রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

চীন-ভারত যুদ্ধ কি আসন্ন


সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারতীয় সংবাদপত্র পাঠ করলে একটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে, চীন ও ভারতের মধ্যে আবার বুঝি যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে! গত প্রায় দুমাস ডোকলাম নিয়ে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধভাব সেখানে বিরাজ করছে। ভুটানের পশ্চিমাংশে একটি ছোট্ট মালভূমির নাম ডোকলাম। এই মালভূমিটি খুব একটা বড় নয়। ১৮৯০ সালের কনভেনশন অনুযায়ী মাত্র ৮৯ বর্গকিলোমিটারের মালভূমিটি নিজের বলে মনে করে চীন। ডোকলামের চীনা নাম দংলাং। অন্যদিকে ভুটান মনে করে এই অঞ্চলটি তাদের। চীন ডোকলামে সড়ক নির্মাণ করলে ভারতীয় বাহিনী সেখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে এবং একপর্যায়ে ভারত-ভুটান মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী ভারত সেখানে সেনা মোতায়েন করে। গত প্রায় দুমাস ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধ হবে কিনা বলা মুশকিল। তবে উত্তেজনা আছে। ভারত ডোকলাম নিয়ে আলোচনার কথা বললেও চীন বলছে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো আলোচনা হবে না। এর আগে বহুল আলোচিত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ (ওবেওআর)-এর একটি মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে বেইজিংয়ে, যেখানে ভারত যোগ দেয়নি। সাম্প্রতিককালে একাধিক ইস্যুতে ভারত ও চীনের মধ্যে এক ধরনের যুগ্ম প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। গত ১৬ মে বেইজিংয়ে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবেওআর) শীর্ষক যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, তাতে ভারত অংশ নেয়নি। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা মধ্য এশিয়ার প্রায় সব সরকারপ্রধান ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ওবেওআরের মাধ্যমে চীন তার দুই অঞ্চলের সঙ্গে প্রায় ৬১টি দেশকে সমুদ্র, সড়ক ও রেলপথে সংযুক্ত করছে। চীনের এই মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। ভারত গেল জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে একটি সামুদ্রিক নৌমহড়া করেছে, যা চীন সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে। আর সর্বশেষ ঘটনায় ভুটানের পশ্চিমাংশে ডোকলাম মালভূমি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে চীন ও ভারত। এর আগেও ১৯৬৬ সালে চীন ডোকলাম দখল করার চেষ্টা করেছিল। তখনো ভারতের সাহায্য নিয়েছিল ভুটান। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে চীন ও ভুটান লিখিত চুক্তিবলে সম্মত হয় যে, তারা দুই দেশের সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। চীনের এ অঞ্চলে মহাসড়ক নির্মাণকে ওই চুক্তির লঙ্ঘন বলে মনে করে। এই অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে ভারতের কাছে। এই মালভূমি আবার ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডরের কাছে। এই করিডর উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে পুরো ভারতকে যুক্ত করেছে। এখানে চীনা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে ভারত হুমকি হিসেবে দেখছে। শুধু ডোকলাম নয়, বেশ কিছু বিষয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে কিছুদিন ধরে দ্বিমতও বিভাজন আছে। কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্ক এতদিন এই বিভাজন আর বিদ্বেষকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অন্য সীমান্ত নিয়ে যে সমস্যা ছিল তা রয়েই গেছেÑ চীন অরুণাচল প্রদেশের একটা অংশকে তাদের নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে। এই দাবি চীন পরিত্যাগ করেনি। নরেন্দ্র মোদির বেইজিং উপস্থিতির সময় (মে ২০১৫) চীনা সরকারি টিভিতে ভারতের যে ম্যাপ দেখানো হয়েছিল তাতে কাশ্মীর ও অরুণাচলকে ভারতীয় অংশ হিসেবে দেখানো হয়নি। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে চীন সড়ক নির্মাণ শেষ করছে ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও। চীন এই সড়ক নির্মাণ বন্ধ করেনি। দক্ষিণ চীন সাগরে চীন একটি বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করছে, যা কিনা জাপানের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের কর্মকা- ভারতের নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজিস্টদের আতঙ্কিত করেছে। ভারত তার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও চীন তাতে সম্মান দেখায়নি। নেপাল ও মিয়ানমারে চীনা প্রভাব বাড়ছেÑ এটাও ভারতীয়দের উৎকণ্ঠার অন্যতম একটি কারণ। ২০১৫ সালে ভূমিকম্পকবলিত নেপালে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে এক ধরনের ‘ঠা-া লড়াই’ও আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ভারত গেল বছরও ভারত মহাসাগরে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে একটি বড় ধরনের নৌ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। এটা নিঃসন্দেহে চীনাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ভারত একটি পারমাণবিক শক্তি। ভারত এখন পরমাণু সরবরাহকারী গোষ্ঠীতে (এনএসজি) অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। কিন্তু তাতে আপত্তি রয়েছে চীনের। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য নিয়ে ভারত চীনা বাজারে ঢুকতে চায়। কিন্তু তাতে রয়েছে চীনাদের আপত্তি। আগামীতে চীনাদের একটা বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে ভারতের প্রাচীন ‘কটন রুট’র পুনরুত্থান। প্রাচীন যুগে ভারত ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে তার সুতিশিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছিল। প্রাচীন ভারতে বণিকরা ভারত মহাসাগরের কয়েকটি রুট ব্যবহার করে তাদের পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে ভারতীয় সুতি কাপড় নিয়ে সুদূর আফ্রিকা পর্যন্ত যেত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল এ পথ ধরেই। অথচ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনার সঙ্গে মোদির প্রস্তাবিত কটন রুটের ধারণা সাংঘর্ষিক। প্রাচীন কটন রুটকে নতুন করে সাজানোর মধ্য দিয়ে ভারত এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেÑ অর্থাৎ ভারত মহাসাগরে তার সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন, মোদি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে মরিশাস, সিসিলি ও শ্রীলংকা সফর করেছেন। মরিশাস সফরের সময় মরিশাসের সঙ্গে সেখানে একটি ভারতীয় নৌঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার সঙ্গে একটি মৈত্রী জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত এবং ওই জোটে মরিশাস ও সিসিলিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। এটা যদি কার্যকর হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শ্রীলংকা, দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের সিসিলি, মরিশাস কিংবা সুদূরের ওমান-মোজাম্বিকও একই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে। এর অর্থ পরিষ্কার বিশাল ভারত মহাসাগরে ভারত তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায় এবং ‘ইন্ডিয়ান ওসেন রীম’ বা ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। অথচ চীন ইতোমধ্যে তার ‘মুক্তার মালা’ নীতির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। জিবুতিতে একটি নৌঘাঁটি নির্মাণ শেষ করেছে চীনÑ এ খবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তবে চীনের জন্য একটি খারাপ খবর হচ্ছে, শ্রীলংকায় তার যে প্রভাব ছিল, তা এখন কমতির দিকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের ‘অতি চীননির্ভর’ নীতির কারণে তাকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল। সিরিসেনার নেতৃত্বে একটি ‘ভারত বাজ’ সরকার সেখানে ক্ষমতাসীন হয়েছে। ফলে আগামী দিনে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন ও ভারতের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা যে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। ভারত ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্র তার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তার সীমান্তবর্তী যেসব দেশ রয়েছে, প্রতিটি দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু ভালোই নয়, বরং সর্বকালের সেরা সম্পর্ক রয়েছে এখন। এ অঞ্চলে ভারতের অর্থনৈতিক, সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে ভারতের মনমোহন সিং সরকার যা করতে পারেনি, তা মোদি সরকার করে দেখিয়েছে। নেইবারহুড ফাস্টের অংশ হিসেবে ভারত এ অঞ্চলের দেশগুলোকে তার পতাকাতলে আনছে। এটা অনেকটা ‘মনরো ডকট্রিনের’ ভারতীয় সংস্করণÑ অর্থাৎ ভারত চাইবে না এ অঞ্চলে অন্য কোনো শক্তি কর্তৃত্ব করুক অথবা প্রভাব বিস্তার করুক। চীন এ অঞ্চলের নিকট-প্রতিবেশী। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে চীনা সীমান্ত খুব বেশি দূরে নয়। এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই ভারত কাজ করে যাচ্ছে। ভারতের আপত্তির কারণে ভুটানে এখন অবধি চীন তার দূতাবাস খুলতে পারেনি। তাই চীন-ভারত সম্পর্কটা অনেকের কাছেই আলোচনার অন্যতম একটি বিষয়। এই সম্পর্ককে অনেক পর্যবেক্ষক ‘ভারতের হাতি বনাম চীনের ড্রাগন’ (ওহফরধহ ঊষবঢ়যধহঃ াং ঈযরহবংব উৎধমড়হ) হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ চীনের পরিচিতি যেখানে ড্রাগনকে দিয়ে, ঠিক তেমনি ভারতের পরিচিতি হাতিকে দিয়ে। ‘হাতি বনাম ড্রাগন’ দ্বন্দ্ব নিঃসন্দেহে একুশ শতকের মধ্যভাগে শুধু এ অঞ্চলেই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের কথা, যে যুদ্ধে ভারতের একটা বিশাল এলাকা চীন দখল করে নিয়েছিল। এর আগে মধ্য পঞ্চাশের দশকে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ সেøাগান তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। তিব্বতকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীন যে ‘পঞ্চশালা নীতি’ গ্রহণ করেছিল, যা ন্যাম বা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় একটি ভিত্তি দিয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই পঞ্চশালা নীতি। যেমন বলা যেতে পারে ইন্দোনেশিয়ার কথা। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে এই পঞ্চশালার কথা বলা আছে। মধ্য পঞ্চাশের সেই ‘নেহরু-চৌ-এনলাই’ ইমেজ আবার ফিরে এসেছিল ‘মোদি-শি জিনপিং বহুত্বের মধ্য দিয়ে। এটি এখন কতটুকু কার্যকর হবে, মোদির সেপ্টেম্বরে বেইজিং সফর (২০১৭) দুদেশের সম্পর্ককে কত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে মানসিকতার। ভারতের ব্যুরোক্রেসি ভারতকে একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে দেখতে চায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে এই প্রভাব কাটানো কঠিন। মনমোহন সিং পারেননি। এখন দেখার পালা মোদি কতটুকু পারেন? তবে এটা তো সত্য মোদির নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। তিনি রাজনীতিকে পাশে ঠেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি। তার চাই উন্নয়ন। চাই বিনিয়োগ। চাই ব্যবসা। সে কারণে পুরনো বৈরিতা ভুলে গিয়ে তিনি প্রথম চীন সফরে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি। তার বৈদেশিক নীতির এটাই বড় বৈশিষ্ট্য। তার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং সর্বশেষ চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরের উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑ তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়ান’ কর্মসূচিকে সফল করা। এখন ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত দ্বন্দ্ব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে মোদি তার মেক ইন ইন্ডিয়া নিয়ে তিনি বেশিদূর যেতে পারবেন না। তিনি ভারতবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগামী ২০২২ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবার জন্য কাজের ব্যবস্থা করবেন। প্রতিবছর ১২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ সেখানে ‘জব মার্কেটে’ প্রবেশ করছে। এদের জন্য কাজ দরকার। চীনের মতোই ভারতকে একটি ‘পণ্যের উৎপাদনশীল’ দেশে পরিণত করতে চান মোদি। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়লে, সেনাবাহিনী চাইবে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ভার বাড়ানোর। ভারত তার নৌ ও বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণ করছে। নৌবাহিনীতে মোট ২৮টি সাবমেরিন সংযোজনের (বর্তমানে আছে ১৫টি) উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। বিমানবাহিনীতে নতুন বিমান আসছে। ভারত এখন নিজেই তৈরি করবে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। লকহিডের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আগামীতে আরও বাড়বে। সীমান্ত সমস্যা, বিশেষ করে ডোকলাম সমস্যার সমাধান যদি না হয়, তাহলে এই উত্তেজনা অন্য অঞ্চলেও সম্প্রসারিত হবে। খুব সঙ্গত কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাতে আক্রান্ত হবে, যা এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। আগামী মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন। নরেন্দ্র মোদির সেখানে যাওয়ার কথা এবং মোদি-শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও বেশি। কিন্তু দুপক্ষ যদি নমনীয় না হয় এবং সেখানে যদি ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় না থাকে, তাহলে আগামীতে ব্রিকস ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাই এ মুহূর্তে ডোকলাম থেকে সব পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার জরুরি।
Daily Amader Somoy
17.08.2017

সত্তর বছরে কতটুকু এগোতে পারল ভারত





ভারতে কৃষক আত্মহত্যার ‘কাহিনী’ নতুন নয়। খরা কিংবা প্রচুর বৃষ্টি ইত্যাদি কারণে প্রচুর কৃষক আত্মহত্যা করে থাকে। মোদি যখন ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের বিধানসভায় নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন, তখন তিনি এক স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে ৪৭৭টি জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। ৩ লাখ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছিলেন। ৫১৮৭টি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ৩৯ লাখ অনুসারি তার টুইটারে। আর ফেসবুকে নির্বাচনের আগে তার ‘লাইক’ এর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর তিনি খুবই কমই গ্রামে গেছেন। তবে ১৯ দেশ সফর করে বিশ্বনেতাদের কাতারে তার নামকে স্থান দিতে পেরেছেন। কি পরিমাণ বদলে গেছেন মোদি, তার বড় প্রমাণ ১০ লাখ রুপির স্যুট পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবাকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ। একসময় ট্রেনে ট্রেনে চা বিক্রি করে যিনি কৈশোরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সেই মোদি কৃষক লাল সিং-এর গত এক বছরে কোনো আশার বাণী নিয়ে আসেননি। গরিব ঘরের সন্তান হয়েও মোদি এখন অভিজাততন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাত-পাত এ বিভক্ত ভারতীয় সমাজের জন্য তিনি কোনো ‘মডেল’ হতে পারেননি এখনো। জমি অধিগ্রহণ বিল নিয়েও একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। কংগ্রেস এটাকে পুঁজি করে ভারতব্যাপী একটা জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেও, তাতে তারা খুব লাভবান হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিন্তু ভারতের জন্য যে সমস্যাটা প্রকট, অর্থাৎ সমাজে অসঙ্গতি তা মোদি দূর করতে পারেননি। নিঃসন্দেহে গত তিন বছরে মোদি নিজেকে একজন উদ্যমী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলে আদভানীর (যিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন) মত নেতাকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি বড়, তা হচ্ছেÑ তিনি ‘গরিব দেশের ধনী প্রধানমন্ত্রী’। প্রেসিডেন্ট ওবামাকে স্বাগত জানাতে (জানুয়ারি ২০১৫) তিনি ১০ লাখ রুপির স্যুট পরিধান করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন তিনি আসলে ধনী শ্রেণিরই প্রতিনিধি! একসময় যে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি কৈশোরে ট্রেনের কামরায় কামরায় চা বিক্রি করতেন, মা পরের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে সংসার চালাতেন (মে মাসের ২০১৫ টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদকের কাছে তা তিনি স্বীকারও করেছেন), সেই মোদির সঙ্গে এখন কর্পোরেট জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্ক বেশি। ট্রেনে চা বিক্রেতাদের মতো সাধারণ ভারতীয়দের কাছে এখন তিনি ‘অনেক দূরের মানুষ’। তিনি যখন বিদেশ যান, তখন তার সাথে যান ব্যবসায়ীরা, যান কর্পোরেট হাউসের প্রতিনিধিরা। কিন্তু গত তিন বছরে তার শরীরে দশ লাখ রুপির স্যুট উঠেছে সত্য, কিন্তু দরিদ্র ভারতের চেহারা তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি। কৃষকদের আত্মহত্যার প্রবণতা তিনি দূর করতে পারেননি। ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রাম এর মতে, জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল, আজ তৃতীয় অবস্থানে (সাধারণ নিয়মে এই অবস্থান সপ্তম)। আর গত বছর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছেÑ ২০২২ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চীনের চাইতে বেশি হবে। যেখানে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ ভাগ, সেখানে ভারতের হবে ৭ দশমিক ৭ ভাগ। নরেন্দ্র মোদি এই ভারতকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছেÑ ভারতের জনগোষ্ঠীর ৩৭ ভাগ মানুষ এখনো গরিব। ৫৩ ভাগ জনগোষ্ঠীর কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এই ‘কাজটি’ নিত্য সমাধান করেন। পরিসংখ্যান বলে বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। চিন্তা করা যায় প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ৮ সেপ্টেম্বর ২০১০)! সাত বছর আগের এই পরিসংখ্যানে খুব পরিবর্তন এসেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শুধু দারিদ্র্যতা কেন বলি প্রায় ৮০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার। ৭০ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে। নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেখানে অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৮৬-কে হিসেবে ধরে) ১৪৬, ভারতের সেখানে ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণ এত ঘটনা ঘটার পরও বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে তৈরি ছবি (যা বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি) গুলাব গ্যাং (উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে গ্রামের সত্য কাহিনী) এর কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। মোদি গত তিন বছরে এদের জন্য কি করেছেন? যদিও মাত্র তিন বছরে দারিদ্র্যতা কমানো সম্ভব নয়, কিংবা বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য চাকরির সংস্থান করাও সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু দারিদ্র্যতা কমানো তার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তার ‘গুজরাট মডেল’ নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। গুজরাটে তিনি সড়ক, মহাসড়ক করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অন্যান্য পণ্যের চাইতে গুজরাটে আসলে কম ছিল, মাত্র ১৩ দশমিক ৪ ভাগ (২০১২-১৩ সালে আসামে ছিল ২১.১ ভাগ, উত্তর খন্ডে ২০.৮ ভাগ, মহারাষ্ট্র ১৯.৮ ভাগ)। শিশু মৃত্যুর হার গুজরাটে হাজারে ৩৮, অথচ কেরালাতে ১২, তামিলনাড়– ২১, মহারাষ্ট্র ২১, শিশু জন্ম দেবার সময় মাতৃমৃত্যুর হার গুজরাটে ৯.৫, কেরালাতে ৩.৩, তামিলনাড়– ৫, মহারাষ্ট্র ৫.২। যেখানে গুজরাটে খাবার পানি নিশ্চিত করা হয়েছে জনগোষ্ঠীর ৮৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষকে, সেখানে পাঞ্জাবে এ সংখ্যা ৯৭.৬, উত্তরপ্রদেশে ৮৭.৮, দিল্লিতে ৯৭.২।
পাকাঘর হারিয়ানাতে ৯৪ দশমিক ৮ ভাগ মানুষের। দিল্লির ৯৪.৭, উত্তর খন্ড ৯৩.৯। অথচ গুজরাটে মাত্র ৭৫.৭ ভাগ। ইন্ডিয়ান সেনসস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা। ফলে ‘গুজরাট মডেল’ কিভাবে সারা ভারতের জন্য একটা মডেল হবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলে সড়ক, মহাসড়ক নির্মাণ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন গুজরাটে। কিন্তু তাতে করে সাধারণ মানুষের প্রতি তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এখন এই মানসিকতায় তিনি যদি ভারতকে পরিচালনা করতে চান তিনি ভুল করবেন। দারিদ্র্যতা দূর হবে না। দারিদ্র্যতা থেকে উঠে আসা নরেন্দ্র মোদি এখন আর দারিদ্র্যতম মানুষগুলোকে স্মরণ করেন না। কাজ পাগলা মানুষ তিনি। সন্দেহ নেই তাতে। মাত্র ৩ ঘণ্টা তিনি ঘুমান একথা নিজেই স্বীকার করেছেন টাইম প্রতিবেদকের কাছে। ‘কম সরকার, অনেক বেশি প্রশাসন’ এই হচ্ছে তার অ্যাপ্রোচ। তাতে করে ভারতকে কতটুকু বদলে দিতে পারবেন তিনি? টাইম মোদিকে নিয়ে প্রচ্ছেদ করেছিল। শিরোনাম ছিল ডযু গড়ফর গধঃঃবৎং? মোদি কেন গুরুত্বপূর্ণ? তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলেই গোধরায় ট্রেনে ৫৪ জন হিন্দু পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে গুজরাটে হাজারের মতো মুসলমান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এবং ওবামা তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় চীনা প্রেসিডেন্ট ছুটে গিয়েছিলেন আহমেদাবাদে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং মাত্র সাড়ে তিন বছরে শীর্ষ বিশ্ব নেতাদের তালিকায় নিজের নামটাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন (টাইম সাময়িকীর মতে বিশ্বের একশজন প্রভাবশালী নেতার একজন তিনি) তাই খুব সঙ্গত কারণেই মোদি বারবার আলোচনায় থাকলেও, দারিদ্র্যতা দূরীকরণ ও সমাজে যে বৈষম্য তা দূরীকরণের ব্যাপারে কোনো বড় উদ্যোগ নিতে পারেননি। তাই অসন্তোষ বাড়ছে। মোদির জমানায় দলিত শ্রেণি যে কিভাবে প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হচ্ছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইন্ডিয়ান টুডের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ দলিত শ্রেণির স্কুল ত্যাগের হার শতকরা ৫০ ভাগ। প্রতিদিন দুজন করে দলিত খুন হচ্ছেন। দুটি করে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মোদি নিজে নিম্ন-শ্রেণির থেকে উঠে আসলেও, এই শ্রেণির মানুষদের তিনি এখন আর প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি এখন উচ্চ শ্রেণির প্রতিনিধি। ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মোদি বলেছিলেন, তিনি গত তিন বছরে দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ উপহার দিতে পেরেছেন! তিনি বলেছিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি প্রধান পাহারাদার, দেশের সম্পদের পাহারাদার। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (ভারত নির্মাণ) অভিযানকে অতিরঞ্জিত প্রচার বলে মন্তব্য করা হয়েছে। মোদি সরকারের কাছে বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও কর্মসংস্থানের হাল যথেষ্ট খারাপ বলেও মন্তব্য করেছে তারা। প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ২০১৫ সালে মোদি সরকারের একবছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতে ‘মোদির একবছর উচ্ছ্বাসের পর্ব শেষ, সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল তাতে বলা হয়েছিল, ‘ভারতে একবছর আগে পরিবর্তন ও আর্থিক পুনরুজ্জীবনের আশায় নরেন্দ্র মোদি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু এবার চূড়ান্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে মোদি সরকার। কর্মসংস্থনের লক্ষ্যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযান শুরু করলেও, ভারতের অর্থনীতি খুড়িয়েই চলছে’। আর নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতে, মোদির অধিকাংশ কর্মসূচি এখনো কথার কথাই রয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমস এর মতে, দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার এখনো বেহাল। ব্যবসায়িক উদ্যোগেও তেমন দানা বাঁধছে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিকভাবেও চাপে পড়েছেন মোদি। সমাজের দলিত শ্রেণি তার উপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে এখন।
এসব মূল্যায়ন মোদি সম্পর্কে কোনো ভাল ধারণা দেয় না। নিশ্চয়ই গত তিন বছরে মোদি অনেককিছু শিখেছেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে তিনি নিজস্ব একটি স্টাইল তৈরি করেছেন। হিন্দুত্ববাদ তার মূল আদর্শ। এটা থেকে তিনি বের হয়ে আসতে পারেননি। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত হিসেবে যে ভারতের বিশ্বে পরিচিত ছিল, সেই পরিচিতি থেকে ভারত এখন বেরিয়ে আসছে। ভারতের গত ৭০ বছরের রাজনীতিতে এটা একটা বড় পরিবর্তন। এই পরিবর্তন ভারতকে আগামীতে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আজ ১৫ আগস্ট ভারতের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাক-ভারত উপমহাদেশ দু’টি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়Ñ একটি পাকিস্তান, অপরটি ভারত। ভারতের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ১৫ আগস্ট, আর পাকিস্তানের ১৪ আগস্ট। সত্তর বছর যে রাষ্ট্রটির বয়স, প্রতিষ্টাবার্ষিকী প্রাক্কালে সেই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে একাধিক সংবাদ চলতি আগস্ট মাসেই ছাপা হয়েছে। গত সত্তর বছরে ভারতে ধনী শ্রেণি মানুষের সংখ্যা যেমনি বেড়েছে, ঠিক তেমনি বেড়েছে দারিদ্র্যতা। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকদের আত্মহত্যা বেড়েছে, কমেনি। জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে সম্প্রতি উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ সেখানে প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করে। এই সংখ্যা ভারতের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক। মোদি ‘স্বচ্ছ ভারত’ এর একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, যাতে তিনি ২০১৯ সালের মধ্যে এটি বন্ধ করতে চান। কিন্তু কতটুকু তিনি পারবেন বলা মুশকিল। মোদি ক্ষমতাসীন হয়ে পুরো ভারতকে বদলে দিয়েছেন। ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। ভারতের জিডিপির পরিমাণ ২ দশমিক ৩০৮ ট্রিলিয়ন ডলার (পিপিপি অর্থাৎ ক্রয় ক্ষমতার হিসেবে ৭ দশমিক ৯৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার)। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ ভাগ। বিশ্বের ৭ম বড় অর্থনীতি ভারতের (পিপিপিতে এর পরিমাণ তৃতীয়)। কিন্তু ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা বন্ধের কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি নরেন্দ্র মোদি।
Amader Orthonity
15.08.2017

অনিয়মের তদন্ত হতে বাধা কোথায়?



গেল সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে পত্রিকায় একাধিক সংবাদ ছাপা হয়েছে, যার কোনো কোনোটি উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের ভূমিকাকে একটি বড় ধরনের প্রশ্নের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। সমসাময়িককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো উপাচার্য এ ধরনের বিতর্কের মাঝে পড়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। শুধু তাই নয়, তার ভূমিকা, বিশেষ করে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের অভিযোগ, প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, অনৈতিক পন্থায় সিনেট অধিবেশন ডেকে তৃতীয়বারের মতো উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত ৭টি কলেজের ছাত্রদের আন্দোলন এবং পুলিশের টিয়ারগ্যাস শেলে চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সিদ্দিকুর রহমানের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার উপাচার্য এড়াতে পারেন কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে। আমার দুঃখ লাগে যখন দেখি এ ঘটনায় উপাচার্য অনুশোচনা কিংবা হাসপাতালে গিয়ে সিদ্দিকুরের প্রতি সমবেদনা জানাননি, অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে জানিয়েছেন সমবেদনা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি আকারে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ছাত্রদের পরীক্ষা নেয়ার জন্য। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখানেই রয়েছে সমস্যা। এখানেই সুশাসনের অভাব রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। আর উপাচার্য মহোদয়ের ‘অতি রাজনীতি’র কারণে তিনি এ সুশাসনটি নিশ্চিত করতে পারেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবেও ওই অপশাসনের শিকার হয়েছি। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিভাগের আমি দ্বিতীয় পরীক্ষক ছিলাম। আমার অনেক ‘বিল’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিশোধ করেনি। এরপর গত দশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষার সঙ্গে আমি আর সম্পৃক্ত থাকিনি। সর্বশেষ ঘটনায় একটি পিএইচডি থিসিস (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ) কমিটির বহিঃস্থ সদস্য ও সভাপতি ছিলাম। সেটি বোধকরি ৬-৭ বছর আগের কথা। উপাচার্য মহোদয়কে আমি লিখিত ও মৌখিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি ‘বিল’ পরিশোধের বিষয়টি। কিন্তু তিনি এত ‘ব্যস্ত’ থাকেন যে একজন শিক্ষকের চিঠির জবাব দেয়ার সময় পান না। এখানেই এসে যায় দায়িত্বহীনতা ও সুশাসনের অভাবের প্রশ্নটি। আজকে যে ঘটনায় সিদ্দিকুর ‘অন্ধত্ব’বরণ করতে যাচ্ছেন, তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে হয়তো উপাচার্যকে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু যিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ভার তো তাকেই বহন করতে হবে। ভারতের মতো দেশে একজন উপাচার্য এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পদত্যাগ করেছিলেন। আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি নেই।

সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা আমি হালকাভাবে নিতে চাই না। একটি বড় ধরনের ‘বিতর্কের’ জন্ম দিয়েছেন উপাচার্য সিনেট সভা আহ্বান করে। এ নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের হাতাহাতির খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। সিনেট সভা আহ্বান করা হয়েছিল তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উপাচার্য প্যানেল গঠন করার জন্য। অভিযোগ উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকে যে ২৫ জন প্রতিনিধি থাকেন, তাদের প্রতিনিধি নির্ধারণ বা নির্বাচন না করেই গত ২৯ জুলাই এ সিনেট সভা আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন ১২ জন শিক্ষকসহ ১৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ জুলাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সিনেট সভা স্থগিত করে দেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করলে চেম্বার আদালত আদেশ স্থগিত করে বিষয়টি ৩০ জুলাই শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে ২৯ জুলাই সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্যানেল নির্বাচন করা হয়, যার মাঝে উপাচার্য স্বয়ং ছিলেন এক নম্বরে। কিন্তু আপিল বিভাগের কাছে এ প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য হয়নি। আপিল বিভাগ তিন সদস্যের প্যানেলের পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত করেছেন। আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে উপাচার্য তার দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন বটে, কিন্তু তার উচ্চাকাক্সক্ষার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ক্ষতি হল, তা পূরণ হবে কীভাবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমার দুঃখ লাগে কেন তিনি এ কাজটি করতে গেলেন। তার মেয়াদ শেষ হবে ২৪ আগস্ট। সুতরাং বোঝাই যায় অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তিনি সিনেটের বিশেষ অধিবেশন ডেকেছিলেন। তিনি তৃতীয় মেয়াদের জন্য উপাচার্য হতে চেয়েছিলেন। এর কি প্রয়োজন ছিল? একজন সজ্জন ব্যক্তি তিনি। তবে তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তার সম্মানকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেনি। একজন উপাচার্যের জন্য দু’টার্মই সঠিক। আর কেন? নতুনদের সুযোগ দেয়া উচিত।

উপাচার্য মহোদয় নিজে নিজেকে বিতর্কিত করেছেন বলে মনে করেন অনেকে। গেল দুই বছর নিয়ম ভেঙে ৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর গত সাড়ে আট বছরে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৯০৭ জন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তে ছিল মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সব কটিতে প্রথম শ্রেণী থাকতে হবে। কিন্তু বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগ, দর্শন, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিদ্যা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংসহ একাধিক বিভাগে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই এ শর্ত পূরণ করেননি। একটি জাতীয় দৈনিকে তাদের নাম-ধাম দেয়া হয়েছে (কালের কণ্ঠ, ৪ আগস্ট)। বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে একাধিক। এটা যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে শুধু ‘অযোগ্যদের’ পুনর্বাসনের জন্য। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রলীগ নেতা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং যার ছবি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তাকেও পরিসংখ্যান বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর এসব নিয়োগের পেছনে রয়েছে রাজনীতি তথা দলীয়করণ। যিনি ছাত্রলীগ করেছেন, তাকে ও তার স্ত্রীকে নিয়োগ দেয়া কতটা নীতিসম্মত সেটা এক প্রশ্ন। আর এ অভিযোগটি উত্থাপিত হয়েছে বিরোধী সাদা গ্রুপ থেকে নয়, বরং আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল দল থেকে। তাদের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে সংবাদপত্রে। আর এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটি ছিল যথেষ্ট যুগোপযোগী। তিনি মন্তব্য করেছেন, শিক্ষক নিয়োগে ঐতিহ্য হারিয়েছে ঢাবি (যুগান্তর, ৪ আগস্ট)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে নিয়োগ পাওয়া জনৈক তোফায়েল আহমদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন হাইকোর্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। তখন প্রধান বিচারপতি এ মন্তব্যটি করেন। দেশের প্রধান বিচারপতি যখন এ ধরনের একটি মন্তব্য করেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান কোথায় থাকে? এর দায়ভার কি উপাচার্য মহোদয়ের ওপর বর্তায় না? যদিও এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেননি। বলেছেন, প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ কমিটিতে সভাপতিত্ব করেন উপ-উপাচার্য।

অতীতে কোনো উপাচার্যের আমলে এমনটি হয়নি। ব্যক্তি আরেফিন সিদ্দিক আমার খুব পছন্দের। ভালো মানুষ তিনি। কোনো ধরনের অহংকার তার মধ্যে আমি দেখিনি। অন্য উপাচার্যদের মতো ‘সবকিছু’ ফেলে তিনি ‘টকশো’ নিয়ে পড়ে থাকেন না। খুব কমই টকশোতে যান। একাধিক টকশোতে আমি তার সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেছি। তিনি সরাসরিই আওয়ামী লীগ করেন। দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগে দলীয় চিন্তা-চেতনা তিনি বিবেচনায় নেবেন, এটা আমি চিন্তাও করিনি। কোর্ট যখন কোনো রুলিং দেন তখন তার সেই ‘ভালো মানুষের’ ইমেজটি আর থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে আমি লজ্জিত ও দুঃখিত। এখন তিনি কী করবেন, আমি জানি না। তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২৪ আগস্ট। এর অর্থ পরিষ্কার। এ সময়ের মধ্যে সিনেট অধিবেশনও হচ্ছে না। আর তিনিও তৃতীয় টার্মের জন্য প্যানেলে থাকতে পারছেন না। এক ধরনের অপবাদ নিয়ে তিনি তার পদ ছাড়ছেন। নিশ্চই তিনি উপলব্ধি করবেন তার ভুলগুলো কোথায় ছিল। তাকে যারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, তারা সঠিক পরামর্শ দেননি। সুশাসনের চরম অবনতি ঘটেছিল। অভিযোগ আছে, তিনি ‘শিক্ষক রাজনীতি’ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে, সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ নেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, বেআইনিভাবে সিনেট অধিবেশন ডাকা এবং তা উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত হয়ে যাওয়া কিংবা শিক্ষক নিয়োগ সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য- এসব ঘটনা অন্তত একটি মেসেজ আমাদের দিচ্ছে। আর তা হচ্ছে, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ আর যাই হোক, উচ্চশিক্ষার মান সমৃদ্ধ করতে পারে না, বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজ যে দুরবস্থা, তার পেছনে কাজ করছে এ শিক্ষক রাজনীতি তথা অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদান। জানি না পরবর্তী উপাচার্য কে হবেন। এখানে তো ভালো ও যোগ্য শিক্ষকের কোনো সম্মান নেই। এখানে গুরুত্ব পায় শিক্ষক রাজনীতি। যিনি শিক্ষক রাজনীতিতে যোগ্য, তিনিই উপাচার্য হন, ইউজিসির সদস্য হন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের কোনো পিএইচডি নেই বলে প্রশ্ন তোলে, তখন সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বৈকি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কি এ ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারে? ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কোনো নেতিবাচক সংবাদ যেমন আমাকে কষ্ট দেয়, ঠিক তেমনি ইউজিসি নিয়ে কোনো মন্তব্যও আমাকে কষ্ট দেয়। এ রকম ঘটনা আর ঘটবে না, এমনটাই আমরা প্রত্যাশা করি। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হলে শিক্ষক নিয়োগে এমনটিই ঘটবে। একজন ভালো ও যোগ্য শিক্ষকই আরেকজন যোগ্য শিক্ষক তৈরি করতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শুধু নয়, প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক নিয়োগে এ অনিয়মের খবর আমরা পাই। এ ক্ষেত্রে যা করা দরকার তা হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি ছেড়ে দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হাতে। অথবা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো একটি কমিশন গঠন করতে হবে, যাদের কাজ হবে দেশের ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া। আর তিন স্তরে (মূল রেজাল্ট, লিখিত পরীক্ষা ও প্রেজেনটেশন) এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নিয়োগপ্রাপ্তকে এক বছর ‘রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে সিনিয়র শিক্ষকের অধীনে একটি গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করতে হবে। তারপরই তিনি প্রভাষক হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ পাবেন। ইউরোপে এ সিস্টেম চালু রয়েছে। একসময় যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হতো, আজ সেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত নয়। সময় অনেক বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। দুঃখ লাগে এ জন্যই, যাদের এসব ভাবার কথা, তারা এসব নিয়ে ভাবেন না। ইউজিসির চেয়ারম্যানের কোনো ভূমিকা আমি দেখি না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন সংকটে, তখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সবকিছু নিয়মের মধ্যে আসুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জনপ্রিয় হয়েও অনেকগুলো অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়েই তিনি এখন চলে যাচ্ছেন। এরপর যিনি উপাচার্য হয়ে আসবেন, তিনি নিশ্চয়ই এ থেকে শিক্ষা নেবেন। আমরা শুধু এটুকু প্রত্যাশাই করতে পারি।

পুনশ্চ : উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি অভিযোগ এনেছেন কয়েকজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথ মানুষের ওপর আস্থা হারাতে নিষেধ করেছিলেন। তাই তার প্রতি আস্থা রেখেই বলতে চাই- একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হোক, যারা অনিয়মগুলো তদন্ত করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসির কি সেই ‘সাহস’ আছে?
Daily Jugantor
13.08.2017

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কোন পথে




গেল সপ্তাহে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছাপা হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা বেশ কিছুদিন ধরে যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়ে আসছিল, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে মিয়ানমার সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। গেল সপ্তাহে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য ‘গালগল্প’। কমিশন রোহিঙ্গা নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পায়নি! তদন্ত কমিটির এ রিপোর্ট কতটুকু তথ্যনির্ভর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘ গেল বছর অক্টোবরে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও ও ধর্ষণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেরা তদন্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাতে রাজি হয়নি; বরং তারা নিজেরা তদন্ত করবে বলে জানিয়ে দিয়েছিল। পরে তারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। গেল রোববার তদন্ত কমিটি তাদের এ রিপোর্টটি প্রকাশ করে। অথচ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০৪ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নিয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে তা অস্বীকার করা হয়েছে। এখন এ রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই শুধু প্রশ্ন ওঠেনি, বরং মিয়ানমার সরকারের ‘মূল ব্যক্তি’ অং সান সু চির ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি সেনাবাহিনীর স্বার্থে কাজ করছেন এবং সেনাবাহিনীকে হত্যাকা- ও ধর্ষণের ঘটনায় দায়ভার দিতে চান না। বলা ভালো, ১৩ সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটির প্রধান ছিলেন সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট মিন্ট সুয়ি। একজন সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান যখন এ ধরনের একটি তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন, তখন প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। জেনারেল মিন্ট সুয়ির নেতৃত্বাধীন কমিটির ক্ষেত্রেও এ প্রশ্নটি উঠেছে।
রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন উঠেছে, তা হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাহলে কোন পথে? এভাবেই কি রোহিঙ্গারা নিজ দেশে পরবাসী হয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেবেন? কিংবা অত্যাচার আর নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশান্তরিত হবেন, কখনও আশ্রয় নেবেন বাংলাদেশে, কখনও সাগরে ভাসবেন। মিয়ানমার সরকার তো সেটাই চাইছে। রাখাইন রাজ্যকে তারা রোহিঙ্গামুক্ত করতে চায়। মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের বৌদ্ধ সন্ত্রাস চলছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। মিয়ানমার তিন দশকের মধ্যে তাদের প্রথম আদমশুমারির ফল প্রকাশ করে ২০১৪ সালে। সেখানে তাদের জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ। আর দেশটিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। মিয়ানমারে প্রায় ১৩৫টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী থাকলেও এদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। সু চি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেও একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন, তারা বাঙালি।’ সু চির এ বক্তব্যের পেছনে কোনো সত্যতা নেই। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। ১৪৩০ সালের দিকে তৎকালীন আরাকান শাসক বৌদ্ধ রাজ নারামাইখালা (Narameikhala), যিনি মিন স মুন নামেও পরিচিত ছিলেন, তার শামনামলে তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের এ অঞ্চলে নিয়ে এসেছিলেন এবং আরাকানে বসবাস করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে রোহিঙ্গারা সেখানে বসবাস করে আসছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৩৪ হাজার। কিন্তু অবৈধভাবে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বৃহত্তর কক্সবাজারে বসবাস করছে। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ১ হাজার রোহিঙ্গাকে ইউরোপসহ অন্যত্র পুনর্বাসন করা হবে। বাংলাদেশ সরকারও একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, রোহিঙ্গাদের হাতিয়ার ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই তেমন অগ্রগতি নেই।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে দুইভাবে বাংলাদেশকে এখন এগোতে হবেÑ প্রথমত, আন্তর্জাতিক আসরে রোহিঙ্গা সমস্যাটা তুলে ধরা; দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য সীমিত সময়ের জন্য ‘নিজস্ব একটি বাসস্থান’ তৈরি করা। উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একটি ‘পজেটিভ’ অবস্থান নিয়েছে। জার্মানি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেলের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ একটি বড় পরিসরে রোহিঙ্গা সমস্যাটি তুলে ধরেছিল। এটা প্রশংসাযোগ্য। জার্মানি নিজেও জানে অভিবাসী সমস্যার গভীরতা। জার্মানি সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১০ লাখ সিরীয় ও ইরাকি অভিবাসীকে তার দেশে আশ্রয় দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসব শরণার্থী জার্মানিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এরা যুদ্ধ শরণার্থী। মানবিক দিকটি বিবেচনা করে জার্মানি এদের আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থাও অনেকটা তেমনই। রোহিঙ্গারা নিজ দেশ থেকে উৎখাত হয়েছেন। সেখানে এক ধরনের ‘এথনিক ক্লিনসিং’ হচ্ছে। অর্থাৎ জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান এ ধরনের ‘এথনিক ক্লিনসিং’ আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম বসনিয়ায়, যেখানে সার্বরা মুসলমানদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করেছিল। হাজার হাজার মুসলমানকে নিজ বাসভূমিতে হত্যা করা হয়েছিল। সেই গণহত্যাকারী সার্ব জেনারেলদের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার পর্যন্ত হয়েছিল। মিয়ানমারে আজ রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের দ্বারা ‘এথনিক ক্লিনসিং’ এর শিকার হয়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা বাংলাদশে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ। এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে স্থায়ী আবাসের নিশ্চয়তা দিতে পারে না বাংলাদেশ। এর আগেও ১৯৭৯ সালের পর থেকে যেসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছিল, মিয়ানমার তাদের অনেককেই ফিরিয়ে নেয়নি। একমাত্র মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করেই সম্ভব রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন। এ কাজটি বাংলাদেশ শুরু করেনি। এখন বিষয়টি ওআইসি ও জাতিসংঘেও তুলতে হবে। আমরা ইইউর সহযোগিতাও নিতে পারি। এরই মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শেষ হয়েছে। ওই সেনা অভিযানের খবরও মিডিয়ায় এসেছে। যাতে রোহিঙ্গাদের অত্যাচারের খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আমার ধারণা, এটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি কৌশল হতে পারে, যাতে অভিযান অব্যাহত রেখে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করা যায়। কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়ে প্রত্যাবাসন আবার বন্ধ করে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং হি কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের অবস্থান জানতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশ অবস্থানকালে তিনি লেদা, নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির, শামলাপুর অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গারা সেখানে অত্যাচারিত। তিনি এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট জাতিসংঘের মহাসচিবকে দেবেন বলেও জানিয়েছিলেন। এটা বিবেচনায় নিয়েই মিয়ানমার সরকার তখন কিছু রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে যারা এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসে গেছেন, তাদের দ্রুত ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসন প্রয়োজন। ঠেঙ্গারচরটি বর্তমানে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। হাতিয়ার মূল ভূখ- থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং নলচিরা ঘাট থেকে পূর্বদিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে জেগে ওঠা একটি চর। প্রায় ১০ হাজার একর জমি রয়েছে এখানে। বন বিভাগ এখানে বিশাল একটি বনাঞ্চল তৈরি করেছে। বিরান এ জনপদে দ্রুত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠারও। ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার জন্য শেল্টার হোম তৈরি করাও প্রয়োজন। এ চরাঞ্চলে গো-চাষের বিশাল এক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ইইউর কাছ থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগিতা পেতে পারে। এজন্য দরকার ‘দক্ষ কূটনীতি’। আমরা যেন এটা ভুলে না যাই, রোহিঙ্গাদের একটা অংশ এখন নানা ধরনের অসামাজিক কাজে লিপ্ত রয়েছে। অবৈধ অভিবাসীরা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত রয়েছেÑ এমন সংবাদও ছাপা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। ফলে যত দ্রুত আমরা রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে পুনর্বাসন করতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। কিন্তু দুঃখজনক যা, তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্লিপ্ততা। আশিয়ান কিংবা ওআইসির তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না। গেল ২ আগস্ট চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমাদ আল ওসাইমিন। ওই সময় তিনি রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়ার এবং দেশটিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিলেন। তিনি ঢাকায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয় ও স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন। তিনি কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পও পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ওআইসি আগামীতে কী ভূমিকা নেয়, সেটাই আমাদের দেখার বিষয়। তবে রোহিঙ্গা সমস্যাটা আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকাটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরোপুরিভাবে করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে ২১ জুন বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম যে কথা বলেছিলেন, তা বেশ প্রণিধানযোগ্য। এইচ টি ইমাম বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি বাংলাদেশ। যে রকমভাবে এটা (রোহিঙ্গা ইস্যু) প্রকাশ্যে নিয়ে আসা উচিত ছিল এবং বিভিন্ন মহলের যে রকম চাপ দেয়ার কথা ছিল, সে রকমভাবে তো করা হয়নি।’ এ মন্তব্যটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একজন উপদেষ্টা যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন, তা হালকাভাবে নেয়া যায় না। আসলে ওটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। রোহিঙ্গা সমস্যাটা আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের ওপর ‘চাপ’ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা চীন ও আশিয়ানের শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারি। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ভালো। চীনকে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। এটা সত্য, মিয়ানমারে আমাদের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিমসটেক তথা প্রস্তাবিত বিসিআইএম জোটে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন সান সু চির একাধিকবার কথা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে অগ্রগতি হয়েছে কম। এখন তাই সময় এসেছে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আসরে শক্তভাবে তুলে ধরা। এ সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে না। সমস্যার মূলে রয়েছে এটাই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে হবে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় রোহিঙ্গারা অমানবিক জীবনযাপন করছে। এরা নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, তারা পরিবেশেরও যথেষ্ট ক্ষতি করছে। গাছ, পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে। এক্ষেত্রে ঠেঙ্গারচরে এদের পুনর্বাসন যুক্তিযুক্ত। এটা যত দ্রুত করা যায়, ততই আমাদের মঙ্গল। যত দেরি হবে, ততই আমাদের ক্ষতি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন মিয়ানমার সরকারের বিশেষ দূত ও সে দেশের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কিউ টিন। সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং দেশটিতে জাতিগত নির্যাতন বন্ধের জন্য চাপ দেয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। মিয়ানমার মূলত সময়ক্ষেপণ করছে। তারা যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে না, এটা স্পষ্ট। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে ও সমস্যার সমাধানে ‘বড় ভূমিকা’ পালন করতে হবে। একদিকে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিকীকরণ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে একটি ‘বড় ভূমিকা’ পালন করতে হবে।
Daily Alokito Bangladesh
13.08.2017

পাকিস্তানে গণতন্ত্র, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

পাকিস্তানের নয়া প্রধানমন্ত্রী শহিদ খাকান আব্বাসি গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তিনি থাকবেন মাত্র কয়েক দিন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পাকিস্তানের আরেকজন প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার কথা। তবে সেই প্রধানমন্ত্রী অনেকটা নির্ধারিত হলেও সংকট পুরোপুরি দূর হয়েছে, তা বলা যাবে না। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলেও পাঞ্জাবের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে সমস্যা আছে। শাহবাজ শরিফের পছন্দের তালিকায় ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান হামজা শরিফ। অন্যদিকে মুসলিম লীগের (নওয়াজ) সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, পাঞ্জাব থেকে যদি শাহবাজ শরিফ সরে আসেন, তাহলে দল সেখানে দুর্বল হবে। শাহবাজ শরিফকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তাঁকে নওয়াজ শরিফের শূন্য আসনে (লাহোর) উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে যেতে হতো। তিনি এখন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। নওয়াজ শরিফের শূন্য আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাঁর স্ত্রী কুলসুম শরিফ। ১০ সেপ্টেম্বর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
শাহবাজ শরিফেরও সমস্যা আছে। ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত করছে। এ ক্ষেত্রে তিনিও উচ্চ আদালত কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন। এ ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০১৮ সালে সেখানে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের সঙ্গে শরিফ পরিবারের দুই ভাইয়ের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেননা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি ব্যুরোর চেয়ারম্যান কামার জামান জানিয়েছেন, তাঁদের দপ্তরে নওয়াজ ও শাহবাজ শরিফের বিরুদ্ধে যে ১৬টি তদন্ত রয়েছে, তা দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এই তদন্ত যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই শেষ হয়ে যায় এবং তাঁরা যদি দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান, তাহলে আগামী নির্বাচনেও তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। পাকিস্তানের গত ৭০ বছরের রাজনীতিতে কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীরা হয় সেনাবাহিনী অথবা উচ্চ আদালত কর্তৃক অপসারিত হয়েছেন। কেউ কেউ আবার আত্মঘাতী বোমায় মারাও গেছেন। ফলে রাজনীতিতে সেনা তথা উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপের কারণে গণতন্ত্র সেখানে ঠিকমতো বিকশিত হতে পারেনি। এটা অনেকেই জানেন, সেনাবাহিনী পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র ‘প্রতিষ্ঠা’ করেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা সেখানে রাজনীতিতে বারবার হস্তক্ষেপ করছে। নওয়াজ শরিফের সাম্প্রতিক পদত্যাগ কিংবা উচ্চ আদালতের রায়ের পেছনে সেনাবাহিনীর একটি ভূমিকা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। পাকিস্তানে অতি সাম্প্রতিক সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও গুরুত্ব বেড়েছে। জঙ্গি দমনে সেনাবাহিনীকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ‘ফাটা অঞ্চলে’ সেনাবাহিনী তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যে সেনা অভিযান পরিচালনা করে আসছে, তাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদিতা মোকাবেলায় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এর ফলে সেনাবাহিনী পাকিস্তানে কার্যত একটি ‘রাজনৈতিক শক্তি’তে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে নওয়াজ শরিফ বরাবরই একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসেননি। একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে পাকিস্তানে তাঁর পরিচিতি আছে। পাকিস্তানে সাবেক সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান এবং তাঁরই ছত্রচ্ছায়ায় তিনি রাজনীতিতে আসেন। তাঁর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও আমলা ও জেনারেলদের কাছে তিনি কখনো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তিন-তিনবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং প্রতিবারই অপসারিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, এপ্রিলে (১৯৯৩) বরখাস্ত হন। এক মাস পর মে মাসে (১৯৯৩) তিনি কোর্টের আদেশে পুনর্বহাল হন। তবে একই বছরের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে তিনি এবং তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ইসহাক খান পদত্যাগ করেন। দ্বিতীয়বার তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। তৃতীয়বার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০১৩ সালের ৫ জুন। এবারও তাঁর দল মুসলিম লীগ (এন) বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। যদিও এবারের সরকার ছিল কোয়ালিশন সরকার। কিন্তু এবারও তিনি পুরো পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণ করতে পারলেন না। ২৮ জুলাই (২০১৭) পদত্যাগ করলেন কেলেঙ্কারির বোঝা মাথায় নিয়ে। শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই নয়, বেনজির ভুট্টোর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও বেনজির ও নওয়াজ শরিফ কখনো তাঁদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। বেনজিরের মতো নওয়াজ শরিফও দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার দেশে ফিরেও এসেছিলেন। একসময় লন্ডনে বসে বেনজির-নওয়াজ শরিফ গণতন্ত্র উদ্ধার কমিটি গঠন করেছিলেন। তখন ছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সময়কাল। তখন পারভেজ মোশাররফ নিজেই দেশান্তরিত। কেন এমনটি হয়? এর কারণ হচ্ছে অত্যন্ত ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী তথা সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি। বেনজির ভুট্টো তো আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারাই গিয়েছিলেন। অভিযোগের তীর ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার দিকে! জেনারেল পারভেজ মোশাররফ যখন সেনাপ্রধান ছিলেন, তখনো নওয়াজ শরিফ তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। অনেকের মনে থাকার কথা, ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে বহনকারী বিমানকে করাচির মাটিতে নামতে দেননি প্রধানমন্ত্রী শরিফ। এর পরই এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। অনেক ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিচার বিভাগের একটা পরোক্ষ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়! এরই মধ্যে পাকিস্তানে যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হচ্ছে সেনাবাহিনী কি বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে নওয়াজকে উত্খাত করল? পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগার অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে যে যৌথ তদন্ত কমিটি  (Joint Investigation Committee) গঠিত হয়েছিল, তাতে ছিলেন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি। দুজন ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার ব্যক্তি এই প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। ফলে একটা প্রশ্ন তো থাকলই। তবে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে তো নওয়াজ শরিফই মনোনীত করেছিলেন। তিনজন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্য থেকে নওয়াজ শরিফ তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একজন নন-পাঞ্জাবি জেনারেল যদি সেনাপ্রধান হন, তিনি নিশ্চিন্তে থাকবেন। জেনারেল বাজওয়া পাঞ্জাবি নন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে পাঞ্জাবি আধিক্য বেশি। শীর্ষ পাঞ্জাবি জেনারেলরা কোর কমান্ডগুলোর নেতৃত্ব দেন। অথচ দেখা গেল একজন নন-পাঞ্জাবি জেনারেলকে সেনাপ্রধান করেও তিনি ‘পার’ পেলেন না। আসলে এখানে কাজ করে সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীস্বার্থ। এই গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে নওয়াজ শরিফ হেরে গেলেন।
নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, একই সঙ্গে আইনের শাসন তথা সুশাসনের ভবিষ্যেক একটি প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দিল। পাকিস্তান কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। জঙ্গিবাদ এখন পাকিস্তানের এক নম্বর সমস্যা। এই জঙ্গিবাদ এখন আর সীমান্তবর্তী পাখতুনখোয়া প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নেই। লাহোর ও ইসলামাবাদ শহরের মতো বড় বড় শহরেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এই জঙ্গিবাদ এখন পাকিস্তান রাষ্ট্রটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে পারছে না। সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়ছে। অন্যদিকে আইনের শাসন তথা সুশাসনের অবস্থাও ভয়াবহ। সুশাসনের ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান ১০০-র মধ্যে ৩২। ১০০ নম্বরকে ধরা হয় সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ। টিআই বা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এই র্যাংকিং করেছে। অন্যদিকে ‘করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স’-এ ১৭৬টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান এখন ১১৬। বিশ্বব্যাংক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুশাসনের অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাকিস্তানে ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতির চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে যেখানে স্কোর ছিল মাইনাস ০.৬৭, সেখানে বর্তমানে স্কোর মাইনাস ০.৭৮। দুর্নীতির ক্ষেত্রে স্কোর মাইনাস ১.১৫ থেকে মাইনাস ০.৮১। সরকারের দক্ষতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে যেখানে স্কোর ছিল মাইনাস ০.৫৯, সেখানে বর্তমান স্কোর মাইনাস ০.৭৫। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫-এর ঘরে থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। রেমিট্যান্সের প্রবাহও কমে গেছে। রপ্তানিতেও ভাটা এসেছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সেখানে ভয়াবহ। এমনি এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে নতুন একটি সরকার গঠিত হয়েছে। তবে এতে সেখানে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তাহলে কোন পথে এখন পাকিস্তান? অনেক সম্ভাবনা আছে এখন। নিয়মমাফিক নির্বাচন হবে আগামী বছর। যে কারণে নওয়াজ শরিফ তাঁর ছোট ভাই শাহবাজ শরিফকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হচ্ছে না, শাহবাজ শরিফের বদলে আসছেন তাঁর স্ত্রী। কিন্তু সেখানে জটিলতা আছে। ফলে রাজনীতিতে নওয়াজ শরিফের ‘কামব্যাক’ একটি প্রশ্নের মধ্যে থাকল। মুসলিম লীগের ওপর নওয়াজের কর্তৃত্ব কতটুকু থাকবে সেটা একটা প্রশ্ন। কেননা নির্বাচন কমিশন তাঁর দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন দলীয় প্রধান নিয়োগের জন্য তারা চিঠি দিয়েছে। দলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আবার ফিরে আসার যে সম্ভাবনা ছিল তা এখন আর নেই। দল যদি আগামী নির্বাচনে ভালো করে, ২০১৮ বা ২০১৯ সালের দিকে তিনি আবার পাকিস্তানে ফিরে আসার উদ্যোগ নিতে পারেন, তা সংকটকে আরো জটিল করবে। উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে একটা ধূম্রজাল আছে। তিনি শুধু চলতি সংসদে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন, নাকি আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। উচ্চ আদালত ট্রায়াল কোর্ট নয়। তাঁকে আজীবন নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার রাখেন না উচ্চ আদালত। সুতরাং নওয়াজ শরিফ আইনি লড়াইয়ে যাবেন! তবে সেনাবাহিনী তাঁকে সেই সুযোগ না-ও দিতে পারে। এমনও হতে পারে, সেনাবাহিনী একদল নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দেখতে চাইছে, যারা সেনাবাহিনীর স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। স্পষ্টতই নওয়াজ শরিফ সেনাবাহিনীর স্বার্থকে আঘাত করেছিলেন।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে নিয়ে সমস্যা রয়েছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু রাজনীতিবিদরাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। শুধু নওয়াজ শরিফ একাই নন, একাধিক রাজনীতিবিদ (ইমরান খানসহ) বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তাঁরা সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেন না। ডিপ্লোম্যাট (Diplomat) নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের পর যে মন্তব্যটি করেছে, তা প্রণিধানযোগ্য। ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, Democracy isn’t an end in itself. Often mistaken for majoritarianism, democracy in its simplest definition is a means to governance to ensure equality. পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই মন্তব্যটি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। দলীয় কর্তৃত্বের নামই গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রের মর্মবাণী হচ্ছে সমতা। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটিই হচ্ছে আসল কথা। সেখানে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং ভবিষ্যৎ পাকিস্তান নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল।
Daily Kalerkontho
13.08.2017

নির্বাচন কমিশনের সংলাপ, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও বিবিধ প্রসঙ্গ


নির্বাচন কমিশন সুধী সমাজের সঙ্গে সংলাপ করেছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, তারা একটি গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন উপহার দিতে চান জাতিকে। ৩১ জুলাইয়ের সংলাপে উপস্থিত সুধী সমাজ প্রায় সবাই এক বাক্যে এ কথাই বলেছেন, আগামীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো যেন একটি নির্বাচন না হয়। আর সে জন্য যা দরকার তা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের শক্ত অবস্থান গ্রহণ। ওইদিন সুধী সমাজের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেখানে অন্তত তিনটি ইস্যুতে বিশিষ্টজনরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এই তিনটি হচ্ছেÑ ‘না’ ভোট পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাচনের দিন সর্বত্র সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং তফসিল ঘোষণার আগেই সব দলের জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরি। সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে ইতোমধ্যেই ‘বড়’ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্টতই দুটি বড় দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি যেখানে সেনা মোতায়েনের পক্ষে, সেখানে আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে। ফলে নির্বাচন কমিশন যে সুপারিশমালা প্রণয়ন করবে এবং সরকারের কাছে তাদের দাবি উত্থাপন করবে, তাতে সেনা মোতায়েনের সুপারিশটি থাকবে কিনা সে প্রশ্ন থাকলই। এটা একটা বড় ইস্যু এবং ইসির জন্য একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চলতি আগস্ট মাসেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন। সেনা মোতায়েনের বিষয়টি যে সেখানে আলোচিত হবে, তা বলাই বাহুল্য। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যদি তাদের প্রস্তাবনায় অথবা সুপারিশে (সবার মতামত নিয়ে) নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ইস্যুটি না রাখে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে সিইসির সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। আর যদি রাখে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে নির্বাচনে সরকারের অসহযোগিতা নিয়ে! কেননা নির্বাচন কমিশন এককভাবে নির্বাচন পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখে না। নানাবিধ কাজে তার সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। ডিসি, এসপি, ওসিÑ তারা তত্ত্বগতভাবে নির্বাচন-পূর্ব তিন মাস সময়ে নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন থাকবেন। তারা নির্বাচন কমিশনের কথামতো চলবেন। এটাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা (সংবিধানের ধারা ১২৬)। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা দেখি ভিন্নচিত্র। জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা ইসি নয়, বরং মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত হন। তারা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে যেতে পারেন না। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কথা না হয় নাই বা বললাম। উপজেলা নির্বাচনে কী হয়েছিল? মিডিয়ার বদৌলতে আমরা দেখেছি ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারা হচ্ছে, পুকুরে ব্যালট পেপার ভাসছে কিংবা তারও আগে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি কেউ কেউ, তাকে ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইত্যাদি। ওই সময় তো শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল! তারা কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলেন? ডিসি সাহেবরা ছিলেন। কিন্তু তাদের ভূমিকা কী ছিল? সুতরাং সেনা মোতায়েনের প্রশ্নটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ইসি এককভাবে এটা পারে না। সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা দরকার। এই সহযোগিতা ইসি সব সময় পেয়েছে, তা বলা যাবে না। তাই সুধী সমাজের এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কাগজ-কলমেই থেকে যেতে পারে। এ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসিকে একটা সমঝোতায় যেতে হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইসির ৭ দফাকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বড় আলোচনায় যাওয়ার দরকার নেই। মূল আলোচনা হতে হবে বিএনপির সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হতে পারে। যদিও এটা সত্য, ‘সহায়ক সরকার’-এর যে কথা বিএনপি বলে আসছে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন নয়। তবে দুটি বড় দলের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ নিতে পারে নির্বাচন কমিশন। এটা কঠিন কিছু নয়। সিইসির আর জীবনে পাওয়ার কিছু নেই। পূর্ণ সচিব না হয়েও কিংবা সচিব হিসেবে সচিবালয়ের কাজ না করেও তিনি সিইসি হয়েছেন। থাকবেন ৫ বছর। এর পর তো তার আর পাওয়ার কিছু থাকতে পারে না। কিন্তু জাতি তাকে মনে রাখবে যদি তিনি দুটি বড় দলের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ নেন। একমাত্র তার আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগই এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি আদৌ এই উদ্যোগটি নেবেন কিনা? সব সময় সংবিধানের দোহাই দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। সাংবিধানিকভাবে সরকারের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। সরকারি দলের জন্য এটা একটা প্লাস পয়েন্ট। তার পরও ‘যে কোনো ফর্মুলায়’ বিএনপিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে আনতে হবে। ইতোমধ্যে আদালতের অনুমতি না নিয়ে খালেদা জিয়া দেশ ছেড়েছেন বলে দুদক আদালতের কাছে আর্জি জানিয়েছে। খালেদা জিয়ার লন্ডন গমন নিয়ে মন্ত্রীরা নানা কথা বলছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এ ধরনের কথাবার্তা না বলাই মঙ্গল। আমরা চাই আস্থার সম্পর্ক। এই আস্থার সম্পর্কই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। ৭ দফা ‘রোডম্যাপ’ কিংবা রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তা নিশ্চিত করা যাবে না। সরকারি দল প্রকাশ্যে এবং গোপনে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় নৌকার পক্ষে ভোট চাইছেন। খালেদা জিয়াও লন্ডন যাওয়ার আগে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন। এরশাদ সাহেবও সক্রিয়। সুতরাং বিএনপিসহ অন্য দলগুলোও যাতে সভা-সমাবেশ করতে পারে, এটা নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা কোনো দলই নির্বাচনী তফসিলের আগে কোনো সভা-সমাবেশ কতে পারবে না। ইসি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করছে, তাতে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ থাকবে না। কেননা নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করেছে। জামায়াত হিসেবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও কীভাবে এবং বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, এ ব্যাপারেও আগ্রহ থাকবে অনেকের। নতুন কয়েকটি ইসলামিক দল তথা জোটকে নতুন করে নিবন্ধন দেওয়া হবে। হেফাজতের সমর্থকরা তাতে থাকবেন। এটাও রাজনীতিতে নতুন একটি দিক। তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের আদৌ কোনো ভূমিকা থাকবে কিনা এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা।
আমরা নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করেছি। যেখানে ভারতের মতো দেশে মাত্র তিনজন কমিশনার দিয়ে নির্বাচনের সব কর্মকা- পরিচালিত হয়, সেখানে আমরা ৫ জন কমিশনার (একজন সিইসিসহ) দিয়ে নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করছি। কিন্তু এতে করে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের নিরপেক্ষ থাকা যেমনি প্রয়োজন, ঠিক তেমনি নির্বাচন কমিশনেরও ক্ষমতা প্রয়োগ করার বিষয়টি জরুরি। নির্বাচন কমিশন কাগুজে ও প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, আমরা তা কেউই চাই না। একটি অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন প্রয়োজন। তা হলেই আমরা গণতন্ত্রকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারব। আর না হলে এ দেশে গণতন্ত্রের ‘মৃত্যু’ ঘটবে। নির্বাচন কমিশন যদি বিষয়টি উপলব্ধি করে তাহলে তা আমাদের সবার জন্য মঙ্গল। এ দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিকচর্চার জন্য দুটি বড় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে তা হলে এ দেশে ‘গণতন্ত্রের হাওয়া’ বইবে না। আর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে যদি বিভেদ-অসন্তোষ থাকে, তা হলে এ থেকে ফায়দা নেবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো, যা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল নয়। দীর্ঘ ৪৫ বছর আমরা পার করেছি। আমাদের অনেক অর্জন আছে। অনেকগুলো সেক্টরে আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাকশিল্পে আমাদের সক্ষমতা, ওষুধশিল্পের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটা পরিচিতি আছে। আমরা ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছি। ‘নেক্সট ইলেভেন’-এ বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭-এর ঘরে থাকবে বলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এখন এই যে অর্জন তা মুখ থুবড়ে পড়বে যদি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে দুটি বড় দলের মাঝে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হয়। এই আস্থার সম্পর্ক শুধু দেশের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গল নয়, বরং দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন উপরন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্যও প্রয়োজন। জনগণ এমনটি দেখতে চায়। সাধারণ মানুষ চায় দুটি বড় দলের নেতারা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য রাখবেন না। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি নেই। কিন্তু সময় এসেছে এ ব্যাপারে কথা বলার ও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এ কারণেই ইসিতে সংলাপে আমি বলেছি এখনই সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হোক। মামলা-মোকদ্দমা থাকতেই পারে। এ জন্য দেশে আইন আছে। আদালত আছে। আইন ও আদালতকে ‘ফেস’ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা সবাই চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। চাই একটি শক্তিশালী পার্লামেন্ট। আর এভাবেই গণতন্ত্রের ভিতকে আমরা আরও শক্তিশালী করতে পারব। না হলে আগামীতে বাংলাদেশের জন্য কোনো মঙ্গল বলে আনতে পারব না আমরা। যে কথাগুলো ওইদিন সুধী সমাজ বলেছে, তার মাঝে কোনো রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ নেই বা কোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাবও তাতে প্রতিফলিত হয়নি। তবে সুশীল সমাজ নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেবে রাজনৈতিক দলগুলো। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে আদৌ সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে কিনা কিংবা ‘না’ ভোট কীভাবে পুনঃস্থাপিত হবে। আমরা চাই এ ব্যাপারে একটা সমঝোতা হোক।
Daily Amader Somoy
09.08.2017

সংলাপ, অনাস্থা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে



  নির্বাচন কমিশনের দ্বিতীয় সংলাপ শুরু হচ্ছে চলতি আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। প্রথম সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুশীল সমাজের সাথে গত ৩১ জুলাই। দ্বিতীয় সংলাপে নির্বাচন কমিশন কথা বলবে গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সাথে। পর্যায়ক্রমে কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ সংস্থা, নারী নেতৃবৃন্দ, সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সাথেও কথা বলবে। প্রতিটি সংলাপে তারা যেসব মতামত পাবেন, তা একত্রিত করে একটি সুপারিশমালা প্রণয়ন করবেন নভেম্বরে। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য পরিষ্কারÑ তারা সকল শ্রেণির মানুষের মতামত নিয়ে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চান। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভাল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিভিন্ন মতামত থাকে। এসব মতামত দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যাবে না। সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যা প্রয়োজন, তা হচ্ছেÑ ১. সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা, ২. নির্বাচনে সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, ৩. নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ, ৪. রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক স্থাপন, ৫. নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে ঐকমত্য ইত্যাদি।
প্রথম সংলাপ এ কিছু মতামত পাওয়া গেছে। এ ধরনের মতামত আগামীতেও পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছেÑ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং সেখানে একটি ঐকমত্যে উপনীত হওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ন্যূনতম ইস্যুতে ঐকমত্যে উপনীত হতে না পারে তাহলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। নির্বাচন নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের ভাল নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। কিন্তু নির্বাচন হয়েছে। এটা একটা সাংবাবিধানিক বাধ্যবাধকতা। নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে আয়োজন করতে না পারলে, নানা জটিলতা তৈরি হতো। কিন্তু দুটি বড় দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই নির্বাচনকে নিয়ে খুব কি লাভবান হয়েছে? নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি যেমনি খুব একটা লাভবান হয়নি, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগও নির্বাচন আয়োজন করে খুব লাভবান হয়েছে, তা বলা যাবে না। তারা সরকারে আছে। কিন্তু দুটি বড় দলের মাঝে বড় অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। তাই প্রথম সংলাপে, যেখানে আমি নিজেও আমন্ত্রিত ছিলাম, সেখানে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে (সেনাবাহিনী মোতায়েন, না ভোট, আস্থার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন), তা যুক্তিযুক্ত। সবাই এসব প্রশ্নে একমত হয়েছিলেন এবং সংলাপ শেষে সিইসি এটা স্বীকারও করেছেন। কিছু বিরোধিতা আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বড় প্রভাব ফেলেনি। দু’একজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যাদেরকে সমাজ আওয়ামী লীগ ঘরনার বলেই মনে করে, তারা সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশ্নে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে এটা বলার চেষ্টা করেছিলেন যে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করলে, অন্যান্য ফোর্স, বিশেষ করে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে! কিন্তু এই মন্তব্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। প্রায় সবাই একবাক্যে ‘না ভোট’ পুনঃস্থাপন করার কথা বলেছেন, যা একসময় চালু হলেও, বর্তমানে তা নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তা বাতিল হয়। নির্বাচন কমিশনকে শক্ত অবস্থানে থাকার কথা বলা হয়েছে সংলাপ থেকে। আমি আমার নিজের বক্তব্যে এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি সংবিধানের ১১৮(৪) ও ১২৬নং অনুচ্ছেদের কথা। ১১৮(৪) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে স্বাধীন’। আর ১২৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য’। এর অর্থ পরিষ্কার একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে এই দায়িত্বটি পালন করতে হবেÑ এটাই ছিল সবার অভিমত। সংলাপে এমন অভিমত দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনপূর্ব তিনমাস তিনটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব (জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও তথ্য) নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। তাহলে ওই সময় যে সরকার থাকবে, তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব খাটাতে পারবেন না। আর এভাবেই নির্বাচন কমিশন তার অবস্থান শক্তিশালী তথা সরকারের প্রভাবের বাইরে থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন।
প্রথম সংলাপে অংশগ্রহণকারী প্রায় সবাই এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে, ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, যা নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হলে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এর ব্যাপারে সিইসির ইতোপূর্বকার বক্তব্য সংলাপে সমালোচিত হয়েছে। সিইসি বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তার করার কিছু নেই’। এটা অনাকাক্সিক্ষত এবং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার দায়িত্ব যে নির্বাচন কমিশনের এ কথাটাও তাকে সংলাপে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিউত্তরে সিইসি কিছুই বলেননি। কোনো যুক্তিই তিনি খন্ডন করেননি। তিনি প্রতিটি বক্তব্যের ‘নোট’ নিয়েছেন এবং কখনো কখনো এর ব্যাখ্যাও চেয়েছেন প্রশ্নকর্তার কাছ থেকে।
সংলাপ ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা হয়নি। কোনো ফর্মূলাও উত্থাপিত হয়নি। সম্ভবত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন একটা ধারণা প্রচলন ছিল যে নির্বাচনের আগে ‘সহায়ক সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হবে, কি হবে না, এটি দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা নেই। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৬, ৫৫(২) ও ৫৬(৪) প্রয়োগ করে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন ‘সহায়ক সরকারের’ ভূমিকা পালন করতে পারে এই অভিমত ছিল অংশগ্রহণকারী সবার। মোদ্দাকথা সংলাপে অংশ নেওয়া প্রায় সবার অভিমত হচ্ছেনির্বাচন কমিশন তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করুক। এ তিনটি মূল ইস্যুর বাইরে নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার না করা, প্রার্থীদের (সংসদ নির্বাচনে) সম্পদের পরিমাণ জানিয়ে দেওয়া, রিটার্নিং অফিসারদের ভূমিকা, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ইত্যাদি মতামত দেওয়া হয়। এর বাইরে আমার আরও অভিমত ছিল নিম্নরূপ;
আচরণ বিধিমালায় (সেপ্টেম্বর ২০০৮) সংশোধন এবং পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য না দেওয়ার বিধি অন্তর্ভুক্ত, স্থানীয় পর্যায়ে বিশিষ্ট ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘পর্যবেক্ষক টিম’ গঠন, যারা মনিটরিং করবে এবং সরাসরি ইসিকে রিপোর্ট করবে, স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান চালু করা। প্রার্থী অনলাইনেও মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের যদি সমানসংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারি না করে পুনরায় ভোট গ্রহণ। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ভোট না পেলে মূল দুই প্রার্থীর মধ্যে পুনরায় ভোটগ্রহণ, এবং সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা গ্রাজুয়েশন নির্ধারণ করা। তবে দেখতে হবে তা, যেন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। সিভিল, মিলিটারি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অবসরের পর ৫ বছর নির্ধারণ করা এবং একই সাথে দলের স্থানীয় পর্যায় থেকে তা অনুমোদিত হওয়া। হলফনামায় দেখা তথ্য যাচাই-বাছাই করা এবং ভুয়া তথ্যের কারণে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধান সুস্পষ্ট করা (নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের বিষয়টি আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি)। দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রার্থী পদে বিধিনিষেধ আরোপ, এবং মনোনয়ন প্রার্থীদের সবার টিআইএন নাম্বার সংযুক্ত বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি। নির্বাচন বিধিমালায় এভাবে সংস্কার আনা যায়।
সংলাপ-এর পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এসব প্রস্তাবলির কতটুকু ইসি গ্রহণ করবে এবং নভেম্বরে যে খসড়া সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হবে তাতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে। সিইসি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন এবং আমি তার উপর আস্থাটি রাখতে চাই। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায় সরকার এর কতটুকু গ্রহণ করবে? আর সরকার যদি ইসির সুপারিশ গ্রহণ না করে, তাহলে ইসিরও বা কি করণীয় আছে? আসল কথা এটাই। সরকার সুপারিশমালা গ্রহণ না করলেও ইসি সাংবিধানিকভাবে ‘অনেক কিছু’ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইসি কিছুই করে না, করতে পারে না। এটাই হচ্ছে সত্য কথা। আমরা এক কঠিন সময় পার করছি। নির্বাচন কমিশন যে আস্থাহীনতায় ভুগছিল, তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সংলাপ-এর আগের দিন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। এখন ইসির অনেকগুলোর কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে বিএনপিকে আস্থায় নেওয়া এবং ‘সকলের জন্য সমান সুযোগ’ সৃষ্টি করা। একদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ যদি এক ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা অব্যাহত রাখেন, অন্যদিকে বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। আর এজন্য ইসি অভিযুক্ত হবে বৈকি! ইসি সাংবিধানিকভাবে অনেক শক্তিশালী। আমরা চাই ইসি তার সেই ‘ক্ষমতা’ প্রয়োগ করুক। এক্ষেত্রে ইসির ব্যর্থতা আমাদেরকে একটি গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে।
Daily Amadersomoy.com
07.08.2017

কোন পথে পাকিস্তান




পাকিস্তানের রাজনীতিতে নওয়াজ শরিফ বরাবরই একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসেননি। একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে পাকিস্তানে তার পরিচিতি আছে। পাকিস্তানে সাবেক সেনা শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের শামনামলে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান এবং তারই ছত্রছায়ায় তিনি রাজনীতিতে আসেন। তার যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও আমলা ও জেনারেলদের কাছে তিনি কখনও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তিনবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। প্রতিবারই তিনি অপসারিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, এপ্রিলে (১৯৯৩) বরখাস্ত হন, এক মাস পর মে মাসে (১৯৯৩) তিনি কোর্টের আদেশে পুনর্বহাল হন। তবে একই বছর জুলাই মাসে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে তিনি এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসহাক খান পদত্যাগ করেন। দ্বিতীয়বার তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। তৃতীয়বার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০১৩ সালের ৫ জুন। সেবারও তার দল মুসলিম লীগ (এন) বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। যদিও এবারের সরকার ছিল কোয়ালিশন সরকার, কিন্তু এবারও তিনি পুরো ৫ বছরের টার্ম পূরণ করতে পারলেন না। ২৮ জুলাই (২০১৭) পদত্যাগ করলেন কেলেঙ্কারির বোঝা মাথায় নিয়ে। শুধু তার ক্ষেত্রেই নয়, বেনজির ভুট্টোর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও বেনজির ও নওয়াজ শরিফ কখনও তাদের ৫ বছরের টার্ম পূরণ করতে পারেননি। বেনজিরের মতো নওয়াজ শরিফও দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার দেশে ফিরেও এসেছিলেন। একসময় লন্ডনে বসে বেনজির, নওয়াজ শরিফ গণতন্ত্র উদ্ধার কমিটি গঠন করেছিলেন। তখন ছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সময়কাল। এখন পারভেজ মোশাররফ নিজেই দেশান্তরিত। কেন এ রকমটি হয়? এর কারণ হচ্ছে, অত্যন্ত ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী তথা সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি। বেনজির ভুট্টো তো আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারাই গিয়েছিলন। অভিযোগের তীর ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার দিকে! জেনারেল পারভেজ মোশররফ যখন সেনাপ্রধান ছিলেন, তখনও নওয়াজ শরিফ তার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। অনেকের মনে থাকার কথা, ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশারফকে বহনকারী বিমানকে করাচির মাটিতে নামতে দেননি নওয়াজ শরিফ। এরপরই এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। অনেক ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিচার বিভাগের একটা পরোক্ষ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়! এরই মধ্যে পাকিস্তানে যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হচ্ছে সেনাবাহিনী কী বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে নওয়াজকে উৎখাত করল? পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মাঝে সন্দেহ জাগার অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে যে যৌথ তদন্ত কমিটি (Joint Investigation Committee গঠিত হয়েছিল, তাতে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার দুইজন ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার ব্যক্তি এ প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। ফলে একটা প্রশ্ন তো থাকলই। তবে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে তো নওয়াজ শরিফই মনোনীত করেছিলেন। তিনজন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে থেকে নওয়াজ শরিফ তাকে বেছে নিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল একজন নন-পাঞ্জাবি জেনারেল যদি সেনাপ্রধান হন, তিনি নিশ্চিন্তে থাকবেন। জেনারেল বাজওয়া পাঞ্জাবি নন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে পাঞ্জাবি আধিক্য বেশি। শীর্ষ পাঞ্জাবি জেনারেলরা কোর কমান্ডগুলোর নেতৃত্ব দেন। অথচ দেখা গেল, একজন নন-পাঞ্জাবি জেনারেলকে সেনাপ্রধান করেও তিনি ‘পার’ পেলেন না। আসলে এখানে কাজ করে সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীস্বার্থ। এ গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে নওয়াজ শরিফ হেরে গেলেন।
তাহলে কোন পথে এখন পাকিস্তান? অনেক সম্ভাবনা আছে এখন এক. নিয়মমাফিক নির্বাচন হবে আগামী বছর। যে কারণে নওয়াজ শরিফ তার ছোট ভাই শাহবাজ শরিফকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাজনীতিতে নওয়াজ শরিফের ‘ক্যামব্যাক’। দুই. মুসলিম লীগের ওপর নওয়াজের কর্তৃত্ব বজায় রইল। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত হলেও দল পরিচালনায় অযোগ্য ঘোষিত হননি। অর্থাৎ দলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আবার ফিরে আসার চেষ্টা করবেন। দল যদি আগামী নির্বাচনে ভালো করে, তিনি ২০১৮ বা ২০১৯ সালের দিকে যদি ফের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন, আমি অবাক হব না। উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে একটা ধূম্রজাল আছে। তিনি শুধু চলতি সংসদে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন, নাকি আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। উচ্চ আদালত ট্রায়াল কোর্ট নয়। তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার রাখে না উচ্চ আদালত। সুতরাং নওয়াজ শরিফ আইনি লড়াইয়ে যাবেন এবং ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশও নিতে পারেন! তিন. তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার দলও শক্তিশালী। বর্তমানে পাকিস্তানের সংবাদের উচ্চকক্ষ সিনেটে (মোট আসন ১০৪) মুসলিম লীগের আসনসংখ্যা ২৫। কিন্তু নিম্নকক্ষে (মোট আসন ৩৪২) মুসলিম লীগের আসনসংখ্যা ১৮৯। নিম্নকক্ষে মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ২০৯, আর বিরোধী দলের ১৩১ আসন। সর্বশেষ নির্বাচনে মুসলিম লীগ পেয়েছিল শতকরা ৩২ দশমিক ৭৭ ভাগ। আর পিপিপি ও তেহরিক-ই ইনসাফ পেয়েছিল শতকরা ১৫ দশমিক ২৩ ভাগ ও ১৬ দশমিক ৯২ ভাগ। এর অর্থ রাজনীতিতে মুসলিম লীগের একটা অবস্থান আছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই ইনসাফ পার্টি; পিপিপির ভূমিকা দৃশ্যত স্পষ্ট নয়। নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের পরপরই ইমরান খানের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন শহিদ আব্বাসি। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন শাহবাজ শরিফ। এজন্য তাকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে হবে এবং উপনির্বাচনে (নওয়াজ শরিফের আসনে) বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে যেতে হবে। শাহবাজ শরিফ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন তার বড় সন্তান হামজা শরিফ। আসলে নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ করলেও তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে চান। এ কারণেই একদিকে শাহবাজ শরিফকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে ভাইপো হামজা শরিফকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছেন। এটা হিতে বিপরীতও হতে পারে। দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফ একাই নন, পানামা পেপারসে আরও অনেকের নাম এসেছিল। কিন্তু এদের সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা, তা-ও স্পষ্ট নয়। ফলে নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে বৈকি! পাকিস্তানের রাজনীতি এখন কোন দিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের পর যে প্রশ্নটি এখন বহুল আলোচিত, তা হচ্ছে কোন পথে এখন পাকিস্তান? পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎইবা কী? এ ঘটনায় নওয়াজ শরিফ পরিবারের সাম্রাজ্যের কি পতন ঘটল? আপাতত নওয়াজ শরিফের দল মুসলিম লীগ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ও নওয়াজ শরিফের ভাই শাহবাজ শরিফকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। বলা ভালো, পানামা পেপারসে নওয়াজ শরিফ, তার দুই ছেলে ও একমাত্র মেয়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। অভিযোগে আছে, এরা অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে অর্থ পাচার করেছিলেন এবং ওই অর্থ দিয়ে লন্ডনে একাধিক বাড়ি ক্রয় করেছেন। গেল বছর পানামা পেপারসে শরিফ পরিবারের নাম উঠলে এবং বিরোধী দল উচ্চ আদালতে গেলে এপ্রিলে আদালত ৩-২ এ শরিফের পক্ষে রায় দিলেও তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। অতিদ্রুততার সঙ্গে ওই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং তাতে নওয়াজ পরিবারকে অভিযুক্ত করা হয়। এখন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ ওই তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে অভিমত দেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরিফ ‘অযোগ্য’। উচ্চ আদালত আরও অভিমত দেন, পার্লামেন্ট ও আদালতের প্রতি সৎ ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী। তিনি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। আমিরাতভিত্তিক অফশোর কোম্পানি এফজেডইর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা গোপন করার কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার পরপরই নওয়াজ শরিফ তার পদত্যাগের কথা জানান। এটা ছাড়া তার করারও কিছু ছিল না। কেননা আপিল বিভাগের রায় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ৯৯(এফ) এবং সংবিধানের ৬২(১)(এফ) বলে নওয়াজ শরিফের পাঞ্জাবের সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। সম্ভবত আগামী বছরও নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হবেন না। তাহলে কি পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের সাম্রাজ্যের পতন ঘটল? পাকিস্তানের একটি জনপ্রিয় ও প্রাচীন সংবাদপত্র ‘ডন’ এর উপসম্পাদকীয়তে এ ধরনের একটি আভাস দেয়া হয়েছে যে, নওয়াজ শরিফ ‘অভিযুক্ত’ হওয়ায় শরিফের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিশেষ করে নওয়াজ শরিফ তার উত্তরসূরি হিসেবে মেয়ে মরিয়ম শরিফকে বেছে নিয়েছিলেন। এখন এ রায় মরিয়মের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করল।
Daily Alokito Bangladesh
06.08.2017

নির্বাচন কমিশন কতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছে



নির্বাচন কমিশনার দেশের সুশীল সমাজের সঙ্গে তাদের প্রথম সংলাপ শেষ করেছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তারা পর্যায়ক্রমে সাংবাদিক সমাজ, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গেও সংলাপ করবেন। এর মধ্যে দিয়ে নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি অনেকে করার চেষ্টা করেন_ তা হচ্ছে এর মধ্যে দিয়ে নির্বাচন কমিশন কী সবার পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পেরেছে? নির্বাচন কমিশন, বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) নিয়ে একটা 'বিতর্ক' ছিল। বিএনপি তার নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছিল। এখন প্রথম 'সংলাপ' শেষ হবার পর তাই সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠবে নির্বাচন কমিশন তার আস্থার জায়গাটা ফিরে পাবে কি-না? সংলাপে অনেক অভিমত দেয়া হয়েছে। যা একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজের মাঝে একটা ঐকমত্যও আমরা লক্ষ্য করেছি। সুতরাং প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, নির্বাচন কমিশন এমন প্রস্তাব বাস্তবায়নে কতটুকু আন্তরিক হবে। সংলাপে বেশ কিছু অভিমত দেয়া হয়েছে। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে 'না' ভোটের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা। নির্বাচন কমিশনকে সরকারের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, অবৈধ আয়, ও প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই বাছাই করা, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে সুযোগ করে দেয়া, দ্বৈত নাগরিক, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন, তাদের ব্যাপারে বিধি নিষেধ আরোপ ইত্যাদি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এগুলোই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। সবার জন্য সমান সুযোগ এর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সিইসির বক্তব্য সমালোচিত হয়েছে বেশি। তিনি কদিন আগে বলে ছিলেন তফসিল ঘোষণার আগে এ ব্যাপারে তার করণীয় কিছু নেই। তখন এইচএম এরশাদ নয়া দিলি্ল থেকে ফিরে এলে, দল তাকে গণসংবর্ধনা দেয়, আর পুলিশ তাতে অনুমতি দেয়। কিন্তু বিএনপি সভা-সমাবেশ করতে চাইলে তাতে বাধা দেয় এতে করে তো লেভেল প্লেইং ফিল্ড হবে না।
সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত। বিএনপি যদি বেগম জিয়াকে দেশে আসার পর গণসংবর্ধনা দিতে চায় সরকার কী তার অনুমতি দেবে? এটা সত্য ইসির এ ক্ষেত্রে করার কিছু নেই। এটা সরকারও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তবে ইসি বলতে পারে তফসিল ঘোষণার আগে কোনো বড় সমাবেশ নয় এবং কোনো নির্বাচনী জনসভা নয়।
দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দরকার আস্থার সম্পর্ক। এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই। আমরা খুব অতীতমুখী। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি বেশি। দোষারোপের রাজনীতির বিত্ত থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এখনই একটি উদ্যোগ নিতে পারে। এমন একটি মেকানিজম ইসি বের করতে পারে, যেখানে দলগুলো এখন থেকে বিদ্বেষমূলক কোনো কথাবার্তা বলবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে সিইসি বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন। এতে কতটুকু ফল তিনি পাবেন তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এ ধরনের একটি উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন।
বলা ভালো ইসির ৭ দফায় এ সংক্রান্ত কিছু নেই। নির্বাচনে সিল মারা সংস্কৃতি, ভোটকেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি, কিংবা বিরোধী দলের প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দেয়া_ এই যে প্রবণতা বিগত দশম সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন কিংবা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি, এই প্রবণতা সুষ্ঠু নির্বচনের পথে অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে ইসির করণীয় আছে। ইসি এ ক্ষেত্রে বেশ কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমন ১. স্থানীয়ভাবে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে ইসি একটি পর্যবেক্ষক টিম গঠন করতে পারে। যাদের কাজ হবে নির্বাচন কেন্দ্রগুলো মনিটর করা এবং সরাসরি কেন্দ্রে রিপোর্ট করা, ২, মিডিয়ার মাধ্যমে যেখান থেকেই জাল ভোট, ভোটকেন্দ্র দখলের খবর আসবে, সেখানে ওই কেন্দ্র নয়, বরং পুরো নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন স্থগিত যোষণা করা, ৩. মনোয়নপত্র একই সঙ্গে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ে গ্রহণ করা। এতে করে প্রার্থীর পক্ষে একাধিক জায়গায় মনোনয়পত্র জমা দেয়া যাবে। মনোনয়পত্র জমা দিতে বাধা দেয়ার খবর এলে ওই এলাকার নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতে হবে, ৪. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনী কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। ৫. সংসদ নির্বাচনে ভোট গণনায় যদি প্রার্থীরা সমানসংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারির পরিবর্তে সেখানে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে, এবং কোনো প্রার্থী যদি শতকরা ৫০ ভাগের নিচে ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা যাবে না। সেখানেও পুনরায় নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের নিয়ম আছে। ৬. সংসদ সদস্যের যোগ্যতার প্রশ্নে নূ্যনতম যোগ্যতা যুগোপযোগী হওয়া উচিত। দেশে উচ্চ শিক্ষার হার বেড়েছে। যারা দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন, তারা যদি শিক্ষিত না হন, তাহলে সঠিক ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করবেন কীভাবে? এতে করে সংসদ সদস্যরা বেশি মাত্রায় আমলানির্ভর হয়ে যাবেন। আমলারা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটাবেন। বর্তমান আইনে সুুবিধাবাধী ও ধান্দাবাজ ঊর্ধ্বতন আমলা, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তারা অবসরের তিন বছর পর নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এটা একটা দুর্বল আইন। এটা পরিবর্তন করে নূ্যনতম ৫ বছর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ একজন আমলা ৫৯ বছর বয়সে অবসরে যাবেন। এবং ৬৫ বছর বয়সে তিনি সংসদ নির্বাচন প্রার্থী হতে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে শর্ত থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ওই সংসদীয় এলাকায় দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে। এটা না হলে দেখা যাবে সুযোগ সন্ধানী আমলারা সচিবালয়ে থাকাকালে মন্ত্রণালয়ের প্রভাব খাটিয়ে তার নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা-ে অংশ নিচ্ছেন। এতে করে পরোক্ষভাবে তিনি সরকারকে ব্যবহার করছেন। পাঁচ বছরের একটি গ্যাপ থাকলে এই কাজটি করতে তিনি অপারগ হবেন। সংলাপেও এসব প্রশ্নই উঠেছে।
এখন সময় এসেছে নির্বাচন কমিশনকে এটা প্রমাণ করতে যে তারা সত্যি সত্যিই 'স্বাধীন'। বেশ ক'জন প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার, একাধিক নির্বাচন পর্যবেক্ষব এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থেই তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। না হলে যে, 'বিতর্ক' নিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন তার যাত্রা শুরু করেছিল, সেই 'বিতর্ক' আরও বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী গত ২৬ জুলাই ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। আমাদের সংবিধানের ১১৮ (৪) ধারায়ও বলা আছে স্পষ্ট করে 'নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে স্বাধীন' এবং সংবিধানের ১২৬ এ বলা আছে 'নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে'। এটাই হচ্ছে আসল কথা। নির্বাচনের তিন মাস আগে সমস্ত প্রশাসন চলে যায় নির্বাচন কমিশনদের হাতে। অর্থাৎ ডিসি, এসপি, ওসিরা থাকেন নির্বাচন কমিশনের আওতায়। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে তা কী বলে? জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা থাকেন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায়। তাদের নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন নয়। ফলে যা হবার তাই হয়। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করে, আর জেলা প্রশাসকরা 'নিয়ন্ত্রিত' হন মন্ত্রণালয় থেকে। এ ক্ষেত্রে প্রায় ক্ষেত্রেই সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রতিফলিত হয়।
আমরা চাই 'সকল দলের অংশগ্রহণ' নিশ্চিত হোক। বিএনপিসহ প্রতিটি নিবন্ধিত দল আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। তাই সংগত কারণেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের দায় দায়িত্বটি অনেক বেশি। ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো পরিস্থিতির যাতে সৃষ্টি না হয়। এ ব্যাপারে বর্তমান সিইসিকে পালন করতে হবে একটি বড় দায়িত্ব। আমরা সেই 'দায়িত্ব' সিইসি কীভাবে পালন করেন, তার অপেক্ষায় লাকসাম। তবে একটা বিষয়ে বোধহয় আমাদের সবার ঐকমত্যে উপনীত হওয়া প্রয়োজন-আর তা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার। সরকারের বহুমন্ত্রী বার বার বলছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই নির্বাচন হবে। অর্থাৎ নির্বাচনের তিন মাস আগে যে সরকার থাকবে তার নেতৃত্ব দেবেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান সরকার প্রধান থাকলে, সেই সরকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিএনপি সেই প্রশ্নটিই তুলেছে। এটা ঠিক ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিকে তথাকথিত নির্বাচনকালীন সরকারের অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বিএনপি ওই সরকারের যোগ দেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কী বিএনপিকে সে রকম একটি মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হবে? কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? ২০১৪ সালে বিএনপি পার্লামেন্টে ছিল। কিন্তু এখন তো তারা পার্লামেন্টে নেই। তাহলে মন্ত্রিসভায় বিএনপি অন্তর্ভুক্ত হবে কীভাবে? বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিএনপি একটি ফ্যাক্টর। বিএনপিকে মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে। বিএনপি বড় দল। জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের সমর্থন রয়েছে এ দলটির প্রতি। বিগত নির্বাচনগুলোর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে আমরা দেখব শতকরা ৩২ থেকে ৩৬ ভাগ জনগণের সমর্থন রয়েছে এই দলটির প্রতি। সুতরাং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলটিকে নিয়ে আসতে হবে। এতে করে একদিকে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা যেমনি বাড়বে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলও উপকৃত হবে। গণতন্ত্রের জন্য, দুটি বড় দলের মাঝে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) 'অস্থার সম্পর্ক' থাকা দরকার। না হলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকেই এ কথাটা বুঝতে চান না। তারা মনে করেন বিএনপিকে বাদ দিয়েই তারা আবারও নির্বাচনে যাবেন। ২০১৪ সালে নির্বাচন হয়েছিল। এতে করে সরকার কী খুব লাভবান হয়েছে? ইসি রোডম্যাপ দিয়েছে। অতীতেও ইসি এমনটি দিয়েছে। বর্তমান কমিশনও দিয়েছে। সংলাপ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। সেটা এখন আবার শুরু হলো। কিন্তু সংলাপ করে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এ জন্য চাই আন্তরিকতা। চাই সদিচ্ছা। যদি সব দলের অংশগ্রহণ আমরা নিশ্চিত করতে চাই। তাহলে সরকারের সদিচ্ছাটাই হলো আসল। সংলাপে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে তেমন কিছু কথা বলা হয়নি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়টি আসবে।
ইসি সংলাপ করেছে। বেশ কিছু মতামত পেয়েছে। এখন ইসির দায়িত্ব এই মতামতগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। কোন একটি মতামতও যদি ইসি বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে ইসি শেষ পর্যন্ত একটি 'কাগুজে সংগঠন' হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বর্তমান সিইসির জন্য তা মঙ্গলজনক নয়। তার যাত্রাটা ভালো হয়নি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে! এখন দেখার পালা তিনি কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে পরিচালনা করেন? শুধু সংলাপ করে, মিডিয়ায় বক্তব্য রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যাবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি যে 'সিরিয়াস', এটা তাকে প্রমাণ করতে হবে। আমরা তাকিয়ে থাকলাম তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ওপর। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা সবাই চাই। এ ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা বড়। তার ক্ষমতা আছে। তাকে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। সবার আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সুশীল সমাজের আস্থা অর্জন করলেই চলবে না। বরং রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপির আস্থা অর্জন করতে হবে। এটা করতে নির্বাচন কমিশন যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সত্যিকার অর্থই বাংলাদেশে নির্বাচনী সংস্কৃতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।
Daily Jai Jai Din05.08.2017

সিইসির আশ্বাসে আস্থা রাখতে চাই




একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন গত সোমবার সুশীল সমাজের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়। ওই সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নে আমার মতামত তুলে ধরেছি। প্রাথমিকভাবে নির্বাচন কমিশন ৫৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু এ আমন্ত্রণে সবাই সাড়া দেননি। সংলাপে আমি এমন অনেক সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে দেখেছি, যারা কোনো দিন নির্বাচন প্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেননি। যারা নির্বাচন নিয়ে কাজ করেছেন, সেমিনার করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন- এমন অনেক ব্যক্তিকে আমি সংলাপে অংশ নিতে দেখিনি। তবে সিইসির প্রারম্ভিক বক্তব্য আমাকে আশাবাদী করেছে। সূচনা বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি ও কমিশনাররা সুশীল সমাজের মন্তব্যগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবেন। এ সংলাপ একটি চলমান প্রক্রিয়া। পর্যায়ক্রমে নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব (আগস্ট ২০১৭), নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০১৭), নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা (অক্টোবর ২০১৭), নারী নেত্রীদের (অক্টোবর ২০১৭), নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের (অক্টোবর ২০১৭) সঙ্গেও কথা বলবে এবং নভেম্বরে (২০১৭) সুপারিশমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করে তা চূড়ান্ত করবে ডিসেম্বরে (২০১৭)। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজের সঙ্গে তাদের প্রথম সংলাপ কিছুটা হলেও বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রথম দিনের সংলাপে আমি দেখেছি, কতগুলো নির্দিষ্ট ইস্যুতে সুশীল সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের মতামত দিয়েছে। তিনটি ক্ষেত্রে সুশীল সমাজের মধ্যে এক ধরনের ‘ঐক্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ তিনটি ইস্যু হচ্ছে ‘না’ ভোটের পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ‘সঠিক’ দায়িত্ব পালন। যারা প্রথম দিনের সংলাপে উপস্থিত ছিলেন, তাদের প্রায় সবাই এ তিনটি ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এবং সংলাপ শেষে সিইসি এটা স্বীকারও করেছেন। কিছু বিরোধিতা আমি লক্ষ করেছি। কিন্তু তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বড় প্রভাব ফেলেনি। দু’-একজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যাদের সমাজ আওয়ামী লীগ ঘরানার বলেই মনে করে, তারা সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশ্নে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে এটা বলার চেষ্টা করেছিলেন যে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে অন্যান্য ফোর্স, বিশেষ করে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে! কিন্তু এ বক্তব্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। প্রায় সবাই একবাক্যে ‘না’ ভোট পুনঃপ্রবর্তন করার কথা বলেছেন, যা একসময় চালু হলেও বর্তমানে নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তা বাতিল হয়।

নির্বাচন কমিশনকে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার কথা বলেছি আমরা সবাই। আমি আমার বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি সংবিধানের ১১৮(৪) ও ১২৬নং অনুচ্ছেদের কথা। ১১৮(৪)নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন।’ আর ১২৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য।’ এর অর্থ পরিষ্কার- একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে এ দায়িত্বটি পালন করতে হবে- এটাই ছিল সবার অভিমত। সংলাপে এমন অভিমত দেয়া হয়েছে যে, নির্বাচনপূর্ব তিন মাস তিনটি মন্ত্রণালয়ের (জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও তথ্য) পূর্ণ কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। এটি হলে ওই সময় যে সরকার থাকবে, তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব খাটাতে পারবে না। আর এভাবেই নির্বাচন কমিশন তার অবস্থান শক্তিশালী করতে তথা সরকারের প্রভাবের বাইরে থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে।

সংলাপে আমরা প্রায় সবাই বলার চেষ্টা করেছি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, যা নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না হলে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ব্যাপারে সিইসির এর আগের বক্তব্য সংলাপে সমালোচিত হয়েছে। সিইসি বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তার করার কিছু নেই।’ এটা অনাকাক্সিক্ষত এবং ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ সৃষ্টি করার দায়িত্ব যে নির্বাচন কমিশনের, এ কথাও তাকে সংলাপে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। এর প্রতিত্যুত্তরে সিইসি অবশ্য কোনো কথা বলেননি। কোনো যুক্তিই তিনি খণ্ডন করেননি। তিনি প্রতিটি বক্তব্যের ‘নোট’ নিয়েছেন এবং কখনও কখনও এর ব্যাখ্যাও চেয়েছেন।

আমি ধারণা করেছিলাম, সংলাপ ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু তেমনটি হয়নি। সম্ভবত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন একটা ধারণা কাজ করেছিল যে, নির্বাচনের আগে ‘সহায়ক সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হবে কি হবে না, তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা নেই। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৬, ৫৫(২) ও ৫৬(৪) প্রয়োগ করে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন ‘সহায়ক সরকারের’ ভূমিকা পালন করতে পারে, এমন অভিমতও দিয়েছেন কেউ কেউ। মোদ্দাকথা, সংলাপে অংশ নেয়া প্রায় সবার অভিমত হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করুক।

এ তিনটি মূল ইস্যুর বাইরে নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার না করা, প্রার্থীদের (সংসদ নির্বাচনে) সম্পদের পরিমাণ জানিয়ে দেয়া, রিটার্নিং অফিসারদের ভূমিকা, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ইত্যাদি মতামতও দেয়া হয়। এর বাইরে আমার আরও অভিমত ছিল নিন্মরূপ : ১. আচরণবিধিমালায় (সেপ্টেম্বর ২০০৮) সংশোধন এবং পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য না দেয়ার বিধি অন্তর্ভুক্ত করা, ২. স্থানীয় পর্যায়ে বিশিষ্ট ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে একটি ‘পর্যবেক্ষক টিম’ গঠন করা, যারা মনিটর করবেন এবং সরাসরি ইসিকে রিপোর্ট করবেন, ৩. স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান চালু করা। প্রার্থী অনলাইনেও মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন, ৪. একাধিক প্রার্থী যদি সমানসংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারি না করে আবার ভোট গ্রহণ করা। শতকরা ৫০ ভাগ ভোট না পেলে মূল দুই প্রার্থীর মধ্যে আবার ভোট গ্রহণ করা, ৫. সংসদ সদস্যের যোগ্যতা গ্রাজুয়েশন নির্ধারণ করা। তবে দেখতে হবে, তা যেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, ৬. সিভিল, মিলিটারি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন সদস্যরা অবসরের ৫ বছর পর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলের স্থানীয় পর্যায় থেকে তা অনুমোদিত হওয়া, ৭. হলফনামায় দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা এবং ভুয়া তথ্যের কারণে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধান সুস্পষ্ট করা (নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের বিষয়টি আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি), ৮. দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রার্থী পদে বিধিনিষেধ আরোপ, ৯. মনোনয়ন প্রার্থীদের সবার টিআইএন নম্বর প্রদান বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি।

সংলাপের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এসব প্রস্তাবের কতটুকু ইসি গ্রহণ করবে এবং নভেম্বরে যে খসড়া সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হবে তাতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে। সিইসি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন এবং আমি তার ওপর আস্থাটি রাখতে চাই। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সরকার এর কতটুকু গ্রহণ করবে? আর সরকার যদি ইসির সুপারিশ গ্রহণ না করে, তাহলে ইসিরইবা কী করণীয় আছে? আসল কথা এটাই। সরকার সুপারিশমালা গ্রহণ না করলে ইসি সাংবিধানিকভাবে একক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে কিনা? একটা সংশয় এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে, এ সংলাপ শেষ পর্যন্ত ‘লোক দেখানো’ এবং শুধু ‘ফটোসেশনের’ মধ্য দিয়েই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থেকে যেতে পারে! আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন, যিনি সংলাপে অংশ নেননি, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, এ ধরনের সংলাপ অর্থহীন। সরকার অনেক ক্ষেত্রেই ‘ছাড়’ দেবে না। সাংবিধানিকভাবে সরকারের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। সুতরাং সরকার যদি উত্থাপিত অভিমতগুলো বিবেচনায় না নেয়, তাহলে সরকারকে অভিযুক্ত করা যাবে না। আমরা শুধু প্রত্যাশা করতে পারি, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু হচ্ছে আগস্টে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪২। এক্ষেত্রে এদের সঙ্গে ক’দিন ধরে সংলাপ চলবে, এটাও একটা প্রশ্ন। তবে জাতি তাকিয়ে থাকবে বিএনপির দিকে। বিএনপি কী প্রস্তাব দেয়, সেটিই দেখার বিষয়। সংলাপে বিএনপি সহায়ক সরকারের কোনো প্রস্তাব দেয় কিনা, এটা নিয়ে আগ্রহ থাকবে অনেকের। তবে না দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। খালেদা জিয়া এখন লন্ডনে। দু’মাস পর তিনি ফিরবেন। বলা হচ্ছে, ফিরে এসে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে সহায়ক সরকারের ফর্মুলা দেবেন। জাতি এখন তাকিয়ে থাকবে তার ফিরে আসার দিকে।

সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। বলা যেতে পারে, এক ধরনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড শুরু করে দিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ইসিকে যেতে হবে অনেক দূর। সামনের দিনগুলো যে খুব ভালো ও স্বচ্ছ, তা বলা যাবে না। প্রথম দিনের সংলাপে সিইসিকে আমার আন্তরিক বলেই মনে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যতই অভিযোগ থাকুক না কেন, তা তিনি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। সংলাপে সুশীল সমাজের আস্থা তিনি পেয়েছেন। এটা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা (বিশেষ করে বিএনপির) যদি তিনি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে ইতিহাসে একজন সফল সিইসি হিসেবে তিনি জায়গা করে নিতে পারবেন। আমি তার শুভ কামনা করি।
Daily Jugantor
02.08.2017

নির্বাচনী সংলাপ






নির্বাচন কমিশন আজ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক মতবিনিময়সভায় মিলিত হচ্ছে। এই মতবিনিময়সভায় যোগ দেওয়ার জন্য প্রায় ৫৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের একটি আমন্ত্রণলিপি আমি নিজেও পেয়েছি। এর আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করেছিল, তাতে বলা হয়েছিল—কমিশন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের মতামত নেবে। আজ সেটা তারা শুরু করল। কিন্তু কতটুকু সফল হতে পারবে তারা? এই নির্বাচনী সংলাপকে সামনে রেখে কতগুলো ‘প্রশ্ন’ আছে। এসব প্রশ্নের জবাবের ওপরই নির্ভর করছে কমিশনের সাফল্য।
প্রথমত, বুদ্ধিজীবীরা কিছু মতামত আজ দেবেন, সন্দেহ নেই তাতে। তার কয়টি গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন? উপরন্তু সমস্যা রয়েছে আরো। তাঁদের নাম পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাঁদের কারো কারো একটি ‘সুস্পষ্ট’ রাজনীতি আছে। সরকার, সরকারি দল ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁদের কারো কারো সংশ্লিষ্টতা আছে। দু-একটি নাম দেখলাম, যাঁরা নির্বাচন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচনী সংস্কার, রাজনীতির গতিবিধি ইত্যাদি নিয়ে কোথাও কোনো দিন কোনো কিছু বলেছেন কি না সন্দেহ। ফলে তাঁদের ‘ডেকে’ ইসি কী মতামত পাবে? যাঁরা সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন এবং এখনো নিচ্ছেন, তাঁরা কী নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে সমালোচনা করতে পারবেন? আমার তা মনে হয় না। ফলে এই নির্বাচনী সংলাপ অনেকটা ‘লোকদেখানো’ হয়ে যেতে পারে এবং ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে তা শেষ হওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। সিইসি জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে এই মুহূর্তে তাঁর করণীয় কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা মুখ্য। সরকার চাইলে অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে কিছুটা নম্র আচরণ করতে পারে। জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে সরকার এটা করেছে। এইচ এম এরশাদ দিল্লি থেকে ফিরে এলে ঢাকায় গণসংবর্ধনা দিয়েছে দল। সরকার তাতে বাধা দেয়নি। বিএনপির ক্ষেত্রে এমনটি কি হবে? খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দুই মাস পর ফিরে এলে পার্টি যদি তাঁকে বিমানবন্দরে গণসংবর্ধনা দিতে চায়, সরকার কি তার অনুমতি দেবে? এটা সত্য, ইসির এ ক্ষেত্রে করার কিছু নেই। এটা সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তবে ইসি বলতে পারে তফসিল ঘোষণার আগে কোনো বড় সমাবেশ নয় এবং কোনো নির্বাচনী জনসভাও নয়।

তৃতীয়ত, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দরকার আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই। আমরা খুব অতীতমুখী। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি বেশি। দোষারোপের রাজনীতির বৃত্ত থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের প্রায় ১৭ মাস আগে নির্বাচন কমিশন কি কোনো উদ্যোগ নিতে পারে? এমন কোনো ‘মেকানিজম’ কি ইসি বের করতে পারে, যেখানে দলগুলো এখন থেকে বিদ্বেষমূলক কোনো কথাবার্তা বলবে না! রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে সিইসি বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন। এতে কতটুকু ফল তিনি পাবেন, তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এ ধরনের একটি উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন। বলা ভালো, ইসির সাত দফায় এসংক্রান্ত কিছু নেই। চতুর্থত, নির্বাচনে ‘সিল মারা সংস্কৃতি’, ‘ভোটকেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি’ কিংবা ‘বিরোধী দলের প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দেওয়া’—এই যে প্রবণতা বিগত দশম সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন কিংবা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি, এই প্রবণতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে ইসির করণীয় কী? ইসি এ ক্ষেত্রে বেশ কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমন—ক. স্থানীয়ভাবে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে ইসি একটি ‘পর্যবেক্ষক টিম’ গঠন করতে পারে, যাঁদের কাজ হবে নির্বাচন কেন্দ্রগুলো মনিটর করা এবং সরাসরি কেন্দ্রে রিপোর্ট করা; খ. মিডিয়ার মাধ্যমে যেখান থেকেই জাল ভোট ও ভোটকেন্দ্র দখলের খবর আসবে, সেখানে ওই কেন্দ্র নয়, বরং পুরো নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা; গ. মনোনয়নপত্র একই সঙ্গে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ে গ্রহণ করা। এতে প্রার্থীর পক্ষে একাধিক জায়গায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার খবর এলে, ওই এলাকার নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতে হবে।
পঞ্চমত, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনী কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। ষষ্ঠত, নির্বাচনে ভোট গণনায় যদি প্রার্থীরা সমানসংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারির পরিবর্তে আবার নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশের নিচে ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করা যাবে না। সেখানেও আবার নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের নিয়ম আছে। সপ্তমত, সংসদ সদস্যের যোগ্যতার প্রশ্নে ন্যূনতম যোগ্যতা ‘গ্র্যাজুয়েশন’ হওয়া উচিত। দেশে উচ্চশিক্ষার হার বেড়েছে। যাঁরা দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন তাঁরা যদি শিক্ষিত না হন, তাহলে সঠিক ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করবেন কিভাবে? এতে সংসদ সদস্যরা বেশি মাত্রায় আমলানির্ভর হয়ে যাবেন। আমলারা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটাবেন। অষ্টমত, সুবিধাবাদী ও ধান্দাবাজ ঊর্ধ্বতন আমলা, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তারা অবসরের তিন বছর পর নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এটা একটা দুর্বল আইন। এটা পরিবর্তন করে ন্যূনতম পাঁচ বছর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ একজন আমলা ৫৯ বছর বয়সে অবসরে যাবেন এবং ৬৫ বছর বয়সে তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে শর্ত থাকবে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ওই সংসদীয় এলাকায় দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে—এটা না হলে দেখা যাবে সুযোগসন্ধানী আমলারা সচিবালয়ে থাকাকালে মন্ত্রণালয়ের প্রভাব খাটিয়ে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এতে পরোক্ষভাবে তিনি সরকারকে ব্যবহার করছেন। পাঁচ বছরের একটি গ্যাপ থাকলে এই কাজ করতে তিনি অপারগ হবেন।
এখন সময় এসেছে নির্বাচন কমিশনকে এটা প্রমাণ করতে যে তারা সত্যি সত্যিই ‘স্বাধীন’। বেশ কয়েকজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার, একাধিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থেই তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। না হলে যে ‘বিতর্ক’ নিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন তার যাত্রা শুরু করেছিল, সেই ‘বিতর্ক’ আরো বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী গত ২৬ জুলাই ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। আমাদের সংবিধানের ১১৮(৪) ধারায়ও স্পষ্ট করে বলা আছে যে ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে স্বাধীন’ এবং সংবিধানের ১২৬-এ বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য’। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের কথাবার্তা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। নির্বাচন কমিশন কখনোই স্বাধীন না এবং নির্বাহী কর্তৃপক্ষ কখনোই নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করে না! বরং স্থানীয় পর্যায়ের যেসব কর্মকর্তা থাকেন (ডিসি, টিএনও ইত্যাদি), তাঁরা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অর্থাৎ এস্টাবলিশমেন্ট মন্ত্রণালয়ের কথা শোনেন। কাগজে-কলমে আছে ওই তিন মাস তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কথা শুনবেন; কিন্তু তাঁরা তা শোনেন না! তাহলে এখন ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? বর্তমান সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখেই ২০১৯ সালের জানুয়ারির তিন মাস আগেই নির্বাচনটি হবে (একাদশ সংসদ নির্বাচন)। প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে যা করতে পারেন (২০১৪ সালেও তিনি তা করেছিলেন), তা হলো বিএনপিকে অন্তর্ভুক্ত করেই একটি মন্ত্রিসভা গঠন, যদিও কাজটি সহজ নয়। কেননা বিএনপি সংসদে নেই। নির্বাচনপূর্ব তিন মাস সময়ের জন্য যে মন্ত্রিসভা—এটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। বিএনপি বলছে একটি সহায়ক সরকারের কথা। আর আওয়ামী লীগ বলছে শেখ হাসিনাই সহায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেবেন। ওই সরকার রুটিন কাজ করবে। আর মূল প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকবে নির্বাচন কমিশন—এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। নির্বাচন কমিশনকে তার ওপর সাংবিধানিকভাবে প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে আমরা ‘খাদের কিনারে’ নিয়ে গেছি। একটি ‘ধাক্কা’ দিলেই গভীর খাদে পড়ে যাবে! আমরা সে রকম একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচন এ ধরনের একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও (ষষ্ঠ সংসদ) কিন্তু সে রকম একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেই ‘পরিস্থিতি’ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম। সপ্তম (১৯৯৬), অষ্টম (২০০১) কিংবা নবম (২০০৮) জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল এবং ‘সকল দলের অংশগ্রহণ’ সেখানে নিশ্চিত হয়েছিল। যুক্তি হিসেবে এটা বলা হয় যে বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে (৫ জানুয়ারি) অংশ না নেওয়ায় নির্বাচন কমিশনের করার কিছুই ছিল না। সাবেক সিইসি তাঁর শেষ সংবাদ সম্মেলনে এমন কথাই বলেছিলেন। এ নিয়ে গত সাড়ে তিন বছরে অনেক কথাই হয়েছে। অনেক বিতর্ক হয়েছে। জাতিও অনেকটা দ্বিধাবিভক্ত। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথাটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এটাও সত্য গণতন্ত্রের স্বার্থে, গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে ন্যূনতম ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘ঐক্য’ প্রয়োজন। সেই ‘ঐক্য’ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই তেমন একটি পরিস্থিতি আবার সৃষ্টি হোক, আমরা কেউ তা চাই না। সংগত কারণেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাটি অনেক বড় ও ব্যাপক।
নির্বাচন কমিশন আজ আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কে আমার ধারণা এর আগেও আমি প্রকাশ করেছি। এ কলামেও তার প্রতিফলন ঘটল কিছু কিছু। এ ক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস, সুধীসমাজ নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এখানে বড়। তারাই মূল ‘স্টেকহোল্ডার’। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে, গ্রহণযোগ্য করতে এবং ‘সকল দলের অংশগ্রহণ’কে নিশ্চিত করতে সুধীসমাজের ভূমিকার চেয়েও তাদের ভূমিকাকে ইসি বেশি গুরুত্ব দেবে—এটাই আমার প্রত্যাশা। বিএনপি ইসির সংলাপে যাবে। তবে তাদের উত্থাপিত দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে ইসির কোনো ‘ভূমিকা’ আছে বলে আমার মনে হয় না। ‘সহায়ক সরকার’ গঠনের ব্যাপারেও ইসির কিছু করণীয় নেই। তবে আজকের ‘নির্বাচনী সংলাপ’-এর ব্যাপারে ইসি যা করতে পারে—১. সুধীসমাজের প্রতিটি বক্তব্য কমিশন লিপিবদ্ধ করবে, বিবেচনায় নেবে এবং আইনের আওতায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে; ২. কমিশন কোনো বক্তব্য দেবে না এবং সুধীসমাজের কোনো বক্তব্য খণ্ডনও করবে না; ৩. সিইসি ও সদস্যরা যত কম কথা বলবেন, যত কম মিডিয়ায় আসবেন তত তাঁদের জন্য মঙ্গল। নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তা বড় ভূমিকা রাখবে। একটি ‘কঠিন সময়ে’ সিইসি ও কমিশনাররা দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার তাঁদের সবার দায়িত্ব অনেক বেশি। আমরা শুধু তাঁদের শুভকামনা করতে পারি।
Daily kaler Kontho
31.07.2017