রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোন পথে






বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাকে একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিয়েছে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ছোড়া এসিডে আহত হয়েছেন দু'জন শিক্ষক। ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পারিবারিককরণ, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের চরমে উঠেছে নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা শিক্ষকদের পিটিয়েছিল। সেখানে দীর্ঘদিন অস্থিরতা বিরাজ করছিল। একপর্যায়ে সেখানে ভিসি ও প্রো-ভিসিকেও অব্যাহতি দেয়া হয়। এর আগে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে সাধারণ একজন দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকা-ের ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছিল। রাজশাহীতেও চাঁদাবাজির সূত্র ধরে খুন হয়েছিল একজন ছাত্র। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোথাও শুরু হয়েছে ভিসি খেদাও আন্দোলন, কোথাও ছাত্রলীগের উন্মত্ততা শিক্ষার পরিবেশকে বিঘি্নত করছে। দেশে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বলতে গেলে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অশান্তি, অস্থিরতা আমাদের উচ্চশিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা যদি মোটাদাগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে বেশ কিছু চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। এই অস্থিরতার সঙ্গে দেশের চলমান রাজনীতির সম্পৃক্ততা কম। দেশীয় রাজনীতি আদৌ প্রভাব ফেলেনি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেই এই অস্থিরতা বেড়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে সরকার সমর্থক শিক্ষকদের একটি অংশ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই আন্দোলনে বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষকরা শরিক হলেও তারা বড় কোনো ভূমিকা পালন করছেন না। জাবিতে যারা ভিসিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন, তারাই এখন নয়া ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বুয়েটে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ তথা বাম আদর্শের শিক্ষকরা। বিএনপি তথা ইসলামপন্থী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ কম ছিল। ওই আন্দোলনে শিক্ষকদের সঙ্গে কর্মচারী ও ছাত্ররাও সংহতি প্রকাশ করেছিল। এরকমটি অতীতে কখনো হয়নি। আন্দোলন দমানের ক্ষেত্রে ভিসিরা নিজ উদ্যোগে তার সমর্থিত শিক্ষকদের নিয়ে একটা পাল্টা 'শো-ডাউন'র চেষ্টা করেন। জাবিতে চেষ্টা করেছিলেন সাবেক ভিসি। কিন্তু তাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। বর্তমানে ভিসিও নিজস্ব একটি বলয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। রাজশাহীতেও এমনটি আমরা লক্ষ্য করি। বুয়েটেও শেষ পর্যায়ে এক ভিসি তার সমর্থিত শিক্ষকদের মাঠে নামিয়েছিলেন। এখানে ছাত্রলীগের ভূমিকাও লক্ষ্য করার বিষয়। জাবিতে সাবেক ভিসি নিজস্ব একটি ছাত্রলীগ তৈরি করেছিলেন। মূলধারার ছাত্রলীগের সমর্থন তিনি পাননি। আর বুয়েটে ছাত্রলীগ ভিসির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। রাজশাহী বা জুয়েটের ছাত্রলীগের ভূমিকা অনেকটা একই। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রধানকে একসময় হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। জাবিতে তিনি করেছেন এবং একটি সমাধানও দিয়েছিলেন। বুয়েটের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে আন্দোলন থামাতে শিক্ষামন্ত্রীর একটি উদ্যোগ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সরকার প্রধানকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। এই প্রবণতা ভালো নয়। কাম্যও নয়। যিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকেন বা তাকে থাকতে হয়, তিনি কেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকা-ে হস্তক্ষেপ করবেন? তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মজুরি কমিশন কেন আছে? প্রয়োজনে ইউজিসির 'অথরিটি' বাড়াতে হবে। সরকার প্রধান নিঃসন্দেহে আমাদের সবার মুরুব্বী। কিন্তু প্রতিটি কাজে তার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকা, কোনো ভালো কথা নয়। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অঞ্চলপ্রীতি, আত্মীয়প্রীতির অভিযোগ উঠেছে। জাবিতে শিক্ষক নিয়োগে টাকার লেন-দেন হয়েছে, এ অভিযোগ ছিল সংবাদকর্মীদের তথা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের। এটা অস্বীকার করা যাবে না জাবিতে কম মেধাসম্পন্নরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। টাকার বিষয়টি প্রমাণ করা যায়নি, কেউ উদ্যোগও নেয়নি। কিন্তু ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দেয়ার একটি ঘটনায় আশুলিয়া থানায় জিডি হয়েছিল। যিনি ঘুষ দিয়েছেন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক প্রার্থী ছিলেন। এই ঘটনা কি প্রমাণ করে না অতীতেও এরকমটা হয়েছিল। ১০ লাখ টাকা নিয়ে ধরা পড়েছিলেন এক ভদ্রলোক। তিনিও জাবির লোক। কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার জন্য তিনি অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শিক্ষক, দলবাজ শিক্ষক নিয়োগে অভিযুক্ত হয়েছেন ভিসিরা। খুলনায় ভিসি থাকার সময়ও বুয়েটের ভিসি একই ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। অঞ্চলপ্রীতিতে তিনি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছেন (বাড়ি তার গোপালগঞ্জে)। তবে আত্মীয়প্রীতিতে সবার শীর্ষে আছে রোকেয়া ও পাবনা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তারা নিজস্ব আত্মীয়স্বজনসহ নিজ গ্রামের অর্ধশত লোককে কর্মচারী তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও বাদ যাননি। আরেকটি নতুন প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি_ আর তা হচ্ছে নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভিসি নিয়োগের দাবি। জাবির বর্তমান ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল জাবির শিক্ষক সমিতি। এখন ডুয়েট বা ঢাকার শেরে বাংলার নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও একই দাবি উঠেছে। সেখান থেকেই ভিসি দিতে হয়েছে। এটা ভালো নয় এবং সমর্থনযোগ্যও নয়। ডুয়েটকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে অতি সম্প্রতি। সেখানে উপাচার্য হওয়ার মতো সিনিয়র ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য শেরেবাংলার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও। জাবিতে যে আন্দোলন চলছিল, সেই আন্দোলনকে 'স্বেচ্ছাচারী' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন নয়া ভিসি। তার এই মূল্যায়ন ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইনকে (সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়) একটি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই আইন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এক ধরনের অধিকার দিয়েছে। তাদের 'স্বেচ্ছাচারী' বলা ঠিক না। জাবি ভিসি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন বাস্তবায়নে সবসময় অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। 'ওয়ান ইলেভেন'র ঘটনায় তিনি যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তখন যুুক্তি তুলে ধরেছিলেন ১৯৭৩ সালের এই আইনটির, যে আইনবলে শিক্ষকরা কিছুটা হলেও স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন। তখন জাবিতে শিক্ষকরা যে 'আন্দোলন' করছিলেন, তার সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। এটাও তার গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু 'স্বৈরাচারী' বলাটা শোভন হয়নি। শিক্ষকরা সিনেটে ভিসি প্যানেল নির্বাচনের আগে পর্যায়ক্রমে সিন্ডিকেট, শিক্ষক প্রতিনিধি (সিনেট) নির্বাচনের যে দাবি করেছিল, তা মেনে নিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে সব নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে নিয়েই তো বিশ্ববিদ্যালয়। সবাইকে নিয়েই তাকে চলতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষকরাও তো চেয়েছিলেন ভিসি প্যানেল নির্বাচন। এ ক্ষেত্রে বিরোধিতা থাকার তো কথা ছিল না। তখন গণতান্ত্রিকভাবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এটা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থান আমাদের জন্য একটা আশঙ্কার কারণ। বুয়েট তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। বুয়েটে এরকমটি কখনো হয়নি। এখানে শীর্ষে থাকা সিনিয়র শিক্ষকই অতীতে সবসময় ভিসি হয়েছেন। প্রো-ভিসির আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবুও সিনিয়রিটির দিক থেকে ৫৯ নাম্বারে থাকা একজন অধ্যাপককে প্রো-ভিসি করা হয়েছিল শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থে। এর ফলে যে ট্র্যাডিশন ভাঙল, তা কি আজ বুয়েটে ফিরে আসবে? বুয়েটের ভিসি ক্ষমতায় আছেন এখনও, তবে প্রোভিসি ক্ষমতা হারিয়েছেন। কিন্তু তাতে ভিসির সম্মান বাড়েনি। মুক্তিযোদ্ধা ও জাবির ভিসি জাবির শিক্ষক, ছাত্রদের স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি শিক্ষকদের গ্রহণযোগ্যতা হারালেন। তিনি সবার ভিসি হতে পারলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে তার সিদ্ধান্তে শিক্ষক সমিতি আপত্তি করেছে। আন্তঃদ্বন্দ্বে ঢাবির ভিসি 'বিজয়ী' হয়েছেন। কিন্তু টিকতে পারবেন কি? আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইনেরও ত্রুটি রয়েছে। একুশ শতকে এই আইনটি অচল। অতিরিক্ত স্বায়ত্তশসান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অচলাবস্থার একটা কারণ। ১৯৭৩ সালের আইন (যা আবার মাত্র ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য) ভিসিকে অঘাত ক্ষমতা দিয়েছে। শিক্ষক হিসেবে তার ব্যক্তিগত পছন্দ, দলীয় আনুগত্য, আত্মীয়তা প্রাধান্য পাচ্ছে। মেধাবীরা শিক্ষক হিসেবে বাদ পড়ছেন। তাই শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি রাখতে হবে ইউজিসির হাতে অথবা পিএসসির মতো একটি সংস্থা গঠন করতে হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষকরা নিয়োগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে চারটি স্টেজ বিবেচনায় নিতে হবে (লিখিত পরীক্ষা, ডেমো, মৌখিক পরীক্ষা ও অতীত শিক্ষা রেকর্ড)। শিক্ষকদের অবসরের বয়স আমরা বাড়িয়েছি। কিন্তু তরুণ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও তাদের যোগ্য শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ আমরা নেইনি। যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা যদি জাবি ও বুয়েটের ঘটনাবলী দিয়ে কিছুট শেখেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের হারানো গৌরব কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে পারবে। জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখার পেছনে কোনো সার্থকতা নেই। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পারিবারিককরণের পরও যদি ক্ষমতা ধরে রাখেন, সেটা হবে দুঃখের এবং লজ্জারও। ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের হামলায় পুনরায় ৩০ জন শিক্ষকের আহত হওয়ার ঘটনায় ভিসি যদি পদত্যাগ করেন, সেটা তার সহকর্মীদের প্রতি শুধু সম্মান জানানোই হবে না, বরং তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। জাবির নয়া ভিসি সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শিক্ষক সমিতির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। অথচ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান প্রশ্নবিদ্ধ। সদ্য প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্ররা ক্লাস করতে পারে না শ্রেণীকক্ষের অভাবে। এদিকে তার দৃষ্টি নেই। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।Daily JAI JAI DIN15.01.13

আজও মেলেনি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি



‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন। সেটা ১৯৭৪ সালের কথা। তারপর কেটে গেছে ৩৮টি বছর। কিন্তু এই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কি নিশ্চিত হয়েছে? র‌্যাব এখন অনেকের কাছে একটি আতংকের নাম। র‌্যাবের অনেক ভালো অর্জন নষ্ট হয়ে গেছে কয়েকটি ঘটনায়। সর্বশেষ ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামের মৃতদেহ পাওয়া গেল কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আদাবাড়ি-মনোহরপুর গ্রামের পেঁয়াজ ক্ষেতের পাশে। অভিযোগ র‌্যাবের বিরুদ্ধে। র‌্যাব তা অস্বীকার করলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, র‌্যাবের পরিচয়ে কয়েক ব্যক্তি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার মৃতদেহ পুলিশের হাতকড়া লাগানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, এ ধরনের হাতকড়া বাইরে কিনতে পাওয়া যায়! কী ভয়াবহ কথা! প্রকাশ্যে বা গোপনে যদি এ ধরনের হাতকড়া পাওয়া যায়, তাহলে তো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সতর্ক হওয়ার কথা। তারা এটা বন্ধ করছে না কেন?
রফিকুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়িক বিরোধ, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি, সম্পত্তি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এখন পুলিশ কিংবা র‌্যাবেরই দায়িত্ব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ খুঁজে বের করা। আমরা চাই না র‌্যাবের সব অর্জন দু’-একটি ঘটনায় ম্লান হয়ে যাক। সাংবাদিক দম্পতি রুনী-সাগরের হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা আজও আমরা করতে পারলাম না। আমাদের এতগুলো সংস্থা। রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে র‌্যাব, পুলিশসহ বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার পেছনে। কিন্তু ফলাফল কী? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বারবার র‌্যাবের নাম এসেছে। অতীতে যাদের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, তারা সমাজের উঁচু স্তরের কেউ নন। বরং প্রায় সবার বিরুদ্ধেই খুন, হত্যা, চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। তারা কেউই সমাজের ভালো মানুষ ছিল না। তারপরও তাদের এমন মৃত্যু প্রত্যাশিত নয়। এই অস্বাভাবিক মৃত্যু আমরা কামনা করতে পারি না। কিন্তু ইলিয়াস আলীর ঘটনাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? ইলিয়াস আলী সাধারণ কেউ নন। সাবেক ছাত্রনেতা ও বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতাদের একজন। তিনি ‘হারিয়ে’ গেলেন। আমরা কেউ তার খোঁজ পেলাম না। র‌্যাব তো কত কিছুই করল। তার বাসায় সিসি ক্যামেরা বসানো হল। জানা গেল না কারা তাকে ধরে নিয়ে গেল। কেনই বা নিল? কী তার অপরাধ? তাকে গুম করার অভিযোগে হরতাল হল। কিন্তু ইলিয়াস আলী আর ফিরে এলেন না।
নির্মল সেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে সংবাদপত্রে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন, সেদিনের পরিস্থিতি আর আজকের পরিস্থিতি এক নয়। মানুষ বেড়েছে। শক্তিশালী বিরোধী দল রয়েছে। রয়েছে সংসদ। সবচেয়ে বড় কথা, তিন তদন্তকারী সংস্থা এখন অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের রয়েছে দক্ষ জনশক্তি। তারা বিদেশে প্রশিক্ষিত। রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। কিন্তু তারপরও আজ পর্যন্ত জানা গেল না কে নিয়ে গেল ইলিয়াস আলীকে। র‌্যাব জানিয়েছে, তারা নেয়নি। তবে কারা নিল? রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হল ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার করতে? রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হল রুনী ও সাগরের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে? রাষ্ট্র কী জবাব দেবে ফারিয়ালকে। কী জবাব দেবে মেঘকে?
আমরা আমাদের সংবিধান নিয়ে গর্ব করি। গর্ব করারই কথা। এই সংবিধানে সাধারণ মানুষের অধিকারের যে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, খুব কম দেশের সংবিধানেই এ ধরনের নিশ্চয়তা রয়েছে। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ এমনকি সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ আমরা গণতন্ত্র চেয়েছি। গণতন্ত্রকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। সেই সঙ্গে চাই আমাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা হোক। মৌলিক মানবাধিকার আর গণতন্ত্র তো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটিকে রেখে অপরটিকে বাদ দেয়া যাবে না। যদি মৌলিক মানবাধিকার লংঘিত হয়, তাহলে গণতন্ত্র অর্থহীন। আবার গণতন্ত্র অর্থহীন, যদি মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত না হয়। ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি’ দাবি করে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন নির্মল সেন। তারপর বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে। অনেক সরকার এলো-গেল। কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তো উঠেছেই। বর্তমানে গণতান্ত্রিক সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন অস্বাভাবিক মৃত্যু বাড়ে কীভাবে? মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ক’দিন আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বর্তমান সরকারের আমলে গত এক বছরে কত ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন অথবা হারিয়ে গেছেন। সরকারি তথ্যে এসব পাওয়া যাবে না। কিন্তু ‘গুম’ একটি আতংকের নাম। বিরোধী রাজনীতিকদের মাঝ থেকে কে কখন ‘গুম’ হয়ে যান, সেই আতংকে থাকেন অনেকেই। গত ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টারের এক প্রতিবেদন। তাতে বলা হয়েছে, সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ১২৮ জন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ২৫৬ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হবিগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিক জুনাইদ আহমেদ জুনেদকে হত্যা করে ২০ টুকরা করা হয়। কী ভয়ংকর কথা। জুনাইদ স্টার সাংবাদিক নন। রুনী-সাগরের হত্যাকাণ্ডের মতো বড় কাভারেজ পাননি। কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোন ‘রাজনীতি’ জড়িত না থাকলেও যে কারণেই তাকে হত্যা করা হোক না কেন, রাষ্ট্র তো এ ধরনের ঘটনায় নিশ্চুপ থাকতে পারে না? রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে অনেক। প্রতিবেদনটিতে যে ২৫৬ জন সাংবাদিকের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলা হয়েছে (২০১২), তাদের অধিকার তো খর্ব হয়েছে। তাদের মাঝে কতজন রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছেন, কতজন গোষ্ঠীগতভাবে বা ব্যক্তিগত শত্র“তার জের ধরে নির্যাতিত হয়েছেন, প্রতিবেদনে তা খোলাসা করা হয়নি। তবে যে কোন পক্ষ থেকে নির্যাতনই অন্যায়। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে চুপ করে বসে থাকতে পারে না।
নির্মল সেন প্রয়াত হয়েছেন, তিনি বেঁচে থাকলে এবং শেষ জীবনে যদি পুরোপুরি সুস্থ থাকতেন, তাহলে এই নির্যাতনের মাত্রা দেখে কী লিখতেন, আমি বলতে পারব না। তবে তার মাঝে এক ধরনের হতাশা আমি দেখেছি। আগের মতো, মধ্য বয়সে ১৯৭৪ সালে তার সেই বিখ্যাত লেখা তিনি পরে আর লিখতে পারেননি। এ সমাজে সাহস করে কথা বলার মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা টকশোতে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ব্যঙ্গোক্তি করে একটি মন্তব্য করেছিলেন (‘তুই চোর’)। ওই মন্তব্যের সঙ্গে সবাই যে একমত হবেন, তা তো নয়। কিন্তু প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি যদি ওই মন্তব্যের রেশ ধরে মন্তব্য করেন, তখন সাধারণ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় বৈকি! আর যারা কলম ধরেন, তাদের মাঝে অলিখিতভাবে কাজ করে একটি ‘ভয়’। একজন সিনিয়র রাজনীতিক, যিনি মুক্তিযোদ্ধা, একটি ছোট দলের প্রধান হলেও অতীতে একটি বড় দলের মন্ত্রী ছিলেন, তিনি নিজে আমাকে বলেছেন, তিনি গভীর রাতের টকশোগুলোতে যান না শুধু ‘গুমে’র ভয়ে। তার মতো একজন ব্যক্তি যখন ‘গুম’ আতংকে থাকেন, তখন আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষকের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়? এটা তো অস্বীকার করা যাবে না যে, একটি ‘ভয়ের আবহ’ তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী এক মাসের ওপর বিএনপি অফিসে ‘বন্দি’। তার ভেতরেও কাজ করছে এক ধরনের ‘গুম’ তথা গ্রেফতার আতংক। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের জীবন কাটে অফিসে। হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়নি। স্কাইপি সংলাপ ফাঁস করার পর তিনি নিজেও আতংকে আছেন।
এই যে ‘ভয়ের আবহ’, তা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা যে, সরকার এই ‘ভয়ের আবহ’ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারেনি। যে কোন ব্যক্তি, তিনি যদি রাজনীতিক হন, সাংবাদিক হন কিংবা হন সাধারণ একজন মানুষ, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তিনি যদি অন্যায় করে থাকেন, রাষ্ট্র প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে অন্যায়ের শাস্তি দেবে। কিন্তু একজন ব্যক্তি ‘গুম’ হবে কিংবা কোন ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকবে পেঁয়াজ ক্ষেতের পাশে, কোন সভ্য দেশে এটা চিন্তাও করা যায় না। রফিকুল ইসলাম রাজনীতি করতেন, এটা আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য বিষয়, তিনি আমার মতো এ দেশের একজন নাগরিক। তাকে যারাই হত্যা করুক না কেন, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রয়োজন। র‌্যাবের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়েছে। হতে পারে দুষ্কৃতকারীরা র‌্যাবের নাম ব্যবহার করেছে। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় যদি সিরিয়াস কোন মামলা না থেকে থাকে, তাহলে র‌্যাব বা পুলিশের তাকে না খোঁজারই কথা। এখন যারাই র‌্যাবের নাম ব্যবহার করে (?) তাকে অপহরণ করে হত্যা করেছে, র‌্যাবের নিজেদের স্বার্থেই উচিত তাদের খুঁজে বের করা। র‌্যাবের প্রয়োজন আছে। আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও র‌্যাবের কর্মকাণ্ড মনিটর করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে র‌্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। র‌্যাবের মঙ্গলের জন্য এটা কোন ভালো খবর নয়। মৃত্যু যেন হয় স্বাভাবিক। পবিত্র কোরআন শরিফেও বলা হয়েছে, প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তাই রাস্তার পাশে, পেঁয়াজ ক্ষেতের পাশে, নদীতে ভাসমান অবস্থায় যখন কোন মৃতদেহ পাওয়া যায়, তখন নির্মলদার সঙ্গে একাÍ হয়েই বলতে হয়, ‘আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। দুঃখটা হচ্ছে, ৩৮ বছর আগে নির্মলদা এ কথাগুলো বলেছিলেন। আজ ৩৮ বছর পরও আমাকে লিখতে হচ্ছে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির কথা। তাহলে কি আমরা আরও ৩৮ বছর অপেক্ষা করব স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্য।
Daily JUGANTOR
13.1.13

উন্মত্ত ছাত্রলীগ : শিক্ষকের শরীরে এসিড!

এ দুঃখ আমরা রাখব কোথায়? গত ১১ জানুয়ারি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সব সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তা পাঠ করে শিক্ষকতা পেশার প্রতিই আমার হতাশা জšে§ গেছে। আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি দেশটাকে? ছাত্রলীগ নামধারীদের এসিড নিক্ষেপে আহত হয়েছেন দুজন শিক্ষক, যারা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছাত্রলীগ আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবে পরিণত হয়েছে। ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কর্তৃক সাধারণ একজন দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকাণ্ড সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। প্রকাশ্যে কুপিয়ে একজন মানুষকে হত্যায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের ধারণা ছিল, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু না। আমাদের ধারণা মিথ্যা হলো এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখলাম ছাত্রলীগের নামধারী ক্যাডাররা দুজন শিক্ষককে এসিড মেরেছে। শিক্ষকের গায়ে এসিড? আমরা কাদের পড়াই? কাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই? এর আগে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়েও এমনটি ঘটেছিল। সেখানেও শিক্ষকরা প্রহৃত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডারদের দ্বারা। আবার নতুন করে ঘটল রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, যার বয়স মাত্র ৪ বছর, এ ধরনের ঘটনা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এ কী করলেন জলিল মিয়া? তিনি অধ্যাপক বটে এবং সেই সূত্রে উপাচার্যও। তার বিরুদ্ধে জোরদার অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। চোখের সম্মুখে গেল বছরগুলোতে তিনি নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আত্মীয়করণ, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতিতে শীর্ষে নিয়ে গেছেন। সংবাদপত্রে তার অনিয়ম আর দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল নির্বিকার। একপর্যায়ে তার দুর্নীতি ও দলীয়করণের প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের সেই আন্দোলন ন্যায়সংগত। মহাজোট সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা, তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ তথা আত্মীয়করণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। প্রায় ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ দলীয়করণকে সমর্থন করেছে। এর সুযোগ নিয়েছে ছাত্রলীগ। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ একটি আলাদা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। তারা দুর্নীতিবাজ ভিসিদের ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে কাজ করেছে। বুয়েট, রাজশাহী, ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়-সব জায়গাতে ছাত্রলীগ অকর্মণ্য ভিসিদের পক্ষে কাজ করে আন্দোলনকারীদের ন্যায়সংগত আন্দোলন নস্যাৎ করে দিয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা ন্যায়সংগত, যৌক্তিক। এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইতিহাসে ভিন্ন আঙ্গিকে এ ধরনের প্রতিবাদ হতে আমরা দেখেছি।
যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা নিশ্চয়ই নিউইয়র্কের ‘অকুপাই মুভমেন্ট’ সম্পর্কে ধারণা রাখেন। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, এ আন্দোলন তার ৪২২ দিন পার করেছে। আগের মতো এই ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর খবর শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয় না সত্য, কিন্তু যারা অনলাইনে বিভিন্ন ব্লগে তথ্য অনুসন্ধান করেন, তারা ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর খবর পাবেন। এ আন্দোলন এখনো চলছে এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদ এখনো অব্যাহত রয়েছে। মূলত মার্কিন সমাজে বৈষম্য, অসমতা, দরিদ্রতা আর ধনী শ্রেণীভিত্তিক যে সমাজব্যবস্থা (প্লুটোনমি), তার প্রতিবাদেই নিউইয়র্কে এ ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর জন্ম হয়েছিল। একসময় এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে ইউরোপ ও প্যাসিফিকভুক্ত দেশগুলোতেও ছড়িয়ে গিয়েছিল। গত ১১ জানুয়ারি অনলাইনে যখন ‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এর সর্বশেষ সংবাদটি পাঠ করছিলাম, তখন মানবকণ্ঠ-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট। নিউইয়র্কের ‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এর সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের কোনো মিল নেই সত্য, কিন্তু এক জায়গায় আমি এক অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাই। আর তা হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এ নিজেদের শরিক করে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। আর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতন শিক্ষক সমাজের ব্যানারে শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীরাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হওয়া ‘সব অন্যায়ের’ বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। মিলটা এখানেই। শিক্ষকরা হচ্ছেন সমাজের সচেতন শ্রেণী। তারাই তো প্রতিবাদ করবেন। প্রতিবাদের এই ধরন ন্যায়সংগত। সব অসমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই যে প্রতিবাদ, এই প্রতিবাদ যুগে যুগে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ ঘটেছে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে ইউরোপজুড়ে তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করেছিলেন। তারা সমাজব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি সত্য, কিন্তু সমাজব্যবস্থাকে একটা ধাক্কা দিয়েছিলেন। আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পুঁজিবাদী সমাজে ‘অকুপাই মুভমেন্ট’ আমাদের দেখিয়ে দিল, এই ‘বিদ্রোহের’ সঙ্গে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ন্যায়সংগত প্রতিবাদ, তার সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই। আজ জাহাঙ্গীনগর, বুয়েটের পথ ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরাও একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আজ শিক্ষক সমাজ যখন সবাই একত্রিত হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তখন আমার কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। এমনটা আমরা লক্ষ্য করেছিলাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়েও। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে ন্যায়সংগত, সেটা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আবারো প্রমাণ করলেন। যেমনটি করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষকরা।
শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জ্বন ব্যক্তি। আমার ধারণা, এদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি যে বোঝেন না, তা নয়। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই অস্থিরতা বিরাজ করছে। জাহাঙ্গীরনগর, পাবনা, রাজশাহী, ডুয়েট-সব জায়গাতেই ছিল অস্থিরতা। এ অস্থিরতার সমাধান করতে কখনো কখনো সরকারপ্রধানকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগরে তিনি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। একটা সমাধান দিয়েছিলেন। নয়া ভিসি সেখানে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা যা ছিল, তা রয়েই গেছে। ঢাকার উপকণ্ঠে ডুয়েটে উপাচার্য ছিলেন না বেশ কয়েক দিন। সেখানে নতুন উপাচার্যও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেখানকার শিক্ষকরা দাবি করেছিলেন, তাদের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে।
ঢাকার শেরেবাংলা নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবিও ছিল তেমনি। সেখানকার উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাজশাহী ও পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। দলীয় বিবেচনায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ। আর এই শিক্ষক নিয়োগে আত্মীয় কোটা ও জেলা কোটা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। মজার ব্যাপার, সব ক্ষেত্রেই ছাত্রলীগ প্রতিটি ক্যাম্পাসে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবে এটা কল্পনাও করা যায়নি যে, ছাত্র নামধারী গুণ্ডারা শিক্ষকদের লক্ষ্য করে এসিড ছুড়বে। এখন যদি দ্রুত এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে তা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনতিবিলম্বে ছাত্রলীগের রাস টেনে ধরা প্রয়োজন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের বলা হয়েছিল এরা বহিরাগত। এখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা একই কথা শুনছি-এসিড নিক্ষেপকারীরা বহিরাগত। এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। দু’দিন আগে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছিলেন। রাজশাহীর চাঁদাবাজির ঘটনায় একজন ছাত্র যখন খুন হলো-শিক্ষামন্ত্রী বললেন ‘গুণ্ডামি’র কথা। আজ সময় এসেছে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড পুনর্মূল্যায়ন করার। তাদের কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবর্মূতি ক্রমেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। চলতি বছর নির্বাচনের বছর। এমনিতেই নানা কর্মকাণ্ডে সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে; ছাত্রলীগ সরকারের জন্য আরেকটা ‘সমস্যা’ তৈরি করছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি এটি উপলব্ধি করেন, তাহলে তারা ভালো করবেন। আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় মর্মাহত। প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। ভিসির সব অপকর্ম তদন্তের দাবি রাখে। তাকে ক্ষমতায় রেখে তদন্তকাজ করা যাবে না। অবিলম্বে সেখানে একজন নয়া উপাচার্য নিয়োগ করে দোষী-ক্রিমিনালদের শাস্তির ব্যবস্থা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। পুনশ্চ, ইতোমধ্যে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় তিনজন ছাত্রলীগ কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। এ থেকেই প্রমাণিত হয় ছাত্রলীগ ওই ঘটনায় জড়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা কোনো সমাধান নয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সব দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশেরও দাবি করছি। এ দুঃখ আমরা রাখব কোথায়? গত ১১ জানুয়ারি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সব সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তা পাঠ করে শিক্ষকতা পেশার প্রতিই আমার হতাশা জšে§ গেছে। আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি দেশটাকে? ছাত্রলীগ নামধারীদের এসিড নিক্ষেপে আহত হয়েছেন দুজন শিক্ষক, যারা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছাত্রলীগ আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবে পরিণত হয়েছে। ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কর্তৃক সাধারণ একজন দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকাণ্ড সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। প্রকাশ্যে কুপিয়ে একজন মানুষকে হত্যায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের ধারণা ছিল, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু না। আমাদের ধারণা মিথ্যা হলো এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখলাম ছাত্রলীগের নামধারী ক্যাডাররা দুজন শিক্ষককে এসিড মেরেছে। শিক্ষকের গায়ে এসিড? আমরা কাদের পড়াই? কাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই? এর আগে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়েও এমনটি ঘটেছিল। সেখানেও শিক্ষকরা প্রহৃত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডারদের দ্বারা। আবার নতুন করে ঘটল রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, যার বয়স মাত্র ৪ বছর, এ ধরনের ঘটনা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এ কী করলেন জলিল মিয়া? তিনি অধ্যাপক বটে এবং সেই সূত্রে উপাচার্যও। তার বিরুদ্ধে জোরদার অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। চোখের সম্মুখে গেল বছরগুলোতে তিনি নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আত্মীয়করণ, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতিতে শীর্ষে নিয়ে গেছেন। সংবাদপত্রে তার অনিয়ম আর দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল নির্বিকার। একপর্যায়ে তার দুর্নীতি ও দলীয়করণের প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের সেই আন্দোলন ন্যায়সংগত। মহাজোট সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা, তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ তথা আত্মীয়করণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। প্রায় ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ দলীয়করণকে সমর্থন করেছে। এর সুযোগ নিয়েছে ছাত্রলীগ। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ একটি আলাদা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। তারা দুর্নীতিবাজ ভিসিদের ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে কাজ করেছে। বুয়েট, রাজশাহী, ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়-সব জায়গাতে ছাত্রলীগ অকর্মণ্য ভিসিদের পক্ষে কাজ করে আন্দোলনকারীদের ন্যায়সংগত আন্দোলন নস্যাৎ করে দিয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা ন্যায়সংগত, যৌক্তিক। এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইতিহাসে ভিন্ন আঙ্গিকে এ ধরনের প্রতিবাদ হতে আমরা দেখেছি।
যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা নিশ্চয়ই নিউইয়র্কের ‘অকুপাই মুভমেন্ট’ সম্পর্কে ধারণা রাখেন। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, এ আন্দোলন তার ৪২২ দিন পার করেছে। আগের মতো এই ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর খবর শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয় না সত্য, কিন্তু যারা অনলাইনে বিভিন্ন ব্লগে তথ্য অনুসন্ধান করেন, তারা ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর খবর পাবেন। এ আন্দোলন এখনো চলছে এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদ এখনো অব্যাহত রয়েছে। মূলত মার্কিন সমাজে বৈষম্য, অসমতা, দরিদ্রতা আর ধনী শ্রেণীভিত্তিক যে সমাজব্যবস্থা (প্লুটোনমি), তার প্রতিবাদেই নিউইয়র্কে এ ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর জন্ম হয়েছিল। একসময় এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে ইউরোপ ও প্যাসিফিকভুক্ত দেশগুলোতেও ছড়িয়ে গিয়েছিল। গত ১১ জানুয়ারি অনলাইনে যখন ‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এর সর্বশেষ সংবাদটি পাঠ করছিলাম, তখন মানবকণ্ঠ-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট। নিউইয়র্কের ‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এর সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের কোনো মিল নেই সত্য, কিন্তু এক জায়গায় আমি এক অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাই। আর তা হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
‘অকুপাই ম্যুভমেন্ট’-এ নিজেদের শরিক করে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। আর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতন শিক্ষক সমাজের ব্যানারে শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীরাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হওয়া ‘সব অন্যায়ের’ বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। মিলটা এখানেই। শিক্ষকরা হচ্ছেন সমাজের সচেতন শ্রেণী। তারাই তো প্রতিবাদ করবেন। প্রতিবাদের এই ধরন ন্যায়সংগত। সব অসমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই যে প্রতিবাদ, এই প্রতিবাদ যুগে যুগে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ ঘটেছে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে ইউরোপজুড়ে তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করেছিলেন। তারা সমাজব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি সত্য, কিন্তু সমাজব্যবস্থাকে একটা ধাক্কা দিয়েছিলেন। আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পুঁজিবাদী সমাজে ‘অকুপাই মুভমেন্ট’ আমাদের দেখিয়ে দিল, এই ‘বিদ্রোহের’ সঙ্গে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ন্যায়সংগত প্রতিবাদ, তার সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই। আজ জাহাঙ্গীনগর, বুয়েটের পথ ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরাও একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আজ শিক্ষক সমাজ যখন সবাই একত্রিত হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তখন আমার কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। এমনটা আমরা লক্ষ্য করেছিলাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়েও। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে ন্যায়সংগত, সেটা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আবারো প্রমাণ করলেন। যেমনটি করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষকরা।
শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জ্বন ব্যক্তি। আমার ধারণা, এদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি যে বোঝেন না, তা নয়। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই অস্থিরতা বিরাজ করছে। জাহাঙ্গীরনগর, পাবনা, রাজশাহী, ডুয়েট-সব জায়গাতেই ছিল অস্থিরতা। এ অস্থিরতার সমাধান করতে কখনো কখনো সরকারপ্রধানকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগরে তিনি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। একটা সমাধান দিয়েছিলেন। নয়া ভিসি সেখানে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা যা ছিল, তা রয়েই গেছে। ঢাকার উপকণ্ঠে ডুয়েটে উপাচার্য ছিলেন না বেশ কয়েক দিন। সেখানে নতুন উপাচার্যও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেখানকার শিক্ষকরা দাবি করেছিলেন, তাদের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে।
ঢাকার শেরেবাংলা নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবিও ছিল তেমনি। সেখানকার উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাজশাহী ও পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। দলীয় বিবেচনায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ। আর এই শিক্ষক নিয়োগে আত্মীয় কোটা ও জেলা কোটা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। মজার ব্যাপার, সব ক্ষেত্রেই ছাত্রলীগ প্রতিটি ক্যাম্পাসে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবে এটা কল্পনাও করা যায়নি যে, ছাত্র নামধারী গুণ্ডারা শিক্ষকদের লক্ষ্য করে এসিড ছুড়বে। এখন যদি দ্রুত এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে তা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনতিবিলম্বে ছাত্রলীগের রাস টেনে ধরা প্রয়োজন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের বলা হয়েছিল এরা বহিরাগত। এখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা একই কথা শুনছি-এসিড নিক্ষেপকারীরা বহিরাগত। এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। দু’দিন আগে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছিলেন। রাজশাহীর চাঁদাবাজির ঘটনায় একজন ছাত্র যখন খুন হলো-শিক্ষামন্ত্রী বললেন ‘গুণ্ডামি’র কথা। আজ সময় এসেছে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড পুনর্মূল্যায়ন করার। তাদের কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবর্মূতি ক্রমেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। চলতি বছর নির্বাচনের বছর। এমনিতেই নানা কর্মকাণ্ডে সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে; ছাত্রলীগ সরকারের জন্য আরেকটা ‘সমস্যা’ তৈরি করছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি এটি উপলব্ধি করেন, তাহলে তারা ভালো করবেন। আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় মর্মাহত। প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। ভিসির সব অপকর্ম তদন্তের দাবি রাখে। তাকে ক্ষমতায় রেখে তদন্তকাজ করা যাবে না। অবিলম্বে সেখানে একজন নয়া উপাচার্য নিয়োগ করে দোষী-ক্রিমিনালদের শাস্তির ব্যবস্থা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। পুনশ্চ, ইতোমধ্যে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় তিনজন ছাত্রলীগ কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। এ থেকেই প্রমাণিত হয় ছাত্রলীগ ওই ঘটনায় জড়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা কোনো সমাধান নয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সব দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশেরও দাবি করছি।
Daily Manobkontho
13.1.13

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান আশার কথা বলছে না

বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন আগামী ২১ জানুয়ারি। কিন্তু চলতি সপ্তাহে অর্থনীতির যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে, তা কোনো আশার কথা বলে না। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Bipartisan Policy Center যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কালো দিকটাই ফুটে উঠেছে। জানুয়ারির শুরুতেই তথাকথিত ‘ফিসক্যাল ক্লিফ’ বা ‘খাদে পড়ার’ হাত থেকে মার্কিন অর্থনীতিকে আপাতত রক্ষা করতে পারলেও সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে ফেডারেল সরকারকে ট্যাক্স রিটার্ন পরিশোধ করতে হবে ৮৬ বিলিয়ন ডলার; স্বাস্থ্যসেবা তথা মেডিকেয়ারের বিল পরিশোধ করতে হবে ৭৩ বিলিয়ন; সোস্যাল সিকিউরিটি বিল ৬১ বিলিয়ন; ঋণের সুদ ৩৮ বিলিয়ন; প্রতিরক্ষা খাতের বিল পরিশোধ ২৯ বিলিয়ন; ফুড স্ট্যাম্প, হাউজিং; ওয়েলফেয়ার খাতে ২২ বিলিয়ন, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ২০ বিলিয়ন, শিক্ষা খাতে ১৭ বিলিয়ন এবং অন্যান্য খাতে ১০৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। মোট অর্থ পরিশোধ করতে হবে ৪৫২ বিলিয়ন ডলার। অথচ রেভিনিউ আসবে মাত্র ২৭৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। তাহলে কোত্থেকে এ ঘাটতি মেটাবেন বারাক ওবামা? এরই মধ্যে একটি বড় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে ওবামা প্রশাসন। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত (২০১২) এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এর একটা অংশ নেয়া হয়েছে চীনের কাছ থেকে। স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা দুটি। এক. চীনকে ঋণের অংশ পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ, দুই. সোস্যাল সিকিউরিটির অর্থ প্রদানে অসম্মতি। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্রিসের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে দেশটি। গ্রিসের অর্থনৈতিক বিপর্যয় পুরো ‘ইউরো জোন’কে ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। একসময় ইউরোপের মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু সমাজে অসমতা ও বৈষম্যের কারণে সেই গর্বের জায়গাটা এখন দুর্বল হয়ে গেছে। গ্রিস ও ইতালির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির রেশ ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভক্তির কথা প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানি এ বিভক্তির পক্ষে। কেননা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত গরিব দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। এরা ঋণ গ্রহণ করে পরিশোধ করতে পারছে না। প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বেকার সমস্যা বাড়ছে। শ্রেণীবৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। জার্মানি ইউরোপে একটি ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হলেও দেশটিতে দরিদ্রের হার ৬ শতাংশ আর বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। সুইজারল্যান্ড ইইউয়ের সদস্য নয়। এখানে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৮ আর ৭ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বেলজিয়ামে এ হার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮ ও ১৫ শতাংশ। পর্তুগাল ঋণ সমস্যায় জর্জরিত। এখানে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ দশমিক ৩ ও ১৮ শতাংশ। শুধু ইউরোপের কথা কেন বলি; অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা তাইওয়ানের মতো শিল্পোন্নত দেশেও ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এর খবর পাওয়া যায় না। এসব দেশেও বেকারত্ব বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ মুহূর্তে শুধু নিউইয়র্কে অকুপাই মুভমেন্ট সীমিত আকারে পরিচালিত হলেও অন্যত্র এর কোনো খবর পাওয়া যায় না।


দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামার দায়িত্ব গ্রহণ তাই সঙ্গত কারণেই একটি প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। তারা চাকরি চায়। সবার জন্য চায় স্বাস্থ্যসেবা। মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কোনো হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই। ওবামা স্বাস্থ্যসেবায় কিছু কাটছাঁট করতেও বাধ্য হয়েছিলেন। এখন দেখার বিষয়, তিনি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কত দূর যান। ১৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ঘাটতি নিয়ে ওবামা তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করবেন। তিনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— এ ঘাটতি তিনি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনবেন। ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কর্মসূচি তার রয়েছে। মোটরগাড়িশিল্প বাঁচাতে প্রণোদনা দেয়া সরকারের সফলতা বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব একটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালে তিনি আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেবেন। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ সমাধান চান তিনি। এতে ইসরায়েলি নেতৃত্ব যে খুশি হবেন না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওবামা জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সামরিক ব্যয় বাড়ানোর বিপক্ষে ওবামা। বরং আগামী এক দশকে এ খাতে ব্যয় প্রতি বছর গড়ে ৪৮ কোটি ডলার কমাতে চান তিনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা, তা এ মুহূর্তে বলা না গেলেও দু-একটা ঘটনায় ইঙ্গিত মিলছে যে— ওই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতি সম্প্রতি যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দিতে পারে। যদিও অনেক দিন থেকে বলা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত টিকফা চুক্তি করতে চাচ্ছিল। বাংলাদেশ সরকার এক্ষেত্রেও কালক্ষেপণ করেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিক নেতা আমিনুলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারার ব্যর্থতা, সর্বোপরি ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিষয়গুলো কখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। ফলে ‘ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ’ সম্প্রতি যে চিঠি ইস্যু করেছে, তাতে জিএসপি সুবিধা বাতিলের কথা পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৮০ কোটি ডলার। বাংলাদেশ যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে, তার মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ এই জিএসপি সুবিধা পায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছি, তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার। কোনো কোনো মহল থেকে আমাদের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল যে, তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা দেয়া হবে। এখন সব ভেস্তে যেতে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র একজন নয়া বাণিজ্যমন্ত্রী ও একজন নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাচ্ছে। বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রচলিত নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে না বলে ধারণা।


ওবামার দ্বিতীয় দফা দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের জন্য একটি আনন্দের সংবাদ। এতে অভিবাসী ও অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সুযোগ আরো বাড়ল। ওবামার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে— অর্থনীতিকে ‘বিপদের’ হাত থেকে রক্ষা করা। ‘ফিসক্যাল ক্লিফে’র ব্যাপারে সিনেট ও কংগ্রেস নীতিগতভাবে এক হলেও এখানে বলা হয়নি— যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের কী হবে? ওই ঋণ যে অর্থনীতিতে একটি অস্থিরতা তৈরি করবে, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। অর্থনীতির ‘পাগলা ঘোড়া’কে তিনি যদি বাগে আনতে না পারেন, তাহলে অতি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাবেন। যে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে থেকে গেলেন, অতি দ্রুত সেই জনপ্রিয়তা তিনি হারাতে পারেন।


পরিসংখ্যান বলে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে একটি বড় ধরনের অসমতা তৈরি হয়েছে। ১৫ শতাংশ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ৫ ভাগের ১ ভাগের মালিক হচ্ছে জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ। ১৯৭০ সালে ধনী শ্রেণীর হাতে মোট আয়ের ৮-৯ শতাংশ অর্থ সঞ্চিত হতো। আজ ২০১২ সালের শেষে এটি ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ১০ শতাংশ আমেরিকান মোট বেতনের ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ গ্রহণ করে। একভাগ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের মালিক। যুক্তরাষ্ট্রের ধনী-গরিব বৈষম্য সাম্প্রতিক কালে অনেক বেড়েছে। এ বৈষম্য ওবামা হুট করে কমিয়ে আনতে পারবেন না। এটা সত্য; তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষা-ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সেটা হবে বড় পাওয়া। বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ওবামা দায়িত্ব নিলেন। এখন দেখতে হবে, অর্থনীতি উদ্ধারে তিনি কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

Daily BONIK BARTA

12.01.13


সরকারের কাজটি আসলে কী?


গত ৩ জানুয়ারি সরকার পঞ্চম দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর যে প্রশ্নটি খুব জোরে সোরেই উচ্চারণ করা যায়, তা হচ্ছে সরকারের কাজটি আসলে কী? আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দৃষ্টান্ত দেখিয়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল। এটা আমরা শুনি। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম তো বিশ্বে কমেছে। এখন তো সরকারের দাম কমানোর কথা। অথ্চ এখন সরকার দাম বাড়ালো। তাই খুব সঙ্গত কারণেই গ্যাসের দামও বাড়বে। বিদ্যুৎ-এর দাম বাড়বে। সরকার যত যুক্তিই দিক না কেন, এটা অনেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। চলতি বছর নির্বাচনের বছর। সরকার বাধ্য করছে বিরোধী দলকে হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তই জনগণের পক্ষে যায়নি। কিংবা জনস্বার্থে করা হয়নি। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো। সরকারের মন্ত্রীরা বোকার মতো বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের চাইতে আমাদের জ্বালানি তেলের দাম কম। কিন্তু মন্ত্রী সাহেবরা যে কথাটি বলেন না, তা হচ্ছে ভারতের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আর আমাদের ক্রয় ক্ষমতা এক নয়। সেখানে মানুষের আয় বেশি, বেতন বেশি, ক্রয় ক্ষমতা অনেক বেশি। সেই আয়ের তুলনায় জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি নয়। তারা তাদের আয় দিয়ে ভালোভাবে চলতে পারেন। এখন তাদের জ্বালানি তেলের দাম দিয়ে আমাদের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ বা তুলনা করা যাবে না। আমাদের ক্রয় ক্ষমতা ভারতের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার চাইতে অনেক কম। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো। তাতে করে সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে তা প্রভাব ফেলবে। পরিবহন খরচ বাড়বে। তাতে করে বেড়ে যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। একজন মন্ত্রীর, একজন এমপির তাতে ক্ষতি না হওয়ারই কথা। ক্ষতি হয় আমাদের মতো আমজনতার, যাদেরকে নির্দিষ্ট আয়ে চলতে হয়। এতে করে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আরো কমে যায়।
সরকার চার বছর পার করলো গত ৫ জানুয়ারি। গেল বছর কোনো একটি ক্ষেত্রেও সরকারের সাফল্য নেই। বরং দুর্নীতিতে বাংলাদেশ একরকম ‘রেকর্ড’ করেছে। দুর্নীতির কারণ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। হলমার্ক, ডেসটিনি আর পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির রেকর্ড, দুর্নীতির সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে  সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত। অথচ লোক দেখানো তদন্ত রিপোর্টে অত্যন্ত সুকৌশলে সরকারের কর্মকর্তাদের বাঁচিয়ে দেয়া হয়েছে। মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে উঠলেও, অভিযুক্ত সেই মন্ত্রীকে বাঁচিয়ে দিয়েছে দুদক। দু’জন কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও বাকিরা থেকে গেছেন পর্দার অন্তরালে। ডেসটিনি, শেয়ার বাজার ও হলমার্ক অর্থ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। এইসব ঘটনা থেকেই প্রমাণ হয় সরকার দুর্নীতিকে ‘প্রমোট’ করছে। সরকার ও দুদকের কর্মকাণ্ডে টিআই’র রিপোর্টকেই সমর্থন করে, সেখানে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। দুর্নীতি দমনে সরকারের ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো। সেই সাথে মানবাধিকার হরণ ও মিডিয়া দলন ছিল সর্বকালের শীর্ষে। দু’জন শীর্ষ সাংবাদিক সাগর ও রুনিকে রাতের আঁধারে খুন করা হলো। সাংবাদিকরা সারা বছর আন্দোলন করলেন। কিন্তু প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার করা হলো না। বিশ্বজিৎ দাসের হত্যকাণ্ড ছিল গেল বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এনেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের ঘটনা সারা বছর জুড়ে আলোচিত হলেও সরকার ছিলেন নির্বিকার। একজন জনপ্রিয় নেতা এভাবে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাবেন, আর রাষ্ট্র তাকে খুঁজে পাবে না, এটা ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় ব্যর্থতা। অতীতে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।
 পৃথিবীর কোনো দেশে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোনো মহিলাকে গ্রেফতার করা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে। ১৭ জন সাংবাদিক হত্যা, ৩ সম্পাদককে গ্রেফতার, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে বর্তমান সরকার গণমাধ্যম কর্মীদের উপর অত্যাচারের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও বহির্বিশ্বে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে সরকার। একদিকে জ্বালানি তেলে ভর্তুকির নামে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ালেও, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি। এই শীতেও প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। অতীতে কখনো শীতের সময়ে লোডশেডিং হয়নি। তাহলে ভর্তুকির টাকা যাচ্ছে কোন পকেটে? প্রকৃত অর্থে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর টাকা চলে যাচ্ছে কিছু ব্যক্তির হাতে, যারা তথাকথিত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছেন। বর্তমানে দেশে মোট রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ৩২। অধিকাংশই ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে চালাতে হয়। সরকার এ খাতে ভর্তুকি দেয়। কোনো কোনো কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় এদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। যেখানে ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি, সে ক্ষেত্রে ২০১১ সালে ভর্তুকি দিয়েছে ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। আর ২০১২ সালে এই ভর্তুকির পরিমাণ ১০ হাজার টাকার অঙ্ককেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই রেন্টাল ও কুইক কেণ্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। শুধুমাত্র লুটপাটের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারের কোনো উদ্যোগ গত এক বছরে পরিলক্ষিত হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ ছিল অসহায়। তাদেরকে জিম্মি করে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি সুবিধা নিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ ছিল অসহায়। শীতের দিনেও শীতের সবজির দাম ছিল আকাশছোঁয়া। মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা কাঁচাবাজার থেকে প্রতিদিন ‘লুট’ করেছেন কোটি কোটি টাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার আদৌ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং সুবিধাভোগীদের উৎসাহ যুগিয়েছে। এইসব সুবিধাভোগীরা প্রত্যক্ষভাবে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনের সাথে জড়িত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ সালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার যেখানে ছিল ৭.৪১ ভাগ, সেখানে ২০১২ সালে তা দাঁড়ায় ১৩ ভাগে। একই সময় ২০০৯ সালে জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ১৯ ভাগ। আর ২০১২ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৪২। জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছর দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির হার যেমনি বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনি বৃদ্ধি পাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হারও। সরকারের এই সিদ্ধান্তে, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে কৃষকদের। লিটার প্রতি ৭ টাকা দাম বাড়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে গত বছরের চেয়ে প্রায় ১ টাকা বেশি হবে। বোরো উৎপাদন প্রায় ৪১ শতাংশ খরচ হয় সেচকাজে। ডিজেলের দাম বাড়াতে এ ব্যয় বেড়ে ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অঙ্কের হিসেবে প্রায় ৮০ কোটি টাকা কৃষকের পকেট কাটা যাবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণকে বাড়তি ভাড়া গুণতে হবে অন্তত ৯০০ কোটি টাকা। এই তথ্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মতে। কর্পোরেশনের মতে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ৩৫০ কোটি, আর কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধিতে বিদ্যুৎবিহীন অঞ্চলে জনগণকে বাড়তি গুণতে হবে অন্তত ৩১৬ কোটি টাকা (সকালের খবর, ৫ জানুয়ারি)। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন এ অঙ্ক আরো বেশি। আর তা যে জনজীবনকে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে, তা কাউকে বলে দিতে হয় না।
সুতরাং যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে সরকারের দায়িত্বটি আসলে কী? শুধুই কী জনস্বার্থ বিরোধী কর্মসূচি নেয়া? সংবিধান তো রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের এই দায়িত্বটি দেয়নি যে, তারা বারে বারে মূল্যবৃদ্ধি করে জনস্বার্থ বিরোধী কর্মসূচি নেবে। জনস্বার্থে সরকারের কাজ করার কথা। কিন্তু সরকার সেই কাজটি করেনি। হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দেয়নি সরকার। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। সারা দেশ জুড়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হলেও তা বন্ধ করতে পারেনি সরকার। সারা দেশে একের পর এক ‘গুম’ এর ঘটনা ঘটেছে তা রোধ কিংবা এর পেছনের কারণ  উদঘাটন করতে পারেনি সরকার। সাংবাদিক হত্যার রহস্যও উদঘাটিত হয়নি। সব মিলিয়ে সরকার ছিল ব্যর্থ। তাই দৈনিক সমকালের জরিপে যখন প্রকাশ পায় বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে (৫ জানুয়ারি), তখন সরকার যদি এটা উপলব্ধি করেন, তাহলে ভালো করবেন।
11.1.13

ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদ এবং অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন

আগামী ২০ জানুয়ারি বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো প্রসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে করে অর্থনীতিকে তিনি কতটুকু সচল করতে পারবেন, সে প্রশ্ন ইতোমধ্যেই উঠেছে। যদিও বছরের শুরুতে তিনি তথাকথিত 'ফিসকাল ক্লিফ' অর্থাৎ অর্থনীতিকে 'খাদে পড়ার' হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বিশাল বেকারত্ব, রেকর্ড অতিক্রম করা ঋণ (১৬ ট্রিলিয়ন ডলার), সরকারের অগ্রাধিকার চর্চায় অচলপ্রায় ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক খাত, সেই সাথে বৈদেশিক নীতিতে ওবামা কি আদৌ কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারবেন? সামনের দিনগুলো ওবামার জন্য সে সুযোগ হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। এটা সত্য গেল অক্টোবর মাসে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ চাকরি পেয়েছেন। যেখানে জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রতি চারজন একটি চাকরির পেছনে দৌড়াবেন, সেখানে নতুন করে ব্যয় ২ লাখ লোকের চাকরি পাওয়া কম কথা নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণী এ থেকে উপকৃত হয়েছেন। বারাক ওবামার ট্রার্গেটই ছিল এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আর্থিক খাতকে এমন একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা বিখ্যাত কায়রো ভাষণে মুসলিম বিশ্বের সাথে নতুন এক সম্পর্ক গড়ার প্রত্যয় ব্যক্তি করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে জঙ্গিবাদেরই জন্ম হয়েছে সেখানে। লিবিয়া থেকে সিরিয়া সব জায়গাতেই আত্মঘাতী বোমাবাজির জন্ম হয়েছে। ওবামার 'আরব বসন্ত' নীতির এটা একটা বড় ব্যর্থতা। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের কিংবা লিবিয়ায় গাদ্দাফির উৎখাতের পর সেখানে ইসলামী কট্টরপন্থীরা শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়াতে আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 'আরব বসন্ত' তিউনেসিয়া, ইয়েমেন, মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সমস্যার তিনি কোনো সমাধান প্রথম টার্মে বের করতে পারেননি। চীনের সঙ্গে দক্ষিণ চীন সফর নিয়ে পার্শ্ববর্তী ফিলিপাইন ও জাপানের সঙ্গে যে বিরোধ, তা ওবামা প্রশাসন উসকে দিয়েছিল। নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে মার্কিন জনমত সোচ্চার ছিল, তার ৪ বছরের টার্মে তিনি এ ব্যাপারে কতটুকু কী করেন, সে ব্যাপারে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। এগুলো হচ্ছে : ১. মৃত্যুদ- রদ করা, ২. ৫১১৩টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের ভবিষ্যৎ, ৩. গুয়ানতানামো বে বন্দি শিবির বন্ধ করে দেয়া, ৪. রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ধসের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার, ৫. পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় ড্রোন বিমান হামলা বন্ধ, ৬. প্রতি ঘণ্টায় নূ্যনতম বেতন ১০ ডলার (বর্তমানে ৭.২৫ ডলার), ৭. ইরানে বিমান হামলা, ৮. নির্বাচনে চাঁদাবাজি বন্ধ, ৯. জলবায়ু পরিবর্তন রোধে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ, ১০. সবার জন্য চাকরির নিশ্চয়তা, ১১. পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুলি্লর ভবিষ্যৎ, ১২. লাদেনকে ধরে এনে কেন বিচার করা হলো না, তার ব্যাখ্যা ইত্যাদি। ওবামার আগামী চার বছর এ প্রশ্নগুলো বারবার উঠবে। তবে সব ছাপিয়ে অর্থনীতিকে বাগে আনা তার জন্য হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সবাই স্বীকার করেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আর আগের মতো নেই। গাড়ি শিল্পে প্রণোদনা দিয়ে তিনি এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু অন্যদিকে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে। এটা হবে তার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিকে বাগে আনতে না পারলে তিনি তার বিশাল জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবেন না। তার জন্য কাজটি খুব সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ধনী ও গরিব শ্রেণীর মাঝে বৈষম্য বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অসমতা, দারিদ্র্য, আর বৈষম্য সেখানে আকুপাই মুভমেন্টের জন্ম দিয়েছে, যা ইতোমধ্যে প্রায় ৪২০ দিন অতিক্রম করেছে। এই বৈষম্য কমিয়ে আনার এক কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে ওবামাকে। কাজটি সহজ নয়। পরিসংখ্যান বলে শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ৫ ভাগের ১ ভাগের মালিক হচ্ছেন জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ ভাগ মানুষ। ১৯৭০ সালে ধনী শ্রেণীর হাতে মোট আয়ের ৮ থেকে ৯ ভাগ অর্থ সঞ্চিত হতো। আজ ২০১২ সালে এসে তারা ভোগ করেন মোট সম্পদের ২৩ দশমিক ৫ ভাগ। ১০ ভাগ আমেরিকান দেশটির মোট বেতনের ৪৯ দশমিক ৭ ভাগ গ্রহণ করে। শীর্ষে থাকা ১ ভাগ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগের মালিক। জোসেফ স্ট্রিগলিৎজের মতে শীর্ষে থাকা ওই ১ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ ভাগ। এই ধনীরা এক রাতে জুয়া খেলায় হেরে যান লাখ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ঈধংরহড় ঈধঢ়রঃধষরংস। অর্থাৎ জুয়া নির্ভর এক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের অপর পিঠে রয়েছে অন্ধকার এক চিত্র। ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন, অর্থাৎ ১ কোটি ৬৪ লাখ শিশু অত্যন্ত গরিব। ২০১০ সালে করপোরেট হাউসগুলোর প্রধান নির্বাহীর বেতন বেড়েছে শতকরা ২৩ ভাগ। এ ধরনের পরিসংখ্যান আরো দেয়া যায়। এসব পরিসংখ্যান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঠিকমত চলছে না। বৈষম্য দিনে দিনে বাড়ছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে। যে সমাজে শতকরা ৪৭ দশমিক ৮ ভাগ মানুষ 'ফুড স্ট্যাম্প'র (খাদ্য সাহায্য) ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজেই একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল, যেখানে মূল দু'জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় করেছেন ৬০০ কোটি (কারো কারো মতে ১০০০ কোটি) ডলার। ওবামা বা রমনি আবার নিজের অর্জিত আয় থেকে এই অর্থ ব্যয় করেননি। তারা প্রকাশ্যেই চাঁদা তোলেন। বড় বড় ব্যবসায়ী তথা করপোরেট হাউসগুলো তাদের চাঁদা দেয়। এটা বৈধ। ওই চাঁদার টাকায় তারা নির্বাচন করেন। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারেন না বিধায়, তৃতীয় কোনো শক্তিশালী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন না। এবারও প্রায় ২৫ জন তথাকথিত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কিন্তু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউই থাকতে পারেননি। এদের নামও কেউ জানে না। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে একটা সমতা ফিরিয়ে আনা, সবার জন্য চাকরি ও স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না বারাক ওবামার জন্য। মানুষ ওবামার ওপর আস্থা রেখেছে এটা সত্য, কিন্তু সেই আস্থার প্রতি কতটুকু সম্মান তিনি দেখাতে পারবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। ওবামার বিজয় অবশ্য একটি বিষয়কে নিশ্চিত করেছে_ আর সেটি হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে বিমান হামলার সম্ভাবনা সীমিত হওয়া। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে সঙ্কট ওবামা তার সমাধানের জন্য আলাপ-আলোচনার ওপরই গুরুত্ব দেবেন। রমনি বিজয়ী হলে হামলার সম্ভাবনা বাড়ত। তবে ওবামার জন্য মধ্যপ্রাচ্য হবে একটি 'টেস্ট কেস'। সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন_ কোনো দেশ থেকেই সুবাতাস আসছে না। 'আরব বসন্ত' সেখানে সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু জন্ম দিয়েছে নতুন এক সঙ্কটের_ জঙ্গিবাদের উত্থান। আত্মঘাতী বোমাবাজির সংস্কৃতির সেখানে জন্ম হয়েছে। ওবামার বৈদেশিক নীতির এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে পুরনো প্রেসিডেন্টকে নতুনভাবে পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি শপথ নেবেন। কিন্তু অর্থনীতির মন্দাভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন কিনা, বৈদেশিক নীতিতে 'সফলতা' পাবেন কিনা, বিশ্বে স্থিতিশীলতা তিনি উপহার দিতে পারবেন কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।
Daily JAI JAI DIN
08.01.13

নির্বাচন ফর্মুলা ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা


আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম। সরকার বলছে, সংবিধানের নিয়ম অনুসরণ করেই নির্বাচন হবে। আর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হরতাল হয়েছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সর্বশেষ পথসভা করেছেন। চলতি সালে বিষয়টি নিয়ে যে রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হবে এটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। এরই মধ্যে ড. আকবর আলি খান একটি ফর্মুলা দিয়েছেন, যা প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ড. খান বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একজন উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি নিজে সর্বজন-গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী মিথ্যা বলেননি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ড. খানের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। ইদানীং তিনি এক ধরনের মিডিয়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। মিডিয়ার সামনে তিনি কথা বলতে পছন্দ করেন। তার বক্তব্য যে সর্বজন-গ্রহণযোগ্যতা পাবে তার কোনো মানে নেই। তবে কিছু কথা তিনি বলেছেন, যা আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে। তাই বলে তার বক্তব্যই যে চূড়ান্ত_ তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। তিনি যে ফর্মুলা উপস্থাপন করেছেন, সেখানে কিছু অসঙ্গতিও রয়েছে। তিনি চারটি বিকল্প প্রস্তাবের কথা বলেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে উচ্চ আদালতে একটি রেফারেন্স পাঠানোর কথা তিনি বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধানে যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিধান নেই, সেখানে উচ্চ আদালতে রেফারেন্স পাঠিয়ে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। কেননা, উচ্চ আদালত সংবিধানের বাইরে যেতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় দলের মধ্য থেকে ৫ জন করে সদস্য নিয়ে (প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতাও থাকবেন) একটি সরকার হবে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পরস্পর নিত্য বিষোদ্গার করে যাচ্ছেন, সেখানে তারা এক টেবিলে বসবেন কীভাবে? উপরন্তু প্রশ্ন থেকে যায়_ ওই সরকারে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? তৃতীয়ত, বলা হয়েছে দুটি বড় দল থেকে ১০ জন করে সদস্য নেওয়া হবে। ১০ জনের মধ্য থেকে ৫ জন করে সদস্যকে সংসদ নির্বাচন করবে। যদি আদৌ কোনো সমঝোতাই না হয়, তাহলে কোনো নামই অনুমোদিত হবে না। আমাদের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব সুখকর নয়। যে ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করে অসংসদীয় ভাষায় সংসদে তারা কথা বলেন, তাতে প্রস্তাবিত নামগুলো যে বিতর্ক ছড়াবে_ সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। চতুর্থত, প্রস্তাবে তিনি একটি গণভোটের কথা বলেছেন। আমাদের সংবিধানের দশম ভাগে গণভোটের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির একটি ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং গণভোটের যে কথা বলেছেন, তা অত সহজ নয়। তবে তার বক্তব্যের স্পিরিটকে আমরা গ্রহণ করতে পারি। আর স্পিরিটটি হচ্ছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন করার লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা। এটিই হচ্ছে মূল কথা। ধারণা করছি, সব শ্রেণীর মানুষও চায় একটি নির্বাচন হোক; কিন্তু তা যেন হয় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এ দেশে ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে (১৫ ফেব্রুয়ারি) তিনটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু ওই নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এমনকি ১৯৮৬ সালে এরশাদীয় জমানায় আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও সেই সংসদ স্থায়ী হয়নি। আজ সরকারের পক্ষ থেকে যে সংবিধানের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে কোনো অসত্য নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন যেখানে বড়, সেখানে সংবিধান বড় হতে পারে না।
সংবিধানে কোনো ধরনের সংশোধনী ছাড়াই নির্বাচন আয়োজন করার পেছনে একটি ঐকমত্যে পেঁৗছানো সম্ভব। যেমন ৫টি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এক. প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে দু\'দলের ৫ জন করে সদস্য নিয়ে একটি সরকার, যাদের দায়িত্ব শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। নিরপেক্ষতার স্বার্থে ওই ১০ সদস্যের কেউই নির্বাচনে অংশ নেবেন না। অথবা দুই. স্পিকারের নেতৃত্বে দু\'দলের ৫ জন করে সদস্য নিয়ে একটি সরকার। উভয় ক্ষেত্রে তারা তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে বাধ্য থাকবেন এবং নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রেও স্পিকারসহ কেউই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। অথবা তিন. সাংবিধানিক অধিকারী (অর্থাৎ যারা শপথ নিয়েছেন) ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সরকার, যারা নিরপেক্ষতার স্বার্থে নির্বাচনের পরপরই দায়িত্ব থেকে অব্যাহিত নেবেন। অথবা চার. সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি সরকার, যেখানে সচিবরা সাময়িকভাবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। অথবা পাঁচ. তিনজন সাবেক প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি \'এলডার্স কাউন্সিল\', যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এ ৫টি বিকল্পের যে কোনো একটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এর কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না, যদি আমরা নির্বাচন প্রশ্নে একটি ঐকমত্যে পেঁৗছতে পারতাম। আমরা সেই ঐকমত্যে পেঁৗছতে পারিনি।
গণতন্ত্র আমাদের একটা কথা শিখিয়েছে। আর তা হচ্ছে, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন। সে সঙ্গে জনগণের প্রতি আস্থা রাখাটাও জরুরি। সরকার যদি জনগণের পক্ষে কাজ করে থাকে, তাহলে তাদের জনগণের আস্থা হারানোর কোনো ভয় নেই। সরকার এই জানুয়ারিতে চার বছর পার করেছে। সরকার একটা তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের পরিস্থিতি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল আর আজকেইবা কেমন। সুশাসনের ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো। সরকারের অর্জনগুলো ম্লান হয়ে গেছে অনেক ব্যর্থতার কারণে। এটা সত্য, বৈশ্বিক অর্থনীতির ঢেউ বাংলাদেশে তেমন একটা লাগেনি। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, গ্রিস বা স্পেনের মতো পরিস্থিতি এ দেশে এখনও সৃষ্টি হয়নি। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ভালো। প্রবৃদ্ধি একদম খারাপ নয়। কিন্তু শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি সরকারের ভাবমূর্তি দেশ-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ছাত্রলীগের ভূমিকা, ক্যাম্পাসগুলোতে ভিসিদের \'নিয়োগ বাণিজ্য\' একজন ক্লিন শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকাকে উজ্জ্বল করেনি। ইউজিসির ভূমিকাও এখানে চোখে লাগার মতো নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের উচিত ছিল শক্ত অবস্থানে যাওয়ার। কিন্তু সরকার যায়নি। কেন যায়নি_ সে প্রশ্ন ভিন্ন। সাত দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। অথচ বিদ্যুতের দাম বাড়ালে যে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে ব্যাপারে সরকার উদাসীন। এটা সরকারের সুশাসনে ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে জনসাধারণকেই সুযোগ দেওয়া উচিত তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের। গণতন্ত্রের এ মূল স্পিরিটটি আমাদের দেশে অনুপস্থিত।
চলতি ২০১৩ সালে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলে ওই একটি ইস্যুতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে দরকার একটি সরকার, যাদের কাজ হবে শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা। এ ক্ষেত্রে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকারও হতে পারে। নামে কিছু যায়-আসে না। মূল বিষয়টি হচ্ছে, ওই সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন বটে; কিন্তু তার জট খোলেনি। কেননা, সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই একটি সরকারের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতাও পায়নি। আমরা সবসময়ই একটা ভুল করি। আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা বলি; কিন্তু সবসময়ই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আদলে আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের ভুলটা সেখানেই। পশ্চিমা সমাজ যেভাবে বিকশিত হয়েছে: সেখানকার সংস্কৃতি, শিক্ষা, সুশাসন, বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব_ সর্বোপরি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ তাদের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সেখানে ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি ব্যাপক অর্থে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অতীতে ফ্লোরিডার কেলেঙ্কারি সেখানকার নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কালিমালিপ্ত করেছিল। তাই বলে একটি \'ফ্লোরিডা\'র ঘটনা নিয়ে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়নি। এমনকি আমরা ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্তরেও যেতে পারিনি। আমরা ইতিমধ্যে ৪১ বছর পার করে ফেলেছি। ভারতের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী। আইন সেখানকার কমিশনকে অনেক শক্তিশালী করেছে; কিন্তু আমরা তা পারিনি। আমাদের সদিচ্ছার অভাব ছিল। অনেকেই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলেন। কিন্তু এখানে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। আমাদের সরকার অতীত ও বর্তমানে, কেউই সত্যিকারার্থে নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বিগত নির্বাচন কমিশন সদস্যরা বারবার বিদেশে গেছেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তারা কোথায়, কীভাবে ব্যবহার করেছেন, আমরা জানি না। কিন্তু রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা তাতে খরচ হয়েছে। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।কিন্তু আমরা ভুলে যাই সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যায় না। আর্থিক ভিত্তি, জনবল ইত্যাদির জন্য নির্বাচন কমিশন সরকারের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর পড়ে। এমনি এক পরিস্থিতিতে একটি ফর্মুলার কথা বলেছেন ড. আকবর আলি খান। তার সঙ্গে আমরা দ্বিমত করতেই পারি; কিন্তু আলোচনা হতে ক্ষতি কী! বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করুক। এটা সংসদে উত্থাপিত হলে ভালো হয়, যাতে পুরো জাতি তা জানতে পারে। এতে আলোচনার একটা সূত্রপাত হতে পারে বলে আমার ধারণা। আমাদের প্রত্যাশা এটাই যে, সরকার নির্বাচন প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে \'সংলাপ\' করুক। আমরা ২০১৩ সালকে একটি স্থিতিশীল বছর হিসেবে দেখতে চাই।
Daily SAMAKAL
08.01.13

‘আরব বসন্ত’ তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে

অতি সম্প্রতি মিসরে গণভোটে ইসলামি শরিয়াহ আইনভিত্তিক সংবিধান পাস হওয়ার পর স্পষ্ট করেই বলা যায় ‘আরব বসন্ত’ তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে দিয়ে আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে, সে প্রশ্ন থেকেই গেল। তেল ও জ্বালানি সম্পদ সমৃদ্ধ আরব বিশ্ব বিশ্ব রাজনীতিতে বরাবরই একটি ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে এখানে যে বৈশিষ্ট্য বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করেছিল তা হচ্ছে এখানে একদিকে ছিল রাজতন্ত্র অন্যদিকে ছিল স্বৈরাচারী শাসক চক্র, যারা বছরের পর বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছিল, যেখানে জনসাধারণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। অনেকটা রাজতন্ত্রের মতোই তারা ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিলেন। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি (১৯৬৯ সাল থেকে), সিরিয়ায় আসাদ (২০০০ সাল থেকে), ইয়েমেনে আব্দুল্লাহ সালেহ (১৯৭৮ সাল থেকে), মিসরে মুবারক (১৯৮১ সাল থেকে) ছিলেন সেসব স্বৈরশাসক, যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তিউনেসিয়ায় সাধারণ এক ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বওকুজিজির (যিনি কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও ছিলেন বেকার) গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা, (২০১০ সালের ডিসেম্বর) পুরো আরব বিশ্বের দৃশ্যপটকে পাল্টে দিল। জন্ম হলো ‘আরব বসন্ত’র। পতন ঘটল তিউনেসিয়ার স্বৈরশাসক বেন আলির। ফেব্র“য়ারি (২০১১) মিসরের তাহরির স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষের অবস্থান ধর্মঘট পদত্যাগ করতে বাধ্য করল হোসনি মোবারককে। একই ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ইয়েমেনে আলি আব্দুল্লাহ সালেহের পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানে গাদ্দাফি উৎখাত না হলেও মার্কিনি হামলায় শেষ অবধি উৎখাত ও নিহত হলেন। আসাদ সিরিয়ায় টিকে আছেন বটে; কিন্তু তার পতনও সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এভাবেই তৈরি হলো ‘আরব বসন্ত’র ইতিহাস। ষাটের দশকে সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে সমাজতন্ত্রবিরোধী যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল প্রাগ বসন্ত হিসেবে। প্রাগ বসন্ত সেখানে কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারেনি। কিন্তু ‘আরব বসন্ত’ আরব বিশ্বে পরিবর্তন ডেকে এনেছে। স্বৈরশাসকদের পতন ঘটেছে। এটা ছিল বিপ্লবের প্রথম স্টেপ। দ্বিতীয় স্টেপে একজন সর্বজন গ্রহণযোগ্য নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন। আর তৃতীয় স্টেপে ইসলামপন্থিরা ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে। যদি মিসরের দৃষ্টান্ত দেই, সেখানে ২০১১ সালের বিপ্লব হোসনি মুবারককে ক্ষমতাচ্যুত করে। দ্বিতীয় ধাপে ড. মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। আর তৃতীয় ধাপে সেখানে গণভোটে একটি সংবিধান অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে বলা আছে আইনের উৎস হবে শরিয়াহ। আগামী ফেব্র“য়ারি মাসে সেখানে নির্বাচন। মিসর ধীরে ধীরে একটি ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।
একপর্যায়ে ইসলামপন্থিরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিচ্ছে এই অভিযোগ তুলে উদারপন্থি, ধর্মনিরপেক্ষ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সদস্যরা সংসদ বয়কট করেছিল। এরপর কোনো রকম সংশোধনী ছাড়াই খসড়া সংবিধানটি সংসদে অনুমোদিত হয়েছিল। পরে খসড়া সংবিধানের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু বিরোধীদলীয় মোর্চ্চা ন্যাশনাল সালভেশন ফ্রন্ট এই গণভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোহাম্মদ মুরসি কি ইসলামের শরিয়াহভিত্তিক একটি সমাজ বিনির্মাণের উদ্যোগ নেবেন মিসরে? তার দল ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস’ পার্টি। ইসলামিক ব্রাদারহুড একটি ‘ধর্মভিত্তিক’ রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে। মুরসি কি এখন এদিকেই মিসরকে চালিত করবেন? এই মুহূর্তে এটি স্পষ্ট নয়। তবে মুরসি অতটা কট্টরপন্থি নন। তিনি ইসলামিক। তিনি ইসলাম আর গণতন্ত্রকে এক কাতারে দেখতে চান। আর এ কারণে তিনি ‘ইসলামিক গণতন্ত্র’র কথা বলছেন। সম্ভবত মিসর ‘তুরস্ক মডেল’ অনুসরণ করবে। তুরস্কে ইসলামপন্থিরা জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। তুরস্কের সেনাবাহিনী ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শের অনুসারী। মিসরের সেনাবাহিনীও অনেকটা তাই। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকারের দ্বন্দ্বের কথা সবাই জানেন। সেনাবাহিনী তখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। যে কারণে সেখানে সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা কম। মুরসি এমনটি চাইবেন মিসরের জন্য। এ ক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সফল হবেন, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। উপরন্তু ইসরাইলের ব্যাপারে নয়া প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। কেননা ইসরাইলের আগ্রাসী নীতির কারণে গোটা আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক কখনো ভালো হয়নি। ১৯৭৮ সালে মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও এ সম্পর্ক কখনই উন্নত হয়নি। এমনকি মিসরের কট্টরপন্থিদের হাতে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছিল। যদিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মুরসিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন এবং নয়া প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন তিনি সব চুক্তির প্রতি সম্মান জানাবেন। কিন্তু তার পরেও কথা থেকে যায়! কেননা ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব এখনো পরিপূর্ণভাবে ‘ইসরাইলবিরোধিতা’ থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তারা যে প্রভাব খাটাবেন তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এখানেই এসে যায় ‘রিয়েল পলিটিকস’র বিষয়টি। মুরসি এই রিয়েল ‘পলিটিকস’ কতটুকু অনুসরণ করেন, সেটাই দেখার বিষয়। তবে আমি মোহাম্মদ মুরসির সাম্প্রতিক দেয়া বক্তব্যে কিছুটা আশাবাদী। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি একটি জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি এই মুহূর্তে খুবই জরুরি। কেননা মিসর এখন একটি বিভক্ত সমাজ। একদিকে রয়েছে ইসলামিক কট্টরপন্থিরা, অন্যদিকে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষবাদী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মুবারক সমর্থকরা। ২০১১ সালে তেহরির স্কয়ারে ১৭ দিনের ‘বিপ্লব’ নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল মিসরে। দীর্ঘ ১৭ দিন দখলে রেখেছিল ‘বিপ্লবীরা’। মূলত তরুণরাই এই বিপ্লবের নায়ক। এরা সবাই যে ইসলামিক আদর্শকে পছন্দ করেন তা নয়, তারা মুবারকের অপশাসন (১৯৮১ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন) থেকে মিসরকে ‘মুক্ত’ করতে চেয়েছিলেন। ওই তরুণরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই তরুণ প্রজšে§র কেউ কেউ মুরসিকে সমর্থন করেছেন এটা সত্য। কিন্তু মিসর ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র হোক, এটি তারা চাইবেন না। মিসর ‘বিপ্লব’ এ নারীরা একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। সেনাবাহিনীর হাতে অনেক তরুণী নিগৃহীতও হয়েছিলেন। এরা নিশ্চয়ই চাইবেন না মিসরে নারীদের অধিকার সংকুচিত হোক, বাধ্যতামূলক পর্দা প্রথা আরোপ করা হোক। মিসরের নারীরা যথেষ্ট স্বাধীন। তারা আধুনিক মনস্ক। প্রেসিডেন্ট অঙ্গীকার করেছিলেন নতুন সরকারে কপটিক খ্রিস্টানদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং নয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। মুরসি বাস্তববাদী। তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তিনি আধুনিক মনস্ক একজন মানুষ। প্রকৌশল বিদ্যায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডক্টরেট ডিগ্রিও নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করছেন। তার রাজনৈতিক জীবনমাত্র ১২ বছরের। দীর্ঘ ৮৪ বছরের একটি সংগঠনের (ইসলামিক ব্রাদাহুড) প্রতিনিধি তিনি। দলে কট্টরপন্থি, উগ্রধর্মীয় আদর্শে বিশ্ববাসী এবং শরিয়াহ আইনভিত্তিক একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লোক অনেক রয়েছে। এদের ‘চাপ’ও থাকবে তার ওপর।
আরব বিশ্বে যে বসন্তের ঢেউ বইছিল তা এখন দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করল। তিউনেসিয়ার পর মিসর একনায়কতান্ত্রিক সরকারের উচ্ছেদের পর জনগণের ভোটে ইসলামপন্থিরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এটা ছিল বিপ্লবের দ্বিতীয় স্তর। তৃতীয় স্তরে কট্টরপন্থিদের অবস্থান শক্তিশালী হলো। গণভোটের পর ইসলামপন্থিরা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করবে। এই মুহূর্তে তাদের পাল্লাটা ভারী। নয়া সংবিধানের আলোকে দু’মাস পর সেখানে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে ইসলামপন্থিরা বিজয়ী হবে, এটাই আশা করা যায়। মিসরে ইসলামপন্থিদের উত্থান ‘আরব বসন্ত’ পরবর্তী আরব বিশ্বে একটি নয়া ইতিহাস রচনা করল। তিউনেসিয়ায় ইসলামপন্থিরা এককভাবে মিসরের মতো ক্ষমতা পরিচালনা করতে না পারলেও তারা ক্ষমতার অংশীদার। লিবিয়ায় ইসলামপন্থিরা শক্তিশালী হচ্ছে। ইয়েমেনে আল কায়দার ঘাঁটি অনেক দিন থেকেই আছে। আর সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। স্পষ্টতই আরব বিশ্বের দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। ইসলামপন্থিরা সেখানে তখন ক্ষমতার অংশীদার। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি? অক্সফোর্ডের মিসরীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষক তারিক রামাদান তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন ‘We are making a mistake, a very big mistake if we look at what we calls the Arab Awakening only by looking at the whole dynamics in political and not in economic terms.’ এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। অর্থনীতিতে যদি পরিবর্তন আনা না যায়, যদি বওকুজিজির মতো তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া না যায়, তাহলে তাহরীর স্কয়ার আবার উত্তপ্ত হবে। আরেকটি বিপ্লবের জন্য তৈরি হবে আরব বিশ্ব।
Daily Manobkontho
07.01.13

নির্বাচনী প্রতিশ্র“তির অধিকাংশই অপূর্ণ

নতুন বছরে এসে ফেলে যাওয়া বছরের দিকে তাকিয়ে দুটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এক. বছরজুড়ে ছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব। দুই. পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনি কেলেংকারি, শেয়ারবাজার কেলেংকারি, তাজরিন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট। সামগ্রিকভাবে পুরো বছরেই সুশাসনের অভাব অনুভূত হয়েছে। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা বছরের পুরোটা সময় রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রাখে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের বিষয়টি। বিরোধী দল এ নিয়ে হরতালও পালন করেছে। কিন্তু বছরের শেষদিন পর্যন্ত ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের বিষয়টি অনুদ্ঘাটিতই থেকে যায়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি বছরের শেষ দিকে এসে যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখন ঘটে দুটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। একজন বিচারপতির সঙ্গে বিদেশে অবস্থানকারী একজন আইন বিশেষজ্ঞের স্কাইপি আলোচনা একটি বিদেশী সাময়িকী ও বাংলাদেশী দৈনিক ফাঁস করে দেয়। ওই ঘটনায় বিদেশী সাময়িকীর বিরুদ্ধে রুল ইস্যু ও এক পর্যায়ে বিচারপতির পদত্যাগ পুরো বিচার প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের একটি চিঠি ও তুরস্কের একটি প্রতিনিধি দলের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আদালত পরিদর্শন বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি করে। সরকার আদালত পরিদর্শনের এ ঘটনার সমালোচনা করে। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের চিঠিকে সরকারের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধারণা করছি, চলতি বছর এ ঘটনায় বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
তবে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পদ্মা সেতুর ঘটনায় সরকারের সব অর্জন নষ্ট হয়ে গেছে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দুদকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত দল গঠন করেছিল। ওই তদন্ত দল দু’-দুবার বাংলাদেশে এসে দুদকের সঙ্গে মতবিনিময় করেও দুদকের কার্যক্রমে খুশি হতে পারেনি। স্পষ্টতই তারা বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে যে রিপোর্ট পাঠাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাতে দুদকের খুশি না হওয়ারই কথা। ফলে ধারণা করছি, পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আটকে গেল। দুদক পদ্মা সেতুতে ‘ষড়যন্ত্রের অভিযোগে’ যে মামলা করেছে, তাতে সেতু বিভাগের সাবেক সচিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। রিমান্ডে তিনি যে বক্তব্য দেন, যার অংশবিশেষ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম এসেছে। বিশ্বব্যাংকের তদন্ত টিমেরও দাবি ছিল, যেহেতু বিভিন্ন সূত্রে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেহেতু তাকেও আসামি করা হোক। দুদক সে কাজটি করেনি। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
টিআই’র রিপোর্টেও বাংলাদেশের দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়টিই একমাত্র অভিযোগ নয়। হলমার্ক ও ডেসটিনির কেলেংকারির ঘটনায় হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ মিডিয়ায় প্রকাশিত হলেও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। হলমার্ক ও ডেসটিনির এমডি গ্রেফতার হলেও টাকা উদ্ধার করা হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা আদৌ উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এ ঘটনা বিদেশে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। এমনকি তাজরিন গার্মেন্টের মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, টেন্ডারবাজি বছরজুড়েই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। চাঁদাবাজি করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে অসন্তোষের কারণে যেমন খুনের ঘটনা ঘটেছে, ঠিক তেমনি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ একজন দর্জি বিশ্বজিৎ দাসের খুনের ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্বজিৎ দাসের খুনের ঘটনায় অভিযুক্তরা শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হলেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের গ্রেফতার করা যায়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘অদৃশ্য কারণে’ প্রকৃত খুনিরা গ্রেফতার হয়নি। এতে বিভক্ত সাংবাদিক সমাজ একত্রিত হয়েছে। তারা পহেলা জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে এটা জানিয়ে দিতে ভোলেননি যে, তারা এ প্রশ্নে রাজপথ ছাড়েননি এবং আগামীতেও ছাড়বেন না।
মন্ত্রীদের দুর্নীতি ও অদক্ষতা একাধিকবার আলোচনার ঝড় তুলেছে। প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। রেলের দুর্নীতি (কালো বিড়াল) উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে নিজেই কালো বিড়াল বনে যান। দুর্নীতির সঙ্গে কয়েক লাখ টাকাসহ ধৃত মন্ত্রীর এপিএসের শেষ পর্যন্ত জেলহাজতে ঠাঁই হলেও মন্ত্রী দুর্নীতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা বারবার অস্বীকার করে এসেছেন। কিন্তু জনমত তার পক্ষে ছিল না। তিনি ‘ইমেজ সংকটে’ ভুগছিলেন। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ এবং আবার দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেলেও প্রধানমন্ত্রীর আস্থা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। নয়া মন্ত্রিসভা নিয়েও জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিল না। তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেননের মন্ত্রিসভায় যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হলেও হাসানুল হক ইনুর মন্ত্রিসভায় যোগদান ছিল অবাক করার মতো একটি ঘটনা। কেননা আওয়ামীবিরোধী রাজনীতি দিয়েই ইনুর জš§। গণবাহিনীর সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের একজন ছিলেন ইনু। যুগের পরিক্রমায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাসদের মশাল প্রতীক বাদ দিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে কুষ্টিয়ার একটি আসন থেকে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। এছাড়া মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই কোন দক্ষতা দেখাতে পারেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তার বিদেশ সফর নিয়ে মিডিয়ার প্রশ্নের সম্মুখীন হন। পররাষ্ট্রনীতিতে তার সফলতার কোন নজির নেই। অর্থমন্ত্রী বেশি কথা বলে খোদ নিজ দলের সংসদ সদস্যদের দ্বারাই সমালোচিত হয়েছেন। দু’-চারজন মন্ত্রীর দুর্নীতির খবরও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এনেও প্রধানমন্ত্রী চমক দেখাতে পারেননি। বছরের শেষ দিকে দলের কাউন্সিল হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থেকে গেলেন। নেতৃত্বে কোন পরিবর্তন এলো না। পর পর সাতবার সভাপতি নির্বাচিত হলেন শেখ হাসিনা। এটা তার জন্য একটা রেকর্ড।
সরকারের জন্য একটা খারাপ খবর ছিল, সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়া। বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোতে এর একটি প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। যদিও খুব দ্রুতই সরকার মন্দিরটি নির্মাণ করে দিয়েছে, তবে অভিযুক্তদের কেউ কেউ, যারা সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। যে বিষয়গুলো দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেনি তা হচ্ছে, গত চার বছরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গুমের ঘটনা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হওয়া, ক্যাম্পাসগুলো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া, ভিসি মহোদয়দের ব্যাপক দুর্নীতি, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ইত্যাদি। একটি ক্ষেত্রেও সরকারের কোন সাফল্য নেই। সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে যত শ্রম, শক্তি, অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে, উপরে উল্লিখিত একটি ক্ষেত্রেও তা ব্যয় করেনি। যদি ব্যয় করত তাহলে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতো। গুমের মতো ঘটনা আমরা রোধ করতে পারতাম। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা দূর করতে পারতাম। দেশে সুশাসনের পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে পারতাম। কিন্তু সরকারের ব্যর্থতা ছিল চোখে লাগার মতো।
সরকারের নীরব সমর্থন পেয়ে সন্ত্রাসীরা আরও শক্তিশালী হয়েছে, ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসীরা’ একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে সরকারকে বিতর্কিত করেছে, অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছেÑ অর্থনীতি যখন ঝুঁকির মুখে, তখন বৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী একের পর এক বেফাঁস মন্তব্য করে ‘নিরোর মতো বাঁশি বাজিয়ে গেছেন’। অর্থনীতিকে বাগে আনতে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি কোন বড় ধরনের উদ্যোগ নেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিতে পারতেন। তাতে বিতর্কের মাত্রা আরও বাড়ত। সম্ভবত অর্থমন্ত্রীর সম্মানের কথা ভেবে তিনি তাকে মন্ত্রিসভায় রেখে দিয়েছেন। দু’জন বিতর্কিত ব্যক্তিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েও তিনি এই সেক্টরে কোন ইতিবাচক ফলাফল জাতিকে উপহার দিতে পারেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাবিত একটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আইন অনুযায়ী তিনি চেয়ারম্যান হতে পারেন না। সরকারের কাছ থেকে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও পেয়েছেন।
এ ধরনের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আসলে পুরো বিষয়গুলোর সঙ্গে সরকারের সুশাসনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যেহেতু সুশাসন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেহেতু বিদেশী গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মন্তব্য করেছে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (এনআইসি) ২০১২ সালের যে গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১৫টি রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। এশিয়ায় মাত্র তিনটি রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রর ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অপর দুটি দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘চড়ঃবহঃরধষ ভড়ৎ পড়হভষরপঃ ধহফ বহারৎড়হসবহঃধষ রষষং.’ অর্থাৎ বলা হয়েছে যুদ্ধময় পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা। গবেষণায় যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রাধান্য পাবে, তা তো এখনই স্পষ্ট। এনআইসি ২০০৫ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল, ২০১৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। পাকিস্তানের বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে এনআইসি’র রিপোর্টটি সত্য বলে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। আরও একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করতে চাই। সেটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফান্ড ফর পিস এবং ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন প্রতিবছর যে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছে ২৯। অর্থাৎ পাকিস্তানের চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। সংস্থাটি মোট ১২টি প্যারামিটারকে সামনে রেখে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকা প্রকাশ করে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের প্রতিবেদনগুলো আদৌ পড়েন কিনা, আমার তাতে সন্দেহ রয়েছে।
তবে সরকারের গত চার বছরের মূল্যায়নে যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হচ্ছে, সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি সব পূরণ করতে পারেনি। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জেল থেকে মুক্তি, গুম, অপহরণ ও হত্যা, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী গার্মেন্ট মালিককে গ্রেফতার না করা, চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার ধসের ঘটনায় জড়িত ঠিকাদারকে গ্রেফতার না করা, প্রকাশ্যে ঘরে ঢুকে একাধিক মানুষ হত্যা, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় না আনাÑ ইত্যাদি ঘটনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশে আইনের শাসন তথা সুশাসনের বড় অভাব রয়েছে। তাই সরকারের ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো।
চলতি বছর নির্বাচনের বছর। সরকার যদি সমস্যা সমাধানে ও নির্বাচনের প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে কোন সমঝোতায় না পৌঁছে, তাহলে সংঘাত অনিবার্য। আর এভাবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাবে, আমরা কেউই যা চাই না।
Daily JUGANTOR
04,01.13

যে ছবি কথা বলে


সংবাদপত্রে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি ছাপা হয়। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই ছবি কথা বলে। কিন্তু গেল সপ্তাহে সংবাদপত্রগুলোতে এমন কয়েকটি ছবি ছাপা হয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে দেশটি ঠিকমত চলছে না, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। ১৯ ডিসেম্বরের একটি ছবি। ছবির ক্যাপসনে লেখা হয়েছে ছাত্রীসংস্থার আটক সদস্যদের সিএমএম কোর্টে হাজির করে রিমান্ডে নেয়া হয়। এর আগের দিন তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল মগবাজার থেকে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের মাঝে একজন অন্তঃসত্ত্বাও রয়েছেন। ভাবতে অবাক লাগে আমরা এই দেশে বসবাস করছি। একজন অন্তঃসত্ত্বাকে গ্রেফতার করা হল? বাকিদের দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে বিজ্ঞ আদালত! কী তাদের অপরাধ? শুধুমাত্র ছাত্রী সংস্থার সদস্য কিংবা হিজাব পরিহিতা এটাই কী তাদের অপরাধ? আমি একটা ধন্দে পড়ে যাই। ছাত্রী সংস্থা তো নিষিদ্ধ কোনো সংস্থা নয়? তাদের কেউ তো ‘চাপাতি শাকিল’ এর মতো প্রকাশ্যে সাধারণ কোনো মানুষকে হত্যা করেনি! এমনকি তাদের কারো নামে মামলা রয়েছে, এমনটিও নয়। তারপরও তাদের গ্রেফতার করা হলো এবং তাদের রিমান্ডে নেয়া হল। যেহেতু বলা হচ্ছে ছাত্রীসংস্থা, সেহেতু ধরে নিচ্ছি তারা ছাত্রী। ছাত্রীরা একটা সংগঠন করতেই পারে। এ দেশে ছাত্রলীগ রয়েছে, ছাত্রদল রয়েছে, ছাত্র সমাজ রয়েছে, কমিউনিস্ট পাটির রয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন। কই কোনো একটি সংগঠনকে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি। ছাত্রলীগ সারা দেশে খুন-খারাবি, টেন্ডারবাজি ও হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠলেও সরকার সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা তো দূরের কথা, সংগঠনটির  কর্মকাণ্ডও সাময়িকভাবে স্থগিতও করেনি। তাহলে ছাত্রীসংস্থার ওপর এই আক্রোশ কেন? সরকার যেখানে গণতন্ত্রের কথা বলে, যেখানে এ দেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে সংগঠন করার অধিকার দিয়েছে, সেখানে কোন যুক্তিতে ওই ২০ জন ছাত্রীকে গ্রেফতার করলো পুলিশ? আমাদের দেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বেশ কিছু ধারা রয়েছে যা, আমাদের অধিকারকে সংরক্ষণ করেছে। বিশেষ করে ২৭ নং অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), অনুচ্ছেদ ৩২ (জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার), অনুচ্ছেদ ৩৬, ৩৭, ৩৮ (চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা) ইত্যাদি উল্লেখ করা যায়। আমরা সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১১ অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করতে পারি যেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখন কোথায় থাকলো এ ধারাগুলো? বাংলাদেশে এতগুলো মানবাধিকার সংগঠন। একজন এডভোকেট মনজিল মোরশেদ মিডিয়ায় স্থান পাবার জন্য মানবাধিকারের কথা বলে প্রায়ই হাইকোর্টে রিট করেন। কোথায় গেলেন মনজিল সাহেব? মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজান সংবাদের শিরোনাম হতে ভালোবাসেন। তার চোখ কী করে এড়িয়ে গেল এই ২০ জন ছাত্রীর গ্রেফতারের ঘটনা? ভাবতে অবাক লাগে পুলিশ এই মেয়েদের চুল ধরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। তাদের নেকাব খুলতে বাধ্য করেছিল। ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা একজন ছাত্রীকে ৮ তলায় উঠতে বাধ্য করেছিল। শুধুমাত্র ছাত্রীসংস্থা করেনÑ এটাই কী তাদের অপরাধ? তাহলে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হোক। সংবিধান তো তাদের অধিকার দিয়েছে (অনুচ্ছেদ ৩৮) সংগঠন করার। তারা তো সংবিধানের বাইরে কিছু করেননি। তাদের রাজনীতি নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তারা তো ছাত্রলীগের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন না। নিরীহ, সাধারণ এই মেয়েদের রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় আমি দুঃখিত ও মর্মাহত। এই সভ্য দেশে এটা কখনোই কাম্য নয়। ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারী জামিন পাবার অধিকার রাখেন। তাঁকে তার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হলো। ক’দিন আগেও রোকেয়া দিবসে প্রধানমন্ত্রী নারী অধিকারের কথা বললেন। এখন একটি মেয়ে যখন কোনো রকম অন্যায় ও অপরাধ না করে জেলে যান, সর্বোপরি তিনি যদি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হন, তাতে করে কী তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না? প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব পেপার কাটিংই যায়। এই ছাত্রীদের গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার কাটিংও নিশ্চয়ই তার কাছে গেছে। এখন কী বলবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
সিপিবি-বাসদের হরতালের সময় পুলিশের ভূমিকার একটি ছবিও গেল সপ্তাহে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এটা ছিল বাহ্যত সরকার সমর্থিত একটি হরতাল। যেখানে অন্য সময় পুলিশ হয়ে ওঠে বেপরোয়া, এবার দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। একটি ছবিতে দেখা গেল পিকেটাররা বাধ্য করছে এক রিকশা চালককে ফিরে যেতে। পাশে দাঁড়ান একদল পুলিশ নির্বিকার। ভাবখানা এমনই যে রিকশাওয়ালা রিকশা বের করলো কেন? আজ তো হরতাল। এই ছবি কী আমাদের বোঝার জন্য যথেষ্ট নয় যে, সরকারই ওই দিন হরতাল করেছে!  আসলে ছবি কথা বলে। ছবিই বলে দেয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কী নির্দেশ ছিল পুলিশের প্রতি! বিশ্বজিৎ এর হত্যার দৃশ্য ধারণ করে ফটো সাংবাদিকরা আমাদের দেখিয়ে দিলেন সরকার আসলে ওইদিন কী চেয়েছিল। বিশ্বজিৎ এর হত্যাকাণ্ডকে নানাভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। বিশ্বজিৎ একজন শিবির কর্মী, একজন অনুপ্রবেশকারীÑ এ ধরনের বক্তব্য এসেছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে। হত্যাকারীরা আদৌ ছাত্রলীগ কর্মী নন, এ ধরনের দাবি ছাত্রলীগের নেতাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হলেও ছবিই প্রমাণ করে দিয়েছে পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। হত্যাকারীরা চেয়েছিল একটি ভয়ের আবহ তৈরি করতে।
বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড, কুপিয়ে প্রকাশ্যে একজন মানুষকে হত্যা করার ঘটনায় সরকারের কোনো উদ্বিগ্নতা প্রকাশ না পেলেও, উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি হত্যাকাণ্ডের এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তার মন্তব্য প্রমাণ করে বিদেশীদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে নিশ্চিন্তপুরের ১১১ জন শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। এখন এর সাথে যোগ হলো প্রকাশ্যে মানুষ মারার ঘটনা। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের বড় বাজার, সেই বাজার এখন হারাতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে। স্পষ্টতই পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ এই বাজার হারাবে। ইতোমধ্যে ওয়ালমার্ট বাংলাদেশ থেকে তার তৈরি পোশাক ক্রয় বাতিল করেছে। কেননা নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টস ওয়ালমার্টকে বিশেষ ধরনের পোশাক সরবরাহ করতো। এটা বন্ধ হয়ে গেল। এটা অন্যদের ক্ষেত্রেও একটা প্রচ্ছন্ন ‘হুমকি’। নিশ্চিন্তপুরের ‘হত্যাকাণ্ডের’ সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম, কিংবা ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস ফোরামের মতো সংগঠন তৎপর হয়েছে। এমনকি স্টেট ডিপার্টমেন্টও একটি মন্তব্য করেছে। তারা স্পষ্ট করেই বলেছে পোশাক শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর।  এ ধরনের মন্তব্য আমাদের জন্য একটি ‘ম্যাসেজ’। পোশাক শিল্প স্পষ্টতই একটি ঝুঁকির মুখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। এবং শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে যেসব মানবাধিকার সংস্থা কাজ করে, তারা ওয়াশিংটনে এক ধরনের ‘লবিস্ট’ হিসেবে কাজ করে। কংগ্রেসম্যানদের তারা বাধ্য করে আইন প্রণয়ন করতে। এমনকি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তৈরি পোশাক শিল্পে জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধা চেয়ে আসছে। বাংলাদেশ এই সেক্টরে এই সুবিধা পায় না। কিছু কিছু সেক্টর, যেমন- সিরামিক, সার, ফার্নিচার ইত্যাদি শিল্পে জিএসপি সুবিধা পায়। তৈরি পোশাকে পায় না। শতকরা ১৫ ভাগ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে প্রবেশ করছে। গুণগত মান ও সস্তা থাকায় বাংলাদেশী এই পণ্যের বড় বাজার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এখন এই জিএসপি সুবিধাও প্রশ্নের মুখে থাকলো। আমি আশঙ্কা করছি মার্কিন শ্রমিক সংগঠন তথা শ্রমিক স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘বাবো’ কংগ্রেসে একটি আইন প্রণীত হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা হতে পারে। এটা হলে বাংলাদেশের জন্য তা হবে এক ধরনের ‘আত্মহত্যার সামিল’। কেননা আমাদের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প একটা বড় অবদান রাখছে। ইউরোপের অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করায় সেখানে বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এমনকি সেখান থেকে ‘অর্ডার’ও কমে আসছে। ফলে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা যদি হ্রাস পায়, তা আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে হুমকি। এমনকি ‘কমপ্লাইয়েন্স’ এর যে সুযোগ-সুবিধা মার্কিন ক্রেতারা দাবি করছে, তা নিশ্চিন্তপুরের ঘটনার পর আরো শক্তিশালী হবে। ‘কমপ্লাইয়েন্স’ এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার উপর জোর দেবে। শুধু তাই নয় একই সাথে তারা চাইবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি। প্রকাশ্যে মানুষ খুন করা হবে, আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন, অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় জেলে পাঠানো হবেÑ এসব ঘটনা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এসব ঘটনায় বাংলাদেশ এক ধরনের ‘ইমেজ’ সঙ্কটের মুখে থাকবে। তাই আমরা বলেছিলাম ছবি কথা বলে। ড. মিজানের মতো তথাকথিত ‘সরকারি মানবাধিকার কর্মীরা’ অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের গ্রেফতারে ‘কথা’ না বললেও ছবি কথা বলেছে। ছবিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এটা বুঝতে আমাদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্টের দিকে তাঁকানোর প্রয়োজন নেই। এই ছবিগুলোই তা বোঝার জন্য যথেষ্ট।
28.12.12

‘সরকারকেই সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে’

জাকারিয়া পলাশ: নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান। তিনি বলেছেন, সঙ্কট সমাধানে সরকারকে সংলাপের উদ্যোক্তা হতে হবে। একই সঙ্গে সব ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করে সংলাপে বসতে হবে। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে অতীত সংলাপ অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, এমন অবস্থায় সংলাপ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কারণ কি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অতীত এবং বর্তমানের প্রেক্ষিত একরকম না। আমরা সামনে তাকাতে চাই। অতীত ভুলতে চাই। বর্তমানের রাজনৈতিক সঙ্কটটি বুঝতে হবে। বিরোধী দলীয় নেত্রী, বেগম খালেদা জিয়া বলে দিয়েছেন তত্ত্বাবধাক সরকার ছাড়া কোন বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ অনঢ় দলীয় সরকারের অবস্থানে। সুশীল সমাজ এবং দাতাগোষ্ঠী বলছে একটা ডায়ালগের প্রয়োজনীতার কথা। আবার সৈয়দ আাশরাফ বললেন ভেতরে ভেতরে সংলাপ চলছে। বিএনপি আবার এর প্রতিবাদ করেছে। একে ষড়যন্ত্র বলেছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। সংলাপ কিন্তু কোন গোপন বিষয় নয়। এটা ওপেন ডায়ালগ হতে হবে। এবং সরকারকেই সে উদ্যোগ নিতে হবে।
ডায়ালগের পরিবেশ কি আছে? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের ফর্মূলাকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার আর বিরোধীদল এক মঞ্চে কিভাবে আসবে? এমন প্রশ্নে ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, এভাবে কোন প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করাটা ঠিক হয়নি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী এমন করলে তো হবে না। তিনি সবার অভিভাবক। তাকে সবার কথা শুনতে হবে। সবার প্রতি সহনশীলতা দেখিয়ে আলোচনার পরিবেশটা তৈরি করা। সেটা তৈরিতে সরকার বিশেষ করে প্রধানন্ত্রীকেই উদ্যোগী হতে হবে। এটা অবশ্যই ঠিক যে, ফর্মূলা প্রত্যাখ্যান হোক বা না হোক দেশের সব সংকটকালেই বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ এবং নিঃস্বার্থ ভূমিকা রেখেছে। সে চেষ্টা অব্যহত থাকবে বলে আমি মনে করি।
Daily MANOBJOMIN interview
03.01.2013

২০১৩ : আন্তর্জাতিক রাজনীতি







আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক ঘটনা ও অঘটনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সাল পার হলো। কেমন হবে ২০১৩ সাল? ২০১২ সালের যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ করেছিলাম, তার ধারাবাহিকতায় কি কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করব? এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ২০১২ সালের কোনো কোনো ঘটনা ২০১৩ সালের রাজনীতিতেও কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে। প্রথমেই বলতে হয়, মিসরের ঘটনাবলির কথা। ২০১১ সালের 'আরব বসন্ত' ৩০ বছরের ক্ষমতায় থাকা হোসনি মুবারককে উৎখাত করেছিল। আরব বসন্ত মিসরে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনার জন্ম দিলেও, সেই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। যে সংবিধান সেখানে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পর পর দুইবারের গণভোটে যা অনুমোদিতও হয়েছে, সেই সংবিধান মিসরবাসীকে বিভক্ত করেছে। মুবারকবিরোধী আন্দোলনে ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, সমাজতন্ত্রী, তথা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট- সবাইকে একত্রিত করেছিল। তাহরির স্কয়ারের ১৭ দিনের 'বিপ্লব' ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোসনি মুবারকের উৎখাতের মধ্য দিয়ে নতুন একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু দেখা গেল, ইসলামপন্থীরা এককভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা 'ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস' পার্টির প্রার্থী হিসেবে মুরসি বিজয়ী হলেও তিনি মিসরবাসীকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান উপহার দিতে পারেননি। বরং খসড়া সংবিধানে বলা হয়েছে, আইনের প্রধান উৎস হবে শরিয়াহ। শরিয়াহ আইন প্রবর্তিত হলে অমুসলমান, বিশেষ করে কপটিক খ্রিস্টানরা বৈষম্যের শিকার হবেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে বলেও নারীসমাজের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। দুই মাস পর সেখানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর তাতে করে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হবে, এটাও ধারণা করা যায়। ২০১৩ সালে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের সংঘাত ও দ্বন্দ্ব আরো বাড়বে। তবে অনেকেরই দৃষ্টি থাকবে সালাফিস্টদের দিকে। এরা কট্টরপন্থী ইসলামিক আদর্শে বিশ্বাসী। সংবিধান গঠন করার জন্য যে সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে অবশ্য সালাফিস্টরা খুব সুবিধা করতে পারেনি। তবে স্পষ্টতই মিসরের রাজনৈতিক উত্থান-পতন আরব বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তিউনিসিয়া। সেখানে নির্বাচন হয়ে গেছে এবং ইসলামপন্থীদের সঙ্গে গণতন্ত্রমনা তথা সমাজতন্ত্রীদের একটা সমঝোতা হয়েছে। এই সমঝোতা ভেঙে যায় কি না, ২০১৩ সালে এটা হবে আলোচনার অন্যতম বিষয়। সিরিয়ার পরিস্থিতি ২০১২ সালে ব্যাপক দৃষ্টি কাড়লেও, কোনো সমাধান হয়নি। চলতি বছর সিরিয়ায় একটা 'সমাধান' আমরা দেখতে পারব। তবে সিরিয়ায় যে নয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে, তাতে আসাদের আদৌ কোনো ভূমিকা থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সিরিয়া সংকটের শুরুতে প্রথমদিকে মনে করা হয়েছিল, আসাদ হয়তো টিকে যাবেন; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আসাদের বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু যে প্রশ্নটি পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, তা হচ্ছে আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় কারা ক্ষমতাসীন হচ্ছেন। সেখানে আদৌ জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, এদিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে দুটি মন্তব্য করা যায়। এক. সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দেশটিকে আরেকটি লেবাননে পরিণত করতে পারে। দুই. সিরিয়ায় আল-কায়েদার প্রভাব বাড়তে পারে। তবে সিরিয়ার রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে তুরস্কের একটি বড় ভূমিকা থাকবে। ২০১৩ সালের রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বিগ্নতা ও একটি সমঝোতা প্রত্যাশিত হলেও, ২০১৩ সালে বড় ধরনের একটি বিপর্যয়ের মুখোমুখিও হতে পারে বিশ্ব। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে ইসরায়েলি বিমান হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। তাঁর প্রশাসন নতুন একজন পররাষ্ট্রসচিব পাবে। তবে এতে করে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। মার্কিন প্রশাসনে ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলেও, নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। এ ক্ষেত্রে হিলারি ক্লিনটনের পরিবর্তে জন কেরি দায়িত্ব পেলেও, মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে ২০১৩ সাল ওবামার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। এই প্রক্রিয়া শুরু হবে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে। ওবামার জন্য তাই যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সেখানে বিকল্প একটি বাহিনী রেখে যাওয়া। এটা অনেকটা নিশ্চিত, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন তথা ন্যাটোর সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হলে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চল তালেবানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। হামিদ কারজাই শুধু কাবুলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বেন। তালেবানদের সঙ্গে আলোচনাও ফলপ্রসূ হয়নি। ওবামা প্রশাসন মুসলিম দেশগুলোর সমন্বয়ে বিকল্প একটি বাহিনী গঠন করার উদ্যোগ নিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানে এখনো যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্য-এশিয়ায় তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার স্বার্থে আফগানিস্তানে তাদের 'টোকেন' উপস্থিতিও থাকবে। ২০১৪-পরবর্তী আফগান রাজনীতিতে ভারতেরও একটা বড় ভূমিকা থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে 'সামরিক ঐক্য' গড়ে উঠেছে, তা ২০১৪-পরবর্তী আফগানিস্তানে একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে রাশিয়ার পুতিন প্রশাসনের সম্পর্কের দিকেও অনেকের দৃষ্টি থাকবে। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের নৌ উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বলেছে। এতে করে পরোক্ষভাবে চীনের ওপর একটি 'চাপ' সৃষ্টি করা হবে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে রাশিয়ার স্প্রিট বাড়ানোর কথা বলেছে। ২০১৩ সালে দুই পরাশক্তির এই অঞ্চলে উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। তৃতীয়ত, চীনের সঙ্গে ওবামা প্রশাসনের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, ২০১৩ সালে সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষকদের লক্ষ্য থাকবে।
ক্রেমলিনে আবার পুতিনের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব আসরে রাশিয়ার তৎপরতা বেড়েছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করেই ডিসেম্বরের (২০১২) শেষদিকে পুতিন ভারত সফর করেছেন এবং ৭৫০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির আওতায় রাশিয়া থেকে ভারত ৪২টি এমইউ-৩০ জঙ্গিবিমান, ৭১ এমআইএল এমআই-১৭ হেলিকপ্টার ও ৯৭০ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন কিনবে। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া ভারতের সঙ্গে তাদের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিল, তা দৃঢ় করল। রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি ইউরো-এশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনেকটা ইউ অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন মডেলে। ইতিমধ্যে কাজাখস্তান ও বেলারুশকে দিয়ে রাশিয়া একটি কাস্টমস ইউনিয়ন গঠন করেছে। রাশিয়া চাচ্ছে এই কাস্টমস ইউনিয়নে ইউক্রেন, কিরঘিজস্তান ও তাজিকিস্তান যোগ দিক। ২০১৩ সালে রাশিয়া এ লক্ষ্যে কাজ করে যাবে। একই সঙ্গে সামরিক জোট CSTO (Collective Security Treaty Organization)-এর ব্যাপারেও আগ্রহ থাকবে অনেকের। CSTO মূলত একটি সামরিক জোট। রাশিয়ার উদ্যোগে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে নিয়েই এই CSTO গঠিত হয়েছে। স্পটতই রাশিয়া CSTO-এর মাধ্যমে War show Treaty Organization (গঠিত ১৯৫৫)-কে পুনরুজ্জীবিত করতে চাচ্ছে। একই সঙ্গে SCO বা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের কথাও উল্লেখ করা যায়। চীন সামরিক জোট SCO-এর সদস্য। একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার মুসলিমপ্রধান দেশগুলোও এর সদস্য। দুটো কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ আছে এ অঞ্চলে। এক. মধ্য এশিয়ার জ্বালানিসম্পদ। দুই. এ অঞ্চলে আল-কায়েদার উত্থান। এ অঞ্চলজুড়ে রয়েছে চীনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। সুতরাং চীনের স্বার্থ অনেক বেশি। এ অঞ্চল থেকে চীন গ্যাস আমদানি করছে। মধ্য এশিয়ার গ্যাস অন্যত্র রপ্তানি করতে মার্কিন কম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগে রয়েছে এ অঞ্চলে। ফলে এ অঞ্চলজুড়ে ২০১৩ সালে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা যাবে। এখানে আরো একটা কথাও উল্লেখ করা যায়। চীনে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসছে। ২০১৩ সালের মার্চে শি জিন পিং রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন লি কে কিয়াং। শি জিন পিং বেশ কিছুদিন ক্ষমতায় থাকবেন। তিনি আগামী দশকে চীনকে নেতৃত্ব দেবেন। তিনি আধুনিকমনস্ক একজন নেতা। তিনি চীনে কতটুকু সংস্কার আনেন, সেটাও দেখার বিষয়। বিশ্ব রাজনীতির অনেক কিছুই এখন চীনা নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছে। কেননা অর্থনৈতিক মন্দার কবল থেকে বিশ্ব এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মন্দাভাব এখনো বিরাজ করছে। গ্রিসে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। গ্রিস ইউরো জোনে থাকবে কি না, সে প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে। স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও ফ্রান্সের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে। ২০১৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকবে- এ ক্ষেত্রে চীন বড় ভূমিকা নিতে পারে। বিশ্ব জিডিপির ২৩ শতাংশ এখন যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন করে। চীন ও ভারতের অবদান ১৭ ও ৭ শতাংশ; কিন্তু চীনের অবদান বাড়ছে। OECD'র হিসাব মতে, ২০৬০ সালের দিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবদান থাকবে ২৫ শতাংশ, ভারতের ১৮ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ শতাংশ। চীন ও ভারত জি-৭-এর জিডিপির প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করে। ২০৬০ সালে এদের অবদান জি-৭-এর মোট অবদানের ১.৫ গুণ বেড়ে যাবে। সুতরাং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Strategic Reassurance-এর যে নীতি বুশ প্রশাসনের আমলে ঘোষিত হয়েছিল (China responsible stakeholder), তা অব্যাহত থাকলে বিশ্বে উত্তেজনা হ্রাস পাবে। তাই ২০১৩ সালে ওবামা প্রশাসনের ভূমিকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
Daily KALERKONTHO02.01.13