বাংলাদেশ যখন তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে, তখন কূটনীতিতে দেশটির সাফল্যের পাল্লাটা কম ভারী নয়। গেল ৫০ বছরে আমাদের বেশ কিছু সাফল্য রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আগামী ২০৩১ সালে বাংলাদেশ পালন করবে হীরকজয়ন্তী। আর তাই চ্যালেঞ্জগুলোকে ‘এড্রেস’ করেই নিতে হবে মহাপরিকল্পনা। সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ শীর্ষ নেতাÑ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহ, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং ও শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এটা একটা বড় পাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পাঁচ নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে ও ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ব নেতাদের বাংলাদেশে উপস্থিতি এর আগেও আমরা একবার দেখেছিলাম ১৯৯৭ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি পালন করেছিল। তখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেইমান ডেমিরেল।
advertisement
বাংলাদেশের সাফল্যের পালকে আরেকটি পালক যোগ হয়েছে যখন দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে চলতি ২০২১ সালে। ২০২৬ সালে স্বীকৃতি মিলবে উন্নয়নশীল দেশের। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় বিশ্বে আমাদের মর্যাদা বেড়েছে সন্দেহ নেই তাতে, কিন্তু কিছুটা ‘ঝুঁকি’ রয়েছে। রপ্তানি আয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাওয়ায় ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, ইউরোপ ও কানাডায় পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার ইত্যাদি ঝুঁকি
তৈরি হলো। ফলে এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিল করার জন্য এখন থেকেই নিতে হবে মহাপরিকল্পনা। গোল্ডম্যান স্যাক্স পরবর্তী যে উঠতি ১১টি শক্তিশালী অর্থনীতির কথা বলেছেন (এন-১১), বাংলাদেশ রয়েছে তার শীর্ষে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি। গোল্ডম্যান স্যাকসের মূল্যায়নে বাংলাদেশ অবস্থান করছে উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মেক্সিকোর পাশাপাশি। আর তাই বিখ্যাত ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাটের মন্তব্য ছিল এ রকম South Asia Has a New Leader : will the world Take Note ? ( Diplomat, October 23, 2020 ) . বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক শক্তিÑ বিশ্বকে এখন এ দিকেই নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের সাফল্যের কথা আছে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও। নিকোলাস ক্রিস্টফ তার প্রবন্ধ Look to Bangladesh (১০ মার্চ ২০২১)-এ লিখেছেন সে কথা। বাংলাদেশ যে ‘অর্জন’ করেছে তার পেছনের কারণ কী? ক্রিস্টফের মতে, What was Bangladesh's secreat ? It was education and girls - শিক্ষা, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বংলাদেশ। আর এভাবেই অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন ক্রিস্টফ। লিখে The World Bank calls Bangladesh an inspiring story of reducing poverty - with 25 million Bangladeshi,s lifted from poverty over 15 years. The share of children stunted by malnutritiin has fallen by about half in, Bangladeshsince 1991 and is niw lower than in India. এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
advertisement
কূটনীতিতে সাফল্যের কথা যদি বলতে হয়, তা হলে বলতে হবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৭৮-১৯৮০ সময়সীমায় বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। ২০০০-২০১২ সালেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে সংসদের স্পিকার (১৯৯৬-২০০১) হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে (১৯৯৬) সভাপতিত্ব করেছিলেন।
আরেকটি সাফল্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। গড়পড়তা প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি সেনাসদস্য বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। বিশেষ করে সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, কুয়েত, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, আইভরিকোস্ট, হাইতি, সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এমনকি সিয়েরা লিওনের কোনো কোনো অঞ্চলে বাংলা ভাষা ‘দ্বিতীয় ভাষা’ হিসেবে চালু হয়েছে। বাংলাদেশকে স্থানীয় মানুষ নামে চেনে। কৃষিক্ষেত্রে সেখানে বাংলাদেশিরা কাজ করছে। বাংলাদেশের জন্য একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সিয়েরা লিওনকে সামনে রেখে আফ্রিকায় বাংলাদেশি পণ্যের একটা বাজার গড়ে তোলার। মানবসম্পদের দিক দিয়ে বাংলাদেশিদের জন্য একটা বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে।
ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম দিক। এর ভিত্তি গড়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি ঐক্য সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের মতো তরুণ নেতৃত্বের পাশাপাশি আতাউর রহমান খানের মতো রাজনীতিবিদও ছিলেন (উইকি পিডিয়া)। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গঠিত ‘আল-কুদস’ কমিটিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, ইরান-ইরাক দীর্ঘ যুদ্ধে (১৯৮০-১৯৮৮) মধ্যস্থতা করার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, বাংলাদেশ ওই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ ও সীমিত সময়ের জন্য কুয়েত দখল করে নিলে সৌদি আরব অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হলে জাতিসংঘের নেতৃত্বে Operation Desert Shield গঠিত হয়। বাংলাদেশ এখন একটি কোয়ালিশন ফোর্সের পক্ষ হয়ে প্রথম গালফ যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে কুয়েতে বাংলদেশ সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়, যাদের কাজ ছিল কুয়েতকে ল্যান্ডমাইনমুক্ত করা। ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে ইরাকই ওইসব মাইন স্থাপন করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কুয়েত থেকে ল্যান্ডমাইন অপারেশনের কাজে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের সদস্যরা এখনো সেখানে আছে। বলা ভালো, প্রথম গালফ যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের ৫৯ জন সদস্য এবং পরে ল্যান্ডমাইন অপসারণে ৭২৮ জন সদস্যকে হারিয়েছে। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন Islamic Military Counter Terrorism Coalition ( IMCTC )- এ যোগ দিতে। বর্তমানে ৪১টি দেশ এর সদস্য। IMCTC এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক উগ্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের এপ্রিলে IMCTC এর একটি সামরিক মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। IMCTC এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দেয়। কূটনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্য এখানেই যে, বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বে তার একটি অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছে।
বাংলাদেশের কূটনীতির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যÑ আর তা হচ্ছে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশ মনে করে আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের উদ্যোক্তা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এটা উপলব্ধি করে সত্তর দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। বাংলাদেশের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের উপস্থিতিতে সার্ক গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ বিমসটেকেরও (১৯৯৭ সালে গঠিত) উদ্যোক্তা। বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোতে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর বসবাস ও দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই সংস্থাটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগসূত্র। বলা যেতে পারে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড) সঙ্গে সমুদ্র নেই ও পাহাড়-পর্বত বেষ্টিত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশের (ভুটান ও নেপাল) মধ্যকার একটি যোগসূত্র। ২০০৪ সালে সংস্থাটি Bay of Bengal Initiative for Multi Sectoral Technical and Economic Cooperation হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
কূটনীতিতে বাংলাদেশের আরও তিনটি উদ্যোগের কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ উদ্যোগ নিয়েছিল মুসলমানপ্রধান ৮টি দেশকে নিয়ে Developing 8 গঠন করার। এই ৮টি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মিসর, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান। ১৯৯৭ সালে এটি গঠিত হয়। কৃষি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে সংস্থাটি কাজ করছে। দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে APTA - Asia Pacific Trade Agreement গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছিল অন্যতম উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, লাওস APTA -এর সদস্য। APTA ভুক্ত অঞ্চলের জনসংখ্যা ২৯২১ দশমিক ২ মিলিয়ন, আর মোট জিডিপি ১৪৬১৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। APTA -ভুক্ত দেশগুলো এখন একটি অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের ASEAN Regional Forum ( ARF) -এ যোগদান। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং অদূর ভবিষ্যতে আসিয়ানে যোগদানের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ARF একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বলা ভালো ভারত আসিয়ানের সঙ্গে ২০০৯ সালে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা ২০১০ থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির কারণে ভারত শুল্কমুক্তভাবে তার পণ্য নিয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে যেতে পারবে। প্রসঙ্গক্রমেই ত্রিদেশীয় মহাসড়কের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। বাংলাদেশ এই ত্রিদেশীয় মহাসড়কে যুক্ত হতে চাইছে। সম্প্রতি মোদি-হাসিনা ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশ এই প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবিত ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক বাংলাদেশের জন্যও একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের East West Evonomic Corridor -এর এটা একটা অংশ। মহাসড়কটি ভারতের মণিপুর রাজ্যের Moreh শহরকে মিয়ানমারের ওপর দিয়ে থাইল্যান্ডের Myawaddy Mae Sot শহরকে সংযুক্ত করবে। পরে এই মহাসড়ক আরও সম্প্রসারিত হবে লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত। বাংলাদেশের পণ্যও অদূর ভবিষ্যতে এই মহাসড়ক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেতে পারবে।
বাংলাদেশের জন্য পার্শ¦বর্তী দুটি বড় দেশের (ভারত ও চীন) সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছে। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো দুটি দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেলেও, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। তিস্তার পানিচুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। সর্বশেষ ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু উদ্বোধন, ভারতকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর, চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশের যোগদান, বাংলাদেশে চীনের উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করলেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কৌশলে একটি ভারসাম্যমূলক কূটনীতি অনুসরণ করছে। কোনো একটি দেশের প্রতি ‘ঝুঁকে পড়ার’ প্রবণতা বাংলাদেশ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। কূটনীতিতে সাফল্য এখানেই নিহিত।
তবে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। সমুদ্রসীমা (ভারত ও মিয়ানমার) নির্ধারণ হয়ে যাওয়ার পরও সমুদ্রের বিশাল সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের ব্যাপারে কোনো বড় পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। একুশ শতক হবে ‘ব্লু-ইকোনমি’নির্ভর। ২০১৪ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঢাকা সফরের সময় জাপান ইওএ-ই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। বঙ্গোপসাগরভুক্ত দেশগুলো উন্নয়নে (অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি, উন্নয়ন প্রক্রিয়া) জাপান অংশীদার হতে চায়, যাতে জাপানের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রক্ষিত হয়। বলা হচ্ছে, এই পরিকল্পনার আওতায় জাপান ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করতে চায়। BIG- B পরিকল্পনা Japan - Bangladesh Comprehensive Partnership এর অংশ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অঞ্চলে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত Quadrilateral Security Dialogue - QUAD , যেখানে সদস্য রয়েছে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এটি একটি সামরিক জোটও বটে। এই জোট চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহত হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণে কৌশলগতভাবে ভারত, নেপাল, ভুটান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গেটওয়ে। এটা বিবেচনায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার যে স্ট্র্যাটেজি তাতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। গেল অক্টোবরে (২০২০) মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান তার ঢাকা সফরে বাংলাদেশকে এই প্রস্তাব দিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি।
সুতরাং কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগামীতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষ জনশক্তি যদি তৈরি করা না যায়, তা হলে কূটনীতিতে সফলতা পাওয়া যাবে না।
Amader Somoy
26.3.2021
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In his Office at UGC Bangladesh
Prof Rahman With US Congressman Joseph Crowley
here you go!!!
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
During his stay in Germany
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
At Fatih University, Turkey during his recent visit.
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In front of an Ethnic Mud House in Mexico
Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts
দক্ষিণ এশিয়ায় সমরাস্ত্রের প্রতিযোগিতা
গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রগুলোয় ছাপা হয় একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়ার পর চতুর্থ স্থানটি দখল করে নেবে ভারত। ওই সময় দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় ৬৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। ৫ ফেব্রুয়ারি অন্য এক সংবাদে বলা হয়, ভারত চীনের সীমান্তজুড়ে নতুন একটি পার্বত্য কোর গঠন করবে এবং এ বাহিনী গঠনে খরচ হবে ৬৯ হাজার কোটি রুপি। ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় এ খবর ছাপা হয়েছিল। আর ওই পত্রিকার সূত্র ধরে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও সংবাদটি ছাপা হয়। এর আগে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে যে ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তাও কোনো কোনো মহলে সমালোচিত হয়েছে। অবশ্য ভারতের ৬৯ হাজার কোটি রুপির পাশাপাশি বাংলাদেশের ৮ হাজার কোটি টাকা সমান্যই বলতে হবে। পাকিস্তানও তার অস্ত্র সম্ভার বাড়িয়েছে।
ভারতের উৎক্ষেপনকৃত অগ্নি-৫ মিসাইল
তবে ভারতের এ অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি দেশটিতে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রথমত. ভারতে দারিদ্র্য অনেক বেশি। গেল সপ্তাহেই দারিদ্রের একটি করুণ কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এক মা তার ১১ বছরের মেয়েকে মুম্বাইয়ের এক পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। মেয়েটি বুদ্ধি করে পুলিশের কাছে যাওয়ায় তা জানাজানি হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত. চীন যখন ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিঃসন্দেহে ভারতের এ সিদ্ধান্ত শুধু চীন-ভারত সীমান্তেই উত্তেজনা ছড়াবে না, বরং তা পাকিস্তান সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়াবে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, উপমহাদেশে পাক-ভারত এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে। ভারত সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। ভারতের অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর পাকিস্তান হাতেফ গজনবি নামক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। অগ্নির মতো হাতেফও পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য। অগ্নির পর ভারত নতুন ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ ও পাকিস্তান হাতেফ-৯ নামে আরো দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে দেশ দুটো এক ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এতে দেশ দুটোর দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি ব্যাহত হতে বাধ্য।
এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল? প্রশ্ন হচ্ছে, বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে দুই দেশের এ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে? পাঠকদের একটা ধারণা দিয়ে রাখি। একটা দূরপাল্লার (যেমন অগ্নি-৫) মিসাইলের দাম ৫ লাখ ৬৯ হাজার থেকে ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। একটি ব্রুজ মিসাইলের (সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য) দাম ১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা) আর বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের (যা ভারত এরই মধ্যে অজর্ন করেছে) ৬ লাখ ডলার। এ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় না করে তা হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যেত। এমনকি ভারতে চরম দরিদ্রতম রাজ্য হিসেবে পরিচিত (দারিদ্র্যের কারণে যেখানে মাওবাদীদের তত্পরতা বেশি) মধ্য প্রদেশে, উত্তর প্রদেশ কিংবা ঝাড়খণ্ডে ক্ষুদ্র ঋণদান প্রকল্প চালু করতে পারত। ভারত তা করেনি। মুম্বাইয়ের চাকচিক্যময় ছবি দেখে ভারতের সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচার করা যাবে না। ভারতে ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গত ১০ বছরে আত্মহত্যা করেছে— এ রকম একটি সংবাদ সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান থেকে এ ধরনের সংবাদ তেমন একটা শোনা যায় না। এ কারণেই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছিলেন এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) অর্জনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে ভালো।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। সিপরির (SIPRI) বার্ষিক গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৮০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। জিডিপিতে প্রতিরক্ষা খাতে প্রবৃদ্ধির হার আড়াই থেকে ৩ শতাংশ। ২০০০ সালের পর প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। এ সময়সীমায় ভারতে যে অস্ত্রসস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়া একাই সরবরাহ করেছে ৮২ শতাংশ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, ভারত এরই মধ্যে তার নৌবহরে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌশক্তিরূপে আবির্ভূত হতে চায় দেশটি। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনের নৌবাহিনীতে যেখানে জাহাজের সংখ্যা ১৩৫, সেখানে ভারতের জাহাজ রয়েছে ১০৩টি। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। ভারতের উদ্দেশ্য যে কী, তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন, প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার জন্য চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ১১ বিলিয়ন ডলার দামে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ১২৬টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। যেখানে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক মানুষ ন্যূনতম টয়লেট সুবিধা পায় না, ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে (যা কিনা জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত অতিদরিদ্রের মানদণ্ড), সেখানে শত শত কোটি রুপি ভারত ব্যয় করছে অস্ত্র খাতে। এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে যে, অগ্নি-৫ উেক্ষপণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হোক। সুদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করছে। তার টার্গেট মূলত চীন, চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। এ লক্ষ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে উঠছে। ভারত এখন আর পাকিস্তানকে অন্যতম শত্রু বলে মনে করে না। ভারতের অন্যতম শত্রু এখন চীন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। গেল বছর বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ব লেডি আর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। হিলারি ক্লিনটনের ঝুড়িতে যে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যে মার্কিন কৌশল অর্থাৎ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামরিক বলয়, সে বলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারতকে দিয়ে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অগ্নি-৫ ও আকাশ উেক্ষপণ এ কৌশলেরই একটি অংশ। ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কিংবা ভারতকে ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত করার উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে বলতে পারব না, কিন্তু যে দেশ তার দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো বড় কর্মসূচি নিতে পারে না কিংবা কৃষকের আত্মহত্যা রোধ করার উদ্যোগ নিতে পারে না বা অগ্নি-৫ মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করে তারা আমাদের জন্য কোনো ‘মডেল’ হতে পারে না। আগামী দিনে ভারতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যার প্রবণতা; একটি সভ্য সমাজে যা কল্পনাও করা যায় না। অগ্নি-৫ উেক্ষপণ ছিল একটি প্রহসন। আর পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে ভারতের চেয়ে ভালো, তা বলা যাবে না। পাকিস্তান বাহ্যত আরেকটি ‘তালেবানি রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। একুশ শতকে এসেও দেশটির কোনো কোনো প্রদেশে মেয়েদের শিক্ষা সীমিত। তালেবান জঙ্গিরা মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে— এ রকম সংবাদ আমরা একাধিকবার পাঠ করেছি। পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে তারা জঙ্গি তত্পরতা দমন করতে পারছে না, সেখানে শাহীন (১ হাজার ৮০০ মাইল দূরপাল্লা) কিংবা হাতেফ গজনবির (১৮০ মাইল দূরে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন) মতো মিসাইল উদ্ভাবন করে পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে উসকে দিল। পাকিস্তান বা ভারতের এ থেকে লাভবান হওয়ার কিছু নেই। এতে দুই দেশের দারিদ্র্য আরো বাড়বে। আর লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র ব্যবসায় তাদের প্রসার ঘটবে। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬৬ কোটি ডলার ব্যয়ে ১৪৫টি হালকা কামান আমদানি করছে। একসময় তথাকথিত ‘নিরাপত্তা সুরক্ষা’র নাম করে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে সাহায্য করেছিল (বিবিসি, ডিসেম্বর ১৬, ২০১০)। এখানে বলা ভালো, ভারত ও পাকিস্তান এনপিটি চুক্তিতে সই করেনি। পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতের ক্ষেত্রে তার নীতির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উপমহাদেশে আগামী দিনগুলোয় এ প্রতিযোগিতা বাড়বে বলেই মনে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় এ পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৫৪৯ মিলিয়ন (প্রতিদিনের আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসেবে)। ২০০৫ সালে তা দাঁড়ায় ৫৯৫ মিলিয়নে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ৬৫০ মিলিয়নের কাছাকাছি। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, ২৫০ মিলিয়ন শিশু অপুষ্টির শিকার। ৩০ মিলিয়ন শিশু কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মোট নারী জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ রক্তশূন্যতায় ভোগে। ভারতে প্রতি তিনজনের একজন দরিদ্র। ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য টয়লেট সুবিধা নেই। প্রতিদিন ভারতে মারা যায় পাঁচ হাজার শিশু। এ পরিসংখ্যান কোনো আশার কথা বলে না। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে দারিদ্র্য কমেনি। অথচ দুটি বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান আজ কোটি কোটি ডলার খরচ করছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে। দক্ষিণ এশিয়ার এ মুহূর্তে সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করা, জাতিগত দ্বন্দ্বের অবসান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সেই সঙ্গে জেন্ডার সমতা আনা। ব্যাপক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির ব্যবস্থা করাও জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা এদিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন।
লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
www.tsrahmanbd.blogspot.com
এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল? প্রশ্ন হচ্ছে, বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে দুই দেশের এ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে? পাঠকদের একটা ধারণা দিয়ে রাখি। একটা দূরপাল্লার (যেমন অগ্নি-৫) মিসাইলের দাম ৫ লাখ ৬৯ হাজার থেকে ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। একটি ব্রুজ মিসাইলের (সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য) দাম ১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা) আর বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের (যা ভারত এরই মধ্যে অজর্ন করেছে) ৬ লাখ ডলার। এ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় না করে তা হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যেত। এমনকি ভারতে চরম দরিদ্রতম রাজ্য হিসেবে পরিচিত (দারিদ্র্যের কারণে যেখানে মাওবাদীদের তত্পরতা বেশি) মধ্য প্রদেশে, উত্তর প্রদেশ কিংবা ঝাড়খণ্ডে ক্ষুদ্র ঋণদান প্রকল্প চালু করতে পারত। ভারত তা করেনি। মুম্বাইয়ের চাকচিক্যময় ছবি দেখে ভারতের সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচার করা যাবে না। ভারতে ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গত ১০ বছরে আত্মহত্যা করেছে— এ রকম একটি সংবাদ সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান থেকে এ ধরনের সংবাদ তেমন একটা শোনা যায় না। এ কারণেই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছিলেন এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) অর্জনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে ভালো।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। সিপরির (SIPRI) বার্ষিক গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৮০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। জিডিপিতে প্রতিরক্ষা খাতে প্রবৃদ্ধির হার আড়াই থেকে ৩ শতাংশ। ২০০০ সালের পর প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। এ সময়সীমায় ভারতে যে অস্ত্রসস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়া একাই সরবরাহ করেছে ৮২ শতাংশ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, ভারত এরই মধ্যে তার নৌবহরে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌশক্তিরূপে আবির্ভূত হতে চায় দেশটি। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনের নৌবাহিনীতে যেখানে জাহাজের সংখ্যা ১৩৫, সেখানে ভারতের জাহাজ রয়েছে ১০৩টি। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। ভারতের উদ্দেশ্য যে কী, তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন, প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার জন্য চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ১১ বিলিয়ন ডলার দামে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ১২৬টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। যেখানে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক মানুষ ন্যূনতম টয়লেট সুবিধা পায় না, ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে (যা কিনা জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত অতিদরিদ্রের মানদণ্ড), সেখানে শত শত কোটি রুপি ভারত ব্যয় করছে অস্ত্র খাতে। এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে যে, অগ্নি-৫ উেক্ষপণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হোক। সুদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করছে। তার টার্গেট মূলত চীন, চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। এ লক্ষ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে উঠছে। ভারত এখন আর পাকিস্তানকে অন্যতম শত্রু বলে মনে করে না। ভারতের অন্যতম শত্রু এখন চীন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। গেল বছর বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ব লেডি আর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। হিলারি ক্লিনটনের ঝুড়িতে যে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যে মার্কিন কৌশল অর্থাৎ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামরিক বলয়, সে বলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারতকে দিয়ে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অগ্নি-৫ ও আকাশ উেক্ষপণ এ কৌশলেরই একটি অংশ। ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কিংবা ভারতকে ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত করার উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে বলতে পারব না, কিন্তু যে দেশ তার দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো বড় কর্মসূচি নিতে পারে না কিংবা কৃষকের আত্মহত্যা রোধ করার উদ্যোগ নিতে পারে না বা অগ্নি-৫ মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করে তারা আমাদের জন্য কোনো ‘মডেল’ হতে পারে না। আগামী দিনে ভারতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যার প্রবণতা; একটি সভ্য সমাজে যা কল্পনাও করা যায় না। অগ্নি-৫ উেক্ষপণ ছিল একটি প্রহসন। আর পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে ভারতের চেয়ে ভালো, তা বলা যাবে না। পাকিস্তান বাহ্যত আরেকটি ‘তালেবানি রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। একুশ শতকে এসেও দেশটির কোনো কোনো প্রদেশে মেয়েদের শিক্ষা সীমিত। তালেবান জঙ্গিরা মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে— এ রকম সংবাদ আমরা একাধিকবার পাঠ করেছি। পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে তারা জঙ্গি তত্পরতা দমন করতে পারছে না, সেখানে শাহীন (১ হাজার ৮০০ মাইল দূরপাল্লা) কিংবা হাতেফ গজনবির (১৮০ মাইল দূরে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন) মতো মিসাইল উদ্ভাবন করে পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে উসকে দিল। পাকিস্তান বা ভারতের এ থেকে লাভবান হওয়ার কিছু নেই। এতে দুই দেশের দারিদ্র্য আরো বাড়বে। আর লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র ব্যবসায় তাদের প্রসার ঘটবে। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬৬ কোটি ডলার ব্যয়ে ১৪৫টি হালকা কামান আমদানি করছে। একসময় তথাকথিত ‘নিরাপত্তা সুরক্ষা’র নাম করে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে সাহায্য করেছিল (বিবিসি, ডিসেম্বর ১৬, ২০১০)। এখানে বলা ভালো, ভারত ও পাকিস্তান এনপিটি চুক্তিতে সই করেনি। পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতের ক্ষেত্রে তার নীতির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উপমহাদেশে আগামী দিনগুলোয় এ প্রতিযোগিতা বাড়বে বলেই মনে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় এ পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৫৪৯ মিলিয়ন (প্রতিদিনের আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসেবে)। ২০০৫ সালে তা দাঁড়ায় ৫৯৫ মিলিয়নে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ৬৫০ মিলিয়নের কাছাকাছি। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, ২৫০ মিলিয়ন শিশু অপুষ্টির শিকার। ৩০ মিলিয়ন শিশু কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মোট নারী জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ রক্তশূন্যতায় ভোগে। ভারতে প্রতি তিনজনের একজন দরিদ্র। ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য টয়লেট সুবিধা নেই। প্রতিদিন ভারতে মারা যায় পাঁচ হাজার শিশু। এ পরিসংখ্যান কোনো আশার কথা বলে না। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে দারিদ্র্য কমেনি। অথচ দুটি বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান আজ কোটি কোটি ডলার খরচ করছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে। দক্ষিণ এশিয়ার এ মুহূর্তে সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করা, জাতিগত দ্বন্দ্বের অবসান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সেই সঙ্গে জেন্ডার সমতা আনা। ব্যাপক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির ব্যবস্থা করাও জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা এদিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন।
লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
www.tsrahmanbd.blogspot.com
বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে দুটি কথা
গত সোমবার ১৮ দলীয় জোটের আহ্বানে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে কঠিন কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি। বিভিন্ন তারিখে বিক্ষোভ ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে ১৮ দলীয় জোট। মূলত সামনে রমজানের কারণে ১৮ দলীয় জোট হরতালের কোনো কর্মসূচি দেয়নি। তবে বেগম জিয়া আগামীতে যে কঠিন কর্মসূচি আসছে, সে ব্যাপারে সরকারকে হুশিয়ার করে দিয়েছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে কোনো জট খুলছে না। ১৮ দলীয় জোটের মূল দাবি হচ্ছে, একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিটা, যারা আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবেন। গত ৩ জুন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমস্যার সমাধানে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই আলোচনা বা সংলাপের কোনো সম্ভাবনাও আমরা দেখছি না। সঙ্গত কারণেই তাই প্রশ্ন ওঠে_ রাজনীতি এখন কোন দিকে? রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে 'গুম', দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে একটা সমাধান হওয়া উচিত। সরকার যেখানে বলছে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই, সেখানে বিরোধী দলের দাবি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ নিয়ে জট খুলছে না। এ ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তিগুলোর এক ধরনের 'হস্তক্ষেপ'ও আমরা লক্ষ্য করছি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা ঘুরে গেলেন কদিন আগে। তিনি বলে গেলেন একটি নিরপেক্ষ সরকার ও সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনই চায় যুক্তরাষ্ট্র। একই কথার প্রতিধ্বনী করলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতও। হিলারি ক্লিনটন আরো একটি কথা ঢাকায় বলে গিয়েছিলেন_ আর তা হচ্ছে, সরকারও বিরোধী দলের মাঝে একটি সংলাপ। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। সংকট নিরসনে এই মুহূর্তে সংলাপ জরুরি। কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, তা সংলাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব। সংবিধান ইতিমধ্যে সংশোধিত হয়েছে। সংবিধানে এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। তবে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যাপারে একটি পদ্ধতি বের করা সম্ভব। ওই পদ্ধতিকে যে কোনো নামে অভিহিত করা যায়। শুধু যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে তার কোনো মানে নেই। নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে বিএনপি তথা ১৮ দল চাচ্ছে সরকার সংবিধান সংশোধন করুক। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন না করেও সংসদে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এখানে বিভিন্ন 'ফর্মুলা' নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আমার ধারণা, মহাজোটের শরিকরা চায় আগামী নির্বাচন হোক একটি নিরপেক্ষ সরকারের আওতায়। এই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো কী হবে, এটা নিয়েই 'সংলাপ' জরুরি। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে, সংসদ সদস্যদের নিজেদের 'পদ' বজায় রেখে (যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে) যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। সরকার ভালো করবে যদি বিরোধী দলসহ সব দলের সঙ্গে একটা 'সংলাপ' শুরু করে। এতে করে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে। হিলারি হরতাল না করার আহ্বান জানিয়ে গেছেন। হরতাল এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ। অতীতেও হরতাল হয়েছে। বিরোধী দল হরতাল আহ্বান করে তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য। তবে সব ক্ষেত্রে দাবি-দাওয়া আদায় হয় না। সাম্প্রতিক সময়ের যে হরতাল, সেই হরতালের পেছনে যুক্তি ছিল। ইলিয়াস আলীকে কে বা কারা 'গুম' করল, রাষ্ট্র তা জানবে না, তা হতে পারে না। বিএনপি এই ইস্যুতে হরতাল করেছে। হরতাল পালন করার মধ্য দিয়ে ইলিয়াস আলী ফিরে আসেননি। এটা দুঃখজনক। তবে এই ইস্যুতে হরতাল দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল সরকারের ওপর প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করা। হরতালে দেশের ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হনই, সবচেয়ে বড় কথা বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারীরা কিংবা আরএমজির ক্রেতারা বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। সরকারের এটা বোঝা উচিত কেন বিরোধী দল হরতাল দেয়। সেই 'পরিস্থিতি' যাতে সৃষ্টি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। আরো একটি কথা, ইলিয়াস আলীর পাশাপাশি শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের অন্তর্ধান (পরবর্তী সময়ে হত্যা) রহস্য উন্মোচন হওয়াও প্রয়োজন। এটা কি কোনো রাজনৈতিক হত্যাকা-? জনপ্রিয় একজন শ্রমিক নেতার মৃত্যু 'ভুল সিগন্যাল' পেঁৗছে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার লেবার অর্গানাইজেশন অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা বাংলাদেশি তৈরি পোশাক বয়কটের ডাক দিতে পারে।
আমরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দাবি করছি, সেখানে এই হত্যাকা- ও এর বিচার না হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকের স্বার্থেই আমিনুলের হত্যাকা-ের বিচার হওয়া উচিত। এদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকা-ের ব্যাপারে হিলারি ক্লিনটনের একটি মন্তব্যের যে প্রতিক্রিয়া অর্থমন্ত্রী দেখিয়েছিলেন, তা শোভন ছিল না। ব্যক্তি ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় কী করেছেন, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, বিশ্বজুড়েই ড. ইউনূসের অনেক 'বন্ধু' রয়েছেন। ড. ইউনূসের অপসারণের ঘটনায় তারা আহত হয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় কোনো একটি ক্ষেত্রে তাকে রাখা গেলে ক্ষতি কি? তিনি নিশ্চয়ই এখন আর আগের মতো গ্রামীণ ব্যাংকে প্রভাব খাটতে পারছেন না। সরকার এই বিষয়টি ভেবে দেখলে ভালো করবে। এমসিএ বা মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্টস থেকে আমরা সহায়তা পাচ্ছি না। বড় বাধা আমাদের দুর্নীতি। এই দুর্নীতি আমরা রোধ করতে পারছি না। পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। ঢাকা সফরে এসে জাপানি উপ-প্রধানমন্ত্রীও বলে গেলেন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার। বিএনপিও বলছে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার জন্য। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। আমাদের স্বার্থেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলা উচিত। হিলারি ক্লিনটন মূলত এ কথাগুলোই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বলে গেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বিষয়গুলো আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ সরকার না হলে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মনোভাব প্রতিফলিত হবে না। সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে হলে তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। হিলারি ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্ব ঢাকায় এসে এ কথাটাই আমাদের বলে গেছেন। সরকার যদি এটা উপলব্ধি করতে না পারে, তাহলে সরকার ভুল করবে। আমাদের কাছে প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে জাতির বৃহত্তম স্বার্থের খাতিরে সরকার এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সংবিধানসম্মত ছিল না। যেমন ২০০৮ সালে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের কথা আমরা বলতে পারি। এ দুটি দেশে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না সংবিধানে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট মুগাবে (জিম্বাবুয়ে) সাবাঙ্গিরাইকে প্রধানমন্ত্রী ও কেনিয়াতে প্রেসিডেন্ট কিনাকি বিরোধী দলনেতা অডিংগাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। আজ গ্রিসের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পাকিস্তানের দৃষ্টান্তও দিতে পারি। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের সংসদেও একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন আয়োজন করার। আমরা চাই দেশে তত্ত্বাবধায়ক তথা নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার একটা ঘোষণা সরকার দিক। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করা সম্ভব। গ্রিস আমাদের জন্য একটা উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা ওই উদাহরণটা অনুসরণ করতে পারি। একজন সাবেক বিচারপতি গ্রিসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচিত হেেছন। এই জুনে সেখানে নির্বাচন। গ্রিসের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশেও তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছেন। আসলে মূল বিষয়টি হচ্ছে সংবিধানই সবকিছু নয়। প্রয়োজনে জাতির স্বার্থে সংবিধানের বাইরে গিয়েও কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আমাদের রাজনীতিবিদরা গ্রিস বা কেনিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন কীনা, সেটাই দেখার বিষয় এখন। তবে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গেল বুধবার বলেছেন, সংলাপ হবে, তবে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো নিয়ে নয়। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও ইঙ্গিত দিয়েছেন একটি নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো নিয়ে মহাজোটের মাঝে আলোচনা হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে পরিষ্কার। সরকার একটু নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। এটা নিশ্চয়ই অনেকেই স্বীকার করবেন, ২০০৮ সালের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই সরকারের অনেক অনিয়ম, বিশেষ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন আহমেদের বিতর্কিত ভূমিকা গোটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সে ধরনের একটি সরকার কেউই চাইবে না। তবে একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সেই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো কী হবে, সেটা নিয়েই সংলাপ হতে পারে। এখানে বিভিন্ন ফর্মুলা নিয়ে মতবিনিময় হতে পরে। তাই সৈয়দ আশরাফের মতো একজন সিনিয়র নেতা যখন বলেন আলোচনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, তখন এটাকে আমি 'পজিটিভলি' নিতে চাই। তত্ত্বাবধায়ক না হোক বিকল্প একটি ব্যবস্থা আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়েই বের হয়ে আসতে পারে। আমার বিশ্বাস নির্বাচন পরিচালনায় একটি নিরপেক্ষ সরকারের আদল আমরা আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে বের করতে পারব। এক সময় তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও আমরা উদ্ভাবন করেছিলাম। ঠিক তেমনি আজো নতুন একটি পদ্ধতি আমরা বের করতে পারব। এ জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে আস্থা ও বিশ্বাস। সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যদি এই আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলেই সম্ভব একটা সমাধানে পেঁৗছানোর। এখন সরকার একটা তারিখ প্রস্তাব করুক। বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাক। আমার বিশ্বাস বিরোধী দল সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেবে।
Daily DESTINY
13.6.12
তিউনিসিয়ার নির্বাচন ও 'আরব বসন্তের' ভবিষ্যৎ
গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ তিউনিসিয়ার এক বেকার কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট মোহাম্মদ বওকুজিজি নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করে যে 'বিপ্লবের' সূচনা করেছিলেন, তার সফল সমাপ্তি ঘটেছে ২৩ অক্টোবর ২০১১ একটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়া পুনর্গঠনে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়ায় একটি জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে, যারা দেশটির জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিষদ দেশটির জন্য একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবে। সংবিধান রচিত হওয়ার পর আগামী বছর সেখানে আবার নির্বাচন হবে।
গত বছর যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ায়, তা আরব বিশ্বে এক গণজাগরণের সৃষ্টি করেছিল, যাকে বলা হচ্ছে 'আরব বসন্ত', অনেকটা সাবেক চেকোস্লাভিয়ার রাজধানী প্রাগে সংঘটিত হওয়া 'প্রাগ বসন্ত'-এর সঙ্গে যার তুলনা করা যায়। ১৯৬৮ সালের 'প্রাগ বসন্ত' ছিল সাবেক সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বড় প্রতিবাদ। আর 'আরব বসন্ত' অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক প্রতিবাদ। পার্থক্য হচ্ছে এক জায়গায়_'প্রাগ বসন্ত' সফল হয়নি। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তন আসেনি। এসেছিল অনেক পরে, ১৯৮৯ সালে। কিন্তু 'আরব বসন্ত' পরিবর্তন আনছে। ইতিমধ্যে তিউনিসিয়ায় বেন আলীর ২৩ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। মিসরে ৩০ বছরের একদলীয় শাসনের অবসান হয়েছে। হোসনি মুবারক এখন ইতিহাসের অংশ, দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর এখন বিচার হচ্ছে। কিন্তু লিবিয়ায় পরিবর্তনটা এসেছে ভিন্নভাবে। সেখানে তিউনিসিয়া কিংবা মিসরের মতো গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। গাদ্দাফি নিজের জীবন দিয়ে বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করে গেলেন। ইয়েমেন আর সিরিয়ায়ও 'আরব বসন্ত'-এর ঢেউ লেগেছে। ইয়েমেনে আলী আবদুল্লাহ সালেহ আর সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু যে বিষয়টি বড় বেশি করে আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে_'আরব বসন্ত' কী ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে পুরো আরব বিশ্বে? কোন শক্তি এখানে ক্ষমতাসীন হচ্ছে? এসব দেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বা কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। বলতে দ্বিধা নেই, পুরো আরব বিশ্বে যে ধরনের সমাজব্যবস্থা চালু ছিল, তাকে কোনো মতেই গণতন্ত্রসম্মত বলা যাবে না। তিউনিসিয়ায় ব্যক্তি বেন আলী ও তাঁর পরিবার ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। Democratic Constitutional Rally নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে বেন আলী ২৩ বছর ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। মিসরেও একই ধারা আমরা প্রত্যক্ষ করি।
অতিসম্প্রতি তিউনিসিয়ার নির্বাচনের পর সেখানে নতুন এক রাজনৈতিক ধারার জন্ম হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কেননা নির্বাচনে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত দল এন্নাহদার বিজয় নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে যাচ্ছে তিউনিসিয়ায়। ১৯৫৬ সালে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৭ সাল থেকে বেন আলী ছিলেন ক্ষমতায়। মধ্য ষাটের দশকে এনাহদা নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর চলতি বছরের মার্চ মাসে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দলটির শীর্ষ নেতা রশিদ আল ঘান্নুচি দীর্ঘদিন ছিলেন লন্ডনে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার পরই তিনি তিউনিসিয়ায় ফিরে আসেন। এনাহদা কট্টরপন্থী কোনো ইসলামিক দল নয়। একসময় দলটি মিসরের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি অনুসরণ করত। ১৯৮১ সালে দলটির জন্ম হয়েছিল। তখন দলটির নাম ছিল Islamic Tendency Movement। পরে ১৯৮৯ সালে এনাহদা বা Awakening Movement নাম ধারণ করে। দলটি ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। দলটির সঙ্গে তুরস্কের Justice and Development Party’'র অনেক মিল রয়েছে। এন্নাহদার নেতারা এটা স্বীকারও করেন। তাঁরা তিউনিসিয়ায় একটি 'তুরস্ক মডেল' অনুসরণ করতে চান। ঘান্নুচি নিজেই বলেছেন, ‘In Turkey and Tunesia there was the same movement of reconcilitation between Islam & modernity and we are the discendants of this movement’। ঘান্নুচির বক্তব্যের মধ্য থেকে এটা বোঝা যায়, এনাহদা আধুনিকতার বিরোধী নয়। এমনকি এবার নির্বাচনে এমন অনেক মহিলা এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা হিজাব পরেন না এবং পর্দাও করেন না। এনাহদা বহুদলীয় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনে বিশ্বাসী। তিউনিসিয়ায় ১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল Personal Status Code, যেখানে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে সমতা আনা হয়েছিল। সেখানে পুরুষদের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা সমঅধিকার ভোগ করেন। এনাহদা এই Personal Status Code-এর বিরোধী নয়। ঘান্নুচির মতে, এই Personal Status Code হচ্ছে '‘as an acceptable interpretation of Islam’। ঘান্নুচির এই অভিমত যেকোনো ইসলামী মৌলবাদী নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁকে পার্থক্য করবে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে পারস্য অঞ্চলে নারীদের অধিকার সীমিত। বহুবিবাহ সেখানে স্বীকৃত, আর নারীরা পুরুষের মতো সমঅধিকার ভোগ করেন না। তিউনিসিয়ায় এ থেকে পার্থক্য ছিল। এখন ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত এনাহদাও সমঅধিকারের পক্ষে।
তিউনিসিয়ায় নারীদের চাকরি করার ব্যাপারে কোনো বাধানিষেধ নেই। তারা স্বামীর অনুমতি না নিয়েই নিজেরা ব্যবসা করতে পারেন, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। হিজাব পরার ব্যাপারেও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যা যেকোনো আরব বিশ্বে অকল্পনীয়। তিউনিসিয়ায় রাজনীতি ও স্থানীয় সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্বের হার ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যার সঙ্গে নরডিকভুক্ত দেশগুলোর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সমাজে নারীদের এই অবস্থান অন্য কোনো আরব বিশ্বে দেখা যায় না। এমনি একটি দেশে ইসলামপন্থী একটি দলের নির্বাচনে বিজয় সংগত কারণেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। ঘান্নুচি হতে যাচ্ছেন তিউনিসিয়ার পরবর্তী নেতা। তাঁকে একজন সমাজবিজ্ঞানী চিহ্নিত করেছেন এভাবে_‘modernist’, but with deep roots in its Arab-Islami identity’। এটাই হচ্ছে আসল কথা। ঘান্নুচি কট্টর নন, আধুনিকমনস্ক এক মানুষ, যিনি এরাবিয়ান ও ইসলামিক ঐতিহ্য ধারণ করেন। তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে 'বিপ্লব'-পরবর্তী তিউনিসিয়ায় নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চান। সম্ভবত তিনি হতে যাচ্ছেন 'তিউনিসিয়ার 'এরদোগান'। তুরস্কের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী এরদোগান তাঁর আদর্শ। তুরস্কের মডেল তিনি অনুসরণ করতে চান তিউনিসিয়ায়। তবে তিউনিসিয়ার পটপরিবর্তন মিসরের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, সেটা একটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু মিসরের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্নতর। সেখানে 'ইসলামিক ব্রাদারহুড' একটি শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। সমাজের সর্বত্র এদের সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। দলটি নিষিদ্ধ থাকলেও ভিন্ন সংগঠনের নামে এর কর্মীরা সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এরা একটি শক্তি। মুবারকবিরোধী আন্দোলনেও এরা অংশ নিয়েছিল। ২৮ নভেম্বর ২০১১ সেখানে সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে এনাহদার মতো 'ইসলামিক ব্রাদারহুডও' যে ভালো ফল করবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
তবে মিসরের সমস্যাটা অন্যত্র। ১১ ফেব্রুয়ারি (১১) হোসনি মুবারকের পদত্যাগের পর ফিল্ড মার্শাল হোসেন তানতাবির নেতৃত্বে ২৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সামরিক জান্তা সেখানে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। এখন শোনা যাচ্ছে, তানতাবি নিজেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আগামী বছরের শেষের দিকে অথবা ২০১৩ সালের প্রথমদিকে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সামরিক জান্তাও চাচ্ছে নয়া সংবিধানে তাদের একটা সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এখন তানতাবির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিসরের বিশ্বাসকে একটা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আরব বিশ্বে একটা পরিবর্তন আসছে। গত ৬০ বছরের আরব বিশ্বের রাজনীতিতে তিনটি ধারা লক্ষণীয়। ১৯৫২ সালে জামাল আবদুল নাসেরের মিসরের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রথম ধারা। তিনি আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম দিয়ে আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে, যখন আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে আরব বিশ্বে ইসরায়েলি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর। ইরানি বিপ্লব ইরানকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। এই বিপ্লব ওই সময় আরব বিশ্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। এখন 'আরব বসন্ত' চতুর্থ একটি ধারার সূচনা করল।' তিউনিসিয়ায় 'জেসমিন বিপ্লব' একটি পরিবর্তনের সূচনা করল। ইসলামপন্থী কিন্তু আধুনিকমনস্ক একটা নয়া নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে আরব বিশ্বে। এনাহদার বিজয় এ কথাই প্রমাণ করল।দৈনিক কালের কণ্ঠ। ২০ নভেম্বর ২০১১। ড. তারেক শামসুর রেহমান অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
কেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে আরো বেশ কিছুটা সময়, আরো দুই বছর। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই হিসাবে নতুন সংবিধান অনুযায়ী ২০১৩ সালের শেষের দিকে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নির্বাচন ইস্যুতে জাতি আবারও বিভক্ত হয়েছে। খালেদা জিয়া দাবি করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় নির্বাচন হতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই নির্বাচন হবে এবং ১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, বিএনপিকে এই নির্বাচনে আসতেই হবে। আমি এটা বুঝতে অক্ষম, প্রধানমন্ত্রী কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নেবেই।
পরিস্থিতি যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেশকে আবার এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে নির্বাচনটি দুই বছর পর হতে যাচ্ছে, তা কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় হবে, নাকি দলীয় সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হবে? যদি সংবিধান অনুসরণ করি, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এখন আর সংবিধানে নেই। নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের আওতায়। কিন্তু বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে দলীয় সরকারের সময় যে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। অতীতে মাগুরা উপনির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মহাজোট সরকারের সময় ভোলায় যে উপনির্বাচন হয়েছে, তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা গণতন্ত্র চাই বটে, কিন্তু নিজ দলীয় কর্তৃত্বের আওতায় সেই গণতন্ত্রকে দেখতে চাই। সুতরাং দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে নেই বটে, কিন্তু তার পরও একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, এ দেশে গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি একটি বড় দল। এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দলটির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে এবং এই ভূমিকা আগামীতেও থাকবে। দলটিকে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। তাদের নীতি ও আদর্শ নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু দলটিকে কোনো অবস্থায়ই অবজ্ঞা করা যায় না। সেটা শোভন নয়। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া বিশাল সমাবেশে হরতালের কর্মসূচি দিলে আমি অবাক হতাম না। কিন্তু হরতাল না দিয়ে তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। হরতালে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। অর্থনীতির ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীরা অসন্তুষ্ট হন। এ ক্ষেত্রে 'রোডমার্চ'-এর কর্মসূচি দিয়ে বিএনপি পরোক্ষভাবে সরকারের ওপর একটি 'চাপ' সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা চার দল কম আসন পেয়েছে। কিন্তু মাত্র ৩০টি আসনের এই দলটিকে গ্রহণযোগ্যতায় না নেওয়া ঠিক হবে না। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে তারা ভোট পেয়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ ভাগ (আওয়ামী লীগ ৪৮ দশমিক ০৬ ভাগ)। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নিয়ে দলটিকে বিচার করতে হবে। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোতে বিএনপির অবস্থান অনেকটা এ রকম : পঞ্চম জাতীয় সংসদে ১৪১ আসন (ভোটপ্রাপ্তি ৩০.৮১ ভাগ), সপ্তম জাতীয় সংসদে ১১৬ আসন (প্রাপ্ত ভোট ৩৩ দশমিক ৬১ ভাগ), অষ্টম জাতীয় সংসদে ১৯৩ আসন (প্রাপ্ত ভোট ৪০ দশমিক ৯৭ ভাগ)। এর আগে ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করলাম না। কেননা ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আর ১৯৭৯ সালের নির্বাচন হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের আওতায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচন দেশে আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে এবং ওই সংসদে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ আবার সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে আসে। এ ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রতিটিতে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং কখনো বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে, কখনো বিএনপি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। আজকে সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপির যে অবস্থান, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল অনেকটা তেমনই। যদিও আসনসংখ্যা বেশি ছিল ৬২ (৪০ দশমিক ১৩ ভাগ ভোট)। এ ক্ষেত্রে এ দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, ঠিক তেমনই বাদ দেওয়া যাবে না বিএনপিকে। এই দুটি দলের পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় রাজনীতি আরো শক্তিশালী হবে। আস্থার ঘাটতি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। 'ওয়ান-ইলেভেন' এর বড় প্রমাণ।
এখন সৈয়দ আশরাফ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার কথা বলছেন। যদি আস্থার ঘাটতি থাকে, তাহলে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনার দিয়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী করা যাবে না। প্রশ্ন আরো আছে। যেখানে দুজন কমিশনারেরই কাজ নেই, সেখানে বাড়তি আরো দুজন কমিশনার কী কাজ করবেন আমি বুঝতে পারছি না। সপ্তাহখানেক আগে একটি গবেষণার কাজে আমি নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু কথাবার্তা আমার কানে এসেছে। বসার জায়গা নেই, গাড়ির ব্যবস্থা নেই_এমতাবস্থায় সংবিধান অনুযায়ী আরো দুজন কমিশনার নিয়োগ দিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এমনকি এই পাঁচজনের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে মতের যে মিল থাকবে, তার গ্যারান্টিও কেউ দিতে পারে না। তাহলে আমরা লাভবান হলাম কতটুকু? বিষয়টি ভাবনার। উপরন্তু আরো যে সমস্যা রয়ে গেছে, তা হচ্ছে বিরোধী দলের সঙ্গে শলাপরামর্শ না করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিলে তাতে জটিলতা বাড়বে বৈ কমবে না। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সম্মতি প্রয়োজন। এ পদ্ধতির ব্যাপারটি নিয়েও বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলা যায়। কেননা নির্বাচন কমিশনাররা সব বিতর্কের ঊধর্ে্ব থাকবেন_এটাই কাম্য। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাঁরাই পরিচালনা করবেন। ওই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেছেন খালেদা জিয়া। তবে তত্ত্বাবধায়ক না বলে একটি 'নিরপেক্ষ সরকার'-এর অধীনে নির্বাচন তো হতে পারে। তাতে ক্ষতি কী? উচ্চ আদালত যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন, তাতে তো একটা পর্যবেক্ষণ ছিল। ওই পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করেই তো একটি 'দলনিরপেক্ষ' সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই একটি ফর্মুলা বের করা সম্ভব। এটা সংবিধানের অংশ হবে না। কিন্তু তারা দু-দুটি নির্বাচন পরিচালনা করবে। বাংলাদেশে এখনো অনেক গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁরা জাতির অভিভাবক। আমরা তাঁদের ওপর আস্থা রাখতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, উদ্যোগটা কে নেবে? বিরোধী দল তো কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। উদ্যোগটা তো নিতে হবে সরকারকেই। কিন্তু সরকার যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাতে বরং জটিলতা বাড়বেই।
তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হোক, একটি নিরপেক্ষ সরকারের আওতায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা যায়। এটা করা জাতির জন্যই মঙ্গল। তা না হলে বিএনপি তথা চারদলীয় জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে, দেশে ও বিদেশে ওই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, বিএনপির নির্বাচন বয়কট দেশকে আবার ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনীতিতে সংঘাত বৃদ্ধি পাবে এবং অসাংবিধানিক শক্তিগুলো এ থেকে ফায়দা নিতে পারে। দেশের চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা এক চরম ঝুঁকির মুখে থাকবে। চতুর্থত, অর্থনীতিতে এর যে প্রভাব পড়বে, সরকারের পক্ষে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। পঞ্চমত, দাতাগোষ্ঠী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর। তারা সব সময়ই একটি সমঝোতার কথা বলে। এ ক্ষেত্রে সরকারের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে দাতারা সরকারের ওপর থেকে আস্থা তুলে নিতে পারে। ষষ্ঠত, সরকার জাতীয় পার্টিকে নিয়ে একটা 'স্বপ্ন' দেখলেও জাতীয় পার্টি যে পক্ষ ত্যাগ করবে না, তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। অতীতে এরশাদ আওয়ামী লীগকে নিয়ে নির্বাচন করলেও (১৯৮৬) ক্ষমতা নিয়মসিদ্ধ করতে পারেননি। আবার আ স ম আবদুর রবকে (১৯৮৮) বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারেননি। বাস্তবতাই হচ্ছে, এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভূমিকা ব্যাপক। এ দুই দলের একটিকে বাদ দিলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখন তাই তত্ত্বাবধায়ক না হোক, একটি 'নিরপেক্ষ সরকারের' আওতায় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে উচ্চ আদালতের রায়, যার একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে, কিন্তু অপর অংশে পরবর্তী দুটি নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় করার কথা বলা হয়েছে।পুরো লেখাটি ই পেপার আকারে দেখতে চাইলে ক্লিক করুন।
মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০১১, দৈনিক কালের কন্ঠ।ড. তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
পরিস্থিতি যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেশকে আবার এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে নির্বাচনটি দুই বছর পর হতে যাচ্ছে, তা কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় হবে, নাকি দলীয় সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত হবে? যদি সংবিধান অনুসরণ করি, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এখন আর সংবিধানে নেই। নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের আওতায়। কিন্তু বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে দলীয় সরকারের সময় যে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। অতীতে মাগুরা উপনির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মহাজোট সরকারের সময় ভোলায় যে উপনির্বাচন হয়েছে, তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা গণতন্ত্র চাই বটে, কিন্তু নিজ দলীয় কর্তৃত্বের আওতায় সেই গণতন্ত্রকে দেখতে চাই। সুতরাং দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে নেই বটে, কিন্তু তার পরও একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, এ দেশে গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি একটি বড় দল। এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দলটির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে এবং এই ভূমিকা আগামীতেও থাকবে। দলটিকে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। তাদের নীতি ও আদর্শ নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু দলটিকে কোনো অবস্থায়ই অবজ্ঞা করা যায় না। সেটা শোভন নয়। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া বিশাল সমাবেশে হরতালের কর্মসূচি দিলে আমি অবাক হতাম না। কিন্তু হরতাল না দিয়ে তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। হরতালে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। অর্থনীতির ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীরা অসন্তুষ্ট হন। এ ক্ষেত্রে 'রোডমার্চ'-এর কর্মসূচি দিয়ে বিএনপি পরোক্ষভাবে সরকারের ওপর একটি 'চাপ' সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা চার দল কম আসন পেয়েছে। কিন্তু মাত্র ৩০টি আসনের এই দলটিকে গ্রহণযোগ্যতায় না নেওয়া ঠিক হবে না। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে তারা ভোট পেয়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ ভাগ (আওয়ামী লীগ ৪৮ দশমিক ০৬ ভাগ)। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নিয়ে দলটিকে বিচার করতে হবে। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোতে বিএনপির অবস্থান অনেকটা এ রকম : পঞ্চম জাতীয় সংসদে ১৪১ আসন (ভোটপ্রাপ্তি ৩০.৮১ ভাগ), সপ্তম জাতীয় সংসদে ১১৬ আসন (প্রাপ্ত ভোট ৩৩ দশমিক ৬১ ভাগ), অষ্টম জাতীয় সংসদে ১৯৩ আসন (প্রাপ্ত ভোট ৪০ দশমিক ৯৭ ভাগ)। এর আগে ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করলাম না। কেননা ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আর ১৯৭৯ সালের নির্বাচন হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের আওতায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচন দেশে আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে এবং ওই সংসদে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ আবার সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে আসে। এ ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রতিটিতে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং কখনো বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে, কখনো বিএনপি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। আজকে সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপির যে অবস্থান, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল অনেকটা তেমনই। যদিও আসনসংখ্যা বেশি ছিল ৬২ (৪০ দশমিক ১৩ ভাগ ভোট)। এ ক্ষেত্রে এ দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, ঠিক তেমনই বাদ দেওয়া যাবে না বিএনপিকে। এই দুটি দলের পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় রাজনীতি আরো শক্তিশালী হবে। আস্থার ঘাটতি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। 'ওয়ান-ইলেভেন' এর বড় প্রমাণ।
এখন সৈয়দ আশরাফ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার কথা বলছেন। যদি আস্থার ঘাটতি থাকে, তাহলে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনার দিয়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী করা যাবে না। প্রশ্ন আরো আছে। যেখানে দুজন কমিশনারেরই কাজ নেই, সেখানে বাড়তি আরো দুজন কমিশনার কী কাজ করবেন আমি বুঝতে পারছি না। সপ্তাহখানেক আগে একটি গবেষণার কাজে আমি নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু কথাবার্তা আমার কানে এসেছে। বসার জায়গা নেই, গাড়ির ব্যবস্থা নেই_এমতাবস্থায় সংবিধান অনুযায়ী আরো দুজন কমিশনার নিয়োগ দিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এমনকি এই পাঁচজনের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে মতের যে মিল থাকবে, তার গ্যারান্টিও কেউ দিতে পারে না। তাহলে আমরা লাভবান হলাম কতটুকু? বিষয়টি ভাবনার। উপরন্তু আরো যে সমস্যা রয়ে গেছে, তা হচ্ছে বিরোধী দলের সঙ্গে শলাপরামর্শ না করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিলে তাতে জটিলতা বাড়বে বৈ কমবে না। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সম্মতি প্রয়োজন। এ পদ্ধতির ব্যাপারটি নিয়েও বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলা যায়। কেননা নির্বাচন কমিশনাররা সব বিতর্কের ঊধর্ে্ব থাকবেন_এটাই কাম্য। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাঁরাই পরিচালনা করবেন। ওই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেছেন খালেদা জিয়া। তবে তত্ত্বাবধায়ক না বলে একটি 'নিরপেক্ষ সরকার'-এর অধীনে নির্বাচন তো হতে পারে। তাতে ক্ষতি কী? উচ্চ আদালত যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন, তাতে তো একটা পর্যবেক্ষণ ছিল। ওই পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করেই তো একটি 'দলনিরপেক্ষ' সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই একটি ফর্মুলা বের করা সম্ভব। এটা সংবিধানের অংশ হবে না। কিন্তু তারা দু-দুটি নির্বাচন পরিচালনা করবে। বাংলাদেশে এখনো অনেক গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁরা জাতির অভিভাবক। আমরা তাঁদের ওপর আস্থা রাখতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, উদ্যোগটা কে নেবে? বিরোধী দল তো কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। উদ্যোগটা তো নিতে হবে সরকারকেই। কিন্তু সরকার যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাতে বরং জটিলতা বাড়বেই।
তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হোক, একটি নিরপেক্ষ সরকারের আওতায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা যায়। এটা করা জাতির জন্যই মঙ্গল। তা না হলে বিএনপি তথা চারদলীয় জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে, দেশে ও বিদেশে ওই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, বিএনপির নির্বাচন বয়কট দেশকে আবার ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনীতিতে সংঘাত বৃদ্ধি পাবে এবং অসাংবিধানিক শক্তিগুলো এ থেকে ফায়দা নিতে পারে। দেশের চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা এক চরম ঝুঁকির মুখে থাকবে। চতুর্থত, অর্থনীতিতে এর যে প্রভাব পড়বে, সরকারের পক্ষে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। পঞ্চমত, দাতাগোষ্ঠী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর। তারা সব সময়ই একটি সমঝোতার কথা বলে। এ ক্ষেত্রে সরকারের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে দাতারা সরকারের ওপর থেকে আস্থা তুলে নিতে পারে। ষষ্ঠত, সরকার জাতীয় পার্টিকে নিয়ে একটা 'স্বপ্ন' দেখলেও জাতীয় পার্টি যে পক্ষ ত্যাগ করবে না, তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। অতীতে এরশাদ আওয়ামী লীগকে নিয়ে নির্বাচন করলেও (১৯৮৬) ক্ষমতা নিয়মসিদ্ধ করতে পারেননি। আবার আ স ম আবদুর রবকে (১৯৮৮) বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারেননি। বাস্তবতাই হচ্ছে, এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভূমিকা ব্যাপক। এ দুই দলের একটিকে বাদ দিলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখন তাই তত্ত্বাবধায়ক না হোক, একটি 'নিরপেক্ষ সরকারের' আওতায় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে উচ্চ আদালতের রায়, যার একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে, কিন্তু অপর অংশে পরবর্তী দুটি নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় করার কথা বলা হয়েছে।পুরো লেখাটি ই পেপার আকারে দেখতে চাইলে ক্লিক করুন।
মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০১১, দৈনিক কালের কন্ঠ।ড. তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
মনমোহনের ঢাকা সফর কতটা ফলপ্রসূ হবে
আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় আসছেন। যে কোন বিবেচনায় এ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সোনিয়া গান্ধীসহ একাধিক মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এ কথাই প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকারকে ভারত খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। ২৯ আগস্ট ঢাকা ঘুরে গেলেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন। ধারণা করা হচ্ছে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যেসব চুক্তি হবে, তা চূড়ান্ত করতেই শিবশংকর মেনন ঢাকায় এসেছিলেন। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যেসব বিষয়ে চুক্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন ও ফেনী নদীর কিছু পানি প্রত্যাহার সংক্রান্ত একটি চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমি হস্তান্তর ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ট্রানজিট সংক্রান্ত কোন চুক্তি হচ্ছে না বলেই জানা গেছে। তবে এটা ঠিক কোন কোন বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। পত্রপত্রিকায় আভাষ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
প্রথমেই এসে যায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখেরি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিলÑ তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাবে ভাগ হবে আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। এখন একটা চুক্তি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন, তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কী? আমরা কি তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? আমি নিশ্চিত নই আগের অবস্থান থেকে আমরা সরে এসেছি কিনা? অবশ্যই একটি চুক্তি ভালো, যদি সেই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়। যে চুক্তিতে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে, সেই চুক্তিকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি আমরা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। প্রতিবছরই সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ কথাটা। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচকাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। আমরা কি এটা বিবেচনায় নিয়েছি?
ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তি হবে। কিন্তু এতে কি বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে? বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিটপ্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয়, ভারত সীমান্তের যত দূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ২ রুপি। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোন জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্যও একটি চুক্তি হবে। এই কয়লা আসবে ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের। এখানে যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমরা ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলাম? এই নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না।
ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়, সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সুন্দরবন সুরক্ষা, বিটিভি ও দূরদর্শনের সম্প্রচার বিনিময় ইত্যাদি যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হবে, তা আমার বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার বিবেচনায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা বা চুক্তি হওয়া উচিত, তা হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য, যা যৌথ ইশতেহারে থাকতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতকে উদ্যোগী হতে হবে স্পষ্ট করে। ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা চলবে না। এই ট্যারিফ কমানের কোন উদ্যোগ ভারত কখনও নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ, তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সঙ্গে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়লেও, ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা ৮০ লাখ পিছ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটিতে উন্নীত করলেও অশুল্কের কারণে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এজন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনোই দেয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের সফরের সময় এই অশুল্ক বাধা নিয়ে আদৌ কোন আলোচনা হবে না। যেখানে আমাদের স্বার্থ জড়িত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে যদি আলোচনা না-ই হয়, তাহলে এই সফরকে আমরা সফল বলতে পারি না।
টিপাইমুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ নেই। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। কিন্তু সম্প্রতি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন নর্থইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ। তিনি বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে থাকবে না কেন? টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ট্রানজিট নিয়ে কোন চুক্তি হচ্ছে না। তবে ট্রানজিটের কাঠামোর ব্যাপারে সমঝোতা হতে পারে। অর্থাৎ কীভাবে ট্রানজিট চলবে, এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা। ভারত ১৫টি রুটে (নদীপথ, সড়কপথ ও রেলযোগাযোগ) ট্রানজিট চাচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের জন্যই আমরা অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছি। ওই ঋণ (১০০ কোটি ডলার) সুদমুক্ত নয়। আমাদের অবকাঠামো ভারত ব্যবহার করবে। আমাদের স্বার্থ এখানে নেই। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী নয়াদিল্লি সফর করে এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন নতুন করে ট্রানজিট চুক্তি করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে ভারত এই ট্রানজিট সুবিধা পেতে পারে। ড. রিজভীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট প্রাপ্তির সুযোগ থাকত, তাহলে ভারত অনেক আগেই এই সুযোগ গ্রহণ করত। অন্তত গওহর রিজভীর বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করত না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (মমতা ব্যানার্জি-পশ্চিমবঙ্গ, তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পু লালথান ওয়ালা-মিজোরাম)। এতেই বোঝা যায় ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায়। এ ধরনের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা নেই। ড. মনমোহন সিং আমাদের অতিথি। আমরা অতিথিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে মনমোহন সিং যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন, তাতে করে এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন তিনি পাবেন না। চুক্তি ও সমঝোতাগুলো হতে যাচ্ছে একপক্ষীয়।
দৈনিক যুগান্তর ৫ই সেপ্টেম্বর ২০১১
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথমেই এসে যায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখেরি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিলÑ তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাবে ভাগ হবে আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। এখন একটা চুক্তি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন, তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কী? আমরা কি তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? আমি নিশ্চিত নই আগের অবস্থান থেকে আমরা সরে এসেছি কিনা? অবশ্যই একটি চুক্তি ভালো, যদি সেই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়। যে চুক্তিতে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে, সেই চুক্তিকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি আমরা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। প্রতিবছরই সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ কথাটা। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচকাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। আমরা কি এটা বিবেচনায় নিয়েছি?
ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তি হবে। কিন্তু এতে কি বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে? বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিটপ্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয়, ভারত সীমান্তের যত দূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ২ রুপি। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোন জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্যও একটি চুক্তি হবে। এই কয়লা আসবে ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের। এখানে যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমরা ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলাম? এই নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না।
ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়, সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সুন্দরবন সুরক্ষা, বিটিভি ও দূরদর্শনের সম্প্রচার বিনিময় ইত্যাদি যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হবে, তা আমার বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার বিবেচনায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা বা চুক্তি হওয়া উচিত, তা হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য, যা যৌথ ইশতেহারে থাকতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতকে উদ্যোগী হতে হবে স্পষ্ট করে। ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা চলবে না। এই ট্যারিফ কমানের কোন উদ্যোগ ভারত কখনও নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ, তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সঙ্গে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়লেও, ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা ৮০ লাখ পিছ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটিতে উন্নীত করলেও অশুল্কের কারণে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এজন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনোই দেয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের সফরের সময় এই অশুল্ক বাধা নিয়ে আদৌ কোন আলোচনা হবে না। যেখানে আমাদের স্বার্থ জড়িত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে যদি আলোচনা না-ই হয়, তাহলে এই সফরকে আমরা সফল বলতে পারি না।
টিপাইমুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ নেই। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। কিন্তু সম্প্রতি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন নর্থইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ। তিনি বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে থাকবে না কেন? টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ট্রানজিট নিয়ে কোন চুক্তি হচ্ছে না। তবে ট্রানজিটের কাঠামোর ব্যাপারে সমঝোতা হতে পারে। অর্থাৎ কীভাবে ট্রানজিট চলবে, এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা। ভারত ১৫টি রুটে (নদীপথ, সড়কপথ ও রেলযোগাযোগ) ট্রানজিট চাচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের জন্যই আমরা অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছি। ওই ঋণ (১০০ কোটি ডলার) সুদমুক্ত নয়। আমাদের অবকাঠামো ভারত ব্যবহার করবে। আমাদের স্বার্থ এখানে নেই। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী নয়াদিল্লি সফর করে এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন নতুন করে ট্রানজিট চুক্তি করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে ভারত এই ট্রানজিট সুবিধা পেতে পারে। ড. রিজভীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট প্রাপ্তির সুযোগ থাকত, তাহলে ভারত অনেক আগেই এই সুযোগ গ্রহণ করত। অন্তত গওহর রিজভীর বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করত না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (মমতা ব্যানার্জি-পশ্চিমবঙ্গ, তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পু লালথান ওয়ালা-মিজোরাম)। এতেই বোঝা যায় ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায়। এ ধরনের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা নেই। ড. মনমোহন সিং আমাদের অতিথি। আমরা অতিথিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে মনমোহন সিং যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন, তাতে করে এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন তিনি পাবেন না। চুক্তি ও সমঝোতাগুলো হতে যাচ্ছে একপক্ষীয়।
দৈনিক যুগান্তর ৫ই সেপ্টেম্বর ২০১১
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর: কিছু প্রশ্ন
মনমোহন সিং ঢাকায় আসছেন। দিনক্ষণ একরকম ঠিক। ইতোমধ্যে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষ টিম ঢাকা সফর করে গেছেন। সরকারের দুজন উপদেষ্টা নয়াদিলি্ল সফর করে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে যেসব চুক্তি হবে, তা একরকম চূড়ান্ত করে এসেছেন। তাদের এই সফর নিয়ে মিডিয়ায় কিছু কিছু গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। ড. গওহর রিজভী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার নয়াদিলি্ল সফরের একটা যুক্তি থাকলেও অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের নয়াদিলি্ল সফরের যুক্তি কি? দেখা যাচ্ছে ড. মসিউর রহমান ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশকিছু চুক্তির ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল মুখ্য। তিনি ট্রানজিট নিয়ে যে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, অনেকেই তার সমালোচনা করেছেন। এমনকি নয়াদিলি্ল সফরের পর তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারেও যে মন্তব্য করেছেন, তাও তাকে বিতর্কিত করেছে। তিনি বলেছেন, তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগি করা হবে। তার এই বক্তব্য স্পষ্ট নয় এবং অতীতে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে বাংলাদেশ যে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তার পরিপন্থী। এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ড. রহমান আশা করছেন এতে করে দুদেশ প্রায় সমান সমান পানি পাবে। এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যেতে পারে। কেননা তিস্তার ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে একটা ফাঁক থেকে যেতে পারে। ড. মসিউর রহমানের কাছে এ ধরনের তথ্য আছে কি না আমি জানি না। এ ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনায় বাংলাদেশের কী পরিমাণ জমি ও জনসংখ্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাও গোপন রাখা হয়েছে। তবে মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরের সঙ্গে এই তিস্তার পানি চুক্তির একটা যোগ আছে। তিস্তার পানি বণ্টন পশ্চিমবঙ্গের বিগত বিধান সভার নির্বাচনের আগে একটা ইস্যু হয়ে গিয়েছিল। মমতা ব্যানার্জি তার একাধিক বক্তৃতায় (নির্বাচনের আগে) হুমকি দিয়েছিলেন তিস্তার পানি বণ্টনে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ রক্ষা করার। এখন একটি চুক্তি হবে। কিন্তু চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানতে পারবো কি না, এটা আমি নিশ্চিত নই। চুক্তি কোনো খারাপ কিছু নয়। চুক্তি হওয়াটা প্রয়োজন। তিস্তা কেন, দুদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটা ঐকমত্যে পেঁৗছানো দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের স্বার্থ ঠিকমতো রক্ষিত হচ্ছে না। অভিযোগ আছে এবং পত্রপত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে যে গঙ্গার পানি চুক্তি (১৯৯৬) করেও আমরা চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছি না। ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তিটি হয়েছে বটে। কিন্তু যদি পানি নেই, তাহলে চুক্তি করে লাভ কী হবে? টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা গেল বছর টিপাইমুখ গিয়েছিলেন। হেলিকপ্টারে ঘুরলেন। জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করছিল। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের বারবার আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। ভারতের উচ্চমহল থেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা বা নেপাল ও ভুটান এখনো ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভি ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভি ট্রাক যাচ্ছে কোন ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুণতে থাকবো সুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুৎ আসবে ভারত থেকে। কই সেই বিদ্যুৎ? ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ভারতে থাকলেও, তা নানা ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। জানা গেছে আগামী ৩ বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরো ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করার অনুমতি চেয়েছে। অথচ ভারতে বাংলাদেশি ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে, যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে।
সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা (দিনকাল, ১৭ মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশে কখনই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মতো নেতারা কোনোদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতৃবৃন্দ বারবার ভারতীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। বলতে দ্বিধা নেই শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ মূলত ভারতীয় দ্বিপাক্ষিক নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্দ্র প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা নেপাল অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলংকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই সৃষ্টি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য দূরীকরণের তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব বিস্তার রাজনীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় 'বন্ধুশূন্য' হতে যাচ্ছে। ক্ষমতা বাণিজ্য, প্রণব মুখার্জি- এরা সবাই মূলত ওই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা মস্নান হয়ে গেছে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মনোভাবের কারণে। ফেলানি যেন একটুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানিরা, তখন ভারতের 'বন্ধুত্ব' নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কিভাবে দেখে, ফেলানির ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জি যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন, তখন আমাদের উৎসাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তৎকালীন ভারতীয় সরকারের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, তখন মমতা এর প্রচ- বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে 'মোস্ট আনপ্রেডিকটেবল পারসন', যার ওপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোনো সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার অাঁতাত, কতদিন স্থায়ী হয়, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় একাধিক চুক্তি হবে। কিন্তু এর একটি ব্যাপারেও সংসদে আলোচনা হলো না। সমগ্র জাতিকে অন্ধকারে রেখে চুক্তিগুলো করা হচ্ছে। সংসদীয় রাজনীতির বৈশিষ্ট্য এখানেই যে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে। বিরোধী দল তাদের মতামত দেবে। ডিবেট হবে। কিন্তু কৈ সেই ডিবেট? বিরোধী দল সংসদে যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি আছে। তারপরও তাদের সংসদে যাওয়া উচিত, যাতে করে তারা প্রসঙ্গগুলো করতে পারেন। জাতিকে জানাতে পারেন চুক্তিগুলো সম্পর্কে।
মনমোহন সিং ঢাকায় আসছেন। তিনি আমাদের অতিথি। আমরা অতিথিকে অবশ্যই সম্মান জানাবো। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি যদি তিনি করেন, তাহলে বাংলাদেশিদের কাছে তিনি বিতর্কিত নেতা হিসেবেই থেকে যাবেন। আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই।
বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু ভারত তার নিজ স্বার্থে একের পর এক চুক্তি করবে এবং যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না, ভারত সরকারের এই মনোভাব দুদেশের বন্ধুত্বকে কখনো আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। সাময়িক সুবিধা তাতে পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা তাতে পাওয়া যাবে না। যায় যায় দিন, শনিবার ২৭ আগস্ট ২০১১ ১২ ভাদ্র ১৪১৮ ২৬ রমজান।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ..
সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা (দিনকাল, ১৭ মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশে কখনই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মতো নেতারা কোনোদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতৃবৃন্দ বারবার ভারতীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। বলতে দ্বিধা নেই শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ মূলত ভারতীয় দ্বিপাক্ষিক নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্দ্র প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা নেপাল অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলংকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই সৃষ্টি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য দূরীকরণের তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব বিস্তার রাজনীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় 'বন্ধুশূন্য' হতে যাচ্ছে। ক্ষমতা বাণিজ্য, প্রণব মুখার্জি- এরা সবাই মূলত ওই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা মস্নান হয়ে গেছে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মনোভাবের কারণে। ফেলানি যেন একটুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানিরা, তখন ভারতের 'বন্ধুত্ব' নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কিভাবে দেখে, ফেলানির ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জি যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন, তখন আমাদের উৎসাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তৎকালীন ভারতীয় সরকারের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, তখন মমতা এর প্রচ- বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে 'মোস্ট আনপ্রেডিকটেবল পারসন', যার ওপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোনো সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার অাঁতাত, কতদিন স্থায়ী হয়, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় একাধিক চুক্তি হবে। কিন্তু এর একটি ব্যাপারেও সংসদে আলোচনা হলো না। সমগ্র জাতিকে অন্ধকারে রেখে চুক্তিগুলো করা হচ্ছে। সংসদীয় রাজনীতির বৈশিষ্ট্য এখানেই যে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে। বিরোধী দল তাদের মতামত দেবে। ডিবেট হবে। কিন্তু কৈ সেই ডিবেট? বিরোধী দল সংসদে যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি আছে। তারপরও তাদের সংসদে যাওয়া উচিত, যাতে করে তারা প্রসঙ্গগুলো করতে পারেন। জাতিকে জানাতে পারেন চুক্তিগুলো সম্পর্কে।
মনমোহন সিং ঢাকায় আসছেন। তিনি আমাদের অতিথি। আমরা অতিথিকে অবশ্যই সম্মান জানাবো। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি যদি তিনি করেন, তাহলে বাংলাদেশিদের কাছে তিনি বিতর্কিত নেতা হিসেবেই থেকে যাবেন। আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই।
বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু ভারত তার নিজ স্বার্থে একের পর এক চুক্তি করবে এবং যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না, ভারত সরকারের এই মনোভাব দুদেশের বন্ধুত্বকে কখনো আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। সাময়িক সুবিধা তাতে পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা তাতে পাওয়া যাবে না। যায় যায় দিন, শনিবার ২৭ আগস্ট ২০১১ ১২ ভাদ্র ১৪১৮ ২৬ রমজান।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ..
একটি মৃত্যু ও অনেক প্রশ্ন
পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। কেননা তিনি \'অভিযুক্ত আসামি\' ছিলেন। পুলিশ তার \'দায়িত্ব\' পালন করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু গ্রেফতারের পর কিছুটা মানবিক হলে তো ক্ষতির কিছু ছিল না। যে লোকটি এক রকম সুস্থই ছিলেন বাসাতে অর্থাৎ গ্রেফতারের সময়, তিনি গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে \'অসুস্থ\' হয়ে যান কী ভাবে? শেষ পর্যন্ত অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদ মারা গেলেন। হাইকোর্টে হাতাহাতি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও পরিবেশ নষ্টের কারণে যে ১৪ জন বিএনপিপন্থি আইনজীবীর নামে পুলিশ মামলা করেছিল তিনি ছিলেন তাদের একজন। ১৩ জন অভিযুক্ত আইনজীবী নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ ও পরে জামিন পেলেও প্রয়াত অ্যাডভোকেট জামিন নিতে পারেননি। কেননা তিনি তখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। শেষ পর্যন্ত জামিন না নিয়েই তিনি চলে গেলেন এমন এক \'রাজ্যে\' যেখান থেকে কেউ কোনোদিন আর ফিরে আসে না। অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। অভিযোগ উঠেছে, গ্রেফতারের পর তার ওপর নির্যাতন করা হয়। তার স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, পুলিশি নির্যাতনে অসুস্থ হয়েই তিনি মারা গেছেন। আমরা জানি না, এর পেছনে সত্যতা কতটুকু। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া যখন দাবি করেন পুলিশের অত্যাচারেই এমইউ আহমেদের মৃত্যু হয়েছে, তখন এটিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। কেননা তিনি \'অভিযুক্ত আসামি\' ছিলেন। পুলিশ তার \'দায়িত্ব\' পালন করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু গ্রেফতারের পর কিছুটা মানবিক হলে তো ক্ষতির কিছু ছিল না। যে লোকটি এক রকম সুস্থই ছিলেন বাসাতে অর্থাৎ গ্রেফতারের সময়, তিনি গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে \'অসুস্থ\' হয়ে যান কী ভাবে? আমি ঠিক জানি না, প্রয়াত অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদ অতীতে কখনও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি-না? কিংবা তিনি নিয়মিত হার্টের ডাক্তারের কাছে যেতেন কি-না? তবে দুটো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে হার্টের অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে। তার স্ত্রী নিশ্চয়ই পুলিশকে এ তথ্য দিয়েছিলেন। তারপরও তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করা এবং ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া_ নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে এখন। পত্রপত্রিকা ঘেঁটে দেখেছি, আইজিপি মহোদয় হার্টের সমস্যার কথা বলেছেন। তাহলে তো তাকে আগে হাসপাতালে নেওয়ার কথা। সুতরাং নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে তা একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। দ্বিতীয়ত, তার স্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, প্রয়াত অ্যাডভোকেট আহমেদকে \'ইলেকট্রিক শক\' দেওয়া হয়েছিল। তার শরীরে (বাম হাতের কব্জি) ইলেকট্রিক শকের দাগ রয়েছে। এটি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে তা নিন্দনীয় এবং একটি অপরাধ। এই অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদেরই শাস্তি হওয়া উচিত। একমাত্র তার চিকিৎসকরাই বলতে পারবেন অভিযোগটি সত্য কি-না। ইদানীং বড় বড় হাসপাতালে রোগীদের \'রোগের ইতিহাস\' লেখা থাকে। রোগীকে যখন ভর্তি করানো হয় তখন রোগীর অবস্থাও রেকর্ড করা হয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও স্কয়ার হাসপাতালের রিপোর্ট রয়েছে। এই রেকর্ড ফাইল প্রয়াত আহমেদের পরিবারের কাছে থাকার কথা। রিপোর্টে অবশ্যই শরীরে \'ইলেকট্রিক শক\'-এর দাগের কথা উল্লেখ থাকবে। তারা এটা প্রকাশ করতে পারেন। তাকে যারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন কিংবা শেষ দিন পর্যন্ত তিনি যার কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তিনিও বলতে পারেন এ বিষয়ে। তৃতীয়ত, প্রয়াত আহমেদ পুলিশ দেখলে চমকে উঠতেন। একজন স্বাভাবিক লোকের পুলিশ দেখে চমকে ওঠার কথা নয়। পুলিশ এমন কিছু করেছিল, যা এমইউ আহমেদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এখানেই এসে যায় \'ইলেকট্রিক শক\'-এর বিষয়টি। চতুর্থত, ওই দিন গ্রেফতারের (১১ আগস্ট রাত দেড়টা) পর এমইউ আহমেদ ৪ ঘণ্টা ছিলেন ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে (সকালের খবর, ২৭ আগস্ট)। কিন্তু পুলিশের ডিসি-ডিবি (উত্তর) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়ার পর অ্যাডভোকেট আহমেদ ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট (যুগান্তর, ২৭ আগস্ট)। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কি কোনো তথ্য গোপন করছেন? একটি সুষ্ঠু তদন্ত হলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। পঞ্চমত, পুলিশ কথা আদায় করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। তারা অত্যাচার করে। কথা আদায়ের নামে এই যে \'টর্চার\', পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে এমনটি নেই। পুলিশ প্রয়োজনে \'লাই ডিটেক্টর\' ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু টর্চার কেন? পুলিশের সংস্কারের কথা উঠেছে। ইউএনডিপির ফান্ডও রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এখানে জরুরি। প্রায়ই দেখা যায় পুলিশের অত্যাচারের ভয়ে অনেকে অনেক কথা স্বীকার করে। কিন্তু আদালতে গিয়ে তা আবার অস্বীকার করে। সুতরাং স্ট্র্যাটেজিতে কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন। ষষ্ঠত, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। এটি যুক্তিযুক্ত। ঘটনার গভীরতা বিশ্লেষণ করে ও প্রয়াত এমইউ আহমেদের সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সরকার হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এ ধরনের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। এতে করে সরকার তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবে। পুলিশের স্বার্থেই পুলিশ এই বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইতে পারে। কেননা পুলিশের বিরুদ্ধে ইদানীং যেসব অভিযোগ উঠেছে, তাতে পুলিশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়নি। লিমন, কাদের, মিলনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাকে কেউ সমর্থন করেনি। আমরা বলেছি, পুলিশের ভেতরে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা সুবিধাবাদী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি করার জন্য তারা এমন সব \'কাণ্ড\' করেন, যা সমগ্র পুলিশ প্রশাসনকে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। ফারুকের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়নি। \'অপরাধ\'কে পুলিশ প্রশাসন সমর্থন করেছে। এটি ভালো নয়। \'ক্রাইমস আনসিন এক্সট্রা জুডিসিয়াল এক্সিকিউশন ইন বাংলাদেশ\' শীর্ষক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টটিতে র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এতে করে কি বহির্বিশ্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে? আমরা বারবার বলে আসছি, বহির্বিশ্বে পুলিশ তথা র্যাবের কর্মকাণ্ড মনিটর করা হচ্ছে। একজন বা দু\'জন পুলিশ কর্মকর্তার কারণে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। অতি উৎসাহীরা পুলিশ বাহিনীতে থেকে এমন সব কাণ্ড ঘটান, যা বহির্বিশ্বে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের মৃত্যুর ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। প্রয়াত এমইউ আহমেদের মৃতদেহ ময়নাতদন্ত হওয়ার পর ইতিমধ্যেই বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে \'লোক দেখানো\' ময়নাতদন্তের। যিনি ময়নাতদন্ত করেছেন, তিনি একজন সহযোগী অধ্যাপক। একজন সিনিয়র শিক্ষক। তিনি \'লোক দেখানো\' ময়নাতদন্ত করবেন না_ এ বিশ্বাস আমার আছে।
আসলে অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের হাসপাতালে মৃত্যু নিয়ে যে ঘটনা ঘটল, তা এ দেশের রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। দুটি বড় দল, বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা এ মৃত্যুকে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। বিএনপি যখন বলছে, \'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড\' ও \'মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া\'র কথা, তখন আওয়ামী লীগের দু\'একজন নেতাও বলছেন \'লাশ নিয়ে রাজনীতি\' করার কথা। অ্যাটর্নি জেনারেলও অনেকটা এ সুরেই কথা বলছেন। তবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য যথেষ্ট \'ম্যাচিউরড\'। তিনি বলেছেন সুষ্ঠু বিচারের কথা। আমরাও তেমনটি চাই। তবে একটা কথা, যে \'ঘটনার\' জন্য প্রয়াত এমইউ আহমেদ অভিযুক্ত হয়েছিলেন অর্থাৎ আদালতে বিশৃঙ্খলা, এই বিশৃঙ্খলা যেন আমরা পরিহার করি। আদালত একটি পবিত্র জায়গা, স্লোগান দেওয়ার জায়গা নয়। বিচারের জন্য আমরা সেখানে যাই। এই মৃত্যু আমাদের মধ্যে উপলব্ধিবোধের জন্ম দিক_ আদালতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা \'মৃত্যুর\'ও কারণ হতে পারে কখনও সখনও। অতীতে এ ধরনের ঘটনা হয়েছে বলে আবার হবে_ এই মানসিকতা থাকা ভালো নয়। অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তিনি যদি হৃদরোগের অসুস্থতার কারণেও মারা গিয়ে থাকেন, তারপরও সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক, যাতে সব প্রশ্নের জবাব আমরা পেয়ে যাব।
ড. তারেক শামসুর রেহমান :অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। কেননা তিনি \'অভিযুক্ত আসামি\' ছিলেন। পুলিশ তার \'দায়িত্ব\' পালন করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু গ্রেফতারের পর কিছুটা মানবিক হলে তো ক্ষতির কিছু ছিল না। যে লোকটি এক রকম সুস্থই ছিলেন বাসাতে অর্থাৎ গ্রেফতারের সময়, তিনি গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে \'অসুস্থ\' হয়ে যান কী ভাবে? আমি ঠিক জানি না, প্রয়াত অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদ অতীতে কখনও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি-না? কিংবা তিনি নিয়মিত হার্টের ডাক্তারের কাছে যেতেন কি-না? তবে দুটো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে হার্টের অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে। তার স্ত্রী নিশ্চয়ই পুলিশকে এ তথ্য দিয়েছিলেন। তারপরও তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করা এবং ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া_ নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে এখন। পত্রপত্রিকা ঘেঁটে দেখেছি, আইজিপি মহোদয় হার্টের সমস্যার কথা বলেছেন। তাহলে তো তাকে আগে হাসপাতালে নেওয়ার কথা। সুতরাং নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে তা একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। দ্বিতীয়ত, তার স্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, প্রয়াত অ্যাডভোকেট আহমেদকে \'ইলেকট্রিক শক\' দেওয়া হয়েছিল। তার শরীরে (বাম হাতের কব্জি) ইলেকট্রিক শকের দাগ রয়েছে। এটি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে তা নিন্দনীয় এবং একটি অপরাধ। এই অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদেরই শাস্তি হওয়া উচিত। একমাত্র তার চিকিৎসকরাই বলতে পারবেন অভিযোগটি সত্য কি-না। ইদানীং বড় বড় হাসপাতালে রোগীদের \'রোগের ইতিহাস\' লেখা থাকে। রোগীকে যখন ভর্তি করানো হয় তখন রোগীর অবস্থাও রেকর্ড করা হয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও স্কয়ার হাসপাতালের রিপোর্ট রয়েছে। এই রেকর্ড ফাইল প্রয়াত আহমেদের পরিবারের কাছে থাকার কথা। রিপোর্টে অবশ্যই শরীরে \'ইলেকট্রিক শক\'-এর দাগের কথা উল্লেখ থাকবে। তারা এটা প্রকাশ করতে পারেন। তাকে যারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন কিংবা শেষ দিন পর্যন্ত তিনি যার কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তিনিও বলতে পারেন এ বিষয়ে। তৃতীয়ত, প্রয়াত আহমেদ পুলিশ দেখলে চমকে উঠতেন। একজন স্বাভাবিক লোকের পুলিশ দেখে চমকে ওঠার কথা নয়। পুলিশ এমন কিছু করেছিল, যা এমইউ আহমেদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এখানেই এসে যায় \'ইলেকট্রিক শক\'-এর বিষয়টি। চতুর্থত, ওই দিন গ্রেফতারের (১১ আগস্ট রাত দেড়টা) পর এমইউ আহমেদ ৪ ঘণ্টা ছিলেন ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে (সকালের খবর, ২৭ আগস্ট)। কিন্তু পুলিশের ডিসি-ডিবি (উত্তর) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়ার পর অ্যাডভোকেট আহমেদ ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট (যুগান্তর, ২৭ আগস্ট)। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কি কোনো তথ্য গোপন করছেন? একটি সুষ্ঠু তদন্ত হলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। পঞ্চমত, পুলিশ কথা আদায় করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। তারা অত্যাচার করে। কথা আদায়ের নামে এই যে \'টর্চার\', পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে এমনটি নেই। পুলিশ প্রয়োজনে \'লাই ডিটেক্টর\' ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু টর্চার কেন? পুলিশের সংস্কারের কথা উঠেছে। ইউএনডিপির ফান্ডও রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এখানে জরুরি। প্রায়ই দেখা যায় পুলিশের অত্যাচারের ভয়ে অনেকে অনেক কথা স্বীকার করে। কিন্তু আদালতে গিয়ে তা আবার অস্বীকার করে। সুতরাং স্ট্র্যাটেজিতে কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন। ষষ্ঠত, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। এটি যুক্তিযুক্ত। ঘটনার গভীরতা বিশ্লেষণ করে ও প্রয়াত এমইউ আহমেদের সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সরকার হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এ ধরনের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। এতে করে সরকার তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবে। পুলিশের স্বার্থেই পুলিশ এই বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইতে পারে। কেননা পুলিশের বিরুদ্ধে ইদানীং যেসব অভিযোগ উঠেছে, তাতে পুলিশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়নি। লিমন, কাদের, মিলনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাকে কেউ সমর্থন করেনি। আমরা বলেছি, পুলিশের ভেতরে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা সুবিধাবাদী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি করার জন্য তারা এমন সব \'কাণ্ড\' করেন, যা সমগ্র পুলিশ প্রশাসনকে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। ফারুকের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়নি। \'অপরাধ\'কে পুলিশ প্রশাসন সমর্থন করেছে। এটি ভালো নয়। \'ক্রাইমস আনসিন এক্সট্রা জুডিসিয়াল এক্সিকিউশন ইন বাংলাদেশ\' শীর্ষক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টটিতে র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এতে করে কি বহির্বিশ্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে? আমরা বারবার বলে আসছি, বহির্বিশ্বে পুলিশ তথা র্যাবের কর্মকাণ্ড মনিটর করা হচ্ছে। একজন বা দু\'জন পুলিশ কর্মকর্তার কারণে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। অতি উৎসাহীরা পুলিশ বাহিনীতে থেকে এমন সব কাণ্ড ঘটান, যা বহির্বিশ্বে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের মৃত্যুর ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। প্রয়াত এমইউ আহমেদের মৃতদেহ ময়নাতদন্ত হওয়ার পর ইতিমধ্যেই বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে \'লোক দেখানো\' ময়নাতদন্তের। যিনি ময়নাতদন্ত করেছেন, তিনি একজন সহযোগী অধ্যাপক। একজন সিনিয়র শিক্ষক। তিনি \'লোক দেখানো\' ময়নাতদন্ত করবেন না_ এ বিশ্বাস আমার আছে।
আসলে অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের হাসপাতালে মৃত্যু নিয়ে যে ঘটনা ঘটল, তা এ দেশের রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। দুটি বড় দল, বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা এ মৃত্যুকে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। বিএনপি যখন বলছে, \'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড\' ও \'মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া\'র কথা, তখন আওয়ামী লীগের দু\'একজন নেতাও বলছেন \'লাশ নিয়ে রাজনীতি\' করার কথা। অ্যাটর্নি জেনারেলও অনেকটা এ সুরেই কথা বলছেন। তবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য যথেষ্ট \'ম্যাচিউরড\'। তিনি বলেছেন সুষ্ঠু বিচারের কথা। আমরাও তেমনটি চাই। তবে একটা কথা, যে \'ঘটনার\' জন্য প্রয়াত এমইউ আহমেদ অভিযুক্ত হয়েছিলেন অর্থাৎ আদালতে বিশৃঙ্খলা, এই বিশৃঙ্খলা যেন আমরা পরিহার করি। আদালত একটি পবিত্র জায়গা, স্লোগান দেওয়ার জায়গা নয়। বিচারের জন্য আমরা সেখানে যাই। এই মৃত্যু আমাদের মধ্যে উপলব্ধিবোধের জন্ম দিক_ আদালতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা \'মৃত্যুর\'ও কারণ হতে পারে কখনও সখনও। অতীতে এ ধরনের ঘটনা হয়েছে বলে আবার হবে_ এই মানসিকতা থাকা ভালো নয়। অ্যাডভোকেট এমইউ আহমেদের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তিনি যদি হৃদরোগের অসুস্থতার কারণেও মারা গিয়ে থাকেন, তারপরও সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক, যাতে সব প্রশ্নের জবাব আমরা পেয়ে যাব।
ড. তারেক শামসুর রেহমান :অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান কয়েক দিন আগে নয়াদিলি্ল গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যেসব চুক্তি হবে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরা। ঢাকায় ফিরে এসে তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তির ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বিবিসির বাংলা বিভাগকে জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগি করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, বণ্টনের এই যে 'নীতি', তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে? অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল (১৯৯৬), তখন ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক। কেননা, ১৯৭৭ সালের পর গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো চুক্তি ছিল না। চুক্তি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সেটা ছিল ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি। কিন্তু পানির হিস্যা কি নিশ্চিত হয়েছে? পরিসংখ্যান ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলে, চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ পানি আমরা পাচ্ছি না। আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আমরা সব কিছু বিবেচনায় নিই না।
ফারাক্কায় যে পরিমাণ পানি থাকে, সেটাই ভাগাভাগি হয়। কিন্তু ভারত তো ফারাক্কা পয়েন্টে পানি পেঁৗছার আগে উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেয়। তখন সংগত কারণেই পানি কম পাওয়া যায়, আর সেটাই ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তার পরও যতটুকু পানি আমাদের পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ পানিও আমরা পাচ্ছি না। এখন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে, তাতে একটা আশঙ্কা থেকেই গেল যে এই চুক্তিতেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। আরো আশঙ্কার কারণ, সরকার কী ধরনের চুক্তি হতে যাচ্ছে, কী পরিমাণ পানি আমরা পাব, সেটিও উল্লেখ করছে না। এমনকি সংসদেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি। সরকারের কোনো 'থিংকট্যাংক'-এর পক্ষ থেকে ও কোনো 'টকশো'তেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়নি, যাতে করে এ সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পেতে পারি। ফলে জাতিকে এক ধরনের অন্ধকারে রেখেই আমরা একটা চুক্তি করতে যাচ্ছি। আরো একটা কথা এখানে বলা দরকার। মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসা (২০০৯) ও প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিলি্ল সফরের (২০১০) আগে দীর্ঘ চার বছর যৌথ নদী কমিশনের কোনো সভা হয়নি। এমনকি ৪০ বার বৈঠক বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর হঠাৎ করেই সচিবপর্যায়ে বৈঠক হলো, তখন বলা হলো (৫ জানুয়ারি, ২০১০), তিস্তার পানি বণ্টনে ঢাকা-নয়াদিলি্ল মতৈক্য। মনমোহনের সফরের আগে আমাদের পানিসম্পদ সচিব নয়াদিলি্ল গেলেন এবং চূড়ান্ত করলেন সেই চুক্তির রূপরেখা। কিন্তু আমরা সেই অন্ধকারেই থেকে গেলাম। ঢাকায় কোথাও আলোচনা হলো না তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে। এখন মনমোহনের সফরের একদিন আগে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী ঢাকায় আসবেন চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য।
আমাদের জন্য তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হঠকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। নদীর তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালু আর পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখারি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তার ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের উপকৃত এলাকা সাত লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এ অঞ্চলে প্রবাহিত বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, দেওনাই, চাড়ালকোটা, বুড়িখোড়া, বাগযোগড়া ও ঘাঘটের এখন দুঃসময়। এর প্রধান নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে এখন পানিশূন্য। ফলে এ অঞ্চলের প্রধান সেচনির্ভর ইরি-বোরো চাষাবাদ এখন হুমকির মুখে, যা কি না আমাদের খাদ্য সংকটকে ঘনীভূত করছে এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তা নদী এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালে এ অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে।
১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ, ৩৯ শতাংশ ভারত ও ২৫ শতাংশ নদীর জন্য রাখার একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে ২০ শতাংশ নদীর জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি_এ দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। এখন দুটি প্রস্তাবের কথা শোনা যাচ্ছে। একটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পাবে ২৫ ভাগ। অন্যদিকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পাবে ৪৮ ভাগ আর ভারত পাবে ৫২ ভাগ এবং এ প্রস্তাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতি আছে বলে ভারতীয় একটি পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভারত তিস্তা ব্যারাজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ শতাংশ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে হঠকারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল (নয়া দিগন্ত, ৬ মে, ২০০৮)। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, 'নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে' তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি হবে। এ কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশের স্বার্থ এতে করে কতটুকু রক্ষিত হবে। 'নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যা' কিভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারতের অবস্থানটা আমরা জানি। শেষ পর্যন্ত কি ভারতের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে আমরা চুক্তিটি করতে যাচ্ছি? ধারণা করছি, চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা বিস্তারিত জানতে পারব। কিন্তু তত দিনে তো করার কিছুই থাকবে না। আন্তর্জাতিকভাবে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর হুট করে সেই চুক্তি বাতিল করা যায় না। এতে আন্তর্জাতিক আসরে একটি দেশের (এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ) ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বাংলাদেশের কোনো সরকারের পক্ষেই ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। অতীতে বিএনপি সরকারও পারেনি। তারা চুক্তির সমালোচনা করেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়ে যে চুক্তি হবে, তা নিয়েও কথা আছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় আমরা এ ধরনের কথা শুনেছিলাম। আমরা রাজি হয়েছিলাম, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে এক দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ভারতকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু এতে করে, অর্থাৎ ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে নদীর নিচু এলাকায় বাংলাদেশের নদী ও তীরবর্তী বিশাল অংশ শুকিয়ে যাবে। প্রত্যাহারকৃত পানি দিয়ে ভারত তার সেচ প্রকল্পগুলো শুরু করতে পারবে। এই বর্ষাকালেও ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরনো মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ এলাকায় ফেনী নদীর প্রশস্ততা ১০০ মিটারের কমে নেমে এসেছে। শীতকালে পানি তলানিতে গিয়ে পেঁৗছবে। সৃষ্টি হবে বালুচরের।
তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি আমরা অবশ্যই চাই। কিন্তু তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়। শুধু তিস্তা নদীর পানি বণ্টন কেন, দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর পানির হিস্যার ব্যাপারে একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি হওয়া উচিত। আমরা টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও আতঙ্কিত। অতিসম্প্রতি মণিপুর ও আসামের মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, টিপাইমুখে বাঁধ নির্মিত হবে। পিটাইমুখ বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ১২ জুলাই, ২০১১ ভারতের নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমাচান্দ পঙ্কজও বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। অথচ আমাদের বারবার বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। সুতরাং একটা বড় প্রশ্ন থেকেই গেল। মণিপুর ও আসাম তাদের নিজ স্বার্থেই বাঁধটি নির্মাণ করছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ও মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী পু লালথানওয়ালা মনমোহনের সঙ্গে ঢাকায় আসছেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশ এ প্রশ্নটি দুজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। বলা ভালো, বাঁধটি নির্মিত হলে মণিপুর হারাবে চার হাজার ৭৬০ হেক্টর বাগান, দুই হাজার ৫৩ হেক্টর ধানি জমি, ১৭৮.২১ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। আর আসাম, মণিপুর ও মিজোরাম একত্রে হারাবে মোট ৩১১ হাজার হেক্টর জমি। আর বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির মতো শুকনো থাকবে এবং বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছাড়লে ব্যাপক বন্যা হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও যখন আমরা বাঁধ নির্মাণের কথা শুনি, তখন আমাদের আশঙ্কাটা বাড়ে বৈকি! মনমোহন সিং ঢাকায় এসে টিপাইমুখ নিয়ে কী কথা বলেন, আমরা শুনতে চাই। কোনো চুক্তি যখন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না, সেই চুক্তি করে কোনো লাভ নেই। গঙ্গার পানি চুক্তি করে (১৫ বছর পর) আমরা এখন লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে পারি। পাল্লাটা যে আমাদের দিকে, তা বোধ হয় জোর দিয়ে বলা যাবে না। এখন তিস্তা নদীর পানির ভাগ-বাটোয়ারা হতে যাচ্ছে, কিন্তু তিস্তার পানি চুক্তি গঙ্গার পানি চুক্তির মতোই হয় কি না_সেটাই দেখার বিষয়।
ফারাক্কায় যে পরিমাণ পানি থাকে, সেটাই ভাগাভাগি হয়। কিন্তু ভারত তো ফারাক্কা পয়েন্টে পানি পেঁৗছার আগে উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেয়। তখন সংগত কারণেই পানি কম পাওয়া যায়, আর সেটাই ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তার পরও যতটুকু পানি আমাদের পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ পানিও আমরা পাচ্ছি না। এখন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে, তাতে একটা আশঙ্কা থেকেই গেল যে এই চুক্তিতেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। আরো আশঙ্কার কারণ, সরকার কী ধরনের চুক্তি হতে যাচ্ছে, কী পরিমাণ পানি আমরা পাব, সেটিও উল্লেখ করছে না। এমনকি সংসদেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি। সরকারের কোনো 'থিংকট্যাংক'-এর পক্ষ থেকে ও কোনো 'টকশো'তেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়নি, যাতে করে এ সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পেতে পারি। ফলে জাতিকে এক ধরনের অন্ধকারে রেখেই আমরা একটা চুক্তি করতে যাচ্ছি। আরো একটা কথা এখানে বলা দরকার। মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসা (২০০৯) ও প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিলি্ল সফরের (২০১০) আগে দীর্ঘ চার বছর যৌথ নদী কমিশনের কোনো সভা হয়নি। এমনকি ৪০ বার বৈঠক বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর হঠাৎ করেই সচিবপর্যায়ে বৈঠক হলো, তখন বলা হলো (৫ জানুয়ারি, ২০১০), তিস্তার পানি বণ্টনে ঢাকা-নয়াদিলি্ল মতৈক্য। মনমোহনের সফরের আগে আমাদের পানিসম্পদ সচিব নয়াদিলি্ল গেলেন এবং চূড়ান্ত করলেন সেই চুক্তির রূপরেখা। কিন্তু আমরা সেই অন্ধকারেই থেকে গেলাম। ঢাকায় কোথাও আলোচনা হলো না তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে। এখন মনমোহনের সফরের একদিন আগে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী ঢাকায় আসবেন চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য।
আমাদের জন্য তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হঠকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। নদীর তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালু আর পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখারি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তার ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের উপকৃত এলাকা সাত লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এ অঞ্চলে প্রবাহিত বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, দেওনাই, চাড়ালকোটা, বুড়িখোড়া, বাগযোগড়া ও ঘাঘটের এখন দুঃসময়। এর প্রধান নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে এখন পানিশূন্য। ফলে এ অঞ্চলের প্রধান সেচনির্ভর ইরি-বোরো চাষাবাদ এখন হুমকির মুখে, যা কি না আমাদের খাদ্য সংকটকে ঘনীভূত করছে এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তা নদী এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালে এ অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে।
১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ, ৩৯ শতাংশ ভারত ও ২৫ শতাংশ নদীর জন্য রাখার একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে ২০ শতাংশ নদীর জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি_এ দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। এখন দুটি প্রস্তাবের কথা শোনা যাচ্ছে। একটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পাবে ২৫ ভাগ। অন্যদিকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পাবে ৪৮ ভাগ আর ভারত পাবে ৫২ ভাগ এবং এ প্রস্তাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতি আছে বলে ভারতীয় একটি পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভারত তিস্তা ব্যারাজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ শতাংশ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে হঠকারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল (নয়া দিগন্ত, ৬ মে, ২০০৮)। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, 'নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে' তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি হবে। এ কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশের স্বার্থ এতে করে কতটুকু রক্ষিত হবে। 'নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যা' কিভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারতের অবস্থানটা আমরা জানি। শেষ পর্যন্ত কি ভারতের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে আমরা চুক্তিটি করতে যাচ্ছি? ধারণা করছি, চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা বিস্তারিত জানতে পারব। কিন্তু তত দিনে তো করার কিছুই থাকবে না। আন্তর্জাতিকভাবে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর হুট করে সেই চুক্তি বাতিল করা যায় না। এতে আন্তর্জাতিক আসরে একটি দেশের (এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ) ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বাংলাদেশের কোনো সরকারের পক্ষেই ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। অতীতে বিএনপি সরকারও পারেনি। তারা চুক্তির সমালোচনা করেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়ে যে চুক্তি হবে, তা নিয়েও কথা আছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় আমরা এ ধরনের কথা শুনেছিলাম। আমরা রাজি হয়েছিলাম, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে এক দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ভারতকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু এতে করে, অর্থাৎ ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে নদীর নিচু এলাকায় বাংলাদেশের নদী ও তীরবর্তী বিশাল অংশ শুকিয়ে যাবে। প্রত্যাহারকৃত পানি দিয়ে ভারত তার সেচ প্রকল্পগুলো শুরু করতে পারবে। এই বর্ষাকালেও ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরনো মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ এলাকায় ফেনী নদীর প্রশস্ততা ১০০ মিটারের কমে নেমে এসেছে। শীতকালে পানি তলানিতে গিয়ে পেঁৗছবে। সৃষ্টি হবে বালুচরের।
তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি আমরা অবশ্যই চাই। কিন্তু তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়। শুধু তিস্তা নদীর পানি বণ্টন কেন, দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর পানির হিস্যার ব্যাপারে একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি হওয়া উচিত। আমরা টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও আতঙ্কিত। অতিসম্প্রতি মণিপুর ও আসামের মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, টিপাইমুখে বাঁধ নির্মিত হবে। পিটাইমুখ বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ১২ জুলাই, ২০১১ ভারতের নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমাচান্দ পঙ্কজও বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। অথচ আমাদের বারবার বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। সুতরাং একটা বড় প্রশ্ন থেকেই গেল। মণিপুর ও আসাম তাদের নিজ স্বার্থেই বাঁধটি নির্মাণ করছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ও মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী পু লালথানওয়ালা মনমোহনের সঙ্গে ঢাকায় আসছেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশ এ প্রশ্নটি দুজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। বলা ভালো, বাঁধটি নির্মিত হলে মণিপুর হারাবে চার হাজার ৭৬০ হেক্টর বাগান, দুই হাজার ৫৩ হেক্টর ধানি জমি, ১৭৮.২১ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। আর আসাম, মণিপুর ও মিজোরাম একত্রে হারাবে মোট ৩১১ হাজার হেক্টর জমি। আর বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির মতো শুকনো থাকবে এবং বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছাড়লে ব্যাপক বন্যা হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও যখন আমরা বাঁধ নির্মাণের কথা শুনি, তখন আমাদের আশঙ্কাটা বাড়ে বৈকি! মনমোহন সিং ঢাকায় এসে টিপাইমুখ নিয়ে কী কথা বলেন, আমরা শুনতে চাই। কোনো চুক্তি যখন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না, সেই চুক্তি করে কোনো লাভ নেই। গঙ্গার পানি চুক্তি করে (১৫ বছর পর) আমরা এখন লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে পারি। পাল্লাটা যে আমাদের দিকে, তা বোধ হয় জোর দিয়ে বলা যাবে না। এখন তিস্তা নদীর পানির ভাগ-বাটোয়ারা হতে যাচ্ছে, কিন্তু তিস্তার পানি চুক্তি গঙ্গার পানি চুক্তির মতোই হয় কি না_সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
tsrahmanbd@yahoo.com
মন্ত্রীদের ব্যর্থতা নিয়ে কিছু কথা
| কার্টুন: প্রথম আলো |
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে খোদ সরকারের দক্ষতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা পর্যন্ত কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতা নিয়ে সংসদে রীতিমতো প্রশ্ন তুলেছেন। মিডিয়াও এ থেকে পিছিয়ে নেই। বেশ কটি সংবাদপত্রে মন্ত্রীদের ব্যর্থতা, তথা খোদ মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা নিয়ে রীতিমতো লিড নিউজ করেছে। ব্যর্থতার তালিকায় যেসব মন্ত্রীর নাম এসেছে, তাদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন যোগাযোগমন্ত্রী। এর পরে পর্যায়ক্রমে রয়েছেন নৌমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কে পরিচালনা করেন, সে প্রশ্নও উঠেছে। দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পুরো মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করলেও এ ক্ষেত্রে আমার মূল্যায়ন কিছুটা ভিন্নতর। যাদের মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ ব্যর্থ হতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই তাদের দক্ষতা মূল্যায়ন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী একজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার দায়ভার নেবেন না। যদিও মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে কোনো মন্ত্রীর ব্যর্থতা সাম্প্রতিকভাবে পুরো কেবিনেট বা মন্ত্রিপরিষদের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। কিন্তু আমি মনে করি, মন্ত্রী যখন ব্যর্থ হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তার পরিবর্তে অন্য কাউকে সুযোগ দিতে পারেন। মন্ত্রিসভায় রদবদল খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। যারা বড় বড় কথা বলে মিডিয়ায় ইতিমধ্যে 'স্টার' হয়ে গেছেন, তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মন্ত্রিসভায় 'স্থান' পাওয়ার জন্য তাদের এটা একধরনের কৌশল কি না, সেটাও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
তবে এটা বলতেই হবে যোগাযোগমন্ত্রী সম্পৃর্ণরূপেই ব্যর্থ। অর্থমন্ত্রীর 'বক্তব্য' এর পরও শেয়ারবাজার অস্থির। গত ২১ আগস্টও বিক্ষোভ হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী এখনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন বটে, কিন্তু মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় দুজন উপদেষ্টাকে। সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি নিজে ব্যবসায়ী। সে কারণে কি না জানি না। কিন্তু তার আগ্রহ বড় বড় প্রজেক্টের ব্যাপারে যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন জড়িত। তার নজর নেই রাস্তাঘাটের দিকে, সাধারণ মানুষ যেসব রাস্তার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল।
জ্বালানি সংকট সরকারের একটি অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকলেও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ। লোডশেডিং এখন নিত্যসঙ্গী। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনা করতে পারছি না। দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা আছে ২৪০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ২০০ কোটি ঘুনফুট। গ্যাসের কারণেই বিদ্যুতের এই ঘাটতি। সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু গেল বছর এই সেক্টরে সরকারের সাফল্য আশাপ্রদ নয়। গেল বছর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রকট ছিল। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। নতুন শিল্পকারখানায় ও নবনির্মিত বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখাও হয়েছিল, যা আজো বহাল রয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র পিকিং প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত হবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল। এসব প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তিনগুণেরও বেশি। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের দাম আরো বাড়বে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। গত ২১ আগস্টও ৩৫২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০০৮) বলা হয়েছিল, ২০১১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট, ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২১ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এটা একটা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে যেসব পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, তা ইতিমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এর আগে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মিত হবে আইপিপি হিসেবে ১৫ বছর মেয়াদে। সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা অদূর ভবিষ্যতে কোনো ফল দিলেও চলতি ২০১১ সালে কোনো ফল দেবে না। ফলে এ সেক্টরে অসন্তোষ লক্ষ করা যাবে। আসলে বিকল্প জ্বালানি দরকার। সৌরবিদ্যুতের একটি সম্ভাবনা থাকলেও এই সেক্টরে ব্যাপক কর্মকা- লক্ষ করা যায় না। তরল গ্যাস আমদানির একটি ঘোষণা থাকলেও এ ব্যাপারে অগ্রগতি তেমন নেই।
অর্থনীতির চেহারা চলতি বছর খুব যে ভালো, তা বলা যাবে না। রিজার্ভ বাড়লেও রেমিটেন্স কমতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের মতো বড় বাজারে জনসম্পদ রফতানি এখনো বন্ধ। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি নিয়ে জটিলতা কাটেনি। সেখান থেকে কয়েক লাখ বাংলাদেশিকে এখন ফিরে আসতে হবে। নতুন ভিসায় যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু বায়রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব জনশক্তি রফতানিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এই সেক্টরে একটি বড় সম্ভাবনা থাকলেও এই মন্ত্রণালয়ে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। চলতি বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। রেমিটেন্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক সাহায্যও কমেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগও আশাপ্রদ নয়। অথচ আমদানি চাহিদা বাড়ছে। ফলে আর্থিক খাতের লেনদেনের চেয়ে বৈদেশিক লেনদেনে চাপ বাড়ছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বারবার শ্রমিক অসন্তোষের কারণে। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরের স্থবিরতাও বিতর্কের মাত্রা বাড়িয়েছে। খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরো বাড়বে। প্রতি বছর দেশে সর্বোচ্চ ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব (এফবিসিসিআইয়ের মতে)। অথচ দেশে বর্তমান দুই কোটি ৭০ লাখ লোক বেকার। আর প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে কর্মবাজারে। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এর ওপর দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মবাজারে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার এককভাবে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে না। তাই দরকার বেসরকারি উদ্যোগ। কিন্তু যেভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে অসন্তোষ 'সৃষ্টি' করা হচ্ছে, তাতে করে বেসরকারি সেক্টরে সেভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যর্থতা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারপ্রধান যেদিন ৩৬ জন পুলিশ অফিসারকে 'পুলিশ পদক' দিয়েছিলেন সেদিনই উচ্চ আদালত কামরাঙ্গীরচর থানার এক পুলিশ অফিসারকে 'কাজে অবহেলার' জন্য কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করেছিলেন। পরে তাকে বরখাস্ত করার জন্য মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশও দিয়েছিলেন। একটি শিশুর অঙ্গহানি ঘটিয়ে তাকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানো হতো। এ ব্যাপারে কামরাঙ্গীরচর থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন নির্লিপ্ত। বছরের এখন অবধি যেভাবে হত্যাকা- সংঘটিত হচ্ছে, তাতে করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। খোদ দুজন মহিলা সংসদ সদস্যের বাসায় ডাকাতি, একজন সাংবাদিক হত্যা পুলিশ রোধ করতে পারেনি। দুজন সংসদ সদস্যের অসহায়ত্ব যখন প্রকাশ পায়, যখন ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্ধর্ষ চুরি রোধ করা সম্ভব হয় না, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে বৈ কি! চলতি বছরের শুরু থেকে এখন অবধি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতির চিত্র আমরা পাই, তাতে করে আগামী দিনগুলো সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে পারি না। গেল বছরও এ মন্ত্রণালয়ের জন্য কোনো আশার খবর ছিল না। আর ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি মাস্তানি এমন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আর একসময়ের ছাত্রলীগের সভাপতি, বর্তমানে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের তো প্রকাশ্যেই ছাত্রলীগের নামে যারা সন্ত্রাসী করে তাদের দ্রুত বিচার আইনে বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন। দলের একজন সিনিয়র নেতার হতাশা কোন পর্যায়ে গেলে এ ধরনের কথা তিনি বলতে পারেন! ছাত্রলীগের এ ধরনের কর্মকা- সরকারের অনেক অর্জনকে মস্নান করে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা, একটি শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দেয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংসদে পাস করা সরকারের জন্য বড় অর্জন। কিন্তু ছোট ছোট 'ঘটনা' যেমনি বড় অর্জনকে মস্নান করে দেয়, ঠিক তেমনি সরকারের 'অনেক বড় অর্জন' মস্নান হয়ে গেছে কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে। সংবাদপত্রগুলো আমাদের জানাচ্ছে, গেল বছর ৪ হাজার ১৬৩টি হত্যা, ৮৭১টি অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হয়েছে ১৩৩টি। গত ৮ মাসে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। কিন্তু তার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে শুনি পুলিশ বাহিনীর প্রশংসার কথা। 'আইনি বাহিনীর আত্মরক্ষার গুলিতে সন্ত্রাসী মরাই স্বাভাবিক' (কালের কণ্ঠ, ২৭ জানুয়ারি), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য যেন বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। এ ধরনের বক্তব্য পুলিশের কর্মকর্তাদের খুশি করলেও সাধারণ মানুষ এই বক্তব্যে খুশি হয়নি।
মন্ত্রীরা বড় বড় কথা বলেন। কাজ করেন কম। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, যেসব মন্ত্রী মিডিয়ায় কম কথা বলেন, তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কম। যারা 'বেশি' কথা বলে মিডিয়ায় 'স্টার' হতে চেয়েছেন, তারাই ব্যর্থ। এ ব্যর্থতা সরকারের জন্য কোনো মঙ্গল নয়। এই ঈদে কয়েক লাখ মানুষ যখন বেহাল রাস্তা ধরে বাড়ি যাবেন, তারা মন্ত্রীর চাইতে সরকারপ্রধানকেই অভিযুক্ত করবেন বেশি। নৌপরিবহন মন্ত্রী শ্রমিক নেতা। আগামীতেও তাকে শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। এটাই তার পেশা। সুতরাং তিনি যে অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেয়ার সুপারিশ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। দুঃখ লাগে যখন দেখি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি নিজের মতো করে এর ব্যাখ্যা দেন। অন্য কোনো দেশ হলে এই দুই মন্ত্রী (নৌ ও যোগাযোগমন্ত্রী) পদত্যাগ করতেন। কিন্তু বাংলাদেশ বলে কথা।
সরকার ৩১ মাস অতিক্রম করেছে। সরকার ক্ষমতায় থাকবে আরো ২৯ মাস। ২৯ মাসের আগেই নির্বাচন হবে। মানুষ কিন্তু হিসাব করতে শুরু করেছে। সরকারপ্রধানের এখন উচিত ব্যর্থ মন্ত্রীদের বিদায় করে দিয়ে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মন্ত্রীদের কেবিনেটে জায়গা দেয়া। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন সংসদীয় গণতন্ত্রেরই অংশ। সুতরাং সরকারপ্রধান বড় ধরনের 'বিতর্ক' এড়াতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী একজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার দায়ভার নেবেন না। যদিও মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে কোনো মন্ত্রীর ব্যর্থতা সাম্প্রতিকভাবে পুরো কেবিনেট বা মন্ত্রিপরিষদের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। কিন্তু আমি মনে করি, মন্ত্রী যখন ব্যর্থ হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তার পরিবর্তে অন্য কাউকে সুযোগ দিতে পারেন। মন্ত্রিসভায় রদবদল খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। যারা বড় বড় কথা বলে মিডিয়ায় ইতিমধ্যে 'স্টার' হয়ে গেছেন, তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মন্ত্রিসভায় 'স্থান' পাওয়ার জন্য তাদের এটা একধরনের কৌশল কি না, সেটাও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
তবে এটা বলতেই হবে যোগাযোগমন্ত্রী সম্পৃর্ণরূপেই ব্যর্থ। অর্থমন্ত্রীর 'বক্তব্য' এর পরও শেয়ারবাজার অস্থির। গত ২১ আগস্টও বিক্ষোভ হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী এখনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন বটে, কিন্তু মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় দুজন উপদেষ্টাকে। সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি নিজে ব্যবসায়ী। সে কারণে কি না জানি না। কিন্তু তার আগ্রহ বড় বড় প্রজেক্টের ব্যাপারে যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন জড়িত। তার নজর নেই রাস্তাঘাটের দিকে, সাধারণ মানুষ যেসব রাস্তার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল।
জ্বালানি সংকট সরকারের একটি অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকলেও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ। লোডশেডিং এখন নিত্যসঙ্গী। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনা করতে পারছি না। দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা আছে ২৪০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ২০০ কোটি ঘুনফুট। গ্যাসের কারণেই বিদ্যুতের এই ঘাটতি। সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু গেল বছর এই সেক্টরে সরকারের সাফল্য আশাপ্রদ নয়। গেল বছর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রকট ছিল। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। নতুন শিল্পকারখানায় ও নবনির্মিত বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখাও হয়েছিল, যা আজো বহাল রয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র পিকিং প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত হবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল। এসব প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তিনগুণেরও বেশি। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের দাম আরো বাড়বে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। গত ২১ আগস্টও ৩৫২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০০৮) বলা হয়েছিল, ২০১১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট, ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২১ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এটা একটা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে যেসব পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, তা ইতিমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এর আগে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মিত হবে আইপিপি হিসেবে ১৫ বছর মেয়াদে। সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা অদূর ভবিষ্যতে কোনো ফল দিলেও চলতি ২০১১ সালে কোনো ফল দেবে না। ফলে এ সেক্টরে অসন্তোষ লক্ষ করা যাবে। আসলে বিকল্প জ্বালানি দরকার। সৌরবিদ্যুতের একটি সম্ভাবনা থাকলেও এই সেক্টরে ব্যাপক কর্মকা- লক্ষ করা যায় না। তরল গ্যাস আমদানির একটি ঘোষণা থাকলেও এ ব্যাপারে অগ্রগতি তেমন নেই।
অর্থনীতির চেহারা চলতি বছর খুব যে ভালো, তা বলা যাবে না। রিজার্ভ বাড়লেও রেমিটেন্স কমতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের মতো বড় বাজারে জনসম্পদ রফতানি এখনো বন্ধ। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি নিয়ে জটিলতা কাটেনি। সেখান থেকে কয়েক লাখ বাংলাদেশিকে এখন ফিরে আসতে হবে। নতুন ভিসায় যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু বায়রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব জনশক্তি রফতানিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এই সেক্টরে একটি বড় সম্ভাবনা থাকলেও এই মন্ত্রণালয়ে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। চলতি বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। রেমিটেন্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক সাহায্যও কমেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগও আশাপ্রদ নয়। অথচ আমদানি চাহিদা বাড়ছে। ফলে আর্থিক খাতের লেনদেনের চেয়ে বৈদেশিক লেনদেনে চাপ বাড়ছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বারবার শ্রমিক অসন্তোষের কারণে। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরের স্থবিরতাও বিতর্কের মাত্রা বাড়িয়েছে। খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরো বাড়বে। প্রতি বছর দেশে সর্বোচ্চ ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব (এফবিসিসিআইয়ের মতে)। অথচ দেশে বর্তমান দুই কোটি ৭০ লাখ লোক বেকার। আর প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে কর্মবাজারে। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এর ওপর দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মবাজারে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার এককভাবে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে না। তাই দরকার বেসরকারি উদ্যোগ। কিন্তু যেভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে অসন্তোষ 'সৃষ্টি' করা হচ্ছে, তাতে করে বেসরকারি সেক্টরে সেভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যর্থতা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারপ্রধান যেদিন ৩৬ জন পুলিশ অফিসারকে 'পুলিশ পদক' দিয়েছিলেন সেদিনই উচ্চ আদালত কামরাঙ্গীরচর থানার এক পুলিশ অফিসারকে 'কাজে অবহেলার' জন্য কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করেছিলেন। পরে তাকে বরখাস্ত করার জন্য মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশও দিয়েছিলেন। একটি শিশুর অঙ্গহানি ঘটিয়ে তাকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানো হতো। এ ব্যাপারে কামরাঙ্গীরচর থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন নির্লিপ্ত। বছরের এখন অবধি যেভাবে হত্যাকা- সংঘটিত হচ্ছে, তাতে করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। খোদ দুজন মহিলা সংসদ সদস্যের বাসায় ডাকাতি, একজন সাংবাদিক হত্যা পুলিশ রোধ করতে পারেনি। দুজন সংসদ সদস্যের অসহায়ত্ব যখন প্রকাশ পায়, যখন ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্ধর্ষ চুরি রোধ করা সম্ভব হয় না, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে বৈ কি! চলতি বছরের শুরু থেকে এখন অবধি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতির চিত্র আমরা পাই, তাতে করে আগামী দিনগুলো সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে পারি না। গেল বছরও এ মন্ত্রণালয়ের জন্য কোনো আশার খবর ছিল না। আর ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি মাস্তানি এমন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আর একসময়ের ছাত্রলীগের সভাপতি, বর্তমানে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের তো প্রকাশ্যেই ছাত্রলীগের নামে যারা সন্ত্রাসী করে তাদের দ্রুত বিচার আইনে বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন। দলের একজন সিনিয়র নেতার হতাশা কোন পর্যায়ে গেলে এ ধরনের কথা তিনি বলতে পারেন! ছাত্রলীগের এ ধরনের কর্মকা- সরকারের অনেক অর্জনকে মস্নান করে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা, একটি শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দেয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংসদে পাস করা সরকারের জন্য বড় অর্জন। কিন্তু ছোট ছোট 'ঘটনা' যেমনি বড় অর্জনকে মস্নান করে দেয়, ঠিক তেমনি সরকারের 'অনেক বড় অর্জন' মস্নান হয়ে গেছে কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে। সংবাদপত্রগুলো আমাদের জানাচ্ছে, গেল বছর ৪ হাজার ১৬৩টি হত্যা, ৮৭১টি অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হয়েছে ১৩৩টি। গত ৮ মাসে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। কিন্তু তার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে শুনি পুলিশ বাহিনীর প্রশংসার কথা। 'আইনি বাহিনীর আত্মরক্ষার গুলিতে সন্ত্রাসী মরাই স্বাভাবিক' (কালের কণ্ঠ, ২৭ জানুয়ারি), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য যেন বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। এ ধরনের বক্তব্য পুলিশের কর্মকর্তাদের খুশি করলেও সাধারণ মানুষ এই বক্তব্যে খুশি হয়নি।
মন্ত্রীরা বড় বড় কথা বলেন। কাজ করেন কম। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, যেসব মন্ত্রী মিডিয়ায় কম কথা বলেন, তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কম। যারা 'বেশি' কথা বলে মিডিয়ায় 'স্টার' হতে চেয়েছেন, তারাই ব্যর্থ। এ ব্যর্থতা সরকারের জন্য কোনো মঙ্গল নয়। এই ঈদে কয়েক লাখ মানুষ যখন বেহাল রাস্তা ধরে বাড়ি যাবেন, তারা মন্ত্রীর চাইতে সরকারপ্রধানকেই অভিযুক্ত করবেন বেশি। নৌপরিবহন মন্ত্রী শ্রমিক নেতা। আগামীতেও তাকে শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। এটাই তার পেশা। সুতরাং তিনি যে অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেয়ার সুপারিশ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। দুঃখ লাগে যখন দেখি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি নিজের মতো করে এর ব্যাখ্যা দেন। অন্য কোনো দেশ হলে এই দুই মন্ত্রী (নৌ ও যোগাযোগমন্ত্রী) পদত্যাগ করতেন। কিন্তু বাংলাদেশ বলে কথা।
সরকার ৩১ মাস অতিক্রম করেছে। সরকার ক্ষমতায় থাকবে আরো ২৯ মাস। ২৯ মাসের আগেই নির্বাচন হবে। মানুষ কিন্তু হিসাব করতে শুরু করেছে। সরকারপ্রধানের এখন উচিত ব্যর্থ মন্ত্রীদের বিদায় করে দিয়ে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মন্ত্রীদের কেবিনেটে জায়গা দেয়া। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন সংসদীয় গণতন্ত্রেরই অংশ। সুতরাং সরকারপ্রধান বড় ধরনের 'বিতর্ক' এড়াতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনতে পারেন।
tsrahmanbd.blogspot.com
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
ভারতের কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও এটা কোন রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। সোনিয়া গান্ধী ভারতে ইউপিএ সরকারের মূল ব্যক্তি হলেও, তিনি সরকারে নেই। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না পর্দার অন্তরালে তিনিই সরকার চালান। সাধারণত তিনি খুব একটা বিদেশ সফর করেন না। নীতি নির্ধারণী ভাষণও দেন না। এ কারণেই বাংলাদেশে অটিজম সম্মেলনে যোগদান, এই সম্মেলনের গুরুত্বই শুধু বাড়িয়ে দেয়নি, বাংলাদেশ তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তাও উল্লেখ করার মত। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতার সম্মাননা দিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী তা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সম্মাননাও সোনিয়া গান্ধীর সফর দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। একাত্তুরের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ইন্দিরা গান্ধী নিজে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন। দেরীতে হলেও, এ জাতি তার অবদানকে স্মরণ করলো। এখন দেখতে হবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, তার সমাধানের ব্যাপারে ভারত কী উদ্যোগ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে একাধিক ভারতীয় ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ৮ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণর ঢাকা সফরের পর এলেন সোনিয়া গান্ধী। ২৯ জুলাই আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম। আগস্ট মাসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসছেন। আর ৬ সেপ্টেম্বর আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর (জানুয়ারি ২০১০) ভারতের ভিআইপিদের একের পর এক বাংলাদেশ সফর দু’ দেশের সম্পর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাজমান সমস্যার সমাধানে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং সমস্যা যা ছিল, তাই রয়ে গেছে। গত ১৬ মে ছিল ফারাক্কা দিবস। পানির ন্যায্য হিস্যা ও ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন প্রয়াত মাওলানা ভাসানী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত (১৯৯৬) ক্ষমতায় এসেই নয়াদিল্লী ছুটে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (ডিসেম্বর ১৯৯৬)। কিন্তু যতটুকু পানি আমাদের পাবার কথা, পানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনদিনই আমরা সেই পরিমাণ পানি পাইনি। অথচ সেই চুক্তি নিয়ে অনেক ‘পজিটিভ’ কথা বলা হচ্ছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও কোন খবর নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা গেল বছর টিপাইমুখ গিয়েছিলেন। হেলিকপ্টারে ঘুরলেন। জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে বারে বারে আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। ভারতের উচ্চমহল থেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা বা নেপাল ও ভুটান এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভী ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভী ট্রাক যাবে কোন ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুনতে থাকবো সুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুত্ আসবে ভারত থেকে। কৈ সেই বিদ্যুত্? ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা ভারতে থাকলেও, তা নানা ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। জানা গেছে, আগামী ৩ বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরো ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। অথচ ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাবার কথা (দিনকাল, ১৭মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাবার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মত নেতারা কোনদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতৃবৃন্দ বার বার ভারতীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। বলতে দ্বিধা নেই শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ মূলত ভারতীয় দ্বি-পাক্ষিক নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা নেপালে অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলংকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই সৃষ্টি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য দূরীকরণে তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বন্ধুশূন্য’ হতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জী, প্রণব মুর্খাজী-এরা সবাই মূলত এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা ম্লান হয়ে গেছে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মনোভাবের কারণে। ফেলানি যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানিরা, তখন ভারতের ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কীভাবে দেখে, ফেলানির ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জী যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন,তখন আমাদের উত্সাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও,এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তত্কালীন ভারতীয় সরকারের সাথে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করছিল, তখন মমতা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে মোস্ট আনপ্রেডেকটিবল পারসন, যার উপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোন সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে তার আঁঁতাত কতদিন স্থায়ী হয়, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জীর কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী তিনি মনমোহন সিং-এর সাথে ঢাকায় আসছেন। কেননা তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ একটি ফ্যাক্টর। তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা হয়েছে সচিব পর্যায়ের বৈঠকে। যদিও আমরা জানি না বাংলাদেশের স্বার্থ তাতে রক্ষিত হবে কী-না। মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। আমরা চাই না গঙ্গার পানি চুক্তির মত তিস্তার পানি চুক্তিটিও বিতর্কিত হোক। সিটমহল ও সীমান্ত চিহ্নিতকরণও জরুরি। গত ৪০ বছরে সিটমহল ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধ করা প্রয়োজন। এটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। দায়িত্বটা ভারতের। কেননা আজ অব্দি একজন ভারতীয়কেও হত্যা করেনি বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনী। পৃথিবীর কোন সীমান্তেই এভাবে মানুষ মারা হয় না। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়েও কথা বলা উচিত। এখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নেই। সোনিয়া গান্ধীর সফরের সময় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নিয়ে দু’দেশ এক সাথে কাজ করতে পারে বলে তিনি অভিমত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সন্ত্রাস আজ গোটা দক্ষিণ এশিয়ারই সমস্যা। সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তান আজ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম। আর আফগানিস্তানে সন্ত্রাস তো নিত্যদিনের ঘটনা। সুতরাং সন্ত্রাস দমনে দ্বি-পাক্ষিক নয়,বরং প্রয়োজন বহু পাক্ষিক সহযোগিতা। বহু পাক্ষিক যোগাযোগের আলোকে আমরা যদি ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি করতে পারি, তাহলে বহু পাক্ষিকতার আলোকে পানি বন্টন ও এর ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল ও ভুটান চুক্তি হতে পারে। চুক্তি হতে পারে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আসছেন। সমস্যাগুলো আমরা জানি। এগুলো নিয়ে সেমিনারে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। এখন চাই বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও ভারতের আন্তরিকতা। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। চারটি নব্য উন্নত দেশ (‘ব্রিক’) এর একটি ভারত। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আঞ্চলিক পরিসরে বড় ভূমিকা পালন করুক। ভারতকে এ ভূমিকা পালন করতে হলে তাকে আন্তরিক হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সোনিয়া গান্ধীর সফরের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষেত্র তৈরি হল। এখন দেখার পালা, সম্পর্ক আরো উন্নত করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটুকু রূপ পায়।
দৈনিক ইত্তেফাক
শনি, ৩০ জুলাই ২০১১, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৮অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়]
tsrahmanbd @ yahoo.com
Subscribe to:
Posts (Atom)












