রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ঈদ-পরবর্তী রাজনীতির চালচিত্র

রাজনীতিতে মোটামুটিভাবে একটি ‘নির্বাচনী আমেজ’ এসে গেছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের ভেতরে যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তিনি ‘নৌকার পক্ষে’ ভোট দেয়ার কথা বলছেন। তিনি উন্নয়ন কর্মকা- আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ারও আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া এখনও ব্যস্ত মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে। কোনো না কোনো মামলায় তাকে প্রতি মাসেই কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন ইফতার পার্টিতে রাজনীতি নিয়ে তিনি কথা বলছেন। নির্বাচন নিয়েও কথা বলছেন। তবে ১৪ জুন খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক ইফতার মাহফিলে তিনি এই প্রথমবারের মতো ‘ধানের শীষে’ ভোট চেয়েছেন। এর আগে আর কখনও এভাবে তাকে ভোট চাইতে দেখা যায়নি। তিনি ভোট চেয়েছেন। আবার একই সঙ্গে বলেছেন, ‘সংসদ নির্বাচন একতরফাভাবে হতে দেয়া হবে না!’ এর অর্থ বিএনপি নির্বাচন নিয়ে ভাবছে। ওই অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীদের এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচন হবে সবার অংশগ্রহণে। শেখ হাসিনা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। মানুষ বুঝে গেছে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করলে ফল কী হয়। নির্বাচন হবে সহায়ক সরকারের অধীনে (যুগান্তর, ১৫ জুন)। এখানেই মূলত মূল আলোচনা নিবদ্ধ। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার যদি সাজা হয়ে যায়, তাহলে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা? দ্বিতীয়ত, একটি সহায়ক সরকারের কথা বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। এখন যদি সহায়ক সরকার (নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য) গঠন করা না হয়, তাহলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা? বিষয় দুইটি বিএনপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা নিয়েও বিএনপির নেতাদের মাঝে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় একবার বলেছিলেন, ‘কীসের জেল, কী কারণে জেল?’ (সমকাল, ৬ মার্চ)। আর মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, ‘সাজা হলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।’ খালেদা জিয়ার মতোই তিনি সম্প্রতি তার বাড়ি হারিয়েছেন। খালেদা জিয়া হচ্ছেন দলের মূল কা-ারি। তার যদি সাজা হয়েই যায় (?), আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন কিনা, সে প্রশ্ন থাকবেই। একই সঙ্গে এসে যাবে মূল প্রশ্নটিও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা? এক্ষেত্রে সরকারি দলের নেতাদের উৎসাহ অনেক বেশি। আকারে-ইঙ্গিতে তারা বারবার বলে আসছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে! এখন বিএনপি কী করবে, তার দিকে শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরাই নন, বরং দেশবাসীর দৃষ্টি এখন এদিকে। গয়েশ্বর রায়ের পাশাপাশি রিজভী আহমদের বক্তব্যও অনেকটা তেমনই। একদিকে বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে রেখে তারা নির্বাচনে যেতে চান না! কিন্তু নির্বাচন হবে তো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ও সংবিধানের অধীনে। এক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলেও সরকার নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে, যেমনটি করেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। বিএনপি এখন একটি ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের’ কথা বলছে। কিন্তু এর রূপরেখা এখন অবধি উপস্থাপন করেনি। তবে সেই রূপরেখা সরকার যে মানবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। মোটামুটিভাবে যেভাবেই হোক একটি নির্বাচনী আমেজ ফিরে এসেছে। টিভি টকশোতেও দেখলাম এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি নিজেও একাধিক টকশোতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, দিন যত যাচ্ছে খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজার বিষয়টি অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজা নিয়ে মন্তব্য করেন, তখন বুঝতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে, যদিও এটা আইনের বিষয়। আদালত ও উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা আগাম মন্তব্য করে বিষয়টিকে উসকে দিলেন মাত্র! আসলে ‘সব দলের অংশগ্রহণে’ একটি নির্বাচন হোকÑ এটা আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান। আরেকটি ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো নির্বাচন হোক, আমরা তা কেউই চাই না। বিদেশিরাও তা চান না।

৫ জানুয়ারি (২০১৪) আমাদের জন্য কোনো সুখকর দিন ছিল না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন নিয়ে দুইটি বিষয় ছিলÑ এক. সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা; দুই. বাস্তবতা। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করার প্রয়োজন ছিল। এটা নিয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে ‘আস্থার সম্পর্ক’ গড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ২০১৪-পরবর্তী যে কোনো সময় একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা, যেমনটি করেছিল বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ (যে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল) কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বারবার আলোচিত হতে থাকবে। ষষ্ঠ সংসদে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। আর দশম জাতীয় সংসদে বিএনপি অংশ নেয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় দুইটি নির্বাচনেরই প্রয়োজন ছিল। তবে তুলনামূলক বিচারে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে বেশি। ১৫৪টি সংসদীয় আসনে (৩০০ আসনের মাঝে, আওয়ামী লীগের ১২৮, ওয়ার্কার্স পার্টি ২, জাসদ ৩, জাতীয় পার্টি-মঞ্জু ১, জাতীয় পার্টি-এরশাদ ২০) বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া, ৫ জেলায় কোনো নির্বাচন না হওয়া কিংবা ৫২ ভাগ জনগোষ্ঠীর ভোট না দেয়ার সুযোগ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। এটা নিয়ে যে যুক্তিই আমরা টিভির টকশোতে দেখাই না কেন, এতে দেশে কোনো আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ ছিল বিধায় আমরা দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী এনে দেশে ফের সংসদীয় রাজনীতির ধারা প্রবর্তন করেছিলাম। সেদিন বিএনপি সংসদীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ধারণা করেছিলাম, ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ‘আস্থার ঘাটতি’ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে পারছি বলে মনে হচ্ছে না।
এরপর এলো ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারির ঘটনা। বিএনপির ‘কালো পতাকা’ দিবসে পুলিশি হামলা প্রমাণ করল ‘আস্থার সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত সহজ নয়। ‘আস্থার সম্পর্কে’র পূর্বশর্ত হচ্ছে বিএনপিকে ‘স্পেস’ দেয়া। অর্থাৎ বিএনপিকে তার কর্মসূচি পালন করতে দেয়া। এটা তো সত্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল, তার দায়ভার বিএনপি এড়াতে পারে না। বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারার সংস্কৃতি আর যা-ই হোক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মানানসই নয়। ওই ঘটনায় বিএনপি তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বিএনপিসহ শরীক দল। কিন্তু আন্দোলন তার পক্ষে পৌঁছতে পারেনি। অর্থাৎ সরকারের পতন হয়নি। কিন্তু সহিংসতায় অনেক মানুষ মারা গেছে। অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের করুণ কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। টিভি পর্দায় তাদের আর্তি দেখে সাধারণ মানুষ কেঁদেছে। মানুষ বিএনপিকেই দোষারোপ করেছে। এটা থেকে বিএনপি বের হয়ে আসতে পারেনি। তারপরও কথা থেকে যায়। বিএনপি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকেছে। এটা সরকরের জন্য একটা প্লাস পয়েন্টও। সরকার বিএনপিকে মূলধারায় আনতে পেরেছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে, যাতে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি অংশ না নিলে (?) জটিলতা থেকে যাবে। তাতে কেউই লাভবান হবে নাÑ সরকার তো নয়ই, বিএনপিও নয়। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের জন্য আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠা জরুরি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরও একটি আস্থার সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারত। তা হয়নি। দুইটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ব্যস্ত থেকেছে পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখতে। ২০১৪ সালে একটি নির্বাচন হয়েছিল। কেন হয়েছিল, কী জন্য হয়েছিল এটা আমরা সবাই জানি; রাজনীতিবিদরাও জানেন, ভালো করে তারা জানেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা গেছে; কিন্তু দেশে নির্বাচনী সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটেছে! গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটা কোনো ভালো খবর নয়। দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। আমরা এরই মধ্যে একটি হাস্যস্পদ সংসদের জন্ম দিয়েছি। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ‘আসনে’ আছে বটে। আবার তারা মন্ত্রীও হয়েছেন। পার্টিপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দলের ওপর কর্তৃত্ব আছে বলে মনে হয় না। ফলে জাতীয় পার্টি বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা হয়নি। এ কারণে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদে থাকা দরকার। না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। গেল ৩ বছরে অনেক জাতীয় ইস্যু সংসদে আলোচিত হয়নি। অনেক সময় সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ বসেনি। এর অর্থ অনেক সংসদ সদস্যই সংসদীয় কার্যক্রমের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন সেই ‘পরিস্থিতি’ থেকে ফিরে আসতে হবে। বিএনপি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। কেননা এ সংসদ নির্বাচনে (একাদশ জাতীয় সংসদ) বিএনপি অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। উপরন্তু নেতাকর্মীদের স্থানীয়ভাবে ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার স্বার্থেও বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়া জরুরি। তাই বিএনপির জন্য একটি ‘স্পেস’ দরকার। তবে বড় কথা হলো, আমাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিএনপি নিঃসন্দেহে এখন যথেষ্ট দুর্বল। মামলা-মোকদ্দমা আর কোর্টে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে তাদের দিন যাচ্ছে। সিনিয়র অনেক নেতা এখন আর সক্রিয় নন। কোনো বড় আন্দোলনও তারা গড়ে তুলতে পারছেন না। তারপরও বিএনপির একটা বড় জনসমর্থন আছে। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই নির্বাচনে যেতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। হুদা কমিশনের ব্যাপারে বিএনপির যত রিজার্ভেশনই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনের প্রশ্নে এই হুদা কমিশনের সঙ্গেই বসতে হবে বিএনপিকে। বিএনপি বড় দল। হুদা কমিশন নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবে। ফলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির একটা ভালো ‘ডায়ালগ’ প্রয়োজন। সাধারণ ভোটাররা একটা ভালো নির্বাচন চায়। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। তাই প্রতিযোগিতা থাকবেই। এ প্রতিযোগিতা হতে হবে রাজনৈতিক ও কর্মসূচিভিত্তিক। একুশ শতকে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চায় দলগুলো, কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে তা দেখতে চায় সাধারণ মানুষ। সেজন্য ‘রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু তা যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যায়, তা কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। তাই ‘আস্থার সম্পর্ক’ থাকাটা জরুরি। ২০১৭ সালটি হবে এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ পর্যবেক্ষণ করার সময়। ঈদের পরপরই বোঝা যাবে এ আস্থার সম্পর্কটা কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়। নির্বাচনের জন্য এটা জরুরি। এজন্য নির্বাচন কমিশন রাজনীতিবিদদের জন্য একটি ‘কোড অব কনডাক্ট’ তৈরি করতে পারে, যাতে কতকগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ে রাজনীতিবিদরা পরস্পরকে আক্রমণ করে নির্বাচনের ন্যূনতম ৬ মাস আগে কোনো বক্তব্য রাখতে পারবেন না। এতে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যাতে বড় দলগুলোর প্রার্থীরা কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। খালেদা জিয়া নির্বাচনসহায়ক সরকারের কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে একটি রূপরখা দিলে তিনি ভালো করবেন। ঈদের পরপরই রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইস্যু কতটুকু প্রাধান্য পাবে সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Alokito Bangladesh
18.06.2017

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ কি আসন্ন?


পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ কি আসন্ন? সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার কয়েকটি দেশ ও সেই সঙ্গে মিসর, ইয়েমেন, মালদ্বীপ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর পরিস্থিতি সেখানে ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তুরস্কের জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এমনকি ইরানের ভূমিকাকেও ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ইরানে প্রথমবারের মতো ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলা হয়েছে। সুরক্ষিত পার্লামেন্ট ভবনে এবং ইমাম খোমেনির মাজারে হামলা হয়েছে। বিষয়টি যে ইরান খুব সহজভাবে নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? যদি একটি ‘যুদ্ধ’ হয়, তাহলে এই ‘যুদ্ধ’ শুধু সৌদি আরব কর্তৃক সম্ভাব্য কাতার হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এ যুদ্ধ পারস্যীয় অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে। এবং আঞ্চলিক শক্তির পাশাপাশি বৃহৎ শক্তিগুলো এ ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে যাবে। সে কারণেই হয়তো ‘যুদ্ধ’ হবে না। কিন্তু উত্তেজনা থাকবে। যে ভুলটি সাদ্দাম হোসেন করেছিলেন ১৯৯০ সালে কুয়েত দখল করে, সেই ভুলটি সৌদি রাজপরিবার করবে না। বিশেষ করে বাদশাহ সালমানের ছেলে প্রিন্স সালমান, যিনিই মূলত পর্দার অন্তরালে থেকে নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করছেন এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে সৌদি ভূমিকাকে নিশ্চিত করতে চান, তিনি বোধ হয় এ যুদ্ধে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করবেন না। তবে সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বে বেশ কতগুলো সম্ভাবনা রয়েছে। এক. সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল লবি একসঙ্গে মিলে কাতারে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর একটি উদ্যোগ নিতে পারে। অর্থাৎ তারা ক্ষমতাসীন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল খলিফাকে অপসারণ করতে পারে। এ ধরনের একটি সম্ভাবনা আমি কোনো কোনো মার্কিন গণমাধ্যমে দেখেছি (ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউস, ১১ জুন)। সম্ভবত আমির নিজে এটা বোঝেন। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন তাঁকে আলাপ-আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনে ডেকেছিলেন, তিনি যাননি। তাঁর ভয় রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার। অতীতেও এমনটি হয়েছে। ক্ষমতাসীন থানি পরিবারে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্র’ নতুন কিছু নয়। বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ২০১৩ সালের ২৫ জুনের পর থেকে ক্ষমতায় আছেন। ৩৭ বছর বয়সী আমির তাঁর বাবা হামাদ বিন খলিফা আল থানিকে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। আমিরের বাবা হামাদ বিন খলিফা আল থানিও একইভাবে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন তাঁর বাবা (অর্থাৎ বর্তমান আমিরের দাদা) শেখ খলিফা বিন হামাদ বিন আবদুল্লাহ আল থানিকে উত্খাত করে ১৯৯৫ সালে। থানি পরিবারই কাতার নামের রাষ্ট্রটি জন্ম দিয়েছিল এবং তারাই ১৯৭২ সালের পর থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। বলা হয় থানি পরিবারভুক্ত প্রায় এক হাজার ৫০০ সদস্য এই রাজবংশকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান আমির যদি ক্ষমতাচ্যুত হন, তাহলে তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তানের (হামাদ বিন তামিম বিন হামাদ আল থানি, জন্ম ২০০৮) ক্ষমতা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাঁর বয়স কম। তাঁর তিন স্ত্রীর সন্তান মোট ৯ জন। তাঁর বড় সন্তান মেয়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বে ট্রাম্প সৌদি আরবের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। তিনি নিজেও সৌদি আরবের সুরে কথা বলেছেন—কাতার তথাকথিত সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করে। এই অর্থায়ন বন্ধে তিনি এরই মধ্যে কাতারে অবস্থিত ‘আল আইদিদ বেজ’-এ বা সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডে কর্মরত জেনারেলদের ডেকেছিলেন। এখন দেখার বিষয় তিনি কোনো ‘মেসেজ’ দিয়েছেন কি না?
তবে বিষয়টি খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। কেননা তুরস্ক কাতারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সেখানে পাঁচ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে। তারা কাতারের আমিরকে যে নিরাপত্তা দেবে, এটিই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের উত্খাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘মহাপরিকল্পনা’ অতি সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। ২০১১ সালে পুরো আরব বিশ্বে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল (আরব বসন্ত) তার পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ও ইসরায়েলি সহযোগিতায় পুরো আরব বিশ্বে পরিবর্তন এসেছিল, যাতে আন্দোলনকারীরা কেউই ক্ষমতায় যেতে পারেনি; বরং আন্দোলন অন্যদিকে পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি ইরাক ও সিরিয়ার একটি অংশে যে আইএসের জন্ম হয়েছিল, সেই জন্মের পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ন্যাটো ও সৌদি আরব। ডিআইএর (ইউএস ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) একটি ডকুমেন্ট থেকে আমাদের এ তথ্যটি দিয়েছেন স্টেফান লোডম্যান গ্লোবাল রিসার্চে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ (১৩ জুন ২০১৭) Dirty open secret : US Criated and supports ISIL-এ। ওই প্রবন্ধে জেমস ফিটজারের একটি প্রবন্ধ উল্লেখ করা হয়েছে (ইরান রিভিউ, জানুয়ারি ২০১৬), যেখানে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আইএসের জন্মদাতা। বর্তমানে মসুলে যে যুদ্ধ চলছে, সেখান থেকে আইএসের জঙ্গিদেরও পালাতে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র। পাঠকদের ‘ইনন প্লান’ (Yinon Plan) সম্পর্কে একটি ধারণা দিই। কট্টরপন্থী ওদেদ ইনন (Oded Yinon) ১৯৮২ সালে বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসে ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বৃহত্তর ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এ পরিকল্পনায় বৃহত্তর ইসরায়েলি রাষ্ট্রটি হবে একদিকে নীল নদ, অন্যদিকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সঙ্গে বর্তমানে এ অঞ্চলে যেসব রাষ্ট্র রয়েছে তা ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিভিত্তিক ও নৃ-তাত্ত্বিকভিত্তিক একাধিক রাষ্ট্র হবে। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মে মাসে রিয়াদে আরব-আমেরিকান সম্মেলনে যোগদান, সৌদি আরবের সঙ্গে ১১ হাজার ডলারের অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষর, তাঁর ইসরায়েল সফর, কাতারের সঙ্গে কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সম্পর্কচ্ছেদ, কায়রোয় গোপনে সিসি-নেতানিয়াহু সাক্ষাৎ মূলত সবই এক সূত্রে গাঁথা। কাতারে ক্ষমতার পরিবর্তন এবং কাতারের বিশাল গ্যাস রিজার্ভের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্বের তৃতীয় বড় গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে কাতারে (রাশিয়া ও ইরানের পর)। কাতারের ডলফিন পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস আরব আমিরাতে সরবরাহ করা হয়। এই গ্যাস দিয়ে আরব আমিরাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আরব আমিরাত চায় কম মূল্যে এই গ্যাস। ইউরোপেও যায় কাতারের গ্যাস। কাতার তার গ্যাস দিয়ে এলএনজি তৈরি করে, যা বিশ্বে রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে কাতার থেকে এলএনজি কেনার জন্য একটি চুক্তি করেছিল। এখন সমুদ্রেও কাতারি গ্যাস রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—কাতারের অর্থনীতিতে ধস নামানো। মাত্র ২৬ লাখ লোকের দেশ এই কাতার, যে লোকসংখ্যার একটা বড় অংশ আবার পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া। আদি কাতারিরা মূলত সরকারি কাজ করে। আধাদক্ষ জনগোষ্ঠী কাজ করে কনস্ট্রাকশন সেক্টরে, যার ১০০ শতাংশ উপমহাদেশের মানুষ। অথচ কাতারের জিডিপির পরিমাণ ৩৫৩ দশমিক ১৪৩ মিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় এক লাখ ৪৫ হাজার ৮৯৪ ডলার, যা কিনা সৌদি আরবের চেয়ে বেশি (৫৫ হাজার ২২৯ ডলার)। এ সংকটের পেছনে কাতারের জ্বালানি সম্পদ ও কাতারের বিশাল অর্থনীতি একটা ফ্যাক্টর। তৃতীয়ত, বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে কাতারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ (বিশেষ করে ইসরায়েলি স্বার্থ) আদায় করার একটি ‘উদ্যোগ’ আমরা ভবিষ্যতে লক্ষ করব। যুক্তরাষ্ট্র কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে এবং জাতিসংঘকেও বাধ্য করতে পারে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে ইসরায়েল। এক তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন কংগ্রেসে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা সংক্রান্ত একটি বিল জমা দেওয়া হয়েছে। ১০ জন কংগ্রেস সদস্য এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ইসরায়েলের পাশাপাশি সৌদি আরব ও আরব আমিরাত কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের উদ্যোগী হয়েছে। গত ২৫ মে এসংক্রান্ত একটি বিল হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের কমিটিতে জমা দেওয়া হয়েছে।
একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রেসপনসিভ পলিটিকসের (ওয়াশিংটন) তথ্য অনুযায়ী যেসব কংগ্রেস সদস্য এই বিল উত্থাপনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাঁরা ২০১৬ সালের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের সময় প্রত্যেকে ইসরায়েলি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১০ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ ডলার সাহায্য পেয়েছেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির পক্ষ থেকেও এসব কংগ্রেসম্যানকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। ক্রিড নিউটন ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউসে যে প্রবন্ধটি লেখেন (১২ জুন ২০১৭) তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের ফরেন রিলেশনস কমিটির সদস্য কংগ্রেসম্যান এড রয়েস ও এলিয়ট অ্যাঙ্গেল একেকজন প্রায় দুই লাখ বা তার ওপরে অর্থ গ্রহণ করেছেন। এর অর্থ পরিষ্কার, একটি সৌদি-ইসরায়েল-আরব আমিরাত লবি চাচ্ছে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হোক। ’ তারা এ জন্য ওয়াশিংটনে ‘লবিজ ফার্ম’ও নিয়োগ করেছে।
চতুর্থত, কাতারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি আনা হয়েছে, অর্থাৎ কাতার সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছে, তার পেছনে সত্যতা কতটুকু, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড, হামাস কিংবা হিজবুল্লাহ গ্রুপকে সমর্থন করছে—এর পেছনে সত্যতা আছে। এখানে সমস্যাটা মূলত ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—সৌদি আরব, না কাতারের হাতে, সমস্যাটা মূলত সেখান থেকেই শুরু।
সাম্প্রতিককালে মুসলিম বিশ্বের যে সংকট, সেই সংকটের ব্যাপারে সৌদি আরব কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। হামাস ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং তাদের নেতৃত্বে একটি সরকারও গঠিত হয়েছিল, যা ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। গাজা নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। আর ইসরায়েলি ট্যাংক ও বিমান যখন গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল তখন এগিয়ে এসেছিল কাতার। এমনকি সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া সংকটেও কোনো সৌদি ভূমিকা ছিল না। আফ্রিকার মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর দারিদ্র্য (সুদান, দারফুর, সাদ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া) দূরীকরণে সৌদি আরবের কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেই। অথচ সৌদি আরবের অর্থনীতি ১ দশমিক ৮০৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। এই অর্থ সৌদি রাজপরিবারের শত শত প্রিন্স ও প্রিন্সেস নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাস ও কাজে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে কাতারের তরুণ আমিরের নিজস্ব একটি চিন্তাভাবনা আছে। ২০১২ সালে কাতার প্রায় ১০০টি দেশে, যার মাঝে মুসলমানপ্রধান দেশ বেশি, ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল, যাতে এই গরিব দেশগুলো এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে। কাতার একটি ছোট্ট দেশ হওয়া সত্ত্বেও (আয়তন ১১ হাজার ৫৮৬ বর্গকিলোমিটার) সুদান-সাদ দ্বন্দ্বে, সুদানের দারফুর সংকটে, জিবুতি-ইরিত্রিয়া দ্বন্দ্বে এবং আফগানিস্তানের তালেবান সংকটে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা সৌদি আরবের নীতিনির্ধারক, বিশেষ করে যুবরাজ প্রিন্স সুলতানের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবং এতে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নের মুখে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সংকটের গভীরতা বেড়েছিল। এখানে বলা ভালো, সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের দ্বন্দ্ব এই প্রথম নয়। এর আগেও ১৯৯২, ২০০২ ও ২০১৪ সালে সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিল এবং দোহা থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন।
তাহলে যুদ্ধ কি আসন্ন? সৌদি আরব এরই মধ্যে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী, যা শিয়া তথা ইরান সমর্থিত, নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বোমাবর্ষণ করে সেখানে একটি ফ্রন্ট ওপেন করেছে। এখন কুয়েতে আগ্রাসন চালিয়ে দ্বিতীয় আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করতে চাইবে না খুব সহজেই। কিন্তু ইসরায়েলি ও আমেরিকান লবির চাপে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত কী করে বলা মুশকিল। সৌদি আরব এরই মধ্যে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করেছে (বাংলাদেশ এর সদস্য)। মজার ব্যাপার, কাতার ও তুরস্ক ওই জোটের সদস্য। অথচ এ সংকটে তুরস্কের অবস্থান কাতারের পক্ষে। সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বৃহৎ শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সৌদি আরবের পক্ষে। অন্যদিকে রাশিয়া সমর্থন করছে কাতারকে। আর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান কাতারের পক্ষে। ফলে একটি যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে ইরান জড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, যেখান থেকে প্রতিদিন ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। বিশ্বে যে জ্বালানি তেল সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয় তার ২০ শতাংশ এই স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে পরিবাহিত হয়। এখন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড যদি এই প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা বিশ্বে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের অনুমোদন দেবে কি না? যুদ্ধ না হলেও এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। একদিকে সিরিয়া সংকটের যখন কোনো সমাধান হয়নি তখন সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব নতুন আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ হলো।
Daily Kalerkontho
18.06.2017

পারস্য উপসাগর অঞ্চলে নতুন উত্তেজনার নেপথ্যে



পারস্য উপসাগরীয় রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর, আরব-ইসলামিক-আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এবং সৌদি আরবকে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তির পরপরই দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এ অঞ্চলে; যা পারস্য উপসাগরীয় তথা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে আগামী দিনে। প্রথমটি হচ্ছে, কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব তথা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত চারটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং কাতারের বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তেহরান পার্লামেন্টে এবং ইমাম খোমেনির মাজারে সন্ত্রাসী হামলা।

২১ মে রিয়াদে আরব-ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলন শেষে ৩৪ হাজার সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সৌদি আরব এ সেনাবাহিনী গঠনের উদ্যোক্তা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন। ফলে সঙ্গত কারণেই ইরান এক ধরনের অস্বস্তিতে আছে। এবং এটা এক ধরনের হুমকিও বটে! মূলত ট্রাম্পের সফরের পরপরই এ অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন এর সঙ্গে যোগ হল সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্ব। সৌদি আরব-ইরান দ্বন্দ্বের সঙ্গে সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্বের একটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিল আছে। আগামী দিনে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে এর একটা প্রভাব থাকবে। সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, কেন এ দ্বন্দ্ব? বস্তুতপক্ষে সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো ক্ষেত্রেই কাতারকে মেলানো যাবে না। ছোট দেশ কাতার। সৌদি আরবের সঙ্গেই রয়েছে তার সীমান্ত। যেখানে সৌদি আরবের আয়তন ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯০ বর্গকিলোমিটার, সেখানে কাতারের আয়তন মাত্র ১১ হাজার ৫৪৬ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা কাতারের মাত্র ২৬ লাখ ৭৫ হাজার, যেখানে সৌদি আরবের ৩ কোটি ৩০ লাখ। সৌদি আরবের জিডিপির পরিমাণ ১ দশমিক ৮০৩ ট্রিলিয়ন ডলার (পিপিপি) আর কাতারের ৩৫৩ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে যে প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক তা হচ্ছে, অর্থনীতি, আয়তন ও লোকসংখ্যায় দেশ দুটির মধ্যে এত পার্থক্য থাকলেও সৌদি আরব ও কাতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেল কেন?

ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে অতীতেও এ দেশ দুটির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইন দোহা (কাতারের রাজধানী) থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। অভিযোগ ছিল কাতার এসব দেশের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে’ হস্তক্ষেপ করছে। এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও কাতার তা মানছিল না। এর আগে ২০০২ সালেও সৌদি আরব তার রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ১৯৯২ সালে সৌদি আরব কাতার সীমান্ত চৌকিতে হামলা করেছিল, যে ঘটনায় দু’জন কাতারি সৈন্য মারা যায়। উভয় দেশ রাষ্ট্রীয় ধর্ম তথা আদর্শ হিসেবে ‘ওয়াহিবিজম’কে ধারণ করলেও সমস্যা ছিল এ অঞ্চলের রাজনীতিতে কে প্রভাব রাখবে, তা নিয়ে। ছোট্ট দেশ কাতার সৌদি কর্তৃত্ব মানতে রাজি ছিল না। ফলে দেশ দুটি বারবার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছে। তবে এটা সত্য, সৌদি আরব সবসময়ই আরব আমিরাত ও বাহরাইনকে তার পাশে পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব যতটুকু না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নেও এদের মাঝে দ্বিমত আছে। অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বই বেশি। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সম্পদ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এটা নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। কাতারের রয়েছে বিশাল গ্যাস সম্পদ। বিশ্বের গ্যাস সম্পদের ১৪ ভাগ রিজার্ভ রয়েছে কাতারে। এর পরিমাণ ৮৯৬ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট। সবচেয়ে বেশি গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে রাশিয়ায়। তারপর রয়েছে ইরানে। বিশাল এক গ্যাসক্ষেত্র আবার ইরান ও কাতার ভাগাভাগি করে নিয়েছে। অন্যদিকে সৌদিতে তেল রয়েছে বেশি (২৬০ বিলিয়ন ব্যারেল, বিশ্বের শতকরা ১৮ ভাগ), কিন্তু গ্যাস রয়েছে কম (৮৪৮৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন কিউবিক ফিট)। সুতরাং এ গ্যাস সম্পদের ওপর সৌদি আরবের আগ্রহ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। দ্বন্দ্বটা সেখানেই। একইসঙ্গে আরব আমিরাত কাতারের গ্যাসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এ গ্যাস দিয়ে আমিরাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আরও একটা কথা, কাতার-তুরস্ক পাইপলাইনের মাধ্যমে কাতারের গ্যাস যাচ্ছে ইউরোপে। গ্যাস উত্তোলনে ইরান ও কাতারের মাঝে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি সৌদি আরবের অপছন্দ।

তৃতীয়ত, বেশকিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে দেশ দুটোর মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কাতার মিসরের ইসলামিক ব্রাদারহুড এবং ফিলিস্তিনের হামাসকে সমর্থন করে আসছে- এটা সত্য। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় ব্রাদারহুড সমর্থক ড. মুরসি মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। কাতার তাকে সমর্থন করেছিল; কিন্তু সৌদি আরব সমর্থন করেছিল ফিল্ড মার্শাল সিসিকে, যিনি এখন মিসরের প্রেসিডেন্ট। ঠিক তেমনি হামাসকে সমর্থন এবং হামাস নেতাদের দোহায় আশ্রয় দিয়েছিলেন কাতারের আমীর। কাতার গাজায় ইসরাইলি বোমায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বাড়িঘরও নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ইসরাইল রাজি হয়নি। সৌদি আরব কখনই হামাসকে সমর্থন করেনি। সুদান ও শাদের মধ্যে দ্বন্দ্বে সমঝোতা করা, দারফুর সংকটের সমাধান, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যকার বিবাদের সমাধান, সিরিয়ায় আসাদবিরোধী ইসলামী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন কিংবা লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উৎখাতে বিরোধী দলগুলোকে কাতারের সমর্থন সৌদি আরবে ভুল মেসেজ পৌঁছে দিয়েছিল। সৌদির রাজপরিবারের তরুণ নেতৃত্ব মনে করেছে, এর মধ্য দিয়ে কাতার মুসলিম বিশ্বের ‘নেতা’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের গ্রহণযোগ্যতাকে একটা প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। এ নিয়েও একটা দ্বন্দ্ব ছিল।

চতুর্থত, ২০১২ সাল থেকে কুয়েত বিশ্বের ১০০টি দেশকে বছরে ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড সমমানের সাহায্য দিয়ে আসছে। এর মধ্য দিয়ে ওইসব দেশ জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস’ অর্জনে সহায়তা পাচ্ছে।

পঞ্চমত, সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা বাড়ছে। এ ভূমিকা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ।

এমনই এক পরিস্থিতিতে কাতার যখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেয়, সঙ্গত কারণেই তা সৌদি নেতৃত্বকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানি প্রভাব বাড়ছিল। এটা সৌদি নেতৃত্ব ভালো চোখে নেয়নি। সৌদি আরবে শিয়া সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে সৌদি নেতৃত্বের। সৌদি রাজবংশের বিরুদ্ধে শিয়া নেতারা মানুষকে উসকে দিচ্ছে- এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি শিয়া নেতা নিমর আল নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। এই যখন পরিস্থিতি তখন কাতার সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় ‘নাক’ গলাচ্ছে- এমন অভিযোগও শোনা গিয়েছিল। তাই খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে, আইএসের নামে কারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে ইরানি পার্লামেন্ট ভবনে ও খোমেনির মাজারে? অভিযোগের আঙুল সৌদি আরবের দিকে থাকলেও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ যত বাড়বে, ততই লাভ ইসরাইলের।

তাহলে পরিস্থিতি এখন কোন্ দিকে যাচ্ছে? সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যকার বিরোধের মধ্যস্থতা করছে কুয়েত। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে যদি বিরোধ থাকে এবং যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইসরাইল এ থেকে ফায়দা নেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে কতগুলো মন্তব্য করা যায়। নিশ্চয়ই সৌদি ও ইরানের নেতারা এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছে, তাতে ইরান আতংকিত। এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরান যে অভিযোগ এনেছে, তা হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে ট্রাম্প তার সৌদি আরব সফরের সময় ইরানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের’ অভিযোগ এনেছেন। এখন ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হল। কেউ এর সঙ্গে কোনো মিল বা যোগসূত্র খুঁজতে পারেন। কাতারের ব্যাপারে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সুস্পষ্ট অভিযোগ এনেছিল। এ দেশ দুটোর অভিযোগ ছিল কাতার আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীকে অর্থ জোগাচ্ছে। কাতার কর্তৃক জঙ্গিদের এক বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের একটি অভিযোগ পাওয়া যায়। ট্রাম্পও অনেকটা কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কাতারের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক সাম্প্রতিককালে বেশ ভালো। এ কাতার-ইরান ঐক্যে ফাটল ধরাতে ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে এবং তা ইরানকে নিবৃত্ত করতে ‘কোনো পক্ষের’ উদ্যোগ হতে পারে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে ইসরাইলের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। ১৯৮২ সালে কট্টরপন্থী ওদেদ ইনন (ঙফবফ ণরহড়হ) যে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, এসব সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি যখন এমনিতেই উত্তপ্ত, ঠিক তখনই সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব ও তেহরানে সন্ত্রাসী হামলা নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান রেজা সেইফুল্লাহ ‘প্রতিশোধ’ নেয়ার কথা বলেছেন। এখন দেখতে হবে ইরান এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় কী সিদ্ধান্ত নেয়। তবে স্পষ্টতই মধ্যপ্রাচ্য তথা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। এ উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন আনতে পারে। সৌদি আরবের দুটি মসজিদের (মসজিদ আল হারাম, মক্কা শরিফ ও মসজিদ আল নববী, মদিনা শরিফ) জিম্মাদার হচ্ছেন সৌদি বাদশাহ। ধর্মীয়ভাবে এ মসজিদ দুটো মুসলমানদের জন্য পবিত্র স্থান। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই সৌদি আরবের পাশে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ইরানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী, যে প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরের তেল বহির্বিশ্বে যায়। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়, তার ২০ ভাগ এ পথে পরিবাহিত হয়, যার পরিমাণ ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রতিদিন)। সুতরাং এ অঞ্চলে যে কোনো দ্বন্দ্বে এই জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে। অন্যদিকে কাতারে রয়েছে বিশ্বের বড় গ্যাস রিজার্ভ। প্রতি মাসে বিশ্বে যে পরিমাণ তরল গ্যাস (এলএনজি) রফতানি হয়, তার মধ্যে কাতার একাই সরবরাহ করে ৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। কাতারের এলএনজি ও পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল আরব আমিরাত। এমনকি ভারত, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া কাতার থেকে এলএনজি ক্রয় করে। এই এলএনজি সরবরাহে যদি বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিশ্বে উত্তেজনা বাড়বে।

কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক ও ইরান। একমাত্র সীমান্ত বন্দর (সৌদি আরবের সঙ্গে) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তুরস্ক সেখানে খাদ্য ও সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনিতেই সেখানে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আগামীতে কী হবে, সেটাও দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ উত্তেজনা সৌদি-কাতারকে কোনো ধরনের ‘যুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দেবে না, এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। এমনিতেই সৌদি আরবের বিমান বাহিনী ইয়েমেনে হাওথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় (শিয়া) বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। এখন সৌদি আরব যদি কাতারে আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করে, তা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।
Daily Jugantor
15.06.2017

পারস্য উপমহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি কোন পথে



পারস্য উপমহাসাগরের রাজনীতি এখন কোন পথে? সেখানে আরেকটি যুদ্ধ কি আসন্ন? সৌদি আরবসহ উপমহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন এবং সেই সঙ্গে মিসর, ইয়েমেন ও মালদ্বীপ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং এই রমজান মাসেও কাতারে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি সেখানে দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে এবং সম্ভাব্য একটি যুদ্ধের আশঙ্কাও দেখছেন কেউ কেউ। অতীতেও পারস্য অঞ্চলে যুদ্ধ হয়েছে। পাঠকমাত্রই স্মরণ করতে পারেন, ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম গালফ যুদ্ধ হয়েছিল। ইরাক ১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েত দখল করে নিলে কুয়েতের সমর্থনে এবং জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৩৯টি দেশের সেনাবাহিনী দখলদার ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে উৎখাত করেছিল। ওই যুদ্ধে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয় গালফ যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালের মার্চে। এবার ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলÑ ইরাকের কাছে মারণাস্ত্র রয়েছে, যা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরাক দখল করে নিয়েছিল। এর পরের কাহিনি আমরা সবাই জানি। সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরাক আজ বাহ্যত তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সেখানে জন্ম হয়েছিল ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি সংগঠনের। যারা সিরিয়ার একটি অংশ দখল করে সেখানে জঙ্গি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে এবং আইএসকে সেখান থেকে উৎখাত করা যায়নি। এখন যে প্রশ্নটি খুব সহজেই করা যায় তা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উত্থানকে কেন্দ্র করে সেখানে যে ‘যুদ্ধ’ চলছে, তা কি এখন গালফ অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে? একটি সৌদি-কাতার যুদ্ধ কি আসন্ন? আর যদি যুদ্ধ আদৌ শুরু হয় তাহলে বিশ্ব রাজনীতি কোনদিকে যাবে? সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানই বা কী হবে? এ বিষয়ে আলোচনার আগে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, তা হচ্ছে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে হঠাৎ এই দ্বন্দ্ব কেন? এই দ্বন্দ্বের পেছনে সৌদি আরবের যুক্তি হচ্ছে, কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড ও হামাসের মতো কট্টরপন্থি ইসলামিক সংগঠনগুলোকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে আসছে, যা সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এর পেছনে কিছুটা সত্যতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যা সত্য, তা হচ্ছে ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্ব কে দেবে, এ নিয়ে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে এক ধরনের ‘সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা’ চলছে। সৌদি আরবে দুটি পবিত্র মসজিদ রয়েছেÑ আল মসজিদ আল হারাম (মক্কা শরিফ) ও আল মসজিদ আল নববী (মদিনা শরিফ)। বিশ্বের সব মুসলমানের জন্য এ মসজিদ দুটি পবিত্রতম স্থান। আর সৌদি বাদশাহ হচ্ছেন এই মসজিদ দুটির জিম্মাদার। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দাবিদার। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন, দরিদ্রতা দূর করার জন্য যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব সৌদি আরব পালন করেনি। এমনকি যখন ইসরায়েলি বোমায় ফিলিস্তিনের গাজা শহর (২০১৪) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন সৌদি আরবের যে ‘ভূমিকা’ পালন করার কথা ছিল তা তারা করেনি। এখানে এগিয়ে এসেছিল কাতার। কাতারের বর্তমান যে শাসক তার একটি আলাদা ‘অ্যাপ্রোচ’ রয়েছে। যদিও সৌদি অর্থনীতি আর কাতারের অর্থনীতি একসঙ্গে মেলানো যাবে না। সৌদি অর্থনীতি অনেক বড় ও অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এই বিশাল অর্থনীতি বিশ্বের দরিদ্রতম মুসলমান বিশ্বের জন্য ব্যয় হয় না। সৌদি যুবরাজরা এই অর্থের অপব্যবহার করেন। তাদের বিলাসবহুল জীবন প্রায় সময়ই নানা সংবাদের জন্ম দেয়। কিছুদিন আগে সৌদি রাজা ইন্দোনেশিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শুধু বিশাল একটি বহরই নিয়ে যাননি, নিজের ব্যবহারের জন্য একটি ‘লিফট’ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ মুসলমান প্রজন্ম অনেক আফ্রিকান দেশে, যেমন সুদান, সাদ কিংবা ক্যামেরুনে মানুষ না খেয়ে থাকে। এখানে সৌদি আরবের কোনো ভূমিকা নেই। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে কাতার বিশ্বের ১০০টি দেশে, যার মধ্যে মুসলমান দেশও রয়েছে, ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড সাহায্য দিয়েছে, যাতে করে ওই দেশগুলো এমডিজি অর্জন করতে পারে। সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো ইতোমধ্যে বিভক্ত হয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ফারমাজো ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি সৌদি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। সৌদি আরব ওই অর্থের বিনিময়ে সোমালিয়ার সমর্থন নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। সোমালিয়া সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে। এখানে বলা ভালো, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোটটি গঠিত হয়েছিল (ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম), তাতে কাতার এবং সোমালিয়াও সদস্য। এ জোটে মোট ৩৩টি দেশ রয়েছে। তবে এ জোটে সিয়েরা লিওন কিংবা আইভরিকোস্টের মতো দেশ থাকায় কিছু প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল। কেননা এই দুটি দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখতে অন্য দেশের সাহায্য নিতে হয়। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের আওতায় এ দুটো দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও কাতার ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের’ (জিসিসি) সদস্য। জ্বালানিসম্পদসমৃদ্ধ (তেল ও গ্যাস) জিসিসির জন্ম ১৯৮১ সালে। বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, আরব আমিরাতও জিসিসির সদস্য। সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্বে বাহরাইন ও আরব আমিরাত সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত ও ওমানের অবস্থান অনেকটা নিরপেক্ষ। সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব যতটুকু না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক। তবে রাজনৈতক প্রশ্নেও এদের মধ্যে দ্বিমত আছে। অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বই বেশি। পারস্য অঞ্চলের জ্বালানিসম্পদ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এটা নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। কাতারের রয়েছে বিশাল গ্যাসসম্পদ। বিশ্বের গ্যাসসম্পদের ১৪ শতাংশ রিজার্ভ রয়েছে কাতারে। এর পরিমাণ ৮৯৬ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট। সবচেয়ে বেশি গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে রাশিয়ায়। তারপর রয়েছে ইরানে। বিশাল এক গ্যাসক্ষেত্র আবার ইরান ও কাতার ভাগাভাগি করে নিয়েছে। অন্যদিকে সৌদিতে তেল রয়েছে বেশি (২৬০ বিলিয়ন ব্যারেল, বিশ্বের শতকরা ১৮ শতাংশ), কিন্তু গ্যাস রয়েছে কম (৮৪৮৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন কিউবিক ফিট)। তাই এই গ্যাসসম্পদের ওপর সৌদি আরবের আগ্রহ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। দ্বন্দ্বটা সেখানেই। একই সঙ্গে আরব আমিরাত কাতারের গ্যাসের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল। এই গ্যাস দিয়ে আমিরাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আরও একটা কথা, কাতার-তুরস্ক পাইপলাইনের মাধ্যমে কাতারের গ্যাস যাচ্ছে ইউরোপে। গ্যাস উত্তোলনে ইরান ও কাতারের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি সৌদি আরবের না-পছন্দ। এর বাইরে বেশ কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে দেশ দুটোর মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। কাতার মিসরের ইসলামিক ব্রাদারহুড ও ফিলিস্তিনের হামাসকে সমর্থন করে আসছে এটা সত্য। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় ব্রাদারহুড সমর্থক ড. মুরসি মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। কাতার তাকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু সৌদি আরব সমর্থন করেছিল ফিল্ড মার্শাল সিসিকে, যিনি এখন মিসরের প্রেসিডেন্ট। ঠিক তেমনি হামাসকে সমর্থন এবং হামাস নেতৃবৃন্দকে দোহায় আশ্রয় দিয়েছিলেন কাতারের আমির। কাতার ২০১৪ সালের আগস্টে গাজায় ইসরায়েলি বোমায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বাড়িঘরও নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিল, যাতে ইসরায়েল রাজি হয়নি। সৌদি আরব কখনই হামাসকে সমর্থন করেনি। সুদান ও সাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমঝোতা করা, দারফুর সংকটের সমাধান, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যকার বিবাদের সমাধান, সিরিয়ায় আসাদবিরোধী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন কিংবা লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উৎখাতে বিরোধী দলগুলোকে কাতারের সমর্থন সৌদি আরবে ভুল মেসেজ পৌঁছে গিয়েছিল। সৌদির রাজপরিবারের তরুণ নেতৃত্ব মনে করলেন এর মধ্য দিয়ে কাতার মুসলিম বিশ্বের ‘নেতা’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা সৌদি আরবের গ্রহণযোগ্যতা মুসলিম বিশ্বে একটা প্রশ্নের মাঝে ফেলে দেবে। সৌদি আরবের ভয়টা ছিল সেখানেই। যদিও সৌদি অর্থনীতি অনেক বড়। লোকসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকেও সৌদি আরব কাতারের চেয়ে অনেক বড়। যেখানে সৌদি আরবের জিডিপির পরিমাণ (ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে) ১ দশমিক ৮০৩ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে কাতারের জিডিপির পরিমাণ ৩৫৩ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার। কাতারের লোকসংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ, যার মাঝে একটা বড় অংশ বিদেশি। আর সৌদি আরবের লোকসংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ। আরও একটি বিষয়Ñ অতি সাম্প্রতিককালে পারস্য অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোয় ইরানের ভূমিকা বাড়ছে। এই ভূমিকা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। এমনি এক পরিস্থিতিতে কাতার যখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেয়, সঙ্গত কারণেই তা সৌদি নেতৃত্বকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। বলা ভালো, সাম্প্রতিক সময় সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানি প্রভাব বাড়ছিল। এটা সৌদি নেতৃত্ব ভালো চোখে নেয়নি। সৌদি আরবে শিয়া সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে সৌদি আরবের। সৌদি রাজবংশের বিরুদ্ধে শিয়া নেতৃবৃন্দ মানুষকে উসকে দিচ্ছেÑ এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি শিয়া নেতা নিমর আল নিমরে মৃত্যুদ- কার্যকর করেছিল সৌদি আরব। এই যখন পরিস্থিতি তখন কাতার সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় ‘নাক’ গলাচ্ছেÑ এমন অভযোগও শোনা গিয়েছিল। তাই খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে, আইএসের নামে কারা সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছিল ইরানি পার্লামেন্ট ভবনে ও খোমেনির মাজারে? অভিযোগ সৌদি আরবের দিকে থাকলেও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ভূমিকাকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ যত বড়বে, ততই লাভ ইসরায়েলের। সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, এই মুহূর্তে বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কাতারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক সেখানে ৫০০ সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো কোনো মার্কিন সাময়িকীতে কাতারে রেজিম চেঞ্জের আভাস দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা (?) নিয়ে কাতারের শাসনকর্তা আমির তামিম বিন হামাদ আল খানিকে উৎখাত করতে পারে! তবে বিষয়টি অত সহজ নয়। তুরস্কের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি আমিরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তবে আল খানি পরিবার যারা ১৯৭২ সাল থেকে কাতার শাসন করে আসছে, এই পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ১৯৯৫ সালের জুন মাসে বর্তমান শাসক তামিম বিন হামাদ তার বাবা আমির খালিফকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা নিজের হাতে করায়ত্ত করেছিলেন। এখন পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে বিবাদ ও সংঘাত সারা মুসলিম বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয় এখন।
Daily Amader Somoy
14.06.2017

সৌদি আরব কাতার দ্বন্দ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি


জুন মাসে প্রথম সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক জেসিসিভুক্ত কয়েকটি দেশ (আরব আমিরাত, বাহরাইন) কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এসব দেশের পাশাপাশি মিসর, ইয়েমেন, লিবিয়া ও মালদ্বীপও যোগ দেয়। এই পরিস্থিতি যখন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে, ঠিক তখনই গত ৭ জুন তেহরানে দুটি এলাকায় হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রথম হামলাটি হয় ইরানের পার্লামেন্ট মজলিশে। ওই সময় মজলিশের অধিবেশন চলছিল। পার্লামেন্টে হামলার ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। পার্লামেন্টে হামলার আধ ঘণ্টা পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির মাজারেও হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এই হামলায় দায়-দায়িত্ব স্বীকার করলেও ইরানের সেনাবাহিনী এই হামলার পেছনে সৌদি আরব রয়েছে বলে দাবি করেছে। যদিও সৌদি আরবের জড়িত থাকার অভিযোগের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সৌদি কাতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে এই হামলার কতটুকু যোগসৃত রয়েছে তাও জানা যায়নি। তবে তেহরানের ঘটনা একই সঙ্গে সৌদি আরব ইরান দ্বন্দ্বকেও এখন উসকে দিল। এই সৌদি ইরান দ্বন্দ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জড়িয়ে গেছেন।
পাঠকদের স্মরণ থাকার কথা, গত মে মাসে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরব আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ এনেছিলেন। সব মিলিয়ে ইরানে সন্ত্রাসী হামলা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যেমনি নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনি ইরানের সঙ্গে ৬ জাতি যে পারমাণবিক সমঝোতা হয়েছিল তাতে এনে দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বলা ভালো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেলের ওপর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল। সেই জ্বালানি তেলের মূল্য এখন ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। নিঃসন্দেহে শিয়া সুনি্ন দ্বন্দ্ব জ্বালানির তেলের মৃল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলবে। শিয়া সুনি্নর দ্বন্দ্বের রেশ ধরে সৌদি আরব অনেক আগেই ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। সেখানে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি 'সামরিক জোট' গঠিত হয়েছে (বাংলাদেশ যার সদস্য), যদিও বলা হচ্ছে এই 'জোট'টি শুধু সন্ত্রাসবিরোধী একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এবং জোট কার্যত একটি তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবে, যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকা- সংক্রান্ত তথ্য আদান প্রদান করবে। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু একটি তথ্য বিনিময় কেন্দ্র হিসেবেই থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি সামরিক জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, এ প্রশ্ন আছে।
এই সৌদি জোটের কর্মকা- অনেক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে এখন । সৌদি আরব নিজে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর অর্থাৎ অন্যতম নির্ধারক হিসেবে নিজেকে দেখতে চায়। অতীতের কোনো সৌদি বাদশাহ এভাবে সৌদি পররাষ্ট্র নীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো বড় ভূমিকা পালন করেননি। কিন্তু বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের 'এপ্রোচ' একটু ভিন্ন। তিনি সৌদি আরবকে দেখতে চান এ অঞ্চলের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক হিসেবে। তাই তার নেতৃত্বে একটি সামরিক জোটের প্রয়োজন ছিল। সৌদি আরব পারস্য অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। এর প্রকাশ হিসেবে আমরা দেখেছি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপ তথা সৌদি বিমান বাহিনীর ইয়েমেনে অব্যাহত বোমাবর্ষণ। এর আগে লেবাননের গৃহযুদ্ধে সৌদি ট্যাঙ্ক বহরকে আমরা লেবাননে প্রবেশ করতে দেখেছিলাম। অতীতে কুয়েতের আমির যখন ইরাকি সেনাদের দ্বারা উৎখাত হন (১৯৯০), তখন সৌদি আরব আমিরকে আশ্রয় দিয়েছিল বটে। কিন্তু আমিরের সমর্থনে যেখানে কোনো সেনা বা বিমান পাঠায়নি।
২০১১ সালে তিউনেশিয়ায় 'জেসমিন বিপ্লব' জাইন আল আবেদিন বেন আলিকে ক্ষমতাচ্যুত ও বেন আলি সৌদি আরবে আশ্রয় নিলেও, সৌদি আরব তিউনেশিয়ায় হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু বাদশাহ সালসান বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতাসীন হয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন আনেন। আর তারই ফলে নতুন এক 'সৌদি আরব'কে আমরা দেখছি। সৌদি আরবের নীতি নির্ধারকদের বরাবরই একটা বড় ভয় ইরানকে নিয়ে। পারস্য অঞ্চলে রাজনীতিতে ইরানের ভূমিকা বাড়ছে। এবং ইরানের এই ভূমিকাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন স্বীকারও করে। ইরানের সঙ্গে ৬ জাতি পারমাণবিক চুক্তি ইরানে ধর্মীয় নেতা খোমেনিকে ওবামার গোপন চিঠি লেখা ইত্যাদি প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে ইরানের ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প এখন ইরান সমঝোতাকে অস্বীকার করেছেন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬ জাতি আলোচনায় যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিগত জানুয়ারি মাসে (২০১৬) ইরানের ওপর থেকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। ফলে ইরান আবারও একটি 'শক্তি' হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। অতীতে ইরানি বিপ্লবের আগে (১৯৭৯) রেজা শাহ পাহলেভীর সময়ে ইরানের ভূমিকাকে 'পারস্যীয়' অঞ্চলের পুলিশের ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করা হতো। ইরান সেই ভূমিকায় আবার ফিরে যাচ্ছে। সৌদি আরবের ভয়টা এখানেই। ইরানের উত্থান সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের শিয়া সম্প্রদায়কে আরও বেশি উৎসাহিত করবে।
বলা ভালো সৌদি জোটে সিরিয়াকে রাখা হয়নি। এটা সবাই জানেন সৌদি আরব চাচ্ছে সিরিয়ায় আসাদের উৎখাত। কিন্তু সৌদি পছন্দের তালিকায় আইএসও নেই। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আসাদবিরোধী দলগুলোর একটি সম্মেলন হয়েছিল রিয়াদে। সেখানে এমন অনেক দল অংশ নিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ ছিল। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ভূমিকা কী হবে এইসব দলও জোটের বিরুদ্ধে? অনেকেই জানেন ইসলামিক স্টেটের নেতৃত্বে সিরিয়ায় ও ইরানের একটা অংশ নিয়ে তথাকথিত একটি জিহাদি রাষ্ট 'সুনি্নস্তান,' এর জন্ম হয়েছে, যারা ওয়াহাবি মতাদর্শে ও আদি ইসলামিক রাষ্ট্রের ধ্যান-ধারণায় পরিচালিত হচ্ছে। সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তিই হচ্ছে এই ওয়াহাবী মতাদর্শ। এ ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে আইএসের সঙ্গে সৌদি নীতি নির্ধারকদের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, আদর্শগতভাবে মিল তো আছেই। সুতরাং সৌদি-আইএস সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
আরও একটা কথা বলা দরকার। ইরাক ও সিরিয়ার তেলের কূপগুলোর একটা বড় অংশ ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কালোবাজারে আইএস এই তেল বিক্রি করে। দৈনিক তাদের গড় আয় ২ মিলিয়ন ডলার। আর এ কারণেই আইএস পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী জঙ্গি গোষ্ঠিতে পরিণত হয়েছে। এই তেল তুরস্কের মাধ্যে দিয়ে অন্যত্র যায়। ইসরাইল এই তেলের অন্যতম ক্রেতা। এই তেল নিয়েই সেখানে একটি স্থল যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে। কেন না আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য কমে যাওয়ায় (ব্যারেল প্রতি বর্তমান মূল্য ৫০ ডলারের নিচে) এতে বহুজাজাতিক তেল কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আয় কমে যাচ্ছে। ফলে একটি 'যুদ্ধ' শুরু না হলে এই তেলের মূল্য বাড়ানো যাবে না। তাই ধারণা করছি একটি যুদ্ধ সেখানে আসন্ন। পাঠকদের উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা দিতে চাই। ইরান ও সৌদি আরবের মাঝখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ যা 'স্ট্রেইট অব হরমুজ' নামে পরিচিত। এই সমুদ্রপথটি তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয় (প্রতিদিন ৫৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল), তার ২০ ভাগ (১৭ মিলিয়ন ব্যারেল) এই পথে পরিবাহিত হয়। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রতিদিন)। এখন তা বেড়েছে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলে (২০১৩)। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান মিলে দেখা যাবে, তা প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। প্রায় ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ 'স্ট্রেইট অব হরমুজ' প্রণালি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে ইরানি নৌবাহিনী। যে কোনো 'সংকটে' ইরান যদি এই জ্বালনি তেল সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেবে। সৌদি আরবে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের বাজার। এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে এ অঞ্চলে মার্কিনি অস্ত্র ব্যবসা বৃদ্ধি পাবে, যা মার্কিনি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছুটা খোঁজ-খবর রাখেন, তারা জানেন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আরও বেশ কটি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছে।
এমনি এক পরিস্থিতিতে ইরানে সন্ত্রাসী হামলাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। বলা হচ্ছে এটা ইরানি-আইএসের কাজ। অতীতে আমরা কখনো আইএসের ইরানি সংস্করণের কথা শুনিনি। প্রধানত সুনি্ন মুসলমানদের মাঝেই আইএস কাজ করে এবং তারা সুনি্ন প্রধান মুসলমান দেশগুলোকে নিয়েই একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ ক্ষেত্রে ইরান একটি শিয়াপ্রধান দেশ। ইরানের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮০% শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে আইএস ইরানে তাদের কর্মকা- সাম্প্রসারিত করেছে, এটা আইএসের আদর্শের সঙ্গে মেলে না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলোই তেহরানে হামলায় কারা প্রকৃতপক্ষে জড়িত ছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? নিশ্চয়ই আগামী দিনগুলোতে আমরা এর হিসাব মেলাতে পারব। তবে মোটা দাগে কতগুলো কথা বলা যায়।
প্রথমত, সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল, তাতে ইরান আতঙ্কিত ছিল। এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরান যে অভিযোগ এনেছে, তা হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প তার সৌদি আরব সফরের সময় ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের অভিযোগ এনেছিলেন। এখন ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হলো। তৃতীয়ত, কাতারের ব্যাপারে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সুষ্পষ্ট অভিযোগ এনেছিল। এই দেশ দুটির অভিযোগ ছিল কাতার আইএসকে অর্থ জোগাচ্ছে। কাতার কর্তৃক এক মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের একটি অভিযোগ পাওয়া যায়। ট্রাম্পও অনেকটা কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কাতারের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক সাম্প্রতিককালে বেশ ভালো। এই কাতার-ইরান ঐক্যে ফাটল ধরাতে ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে এবং ইরানকে নিবৃত্ত করার 'কোন পক্ষের' কোন উদ্যোগ হতে পারে। চতুর্থত, উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে ইসরাইলের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। এসব সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে একজন কট্টরপন্থি ওদেদ ইনন (ঙফবফ ণরহড়হ) ১৯৮২ সালে যে বৃহত্তর একটি ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, তার সাথে কোন যোগসূত্র আছে কি-না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে মধ্যেপ্রাচ্যের রাজনীতি যখন এমনিতেই উত্তপ্ত, ঠিক তখনই সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব ও তেহরানে সন্ত্রাসী হামলা নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। ইরানের সুনি্ন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপ-প্রধান রেজা সেইফুল্লাহ প্রতিশোধ নেয়ার কথা বলেছেন। এখন দেখতে হবে ইরান এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় কী সিদ্ধান্ত নেয়। তবে স্পষ্টতই মধ্যপ্রাচ্য তথা পারস্য অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ল।
Daily Jai Jai Din12.06.2017

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক রাজনীতি

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক রাজনীতি তিনটি কারণে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। এই তিনটি কারণ হচ্ছে এক. সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং মুসলিমবিশ্বে এর প্রভাব। দুই. তেহরান পার্লামেন্ট ও ইমাম খোমেনির মাজারে সন্ত্রাসী কর্মকা- এবং আইএসের দায় স্বীকার। তিন. সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল, তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর। এ তিনটি ঘটনার একটির সঙ্গে অপরটির সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। তবে ইরানে সন্ত্রাসী ঘটনা এ অঞ্চলের রাজনীতির দৃশ্যপটকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে। কেননা ইরান শিয়াপ্রধান একটি দেশ এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় আছে। সম্প্রতি সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে; কিন্তু কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের খবর আমরা পাইনি। এ রকম একটি সময়ে আইএসের জঙ্গিরা সেখানে হামলা চালাবে, তা অকল্পনীয় এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে। কেননা আইএস মূলত সুন্নিপ্রধান একটি সংগঠন। সুন্নিশাসিত এলাকাগুলো নিয়ে আইএস তার তথাকথিত ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অতীতে আইএস ইরান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি এবং ইরানের কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক আছে, এমনটিও জানা যায় না। এখন জানা গেল আইএসের ‘ইরানি যোদ্ধারা’ এ সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটিত করেছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সৌদি আরব এ সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত! মনে রাখতে হবে, ইরানে এ সন্ত্রাসী হামলা হলো মে মাসে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের পর যেখানে তিনি প্রকাশ্যে ইরান সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছে, এমন অভিযোগ করেছিলেন। তার ওই বক্তব্য এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিরোধ অর্থাৎ শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়েছিল। এখন সন্ত্রাসী কর্মকা- ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে আবারও সামনে নিয়ে এলো। এখানে ইসরাইলও একটি ফ্যাক্টর। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে ইসরাইলের একটা বড় ভয় রয়েছে। সম্প্রতি কাতার-ইরান সমঝোতাকে ভালো চোখে নেয়নি ইসরাইল। ট্রাম্প প্রশাসনও এ সমঝোতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে। ফলে কাতার-ইরান সমঝোতাকে ভ-ুল করতে ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয়া যায় না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নিয়েছিলেন। রিয়াদে ২১ মে তিনি আরব ইসলামিক-আমেরিকান (এআইএ) সম্মেলনে ভাষণও দেন। ওই সম্মেলনে মুসলমানপ্রধান ৫৬ দেশের রাষ্ট্র তথা সরকারপ্রধানরা অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনে শেখ হাসিনা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমনে চার দফা প্রস্তাবও পেশ করেছিলেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিয়াদ সফর ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এ সম্মেলনে তিনি ইরানবিরোধী যে বক্তব্য দেন, তা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে যে ১১ হাজার কোটি ডলারের এটি অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তা এখন এ অঞ্চলের উত্তেজনার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ অস্ত্র বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কী? যুক্তরাষ্ট্র যে অস্ত্র বিক্রি করবে, তা নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে। কিন্তু একই সঙ্গে সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব আবারও বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া সংকটের যখন সমাধান হয়নি কিংবা ইসলামিক স্টেটকে যখন পরিপূর্ণভাবে উৎখাত করা সম্ভব হয়নি, ঠিক তখনই ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র এ অঞ্চলে নতুন একটি ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করবে এবং এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদবিরোধী একটি জোট গঠিত হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেরোরিজম’। বাংলাদেশ ওই জোটে আছে। প্রায় ৩৩টি মুসলমানপ্রধান দেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এ জোটে। এ জোটকে অভিহিত করা হয়েছে ‘আরব ন্যাটো’ হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্বের রেশ ধরে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এখন সৌদি আরব একটি সামরিক জোট গঠন করল এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হলো। যদিও প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে, ‘জোটটি’ শুধু সন্ত্রাসবিরোধী একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এবং জোট কার্যত একটি তথ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু একটি তথ্য বিনিময় কেন্দ্র হিসেবেই থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি সামরিক জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেÑ এ প্রশ্ন থাকলই। কেননা আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনের পর যে রিয়াদ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে বেশকটি দেশের অংশগ্রহণে ৩৪ হাজার সেনার অতিরিক্ত বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ওই ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, ইরাক ও সিরিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে সহযোগিতার জন্যই এ সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হবে। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। বিশেষ করে সৌদি শিয়া নেতা নিমর আল নিমরের মৃত্যুদ- কার্যকর করার পর (জানুয়ারি ২০১৬) এখন একটি সুন্নিপ্রধান সামরিক জোট গঠন এ অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব ও বিভেদকে উপসাগরের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেবে। এখানে একটা কথা বলা দরকার, পারস্য উপসাগরভুক্ত অঞ্চলে সুন্নিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ অঞ্চলের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত আর ৩৬ ভাগ মানুষ হচ্ছেন শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এ অঞ্চলের মাঝে ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন আর বাহরাইনে শিয়া সম্প্রদায়ের লোক বেশি বাস করে। যেমন বলা যেতে পারে, ইরানে যেখানে ৮৫ শতাংশ লোক শিয়া সাম্প্রদায়ভুক্ত, সেখানে সুন্নিদের সংখ্যা শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ। ইরাকের ৬৩ শতাংশ যেখানে শিয়া, ৩২ শতাংশ সেখানে সুন্নি। সিরিয়ায় ১৫ শতাংশ শিয়া আর ৭৩ শতাংশ সুন্নি। বাহরাইনে ৭৫ শতাংশ শিয়া, ২৫ শতাংশ সুন্নি। ইয়েমেনে ৪৪ শতাংশ শিয়া, ৫৬ শতাংশ সুন্নি। মজার ব্যাপার হলো, বাহরাইনে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। সুন্নি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে খলিফা হামাদ ও তার পরিবার সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ আলাউট সম্প্রদায়ের লোক। আলাউট সম্প্রদায় শিয়াদের একটি উপশাখা। একটি গোত্র। এই গোত্র সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বাসার আল আসাদের বাবা হাফিজ আল আসাদও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সিরিয়া ও ইরাকে একসময় বাম-মনা বার্থ পার্টি গঠিত হয়েছিল। হাফিজ আল আসাদ সেনাবাহিনীর লোক হয়েও বার্থ পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর ২০০০ সালে ছেলে বাসার আল আসাদকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ইরাকে সাদ্দাম-পরবর্তী জমানায় শিয়ারা ক্ষমতা পরিচালনা করলেও সাদ্দামের (সুন্নি) সময় শিয়ারা ছিলেন উপেক্ষিত। এখন ইরাকে শিয়ারা ক্ষমতায়। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। সৌদি শিয়া নেতা নিমর আল নিমরের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছিল এমন একটি সময়, যখন এ অঞ্চলে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ২০১৫ সালেই একটি সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল। এ জোট গঠনকে ইরান ভালো চোখে দেখেনি। খুব সংগত কারণেই এ সামরিক জোটটি গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনার দাবি রাখে।
তাহলে পরিস্থিতি এখন কোনদিকে যাচ্ছে? কুয়েত সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে বিরোধের মধ্যস্থতা করছে। দুইটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে যদি বিরোধ থাকে এবং যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইসরাইল এ থেকে ফায়দা নেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে কতকগুলো মন্তব্য করা যায়। নিশ্চয়ই সৌদি ও ইরানের নেতারা এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল, তাতে ইরান আতঙ্কিত ছিল। এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরান যে অভিযোগ এনেছে, তা হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ট্রাম্প তার সৌদি আরব সফরের সময় ইরানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের’ অভিযোগ এনেছিলেন। এখন ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হলো। কেউ এর সঙ্গে কোনো মিল খুঁজতে পারেন। কাতারের ব্যাপারে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সুস্পষ্ট অভিযোগ এনেছিল। এ দেশ দুইটির অভিযোগ ছিল, কাতার আইএসসংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীকে অর্থ জোগাচ্ছে। কাতার কর্তৃক জঙ্গিদের ১ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের একটি অভিযোগ পাওয়া যায়। ট্রাম্পও অনেকটা কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কাতারের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক সাম্প্রতিককালে বেশ ভালো। এই কাতার-ইরান ঐক্যে ফাটল ধরাতে ইরানে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে এবং ইরানকে নিবৃত্ত করার ‘কোনো পক্ষের’ কোনো উদ্যোগ হতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে ইসরাইলের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। এসব সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে একজন কট্টরপন্থী ওদেদ ইনন (ড়ফবফ ুরহড়হ) ১৯৮২ সালে যে বৃহত্তর একটি ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি যখন এমনিতেই উত্তপ্ত, ঠিক তখনই সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব এবং তেহরানে সন্ত্রাসী হামলা নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান রেজা সেইফুল্লাহ ‘প্রতিশোধ’ নেয়ার কথা বলেছেন। এখন দেখতে হবে, ইরান এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় কী সিদ্ধান্ত নেয়। তবে স্পষ্টতই মধ্যপ্রাচ্য তথা পারস্য অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ল। এ উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে। সৌদি আরবের দুইটি মসজিদ (মসজিদ আল হারামÑ মক্কা শরিফ ও মসজিদ আল নববিÑ মদিনা শরিফ) এর জিম্মাদার হচ্ছেন সৌদি বাদশা। ধর্মীয়ভাবে এ মসজিদ দুইটি মুসলমানদের জন্য পবিত্র স্থান। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষ সবসময় সৌদি আরবের পাশে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ইরানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’, যে প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরের তেল বহির্বিশ্বে যায়। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয, তার ২০ ভাগ এ পথে পরিবাহিত হয়, যার পরিমাণ ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রতিদিন)। সুতরাং এ অঞ্চলে যে কোনো দ্বন্দ্বে ওই জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘœ ঘটবে। অন্যদিকে কাতারে রয়েছে বিশ্বের বড় গ্যাস রিজার্ভ। প্রতি মাসে বিশ্বে যে পরিমাণ তরল গ্যাস (এলএনজি) রফতানি হয়, তার মাঝে কাতার একাই সরবরাহ করে ৮ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন কিউসেক মিটার। কাতারের এলএনজি ও পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল আরব আমিরাত। যে কোনো সংকটে এ সরবরাহে বিঘœ ঘটবে। পারস্য অঞ্চলে তাই কোনো ধরনের উত্তেজনা, যুদ্ধ কিংবা বিবাদ কাম্য নয়। সৌদি, কাতার ও ইরানের জাতীয় নেতারা নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবেন আমাদের প্রত্যাশা এটাই।
Daily Alokito Bangladesh
11.06.2017

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচন : অনিশ্চয়তা থাকলই


শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নির্বাচনে বুথফেরত জরিপই সত্য হলো। প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে।
এককভাবে সরকার গঠন করার জন্য যে ৩২৬টি আসনের প্রয়োজন ছিল, তা কনজারভেটিভরা নিশ্চিত করতে পারেনি। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, কনজারভেটিভদের আসন কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩১৯টিতে। আবার লেবার পার্টির আসন বেড়েছে। এ সংখ্যা ২৬২। কিন্তু এ আসন নিয়ে সরকার গঠন করাও সম্ভব নয়। ফলে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান পার্লামেন্ট, হাল হতে যাচ্ছে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের। আগামী ১৯ জুন রানির ভাষণের মধ্য দিয়েই পার্লামেন্টের অধিবেশন বসছে। কিন্তু অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে নয়া পার্লামেন্টকে। প্রথমত, টেরেসা মে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবেন না। তাঁকে সরকার গঠন করতে হলে তৃতীয় একটি পার্টির সঙ্গে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হবে। ২০১০ সালের নির্বাচনের পরেও কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। এখন লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের দিকেই তাকাতে হবে টেরেসা মেকে। বিষয়টি খুব সহজ নয়। তৃতীয় পার্টি স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি টেরেসা মের সরকারে যোগ দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। আর লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা প্রো-ইউরোপীয় ধারণায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে কনজারভেটিভরা ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী। ফলে কোয়ালিশনের ধারণা আদৌ আলোচিত হবে কি না, বলা মুশকিল। একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্ম হলো। বলা ভালো, ২০১৫ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে কনজারভেটিভরা পেয়েছিল ৩৩০ আসন, অর্থাৎ ৩৬.৯ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে লেবার পার্টি পেয়েছিল ২৩২ আসন, অর্থাৎ ৩০.৪০ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করেছিল লেবার পার্টি। ৪.৭ শতাংশ ভোট আর ৫৬টি আসন নিশ্চিত করেছিল স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি। আর লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিল ৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৭.৯ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন প্রমাণ করল ব্রিটিশ জনগণ টেরেসা মের ওপর পূর্ণ আস্থা  রাখতে পারছে না। তিনি সম্ভবত একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করবেন। তবে তাঁর নেতৃত্ব এখন প্রশ্নের মুখে থাকল। ২০১৬ সালের ১১ জুলাই থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ (২৩ জুন ২০১৬) করেছিলেন। ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু গণভোটে (ব্রেক্সিট প্রশ্নে) হেরে গিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। এখন নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল, ব্রেক্সিট প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় ভোটাররা টেরেসা মের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। তাঁর আগাম নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। এখন একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টে তিনি কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যদি না লেবার পার্টি তাঁকে সহযোগিতা করে। এর মধ্যেই তাঁর ‘ভুল সিদ্ধান্তের’ কারণে তাঁর পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে। এমনকি লেবার লিডার জেরেমি করবিনও তাঁকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তৃতীয়ত, বিতর্কিত দক্ষিণপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজ ব্রেক্সিট প্রশ্নে দ্বিতীয় আরেকটি রেফারেন্ডামের আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রেক্সিট অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে ফারাজ সোচ্চার ছিলেন বেশি। ব্রেক্সিটের ব্যাপারে গণভোটে সিদ্ধান্ত হওয়ায় ফারাজ তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর দায়িত্ব শেষ। তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলের পর তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, তিনি রাজনীতিতে আবার ফিরে আসছেন। চতুর্থত, আরো একটি নির্বাচনের কথা কোনো কোনো মহল থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু Fixed term parliament Act 2011 অনুযায়ী আগাম নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী ২০২২ সালে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য চাইলে আগাম নির্বাচন সম্ভব। ২০১৫ সালে নির্বাচন হলেও ২০১৭ সালের ৮ জুন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়েছিল পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য চেয়েছিলেন বলেই। এখন লেবার পার্টি আবারও একটি নির্বাচন চাইবে, এটা মনে হয় না। ফলে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
পঞ্চমত, এই নির্বাচন ছিল লেবার পার্টির লিডার জেরেমি করবিনের জন্য ব্যক্তিগতভাবে একটি বড় বিজয়। তাঁর ‘বাম চিন্তাধারা’ তাঁকে দলের ভেতরে ও বাইরে বিতর্কিত করলেও এটা প্রমাণিত হয়েছে, মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি ভালো বক্তা। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার এক অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি রয়েছে তাঁর। একুশ শতকে এসেও সারা বিশ্ব যেখানে পুঁজিবাদের দিকে, বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকছে, সেখানে করবিন সেই পুরনো ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসি’র ধারণা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে গেছেন। জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো, রেল, পোস্ট অফিস ও তার কার্যক্রম, পানি ব্যবস্থাপনা জাতীয় করা, ধনী ব্যবসায়ীদের ওপর ট্যাক্স আরোপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ‘ফ্রি’ করে দেওয়া ইত্যাদি জনপ্রিয় কিছু কর্মসূচি নিয়ে মানুষের কাছে গেছেন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন তিনি পেয়েছেন। অনেক দিন পর লেবার পার্টি এমন একজন নেতা পেল, যিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক দিন দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। তিনি ‘নতুন এক লেবার পার্টির’ জন্ম দিতে যাচ্ছেন, যেখানে পুরনো ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসি’র ধারণা আবার ফিরে এসেছে।
ষষ্ঠত, নয়া সরকারের জন্য দুটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসননীতিতে কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা এবং ব্রেক্সিট আলোচনায় ব্রিটেনের শক্ত অবস্থানে যাওয়া। এমনকি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। ধারণা করা হয়েছিল, ম্যানচেস্টার ও লন্ডন ব্রিজে সন্ত্রাসী হামলার পর মানুষ কনজারভেটিভদের আরো বেশি করে ভোট দেবে, যাতে কনজারভেটিভরা তথাকথিত ‘জঙ্গি কার্যক্রম’ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে পারে। টেরেসা মে এটাকে ইস্যু করতে চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, তিনি জঙ্গিদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিলে মানুষ তাঁর দলকে আবার ক্ষমতায় বসাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে।
টেরেসা মে নির্বাচনের আগে কতগুলো বিষয় স্পষ্ট করেছিলেন। ১. সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় মানবাধিকার আইনে তিনি পরিবর্তন আনবেন; ২. ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ সন্দেহভাজনদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাবেন; ৩. হুমকি সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের চলাফেরায় তিনি নিয়ন্ত্রণ আনবেন। কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা গেল মানুষ তাঁর কথায় আস্থা রাখতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ আছে ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলায়, যাতে মারা গিয়েছিল ২২ ব্যক্তি (অ্যারিয়ানা গ্রানডের কনসার্টে), সেই হামলায় জড়িত ছিলেন সালমান আবেদি, তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল। লিবিয়ার একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। টেরেসা মে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন আবেদি ও তাঁর সমর্থকরা একাধিকবার ব্রিটেন থেকে লিবিয়ায় গেছে। গোয়েন্দারা তাঁর তত্পরতা সম্পর্কে অবগত ছিল। ফলে টেরেসা মে তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি, এমন একটা অভিযোগ ছিল।
সপ্তমত, ২০১৫ সালের নির্বাচনে স্কটল্যান্ডের ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি) অনেক বেশি আসন পেয়েছিল। স্কটল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত ৫৯টি আসনের মধ্যে এসএনপি পেয়েছিল ৫৬ আসন। কিন্তু এবার তাঁর আসন কমেছে। এসএনপির কিছু আসন চলে গেছে লেবার ও কনজারভেটিভদের হাতে। অষ্টমত, ২০১৫ সালের নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান খুব ভালো ছিল না। মাত্র আটটি আসন তারা পেয়েছিল। এবার তাদের আসন বেড়েছে। তারা প্রো-ইউরোপপন্থী। এবার আসন ১৩টি।
একটি ‘ঝুলন্ত পার্লামেন্ট’ ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনাকে আরো জটিল করে দিতে পারে। ব্রেক্সিট কার্যকর (২০১৯ সালের মার্চে এ প্রক্রিয়া শেষ হবে) করতে ব্রিটেনকে ১০০ বিলিয়ন ইউরো অথবা ১১২ বিলিয়ন ডলার ‘ডাইভোর্স বিল’ পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্রিটেন কিভাবে পরিশোধ করবে, আদৌ পরিশোধ করতে পারবে কি না, এটা নিয়ে এখন রয়েছে নানা প্রশ্ন। কাজটি খুব সহজ নয়। এর বাইরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশের সঙ্গে। এসব চুক্তির ধরন আলাদা আলাদা। পার্লামেন্টে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তিনি বারবার বাধার সম্মুখীন হবেন। তিনি কোনো ভালো চুক্তি করতে পারবেন না। ফলে ২০১৯ সালের মার্চ মাসের ‘ডেটলাইন’টি একটি বড় ধরনের প্রশ্নের মধ্যে থাকল এখন। একটি দুর্বল সরকার এখন ব্রিটেন পাবে। টেরেসা মে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য হয়তো প্রধানমন্ত্রী থেকে যাবেন। কিন্তু কনজারভেটিভদের পক্ষ থেকেও নয়া নেতা নির্বাচনের দাবি উঠবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের যে সম্পর্ক তাতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে অভিবাসনের ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি থাকবে। প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এখন ব্রিটেনে বসবাস করে। আমাদের আশার কথা, ২০১৫ সালে যে তিনজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী লেবার পার্টির পক্ষ থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন, এবারও তাঁরা বিজয়ী হয়েছেন।
Daily Kalerkontho
 10.06.2017

শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি শিক্ষার মানোন্নয়ন নির্দেশ করে না


জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮-তে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটে এর পরিমাণ ৬৫ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা, যা কিনা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৪ ভাগ। কিন্তু ওই বাজেট বৃদ্ধি কি আদৌ শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো অবদান রাখবে? উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এই বাজেট বৃদ্ধির প্রভাব কী? এখানে আমাদের নীতিনির্ধারকদের একটা বড় সমস্যা, তারা মনে করেন প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কিংবা হাজার হাজার জিপিএ-৫ ‘পাইয়ে’ দিয়ে তারা মনে করেন উচ্চশিক্ষায় একটি ‘বিপ্লব’ আনতে যাচ্ছেন। কিন্তু এটা একটি ভুল ধারণা। এভাবে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না। কিছুদিন আগে তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন ছাত্রের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিল। এরা সবাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং সবাই জিপিএ-৫ এর অধিকারী। সাক্ষাৎকারে তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তারা এর যেসব জবাব দিয়েছিল তা তখন ভাইরাল হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছিল। এ নিয়ে আলোচনা করা অর্থহীন। শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে জিপিএ-৫ নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আজ কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, ওইসব ছাত্রছাত্রীর জবাবের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ আমরা মানসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে পারিনি। আমাদের এক সময়ের ‘সমাজতাত্ত্বিক’ শিক্ষামন্ত্রী জিপিএ-৫ নিয়ে গর্ব করেন। এখন ছাত্রছাত্রীদের ওই বক্তব্য তাকে কতটুকু গৌরবান্বিত করতে পেরেছিল আমি জানি না। কিন্তু আমি এটা বুঝি যে, তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভরসার স্থল, তারা আমাদের আশাভঙ্গ করেছে। এই প্রজন্মকে নিয়ে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। বিভিন্ন ‘কোটায়’ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, তারা একটি দক্ষ জনশক্তি কী আদৌ গড়ে তুলতে পারবে? তাই ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে যখন শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৬৫ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়, তাতে করে শিক্ষার মানোন্নয়নে তা কতটুকু অবদান রাখবে, এ প্রশ্ন থাকলই। তরুণ প্রজন্ম আমাদের ‘শক্তি’। কিন্তু এই শক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে আমরা পরিণত করতে পারিনি। শিক্ষক হিসেবে এ ব্যর্থতা আমার। কীভাবে একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা যায়, সিঙ্গাপুর আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত। চীনের দৃষ্টান্তও আমরা দিতে পারি। আমাদের বড় ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি কম। শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। তাতে করে উপকৃত হয়েছে কারা? বেতন খাতেই তো চলে যায় পুরো টাকা। সরকারি কলেজগুলোয় (সরকারি) অবকাঠামো খাতে কিছু উন্নয়ন হয়। কিন্তু এখানে মানসম্মত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন না কেউ। আর শিক্ষকরা এখন গুরুত্ব দেন ‘প্রাইভেট পড়ানোর’ ওপর। মানসম্মত শিক্ষা তাদের কাছে মুখ্য নয়। এসব দেখারও যেন কেউ নেই। অর্থমন্ত্রী যখন নতুন বাজেট উপস্থাপন করলেন তখন এ কথাটাই আবার মনে হলো। নিয়ম রক্ষার্থে তিনি শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছেন। কিন্তু যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হচ্ছে এই বিশাল ব্যয় দিয়ে আমরা উচ্চশিক্ষার কতটুকু মানোন্নয়ন করতে পারব? বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, আইটি সেক্টরের উন্নয়নÑ এই বরাদ্দ দিয়ে আদৌ সম্ভব নয়। কেননা এই অর্থের মধ্যে ২২ হাজার ২২ কোটি টাকা ব্যয় হবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। আর ২৩ হাজার ১৪১ কোটি (নির্দিষ্ট) টাকা ব্যয় হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বরাদ্দ তাতে করে আমাদের উৎফল্লিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা এই টাকার খুব সামান্যই ব্যয় হয় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে একটা অংশ বরাদ্দ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। ২০০১-০২ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১১০২.২৪ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৭৫ ভাগ বরাদ্দ থাকে শিক্ষা খাতে (২০০১-০২)। এ পরিসংখ্যান বেড়েছে ০.৮৪ ভাগ ২০১০-১১ সালে। আবার যদি শুধু শিক্ষা খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে এ বরাদ্দ মাত্র ৭.৮৫ ভাগ (২০০১-০২) থেকে ৮.২২ ভাগ (২০১০-১১)। চলতি অর্থবছরে এই হার খুব বেড়েছে তা নয়। অর্থাৎ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার পরিমাণ খুব বেশি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে, বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও। যদিও তুলনামূলক বিচারে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বাজেট শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম। তার পরও কথা থেকে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেবে দেখতে হবে, কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়ানো যায় এবং সরকারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা কমানো যায়। এখানে আরও একটা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজনÑ আর তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে টাকা বরাদ্দ করা হয়, তার খুব কম অংশই ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপাচার্য মহোদয়রা উন্নয়ন খাতে কিংবা গবেষণায় যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেই টাকা নতুন শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যয় করেছেন। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা দলীয় কোটায়, স্থানীয় কোটায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক বেশ কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি নিজের মেয়ে, ভাই, আপন ভায়রা, শ্যালিকার মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়েকে শিক্ষক তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটা রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এই প্রবণতা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। অভিযোগ আছে, জাহাঙ্গীরনগর ইতোমধ্যে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়েও পরিণত হয়েছে! ফলে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়ন বাজেট থেকে টাকা এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে বিজ্ঞাপিত পদের (প্রভাষক) বিপরীতে প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। অতীতে এমনটি কখনই হয়নি। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য একাধিক বিভাগ ভেঙে নতুন নতুন বিভাগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যার আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। অনেক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলে তারা বলতে পারবেন না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মোট বিভাগের সংখ্যা কত। ফলে সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হচ্ছে নতুন করে সৃষ্টি করা বিভাগগুলো কি আদৌ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারবে? প্রসঙ্গক্রমেই আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ফলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটের সঙ্গে পটুয়াখালী কিংবা গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা কী সমমানসম্পন্ন? আমি কাউকে ছোট করতে চাই না। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যোগ্য শিক্ষক নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ান, তারা মূলত কলেজ শিক্ষক। কলেজ শিক্ষক এনে পাঠদান করানো হচ্ছে। সেদিন একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভিনিং বা সান্ধ্যকালীন এমবিএ কোর্সের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি! সান্ধ্যকালীন কোর্স, তাও আবার এমবিএ কারা পড়াবেন? কে পড়বেন? এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল? ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ওখানে তো বিজ্ঞান, আইটিসংক্রান্ত কোর্সই চালু থাকবে। বিবিএর বিষয়টি কি আইনে অনুমোদন করে? আরও দুটি দৃষ্টান্ত দিই। এক. গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চালু করা হয়েছে। আমি অবাক হয়ে যাই ওখানে কারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়াবেন? আমরা কী যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারব সেখানে? যারা শিক্ষক নিয়োগ কমিটিতে আছেন, তাদের আমি চিনি। কাউকে ছোট করা নয় বরং বিবেচনায় নেওয়া উচিত আমাদের আদৌ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা উচিত কিনা? মঞ্জুরি কমিশন নিশ্চয়ই অনুমতি দিয়েছে। এখানে মঞ্জুরি কমিশন বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেনি। দুই. গণবিশ্ববিদ্যালয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে! বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক! কোন ছাত্ররা হাজার টাকা মাসে বেতন দিয়ে ওখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়বে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তার বিচক্ষণতাকে আমি সমর্থন করতে পারলাম না। সবাই সার্টিফিকেটসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছে। কিন্তু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কেন করবেন? এ ক্ষেত্রে অবশ্য মঞ্জুরি কমিশনকে ধন্যবাদ দিতে হয়। মঞ্জুরি কমিশন চায়নি গণবিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে শুধু ‘সার্টিফিকেট বিক্রি করুক।’ ওখানে সরকার ও রাজনীতি বিভাগ আছে। প্রয়োজনে ওই বিভাগে কোর্সের আওতায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়ানো যায়। আমি অবাক হয়ে যাই, যখন দেখি গণবিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে! এটা কি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পারে? এটা মঞ্জুরি কমিশনের জন্য একটি অশনিসংকেত। কমিশন যদি শক্ত অবস্থানে না যায়, তাহলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এভাবে মঞ্জুরি কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করবে। কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহারে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওখানে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও আছে। এর সত্যতা আছে। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। কীভাবে লাইব্রেরি ওয়ার্ক না করে, ফিল্ড সার্ভে না করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব? যারা করছেন, তারা কী এটা বোঝেন না? যে বিভাগে মাত্র একজন অধ্যাপক ডক্টরেট ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই, সেই বিভাগে উচ্চতর শিক্ষা কমিটি গঠিত হয় কীভাবে? সংবাদপত্রে যে ‘সিন্ডিকেটের’ মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগটি উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত, এ ব্যাপারে তদন্ত করে দেখা। না হলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করবে। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসও পিএইচডি ডিগ্রি দিচ্ছে। অথচ তাদের আদৌ সিনিয়র শিক্ষক নেই। ফুলটাইম সিনিয়র শিক্ষক ছাড়া পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া কতটুকু নীতিমালার মধ্যে পড়ে, আমি বুঝতে অক্ষম। মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদন দিল কীভাবে? সেনাবাহিনীকে নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব। ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারদের যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তারা যদি একটি ভুল করেন (?), আমাদের তা কষ্ট দেয়। আমি জানি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আগামীতে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কিন্তু এখানে দরকার যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। অনেক শিক্ষক আছেন, যারা অবসর নিয়েছেন, কিন্তু কর্মক্ষম তাদের বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের পিএইচডি কার্যক্রম অব্যাহত রাখুক, এই অনুরোধ রাখাব। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু এতে করে আমি আশাবাদী হতে পারলাম না। বাজেট বাড়িয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য চাই যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা বাধ্যতামূলক করা, যোগ্য উপাচার্য নিয়োগ, মঞ্জুরি কমিশনকে ঢেলে সাজানো ইত্যাদি। না হলে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়বে। তাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে না।
Daily Amader Somoy
07.06.2017

রক্তাক্ত লন্ডন ও নির্বাচনের রাজনীতি



লন্ডন আবারও রক্তাক্ত হয়েছে। লন্ডনের ব্রিজ ও বরো মার্কেটে সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেলেন সাতজন, আর আহতদের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি।
এই হামলা হলো এমন একটা সময় যখন মানুষ প্রস্তুত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচনের জন্য। ৮ জুন অর্থাৎ আগামীকাল সেখানে নির্বাচন। অনেক প্রশ্ন এখন। কেন এই সময়টা বেছে নিল সন্ত্রাসীরা? তাহলে কী আইএস নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে চাইছে? তাদের স্বার্থ কী? আইএস এর দায়দায়িত্ব স্বীকার করে নিলেও এই হামলা ব্রিটেনসহ সারা বিশ্বেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এটা স্পষ্ট, এর একটি প্রতিক্রিয়া থাকবে এবং নির্বাচনে যে দলই বিজয়ী হোক, সেই দলকে ‘মুসলমান’ তথা অভিবাসনবিরোধী ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে। আইএসের লাভটা এখানেই! বলা ভালো, ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। এখন ‘নয়া সরকারকে’ ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় যেতে হবে। ২০১৬ সালের ২৩ জুন গণভোটে হেরে ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন টেরেসা মে। তিনি ২০১৬ সালের ১১ জুলাই থেকে পার্টি এবং সেই সঙ্গে ব্রিটেনেরও নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। গণভোটের ওই রায়কে অনুসরণ করে ইইউর আর্টিক্যাল ৫০ অনুযায়ী ব্রিটেন গত মার্চ মাসে (২০১৭) ইইউ ত্যাগ করার আবেদন করে। এর অর্থ হচ্ছে, এ মুহূর্তে ব্রিটেন আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। তবে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে যেতে আরো কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। এবং ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ এই বেরিয়ে যাওয়ার কাজটি সম্পন্ন হবে। টেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই নিজের হাতকে আরো শক্তিশালী করা এবং ব্রেক্সিট আলোচনায় (ইইউর সঙ্গে) ব্রিটেনের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে হাউস অব কমন্সে তাঁর দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। বিরোধী দল লেবার পার্টি যদি আগাম নির্বাচনের প্রস্তাবকে সমর্থন না করত, তাহলে ২০২০ সালেই পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল সংসদের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে’ ভোটাভুটিতে টেরেসা মের আগাম নির্বাচনের পক্ষে পড়ে ৫২২ ভোট, আর ১৩ ভোট বিপক্ষে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ আগাম নির্বাচনের পক্ষেই রায় দিয়েছিল। এর ফলে ৮ জুন সেখানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। টেরেসা মের ভয় ছিল লেবার পার্টি ও সংসদের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস তাঁর পরিকল্পনায় বাধা দিতে পারে। এতে ইইউর সঙ্গে তাঁর আলোচনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। যদিও সেই আশঙ্কা তিনি অনেক আগেই কাটিয়ে উঠেছেন। এখন নির্বাচনে বিজয়ী হলেও তাঁকে এক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেনা পরিশোধ করতে হবে। ইইউর সঙ্গে আলোচনায় ব্রিটেনের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্রিটেনে বসবাসকারী ইইউর নাগরিকদের বসবাস ও চাকরি করার অধিকারের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
এখানে বলা ভালো, হাউস অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০। সরকার গঠন করতে হলে দরকার হয় ৩২৬ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। ব্রিটেনে মূলত একটি দ্বিদলীয় সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। অর্থাৎ কনজারভেটিভ অথবা লেবার পার্টি মূলত ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। অনেক দিন ধরেই তৃতীয় একটি পার্টির কথা বলা হলেও তৃতীয় পার্টির উত্থান সেভাবে ঘটেনি। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির অস্তিত্ব আছে বটে, কিন্তু সংসদে তাদের অবস্থান দুর্বল। বরং তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে স্কটিশ পার্টি স্কটল্যান্ড ন্যাশনালিস্ট পার্টি। ২০১৫ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আসন সংখ্যা ছিল ৩৩০। অন্যদিকে  লেবার পার্টি পেয়েছিল ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। আসন ছিল ২৩২। আর লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। আসন মাত্র ৮। তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে স্কটল্যান্ড ন্যাশনালিস্ট পার্টি। তারা পেয়েছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু আসন ৫৬। অর্থাৎ স্কটল্যান্ডের যে ৫৯টি আসন রয়েছে তার মধ্যে ৫৬টি আসনই পেয়েছিল স্কটল্যান্ডের এই জাতীয়তাবাদী পার্টি। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, কনজারভেটিভরা কী তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে? নাকি লেবার পার্টির নেতৃত্বে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে? একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ।
একসময় মনে করা হতো টেরেসা মে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন, যাতে ইইউর সঙ্গে আলোচনায় তিনি একটি শক্ত অবস্থানে যেতে পারেন। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই টেরেসা মের জনপ্রিয়তা কমছে। একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউগভের চালানো এক জরিপে বলা হয়েছে, সরকার গঠনে টেরেসা মের কনজারভেটিভ পার্টি প্রয়োজনীয় আসন থেকে ১৬টি আসন কম পেতে পারে। তাহলে সরকার গঠনের জন্য টেরেসা মেকে স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি সম্ভব হবে কি না? কেননা স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেত্রী স্টারজিওন কনজারভেটিভ পার্টির অনেক কর্মসূচির সমালোচনা করে আসছেন। এমনকি দলটি ছিল ব্রেক্সিটের বিপক্ষে। স্টারজিওন এখন চাচ্ছেন স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা। এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে জায়গাটি ব্রিটেন ছেড়ে দিল, ওই স্থানটিতে যেতে চান স্টারজিওন। অর্থাৎ স্কটল্যান্ড ইইউতে যোগ দিতে চায়। ফলে ব্রিটেনে একটি কোয়ালিশন সরকারে স্টারজিওনের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। গেল নির্বাচনের মতোই স্টারজিওন এবার ৫০টির ওপর আসন পাবেন বলে ইউগভের জরিপে জানা গেছে। জরিপে লেবার পার্টির অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো দেখানো হয়েছে। গত নির্বাচনের চেয়ে লেবার পার্টি আরো ২৯টি আসন বেশি পাবে বলে বলা হয়েছে। এখানেও রয়েছে সমস্যা। সরকার গঠনের জন্য যে ৩২৬ আসন প্রয়োজন, তা যদি লেবার পার্টি না পায়, তাহলে লেবারকে সরকার গঠনের জন্য কোয়ালিশনে যেতে হবে। কিন্তু লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন সেটা চাচ্ছেন না। তিনি এরই মধ্যে এটা স্পষ্ট করেছেন, তাঁর দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে মিলে কোনো কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে না। জনমত জরিপকে যদি আমরা ‘সত্য’ বলে ধরে নিই, তাহলে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্ম হতে যাচ্ছে ব্রিটেনে।
গেল নির্বাচনে ব্রিটেনে ব্যাপক অভিবাসী আগমন, ব্রেক্সিট ইস্যু একটা বড় প্রভাব ফেলেছিল। ব্যাপক অভিবাসী আগমন, বসবাস ও চাকরিবাকরি করার কারণে ব্রিটেনে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে অভিবাসীদের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে। তারা চাকরিবাকরি পাবে না। এ কারণেই ভোটাররা কনজারভেটিভ পার্টির দিকে ঝুঁকেছিল। এবারে নির্বাচনে কোনো একটি ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে না। ব্রেক্সিটের প্রশ্ন এখন আর নেই। তবে ব্রেক্সিট-পরবর্তী আলোচনায় ব্রিটেনের শক্ত অবস্থানে থাকার বিষয়টি এবার গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচনের আগে দুটি বড় দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। কনজারভেটিভদের ইশতেহারে অভিবাসীদের সংখ্যা বছরে মাত্র কয়েক হাজারে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রেক্সিট আলোচনায় ব্রিটেনের অবস্থান ও স্বার্থ শক্তিশালী করা, পেনশনব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যাটো, জি-২০, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ব্রিটেনের ‘কমিটমেন্ট’ অব্যাহত রাখা ও প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ, উন্নয়নশীল বিশ্বে সাহায্যের পরিমাণ জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে লেবার পার্টির প্রতিশ্রুতিও তাই। তবে লেবার পার্টি বেশ কয়েকটি বড় বড় সেক্টর (পানি, পোস্ট, রেল) জাতীয়করণের প্রস্তাব করেছে। তবে ৩ জুন খোদ লন্ডনে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর আগে ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ভোটাররা প্রভাবান্বিত হতে পারে। আর তাতে করে লাভবান হবে কনজারভেটিভরাই। আর তারা মুসলিম তথা অভিবাসনবিরোধী কঠোর আইন পাস করুক—এটাই চাচ্ছে!
এই নির্বাচন আমাদের জন্য, বিশেষ করে লন্ডনে বসবাসকারী বাঙালিদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এবার নির্বাচনে ১৪ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে আটজন রয়েছেন লেবার পার্টি থেকে। কনজারভেটিভ পার্টি থেকে গেলবার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এবার পার্টি কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতকে মনোনয়ন দেয়নি। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে একজন মনোনয়ন পেয়েছেন। সাধারণত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা যেখানে বসবাস করেন, সেখানেই তাঁরা প্রার্থী হন। গেলবার তিনজন বাঙালি লেবার প্রার্থী—রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক ও রূপা হক নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। কনজারভেটিভ পার্টি বিজয়ী হলে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ব্যাপারে আরো কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা হবে। লন্ডন ও আশপাশের শহরের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের একটা বড় অভিযোগ, তাঁরা দক্ষ শেফ ও রেস্টুরেন্টকর্মী পাচ্ছেন না। স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ কমিউনিটি এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। ফলে বাংলাদেশের ওপর তাঁদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ভিসা সমস্যার কারণে তাঁরা বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনতে পারছেন না। কর্মী সমস্যার কারণে ঝুঁকির মুখে আছে এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। নির্বাচনের আগেই টেরেসা মে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় অভিবাসীদের সংখ্যা বছরে মাত্র কয়েক হাজারে নামিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। তাঁর ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি যদি এটি কার্যকর করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা। এ ক্ষেত্রে রুশনারা, টিউলিপ ও রূপা হকদের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। বাংলাদেশি পণ্যের আরো বাজার সম্প্রসারণের একটা সম্ভাবনা রয়েছে যুক্তরাজ্যে। এই বাজার সম্প্রসারণে তাঁরা কাজ করতে পারেন। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তথা নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগকে আরো শক্তিশালী করতে পারেন তাঁরা।
মোটা দাগে যা বলা যায় তা হচ্ছে, নির্বাচনের পর যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো উন্নত হবে। বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের আগ্রহ আরো বাড়বে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করা, মানবাধিকার পরিস্থিতির আরো উন্নত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, নারী উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দুই দেশের সম্পর্ক আরো উন্নতি হবে। অন্যদিকে ট্রেডিশনাল যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে তেমন পরিবর্তন আসবে না। ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পর ব্রিটেনের রাজনীতিতে এখন পরিবর্তন আসবে ব্যাপক। অভিবাসনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আসবে আরো। দক্ষিণ এশীয় ও পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন প্রক্রিয়ায়ও আরো কড়াকড়ি ব্যবস্থা আসবে। এতে যেকোনো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত নাগরিক হুট করে ব্রিটেনে বসবাস বা সামাজিক সুবিধা পাবেন না। ইউরোপ এখন ধীরে ধীরে নতুন এক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনকে এখন একা চলতে হবে। নতুন করে ইইউ তথা ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের সঙ্গে ব্রিটেনকে আলাদা আলাদাভাবে চুক্তি করতে হবে। প্রায় সাত শর মতো চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কাজটি সহজ নয়। এই জুন মাসেই এ আলোচনা শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো দলই যদি হাউস অব কমন্সে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, যদি একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্ম হয়, তাহলে ইইউর সঙ্গে আলোচনায় জট বাঁধবে। ব্রিটেনের স্বার্থের প্রশ্নে যদি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে ইইউর সঙ্গে আলোচনা এগোবে না। এই নির্বাচন তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
Daily Kalerkontho
07.06.2017

একটি ছবি, প্রশ্ন অনেক



হাতকড়া অবস্থায় শুয়ে আছে একটি ছেলে। হাসপাতালের বেডে। হাতকড়া লাগানো আছে বেড স্ট্যান্ডের সঙ্গে, যাতে সে পালিয়ে যেতে না পারে। এ ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক গণমাধ্যমে। প্রথম দর্শনে মনে হবে ও হয়তো ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী। কিংবা জঙ্গি। হয়তো সাম্প্রতিক কোনো জঙ্গিবিরোধী ‘অপারেশনে’ সে আহত হয়েছে এবং পুলিশ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ওকে ভর্তি করিয়েছে। না, পুলিশ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়নি। ও নিজে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। আর আমাদের পুলিশ ‘তৎপর’ হয়ে তাকে হাতকড়া পরিয়ে বেডের সঙ্গে আটকে রেখেছে। কিন্তু যা সত্যি নয়, তা হচ্ছে ও কোনো সন্ত্রাসী নয় এবং কোনো ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আহতও হয়নি। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটল এবং যার রেশ ধরে যে ৪২ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলা করল, ও তাদের একজন। পুলিশ তাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে আটকে রেখেছিল। ওর নাম নাজমুল হোসাইন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। যে বিভাগে আমি এক সময় শিক্ষকতা করেছি। নাজমুল কি দোষী? যদি দোষী হয়েই থাকে, তাকে কি হাতকড়া পরিয়ে হাসপাতালের বেডে আটকে রাখতে হবে? হাইকোর্ট এক দৃষ্টি আকর্ষণ নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়া থানার ওসিকে সশরীরে হাজির হয়ে এর ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওসি এসেছিলেন। ক্ষমাও চেয়েছিলেন। কিন্তু এর রেশ কি থেমে যাবে? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। তাও যে ঘটনা ঘটেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে। তবে এমনিতেই গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে এ সময়টা বন্ধই থাকত বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বন্ধের সময় হলগুলো খোলা থাকে। ছেলেদের একটা অংশ হলে থেকে টিউশনি করে, বিসিএস কিংবা ব্যাংকগুলোতে পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়, কোচিং করে। ওরা এখন সবাই হল ছাড়তে বাধ্য হল।

জাহাঙ্গীরনগরে এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আগেও ঢাকা-আরিচা রোডে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে ছাত্রী পর্যন্ত মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। কিন্তু কোনো একটি ঘটনায় কোনো একজন বেপরোয়া গাড়ি চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে, তা বলা যাবে না। হয়নি। সারা দেশই তো আজ বেপরোয়া গাড়ি চালকদের হাতে জিম্মি!

প্রতিদিন কত মানুষ গাড়ি চাপায় মারা যায়, বিচার হচ্ছে কই! বরং গাড়ি চালকরা ক’দিন আগেও দেখিয়ে দিয়েছিল তারা কী পারে। সারা দেশ তারা অচল করে দিয়েছিল। তাদের পেছনে একটি ‘বড় শক্তি’ আছে। সরকার, বিচার বিভাগ এখানে অসহায়! সুতরাং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনায় যে একটা প্রতিক্রিয়া থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘ব্যর্থতা’ ছিল, তারা পরিস্থিতির ‘গভীরতা’কে ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারেননি। উপাচার্যকে যারা পরামর্শ দিয়েছেন, তারা সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন বলে মনে হয় না। ছাত্ররা আমাদের সন্তানের মতো। নিশ্চয়ই উপাচার্য ভবন ভাংচুর করা ঠিক হয়নি। এটা অন্যায়। আমি এ অন্যায়কে সমর্থন করতে পারি না। কিন্তু আমি এটা বুঝি ওরা বিক্ষুব্ধ ছিল। উত্তেজিত ছিল। সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? কিন্তু কেন ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকবে? কেন রাবার বুলেট ছুড়বে? কেন আহত করবে আমার সন্তানতুল্য ছাত্রদের? হ্যাঁ, রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করা অন্যায়। ছাত্রদের এটা করাও ঠিক হয়নি। আমি ওদের সেন্টিমেন্টকে ধারণ করি। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা রাস্তা অবরোধ করা নয়, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা আরও এক জায়গায় আমি দেখি। রাস্তায় ‘স্পিডব্রেকার’ ছিল না। সেই কবে চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য তা তুলে নেয়া হয়েছিল। সওজ এরপর আর তা প্রতিস্থাপন করেনি। এখানে সুশাসনের ঘাটতি দেখি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরেই আনেননি কেউ! বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডির কি দায়িত্ব ছিল না বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নজরে আনা? প্রয়োজনে তিন গেটে তিনটি ‘স্পিড ব্রেকার’ নির্মাণ করবে বিশ্ববিদ্যালয় নিজ খরচে। ক্ষতি কী? এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় হাজার হাজার টাকা খরচ করে ‘নানাবিধ’ কাজে। এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয় নিজ খরচে তিনটি ‘স্পিড ব্রেকার’ নির্মাণ করত, তাতে এমন কী ক্ষতি হতো? আসলে প্রশ্নটা দায়িত্বহীনতার। প্রশ্নটা সুশাসনের। দায়িত্ববোধের বড় অভাব। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা ও অন্যত্র যাতায়াত করে। তিনটি গেটের মাঝে মূলত দুটি গেটই তারা বেশি ব্যবহার করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।

উপাচার্যের একটি কথায় আমি আহত হয়েছি। তিনি বলেছেন, তিনি ছাত্রদের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলবেন না। কথাটা এভাবেই মিডিয়ায় এসেছে। একজন অভিভাবক এভাবে কথা বলতে পারেন না। তার বাসভবন আক্রান্ত হয়েছে। তিনি অসন্তুষ্ট হতেই পারেন। কিন্তু ‘সন্তানদের’ বিরুদ্ধে মামলা করব কেন? ক’জন ছাত্রছাত্রীকে জেলেও পাঠিয়েছিল পুলিশ ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে। এদের মাঝে কয়েকটি মেয়েও ছিল। এর কি কোনো প্রয়োজন ছিল? ওরা জামিন পেয়েছে। কিন্তু ওদের ‘ব্যক্তি জীবনে’ যে একটা ‘কালি’ লেগে গেল, আমরা কি তা ভেবেছি কখনও? আমরা কি কখনও ভেবেছি ওদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আমরা কতটুকু ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ করে দিলাম? ওদের কেউ কেউ আগামীতে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, এবং ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’-এ তারা ‘আটকে’ যেতে পারে, আমরা কি তা ভেবেছি কখনও? ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ নিয়ে নানা ‘কাহিনী’ আমরা জানি। আমরা এসব ছেলেদের জীবনকে আরও ‘অনিশ্চিত’ করে দিলাম এই মামলা করার মধ্য দিয়ে। মামলা না করেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘প্রশাসনিক ব্যবস্থা’ নিতে পারতেন। আগেও অনেকবার এ ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। এবার নিলেও তেমন ক্ষতি হতো না। মামলা করাটা ঠিক হয়নি। উপাচার্য এর অনুমতি দিয়েছেন। না দিলে মামলা হতো না। এটিও তিনি ঠিক করেননি। ‘অন্যভাবে’ এর সমাধান করতে পারতেন তিনি।

এখন এর সমাধান কী? ১. মামলা প্রত্যাহার করা জরুরি। ধরে নিচ্ছি ছাত্ররা ‘অন্যায়’ করেছে। কিন্তু তারপরও অভিভাবক হিসেবে আমি মামলার অনুমতি দিতে পারি না। উপাচার্য এখন স্ব-উদ্যোগে মামলা প্রত্যাহার করে সিন্ডিকেটে রিপোর্ট করতে পারেন। শুনলাম মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আইন উপদেষ্টার পরামর্শ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি ভালো খবর। ২. শুধু মামলা প্রত্যাহারই নয়। মামলায় যাদের নাম আছে, তারা যাতে ভবিষ্যতে কোনোভাবে ‘পুলিশি হয়রানির’ শিকার না হয়, এ বিষয়টিরও নিষ্পত্তি করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রয়োজনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এর ফয়সালা করতে হবে। ৩. দ্রুত হলগুলো খুলে দিতে হবে। হলে ছাত্রছাত্রীরা থাকে নানাবিধ কারণে। অনেকেরই ঢাকা শহরে থাকার জায়গা নেই। রমজান শুরু হয়েছে। সামনে ঈদ। খুব বেশি ছাত্রছাত্রী হয়তো হলে থাকবে না। অনেকেই ইতিমধ্যে বাড়ি চলে গেছে। আমি অনেক ছাত্রীকে জানি, যাদের কেউ কেউ এখন তাদের ‘প্রাইভেট ছাত্রীদের’ বাসায় থাকছে একরকম অনন্যোপায় হয়ে। ছাত্রী পড়িয়েই ওদের চলে। তাই খুলে দেয়া হোক ছাত্রাবাসগুলো। এই লেখা শেষ করার পর জেনেছি ৮ জনু থেকে হলগুলো খুলে দেয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটিও ভালো খবর। ৪. ছাত্ররা দাবি করেছিল ক্ষতিপূরণ দেয়ার। উপাচার্য তাতে রাজিও হয়েছিলেন। তিনি নিজে টিভিতে এ কথা স্বীকারও করেছিলেন। আমি জানি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো না কোনো ‘ফান্ড’ থাকে। তা থেকে এ টাকা দেয়া সম্ভব। না হলে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব। ৫. বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি ‘আপদকালীন ফান্ড’ গঠন করতে পারেন, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ফান্ড থেকে অর্থ জোগান দেয়া যায়। প্রত্যেক ছাত্র, প্রত্যেক শিক্ষক প্রতি মাসে ‘সীমিত পরিমাণ’ টাকা এ ফান্ডে দান করবেন। প্রতি মাসে ছাত্র সংসদের জন্য টাকা নেয়া হয় (শিক্ষকরাও দেন)। এ টাকা কোথায় যায়, কোন কাজে ব্যয় হয়, তার হিসাব কেউ কোনোদিন নেয় না। কেউ জানেও না। উপাচার্য নিজেও জানেন কিনা জানি না। ওই টাকা এই আপৎকালীন ফান্ডে এখন জমা হতে পারে। এমনকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এখন অনেকেই উচ্চপদে আছেন। সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাও আছেন। তাদের কাছ থেকে ‘ফান্ড’ জোগাড় করা কঠিন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এমনকি ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকেও ফান্ড জোগাড় করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ নেয়ার। ৬. বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে (মূল গেটগুলোসহ) একাধিক ‘স্পিড ব্রেকার’ নির্মাণ করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় স্ব-উদ্যোগে এ কাজটি করুক। শুধু ‘স্পিড ব্রেকার’ নয়, প্রয়োজনে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে কথা বলে তিন গেটে তিনজন ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা করা হোক। বিকল্প হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা শাখা থেকে তিনজনকে তিন গেটে ‘ডিউটির’ ব্যবস্থা করা হোক। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালীন খুব কমই দুর্ঘটনা ঘটে। সুতরাং বিকাল ও রাতের কিছুটা সময় যাতে এখানে দায়িত্ব পালন করার লোক থাকে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যেই স্পিড ব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে শুনলাম। ৭. ‘প্রক্টোরিয়াল বডি’তে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমার ধারণা এই ‘বডি’ উপাচার্যকে সঠিক তথ্যটি দেয় না। অতীতে ছাত্র ও শিক্ষকদের ক্ষোভ আমি ‘প্রক্টোরিয়াল বডি’, বিশেষ করে প্রক্টরের ওপর দেখেছি। আমার নিজের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়। আমি নিজেও প্রক্টরকে প্রায় সময়ই খুঁজে পাই না। ফলে এই ‘বডি’র দায়বদ্ধতা ও পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়মিতভাবে দলের বাইরে থাকা ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে যদি মতবিনিময় করেন, তাহলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘চিত্র’ তিনি পাবেন, যা তাকে তার দলের লোকেরা কখনই দেন না। তিনি একটি ‘ক্ষুদ্র গ্রুপ’-এর স্বার্থে কাজ করেন এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত হন- এমন অভিযোগ আছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষক নিয়োগ, স্বার্থান্বেষী গ্রুপের স্ত্রী-সন্তানদের বিজ্ঞপ্তি ছাড়া চাকরি দেয়া ইত্যাদি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে যা পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। এ বিতর্কের মাঝে কেন তিনি যাবেন? তিনি শিক্ষক। এ পরিচয়ই যেন তার কাছে বড় হয়ে থাকে- এই পরামর্শটুকুই তাকে দিতে পারি মাত্র!

একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এ কমিটি তদন্ত করে কী বের করবে আমি জানি না। কিন্তু অনেককেই আমি অসন্তুষ্ট হতে দেখেছি। তবুও দেখা যাক তদন্ত কমিটি কী করে! দু’জন ছাত্র প্রাণ হারিয়েছে। ৪২ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করেছে- এটা দুঃখজনক, অনাকাক্সিক্ষত। এ দুই ছাত্রই ছিল পরিবারের ভরসা। আশার জায়গা। সেই ‘আশা’ কীভাবে পূরণ হবে আমি জানি না। ‘ক্ষতিপূরণ’ দিলেও সেই দুটি পরিবারে ‘শান্তি’ ফিরে আসবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। উপাচার্য তাদের অভিভাবক। ওই দুই পরিবারের ‘ক্ষতি’ তিনি কিছুটা হলেও কমাতে পারবেন যদি তিনি নিজে ওই দুই পরিবারের কাছে যান। সন্তান হারানোর ব্যথা তিনি নিজেও বুঝবেন। ছাত্ররা অভিযোগ করেছে কিন্তু শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ছাত্ররা নাকি শিক্ষকদের গালাগালিও করেছে। উপাচার্য নিজে অভিযোগ করেছেন ছাত্ররা শিক্ষকদের দিকে কাঁঠালের অব্যবহৃত অংশ ছুড়ে মেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে অন্যায়। ছাত্রদের এটা করা ঠিক হয়নি। উপাচার্য একটি প্রতিষ্ঠান। তার বাড়ি ভাংচুর করার অর্থ একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত করা। এটা কি ছাত্রদের ‘ছাত্রসুলভ’ কাজ হয়েছে? যে প্রতিষ্ঠান থেকে তারা সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেবে, সেই প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা, তার ভাবমূর্তি নষ্ট করা অন্যায়। মহা-অন্যায়। উপাচার্য এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি হলেও তিনি যখন উপাচার্যের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি নিজেও একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে যান। আমি আশা করব আন্দোলনকারী ছাত্ররা এজন্য উপাচার্যের কাছে ক্ষমা চাইবে। তারা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে, অথবা সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষমা চাইতে পারে। আমি এতে কোনো সমস্যা দেখি না। আর একটা কথা। কিছু হলেই উপাচার্য ভবন ভাংচুর হয়। ঘেরাও হয়। আমরা ভুলে যাই উপাচার্যেরও পরিবার আছে। তার পরিবারের সদস্যদের ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ করা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসুক। পরপর দুটি মৃত্যু তার বন্ধুদের আহত করেছে। বিক্ষুব্ধ করেছে। আমি তাদের সঙ্গে সমব্যাথী। সুযোগ থাকলে আমি ওদের ‘শিক্ষক’ হিসেবে পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু যেতে পারিনি। তবে আমাদের বোধহয় চিন্তা করা প্রয়োজন- আমরা প্রতিবাদী হব, কিন্তু তা যেন হয় নিয়মতান্ত্রিক। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ল। আহতদের ছবি সামাজিক গণমাধ্যমে আছে। পুলিশ কি আরও একটু সংযত হতে পারত না? সাভারে নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তো আমার ছাত্র। এ জাহাঙ্গীরনগরই তাকে ডিগ্রি দিয়েছে। তিনি কি আরও একটু সংযত হতে পারতেন না? অন্তত রাবার বুলেট না ছুড়ে, ছাত্রদের লাঠিচার্জ না করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেও তো ‘বিক্ষুব্ধ’ ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

নাজমুলের হাতকড়া পরা অবস্থায় তার করুণ কাহিনী আমাকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ‘বিচারের কাঠগড়ায়’ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাকে ‘দোষী’ করেছে নাজমুল! আদালত এটা বিবেচনায় নিয়েছেন। এ জন্য উচ্চ আদালতের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি খুশি হতাম যদি উপাচার্য হাসপাতালে যেতেন ও নাজমুলের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। আমি উপাচার্য হলে তাই করতাম। ওর বাবা যখন ওকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে রেখে যায়, ওই আমাদের সন্তান! এই ‘সন্তানদের’ দেখার দায়িত্ব আমাদের সব শিক্ষকদের। দুঃখজনক হলেও সত্য, এটা আমরা ভুলে যাই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার বয়স তো নাজমুলদেরই! জাহাঙ্গীরনগরে যে ঘটনা ঘটেছিল, আমরা সবাই মিলে তা ভুলে যেতে চাই। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের সবার। নাজমুলরা একদিন থাকবে না। আমি থাকব না। নতুন একজন উপাচার্য আসবেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি থাকবে হাজার বছর। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভালো’ আমাদের সবার জন্য ‘ভালো’।
Daily Jugantor
05.06.2017