেবে। পাঠকদের স্মরণ থাকার কথা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘মার্শাল প্লান’ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। অনেকটা সে মডেলকে সামনে রেখেই চীন একুশ শতকে অবকাঠামো উন্নয়নে যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তাকেই অভিহিত করা হয়েছে ‘চীনের মার্শাল প্লান’ হিসেবে। এখন প্রশ্ন অনেকÑ এক, বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র চীনের এ মহাপরিকল্পনাকে কীভাবে দেখছে? কেননা আগামী ১০ বছরের মধ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হবে তখন দ্বিতীয়। চীনের এ অর্থনৈতিক আধিপত্যকে যুক্তরাষ্ট্র সহজভাবে নেবে বলে মনে হয় না। দুই, উঠতি অর্থনীতির দেশ ভারত। ভারত চীনের এ উত্থানকে খুব ভালো চোখে দেখবে বলে মনে হয় না। তিন, ইউরোপের অবস্থান কী হবে? সম্প্রতি মে মাসে বেইজিংয়ে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। চীন প্রায় ১০০টির মতো দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে অনেক দেশই আসেনি। এমনিক যে ৬৮টি দেশ এই ওবিওআরে সংযুক্ত হবে, সেখান থেকেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হয়নি। অনেক রাষ্ট্র তথা সরকারপ্রধান আসেননি। এর অর্থ পরিষ্কারÑ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মাঝে চীনের ব্যাপারে এক ধরনের শঙ্কা আছে। ভারত সম্মেলনে যোগ দেয়নি। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। কেননা এটি বিতর্কিত গিলগিট-বালটিস্তানের ওপর দিয়ে গেছে, যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভারত মনে করে এটি তাদের। সম্মেলন শেষে যে ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে ইউরোপের কোনো রাষ্ট্র স্বাক্ষর করেনি। তারা পরিশেষের সমস্যাটা বড় করে দেখছে। ফলে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর সাফল্য নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। ভারত-চীন দ্বন্দ্ব যদি আরও বেড়ে যায়, তাহলে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। এক্ষেত্রে ছয়টি অর্থনৈতিক করিডোরের একটি বিসিআইএম করিডোর বিকশিত হবে না। ভারত মহাসাগরে দেশ দুইটি প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। তবে এটা বলাই যায়, চীনের এ মহাপরিকল্পনা আগামীতে বারবার আলোচিত হতে থাকবেই। এখন যে অসন্তোষের জন্ম হয়েছে, তা নিরসনে চীন কী ভূমিকা নেয়, সে ব্যাপারেও লক্ষ থাকবে অনেকের।
Daily Alokito Bangladesh
21.05.2017

বিএনপির ভিশন ২০৩০ ও কিছু কথা


খালেদা জিয়া সম্প্রতি ভিশন ২০৩০ উপস্থাপন করেছেন। এটি বিএনপির একটি পরিকল্পনা, একটি রূপকল্প, যে রূপকল্প বিএনপি যদি ক্ষমতায় যেতে পারে, তাহলে বাস্তবায়ন করবে। একটি বড় দলের কাছ থেকে এ ধরনের পরিকল্পনা আশা করাই যায়। রূপকল্প বা ভিশন ২০৩০-এর অর্থ হচ্ছে, বিএনপি ২০৩০ সালকে টার্গেট করেছে। অর্থাৎ বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করছে! একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির এই রূপকল্প ছিল। এটা নির্বাচনী ইশতেহার নয়। এটা বিএনপির একটি মহাপরিকল্পনা। বাংলাদেশকে বিএনপি কীভাবে দেখতে চায়, এই ভিশন ২০৩০-এ তা প্রতিফলিত হয়েছে। আওয়ামী লীগও এ ধরনের একটি মহাপরিকল্পনা দিয়েছিল। রূপকল্প ২০২১। সেই রূপকল্পেও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে ২০২১ সালে কীভাবে দেখতে চায়, তা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিল। এ ধরনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যে কোনো বিবেচনায় প্রশংসার দাবি রাখে। তাই বিএনপি যখন ভিশন ২০৩০ উপস্থাপন করল, আমরা তাকে স্বাগত না জানিয়ে পারি না। বিএনপি বড় দল। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার দাবিদার। তাই ভিশন ২০৩০ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। আমার বিবেচনায় ভিশন ২০৩০-এ অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে। তবে কিছু কিছু নেতিবাচক দিক যে নেই, তা বলা যাবে না। আছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট একটি সংসদের কথা বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিএনপি। সরাসরি প্রস্তাব করেননি খালেদা জিয়া। বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। এতে করে নানা জটিলতা তৈরি হবে। সংসদীয় এলাকায় কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নানা প্রশ্ন তৈরি করবে এবং দু’জন ‘সংসদ সদস্য’কে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে। এটা নিয়ে সুস্পষ্ট আইন থাকলেও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে বাধ্য। অন্য যেসব দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ রয়েছে (ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি) তার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্য মেলানো যাবে না। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। হতে পারে জনসংখ্যা বেশি। কিন্তু এই ছোট দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কাম্য নয়। খালেদা জিয়া যে যুক্তি দেখিয়েছেন, অর্থাৎ পেশাজীবীদের উচ্চকক্ষে স্থান দেওয়া, এটা তত্ত্বগতভাবে ভালো। কিন্তু এককক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় রাজনীতিতেও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বিএনপি পেশাজীবীদের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে করে সংসদীয় রাজনীতির মান আরও বাড়বে। বাংলাদেশে কোনো প্রদেশ নেই। জনসংখ্যার মাঝে জাতিগতভাবেও তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ফলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করারও কোনো প্রয়োজন নেই। তাই উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করা একটি অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এতে করে সরকারি খাতের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে চায় বিএনপি। ভিশন ২০৩০-এ আছে সে কথাও। কিন্তু এ ভারসাম্য কীভাবে আনা যাবে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব নিশ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অতি ক্ষমতাবান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এটা কীভাবে কমানো যায়, কীভাবে রাষ্ট্রপতিকে ‘বিন্দু’ ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য আনা যায়, তা যদি খালেদা জিয়া নিশ্চিত করতেন, তাতে করে সাধারণ মানুষ একটা স্পষ্ট ধারণা পেত। ভিশন ২০৩০-এ বলা হয়েছে, ‘অন্য কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলবে বিএনপি।’ এই বক্তব্য অনেকটা সাদামাঠা বক্তব্য। বর্তমান সরকারও অনেকটা একই সুরে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য নেই। খালেদা জিয়া বলেছেন, চীনের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগের সঙ্গে সংযুক্তির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যোগ তো ইতোমধ্যে চীন নিয়েছে। এ নিয়ে মে মাসের মাঝামাঝি চীনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রীসহ একটি প্রতিনিধি দল যোগ দিয়েছে। চীনের সঙ্গে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাপারে ভিশন ২০৩০-এ বিশেষ কিছু বলা নেই। সম্ভবত ভিশন ২০৩০-এ এটা একটা দুর্বল দিক। পররাষ্ট্র ও দেশরক্ষা নীতি এখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ভিত্তি রচিত হয়েছে, সে ব্যাপারেও তেমন কোনো কথা নেই। তবে ভিশন ২০৩০-এ অনেক ভালো ভালো কথা আছে। খালেদা জিয়া ‘থ্রি-জি’, অর্থাৎ সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও সুসরকারের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে থ্রি-জির গুরুত্ব অনেক। এখন এই থ্রি-জিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বাংলাদেশে সুস্থ সরকার পরিচালনায় এই তিনটি সমস্যাই মূলÑ অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতি রোধ করা আর সুসরকার প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রেও যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কীভাবে এটি করবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বিএনপির প্রস্তাবে সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা প্রবর্তন, সংসদে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ও পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের পার্লামেন্টে এমনটি আছে। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নেওয়া হবে, এমন কথাও বলা হয়েছে। এমন নজিরও অন্যত্র আছে। আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পরিচালনার ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করা, ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা, দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় ৫ হাজারে উন্নীত করাসহ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ডবল ডিজিটে উন্নীত করা, খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা, স্বাস্থ্যবীমা চালুসহ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি পুনঃপরীক্ষা ইত্যাদিসহ আরও বেশ কিছু প্রস্তাব রয়েছে ভিশন ২০৩০-এ। খালেদা জিয়া গ্রিন-এনার্জির কথা বলতে পারতেন। তা বলেননি। এমনকি সুন্দরবনের পাশে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে যে বিতর্ক, সে ব্যাপারেও খালেদা জিয়া কোনো মন্তব্য করেননি। আসলে ভিশন ২০৩০ নিয়ে মূল বিতর্ক কেন্দ্রীভূত এক জায়গায়Ñ আর তা হচ্ছে এটি এক ধরনের নির্বাচনী ইশতেহার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যে ভিশন ২০৩০ ব্যবহার করবে, এ ব্যাপারে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।
অনেক কারণের জন্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ‘সকল দলের অংশগ্রহণে’ একটি নির্বাচন প্রয়োজন। এ জন্য বিএনপিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে। আমার ধারণা বর্তমান সরকারও চায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক। পরপর দুটি নির্বাচনে বিএনপি যদি অংশ না নেয়, তাতে সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হবে না সত্য, কিন্তু বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি একটা প্রশ্নের মুখে থাকবে। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। মামলার রায়ও হবে চলতি বছরে। এতে করে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটা প্রশ্ন আছে। খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে নাÑ এসব কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টি একান্তই আইনগত। তাই আদালতের কাছেই বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে। এ বিষয়ে আমরা যত কম কথা বলব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। তৃতীয়ত, জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলে, আবার সরকারে রেখে সরকার খুব লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে মেনে নেয়নি। বিএনপি সংসদে বিরোধী দলে থাকলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
এ দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য দুটি বড় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে এ দেশে ‘গণতন্ত্রের হাওয়া’ বইবে না। আর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি বিভেদ-অসন্তোষ থাকে, তাহলে এ থেকে ফায়দা নেবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো, যা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল নয়। দীর্ঘ ৪৫ বছর আমরা পার করেছি। আমাদের অনেক অর্জন আছে। অনেক সেক্টরে আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাকশিল্পে আমাদের সক্ষমতা, ওষুধশিল্পের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটা পরিচিতি আছে। আমরা ‘সফটপাওয়ার’ হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছি। ‘নেক্সট ইলেভেন’-এ বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭-এর ঘরে থাকবে বলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এখন এই যে ‘অর্জন’, এই অর্জন মুখ থুবড়ে পড়বে যদি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে দুটি বড় দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হয়। এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ শুধু দেশের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গল নয়, বরং দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, উপরন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্যও প্রয়োজন। জনগণ এমনটি দেখতে চায়। সাধারণ মানুষ চায় দুটি বড় দলের নেতারা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য রাখবেন না। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবেন। দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে। এই প্রতিযোগিতা হতে হবে রাজনৈতিক ও কর্মসূচিভিত্তিক। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এমনটি দেখতে পাই না। ভিশন ২০৩০ উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে, বলতে গেলে ওইদিন সন্ধ্যাবেলায়ই আমরা আওয়ামী লীগের নেতিবাচক মনোভাব পেয়েছি। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভিশন ২০৩০ জাতির সঙ্গে তামাশা ও প্রতারণা। অনেক সিনিয়র মন্ত্রীও একই লাইনে কথা বলেছেন।’ এর প্রয়োজন ছিল না। বিএনপি একটি কর্মসূচি দিয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগও রূপকল্প ২০২১ দিয়েছিল। সব কর্মসূচিই যে ভালো তা বলা যাবে না। আওয়ামী লীগের রূপকল্পে যেমনি সীমাবদ্ধতা আছে, ঠিক তেমনি ভিশন ২০৩০-ও পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে ভালো দিক হচ্ছে, দুটি বড় দলই তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। আগামী নির্বাচনে এর একটি প্রতিফলন থাকবে। কোনটি ভাল, কোনটি খারাপÑ এভাবে সমালোচনা না করে বরং নির্দিষ্ট করে বলা উচিত দলগুলোর সীমাবদ্ধতা কোথায়। দুটি বড় দলই এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দিল। নিঃসন্দেহে এর ইতিবাচক দিক আছে।
Daily Amader Somoy
18.05.2017

অথঃ ভিসি কাহিনী


ভিসিদের কাহিনী নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে অনেক ভিসি যে অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তা উল্লেখ করা হয়েছিল। ভিসি হচ্ছেন একটা প্রতিষ্ঠান। তিনি যদি বিতর্কিত হন, দুর্নীতি করেন, তাহলে আস্থার জায়গাটা আর থাকে না
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলে, সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ভিসি বা উপাচার্যের ‘কাহিনী’ এখন নিয়মিত কাগজে ছাপা হচ্ছে। একজন ভিসি বললেন, তিনি ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ছাড়া অন্য কাউকে চাকরি দেবেন না! একজন অস্ত্রবাজ শিক্ষক তার ‘চাকরি’ পেলেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভিসি বললেন, বিষয়টি তিনি জানেন না। তার তা না জানারই কথা; কেননা প্রভাষক নিয়োগ বোর্ডে তিনি সভাপতিত্ব করেন না। আর একজন ভিসি, যিনি দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল জমি দখলের! বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সংবাদ আরও মারাত্মকÑ তিনি তার সরকারি বাসভবনে একটি বিউটি পারলার বসিয়েছেন! কী সাংঘাতিক কথা! ভিসির বাংলোয় বিউটি পারলার। স্ত্রী অধ্যাপনা করেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই ভিসির বাংলোয় সিরিয়াল রক্ষার কাজটি তিনি নিজেই করেন। সংবাদদাতা একটি ছবিও পাঠিয়েছেন সংবাদের সঙ্গে, যাতে দেখা যায় তিনি দাঁড়িয়ে (ভিসি-বাংলোয়) সিরিয়াল দিচ্ছেন সেবা গ্রহণকারীদের। আর পাশে বসা বেশ কয়েকজন সেবা গ্রহণকারী। এর বাইরে আরও অনেক ভিসি কাহিনী ছাপা হয়েছে, যা হয়তো আমার চোখে ধরা পড়েনি। খুঁজলে হয়তো তা পাওয়াও যাবে। কেননা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪২। ৪২ জন ভিসি তো আছেনই, তাদের নিয়ে সংবাদ ছাপা হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গেছে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এ কে এম নূর উন নবীর কাহিনী। তিনি এখন সাবেক। কেননা ৫ মে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। মাত্র সাড়ে ৫ মাসে তিনি খাবার খেয়েছেন (অফিস তথা আপ্যায়ন) ১০ লাখ টাকার (পরিবর্তন.কম, ৪ মে)। এর সঙ্গে ট্রেজারার হিসেবে অতিরিক্ত খেয়েছেন আরও ২ লাখ ১৯ হাজার। সবমিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা! তাকে নিয়ে ‘কাহিনী’ আরও আছে। ভিসির পদটি সার্বক্ষণিক। কিন্তু তিনি ঢাকায় থাকতেন বেশিরভাগ সময়। আর টিএ/ডিএ’র নামে উত্তোলন করেছেন ৪ লাখ টাকা। ভর্তি পরীক্ষায় ‘তদারকিতে’ তিনি নিয়েছেন ১৬ লাখ টাকা! প্রায় ১২ লাখ টাকার যে আপ্যায়ন ‘বিল’ তিনি তুলেছেন, তা মাত্র ১৬৫ দিনেরÑ যতদিন তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন! সামাজিক মিডিয়ায় কে যেন একটা হিসাব দিয়েছে। তিনি যা খেয়েছেন এবং যার জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকা বিল তুলেছেন, তা যদি দিন হিসাবে গণনা করা হয়, তাহলে প্রতিদিন তিনি ‘খেয়েছেন’ (নাশতা) প্রায় ৭ হাজার টাকা! পাঠক, বিভ্রান্ত হবেন না। এ হিসাবটা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের। তারা সেখানে তদন্তে গিয়েছিলেন। তাদের তদন্তে এসব অসংগতি ধরা পড়েছে। সচেতন পাঠকমাত্রই জানেন, এর আগে যিনি ভিসি ছিলেন, ড. জলিল, তিনিও ব্যাপক অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। দুদক সেসব অনিয়মের তদন্ত করছে। গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’কেও দুদক চিঠি দিয়েছিল। যদিও সে চিঠি তিনি আদৌ গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। একজন ভিসি, যিনি শিক্ষাবিদও বটে, তিনি যখন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে জাতির কাছে ‘ছোট’ করছেন। দুদকের উচিত এসব অনুসন্ধান করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। না হলে এ প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ৪২। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের অনেকে শুধু অযোগ্যই নন, বরং অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন; শিক্ষক সমাজকে জাতির কাছে ‘ছোট’ করেছেন। দলীয় পরিচয়ে কিংবা আঞ্চলিকতা বিবেচনায় নিয়ে যাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তারা যে ব্যর্থ এবং ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান যে তারা আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন না, গোপালগঞ্জ কিংবা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কর্মকা-ে আবারও তা প্রমাণিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েই অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। নিজের আত্মীয়স্বজন, ভাই, স্ত্রী এদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেন তাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এর বড় প্রমাণ। এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শোনা যায়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি আইন করতে পারে, যেখানে বলা থাকবেÑ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের সন্তান বা আত্মীয়স্বজন প্রথমে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগ পাবেন না। তাদের অন্য যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে, পরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকরা প্রথমে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে পরে যদি চান নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কর্মজীবন শুরু করেন। এটা করা না হলে অচিরেই প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকটি ‘পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে’ পরিণত হবে। আমার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রবণতা আমি লক্ষ করছি। এটা ভালো নয়। উচ্চশিক্ষার জন্য তা মঙ্গলও নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর মঞ্জুরি কমিশনের নজরদারি অনেক কম। চেয়ারম্যান ও সদস্যরা আছেন; কিন্তু তাদের কোনো শক্ত কর্মকা- আমার চোখে ধরা পড়ছে না। এখন ইউজিসির নামের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। তাতে উচ্চশিক্ষায় কতটুকু পরিবর্তন আসবে, আমি নিশ্চিত নই। অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এসডিজি-বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আজাদ সাবেক আমলা। সিনিয়র সচিব ছিলেন। অবসরে গেছেন। তিনি কথাটা মিথ্যা বলেননি। সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানও একাধিকবার এ ধরনের কথা বলেছেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মানের যে অবনতি ঘটেছে, এটা তো হাজারটা দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানো যায়। টিআইবির ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর (যেগুলো সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়) যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাতে তথ্য-উপাত্তসহ উল্লেখ করা হয়েছিল ব্যক্তির ইচ্ছায়, দলীয় বিবেচনায়, টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের অনেকেই যোগ্য নন। ফলে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে তারা অবদান রাখতে পারছেন না। আমার ধারণা ছিল, ইউজিসি ওই প্রতিবেদনের পর একটি বড়সড় অনুসন্ধান চালাবে। কিন্তু তারা তা করেনি। শুধু এর প্রতিবাদ করে তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। দুদকও বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারে। টাকার বিনিময়ে যদি শিক্ষক নিয়োগ হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কীভাবে? একটা হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এর প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নে যে কাজটি করা দরকার, তা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে যাদের ওপর এ দায়িত্বটি বর্তেছে, তারা এটা না করে ব্যস্ত থাকছেন অন্য কাজে। তাই যোগ্য ও দক্ষ লোকদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে। ইউজিসি এ কাজটি করতে পারছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। উচ্চশিক্ষায় যাদের উচ্চতর ডিগ্রি নেই, গবেষণা নেই, তাদের এখানে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
ভিসিদের কাহিনী নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে অনেক ভিসি যে অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তা উল্লেখ করা হয়েছিল। ভিসি হচ্ছেন একটা প্রতিষ্ঠান। তিনি যদি বিতর্কিত হন, দুর্নীতি করেন, তাহলে আস্থার জায়গাটা আর থাকে না। শুধু আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, কোনো কোনো ভিসি আবার নিজের অনুপযুক্ত ছেলেকে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক বানিয়ে ‘সুবিধা’ নেয়ার চেষ্টা করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ সম্প্রতি ছাপা হয়েছে। যে ‘ছাত্র’ কোনোদিন যোগ্যতাবলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তিনি এখন কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! যে ছাত্রটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তার তো ‘ভালো ছাত্র হলে’ ওইসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করার কথা! বাবা ভিসি। তাই বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে! তার নিয়োগ প্রক্রিয়া যে সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়েছিল, ওই সিন্ডিকেট সভায় ভিসি কি উপস্থিত ছিলেন? নিজে উপস্থিত থেকে ছেলের নিয়োগ প্রক্রিয়া তিনি কি অনুমোদন করতে পারেন? আইনগতভাবে এবং নৈতিকভাবে তিনি তা পারেন না। ইউজিসি কি বিষয়টি তলিয়ে দেখেছে? শিক্ষামন্ত্রী ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলেছেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’ কথাটা শুনতে ভালোই শোনায়। জানতে খুব ইচ্ছে করে, মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী কী উদ্যোগ নিয়েছে? অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ কি শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো নির্দেশনা দেয়? ব্যক্তির ইচ্ছায় এবং ব্যক্তিকে সামনে রেখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে, যার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ার ক্ষেত্রেও তা কোনো অবদান রাখবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্র্যাকটিক্যাল কেমিস্ট্রি নামে নতুন একটি বিভাগ খোলা ও সেখানে জনবল নিয়োগে যে অনিয়ম হয়েছে, তার রেশ ধরে ইউজিসির এক কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। এজন্য ইউজিসির চেয়ারম্যান ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ তথা বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি বন্ধে ইউজিসি যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তা বড় অবদান রাখবে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি মাথায় নিয়ে তার ৪ বছরের টার্ম শেষ করেছেন। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, দ্বিতীয় টার্মে থাকার ‘খায়েস’ প্রকাশ করলেও শেষ অবধি তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এ ধরনের দুর্নীতিবাজরা যদি আবার এখানে নিয়োগ পেতেন, তাতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট বাড়ত বৈ কমত না! আরও একজন অধ্যাপক (যিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি এখন) লবিং করছেনÑ যার কাজ হচ্ছে টিভি টকশোতে বক্তৃতা দেয়া, নির্বাচন মনিটরিংয়ের নামে বিদেশ থেকে টাকা আনা। এসব ‘শিক্ষক’ ভিসি হলে(?) পরিস্থিতির অবনতি ছাড়া উন্নতি হবে না। এসব জুনিয়র শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা থেকে যত দূরে রাখা যায়, ততই সবার মঙ্গল। রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ বন্ধ হোক। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র শিক্ষকদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হোক, যাদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। যশোর, গোপালগঞ্জ, জগন্নাথ কিংবা রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, তা থেকে আমরা কী শিক্ষা নেব প্রশ্ন আমাদের সেখানেই।
Daily Alokito Bangladesh
14.05.2017

দুদক তদন্ত করুক, দুর্নীতিবাজরা শাস্তি পাক




ভদ্রলোক প্রতিদিন নাশতা খেয়েছেন সাত হাজার ২৩৩ টাকার। তিনি একজন ভিসি, অর্থাৎ উপাচার্য, এখন সাবেক। ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ এই দুই অর্থবছরে মাত্র ১৬৫ দিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করে মোট ১১ লাখ ৯৩ হাজার ৫২৮ টাকার 'নাশতা' খেয়েছেন। যার অর্থ প্রতিদিন ৭ হাজার ২৩৩ টাকা। নাশতা তিনি খেতেই পারেন। তিনি যখন মিটিংয়ে থাকেন, তখন নাশতা খেতে পারেন। তবু তার জন্য প্রতিদিন সাত হাজার ২৩৩ টাকা বরাদ্দ। কী খেয়েছিলেন তিনি?
সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, মন্ত্রীরা কিংবা সচিবরাও কী তাহলে এ ধরনের ঋণ করেন? এই ভদ্রলোকের নাম অধ্যাপক নুর উন নবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক। কোথায় যেন শুনেছিলাম তিনি একসময় জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে তিনি যে আওয়ামী লীগের সম্মানিত শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। জাসদ এখন সরকারের অংশীদার। হতে পারে 'জাসদ কোটায়' তিনি ভিসি হয়েছিলেন। একজন শিক্ষক যখন দুর্নীতিবাজ হন, আমরা তখন কার কাছে আস্থাটা রাখি? তার দুর্নীতির যে খবর পত্র-পত্রিকায় ও অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে (যায়যায়দিন ও পরিবর্তন.কম) তা নিছক কোনো একটি সাধারণ রিপোর্ট নয়। ওটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট সুতরাং এর পেছনে সত্যতা আছে। ভদ্রলোকের দুর্নীতির আরও কাহিনী আছে। তিনি নিজে একা তিনটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। এর মাঝে একটি আবার সার্বক্ষণিকভাবে ঢাকায় তার স্ত্রী ব্যবহার করতেন। স্ত্রী কেন সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন? বিশ্ববিদ্যালয় কেন ওই গাড়ির ড্রাইভারের বেতন ও জ্বালানি বিল পরিশোধ করবে? জ্বালানি বাবদ তিনি কত ব্যবহার করেছিলেন, তারও হিসাব নেয়া প্রয়োজন। আরও 'কাহিনী' আছে। তিন বছরে ভর্তি পরীক্ষার 'সম্মানী' বাবদ ১৬ লাখ টাকা তিনি নিয়েছেন। এটা তো তিনি পারেন না? মঞ্জুরি কমিশনের আইনে তা অনুমোদন করে না। এসব দুর্নীতিবাজ শিক্ষকদের কারণে শিক্ষক সম্পর্কে আজ সবাই অন্য চোখে দেখে। প্রশ্ন হচ্ছে_ শিক্ষক হিসেবে তিনি কী মাফ পেতে পারেন? আইন কী তাকে অন্য চোখে দেখবে? দুদক অতি সম্প্রতি অনেক ভালো কাজ করেছে। সর্বশেষ ঘটনায় দুদক সিলেটেরে হাওর অঞ্চলের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের ডেকেছে। তাদের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা নিয়ে যারা 'নয়-ছয়' করেন, তা দেখার দায়িত্ব দুদকের। এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত শেষে এসব আর্থিক কেলেঙ্কারী ধরা পড়েছে। সুতরাং দুদক তদন্ত করতেই পারে। করা উচিত। কেউই আইনের ঊধর্ে্ব নন। একজন শিক্ষক কিংবা একজন উপার্চায হিসেবে কেউই মাফ পেতে পারেন না। তিনি যদি আর্থিক কেলেঙ্কারীর সঙ্গে জড়িয়ে যান, তার বিচার প্রচলিত আইনেই হওয়া উচিত। দুদক যদি তার আর্থিক অনিয়মের বিচার করে, তাহলে এটা একটা মেসেজ পেঁৗছে যাবে সব ভিসির কাছে_ কেউই তখন আর দুর্নীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িত করবেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্যদের নানা কাহিনী পত্র পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, যা পড়ে মাথা হেট হেয়ে যায়। আরেক উপাচার্যের কাহিনী ছাপা হয়েছিল ক'দিন আগে। তাতে দেখা গেছে তিনি তার সরকারি বাসায় একটি বিউটি পার্লার স্থাপন করেছেন। ছবিও আছে একটি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভিসি তার বাসভবনে প্রতিষ্ঠিত বিউটি পার্লারের সিরিয়াল নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। একজন ভিসি, অর্থাৎ উপাচার্য, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিউটি পার্লার কেন, আলু-পটোলের ব্যবসা করতেই পারেন। এটা তার অধিকার। কিন্তু তিনি তো এর জন্য উপাচার্য ভবন ব্যবহার করতে পারেন না? খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ওই বিউটি পার্লারের জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও নেয়া হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তা থেকে। আমাদের দুঃখ লাগে আমরা এ ধরনের 'লোককেও' ভিসি বানিয়েছি। তিনি তো শিক্ষক সমাজের কলঙ্ক। তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাম তিনি গোপালগঞ্জের মানুষ হতে পারেন। কিন্তু গোপালগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ওই এলাকার একজন শিক্ষকেই নিয়োগ দিতে হবে কেন। এ প্রবণতা তো আঞ্চলিকতার জন্ম দেবে। দিয়েছেও। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধির কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করেছেন। এটা তিনি করতে পারেন না। দুদকে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারীর অভিযোগ রয়েছে। তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন দুদকের চিঠির কোনো জবাব দিতে হবে না। কেননা তিনি ম্যানেজ করে ফেলেছেন। কী সাংঘাতিক কথা। সরাসরি তিনি বললেন 'ম্যানেজ' করার কথা। দুদক তো কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না ইদানীং। ভদ্রলোক গোপালগঞ্জের মানুষ এবং ভিসি হতে পারেন। তাই বলে কী ছাড় পেতে পারেন? নিশ্চয়ই তিনি এটা পারেন না। তার বিরুদ্ধেও তহবিল তসরূফ ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এখন ভবিষ্যতই বলতে পারবে দুদক বিষয়গুলোকে কিভাবে দেখছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে অনেক ভিসির 'কাহিনী' কোনোদিই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। হয়তো হবেও না। তবে তাদের সম্পদের হিসাব যদি নেয়া যায়, তাহলে 'থলের বিড়াল' বেরিয়ে এলেও আসতে পারে। মনে আছে বিএনপি জমানায় এক ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্রয়কৃত ইট-সিমেন্ট দিয়ে ঢাকায় নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। আরেক ভিসি তার জন্য নির্ধারিত বাসভবনে না থেকে নিজ বাড়িতে থেকে বাসা ভাড়া গ্রহণ করেছিলেন (সে টাকা ফেরত দিতে আমি বাধ্য করেছিলাম আমার তদন্ত শেষে)। আরেক ভিসি নিজের বোনকে বিয়ের বিনিময়ে একজনকে চাকরি দিয়েছিলেন। তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তার দুর্নীতি সংক্রান্ত ফাইল হারিয়ে গিয়েছিল। কোনো বিচার হয়নি। আজ তাই গোপালগঞ্জের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির 'বিউটি পার্লার' দেয়ার কাহিনী শুধু সংবাদপত্রেই থেকে যাবে বলে আমার আশঙ্কা। আর শিক্ষামন্ত্রীও আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যাবেন এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের আহ্বান জানাবেন। সংবাদপত্রে সে খবর ছাপা হবে। আমরা উৎসাহিত হব। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন হবে, আমরা তা আশা করতেই থাকব। এ 'কাহিনীর' যেন শেষ নেই। সরকার একটু ভাবুন কাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে? কী তাদের যোগ্যতা? 'বিউটি পার্লার' দেয়ার যার মানসিকতা তিনি কী ভিসি হতে পারেন? যোগ্য লোককে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদগুলোতে নিয়োগ না দিলে যা হয় তাই হয়েছে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির ক্ষেত্রে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিক তাকে ওই পদে রাখা কতটুকু যৌক্তিক হবে? আমরা শুধু আশা করতেই পারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ঠিকমতো চলুক। দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি অবদান রাখুক। প্রধানমন্ত্রীর নিজের বাড়ি গোপালগঞ্জ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের কথা বিবেচনা করে তিনি গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু একজন ব্যক্তির জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়বে, আমরা তা চাই না। বিষয়টি তদন্ত হোক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হোক। সেই সঙ্গে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও কথা বলা দরকার। প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ি রংপুর। উপরন্তু একজন মহীয়সী নারীর নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অধ্যাপক নবী মাত্র তৃতীয় ভিসি। অধ্যাপক নূর উন নবী তার টার্ম শেষ করেছেন ৫ মে। তিনি অনেক তদবির করেছেন দ্বিতীয় টার্মের জন্য। তার অতীত রেকর্ড ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে সরকার আর দ্বিতীয় টার্মের জন্য তাকে নিয়োগ দেয়নি। দ্বিতীয় টার্ম যে কখনো ভালো হয় না তার বড় প্রমাণ অধ্যাপক মীজানুর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তার একটি মন্তব্যের জন্য তিনি বিতর্কিত হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, 'ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাকরি দিতে তিনি বাধ্য।' হয়ত কথাটা তিনি এভাবে বলতে চাননি। কিন্তু প্রথম আলোর মতো পত্রিকা তার বক্তব্য এভাবেই ছেপেছিল। তিনি নাকি বলতে চেয়েছিলেন তার আমলে কোনো জামায়াত-শিবির কর্মী জগন্নাথে চাকরি পাবে না। তিনি ভিসি। সিদ্ধান্ত তিনি নিতেই পারেন। কে শিবির, কে ছাত্রদল, কে জাসদ_ কাউকে তো এভাবে চিহ্নিত করা যায় না। তিনি স্পষ্টভাষী। সবসময় স্পষ্ট করে কথা বলেন। টিভি টকশোতেও বলেন। বিরোধী পক্ষকে ছাড় দেন না। তার রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তিনি এমনটি করতেই পারেন। আমার ধারণা তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নিলে ভালো করবেন। ভবিষ্যতে দেশ ভালো নেতৃত্ব পাবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতি আর শিক্ষকতা এক সঙ্গে তিনি মেলাতে পারছেন না। রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। নিশ্চয়ই তিনি এটা উপলব্ধি করতে পারবেন। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার অনুরোধ থাকবে তিনি রাজনীতিতে আসুন। আমরা দেশে ভালো নেতৃত্ব পাব।
ভিসিদের নিয়ে নানা কাহিনী আমাকে বিব্রত করে। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি সরকারের শীর্ষ আমলা হয়েছিলেন। তিনি আমাকে দেখাতে চেয়েছিলেন কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে (এমনকি জাহাঙ্গীরনগরের ক্ষেত্রেও)। আমার ওই বন্ধু বর্তমান সরকারের খুব কাছের লোক। ধারণা করছি ভবিষ্যতে কোনো 'বড় পদ' পাবেন তিনি। বন্ধু হিসেবে নিশ্চয়ই খুশি হব আমি তাতে; কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম শিক্ষক হিসেবেই আমি ব্যর্থ। উপাচার্য হই কিভাবে? বর্তমান সময়ে উপাচার্য হলে অনেক 'গ্রুপ'কে সন্তুষ্ট করতে হয়। আমি তা পারব না। আমার অনেক দুঃখবোধ আছে। শিক্ষক হিসেবে ভালো ছাত্রটিকে আমি শিক্ষক হিসেবে পাইনি। কেননা তার কোনো রাজনৈতিক দর্শন ছিল না। অর্থাৎ কোনো বড় ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। শুধু পড়াশোনা করে গেছে সারাটা সময়। অনার্স ও মাস্টার্সে তার অবস্থান দুটোতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম ছিল। কিন্তু শিক্ষক হবার 'যোগ্যতা' সে অর্জন করতে পারেনি। টিআইবি আমাদের জানিয়েছিল টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়। কাকে শিক্ষক বানানো হবে, প্রথম থেকেই অর্থাৎ প্রথম বর্ষ থেকেই 'টার্গেট' নিয়ে এগিয়ে যায় একটি 'চক্র'। বারে বারে পরীক্ষা কমিটিতে থাকা, বিশেষ বিশেষ শিক্ষকের সঙ্গে সখ্যতা_ যা টিআইবির রিপোর্টে ছিল, তাতে কোনো মিথ্যা কিছু ছিল না। কিন্তু ওই রিপোর্টের পরও কী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন এসেছে? না, পরিবর্তন আসেনি। আজও দেখি আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। কিংবা অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা 'চুপ'। কেননা তাদের স্বার্থ আছে। তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সন্তানরা শিক্ষক হিসেবে এখন যোগ দিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগরে। তাই আমার বন্ধুকে বলি আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। অবসরে যাব এই ব্যর্থতা নিয়েই। কোনো দায়িত্ব আমি আগামীতেও নেবো না।
লেখাটা শুরু করেছিলাম দুদককে উদ্দেশ্য করে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক নূর উন নবী 'দুর্নীতির ডাকাত' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। প্রতিদিন 'নাশতার' বা আপ্যায়নের জন্য যিনি বিল তোলেন প্রায় সাত হাজার ২৩৩ টাকা (মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী), ভর্তি পরীক্ষায় ডিউটি না করেও যিনি তিন বছরে বিল নেন ১৬ লাখ টাকা (তদন্ত রিপোর্ট), তাকে 'দুর্নীতির ডাকাত' বলাই তো যুক্তিসঙ্গত। এখন দুদক তদন্ত করুক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হোক। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক।
আর ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাছ-বিচার করা হোক। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিরুৎসাহিত করে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের এবং সিনিয়র প্রফেসরদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হোক। যারা এখন ভিসির জন্য তদবির করছেন, টিভি টকশোতে সরকারের গুণগান গাচ্ছেন বেশি করে, বুঝতে হবে তাদের উদ্দেশ্য সৎ নয়। আমরা একুশ শতক উপযোগী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তৈরি করতে চাই। কিন্তু 'নবী মার্কা ভিসি' কিংবা 'মীজান মার্কা মডেল' (প্রথম আলো), আর যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একুশ শতক উপযোগী করে গড়ে তুলতে কোনো সাহায্য করবে না। আমাদের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে এই উপলব্ধি বোধটুকু আসুক, এটাই প্রত্যাশা করি।
Daily Jai Jai Din13.05.2017

বিএনপি কি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিল?



বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বুধবার ঢাকায় একটি হোটেলে ‘ভিশন-২০৩০’ উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি ২০৩০ সালের বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চায়, তা উপস্থাপন করেছে। যদিও এর আগে বিএনপির মহাসচিব জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভিশন-২০৩০-এর সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। বিএনপি এখনও নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনেনি। অর্থাৎ বিএনপি বারবার বলে আসছে, শেখ হাসিনা দলীয়প্রধান, তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেখে নির্বাচনের আয়োজন করলে সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। একসময় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করত। এখন আর তারা সেই দাবি করে না। তারা চাচ্ছে একটি নির্বাচনকালীন সরকার, যেখানে বড় দল হিসেবে বিএনপিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সরকার গঠিত হবে, যে সরকার নির্বাচন পরিচালনা করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সংবিধানে এ ধরনের কোনো সরকারের কথা উল্লেখ নেই। এটাই বিবেচনায় নিচ্ছে সরকারি দল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়ে দিয়েছেন, পৃথিবীর কোনো দেশে এ ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার নেই। অর্থাৎ বিএনপির প্রস্তাবে আওয়ামী লীগ রাজি নয়। ফলে একটা জটিলতা থেকেই গেল।

সংবিধানের কোথাও স্পষ্ট করে বলা নেই একটি ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ কথা। তবে ৫৭(৩)-এ বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না।’ এর অর্থ পরিষ্কার- যিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন। অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। বিএনপির আপত্তিটা এখানেই। বিএনপি মনে করে, যেহেতু শেখ হাসিনা একটি দলের প্রধান, সুতরাং তাকে ক্ষমতায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ যুক্তি একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবে বলা হলেও এ কমিশন কখনই স্বাধীন ছিল না। কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা, ডিসি ও টিএনওদের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর এদের নিয়ন্ত্রণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও সংবিধানের ১২৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে’, বাস্তবে এটা শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ‘নির্বাহী কর্তৃপক্ষ’ নির্বাচন কমিশনের কথায় চলে না। এবং নির্বাচন কমিশনও এদেরকে ‘কর্তব্য পালনে’ বাধ্য করতে পারে না। ফলে সরকার যা চায় তা-ই হয়। নির্বাচন কমিশন এখানে ঠুঁটো জগন্নাথ। কাজেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রশ্নে সরকারের আন্তরিকতাটাই আসল।

এখন বিএনপি বলছে একটি ‘নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখার’ কথা। এই ‘রূপরেখা’ তো সরকার দেবে না। দিতে হবে বিএনপিকে। গত ৯ মার্চ এক আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছিলেন, শিগগিরই খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেবেন। আমরা জানি না সেই রূপরেখা কী হবে। ইতিমধ্যে দু’মাস কেটে গেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে (২০১৪) প্রধানমন্ত্রী একটি ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। ওই মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিএনপিকে, যা বিএনপি গ্রহণ করেনি। এখন কি প্রধানমন্ত্রী সেরকম একটি আমন্ত্রণ জানাবেন? তবে ২০১৪-পূর্ববর্তী পরিস্থিতি ও আজকের পরিস্থিতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নবম সংসদে বিএনপি ছিল এবং সংসদ সদস্যদের সমন্বয়েই ওই সময় একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। এখন তো বিএনপি সংসদে নেই। তাহলে বিএনপি ‘নির্বাচনকালীন সরকারে’ থাকবে কী করে? এখানেই এসে যায় সরকারের আন্তরিকতার প্রশ্ন। বিএনপি সংসদের বাইরে বড় দল। দেশে ও বিদেশে দলটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে। দাতাগোষ্ঠী বারবার ‘সব দলের অংশগ্রহণে’ যে নির্বাচনের কথা বলছে, তার মাধ্যমে তারা পরোক্ষভাবে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার কথাই বোঝাচ্ছে। এখন সেটি সম্ভব হবে কীভাবে? শেখ হাসিনাই নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। এটাই সংবিধানের কথা। সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না। এখন বিএনপিকে আস্থায় নিতে হলে দলটিকে একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায়’ অন্তর্ভুক্ত করা যায় শুধু নির্বাচন প্রস্তুতিকালীন তিন মাস সময়ের জন্য। সরকার নীতিগতভাবে এক্ষেত্রে কতগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা অনেকটা এরকম : ১. শুধু সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন একটি সরকার গঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ১০ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা থাকবে; ২. তিনটি দল- আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এই মন্ত্রিসভায় থাকবে (মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির জন্য তিনটি উপনির্বাচনে তিনজন বিএনপি প্রার্থীকে ‘বিজয়ী’ করে সংসদে আনা যায়); ৩. প্রধানমন্ত্রী ব্যতিরেকে যারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন, তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না; ৪. জনপ্রশাসন অথবা স্বরাষ্ট্র যে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেয়া যেতে পারে; ৫. ওই সরকার নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না; ৬. নির্বাচনের সময় ডিসি, টিএনও ও ওসিদের বদলি করা হবে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নতুন লোক দিতে হবে। বিকল্প হিসেবে স্পিকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে পারেন, অথবা আওয়ামী লীগের যে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা এই দায়িত্বটি নিতে পারেন। তবে নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তারা কেউই (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। তিনটি দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এ কারণে যে, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই তিনটি দলের বরাবরই প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এর বাইরে যেসব দল দশম কিংবা নবম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে, তারা দুটো বড় দলের ব্যানারে এবং ওই দলের প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন (যেমন জাসদের দলীয় প্রতীক মশাল, বিজয়ী হয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে)। সুতরাং অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় ওইসব দলের প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন নেই।

বেশকিছু কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন প্রয়োজন। এজন্য বিএনপিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে। আমার ধারণা বর্তমান সরকারও চায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক। পরপর দুটো নির্বাচনে বিএনপি যদি অংশ না নেয়, তাতে সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হবে না সত্য, কিন্তু বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি একটা প্রশ্নের মুখে থাকবে। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। মামলার রায়ও হবে চলতি বছরে। এতে করে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার একটা প্রশ্ন আছে। খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না- এসব কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টি একান্তই আইনগত। সুতরাং আদালতের ওপরই বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে। এ বিষয়ে আমরা যত কম কথা বলব, ততই মঙ্গল। তৃতীয়ত, জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলে এবং একইসঙ্গে সরকারে রেখে সরকার খুব লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে মেনে নেয়নি। বিএনপি সংসদে বিরোধী দলে থাকলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত।

এদেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য দুই বড় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে দেশে ‘গণতন্ত্রের হাওয়া’ বইবে না। আর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি বিভেদ-অসন্তোষ থাকে, তাহলে এ থেকে ফায়দা নেবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো, যা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের অনেক অর্জন আছে। অনেক সেক্টরে আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা রাখি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাক শিল্পে আমাদের সক্ষমতা, ওষুধ শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটা পরিচিতি আছে। আমরা ‘সফ্ট পাওয়ার’ হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছি। ‘নেক্সট ইলেভেনে’ বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭-এর ঘরে থাকবে বলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই ‘অর্জন’ মুখ থুবড়ে পড়বে যদি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে দুই বড় দলের মাঝে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হয়। এ ‘আস্থার সম্পর্ক’ শুধু দেশের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্যই নয়, বরং স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, উপরন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্যও প্রয়োজন। কারণ সাধারণ মানুষ চায় দুই বড় দলের নেতারা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবেন। তারা একে অন্যকে আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য রাখবেন না। দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে। এই প্রতিযোগিতা হতে হবে রাজনৈতিক ও কর্মসূচিভিত্তিক।

প্রধানমন্ত্রী পরোক্ষভাবে ‘নির্বাচনী প্রচারণা’ একরকম শুরু করে দিয়েছেন। গত দুই মাসে তিনি একাধিক জনসভা করেছেন। প্রতিটিতেই তিনি উন্নয়নের কথা বলেছেন। বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি বলেই বিবেচিত। সেখানে তিনি বলেছেন, উন্নয়নে কোনো বিশেষ এলাকা বিবেচ্য নয়। এর অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়ে আসবেন। সামনে আছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের বিষয়টি, যা ২০১৮ সালে চালু হওয়ার কথা। হয়তো পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেই তিনি নির্বাচনের তারিখ দেবেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে? দলটি নির্বাচনে যাবে। তারা নিশ্চিত হতে চায় নির্বাচনে কারচুপি হবে না এবং নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে। ইসির ব্যাপারে বিএনপির রিজার্ভেশন আছে। সিইসিকে বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপরও কথা থেকে যায়। একটি গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার- যা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেও গঠন করা সম্ভব- বিএনপির আস্থা অর্জন করতে পারে এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। স্পষ্টতই ‘রাজনীতির বলটি’ এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে কিংবা নিবন্ধন বাতিল করার কথা বলে আর যাই হোক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা উপহার দিতে পারব না। সুতরাং নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি যখন আগ্রহ দেখিয়েছে, তখন বিএনপির এই ‘আগ্রহ’কে কাজে লাগিয়েই নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

এদিকে গত ৮ মে ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদোন বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ কাম্য (যুগান্তর, ৯ মে)। এ ধরনের কথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এর আগেও উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু এই ‘শিক্ষা’ কি বড় দলগুলো নিয়েছে? আমার মনে হয় না। আমরা বারবার বলে আসছি, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে একটা আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার। ২০১৪ সালের পর আজ অব্দি সেই আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে দিন যতই গড়াচ্ছে, ততই শঙ্কা বাড়ছে- যদি আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হয়, তাহলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা? ২০১৪ সালের জানুয়ারির আর ২০১৮ সালের শেষের কিংবা ২০১৯ সালের জানুয়ারির পরিস্থিতি নিশ্চয়ই এক নয়। এক হবেও না। বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। তারা তা পারেনি। এই ভুল এবার আর বিএনপি করবে না। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য, বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসতে হলে সরকারকে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের আন্তরিকতাটাই হল আসল।
Daily  Jugantor
13.05.2017

ফ্রান্সে ম্যাখোঁর বিজয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ


শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বিজয়ী হয়েছেন। এই বিজয় ইউরোপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করলেও ব্রেক্সিটের পর তাঁরা যে খুব স্বস্তিতে আছেন, তা বলা যাবে না। ফ্রান্সে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণ ঠেকানো গেছে বটে, তার পরও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং তা থাকবেও। ম্যাখোঁ বিজয়ী হয়েছেন বহু কারণে। প্রথমত, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুটি বড় দল সমাজতান্ত্রিক আর রিপাবলিকান পার্টির কোনো প্রার্থী ছিল না। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলের মনোনয়নই পাননি। আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল দুর্নীতির। ফলে একসময় ওলাঁদের মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী ম্যাখোঁ অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ফ্রান্স ঐতিহ্যগতভাবেই অভিবাসীদের দেশ। অভিবাসীদের রক্তেই ফ্রান্সের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে মারিন ল্য পেনের অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেনি। তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতেই মানুষ বেশি পছন্দ করেছে। ব্রেক্সিটের পর ফ্রেক্সিটের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সের বেরিয়ে যাওয়া) ব্যাপারে সমর্থন ছিল না ফ্রান্সবাসীর। বলা ভালো, ছয়টি দেশ নিয়ে ১৯৫৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বসূরি ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি গঠিত হয়েছিল, ফ্রান্স ছিল তার মধ্যে অন্যতম। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাপারে ফ্রান্সবাসীর এক ধরনের দুর্বলতা আছে। তারা ল্য পেনকে ক্ষমতায় বসিয়ে ইইউ ছাড়তে রাজি ছিল না।
অনেক প্রশ্ন, আর অনেক জিজ্ঞাসা সামনে রেখেই ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ক্ষমতা নিতে যাচ্ছেন ১৪ মের মধ্যে। এটাই নিয়ম। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের মতো একটি বড় শক্তির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াকে বিশ্লেষকরা কেউ কেউ সম্রাট নেপোলিয়নের (১৭৬৯-১৮২১) সঙ্গে তাঁকে তুলনা করেছেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৮০৪ সালে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেছিলেন (১৮০৪-১৪)। আর ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ক্ষমতা নিচ্ছেন ৩৯ বছর বয়সে। ফ্রান্স বিশ্বের ষষ্ঠ অর্থনীতি জি-৭-এর সদস্য। সুতরাং ফ্রান্স যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শক্তিশালী হবে। আর ল্য পেন বিজয়ী হলে ফ্রান্স বেক্সিটের পথ অনুসরণ করত, তাতে ক্ষতি হতো ইউরোপীয় ঐক্যের। লাভবান হতো রাশিয়া ও ট্রাম্প। ট্রাম্প তো বেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন এবং ফ্রেক্সিটকেও সমর্থন করতেন। এতে আমরা এক দুর্বল ইউরোপকে পেতাম। এ যাত্রা রক্ষা পেয়েছে ইইউ। কিন্তু ইইউয়ের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ফ্রান্সের মতোই ইইউয়ের অন্যান্য দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা শক্তিশালী হচ্ছে। এরা ইউরোপীয় ঐক্যকে আগামী দিনে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ফলে ভেঙে যেতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই প্রক্রিয়া ব্রিটেন থেকেই শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে ব্রিটেনে গণভোট হয়েছিল। সেই গণভোটে ইইউতে না থাকার পক্ষে রায় পড়েছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের আইনসভার উভয় কক্ষে এটি অনুমোদিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে গত ২৯ মার্চ আর্টিকেল ৫০ অনুযায়ী একটি চিঠি লিখেছেন। ৪৪ বছর আগে ১৯৭৩ সালে ব্রিটেন ইইসিতে যোগ দিয়েছিল। আর ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত লিসবন চুক্তি হচ্ছে ইইউয়ের সাংবিধানিক ভিত্তি। অর্থাত্ লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুযায়ী যেকোনো সদস্য দেশ ইইউ ত্যাগ করতে পারে। ব্রিটেন এখন এই ধারা অনুসরণ করছে। তবে সমস্যা কিছু রয়ে গেছে। ব্রিটেনকে বিশাল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ব্রিটেনে বসবাসরত ইইউয়ের নাগরিকদের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন আছে। আলোচনা শুরু হবে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। আর সব ঠিক থাকলে ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ কার্যকর হবে। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, ফ্রান্সে ম্যাখোঁর বিজয় ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু ব্যাপক অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, সন্ত্রাসবাদ—যার সঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন জড়িত। কিংবা ইইউয়ের ভেতরকার আর্থিক টানাপড়েন, উগ্র ডানপন্থী তথা কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান কি ভবিষ্যতে ইইউকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে আদৌ কোনো সাহায্য করবে?
এটা অস্বীকার করা যাবে না বিশ্ব রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি অবস্থান রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। কেননা পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক  রাষ্ট্রগুলোর প্রায় সব কটি এখন ন্যাটো তথা ইইউয়ের সদস্য। ফলে ইইউ বিশ্ব রাজনীতিতে এখন একটি শক্তি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়েও আলাদা একটি অবস্থান নিয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এক ও অভিন্ন, তা বলা যাবে না। কিন্তু ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসী আগমনকে কেন্দ্র করে বদলে গেছে দৃশ্যপট। এই অভিবাসন ইস্যুতে ব্রিটেনে নির্বাচনে হেরে গেছে ক্ষমতাসীন দল। ভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় পড়ে। আর টেরেসা মে সেই প্রক্রিয়াই এখন শুরু করেছেন। তবে ভালো সংবাদ হচ্ছে, ফ্রান্সে ভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থীরাই জয়ী হয়েছেন।
গেল মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার জন্মের ৬০ বছর পার করেছে। ১৯৫৭ সালে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গকে নিয়ে যে সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল (ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি) তা এখন ২৭টি রাষ্ট্রের একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া এই সংগঠনে যোগ দিয়েছে ২০০৭ সালে। মূলত ২০০৪ সালের আগে কোনো সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশ ইইউতে যোগ দিতে পারেনি। এ জন্য কোপেনহেগেন ফর্মুলায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু, মুক্তবাজার অর্থনীতি, মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। এক. শেঙেন চুক্তি ও দুই. একক মুদ্রা ইউরো চালু। ১৯৯৭ সালের ১৬ মার্চ শেঙেন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ইইউভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা ভিসা ছাড়া এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলাচল করতে পারে। অন্যদিকে ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এক মুদ্রা ইউরো চালু হয়। ১৯৯২ সালের ম্যাসট্রিচট্ চুক্তির ফলে ইউরো চালু হয়েছিল। এখানে বলা ভালো, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে ইইসি ইউরোপীয় ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ইইউয়ের জিডিপির পরিমাণ ১৯.২০৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের বড় অর্থনীতি। কিন্তু ইইউয়ের জন্য বড় সমস্যা হচ্ছে দক্ষিণপন্থী উত্থান। শুধু ফ্রান্স কেন? ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ (ইইউভুক্ত) এই দক্ষিণপন্থী প্রবণতায় আক্রান্ত। অস্ট্রিয়ায় নব্য নাজি নেতা নর্বাট হফার ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় জিতে গিয়েছিলেন। তিনি ফ্রিডম পার্টির নেতা। জার্মানিতে জুন মাসে (২০১৭) সংসদ নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, উগ্র দক্ষিণপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মান পার্টি, যাদের নব্য নাজি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তারা সংসদে প্রথমবারের মতো যেতে পারে। হল্যান্ডে উগ্র দক্ষিণপন্থী পার্টি ফর ফ্রিডমের উত্থান লক্ষ করার মতো। মার্চে (২০১৭) সেখানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই দলটি নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে। নিউ ইর্য়ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে (মার্চ ২০, ২০১৭) পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে—ইতালি, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, সুইডেন কিংবা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পেরেছে। ফলে ফ্রান্সে মারিন ল্য পেনের উত্থান ঘটবে, উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সেখানে শক্ত অবস্থানে থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। এই উগ্র দক্ষিণপন্থী উত্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যের জন্য হুমকি। এই উগ্র দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের কারণে ইতালিতেও সরকারের পতন ঘটেছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য আরেকটি অশনিসংকেত হচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে ধনী ও গরিব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। গ্রিসের অভিজ্ঞতা পাঠকদের মনে আছে। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। পরে সেখানকার বামপন্থী সিপ্রাস সরকার শর্ত মেনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ গ্রহণ করে। বলা যেতে পারে, এক ধরনের শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণ করেই গ্রিস তার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখছে। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, ইতালি, পর্তুগাল কিংবা আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতিও কোনো ভালো অবস্থানে নেই। মূলত ইইউভুক্ত দেশগুলোতে একদিকে জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের মতো ধনী রাষ্ট্র রয়েছে, যারা নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রভাব খাটাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রিস কিংবা পর্তুগালের মতো দেশ রয়েছে, যারা পরিপূর্ণভাবে ধনী রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য যদি কমিয়ে আনা না যায়, তাহলে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে অসন্তোষ থাকবেই। আর এই অসন্তোষই ইইউকে বিভক্তির মুখে ঠেলে দেবে। ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। ফ্রান্সে এ রকম একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা ম্যাখোঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে এড়ানো গেছে। ভবিষ্যতে ইতালির দিকে লক্ষ্য থাকবে অনেকের। সেখানে অসন্তোষ আছে। ইইউবিরোধী সেন্টিমেন্ট আছে। উগ্র দক্ষিণপন্থীরা এই অসন্তোষ তাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, কিছু বিষয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ঐক্য, অভিবাসন, অর্থনীতি, ফরাসি নাগরিকদের মর্যাদা ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়গুলো ভবিষ্যতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। ১১ জুন সেখানে সংসদ নির্বাচন। যদিও ফ্রান্সে সংসদীয় রাজনীতি নেই। এখানে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। এ কারণে সংসদের ভূমিকা মুখ্য নয়, গৌণ। তার পরও সংসদে যে দলের আসন বেশি থাকবে, তার একটি ভূমিকা থেকে যাবেই। এর মধ্যেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূলধারার রাজনীতিবিদদের বিদায় নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে সেখানে। এখন দেখার পালা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি ভালো অর্থনীতিবিদ। অর্থমন্ত্রী ছিলেন। করপোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। ফ্রান্সে বেকার সংখ্যা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ। এই বেকারদের একটা বড় অংশ অভিবাসী, বিশেষ করে মুসলমান ধর্মাবলম্বী এবং মুসলমানপ্রধান দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান। তাদের একটা অংশ বিভ্রান্ত হয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে। সেখান থেকে কেউ কেউ ফিরেও এসেছে। তবে ম্যাখোঁর নীতি নিয়ে ভয়ও আছে। নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ ২০ হাজার সরকারি কর্মসংস্থান কমিয়ে সরকারি খরচ ৬০ বিলিয়ন ইউরো কমাবেন। সেই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ কমাবেন ৫০ মিলিয়ন ইউরো। করপোরেট লাভের কর ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনবেন ২৫ শতাংশে। সরকারি খরচ জিডিপির ৫২ শতাংশে নামিয়ে আনবেন। সপ্তাহের শ্রমঘণ্টা ৩৫ ঘণ্টা তিনি বহাল রাখবেন। যারা স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের সবার স্বাস্থ্যসেবা তিনি নিশ্চিত করবেন। প্রতি মাসে ৫০০ ইউরো বাসা ভাড়া বরাদ্দ ও বেকার ভাতার পরিধি বাড়াবেন। ইইউ যে সাধারণ শরণার্থী নীতি গ্রহণ করেছে, তা তিনি অনুসরণ করবেন। অতিরিক্ত ১০ হাজার পুলিশ নিয়োগ দেবেন। কিন্তু যে প্রশ্ন আমি এরই মধ্যে অনেকের লেখায় পেয়েছি, তা হচ্ছে তাঁর এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি বেকার সমস্যা সমাধানে ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হ্রাসে কতটুকু সাহায্য করবে? ম্যাখোঁ অর্থনীতি ভালো বোঝেন। সুতরাং ইসলামবিরোধী একটি সেন্টিমেন্টের জন্ম দিয়ে গেলেন, তার কী হবে? প্রায় ৬৬.৮১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭.৭ মিলিয়ন ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। শতকরা হিসেবে প্রায় ১১ ভাগ। মূল জনগোষ্ঠীর জন্য এটা কোনো হুমকি নয়। তবে আইএস তাদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা ঘাঁটি গেড়েছে। ম্যাখোঁ এখন এই তরুণদের ব্যাপারে কী নীতি গ্রহণ করেন সেটাই দেখার বিষয়। ম্যাখোঁর বিজয় তাই এই মুহূর্তে হয়তো অনেক প্রশ্নের কোনো জবাব দেবে না। তবে এটা তো ঠিক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যত্ রাজনীতির দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। রাশিয়ার আগ্রহ বাড়ছে ইউরোপের দিকে। ম্যাখোঁর ই-মেইল ফাঁসের সঙ্গে রাশিয়া জড়িত, এমন একটা কথা শোনা গেছে। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পও চান ব্রিটেনের মতো অন্যান্য দেশও ইইউ থেকে বেরিয়ে আসুক। সব মিলিয়ে ব্রেক্সিটের পর ফ্রান্সের নির্বাচনে বড় পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু ইইউ নিয়ে আলোচনা যে শেষ হয়েছে, এটা বলা যাবে না।
Daily kalerkontho
10.05.2017

কোন পথে ফ্রান্স


ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ম্যাক্রনের বিজয়ী হওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে কোন পথে এখন ফ্রান্স? প্রথম দফা নির্বাচনে কোনো প্রার্থী শতকরা ৫০ ভাগ ভোট নিশ্চিত করতে না পারায় চূড়ান্ত পর্বে দুজন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। গত ৭ মে মূল পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন আর মেরিন লে পেন। নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। ফ্রান্সের নয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এলিসি প্রাসাদে উঠবেন আগামী ১০ দিনের মধ্যে। মজার কথা হচ্ছে, প্রথা অনুযায়ী নয়া প্রেসিডেন্টকে কোনো শপথ নিতে হবে না। তবে ১০ দিনের একটি কথা বলা আছে। এই ১০ দিনের মধ্যেই তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন। এর আগে যেদিন তিনি এলিসি প্রাসাদে যাবেন, সেদিন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের সঙ্গে একটি বৈঠকে মিলিত হবেন এবং পারমাণবিক অস্ত্রের কোড বুঝে নেবেন। সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মার্চপাস্ট, সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে নয়া প্রেসিডেন্টকে বরণ করে নেওয়া হবে। অনেকগুলো কারণের জন্য এবারের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনেক বৈশিষ্ট্যম-িত ছিল। বিশেষ করে ট্রেডিশনাল দুটি পার্টি সমাজতান্ত্রিক ও রিপাবলিকান এই দল দুটোর প্রার্থীরা চূড়ান্ত পর্বে আসতে পারেননি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ সমাজতান্ত্রিক। কিন্তু তিনি নির্বাচনেই ছিলেন না। কেননা জনপ্রিয়তা না থাকায় দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। ম্যাক্রন ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং সমাজতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য তিনি নতুন একটি সংগঠন (‘এন মার্চে’Ñ চলো এগিয়ে যাই) গঠন করেন। প্রশাসনে ম্যাক্রনের অভিজ্ঞতা আছে। তিনি সাবেক ব্যাংকারও বটে। নির্বাচনের জন্যই তিনি গত আগস্ট (২০১৬) সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে মেরিন লে পেনের কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল না। পারিবারিকভাবেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। তার প্রয়াত বাবা জ্যাঁ পেরি লে পেন অতীতে উগ্রপন্থি নানা বক্তব্যের জন্য বারবার সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি কট্টরপন্থি উগ্র ন্যাশনাল ফ্রন্ট দলটি গঠন করেছিলেন অনেক আগেই। ২০০২ সালে জ্যাঁ পেরি লে পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। ফ্রান্সের রাজনীতিতে ন্যাশনাল ফ্রন্টের অবস্থান কখনই শক্ত ছিল না। তবে এবারই প্রথম ব্যতিক্রম। মূলত ব্যাপক অভিবাসন ইস্যুকে মুখ্য করে মেরিন লে পেন এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার অবস্থান শক্ত করেছিলেন। এমনকি কোনো এক পর্যায়ে তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হবেন বলেও ধরা হয়েছিল। যদিও প্রথম দফায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি থেকে গিয়েছিলেন। এটাই তার বড় সাফল্য। নির্বাচনে এদের দুজনেরই রাজনৈতিক অবস্থান ছিল পরস্পরবিরোধী। মেরিন লে পেন ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী। তিনি ব্রিটেনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে আনতে চেয়েছেন। তবে কাজটি কারো জন্যই খুব সহজ নয়। এর সঙ্গে সংবিধানের প্রশ্নটি জড়িত। লে পেন বলেছিলেন, তিনি ‘বিজয়ী’ হলে গণভোটের আয়োজন করবেন। এমনকি তিনি ইউরোর পরিবর্তে ফ্রান্সের আদি মুদ্রা ফ্রাংক প্রবর্তনেরও পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে ম্যাক্রনের অবস্থান ছিল পরিপূর্ণভাবে বিপরীত। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্সের থাকার পক্ষে ছিলেন। তবে সংস্কারের পক্ষপাতী। আবার ম্যাক্রনের মুখ থেকে কখনও মুসলমানবিরোধী কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। কিন্তু মেরিনের বক্তব্য ছিল ঠিক উল্টো। তিনি প্রথম থেকেই মুসলমানবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তিনি প্রচ-ভাবে অভিবাসনবিরোধী। ২০১৫ সালের পর থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে যে সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটিত হয়েছে, তাতে মারা গেছেন ২৩০ জন। এ প্রসঙ্গ টেনে মেরিন বলেছিলেন, সীমান্তে কড়াকড়ি করার ইচ্ছা আছে তার। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিসাহীন ও অবাধ যাতায়াতের (শেঙ্কে চুক্তি) যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে তার আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে বেকারত্বের হার শতকরা ১০ ভাগ। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের দিক থেকে ফ্রান্সের অবস্থান অষ্টম। মাগরেবভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের মধ্যে এই বেকারত্বের হার বেশি, যা কিনা তরুণ প্রজন্মকে জঙ্গিবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক তরুণ এখন সিরিয়ার রাকা থেকে ফ্রান্সে ফিরে আসছে। এরা অনেকেই আবার ফ্রান্সের ভেতরেই সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। নয়া প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের দায়িত্ব এখন তরুণদের কীভাবে এ পথ থেকে ফেরানো যায়, সে ব্যাপারে একটি ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া ও সবার সহযোগিতা নিশ্চিত করা। ম্যাক্রনের নীতিতে বছরে ১০ হাজার অভিবাসী গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যারা ফ্রান্স ভাষা জানেন ও বলতে পারেন। অন্যদিকে মেরিন লে পেন সীমান্ত ‘সিল’ করে দিয়ে মুসলমান অভিবাসীদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু এতে করে ফ্রান্সে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা যাবে না। এটা সত্য, আগামীতে ফ্রান্সের জন্য নিরাপত্তা ইস্যু হবে প্রধান সমস্যা। ট্রেডিশনালি এক সময় যে দেশগুলো ফ্রান্সের কলোনি ছিল এবং যারা মুসলমানপ্রধান দেশ হিসেবেই পরিচিত (যেমন আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিশিয়া), সেসব দেশ থেকেই মানুষ আইনগতভাবে ফ্রান্সে বসবাস করতে যান। এরা সবাই ফ্রান্স ভাষা জানেন। ফলে এদের আসা বন্ধ করা যাবে না। তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে ইমানুয়েল ম্যাক্রন অনেকটাই সফল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো নির্বাচনের আগে জনমানসে তিনি একটা অভিবাসনবিরোধী ‘সেন্টিমেন্ট’ ঢুকিয়ে দেননি। মানুষ এটা গ্রহণও করেনি, একই সঙ্গে ট্রাম্পের মতো ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ বা ‘শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্য’ মানসিকতার জন্ম তিনি দেননি। এটা ফ্রান্সের রাজনীতির জন্য বড় বেশি বেমানান। অতীতে কখনো ফ্রান্সের রাজনীতিতে এই ‘শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ’ দ্বন্দ্ব বড় ভূমিকা পালন করেনি। কিন্তু ট্রাম্পের আদলে লে পেন এই রাজনীতি শুরু করেছিলেন। কিছুটা সফল তিনি হয়েছেন, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। এই ‘রাজনীতি’ আগামী দিনে ফ্রান্সকে কোথায় নিয়ে যাবে, বলা মুশকিল। ম্যাক্রন এখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে হয়তো অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে এই শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ দ্বন্দ্ব থেকে যেতে পারে। ভয়টা এখানেই। তাই ফ্রান্সের নয়া প্রেসিডেন্টের জন্য একটি প্রধান কাজ হবে মুসলমান অভিবাসীদের আস্থা অর্জন করা।
তবে এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় এবং রাজনীতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থি যে প্রবণতা, তা আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেই স্পর্শ করেছে। ইউরোপের মানুষ এই সস্তা ‘পপুলিজ’-এ আকৃষ্ট হয়েছে। যে কারণে দেখা যায়, ব্রিটেনে দক্ষিণপন্থি তেরেসা মের উত্থান ও ‘ব্রেক্সিট’ বাস্তবায়ন। অর্থাৎ ব্রিটেনের নিজস্ব স্বকীয়তা, ‘শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেসি’ অভিবাসন বিরোধিতা ইত্যাদি সস্তা সেøাগান তুলে ব্রিটেন এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেল। এই রাজনীতি ফ্রান্সে লাগেনি, এটাই প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু আগামীর কথা কেউ বলতে পারে না। আগামী ১১ জুন সেখানে সংসদ নির্বাচন। যদিও ফ্রান্সে সংসদীয় রাজনীতি নেই। এখানে রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, উগ্র দক্ষিণপন্থিরা সমাজে সর্বত্র ঘাঁটি গেড়েছে। এই উগ্র দক্ষিণপন্থি তথা ন্যাশনাল ফ্রন্ট সমর্থকরা সংসদ নির্বাচনে ভালো করতে পারে। উগ্র দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে মডারেট বা মধ্যপন্থিদের ব্যবধান যে কমেছে, এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই প্রমাণিত হয়েছে। যেখানে ম্যাক্রন ভোট পেয়েছেন শতকরা ৬৫ ভাগ, সেখানে মেরিন লে পেন পেয়েছেন প্রায় ৩৫ ভাগ। ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর উগ্র দক্ষিণপন্থিরা এবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চিরাক পেয়েছিলেন ৮২ দশমিক ২ ভাগ ভোট, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেরিন লে পেনের বাবা জ্যাঁ লে পেন পেয়েছিলেন ৬৪ দশমিক ৪ ভাগ ভোট। এর পর প্রতিটি নির্বাচনে ব্যবধান ছিল বিশাল এবং উগ্র দক্ষিণপন্থিরা কখনো মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন না। ১৯৬৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যবধানটা ছিল কাছাকাছি, পমপেদু (৫৮.২ ভাগ) ও পোহের ( ১৬.৪ ভাগ)। ২০১২ সালে ব্যবধানটা ছিল বিশাল। ওলাঁদ (৫১.৬ ভাগ) ও সারকোজি (৩.৩ ভাগ)। ২০০৭ সালে ব্যবধান ছিল সারকোজি (৫৩.১ ভাগ) ও রয়াল (৬.১ ভাগ)। এর অর্থ হচ্ছে, ২০০২ সালের পর উগ্র দক্ষিণপন্থিরা নির্বাচনে তাদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে। এটা যে সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
কোন পথে এখন ফ্রান্স? নির্বাচনে বিজয়ের পর ম্যাক্রন স্পষ্ট করেছেন ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে। তবে আমাদের বুঝতে হবে, ফ্রান্সের জনগোষ্ঠীর প্রতি ৩ জনের ১ জন ইইউবিরোধী। এটা এখন ম্যাক্রনকে বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সে ৫ম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ফ্রান্সের জনগণ এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেয়েছে, যিনি শুধু তারুণ্যেরই প্রতিনিধিত্ব করেন না; বরং মূল ধারার রাজনীতিতেও তিনি নেই। তিনি দক্ষিণপন্থি নন, আবার বামপন্থিও নন। তিনি মূলত করপোরেট জগতের মানুষ। নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী ৫ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার সরকারি কর্মসংস্থান কমিয়ে সরকারি খরচ ৬০ বিলিয়ন ইউরো কমাবেন। সেই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ কমাবেন ৫০ বিলিয়ন ইউরো। করপোরেট লাভের কর ৩০ ভাগ থেকে কমিয়ে আনবেন ২৫ ভাগে এবং সরকারি খরচ জিডিপির ৫২ ভাগে কমিয়ে আনবেন। সপ্তাহের শ্রমঘণ্টা ৩৫ ঘণ্টা তিনি বহাল রাখবেন। যারা স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের সবার স্বাস্থ্যসেবা তিনি নিশ্চিত করবেন। প্রতি মাসে ৫০০ ইউরো বাসা ভাড়া বরাদ্দ ও বেকার ভাতার পরিধি বাড়াবেন। ইইউ যে সাধারণ শরণার্থী নীতি গ্রহণ করেছে, তা তিনি অনুসরণ করবেন। অতিরিক্ত ১০ হাজার পুলিশ তিনি নিয়োগ করবেন। কিন্তু যে প্রশ্ন আমি ইতোমধ্যে অনেকের লেখায় পেয়েছি, তা হচ্ছে তার এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি বেকার সমস্যা সমাধানে ও সন্ত্রাসী কর্মকা- হ্রাসে কতটুকু সাহায্য করবে? ম্যাক্রন অর্থনীতি ভালো বোঝেন। তাই তিনি জানেন অর্থনীতিকে কীভাবে বাগে আনতে হয়। কিন্তু মেরিন লে পেন যে ইসলামবিরোধী একটি সেন্টিমেন্টের জন্ম দিয়ে গেলেন, তার কী হবে? প্রায় ৬৬ দশমিক ৮১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। শতকরা হিসেবে প্রায় ১১ ভাগ। মূল জনগোষ্ঠীর জন্য এটা কোনো হুমকি নয়। তবে আইএস এদের মাঝে, বিশেষ করে তরুণ মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা ঘাঁটি গেড়েছে। ম্যাক্রন এখন এসব তরুণের ব্যাপারে কী নীতি গ্রহণ করেন, সেটাই দেখার বিষয়। ইইউর মধ্যে ফ্রান্সের অর্থনীতির অবস্থান তৃতীয়। জার্মানি ও ব্রিটেনের পর। এখন ব্রিটেন বেরিয়ে গেল। এর একটা প্রভাব ফ্রান্সের অর্থনীতিতে থাকবেই।
নির্বাচনে বিজয়ের পর ম্যাক্রন ওই রাতেই হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি পালক যুক্ত হলো।’ কথাটা সত্য। তারুণ্য, মূল ধারার বাইরে গিয়ে নতুন একটি ধারা তৈরি করে ম্যাক্রন একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। আপাতত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে ম্যাক্রনের এই বিজয় কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে। কিন্তু যেতে হবে বহুদূর। ব্রেক্সিট এবং ট্রাম্পের আগামী রাজনীতি ইইউবিরোধী জনমতকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয়। ফ্রান্সে ম্যাক্রনের বিজয় প্রো-ইইউ ধারাকে শক্তিশালী করল। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়।
Daily Amader Somoy
09.05.2017

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও প্রসঙ্গ কথা

আজ ৭ মে ফ্রান্সের দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৩ এপ্রিল। ওই নির্বাচনে কোনো প্রার্থীই শতকরা ৫০ ভাগ ভোট না পাওয়ায়  নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন দুইজন কট্টর ডানপন্থী ম্যারিন লি পেন আর মধ্যপন্থী ইমানুয়েল ম্যাক্রোন। এদের একজন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত এলিসি প্রাসাদে উঠবেন দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের ১০ দিনের মধ্যে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অন্যান্য দেশের মতো নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে কোনো শপথ পাঠ করতে হবে না। তবে নানা ধরনের অনুষ্ঠান, মিলিটারি প্যারেড ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের ‘দায়িত্ব গ্রহণ’ সম্পন্ন হবে। ফ্রান্সের এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের রাজনীতিতে দুইটি বড় দলের অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক পার্টি এবং রিপাবলিকান পার্টির কর্তৃত্ব ভাঙতে যাচ্ছে। এই দুইটি দল দীর্ঘদিন ফ্রান্সের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিল। এখন ম্যারিন লি পেন কিংবা ইমানুয়েল ম্যাক্রোন কেউই এই দুই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন না। ম্যারিন লি পেন উগ্র ডানপন্থী আর ম্যাক্রোন সাবেক সমাজতান্ত্রিক। নির্বাচনের আগে তিনি নতুন একটি দল (‘এ মার্চা’Ñ চলো এগিয়ে যাই) গঠন করেন। প্রশাসনে ম্যাক্রোনের অভিজ্ঞতা আছে। তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী। নির্বাচনের জন্যই তিনি আগস্ট (২০১৬) সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে ম্যারিন লি পেনের কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। পারিবারিকভাবেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। তার প্রয়াত বাবা জ্যাঁ পেরি লি পেন অতীতে উগ্রপন্থী নানা বক্তব্যের জন্য বারবার সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি কট্টরপন্থী উগ্র ন্যাশনাল ফ্রন্ট দলটি গঠন করেছিলেন অনেক আগেই। ২০০২ সালে জ্যাঁ পেরি লি পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। ফ্রান্সের রাজনীতিতে ন্যাশনাল ফ্রন্টের অবস্থান কখনোই শক্ত ছিল না। তবে এবারই প্রথম ব্যতিক্রম। মূলত ব্যাপক অভিবাসন ইস্যুকে মুখ্য করে ম্যারিন লি পেন এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার অবস্থান শক্ত করেছিলেন। এমনকি কোনো এক পর্যায়ে তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হবেন বলেও ধারণা করা হয়েছিল। যদিও প্রথম দফায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি থেকে গেলেন। এটাই তার বড় সাফল্য। দ্বিতীয়ত, এদের দুইজনেরই রাজনৈতিক অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ম্যারিন লি পেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-বিরোধী। তিনি ব্রিটেনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে আনতে চান। তবে কাজটি তার জন্য খুব সহজ নয়। এর সঙ্গে সংবিধানের প্রশ্নটি জড়িত। এ জন্য তিনি ‘বিজয়ী’ হলে গণভোটের আয়োজন করবেন। এমনকি তিনি ইউরোর পরিবর্তে ফ্রান্সের আদি মুদ্রা ফ্রাঙ্ক প্রবর্তনেরও পক্ষপাতী। অন্যদিকে ম্যাক্রোনের ‘অবস্থান’ পরিপূর্ণভাবে ভিন্ন। তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ফ্রান্সের থাকার পক্ষে। তবে সংস্কারের পক্ষপাতী। তৃতীয়ত, ম্যাক্রোনের মুখ থেকে কখনও মুসলমানবিরোধী কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। কিন্তু ম্যারিনের বক্তব্য ঠিক উল্টো। তিনি প্রথম থেকেই মুসলমানবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তিনি প্রচ-ভাবে অভিবাসনবিরোধী। ২০১৫ সালের পর থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে যে সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটিত হয়েছে, তাতে মারা গেছেন ২৩০ জন। এ প্রসঙ্গ টেনে ম্যারিন বলেছিলেন, সীমান্তে কড়াকড়ি করার ইচ্ছা আছে তার। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিসাহীন ও অবাধ যাতায়াতের (শেঙেন চুক্তি) যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে তার আপত্তি রয়েছে। চতুর্থত, ফ্রান্সে বেকারত্বের হার শতকরা ১০ ভাগ। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের দিক থেকে তাদের অবস্থান অষ্টম। মাগরেবভুক্ত  দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের মধ্যে এই বেকারত্বের হার বেশি, যা কিনা তরুণ প্রজন্মকে জঙ্গিবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক তরুণ এখন সিরিয়ার রাকা থেকে ফ্রান্সে ফিরে আসছে। এরা অনেকেই আবার ফ্রান্সের ভেতরেই সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, তরুণদের কীভাবে এ পথ থেকে ফেরানো যায়, সে ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট নীতি এদের দুইজনের কারোরই নেই। ম্যাক্রোনের নীতিতে বছরে ১০ হাজার অভিবাসী গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যারা ফ্রান্স ভাষা জানেন ও বলতে পারেন। অন্যদিকে ম্যারিন লি পেন সীমান্ত ‘সিল’ করে দিয়ে মুসলমান অভিবাসীদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষপাতী। কিন্তু তাতে করে কী সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা যাবে? এটা সত্য, আগামীতে ফ্রান্সের জন্য নিরাপত্তা ইস্যুটা প্রধান সমস্যা। ট্র্যাডিশনালি একসময় যে দেশগুলো ফ্রান্সের কলোনি ছিল এবং যারা মুসলমান প্রধান দেশ হিসেবেই পরিচিত (যেমন আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনেশিয়া), সেইসব দেশ থেকেই মানুষ আইনগতভাবেই ফ্রান্সে বসবাস করতে যান। এরা সবাই ফ্রান্স ভাষা জানেন। ফলে এদের আসা বন্ধ করা যাবে না। তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে ম্যারিন লি পেন অনেকটাই সফল, অনেকটা ট্রাম্পের মতো, যেখানে জনমানসে তিনি একটা অভিবাসনবিরোধী ‘সেন্টিমেন্ট’ ঢুকিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের মতোই ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ বা ‘শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্য’ মানসিকতার জন্ম দিয়েছেন ম্যারিন। এটা ফ্রান্সের রাজনীতিতে স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। অতীতে কখনও ফ্রান্সের রাজনীতিতে এই ‘শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ’ দ্বন্দ্ব বড় ভূমিকা পালন করেনি। কিন্তু ট্রাম্পের আদলে লি পেন এই রাজনীতি শুরু করেছেন। কিছুটা সফল যে তিনি হয়েছেন, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। এই ‘রাজনীতি’ আগামী দিনে ফ্রান্সকে কোথায় নিয়ে যাবে, বলা মুশকিল। ম্যাক্রোন যদি প্রেডিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তাহলে এক্ষেত্রে হয়তো অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে এই ‘শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ’ দ্বন্দ্ব থেকে যেতে পারে। ভয়টা এখানেই। সুতরাং ফ্রান্সের এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকলোই।
তবে এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় এবং রাজনীতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থী যে প্রবণতা, তা আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশই স্পর্শ করেছে। ইউরোপের মানুষ এই সস্তা ‘পপুলিজম’-এ আকৃষ্ট হয়েছেন। যে কারণে দেখা যায় ব্রিটেনে দক্ষিণপন্থী তেরেসা মে’র উত্থান ও ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন। অর্থাৎ ব্রিটেনের নিজস্ব স্বকীয়তা, ‘শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেসি’, অভিবাসন বিরোধিতাÑ ইত্যাদি সস্তা সেøাগান তুলে ব্রিটেন এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেল। এই ব্রেক্সিটের প্রভাব যে ফ্রান্সে লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। ব্রেক্সিটের প্রভাবে ম্যারিন লি পেনের পালে হাওয়া লেগেছে। এ যাত্রায় হয়তো তিনি পার পাবেন না। এলিসি প্রাসাদে যাওয়ার রাস্তাটা তার সহজ হবে না। কিন্তু এর প্রভাব থাকলোই। ১১ জুন সেখানে অনুষ্ঠিত হবে সংসদ নির্বাচন। সেখানে দক্ষিণপন্থীরা যে ভালো করবে, তা বলাই বাহুল্য। দক্ষিণপন্থী এই প্রবণতা শুধু ফ্রান্সে কেন? ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ এই দক্ষিণপন্থী প্রবণতায় আক্রান্ত। অস্ট্রিয়ায় নব্য নাজি নেতা নর্বাট হফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় জিতে গিয়েছিলেন। তিনি ফ্রিডম পার্টির নেতা। জার্মানিতে জুন মাসে সংসদ নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, উগ্র দক্ষিণপন্থী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মান পার্টি’, যাদের নব্য নাজি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তারা সংসদে প্রথমবারের মতো যেতে পারে। হল্যান্ডে উগ্র দক্ষিণপন্থী ‘পার্টি ফর ফ্রিডম’ এর উত্থান লক্ষ্য করার মতো। মার্চে সেখানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই দলটি নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে (মার্চ ২০, ২০১৭) পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ইতালি, সুইডেন কিংবা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পেরেছে। তবে স্পেনে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বেকার সময় ফ্যাসিস্ট পার্টির জন্ম হয়েছিল, সেখানে বর্তমান উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রভাব কম। একই কথা প্রযোজ্য রুমানিয়া, সেøাভাকিয়া, চেক রিপাবলিকের ক্ষেত্রে। ফলে ফ্রান্সে ম্যারিন লি পেনের উত্থান ঘটবে, উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সেখানে শক্ত অবস্থানে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ট্রাম্পের রাজনীতিই মূলত এর জন্য দায়ী।
বলা ভালো, প্রথম দফা নির্বাচনে (২৩ এপ্রিল) ম্যাক্রোন পেয়েছিলেন শতকরা ২৩ দশমিক ৭ ভাগ ভোট, আর ম্যারিন লি পেন পেয়েছিলেন ২১ দশমিক ৭ ভাগ ভোট। ব্যবধানটা খুব বেশি নয়। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে ছিলেন ফ্রাঁসোয়া জিয়োঁ (১৯ দশমিক ৯ ভাগ ভোট) ও জ্যাঁ লুক মেলাশ (১৯ দশমিক ৬ ভাগ)। এর পরের অবস্থান ছিল বেনায়েত হ্যামোর (৬ দশমিক ৩ ভাগ)। প্রথম দফা নির্বাচনের পরপরই ফ্রাঁসোয়া জিয়োঁ ও বেনায়েত হ্যামোর ঘোষণা করেছিলেন, তারা দ্বিতীয় দফা ভোটাভুটিতে ম্যাক্রোনকে সমর্থন দেবেন। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানেই। ম্যাক্রোন আশঙ্কা করছেন, দ্বিতীয় দফা ভোটাভুটিতে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন না। মূলধারার প্রার্থীদের (ম্যাক্রোন ও ম্যারিন লি পেন মূল ধারার প্রার্থী নন) সমর্থক ভোটাররা দ্বিতীয় দফায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, ম্যারিন লি পেনকে ঠেকাতে ‘বাম ও মধ্যপন্থীদের’ ঐক্য কাজ করবে কিনা? বামপন্থী প্রার্থী জ্যালুক মেলাঁশ (চতুর্থ স্থান অধিকারী) এর সমর্থকদের ৬৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে অনুপস্থিত থাকবেন। অথবা খালি ব্যালট পেপার জমা দেবেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা লি পেনকে ঠেকাতে ম্যাক্রোনকে ভোট দেবেন। সুতরাং প্রথম দফায় তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকারীর সমর্থকরা কী করেন, তার ওপর নির্ভর করছে ভোটের ফল।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, কতগুলো বিষয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে। ইউরোপিয়ান ঐক্য, অভিবাসন, অর্থনীতি, ফরাসি নাগরিকদের মর্যাদা এবং সন্ত্রাসবাদÑ এ বিষয়গুলো আগামীতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। ১১ জুন সংসদ নির্বাচন। যদিও ফ্রান্সে সংসদীয় রাজনীতি নেই। এখানে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান। সংসদের ভূমিকা এ কারণে মুখ্য নয়, গৌন। তারপরও সংসদে যে দলের আসন বেশি থাকবে, তার একটা ভূমিকা থেকে যাবেই। এরই মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ধারার রাজনীতিবিদদের বিদায় নতুন এক ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির’ জন্ম হয়েছে সেখানে। এখন দেখার পালা, এই রাজনীতি ফ্রান্সকে কোথায় নিয়ে যায় আগামীতে।
Daily Alokito Bangladesh
07.05.2017

দলীয় কলমে যোগদানপত্রে সই!


অস্ত্রবাজ একজন শিক্ষকের ছবি সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! তিনি দশ মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন। অনলাইনে তার একটি ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে। অস্ত্র হাতে তিনি নিশানা প্র্যাকটিস করছেন। স্থান ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের একটি জঙ্গলে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে সজীব হিসেবে, যিনি ইবি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা। ঘটনাটা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের। ডেইলি স্টার (২৩ এপ্রিল ২০১৭) এবং যায়যায়দিন আমাদের জানাচ্ছে, এই শিক্ষকের নাম মতিয়ার। অনলাইন পত্রিকা বাংলা ট্রিবিউনে পরিসংখ্যান বিভাগের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তাদের দু’জনের বক্তব্য মোটামুটি একই- মতিয়ার যেহেতু কোনো মামলায় ‘অভিযুক্ত’ হননি, সেক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে আইনগত কোনো বাধা নেই! সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নির্বাচনী বোর্ড হয়, তার সভাপতি থাকেন প্রো-ভিসি। মূলত মতিয়ারের নিয়োগে তিনিই সুপারিশ করেছেন এবং সিন্ডিকেট তা অনুমোদন করেছে। প্রশ্নটা একজন শিক্ষক ‘অভিযুক্ত’ হয়েছিলেন কিনা, তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা নৈতিকতার। হতে পারে বিভাগের সভাপতি কিংবা প্রো-ভিসি বিষয়টি জানতেন না। এখন তারা জেনেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে। তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিটির কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারে।

বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে এ কারণে যে, এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। তিনি অস্ত্রের ট্রেনিং নিয়েছেন। ছবি তো সেকথাই বলে। তিনি একজন অস্ত্রবাজ। ক্যাডার। এখন এই মতিয়ার যখন ছাত্রদের পড়াবেন, তিনি কী মেসেজ দেবেন? তার ছাত্ররা কী শিখবে? একজন শিক্ষক তো ছাত্রদের কাছে ‘রোল মডেল’। ছাত্ররা একজন শিক্ষককে দেখে শেখে। তাকে অনুকরণ করে। তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। অন্তত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা-ই দেখেছি। এখন অস্ত্র হাতে ট্রেনিংরত অবস্থায় মতিয়ারের ছবি দেখে কি ছাত্ররা তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে? ছাত্রদের মনে কি তার সম্পর্কে ঘৃণার জন্ম হবে না? সবচেয়ে বড় কথা, মতিয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে গোটা জাতির কাছে ‘ছোট’ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে অনেক গুণী শিক্ষক ছিলেন এবং এখনও আছেন, যারা আমাদের সবার গর্বের। আমি তাদের সবার সঙ্গে মতিয়ারকে মেলাতে পারি না। আমাকে ক্ষমা করবেন মতিয়ার। আপনি পদত্যাগ করলে ভালো করবেন। অন্তত একটি কেলেঙ্কারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা পাবে। মতিয়ার, আমি বিশ্বাস করি আপনি অন্যত্র একটি চাকরি পাবেন। কেন আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও অসম্মানিত করবেন? একজন অস্ত্রবাজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শিক্ষক হিসেবে নিশ্চয়ই দেখতে চাইবে না!

মতিয়ারের সংবাদটি যখন ছাপা হয়েছে, তখন আরও একটি তথ্য প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকায়। একটি জনপ্রিয় দৈনিকের উপ-সম্পাদকীয় ছিল এরকম- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে মীজানুর রহমান মডেল’ (২৭ এপ্রিল )। উপ-সম্পাদকীয়টি লিখেছেন সোহরাব হাসান। এর আগে ওই পত্রিকায় একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল। তাতে শিরোনাম ছিল ‘‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশেষ কর্মকর্তা’ পদে ছাত্রলীগের ১২ জন।’’ উপাচার্যের বক্তব্যটি ছিল এরকম- ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাকরি দিতে আমি বাধ্য’। উপ-সম্পাদকীয়তে এটাকেই ‘মীজানুর রহমান মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সংবাদটি হচ্ছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অতি সম্প্রতি কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১২ জন ছাত্রলীগ নেতাকে নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য। যা বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে তা হচ্ছে উপাচার্যের ওই বক্তব্য। যদিও উপাচার্য মীজানুর রহমান পরে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার আমলে তিনি জামায়াত-শিবিরের কাউকে নিয়োগ দেবেন না। মীজানুর রহমানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। প্রায়ই টকশোতে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন। উপাচার্য হয়েও তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেননি। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি উত্তর কুমিল্লা থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন। কাউন্সিলর হিসেবে তার একটি ছবিও আমি তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছিলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তার আমলে অনেক নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে জগন্নাথে। এর কৃতিত্ব তিনি নিতেই পারেন। কিন্তু উপাচার্য হিসেবে তিনি জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে ‘বিশেষ কর্মকর্তা’ হিসেবে কোনো পদ নেই। প্রতিটি পদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে অনুমোদন নিতে হয়। নতুন নতুন বিভাগ চালাতে শিক্ষকের পাশাপাশি স্টাফের দরকার। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এ ধরনের নিয়োগে বিতর্ক বাড়ায়। কেন মীজানুর রহমান এই বিতর্কে নিজেকে জড়ালেন, আমি জানি না। প্রশাসক হিসেবে তিনি যোগ্য। কিন্তু বিতর্ক কেন? এমনিতেই শিক্ষক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের নিয়েও নানা কথা আছে। তার নিজ দলের লোকেরাই তার বিরোধিতা করছেন। এটা তিনি জানেন। তিনি যদি মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি নিতেন, ভালো করতেন। যেহেতু নতুন নতুন বিভাগ হয়েছে, সুতরাং সেখানে স্টাফ নিয়োগ দিতে হবেই। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতো মাত্র। যে ১২ জনকে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন, তারাই না-হয় নিয়োগ পেতেন! সেটাই ছিল মঙ্গলজনক। তিনি বিতর্ক এড়াতে পারতেন। আর যারা ‘বিশেষ কর্মকর্তা’ হিসেবে নিয়োগ পেলেন, তারাও বিতর্কিত হয়ে গেলেন! এ ধরনের সিদ্ধান্ত উপাচার্যের ভাবমূর্তি কতটুকু উজ্জ্বল করবে, আমি জানি না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা বিভিন্ন উপ-সম্পাদকীয়তে তার সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে, আমি তাতে হতাশ হয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমার প্রিয় মানুষদের একজন। তার জন্য আমার দুঃখবোধ ছাড়া কিছুই আর থাকল না।

আসলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মকর্তা ও শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যেসব সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, তাতে করে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে ইউজিসি প্রদত্ত ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৩ ও ২০১৪’ প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছেন, তার সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষক তাদের লক্ষ্য রাখা উচিত ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, তারা কী করছে, ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে কিনা, তা দেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে যাচ্ছে, সেদিকে দৃষ্টি দিতেই তিনি ওই কথাগুলো বলেছিলেন। এর আগে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নজরদারিতে রাখা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল (যুগান্তর, ২৪ ফেব্রুয়ারি)। দুটো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষার মানোন্নয়ন, আর আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চায় অনুপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা। এই কাজটি কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো পালন করছে? একটি দৃষ্টান্ত দেই। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাহাঙ্গীরনগর) আমার বিভাগে একাধিক শিক্ষার্থীকে পাওয়া গেল, যারা নিয়মিত ক্লাস করে না। ইনকোর্স পরীক্ষা দেয় না। বিষয় সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হলেও কর্তৃপক্ষ থাকল উদাসীন। সর্বশেষ ঘটনায় পাওয়া গেল একজন ছাত্রীকে, যে প্রথমবর্ষে একবার মাত্র ভর্তি হয়েছিল। তারপর আর ক্লাসে আসেনি। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ওই ছাত্রী কি আদৌ কোনো জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কি সেই তথ্যটি আছে? বিষয়টি বিভাগীয় সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কোনো ‘পদক্ষেপ’ নেয়া সমীচীন মনে করেনি কর্তৃপক্ষ! এর মধ্য দিয়ে কি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তকে একরকম চ্যালেঞ্জ করা হল না? তাই প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাজটি তাহলে কী? প্রধানমন্ত্রী যে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন চান, তা তাহলে নিশ্চিত হবে কীভাবে? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি তলিয়ে দেখুক।

শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, উপাচার্য মহোদয়রা চান শুধু শিক্ষক নিয়োগ! এসব শিক্ষক নিয়োগে মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন আছে কিনা, তা উপাচার্য মহোদয়রা দেখেন না। মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশকে উপেক্ষা করে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে ‘শিক্ষক’ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এটা কে দেখবে? দুদক একবার রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। ওই তদন্তের বর্তমান কী হাল, আমরা জানি না। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নতুন ওই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিকীকরণ করেছিলেন। নিজের ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, সন্তানকে অবৈধভাবে সেখানে চাকরি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যও ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় থেকে টিএ/ডিএ উত্তোলন করেছিলেন। এ-সংক্রান্ত খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মেয়াদের শেষ সময়ে এসে তিনি বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেন। এটা কোন পর্যায়ে আছে বলতে পারব না। প্রধানমন্ত্রীর দফতর সব বিষয়ে অনুসন্ধান করে কিনা, তাও আমার জানা নেই। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি যা বুঝি তা হচ্ছে, ভালো শিক্ষক না হলে ভালো ছাত্র তৈরি হয় না। সিনিয়র শিক্ষকরা অবসরে যাওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মেধার ঘাটতি’ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, উপাচার্যরা দলীয় কোটায় শিক্ষক নিয়োগ দিতেই ব্যস্ত! প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পারিবারিকীকরণ হচ্ছে। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার নিজ সন্তানকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিলেন। যিনি কোনোদিন মেধাবলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তিনি কিনা এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক! শুধু পারিবারিক কিংবা দলীয় ‘কোটায়’ কেন, এখন শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে টাকার বিনিময়েও! টিআইবি তদন্ত করেছিল, সুনির্দিষ্ট অভিযোগও এনেছিল। কিন্তু দুদক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মঞ্জুরি কমিশন- কেউ তদন্ত করেনি। তাই সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান এটাকে ‘মীজান ফর্মুলা’ বলেছেন। কিন্তু এই ‘ফর্মুলা’ তো সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন তার সন্তানকে শিক্ষক বানান, আমি তাতে অবাক হই না। কারণ তিনি একটি ‘ধারা’ অনুসরণ করেছেন মাত্র। গলদ তো সেখানেই!

প্রভাবশালীদের সন্তানরা এখন শিক্ষক হচ্ছেন, কর্মকর্তা হচ্ছেন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য আমার কাছে নেই। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তথ্য সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে (মানবকণ্ঠ, ১৩ এপ্রিল)। সেখানে বলা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে, যারা সবাই প্রভাবশালীদের সন্তান। অপর একটি সংবাদ- পদ খালি নেই, তারপরও শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়েছে। এটিও জাহাঙ্গীরনগরের (সমকাল, ২২ মার্চ)। আমার নিজের বিভাগেই শিক্ষক এখন ১৮ জন। সব পদের বিপরীতে মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদনও নেই। টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল (যায়যায়দিন, ২ এপ্রিল)। কিন্তু তারপরও এ ব্যাপারে মঞ্জুরি কমিশন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু আমার মনে আছে, টিআইবির রিপোর্টের প্রতিবাদ করেছিল মঞ্জুরি কমিশন। অতি সম্প্রতি মঞ্জুরি কমিশনের একটি বিজ্ঞপ্তি আমার চোখে পড়েছে। কমিশন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, গণবিশ্ববিদ্যালয়ে (সাভার) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিএড, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র ভর্তির কোনো অনুমোদন নেই। ছাত্ররা যেন ওইসব বিভাগে ভর্তি না হয়। এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এটাই কি শেষ? গণবিশ্ববিদ্যালয় যদি আইন ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে মঞ্জুরি কমিশন ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? তাহলে মঞ্জুরি কমিশন কি সত্যি সত্যিই কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল!

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার মান বৃদ্ধির কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। কিন্তু মান বৃদ্ধি হচ্ছে কই? এটা দেখবে কে? প্রধানমন্ত্রী এডুকেশন কাউন্সিল করার কথা বলেছেন। এই কাউন্সিলের কাজ কী হবে? শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো? তা যদি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাব। শুধু অনুরোধ রাখব এই কাউন্সিলে যেন যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়া হয়। না হলে মঞ্জুরি কমিশনের মতো এটাও একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

একজন অস্ত্রবাজ শিক্ষককে দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। শেষ করতে চাই নয়াদিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ড. কবিতা এ শর্মার একটি বক্তব্য উল্লেখ করে। ঢাকায় তিনি এসেছিলেন বেসরকারি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ষষ্ঠ সমাবর্তনে। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকরণ উচ্চশিক্ষার মানের অবনতি ঘটাচ্ছে’ (সমকাল)। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষার মানোন্নয়ন। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ, বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া- এসব আর যাই হোক, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাবে না।
Daily Jugantor
06.05.2017