রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ভারতকে কোথায় নিয়ে যাবেন নরেন্দ্র মোদি?

সম্পাদকীয়
গতকাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এ নিয়ে তিনি দুই টার্ম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন।
১৯৪৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতে ১৮ জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদি। এর মাঝে সবচেয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় ছিলেন জওহরলাল নেহেরু- ৬১৩০ দিন (১৫ আগস্ট ১৯৪৭-২৭ মে ১৯৬৪), ইন্দিরা গান্ধী দু’দফায় ৫৯২৯ দিন (২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬-২৪ মার্চ ১৯৭৭ এবং ১৪ জানুয়ারি ১৯৮০-৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) এবং ড. মনমোহন সিং ৩৬৫৪ দিন (২২ মে ২০০৪-২৬ মে ২০১৪)।
স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে গুলজারিলাল নন্দ দু’বার (২৭ মে-৯ জুন ১৯৬৪ এবং ১১ জানুয়ারি-২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬) অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ভিপি সিংয়ের শাসনামল ছিল ৩৪৩ দিনের। তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে গিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। অন্যদিকে বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ীর প্রথম টার্ম ছিল মাত্র ১৬ দিনের। কিন্তু দ্বিতীয়বার তিনি দীর্ঘ ৬ বছর ৬৪ দিন ক্ষমতায় ছিলেন (১৯ মার্চ ১৯৯৮-২২ মে ২০০৪)। ভারতের দীর্ঘ ৭২ বছরের রাজনীতিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস দেশটি শাসন করেছে। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পতনের মধ্য দিয়ে জনতা দল ক্ষমতাসীন হয়েছিল। কিন্তু জনতা দল একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মোরারজি দেশাই ছিলেন প্রথম জনতা দলের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ২ বছর ১১৬ দিন (২৪ মার্চ ১৯৭৭-২৮ জুলাই ১৯৭৯)। তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। দেশাই পদত্যাগ করলে চরণ সিং প্রধানমন্ত্রী হন (১৭০ দিন)। তিন ছিলেন জনতা পার্টির নেতা (পরবর্তী সময়ে লোকদল গঠন করেন)। জনতা দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব পুনরায় কংগ্রেস তথা ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আততায়ীর হাতে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর (১৯৮৯) পুনরায় জনতা দল ক্ষমতাসীন হয়। দলটি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ভিপি সিং (জনতা দল), চন্দ্রশেখর (সমাজবাদী জনতা দল), দেবগৌড়া (জনতা দল-সেকুলার), আইকে গুজরাল (জনতা দল)- সবাই যথাক্রমে ৩৪৩ দিন, ২২৩ দিন, ৩২৪ দিন ও ৩৩২ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৃত অর্থেই বিজেপির উত্থান ঘটে অটল বিহারি বাজপেয়ীর আমলে (১৯ মার্চ ১৯৯৮-২২ মার্চ ২০০৪)। সেই রাজনীতির ধারাবাহিকতায় মোদি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। অটল বিহারি বাজপেয়ীর পর অবশ্য ড. মনমোহন সিং দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
এখন কতদূর যেতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি? নির্বাচনের আগে তিনি ‘সাম্প্রদায়িক কার্ড’ ব্যবহার করেছেন। প্রচণ্ড মুসলমান বিদ্বেষকে পুঁজি করে তিনি যেতে চেয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে। তাতে তিনি সফল হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই রাজনীতি নিয়েই কি তিনি এগিয়ে যাবেন? নাকি একটি ‘লো-প্রোফাইল’ অবস্থান গ্রহণ করবেন? গত ২৫ মে তার এক বক্তব্য একটি আশার খোরাক জুগিয়েছে। সংসদের সেন্ট্রাল হলে পা রাখার ঠিক আগে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা সংবিধানের ওপর মাথা রেখে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস।’ ‘সবকা বিশ্বাস’ এটা নতুন মন্ত্র। এই বিশ্বাসটা মুসলমানদের। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানকে সাক্ষী রেখে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি যে, সব বর্গের মানুষকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। ধর্ম-জাতির ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ হবে না।’ (আনন্দবাজার, ২৬ মে)। তার এ বক্তব্যে মানুষ খুশি হবে। বিশেষ করে মুসলমানদের মাঝে যে ভয় জেগে গেছে, এ বক্তব্য তাদের হয়তো আশার বাণী শোনাবে। আবার এটাও সত্য, নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে একটা মুসলমান বিদ্বেষের ঢেউ তিন সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটা এখন তিনি কীভাবে কমাবেন? বিষয়টি অত সহজ নয়। তবে ভারত বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলেও সমাজে নানা সংকট রয়েছে। সমাজে জাত-পাতের বিভেদ অনেক বেশি। নিজে কৈশোরে চা বিক্রি করে এবং মা পরের বাড়িতে ঝি’র কাজ করে (টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, ৭ মে ২০১৫) যাদের সংসার চলত, সেই মোদি এখন কর্পোরেট জগতের বাসিন্দা। যখন বিদেশে যান, তখন সঙ্গে নিয়ে যান কর্পোরেট জগতের প্রতিনিধিদের। কিন্তু ভারতের জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনও গরিব। ৫৩ শতাংশের কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এ ‘কাজটি’ নিত্য সমাধান করেন। পরিসংখ্যান বলে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। প্রায় ৯ বছর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে (৮ সেপ্টেম্বর ২০১০) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে। ২০১৯ সালে এসে এতে খুব যে একটা পরিবর্তন এসেছে তা বলা যাবে না। শুধু দরিদ্রতা কেন বলি, প্রায় ৮০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার। ৭০ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেখানে অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৮৬টি হিসাব করে) ১৪৬, সেখানে ভারতের ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ হয়নি (পাঠক, উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের গ্রামের সত্য কাহিনী নিয়ে তৈরি সিনেমা ‘গুলাব গ্যাং’-এর কথা স্মরণ করতে পারেন)।
সড়ক, মহাসড়ক নির্মাণ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন মোদি। কিন্তু তাতে একদিকে যেমন দরিদ্রতা দূর হয়নি, অন্যদিকে তেমনি ব্যবসাবান্ধব একটি পরিবেশও তিনি তৈরি করতে পারেননি গত ৫ বছরে। IMD World Competitiveness Ranking 2019-এর তালিকায় ভারতের অবস্থান এখন ৪৩ (প্রথম সিঙ্গাপুর, দ্বিতীয় হংকং, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র)। ভারতের এ অবস্থান মালয়েশিয়া (২২তম) ও ব্রিটেনেরও (২৩তম) পরে। তিনি কাজপাগল মানুষ (মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমান- একথা স্বীকার করেছেন টাইম প্রতিবেদকের কাছে)। কিন্তু ভারতের বড় যে সমস্যা দরিদ্রতা, অসমতা, তা তিনি দূর করতে পারেননি। গত ৫ বছরে মোদি ৫৯টি দেশ সফর করলেও নিজ দেশের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন খুব কম। পরিসংখ্যান বলছে, ২ দশমিক ৮৪৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের। কিন্তু বেকার সমস্যা সেখানে প্রবল। কর্মজীবী মানুষের (যাদের বয়স ১৫-এর ওপরে) মাঝে ৫০ শতাংশের কোনো চাকরি নেই। ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫-এর নিচে। এদের চাকরি দরকার। বেকারত্বের হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিমাসে ১২ লাখ তরুণের জন্য কাজ দরকার। বিষয়টি নরেন্দ্র মোদির জন্য যে খুব সহজ, তা বলা যাবে না।
তার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে কৃষককে আস্থায় নেয়া। সাম্প্রতিকালে ভারতে সবচেয়ে বড় কৃষক আন্দোলন হয়েছে। কৃষককে সংগঠিত করে বাম সংগঠগুলো নয়াদিল্লিতে পর্যন্ত দীর্ঘ লংমার্চ করেছে। ঋণের ভারে কৃষক পর্যুদস্ত। তারা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। এ রকম ঘটনা একটি নয়, একাধিক। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী (৩ মে ২০১৭) বছরে ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে। সুপ্রিমকোর্টে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যার বিষয়টি যে কোনো সরকারের জন্যই একটি বিব্রতকর অবস্থা। মোদি সরকার তাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিটি কৃষক পরিবারকে ৬ হাজার রুপি করে দেয়ার। আর কংগ্রেসের প্রস্তাব ছিল অতি গরিব মানুষকে (২০ শতাংশ) বছরে ৭২ হাজার টাকা করে দেয়া। নয়া সরকারের জন্য এটি হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাপক শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে বড় ধরনের পানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর ২ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে মারা যায়। ২০২০ সালের মধ্যে ২১টি বড় শহরে পানি সংকট দেখা দেবে। ৭৫ শতাংশ মানুষ নিজ বাড়িতে সুপেয় পানি পায় না। আর ৭০ শতাংশ পানি দূষিত। সুচিকিৎসা ভারতের জন্য একটি বড় সমস্যা। National Health Profile 2018-এ দেখা যায়, ভারতের নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ধনী রাষ্ট্রগুলো ব্যয় করে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এমনকি নিুআয়ের দেশগুলোও ব্যয় করে প্রায় ২ শতাংশ। মোদি সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ- কী করে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। এজন্য বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার Ayushman Bharat প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যাতে করে একটি স্কিমের আওতায় নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হবে। কিন্তু এতে কতটুকু সফলতা পাওয়া যাবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। শিক্ষা নয়া সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতিবছর ‘জব মার্কেটে’ প্রবেশ করছে। কিন্তু তারা সুশিক্ষিত নয়। অথবা বলা যেতে পারে তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি।
সুতরাং মোদির জন্য রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যদূরীকরণ, মুসলমানদের আস্থায় নেয়া, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানো- এ কাজগুলো সহজ নয়। তথাকথিত নগরপুঞ্জির নাম করে মুলমানদের ‘অবৈধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা দু’দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। বাংলাদেশে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী এটা থেকে ‘ফায়দা’ ওঠাতে চাইবে। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মোদি নির্বাচনে সুবিধা নিয়েছেন। এখন তাকে হতে হবে বাস্তববাদী। তিনি বলেছেন বটে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’; তবে এ বক্তব্য যদি তিনি ধারণা করেন এখন, তবেই তিনি সফল হবেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সবার উন্নতি এবং সবার বিশ্বাস নিশ্চিত করাই তার মূল মন্ত্র। আগামী ৫ বছর তিনি যদি এটি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে ইতিহাসের খাতায় এক অবিসংবাদিত নেতা হয়ে থাকবেন। এখন দেখার পালা তার কথা ও কাজে কতটুকু মিল থাকে।
Daily Jugantor
31.05.2019

মোদির বিজয় বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে কতটুকু প্রভাব ফেলবে



ভারতে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা এনডিএ জোটের ‘বিশাল’ বিজয় যে প্রশ্নটিকে এখন সামনে নিয়ে এসেছে। তা হচ্ছে এতে করে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে। আগামী ২৯ মে মোদি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলই তার দ্বিতীয় টার্মে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা মোদির পররাষ্ট্র নীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি’। অর্থাৎ তার বৈদেশিক নীতিতে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন প্রথম। তার প্রথম টার্মে ‘সার্ক যাত্রা’র অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ প্রতিটি সার্কভুক্ত দেশ প্রথমেই স্বাক্ষর করেছিল। তবে এটাও সত্য সন্ত্রাসবাদী কর্মকাÐকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে ইসলামাবাদে সর্বশেষ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। ভারত সম্মেলনে (২০১৬) যোগ দিতে আপত্তি করলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশও যোগ দিতে আপত্তি জানায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘জোন অব রিভিলেইজ ইন্টারেস্ট’ নামে একটি তত্ত¡ রয়েছে। সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী প্রিমাকভ এই তত্তে¡র প্রবক্তা। এই তত্তে¡ একটি বড় দেশের পাশে একটি ছোট দেশ যদি থাকে, তাহলে ওই ছোট দেশটির ওপর (এ ক্ষেত্রে বেলারুশের ওপর রাশিয়ার) বড় দেশের এক ধরনের প্রভাব স্বীকৃত। বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন যেখানে অগ্রাধিকার বেশি সেখানে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। ফলে ভারতের সহযোগিতা আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে প্রথমে। তাই সঙ্গত কারণে মোদির দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের পরপরই আমাদের দৃষ্টি থাকবে ভারতের নীতি নির্ধারকদের দিকে।
নয়া ভারত সরকার কোন দৃষ্টিতে এখন বাংলাদেশকে দেখে, এটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। অতীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন বাংলাদেশ-ভারতকে দিয়েছে বেশি। কিন্তু প্রাপ্তির খাতাটা পরিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ আমাদের অনেক দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান হয়নি। কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে তার মুখ থেকে কিছুটা অসন্তুষ্টি বের হয়েছিল। এটা সত্য, মোদির প্রথম শাসনামলে স্থল সীমান্ত চুক্তিটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে যার আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আসামের তথাকথিত নাগরিকত্ব তালিকা (এনআরসি), যে তালিকায় আসামে বসবাসকারী কিছু মুসলমানকে (৪০ লাখ) বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে এদের বাংলাদেশে জোর করে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মোদি নিজে পশ্চিমবঙ্গের এনআরসি করতে চান। বাংলাদেশ-ভারত উষ্ণ সম্পর্কের থেকে এই প্রক্রিয়া বড় ধরনের অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের একটি সাম্প্রদায়িক মনোভাব লক্ষ করা যায়। যখন অমিত শাহ বলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গেও এই তালিকা করবেন। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তারা থাকতে দেবেন। আসামে তারা এই তালিকা করলেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির মুখে তারা এই তালিকা করতে পারেনি। মমতা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গে এই তালিকা করতে দেবেন না। অনেকেই জানেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বিধান সভার নির্বাচনে বিজেপি ভালো ফলাফল করেছে। ত্রিপুরাসহ বেশ কয়টি রাজ্যে বিজেপি সরকারও গঠন করেছে। এখন তাদের টার্গেট ২০২১ সালে পশ্চিম বাংলা। মমতাকে হটিয়ে তারা সেখানে সরকার গঠন করতে চায়। সুতরাং তারা যে নাগরিকত্ব তালিকাকে ইস্যু করবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হচ্ছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া। যতদূর জানা যায় মমতার আপত্তির কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটি করতে পারেনি। তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি ইস্যু। মমতা তখন প্রকাশ্যেই বলছেন পশ্চিম বাংলার উত্তরবঙ্গের মানুষদের পানি না দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে পারবেন না। আথচ তার নিয়োগকৃত কল্যাণ রুদ্র কমিশনের অভিমত হচ্ছেÑ উত্তরবঙ্গকে পর্যাপ্ত পানি দিয়েও বাংলাদেশের প্রাপ্ত পানি দেওয়া সম্ভব। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। আন্তর্জাতিক নদীর পানির ব্যবহার সংক্রান্ত যেমন আইন রয়েছে (১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নীতিমালা, ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালা, ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশন, কিংবা জীববৈচিত্র্য কনভেনশন) প্রতিটি আইনে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। এখন মমতা ব্যার্নাজি যদি উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেন। সেটা হবে আন্তর্জাতিক পানি সংক্রান্ত আইনের বরখেলাপ। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে। ফারাক্কা চুক্তি নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে। ১৯৯৬ সালে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশের পাবার কথা বাংলাদেশ তাও পাচ্ছে না বলে অভিযোগে উঠেছে।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে, অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ৫০ বছর পর। এই ৫০ বছরে জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। মোটামুটি হিসাবে পানির প্রয়োজনও বাড়বে তিনগুণ। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে যে পানি পেয়েছি, ২০২৭ সাল পর্যন্ত পেতে থাকব আরও কম। সুতরাং বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করে এখন থেকেই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। গঙ্গার এই পানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে ১১টি রাজ্যে গঙ্গার অববাহিকা বিস্তৃত সেখানে গঙ্গা বা উপনদীর ওপর জলাধার নির্মাণ ও সেচের প্রয়োজনে নদী থেকে পানি টেনে নেওয়া এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে নদীর কোনো অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যায়। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, ভ‚-গর্ভের পানি স্তর থেকে নদীর দিকে অক্ষুণœ রাখার জন্য নদীপাড় থেকে ৫০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত গভীর ও অগভীর নলক‚পের সাহায্যে সেচের পানি তোলা নিষিদ্ধ করা দরকার। সেই সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির পুনঃমূল্যায়নের কথাও বলেছেন তিনি।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অন্তরায়। বাংলাদেশ-ভারতে রফতানি করে কম, আমদানি করে বেশি বাংলাদেশ-ভারতের অন্যতম বাজারে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য রেশিও ১ঃ৭.৯। অর্থাৎ ৭.৯ ভাগ বেশি আমদানি করে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ভারসাম্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভারতের সরকারি নীতি। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও কিছু অশুল্ক বাধার কারণে দু’দেশের কাক্সিক্ষত বাণিজ্য বাড়ছে না। বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানির ক্ষেত্রে বন্দর, পণ্য পরীক্ষা ও বকেয়াসহ প্রতিবন্ধকতার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং চট্টগ্রাম, মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার নিয়েও কথা আছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আয় মিলিয়ে বন্দরভিত্তিক কার্যক্রমে বার্ষিক মোট ৩৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরিত হচ্ছে। এখন চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে প্রবাহের শতকরা ১০ ভাগও যদি ভারতের ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৩-৪ হাজার কোটি টাকা (ফি বাবদ) ট্যারিফ চার্জ, মাশুল বাবদ নিশ্চিত আয় হবার কথা। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। নরেন্দ্র মোদির বৈদেশিক নীতির একটি অন্যতম দিক ছিল তার নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিকে তিনি তার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির আলোকেই রচিত হয়েছে। তার শাসনামলে বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি রচিত হয়েছে। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের পানি সংকট ও জ্বালানি সংকট সমাধানে বড় ভ‚মিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোটানো সম্ভব। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটেরও সমাধান সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ভারতকে আরও উদার হতে হবে। ভুটান কিংবা নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হলে তা ভারতের ওপর দিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত না চাইলে আমরা তা পাব না। আশার কথা মোদি সরকার এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন। মোদি সরকার একদিকে বিবিআইএন উপ-অঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সাতবোন রাজ্যের সম্পর্ককে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি পাশে রেখে, অনেকটা নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেক জোটকে (বাংলাদেশ ভারত মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান) শক্তিশালী করতে চায় ভারত। শুধু তাই নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) মহাপরিকল্পনায় যোগ দিয়েছে। ভারত
যোগ দেয়নি। এতে করে ভারতের নীতি নির্ধারকরা বিষয়টিকে যে ভালো চোখে দেখবেন তা মনে হয় না।
নরেন্দ্র মোদির বিজয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোদিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের অনেকে মনে করেন, মোদির দ্বিতীয় টার্মে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার অনেক সমাধান হবে। তবে নির্বাচনের আগে বিজেপি তার ইশতেহারে যেমন প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল, তা যদি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। বিশেষ করে মোদি সরকার যদি এনআরসি পশ্চিম বাংলায় শুরু করে, যদি বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি করে, যদি মুসলিম পারিবারিক আইনে পরিবর্তন আনতে চায় তাহলে মুসলিম উগ্রপন্থিরা ভারত ও বাংলাদেশে এটাকে পুঁজি করতে পারে। বাংলাদেশে তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এই অঞ্চলে তাদের জঙ্গি তৎপরতা বাড়াতে চায়। তারা এসব মুসলমানবিরোধী কর্মকাÐকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে পারে। মোদি সরকার বিষয়টি নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবে। মোদির এই বিজয় একটা শঙ্কা যে তৈরি করল, তা অস্বীকার করা যাবে না।
Daily Somoer Alo
27.05.2019

মোদির বিজয় অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে


ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিজয় তাকে জওয়াহেরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর পর তৃতীয় ভারতীয় নেতায় পরিণত করেছে, যিনি পর পর দুবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো যে ‘গেরুয়া ঝড়’ তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, সেই ‘ঝড়’কে তিনি এখন ‘মহাঝড়ে’ পরিণত করে ভারতের রাষ্ট্র কাঠামোকে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিলেন। ভারতের সনাতন রাজনীতির যে চিত্রÑ একটি বহুত্ববাদী সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষতা, সেই চিত্রকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়ে মোদি এখন ভারতকে একটি অলিখিত ‘হিন্দুরাষ্ট্র’-তে পরিণত করতে যাচ্ছেন! মোদি-অমিত শাহ জুটির সাফল্য এখানে যে, তারা ভারতের সাধারণ মানুষের ‘মাইন্ড সেট-আপ’কে বদলে দিয়েছেন। রামমন্দির নির্মাণ করা, তথাকথিত নাগরিকপঞ্জির নাম করে আসাম ও পশ্চিমবাংলা থেকে মুসলমানদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা, কিংবা মুসলিম পারিবারিক আইনে পরিবর্তন আনা, সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ (ক) ধারায় (কাশ্মীরকে বিশেষ স্ট্যাটাস দেওয়া) পরিবর্তনের প্রস্তাব, ভারতের সনাতন রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে মিল খায় না। গেরুয়া ঝড় এখন ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে ভারতকে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এখন ধীরে ধীরে পরিণত হতে যাচ্ছে একটি হিন্দুধর্ম নির্ভর রাষ্ট্রে। ট্রাম্পের মতোই এক ধরনের পপুলিজম (ঢ়ড়ঢ়ঁষরংস) এর জন্ম দিয়েছেন মোদি, যেখানে ধর্মকে তিনি ব্যবহার করেছেন।
১৯৮৫ সালে যে মানসিকতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি আরএসএস-এ যোগ দিয়েছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা ও গোদরা দাঙ্গার জন্য (৭৯০ জন মুসলমানকে ট্রেনে পুড়িয়ে মারা, ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে) যিনি অভিযুক্ত ছিলেন, সেই মানসিকতা থেকে তিনি আজও বের হয়ে আসতে পারেননি। বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে তিনি পাকাপোক্ত করেছেন। সাধারণ মানুষের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছেন সেই বিষবাষ্প। নরেন্দ্র দামোদার দাস মোদি তার কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যোগ করেছেন। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মিশ্রণে তিনি নতুন এক রাজনীতির সূচনা করেছেন, যা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছে। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কাছে রাহুল গান্ধীর পারিবারিক ঐতিহ্য ধুলোয় মিশে গেছে। রাহুল গান্ধী কোনো অবস্থাতেই মোদির বিকল্প ছিলেন না। উপরন্তু মোদি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত, অর্থাৎ নির্বাচনের আগে ১ দশমিক ৫ লাখ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন এবং ১৮২টি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অমিত শাহ ভ্রমণ করেছেন ১ দশমিক ৫৮ লাখ কিলোমিটার, আর ভাষণ দিয়েছেন ১৬১টি নির্বাচনী জনসভায়। মোদি-অমিত শাহ জুটির কাছে রাহুল-প্রিয়াংকা জুটি ছিলেন অনুকূল। রাহুল-প্রিয়াংকার বাইরে অন্য কোনো সিনিয়র কংগ্রেস নেতাকেও এভাবে গ্রামে গ্রামে যেতে দেখা যায়নি। এমনকি, আমেথিতে রাহুল গান্ধীর পরাজয় পারিবারিক রাজনীতির প্রত্যাখ্যান কি না, তা এই মুহূর্তে হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু এটা রাহুল গান্ধীর জন্য যে একটা ‘শিক্ষা’, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কংগ্রেসের হাল ধরার জন্য একজন বিকল্প নেতা যে প্রয়োজন এই প্রশ্নটি আবারও সামনে চলে এলো।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান মমতা ব্যানার্জির জন্যও একটি ‘শিক্ষা’। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার পরবর্তী নির্বাচন। লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল (তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮, কংগ্রেস ২) মমতা ব্যানার্জিকে যে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলে দেবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এটা বলতেই হয় যে নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা ব্যানার্জির আচরণ সংগত ছিল না। তিনি যে ভাষায় দিনের পর দিন মোদিকে আক্রমণ করেছেন, যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা শোভন ছিল না। প্রত্যুত্তরে মোদির আচরণ ছিল ভদ্রোচিত, তিনি কোনো অভদ্র আচরণ করেননি। অশোভন বক্তব্যও দেননি। সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করেছে বলে আমার ধারণা। এক্ষেত্রে বামদের ভোটও এবার বিজেপি পেয়েছে। বামরা তৃণমূলে কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপিকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। মমতা ব্যানার্জির এটা একটা ব্যর্থতা তিনি বিজেপিকে ঠেকাতে বামদের সঙ্গে কোনো সখ্য গড়ে তুলতে পারেননি। প্রচ- অহংকারী মমতা তৃণমূল কংগ্রেসে দ্বিতীয় কোনো নেতৃত্বও তৈরি করেননি। তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজিতেও ভুল ছিল। পুরুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তৃণমূল নেতাদের ‘কাটমানি’ নেওয়া, তফসিলি জাতি-উপজাতি ও মতুয়াদের ভোট না পাওয়া, দলীয় কোন্দল পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলেও, লোকসভা ভোটের ফলাফল প্রমাণ করল বিজেপি এখন আর পশ্চিমবঙ্গের কোনো প্রান্তিক শক্তি নয়, বরং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জার হিসেবে বিজেপি প্রবলভাবে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, লোকসভা নির্বাচন প্রমাণ করল ভারতে বাম রাজনীতি একরকম পরিত্যক্ত। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় বরং কেরালাতেও বাম রাজনীতির আবেদন তেমন একটা আর নেই। অর্থাৎ একসময় যে বামফ্রন্টকে ভারতে বিকল্প শক্তি হিসেবে চিন্তা করা হতো, সেই বাম রাজনীতির সমর্থকরা এখন গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে! পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বিজেপির ভোট বেড়েছে এবং ভোটপ্রাপ্তির হার দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ২৩ ভাগে, সেখানে বামদের ভোট নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৫২ ভাগে। এর আগের লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট যখন ২৫ ভাগ ভোট পেয়েছিল তখন  বিজেপির ভোট ছিল মাত্র ১০ দশমিক ১৬ ভাগ। অনেকেই মনে করছেন বামদের যে ১৫ ভাগ ভোট ক্ষয় হয়েছে তার সবটাই ঘরে তুলেছে বিজেপি (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ মে)। পাঠকদের আরও কিছু তথ্য দেই। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বামফ্রন্ট সর্বোচ্চ আসন পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচনে, ১৯৮০ সালে ৩১টি আসনে জিতে । ২০০৪ সালেও ছিল ২৯ আসন। এরপরই তা কমতে থাকে। ২০১৪ সালে ছিল মাত্র ২টি আসন, আর ২০১৯ সালে একটি আসনেও পেল না বামরা। উগ্র দক্ষিণপন্থি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে বাম রাজনীতির এই পরাজয় নিশ্চয় বাম নেতাদের জন্য চিন্তার খোরাক জোগাবে যে, কেন তারা পরাজিত হলেন। মমতাকে ঠেকানোর জন্য বিজেপিকে ভোট দেওয়া বামদের এই স্ট্র্যাটেজি সঠিক কি না, এই হিসাব এখন তাদের কষতে হবে।
ভারতে আঞ্চলিক দলগুলোর আবেদনও কমে গেছে। লোকসভার পাশাপাশি ৪টি রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে অন্ধ্রপ্রদেশে তেলেগু দেশজ পার্টি (চন্দ্রবাবু নাইডু) ক্ষমতা হারিয়েছে। ওয়াইএসআর কংগ্রেস সেখানে ১৫০টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অরুণাচলে ৩২ আসন পেয়ে বিজেপি এখন সেখানে সরকার গঠন করবে। সিকিমে বিজেপি মিত্র এসকেএসএম পার্টি (১৭ আসন) সেখানে সরকার গঠন করবে। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম ওড়িশাতে। সেখানে বিজু জনতা দল এখনো ক্ষমতা ধরে রেখেছে। আসন পেয়েছে ১১৩টি। বিজেপির আসন এখানে ২২, আর কংগ্রেসের ৯।
মোদি বিজয়ী হয়েছেন বটে। কিন্তু তার সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ।  প্রথমত, গত বছর ভারতে বেকারত্বের হার ৬ দমমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তা ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন বেকারত্ব সামাল দিতে হলে প্রতি মাসে ১২ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান করতে হবে। মোদির জন্য এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে শ্লথগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে তা সাড়ে ৬ শতাংশের নিচে। ঋণের পরিমাণ কয়েক বছরে বহুগুণ বেড়েছে। যার ফলে চাপের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর এই ব্যাংকগুলোর ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে অন্য প্রকল্পে টাকা আটকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন কৃষি থেকে আয় এক চতুর্থাংশ কমছে। এটাও মোদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মোদিকে অভিবাদন বাণী পাঠালেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন তলানিতে। পাকিস্তানি মদদপুষ্ট জঙ্গিরা ভারতের মাটিতে হামলা চালাচ্ছে। ২০১৬ সালে উরিতে, ২০০১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে হামলা, ২০০৮ সালে মুম্বাই হোটেলে হামলার প্রতিটিতেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে বলে ভারত অভিযোগ করে আসছে এবং সর্বশেষ বালাকোটে ভারতীয় বিমান হামলা দুই দেশের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলন আয়োজনে ভারতের আপত্তি রয়েছে। ফলে মোদির জন্য এটাও একটা চ্যালেঞ্জÑ তিনি কীভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবেন। চতুর্থত, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মোদির আরেকটি এজেন্ডা। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়ছে। এটা ভারতের পছন্দ নয়। চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনছে। এটা ভারতের চিন্তার কারণ। মোদির আমলে পুরনো ‘কটনরুট’কে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় ভারত। এটা চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর বিকল্প। ভারত-চীন সম্পর্কটা তাই আলোচনায় থাকবে। পঞ্চমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ আরও জোরদার হয়েছে। ভারতের জোটনিরপেক্ষতা এখন প্রশ্নের মুখে। মার্কিনি চাপে ভারত ইরান থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আগামী ৫ বছর কোন পর্যায়ে যায়, সেটাও মোদির অন্যতম একটি এজেন্ডা।
বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বেশ কিছু সামস্যা রয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে এসব সমস্যার সমাধানে মোদি আন্তরিক হবেন। কট্টর হিন্দুত্ববাদ মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তিনি যদি একটি বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করেন, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং তিনি সত্যিকার অর্থেই বিশ^নেতায় পরিণত হবেন।
Desh Rupantor
26.05.2019

ভারতে লোকসভা নির্বাচনের ফল ও আমাদের প্রত্যাশা


নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি প্রধান অমিত শাহ
নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি প্রধান অমিত শাহ
ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে ২৩ মে। বুথফেরত জনমত জরিপকে সত্য প্রমাণ করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের চেয়েও এবার এনডিএ জোট ভালো করেছে।
২০১৪ সালে তাদের প্রাপ্ত আসন ছিল ৩৩৬, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০-এ। ইউপিএ জোটের আসন সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে ইউপিএ জোটের আসন ছিল ৬০, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩টিতে। নরেন্দ্র মোদি এখন দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করবেন।
এ নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এক. নরেন্দ্র মোদি অর্থনীতি ও উন্নয়নকে একত্রিত করে যে রাজনীতি উপস্থাপন করেছিলেন, যা কোনো কোনো বিশ্লেষক ‘মোদিনোমিক্স’ (Modinomics) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তাতে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। মানুষ চেয়েছে উন্নয়ন। ভারতের মানুষ নরেন্দ্র মোদির ওপর আবারও আস্থা রেখেছে।
দুই. ২০১৪ সালে এক কঠোর ‘হিন্দুত্ববাদী’ নীতি সারা ভারতে ছড়িয়ে গিয়েছিল। সেই স্রোত এখনও বহমান। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ ট্রেডিশনাল রাজনীতির ‘মৃত্যু’ হতে যাচ্ছে! সেখানে স্থান পেয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদ!
তিন. সারা বিশ্বেই কট্টর দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। এ উত্থানপর্ব শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ের মধ্য দিয়ে। এখন ইউরোপ ছাড়িয়ে তা ভারতের মতো বড় গণতান্ত্রিক দেশেও আঘাত করল।
চার. মোদি প্রমাণ করলেন তিন একাই একশ’। মোদির ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে দীর্ঘদিনের সংগঠন কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটল। কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাহুল গান্ধীর ভূমিকা এখন প্রশ্নের মুখে থাকবে। ব্যক্তিগতভাবে আমেথিতে তার পরাজয় পারিবারিক রাজনীতির বৃত্ত ভাঙল। কংগ্রেসকে এখন বিকল্প নেতৃত্বের কথা ভাবতে হবে।
পাঁচ. ভারতীয় রাজনীতিতে বামরা এক রকম ‘উচ্ছেদের’ মুখে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে বাম রাজনীতি আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে পারল না।
ছয়. আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তিও কমেছে (২০১৪ সালে ১৪৭, এবার ১০০)।
সাত. পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের আবেদন এখন কমতির দিকে (২০১৪ সালে ৩৪, ২০১৯ সালে ২২)। গেরুয়া সেখানে আঘাত হেনেছে। ২০২১ সালে (বিধানসভার নির্বাচন) রাজ্যের রাজনীতিতে সম্ভাব্য একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল এই লোকসভা নির্বাচন।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। আমরা চাই নয়াদিল্লির নয়া সরকার যখন গঠিত হবে, তখন সেই সরকার দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে আরও আন্তরিক হবে। এটি সত্য, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তার শাসনামলেই ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে।
১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ভারত দীর্ঘদিন ওই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন করে ওই চুক্তিটি অনুমোদন করেছিল। এর জন্য ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। ৫ মে (২০১৫) ভারতের মন্ত্রিসভায়, ৬ মে রাজ্যসভায়, ৭ মে লোকসভায় বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল।
স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। ১১১টি ছিটমহলের ৪০ হাজার ৪৭০ নাগরিক এখন বাংলাদেশের নাগরিক। এতে ১৭,১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৭,১১০ দশমিক ০২ একর জমি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
কিন্তু কিছু কিছু সমস্যা যা ছিল, তা রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আসামের তথাকথিত নাগরিকত্ব তালিকা (এনআরসি), যে তালিকায় আসামে বসবাসকারী বেশকিছু মুসলমানকে বাংলাদেশি হিসেবে ‘চিহ্নিত’ করে তাদের বাংলাদেশে জোর করে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে।
মোদি নিজে পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি করতে চান। বাংলাদেশ-ভারত উষ্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বড় ধরনের অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের একটি সাম্প্রদায়িক মনোভাব লক্ষ করা যায়, যখন অমিত শাহ প্রকাশ্যেই বলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গেও এ তালিকা করবেন। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তারা থাকতে দেবেন।
আসামে তারা এই তালিকা করলেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির মুখে তারা এ তালিকা করতে পারেননি। মমতা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গে এ তালিকা করতে দেবেন না।
অনেকেই জানেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে (সাত বোন রাজ্য) বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি ভালো ফলাফল করেছে। ত্রিপুরাসহ বেশ ক’টি রাজ্যে বিজেপি সরকারও গঠন করেছে। এখন তাদের টার্গেট ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ। মমতাকে হটিয়ে তারা সেখানে সরকার গঠন করতে চায়। সুতরাং তারা যে নাগরিকত্ব তালিকাকে ইস্যু করবে এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া। যতদূর জানা যায়, মমতার আপত্তির কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি করতে পারেনি। তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি ইস্যু।
মমতা তখন প্রকাশ্যেই বলেছেন, পশ্চিম বাংলার উত্তরবঙ্গের মানুষদের পানি না দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে পারবেন না! অথচ তার নিয়োগকৃত কল্যাণ রুদ্র কমিশনের অভিমত হচ্ছে, উত্তরবঙ্গকে পর্যাপ্ত পানি দিয়েও বাংলাদেশের প্রাপ্ত পানি দেয়া সম্ভব।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। আন্তর্জাতিক নদীর পানির ব্যবহার সংক্রান্ত যেসব আইন রয়েছে (১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নীতিমালা, ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালা, ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশন কিংবা জীববৈচিত্র্য কনভেশন)- প্রতিটি আইন বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে।
এখন মমতা ব্যানার্জি যদি উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেন, সেটি হবে আন্তর্জাতিক পানি সংক্রান্ত আইনের বরখেলাপ। এক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে। ফারাক্কা চুক্তি নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে।
১৯৯৬ সালে এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা, বাংলাদেশ তাও পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে, অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ৫০ বছর পর। এ ৫০ বছরে জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। মোটামুটি হিসাবে পানির প্রয়োজনও বাড়বে তিনগুণ।
কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে আমরা যে পানি পেয়েছি, ২০২৭ সাল পর্যন্ত পেতে থাকব আরও কম। সুতরাং বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করে এখন থেকেই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। গঙ্গার এ পানি সংকট মোকাবেলায় ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যে ১১টি রাজ্যে গঙ্গার অববাহিকা বিস্তৃত সেখানে গঙ্গা বা উপনদীর উপর জলাধার নির্মাণ ও সেচের প্রয়োজনে নদী থেকে পানি টেনে নেয়া এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে নদীর কোনো অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যায়।
সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, ভূগর্ভের পানি স্তর থেকে নদীর দিকে বেইস ফ্লো অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য নদীপাড় থেকে ৫০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচের পানি তোলা নিষিদ্ধ করা দরকার। সেই সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির পুনঃমূল্যায়নের কথাও বলছেন তিনি।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অন্তরায়। বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করে কম, আমদানি করে বেশি। বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বাজারে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য রেশিও ১:৭.৯। অর্থাৎ ৭.৯ শতাংশ বেশি আমদানি করে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ভারসাম্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভারতের সরকারি নীতি।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও কিছু অশুল্ক বাধার কারণে দু’দেশের কাক্সিক্ষত বাণিজ্য বাড়ছে না। বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানির ক্ষেত্রে বন্দর, পণ্য পরীক্ষা ও বকেয়াসহ প্রতিবন্ধকতার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। এদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং চট্টগ্রাম-মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার নিয়েও কথা আছে।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আয় মিলিয়ে বন্দরভিত্তিক কার্যক্রমে বার্ষিক মোট ৩৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরিত হচ্ছে। এখন চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্য প্রবাহের ১০ শতাংশও যদি ভারতের ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা (ফি বাবদ) ট্যারিফ, চার্জ, মাশুল বাবদ নিশ্চিত আয় হওয়ার কথা। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। নরেন্দ্র মোদির প্রথম টার্মের বৈদেশিক নীতির একটি অন্যতম দিক ছিল তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসি। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিকে তিনি তার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এ আলোকেই রচিত হয়েছে। তার শাসনামলে বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি রচিত হয়েছে।
এ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের পানি ও জ্বালানি সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানো সম্ভব। একইসঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটেরও সমাধান সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ভারতকে আরও উদার হতে হবে। ভুটান কিংবা নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হলে তা ভারতীয় এলাকার উপর দিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত না চাইলে আমরা তা পাব না। আশার কথা, মোদি সরকার এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিল।
মোদি সরকার একদিকে বিবিআইএন উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সাত বোন রাজ্যের সম্পর্ককে আরও উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে; ঠিক তেমনি সার্ককে পাশে রেখে, অনেকটা নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেক জোটকে (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান) শক্তিশালী করতে চায় ভারত।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ বিআরআই (চীনের প্রস্তাবিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) জোটে আছে। চীন থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিচ্ছে। এটাও ভারতের পছন্দ নয়। ভারত মনে করে, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী এ দুটি বড় দেশের সঙ্গে (চীন ও ভারত) এক ধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে আসছে। এটাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য।
ইতিমধ্যে ঢাকায় একটি ‘সিল্করোড ফোরাম’ গঠিত হয়েছে। যে অনুষ্ঠানে এ ফোরামটি গঠিত হয়, সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এর অর্থ, এ ফোরামের ব্যাপারে সরকারের সমর্থন রয়েছে। ভারত বিষয়টিকে ‘ভালো চোখে’ দেখবে বলে মনে হয় না। সুতরাং নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় সরকার বিষয়টিকে কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, সেটাই দেখার বিষয়।
সরকার গঠনের আগেই নরেন্দ্র মোদি ২১ মে তার আগামী সরকারের ব্লুপ্রিন্ট উন্মোচন করেছেন। এতে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে- জাতীয় নিরাপত্তা, জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়ন। অর্থাৎ এনডিএ-২ সরকারের সময় পররাষ্ট্রনীতি হয়তো কম গুরুত্ব পাবে। এখন দেখার বিষয় মোদি সরকার আগামী ৫ বছর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন। লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদি-মমতা ব্যানার্জি যেভাবে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তা বিধানসভা নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে তখন। ভারতে নয়া সরকারের জন্য ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
Daily Jugantor
25.05.2019

মোদি ম্যাজিক ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

ভারতে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা এনডিএ জোটের 'বিশাল' বিজয় অনেক প্রশ্ন এখন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. ভারতের মানুষ নরেন্দ্র মোদির ওপর আবারও আস্থা রেখেছে। এর পেছনে কাজ করেছে মোদির রাজনীতি। একদিকে যেমনি তিনি 'হিন্দুত্ব কার্ড' ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে তেমনি উন্নয়ন আর অর্থনীতিকে একত্রিত করে নতুন এক রাজনীতি উপহার দিয়েছেন, যা মানুষ গ্রহণ করেছে। এই উন্নয়ন আর অর্থনীতিকে বলা হচ্ছে 'মোদিনোমিকস' (গড়ফরহড়সরপং)। মোদির গত ৫ বছরের জমানায় অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন এসেছে, তার কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। ভারতের অর্থনীতির আকার এখন ২ দশমিক ৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অর্থনীতি ভারতকে বিশ্বের পঞ্চম  বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত করতে যাচ্ছে। ব্রিটেনকে টপকে যাবে।

পরিসংখ্যান বলছে, মোদির জমানায় ৫৯৭৪৬৪ গ্রামকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। ভারতের সাধারণ মানুষ টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। Swachh Bharat Abhiyaan  প্রকল্পের আওতায় ৯ দশমিক ৫৬ কোটি টয়লেট তৈরি করা হয়েছে। মুদ্রাস্ম্ফীতি ২০১৫ সালে যেখানে ছিল ৫.৯ ভাগ, ২০১৮ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৪ ভাগে। ১ দশমিক ৯ লাখ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করা হয়েছে। Pradhan Mantri Ujjwala Yojanna পরিকল্পনার আওতায় ৫ কোটি লোককে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে তুলে আনা হয়েছে। ৩৩ কোটি এলইডি বাল্ক্ব সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে সাশ্রয় হয়েছে ১৭ হাজার কোটি রুপি। অর্থনীতির এই পরিসংখ্যান আরও দেওয়া যায়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, মোদি অর্থনীতি ও উন্নয়নকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহারে এই দিকটা ছিল উপেক্ষিত। (দেখুন Samju Verma  প্রবন্ধ Lok Sabha Exit Polls 2019 : Why India Has Voted for Modinomics, Daily O, 21 May, 2019)। দুই. বিশ্বজুড়েই দক্ষিণপন্থি কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ (২০১৭) ও তার রাজনীতি যে কট্টরপন্থি একটি ধারার সূচনা করেছিল, তা ইউরোপকে স্পর্শ করে এখন ভারতের মাটিও স্পর্শ করল। মোদি এই কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যোগ করেছেন।

ধর্ম আর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মিশ্রণে তিনি নতুন এক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছে। তিন. মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কাছে রাহুল গান্ধীর পারিবারিক ঐতিহ্য ধুলোয় মিশে গেছে। রাহুল গান্ধী কোনো অবস্থাতেই মোদির বিকল্প ছিলেন না। উপরন্তু মোদি ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত (২০১৯) অর্থাৎ নির্বাচনের আগে ১ দশমিক ৫ লাখ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন ও ১৮২টি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অমিত শাহ ভ্রমণ করেছেন ১.৫৮ লাখ কিলোমিটার আর ভাষণ দিয়েছেন ১৬১টি নির্বাচনী জনসভায়। মোদি-অমিত শাহ জুটির কাছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা জুটি ছিলেন অনুজ্জ্বল। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার বাইরে অন্য কোনো সিনিয়র কংগ্রেস নেতাকেও এভাবে গ্রামে গ্রামে যেতে দেখা যায়নি। চার. আমেথিতে রাহুল গান্ধীর পরাজয় পারিবারিক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান কি-না, তা এই মুহূর্তে হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু এটা রাহুল গান্ধীর জন্য যে একটা 'শিক্ষা', তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কংগ্রেসের হাল ধরার জন্য একজন বিকল্প নেতার প্রয়োজন কি-না- এই প্রশ্নটি আবার সামনে চলে এলো। পাঁচ. পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যও একটি 'শিক্ষা'। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভার পরবর্তী নির্বাচন।

লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল (তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮, কংগ্রেস ২) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলে দেবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণ সঙ্গত ছিল না। তিনি যে ভাষায় দিনের পর দিন মোদিকে আক্রমণ করেছেন, যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা শোভন ছিল না। প্রতিউত্তরে মোদির আচরণ ছিল ভদ্রজনোচিত। তিনি কোনো অভদ্র আচরণ করেননি। অশোভন বক্তব্যও দেননি। সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করেছে বলে আমার ধারণা। এ ক্ষেত্রে বামদের ভোটও এবার বিজেপি পেয়েছে। বামেরা তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপিকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এটা একটা ব্যর্থতা। তিনি বিজেপিকে ঠেকাতে বামেদের সঙ্গে কোনো সখ্য গড়ে তুলতে পারেননি। প্রচণ্ড অহঙ্কারী মমতা তৃণমূল কংগ্রেসে দ্বিতীয় কোনো নেতৃত্ব তৈরি করেননি। তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজিতেও ভুল আছে। পুরুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তৃণমূল নেতাদের 'শর্টমানি' নেওয়া, তফসিলি জাতি-উপজাতি ও মাতুয়াদের ভোট না পাওয়া, দলীয় কোন্দল পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলেও লোকসভা ভোটের ফলাফল প্রমাণ করল, বিজেপি এখন আর পশ্চিমবঙ্গে কোনো প্রান্তিক শক্তি নয় বরং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জার হিসেবে বিজেপি প্রবলভাবে উঠে এসেছে। ছয়. লোকসভা নির্বাচন প্রমাণ করল, ভারতে বাম রাজনীতি এক রকম পরিত্যক্ত। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয় বরং কেরালাতেও বাম রাজনীতির আবেদন তেমন একটা নেই।

অর্থাৎ একসময় যে বামফ্রন্টকে ভারতে বিকল্প শক্তি হিসেবে চিন্তা করা হতো, সেই বাম রাজনীতির সমর্থকরা এখন গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বিজেপির ভোট বেড়ে ভোটপ্রাপ্তির হার দাঁড়িয়েছে ৪০.২৩ ভাগে, সেখানে বামদের ভোট নেমে এসেছে ৭.৫২ ভাগে। এর আগের লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট পেয়েছিল ২৬ ভাগ ভোট। বিজেপির ভোট তখন ছিল মাত্র ১০.১৬ ভাগ। অনেকেই মনে করছে, বামেদের যে ১৫ ভাগ ভোট ক্ষয় হয়েছে, তার সবটাই ঘরে তুলেছে বিজেপি (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ মে)। পাঠকদের আরও কিছু তথ্য দিই। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে ১৯৮০ সালে বামফ্রন্ট সর্বোচ্চ ৩১টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ২০০৪ সালেও ছিল ২৯ আসন। এরপর কমতে থাকে। ২০১৪ সালে মাত্র ২ আসন। আর ২০১৯ সালে একটি আসনও পেল না বামেরা। উগ্র দক্ষিণপন্থি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে বাম রাজনীতির এই পরাজয় নিশ্চয়ই বাম নেতাদের জন্য চিন্তার খোরাক জোগাবে, কেন তারা পরাজিত হলেন! বামদের জন্য দরকার এখন 'নয়া রাজনীতি'। বিশ্বব্যাপীই সনাতন ট্র্যাডিশনাল মার্কসবাদী রাজনীতি আর নেই। চীন, ভিয়েতনামেও মার্কসবাদ একরকম পরিত্যক্ত। 'সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি'র নামে যে 'রাজনীতি' তারা গ্রহণ করেছে, তা একুশ শতকে মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছে।

ভারতে বামেরা নিশ্চয়ই এই রাজনীতি থেকে শিখবে। লোকসভা নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি কেন, এটা নিশ্চয়ই এখন তারা উপলব্ধি করতে পারবেন। সাত. লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের মধ্যে অনৈক্য বিজেপিকে কিছুটা সুবিধা করে দিয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। শেষ মুহূর্তে এসে অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু কংগ্রেসসহ প্রধান প্রধান বিরোধী দলকে এক পতাকাতলে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কংগ্রেস, তৃণমূল, বহুজন সমাজবাদী দল, সমাজবাদী দল, আমজনতা পার্টি, এমনকি বামেদের নিয়েও একটা ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভোটের ফলাফলে তাতে কোনো প্রভাব ফেলেনি। এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালেও তাদের সঙ্গে অনৈক্য ছিল প্রবল। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি একটি জোট করলেও কংগ্রেস আলাদাভাবে নির্বাচন করেছে। এর ফল ঘরে তুলেছে বিজেপি। লোকসভায় সবচেয়ে বেশি আসন উত্তরপ্রদেশে, আসন সংখ্যা ৮০। রাজ্য শাসন করছে বিজেপি। এখানে মায়াবতী (বহুজন সমাজ পার্টি) ও অখিলেশ যাদব (সমাজবাদী পার্টি) একজোট হলেও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে ভালো করেছে বিজেপি। তারা পেয়েছে ৫০ আসন। এখন চন্দ্রবাবু নাইডুর সব উদ্যোগও ভেস্তে গেছে। লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের (অন্ধ্রপ্রদেশ) ২৫টি আসনে তার দল (তেলেগু দেশম) হেরে গেছে। বিজয়ী হয়েছে ওয়াইএসআর কংগ্রেস ২২টি আসন পেয়ে। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন জগমোহন রেড্ডি। বাবা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী (২০০৯) রাজশেখর রেড্ডি (একসময় যিনি কংগ্রেসে ছিলেন) পদাঙ্ক অনুসরণ করেই জগমোহন রেড্ডি বিধান সভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এখন হতে যাচ্ছেন অন্ধ্রপ্রদেশের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় তার দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস পেয়েছে ১৫০ আসন। চন্দ্রবাবু নাইডু পদত্যাগ করেছেন। ৩০ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন জগমোহন রেড্ডি (জগন)। নয়াদিল্লির এনডিএর মন্ত্রিসভায়ও যোগ দিতে পারে জগনের দল।

২০১৪ সালে যে 'মোদি ম্যাজিক' নরেন্দ্র দামোদর এস মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, সেই 'মোদি ম্যাজিক'ই তাকে আবারও ক্ষমতায় নিয়ে এলো। তার এই ক্ষমতায় ফিরে আসা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কতটুকু মঙ্গলজনক! এ নিয়ে অনেকে মন্তব্য করেছেন। একজন ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক অতীশ তাছির বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে লিখিত একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন এভাবে- of the great democracies to fall to Populism, India won the first. উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির (পপুলিজম) কাছে গণতন্ত্রের হেরে যাওয়া। একজন নরেন্দ্র মোদি তার উগ্র ধর্মান্ধ রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িক কার্ড ব্যবহার করে (রামমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি) ভারতীয় গণতন্ত্রকে কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন
Daily Samakal
26.05.2019

অলির বক্তব্য ও বিরোধীদলীয় রাজনীতির স্বরূপ


কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন গত ১৫ মে। এইদিন এলডিপি আয়োজিত ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে জেলে থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব নয়। লন্ডন থেকে তারেক রহমানের পক্ষেও সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদেরই সেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমি সেই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’ বিএনপির নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়েছি বিএনপিকে অনুরোধ করব আপনারা নেতৃত্ব দেন আর না হলে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন।’
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বিএনপির জমানায় রেলমন্ত্রী ছিলেন। ২০ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা তিনি। স্পষ্টতই তিনি একটি ‘মেসেজ’ দিলেন। তিনি মেসেজটি দিলেন এমন এক সময় যখন বিএনপির ভেতরে বড় ধরনের ‘অন্তর্দ্বন্দ্ব’ রয়েছে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মূলত দলের ৫ জন সংসদ সদস্যের সংসদে যোগদানকে কেন্দ্র করে। খোদ তারেক রহমানের নির্দেশে তারা সংসদে যোগ দিলেও, দলের অনেক সিনিয়র নেতা এতে অসন্তুষ্ট এবং তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। নিশ্চয়ই তারেক রহমান অনেক ‘হিসাব-নিকাশ’ করেই দলের নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই ‘হিসাব-নিকাশ’ এর সঙ্গে বেগম জিয়ার জামিনে মুক্তির বিষয়টি কতটুকু জড়িত, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও বাজারে এটা নিয়ে গুজব আছে।
এখন কর্নেল (অব.) অলি অনেকটা বিএনপির নেতৃত্ব নিজ কাঁধে নিতে চান। বিএনপি কত অসহায় হলে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যজোট গঠন করে নির্বাচনে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে সুবিধা করতে পারেনি দলটি। কিন্তু তারপরও বিএনপিই বিরোধী দলের মূল কেন্দ্র। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হযেছিল (১৯৭৩ সালে প্রথম)। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭ আসন (শতকরা ৪১ দশমিক ১৭ ভাগ) (আওয়ামী লীগ-মালেক ৩৯ আসন, ২৪ দশমিক ৫৬ ভাগ ভোট)।
জিয়ার মৃত্যু, এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩ আসন, আর আওয়ামী লীগ ৭৬ আসন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই বয়কট করে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০ আসন (৩০.৮১ ভাগ ভোট)। আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন (৩০.০৮ ভাগ ভোট)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে, যে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৩ দিন। ১৯৯৬ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ আসন (৩৭.৪৪ ভাগ ভোট), আর বিএনপি পেয়েছিল ১১৬ আসন (৩৩.৬১ ভাগ ভোট)। পরবর্তী সময়ে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১), নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও (২০০৮) এই দুটি বড় দলের অবস্থান ছিল এরকম : বিএনপি তথা চারদলীয় জোট ১৯৩ আসন (৪০.৯৭ ভাগ) ও আওয়ামী লীগ ৬২ (৪০.১৩ ভাগ)। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২৬২ (আওয়ামী লীগ ২৩০ আসন) (৫৬.৯ ভাগ ভোট), আর বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩৩ আসন (৩৮.০৬ ভাগ)। কিন্তু এর পর পরই দৃশ্যপট বদলে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে নির্বাচন বিএনপি তথা চারদলীয় জোট বয়কট করেছিল।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। সংসদীয় রাজনীতির এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বড় দুটি দলের মাঝে আস্থার সম্পর্কটা থাকা জরুরি। তাতে করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আস্থার সম্পর্ক আগামীতে কতটুকু গড়ে উঠবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবেন। জাতীয় নেতাদের প্রতি সম্মান দেখানো, কোনো ধরনের বিরূপ মন্তব্য না করা, বিএনপিকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়াÑ এ সবই নির্ভর করে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখন উচ্চ আদালতের জামিন মঞ্জুর সাপেক্ষে এবং চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী বেগম জিয়া যদি বিদেশে যান (?) তাহলে দলটি নেতৃত্বহীন অবস্থায় কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটাও একটা প্রশ্ন। বিএনপি আগেই অনেকটা নেতৃত্বহীন। দলটির স্থায়ী পরিষদের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে জন্ম হচ্ছে না। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করারও কেউ নেই। তাই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। এই যোগদান রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন যদি ডেকে নাও আনে, বাস্তবতা হচ্ছে এই যোগদান ‘বিরোধী’ শিবিরে একটি বড় ‘সংকট’ তৈরি করেছে।
মৌমাছিরা যেমনি একটি রানী মৌমাছিকে কেন্দ্র করে একটি ‘চাক’ তৈরি করে, ঠিক তেমনি ছোট ছোট দলগুলো বিএনপিকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক চাক তৈরি করেছিল। ওই ছোট ছোট দলগুলোর অনেকগুলোরই কোনো গণভিত্তি নেই। সংগঠনের অস্তিত্বও নেই। একজন আন্দালিব রহমান পার্থ একাই ‘একটি দল’। দলটির নিবন্ধন আছে বটে, কিন্তু এর গণভিত্তি  কোথায়? কোন কোন জেলায় কটি সাংগঠনিক কমিটি আছে? ব্যক্তিপরিচয়ে কোনো দল কখনো টিকে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক ‘কমিটমেন্ট’, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সুস্পষ্ট রাজনীতি না থাকলে, যে কোনো দল ‘কাগুজে সংগঠন’ হিসেবে পরিচিতি পেতে বাধ্য। বিজেপি (পার্থর নেতৃত্বাধীন দল) এর ব্যতিক্রম নয়। বিজেপি এতদিন ‘বড় মর্যাদা’ পেয়েছে বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করার কারণেই। পারিবারিকভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার ছোট ভাইরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সুতরাং পার্থর ‘ইউটার্ন’-এ আমি অবাক হইনি।
এখন ২০ দলীয় জোটে যে সব দল আছে, তাদের পক্ষে বিএনপিকে বাদ দিয়ে অন্য জোট গঠন করাও তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে চূড়ান্ত বিচারে তারা বিএনপির নেতৃত্বেই আস্থাশীল
থাকবে। বিএনপির সাংসদদের শপথ নেওয়া ও সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ২০ দলীয় জোটের কেউ কেউ ‘আত্মহত্যা’ বললেও, আন্দালিব রহমান পার্থই এখন অব্দি একমাত্র ব্যক্তি, যে ও যার দল (বিজেপি) ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করেছে। অন্যরা এখনো আছেন। তবে সময়ই বলে দেবে ২০ দলীয় জোটে ভাঙন আসবে কি না।
এটা অস্বীকার করা যাবে না রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই সংসদের মেয়াদ। বিএনপি তার ৫ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য আনতে পারবে না। ঐক্যফ্রন্টের আবেদনও ফুরিয়ে গেছে। ফলে আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মতো। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ আর থাকল না। সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলীয় আসনে আছে। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। উপরন্তু এরশাদের অসুস্থতা, ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া জাতীয় পার্টির ভেতরে বড় ধরনের ‘সংকটের’ সৃষ্টি করেছে। রওশনপন্থিরা নাখোশ। এর প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পার্টি যদি আগামীতে ভেঙে যায়, আমি অবাক হবো না। সব মিলিয়ে বিরোধীদলীয় রাজনীতি একরকম নেই বললে চলে। সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধীদলীয় রাজনীতি চোখে পড়ে না। সরকারের এটাই প্লাস পয়েন্ট।
সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো সরকারের জন্যই কোনো ভালো খবর নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার ‘ভুল’ করতে পারে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধী এই ভুলটাই করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান, ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের অবস্থানকে অনেক শক্তিশালী করেছিল। ওই সময় লোকসভার নির্বাচনে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৫২ আসন (৪৪ ভাগ ভোট)। এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কংগ্রেসকে অনেক একক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা জারি, সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাইয়ের মতো নেতাকে গ্রেপ্তার বরণ করতে হয়েছিল। এর পরিণামে ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল (আসন সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১৫৪-এ)। সুতরাং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো বড় দলের জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
বিএনপির সংসদে যোগদান নিঃসন্দেহে এই সংসদকে বড় গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে। বিএনপি মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে এটা আমাদের জন্য স্বস্তির খবর। এখন বিএনপিকে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতিই করতে হবে। লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করা সহজ নয়, দলের জন্যও ভালো নয়। বিএনপিকে দল গোছাতে হবে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে টিকে থাকতে হলে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা জরুরি।
বয়স্ক নেতৃত্বকে উপদেষ্টাম-লীতে রাখা যেতে পারে, যেমনটি করেছিলেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তিনি ‘নতুন মুখ’ এনেছেন। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি সিনিয়র অনেক নেতাকে ‘উপদেষ্টা পরিষদে’ পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাদের মন্ত্রীও করেননি। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। সিনিয়ররা আজীবন ‘দল’ চালাবেন না। দলে নয়া নেতৃত্ব দরকার। বিএনপিকে এখন এই কাজটিই করতে হবে। এখন কর্নেল (অব.) অলি ২০ দলের মূল নেতৃত্বে আসতে চাচ্ছেন। তার একটি গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু বিএনপি তার নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটে থাকবে, এটা আমার মনে হয় না। আবার এটাও সত্য,  ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়েই বিএনপি ঐক্যফ্রন্টে গিয়েছিল। বিএনপির রাজনীতি ও স্ট্র্যাটেজি তাই অনেকের কাছেই একটি প্রশ্ন। রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছে। এক্ষেত্রে কর্নেল (অব.) অলির নেতৃত্বে যদি আরেকটি জোাটের ‘জন্ম’ হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
Daily Desh Rupantor
21.05.2019

বিরোধী জোটে ভাঙনের সুর

Image result for Opposition politics bangladesh cartoonবিরোধীদলীয় রাজনীতিতে ভাঙনের খবর এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন সংসদ সদস্যের মধ্যে পাঁচজনের সংসদ অধিবেশনে যোগদান ২০ দলীয় রাজনীতিকে একটি বড় ধরনের ‘ধাক্কা’ দিয়েছে। আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। যদিও পরে তিনি বলেছেন, বিএনপি যদি এককভাবে তাঁকে ডাকে তাহলে তিনি যেতে পারেন। তবে জোটে ফিরে যাবেন কি না সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি। আরেকটি ছোট দল লেবার পার্টি হুমকি দিয়েছে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে দিতে! এলডিপি কিংবা কল্যাণ পার্টির মতো ছোট ছোট দলের নেতারাও বিএনপির সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তে তাঁদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এলডিপি খুব কড়া ভাষায় বিএনপির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি অবশ্য বলেছেন, তিনি কিংবা তাঁর দল ২০ দলীয় জোট ছাড়ছেন না। এমনকি বিএনপি জোটকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও তেমন কোনো সুখবর নেই। নির্বাচনের আগে আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এই ফ্রন্ট যখন গঠিত হয়েছিল, তখন ফ্রন্ট সম্পর্কে একটি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই ‘আগ্রহে’ এখন ভাটা পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট সম্পর্কে এখন কোনো কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। ড. কামাল হোসেনের ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখন অকার্যকর হয়ে গেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গণফোরামের দুজন সংসদ সদস্যের সংসদ অধিবেশনে যোগদান, দল থেকে ‘বহিষ্কার’, আবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করেই একজনকে পাশে বসিয়ে (মোকাব্বির খান) বিশেষ কাউন্সিল করা, এমনি করে রাজনৈতিক দৈন্যতা কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তবে বিএনপির কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা ‘প্রশ্ন’ থাকলেও, বিএনপির ‘ঐক্যে’ এখনো তেমন ভাঙন দেখা যায়নি। কর্মীদের মধ্যে হতাশা আছে, এটি সত্য। কিন্তু জিয়া পরিবার ও খালেদা জিয়াই যে বিএনপির মূল ‘কেন্দ্র’, সেটি আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (১৯৭৩ সালে প্রথম)। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭ আসন (প্রাপ্ত ভোটের শতকরা ৪১.১৭ শতাংশ)। আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯ আসন, ২৪.৫৬ শতাংশ ভোট। জিয়ার মৃত্যু ও এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩ আসন, আর আওয়ামী লীগ ৭৬ আসন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই বয়কট করে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০ আসন (৩০.৮১ শতাংশ ভোট), আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন (৩০.০৮ শতাংশ ভোট)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে, যে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৩ দিন। ১৯৯৬ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ আসন (৩৭.৪৪ শতাংশ ভোট), আর বিএনপি পেয়েছিল ১১৬ আসন (৩৩.৬১ শতাংশ ভোট)। পরবর্তী সময়ে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১), নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও (২০০৮) ওই দুটি বড় দলের অবস্থান ছিল এ রকম : বিএনপি তথা চারদলীয় জোট ১৯৩ আসন (৪০.৯৭ শতাংশ) ও আওয়ামী লীগ ৬২ (৪০.১৩ শতাংশ)। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২৬২ (আওয়ামী লীগ ২৩০) আসন (৫৬.৯ শতাংশ ভোট), আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩৩ আসন (৩৮.০৬ শতাংশ)। কিন্তু এর পরপরই দৃশ্যপট বদলে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়।
দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে নির্বাচন বিএনপি তথা চারদলীয় জোট বয়কট করেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। সংসদীয় রাজনীতির এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বড় দুটি দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক থাকা জরুরি। তাতে করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আস্থার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কতটুকু গড়ে উঠবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি করবেন। জাতীয় নেতাদের প্রতি সম্মান দেখানো, কোনো ধরনের বিরূপ মন্তব্য না করা, বিএনপিকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়া—এসবই নির্ভর করে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখন উচ্চ আদালতের জামিন মঞ্জুর সাপেক্ষে এবং চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী খালেদা জিয়া যদি বিদেশে যান (?), তাহলে দলটি নেতৃত্বহীন অবস্থায় কিভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। বিএনপি এখনই অনেকটা নেতৃত্বহীন। দলটির স্থায়ী পরিষদের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে জন্ম হচ্ছে না। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করারও কেউ নেই। তাই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। এই যোগদান রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন যদি ডেকে নাও আনে, বাস্তবতা হচ্ছে এই যোগদান ‘বিরোধী’ শিবিরে একটি বড় ‘সংকট’ তৈরি করেছে। মৌমাছিরা যেমনি একটি রানি মৌমাছিকে কেন্দ্র করে একটি ‘চাক’ তৈরি করে, ঠিক তেমনি ছোট ছোট দলগুলো বিএনপিকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক ‘চাক’ তৈরি করেছিল। ওই ছোট দলগুলোর অনেকটিরই কোনো গণভিত্তি নেই। সংগঠনের অস্তিত্বও নেই। একজন আন্দালিব রহমান পার্থ একাই ‘একটি দল’। দলটির নিবন্ধন আছে বটে, কিন্তু এর গণভিত্তি কই? কোন কোন জেলায় কয়টি সাংগঠনিক কমিটি আছে? ব্যক্তি পরিচয়ে কোনো দল কখনো টিকে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক ‘কমিটমেন্ট’, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সুস্পষ্ট রাজনীতি না থাকলে যেকোনো দল ‘কাগুজে সংগঠন’ হিসেবে পরিচিতি পেতে বাধ্য। বিজেপি (পার্থর নেতৃত্বাধীন দল) এর ব্যতিক্রম নয়। বিজেপি এত দিন ‘বড় মর্যাদা’ পেয়েছে বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করার কারণেই। পারিবারিকভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর ছোট ভাইয়েরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সুতরাং পার্থর ‘ইউটার্ন’-এ আমি অবাক হইনি। এখন ২০ দলীয় জোটে যেসব দল আছে, তাদের পক্ষে বিএনপিকে বাদ দিয়ে অন্য জোট গঠন করাও তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে চূড়ান্ত বিচারে তারা বিএনপির নেতৃত্বেই আস্থাশীল থাকবে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়া ও সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ২০ দলীয় জোটের কেউ কেউ ‘আত্মহত্যা’ বললেও আন্দালিব রহমান পার্থর মতো অন্য কেউই ‘সাহস’ করে জোট ছাড়ার কথা বলেননি। অলি আহমদ নিজেই বলেছেন তিনি ২০ দলীয় জোটে থাকছেন। তবে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী। ব্যক্তিনির্ভর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী ঐক্যফ্রন্টে অনেক অসংগতি রয়েছে এটি দাবি করে আগামী ৮ জুনের মধ্যে সেসব অসংগতি দূর করার জন্য ড. কামাল হোসেনকে একটি ‘আলটিমেটাম’ দিয়েছেন। না হলে তিনি ও তাঁর দল ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করবে। এটি ঠিক ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। ফ্রন্টের রাজনীতি স্পষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে কিছু দলছুট নেতা, যাঁদের আবার নিবন্ধনও নেই, তাঁরা ‘একটা বড় কিছু’ প্রত্যাশা করেছিলেন। তাতে তাঁরা সফল হননি। দেখা গেল ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত কেউ কেউ মানছে না। সুলতান মনসুর তো ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে প্রকাশ্যেই বলেছেন, গণফোরামের রাজনৈতিক মতাদর্শ তিনি ধারণ করেন না। ঐক্যফ্রন্টে রয়েছে হতাশা। তাঁদের অনেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আর এখন যদি কাদের সিদ্দিকী বেরিয়ে যান, তাহলে ঐক্যফ্রন্ট যে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। যদিও এটি সত্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কার্যক্রম বেশি মাত্রায় টাঙ্গাইলকেন্দ্রিক।
ব্যক্তি কাদের সিদ্দিকী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাই দলের মূল শক্তি। দলে দ্বিতীয় কোনো নেতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। ফলে একজন ব্যক্তি কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে যে দল গড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ কী? ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করলেও জাতীয় পর্যায়ে দলটির আবেদন কী? দলটি শেষ পর্যন্ত একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
এটি ঠিক বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনীতির ময়দানে এক ধরনের ‘রাজনৈতিক সুনামির’ সৃষ্টি করেছে। ফ্রন্ট অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। ২০ দলীয় জোটে ভাঙন আসতে পারে। তাতে করে কি রাজনীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে? আওয়ামী লীগ তথা সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই সংসদের মেয়াদ। বিএনপি তার পাঁচজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য আনতে পারবে না। ঐক্যফ্রন্টের আবেদনও ফুরিয়ে গেছে। ফলে আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ‘ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার’ মতো। সংসদের ভেতর ও বাইরে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ আর থাকল না। সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলীয় আসনে আছে। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। উপরন্তু এরশাদের অসুস্থতা, ভাই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় জাতীয় পার্টির ভেতরে বড় ধরনের ‘সংকটের’ সৃষ্টি করেছে। এতে রওশনপন্থীরা নাখোশ। এর প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পার্টি যদি ভবিষ্যতে ভেঙে যায়, আমি অবাক হব না। সব মিলিয়ে বিরোধীদলীয় রাজনীতি এক রকম নেই বললেই চলে। সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধীদলীয় রাজনীতি চোখে পড়ে না। সরকারের এটিই প্লাস পয়েন্ট।
Daily Kalerkontho
20.05.2019

ভারতের পরবর্তী নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

গত ১১ এপ্রিল সাত পর্যায়ে ভারতের লোকসভার যে নির্বাচন শুরু হয়েছিল, তা এখন শেষ পর্যায়ে। গত ১২ মে ষষ্ঠ দফা নির্বাচন শেষ হয়েছে। আগামী ১৯ মে সর্বশেষ সপ্তম ধাপের লোকসভার সর্বশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন বিহারের আটটি, চ-ীগড়ের একটি, হিমাচলের চারটি, ঝাড়খ-ের ১৪ আসনের তিনটি ও মধ্যপ্রদেশের ২৯ আসনের আটটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে ২৩ মে ভোট গণনা শুরু হবে এবং এর পরপরই এটা নিশ্চিত হয়ে যাবে কে হতে যাচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের গুরুত্ব একেবারে কম নয়। মোদি জমানায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। মোদি নিজে ঢাকা সফর করে গেছেন। মোদি তার ‘নেইবারহুড ফাস্ট’ পলিসির আওতায় বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে যে প্রশ্নটি অনেকে করার চেষ্টা করেন, তা হচ্ছে মোদি তথা এনডিএ জোটের বাইরে অন্য কেউ যদি সরকার গঠন করে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে? নয়া নেতৃত্ব কী এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, নাকি সম্পর্কের মধ্যে একটা আস্থাহীনতার সৃষ্টি হবে? এনডিএ জোট কিংবা ইউপিএ জোটের বাইরে তৃতীয় একটি শক্তির নেতৃত্বে যদি সরকার গঠিত হয়, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেমন হবে, যদিও জনমত জরিপের পাল্লা এখনো মোদি তথা এনডিএ জোটের দিকেই ঝুঁকে আছে, তারপরও আঞ্চলিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি তৃতীয় শক্তির (কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের বাইরে) উত্থানের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী নিজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, তৃণমূলকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রে কোনো সরকার গঠন করা যাবে না। আর অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, যিনি আঞ্চলিক দল তেলেগু দেশম পার্টির নেতাও বটে। তিনি বলেছেন মমতা ব্যানার্জি হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে সেখানে।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। আমরা চাই নয়া দিল্লিতে যে সরকারই আসুক না কেন, সেই সরকার দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে আরও আন্তরিক হবে। এটা সত্য, ২০১০ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তার শাসনামলেই ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, ভারত দীর্ঘদিন ওই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন করে ওই চুক্তিটি অনুমোদন করেছিল। এর জন্য ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। ৫ মে (২০১৫) ভারতের মন্ত্রিসভায়, ৬ মে রাজ্যসভায়, ৭ মে লোকসভায় বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল। স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। ১১১টি ছিটমহলের ৪০ হাজার ৪৭০ জন নাগরিক এখন বাংলাদেশের নাগরিক। এতে ১৭১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৭১১০ দশমিক শূন্য ২ একর জমি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু কিছু কিছু সমস্যা যা ছিল, তা এখনো রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আসামের তথাকথিত নাগরিকত্ব তালিকা (এনআরসি), যে তালিকায় আসামে বসবাসকারী বেশ কিছু মুসলমানকে বাংলাদেশি হিসেবে ‘চিহ্নিত’ করে তাদের বাংলাদেশে জোর করে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছ। মোদি নিজে পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি করতে চান।
বাংলাদেশ-ভারত উষ্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বড় ধরনের অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের একটি সাম্প্রদায়িক মনোভাব লক্ষ করা যায়, যখন অমিত শাহ প্রকাশ্যেই বলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গেও এই তালিকা করবেন। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তারা থাকতে দেবেন। আসামে তারা এই তালিকা করলেও, পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির মুখে তারা এই তালিকা করতে পারেনি। মমতা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গে এই তালিকা করতে দেবেন না। অনেকেই জানে, সাম্প্রতিক সময়ে, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে (সাত বোন রাজ্য) বিধান সভার নির্বাচনে বিজেপি ভালো ফলাফল করেছে। ত্রিপুরাসহ বেশ কটি রাজ্যে বিজেপি সরকারও গঠন করেছে। এখন তাদের টার্গেট পশ্চিম বাংলা। মমতাকে হটিয়ে তারা সেখানে সরকার গঠন করতে চায়। সুতরাং তারা যে নাগরিকত্ব তালিকাকে ইস্যু করবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হচ্ছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া। যতদূর জানা যায়, মমতার আপত্তির কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটি করতে পারেনি। তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি ইস্যু। মমতা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, পশ্চিম বাংলার উত্তরবঙ্গের মানুষদের পানি না দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে পারবেন না! অথচ তার নিয়োগকৃত কল্যাণ রুদ্র কমিশনের অভিমত হচ্ছে, উত্তরবঙ্গকে পর্যাপ্ত পানি দিয়েও বাংলাদেশের প্রাপ্ত পানি দেওয়া সম্ভব। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। আন্তর্জাতিক নদীর পানির ব্যবহার-সংক্রান্ত যেমন আইন রয়েছে (১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নীতিমালা, ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালা, ১৯৯৭ সালর জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশন, কিংবা জীববৈচিত্র্য কনভেনশন), প্রতিটি আইনে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। এখন মমতা ব্যানার্জি যদি উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেন, সেটা হবে আন্তর্জাতিক পানি-সংক্রান্ত আইনের বরখেলাপ। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে। ফারাক্কা চুক্তি নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে। ১৯৯৬ সালে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা, বাংলাদেশ তাও পাচ্ছে না। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে, অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ৫০ বছর পর। এই ৫০ বছরে জনসংখ্যা বাড়বে তিন গুণ। মোটামুটি হিসাবে পানির প্রয়োজনও বাড়বে তিন গুণ। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে যে পানি পেয়েছি, ২০২৭ সাল পর্যন্ত পেতে থাকব আরও কম। সুতরাং বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করে এখন থেকেই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। গঙ্গার এই পানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে ১১টি রাজ্যে গঙ্গার অববাহিকা বিস্তৃতÑ সেখানে গঙ্গা বা উপনদীর ওপর জলাধার নির্মাণ ও সেচের প্রয়োজনে নদী থেকে পানি টেনে নেওয়া এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে নদীর কোনো অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যায়। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, ভূগর্ভের পানির স্তর থেকে নদীর দিকে বেইজ ফ্লো অক্ষুণœ রাখার জন্য নদীর পাড় থেকে ৫০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচের পানি তোলা নিষিদ্ধ করা দরকার। সেই সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির পুনর্মূল্যায়নের কথাও বলছেন তিনি।

বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অন্তরায়। বাংলাদেশ ভারতে রপ্তনি করে কম, আমদানি করে বেশি। বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বাজারে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য রেশিও ১:৭.৯। অর্থাৎ ৭ দশমিক ৯ ভাগ বেশি আমদানি করে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ভারসাম্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভারতের সরকারিনীতি। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও, কিছু অশুল্ক বাধার কারণে দুদেশের কাক্সিক্ষত বাণিজ্য বাড়ছে না। বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দর, পণ্য পরীক্ষা ও বকেয়াসহ প্রতিবন্ধকতার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। এদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং চট্টগ্রাম-মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার নিয়েও কথা আছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আয় মিলিয়ে বন্দরভিত্তিক কার্যক্রমে বার্ষিক মোট ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরিত হচ্ছে। এখন চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর দিয়ে পণ্যপ্রবাহের শতকরা ১০ ভাগও যদি ভারতের ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে বছরে প্রায় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা (ফি বাবদ) ট্যারিফ, চার্জ, মাশুল বাবদ নিশ্চিত আয় হওয়ার কথা। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। নরেন্দ্র মোদির বৈদেশিক নীতির একটি অন্যতম দিক হচ্ছে তার ‘নেইবারহড ফাস্ট’ পলিসি। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিকে তিনি তার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিও সে আলোকেই রচিত। তার শাসনামলে বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি রচিত হয়েছে। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের পানি সংকট ও জ¦ালানি সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটেরও সমাধান সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ভারতকে আরও উদার হতে হবে। ভুটান কিংবা নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হলে তা ভারতীয় এলাকার ওপর দিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত না চাইলে আমরা তা পাব না। আশার কথা, মোদি সরকার এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। মোদি সরকার একদিকে বিবিআইএন উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ‘সাত বোন রাজ্যের’ সম্পর্ককে আরও উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি সার্ককে পাশে রেখে, অনেকটা নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেক জোটকে (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান) শক্তিশালী করতে চায় ভারত। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ বিআরআই (চীনের প্রস্তাবিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ইনিশিয়েটিভ) জোটে আছে। চীন থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিচ্ছে। এটাও ভারতের পছন্দ নয়। ভারত মনে করে এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী এই দুটি বড় দেশের সঙ্গে (চীন ও ভারত) এক ধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে আসছে। আমাদের জাতীয় স্বার্থের কারণেই আমরা এ কাজটি করছি। সুতরাং ভারতে একটি নয়া সরকার এলে সংগত কারণেই এ প্রশ্নগুলো আলোচিত হবে।
যদিও ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসে না। অতীতের সরকারগুলোর পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির খুব একটা পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ‘এপ্রোচের’ হয়তো পার্থক্য রয়েছে। মোদির জমানায় বাংলাদেশ ভারতকে ‘অনেক বেশি’ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন সে কথা। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে আরও বেশি পাওয়ার কথা ছিল আমাদের, যা আমরা পাইনি। বড় দেশ হিসেবে আমরা সব সময়ই ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা চাই। সেই সঙ্গে এটাও চাই, ভারত দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবে। সম্পর্কটা যেন একপক্ষীয় না হয়ে যায়। ভারতের নয়া সরকার নিশ্চয়ই বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পারবে।
Daily Desh Rupantor
16.05.2019

বিএনপির সংসদে যোগদান রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারবে কতটুকু





বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন সংসদ দস্যের মধ্য থেকে পাঁচজনের সংসদ অধিবেশনে যোগদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কি আদৌ কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারবে? এ প্রশ্ন এখন অনেকের। তাদের যোগদানকে প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানিয়েছেন এবং মির্জা ফকরুল ইসলাম জানিয়েছেন আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তারা সংসদে গেছেন। মির্জা ফকরুলের কথার পেছনে ‘যুক্তি’ যাই থাকুক না কেন, এই যোগদান দুটি বড় দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বিএনপি সংসদে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসল। এখন তারা যে ‘যুক্তিই’ দিক না কেন, কর্মীদের মাঝে, এমনকি ২০-দলীয় জোটও এই সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখেনি। তারা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। কর্নেল অলি এটাকে আখ্যায়িত করেছেন হটকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে। কল্যাণ পর্টির মতো ছোট ছোট দলগুলোও তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে দিয়ে কি চলমান রাজনীতিতে কিছু পরিবর্তন আসবে?
বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদ অধিবেশনে যোগদান এখন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। এক. ২০-দলীয় জোটে বিভক্তি আসতে পারে এবং নতুন আরেকটি জোট গঠিত হতে পারে। দুই. জাতীয় ঐক্যজোটের ‘ভ‚মিকা’ও সীমিত হয়ে আসবে। এখান থেকে বিএনপি নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। খোদ কামাল হোসেনের ভ‚মিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং গণফোরাম আরেক দফা ভেঙেছে। এটি একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হতে যাচ্ছে। তিন. বেগম জিয়ার ‘জামিনে’ মুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর সঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্যের সংসদে যোগদানের কোনো সম্পর্ক থাকুক আর নাই থাকুক, মানুষ এটা নিয়ে কথা বলবে। টক শোতে ইতোমধ্যে কথা বলা শুরু হয়েছে। তবে মুক্তি পেতে হয়তো আরও কিছু সময় লাগবে। বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি নেবেন কি না, কিংবা বিদেশে চিকিৎসা নেবেন কি না, তা নির্ভর করছে একান্তই তার ওপর। জিয়া পরিবার প্যারোলে মুক্তি চাচ্ছে, এমন কথাও চাউর হয়েছে। বেগম জিয়ার বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্য আর আগের মতো নেই। ছোট ছেলের মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনীতি, বিশেষ করে বিএনপির আন্দোলনে ব্যর্থতা বেগম জিয়াকে আরও বেশি হতাশাগ্রস্ত করে ফেলেছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। এটা বোধকরি বেগম জিয়া নিজেও উপলব্ধি করেন যে আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি হয়তো আর জামিন পাবেন না। এ ক্ষেত্রে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া তার জন্য মঙ্গল এই উপলব্ধি বোধ তার মাঝে আসতে পারে। তিনি বিদেশে বসে দলের নেতৃত্ব দেওয়া ও আন্দোলন সংঘটিত করা এটাও তিনি চিন্তা করতে পারেন। আগে সুস্থতা নিশ্চিত করা, পরে রাজনীতি। এরশাদবিরোধী আন্দোলন বেগম জিয়ার নেতৃত্ব আর আজকের বেগম জিয়া এর মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তখন বয়স কম ছিল। দুটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যৌথ আন্দোলন করেছিল। আর আজ বেগম জিয়া একা, সঙ্গে কোনো বড় দল নেই, উপরন্তু মাঝখানে চলে গেছে ২৯ বছর। বয়স বেড়েছে। হতাশা বেড়েছে। ব্যক্তি জীবনে বিপর্যয় এসেছে বারবার। এটা ঠিক বেগম জিয়া এখনও অবিসংবাদিত নেত্রী। এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার বিকল্প বেগম জিয়াই। কামাল হোসেন নন। বিএনপির একটি অংশ এবং ঐক্যফ্রন্টও চাইবে বেগম জিয়া জেলে থাকুন! তাতে করে আন্দোলন করা সহজ। বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তিতে আন্দোলনে আর কোনো ‘ইস্যু’ থাকে না! তাইতো গণঅনশনে আমরা ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বক্তব্য শুনেছি তারা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে চান। এটা যে শুধুমাত্র একটি ‘সেøাগান’ তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। বেগম জিয়া এক বছরের ওপরে জেলে আছেন। বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি। কর্মীরা আন্দোলনের পক্ষে থাকলেও, বিএনপির নেতাদের আন্দোলনে দেখা যায় না। তারা বয়োবৃদ্ধ, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, আন্দোলনে তারা ব্যর্থ। তাই আন্দোলন নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়াতেই বেগম জিয়ার মুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। তাতেও তারা সফল হয়নি। এই যখন পরিস্থিতি তখন বিএনপির নির্বাচিত পাঁচজন সংসদ সদস্য সংসদে যোগ দিয়েছেন। এর আগে সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান সংসদে যোগ দিয়েছেন। এখন বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাদের অনুসরণ করলেন। তারেক রহমান এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপির সাবেক নেতা ও এলডিপির সভাপতি অলি আহমেদ অত্যন্ত কড়া ভাষায় এর সমালোচনা করেছেন। আর বিএনপি ২০ দল ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ ছাড়া বিএনপির কাছে কোনো বিকল্প ছিল না প্রায় বারো বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দশম জাতীয় সংসদে (২০১৪-১৮) নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় সংসদীয় রাজনীতি থেকে বিএনপি ছিটকে পড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি অংশ নিলেও, আসন পেয়েছে মাত্র ৬টি। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন বেগম জিয়া একদিকে জেলে অন্যদিকে কর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলা। সংসদে কথা বলার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে বিএনপি যদি সংসদে কথা বলার সুযোগটি বেছে নেয়, আমি তাতে অবাক হব না। কেননা সংসদীয় রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা একটিই আর তা হচ্ছে সংসদ। বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করে সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারেনি। তাই তাদের সংসদ অধিবেশনে যোগদানকে আমি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। তবে প্রশ্ন যে নেই, তা নয়। প্রশ্ন আছে। এবং ২০ দলের শরিকরা সে প্রশ্নটিই তুলেছেন। অনেক দলীয় সিদ্ধান্ত দল যখন ধরে রাখতে পারে না, তখন দল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে একটা ভিন্ন ম্যাসেজ পৌঁছে যায়। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটল।
বিএনপির সংসদে যোগদানের বিষয়টির একটি ‘পজিটিভ’ দিক আছে। আর তা হচ্ছে বিএনপিকে আস্থায় নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিকে শক্তিশালী করা। জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের সমর্থন রয়েছে এই দলটির প্রতি। এই জনসমর্থন খুব একটা কমেছে বলে মনে হয় না। এখনও বিএনপি জনসভা করলে বিপুল জমায়েত হয়। সুতরাং গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপিকে তাই আস্থায় নেওয়া প্রয়োজন। সংসদীয় রাজনীতিতেও বিএনপির অবস্থান বেশ শক্তিশালী। বিএনপির জন্মের পর থেকেই এখন বিএনপি বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। একাধিকবার দলে ভাঙন আসলেও, জিয়া পরিবারের হাতেই রয়েছে বিএনপির নেতৃত্ব। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রæয়ারি দেশে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (প্রথম ১৯৭৩ সালে)। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭ আসন, প্রাপ্ত ভোটের শতকরা ৪১ দশমিক ১৭ ভাগ (আওয়ামী লীগ ৩৯ আসন, ২৪ দশমিক ৫৬ ভাগ ভোট)। জিয়ার মৃত্যু, এরশাদের সাময়িক অভ্যুত্থানের পর ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩ আসন, আর আওয়ামী লীগ ৭৬ আসন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই বয়কট করে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০ আসন (৩০.৮১ ভাগ ভোট)। আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন (৩০.০৮ ভাগ ভোট)। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে, যে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৩ দিন। ১৯৯৬ সালেই তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ আসন (৩৭.৪৪ ভাগ ভোট আর পিএনপি পেয়েছিল ১১৬ আসন (৩৩.৬১ ভাগ ভোট)। পরবর্তীতে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১, ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (২০০৮) এই দুটি বড় দলের অবস্থান ছিল এ সময় বিএনপি চারদলীয় জোট ১৯৩ আসন (৪০.৯৭ ভাগ) ও আওয়ামী লীগ ৬২ আসন (৪০.১৩ ভাগ)। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২৬২ (আওয়ামী লীগ ২৩০) আসন (৫৬.৯ ভাগ ভোট), আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩৩ আসন (৩৮.০৬ ভাগ)। কিন্তু এর পরপরই দৃশ্যটি বদলে যায়। তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচন বিএনপি তথা চারদলীয় জোট বয়কট করে করেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে অংশ নেয়। সংসদীয় রাজনীতির এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বড় দুটি দলের মাঝে আস্থার সম্পর্কটা থাকা জরুরি। তাতে করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আস্থার সম্পর্ক কতটুকু গড়ে উঠবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবেন। জাতীয় নেতাদের সম্মান দেখানো, কোনো ধরনের মন্তব্য না করা, বিএনপিকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এসবই নির্ভর করে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখন উচ্চ আদালতের জামিন মঞ্জুর সাপেক্ষে এবং চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী বেগম জিয়া যদি বিদেশে যান (?) তাহলে দলটি নেতৃত্বহীন অবস্থায় কীভাবে পরিচালিত হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। বিএনপি এখনই অনেকটা নেতৃত্বহীন। দলটির স্থায়ী পরিষদের কোনো ভ‚মিকা দেখা যাচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে জন্ম হচ্ছে না। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করারও কেউ নেই। তাই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।
Daily Somoyer Alo
12.05.2019

বিএনপিতে কি খালেদা যুগের অবসান হতে যাচ্ছে

https://en.prothomalo.com/contents/cache/images/600x315x1/uploads/media/2018/09/09/e2759657bf4f5134effb4b3b40ec6e71-c4f6d34e5b5fbac7b7e8000353b401a7-5a8d0890af378.jpg?jadewits_media_id=172106


অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বিএনপির ৫ জন সংসদ সদস্যের সংসদ অধিবেশনে যোগদান, কৌশলগত কারণে ফখরুল সাহেবের সংসদে যোগ না দেওয়া ও বগুড়া-৬ আসন শূন্য ঘোষণা এবং বেগম জিয়ার হয় জামিন নতুবা প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা চলমান রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছে। বিএনপির সাংসদদের সংসদ অধিবেশনে যোগদান খোদ ২০ দলীয় জোটে নানা মাত্রার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তও সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু এটা ছাড়া বিএনপির কোনো গত্যন্তর ছিল না। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বেগম জিয়ার মুক্তি। তিনি প্যারোলে মুক্তি পাবেন, নাকি জামিনে, তা স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বেগম জিয়া যদি প্যারোলে মুক্তি পেতে চান, তাহলে তাকে আবেদন করতে হবে। কিন্তু তিনি কি তা করবেন? জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম জিয়ার শাস্তি হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় উসকানি ও মানহানির দুটি মামলা চলমান। আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি মুক্তি পাবেন, সে সম্ভাবনা কম। বেগম জিয়া অসুস্থ। অন্যের সাহায্য নিয়েই তাকে চলাফেরা করতে হয়। তিনি এখন বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য যদি তিনি বিদেশে যেতে চান, তাহলে আইনের বিধান মতে তাকে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আবেদন করলেই তিনি প্যারোলে মুক্তি পাবেন, তেমনটি নয়। এর সঙ্গেও একটি ‘রাজনীতি’ আছে। অর্থাৎ তার ‘মুক্তির’ বিষয়টির সঙ্গে ‘রাজনীতির’ বিষয়টি জড়িত। তাহলে সেই ‘রাজনীতি’টি কী? বাজারে গুজব রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে যে ৬ জন নির্বাচিত হয়েছেন, তারা যদি সংসদে যোগ দেন তাহলে বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করবে সরকার। তারা এরই মধ্যে যোগ দিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে তাই নানা প্রশ্ন জনমানসে। যদিও বিএনপির নেতৃবৃন্দ মনে করছেন প্যারোলে নয়, জামিন তার প্রাপ্য। গত ৭ এপ্রিল বিএনপির নেতৃবৃন্দ বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে গণঅনশন করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকরাও গণঅনশনে অংশ নিয়েছেন। গণঅনশনে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেছেনÑ বেগম জিয়াকে তারা ‘আন্দোলনের’ মাধ্যমে মুক্ত করে ছাড়বেন!
অনেকগুলো প্রশ্ন এখন আছে। বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি নেবেন কি-না, তা নির্ভর করছে, একান্তভাবেই তার ওপর। জিয়া পরিবার প্যারোলে মুক্তি চাচ্ছে, এমন কথাও চাউর হয়েছে। বেগম জিয়ার বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্য আর আগের মতো নেই। ছোট ছেলের মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা ও পরিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনীতি, বিশেষ করে বিএনপির আন্দোলনে ব্যর্থতা, বেগম জিয়াকে আরও বেশি হতাশাগ্রস্ত করে ফেলেছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। এটা বোধ করি বেগম জিয়া নিজেও উপলব্ধি করেন যে, আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি হয়তো আর জামিন পাবেন না! এ ক্ষেত্রে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া তার জন্য মঙ্গল এই উপলব্ধি বোধ তার মাঝে আসতে পারে। তিনি বিদেশে বসে দলের নেতৃত্ব দেওয়া ও আন্দোলন সংগঠিত করা এটাও তিনি চিন্তা করতে পারেন। আগে সুস্থতা নিশ্চিত করা, পরে রাজনীতি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার নেতৃত্ব আর আজকের বেগম জিয়া এর সঙ্গে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তখন বয়স কম ছিল। দুটি বড় দলÑ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যৌথ আন্দোলন করেছিল। আর আজ বেগম জিয়া একা, সঙ্গে কোনো বড় দল নেই, উপরন্তু মাঝখানে চলে গেছে ২৯ বছর। বয়স বেড়েছে। হতাশা বেড়েছে। ব্যক্তি জীবনে বিপর্যয় এসেছে বারে বারে। এটা ঠিক, বেগম জিয়া এখনো অবিসংবাদিত নেত্রী। এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার বিকল্প বেগম জিয়াই। কামাল হোসেন নন।

বিএনপির একটি অংশ এবং ঐক্যফ্রন্টও চাইবে বেগম জিয়া জেলে থাকুন! তাতে করে আন্দোলন করা সহজ। বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তিতে আন্দোলনে আর কোনো ‘ইস্যু’ থাকে না! তাই তো গণঅনশনে আমরা ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্য দেখেছিÑ তারা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে চান! এটা যে শুধুমাত্র একটি ‘সেøাগান’ তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। বেগম জিয়া এক বছরের ওপরে জেলে আছেন। বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি। কর্মীরা আন্দোলনের পক্ষে থাকলেও, বিএনপির নেতৃবৃন্দকে আন্দোলনে দেখা যায় না। তারা বয়োবৃদ্ধ, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, আন্দোলনে তারা ব্যর্থ। তাই আন্দোলন নয় বরং আইনি প্রক্রিয়াতেই বেগম জিয়ার মুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। তাতেও তারা সফল হয়নি। এই যখন পরিস্থিতি তখন বিএনপির নির্বাচিত ৫ জন সংসদ সদস্য সংসদে যোগ দিয়েছেন। এর আগে সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান এরই মধ্যে সংসদে যোগ দিয়েছেন। এখন বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাদের অনুসরণ করলেন।

তারেক রহমান এককভাবে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপির সাবেক নেতা ও এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ অত্যন্ত কড়া ভাষায় এর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ ছাড়া বিএনপির কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। প্রায় বার বছর বিএনপি ক্ষমতার বইরে। দশম জাতীয় সংসদ (২০১৪-২০১৫) নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় সংসদীয় রাজনীতি থেকে বিএনপি ছিটকে পড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি অংশ নিলেও আসন পেয়েছে মাত্র ৬টি। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন বেগম জিয়া একদিকে জেলে, অন্যদিকে কর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলা। সংসদে কথা বলার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বিএনপি যদি সংসদে কথা বলার সুযোগটি বেছে নেয়, আমি তাতে অবাক হব না। কেননা সংসদীয় রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা একটিইÑ আর তা হচ্ছে সংসদ! বিএনপি রাজপথে ‘আন্দোলন’ করে সরকারকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করতে পারেনি। তাই তাদের সংসদ অধিবেশনে যোগদানকে আমি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। তবে প্রশ্ন যে নেই, তা নয়। প্রশ্ন আছে। এবং ২০ দলের শরিকরা সে প্রশ্নটিই তুলেছেন। অনেক দলীয় সিদ্ধান্ত দল যখন ‘ধরে’ রাখতে পারে না, তখন দল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে একটা ভিন্ন ‘মেসেজ’ পৌঁছে যায়। যেমন বলা যেতে পারেÑ গণফোরামের কথা। গণফোরামের দুজন সংসদ সদস্য, যারা আগেই সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন, দল তখন তাদের বহিষ্কার করেছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে মোকাব্বির খানকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করে  ড. কামাল হোসেন তাকে তার অফিসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়নি। এমনকি ড. কামাল হোসেন পরে ‘বহিষ্কৃত’ মোকাব্বির খানকে পাশে বসিয়ে গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল পর্যন্ত করলেন। এর মধ্য দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা থাকল কি? একটা দলের জন্য শৃঙ্খলা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বিএনপি ও গণফোরামের ক্ষেত্রে সেই দলীয় শৃঙ্খলা থাকল না। উপরন্তু সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট করে বলা আছে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ব্যক্তি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না! এখন ৭ জন সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেন এবং দল তাদের বিরুদ্ধে কোনো ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিতে পারল না! দল এখানে ‘মুখ্য’ হলো না, মুখ্য হয়ে গেল ‘ব্যক্তি’। যদিও বলা হয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্নটি আসেÑ তারেক রহমান একাই কি দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ? দলের স্থায়ী পরিষদের কি কোনো ভূমিকা নেই? এসব প্রশ্ন বারবার আলোচিত হতে থাকবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এদের সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদ বয়কট কোনো ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সংসদীয় রাজনীতির জন্য একটা কোনো ভালো খবরও নয়। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগও সংসদ বয়কটের রাজনীতি করেছিল। ওই সংসদ বয়কটের রাজনীতি আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেনি। বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল। কিন্তু নির্বাচন বয়কটের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। সাধারণ মানুষ এটা সমর্থনও করেনি। ওই সংসদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও শেষ দিন পর্যন্ত সংসদ টিকে ছিল। আমরা ভারতে কংগ্রেসের উদাহরণ দিতে পারি। যে কংগ্রেস ছিল ভারতের রাজনীতিতে অবিসংবাদিত ‘শক্তি’, ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে (২০১৪) দলটির কী হাল হয়েছিল, আমরা নিশ্চয়ই তা স্মরণ করতে পারি। ৫৪৩টি আসনের মাঝে দলটি পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন। যে দলটি (কংগ্রেস) প্রথম লোকসভায় (১৯৫২) পেয়েছিল ৩৬৪টি আসন, দ্বিতীয় লোকসভায় ৩৭১ আসন, ১৯৭১ সালে ৩৫২ আসন, ১৯৮০ সালে ৩৫৩ আসন, ১৯৮৪ সালে ৪১৫ আসন, সেই দলটিও ৪৪ আসন পেয়েছিল। ফলে দলের বিপর্যয় হতেই পারে। এ ক্ষেত্রে সংসদ বর্জন সংসদীয় রাজনীতির জন্য কোনো ভালো খবর হতে পারে না। নিশ্চয়ই বিএনপি এটা থেকে শিখবে ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য আমরা ভোটের সংস্কৃতিকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছি (রাতের বেলা ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা, প্রকাশ্যে ভোটকেন্দ্র দখল ও সিল মারা, নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা) এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। গণতন্ত্রের স্বার্থেই তা মঙ্গলজনক
ঐক্যফ্রন্টের ৭ জন সংসদ সদস্যের সংসদে যোগদান বর্তমান সংসদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিল। সংসদ এখন পরিপূর্ণ। সকল দলের অংশগ্রহণ যেভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছিল, এখন সবার সংসদে যোগদান সংসদকে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করল। সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি এতে করে আরও শক্তিশালী হলো। তবে বিএনপি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সংসদের মেয়াদ। তখন বেগম জিয়ার বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৮০’র কাছাকাছি। এর অর্থ প্রথাগত রাজনীতি থেকে তার আপাতত বিদায়! এখন বগুড়া-৬ আসন থেকে জিয়া পরিবারের পরের প্রজন্ম নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন কি না, কিংবা দলে বেগম জিয়ার ‘শূন্যস্থান’ পূরণ করেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Desh Rupantor
06.05.2019

বিএনপির সংসদে যাওয়া রাজনীতিতে নতুন মাত্রা

হঠাৎ করেই চলমান রাজনীতি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দেবেন কি দেবেন না—এটি নিয়ে যখন বড় ধরনের ‘কনফিউশন’ তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই নির্ধারিত ৯০ দিন শেষ হওয়ার ঠিক আগে বিএনপির চারজন সংসদ সদস্য শপথ নিলেন। এর আগে নিয়েছিলেন একজন। মির্জা ফখরুল শপথ না নেওয়ায় তাঁর আসন শূন্য হয়েছে এরই মধ্যে। তিনি অবশ্য সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দিয়েছেন। এর আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে গণফোরামের দুজন সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। বিএনপির সংসদ অধিবেশনে যোগদান নিঃসন্দেহে আলোচনার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। আলোচনায় আরো আছে জামায়াতের সংস্কারবাদীদের নতুন দল ঘোষণার সিদ্ধান্ত। আলোচনায় এ বিষয়ও থাকবে। এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে আরো যোগ হয়েছে ঢাকায় একটি অঞ্চলে জঙ্গিদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ। ২৯ এপ্রিল ঢাকার বসিলায় জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার একটি উদ্যোগ র‌্যাব নস্যাৎ করে দিয়েছে। এর আগে সংবাদপত্রে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল যে বাংলাদেশে হামলার পরিকল্পনা করছে আইএস। ঘর-সংসার ছাপিয়ে গেছে বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সংবাদে। এমনকি খালেদা জিয়ার প্যারোলে ‘মুক্তি’ পাওয়ার বিষয়টিও এখন ‘চাপা’ পড়ে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, একজন ‘সুস্থ’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নির্দেশেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন তখন অনেকেই এর সঙ্গে ‘অন্য কিছু’ মেলাতে চাইবেন। মির্জা ফখরুলের আসন শূন্য হয়েছে। সেখানে উপনির্বাচন হবে। খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টিও এখন সামনে আসছে। তাহলে কি খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন? এই সংসদ আগামী পাঁচ বছর থাকবে। এর অর্থ বিএনপিতে এখন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে নতুন নেতৃত্ব আসছে।
এখন যে প্রশ্নটি বেশি করে আলোচিত হতে থাকবে তা হচ্ছে, বিএনপি কিংবা গণফোরামের সদস্যদের সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক? প্রথম কথা হচ্ছে, বিএনপি তথা গণফোরাম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা সংসদে যাবে না। এমনকি বিএনপি জাহিদুর রহমান ও গণফোরাম সুলতান মনসুরকে দল থেকে ‘বহিষ্কার’ এবং মোকাব্বির খানকে শোকজ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তাঁদের কারোরই বরিহষ্কারাদেশ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়নি। এমনকি ড. কামাল হোসেন মোকাব্বির খানকে পাশে বসিয়ে গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল পর্যন্ত করলেন। এর মধ্য দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা কি থাকল? একটি দলের জন্য শৃঙ্খলা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বিএনপি ও গণফোরামের ক্ষেত্রে সেই দলীয় শৃঙ্খলা থাকল না। উপরন্তু সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট করে বলা আছে—দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ব্যক্তি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখন সাতজন সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেন এবং দল তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিতে পারল না! দল এখানে ‘মুখ্য’ হলো না, মুখ্য হয়ে গেল ‘ব্যক্তি’। যদিও বলা হয়েছে, বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নির্দেশেই তাঁরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। তাহলে ‘প্রশ্নটি’ আসে—তারেক রহমান একাই কি দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ? দলের স্থায়ী পরিষদের কি কোনো ভূমিকা নেই? এসব প্রশ্ন বারবার আলোচিত হতে থাকবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদ বয়কট কোনো ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সংসদীয় রাজনীতির জন্য এটি কোনো ভালো খবরও নয়। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগও সংসদ বয়কটের রাজনীতি করেছিল। ওই সংসদ বয়কটের রাজনীতি আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেনি। বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল। কিন্তু নির্বাচন বয়কটের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। সাধারণ মানুষ এটি সমর্থনও করেনি। ওই সংসদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও শেষ দিন পর্যন্ত সংসদ টিকে ছিল। একটি দলের জন্য বিপর্যয় আসতে পারে। আমরা ভারতে কংগ্রেসের উদাহরণ দিতে পারি। যে কংগ্রেস ছিল ভারতের রাজনীতিতে অবিসংবাদিত ‘শক্তি’, ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে (২০১৪) দলটির কী হাল হয়েছিল, আমরা নিশ্চয়ই তা স্মরণ করতে পারি। ৫৪৩টি আসনের মধ্যে দলটি পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন। যে দলটি (কংগ্রেস) প্রথম লোকসভায় (১৯৫২) পেয়েছিল ৩৬৪টি আসন, দ্বিতীয় লোকসভায় ৩৭১ আসন, ১৯৭১ সালে ৩৫২ আসন, ১৯৮০ সালে ৩৫৩ আসন, ১৯৮৪ সালে ৪১৫ আসন—সেই দলটিও ৪৪ আসন পেয়েছিল। ফলে দলের বিপর্যয় হতেই পারে। এ ক্ষেত্রে সংসদ বর্জন সংসদীয় রাজনীতির জন্য কোনো ভালো খবর হতে পারে না। নিশ্চয়ই বিএনপি এটি থেকে শিখবে ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে সেই সঙ্গে এটিও সত্য, আমরা ভোট সংস্কৃতিকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছি (রাতের বেলা ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা, প্রকাশ্যে ভোটকেন্দ্র দখল ও সিল মারা, নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা) এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। গণতন্ত্রের স্বার্থেই তা মঙ্গল।
বিএনপি যখন তার রাজনৈতিক দৈন্য থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিচ্ছে, ঠিক তখনই জামায়াতের সংস্কারবাদীদের একটি উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’—এই স্লোগান সামনে রেখে জামায়াতের তরুণ প্রজন্ম নতুন একটি দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল। জামায়াতের অতীত ভূমিকা, বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা জামায়াতকে ‘জনতার কাঠগড়ায়’ দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হয়েছে এবং বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ভার জামায়াত এড়াতে পারে না। সুতরাং জামায়াত সমর্থিত তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ছিল। তারা এটি থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছিল। তারা আদর্শিকভাবে জামায়াতের রাজনীতি সমর্থন করেছিল, এটি সত্য। কিন্তু জামায়াত নেতাদের একাত্তরের ভূমিকার দায়ভার নিতে চাইছিল না। তাদের এই মনোভাব প্রকাশ পায় যখন নতুন দল গঠনের উদ্যোক্তা মজিবুর রহমান মঞ্জু তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘একাত্তরের রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের বহন করা উচিত নয়।’ এটিই হচ্ছে মোদ্দা কথা। একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা, নতুন প্রজন্ম এর দায়ভার নেবে না। মঞ্জুর আরো কিছু বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, নতুন দলটি কোনো ধর্মভিত্তিক দল হবে না। তাদের সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এটি কোনো আদর্শভিত্তিক দলও হবে না। তাঁর এই বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন দল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়। তবে চান্সও আছেই। ‘এটি কি নতুন বোতলে পুরনো মদ।’ অর্থাৎ নতুন মোড়কে জামায়াত! জামায়াত কি নতুন দলে বিলীন হয়ে যাবে?
জামায়াত মূলত তার আদর্শকে ধারণ করে মিসরে ১৯২৮ সালে গঠিত ইখওয়ানুল মুসলেমিন বা ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি থেকে। বলা হয়, মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ইখওয়ানুল মুসলেমিনের আদর্শকে ধারণ করে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিল। পাক-ভারত-বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্ম এভাবেই। তারা ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি ধারণ করে। কিন্তু মিসরে দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর তারা নানাভাবে ও নতুন সংগঠনের ব্যানারে নিজেরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছিল। সফল হয়নি। কিন্তু ‘আরব বসন্ত’ (২০১১) পুরো দৃশ্যপটকে বদলে দেয়। এই দলের সমর্থকরা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি গঠন করে সফলতা পায়। ড. মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। কিন্তু বেশি মাত্রায় ‘ইসলামীকরণ’ ও সেনাবাহিনীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করায় সেনাবাহিনী কর্তৃক অপসারিত হন। আমরা তুরস্কের দৃষ্টান্ত দিতে পারি। তুরস্কে ইসলামিক জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি) ক্ষমতায়। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ২০০৩ সাল থেকেই ক্ষমতায়। ২০১৪ সালের পর থেকে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত একে পার্টি ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি ধারণ করে। প্রথমে এর সমর্থকরা নেকমাতিন এরবাকানের নেতৃত্বে ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টির ব্যানারে সংগঠিত হয়েছিল। এরবাকানের ভাবশিষ্য হচ্ছেন এরদোয়ান। দলটি সরকারও গঠন করেছিল। কিন্তু ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় প্রথমে ভার্চু পার্টি ও পরে ইসলামিক জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (২০০১) নামে আত্মপ্রকাশ করে। আমরা তিউনিসিয়া ও জর্দানের, এমনকি মরক্কোর দৃষ্টান্তও দিতে পারি। মরক্কোয় ইসলামিক ব্রাদারহুডের ভাবধারায় গঠিত জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এখন ক্ষমতায়। রাজতন্ত্রশাসিত এ দেশে ২০১৬ সালে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। (দলটি ৩৯৫ আসনের মধ্যে ১২৫ আসন পেয়েছিল)। তিউনিসিয়ায় আননাহাদা ও জর্দানে ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট একই রাজনীতি ধারণ করে এবং আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
তুরস্কের দৃষ্টান্ত অনেকেই দেওয়ার চেষ্টা করে। ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক ‘রাজনীতি’ একে পার্টি তুরস্কে উপহার দিয়েছে। এ কারণেই দলটির জনসমর্থন আছে। ২০০২, ২০০৭, ২০১১, ২০১৫, ২০১৮ প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনে দলটি বিজয়ী হয়েছে। একে পার্টির উত্থানের কারণে তুরস্কের ট্র্যাডিশনাল পার্টিগুলোর ভূমিকা একরকম নেই বললেই চলে। রাজনীতিগতভাবে আননাহদা (১৯৮১) পার্টি তুরস্কের একে পার্টিকে অনুসরণ করে। আননাহদা পার্টির নেতা রশিদ ঘানুচি নিজে বলেছেন, এরদোয়ানকে তিনি অনুসরণ করেন। এমনকি মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী সাদেদ্দিন ওথমানিও (২০১৭) এরদোয়ানের রাজনীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। একই কথা জর্দানের ক্ষেত্রেও। এর অর্থ হচ্ছে, আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে আরববিশ্বে যে পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে, তাতে ইসলামিক ব্রাদারহুডের সমর্থকরা নতুন নতুন দলের ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা আধুনিক এবং মৌলবাদী হিসেবে তাদের চিহ্নিত করাও যাবে না। তারা ইসলাম ও গণতন্ত্রকে একত্র করে আরববিশ্বে নতুন এক রাজনীতি নিয়ে এসেছে। তবে এটি সত্য, তাদের সবার মূল রুট হচ্ছে ইসলামিক ব্রাদারহুড, যাকে যুক্তরাষ্ট্র অতি সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এ নামে বর্তমানে কোনো দলেরই অস্তিত্ব নেই। এরদোয়ান যখন ২০০১ সালে একে পার্টি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তখন ধর্মনিরপেক্ষ ট্রুথ পার্টি, মাদারল্যান্ড পার্টি থেকেও সমর্থকরা নতুন দলে যোগ দিয়েছিল। এখন দেখার বিষয়, মজিবুর রহমান মঞ্জুরা যে ‘উদ্যোগ’ নিয়েছেন, তাতে তাঁরা ব্রাদারহুড কিংবা জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ থেকে কতটুকু সরে আসতে পারবেন। যদি সরে আসতে না পারেন, যদি একাত্তরের রাজনীতির জন্য ভুল স্বীকার না করেন, তাহলে নতুন দলও বিতর্কিত হবে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি সংসদে যাওয়ায় বর্তমান সংসদ গ্রহণযোগ্যতা পেল। সংসদীয় রাজনীতিও নতুন একটি মাত্রা পেল। মির্জা ফখরুলের সংসদে যোগ না দেওয়া, তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা ও সেই আসন থেকে জিয়া পরিবারের কাউকে সংসদে নিয়ে আসা—এ আলোচনার মধ্য দিয়ে বিএনপি পারিবারিক রাজনীতিতে নতুন এক নেতৃত্ব পেতে পারে। তারেক রহমানের অবর্তমানে তিনিই হয়তো বিএনপির হাল ধরবেন। আর এর মধ্য দিয়ে ‘খালেদা জিয়া যুগের’ অবসান হতে যাচ্ছে বলেই আমার ধারণা।
Daily Kalerkontho
03.05.2019