রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

স্নিগ্ধ ইউরোপ মলিন হচ্ছে?

ইউরোপের রাজনীতি এখন কোন পথে? আমি এখন ইউরোপে। প্যারিস থেকে ফ্রাংকফুর্টে। আগামী সপ্তাহে চলে যাব আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। খুব কাছ থেকে দেখছি ইউরোপের রাজনীতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের লোক হিসেবে যেখানেই যাই দেখার চেষ্টা করি কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বদলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। যেসব বাংলাদেশি থাকেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বুঝতে চেষ্টা করছি রাজনীতিটা যাচ্ছে কোন দিকে। জার্মানির সাধারণ নির্বাচনের পর আরও দুটি প্রাদেশিক নির্বাচন হয়ে গেল। সেখানেও উগ্র ডানপন্থীরা ভালো করেছে। অস্ট্রিয়াতেও সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে। সেখানেও উগ্র ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। এর অর্থ কী? ইউরোপ কি একটি উগ্র ডানপন্থী উত্থান প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে আগামী দশকে? ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশেই এখন উগ্র ডানপন্থীরা তাদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এ উগ্র ডানপন্থীরা দুটো কাজ করতে পারে- এক. তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, যেমনটি গেছে ব্রিটেন; দুই. এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে, যেমনটি দিয়েছে স্পেনের কাতালোনিয়া।
প্যারিসে Pantheon দেখতে গিয়ে ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সঙ্গে হঠাৎ করেই পরিচয়। পাশের উন্মুক্ত রেস্তোরাঁয় কফি খেতে খেতে ফ্রান্সের রাজনীতি নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। Pantheon হচ্ছে একটি মিউজিয়াম। ফরাসি বিপ্লবের পর এ ভবনটিকে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির কবর আছে এখানে : ভলতেয়ার, ভিক্টর হুগো এবং ম্যারি কুরি। আমার মিউজিয়াম দেখার উদ্দেশ্যও ছিল তা-ই। সেখানেই পরিচয় অধ্যাপক ফাঁসোয়ার সঙ্গে। তারপর আলাপ। তিনি নৃবিজ্ঞান পড়ান। সঙ্গে ভিয়েতনামী স্ত্রী। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতো দেশগুলোর ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে ভদ্রলোকের। তিনি স্পষ্ট করেই বললেন, ইউরোপ বদলে যাচ্ছে। আরও দশ বছরে আরও দশটি কাতালোনিয়ার জন্ম হবে! অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে। এ মুহূর্তে কাতালোনিয়া নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। কাতালোনিয়ার গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় পড়ার পর স্পেন বেশ শক্ত অবস্থানে গেছে। কাতালোনিয়ার নেতারা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা স্থগিত রেখেছেন বটে; কিন্তু কতদিন? স্পেন সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা একরকম ব্যর্থ হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতাকামীদের নেতা চার্লস পুইজমন্ট যদি স্বাধীনতা পরিত্যাগের সুস্পষ্ট ঘোষণা না দেন, তাহলে কাতালোনিয়া যে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে, স্পেন সরকার তা বাতিল করবে।
কাতালোনিয়া স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ। মাত্র ১২ হাজার ৩৯৭ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে প্রদেশটি গঠিত, লোকসংখ্যা ৭৫ লাখ ২২ হাজার। এই কাতালোনিয়া এখন স্বাধীনতা চায়। গত ১ অক্টোবর সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে শতকরা ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে স্বাধীনতার পক্ষে। এ নিয়ে একটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে স্পেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সমালোচনা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ আদালত বলছে, কাতালোনিয়া এ গণভোট আয়োজন করতে পারে না। কিন্তু কাতালোনিয়া স্বাধীনতার প্রশ্নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা চার্লস পুইজমন্ট বলেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এভাবেই বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি। একদিকে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের উত্থান ঘটছে, অনদিকে বাড়ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারা। এ পরিস্থিতি কোথায় নিয়ে যাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য কি ধরে রাখা সম্ভব হবে? এসব প্রশ্ন এখন উঠছে বিভিন্ন মহলে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হচ্ছে উগ্র ডানপন্থী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ এবং সাধারণ ইউরোপীয়দের মাঝে এদের প্রভাব বৃদ্ধি। পার্লামেন্ট কিংবা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এরা বিপুলসংখ্যক আসনে বিজয়ী হয়ে ইউরোপের সনাতন রাজনীতির ট্রেন্ডকে ভেঙে দিয়েছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, হল্যান্ড, চেক রিপাবলিক- সর্বত্রই এই উগ্র ডানপন্থীদের প্রভাব বাড়ছে। ভয়টা সেখানেই। সবচেয়ে অবাক করার ঘটনা ঘটেছে জার্মানির পার্লামেন্ট নির্বাচনে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সেখানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে উগ্রবাদী দল হিসেবে পরিচিত অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানির রাজনীতি পরিচালনা করে আসছে দুটি বড় দল- সিডিইউ আর এসপিডি। এখন জার্মান পার্লামেন্টে তৃতীয় শক্তি হচ্ছে এএফডি। ভয়ের কারণ হচ্ছে, এএফডির উত্থান অন্য দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। অস্ট্রিয়া এর বড় প্রমাণ। সেখানে গত রোববারের নির্বাচনে উগ্রপন্থী পিপলস পার্টি বিজয়ী হয়েছে এবং ৩১ বছর বয়স্ক সেবাসটিয়ান কুর্জ সেদেশের চ্যান্সেলর হতে যাচ্ছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ম্যাত্রেঁদ্ধার বিজয় একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সে এসে দেখলাম তার জনপ্রিয়তা আগের মতো নেই। মে মাসে তার জনপ্রিয়তা ছিল শতকরা ৬২ ভাগ, আর আগস্টে (২০১৭) তা কমে দাঁড়ায় ৪০ ভাগে (টাইম, ৯ অক্টোবর ২০১৭)। তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাস্তায়ও নেমেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ম্যাক্রোঁর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। ফ্রান্সের রাজনীতি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করেছে একদিকে মধ্য-দক্ষিণপন্থীরা, অন্যদিকে মধ্য-বামপন্থীরা। এ দুটি ভাবধারার বড় রাজনৈতিক দলের আদর্শ মানুষকে টানতে পারেনি। তাই নির্বাচনে (প্রেসিডেন্ট) তারা ম্যাক্রোঁকে বেছে নিয়েছিলেন। ম্যাত্রেঁদ্ধা মাত্র দুবছর আগে এটি দল গঠন করে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছিলেন। তার তারুণ্য, স্পষ্ট বক্তব্য মানুষ গ্রহণ করেছিল। এখন ম্যাক্রোঁ যদি ব্যর্থ হন, তাহলে উগ্র লি পেনের উত্থান ঠেকানো যাবে না।
সমস্যা আছে ইতালিতেও। একটি ভঙ্গুর সরকার সেখানে রয়েছে; কিন্তু যে কোনো সময় এ সরকারের পতন ঘটতে পারে। কমেডিয়ান বেপ্পে গ্রিল্লও ও তার নবগঠিত দল
ফাইভ স্টার মুভমেন্টের উত্থান ইতালির সনাতন রাজনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এ দলটি শরণার্থীবিরোধী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী। ইতিমধ্যে ইতালি ৮০ হাজারের ওপর শরণার্থী গ্রহণ করেছে। এ শরণার্থী আগমন ইতালির রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। জন্ম হচ্ছে নব্য নাৎসি পার্টির।
শরণার্থীদের ব্যাপক হারে ইউরোপে প্রবেশ শুধু জার্মানি, ফ্রান্স আর ইতালির রাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক আর স্লোভাকিয়ার রাজনীতিকেও। শরণার্থীরা যখন ইউরোপে ব্যাপক হারে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ধরনের কোটা সিস্টেম আরোপ করেছিল। এ সিস্টেমে প্রতিটি দেশকে ১১ হাজার করে শরণার্থী গ্রহণে নির্দিষ্ট কোটা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসে আবেদন করলে তা বাতিল হয়। এসব দেশে শরণার্থীদের ব্যাপক অভিবাসনকে কেন্দ্র করে যেমন একদিকে দক্ষিণপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী মনোভাবও শক্তিশালী হচ্ছে।
বদলে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতিও। নতুন নতুন রাজনীতিকদের উত্থান ঘটছে ইউরোপে, যারা তথাকথিত পপুলিজমের কারণে জনপ্রিয় হচ্ছেন। সস্তা স্লোগান, জাতীয়তাবোধের ধারণা তাদের জনপ্রিয় করছে। এক সময়ের ট্রেডিশনাল রাজনৈতিক দলগুলো চলে গেছে পেছনের সারিতে। লি পেন, উইলডার্স, গ্রিল্লও, ভিক্টর উরবান- এ নামগুলো এখন ইউরোপের রাজনীতিতে বারবার আলোচিত হচ্ছে। হল্যান্ডে গ্রিয়ার্ট উইলডার্সের দল নির্বাচনে সনাতন রাজনৈতিক দলগুলোকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় হয়েছিল, অনেকটা ফ্রান্সের লি পেনের মতো। লি পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (ফ্রান্সে) দ্বিতীয় হয়েছিলেন। তাদের সবার মধ্যে একটা মিল আছে। এরা সবাই শরণার্থীবিরোধী তথা মুসলমানবিরোধী। এরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধারণারও বিরোধী। উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ দ্বারা সবাই চালিত। তাই সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে, এই উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ইউরোপকে কোথায় নিয়ে যাবে? ২৮টি দেশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত। লোকসংখ্যা প্রায় ৫১০ মিলিয়ন। ১৯৯৯ সালে একক মুদ্রার (ইউরো) সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর হয় ২০০২ সালে, যদিও মাত্র ১৯টি দেশ ইউরো চালু করেছে নিজ দেশের মুদ্রাকে অবলুপ্ত করে। ১৯৫১ সালে প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি তার যাত্রা শুরু করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৯৩ সালে। ১৬ দশমিক ৪৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ইইউর যে অর্থনীতি, তা বিশ্বের জিডিপির প্রায় ২৩ ভাগ। বড় অর্থনীতির এ সংস্থাটি বিশ্ব আসরে এতদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। এখন এতে বিভক্তি আসছে। তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। এ জটিলতা, বিভক্তি, দ্বন্দ্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।
সিরিয়া ও ইরাকের সংকট লাখ লাখ মানুষকে দেশান্তরিত করেছে। ১০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়ে জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মার্কেল মানবতার যে পরিচয় দিয়েছিলেন ২০১৫-১৬ সালে, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। তার ওই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও রাজনীতির দিক থেকে তিনি একটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি রাজনীতির জুয়া খেলেছিলেন। এতে তিনি বিজয়ী হতে পারেননি। এ শরণার্থী সংকট ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শরণার্থীবিরোধী অবস্থান। বলার অপেক্ষা রাখে না, ট্রাম্পের মনোভাব ও নীতির কারণে ইউরোপের উগ্র দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো উৎসাহিত হয়েছে। প্রশ্নটা তাই সে কারণেই- কেমন ইউরোপ আমরা দেখব আগামী দিনে?
অনেক কিছুই ঘটতে পারে। উগ্র নব্য-নাৎসি সংগঠনগুলো এখন ইউরোপের প্রতিটি দেশে শক্ত অবস্থান নিয়ে গোটা ইউরোপে একটি
ফ্যাসিস্ট অ্যালায়েন্স গড়ে তুলবে এবং ইউরোপের সমাজে যে বহুত্ববাদ, অর্থাৎ বহু সংস্কৃতির মিলন, তা ভেঙে যাবে। কাতালোনিয়ার মতো অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ নিজ নিজ দেশ থেকে আলাদা হতে চাইবে। ব্রিটেনের মতো কিছু দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবে। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাঝে দুটি ব্লকের আত্মপ্রকাশ ঘটবে : জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে একটি ব্লক। এ ব্লক ধনী এবং এরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। আর গ্রিসের নেতৃত্বে গরিব দেশগুলোর একটি ব্লক, যারা পরিপূর্ণভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর দিকে এখন লক্ষ থাকবে অনেকের।
গত দুই সপ্তাহ ধরে ইউরোপে ঘুরেছি। ফ্রান্স থেকে জার্মানি ও চেক রিপাবলিক। দেখছি নতুন এক
রাজনীতির দিকে যাচ্ছে ইউরোপ। এই ইউরোপ কেমন হবে, তার রাজনীতি কেমন হবে এসব দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।


মিয়ানমারের ব্লাফ গেম!

ঢাকা সফর করে গেলেন মিয়ানমারের মন্ত্রী কিয়াও টিন্ট সোয়ে। ওই সফরে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মিয়ানমারের মন্ত্রী হাসিমুখে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। এই আশ্বাসের মাধ্যমে কি মিয়ানমারের গণহত্যাকারীদের আড়াল করা হল? সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্থাপিত ৫ দফা নিয়ে আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ আলোচনা পাঁচ দফা সম্পর্কিত নয়। আমরা একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রক্রিয়াটি শুরু হল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এ ধরনের কথা বলেন, তখন আমি অবাক না হয়ে পারি না। কারণ প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে উত্থাপিত তার ৫ দফায় বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেছেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এ ৫ দফা কেন উত্থাপিত হল না, আমি বুঝতে অক্ষম। নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন মূল ইস্যু। কিন্তু ৫ দফার সঙ্গে সুস্পষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান আছে। এই তথাকথিত ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমরা মোটামুটিভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফলাফল জানি। অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে; কিন্তু ফলাফল শূন্য।


৪-৫ লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই কক্সবাজার এলাকায় শরণার্থী ক্যাম্পে ও এর আশপাশের এলাকায় বসবাস করে আসছিল। এখন এদের সঙ্গে যুক্ত হল আরও ৫ লাখের ওপর। অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা এখন অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে মিয়ানমারের মন্ত্রী এসে বলে গেলেন তাদের নাগরিকদের তারা ফিরিয়ে নেবেন। এটা যে স্রেফ ভাঁওতাবাজি ও সময়ক্ষেপণ করা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের নামে মিয়ানমার আমাদের স্রেফ ব্লাফ দিল! আমরা তাদের আশ্বাসকে যদি বিশ্বাস করি তাহলে ভুল করব। দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারলাম না। চাপ সৃষ্টি করার একটা কৌশল হচ্ছে মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার দাবি করা। এই গণহত্যার কথা আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলেছে, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান বলেছেন। সুতরাং বাংলাদেশ এ প্রশ্ন তুলতেই পারে এবং এর মাধ্যমে মিয়ানমারকে চাপে রাখা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ এ পথটি এড়িয়ে গেল! এতে করে কি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার?

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অতি সম্প্রতি ছাপা হয়েছে, যা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথম খবরটি এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণআদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট পিপল্স ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামে এ আন্তর্জাতিক গণআদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চি ও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্তে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত সদস্যদের বিচারক প্যানেল এ রায় দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেছে, যা জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাঠানো হবে।

দ্বিতীয় খবরটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা এবং ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন এ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার) দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা
সুবিধা দেয়ার জন্যই এই অর্থ দেয়া হবে। এখানে বলে রাখা ভালো, ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজেদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছিল, যাকে পরবর্তীকালে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। ওই সময় শত শত ইয়াজেদি তরুণীকে ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করুণ কাহিনী ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াজেদি সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্তে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।

উপরে উল্লিখিত দুটো সংবাদ বিচ্ছিন্ন হলেও একটা মিল আছে- যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। এটা সত্য, মালয়েশিয়ার পিপিটির কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এটা সিম্বলিক অর্থাৎ প্রতীকী আদালত। কিন্তু এর একটি প্রতিক্রিয়া আছে। এ ধরনের ঘটনা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠনে সহায়তা করে থাকে। রোম স্ট্যাটিটিউটে (১৯৯৮, কার্যকর ২০০২) এ ধরনের আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। আগামীতে ইরাকে এ ধরনের আদালত গঠিত হবে এবং আমাদের ধারণা আমরা যদি মিয়ানমারের গণহত্যার ঘটনা সত্যিকারভাবে আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মিয়ানমারের ব্যাপারে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা সম্ভব হবে।

জশুয়া কুরলান্টসিক (Joshua Kurlantyick) গত ১ অক্টোবর The National-এ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধটির শিরোনাম Aung San Suu Kyi is the bad gyu in the Rohingya crisis, but what about the man directly responsible for massacres? শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় কী বলতে চেয়েছেন তিনি। যে কথাটা আমরা বারবার বলে আসছি, সে কথাটাই বলেছেন তিনি- অর্থাৎ গণহত্যা ও উচ্ছেদ অভিযানের দায় সু চি এড়াতে পারেন না। তবে তিনি বেশি দায়ী করেছেন সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিং অং হ্লাইংকে। তার মন্তব্য অনেকটা এরকম :
It needs to give the Mayanmar generals a serious warning. Doing so might lead the military to halt its atrocities, but more importantly, it would suggest that army leaders cannot continue a scorched earth policy and let Ms. Suu Kyi take all the public criticism. পশ্চিমাদের উচিত জেনারেল অং হ্লাইংকে একটা কড়া মেসেজ দেয়া।

ব্যবসায়িক ও কর্পোরেট স্বার্থ এখানে এত বেশি যে, পশ্চিমা বিশ্ব এই জেনারেলকে এখনও সমীহ করে চলছে। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ব্যক্তিগত পর্যায়ে জেনারেল হ্লাইং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে আসছেন। লক্ষ্য করে দেখবেন পশ্চিমা নেতারা কিন্তু সরাসরি জেনারেল হ্লাইংকে আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য রাখেননি। গত এক বছরে জেনারেল হ্লাইং জার্মানি, ইতালি, জাপান, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম সফর করেছেন এবং প্রতিটি দেশে তাকে লাল কার্পেট সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। বেলজিয়ামে তিনি (নভেম্বর ২০১৬) ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিলিটারি কমিটির কাছে বক্তব্য রেখেছেন। ইতালিতে তিনি অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জার্মানিতে গিয়েছিলেন ২০১৭ সালের এপ্রিলে। জাপানেও তিনি গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য প্রধানত দুটো : এক. এসব দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করা; দুই. নিজেকে মিয়ানমারের মূল নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা। এতদিন চীনের অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল মিয়ানমার। এখন জেনারেলরা এ নীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। ভারত থেকেও টর্পেডো (যা সাবমেরিন ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়) কিনেছেন জেনারেলরা। জেনারেল হ্লাইং ভারতেও গিয়েছিলেন। ভারত সফরে (জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগে) তিনি মোদি ও অজিত দোভালের সঙ্গে দেখাও করেছেন। অজিত দোভাল ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ২৬ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা শুরুর আগে দোভালের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। বলা ভালো, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশ ভারতের সমর্থন পায়নি। ভারত মূলত সমর্থন করেছে মিয়ানমারকে। এমনকি মিয়ানমারে যে মুসলিম গণহত্যা হয়েছে, তারও নিন্দা করেনি ভারত। এতে জেনারেল হ্লাইং ও স্থানীয় সেনা কমান্ডাররা উৎসাহিত হয়েছেন গণহত্যায়। অতীতে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এভাবে কখনও বিদেশ সফর করেননি। জেনারেল হ্লাইং নিজেকে তৈরি করছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হটিন কিঅ (Htin Kyaw) দায়িত্ব নিয়েছেন ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ। ১৯৬২ সালের পর তিনিই প্রথম সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাদের ধারণা, বর্তমান প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জেনারেল হ্লাইং হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট, যে কারণে বহির্বিশ্বে তিনি অস্ত্র ক্রয়ের নামে জনসংযোগ তৈরি করছেন। মিয়ানমারের জিডিপির পরিমাণ ৭২ দশমিক ৩৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ দেশে রয়েছে তেল, গ্যাসসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। সুতরাং পশ্চিমা বিশ্বের যে আগ্রহ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এ আগ্রহটাকে ব্যবহার করেই জেনারেল হ্লাইং তার ভবিষ্যৎ পথ পরিষ্কার করছেন। কিন্তু গণহত্যার মূল হোতা তিনি।

এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ যদি মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বিচারের ব্যাপারে সোচ্চার না হয়, তাহলে পৃথিবীর অন্যত্র যেসব গণহত্যা হয়েছে, তার বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রধানত দুটি বড় শক্তি চীন ও রাশিয়ার কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেই- গেল বছর মিয়ানমারের সেনাপ্রধান রাশিয়া সফর করেছিলেন। ওই সফরে তিনি সামরিক অস্ত্র ক্রয়ের ব্যাপারে কয়েক মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছিলেন। চীনের যে মিয়ানমারে অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রেরও অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। দীর্ঘদিন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। ওবামা প্রশাসনের আমলে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু এখন প্রমাণিত হয়েছে, তথাকথিত গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে সেনাবাহিনীই মূলত দেশটি চালাচ্ছে। আর তাতে সমর্থন রয়েছে সু চির।

সু চির মন্ত্রীর সফরে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আমরা পেলাম না। কবে প্রত্যাবাসন শুরু হবে, মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে, কিংবা সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হবে কিনা, এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। সুতরাং এটা বোঝাই যায়, কিয়াও টিন্ট সোয়ের এটি লোক দেখানো সফর। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে না। বাংলাদেশকে এখন দু
ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এক. নিবারক কূটনীতি, অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা। দুই. আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে মিয়ানমারের গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবি তোলা এবং এ দাবির সপক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনীতি আরও সক্রিয় হতে হবে। বাংলাদেশ যদি দুর্বলভাবে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রশ্নে, তাহলে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে মাত্র।

কাতালোনিয়ার গণভোট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ

গত ১ অক্টোবর স্পেনের প্রদেশ কাতালোনিয়ায় অনুষ্ঠিত গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় পড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতি এখন নতুন একটি মোড় নিল। গেল সপ্তাহে জার্মানিতে সাধারণ নির্বাচনে নব্য নাজি পার্টি হিসেবে খ্যাত অলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টির বিজয়ে এবং পার্লামেন্টে তৃতীয় বৃহত্তম পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর সারা ইউরোপ যখন উৎকণ্ঠিত, ঠিক তখনই এলো কাতালোনিয়ার গণভোটের খবর। গণভোটে ৯০ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। আর তাই কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা কার্লস পুইগদেমন্ত বলেছেন, ১২ হাজার ৩৯৭ বর্গমাইল আয়তনের কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাধীনতা কি স্পেন মেনে নেবে? কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানই বা কী হবে? গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় পড়ায় চরম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। স্পেন সরকার এর সমালোচনা করেছে এবং স্পেনের একটি সাংবিধানিক আদালত বলেছেন, ১৯৭৮ সালের সংবিধানের ডিক্রি অনুসারে দেশকে বিভক্ত করা যাবে না। শুধু জাতীয় সরকারই গণভোটের আয়োজন করতে পারে। কিন্তু কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা স্বাধীনতার প্রশ্নে অনড়। এ ক্ষেত্রে কাতালোনিয়া যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তাহলে স্পেন সরকার সংবিধানের ১৫৫ ধারা প্রয়োগ করতে পারে। স্পেনের পার্লামেন্ট কাতালোনিয়ার জন্য যে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তা বাতিল করতে পারে। পার্লামেন্ট হয়তো একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যেতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতাকামীরা তা মানবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বলা ভালো, কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা মাত্র ৭৫ লাখ ২২ হাজার। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ মানুষ কাতালোনিয়ায় বসবাস করে। এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। বার্সেলোনার ফুটবল টিম জগদ্বিখ্যাত। স্পেনের জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ আসে (২৫৫.২০৪ মিলিয়ন) এই প্রদেশ থেকে। ইউরো জোনের চতুর্থ বড় অর্থনৈতিক শক্তি হচ্ছে স্পেন। এখন কাতালোনিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন যদি শক্তিশালী হয়, যদি সত্যি সত্যিই কাতালোনিয়া ইউরোপে নতুন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে তা ইউরোপের অন্যত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আরো উৎসাহ জোগাবে।
বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেছে। উগ্র ডানপন্থী উত্থান ঘটেছে ইউরোপে, যারা নতুন করে ইউরোপের ইতিহাস লিখতে চায়। ফ্রান্সে উগ্র ডানপন্থী উত্থানের পাশাপাশি এখন জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী তথা নব্য নাজি উত্থান ইউরোপের রাজনীতি বদলে দিতে পারে। ভয়টা হচ্ছে জার্মানিতে এএফডির উত্থান নিয়ে। এরা পার্লামেন্টে থাকায় উগ্রবাদ বিস্তার ঘটবে। এটা বড় ধরনের ঘটনা নিঃসন্দেহে। নির্বাচনে নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (AFD) পার্টি প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে যাওয়ায় তা শুধু একটি বড় ধরনের ঘটনারই জন্ম দেয়নি, বরং ইউরোপের সনাতনপন্থী রাজনীতিবিদদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চিন্তাটা হচ্ছে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান। এই ডানপন্থী উত্থান এরই মধ্যে ইউরোপে অনেক দেশে বিস্তৃত হয়েছে। জার্মানি বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বলা যেতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পর জার্মানিই হচ্ছে ইউরোপের নেতা। এখন সেই জার্মানিতেই যদি নব্য নাজিবাদের উত্থান ঘটে, তা যে একটা খারাপ সংবাদ বয়ে আনল, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এএফডির জন্ম মাত্র চার বছর আগে, ২০১৩ সালে। মূলত মুসলমান বিদ্বেষ আর ব্যাপকহারে জার্মানিতে শরণার্থী আগমনকে কেন্দ্র করে (২০১৫ সালে ১৩ লাখ সিরীয়-ইরাকি শরণার্থীর জার্মানি প্রবেশ) এই দলটির জন্ম হয়। এরই মধ্যে তারা জার্মানির ১৬টি প্রদেশের মধ্যে ১৩টি প্রদেশ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। আরো মজার বিষয় হচ্ছে, সাবেক পূর্ব জার্মানি, যেখানে একসময় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানে এই দলটির (এএফডির) প্রতিপত্তি এখন বেশি। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল নিজেও পূর্ব জার্মানি থেকে এসেছেন।
নির্বাচনে এএফডি ১২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে ৯৪টি আসন (মোট আসন ৭০৯) নিশ্চিত করেছে। সংখ্যার দিক থেকে ৯৪টি আসন খুব বেশি নয়। কিন্তু ভয়টা হলো, ইউরোপের প্রতিটি দেশে উগ্র ডানপন্থীরা একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। যেমনঅস্ট্রিয়ায় ফ্রিডম পার্টি ভোট পেয়েছে ৩৫.১ (২০১৬), বেলজিয়ামে নিউ  ফ্লেমিস অ্যালায়েন্স ২০.৩ শতাংশ (২০১৪), ব্রিটেনে ইউকেআইপি ১২.৭ শতাংশ  (২০১৫), ডেনমার্কে পিপলস পার্টি ২১.১ শতাংশ (২০১৫), ফিনল্যান্ডে ফিনস পার্টি ১৭.৭ শতাংশ (২০১৫), ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২৭.৭ শতাংশ (২০১৫), হাঙ্গেরিতে ফিডেস-কেডিএনপি ৪৪.৮ শতাংশ (২০১৪), হল্যান্ডে পার্টি অব ফ্রিডম ১৩.১ শতাংশ (২০১৭), পোল্যান্ড ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ৩৭.৬ শতাংশ (২০১৫), স্লোভাকিয়ায় ন্যাশনাল পার্টি ৮.৬ শতাংশ (২০১৬), সুইডেনে ডেমোক্রেটস ১২.৯ শতাংশ (২০১৪)  কিংবা সুইজারল্যান্ডে পিপলস পার্টি ২৯.৪ শতাংশ (২০১৫)। এখন এসব উগ্র দক্ষিণপন্থী দলগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো এএফডির (জার্মানি) নাম। অথচ এই দলটি ২০১৩ সালে পেয়েছিল মাত্র ৪.৭ শতাংশ ভোট। ফলে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ৫ শতাংশ ভোটের দরকার হয় পার্লামেন্টে যেতে। এই উগ্র ডানপন্থী উত্থান এখন ইউরোপের জন্য একটা হুমকি। এর প্রভাব ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় পড়বে এটা স্বাভাবিক। ফ্রান্স ও ইতালিতে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সক্রিয়। এরা সবাই মিলে ইউরোপে উগ্র দক্ষিণপন্থী উত্থানের জন্ম দিতে পারে। তাই এএফডির উত্থান জার্মানির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না।
এএফডি চাচ্ছে ইউরো জোন থেকে জার্মানি বেরিয়ে আসুক। এটা নিশ্চয়ই মার্কেল করবেন না। কিন্তু তিনি চাপে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কার আসতে পারে। ইইউতে জার্মানি বড় দেশ। দেশটির যেকোনো সিদ্ধান্ত ইইউর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণপন্থীদের ব্যাপক উত্থান পুরো ইউরোপের চেহারা ভবিষ্যতে বদলে দিতে পারে। শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। নির্বাচনে টেরেসা মে সেখানে সুবিধা করতে পারেননি। তিনি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন আরেকটি দলের ওপর। এখন অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের অবস্থা হতে যাচ্ছে তেমনটি। কট্টরপন্থী এএফডিকে ব্যালান্স করার জন্য তাঁকে এখন দুটি বড় দল ও কোয়ালিশন পার্টনার এফডিপি ও গ্রিন পার্টিকে ছাড় দিতে হবে। এই দল দুটির মধ্যেও তাঁকে সমন্বয় করতে হবে। তিনি যদি ব্যর্থ হন, তাহলে নয়া নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই ঝুঁকিটি এই মুহূর্তে কোনো দলই নিতে চাইবে না। কেননা, দ্রুত আরেকটি নির্বাচন মানে এএফডিকে আরো সুযোগ করে দেওয়া। নয়া নির্বাচন এএফডিকে একটি দর-কষাকষি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি ক্ষমতাসীন সিডিইউ-সিএসইউকে বাধ্য করতে পারে গ্রিন পার্টিকে বাদ দিয়ে তাদের কোয়ালিশন সরকারে নিতে! শুধু তা-ই নয়, সিডিইউয়ের নেতৃত্ব থেকে মার্কেল সটকে পড়তে পারেন।
আগামী ২৪ অক্টোবর পার্লামেন্টের অধিবেশন বসছে। মার্কেল চ্যান্সেলরের দায়িত্ব নেবেন। মোট চারবার তিনি জার্মানিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। তিনি কনরাড অ্যাডেনাওয়ার, হেলমুট কোল কিংবা উইলি ব্রান্ডের নামের তালিকায় নিজের নামটি অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হলেন বটে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি। কট্টর দক্ষিণপন্থী উত্থান ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থান এই শক্তিকে আরো শক্তিশালী করেছে। এখন দেখার পালা জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীর উত্থান অন্য দেশগুলোতে কতটুকু প্রভাব ফেলে। ফ্রান্সে যে প্রত্যাশা নিয়ে ম্যাক্রো ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই প্রত্যাশায় ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। মে মাসে তাঁর জনপ্রিয়তা যেখানে ছিল ৬২ শতাংশ, আগস্টে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে (টাইম, অক্টোবর ৯, ২০১৭)। তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে গত ২৩ সেপ্টেম্বর। বড় বিক্ষোভ হয়েছে সেখানে। ফ্রান্সে এসে লক্ষ করলাম, ম্যাক্রোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। ফ্রান্সের রাজনীতি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করেছে একদিকে মধ্যপন্থী ডানরা, আর মধ্যপন্থী বামরা। এই দুটি বড় রাজনৈতিক দলের আদর্শ মানুষকে টানতে পারেনি। তাই নির্বাচনে (প্রেসিডেন্ট) তারা ম্যাক্রোকে বেছে নিয়েছিল। ম্যাক্রো মাত্র দুই বছর আগে একটি দল গঠন করে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁর তারুণ্য, স্পষ্ট বক্তব্য মানুষ গ্রহণ করেছিল। এখন ম্যাক্রো যদি ব্যর্থ হন, তাহলে লি পেনের উত্থানকে ঠেকানো যাবে না। সমস্যা আছে ইতালিতেও। একটি ভঙ্গুর সরকার সেখানে রয়েছে, যেকোনো সময় এই সরকারের পতন ঘটতে পারে। কমেডিয়ান বেপ্পে গ্রিল্লও এবং তাঁর নবগঠিত দল ফাইভ স্টার মুভমেন্ট-এর উত্থান ইতালির সনাতন রাজনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এই দলটি শরণার্থীবিরোধী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী। এরই মধ্যে ইতালি ৮০ হাজারের ওপরে শরণার্থী গ্রহণ করেছে। এই শরণার্থী আগমন ইতালির রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে বদলে দিয়েছে। জন্ম হচ্ছে নব্য নাজি পার্টির।
শরণার্থীদের ব্যাপকহারে ইউরোপে প্রবেশ শুধু জার্মানি, ফ্রান্স আর ইতালির রাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, বরং পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক আর স্লোভাকিয়ার রাজনীতিকেও বদলে দিয়েছে। শরণার্থীরা যখন ইউরোপে ব্যাপকহারে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ধরনের কোটা সিস্টেম আরোপ করেছিল। ওই কোটা সিস্টেমে প্রতিটি দেশকে শরণার্থী গ্রহণে নির্দিষ্ট কোটা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক ও স্লোভাকিয়া তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রতিটি দেশকে ১১ হাজার করে শরণার্থী নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এই দেশগুলো তা মানেনি। এমনকি হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসে  আবেদন করলে তা বাতিল হয়। এসব দেশে শরণার্থীদের ব্যাপক অভিবাসনকে কেন্দ্র করে যেমনি একদিকে দক্ষিণপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী মনোভাবও শক্তিশালী হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতি। নতুন নতুন রাজনীতিবিদের উত্থান ঘটছে ইউরোপে, যাঁরা তথাকথিত পপুলিজম-এর কারণে জনপ্রিয় হচ্ছেন। সস্তা স্লোগান, জাতীয়তাবোধের ধারণা তাঁদের জনপ্রিয় করছে। একসময়ের ট্র্যাডিশনাল রাজনৈতিক দলগুলো চলে গেছে পেছনের সারিতে। লিপেন, উইলডাস, গ্রিল্লাও, ভিক্টর উরবানএই নামগুলো এখন ইউরোপের রাজনীতিতে বারবার আলোচিত হচ্ছে। হল্যান্ডে গ্রিয়াট উইলডার্সের দল নির্বাচনে সনাতন রাজনৈতিক দলগুলোকে পেছনে ঠেলে দ্বিতীয় হয়েছিল, অনেকটা ফ্রান্সের মিরিয়ান লি পেনের মতো। লি পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (ফ্রান্সে) দ্বিতীয় হয়েছিলেন। তাঁদের সবার মধ্যে একটা মিল আছে। তাঁরা সবাই মুসলমান তথা শরণার্থীবিরোধী। তাঁরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধারণারও বিরোধী। উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ দ্বারা সবাই চালিত। তাই সংগত কারণেই যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হচ্ছে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ইউরোপকে কোথায় নিয়ে যাবে? ২৮টি দেশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত। লোকসংখ্যা প্রায় ৫১০ মিলিয়ন। ১৯৯৯ সালে একক মুদ্রার (ইউরো) সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর হয় ২০০২ সালে। যদিও মাত্র ১৯টি দেশ ইউরো চালু করেছে নিজ দেশের মুদ্রাকে অবলুপ্ত করে। ১৯৫১ সালে প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি তার যাত্রা শুরু করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৯৩ সালে। ১৬ দশমিক ৪৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ইইউর যে অর্থনীতি, তা বিশ্বের জিডিপির প্রায় ২৩ শতাংশ। বড় অর্থনীতির এই সংস্থাটি বিশ্ব আসরে এত দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। এখন এতে বিভক্তি আসছে। তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। এই জটিলতা, বিভক্তি, দ্বন্দ্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।

লাস ভেগাসে হত্যাকাণ্ড, আইএস-সংশ্লিষ্টতা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি

লাস ভেগাস হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততা আছে কি নেই, আমার কাছে তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হচ্ছে, আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। এ হত্যাকা-ের আগে স্টিফেন প্যাডক যে ১ লাখ ডলার ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন, এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ফিলিপাইনের জঙ্গি কার্যক্রমে তিনি সহায়তা দিয়ে থাকতে পারেন! এখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুরবস্থার সুযোগে এ রকম দাতা এগিয়ে আসতে পারে। আরেকজন স্টিফেন প্যাডকের জন্ম হতে পারে! তাই রোহিঙ্গা পরিস্থিতির দিকে সবার দৃষ্টি থাকবেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন
ডালাস থেকে লাস ভেগাসের দূরত্ব গাড়িতে ১ হাজার ২১৮ মাইল। ডালাসে আমি বসবাস করি। ছোট শহর, হাইল্যান্ড ভিলেজ। ছিমছাম। মূলত কিছুটা ধনী ব্যক্তিরাই এখানে থাকেন। কোনো অ্যাপার্টমেন্ট নেই। সব নিজস্ব বাড়ি। দীর্ঘমেয়াদি লিজে বাড়ি কিনতে হয়। আমাদের এক প্রতিবেশী গেল ২ অক্টোবর গিয়েছিলেন লাস ভেগাসে। উদ্দেশ্য জুয়া খেলা। পাঠকমাত্রই জানেন, লাস ভেগাস কী জন্য বিখ্যাত। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় বড় ক্যাসিনো, যেখানে জুয়া খেলা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব হোটেলে জুয়া খেলা হয়, সাধারণত সেসব হোটেলে রাত্রীবাস ফ্রি; অর্থাৎ যারা জুয়া খেলতে আসেন, তারা থাকেন ফ্রি, আর জুয়া খেলে হয় হেরে যান, নয়তো আবার জিতে নিয়ে যান মিলিয়ন ডলার। গত ২ অক্টোবর ওই লাস ভেগাসেই ঘটল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকা-। একজন পেশাদার জুয়াড়ি স্টিফেন প্যাডক গুলি করে মারল ৫৯ জন সাধারণ মানুষকে। এ ঘটনায় হতবাক সারা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। আরও অবাক হয়েছে এটা শুনে যে, আইএস অর্থাৎ চরমপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত। আইএস তার দায় স্বীকারও করেছে। আইএসের জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নানা গুজব তৈরি হয়েছে। আসলেই কি আইএস জড়িত? আইএস দাবি করেছে, ৬৪ বছরের প্যাডক এক মাস আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। অনেকটা নিরীহ গোছের মানুষ ছিলেন প্যাডক। তার তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গি দলে যোগদান, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এফবিআই কিংবা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কেউ জানল না? নাকি আইএসের দাবি মিথ্যা? সত্যি হোক, মিথ্যা হোক, আইএস নিয়ে এ দেশে সন্দেহ বাড়ছে। এ ধরনের হত্যাকা- অতীতেও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এককভাবেই এসব হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে, যেসব ঘটনাকে Lone wolf attackহিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
লন্ডনের দি ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে গেল ২৭৫ দিনে ২৭৩টিLone wolf attack-এর ঘটনা ঘটেছে। আর বিখ্যাত সংবাদ সাময়িকী ইকোনমিস্ট ১৯৮২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হত্যাকা- ঘটেছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২০১২ সালের পর থেকে এ ধরনের হামলার প্রবণতা বেড়েছে। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন অরল্যান্ডো নাইটক্লাবে হামলার কথা (২০১৬, মৃত্যু ৪৯ জন); ক্যালিফোর্নিয়ার সানমারডিনোতে হত্যাকা-ের খবর (২০১৫, মৃত্যু ১৪ জন) কিংবা নিউটাউন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হত্যাকা-ের কথা (২০১২, মৃত্যু ২৭ জন)। সেসব হত্যাকা-ের সঙ্গে কখনোই কোনো জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠেনি; এখন উঠছে। উঠেছে এ কারণে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্স, ব্রাসেলস, জার্মানি কিংবা লন্ডনে জঙ্গি আক্রমণ বেড়েছে। আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা, যারা একসময় সিরিয়ায় যুদ্ধে করেছে, তারা এখন ইউরোপে ফিরে গিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গেল ২ বছরে যেসব জঙ্গি আক্রমণ হয়েছে, তাতে আইএসের সংশ্লিষ্টতা থাকা অবিশ্বাস্য কোনো বিষয় নয়। তবে লাস ভেগাসের হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্বীকার করবে কিনা, এটা একটা বড় প্রশ্ন।
যারা বিশ্বব্যাপী জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে কাজ করেন, তারা লক্ষ করেছেন, সিরিয়া-ইরাকের আইএসের কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসছে। আইএস সেখানে পরাজিত হয়েছে অনেকটা। তবে এখানে যেসব জঙ্গি
যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারা এখন সেখান থেকে সটকে পড়েছে। আগামীতে জঙ্গি কার্যক্রম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত হবে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। এক্ষেত্রে দুইটি দেশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন অনেকে। একটি ফিলিপাইনে অপরটি মিয়ানমারÑ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন অক্টোবর (২০১৭) সংখ্যায় অধ্যাপক জাকারি আবুজার (Zachary Abuza)একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ফিলিপাইনের জঙ্গিবাদের প্রসার নিয়ে। অধ্যাপক আবুজা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত  National War Collageএর একজন অধ্যাপক। তার প্রবন্ধের নাম Mayhem in Marawi ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি শহর মারাবি ((Marawi))সেখানে গত মে (২০১৭) থেকে ফিলিপাইনের সেনাবাহিনী আইএস-সংশ্লিষ্ট আবু সায়াফ গ্রুপের সঙ্গে যে যুদ্ধে লিপ্ত, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। গত ৪ মাসে সেখানে জঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন সেনাবাহিনীর ১৪৭ সদস্য এবং ৪৭ জন সিভিলিয়ান। জঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধে ওই শহরটি পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এ যুদ্ধের সঙ্গে সিরিয়া-ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে সিরিয়া ও ইরাকি বাহিনী যে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেনাবাহিনী এখনও মারাবি শহরের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণভার নিতে পারেনি। শহরটি এখন পরিপূর্ণভাবে পরিত্যক্ত। শহরের শতভাগ বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন সম্প্রসারিত হয়েছে ফিলিপাইনে। সিএনএন গেল ২৯ মে (২০১৭) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেÑPhillippines; The next ISIS stronghold?অর্থাৎ ফিলিপাইন কি হতে যাচ্ছে আইএসের পরবর্তী শক্তিশালী ঘাঁটি? ওই প্রতিবেদনে একটি মসজিদে আইএস কর্তৃত্ব তাদের পতাকা উত্তোলন করার দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম। এ অঞ্চলের তিনটি দেশেÑ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ায় গত ২ বছরে যেসব জঙ্গি কর্মকা- হয়েছে এবং যার সঙ্গে আইএস জড়িত, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে সিএনএনের প্রতিবেদনে। পাঠকদের সেখান থেকে কিছু তুলে দিচ্ছিÑ জুন ২৮, ২০১৬ কুয়ালালামপুরের একটি নাইটক্লাবে জঙ্গি হামলায় আটজনের মৃত্যু। জানুয়ারি ১৪, ২০১৬ জাকার্তায় সন্ত্রাসী হামলায় চারজনের মৃত্যু। জাকার্তায় মে ২৪, ২০১৭ সন্ত্রাসী হামলায় তিনজনের মৃত্যু। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের দাভাও শহরÑ সন্ত্রাসী বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু ১৪ জন। আর মারাবির ঘটনা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রতিটি ঘটনায় আইএস তার দায় স্বীকার করেছে। গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন তৎপর, যাদের সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ রয়েছে। যেমন বলা যেতে পারে মরো লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) কথা। এরা তৎপর সুলু দ্বীপপুঞ্জ এলাকায়। সুলু দীপপুঞ্জ এলাকায় Bangsamoro Islamic Freedom Fighters-I (BIFF) তৎপর। জাকার্তায় তৎপর জামেইয়া ইসলামিয়া। আবু সায়াফ গ্রুপ ও মাউটে গ্রুপও তৎপর দক্ষিণাঞ্চলে। আবার ব্রুনাইয়ে আবু সায়াফ গ্রুপ তাদের তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে। সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক Centre for Political Violence and Terrorism Research তাদের এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, আইএস সম্প্রতি সিরিয়া-ফেরত জঙ্গিদের নিয়ে এ অঞ্চলে নতুন একটি ব্রিগেড তৈরি করেছে, যার নাম Katibah Al Muhajirপুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ব্রিগেডের তৎপরতা রয়েছে। এ ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাপিলন নামে এক জঙ্গি। হাপিলন এসেছেন সুলু অঞ্চল থেকে। ২০১৬ সালে আইএস তাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আমির হিসেবে ঘোষণা করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মার্কিনি গোয়েন্দাদের মতে হাপিলন ইংরেজি বা আরবি ভাষা কিছুই বোঝেন না এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার জ্ঞানও সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ধরার জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছে। কয়েক হাজার জঙ্গি বর্তমানে এ অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত। ফলে আগামী দিনগুলোয় এ অঞ্চলে যে অস্থিরতা বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হলো রোহিঙ্গাদের নাম। ফিলিপাইনে জঙ্গি উত্থানের পাশাপাশি এখন রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যেতে পারে বলে অনেক গবেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সিএনবিসি (যুক্তরাষ্ট্র) টিভি চ্যানেল তাদের এক প্রতিবেদনে (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭) বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সুযোগ নিতে পারে। একটি আশঙ্কার কথা বলছেন অনেকে যে, রাখাইন অঞ্চল সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে সুলু অঞ্চলে (মিন্দানাও) অবস্থানরত জিহাদিরা সমুদ্রপথে রাখাইনে যেতে পারে এবং সেখানে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হতে পারে। সুলু অঞ্চল (ফিলিপাইন) আর রাখাইন অঞ্চলের অনেক মিল আছে। অস্ত্র আনা-নেয়া কিংবা সন্ত্রাসীদের মুভমেন্টের জন্য সমুদ্রপথ খুবই উপযোগী। ফলে ফিলিপাইনের জিহাদিরা যদি ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর মারাবি থেকে উৎখাত হয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়, আমি অবাক হব না। এখন পর্যন্ত আরাকানে আরাকান সালভেশন আর্মির খবর আমরা জানি, যাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর বাইরেও আরও কয়েকটি গ্রুপের অস্তিত্ব রয়েছে। মজার ব্যাপার, সালভেশন আর্মি খুব বড় সশস্ত্র সংগঠন নয়। কোচিন লিবারেশন ফোর্স মিয়ানমারের বড় বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এরা কোচিন প্রদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেনি। কোচিনরা ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। বোঝাই যায়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মুসলমানদের টার্গেট করেছে। এখন সালভেশন আর্মি কতটুকু রোহিঙ্গাদের স্বার্থ দেখে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। রোহিঙ্গারা অনেকেই বলেছেন, তারা এ সংগঠনটির ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। এরই মধ্যে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আইএসের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এ অঞ্চলের ব্যাপারে আইএসের আগ্রহ আছে, এটা বোগদাদির একটি বক্তব্যে আমরা জেনেছিলাম ২০১৪ সালেই। এখন নতুন করে ৭ লাখ রোহিঙ্গা (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর স্ট্যাটাস অনুযায়ী) বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের যে জঙ্গিরা টার্গেট করবে, এটা বলাই বাহুল্য। জঙ্গিরা সুযোগটি নেবে। রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে একটি সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। 
লাস ভেগাস হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততা আছে কি নেই, আমার কাছে তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হচ্ছে, আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। এ হত্যাকা-ের আগে স্টিফেন প্যাডক যে ১ লাখ ডলার ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন, এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ফিলিপাইনের জঙ্গি কার্যক্রমে তিনি সহায়তা দিয়ে থাকতে পারেন! এখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুরবস্থার সুযোগে এ রকম দাতা এগিয়ে আসতে পারে। আরেকজন স্টিফেন প্যাডকের জন্ম হতে পারে! তাই রোহিঙ্গা পরিস্থিতির দিকে সবার দৃষ্টি থাকবেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ফিলিপাইনে জঙ্গি কার্যক্রমের পর রাখাইন রাজ্যে জঙ্গি কার্যক্রম কোন দিকে যায়, সেটাই এখন আমাদের সবার দেখার বিষয়। 


আলোকিত বাংলাদেশ ৮ অক্টোবর ২০১৭

মিয়ানমারে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কেন জরুরি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অতি সম্প্রতি ছাপা হয়েছে, যা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথম খবরটি এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।
মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণ-আদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামে এই আন্তর্জাতিক গণ-আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চি ও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্তে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক প্যানেল এই রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেন, যা কিনা জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাঠানো হবে। দ্বিতীয় খবরটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা ও ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা শান্তি দেওয়ার জন্যই এ অর্থ দেওয়া হবে! এখানে বলে রাখা ভালো, ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে; যাকে পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিল। ওই সময় শত শত যুবতী ইয়াজিদি মেয়েকে ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করুণ কাহিনি ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্তে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।
ওপরে উল্লিখিত দুটি সংবাদ বিচ্ছিন্ন হলেও একটা মিল আছে। আর তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। মালয়েশিয়ার পিপিটির কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এটি সিম্বলিক, অর্থাৎ প্রতীকী আদালত। কিন্তু এর একটি প্রতিক্রিয়া আছে। এ ধরনের ঘটনায় একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠনে সহায়তা করে থাকে। রোম স্ট্যাটিটিউটে (১৯৯৮, কার্যকর ২০০২) এ ধরনের আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ইরাকে এ ধরনের আদালত ভবিষ্যতে গঠিত হবে এবং আমার ধারণা, আমরা যদি মিয়ানমারের গণহত্যার ঘটনা সত্যিকারভাবে আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মিয়ানমারের ব্যাপারে একটা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা সম্ভব।

হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বসনিয়া হার্জেগোভিনার কসাই হিসেবে পরিচিত সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের (যিনি ছিলেন সর্বশেষ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট) বিচারের কাহিনি সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। মুসলমানদের ব্যাপক গণহত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বহুল আলোচিত স্রেব্রেনিচা গণহত্যার কাহিনি (১১-১৩ জুলাই ১৯৯৫) অনেকে স্মরণ করতে পারেন। ওই গণহত্যায় একটি কমিশন প্রমাণ পেয়েছিল যে আট হাজার ৩৭৩ জনকে (যাদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান) হত্যা করা হয়েছে, যাদের মাঝে ছিল শিশু, মহিলা ও কিশোর। এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্লোবোদান মিলোসেভিচ। সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা গণহত্যার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই ট্রাইব্যুনালের অস্তিত্বকাল ছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মিলোসেভিচ কারাগারে মারা গেলে এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জাতিসংঘ কসোভো গণহত্যার জন্যও মিলোসেভিচকে অভিযুক্ত করেছিল। এবং উভয় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর বিচার শুরু হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গণহত্যার, জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের, হত্যার, বিনা অভিযোগে বন্দি করে রাখা ও নিপীড়ন করার। ট্রাইব্যুনাল তাঁর মৃত্যুতে কোনো রায় দেননি। কিন্তু মোট ৬৬টি ঘটনা, হত্যাকাণ্ড ও জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি। রুয়ান্ডায় গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ওই সময়কার হুতু-তুতসি দ্বন্দ্ব ও গণহত্যার খবর। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত (৯৫৫) অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ প্রথম দিকে নির্লিপ্ত ছিল। এমনকি জাতিসংঘ প্রথম দিকে সেখানে যে গণহত্যা হয়েছে, তা স্বীকারও করেনি (রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ গণহত্যার কথা বলেছে)। কেননা গণহত্যা স্বীকার করলে সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী পাঠাতে হয়। একমাত্র গণহত্যা বন্ধের পরই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে একটি তথ্য অনুসন্ধান টিম পাঠাতে রাজি হয়। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের নামে সেখানে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। রুয়ান্ডায় হুতুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর তুতসি উপজাতির লোকেরা ছিল সংখ্যালঘু। আর সংখ্যালঘু তুতসিরাই গণহত্যা, ধর্ষণ আর জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়। প্রায় পাঁচ লাখ থেকে ৯ লাখ মানুষ এই জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে (১৯৯৪) মারা গিয়েছিল। বিচারে ৬১ জন গণহত্যাকারীর বিচার হয়েছিল। তাদের মধ্যে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পল কাগামের (যিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে ফ্রান্সের একটি আদালতে এখন বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সুদানের দারফুরে (পশ্চিম সুদান) গণহত্যার কথাও আমরা উল্লেখ করতে পারি। ২০০৩ সালে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। এ হত্যাকাণ্ডে সরকারি কর্মকর্তারা ও জানজাভেদ নামে একটি মিলিশিয়া গ্রুপ জড়িত ছিল। তারা দারফুরে বসবাসকারীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। মানুষজন হত্যা করেছিল। প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রায় ২৮ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। দারফুরের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (হেগে) গঠিত হয়েছিল এবং ২০০৯ সালের ৪ মার্চ আদালত সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বসিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে চীন ও রাশিয়া সুদানের ওমর আল বসিরকে সমর্থন করেছে। সুদানে এই দেশ দুটির যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। দারফুরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৭ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ২৬ হাজার শান্তিরক্ষী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এখানে আছে) সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু গণহত্যার জন্য কারো বিচার হয়েছেতেমনটি শোনা যায় না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর কোন কোন দেশে, যেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেখানে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গোতে ২০০৪ সালে, কম্বোডিয়ায় ২০০১ সালে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে যারা জড়িত, তাদের বিচার করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বিচারকার্য এখনো চলছে। আজ মিয়ানমারে যে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান তথা গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তা খোদ বাংলাদেশেই নয়, বরং জাতিসংঘও একে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা জেইদ রাদ আল হুসেইন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এই পাশবিকতার ঘটনা পাঠ্যপুস্তকের জন্য জাতিগত নিমূর্লের একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। রয়টার্স হুসেইনের বক্তব্য উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস-এর এক প্রতিবেদনে (Myanmar, Cambodia, and the oppurtunity for the U.S. Congress, September 07, 2017) বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে জাতিসংঘের সিরিয়াসলি কিছু করা উচিত। প্রতিবেদনে সিনেটর ম্যাককেইন ও কংগ্রেসম্যান এডওয়ার্ড রয়েস অং সান সু চিকে যে সহিংসতা বন্ধে চিঠি লিখেছেন, তা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে মিয়ানমারে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি শুনানি করার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। এই পাঁচ দফায় আছে(১) অবিলম্বে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, (২) জাতিসংঘের মহাসচিবের উচিত রাখাইনে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানো, (৩) মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, (৪) রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, (৫) কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর এ প্রস্তাবের ব্যাপারে অনেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত ও কার্যকর একটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো মিয়ানমারের সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরানি প্রেসিডেন্ট কিংবা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও আমরা একই সুর পেয়েছি। অর্থাৎ সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এর আগে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এগুলো অনেকটা এ রকম : ১. রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা, ২. একটি নিরাপদ এলাকা বা সেফ জোন প্রতিষ্ঠা করা, ৩. বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা যাতে নিজ বাসভূমে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করা, ৪. কফি আনান কমিশনের প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ৫. রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রপাগান্ডা বন্ধ করা, ৬. রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে না ফেরা পর্যন্ত তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। উভয় প্রস্তাবে মিল আছে যথেষ্ট। তবে আমি খুশি হতাম যদি ওই প্রস্তাবের সঙ্গে আরো একটি প্রস্তাব থাকত, যেখানে বাংলাদেশ গণহত্যার সুষুম তদন্ত দাবি করত। এটি একটি ন্যায্য দাবি। আমার ধারণা, ওআইসির দেশগুলো গণহত্যা বিচারের দাবিকে সমর্থন করবে।

আমরা বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। সেই বিচার এখনো চলছে। বিশ্বের যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, বাংলাদেশ তার সমলোচনা করেছে। এখন সু চি রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে ভুল তথ্য দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য খণ্ডন করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ তথ্য-প্রমাণসহ কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের রাখাইনে যাওয়ার দাবিও বাংলাদেশ করতে পারে। সেই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআর যাতে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করতে পারে সে ব্যাপারে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ জোর দিতে পারে।


বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ। এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করেছে। কিন্তু এটা যে একটা নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে থাকতে পারে না। এরই মধ্যে সু চি এক ভাষণে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। এখন এর প্রতিবাদই নয়, বরং এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্যও বাংলাদেশকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো তৎপর হতে হবে। আমাদের ব্যর্থতা রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য এ অঞ্চলে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিতে পারে, যা কিনা পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দিতে পারে ভবিষ্যতে। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এটি একটি পজিটিভ চিন্তাধারা। এখন রোহিঙ্গা প্রশ্নে শুধু মিয়ানমারের সঙ্গেই আলোচনা নয়, বরং বহুপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। খুব দ্রুত নয়াদিল্লি ও পেইচিংয়ে বিশেষ দূত পাঠানো উচিত। সনাতন কূটনৈতিক চ্যানেলের পাশাপাশি রাজনৈতিক চ্যানেলেও এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

মিয়ানমারের গণহত্যার বিচার কি আদৌ হবে

ন্তর্জাতিক সাম্প্রদায় মোটামুটিভাবে এখন নিশ্চিত হয়েছে যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা হয়েছে। এই গণহত্যায় শুধু মুসলমানদেরকেই যে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনটি নয়। বরং দেখা গেছে হিন্দুরাও আক্রান্ত্ম হয়েছে এবং তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে এসব গণহত্যাকারীর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আদৌ বিচার হবে কি-না। অতীতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। প্রায় ÿেত্রেই তার বিচার হয়েছে এবং দোষীদের শাস্ত্মি দেয়া হয়েছে। তবে এখানে বড় বাধা এখনও বৃহৎ শক্তিগুলো। বৃহৎ শক্তিগুলো যদি না চায়, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ বিচারের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত্ম নিতে পারবে না। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত্ম আমরা জাতিসংঘ থেকে যে খবর পেয়েছি, তাতে গণহত্যা কারীদের বিচারের কোনো কথা বলা হয়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বড় ধরনের মানবিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এদের, অর্থাৎ যারা বাংলাদেশ আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সাহায্য করার কথা বলেছে। কিন্তু এটাই সব নয়। যদি গণহত্যাকারীদের বিচার না হয়, তাহলে সেখানে গণহত্যাকারীদের হত্যাকা-কে সমর্থন করা হবে! এমনকি অন্যত্র যেসব হত্যাকা- হয়েছে (বসনিয়া, রম্নয়ান্ডা, সুদান), তাদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই মিয়ানমানের গণহত্যাকারীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। এদিকে মিয়ানমারের ওপর আন্ত্মর্জাতিক সম্প্রদায়ের 'চাপ' ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু তাতে মিয়ানমার সরকার এতটুকু নরম হয়েছে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত্ম সেখানে একটি অনুসদ্ধান টিম পাঠালেও, মিয়ানমার সরকার তাদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়নি। একটি আশঙ্কাজনক খবরও আমরা পেয়েছি আর তা হচ্ছে যেসব বাড়িঘর থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উৎখাত করা হয়েছে। সেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পুনর্বাসন হচ্ছে। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ওইসব বাড়ি-ঘর দখল করে নিচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কয়েক লাখ মিয়ানমারের নাগরিককে মিয়ানমার সরকার ফিরিয়ে নেবে, এখন কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। ফলে মিয়ানমার সরকারের অনাগ্রহের কারণে রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা বাড়ছে। এখনও রাখাইনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব সংগতকারণেই তাই সেখানকার যুদ্ধপরাধীদের বিচার জরম্নরি। সেব্রেনিসকায় কী হয়েছিল, তার কথা কী মনে আছে আপনাদের? সেইসব গণহত্যার (সেব্রেনিসকা, বসনিয়া) সাথে আজ মিয়ানমারের রাখাইনে যে গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে, তার সঙ্গে অদ্ু্ভত এক মিল আছে। সাব্রা ও সাতিলার (ংধনৎধ ধহফ ংযধঃরষধ) কথা মনে আছে। সাব্রা ও সাতিলা ছিল ফিলিস্ত্মিনিদের শরণার্থী ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে ইসরাইলি বিমান বোমা হামলা চালিয়ে ১৯৮২ সালের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ২০০০ ফিলিস্ত্মিনি শিশু, কিশোর আর মহিলাদের হত্যা করেছিল। সারা বিশ্বব্যাপী এর প্রতিবাদ উঠলে ইসরাইল একটি তদন্ত্ম কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত্ম কমিটি তৎকালীন প্রতিরÿামন্ত্রী (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) এরিয়েল শ্যারনকে দোষী সাব্যস্ত্ম করেছিল। শ্যারন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে শারনের কী হয়েছিল, তা অনেকের মনে থাকার কথা। তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর কোমায় থাকার পর তার মৃতু্য হয়েছিল। গণহত্যাকারীদের এভাবেই বিচার হয়। আর সেব্রেনিসকা? সেব্রেনিসকা হচ্ছে বসনিয়া হারজেগোভিনার একটি শহর। অধিবাসীদের অধিকাংশই মুসলমান। সেখানে সার্ব বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল (১৯৯৫ সালের ১১-১৩ জুলাই), তাতে ৮৩৭৫ জন মুসলমান নাগরিককে হত্যা করেছিল সাব যুদ্ধাপরাধীরা। আজ রাখাইনে যে গণহত্যা হয়েছে (যা জাতিসংঘ স্বীকার করেছে), তার সাথে সাব্রা-সাতিলা কিংবা সেব্রেনিসকার গণহত্যার অদ্ভুত এক মিল আছে। রাখাইনে শত শত গ্রাম আগুন নিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে সেখানকার সেনাবাহিনী যে নারকীয় ঘটনার সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসে এর সাথে হিটলারের গ্যাস চেম্বারে যে শত শত নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল, তার সাথে মেলান যাবে। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার নারী-পুরম্নষ ও শিশু দিনের পর দিন না খেয়ে হেঁটে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে- এ কাহিনী তো আজ সারাবিশ্বের মানুষ জানে। বিশ্ব মিডিয়ায় আজ স্থান পেয়েছে রোহিঙ্গাদের করম্নণ কাহিনী। পাঠক, ÿ্য করবেন সিরিয়া, লিবিয়া আর ইরাক থেকেও এভাবে লাখ লাখ শরণার্থী, যারা প্রায় সবাই ছিল মুসলমান, তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই প্রবণতা এখন আর সিরিয়াতে নেই বটে, কিন্তু ইতিমধ্যেই এসব অঞ্চলে ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ দেশান্ত্মরিত হয়েছে। সিরিয়া-ইরাকের পর এখন মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট, সেখানে মুসলমান শূন্য করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রাখাইনের অর্ধেকের বেশি মানুষ তাদের নিজ বাসভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অথচ সু চি এদের নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা মিথ্যাচারে ভরা। যে জন্য তাকে নোবেল শান্ত্মি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। তা এখন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। 
তিনি রাখাইন 'শান্ত্মি' নিশ্চিত করার পরিবর্তে এই সংকটককে আরও উসকে দিলেন। স্পষ্টতই মিয়ানমারের জেনারেলরা যা তাকে শিখিয়েছেন, তিনি তোতা পাখির মতো তা আউড়ে গেলেন মাত্র। তার ওই বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি নিজেও চাচ্ছেন রোহিঙ্গা মুসলমানরা দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে যাক। লÿ ÿ রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশে আশ্রয়। তাদের ওপর অত্যাচারের করম্নণ কাহিনীতে সারাবিশ্বের মানুষ যখন প্রতিবাদমুখর ও গণহত্যার দায়ে তার এবং সেই সাথে শীর্ষ স্থানীয় সেনা কমান্ডারদের বিচারের দাবি এখন জোরদার হচ্ছে তখন সু চি জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দিয়েছিলেন। বিশ্বের সর্বত্র তার ভাষণের ব্যাপারে একটা আগ্রহ ছিল। তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে কী বলেন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তার কর্মসূচি কী, এসব ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ছিল। সুতরাং তার ভাষণ নিয়ে সর্বত্র একটা আগ্রহ তৈরি হলেও তিনি হাতাশ করেছেন। এমনকি বিবিসির সাংবাদিকরা পর্যন্ত্ম তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতন প্রশ্নে মিথ্যা কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। মনে হচ্ছে সেনা শাসকরা যা তাকে শিখিয়েছেন তিনি তাই বলেছেন। তিনি তার ভাষণে মূল যে কথাগুলো বলেছেন, তা অনেকটা এরকম : ক. ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সামরিক বাহিনীর অভিযান বন্ধ রয়েছে, খ. রাখাইনে সবার জন্য শিÿা ও স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, গ. ৫০ ভাগ রোহিঙ্গা পালিয়েছে; ঘ. মুসলমানদের মিয়ানমার থেকে দলে দলে পাঠানো রহস্যময় ঙ. রাখাইনে আন্ত্মর্জাতিক পর্যবেÿকদের ঢুকতে দেয়া হবে ইত্যাদি। এসব বক্তব্যের মধ্যে সত্যতা আছে কতটুকু? পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই ঐতিহাসিকভাবেই রাখাইন স্টেটের মানুষ রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। এবং আন্ত্মর্জাতিকভাবে তা স্বীকৃতও বটে। কিন্তু সূ চি একবারও তার ভাষণে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেননি। তিনি বলেছেন, বাঙালি এবং মুসলমান। এর অর্থ হচ্ছে তিনি তার অবস্থান এতটুকুও পরিবর্তন করেননি। তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? তিনি 'যাচাই-বাছাই' সাপেÿে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার কথা বলেছেন কিন্তু তা সম্ভব কীভাবে? যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকের কাছেই নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো কাগজপত্র নেই। তাহলে তাদের নাগরিকত্ব সু চি সরকার নিশ্চিত করবেন কীভাবে? এটা একটা ভাঁওতাবাজি। 'লোক দেখানোর' নামে হয়তো আগামীতে কিছু শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার। কিন্তু অনেককেই তারা নেবে না। ফলে উখিয়া, টেকনাফে যে বিশাল রোহিঙ্গা জনবসতি গড়ে উঠছে তারা অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে থাকতে বাধ্য হবেন বছরের পর বছর। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সেনা অভিযান বন্ধ রয়েছে বলে যে কথা সু চি বলেছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা। কেননা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বিবিসি কিংবা আল জাজিরা যেসব সংবাদ প্রচার করেছে। তাতে স্পষ্ট দেখা গেছে, রোহিঙ্গা অধু্যষিত অঞ্চলে ফের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাহলে সূ চির বক্তব্যের পেছনে সত্যতা থাকল কোথায়? রাখাইনে সবার জন্য শিÿ, স্বাস্থ্যের সুবিধা আছে দাবি করেছেন সু চি। এটা যে কত বড় মিথ্যা কথা, তা রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা যে সাÿাৎকার দিয়েছে, তাতেই প্রমাণিত হয়েছে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়েছে করম্নণ কাহিনী যেখানে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের অন্যদের থেকে আলাদা করা হয়েছিল। প্রাথমিক স্কুলের শিÿা পাঠ শেষ হওয়ার পর কোনো রোহিঙ্গাকেই মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ শিÿার কোনো সুযোগ দেয়া হতো না। এরা এক অঞ্চল খেকে অন্য অঞ্চলে যেতে পারত না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তো চিন্ত্মাও করা যায় না। এমনকি বিয়ে করার জন্য তাদের অনুমতি নিতে হতো। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্ত্মর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে রাখাইন অঞ্চলে ২১৪টি গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সংস্থাটি স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবি তুলে দেখিয়ে দিয়েছে আগে ওইসব গ্রামে কি অবস্থা ছিল আর এখন কি অবস্থা হয়েছে। তাহলে সু চির কথায় যুক্তি থাকে কতটুকু


শতকরা ৫০ ভাগ মুসলমান পালিয়েছে। তাদের পালানো রহস্যজনক এ কথা বলেছেন সু চি। জীবন রÿার্থে যারা দিনের পর দিন না খেয়ে পাহাড় অতিক্রম করে শুধু বেঁচে থাকার আশায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা কেন পালাবে, তাদের তো বাধ্য করা হয়েছে। এই বাধ্য করার বিষয়টিকে সু চি আখ্যায়িত করেছেন 'পালানো' হিসেবে। আমার দুঃখ লাগে এই মানুষটির জন্য যখন তিনি দেশে অন্ত্মরীণ ছিলেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ তার মুক্তি দাবি করেছে। তার জন্য প্রার্থনা করেছে। তাকে নিয়ে আশাবাদী হয়েছে। অথচ তিনি যে একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ। প্রচ- মুসলমান বিদ্বেষী মানুষ, তা আমরা প্রথম জানতে পেরেছিলাম যখন তিনি অন্ত্মরীণ অবস্থা থেকে মুক্তি পান। সেই ২০১৫ সালের কথা তিনি তখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তখনও তিনি স্বীকার করে নেননি রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। আন্ত্মর্জাতিক সম্প্রদায় যখন মিয়ানমারের গণহত্যার ব্যাপারে সোচ্চার, যখন নিরাপত্তা পরিষদের ৭টি দেশ (মোট দেশ ১৫টি) নিরাপত্তা পরিষদে (জাতিসংঘ) মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে আলোচনার দাবি তুলেছে। ঠিক তখনই সু চি বিভ্রান্ত্ম বাড়ানোর জন্য নতুন করে আবার প্রস্ত্মাব করেছেন। কিছু শরণার্থীকে ফেরত নেয়া হবে! এটা এক ধরণের কালÿেপণ। অতীতেও অমরা দেখেছি, যারা বাংলাদেশে এসেছিল (১৯৭৮, ১৯৯২), তাদের একটা বড় অংশকেই তারা ফেরত নেয়নি। এটা তাদের এক ধরনের কৌশল। আলাপ আলোচনার নাম করে সময় ÿেপণ করা। তারা কখনই পুরো শরণার্থীদের ফেরত নেবে না। তথাকথিত আলাপ আলোচনার নামে সময় ÿেপণ করবে। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। মুসলমান শূন্য রাখাইনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদের পুনর্বাসন করা। গত ২২ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্রে এরকম একটি সংবাদই প্রকাশিত হয়েছে। শরণার্থী রোহিঙ্গা মুসলমানরা কেউই আর তাদের বসতবাড়ি ফেরত পাবে না। আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে তারা প্রমাণপত্রও দেখাতে পারবেন না। ফলে আশঙ্কটা হচ্ছে তাদেরকে ফিলিস্ত্মিনিদের মতো ক্যাম্প জীবনযাপন করতে হতে পারে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন একটি খবর এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণআদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে পিপলস ট্রাইবু্যনাল (পিপিটি) নামে এই আন্ত্মর্জাতিক গণআদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চিও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত্ম করেছে। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্ত্মে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত সদস্যদের বিচারক 
প্যানেল এই রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের জজ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেন, যা কি-না জেনেভায় জাতিসংঘ সাধারণ কাউন্সিলে পাঠান হবে। দ্বিতীয় খরবটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানের সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে। এই টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা ও ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন এই প্রস্ত্মাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) দেয়ার প্রতিশ্রম্নতি দেয়। যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা 'শান্ত্মি' দেয়ার জন্যই এই অর্থ দেয়া হবে। এখানে বলে রাখা ভালো ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজেদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। যাকে পরবর্তীতে জাতিসংঘ 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করেছিল। এ সময় শত শত যুবতি ইয়াজেদি মেয়েদের ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করম্নণ কাহিনী ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত্ম অনুযায়ী ইয়াজেদি সম্পদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্ত্মে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে। সুতরাং আমরাও চাইব মিয়ানমারে মুসলিম গণহত্যার ব্যাপারে একটি আন্ত্মর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হোক। 

জার্মানির নির্বাচন ও ইউরোপে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান

গত ২৪ সেপ্টেম্বর জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনে নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত অলন্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) পার্টি প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে যাওয়ায় তা শুধু একটি বড় ধরনের ঘটনারই জন্ম দেয়নি, বরং ইউরোপের সনাতনপন্থি রাজনীতিবিদদের একটি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চিন্তাটা হচ্ছে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান। এই ডানপন্থি উত্থান ইতোমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশে বিস্তৃত হয়েছে। জার্মানি বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বলা যেতে পারে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পর জার্মানিই হচ্ছে ইউরোপের নেতা। এখন সেই জার্মানিতেই যদি নব্য নাজিবাদের উত্থান ঘটে, তা যে একটা খারাপ সংবাদ বয়ে আনল, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এএফডির জন্ম মাত্র ৪ বছর আগে ২০১৩ সালে। মূলত মুসলমান বিদ্বেষ আর ব্যাপক হারে জার্মানিতে শরণার্থী আগমনকে কেন্দ্র করে (২০১৫ সালে ১৩ লাখ সিরীয়-ইরাকি শরণার্থীর জার্মানি প্রবেশ) এই দলটির জন্ম হয়। ইতোমধ্যে তারা জার্মানির ১৬টি প্রদেশের মধ্যে ১৩টি প্রদেশ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাবেক পূর্ব জার্মানি যেখানে এক সময় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানে এই দলটির (এএফডির) প্রতিপত্তি বেশি। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল নিজেও পূর্ব জার্মানি থেকে এসেছেন। নির্বাচনে এএফডি শতকরা ১২ দশমিক ৬ ভাগ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে ৯৪টি আসন (মোট আসন ৭০৯) নিশ্চিত করেছে। সংখ্যার দিক থেকে ৯৪টি আসন খুব বেশি নয়। কিন্তু ভয়টা হলো ইউরোপের প্রতিটি দেশে উগ্র ডানপন্থিরা একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। যেমন অস্ট্রিয়াতে ফ্রিডম পার্টি ভোট পেয়েছে ৩৫.১ (২০১৬), বেলজিয়ামে নিউ ফ্লেমিস অ্যালায়েন্স ২০.৩ ভাগ ভোট (২০১৪), ব্রিটেনে ইউকে আইপি ১২.৭ ভাগ ভোট (২০১৫), ডেনমার্কে পিপলস পার্টি ২১.১ ভাগ ভোট (২০১৫), ফিনল্যান্ডে ফিনস পার্টি ১৭.৭ ভাগ (২০১৫), ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২৭.৭ ভাগ (২০১৫), হাঙ্গেরিতে ফিডেস-কেডিএনপি ৪৪.৮ ভাগ (২০১৪), হল্যান্ডে পার্টি অব ফ্রিডম ১৩.১ ভাগ (২০১৭), পোল্যান্ড ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ৩৭.৬ ভাগ (২০১৫), সেøাভাকিয়ায় ন্যাশনাল পার্টি ৮.৬ ভাগ (২০১৬), সুইডেনে ডেমোক্রেটস ১২.৯ ভাগ (২০১৪), কিংবা সুইজারল্যান্ডে পিপলস পার্টি ২৯.৪ ভাগ (২০১৫)। এখন এসব উগ্র দক্ষিণপন্থি দলের তালিকায় যুক্ত হলো এএফডির (জার্মানি) নাম। অথচ এই দলটি ২০১৩ সালে পেয়েছিল মাত্র ৪.৭ ভাগ ভোট। ফলে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। শতকরা ৫ ভাগ ভোটের দরকার হয় পার্লামেন্টে যেতে। এই উগ্র ডানপন্থির উত্থান এখন ইউরোপের জন্য একটা হুমকি।
জার্মানিতে মের্কেল ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছেন বটে। কিন্তু এই নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, কট্টর দক্ষিণপন্থি ও নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত এএফডির উত্থান প্রমাণ করল, জার্মানিতে কট্টরপন্থিদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। আগামীতে এরা সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। জার্মানির ১৬টি স্টেটের মধ্যে ১৩টি স্টেটের পার্লামেন্টে এদের প্রতিনিধিত্ব আগেই নিশ্চিত হয়েছিল। এখন কেন্দ্রে এদের অবস্থান তৃতীয়। সবচেয়ে বড় স্টেট এবং কনজারভেটিভদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত বায়ার্ন প্রদেশে ১৯৪৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো সিএসইউ (সিডিইউর বিকল্প দল শুধু বায়ান স্টেটে) সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। এখানে এএফডি ভালো করেছে। ফলে আশঙ্কা থাকলই ধীরে ধীরে এএফডি সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। আমরা যেন ভুলে না যাই এডলফ হিটলার ও তার নাজি পার্টি জার্মানিতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল এবং হিটলার নির্বাচিত চ্যান্সেলর হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন। এখন এএফডি কী ধীরে ধীরে নাজি পার্টির অবস্থানে যাচ্ছে, সেটাই দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে ইউরোপে ব্যাপক শরণার্থী (সিরীয়, ইরাকি ও আফগানি) আফগানকে কেন্দ্র করে পুরো ইউরোপের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যায়। কট্টরপন্থিদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিজয় এই দক্ষিণপন্থি উত্থানকে আরও উৎসাহিত করেছে। ওই সময় দশ লাখের অধিক সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মের্কেল সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ তার সমালোচনা করেছিল। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিক বরাবরই সিরীয়-ইরাক শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার বিপক্ষে ছিল। মের্কেল যখন জার্মানিতে এসব শরণার্থী আসার সুযোগ করে দেন, তখন এই তিনটি দেশের সরকারপ্রধানরা এর সমালোচনা করেছিলেন। এখন তারা নতুন করে যুক্তি তুলবেন যে, তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। জার্মান নির্বাচন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় কট্টরপন্থিদের আরও উৎসাহিত করবে। অক্টোবর মাসে চেক রিপাবলিকের নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন্দ্রেই বাবিস ও তার দল ভালো করবে বলে সবার ধারণা। বাবিস অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্প স্টাইলে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান। বাবিস একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। চেক রিপাবলিকে তার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলারের মালিক। তিনি নিজে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান কিংবা পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের নেতা জারুজলাভ কাসিনিস্কির মতো দক্ষিণপন্থি নেতাদের উত্থান পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতির দৃশ্যপটকে বদলে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যেসব মডারেট নেতা আছেন, বিশেষ করে মের্কেল কিংবা ম্যাক্রোঁর (ফ্রান্স) মতো নেতাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, জার্মানিতে সম্ভাব্য একটি কোয়ালিশন সরকার (সিডিইউ-সিএমইউ, এফডিপি আর গ্রিন) যদি গঠিত হয়, তা হলে এই সরকারকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গেলা মের্কেল কতটুকু এই ঐক্যকে ধরে রাখতে পারবেন, এটাও একটা প্রশ্ন। কেননা অনেকগুলো জাতীয় প্রশ্নে এফডিপি ও গ্রিন পার্টির মধ্যে নীতিগতভাবে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি প্রশ্নে বড় পার্থক্য রয়েছে, তা হচ্ছেÑ গ্রিন পার্টি চাচ্ছে আগামীতে ২০টি কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার। কিন্তু ব্যবসাবান্ধব এফডিপি এর পক্ষে। তা হলে সমঝোতা হবে কীভাবে? এই মতপার্থক্য জার্মানিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি সংখ্যালঘু সরকার হয়তো গঠিত হতে পারে। কিন্তু মের্কেল তা চাচ্ছেন না। চতুর্থত, এএফডির বিজয় সরকারকে শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রায় ৮ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। তবে ২০১৭ সালে এই সংখ্যা কম। শুধু তাই নয়, জাতিগত বৈষম্যও বেড়ে যেতে পারে। এএফডির শীর্ষ নেতা আলেকজান্ডার গাউল্যান্ড গ্রিন পার্টির নেতাদের সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা অনাকাক্সিক্ষত। তিনি বলেছেন, এদের তুরস্কে চলে যাওয়া উচিত। জার্মানির অতীত নিয়ে তিনি প্রশংসামূলক মন্তব্য করেছেন, যা বিতর্ক বাড়িয়েছে। জ্যামাইকা কোয়ালিশন আগামীতে সরকার পরিচালনা করবে। কিন্তু সেই সরকার থাকবে নড়েবড়ে। ৭০৯ সিটের পার্লামেন্টে তাদের হাতে থাকবে মাত্র ৩৯৩ আসন। তাই বোঝাই যায় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া মের্কেলের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। টানা চারবার চ্যান্সেলর হয়ে অ্যাঙ্গেলা মের্কেল ইতিহাসে নাম লেখালেন। এক সময় পূর্ব জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষাবিদ (যার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে) রাজনীতিতে এসেছিলেন দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পরই। অতি সাধারণ জীবনযাপন করা মের্কেল এক সময় পূর্ব জার্মানিতে ছিলেন যখন তিনি বাসা ভাড়া দিতে পারতেন না। সঠিক নীতি, সাধারণ জীবন, শরণার্থীদের ব্যাপারে তার সহানুভূতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যকে ধরে রাখা, ট্রাম্পের কট্টরনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাকে বিশ্ব রাজনীতিতে অসাধারণ করেছে। তিনি এক সময়ের জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। অব্যাহত কট্টরপন্থিদের উত্থানের বিরুদ্ধে সীমিত কিছু কোয়ালিশন সিট নিয়ে তিনি আগামীতে কীভাবে জার্মানির নেতৃত্ব দেন, সেটাই দেখার বিষয়। তবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে কেন মানুষ এএফডির মতো দলকে ভোট দিল, তা খতিয়ে দেখা। মানুষ কী প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে এএফডিকে ভোট দিল? শুধু জাতিগত বৈষম্য, মুসলমান বিদ্বেষ কিংবা শরণার্থী বিরোধিতাই কী এএফডিকে জনপ্রিয় করল? এসব এখন খতিয়ে দেখতে হবে। মের্কেল কথা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বাধ্য হয়ে এএফডিকে সন্তুষ্ট করার জন্য যদি তার নীতিতে পরিবর্তন আনেন, তা হলে তা জার্মানির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। এএফডি চাচ্ছে ইউরো জোন থেকে জার্মান বেরিয়ে আসুক। এটা নিশ্চয়ই মের্কেল করবেন না। কিন্তু তিনি চাপে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কার আসতে পারে। ইইউতে জার্মানি বড় দেশ। দেশটির যে কোনো সিদ্ধান্ত ইইউর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণপন্থিদের ব্যাপক উত্থান পুরো ইউরোপের চেহারা আগামীতে বদলে দিতে পারে। শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। নির্বাচনে তেরেসা মে যেখানে সুবিধা করতে পারেননি। তিনি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন আরেকটি দলের ওপর। এখন অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের অবস্থা হতে যাচ্ছে তেমনটি। কট্টরপন্থি এএফডিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তাকে এখন দুটি বড় দল ও কোয়ালিশন পার্টনার এফডিপি ও গ্রিন পার্টিকে ছাড় দিতে হবে। এই দল দুটির মধ্যেও সমন্বয় করতে হবে। তিনি যদি ব্যর্থ হন, তা হলে নয়া নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই ঝুঁকিটি এ মুহূর্তে কোনো দলই নিতে চাইবে না। কেননা দ্রুত আরেকটি নির্বাচন মানে এএফডিকে আরও সুযোগ করে দেওয়া। নয়া নির্বাচন এএফডিকে একটি দরকষাকষি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি ক্ষমতাসীন সিডিইউ-সিএসইউকে বাধ্য করতে পারে গ্রিন পার্টিকে বাদ দিয়ে তাদের কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিতে! শুধু তাই নয়, সিডিইউর নেতৃত্ব থেকে মের্কেল সটকে পড়তে পারেন। আগামী ২৪ অক্টোবর পার্লামেন্টের অধিবেশন বসছে। মের্কেল চ্যান্সেলরের দায়িত্ব নেবেন। মোট চার-চারবার তিনি জার্মানিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। তিনি কনরাড অ্যাডেনাওয়ার হেলমুট কোল কিংবা উইলি ব্রান্ডের নামের তালিকায় নিজের নামটি অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হলেন বটে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি। কট্টর দক্ষিণপন্থির উত্থান ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থান এই শক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন দেখার পালা ইউরোপ আগামীতে কোন দিকে যায়। ইউরো জোনের ব্যর্থতা আর কট্টরপন্থিদের উত্থান যদি ইইউতে ভাঙন সৃষ্টি করে আমি অবাক হব না।