রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় যেসব বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া জরুরি

যুক্তরাষ্ট্রে আমরা যখন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কনভেনশন নিয়ে আলোচনায় মগ্ন, ঠিক তখনই এলো ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানের খবর। একটি টিভি চ্যানেল স্কাইপিতে আমন্ত্রণ জানাল এ বিষয়ে কথা বলার জন্য। বেশ কিছুটা সময় আলাপ হল বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গিদের আস্তানায় অভিযানের খবর এলো এমন একসময়, যখন সিরিয়া-ইরাক ছাড়াও বিশ্বের বেশ কটি দেশের বড় শহরে জঙ্গি হামলা হয়েছে, যেখানে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের সংশ্লিষ্টতার দাবি উঠেছে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে জঙ্গিরা গির্জায় প্রবেশ করে ধর্মযাজককে গলা কেটে হত্যা করেছে। এর আগে এই ফ্রান্সেরই নিস শহরে (১৪ জুলাই) এক ট্রাকচালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনা ও গুলিবর্ষণে মারা গেছেন ৮৪ জন সাধারণ মানুষ। ১৮ জুলাই মিউনিখ শহরে জনৈক বন্দুকধারীর গুলিতে ১০ জন মারা গেলে এর সঙ্গে আইএস-সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হলেও আন্সবাক শহরে উন্মুক্ত সঙ্গীত উৎসবে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অভিযুক্ত আইএস। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মারা গেছেন ১৩ জন সাধারণ মানুষ। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে আইএসের। এর আগে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডে, তুরস্কের ইস্তান্বুল বিমানবন্দরে, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জার্কাতায় কূটনৈতিক পাড়ায়। প্রতিটি ঘটনায় ঘুরেফিরে একটি নামই আসছে- আইএস। আইএস এখন এক ধরনের ‘আতংকের’ নাম।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে মুসলমানদের এখন তীর্যক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। খোদ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন একাধিকবার। এতদিন তিনি বলেছেন মুসলমানদের নিয়ে। এবার ফ্রান্স ও জার্মানিতে সংঘটিত হওয়া সন্ত্রাসী ঘটনার পর আক্রমণ করলেন ফ্রান্স আর জার্মানির নেতৃবৃন্দকে। বললেন, এ জন্য তারা নিজেরা দায়ী! ট্রাম্প বোঝাতে চাইছেন এ দুটো দেশে বারবার সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে। কারণ তারা সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। আগামীতে তিনি এই দুটো দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন! কী ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের। শুধু মুসলমানবিদ্বেষীই তিনি নন, এখন তিনি ইউরোপবিদ্বেষীও হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। আর তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে আইএস। সুযোগ করে দিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কট্টরপন্থীদের মুসলমানবিরোধী একটা অবস্থান নিতে।

এমনই এক পরিস্থিতিতে আমরা দেখলাম ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানের খবর। এটা কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ছিল না, ঢাকার আর্টিজান বেকারির হামলার মতো। তাই আইএসের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি থাকবে না বলেই আমার ধারণা। তবে এই হামলা ও ৯ জন জঙ্গির মৃত্যুর খবর অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এক. আইএস বলি আর জেএমবি বলি, জঙ্গিরা যে বাংলাদেশে তৎপর, তা তারা প্রমাণ করল। হলি আর্টিজান ঘটনার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে কল্যাণপুরে একটা আস্তানা গড়ে তোলার বিষয়টি প্রমাণ করে জঙ্গিরা একটা বড় ধরনের ‘হামলার’ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোয়েন্দারা সক্রিয় থাকায় তাদের সেই তৎপরতা বাস্তবে রূপ নেয়নি সত্য। কিন্তু আশংকা থেকেই গেল, তারা আবার অন্যত্র সংগঠিত হতে পারে এবং যে কোনো স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। কলকাতার একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, ঢাকার আশপাশে জঙ্গিরা ১৯টি আস্তানা গড়ে তুলেছে। কল্যাণপুরের ঘটনা প্রমাণ করল ওই সংবাদের পেছনে সত্যতা আছে। এখন গোয়েন্দাদের দায়িত্ব ঢাকার আশপাশে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য যেসব আবাসস্থল গড়ে উঠেছে (বাড্ডা, বাসাবো, আদাবর ইত্যাদি) সেসব জায়গায় গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো।

দুই. পুলিশের পক্ষ থেকে অনেক আগেই প্রতিটি থানাধীন এলাকায় বসবাসরতদের ডাটাবেজ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আমার ধারণা, সেই কার্যক্রমে কিছুটা হলেও স্থবিরতা এসে গেছে। না হলে কল্যাণপুরের মতো একটি নিুমধ্যবিত্ত এলাকায় একটি বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য দেবে না, এটা কী করে সম্ভব হল? এ ঘটনা প্রমাণ করল ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য নেয়ার উদ্যোগটি সঠিক ছিল। প্রাপ্ত তথ্যগুলো দ্রুত বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তিন. আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখন গুরুত্ব দিতে হবে নতুন আবাসিক এলাকাগুলোর দিকে, যেখানে শত শত মেস তৈরি করে সীমিত আয়ের মানুষের বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছে কিছু বাড়িওয়ালা। জঙ্গিরা এসব জায়গা বেছে নিচ্ছে। সাধারণত উচ্চমধ্যবিত্তের জন্য যেসব আবাসিক এলাকা রয়েছে (গুলশান, ধানমণ্ডি), সেখানে উচ্চ ভাড়ার কারণে জঙ্গিরা বাসা ভাড়া নেবে না। তাদের টার্গেট থাকে নিুমধ্যবিত্ত এলাকার দিকে।

চার. পুলিশের পক্ষে প্রতিটি বাসায় যাওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় মুরুব্বিদের সঙ্গে নিয়ে একটি ‘জঙ্গিবিরোধী সেল’ গঠন করা যেতে পারে। কিন্তু এতে যদি ‘রাজনীতি’ ঢুকে যায়, যদি বিরোধীদলীয় কর্মীদের জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়(!), তাহলে এটা কোনো ফল দেবে না।

পাঁচ. যারা নিয়মিত মসজিদে নামাজ আদায় করে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ, তাদের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে তাকালে তাও কোনো ফল দেবে না। যারা নিয়মিত মসজিদে যায়, তারা মৌলবাদী(!) এটা আমি বিশ্বাস করি না। ইসলামের সঙ্গে জঙ্গিবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ইসলামের নামেই এই জঙ্গিবাদ বিস্তার হচ্ছে। এবং আমি অনেক তথ্য যাচাই করে দেখেছি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং জঙ্গি তৎপরতা চালাতে গিয়ে মারা গেছে, তারা কেউই ব্যক্তিগত জীবনে নামাজি ছিল না। ধর্ম-কর্মও করত না। ফলে যারা নিয়মিত নামাজ আদায় করে, তাদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখলে আমরা ভুল করব।

ছয়. হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া এবং এখন কল্যাণপুর প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে উচ্চশিক্ষিত, ধনীর দুলাল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কল্যাণপুরের ঘটনায় যেসব জঙ্গি নিহত হয়েছে, আমার ধারণা, তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত তরুণরাও আছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের দিকে নজরদারি বাড়ানোটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেটা করা প্রয়োজন তা হচ্ছে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সরকারি ও বেসরকারি) একটি সেল গঠন করতে হবে, তাদের কাজ হবে অনিয়মিত ছাত্রদের দিকে নজরদারি বাড়ানো। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ সেল গঠন করা হয়েছিল। সেই আদলে একটি জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা যায়। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে করণীয় কী, সে ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। ‘লোকদেখানো’ এ ধরনের সভার আয়োজন করে পত্রিকায় সংবাদ হওয়া যায় বটে; কিন্তু তাতে মূল সমস্যা যা ছিল, তা রয়েই যায়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন দূরদর্শিতা আর দক্ষতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আজ অনেক। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র মাসের পর মাস ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার পরও ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না কখনোই।

সাত. জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে একটি অর্থের প্রশ্ন জড়িত। কারা জঙ্গিদের অর্থ জোগায়, কীভাবে তারা বিস্ফোরক সংগ্রহ করে, তা জানা জরুরি। বিদেশ থেকে অর্থ আসতে পারে। অভ্যন্তরীণভাবেও অর্থের জোগান থাকতে পারে। কোনো কোনো এনজিওর নামেও অর্থ আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানোটা খুবই জরুরি।

আট. টিভি টকশোতে আলোচনায় কোনো কোনো বক্তার মুখে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের কথা আমি শুনেছি। অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছেন, জঙ্গি কার্যক্রমের একটি মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের পরিবর্তন। এটি একটি ভুল ব্যাখ্যা। হলি আর্টিজানে ১৭ জন বিদেশীকে হত্যা করে কখনও কোনো দেশে সরকার পরিবর্তন করা যায়নি। বাংলাদেশেও জঙ্গিদের টার্গেট সরকার পরিবর্তন নয়, বরং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘ইসলামী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করা। বৃহত্তর পরিসরে আইএস যে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, সেই আদর্শেই স্থানীয় জঙ্গিরা ‘মোটিভেটেড’ বা অনুপ্রাণিত হয়েছে। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, এসব বিভ্রান্ত তরুণদের ভুলগুলো আমরা ভাঙাতে পারিনি।

নয়. তরুণদের একটা অংশের জঙ্গিবাদী আদর্শ গ্রহণ করার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। আমরা ফ্রান্সের দৃষ্টান্ত থেকে দেখেছি, সেখানে নর্থ আফ্রিকা থেকে আসা ইমিগ্র্যান্টরা, যারা পারিবারিকভাবে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার পরও ‘বেকারত্ব’ ও ‘ছদ্ম বেকারত্ব’ তাদের জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন বেকারত্ব তরুণ সমাজের একটা অংশকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই সরকার একমাত্র চাকরিদাতা নয়। আমাদের দেশে বেসরকারি খাত বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল, তা হয়নি। উপরন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক সব ত্রুটি রয়েছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থা বেশি মাত্রায় ‘রাজনীতিনির্ভর’। ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ একশ’র ওপর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে ‘সার্টিফিকেট’ বিক্রির উদ্দেশ্যই প্রধান। ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতে করে বাড়ছে শিক্ষাবৈষম্য। এই বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ আমি কখনও দেখিনি। দক্ষ নেতৃত্বের অভাবে যা হয়, তা-ই হয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের কোনো ‘ভিশন’ নেই। তারা সবাই যেন সেখানে ‘চাকরি’ করেন! তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র বিবিএ’র একখানা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে যখন ‘বেকার’ থাকে, তখন তার মধ্যে হতাশা আসতে বাধ্য। আর এ সুযোগটিই নেয় ‘অদৃশ্য শক্তি’। এরা হতাশাগ্রস্ত তরুণদের ‘হুর-পরী’দের কথা শোনায়। রিক্রুট করে। ২৪-২৫ বছরের একটি যুবকের এতে করে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের দুর্ভাগ্য, এসব তরুণকে যারা রিক্রুট করে সেসব ‘অদৃশ্য শক্তি’কে আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি। এখানেই বোধহয় আমাদের বড় ত্রুটি। রাজনৈতিক বিবেচনায় কখনও কখনও এসব ‘অদৃশ্য শক্তি’কে চিহ্নিত করা হয় বটে, কিন্তু ‘মূল শক্তি’ থেকে যায় আলোচনার বাইরে।

দশ. আমাদের দেশে ‘তাবলিগ জামাত’-এর নাম করে বিশেষ কয়েকটি দেশ থেকে প্রতিবছর প্রচুর মুসল্লি এ দেশে আসেন এবং থেকে যান অবৈধভাবে। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে আসা নাগরিকদের দিকে দৃষ্টি দেয়া এখন প্রয়োজন। এসব অঞ্চল থেকে প্রচুর লোক আইএসে যোগ দিয়েছে। তুরস্কের ইস্তান্বুলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় এরা জড়িত ছিল। আমি ওসব অঞ্চল থেকে আসা মুসল্লিদের সঙ্গে আমাদের তরুণদের ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে দেখেছি। এদের দিকে নজরদারি বাড়ানো দরকার। এদের দিয়ে অর্থ সরবরাহ, জঙ্গি তৎপরতা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি দেয়া হয়। আপাতত সীমিত সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দেশের মুসল্লিদের জন্য ‘ভিসা সীমাবদ্ধতা’ থাকা উচিত। কিংবা তাদের দেয়া ঠিকানা, তদের অবস্থান, কর্মকাণ্ড মনিটরিং করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা আছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।

এগারো. একজন তরুণের পক্ষে বিস্ফোরক ব্যবহার, স্থানীয় গ্রেনেড তৈরি কিংবা অস্ত্র ব্যবহার করার কথা নয়। এর অর্থ, এদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্রশিক্ষণটা হয়েছিল কোথায়? এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। হলি আর্টিজানে যারা হামলা চালিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কোনো কোনো জেলায় কিছুদিন থেকেছে। এর অর্থ কী? পাঠক, ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ওই বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতীয় গোয়েন্দারা জানতে পারে এর সঙ্গে বাংলাদেশের জেএমবি জড়িত। এর পরপরই জানা গেল পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়টি সীমান্তবর্তী জেলায় জেএমবির ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ফলে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশী তরুণদের রিক্রুট করে কৌশলে সীমান্ত অতিক্রম করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের ওইসব অঞ্চলে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতরে। এ বিষয়টির দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যাপারটি জরুরি হয়ে পড়েছে।

হলি আর্টিজান, শোলাকিয়ার পর কল্যাণপুরের ঘটনায় অন্তত একটি বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট- জেএমবির একটা অংশ ওই অপতৎপরতা তথা জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে বাইরের একটি ‘শক্তি’র যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে একটি ভীতি সৃষ্টি করাই হচ্ছে তাদের লক্ষ্য। এতে করে তারা আইএসের আরও কাছাকাছি যেতে চাইছে। জেএমবিই মূলত আইএসের নাম ব্যবহার করছে এবং ‘বোকো হারামের’ (নাইজেরিয়া) মতো আইএসের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করছে। আমাদের গোয়েন্দারা কল্যাণপুরের ঘটনায় সফল হয়েছেন। কিন্তু জঙ্গি দমনে যেতে হবে বহুদূর। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য।

ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র

Daily Jugantor
31.07.2016



যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ত্রুটি!

কথাটা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বয়ং। ২২ জুলাই ডালাসে পাঁচজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের হত্যাকা-ে আয়োজিত এক স্মরণ সভায় তিনি বলেছেন, 'The deepest fault lines of our democracy' (ভোয়া, ১৩ জুলাই)। যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত বিদ্বেষ যেভাবে বাড়ছে, কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বিদ্বেষ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা উল্লেখ করেই ওবামা বলেছেন, এটাই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বড় ত্রুটি। একজন প্রেসিডেন্ট যখন প্রকাশ্যে এ ধরনের কথা বলেন, যখন বলেন এত বছর পরও এ জাতিগত দ্বন্দ্বের কোনো অবসান হয়নি, তখন বুঝতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের গণতন্ত্র নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তার নিজের সংস্কৃতিতে যে বড় ত্রুটি, তা সারাতে পারেনি। অতি সম্প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম বিদ্বেষী জনমতও বাড়ছে। আর বলতে দ্বিধা নেই, মুসলিম বিদ্বেষকে উসকে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, তিনি মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেবেন! তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দীর্ঘদিন পর কট্টরপন্থী আমেরিকানরা এমন একজন ‘ব্যক্তি’কে পেয়েছেন, যিনি প্রয়োজনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনা করতে পারেন! ১৮ জুলাই ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টি কনভেনশনে চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন। চলতি জুলাইয়ে পাঁচজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছিল ডালাসে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ মিকা জেভিয়ার জনসন তাদের হত্যা করে। এর আগে মিনেসোটা ও লুসিয়ানায় দুইজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে হত্যা করেছিল শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। ধারণা করা হয়, প্রতিশোধ নিতেই জনগণ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের হত্যা করেছিল। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব বেড়েছে। এমনকি একাধিক জরিপে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় চলতি ওবামা প্রশাসনের আমলে এ জাতিগত দ্বন্দ্ব বেশি বেড়েছে। এ জাতিগত দ্বন্দ্ব যখন অনেকের জন্য চিন্তার কারণ, ঠিক তেমনি এর পাশাপাশি মুসলিম বিদ্বেষও বেড়েছে। পাঠক, স্মরণ করতে পারেন ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবে সন্ত্রাসী হামলার কথা। ওই হামলায় মারা যান ৪৯ জন সাধারণ মানুষ। একজন আফগান-আমেরিকান ওমর মতিন এ সমকামী ক্লাবে হামলা চালিয়ে সবাইকে হত্যা করেছিলেন। ওমর মতিন একজন মুসলমান এবং হামলার আগে আইএসের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর আইএসবিরোধী একটা জনমত এখানে আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওমর মতিন সমকামীও ছিলেন। সমকামীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটে এক ধরনের ‘অ্যাপ’ ব্যবহার করে। ওমর মতিন তাই করতেন। টিভিতে দুইজনের বক্তব্য আমি দেখেছি, যারা বলেছেন ওমর মতিন তাদের সঙ্গে ‘সমকামী সম্পর্ক’ স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। সালাফিস্টরা সাধারণত মুখম-লে দাড়ি রাখেন। এটা এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ওমর মতিন ছিলেন ‘ক্লিন শেভড’। সালাফিস্টরা সাধারণত শিয়া সম্প্রদায়ভুক্তের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর (লেবানন) সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না ধর্মীয় আনুগত্যের কারণে। কিন্তু ওমর মতিনের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, তিনি কোনো একসময় হিজবুল্লাহ সংগঠনের ব্যাপারে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সালাফিস্টরা সাধারণত তাদের স্ত্রীদের ধর্মীয় বিধান মতে পর্দাপ্রথা তথা হিজাব পরতে ‘বাধ্য’ করেন। কিন্তু মতিনের প্রথম স্ত্রী সিতোরা ইউসুফী এবং দ্বিতীয় স্ত্রী নূর সালমানÑ কেউই হিজাবি ছিলেন না। তিনি তাদের পর্দা করতেও বাধ্য করেননি। ধর্ম সম্পর্কে ওমর মতিনের জ্ঞান ছিল সীমিত। শিয়া-সুন্নির পার্থক্য তিনি জানতেন না। নিয়মিত মসজিদে যেতেন কিংবা নামাজ আদায় করতেন, এমন তথ্যও পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে কট্টরপন্থী ইসলামিক গ্রুপগুলোর সঙ্গে তিনি সম্পর্ক রক্ষা করতেন, এমন তথ্যও এফবিআই’র পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। তবে এফবিআই দুই-দুইবার তার ব্যাপারে তদন্ত করেছে, এমন তথ্য আমরা পেয়েছি এবং দুই-দুইবারই এফবিআই তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। তাহলে এ হত্যাকা-ের পেছনে কী মোটিভ কাজ করেছিল? তিনি কী হতাশাগ্রস্ত কিংবা বিকারগ্রস্ত ছিলেন? উগ্র মানসিকতার অধিকারী তিনি ছিলেন? প্রথম স্ত্রীকে তিনি পেটাতেন, এটা স্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন। যে কারণে তার মাত্র ৪ মাসের বৈবাহিক জীবন ছিল সিতোরা ইউসুফীর সঙ্গে। তাহলে শুধু রাগ, ক্ষোভ আর হতাশা থেকেই কী তিনি এ হত্যাকা- সংঘটিত করেছিলেন? এটাও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। শুধু সমকামী বিদ্বেষ থেকে (তার বাবার ভাষ্য মতে) ওমর মতিন এ হত্যাকা- চালিয়েছিল? এটাও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। কেননা তিনি অনিয়মিত ‘পালস’ নামের এ সমকামী ক্লাবে যেতেন। নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষ তাকে ব্যবহার করেছে? উদ্দেশ্য ক্লিয়ারÑ যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবকে আরও উসকে দেয়া? সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিজয়ী করতেই কী এই হত্যাকা-? ৯/১১-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আফগানিস্তান, পরে ইরাক দখল করে নিয়েছিল। ২০০১ সালের পর তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এ যুদ্ধ চলছে। ফলাফল? আফগানিস্তানে এখনও যুদ্ধ চলছে। গত সপ্তাহেই ন্যাটো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে ন্যাটোর সেনাবাহিনী আরও কিছু দিনের জন্য থাকবে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে সত্য; কিন্তু ইরাক ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে লিবিয়া ও সিরিয়াও। আফ্রিকায় বোকো হারাম, আল-শাবাবের মতো সংগঠনের জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, তা শেষ হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম বিদ্বেষ কিছুটা কমেছে। এখন অরল্যান্ডোর এ হত্যাকা-ে মুসলিম বিদ্বেষ আবারও বাড়ল। অরল্যান্ডোর এ হত্যাকা-ে আইএস নতুন একটি মাত্রা পেল। আইএসের কর্মকা- সিরিয়া-ইরাক ছাড়িয়ে ইউরোপের পর এখন যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রসারিত হলো। আইএস মার্কিন সমাজে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছে, এটা নিয়ে একদিকে বিতর্ক বাড়বে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলিম সমাজে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে আইএস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কী? আমি দুইটি সার্ভে রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতে চাই। দুইটি সার্ভে রিপোর্টই পিউই (Pew )গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ওয়াশিংটন) থেকে পরিচালিত হয়েছে। পিউই ২০১৫ সালে বেশ কিছু মুসলিমপ্রধান দেশে আইএসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি গবেষণা চালায়। যেমন লেবাননে শতকরা ১০০ ভাগ মানুষ আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল নন। জর্ডানে এ সংখ্যা ৯৪ ভাগ, ইন্দোনেশিয়ায় ৭৯ ভাগ, ফিলিস্তিনে ৮৪ ভাগ, তুরস্কে ৭৩ ভাগ, নাইজেরিয়ায় ৬৬ ভাগ, বুরকিনা ফাসোতে ৬৪ ভাগ, মালয়েশিয়ায় ৬৪ ভাগ, সেনেগালে ৬০ ভাগ এবং পাকিস্তানে ২৮ ভাগ। অর্থাৎ মুসলিমপ্রধান দেশে মানুষ আইএসের প্রতি সহানভূতিশীল নন। আবার এসব দেশে আইএসের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে মাত্র ৮ ভাগ মানুষ (তুরস্ক), ৪ ভাগ (ইন্দোনেশিয়া), নাইজেরিয়ায় রয়েছে ১৪ ভাগ, মালয়েশিয়ায় ১১ ভাগ, সেনেগালে ১১ ভাগ, পাকিস্তানে ৯ ভাগ। অর্থাৎ আইএস মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা পরিসংখ্যান দিই। পিউই ২০১৬ সালে এ গবেষণাটি করে। যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ আইএসকে অন্যতম হুমকি হিসেবে মনে করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করে ৭৬ ভাগ মানুষ। সাইবার আক্রমণকে ৭২ ভাগ মানুষ হুমকি মনে করে (ইইউ ৫৪ ভাগ); আর পরিবেশ বিপর্যয়কে হুমকি মনে করে ৫৩ ভাগ (ইইউ ৬৬ ভাগ)। পিউই’র এ গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, আইএসের হুমকিকে তারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। ফলে অরল্যান্ডোর হত্যাকা-, আইএসের সংশ্লিষ্টতা যে মার্কিন সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, এটা বলাই বাহুল্য। এর প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে। মসজিদগুলোতে পুলিশি পাহারা বাড়ানো হয়েছে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আবারও কালো-সাদার দ্বন্দ্ব অর্থাৎ কৃষাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন এক রূপ পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, (২০১৬) যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মাঝে শতকরা ১ ভাগ হচ্ছে মুসলমান। ২০১০ সালে এ পরিসংখ্যান ছিল ০.৯ ভাগ। অন্যদিকে শতকরা ৭০ দশমিক ৬ ভাগ হচ্ছে খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বী, ইহুদি ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় ২ ভাগ। মাত্র ১ ভাগ জনগোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে তাদের এত উৎকণ্ঠা(!) স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। অন্যদিকে প্রায় ৩২ কোটি ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর এ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার মাঝে ৭২ দশমিক ৪ ভাগ শ্বেতাঙ্গ, ১২ দশমিক ৬ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের ৪৪১ জন সদস্যের মাঝে ৪৫ জন কৃষ্ণাঙ্গ, আর সিনেটের ১০০ জন সদস্যের মাঝে মাত্র ২ জন কৃষ্ণাঙ্গ। সুতরাং বোঝাই যায়, কৃষ্ণাঙ্গরা কীভাবে মার্কিন সমাজে অবহেলিত। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃষ্ণাঙ্গরা আক্রান্ত হচ্ছেন। মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যকার এ বৈষম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক গবেষণা হয়েছে। প্রতিটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষায়ও তাদের অগ্রগতি নেই। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা ও শ্বেতাঙ্গ বিদ্বেষ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। আর এরই প্রতিফলন ঘটেছে ডালাস হত্যাকা-ের ঘটনায়। এরপর ঘটল বেটন রুজে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাষ্ট্রে পরিণত হলেও দেখা গেছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে কিছু সম্পদশালী লোকের কাছে। এসব সম্পদশালী লোকই রাজনীতি তথা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। এরা শত শত করপোরেট হাউস গঠন করে আজ শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ১ ভাগ মানুষ। এখানেই গড়ে উঠেছিল ‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের সেই জুকোটি পার্কের কাহিনী সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। ম্যানহাটনের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাশেই সেই জুকোটি পার্ক। গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম সেখানে। ছোট একটি পার্ক। মানুষ বসে বিশ্রাম করে। আগের মতো সেই জুকোটি পার্ক আন্দোলনের (সেপ্টেম্বর ২০১১) কথা কেউ মনে রাখে না এখন আর। শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বৈষম্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এ বৈষম্য কমিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ কখনও গ্রহণ করা হয়নি। সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। ফলে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ছিল। আর সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মিনেসোটা ও লুজিয়ানায় কিশোর হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। পুলিশের ভূমিকা এখন সর্বত্র সমালোচিত হচ্ছে। পুলিশ অফিসাররা, যারা সবাই শ্বেতাঙ্গ, তারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যে বর্বরোচিত আচরণ করেছে, তা সঙ্গত ছিল না। তাদের ভেতরে এক ধরনের জাতিবিদ্বেষ কাজ করেছিল। একজন কৃষ্ণাঙ্গ গবেষক মিস একেনি সøটার-জনসন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন সম্প্রতি (Still Second Class Citizens , Other Words, 13 July 2016 )। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এই যে অত্যাচার, নিপীড়ন তা মূলত ১৮৫৭ সালে দেয়া তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রজার তানেহর দেয়া একটি ঐতিহাসিক রায়েরই প্রতিফলন। একটি দাস পরিবারে জন্ম নেয়া জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ ড্রেড স্কট ‘স্বাধীন’ কিনা, এটা জানতেই সেদিন মামলা হয়েছিল। বিচারপতি রজার তার ওই আবেদন শুধু খারিজই করেননি, বরং একটি মেসেজও দিয়েছিলেন, যা আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, ‘আফ্রো-আমেরিকার অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গরা আদৌ এ দেশের নাগরিক নন, তাদের কোনো অধিকারই নেই এ ধরনের মামলা করার।’ প্রধান বিচারপতি রজার তার রায়ে তখন উল্লেখ করেছিলেন, ‘আফ্রো-আমেরিকানদের কোনো অধিকার নেই, যা শ্বেতাঙ্গরা মানতে বাধ্য।’ কী সাংঘাতিক কথা! কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজে কী এ ধরনের কথা বলা সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের কথা বলে। গেল ১৫ জুলাই তুরস্কে যে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান হয়ে গেল, সেখানেও মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জন কেরি বলেছেন, তুরস্ক আইনের শাসন, তথা গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত রাখবে, এটাই যুক্তরাষ্ট্র চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কী আইনের শাসন সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়েছে? জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণ করে দেশটি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যে একটি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, ওই যুদ্ধ ন্যায্য ছিল না। এক মার্কিন অধ্যাপকের লেখায় পড়েছিলাম যে, বুশকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত! কিন্তু সেটা করা কখনোই সম্ভব হবে না। আজ কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ দ্বন্দ্বের ফলে ডালাসে হত্যাকা-ের মতো ঘটনা ঘটেছে। তারপর ঘটল বেটন রুজের ঘটনা। একদিকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকরা, অন্যদিকে এর প্রতিশোধ নিচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গরা। তাই ওবামা যখন মার্কিন সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ত্রুটির কথা বলেন, তিনি মিথ্যা বলেন না। কিন্তু এ ত্রুটি সারাবে কে? এই সমাজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি সৃষ্টি করেছে, যাকে এখন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক সমর্থন করেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মুসলমানদের এ দেশ থেকে বের করে দেবেন! এর বড় প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়নি। এ বৈপরীত্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বে বড় ভূমিকা পালন করতে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্র বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। এ দেশের নেতৃত্বের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। হ ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
 Daily Alokito Bangladesh
24.07.2016

অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনে কার হাত?

ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের রাজনীতি নিয়ে এখন আলোচনার শেষ নেই। যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করেন তারা বলার চেষ্টা করছেন যে, প্রেসিডেন্ট এরদোগান সব ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়ার জন্য ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের নামে একটি ‘সাজানো নাটক’ মঞ্চস্থ করেছেন (দি ইনডিপেনডেন্ট, লন্ডন, ১৬ জুলাই)। ১৯৩৩ সালে হিটলার এমন এক ‘সাজানো নাটকের’ মাধ্যমে জার্মান পার্লামেন্ট আক্রমণ করে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এরদোগান যখন এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পেছনে তুরস্কের ধর্মগুরু ও পণ্ডিত ফতেহউল্লাহ গুলেনকে দায়ী করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়া থেকে গুলেন এমনই একটি আভাস দিয়েছেন যে, এটি ছিল একটি সাজানো নাটক! এই ‘সাজানো নাটকের’ কাহিনী বেশ কটি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ছাপা হলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে অন্তত ২৬৩ জন মানুষ মারা গেছেন এবং অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে। ১৯২৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যে দিয়ে তুরস্ক নামক যে রাষ্ট্রটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেখানে দীর্ঘ ৯৩ বছরের ইতিহাসে তিনটি সামরিক অভ্যুত্থানের খবর জানা যায় (১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০), যা সফল হয়েছিল। এবং ১৯৯৭ সালে সেনাবাহিনী বাধ্য করেছিল তৎকালীন সরকারকে তাদের একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। এরপর থেকে আর তেমন কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের খবর পাওয়া যায় না। তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ১৫ জুলাইয়ের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানই দেশটির শেষ সামরিক অভ্যুত্থান নয়। যারা তুরস্কের রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা জানেন মূলত তিনটি ‘শক্তি’ তুরস্কের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই তিনটি শক্তি হচ্ছে : সেনাবাহিনী, ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা। এর মাঝে ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা সবচেয়ে দুর্বল। আর সেনাবাহিনী শক্তিশালী হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থাশীল। কামাল পাশা, যিনি জাতীর পিতা বা ‘আতাতুর্ক’ হিসেবে ভূষিত হয়েছিলেন, তিনি এই সেনাবাহিনী গঠন করে গেছেন। কামাল পাশা তুরস্কে একটি ব্যাপক সংস্কার এনেছিলেন। তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শেই তিনি সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন। সেই আদর্শ থেকে সেনাবাহিনী আজও বিচ্যুত হয়নি। তবে সাম্প্রতিককালে সেনাবাহিনীর মধ্যে ফতেহউল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের প্রভাব বাড়ছিল, যা ছিল এরদোগানের চিন্তার কারণ। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে এখন ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ৬ লাখ ৪০ হাজার সদস্য নিয়ে গঠিত তুরস্কের প্রতিরক্ষা বাহিনী। এর মাঝে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যাই বেশি। ব্রিগেডিয়ার থেকে শুরু করে পূর্ণ জেনারেল পর্যন্ত সিনিয়র অফিসারের সংখ্যা ৩৫০-এর ওপরে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী ১০৩ জন সিনিয়র অফিসারকে ইতিমধ্যে বহিষ্কার অথবা গ্রেফতার করা হয়েছে। একসময় ধারণা করা হতো তুরস্কে ইসলামপন্থীদের যেভাবে উত্থান ঘটেছে, সেখানে কামাল আতাতুর্কের রাজনীতির অনুসারী সেনাবাহিনী তাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সে ধারণা পাল্টে গেছে। গুলেনপন্থী ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসারদের বহিষ্কার ও গ্রেফতারের ঘটনা প্রমাণ করে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে গুলেনপন্থীদের প্রভাব বাড়ছিল। এতে করে গুলেনপন্থীদের প্রভাব প্রতিরক্ষা বাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়ে গেছে- এটা যেমন স্বীকৃতি পেল, ঠিক তেমনি এদের উৎখাত করে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে এখন ব্যাপক সংস্কার আনতে সক্ষম হবেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। এটা করতে গিয়ে তিনি তার জনপ্রিয়তাকে বিতর্কিত করতে পারেন। এখানে বলা ভালো, ফতেহউল্লাহ গুলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ। তথাকথিত ইসলামী শিক্ষায় তিনি শিক্ষিত না হয়েও কিংবা তুরস্কে কোনো শীর্ষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান না হয়েও তিনি ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয় করে ইসলামকে নতুন করে তুরস্কের মানুষের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি প্রচুর লিখেছেন এ বিষয়ে। ইংরেজিতে অনূদিত বইও আছে তার। আমার মনে আছে, ঢাকাস্থ তুরস্কের সাংস্কৃতিক বিভাগের প্রধানের মাধ্যমে ২০১২ সালে আমি গুলেনের একটি বই পেয়েছিলাম। বাংলাদেশে ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের মাঝে গুলেন খুব পরিচিত নাম নয়। তার ওপর লেখাজোখা খুব কমই হয়েছে। তার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের এক অধ্যাপকের একটি প্রবন্ধও আমি পড়েছিলাম আজ থেকে ৪-৫ বছর আগে। গুলেন নিজে স্যুটেড-বুটেড, বর্তমানে স্বেচ্ছা নির্বাসিত, থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়ায়। অনেকটা সুফি ভাবধারার অনুসারী তিনি। জিহাদি মতাদর্শকে তিনি সমর্থন করেন না। তাকে বলা হয় ‘ইসলামের গান্ধী’। তার মূল মন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা। ‘জিহাদি শিক্ষার’ কথাও শোনা যায় কোনো কোনো প্রবন্ধে। এর অবশ্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। তুরস্কে একটি বিশাল সাম্রাজ্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন। যে সাম্রাজ্যের আওতায় রয়েছে ব্যাংক, বীমা, মিডিয়া ও শত শত স্কুল। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে একশ’র বেশি স্কুল রয়েছে গুলেন অনুসারীদের। তিনি যে প্রতিষ্ঠান তুরস্কে গড়ে তুলেছিলেন, তার নাম Hizmet, ইংরেজি করলে দাঁড়ায় Service অথবা সেবা। এই সংগঠনের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বলা হয় Cemaat বা সম্প্রদায় অথবা কমিউনিটি। তার সংগঠন ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে তুরস্কে। বাংলাদেশে উত্তরার ৫নং সেক্টরে যে তার্কিস স্কুল রয়েছে, এটাও তারা পরিচালনা করে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতেও তাদের স্কুল রয়েছে। তুরস্কে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ৬০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। এরা প্রশাসনের এত গভীরে প্রবেশ করেছে, যা এরদোগানের জন্য ছিল চিন্তার কারণ। একসময় এরদোগানকে গুলেন অনুসারী হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে এরদোগানের সঙ্গে গুলেনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরদোগান মনে করতেন, গুলেন তার জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছেন। গুলেন সমর্থকদের দ্বারা উৎখাত হওয়ারও ভয় ছিল তার। দুর্নীতির অভিযোগে এরদোগানের ছেলে, তিন মন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে এবং একটি বড় ব্যাংকের বিরুদ্ধে যখন তদন্ত শুরু হয় ২০১৩ সালে, তখনই দেখা গিয়েছিল গুলেনের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এরপর ঘটে ইস্তান্বুলে গাজি পার্কের ঘটনা। ইস্তান্বুলের মেয়র ছিলেন এরদোগান (১৯৯৪-৯৮) এবং এই ইস্তান্বুলই হচ্ছে তার ‘ক্ষমতার উৎস’। সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এখানেই বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ইস্তান্বুুলে তাকসিম গাজি পার্কের ঘটনা যখন ঘটে (২০১৩ জুন, নিউইয়র্কের অকিউপাই মুভমেন্টের আদলে বিশাল এলাকা অকিউপাই করা, পুলিশের উচ্ছেদ অভিযানে ১১ জনের মৃত্যু), তখন এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, খোদ এরদোগানের অনুসারীদের ভেতরেই একটি পক্ষ এই ‘অকিউপাই মুভমেন্টকে’ সমর্থন করেছিল। এরদোগান মনে করতেন, এ আন্দোলনের পেছনে গুলেনের ইন্ধন রয়েছে। এটা সত্য, তিনজন মন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে (যার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন) তদন্ত কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা খুব একটা সহজ ছিল না। এতে করে ধারণা করা স্বাভাবিক, সরকারের ভেতরে ওঁৎ পেতে থাকা একটি ‘শক্তি’ এরদোগান তথা একে পার্টির বিরুদ্ধে তৎপর ছিল। গুলেনের সমর্থকরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে আছে। ফলে তাদের মাধ্যমে এ ধরনের কাজ করা অসম্ভব কিছু নয়। এরদোগান তাই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে গুলেনের যোগসাজশের অভিযোগ এনেছেন। এই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর এখন বেশকিছু ঘটনা ঘটতে পারে। এক. গুলেনপন্থীদের সঙ্গে তার সমর্থকদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটবে। তিনি প্রশাসন, বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগ, পুলিশ বিভাগে শুদ্ধি অভিযান চালাবেন। তথাকথিত গুলেনপন্থী হিসেবে অভিহিত হয়ে অনেকে চাকরি হারাবেন এবং গ্রেফতার হবেন। এতে করে তুরস্কে নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে যে ইসলামপন্থীদের উত্থান ঘটেছিল, তা এখন বাধাগ্রস্ত হবে। দুই. এরদোগান এখন তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষবাদী লিবারেল দলগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন। লক্ষণীয়, বর্তমান সংসদে (মোট সদস্য ৫৫০) যেখানে একে পার্টির আসন সংখ্যা ৩১৭, সেখানে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির আসন ১৩৩, আর এইচডিপির ৫৯। প্রাপ্ত ভোটের ১০ ভাগ না পেলে কোনো দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এ কারণেই সংসদে বিরোধী দলের আসন কম। তবে তারা এরদোগানকে সমর্থন করেছেন। ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সমালোচনা করেছেন। তিন. সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা এরদোগানকে পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারী করে তুলতে পারে। তিনি এক ধরনের ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের’ জন্ম দিতে পারেন। এবং তুরস্কে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ‘মৃত্যু’ ঘটতে পারে! হার্ভার্ডের স্কুল অব গভর্নমেন্টের অধ্যাপক ডানি রডরিক এক প্রসঙ্গে এমন আভাসই দিয়েছেন। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের লেখনীতে এমন কথাও এসেছে যে, অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান মেহমুদ-২-এর শাসনামলে একই ধরনের ঘটনায় সুলতান পুরো সেনাবাহিনীকে নিষিদ্ধ করে নিজের অনুগতদের নিয়ে একটি নতুন সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন, যারা ছিল পুরোপুরি তার বিশ্বস্ত ও অনুগত। হিটলারের আমলে ১৯৩৩ সালে পার্লামেন্ট ভবনে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর হিটলার আরও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের ভুললে চলবে না, হিটলার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা ছিলেন। আজ কোনো কোনো মহল থেকে হিটলারের সঙ্গে এরদোগানের তুলনা করা হচ্ছে। এখন যুগ পাল্টেছে। এরদোগান হয়তো এমনটি করবেন না। তবে তিনি যে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন, একটি শক্তিশালী প্রেসিডেন্সি সৃষ্টি করবেন, তা বলাই বাহুল্য। একটি নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পথে যাচ্ছে তুরস্ক। পুরো সেনাবাহিনী নিষিদ্ধ না হলেও সেখানে ব্যাপক সংস্কার আনবেন তিনি। অনেক জেনারেল চাকরি হারাবেন। তার একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হুলুসি আকার প্রচণ্ড চাপে থেকেও সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেননি। ফলে অনেক গ্যারিসন কমান্ডারের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেনি অভ্যুত্থানকারীরা। তবে এরদোগান সংস্কারটা আনবেন ধীরে ধীরে। দ্রুত সেনাবাহিনীতে পরিবর্তন আনতে চাইলে কিংবা নতুন একটি সেনাবাহিনী গড়তে চাইলে সেনাবাহিনী তার কর্পোরেট স্বার্থে এর বিরোধিতা করবে। সে ক্ষেত্রে আরেকটি ক্যু দে’তা অসম্ভব কিছু নয়। চার. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এরদোগান গুলেনকে তুরস্কের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তুরস্ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে করে আইনের শাসন তথা গণতান্ত্রিক চর্চা তুরস্কে অব্যাহত রাখা হয়। কেরি এমনও আভাস দিয়েছেন, তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বর্পূণ সদস্য হওয়ায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, মানবাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদির প্রতি তার ‘কমিটমেন্ট’ অব্যাহত রাখতে হবে। যদি তুরস্ক ব্যর্থ হয়, ন্যাটোর সদস্যপদ স্থগিত করারও হুমকি দিয়েছেন কেরি। বাস্তব ক্ষেত্রে এটি আদৌ কার্যকর হবে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো সদস্যভুক্ত কোনো দেশের সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধান সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ায় এরদোগানকে ফোন করে সহমর্মিতা জানাননি। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ফোন করেছিলেন। এরদোগান ক্যু দে’তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন। অনেকে ধারণা করছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এরদোগান রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকতে পারেন। যদিও সিরিয়া সংকট, আইএসের উত্থান, ইরানের পারমাণবিক শক্তি হিসেবে উত্থান ইত্যাদি নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে তুরস্কে। ভূমধ্যসাগরতীরের আদানা শহরে ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিসহ ইজমিরেও রয়েছে মার্কিন বিমানঘাঁটি। ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিতে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন বিমান সেনা রয়েছে। এই বিমানঘাঁটিতে পারমাণবিক বোমা সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজে এই বিমানঘাঁটি থেকে তার সৈন্য ও প্রায় ৬০টির মতো বিমান প্রত্যাহার করে নেবে না। পাঁচ. এরদোগান সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে পুনরায় মৃত্যুদণ্ড বহাল করার কথা বলেছেন। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর সিএনএনের সঙ্গে দেয়া সাক্ষাৎকারে এরদোগান বলেছেন, পার্লামেন্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল করার (২০০৪ সালে বাতিল) আইন প্রণয়ন করতে পারে। এটা যদি তুরস্ক করে, তাহলে ইইউর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার ফলে আগামীতে ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা আসতে পারে। সুতরাং তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর আলোচনার সব কেন্দ্রবিন্দু এখন প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে ঘিরে। তার কোনো কোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে তুরস্কের ভবিষ্যৎ। তার কর্তৃত্ববাদী আচরণ, যা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, তা তুরস্ককে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। তার কর্তৃত্ববাদী আচরণের জন্য কেউ কেউ তাকে ইতিমধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক সুলতানদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একজন ‘সুলতান’ এরদোগান আংকারায় প্রায় এক হাজার কক্ষবিশিষ্ট প্রেসিডেন্ট হাউস (হোয়াইট প্যালেস, নির্মাণ ব্যয় ৬১৫ মিলিয়ন ডলার) নির্মাণ করে নিজের অবস্থানকে সুলতানদের সমতুল্য করতে পারেন বটে; কিন্তু ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটিতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা যদি দূর করার উদ্যোগ তিনি না নেন, তাহলে বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। তাই প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন সব শ্রেণীর মানুষের আস্থা অর্জন। ২০০২ সাল থেকে বারবার জনগণ তাকে এবং তার দলকে ভোট দিয়েছে। জনপ্রিয়তা তার আছে; কিন্তু এই জনপ্রিয়তাকে যদি তিনি ভিন্ন খাতে নিয়ে যান, তাহলে তা তুরস্কের জন্য আগামীতে কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র Daily Jugantor 24.07.2016

তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

তুরস্কের গত ১৫ জুলাই এর ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর এখন অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম হয়েছে যা তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক একটি ন্যাটোভুক্ত দেশ। মার্কিন বিমান ঘাঁটি এখানে রয়েছে। অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার অভিযোগ করায় এখন দুই দেশের  মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান পুনরায় ফাঁসির দণ্ড চালু করার উদ্যোগ নেওয়ায় তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পেতে এখন আরও বিলম্ব হতে পারে। তুরস্কের রাজনীতিতে ইসলাম আর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বন্দ্ব তা এই ঘটনায় আরো প্রকট হবে। এরদোয়ান আরও স্বৈরাচারি হয়ে উঠবেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ক্ষমতা এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে।
তবে এরদোয়ান যেভাবে সরকার পরিচালনা করছিলেন সে বিষয়ে অনেকের আপত্তি আছে। তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগের একটি হচ্ছে তিনি ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে চান। ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা একই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কিন্তু দেশটির সংবিধান তাকে আরো একবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে না দেয়ায় তিনি ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এক পর্যায়ে তার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে তিনি প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি তার এক সময়ের বিশ্বস্ত ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুলগলুর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যান এবং তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি রাজধানী আঙ্কারায় একটি পাহাড়ে প্রেসিডেন্ট হাউজ নির্মাণ করেছেন যার পরিচিতি ‘হোয়াইট প্যালেস’ হিসেবে। প্রায় একহাজার কক্ষ বিশিষ্ট এই বাড়িটি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসস্থান হোয়াইট হাউজ থেকেও বড়। নির্মাণ ব্যায় ধরা হয়েছিল ৬১৫ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় ৪৯২০ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রাসাদতুল্য এ ধরনের একটি ভবন তৈরী করা আদৌ উচিত কীনা, সে প্রশ্ন কোনো কোনো মহলে উঠেছে।
তৃতীয়ত, এরদোয়ানের মন্ত্রীসভার অনেক সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গ সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। শীর্ষস্থানীয় তার দলের নেতাদের এই দুর্নীতি তিনি রোধ করতে পারেননি।
চতুর্থত, ইরানের বিরুদ্ধে যখন আন্তর্জাতিক অবরোধ বজায় ছিল, তখন তুরস্ক ইরান থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছে। একই কথা প্রযোজ্য সিরিয়ার আইএস(ইসলামিক স্টেট) বিদ্রোহীর ক্ষেত্রেও। সিরিয়ার এবং ইরাকের অনেক তেলখনি দখল করে নিয়েছিল আইএস বিদ্রোহীরা। তারা ওই তেলক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন করে অবৈধভাবে তুরস্ক দিয়ে ওই তেল বিদেশে রফতানি করতো। এই তেল বিক্রি ছিল আইএস এর অর্থ আয়ের অন্যতম উৎস। সারা বিশ্ব যখন মোটামুটিভাবে আইএস এর জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে উৎকণ্ঠিত, তখন তুরস্ক আইএস এর অর্থ আয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এমন কথাও শোনা যায় জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তুরস্কের কোনো কোনো গোপন আস্তানায়।
পঞ্চমত, খোদ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তিনি নিজেকে ইতোমধ্যেই তুরস্কের সুলতান ভাবতে শুরু করেছেন। তুরস্কের অটোমান সা্ম্রাজ্য প্রায় এক হাজার বছর ক্ষমতায় ছিল। একদিকে দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়ার ককেশিয়ান অঞ্চল ও অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তুরস্কের শাসকরা। যারা সুলতান হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর পরই এই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর অটোমান সাম্রাজ্যের অবসানের ঘোষণা করা হয়। এখন এরদোয়ান যেভাবে সরকার পরিচালনা করছেন, যেভাবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, তাতে করে কেউ কেউ তাকে সাবেক অটোমান শাসকদের সাথে তুলনা করেছেন।
ষষ্ঠত, গেল বছর তুরস্কের জনপ্রিয় পত্রিকা জামান এর নিয়ন্ত্রণভার সরকারের হাতে তুলে দেয়া হয়। অর্থাৎ পত্রিকাটি সরকারিকরণ করা হয়। এর মাধ্যামে তিনি মিডিয়ার উপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা তার আছে। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ক্যারিশম্যাটিক’ বা সম্মোহনী নেতৃত্ব বলে, সেই সম্মোহনী নেতৃত্ব তার রয়েছে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার এক মহাপরিকল্পনা তার রয়েছে। চীনের মত পুরানো সিল্করোড’কে তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চান।
তুরস্কে আমি দেখেছি আফ্রিকার অনেক গরিব দেশের শিশুদের তার সরকার আশ্রয় দিয়েছে। ইসলামিক মতাদর্শের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলেও তিনি ওয়াহেবি বা জিহাদি মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। এক সময়ের ফুটবল খেলোয়াড় এরদোয়ান তার রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছেন ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতা বেকমাতিন এরবাকারের ছত্রছাঁয়ায়। তিনি ছিলেন প্রাচীন নগরী ইস্তাম্বুলের জনপ্রিয় মেয়র। এই ইস্তাম্বুলই হচ্ছে তার ক্ষমতার ঘাঁটি। যখন অভ্যুত্থাকারীরা আঙ্কারার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন অবসরকালীন ছুটিতে। তিনি কর্মীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন রাস্তায় অবস্থান নিতে। তার হাজার হাজার সমর্থক ইস্তাম্বুলের রাস্তায় অবস্থান নিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছিল।
এখানে বলা দরকার  বেকমাতিন এরবাকারের নেতৃত্বে ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টি অতি ইসলামিক এবং তুরস্কের সংবিধানের মূল ধারার (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা) পরিপন্থী হওয়ায় দলটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল যা কীনা সেনাবাহিনী চেয়েছিল। দলটি নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ায় ওই দলের সমর্থকরা প্রথমে ভার্চু পার্টি গঠন করে এবং পরে গঠন করে জাস্টিস এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি যা একেপি নামেও পরিচিত। আবদুল্লাহ গুল ও  এরদোয়ান একেপি পার্টি গঠনের নেপথ্য নায়ক। ২০০২ সালে নির্বাচনে একেপি পার্টি বিজয়ী হওয়ায় আবদুল্লাহ গুল প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরদোয়ান তখন ছিলেন জেলে। একটি কবিতা আবৃত্তি করার অভিযোগে, যেখানে তিনি তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে কটাক্ষ করেছিলেন, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
একেপি পার্টি সরকার গঠন করে তার সাজা মওকুফ করে দেয়। তিনি উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে আসেন, প্রধানমন্ত্রী হন আর আবদুল্লাহ গুল হন প্রেসিডেন্ট। সেই থেকে তার যাত্রা শুরু। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। এবং সংবিধানে পরিবর্তন এনে তুরস্ককে রাষ্ট্রপতি শাসিত একটি দেশে পরিণত করেছেন। দেশটিতে একজন প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃ্ত্বে একটি ক্যাবিনেট থাকলেও মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে।
এখন ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর সন্দেহাতীতভাবে এরদোয়ানের হাত আরো শক্তিশালী হয়েছে। একটি শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট কী তুরস্কের গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে? একটি জিনিস অবশ্য লক্ষ্যণীয়, আর তা হচ্ছে এরদোয়ান আর একেপি পার্টির ক্ষমতা পরিচালনা নিয়ে তর্ক বির্তক থাকলেও সংসদে সকল বিরোধী দল একত্রিত হয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের উদ্যোগকে সমালোচনা করেছেন। এরদোয়ানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও সকল বিরোধীদলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের শক্তি। গণতন্ত্রের জন্য একটা ম্যাসেজ। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে জাতি যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।
তুরস্কের গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে যায়নি, একটা ধাক্কা খেয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যটা বড় প্রয়োজন। তবে সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানেরও দায়িত্ব রয়েছে অনেক। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস- এটা মিডিয়ার স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচার বিভাগ- এসব যদি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে সত্যিকার গণতন্ত্রের স্বাদ তুরস্কের জনগণ পাবে না। অভ্যুত্থান পরবর্তী তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কাছে প্রত্যাশা তাই অনেক বেশী। তাই সংগতকারণেই যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হচ্ছে এই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান থেকে এরদোয়ান আদৌও কিছু শিখবেন কীনা?
তার বক্তব্যের মধ্যে এটা তিনি স্পষ্ট করেছেন যে এই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন ফাতেউল্লাহ গুলেন। তিনি মূলত তুরস্কের অধ্যাত্মিক গুরু। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়াতে বসবাস করেন। ফাতেহউল্লাহ গুলেন অনেকটা আমাদের দেশের সুফীবাদের ধারায় ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছেন। ইসলাম সম্পর্কে তার প্রচুর বই রয়েছে। তার আদর্শকে ধারণ করেই তুরস্কে গড়ে উঠেছে গুলেন মুভমেন্ট। গুলেন কট্টরবাদ, জঙ্গিবাদের সমালোচনা করেছেন। ইসলামকে তিনি সত্যিকার অর্থেই শান্তির ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তুরস্কে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত দু’ধারায় রাজনীতিতে বিভক্ত হয়ে আছে।
একদিকে রয়েছে ইসলামপন্থীরা অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা। উভয় শক্তি মূলত গণতান্ত্রিক আদর্শকে ধারণ করে। দীর্ঘদিন তুরস্কের রাজনীতিতে এই ধর্মনিরপেক্ষবাদ বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তুরস্কের জাতির পিতা কামাল পাশা এই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রবক্তা। সেনাবাহিনী তার আদর্শেই গড়ে উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানও তেমনি। দশ বছর আগেও স্কার্ফ পরে কোনো মেয়েকে ক্যাম্পাসে দেখা যেত না। মাথায় স্কার্ফ পরা ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। আধুনিক মনস্ক ইসলামপন্থীরা ধীরে ধীরে ক্ষমতা করায়ত্ব করে। এখন তারা অন্যতম একটি শক্তি। মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পরা সংক্রান্ত যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে নেয়া হয়। একসময় কামাল আতাতুর্কের সময় যে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, এরদোয়ান সেগুলো আবার খোলার অনুমতি দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় গুরু ফাতেহউল্লাহ গুলেনের অবদান ছিল বেশি। এরদোয়ান এ সময় তার ভাবশিষ্য ছিলেন। তার আদর্শকে তিনি ধারণ করেছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে তার সঙ্গে গুলেনের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। এর পর এরদোয়ানের ভয়টা হচ্ছে এখানে যে গুলেনপন্থীরা সেনাবাহিনী, সিভিল প্রশাসন আর পার্টি নেতৃত্বে বড় প্রভাব ফেলছে। এই প্রভাব এরদোয়ানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে গুলের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেননি। তিনি ক্ষমতা চানও না। কিন্তু তার অনুসারীরা ক্ষমতা সংহত করেছেন। এরদোয়ানের ভয়টা এখানেই।
তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জন্য একটি ‘শিক্ষা’। তিনি যদি সকল ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন, যার সম্ভাবনা এখন বেশি, তাহলে তিনি ভুল করবেন। এবং সে ক্ষেত্রে কাল আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান তাকে মোকাবিলা করতে হবে।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
Poriborton
21.07.2016

"দৃষ্টি দিতে হবে বহুক্ষেত্রে "

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ এবং শোলাকিয়া ঈদগাহ মসজিদের পাশে হামলার পর সরকারের জঙ্গি দমন কার্যক্রম নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হচ্ছে, এই জঙ্গি দমন কার্যক্রম কি বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিদের পরিপূর্ণভাবে উৎখাত করতে পারবে? দু’ দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের সংবাদের জš§ দিয়েছে। কিছু কিছু প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের সিদ্ধান্তের খবর আমরা জেনেছি। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা বিসওয়াল ঘুরে গেছেন। জঙ্গি হামলার পর তার এই সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বের। নিশা বিসওয়াল তার সফরের সময় জঙ্গি দমনে বিশেষজ্ঞ দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এফবিআইয়ের স্টাফরা ইতোমধ্যে  জঙ্গি দমনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নিশা বিসওয়াল ঢাকায় এসে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। এর অর্থ পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এই জঙ্গিবাদের উত্থানকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এই জঙ্গি দমন কার্যক্রমে ভারতকে সঙ্গে রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে, জঙ্গি দমনে এই ত্রিদেশীয় উদ্যোগ (বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র-ভারত) আদৌ কোনো ফল দেবে কিনা?
সরকার আরো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নর্থ সাউর্থ বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘নিয়ন্ত্রণের’ মধ্যে আনতে চায় সরকার। যে ছাত্র ১০ দিনের বেশি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকবে তাদের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এতে জঙ্গি দমন কার্যক্রম কতটুকু সফল হবে? এটা সত্য সম্প্রতি জঙ্গি হামলার সঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র জড়িত। কিন্তু কিছু ছাত্রের জন্য পুরো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ব্লাক লিস্ট’ করা ঠিক হবে না। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি এবং সেই সঙ্গে কিছু মাদরাসার ছাত্রও জড়িত। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এখানেই যে, তাদের কাছে ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়া ছাত্রদের কোনো তথ্য নেই। যারা সম্প্রতি যাত্রীবেশে তুরস্ক গেছে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য তাদের ওপর নজরদারিও রাখতে পারেননি আমাদের গোয়েন্দারা এবং যখন তারা ফিরে এসেছে তখনো তা তারা মনিটর করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
শোলাকিয়া ও হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আমাদের নীতি-নির্ধারকরা কতগুলো বিষয়ের দিকে এখন দৃষ্টি দিতে পারেন। শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে তাকালে আমরা ভুল করব। ৩৭ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেও তাকাতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিক) যেমনি নারী  নির্যাতন সেল রয়েছে, ঠিক তেমনি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে (পাবলিক ও প্রাইভেট) নিজস্ব উদ্যোগে একটি ‘জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করতে হবে। একজন সিনিয়র অধ্যাপক এর দায়িত্বে থাকবেন। এই সেলের কাজ হবে ক্যাম্পাসে সব অনিয়মিত ছাত্রের তালিকা তৈরি করে তা মনিটর করা, তাদের অভিভাবকদের সহায়তা দেয়া এবং প্রতি মাসে একটা রিপোর্ট পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে দেয়া। কাজটা পুলিশি কাজ সন্দেহ নেই তাতে। তবুও এটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একটি ডাটাবেজ তৈরি করাও জরুরি, যাতে ছাত্রের পূর্ণ তথ্য তাতে থাকবে। বিশেষ করে আইটি সেক্টরে পড়–য়া ছাত্রদের দিকে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। যে তরুণ প্রজš§কে নিয়ে আমাদের এত আশাবাদ, সেই তরুণ প্রজšে§র একটা অংশ বিভ্রান্ত হচ্ছে জঙ্গিবাদী আদর্শে। ইন্টারনেট এর একটা বড় মাধ্যম যার মাধ্যমে তরুণ প্রজš§ ‘ভ্রান্ত আদর্শে’ আকৃষ্ট হচ্ছে। এটা যে প্রকৃত ইসলাম নয়, এটা তারা বোঝে না। ইন্টারনেট বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে। বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাদের ‘ব্রেইন ওয়াশ’ করা হচ্ছে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে যা করা দরকার তা হচ্ছে ইন্টারনেটে নজরদারি বাড়ানো। প্রযুক্তিবিদদের সহযোগিতা নিয়ে এটা সম্ভব। ইন্টারনেট আমাদের জন্য অপার এক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু ক্ষতিও করছে। বিভ্রান্তকারীরা তরুণ সমাজকে জঙ্গিবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে। যে তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে, সেই তরুণের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে পরজšে§র কথা। নেটের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে জিহাদি মনোভাব। জানানো হচ্ছে কীভাবে বোমা তৈরি করতে হয়।
গুলশানে হামলাকারীরা আত্মঘাতী ছিল। তারা জানত তাদের পরিণতি কী হবে। তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল ‘বেহেস্তের’ কথা। তাই সেনা কমান্ডো হামলার চূড়ান্ত মুহূর্তে তারা বলেছিল ‘বেহেস্তে’ যাওয়ার কথা। তাদের এই যে মগজ ধোলাই, এটা করা হয়েছিল ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তাই ইন্টারনেটের কার্যকলাপ, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারা কারা ওইসব ‘সাইট’ ভ্রমণ করে তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ানোও জরুরি। যেসব তরুণ এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, তারা ৫ থেকে ৬ মাস আগে বাসা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। তাদের অভিভাবকরা সবাই পুলিশ স্টেশনে জিডি করেছিলেন। পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। পুলিশ সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই অভিভাবকদের দোষ দেয়া যাবে না। বিশ বছরের এক তরুণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পুলিশের ভূমিকাকে আমরা তাই গুরুত্ব দিতে চাই। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন শৈথিল্য এসেছে। তারা দায়িত্ব পালনে শতকরা এক শ’ ভাগ সফল, এটা বলতে পারছি না। তাই মোটিভেশন দরকার। প্রশিক্ষণ দরকার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এই ঘটনায় আরো একবার প্রমাণিত হলো। একজন তরুণ ছয় মাস আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, তার হদিস পুলিশ পাবে নাÑএটা বিস্ময়কর বিষয়। নিবরাস ইসলাম, মীর মুবাশ্বের, রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল কিংবা রায়ান মিনহাজরা ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়ার পর গত ৫-৬ মাস কোথায় ছিল, কীভাবে ছিল তা জানা দরকার। ধারণা করা যায় তাদের সিরিয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রশিক্ষণের জন্য। যদি তাই হয় তাহলে এর পেছনে কোন ‘শক্তি’ সক্রিয় ছিল তা অভ্যন্তরীণ কোনো ‘শক্তি’ কিনা, তা জানা দরকার। অভ্যন্তরীণ শক্তির যোগসাজশ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। এদের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই হলি আর্টিজান কিংবা শোলাকিয়ায় অপারেশন চালাতে পারত না জঙ্গিরা। তাই অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আরো একটা কথা বলা দরকার। সিরিয়ায় আইএসের উত্থানের পর থেকে ইউরোপ এবং বাংলাদেশ থেকে কিছু তরুণ সিরিয়ায় গেছে। সাধারণত এরা তুরস্ক হয়েই সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে। এ ক্ষেত্রে ধরে নেয়া যেতে পারে তারা বিমানবন্দর ব্যবহার করেছে। যদি তাই হয়ে থাকে, বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য থাকার কথা। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা দরকার। কোনো ধরনের শৈথিল্য যেন এ কাজে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।
আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আর তা হচ্ছে, বাংলাদেশি জঙ্গিদের পশ্চিম বাংলার বর্ধমান ও নদিয়া জেলায় আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ। এরা জেএমবির সদস্য। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল তাতে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ভারতীয় গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেএমবির ঘাঁটি রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হাফিজ শেখ (জানুয়ারি ২০১৬) কিংবা সেলিম রেজার (জানুয়ারি ২০১৬) জঙ্গি কানেকশনে গ্রেফতারের কাহিনী সেখানকার পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাঠক স্মরণ করতে পারেন ভারতীয় গোয়েন্দারা ওইসব কর্মকাণ্ডে (বিশেষ করে বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণ) জেএমবির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে ঢাকায়ও এসেছিলেন। ফলে হলি আর্টিজানে যে জঙ্গিরা মারা গেছে তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকতে পারে। আমাদের গোয়েন্দাদের এখন বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তুরস্কে আইএসের হামলায় যে তিন জঙ্গি অংশ নিয়েছিল তারা কেউই তুরস্কের নাগরিক নয়। ওই তিনজন ছিল রাশিয়া (চেচেন), উজবেকস্তিান ও ফিলিস্তিনের নাগরিক। আইএস এখন মধ্য এশিয়ার নাগরিকদের ব্যবহার করছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। এটা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে যেসব বিদেশি নাগরিক ভ্রমণ বা ধর্মীয় কাজে আসেন, বিশেষ করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয়ে যাওয়া মুসলিম রিপাবলিকগুলো থেকে আসা নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। সেই সঙ্গে আফগান, পাকিস্তান ও তুরস্কের নাগরিকদের গতিবিধিও লক্ষ্য রাখতে হবে। তবলিগ জামাতে যোগ দিতে এরা আসেন। অনেকে থেকেও যান বিনা ভিসায়। পুলিশের কাছে এদের তথ্য আছে কিনা জানি না, কিন্তু এদিকে দৃষ্টি দেয়া এখন প্রয়োজন। জঙ্গিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তারা তথ্য আদান-প্রদান করেছে কিংবা ছবি আপলোড করেছে, তাতে কী বিষয়ে কথা হয়েছে, কার সঙ্গে কথা হয়েছে তার কোন তথ্য থাকে না। ফলে খুব সহজেই জঙ্গিরা পার পেয়ে যায়। সুতরাং আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে জরুরিভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাতে জঙ্গি তৎপরতা মনিটর করা সহজ হয়।
হলি আর্টিজানের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে জঙ্গিরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ধনী ঘরের সন্তান। সুতরাং এ ধারণা এখন পরিতাজ্য যে, শুধু কওমি মাদরাসাগুলোই জঙ্গি উৎপাদন করে। মাদরাসার ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা শোলাকিয়ার ঘটনায় পাওয়া গেছে। কিন্তু আমাদের চিন্তার জায়গাটা হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টার্গেট না করে বরং সরকারের উচিত ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতা করা। নর্থ সাউথ প্রয়োজনে একদল মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করতে পারে, যাদের কাজ হবে ছাত্রদের কাউন্সিলিং করা। মনিটর করার পাশাপাশি কাউন্সিলিং করাটা খুব জরুরি। কেননা কিছু তরুণ বিভ্রান্ত হয়েছে। এদের সঠিক পথে আনার দায়িত্বটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি তিন বাংলাদেশি আইএস জঙ্গি রাকা থেকে (আইএস-এর রাজধানী সিরিয়াতে) ভিডিও বার্তায় বাংলা ভাষায় আবারো জঙ্গি হামলার হুমকি দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এদের পরিচয় ইতোমধ্যে জানা গেছে। সবাই উচ্চশিক্ষিত। বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখার জন্য এদের অভিভাবকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। একজন সাবেক সচিবের সন্তান যখন বিপথগামী হয় তিনি জেনেও তা যদি পুলিশকে না জানিয়ে থাকেন তাহলে তিনি অন্যায় করেছেন। সাবেক সচিব হিসেবে তিনি ক্ষমা পেতে পারেন না। সন্তানের দায়ভার তাকে বহন করতে হবেই। বিষয়টি যদি পুলিশ আগে জানত বোধকরি পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। বিবিসি বাংলা আমাদের জানাচ্ছে, ওই সচিবের ছেলে শাফি (যে বাংলায় রাকা থেকে হুমকি দিয়েছিল), ৬-৭ মাস আগে তুরস্ক চলে গিয়েছিল। ওই সচিবের ব্যর্থতা এখানেই যে, ছেলের চাল-চলন দেখেও তাকে তিনি সংশোধন করতে পারেননি এবং পুলিশ প্রশাসনকে তা জানাননি। ইতোমধ্যে কিছু সময় পার হয়ে গেছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দেশে ডেকে এনে কতটুকু জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই। এতে বিদেশি বিশেষ করে মার্কিনিদের ওপর আমাদের নির্ভরতা বাড়বে এবং বিদেশিরা আমাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়াদির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে যাবেন। আমি মনে করি আমাদের সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা এ কাজের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত। জঙ্গি দমনে সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। সেই সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্যেরও  প্রয়োজন।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র Daily Manobkontho 20.07.2016 >

কোন পথে তুরস্কের গণতন্ত্র

তুরস্কে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে তুরস্কের গণতন্ত্র এখন কোন পথে? প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এই সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিতে সমর্থ্য হলেও এই সেনা অভ্যুত্থান তুরস্কের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য খুব ভালো খবর নয়। তুরস্কের সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী ‘শক্তি’ সে দেশে। আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল পাশা নিজে ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্য। ১৯২৩ সালে তিনি যে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেখানে তিন তিনবার সেনাবাহিনী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। ১৯৬০, ১৯৭১ ও ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর দীর্ঘদিন সেনাবাহিনী ক্ষমতার বাইরে থেকেছে। তবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এরদোয়ান তথা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সম্পর্ক খুব যে ভালো, তা বলা যাবে না। সেনাবাহিনীর ভেতরে নানা অসন্তোষ আছে। এরদোয়ান প্রশাসনের দুর্নীতি, স্বয়ং এরদোয়ানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, এমনকি সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের পরোক্ষ সমর্থন, তুরস্কে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ও জঙ্গিবাদ দমনে ব্যর্থতা ইতাদি কারণে সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আর এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বিমানবাহিনীর কিছু অফিসারের ক্ষমতা গ্রহণ করার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। সেটা ব্যর্থ হয়েছে। মূলত সেনাপ্রধান এই সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত করেননি এবং গ্যারিসন কমান্ডারদের তাতে সমর্থনও ছিল না। তথ্যগতভাবে দেখা যায়, খুব কম ক্ষেত্রেই এ ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। তুরস্কে তাই সেনা অভ্যুত্থান সফল হয়নি। বিংশ শতাব্দীতে ষাটের দশকে আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে জুনিয়র অফিসাররা সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত করে সফল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। বরং দুটি বড় শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এখন আর অতীতের মতো কোনো সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থন করে না। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সত্তরের দশকে আফ্রিকায় সেনাবাহিনীর অফিসারদের দিয়ে ‘সমাজতন্ত্র’ বিনির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল (ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, সিয়েরা লিওন ইত্যাদি)। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ফলে তুরস্কের বিমানবাহিনীর তরুণ অফিসাররা মূলত যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাতে সব সিনিয়র জেনারেলের কোনো সমর্থন ছিল না। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়, সেটা দেখার বিষয়। এমনিতেই সেনাবাহিনীতে কিছুটা অসন্তোষ আছে। ২০১০ সালে তিনি ৪০ জন সেনা অফিসারকে (চারজন অ্যাডমিরাল, একজন জেনারেলসহ) গ্রেপ্তার করে তাঁদের বিচার করেছিলেন ‘অভ্যুত্থানে প্ররোচনা’ দেওয়ার অভিযোগে। উপরন্তু সেনাবাহিনী মূলত ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছে। স্বাধীন তুরস্কে কামাল পাশা (জাতির পিতা, আতাতুর্ক) যে সেনাবাহিনীর জন্ম দিয়েছিলেন, সেই আদর্শ থেকে (ধর্মনিরপেক্ষতা) সেনাবাহিনী আজও সরে আসেনি। অন্যদিকে একেপি পার্টি ও এরদোয়ান নিজে ইসলামপন্থী। এখানে ইসলামী আদর্শ আর ধর্মনিরপেক্ষতার একটা দ্বন্দ্ব আছে। ফলে ছয় লাখ ৪০ হাজার সদস্যবিশিষ্ট সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব থাকাটা স্বাভাবিক। এবারে তিনি অভ্যুত্থান নস্যাৎ করে দিতে পেরেছেন বটে। কিন্তু ভবিষ্যৎ এ সেনাবাহিনীকে তিনি কতটা আস্থায় রাখতে পারবেন, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। এরদোয়ান যেভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন, সে ব্যাপারে অনেকেরই আপত্তি আছে। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের একটি হচ্ছে, তিনি ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে চান। ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কিন্তু সংবিধান তাঁকে আরো একবার দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দেওয়ায় তিনি ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। একপর্যায়ে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে তিনি প্রেসিডেন্টশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর এক সময়ের বিশ্বস্ত ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুলগলুর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যান এবং দাভুলগলুকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি রাজধানী আঙ্কারার একটি পাহাড়ে প্রেসিডেন্ট হাউস নির্মাণ করছেন, যার পরিচিতি ‘হোয়াইট প্যালেস’ হিসেবে। প্রায় এক হাজার কক্ষবিশিষ্ট এই বাড়িটি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসস্থান হোয়াইট হাউসের চেয়েও বড়। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬১৫ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় চার হাজার ৯২০ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রাসাদতুল্য এ ধরনের একটি ভবন তৈরি করা আদৌ উচিত কি না, সে প্রশ্ন কোনো কোনো মহলে উঠেছে। তৃতীয়ত, এরদোয়ানের মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। একেপি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এই দুর্নীতি তিনি রোধ করতে পারেননি। চতুর্থত, ইরানের বিরুদ্ধে যখন আন্তর্জাতিক অবরোধ বজায় ছিল, তখন তুরস্ক ইরান থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছে। একই কথা প্রযোজ্য সিরিয়ার আইএসের (ইসলামিক স্টেট) ক্ষেত্রেও। সিরিয়া ও ইরাকের অনেক তেলক্ষেত্র দখল করে নিয়েছিল আইএস বিদ্রোহীরা। তারা ওই তেলক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন করে অবৈধপথে তুরস্ক দিয়ে বিদেশে রপ্তানি করত। এই তেল বিক্রি ছিল আইএসের অর্থ আয়ের অন্যতম উৎস। সারা বিশ্ব যখন মোটামুটিভাবে আইএসের জঙ্গি তত্পরতার ব্যাপারে উত্কণ্ঠিত, তখন তুরস্ক আইএসের আয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এমন কথাও শোনা যায়, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় তুরস্কের কোনো কোনো গোপন আস্তানায়(?)। পঞ্চমত, খোদ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, তিনি নিজেকে এরই মধ্যে তুরস্কের ‘সুলতান’ ভাবতে শুরু করেছেন। তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য ১৮০৮ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একদিকে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়ার ককেসিয়ান অঞ্চল; অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তুরস্কের শাসকরা, যাঁরা সুলতান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পরপরই এই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর অটোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘোষণা করা হয়। এরপর কামাল পাশার নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্কের গোড়াপত্তন হয়। এখন এরদোয়ান যেভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন, যেভাবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছেন, তাতে করে কেউ কেউ তাঁকে সাবেক অটোমান শাসকদের সঙ্গে তুলনা করছেন। ষষ্ঠত, গেল বছর তুরস্কের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘জামান’-এর নিয়ন্ত্রণভার সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ দৈনিক পত্রিকাটি সরকারীকরণ করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি মিডিয়ার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ক্যারিসমেটিক’ বা সম্মোহনী নেতৃত্ব বলে, সেই সম্মোহনী নেতৃত্ব তাঁর রয়েছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার এক মহাপরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। চীনের মতোই পুরনো ‘সিল্ক রোড’কে তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চান। তুরস্কে আমি দেখেছি আফ্রিকার অনেক গরিব দেশের শিশুদের তুরস্ক সরকার আশ্রয় দিয়েছে। ইসলামিক মতাদর্শের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলেও তিনি ওয়াহাবি বা জিহাদি মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। এক সময়ের ফুটবল খেলোয়াড় এরদোয়ান তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছেন ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতা নেকমাতিন এরবাকনের ছত্রচ্ছায়ায়। তিনি ছিলেন প্রাচীন নগরী ইস্তাম্বুলের জনপ্রিয় মেয়র। এই ইস্তাম্বুলই হচ্ছে তাঁর ‘ক্ষমতার ঘাঁটি’। যখন অভ্যুত্থানকারীরা আঙ্কারার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন অবসরকালীন ছুটিতে। তিনি কর্মীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন রাস্তায় অবস্থান নিতে। আর হাজার হাজার সমর্থক ইস্তাম্বুলের রাস্তায় অবস্থান নিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। এখানে বলা দরকার, নেকমাতিন এরবাকনের নেতৃত্বে ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টি ‘অতি ইসলামিক’ ও তুরস্কের সংবিধানের মূলধারার (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার) পরিপন্থী হওয়ায় দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, যা কি না সেনাবাহিনী চেয়েছিল। দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় ওই দলের সমর্থকরা প্রথমে ভার্চু পার্টি গঠন করে এবং পরে গঠন করে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, যা একেপি নামেও পরিচিত। আবদুল্লাহ গুল ও এরদোয়ান একেপি পার্টি গঠনের উদ্যোক্তা। ২০০২ সালের নির্বাচনে একেপি পার্টি বিজয়ী হওয়ায় আবদুল্লাহ গুল প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরদোয়ান তখন ছিলেন জেলে। একটি কবিতা আবৃত্তি করার অভিযোগে, সেখানে তিনি তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে কটাক্ষ করেছিলেন, তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একেপি পার্টি সরকার গঠন করে তাঁর সাজা মওকুফ করে দেয়। তিনি উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে আসেন, প্রধানমন্ত্রী হন আর আবদুল্লাহ গুল হন প্রেসিডেন্ট। সেই থেকে তাঁর যাত্রা শুরু। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। এবং সংবিধানে পরিবর্তন এনে তুরস্ককে রাষ্ট্রপতিশাসিত একটি দেশে পরিণত করেছেন। দেশটিতে একজন প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কেবিনেট থাকলেও মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে। এখন ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর সন্দেহাতীতভাবে এরদোয়ানের হাত আরো শক্তিশালী হয়েছে। একটি শক্তিশালী প্রেসিডেন্সি কি তুরস্কের গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে? একটি জিনিস অবশ্য লক্ষণীয় আর তা হচ্ছে এরদোয়ান আর একেপি পার্টির ক্ষমতা পরিচালনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকলেও সংসদে সব বিরোধী দল একত্রে সামরিক অভ্যুত্থানের উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। এরদোয়ানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও সব বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি বার্তা। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে জাতি যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। তুরস্কের গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েনি, একটি ধাক্কা খেয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য বড় প্রয়োজন। তবে সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানেরও দায়িত্ব রয়েছে অনেক। ‘জনগণই সব ক্ষমতার উৎস’ এটা তুরস্কের জনগণ প্রমাণ করেছে। কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, মিডিয়ার স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচার বিভাগ—এসব যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সত্যিকার গণতন্ত্রের স্বাদ তুরস্কের জনগণ পাবে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কাছে প্রত্যাশা তাই অনেক বেশি Daily Kalerkontho 19.07.2016 -f

বিশ্বের সর্বত্র জঙ্গিবাদের কালো ছায়

বাংলাদেশে ঢাকার গুলশানে আর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া জঙ্গি হামলা নিয়ে মিডিয়ায় আলাপ-আলোচনা যখন এখনো অব্যাহত রয়েছে, ঠিক তখনই ফ্রান্সের নিস শহরে জঙ্গি হামলা হলো। জঙ্গি হামলায় মারা গেছেন ৮৪ জন মানুষ, আর আহতের সংখ্যা ১০০-এর ওপরে। ফ্রান্সের পুলিশ জানিয়েছেন এই হামলার সঙ্গে জড়িত যিনি, তিনি তিউনেশিয়ার বংশোদ্ভূত ফ্রান্সের নাগরিক। নাম তার মোহাম্মদ লাউইজ বুলেল। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ আমাদের জানিয়েছেন এটা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের কাজ। ফ্রান্স যখন তার স্বাধীনতা দিবস পালন করছিল (১৪ জুলাই) তখন ৩১ বছরের বুলেল রাস্তায় থাকা শত শত মানুষের ওপর বিস্ফোরক ভর্তি ট্রাক উঠিয়ে দেয় এবং গুলি করে মানুষ হত্যা করে। ফ্রান্সের নিস শহরে এই ঘটনাটি ঘটল প্যারিসে গত নভেম্বরে (২০১৫) সন্ত্রাসী হামলার পর পরই প্যারিসে ওই সন্ত্রাসী হামলায় মারা গিয়েছিলেন ১৩০ জন মানুষ। এই ঘটনায় এখন অব্দি আইএস তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করলেও, বিশ্বব্যাপী আইএস যেভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে, তার সঙ্গে এর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে গেল এক বছরে সিরিয়া-ইরাক বাদে বিশ্বের সর্বত্র যেসব জঙ্গি হামলা হয়েছে, তাতে এখন অব্দি মারা গিয়েছেন প্রায় ১২০০ মানুষ। যার অর্ধেকই প্রায় পশ্চিমা বিদেশি নাগরিক। গত এক বছরে প্যারিস, ব্রাসেলস, তিউনেশিয়া, মিসর, তুরস্ক, ক্যালিফোর্নিয়া কিংবা অরল্যান্ডে যেসব আত্মঘাতী হামলা হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইএস তার দায় স্বীকার করেছে। গেল রমজান মাসে আইএস যে হামলা চালাবে, তা তারা আগেই ঘোষণা করেছিল। আইএসের একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে তা পশ্চিমা সংবাদপত্রে ছাপাও হয়েছিল। আর ওই রমজান মাসেই ঘটল একাধিক সন্ত্রাসী ঘটনা। অরল্যান্ডে সমকামী ক্লাবে হামলা চালালো ওমর মতিন, যিনি হামলার আগে আইএসের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন। মদিনায় যে হামলা হলো সেখানেও আইএসের কথা বলা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে জাকার্তায় তামরির স্ট্রিটের দূতাবাস এলাকায়ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল আইএস। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে আইএসের একটা যোগসূত্রে রয়েছে ঢাকার হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় আইএস তার দায়ভার স্বীকার করছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জেএমবির কথা, যারা সম্ভবত চেষ্টা করছে আইএসের অনুমোদন নিতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে গুলশানের হলি আর্টিজানের পর শোলাকিয়ার ঘটনা আমাদের জন্য অন্যতম একটা চিন্তার কারণ। গত বেশ কিছুদিন ধরে এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা বার বার ঘটছে। এতে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটি দিন। কিন্তু এর রেশ বাংলাদেশে যেমন রয়ে গেছে, তেমনি রয়ে গেছে বিদেশেও। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো সংবাদপত্রে, গবেষণামূলক সাময়িকীতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ যে মার্কিনী নীতি-নির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হয়ে উঠছে, এটা তার বড় প্রমাণ। মার্কিনীরা আসলে জানতে চায় বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে? ঘুরেফিরে স্যোশাল মিডিয়ায় ৫ জঙ্গির ছবি, তাদের নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এটা বড় ধরনের ঘটনা। তবে হলি আর্টিজানে হামলা এবং নূ্যনতম ৫ জন জঙ্গির সম্পৃক্ততাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রশ্ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নীতি-নির্ধারকরা এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে দেখতে পারেন। এর ফলে আগামী দিনে জঙ্গি দমন কার্যক্রম নতুন একটি গতি পাবে। এক. জঙ্গিরা বাংলাদেশি এটা প্রমাণিত। এরা সবাই ৫-৬ মাস আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এরা পরস্পর পরস্পকে সম্ভবত চিনত না। এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা কোনো একটি 'শক্তি' তাদের একত্রিত করে 'অপারেশন'-এর জন্য তৈরি করে। দুই. জঙ্গিরা কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, এ ব্যাপারে অস্পষ্টতা রয়েছে। এক জঙ্গির বাবা স্বীকার করেছেন তিনি তার ছেলের পাসপোর্ট সরিয়ে রেখেছিলেন। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অনেক সম্ভাবনা আমাদের মধ্যে উঁকি দেয়। তাহলে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হলো কোথায়? সিরিয়ায় নাকি বাংলাদেশের ভেতরে কোথাও? এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে। যদি সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তারা কোন পথে সিরিয়া গেছে? বিমানবন্দর হয়ে, নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের মধ্যদিয়ে তারা গেছে সিরিয়ায়? গত ৬ মাসের ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীদের চেকলিস্ট অনুসন্ধান করলে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। আমার যতটুকু ধারণা সাম্প্রতিককালে বিমানবন্দরে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছিল এবং বিদেশে যারা যাচ্ছেন তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হয়েছিল। জঙ্গিরা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ার কায়রোয় (তথাকথিত আইএসের রাজধানী) থাকার কথা। জঙ্গিরা মালয়েশিয়ার রুট ব্যবহার করে থাকতে পারে। গোয়েন্দারা এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। আরো একটি সম্ভাবনাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবর যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, তাতে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে। যেটা খুব উদ্বেগের বিষয়, তা হচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেএমবির ঘাঁটি রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হাফিজ শেখ (জানুয়ারি ২০১৬), কিংবা সেলিম রেজার (জানুয়ারি ২০১৬) জঙ্গি কালেকশনে গ্রেপ্তারের কাহিনী সেখানকার পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাঠক স্মরণ করতে পারেন ভারতীয় গোয়েন্দারা ওইসব কর্মকা-ে (বিশেষ করে বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণ) জেএমবির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে ঢাকায়ও এসেছিলেন। ফলে হলি আর্টিজানে যে ৫ জন জঙ্গি মারা গেছে, তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকতে পারে। আমাদের গোয়েন্দাদের এখন বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তুরস্কে আইএসের হামলায় যে তিন জঙ্গি অংশ নিয়েছিল, তারা কেউই তুরস্কের নাগরিক নন। ওই তিনজন ছিলেন রাশিয়ার চেচেন উজবেকিস্তান ও ফিলিস্তিনের নাগরিক। আইএস এখন মধ্য এশিয়ার নাগরিকদের ব্যবহার করছে সন্ত্রাসী কর্মকা-ে। এটা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে যেসব বিদেশি নাগরিক, ভ্রমণ বা ধর্মীয় কাজে আসেন, বিশেষ করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয়ে যাওয়া মুসলিম রিপাবলিকগুলো থেকে আসা নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। সেই সঙ্গে আফগান, পাকিস্তানি ও তুরস্কের নাগরিকদের গতিবিধিও লক্ষ্য রাখতে হবে। তাবলিক জামাতে যোগ দিতে এরা আসেন। অনেকে থেকেও যান বিনা ভিসায়। পুলিশের কাছে এদের তথ্য আছে কিনা জানি না; কিন্তু এদিকে দৃষ্টি দেয়া এখন প্রয়োজন। জঙ্গিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যে অ্যাপ ব্যবহার করে তারা তথ্য আদান-প্রদান করেছে কিংবা ছবি আপলোড করেছে, তাতে কী বিষয় কথা হয়েছে, কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তার কোনো তথ্য থাকে না। ফলে খুব সহজেই জঙ্গিরা পার পেয়ে যায়। সুতরাং আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে জরুরি ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে জঙ্গি তৎপরতা মনিটর করা সহজ হয়। হলি আর্টিজানের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে জঙ্গিরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ধনী ঘরের সন্তান। এ ক্ষেত্রে আমরা এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তদন্ত করার জন্য আমাদের দরজা বিদেশিদের খুলে দিতে পারি না। বরং আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আরো দক্ষ, প্রশিক্ষিত করা যায়। তাদের জঙ্গি দমনে প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশেই বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। এই ইউনিটের সঙ্গে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ নেয়া কমান্ডোদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এই ইউনিটকে অন্যসব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বিভেদ, রেষারেষি ও অনৈক্য যদি থাকে, তাতে জঙ্গিরাই লাভবান হবে। এ ধরনের জঙ্গি হামলাকে আমরা একপাশে ঠেলে সরিয়ে রাখতে পারি না। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের বিষয়টির (প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে) নীতি-নির্ধারকরা বিবেচনায় নিতে পারেন। মোদ্দা কথা 'নাইন-ইলেভেন'-এর পর সারাবিশ্ব জঙ্গিবাদের এক ধরনের উত্থান দেখেছিল। তখন আল-কায়েদার টার্গেট ছিল মার্কিন নাগরিক, মার্কিন স্থাপনা কিংবা যেখানে মার্কিনী স্বার্থ রয়েছে সেখানে তাদের আক্রমণ তারা পরিচালনা করেছে। কিন্তু আইএস এক ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আর্বিভূত হয়েছে। তাদের আক্রমণের টার্গেট হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং এক আত্মঘাতী সন্ত্রাসী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে আইএস। এই সন্ত্রাসীদের দমনে জাতিসংঘে যে আইনটি পাস হওয়া জরুরি ছিল, তা পাস হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী যদি ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়ে ক্ষমতাসীনদের উৎখাত করতে পারে, তাহলে সিরিয়া-ইরাকের একটা অংশ দখল করে নেয়া আইএস জঙ্গিদের উৎখাত করতে পারবে না কেন? এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা, ইসরাইলি কানেকশন, রাশিয়ার ভূমিকা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আছে তাই আইএস এর উত্থান ও তাদের যে কোনো হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এতদিন আমাদের একটা ধারণা ছিল আইএসের কর্মকা- শুধু সিরিয়া ও ইরাকের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু আইএস তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা- এখন বিশ্বের সর্বত্র সম্প্রসারিত করছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পর্যন্ত আইএসের 'অপারেটিভ'রা হামলা চালিয়েছে। অরল্যান্ডের ঘটনা এর বড় প্রমাণ অরল্যান্ডের পর ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আবারো ফ্রান্স। ফলে বিশ্বের সর্বত্র জঙ্গিবাদের যে বিস্তার ঘটছে, তাকে কোনো অবস্থাতেই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। এই জঙ্গিবাদ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যতম একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্র কিংবা প্যারিসের মতো দেশও আজ আক্রান্ত। বিশ্ব নেতারা এই বিষয়টি নিয়ে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি গরুত্বের দাবি রাখে। আমরা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছি। ভবিষ্যতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাকেও আমি উড়িয়ে দিতে পারি না। তাই জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। মনে রাখতে হবে জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যায় আমরা আক্রান্ত হতে বাধ্য! এ ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় নেতারা যদি দূরদর্শিতার পরিচয় না দেন, যদি জঙ্গি দমন প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আমাদের জন্য এক মহাদুর্যোগ অপেক্ষা করছে। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে Daily Jai Jai Din 18.07.2016

বিশ্বের সর্বত্র জঙ্গিবাদের কালো ছায়


বিশ্বজুড়ে সহিংসতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবারও জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছে ফ্রান্স। দেড় বছরের মধ্যে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সন্ত্রাসী হামলার শিকার হল দেশটি। বৃহস্পতিবার রাতে ফ্রান্সের নিস শহরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৪ ব্যক্তি। এর ক’দিন আগে সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে তুরস্কের ইস্তান্বুল নগরী। গত মার্চে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। শুধু ইউরোপ নয়, জঙ্গি হামলার শিকার হচ্ছে এশিয়াও। সম্প্রতি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে হামলা হয়েছে ঢাকা, বাগদাদ ও মদিনায়। সহিংসতার উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি ভিন্ন হলেও এ থেকে মুক্ত নেই আমেরিকাও। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ও লুসিয়ানা অঙ্গরাজ্যে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার কর্তৃক দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের হত্যাকাণ্ডের পর ডালাসে ৫ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এখন আলোচনার ঝড় বইছে। ৫ পুলিশ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে গত ৮ জুলাই। হত্যাকারী একজন কৃষ্ণাঙ্গ- মিকা জেভিয়ার জনসন। মিকা একজন আফগানফেরত সৈনিক। পরিকল্পিতভাবে সে ৫ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে। পরে পুলিশের ‘রকেটবোমায়’ মিকা নিহত হয়। এই ৫ পুলিশ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নতুন করে আবার জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিয়েছে। গত ১২ জুলাই ৫ পুলিশ অফিসারের জন্য আয়োজিত স্মরণসভায় ডালাসে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা, ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। ওবামা এখানে যে বক্তব্য দেন তাও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তিনি বলেছেন, ‘যতটা বলা হয় আমরা বিভক্ত সমাজ, আমরা অতটা বিভক্ত নই’, তারপরও তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ধরনের হতাশা। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘আফ্রো-আমেরিকানদের দুর্দশার জন্য, তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য যা করা উচিত ছিল, তা আমরা করতে পারিনি।’ ৫ পুলিশ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে বিষয়টি কাজ করেছিল, তা হচ্ছে জাতিগত দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এক ধরনের অবহেলা এবং একই সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে দিয়ে এই জাতিগত বিদ্বেষের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এই জাতিগত বিদ্বেষ কত গভীরে। মিনেসোটা ও লুসিয়ানায় দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমি নিউইয়র্কে। এমনকি ৫ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার হত্যার সময়ও আমি ছিলাম নিউইয়র্কে। নিউইয়র্ক অনেক বড় শহর। এই জাতিগত বিদ্বেষের বিষয়টি সেখানে বোঝা যায় না। যেদিন ওবামা ডালাসে ভাষণ দিলেন (১২ জুলাই), সেদিন আমি নিউইয়র্ক থেকে ডালাসের ফ্লাইট ধরেছি। ডালাসে আসব। আমেরিকান এয়ারলাইনসে আমার পাশে বসা ছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবয়সী। ৪ ঘণ্টার ফ্লাইট। একসময় পরিচয় হল। কমিউনিটি কলেজের শিক্ষক। বোধকরি আমাকে কিছুটা আস্থায় তিনি নিতে পেরেছিলেন। কেননা আমি কৃষ্ণাঙ্গ নই, এশিয়ান এবং মিক্সড কালার, গায়ের রংটা একেবারে কালো নয়। দীর্ঘ সময় যে আলোচনা হয়েছে তার মোদ্দা কথা একটাই- কৃষ্ণাঙ্গরা অসভ্য, তারা আইন-কানুন মানে না, কাজ করতে চায় না, জঙ্গি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি জানি, টেক্সাস একটি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত এলাকা। এখানকার মানুষ অনেক কনজারভেটিভ। ডালাসে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ৫০ দশমিক ৭ ভাগ শ্বেতাঙ্গ, আর ২৫ জন কৃষ্ণাঙ্গ। প্রায় ৩ ভাগ হচ্ছেন এশিয়ান বংশোদ্ভূত। প্রতিবছরই আমি ডালাস বেড়াতে আসি। আমি এখানকার মানুষের মনোভাব কিছুটা বুঝতে পারি। সুতরাং ওই কমিউনিটি কলেজের অধ্যাপক একজন শিক্ষিত লোক হলেও যে তার ভেতরে এক ধরনের জাতিগত বিদ্বেষ রয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমি তাতে অবাক হইনি। ৫ পুলিশ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হচ্ছে- এটাই ছিল একদিকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ, অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পুলিশ কর্তৃক ১১টি কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু কোনো একটি ক্ষেত্রেও অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ অফিসারের বিচারে শাস্তি হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত অফিসার পদত্যাগ করেছেন, অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ‘ফয়সালা’ হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। অতি সম্প্রতি মিনেসোটা ও লুসিয়ানায় যে কিশোরদের হত্যা করা হয়েছে তাতে দেখা যায় (ভিডিও ফুটেজ), জনৈক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে গুলি করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার মুভমেন্ট’। আর এ মুভমেন্টের সংগঠকরা যখন ডালাসের রাস্তায় মিনেসোটা-লুসিয়ানায় পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদে একটি মিছিলের আয়োজন করেছিল, তখন অদৃশ্য আততায়ীর গুলিতে মারা যান ৫ পুলিশ অফিসার, যারা ছিলেন সবাই শ্বেতাঙ্গ। মিকা জেভিয়ার জনসন ‘শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার’ হত্যার অঙ্গীকার করেছিল। টেক্সাসে তার বাড়িতে হানা দিয়ে পুলিশ বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও উপাদানও সংগ্রহ করে। স্পষ্টতই মিকা এক ধরনের ‘প্রতিশোধ’ নিতে চেয়েছিল। ডালাস ট্রাজেডি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এই জাতিগত বিদ্বেষ কত গভীরে প্রবেশ করেছে। ডালাস হত্যাকাণ্ডের পর সাউথ ক্যারোলিনায় দক্ষিণপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গৃহযুদ্ধকালীন পুরনো পতাকা পর্যন্ত উড়িয়েছে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানবতাবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত ভাষণ (২৮ আগস্ট ১৯৬৩) : 'I have a dream' -আমার একটি স্বপ্ন আছে। হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের উপস্থিতিতে লুথার কিং বলেছিলেন, ‘তার একটি স্বপ্ন আছে যে একদিন এ জাতি জেগে উঠবে।’ কিং বলেছিলেন, 'I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed : We hold these truth to be self evident, that all men are created equal।’ কিং তার স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন- একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস ও দাসের মালিকরা একসঙ্গে বসে ভ্রাতৃত্ববোধকে সমুন্নত রাখবে। একসঙ্গে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সব ভেদাভেদ ভুলে দেশকে গড়ে তুলবে! প্রায় ৫৩ বছর আগের কথা। লুথার কিংয়ের স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? না, পূরণ হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গরা এখনও মূলধারার রাজনীতিতে আসতে পারেননি। ওবামাকে বলা হয় কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু ওবামার মা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, বাবা কেনিয়ান। অর্থাৎ তিনি মিশ্র। তবে স্ত্রী মিশেল কৃষ্ণাঙ্গ এবং সাবেক এক আফ্রিকান দাসের রক্ত তার শরীরে রয়েছে। ওবামা কোনো দাসের রক্ত বহন করেন না। মার্কিন সমাজে কৃষ্ণাঙ্গরা এখনও অবহেলিত। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ১১৪তম কংগ্রেস (সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে (মোট সদস্য ৪৪১) আর সিনেটে রয়েছেন ২ জন কৃষ্ণাঙ্গ (মোট সদস্য ১০০)। এদের পরিচিতি আফ্রো-আমেরিকান হিসেবে। বলা ভালো, প্রায় ৩২ কোটি ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর এই দেশ যুক্তরাষ্ট্র। জনসংখ্যার ৭২ দশমিক ৪ ভাগ শ্বেতাঙ্গ, ১২ দশমিক ৬ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ, আর ৪ দশমিক ৭৩ ভাগ এশিয়ান (চীনা, ভারতীয়সহ)। সুতরাং কংগ্রেসে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব খুব বেশি এটা বলা যাবে না। মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে বৈষম্য আছে। ওয়াশিংটনের পিউ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যেখানে গড়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গের সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৫,৬৭৭ ডলার, সেখানে একজন শ্বেতাঙ্গের সম্পদের পরিমাণ ১,১৩,১৪৯ ডলার। অর্থাৎ ২০ গুণেরও বেশি সম্পদের অধিকারী শ্বেতাঙ্গরা। পরিসংখ্যান বলছে, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ ভাগের কাছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের সম্পদ আছে। আর শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে আছে ৩০ ভাগ। ১ ভাগের কম কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী ১ মিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক, অথচ ১০ ভাগ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে আছে ৮ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ৪ ভাগের ১ ভাগ মাত্র ১০০০ ডলার করে পেনশন ভাতা পান। আর গড় শ্বেতাঙ্গদের পেনশনের পরিমাণ অনেক গুণ বেশি। শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যকার এই বৈষম্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক গবেষণা হয়েছে। প্রতিটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষায়ও তাদের অগ্রগতি নেই। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা ও শ্বেতাঙ্গবিদ্বেষ থাকা বিচিত্র নয়। আর এরই প্রতিফলন ঘটেছে ডালাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাষ্ট্রে পরিণত হলেও দেখা গেছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে কিছু সম্পদশালী লোকের কাছে। এসব সম্পদশালী লোকই রাজনীতি তথা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। এরা শত শত কর্পোরেট হাউস গঠন করে আজ শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ১ ভাগ মানুষ। এ কারণেই গড়ে উঠেছিল ‘অকুপাই মুভমেন্ট’। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের সেই জুকোটি পার্কের কাহিনী সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। ম্যানহাটনের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাশেই জুকোটি পার্ক। গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম সেখানে। ছোট একটি পার্ক। মানুষ বসে বিশ্রাম করে। আগের মতো সেই ‘জুকোটি পার্ক’ আন্দোলনের (সেপ্টেম্বর ২০১১) কথা কেউ মনে রাখে না এখন আর। শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বৈষম্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এ বৈষম্য কমিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ কখনও গ্রহণ করা হয়নি। সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। ফলে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ছিল। আর সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মিনেসোটা ও লুসিয়ানায় কিশোর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। পুলিশের ভূমিকা এখন সর্বত্র সমালোচিত হচ্ছে। পুলিশ অফিসাররা, যারা সবাই শ্বেতাঙ্গ, তারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যে বর্বোরোচিত আচরণ করেছে, তা সংগত ছিল না। তাদের ভেতরে এক ধরনের জাতিবিদ্বেষ কাজ করেছিল। কৃষ্ণাঙ্গ গবেষক এবোনি স্লটার জনসন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন সম্প্রতি (Still Second Class Citizens, Other Worlds, 13 July, 2016)। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এই যে অত্যাচার-নিপীড়ন, তা মূলত ১৮৫৭ সালে দেয়া তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রজার তানেহর দেয়া একটি ঐতিহাসিক রায়েরই প্রতিফলন। একটি দাস পরিবারে জন্ম নেয়া জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ ড্রেড স্কট ‘স্বাধীন’ কিনা, এটা জানতেই সেদিন মামলা হয়েছিল। বিচারপতি রজার ওই আবেদন শুধু খারিজই করেননি, বরং একটি বার্তাও দিয়েছিলেন, যা আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল : ‘আফ্রো-আমেরিকান, অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গরা আদৌ এ দেশের নাগরিক নন, তাদের কোনো অধিকারই নেই এ ধরনের মামলা করার।’ প্রধান বিচারপতি রজার তার রায়ে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আফ্রো-আমেরিকানদের কোনো অধিকার নেই, যা শ্বেতাঙ্গরা মানতে বাধ্য।’ ইন্সটিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের গবেষক এবোনি স্লটার জনসন মন্তব্য করেছেন এভাবে- 'The fight for full African American citizenship continues।’ অর্থাৎ পূর্ণ নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার অব্যাহত থাকবে। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৩তম, ১৪তম ও ১৫তম সংশোধনী বলে পর্যায়ক্রমে দাসত্ব প্রথা বিলোপ করা হয় এবং আফ্রো-আমেরিকানদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। যাদের সম্পত্তি ছিল, তারাই শুধু ভোট দিতে পারতেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার নিয়েও সমস্যা ছিল। প্রেসিডেন্ট জনসন ১৯৬৫ সালের ৬ আগস্ট যে আইনে স্বাক্ষর করেন, তাতে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে যত ধরনের বাধা ছিল, তা দূর হয়। আসলে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের যে আচরণ, তা পরিপূর্ণভাবে দূর হয়েছে এটা বলা যাবে না। কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে এখনও অনেকটা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর’ নাগরিকের মতো আচরণ করা হচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গরা এখনও সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিবিএসের সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ ভাগ আমেরিকান মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত বিদ্বেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে (১৩ জুলাই ২০১৬)। ১৯৯২ সালে লস এঞ্জেলেসে জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ রডনি কিংয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এই প্রথম জাতিগত বিদ্বেষ চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এই জাতিগত বিদ্বেষ আরও বাড়বে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন(?)। এই জাতিগত বিদ্বেষের ঘটনায়, বিশেষ করে মিনেসোটা ও লুসিয়ানার ঘটনার পর ডালাসের হত্যাকাণ্ড খোদ প্রেসিডেন্ট ওবামাকেও ক্ষুব্ধ করেছে। ডালাসের স্মরণসভায় তিনি এই জাতিগত বিদ্বেষকে তুলনা করেছেন 'The deepest fault lines of our democracy' হিসেবে (ভোয়া, ১৩ জুলাই)। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের একটি বড় ত্রুটি হচ্ছে এই জাতিগত বিদ্বেষ। প্রেসিডেন্ট ওবামার এ ধরনের মন্তব্য নিঃসন্দেহে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়ছে। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। পুলিশ বিভাগে শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা আইনবহির্ভূতভাবে এমন সব ‘কাজ’ করছেন, যা শুধু অভ্যন্তরীণভাবেই বিতর্কের সৃষ্টি করছে না, বরং জাতিগত বিদ্বেষকে আরও উসকে দিচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে Daily Jugantor 17.07.2016

জঙ্গি দমনে বিদেশি সহযোগিতা প্রশ্নে কিছু কথা




বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান রোধে বিশেষজ্ঞ দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিসা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশে এসেছিলেন। এর আগেও তিনি এসেছিলেন। এবারের প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন। বাংলাদেশে জঙ্গি দমনে সহযোগিতা দেয়া! বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিদেশি সহযোগিতা নিয়ে এ জঙ্গিবাদের উত্থান রোধ করা কতটুকু সম্ভব? এমন খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে যে, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে সংযুক্ত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের এজেন্টরা বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সঙ্গে একসঙ্গে মিলে জঙ্গি হামলাগুলোর তদন্ত করছে! এসব তদন্তের কী ফল বয়ে আনবে আমরা জানি না। কিন্তু এটা জানি, অতীতেও এফবিআইয়ের এজেন্টরা বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু তারা খুব একটা সুবিধা করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। বাংলাদেশী-আমেরিকান নাগরিক হত্যাকা-ের রহস্য তারা উদ্ঘাটন করতে পারেননি। সুতরাং বিদেশি তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের দিয়ে জঙ্গি তৎপরতা কতটুকু রোধ করা সম্ভব হবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।
আমি এর আগের লেখাগুলোতে বলতে চেষ্টা করেছি, জঙ্গিবাদ আজ একমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে এ সমস্যাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটা আঞ্চলিক যোগসূত্রও রয়েছে। বাংলাদেশে ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গি রয়েছে। এদের সীমিত কর্মকা- আমরা অতীতে দেখেছি। সাম্প্রতিক এসব ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর, বিশেষ করে আইএসের একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা, তিন বাংলাদেশীর রাকা থেকে ভিডিও টেপে হামলার হুমকি, শোলাকিয়ায় ঈদগাহ ময়দানের পাশে জঙ্গি হামলাÑ সব মিলিয়ে স্থানীয় ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। এ মুহূর্তে তাই প্রয়োজন জনসচেতনতা। জঙ্গি দমনে করণীয় নির্ধারণের জন্য সরকারের উচিত একটি ‘জাতীয় সংলাপ’ আহ্বান করা। সব রাজনৈতিক দলের (বিধিবদ্ধ ও নিবন্ধিত) সঙ্গে সরকার একটি ‘সংলাপ’ শুরু করতে পারে। আলোচ্যসূচিতে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে সরকার। মনে রাখতে হবে, সংলাপ চলাকালীন যদি দলগুলোর অতীত ভূমিকা আলোচিত হয়, তা কোনো ফল বয়ে আনবে না। অতীতমুখিতা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অতীত নয়, বরং সামনের দিকে তাকাতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস যেভাবে বলছে কারা কারা এ জঙ্গি হামলার উৎসাহদাতা, অর্থের যোগানদাতা তা খুঁজে বের করা জরুরি। এখানে যেন কোনো রাজনীতি কাজ না করে, অপরপক্ষকে দমন করার কোনো অভিপ্রায় যেন কাজ না করে। গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় যেন একধরনের শৈথিল্য আছে। তাদের মোটিভেশন দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বক্তব্যের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনায় একজনের বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। নানাজন বক্তব্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
জঙ্গি দমন প্রশ্নে কতগুলো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আইএস সম্পৃক্ততার দাবি সরকার উড়িয়ে দিচ্ছে না।’ এর অর্থ কী? আমরা এর ব্যাখ্যা কীভাবে করব? ইনু সাহেব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি যখন পরোক্ষভাবে এটা অনেকটা স্বীকার(?) করে নিলেন যে, বাংলাদেশে আইএস থাকতে পারে, তখন কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা স্বীকার করেন না। ফলে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্ত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলে তাতে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে। জঙ্গি প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। এখানে তথ্যমন্ত্রী উপযাচক হয়ে বক্তব্য দিলে বহির্বিশ্বে তার বক্তব্যকেই ‘কোট’ করবে। তথ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন, বাংলাদেশে আইএস আছে, এ স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা(?) এতে বাড়তে পারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর নামে এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে, ঠিক তখনই ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র উল্লেখ করে বলেছে, ‘জেএমবিকে ব্যবহার করে ভারতকে টার্গেট করছে আইএস।’ বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থান ভারতের নিরাপত্তাকে বিস্মিত করতে পারে(?), এ প্রশ্ন ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতারা তুলতে পারেন। কলকাতার আনন্দবাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, গুলশানের জঙ্গি হামলা তদন্ত করতে ভারত তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজির বিশেষ একটি টিমকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। তবে এটা স্পষ্ট নয়, এরই মধ্যে ওই টিম বাংলাদেশে এসেছে কিনা? পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অবশ্যই আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি সংস্থা আসছে না। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। দুই দেশের গোয়েন্দাদের মাঝে তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। এ মুহূর্তে সেটা বড় প্রয়োজন। আমি মনে করি, ভারতীয় গোয়েন্দাদের নিজ দেশে আরও সক্রিয় হওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবির নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। পরে দুইজন বাংলাদেশী নাগরিক হাফিজ শেখ ও সেলিম রেজা চলতি বছর গ্রেফতার হয়েছিলেন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে। ফলে এটা স্পষ্ট, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশী এবং ভারতীয় জঙ্গিদের তথাকথিত ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানে যেসব জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল, তাদের প্রশিক্ষণ ওই বর্ধমানে হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তাই জঙ্গি উৎখাতে ভারতের গোয়েন্দারা যদি তৎপর না হন, তাহলে তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে নাশকতা করবে। তাই এনএসজি পাঠানোর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গি দমন ও জঙ্গি নির্মূলের জন্য যথেষ্ট। ভারতকে এখন পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ করতে হবে। শোলাকিয়ার ঘটনায় নিহত জঙ্গি আবির হোসেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর আগে হলি আর্টিজানে হামলায় নিহত জঙ্গিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। আবিরও নিখোঁজ ছিল বেশ কয়েক মাস। তাই বিষয়টি এখন জরুরি যে, প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল’ (এটা অন্য নামেও হতে পারে) গঠন করতে হবে, যাদের কাজ হবে ছাত্রদের ডাটাবেজ তৈরি করে অনুপস্থিত ছাত্রদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া। ছেলেরা বিপথগামী কেন হয়, এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও উচিত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। কলকাতার আনন্দবাজারের খবর বাংলাদেশে আরও জঙ্গি হামলা হতে পারে এবং জঙ্গিরা একটি বড়সড় রিজার্ভ বেঞ্চ তৈরি করেছে রাজধানীর ১৫ কিলোমিটার বৃত্তের মধ্যে (৮ জুলাই)। বাংলাদেশের গোয়েন্দারাই বলতে পারবেন, এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে। তবে আরও জঙ্গি হামলার আশঙ্কাকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি না।
জঙ্গি তৎপরতা একটা বাস্তব সত্য। আমাদের তরুণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ বিপথগামী হয়েছে। মিডিয়া এ বিপথগামী থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামিক স্কলারদের ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও  তাদের ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। যাদের টিভির পর্দায় নিত্য দেখা যায়, তারা বেশিমাত্রায় সরকার-ঘেঁষা। তাদের বক্তব্যে ‘প্রকৃত সত্য’ ফুটে ওঠে না কখনও। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝেও তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই হলি আর্টিজান আর শোলাকিয়ার ঘটনায় জাতিকে কতটুকু ঐক্যবদ্ধ করবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের ওপর। এ দুই ঘটনা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জঙ্গি দমনে একসঙ্গে কাজ করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। কতিপয় বিভ্রান্ত তরুণের কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করতে পারি না। এ তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভরসা। বাংলাদেশকে এরই মধ্যে একটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। বিশেষ করে বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান, পোশাক শিল্পে আমাদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা, ঔষধ শিল্পের মান ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য আসনে গেছে। এখন কতিপয় বিভ্রান্ত যুবকের জন্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের রাজনীতিবিদদের দূরদর্শিতা দেখানোর সময় এখনই।
এটা সত্য, হলি আর্টিজানের ঘটনায় কিছু বিদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। কিন্তু সন্ত্রাসীরা যখন হঠাৎ করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটায়, তা রোধ করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। ওরল্যান্ডের সমকামী ক্লাবে একজন সন্ত্রাসী ওমর মতিন যখন হামলা চালিয়ে ৪৯ জনকে হত্যা করেছিল, তখন ওই হত্যাকা-কে কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দারা বন্ধ করতে পারেনি। প্যারিসে, ব্রাসেলসে কিংবা ইস্তানবুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলাও বন্ধ করা যায়নি। সুতরাং সন্ত্রাসীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এটা রোধ করার জন্য একদিকে যেমন দরকার জনসচেতনতা, অন্যদিকে তেমনি দরকার প্রশিক্ষিত, দক্ষ জনবল। জঙ্গি দমনে আমাদের বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। বৈদেশিক বিশেষজ্ঞদের আনাও ঠিক হবে না। আমাদের জনবল আছে। সেনাবাহিনীর অনেক চৌকস অফিসার আছেন, যারা প্রশিক্ষিত ও দক্ষ। তাদের আজ প্রয়োজন কাজে লাগানোর। একটা কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স গঠন করা হয়েছে। এখানে কিছুুটা পরিবর্তন দরকার। এ ইউনিটকে র‌্যাবের আঙ্গিকে গড়ে তোলা যায়। অর্থাৎ শুধু পুলিশ সদস্যদের মাঝে এ ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ না রেখে সেনা এবং নৌবাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। যতদূর জানি, নৌবাহিনীর কিছুু সদস্য মার্কিন নৌবাহিনীর সিল কমান্ডো (ঝঊঅখ) দ্বারা প্রশিক্ষিত। ওসামা বিন লাদেন হত্যাকা-ে ‘সিল’ জড়িত হওয়ার পর এর নামডাক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আমরা সেই আদলে একটি ‘টিম’ অথবা কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে সেই আদলে গড়ে তুলতে পারি। এদের কাজ হবে শুধু জঙ্গি মনিটরিং, জঙ্গি কার্যক্রম দেখভাল করা ও সে সঙ্গে জিম্মি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আমরা অন্য ‘কাজ’ করতেও দেখি। আরও একটি কথাÑ শুধু নর্থ সাউথ বা সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আঙুল নির্দেশ করা ঠিক হবে না। নর্থ সাউথকে ‘শাস্তি’ দেয়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। একজন ছাত্রকে দিয়ে হাজার হাজার ছাত্রকে একধরনের ‘বিচারের কাঠগড়ায়’ দাঁড় করানোও ঠিক নয়। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নর্থ সাউথের অবদান আছেÑ এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। আমার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলি, আমার এক ছাত্র সারা বছরে একদিনের জন্যও ক্লাস না করে শেষ মুহূর্তে এসে পরীক্ষা দিয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে (জাহাঙ্গীরনগর) জানানো হলেও, ওই ছাত্রটি আদৌ কোথায় ছিল, কী অবস্থায় ছিল, ভিসি একবারের জন্যও তো খুঁজে দেখার প্রয়োজনীয়তাবোধ করেননি। সুতরাং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যে ‘ধোয়া তুলসী পাতা’, তা বলা যাবে না। জঙ্গিবাদের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, এটা ভালো কথা। এখন গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হচ্ছে বৈদেশিক সহযোগিতা নয়, বরং ঐক্যবদ্ধভাবে নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করে জঙ্গি নির্মূলে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়াই মঙ্গল।
Daily Alokito Bangladesh
 15.07.2016

বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ


গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই শোলাকিয়া ঈদগাহের পাশে হামলা চালাল জঙ্গিরা। অতি সাম্প্রতিককালে নতুন করে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটেছে, তার রেশ ধরেই বাংলাদেশে এই জঙ্গি হামলা হলো। বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার কাছাকাছি সময়ে ইন্দোনেশিয়ায় জঙ্গি হামলা হয়েছে। মদিনায় জঙ্গি হামলা হয়েছে। সূত্রটা একই আইএস। অর্থাৎ আইএস বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাসী তত্পরতা অব্যাহত রেখেছে, তারই ধারাবাহিকতায় একের পর এক জঙ্গি হামলা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গেল এক বছরে সিরিয়া-ইরাক বাদে বিশ্বের সর্বত্র যেসব জঙ্গি হামলা হয়েছে, তাতে মারা গেছে প্রায় এক হাজার ২০০ জন। যার প্রায় অর্ধেকই পশ্চিমা বিদেশি নাগরিক। গত এক বছরে প্যারিস, ব্রাসেলস, তিউনিসিয়া, মিসর, তুরস্ক, ক্যালিফোর্নিয়া কিংবা অরল্যান্ডোয় যেসব আত্মঘাতী হামলা হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইএস তার দায় স্বীকার করেছে। রমজান মাসে আইএস যে হামলা চালাবে, তা তারা আগেই ঘোষণা করেছিল। আইএসের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে তা পশ্চিমা সংবাদপত্রে ছাপাও হয়েছিল। আর এই রমজান মাসেই ঘটল একাধিক সন্ত্রাসী ঘটনা। অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবে হামলা চালাল জনৈক ওমর মতিন, হামলার আগেই সে আইএসের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিল। মদিনায় যে হামলা হলো সেখানেও আইএসের কথা বলা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে জাকার্তার তামরিন স্ট্রিটের দূতাবাস এলাকায়ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল আইএস। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে আইএসের একটা যোগসূত্র রয়েছে। ঢাকার হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় আইএস তার দায়ভার স্বীকার করছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জেএমবির কথা। এরপর শোলাকিয়ার ঈদগাহের পাশে যে হামলা হলো তার সঙ্গে হলি আর্টিজানের হামলাকারী চক্রের যোগসূত্র আছে বলে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। নিঃসন্দেহে গুলশানের পর শোলাকিয়ার ঘটনা আমাদের জন্য অন্যতম একটা চিন্তার কারণ। বেশ কিছুদিন ধরে এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা বারবার ঘটছে। এতে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটি দিন। কিন্তু এর রেশ বাংলাদেশে যেমন রয়ে গেছে, তেমনি রয়ে গেছে বিদেশেও। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো সংবাদপত্রে, গবেষণামূলক সাময়িকীতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ যে মার্কিনি নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হয়ে উঠছে, এটা তার বড় প্রমাণ। মার্কিনিরা আসলে জানতে চায় বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে? ঘুরেফিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাঁচ জঙ্গির ছবি, তাদের নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এটা বড় ধরনের ঘটনা। তবে হলি আর্টিজানে হামলা এবং ন্যূনতম পাঁচ জঙ্গির সম্পৃক্ততাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রশ্ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকরা এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজে দেখতে পারেন। এর ফলে আগামী দিনে জঙ্গি দমন কার্যক্রম নতুন একটি গতি পাবে। এক. জঙ্গিরা বাংলাদেশি। এটা প্রমাণিত। এরা সবাই পাঁচ-ছয় মাস আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এরা পরস্পর পরস্পরকে সম্ভবত চিনত না এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা কোনো একটি ‘শক্তি’ তাদের একত্রিত করে ‘অপারেশন’-এর জন্য তৈরি করে। দুই. জঙ্গিরা কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, এ ব্যাপারে অস্পষ্টতা রয়েছে। এক জঙ্গির বাবা স্বীকার করেছেন তিনি তাঁর ছেলের পাসপোর্ট সরিয়ে রেখেছিলেন। এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অনেক সম্ভাবনা আমাদের মাঝে উঁকি দেয়। তাহলে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো কোথায়? সিরিয়ায় নাকি বাংলাদেশের ভেতরে কোথাও? এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে। যদি সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তারা কোন পথে সিরিয়ায় গেছে? বিমানবন্দর হয়ে, নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের মধ্য দিয়ে তারা গেছে সিরিয়ায়? গত ছয় মাসে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীদের ‘চেকলিস্ট’ অনুসন্ধান করলে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। আমার যতটুকু ধারণা, সাম্প্রতিককালে বিমানবন্দরে গোয়েন্দা তত্পরতা বাড়ানো হয়েছিল এবং বিদেশে যারা যাচ্ছে, তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হয়েছিল। জঙ্গিরা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ার রাকাতে (তথাকথিত আইএসের রাজধানী) যাওয়ার কথা। জঙ্গিরা মালয়েশিয়ার রুট ব্যবহার করে থাকতে পারে। গোয়েন্দারা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। আরো একটি সম্ভাবনাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, তাতে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে। যেটা খুব উদ্বেগের বিষয়, তা হচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেএমবির ঘাঁটি রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হাফিজ শেখ (জানুয়ারি ২০১৬) কিংবা সেলিম রেজার (জানুয়ারি ২০১৬) জঙ্গি কানেকশনে গ্রেপ্তারের কাহিনী সেখানকার পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাঠক স্মরণ করতে পারেন ভারতীয় গোয়েন্দারা ওই সব কর্মকাণ্ডে (বিশেষ করে বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণ) জেএমবির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে ঢাকায়ও এসেছিলেন। ফলে হলি আর্টিজানে যে পাঁচ জঙ্গি মারা গেছে, তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকতে পারে। আমাদের গোয়েন্দাদের এখন বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিন. তুরস্কে আইএসের হামলায় যে তিন জঙ্গি অংশ নিয়েছিল, তারা কেউই তুরস্কের নাগরিক নয়। ওই তিনজন ছিল রাশিয়া (চেচেন), উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের নাগরিক। আইএস এখন মধ্য এশিয়ার নাগরিকদের ব্যবহার করছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। এটা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে নাগরিক ভ্রমণ বা ধর্মীয় কাজে আসা বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। সেই সঙ্গে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তুরস্কের নাগরিকদের গতিবিধিও লক্ষ রাখতে হবে। পুলিশের কাছে এদের তথ্য আছে কি না জানি না, কিন্তু এদিকে দৃষ্টি দেওয়া এখন প্রয়োজন। চার. জঙ্গিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যে অ্যাপ ব্যবহার করে তারা তথ্য আদান-প্রদান করেছে কিংবা ছবি আপলোড করেছে, তাতে কী বিষয়ে কথা হয়েছে, কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তার কোনো তথ্য থাকে না। ফলে খুব সহজেই জঙ্গিরা পার পেয়ে যায়। সুতরাং আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে জরুরি ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে জঙ্গি তত্পরতা মনিটর করা সহজ হয়। পাঁচ. হলি আর্টিজানের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে জঙ্গিরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ধনী ঘরের সন্তান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে জঙ্গিদের বড় আস্তানায় পরিণত হয়েছে, এটা এখন দিবালোকের মতো সত্য। সুতরাং ‘নারী নির্যাতন সেল’-এর মতো প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সেই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও) একটি ‘জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল’ (এটা অন্য নামে হতে পারে) গঠন করতে হবে। এই ‘সেল’-এর কাজ হবে যেসব ছাত্র ক্লাসে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকে, তাদের বিষয়ে মনিটর করা। প্রতিটি ছাত্রের ডাটাবেইস করতে হবে। এতে এক ধরনের নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং যারা বিপথগামী তাদের চিহ্নিত করা সহজ হবে। ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, তিন বাংলাদেশি আইএস জঙ্গি রাকা থেকে (আইএসের রাজধানী সিরিয়ায়) ভিডিও বার্তায় বাংলা ভাষায় আবারও জঙ্গি হামলার হুমকি দিয়েছে। আমি বিশ্বাস রাখতে চাই, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তাদের পরিচয় ইতিমধ্যে জানা গেছে। সবাই উচ্চশিক্ষিত। বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখার জন্য তাদের অভিভাবকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। কোনো অভিভাবকের সন্তান যখন বিপথগামী হয়, তিনি জেনেও তা যদি পুলিশকে না জানিয়ে থাকেন, তিনি অন্যায় করেছেন। তেমন অভিভাবক কোনোভাবেই ক্ষমা পেতে পারেন না। সন্তানের দায়ভার তাঁকে বহন করতে হবেই। বিষয়টি যদি পুলিশ আগে জানত, বোধ করি পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। বিবিসি বাংলা আমাদের জানাচ্ছে তেমনি একজন অভিভাবকের ছেলে নাকি (যে বাংলায় রাকা থেকে হুমকি দিয়েছিল) ছয়-সাত মাস আগে তুরস্ক চলে গিয়েছিল। তাঁর ব্যর্থতা এখানেই যে ছেলের চাল-চলন দেখেও তাকে তিনি সংশোধন করতে পারেননি এবং পুলিশ প্রশাসনকে তা জানাননি। এ ক্ষেত্রে আমরা এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তদন্ত করার জন্য আমাদের দরজা বিদেশিদের হাতে খুলে দিতে পারি না। বরং আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আরো দক্ষ ও শিক্ষিত করা যায়। তাদের জঙ্গি দমনে প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশেই বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এই ইউনিটের সঙ্গে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ নেওয়া কমান্ডোদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এই ইউনিটকে অন্য সব কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিভেদ, রেষারেষি ও অনৈক্য যদি থাকে, তাতে জঙ্গিরাই লাভবান হবে। এ ধরনের জঙ্গি হামলাকে আমরা একপাশে ঠেলে সরিয়ে রাখতে পারি না। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের বিষয়টিও (প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে) নীতিনির্ধারকরা বিবেচনায় নিতে পারেন। মোদ্দা কথা ‘নাইন ইলেভেন’-এর পর সারা বিশ্ব জঙ্গিদের এক ধরনের উত্থান দেখেছিল। তখন আল-কায়েদার টার্গেট ছিল মার্কিন নাগরিক, মার্কিন স্থাপনা কিংবা যেখানে মার্কিনি স্বার্থ রয়েছে সেখানে তাদের আক্রমণ তারা পরিচালনা করেছে। কিন্তু আইএস এক ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের আক্রমণের টার্গেট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এক আত্মঘাতী সন্ত্রাসী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে আইএস। এই সন্ত্রাসীদের দমনে জাতিসংঘে যে আইনটি পাস হওয়া জরুরি ছিল তা পাস হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী যদি ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়ে ক্ষমতাসীনদের উত্খাত করতে পারে, তাহলে লিবিয়া-ইরাকের একটা অংশ দখল করে নেওয়া আইএস জঙ্গিদের উত্খাত করতে পারবে না কেন? এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা, ইসরায়েলি কানেকশন, রাশিয়ার ভূমিকা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আছে; তাই আইএসের উত্খাত ও তাদের যেকোনো হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এত দিন ভেবেছি, আমরা আক্রান্ত হব না। কিন্তু হলি আর্টিজান আর সর্বশেষ শোলাকিয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হলো আইএসের হুমকিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ আর নেই। প্রয়োজন তাই ঐক্যের ও জনসচেতনতার। Daily Kalerkontho 12 July 2016 - See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2016/07/12/379791#sthash.argsKAcC.dpuf