রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক


ভারতের কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও এটা কোন রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। সোনিয়া গান্ধী ভারতে ইউপিএ সরকারের মূল ব্যক্তি হলেও, তিনি সরকারে নেই। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না পর্দার অন্তরালে তিনিই সরকার চালান। সাধারণত তিনি খুব একটা বিদেশ সফর করেন না। নীতি নির্ধারণী ভাষণও দেন না। এ কারণেই বাংলাদেশে অটিজম সম্মেলনে যোগদান, এই সম্মেলনের গুরুত্বই শুধু বাড়িয়ে দেয়নি, বাংলাদেশ তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তাও উল্লেখ করার মত। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতার সম্মাননা দিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী তা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সম্মাননাও সোনিয়া গান্ধীর সফর দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। একাত্তুরের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ইন্দিরা গান্ধী নিজে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন। দেরীতে হলেও, এ জাতি তার অবদানকে স্মরণ করলো। এখন দেখতে হবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, তার সমাধানের ব্যাপারে ভারত কী উদ্যোগ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে একাধিক ভারতীয় ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ৮ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণর ঢাকা সফরের পর এলেন সোনিয়া গান্ধী। ২৯ জুলাই আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম। আগস্ট মাসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসছেন। আর ৬ সেপ্টেম্বর আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর (জানুয়ারি ২০১০) ভারতের ভিআইপিদের একের পর এক বাংলাদেশ সফর দু’ দেশের সম্পর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাজমান সমস্যার সমাধানে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং সমস্যা যা ছিল, তাই রয়ে গেছে। গত ১৬ মে ছিল ফারাক্কা দিবস। পানির ন্যায্য হিস্যা ও ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন প্রয়াত মাওলানা ভাসানী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত (১৯৯৬) ক্ষমতায় এসেই নয়াদিল্লী ছুটে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (ডিসেম্বর ১৯৯৬)। কিন্তু যতটুকু পানি আমাদের পাবার কথা, পানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনদিনই আমরা সেই পরিমাণ পানি পাইনি। অথচ সেই চুক্তি নিয়ে অনেক ‘পজিটিভ’ কথা বলা হচ্ছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও কোন খবর নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা গেল বছর টিপাইমুখ গিয়েছিলেন। হেলিকপ্টারে ঘুরলেন। জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে বারে বারে আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। ভারতের উচ্চমহল থেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা বা নেপাল ও ভুটান এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভী ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভী ট্রাক যাবে কোন ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুনতে থাকবো সুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুত্ আসবে ভারত থেকে। কৈ সেই বিদ্যুত্? ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা ভারতে থাকলেও, তা নানা ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। জানা গেছে, আগামী ৩ বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরো ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। অথচ ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাবার কথা (দিনকাল, ১৭মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাবার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মত নেতারা কোনদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতৃবৃন্দ বার বার ভারতীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। বলতে দ্বিধা নেই শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ মূলত ভারতীয় দ্বি-পাক্ষিক নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা নেপালে অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলংকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই সৃষ্টি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য দূরীকরণে তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বন্ধুশূন্য’ হতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জী, প্রণব মুর্খাজী-এরা সবাই মূলত এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা ম্লান হয়ে গেছে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মনোভাবের কারণে। ফেলানি যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানিরা, তখন ভারতের ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কীভাবে দেখে, ফেলানির ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জী যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন,তখন আমাদের উত্সাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও,এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তত্কালীন ভারতীয় সরকারের সাথে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করছিল, তখন মমতা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন।  মমতা হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে মোস্ট আনপ্রেডেকটিবল পারসন, যার উপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোন সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে তার আঁঁতাত কতদিন স্থায়ী হয়, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জীর কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী তিনি মনমোহন সিং-এর সাথে ঢাকায় আসছেন। কেননা তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ একটি ফ্যাক্টর। তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা হয়েছে সচিব পর্যায়ের বৈঠকে। যদিও আমরা জানি না বাংলাদেশের স্বার্থ তাতে রক্ষিত হবে কী-না। মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। আমরা চাই না গঙ্গার পানি চুক্তির মত তিস্তার পানি চুক্তিটিও বিতর্কিত হোক। সিটমহল ও সীমান্ত চিহ্নিতকরণও জরুরি। গত ৪০ বছরে সিটমহল ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধ করা প্রয়োজন। এটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। দায়িত্বটা ভারতের। কেননা আজ অব্দি একজন ভারতীয়কেও হত্যা করেনি বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনী। পৃথিবীর কোন সীমান্তেই এভাবে মানুষ মারা হয় না। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়েও কথা বলা উচিত। এখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নেই। সোনিয়া গান্ধীর সফরের সময় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নিয়ে দু’দেশ এক সাথে কাজ করতে পারে বলে তিনি অভিমত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সন্ত্রাস আজ গোটা দক্ষিণ এশিয়ারই সমস্যা। সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তান আজ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম। আর আফগানিস্তানে সন্ত্রাস তো নিত্যদিনের ঘটনা। সুতরাং সন্ত্রাস দমনে দ্বি-পাক্ষিক নয়,বরং প্রয়োজন বহু পাক্ষিক সহযোগিতা। বহু পাক্ষিক যোগাযোগের আলোকে আমরা যদি ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি করতে পারি, তাহলে বহু পাক্ষিকতার আলোকে পানি বন্টন ও এর ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল ও ভুটান চুক্তি হতে পারে। চুক্তি হতে পারে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আসছেন। সমস্যাগুলো আমরা জানি। এগুলো নিয়ে সেমিনারে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। এখন চাই বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও ভারতের আন্তরিকতা। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। চারটি নব্য উন্নত দেশ (‘ব্রিক’) এর একটি ভারত। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আঞ্চলিক পরিসরে বড় ভূমিকা পালন করুক। ভারতকে এ ভূমিকা পালন করতে হলে তাকে আন্তরিক হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সোনিয়া গান্ধীর সফরের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষেত্র তৈরি হল। এখন দেখার পালা, সম্পর্ক আরো উন্নত করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটুকু রূপ পায়।

দৈনিক ইত্তেফাক  

শনি, ৩০ জুলাই ২০১১, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৮
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়]
tsrahmanbd @ yahoo.com

যে সিদ্ধান্তকে সবার স্বাগত জানানো উচিত

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে এখন থেকে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে। একটি বয়সসীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৪৭৫তম সিন্ডিকেটে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত সাধারণ সভায় শিক্ষকদের পদোন্নতি ও শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিল। এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আমি মনে করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আজ যে সিদ্ধান্তটি দিল, তা দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসরণ করা উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায় প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে ঠিক তেমনি প্রশ্ন উঠেছে এদের পাঠদানের ক্ষমতা নিয়ে। এ দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে! অনেক ক্ষেত্রেই পদ সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কোন অনুমতি ছিল না। মঞ্জুরি কমিশনের আইন অনুযায়ী কমিশনের অনুমতি ছাড়া শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা যায় না এবং সেই পদে শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া যায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ মঞ্জুরি কমিশনের এ আইনের প্রতি থোড়াইকেয়ার করেছে। এ নিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকদের একটা অংশ সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি তার একাধিক বক্তৃতায় শিক্ষার গুণগতমানের কথা বলেছেন। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয় তা হচ্ছে ‘দলীয় বিবেচনায়’ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব কিনা? অনেকেই স্বীকার করবেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাকরির ক্ষেত্র হতে পারে না। এখানে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত যোগ্যতার বলেই। আর যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন পূর্ণকালীন সদস্য থাকার সুবাদে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেই আলোকেই আমি একটা সুপারিশ রাখতে চাই। আর তা হচ্ছে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তিন স্টেজে। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং উপস্থাপনা। বলা ভালো, কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এতে সুবিধা হল : ১. কোন দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকে না; ২. এতে বিতর্ক কম হয়। কেননা মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকারীও ওই তিনটি স্টেজ অতিক্রম করে যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন; ৩. এ ধরনের নির্বাচনে ‘ব্যক্তির’ কোন ভূমিকা থাকে না। আমি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য থাকাকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার নিয়ম চালু করেছিলাম (সেই নিয়ম বোধকরি এখন আর অনুসরণ করা হয় না)।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা একাধিক। শিক্ষকদের নিয়োগে ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একক কোন নিয়মনীতি নেই। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক নিয়ম। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতির নীতিমালা এক নয়। এমনকি শিক্ষক নিয়োগ কমিটির গঠন কাঠামোও এক নয়। ফলে এটা শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায় না, বরং নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। এজন্য একটি একক নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একক নীতিমালা না থাকার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের বৈষম্যও তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন এখন শুধু ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর (ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম)। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ওই আইনেরও লঙ্ঘন হচ্ছে (যেমন সিনেট কর্তৃক ভিসি প্যানেল নির্বাচন, সিনেট নির্বাচন না হওয়া ইত্যাদি)। আমরা মঞ্জুরি কমিশনে থাকাকালীন একটি অভিন্ন আইন তৈরি করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বর্তমান মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অত্যন্ত ‘ডায়নামিক’ ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ও রয়েছে। যতদূর জানি, তিনি এখন অবধি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেননি। তিনি চাইলে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিপূর্বে প্রণীত অভিন্ন নীতিমালাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। সেখানে শিক্ষক নিয়োগের তিন স্তরের প্রক্রিয়াটি নেই। এটা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আরও তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে আমি মনে করি। এক. পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে ন্যূনতম এক বছর বিভাগে একজন সিনিয়র শিক্ষকের অধীনে থেকে (টিচিং অ্যাসিসটেন্ট) অভিজ্ঞতা অর্জন করা। দুই. ‘ভিজিটিং প্রফেসর’ হিসেবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনিয়র শিক্ষকদের পাঠদান ও গবেষণার সুযোগ দেয়া। আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, যেখানে শুধু প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের দিয়ে বিভাগটি পরিচালিত হচ্ছে। এটা ভালো নয়। এতে শিক্ষার মানের কোন উন্নতি ঘটবে না। তিন. শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি থাকতে হবে মঞ্জুরি কমিশনের হাতে। প্রয়োজনে একটি পিএসসি ধরনের কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। যাদের কাজ হবে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এ কমিশনের হাতে সরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটিও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে, যা কিনা এখন পিএসসি সম্পন্ন করছে। এতে করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। নামটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার জন্য আরেকটি কাঠামো দরকার। বর্তমানে মাত্র একজন সদস্য প্রায় ৫৪টি (আরও আসছে প্রায় ২০টি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করেন। এটা অসম্ভব ব্যাপার। সঙ্গত কারণেই তাই ইউজিসির মডেলে আরেকটি কমিশন গঠন করা যুক্তিযুক্ত। সেই সঙ্গে ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ গঠন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ধারণ করে রেটিং প্রদান করবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কোন ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ নেই। এ কাউন্সিল গঠনের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। কিন্তু এর কোন বাস্তবায়ন নেই। বর্তমান ইউজিসির চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তার দুয়ারকে খুলে দিয়েছে। শিক্ষক সমিতির বিরোধিতা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আমার বিশ্বাস শিক্ষক সমিতি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করতে পারবেন যে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা না হলে উচ্চশিক্ষার মানের কোন উন্নয়ন সম্ভব নয়। তরুণ শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণটা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি তাদের বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। এক্ষেত্রে সরকার তথা বিশ্বব্যাংকের কাছে অর্থ সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তরুণ শিক্ষকরা আমাদের সম্পদ। সিনিয়র শিক্ষকরা শিক্ষকতা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আগামী পাঁচ-সাত বছরে আরও অনেক গুণী শিক্ষক অবসরে যাবেন। কিন্তু যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণ শিক্ষকদের আমরা দেখছি না, যারা জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। সুতরাং তরুণ শিক্ষকদের সরকারি খরচে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তটি বিবেচনায় নিয়ে ইউজিসি যদি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে, আমার বিশ্বাস শিক্ষার মান উন্নয়নে তা বড় ধরনের সাহায্য করবে।

পুনশ্চ গত ২৮ মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পর্ষদের ১২৫তম সভায় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, সমাজকল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তটি যুগান্তরকারী। দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেয়ায় উপাচার্যকে ধন্যবাদ জানাই। ইতিমধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্যের আমলে ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চালু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য
www.tsrahmambd.blogspotcom
[সূত্রঃ যুগান্তর, ২৭/০৭/১১]

মনমোহন আসছেন আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ইতোমধ্যে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর (জানুয়ারি-২০১০) ফিরতি সফরে আসছেন মনমোহন সিং। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সফরটি যে গুরুত্বপূর্ণ তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। শুধু বাংলাদেশি পর্যবেক্ষকরাই নন, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিশ্লেষকরা লক্ষ্য রাখবেন এই সফরের দিকে। সাম্প্রতিক সময় দুদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা দুদেশের রাজধানী সফর করেছেন। এক্ষেত্রে ভারত এগিয়ে আছে একটু বেশি। ইতোমধ্যে ঢাকা সফর করে গেলেন সোনিয়া গান্ধী। ২৯ জুলাই এসে গেলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। আগস্ট মাসে আসছেন ভারতের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোনিয়া গান্ধীর সফরের আগে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। কৃষ্ণার সফরের সময় দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একটি বিনিয়োগ সংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি ভুটানের যানবাহন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ সংক্রান্ত। সোনিয়া গান্ধীর সফর কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। কিন্তু তার এই সফরের গুরুত্ব আনেক বেশি। কেননা তিনি কংগ্রেসের সভাপতি। ২০০৪ সালেই তিনি ইচ্ছা করলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু জাতির 'বৃহত্তর স্বার্থে' মনমোহন সিংকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সরকার ও মনমোহন সিংয়ের ওপর তার প্রভাব যথেষ্ট। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি যে ওয়াকিবহাল নন, তা বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার আলাপচারিতায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেই আমরা ধরে নিতে পারি। তাই ধরে নিতে পারি তিনি ওই বিষয়গুলো নিয়ে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কী? বলা হচ্ছে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে বেশ কটি চুক্তি হবে। চুক্তি নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে? কৃষ্ণা ঢাকায় বলেছিলেন ভারতের একটি রোল মডেলের কথা। এই 'রোল মডেল' কি শুধু ভারতের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য? আমরা ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমাদের একটি সমস্যারও তো সমাধান হলো না। সীমান্তহাট চালু হয়েছে গত ২৩ জুলাই। এই সীমান্তহাট কি বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারবে? এটা কি লোক দেখানো না?
এই উদ্যোগ কি আমাদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে না?
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বড় দেশ। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী ভারতের। নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর দিক থেকে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ ও অষ্টম। আয়তনের দিক থেকে ভারত বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ দেশ। শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদনের দিক থেকে ভারতের অবস্থান দশম। আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। মাথাপিছু আয় গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলার। সুতরাং বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত তো একটা ভূমিকা রাখতেই পারে। আমরাও তা চাই। কিন্তু সেই ভূমিকাটি যদি হয় একতরফা, তখন তো প্রশ্ন উঠবেই। ভারত ১ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। ঢাকায় চুক্তিও স্বাক্ষরিত হলো। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই ঋণ আটকে আছে। যেসব শর্তে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে, তা নিয়েও কথা আছে। সেইসব শর্ত, ঋণের সুদ বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। তাহলে এটা কি 'রোল মডেল?' বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমস্যা একাধিক, আর একটিরও সমাধান হয়নি। অথচ বারবার বলা হচ্ছে সমাধান হবে। সীমান্তে বাংলাদেশি গুলি করে হত্যা করা বন্ধ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় গত ২৬ মাসে ১৩৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের কথা দিয়েছিলেন সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে। গঙ্গার পানি বণ্টনের চুক্তি আমরা করেছিলাম ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে (হাসিনা-দেবগৌড়া চুক্তি)। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা পাইনি কোনোদিন। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তির কথা বলা হলেও, চুক্তি হয়নি (এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি হবে)। বাংলাদেশ-ভারত ৬.৫ কিলোমিটার সীমানা আজো চিহ্নিত হয়নি। বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আমরা আজো ফেরত পাইনি। বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে। এই ভারসাম্য কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। বাংলাদেশের খাদ্য সঙ্কটের সময় ভারত বাংলাদেশকে চাল বিক্রি করার চুক্তি করলেও, সেই চাল ভারত বিক্রি করেনি। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার খর্ব করে ভারত আমাদের কয়েকটি অনুসন্ধানী বস্নকের ওপর তাদের অধিকার দাবি করেছে। দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের এলাকা হলেও ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী এটা দখল করে নিয়েছিল। সেই থেকে এটা তাদের দখলে। তিনবিঘার পরিবর্তে আমরা বেরুবাড়ী দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ তিনবিঘা 'লিজ' হিসেবে পেয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনবিঘার ওপর দিয়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা ঝুলে আছে। তাহলে এটা 'রোল মডেল' হলো কীভাবে? ভারত তো তার নিজের স্বার্থ দেখছে। ভারত তার পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে। নেপালের ৪টি নদীতে (কর্ণালী, পঞ্চেস্বর, সপ্তকোসি, বুড়িগন্ধকী) ও ভুটানের মানোস ও সাংকোশ নদীতে বহুমুখী ড্যাম নির্মাণ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ১২ লাখ একর জমির সেচ সমস্যার সমাধান করেছে। নেপালে রিজার্ভারে পানি ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু এ জন্য দরকার ত্রিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) উদ্যোগ। যোগাযোগের আপেক্ষিকতার কথা ভারত বললেও (বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন এ কথা), জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে কোনো আপেক্ষীয়, নিদেনপক্ষে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। ভারতের 'নেগেটিভ লিস্ট'-এর কারণে বাংলাদেশি পণ্যের কোনো বাজার নেই ভারতে। এর ব্যাখ্যা আমরা কীভাবে করব? কৃষ্ণ যে 'রোল-মডেলের' কথা বলে গেলেন, এটা কি তাহলে? 'রোল-মডেল' মানেই কি ভারতীয় স্বার্থ?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা ইদানীং নতুন একটি ধারণা বা ঈড়হপবঢ়ঃ এর কথা শুনছেন। এটি ্তুতড়হব ড়ভ চৎরারষবমবফ রহঃবৎবংঃ্থ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ তার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে (বিশেষ করে বেলারুস) সম্পর্কের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই তত্ত্বের কথা বলেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে সীমান্তবর্তী দেশের ওপর তার এক ধরনের স্বার্থ ও অধিকার রয়েছে। এক সময় বেলারুশ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে স্বাধীন। বেলারুশ তার জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার কারণে রাশিয়া ও বেলারুশ একটি টহরড়হ ঝঃধঃব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পূর্ণ একত্রীকরণের পথে এটা একধাপ। বেলারুশে রাশিয়ার মুদ্রা রুবল চালুরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে রাশিয়া তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ঈড়ষষবপঃরাব ঝবপঁৎরঃু ড়ৎমধহরুধঃরড়হ গঠন করেছে, যা মূলত একটি সামরিক জোট। একটি বড় দেশের পাশে একটি ছোট দেশ থাকলে ওই বড় দেশটি ছোট দেশটির ওপর প্রভাব খাটায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনাম-লাওসের বড় প্রমাণ। নিজেদের স্বার্থ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল (১৯৭৮), ভিয়েতনাম দখল করে নিয়েছিল কম্বোডিয়া (১৯৭৮)। দখলদাররা পুতুল সরকারও গঠন করে। ইতিহাসে বারবাক কারমাল (আফগানিস্তান) কিংবা হেং সামারিনের (কম্বোডিয়া) নাম এভাবেই উচ্চারিত হয়। পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস না হয় নাই বা উল্লেখ করলাম। বাংলাদেশের অবস্থান তখন ভারতের ্তুতড়হব ড়ভ ঢ়ৎরারষবমবফ রহঃবৎবংঃ্থ-এর অন্তর্ভুক্ত। যারা ভারতের বৈদেশিক নীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত এক সময় 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন' ও গুজরাল ডকট্রিন-এর কথা বলেছিল। 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন'-এ বলা হয়েছিল ভারত এ অঞ্চলে অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির 'নাক গলানো' পছন্দ করবে না। এ ডকট্রিন বা মতবাদে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তাকে এক করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে গুজরাল ডকট্রিন-এ বলা হয়ছে ভারতের সাতবোন রাজ্যের (আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল) উন্নয়নে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে আমরা এই গুজরাল ডকট্রিন এখন বাস্তবায়ন করছি। গুজরাল ডকট্রিন হচ্ছে ইন্ডিয়া ডকট্রিন-এর সম্প্রসারিত পরিবর্তিত রূপ।
কৃষ্ণা চলে গেলেন। এরপর গেলেন সোনিয়া গান্ধী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরণ এবং সেপ্টেম্বরে আসছেন মনমোহন সিং। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়। আমরা বারবার বলে আসছি আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের অনেক কিছু আছে বিশ্বকে দেয়ার। যে রোল মডেলের কথা কৃষ্ণা বলেছেন, তা হতে পারে যদি ভারত তার সহযোগিতার হাত আরো সম্প্রসারিত করে।
আমরা সব সমস্যার সমাধান চাই তিস্তার পানি বণ্টন থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ পর্যন্ত। লোক দেখানো চুক্তি আমরা চাই না। মনমোহন সিং অনেক অভিজ্ঞ লোক। তার আগের বক্তব্যে অনেক মানুষ অখুশি হয়েছে। সেই বক্তব্য থেকে তিনি সরে এসেছেন বলেই মনে হয়। এখন এ দেশের মানুষ আরো খুশি হবে, যদি তিনি সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসে একাধিক চুক্তি করে বিরাজমান সমস্যাগুলোর একটা সমাধান দিয়ে যান। আমরা অবশ্যই লোক দেখানো কোনো চুক্তি চাইবো না। কিন্তু যেটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে চুক্তির আগে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? তিস্তার চুক্তি নিয়ে জাতিকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। আমরা জানি না ওই চুক্তিতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে। গঙ্গার পানি চুক্তি করে আমরা পানি পাইনি। এখন তিস্তার পানি চুক্তি করে যদি পানি না পাই, তাহলে তা হবে দুঃখজনক। ট্রানজিট চুক্তির বিষদ বিবরণ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। তিস্তার চুক্তি বিবরণ কী, তাও আমরা জানি না। সংসদেও উপস্থাপিত হয়নি। তবে নয়াদিলি্লতে দুদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রীরা এ ব্যাপারে নূ্যনতম ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। যদি চুক্তি করে ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হয়, তাহলে সরকারের ভাবমূর্তির জন্য তা ভালো নয়। আমরা সমমর্যাদা চাই। মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হোক-আমরা এটা দেখতে চাই।
দৈনিক যায় যায় দিন, শুক্রবার ২৯ জুলাই ২০১১ ১৪ শ্রাবণ১৪১৮ ২৬ শাবান ১৪৩২
ড. তারেক শামসুর রেহমান অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাতিকে উদ্ধারের দায়িত্ব

শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র শেখায় সহনশীলতা। গণতন্ত্র শেখায় পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। একদলীয় সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের স্পিরিটের পরিপন্থী। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি এ পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে আমরা গণতন্ত্রের সুফলকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে পারিনি। সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। গত ১২ জুলাই হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, 'দয়া করে জাতিকে উদ্ধার করুন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতি উদ্বিগ্ন। এই সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়। মুক্তি দিন।' বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের জামিন আবেদনের সময় হাইকোর্ট এ মন্তব্যটি করলেন। বিচারপতি নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ আনোয়ারুল হককে নিয়ে ওই বেঞ্চটি গঠিত। বিচারপতিদের এ মন্তব্যই বলে দেয় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন। একদিকে সরকারের কঠোর মনোভাব ও অন্যদিকে বিরোধী দলের সরকার পতনের আন্দোলন দেশকে এক কঠিন সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যে 'কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস' বা আস্থার রাজনীতির কথা বলে, তা বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নেই। সরকার ও বিরোধী দল এখন পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা আমাদের ২০০৬ সালের অক্টোবরের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় মাত্র।
মাননীয় বিচারপতিদ্বয়ের এ মন্তব্যটিকে আমি বেশি করে গুরুত্ব দিতে চাই। এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সরকার। রোজা শুরু হওয়ার এখনও কিছুদিন বাকি। কিন্তু প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী। তেল, চাল, চিনি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। কাঁচাবাজার এখন রীতিমতো আতঙ্ক। ৪০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না কোনো শাকসবজি। অথচ এ জায়গাটিতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থতা সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশের সংবিধান, ভবিষ্যৎ নির্বাচন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল যখন নূ্যনতম ঐকমত্যে পেঁৗছতে পারছে না, তখন দেশের অর্থনীতির যে চিত্র আমরা পাই, তা কোনো আশার কথা বলে না। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারের ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ১১৮ দশমিক ৩৬ ভাগ ও ১৪৬ দশমিক ১৫ ভাগ। ২০১০-১১ অর্থবছরের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। সার ও ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ায় এমডিজির বাস্তবায়ন (২০১৫ সালের মধ্যে) এখন প্রশ্নের মুখে। রেমিট্যান্স আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা শ্লথ হয়েছে। গত অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরে (২০০৯-১০) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি। বিদেশে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও সমস্যা রয়ে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬৩০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, (৫ জুলাই) ২০০৪ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, এখনও সে পরিমাণ বিদ্যুৎই উৎপাদন হচ্ছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি কোনো আশার কথা বলে না। এর মাঝে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। পুলিশের পিটুনিতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি এখন নিউইয়র্কে। জয়নাল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে পুলিশের কী লাভ হয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু এতে সরকারের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। পুলিশ অত্যাচারের ওই ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বে, যা পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুলিশের এই 'অতি বাড়াবাড়ি'র সমালোচনা না করে সমর্থন করলেন। অতীতেও পুলিশ প্রায় একই ধরনের 'কাণ্ড' করেছে। পুলিশের জন্য একটি 'কোর্ড অব কনডাক্ট' প্রণয়ন করা বোধহয় জরুরি হয়ে পড়েছে। মিডিয়ায় দুই পুলিশ অফিসার 'অভিযুক্ত' হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে না কোনো অবস্থাতেই। এই যখন পরিস্থিতি, তখন যে প্রশ্নটি জরুরি_ তা হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। দেশের সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে একটা আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকগুলো ইস্যুতে (রাষ্ট্রধর্ম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মৌলিক কাঠামো) খোদ মহাজোটের শরিকদের মাঝেও বিভক্তি রয়েছে। মহাজোটের শরিকরা (ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ) পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও প্রকারান্তরে তারা তাদের দ্বিমতের কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সেমিনারে। এদিকে ড. কামাল হোসেন বলেছেন সংবিধানে ১৬তম সংশোধনী আনার। সব মিলিয়ে সমঝোতা কী ভাবে সম্ভব তা এক বড় প্রশ্ন এখন। সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পরও সরকার বিরোধী দলকে সংসদে এসে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিরোধী দলের উচিত, সরকারের এই বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতায় নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা। এতে করে অন্তত সংসদে একটি রেকর্ড থাকল। সরকার যদি তাদের প্রস্তাব নাও মানে, বিরোধী দলের প্রস্তাবাবলি বিবেচনায় নিয়ে একটি আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। যেহেতু সংসদ কার্যকর, সেহেতু সংসদে এসে প্রস্তাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির ধারাকে আমরা আরও শক্তিশালী করতে পারি।
যে জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল, সেই জনপ্রিয়তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর তাৎপর্য যতটা না বেশি, তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা। বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন তারা বোঝেন না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ল কি কমল, এতে তাদের কিছু যায় আসে না। টাকার মান কমে গেলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে, এটাও তারা বোঝেন না। তারা চান জিনিসের দাম কম থাকুক। চালের দাম কমে যাক। কমুক তেলের দাম। সরকার যদি এদিকে দৃষ্টি দিত, বোধকরি এটা সরকারের জন্য ভালো হতো। মানুষের তো সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনেক। ওএমএসের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এদিকে দৃষ্টি দেন কি-না জানি না। দেশে কতসংখ্যক লোক দরিদ্রতার নিচে বসবাস করে, এর একটা পরিসংখ্যান আছে। এর জন্য কিছু লোকও রয়েছেন, যারা এসব পরিসংখ্যান তৈরি করে দেন। কিন্তু কেউ কি জানেন 'ছদ্মবেশী দরিদ্রের' সংখ্যা বাংলাদেশে কত? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশ দরিদ্রতার নিচে চলে গেছে। সীমিত আয়ে তাদের আর সংসার চলে না, চালানো যায় না। ওদের নিয়ে কেউ ভাবে না।
শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র শেখায় সহনশীলতা। গণতন্ত্র শেখায় পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। একদলীয় সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের স্পিরিটের পরিপন্থী। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি এ পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে আমরা গণতন্ত্রের সুফলকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে পারিনি। উচ্চ আদালত যে মন্তব্যটি করেছেন তা যদি আমরা বিবেচনায় নিই তাহলে তা আমাদের সবার জন্যই মঙ্গল।
দৈনিক সমকাল, বৃহস্পতিবার | ২৮ জুলাই ২০১১ | ১৩ শ্রাবণ ১৪১৮ | ২৫ শাবান ১৪৩২
প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মাত্রা

সোনিয়া গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের মধ্যে দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। সোনিয়া গান্ধী ভারত সরকারের কোনো পদে নেই। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি। তার বাংলাদেশ সফরও কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। অটিজম সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি চলেও গেছেন গত ২৫ জুলাই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হলেও, তার পরিচয় তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী নেহেরু পরিবারের সদস্য, সবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ, রাজীব গান্ধীর স্ত্রী ও 'ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী' রাহুল গান্ধীর মা। মূলত তার এসব পরিচয়ই তাকে শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বে আরো বেশি করে পরিচিত করেছে। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে 'বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা' পদক গ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্বরণীয় অবদানের স্বীকৃতিসরূপ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রায় দু'শ ভরি ওজনের স্বর্ণের তৈরি পদকটি দেয়া হয়। অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদানকে স্মরণ করলো। বাংলাদেশের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো অনেক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা জটিলতায় আটকে আছে। সোনিয়া গান্ধীর এই সফরের মধ্যে দিয়ে এ জটিলতা কতটুকু দূর হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে। কিন্তু এটা সত্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত (জানুয়ারি ২০১০) সফরের পর এই দুটি দেশের মাঝে সম্পর্ক নতুন একটি দিকে টার্ন নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নয়াদিলি্লতে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ইতিমধ্যে ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও এটা নির্ধারিত হয়নি 'ট্রানজিট ফি' আমরা কতটুকু নির্ধারণ করবো। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর ঢাকায় এসেছিলেন ভারত সরকারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি প্রণব মুখার্জি। ভারত যে ১০০ কোটি ডলারের সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল, সে ব্যাপারে একটি চুক্তি করতেই ঢাকায় এসেছিলেন প্রণব মুখার্জি। এরপর গত ৮ জুলাই ঢাকা সফর করে গেলেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। ২৯ জুলাই আসছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম। সেপ্টেম্বর মাসে আসছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। মাঝখানে ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরও ঢাকা সফর করার কথা। বলা হচ্ছে পি. চিদাম্বরমের ঢাকা সফরের সময় একটি 'বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্লান' সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। অতীতে কখনই এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করেননি। কৃষ্ণার সফরের প্রাক্কালেও বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা অব্যাহত ছিল। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিএসএফের হাতে ১৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। আর চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ২ জন বাংলাদেশি। আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো সংসদে স্বীকার করেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৬ মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরো ১৭০ জন (আমার দেশ, ৭ জুলাই)। কিশোরী ফেলানিকে পাখির মতো গুলি করে তার মৃতদেহ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশ্বের মানুষ এ ঘটনায় বিস্ময় ও হতবাক হলেও, ঢাকার সেগুনবাগিচায় কর্মরত কর্তাব্যক্তিদের টনক তাতে নড়েনি। তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে আমাদের পররাষ্ট্র-সচিব 'সাহস' পেলেন না প্রতিবাদ জানাতে। যদিও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আজ আমাদের দীপু মনির সঙ্গে বসে কৃষ্ণা বাবু যখন বললেন, 'সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশকে দায়িত্ব নিতে হবে, তখন আমাদের দীপু মনি 'সাহস' করে বলতে পারলেন না একজন ভারতীয় নাগরিককে কখনো হত্যা করেনি বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড। আমাদের দুঃখটা এখনেই_ আমাদের নেতা-নেত্রীরা সাহস করে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।
কৃষ্ণার সফরকালে দুটি চুক্তি হয়েছে। একটি যৌথ বিনিয়োগ সংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি ভুটানের যানবাহন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ সংক্রান্ত। এই দুটি চুক্তি থেকে আমাদের লাভ কতটুকু তা আগামী দিনই বলতে পারবো। তবে ভারতের ভূমি সংক্রান্ত চুক্তি আগেও হয়েছিল, কাজ হয়নি। আমাদের বলা হলো ভারতীয় ১০০ কোটি ঋণ সংক্রান্ত প্রকল্প চূড়ান্ত হবে মনমোহন সিংয়ের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরের সময়। বলা হলো তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও একটি চুক্তি হবে ওই সময়। ভারতীয় ঋণ চুক্তি নিয়ে যে জটিলতা, সিরিয়াস পাঠকরা এ সম্পর্কে মোটামুটি জানেন। তাই এ বিষয় আলোকপাত করলাম না। কিন্তু আমার শঙ্কা তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে। একটি চুক্তি হবে_ এটা আমার কথা। কিন্তু তাতে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কী? ইতিমধ্যে দুদেশের পানিসম্পদ সচিবরা একটি খসড়া চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু এর খুঁটিনাটি আমরা জানি না। এর জন্য আলোচনার পথও সরকার তৈরি করে দেয়নি। সংসদেও আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। আশঙ্কা করছি ফারাক্কা চুক্তির মতোই তিস্তা চুক্তি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে প্রথম যখন সরকার গঠন করে, তখন তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিলি্লতে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (১৯৯৬, ডিসেম্বর)। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা কোনো দিনই পাইনি। ওই চুক্তির আগে ১৯৯৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে পদ্মায় পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ যেখানে ছিল ৯.৪৫ মিটার, সেখানে ২০১১ সালের মে মাসে রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ মাত্র ৮.৯২ মিটার (আমার দেশ, ১৬ মে, ১১)। ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে একটা পর্যায়ে এসে পানি আরো কমে যাবে। ওই চুক্তি করে লাভবান হলো ভারত, আর আমরা আমাদের পানির হিস্যা হারালাম। এখন ভয় হচ্ছে তিস্তা নিয়েও এমন একটি চুক্তি হয় কী না। চুক্তি করলেই স্বার্থ রক্ষিত হয় না। ফারাক্কা চুক্তি এর বড় প্রমাণ।
শুধু তিস্তার চুক্তির কথা কেন বলি, ভারতের সঙ্গে আমাদের সমস্যা একাধিক। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষ্ণার সফরের সময় এর কোনোটি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। ট্রানজিট চুক্তির বিনিময়ে ইতিমধ্যে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরায় ওভার ডাইমেনশনাল (ওডিসি), পরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু ট্রানজিট ফি কত হবে, তা আজো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৬.৫ কিলোমিটার সীমানা আজো চিহ্নিত হয়নি। ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে, যার জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর। ওইসব ছিটমহল আজো বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়নি। তিনবিঘা করিডরের ওপর একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো কার্যকরী হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে। বাণিজ্য ভারসাম্য কমিয়ে আনতে ভারতের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা ধরনের ট্রারিফ ও প্যারাট্যারিফের কারণে সেই পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। কৃষ্ণার বাংলাদেশ সফরের সময় এসব বিষয় নিয়ে আদৌ আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা হয়নি। এখন মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় আমরা কী পাব, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছি না। কেননা কৃষ্ণার সফরের সময়ই মনমোহন সিংয়ের সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হয়েছে। মনমোহন আসবেন শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য।
আমরা বারবার বলে আসছি, আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের একজন ড. ইউনূস আছেন, যিনি বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। আমাদের সেনাবাহিনী বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। পোশাক শিল্পে আমাদের দক্ষতা আমরা প্রমাণ করেছি। তাই বাংলাদেশকে ছোট করে দেখা যাবে না। ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। এখন একটি সেমিনারে অংশ নিতে ঢাকা সফর করে গেলেন সোনিয়া গান্ধী। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। বেশ কিছুদিন আগে রাহুল গান্ধীও ঢাকা ঘুরে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ যে পারে, আমরা তো তা প্রমাণ করেছি। এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রমাণ দেখানোর পালা। সেপ্টেম্বর হতে আর খুব বাকি নেই। আমরা প্রত্যাশা করবো মনমোহন সিং ঢাকায় এসে আমাদের আশার কথা শোনাবেন। যে বক্তব্য রেখে তিনি বাংলাদেশকে 'ছোট' করেছিলেন, এখন তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে। সোনিয়া গান্ধী নিজেও দেখে গেলেন বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি নই। আমরা ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছি। সোনিয়া গান্ধী পারেন একটি বড় ভূমিকা নিতে। তিনি সরকারে না থাকলেও, তিনিই মূল ব্যক্তি। তার সিদ্ধান্তের বাইরে মনমোহন সিং কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখন সোনিয়া গান্ধীর সফরের পর বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারত সরকারের একটি বড় উদ্যোগ আমরা দেখতে চাই। আমরা আশা করি, মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরও সফল হবে এবং আমরা ভারতের ওপর আস্থা রাখতে পারবো।
ড. তারেক শামসুর রেহমান,
অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সব সমস্যার সমাধান চাই


আগামী ২৫ থেকে ২৭ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠেয় অটিজম-বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ঢাকায় আসছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২৫ জুলাই বঙ্গভবনে সোনিয়া গান্ধীর হাতে তাঁর শাশুড়ির অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর এই সম্মাননা পদক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তুলে দেবেন। ২৯ জুলাই আসবেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম। তারপর আসছেন উপবিদেশমন্ত্রী। সব শেষে আসছেন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণ ঢাকা সফর করে গেলেন। মূলত আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং যে ঢাকায় আসছেন, এর খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতেই তাঁর ঢাকায় আসা। তবে সোনিয়া গান্ধীর সফরও তাৎপর্যবহ। যদিও তিনি একটি সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশে আসছেন, কিন্তু তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণী স্তরে সংগত কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ভারতের অন্য মন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফরও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণের সফরকালে দুটি চুক্তি হয়েছে। একটি যৌথ বিনিয়োগসংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি ভুটানের যানবাহন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশসংক্রান্ত। চুক্তি দুটি তুলনামূলক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো চুক্তি নয়। তবে ঢাকা সফরকালে কৃষ্ণ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক. বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এ অঞ্চলের রোল মডেল হবে। দুই. ট্রানজিটের আওতায় অস্ত্রশস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের কোনো আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এ দুটি বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ট্রানজিট নিয়ে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বহুপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ট্রানজিটের কথা বলা হলেও শুধু ভারত ট্রানজিট পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে ট্রানজিটের ফি নির্ধারণের আগেই ভারত এরই মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা দিতে শুরু করেছে। পক্ষান্তরে ভুটান ও নেপাল ট্রানজিটের সুবিধা এখনো পায়নি। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, সাতবোন রাজ্যের বিদ্রোহ দমন করতে ভারত এই ট্রানজিট রুটে অস্ত্রশস্ত্র পরিবহন করতে পারে। ভারত ২৮ চাকার যে 'ওভার ডাইমেনশনাল কার্গো' (ওডিসি) এই রুটে চালাবে, তাতে কী পরিবহন করা হচ্ছে তা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করতে পারবে কি না কিংবা তাতে শুল্ক আরোপ করতে পারবে কি না, সে ব্যাপারে এখনো একটি ধূম্রজাল রয়ে গেছে। কৃষ্ণের কথায় আমরা কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারলেও ভবিষ্যৎই বলে দেবে তাঁর কথার সত্যতা কতটুকু। তবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হচ্ছে রোল মডেলের প্রসঙ্গটি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ২০১০ সালের জানুয়ারির পর থেকেই একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক একটি নতুন টার্ন নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ছিল ঐতিহাসিক। ওই সফরে তিনি বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল ট্রানজিট-সংক্রান্ত। কৃষ্ণ যখন রোল মডেলের কথা বলেন, তখন সংগত কারণেই নানা প্রশ্ন ওঠে। এর অর্থ কী? ভারত কি তার সুবিধা আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করবে?
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বড় দেশ। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী ভারতের। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর দিক থেকে বিশ্বে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ ও অষ্টম। আয়তনের দিক থেকে ভারত বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ দেশ। শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদনের দিক থেকে ভারতের অবস্থান দশম। আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। সুতরাং বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত তো একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতেই পারে। আমরাও তা চাই। কিন্তু সেই ভূমিকাটি যদি হয় একতরফা, তখন তো প্রশ্ন উঠবেই। ভারত এক মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই ঋণ আটকে আছে। যেসব শর্তে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও কথা আছে। সেসব শর্ত, ঋণের সুদ বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। তাহলে এটি কি রোল মডেল? বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমস্যা একাধিক এবং এর একটিরও এখন পর্যন্ত সমাধান হয়নি। অথচ বারবার বলা হচ্ছে, সমাধান হবে। সীমান্তে বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করা বন্ধ হয়নি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় গত ২৬ মাসে ১৩৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ)। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের কথা দিয়েছিলেন সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে। গঙ্গার পানি বণ্টনের চুক্তি আমরা করেছিলাম ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে (হাসিনা-দেবগৌড়া চুক্তি)। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা পাইনি কোনো দিন। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তির কথা বলা হলেও চুক্তি হয়নি (এখন শোনা যাচ্ছে, মনমোহনের ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি হবে)। বাংলাদেশ-ভারত সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা আজও চিহ্নিত হয়নি। ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়নি। বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে। এই ভারসাম্য কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। বাংলাদেশের খাদ্য সংকটের সময় বাংলাদেশে চাল বিক্রির চুক্তি করলেও সেই চাল ভারত বিক্রি করেনি। সমুদ্রসীমায় অধিকার খর্ব করে ভারত আমাদের কয়েকটি অনুসন্ধানী ব্লকের ওপর তাদের অধিকার দাবি করেছে। দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের এলাকা হলেও ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী এটা দখল করে নিয়েছিল। সেই থেকে এটা তাদের দখলে। তিনবিঘার পরিবর্তে আমরা বেরুবাড়ী দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ তিনবিঘা 'লিজ' হিসেবে পেয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনবিঘার ওপর দিয়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করার কথা। কিন্তু সেটাও ঝুলে আছে। তাহলে এটা রোল মডেল হলো কিভাবে? ভারত তার পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করে। নেপালের চারটি নদীতে (কর্ণালী, পঞ্চেশ্বর, সপ্তকোষী, বুড়িগন্ধকী) এবং ভুটানের মানোস ও সাংকোশ নদীতে বহুমুখী ড্যাম নির্মাণ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ১২ লাখ একর জমির সেচ সমস্যার সমাধান করেছে। নেপালে রিজার্ভারে পানি ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু এ জন্য দরকার ত্রিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) উদ্যোগ। যোগাযোগের বহুপাক্ষিকতার কথা ভারত বললেও (বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন এ কথা) জ্বালানি সংকট সমাধানে কোনো বহুপক্ষীয়, নিদেনপক্ষে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না। কৃষ্ণ যে রোল মডেলের কথা বলে গেলেন, এটা কী তাহলে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা ইদানীং নতুন একটি ধারণা বা পড়হপবঢ়ঃ-এর কথা শুনছেন। এটি হচ্ছে ুড়হব ড়ভ ঢ়ৎরারষবমবফ রহঃবৎবংঃ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ তাঁর সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে (বিশেষ করে বেলারুশ) সম্পর্কের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই তত্ত্বের কথা বলেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে, সীমান্তবর্তী দেশের ওপর তাঁর এক ধরনের স্বার্থ ও অধিকার রয়েছে। একসময় বেলারুশ সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে স্বাধীন। বেলারুশ তার জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার কারণে রাশিয়া ও বেলারুশ একটি টহরড়হ ঝঃধঃব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পূর্ণ একত্রীকরণের পথে এটা এক ধাপ। বেলারুশে রাশিয়ার মুদ্রা রুবল চালুরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে রাশিয়া তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে Collective Security Organization গঠন করেছে, যা মূলত একটি সামরিক জোট। একটি বড় দেশের পাশে একটি ছোট দেশ থাকলে বড় দেশটি ছোট দেশটির ওপর প্রভাব খাটায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনাম-লাওস এর বড় প্রমাণ। পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস না হয় না-ই বা উল্লেখ করলাম। বাংলাদেশের অবস্থান এখন ভারতের yone of privileged interest-এর অন্তর্ভুক্ত। যাঁরা ভারতের বৈদেশিক নীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন ভারত একসময় 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন', ও 'গুজরাল ডকট্রিন'-এর কথা বলেছিল। ইন্ডিয়া ডকট্রিনে বলা হয়েছিল, ভারত এ অঞ্চলে অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির 'নাক গলানো' পছন্দ করবে না। এই ডকট্রিন বা মতবাদে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তাকে এক করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে গুজরাল ডকট্রিনে বলা হয়েছে, ভারতের সাতবোন রাজ্যের (আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল) উন্নয়নে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে আমরা এই গুজরাল ডকট্রিন এখন বাস্তবায়ন করছি কি? গুজরাল ডকট্রিন হচ্ছে ইন্ডিয়া ডকট্রিনের সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়। আমরা বারবার বলে আসছি, আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের অনেক কিছু আছে বিশ্বকে দেওয়ার। যে রোল মডেলের কথা কৃষ্ণ বলেছেন, তা হতে পারে যদি ভারত তার সহযোগিতার হাত আরো সম্প্রসারিত করে। আমরা সব সমস্যার সমাধান চাই_তিস্তার পানি বণ্টন থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ পর্যন্ত। লোকদেখানো চুক্তি আমরা চাই না। মনমোহন সিং অনেক অভিজ্ঞ মানুষ তথা রাজনীতিক। তাঁর আগের বক্তব্যে অনেক মানুষ অখুশি হয়েছে। সেই বক্তব্য থেকে তিনি সরে এসেছেন বলেই মনে হয়। এখন এ দেশের মানুষ আরো খুশি হবে, যদি তিনি সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসে একাধিক চুক্তি করে বিরাজমান সমস্যাগুলোর একটা সমাধান দিয়ে যান। তবে কোনো চুক্তিই যাতে লোকদেখানো না হয় এবং আমাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয় এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা চাই।
তারেক শামসুর রেহমান
রবিবার, ২৪ জুলাই ২০১১, ৯ শ্রাবণ ১৪১৮, ২১ শাবান ১৪৩২, দৈনিক কালের কন্ঠ
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

আবারও টিপাইমুখ

আবারও টিপাইমুখ বাঁধের প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছে। গত ১২ জুলাই বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। ওই সংবাদে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও সেই সঙ্গে আসাম রাজ্য সরকার জানিয়ে দিয়েছে যে টিপাইমুখে বরাক নদীর ওপর প্রস্তাবিত জলবিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবেই। নর্থ-ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেডের (নিপকো) চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ সংবাদ মাধ্যমে এ তথ্যটি জানান। এমনকি আসাম রাজ্য সরকারও এ প্রকল্পসহ আরও বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈর একটি মন্তব্যও ছাপা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যে কোনো মূল্যে বাঁধ হবেই।
প্রেমচান্দ কিংবা আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বাংলাদেশে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। অনেকেরই মনে থাকার কথা বাংলাদেশে টিপাইমুখ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে গেল বছরের জুলাই মাসে (২০১০) বাংলাদেশের একটি সর্বদলীয় (চারদল বাদে) সংসদীয় প্রতিনিধিদল টিপাইমুখ সফরে গিয়েছিল। যদিও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তাদের পক্ষে ওই এলাকায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু নয়াদিল্লিতে তারা যখন সিনিয়র ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হন তখন তাদের বলা হয়েছিল টিপাইমুখ বাঁধের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীও একবার বলেছিলেন, টিপাইমুখে ভারত এমন কিছু করবে না, যা বাংলাদেশের ক্ষতি করে। ভারতীয় নেতাদের ওই বক্তব্যের সঙ্গে প্রেমচান্দ বা তরুণ গগৈর বক্তব্যের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রস্তাবিত এ বাঁধটি নির্মিত হচ্ছে ভারতের মণিপুর রাজ্যের চোরাচাঁদপুর জেলার তুই ভাই ও বরাক নদীর সঙ্গমস্থলে টিপাইমুখে। তবে বাংলাদেশে শুধ নয়, খোদ ভারতেই এই বাঁধ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ভারতের পরিবেশবাদীরা এই জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের বিরুদ্ধে।
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ইতিহাস অনেক পুরনো। প্রায় ৫৫ বছর। এই বাঁধ নির্মাণের প্রথম প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল (আসাম সরকার) ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৫ সালে মণিপুরের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী রিসাং কেইসিং ঘোষণা করেছিলেন যে মণিপুর সরকার এই বাঁধ নির্মাণের অনুমতি দেবে না। এমনকি ১৯৯৮ সালে মণিপুরের বিধানসভায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ২০০১ সালে এ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুযোগ নিয়ে এ প্রকল্পটি অনুমোদন করিয়ে নেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও মণিপুরে এই বাঁধের বিরুদ্ধে শক্ত জনমত রয়েছে। এরই মধ্যে সেখানে ২০টি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ACTIP বা Action Committee Against Tipaimukh Project। এদের যুক্তি হচ্ছে এই বাঁধটি নির্মিত হলে অনেক এলাকা জলমগ্ন হবে এবং অনেক আদিবাসী স্থানচ্যুত হবে। তারা নিজ বাসভূমি ছাড়তে বাধ্য হবেন এবং উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন। শুধু তাই নয় পরিবেশেরও মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে (২০১২ সালে এটি চালু হওয়ার কথা) মেঘনারও ‘মৃত্যু’ ঘটবে। মেঘনার পরিণতি হবে পদ্মার শীর্ণ স্রোতস্বিনীর আকার ধারণ করার মতো। গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁধটি চালু হলে সুরমা-কুশিয়ারার পানি শুষ্ক মৌসুমে ৬০ শতাংশ ও ভরা মৌসুমে ১২ শতাংশ হ্রাস পাবে। বাঁধটি পরিচালনার আগে যখন রিজার্ভারটি পূর্ণ করা হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এর ভাটিতে পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হবে, যা ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ইকো-সিসটেমকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং মত্স্য প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ওই প্রকল্পের ফলে খোদ ভারতেই ২৭ হাজার ২৪২ হেক্টর বনভূমি বিনষ্ট হবে। আসাম, মণিপুর ও মিজোরামের ৩১১ বর্গকিমি ভূমি প্লাবিত হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১ হাজার ৪৬১ আদিবাসী হাম (Hamar) পরিবার এবং জিলিয়ানোগ্রং নাগা উপজাতির এক-তৃতীয়াংশ তাদের আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হবে। অতীতে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছিলেন, ‘কিছু লোক না বুঝেই টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতা করছে’ (আমার দেশ, ২৭ মে, ০৯)। তখন তিনি সত্য কথাটি বলেননি। এ দেশে কিছু লোক আছেন, যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন, গবেষণা করেন। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় বিষয়টি দেখা ঠিক নয়। মানুষের সেন্টিমেন্ট রাজনীতিবিদদের বুঝতে হয়। তিনি যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, সেই একই ভাষায় কথা বলেছিলেন আমাদের কয়েকজন পূর্ণ মন্ত্রীও। টিপাইমুখ নিয়ে দেশে ও বিদেশে কাজ হচ্ছে। আরো কাজ হওয়া উচিত। প্রয়োজনে সরকার পরিবেশবাদী ও সমাজবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটিও গঠন করতে পারে। সরকারি উদ্যোগে সেখানে তাদের পাঠানো যেতে পারে। বিএনপি ও বামমনা দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হতে পারে। কেননা বিষয়টি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কোনো বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রীয় বিষয়। টিপাইমুখ বাঁধ যেহেতু ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে অবস্থিত, সে কারণে বৃহত্তর সিলেট আগামীতে একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে। এ নিয়ে খোদ ভারতেই গবেষণা হয়েছে। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সাইন্স বিভাগের শিক্ষক ড. সইবাম ইবোটমবির (Soibam Ibotombi) গবেষণার অংশবিশেষ উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন, 'The trend of earthquakes shows that the regions which have experienced earthquakes in the past are more prone to it, the magnitude of future earthquakes may be uniform to the past ones, and the earthquake occurrence, geological data and tectonic history all have close correlation. The Tipaimukh Dam site has been chosen at the highest risk seismically hazardous zone'। এই কথাগুলো যখন ভারতীয় গবেষকদের মুখ থেকে বের হয়, তখন আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। ভারত টিপাইমুখ বাঁধের কাছাকাছি ফুলেরতাল নামক স্থানে (বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুইশ’ কিমি উজানে) একই সঙ্গে একটি ব্যারাজও নির্মাণ করছে। এর অর্থ সমতল ভূমিতে (বাঁধ নির্মিত হয় উচ্চতায়, বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য) পানি ধরে রাখা ও তা দিয়ে কৃষিকাজ করা। বরাক নদী দিয়ে আগামীতে যে পানি প্রবাহ কমবে, এটা তার আরেকটি উদাহরণ। অথচ আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত ১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র, অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। তা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি না করেই নিতে হবে। ভারত বাংলাদেশের ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় না নিয়েই টিপাইমুখ বাঁধ নর্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রামসার কনভেনশনের (জলা ভূমিবিষয়ক কনভেনশন) ৫ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে কনভেনশনে উদ্ভূত বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরামর্শ করবে এবং একই সঙ্গে জলাভূমির এবং সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর সংরক্ষণের স্বার্থে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু ভারত তা করেনি। টিপাইমুখ বাঁধ আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ কনভেনশন কিংবা জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
সুতরাং আজ যখন টিপাইমুখ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তখন আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। সরকারের উচিত উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়া। এমনকি প্রয়োজনে আসাম সরকারের কাছ থেকেও এর ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। আসাম সরকার যদি টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প কার্যকর করে, তাহলে তা ‘বন্ধুত্বের’ স্পিরিটের পরিপন্থী। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ওই সফরে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে সরকারি পর্যায়ে বলা হচ্ছে। আলোচনায় এখন টিপাইমুখও অন্তর্ভুক্ত হোক। কেননা বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ ও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আমরা নিপকোর চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে হালকাভাবে নিতে চাই না। নিপকোর চেয়ারম্যানের বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কেন এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথাগুলো বলেছেন, তা আমাদের জানা প্রয়োজন। আমি অতীতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তার ওপর ভরসা রাখতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, ভারতীয় নেতারা বাংলাদেশর স্বার্থকে গুরুত্ব দেবেন। অতীতে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা জরুরি। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এ সম্পর্কটা যেন হয় জাতিসংঘের সনদের ২.৭ ধারা অনুযায়ী, যেখানে বলা হয়েছে সমমর্যাদার কথা।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanog@Gmail.com

কোন পথে বাংলাদেশ


কোন পথে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশ? এ প্রশ্ন যে আজ সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই উঠেছে তা নয়। বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে উচ্চ আদালতও বিব্রত, তা সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে। গত ১২ জুলাই পুলিশের পিটুনিতে আহত বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের জামিনের আবেদনের শুনানিকালে হাইকোর্টে বলেছেন, 'দয়া করে জাতিকে উদ্ধার করুন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতি উদ্বিগ্ন। এই সঙ্কটপূর্ণ অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়। মুক্তি দিন।' হাইকোর্টের এই আবেদনটি ছিল সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি (আমার দেশ, ১৩ জুলাই, ২০১১)। হাইকোর্টে জামিনের আবেদনের ওপর শুনানি করেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক। দেশের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে হাইকোর্টের বিচারপতিরা এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন। ইতোমধ্যে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। সংবিধানে ৫১ দফা সংবলিত পঞ্চদশ সংশোধনী যোগ হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিএনপি তথা চারদল প্রথম দফায় ৩৬ ঘণ্টা ও দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল পালন করেছে। ইসলামিক দলগুলোও আলাদাভাবে আরো একটি ৩৬ ঘণ্টার হরতাল পালন করেছে, যার প্রতি বিএনপির সমর্থন ছিল। এরপর বিএনপি গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেছে। খালেদা জিয়া এখন বলছেন ঈদের পর সরকার পতনের একদফা আন্দোলন শুরু করা হবে। স্পষ্টতই হরতাল, লংমার্চ ইত্যাদি আমরা প্রত্যক্ষ করবো। এর অর্থ হচ্ছে ঈদের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। সরকার গঠিত হয়েছে মাত্র ৩০ মাস। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকবে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। সংবিধানে যদি নতুন করে পরিবর্তন না আসে, তাহলে ২০১৩ সালের শেষের দিকে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তার আগেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশি করে বিতর্কের ঝড় তুলছে, তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল। অথচ শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালের মাগুরার উপ-নির্বাচনের পর এককভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিল। এখন তার সরকারের আমলেই তা বাতিল হলো। বলা ভালো মাত্র ১৩ দিনের সংসদে (৬ষ্ঠ সংসদ) সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন খালেদা জিয়া। পরপর তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আজ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল। আর বিএনপি চাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের। হরতালের এটা অন্যতম একটি ইস্যু। বাস্তবতা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে পরবর্তী দুটো সংসদ নির্বাচন (দশম ও একাদশ) 'নিরপেক্ষ' একটি সরকারের মাধ্যমে আয়োজন করা সম্ভব। এটা সংবিধানের কোনো অংশ হবে না। কিন্তু সংসদে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। সরকার এ ব্যাপারে সংসদে একটি প্রস্তাব আনতে পারে। অথবা শরিক দলের পক্ষ থেকেও যে কেউ এ ধরনের একটি প্রস্তাব আনতে পারে, যাতে সরকারের সমর্থন থাকবে। এটা একটা কমপ্রোমাইজিং ফর্মুলা, বিএনপিকে আস্থায় নেয়ার একটি উদ্যোগ হতে পারে। তাতে করে অন্তত হরতালের রাজনীতি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো। এই 'নিরপেক্ষ সরকার'-এ কারা থাকবেন, কাঠামো কী হবে, তা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে। 'নিরপেক্ষ' সরকারের কাঠামোর ব্যাপারে সংসদের স্পিকারও একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। সুশীল সমাজকেও উৎসাহিত করা যেতে পারে একটি ফর্মুলা উপস্থাপন করতে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে ফর্মুলা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উপস্থাপন করেছেন, তা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কেননা ওই ফর্মুলা অনুযায়ী শেষ ৯০ দিন তো মহাজোট সরকারই ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্ন উঠবে এবং সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া যাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে। এখন পঞ্চদশ সংশোধনীবলে নির্বাচন কমিশনারদের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তা যথেষ্ট নয়। প্রথমত বর্তমান সরকারই আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে সিইসি তথা নতুন কমিশনারদের নিয়োগ দেবে। সঙ্গত কারণেই তাই দলীয় আনুগত্যের প্রশ্ন উঠবে।
সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের অবসরের পর রাজনীতি করার প্রবণতা বেড়েছে। তাদের আনেকেই বিশেষ করে বেসামরিক আমলারা ক্ষমতায় থাকার সময়ই একটি 'বিশেষ সম্পর্ক' গড়ে তোলেন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে কেউ নেতা-নেত্রীকে খুশি করেন। এরা যখন এ ধরনের সাংবিধানিক পদে নিয়োগ পান, তখন তাদের 'আনুগত্য' নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান কাঠামোয় নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ_ এটা বলা যাবে না। অর্থের জন্য তাদের সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব 'ক্যাডার' তৈরি হয়নি, যারা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে সরকারি প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। যতদিন পর্যন্ত না নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবল থাকবে এবং আইন এদের নির্বাচন পরিচালনায় যথেষ্ট ক্ষমতা দেবে, আর্থিক স্বাধীনতা দেবে, সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের নিরপেক্ষ 'মেকানিজম' তৈরি হবে, ততদিন পর্যন্ত নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ইভিএম মেশিনও গ্রহণযোগ্য নয়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র তা ব্যবহৃত হয়নি। আমাদের দেশের নিরক্ষরতা, প্রযুক্তি বা জানার ব্যর্থতা, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা ও সর্বোপরি প্রযুক্তি কারচুপি নির্বাচনে ইভিএম মেশিনে ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সিইসি 'অতি উৎসাহ' ইতোমধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তব্য বিতর্কের মাত্রা বাড়াবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এখন সংবিধানের অংশ। এটা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এটা আর পরিবর্তন করা যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে শুধু সংসদই পারে ষোলতম সংশোধনী এনে সংবিধানকে পুনরায় আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে। কিন্তু তাও খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। কেননা সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় (১৪২ আ) পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে ৭(খ) যোগ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, 'এ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহাই কিছু থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথমভাগের সব অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সব অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয়ভাগের সব অনুচ্ছেদ এবং একাদশভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলী সংযোজন পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।' সংবিধানে ৭ (খ)-এর অন্তর্ভুক্তি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে এবং সংবিধান সংশোধন কমিটির আসল উদ্দেশ্যকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। কেননা এর ফলে 'জাতির পিতা' শিরোনামের অনুচ্ছেদ ৪-এ যা কিছু সংযোজিত হয়েছে (ছবি প্রদর্শন) তাতে সংশোধনী আনা যাবে না। ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইত্যাদি সংযুুক্ত (অনুচ্ছে ১৫০.২) সংশোধন কঠিন হবে। এমনকি রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি, জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিকতায় বাংলাদেশি বাতিল করা কিংবা 'আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' পুনঃস্থাপন করা সহজ হবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য 'জাতির পিতা', 'স্বাধীনতার ঘোষণা' ইত্যাদি প্রশ্নে জাতি এখনো বিভক্ত থেকে গেল। স্বাধীনতার বীর সৈনিকদের নিয়ে যে জাতি ৪০ বছর পরও 'বিতর্ক করে, সে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কামুক্ত হওয়া যায় না।
হরতাল কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। আবার সরকারের কঠোর মনোভাবও কোনো সমাধানের পথ তৈরি করে দেবে না। আলোচনাই একমাত্র সমাধান। পৃথিবীর বড় বড় সমস্যা আলোচনার টেবিলেই সমাধান হয়েছে। বিচার মানি কিন্তু 'তালগাছ আমার'_ এই মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে। সংশোধিত সংবিধানকে সামনে রেখেই এবং উচ্চ আদালতের রায়কে অনুসরণ করেই দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা এই মুহূর্তে জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। না হলে হরতালের যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তাতে জনমত যদি রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে চলে যায়, অবাক হওয়ার কিছু নেই।
অন্তত উচ্চ আদালতের উপরে উল্লেখিত মন্তব্যটি যদি সরকার ও বিরোধী দল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, তাহলে সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা 'বল' এখন সরকারের কোর্টে। সরকার যদি কঠোর হয়, যদি সমঝোতার পথ তৈরি করে না দেয়, তাহলে আমরা অচিরেই একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট প্রত্যক্ষ করবো।
দৈনিক যায় যায় দিন, বৃহস্পতিবার ২১ জুলাই ২০১১ ড. তারেক শামসুর রেহমান: অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা


চলতি জুলাই মাসে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তথা চীনের রাজনীতি আবারও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনায় এসেছে। চীন যখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ৯০তম জন্মবার্ষিকী পালন করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চীফ অফ স্টাফের চেয়ারম্যান এডমিরাল মুলেন চীন সফর করেছেন। এডমিরাল মুলেনের ওই সফর ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।  ওই সফরে এডমিরাল মুলেন চীনা সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল চ্যান পিংদের সাথে বৈঠক, হাসিমুখে ফটোসেশনে অংশ নিয়েছেন বটে, কিন্তু স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। এডমিরাল মুলেন এমন এক সময় চীনে গেলেন যখন দক্ষিণ চীন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সাথে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়, যা কীনা চীন ভালো চোখে দেখেনি এবং চীন এই যৌথ মহড়াকে ‘চূড়ান্ত অসংগত’ বলে মনে করছে। মুলেনের সফরের সময় জেনারেল পিংদের একটি মন্তব্যও এডমিরাল মুলেনকে একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। জেনারেল পিংদে বলেছিলেন, সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমানো উচিত। তিনি একথাও বলেন যে, ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।  দক্ষিণ চীন সফরে তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ কিছু এলাকা রয়েছে, যা একই সাথে চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনও দাবি করছে। সুতরাং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ চীন খুব ভালো চোখে দেখেনি। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম কোন ঊর্ধ্বতন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা বেইজিং সফর করলেন। কিন্তু সফর সফল হয়নি। তবে এডমিরাল মুলেন বেইজিং-এ স্বীকার করেছেন চীন এখন বিশ্বশক্তি। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা।  চীন এখন বিশ্ব রাজনীতি তথা অর্থনীতিতে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। আর চীনকে এ পর্যায়ে উন্নীত করতে চীনা কম্পিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। যেখানে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সফল হয়েছে। বলা ভালো চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়েছিল ১৯২১ সালের ১ জুলাই, চীনের সাংহাই শহরে। যুগের পরিক্রমায় চীনা  কমিউনিস্ট পার্টিতেও পরিবর্তন এসেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন আর ধ্রুপদী মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। চীন এখনও রাষ্ট্রব্যবস্থায়  বহুদলীয় রাজনীতি শুরু করেনি। অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসলেও, কমিউনিস্ট পার্টির একক কর্তৃত্ব চীনা সমাজে এখনও বহাল রয়েছে। এ জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের মত চীন ভেঙ্গে যায়নি। এখনও টিকে আছে।  কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুটি বড় দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মাঝে পার্থক্য এখানেই। তাই চীনা কমিউস্টি পার্টি নিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে যে আগ্রহ থাকবে, এটা বলাই বাহুল্য। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি যেমনি একদিন (১৯৩৪) লং মার্চের নেতৃত্ব দিয়ে বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি আজও স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘নয়া চীন’কে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রায় ৮ হাজার মাইলব্যাপী ওই লং মার্চে অংশ নিয়েছিল প্রায় ১ লক্ষ মানুষ। বিশ্ব ইতিহাসে সেটা ছিল এক বিরল ঘটনা। উচিয়াং, চিনশা, তাতু নদীর মতো প্রাকৃতিক বাঁধা, কিংবা জনমানবহীন  লাজি বিশাল জলাভূমি পার হতে বিপ্লবীরা সেদিন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর আজও, সোভিয়েত ইউনিয়নের মত একটি বড় সমাজতান্ত্রিক দেশের অবর্তমানে সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি চীনকে একুশ শতকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।
কোন পথে এখন চীন? চীন কী একুশ শতকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারবে? চীন সম্পর্কে এসব প্রশ্ন এখন উঠেছে। চীন যখন কমিউনিস্ট পার্টির ৯০ বছরের পূর্তি উত্সব পালন করছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৭৩-৭৭) হেনরি কিসিঞ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন চীন সম্পর্কে। কানাডার টরেন্টোতে আয়োজিত একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানে কিসিঞ্জার বলেছেন, চলতি শতাব্দীতে চীন বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্বের সুযোগ পাবে না। তার যুক্তি চীন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যায় বেশি জর্জরিত থাকবে। ফলে তার পক্ষে বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগামি ২৫ বছর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে-এটাও মনে করেন কিসিঞ্জার। যদিও ওই বিতর্কে ইতিহাসবিদ নিয়াল ফার্গুসন এবং বেইজিংয়ের  সিঙহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডেভিড লি কিসিঞ্জারের সাথে একমত হননি।
চীন অনেক বদলে গেছে। এক সময় যে চীন ছিল কৃষিনির্ভর, দরিদ্রতা যেখানে ছিল প্রকট, বাড়িতে রঙিন টিভি ছিল যেখানে স্বপ্ন, সেই চীন আজ বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বড় অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের পরই চীনের অর্থনীতি। ইতোমধ্যে জাতীয় উত্পাদনের দিক থেকে জাপানকেও ছাড়িয়ে গেছে চীন। আর যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে ২০২০ সালে। উত্পাদনের দিক থেকে চীনকে বলা হয় সুপার পাওয়ার। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার, মাইক্রোওয়েভ ও জুতা তৈরি হয়, তার তিন ভাগের দুই ভাগ উত্পাদন করে চীন। সেই সাথে বিশ্বে উত্পাদিত মোবাইল ফোনের ৬০ ভাগ, ডিভিডির ৫৫ ভাগ, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০ ভাগ, শিশুদের খেলনার ৭৫ ভাগ ও ৩০ ভাগ পারসোনাল কম্পিউটার একা উত্পাদন করে চীন। সুতরাং এই চীনকে বিশ্ব উপেক্ষা করে কীভাবে? পরিসংখ্যান বলে চীনে বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার। ফরচুন ম্যাগাজিন বিশ্বের বড় বড় যে ৫০০টি বহুজাতিক কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে, তার মাঝে চীনের একারই রয়েছে ৩৭টি কোম্পানি। বিশ্বে যত জ্বালানি ব্যবহূত হয়, তার মাঝে শতকরা ১৬ ভাগ ব্যবহূত হয় চীনে।  জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে চীনের অবস্থান তৃতীয়। প্রতিবছর কয়েক কোটি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়।  ৩ লক্ষ ছাত্র প্রতিবছর বিদেশে পড়তে যায়। যেখানে ১৯৪৮ সালে শিক্ষার হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ, সেখানে এখন শতকরা ১০০ ভাগই শিক্ষিত। ২১ কোটি শিশু প্রতিবছর প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হয়। চীন ইতোমধ্যে ২০ কোটি লোককে চরম দরিদ্রতা থেকে তুলে আনতে পেরেছে। তবে চীনে এখনও দরিদ্র মানুষ আছে। বিশ্বব্যাংক প্রতিদিন আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসাব করে দরিদ্রের যে সীমারেখা টানছে, সেই হিসাবে চীনে এখনও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২১ কোটি। চীনে এখন নতুন নতুন তাক লাগানো শহর গড়ে উঠছে। আকাশছোঁয়া সব ভবনের ছবি টাইমস ছেপেছিল ২০০৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায়। চীন বিশ্বের রূপান্তরযোগ্য জ্বালানির বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ‘সবুজ জ্বালানি’ (অর্থাত্ সৌরবিদ্যুত্) খাতে চীন গত বছর বিনিয়োগ করেছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় শতকরা ৩৯ ভাগ বেশি। বিশ্ব জুড়ে গত বছর এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। চীন ২০২০ সালের দিকে এ খাত থেকে শতকরা ১৫ ভাগ বিদ্যুত্ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে চায়। চীনের ‘সবুজ জ্বালানি’ প্রকল্প উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত। স্কুলগুলোতে শেখান হয় ‘গ্রীন লিভিং’-এর কথা। কোন কোন শহরে রাস্তার বিদ্যুত্-এর বাতি জ্বলে সৌর  বিদ্যুত্-এ। ১৯৪৯ সালের চীনের সাথে ২০১১ সালের চীনকে মেলান যাবে না। কৃষিনির্ভর একটি দেশ এখন পরিণত হয়েছে শিল্পোন্নত একটি দেশে। কিন্তু রাজনীতি? রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে? সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার চীন সফরের শেষ পর্যায়ে হংকং-এ এসে বলে ছিলেন তিনি তার জীবদ্দশায় দেখে যাবেন চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে চীনে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে- এ ব্যাপারে সকলেই সন্দিহান। কেননা গণতন্ত্রের জন্য চীন প্রস্তুত নয়। ১২০ কোটি লোকের দেশ চীন। চীনে বাস করে ৫৬ জাতির লোক। দেশের শতকরা ৯৪ ভাগ লোকই হান জাতির।২২ প্রদেশ, ৫টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে আজকের চীন। এখানে পশ্চিমা ধাঁচের পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয়। তাই বলে চীনকে এখন ধ্রুপদী একটি মার্কসবাদী রাষ্ট্রও বলা যাবে না। তারা অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। পুঁজিবাদের  বেশকিছু উপাদান (ব্যক্তিগত খাত, ইপিজেড, স্টক মার্কেট) এখন চীনে চালু রয়েছে। স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরিভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এটা বলা যাবে না। চীন  এখন যৌথ  নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একদিকে যেমনি পাওয়া যায় ইউরোপের Social Demoeracy' ধারণা, ঠিক অন্যদিকে রয়েছে ল্যাতিন আমেরিকার Corporatism ও পূর্ব এশিয়ার Neo-Authorism-এর উপাদান। এই তিনটির সংমিশ্রণে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে চীনে। এটাকে ঠিক মার্কসবাদও বলা যাবে না, আবার পুঁজিবাদও বলা যাবে না। এক সময় চীনে কনফুসিয়াসের ধ্যান-ধারণা নিষিদ্ধ ছিল। আজ চীন কনফুসিয়াসকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পূজা করে। কনফুসিয়াসের অনেক চিন্তাধারা চীন এখন গ্রহণ করেছে। বাজার এখন চীনের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনা পণ্য এখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের বড় বিনিয়োগ এখন আফ্রিকাতে। গরবাচেভ যে ভুলটি করেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে, সেই ভুল করেননি চীনা নেতৃবৃন্দ। তারা চীনকে বদলে দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তেমন কোন পরিবর্তন আনেননি। এখানে পরিবর্তন আসছে খুব ধীর গতিতে। আগে অত্যন্ত ক্ষমতাবান পালটব্যুরোর সদস্যরা অবসরে তেমন একটা যেতেন না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা থাকতেন পালটব্যুরোর সদস্য হয়ে। এখন ক্ষমতাবানদের অবসরে যেতে হয়। ২০১২ সালে অবসরে যাবেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ও প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং হু জিনতাও-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন। সি জিনপিং চলতি বছরের প্রথমদিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সংস্কারবাদী হিসাবেই তিনি পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে আজ থেকে ৩৪ বছর আগে চীনা সংস্কারের জনক দেং জিয়াও পিং যে  সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, সেই ধারায় সি জিনপিংও একুশ শতকে চীনকে নেতৃত্ব দেবেন। এ জন্যই মাইকেল এলিয়ট  (Michael Elliott) লিখেছিলেন, `in this century the relative power of the u.s. is going to decline, and that of china is going to rise. That cake was backed long ago (The chinese century  Time, 22 january 2007)। মাইকেল এলিয়ট মিথ্যা বলেননি। চীন আজ একটি শক্তি। এই শক্তিকে অবহেলা করা যাবে না। আর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সার্থকথা এখানেই যে, তারা চীনকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
এখন এডমিরাল মাইক মুলেন বেইজিং-এ এসে চীনকে বিশ্ব শক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন বটে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রণেতারা চীনের উত্থানকে খুব ভালো চোখে দেখছেন না। সম্প্রতি  New American Foundation  (ওয়াশিংটস্থ একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান) যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে একটি দীর্ঘস্থায়ী গবেষণা পরিচালনা করে। একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী চীনা কর্তৃত্বকে খর্ব করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। একই সাথে ইউরোপে, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ সীমিত করা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে রাশিয়ার স্বার্থকে (যাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ চিহ্নিত করেছেন zone of privileged interert'  হিসাবে) সম্মান করা ( Anatol lieven, us Rusian Relations and the rise of china, New American Foundation 11 july, 2011)। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চিন্তিত। এমনিতেই নানা ইস্যুতে (তিব্বত, তাইওয়ান, চীনা মুদ্রা, বাণিজ্য ইত্যাদি) চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না। কোন কোন মহল থেকে ‘চীনকে ঘিরে ফেলার’  (Containment Theory) একটি নীতির কথাও বলা হচ্ছে। মুলেনের সফরের পর চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরো অবনতি ঘটলো, যখন প্রেসিডেন্ট ওবামা তিব্বতের বিতর্কিত নেতা দালাই লামার সাথে ওয়াশিংটনে দেখা করেন। চীন এই বৈঠকের নিন্দা করেছে এবং মন্তব্য করেছে যে, এই ঘটনা চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সামিল। সবমিলিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়। এই দু’টো দেশের মাঝে সম্পর্কের যদি আরো অবনতি ঘটে, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবেই।

দৈনিক ইত্তেফাক, |  বুধ, ২০ জুলাই ২০১১, ৫ শ্রাবণ ১৪১৮

লেখক: ড. তারেক শামসুর   রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
tsrahmanbd@yahoo.com
www.tsrahmanbd.blogspot.com

টিপাইমুখ নিয়ে নতুন বিতর্ক

ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গেল বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল যখন টিপাইমুখ বাঁধ দেখতে গিয়েছিল, তখন তারা নয়াদিলি্লতে ঊর্ধ্বতন ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। তখন তাদের বলা হয়েছিল ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। সংসদীয় প্রতিনিধি দলটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ২৯ জুলাই (২০১০) টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণাধীন এলাকায় যেতে পারেনি। তারা বাংলাদেশে ফিরে এসে বলেছিলেন ভারত টিপাইমুখে কোনো বাঁধ নির্মাণ করছে না। আমরা তখন আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু হাটে হাঁড়িটি ভেঙে দিলেন ভারতের নর্থ-ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রেমাচান্দ পংকজ। তিনি গত ১১ জুলাই স্থানীয় একটি সংবাদ সংস্থার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, টিপাইমুখে বরাক নদীতে প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবেই। তিনি জানান, প্রস্তাবিত ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম টিপাইমুখ প্রকল্পের কাজ যথারীতি এগিয়ে নেয়া হবে (আমার দেশ, ১২ জুলাই, ২০১১)। প্রেমাচান্দের এই বক্তব্য বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের মনিপুর রাজ্যের চোরা-চাঁদপুর জেলার তুইভাই ও বরাক নদীর সঙ্গমস্থলে টিপাইমুখ বাঁধটি নির্মিত হচ্ছে। ভারত প্রায় ৯ হাজার কোটি রুপি ব্যয় করে এই বাঁধটি নির্মাণ করছে। আগামী ২০১২ সালের মধ্যে বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হবার কথা। শুধু বাংলাদেশেই নয়। খোদ আসাম ও মনিপুরের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন এই বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করছে। তারা মনে করছেন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবেশে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ফলস্বরূপ অর্থনৈতিকভাবেও বিপন্ন হয় পড়বে এলাকার বাসিন্দারা। ভারতের পরিবেশবাদীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করলেও, আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গটস বলেছেন বৃহৎ নদী বাঁধ যেকোনো মূল্যে হচ্ছেই। কেউ বাঁধের কাজ আটকাতে পারবে না। এখন মুখ্যমন্ত্রী গটস কিংবা প্রেমাচান্দের বক্তব্যের পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, টিপাইমুখ বাঁধ হচ্ছেই।
বাঁধটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে বাংলাদেশ যে বড় ধরনের একটি পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে, ৯৩০ মিটার দীর্ঘ ও ৯৬৯ মিটার উঁচু এই বাঁধটি চালু হলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রাকোনা ও নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এলাকা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিমি. এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে এবং বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছাড়লে ব্যাপক বন্যা হবে। প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রভাবিত হবে এর কারণে। ভূমিকম্পের আশংকা বাড়বে। খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে এবং বেশ কিছু শাখা নদী মরে যাবে। বলা বাহুল্য, এই বাঁধটিতে প্রায় ১৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি আটকে রাখা হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। পানিসম্পদ মন্ত্রী এই বাঁধটির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত না হলেও, টিপাইমুখ সফররত সংসদের পানিসম্পদ মন্ত্রাণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়রম্যান আবদুর রাজ্জাক পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন এই ক্ষয়ক্ষতির কথা। ২০১০ সালের ২৮ জুলাই বিবিসির বাংলা বিভাগ টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে একটি প্রতিবেদন পরিবেশন করে। বাংলা বিভাগের প্রতিনিধি নিজে টিপাইমুখ এলাকায় গিয়েছিলেন এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সাধারণ মানুষেরা, যারা বংশপরম্পরায় ওই এলাকায় বসবাস করে আসছেন, তারা অকপটে স্বীকার করেছেন তাদের জমি হারানোর কথা। বাঁধটি নির্মাণ করা হলে যে এলাকাগুলো সম্পূর্ণ পানির নিচে ডুবে যাবে, তার ৯৪ শতাংশ মনিপুরে আর বাকি ৬ শতাংশ মিজোরামে পড়েছে। মনিপুর হারাবে ৪৭৬০ হেক্টর বাগান, ২০৫৩ হেক্টর ধানি জমি, ১৭৮.২১ বর্গ কিমি. বনভূমি। আর আসাম, মনিপুর ও মিজোরাম একত্রে হারাবে মোট ৩১১ হাজার হেক্টর ভূমি। উভয় রাজ্যের ৬৭টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মনিপুরের ১৬টি গ্রাম সম্পূর্ণ তলিয়ে যাবে পানির নিচে। এই পরিসংখ্যান মনিপুরের পরিবেশবাদীদের। আমরা বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা না হয় নাইবা বললাম। মনিপুরের পরিবেশবাদীরা গত বছর বাংলাদেশে এসেছিলেন। তারা বাংলাদেশে এসে তাদের সমস্যার কথা বলে গেছেন। বলে গেছেন বাংলাদেশকে টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাতে। এরপর সংসদের সরকারি প্রতিনিধি দল ভারতে গেল। তারা কিন্তু সেখানে গিয়ে মনিপুরের পরিবেশবাদীদের সঙ্গে কথা বলেননি। তাদের কী কথা বলা উচিত ছিল না? আমি নিশ্চিত যে, খোদ মনিপুরই যখন বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তখন বাংলাদেশ যে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এ কথাটা রাজ্জাক সাহেব সাহস করে ভারতীয় পক্ষকে বলেননি। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী যখন নিজে ভারতীয় হাইকমিশনারের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলেন, তখন আমি সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রীর উপরও আস্থা রাখতে পারি না। প্রতিনিধি দলে সংসদ সদস্য ছিলেন ছ'জন। এরা জনপ্রতিনিধি। জনগণ এদের ভোট দিয়ে সংসদ পাঠিয়েছে। কিন্তু তাদের তো সেই বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নেই। তারা কী বুঝবেন বাঁধ নির্মাণের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? বাঁধের এরিয়াল সার্ভে ম্যাপ, হাইড্রোলজিক্যাল ম্যাপ, জিয়োটেকটেনিক ডাটা বিশ্লেষক করার ও বোঝার জ্ঞান দরকার, তাদের তা নেই। এজন্য একাধিক কারিগরি বিশেষজ্ঞ থাকা প্রয়োজন ছিল। পানিসম্পদ সচিব প্রায় এক বছর হলো এ মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়েছেন। তারও এ ব্যাপারে জ্ঞান সীমিত। সেই অর্থ বিশেষজ্ঞ ছিলেন দুজন_ যৌথ নদী কমিশনের একজন সদস্য ও বুয়েটের পানিসম্পদ বিভাগের একজন অধ্যাপক। যেখানে যৌথ নদী কমিশনে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আলোচনা হয়নি, সেখানে যৌথ নদী কমিশনের সদস্য প্রতিনিধি দলটিকে সহযোগিতা করতে পারেননি। বুয়েটের যিনি অধ্যাপক, তার কাছেও প্রচুর তথ্য ও উপাত্ত নেই। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী স্বয়ং নিজে স্বীকার করেছেন ভারত বাঁধটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের হিসাব ছাড়া আর কোনো তথ্য দেয়নি। তাহলে এই তথ্য নিয়ে বুয়েটের অধ্যাপক গবেষণা করেছেন বলে আমার জানা নেই। এ ক্ষেত্রে যারা এ বিষয় গবেষণা করেছেন এবং বিভিন্ন সেমিনারে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন, তাদের কয়েকজন ভারতে গেলে ভালো হতো। কিন্তু তা হয়নি। টিপাইমুখ বিতর্ক এড়ানোর জন্য সরকার এটি করলে ভালো করতো। আরো একটি কথা, টিপাইমুখ ব্যর্থ সফর শেষে প্রতিনিধি দল ঢাকায় ফিরে এসেছিল। গত এক বছরে আমরা আর টিপাইমুখ নিয়ে কিছু শুনিনি। ভারত আমাদের তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করলেও, সংসদীয় প্রতিনিধি দলের পক্ষে তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করাও সম্ভব ছিল না। তবে আমার বিশ্বাস, ভারত ওই প্রতিনিধি দলকে আলাদা কারিগরি তথ্য ও উপাত্ত দেয়নি। এদিকে গত (২০ জুলাই ২০১০) সংবাদপত্রে প্রাকশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতিকারক কোনো পদক্ষেপ ভারত নেবে না। টিপাইমুখে কোনো সেচ প্রকল্প হবে না। এমন কথাও আমাদের জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যে আমরা কতটুকু আশ্বস্ত হতে পারি? গঙ্গার পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অতীতে ভারত আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলে ভিন্ন কথা। গত ৫ জুলাই (২০১১) ছাপা হওয়া একটি সংবাদই এটা বোঝার জন্য যথেষ্ট। ওই সংবাদে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া গঙ্গা পানি চুক্তির পর এ বছর পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ সবচেয়ে কম। ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে আগেভাগেই পানি প্রত্যাহার ও ১ জানুয়ারি থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন ভারতীয় মন্ত্রীর কথায় আমরা আস্থা রাখি কিভাবে? আমরা কখনো বলিনি টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে তা সেচকালে ব্যবহার করবে। ভারতের কাছারে বারাকের উজানে যুগেরতাল এলাকায় ভারত নির্মাণ করছে একটি ব্যারাজ, যার মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে অথবা সংরক্ষণ করে এ অঞ্চলের সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করবে। ভারতীয় মন্ত্রী কিন্তু যুগেরতাল প্রকল্পের ব্যাপারে কিছু বলেনি। আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই বাংলাদেশ সরকার যুগেরতাল ব্যারাজ নির্মাণের ব্যাপারটি নিয়ে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন কি-না কখনো? না হলে, আলোচনাটা এখন জরুরি।
সংসদের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের টিপাইমুখ পরিদর্শনের পর এক বছর পার হয়েছে। এরই মধ্যে এলো প্রেমাচান্দের বক্তব্যটি। এখন রাজ্জাক সাহেব বিষয়টি কীভাবে নেবেন, আমি জানি না। তবে তিনি বাংলাদেশি হাইকমিশনের মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। তিনি সংসদে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন বটে। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা জানতে চাই, স্থায়ী কমিটির মূল্যায়ন কি? আমরা দেখতে চাই টিপাইমুখ গঙ্গা যুগেরতাল ব্যারাজের 'ডিটেইলড প্ল্যান'_ যা ভারতীয় পক্ষ আমাদের সরবরাহ করবে এবং আমাদের বিশেষজ্ঞরা এই 'ডিটেইলড প্ল্যান' নিয়ে পর্যালোচনা করবেন। ফারাক্কা চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে দিলি্ল আমাদের নদীগুলোর উজানে কোনো রকম স্থাপনা তৈরি করবে না। এখন আমাদের প্রশ্ন, ভারত এই চুক্তি সংযন করছে কি না? টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আমাদের শঙ্কা, আরেকটি ভারতীয় পক্ষকে অবহিত করেছি কি-না তাও আমরা জবাব রাজ্জাকের মুখ থেকে জানতে চাই। আসলে ভারতের 'কূট-কৌশলের' কাছে আমরা শক্ত হাতে দাঁড়াতে পারি না। ভারত মুখে বলে এক কথা। কাজ করে উল্টোটি। সারা বিশ্বেই বড় বড় বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক এ ধরনের প্রকল্পে সাধারণত অর্থায়ন করে না। বিশ্বজনমতকে আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। ভারতে অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যারা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে। তাদের সঙ্গেও বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ করা যায়। মনিপুরের পরিবেশবাদীদের সঙ্গেও আমরা সম্পর্ক বাড়াতে পারি। এ কাজগুলো সরকার যদি না করে, তাহলে তা করতে হবে বিরোধী দলকে, সেই সঙ্গে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক,
অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

হরতালের রাজনীতি

বাংলাদেশ আবার হরতালের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। গত ৬ ও ৭ জুলাই চারদলীয় জোটের হরতাল পালন করার পর, ১০ ও ১১ জুলাই হরতাল পালিত হলো কয়েকটি ইসলামিক দলের আহ্বানে। বিএনপি এই হরতাল সমর্থন করেছিল। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর থেকে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বাদ ইত্যাদি নানা কারণে চারদলীয় জোট তথা ইসলামিক দলগুলো এ হরতাল আহ্বান করেছিল। গত ৬ জুলাই হরতাল চলাকালে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক প্রহৃত হয়েছেন পুলিশ বাহিনী দ্বারা। টিভি পর্দায় এ দৃশ্য যারা দেখেছেন, তারা মর্মাহত না হয়ে পারবেন না। একজন জনপ্রতিনিধিকে একজন পুলিশ অফিসার এভাবে 'শার্টের কলার ধরে টানবেন' 'শুয়োরের বাচ্চা' বলে গালি দেবেন, তা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনযোগ্য নয়। 'ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি' অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের অবস্থান অনেক ঊধর্ে্ব। তিনি ভিআইপি। রাষ্ট্র তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি বিরোধী দলে থাকতে পারেন, কিন্তু তাই বলে তার প্রায় সন্তানতুল্য একজন এসি তাকে গালাগাল করবেন, এটা শোভন নয়, বরং সব সংসদ সদস্যের জন্য এ ঘটনা অপমানজনক। একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দেবে, আমরা তা জানি না। কিন্তু টিভি প্রতিবেদনগুলো সাক্ষী সেদিন অভিযুক্ত দুই পুলিশ অফিসার সংসদ এলাকায় কী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তদন্তের স্বার্থেই এদের দুজনকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা উচিত। নচেৎ এরা তদন্তে প্রভাব খাটাতে পারেন।
স্পষ্টতই বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে যে সমঝোতার প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থান এখন মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে সংসদে এসে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সেই সুযোগ এখন আর নেই। সংসদে এসে সংবিধান নিয়ে আলোচনা করার এখন কোনো অর্থ নেই। সংবিধান ইতিমধ্যে সংশোধিত হয়ে গেছে। এখন সংসদে আলোচনা করেও সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা যাবে না। তবে সংবিধান নয়, বরং আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি সমঝোতায় আসা সম্ভব। অতীত থেকে আমরা এতটুকুও শিক্ষা নেইনি। দেয়ালের লিখন থেকেও আমরা এতটুকু শিখিনি। যারা সরকারে থাকে, তাদের কিছুটা সহনশীল হতে হয়। বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। গণতন্ত্রের এই স্পিরিট আমাদের দেশে কার্যকর হচ্ছে না। তাই অবশ্যম্ভাবীভাবে ফিরে আসছে ২০০৬ সালের অক্টোবরের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি (২)। আজ আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে না পারেন, তাহলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। তাই একটা সমঝোতা জরুরি।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে সামনে রেখেও এই সমঝোতা সম্ভব। সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে না। নির্বাচন পরিচালনা করবে একটি নিরপেক্ষ কাউন্সিল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই নিরপেক্ষ কাউন্সিল গঠিত হতে পারে। বিকল্প হিসেবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির (সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি নন) নেতৃত্বে একটি 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠিত হতে পারে, যারা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এই 'এলডার্স কাউন্সিল' তিন অথবা পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট হতে পারে। দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিরাই এ কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ-সংক্রান্ত একটি বিল সংসদে উপস্থাপিত হতে পারে। শরিক দলের কোনো সদস্য এ বিল উপস্থাপন করতে পারেন। সরকার ওই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে পারে। এতে করে সরকারের সৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত হবে। কিংবা বিরোধী দল হিসেবে সংসদে উপস্থিত এলডিপি সদস্য কর্নেল অলি আহমদও এ ধরনের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন। অথবা স্পিকার নিজ উদ্যোগে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনার একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি সরাসরি বিএনপির সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারেন। এতে বরফ গলতে পারে। বিকল্প হিসেবে প্রেসিডেন্ট নিজেও একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। সাংবিধানিকভাবে তার কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু তিনি তো জাতির অভিভাবক। সংকট মুহূর্তে তার একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা জাতি আশা করতেই পারে। আমার বিশ্বাস এর যে কোনো একটি সমঝোতার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
আমি সরকারের ভূমিকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। সরকারকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু সম্পন্ন করা ঠিক নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে কেউ কখনো জোর করে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। বাংলাদেশের ৪০ বছরের ইতিহাস অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এরশাদ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন বটে, কিন্তু গণঅসন্তোষ তাকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়নি। বেগম জিয়া ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অথচ প্রথমদিকে তিনি রাজি ছিলেন না। পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল। সেদিন শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ব্যাপারে ছিলেন সোচ্চার। অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস। যিনি একদিন নিজেকে দাবি করতেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে, তিনি নিজে এখন এ ব্যবস্থার বিরোধী। শেখ হাসিনা যদি আজ বিরোধী দলে থাকতেন, তিনি কী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অবসান চাইতেন? এটা একটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
সংসদে সরকারের 'ব্রুট মেজরিটি' রয়েছে। এই ব্রুট মেজরিটি অনেক সময় দলের জন্য মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। ব্রুট মেজরিটির কারণে সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে বলেই আমার ধারণা। সরকারের যদি ব্রুট মেজরিটি না থাকতো, তাহলে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দু'বার চিন্তা করতো। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এখন একটা বাস্তবতা। ভালো হয়েছে কী মন্দ হয়েছে, এই বিতর্কে না গিয়ে জটিলতা না বাড়িয়ে বিরোধী দলের সহযোগিতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, এটাই বড় প্রশ্ন এখন। হার্ড লাইনে গিয়ে সমস্যার যেমনি কোনো সমাধান করা যায় না, ঠিক তেমনি গণতন্ত্রও বিনির্মাণ করা যায় না। পরপর হরতাল পালন করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের যদি উপলব্ধি হয়, তাতেই জনগণের মঙ্গল নিহিত। সবচেয়ে বড় কথা, এ মুহূর্তে বিরোধী দলকে আস্থায় নিতে হবে। বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পেটানোর ঘটনায় অভিযুক্ত দুই পুলিশ অফিসারের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া যাবে না। আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, এডিসি হারুন ও এসি বিপ্লব একজন এমপিকে যেভাবে পেটালেন, যেভাবে অপমান করলেন, পিটিয়ে অচেতন করে রাস্তায় শুইয়ে রাখলেন, এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশ ছিল না। এই দুই অফিসার নিজ উদ্যোগে এ কাজটি করেছেন। এটাকে ধামাচাপা দেয়া ঠিক হবে না। শুভবুদ্ধির কোনো মানুষ এ বর্বরোচিত হামলাকে সমর্থন করবে না। এ ঘটনা আবারো প্রমাণ করলো পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক ক্যাডাররা রয়ে গেছেন, যারা 'পুলিশের পোশাক'কে ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক স্বার্থে। একজন অফিসার, তিনি পুলিশে থাকুন কিংবা প্রশাসনে থাকুন, অতীতে তারা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। সেটা কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ তিনি যদি তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ভুলে গিয়ে না থাকেন। সুবিধা নেয়ার জন্য তারা এ কাজটি করেন। সরকারি চাকরিতে থেকেও তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। এটা সুষ্ঠু পুলিশ প্রশাসনের জন্য ভালো নয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করতে পারবেন। যে ঘটনা ঘটলো, জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য কলঙ্ক। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিও এতে নষ্ট হয়েছে। একমাত্র দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদানের মধ্যে দিয়ে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।
বাংলাদেশে যে হরতালের রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা দেশটির প্রবৃদ্ধিকে আরে শ্লথ করে দেবে। বারবার হরতালের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্পে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে রফতানিতে যে গতি আসবে না, তা বলাই বাহুল্য। এমনিতেই সরকারের গত আড়াই বছরের 'পারফরম্যান্স' ভালো নয়। সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমাতে পারেনি। ওএমএসের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বেকার ও ছদ্মবেকারের সংখ্যা বাড়ছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে যারা জড়িত, তাদের বিচার করা যায়নি। প্রায় ৩৩ লাখ খুদে বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু যারা কোটি কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে বাজার থেকে তুলে নিলেন তারা দিব্যি চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। সরকার এদিকে যদি দৃষ্টি না দেয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে সরকারের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। বারেবারে হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে একটা প্রশ্নই সামনে চলে এলো, তা হচ্ছে_ একটা সমঝোতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আর সমঝোতার উদ্যোগটি নিতে হবে সরকারকেই।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সিদ্ধান্তটি এখন সরকারের

‘রাজনীতির বল’টি এখন সরকারের কোর্টে। গত ১৩ জুলাই ৮ ঘণ্টার গণঅনশনের পর প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী ‘রাজনীতির বল’টি ঠেলে দিলেন সরকারের কোর্টে। পর পর দু’সপ্তাহে টানা হরতালের পর গণঅনশন কর্মসূচিতে তিনি ঘোষণা করলেন ঈদের পর আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এর অর্থ তিনি সরকারকে কিছুটা সময় দিলেন। রমজানের আগে তিনি ‘নতুন কর্মসূচি’ দিতে পারতেন বটে। কিন্তু তা না দিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবার কিছুটা সময় দিলেন। সরকার অতি দ্রুততার সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিতর্কের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি গত ৮ জুন সংবিধান সংশোধনের জন্য ৫১ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করার মাত্র ১২ দিনের মাথায় তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও দ্রুততার সঙ্গে সংসদে পাস করিয়ে নেয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে নানা কথা উঠেছে। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই এই সরকার বাতিল করে দেয়নি, বরং সংবিধানের মূল নীতিতে (৮.১ ক) যেখানে ছিল ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’—তাও বাতিল করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী যেখানে সমাজতন্ত্র উঠে গেছে, সেখানে নতুন করে সমাজতন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয় বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী অন্তর্ভুক্ত করে নতুন এক সঙ্কট সৃষ্টি করা হলো এখন। সংবিধানে একদিকে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রাখা হয়েছে বটে, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা পরস্পরবিরোধী। এর মাধ্যমে একটা জগাখিচুড়ি সৃষ্টি করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের কারণ যেটি, তা হচ্ছে সংবিধানে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংবিধানে এই ধারার অন্তর্ভুক্তির এখন ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে এবং যে কাউকে সংবিধানের এই ধারামতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া যেতে পারে।
সংবিধানে এই আমূল পরিবর্তনে বিরোধী দলের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি দেশের বুদ্ধিবীজীদেরও কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। অনেকটা দলীয় তথা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। ফলে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি তথা চার দলের বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকগুলো ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি করবেন। এ ব্যাপারে কারোরই আপত্তি নেই। যারা গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার হোক। রুয়ান্ডার যুদ্ধাপরাধীদের যদি বিচার হতে পারে, যদি বসনিয়ার কসাই মিলোসেভিচকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে পারে। কিন্তু মুখচেনা কিছু ব্যক্তির বিচার করলে তো পুরো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিচার তার আমলেই সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ৩ জুলাই গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এই মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের বিচার করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েক লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এদের পরিবার ও সমর্থকদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। পত্রপত্রিকায় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের নাম-ধাম এসেছে। এদের কেউ কেউ সরকারি দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ১৯৯৬ সালে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির সময়েও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। অভিযুক্তদের কারোরই সেদিন বিচার হয়নি। আজও অভিযুক্তদের যদি বিচার না হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য তা ভালো কোনো খবর নয়। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে।
সরকার সংবিধান সংশোধনীর মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেসব বিষয়, সেগুলোর ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি এতটুকুও। অথবা গুরুত্ব দিলেও এ ব্যাপারে অগ্রগতি হয়েছে কম। যেমন খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ১১৮ দশমিক ৩৬ ভাগ ও ১৪৬ দশমিক ১৫ ভাগ। এটা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের দেয়া তথ্য। ২০১০-১১ অর্থবছরের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। সার ও ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার এখানে ব্যর্থ।
এরই মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। ২০১৫ সালে এমডিজির বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নের মুখে। যে রেমিট্যান্স নিয়ে আমাদের এত গর্ব, সেখানে আশার কোনো খবর নেই। রেমিট্যান্স আয়ের উচ্চপ্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা শ্লথ হয়েছে। গত অর্থবছরে যে অর্থ এসেছে (১ হাজার ১৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার), তার প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরে (২০০৯-১০) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ শতাংশের বেশি। এর অর্থ পরিষ্কার, শ্রমবাজার খোঁজার ব্যর্থতা। বাংলাদেশের জনবল রফতানির মূল বাজার মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে (কিন্তু নেপালের মতো দেশের সম্ভাবনা সেখানে বাড়ছে কোনো কোনো দেশে)। দেশে বেকার সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু সরকারের কোনো বড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এমনিতেই জ্বালানি সঙ্কটের কারণে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়েনি। নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুত্ সংযোগও দেয়া সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুত্ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬৩০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ছয় বছর আগে ২০০৪ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন হতো, এখনও সেই পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে (কালের কণ্ঠ, ৫ জুলাই)। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো তা বলা যাবে না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন পুলিশের জন্য আরও ১০টি আইজি পদ চাচ্ছেন, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। শুধু এক মাসে ২৬ শিশু ও ১২ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সকালের খবর গত ৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে। আর জুন মাসে ঢাকা শহরের একাধিক সোনার দোকান ও বাসায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ভূমিকা আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হলো যখন বিএনপির সংসদীয় দলের চিফ হুইপ পুলিশের পিটুনিতে আহত হলেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন পুলিশের পিটুনির শিকার হন, তখন এর চাইতে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। পুলিশের পিটুনির পরও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চিকিত্সার জন্য তিনি এখন বিদেশে।
সরকারের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ একাধিক। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আসছেন সেপ্টেম্বরে। এসে গেলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আসবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সোনিয়া গান্ধী স্বয়ং। স্পষ্টতই বোঝা যায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন দিকে টার্ন নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমস্যা রয়েছে অনেক। গত ৪০ বছরেও সে সব সমস্যার সমাধান হয়নি। আমরা ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু বিদ্যুত্ কবে আসবে, আমরা জানি না। ‘হাই প্রোফাইল’ ভিজিট ভালো। কিন্তু আমরা পদ্মায় পানি চাই, চাই তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার। চাই বিএসএফের হত্যা বন্ধ। চাই ছিটমহলগুলো ফেরত। ভারতকে ‘বন্ধু’ ভাবতে চাই। কিন্তু এই বন্ধুত্ব হতে হবে একপক্ষীয় নয়—দ্বিপক্ষীয়, প্রয়োজনে বহুপাক্ষিক। শেখ হাসিনার জন্য এটা আরেকটা চ্যালেঞ্জ। অতিমাত্রায় ভারতনির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ‘ইমেজ সঙ্কট’ সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনীতি এক অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সরকারের কঠোর মনোভাব সঙ্কটকে আরও জটিল করেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বিরোধী দলের উত্থাপিত দাবি-দাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। বিশেষ করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে পরিবর্তন আনাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কীভাবে পরিবর্তন আনা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা যায়, এ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে ‘সংলাপ’ ওপেন করা জরুরি। বেগম জিয়া এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন। তার ওই বক্তব্যকে বিবেচনায় নিলে একটা সমাধান সম্ভব। কিন্তু তা না করে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে মামলা দিয়ে যদি বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়, তা সরকারের জন্য খুব ভালো হবে বলে মনে হয় না। কেননা, সংবিধান একটি দেশের, কোনো দলের নয়। দলীয় বিবেচনায় সংবিধান সংশোধন করা ঠিক নয়। সরকার ও বিরোধী দল নিয়েই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে যে ‘গণতন্ত্র’, তাকে কোনোমতেই ‘গণতন্ত্র’ বলা যাবে না।
বেগম জিয়া ঈদের পর বড় ধরনের গণআন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটাকে বিবেচনায় নিতে হবে। হরতাল, লাগাতার হরতাল, লংমার্চ ইত্যাদি কর্মসূচি আসছে। এসব কর্মসূচি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও উচ্চতায় পৌঁছে দেবে না। সরকারের কঠোর মনোভাব দেশকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। আর এর দায়ভার নিতে হবে সরকারকেই। লাগাতার হরতাল ও গণঅনশনের পর বিএনপি একটা মেসেজ পৌঁছে দিয়েছে—আর তা হচ্ছে অতিদ্রুত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের উদ্যোগ নেয়া। যে দ্রুততার সঙ্গে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল, একই ধরনের দ্রুততার সঙ্গে সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী আনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা এবং ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানে ফিরিয়ে আনা।
দৈনিক আমার দেশ, রোববার ১৭ জুলাই ২০১১, ০২ শ্রাবণ ১৪১৮, ১৩ শাবান ১৪৩২ হিজরী
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com