রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ইয়েমেনের পরিস্থিতি এখন কোন দিকে


ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুথি গ্রুপের হাতে ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ নিহত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হচ্ছেÑ ইয়েমেনের পরিস্থিতি এখন কোন দিকে গড়াবে? সেখানে কি আদৌ স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে? গৃহযুদ্ধ কি সেখানে বন্ধ হবে? সিরিয়া থেকে আইএস উৎখাতের পর ইয়েমেনে কি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে? ইয়েমেন সংকটকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব আর ইরানের মধ্যে এক ধরনের ‘প্রক্সি-যুদ্ধ’ চলে আসছিল। এখন কি তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে? আলী আবদুল্লাহ সালেহ নিহত হওয়ার পর এসব প্রশ্ন এখন উঠেছে এবং কোনো একটি প্রশ্নেই সুস্পষ্ট করে কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।
কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সেখানে সরকার উৎখাতের আন্দোলন করে আসছে। এক পর্যায়ে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানায় প্রেসিডেন্ট ভবন পর্যন্ত দখল করে নিয়েছিল। এক পর্যায়ে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধ’ পর্যন্ত শুরু করে। গেল এক বছরের উপরে সৌদি বিমানবাহিনী নিয়মিত হুথি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। কিন্তু তারপরও হুথি বিদ্রোহীদের দমন করা যায়নি; বরং হুথিরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়েছে। এখানে বলা ভালো, ২০১১ সালে তিউনেশিয়ায় উচ্চশিক্ষিত এক ফলবিক্রেতা (যিনি আইটিতে ডিগ্রি নিয়েও চাকরি পাননি। ফল বিক্রি করে জীবনযাপন করতেন) বোউয়াজিজি পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে আত্মহত্যা করেছিলেন। তার আত্মহত্যায় ফুলকির মতো আন্দোলন আরববিশ্বে ছড়িয়ে যায় এবং একে একে পতন ঘটে স্বৈরশাসকদের, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। তিউনেশিয়ায় পদত্যাগ করেছিলেন জইন আল আবেদিন, যিনি দীর্ঘ ২৩ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কোনো চিহ্ন ছিল না। সেখানে জইন আল আবেদিনের উৎখাতের মধ্য দিয়ে জেসমিন বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। এর রেশ ধরে মিসরে হোসনি মোবারক (১৯৮১ সাল থেকে), মুয়াম্মার গাদ্দাফি (১৯৬৯ সাল থেকে) ও ইয়েমেনে আলী আবদুল্লাহ সালেহ (১৯৭৮ সাল থেকে ক্ষমতায়) সরকারের পতন ঘটেছিল। স্বৈরাচারী শাসকদের উৎখাতের মধ্য দিয়ে সেখানে ‘আরব বসন্ত’র সূচনা হয়েছিল। যদিও আরব বসন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট (ড. মুরসি) সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত হয়েছিলেন। গাদ্দাফির মৃত্যু লিবিয়াকে একটি সন্ত্রাসীদের রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তিউনেশিয়ায় কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছে।
এখানে ইয়েমেনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। আজকের যে ইয়েমেন, তা একসময় দুই ভাগে বিভক্ত ছিলÑ উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন। উত্তর ইয়েমেন ট্র্যাডিশনালি স্বাধীন। ধরা হয়, উত্তর ইয়েমেন স্বাধীন হয়েছে ১৯১৮ সালের ১ নভেম্বর (আর দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীন হয় ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর)। দুই ইয়েমেনের মধ্যে বৈরিতা ও যুদ্ধের ইতিহাসও আছে। আজকের ইয়েমেনের যে পরিস্থিতি, তার সঙ্গে অতীত ইতিহাসের একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৬২ সালে উত্তর ইয়েমেনের শাসক ইমাম আহমেদ বিন ইয়াহিয়া মারা গেলে তার ছেলে ক্ষমতাসীন হন। কিন্তু সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে চাইলে সেখানে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। ওই গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব, ব্রিটেন এবং জর্ডান ক্ষমতাসীনদের পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে মিসরের সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় সেনাবাহিনীর পক্ষে। মিসর সেখানে সেনাবাহিনীও পাঠায় ১৯৬২ সালে। দীর্ঘ ৬ বছরের গৃহযুদ্ধের পর বিদ্রোহী সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং ইয়েমেন আরব রিপাবলিক (উত্তর ইয়েমেন) হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করে। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন আবদুল্লাহ আল সাল্লাল। এরপর ক্ষমতাসীন হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। অন্যদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির সমর্থকদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৬৭ সালে ৩০ নভেম্বর তথাকথিত মার্কসবাদীরা সেখানে ক্ষমতাসীন হন এবং নিজেদের পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক হিসেবে ঘোষণা করেন। সমাজতান্ত্রিক মডেলে গড়া সমাজ ব্যবস্থায় পার্টিপ্রধানই ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। প্রথমে আবদুল ফাত্তাহ ইসমাইল ও পরে আলী নাসির মোহাম্মদ ক্ষমতা পরিচালনা করেন। শেষের দিকে ক্ষমতা পান আলী সালিম আল বেইদেহ। দুই ইয়েমেনের মধ্যে সম্পর্ক কখনও উষ্ণ ছিল না। ১৯৭২ সালে দুই ইয়েমেন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। উত্তর ইয়েমেনের অভিযোগ ছিল যে, দক্ষিণ ইয়েমেন বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় তাদের দেশটি দখল করতে চায়। তাদের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সৌদি আরবের দিকে। তারপরও দুই ইয়েমেন ১৯৯০ সালের ২২ মে একত্রিত হয়। একত্রীকরণের পর আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। আর দক্ষিণ ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী সালিম বেইদেহ যুক্ত ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। তারপর থেকে উৎখাতের আগ পর্যন্ত সালেহ এককভাবে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিলেন। ২০১১ সালের আরব বসন্তর ঢেউ এসে লাগে ইয়েমেনেও। আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের নভেম্বরে সালেহ সৌদি আরব পালিয়ে যান। এর আগে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হাদি পরবর্তী সময় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হলেও সেখানে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা সমাধানে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে সৌদি আরব হুথি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে, যা আজো অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ কার্যত দেশটিকে একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠীর মাঝে বিভক্ত করে রেখেছে। রাজধানী সানা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে হুথি বিদ্রোহী গ্রুপ কর্তৃক পরিচালিত সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল। একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হাদি সরকার ও তার সমর্থকরা। আল কায়দা সমর্থিত আনসার আল সারিয়ার নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে একটা বড় অংশ। আবার আইএসের নিয়ন্ত্রণাধীনেও রয়েছে একটি এলাকা। ২০১৫ সালের পর থেকেই কার্যত ইয়েমেনে কোনো সরকার নেই। হুথি ও হাদি সরকার পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত। ২০১৫ সালের পর থেকে এখন অবধি সৌদি বিমানবাহিনী হুথি অবস্থানের ওপর বিমান হামলা অব্যাহত রেখে আসছে।
ইয়েমেনের সংকটকে কেন্দ্র করে হুথিদের বাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। হুথিরা মূলত শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। বলা হয়, ইয়েমেনের জাইদি গোত্রভুক্ত হচ্ছে এ হুথিরা। তবে তাদের সঙ্গে সুন্নিরাও যোগ দিয়েছে, বলা হচ্ছে। ২০১১ সালের নভেম্বরে আন্দোলনের মুখে আলী আবদুল্লাহ সালেহ পদত্যাগ করেছিলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি। পরবর্তী সময় ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐকমত্যের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। ইয়েমেনে বিভিন্ন দল ও গোত্রের সঙ্গে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কনফারেন্স’ এর ব্যানারে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও একটি সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। হাদি ঐকমত্যের প্রার্থী হলেও তিনিও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নিয়েছিলেন সালেহ ও তার বাহিনী। দুঃখজনক হলেও সত্য, হুথি বিদ্রোহীদের হাতেই শেষ পর্যন্ত সালেহর মৃত্যু হলো। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, তিনি হঠাৎ করেই বর্তমান মিত্র হুথিদের ত্যাগ করে প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি ও সৌদি জোটের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার ওই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছিল সৌদি জোট ও প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি গং। কিন্তু হুথি বিদ্রোহীরা এটা পছন্দ করেনি। তারা এটাকে আখ্যায়িত করেছিল এক ধরনের ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে।
ইয়েমেনের এ সংকটের সঙ্গে ট্র্যাডিশনালি সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের একটা যোগসূত্র আছে। সৌদি আরবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থান ও সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠনের পরপরই সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এ অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ দ্বন্দ্বের জন্ম। সৌদি আরবের অভিযোগে ইরান ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। এ কারণেই ২ বছর ধরে সৌদি বিমান ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ঘাঁটির ওপর অনবরত বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। পাঠক লক্ষ করে থাকবেন, সিরিয়া ও ইরাকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস যখন তার সব ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখন লেবানন আর ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি রাজতন্ত্র ও ইরানি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এক তাগুত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে এ এলাকা কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়ে। সৌদি আরব লেবানন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে, লেবানন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে! লেবাননের ইরান সমর্থিত শিয়া হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগে ছিল, তারা সৌদি আরবে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। একজন সৌদি মন্ত্রী থামের আল সাবহান আল আরাবিয়া টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছিলেনÑ হিজবুল্লাহ এ অঞ্চলের প্রত্যেকটি সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত, যা সৌদি আরবকে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে! ক’দিন আগে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি ‘নিরাপত্তার অজুহাতে’ সৌদি আরব পালিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তী সময় হারিরি আবার লেবানন ফিরে গিয়েছিলেন। স্পষ্টই হারিরির অভিযোগটি ছিল হিজবুল্লাহর দিকে, যাদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে ইরান। তিনি পদত্যাগ করে পরে পদত্যাগ প্রত্যাহারও করে নিয়েছিলেন। পর্যবেক্ষকরা লক্ষ করে আসছেন, এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতনে সৌদি আরব ও ইরান প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। সৌদি আরব ইয়েমেনে হাদি সরকার, লেবাননে প্রধানমন্ত্রী হারিরি, সিরিয়ার দামেস্কে বিভিন্ন উপদল এবং ইরাকে সরকারের সঙ্গে যারা জোটে আছে, তাদের সমর্থন জুগিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইরান ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের, লেবাননে হিজবুল্লাহকে, সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদকে, বাগদাদে শিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন জুগিয়ে আসছে। সৌদি আরব ও ইরানের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম এখন ৬৪ দশমিক ৩২ ডলার। এ দাম আরও বাড়তে পারে। এই যখন পরিস্থিতি, ঠিক তখনই এলো সাবেক ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর মৃত্যুর খবর। এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়বে। এরই মধ্যে ইয়েমেনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষ। সালেহ হত্যার বদলা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তার নির্বাসিত ছেলে আহমেদ আলী সালেহ। তিনি বর্তমানে আরব আমিরাতে বসবাস করছেন। মৃত্যুর একদিন আগে সালেহ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ইয়েমেনে একটি শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখন সেখানে অনিশ্চয়তা এলো। সৌদি আরব সেখানে বিমান হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। এর অর্থ খুব সহসাই সেখানে গৃহযুদ্ধ থামছে না। এরই মধ্যে সেখানে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে। হাসপাতালগুলোয় কার্যত এখন আর কোনো সেবা পাওয়া যায় না। অস্ত্র এখন ইয়েমেনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের পরিস্থিতি কোন দিকে, বলা সত্যিই কঠিন। তবে সেখানে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
Daily Alokito Baangladesh
10.12.2017

নির্বাচন নেপালে স্থিতিশীলতা আনবে কি?



Image result for Nepal election
নেপালে সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হল গতকাল ৭ ডিসেম্বর। ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচনের প্রথম ধাপ। ২০১৭ সালটা ছিল নেপালে নির্বাচনের বছর। প্রথমে নেপাল সংবিধান সভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এরপর সংবিধানের শর্ত অনুযায়ী গত মে মাসে সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আর এখন সম্পন্ন হল সংসদ নির্বাচন। প্রশ্ন হচ্ছে, এ নির্বাচন নেপালে স্থিতিশীলতা কতটুকু নিশ্চিত করবে? সাম্প্রতিককালে নেপালে বারবার সরকার পরিবর্তনের ফলে সেখানে বিকাশমান গণতন্ত্র একদিকে ঝুঁকির মুখে ছিল, অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছিল অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা। তাই সঙ্গত কারণেই এ নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি ছিল অনেকের।


নেপালের এ নির্বাচন কোন দলকে ক্ষমতায় বসাবে, তা বলা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। গত ১০ বছরে সেখানে বারবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। কখনও মাওবাদীদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে, কখনোবা কংগ্রেস ক্ষমতাসীন হয়েছে। মূলত তিনটি দলই মূল ক্ষমতা পরিচালনা করছে। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক দলগুলো। সম্প্রতি বাম জোট গঠিত হয়েছে। এ জোটে আছে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল) ও মাওবাদীরা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউএমএল প্রথম ও মাওবাদীরা তৃতীয় স্থানে ছিল। আর দ্বিতীয় স্থানে ছিল নেপালি কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে রয়েছেন শের বাহাদুর দেউশ, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীও বটে। এবার নেপালি কংগ্রেস কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে ঐক্য করেছে। তারা যে জোটটি করেছে, তার নাম গণতান্ত্রিক জোট। এখানে বলা ভালো, ২০১৫ সালে নেপালে নতুন যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেই সংবিধানের আওতাতেই এবার নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নেপালি পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট : হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ (প্রতিনিধিসভা) ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (রাষ্ট্রীয়সভা)। প্রতিনিধিসভার সদস্য সংখ্যা ২৭৫, যাদের একটা অংশ জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হয়। আর রাষ্ট্রীয়সভার সদস্য হচ্ছে ৫৯। হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের ২৭৫ জন সদস্যের মধ্যে ১৬৫ জন সরাসরি নির্বাচিত হন। জনসংখ্যা হিসাবে ১৬৫টি এলাকা (সংসদীয়) নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ১১০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন আনুপাতিক হারে। প্রতিটি দল নির্বাচনে শতকরা যতভাগ ভোট পাবে, তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিরা সেভাবে নির্ধারিত হবে। এভাবেই ১১০ জন ‘নির্বাচিত’ হবেন। আর হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে মোট ২৭৫ জন প্রতিনিধিত্ব করবেন। তারা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।

নেপালে একসময় রাজতন্ত্র ছিল। দীর্ঘদিন দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলেছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নেপালে রাজতন্ত্রের পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ গণঅভ্যুত্থানে রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। পরবর্তী সময়ে, ২০০১ সালের ১ জুন, তৎকালীন রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব ও তার পরিবারের সদস্যরা যুবরাজ দীপেন্দ্র কর্তৃক ব্রাশফায়ারে নিহত হন। এরপর রাজা হিসেবে নিযুক্ত হন রাজার ভাই জ্ঞানেন্দ্র। কিন্তু তিনি কখনই জনপ্রিয় ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে সব ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়ার চেষ্টা করেন। সরকার মাওবাদীদের দমনে ব্যর্থ এ অভিযোগ তুলে ২০০৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজা জ্ঞানেন্দ্র নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার এ ক্ষমতা করায়ত্ত করার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেনি। ফলে প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখে তিনি তৎকালীন সাতদলীয় জোটের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত নেপালে রাজতন্ত্র বাতিল ঘোষিত হয়। বলা ভালো, ১৭৬৯ সালে হিমালয়ের পাদদেশের এ দেশটিতে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত ঘোষিত হলেও সেখানে একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয় সরকারের স্থিতিশীলতা। গত ১০ বছরে সেখানে কয়েকটি সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি দলগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বও প্রবল। একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করা নিয়েও সমস্যা ছিল। সংখ্যালঘুদের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়েও সমস্যা ছিল। তবে নেপালের রাজনীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হল চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে পরিচিত মাওবাদীদের সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণা পরিত্যাগ করা এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা। মাওবাদীরা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে আসছিল। ২০০৬ সালের ২১ নভেম্বর ওই সময়ের ক্ষমতাসীন সাতদলীয় জোটের প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালার সঙ্গে মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ড একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এ চুক্তি বলে মাওবাদীরা মূলধারায় ফিরে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে প্রচন্ড দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। একটি সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। কিন্তু দীর্ঘ সময় লেগেছিল সংবিধান প্রণয়ন করতে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দলগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নেপালি রাজনীতির অন্যতম সমস্যা। ১৯৯১ সালের ৭ মে সাধারণ ভোটে দীর্ঘ ৩২ বছর পর নেপালে যে পার্লামেন্ট গঠিত হয়েছিল, ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে সেই পার্লামেন্ট ভেঙে যায় মূলত নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। নেপালি কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল মূলত দুই ব্যক্তিকে নিয়ে। একদিকে ছিলেন গিরিজা প্রসাদ কৈরালা, অন্যদিকে কৃষ্ণ প্রসাদ ভট্টরাই। এ দ্বন্দ্বের কারণে শের বাহাদুর দেউবা এর আগে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পার্টি ফোরামে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কৈরালা ও ভট্টরাই কেউই প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। তখন তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে দেউবা উঠে আসেন। দ্বন্দ্ব ছিল মাওবাদীদের মধ্যেও। প্রচন্ড ও বাবুরাম ভট্টরাইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বে সেখানে মাওবাদীরাও শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি। প্রচন্ড ও বাবুরাম ভট্টরাই দু’জনেই সীমিত সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী

হয়েছিলেন। মাওবাদীদের বাইরে ইউনাইটেড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট পার্টিও (ইউএমএল) নেপালের অন্যতম একটি রাজনৈতিক শক্তি। এর পাশাপাশি মাদেসি ফ্রন্টও স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী।

এখন মূলত চার ব্যক্তিকে ঘিরে নেপালের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে : শের বাহাদুর দেউবা, খাদগা প্রসাদ অলি, পুষ্পকমল দাহাল ও কামাল থাপা। দেউবা নেপালি কংগ্রেসের নেতা। খাদগা প্রসাদ অলি ইউএমএল নেতা। পুষ্পকমল দাহাল মাওবাদীদের নেতা, আর কামাল থাপা রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির নেতা। এ চারজনের যে কোনো একজন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। কোনো দলের পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। তাই দলগুলো জোটবদ্ধ হয়েছে। বামপন্থী জোটে আছে কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল), কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী), নয়া শক্তি পার্টি। নয়া শক্তি পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক মাওবাদী নেতা বাবুরাম ভট্টরাই। শেষ পর্যন্ত তিনি আর বাম জোটে থাকেননি গোরকা নির্বাচনী এলাকায় জোটের প্রার্থী হতে না পারায়। পরবর্তী সময়ে তিনি জোটবদ্ধ হয়েছেন অপর দুটি বাম সংগঠন- রাষ্ট্রীয় জনমোর্চা ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (এমএল) সঙ্গে। অপরদিকে নেপালি কংগ্রেস জোটবদ্ধ হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি, রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (গণতান্ত্রিক) এবং মাদেসি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে। মোট ৮৮টি রাজনৈতিক দল এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

নির্বাচনের পরও নেপালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে কিনা সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন এখন। বাম জোটে মাওবাদীরা ইউএমএলের সঙ্গে ঐক্য করলেও এ ঐক্য নির্বাচনের পর আদৌ থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অতীতে খাদগা প্রসাদ অলি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই সরকার পদত্যাগ করেছিল মাওবাদীরা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়ায়। এমনটি এবারও ঘটতে পারে। বাম জোট নির্বাচনে ভালো করলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে অলি-প্রচন্ড আবারও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারেন! এ নির্বাচনের ব্যাপারে চীন ও ভারতের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। এ দেশ দুটি নেপালি রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। দুটি দেশের সঙ্গেই নেপালের সীমান্ত রয়েছে। চীন অলির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন করেছিল। ভারতের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক প্রভাব কমাতে চীন নেপালের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি করেছিল। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ভারত চেয়েছিল অলি সরকারের পতন (দ্য ডিপ্লোমেন্ট, ২৬ জুলাই ২০১৬)। অনেকেই মনে করেন, নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন একটি সরকার সেখানে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে বেশি। সুতরাং এ নির্বাচনে দেশ দুটি কোনো না কোনোভাবে প্রভাব খাটাতে চাইবে।

নির্বাচনে যে জোটই ভালো ফলাফল করুক না কেন, দৃষ্টি থাকবে প্রধানমন্ত্রী পদটির দিকে। তবে অলি, প্রচন্ড, দেউবা- যে কোনো একজনই আগামীতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন এটা প্রায় নিশ্চিত। দেউবা এখন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৯৫-১৯৯৭, ২০০১-২০০২, ২০০৪-২০০৫ সময়সীমায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। একইসঙ্গে অলি ও প্রচন্ড নেপালের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। একজন নারীনেত্রী বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি নেপালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেও দেশটির রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ তেমন একটা নেই। পার্লামেন্টে নারীদের জন্য কোনো ‘কোটা’ ব্যবস্থা নেই। মিসেস ভাণ্ডারি মাওবাদী নেতা ও সাবেক দেশরক্ষামন্ত্রী। তার প্রয়াত স্বামী মদন কুমার ভাণ্ডারিও ছিলেন মাওবাদীদের নেতা। সংসদে তিনি মাওবাদী গ্রুপের ডেপুটি লিডার ছিলেন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে তিনি পার্লামেন্ট কর্তৃক ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

এখন দেখার পালা দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের পর যে ফলাফল পাওয়া যাবে, তাতে সরকার গঠনে জটিলতা এড়ানো যায় কিনা। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৩৮টি আসন বাম জোট নাকি গণতান্ত্রিক জোট পাবে, তার ওপর নির্ভর করছে নেপালের আগামী দিনের রাজনীতি। আগেই বলেছি, ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে নেপালে। চীনের স্বার্থ থাকলেও দেশটি সরাসরি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নেপালের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারেনি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দলাদলির কারণে। গত ১০ বছরে রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করতে পেরেছে। এখন প্রত্যাশা একটাই- সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসুক।
Daily Jugantor
08.12.2017

সংবাদটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্ব অনেক

Image result for Rohingya
একটি ছোট্ট সংবাদ। ছাপা হয়েছিল একটি জাতীয় দৈনিকের তৃতীয় পাতায়। সংবাদটি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে। সংবাদের শিরোনাম ‘চুক্তি কার্যকর নিয়ে দূতদের সংশয়’ (একটি জাতীয় দৈনিক, ২৮ নভেম্বর)। অতিসম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতদের একটি সম্মেলন। বিদেশে বাংলাদেশকে যারা প্রতিনিধিত্ব করেন তারা এই প্রথমবারের মতো ঢাকায় একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশি দূতরা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ফলে তারা নানা অজুহাতে চুক্তি কার্যকর করা নিয়ে টালবাহানা করতে পারে।’ বাংলাদেশি সিনিয়র কূটনীতিকরা যখন এ ধরনের মনোভাব প্রদর্শন করেন, তখন বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। গত ২২ ও ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিয়ানমারের নেপিদোতে আসেম সম্মেলনে যোগ দেন। এর পর ২৩ নভেম্বর তিনি সেখানে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পারসন ফ্রম রাখাইন স্টেট’ নামে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এর পর ঢাকায় এসে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন গত ২৫ নভেম্বর। এর পর পরই ঢাকায় সিনিয়র কূটনীতিকদের এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত হয়তো এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফেরত নেবে না। এখানে লক্ষ করার বিষয়, সমঝোতা স্মারকে কিন্তু রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে ‘ডিসপ্লেসড’ পারসন, অর্থাৎ বাস্তুচ্যুত নাগরিক। যারা সমঝোতা স্মারকটি দেখেছেন, তারা লক্ষ করেছেন সেখানে ১৯ দফা আছে। এই দফাগুলো নিয়েও কথা আছে। অতীতে দু-দুটো চুক্তি হয়েছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। একটি ১৯৭৮ সালে, অপরটি ১৯৯২ সালে। এবারে সমঝোতা স্মারকে ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুসরণ করা হবে বলে বলা হয়েছে। যতদূর জানা যায়, অতীতে ৪ লাখ ৭৬ হাজার রোহিঙ্গা ওইসব চুক্তিবলে ফেরত গেছে। কিন্তু তার পরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বৈধ ও অবৈধভাবে কক্সবাজারে রয়ে গেছে। এদের একটা অংশ বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে। একটা অংশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সনদ গ্রহণ করেছে। অনেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ইউএনএইচসিআর ওদের দেখভাল করছে। তাদের হিসাবে বৈধ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কয়েক হাজার। অবৈধ অর্থাৎ রেজিস্টারবিহীন রোহিঙ্গা নাগরিকদের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। তারা অবৈধভাবে ক্যাম্প করে বসাবস করছে। এখন যোগ হলো আরও প্রায় ৭ লাখ। এদের মধ্য থেকে কতজনকে মিয়ানমার ফেরত নেবে, সে প্রশ্ন থাকলই। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলরের অফিস থেকে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হবে! সমঝোতা চুক্তিতে ওই ১৯৯২ সালের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটা একটা বড় ধরনের ফাঁদ। আমরা সম্ভবত সেই ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি। ১৯৯২ সালের চুক্তি ‘াবৎরভরপধঃরড়হ’ শব্দটা আছে। অর্থাৎ মিয়ানমারে যেসব রোহিঙ্গার নাম দেওয়া হবে, তাদের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি তারা যাচাই করবে। অতীতে এ ধরনের নামের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার এর কোনো জবাব দেয়নি। এবারও সেই ফাঁদে আটকে যাবে বাংলাদেশ! তথাকথিত াবৎরভরপধঃরড়হ-এর নামে তারা সময়ক্ষেপণ করবে। লোক দেখানো কিছু রোহিঙ্গাকে তারা ফেরত নিতে পারে। কিন্তু একটা বড় অংশকেই Verification-এর নামে আর ফেরত নেবে না। এটাই মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি। যেহেতু মিয়ানমারের ওপর একটি আন্তর্জাতিক ‘চাপ’ আছে, সেহেতু তারা রোহিঙ্গাদের নিতে রাজি হয়েছে। এটাও বিশ্ববাসীকে দেখানো যে, তারা তাদের নাগরিকদের ফেরত নিচ্ছে। কিন্তু নেবে না। তারা সময়ক্ষেপণ করবে। বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নারী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এরা সবাই অন্তঃসত্ত্বা। এদের সন্তান এখন জন্ম নেবে বাংলাদেশে। জন্মসূত্রে ওইসব সন্তান হবে বাংলাদেশি নাগরিক। মিয়ানমার ওইসব সন্তানকে ফেরত নেবে না। সন্তান না গেলে মায়েরাও যেতে চাইবে না। ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এ দেশে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শরণার্থীসংক্রান্ত যে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে তাতে কোনো শরণার্থীকে ‘জোর করে’ ফেরত পাঠানো যাবে না। আর ইউএনএইচসিআর দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, এদের জোর করে ফেরত না পাঠানোর জন্য। ফলে আগামীতে এ ক্ষেত্রে একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। বলা হচ্ছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হওয়ার কথা। এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা প্রাথমিক স্টেজ। অর্থাৎ দু’পক্ষ বসবে। নীতিমালা ঠিক করবে। কীভাবে, কোন প্রসেসে ‘কাজ’টি শুরু হবে, তা নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ তিন সপ্তাহের মধ্যেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সে রকম একটি আভাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি-ঘর করতে সময় লাগবে! তার কথা থেকেই বোঝা যায়, পুরোপুরি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে সময় লাগবে। ভয়টা হচ্ছে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে। বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। এতে করে লাভ হবে মিয়ানমারের। আমাদের কোনো লাভ নেই। মিয়ানমারের একগুঁয়েমির কারণে আমরা তাদের কিছু দাবি মেনে নিয়েছি। কিন্তু তার পরও তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। তাদের একগুঁয়েমি মনোভাব আজকের নয়। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন, অতীতে মিয়ানমার জাতিসংঘ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন, প্রচলিত বিধিবিধান তারা মানে না। সেনাবাহিনীর কথায় এখন চলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে অং সান সু চি বহির্বিশ্বে তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এটা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি না। কিন্তু মুখ্য করতে পারি। কূটনৈতিক চ্যানেলে এখন আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। দক্ষ কূটনীতিকদের প্রয়োজনে নিয়োগ দিতে হবে। কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। এসব দেশের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে হবে। চীন ও রাশিয়ার বাংলাদেশে বড় বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। এই বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টি আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনে যাননি। এমনকি রাশিয়ায়ও যাননি। এ ধরনের একটি সংকট হলে, সাধারণত সরকারের বিশেষ দূত, নিদেনপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করেন। নিজ দেশের অবস্থা বিদেশে তুলে ধরেন। জনমত সৃষ্টি করেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে অনেকটাই নীরব। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটিতে ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এখানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। ওআইসি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। ১৩৫টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ রয়েছে। এখানেও আমাদের ব্যর্থতা, আমরা সার্কভুক্ত দেশগুলোতেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে সমর্থন আদায় করতে পারিনি। একমাত্র পাকিস্তান ও মালদ্বীপকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি। অতিসম্প্রতি টিলারসনের একটি বক্তব্যে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ রয়েছে। টিলারসন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, মিয়ানমারে ‘জাতিগত নিধন’র মতো ঘটনা ঘটেছে। কিছুটা হলেও সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন স্বীকার করে নিচ্ছে যে, মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান চলছে। আমরা এ বক্তব্য আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। আমরা বারবার বলে আসছি, যারা রোহিঙ্গা হত্যা আর অত্যাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হোক। যারা বিভিন্ন দেশে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হচ্ছে। তাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের দাবি করলে মিয়ানমার একটা ‘চাপ’-এর মুখে থাকবে। তাই একদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুততর করা, অন্যদিকে গণহত্যার বিচার দাবি করতে পারে বাংলাদেশ। মনে রাখতে হবে মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সময়ক্ষেপণ করা। তাই আমরা তাদের পাতা ফাঁদে যেন পা না দিই, এটা সব সময় বিবেচনায় নিতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে একটা মূল প্রশ্ন জড়িত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি জড়িত। মিয়ানমার এদের আদৌ তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেবে কিনা? সমঝোতা স্মারকে ‘বাস্তুচ্যুত রাখাইনের নাগরিক’ কথাটা লেখা আছে। রোহিঙ্গা নেই। তাদের প্রত্যাবাসন তাই প্রশ্নবিদ্ধ! বলা ভালো মিয়ানমার এসব রোহিঙ্গাকে নিজেদের নাগরিক হিসেবেও স্বীকার করে না। এমনকি তারা রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করতেও নারাজ। পোপকেও তারা এ শব্দটি ব্যবহার করতে দেয়নি। তারা এদের মুসলমান নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে। মিয়ানমারে যে ১২৫টির মতো নৃগোষ্ঠী রয়েছে, সেখানে রোহিঙ্গা তথা মুসলমান জনগোষ্ঠীর নাম নেই। ফলে প্রশ্ন জাগে, রোহিঙ্গারা কি তাদের নিজ নিজ বাসভূমে থাকতে পারবে? সমঝোতা স্মারকে এ সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা নেই কোথাও। শুধু প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে! নিজ বাসভূমি কথাটা নেই। এ ক্ষেত্রে আমরা মিয়ানমারের তৈরি করা ফাঁদে পা দিতে পারি! মিয়ানমারের সুস্পষ্ট একটা পরিকল্পনা আছে, রোহিঙ্গাদের অন্যত্র অনেকটা শত শত ক্যাম্প তৈরি করে সেখানে তাদের পুনর্বাসন করা! এতে করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার স্বার্থ রক্ষিত হবে। তারা একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের রাখবে। এতে করে মিয়ানমারের নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ৭টি হোমল্যান্ড তৈরি করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে সেখানে যেতে বাধ্য করেছিল। মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি অনেকটা সে রকম। এতে করে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সেখানে আরও খারাপ হবে। সমঝোতা স্মারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন শুরু থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বা হবে, তা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা, বিশেষ করে ইউএনএইচসিআরকে যদি জড়িত না করি, তা হলে নানা জটিলতা তৈরি হবে। অবশ্যই আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাকে জড়িত করতে হবে, যা মিয়ানমার চায় না। এটা জরুরি এ কারণে যে, এতে করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং রোহিঙ্গারা এক ধরনের স্বস্তিতে থাকবে। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে যে, মিয়ানমার সরকার তিনটি এলাকায় (মংডু, বুথিয়াডং ও রাথেডং) একাধিক টাউনশিপ নির্মাণ করছে, যেখানে কিছু রোহিঙ্গাকে স্থান করে দেওয়া হবে। এ জন্য স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি একটি কমিটিও গঠন করেছেন, যার নাম টহরড়হ ঊহঃবৎঢ়ৎরংব ঋড়ৎ ঐঁসধহরঃধরড়হ অংংরংঃধহপব, জবংবঃষষবসবহঃ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ জধশযরহব (টঊঐজউ)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব টাউনশিপ নির্মাণে রাখাইন রাজ্য সরকারকে সম্পৃক্ত তথা তাদের জড়িত করা হয়নি। এ নিয়ে সেখানে এক ধরনের অসন্তোষ আছে। ফলে সমঝোতা স্মারকটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ইতোমধ্যে। জাতিসংঘ বলছে, রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন এখনো নিরাপদ নয়। আর অ্যামনেস্টি বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন অচিন্তনীয় ও বিপজ্জনক। আর এমনি এক পরিস্থিতিতে আমাদের কূটনীতিকরা বললেন, তারা শতকরা একশ ভাগ মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না! ফলে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু এই সমঝোতা স্মারক সব প্রশ্নের জবাব দেয় না।
Daily Amader Somoy
06.12.2017

পোপের ঢাকা সফর ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


Image result for Popes Bangladesh visit\


বিশ্বের ১৩০ কোটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস তিন দিনের ঢাকা সফর শেষ করেছেন গত শনিবার। ৩০ বছর পর এ প্রথম একজন পোপ বাংলাদেশে এলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে পোপ পল এবং ১৯৭০ সালেও পোপ এ অঞ্চল সফর করে গিয়েছিলেন। পোপ ফ্রান্সিস একজন ধর্মীয় নেতা হলেও ভ্যাটিকান সিটির প্রধান হিসেবে তিনি বিশ্বের সর্বত্র আলাদা একটি সম্মান পান এবং একজন প্রেসিডেন্টের মতো তিনি ‘প্রটোকল’ পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশেও তিনি সে সম্মান পেয়েছেন। তার এ সফর যে কোনো বিবেচনায় যথেষ্ট গুরত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে মিয়ানমারের কয়েক লাখ নাগরিক, যাদের আমরা রোহিঙ্গা বলি, তারা অত্যাচার আর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে যখন আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, তখন পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশে আগমন ও তাদের কাছ থেকে তাদের দুরবস্থার কথা শোনা, রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে ছুটে যাননি বটে; কিন্তু রোহিঙ্গাদের একটা ক্ষুদ্র অংশ তার সঙ্গে ঢাকায় এসে দেখা করেছে। তিনি তাদের কথা শুনেছেন। এখানে বলা ভালো, তিনি ঢাকা সফরের আগে মিয়ানমার সফর করেছেন। সেখানে তিনি তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি; কিন্তু পরোক্ষভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন। তিনি সেখানে সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মাঝে ঐক্য ও সম্প্রীতির পথে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিগত নির্যাতন বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে এসেও তিনি কৌশলে রোহিঙ্গা শব্দটি সর্বত্র বলেননি; কিন্তু বলেছেন, সৃষ্টিকর্তার মাঝে একজন রোহিঙ্গাও বসবাস করেন। পরোক্ষভাবে এ নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি ইঙ্গিত করে পোপ ফ্রান্সিস ঢাকায় দেয়া তার বক্তব্যে বলেছেন, গত কয়েক মাসে রাখাইন থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ উদার মন এবং অসাধারণ ঐক্যের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, এটি কোনো ছোট বিষয় নয়, বরং সারা বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং শরণার্থী শিবিরগুলোয় থাকা আমাদের ভাইবোন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা কেউই ব্যর্থ হইনি। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসাটা অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেছেন পোপ।
সুতরাং পোপ ফ্রান্সিস তার মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরে রোহিঙ্গা শব্দটি সবসময় উচ্চারণ না করলেও এ সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে ‘উদার মন’ ও ‘অসাধারণ ঐক্যের’ পরিচয় দিয়েছে, সে কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিক তার সঙ্গে ঢাকায় এসেছেন। তাদের প্রতিবেদনে পোপ ফ্রান্সিসের এ বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আসরে রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা আরও বাড়ল। পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বের যেখানেই যান, সেখানে তিনি শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলেন। তিনি মূলত বিশ্বশান্তির প্রতীক। যিশুখ্রিস্টের দৃশ্যমান প্রতিনিধি তিনি। ২০১৩ সালের মার্চে ২৬৬তম পোপ হিসেবে নিযুক্তির পর থেকে তিনি আন্তঃধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত ঐক্যের কথা বলে আসছেন। ঢাকায় গেল শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশেও তিনি প্রার্থনা করেন। তরুণ সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন। বাংলাদেশ একটি সহনীয় ইসলাম ধর্মের দেশ। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যে হাজার বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে এবং সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে, তা পোপ ফ্রান্সিসের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তবে প্রতিটি সমাজেই বিভ্রান্তকারী কিছু ব্যক্তি থাকে, যারা ধর্মের নামে সমাজকে বিভক্ত করতে চায়। বাংলাদেশেও এ রকম মানুষ আছে, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐক্যকে বিনষ্ট করতে চেয়েছিল। পোপ ফ্রান্সিস ঢাকায় গুলশানে জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করে আমাদের সে কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবে বলতে দ্বিধা নেই, পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের সময় আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে সোচ্চার হবেন। পোপ রোহিঙ্গা শব্দটি সর্বত্র ব্যবহার না করেও রাখাইনের জনগোষ্ঠীর কথা বলেছেন, কার্যত তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেই বুঝিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রশ্নে কিছু কিছু অগ্রগতি হয়েছে। দুই দেশের মাঝে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা কিছুটা হলেও একটি অগ্রগতি বটে। দায়িত্ব এখন মিয়ানমারের। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতদের একটি সম্মেলন। বিদেশে বাংলাদেশকে যারা প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা এ প্রথমবারের মতো ঢাকায় একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশী দূতরা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ফলে তারা নানা অজুহাতে চুক্তি কার্যকর করা নিয়ে টালবাহানা করতে পারে।’ বাংলাদেশী সিনিয়র কূটনীতিকরা যখন এ ধরনের মনোভাব প্রদর্শন করেন, তখন বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এটা ছাড়া বাংলাদেশের কোনো বিকল্পও ছিল না। গেল ২২ ও ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিয়ানমারের নেপিদোতে আসেম সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর ২৩ নভেম্বর তিনি সেখানে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পারসন্স ফরম রাখাইন স্টেট’ নামে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এরপর ঢাকায় এসে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন ২৫ নভেম্বর। এর পরপরই ঢাকায় সিনিয়র কূটনীতিকদের এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত হয়তো এ সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফেরত নেবে না! এখানে লক্ষ করার বিষয়, সমঝোতা স্মারকে কিন্তু রোহিঙ্গা শব্দটিও ব্যবহার করা হয়নি; ব্যবহার করা হয়েছে ‘ডিসপ্লেসড পারসন’, অর্থাৎ বাস্তুচ্যুত নাগরিক। যারা সমঝোতা স্মারকটি দেখেছেন, তারা লক্ষ করেছেন, সেখানে ১৯ দফা আছে। এ দফাগুলো নিয়েও কথা আছে। অতীতে দুই-দুইটি চুক্তি হয়েছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। একটি ১৯৭৮ সালে, অপরটি ১৯৯২ সালে। এবার সমঝোতা স্মারকে ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুসরণ করা হবে বলা হয়েছে। যতদূর জানা যায়, অতীতে ৪ লাখ ৭৬ হাজার রোহিঙ্গা সেসব চুক্তি বলে ফেরত গেছে। কিন্তু তারপরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বৈধ ও অবৈধভাবে কক্সবাজারে রয়ে গেছে। এদের একটা অংশ বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে। একটা অংশ এরই মধ্যে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব সনদ গ্রহণ করেছে। অনেকে বাংলাদেশী পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ইউএনএইচসিআর এদের দেখভাল করছে। তাদের হিসাবে বৈধ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কয়েক হাজার। অবৈধ অর্থাৎ রেজিস্টারবিহীন রোহিঙ্গা নাগরিকদের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। তারা অবৈধভাবে ক্যাম্প করে বসবাস করছে। এখন যোগ হলো আরও প্রায় ৭ লাখ। এদের মাঝ থেকে কতজনকে মিয়ানমার ফেরত নেবে, সে প্রশ্ন থাকলোই। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের অফিস থেকে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হবে! সমঝোতা চুক্তিতে এ ১৯৯২ সালের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটা একটা বড় ধরনের ঝুঁকি। আমরা সম্ভবত তাদের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি! ১৯৯২ সালের চুক্তিতে াবৎরভরপধঃরড়হ শব্দটা আছে। অর্থাৎ মিয়ানমারকে যেসব রোহিঙ্গার নাম-ঠিকানা দেয়া হবে, সেগুলো তারা যাচাই করবে। অতীতে এ ধরনের নামের একটি তালিকা দেয়া হয়েছিল; কিন্তু মিয়ানমার এর কোনো জবাব দেয়নি। এবারও সে ফাঁদে আটকে যেতে পারে বাংলাদেশ! তথাকথিত াবৎরভরপধঃরড়হ-এর নামে তারা সময়ক্ষেপণ করতে পারে। লোকদেখানো কিছু রোহিঙ্গাকে তারা ফেরত নিতে পারে; কিন্তু একটা বড় অংশকেই তথাকথিত াবৎরভরপধঃরড়হ-এর নামে আর ফেরত না-ও নিতে পারে। এটাই মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর একটা ‘চাপ’ আছে। উপরন্তু পোপ ফ্রান্সিস রাখাইনের নির্যাতিত ভাইবোনের পক্ষে কথা বলেছেন, সেক্ষেত্রে মিয়ানমারের পক্ষে কাজটি করা খুব সহজ হবে না। তারা রাখাইন স্টেটের নির্যাতনের খবর অস্বীকার করবেন কীভাবে? পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের পর রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক মাত্রাটা আরও বাড়ল। আমাদের কাজটি হবে, এখন আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগের কাজটি আরও দ্রুত করা। আন্তর্জাতিক কমিউনিটি আমাদের পক্ষে। এখন পোপ ফ্রান্সিসও আমাদের পক্ষে দাঁড়ালেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমেই পোপ অন্তত একটি মেসেজ দিলেন বিশ্বসম্প্রদাকে। আমাদের কাজটিই হবে এখন পোপের এ মেসেজটি ধারণ করে আন্তর্জাতিক আসরে রোহিঙ্গা প্রশ্নে জনমত গড়ে তোলা। রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীও এ রকম আহ্বান জানিয়েছিলেন। একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আসরে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ অব্যাহত রাখাÑ এভাবেই আামাদের এগিয়ে যেতে হবে।
পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে ভ্যাটিকানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলো। বাংলাদেশ যে একটি ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ, তা আবারও প্রমাণিত হলো। তার এ সফরের মধ্য দিয়ে এটা আরও প্রমাণিত হলো যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। হাজার বছরের যে ইতিহাস, যেখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি একটা বড় স্থান করে আছে, পোপের এ সফরের মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হলো।
Daily Alokito Bangladesh
05.12.2017

পোপ ফ্রান্সিসের সফরে কী পেল বাংলাদেশ


Image result for Popes Bangladesh visit\




তিনি এলেন। দেখলেন।
এবং জয় করলেন। তিনি ১৩০ কোটি খ্রিস্টান ক্যাথলিক জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় গুরু পোপ ফ্রান্সিস। ২৬৬তম পোপ তিনি। আমাদের দেশে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের জন্য পোপকে পাওয়া একটা ভাগ্যের ব্যাপার। কজনেরই বা এমন সৌভাগ্য হয়। ৩০ বছর আগে এসেছিলেন পোপ দ্বিতীয় জনপল। ৩০ বছর পর পোপ ফ্রান্সিস এলেন শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। পোপ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ভ্যাটিকান সিটির প্রধান তিনি। পৃথিবীর যেখানেই তিনি যান, সেখানেই পান রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। বাংলাদেশও তাঁকে সেই মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর এই সফরে কী পেল বাংলাদেশ? নগর রাষ্ট্র হচ্ছে ভ্যাটিকান সিটি। মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই রাষ্ট্রের জনসংখ্যা মাত্র এক হাজার। এটি একটি ক্যাথলিক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। পোপ ফ্রান্সিস হচ্ছেন ধর্মগুরু। কিন্তু তাঁর বিশ্বব্যাপী রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। পৃথিবীর যেখানেই তিনি যান সেখানেই তিনি পান রাষ্ট্রপতির মতো সম্মান। তাই তিনি যখন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করে গেলেন তখন সংগত কারণেই সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল তাঁর এই সফরের দিকে। তিনি কী বলেন, কী সিদ্ধান্ত নেন—এ ব্যাপারে আগ্রহ ছিল বিশ্ববাসীর। বিশেষ করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু যখন জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল তখন একজন শান্তির দূত পোপ ফ্রান্সিস এদের ব্যাপারে কথা বললেন, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু না, মিয়ানমারে তিনি রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারেননি। কিন্তু বাংলাদেশে পেরেছেন। রোহিঙ্গা প্রশ্নে তিনি বাংলাদেশে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন—ঞযব ঢ়ত্বংবহপব ড়ভ ড়েফ ঃড় ফধু রং পধষষবফ জড়যরহমধ. অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতির নামই রোহিঙ্গা! কী দারুণ কথা! রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার তুলনা করেছেন! এটা তিনি মিয়ানমারে বলতে পারেননি। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। বলেছেন, দেশটির সামরিক ও বেসামরিক উভয় পক্ষকেই তিনি সঠিক বার্তা দিতে পেরেছেন। রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করে তিনি আলোচনা বন্ধ করতে চাননি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের ভূমিকার তিনি প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, রাখাইন থেকে আসা বিপুলসংখ্যক অনুপ্রবেশকারীকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ উদার মন ও অসাধারণ ঐক্যের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, এটি কোনো ছোট বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট ও আশ্রয়শিবিরগুলোতে থাকা আমাদের ভাই-বোন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা কেউই ব্যর্থ হইনি। এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসাটা অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেছেন পোপ। সুতরাং পোপ ফ্রান্সিস তাঁর মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরে রোহিঙ্গা শব্দটি সব সময় উচ্চারণ না করলেও এই সংকট সমাধানে বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে ‘উদার মন’ ও ‘অসাধারণ ঐক্যে’র পরিচয় দিয়েছে, সে কথাটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে ঢাকায় এসেছেন। তাঁদের প্রতিবেদনে পোপ ফ্রান্সিসের এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আসরে রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা আরো বাড়ল। পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বের যেখানেই যান সেখানেই তিনি শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলেন। তিনি মূলত বিশ্বশান্তির প্রতীক। যিশু খ্রিস্টের দৃশ্যমান প্রতিনিধি তিনি। ২০১৩ সালের মার্চে ২৬৬তম পোপ হিসেবে নিযুক্তির পর থেকে তিনি আন্তর্ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত ঐক্যের কথা বলে আসছেন। ঢাকায় গেল শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশেও তিনি প্রার্থনা করেন। তরুণসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় করেন। বাংলাদেশ একটি সহনীয় ইসলাম ধর্মের দেশ। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যে হাজার বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে এবং সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে, তা পোপ ফ্রান্সিসের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তবে প্রতিটি সমাজেই বিভ্রান্তকারী কিছু ব্যক্তি থাকে, যারা ধর্মের নামে সমাজকে বিভক্ত করতে চায়। বাংলাদেশেও এ রকম মানুষ আছে, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐক্যকে বিনষ্ট করতে চেয়েছিল। পোপ ফ্রান্সিস ঢাকায় গুলশান জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করে আমাদের সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে বিশ্বকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এটা নিশ্চয়ই বিশ্বনেতৃত্বকে আরো ভাবিয়ে তুলবে। তবে আমরা যেন ভুলে না যাই, মিয়ানমারের কূটনৈতিক আচরণ আন্তর্জাতিক মানের নয়। আন্তর্জাতিক আইন, প্রচলিত ধারণা মিয়ানমার মানে না। দীর্ঘদিন মিয়ানমার বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, অতীতে মিয়ানমার জাতিসংঘ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের (তেল ও গ্যাস) রিজার্ভ মিয়ানমারকে শক্তিধর দেশগুলোর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সেখানে বাড়ছে। চীনের বিশাল বিনিয়োগের (গভীর সমুদ্রবন্দরে সাত মিলিয়ন ডলার, তেল ও গ্যাস উত্তোলনের প্রায় তিন মিলিয়ন ডলার) সুযোগ নিচ্ছে মিয়ানমার। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর যে ধারণা, তাতে মিয়ানমারের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বৃহৎ শক্তির কাছে রোহিঙ্গা নির্যাতন তেমন গুরুত্ব পায়নি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। ধারণা করছি, শিগগিরই দেশ দুটি আলোচনার টেবিলে বসবে। তবে বলতে দ্বিধা নেই, মিয়ানমার একটি কঠিন প্রতিপক্ষ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে সদ্য আগত সাত লাখ রোহিঙ্গা—তারা সবাইকে ফেরত না-ও নিতে পারে। এটাই মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর একটা ‘চাপ’ আছে। উপরন্তু পোপ ফ্রান্সিস ‘রাখাইনের নির্যাতিত ভাই-বোনের’ পক্ষে কথা বলেছেন, সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পক্ষে কাজটি করা খুব সহজ হবে না। তারা রাখাইন স্টেটের নির্যাতনের খবর অস্বীকার করলেন কিভাবে? পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের পর রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক মাত্রা আরো বাড়ল। আমাদের কাজটি হবে এখন আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগের কাজটি আরো দ্রুত করা। আন্তর্জাতিক কমিউনিটি আমাদের পক্ষে। তখন পোপ ফ্রান্সিসও আমাদের পক্ষে দাঁড়ালেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমেই পোপ অন্তত একটি বার্তা দিলেন বিশ্বসম্প্রদায়কে। আমাদের কাজটিই হবে এখন পোপের এই মেসেজ ধারণ করে আন্তর্জাতিক আসরে রোহিঙ্গা প্রশ্নে জনমত গড়ে তোলা। রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীও এ রকম আহ্বান জানিয়েছিলেন। একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আসরে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ অব্যাহত রাখা—এভাবেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এই সফরের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। বাংলাদেশ একটি শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ, সেই বার্তাটি তিনি বিশ্ববাসীকে দিলেন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফেরত নেবে। এই স্বীকারোক্তি তাদের আছে। কমিটমেন্টও আছে। এখন তথাকথিত ‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যেন আটকে না যায়। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের আন্তরিকতাই হলো আসল। মিয়ানমার যেন তাদের আন্তরিকতা প্রদর্শন করে সে ব্যাপারে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে আমাদের স্বার্থে ‘ব্যবহার’ করতে হবে। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের পর আন্তর্জাতিক আসরে আমাদের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। তাই ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস ও পেইচিংয়ে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। আমাদের প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও পেইচিংয়ে রোহিঙ্গা প্রশ্নে নীতিগতভাবে কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা নির্যাতনকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। দু-একজন মার্কিন সিনেটরের বক্তব্যেও এমনটি ফুটে উঠেছে। এখন মিয়ানমার যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কালক্ষেপণের উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমরা মার্কিন আইন প্রণেতা ও প্রশাসনকে ব্যবহার করতে পারব। চীনের নীতিতেও ‘কিছু পরিবর্তন’ লক্ষণীয়। চীন এখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বলে গেছেন, প্রয়োজনে চীন মধ্যস্থতা করতে পারে। বাংলাদেশে চীনের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশ বরাবরই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। মিয়ানমারের বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর প্রধান রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পরপরই পেইচিং সফর করেছিলেন। এর পরপরই মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের বিশ্ব মিডিয়া রোহিঙ্গাদের করুণ কাহিনি আরো প্রকাশ করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ইতিহাস মুছে ফেলতে চাইছে মিয়ানমার। টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের স্বাধীনতার শুরুর দিকে বিশিষ্ট রোহিঙ্গারা বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশটির শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের আলাদা একটি ইউনিয়নও ছিল। স্বাধীনতার পর দেশটির প্রথম নেতা উনুর মন্ত্রিসভায়ও একজন সদস্য ছিলেন রোহিঙ্গা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা সেই মন্ত্রীও নিজেকে আরাকান মুসলিম হিসেবেই পরিচয় দিতেন। এমনকি জেনারেল নে উইনের সময়ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বেতার থেকে রোহিঙ্গা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্বও ছিল
(No such Thing as Rohinga; Myanmar Erases a History, New York Times, 1 December, ২০১৭) নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বাস্তব ইতিহাসটিই ফুটে উঠেছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ইতিহাস কতটুকু মুছে ফেলতে পারবে, তা হয়তো আগামী দিনের ইতিহাস বলবে। কিন্তু এভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণভাবে উচ্ছেদ করে নতুন করে ইতিহাস লেখা যায় না। হিটলার জার্মানিতে পারেননি। মিলোসেভিচ বসনিয়ায় পারেননি। টার্লস টেলরও পারেননি লাইবেরিয়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা আফ্রিকার রুয়ান্ডায়ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানেও শাসকরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই যত দ্রুত মিয়ানমারের নেতাদের মধ্যে এই উপলব্ধি বোধটুকু আসবে ততই মিয়ানমারের জন্য মঙ্গল। পোপ ফ্রান্সিসের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে তিনি আরো একবার এ মেসেজই দিয়ে গেলেন।
Daily Kalerkontho
05.12.2017

চীনের প্রস্তাব রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কতটুকু সহায়ক হবে


Image result for Rohingya



সদ্য শেষ হওয়া আসেম সম্মেলনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন তিন দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। গত ২১ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট আসেমের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন শেষ হয়েছে।
ওই সম্মেলন শুরু হওয়ার আগের দিন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক সংবাদ সম্মেলনে এই তিন দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এর আগে তিনি নেপিডোতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর বা সরকারপ্রধান অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট তিন কিয়াউ ও ক্ষমতাবান সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল সিন অং থ্লইংয়ের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। এর আগে তিনি ঢাকা ঘুরে যান। ঢাকায় তিনি এমন আভাস দিয়েছিলেন যে চীন প্রয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘মধ্যস্থতা’ করবে। এখন তিনি মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তাঁর তিন দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করলেন। এই তিন দফা পরিকল্পনায় রয়েছে : ১. অস্ত্রবিরতি ও শান্তি-স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যাতে রাখাইন থেকে লোকজন না পালায় এবং শান্তিতে থাকে; ২. মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্যের ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের উপায় খোঁজা; ৩. রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, চীন বিশ্বাস করে সংলাপের মধ্য দিয়েই প্রতিবেশী দুই দেশ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এটাও মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রাখাইনের দারিদ্র্য দায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের এই তিন দফা পরিকল্পনা কি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আদৌ সহায়ক হবে? যেখানে নাগরিকত্ব মূল ইস্যু, সেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে চীনের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। এ থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে চীন সরাসরিভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেয়নি। মিয়ানমারে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। সেই বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হোক, এটা চীন চায় না। চীন রাখাইনের সমুদ্র উপকূলে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে। ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে রাখাইনের গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস উত্তোলনে। এই তেল ও গ্যাস উত্তোলন গত এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে এবং চীন পাইপলাইনের মাধ্যমে তা নিয়ে যাচ্ছে ইউনান প্রদেশে। চীন চায় না, তার এই বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। তবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চারজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (জাপান, জার্মানি, সুইডেন ও ইইউ) ঢাকা সফর করে গেছেন। ঢাকা সফর করে গেছেন চারজন মার্কিন আইন প্রণেতা। মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে সম্প্রতি। এতে মিয়ানমারের রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে বলা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছেন বারবার। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানের ৩১তম সম্মেলনে সু চি বলেছিলেন, সমঝোতা চুক্তি হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার! এটা সময়ক্ষেপণ করার একটা কৌশল। এর আগে অক্টোবরে সু চি বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে চায় না। তিনি একবার এমন কথাও বলেছেন যে মুসলমানরা কেন চলে যাচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। গেল সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় এসেছিলেন মিয়ানমারের বিশেষ দূত কিউ টিন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ফলে একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফর, এমনকি আসেম শীর্ষ সম্মেলনও আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছিল। আমরা ওই সম্মেলন থেকে খুব বেশি কিছু পাইনি। তবে প্রত্যাশা ছিল। এই নভেম্বরেই আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি বাংলাদেশে এসে মিয়ানমারেও যাবেন। আমরাও এই সুযোগ আমাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি। মোদ্দা কথা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পাশে আছে। এখন দরকার কূটনৈতিক যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করা। দুঃখজনক হলেও আমরা তা পারিনি। চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আসেম সম্মেলনে যোগদানের আগে ঢাকা সফর করে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের দেখাও হয়েছিল। নিশ্চয় বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। আসেম সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে এই শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। আসেম (ASEM-ASIA-EUROPE Meeting) একটি বড় সংগঠন। বর্তমানে ৫১টি দেশ ও দুটি আঞ্চলিক সংস্থা আসেমের সদস্য। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ (ভারতসহ) এবং চীন আসেমের সদস্য। ফলে আসেম সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বাংলাদেশ একটি সুযোগ পেয়েছিল রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরার। আসিয়ান সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো আলোচনা হয়নি বটে, তবে আসিয়ানভুক্ত অনেক দেশ এ সংকট সম্পর্কে অবগত। আমাদের উচিত ছিল ওই সব দেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি যৌথ অবস্থানে যাওয়া। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ড বরাবরই রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরে আয়োজিত একটি বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের কোনো প্রতিনিধি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কেউ এসব দেশে গেছেন, এটা আমার জানা নেই। ২০১২ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরু হলে, শত শত রোহিঙ্গা যখন সাগরে দিনের পর দিন ভাসছিল তখন থাইল্যান্ড একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ব্যাংককে। এরপর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেওয়ার প্রবণতা কমেছিল। এর পর থেকে আমরা কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। এর রেশ ধরেই আবারও সৃষ্টি হয়েছে এই সংকট। তাহলে এর সমাধান হবে কিভাবে? বাকি রোহিঙ্গারা এভাবেই ক্যাম্পে থেকে মানবেতর জীবন যাপন করবে? সুতরাং রোহিঙ্গা প্রশ্নে সমাধানটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রস্তাব আদৌ কি কোনো জট খুলতে সাহায্য করবে? চীন বলছে অস্ত্রবিরতির কথা। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা আসছে বটে; কিন্তু সহিংসতার খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। জঙ্গিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির খবরও তেমন একটা নেই। কারা স্যালভেশন আর্মি তৈরি করেছে, এটা নিয়েও মানুষের মাঝে সন্দেহ আছে। চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপের কথা বলছে। শুধু সংলাপ সংবাদপত্রের জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু তা কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। সমাধানের জন্য চাই বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ছয় লাখ ৩১ হাজার রোহিঙ্গা আদৌ তাদের নাগরিক কি না, সে ব্যাপারে মিয়ানমারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। এরা বাঙালি, এ কথা তারা বারবার বলে আসছে। সেই অবস্থান থেকে মিয়ানমার এক চুলও সরে আসেনি। খুব কম রোহিঙ্গার কাছেই নাগরিকত্ব প্রমাণসংক্রান্ত কাগজপত্র আছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কারণে সব কাগজ নষ্ট হয়ে গেছে। তাহলে তারা কিভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণ করবে? সুতরাং সংলাপে নাগরিকত্ব প্রশ্নে সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলছে চীন। সেখানকার মানুষ দরিদ্র। এটাও সত্য কথা। এর সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো যোগসূত্র নেই। চীনের বক্তব্য আরো স্পষ্ট হলে আমি খুশি হতাম। কিন্তু তা নেই। নাগরিকত্ব প্রমাণ করাই হচ্ছে মূল সমস্যা। উপরন্তু তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও আছে। তাদের বাড়িঘর তৈরি করা, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া—এ বিষয় তো মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিবারক কূটনীতি বলে একটা কথা আছে। বিশ্বরাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই পরিবর্তন সামনে রেখে এবং শান্তি নিশ্চিত করতে অনেক রাষ্ট্র নিবারক কূটনীতি বা ‘প্রিভেনটিভ ডিপ্লোম্যাসি’ প্রয়োগ করে। নিবারক কূটনীতির মূলকথা হচ্ছে দুটি দেশ যাতে কোনো বিপদ বা বিতর্কে জড়িয়ে না যায়, যাতে এ বিপদ সংঘর্ষ পর্যায়ে উপনীত না হয় এবং যাতে সব ধরনের বিপদকে নিষ্পত্তি করার জন্য পারস্পরিক বিশ্বাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এই নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে আসছে। এর পরও কথা থেকে যায়। সদ্য আগত ছয় লাখ ৩১ হাজারসহ মোট ১০ লাখের ওপরে রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকে। এরা মিয়ানমারের নাগরিক। চীনের ‘প্রস্তাব’ এবং উদ্যোগ নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। এরই মধ্যে আসেম সম্মেলন শেষে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি; যদিও বুধবার পর্যন্ত এ সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত জানা যায়নি। এটা ভুলে গেলে চলবে না, এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি জড়িত। রোহিঙ্গারা যদি এ দেশে ‘স্থায়ী’ হয়ে যায়, তাহলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তাদের বিবাদ ও সংঘর্ষ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। একটি ‘ফিলিস্তিনি সংকটে’র মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। স্থানীয় বাঙালিরা এরই মধ্যে উখিয়ায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে শুধু পরিবেশগত সমস্যাই নয়, বরং নিরাপত্তা সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কিছু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের দৃষ্টি এখন রোহিঙ্গাদের দিকে। তারা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে চায়। কোনো কোনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রও পরোক্ষভাবে এসব সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে উৎসাহ দিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এ এলাকাজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করা। অস্থিরতা সৃষ্টি হলে এর সুযোগ নেবে ওই সব রাষ্ট্র। সিরিয়ায় আইএসের পতন হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাশিয়ার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, রাকা (আইএসের অলিখিত রাজধানী) থেকে আইএস সদস্যদের পালাতে সাহায্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আইএসের জঙ্গিরা গেল কোথায়? ফিলিপাইনে আইএসের একটি শক্ত ঘাঁটির পতন ঘটেছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলার চেষ্টা করছেন, আইএস জঙ্গিরা রাখাইনে প্রবেশ করতে পারে।
এসব কারণেই আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, অন্যদিকে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’—দুইভাবে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। আন্তর্জাতিক মহল আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। লাখ লাখ মানুষ, শুধু ধর্মের কারণে দেশান্তরিত হবে, এই একুশ শতকে এসে তা চিন্তা করা যায় না। আজকে রোহিঙ্গারা যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বী না হতো, তাহলে সম্ভবত তাদের দেশ ত্যাগ করতে হতো না! শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে তাদের ওপর নেমে এসেছে অত্যাচার আর নির্যাতন। সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়নি, যা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্ষেত্রে হয়েছে। সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থীরা সমুদ্রপথে দেশ ত্যাগ করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিটলার যেভাবে ইহুদিদের হত্যা করেছিল, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অনেকটা সেভাবেই হত্যা করছে রোহিঙ্গাদের। এ বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করেনি। একজন শীর্ষস্থানীয় জাতিসংঘের কর্মকর্তা বলেছেন মিয়ানমারে ‘গণহত্যা’ হয়েছে। অতি সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছে মার্কিন সিনেটর জেফ মার্কেলের নেতৃত্বে একটি কংগ্রেশনাল প্রতিনিধিদল। তারা স্বীকার করেছে ‘রাখাইনে যুদ্ধাপরাধের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ প্রশ্নেও চীনের কোনো বক্তব্য নেই। এর পরও আমি মনে করি, চীন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমার অসন্তুষ্ট হবে, মনঃক্ষুণ্ন হবে, এটা চীন বিবেচনায় নিয়েই প্রস্তাব দিয়েছে। এখন এটাকে সামনে রেখেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আলোচনা শুরু করেছে। এ আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান বের করা সম্ভব। বৈরিতা অব্যাহত রেখে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।
Daily Kalerkontho
28.11.2017

সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, কিন্তু রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে তো?

গেল বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার পর্যন্ত এ সমঝোতা স্মারক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না জানায় একটা বড় প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সব রোহিঙ্গা শেষ পর্যন্ত নিজ বাসভূমে ফেরত যাবে কিনা? আর যদি ফিরে যায়, তাহলে কবে নাগাদ তারা ফিরে যাবে? কবে থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে, সে ব্যাপারেও স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার নেপিডোয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাংবাদিকরা কথা বলার চেষ্টা করেন। তিনি যে জবাব দিয়েছেন, তা আশাব্যঞ্জক নয়। চুক্তি সম্পর্কে বলা হলে তিনি জানান, ‘রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে। সেখানকার (রাখাইনে) বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়িঘর তৈরি করতে হবে।’ তিনি নিশ্চিত করে বলেননি কত দিনের মধ্যে এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ হবে, কিংবা কবে নাগাদ তা শুরু হবে। অবশ্য তিনি জানিয়েছেন, চুক্তির বিষয়গুলো ঢাকায় এসে তিনি জানাবেন। একটা আশঙ্কা তাই থেকেই গেল শেষ পর্যন্ত শুধু চুক্তির জন্য একটা চুক্তি করা হলো কিনা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে অনেক প্রশ্ন জড়িত। এক. প্রত্যাবাসনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি জড়িত। মিয়ানমার এদের আদৌ তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেবে কিনা? সমঝোতা স্মারকে যদি ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ কথাটা লেখা না থাকে, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসন অর্থহীন। বলা ভালো, মিয়ানমার এসব রোহিঙ্গাকে নিজেদের নাগরিক হিসেবেও স্বীকার করে না। এমনকি তারা রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করতেও নারাজ। তারা এদের মুসলমান নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে। তবে মিয়ানমারে যে ১২৫টির মতো নৃগোষ্ঠী রয়েছে, সেখানে রোহিঙ্গা তথা মুসলমান জনগোষ্ঠীর নাম নেই। দুই. রোহিঙ্গারা কী তাদের নিজ নিজ বাসভূমে থাকতে পারবে? সমঝোতা স্মারকে কি এ সম্পর্কে সুষ্ঠুভাবে কিছু বলা আছে? নাকি শুধু প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে? এক্ষেত্রে আমরা মিয়ানমারের তৈরি করা ফাঁদে পা দিতে পারি। মিয়ানমারের সুস্পষ্ট একটা পরিকল্পনা আছে, রোহিঙ্গাদের অন্যত্র শত শত ক্যাম্প তৈরি করে সেখানে তাদের পুনর্বাসন করা। এতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার স্বার্থ রক্ষিত হবে। তারা একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের রাখবে। এতে মিয়ানমারের নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী মনোভাবের দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার সাতটি হোমল্যান্ড তৈরি করে কৃষাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে সেখানে যেতে বাধ্য করেছিল। মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি অনেকটা সে রকম। এতে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সেখানে আরও খারাপ হবে। তিন. সমঝোতা স্মারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা, বিশেষ করে ইউএনএইচসিআর’কে যদি জড়িত না করি, তাহলে নানা জটিলতা তৈরি হবে। অবশ্যই আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাকে জড়িত করতে হবে, যা মিয়ানমার চায় না। এটা জরুরি এ কারণ যে, এতে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং রোহিঙ্গারা এক ধরনের স্বস্তিতে থাকবে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে যে, মিয়ানমার সরকার তিনটি এলাকায় (মংডু, বুথিয়াডং ও রাথেডং) একাধিক টাউনশিপ নির্মাণ করছে, যেখানে কিছু রোহিঙ্গার স্থান করে দেয়া হবে। এজন্য স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি একটি কমিটিও গঠন করেছেন, যার নাম Union Enterprise for Humanitation Assistance, Betterment and Development in Rakhine (UEHRD)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব টাউনশিপ নির্মাণে রাখাইন রাজ্য সরকারকে সম্পৃক্ত তথা তাদের জড়িত করা হয়নি। এ নিয়ে রাখাইন রাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্যদের ক্ষোভ প্রকাশের খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। The Irrawaddy পত্রিকার গেল ২৩ নভেম্বর রাজ্য পার্লামেন্টের দুই সদস্য উ মং অন(U maung ohn) ও উ খা উইনের (U Kyaw Win) বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তারা সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যাও চেয়েছেন। এর অর্থ যাদের আগামীতে ‘ফেরত’ নেয়া হবে, তাদের সেসব টাউনশিপে রাখা হবে। তারা তাদের নিজ বাসভূমে ফেরত যেতে পারবে না। অথচ কফি আনান কমিশন তাদের (রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে) নাগরিকত্বসহ তাদের নিজ নিজ বাসভূমে পুনর্বাসনের প্রস্তাব করেছিলেন। মিয়ানমার সরকার এখন যদি টাউনশিপগুলোয় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসিত করে, তাহলে সু চি তার আগের দেয়া প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করবেন। তিনি কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট গ্রহণ করার সময় বলেছিলেন, তার সরকার আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করবে। এতে আমরা যে নিরাপত্তার কথা বলছি, সে সম্ভাবনাও থাকল। চার. সমঝোতা চুক্তিতে সদ্য আগত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গার কথা হয়েছে, নাকি ‘শব্দ চয়নে’ কিছু মুসলমানদের (রোহিঙ্গা শব্দ যেহেতু তারা ব্যবহার করে না) ফেরত নেয়ার কথা বলছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। এখানে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই, মিয়ানমারের কাছে কূটনৈতিক সৌজন্যবোধ বলতে কিছু নেই। তারা মিথ্যা কথাও বলেন। অতীতে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে দুই-দুইটি চুক্তি হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে ও ১৯৯২ সালে। যতদূর জানা যায়, ৪ লাখ ৭৬ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত গেছে। কিন্তু তারপরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বৈধ ও অবৈধভাবে কক্সবাজারে রয়ে গেছে। এদের একটা অংশ বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে। একটা অংশ বাংলাদেশী পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। অনেক দিন আগে থেকেই ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের দেখভাল করছে। তাদের হিসাবে বৈধ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার। অবৈধ অর্থাৎ রেজিস্টারবিহীন রোহিঙ্গা নাগরিকের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। তারা অবৈধভাবে ক্যাম্প করে বসবাস করছে। এখন যোগ হলো আরও প্রায় ৭ লাখ। এদের মাঝে থেকে কতজনকে মিয়ানমার ফেরত নেবে, সে প্রশ্ন থাকলই। পাঁচ. মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের অফিস থেকে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হবে। সমঝোতা চুক্তিতে এ ১৯৯২ সালের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটা একটা বড় ধরনের ফাঁদ। আমরা সম্ভবত সে ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি। ১৯৯২ সালের চুক্তিতে Certification ’ শব্দটা আছে। অর্থাৎ যেসব রোহিঙ্গার নাম দেয়া হয়েছে, মিয়ানমার তাদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি যাচাই করবে। অতীতে এ ধরনের নামের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার এর কোনো জবাব দেয়নি। এবারও সে ফাঁদে আটকে যাবে বাংলাদেশ! Certification এর নামে সময়ক্ষেপণ করবে। লোকদেখানো কিছু রোহিঙ্গাকে তারা ফেরত নিতে পারে। কিন্তু একটা বড় অংশকেই তথাকথিত Certification -এর নামে আর ফেরত নেবে না। এটাই মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি। যেহেতু মিয়ানমারের ওপর একটি আন্তর্জাতিক ‘চাপ’ আছে, তাই তারা রোহিঙ্গাদের নিতে রাজি হয়েছে। এটাও বিশ্ববাসীকে দেখানো যে, তারা তাদের নাগরিকদের ফেরত নিচ্ছে। কিন্তু নেবে না। তারা সময়ক্ষেপণ করবে। ছয়. ৫০ থেকে ৬০ হাজার নারী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এরা সবাই অন্তঃসত্ত্বা। এদের সন্তান এখন জন্ম নেবে বাংলাদেশে। জন্মসূত্রে ওইসব সন্তান হবে বাংলাদেশী নাগরিক। মিয়ানমার ওইসব সন্তান ফেরত নেবে না। সন্তান না গেলে মায়েরাও যেতে চাইবে না। ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এ দেশে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শরণার্থীসংক্রান্ত যে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে, তাতে কোনো শরণার্থীকে ‘জোর করে’ ফেরত পাঠানো যাবে না। আর ইউএনএইচসিআর দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, এদের জোর করে ফেরত না পাঠানোর। ফলে আগামীতে এক্ষেত্রে একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাত. বলা হচ্ছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা প্রাথমিক স্টেজ। অর্থাৎ দুই পক্ষ বসবে। নীতিমালা ঠিক করবে। কীভাবে, কোন প্রসেসে ‘কাজটি’ শুরু হবে, তা নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ দুই মাসের মধ্যেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সে রকম একটি আভাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়িঘর করতে সময় লাগবে! তার কথা থেকেই বোঝা যায়, পুরোপুরি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে সময় লাগবে। ভয়টা হচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে। বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। এতে লাভ হবে মিয়ানমারের। আমাদের কোনো লাভ নেই। মিয়ানমারের একগুঁয়েমির কারণে আমরা তাদের কিছু দাবি মেনে নিয়েছি। কিন্তু তারপরও তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। তাদের একগুঁয়েমি মনোভাব আজকের নয়। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন, অতীতে মিয়ানমার জাতিসংঘ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন, প্রচলিত বিধিবিধান তারা মানে না। সেনাবাহিনীর কথায় এখন চলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে অং সান সু চি বহির্বিশ্বে তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্ট করছে। এটা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি না; কিন্তু মুখ্য করতে পারি। কূটনৈতিক চ্যানেলে এখন আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। দক্ষ কূটনৈতিকদের প্রয়োজনে নিয়োগ দিতে হবে। কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। এসব দেশের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে হবে। চীন ও রাশিয়ার বাংলাদেশে বড় বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। এ বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টি আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনে যাননি। এমনকি রাশিয়ায়ও যাননি। এ ধরনের একটি সংকট হলে সাধারণত সরকারের বিশেষ দূত, নিদেনপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করেন। নিজ দেশের অবস্থা বিদেশে তুলে ধরেন। জনমত সৃষ্টি করেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অনেকটাই নীরব। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এখানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। ওআইসি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। ১৩৫টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। সেসব দেশের মাঝে আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ রয়েছে। এখানেও আমাদের ব্যর্থতা আমরা সার্কভুক্ত দেশগুলোয়ও রোহিঙ্গা প্রশ্নে সমর্থন আদায় করতে পারিনি। একমাত্র পাকিস্তান ও মালদ্বীপকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি।
অতিসম্প্রতি টিলারসনের একটি বক্তব্যে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ রয়েছে। টিলারসন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, মিয়ানমারে ‘জাতিগত নিধন’ এর মতো ঘটনা ঘটেছে। কিছুটা হলেও সত্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন স্বীকার করে নিচ্ছে যে, মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান চলছে। আমরা এ বক্তব্য আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। আমরা বারবার বলে আসছি, যারা রোহিঙ্গা হত্যা আর অত্যাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হোক। যারা বিভিন্ন দেশে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হচ্ছে। সুতরাং মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের দাবি করলে মিয়ানমার একটা ‘চাপ’ এর মুখে থাকবে। সুতরাং একদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুততর করা, অন্যদিকে গণহত্যার বিচার দাবি করতে পারে বাংলাদেশ। মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সময়ক্ষেপণ করা। সুতরাং আমরা তাদের পাতা ফাঁদে যেন পা না দিই, এটা সবসময় বিবেচনায় নিতে হবে।

Daily Alokito Bangladesh
26.11.2017

রোহিঙ্গারা কি এবার ফিরে যেতে পারবে?

Image result for Rohingya exodus in Bangladesh
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পারসনস ফ্রম রাখাইন স্টেট’ শীর্ষক এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দফতরের মন্ত্রী খিও তিন্ত সোয়ে। চুক্তির বিস্তারিত এখনও জানা না গেলেও নেপিদো থেকে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ কিছুটা ছাড় দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল- জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ সব উন্নয়ন সহযোগীকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত শুধু ইউএনএইচসিআরকে প্রয়োজনমতো কাজে লাগাবে বলে সম্মত হয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার ২ মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শেষ হবে, বাংলাদেশ তার একটি সময়সীমা চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার এ ধরনের কোনো সময়সীমা দিতে রাজি হয়নি।


বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অবস্থান নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো এখনও কিছু ঘটেনি। এশিয়া-ইউরোপ মিটিংয়ের (আসেম) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে ২১ নভেম্বর। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশসহ ৫৩টি দেশ ও সংস্থার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। যেহেতু আসেম নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে, সেহেতু রোহিঙ্গাদের নিয়ে এ অঞ্চলে যে নিরাপত্তা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা এ সম্মেলনে আলোচিত হবে, সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তাই এ সংকটের গভীরতা বুঝতে আসেম সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে ঢাকা ঘুরে গিয়েছিলেন আসেমভুক্ত ৪টি দেশ ও সংস্থার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। জার্মানি, জাপান, সুইডেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পও পরিদর্শন করেছিলেন। আমাদের প্রত্যাশা ছিল রোহিঙ্গা সমস্যাটি আলোচিত হবে। সেটা হয়েছেও। এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথাও বলেছেন। কিন্তু তাতে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। এটা অস্বীকার করা যাবে না, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমার খুব অস্বস্তিতে আছে। চাপে আছে। এশিয়া ও ইউরোপের ১৫টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কয়েকটি বিষয়ে অনেকটা অভিন্ন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। তারা অনতিবিলম্বে সংঘাত বন্ধ, রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী স্রোত থামানো এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ফিরিয়ে নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি ফেদেরিকা মঘেরিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছবে বলে তিনি আশাবাদী। সেই চুক্তিটি অবশেষে স্বাক্ষরিত হল।

এদিকে চীন তিন দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তাতে অস্ত্র বিরতি (রাখাইনে), মিয়ানমার-বাংলাদেশ আলোচনা এবং রাখাইনের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। সু চি আসেমের উদ্বোধনী ভাষণে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তিনি শুধু জানিয়েছেন, ১৯৯২ সালের চুক্তির ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হবে! অথচ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, ১৯৯২ সালের চুক্তির ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এ কারণে যে, ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজটি মিয়ানমারকে দেয়া হয়েছিল।

রোহিঙ্গারা বর্তমানে অবর্ণনীয় ও অমানবিক জীবনযাপন করছে উখিয়ায় তৈরি করা ক্যাম্পগুলোতে। তাদের নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা সমস্যা। সুতরাং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানটা জরুরি। এক্ষেত্রে চীনের প্রস্তাব আদৌ কি কোনো জট খুলতে সাহায্য করবে? চীন বলছে অস্ত্রবিরতির কথা। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা আসছে বটে; কিন্তু সহিংসতার খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। জঙ্গিগোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) খবরও তেমন একটা নেই। কারা আরসা তৈরি করেছে, তা নিয়েও মানুষের মাঝে সন্দেহ আছে। চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপের কথা বলছে। শুধু সংলাপ সংবাদপত্রের জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু তা কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। সমাধানের জন্য চাই বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ৬ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা আদৌ মিয়ানমারের নাগরিক কিনা, সে ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। তারা বারবার বলে আসছে, এরা ‘বাঙালি’। সেই অবস্থান থেকে মিয়ানমার এক চুলও সরে আসেনি। খুব কম রোহিঙ্গার কাছেই নাগরিকত্বের প্রমাণসংক্রান্ত কাগজপত্র আছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার কারণে সব কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। তাহলে তারা কীভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণ করবে? সুতরাং সংলাপে নাগরিকত্ব প্রশ্নে সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলছে চীন। সেখানকার মানুষ দরিদ্র এটা সত্য। কিন্তু এর সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো যোগসূত্র নেই। চীনের বক্তব্য আরও স্পষ্ট হলে আমি খুশি হতাম। নাগরিকত্ব প্রমাণ করাই হচ্ছে মূল সমস্যা। উপরন্তু তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও আছে। তাদের বাড়িঘর তৈরি করা, নিরাপত্তা দেয়া- এ বিষয়টি তো মিয়ানমারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিবারক কূটনীতি বলে একটা কথা আছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই পরিবর্তনকে সামনে রেখে শান্তি নিশ্চিত করতে অনেক রাষ্ট্র নিবারক কূটনীতি বা ‘প্রিভেনটিভ ডিপ্লোমেসি’ প্রয়োগ করে থাকে। নিবারক কূটনীতির মূল কথা হচ্ছে, দুটো দেশ যাতে কোনো বিবাদ বা বিতর্কে জড়িয়ে না যায় কিংবা বিবাদ সংঘর্ষ পর্যায়ে উপনীত না হয় এবং যাতে করে সব ধরনের বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য পারস্পরিক বিশ্বাসের আবহ সৃষ্টি করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এ নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে আসছে। তারপরও কথা থেকে যায়। সম্প্রতি আগত ৬ লাখ ৩০ হাজারসহ অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকে। তারা মিয়ানমারের বাসিন্দা। তাই চীনের ‘প্রস্তাব’ ও উদ্যোগকে যথোপযুক্ত মনে হচ্ছে না।

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি জড়িত। রোহিঙ্গারা যদি এদেশে স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের নিত্য বিবাদ ও সংঘর্ষ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে ‘ফিলিস্তিন সংকটের’ মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। স্থানীয় বাঙালিরা ইতিমধ্যেই উখিয়ায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে শুধু পরিবেশগত সমস্যাই নয়, নিরাপত্তা সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কিছু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের দৃষ্টি এখন রোহিঙ্গাদের দিকে। তারা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে চায়। কোনো কোনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রও পরোক্ষভাবে এসব সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে উৎসাহ দিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এ এলাকাজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করা। অস্থিরতা সৃষ্টি হলে এর সুযোগ নেবে ওইসব রাষ্ট্র। সিরিয়ায় আইএসের পতন হয়েছে; কিন্তু রাশিয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, রাকা (আইএসের অলিখিত রাজধানী) থেকে আইএস সদস্যদের পালাতে সাহায্য করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আইএসের জঙ্গিরা গেল কোথায়? ফিলিপাইনে আইএসের একটি শক্ত ঘাঁটির পতন ঘটেছে। তাই অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলার চেষ্টা করছেন, আইএস জঙ্গিরা রাখাইনে প্রবেশ করতে পারে।

এসব কারণেই আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, অন্যদিকে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’- দু’ভাবে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। আন্তর্জাতিক মহল আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। লাখ লাখ মানুষ শুধু ধর্মের কারণে দেশান্তরিত হবেন, এই একুশ শতকে এসে তা চিন্তা করাও যায় না। রোহিঙ্গারা যদি মুসলমান না হতো, তাহলে সম্ভবত আজ তাদের দেশত্যাগ করতে হতো না! শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে তাদের ওপর নেমে এসেছে অত্যাচার আর নির্যাতন! সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়নি, যা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্ষেত্রে হয়েছে। সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থীরা সমুদ্রপথে দেশত্যাগ করেছেন; কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। শিশুদের পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। হিটলার যেভাবে ইহুদিদের হত্যা করেছিল, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অনেকটা সেভাবেই হত্যা করেছে রোহিঙ্গাদের। এ বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করেনি, একজন শীর্ষস্থানীয় জাতিসংঘ কর্মকর্তা বলেছেন, মিয়ানমারে ‘গণহত্যা’ হয়েছে। অতি সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছেন মার্কিন সিনেটর জেফ মার্কেলের নেতৃত্বে একটি কংগ্রেশনাল প্রতিনিধি দল। তারা স্বীকার করেছেন, রাখাইনে যুদ্ধাপরাধের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ প্রশ্নেও চীনের কোনো বক্তব্য নেই। তারপরও আমি মনে করি, চীন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমার অসন্তুষ্ট হবে, মনোক্ষুণœ হবে- এসব বিবেচনায় নিয়েই চীন প্রস্তাব দিয়েছে। এটি আমরা বিবেচনায় নিতে পারি; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেন মনে না করি। কূটনৈতিক চ্যানেলে আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে এ কাজে দক্ষ কূটনীতিকদের নিয়োগ দিতে হবে। কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। এসব দেশের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও বাড়াতে হবে সম্পর্ক। বাংলাদেশে চীন ও রাশিয়ার বড় বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। এ বিষয়টি আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন, কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনে যাননি, এমনকি রাশিয়াতেও যাননি। এ ধরনের একটি সংকট সৃষ্টি হলে সাধারণত সরকারের বিশেষ দূত, নিদেনপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করেন। নিজ দেশের অবস্থা বিদেশে তুলে ধরেন। জনমত সৃষ্টি করেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অনেকটাই নীরব।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এক্ষেত্রেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। ওআইসি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। ১৩৫টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ১০টি দেশ ভোট দিয়েছে বিপক্ষে। ভোট প্রদানে বিরত ছিল ২৬টি দেশ। ওইসব দেশের মধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ রয়েছে। এখানেও আমাদের ব্যর্থতা, আমরা সার্কভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে সমর্থন আদায় করতে পারিনি। একমাত্র পাকিস্তান ও মালদ্বীপকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি।

মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে বটে; কিন্তু এ চুক্তি অনুযায়ী কতসংখ্যক রোহিঙ্গা তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে, সব রোহিঙ্গা ফিরে যেতে পারবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। এজন্য মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে দেশটির ওপর ‘চাপ’ অব্যাহত রাখতে হবে।
Daily Jugantor
24.11.2017

রোহিঙ্গা সংকটে আমাদের কূটনীতি কতটা সফল


সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহল যতটা সোচ্চার হয়েছে, আমাদের কূটনীতি কি ততটা সফল হয়েছে? এই সংকটের শুরু গত ২৫ আগস্ট থেকেÑ যখন কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। এর পর প্রায় তিন মাস পার হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের কোনো ইতিবাচক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়নি। তবে এটা যে একটা বড় ধরনের সংকট, তা আন্তর্জাতিক মহল স্বীকার করে নিয়েছে। গত রবিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) তিনটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা (জাপান, জার্মানি ও সুইডেন) ঢাকা সফর করে মিয়ানমার গেছেন। সেখানে তারা এশিয়া-ইউরোপ মিটিং বা আসেম সম্মেলনে যোগও দিয়েছিলেন। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আসেম সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তি কী? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব আমরা কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি? ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ১৩৫টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের একটি বড় বিজয় অর্জিত হয়েছে। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে রাশিয়া ও চীন। আর ভারত ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত ছিল। এর ব্যাখ্যা আমরা কীভাবে দেব? চীন ও রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। এ বিষয়টি আমরা বহুবার আলোচনা করেছি। আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারিনি। বাংলাদেশে রাশিয়ার যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। রাশিয়া থেকে আমরা কয়েক হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র কিনছি। বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে দিচ্ছে রাশিয়া। নতুন করে বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। চীনও আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমরা চীন ও রাশিয়ার কাছে আমাদের ‘অবস্থান’ তুলে ধরতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। এটা ঠিক, মিয়ানমারে চীন ও রাশিয়ার স্বার্থ রয়েছে। জাতীয় স্বার্থের আলোকে দেশ দুটি তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। তবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের সরকারিনীতি কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে দেশান্তরিত হয়, তখন ওই সমাজকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। পশ্চিমাদের কাছে একটা প্রত্যাশা ছিল সু চিকে ঘিরে। তাদের ধারণা ছিল, মিয়ানমারে সত্যিকার অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু করবেন সু চি। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীস্বার্থেই তিনি কাজ করছেন। রোহিঙ্গা ইস্যু সামনে রেখেই সু চি যে ব্যর্থ হয়েছেন, এটা আগামীতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করবে। সেনাবাহিনীর পক্ষে এটা বলা সহজ হবে যে, মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে সু চি ব্যর্থ হয়েছেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর সংসদ বসেছিল ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে অং সান সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন হাতিন কিয়াউ (ঐঃরহ কুধ)ি। তার মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালে। এর আগে ২০২০ সালের দিকে সেখানে নির্বাচন হবে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এতে বহির্বিশ্বে সু চির ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। পুনরায় তার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল অং চাইয়াং হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। সেনাবাহিনীর সমর্থনকারী একাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনী এসব রাজনৈতিক দল ব্যবহার করবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কী হবে? মিয়ানমার কি তাদের ফিরিয়ে নেবে? রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার কয়েকটি শর্তের কথা বলছে। প্রথমত রয়েছেÑ তারা যে মিয়ানমারের নাগরিক, তা প্রমাণ করতে হবে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার। মিয়ানমারের এসব নাগরিককে তারা বলছে ‘বাঙালি’। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না। কেননা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। ফলে তাদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র থাকার কথা নয়। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সন্তানদেরও প্রমাণ করতে হবে তাদের মা-বাবা রাখাইনে অনেক আগে থেকেই বসবাস করে আসছিলেন। এটিও সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে তাদের বাড়িঘরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন। নতুন করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ‘আস্থার সংকট’-এর যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা রয়ে গেছে। ফলে রোহিঙ্গারা কোনো নিশ্চয়তা না পেয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইবেন না। একটু সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এতে মিয়ানমারের রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে বলা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছেন বারবার। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানের ৩১তম সম্মেলনে সু চি বলেছিলেন, সমঝোতা চুক্তি হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার। এটা সময়ক্ষেপণ করার একটা কৌশল। এর আগে গত অক্টোবরে সু চি বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে চান না। তিনি একবার এমন কথাও বলেছেন যে, মুসলমানরা কেন চলে যাচ্ছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন মিয়ানমারের বিশেষ দূত কিউ টিন। কিন্তু ফল শূন্য। তাই একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফর, এমনকি আসেম শীর্ষ সম্মেলনও আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। আমরা ওই সম্মেলন আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। এ নভেম্বরেই আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি বাংলাদেশে এসে মিয়ানমারেও যাবেন। আমরাও এ সুযোগটি আমাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি। মোদ্দা কথা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পাশে আছে। এখন দরকার কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা। দুঃখজনক হলেও আমরা তা পারিনি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসেম সম্মেলনে যোগদানের আগে ঢাকা সফর করে গেলেন গত শনিবার। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দেখাও হয়েছে। নিশ্চয় বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। আসেম সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার থেকে মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিদোতে ওই শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। আসেম (অঝঊগ-অংরধ-ঊঁৎড়ঢ়ব গববঃরহম) একটি বড় সংগঠন। বর্তমানে ৫১টি দেশ ও দুটি আঞ্চলিক সংস্থা আসেমের সদস্য। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ (ভারতসহ) এবং চীন আসেমের সদস্য। ফলে আসেম সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বাংলাদেশ একটি সুযোগ পাবে রোহিঙ্গা সমস্যাটা তুলে ধরার। আসিয়ান সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো আলোচনা হয়নি বটে তবে আসিয়ানভুক্ত অনেক দেশ ওই সংকটটি সম্পর্কে অবগত। আমাদের উচিত ছিল ওইসব দেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটা শক্ত অবস্থানে যাওয়া। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ড বরাবরই রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরে আয়োজিত একটি বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের কোনো প্রতিনিধি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীÑ কেউ এসব দেশে গেছেন, এটা আমার জানা নেই। ২০১২ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরু হলে শত শত রোহিঙ্গা যখন সাগরে দিনের পর দিন ভাসছিলেন, তখন থাইল্যান্ড একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ব্যাংককে। এর পর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেওয়ার প্রবণতা কমেছিল। আমরা তারপর থেকে রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। এর রেশ ধরেই আবারও সৃষ্টি হয়েছে ওই সংকট। তাহলে এর সমাধান হবে কীভাবে? বাকি রোহিঙ্গারা এভাবেই ক্যাম্পে থেকে মানবেতর জীবনযাপন করবেন? যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের একটি মানবিক দিক আছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যথেষ্ট সচেতন, সেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত শনিবার ঢাকা সফর করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াংই কথা বলেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপে সহযোগিতা করতে চীনের আগ্রহের কথা তিনি জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো খবর। চীন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। বাংলাদেশে চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। চীনের যথেষ্ট প্রভাব আছে মিয়ানমার সরকারের ওপর, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ওপর তাদের প্রভাব অনেক। এ ক্ষেত্রে চীন যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে একটা অর্থপূর্ণ সংলাপ হতে পারে। দ্বিতীয় সংবাদটিও উৎসাহব্যঞ্জক। মার্কিন সিনেটর জেফ মার্কেল গত শনিবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত মার্কিন কংগ্রেসে উপস্থাপন করবেন। তার সঙ্গে আরও এক সিনেটর ও তিন কংগ্রেসম্যান ছিলেন। নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় ঘটনা। আমরা ওই সফর আমাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিবারক কূটনীতি বলে একটা কথা আছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, ওই পরিবর্তন সামনে রেখে ও শান্তি নিশ্চিত করতে অনেক রাষ্ট্র নিবারক কূটনীতি বা ‘প্রিভেনটিভ ডিপ্লোমেসি’ প্রয়োগ করে। নিবারক কূটনীতির মূল কথা হচ্ছে, দুটি দেশ যাতে কোনো বিপদ বা বিতর্কে জড়িয়ে না যায়Ñ যাতে করে এ বিপদ সংঘর্ষের পর্যায়ে উপনীতি না হয় এবং যাতে সব বিপদ নিষ্পত্তি করার জন্য পারস্পরিক বিশ্বাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করা যায়, এ লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এই নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে আসছে। তারপরও কথা থেকে যায়। সদ্য আসা ৬ লাখ ২০ হাজারসহ মোট ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকে। তারা মিয়ানমারের নাগরিক। চীনের ‘সংলাপ’-এর উদ্যোগকে আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। চীনের ওপর আস্থা রাখাটা জরুরি। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এখন দেখার পালা চীন কী উদ্যোগ নেয়! আমাদের ভুললে চলবে না, চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইনে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে চীন (যা এক সময় করার কথা ছিল কক্সবাজারের সোনাদিয়ায়) এবং ২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে তেল ও গ্যাস উত্তোলন খাতে। গত এপ্রিলে সেখানে উত্তোলন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ৭৭০ কিলোমিটার দূরে চীনের ইউনান প্রদেশে। এখন চীন যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মধ্যস্থতা করে, তাহলে তা আমাদের জন্য হবে বড় পাওয়া। এ জন্যই আমাদের যা দরকার, তা হচ্ছে দক্ষ কূটনীতি। সরকার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিশনও গঠন করতে পারেÑ যারা সরকারকে সহযোগিতা করবেন এবং প্রয়োজনে বিদেশে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।
Daily Amader Somoy
21.11.2017

রোহিঙ্গা সমস্যার আদৌ কি সমাধান হবে



আজ রোববার তিনটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এবং সেই সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির দেখতে যাচ্ছেন। সঙ্গে থাকবেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জার্মানি, জাপান ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যাচ্ছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। ফিরে এসে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। তারপর তারা যাবেন মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে, যেখানে তারা আসেম বা এশিয়া-ইউরোপ মিটিংয়ে যোগ দেবেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা সমস্যা যে কত গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে, তার বড় প্রমাণ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং মার্কিন সিনেটর জেক মার্কেলের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দলেরও একই সময় ঢাকা আগমন। এর অর্থ হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা। এসব তৎপরতা অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন একসময়, যখন গেল ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহনীর অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৩৫টি রাষ্ট্র। বিপক্ষে পড়েছে ১০টি ভোট। কিছু দেশ ভোটদানে অনুপস্থিত ও বিরত ছিল। চীন ও রাশিয়া ভোটদানের সময় প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ভারত ও জাপানসহ ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংসতা বন্ধ ও মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের ‘পূর্ণ নাগরিকত্ব’ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত ও রোহিঙ্গাদের ওপর যারা অত্যাচার-নিপীড়ন করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্যও দেশটির সরকারকে বলা হয়েছে। ওআইসি এ খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। এর কো-স্পন্সর ছিল ৯৭টি দেশ। যে কোনো বিবেচনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে এ ধরনের একটি প্রস্তাব পাস করানো আমাদের জন্য এক ধরনের ‘বিজয়’। চীন ও রাশিয়ার ‘অবস্থান’ আমাদের আগেই জানা ছিল। ভারত প্রথম দিকে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান করলেও এখন ভোটাভুটিতে ভারত বিরত থাকায় ভারতের অবস্থান কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে বলে আমার ধারণা। এখন এতগুলো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঢাকায় আসছেন। তারা নিজেরা রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখবেন। ফলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর এক ধরনের ‘চাপ’ আসতে পারে বলে আমার ধারণা। বলা হচ্ছে, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দুই দেশের মাঝে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে, যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করবে। কাজটি খুব সহজ নয়। এর সঙ্গে অনেক ‘প্রশ্ন’ জড়িত। তবে এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাদের একসঙ্গে রাখা।
রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন নিয়ে সাম্প্রতিককালে দুইটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল সংবাদপত্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গেল ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে জার্মানির সহযোগিতা চেয়েছিলেন। অপর সংবাদটিও রোহিঙ্গা পুনর্বাসনসংক্রান্ত। বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রধান শিনজি কুবো জানিয়েছিলেন, ১ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভিন্ন কোনো দেশে পুনর্বাসনের জন্য তারা বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি চেয়েছেন। তবে সম্প্রতি যে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, তদের মধ্য থেকে এ ১ হাজার রোহিঙ্গাকে বেছে নেয়া হবে বলে মনে হয় না। কুবো জানিয়েছেন, বাংলাদেশের দুইটি শরণার্থী ক্যাম্পে প্রায় ৩৪ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। সেখান থেকেই এ ১ হাজার রোহিঙ্গাকে বাছাই করা হবে। এ দুইটি সংবাদই রোহিঙ্গা শরণার্থী পুনর্বাসন প্রশ্নে একটি বড় সংবাদ। কিন্তু এতে করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারে অবৈধভাবে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের হাতিয়া উপজেলার একটি বিরান চর ঠেঙ্গারচরে (ভাসানচর) সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কবে নাগাদ সেখানে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে। এরই মধ্যে সেনাবাহিনীকে একটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেখানে অবকাঠামো গড়ে তুলতে। ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের প্রশ্নে কিছু কিছু দ্বিমত থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। কেননা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কক্সবাজারে উপস্থিতি শুধু পরিবেশগত সমস্যাই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংঘর্ষ হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে এ ধরনের সংবাদ প্রমাণ করে, রোহিঙ্গা সমস্যাটি ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে এরই মধ্যে। সংগত কারণেই তাই প্রশ্নটি উঠছেÑ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কোন পথে? বাংলাদেশও এক্ষেত্রে কী করতে পারে? সম্প্রতি একাধিক টিভি চ্যানেলে রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনায় আমি অংশ নিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ ও হুমায়ুন কবির। দুইজনই সিনিয়র কূটনীতিক। সেখানেও এ প্রশ্নটি উঠেছিলÑ বাংলাদেশ এখন কী করবে? বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সমস্যাটি বিবেচনা করে সাময়িকভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ এতে কি সমস্যাটির সমাধান হবে? আমার বিবেচনায় এতে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সমস্যার গভীরতা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ শুধু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ‘বসে’ থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অনেক কিছু করার আছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাটির আরও আন্তর্জাতিক করার উদ্যোগ নিতে পারে। এক্ষেত্রে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে পারে বাংলাদেশ এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) পাশাপাশি বাংলাদেশ চীন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং তাদের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারে ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করতে পারে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতরেই একটি ‘সেফ হ্যাভেন’ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক তদারকিতে সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার কথা বলতে পারে বাংলাদেশ। যেহেতু জাতিসংঘ রোহিঙ্গা নির্যাতনকে গণহত্যা বলছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এ গণহত্যার বিষয়টি তুলতে পারে। এটা সত্য, মিয়ানমারে আমাদের স্বার্থ রয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এ সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক। ন্যূনতম দুইটি আঞ্চলিক সংস্থায় (বিসিআইএন ও বিমসটেক) বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যাটাকে এ সম্পর্কের বাইরে রাখা যাবে না। এজন্য দরকার ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’। সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বলা ভালো, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে অং সান সু চির কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দুঃখজনক হলেও সত্য, ২০১২ সালের পর থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপকতা পেলে এবং শত শত রোহিঙ্গার নৌকাযোগে মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যাপারেও ওই সময় সু চির কোনো বক্তব্য ছিল না। মিয়ানমারের বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে না। মিয়ানমার সরকার মনে করে, রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক! অথচ ইতিহাস বলে, শত বছর ধরেই রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে। উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাচ্ছে। সু চি এ প্রক্রিয়ার পুরোপুরি বাইরে নন। তিনি জানেন, ক্ষমতায় থাকার জন্য তার উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সমর্থনের প্রয়োজন আছে। তাই উগ্রপন্থীরা যখন মুসলমানদের হত্যা করছে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করতে তখন তিনি নিশ্চুপ। মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারেও তার কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি যে স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছেন, তা সুবিধাবাদিতায় ভরা। সর্বজন গ্রহণযোগ্য একজন নেত্রী তিনিÑ এ কথাটা বলা যাবে না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনের আগে একদিকে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক ধরনের ‘সহাবস্থান’ গিয়েছিলেন, অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থেকে তিনি উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অবস্থানকেই সমর্থন করেছিলেন। এতে তিনি ‘বিজয়ী’ হয়েছেন, এটা সত্য। কিন্তু সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি সমাজ ব্যবস্থা সেখানে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হবেÑ সে প্রশ্ন আছে। একটি জনগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়, তখন সেই সমাজকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। পশ্চিমাদের বিরাট একটা প্রত্যাশা ছিল সু চিকে ঘিরে। তাদের ধারণা ছিল, সু চি মিয়ানমারে সত্যিকার অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু করবেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীস্বার্থেই কাজ করছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখেই সু চি যে ব্যর্থ হয়েছেন, এটা আগামীতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করবে। সেনাবাহিনীর পক্ষে এটা বলা সহজ হবে যে, সু চি মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর সংসদ বসেছিল ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে অং সান সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি; প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন হাতিন কিয়াও(Htin Kyaw)। তার টার্ম শেষ হবে ২০২১ সালে। এর আগে ২০২০ সালের দিকে সেখানে নির্বাচন হবে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে বহির্বিশ্বে সু চির ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। ফের তার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল অং হ্লাইং হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। সেনাবাহিনীর সমর্থনকারী একাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনী এসব রাজনৈতিক দলকে ব্যবহার করবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কী হবে? মিয়ানমার কি তাদের ফিরিয়ে নেবে? মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কয়েকটি শর্তের কথা বলছে। প্রথমত রয়েছে তারা যে মিয়ানমারের নাগরিক, তা প্রমাণ করতে হবে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। মিয়ানমারের এসব নাগরিককে তারা বলছে ‘বাঙালি’। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব তারা প্রমাণ করতে পারবেন না। কেননা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জীনব বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। ফলে তাদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র থাকার কথা হয়। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সন্তানদেরও প্রমাণ করতে হবে তাদের বাবা-মায়েরা রাখাইনে অনেক আগে থেকেই বসবাস করে আসছিলেন। এটিও সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে বাড়ি ঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে তাদের বাড়িঘরের অস্তিত্ব প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। নতুন করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ‘আস্থার সংকটে’র যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা রয়ে গেছে। ফলে রোহিঙ্গারা কোনো ধরনের নিশ্চয়তা না পেয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইবে না।
একটু সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এতে মিয়ানমারের রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে বলা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছেন বারবার। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানের ৩১তম সম্মেলনে সু চি বলেছিলেন, সমঝোতা চুক্তি হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার। এটা সময়ক্ষেপণ করার একটা কৌশল। এর আগে অক্টোবরে সু চি বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে চায় না। তিনি একবার এমন কথাও বলেছেন, মুসলমানরা কেন চলে যাচ্ছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। গেল সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন মিয়ামনমারের বিশেষ দূত কিউ টিন। কিন্তু ফল শূন্য। ফলে একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফর, এমনকি আসেম শীর্ষ সম্মেলনও আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আমরা এ সম্মেলনকে আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। এ নভেম্বরেই আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি বাংলাদেশে এসে মিয়ানমারেও যাবেন। আমরাও এ সুযোগটি আমাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি। মোদ্দাকথা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পাশে আছে। এখন দরকার কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা।
Daily Alokito Bangladesh
19.11.2017

ট্রাম্পের সফর কতটা বৈশ্বিক, কতটা সাম্রাজ্যবাদী?

Image result for Trump cartoon

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদ্য সমাপ্ত এশিয়া সফর একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘ সময় (১২ দিন) এশিয়া সফর করলেন। দ্বিতীয়ত, তার চীন সফর ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা ট্রাম্পের শাসনামলে দু’দেশের সম্পর্ক কোনদিকে যায়, তা নিয়ে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনা ছিল। ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার আগে ও পরে চীন সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছিলেন তাতে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, তিনি চীনের ব্যাপারে বেশ কঠোর হবেন। তাই তার চীন সফরের দিকে সবার বিশেষ দৃষ্টি ছিল। তৃতীয়ত, তিনি ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত অ্যাপেক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ট্রাম্প চলতি বছরের প্রথমদিকে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তিটি বাতিল করে দেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলভুক্ত ১২টি দেশের সঙ্গে অ্যাপেক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। তাই দেখার বিষয় ছিল তার ওই সফরে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়।


ট্রাম্পের এ সফরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন দিকে টার্ন নিয়েছে। বলা যেতে পারে, চীনের ব্যাপারে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তাকে চীনে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে, যা ওবামার শেষ সময়ে তার চীন সফরের সময় দেয়া হয়নি। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্ক চীনের অনুকূলে। এ নিয়ে অতীতে ট্রাম্প নানা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কথাও তিনি বলেছিলেন। কিন্তু চীনে এসে তিনি তার সুর বদল করলেন। বললেন, বাণিজ্য ঘাটতির জন্য চীনকে দায়ী করা যাবে না। তিনি উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন। তার সফরে বাণিজ্য ছিল প্রধান। উল্লেখ্য, এ সফরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২৫ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের ‘জ্বালানি ক্ষুধা’ মেটাতে আলাস্কা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস চীনে রফতানি করা হচ্ছে। ৩৭০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে ৩০০টি বোয়িং বিমানও কিনবে চীন। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ‘কৌশলগত সম্পর্কের’ ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এটা অনেকের কাছে স্পষ্ট, দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটা চিন্তার কারণ। তাই একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, চীনের বিরুদ্ধে প্রক্সি বাহিনী হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো কৌশল। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ব্যবহার করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। তখন ইউরোপে কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। আজ একুশ শতকে এসে স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হয়েছে এশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের বদলে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট। আর চীনের বিরুদ্ধে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভারতকে ব্যবহার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তাই ভারতকে নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। ভারত তাতে যোগ দেয়নি, যদিও বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করতে চায়। অনেকের মনে থাকার কথা, কিছুদিন আগে ভারত দক্ষিণ চীন সাগরে ৪টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল। ভারত ভিয়েতনাম নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দক্ষিণ চীন সাগরে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাব্যতা নিয়ে গভীর কূপ খননে নিয়োজিত রয়েছে। চীন এ কাজকে ভালো চোখে দেখছে না। ডোকলাম নিয়ে অতিসম্প্রতি ভারত ও চীনের দ্বন্দ্ব ও সম্ভাব্য একটি সংঘর্ষের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আফগানিস্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে নয়া স্ট্র্যাটেজি, তাতে যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত সেখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করুক। আফগানিস্তানে ভারতের ভূমিকা বাড়ছে। সেখানে ভারতের একটি বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভারত মহাসাগরে প্রভাববলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে চীনের একধরনের ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ চলছে। চীনের পাশাপাশি ভারতও ভারত মহাসাগরভুক্ত কোনো কোনো দেশে তাদের নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করছে। ফলে চীনকে ‘ঘিরে ফেলার’ যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘ স্ট্র্যাটেজি তাতে ভারত অন্যতম অংশীদার হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই ট্রাম্প যখন এশিয়ায় দীর্ঘ সফরে এলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক নিয়েও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল অনেকের।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ট্রাম্প তার চীন সফরে চীনবিরোধী কোনো বক্তব্য দেননি। চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। তিনি ‘নিষিদ্ধ নগরী’ (বেইজিং) পরিদর্শন করেছেন। সঙ্গে ছিলেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ট্রাম্প তার নাতির গাওয়া একটি চীনা সঙ্গীত শি জিনপিংকে শুনিয়েছেন। এই সঙ্গীত শুনে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এই গায়কী ‘এ-প্লাস’ পাওয়ার যোগ্য। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে প্রশংসা করতে তিনি এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। সম্প্রতি চীনে কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেস শেষ হয়েছে। কংগ্রেসে শি জিনপিং আবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ‘মহান নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি তাকে ‘রাজার’ সঙ্গে তুলনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি (গার্ডিয়ান, ২৫ অক্টোবর ২০১৭)। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে হামবুর্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল। এবার আবারও তাদের সাক্ষাৎ হল।

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে চীনের কোনো কোনো সিদ্ধান্তে ট্রাম্প খুশি। চীন উত্তর কোরিয়ার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ভালো করেই জানে, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ করতে হলে চীনের সাহায্য প্রয়োজন। এজন্যই ট্রাম্প চীনে গিয়ে চীনবিরোধী কোনো শক্ত মন্তব্য করেননি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তর কোরিয়াবিরোধী একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে হলে ট্রাম্পের প্রয়োজন চীনের সহযোগিতা। তবে দক্ষিণ চীন সাগর প্রশ্নে তিনি ‘স্ট্যাটাস কো’ পন্থা অবলম্বন করেন কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। দক্ষিণ চীন সাগরের আশপাশে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত টহল দেয়। এটা চীন কোনোমতে মেনে নেয়নি। চীন মনে করে এ অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজের চলাচল তার সার্বভৌমত্ব খর্বের শামিল। দক্ষিণ চীন সাগর চীনের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে বেইজিং। ইতিমধ্যে চীন সেখানে তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রচুর গ্যাস ও তেল রয়েছে এ অঞ্চলে, যা কিনা চীনের জ্বালানি ক্ষুধা মেটাতে সাহায্য করবে। এ অঞ্চলের ওপর তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামেরও দাবি রয়েছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালত চীন-ফিলিপাইন দ্বন্দ্বে ফিলিপাইনের দাবির পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু ফিলিপাইন চীনের আর্থিক সহযোগিতার (২৪ বিলিয়ন ডলার) পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর তার দাবি থেকে সরে এসেছে। চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্ক এখন ভালো। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে ইতিমধ্যে চীন সফর করেছেন। এ এলাকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কারণ এলাকাটির স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার ষষ্ঠ নৌবহরের রসদ সরবরাহের জন্য এ রুটের গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সীমান্ত না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এ এলাকার ব্যাপারে তার আগ্রহ হারায়নি। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ চীন সাগরের প্রশ্নটি উত্থাপন করেননি। বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সফরের সময় সঙ্গত কারণেই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছেন। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে তিনি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ব্যবহার করবেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতিমধ্যে ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। এটি দেশটিকে উত্তর কোরিয়ার যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করবে। যদিও ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন নিয়ে একধরনের ‘বিভ্রান্তি’ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছে, ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সব খরচ দক্ষিণ কোরিয়াকে বহন করতে হবে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া তাতে রাজি হয়নি। এ বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি। তবে একটা ভালো খবর হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে ট্রাম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অসামরিক এলাকায় যেতে পারেননি। এতে করে উত্তর কোরিয়া যে কোনো ধরনের ‘প্রভোকেশন’ থেকে নিবৃত্ত থাকবে। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রে ‘আগাম হামলা’ চালাতে পারেন! প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালে ইরাকে ‘আগাম হামলা’ চালিয়েছিলেন। বুশের যুক্তি ছিল, সাদ্দাম হোসেনের কাছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র রয়েছে। সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা চালানোর(?) আগেই বুশ ইরাকের সব সমরাস্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। অথচ পরে জানা গেল সাদ্দাম হোসেনের কাছে কোনো ধরনের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ছিল না। এখন ট্রাম্প একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে। আগাম হামলা বা প্রিয়েমটিভ অ্যাটাকের সূচনা যাতে ট্রাম্প করতে না পারেন, সেজন্য ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসে একটি বিল উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এ বিল কংগ্রেসে পাস হলে ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ায় আগাম হামলা চালাতে পারবেন না। তারপরও চূড়ান্ত বিচারে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হয়ে টিপিপি চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের সীমান্তঘেঁষা ১২টি দেশ (যে দেশগুলোর কয়েকটিতে সফর করলেন ট্রাম্প) এই টিপিপির অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশ্বের ৪০ ভাগ জিডিপির অধিকারী এ দেশগুলো। টিপিপির মাধ্যমে একটি শুল্কমুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি বাতিল করায় অন্য দেশগুলো কী করবে, তা স্পষ্ট নয়। চীন টিপিপিতে ছিল না। ফলে বাকি ১১টি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) চীনের সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি করতে পারে। বলা ভালো, জাপান এ চুক্তিটি ইতিমধ্যে ‘রেটিফাই’ করেছে। ট্রাম্পের এ সফরে টিপিপির বিকল্প নিয়ে তেমন একটা আলোচনা না হলেও ট্রাম্প বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে টিপিপিভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্তভাবে তাদের পণ্যের যে সুবিধা পেত, তা এখন না থাকায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য কীভাবে বাড়বে, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। উপরন্তু টিপিপিভুক্ত ১১টি দেশ যদি সত্যি সত্যিই চীনের সঙ্গে একটি শুল্কমুক্ত চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এটাকে ভালো চোখে দেখবে না, এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ‘বাণিজ্য যুদ্ধের’ সম্ভাবনা বাড়বে বৈকি!

আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়। তিনটি বড় অর্থনীতির দেশ এ অঞ্চলে অবস্থিত- চীন, জাপান ও ভারত। বেইজিংয়ে তিনি যতই লালগালিচা সংবর্ধনা পান না কেন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কই আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন যে ভারতকে ব্যবহার করবে, তা অ্যাপেক সম্মেলনে দেয়া ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্পের এ সফর প্রমাণ করল এ অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতেও এর কোনো কমতি হবে না।
Daily Jugantor
16.11.2017