রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বিদ্যুৎ সংকট ও সরকারের দায়দায়িত্ব

বিদ্যুৎ বিভাগ বেশ কিছুদিন ধরে ‘বিদ্যুৎবার্তা’ প্রচার করে আসছে। এই ‘বিদ্যুৎবার্তা’য় আমজনতাকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে সর্বশেষ বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথা। মোটামুটি সব পত্রিকায়ই এই বিজ্ঞাপনটি (?) প্রচার হচ্ছে। যেমন ৩১ জুলাইয়ের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল : উৎপাদন ৪৫০৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট (এর আগের দিন ছিল ৪৬৩২ মেগাওয়াট)। লোডশেডিং ৯৮৫ মেগাওয়াট (গত বছর ছিল ৮৯০ মেগাওয়াট)। গত বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের এই দিনে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩৯০১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এটা সরকারি ভাষ্য, সরকারি প্রপাগান্ডা। ওই ‘বিদ্যুৎবার্তা’য় আমাদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, ৬ জানুয়ারি, ২০০৯ যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৩২৬৭ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, সেখানে ৩১ জুলাই, ২০১১ এ উৎপাদন হয়েছে ৪৫০৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন বেড়েছে। সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের জুলাইয়ে উৎপাদন যোগ হয়েছে ২০৫ মেগাওয়াট। আর চলতি আগস্টে নতুন উৎপাদন যোগ হবে ৭৯৮ মেগাওয়াট।
সংবাদটি পড়ে যে-কেউ পুলকিত হতে পারেন। হাতে তালিও দিতে পারেন। কিন্তু কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ আছে। উৎপাদন যদি বাড়েই, তাহলে বিদ্যুতের এই পরিস্থিতি কেন? ১ আগস্টের রাতের কথাই বলিÑ আমি যে এলাকায় থাকি (আদাবর) সেখানে রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কোন বিদ্যুৎ ছিল না। আর দিনের বেলার কথা নাইবা বললাম। দিনের মধ্যে কতবার যে বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব করিনি। ক্লাস নিতে গিয়ে পারিনি বিদ্যুতের অভাবে। এখন শুধু রাতেই যদি কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে (অথচ রাতে বিদ্যুতের চাহিদা কম। অফিস, কল-কারখানা বন্ধ), তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যে কোথায়, তা সহজেই আঁচ করা যায়। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সরকারি বক্তব্যকে সমর্থন করছে না। সরকার যে তথ্য দিচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই।
বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট আছে। চাহিদা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। কিন্তু সেভাবে উৎপাদন হচ্ছে না। হাজার হাজার ফ্ল্যাট এই ঢাকা শহরেই তৈরি হচ্ছে। এসব ফ্ল্যাটে কি আদৌ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে? যদি না হয়, তাহলে যারা লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফ্ল্যাটগুলো কিনছেন, তারা কী করবেন? আবাসনশিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক লাখ মানুষ। তাদের আয়-রোজগারের কী হবে? ডেভেলপাররা যদি ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে না পারেন, তাহলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে যাবেন। সরকারের জন্য আদৌ তা কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে। এই গ্যাস এখন ফুরিয়ে আসছে। চলমান গ্যাস সংকট মোকাবেলায় সরকার ২০০৯ সালে ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগ্রাম’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর অধীনে অতিদ্রুত নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের হাতে থাকা ৩, ৬, ৮ ও ১১ নম্বর ব্লকের মোট তিন হাজার ১০০ কিলোমিটার লাইন দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) সিসমিক জরিপের কাজ তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, স্থলভাগের ২৩টি ও অগভীর সমুদ্রের আটটি ব্লককে পিএসসির আওতায় বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কনোকো-ফিলিপস একটির দায়িত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসপ্রম এবং অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সান্তোসও শিগগিরই কাজ পাচ্ছে। এমন অভিযোগও উঠেছে যে, স্থলভাগে সুনেত্রার মতো বিশাল মজুদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হতে পারে। কনোকো-ফিলিপস যে দায়িত্বটি পেয়েছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের বিতর্ক হচ্ছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা এই চুক্তির বিরোধিতা করে দেশব্যাপী এখন গণসংযোগ করছেন। তাদের যুক্তি একটাই, কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি করা যাবে না। গভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। মিয়ানমার ও ভারত গভীর সমুদ্রে গ্যাস পেয়েছে। মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রে প্রাপ্ত গ্যাস আগামী বছর যাবে থাইল্যান্ডে। চীনও এই গ্যাস কিনছে। এক্ষেত্রে যদি গ্যাস পাওয়াও যায়, তা উত্তোলন ও জাতীয় গ্রিডে দিতে ন্যূনতম আরও পাঁচ-ছয় বছর প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের কাছে বিকল্প কী, এটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। যদিও একটা কথা ইদানীং শোনা যাচ্ছে, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বাপেক্স যে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (সম্ভাব্য মজুদ) গ্যাস আবিষ্কার করেছে, তা যদি উত্তোলনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ সংকটের একটা সমাধান সম্ভব। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই মজুদও বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত সরকার বিষয়টি খোলাসা করেনি।
যেহেতু গ্যাসের একটি সংকট আছে, তাহলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান আমরা কীভাবে করব? গ্যাসের বিকল্প হতে পারে কয়লা। এ পর্যন্ত দেশে পাঁচটি কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত মজুদের পরিমাণ দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন। এ কয়লাসম্পদ ৭৩ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য। তবে উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ ২০ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য ধরা যেতে পারে, যা ৩০ থেকে ৪০ বছরের জ্বালানি-নিরাপত্তা দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কয়লা উত্তোলন নিয়েও বাংলাদেশে একটি বড় বিতর্ক রয়েছে। কয়লা উš§ুক্ত পদ্ধতিতে তোলা হবে, নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে তোলা হবেÑ এটা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। উš§ুক্ত পদ্ধতিতে খনন করলে ছয় হাজার হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হবে এবং অনেককে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিপক্ষে। অথচ উš§ুক্ত পদ্ধতির একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, এই পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশ কয়লা তোলা যাবে। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে তোলা যাবে মাত্র ১০ শতাংশ কয়লা। বড়পুকুরিয়া কয়লাক্ষেত্রের বেলায় দেখা যাচ্ছে, শতকরা ১০ ভাগ কয়লাও তোলা সম্ভব হচ্ছে না। কোন কোন বিশেষজ্ঞ অভিমত দিয়েছেন যে বড়পুকুরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন টনের বেশি কয়লা তোলা সম্ভব হবে না। পক্ষান্তরে উš§ুক্ত পদ্ধতিতে ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন টন কয়লা তোলা সম্ভব, যা বাংলাদেশের ৪০ থেকে ৫০ বছরের জ্বালানি-নিরাপত্তা দেবে।
জ্বালানি খাতে কয়লা একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও তাতে এখন রাজনীতি ঢুকে গেছে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীর কয়লাখনি উত্তোলনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। তাতে মারা যান ছয়জন। এরা উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। সেই থেকে ফুলবাড়ী কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি শুনে আসছি। এ ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত কোন কয়লানীতিও গ্রহণ করতে পারেনি। যদিও ২০০৭ সালের ১১ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুয়েটের সাবেক ভিসি অধ্যাপক মোমিন পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি ২০০৮ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দেয়। তাতে উš§ুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, রফতানির সুযোগ না রাখা, দেশের চাহিদা পূরণের জন্য ৫০ বছরের জ্বালানি-নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, খনির মুখে একটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি বর্তমান সরকার কোন কয়লানীতিও গ্রহণ করেনি। ফলে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর আমাদের কোন কাজে আসছে না। এখানে বলা ভালো, বিশ্বের ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় কয়লা থেকে। কয়েকটি দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ হচ্ছেÑ অস্ট্রেলিয়া ৭৯, চীন ৭৮, জার্মানি ৪৯, ভারত ৬৯, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯২ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ। এখানে আরও একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন আর তা হচ্ছে, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও আমরা খুলনা ও চট্টগ্রামে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছি আমদানিকৃত (ভারত) কয়লার ওপর নির্ভর করে।
বিদ্যুৎ ঘাটতিতে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। কমিটির সভায় সরকারের দেয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যানও প্রত্যাখ্যান করা হয়। সরকারি দলের এমপিরা যখন খোদ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন, তখন বুঝতে কারও বাকি থাকে না পরিস্থিতি আদৌ ভালো নয়। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সমস্যার কোন সমাধান নয়। বিদ্যুৎ সংকট আগামীতে আরও ঘনীভূত হবে। এটা অন্যতম একটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে যেতে পারে এখন। সরকার এখন বিভিন্ন ‘চাপ’-এর মুখে আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারের ব্যর্থতা প্রকট। এখন এর সঙ্গে যোগ হল বিদ্যুৎ ঘাটতির বিষয়টি। বিদ্যুৎ ঘাটতি রোধে সরকারের কাছে এ মুহূর্তে কোন ‘ফর্মুলা’ আছে বলেও মনে হয় না। একমাত্র কয়লা উত্তোলনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের একটা পথ হতে পারে। এ জন্য দ্রুত কয়লানীতি মন্ত্রিসভায় পাস করা জরুরি।
দৈনিক যুগান্তর, ১০ ই আগস্ট, বুধবার,
ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেয়া কেন জরুরি

বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান একটা বেফাঁস মন্তব্য করে বিপদেই আছেন মনে হচ্ছে। গত ৪ আগস্ট ঢাকায় এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছিলেন, 'আপনারা কম খান, কম খেলে সমস্যা কমবে। ব্যবসায়ীরা ভেজাল মেশাতে নিরুৎসাহিত হবে। খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে সহজে প্রবেশ করে। আগেকার মানুষ কম খেত বলে বেশি দিন বাঁচত।' ফারুক খানের এই বক্তব্য প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় এভাবেই ছাপা হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদও করেননি। ফলে ধরে নিতে হবে তিনি যা বলেছেন, সংবাদপত্রে তার বক্তব্য সেভাবেই ছাপা হয়েছে। ফারুক খানের এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন সরকারি দায়িত্বশীল পদে বসে কারো দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দেয়া উচিত নয়। কারো নাম উল্লেখ না করেই তিনি বলেছেন 'দায়িত্ব পালন করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান'। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ওবায়দুল কাদেরকে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগের 'বিবেক'। তিনি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হলেও, মাঝে মধ্যে স্পষ্ট কথা বলেন। অতীতেও তিনি মন্ত্রীদের সমালোচনা করেছেন। ছাত্রলীগের এই সাবেক নেতা বর্তমানে ছাত্রলীগের কর্মকা-েও অসন্তুষ্ট। তাই স্পষ্টভাষী এই নেতা যখন ফারুক খানের ওই বক্তব্যের একদিন পর এ ধরনের কথা বলেন, তখন বুঝতে কারো বাকি থাকে না ফারুক খানের ওই বক্তব্যে খোদ দলের মধ্যেই একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের মন্ত্রিপরিষদে যে ক'জন ব্যক্তি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না, তার মাঝে বাণিজ্যমন্ত্রী অন্যতম। অতীতেও তিনি একাধিকবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধামকি দিয়েও বাগে আনতে পারেননি। ব্যবসায়ীরা তার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অতি উচ্চমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করলেও, বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তার ব্যর্থতা এখানেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ আজ হতাশাগ্রস্ত। ইতিমধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নের মুখে। যে রেমিটেন্স নিয়ে আমাদের এত গর্ব, সেখানে আশার কোনো খবর নেই। রেমিটেন্স আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা শ্লথ হয়েছে। গত অর্থবছরের অর্থ এসেছে (১ হাজার ১৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার), তার প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরে (২০০৯-১০) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি। এর অর্থ পরিষ্কার শ্রমবাজার খোঁজার ব্যর্থতা। বাংলাদেশের মূল জনবল রফতানির বাজার মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে (কিন্তু নেপালের মতো দেশের সম্ভাবনা সেখানে বাড়ছে কোনো কোনো দেশে)। দেশে বেকার সমস্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু সরকারের কোনো বড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এমনিতেই জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগও দেয়া সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬৩০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ছয় বছর আগে ২০০৪ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, এখনো সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে (কালের কণ্ঠ ৫ জুলাই)। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো তা বলা যাবে না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন পুলিশের জন্য আরো ১০টি আইজি পদ চাচ্ছেন, তখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। শুধু এক মাসে ২৬ শিশু ও ১২ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সকালের খবর গত ৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে। আর জুন মাসে ঢাকা শহরের একাধিক সোনার দোকানে ও বাসায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ভূমিকা আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হলো যখন বিএনপির সংসদীয় দলের চিফ হুইপ পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়েছিলেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন পুলিশের পিটুনির শিকার হন, তখন এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। পুলিশের পিটুনির পরও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তিনি এখন বিদেশে। মামলা হয়েছে আরেকজন এমপির বিরুদ্ধেও।
সরকারের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ একাধিক। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আসছেন সেপ্টেম্বরে। এসে গেলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সোনিয়া গান্ধী স্বয়ং। স্পষ্টতই বোঝা যায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন দিকে টার্ন নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমস্যা রয়েছে একাধিক। গত ৪০ বছরেও সেসব সমস্যার সমাধান হয়নি। আমরা ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু বিদ্যুৎ কবে আসবে, আমরা জানি না। 'হাই প্রোফাইল' ভিজিট ভালো। কিন্তু আমরা পদ্মায় পানি চাই। চাই তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার। চাই বিএসএফের হত্যা বন্ধ। চাই ছিটমহলগুলো ফেরত। ভারতকে 'বন্ধু' ভাবতে চাই। কিন্তু এই বন্ধুত্ব হতে হবে একপক্ষীয় নয়, দ্বিপাক্ষিক, প্রয়োজনে বহুপাক্ষিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এটা আরেকটা চ্যালেঞ্জ_ অতি মাত্রায় ভারত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য 'ইমেজ সংকট' সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনীতি এক অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সরকারের কঠোর মনোভাব সংকটকে আরো জটিল করেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বিরোধী দলের উত্থাপিত দাবি-দাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। বিশেষ করে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে পরিবর্তন আনাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কীভবে পরিবর্তন আনা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা যায়, এ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে 'সংলাপ' ওপেন করা জরুরি। বেগম জিয়া ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন কোন কোন জায়গায় পরিবর্তনটা প্রয়োজন। তার ওই বক্তব্যকে বিবেচনায় নিলে একটা সমাধান সম্ভব। কিন্তু তা না করে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, মামলা দিয়ে যদি বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়, তা সরকারের জন্য খুব ভালো হবে বলে মনে হয় না। কেননা সংবিধান একটি দেশের, কোনো দলের নয়। দলীয় বিবেচনায় সংবিধান সংশোধন করা ঠিক নয়। সরকার ও বিরোধী দল নিয়েই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে যে 'গণতন্ত্র', তাকে কোনোমতেই 'গণতন্ত্র' বলা যাবে না।
বেগম জিয়া ঈদের পর বড় ধরনের গণআন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটাকে বিবেচনায় নিতে হবে। হরতাল, লাগাতার হরতাল, লংমার্চ ইত্যাদি কর্মসূচি আসছে। এসব কর্মসূচি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় পেঁৗছে দেবে না। সরকারের কঠোর মনোভাব দেশকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। আর এর দায়ভার নিতে হবে সরকারকেই। লাগাতার হরতাল ও গণঅনশনের পর বিএনপি একটা ম্যাসেজ পেঁৗছে দিয়েছে আর তা হচ্ছে, অতি দ্রুত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের উদ্যোগ নেয়া। যে দ্রুততার সঙ্গে সংবিধানে পঞ্চশ সংশোধনী আনা হয়েছিল, একই ধরনের দ্রুততার সঙ্গে সংবিধানে ১৬তম সংশোধনী আনা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা ও 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' সংবিধানে ফিরিয়ে আনা। একটি আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যদি আস্থার পরিবেশ না থাকে, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবেই। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজে ব্যবসায়ী। তার পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আজ সংসদ যদি ঠিক মতো চলতো, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। বাজার মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে_ এটা সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। দুঃখ লাগে একজন মাননীয় সংসদ সদস্যও সংসদে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্নটা করলেন না। অথচ সাধারণ মানুষের ভোটেই এরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং আগামীতে নির্বাচিত হবারও স্বপ্ন দেখছেন।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার পরিবেশ নেই বলেই আদালতপাড়ায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলো। আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির খবর কোনো ভালো খবর নয়। কোনো বিচারপতিকে নিয়ে কটূক্তি করাও শোভন নয়, কাম্য নয়। একজন বিচারপতিকে সম্মান করেই সম্বোধন করতে হয়। আদালতপাড়ায় রাজনীতি টেনে আনাও কোনো শুভ লক্ষণ নয়। বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সনদ বাতিল করে রুল ইস্যু করা হয়েছে। এর একটা সমাধান প্রয়োজন। ধারণা করছি সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যস্থতায় একটা সমাধান পাওয়া যাবে। আদালতপাড়ায় এসব ঘটনা আমাদের আহত করে। আমাদের আস্থার জায়গাটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
বর্তমান সরকার আরো দু'বছরের উপরে ক্ষমতায় থাকবে। সরকার সাধারণ মানুষের যে সমস্যা, সেসব সমস্যার দিকে নজর দেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সেই সঙ্গে সরকার যদি পুনরায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়, আমার বিশ্বাস এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। 
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com

বেলুচিস্তান কি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট?

পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যখন 'অস্বাভাবিক', তখন ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যামেরন মুন্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ। আগস্টের প্রথম দিকে তিনি বেলুচিস্তান সফর করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে বেলুচিস্তানের আঞ্চলিক পরিষদের স্পিকার মোহাম্মদ আসলাম ভুটানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় তিনি এ মন্তব্যটি করেন। যদিও মুন্টার তাঁর মন্তব্যের কোনো ব্যাখ্যা দেননি, কিন্তু যাঁরা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা জানেন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। এ অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই বেলুচিস্তান বিভক্ত। এর এক অংশ পাকিস্তানে, অন্য অংশ ইরানে, যা ইরানের একটি প্রদেশ। এটি সিস্তান বেলুচিস্তান নামে ইরানে পরিচিত। বেলুচিস্তানের দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর, আর উত্তরে আফগানিস্তান। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে এবং আফগানিস্তানের তালেবানের আশ্রয়স্থলও রয়েছে এখানে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। চীনেরও উপস্থিতি রয়েছে বেলুচিস্তানে। চীন বেলুচিস্তানের গাওদারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। ভারতেরও আগ্রহ রয়েছে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। একদিকে আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার পরিকল্পনার ছক কাটছে, তখন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে এ অঞ্চল সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এল। বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, বেলুচিস্তানের দুই নেতা গেল বছর ভারত সফর করেছিলেন। দুই নেতা_ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেহুল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লি সফর করেছিলেন। এ দুই নেতা ফ্রান্স থেকে ভারতে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য 'স্বাধীন বেলুচিস্তানের' ব্যাপারে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তাঁরা দিল্লিতে এসে এ কথাও বলেছিলেন যে ৬২ বছর ধরে পাকিস্তান বেআইনিভাবে বেলুচিস্তান জবরদখল করে রেখেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে_এ অভিযোগও এ দুই নেতার। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ঢাকার সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছিল তখন। দৈনিক যায়যায়দিনের নিজস্ব প্রতিবেদক কলকাতা থেকে প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন গত ৯ নভেম্বর। ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেহুলকে নয়াদিল্লিতে আসতে দেওয়া এবং ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় নতুন করে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। কেননা পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। ওয়াহিদ ও মুনিরের দিল্লি সফরের পর পাকিস্তানের অভিযোগ আরো শক্ত হয়েছিল। এখানে বলা প্রয়োজন যে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে বৃহৎ শক্তি তথা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহের অন্যতম কারণ এ অঞ্চলের গ্যাসসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। বেলুচিস্তানের 'সুই' গ্যাস দিয়ে পাকিস্তানের জ্বালানি চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু এ অঞ্চল বরাবরই অবহেলিত। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে লাগেনি। বেলুচিস্তানে ২০০১ সালে গঠিত হয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। এর নেতৃত্বে আছেন বেলুচ মারি, যিনি একসময় মস্কোতে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৫ সালে তাঁরা সুই গ্যাসকেন্দ্রে হামলা চালালে তাঁদের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে তাঁরা আলোচনায় আছেন। ইরানের সিস্তান বেলুচিস্তানেও 'জুনদুল্লাহ'র নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।
বেলুচিস্তানের অবস্থান আরব সাগর ঘেঁষে। এ কারণে একদিকে যেমন আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, তেমনি আগ্রহ রয়েছে চীনের। অন্যদিকে ভারতের আগ্রহেরও কমতি নেই। এখানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। এ অঞ্চলকে যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় অথবা যদি বিচ্ছিন্নতা উসকে দেওয়া যায়, তাহলে তা থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ফায়দা লুটতে পারবে বেশি। আফগানিস্তানের একটি সীমান্ত রয়েছে বেলুচিস্তানের সঙ্গে। আফগান তালেবান এ সীমান্ত অতিক্রম করে বেলুচিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে_এ অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। যে কারণে বেলুচিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রম রয়েছে। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভালো নয়। পাকিস্তানি তালেবান এখন পাকিস্তানের ভেতরেই আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সেনা অভিযানের ফলে তালেবান যদি সেখান থেকে উৎখাত হয়, তাহলে বেলুচিস্তান হবে তালেবানের পরবর্তী অভয়ারণ্য। সে ক্ষেত্রে ২০০১ সালের অক্টোবরে যেমন বোমা হামলা চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তেমনটিও ঘটতে পারে বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে। এ অঞ্চলে আরব সাগরঘেঁষা গাওদার একটি সমুদ্রবন্দর। বন্দরটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বন্দরটি তৈরি করে দিচ্ছে চীন, যেখানে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার। চীন 'মুক্তার মালা' বা String of Pearls-এর যে নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে গাওদার একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এই পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। কেননা এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিট থাকবে, যেখান থেকে ভারত মহাসাগরের সব ধরনের নৌ কার্যক্রম লক্ষ করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রেরও আগ্রহ রয়েছে গাওদারের ব্যাপারে। ইরানের সীমান্ত থেকে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে গাওদার। আর হরমুজ প্রণালি থেকে দূরত্ব মাত্র ৪০০ কিলোমিটার। এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের তেল পশ্চিম ইউরোপসহ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হয়। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সদস্যরা যেকোনো সময় এই হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যদি কোনো নৌ অবরোধ সৃষ্টি করতে হয় (?) তাহলে গাওদার বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চীন তার পূর্বাঞ্চলে ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। এ ব্যাপারে একটি মহাপরিকল্পনাও তারা প্রণয়ন করছে। সুতরাং সংগত কারণেই বেলুচিস্তান আগামী দিনগুলোতে উত্তপ্ত থাকবে এবং বৃহৎ তথা কোনো কোনো আঞ্চলিক শক্তির কাছে স্বাধীন একটি বেলুচিস্তান রাষ্ট্র (?) আকর্ষণীয়। ২০০১ সালের জুলাই মাসে জেনস ইনফরমেশন গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বেলুচিস্তানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যথেষ্ট তৎপর।
ইরানি প্রদেশ সিস্তান বেলুচিস্তান ছিল বরাবরই শান্ত ও স্থিতিশীল। ইতিহাসের কিংবদন্তির বীর রুস্তমের জন্ম এখানে। এমনকি ইরানের শীর্ষস্থানীয় শিয়া নেতা আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানির জন্মও এখানে। সিস্তান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের ভাষা ও ধর্ম এক, তবে স্থানীয় ভাষায় তারা কথা বলে। বেলুচিস্তানের যে অংশ ইরানের সঙ্গে ছিল, তা একসময় যুক্ত ছিল ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশের সঙ্গে। কিন্তু রেজা শাহ ১৯৫৯ সালে সিস্তানকে আলাদা প্রদেশ করেন। জুনদুল্লাহরা তাদের আন্দোলন বেলুচিস্তানে সম্প্রসারিত করছে। তাদের যুক্তি বেলুচ ও পারসীয়রা এক নয়। তারা মনে করে, পারসীয়রা ইরানি হলেও সব ইরানি পারসীয় নন। ইরানিদের মধ্যে আজারি, বেলুচরা রয়েছে। সিস্তানের ব্যাপারে দ্বন্দ্ব মূলত পারসীয়দের সঙ্গে বেলুচদের। এই দ্বন্দ্বটাকে জুনদুল্লাহই কাজে লাগাতে চায়। সিস্তানকে ইরান থেকে তারা আলাদা করতে চায়। তবে একটি 'গ্রেটার বেলুচিস্তান' গড়ার ডাক তারা দেয়নি। ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র জুনদুল্লাহকে 'প্রমোট' করছে। জুনদুল্লাহর নেতা আবদুল মালেক রিগি একসময় তালেবানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি হিসেবেও তিনি পরিচিত। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিতে তাঁর ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে। জুনদুল্লাহরা সমর্থন পাচ্ছে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আনজুমান ই সিপাহ ই সাহাব ও লস্কর ই জাগজাবি নামক দুটি সংগঠনের, যারা পাকিস্তানে শিয়া স্থাপনার ওপর একাধিকবার আক্রমণ চালিয়েছে।
পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তান ও ইরানের প্রদেশ সিস্তানের সমস্যা এক নয়। উভয় অঞ্চলের মানুষের মিল এক জায়গায়_তারা বেলুচ। এবং উভয় অঞ্চলেই উন্নয়ন হয়নি। এ কারণে তাদের ক্ষোভ রয়েছে। পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তানে স্থায়ী বাসিন্দা অর্থাৎ বেলুচরা ক্রমেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। অন্য প্রদেশ থেকে মানুষ এসে এখানে বসবাস করছে। অন্যদিকে সিস্তানের সমস্যাটা মূলত অনুন্নয়ন। বেলুচিস্তান নিয়ে সমস্যা মূলত দুটি। এক. আফগানিস্তানের পসতুনরা আর বেলুচিস্তানের পাঠানরা এক হয়ে ভবিষ্যতে একটি পসতু রাষ্ট্র (চধংযঃড় ঝঃধঃব) গঠন করতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবানকে যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে একদিন এ অঞ্চলে জন্ম হবে তালেবানমুক্ত পসতু রাষ্ট্র। পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন থাকবে এই পসতু রাষ্ট্রের ব্যাপারে। দুই. ইরান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তান মিলে একটি গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যদি কোনো ধরনের সহাবস্থান না হয়, তাহলে এই গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা আরো শক্তিশালী হবে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানে গঠিত হয়েছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, যার নেতৃত্বে রয়েছে বেলুচ মারি। রয়েছে বেলুচিস্তান পিপলস ফ্রন্ট, যাদের নেতৃত্বে গ্রেটার বেলুচিস্তান আন্দোলন শুরু হতে পারে। পাঠক, নব্বইয়ের দশকের সাবেক যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্রের কথা স্মরণ করতে পারেন। সার্বদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে একে একে স্বাধীন হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া (১৯৯১), বসনিয়া-হারজেগোভিনা (১৯৯২)। এরপর স্বাধীন হয়েছে মন্টিনেগ্রো, ম্যাসিডোনিয়া ও স্বাধীনতার পথে রয়েছে কসোভো। 'বলকানাইজেশন'-এর প্রক্রিয়া ইরানেও আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি ভবিষ্যতে। ইরান ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র যে ঝড়ভঃ ডধৎ শুরু করেছে, তার উদ্দেশ্য একটাই, ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করা। বেলুচিস্তান দিয়েই (?) এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন। ভারতের যে বিপুল জ্বালানি চাহিদা, তা দেশটি মেটাবে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে। এক. ইরান থেকে বেলুচিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (আসালুইয়ে-বন্দর আব্বাস-ইরানশহর-গুজদার-সুই-মুলতান-নয়াদিল্লি)। দুই. তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (দুজুলেবাদ-হেরাত-কান্দাহার-কোয়েটা-মুলতান-ফাজিলকা-নয়াদিল্লি, TAPI প্রজেক্ট)। বেলুচিস্তান ভারতের জন্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা এই দুটি প্রজেক্টের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। তাই বেলুচিস্তানের ঘটনাবলি যে আগামী দিনগুলোতে বারবার আলোচিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বুধবার, ১০ আগষ্ট ২০১১, ২৬ শ্রাবণ ১৪১৮, ৯ রমজান ১৪৩২, দৈনিক কালের কন্ঠ.ড. তারেক শামসুর রেহমান নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : tsrahmanbd@yahoo.com

কয়লানীতি কেন জরুরি


বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত্ সংকটের কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এ ধরনের একটি দাবি যখন ওঠে, তখন আমি অবাক হই না। বাংলাদেশ বর্তমানে এক চরম বিদ্যুত্ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রোজা-রমজানের দিনে-রাতেও একাধিকবার বিদ্যুত্ যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সংকট। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। অথচ চাহিদা বাড়ছে। এ কারণেই কয়লাকে এখন গ্যাসের বিকল্প ভাবতে হবে। কয়লার এক বিশাল ভাণ্ডার বাংলাদেশে রয়েছে। কয়লার সুষ্ঠু ব্যবহার, উত্তোলন ও কয়লানির্ভর বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য তাই চাই কয়লানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
বিদ্যুত্ আমাদের প্রয়োজন। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এখন বিদ্যুত্ শীর্ষে থাকা উচিত। গ্যাসের রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে এবং নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হচ্ছে না। সুতরাং গ্যাসনির্ভর যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র, তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই ভরসা এখন কয়লা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫টি কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন, যা ৭৩ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য (উত্তোলনযোগ্য ২০ টিসিএফ)। এতে ৩০ থেকে ৪০ বছরের জ্বালানি চাহিদা পূরণ সক্ষম। উত্তরাঞ্চলের বড় পুকুরিয়ায় ৬টি কয়লা স্তর (১১৯ থেকে ৫৬০ মিটার গভীরে) পাওয়া গেছে, যার মজুদের পরিমাণ ৬০৩ মিলিয়ন টন। বর্তমানে এ কয়লা খনিটি ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতির মাধ্যমে উত্তোলনের পর্যায়ে রয়েছে। বড় পুকুরিয়া ছাড়াও জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে কয়লা পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই কয়লা উত্তোলনের ব্যাবস্থা না করে সরকার ভারত থেকে কয়লা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের সাথে পিডিবির একটি চুক্তি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতীয় কয়লায় চট্টগ্রাম ও খুলনায় দু’টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যায় ধরা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের কয়লা দিয়েই আমরা বিদ্যুত্ কেন্দ্র ২টি চালাতে পারতাম। আমাদের নিম্নমানের ভারতীয় কয়লার প্রয়োজন হত না।
জামালগঞ্জে ৭টি কয়লাস্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। কয়লা এলাকার বিস্তৃতি প্রায় ১২ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট আনুমানিক মজুদের পরিমাণ ১০৫৩ মিলিয়ন টন। এখানে কয়লা স্তরের গভীরতা বেশি হওয়ায় তা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক হবে কি না, সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। ফলে এ মজুদের উন্নয়নের কাজ আরাম্ভ হয়নি। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা খনি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়াছে। এখানে কয়লা মজুদের পরিমাণ ৫৭২ মিলিয়ন টন। এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন (বাংলাদেশ)। খনির মেয়াদকালে মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ফুলবাড়ি কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলার কথা, যা ইতিমধ্যে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এ খনিতে বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতা হবে ১৫ মিলিয়ন টন। এই কয়লা খনির দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার (উত্তর-দক্ষিণে) এবং প্রস্থ ৩ কিলোমিটার (পূর্ব-পশ্চিমে)। এই খনিটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৬৫ থেকে ২৭০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
এসব কয়লা খনি নিয়ে আমাদের দেশে একটি বড় বিতর্ক চলছে-আর তা হচ্ছে কয়লা আমরা তুলবো কিভাবে ? ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে, নাকি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে? উন্মুক্ত পদ্ধতির গ্যাস পরেই হচ্ছে এই পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশ কয়লা তোলা যাবে। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে তুললে তোলা যাবে মাত্র ১০ শতাংশ। এতে ঝুঁকিও বেশি। বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। অল্প জমিতে প্রচুর মানুষ বাস করে। সমস্যা হচ্ছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তুলতে হলে অনেকে জমি হারাবেন। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে, এর প্রায় ৮০ শতাংশই কৃষি জমি। প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে প্রকল্পকালে প্রায় ২ হাজার ৩০০ আদিবাসীসহ প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে স্থানাস্তর ও পুনর্বাসিত করতে হবে। এই কাজটি ১০ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এখানে ১০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত্ উত্পাদন করার কথা। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্প চালু হলে প্রতি বছর জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ সংযোজন হতে পারে। প্রকল্প মেয়াদকালে জিডিপিতে অবদান রাখবে প্রায় ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ফুলবাড়ির জনগণ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিরোধিতা করে আসছে সেই প্রথম থেকেই। ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট ফুলবাড়ি কয়লা খনি উত্তোলনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় জনগণের সাথে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। তাতে মারা যান ৬ জন মানুষ। এশিয়া এনার্জির সাথে যে চুক্তি হয়েছিল, তারও বিরোধিতা করছে একটি জাতীয় কমিটি। ফুলবাড়ি কয়লা উত্তোলন নিয়ে যে জটিলতা, সেই জটিলতা এখনও দূর হয়নি। তবে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির বৈঠকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার পক্ষে মত দেয়া হয়েছে। তারা কয়লা নীতি দ্রুত চূড়ান্ত করারও সুপারিশ করেছে। এই যখন পরিস্থিতি এবং যেখানে দেশে প্রচুর কয়লা সম্পদ রয়েছে, সেখানে বিদেশ থেকে (ভারত) কয়লা আমদানি করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত-এ প্রশ্ন করাই যায়। এতে করে ভারতের উপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। আগামীতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যদি অবনতি ঘটে, তাহলে এই কয়লা আমদানির উপর তা কোন প্রভাব ফেলবে কী না আমরা জানি না। বলা হচ্ছে বিদ্যুত্ কেন্দ্র দু’টি নির্মাণে যে ব্যয় হবে, তা দেশ দু’টি সমানভাবে ভাগ করে নেবে। এক্ষেত্রে ভারত যা ব্যয় করবে তা তুলে নেবে কীভাবে? এই চুক্তিটি বহাল থাকবে কত বছরের জন্য? এসব বিষয় বিস্তারিত জানা দরকার। এটা ভালো হয় যদি তা সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এতে করে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের একটি সুযোগ তৈরি হল। এর মধ্যদিয়ে আমাদের বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এটা জানার সুযোগ পাবেন যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র দু’টির জন্য যে কয়লা প্রয়োজন, তা আমরা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে পারতাম কী না? দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে যেসব শর্ত রাখা হয়েছে তা বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলে কী না? তৃতীয়ত, ভারতীয় ঋণ শোধ করার প্রক্রিয়াটি কী? চতুর্থত, যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে কোন ‘তৃতীয় পক্ষ’-এর উপস্থিতি রয়েছে কী না?
ক্রমাবর্ধমান বিদ্যুত্ সংকটে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ আমাদের জন্য একটি ‘আশার আলো’। কিন্তু যেহেতু দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আমাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে, সেহেতু এই চুক্তি যেন আমাদের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে না দাঁড়ায়! একই সাথে সংসদীয় কমিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার যে সুপারিশ করেছে, আমি তাকে স্বাগত জানাই। তবে ফুলবাড়ীর মানুষের কথা মনে রাখতে হবে। কয়লা সম্পদের ভাগিদার তারাও। তাদের পুনর্বাসনই শুধু নয়, চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রেও তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ফুলবাড়ীর কয়লা সম্পদের ‘হক’ তাদেরও আছে। এই ‘হক’ থেকে তাদের আমরা বঞ্চিত করতে পারি না। রাষ্ট্র এ অঞ্চলের সম্পদ জাতীয় উন্নয়নে ব্যয় করবে এটা যেমন সত্য, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। দেশে ইতিমধ্যে একটি ‘জাতীয় কমিটি’ গঠিত হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই
দেশের জ্বালানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে তাদের বক্তব্য দিয়ে আসছে। তাদের সাথে কথাবার্তা বলাটাও জরুরী। তবে এটা ঠিক বাংলাদেশের কয়লা ব্যাবহার না  করে কেন ভারতীয় কয়লা আমাদানি করবো-এর একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কেননা আমরা জানি, ভারতীয় কয়লায় পরিবেশ দূষণ হয় সবচেয়ে বেশি। সেই তুলনায় আমাদের কয়লার মান অনেক ভাল। মনে রাখতে হবে যেখানে সারাবিশ্বে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ ৭৯ শতাংশ, চীনে ৭৮ শতাংশ, জার্মানিতে ৪৯ শতাংশ, কিংবা ভারতে ৬৯ শতাংশ, সেখানে আমাদের কয়লা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ব্যবহার করতে পারছি না। বাংলাদেশে ২০১২ সালে বিদ্যুত্-এর চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার মেগাওয়াট, আর ২০২০ সালে ১৬৮০৮ মেগাওয়াট, তখন কয়লা ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প নেই। গ্যাস সম্পদ ফুরিয়ে আসছে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলন নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। সে ক্ষেত্রে আমাদের কয়লা সম্পদ আমাদের জন্য একটি ভরসা। কিন্তু এই কয়লা সম্পদকে ব্যাবহার না করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কয়লা আমদানি করলে বিতর্ক তো বাড়বেই। আমরা চাই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হোক। আমরা বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে চাই। কিন্তু পরনির্ভরশীল হতে চাই না।
বিদ্যুত্-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সামনে রেখে তাই কয়লা নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরী হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে বিদ্যুত্ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিরোধী দল এটাকেও ইস্যু করতে পারে। তাই একটি সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া যদি আমরা শুরু করি, আমার বিশ্বাস বিদ্যুত্-এর অনেক চাহিদা আমরা পূরণ করতে পারবো। ইতোমধ্যে কয়ল নীতি প্রণয়ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মতামতও দিয়েছেন। ২০০৭ সালের ১১ জুন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোমিন পাটোয়ারীকে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি ২০০৮ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। তাতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, রফতানির সুযোগ না রাখা, দেশের চাহিদা পূরণের জন্য ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিধান রাখা হয়েছিল। ওই রিপোর্টটিকে বিবেচনায় নিয়েই প্রয়োজনে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করে নতুন একটি কয়লানীতি আমাদের দরকার। মনে রাখতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তা শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, বরং আমাদের উন্নয়নের সাথেও সম্পর্কিত।
মঙ্গল, ৯ অগাষ্টu-এ ২০১১, ২৫ শ্রাবণ ১৪১৮   দৈনিক ইত্তেফাক
লেখক: ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
tsrahman09@g-mail.com

সোনিয়া গান্ধীর সফর ও আমাদের প্রত্যাশা

সোনিয়া গান্ধী ঢাকায় আসলেন। দেখলেন। চলেও গেলেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এসপিজির (স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ) একটি গ্রুপ। সেটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। তার শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধী নিজ দেহরক্ষীদের দ্বারা মারা গিয়েছিলেন। স্বামী রাজীব গান্ধীকে হত্যা করেছিল তামিল টাইগাররা। সুতরাং তার সঙ্গে এসপিজি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন অটিজমের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। তিনি ভারতের অটিজম সম্পর্কিত একটি ন্যাশনাল কমিটির উপদেষ্টা। বাংলাদেশে এ ধরনের একটি সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কানাডা প্রবাসী মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। নিঃসন্দেহে উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর ঢাকা সফর নিয়ে সংবাদপত্রগুলো যেভাবে ‘উচ্ছ্বাসের ফুলকি’ ছড়িয়েছিল, তাতে আমি অবাকই হয়েছি। এমনকি আমাদের তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত যেভাবে বলার চেষ্টা করেছেন যে ‘সোনিয়া গান্ধী সমস্যার সমাধান দিয়ে যাবেন’, তাতে আমি বিস্মিত না হয়ে পারিনি। প্রধানত সোনিয়া গান্ধী সরকারে নেই। হতে পারে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি ও ক্ষমতাসীন জোটের (ইউপিএ) প্রধান; কিন্তু আমরা বোধকরি ভুলে গিয়েছিলাম সরকার চালান মনমোহন সিং। ব্যক্তির ইচ্ছা এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য রাষ্ট্রীয় নীতি। বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের একটা স্পষ্ট নীতি আছে। ওই নীতির বাইরে সোনিয়া কেন, মনমোহন সিং যেতে পারেন না বা যান না। দ্বিতীয়ত, ভারত বহুপাক্ষিকতার আলোকে সম্পর্ক তৈরি করে না। সম্পর্ক তৈরি করে দ্বিপাক্ষিকতার ভিত্তিতে। এখানে বহুপাক্ষিকতার কোনো সুযোগ নেই। তাই এ সফর থেকে যে বেশি কিছু পাওয়া যাবে না, এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। আমি এতে অবাক হইনি। অবাক হয়েছিলাম যখন আমাদের পত্রিকাগুলো মন্তব্য করেছিল, অনেকটা এভাবে যে, বাংলাদেশ-ভারত মধ্যকার সমস্যার সমাধান সোনিয়া গান্ধীর হাতে রয়েছে। ভারতের বাইরে গিয়েও সোনিয়া গান্ধী খুব একটা মন্তব্য কখনও করেননি। বাংলাদেশে এসেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে খুব একটা মন্তব্য করলেন না। অটিজম সম্মেলনে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তার তথ্যসচিব সংবাদমাধ্যমকে যা জানালেন, তাতে আমরা কয়েকটি বিষয় খুঁজে পাই। এক. জঙ্গি এবং সন্ত্রাস দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ ও ভারত, দুই. সোনিয়া-হাসিনা আলোচনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে স্থান পায়, তিন. ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনা হয়, চার. স্বাস্থ্য ও সামাজিক ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন সোনিয়া গান্ধী। সোনিয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে মুখোমুখি হননি। দুই নেত্রীর আলোচনার বিবরণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য সচিব। যদিও একান্তে কোনো সহকারী ছাড়াই সোনিয়া-হাসিনা যে আলোচনা হয়, তার বিবরণ তথ্যসচিব দেননি। তাহলে প্রশ্ন এসে যায়, সোনিয়ার এই সফর থেকে আমরা কী পেলাম? ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও সোনিয়া গান্ধীর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা দিয়েছে। বাংলাদেশ যে ‘বন্ধুকে’ সম্মান জানাতে জানে, এটা বাংলাদেশ আবারও প্রমাণ করল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তি ইন্দিরা গান্ধীর একটি বড় ভূমিকা রয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। ইন্দিরা গান্ধী নিজে সেই ১৯৭১ সালে বিভিন্ন দেশ সফর করেছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করতে। ওই সময়ে ভারত যদি আমাদের পাশে না থাকত, তাহলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধ আরও প্রলম্বিত হতো। তাই ইন্দিরা গান্ধীকে যখন বাংলাদেশ মরণোত্তর স্বাধীনতা সম্মাননা দেয়, এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর ঢাকায় উপস্থিতির সময় যখন লালমনিরহাটের পাটগ্রামের রফিকুল ইসলামকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে সনিয়াজান নদীতে ভাসিয়ে দেয় (যার ছবিও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে), তখন ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকে বৈকি! আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিএসএফের হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সোনিয়া-হাসিনা আলোচনায় এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। সন্ত্রাস দমনে যৌথ উদ্যোগ কেন? সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যদি সার্কভুক্ত দেশগুলো সন্ত্রাস দমনে একটি চুক্তির আওতায় আসত, তাহলে ভালো হতো। ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সমস্যা প্রচুর (ছিটমহল, বাণিজ্য, বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশাধিকার, সীমান্ত ইত্যাদি)। এর একটি ক্ষেত্রেও যদি সোনিয়া গান্ধী আমাদের আশ্বাসের বাণী শোনাতেন, আমরা খুশি হতাম। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাণী নেই।
 
বস্তুত ভারত তার স্বার্থ একের পর এক আদায় করে নিচ্ছে। আমরা আমাদের সুবিধা পাচ্ছি না। ট্রানজিট আমরা দিলাম। এখন আসবে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহারের দাবি। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আমাদের নিজেদেরই সমস্যা। আমাদের আমদানি-রফতানি বাড়ছে। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩৫ মেট্রিক টন কার্গো (২০০৪ সালে এর পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৩ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন)। ২০০৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬১ মেট্রিক টনে। একই সময় রফতানির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৪ মেট্রিক টন (২০০৩) থেকে ৩৩ লাখ ৯২ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন (২০০৭)। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর মোট হ্যান্ডলিং করেছে ২ কোটি ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৮৮৯ মেট্রিক টন পণ্য। ২০০৭ সালে তা হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন। জাহাজ ভিড়েছে ১৭২০টি থেকে (২০০৩) ১৯৪৫টি (২০০৭)। প্রতিবছর শতকরা ১৪ ভাগ হারে কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে। এই যে পরিসংখ্যান, এই পরিসংখ্যান আমাদের কী বলে? পরিসংখ্যানই বলে দেয় আগামী ৫ বছরে এই বন্দরের কনটেইনার পরিবহন আরও বাড়বে। তাই বর্তমান অবকাঠামো বজায় রেখে অন্যকোনো দেশকে ওই বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া যায় না। গভীর সমুদ্রে বন্দর নির্মিত হলে তা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, আমাদের নিরাপত্তার জন্য এই বন্দরের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের সামুদ্রিক পরিবহনের ৯২ ভাগ পরিচালিত হয় এই বন্দর দিয়ে। এখন ভারতের ‘সাত বোন’ রাজ্যগুলোর কনটেইনার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিবহনের সুযোগ দিলে চট্টগ্রাম বন্দরে জট সৃষ্টি হবে। বিঘ্নিত হবে আমাদের পণ্য রফতানি। মনে রাখতে হবে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমরা ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৫৭ মেট্রিক টন গার্মেন্ট পণ্য (তৈরি পোশাক) রফতানি করেছি, যা ছিল রফতানির তালিকায় শীর্ষে। এখন এ খাতে রফতানি বিঘ্নিত হওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য ও বিভিন্ন কাঁচামাল মূলত আমদানি হয় এই বন্দর দিয়েই। খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। ভারত থেকে খাদ্য আমদানি করার সম্ভাবনা (ট্রেনে) দিনে দিনে কমে আসছে। কেননা সেখানে উত্পাদন হ্রাস পাচ্ছে খরার কারণে। চলতি বছর ভারতকে খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। সুতরাং সমুদ্র পথেই আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভরসা ওই চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু ভারতকে এই বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ায় এখন চীনও এই বন্দর ব্যবহার করতে চাইবে। কেননা চীনের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোর (ইউনানসহ) সঙ্গে কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। এ অঞ্চলে রয়েছে চীনের বেশ কয়েকটি প্রদেশ-ইউনান, গুইজু, গুয়ানজি ইত্যাদি। শুধু গুয়ানজি প্রদেশ দক্ষিণ চীন সাগর ঘেঁষে থাকায় এখানে পোর্ট রয়েছে। তবে তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। এবং কুনমিং (ইউনানের রাজধানী) থেকে বেশ দূরে। পণ্য পরিবহনে তাই খরচ বেড়ে যায়। কুনমিংয়ের সঙ্গে চট্টগ্রামের বিমান দূরত্ব মাত্র এক ঘণ্টার। চীনের তাই আগ্রহ রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যাপারে। আগামীতে চীনের সঙ্গে সড়ক পথে চট্টগ্রামের (মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে) একটা যোগসূত্র স্থাপিত হতে পারে। এখন ভারতকে আমরা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দিলাম। আগামীতে চীনকেও দিতে হবে। একই সঙ্গে চীনকে এই বন্দর ব্যবহার করে আমদানি করারও সুযোগ দিতে হবে। আমরা কি বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছি কী পরিমাণ কনটেইনার তখন চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে? ‘কানেকটিভি’র আওতায় ভুটান ও নেপালকে মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মংলা বন্দর তো এক কথায় অচল। পলি পড়ে সমুদ্রের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। বড় জাহাজ সেখানে খুব একটা প্রবেশ করতে পারে না। অতীতে কোনো সরকারই মংলাকে সচল করার উদ্যোগ নেয়নি। কেননা ড্রেজিংয়ে অনেক খরচ। উপরন্তু ড্রেজিং করেও দেখা গেছে অতিদ্রুত পলি এসে তা আবার ভরাট করে দেয়। এ অঞ্চলের রাস্তাঘাটও প্রশস্ত নয়। হেভি ট্রাক চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত। যুক্তির খাতিরে ভুটান ও নেপালের কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রেই তারা এটা ব্যবহার করবে না। ভারতের আগ্রহ নেই মংলা বন্দরের ব্যাপারে। মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সাত বোন’ রাজ্যগুলোর জন্যই চট্টগ্রাম বন্দরের এই গুরুত্ব। ভারতের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তার কথা স্মরণ করতে চাই। ওই ঋণ ব্যবহার হবে আবার সড়ক ও রেলপথ উন্নয়নে। এতে করে তো লাভবান হবে ভারত। বাংলাদেশের ভেতরকার রাস্তা প্রশস্ত হবে, বেশকিছু কৃষিজমি তাতে নষ্ট হবে। কিন্তু উন্নয়ন হবে ভারতের ‘সাত বোন’ রাজ্যের। চট্টগ্রাম থেকে আগরতলার দূরত্ব ২৪৮ কিমি, আইজলের দূরত্ব ৬৫৫ কিমি, শিলংয়ের দূরত্ব ৬৭৫ কিমি আর কোহিমা রয়েছে ৮৮০ কিমি দূরত্বে। এখন এই অঞ্চলগুলো ব্যবহার করে কলকাতা বন্দর। দূরত্বটা লক্ষ্য করুন : কলকাতা থেকে আগরতলা (ত্রিপুরা) ১৬৮০ কিমি, কলকাতা-আইজল (মিজোরাম) ১৫৫০ কিমি, কলকাতা-শিলং (মেঘালয়) ১১৮০ কিমি ও কলকাতা-কোহিমা (নাগাল্যান্ড) ১৪২০ কিমি। অংকের হিসেবেই বলে দেয় চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ কেন? প্রশ্ন আসতেই পারে—বিনিময়ে আমরা কী পেলাম? কিছু অশুল্ক বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি (কোন কোন পণ্য? যা সম্ভবত বাংলাদেশ উত্পাদন করে না!)! ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ (কবে থেকে তাও আমরা জানি না)। আমাদের এজেন্ডা তো অনেক। টিপাইমুখ, তিস্তা, সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, সমুদ্রসীমা, বাণিজ্য ভারসাম্য কমানো, বিএসএফ হত্যা বন্ধ, ছিটমহল, দক্ষিণ তালপট্টি ইত্যাদি। প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থ জড়িত। এই জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না। সোনিয়া-হাসিনা আলোচনায়ও উপেক্ষিত থাকল জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো। আমি খুশি হতাম যদি সরকারপ্রধান সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার আগে বিরোধী দলের মতামত বা তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমরা তো এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে তৈরি করতে পারিনি। ভারত কিন্তু তা করে। জাতীয় ইস্যুতে বিরোধী দলের মতামত নেয়। ইউরোপের কথা না হয় নাই বা বললাম। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টও বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা তা করছি না। জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার দলটির বা প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট তার রয়েছে। কিন্তু যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত, সেখানে বিরোধী দলের পরামর্শ নেয়া ক্ষতির কিছু ছিল না। বরং তাতে করে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান আরও শক্তিশালী হতো। তারপরও ডিবেট হোক। বিএনপি সংসদে গিয়ে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করুক। তাদের সমালোচনা সংসদেই হোক। তারা তাদের প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করুক। শুধু একটা অনুরোধ রাখব সরকারি দলের সংসদ সদস্যের প্রতি, তারা সংসদে অসংলগ্ন আচরণ করবেন না, অতীত ইতিহাস টেনে সংসদে অযথা উত্তাপ ছড়াবেন না। তারা বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাব দেবেন। কিন্তু তা যেন হয় মার্জিত এবং তথ্যনির্ভর। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম সেই বিতর্কের জন্য। বিএনপিকে সংসদে আসতে সুযোগ দেয়া হোক। জাতীয় ইস্যুগুলো আলোচিত হোক। ডিবেট হোক। প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক। শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় (জানুয়ারি ২০১০) যেসব চুক্তি হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ জানাটা জরুরি। এখন সোনিয়া গান্ধী বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা নিয়ে দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু আমরা কী পেলাম? 
ড. তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

আস্থার জায়গাটা কি তৈরি হচ্ছে ????

ড. তারেক শামসুর রেহমান
গত ২৯ জুলাইর একটি খবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরের পুলিশি নির্যাতনের খবর যখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় ও তা হাইকোর্টের নজরে আসে, তখন হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে সকালে (২৮ জুলাই) একটি রুল জারি করেছিল। আর বিকালে শুনানি শেষে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। আট সপ্তাহের মধ্যে বিভাগীয় তদন্তেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ ধরনের একটি আদেশে আমরা আশার আলো দেখতে পাই। আদালত যে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারে, এটা একটা বড় প্রমাণ। নিরীহ ছাত্র কাদেরকে পুলিশ ডাকাত বানিয়েছিল। যে ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন বিভাগে পড়ে পাস করে বেরুনোর পরপরই যার ভালো চাকরি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে পুলিশ তাকে ডাকাত বানিয়ে ফেললো। আজ মাননীয় বিচারপতিরা যদি হস্তক্ষেপ না করতেন, তাহলে কাদেরকে হয়তো জেলের ঘানি টানতে হতো। একজন মেধাবী ছাত্র কাদের হয়তো শেষ পর্যন্ত ডাকাত (?) হিসেবেই পরিচিত হতো। এর চেয়ে আর দুঃখজনক তো কিছু হতে পারে না।
সাম্প্রতিককালে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আমিনবাজারে ৬ ছাত্রের হত্যাকা- ও সেখানে মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে পুলিশের ব্যর্থতা কিংবা আরো আগে বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবেদিন ফারুককে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে নানা কথা। এর একটি ঘটনায়ও পুলিশের ভূমিকাকে সমর্থন করেননি কেউ। আজ যখন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে হাইকোর্ট প্রশ্ন তোলে, তখন একটা আস্থার জায়গা আমরা দেখতে পাই। এর আগে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ ১২ জুলাই সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, 'দয়া করে জাতিকে উদ্ধার করুন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতি উদ্বিগ্ন। এই সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়।' বিচারপতিদের ওই মন্তব্যই বলে দেয় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন। অর্থনীতির অবস্থাও ভালো নয়। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ১১৮ দশমিক ৩৬ ভাগ ও ১৪৬ দশমিক ১৫ ভাগ। ২০১০-২০১১ অর্থবছরের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘর অতিক্রম করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। সার ও ডিজেলের দামও বাড়ান হয়েছে। ইতিমধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ায় এমডিজি'র বাস্তবায়ন (২০১৫ সালের মধ্যে) এখন প্রশ্নের মুখে। রেমিটেন্স আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা শ্লথ হয়েছে। গত অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরে (২০০৯-২০১০) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি। বিদেশে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার দিনে দিনই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও সমস্যা রয়ে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগও দেয়া সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬৩০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী (৫ জুলাই) ২০০৪ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, এখনো সেই পরিমাণ বিদ্যুৎই উৎপাদন হচ্ছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি কোনো আশার কথা বলে না। এর মাঝে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। পুলিশের পিটুনিতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য এখন নিউইয়র্কে। জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে পুলিশের কী লাভ হয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু এতে সরকারের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। পুলিশি অত্যাচারের ওই ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বে, যা পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুলিশের এই 'অতি বাড়াবাড়ি'র সমালোচনা না করে সমর্থন করেছিলেন। অতীতেও পুলিশ প্রায় একই ধরনের 'কা-' করেছে। পুলিশের জন্য একটি 'কোড অফ কনডাকট' প্রণয়ন করা বোধ হয় জরুরি হয়ে পড়েছে। মিডিয়ায় দুই পুলিশ অফিসার 'অভিযুক্ত' হলেও, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে না কোনো অবস্থাতেই। এই যখন পরিস্থিতি তখন যে প্রশ্নটি জরুরি তা হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। দেশের সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে একটা আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো ইস্যুতে (রাষ্ট্রধর্ম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মৌলিক কাঠামো) খোদ মহাজোটের শরিকদের মাঝেও বিভক্তি রয়েছে। মহাজোটের শরিকরা (ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ) পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও, প্রকারন্তরে তারা তাদের দ্বিমতের কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন সেমিনারে। এদিকে ড. কামাল হোসেন বলেছেন সংবিধানে ১৬তম সংশোধনী আনার। সব মিলিয়ে সমঝোতা কীভাবে সম্ভব, তা এক বড় প্রশ্ন এখন। সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হবার পরও সরকার বিরোধী দলকে সংসদে এসে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাবে_ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিরোধী দলের উচিত সরকারের এই বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতায় নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা। এতে করে অন্তত সংসদে একটি রেকর্ড থাকলো। সরাকর যদি তাদের প্রস্তাব নাও মানে, বিরোধী দলের প্রস্তাবাবলি বিবেচনায় নিয়ে একটি আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। যেহেতু সংসদ কার্যকর, সেহেতু সংসদে এসে প্রস্তাব দেয়ার মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির ধারাকে আমরা আরো শক্তিশালী করতে পারি।
যে জনপ্রিয়তা নিয়ে সরাকর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল, সেই জনপ্রিয়তা অনেকটাই মস্নান হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর তাৎপর্য যতটা না বেশি, তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা। বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন তারা বোঝেন না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লো কী কমলো, এতে তাদের কিছু যায় আসে না। টাকার মান কমে গেলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে, এটাও তারা বোঝেন না। তারা চান জিনিসের দাম কম থাকুক। চালের দাম কমে যাক। কমুক তেলের দাম। সরকার যদি এদিকে দৃষ্টি দিত, বোধকরি এটা সরকারের জন্য ভাল হতো। মানুষের তো সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনেক। ওএমএসের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা এ দিকে দৃষ্টি দেন কি না জানি না। দেশে কত সংখ্যক লোক দরিদ্রতার নিচে বসবাস করে, এর একটা পরিসংখ্যান আছে। এর জন্য কিছু লোকও রয়েছেন, যারা এসব পরিসংখ্যান তৈরি করে দেন। কিন্তু কেউ কী জানেন 'ছদ্মবেশী দরিদ্রের' সংখ্যা বাংলাদেশে কত? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশ দরিদ্রতার নিচে চলে গেছে। সীমিত আয়ে তাদের আর সংসার চলে না, চালানো যায় না। এদের নিয়ে কেউ ভাবে না।
শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রে শেখায় সহনশীলতা। গণতন্ত্রে শেখায় পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। একদলীয় সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের স্পিরিটের পরিপন্থী। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে আমরা গণতন্ত্রের সুফলকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে পারিনি। উচ্চ আদালত যে মন্তব্যটি করেছে, তা যদি আমরা বিবেচনায় নেই, তাহলে তা আমাদের সবার জন্যই মঙ্গল।
উচ্চ আদালতের দুটো সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ। একটি সিদ্ধান্তে যেমনি সরকার ও বিরোধী পক্ষকে বলা হয়েছে একটি সমঝোতায় যেতে, তেমনি অপর একটি বেঞ্চের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে পুলিশ যাই করুক, তা উচ্চ আদালতের দৃষ্টি এড়ায় না। এতে করে সরকার বা পুলিশের কতটুকু টনক নড়বে বলতে পারবো না, তবে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ একটা আস্থা খুঁজে পেয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। কাদেরের ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। আমরা দেখতে চাই তদন্ত কমিটি দোষীদের দৃষ্টন্তমূলক শাস্তি দিক। উচ্চ আদালতের এই রায়টি একটি 'ম্যাসেজ' পেঁৗছে দিল সবার কাছে_ আর তা হচ্ছে যিনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন, অন্যায় করলে তার শাস্তি পেতে হয়ই।
দৈনিক ডেসটিনি. বুধবার৩ আগস্ট ২০১১, ১৯ শ্রাবণ ১৪১৮
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ওরা কোথায় যাবে?

গত ২৮ জুলাই এইচএসসির ফল প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের যে উল্লাসের ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সেই উল্লাস হতাশায় পরিণত হতে পারে যখন এদের অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির কোনো সুযোগ পাবে না। দেশে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। পাসের হারও বেড়েছে। ১০টি শিক্ষা বোর্ডের মোট পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। পাসের হার এবার ৭৫ দশমিক ০৮। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৯ হাজার ৭৬৯ ছাত্রছাত্রী, যা গত বছরের চেয়ে ১০ হাজার ৭৬৫ জন বেশি। এতে করে আমাদের শিক্ষার মান কতটুকু বেড়েছে, আমি সেই বিতর্কে যাব না, আমার প্রশ্ন, মেধাসম্পন্ন এসব তরুণ কোথায় ভর্তি হবে? আমরা যখন এক সময় এইচএসসি পাস করেছিলাম, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল কম, হাতেগোনা। মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যাও ছিল সীমিত। বুয়েট ছিল প্রকৌশল বিদ্যার একমাত্র ভরসা। আজ যুগের বিবর্তনে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। বেড়েছে মেডিক্যাল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু তার পরও মেধাবীদের অনেকেই সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ পাবে না। পরিসংখ্যানই বলে দেয় এদের অনেকের জন্যই কোনো সুযোগ নেই।
এবার বিভিন্ন গ্রেডে পাস করেছে পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ২৬১ জন। এরা কোথায় যাবে? সবারই টার্গেট থাকে নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল তথা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু সেই ভাগ্য অনেকেরই হয় না। অনেকে বাধ্য হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজগুলোতে ভর্তি হয়। কিন্তু কলেজগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া হয় না। আমি অনেক কলেজের খবর জানি, যেখানে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্লাস হয় না। এমনি একটি কলেজের নাম পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, যে কলেজের ছাত্র ছিলাম আমি একসময়। ইংরেজিতে অনার্স রয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যা কম। আদৌ কোনো ক্লাস হয় না। এই কলেজটি পুরনো। অনার্স রয়েছে ১৩টি বিষয়ে। অধিকাংশ শিক্ষকই ক্লাস নেন না, প্রাইভেট পড়ান। ছাত্ররা বাধ্য হয় প্রাইভেট পড়তে। ইংরেজিতে অনার্স পড়া এক ছাত্র আমাকে জানিয়েছিল, তারা ঢাকা থেকে গাইড বই নিয়ে যায়, ওটা মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়। ঢাকার একটি নামি কলেজের খবর আমি জানি। ওখানকার অবস্থাও একই। অনার্স চালু করা হয়েছে। কিন্তু কোনো তদারকি নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে একটি সার্টিফিকেট বিতরণ করা প্রতিষ্ঠানে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা নাই বা বললাম। ওখানে কারা পড়ান, কী পড়ান_তা মনিটর করার কেউ নেই। সদ্যবিদায়ী মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম তাই আক্ষেপ করেই বলেছেন, 'ওরা কোনো কথা শোনে না।'
আজ যখন এইচএসসির মেধাবী তরুণদের ছবি আমি দেখি, তখন আমার মনে হয়, আমরা এক সার্টিফিকেটসর্বস্ব জাতিকে পরিণত হতে যাচ্ছি। 'ঘরে ঘরে এমএ পাস। আর ইদানীং ট্রেণ্ড হচ্ছে এমবিএ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাঁড়িয়ে আছে এমবিএ ডিগ্রি দেওয়ার জন্য। তাদের আবার একাধিক ক্যাম্পাস। একটি শক্ত লোকের বড় দরকার ছিল ইউজিসিতে। আজাদ চৌধুরী নিজেকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে গর্ব করেন। পত্রিকায় পরিচয়ও দেন সেভাবে। দু-দুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি ভিসি ছিলেন, তাঁর কাছে প্রতিমন্ত্রীর পরিচয়টা বড় হওয়া উচিত নয়। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন_এই উদ্যোগই তাঁর নেওয়া উচিত।
শিক্ষামন্ত্রী আসেন। শিক্ষামন্ত্রী যান। ইউজিসির চেয়ারম্যানও বদলে যায় সরকারের পটপরিবর্তনের পর পরই। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় গুণগত কোনো পরিবর্তন আসে না। আমরা একটি শিক্ষানীতি পেয়েছি। কিন্তু সেখানেও নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আগামী ২০ বছরে আমাদের কত গ্র্যাজুয়েট দরকার, কোন কোন খাতে আমাদের প্রশিক্ষিত জনশক্তি দরকার, তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি বা ফারসি ভাষায় শত শত ছাত্রছাত্রী ভর্তি হচ্ছে। এর কি আদৌ প্রয়োজন? আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন মুসলমান ছেলে পালি ভাষায় মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করবে কোথায়? শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্যই ভর্তি হওয়া। পড়াশোনাটা এখানে গৌণ। এভাবেই মেধার অপচয় হচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ভাবেন বলে মনে হয় না। উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রায় প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কথা বলছেন মাননীয় রাষ্ট্রপতি। আমরা আমজনতা তাঁর বক্তব্য শুনে উৎফুল্ল হচ্ছি। কিন্তু তিনি কি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন? কেন এখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা হলো না, যারা শিক্ষার মান নির্ধারণ করবে? নামসর্বস্ব একটি সার্টিফিকেট, শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো পরিচয় হতে পারে না। আমরা আশঙ্কা করছি, এইচএসসি পাস করা অনেক তরুণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আদৌ কোনো সুযোগ না পেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে এবং একসময় নামসর্বস্ব একখানা সার্টিফিকেটের অধিকারী সে হবে! কিন্তু ওই সার্টিফিকেট দেখিয়ে সে চাকরি পাবে, এই নিশ্চয়তা সমাজ তাকে দেবে না।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো ভালো ভালো শিক্ষক রয়েছেন। অনেকেই শুধু টাকার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। তরুণ শিক্ষার্থীরা যাতে করে নামসর্বস্ব সার্টিফিকেটের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সে জন্য নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যায় : ১. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'দ্বিতীয় শিফট চালু করা। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শিফটে যারা পড়বে, তারা অতিরিক্ত ভর্তি ফি দিয়ে পড়বে। বিভাগের শিক্ষকদের এ জন্য অতিরিক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে একদিকে তাঁরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহী হবেন, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে আমরা দ্বিতীয় শিফটের ব্যাপারে আকৃষ্ট করতে পারব। দ্বিতীয় শিফটের জন্য ইউজিসি একটি নীতিমালা তৈরি করবে এবং প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তা অনুসরণ করবে। ২. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু করা। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী কিংবা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বিভাগের বাইরে অন্যত্র চালু করা সম্ভব। একজন প্রো-ভিসির পরিচালনায় তা চালু হতে পারে। মূল ক্যাম্পাসের শিক্ষকরাই সেখানে নিয়মিতভাবে শিক্ষা দিতে পারেন। প্রয়োজনে কিছু তরুণ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। ৩. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ভেঙে সাতটি বিভাগীয় শহরে সাতটি পুরনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে চালু করা যেতে পারে। কোনো কোনো কলেজে ভালো শিক্ষক আছেন। তাঁদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। এসব কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যেভাবে রয়েছে, তা শুধু সার্টিফিকেটসর্বস্ব একটি তরুণ প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে। ৪. পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে নতুন ক্যাম্পাস, দ্বিতীয় শিফট চালুর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের মেধা আছে। এরা প্রতিভাবান। উচ্চশিক্ষা এদের অধিকার। এদের মেধা ব্যবহার করার স্বার্থেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাই না, যে জিপিএ-৫ পেয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছিল, তার স্বপ্ন ভেঙে যাক।
দৈনিক কালের কন্ঠ.মঙ্গলবার, ২ আগষ্ট ২০১১, ১৮ শ্রাবণ ১৪১৮, ১ রমজান ১৪৩২

ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য
tsrahman 09@gmail.com

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক


ভারতের কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও এটা কোন রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। সোনিয়া গান্ধী ভারতে ইউপিএ সরকারের মূল ব্যক্তি হলেও, তিনি সরকারে নেই। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না পর্দার অন্তরালে তিনিই সরকার চালান। সাধারণত তিনি খুব একটা বিদেশ সফর করেন না। নীতি নির্ধারণী ভাষণও দেন না। এ কারণেই বাংলাদেশে অটিজম সম্মেলনে যোগদান, এই সম্মেলনের গুরুত্বই শুধু বাড়িয়ে দেয়নি, বাংলাদেশ তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তাও উল্লেখ করার মত। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতার সম্মাননা দিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী তা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সম্মাননাও সোনিয়া গান্ধীর সফর দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। একাত্তুরের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ইন্দিরা গান্ধী নিজে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন। দেরীতে হলেও, এ জাতি তার অবদানকে স্মরণ করলো। এখন দেখতে হবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, তার সমাধানের ব্যাপারে ভারত কী উদ্যোগ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে একাধিক ভারতীয় ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ৮ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণর ঢাকা সফরের পর এলেন সোনিয়া গান্ধী। ২৯ জুলাই আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম। আগস্ট মাসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসছেন। আর ৬ সেপ্টেম্বর আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর (জানুয়ারি ২০১০) ভারতের ভিআইপিদের একের পর এক বাংলাদেশ সফর দু’ দেশের সম্পর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাজমান সমস্যার সমাধানে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং সমস্যা যা ছিল, তাই রয়ে গেছে। গত ১৬ মে ছিল ফারাক্কা দিবস। পানির ন্যায্য হিস্যা ও ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন প্রয়াত মাওলানা ভাসানী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত (১৯৯৬) ক্ষমতায় এসেই নয়াদিল্লী ছুটে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (ডিসেম্বর ১৯৯৬)। কিন্তু যতটুকু পানি আমাদের পাবার কথা, পানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনদিনই আমরা সেই পরিমাণ পানি পাইনি। অথচ সেই চুক্তি নিয়ে অনেক ‘পজিটিভ’ কথা বলা হচ্ছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও কোন খবর নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা গেল বছর টিপাইমুখ গিয়েছিলেন। হেলিকপ্টারে ঘুরলেন। জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে বারে বারে আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। ভারতের উচ্চমহল থেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা বা নেপাল ও ভুটান এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভী ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভী ট্রাক যাবে কোন ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুনতে থাকবো সুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুত্ আসবে ভারত থেকে। কৈ সেই বিদ্যুত্? ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা ভারতে থাকলেও, তা নানা ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। জানা গেছে, আগামী ৩ বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরো ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। অথচ ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাবার কথা (দিনকাল, ১৭মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাবার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মত নেতারা কোনদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতৃবৃন্দ বার বার ভারতীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। বলতে দ্বিধা নেই শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ মূলত ভারতীয় দ্বি-পাক্ষিক নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা নেপালে অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলংকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই সৃষ্টি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য দূরীকরণে তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বন্ধুশূন্য’ হতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জী, প্রণব মুর্খাজী-এরা সবাই মূলত এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা ম্লান হয়ে গেছে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মনোভাবের কারণে। ফেলানি যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানিরা, তখন ভারতের ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কীভাবে দেখে, ফেলানির ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জী যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন,তখন আমাদের উত্সাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও,এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তত্কালীন ভারতীয় সরকারের সাথে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করছিল, তখন মমতা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন।  মমতা হচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে মোস্ট আনপ্রেডেকটিবল পারসন, যার উপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোন সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে তার আঁঁতাত কতদিন স্থায়ী হয়, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জীর কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী তিনি মনমোহন সিং-এর সাথে ঢাকায় আসছেন। কেননা তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ একটি ফ্যাক্টর। তিস্তার পানি বন্টনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা হয়েছে সচিব পর্যায়ের বৈঠকে। যদিও আমরা জানি না বাংলাদেশের স্বার্থ তাতে রক্ষিত হবে কী-না। মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। আমরা চাই না গঙ্গার পানি চুক্তির মত তিস্তার পানি চুক্তিটিও বিতর্কিত হোক। সিটমহল ও সীমান্ত চিহ্নিতকরণও জরুরি। গত ৪০ বছরে সিটমহল ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধ করা প্রয়োজন। এটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। দায়িত্বটা ভারতের। কেননা আজ অব্দি একজন ভারতীয়কেও হত্যা করেনি বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনী। পৃথিবীর কোন সীমান্তেই এভাবে মানুষ মারা হয় না। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়েও কথা বলা উচিত। এখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নেই। সোনিয়া গান্ধীর সফরের সময় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নিয়ে দু’দেশ এক সাথে কাজ করতে পারে বলে তিনি অভিমত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সন্ত্রাস আজ গোটা দক্ষিণ এশিয়ারই সমস্যা। সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তান আজ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম। আর আফগানিস্তানে সন্ত্রাস তো নিত্যদিনের ঘটনা। সুতরাং সন্ত্রাস দমনে দ্বি-পাক্ষিক নয়,বরং প্রয়োজন বহু পাক্ষিক সহযোগিতা। বহু পাক্ষিক যোগাযোগের আলোকে আমরা যদি ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি করতে পারি, তাহলে বহু পাক্ষিকতার আলোকে পানি বন্টন ও এর ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল ও ভুটান চুক্তি হতে পারে। চুক্তি হতে পারে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আসছেন। সমস্যাগুলো আমরা জানি। এগুলো নিয়ে সেমিনারে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। এখন চাই বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও ভারতের আন্তরিকতা। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। চারটি নব্য উন্নত দেশ (‘ব্রিক’) এর একটি ভারত। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আঞ্চলিক পরিসরে বড় ভূমিকা পালন করুক। ভারতকে এ ভূমিকা পালন করতে হলে তাকে আন্তরিক হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সোনিয়া গান্ধীর সফরের মধ্য দিয়ে একটি ক্ষেত্র তৈরি হল। এখন দেখার পালা, সম্পর্ক আরো উন্নত করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটুকু রূপ পায়।

দৈনিক ইত্তেফাক  

শনি, ৩০ জুলাই ২০১১, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৮
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়]
tsrahmanbd @ yahoo.com

যে সিদ্ধান্তকে সবার স্বাগত জানানো উচিত

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে এখন থেকে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে। একটি বয়সসীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৪৭৫তম সিন্ডিকেটে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত সাধারণ সভায় শিক্ষকদের পদোন্নতি ও শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিল। এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আমি মনে করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আজ যে সিদ্ধান্তটি দিল, তা দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসরণ করা উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায় প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে ঠিক তেমনি প্রশ্ন উঠেছে এদের পাঠদানের ক্ষমতা নিয়ে। এ দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে! অনেক ক্ষেত্রেই পদ সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কোন অনুমতি ছিল না। মঞ্জুরি কমিশনের আইন অনুযায়ী কমিশনের অনুমতি ছাড়া শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা যায় না এবং সেই পদে শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া যায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ মঞ্জুরি কমিশনের এ আইনের প্রতি থোড়াইকেয়ার করেছে। এ নিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকদের একটা অংশ সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি তার একাধিক বক্তৃতায় শিক্ষার গুণগতমানের কথা বলেছেন। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয় তা হচ্ছে ‘দলীয় বিবেচনায়’ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব কিনা? অনেকেই স্বীকার করবেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাকরির ক্ষেত্র হতে পারে না। এখানে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত যোগ্যতার বলেই। আর যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন পূর্ণকালীন সদস্য থাকার সুবাদে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেই আলোকেই আমি একটা সুপারিশ রাখতে চাই। আর তা হচ্ছে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তিন স্টেজে। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং উপস্থাপনা। বলা ভালো, কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এতে সুবিধা হল : ১. কোন দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকে না; ২. এতে বিতর্ক কম হয়। কেননা মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকারীও ওই তিনটি স্টেজ অতিক্রম করে যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন; ৩. এ ধরনের নির্বাচনে ‘ব্যক্তির’ কোন ভূমিকা থাকে না। আমি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য থাকাকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার নিয়ম চালু করেছিলাম (সেই নিয়ম বোধকরি এখন আর অনুসরণ করা হয় না)।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা একাধিক। শিক্ষকদের নিয়োগে ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একক কোন নিয়মনীতি নেই। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক নিয়ম। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতির নীতিমালা এক নয়। এমনকি শিক্ষক নিয়োগ কমিটির গঠন কাঠামোও এক নয়। ফলে এটা শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায় না, বরং নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। এজন্য একটি একক নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একক নীতিমালা না থাকার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের বৈষম্যও তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন এখন শুধু ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর (ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম)। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ওই আইনেরও লঙ্ঘন হচ্ছে (যেমন সিনেট কর্তৃক ভিসি প্যানেল নির্বাচন, সিনেট নির্বাচন না হওয়া ইত্যাদি)। আমরা মঞ্জুরি কমিশনে থাকাকালীন একটি অভিন্ন আইন তৈরি করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বর্তমান মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অত্যন্ত ‘ডায়নামিক’ ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ও রয়েছে। যতদূর জানি, তিনি এখন অবধি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেননি। তিনি চাইলে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিপূর্বে প্রণীত অভিন্ন নীতিমালাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। সেখানে শিক্ষক নিয়োগের তিন স্তরের প্রক্রিয়াটি নেই। এটা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আরও তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে আমি মনে করি। এক. পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে ন্যূনতম এক বছর বিভাগে একজন সিনিয়র শিক্ষকের অধীনে থেকে (টিচিং অ্যাসিসটেন্ট) অভিজ্ঞতা অর্জন করা। দুই. ‘ভিজিটিং প্রফেসর’ হিসেবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনিয়র শিক্ষকদের পাঠদান ও গবেষণার সুযোগ দেয়া। আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, যেখানে শুধু প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের দিয়ে বিভাগটি পরিচালিত হচ্ছে। এটা ভালো নয়। এতে শিক্ষার মানের কোন উন্নতি ঘটবে না। তিন. শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি থাকতে হবে মঞ্জুরি কমিশনের হাতে। প্রয়োজনে একটি পিএসসি ধরনের কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। যাদের কাজ হবে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এ কমিশনের হাতে সরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটিও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে, যা কিনা এখন পিএসসি সম্পন্ন করছে। এতে করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। নামটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার জন্য আরেকটি কাঠামো দরকার। বর্তমানে মাত্র একজন সদস্য প্রায় ৫৪টি (আরও আসছে প্রায় ২০টি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করেন। এটা অসম্ভব ব্যাপার। সঙ্গত কারণেই তাই ইউজিসির মডেলে আরেকটি কমিশন গঠন করা যুক্তিযুক্ত। সেই সঙ্গে ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ গঠন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ধারণ করে রেটিং প্রদান করবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কোন ‘অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ নেই। এ কাউন্সিল গঠনের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। কিন্তু এর কোন বাস্তবায়ন নেই। বর্তমান ইউজিসির চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তার দুয়ারকে খুলে দিয়েছে। শিক্ষক সমিতির বিরোধিতা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আমার বিশ্বাস শিক্ষক সমিতি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করতে পারবেন যে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা না হলে উচ্চশিক্ষার মানের কোন উন্নয়ন সম্ভব নয়। তরুণ শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণটা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি তাদের বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। এক্ষেত্রে সরকার তথা বিশ্বব্যাংকের কাছে অর্থ সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তরুণ শিক্ষকরা আমাদের সম্পদ। সিনিয়র শিক্ষকরা শিক্ষকতা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আগামী পাঁচ-সাত বছরে আরও অনেক গুণী শিক্ষক অবসরে যাবেন। কিন্তু যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণ শিক্ষকদের আমরা দেখছি না, যারা জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। সুতরাং তরুণ শিক্ষকদের সরকারি খরচে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তটি বিবেচনায় নিয়ে ইউজিসি যদি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে, আমার বিশ্বাস শিক্ষার মান উন্নয়নে তা বড় ধরনের সাহায্য করবে।

পুনশ্চ গত ২৮ মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পর্ষদের ১২৫তম সভায় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, সমাজকল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তটি যুগান্তরকারী। দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেয়ায় উপাচার্যকে ধন্যবাদ জানাই। ইতিমধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্যের আমলে ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চালু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য
www.tsrahmambd.blogspotcom
[সূত্রঃ যুগান্তর, ২৭/০৭/১১]

মনমোহন আসছেন আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ইতোমধ্যে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর (জানুয়ারি-২০১০) ফিরতি সফরে আসছেন মনমোহন সিং। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সফরটি যে গুরুত্বপূর্ণ তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। শুধু বাংলাদেশি পর্যবেক্ষকরাই নন, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিশ্লেষকরা লক্ষ্য রাখবেন এই সফরের দিকে। সাম্প্রতিক সময় দুদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা দুদেশের রাজধানী সফর করেছেন। এক্ষেত্রে ভারত এগিয়ে আছে একটু বেশি। ইতোমধ্যে ঢাকা সফর করে গেলেন সোনিয়া গান্ধী। ২৯ জুলাই এসে গেলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। আগস্ট মাসে আসছেন ভারতের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোনিয়া গান্ধীর সফরের আগে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। কৃষ্ণার সফরের সময় দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একটি বিনিয়োগ সংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি ভুটানের যানবাহন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ সংক্রান্ত। সোনিয়া গান্ধীর সফর কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। কিন্তু তার এই সফরের গুরুত্ব আনেক বেশি। কেননা তিনি কংগ্রেসের সভাপতি। ২০০৪ সালেই তিনি ইচ্ছা করলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু জাতির 'বৃহত্তর স্বার্থে' মনমোহন সিংকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সরকার ও মনমোহন সিংয়ের ওপর তার প্রভাব যথেষ্ট। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি যে ওয়াকিবহাল নন, তা বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার আলাপচারিতায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেই আমরা ধরে নিতে পারি। তাই ধরে নিতে পারি তিনি ওই বিষয়গুলো নিয়ে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কী? বলা হচ্ছে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে বেশ কটি চুক্তি হবে। চুক্তি নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে? কৃষ্ণা ঢাকায় বলেছিলেন ভারতের একটি রোল মডেলের কথা। এই 'রোল মডেল' কি শুধু ভারতের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য? আমরা ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমাদের একটি সমস্যারও তো সমাধান হলো না। সীমান্তহাট চালু হয়েছে গত ২৩ জুলাই। এই সীমান্তহাট কি বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারবে? এটা কি লোক দেখানো না?
এই উদ্যোগ কি আমাদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে না?
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বড় দেশ। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী ভারতের। নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর দিক থেকে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ ও অষ্টম। আয়তনের দিক থেকে ভারত বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ দেশ। শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদনের দিক থেকে ভারতের অবস্থান দশম। আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। মাথাপিছু আয় গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলার। সুতরাং বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত তো একটা ভূমিকা রাখতেই পারে। আমরাও তা চাই। কিন্তু সেই ভূমিকাটি যদি হয় একতরফা, তখন তো প্রশ্ন উঠবেই। ভারত ১ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। ঢাকায় চুক্তিও স্বাক্ষরিত হলো। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই ঋণ আটকে আছে। যেসব শর্তে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে, তা নিয়েও কথা আছে। সেইসব শর্ত, ঋণের সুদ বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। তাহলে এটা কি 'রোল মডেল?' বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমস্যা একাধিক, আর একটিরও সমাধান হয়নি। অথচ বারবার বলা হচ্ছে সমাধান হবে। সীমান্তে বাংলাদেশি গুলি করে হত্যা করা বন্ধ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় গত ২৬ মাসে ১৩৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের কথা দিয়েছিলেন সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে। গঙ্গার পানি বণ্টনের চুক্তি আমরা করেছিলাম ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে (হাসিনা-দেবগৌড়া চুক্তি)। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা পাইনি কোনোদিন। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তির কথা বলা হলেও, চুক্তি হয়নি (এখন শোনা যাচ্ছে মনমোহনের ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি হবে)। বাংলাদেশ-ভারত ৬.৫ কিলোমিটার সীমানা আজো চিহ্নিত হয়নি। বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আমরা আজো ফেরত পাইনি। বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে। এই ভারসাম্য কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। বাংলাদেশের খাদ্য সঙ্কটের সময় ভারত বাংলাদেশকে চাল বিক্রি করার চুক্তি করলেও, সেই চাল ভারত বিক্রি করেনি। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার খর্ব করে ভারত আমাদের কয়েকটি অনুসন্ধানী বস্নকের ওপর তাদের অধিকার দাবি করেছে। দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের এলাকা হলেও ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী এটা দখল করে নিয়েছিল। সেই থেকে এটা তাদের দখলে। তিনবিঘার পরিবর্তে আমরা বেরুবাড়ী দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ তিনবিঘা 'লিজ' হিসেবে পেয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনবিঘার ওপর দিয়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা ঝুলে আছে। তাহলে এটা 'রোল মডেল' হলো কীভাবে? ভারত তো তার নিজের স্বার্থ দেখছে। ভারত তার পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে। নেপালের ৪টি নদীতে (কর্ণালী, পঞ্চেস্বর, সপ্তকোসি, বুড়িগন্ধকী) ও ভুটানের মানোস ও সাংকোশ নদীতে বহুমুখী ড্যাম নির্মাণ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ১২ লাখ একর জমির সেচ সমস্যার সমাধান করেছে। নেপালে রিজার্ভারে পানি ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু এ জন্য দরকার ত্রিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) উদ্যোগ। যোগাযোগের আপেক্ষিকতার কথা ভারত বললেও (বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন এ কথা), জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে কোনো আপেক্ষীয়, নিদেনপক্ষে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। ভারতের 'নেগেটিভ লিস্ট'-এর কারণে বাংলাদেশি পণ্যের কোনো বাজার নেই ভারতে। এর ব্যাখ্যা আমরা কীভাবে করব? কৃষ্ণ যে 'রোল-মডেলের' কথা বলে গেলেন, এটা কি তাহলে? 'রোল-মডেল' মানেই কি ভারতীয় স্বার্থ?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা ইদানীং নতুন একটি ধারণা বা ঈড়হপবঢ়ঃ এর কথা শুনছেন। এটি ্তুতড়হব ড়ভ চৎরারষবমবফ রহঃবৎবংঃ্থ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ তার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে (বিশেষ করে বেলারুস) সম্পর্কের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই তত্ত্বের কথা বলেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে সীমান্তবর্তী দেশের ওপর তার এক ধরনের স্বার্থ ও অধিকার রয়েছে। এক সময় বেলারুশ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে স্বাধীন। বেলারুশ তার জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার কারণে রাশিয়া ও বেলারুশ একটি টহরড়হ ঝঃধঃব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পূর্ণ একত্রীকরণের পথে এটা একধাপ। বেলারুশে রাশিয়ার মুদ্রা রুবল চালুরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে রাশিয়া তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ঈড়ষষবপঃরাব ঝবপঁৎরঃু ড়ৎমধহরুধঃরড়হ গঠন করেছে, যা মূলত একটি সামরিক জোট। একটি বড় দেশের পাশে একটি ছোট দেশ থাকলে ওই বড় দেশটি ছোট দেশটির ওপর প্রভাব খাটায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনাম-লাওসের বড় প্রমাণ। নিজেদের স্বার্থ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল (১৯৭৮), ভিয়েতনাম দখল করে নিয়েছিল কম্বোডিয়া (১৯৭৮)। দখলদাররা পুতুল সরকারও গঠন করে। ইতিহাসে বারবাক কারমাল (আফগানিস্তান) কিংবা হেং সামারিনের (কম্বোডিয়া) নাম এভাবেই উচ্চারিত হয়। পূর্ব ইউরোপের ইতিহাস না হয় নাই বা উল্লেখ করলাম। বাংলাদেশের অবস্থান তখন ভারতের ্তুতড়হব ড়ভ ঢ়ৎরারষবমবফ রহঃবৎবংঃ্থ-এর অন্তর্ভুক্ত। যারা ভারতের বৈদেশিক নীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত এক সময় 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন' ও গুজরাল ডকট্রিন-এর কথা বলেছিল। 'ইন্ডিয়া ডকট্রিন'-এ বলা হয়েছিল ভারত এ অঞ্চলে অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির 'নাক গলানো' পছন্দ করবে না। এ ডকট্রিন বা মতবাদে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তাকে এক করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে গুজরাল ডকট্রিন-এ বলা হয়ছে ভারতের সাতবোন রাজ্যের (আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল) উন্নয়নে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে আমরা এই গুজরাল ডকট্রিন এখন বাস্তবায়ন করছি। গুজরাল ডকট্রিন হচ্ছে ইন্ডিয়া ডকট্রিন-এর সম্প্রসারিত পরিবর্তিত রূপ।
কৃষ্ণা চলে গেলেন। এরপর গেলেন সোনিয়া গান্ধী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরণ এবং সেপ্টেম্বরে আসছেন মনমোহন সিং। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়। আমরা বারবার বলে আসছি আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের অনেক কিছু আছে বিশ্বকে দেয়ার। যে রোল মডেলের কথা কৃষ্ণা বলেছেন, তা হতে পারে যদি ভারত তার সহযোগিতার হাত আরো সম্প্রসারিত করে।
আমরা সব সমস্যার সমাধান চাই তিস্তার পানি বণ্টন থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ পর্যন্ত। লোক দেখানো চুক্তি আমরা চাই না। মনমোহন সিং অনেক অভিজ্ঞ লোক। তার আগের বক্তব্যে অনেক মানুষ অখুশি হয়েছে। সেই বক্তব্য থেকে তিনি সরে এসেছেন বলেই মনে হয়। এখন এ দেশের মানুষ আরো খুশি হবে, যদি তিনি সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসে একাধিক চুক্তি করে বিরাজমান সমস্যাগুলোর একটা সমাধান দিয়ে যান। আমরা অবশ্যই লোক দেখানো কোনো চুক্তি চাইবো না। কিন্তু যেটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে চুক্তির আগে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? তিস্তার চুক্তি নিয়ে জাতিকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। আমরা জানি না ওই চুক্তিতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে। গঙ্গার পানি চুক্তি করে আমরা পানি পাইনি। এখন তিস্তার পানি চুক্তি করে যদি পানি না পাই, তাহলে তা হবে দুঃখজনক। ট্রানজিট চুক্তির বিষদ বিবরণ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। তিস্তার চুক্তি বিবরণ কী, তাও আমরা জানি না। সংসদেও উপস্থাপিত হয়নি। তবে নয়াদিলি্লতে দুদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রীরা এ ব্যাপারে নূ্যনতম ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। যদি চুক্তি করে ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হয়, তাহলে সরকারের ভাবমূর্তির জন্য তা ভালো নয়। আমরা সমমর্যাদা চাই। মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হোক-আমরা এটা দেখতে চাই।
দৈনিক যায় যায় দিন, শুক্রবার ২৯ জুলাই ২০১১ ১৪ শ্রাবণ১৪১৮ ২৬ শাবান ১৪৩২
ড. তারেক শামসুর রেহমান অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাতিকে উদ্ধারের দায়িত্ব

শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র শেখায় সহনশীলতা। গণতন্ত্র শেখায় পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। একদলীয় সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের স্পিরিটের পরিপন্থী। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি এ পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে আমরা গণতন্ত্রের সুফলকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে পারিনি। সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। গত ১২ জুলাই হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, 'দয়া করে জাতিকে উদ্ধার করুন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতি উদ্বিগ্ন। এই সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়। মুক্তি দিন।' বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের জামিন আবেদনের সময় হাইকোর্ট এ মন্তব্যটি করলেন। বিচারপতি নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ আনোয়ারুল হককে নিয়ে ওই বেঞ্চটি গঠিত। বিচারপতিদের এ মন্তব্যই বলে দেয় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন। একদিকে সরকারের কঠোর মনোভাব ও অন্যদিকে বিরোধী দলের সরকার পতনের আন্দোলন দেশকে এক কঠিন সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যে 'কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস' বা আস্থার রাজনীতির কথা বলে, তা বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নেই। সরকার ও বিরোধী দল এখন পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা আমাদের ২০০৬ সালের অক্টোবরের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় মাত্র।
মাননীয় বিচারপতিদ্বয়ের এ মন্তব্যটিকে আমি বেশি করে গুরুত্ব দিতে চাই। এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সরকার। রোজা শুরু হওয়ার এখনও কিছুদিন বাকি। কিন্তু প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী। তেল, চাল, চিনি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। কাঁচাবাজার এখন রীতিমতো আতঙ্ক। ৪০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না কোনো শাকসবজি। অথচ এ জায়গাটিতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থতা সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশের সংবিধান, ভবিষ্যৎ নির্বাচন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল যখন নূ্যনতম ঐকমত্যে পেঁৗছতে পারছে না, তখন দেশের অর্থনীতির যে চিত্র আমরা পাই, তা কোনো আশার কথা বলে না। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারের ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ১১৮ দশমিক ৩৬ ভাগ ও ১৪৬ দশমিক ১৫ ভাগ। ২০১০-১১ অর্থবছরের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। সার ও ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ায় এমডিজির বাস্তবায়ন (২০১৫ সালের মধ্যে) এখন প্রশ্নের মুখে। রেমিট্যান্স আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা কিছুটা শ্লথ হয়েছে। গত অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরে (২০০৯-১০) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি। বিদেশে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও সমস্যা রয়ে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬৩০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, (৫ জুলাই) ২০০৪ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, এখনও সে পরিমাণ বিদ্যুৎই উৎপাদন হচ্ছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি কোনো আশার কথা বলে না। এর মাঝে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। পুলিশের পিটুনিতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি এখন নিউইয়র্কে। জয়নাল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে পুলিশের কী লাভ হয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু এতে সরকারের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। পুলিশ অত্যাচারের ওই ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বে, যা পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুলিশের এই 'অতি বাড়াবাড়ি'র সমালোচনা না করে সমর্থন করলেন। অতীতেও পুলিশ প্রায় একই ধরনের 'কাণ্ড' করেছে। পুলিশের জন্য একটি 'কোর্ড অব কনডাক্ট' প্রণয়ন করা বোধহয় জরুরি হয়ে পড়েছে। মিডিয়ায় দুই পুলিশ অফিসার 'অভিযুক্ত' হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে না কোনো অবস্থাতেই। এই যখন পরিস্থিতি, তখন যে প্রশ্নটি জরুরি_ তা হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। দেশের সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে একটা আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকগুলো ইস্যুতে (রাষ্ট্রধর্ম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মৌলিক কাঠামো) খোদ মহাজোটের শরিকদের মাঝেও বিভক্তি রয়েছে। মহাজোটের শরিকরা (ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ) পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও প্রকারান্তরে তারা তাদের দ্বিমতের কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সেমিনারে। এদিকে ড. কামাল হোসেন বলেছেন সংবিধানে ১৬তম সংশোধনী আনার। সব মিলিয়ে সমঝোতা কী ভাবে সম্ভব তা এক বড় প্রশ্ন এখন। সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পরও সরকার বিরোধী দলকে সংসদে এসে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিরোধী দলের উচিত, সরকারের এই বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতায় নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা। এতে করে অন্তত সংসদে একটি রেকর্ড থাকল। সরকার যদি তাদের প্রস্তাব নাও মানে, বিরোধী দলের প্রস্তাবাবলি বিবেচনায় নিয়ে একটি আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। যেহেতু সংসদ কার্যকর, সেহেতু সংসদে এসে প্রস্তাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির ধারাকে আমরা আরও শক্তিশালী করতে পারি।
যে জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল, সেই জনপ্রিয়তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর তাৎপর্য যতটা না বেশি, তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা। বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন তারা বোঝেন না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ল কি কমল, এতে তাদের কিছু যায় আসে না। টাকার মান কমে গেলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে, এটাও তারা বোঝেন না। তারা চান জিনিসের দাম কম থাকুক। চালের দাম কমে যাক। কমুক তেলের দাম। সরকার যদি এদিকে দৃষ্টি দিত, বোধকরি এটা সরকারের জন্য ভালো হতো। মানুষের তো সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনেক। ওএমএসের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এদিকে দৃষ্টি দেন কি-না জানি না। দেশে কতসংখ্যক লোক দরিদ্রতার নিচে বসবাস করে, এর একটা পরিসংখ্যান আছে। এর জন্য কিছু লোকও রয়েছেন, যারা এসব পরিসংখ্যান তৈরি করে দেন। কিন্তু কেউ কি জানেন 'ছদ্মবেশী দরিদ্রের' সংখ্যা বাংলাদেশে কত? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশ দরিদ্রতার নিচে চলে গেছে। সীমিত আয়ে তাদের আর সংসার চলে না, চালানো যায় না। ওদের নিয়ে কেউ ভাবে না।
শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র শেখায় সহনশীলতা। গণতন্ত্র শেখায় পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার কথা। একদলীয় সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের স্পিরিটের পরিপন্থী। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি এ পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে আমরা গণতন্ত্রের সুফলকে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে পারিনি। উচ্চ আদালত যে মন্তব্যটি করেছেন তা যদি আমরা বিবেচনায় নিই তাহলে তা আমাদের সবার জন্যই মঙ্গল।
দৈনিক সমকাল, বৃহস্পতিবার | ২৮ জুলাই ২০১১ | ১৩ শ্রাবণ ১৪১৮ | ২৫ শাবান ১৪৩২
প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মাত্রা

সোনিয়া গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের মধ্যে দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। সোনিয়া গান্ধী ভারত সরকারের কোনো পদে নেই। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি। তার বাংলাদেশ সফরও কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। অটিজম সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি চলেও গেছেন গত ২৫ জুলাই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হলেও, তার পরিচয় তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী নেহেরু পরিবারের সদস্য, সবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ, রাজীব গান্ধীর স্ত্রী ও 'ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী' রাহুল গান্ধীর মা। মূলত তার এসব পরিচয়ই তাকে শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বে আরো বেশি করে পরিচিত করেছে। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে 'বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা' পদক গ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্বরণীয় অবদানের স্বীকৃতিসরূপ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রায় দু'শ ভরি ওজনের স্বর্ণের তৈরি পদকটি দেয়া হয়। অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদানকে স্মরণ করলো। বাংলাদেশের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো অনেক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা জটিলতায় আটকে আছে। সোনিয়া গান্ধীর এই সফরের মধ্যে দিয়ে এ জটিলতা কতটুকু দূর হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে। কিন্তু এটা সত্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত (জানুয়ারি ২০১০) সফরের পর এই দুটি দেশের মাঝে সম্পর্ক নতুন একটি দিকে টার্ন নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নয়াদিলি্লতে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ইতিমধ্যে ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও এটা নির্ধারিত হয়নি 'ট্রানজিট ফি' আমরা কতটুকু নির্ধারণ করবো। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর ঢাকায় এসেছিলেন ভারত সরকারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি প্রণব মুখার্জি। ভারত যে ১০০ কোটি ডলারের সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল, সে ব্যাপারে একটি চুক্তি করতেই ঢাকায় এসেছিলেন প্রণব মুখার্জি। এরপর গত ৮ জুলাই ঢাকা সফর করে গেলেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। ২৯ জুলাই আসছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম। সেপ্টেম্বর মাসে আসছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। মাঝখানে ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরও ঢাকা সফর করার কথা। বলা হচ্ছে পি. চিদাম্বরমের ঢাকা সফরের সময় একটি 'বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্লান' সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। অতীতে কখনই এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করেননি। কৃষ্ণার সফরের প্রাক্কালেও বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা অব্যাহত ছিল। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিএসএফের হাতে ১৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। আর চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ২ জন বাংলাদেশি। আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো সংসদে স্বীকার করেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৬ মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৩৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরো ১৭০ জন (আমার দেশ, ৭ জুলাই)। কিশোরী ফেলানিকে পাখির মতো গুলি করে তার মৃতদেহ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশ্বের মানুষ এ ঘটনায় বিস্ময় ও হতবাক হলেও, ঢাকার সেগুনবাগিচায় কর্মরত কর্তাব্যক্তিদের টনক তাতে নড়েনি। তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে আমাদের পররাষ্ট্র-সচিব 'সাহস' পেলেন না প্রতিবাদ জানাতে। যদিও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আজ আমাদের দীপু মনির সঙ্গে বসে কৃষ্ণা বাবু যখন বললেন, 'সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশকে দায়িত্ব নিতে হবে, তখন আমাদের দীপু মনি 'সাহস' করে বলতে পারলেন না একজন ভারতীয় নাগরিককে কখনো হত্যা করেনি বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড। আমাদের দুঃখটা এখনেই_ আমাদের নেতা-নেত্রীরা সাহস করে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।
কৃষ্ণার সফরকালে দুটি চুক্তি হয়েছে। একটি যৌথ বিনিয়োগ সংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি ভুটানের যানবাহন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ সংক্রান্ত। এই দুটি চুক্তি থেকে আমাদের লাভ কতটুকু তা আগামী দিনই বলতে পারবো। তবে ভারতের ভূমি সংক্রান্ত চুক্তি আগেও হয়েছিল, কাজ হয়নি। আমাদের বলা হলো ভারতীয় ১০০ কোটি ঋণ সংক্রান্ত প্রকল্প চূড়ান্ত হবে মনমোহন সিংয়ের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরের সময়। বলা হলো তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও একটি চুক্তি হবে ওই সময়। ভারতীয় ঋণ চুক্তি নিয়ে যে জটিলতা, সিরিয়াস পাঠকরা এ সম্পর্কে মোটামুটি জানেন। তাই এ বিষয় আলোকপাত করলাম না। কিন্তু আমার শঙ্কা তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে। একটি চুক্তি হবে_ এটা আমার কথা। কিন্তু তাতে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কী? ইতিমধ্যে দুদেশের পানিসম্পদ সচিবরা একটি খসড়া চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু এর খুঁটিনাটি আমরা জানি না। এর জন্য আলোচনার পথও সরকার তৈরি করে দেয়নি। সংসদেও আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। আশঙ্কা করছি ফারাক্কা চুক্তির মতোই তিস্তা চুক্তি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে প্রথম যখন সরকার গঠন করে, তখন তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিলি্লতে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (১৯৯৬, ডিসেম্বর)। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা কোনো দিনই পাইনি। ওই চুক্তির আগে ১৯৯৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে পদ্মায় পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ যেখানে ছিল ৯.৪৫ মিটার, সেখানে ২০১১ সালের মে মাসে রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ মাত্র ৮.৯২ মিটার (আমার দেশ, ১৬ মে, ১১)। ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে একটা পর্যায়ে এসে পানি আরো কমে যাবে। ওই চুক্তি করে লাভবান হলো ভারত, আর আমরা আমাদের পানির হিস্যা হারালাম। এখন ভয় হচ্ছে তিস্তা নিয়েও এমন একটি চুক্তি হয় কী না। চুক্তি করলেই স্বার্থ রক্ষিত হয় না। ফারাক্কা চুক্তি এর বড় প্রমাণ।
শুধু তিস্তার চুক্তির কথা কেন বলি, ভারতের সঙ্গে আমাদের সমস্যা একাধিক। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষ্ণার সফরের সময় এর কোনোটি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। ট্রানজিট চুক্তির বিনিময়ে ইতিমধ্যে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরায় ওভার ডাইমেনশনাল (ওডিসি), পরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু ট্রানজিট ফি কত হবে, তা আজো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৬.৫ কিলোমিটার সীমানা আজো চিহ্নিত হয়নি। ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে, যার জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর। ওইসব ছিটমহল আজো বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়নি। তিনবিঘা করিডরের ওপর একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো কার্যকরী হয়নি। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে। বাণিজ্য ভারসাম্য কমিয়ে আনতে ভারতের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা ধরনের ট্রারিফ ও প্যারাট্যারিফের কারণে সেই পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। কৃষ্ণার বাংলাদেশ সফরের সময় এসব বিষয় নিয়ে আদৌ আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা হয়নি। এখন মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় আমরা কী পাব, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছি না। কেননা কৃষ্ণার সফরের সময়ই মনমোহন সিংয়ের সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হয়েছে। মনমোহন আসবেন শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য।
আমরা বারবার বলে আসছি, আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের একজন ড. ইউনূস আছেন, যিনি বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। আমাদের সেনাবাহিনী বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। পোশাক শিল্পে আমাদের দক্ষতা আমরা প্রমাণ করেছি। তাই বাংলাদেশকে ছোট করে দেখা যাবে না। ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। এখন একটি সেমিনারে অংশ নিতে ঢাকা সফর করে গেলেন সোনিয়া গান্ধী। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। বেশ কিছুদিন আগে রাহুল গান্ধীও ঢাকা ঘুরে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ যে পারে, আমরা তো তা প্রমাণ করেছি। এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রমাণ দেখানোর পালা। সেপ্টেম্বর হতে আর খুব বাকি নেই। আমরা প্রত্যাশা করবো মনমোহন সিং ঢাকায় এসে আমাদের আশার কথা শোনাবেন। যে বক্তব্য রেখে তিনি বাংলাদেশকে 'ছোট' করেছিলেন, এখন তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে। সোনিয়া গান্ধী নিজেও দেখে গেলেন বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি নই। আমরা ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছি। সোনিয়া গান্ধী পারেন একটি বড় ভূমিকা নিতে। তিনি সরকারে না থাকলেও, তিনিই মূল ব্যক্তি। তার সিদ্ধান্তের বাইরে মনমোহন সিং কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখন সোনিয়া গান্ধীর সফরের পর বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারত সরকারের একটি বড় উদ্যোগ আমরা দেখতে চাই। আমরা আশা করি, মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরও সফল হবে এবং আমরা ভারতের ওপর আস্থা রাখতে পারবো।
ড. তারেক শামসুর রেহমান,
অধ্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।