রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

রোহিঙ্গা সমস্যা : সঙ্কট কাটছে না


মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন স্থাপন বিষয়কমন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ের বাংলাদেশ সফরের পর যে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান কি আদৌ হবে? মন্ত্রী মিয়াত বাংলাদেশে এসেছিলেন গত ১১ এপ্রিল। তিনি ফিরেও গেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা আমরা পাইনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত ২৩ নভেম্বর (২০১৭) মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিদোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯ ডিসেম্বর দেশ দু’টি একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করে। এর মধ্য দিয়ে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গারা শেষ পর্যন্ত বোধ হয় নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি একটি তারিখ নির্ধারিত হলেও প্রত্যাবাসনের কাজটি শুরু হয়নি। আমরা বার বার বলে আসছি, মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখাটা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। মিয়ানমার সনাতন কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলে না। আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মিয়ানমার এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেই প্রতিশ্রুতি তারা পালন করেনি। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও, তা কোনো ফল বয়ে আনেনি। কিছু রোহিঙ্গাকে তারা ফেরত নিয়ে গেছে বটে, কিন্তু ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা- যারা নিবন্ধিত নয়, তারা বাংলাদেশের মাটিতে রয়ে গিয়েছিল। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো আরো সাড়ে ছ’ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ এদের আশ্রয় দিয়ে নিঃসন্দেহে মানবতার পরিচয় দিয়েছিল। বাংলাদেশের এই ভূমিকা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি অথবা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা জরুরি ছিল। বাংলাদেশ সেটা করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের মানসিকতার যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের মাটিতে থেকে যেতে পারে! সুতরাং মিয়ানমার সরকারের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে, এটা আমরা বলতে পারি না। তাদের কোনো কার্যকলাপে তা প্রমাণিত হয় না। সেজন্য একটা আশঙ্কা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে যে, মিয়ানমার তথাকথিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে কালক্ষেপণ করতে পারে! এই কালক্ষেপণের স্ট্র্যাটেজি তাদের অনেক পুরনো। এবারো এমনটি হতে পারে। গত ২১ জানুয়ারি পরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন। তিনি নিজে মিডিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াং ঝি লিও গত ২১ জানুয়ারি উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এদের সবার বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ব্রিফিং করেছেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতও। তার বক্তব্যও গুরুত্বের দাবি রাখে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেছিলেন ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠিক কোনদিন থেকে শুরু হবে, সে রকম তারিখ-টারিখ বলা মুশকিল।’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘যেতে না চাইলে তো জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না। আমাদের চুক্তির সব জায়গায়ই স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কফি আনানের কমিশনের রিপোর্টেও তা আছে। যখন রোহিঙ্গারা জানতে পারবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। তাদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এসব বিষয় দেখলে তখন তারা নিজেরাই যেতে উৎসাহী হবে’ (যুগান্তর, ২২ জানুয়ারি)। অনেকটা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের বক্তব্যের একটা ‘মিল’ খুঁজে পাওয়া যায়। বার্নিকাট বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অবশ্যই নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় হতে হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্পষ্টতই কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এক. রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি কতটুকু নিহিত হয়েছে? দুই. রোহিঙ্গারা সেখানে কতটুকু নিরাপদ? তিন. রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে পারবে কি না? চার. রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের জীবন-জীবিকার কী হবে? মিয়ানমারের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক ও পরবর্তী সময়ে ‘বাস্তুচ্যুত রাখাইনের বাসিন্দাদের প্রত্যাবাসন’ সংক্রান্ত যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে নাগরিকত্বের বিষয়টি আদৌ নেই। মিয়ানমার এদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। রোহিঙ্গা নামেরও আপত্তি রয়েছে তাদের। এমনকি কফি আনান কমিশনের রিপোর্টেও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। মিয়ানমার এদের ‘বাঙালি’ হিসেবে স্বীকার করে। সাম্প্রতিক মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় এবং ডকুমেন্টে কোথাও রোহিঙ্গা শব্দটি নেই। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গা খেদাও অভিযান শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকলেও নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন হয়েছে- এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। এক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠবে, তা হচ্ছে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গারা আদৌ ফেরত যেতে চাইবে কি না? মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে এটা একটা বড় দুর্বলতা। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারিনি। দ্বিতীয় প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ- এটি হলো নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে। অনেকে তার স্ত্রী, স্বামী, সন্তানকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যা করতে দেখেছে। অনেক দেরিতে হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীপ্রধান ‘সীমিত হত্যাকাণ্ডের’ কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে তাদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। এখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করেছে, রোহিঙ্গারা তাদের বিশ্বাস করবে না।
ইতোমধ্যে মার্কিন রাষ্টদূত এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তারা সুস্পষ্ট করেই বলেছেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না!
রোহিঙ্গারা এই ধরনের বক্তব্যে উৎসাহিত হবে নিঃসন্দেহে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো নিজেই বলেছেন, জোর করে কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো যাবে না। এ ধরনের বক্তব্য রোহিঙ্গাদের এ দেশে  থেকে যেতে উৎসাহ জোগাতে পারে। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে আরো ম্যাচুরড বক্তব্য আশা করেছিলাম। তৃতীয় প্রশ্নটিকেও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। রোহিঙ্গারা কি আদৌ নিজ বাসভূমে ফেরত যেতে পারবে? এর সরাসরি জবাব হচ্ছে ‘না’। যে চুক্তি হয়েছে, তাতে মিয়ানমার দু’টো ক্যাম্প করবে। প্রথমটা অভ্যর্থনা ক্যাম্প, দ্বিতীয়টা অন্তর্বর্তীকালীন ক্যাম্প। অর্থাৎ যারা বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাবে, তাদের প্রথমে অভ্যর্থনা ক্যাম্পে রাখা হবে। তারপর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। এখানেই সমস্যাটা তৈরি হবে। এই ক্যাম্পে তারা বছরের পর বছর থেকে যেতে বাধ্য হবে! এটা এক ধরনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প! এখানে রেখেই তথাকথিত যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি হবে। আমার শঙ্কা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ভাগ্য ফিলিস্তিনিদের মতো হতে পারে! পাঠক স্মরণ করতে পারেন ফিলিস্তিনিরা নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত হয়ে বছরের পর বছর, জেনারেশনের পর জেনারেশন তারা থেকে যাচ্ছেন ক্যাম্পে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ যুগে হোমল্যান্ডগুলোর কথা স্মরণ করতে পারেন। বর্ণবাদ যুগের অবসানের আগে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে ৭টি হোমল্যান্ডে রাখা হয়েছিল। আমার আশঙ্কাটা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অবস্থা অনেকটা হোমল্যান্ডগুলোতে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অথবা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মতো হতে পারে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতি এটাই- রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করা। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তারা রোহিঙ্গাদের নিতে চাচ্ছে বটে, কিন্তু বাস্তবতাই বলে তারা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করে নিতে চাইছে না। উপরন্তু তারা কোনোদিনই তাদের স্ব স্ব বসতবাটিতে ফেরত নেবে না। কেননা ওইসব বসতবাটির আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। রাখাইনে কয়েকশ’ গ্রামে রোহিঙ্গাদের বসতবাটি মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওইসব গ্রাম এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ‘লিজ’ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে থাকতে পারছে না। রোহিঙ্গারা কোনো মতেই অন্যত্র থাকতে চাইবে না। বংশ পরম্পরায় তারা নিজ বাসভূমে বসবাস করে আসছে। জমিজমা চাষ করে আসছে। কেউ কেউ ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। এখন তাদের যদি অন্যত্র রাখা হয়, তারা তা মানতে চাইবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এটা একটা অন্যতম সমস্যা। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে এসব প্রশ্নের জবাব থাকা বাঞ্ছনীয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ খুব শক্ত অবস্থানে গিয়েছে, এটা আমার মনে হয় না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং তার ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলে দেয় বাংলাদেশ একটি চুক্তি করতে চেয়েছিল! কিন্তু মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করার কোনো কৌশল অবলম্বন করেনি। জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হয়েছে। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান একটি ঘৃণিত অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য। ইতোমধ্যে বসনিয়া-হারজেগোভিনা, কঙ্গো, লাইবেরিয়া কিংবা রুয়ান্ডাতে যারা জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে জড়িত ছিলেন, সেইসব সেনা কর্মকর্তাদের বিচার হয়েছে। রায়ও দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিক সেনা কর্মকর্তাকে মিয়ানমারের গণহত্যার জন্য চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ এদের বিচারের দাবি করতে পারত। তাহলে অন্তত মিয়ানমার সরকার একটা ‘চাপ’ এর মুখে থাকত। কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে একটি ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’র আশ্রয় নিয়েছে। ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা ও রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও, বাংলাদেশ নিকট প্রতিবেশী, বিশেষ করে চীন ও ভারতের সাহায্য নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শেষ অব্দি চীন স্ব উদ্যোগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল এবং সেই প্রস্তাব অনুসরণ করেই মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্টের পর থেকে সঙ্কটের গভীরতা বাড়লেও, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি ওই সময় চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সফর করেননি। এমনকি ওইসব দেশের সাহায্যও চায়নি। অথচ প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ভালো। এইসব দেশকে দিয়ে আমরা মিয়ানমারের ওপর প্রভাব খাটাতে পারতাম। এখনই যে সেই সুযোগটি শেষ হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। বাংলাদেশ দু’ভাবে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারে। দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ এবং একই সঙ্গে বহুপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। আমাদের ভুললে চলবে না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে। অতীতে যারা এসেছিল, তাদের ক্ষেত্রেও ইউএনএইচসিআর একই নীতি অবলম্বন করেছিল। প্রকারান্তরে এই নীতি মিয়ানমারের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ। এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি আমাদের নিরাপত্তাকে নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ডিপথেরিয়ার মতো রোগ আবার ফিরে এসেছ উখিয়ায়। রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা (এআরএস) বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে- এমন একটি তালিকা (১৫০ জন) মিয়ানমার বাংলাদেশকে দিয়েছে। এরা বাংলাদেশেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিদেশের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ধরনের ‘চাপ’ এর মুখে রেখেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে (৬ এপ্রিল) রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। প্রতিউত্তরে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাস্তবতা এটাই- রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার সিরিয়াস নয়। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সত্যিকার অর্থেই মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ না দেয়, তাহলে মিয়ানমার কোনো শরণার্থীকেই ফেরত নেবে না। আর ‘চাপ’ প্রয়োগ করার কৌশল একটাই- পুনরায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
Bangladesher Khobor
29.04.2018

একটি হাইপ্রোফাইল ভিজিট ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা



  তারেক শামসুর রেহমান ৩০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি হাইপ্রোফাইল ভিজিট সম্পন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল ভারতে গিয়েছিল। এ প্রতিনিধি দলে ৪ জন ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য, তিনজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কয়েকজন সাংগঠনিক সম্পাদক। বাংলাদেশের গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে এ সংবাদটি ছেপেছে। ২৩ এপ্রিল প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রেই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ছবি ছেপেছে। এ হাইপ্রোফাইল ভিজিটের যে গুরুত্ব আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথমত, এ সফরটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন একসময় যখন বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আর বাকি আছে মাত্র ৮ মাস। খুব সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক পণ্ডিতরা এটা নিয়ে একটা অঙ্ক কষতে পারেন। দ্বিতীয়ত, একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে, সাধারণত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন না। সরকারের সঙ্গে বৈঠকে থাকতে পারেন। কিন্তু এ বৈঠকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলেও উপস্থিত ছিলেন। এমনকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শ্রী প্রিয় রঙ্গনাথন ও মুখপাত্র রবীশ কুমারও উপস্থিত ছিলেন। আমার বিবেচনায় এতে দ্বিপাক্ষিক কিছু বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলোচনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন বলে সংবাদপত্রগুলো আমাদের জানিয়েছে। একে রাজনৈতিক পণ্ডিতরা আওয়ামী লীগের প্রতি ভারত সরকারের সমর্থন হিসেবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। বাংলাদেশে সাধারণ একটা ‘পারসেপশন’ আছে যে, মোদি সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন করছে। এবং ভারত চাচ্ছে আওয়ামী লীগ আরও একবার ক্ষমতায় আসুক! চতুর্থত, ওবায়দুল কাদের শুধু বলেছেন, ‘অসম্ভব ভালো মিটিং হয়েছে। ভেরি ভেরি পজিটিভ আউটকাম!’ এ সংবাদটুকু মিডিয়ার দেয়া (বাংলা ট্রিবিউন, ২৩ এপ্রিল)। মিডিয়া মোদির বক্তব্য উল্লেখ করেছে এভাবে, ‘যত দ্রুত সম্ভব এই চুক্তি যেন সম্পাদন করা যায় (তিস্তা চুক্তি), সেই লক্ষ্যে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে তাদের বাসভূমিতে ফিরতে পারবেন বলেও মোদি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? ডিসেম্বরে (২০১৮) অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ভারত মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করবে?
শেখ হাসিনার সরকারের সময়েই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এমন বক্তব্য কাদের ছাড়াও দু’পক্ষ থেকেই বিভিন্ন সময়ে এসেছে। কিন্তু মোদি সরকারের তেমন উদ্যোগ আমরা দেখিনি। ২০১৯ সালে ভারতে লোকসভার নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গেও বিধানসভার নির্বাচন আগামীতে। এক্ষেত্রে তিস্তার পানি বণ্টন একটি ফ্যাক্টর। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে পাস কাটিয়ে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আদৌ কোনো তিস্তা চুক্তি করবেন বলে মনে হয় না। যদিও সংবিধান তাকে অধিকার দিয়েছে- তিনি চুক্তি করতে পারেন। এখন ওবায়দুল কাদের যখন বলেন, ‘ভেরি ভেরি পজিটিভ আউটকাম’, তখন আশ্বস্ত হই কীভাবে? নাকি এটা কথার কথা! পঞ্চমত, আওয়ামী লীগ নেতারা বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কাদেরের সঙ্গে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের ছবিও ছাপা হয়েছে। তবে বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ-এর সঙ্গে বৈঠকের কোনো খবর সংবাদপত্র দেয়নি। বিজেপি-আওয়ামী লীগ আলোচনার পর এক শীর্ষ বিজেপি নেতার কথায় ‘আওয়ামী লীগকে এ আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আমরা এটাই বোঝাতে চাই যে, বাংলাদেশে আমাদের সমর্থন গণতন্ত্রের প্রতি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতি’। অর্থাৎ বিজেপি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সমর্থন করে! এটাই স্বাভাবিক। ভারত একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশ। বিজেপি একটি ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল হলেও জনগণের ভোটে তারা ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশের জনগণ, সিভিল সোসাইটি মনে করে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে ভারত তথা ভারতের ক্ষমতাসীন দল একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কোন একটি ‘বিশেষ দল’কে নয়, বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতিই ভারতের কমিটমেন্ট থাকা উচিত। ষষ্ঠ, এই সফরে আওয়ামী লীগ নেতারা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি। সপ্তম, ঢাকায় ফিরে এসে ওবায়দুল কাদের বলেছেন নির্বাচন নিয়ে ভারতের নাক গলানোর কিছু নেই। ভারত নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। এবারও করবে না। কিন্তু তার এই বক্তব্যে রাজনৈতিক মহল কতটুকু আশ্বস্ত হতে পেরেছে, আমি নিশ্চিত নই। বিএনপি প্রায় প্রতিদিনই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। রিজভী প্রায় প্রতিদিনই প্রেস ব্রিফিং করছেন। এ একটি ক্ষেত্রে দেখলাম বিএনপি কোনো কথা বলল না। সাধারণত আওয়ামী লীগকে কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জির খুব ঘনিষ্ঠ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু ভারত সফরে আওয়ামী লীগ কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করলেন না। এতে করে আওয়ামী লীগ ভারতে ক্ষমতাসীন পার্টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়- এটা প্রমাণিত হতে পারে। রাজনৈতিকভাবে বিজেপি আর আওয়ামী লীগ এক নয়। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করলেও, বিজেপি ধর্মনির্ভর একটি রাজনৈতিক দল। হিন্দুত্ববাদে তারা বিশ্বাসী। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিজেপির মধ্যে মিল হওয়ার কথা নয়। তবু হয়েছে। কারণ এখানে স্বার্থের প্রশ্নটি জড়িত।
বাংলাদেশে ভারতের প্রচুর স্বার্থ রয়েছে। মোদি সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যত বেশি উন্নতি হয়েছে, অতীতে কোনো সরকারের আমলেই সম্পর্ক এত উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কোন সরকার ক্ষমতায় এটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বিবেচ্য নয়। তারা তাদের স্বার্থ দেখে। এক্ষেত্রে বিজেপি সরকার আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কতটুকু আদায় করে নিতে পেরেছে? সীমান্ত চুক্তিটি এ মোদি সরকারের সময়েই চূড়ান্ত হয়েছে। সীমানা চিহ্নিত হয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে। আমরা ভারত থেকে কিছু বিদ্যুৎ পাচ্ছি- এসবই অর্জন। কিন্তু আমরা অনেক কিছুই পাইনি। তিস্তার চুক্তি তো বহুল আলোচিত। এ চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমান মোদি সরকার কেন, অতীতে সব সরকারই আমাদের আশ্বাস দিয়ে গেছে। কিন্তু চুক্তি হয়নি। আমরা মমতা ব্যানার্জির ব্যাপারে আগ্রহান্বিত ছিলাম। মমতা ঢাকায় এসে বলে গিয়েছিলেন ‘তিনি কাঠ-বিড়ালী হয়ে কাজ করবেন’! অর্থাৎ ভারতের কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে ‘গো-বিটুইন’ হিসেবে কাজ করবেন- এমনটাই বোঝায় তার কথায়। কিন্তু কৈ? কেন্দ্র তো রাজি তিস্তা চুক্তিতে। রাজি না মমতা ব্যানার্জি। ভারতের দাবি অনুযায়ী সবই তো আমরা মেনে নিয়েছি। দিয়েছিও। ট্রানজিট থেকে শুরু করে পায়রায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ পর্যন্ত। অথচ আমাদের প্রয়োজন ছিল কক্সবাজারের সন্নিকটে সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। পায়রার চেয়ে সোনাদিয়ার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তা ঝুলে গেল! এখন মাতারবাড়ী প্রজেক্ট নিয়ে জাপানিদের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে। সোনাদিয়ায় এটি তৈরি করে দিতে চেয়েছিল চীন। এটি ছিল চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপ্রকল্পের ৬টি অর্থনৈতিক করিডোরের একটি। চীনের এ কর্মসূচিকে বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু ভারত এতে যোগ দেয়নি। ভারত অতি সম্প্রতি এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা আমাদের স্বার্থের বিরোধী। গত বছরের জানুয়ারি মাসে তিন ধরনের বাংলাদেশি পাট পণ্যের ওপর ভারত শুল্কারোপ করেছে। জুন মাসে শুল্কারোপ করা হয় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এর ওপর। বাংলাদেশে তৈরি ফিশিং নেটও শুল্কারোপের আওতায় এসেছে। পাট পণ্যের (পাট সুতা, বস্তা ও চট) ওপর শুল্কারোপে সাফটা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হল। ভারত তার স্বার্থ দেখে। বড় দেশ হিসেবে ভারত প্রভাব খাটাতে চায়। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আমাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে পারছি না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না।
ওবায়দুল কাদের দিল্লি গিয়েছিলেন। কোনো সরকারি সফরে তিনি যাননি। সুতরাং বিষয়ভিত্তিকভাবে আলোচনার সুযোগ কম ছিল। তবে কিছু কিছু বিষয় যে আলোচনা হয়েছে, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি কি পাওয়া গেছে? আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কি ওইসব বিষয় থাকবে, যা ভারত আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সমাধানের? মিডিয়া জানতে চেয়েছিল। ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করেননি কিছুই। শুধুই প্রতিশ্রুতি আর আশাবাদ!
ভারত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে না বলে ওবায়দুল কাদের আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে তো ভিন্ন কথা! শ্রীলংকা, নেপাল আর ভুটানের খবর তো সিরিয়াস পাঠকরা জানেন। প্রশ্ন হচ্ছে মোদির ‘নেইবারহুড ফাস্ট’ পলিসিতে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। মোদি বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়েই উপআঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বিবিআইএনকে কার্যকর করতে চায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিবিআইএন-এর গুরুত্বকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মোদি সরকার যদি বিশেষ একটি দলকে নিয়ে তাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, তাতে তারা সফল হবে না। বিশেষ দল নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের আস্থা তাদের নিশ্চিত করতে হবে। একটি বিশেষ দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা একটা ভুল মেসেজ পৌঁছে দিলেন কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। আমাদের অন্যতম উন্নয়ন পার্টনার ভারত। বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল সরকার ভারতেরও কাম্য। মোদি সরকার এখন বিএনপির একটি দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে। এমনকি সংসদের বিরোধী দলকেও আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
এর মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে দেশে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ হোম অফিসের তথাকথিত চিঠি, যাতে ১৩টি ভুল চিহ্নিত হওয়া, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতিতে লিপ্ত হয়েছে। এরই মাঝে ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন ভারত সফরও শেষ হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে ভারতের একটি ভূমিকা থাকবে। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন, সব দলের অংশগ্রহণ, সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করা- এটাই সবার কাম্য। এক্ষেত্রে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারত নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারে। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে কারিগরি সহযোগিতা করতে পারে। মোদ্দা কথা, আগামী নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা থাকবেই, তা কোনো দল চাক আর না চাক। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতের এ সহযোগিতা আমাদের দরকার। বেগম জিয়া অসুস্থ। তাকে প্যারোলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠালে ক্ষতি কি? সরকারের এটা প্লাস পয়েন্টও হতে পারে। বেগম জিয়া যত দিন অসুস্থ থাকবেন, গুজবের ডাল-পালা তত বেশি করে গজাবে! ‘অসুস্থ’ বেগম জিয়াকে বাইরে রেখেও নির্বাচনে যাওয়া উচিত বিএনপির। আর এতে করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে। আর এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজই বিজেপি বাংলাদেশে দেখতে চায়- আমার বিশ্বাসটা এখানেই।
Daily Jugantor
30.4.2018

সিরিয়া : যে যুদ্ধের শেষ নেই



গত ১৪ এপ্রিল সিরিয়ার তিনটি রাসায়নিক অস্ত্রাগারে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে দেশে ‘চতুর্থ যুদ্ধ’ এর সূচনা করেছিলেন কিনা, সে ব্যাপারে এখনও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। কেননা ১৪ এপ্রিলের পর আর কোনো বিমান হামলার ঘটনা ঘটেনি। রাশিয়া স্পষ্টই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। তবে রাশিয়ার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র (সেই সঙ্গে ফ্রান্স ও ব্রিটেন) বিমান হামলা বন্ধ রেখেছে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। যারা মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে মার্কিনি নীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান টার্গেট হচ্ছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ। যে-কোনো মূল্যে তাকে তিনি সরাতে চান। এজন্য একটি দীর্ঘ ‘যুদ্ধ’ এর সম্ভাবনাকেও একবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ১৯৯১ সালে ইরাক যখন কুয়েত দখল করে নিয়েছিল, তখন আরববিশ্বে ‘প্রথম যুদ্ধ’ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করেছিল ইরাক। সেটা ছিল ‘দ্বিতীয় যুদ্ধ’। আর ২০১১ সালের ১৯ মার্চ ইঙ্গ-মার্কিন বিমান হামলায় জ্বলে উঠেছিল লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি। সেটা ছিল ‘তৃতীয় যুদ্ধ’। আর এখন ‘ক্ষেত্র’ প্রস্তুত হচ্ছে ‘চতুর্থ যুদ্ধ’ এর। ইরাকের কাছে মারাত্মক সব মারণাস্ত্র রয়েছে, সেই অভিযোগ তুলে ইরাক দখল হয়ে গিয়েছিল। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছেÑ এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে দীর্ঘ বোমা হামলা চালিয়ে গাদ্দাফি সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিল। আর এখন সিরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আসাদ সরকার নিজ জনগণের ওপর দৌমায় রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে! সেখানে রাসায়নিক হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কে এই হামলা চালিয়েছেÑ আসাদ সরকারের সেনাবাহিনী, নাকি ইসরাইল? রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার আঙুল কিন্তু ইসরাইলের দিকেই।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার কথিত হস্তক্ষেপ, ক্রিমিয়ার রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্তি, পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে রাশিয়ার সমর্থন, লন্ডনের স্যালিসব্যারিতে ‘ডাবল এজেন্ট’ স্কিরপালকে হত্যা প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনীতিকদের বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে টান টান উত্তেজনা বজায় রয়েছে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হলো সিরিয়া প্রসঙ্গ। ফলে সামগ্রিক বিচারে অনেকেই এই পরিস্থিতিকে স্নায়ুযুদ্ধের নয়া সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস এ ধরনের একটি কথাই বলেছেন। সিরিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। অনেকগুলো পক্ষ এই সংকটে জড়িয়ে গেছে। ইসরাইলের একটি ভূমিকাও এতে আছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ নিজেই বলেছেন, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার যে প্লট সাজানো হয়েছে এবং যার মাধ্যমে আসাদ সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তার সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। তার কাছে এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। দৌমায় যে রসায়নিক বোমা হামলা চালানো হয়েছিল এবং যাতে ৪০ জন সিরীয় নাগরিকের মৃত্যু, যাদের অনেকেই ছিল শিশুÑ সেই হামলার সঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনী কি আদৌ জড়িত ছিল? এটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এই যুক্তি তুলে ধরে সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হলো। অথচ অভিযোগ আছে, এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এমনকি ব্রিটেনের পার্লামেন্টেও ব্রিটেনের বিমান হামলার কোনো অনুমতি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রেসিডেন্ট নিজে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না। এজন্য তার কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তা করেননি। তবে ট্রাম্পের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যানদের অনেকেই আসাদবিরোধী। ফলে কংগ্রেসের সমর্থন তিনি পাবেন। তবে এই ‘যুদ্ধ’ সিরিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিল। সিরিয়া সংকটের সমাধানের পথে এলো এখন বড় অনিশ্চয়তা। তবে এটা এখনও নিশ্চিত নয়, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মেরিন সেনা পাঠাবে কি না। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল ২০০৩ সালে। কিন্তু লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে যখন উৎখাতের উদ্যোগ নেওয়া হয় (২০১৩), তখন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সেনা পাঠায়নি। বিমান হামলার মধ্য দিয়ে সেখানে গাদ্দাফিকে উৎখাত করা হয়েছিল। ‘আরব বসন্ত’পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিতে ‘রেজিম চেঞ্জ’ এর একটি ধারণা আছে অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করা। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে যাচ্ছে বলেই ধারণা অনেকের। 
তাহলে সমাধানটা হবে কীভাবে? সিরিয়ার পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই জটিল হয়ে পড়েছে। এখানে কার্যত দুইটি বড় শক্তির অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টই কুর্দিদের নিয়ে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ আসাদবিরোধী একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে তুরস্কের সমর্থন না পাওয়া। কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থান ও সমর্থন তুরস্ক ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব কমানো। এক্ষেত্রে সুন্নি ধর্মাবলম্বী তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল মিত্র হতে পারত; কিন্তু তা হয়নি। বরং তুরস্ক ও ইরান এক ধরনের অ্যালায়েন্সে গেছে। রাশিয়া আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল; কিন্তু রাশিয়া চায় না আসাদ অপসারিত হোক। আসাদকে রেখেই রাশিয়া একধরনের সমাধান চায়। এখানে তুরস্কের আপত্তি থাকলেও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ রাশিয়ার মিত্র। রাশিয়া নিজ উদ্যোগে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে চায়। সেজন্যই সোচিতে সিরিয়ার সব দল ও মতের প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেছিল রাশিয়া, যাকে তারা বলছে ‘সিরিয়ান কংগ্রেস অব ন্যাশনাল ডায়ালগ’। কিন্তু সেখানেও বিরোধ আছে। নানা মত ও পক্ষের প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও একটা বড় অংশ এতে অংশ নেয়নি। সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ ‘সিরিয়ান নেগোসিয়েশন কমিশন’ এ সম্মেলনে অংশ নেয়নি। সিরিয়া সংকটের মূলে রয়েছে সব মত ও পথকে একটি কাঠামোয় আনা। সেখানে সুন্নি, শিয়া, দুর্জ, আলাউট মতাবলম্বীসহ বিভিন্ন সামরিক গ্রুপও রয়েছে। আসাদ সমর্থকরাও একটি পক্ষ। কিছু ইসলামিক গ্রুপও রয়েছে, যারা আইএসএর বিরোধিতা করেছিল। সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করা সহজ কাজ নয়। যদিও সোচিতে সবাই সিরিয়ার অখ-তা রক্ষায় একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারা ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছেন। তারপরও কথা থেকে যায়Ñ বড় বিরোধী দলের অবর্তমানে এই সমঝোতা আদৌ কাজ করবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলা স্পষ্টই আসাদকে উৎখাত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের। তখন নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছিলÑ  Humanitariam Intervention অর্থাৎ মানবাধিকার রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ। ২০০৩ সালে জাতিসংঘ অনুমোদন দেয়নি ইরাক আক্রমণের। তবে নিরাপত্তা পরিষদে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল; তাতে বলা হয়েছিল ‘প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা’ গ্রহণ করার। আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যায় এই ‘প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা’ কোনো পর্যায়েই যুদ্ধকে সমর্থন করে না। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন লিবিয়া আক্রমণ করল, তখনও কোনো সমর্থন ছিল না নিরাপত্তা পরিষদের। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছেÑ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরু করা যাবে না। কিন্তু সেই অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ও লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরু করেছিল। লিবিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল একটি তত্ত্ব ঐঁ Humanitariam Intervention। আর সিরিয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যবহৃত হতে পারে Responsibility to protect তত্ত্ব। অর্থাৎ বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে মানবতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। সিরিয়ায় অতীতেও ওই ধরনের রাসায়নিক হামলার খবর আমরা জানি। জাতিসংঘের টিমকে পর্যন্ত সেখানে পাঠানো হয়েছিল, যারা খুঁজে পায়নি কারা সেখানে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। 
রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিঃসন্দেহে শুধু নিন্দনীয়ই নয়, বরং একটি অপরাধও। এখানে অনেকগুলো পক্ষ আছে, যারা এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। আসাদ সরকারের সেনাবাহিনী যেমনি এটা করতে পারে, তেমনি বিদ্রোহী বাহিনীও এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এর আগে ২০১৩ সালেও এ রকম একটি অভিযোগ ছিল। ওই সময় রাশিয়া জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে একটি ডকুমেন্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, সিরিয়ার বিদ্রোহী সৈন্যরাই এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Global Research  ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলÑ সিরীয় সরকার নয়, বরং বিদ্রোহীদের হাত রয়েছে ওই রাসায়নিক অস্ত্রের হামলার পেছনে। এটাও সত্য, আসাদ বাহিনী যে এটা করতে পারবে না, তেমনিটও নয়। তারাও করতে পারে।
সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র আছেÑ এ অভিযোগ অনেক পুরানো। ২০১৩ সালে জেনেভায় লেভারড-কেরি একটি সমঝোতা হয়েছিল। ওই সমঝোতার কারণে সেখানে যুদ্ধ এড়ানো গেছে। ওই সমঝোতায় সিরিয়ায় রাসায়নিক তদন্তের হিসাব, অবস্থান, মজুত, অস্ত্রের ধরন, গবেষণা ইত্যাদি সম্পর্কে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কমিটি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে একটি রিপোর্টও দিয়েছিলেন। ফলে ওই সময় আর যুদ্ধ হয়নি। এখানে বলা ভালো, ধারণা করা হয়, সিরিয়ায় মোট ৪০টি রাসায়নিক কারখানা অথবা এলাকা রয়েছে, যেখানে এসব অস্ত্র উৎপাদন করা হয়, অথবা তা সংরক্ষণ করা হয়। প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস (সারিন ও মাস্টার্ড গ্যাস) সিরিয়া সংরক্ষণ করেছে, এমন একটা কথা পশ্চিমা বিশ্বে চাউর হয়ে আছে। এসব গ্যাস ধ্বংস করা কঠিন কাজ। একজন গবেষক লিখেছেনÑ যুক্তরাষ্ট্র ২৮ বছর ধরেই তাদের কাছে রক্ষিত রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করে আসছে। কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। আরও একটা সমস্যা ছিল, কোন প্ল্যান্ট বা স্থানে তা ধ্বংস করা হবে! সিরিয়ায় তা করা যাবে না। সিরিয়া থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কোনো দেশে তা ধ্বংস করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের ১৩টি প্ল্যান্টের মধ্যে ৯টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপের পরিবেশবাদীরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা যে-কোনো পরিবহন ব্যবস্থায় (গ্যাস পরিবহন) প্রতিবন্ধকতা গড়ে তুলতে পারে। একমাত্র সম্ভাবনা ছিল রাশিয়ায়। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্কের কারণে সেটা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। ফলে একটি সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু তাতে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র সব ধ্বংস হয়েছে, তা বলা যাবে না।
পরিস্থিতি এখন কোনদিকে যাবে বলা মুশকিল। রাশিয়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও চূড়ান্ত বিচারে রাশিয়া এই ‘যুদ্ধে’ আদৌ জড়াবে না। এমনিতেই রাশিয়া নানাবিধ সংকটে আছেন এখন। ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করার পর জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। রাশিয়ার ওপর সীমিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। তা এখনও বলবৎ আছে। ১৪ জুন থেকে রাশিয়ায় শুরু হচ্ছে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব যদি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষের জন্ম দেয়, তাহলে বিশ্বকাপ ফুটবল ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা কিছু কিছু দেশ কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিতে পারেন! এ ধরনের একটি ঝুঁকি আছেই। ফলে প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়াকে জড়িত করবেন না। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সিরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করল যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থায়ই ‘যুদ্ধ’ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। আফগান যুদ্ধ পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে, এটা বলা যাবে না। সেখানে ট্রাম্প আরও কিছু সেনা পাঠাতে চান। ট্রাম্পের সিরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ায় যুদ্ধের খরচ আরও বাড়বে। পাঠকদের জানিয়ে রাখি, শুধু একটি টমহক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৮ লাখ ৩২ হাজার ডলার  (Invertopedia), তা-ও ১৯৯৯ সালের হিসাবে এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান হিসাবে এর দাম আরও বেশি। সুতরাং যুদ্ধ যদি সেখানে প্রলম্বিত হয়, তাহলে মিসাইলের ব্যবহার বাড়বে। বাড়বে যুদ্ধের খরচ। Internaion Closing House (ICH) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত ১৪ এপ্রিল ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের একটি খরচ দিয়েছে। এর পরিমাণ ৪৫ লাখ ৯২ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৮৯৬ ডলার (সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খরচ এতে ধরা হয়নি)। Nathal Priorities Project থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ICH  আরও উল্লেখ করেছেÑ ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হাতে মারা গিয়েছিলেন ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯০ ইরাকি। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসদস্য মারা গিয়েছিলেন ৪ হাজার ৮০১ জন। আফগানিস্তানে বিদেশি সেনা মারা গেছেন ৩ হাজার ৪৩০ জন। এখন সিরিয়ায় যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি যেমন বাড়বে, বাড়বে যুদ্ধের খরচ। আর এই খরচ মেটাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ।
যুদ্ধ মানুষ চায় না। ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। যুদ্ধ সেখানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সেখানে অস্থিতিশীলতা বাড়বে বৈ কমবে না। ইতোমধ্যে পরিস্থিতির সেখানে আরও অবনতি হয়েছে। রাশিয়া সিরিয়ার মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য এস-৩০০ মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সিরিয়ায় সরিয়ে নিয়েছে। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শুধু মার্কিন টমহক মিসাইলকে ধ্বংসই করবে না, বরং ১২০ মাইল দূরে শক্ত স্থাপনার ওপর আঘাতও হানতে সম্ভব। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান (যার আওতায় রয়েছে সিরিয়া) জেনারেল জোসেফ ভোটেল ইসরাইল সফর করেছেন। ফলে স্পষ্টই সিরিয়ার সংকট একটি নতুন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একটি ‘সীমিত যুদ্ধ’ এর সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ইউরোপে এ ধরনের একটি সীমিত যুদ্ধের সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল। আজ এত বছর পর বিশ্ব সে রকম আরেকটি সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে।
Daily Alokito Bangladesh
29.04.2018

সিরিয়া যুদ্ধের শেষ কোথায়


)
শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছেন। গত ১৪ এপ্রিল মার্কিন বিমানবাহিনীকে তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে এই হামলার নির্দেশ দেন। এবারও মার্কিন বিমানবাহিনীর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের বিমানবাহিনী। বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৩ সালের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিল। ইরাকের কাছে ডাব্লিউএমডি (WMD) বা মারাত্মক সব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—এই অভিযোগ তুলে সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানা গেল, ইরাকের কাছে ডাব্লিউএমডি নেই। কিন্তু তত দিনে ইরাকে মার্কিন দখলিস্বত্ব কায়েম হয়েছে। এবারের পরিস্থিতিও অনেকটা সে রকম। অভিযোগ, ক্ষমতাসীন সরকার রাজধানী দামেস্কের পাশে একটি ছোট্ট শহর দৌমায় রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে। আর এই হামলার ছবি সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাসায়নিক হামলার প্রতিবাদে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু প্রশ্ন এখন দুটি। এক. আসাদ বাহিনী কি আদৌ এই রাসায়নিক হামলা চালিয়েছিল? দুই. মার্কিন এই বিমান হামলা সিরিয়ার পরিস্থিতিকে এখন কোন দিকে নিয়ে যাবে? এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রুশ-মার্কিন সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটিয়েছে।
এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ক্রিমিয়ার রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্তি, পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন এবং সর্বশেষ রাশিয়ার আসাদকে সমর্থন—ইত্যাদি কারণে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্বকে নয়া স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এখন বিভিন্ন ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এর আগে রাশিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ায় হামলা চালায়, তাহলে এর পরিণতি ভালো হবে না। রাশিয়া বলেছে, এ ধরনের হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার অভিযোগের যে প্লট সাজানো হয়েছে তার সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। তিনি আরো বলেছেন, এ ব্যাপারে তাদের কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে। এটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। দৌমায় যে রাসায়নিক বোমা হামলা চালানো হয়েছিল এবং যাতে ৪০ জন সিরীয় নাগরিকের মৃত্যু, যাদের অনেকেই ছিল শিশু, এই হামলার সঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনী কি আদৌ জড়িত ছিল? এটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এই যুক্তি তুলে ধরে সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হলো। অথচ অভিযোগ আছে, এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এমনকি ব্রিটেনের পার্লামেন্টেও ব্রিটেনের বিমান হামলার কোনো অনুমতি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট নিজে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না। এ জন্য তাঁর কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তা করেননি। তবে ট্রাম্পের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যানদের অনেকেই আসাদবিরোধী। ফলে কংগ্রেসের সমর্থন তিনি পাবেন। তবে এই ‘যুদ্ধ’ সিরিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিল। সিরিয়া সংকটের সমাধানের পথে এখন বড় অনিশ্চয়তা এলো। তবে এটা এখনো নিশ্চিত নয় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মেরিন সেনা পাঠাবে কি না। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল ২০০৩ সালে। কিন্তু লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে যখন উত্খাতের উদ্যোগ নেওয়া হয় (২০১৩) তখন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সেনা পাঠায়নি। বিমান হামলার মধ্য দিয়ে সেখানে গাদ্দাফিকে উত্খাত করা হয়েছিল। ‘আরব বসন্ত’ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র স্ট্র্যাটেজিতে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর একটি ধারণা আছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারকে উত্খাত করা। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে যাচ্ছে বলেই ধারণা অনেকের।
তাহলে সমাধানটা হবে কিভাবে? সিরিয়ার পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই জটিল হয়ে পড়েছে। এখানে কার্যত দুটি বড় শক্তির অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই কুর্দিদের নিয়ে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ আসাদবিরোধী একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে তুরস্কের সমর্থন না পাওয়া। কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থান ও সমর্থন তুরস্ক ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব কমানো। এ ক্ষেত্রে সুন্নি ধর্মাবলম্বী তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল মিত্র হতে পারত; কিন্তু তা হয়নি। বরং তুরস্ক ও ইরান এক ধরনের অ্যালায়েন্সে গেছে। রাশিয়া আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল। কিন্তু রাশিয়া চায় না আসাদ অপসারিত হোক। আসাদকে রেখেই রাশিয়া এক ধরনের সমাধান চায়। এখানে তুরস্কের আপত্তি থাকলেও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ রাশিয়ার মিত্র। রাশিয়া নিজ উদ্যোগে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে চায়। সে জন্যই সোচিতে সিরিয়ার সব দল ও মতের প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেছিল রাশিয়া, যাকে তারা বলছে ‘সিরিয়ান কংগ্রেস অব ন্যাশনাল ডায়ালগ’। কিন্তু সেখানেও বিরোধ আছে। নানা মত ও পক্ষের প্রায় এক হাজার ৫০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও একটা বড় অংশ এতে অংশগ্রহণ করেনি। সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করাও সহজ কাজ নয়; যদিও সোচিতে সবাই সিরিয়ার অখণ্ডতা রক্ষায় একমত হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারা ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছে। তার পরও কথা থেকে যায়—বড় বিরোধী দলের অবর্তমানে এই সমঝোতা আদৌ কাজ করবে কি না?
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলা স্পষ্টতই আসাদকে উত্খাত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের। তখন নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছিল—Humanitarian Intervention. অর্থাৎ মানবাধিকার রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ। ২০০৩ সালে জাতিসংঘ অনুমোদন দেয়নি ইরাক আক্রমণের। তবে নিরাপত্তা পরিষদে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল—তাতে বলা হয়েছিল, ‘প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা’ গ্রহণ করার। আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যায় এই ‘প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা’ কোনো পর্যায়েই যুদ্ধকে সমর্থন করে না। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন লিবিয়া আক্রমণ করল তখনো কোনো সমর্থন ছিল না নিরাপত্তা পরিষদের। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরু করা যাবে না। কিন্তু সেই অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ও লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরু করেছিল। লিবিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল একটি তত্ত্ব—Humanitarian Intervention আর সিরিয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যবহৃত হতে পারে Responsibility to Protect তত্ত্ব। অর্থাৎ বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে মানবতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। সিরিয়ায় অতীতেও এ ধরনের রাসায়নিক হামলার খবর আমরা শুনেছি। জাতিসংঘের টিমকে পর্যন্ত সেখানে পাঠানো হয়েছিল, যারা খুঁজে পায়নি কারা সেখানে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল।
রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিঃসন্দেহে শুধু নিন্দনীয়ই নয়, বরং একটি অপরাধও। এখানে অনেক পক্ষ আছে, যারা এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। আসাদ সরকারের সেনাবাহিনী যেমন এটা করতে পারে, তেমনি বিদ্রোহী বাহিনীও এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এর আগে ২০১৩ সালেও এ রকম একটি অভিযোগ ছিল। ওই সময় রাশিয়া জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে একটি ডকুমেন্ট প্রকাশ করে। এতে দেখা যায় সিরিয়ার বিদ্রোহী সেনারাই এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Global Research ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, সিরীয় সরকার নয়, বরং বিদ্রোহীদের হাত রয়েছে ওই রাসায়নিক অস্ত্রের হামলার পেছনে। তবে এও সত্য, আসাদ বাহিনী যে এটা করতে পারবে না, তেমনটাও নয়। তারাও করতে পারে।
সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র আছে, এ অভিযোগ অনেক পুরনো। ২০১৩ সালে জেনেভায় লেভারভ-কেরি একটি সমঝোতা হয়েছিল। ওই সমঝোতার কারণে সেখানে যুদ্ধ এড়ানো গেছে। ওই সমঝোতায় সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের হিসাব, অবস্থান, মজুদ, অস্ত্রের ধরন, গবেষণা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কমিটি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিল। ফলে ওই সময় আর যুদ্ধ হয়নি। এখানে বলা ভালো, ধারণা করা হয় সিরিয়ায় মোট ৪০টি রাসায়নিক কারখানা অথবা এলাকা রয়েছে, যেখানে এসব অস্ত্র উত্পাদন করা হয় অথবা তা সংরক্ষণ করা হয়। প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন গ্যাস (সারিন ও মাস্টার্ড গ্যাস) সিরিয়া সংরক্ষণ করেছে, এমন একটা কথা পশ্চিমা বিশ্বে চাউর হয়ে আছে। এসব গ্যাস ধ্বংস করা কঠিন কাজ। একজন গবেষক লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২৮ বছর ধরেই তাদের কাছে রক্ষিত রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করে আসছে; কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। আরো একটা সমস্যা ছিল—কোন প্লান্ট বা স্থানে তা ধ্বংস করা হবে। সিরিয়ায় তা করা যাবে না। সিরিয়া থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কোনো দেশে, তা ধ্বংস করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের ১৩টি প্লান্টের মধ্যে ৯টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপের পরিবেশবাদীরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁরা যেকোনো পরিবহনব্যবস্থায় (গ্যাস পরিবহন) প্রতিবন্ধকতা গড়ে তুলতে পারে। একমাত্র সম্ভাবনা ছিল রাশিয়ায়। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্কের কারণে সেটা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। ফলে একটি সমঝোতা হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র সব ধ্বংস হয়েছে, তা বলা যাবে না।
পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল। রাশিয়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও চূড়ান্ত বিচারে রাশিয়া এই ‘যুদ্ধে’ আদৌ জড়াবে না। এমনিতেই রাশিয়া নানা রকম সংকটে আছে এখন। ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করার পর জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। রাশিয়ার ওপর সীমিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। তা এখনো বলবৎ আছে। ১৪ জুন থেকে রাশিয়ায় শুরু হচ্ছে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব যদি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষের জন্ম দেয়, তাহলে বিশ্বকাপ ফুটবল ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা কিছু দেশ কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিতে পারেন। এ ধরনের একটি ঝুঁকি আছেই। ফলে প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়াকে জড়িত করবেন না। কিন্তু তার পরও কথা থেকে যায়। সিরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করল যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থায়ই ‘যুদ্ধ’ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।
আফগান যুদ্ধ পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে, এটা বলা যাবে না। সেখানে ট্রাম্প আরো কিছু সেনা পাঠাতে চান। ট্রাম্পের সিরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ায় যুদ্ধের খরচ আরো বাড়বে। পাঠকদের জানিয়ে রাখি, শুধু একটি টমাহক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম আট লাখ ৩২ হাজার ডলার (Investopedia)। তা-ও ১৯৯৯ সালের হিসাবে এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান হিসাবে এর দাম আরো বেশি। সুতরাং যুদ্ধ যদি সেখানে প্রসারিত হয়, তাহলে মিসাইলের ব্যবহার বাড়বে। বাড়বে যুদ্ধের খরচ।
যুদ্ধ মানুষ চায় না। ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। যুদ্ধ সেখানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সেখানে অস্থিতিশীলতা বাড়বে বৈ কমবে না।
Daily Kalerkontho
26.04.2018

ক্যাস্ত্রো-পরবর্তী যুগে কিউবা



  তারেক শামসুর রেহমান ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এটা অনেকটাই নির্ধারিত ছিল। কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রো পদত্যাগ করবেন। কিউবার পার্লামেন্টের অধিবেশনে তিনি পদত্যাগ করবেন- এমনটাই বলা হয়েছিল। তিনি তাই করলেনও। প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট মিগেল ডিয়াজ-কানেল দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, ওটাও অনেকটা নির্ধারিত ছিল। সব মিলিয়ে অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই কিউবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় পটপরিবর্তন ঘটল। কিউবান বিপ্লবের ৫৯ বছরের ইতিহাসে ওই প্রথম কিউবা একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে পেল, যিনি ক্যাস্ত্রো পরিবারের বাইরে এবং কিউবার বিপ্লবের পর যার জন্ম। ৫৭ বছর বয়সী মিগেল ডিয়াজ-কানেলকে বলা হয় তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। কেননা রাউল ক্যাস্ত্রোর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। যদিও ৮৬ বছর বয়সে তিনি ‘সুস্থ’ই ছিলেন। তার পরও বছর দু’এক আগেই বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালের কিউবান পার্লামেন্টের অধিবেশনে তিনি পদত্যাগ করবেন। রাউল ক্যাস্ত্রো ক্ষমতায় ছিলেন ২০০৬ সাল থেকে। অর্থাৎ প্রায় ১২ বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করে গেছেন। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখনও তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ত্রোর হাতে। আর ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল এসে রাউল ক্যাস্ত্রোও ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন।
রাউল ক্যাস্ত্রোর ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া কিংবা মিগেল ডিয়াজ-কানেলের ক্ষমতা গ্রহণ নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। কোন পথে এখন হাঁটবে কিউবা? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের কী আদৌ উন্নতি ঘটবে? মিগেল ডিয়াজ-কানেল কী ক্যাস্ত্রো অনুসৃত নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন? এসব প্রশ্ন এখন বারবার উচ্চারিত হবে। বারবার আলোচিত হতে থাকবে। তবে এটা বলতেই হয়, মিগেল ডিয়াজ-কানেল রাউল ক্যাস্ত্রোর খুব ঘনিষ্ঠজন। ব্যক্তি এখানে একটি ফ্যাক্টর। তিনি রাউল ক্যাস্ত্রোর প্রভাবের বাইরে যেতে পারবেন না। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের পতনের রেশ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল, তখন বলতে গেলে সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল কিউবার দিকে। কেননা বিউবা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম মিত্র। øায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটা অবস্থান নিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বলা হয়েছিল কিউবা কী আদৌ অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়াতে পারবে? কেননা কিউবার অর্থনীতির অন্যতম উৎস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এ ক্ষেত্রে তখন বলা হয়েছিল, কিউবা অর্থনীতি ভেঙে পড়বে! কিউবার অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি সত্য, কিন্তু অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর দুটি বড় সমাজতান্ত্রিক দেশ, চীন ও ভিয়েতনামের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। চীন ও ভিয়েতনাম এখন আর ধ্রুপদী মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। তাদের অর্থনীতিতে বাজার অর্থনীতির কিছু মৌলিক ‘এলিমেন্ট’ প্রবেশ করেছে। ব্যক্তিগত খাত, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শেয়ারবাজার ইত্যাদি এখন এই দুটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তারা এখন অর্থনৈতিক এই বিবর্তনকে বলছে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি। তাতে তারা ফলও পেয়েছে। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। চীনের অর্থ ও উৎপাদন সামগ্রী এখন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ক্ষেত্রে কিউবাতেও কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে চীনের মতো অত ব্যাপক নয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন অনেক দিন ধরেই চাচ্ছে কিউবা আরও ‘উন্মুক্ত’ হোক। কিন্তু কিউবার নেতৃত্ব এখনও সবকিছু ‘উন্মুক্ত’ করে দেয়নি। দেশের অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ এখনও সরকার নিয়ন্ত্রিত। কিছু কিছু ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সারা দেশে এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের আরও সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ‘ট্যুরিজম খাত’। এ খাত কিছুটা উন্মুক্ত করা হয়েছে। আরও উন্মুক্ত করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল চেইন ব্যবসায়ীরা এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিউবায় সীমিত আকারে ডলার বাণিজ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কিউবান-আমেরিকানরা এখন নিয়মিত কিউবাতে ডলার পাঠাচ্ছে। কিউবাতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এতদিন ভেনিজুয়েলা থেকে যে স্বল্পমূল্যে জ্বালানি পেত, তা এখন আর আগের মতো আসছে না। কিউবাতে তেমন একটা বিনিয়োগও আসছে না। মার্কিন বিনিয়োগ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। সবচেয়ে বড় কথা কিউবা-আমেরিকা সম্পর্কে তেমন উন্নতি ঘটছে না। একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তিনি কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি নিজে হাভানায় গিয়েছিলেন। হাভানায় পুনরায় মার্কিন দূতাবাস খোলা হয়েছিল। তিনি অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ওবামা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন, তিনি কিউবাকে রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে বাদ দেবেন। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বদলে দিলেন সবকিছু। তিনি দাবি জানালেন কিউবাতে আরও বেশি গণতন্ত্রায়নের।
কিউবার বড় সমস্যা তার নিরাপত্তাহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র কখনই কিউবায় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকার করে নেয়নি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবার এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কিউবা বিপ্লবের মাত্র দু’বছরের মধ্যে ১৯৬১ সালে ভাড়াটে কিউবানদের দিয়ে কিউবা সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা চালায়। সিআইএ’র অর্থে পরিচালিত এই অভিযান ‘বে অব পিগ্স’ নামে পরিচিত। বলাই বাহুল্য, ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি।
একটি পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে, যা যুুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে, এটা বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল, যাতে সমুদ্রপথে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র কিউবাতে সরবরাহ করা না যায়। ওই সমুদ্র অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্ক থেকে তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দীর্ঘ ১৩ দিন ওই সমুদ্র অবরোধ বহাল ছিল। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে মিসাইল প্রত্যাহার করে নিলে সোভিয়েত ইউনিয়নও কিউবা থেকে ক্ষেণাস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে গেলেও সংকট থেকে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে এই অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে কিউবা যুদ্ধ করে আসছিল। এতে করে কিউবার অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু প্রবল ‘চাপ’-এর মুখে থেকেও কিউবা তার সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে গেছে। এমনকি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে কিউবা ছিল একটি আদর্শ। পৃথিবীর যেখানেই শোষণ হয়েছে, অত্যাচার হয়েছে, সেখানেই ফিদেল ক্যাস্ত্রো আর কিউবার নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের মাঝেও চে গুয়েভারা ও ফিদেল ক্যাস্ত্রো ছিলেন সমান জনপ্রিয়। শোষণ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই দুই ব্যক্তি বারবার আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
কিউবার বিপ্লবের এত বছর পর এই প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হল এমন একজনের কাছে, যিনি ক্যাস্ত্রো পরিবারের বাইরে। ক্যাস্ত্রো পরিবারের সদস্যরা কিউবাতে আছেন। তাদের সন্তানরা কেউ সেনাবাহিনীতে, কেউ পার্টিতে। কিন্তু রাউল ক্যাস্ত্রো এদের কাউকে সামনে নিয়ে আসেননি। নিয়ে এসেছিলেন মিগেল ডিয়াজ-কানেলকে। ৮৬ বছর বয়স হয়েছিল রাউল ক্যাস্ত্রোর। তিনি ইচ্ছা করলে আরও কিছুদিন থাকতে পারতেন। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, রাউল এক সময় চিন্তা করেছিলেন তিনি আরও দু’টার্ম থাকবেন (৫ বছর করে) এবং এরপর মিগেল ডিয়াজ দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন। দু’বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করবেন। এবং করলেনও তাই। ফিদেল ক্যাস্ত্রো জীবিত থাকাকালীন রাউল ক্যাস্ত্রো তার পাশাপাশি থেকেছেন। ফিদেল তাকেই উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিল। যদিও এটা ঠিক কিউবার বিপ্লবে রাউল ক্যাস্ত্রোরও একটি ভূমিকা ছিল। কিন্তু মিগেল ডিয়াজ-কানেল বিপ্লবে অংশ নেননি। কিন্তু রাউল ক্যাস্ত্রোই তাকে বেছে নিয়েছিলেন। এখন যে প্রশ্নটি পশ্চিমা বিশ্বে উঠেছে, তা হচ্ছে মিগেল ডিয়াজ-কানেল কি রাউলের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারবেন? কিংবা সংস্কারের ব্যাপারে তিনি কতটুকু ‘কমিটেড’ হবেন? রাউল ক্যাস্ত্রো বিদায় নিয়েছেন বটে; কিন্তু অত্যন্ত ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী ও পার্টিপ্রধান হিসেবে তিনি থেকে যাচ্ছেন। এর অর্থ নয়া প্রেসিডেন্ট মিগেল রাউল ক্যাস্ত্রোর প্রভাবের বাইরে যেতে পারবেন না। তিনি যদি আরও বেশি সংস্কারের উদ্যোগ নেন, সে ক্ষেত্রে রাউলের সমর্থনের তার প্রয়োজন হবে। রাউল ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে থেকে যাচ্ছেন। এটাও ঠিক আছে। এ মুহূর্তে তিনি যদি পার্টিপ্রধান হিসেবেও পদত্যাগ করেন, তাহলে পার্টিতে কোন্দল দেখা দিতে পারে। পার্টির জন্য তা কোনো ভালো খবর নয়। প্রকাশ্যে পার্টির ভেতরকার কোনো দ্বন্দ্বের খবর আমরা জানি না। পার্টিতে যারা সিনিয়র, তারা কিউবান বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ বেঁচে আছেন। এরা সংস্কারের ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। রাউল ক্যাস্ত্রোর মেয়ের জামাই (যিনি সেনাবাহিনীর জেনারেল) সম্পর্কেও পশ্চিমা বিশ্বে একটা কথা বলা হয় যে, তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমতালিপ্সু। যদিও তার অতি আগ্রহের কথা সংবাদপত্রে কখনই প্রকাশিত হয়নি। এর অর্থ পরিষ্কার মিগেল ডিয়াজ-কানেল অনেক দিনের জন্য ক্ষমতায় এলেন। দুটি বিষয় দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক. যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষমতাবদলকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে এবং কিউবার ব্যাপারে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির আদৌ পরিবর্তন হবে কিনা? দুই. কিউবায় আরও বেশি অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে মিগেল ডিয়াজ যাবেন কিনা? কিউবার ব্যাপারে ওবামা প্রশাসন একটি ‘নরম’ অবস্থানে গিয়েছিল। রিপাবলিকানদের চাপের মুখেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়ার। তিনি নিজে কিউবায় গিয়েছিলেন। কিন্তু কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার যে উদ্যোগ, তা তিনি নিতে পারেননি। এখন ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে পুরো উল্টোপথে হাঁটলেন। রাউল ক্যাস্ত্রোর সম্পর্কেও তিনি নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি চান কিউবা সবকিছু আরও বেশি উন্মুক্ত করে দিক! এটা বোধহয় কিউবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আরও বেশি তথাকথিত গণতন্ত্রায়নের অর্থ হচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা কমানো, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও তাদের প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে সুযোগ করে দেয়া। কিউবার নয়া নেতৃত্ব এটি করবে বলে মনে হয় না। ফলে কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে পর্যায়ে রয়েছে, সে রকমটিই রয়ে যাবে। তবে নয়া প্রেসিডেন্ট মিগেল ডিয়াজ-কানেল সংস্কারের ব্যাপারে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে পারেন। সমাজতান্ত্রিক সমাজে সংস্কারটা প্রয়োজন। চীন ও ভিয়েতনাম ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার এনে সফল হয়েছে। কিউবা এখন সে পথে হাঁটতে পারে। সমাজতন্ত্রের অর্থ দারিদ্র্য নয়- এ কথাটা বলেছিলেন চীনের সংস্কারের জনক দেং জিয়াও পিং। চীনে ওই সময় দরিদ্রতা ছিল। চীন সমাজতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখেই ধীরে ধীরে একটি ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য সেখানে কমেছে। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিউবার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। ৮৭ মিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কিউবার। জিডিপি র‌্যাংকিংয়ে কিউবার অবস্থান ৬৫তম। মাথাপিছু আয় ৭৪৬৫ ডলার। সার্ভিস সেক্টরে জিডিপির অবদান বেশি, শতকরা ৭৩ ভাগ। এখানেই নয়া কিউবা সরকারকে হাত দিতে হবে। ট্যুরিজমের প্রচুর সম্ভাবনা আছে। এই সার্ভিস সেক্টর যদি আরও উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা যায়, তাহলে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কিউবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জগৎ বিখ্যাত। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে কিউবা এই সেবা দিয়ে থাকে (ভেনিজুয়েলার সহযোগিতায়)। ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক মান্দাভাবের কারণে এটাও এখন বন্ধের পথে। সস্তায় জ্বালানি তেলও পাওয়া যাচ্ছে না ভেনিজুয়েলা থেকে। ফলে এই সেক্টরের দিকে প্রেসিডেন্ট মিগেলকে নজর দিতে হবে।
কিউবার নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। এটাই স্বাভাবিক। নয়া নেতৃত্ব, যাদের জন্ম বিপ্লবের পর, তারা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন। একুশ শতকে তারা এখন কিউবাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Jugantor
23.04.2018

জাতিসংঘ কি আসল কথাটা বলে ফেলেছে?

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব উরসুলা মুয়েলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৭ লাখ রোহিঙ্গা যখন নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষা করছে, ঠিক তখনই তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য পরিস্থিতি অনুকূল নয়। সম্প্রতি মিয়ানমার তাকে রাখাইনে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। তিনি ছয় দিনের সফরে মিয়ানমারে গিয়েছিলেন এবং রাখাইনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলও সফর করেছেন। তিনি সফরশেষে এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পরও ৪ লাখের বেশি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৬ বছর ধরে শিবিরে বন্দি রয়েছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ যখন বড় ধরনের সংকটে আছে, ঠিক তখনই উরসুলা মুয়েলারের এই বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তার বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে, জাতিসংঘ প্রকারান্তরে চাচ্ছে না রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরে যাক। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোনো কর্মকা- গ্রহণ করতে মিয়ানমার সরকারকে দেখেননি। তিনি আরও একটি কথা বলেছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে এখনও চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে প্রান্তিকীকরণের শিকার ও কঠোর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া ৪ লাখেরও বেশি মুসলমান ব্যক্তির (রোহিঙ্গা) দুঃখের কথা আমরা ভুলতে পারি না; কোনোভাবেই আমাদের উচিতও নয়।
মিথ্যা বলেননি উরসুলা মুয়েলার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জাতিসংঘের যে ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল, সেটি করতে পারছে না শুধু বৃহৎ দুই শক্তি চীন ও রাশিয়ার অসহযোগিতার কারণে। এ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হলেও তাতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন ভারতের নয়া পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। গোখলে সাংবাদিকদের বলেছেন, তার সরকার ও বাংলাদেশ একসঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কাজ করবে। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ভারত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য দেবে। অতীতে ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। নিঃসন্দেহে ভারত যদি মিয়ানমার সরকারকে কিছুটা ‘চাপ’ দেয়, তাহলে চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২১ জানুয়ারি বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন। তিনি নিজে মিডিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াং ঝি লিও ২১ জানুয়ারি উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এদের সবার বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ব্রিফিং করেছেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতও। তার বক্তব্যও গুরুত্বের দাবি রাখে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠিক কোনদিন থেকে শুরু হবে, সে রকম তারিখ-টারিখ বলা মুশকিল।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যেতে না চাইলে তো জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না। আমাদের চুক্তির সব জায়গায়ই স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কফি আনানের কমিশনের রিপোর্টেও তা আছে।’ যখন রোহিঙ্গারা জানতে পারবে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, তাদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেÑ এসব বিষয় দেখলে তখন তারা নিজেরাই যেতে উৎসাহী হবে। (যুগান্তর, ২২ জানুয়ারি)। অনেকটা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের বক্তব্যের একটা ‘মিল’ খুঁজে পাওয়া যায়। বার্নিকাট বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অবশ্যই নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় হতে হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্পষ্টই কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছেÑ এক. রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে? দুই. রোহিঙ্গারা সেখানে কতটুকু নিরাপদ? তিন. রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে পারবে কি না? চার. রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের জীবন-জীবিকার কী হবে? মিয়ানমারের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক ও পরবর্তীতে বাস্তুচ্যুত রাখাইনের বাসিন্দাদের প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে নাগরিকত্বের বিষয়টি আদৌ নেই। মিয়ানমার এদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। রোহিঙ্গা নামেরও আপত্তি রয়েছে তাদের। এমনকি কফি আনান কমিশনের রিপোর্টেও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। মিয়ানমার এদের ‘বাঙালি’ হিসেবে স্বীকার করে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় এবং ডকুমেন্টে কোথাও রোহিঙ্গা শব্দটি নেই। গত বছর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গা খেদাও অভিযান শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকলেও নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন হয়েছেÑ এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। এক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি উঠবে, তা হচ্ছে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গা আদৌ ফেরত যেতে চাইবে কি না?
মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের এটা একটা বড় দুর্বলতা। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারিনি। দ্বিতীয় প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণÑ নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে। অনেকে তার স্ত্রী, স্বামী, সন্তানকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যা করতে দেখেছে। অনেক দেরিতে হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীপ্রধান ‘সীমিত হত্যাকা-ে’র কথা স্বীকার করেছেন। তাদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইবেন নাÑ এটাই স্বাভাবিক। এখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করেছে, রোহিঙ্গারা তাদের বিশ্বাস করবে না। ইতোমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তারা সুস্পষ্ট করেই বলেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না! রোহিঙ্গারা এ ধরনের বক্তব্যে উৎসাহিত হবেন নিঃসন্দেহে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো নিজেই বলেছেন, জোর করে কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো যাবে না! এ ধরনের বক্তব্য রোহিঙ্গাদের এই দেশে থেকে যেতে উৎসাহ জোগাতে পারে। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে আরও ম্যাচিউরড বক্তব্য আশা করেছিলাম। তৃতীয় প্রশ্নটিকেও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। রোহিঙ্গারা কি আদৌ নিজ বাসভূমে ফেরত যেতে পারবে? এর সরাসরি জবাব হচ্ছেÑ না। যে চুক্তি হয়েছে, তাতে মিয়ানমার দুটি ক্যাম্প করবে। প্রথমটা অভ্যর্থনা ক্যাম্প, দ্বিতীয়টা অন্তর্বর্তীকালীন ক্যাম্প। অর্থাৎ যারা বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাবে, তাদের প্রথমে অভ্যর্থনা ক্যাম্পে রাখা হবে। তারপর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। এখানেই সমস্যাটা তৈরি হবে। এই ক্যাম্পে তারা বছরের পর বছর থেকে যেতে বাধ্য হবে! এটা একধরনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এখানে রেখেই তথাকথিত যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি হবে। আমার শঙ্কা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য ফিলিস্তিনিদের মতো হতে পারে! পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ফিলিস্তিনিরা নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত হয়ে বছরের পর বছর, জেনারেশনের পর জেনারেশন থেকে যাচ্ছেন ক্যাম্পে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাঠক, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ যুগে ‘হোমল্যান্ড’গুলোর কথা স্মরণ করতে পারেন। বর্ণবাদ যুগের অবসানের আগে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে সাতটি হোমল্যান্ডে রাখা হয়েছিল। আমার আশঙ্কাটা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অবস্থা অনেকটা হোমল্যান্ডগুলোয় থাকা কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অথবা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মতো হতে পারে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতি এটাইÑ রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করা। আন্তর্জাতিক ‘চাপ’ এর কারণে তারা রোহিঙ্গাদের নিতে চাচ্ছে বটে, কিন্তু বাস্তবতাই বলে তারা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করে নিতে চাইছে না। উপরন্তু তারা কোনোদিনই তাদের নিজ নিজ বসতবাটিতে ফেরত নেবে না। কেননা সেসব বসতবাটির আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। রাখাইনে কয়েকশ গ্রামে রোহিঙ্গাদের বসতবাটি মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেসব গ্রাম এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ‘লিজ’ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে থাকতে পারছে না। রোহিঙ্গারা কোনোমতেই অন্যত্র থাকতে চাইবে না। বংশপরম্পরায় তারা নিজ বাসভূমে বসবাস করে আসছে। জমিজমা চাষ করে আসছে। কেউ কেউ ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। এখন তাদের যদি অন্যত্র রাখা হয়, তারা তা মানতে চাইবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এটা একটা অন্যতম সমস্যা। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের জবাব থাকা বাঞ্ছনীয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ খুব শক্ত অবস্থানে গেছে, এটা আমার মনে হয় না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং তার ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ বলে দেয়, বাংলাদেশ একটি চুক্তি করতে চেয়েছিল; কিন্তু মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করার কোনো কৌশল অবলম্বন করেনি। জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হয়েছে। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান একটি ঘৃণিত অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে তা দ-নীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য। ইতোমধ্যে বসনিয়া-হারজেগোভিনা, কঙ্গো, লাইবেরিয়া কিংবা রুয়ান্ডায় যারা জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে জড়িত ছিলেন, সেসব সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়েছে। রায়ও দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিক সেনা কর্মকর্তাকে মিয়ানমারে গণহত্যার জন্য চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ এদের বিচারের দাবি করতে পারত। তাহলে অন্তত মিয়ানমার সরকার একটা ‘চাপ’ এর মুখে থাকত। কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে একটি ‘সফ্ট ডিপ্লোম্যাসি’র আশ্রয় নিয়েছে। ২৫ আগস্টের (২০১৭) রোহিঙ্গা গণহত্যা ও রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও বাংলাদেশ নিকট প্রতিবেশী, বিশেষ করে চীন ও ভারতের ‘সাহায্য’ নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শেষ অবধি চীন স্ব-উদ্যোগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল এবং সে প্রস্তাব অনুসরণ করেই মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্টের পর থেকে সংকটের গভীরতা বাড়লেও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি ওই সময় চীন, রাশিয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সফর করেননি, এমনকি এসব দেশের সাহায্যও চাননি। অথচ প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ভালো। এসব দেশকে দিয়ে আমরা মিয়ানমারের ওপর প্রভাব খাটাতে পারতাম। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পক্ষে। সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে। তিনিও বলেছেন, ভারত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে থাকবে। কিন্তু জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উরসুলা মুয়েলার যখন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূল নয়, তা বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভিন্ন মেসেজ পৌঁছে দিতে পারে! তারা ‘জোর করে’ রোহিঙ্গাদের পাঠাতে চাইবে না! এমনকি বাংলাদেশ যেখানে ৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছে, সেখানে মিয়ানমার জানিয়েছে তারা মাত্র ৩৮৩ জনকে গ্রহণ করবে। এর অর্থ পরিষ্কারÑ মিয়ানমার অন্য রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না! তাহলে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ কোথায় আশ্রয় দেবে? ভাসানচরে কিছু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার স্থান হবে, কিন্তু বাকিরা থেকে যাবে বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায়। এখন জাতিসংঘের কর্মকর্তার বক্তব্য প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের উৎসাহ জোগাবে বাংলাদেশে থেকে যেতে। এরই মাঝে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী উ উইন মাইয়াত আই। প্রথমে তিনি কুতুপালং কাম্পে যান। রোহিঙ্গাদের আশ্বস্ত করেন। এর পর ঢাকায় এসে দেখা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। রোহিঙ্গাদের তিনি ‘সবকিছু ভুলে’ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বলেছেন, তাদের জন্য নতুন নতুন গ্রাম তৈরি করা হবে। রোহিঙ্গাদের  NVC বা National Varification Card দেওয়া হবে বলেও জানান। কিন্তু এই কার্ড নাগরিকত্বের পরিচয় বহন করে না। ফলে প্রশ্ন থাকলইÑ রোহিঙ্গারা শেষ অবধি নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন কি না।
Daily Alokito Bangladesh
22.04.2018

গোখলের ঢাকা সফর ও অমীমাংসিত বিষয়াবলি

ভারতের নয়া পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলের ঢাকা সফর শেষ হয় গত ১০ এপ্রিল। এটা গোখলের প্রথম ঢাকা সফর। এই সফরে তথ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ ছয়টি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। শিলিগুড়ি ও পার্বতীপুরের মধ্যে মৈত্রী পাইপলাইন বাস্তবায়ন, দেশের ৫০৯ স্কুলে কম্পিউটার ও ভাষা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, রংপুর সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিসিআর রবীন্দ্র চেয়ার প্রবর্তন, ভারতের স্পেশাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ এবং বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশনের আন্তঃসংস্থা চুক্তিতে একটি সংযোজন স্মারক স্বাক্ষর করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আমাদের জানিয়েছেন, ভারত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট ‘কমিটমেন্ট’ আমরা পাইনি। আসামে প্রায় ৫০ লাখ বাঙালি মুসলমান সেখানে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ভারতীয় নাগরিকত্ব চিহ্নিতকরণের যে কর্মসূচি আসাম সরকার হাতে নিয়েছে, তাতে উৎরে যেতে পারেননি ওইসব বাঙালি মুসলমান। আসাম সরকারের অভিযোগ, এরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এরা আর ফিরে যাননি। এদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে- এমন কথা আসাম সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হয়েছে। প্রসঙ্গটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এসেছে- এমন তথ্য মিডিয়ায় আসেনি। শুধু তাই নয়, এক বছরের মধ্যে ভারত সরকার একাধিক বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করেছে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে তিন ধরনের পাট পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করা হয়। আর জুন মাসে শুল্কারোপ করা হয় হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ওপর। বাংলাদেশে তৈরি ফিশিং নেটও শুল্কারোপের আওতায় আসছে। পাটপণ্যের (পাটের সুতা, বস্তা ও চট) ওপর শুল্কারোপ সাফটা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হলো। বিষয়টি গোখলের সফরে আলোচনা হয়েছে, এমন তথ্যও আমাদের জানা নেই। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে ছিল তিস্তার পানি বণ্টন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কথা।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র, অভিন্ন নদীসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। এখন পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেকটি তীরবর্তী রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানি সম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু এই ‘যুক্তি ও ন্যায়ের’ ভিত্তিটি উপেক্ষিত থাকে যখন পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। তিস্তার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হয়নি।
১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘জলপ্রবাহ কনভেনশন’ নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করে। এই নীতিমালার ৬নং অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা’র কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ব্যবহার, অর্থাৎ এককভাবে তিস্তার পানির ব্যবহার এই ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা’র ধারণাকে সমর্থন করে না। আমরা আরো আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারব, যেখানে বাংলাদেশের অধিকারকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে, পরিবেশসংক্রান্ত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের ১৪নং অনুচ্ছেদ, জলভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদ- প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিসমূহের সংরক্ষণের যে কথা বলা হয়েছে, তা রক্ষিত হচ্ছে না। এখানে সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু কোনো রাজ্য (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ, এমন কিছু করতে পারে না, যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। সমস্যাটা ভারতের। পশ্চিমবঙ্গকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই।
তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া এবং তিস্তায় পানি না পাওয়া এখন আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেন, তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সঙ্কটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে করে বাড়বে। মনে রাখতে হবে, তিস্তায় পানিপ্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থন-এটা আমাদের বিষয় নয়। আমাদের নেতৃত্ব বিষয়টিকে হালকাভাবে নেননি। আমাদের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুঁড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর গাড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দু’দেশের মন্ত্রীপর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই অতীতে মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরো একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানি বণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। মমতা ব্যানার্জি এই পানি চাইবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক নদীর পানি এককভাবে তিনি ব্যবহার করতে পারেন না। তিনি নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে (প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর, ২০১৭ সালের এপ্রিল) নতুন একটি ‘ফর্মুলা’ দিয়েছিলেন। তিনি তোসা ও জলঢাকাসহ চারটি নদীর নাম বলেছিলেন, যেখান থেকে পানি নিয়ে বাংলাদেশের চাহিদা পূরণ করা যায় বলে মনে করেন! বাংলাদেশে তোসা ও জলঢাকা নদী দুধকুমার ও ধরলা নামে পরিচিত। মমতার ওই বক্তব্য মূলত ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের নামান্তর। আগেই উল্লেখ করেছি মমতা ঢাকায় এসে অভিযোগ করেছিলেন বাংলাদেশ আত্রাই নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এই হচ্ছে মমতা। তবে একটা সমস্যা আছে। প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের জানিয়েছিলেন মমতার সম্মতি নিয়েই তিস্তা চুক্তি হবে। দুর্ভাগ্য আমাদের, সেই ‘সম্মতি’ আজ অব্দি পাওয়া যায়নি। আরো একটা ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ। এই ব্যারাজ বাংলাদেশ ও ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন আমাদের কাছে যে তথ্য ছিল, তা হচ্ছে রাজবাড়ীর পাংশায় একটি স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল, যেখানে একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় একটি রিজার্ভিয়ার নির্মাণ করা হবে, যাতে বর্ষার মৌসুমের পানি ধরে রাখা যায়। এই পানি শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সমর্থন ও আর্থিক সহযোগিতার প্রশ্ন ছিল। দুটো চীনা কোম্পানি এবং জাপান এ খাতে দুই বিলিয়ন ডলার সাহায্যের তথা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২ দশমিক ৯০ ট্রিলিয়ন লিটার পানি ধরে রাখার কথা। ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও ছিল। এতে করে ভারতও উপকৃত হতো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন পাংশায় যে ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, তা তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। তবে একটি উপযুক্ত স্থান দেখার জন্য তিনি মমতা ব্যানার্জির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যৌথ উদ্যোগের কথাও বলেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি পানি ধরে রাখার জন্য নদী ড্রেজিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০১৭ সালে দুই প্রধানমন্ত্রী যে যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করেছিলেন তার ৪১নং ধারায় গঙ্গা ব্যারাজের কথা বলা হয়েছিল। সেখানে দু’দেশের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ কারিগরি টিম’ গঠন করার কথাও বলা হয়েছিল। এই ‘যৌথ কারিগরি টিম’-এর ভারতীয় পক্ষ বাংলাদেশ সফর করবে এবং বাংলাদেশে তারা একটি সমীক্ষা চালাবে। কিন্তু সেই সমীক্ষা আজো চালানো হয়নি। ফলে পানি নিয়ে সঙ্কট বাড়ছে। শুষ্ক মৌসুম আসছে। তিস্তায় পানি থাকবে না। এটা বাংলাদেশে একটি বড় সঙ্কট তৈরি করবে।
ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে ভারতের অবস্থান মাত্র ২ দশমিক ৮ ভাগ হলেও, ২০৫০ সালে ভারত দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। সুতরাং ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারতকে আরো উদার হতে হবে। ভারত যদি আরো উদার না হয়, তাহলে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার যে বড় সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হবে। ‘কবি’ নরেন্দ্র মোদি (তার দুটি কবিতার বই আছে) ঢাকায় এসে বলেছিলেন, পাখি কিংবা বায়ুর কোনো সীমান্ত নেই। তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি’ আমাদের জন্য অনেক বড় কিছু। ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত যৌথ ঘোষণাপত্রে যে ৬২টি দফা আছে, তাতে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। এখন দেখার পালা কতটুকু তা বাস্তবায়িত হয়। শুধু ‘আশ্বাস’ বাংলাদেশিদের মন ভরাতে পারবে না! ভারতীয় নেতৃবৃন্দের ‘মাইন্ড সেটআপ’-এ পরিবর্তন দরকার। সেটি যদি না হয়, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান হবে, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তির কথাও তিনি বলেছিলেন। আমরা চাই তিনি তার কথা রাখবেন। ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। কিন্তু তাতে আশাবাদী হওয়ার মতো আমরা কিছু পাইনি।