রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

অনিশ্চিত সার্কের ভবিষ্যৎ


হঠাৎ করেই কাশ্মীর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে কাশ্মীর সংক্রান্ত খবরাখবর। শুধু তাই নয়, কাশ্মীর নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধের আশংকা দেখছেন কেউ কেউ। গত জুলাই থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক ধরনের ‘অসহযোগ আন্দোলন’ চলে এলেও দু’দেশের মাঝে উত্তেজনা বাড়ে যখন শ্রীনগর-মুজাফফরাবাদ হাইওয়ের পাশে অবস্থিত উরির সীমান্ত ফাঁড়িতে ১৮ ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ভারতে। ৫ মিনিটের মধ্যে মানচিত্র থেকে পাকিস্তানের চিহ্ন মুছে ফেলার হুমকি দেয়া হয় ভারতের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে, ভারত সীমান্তে অবস্থিত পাকিস্তানি ফাঁড়িগুলোতে হামলা চালাতে পারে। পাকিস্তান ভারতীয় ‘হুমকিকে’ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, তা বোঝা যায় জেনারেল রাহিল শরিফের কোর কমান্ডারদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক ও বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পাল্টা হুমকিতে।

ভারত অভিযোগ করেছে, ১৮ ভারতীয় সৈনিকের হত্যার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দায়ী। পাক সেনাবাহিনী মূলত নওয়াজ শরিফের সিভিলিয়ান সরকারকে দুর্বল করতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাই এ কাজটি করেছে, যাতে করে পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নটি জাতিসংঘে তুলে বিশ্ব জনমত তার পক্ষে নেয়ার যে চেষ্টা করছে তা ভেস্তে যায়। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাক প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যভুক্ত ৫টি রাষ্ট্রকে চিঠি দিয়ে কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ এনেছেন। সব মিলিয়ে কাশ্মীর নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। এ উত্তেজনা সার্ক সম্মেলনের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ৯ ও ১০ নভেম্বর ইসলামাবাদে সার্ক (১৯তম) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইতিমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইসলামাবাদে যাচ্ছেন না। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানও সার্ক সম্মেলনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সার্কের চার্টারে বলা হয়েছে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর কোনো একটি যদি শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তাহলে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। তাই একটা বিষয় বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে- নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন স্থগিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত।

উরির ঘটনা ছাড়াও সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সার্ক সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণ না করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গত আগস্টে ইসলামাবাদে সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সম্মেলনে দু’দেশের মধ্যে একটি তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল। এমনকি রাজনাথ সিং সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই তখন ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছিলেন। সম্মেলন চলাকালীন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে হাতে হাত মেলাননি। এটা ছিল কূটনৈতিক অসৌজন্যতা। রাজনাথ সিং পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসভবনে আয়োজিত ডিনারেও অংশ নেননি। সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে রাজনাথ সিং অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাকিস্তান সাহায্য করছে বলেও তার অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বলেছিলেন, স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী বলা ঠিক হবে না। কাশ্মীরে ভারতের দখলদারিত্বের অভিযোগ এনে যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে, পাকিস্তান তাদের দেখছে ‘স্বাধীনতাকামী’ হিসেবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে (৭১তম) পাকিস্তান কাশ্মীর প্রসঙ্গটি তুলেছে। একইসঙ্গে ভারত কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘন করছে বলেও অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। ফলে একটি তিক্ততার সম্পর্ক ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। প্রথমবার তিনি মন্তব্য করেছেন পার্টির সিনিয়র নেতাদের সভায়। সেখানে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান বেলুচিস্তানে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে এবং সেখানে মানবাধিকার লংঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে। এরপর তিনি স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে (১৫ আগস্ট, ২০১৬) আবারও বেলুচিস্তানের প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং বেলুচিস্তান, গিলগিট ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণ যে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সে কথাটাও তিনি উল্লেখ করেন। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ। তিনি বলেছিলেন, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত, মোদির বক্তব্যে এটা আবারও প্রমাণিত হল।

তৃতীয়ত, ভারত অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভারতীয় বিমানঘাঁটি ব্যবহার

করতে পারবে।

চতুর্থত, অক্টোবরে আফগান সমস্যার সমাধানের জন্য নিউইয়র্কে একটি ত্রিদেশীয় (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যাতে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। স্পষ্টতই, এ অঞ্চলে দুটি জোটের জন্ম হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অক্ষ, অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষ। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার, তা নিয়ে ভারতের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। এই অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্কে। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই চাইবে না এ অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক।

ইতিমধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে চীনও শরিক হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা করেছেন এবং কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। নওয়াজ শরিফ জাতিসংঘে দেয়া তার ভাষণে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতের অত্যাচার ও মানবাধিকার লংঘনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি একইসঙ্গে জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব বান কি মুনের কাছে ভারতীয় ‘অত্যাচার ও নিপীড়নের’ দৃশ্য সংবলিত ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন। তিনি কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করলেও বান কি মুন অবশ্য এ ব্যাপারে সায় দেননি। মুন কাশ্মীর প্রশ্নে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছিলেন। নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানির আলোচনায় ইরান কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থনের কথাও জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে কাশ্মীর প্রশ্নে একদিকে পাক-ভারত উপমহাদেশে উত্তেজনা যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে এ দুটি দেশের মধ্যে একটি ‘কূটনৈতিক যুদ্ধ’ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বালুচ নেতা ব্রাহামদাগ বুগতিকে দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আদালতে চীনের বিরুদ্ধে মামলা করার একটি উদ্যোগ নিচ্ছে, এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বলা ভালো, ৮ জুলাই (২০১৬) কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদিন কমান্ডার বুরহান ওয়ানিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী হত্যা করে। এরপর থেকেই কাশ্মীরের পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে এবং তা শেষ পর্যন্ত সার্ক সম্মেলনকে আক্রান্ত করেছে।

অনেক পর্যবেক্ষকই এখন মনে করেন, সার্ক তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ৩১ বছর আগে সার্ক গঠিত হলেও সংস্থাটির উন্নয়ন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বৈ কমেনি। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র্যতম অঞ্চলগুলোর একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু দারিদ্র্য এখানে কমেনি। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৬ ভাগ। বাংলাদেশে এ হার ৩২, নেপালে ২৫, পাকিস্তানে ২২, ভুটানে ১২, শ্রীলংকায় ৯, আর ভারতে ৩০ ভাগ। ভারতে হাজার হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে, কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের নিজস্ব কোনো ল্যাট্রিন নেই। তারা প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করেন। জাতিসংঘ প্রণীত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) অর্জনে পূর্ণ সফল হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তবে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভালো। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পিছিয়ে আছে আফগানিস্তান। এ ক্ষেত্রে সার্ক ফোরাম কোনো বড় ভূমিকা নিতে পারেনি।

মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য রাখার মতো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চরিত্রগত দিক দিয়ে বেশি মাত্রায় মধ্যএশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রার দিক দিয়ে এ দুটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। উপরন্তু রয়েছে এক ধরনের অবিশ্বাস। পাকিস্তান ও ভারতের বৈরিতা ঐতিহাসিক। এ বৈরিতা দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরেও কমেনি। একইসঙ্গে ভারতের ‘বড়ভাইসুলভ’ আচরণে আতংকিত থাকে পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট দেশগুলো। শ্রীলংকা ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এসব দেশে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এখন ভারতের। কিন্তু ভারতের এ অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভারত সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড় উঠেছে এ দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। এখানে বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পায়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে এ বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সমস্যা জ্বালানি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ। এ অঞ্চলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও ভারত এটাকে ব্যবহার করছে তার নিজের স্বার্থে। ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ভারত। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বটে; কিন্তু তা ত্রিদেশীয় উদ্যোগে উৎপাদিত কোনো বিদ্যুৎ নয়। তাছাড়া এ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও নানা কথা আছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে তা থেকে উপকৃত হতো এ অঞ্চলের জনগণ। কিন্তু তা হয়নি। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়েও কথা আছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারত রফতানি করে বেশি, আমদানি করে কম। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত। এখানেও সমস্যা ভারতকে নিয়ে। ট্যারিফ ও প্যারাট্যারিফের কারণে পণ্যের দাম বেশি হয়ে যায়, যাতে ভারতের আমদানিকারকদের আর আগ্রহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। ভারত অনেক সময় বেশকিছু পণ্যের শুল্ক সুবিধা দেয়ার

কথা বলে বটে; কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্য আদৌ উৎপাদিত হয় না।

ভারত ইতিমধ্যে সার্কের ভেতরে একটি উপআঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত হয়েছে এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) নামে পরিচিত। এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে সঙ্গত কারণেই সার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ভারত বিবিআইএনের পাশাপাশি বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে অপর দুটি জোটের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বেশি। দুটি জোটেই পাকিস্তান নেই। এতে করে একটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক- ভারত চূড়ান্ত বিচারে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, চীন যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার) জোটের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল (যা একসময় পরিচিত ছিল কুনমিং উদ্যোগ নামে) তাতেও শ্লথগতি আসতে পারে। বিসিআইএম জোট, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং বাংলাদেশী পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করবে, এ মুহূর্তে তা ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ভারতের এ মুহূর্তের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। ফলে চীনের বন্ধুৃ হিসেবে পাকিস্তানকে ভারত ‘কূটনৈতিক জালে’ আটকে ফেলে পাকিস্তানের ভূমিকাকে সংকুচিত করতে চাইছে।

এ পটভূমিতে এবং কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায়- যে ক্ষেত্রে একটি ‘সীমিত যুদ্ধের’ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না- ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন যদি দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে আন্তঃপ্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্র। ভারত যদি সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ায়, তাহলে তা দেশটির উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই কথা প্রযোজ্য পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। জঙ্গিবাদ আজ পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জঙ্গিবাদের কারণে পাকিস্তানের ‘জিডিপি গ্রোথ’ এখন সর্বনিু পর্যায়ে। দারিদ্র্য, সমাজে অসমতা, ধর্মীয় উন্মত্ততা বিদেশে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। মার্কিন কংগ্রেসে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আবারও অস্ত্রসজ্জার উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে উপমহাদেশের পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। এতে করে সার্কের উন্নয়ন যে বাধাগ্রস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘আসিয়ান’ আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু সার্ক তেমনটি পারল না। নিজেদের মধ্যে আস্থার অভাব, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, কর্তৃত্ব করার মানসিকতা, ভারতের ‘বড়ভাইসুলভ’ আচরণ ইত্যাদি নানা কারণে সার্ক একটি গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না।

এমনই যখন পরিস্থিতি তখন কাশ্মীর ইস্যু পুরো দৃশ্যপটকে আরও জটিল করে তুলল। এর সঙ্গে এখন যোগ হল সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের প্রশ্নটিও। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। এ চুক্তির ফলে পাকিস্তানের সেচব্যবস্থা সফল হয়েছে। পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি নদী এ চুক্তির ফলে উপকৃত হচ্ছে। এখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আভাস দিয়েছেন, তারা সিন্ধু পানিচুক্তি বাতিল করে দিতে পারেন। সার্কের ভবিষ্যৎ এখন সংকটাপন্ন।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Dily Jugantor
30.09.2016

কোন পথে জাতিসংঘ


 

জাতিসংঘ ৭১ বছরে পা দিয়েছে। সাধারণত প্রতি বছরই এ সময়টাতে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয় এবং বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা এ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে থাকেন। এবারও তারা এসেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন। তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণও দিয়েছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে, আর তা হচ্ছে জাতিসংঘ কি বিশ্ব সমস্যার সমাধানে কোনো বড় ভূমিকা পালন করতে পারছে? আর যদি না পেরে থাকে, তাহলে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তাও-বা কতটুকু? শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় তৃতীয় বিশ্বের; এমনকি মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বলেও অনেকে মনে করেন। বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ব্যর্থতা, ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য দূর করা, মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রপন্থী রাজনীতির বিকাশ, বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা রোধ করার ব্যর্থতা একুশ শতকে জাতিসংঘের ভূমিকাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিবাসন সমস্যা। এ নিয়ে সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরুর আগে একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেও, তা ছিল অনেকটা ‘লোক দেখানো’Ñ সেখানে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলই, এ ধরনের শীর্ষ সম্মেলন করে লাভ কী? বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানরা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। ৫ মিনিট করে সবাই বক্তব্য দেন (মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আবার একটু বেশি সময় দেয়া হয়)। তারপর ফটোসেশন হয়। ছবি তোলা হয়। পার্টি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকও করেন। সাইড লাইনে কেউ কেউ কথাও বলেন। তারপর যে যার মতো চলেও যান। লাখ লাখ ডলার খরচ করে এ ধরনের শীর্ষ সম্মেলন করার অর্থ কী, যদি কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা না-ই যায়! এ শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন একসময়ে, যখন সিরিয়ায় শিশুরা বোমাবর্ষণে মারা যাচ্ছে। আলেপ্পোতে মানুষ আটকে আছে। তাদের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। এমনকি খাদ্যদ্রব্য বহনকারী রেডক্রসের গাড়ির বহরের ওপর বোমাবর্ষণ করা হলে, রেডক্রস তাদের তৎপরতা বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া; এমনকি আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধ’ বন্ধ করতে পারেনি। এ যুদ্ধ ওইসব দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে এ প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত যে, জাতিসংঘ যদি যুদ্ধ থামাতে না পারে, যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে এ জাতিসংঘের প্রয়োজন কী? উন্নত বিশ্ব নিজেদের স্বার্থেই জাতিসংঘকে টিকিয়ে রাখছে।  ‘যুদ্ধ’ তাদেরই সৃষ্টি। সুতরাং ‘যুদ্ধ’ থেমে যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, ১৯৪৫ আর ২০১৬ এক নয়। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে যে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়েছিল, আজকে সেই জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি রাষ্ট্র। ১৯৪৫ সালে মাত্র ৫০টি দেশ নিয়ে জাতিসংঘ তার যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৪৫ সালে যে বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল, আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাকে মেলানো যাবে না। তবে এটা সত্য, কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাফল্য রয়েছে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় প্রথম যুদ্ধ ও কুয়েতকে শত্রুমুক্ত করা, এল সালভাদর, কম্বোডিয়া কিংবা নামিবিয়ায় পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া ও শান্তি ফর্মুলায় রাজি করানোর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছিল, যে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতিসংঘের একটি ভূমিকা রয়েছে। সাবেক যুগোসøাভিয়ার গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানো, কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানো ও সেখানে একটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, নেপালে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জাতিসংঘের উদ্যোগ যে কোনো বিবেচনায় প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর নামে যুক্তরাষ্ট্র যখন ১৫ বছর ধরে আফগানিস্তান, ইরাক আর সিরিয়ায় এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা করে আসছে, জাতিসংঘ সেই ‘যুদ্ধ’ বন্ধ করতে পারেনি। কোনো বড় উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। একটি পরিসংখ্যান দিই। ‘যুদ্ধে’ ইরাকি নাগরিকের মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯০ জন। আর যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধের পেছনে খরচ করেছে (ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে) এরই মাঝে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ২০১৭ সালের বাজেটে যা যুক্ত হবে, তা যোগ করলে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার। চিন্তা করা যায়, কি বিপুল পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করছে শুধু যুদ্ধের পেছনে? অথচ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি। বিশ্বে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের ব্যাপারে দেশটির ভূমিকা বড়। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে আফ্রিকা কিংবা দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণ এশিয়ায় বড় অবদান রাখতে পারত। ব্রাজিলের মতো দেশ, যারা কিনা অলিম্পিক আয়োজন করল, দেশটি একটি ‘বস্তির নগরীর’ দেশে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। জাতিসংঘের ভূমিকা এখানে গৌণ। সিরিয়া ও ইরাক থেকে প্রায় ৫০ লাখ অভিবাসী দেশান্তরিত হয়েছে। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার সময় কত নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, তার হিসাব কারও কাছেই নেই। জাতিসংঘ এ অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। বেঁচে থাকার আশায় এরা যখন ইউরোপের বনে-জঙ্গলে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়িয়েছে, জাতিসংঘ এদের সাহায্যে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। প্রশ্নটা তাই ঘুরেফিরে আসবেইÑ জাতিসংঘের প্রয়োজন তাহলে কী?
আসলে জাতিসংঘের কাঠামোয় উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো ভূমিকা নেই। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাকে হামলা চালিয়েছিল এবং দেশটি দখল করে নিয়েছিল, যা ছিল জাতিসংঘ সনদের বরখেলাপ। অথচ এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়া করাতে পারেনি জাতিসংঘ। সম্প্রতি ব্রিটেনের ওই সময়কার প্রধানমন্ত্রী টনি  ব্লেয়ার স্বীকার করেছেন, ইরাক আক্রমণ ছিল ভুল। কিন্তু তার এ ‘ভুল’ স্বীকারের জন্য ব্লেয়ার কিংবা ব্রিটেনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (হেগ) বিচারের সম্মুখীন করা যায়নি। ২০১১ সালে তথাকথিত ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’ এ অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। এ হামলার ফলে গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু দেশটি কার্যত এখন একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইরাক ও লিবিয়া একসময় ছিল সমৃদ্ধিশালী দুইটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক না কেন, মানুষ সেখানে শান্তিতে ছিল। রাষ্ট্র নাগরিক সুবিধা সেখানে নিশ্চিত করেছিল। আজ রাষ্ট্র দুইটি মূলত দুইটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং রাষ্ট্র দুইটি এখন কার্যত কয়েক টুকরায় ভাগ হয়ে গেছে। এর জন্য দায়ী কে? জাতিসংঘের ভূমিকাইবা এখানে কী? সিরিয়ায় যখন ইলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটল, যখন লাখ লাখ লোক দেশান্তরিত হলো, তখন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’ করে সেখানে মেরিন সেনা পাঠায়নি। ১৯৯০ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো জাতিসংঘ সিরিয়ায় সাধারণ মানুষকে রক্ষায় বহুজাতিক সৈন্য পাঠায়নি। অর্থাৎ জাতিসংঘ এখানে বৃহৎ শক্তির স্বার্থের বাইরে যেতে পারেনি। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থেই সিরিয়ায় ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখছে। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধিতে শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ নেই। স্থায়ী পরিষদের সদস্যপদ পাঁচটি, যাদের ‘ভেটো’ পাওয়ার রয়েছে। অস্থায়ী সদস্য রয়েছে ১০টি। স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কোনো কার্যকরী হয়নি। জাতিসংঘের উদ্যোগে অনেক আগেই ঈড়সসরংংরড়হ ড়হ এষড়নধষ এড়াবৎহধহপব নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল জাতিসংঘে কীভাবে সংস্কার আনা যায়, সে ব্যাপারে একটি সুপারিশ করা। সিদ্ধার্থ রামপাল ও ইনভার কলিসন ছিলেন ওই কমিশনের যৌথ চেয়ারম্যান। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। ওই কমিশনের সুপারিশে নিরাপত্তা পরিষদে এক ধরনের ‘স্ট্যান্ডিং’ সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার সদস্য সংখ্যা হবে পাঁচ। এর মধ্যে দুইটি দেশ আসবে উন্নত দেশ থেকে, বাকি তিনটি দেশ আসবে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা থেকে। কিন্তু তাদের কোনো ‘ভেটো’ ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু ২১ বছরেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে থেকে জাপান ও জার্মানি ভেটো ক্ষমতাসহ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ চায়। উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে ভারত স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার। সেখানে আবার চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি রয়েছে। ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের। ভারতের দাবি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু ভারতের ব্যাপারে স্থায়ী সদস্যভুক্ত সবার সমর্থন রয়েছেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে উন্নত বিশ্বকে। বায়ুম-লে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের কারণেই বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘কপ’ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও এবং সর্বশেষ প্যারিস সম্মেলনে (কপ-২১) একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও, তা বাস্তবায়ন নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা জাতিসংঘের নেই। জাতিসংঘের সর্বশেষ সম্মেলনে (২০১৫) ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এর আগে গরষষবহহরঁস উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এটা বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৫ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অনেক দেশ এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পশ্চিমা বিশ্বের সাহায্য ও সহযোগিতার। সেই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের। এ কাজটি জাতিসংঘ করতে পারবে বলে মনে হয় না।
উদ্বাস্তু সমস্যা এ মুহূর্তে অন্যতম আলোচিত সমস্যা। ৫০ লাখ মানুষ (সিরিয়া-ইরাকের) এখন ‘যুদ্ধের’ কারণে অভিবাসী হয়েছেন। কিন্তু ইউরোপে এটা একটা বড় সমস্যার জন্ম দিয়েছে। ‘ইন্ট্রিগেশন’ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। উপরন্তু রয়ে গেছে ধর্মীয় সমস্যা। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো বড় ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
জাতিসংঘ ৭১ বছরে পা দিয়েছে। সময়টা একেবারে কম নয়। প্রতি বছর একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে আমরা অনেক ভালো ভালো কথা শুনি বটে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তা কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারেনি। শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্ব যে অর্থ ব্যয় করে, তা অর্থহীন। জাতিসংঘ মূলত একটি ‘টকিং ক্লাবে’ পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতারা আসেন। ছবি তোলেন। বক্তৃতা করেন। ব্যস এ পর্যন্তই। বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মুসলমান বিদ্বেষ বাড়ছে। একটি ‘মুসলমান বিদ্বেষী’ মনোভাব বিশ্বে অত্যন্ত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ বিশ্বের জনসংখ্যার ২৩ ভাগ হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী (১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ)। অথচ শান্তির ধর্ম ইসলামকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকা-কে এক করে দেখানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলইÑ প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক ব্যয় নিয়ে (২০১৬-১৭ বাজেট) এ প্রতিষ্ঠানটি আর কত দিন টিকে থাকবে? শুধু ফটোসেশন আর বক্তৃতা দেয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। সুতরাং জাতিসংঘের সংস্কারটা জরুরি। হ
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
25.09.2016

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন ও সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি?


সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে নিউইয়র্ক, মিনেসোটা আর নিউ জার্সিতে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আবারও প্রমাণ করল সন্ত্রাসীদের টার্গেটের শীর্ষে এখনও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরপর কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে আবার আতংক ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথম ঘটনা ঘটল মিনেসোটায়। একজন কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী, যে ১৫ বছর ধরে মিনেসোটায় বসবাস করছে, সে একটি শপিং মলে ছুরিকাঘাত করে আহত করল ৯ জনকে। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সংবাদ সংস্থা ‘আমাক’-এ দাবি করা হল, এ কাজটি তাদের সৈনিকরা করেছে। পুলিশ অবশ্য তাকে গুলি করে হত্যা করে। পরের ঘটনা নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। দুটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমা পাওয়া গেল। একটি বিস্ফোরিত হল। আহত হল ২৯ জন। অপর বোমাটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় ‘আবিষ্কার’ করল পুলিশ। নিউইয়র্কের গভর্নর জানালেন, এ সন্ত্রাসী ঘটনায় কোনো বিদেশী সম্পৃক্ততা নেই। অর্থাৎ সম্ভাব্য আইএস সংশ্লিষ্টতা তিনি অস্বীকার করলেন। তৃতীয় ঘটনা নিউ জার্সিতে। সেখানে অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া গেল ৫টি বোমা। উদ্ধার করতে গিয়ে একটি বোমা বিস্ফোরিত হল।

এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) জনমনে, মিডিয়ায় এখন প্রশ্ন একটিই- এই সন্ত্রাসী হামলার শেষ কোথায়? এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ ঘটল এমন একটি সময় যখন ১. যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১-এর ঘটনার (টুইন টাওয়ারে হামলা ও ধ্বংস করে দেয়া) ১৫ বছর পার করেছে, ২. জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে এবং বিশ্ব নেতারা নিউইয়র্কে জমায়েত হতে শুরু করছেন, ৩. মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (নভেম্বর) প্রচারণা এখন তুঙ্গে এবং অন্যতম প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য মুসলমানদের দায়ী করছেন এবং মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়ার হুমকি অব্যাহত রেখেছেন। যারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে উপরে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? বাস্তবতা বলে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়, সেখানে একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে। পাঠক, চলতি বছর অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবে বোমা হামলার ঘটনা স্মরণ করতে পারেন। যিনি হামলা চালিয়েছিলেন, তিনি একজন মুসলমান এবং হামলার আগে ইসলামিক স্টেটের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে এক পাকিস্তান বংশোদ্ভূত দম্পতির স্কুলে আত্মঘাতী হামলা এবং আইএসের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছিল। এখন যে বিষয়টি বহুল আলোচিত তা হচ্ছে- আইএস মার্কিন সমাজে কতটুকু ভিত গাড়তে পেরেছে? নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে তৈরি বোমা দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এবং এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, অভিবাসীদের দ্বারাই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে! মিনেসোটায় যে যুবক ৯ জন লোককে ছরিকাঘাত করে আহত করল, সে সোমালি বংশোদ্ভূত। সোমালিয়ায় আল শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে এবং আল শাবাব অতি সম্প্রতি আইএস নেতা বুগদাদির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। ফলে আইএসের পক্ষ থেকে ‘আমাক’ যখন মিনেসোটার ঘটনাকে ‘ইসলামী সেনার’ কাজ বলে অভিহিত করে, তখন এটাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ কম। তবে নিউইয়র্কের ঘটনায় তথাকথিত আইএসের সংশ্লিষ্টতা এখনও প্রমাণিত হয়নি। এফবিআই তদন্ত করছে। ধারণা করছি, হয়তো আগামীতে জানা সম্ভব হবে এ ঘটনার সঙ্গে আইএস আদৌ জড়িত ছিল কিনা। তবে যারা এ কাজটি করেছে, তারা সন্দেহাতীতভাবে দুটি বিষয় মাথায় রেখেছে- এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, দুই. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন।

এসব ‘সন্ত্রাসী ঘটনায়’ লাভবান হবেন ট্রাম্প। তার জনপ্রিয়তা বাড়বে। হয়তো কয়েক পয়েন্টে তিনি হিলারির চেয়ে এগিয়ে যাবেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় এ সন্ত্রাসী ঘটনাকে তার স্বার্থে ব্যবহার করবেন। তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার আক্রমণ আরও শাণিত করবেন। ফলে নির্বাচনে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বলে, যারাই এ কাজটি করেছে, তারা চাইছে ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ী হোন! ভবিষ্যৎই বলতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রে এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে। আমার কাছে সন্ত্রাস দমন প্রশ্নে হিলারির অবস্থানকে শক্তিশালী মনে হয়নি। ফলে পরোক্ষভাবে ট্রাম্প সুবিধা পাচ্ছেন বেশি। এখানে আবার ‘ইসরাইলি কানেকশনের’ প্রশ্নটি চলে আসে। অভিযোগ আছে, আইএসের জন্ম ও উত্থানের পেছনে ইসরাইলের একটা যোগসূত্র আছে। অনেক নিবন্ধে তথ্য ও উপাত্তসহ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ আইএস তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের নীতিনির্ধারকরা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি লবিও চাচ্ছে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে। সুতরাং একটি ‘আইএস ফোবিয়া’ তৈরি করে জনমতকে ট্রাম্পের দিকে নিয়ে যাওয়ার যে ‘তত্ত্ব’, তা অস্বীকার করি কীভাবে? ট্রাম্প নিজে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি তার ভালোবাসা ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করেছেন একাধিকবার। তিনি একবার প্রকাশ্যে বলেছেন, তার মেয়ে এক ইহুদি সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ তার মেয়ে-জামাই যে ইহুদি, এটা তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন। ফলে নির্বাচনে আইএস বিতর্ক কাজ করবে।

কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ১৫ বছর পার করেছে। ২০০১ সালের ওই হামলা সারা বিশ্বের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল। সারা বিশ্বের মানুষ প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করেছিল সন্ত্রাসীরা কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ৯/১১-কে নিয়ে যে ‘মিথ’, যে ‘বিতর্ক’, এত বছর পরও তার কোনো সমাধান হয়নি। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকালবেলা আমি গ্রাউন্ড জিরোতে গিয়েছিলাম। এক সময় সেখানে টুইন টাওয়ার ছিল, যা ৯/১১-এর হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন একটি ভবন ‘ফ্রিডম টাওয়ার’। যারা হামলা করেছিল বিমান হাইজ্যাক করে, তাদের পরিচয় পাওয়া গেছে সত্য (১৫ জন ছিলেন সৌদি নাগরিক), কিন্তু কে তাদের প্ররোচিত করেছিল, আল কায়দা এর সঙ্গে কতটুকু জড়িত ছিল- এ বিতর্কের আজও কোনো সমাধান হয়নি। একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল সত্য। কিন্তু কমিশনকে পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি সরকার। চার চারটি প্লেন কীভাবে একসঙ্গে হাইজ্যাক করা হল, কেন চারটি বিমানের ‘ব্ল্যাকবক্স’ খুঁজে পাওয়া গেল না, কেন হাইজ্যাকার কিংবা বিমানযাত্রীদের ডিএনএ টেস্ট করা হল না- এসব প্রশ্নের কোনো সঠিক জবাব মানুষ আজও পায়নি। টুইন টাওয়ারের মতো সুউচ্চ ভবন কীভাবে একসঙ্গে ভেঙে পড়ল এটা নিয়েও বিতর্ক আছে। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটা ছিল 'Controllad Demolition' অর্থাৎ ‘নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস’। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভবন দুটি ধ্বংস করা হয়েছে। সাধারণত বড় বড় ভবন এভাবে ধ্বংস করা হয়, যাতে করে পাশের ভবনের কোনো ক্ষতি না হয়। একটি বিমান কোনো ভবনে আঘাত করলে, পুরো ভবনটি একসঙ্গে নিচের দিকে ভেঙে পড়ার কথা নয়। টুইন টাওয়ারের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছিল। পাশের তৃতীয় একটি ভবন ভেঙে গিয়েছিল অনেক পরে। কিন্তু সেখানে কোনো বিমান হামলা হয়নি।

সুতরাং ৯/১১ নিয়ে বিতর্ক আছে এবং বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে ৯/১১-এর হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা দীর্ঘ ১৫ বছরেও শেষ হয়নি। একদিকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ার মতো দেশ যখন পরিপূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অন্যদিকে তখন আফ্রিকায় জন্ম হয়েছে নতুন নতুন ফ্রন্টের। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নয়া কমান্ড ‘আফ্রিকম’ (AFRICOM)। দক্ষিণ এশিয়াতেও এ ধরনের অপর একটি কমান্ড প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বরং বেড়েছে। ৯/১১-কে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ জেনেছিল আল কায়দার কথা। আর এখন মানুষ জানছে ইসলামিক স্টেটের কথা। কিন্তু সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি। ইতিমধ্যে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা জনপ্রতি হাজার হাজার ডলার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিশোধ করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইন্সটিটিউট একটি গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে। তাদের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও পাকিস্তান যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালের বাজেটে আরও যুক্ত হচ্ছে ৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য, ৩২ বিলিয়ন ডলার হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য এবং যুদ্ধাহত সৈন্যদের জন্য আরও খরচপাতি। সব মিলিয়ে যুদ্ধের পেছনে খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ বিভিন্ন সূত্র থেকে ধার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রকে তা পরিশোধ করতে হবে সুদসহ। বছরের পর বছর সুদের পরিমাণ বাড়বে এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, ২০৫৩ সালে (যখন সব ঋণ পরিশোধ হবে) যুদ্ধের খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। জুয়ান কোল এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, ন্যূনতম ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে কী করা যেত (Juan Cole, What did we buy with $ 5 trillion that the Iraq and Afghanistan wars have cost us? Truthdig, Sept. 13, 2016)। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিদিন যদি ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা যায়, তাতেও এ টাকা শেষ হতে সময় লাগবে ২৭৩ বছর! এ যুদ্ধে ৭ হাজার মার্কিন সৈন্য মারা গেছেন, ৫২ হাজার সৈন্য আহত হয়েছেন। আর ইরাকি ও আফগান জনগণের মৃত্যুর হিসাব কয়েক লাখ। ৪০ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে দেশান্তরিত হয়েছেন। জুয়ান কোলের মতে আল কায়দা যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। ইরাকে কোনো আল কায়দা ছিল না। এমনকি সিরিয়াতেও নেই। এ দুটি দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও লিবারেলরা ক্ষমতায় ছিল বা আছে (সাদ্দাম হোসেন ও আসাদ)। কিন্তু ‘যুদ্ধ’ সেখানে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ জন্ম দিয়েছে। দেশ দুটি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কোনো ফল বয়ে আনেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য বেড়েছে। আয়-বৈষম্য বেড়েছে। কর্পোরেট হাউসগুলো এ যুদ্ধ থেকে লাভবান হয়েছে। এই কর্পোরেট হাউসগুলোর স্বার্থেই এই ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা। এ ব্যবসায় সাধারণ মানুষ লাভবান হয় না। লাভবান হয় বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্পোরেট হাউসগুলো।

আজ যখন নিউইয়র্ক, মিনেসোটা আর নিউ জার্সিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়, তখন এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাধারণত মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা হয় কম। কিছু ওয়েবসাইট ও অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্র রয়েছে, যেখানে বিষয়গুলো আলোচিত হয় বেশি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ সময় খোদ নিউইয়র্ক শহরে শত নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও যখন বোমা বিস্ফোরিত হয়, তখন এটা স্পষ্ট, যারাই এ কাজটি করেছে তারা বিশ্ব নেতাদের একটি মেসেজ দিতে চায়- আর তা হচ্ছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখনও শেষ হয়নি। তাহলে এর শেষ কোথায়? ১৫ বছর পার হয়েছে। যুদ্ধ এখনও চলছে। এক নয়া মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম হতে যাচ্ছে। তথাকথিত একটি জিহাদি রাষ্ট্রের ইতিমধ্যে জন্ম হয়েছে। সেখানে ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের লাভটা এখানেই। দুঃখজনক হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, কিংবা মুসলিম বিশ্ব আজ দ্বিধাবিভক্ত। সেখানে কোনো ঐক্য নেই। সিরিয়া সংকটের আদৌ কোনো সমাধান হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পর দীর্ঘ এক বছর পার হয়েছে। আইএসকে উৎখাত করা যায়নি।

নিউইয়র্কের বোমা বিস্ফোরণে অভিযুক্ত আহমদ খান রাহামিকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। এর মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের ‘ঘটনার’ হয়তো একটা সমাধান পাওয়া যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কি বন্ধ হবে? অভিযুক্ত রাহামি একা এ কাজ করেছেন, তা আমার মনে হয় না। আমার ধারণা, এ ঘটনার সঙ্গে শুধু রাহামি একাই জড়িত ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ নেটওয়ার্ক যদি ভেঙে ফেলা না যায় তাহলে নিউইয়র্কের মতো ঘটনা আরও ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর অভিবাসী রয়েছে। এদের মাঝে আইএস সমর্থকদের সংখ্যা বাড়ছে। অতি সম্প্রতি সিরিয়া থেকে বেশ কিছু শরণার্থী এসেছে। তাদের মাঝে আইএসের এজেন্ট যে নেই, তা হলফ করে বলা যাবে না। তাই একটা প্রশ্ন থেকে গেলই- যুক্তরাষ্ট্রে আদৌ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কিনা? তবে এ ঘটনা যে আগামী নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ ক্ষেত্রে যদি নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হন, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Jugantor
22.09.2016

কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট




যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। দুজন প্রার্থী, হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক আর রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশনে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন। সেই থেকে বিতর্কের মাত্রাটা বেড়েছে। দুজন প্রার্থীই নানা বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন এরই মধ্যে। গত ৭ সেপ্টেম্বর এনবিসির সিকিউরিটি ফোরামের বিতর্কে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে অনেক বেফাঁস মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ওবামার চেয়ে ভালো প্রেসিডেন্ট মনে করেন। তিনি হিলারি ক্লিনটনের সমালোচনা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, সাবেক ফার্স্ট লেডি এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আগামী ৮ নভেম্বর যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, তাতে ডেমোক্রেটিক পার্টি তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাল। ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার পর বিগত ২৪০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারী কখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এই প্রথম একজন নারী এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সেটা হবে আরেক ইতিহাস। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলন তথা নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে এটা হবে একটি মাইলফলক। পাঠকদের জানিয়ে রাখি, যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বড় অর্থনীতি ও বড় গণতন্ত্রের দেশ হলেও এখানে নারীদের ভোটের অধিকারের বয়স মাত্র ৯৬ বছর। দীর্ঘদিন এখানে নারীদের ভোটের অধিকার দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে নারী আন্দোলনের ইতিহাসও বিভিন্ন গল্পে পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের মনোনয়ন পাওয়া এখানকার নারী আন্দোলনকে আরো উজ্জীবিত করবে। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কনজারভেটিভ সোসাইটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব সীমিত। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলে, কংগ্রেসে ৫৩৫টি আসনে (সিনেট ১০০, প্রতিনিধি পরিষদ ৪৩৫) মাত্র ১০৭ জন নারী আইন প্রণেতা রয়েছেন (ডেমোক্র্যাট ৭৬ জন, রিপাবলিকান ২৮ জন)। সিনেটে নারী প্রতিনিধি রয়েছেন ২০ জন (২০ শতাংশ), আর প্রতিনিধি পরিষদে রয়েছেন মাত্র ৮৪ জন (১৯.৩ শতাংশ)। সুতরাং এই সীমিত প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে নারীর পূর্ণ অধিকার রক্ষিত হয়েছে, এটি বলা যাবে না। হিলারি ক্লিনটনের এই মনোনয়ন যুক্তরাষ্ট্রের নারী সমাজের জন্য বড় ধরনের একটি অগ্রগতি। ১৮৪৮ সালে সেনেকা ফলস কনভেনশনে (Seneca Falls  Convention) প্রথমবারের মতো নারীদের ভোটাধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল। আর ওই কনভেনশনের ১৬৮ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র এবার একজন নারী প্রার্থী পেল, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রায় প্রতিদিনই হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেকেই করার চেষ্টা করছেন, তা হচ্ছে এই দুজনের একজন যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন এবং ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করবেন তখন কি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে? ট্রাম্পের অভিযোগ, হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে ওবামা প্রশাসনের নীতিই তিনি অব্যাহত রাখবেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা আইএসকে সৃষ্টি করেছিল এবং হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে আইএস আরো শক্তিশালী হবে ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা আরো ঝুঁকির মুখে থাকবে। ট্রাম্পের আরো অভিযোগ, ওবামা টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তি করে অনেক মার্কিনির চাকরি হারানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে এই চুক্তি তথা নাফটা চুক্তির (কানাডা, মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে মুক্তবাজার) ব্যাপারে তিনি পুনর্মূল্যায়ন করবেন। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের অর্থনৈতিক ‘প্রভাব’ বাড়ছে। এই প্রভাব তিনি কমাতে চান। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবিরের বক্তব্য হচ্ছে, ট্রাম্প অতিমাত্রায় দক্ষিণপন্থী, যুদ্ধংদেহী। তিনি প্রয়োজনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু করে দিতে পারেন! তিনি অতিমাত্রায় রাশিয়াপন্থী। রাশিয়ায় তাঁর বিশাল বিনিয়োগ আছে। পুতিনকে তিনি ওবামার চেয়েও যোগ্য নেতা মনে করেন। ফলে ট্রাম্পের অতি ‘রাশিয়াপ্রীতি’ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। ট্রাম্প মূলত মুনাফা অর্জনই বোঝেন। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের সামাজিক কাঠামোর মানোন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর কোনো কমিটমেন্ট নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মুসলমান ও মেক্সিকানবিদ্বেষী। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার কথাও বলেছেন তিনি। তিনি সেনাবাহিনীর ‘গৌরব’কে আঘাত করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে ডেমোক্র্যাট শিবিরের পক্ষ থেকে। হিলারি যখন সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন, বেতন বৃদ্ধি, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন, সেখানে ট্রাম্প গুরুত্ব দিয়েছেন অভিবাসন রোধ করা ও চাকরির সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদির ওপর।
৮ নভেম্বর নির্বাচন। দুই প্রার্থীই চূড়ান্ত মনোনয়নের পর প্রচারণায় ব্যাপক অংশ নিচ্ছেন। হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্য, অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলা, মধ্যবিত্তকে আকৃষ্ট করা, স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা, টিম কেইনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া। সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থান এখন শক্তিশালী বলেই মনে হয়। অন্যদিকে ট্রাম্পের কোনো বক্তব্যই সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তিনি পুরনো রাজনীতিবিদও নন। ওয়াশিংটন ডিসির রিপাবলিকান শিবিরেও তিনি খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। ৭০ বছর বয়সী ট্রাম্প বিপুল অর্থবিত্তের (ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) মালিক হলেও ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি একবার রিফর্ম পার্টির হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। তিনি অতীতে কখনো কোনো ‘রাজনৈতিক পদ’ গ্রহণ করেননি। টিভি উপস্থাপকও ছিলেন (রিয়ালিটি শো, এবিসি)। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনের রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণাঢ্যময়। তরুণ আইনজীবী হয়ে তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। করপোরেট আইনজীবী না হয়ে তিনি শিশু অধিকার, মাতৃ অধিকার নিয়ে তাঁর কর্মময় জীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ফার্স্ব লেডি, নিউ ইয়র্কের সিনেটর এবং সর্বশেষ সেক্রেটারি অব স্টেট বা বিদেশমন্ত্রী। তুলনামূলক বিচারে রাজনীতি, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে তাঁর স্পষ্ট ধারণা রয়েছে এবং তিনি অভিজ্ঞ। পররাষ্ট্র তথা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই। ন্যাটো প্রশ্নে, আইএস প্রশ্নে, ব্রেক্সিট প্রশ্নে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অজ্ঞতাই স্পষ্ট হয়েছে। নাফটা ও টিপিপি চুক্তির ব্যাপারেও তাঁর অবস্থান হিলারির বিপরীতে। তিনি মনে করেন, নাফটা ও টিপিপি চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বেড়েছে। অথচ হিলারি মনে করেন, এই দুটি চুক্তির কারণে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে বেশি। ট্রাম্প মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চান। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন, মেক্সিকানরা মার্কিন অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন আছে ট্রাম্পের। ডেমোক্র্যাটরা গত আট বছরে (ওবামা প্রশাসনে) যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের হাতে তুলে দিয়েছে—এই অভিযোগ ট্রাম্পের। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন, চীনের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কই নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার অন্যতম শর্ত। ওবামার শাসনামলে আইএসের জন্ম হয়েছে এবং এ জন্য ডেমোক্র্যাটরাই দায়ী, ট্রাম্পের এ ধরনের অভিযোগ স্বীকার করেন না হিলারি ক্লিনটন। হিলারি বলেছেন, তিনি বিদেশমন্ত্রী থাকার সময় ১২২টি দেশ সফর করেছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মাইল ভ্রমণ করেছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যই। অথচ ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। তবে ট্রাম্পের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, তিনি সোজাসাপ্টা কথা বলেন। আক্রমণ করে কথা বলেন, যা হিলারি পারেন না কখনো। তিনি তাঁর বক্তৃতায় ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন সত্য, কিন্তু তা অনেক মার্জিত ভাষায়। তাই একটি প্রাক-গবেষণায় (সিন কোলারোসি কর্তৃক পরিচালিত) যখন হিলারিকে সর্বোচ্চ নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে বিজয়ী হবেন বলে মন্তব্য করা হয়, আমি তাতে অবাক হই না। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে ৫৩৮ জন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে হিলারি পাবেন ৩৪৭ ভোট আর ট্রাম্প পাবেন ১৯১ ভোট। নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ে।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিতর্ক ঘিরে ধরেছে দুই প্রার্থীকে। হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিতর্ক তাঁকে যথেষ্ট ভোগাচ্ছে। সর্বশেষ এনবিসির বিতর্কেও তিনি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি যখন বিদেশমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি বিদেশ মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্ধারিত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে বিদেশে যোগাযোগ করেছেন। ওই সব ই-মেইলের কিছু অংশ ফাঁস হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ট্রাম্পের প্ররোচনায় রাশিয়ার হ্যাকাররা এই ই-মেইল ফাঁস করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হিলারি ক্লিনটনের বাকি সব ই-মেইল প্রকাশ করা হোক। এটা নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের জন্য একটি মাইনাস পয়েন্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বিপদে আছেন। ডেমোক্র্যাট শিবির তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার। তাঁর স্ত্রী (তৃতীয়) মেলানিয়ার মধ্য নব্বইয়ে তোলা নগ্ন ছবি (তিনি ফটো মডেল ছিলেন) প্রকাশিত হয়েছে, যা ট্রাম্পকে বিব্রত করেছে। সব মিলিয়ে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। তবে চূড়ান্ত বিচারে পাল্লা কোন দিকে হেলে পড়ে, এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। ১১টি রাজ্যের কথা বলা হচ্ছে (কলোরাডো, ফ্লোরিডা, আইওয়া, মিশিগান, নেভাদা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইয়ো, পেনসিলভেনিয়া, ভার্জিনিয়া ও উইসকনসিন) যাদের বলা হচ্ছে ‘ব্যাটেল গ্রাউন্ড স্টেটস’। এই রাজ্যগুলো বিগত দুটি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব রাজ্যের ভোটাররা এখনো দ্বিধাবিভক্ত। তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সমর্থন কোনো প্রার্থীর পক্ষেই নেই। কখনো তারা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করে, কখনো রিপাবলিকানদের। এত দিন পর্যন্ত জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্প ব্যবধান অনেকটা কমিয়ে এনেছেন। ফলে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
Daily Kalerkontho
22.09.2016

চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব কি বড় সংঘর্ষের জন্ম দেবে



চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হ্যাংঝুতে সদ্য শেষ হওয়া জি-২০ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন করে আবারও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের দুইটি বড় অর্থনীতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশ দুইটি জি-২০ এর সদস্য। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতির দেশগুলোকে নিয়ে জি-২০ গঠিত। প্রতি বছরই একবার করে এ দেশগুলো একটি শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়। এবারও তারা মিলিত হয়েছিল চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হ্যাংঝুতে। কিন্তু এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তিক্ততার জন্ম হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন হ্যাংঝুতে পৌঁছলেন তখন তাকে প্রটোকল অনুযায়ী লালগালিচা সংবর্ধনা জানানো হয়নি। অথচ জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেয়া অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের, বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। ওবামাকে লালগালিচা সংবর্ধনা না দেয়া ছিল অনাকাক্সিক্ষত। এজন্য চীন কোনো দুঃখ প্রকাশও করেনি। এমনকি ওবামার সফর সঙ্গীদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার পর্যন্ত করা হয়েছিল। ওবামার জি-২০ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যেও চীনের প্রতি এক ধরনের ‘হুমকি’ ছিল। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যে দ্বন্দ্ব এবং সেখানে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র যে অখুশি, তাও ওবামার বক্তব্যে ফুটে উঠেছিল। সম্মেলনে ওবামা বলেছিলেন, চীন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করলে, তাকে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে। সিএনএনের ফারিদ জাকারিয়াকে ওবামা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা করে, চীন দায়িত্বশীল আচরণ করবে। এ ধরনের মন্তব্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ফিলিপাইনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক আদালত সম্প্রতি একটি রায় দিয়েছেন। তাতে তারা বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জের ব্যাপারে চীনের দাবি অযৌক্তিক। বলা ভালো, শুধু ফিলিপাইনেই নয়, বরং ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া এমনকি জাপানেরও দাবি রয়েছে এ দ্বীপগুলোর ব্যাপারে। আন্তর্জাতিক আদালত ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিলেও চীন তা মানছে না। যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় তার সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ফলে সঙ্গত কারণেই চীন মার্কিন কর্মকা-ে অখুশি। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তার সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গেও একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই চুক্তিটি, যা লেমোয়া (LEMOA- Logistic Exchange Memorandum of Agreement) নামে অভিহিত, তা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ চুক্তি ভারতকে আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও দুইটি চুক্তি নিয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে এবং ধারণা করছি, শিগগিরই ভারত এ দুইটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করবে। এর একটি হচ্ছে সিসমোয়া (CISMOA- Communications Interpretability and Security Memorandum of Agreement) এবং অপরটি হচ্ছে বেকা (BECA- Basic Exchange and Cooperation Agreement for Geospatial Cooperation)। সিসমোয়া চুক্তির ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব তথ্য পাবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ‘বেকা’ চুক্তির আওতায় বিভিন্ন স্থানের ডিজিটাল মানচিত্র ও সমীক্ষা রিপোর্টের ব্যবহারের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং এ ধরনের চুক্তির ধরন এবং এর ব্যবহার যে ভারতকে আরও বেশি মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রায় ১৬ বছর যাবৎ ভারতের রাজনীতিতে, বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এর ফলে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণসহ সব ধরনের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যা শুধু অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সরবরাহ করছে। ভারত এখন নিউক্লিয়ার সাপ্লাইস গ্রুপ বা এনএসজি’র সদস্য হতে চায়, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতকে এ অঞ্চলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মনে করে, একুশ শতকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য প্রণীত নীতির আওতাভুক্ত। এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন, এ অঞ্চলের তিনটি শক্তির (চীন, ভারত, জাপান) মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলের গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওবামার ‘Pivot to Asia’ পলিসির প্রধান বিষয় হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। এ অঞ্চলের উত্থান-পতনে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূমিকা রাখতে চায়। চীনের ভূমিকাকে খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা দু’দুবার ভারত সফর করেছেন। প্রতিবারই তিনি বিশাল এক ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারত গেছেন এবং একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। শুধু তাই নয়, ওবামা তার ভারত সফরের সময় ভারতের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এতেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলের ব্যাপারে তার একটা স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৬ সালের মার্চে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘রাইমিনা ডায়ালগে’ যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ষষ্ঠ ফ্লিটের প্রধান অ্যাডমিরাল হ্যারি হারিস এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন। তবে এ ধরনের  প্রস্তাব নতুন নয়। জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজে আবে এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন ২০০৬-০৭ সালে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রস্তাব Quadrilateral Initiative হিসেবে পরিচিত। এ থেকেই বোঝা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের Pivot to Asia পলিসির আসল উদ্দেশ্য কী। চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধি ও দক্ষিণ চীন সাগরের চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামে সাপ্লাই লাইনের জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য তাই পরিষ্কারÑ এ অঞ্চলভুক্ত জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতকে সংযুক্ত করে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি বুঝতে আমাদের সহজ হবে যদি আমরা অতি সাম্প্রতিক এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, তার দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্র গেল জুলাইয়ে (২০১৬) ফিলিপাইনের নৌবাহিনীকে USA Boutwell নামে একটি বড় ধরনের ডেস্ট্রয়ার সরবরাহ করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ রাখা ও প্রয়োজনে চীনা জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা। বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সঙ্গে Enhanced Defense Cooperation নামে একটি চুক্তি করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে আসছে। এ চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা অথবা মেরিন সেনাকে স্থায়ীভাবে মোতায়েনের সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে South East Asia Maritime Security Initiative (MSI) এর আওতায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র South East Asia Maritime Law Enforcement Initiative গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমুদ্রসীমার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও প্রশিক্ষণ দেয়া। মূল কথা একটাইÑ চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে দাঁড় করানো।
চীনের জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব অনেক। এ কারণেই চীন চায় না তার প্রভাবাধীন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তি সামরিক তৎপরতা চালাক। শুধু স্ট্র্যাটেজিক কারণেই এ এলাকার গুরুত্ব বাড়েনি, বরং বাণিজ্যিক রুট হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুট এটি। বছরে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য এ পথে পরিবহন করা হয়। বিশাল এক জ্বালানি রিজার্ভ রয়েছে এ অঞ্চলে। প্রায় ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল, ১৯০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস ও ১০ মিলিয়ন টন মাছের এক বিশাল ভা-ার রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। চীনের জ্বালানি সুধা’র কথা সবাই জানে। চীন তার অর্থনৈতিক কর্মকা- অব্যাহত রাখতে হলে তার জ্বালানি প্রয়োজন। চীন তার জ্বালানি চাহিদা মেটায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সুতরাং চীন খুব স্বাভাবিকভাবেই চাইবে, দক্ষিণ চীন সাগরের নিচে যে বিশাল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তা ব্যবহার করতে। কিন্তু মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর লোলুপদৃষ্টি পড়েছে এ অঞ্চলের দিকে। আর তাদের স্বার্থে কাজ করছে মার্কিন সেনা ও নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী দাবি করছে, তাদের সাপ্লাই রুটের জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের সামুদ্রিক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনে মার্কিন মেরিন সেনাদের সহায়তার জন্য এ রুটটির নিরাপত্তা তারা চায়। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ভিন্নÑ সাপ্লাই রুটের নাম করে এ অঞ্চলে যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের ওপর এক ধরনের ‘চাপ’ প্রয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যে সৎ নয়, তা বোঝা যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। Foreign Military Financing কিংবা Development of Asian Reassurance এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামকে সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে, যার অন্যতম একটি দিক হচ্ছে প্রশিক্ষণ দেয়া ও ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে সহযোগিতা করা। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অন্যদিকে ভারতও ভিয়েতনামকে ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত ভিয়েতনাম নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত রয়েছে। ভারতের নৌবাহিনীর চারটি জাহাজকে দক্ষিণ চীন সাগরে সম্প্রতি মোতায়েন করা হয়েছিল। এজন্যই অনেকের দৃষ্টি এখন দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে। অনেকেই ধারণা করছেন, দক্ষিণ চীন সাগরের বিশাল জ্বালানি রিজার্ভের কারণে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষ অনিবার্য! কীভাবে চীনে আক্রমণ চালানো হবে, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠিত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক (গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান) RAND একটি সিরিয়াস গবেষণা কর্মও পরিচালনা করে। বলা হয়ে থাকে, পেটাগনের উদ্যোগ এবং অর্থায়নে এ গবেষণা কর্মটি পরিচালিত হয়েছে। সিরিয়াস পাঠকরা War with China শীর্ষক গবেষণা কর্মটি ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খুঁজে দেখতে পারেন।
বিশ্ব রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। এক সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে প্রভাব বলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তি, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ এর জন্ম হয়েছিল, যা ইতিহাসে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। দীর্ঘ ৪৬ বছর, অর্থাৎ ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এ স্নায়ুযুদ্ধ বহাল ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধেরও অবসান ঘটে। আজ দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন আর ইউরোপ দুই পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) মাঝে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রভূমি নয়। বরং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল হচ্ছে এমন একটি জায়গা, যাকে কেন্দ্র করে নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হচ্ছে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট হচ্ছে চীন! এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’। এখন চীনকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়েই নতুন করে তৈরি হয়েছে আরেকটি ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্দেশ্যকে চীন যে চ্যালেঞ্জ জানাবে, এটাই স্বাভাবিক। হ্যাংঝুতে চীন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্বে স্থিতিশীলতার জন্য চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। এ দুইটি দেশের মাঝে সম্পর্কের যদি অবনতি ঘটে, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়াবে মাত্র। বিশ্ব আসরে চীন ও রাশিয়া এক কাতারে অবস্থান করছে। চীন সিরিয়া সংকটে যুদ্ধ বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থবিরোধী। সুতরাং চীন-মার্কিন সম্পর্ক এখন কোন দিকে যায়, সেদিকে লক্ষ থাকবে অনেকের।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
18.09.2016

জঙ্গিবাদ দমনে মার্কিন সহযোগিতা প্রশ্নে কিছু কথা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকা ও নয়াদিলি্ল সফরের সময় জঙ্গিবাদ দমন প্রশ্নে দুটো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক. কেরির ভাষায় 'আমরা বলেছি আইএসের নেটওয়ার্ক দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। তারা দেশীয় সংগঠনের সাথে যুক্ত'। আল জাজিরা আর রয়টার্সের প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে জন কেরি মনে করেন বাংলাদেশে আইএস আছে। দুই. জঙ্গি দমনে অতিরিক্ত গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগমূলক সহযোগিতার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র এক হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ভয়েস অব আমেরিকা আমাদের তিনজনের ডালাস থেকে আমি, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলী রিয়াজ এবং ঢাকা থেকে ইশফাক এলাহি চৌধুরীর সঙ্গে এক টেলি কনফারেন্সের আয়োজন করে। ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক শ্রোতা প্রশ্ন করেন। সবার প্রশ্নের ধরন ছিল একটিই_ যুক্তরাষ্ট্র যে সহযোগিতার কথা বলছে, তাতে করে কী জঙ্গি দমন কার্যক্রম সফল হবে? ভোক্তার শ্রোতাদের পাশেই যে এই প্রশ্নের উদ্বেগ করেছে, তেমনটি নয়। বরং দেশে অনেকের মনেই এ ধরনের প্রশ্ন উঠেছে যে এই সহযোগিতার ধরনটি আসলে কেমন হবে? এবং জঙ্গি দমনে আমরা সফলতা পাব কিনা? কেননা যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গি দমনে যেখানেই হাত বাড়িয়েছে (আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক) সেখানে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে বৈ কমেনি। ভারতেও তিনি জঙ্গিবাদের কথা বলেছেন। কিন্তু কোনো সহযোগিতার কথা বলেননি। ভারত এ ধরনের সহযোগিতা কখনো চায়ওনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের সময় একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাতে মার্কিন বিমান ভারতীয় বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে জঙ্গিবিরোধী যে কোনো অভিযানে ভারতীয় ঘাঁটি ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকল। আমি এর আগের লেখাগুলোতে বলতে চেষ্টা করেছি যে জঙ্গিবাদ আজ একমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে এই সমস্যাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটা আঞ্চলিক যোগসূত্রও রয়েছে। বাংলাদেশে 'হোমগ্রোন' জঙ্গি রয়েছে। এদের সীমিত কর্মকা- আমরা অতীতে দেখেছি। সাম্প্রতিককালে এইসব 'হোমগ্রোন' জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিশেষ করে আইএসের একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা, তিন বাংলাদেশির ভিডিও টেপে হামলার হুমকি, শোলাকিয়ায় ঈদগাহ ময়দানের পাশে জঙ্গি হামলা_ সব মিলিয়ে স্থানীয় 'হোমগ্রোন' জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। এই মুহূর্তে তাই প্রয়োজন জনসচেতনতার। জঙ্গি দমনে করণীয় নির্ধারণের জন্য সরকারের উচিত একটি 'জাতীয় সংলাপ' আহ্বান করা। সকল রাজনৈতিক দলগুলোর (বিধিবদ্ধ ও নিবন্ধিত) সঙ্গে সরকার একটি 'সংলাপ' শুরু করতে পারে। আলোচ্য সূচিতে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে সরকার। মনে রাখতে হবে সংলাপ চলাকালীন সময়ে যদি দলগুলোর অতীত ভূমিকা আলোচিত হয়, তা কোনো ফল বয়ে আনবে না। অতীতমুখিতা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অতীত নয়, বরং সামনের দিকে তাকাতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস যেভাবে বলছে কারা কারা এই জঙ্গি হামলার উৎসাহদাতা, অর্থের যোগানদাতা, তা খুঁজে বের করা জরুরি। এখানে যেন কোনো 'রাজনীতি' কাজ না করে, অপর পক্ষকে দমন করার কোনো অভিপ্রায় যেন কাজ না করে। গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় যেন এক ধরনের শৈথিল্য আছে। তাদের মোটিভেশন দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বক্তব্যের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনায় একজনের বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। নানাজন বক্তব্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। জঙ্গি দমন প্রশ্নে কতগুলো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশে আইএস সম্পৃক্ততার দাবি সরকার উড়িয়ে দিচ্ছে না। এর অর্থ কী? আমরা এর ব্যাখ্যা কীভাবে করব। ইনু সাহেব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি যখন পরোক্ষভাবে এটা অনেকটা স্বীকার (?) করে নিলেন যে বাংলাদেশে আইএস থাকতে পারে, তখন কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা স্বীকার করেননি। ফলে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্ত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলে তাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে। জঙ্গি প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। এখানে তথ্যমন্ত্রী উপযাচক হয়ে যখন বক্তব্য দেন, বহির্বিশ্বে তার বক্তব্যকেই 'কোট' করবে। তখন কেরি বললেন সে কথা। তথ্যমন্ত্রী ঠিকই জানেন বাংলাদেশে আইএস আছে, এই স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা (?) এতে বাড়তে পারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে, ঠিক তখনই ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র উল্লেখ করে বলেছে 'জেএমবিকে ব্যবহার করে ভারতকে টার্গেট করছে আইএস'। বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থান ভারতের নিরাপত্তাকে বিস্মিত করতে পারে (?) এপ্রশ্ন ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতারা তুলতে পারেন। কলকাতার আনন্দবাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছিল গুলশানের জঙ্গি হামলা তদন্ত করতে ভারত তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজির বিশেষ একটি টিমকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। তবে এটা স্পষ্ট নয় ইতোমধ্যে ওই টিম বাংলাদেশে এসেছিল কিনা? পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি সংস্থা আসছে না। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। দু'দেশের গোয়েন্দাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। এই মুহূর্তে সেটা বড় প্রয়োজন। আমি মনে করি ভারতীয় গোয়েন্দাদের নিজ দেশে আরো সক্রিয়া হওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবির নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দু'জন বাংলাদেশি নাগরিক হাফিজ শেখ ও সেলিম রেজা ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে। ফলে এটা স্পষ্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশি এবং ভারতীয় জঙ্গিদের তথাকথিত ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানে যেসব জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল তাদের প্রশিক্ষণ ওই বর্ধমানে হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তাই জঙ্গি উৎখাতে ভারতের গোয়েন্দারা যদি তৎপর না হন তাহলে এরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে নাশকতা করবে। তাই এনএসজি পাঠানোর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গি দমন ও জঙ্গি নির্মূলের জন্য যথেষ্ট। ভারতকে এখন পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ করতে হবে। শোলাকিয়ার ঘটনায় নিহত জঙ্গি আবির হোসেন ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর আগে হলি আর্টিজানে হামলায় নিহত জঙ্গিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আবিরও নিখোঁজ ছিল বেশ কয়েক মাস। তাই বিষয়টি এখন জরুরি যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি 'জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল' (এটা অন্য নামেও হতে পারে) গঠন করতে হবে, যাদের কাজ হবে ছাত্রদের ডাটাবেজ তৈরি করে অনুপস্থিত ছাত্রদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া। ছেলেরা বিপথগামী কেন হয় এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও উচিত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও এ ধরনের একটি নির্দেশনা গেছে সত্য। কিন্তু তাতে করে সিদ্ধান্তটি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারতীয় এনএসজির যেমন আমাদের প্রয়োজন নেই, তেমনি প্রয়োজন নেই কোনো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বাংলাদেশে উপস্থিতি। এতে বরং আরো জটিলতা বাড়বে। বিদেশি গোয়েন্দারা কোনো কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন। কিংবা আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারেন। এতে করে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। জঙ্গি তৎপরতা একটি বাস্তব সত্য। আমাদের তরুণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ বিপথগামী হয়েছে। মিডিয়া এই বিপথগামী থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে ইসলামিক স্কলারদের ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও, তাদের ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। যাদের টিভির পর্দায় নিত্য দেখা যায়, তারা বেশি মাত্রায় সরকার ঘেঁষা। তাদের বক্তব্যে 'প্রকৃত সত্য' ফুটে ওঠে না কখনো। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝেও তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই হলি আটির্জান আর শোলাকিয়ার ঘটনায় জাতিকে কতটুকু ঐক্যবদ্ধ করবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের ওপর। এই দুই ঘটনা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জঙ্গি দমনে একসঙ্গে কাজ করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। কতিপয় বিভ্রান্তকারী তরুণের কাছে আমরা আত্মসর্মপণ করতে পারি না। এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভরসা। বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে একটি 'সফট পাওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। বিশেষ করে বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান, পোশাক শিল্পে আমাদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা, ওষুধ শিল্পের মান ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য আসনে গেছে। এখন কিছু বিভ্রান্তকামী যুবকের জন্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের রাজনীতিবিদদের দূরদর্শিতা দেখানোর সময় এখনই। এটা সত্য হলি আর্টিজানের ঘটনায় কিছু বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক এবং বিন্দনীয়। কিন্তু সন্ত্রাসীরা যখন হঠাৎ করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটায়, তা রোধ করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। ওরল্যান্ডের সমকামী ক্লাবে একজন সন্ত্রাসী ওমর মতিন যখন হামলা চালিয়ে ৪৯ জন মানুষকে একাই হত্যা করেছিল, তখন ওই হত্যাকা-কে কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দারা বন্ধ করতে পারেনি। প্যারিসে, ব্রাসেলসে কিংবা ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলাও বন্ধ করা যায়নি। সুতরাং সন্ত্রাসীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এটা রোধ করার জন্য একদিকে যেমন দরকার জনসচেতনতা অন্যদিকে তেমনি দরকার প্রশিক্ষিত, দক্ষ জনবল। জঙ্গি দমনে আমাদের বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। বৈদেশিক সহযোগিতায় দেশে বিদেশি গোয়েন্দাদের আসার সুযোগ করে দেয়ার চাইতে এই মুর্হূতে বড় প্রয়োজন আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমরা নিতে পারি। এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু বিদেশি গোয়েন্দাদের এ দেশে আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে না। জন কেরি চলে গেছেন। কিন্তু সমঝোতার ও সহযোগিতার যে কথা তিনি বলে গেছেন, আমরা নিশ্চিত নই, এর ধরনটা কী হবে? আমরা এমন কিছু করব না যাতে করে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। আমাদের স্বার্থটা এখানে প্রধান। জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে আছে। স্থানীয় জঙ্গিরা চেষ্টা করছে আইএসের সঙ্গে একটা 'সম্পর্ক' তৈরি করতে। আমরা আস্থা রাখতে চাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। এরা জঙ্গি দমনের জন্য যথেষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে সব জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে খ্যাত তামিম চৌধুরীর 'অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭' এ নিহত হওয়ার ঘটনা এর বড় প্রমাণ। তাই মার্কিনি সহযোগিতার আলোকে প্রয়োজন তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে Daily Jai Jai Din 12.09.2016

এ অঞ্চলের ত্রিভুজ রাজনীতি বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে?

 
Image result for Indian Ocen rivalry
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যখন গত আগস্টের শেষে বাংলাদেশ ও ভারত সফর করছিলেন, ঠিক প্রায় একই সময় ওয়াশিংটনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পানিকর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বৈশ্বিক রাজনীতি এশিয়া-প্যাসিফিক তথা ভারত মহাসাগরে প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার আলোকে এ চুক্তির গুরুত্ব অনেক। এর মধ্য দিয়ে একদিকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে বড় ধরনের অবিশ্বাস। এ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন ও অনেক সম্ভাবনার জন্ম হবে।
 
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জোটনিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে আসছে। বলা যেতে পারে, ষাটের দশকে যে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল (ন্যাম), তার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল ভারত। যদিও অতীতে, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউয়িনের মধ্যকার সম্পর্ক ভারতের জোটনিরপেক্ষ নীতিকে একটি প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিলেও ভারত বরাবর সচেষ্ট থেকেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে। সবসময়ই ভারত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বক্তব্যকে ওই সময়ে সমর্থন করেছে এমন নয়। কিন্তু ভারতের বর্তমান ‘অবস্থান’ দেখে মনে হচ্ছে, ভারত তার জোটনিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে আসছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তি এর বড় প্রমাণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এরপর ভারতকে আর কখনও এ ধরনের সামরিক চুক্তি করতে দেখা যায়নি। তবে চন্দ্রশেখর যখন ভারতে সীমিত সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন কুয়েত যুদ্ধে (কুয়েত থেকে ইরাকি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার; প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ) মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে ভারতের পোর্টে জ্বালানি নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর প্রতিবাদের মুখে চন্দ্রশেখর সরকার শেষ পর্যন্ত এ অনুমোদন বাতিল করে।

এখন ভারত যে সামরিক চুক্তি করল, তাতে দু’দেশ (ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) পরস্পরের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগটি ভারতের জন্য যত না প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্যপ্রাচ্যে একটি মারাত্মক যুদ্ধে (সিরিয়ায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে) মার্কিন বিমানবহর ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে রিফুয়েলিংয়ের জন্য। এ চুক্তিটি, যা লেমোয়া (LEMOA- Logistic Exchange Memorandum of Agreement) নামে অভিহিত হচ্ছে, তা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ চুক্তি ভারতকে আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও দুটো চুক্তি নিয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, এবং ধারণা করছি অতি শিগগিরই ভারত এ দুটো চুক্তিতেও স্বাক্ষর করবে। এর একটি হচ্ছে সিসমোয়া (CISMOA- Communications Interoportability and Security Memorandum of Agreement) এবং অপরটি হচ্ছে বেকা (BECAÑ Basic Exchange and Cooperation Agreement for Geo special Cooperation)। সিসমোয়া চুক্তির ফলে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব তথ্য পাবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে বেকা চুক্তির আওতায় বিভিন্ন স্থানের ডিজিটাল মানচিত্র ও সমীক্ষা রিপোর্টের ব্যবহারের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং এ ধরনের চুক্তির ধরন এবং এর ব্যবহার যে ভারতকে আরও বেশি মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত প্রায় ১৬ বছর ধরে ভারতের রাজনীতিতে বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণসহ সব ধরনের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যা শুধু অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সরবরাহ করছে। ভারত এখন নিউক্লিয়ার সাপ্লাইস গ্রুপ বা এনএসজির সদস্য হতে চায়, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতকে এ অঞ্চলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মনে করে, একুশ শতকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য প্রণীত নীতির আওতাভুক্ত। এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন, এ অঞ্চলের তিনটি শক্তির (চীন, ভারত, জাপান) মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অন্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চল গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওবামার 'Pivot to Asia' পলিসির প্রধান বিষয় হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। এ অঞ্চলের উত্থান-পতনে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূমিকা রাখতে চায়। চীনের ভূমিকাকে খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা দু’-দু’বার ভারত সফর করেছেন। প্রতিবারই তিনি বিশাল এক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারত গেছেন। এবং একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। শুধু তাই নয়, ওবামা তার ভারত সফরের সময় ভারতের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এতেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলের ব্যাপারে আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গত মার্চে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘রাইসিনা ডায়ালগে’ যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ষষ্ঠ ফ্লিটের প্রধান অ্যাডমিরাল হ্যারি হারিস এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন।

তবে এমন প্রস্তাব নতুন নয়, জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন ২০০৬-০৭ সালে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রস্তাব Quadrilateral Initiative হিসেবে পরিচিত। এ থেকেই বোঝা যায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের Pivot to Asia পলিসির আসল উদ্দেশ্য কী। চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধি এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামে ‘সাপ্লাই লাইনের’ জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য তাই পরিষ্কার- এ অঞ্চলভুক্ত জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে সংযুক্ত করে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি বুঝতে আমাদের সহজ হবে যদি আমরা অতি সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, তার দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্র গত জুলাইয়ে ফিলিপাইনের নৌবাহিনীকে USA Boutwell নামে একটি বড় ধরনের ডেস্ট্রয়ার সরবরাহ করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখা এবং প্রয়োজনে চীনা জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা।

গত বেশকিছু দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সঙ্গে Enhanced Defense Cooperation নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে আসছে। এই চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা অথবা মেরিন সেনাকে স্থায়ীভাবে মোতায়েনের সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের South East Asia Maritime Security Initiative (MSI)-এর আওতায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র South East Asia Maritime Law Enforcement Initiative গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমুদ্রসীমার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, প্রশিক্ষণ দেয়া। মূল কথা একটাই- চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে দাঁড় করানো।

এ প্রসঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ‘দি সিল্ক রোড ইকনোমিক বেল্ট অ্যান্ড মেরিটাইম সিল্ক রোড’ (বহুল প্রচারিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) নামে যে নীতি প্রণয়ন করেছেন, তাতে ৬০ দেশকে চীন তার বাণিজ্যিক কাঠামোয় নিয়ে আসতে চাইছে। এতে করে চীনের সঙ্গে সড়কপথে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যেমন যুক্ত হবে, ঠিক তেমনি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও সামুদ্রিক পথে সংযুক্ত হবে। এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের খরচ হবে ৪ থেকে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ও শীর্ষস্থানীয় বড় অর্থনীতির সঙ্গে টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এবং ট্রান্স আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ নামে যে দুটো চুক্তি করেছে, তার বিকল্প হিসেবেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ হচ্ছে এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি। সিরিয়াস পাঠকরা স্মরণ করতে পারেন চীনের ‘String of Pearl’ বা মুক্তারমালা প্রকল্পের কথা, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সমুদ্রবন্দরগুলোকে এক নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে চাইছে চীন। চীনের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। এ অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী জাহাজ এ অঞ্চলে ঘোরাফেরা করছে। এ অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত সম্প্রতি চীনের দাবি খারিজ করে দিলেও চীন তা মেনে নেয়নি। ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তার ঢেউ এসে লাগবে ভারত মহাসাগরেও। সুতরাং চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার তৎপরতা বাড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই জন কেরির বাংলাদেশ ও ভারত সফরকে এ দৃষ্টিতেই আমাদের দেখতে হবে। মোদির জমানায় ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও বেড়েছে। ভারতে মার্কিন বিনিয়োগ বেড়েছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজির অংশ। ভারতকে তার প্রয়োজন এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোর জন্য। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তা ভারতকে গুরুত্ব দিয়েই আবর্তিত হবে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি একদিকে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে আস্থাহীনতা ঘটাবে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। বেলুচিস্তান নিয়ে মোদি সম্প্রতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে পাকিস্তান অখুশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, চীনের সরকারি প্রচারমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে প্ররোচনা দেয়ার। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ মিলিয়ন ডলার, তা নিয়ে ভারতের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্কে। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই এ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা চাইবে না।

বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। অতি সম্প্রতি লন্ডনে বেলুচ ছাত্র সংগঠন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। পাকিস্তান মনে করে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দেয়ার পেছনে ভারতের ইন্ধন রয়েছে। মজার ব্যাপার, ইরান নিয়ন্ত্রিত বেলুচিস্তানের চাহবারে ভারত একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। একইসঙ্গে চাহবার থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করছে ভারত। এ রেলপথ চাহবার থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। চলতি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈঠকের প্রাক্কালে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে (যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-আফগানিস্তান)। এ বৈঠকে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি।

এ অঞ্চলের রাজনীতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এক সময় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপাক্ষিকতা প্রাধান্য পেত। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা (সামরিক ও বাণিজ্যিক) আগামীতে চীনের সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ১৬ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। এরই মাঝে খবর বেরিয়েছে, চীন অত্যন্ত গোপনে তিব্বতে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে দিয়েছে। তিব্বতের এক বিমানবন্দরে জে-২০ স্টেলথ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। ভারত অরুণাচলে ক্ষেপণাস্ত্র এবং লাদাখে শতাধিক ট্যাংক মোতায়েন করার পরিপ্রেক্ষিতেই চীন জে-২০ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে বলে পত্রপত্রিকাগুলো আভাস দিয়েছে। ফলে এ ধরনের সূক্ষ্ম অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ভারত ও চীনের মাঝে।

এরই মধ্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এই প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দেবে মাত্র। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়বে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের রাজনীতি বদলে যাচ্ছে। ভারত ভিয়েতনামকে ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। মোদি ভিয়েতনাম সফর করেছেন। এর আগে ওবামা ভিয়েতনাম সফর করে গেছেন। ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পশ্চিমা দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করতে পারবে। স্পষ্টতই বদলে যাচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক এবং সেই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি। এরই মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে গোয়ায় যাবেন ১৫ অক্টোবর। এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তার ছোঁয়া এসে লাগবে বাংলাদেশেও। এসব পরিবর্তনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
Daily Jugantor
10.09.2016

সার্ক শীর্ষ সম্মেলন কি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে


৯ ও ১০ নভেম্বর ইসলামাবাদে সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে (২৬-২৭ নভেম্বর) ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছে, তাতে করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি এ সম্মেলনে যোগ দিতে তার অপারগতার কথা জানান, তাহলে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পিছিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকবে না। সার্কের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। আগেও বেশ কয়েকবার সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পিছিয়েছিল। এ অঞ্চলের রাজনীতির উন্নয়নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই মিডিয়ায় আলোচিত হয়ে আসছে। এ সম্পর্ক কখনও খুব উচ্চতায় উপনীত হয়েছিল, তা বলা যাবে না। মাঝেমধ্যে এ দুই দেশের মাঝে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে, মাঝেমধ্যে আবার উত্তেজনার জন্ম হয়। এতে করে সার্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এবারও তেমন একটি অনিশ্চয়তার জন্ম হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে চির বৈরী এ দেশ দুইটির মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, সেই আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ফলে সার্কের মধ্যকার এ দুইটি বড় দেশের মাঝে অনাস্থা সার্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক যেভাবে বিকশিত হয়েছে, সে তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত সার্ক সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সার্ক ডিসেম্বরে ৩১ বছর পার করবে। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে সার্কের জন্ম হয়েছিল। সার্কের চার্টারে প্রতি বছর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে কারণে ন্যূনতম ৩০টি শীর্ষ সম্মেলন এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। প্রধানত ভারতের আপত্তির কারণে অতীতে একাধিকবার সার্ক সম্মেলন পিছিয়ে গিয়েছিল। কেননা সার্কের চার্টারে বলা আছে, সদস্যভুক্ত কোনো একটি দেশ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তাদের অপারগতার কথা জানালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ক্ষেত্রেও এমনটির জন্ম হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি ভারত আপত্তি জানায়, তাহলে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের আপত্তি কেন থাকবে? অতি সম্প্রতি এ অঞ্চলে একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যাতে করে ভারতের অংশগ্রহণ না করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আগস্টে ইসলামাবাদে সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সম্মেলনে দুই দেশের মধ্যে একটি তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল। এমনকি রাজনাথ সিং সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছিলেন। সম্মেলন চলাকালীন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে হাতে হাত মেলাননি। এটা ছিল কূটনৈতিক অসৌজন্যতা। রাজনাথ সিং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসভবনে আয়োজিত ডিনারেও অংশ নেননি। সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে রাজনাথ সিং পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। বিশেষ করে, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাকিস্তান সাহায্য করছে বলেও তার অভিযোগ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বলেছিলেন, স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী বলা ঠিক হবে না। কাশ্মীরে ভারতের দখলদারিত্বের অভিযোগ এনে যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে, পাকিস্তান তাদের মনে করছে ‘স্বাধীনতাকামী’ হিসেবে। চলতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (অক্টোবর, ২০১৬) পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নটি তুলতে পারে বলে জানা গেছে। ভারত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ পাকিস্তানের। ফলে একটি তিক্ততার সম্পর্ক এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। প্রথমবার তিনি মন্তব্য করেছেন পার্টির সিনিয়র নেতাদের সভায়। সেখানে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান বেলুচিস্তানে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে। এরপর তিনি স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে (১৫ আগস্ট, ২০১৬) আবার বেলুচিস্তানের প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং বেলুচিস্তান, গিয়েগিট ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণ যে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সে কথাটাও তিনি উল্লেখ করেন। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারতাজ আজিজ। তিনি বলেছিলেন, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত, মোদির বক্তব্যে এটা আবারও প্রমাণিত হলো। তৃতীয়ত, ভারত অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভারতীয় বিমান ঘাঁটি অদূর ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারবে। চতুর্থত, চলতি অক্টোবরে আফগান সমস্যা সমাধানের জন্য নিউইয়র্কে একটি ত্রিদেশীয় (ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যাতে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। স্পষ্টতই এ অঞ্চলে দুইটি জোটের জন্ম হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অক্ষ, অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষ। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ‘আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার তাতে ভারতের প্রচ- আপত্তি রয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপ লাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবিস্থত ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ প্রণালি (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্ক। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই এ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা চাইবে না। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। অতি সম্প্রতি লন্ডনে বেলুচ ছাত্র সংগঠন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। পাকিস্তান মনে করে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উসকে দেয়ার পেছনে ভারতের ইন্ধন রয়েছে। মজার ব্যাপার, ইরান নিয়ন্ত্রিত বেলুচিস্তানের চাহবারে ভারত একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। একইসঙ্গে চাহবার থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করছে ভারত। এ রেলপথ চাহবার থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটা সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভারত আফগানিস্তানের ব্যাপারে একটি বড় ভূমিকা পালন করুক। চলতি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈঠক প্রাক্কালে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে (যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-আফগানিস্তান)। এ বৈঠকে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। পাকিস্তান মনে করছে, এতে করে তার জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা পাকিস্তান এরই মধ্যে আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল।
এ অঞ্চলের রাজনীতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। একসময় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপাক্ষিকতা প্রাধান্য পেত। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা (সামরিক ও বাণিজ্যিক) আগামীতে চীনের সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যাবে, বলা মুশকিল। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং ১৬ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। এরই মাঝে খবর বেরিয়েছে, চীন অত্যন্ত গোপনে তিব্বতে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে দিয়েছে। তিব্বতের এক বিমানবন্দরে চীন জে-২০ স্টেলথ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। বলা হচ্ছে, অরুনাচলে ভারত ব্রহ্ম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ও লাদাখে শতাধিক ট্যাঙ্ক মোতায়েনের পরিপ্রেক্ষিতেই চীন জে-২০ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে বলে পত্রপত্রিকা  আমাদের আভাস দিয়েছে। ফলে এ ধরনের সূক্ষ্ম আন্তঃপ্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ভারত ও চীনের মাঝে। এরই মাঝে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, এই প্রতিযোগিতাকে উসকে দেবে মাত্র। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়বে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে এসব কারণেই।
অনেক পর্যবেক্ষকই এখন মনে করেন, সার্ক তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সার্ক ৩১ বছর আগে গঠিত হলেও সার্কের উন্নয়ন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে দরিদ্রতার হার বেড়েছে বৈ কমেনি। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু দরিদ্রতা এখানে কমেনি। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে আফগানিস্তানে দরিদ্রতার হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৬ ভাগ। বাংলাদেশে এই হার ৩২, নেপালে ২৫, পাকিস্তানে ২২, ভুটানে ১২, শ্রীলঙ্কায় ৯, আর ভারতে ৩০ ভাগ। ভারতে হাজার হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের নিজস্ব কোনো পায়খানা নেই। তারা প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করে। জাতিসংঘ প্রণীত মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এমডিজি অর্জনে পূর্ণ সফল হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তবে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভালো। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পিছিয়ে আছে আফগানিস্তান। এক্ষেত্রে সার্ক ফোরাম কোনো বড় ভূমিকা নিতে পারেনি।
মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য লক্ষ রাখার মতো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চরিত্রগত দিক দিয়ে বেশিমাত্রায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রার দিক দিয়ে এ দুইটি দেশের সঙ্গে অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। উপরন্তু রয়েছে এক ধরনের অবিশ্বাস। পাকিস্তান ও ভারতের বৈরিতা ঐতিহাসিক। এ বৈরিতা প্রায় ৭০ বছরেও কমেনি। একইসঙ্গে ভারতের একটি ‘বড়ভাই’সুলভ আচরণে আতঙ্কিত থাকে পার্শ্ববর্তী ছোট দেশগুলো। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এসব দেশে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। এশিয়ার দ্বিতীয় অর্থনীতি এখন ভারতের। কিন্তু ভারতের এ অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভারত সাধারণত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। এখানে বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পায়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে এ বহুপাক্ষিকতা জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সমস্যা জ্বালানি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ। এ অঞ্চলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও ভারত এটাকে ব্যবহার করছে তার নিজের স্বার্থে। ভারত ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বটে, কিন্তু তা ত্রিদেশীয় উদ্যোগে উৎপাদিত কোনো বিদ্যুৎ নয়। তাছাড়া ওই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও নানা কথা আছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে ভুটান-বাংলাদেশ-নেপাল ও ভারতের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে তা থেকে উপকৃত হতো এ অঞ্চলের জনগণ। কিন্তু তা হয়নি। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়েও কথা আছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারত রফতানি করে বেশি, আমদানি করে কম। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত। এখানেও সমস্যা ভারতকে নিয়ে। টেরিফ এবং প্যারা-টেরিফের কারণে পণ্যের দাম বেশি হয়ে যায়, যাতে ভারতের আমদানিকারকদের আর আগ্রহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। এ সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। ভারত অনেক সময় বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক সুবিধা দেয়ার কথা বলে বটে, কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্য আদৌ উৎপাদিত হয় না।
ভারত এরই মধ্যে সার্কের ভেতরে একটি উপআঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত হয়েছে এই উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) নামে পরিচিত। এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে সংগত কারণেই সার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ভারত বিবিআইএনের পাশাপাশি বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে অপর দুইটি জোটের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বেশি। দুইটি জোটেই পাকিস্তান নেই। এতে করে একটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে, ভারত চূড়ান্ত বিচারে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, চীন যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমার) জোটের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল (যা একসময় পরিচিত ছিল কুনমিং উদ্যোগ নামে) তাতেও শ্লথ গতি আসতে পারে। বিসিআইএম জোট, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং বাংলাদেশী পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করবে, এ মুহূর্তে ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ভারতের এ মুহূর্তের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। ফলে চীনের বাহু হিসেবে পাকিস্তানকে ভারত ‘কূটনৈতিক জালে’ আটকে ফেলে পাকিস্তানের ভূমিকাকে সংকুচিত করতে চাইছে। তাই নভেম্বরে নির্দিষ্ট সময়ে সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এ ব্যাপারে আমার শঙ্কা থেকেই গেল।

ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito bangladesh
11.09.2016