রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

Showing posts with label আন্তর্জাতিক. Show all posts
Showing posts with label আন্তর্জাতিক. Show all posts

কূটনীতিতে বাংলাদেশ ৫০ বছরের

বাংলাদেশ যখন তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে, তখন কূটনীতিতে দেশটির সাফল্যের পাল্লাটা কম ভারী নয়। গেল ৫০ বছরে আমাদের বেশ কিছু সাফল্য রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আগামী ২০৩১ সালে বাংলাদেশ পালন করবে হীরকজয়ন্তী। আর তাই চ্যালেঞ্জগুলোকে ‘এড্রেস’ করেই নিতে হবে মহাপরিকল্পনা। সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ শীর্ষ নেতাÑ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহ, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং ও শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এটা একটা বড় পাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পাঁচ নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে ও ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ব নেতাদের বাংলাদেশে উপস্থিতি এর আগেও আমরা একবার দেখেছিলাম ১৯৯৭ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি পালন করেছিল। তখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেইমান ডেমিরেল। advertisement বাংলাদেশের সাফল্যের পালকে আরেকটি পালক যোগ হয়েছে যখন দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে চলতি ২০২১ সালে। ২০২৬ সালে স্বীকৃতি মিলবে উন্নয়নশীল দেশের। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় বিশ্বে আমাদের মর্যাদা বেড়েছে সন্দেহ নেই তাতে, কিন্তু কিছুটা ‘ঝুঁকি’ রয়েছে। রপ্তানি আয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাওয়ায় ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, ইউরোপ ও কানাডায় পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার ইত্যাদি ঝুঁকি তৈরি হলো। ফলে এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিল করার জন্য এখন থেকেই নিতে হবে মহাপরিকল্পনা। গোল্ডম্যান স্যাক্স পরবর্তী যে উঠতি ১১টি শক্তিশালী অর্থনীতির কথা বলেছেন (এন-১১), বাংলাদেশ রয়েছে তার শীর্ষে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি। গোল্ডম্যান স্যাকসের মূল্যায়নে বাংলাদেশ অবস্থান করছে উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মেক্সিকোর পাশাপাশি। আর তাই বিখ্যাত ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাটের মন্তব্য ছিল এ রকম South Asia Has a New Leader : will the world Take Note ? ( Diplomat, October 23, 2020 ) . বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক শক্তিÑ বিশ্বকে এখন এ দিকেই নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের সাফল্যের কথা আছে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও। নিকোলাস ক্রিস্টফ তার প্রবন্ধ Look to Bangladesh (১০ মার্চ ২০২১)-এ লিখেছেন সে কথা। বাংলাদেশ যে ‘অর্জন’ করেছে তার পেছনের কারণ কী? ক্রিস্টফের মতে, What was Bangladesh's secreat ? It was education and girls - শিক্ষা, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বংলাদেশ। আর এভাবেই অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন ক্রিস্টফ। লিখে The World Bank calls Bangladesh an inspiring story of reducing poverty - with 25 million Bangladeshi,s lifted from poverty over 15 years. The share of children stunted by malnutritiin has fallen by about half in, Bangladeshsince 1991 and is niw lower than in India. এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। advertisement কূটনীতিতে সাফল্যের কথা যদি বলতে হয়, তা হলে বলতে হবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৭৮-১৯৮০ সময়সীমায় বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। ২০০০-২০১২ সালেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে সংসদের স্পিকার (১৯৯৬-২০০১) হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে (১৯৯৬) সভাপতিত্ব করেছিলেন। আরেকটি সাফল্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। গড়পড়তা প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি সেনাসদস্য বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। বিশেষ করে সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, কুয়েত, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, আইভরিকোস্ট, হাইতি, সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এমনকি সিয়েরা লিওনের কোনো কোনো অঞ্চলে বাংলা ভাষা ‘দ্বিতীয় ভাষা’ হিসেবে চালু হয়েছে। বাংলাদেশকে স্থানীয় মানুষ নামে চেনে। কৃষিক্ষেত্রে সেখানে বাংলাদেশিরা কাজ করছে। বাংলাদেশের জন্য একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সিয়েরা লিওনকে সামনে রেখে আফ্রিকায় বাংলাদেশি পণ্যের একটা বাজার গড়ে তোলার। মানবসম্পদের দিক দিয়ে বাংলাদেশিদের জন্য একটা বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে। ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম দিক। এর ভিত্তি গড়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি ঐক্য সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের মতো তরুণ নেতৃত্বের পাশাপাশি আতাউর রহমান খানের মতো রাজনীতিবিদও ছিলেন (উইকি পিডিয়া)। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গঠিত ‘আল-কুদস’ কমিটিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, ইরান-ইরাক দীর্ঘ যুদ্ধে (১৯৮০-১৯৮৮) মধ্যস্থতা করার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, বাংলাদেশ ওই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ ও সীমিত সময়ের জন্য কুয়েত দখল করে নিলে সৌদি আরব অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হলে জাতিসংঘের নেতৃত্বে Operation Desert Shield গঠিত হয়। বাংলাদেশ এখন একটি কোয়ালিশন ফোর্সের পক্ষ হয়ে প্রথম গালফ যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে কুয়েতে বাংলদেশ সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়, যাদের কাজ ছিল কুয়েতকে ল্যান্ডমাইনমুক্ত করা। ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে ইরাকই ওইসব মাইন স্থাপন করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কুয়েত থেকে ল্যান্ডমাইন অপারেশনের কাজে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের সদস্যরা এখনো সেখানে আছে। বলা ভালো, প্রথম গালফ যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের ৫৯ জন সদস্য এবং পরে ল্যান্ডমাইন অপসারণে ৭২৮ জন সদস্যকে হারিয়েছে। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন Islamic Military Counter Terrorism Coalition ( IMCTC )- এ যোগ দিতে। বর্তমানে ৪১টি দেশ এর সদস্য। IMCTC এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক উগ্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের এপ্রিলে IMCTC এর একটি সামরিক মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। IMCTC এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দেয়। কূটনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্য এখানেই যে, বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বে তার একটি অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছে। বাংলাদেশের কূটনীতির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যÑ আর তা হচ্ছে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশ মনে করে আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের উদ্যোক্তা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এটা উপলব্ধি করে সত্তর দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। বাংলাদেশের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের উপস্থিতিতে সার্ক গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ বিমসটেকেরও (১৯৯৭ সালে গঠিত) উদ্যোক্তা। বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোতে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর বসবাস ও দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই সংস্থাটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগসূত্র। বলা যেতে পারে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড) সঙ্গে সমুদ্র নেই ও পাহাড়-পর্বত বেষ্টিত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশের (ভুটান ও নেপাল) মধ্যকার একটি যোগসূত্র। ২০০৪ সালে সংস্থাটি Bay of Bengal Initiative for Multi Sectoral Technical and Economic Cooperation হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কূটনীতিতে বাংলাদেশের আরও তিনটি উদ্যোগের কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ উদ্যোগ নিয়েছিল মুসলমানপ্রধান ৮টি দেশকে নিয়ে Developing 8 গঠন করার। এই ৮টি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মিসর, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান। ১৯৯৭ সালে এটি গঠিত হয়। কৃষি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে সংস্থাটি কাজ করছে। দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে APTA - Asia Pacific Trade Agreement গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছিল অন্যতম উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, লাওস APTA -এর সদস্য। APTA ভুক্ত অঞ্চলের জনসংখ্যা ২৯২১ দশমিক ২ মিলিয়ন, আর মোট জিডিপি ১৪৬১৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। APTA -ভুক্ত দেশগুলো এখন একটি অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের ASEAN Regional Forum ( ARF) -এ যোগদান। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং অদূর ভবিষ্যতে আসিয়ানে যোগদানের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ARF একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বলা ভালো ভারত আসিয়ানের সঙ্গে ২০০৯ সালে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা ২০১০ থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির কারণে ভারত শুল্কমুক্তভাবে তার পণ্য নিয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে যেতে পারবে। প্রসঙ্গক্রমেই ত্রিদেশীয় মহাসড়কের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। বাংলাদেশ এই ত্রিদেশীয় মহাসড়কে যুক্ত হতে চাইছে। সম্প্রতি মোদি-হাসিনা ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশ এই প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবিত ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক বাংলাদেশের জন্যও একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের East West Evonomic Corridor -এর এটা একটা অংশ। মহাসড়কটি ভারতের মণিপুর রাজ্যের Moreh শহরকে মিয়ানমারের ওপর দিয়ে থাইল্যান্ডের Myawaddy Mae Sot শহরকে সংযুক্ত করবে। পরে এই মহাসড়ক আরও সম্প্রসারিত হবে লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত। বাংলাদেশের পণ্যও অদূর ভবিষ্যতে এই মহাসড়ক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেতে পারবে। বাংলাদেশের জন্য পার্শ¦বর্তী দুটি বড় দেশের (ভারত ও চীন) সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছে। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো দুটি দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেলেও, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। তিস্তার পানিচুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। সর্বশেষ ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু উদ্বোধন, ভারতকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর, চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশের যোগদান, বাংলাদেশে চীনের উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করলেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কৌশলে একটি ভারসাম্যমূলক কূটনীতি অনুসরণ করছে। কোনো একটি দেশের প্রতি ‘ঝুঁকে পড়ার’ প্রবণতা বাংলাদেশ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। কূটনীতিতে সাফল্য এখানেই নিহিত। তবে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। সমুদ্রসীমা (ভারত ও মিয়ানমার) নির্ধারণ হয়ে যাওয়ার পরও সমুদ্রের বিশাল সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের ব্যাপারে কোনো বড় পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। একুশ শতক হবে ‘ব্লু-ইকোনমি’নির্ভর। ২০১৪ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঢাকা সফরের সময় জাপান ইওএ-ই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। বঙ্গোপসাগরভুক্ত দেশগুলো উন্নয়নে (অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি, উন্নয়ন প্রক্রিয়া) জাপান অংশীদার হতে চায়, যাতে জাপানের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রক্ষিত হয়। বলা হচ্ছে, এই পরিকল্পনার আওতায় জাপান ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করতে চায়। BIG- B পরিকল্পনা Japan - Bangladesh Comprehensive Partnership এর অংশ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অঞ্চলে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত Quadrilateral Security Dialogue - QUAD , যেখানে সদস্য রয়েছে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এটি একটি সামরিক জোটও বটে। এই জোট চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহত হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণে কৌশলগতভাবে ভারত, নেপাল, ভুটান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গেটওয়ে। এটা বিবেচনায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার যে স্ট্র্যাটেজি তাতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। গেল অক্টোবরে (২০২০) মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান তার ঢাকা সফরে বাংলাদেশকে এই প্রস্তাব দিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি। সুতরাং কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগামীতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষ জনশক্তি যদি তৈরি করা না যায়, তা হলে কূটনীতিতে সফলতা পাওয়া যাবে না। Amader Somoy 26.3.2021

দক্ষিণ এশিয়ায় সমরাস্ত্রের প্রতিযোগিতা

গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রগুলোয় ছাপা হয় একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়ার পর চতুর্থ স্থানটি দখল করে নেবে ভারত। ওই সময় দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় ৬৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। ৫ ফেব্রুয়ারি অন্য এক সংবাদে বলা হয়, ভারত চীনের সীমান্তজুড়ে নতুন একটি পার্বত্য কোর গঠন করবে এবং এ বাহিনী গঠনে খরচ হবে ৬৯ হাজার কোটি রুপি। ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় এ খবর ছাপা হয়েছিল। আর ওই পত্রিকার সূত্র ধরে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও সংবাদটি ছাপা হয়। এর আগে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে যে ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তাও কোনো কোনো মহলে সমালোচিত হয়েছে। অবশ্য ভারতের ৬৯ হাজার কোটি রুপির পাশাপাশি বাংলাদেশের ৮ হাজার কোটি টাকা সমান্যই বলতে হবে। পাকিস্তানও তার অস্ত্র সম্ভার বাড়িয়েছে।
 
ভারতের উৎক্ষেপনকৃত অগ্নি-৫ মিসাইল
  তবে ভারতের এ অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি দেশটিতে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রথমত. ভারতে দারিদ্র্য অনেক বেশি। গেল সপ্তাহেই দারিদ্রের একটি করুণ কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এক মা তার ১১ বছরের মেয়েকে মুম্বাইয়ের এক পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। মেয়েটি বুদ্ধি করে পুলিশের কাছে যাওয়ায় তা জানাজানি হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত. চীন যখন ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিঃসন্দেহে ভারতের এ সিদ্ধান্ত শুধু চীন-ভারত সীমান্তেই উত্তেজনা ছড়াবে না, বরং তা পাকিস্তান সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়াবে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, উপমহাদেশে পাক-ভারত এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে। ভারত সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। ভারতের অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর পাকিস্তান হাতেফ গজনবি নামক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। অগ্নির মতো হাতেফও পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য। অগ্নির পর ভারত নতুন ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ ও পাকিস্তান হাতেফ-৯ নামে আরো দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে দেশ দুটো এক ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এতে দেশ দুটোর দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি ব্যাহত হতে বাধ্য।
এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল? প্রশ্ন হচ্ছে, বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে দুই দেশের এ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে? পাঠকদের একটা ধারণা দিয়ে রাখি। একটা দূরপাল্লার (যেমন অগ্নি-৫) মিসাইলের দাম ৫ লাখ ৬৯ হাজার থেকে ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। একটি ব্রুজ মিসাইলের (সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য) দাম ১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা) আর বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের (যা ভারত এরই মধ্যে অজর্ন করেছে) ৬ লাখ ডলার। এ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় না করে তা হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যেত। এমনকি ভারতে চরম দরিদ্রতম রাজ্য হিসেবে পরিচিত (দারিদ্র্যের কারণে যেখানে মাওবাদীদের তত্পরতা বেশি) মধ্য প্রদেশে, উত্তর প্রদেশ কিংবা ঝাড়খণ্ডে ক্ষুদ্র ঋণদান প্রকল্প চালু করতে পারত। ভারত তা করেনি। মুম্বাইয়ের চাকচিক্যময় ছবি দেখে ভারতের সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচার করা যাবে না। ভারতে ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গত ১০ বছরে আত্মহত্যা করেছে— এ রকম একটি সংবাদ সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান থেকে এ ধরনের সংবাদ তেমন একটা শোনা যায় না। এ কারণেই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছিলেন এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) অর্জনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে ভালো।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। সিপরির (SIPRI) বার্ষিক গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৮০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। জিডিপিতে প্রতিরক্ষা খাতে প্রবৃদ্ধির হার আড়াই থেকে ৩ শতাংশ। ২০০০ সালের পর প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। এ সময়সীমায় ভারতে যে অস্ত্রসস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়া একাই সরবরাহ করেছে ৮২ শতাংশ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, ভারত এরই মধ্যে তার নৌবহরে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌশক্তিরূপে আবির্ভূত হতে চায় দেশটি। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনের নৌবাহিনীতে যেখানে জাহাজের সংখ্যা ১৩৫, সেখানে ভারতের জাহাজ রয়েছে ১০৩টি। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। ভারতের উদ্দেশ্য যে কী, তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন, প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার জন্য চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ১১ বিলিয়ন ডলার দামে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ১২৬টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। যেখানে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক মানুষ ন্যূনতম টয়লেট সুবিধা পায় না, ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে (যা কিনা জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত অতিদরিদ্রের মানদণ্ড), সেখানে শত শত কোটি রুপি ভারত ব্যয় করছে অস্ত্র খাতে। এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে যে, অগ্নি-৫ উেক্ষপণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হোক। সুদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করছে। তার টার্গেট মূলত চীন, চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। এ লক্ষ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে উঠছে। ভারত এখন আর পাকিস্তানকে অন্যতম শত্রু বলে মনে করে না। ভারতের অন্যতম শত্রু এখন চীন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। গেল বছর বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ব লেডি আর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। হিলারি ক্লিনটনের ঝুড়িতে যে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যে মার্কিন কৌশল অর্থাৎ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামরিক বলয়, সে বলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারতকে দিয়ে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অগ্নি-৫ ও আকাশ উেক্ষপণ এ কৌশলেরই একটি অংশ। ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কিংবা ভারতকে ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত করার উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে বলতে পারব না, কিন্তু যে দেশ তার দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো বড় কর্মসূচি নিতে পারে না কিংবা কৃষকের আত্মহত্যা রোধ করার উদ্যোগ নিতে পারে না বা অগ্নি-৫ মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করে তারা আমাদের জন্য কোনো ‘মডেল’ হতে পারে না। আগামী দিনে ভারতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যার প্রবণতা; একটি সভ্য সমাজে যা কল্পনাও করা যায় না। অগ্নি-৫ উেক্ষপণ ছিল একটি প্রহসন। আর পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে ভারতের চেয়ে ভালো, তা বলা যাবে না। পাকিস্তান বাহ্যত আরেকটি ‘তালেবানি রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। একুশ শতকে এসেও দেশটির কোনো কোনো প্রদেশে মেয়েদের শিক্ষা সীমিত। তালেবান জঙ্গিরা মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে— এ রকম সংবাদ আমরা একাধিকবার পাঠ করেছি। পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে তারা জঙ্গি তত্পরতা দমন করতে পারছে না, সেখানে শাহীন (১ হাজার ৮০০ মাইল দূরপাল্লা) কিংবা হাতেফ গজনবির (১৮০ মাইল দূরে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন) মতো মিসাইল উদ্ভাবন করে পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে উসকে দিল। পাকিস্তান বা ভারতের এ থেকে লাভবান হওয়ার কিছু নেই। এতে দুই দেশের দারিদ্র্য আরো বাড়বে। আর লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র ব্যবসায় তাদের প্রসার ঘটবে। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬৬ কোটি ডলার ব্যয়ে ১৪৫টি হালকা কামান আমদানি করছে। একসময় তথাকথিত ‘নিরাপত্তা সুরক্ষা’র নাম করে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে সাহায্য করেছিল (বিবিসি, ডিসেম্বর ১৬, ২০১০)। এখানে বলা ভালো, ভারত ও পাকিস্তান এনপিটি চুক্তিতে সই করেনি। পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতের ক্ষেত্রে তার নীতির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উপমহাদেশে আগামী দিনগুলোয় এ প্রতিযোগিতা বাড়বে বলেই মনে হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় এ পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৫৪৯ মিলিয়ন (প্রতিদিনের আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসেবে)। ২০০৫ সালে তা দাঁড়ায় ৫৯৫ মিলিয়নে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ৬৫০ মিলিয়নের কাছাকাছি। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, ২৫০ মিলিয়ন শিশু অপুষ্টির শিকার। ৩০ মিলিয়ন শিশু কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মোট নারী জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ রক্তশূন্যতায় ভোগে। ভারতে প্রতি তিনজনের একজন দরিদ্র। ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য টয়লেট সুবিধা নেই। প্রতিদিন ভারতে মারা যায় পাঁচ হাজার শিশু। এ পরিসংখ্যান কোনো আশার কথা বলে না। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে দারিদ্র্য কমেনি। অথচ দুটি বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান আজ কোটি কোটি ডলার খরচ করছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে। দক্ষিণ এশিয়ার এ মুহূর্তে সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করা, জাতিগত দ্বন্দ্বের অবসান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সেই সঙ্গে জেন্ডার সমতা আনা। ব্যাপক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির ব্যবস্থা করাও জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা এদিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন।
লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
www.tsrahmanbd.blogspot.com




লাদেন এবং সামসাম্প্রতিক ভাবনা

ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকা-ের এক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরও তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার শেষ নেই। যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছিল, তার অবসান ঘটবে কি-না। এ নিয়ে নানা কথাবার্তা বলা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া সত্যিই কঠিন। ওসামার হত্যাকা-, হত্যাকা- নিয়ে ওবামা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, পাকিস্তানের ভূমিকা ইত্যাদি নানা বিষয়ে একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ওসামার মৃত দেহের ছবি প্রকাশ না করা, দ্রুত ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন করা, মৃতদেহের প্রতি নূ্যনতম সম্মান না জানিয়ে তা আরব সাগরে দ্রুত ভাসিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা বিষয় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে, যা কি-না বিতর্কের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে গত ৪ মে বহুল পঠিত ও নির্ভরযোগ্য একটি ম্যাগাজিন ঋড়ৎবরমহ চড়ষরপু একটি সিরিজ ছবি প্রকাশ করেছে (ঞযব করষষবৎং খধরৎ, ৪ গধু, ১১)। তাতে অ্যাবোটাবাদে যে বাড়িটিতে ওসামা বিন লাদেন থাকতেন বলে বলা হচ্ছে, ওই বাড়ির ও বাড়ির আশপাশের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। একটি ছবি নিয়ে বিতর্ক ও নতুন জল্পনাকল্পনার জন্ম দিতে বাধ্য। ওই ছবিটি ২০০৫ সালের ১৫ জুনের তোলা। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ওই বাড়িটি, যেখানে ওসামা থাকতেন। সম্ভবত ছবিটি সিআইয়ের তোলা এবং ঋড়ৎবরমহ চড়ষরপু গধমধুরহব তা সংগ্রহ করেছে। পাঠক বোঝার চেষ্টা করুন ছবিটি ২০০৫ সালের এবং সিআইএ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ওসামা এখানে থাকতে পারেন। এর অর্থ কী? সিআইএ জানতো ওসামা বিন লাদেন কোথায় আছেন। ২০০৫ থেকে ২০১১ সময়টা অনেক লম্বা। ওই সময় ওসামাকে হত্যা বা গ্রেফতার করা হলো না কেন? আজ ২০১১ সালের মে মাসে তাঁকে হত্যা করা হলো এমন একটা সময় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র এক বছর এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থার কারণে বারাক ওবামার পুনরায় বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছিল! ওসামা মারা যাওয়ার সময় তার পকেটে পাওয়া গেল মাত্র ৫৫০ ইউরো! যিনি বিলিয়ন ডলারের মালিক, তার পকেটে কি-না মাত্র ৫৫০ ইউরো! ওসামা মারা গেছেন, এটা আল-কায়েদাও স্বীকার করেছে। তাকে কী 'বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য' বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল? এসব প্রশ্ন এখন উঠেছে। আর ওঠাটা খুবই স্বাভাবিক। অ্যাবোটাবাদের মতো ছোট একটি শহরে একটি বাড়িতে তিনি থাকলেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা এটা জানবে না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে এখানে আরো একটি প্রশ্ন উঠেছে। খোদ আইএসআই কী শেষ পর্যন্ত লাদেনের খবর জানিয়ে দিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষকে? পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন গেল ১১ এপ্রিল ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন আইএসআই প্রধান জেনারেল আহমেদ সুজা পাশা। জেনারেল পাশা সিআইএ প্রধান লিওন পেন্ট্রার সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিতও হয়েছিলেন। তাদের মাঝে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, তার বিররণ মিডিয়ায় জানান হয়নি। হতে পারে 'কোনো বড় ধরনের প্রাপ্তির আশায় আইএসআই লাদেনের খোঁজটি জানিয়ে দিল মার্কিন কর্তৃপক্ষকে। যদিও আইএসআই অস্বীকার করেছে যে, তারা লাদেনের আস্তানার ঠিকানা জানতো; কিন্তু এই বক্তব্য কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
সত্যিকার অর্থেই পাকিস্তানের ভাবমূর্তি আজ বিশ্বে যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিল যে, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের 'প্রমট' করছে। লাদেনের ঘটনায় এটা এখন প্রমাণিত হলো। ভারত এখন দাবি করছে যে ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী কর্মকা-ের হোতারা পাকিস্তানে লুকিয়ে আছে। ভারত তাদের গ্রেফতার ও ভারতের কাছে হস্তান্তরের দাবি করেছে। বিশ্ব আসরে ভারতের এ দাবি আরও শক্তিশালী হবে এখন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাকে এখন বিশ্বব্যাপী ভিন্ন চোখে দেখা হবে। আগামীতে গোয়েন্দ সংস্থার কর্মকর্তারা যদি ইউরোপ তথা আমেরিকায় নিষিদ্ধ হন আমি আবাক হব না। পাক প্রধানমন্ত্রী গিলানির সরকারের জন্যও এটা খারাপ সংবাদ। দুটো কারণে গিলানি সরকারকে এখন 'কঠিন পরীক্ষার' মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, বিরোধী দল বিশেষ করে ইসলামিক দলগুলো এটাকে ইস্যু করবে এবং সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে। নওয়াজ শরিফ এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছেন। দ্বিতীয়ত, মার্কিন ৪টি হেলিকপ্টার তার টার্গেট এ (এবৎড়হরসড়- লাদেনের কোড নাম) যখন হামলা করলো, তখন পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। এটা স্পষ্টতই পাকিস্তানের সাবধানতা ও সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ এই অভিযোগটি তুলেছেন। এর পেছনে যুক্তি আছে। মৌলবাদী সংগঠনগুলো এটাকেও ইস্যু করেছে ইতিমধ্যে। এমনিতেই সরকারের অবস্থান বেশ নড়বড়ে। চালকবিহীন ড্রোন বিমান হামলা সেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এ যাবত প্রায় ২০০ ড্রোন হামলা পাকিস্তানের ভেতরে পরিচালিত হয়েছে। বলা হয়েছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এই বিমান হামলা হচ্ছে। এর পেছনে সত্যতা যাই থাকুক, বাস্তবতা হচ্ছে এসব হামলায় পাকিস্তানি নাগরিকরা মারা যাচ্ছেন। এটা তো একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করার শামিল। পাক সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বলা যেতে পারে পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন চালকবিহীন ড্রোন বিমান হামলা ঠেকাতে। সরকারের জন্য এটা ভালো নয়। আরো একটি বিষয়, যা নিয়ে আমি চিন্তিত, তা হচ্ছে পাকিস্তান কী শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারবে। লদেনের মৃত্যুর খবর জানাজানি হওয়ার পর লাহোরে বড় ধরনের জানাজা হয়েছে। লস্করই তালিবান নেতা হাফিজ মোহাম্মদ সাঈদ এই জানাজা পরিচালনা করেন। সেখান থেকে প্রতিশোধের কথা উচ্চারিত হয়েছে। প্রতিশোধের কথা বলেছে তেহরিকই তালিবান নামে আরেকটি সংগঠন। কোয়েটায় লাদেনের সমর্থনে মিছিল বের হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার_ পাকিস্তানে এই জঙ্গিবাদী মনোভাব আরো শক্তিশালী হলো। এরা পাকিস্তানের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। ধীরে ধীরে পাকিস্তানে সনাতন রাজনীতির 'মৃত্যু' ঘটতে পারে এবং মৌলবাদী চিন্তা চেতনা পাকিস্তানে আরো শক্তিশালী হতে পারে। ফলশ্রুতিতে ঋঅঞঅ অঞ্চল এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, অথবা আফগানিস্তানের সঙ্গে মিশে গিয়ে বৃহত্তর একটি 'পাখতুনিস্তান' গঠন করতে পারে। শুধুমাত্র ইসলামাবাদ আর লাহোর শহরকেন্দ্রিক ছোট্ট এক পাকিস্তান তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা সামরিক নেতৃত্ব আজ কতটুকু বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন, সেটাই দেখার বিষয় এখন। সত্যিকার অর্থেই পাকিস্তান আজ বড় ধরনের এক সংকটের মুখোমুখি।
লাদেনের মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে একটি অধ্যায়ের। ওসামা বিন লাদেন তাকে ফিরে একটি 'মিথ' তৈরি করেছিলেন। তবে অনেক প্রশ্নেরই কোনো জবাব হয়ত কোনোদিনই পাওয়া যাবে না এবং বিশ্ববাসী হয়তো কোনোদিনই জানবে না কে বা কারা লাদেনকে কেন এবং কোন কাজে 'তৈরি' করেছিল। যে ব্যক্তি সারাবিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, যার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনায় ৯/১১-এর জন্ম হয়েছিল, তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে কোনো ইন্টারনেট বা টেলিফোন ছাড়া অ্যাবোটাবাদে একাকী থাকবেন, এটা বিশ্বসযোগ্য নয়। যিনি শত শত 'যোদ্ধা' তৈরি করেছেন, যারা তার একটি মাত্র নির্দেশে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে পারে, নেতা হিসেবে লাদেনের তো তাদের সঙ্গেই থাকার কথা? ইসলামের 'শত্রুদের' বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ করার কথা, যেমনি করেছিলেন তামিল টাইগার নেতা প্রভাকরণ? যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় লাদেন বাস করলেন স্ত্রী-সন্তানসহ কোনো ধরনের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছাড়া? এটা কী নতুন করে কোনো প্রশ্নের জন্ম দেবে না?
লাদেনের এই মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ' এর অবসান ঘটাবে না। ইয়েমের, আলজেরিয়া, মালি, ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানে আল-কায়েদা নেটওয়ার্ক আরো শক্তিশালী হবে। তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমবেদনা আরো বাড়বে। মৃত লাদেন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন। লাদেনকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাব আরো স্পষ্প হলো। এর মধ্যে দিয়ে এটা আবারো প্রমাণিত হলো আগ্রাসন ও বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ব করার যে মানসিকতা। সেই মানসিকতার প্রশ্নে বুশ আর ওবামার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বুশ যে যুক্তিতে ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছিল, আজ ওবামা অনেকটা একই ধারাবাহিকতায় একটি স্বাধীন দেশের (পাকিস্তান) স্বাধীনতাও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলেন। এটাই হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য দিক। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একক পরাশক্তি হেসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করবে। ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর কায়রো সফর করেছিলেন। সেখানে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন একটি মাত্রা দিতে চান; কিন্তু লাদেনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (হেগে) বিচারের মুখোমুখি না করে, তাকে হত্যা করা_ কোনো আন্তর্জাতিক আইন তা অনুমোদন করে না। তাই মার্কিনি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। আল-কায়েদা প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলছে। এখন আমাদের শুধু অপেক্ষার পালা- প্রতিশোধটি কেমন এবং কোন পর্যায়ে যায়, তা দেখার। একজন ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু উত্থাপিত সব প্রশ্নের কোনো সমাধান দিলো না। 
পূর্বে প্রকাশ @ দৈনিক ডেসটিনি, ১১/০৫/১১

তিউনিসিয়ার নির্বাচন ও 'আরব বসন্তের' ভবিষ্যৎ


গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ তিউনিসিয়ার এক বেকার কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট মোহাম্মদ বওকুজিজি নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করে যে 'বিপ্লবের' সূচনা করেছিলেন, তার সফল সমাপ্তি ঘটেছে ২৩ অক্টোবর ২০১১ একটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়া পুনর্গঠনে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়ায় একটি জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে, যারা দেশটির জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিষদ দেশটির জন্য একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবে। সংবিধান রচিত হওয়ার পর আগামী বছর সেখানে আবার নির্বাচন হবে।
গত বছর যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ায়, তা আরব বিশ্বে এক গণজাগরণের সৃষ্টি করেছিল, যাকে বলা হচ্ছে 'আরব বসন্ত', অনেকটা সাবেক চেকোস্লাভিয়ার রাজধানী প্রাগে সংঘটিত হওয়া 'প্রাগ বসন্ত'-এর সঙ্গে যার তুলনা করা যায়। ১৯৬৮ সালের 'প্রাগ বসন্ত' ছিল সাবেক সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বড় প্রতিবাদ। আর 'আরব বসন্ত' অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক প্রতিবাদ। পার্থক্য হচ্ছে এক জায়গায়_'প্রাগ বসন্ত' সফল হয়নি। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তন আসেনি। এসেছিল অনেক পরে, ১৯৮৯ সালে। কিন্তু 'আরব বসন্ত' পরিবর্তন আনছে। ইতিমধ্যে তিউনিসিয়ায় বেন আলীর ২৩ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। মিসরে ৩০ বছরের একদলীয় শাসনের অবসান হয়েছে। হোসনি মুবারক এখন ইতিহাসের অংশ, দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর এখন বিচার হচ্ছে। কিন্তু লিবিয়ায় পরিবর্তনটা এসেছে ভিন্নভাবে। সেখানে তিউনিসিয়া কিংবা মিসরের মতো গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। গাদ্দাফি নিজের জীবন দিয়ে বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করে গেলেন। ইয়েমেন আর সিরিয়ায়ও 'আরব বসন্ত'-এর ঢেউ লেগেছে। ইয়েমেনে আলী আবদুল্লাহ সালেহ আর সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু যে বিষয়টি বড় বেশি করে আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে_'আরব বসন্ত' কী ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে পুরো আরব বিশ্বে? কোন শক্তি এখানে ক্ষমতাসীন হচ্ছে? এসব দেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বা কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। বলতে দ্বিধা নেই, পুরো আরব বিশ্বে যে ধরনের সমাজব্যবস্থা চালু ছিল, তাকে কোনো মতেই গণতন্ত্রসম্মত বলা যাবে না। তিউনিসিয়ায় ব্যক্তি বেন আলী ও তাঁর পরিবার ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। Democratic Constitutional Rally নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে বেন আলী ২৩ বছর ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। মিসরেও একই ধারা আমরা প্রত্যক্ষ করি।
অতিসম্প্রতি তিউনিসিয়ার নির্বাচনের পর সেখানে নতুন এক রাজনৈতিক ধারার জন্ম হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কেননা নির্বাচনে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত দল এন্নাহদার বিজয় নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে যাচ্ছে তিউনিসিয়ায়। ১৯৫৬ সালে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৭ সাল থেকে বেন আলী ছিলেন ক্ষমতায়। মধ্য ষাটের দশকে এনাহদা নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর চলতি বছরের মার্চ মাসে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দলটির শীর্ষ নেতা রশিদ আল ঘান্নুচি দীর্ঘদিন ছিলেন লন্ডনে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার পরই তিনি তিউনিসিয়ায় ফিরে আসেন। এনাহদা কট্টরপন্থী কোনো ইসলামিক দল নয়। একসময় দলটি মিসরের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি অনুসরণ করত। ১৯৮১ সালে দলটির জন্ম হয়েছিল। তখন দলটির নাম ছিল Islamic Tendency Movement। পরে ১৯৮৯ সালে এনাহদা বা Awakening Movement নাম ধারণ করে। দলটি ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। দলটির সঙ্গে তুরস্কের Justice and Development Party’'র অনেক মিল রয়েছে। এন্নাহদার নেতারা এটা স্বীকারও করেন। তাঁরা তিউনিসিয়ায় একটি 'তুরস্ক মডেল' অনুসরণ করতে চান। ঘান্নুচি নিজেই বলেছেন, ‘In Turkey and Tunesia there was the same movement of reconcilitation between Islam & modernity and we are the discendants of this movement’। ঘান্নুচির বক্তব্যের মধ্য থেকে এটা বোঝা যায়, এনাহদা আধুনিকতার বিরোধী নয়। এমনকি এবার নির্বাচনে এমন অনেক মহিলা এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা হিজাব পরেন না এবং পর্দাও করেন না। এনাহদা বহুদলীয় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনে বিশ্বাসী। তিউনিসিয়ায় ১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল Personal Status Code, যেখানে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে সমতা আনা হয়েছিল। সেখানে পুরুষদের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা সমঅধিকার ভোগ করেন। এনাহদা এই Personal Status Code-এর বিরোধী নয়। ঘান্নুচির মতে, এই Personal Status Code হচ্ছে '‘as an acceptable interpretation of Islam’। ঘান্নুচির এই অভিমত যেকোনো ইসলামী মৌলবাদী নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁকে পার্থক্য করবে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে পারস্য অঞ্চলে নারীদের অধিকার সীমিত। বহুবিবাহ সেখানে স্বীকৃত, আর নারীরা পুরুষের মতো সমঅধিকার ভোগ করেন না। তিউনিসিয়ায় এ থেকে পার্থক্য ছিল। এখন ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত এনাহদাও সমঅধিকারের পক্ষে।
তিউনিসিয়ায় নারীদের চাকরি করার ব্যাপারে কোনো বাধানিষেধ নেই। তারা স্বামীর অনুমতি না নিয়েই নিজেরা ব্যবসা করতে পারেন, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। হিজাব পরার ব্যাপারেও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যা যেকোনো আরব বিশ্বে অকল্পনীয়। তিউনিসিয়ায় রাজনীতি ও স্থানীয় সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্বের হার ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যার সঙ্গে নরডিকভুক্ত দেশগুলোর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সমাজে নারীদের এই অবস্থান অন্য কোনো আরব বিশ্বে দেখা যায় না। এমনি একটি দেশে ইসলামপন্থী একটি দলের নির্বাচনে বিজয় সংগত কারণেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। ঘান্নুচি হতে যাচ্ছেন তিউনিসিয়ার পরবর্তী নেতা। তাঁকে একজন সমাজবিজ্ঞানী চিহ্নিত করেছেন এভাবে_‘modernist’, but with deep roots in its Arab-Islami identity’। এটাই হচ্ছে আসল কথা। ঘান্নুচি কট্টর নন, আধুনিকমনস্ক এক মানুষ, যিনি এরাবিয়ান ও ইসলামিক ঐতিহ্য ধারণ করেন। তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে 'বিপ্লব'-পরবর্তী তিউনিসিয়ায় নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চান। সম্ভবত তিনি হতে যাচ্ছেন 'তিউনিসিয়ার 'এরদোগান'। তুরস্কের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী এরদোগান তাঁর আদর্শ। তুরস্কের মডেল তিনি অনুসরণ করতে চান তিউনিসিয়ায়। তবে তিউনিসিয়ার পটপরিবর্তন মিসরের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, সেটা একটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু মিসরের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্নতর। সেখানে 'ইসলামিক ব্রাদারহুড' একটি শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। সমাজের সর্বত্র এদের সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। দলটি নিষিদ্ধ থাকলেও ভিন্ন সংগঠনের নামে এর কর্মীরা সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এরা একটি শক্তি। মুবারকবিরোধী আন্দোলনেও এরা অংশ নিয়েছিল। ২৮ নভেম্বর ২০১১ সেখানে সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে এনাহদার মতো 'ইসলামিক ব্রাদারহুডও' যে ভালো ফল করবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
তবে মিসরের সমস্যাটা অন্যত্র। ১১ ফেব্রুয়ারি (১১) হোসনি মুবারকের পদত্যাগের পর ফিল্ড মার্শাল হোসেন তানতাবির নেতৃত্বে ২৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সামরিক জান্তা সেখানে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। এখন শোনা যাচ্ছে, তানতাবি নিজেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আগামী বছরের শেষের দিকে অথবা ২০১৩ সালের প্রথমদিকে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সামরিক জান্তাও চাচ্ছে নয়া সংবিধানে তাদের একটা সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এখন তানতাবির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিসরের বিশ্বাসকে একটা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আরব বিশ্বে একটা পরিবর্তন আসছে। গত ৬০ বছরের আরব বিশ্বের রাজনীতিতে তিনটি ধারা লক্ষণীয়। ১৯৫২ সালে জামাল আবদুল নাসেরের মিসরের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রথম ধারা। তিনি আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম দিয়ে আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে, যখন আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে আরব বিশ্বে ইসরায়েলি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর। ইরানি বিপ্লব ইরানকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। এই বিপ্লব ওই সময় আরব বিশ্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। এখন 'আরব বসন্ত' চতুর্থ একটি ধারার সূচনা করল।' তিউনিসিয়ায় 'জেসমিন বিপ্লব' একটি পরিবর্তনের সূচনা করল। ইসলামপন্থী কিন্তু আধুনিকমনস্ক একটা নয়া নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে আরব বিশ্বে। এনাহদার বিজয় এ কথাই প্রমাণ করল।
দৈনিক কালের কণ্ঠ। ২০ নভেম্বর ২০১১। ড. তারেক শামসুর রেহমান অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

কোন পথে যুক্তরাষ্ট্র

গত ১১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন যখন ৫৩ দিন পার করে, তখন সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়, তা হচ্ছে এই আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী? যারা ইন্টারনেটে এ আন্দোলন সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ওয়াল স্ট্রিটের পাশে জুকোট্টি পার্কে শত শত মানুষ দীর্ঘ ৫৩ দিন যাবত দিন-রাত অবস্থান করে এক ধরনের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন- এই বিক্ষোভ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। এই প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে যে অসমতা ও বৈষম্য রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে, যেখানে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, আর গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। যারা আজ জুকোট্টি পার্কে জমায়েত হয়েছেন, তারা সমাজের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী, যারা বলছেন, ‘We are the 99 percent’, অর্থাত্ আমরাই ৯৯ ভাগ। এই আন্দোলন আজ শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ছড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরে। ওয়াশিংটনের ফ্রিডম প্লাজায় যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের নামকরণ করা হয়েছে October 2011 Movement, যারা ওই স্থান দখল করে আন্দোলন করে আসছেন গত ৩৬ দিন ধরে। তারা আন্দোলন করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল অর্থ যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করে (তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার), তার প্রতিবাদে। তাদের দাবি, যুদ্ধের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, তা কমিয়ে সামাজিক খাতে (স্বাস্থ্য ও শিক্ষা) ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। সর্বশেষ ঘটনায় বিক্ষোভকারীরা ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড পোর্টও দখল করে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই চলছে এই আন্দোলন। এই আন্দোলন চলছে এমন একটি সময় যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক ব্যাংক সেখানে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার নয় দশমিক এক শতাংশ। দেশটির প্রবৃদ্ধির অবস্থাও উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে জুন) গড় প্রবৃদ্ধি এক শতাংশেরও কম। ঋণমানকারী সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরসের ক্রেডিট রেটিংয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঋণমান সূচক ট্রিপল-এ থেকে এক ধাপ নামিয়ে ডবল-এ প্লাসে কমানো হয়েছে। এতে দেশটির সরকার, সেখানকার বিভিন্ন কোম্পানি ও ভোক্তাদের ঋণ গ্রহণের খরচ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব পরিস্থিতির জের ধরে দেশটি নতুন করে মন্দায় পতিত হতে পারে। 
এই পরিস্থিতি কোনো আশার কথা বলে না। এই পরিস্থিতির রেশ ধরেই জন্ম হয়েছে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বৈষম্য ও অসমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। নোয়াম চমস্কি এই ধরনের আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। চমস্কি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে চিহ্নিত করেছেন Plutonomy হিসেবে। অর্থাত্ সম্পদের কারণে একটি ধনিক শ্রেণীর জন্ম হয়েছে, যারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। এরা সমাজের মাত্র এক ভাগ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, বাকি ৯৯ ভাগ Precariat, অর্থাত্ অনিশ্চিতভাবে জীবনযাপনকারী একটি শ্রেণী। এই দুই শ্রেণীর মাঝে দ্বন্দ্ব এখন অনিবার্য। 
পরিসংখ্যান বলে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পেছনে (ইরাক ও আফগানিস্তান) তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে (প্রতি মাসে নয় দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার), সেখানে জনগোষ্ঠীর নয় দশমিক এক ভাগের কোনো চাকরি নেই। শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ মালিক হচ্ছে জনগোষ্ঠীর মাত্র এক ভাগ মানুষ। ক্ষোভটা তাই ওয়াল স্ট্রিটকে ঘিরেই। ওয়াল স্ট্রিটকে ধরা হয় পুঁজিবাদের একটা সিম্বল হিসেবে। প্রধান প্রধান করপোরেট হাউসগুলোর অফিস সেখানে। স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনও এখানে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজিবাদী সমাজে ১৯৭০ সালে ধনিক শ্রেণী হিসেবে পরিচিতদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আয়ের আট থেকে নয় ভাগ অর্থ সঞ্চিত হতো। আজ ২০১১ সালে তারা ভোগ করে মোট সম্পদের ২৩ দশমিক পাঁচ ভাগ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ব্রাকলে) অধ্যাপক এমানুয়েল সাজ (Emanuel Saez) তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে আমেরিকান সমাজে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তার মতে ১০ ভাগ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের মোট বেতনের ৪৯ দশমিক সাত ভাগ গ্রহণ করে। ডেভিড গ্র (David Graw) তার এক প্রবন্ধে (The Richest 1%, Have Captured America’s Wealth, Alternet) উল্লেখ করেছেন আমেরিকান ধনীদের মোট সম্পদের পরিমাণ এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের গরিব জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। অর্থাত্ ১৫৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর সম্পদের চেয়েও বেশি। তার মতে শীর্ষে থাকা এক ভাগ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগের মালিক। যদিও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিস (Joseph Stiglitz) মনে করেন, শীর্ষে থাকা ওই এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ ভাগ। অথচ ২৫ বছর আগে ধনীরা নিয়ন্ত্রণ করত মাত্র ১২ ভাগ সম্পদ (By the 1%, for the 1%, Vanity fare)। অপর এক গবেষক রবার্ট রাইচ (Robert Reich)-এর মতে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ বেতনভোগী মানুষের মাঝে পাঁচ ভাগ ৩৭ ভাগ ভোগ্যপণ্যের ক্রেতা। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রে একটি শ্রেণী ধনী থেকে আরও ধনী হচ্ছে, আর অপর শ্রেণী গরিব থেকে আরও গরিব হচ্ছে, যাদের ক্রয়ক্ষমতা কম, সম্পদের পরিমাণও কম। যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে Casino Capitalism। অর্থাত্ ক্যাসিনো নির্ভর একটি অর্থনীতি, যেখানে এক রাতে জুয়া খেলায় লাখ ডলার হেরে যান অনেক আমেরিকান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ধনীরা ব্যক্তিগত প্লেন নিয়ে আটলান্টায় যান। ক্যাসিনোগুলোর নিজস্ব ফাইভ স্টার হোটেল আছে, সেখানে থাকেন। সারা রাত জুয়া খেলে রোববার যার যার শহরে চলে যান। ওখানে একদিকে ক্যাসিনোগুলোর জৌলুস, অন্যদিকে ক্যাসিনোগুলোর কিছুটা দূরে জরাজীর্ণ পুরনো বাড়ি, সেখানে বাস করে ব্ল্যাক আমেরিকানরা, যাদের অনেকেরই চাকরি নেই। স্বাস্থ্যসেবাও তারা পান না। কী বৈসাদৃশ্য! একই দেশের নাগরিক। একজন যেখানে এক রাতে জুয়া খেলে হেরে যান কয়েক হাজার ডলার, অন্যজন সারা মাসেও যার রোজগার নেই মাত্র এক হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের এই সমাজ ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থায় ‘সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির’ ধারণা সেখানে গরিবদের, বেকারদের ন্যূনতম অধিকার (স্বাস্থ্য, শিক্ষা) নিশ্চিত করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই অধিকার নিশ্চিত হয়নি। রাষ্ট্র সব নাগরিকের ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। আমি যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীন মানুষ দেখেছি। ভিক্ষা করে এমন লোকও আমি সাবওয়েতে দেখেছি। গায়িকা ম্যাডোনার ভাইও গৃহহীনদের একজন-এ খবরও ছাপা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেখানে ১৬ দশমিক চার মিলিয়ন, অর্থাত্ এক কোটি ৬৪ লাখ শিশু রয়েছে অত্যন্ত গরিব। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার দরিদ্র পরিবারের যে সীমা নির্ধারণ করেছে (অর্থাত্ ২২ হাজার ৫০ ডলার বছরে), সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ ভাগ শিশু সন্তান (প্রতি পাঁচ জনে একজন) ওই সব পরিবারে বসবাস করে। জীবনের কোনো এক সময় ৯০ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ শিশু ‘ফুড স্টাম্প’ (বিনে পয়সায় খাদ্য) এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য পাস করা একজন গ্র্যাজুয়েট কোনো চাকরির সংস্থান করতে পারছে না, সেখানে ২০১০ সালে করপোরেট হাউসগুলোর প্রধান নির্বাহীর বেতন বেড়েছে শতকরা ২৩ ভাগ। জুকোট্টি পার্কে যারা অবস্থান নিয়ে দিনের পর দিন অবস্থান করে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন, তাদের অনেকেরই চাকরি নেই। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বছরে ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করে আফগান সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছে তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে অনেকের চাকরির সংস্থান করা যেত। শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো যেত, বাড়ানো যেত ‘সামাজিক নেট’-এর পরিধি (ফুড স্ট্যাম্প, হাউজিং ইত্যাদি)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা করেনি। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ সেখানে যখন কোনো সমাধান বয়ে আনতে পারেনি, তখন লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ‘তৃতীয় যুদ্ধ’-এর সূচনা করেছিল। গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে বটে, কিন্তু লিবিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী একটি অস্থিতিশীলতার জন্ম হল। লিবিয়ায় ‘আরেকটি আফগানিস্তান’ কিংবা ‘আরেকটি সোমালিয়া’ জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে জড়িয়ে গেছে। এখন জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় সেখানে যুদ্ধের খরচ মেটাতে হচ্ছে।
এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এই যে বৈষম্য, এই বৈষম্যের কারণেই সেখানে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’-এর মতো আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। যদিও পুঁজিবাদী সমাজে এই বৈষম্য নতুন কিছু নয়। পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিই হল আসল কথা। এই পুঁজি একটি নতুন অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে_Plutonomy| এই সম্পদশালী ধনিক শ্রেণী এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কথা বলার কেউ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যারা নির্বাচিত হন, তারা এই Plutonomy-রই প্রতিনিধি। এদের আর্থিক সহায়তায় এরা নির্বাচিত হন। তাই নির্বাচিত হওয়ার পর তারা এই সম্পদশালী ধনিক শ্রেণীরই স্বার্থ রক্ষা করেন। নোয়াম চমস্কি লিখেছেন, ‘The world is divided into two blocks-the plutonomy and the rest’। যুক্তরাষ্ট্র এই Plutonomy অর্থনীতিরই প্রতিনিধিত্ব করে। কার্ল মার্কস শ্রেণীদ্বন্দ্বের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন শ্রেণীদ্বন্দ্বের কারণে বিপ্লব অনিবার্য। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে শ্রেণীদ্বন্দ্বের একটি রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। একটি সামাজিক বিপ্লব সেখানে আসন্ন। 
  দৈনিক সকালের খবর ১৪ নভেম্বর ২০১১,
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য,
tsrahmanbd@yahoo.com  

জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন এবং ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন


গত ৪ নভেম্বর কানের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে কোনো রকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই। বিশ্বের ধনী ২০টি দেশের সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা এই শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন এমন একটি সময় যখন সারা বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে এক রকম অস্থিরতা বজায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় বড় শহরে অসমতা, বেকারত্ব আর একশ্রেণীর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে যখন জনমত শক্তিশালী, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ওবামা ছুটে গেলেন আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে বিনোদন নগরী হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সের কান শহরে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে গ্রিসের ঋণসঙ্কট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেটাও ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। ঋণ এখন অনেকটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। ইউরোপের ধনী রাষ্ট্রগুলো গ্রিসকে ১১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েও গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। গ্রিসের মোট ঋণের পরিমাণ এখন ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ান ডলার। এই ঋণ গ্রিস শোধ করতে পারছে না। অনেকটা দেউলিয়া হয়ে গেছে রাষ্ট্রটি। গ্রিস 'ইউরো জোনে' থাকবে কী, থাকবে না, এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পাপান্দ্রু একটি গণভোট করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বাতিল করতে বাধ্য হন। এখন সর্বশেষ আস্থা ভোটে পাপান্দ্রু টিকে গেলেও তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তা গ্রিসের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। গ্রিসের পরিস্থিতি যখন অবনতিশীল তখন ধারণা করা হয়েছিল জি-২০ নেতারা একটি উদ্ধার অভিযানে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু 'ফটো সেশন' এর মধ্য দিয়ে দুদিনব্যাপী জি-২০ এর শীর্ষ সম্মেলন শেষ হলো। এমনকি অসমতা, বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বজুড়ে যে আন্দোলন চলছে সে ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত নিল না জি-২০ এর নেতারা।
এই মুহূর্তে গ্রিসের ঋণ পরিস্থিতি যেমনি আলোচনার অন্যতম বিষয়, ঠিক তেমনি আলোচনার বিষয় আমেরিকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও। যে দেশ শিশুদের নূ্যনতম অধিকার (২১ ভাগ সন্তান নির্ধারিত দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে) নিশ্চিত করতে পারেনি, সেই দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে শুধু অন্য দেশের (আফগানিস্তান, ৬ বিলিয়ন ডলার বছরে) সেনা প্রশিক্ষণের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জন গরিব। ৪ কোটি ৬২ লাখ মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে, শতকরা হার যা ১৫ দশমিক ১ ভাগ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবার আফ্রো-আমেরিকানদের এবং হিস্পানিকদের সংখ্যা বেশি। এই হার যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৪ ও ২৬ দশমিক ৬ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির সংস্থান না করে, তাদের নূ্যনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে যুদ্ধের পেছনে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর একটা অংশ রয়েছে, যাদের হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই। স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ দশমিক ৩ ভাগ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যুদ্ধের খরচ মেটাতে কর দেন। ওবামা প্রশাসনের যুদ্ধের জন্য বাজেট প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার (যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধের পেছনে খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার) , স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ওবামা প্রশাসনের নজর এদিকে নেই। যুদ্ধ তাদের দরকার। যুদ্ধ প্রলম্বিত করে করপোরেট হাউজগুলো মুনাফা লুটছে। যুদ্ধ মানেই তো ব্যবসা। সুতরাং আজ যে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন গড়ে উঠছে, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
যুক্তরাষ্ট্রেই গবেষণা হচ্ছে যুদ্ধের খরচ যদি কমানো যায়, তাহলে ওই অর্থ দিয়ে সামাজিক খাতে কী কী পরিবর্তন আনা সম্ভব। পেটাগনের হিসাব মতে প্রতিমাসে আফগানিস্তান ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় ৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার, যার তিন ভাগের ২ ভাগ খরচ হয় আফগানিস্তানে। পেন্টাগন ইরাক ও আফগানিস্তানে গত ৪০ মাসে খরচ করেছে ৩৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা কি না বয়োজ্যেষ্ঠদের স্বাস্থ্যবীমা খাতে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে গত ১০ বছরে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু সেনাদের ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি তেল (আফগানিস্তানে) বাবদ (অক্টোবর ২০১০ থেকে মে ২০১১ পর্যন্ত) যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে তেল সরবরাহ ও জনশক্তির খরচ হিসাব করা হতো, তাহলে প্রতি গ্যালন তেলের মূল্য গিয়ে দাঁড়াতো ১০০ ডলারে। প্রতি বছর আফগানিস্তানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে (সেনা সদস্যদের জন্য) যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ছিল ৫ লাখ ৭ হাজার ডলার (বছরে)। ২০১০ সালে এটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার ডলারে। আর ২০১১ সালের হিসাব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ডলারে। এটা কংগ্রেশনাল রিপোর্ট। এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ইরাকে ২০০৭ সালে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য বছরে খরচ ছিল ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার, ২০১১ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ২ হাজার ডলারে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ইরাকের জন্য বরাদ্দ ৪৬ বিলিয়ন। এখন ওবামা প্রশানকে যুদ্ধের জন্য যদি অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে না হতো, তাহলে এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে (১) ৫৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশুর (নিম্ন আয়ের পরিবারের) স্বাস্থ্যসেবা, (২) ২৩ মিলিয়ন নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা (৩) ২০২ মিলিয়ন ছাত্রের বৃত্তি, (৪) ১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা ও (৫) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ১৪ দশমিক ২৬ মিলিয়ন আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সুতরাং আজকে ওয়াশিংটনে কিংবা নিউ ইয়র্কে যে আন্দোলন হচ্ছে, তার পেছনে কারণগুলো কি, তা সহজেই অনুমেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হলেও, ওবামা প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং তিনি লিবিয়ায় নতুন একটি ফ্রন্ট ওপেন করেছেন। লিবিয়ায় যে যুদ্ধের সূচনা তিনি করেছিলেন তাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় যুদ্ধ হিসেবে। লিবিয়ায় গাদ্দাফির মৃত্যুর পর এখন সম্ভাব্য টার্গেট হচ্ছে সিরিয়া ও ইরান। সুতরাং আগামীতে যুদ্ধ বন্ধের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আর সঙ্গতকারণেই যুদ্ধের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হলে সামাজিক খাতে আরো কাটছাঁট করতে হবে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বয়োজ্যেষ্ঠরা আর শিশুরা। 
তাদের স্বাস্থ্য সুবিধা আরো সীমিত হবে। যুদ্ধের কারণে সমাজের একটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সুবিধাভোগী একটি অংশ বরং এতে উপকৃতই হচ্ছে। ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে করপোরেট হাউজগুলো আরো ধনী হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ধনিক শ্রেণী, যাদের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ, তারা দেশটির মোট সম্পদের ৩৩ শতাংশের মালিক। সুতরাং করপোরেট হাউজগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
আজ নিউ ইয়র্কের জুকোটি পার্কে (অকুপাই ও ওয়াল স্ট্রিট) শত শত তরুণ সমবেত হয়ে যে আন্দোলনের সূচনা করলেন, তার সঙ্গে কায়রোর তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলনের বেশ মিল পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করে মিসরের তরুণ সমাজ একটি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। পতন ঘটেছিল হোসনি মোবারকের। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কেও তরুণরা এই সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহার করছে। তবে পার্থক্যটা এখানেই যে এতে করে ওবামা প্রশাসনের পতন ঘটবে না। তবে ওবামা প্রশাসন নিশ্চয়ই এটা থেকে কিছু শিখবে। ২০১২ সালে সেখানে নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন কোনো প্রভাব ফেলবে না, তা বলা যাবে না। আরো একটা কথা। সারা বিশ্বব্যাপীই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে, রোমে, লন্ডনে, অকল্যান্ডে। গ্রিসের অর্থনৈতিক সঙ্কট রাষ্ট্রটিকে একটি 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' এ পরিণত করেছে। ইউরোপে এক মুদ্রা ইউরো এখন অনেকটা অকার্যকর। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। এখন বিশ্ব নেতারা সমস্যার সমাধানে কি উদ্যোগ নেন, সেটাই দেখার বিষয়। তবে একটি বিপ্লব সেখানে আসন্ন। এই বিপ্লবকে মার্কস বেঁচে থাকলে হয়তো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দিতেন। এটা একটা সামাজিক বিপ্লব। এই সামাজিক বিপ্লব সেখানে একটি পরিবর্তন আনবে। ধনী ও গরিবের মধ্যে পার্থক্য ঘোচাতেই হবে। শ্রেণীবৈষম্য কমিয়ে আনতেই হবে। না হলে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটবে। হোয়াইট হাউজ প্রশাসন এটা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবে যে এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এভাবে বৈষম্য বজায় রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই পরিবর্তনটুকু যত দ্রুত আনা যায়, ততই মঙ্গল। সমাজতন্ত্র যেমনি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি পুঁজিবাদও এখন ব্যর্থ প্রমাণিত হলো। নতুন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরি, যেখানে কোনো বৈমষ্য থাকবে না, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন হবে, আর রাষ্ট্র জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু এই প্রত্যাশা পুরণে জি-২০ সম্মেলন কোনো আশার বাণী শোনাল না। প্রতিবারের মতো এবারোও তারা ফটো-সেশন করলেন। ওবামা অনেক আশ্বাসের বাণী শোনালেন। ইতোমধ্যে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন ৫০ দিন পার করেছে। প্রচ- শীতেও বিক্ষোভকারীদের মাঝে এতটুকু হতাশা আসেনি। বরং তা ছড়িয়ে গেছে ক্যালিফোর্নিয়াতেও। সেখানে অকল্যান্ড সমুদ্রবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। একই সঙ্গে খোদ ওয়াশিংটনের ফ্রিডম প্লাজাতেও ড়পঃড়নবৎ-২০১১ সড়াবসবহঃ, যা যুদ্ধের বিরুদ্ধে পরিচালিত, তা পার করেছে ৩০ দিন। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে কমিয়ে দেয় বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে বাধ্য।

ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য,
tsrahmanbd@yahoo.com 

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং কিছু কথা

সারা বিশ্ব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে যুদ্ধের ১০ বছর পার করল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান বিধ্বস্ত করে ভবন দুটি ধ্বংস করার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ১০ বছর পার করার পর সেই যুদ্ধের অবসান হয়েছে_তা বোধ হয় বলা যাবে না। কেননা ওবামা প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সেখানে যুদ্ধ চলছে। ইরাকে মার্কিন সেনা নেই বটে। কিন্তু আত্মঘাতী বোমা সংস্কৃতির সেখানে জন্ম হয়েছে। আর লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী এক গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পাশাপাশি আরেকটি বিমান হামলা হয়েছিল ভার্জিনিয়ায় পেন্টাগনের সদর দপ্তরে। চতুর্থ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল পেনসিলভানিয়ায়। আল-কায়েদা নামে একটি সংগঠন এই হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছিল। এরপর জানা গেল আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের নাম। গত ১০ বছর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ' পরিচালনা করেছে। গত ১ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরের একটি বাড়িতে অবস্থান নেওয়া বিন লাদেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'র একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বটে। কিন্তু 'যুদ্ধ' এখনো শেষ হয়নি। এমনকি ওবামা নিজেও এই যুদ্ধের সমাপ্তির কথা ঘোষণা করেননি।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল? ১০ বছরের হিসাব-নিকাশ যদি মেলানো যায় তাহলে দেখা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোষ্ঠী এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লাভবান হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। ডেভিড ডি গ্র (David de Graw) Global Research-এ লিখিত একটি প্রবন্ধে স্বীকার করেছেন, এই যুদ্ধের মোট খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৪৪ কোটি লাখ টাকার সমান)। চিন্তা করা যায়, কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সাধারণ করদাতারা এই অর্থ পরিশোধ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এই যুদ্ধের খরচের একটি হিসাব দিয়েছে। তাদের ভাষায়, এই খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি পরিসংখ্যান দিয়েছেন ন্যানসি এ ইউসুফ (Nancy A. Youssef) তাঁর এক প্রবন্ধে The True Cost of Afgan Iraq War is Anyone's Guess (Me Clatchy-এর প্রতিবেদন, ১৫ আগস্ট ২০১১)। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি ছয়জন মার্কিনের মধ্যে একজন দরিদ্র। পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ দরিদ্র। এশীয়দের মধ্যে দারিদ্রের হার ১২.১ শতাংশ। তাদের চাকরি নেই। বুশ তথা ওবামা প্রশাসন তাদের জন্য ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারত। সামাজিক খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে পারত। তা তারা করেনি। অথচ 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' নিয়েও নানা কথা আছে। কারা শুরু করল, কেন করল_অনেক প্রশ্নেরই কোনো জবাব নেই দীর্ঘ ১০ বছর পরও। একটি নয়, দুটি নয়_চার-চারটি বিমান ছিনতাই হলো। গোয়েন্দারা টের পেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে টুইন টাওয়ারে দুটি বিমান বিধ্বস্ত হলো। দেখা গেল, ভবন দুটি ধসে পড়েছে, অথবা গলে গেছে। কোনো ধরনের বিস্ফোরক ছাড়া কি এত উঁচু ভবন একসঙ্গে ধসে নিচে পড়ে যেতে পারে? তাহলে কি কোনো শক্তি এমন কোনো বিস্ফোরক ব্যবহার করেছিল, যাতে করে পুরো ভবন ধসে পড়ে? কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে বড়জোর ওই ভবনের কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পুরো ভবনটি ধসে পড়ার কথা নয়। শুধু দুটি ভবনই ধসে পড়ল, পাশের ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকল, একটুও ক্ষতি হলো না কিংবা কাত হয়ে পড়ল না_এটা কি সম্ভব? ওই দুটি ভবন বেছে নেওয়ার কারণই বা কী? আশপাশে তো আরো অনেক ভবন ছিল। এটা করা হয়েছিল কী এ কারণে যে ভবন দুটি ছিল বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদর দপ্তর। এখানে যেকোনো হামলা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে। পেন্টাগনে যে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো, ওই বিমানের যাত্রীদের কোনো ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া যায়নি। সাধারণত বিমান বিধ্বস্ত হলে মৃতদেহ পাওয়া যায়_এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে পাওয়া গেল না কেন? এমনকি বিধ্বস্ত বিমানের কোনো ছবিও দেখা যায়নি। পেনসিলভানিয়ার এক মাঠে চতুর্থ যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণও আমরা পাইনি কোনো দিন। ওই বিমানে কতজন যাত্রী ছিল, কয়টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে_এসব কোনো তথ্যই কারো কাছে নেই। পাঠক লক্ষ করুন, কোনো বিমান যদি বিধ্বস্ত হয়, তাহলে প্রথমেই খোঁজ পড়ে ব্লাক বঙ্রে, যেখানে সর্বশেষ কথোপকথন রেকর্ড হয়ে থাকে। যতদূর মনে পড়ে, বিধ্বস্ত চারটি বিমানের একটিরও 'ব্লাক বঙ্' উদ্ধার করা কিংবা পাওয়া যায়নি। এটা কি ইচ্ছাকৃত? নাকি কোনো তথ্য গোপন করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টুইন টাওয়ারে হামলায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারালেও (বাংলাদেশি পাঁচজনসহ) একজন ইহুদিও মারা যায়নি। এটা কি কাকতালীয়, নাকি অন্য কিছু? অভিযোগ আছে, বিমান হামলার পাঁচ মিনিট আগে সব ইহুদি এই ভবন ত্যাগ করে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব গত ১০ বছরে আমরা পাইনি। কিন্তু ওই হামলার পর বিশ্বকে বদলে যেতে দেখেছি আমরা। আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল মার্কিন বাহিনী ২০০১ সালে। সেই দখলীস্বত্ব আজও বজায় রয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, মার্কিন সেনাবাহিনী সেখানে থাকবে। কেননা মধ্যএশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের (গ্যাস ও তেল) ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আফগানিস্তান থেকে সেই সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের। বেলুচিস্তানের মরুভূমিতে রয়েছে একটি বিমান ঘাঁটি, যা যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে। বেলুচিস্তানের সীমান্তে রয়েছে ইরানের একটি প্রদেশ 'সিস্তান বেলুচিস্তান'। আরব সাগর ঘেঁষা গাওদারে চীনারা তৈরি করছে গভীর সমুদ্রবন্দর। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেলুচিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি।
আফগানিস্তানের পাশাপাশি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নিয়েছিল ইরাক। অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র (ডগউ) রয়েছে_এই অভিযোগ তুলে দেশটি দখল করে নিয়েছিল। ২০১০ সালে এসে সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে সত্য (৫০ হাজার সৈন্য রয়ে গেছে প্রশিক্ষণের জন্য)। কিন্তু ইরাকি সম্পদ (তেল) চলে গেছে মার্কিন কম্পানিগুলোর হাতে। ইরাকি তেলের পয়সায় এখন মার্কিন কম্পানিগুলো বিধ্বস্ত ইরাকের পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত। ২০১০ সালে এসে সারা আরব বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে এক ধরনের গণ-আন্দোলন, যাকে বলা হচ্ছে 'আরব বসন্ত'। এই আরব বসন্ত কার জন্য, কিসের জন্য_এটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকরা (বেন আলী, হোসনি মুবারক, আলী আবদুল্লাহ সালেহ) উৎখাত হয়েছেন বটে। কিন্তু ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে আসেনি। সর্বশেষ গাদ্দাফিরও পতন হয়েছে। লিবিয়াকে বলা হয় উত্তর আফ্রিকায় যাওয়ার দরজা বা ধেঃবধিু। লিবিয়া যদি নিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর (নাইজার, সাদ, গিনি বিসাউ) দেশগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। আফ্রিকায় ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে AFRICOM আফ্রিকান কমান্ড। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার যে মানসিকতা, তা সামনে রেখেই পতন ঘটানো হলো গাদ্দাফি সরকারের।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথাকথিত 'যুদ্ধ' শুরু করেছিল বুশ প্রশাসন। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে ওবামা সেই যুদ্ধ বন্ধ করেননি। মার্কিন সমরাস্ত্র কারখানাগুলোতে উৎপাদন বেড়েছে। বিশ্বের সর্বত্র, বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরাক_সর্বত্রই আমেরিকার কম্পানিগুলোর রমরমা ব্যবসা। নাইন-ইলেভেন এই ব্যবসার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফিনিয়ান কানিংহামের প্রবন্ধ '9/11 paved the way for America's permanent war of Aggression'-এ এ কথাই বলা আছে। আর মিসেল চসুডোভক্সি তো স্পষ্ট করে বলেছেন, 'alleged Jihadi plotters were the product of us state terrorism.' ... অনলাইনে চমস্কির বই ৯/১১ : was there an alternative (seven stories press) কেউ পড়ে দেখতে পারেন। তাই 'নাইন ইলেভেন' নিয়ে যে অসংখ্য প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা, ১০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও আমরা এর পূর্ণ জবাব খুঁজে পেলাম না। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু হয়েছে সত্য, কিন্তু আল-কায়েদা ধ্বংস হয়ে যায়নি। তারা তাদের স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন এনেছে। অঞ্চল ভিত্তিতে আল-কায়েদা এখন সংগঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। যেমন-সৌদি আরবভিত্তিক Al-Qaeda in Arabian Peninsula (AQAP), রিয়াদে ২০০৩ সালে হামলার জন্য যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২০০৪ সালে ইরাকে সংগঠিত হয়েছে AQI বা Al-Qaeda in Iraq। ২০০৭-এ জন্ম হয়েছে Al-Qaeda in Islamic Magreb (AQIM)। ছোট ছোট সেল-এ বিভক্ত হয়ে তারা এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যাকে বলা হচ্ছে 'Spider Web'। মাকড়সার জালের মতো সংগঠিত হচ্ছে, আবার তারা ধ্বংসও হচ্ছে। এরপর অন্য এক জায়গায় গিয়ে তারা সন্ত্রাসের জাল বুনছে, মাকড়সারা যেমনটি করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে একরকম যোগাযোগ ছাড়াই এই জিহাদি কর্মকাণ্ড পরিচালনার তত্ত্ব দিয়েছেন আল-কায়েদার একজন তাত্ত্বিক আবু মুসাব আল সুরি (The Global Islamic Resistance)। নোয়াম চমস্কি তাই লিখেছেন, The Jihadi movement could have been split and undermined after 9/11 if the 'crime against humanity' had been approached as a crime (was war only answer to 9/11? nation of change, 5 september, 2011)। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডকে সত্যিকার অর্থেই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ব্যবহার করা হয়েছে গোষ্ঠীস্বার্থে তথা ব্যবসায়িক স্বার্থে। ইরাক তার বড় প্রমাণ। ইরাকের তেলের পয়সায় এখন সেখানে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আর এককভাবে কাজ পেয়েছে মার্কিন কম্পানিগুলো। একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে এখন লিবিয়ায়। 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' একটি জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিভিন্ন চোখে দেখা হতো। এখন পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছ, এটা সত্য। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান 'নাইন-ইলেভেন'-এর আগের অবস্থায় আর ফিরে যায়নি। 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' একটি কালো অধ্যায়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা এই 'যুদ্ধ' প্রকারান্তরে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার প্রয়াসেই রচিত। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যায়নি। বরং তা আরো বেড়েছে। সারা বিশ্ব যখন টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার দশম বর্ষ পালন করছে, তখন কাবুলের কূটনীতিকপাড়ায় তালেবানদের হামলা (১৩ সেপ্টেম্বর) এ কথাই প্রমাণ করল আবার।
তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

এ যুদ্ধের শেষ কোথায়?

যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ১০ বছর আগে, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছিল নাইন-ইলেভেনের মতো ঘটনা। ১৯ সদস্যের একটি দল চার ভাগে বিভক্ত হয়ে চারটি বিমান হাইজ্যাক করল। দুটো আছড়ে পড়ল নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে, একটি ভার্জিনিয়ায় পেন্টাগন সদর দফতরে, অপর একটি বিধ্বস্ত হল পেনসিলভিনিয়ার একটি মাঠে। সারাবিশ্ব জানল ‘আল-কায়দা’ নামের একটি সংগঠন ওই হামলা চালিয়েছে, আর এর নেতা হচ্ছেন ওসামা বিন লাদেন। সেই ওসামা বিন লাদেনকে পাওয়া গেল পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে, দুই স্ত্রীসহ গত পাঁচ বছর ধরে এখানেই তিনি অবস্থান করছিলেন। ১ মে রাতে (২০১১) মার্কিন নেভির কমান্ডোরা সেই লাদেনকে হত্যা করল। মৃতদেহ ভাসিয়ে দিল আরব সাগরে কোন ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই। টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী বিমান হামলার পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ শুরু করেছিলেন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। টার্গেট করা হয়েছিল মুসলমানদের। ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করার পর ২০০৩ সালে দখল করা হল ইরাক, আর ২০১১ সালে এসে বোমা হামলা চালিয়ে লিবিয়া থেকে উৎখাত করা হল গাদ্দাফিকে। এই যে ‘যুদ্ধ’, তা কি শেষ হয়েছে? ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন, তখন কিন্তু তিনি ঘোষণা করেননি যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

আজ হিসাব-নিকাশের পালা- এই যুদ্ধ বিশ্বকে কী দিয়েছে। কিংবা যুক্তরাষ্ট্রইবা এ যুদ্ধ থেকে কতটুকু উপকৃত হয়েছে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পরিচালনা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ যেখানে বলা হচ্ছে ছয় ট্রিলিয়ন ডলারের কথা (Global Research-এর মতে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এর পরিমাণ তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার), সেখানে বাংলাদেশের পাঠকরাও জেনেছেন (১৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ছয়জনের একজন গরিব। দেশটির চার কোটি ৬২ লাখ মানুষ এখন বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে, শতকরা হারে যা ১৫ দশমিক ১। ২০০৯ সালে এ হার ছিল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা সরকারি তথ্য। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে আবার আফ্রো-আমেরিকান এবং হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর হার বেশি (২৭ দশমিক ৪ এবং ২৬ দশমিক ৬)। যুক্তরাষ্ট্রের গত ৫২ বছরের ইতিহাসে এই হার সর্বোচ্চ। বাংলাদেশী-আমেরিকান যারাই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তারা অনেকেই এখন চাকরি হারানোর আশংকা করছেন। যে যুদ্ধের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা বহন করেন, সেখানে নতুন করে চাকরির সংস্থান করা হচ্ছে না। অনেকেই রয়েছেন স্বাস্থ্য-শিক্ষার বাইরে। এ সংখ্যা পাঁচ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৩ ভাগ। অথচ যুদ্ধের জন্য খরচ হচ্ছে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার! বাংলাদেশী টাকায় এর পরিমাণ ৪৪৪ কোটি লাখ টাকা (ডলারপ্রতি ৭৪ টাকা হিসাবে)। কী বিশাল বাজেট! এর একটা অংশ দিয়ে নতুন চাকরির সংস্থান করা যায়, স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের দিকে খেয়াল নেই ওবামাদের। যুদ্ধ তাদের দরকার। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর যে সূচনা করেছে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের হিসাবে খরচের পরিমাণ তিন দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলার। পেন্টাগনের হিসাবমতে প্রতি মাসে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ নয় দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার (যার তিন ভাগের দুই ভাগ খরচ হয় আফগানিস্তানে)। প্রশিক্ষণ, অস্ত্রশস্ত্র ও ড্রোন বিমান হামলা চালাতে এই খরচ হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রকে মহাশূন্যে একটি শাটল মহাকাশযান পাঠাতে খরচ হয়েছিল এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগন ইরাক ও আফগানিস্তানে গত ৪০ মাসে খরচ করেছে ৩৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা বয়োজ্যেষ্ঠদের স্বাস্থ্যবীমা খাতে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে গত ১০ বছরে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু সেনাদের ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি তেল (আফগানিস্তান) বাবদ (অক্টোবর, ২০১০ থেকে মে, ২০১১) যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে তেল সরবরাহ ও জনশক্তির খরচ হিসাব করা হতো, তাহলে প্রতি গ্যালন তেলের মূল্য গিয়ে দাঁড়াত ১০০ ডলারে। প্রতি বছর সেখানে অর্থাৎ আফগানিস্তানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে (শুধু সেনাদের জন্য) যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ছিল পাঁচ লাখ সাত হাজার ডলার (বছরে)। ২০১০ সালে এটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৬৭ হাজার ডলারে। আর ২০১১ সালে এই খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ছয় লাখ ৯৪ হাজার ডলারে। এটা কংগ্রেশনাল রিপোর্ট। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরাকে ২০০৭ সালে প্রতি মার্কিন সেনার জন্য বছরে খরচ ছিল পাঁচ লাখ ১০ হাজার ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আট লাখ দুই হাজার ডলারে। ২০১১ সালে কংগ্রেস আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ইরাকের জন্য বরাদ্দ ৪৬ বিলিয়ন (২০১২ সালের জন্য বরাদ্দ কিছুটা কমেছে ১০৭ বিলিয়ন ও ১১ বিলিয়ন ডলার)। বলা ভালো, ইরাক থেকে ‘ক্যামবেট ট্র-পস,’ অর্থাৎ যুদ্ধরত সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য রয়ে গেছে, যারা শুধু প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত। অন্যদিকে ওবামা ঘোষণা করেছেন ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে (ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য দেখুন McClatchy Newspaper-এর প্রতিবেদন ১৫ আগস্ট, ২০১১)।

যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, তা দিয়ে সামাজিক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারত। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে (১১৩ বিলিয়ন, ২০১১-১২), সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে- ক. ৫৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশুর (নিম্ন আয়ের পরিবারের) স্বাস্থ্যসেবা খ. ২৩ মিলিয়ন নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ. ২০২ মিলিয়ন ছাত্রের বৃত্তি ঘ. ১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা ঙ. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ১৪ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই সঙ্গে প্রাথমিক স্কুলে ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন শিক্ষক ও ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন পুলিশ অফিসার নিয়োগ এবং ৬৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব।

প্রশ্ন এসে যায়, আর কতদিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র পেছনে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করবে? ওবামা শান্তিবাদী নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল তিনি যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু দেখা গেল, যে শক্তি সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ পরিচালনা করেছিল, তারাই ওবামাকে পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট হাউস, সমরাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শক্তি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে পরিচালনা করছে। ওবামা এদের ওপর নির্ভরশীলও। অধ্যাপক মিশেল চসুডোভস্কি তার একাধিক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই উপকৃত হয়েছে এবং তার নিজ স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে। আল কায়দা তথা ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছিল ১৯৭৯ সালে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল ওসামা বিন লাদেনকে। আজ সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আল কায়দার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ‘যুদ্ধ’ শুরু করলেও অধ্যাপক পিটার ডেল স্কট দেখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে, যেখানে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি, সেখানে আল কায়দাকে ব্যবহার করেছিল (দেখুন Prof. Peter Dale Scot, US-Al Qaeda's Alliance; Bosnia, Kosovo & now Libya- Washington's on going collusion with terrorist, global Research, 29.7.11)। আর অধ্যাপক চসুডোভস্কি তো সরাসরিই মন্তব্য করেছেন, ‘alleged jihadi ploters were the product of US state terrorism’। ১০ বছর আগে নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ওই ঘটনা নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রায় সবই একতরফাভাবে লিখিত।

প্রবন্ধগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অভিযোগ আনা হয়েছে। তবু এর মাঝেও দু-একজন বিশেষজ্ঞকে দেখা গেছে যারা ওই ঘটনার জন্য মার্কিনি আগ্রাসী শক্তিকে দোষ চাপিয়েছেন। নোয়াম চমস্কি এদের মাঝে অন্যতম। চমস্কির বাইরে যারা বিভিন্ন জার্নালে অধ্যাপক স্টেফেন জুনেস (Prof. Stephen Zunes, University of San Francisco), (Prof. Marry Ellen Connell, Notre Dame), অধ্যাপক মিশেল হাস, অধ্যাপক রবার্ট ফারলের লেখা পাঠ করেছেন, তারা দেখেছেন এরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখেছেন। এরা বলার চেষ্টা করেছেন, একটি ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ সামনে রেখেই ‘নাইন-ইলেভেন’ সংগঠিত করা হয়েছিল। অধ্যাপক হাস ২০০৯ সালে লিখিত তার গ্রন্থে (George W. Bush : War Criminal?) সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করার জন্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং বিচার দাবি করেছিলেন। তিনি পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছিলেন, যার কারণে ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে বুশকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা যায়। কারণগুলো হচ্ছে- ১. গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহযোগিতা ২. আগ্রাসী যুদ্ধের সূচনা ৩. আগ্রাসী যুদ্ধের পরিকল্পনা ৪. যুদ্ধের সূচনা করার জন্য ষড়যন্ত্র ৫. যুদ্ধের জন্য প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা। মার্কিন নীতির কঠোর সমালোচক নোয়াম চমস্কি তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, যদি সত্যিকার অর্থে নুরেমবার্গ যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য প্রণীত আইন অনুসরণ করা যায় (International Military Tribunal at Nuremberg, 1945), তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। এটাই হচ্ছে আসল কথা। হাজার হাজার মানুষকে হত্যার জন্য বুশ কিংবা ওবামাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনকে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে তুলে না দিয়ে অপর একটি দেশের সার্বভৌমত্ব লংঘন করে তাকে হত্যা করা হয়। ওসামা বিন লাদেন নিঃসন্দেহে অন্যায় করেছেন। তার বিচার হওয়া উচিত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করলেও এটা শেষ হবে, তা মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ায় ‘তৃতীয় যুদ্ধ’ শুরু করেছে। গাদ্দাফি উৎখাত হয়েছেন। একজন ‘হামিদ কারজাই’কে পাওয়া গেছে সেখানে। তিনি হচ্ছেন মুস্তফা আবদুল জলিল। জলিল ছিলেন একসময়ে গাদ্দাফির বিচারমন্ত্রী। বর্তমানে জাতীয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। লিবিয়ার পাশাপাশি সিরিয়ায়ও গঠিত হয়েছে একটি জাতীয় পরিষদ। এখন কবে নাগাদ বাশার আল আসাদ উৎখাত হন, সেটাই দেখার বিষয়। ‘যুদ্ধ’-এর ক্ষেত্র এখন বদলে যাচ্ছে, আফগানিস্তান থেকে লিবিয়া। লিবিয়ার তেলসম্পদ সেখানে ‘যুদ্ধ’কে প্রলম্বিত করবে। পশ্চিমাদের স্বার্থ ওখানে বেশি। প্রথমত জ্বালানি তেল আর দ্বিতীয়ত লিবিয়া হচ্ছে ‘আফ্রিকার গেটওয়ে’, অর্থাৎ আফ্রিকায় যাওয়ার রাস্তা। ইউরেনিয়ামসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে পূর্ব আফ্রিকায়, বিশেষ করে নাইজার, শাদ কিংবা গিনি-বিসাউয়ে। আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি কমান্ড। এখন লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলো। লিবিয়া দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হবে আফ্রিকা। তাই লিবিয়ায় ‘যুদ্ধ’টা প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফির পতনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হবে না। নতুন আঙ্গিকে যুদ্ধ পরিচালিত হবে। আফগানিস্তানে ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ গঠনের সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, এখন ঠিক তেমনি আফ্রিকায়ও ন্যাটোর আফ্রিকা সংস্করণ গঠনের প্রশ্ন উঠবে। তাই অদূর ভবিষ্যতে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বন্ধ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। 
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

মনমোহনের ঢাকা সফর কতটা ফলপ্রসূ হবে

আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় আসছেন। যে কোন বিবেচনায় এ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সোনিয়া গান্ধীসহ একাধিক মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এ কথাই প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকারকে ভারত খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। ২৯ আগস্ট ঢাকা ঘুরে গেলেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন। ধারণা করা হচ্ছে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যেসব চুক্তি হবে, তা চূড়ান্ত করতেই শিবশংকর মেনন ঢাকায় এসেছিলেন। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যেসব বিষয়ে চুক্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন ও ফেনী নদীর কিছু পানি প্রত্যাহার সংক্রান্ত একটি চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমি হস্তান্তর ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ট্রানজিট সংক্রান্ত কোন চুক্তি হচ্ছে না বলেই জানা গেছে। তবে এটা ঠিক কোন কোন বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। পত্রপত্রিকায় আভাষ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
প্রথমেই এসে যায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে ভিখেরি হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিলÑ তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাবে ভাগ হবে আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। এখন একটা চুক্তি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন, তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কী? আমরা কি তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? আমি নিশ্চিত নই আগের অবস্থান থেকে আমরা সরে এসেছি কিনা? অবশ্যই একটি চুক্তি ভালো, যদি সেই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়। যে চুক্তিতে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে, সেই চুক্তিকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি আমরা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। প্রতিবছরই সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ কথাটা। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচকাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে থাকবে। আমরা কি এটা বিবেচনায় নিয়েছি?
ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তি হবে। কিন্তু এতে কি বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে? বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিটপ্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয়, ভারত সীমান্তের যত দূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ২ রুপি। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোন জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্যও একটি চুক্তি হবে। এই কয়লা আসবে ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের। এখানে যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমরা ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলাম? এই নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না।
ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়, সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সুন্দরবন সুরক্ষা, বিটিভি ও দূরদর্শনের সম্প্রচার বিনিময় ইত্যাদি যেসব চুক্তি বা সমঝোতা হবে, তা আমার বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার বিবেচনায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা বা চুক্তি হওয়া উচিত, তা হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য, যা যৌথ ইশতেহারে থাকতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতকে উদ্যোগী হতে হবে স্পষ্ট করে। ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা চলবে না। এই ট্যারিফ কমানের কোন উদ্যোগ ভারত কখনও নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ, তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সঙ্গে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়লেও, ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা ৮০ লাখ পিছ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটিতে উন্নীত করলেও অশুল্কের কারণে বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এজন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনোই দেয়নি। এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের সফরের সময় এই অশুল্ক বাধা নিয়ে আদৌ কোন আলোচনা হবে না। যেখানে আমাদের স্বার্থ জড়িত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে যদি আলোচনা না-ই হয়, তাহলে এই সফরকে আমরা সফল বলতে পারি না।
টিপাইমুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ নেই। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। কিন্তু সম্প্রতি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন নর্থইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ। তিনি বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে থাকবে না কেন? টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ট্রানজিট নিয়ে কোন চুক্তি হচ্ছে না। তবে ট্রানজিটের কাঠামোর ব্যাপারে সমঝোতা হতে পারে। অর্থাৎ কীভাবে ট্রানজিট চলবে, এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা। ভারত ১৫টি রুটে (নদীপথ, সড়কপথ ও রেলযোগাযোগ) ট্রানজিট চাচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের জন্যই আমরা অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছি। ওই ঋণ (১০০ কোটি ডলার) সুদমুক্ত নয়। আমাদের অবকাঠামো ভারত ব্যবহার করবে। আমাদের স্বার্থ এখানে নেই। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী নয়াদিল্লি সফর করে এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন নতুন করে ট্রানজিট চুক্তি করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে ভারত এই ট্রানজিট সুবিধা পেতে পারে। ড. রিজভীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট প্রাপ্তির সুযোগ থাকত, তাহলে ভারত অনেক আগেই এই সুযোগ গ্রহণ করত। অন্তত গওহর রিজভীর বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করত না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (মমতা ব্যানার্জি-পশ্চিমবঙ্গ, তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পু লালথান ওয়ালা-মিজোরাম)। এতেই বোঝা যায় ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায়। এ ধরনের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা নেই। ড. মনমোহন সিং আমাদের অতিথি। আমরা অতিথিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে মনমোহন সিং যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন, তাতে করে এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন তিনি পাবেন না। চুক্তি ও সমঝোতাগুলো হতে যাচ্ছে একপক্ষীয়।
দৈনিক যুগান্তর ৫ই  সেপ্টেম্বর ২০১১
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফর

মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফর নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। যে ক’টি চুক্তি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে, তাতে ভারতের পাল্লাটা ভারি। বাংলাদেশের প্রাপ্তি এখানে কম। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিতে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি এবং পশ্চিম দিনাজপুর ও কুচবিহারে বিক্ষোভ এই চুক্তির ভবিষ্যেক একটি প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তার পানি বন্টনের উপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের চাষাবাদ অনেকাংশ নির্ভরশীল। তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি এখন ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে। ফেনী নদীর পানি বন্টনের ফলে ফেনী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী, সোনাগাজী ও মিরসরাই অঞ্চলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। মুহুরী প্রকল্পও বড় ধরনের ঝুঁকির মাঝে থাকবে। ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি একদিকে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সংকটে কিছুটা সমাধান দেবে বটে, কিন্তু ভবিষ্যতে নানা জটিলতার জন্ম দিতে পারে। ভারত থেকে কয়লা আমদানি করে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের সিদ্ধান্ত ভালো, কিন্তু উত্তরাঞ্চলের ৫টি কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন ও বিদ্যুত্ উত্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়াই উত্তম। ট্র্যানজিটে কাঠামো সম্পর্কে যে সমঝোতা   স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে এবং যার আওতায় ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সুবিধা পাবে তা বিতর্কের মাত্রা বাড়াবে। ট্র্যানজিটের ব্যাপারে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি, ফি নির্ধারণ, কোন কোন পণ্য চলাচল করবে তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো পূর্বাহ্নে সমীক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। সুন্দরবন সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে চুক্তি, বাঘ রক্ষা, স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণ সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক অত্যন্ত সাদামাটা। এর জন্য এই হাই লেভেল ভিজিটের প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয় এমন কোন চুক্তি না থাকায় মনমোহন সিং-এর সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যেসব বিষয় চুক্তিতে থাকা জরুরি ছিল তা হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা, বাণিজ্য ঘাটতি  কমাতে সকল বাংলাদেশী পণ্যের ভারতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, পণ্যের স্পর্শকাতর তালিকা বাতিল করা, সাফটার আওতায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বাণিজ্য অধিকার নিশ্চিত করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের দাবির প্রতি ভারতের নমনীয় অবস্থান ইত্যাদি। এর একটি ক্ষেত্রেও ভারতের সম্পর্ক আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমরা ভারতের সহযোগিতা চাই। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চুক্তি ও সমঝোতাগুলো যদি একপক্ষীয় হয়ে যায় তাহলে মনমোহন সিং-এর সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

মূল লেখাটি পড়ুন এখানে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফর বিশিষ্ট নাগরিকদের ভাবনা

 
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


বেলুচিস্তান কি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট?

পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যখন 'অস্বাভাবিক', তখন ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যামেরন মুন্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ। আগস্টের প্রথম দিকে তিনি বেলুচিস্তান সফর করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে বেলুচিস্তানের আঞ্চলিক পরিষদের স্পিকার মোহাম্মদ আসলাম ভুটানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় তিনি এ মন্তব্যটি করেন। যদিও মুন্টার তাঁর মন্তব্যের কোনো ব্যাখ্যা দেননি, কিন্তু যাঁরা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা জানেন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। এ অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই বেলুচিস্তান বিভক্ত। এর এক অংশ পাকিস্তানে, অন্য অংশ ইরানে, যা ইরানের একটি প্রদেশ। এটি সিস্তান বেলুচিস্তান নামে ইরানে পরিচিত। বেলুচিস্তানের দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর, আর উত্তরে আফগানিস্তান। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে এবং আফগানিস্তানের তালেবানের আশ্রয়স্থলও রয়েছে এখানে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। চীনেরও উপস্থিতি রয়েছে বেলুচিস্তানে। চীন বেলুচিস্তানের গাওদারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। ভারতেরও আগ্রহ রয়েছে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। একদিকে আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার পরিকল্পনার ছক কাটছে, তখন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে এ অঞ্চল সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এল। বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, বেলুচিস্তানের দুই নেতা গেল বছর ভারত সফর করেছিলেন। দুই নেতা_ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেহুল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লি সফর করেছিলেন। এ দুই নেতা ফ্রান্স থেকে ভারতে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য 'স্বাধীন বেলুচিস্তানের' ব্যাপারে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তাঁরা দিল্লিতে এসে এ কথাও বলেছিলেন যে ৬২ বছর ধরে পাকিস্তান বেআইনিভাবে বেলুচিস্তান জবরদখল করে রেখেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে_এ অভিযোগও এ দুই নেতার। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ঢাকার সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছিল তখন। দৈনিক যায়যায়দিনের নিজস্ব প্রতিবেদক কলকাতা থেকে প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন গত ৯ নভেম্বর। ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেহুলকে নয়াদিল্লিতে আসতে দেওয়া এবং ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় নতুন করে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। কেননা পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। ওয়াহিদ ও মুনিরের দিল্লি সফরের পর পাকিস্তানের অভিযোগ আরো শক্ত হয়েছিল। এখানে বলা প্রয়োজন যে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে বৃহৎ শক্তি তথা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহের অন্যতম কারণ এ অঞ্চলের গ্যাসসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। বেলুচিস্তানের 'সুই' গ্যাস দিয়ে পাকিস্তানের জ্বালানি চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু এ অঞ্চল বরাবরই অবহেলিত। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে লাগেনি। বেলুচিস্তানে ২০০১ সালে গঠিত হয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। এর নেতৃত্বে আছেন বেলুচ মারি, যিনি একসময় মস্কোতে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৫ সালে তাঁরা সুই গ্যাসকেন্দ্রে হামলা চালালে তাঁদের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে তাঁরা আলোচনায় আছেন। ইরানের সিস্তান বেলুচিস্তানেও 'জুনদুল্লাহ'র নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।
বেলুচিস্তানের অবস্থান আরব সাগর ঘেঁষে। এ কারণে একদিকে যেমন আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, তেমনি আগ্রহ রয়েছে চীনের। অন্যদিকে ভারতের আগ্রহেরও কমতি নেই। এখানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। এ অঞ্চলকে যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় অথবা যদি বিচ্ছিন্নতা উসকে দেওয়া যায়, তাহলে তা থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ফায়দা লুটতে পারবে বেশি। আফগানিস্তানের একটি সীমান্ত রয়েছে বেলুচিস্তানের সঙ্গে। আফগান তালেবান এ সীমান্ত অতিক্রম করে বেলুচিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে_এ অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। যে কারণে বেলুচিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রম রয়েছে। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভালো নয়। পাকিস্তানি তালেবান এখন পাকিস্তানের ভেতরেই আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সেনা অভিযানের ফলে তালেবান যদি সেখান থেকে উৎখাত হয়, তাহলে বেলুচিস্তান হবে তালেবানের পরবর্তী অভয়ারণ্য। সে ক্ষেত্রে ২০০১ সালের অক্টোবরে যেমন বোমা হামলা চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তেমনটিও ঘটতে পারে বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে। এ অঞ্চলে আরব সাগরঘেঁষা গাওদার একটি সমুদ্রবন্দর। বন্দরটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বন্দরটি তৈরি করে দিচ্ছে চীন, যেখানে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার। চীন 'মুক্তার মালা' বা String of Pearls-এর যে নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে গাওদার একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এই পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। কেননা এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিট থাকবে, যেখান থেকে ভারত মহাসাগরের সব ধরনের নৌ কার্যক্রম লক্ষ করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রেরও আগ্রহ রয়েছে গাওদারের ব্যাপারে। ইরানের সীমান্ত থেকে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে গাওদার। আর হরমুজ প্রণালি থেকে দূরত্ব মাত্র ৪০০ কিলোমিটার। এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের তেল পশ্চিম ইউরোপসহ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হয়। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সদস্যরা যেকোনো সময় এই হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যদি কোনো নৌ অবরোধ সৃষ্টি করতে হয় (?) তাহলে গাওদার বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চীন তার পূর্বাঞ্চলে ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। এ ব্যাপারে একটি মহাপরিকল্পনাও তারা প্রণয়ন করছে। সুতরাং সংগত কারণেই বেলুচিস্তান আগামী দিনগুলোতে উত্তপ্ত থাকবে এবং বৃহৎ তথা কোনো কোনো আঞ্চলিক শক্তির কাছে স্বাধীন একটি বেলুচিস্তান রাষ্ট্র (?) আকর্ষণীয়। ২০০১ সালের জুলাই মাসে জেনস ইনফরমেশন গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বেলুচিস্তানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যথেষ্ট তৎপর।
ইরানি প্রদেশ সিস্তান বেলুচিস্তান ছিল বরাবরই শান্ত ও স্থিতিশীল। ইতিহাসের কিংবদন্তির বীর রুস্তমের জন্ম এখানে। এমনকি ইরানের শীর্ষস্থানীয় শিয়া নেতা আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানির জন্মও এখানে। সিস্তান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের ভাষা ও ধর্ম এক, তবে স্থানীয় ভাষায় তারা কথা বলে। বেলুচিস্তানের যে অংশ ইরানের সঙ্গে ছিল, তা একসময় যুক্ত ছিল ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশের সঙ্গে। কিন্তু রেজা শাহ ১৯৫৯ সালে সিস্তানকে আলাদা প্রদেশ করেন। জুনদুল্লাহরা তাদের আন্দোলন বেলুচিস্তানে সম্প্রসারিত করছে। তাদের যুক্তি বেলুচ ও পারসীয়রা এক নয়। তারা মনে করে, পারসীয়রা ইরানি হলেও সব ইরানি পারসীয় নন। ইরানিদের মধ্যে আজারি, বেলুচরা রয়েছে। সিস্তানের ব্যাপারে দ্বন্দ্ব মূলত পারসীয়দের সঙ্গে বেলুচদের। এই দ্বন্দ্বটাকে জুনদুল্লাহই কাজে লাগাতে চায়। সিস্তানকে ইরান থেকে তারা আলাদা করতে চায়। তবে একটি 'গ্রেটার বেলুচিস্তান' গড়ার ডাক তারা দেয়নি। ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র জুনদুল্লাহকে 'প্রমোট' করছে। জুনদুল্লাহর নেতা আবদুল মালেক রিগি একসময় তালেবানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি হিসেবেও তিনি পরিচিত। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিতে তাঁর ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে। জুনদুল্লাহরা সমর্থন পাচ্ছে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আনজুমান ই সিপাহ ই সাহাব ও লস্কর ই জাগজাবি নামক দুটি সংগঠনের, যারা পাকিস্তানে শিয়া স্থাপনার ওপর একাধিকবার আক্রমণ চালিয়েছে।
পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তান ও ইরানের প্রদেশ সিস্তানের সমস্যা এক নয়। উভয় অঞ্চলের মানুষের মিল এক জায়গায়_তারা বেলুচ। এবং উভয় অঞ্চলেই উন্নয়ন হয়নি। এ কারণে তাদের ক্ষোভ রয়েছে। পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তানে স্থায়ী বাসিন্দা অর্থাৎ বেলুচরা ক্রমেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। অন্য প্রদেশ থেকে মানুষ এসে এখানে বসবাস করছে। অন্যদিকে সিস্তানের সমস্যাটা মূলত অনুন্নয়ন। বেলুচিস্তান নিয়ে সমস্যা মূলত দুটি। এক. আফগানিস্তানের পসতুনরা আর বেলুচিস্তানের পাঠানরা এক হয়ে ভবিষ্যতে একটি পসতু রাষ্ট্র (চধংযঃড় ঝঃধঃব) গঠন করতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবানকে যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে একদিন এ অঞ্চলে জন্ম হবে তালেবানমুক্ত পসতু রাষ্ট্র। পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন থাকবে এই পসতু রাষ্ট্রের ব্যাপারে। দুই. ইরান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তান মিলে একটি গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যদি কোনো ধরনের সহাবস্থান না হয়, তাহলে এই গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা আরো শক্তিশালী হবে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানে গঠিত হয়েছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, যার নেতৃত্বে রয়েছে বেলুচ মারি। রয়েছে বেলুচিস্তান পিপলস ফ্রন্ট, যাদের নেতৃত্বে গ্রেটার বেলুচিস্তান আন্দোলন শুরু হতে পারে। পাঠক, নব্বইয়ের দশকের সাবেক যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্রের কথা স্মরণ করতে পারেন। সার্বদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে একে একে স্বাধীন হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া (১৯৯১), বসনিয়া-হারজেগোভিনা (১৯৯২)। এরপর স্বাধীন হয়েছে মন্টিনেগ্রো, ম্যাসিডোনিয়া ও স্বাধীনতার পথে রয়েছে কসোভো। 'বলকানাইজেশন'-এর প্রক্রিয়া ইরানেও আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি ভবিষ্যতে। ইরান ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র যে ঝড়ভঃ ডধৎ শুরু করেছে, তার উদ্দেশ্য একটাই, ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করা। বেলুচিস্তান দিয়েই (?) এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন। ভারতের যে বিপুল জ্বালানি চাহিদা, তা দেশটি মেটাবে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে। এক. ইরান থেকে বেলুচিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (আসালুইয়ে-বন্দর আব্বাস-ইরানশহর-গুজদার-সুই-মুলতান-নয়াদিল্লি)। দুই. তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (দুজুলেবাদ-হেরাত-কান্দাহার-কোয়েটা-মুলতান-ফাজিলকা-নয়াদিল্লি, TAPI প্রজেক্ট)। বেলুচিস্তান ভারতের জন্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা এই দুটি প্রজেক্টের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। তাই বেলুচিস্তানের ঘটনাবলি যে আগামী দিনগুলোতে বারবার আলোচিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বুধবার, ১০ আগষ্ট ২০১১, ২৬ শ্রাবণ ১৪১৮, ৯ রমজান ১৪৩২, দৈনিক কালের কন্ঠ.ড. তারেক শামসুর রেহমান নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : tsrahmanbd@yahoo.com