রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

সংলাপ-সমঝোতা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি

দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর তৃতীয়বারের মতো বিএনপি সংসদের বাইরে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদেও বিএনপি সংসদের বাইরে ছিল। যদিও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অনেক ‘বিতর্ক’ আর ‘প্রশ্ন’ নিয়ে দশম সংসদ তার যাত্রা শুরু করল। মির্জা ফখরুল এই সংসদকে অভিহিত করেছেন ‘সাংবিধানিক গোঁজামিলের’ সংসদ হিসেবে। তিনি বলেছেন, ‘এটি ৫ শতাংশের ভোটের সংসদ।’ প্রথা অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ভাষণ দিয়েছেন। তার ভাষণেই ফুটে উঠল মূল বক্তব্যটি। রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র বিকাশে সরকারের সঙ্গে সংলাপ করতে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানালেন। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই সিনিয়র মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলেছেন এর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের কোনো মিল আমি খুঁজে পাই না। সদ্য নিযুক্ত চিফ হুইফ জানিয়ে দিলেন ১৮২৫ দিন অপেক্ষা করার কথা। তাই রাষ্ট্রপতি যে সংলাপের কথা বলেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে এই সংলাপের সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আপাতত কোনো সম্ভাবনাও নেই। শুনতে হয়তো খারাপ শোনাবে এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা হয়তো আশাহত হতে পারেন; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরকার এই মুহূর্তে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না। এর অনেক কারণও আছে। নির্বাচন নিয়ে প্রথম দিকে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে থেকে যত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই আসুক না কেন, সরকার মনে করছে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির কারণে তার ‘অবস্থান’ এখন অনেক শক্তিশালী। বিদেশ থেকে একের পর এক অভিনন্দন বার্তা আসছে। এর মধ্যে দিয়ে সরকারের ‘লেজিটেমেসি’ বেড়েছে। সরকার মনে করছে তারা খুব সহজেই পাঁচ বছর পার করে দিতে পারবে এবং যারা দশম জাতীয় সংসদে এসেছেন, তারা চাইবেন না সংসদ ভেঙে দেয়া হোক। তারা চাইবেন পুরো টার্ম পূরণ করতে। বিদেশে এই সংসদ নিয়ে যত নেতিবাচক ধারণারই জন্ম হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে একটা সংসদ গঠিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের ষষ্ঠ সংসদের বয়স ছিল মাত্র ১৩ দিন। আমরা ওই সংসদের সঙ্গে দশম সংসদকে মেলালে ভুল করব। ওই সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। কিন্তু দশম সংসদের কাছে এ রকম কোনো এজেন্ডা নেই। ফলে সংসদ ভেঙে দেয়ার ‘চাপ’ থাকলেও তা খুব শক্তিশালী হবে বলে মনে হয় না। এখন সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে বিএনপি তথা ১৮ দল (১৯ দল) আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের অনেকেই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। ফলে ‘নির্বাচন প্রতিহত’ করার ডাক দিয়েও তা ‘প্রতিহত’ করা যায়নি। এখন সংসদ গঠিত হওয়ায় সরকারের অবস্থান ভালো। বিএনপি শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে সরকার ‘চাপ’-এ থাকবে না এবং সে ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারকে বাধ্য করানো যাবে না। এটা স্বীকার করতেই হবে সরকার বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের একটা ‘ব্যবধান’ তৈরি করে দিতে সমর্থ হয়েছে। এই কৌশলে সরকার লাভবান হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে বিএনপির। সরকার কখনো জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে না, অথচ সরকার ইচ্ছে করলে তা পারে। সংবিধানের ৩৮(গ) ও (খ) রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অডিন্যান্স, ১৯৭২, দ্যা পলিটিক্যাল পার্টিস অডিন্যান্স ১৯৭৮-এর ধারা, উপধারা বলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ কিংবা উচ্চ আদালতের দায়ের করা একটি আপিল মামলার নিষ্পত্তি করে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। সরকার সেদিকে যাবে বলে আমার মনে হয় না। সরকারের স্ট্রাটেজি হচ্ছে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ‘দূরত্ব’ যদি সৃষ্টি করা যায় তাতে দুর্বল হবে ১৯ দল, আর তাতে লাভ সরকারের। সরকার, সুশীল সমাজ এবং মিডিয়ায় জামায়াত একটি জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।সরকারের বড় প্লাসপয়েন্ট হচ্ছে বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জামায়াতের কর্মকাণ্ডকে জঙ্গি কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে। এতে পরোক্ষভাবে সরকারের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। এরই মাঝে দুজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী (ত্রাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যমন্ত্রী) সরাসরি বলেছেন নির্বাচন চাইতে হলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর অভিমতও অনেকটা তেমনই। অন্যদিকে আরো কয়েকজন মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেয়া বেগম জিয়ার বক্তব্যের (সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনীর অপারেশন প্রসঙ্গে) যেভাবে সমালোচনা করেছেন তাতে ‘সংলাপ’ এর সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়ে এলো। বেগম জিয়াকে ‘ক্ষমা চাইতে হবে’, ‘জঙ্গিদের সেনাপতি’ (সৈয়দ আশরাফ), ‘খালেদা সঙ্গ’ (আমির হোসেন আমু), ‘তিনি অশান্তি চান’ (হাসানুল হক ইনু), ‘তার বক্তব্য বিপজ্জনক’ (ওবায়দুল কাদের)-এ ধরনের বক্তব্য ‘সংলাপ’ এর পরিবেশের জন্য যথেষ্ট নয়। এমনকি বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হচ্ছে। আমরা এখানে সাতক্ষীরায় দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও (খালেদা জিয়ার শয়নে স্বপনে পেয়ারে পাকিস্তান) উল্লেখ করতে পারি। এতে এমন একটা ধারণার জন্ম হয়েছে যে, আগামীতে সংলাপের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচনের পর এখন ‘সংলাপ’ এর এজেন্ডা কী? বিএনপি যদি এখনো তত্ত্বাবধায়ক কিংবা নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কথা বলতে চায়, তাহলে সরকারের সমর্থন তাতে থাকবে না। বিএনপি সরকারকে বাধ্য করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে) আওতায় নির্বাচন দিতে। সরকার যেভাবে সংবিধানে পরিবর্তন এনেছিল (পঞ্চদশ সংশোধনী) সেভাবেই নির্বাচন হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। এখন বিএনপিকে নির্বাচন যেতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে রেখেই নির্বাচনে যেতে হবে। কিন্তু বিএনপি কি তা করবে? এটা যদি বিএনপি করে, তাহলে প্রশ্ন আসবে বিএনপি তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিল না কেন? অন্যদিকে সরকার আন্দোলনের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্য জনগণকে আন্দোলন সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেছে। দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচন হয় না। তবে দলীয় নেতা ও কর্মীরা অন্য মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এ ক্ষেত্রে তাই ঘটবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা এই নির্বাচনে অংশ নেবেন। এখানে বিএনপির সমর্থকরা যদি বিজয়ীও হন তাতে তা সরকারের ওপর আদৌ কোনো ‘প্রভাব’ ফেলবে না। আন্দোলনও আপাতত ‘স্থগিত’ই থাকবে। সরকার এখন শক্তিশালী। সরকারের এখন স্ট্রাটেজি হচ্ছে মামলা, মোকদ্দমা, আইন-আদালত করে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ব্যতিব্যস্ত রাখা। নেতাদের কেউ কেউ উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও অন্য মামলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। জেলেই থাকছেন তারা। অন্যদিকে পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুদকের মামলায় নিু আদালত থেকে খালাস পেলেও দুদক আপিল করেছে। নবনিযুক্ত আইনমন্ত্রী বলেছেন, তারেক রহমান নিু আদালতে আত্মসমর্পণ করলে জামিন পাবেন। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে একটি তারেক রহমানের মামলাগুলো সচল রেখে পরোক্ষভাবে বেগম জিয়ার ওপর ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ প্রয়োগ করা। নতুন করে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যে সরকার গঠন করেছেন, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ‘ঐকমত্যের সরকার’ হিসেবে। এই মুহূর্তে এই সরকারে চারটি দল রয়েছে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টি। আমার ধারণা ভবিষ্যতে এই সরকারে আরো দু’চারটি দল (সিপিবি, তরিকত ইত্যাদি) যোগ দিতে পারে। বিএনপির একটি অংশ যদি যোগ দেয়(?) আমি তাতে অবাক হব না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে একটি ‘মালয়েশিয়ান মডেল’ উপহার দিতে পারেন; যেখানে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন প্রধান রাজনৈতিক দল হলেও ১৩টি রাজনৈতিকর দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ন্যাশনাল ফ্রন্ট, যারা ১৯৬৪ সাল থেকেই জোটগতভাবে শাসন কার্য পরিচালনা করে আসছে। সেখানে বিরোধী দলের অস্তিত্ব তেমন শক্তিশালী নয়, যদিও সর্বশেষ নির্বাচনে (২০১৩) বিরোধী দল কিছুটা ভালো করেছে (বিরোধ পিপলস অ্যালায়েন্স পেয়েছে ৮৯ আসন, আর ক্ষমতাসীন ফ্রন্ট পেয়েছে ১৩৩। মোট আসন ২২২)। সেখানে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ চালু করেছে। মাহাথির মোহাম্মদ দীর্ঘ ২২ বছর (১৯৮১-২০০৩) ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৩ সালে অবসর নেন। মালয়েশিয়াতে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র এ নাগরিক অধিকার কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু নিয়মমাফিক ৫ বছর পর পর নির্বাচন হয়। সেখানে নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। ‘ভোট কেন্দ্র দখল’ কিংবা ‘সিল মারার’ ঘটনাও কখনো ঘটেনি। তারা রাজনীতির চাইতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে মালয়েশিয়া আজ বিশ্বে নতুন এক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জন্ম নিয়েছে। শেখ হাসিনা যদি মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক মডেলকে অনুসরণ তাহলে করেন তিনি ভালো করবেন। রাষ্ট্রপতি যে সংলাপের কথা বলেছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেননা রাষ্ট্রপতির ওই ভাষণ সরকারের বক্তব্য হিসেবেই চিহ্নিত হয়। কেননা রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয় এবং মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিতও হয়। প্রতিটি লাইন ‘চেক’ করে দেখা হয়। এর বাইরে রাষ্ট্রপতির ভাষণে একটি লাইনও তিনি যোগ করতে পারেন না। অতীতে এটা নিয়ে নানা কথা উঠেছিল। সুতরাং রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের বক্তব্যে যা ফুটে উঠেছে তা হচ্ছে সরকারের বক্তব্য। যদি তাই হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে সরকারই সংলাপ চাচ্ছে। আমরা বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার একটা কথা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে। তাহলেই সংলাপ। বিএনপি কৌশলগত কারণে জামায়াতকে না নিয়েই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা করেছে। সরকারের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছে বিএনপি। কিন্তু তাদের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ‘রাজনৈতিক।’ তারা জামায়াতকে ১৯ দলীয় জোট থেকে বের করে দেবে না। বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য করার ব্যাপারে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। জামায়াত না থাকলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে কাদের সিদ্দিকী, ড. কামাল হোসেন, কিংবা অধ্যাপক বি. চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বকে আমরা দেখতে পেতাম। সেটা হয়নি জামায়াতের কারণে। আমি মনে করি বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপট এজেন্ডা হওয়া উচিত একটাই আর তা হলো গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু এই নির্বাচন গণতন্ত্রের বিকাশকে অনেক ‘ক্ষতি’ করেছে। বাংলাদেশের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্য এই ‘ক্ষতি’ অনেক। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে একসময় প্রশংসাসূচক কথাবার্তা আমরা শুনতে পেতাম বিশ্ব নেতাদের মুখ থেকে। খোদ একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চাকে প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশ একটি মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ। মুসলমানপ্রধান দেশও যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে, বাংলাদেশ তার প্রমাণ। এটা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। দু’দুজন রাষ্ট্রপতি সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছেন। এমন একটি দেশেও যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, বাংলাদেশ সেটা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের প্রশংসা এ কারণেই। আমি বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে মনে করি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টার্মে আমরা বলি বাংলাদেশ হচ্ছে একটি ‘সফট পাওয়ার।’ বিশ্বকে অনেক কিছু দেয়ার আছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ দিতে পারে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। একটি দক্ষ, প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছেন আমাদের সেনা নেতৃত্ব। তৈরি পোশাক খাতে আমরা ‘লিডার।’ শত প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তৈরি পোশাকে বাংলাদেশের ওপর ধনী দেশগুলোর নির্ভরতা থাকবেই। ওষুধ শিল্পেও বাংলাদেশের অবস্থান উজ্জ্বল। বাংলাদেশের রয়েছেন দক্ষ ওষুধ প্রযুক্তিবিদ। আইটি সেক্টরেও বাংলাদেশ ভালো করেছে। অদক্ষ জনশক্তি রফতানিতেও বাংলাদেশের বিকল্প কোনো দেশ নেই। সুতরাং এমনি এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা চাইবে উন্নত বিশ্ব। সে জন্যই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক না কেন, পশ্চিমা বিশ্ব চাইবে জি-২ পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘সরকার টু সরকার’ পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নত করতে।
রাষ্ট্রপতি যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন, সে ব্যাপারে বিএনপি তথা ১৯ দলের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সরকারকেই উদ্যোগটা নিতে হবে। সংসদ নেত্রী প্রয়োজনে একটি সংসদীয় কমিটির গঠন করে দিতে পারেন। বিএনপি এই আলোচনায় বৃহত্তর বিরোধী গোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার জন্য সরকারবিরোধী ত্রিদলীয় জোট (কাদের সিদ্দিকী, বি. চৌধুরী ও আসম আবদুর রবের দল) এর সঙ্গে একটা অ্যালায়েন্স গঠন করতে পারে। এটা হতে পারে ১৯ প্লাস ৪ দলীয় ঐক্য। ড. কামাল হোসেনও থাকতে পারেন। বস্তুত পক্ষে বিএনপির সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওপরে উল্লেখিত চারটি রাজনৈতিক দলের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এই রাজনীতিকদের সবাই মনে করেন যে প্রক্রিয়ায় দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। তারা চাচ্ছেন অতি দ্রুত একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা। এমনকি নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার থাকা উচিত এ ব্যাপারেও সবার অভিমত এক। ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানকে অন্তবর্তীকালীন সরকারপ্রধান রেখে যে নির্বাচন হয় এবং তা যে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয় না, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এর বড় প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা হয়েছে। এটা বিবেচনায় নিলেও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হয়নি। এই অভিমত বিএনপিসহ বাকি দলগুলোর। শুধু মতপার্থক্য এক জায়গায় আর তা হচ্ছে জামায়াতকে ছাড়তে হবে। যদি বিএনপি জামায়াতকে মাইনাস করত তাহলে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল। কিন্তু তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য হতে পারে। এই মুহূর্তে একটি ‘গণতন্ত্র সনদ’ স্বাক্ষরিত হওয়া জরুরি। অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন ২০০৭ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে লন্ডনে পাকিস্তানের দুটি বড় দল পিপলস পার্টি (বেনজির ভুট্টো) ও মুসলিম লীগ (নেওয়াজ শরীফ) এর মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল যা ‘গণতন্ত্র সনদ’ নামে অভিহিত হয়েছে। এই সময়ে ওই দুই দলের প্রধান টার্গেট ছিল পারভেজ মোশাররফ। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।মোশাররফবিরোধী তথা পাকিস্তানে সাচ্চা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ২০০৭ সালে পিপলস পার্টি ও মুসলিম লীগ একত্রিত হয়েছিল। এ দুটি দলের মাঝে বৈরিতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সবার জানা। শুধু এই দুই দলের মাঝে বৈরিতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘদিন সেখানে কোনো সরকারই স্থায়িত্ব পায়নি। বেনজির ভুট্টো এবং নেওয়াজ শরীফ দু’দুবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একজনের ব্যর্থতা (বেনজির ভুট্টো ১৯৮৮, ১৯৯৩ দু’বার) অন্যজনকে (নেওয়াজ শরীফ ১৯৯০, ১৯৯৭, দু’বার) ক্ষমতায় বসিয়েছিল। এই দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা এখনো বহমান। মোশাররফের উৎখাতের পর প্রথমবারের মতো পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন (বেনজিরের মৃত্যুর পর) একটি কোয়ালিশন সরকার তার পাঁচ বছরের টার্ম শেষ করেছে এবং ২০১৩ সালে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সেখানে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে নেওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ আবার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আজ একটি ‘গণতন্ত্র সনদ’ প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিরোধী দলগুলো একত্রিত হয়ে একটি ‘গণতন্ত্র সনদ’ প্রণয়ন করতে পারে। আর এ জন্যই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি ১৯ দল প্লাস ৪ দলের ওপর। বিরোধী দলগুলো একত্রিত হলেই সরকার বাধ্য হবে একাদশ সংসদের নির্বাচনের ব্যাপারে সংলাপ শুরু করতে। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। তারাও একসময় চাইবে একাদশ সংসদ নির্বাচন। যেহেতু রাষ্ট্রপতির ভাষণ মানেই সরকারের ভাষণ সেহেতু রাষ্ট্রপতির সংলাপের আহ্বানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সরকারের উচিত হবে দ্রুত সংলাপ শুরু করা। এতে প্রধান প্রধান দলগুলোর মাঝে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে। স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাব। সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংসদ অধিবেশন চলুক। সেই সঙ্গে চলুক সংলাপও। Daily MANOBKONTHO 04.02.`14

গণতন্ত্রের সংগ্রাম : দেশ থেকে দেশে


চলতি বছর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন এক মাত্রা পেয়েছে বিভিন্ন দেশে। শুধু বাংলাদেশই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড, আর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি দেশ ইউক্রেনে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশে বিতর্কিত একটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থেকে গেছে। অনেকটা একইরকম থাইল্যান্ডের গত ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়ে থাই পার্টিই থেকে গেল। বাংলাদেশের মতোই থাইল্যান্ডের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি নির্বাচন বয়কট করে। যদিও বাংলাদেশ আর থাইল্যান্ডের পরিস্থিতি একসঙ্গে মেলানো যাবে না। তবে ইউক্রেনের পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। সেখানেও গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ সালে আরো বেশ ক'টি দেশে আসন্ন নির্বাচন প্রত্যক্ষ করব এবং প্রতিটি দেশেই গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অনেকটা প্রশ্নের মুখে। ৬ এপ্রিল আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যেখানে কারজাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারছেন না। পারছেন না মালিকিও ইরাকে। সেখানে ওই এপ্রিলেই সংসদ নির্বাচন। দক্ষিণ আফ্রিকায়ও এপ্রিল-জুনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন, যেখানে সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। ইন্দোনেশিয় (জুলাই ৯) ও ব্রাজিলের (৫ অক্টোবর) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। তবে অনেকেরই দৃষ্টি থাকবে ভারতের দিকে। এপ্রিলে সেখানে লোকসভার নির্বাচন। আর কংগ্রেস জোট বিজয়ী হলে রাহুল গান্ধী হবেন প্রধানমন্ত্রী। তার অভিজ্ঞতা নেই। কংগ্রেস জোট ক্ষমতা পেলেও রাহুল গান্ধীর জন্য বিষয়টি খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী পদে দাবিদার রয়েছে আরো অনেকে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজেপির প্রার্থী। গেল বছরের শেষের দিকে ভারতে পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির বড় বিজয় রয়েছে নরেন্দ্র মোদির জন্য একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নরেন্দ্র মোদির বিজেপির মনোনয়ন লাভ খোদ ভারতের গণতন্ত্রের জন্য একটি কলঙ্ক। কেননা ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য মোদিকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। যাদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। গত ১০ বছরেও মোদি এই অভিযোগ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ থাকায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে কখনো ভিসা দেয়নি। আগামী এপ্রিল-মে মাসে ভারতে লোকসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ভারতের রাজনীতিতে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা প্রবণতা চলছে, আর তা হচ্ছে কোয়ালিশন রাজনীতি। কংগ্রেসের নেতৃত্বে রয়েছে ইউপিএ বা ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স। ইউপিএ জোটে রয়েছে বেশ ক'টি আঞ্চলিক দল। বিজেপির নেতৃত্বেও রয়েছে একটি জোট_ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)। বামদের নেতৃত্বেও রয়েছে একটি জোট। ধারণা করা হয়, চলতি লোকসভা নির্বাচনের পরও এ জোট রাজনীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। এককভাবে কংগ্রেস অথবা বিজেপির পক্ষে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই নেই। তবে এটা বলতেই হবে দিলি্লর রাজ্য সরকারের নির্বাচনে তখন আদমি পার্টি তথা অরবিন্দ কেজরিওয়ালার উল্লাস (যিনি এখন দিলি্লর মুখ্যমন্ত্রী) ঘাটলেও, জাতীয় রাজনীতিতে তার দলের আদৌ কোনো ভূমিকা থাকবে না। কেননা সর্বভারতব্যাপী এই দলের কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় নির্বাচনে তিনি 'চমক' দেখিয়েছিলেন, কিন্তু লোকসভা নির্বাচনটা একটা ভিন্ন বিষয়। চলতি বছর ভারতের পাশাপাশি আফগানিস্তান, ইরাক, দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিমা, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেখানেও পরিবর্তন আসবে।
অতিসম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র মালদ্বীপে গেল বছর দ্বিতীয় দফা ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং আবদুল্লাহ ইয়ামিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নাসিদ তা মেনে নিয়েছেন। গেল বছর পাকিস্তানে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং নওয়াজ শরিফ আরো একবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে দুটো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে পাকিস্তানে। প্রধান বিচারপতি ও সেনাপ্রধান অবসরে গেছেন। প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী নিয়মমাফিক অবসরে যাওয়ার পর তাসাদ্দুক হোসেন জিলানি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। আর জেনারেল কায়ানির টার্ম শেষ হয়ে যাওয়ার পর জেনারেল রাহিল শরিফ নয়া সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে চলতি বছর শরিফের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাহরিক-ই- তালিবানকে নিষ্ক্রিয় করা ও তাদের জঙ্গিবাদী তৎপরতা বন্ধ করা। মূলত তাহরিক-ই তালিবান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
এ অঞ্চলে এখন ইমরান খানের দল তাহরিক-ই ইনসাফ সরকার গঠন করেছে। ধারণা করা হয়, ইমরান খানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি দল হিসেবে পরিচিত তাহরিক-ই তালিবানের একটা সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সীমান্ত অঞ্চলে মার্কিন ড্রোন বিমান হামলা বন্ধ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শরিফ এ হামলা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ জানালেও তা রক্ষিত হয়নি। এটা খোদ নওয়াজ শরিফের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানের জন্য এটা বড় খবর হলো যে একটা নির্বাচিত সরকার তার পাঁচ বছরের টার্ম পূরণ করেছে।
২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। ওবামা এই প্রতিশ্রুতি দিলেও, তিনি প্রতিশ্রুতি কতটুকু রাখতে পারবেন, তা একটা প্রশ্ন। যুক্তফ্রন্ট ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের কারজাই সরকারের সাবেক একটা নিরাপত্তা চুক্তি করতে চাইলেও, তা হয়নি। এ ক্ষেত্রে চলতি বছর আফগানিস্তানের দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। ৬ এপ্রিল সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কারজাই আর তৃতীয় বারের মতো দাঁড়াতে পারছেন না। অনেকেরই ধারণা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটা উপস্থিতি সেখানে থাকবেই। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানেও জঙ্গি তৎপরতা বাড়বে।
পাকিস্তানের কথা শুধু নয়, খোদ নেপালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন করল। এ দুটো দেশ নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন সম্পন্ন করে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। নেপালে মাওবাদীরা সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচনে ভালো ফলাফল করেনি। তবে ভালো খবর হলো, তারা শেষ পর্যন্ত অধিবেশনে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যেসব দেশ গণতন্ত্রচর্চা করে, তাদের জন্য 'খারাপ' খবর আছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড আর ইউক্রেনে সরকারবিরোধী আন্দোলনের নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে থাইল্যান্ডে সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতি দুই পক্ষের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে 'রেড শার্ট', আন্দোলন, যারা সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত। আন্দোলন উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক গত ২ ফেব্রুয়ারি কথা নির্বাচন সম্পন্ন করলেন, যেখানে 'হলুদ শার্ট' আন্দোলনকারী তথা ডেমোক্রেটিক পার্টি তা বয়কট করে। একপর্যায়ে সেনাপ্রধান সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং সামরিক অভ্যুত্থানের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। 'রেড শার্ট' আর 'হলুদ শার্ট' আন্দোলনের কারণে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র একটি বড় প্রশ্নের মধ্যে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক এভাবে 'রেড শার্ট', আন্দোলনকারীদের উসকে দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তিনি তার ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে (সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী) দায়মুক্তি দেয়ার উদ্দেশে সংসদে একটি বিল এনেছেন। ইউক্রেনের অবস্থাও ঠিক তেমনি। ২০০৪ সালের 'কয়লা বিপ্লব' এখন ব্যর্থ হতে চলেছে। ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তি বাতিল ও রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক বৃদ্ধি এসব নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইরাকে বিভিচ কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন তা একটা বড় প্রশ্ন এখন।
গেল বছর (২০১৩) ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের মৃত্যু ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে হাসান রুহানির অভিষেক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে 'যুদ্ধ' করে এক সময় হেরে গিয়েছিলেন হুগো শ্যাভেজ। তার মৃত্যুর পর তিনি, 'সমাজতন্ত্রের নতুন এক ধারা' প্রবর্তন করেছিলেন তার স্থায়িত্ব কতটুকু থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয় সে ব্যাপারেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভেনিজুয়েলা হবে একটি 'টেস্ট কেস'।
আরব বিশ্বে 'আরব বসন্ত' যে সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, সেই সম্ভাবনার এখন 'মৃত্যু' ঘটেছে। 'আরব বসন্ত' সেখানকার দীর্ঘদিনের শাসকদের (তিউনেশিয়ায় জইন আবেদিন বেন আলী, মিসরে হোসনি মোবারক, ইয়েমেনের সালেহ, লিবিয়ায় গাদ্দাফি), ক্ষমতা থেকে উৎখাত করলেও, সেখানে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেনি। উপরন্তু মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। তিউনেশিয়ায় একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে। চলতি বছর সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে 'আরব বসন্ত' পুরো আরব বিশ্বে জঙ্গিবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটিয়েছে'। বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলে সেখানে একটি বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ইসলামিক জঙ্গিদের একটি কোয়ালিশন। লিবিয়ায়ও এরা শক্তিশালী। আর ইরাকে জঙ্গিদের তৎপরতা ইরাকের অস্তিত্বকে একটি বড় হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সিরিয়ায় গেল বছর মার্কিন বিমান হামলা এড়ানো গেছে সত্য, কিন্তু যদি সেখানে কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে বিমান হামলা হতে পারে। জেনেভা-২ আলোচনা জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের কোনো সমাধান এখনো হয়নি_ আর তা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট আসাদ ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি একটা নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পরিহার করবেন। চলতি বছরের মাঝামাঝি সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনে তিনি যদি প্রার্থী না হন, তাহলে সমাধানের একটা পথ বের হতে পারে। তাই জেনেভা-২ আলোচনার দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। তবে চূড়ান্ত বিচারে এ আলোচনায় সিরীয় সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তা কোনো 'ফল' বয়ে আনবে না_ এমন আশঙ্কাই করা হচ্ছে।
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ নিয়ে আরো একটি ভয়_ তা হচ্ছে প্রায় ৫৫ হাজার শরণার্থী বর্তমানে জর্ডানে আশ্রয় নিয়েছে। এদের যদি দেশে ফিরেয়ে নিয়ে আনার ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে এরা জর্ডানে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে এবং সেখানকার সরকারের পতন ঘটাতে পারে। জাতিসংঘেরই এ শরণার্থীদের জন্য ব্যয় করে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘদিন জাতিসংঘের জন্য এ অর্থ ব্যয় বহন করাও সম্ভব নয়। তাই জেনেভা আলোচনায় কোনো ফল পাওয়া না গেলে সীমিত বিমান হামলার (লিবিয়ার মতো) সম্ভাবনা ২০১৪ সালে বাড়বে। এর পাশাপাশি তুরস্কের কী পরিবর্তন আসে, সে ব্যাপারেও দৃষ্টি থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। আগস্টে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই প্রথমবারের মতো সেখানে সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। সংবিধানে বাধ্যবাধকতার কারণে এরদোগান তিনবারের বেশি আর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। ধারণা করা হচ্ছে, এরদোগান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তুরস্কের রাজনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে সিরিয়ার রাজনীতির একটা সম্পর্ক রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় স্বার্থ রয়েছে তুরস্কে। কেননা সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনে (যা তুরস্কও চাইছে) তুরস্কের সমর্থন প্রয়োজন পশ্চিমা বিশ্বের। সুতরাং এ অঞ্চলের রাজনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। সেই সঙ্গে পূর্ব চীন সাগরে উত্তেজনা কিংবা ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (৯ জুলাই) দৃষ্টি কাড়বে অনেকের।
সুতরাং ২০১৩ সালের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের বিশ্ব রাজনীতিতেও উত্তেজনা থাকবে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের এক-তৃতীয়াংশ (সিনেটের ৩৫) আসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটা বোঝা যাবে কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী। হিলারি ক্লিনটনের দিকে তাই দৃষ্টি থাকবে অনেকের। সারা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের যে সংগ্রাম তাতে নতুন মাত্রা এসেছে। প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়েও যে নির্বাচনে আয়োজন করা সম্ভব তা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে। আর ভারতে প্রধান বিরোধী দল বিজেপিকে যদি জনগণ ক্ষমতায় বসায় ও বিতর্কিত রাজনীতিবিদ নরেন্দ্র মোদি যদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন (২), তা হবে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে তাই হাজারটা প্রশ্ন নতুন করে উঠবে।

DAINIK JAIJAIDIN 03.02.2014

বেগম জিয়া কী মেসেজ দিলেন

বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া কী মেসেজ দিলেন গত ২০ জানুয়ারির জনসভায়? সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় তিনি যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তার মাঝে নতুনত্ব কিছু নেই। তবে একাধিক কারণে আমার কাছে এই কথাবার্তার গুরুত্ব অনেক। প্রথমত, ওই জনসভায় জামায়াতের উপস্থিতি আদৌ ছিল না। তাদের নেতারা বক্তব্যও রাখেননি। সরকার বিএনপিকে অনুমতি দিয়েছিল এক শর্তে আর তা হচ্ছে জামায়াত কর্মীদের আনা যাবে না কিংবা জামায়াত নেতারা বক্তব্য দিতে পারবেন না। এর আগে বিদেশি দূতরা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে বিএনপির উচিত হবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও শর্ত দিয়েছিলেন বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে, যদি বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে আসে। এখন বিএনপি এই কাজটি করল। সরকার বিএনপির এই উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দেয় কি-না, সেটাই দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, বেগম জিয়া দশম জাতীয় সংসদকে ‘অবৈধ সংসদ’ বলেছেন। তিনি ‘প্রহসনের নির্বাচনে অংশ না নেয়ায়’ জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। নয়া নির্বাচনেরও দাবি তিনি করেছেন। কিন্তু বেগম জিয়ার এই বক্তব্যের তিনটি প্রতিক্রিয়া আমরা পেয়েছি। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী এবং খাদ্যমন্ত্রী অনেকটা একই সুরে বলেছেন, নির্বাচন চাইলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আওয়ামী লীগের অনেক নীতি-নির্ধারকও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে। কিন্তু ভিন্ন কথাও শুনেছি এরশাদের মুখ থেকে। ২০ তারিখে তিনি বলেছেন, নয়া নির্বাচন কমিশনের অধীনে দ্রুত নির্বাচন হবে। এরশাদ এখন ৫৩ হাজার টাকা বেতনে মন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারের বিশেষ দূত। এখন এই ‘বিশেষ দূত’ই বললেন ‘দ্রুত নির্বাচনের’ কথা। এখন কোন বক্তব্যকে আমরা গুরুত্ব দেব? এটা সত্য প্রধানমন্ত্রী একাদশ সংসদ সম্পর্কে কোনো আগাম মন্তব্য করেননি। এখন যে বিষয়টি আমাদের শঙ্কার কারণ, তা হচ্ছে আমরা কী ২০১৯ সালকেই পরবর্তী নির্বাচনের সময়সীমা ধরে নেব? সংবিধান সে কথাই বলে। কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে? একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়নি, এটা বোধকরি খোদ আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও বিশ্বাস করেন। তাহলে ‘এই সংসদ’ নিয়ে কী পাঁচ বছর টিকে থাকা যাবে? তাতে কি অস্থিতিশীলতা বাড়বে না? তৃতীয়ত, বেগম জিয়া বলেছেন তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। এর ব্যাখ্যা সরকার হয়তো দেবে। তবে অভিযোগটি তো গুরুতর। গত এক মাসে দেশে কী হয়েছে, তা মোটামুটিভাবে মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সবাই জানি। বেগম জিয়াকে তার বাসস্থান থেকে বের হতে না দেয়া, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যেতে বাধা দান-এসব তো মিডিয়ার কল্যাণেই আমরা জেনেছি। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন অভিযোগ করেন, তখন তা গুরুত্ব পায় বৈকি! নিঃসন্দেহে এটা কাম্য নয়। চতুর্থত, বেগম জিয়া বলেছেন, ‘যৌথবাহিনীর নামে বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে।’ এ অভিযোগটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতি সাম্প্রতিককালে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সরকার এ ব্যাপারে একটা ব্যাখ্যা দিলে ভালো করবে। আরেকটি অভিযোগ বেগম জিয়ার। সেটি হচ্ছে ‘সংখ্যালঘুদের ওপর সরকার হামলা করছে।’ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্থান পাচ্ছে। সুতরাং এটাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বেগম জিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তৃতা দেয়ার আগে আমরা ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস আর লন্ডন থেকে তিনটি প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ৬ দফার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর আগে সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান মেনডেজ চিঠি দিয়েছিলেন দুই নেত্রীকে। সিনেটের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের হাউস অব কমনসও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাপারে। মোটা দাগে এই তিনটি প্রস্তাব যদি বিশ্লেষণ করি, তাতে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত একটি মিল খুঁজে পাই। এগুলো হচ্ছে ১. অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। ২. অবিলম্বে স্থগিত হয়ে যাওয়া সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করা। ৩. সহিংসতা বন্ধ করা। এখানে সবাই একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বললেও বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা কেউ বলেনি। তবে যে ভাষা তারা ব্যবহার করেছেন তাতে ধারণা করা এটা স্বাভাবিক যে, দশম সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় এরা খুশি নন। সব দলের অংশগ্রহণ এতে হয়নি, এমন অভিমতও দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের হাউস অব কমনসে গৃহীত সিদ্ধান্তে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছে, যা অন্য কেউ বলেনি। এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘সন্ত্রাসে জড়িত দল নিষিদ্ধ করা উচিত’ বলে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দলকে বোঝানো হয়নি। সাম্প্রতিককালে সহিংস ঘটনাবলির জন্য জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম অভিযুক্ত। সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেবে-ইইউ’র এই সিদ্ধান্ত কি জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? সরকার কি সিদ্ধান্তটি নেবে? সরকারের হাতে একাধিক ‘অপশন’ আছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার। কী করবে সরকার এখন তা স্পষ্ট নয়। এসব প্রস্তাব ও সিনেটর মেনডেজের চিঠির মধ্য দিয়ে একটি মেসেজ আমরা পাচ্ছি আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটা পথ হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে ‘সংলাপ’ শুরু করা। এদিকে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটি আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুটি বড় দলের মাঝে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে আংশিক ব্রিটিশ সহযোগিতা হারাতে পারে বাংলাদেশ। এসব মন্তব্য বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার হার্ড লাইনে গেলে ভুল করবে। গত ১৩ জানুয়ারি বিএনপির নেতারা ঢাকায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে কূটনীতিকরা মন্তব্য করেছেন যে, দশম সংসদ নির্বাচনে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। তারা সহিংসতা পরিহার করে সব দলের প্রতি সমঝোতার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। জাতির জন্য, সমাজের জন্য এই সহিংসতা কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে বিরোধী দলের মধ্যে এই উপলব্ধিবোধটুকু আসতে হবে। তবে এটা ভালো খবর যে, নির্বাচনের পর পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নির্বাচনের পর তেমন সহিংসতার খবর আসছে না। এ ব্যাপারে সরকার তেমন শক্ত অবস্থানে যায়নি। ওপরে উল্লিখিত তিনটি সিদ্ধান্তেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গটি এসেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আক্রান্ত হয়েছেন বেশি। আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি নির্বাচনের আগে ও পরে এই সম্প্রদায়ের লোকদের টার্গেট করে আক্রমণ করা হয়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এমন অপকাণ্ড অতীতে বারবার হয়েছে। এবারো হলো এবং অভিযোগ আছে এই সহিংস ঘটনার জন্য সরকারি দলের লোকজনও জড়িত। এমনি ধরনের একটি অভিযোগ এনেছেন হিন্দু-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জনৈক নেতা। বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেই থাকুক, সে রাষ্ট্রের শত্রু, সমাজের শত্রু। আমরা চাইব সরকার একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এসব ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। এ ঘটনায়ও বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। বিদেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ নিয়ে যখন কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তখন আগামীতে বিএনপির ভূমিকাও ভবিষ্যতে আরো প্রশ্নের মুখে পড়বে। আশার কথা, বিএনপি কোনো হরতাল আর অবরোধের কর্মসূচি দেয়নি। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার। বেগম জিয়া উপলব্ধি করেছেন যে, হরতাল আর অবরোধে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। আর এই সহিংসতায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। সহিংসতায় সাধারণ মানুষের যেমনি সমর্থন থাকে না, ঠিক তেমনি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও সমর্থন করে না। এখন বিএনপির সভায় জামায়াতকে আমন্ত্রণ না জানানো এবং জামায়াতের কোনো নেতা বক্তৃতা না দেয়ায় স্পষ্টতই বেগম জিয়া একটি মেসেজ দিলেন-আর তা হচ্ছে সংলাপের ব্যাপারে তিনি সিরিয়াস। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি যে উদারতা দেখিয়েছে, সরকার সেই উদারতা দেখাবে কিনা। বল তো এখন সরকারের কোর্টে। জামায়াতের ব্যাপারে সরকার কী করবে, তাও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আইনানুযায়ী সরকারের কাছে একাধিক সুযোগ রয়েছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার। সংবিধানের ৩৮ (গ) ও (খ) রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অর্ডিন্যান্স ১৯৭২ দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮-এর ধারা-উপ-ধারা বলে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ কিংবা উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলার ফয়সালা করে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। আগামী নির্বাচনে জামায়াত নামে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনগত ও সাংবিধানিকভাবেই হওয়া উচিত। এটাকে সংলাপের পূর্বশর্ত আরোপ করা উচিত নয়। তবে এটা তো ঠিক বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের মাঝে এই উপলব্ধিবোধ এসেছে যে, বিএনপির জামায়াতকে পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। যদি সংলাপ হয়ও, তাতে কি কোনো ‘ফল’ আসবে? সংলাপে মূল আলোচ্য বিষয় কী? একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন? তাতে সরকার হয়তো রাজি হবে। কিন্তু নির্বাচনটা হবে কোন সরকারের অধীনে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? সংবিধানে তো সেভাবেই লেখা আছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই তো নির্বাচন হওয়ার কথা! বিএনপি তা কি মানবে? যদি এটা বিএনপিকে মানতেই হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিল না কেন? আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি সংবিধানে বর্ণিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফর্মুলা বাদ দিয়ে (যেখানে শেখ হাসিনাই থেকে যাবেন সরকারপ্রধান হিসেবে), অন্য যে কোনো ফর্মুলায় বিএনপি রাজি হবে। ফলে সংলাপ হলেও তা কোনো ফল দেবে না-আমার আশঙ্কা এখানেই। সরকার এখন চাইবে দশম সংসদকে পাঁচ বছর টেনে নিয়ে যেতে। এতে সরকার কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কতটুকু সংগঠিত করতে পারবে তার ওপর। সম্ভবত বিএনপি তথা ১৮ দলের স্ট্র্যাটেজি সঠিক ছিল না। এটা সত্য নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। যেখানে ১৫৩ আসনে কোনো নির্বাচন হয়নি এবং অন্য আসনে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম, সেখানে বিএনপির প্রতি জনসমর্থন থাকলেও বিএনপি আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন বাংলাদেশে কায়রোর তাহরির স্কয়ার কিংবা ব্যাংককের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে! সেটা হয়নি। বিএনপিকে এখন বিগত দিনের আন্দোলনের হিসাব মেলাতে হবে। আন্দোলনে বিএনপি কর্মীদের মাঠে না থাকা, জেলের ভয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পালিয়ে বেড়ানো ইত্যাদি ঘটনা সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বিএনপি চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারেনি। তাই নতুন করে ‘হিসাবের খাতা’ খুলতে হবে। জামায়াত কৌশলী। তারা আপাতত ‘ব্যাকফুটে’ চলে যাবে। তবে তারা চূড়ান্তভাবে হারিয়ে যাবে এটা আমার মনে হয় না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও (?) তারা নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করবে। তুরস্কের ইতিহাস আমাদের সামনে আছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা নব্বইয়ের শেষের দিকে নেকমাতিন এরবাকানের নেতৃত্বে ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল তুরস্কে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচিত ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টির সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী ট্র– পাথ পার্টির একটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল তুরস্কে ১৯৯৬ সালে। এরবাকান ছিলেন ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। যদিও সেই সরকার স্থায়ী হয়নি। একপর্যায়ে ওয়েলফেয়ার পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হলে তারা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ব্যানারে সংগঠিত হন এবং পর পর তিনবার সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। সুতরাং জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও এরা হারিয়ে যাবে, এটা আমার মনে হয় না। বেগম জিয়া নতুন করে কোনো কঠোর কর্মসূচি না দেয়ায়, স্পষ্টতই সংকটের জট খোলার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদ্যোগটা নিতে হবে সরকারকেই। এমনকি গত ২১ জানুয়ারি রেলমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ হাইকমিশনারও বলেছেন দ্রুত সংলাপে যাওয়ার। কিন্তু সিনিয়র মন্ত্রীদের কথাবার্তা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেগম জিয়াকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান, আমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, প্রত্যাশিত এই সংলাপটি নাও হতে পারে। তাই একটি সংলাপ হবে কিংবা একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০১৪ সালেই অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে এখনই কিছু বলা কঠিন। এখন অনেক সম্ভাবনার জন্ম হবে। এক. যারা নতুন করে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন (?) তারা চাইবেন ৫ বছরের টার্ম পূরণ করতে। দুই. জাতীয় পার্টির সুবিধাভোগীরা জানে ক্ষমতা হারালে পরবর্তী নির্বাচনে তাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই সংসদ ভেঙে যাক এটা তারা চাইবেন না। তিন. সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মী আছেন, যারা মনে করেন আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারলে বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্ষমতা আরো দীর্ঘায়িত করা সম্ভব হবে। চার. আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, আগামীতে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে হবে (রাজনৈতিকভাবে) জামায়াতকে, জামায়াত যে নামেই আত্মপ্রকাশ করুক না কেন। জামায়াতের তরুণ প্রজšে§র নেতৃত্বেই একটি আধুনিক ইসলামিক ফোর্সের (অনেকটা তুরস্কের মডেলে) আত্মপ্রকাশ ঘটবে এবং তারাই হবে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিপক্ষ। এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বিএনপি অনেকটা ‘রণে ভঙ্গ দিয়েছে’। সুতরাং আওয়ামী লীগ খুব অনায়াসে ৫ বছর ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারবে। এটা স্পষ্ট যে, বিএনপি নয়া সংসদ ও নয়া সরকারের ব্যাপারে একটা ‘সফট অ্যাটিচিউড’ গ্রহণ করেছে। অনেকের ধারণা ছিল ২৯ জানুয়ারি (যেদিন দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে) বিএনপি হরতাল দেবে। কিন্তু বিএনপি তা দেয়নি। এর মধ্য দিয়ে মেসেজটি পরিষ্কার, বিএনপি এক ধরনের সমঝোতা চায়। আগামী মাসে উপজেলা নির্বাচন। এই নির্বাচন দলীয়ভাবে হয় না। তবে সমর্থকরা অংশ নেন। বিএনপির সমর্থকরা এই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে আমার ধারণা। এই নির্বাচনে অংশ না নিলে স্থানীয়ভাবে বিএনপির যে ভিত্তি তাও হারাতে পারে দলটি। তাই বেগম জিয়াকে এখন পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ করে এগোতে হবে। তার উচিত হবে এখন জেলাপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা। বেগম জিয়া এখন প্রতিটি বিভাগীয় শহরে যাবেন এই সিদ্ধান্তটি ভালো। তবে আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। নিশ্চয়ই বিগত আন্দোলন থেকে তিনি শিখেছেন। জনসমর্থন থাকলেও সরকারের যে পতন ঘটানো যায় না, তা এবার প্রমাণিত হলো। তবে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ চায়। আর এটা নিশ্চিত করতে হলে দুটি বড় দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে সহাবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। এই মুহূর্তে এই সহাবস্থানটি নেই। ফলে খুব দ্রুত একটি সংলাপ হবে, মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে-তা এখনই দৃঢ়ভাবে বলা কঠিন। Daily Manobkontho 24.01.14

তিনটি সিদ্ধান্ত কিন্তু প্রশ্ন অনেক

তিনটি সিদ্ধান্ত হয়েছে তিনটি দেশে। কিন্তু দেশ একটি। দেশটি বাংলাদেশ। সিদ্ধান্ত হয়েছে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস আর লন্ডনে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তও বাংলাদেশকে নিয়ে। আর ব্রিটেনের হাউস অব কমনসের সিদ্ধান্তও এলো বাংলাদেশকে নিয়ে। পুরো বিষয়টিই বাংলাদেশকে নিয়ে, ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে নিয়ে। এ সংসদ এখন গঠিত হয়েছে। একটি মন্ত্রিসভাও আমরা পেয়েছি। এ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল কম। এ নিয়ে এন্তার আলোচনা হয়েছে। টকশোগুলোয় আলোচনা চলছে আজও। আমি নিজেও একাধিক টকশোতে অংশ নিয়েছি।একটি নির্বাচন হয়েছে। আমরা চাই বা না চাই, জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫২ ভাগ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাক বা না পাক, বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনটি হয়ে গেছে। আর ২৯ জানুয়ারি বসছে ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন। এখানে যে বিষয়টি আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে উপরে উল্লিখিত তিনটি পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তগুলো। অতীতে কোনো দেশের ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সুনির্দিষ্টভাবে ছয়টি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ১. রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরাসরি ও সত্যিকার অর্থে সংলাপ, ২. রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ, ৩. শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পথ সুগম করা, ৪. নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ৫. জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকোর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন এবং ৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা বন্ধ ও গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দেয়া। সিনেটে গৃহীত এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সিনেটর রবার্ট মেনডেজ কর্তৃক দুই নেত্রীকে লেখা চিঠির কথাও আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। ওই চিঠিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, সহিংসতা বন্ধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে। সিনেটর মেনডেজ মার্কিন সিনেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান।ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে ১৬ জানুয়ারি। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয়েছে সাতটি বিষয়ে। এগুলো অনেকটা এরকম- ১. নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা, ২. সহিংসতা বন্ধে সংকট উত্তরণের পথ বের করতে সব পক্ষের কার্যকর আলোচনায় বসা, ৩. স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন, ৪. বিরোধী নেতাদের কারাবন্দি রাখার ঘটনায় নিন্দা এবং সহিংসতার ঘটনায় বিরোধী দলের (নবম সংসদের) জড়িত থাকার নিন্দা ও দল নিষিদ্ধ, ৫. গণগ্রেফতার বন্ধ ও শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, ৬. ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং ৭. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।ব্রিটেনের হাউস অব কমনসে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে ১৭ জানুয়ারি। সেখানে আছে পাঁচটি প্রস্তাব। ১. একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, ২. সব রাজবন্দির মুক্তি, ৩. সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন, ৪. সহিংসতা বন্ধ এবং ৫. একটি ‘বিতর্কিত’ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিলুপ্তি।
মোটা দাগে আমরা এ তিন সিদ্ধান্ত যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে এতে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত একটি মিল খুঁজে পাই। এগুলো হচ্ছে- ১. অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন, ২. অবিলম্বে স্থগিত হয়ে যাওয়া সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ৩. সহিংসতা বন্ধ করা। লক্ষণীয়, সবাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বললেও বর্তমান দশম সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা কেউ বলেনি। তবে যে ভাষা তারা ব্যবহার করেছে, তাতে এটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে, দশম সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় তারা খুশি নয়। সব দলের অংশগ্রহণ এতে হয়নি, এমন অভিমতও দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকরা। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের হাউস অব কমনসে গৃহীত সিদ্ধান্তে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছে, যা অন্য কেউ বলেনি। এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘সন্ত্রাসে জড়িত দল নিষিদ্ধ করা উচিত’ বলে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দলকে বোঝানো হয়নি। সাম্প্রতিককালে সহিংস ঘটনাবলীর জন্য জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম অভিযুক্ত। সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেবে- ইইউ’র এ সিদ্ধান্ত কি জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে? সরকার কি সিদ্ধান্তটি নেবে? সরকারের হাতে একাধিক ‘অপশন’ আছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার। কী করবে সরকার এখন?এসব প্রস্তাব ও সিনেটর মেনডেজের চিঠির মধ্য দিয়ে একটি মেসেজ আমরা পাচ্ছি আর তা হচ্ছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটা পথ হল একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে ‘সংলাপ’ শুরু করা। এদিকে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটি আশংকার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুই বড় দলের মাঝে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে আংশিক ব্রিটিশ সহযোগিতা হারাতে পারে বাংলাদেশ।এসব মন্তব্য এখন বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার হার্ড লাইনে গেলে ভুল করবে। ১৩ জানুয়ারি বিএনপি ঢাকায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে কূটনীতিকরা মন্তব্য করেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। তারা সহিংসতা পরিহার করে সব দলের প্রতি সমঝোতার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। জাতির জন্য, সমাজের জন্য সহিংসতা কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে, বিশেষ করে বিরোধী দলের মাঝে এ উপলব্ধিটা আসতে হবে। তবে এটা ভালো খবর, নির্বাচনের পরপরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নির্বাচনের পর দেশে তেমন সহিংসতার খবর আসছে না। সরকারও তেমন শক্ত অবস্থানে যায়নি।উপরে উল্লিখিত তিনটি সিদ্ধান্তেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গটি এসেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আক্রান্ত হয়েছেন বেশি। আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, নির্বাচনের আগে ও পরে এ সম্প্রদায়ের লোকদের টার্গেট করে আক্রমণ করা হয়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এটা অতীতে বারবার হয়েছে। এবারও হল এবং খুব আশ্চর্যজনকভাবে আমরা এবার লক্ষ্য করলাম, এ সহিংস ঘটনার সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি দলের লোকজনও জড়িত। এ ধরনের একটি অভিযোগ এনেছেন হিন্দু-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জনৈক নেতা। বিষয়টা হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেই থাকুক, সে রাষ্ট্রের শত্র“, সমাজের শত্র“। আমরা চাইব, সরকার একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এসব ঘটনায় যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। এ ঘটনায়ও বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে।বিদেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ নিয়ে যখন কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তখন আগামীতে বিএনপি ভূমিকাও একটা প্রশ্নের মুখে থাকবে অনেকের কাছে। আশার কথা, বিএনপি কোনো হরতাল আর অবরোধের কর্মসূচি দেয়নি। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার। খালেদা জিয়া উপলব্ধি করেছেন, হরতাল আর অবরোধে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। আর এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। সহিংসতায় সাধারণ মানুষের যেমন সমর্থন থাকে না, তেমনি বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তা সমর্থন করে না। বিএনপি ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে যে বৈঠক করেছিল, তাতে কূটনীতিকরা সবাই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এদিকে বিএনপি ২০ জানুয়ারি ঢাকায় একটি গণসমাবেশ করেছে। সরকারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করার জন্য এ ধরনের সমাবেশ বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত। সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি ২৯ জানুয়ারি কালো পতাকা প্রদর্শনের ডাক দিয়েছে। সবার জানা, ওইদিন দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়া আবার প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ করার কথা বলেছেন। এটাও ভালো দিক। এতে করে কর্মীদের ধরে রাখা ও উজ্জীবিত করা সহজ হবে। খালেদা জিয়া সংলাপের কথা বলেছেন। এ অ্যাপ্রোচটাও ভালো। মূলত একটি সমঝোতা ও সংলাপের কথা সবাই বলছেন। দাতাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তাতে এ সংলাপের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার এ আহ্বান নিঃসন্দেহে এখন একটি সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থা না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আপতত সহিংসতানির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটল।দু’সপ্তাহ পরই ভাষা আন্দোলনের মাস। সুতরাং ভাষার মাসে বিএনপি কোনো বড় কর্মসূচি দেবে না, এটাই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে মার্চ হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। এ মাসেও বিএনপি হরতাল আর অবরোধের মতো কর্মসূচি দেবে না, এটাও ধারণা করা যায়। কিন্তু তাতে করে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনো অবসান হবে কি? আমার মনে হয় না। সরকার যদি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে সমস্যা যা ছিল, তাই থেকে যাবে। খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর ‘রাজনীতির বলটি’ এখন স্পষ্টতই তিনি ঠেলে দিলেন সরকারের কোর্টে। সরকার যদি নমনীয় না হয়, তাহলে সমস্যা যা ছিল, তা-ই থেকে যাবে। তবে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহ্রিয়ার আলম। একেবারেই আনকোরা একজন মানুষ। ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় তিনি প্রস্তুত। তিনি দলের শীর্ষ নেতা নন। নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায়ও তিনি জড়িত নন। তবু তার অ্যাপ্রোচটি আমার ভালো লেগেছে। রাজনীতিতে এ ‘রিয়েল পলিটিকস’টাই হল আসল কথা। বাস্তবতা মেনে নেয়ার মধ্যেই দেশ ও জাতির মঙ্গল নিহিত। আর বাস্তবতা বলে বিএনপি একটি বড় দল। এ দলকে বাইরে রেখে দেশে স্থিতিশীল রাজনীতি প্রত্যাশা করা যাবে না। এতে করে নানা জটিলতা তৈরি হবে। তবে সরকারপ্রধান একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। শর্তটি হচ্ছে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে। বিএনপির জন্য কাজটি কঠিন, সন্দেহ নেই। তবে সরকারের জন্য একটি সুযোগ তো আছে। সংবিধানের ৩৮(গ) ও (ঘ), রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস্ অর্ডিন্যান্স ১৯৭২, দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮-এর ধারা-উপধারা বলে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ কিংবা উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলার ফয়সালা করে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নামে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনগত ও সাংবিধানিকভাবেই যাওয়া উচিত। এটাকে সংলাপের পূর্বশত করা উচিত নয়। তবে এটা তো ঠিক, বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের মাঝে এ উপলব্ধি এসেছে যে, বিএনপির জামায়াতকে পরিত্যাগ করা উচিত।তবে আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। যদি সংলাপ হয়ও, তাতে কি কোনো ফল পাওয়া যাবে? সংলাপে মূল আলোচ্য বিষয় কী? একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন? তাতে সরকার হয়তো রাজি হবে। কিন্তু নির্বাচনটা হবে কোন সরকারের অধীনে? অন্তবর্তীকালীন সরকার? সংবিধানে তো সেভাবেই লেখা আছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই তো নির্বাচন হওয়ার কথা। বিএনপি তা কি মানবে? যদি এটা বিএনপিকে মানতেই হয় তাহলে প্রশ্ন উঠবে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিল না কেন? আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, সংবিধানে বর্ণিত অন্তবর্তীকালীন সরকারের ফর্মুলা বাদ দিয়ে (যেখানে শেখ হাসিনাই থেকে যাবেন সরকারপ্রধান হিসেবে) অন্য কোনো ফর্মুলায় বিএনপি রাজি হবে। ফলে সংলাপ হলেও তা কোনো ফল দেবে না- আমার আশংকা এখানেই। তাহলে কী হতে পারে ভবিষ্যতে? নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে, যেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সত্যিকার অর্থেই ‘ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৮ দলীয় জোট থেকে কেউ যদি মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়, আমি অবাক হব না। গুজব আছে ১৮ দলের দুই দলীয় প্রধানকে নিয়ে। বিএনপির ভেঙে যাওয়া এবং সরকারে যোগ দেয়ার সম্ভাবনাকেও আমি উড়িয়ে দেই না। বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন আছে। সরকার উপজেলা নির্বাচন দিতে যাচ্ছে। আমার ধারণা, বিএনপির সমর্থকরা এতে অংশ নেবেন এবং ওই নির্বাচনের ফলাফল বিএনপিকে একসময় বাধ্য করতে পারে প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে। একটা বড় ধরনের অবরোধ আর হরতালের কর্মসূচির পর বিএনপির পক্ষে কঠিন হবে আন্দোলন সংগঠিত করা। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে এবং কোন প্রতিক্রিয়ায় জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়।বাংলাদেশে এখন একধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাশিয়ার গণতন্ত্র কিংবা মালয়েশিয়ার ঐকমত্যের রাজনীতি এ ক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে। সরকার যদি এখন সিঙ্গাপুরের গণতান্ত্রিক মডেল ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়, আমার ধারণা তাতে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি থাকবে না। সেই সঙ্গে দরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সব ধরনের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সংসদ নির্বাচন হয়েছে। বিদেশ থেকে সমর্থনও আসছে। এখন তিনটি দেশের পার্লামেন্টে গৃহীত সিদ্ধান্তে দেশে সরকার পরিচালনায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে বলে আমার মনে হয় না। Daily JUGANTOR 23.01.14

বিএনপির রাজনীতি এখন কোন পথে : তারেক শামসুর রেহমান

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন 'প্রতিহত' ঘোষণার 'ব্যর্থতা' এবং দীর্ঘ প্রায় এক মাসজুড়ে চলা হরতাল-অবরোধের পর যে প্রশ্নটি এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে বিএনপি এখন কী করবে? কোন পথে এখন বিএনপি? দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও, বাস্তবতা হচ্ছে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি ওই সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল। কিন্তু নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। যেখানে ৩৫ থেকে ৪০টি কেন্দ্রে কোনো ভোট পড়েনি, যেখানে ৫২ ভাগ জনগোষ্ঠী আদৌ তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, সেখানে 'নির্বাচন'-এর নামে একটি নির্বাচন হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় 'বিজয়ী হয়েছে গণতন্ত্র'। ওই নির্বাচন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও, বাস্তবতা হচ্ছে আগামী ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিএনপিকে ছাড়াই সংসদ অধিবেশন বসছে। যদিও এর আগে ১৯৮৬ সালে ও ১৯৮৮ সালেও (তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ) বিএনপি সংসদে ছিল না। তবে ওই সংসদ টিকে ছিল ১৭ মাস ও ৩১ মাস। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। নবনিযুক্ত মন্ত্রীরা বলছেন, এই সংসদ থাকবে ৫ বছর। সংবিধানে এই ৫ বছরের কথাই বলা আছে। যেখানে সংসদ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের কথা, সেখানে বিএনপি তথা ১৮ দলের অংশগ্রহণ না থাকায়, এ সংসদ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে বিএনপির ভবিষ্যৎ এখন কী? গেল বুধবার খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে নয়া কর্মসূচি দিয়েছেন। তার বক্তব্যে অনেক দিক আছে। প্রথমত, তিনি কোনো অবরোধ আর হরতালের কর্মসূচি দেননি। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার। তিনি বোধ করি উপলব্ধি করেছেন যে হরতাল আর অবরোধে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। আর এই সহিংসতায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশি। সহিংসতায় সাধারণ মানুষের যেমনি সমর্থন থাকে না, ঠিক তেমনি বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও তা সমর্থন করে না। বিএনপি ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যে বৈঠক করেছিল, তাতে কূটনীতিকরা সবাই এই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বিএনপি ২০ জানুয়ারি ঢাকায় একটি গণসমাবেশ করেছে। সরকারের ওপর 'চাপ' প্রয়োগ করার জন্য এ ধরনের সমাবেশ বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত। তৃতীয়ত, বিএনপি ২৯ জানুয়ারি কালো পতাকা প্রদর্শনের ডাক দিয়েছে। সবার জানা ওই দিন দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। চতুর্থত, খালেদা জিয়া আবার প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ করার কথা বলেছেন। এটাও ভালো দিক। এতে কর্মীদের ধরে রাখা ও উজ্জীবিত করা সহজ হবে। পঞ্চমত, খালেদা জিয়া সংলাপের কথা বলেছেন। এই অ্যাপ্রোচটাও ভালো। মূলত একটি সমঝোতা ও সংলাপের কথা সবাই বলছেন। দাতাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তাতে এ সংলাপের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। খালেদা জিয়ার এ আহ্বান নিঃসন্দেহে এখন একটি সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থা না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আপাতত সহিংসতানির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটল। কিছুদিন পরেই ভাষার মাস। সুতরাং ভাষার মাসে বিএনপি কোনো বড় কর্মসূচি দেবে না, এটাই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে মার্চ হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। এ মাসেও বিএনপি হরতাল আর অবরোধের মতো কর্মসূচি দেবে না, এটাও ধারণা করা যায়। কিন্তু তাতে করে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনো অবসান হবে কি? আমার মনে হয় না। সরকার যদি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে সমস্যা যা ছিল, তা থেকে যাবে। খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর 'রাজনীতির বল'টা এখন স্পষ্টতই সরকারের কোর্টে। সরকার যদি সংলাপের ব্যাপারে আন্তরিক না হয়, তাহলে সমস্যা যেভাবে ছিল, সেভাবেই থেকে যাবে। বরং তাতে জটিলতা আরো বাড়বে। খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে বলেছেন, জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল। এর সঙ্গে অনেকেই ঐক্য করেছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন তিনি হয়তো এ ব্যাপারে একটি ঘোষণা দেবেন। কৌশলগত কারণে সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন। এর আগে তো তিনি একটি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমকে স্পষ্ট করেছেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। আমরা যারা রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি, আমরা সবাই জানি রাজনীতি বিষয়ে সেই বিখ্যাত উক্তিটি 'রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই, স্থায়ী কোনো শত্রু নেই।' এটা তো সত্যি, এই জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। ১৯৮৬ সালে দেশে যখন তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (এরশাদীয় জমানায়), তখন বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশ নিয়েছিল। সুতরাং রাজনীতিতে 'স্থায়ী শত্রু, স্থায়ী মিত্র'র ধারণা থেকে বিএনপি-জামায়াত ঐক্য টিকে আছে। আগামীকে এই ঐক্য নাও টিকে থাকতে পারে! তাই বোধ করি খালেদা জিয়া বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি এবার ধীর গতিতে এগুচ্ছেন। নির্বাচনটা হয়ে গেছে। মন্ত্রিসভাও হয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা। এ মন্ত্রিসভা নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক, নির্বাচন নিয়ে যত বিরূপ মন্তব্যই আসুক না কেন, সরকার এটাকে আদৌ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। তাই বিএনপি তথা ১৮ দলের কাছে বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ১৮ দল এখন হরতাল নয়, বরং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখেই তাদের স্ট্রাটেজি ঠিক করছে। এ কারণেই দেখা যায় বিএনপি কোনো কঠোর কর্মসূচি দেয়নি। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার পুরো বিষয়টাই এখন নির্ভর করছে সরকারের ওপর। সরকার কি আদৌ বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাবে? আর যদি সমঝোতায় যায়ও, তাহলে এর ধরন কী হবে? বিএনপির তো দাবি ছিল একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সরকার সেটা মানেনি। এবং আগামীতে যে মানবে, তাও নয়। কিছুটা নমনীয় হয়ে বিএনপির দাবি ছিল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারথ তাও হয়নি। বিএনপির আরো একটি দাবি ছিলথ শেখ হাসিনাকে বাইরে রেখে যে কোনো অন্তর্র্বতীকালীন সরকারে তারা নির্বাচনে যেতে রাজি। তাও হয়নি। তাহলে বিএনপি কোন দাবিকে মুখ্য করে এখন আন্দোলনে যাবে? মধ্যবর্তী নির্বাচন? কিন্তু তাও খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। ভোটকেন্দ্রে কেউ আসুক, না আসুক, নির্বাচন হয়েছে। 'সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন' হয়নি। যারা রাজনীতিতে 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' নিয়ে কাজ করেন, তারা এখন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে একটি 'ষড়যন্ত্র আবিষ্কার' করে ফেলতে পারেন! বলতে দ্বিধা নেই। একটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত নির্বাচন এটি হলো না। আমাদের দুর্ভাগ্য এ জাতি আবারো একটি নির্বাচন দেখল, যেখানে প্রধান একটি দলের আদৌ কোনো অংশগ্রহণ নেই। ইতোমধ্যে দশম সংসদের ২৯৬ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। নয়া মন্ত্রিসভা গঠিত হলো ১২ জানুয়ারি রোববার। এর মধ্য দিয়ে দশম সংসদ তার যাত্রা শুরু করল। তবে এ সংসদ নিয়ে 'কিছু' এবং 'কিন্তু' আছে। এ শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি বড় ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ৬৫(২) ধারায় বলা আছে, 'একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ৩০০ সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।' এর অর্থ যারা শপথ নিয়েছেন, তারা সংবিধান মোতাবেক বৈধ কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ এখনো বহাল আছে। আরো মজার ব্যাপার এর মধ্য দিয়ে ১২২ আসনে এখনো দুজন করে এমপি! এটা তো স্পষ্টতই সংবিধানে ৬৫(২) ধারার বরখেলাপ। আমি জানিনা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা তাকে বিষয়টির কীভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আরো একটা মজার কাহিনী আমাকে শুনিয়ে ছিলেন অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, যিনি নয়া মন্ত্রিসভায়ও আছেন। তিনি জাতীয় পার্টির নেতা। বৃহস্পতিবার তিনি আমার সঙ্গে এটিএন নিউজের টকশোয় আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন। তিনি বললেন, জাতীয় পার্টি সরকারেও থাকবে, আবার বিরোধী দলেও থাকবে। কী অদ্ভুত কথা! গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের কথা কেউ কখনো শোনেনি। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা আমাদের এ ধরনের কথা শোনাচ্ছেন! রাজনীতির ছাত্র হিসেবে আমি কোথাও পাইনি যে দল একই সঙ্গে সরকারে থাকবে, আবার বিরোধী দলেও থাকবে। আমরা গণতন্ত্রের এ কোন রূপ বাংলাদেশে দেখছি! এরশাদ সাহেব আরো বিতর্কিত করলেন নিজেকে। তার অনেকদিনের স্বপ্ন সরকারের 'বিশেষ দূত' তিনি হবেন। এবার হলেন। কিন্তু 'অসুস্থ' হয়ে, গল্ফ খেলে, নিজেকে 'থু থু এরশাদ' হিসেবে পরিচিত করে তিনি কী পেলেন, জানিনা। কিন্তু দেশে রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে একটা বাজে ধারণার জন্ম দিলেন। জনগণের ওপর 'চাপিয়ে' দেয়া এই যে রাজনীতি, এই রাজনীতি আর যাই হোক জনগণের মঙ্গলের জন্য যে রাজনীতি, তা নয়। আরো একটি খবরথ নতুন নির্বাচন চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। রিটটি করেছেন নবম সংসদের বিএনপির সংসদীয় দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। এ রিটের ভবিষ্যৎ কী আমরা জানি না। কিন্তু রাজনীতির বিষয়টিকে আমরা আবারো আদালতে নিয়ে গেলাম। এই প্রবণতা ভালো নয়। মঙ্গলও নয়। রাজনীতির বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হওয়া উচিত। তাই তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবেন আমি জানিনা। কিন্তু আমি বুঝি দেশে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার জন্য বিএনপির সঙ্গে 'সমঝোতা' ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি তার 'অবরোধ আর হরতালের' কর্মসূচি চূড়ান্তভাবে পরিত্যাগ করেছে, এটা মনে হয় না। যদিও রাজধানীতে অবরোধ আর তেমনভাবে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারে না আগের মতো। কিন্তু 'সংসদের বাইরে' থাকা বিএনপির এ কর্মসূচি ছাড়া বিকল্প কিছু আছে কি? 'নির্বাচন' হয়েছে। সেখানে যত কম ভোটই পড়ুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই নির্বাচন বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার 'মৃত্যু' ঘটাল। সরকার এ নির্বাচন দিয়ে তার 'লেজিটেমেসি' বাড়িয়েছে। সুতরাং আগামী দিনগুলো নিয়ে একটা শঙ্কা থেকেই গেল। আমার বিবেচনায় বিএনপি এখন সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছে। হরতাল আর অবরোধ না দিয়ে বহির্বিশ্বে তার ইমেজ বাড়াতে চাইছে বিএনপি। সরকারের উচিত হবে তাই বিএনপির সঙ্গে একটা 'সংলাপ' শুরু করা। এ কাজটি করতে আমাদের যত দেরি হবে, রাজনীতিতে অস্থিরতা তত বাড়বে।

সংসদ মন্ত্রিসভা ও বিবিধ প্রশ্ন

অনেক ‘বিতর্কের’ জন্ম দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভাও শপথ নিয়েছে এবং বোধকরি গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রথম একটি দেশ যেখানে নামমাত্র একটি বিরোধী দল সরকারেও আছে, আবার একইসঙ্গে বিরোধী দলেও আছে। শুধু তাই নয়, এমন একটি নির্বাচন হলো, যেখানে ১৫৩ জন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ও হলেন! আরও অবাক করার বিষয়Ñ নবম জাতীয় সংসদকে রেখেই দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হলো এবং দশম জাতীয় সংসদ থেকে সদস্যদের নিয়ে মন্ত্রিসভাও গঠিত হলো! পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল। পুরো প্রক্রিয়াটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে। এরই মধ্যে হাইকোর্টে দু’দুটো রিট করা হয়েছে। এ রিটের ভাগ্য কী, তা আমরা জানি না, তবে সংবিধান যারা বোঝেন, ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তাদের কারও কারও মতামত আমরা পেয়েছি। আর ওইসব মতামত সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করে না। সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই যেখানে সংবাদপত্রে, টিভি টকশোতে বারবার বলা হচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে একটা ‘সমঝোতায়’ যেতে, সেখানে নয়া মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে করে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। যে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সারা বিশ্বেই একটা প্রশ্নের মুখে, সেখানে অনেক সিনিয়র মন্ত্রীকে বলতে শুনলামÑ ‘সরকার থাকবে পাঁচ বছরের জন্য’! সাধারণ নিয়মে একটা সরকার পাঁচ বছরই থাকে। কিন্তু যে ‘নির্বাচন’ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে যে সংসদ তার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে, সেই সংসদের আয়ুষ্কাল পাঁচ বছর বলা হলে সমঝোতার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বুধবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল নয়া কর্মসূচি দিয়েছে। ২৯ জানুয়ারি নয়া সংসদের উদ্বোধনী দিন। ওইদিন হরতাল দেয়নি প্রধান বিরোধী দল। এটাকে সমঝোতা ও সংলাপের ব্যাপারে শুভ সঙ্কেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপির এই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ভূমিকা কিরূপ হয় নির্বাচন হয়ে গেছে। ওই ‘নির্বাচন’ নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদের ২৯২ জন সদস্যই শপথ নিয়েছেন (বাকি ৮টি আসনে নির্বাচন হয়নি)। সংবিধান অনুযায়ী তারা এখন সংসদ সদস্য, তবে সরকারি ভাষ্য মতে, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন ২৪ তারিখের পর। অর্থাৎ নবম সংসদ বিলুপ্ত হলো না। নিয়মমাফিক ২৪ তারিখ ওই সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং দশম সংসদের কার্যক্রম শুরু হবে। এ নির্বাচন এবং শপথ গ্রহণ নিয়ে অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ১৪৮ ২(ক) অনুযায়ী সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা অনুসরণ করে সংসদ সদস্যরা (দশম সংসদ) শপথ নিয়েছেন। এটা সংবিধান অনুযায়ী করা হয়েছে। কিন্তু ১৪৮(১) যদি আমরা অনুসরণ করি, তাহলে দেখব এ ধারা বলে যে শপথ গ্রহণ করা হলো তা ৬৫(২) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৪৮(১) ধারাটা এরকম ‘তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত যে কোনো পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যগ্রহণের পূর্বে উক্ত তফসিল অনুযায়ী শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দান করিবেন।’ এর অর্থ কী? এমপি সাহেবরা শপথ নিয়েছেন কার্যগ্রহণের আগে। অর্থাৎ ৯ তারিখ থেকেই তিনি সংসদ সদস্য! কিন্তু ১২২টি আসনে যেখানে অন্য এমপি রয়েছেন, তার কী হবে? সংবিধানের কোথাও কিন্তু বলা হয়নি নয়া এমপি দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো এমপি আর তার দায়িত্বে থাকবেন না। এখানে এক ধরনের জটিলতা রয়েছে। দেশের আইনজীবীরাও এ ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত। এ দেশে যিনি আজীবন কোম্পানি আইন পড়েছেন, কোম্পানি আইনে মামলা-মোকদ্দমা করেন, তিনি হয়ে যান সংবিধান বিশেষজ্ঞ! তারা তাদের মতো করে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেন। এখন শপথ গ্রহণের বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, সে ব্যাপারে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে। ব্যাখ্যাটা আদালতই দেবেন। এমনকি সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কিংবা ড. কামাল হোসেন, যারা সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত, তারা আদালতের কাছে স্বউদ্যোগেও একটা ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটা ভালো। মন্ত্রিসভা হয়েছে। এই মন্ত্রিসভা ভালো কী মন্দ এ নিয়ে কম কথা হয়নি এ ক’দিনে। বিতর্কিত মন্ত্রীরা বাদ পড়েছেন। বলা হচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে, যারা বেশি কথা বলে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করতেন, তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। এটা তো ঠিক, যারা মন্ত্রী হয়ে অঢেল টাকার মালিক হয়েছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রী দূরে সরিয়ে রেখেছেন। নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্ত অন্যদের একটা মেসেজ পৌঁছে দেবে। অর্থাৎ যারা নতুন মন্ত্রী হয়েছেন, তারা দুর্নীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখবেন। এ সিদ্ধান্তটি ভালো। তরুণ অনেক মুখ ছোট মন্ত্রী হয়েছেন। এটাও ভালো। এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হবে। এটা খুবই দরকার। দলের সিনিয়র নেতারা সম্ভবত শেষবারের মতো কেবিনেটে থাকলেন। আগামীতে আর বয়সের ভারে তারা কর্মক্ষম থাকবেন না। সুতরাং নয়া নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তবে মন্ত্রিসভায় দক্ষ ও আধুনিকমনস্ক লোকদের আমি কম দেখেছি। একুশ শতকে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আধুনিকমনস্ক, শিক্ষিত ও যোগ্য মন্ত্রী দরকার। যদি সংসদে না থাকেন তাহলে টেকনোক্রেট কোটায় বাইরে থেকে নিতে হবে। কিন্তু যাকে টেকনোক্রেট কোটায় নেয়া হলো তিনি ঠিক এ মানদ-ে পড়েন না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ব্যক্তি দরকার। বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। পুনরুদ্ধারে দরকার যোগ্য ব্যক্তি। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে আমাদের দেশ সম্পর্কে একটা বাজে ধারণার জন্ম হয়েছে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, সিনেটে অবিলম্বে সংলাপ শুরুর আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাঁচজন সিনেটর রিচার্ড ডারবিন, জজ বুজম্যান, বারবারা বস্ক্রার, মাইকেল রি এন্ডি ও সিনেটর ক্রিস্টোফার এস মার্ফি ১১ ডিসেম্বর এই প্রস্তাবটি পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট কমিটিতে পাঠান। এটি নিয়েই আলোচনা হয়। সিনেটে গৃহীত প্রস্তাবে ছয়টি বিষয় রয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সত্যিকার অর্থে সংলাপ, অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ, নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা প্রদান, তারানকোর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি। একই সঙ্গে সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান রবার্ট মেনডেজ দুই নেত্রীকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী) যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, সহিংসতা বন্ধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে। সিনেটর মেনডেজের চিঠিটি ছাপা হয়েছে শনিবার। সিনেটের প্রস্তাব ও সিনেটর মেনডেজের চিঠির মধ্য দিয়ে একটি মেসেজ আমরা পাচ্ছি আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটা পথ হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে ‘সংলাপ’ শুরু করা। এদিকে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটি আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুটি বড় দলের মাঝে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে আংশিক ব্রিটিশ সহযোগিতা হারাতে পারে বাংলাদেশ। এসব মন্তব্য এখন বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার হার্ডলাইনে গেলে ভুল করবে। ১৩ জানুয়ারি বিএনপি ঢাকায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে কূটনীতিকরা মন্তব্য করেছেন, দশম নির্বাচনে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। তারা সহিংসতা পরিহার করে সব দলের প্রতি সমঝোতার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। জাতির জন্য, সমাজের জন্য এ সহিংসতা কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে, বিশেষ করে বিরোধী দলের মাঝে এ উপলব্ধি বোধটুকু আসতে হবে। তবে এটা ভালো খবর যে, নির্বাচনের পরপরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নির্বাচনের পর দেশে তেমন সহিংসতার খবর আসছে না। জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব এখন আলোচিত হতে থাকবে বারবার। নির্বাচনের আগে দলটি আরেক দফা ভেঙে গেছে। বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচনের পর বর্তমান মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি মন্ত্রিসভাকে বড় ধরনের বিতর্কের মাঝে ফেলে দিয়েছে। যতদূর জানা যায়, ২০০৬ সালে হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত একটি পর্যবেক্ষণ ছিল। তাতে বলা হয়েছিলÑ একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা অনৈতিক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সংবিধানবহির্ভূত। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শনিবার হাইকোর্টের এ পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে ঐকমত্যের সরকারের বিরোধিতা করেছেন। এখানে ঐকমত্যের ধারণার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু ঐকমত্যের ব্যানারে যাদের পেলাম তারা সবাই মূলত আগের মহাজোট সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাতে ‘ঐকমত্য’ সরকার হলো কোথায়? অনেকেই এটা স্বীকার করবেন, বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে একটা ঐকমত্যের সরকারের প্রয়োজন ছিল। এটা ভালো হতো যদি সব দল ও মতের প্রতিনিধিত্ব এই মন্ত্রিসভায় থাকত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকেও এ মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। কেননা, পরিস্থিতি এটাই দাবি করে। তবে সংবিধান যেহেতু ‘সংসদ সদস্য নন’ এমন লোকদের নিয়ে মন্ত্রী করার বিধান সীমিত, এক্ষেত্রে টেকনোক্রেট কোটায় কিংবা উপদেষ্টা পরিষদে তাদের রাখা যেত। মন্ত্রিসভায় সব মতের প্রতিনিধিত্ব থাকলে, সঙ্কট সমাধানের পক্ষে আমরা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু সেটা হলো না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা দরকার। গেজেটে রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাকে সে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার দল যখন মন্ত্রিসভায় থাকে, তখন তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ছুরিকাঘাতের শামিল। বেশ কিছুদিন ধরেই জাতীয় পার্টির মাঝে একটা ধারা লক্ষ্য করা গেছেÑ আর তা হচ্ছে, মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ! এখন রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতা বানিয়ে তারা নিজেরা মন্ত্রী হলেন। আমি এর আগেও বলেছি এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির একটা অংশ আওয়ামী লীগের মাঝে বিলীন হয়ে যাবে, অপর অংশ চলে যাবে বিএনপিতে। এরশাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও তার সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে তৃতীয় দল হিসেবে জাতীয় পার্টির বিকশিত হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, সেই সম্ভাবনার ‘মৃত্যু’ ঘটেছে। অতীতেও একাধিকবার জাতীয় পার্টি ভেঙেছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জু কিংবা সর্বশেষ কাজী জাফর মূল দল ত্যাগ করে আলাদাভাবে সংগঠিত হয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কিংবা নাজিউর রহমান মঞ্জু ‘এক দল এক নেতা’ হিসেবে বিবৃতির মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখলেও লাভবান হয়েছেন এক জায়গায়। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আবারও মন্ত্রী হয়েছেন। আর নাজিউর রহমান মঞ্জুর অবর্তমানে তার ছেলে দলটিকে ভোলাকেন্দ্রিক একটি দলে পরিণত করেছেন। সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত জাতীয় পার্টির কারোরই নেই। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গেছে, মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার জন্যই যেন রাজনীতি! আর এ রাজনীতির কারণেই জাতীয় পার্টি আগামীতে তার অস্তিত্ব হারাবে। বুধবার খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে নয়া কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তার বক্তব্যের অনেক দিক আছে। প্রথমত, তিনি কোনো অবরোধ আর হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার। তিনি বোধকরি উপলব্ধি করেছেন, হরতাল আর অবরোধে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। আর এ সহিংসতায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। সহিংসতায় সাধারণ মানুষের যেমনি সমর্থন থাকে না, ঠিক তেমনি বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রগুলোও তা সমর্থন করে না। বিএনপি ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে যে বৈঠক করেছিল, তাতে কূটনীতিকরা সবাই ওই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, ‘চাপ’ প্রয়োগ করার জন্য এ ধরনের সমাবেশ বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত। তৃতীয়ত, বিএনপি ২৯ জানুয়ারি কালো পতাকা প্রদর্শনের ডাক দিয়েছে। সবার জানা ওই দিন দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। চতুর্থত, খালেদা জিয়া আবার প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ করার কথা বলেছেন। এটাও ভালো দিক। এতে করে কর্মীদের ধরে রাখা ও উজ্জীবিত করা সহজ হবে। পঞ্চমত, খালেদা জিয়া সংলাপের কথা বলেছেন। এই প্রচেষ্টাও ভালো। মূলত একটি সমঝোতা ও সংলাপের কথা সবাই বলছেন। দাতাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তাতে এ সংলাপের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। খালেদা জিয়ার এ আহ্বান নিঃসন্দেহে এখন একটি সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থা না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আপাতত সহিংসতানির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটল। ক’দিন পরই ভাষার মাস। সুতরাং ভাষার মাসে বিএনপি কোনো বড় কর্মসূচি দেবে না, এটাই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে মার্চ হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। এ মাসেও বিএনপি হরতাল আর অবরোধের মতো কর্মসূচি দেবে না, এটাও ধারণা করা যায়। কিন্তু তাতে করে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনো অবসান হবে কি? আমার মনে হয় না। সরকার যদি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে সমস্যা যা ছিল, তা থেকে যাবে। খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর ‘রাজনীতির বল’টা এখন স্পষ্টতই সরকারের কোর্টে। সরকার যদি সংলাপের ব্যাপারে আন্তরিক না হয়, তাহলে সমস্যা যেভাবে ছিল, সেভাবেই থেকে যাবে। বরং তাতে জটিলতা আরও বাড়বে। খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কছেদের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে বলেছেন, জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল, এর সঙ্গে অনেকেই ঐক্য করেছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তিনি হয়তো এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত দেবেন। কৌশলগত কারণে সম্পর্কছেদের বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন। এর আগে তো তিনি একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট করেছেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। আমরা যারা রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি, তারা সবাই জানি রাজনীতি বিষয়ে সেই বিখ্যাত উক্তিটি ‘রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই, স্থায়ী কোনো শত্রু নেই।’ এটা তো সত্য, এ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। ১৯৮৬ সালে দেশে যখন তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (এরশাদীয় জমানায়), তখন বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশ নিয়েছিল। সুতরাং রাজনীতিতে ‘স্থায়ী শত্রু, স্থায়ী মিত্র’-এর ধারণা থেকে বিএনপি-জামায়াত ঐক্য টিকে আছে। আগামীতে এ ঐক্য নাও টিকে থাকতে পারে। তাই বোধকরি খালেদা জিয়া বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি এবার যাচ্ছেন ধীরগতিতে। নির্বাচনটা হয়ে গেছে। মন্ত্রিসভাও হয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা। এই মন্ত্রিসভা নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক, নির্বাচন নিয়ে যত বিরূপ মন্তব্যই আসুক না কেন, সরকার এটাকে আদৌ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। তাই বিএনপি তথা ১৮ দলের কাছে বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ১৮ দল এখন হরতাল নয়, বরং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখেই তাদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করছে। এ কারণেই দেখা যায়, বিএনপি কোনো কঠোর কর্মসূচি দেয়নি। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার পুরো বিষয়টিই এখন নির্ভর করছে সরকারের ওপর। Daily Alokito Bangladesh 22.01.14

ইতিহাসে কীভাবে চিহ্নিত হবে?

গত বৃহস্পতিবার দশম সংসদের ২৮৩ সদস্য শপথ নিয়েছেন। আর শনিবার নিলেন এরশাদ। পুরো মন্ত্রিসভা গঠিত হলো রোববার। এর মধ্য দিয়ে দশম সংসদ তার যাত্রা শুরু করল। তবে এই সংসদ নিয়ে ‘কিছু’ এবং ‘কিন্তু’ আছে। বৃহস্পতিবারের ওই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি বড় ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ৬৫ (২) ধারায় বলা আছে ‘একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিনশত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।’ এর অর্থ যারা শপথ নিয়েছেন তারা সংবিধান মোতাবেক বৈধ কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ এখনো বহাল আছে। আরো মজার ব্যাপার ১২২ আসনে এখন দুজন করে এমপি! এটা তো স্পষ্টতই সংবিধানের ৬৫(২) ধারার বরখেলাপ। আমি জানি না প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা তাকে বিষয়টির কীভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আরো একটা মজার কাহিনী আমাকে শুনিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ যিনি নয়া মন্ত্রিসভায়ও আছেন। তিনি জাতীয় পার্টির নেতা। বৃহস্পতিবার তিনি আমার সঙ্গে এটিএন নিউজের টকশোতে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। তিনি বললেন, জাতীয় পার্টি সরকারেও থাকবে, আবার বিরোধী দলেও থাকবে। কী অদ্ভুত কথা! গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের কথা কেউ কখনো শোনেনি। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা আমাদের এ ধরনের কথা শোনাচ্ছেন! রাজনীতির ছাত্র হিসেবে আমি কোথাও পাইনি যে, দল একইসঙ্গে সরকারের থাকবে, আবার বিরোধী দলেও থাকবে। আমরা গণতন্ত্রের এ কোন রূপ বাংলাদেশে দেখছি?
বৃহস্পতিবার এমপিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি সম্পর্কে যে ‘গুজব’ এতদিন ভাসছিল তা বাস্তবে রূপ পেল। শপথ গ্রহণের আগেরদিন রওশন এরশাদ ‘জীবনের প্রথমবারের মতো’ সংবাদ সম্মেলনে করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনিই হতে যাচ্ছেন সংসদ বিরোধী দল নেতা। এরশাদ নন কেন? জবাবটা সোজাসাপ্টা। যেহেতু এরশাদ রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাই তার পক্ষে বিরোধীদলীয় প্রধান হওয়া শোভা পায় না। অথচ তিনি কিনা বিশেষ দূত হলেন এখন। কি দুর্ভাগ্য এ জাতির! সংবাদ সম্মেলনে একটা কথা বললেই হলো। এর পেছনে সত্যতা আছে কী নেই, এর বাছবিচার অনেকেই করেন না। পৃথিবীর অনেক দেশের দৃষ্টান্ত দেখা যাবে, যেখানে সরকারপ্রধানরা ক্ষমতা হারানোর পর বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। বেগম রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে তার ডান পাশে বসা ছিলেন পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। হাওলাদার সাহেব এতদিন বারবার বলে আসছেন তিনি প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার জন্য আবেদন করেছেন, তার দল নির্বাচন বয়কট করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই হাওলাদার সাহেব কিনা শপথ নিলেন! তারাই আমাদের জাতীয় নেতা! তারাই মন্ত্রী হন! জনগণের সেবক! বিভ্রান্তিকর কথার্বাতা আর সুবিধাবাদিতার রাজনীতি পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। বিএনপির বিকল্প হিসেবে জাতীয় পার্টির একটা সম্ভাবনা ছিল। এখন জাতীয় পার্টির এই ভূমিকা বিশেষ করে এইচএম এরশাদের দ্বৈত ভূমিকা জাতীয় পার্টিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে তার অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলবে। একসময় ১৯৮৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব দেশে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবর্তমানে (নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কারণে) সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছিলেন আ স ম আবদুর রব। কিন্তু মানুষ রব সাহেবকে সেদিন কীভাবে সম্বোধন করেছিল, তা নিশ্চয়ই আমাদের অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা! এরশাদ সাহেবও নিশ্চয়ই তা ভুলে যাননি। গত শনিবার ‘অনেক নাটকের পর’ তিনি শপথ নিলেন। গণমাধ্যম জানাচ্ছে, শপথ অনুষ্ঠানে তিনি হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। আগে যেভাবে অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বারবার বলে আসছিলেন তার দল নির্বাচনে যাবে না, তিনি তার প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন কী হলো? ‘অসুস্থ’ হয়ে তিনি আবার চলে গেলেন সিএমএইচএ তারপর বাড়িতে। এরশাদের এই ভূমিকাকে আমরা কী বলব? নাটক? তিনি সেনাবাহিনীপ্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ৯ বছর দেশ চালিয়েছেন। একবারও কী মনে হলো না তার এই ‘অভিনয়’ মানুষ বোঝেন! আমরা অসাংবিধানিক শক্তিকে চাই না। সাংবিধানিক শক্তিকেই চাই। কিন্তু এই সাংবিধানিক শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিরা যখন বিভ্রান্তিকর কথা বলেন, তখন আস্থার জায়গা আর থাকে না। আমরা তো  রাজনীতিবিদদের কাছেই বারবার ফিরে যেতে চাই। তারাই দেশ চালাবেন। দেশকে নেতৃত্ব দেবেন। তিনি ‘অসুস্থ’ হলেন। ‘অসুস্থ’ হয়ে গলফ খেললেন। আবার শপথ নিতেও ভুললেন না। তরুণ প্রজন্ম এসব রাজনীতিবিদের কাছ থেকে কী শিখবে? তরুণ প্রজন্ম যারা রাজনীতি করতে আগ্রহী তারা কী এসব ঘটনায় অনুপ্রাণিত হবে  আদৌ? একজন ‘অসুস্থ এরশাদ’ এখন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত!
‘নির্বাচন’ হয়ে গেছে। এই ‘নির্বাচন’ নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদের ২৯২ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। সংবিধান মোতাবেক তারা এখন সংসদ সদস্য তবে সরকারি ভাষ্যমতে, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন ২৪ তারিখের পর। নবম সংসদ বিলুপ্ত হলো না। নিয়মমাফিক ২৪ তারিখ ওই সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং দশম সংসদ তার কার্যক্রম শুরু হবে। এই নির্বাচন এবং শপথ গ্রহণ নিয়ে অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ১৪৮ ২(ক) অনুযায়ী সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা অনুসরণ করে সংসদ সদস্যরা (দশম সংসদ) শপথ নিয়েছেন। এটা সংবিধান অনুযায়ী করা হয়েছে কিন্তু ১৪৮(১) যদি আমরা অনুসরণ করি, তাহলে দেখব এই ধারাবলে যে শপথ গ্রহণ হলো তা ৬৫(২) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৪৮(১) ধারাটা এ রকম তৃতীয় তফসিলে উল্লেখিত যে কোন পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যগ্রহণের পূর্বে উক্ত তফসিল অনুযায়ী শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দান করিবেন। এর অর্থ কী? এমপি সাহেবরা শপথ নিয়েছেন কার্যগ্রহণের পূর্বে। অর্থাৎ ৯ তারিখ থেকেই তিনি সংসদ সদস্য! কিন্তু ১২২টি আসনে যেখানে অন্য এমপি রয়েছেন তাদের কী হবে? সংবিধানের কোথাও কিন্তু বলা হয়নি নয়া এমপি দায়িত্বগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো এমপি আর তার দায়িত্বে থাকবেন না। এখানে এক ধরনের জটিলতা রয়েছে। দেশের আইনজীবীরাও এ ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত। এ দেশে যিনি আজীবন কোম্পানি আইন পড়েছেন, কোম্পানি আইনে মামলা-মোকাদ্দমা করেন, তিনি হয়ে যান সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তারা তাদের মতো করে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেন। এখন শপথ গ্রহণের বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, সে ব্যাপারে যে কেউ উচ্চ আদালতের কাছে একটা রেফারেন্স চাইতে পারেন। এমনকি সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কিংবা ড. কামাল হোসেন যারা সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত তারা স্ব-উদ্যোগে একটা রিট করতে পারবেন। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটা ভালো। এমনকি সরকার নিজেও সব বিতর্ক এড়াতে উচ্চ আদালতের কাছে মতামত চাইতে পারত। আরো জটিলতা আছে। রোববার মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। দশম সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নেয়া হয়েছে। এটাই নিয়ম। কিন্তু এই শপথ যদি ২৪ জানুয়ারির পরে অনুষ্ঠিত হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠতে পারে। এখানে ‘সংসদ সদস্যদের’ ব্যাপারটি নিয়ে একটা গোলমাল লেগে যেতে পারে। একটা মন্ত্রিসভা হলো যখন নবম জাতীয় সংসদ বহাল। আর মন্ত্রিসভা হলো দশম জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে। তাহলে কেউ তো প্রশ্ন করতেই পারেন এটা সংবিধানের বরখেলাপ নয় কি? এই মন্ত্রিসভা ২৪ তারিখের পরে গঠিত হলে ভালো হতো। শোভন হতো। কোনো জটিলতা থাকত না। কোনো প্রশ্নও থাকত না। নিশ্চই সরকারপ্রধান তথা সরকারের উপদেষ্টারা সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সংবিধানের প্রসঙ্গটি বাদই দিলাম। নির্বাচনের পর কোনো দেশ থেকে অভিনন্দন বার্তা এসেছে কি? এমনকি ভারতের কাছ থেকে যে বার্তা এসেছে, সেখানে সেই অর্থে অভিনন্দন সূচক কোনো বক্তব্য ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ খবর এসেছে। গত ৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের ১১৩তম কংগ্রেসে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপ শুরুর আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ জন সিনেটর রিচার্ড ডারবিন, জন বুজম্যান, বারবারা বস্কার, মাইকেল বি, এজি ও সিনেটর ক্রিস্টোফার এস মার্ফি গত ১১ ডিসেম্বর এই প্রস্তবাটি পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট কমিটিতে পাঠান। এটি নিয়েই আলোচনা হয়। সিনেটর গৃহীত প্রস্তাবে ৬টি বিষয় রয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-নিরপেক্ষ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সত্যিকার অর্থে সংলাপ, অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ, নির্বাচক পর্যবেক্ষদের নিরাপত্তা প্রদান, তারানকোর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি। একই সঙ্গে সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান রবার্ট মেনডেজ দু’নেত্রীকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী) যে চিঠি দিয়েছেন তাতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, সহিংসতা বন্ধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে। সিনেটর মেনডেজের চিঠিটি ছাপা হয়েছে গত শনিবার। সিনেটের প্রস্তাব ও সিনেটর মেনডেজের চিঠির মধ্যে দিয়ে যে মেসেজ আমরা পাচ্ছি, তা হচ্ছে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটা পথ হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে ‘সংলাপ’ শুরু করা। এদিকে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটি আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুটি বড় দলের মাঝে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে আংশিক ব্রিটিশ সহযোগিতা হারাতে পারে বাংলাদেশ।
এমনি এক পরিস্থিতিতে একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে গত রোববার। সংবিধানের ৫৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে ‘একজন প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেই রূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকিবেন।’ একই সঙ্গে (২) ধারায় বলা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে তাহাদের সংখ্যার কমপক্ষে নয় দশমাংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন...।’ সমস্যাটা হয়েছে এখানেই। যেখানে ‘সংসদ সদস্যদের’ মধ্য থেকে কথাটা বলা হয়েছে, সেখানে দুই সংসদের (নবম ও দশম) অস্তিত্ব বজায় থাকায় সেখানে দশম সংসদ থেকে মন্ত্রী নেয়ায় একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই মন্ত্রিসভার বৈধতা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। একইসঙ্গে মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি মন্ত্রিসভাকে বড় ধরনের বিতর্কের মাঝে ফেলে দিয়েছে। যতদূর জানা যায়, ২০০৬ সালে হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত একটি পর্যবেক্ষণ ছিল। তাতে বলা হয়েছিল একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা অনৈতিক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সংবিধানবহির্ভূত। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গত শনিবার হাইকোর্টের ওই পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে ঐকমত্যের সরকারের বিরোধিতা করেছেন। এখানে ঐকমত্যের ধারণার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু ঐকমত্যের ব্যাপারে যাদের পেলাম, তারা সবাই মূলত আগের মহাজোট সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাতে ‘ঐকমত্য সরকার’ হলো কোথায়? অনেকেই এটা স্বীকার করবেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে একটা ঐকমত্যের সরকারের প্রয়োজন ছিল। এটা ভালো হতো যদি সব দল ও মতের প্রতিনিধিত্ব এই মন্ত্রিসভায় থাকত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকেও এই মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। কেননা পরিস্থিতি এটাই দাবি করে। তবে সংবিধান যেহেতু ‘সাংসদ নন’ এমন কাউকে নিয়ে মন্ত্রী করার বিধান সীমিত, এক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাট কোটায় কিংবা উপদেষ্টা পরিষদে তাদের রাখা যেত। মন্ত্রিসভায় সব মতের প্রতিনিধিত্ব থাকলে, সংকট সমাধানের পথে আমরা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু সেটা হলো না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা দরকার। গেজেটে রওশন এরশাদকে বিরোধী দল নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাকে সেই মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার দল যখন মন্ত্রিসভায় থাকে, তখন তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর ছুরিকাঘাতের শামিল। বেশকিছু ধরেই জাতীয় পার্টির মাঝে একটা ধারা লক্ষ্য করা গেছে আর তা হচ্ছে মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ! এখন বেগম রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতা বানিয়ে তারা নিজেরা মন্ত্রী হলেন। আমি এর আগেও বলেছি এরশাদের অবর্তমানের জাতীয় পার্টির একটা অংশ আওয়ামী লীগের মাঝে বিলীন হয়ে যাবে, অপর অংশ চলে যাবে বিএনপিতে। এরশাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও তার সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে তৃতীয় দল হিসেবে জাতীয় পার্টির বিকশিত হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল সেই সম্ভাবনার ‘মৃত্যু’ ঘটেছে। অতীতেও একাধিকবার জাতীয় পার্টি ভেঙেছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জু কিংবা সর্বশেষ কাজী জাফর মূল দল ত্যাগ করে আলাদাভাবে সংগঠিত হয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কিংবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর ‘এক দল এক নেতা’ হিসেবে বিবৃতির মাধ্যমে তাদের অস্থিত্ব বজায় রাখলেও লাভবান হয়েছেন এক জায়গায়। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আবারো মন্ত্রী হয়েছেন। আর নাজিউর রহমান মঞ্জুর অর্বতমানে তার ছেলেরা দলটিকে ‘ভোলাকেন্দ্রিক’ একটি দলে পরিণত করেছেন। আগামীতে বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে পার্থ কিংবা কাজী জাফর আবারো মন্ত্রী হতে পারেন। বিতর্কিত নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা ৪৮ সদস্যবিশিষ্ট যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তাতে তেমন কোনো চমক নেই। তবে এটা ঠিক বেশকিছু বিতর্কিত ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ‘সাবেক মন্ত্রীদের’ নয়া মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেননি। অযোগ্য, অতি কথার প্রিয় ব্যক্তিরাও ঠাঁই পাননি। এতে তিনি প্রশংসা পেতেই পারেন। আবার যখন দেখি বিতর্কিত নির্বাচনে এবারে ‘বিজয়ী’ হয়েই সরাসরি শপথ নিয়েছেন, তখন আস্থার জায়গাটা ফিকে হয়ে আসে। আসলে কোন নীতিমালার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নয়া মন্ত্রিসভা গঠন করলেন, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এই মন্ত্রিসভা জাতির আস্থা অর্জন করতে পারবে বলে মনে হয় না। যারা অতি কথা বলেন এবং বিরোধী দলের সঙ্গে যে কোনো সমঝোতায় যেতে প্রধান অন্তরায়, তারাও রয়ে গেছেন মন্ত্রিসভায়। এতে কি ঐকমত্যের সরকার হবে?
গতকালের আরো একটি খবর নতুন নির্বাচন চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে। এই রিটটি করেছেন নবম সংসদের বিএনপির সংসদীয় দলের চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুক। এই রিটের ভবিষ্যৎ কী আমরা জানি না। কিন্তু রাজনীতির বিষয়টিকে আমরা আবারো আদালতে নিয়ে গেলাম। এ প্রবণতা ভালো নয়। রাজনীতির বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হওয়া উচিত। তাই তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবেন, জানি না। কিন্তু এটা সত্য যে দেশে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার জন্য বিএনপির সঙ্গে ‘সমাঝোতা’ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ‘অবরোধ আর হরতালের’ কর্মসূচি পরিত্যাগ করেছে, এটা মনে হয় না। যদিও রাজধানীতে অবরোধ আর তেমনভাবে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারে না আগের মতো। কিন্তু ‘সংসদের বাইরে’ থাকা, বিএনপির এই কর্মসূচি ছাড়া বিকল্প কিছু আছে কি? ‘নির্বাচন’ হয়েছে। সেখানে যত কম ভোটই পড়–ক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই নির্বাচন বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার ‘মৃত্যু’ ঘটাল। সরকার এই নির্বাচন দিয়ে তার ‘লেজিটেমেসি’ বাড়িয়েছে। সুতরাং আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা থেকেই গেল। 
Daily Manobkontho 16.01.14