হরতালের রাজনীতি যেন এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।
হরতাল হচ্ছে। গাড়ি ভাংচুর হচ্ছে। অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বিশেষ করে গার্মেন্ট সেক্টরের ব্যবসায়ীদের আকুল মিনতি
সংবাদপত্রে ছাপা হলেও যারা হরতাল আহ্বান করেছেন, তাদের কর্ণকুহুরে তা আদৌ
প্রবেশ করেছে বলে মনে হয় না। হরতালে একটি দেশের অর্থনীতিতে যে কী ক্ষতি
ডেকে আনে, এটা যেমন সরকারের নীতিনির্ধারকরা বোঝেন— ঠিক তেমন বোঝেন যারা
হরতাল ডাকেন, তারাও। কোন দল অতীতে কতবার হরতাল করেছে, এ তথ্য একাধিকবার
সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাতে কি কারো যায় আসে? যারা হরতাল
ডাকার, তারা হরতাল ডাকবেনই। আর যারা ক্ষমতায়, যারা হরতালের বিরুদ্ধে, তারা
হরতালের বিরুদ্ধে কথা বলবেনই। মাঝখানে আমরা যারা আমজনতা, তারাই হরতালে
পিষ্ট হচ্ছি!
প্রশ্ন হচ্ছে হরতাল কেন? হরতাল ডেকে একটি পক্ষ (এক্ষেত্রে বিরোধী দল) অন্য
পক্ষের (এক্ষেত্রে সরকার) ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে সুবিধা আদায় করে নিতে চায়।
সরকারের পতন চায়। কিন্তু হরতাল ডেকে কি অতীতে কখনো সরকারের পতন ঘটানো
গেছে? ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার পর সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনী
এনে আমরা ‘গণতন্ত্রের দ্বিতীয় যাত্রাপথে’ হাঁটতে শুরু করেছিলাম। পুনরায়
সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে গিয়ে আমরা সত্যিকার অর্থে উদারমনা গণতন্ত্র
বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলাম! বিশ বছর পার হয়েছে। চারটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে।
ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু কত দূর এগোতে
পেরেছি আমরা? হরতালের পর হরতাল হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ বর্জন (যে যখন
বিরোধী দলে থাকে) যেন এক ধরনের ‘গণতান্ত্রিক ফ্যাশনে’ পরিণত হয়েছে। উদার
গণতন্ত্রে যে ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস’, অর্থাত্ বিরোধী পক্ষকে আস্থায়
নেয়ার কথা, তা গত বিশ বছরেও তৈরি হয়নি। ‘আমিত্ব’ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে
পারিনি। তাই বিরোধী দলের কাছে অর্থ একটাই— হরতালের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন
ঘটানো!
হরতালে সরকারের পতন হয় না। কিন্তু ক্ষতি হয় সবার; সাধারণ একজন মুদি দোকানি
ও ফুটপাতের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় রফতানিকারক, সবার। ক্ষতির একটা
পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। তা অনেকটা এ রকম: ক্ষুদ্র ব্যবসা ৫০০ কোটি টাকা,
পোশাকশিল্পে ৩৬০ কোটি, রাজস্ব খাতে ২৫০ কোটি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ৫০
কোটি, শিক্ষা খাতে ৫০ কোটি, বীমা খাতে ১৫ কোটি ও পেট্রল পাম্পে ১০০ কোটি
টাকা। এটা প্রতিদিনের হিসাব। এ হিসাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য
থাকতেই পারে। কিন্তু ক্ষতি তো হয়ই। সাধারণ মানুষও তা বোঝে। বোঝেন আমাদের
রাজনীতিবিদরাও। এরই মধ্যে বাংলাদেশ একটি ‘হরতালের রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে।
পোশাক আমদানিকারকরা আস্তে আস্তে বাংলাদেশের ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।
তারা নতুন বাজার পেয়েছেন ভিয়েতনাম আর লাওসে। মিয়ানমার ‘উন্মুক্ত’ হয়ে
যাওয়ায়, মার্কিনদের একটা বড় বাজার হতে যাচ্ছে দেশটি। এরই মধ্যে বেশকিছু
মার্কিন কোম্পানি দেশটিতে তাদের অফিস খুলেছে। সেখানে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও
বাড়ছে। বাংলাদেশের এ রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন পশ্চিমা বিশ্বের গণমাধ্যমে
ব্যাপকভাবে প্রচার হচ্ছে। গণমাধ্যমে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের
রাজনীতির গতিধারা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এটা তো সত্য, রাজনৈতিক অস্থিরতার
কারণে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না এবারও। এডিবি তাদের সর্বশেষ
পর্যবেক্ষণে বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ৭
শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, ৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। অথচ চলতি বাজেটে
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এখন সেটা কল্পনায়ই
থেকে গেল। বাংলাদেশের একটা বিশাল সম্ভাবনা ছিল। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এ
দেশটিতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক কোটি। প্রতি বছরই কর্মক্ষম
জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা এ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উত্পাদনশীল কাজে
ব্যবহার করতে পারতাম। এদের যদি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া যেত, তাহলে এরা
অর্থনীতিতে একটা বড় অবদান রাখতে পারত। যেখানে ইউরোপে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
কমছে, সেখানে আমাদের বাড়ছে। চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব
অর্থনীতিতে অন্যতম শক্তি হিসেবে পরিণত হয়েছে। তবে চীনে বয়সী মানুষের সংখ্যা
বেড়ে যাওয়ায়, তারা উত্পাদনে কোনো অবদান রাখতে পারছে না। এ বয়স্ক নাগরিকদের
পেনশনসহ সামাজিক নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্রের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের যে অবস্থান (বর্তমানে দ্বিতীয়), আগামী কয়েক দশক পর
দেশটি আর তা ধরে রাখতে পারবে না। একসময় ব্রিক দেশগুলো অন্যতম অর্থনৈতিক জোট
হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্রিকে যোগ দেয়ায় এ জোট
শক্তিশালী হয়েছিল, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু গোল্ডম্যান স্যাকসের
অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিলের মতে, (যিনি ২০০১ সালে ব্রিকসের উত্থান নিয়ে
ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন), ব্রিকস আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই দুর্বল একটি
অর্থনৈতিক জোটে পরিণত হবে। তার যুক্তি, ‘Economic growth in Russia or
China would be hampered by shrinking working age population, so India
and Brazil would be placed with countries that boat growing economics
and population’। তিনি মিথ্যা বলেননি। জিম ও’নিল নতুন একটি অর্থনৈতিক জোট
MIKT-এর কথা বলেছেন, আর জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
জ্যাক প্লেডস্টোন বলেছেন অন্য একটি জোট TIMBI-এর কথা। বাংলাদেশের বিপুল
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিক্ষিত শ্রেণীর উত্থান এ দেশকে আগামী দশকে MIKT অথবা
TIMBI জোটে নিয়ে যেতে পারত। বলা ভালো, প্রতিটি দেশের প্রথম অক্ষর নিয়ে নতুন
জোটকে পরিচিত করানো হচ্ছে, অনেকটা ব্রিকসের মতো। যেমন MIKT-তে রয়েছে
মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক। আর TIMBI জোটে আছে তুরস্ক,
ভারত, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, এসব
দেশের প্রতিটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। ভারতে দারিদ্র্য থাকলেও
(২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী জনগোষ্ঠীর ৩৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ লোক দরিদ্র);
বিশ্বব্যাংকের মতে, আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত
হবে। তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখবে ১৭ শতাংশ (২০০৭ সালে মাত্র ২
শতাংশ)। মাথাপিছু আয় গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে (বর্তমানে ৯৪০ ডলার)।
তুরস্কের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপর। ইউরোপে যেখানে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস
নেমেছে, সেখানে তুরস্কের অর্থনীতিতে তা এতটুকু প্রভাব ফেলেনি। ভারত ও
তুরস্ক এটা অর্জন করতে পেরেছে। কারণ সেখানে রয়েছে বিপুল শিক্ষিত এক
জনগোষ্ঠী। রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত
করতে পারতাম, আমরাও ভারত ও তুরস্কের কাতারে নিজেদের নিয়ে যেতে পারতাম।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের বড় অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়। এখন আমাদের
রাজনীতিবিদরাই সিদ্ধান্ত নেবেন, তারা একুশ শতকে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যেতে
চান।
এখন পরিস্থিতি যেদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা আমাদের কোনো আশার কথা বলে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা নিক (National Intelligence
Council— NIC) বৈশ্বিক প্রবণতার ওপর ২০১২ সালে যে Global Trends রিপোর্ট
প্রকাশ করেছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১৫টি রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে
পরিণত হবে, তার একটি তালিকা রয়েছে। ওই তালিকায় এশিয়ায় যে তিনটি রাষ্ট্র
ব্যর্থ রাষ্ট্রের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে
বাংলাদেশের নামও রয়েছে। অন্য দুটি দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান।
যুক্তি হিসেবে নিক উল্লেখ করেছে সংঘাতময় পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশকে আমরা কোনোভাবে
মেলাতে পারব না, এটা সত্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের গুলিতে প্রায় ১৭০ জন সাধারণ মানুষের
মৃত্যু, পুলিশের মৃত্যু, বিরোধী দলের নেতাদের ওপর গুলিবর্ষণ, তাদের আহত করা
ও গ্রেফতার, গত ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দেড়শতাধিক গাড়িতে আগুন
(আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিলে) কিংবা ১২ এপ্রিল খুলনায় ভারতের
হাইকমিশনারের গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা একথাই প্রমাণ করে— বাংলাদেশ বড়
ধরনের একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অস্থিরতা একদিকে
গণতন্ত্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে। এর
সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে লাগাতার হরতালের বিষয়টি।
হরতাল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বেমানান। কিন্তু বিরোধীদলীয় জোটের কাছে
হরতাল ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প আছে বলেও মনে হয় না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের
জন্যও এটা মঙ্গল হরতালের ব্যাপারে একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো, যাতে আমরা
ভবিষ্যতে হরতাল পরিহার করতে পারি। সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এজেন্ডা
বাস্তবায়নের একটা কৌশল হিসেবে হরতাল ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু হরতালকে
কেন্দ্র করে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ
প্রেক্ষাপটে হরতালের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। যেহেতু হরতাল হচ্ছে
এক ধরনের প্রতিবাদ, সেক্ষেত্রে এর অংশ হিসেবে কোনো একটি জায়গায় গণজমায়েত
হতে পারে, মানববন্ধন হতে পারে, এক ঘণ্টার জন্য সবকিছু বন্ধ থাকতে পারে।
হরতালের বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
মতো পুঁজিবাদী সমাজেও ‘শাটডাউন’ অর্থাত্ ধর্মঘটের মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু
আমাদের দেশের মতো দীর্ঘস্থায়ী সবকিছু বন্ধ থাকে না। সহিংস ঘটনাও সেখানে ঘটে
না। হয়তো দেখা গেছে, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে শ্রমিকরা হাতে
প্ল্যাকার্ড নিয়ে একটি সীমিত এলাকায় ঘুরে ঘুরে শ্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ
জানাচ্ছে। এটাই তাদের প্রতিবাদের ধরন। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মালিকপক্ষ
কিছু দাবিদাওয়া মেনে নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে
শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে হরতাল বা শাটডাউনের ঘটনা ঘটেছে খুব কম
ক্ষেত্রেই। এখানে আর্থিক বিষয়টা প্রাধান্য পেয়েছে কম, একদমই না। আদৌ তা
প্রাধান্য পায়নি। এখানে হরতালের বিষয়টা পরিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক। সরকারের
পতন, রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিবর্তন প্রভৃতি প্রাধান্য পায় হরতালের ক্ষেত্রে।
জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব বিষয়, যেমন— দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ বা
দুর্নীতি প্রতিরোধকে একমাত্র ‘দাবি’ হিসেবে সামনে রেখে হরতাল আহ্বান করা
হয়েছে, এ রকম ঘটনা ঘটেনি। দ্রব্যমূল্যকে কখনো সখনো যুক্ত করা হয়েছে মাত্র।
সুতরাং বাংলাদেশের বিকাশমান গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে হরতাল আদৌ থাকবে কিনা এ
ব্যাপারে বড় দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। বাংলাদেশে যেভাবে হরতাল হয়,
একুশ শতকে এসে এ সংস্কৃতি আমাদের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারবে না।
আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ শুভবুদ্ধির উদয় হোক, আমাদের প্রত্যাশা এটাই।
Bonik Barta 20.4.13 |
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In his Office at UGC Bangladesh
Prof Rahman With US Congressman Joseph Crowley
here you go!!!
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
During his stay in Germany
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
At Fatih University, Turkey during his recent visit.
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In front of an Ethnic Mud House in Mexico
হরতালের রাজনীতি, অর্থনীতিতে হরতাল
21:01
No comments
নির্বাচনকালীন সরকারের ‘রূপরেখা’
18:00
No comments
দেশের চলমান রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলামের উত্থান, শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতাদের জেলে প্রেরণের ঘটনায় রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই টিআইবি নির্বাচনকালীন সরকারের একটি ‘রূপরেখা’ উপস্থাপন করেছে। একসময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করলেও এখন তাদের আন্দোলন এক দফায় কেন্দ্রীভূত। তাদের দফা এখন একটিইÑ সরকারের পদত্যাগ। এর আগে প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সে ব্যাপারটি বেশিদূর এগোয়নি। কেননা প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রস্তাবে বিএনপি ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ফলে এ নিয়ে জনমনে কোন সাড়াও পড়েনি। রাজনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির নেতা এইচএম এরশাদ বরাবরই সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলে আসছেন। যদিও তিনি সেই নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কোন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেননি। তিনি এখনও মহাজোট সরকারে আছেন এবং বারবার বলে আসছেন ‘ঠিক সময়ই জাতীয় পার্টি মহাজোট ত্যাগ করবে।’ জাতীয় পার্টি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামো গ্রহণ করেছে, এমন তথ্যও আমাদের জানা নেই। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান ছিল, তা পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হলে আবার সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমান সরকারই দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী থেকে যাচ্ছেন ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। আর আপত্তিটা উঠেছে এ কারণেই।
দুই
বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। নেপালের মতো পাকিস্তানেও গঠিত হয়েছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যারা দু’দেশেই পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনা করবেন। পাকিস্তানে গত ১৭ মার্চ প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার তার টার্ম শেষ করল। এরপর বিচারপতি মির হাজার খান খোসো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তারপরও কথা থেকে যায়। সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানিকে ঘিরে বারবার সংবাদ হয়েছে। তার চাকরির মেয়াদ বেড়েছে। ক্ষমতা নেয়ার ব্যাপারে তার অনাগ্রহের কথা তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। এখন দেখার বিষয় পাকিস্তানের রাজনীতিকরা কতটুকু দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ১১ মে সেখানে সাধারণ নির্বাচন।
নেপালে গঠিত হয়েছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২১ জুন সেখানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে ১৪ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন নেপাল সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি খিল রাজ রেগমি। গত প্রায় ১০ মাস ধরে সেখানে রাজনীতিতে অচলাবস্থা চলে আসছিল। নেপালে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে একটি বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। মূলত চারটি প্রধান দলের পক্ষ থেকেই গত ১০ মাসে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু পার্লামেন্টের সমর্থন না পাওয়ায় কেউই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেননি। গত মে মাসে পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ওই সময়ে নেপালের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রধান চারটি দল একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে নীতিগতভাবে একমত হয় এবং বিচারপতি রেগমিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করেন। রেগমি এরই মধ্যে শপথও নিয়েছেন। তার প্রধান ও একমাত্র কাজ হচ্ছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। সেখানে মূল সমস্যা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছিল না। এমনকি মাওবাদীদের মাঝেও দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছিল। যারা বিশ্ব রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন সম্প্রতি ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ায় সরকার ভেঙে দেয়া হয়েছে। বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট রোজেন প্লেভনেলিয়েভ সাবেক কূটনীতিক মারিয়ান রায়কভকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। রায়কভ মে মাস পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন এবং মে মাসে তিনি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবেন। অনেকের মনে থাকার কথা, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গ্রিসে পাপেন্দ্র“ সরকারের পতন ঘটেছিল। পরে সেখানে একজন বিচারপতি পাপাদেমাসের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং তিনি এরই মধ্যে একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেমানান। কিন্তু কখনও সখনও রাষ্ট্রকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনার পরিপন্থী। গ্রিস, যেখানে একসময় গণতন্ত্রের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেখানেও পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা গ্রহণ করতে। ২০০৭ সালে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়েতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছিল, অথচ সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোন পদ ছিল না। বৃহত্তর ঐক্য ও সংকট এড়াতে সরকারকে সংবিধানবহির্ভূত অনেক সিদ্ধান্তই নিতে হয়। এসব ঘটনা থেকে আমরা কী শিখছি? বাংলাদেশে আন্দোলনের ফল ছিল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেটা ১৯৯৩-এর পরবর্তী সময়ের কথা। জামায়াতও সেদিন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। বেগম খালেদা জিয়া প্রথমে রাজি ছিলেন না। কিন্তু ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ কর্তৃক বয়কটের পর ১৩ দিনের ওই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পরে ৭ম (১৯৯৬), ৮ম (২০০১) ও ৯ম (২০০৮) সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়। এরপর সংবিধানে সংশোধনী এনে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রায় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, দশম সংসদ নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে? সরকার সংবিধান অনুসরণ করবেÑ এটাই স্বাভাবিক। আর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কোন সুযোগ নেই। তবে এটাও সত্য, সব দলের বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা না হোক, একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
তিন
এখন টিআইবি একটি ‘ফর্মুলা’ নিয়ে এলো। টিআইবি বলছে, এটা নির্বাচনের সময়ের জন্য একটি ‘রূপরেখা’। তাদের ‘রূপরেখা’র মোদ্দা কথা অনেকটা এরকম : ১. নির্বাচিত দুই দলের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি গঠিত হবে (পাকিস্তানে এরকমটি ছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল)। সরকারপ্রধানসহ সরকারে সদস্য হবেন মোট ১১ জন; ২. এই ১১ জন সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না এবং পরবর্তীকালে সরকারের কোন লাভজনক পদে যোগ দিতে পারবেন না; ৩. নিজেরা আলোচনা করে সরকারপ্রধান ঠিক করবেন। তবে ঐকমত্য না হলে অনধিক তিন ব্যক্তির নাম স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবেন। রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে একজনকে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করবেন; ৪. ৯০ দিনের মধ্যে তারা নির্বাচন সম্পন্ন করবেন।
টিআইবি যে কথাগুলো বলেছে, তাতে নতুনত্ব কিছু নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর আগেও বিভিন্ন লেখায় এ ধরনের একাধিক প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে টিআইবি ‘নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে সিরিয়াসলি গবেষণা করেছে কি-না, আমার সন্দেহ রয়েছে। কোন কোন দেশে (গ্রিস, বুলগেরিয়া, নেপাল) যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, তা তারা কতটুকু বিবেচনায় নিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। নির্বাচনকালীন সেনা মোতায়েন, বিশেষ করে নির্বাচনের দিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান আরপিওতে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নেই। উপরন্তু জাতীয় পার্টি একটি বড় শক্তি। ২৬টি আসনসহ তাদের প্রাপ্ত ভোট ৭ দশমিক ০৫ ভাগ। জামায়াতের আসন কম (২), প্রাপ্ত ভোট ৪ দশমিক ৬০। জাসদ (৩), ওয়ার্কার্স পার্টি (২), বিজেপি (১) ও এলডিপির (১) আসনও সংসদে রয়েছে। সুতরাং প্রশ্ন উঠতেই পারে, শুধু নির্বাচিত দুটি বড় দলের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ‘সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি’ কেন? বাকি দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নয় কেন? যে ১০ জন মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে, তারা কি নির্বাচিত নাকি অনির্বাচিত? যদি নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তারা কি নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন? সবচেয়ে বড় কথা, ‘তিনজন ব্যক্তির একটি তালিকা’ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি কিন্তু দলীয়ভাবেই নির্বাচিত হবেন আগামী ২৯ এপ্রিল। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার দলীয় আনুগত্য ত্যাগ করবেন, কিন্তু তারপরও আপত্তির একটা সুযোগ তৈরি হল (পাকিস্তানে কিন্তু এ তালিকা দলীয়ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়নি। পাঠানো হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে)। টিআইবির রূপরেখায় সীমাবদ্ধতা আছে। তারপরও এ প্রস্তাব আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
চার
আসল কথা হচ্ছে, এমন একটি নিরপেক্ষ সরকার আমরা চাই, যে সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে। বিদেশী দাতা এবং জনগণের বড় অংশ একটি নিরপেক্ষ তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। প্রথম সারির তিনটি জাতীয় দৈনিকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে রায় পড়েছিল বেশি। কিন্তু সরকার এদিকে দৃষ্টি দিয়েছে বলে মনে হয় না। তাদের কোন আগ্রহও নেই। সরকার এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ও দেশকে এক কঠিন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটাই আর তা হচ্ছে, একটি তত্ত্বাবধায়ক তথা নিরপেক্ষ সরকার গঠনের লক্ষ্যে ১৮ দলীয় জোটের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা। সরকার যত দেরি করবে, ততই দেশ ও জাতির জন্য তা অমঙ্গল বয়ে আনবে। এত সংকট, বিভেদ আর বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান আর নেপাল যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে আমরা তা পারব না কেন? আসলে যা দরকার, তা হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের শুভবুদ্ধির উদয়। শুভবুদ্ধির উদয় না হলে সংকট আরও বাড়বে। জোর করে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে কোন কৃতিত্ব থাকতে পারে না। জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। আজ একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যদি নির্বাচন হয় আর সেই নির্বাচন যদি মহাজোট সরকারকে আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসে(?) তাহলে কারও কিছু বলার নেই। দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সে কথাই বলছেন। মহাজোট সরকারের গত পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করার অধিকার দেয়া হোক জনগণকে। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু তা না করে এককভাবে একটি নির্বাচন করলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কারও কাছেই থাকবে না। ১৮ দলীয় জোটকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। আর দায়িত্বটি সরকারের। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন বিকল্প নেই। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারই পারে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে।
Daily JUGANTOR
18.04.13
লংমার্চ হরতাল অবরোধ
18:10
No comments
গেল সপ্তাহে সারা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করল তিনটি ঘটনা। লংমার্চ করতে না পারলেও ঢাকায় বিশাল জমায়েত করল হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন। আর এই জমায়েত তথা লংমার্চকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। যদিও তাতে খুব একটা সফল তারা হয়নি। আর ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৭টি সাংস্কৃতিক সগঠন হরতাল পালন করল ২৪ ঘণ্টা, ৫ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে ৬ এপ্রিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। মানুষ প্রত্যক্ষ করল, ছুটির দিনে এবং রাতেও হরতাল হয়। হরতালে গাড়ি-ঘোড়া চলেনি, মানুষ ঘরেই ছিল। বড় ধরনের সহিংসতা হতে পারে- এটা ধারণা করে মানুষ ঘরের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল। এ তিনটি ঘটিনা পরস্পরবিরোধী। এক দল চাচ্ছে লংমার্চ। অন্য দল চাচ্ছে তাদের প্রতিহত করতে। এখন ফলাফল কী? আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব ৬ এপ্রিলের গণজমায়েতকে? এ লংমার্চ কি চলমান রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারবে? পারলে কতটুকু পারবে? প্রথমত, বলতেই হবে, লংমার্চ সফল হয়েছে। শত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার পরও মানুষ হেঁটে শাপলা চত্বরে পৌঁছেছে। আশপাশের এলাকা জনারণ্যে পরিণত হয়েছিল। এই সমাবেশ প্রমাণ করল, হেফাজতে ইসলাম একটি শক্তি। সরকার এই শক্তিকে ব্যবহারও করতে পারে! আবার এই শক্তি সরকারের বিরুদ্ধেও চলে যেতে পারে। এখন তারা সরকারের বিরুদ্ধেই গেল। দ্বিতীয়ত, এই লংমার্চকে সরকার খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারত। আল্লামা শফীর সঙ্গে আলোচনায় একজন সিনিয়র নেতা বা উপদেষ্টাকে পাঠানো উচিত ছিল। বনমন্ত্রীকে পাঠিয়ে হেফাজতে ইসলামকে কম গুরুত্ব দিয়েছিল সরকার। ফলাফল তারা পেয়েছে। তৃতীয়ত, হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক হিসেবে ঘোষণা করলেও ঘটনাচক্রে তারা একটি শক্তি, তৃতীয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে তারা কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, এটা সত্য। কিন্তু যাঁরা ক্ষমতায় যেতে চান, তাঁরা চেষ্টা করবেন এই শক্তিকে নিজের হাতে রাখতে। এ ক্ষেত্রে বলতেই হবে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের পাল্লা ভারী। চতুর্থত, হেফাজতে ইসলাম বারবার বলে আসছে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধী নয়। তারা জামায়াতের রাজনীতিরও বিরোধিতা করে। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আল্লামা শফীর সাক্ষাৎকারে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে তাঁরা জামায়াতের রাজনীতিকে সমর্থন করেন না। সরকারের কাছে একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তাদের জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার। সরকারের ব্যর্থতা এখানেই যে তারা এই সুযোগটি গ্রহণ করতে পারল না। পঞ্চমত, গণজাগরণ মঞ্চ ও ঘাদানিকসহ ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা চূড়ান্ত বিচারে সরকারের পক্ষে যায়নি। সরকার তাদের মাঠে নামিয়েছে- এ সত্যই শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো। এ ক্ষেত্রে এ দুই পক্ষকে হেফাজতে ইসলামীর বিপক্ষে দাঁড় করানো সঠিক হয়নি। এই সিদ্ধান্ত সরকারের অবস্থান দুর্বল করেছে। ষষ্ঠত, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে কিংবা পাল্টা হরতাল পালনকারীদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। এটাও চোখে লাগার মতো। সহিংস ঘটনাবলির মধ্য দিয়েই সাধারণত হরতাল শেষ হয়। গাড়িতে আগুন লাগে, পুলিশ গুলিবর্ষণ করে, ককটেল ফোটে- এ হচ্ছে সাম্প্রতিককালের হরতালের চালচিত্র। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে এ রকমটি ঘটেনি। সরকার তাদের জমায়েত করার অনুমতি দিয়ে ভালো কাজ করেছিল। এর পরও চট্টগ্রাম থেকে বাসের কাফেলা আসতে দিলে কিংবা ফেরি চলাচল উন্মুক্ত করে দিলে তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ত বৈ কমত না। সপ্তমত, রাসুলে করিম (সা.)কে নিয়ে ব্লগে যারা কটূক্তি করেছিল, তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে সরকার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, সরকারের এই ইতিবাচক দিকটি হেফাজতের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। অষ্টমত, সরকার অতিমাত্রায় বামমনা এবং একই সঙ্গে নাস্তিকদের দ্বারা চালিত হচ্ছে, এ ধরনের অভিযোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা সরকার নেয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এটা একটা বড় ব্যর্থতা যে তাঁরা সাধারণ মানুষের 'পালস' বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নবমত, একটা প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তারুণ্যের প্রতিবাদ হিসেবে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম হয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী এর প্রয়োজন নেই। গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দিতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করলে সরকার তার নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু সরকার তা করেনি, উদ্যোগও নেয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান। দু-একজনের চূড়ান্ত রায় আমরা প্রত্যাশা করছি খুব শিগগির। এমনই এক পরিস্থিতিতে গণজাগরণ মঞ্চ যদি আবার সক্রিয় হয়, তাতে বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগ আরো শক্তিশালী হবে। দশমত, হেফাজতে ইসলাম জামায়াতের 'সেকেন্ড ফ্রন্ট'- এই অভিযোগ তুলে হাজার হাজার তরুণকে সরকারবিরোধী অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হলো। কারণ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একটি তরুণ প্রজন্ম রয়েছে, যারা আবার জামায়াত-শিবির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।
এখন যে প্রশ্নটি আমাকে অনেকেই করেছেন, তা হচ্ছে এরপর কী? লংমার্চ হলো। ৮ এপ্রিল হরতালও হলো। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কি আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, হেফাজতের ১৩ দফা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অনেক দেরিতে কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপলব্ধি করলেন! হেফাজতে ইসলামকে 'আন্ডারমাইন' করেছিল সরকার। এখন সরকারের এই উপলব্ধি একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করল। সরকারকে এখন সংলাপে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। অনেক আগেই উচিত ছিল জনাব চৌধুরীকে ব্যবহার করা। জনাব চৌধুরীর সঙ্গে আল্লামা শফীর ব্যক্তিগত 'সখ্য' সরকারের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলাতে সাহায্য করতে পারে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার অনেকগুলো নিয়েই সরকার কথা বলতে পারে। ১ নম্বর দাবিতে সংবিধানে 'আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করার যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ব্যাপারটি সরকার ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিতে পারে। এ দাবি অনেকেরই। সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির (এরশাদ) দাবিও এটি। সরকার প্রয়োজনে এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করে দিতে পারে। সংশোধিত সংবিধানের প্রস্তাবনায় 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' বজায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। আবার অষ্টম অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বহাল রাখা এবং সেই সঙ্গে প্রস্তাবনায় 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' থাকার কারণে সরকার খুব সংগত কারণেই সংবিধানে 'আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' শব্দটি পুনঃস্থাপন করতে পারে। ২ নম্বর দফায় আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে। সরকার তো ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে। ৩ নম্বর দফায় কুৎসা রটনাকারী ব্লগারদের শাস্তি দাবি করা হয়েছে। সরকার তো ইতিমধ্যে কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেপ্তারও করেছে। ৯ নম্বর দফায় টিভিতে ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধের দাবি করা হয়েছে। এটা মনিটর করা কঠিন কিছু নয়। ১৩ নম্বর দফায় গ্রেপ্তারকৃত মাদ্রাসাছাত্রদের মুক্তি দাবি করা হয়েছে। এটাও সরকার করতে পারে। ১১ নম্বর দফায় আলেম-ওলামাদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি রয়েছে। ৮ নম্বর দফায় বায়তুল মোকাররমে মুসলি্লদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করার দাবিও রয়েছে। এগুলো মানা সরকারের জন্য কঠিন কিছু নয়। তবে ৪ নম্বর দফায় 'নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ' বন্ধের যে দাবি করা হয়েছে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক আরবদেশে (মিসর ও তিউনিসিয়া) নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মেয়েদের ভূমিকাও ব্যাপক। হেফাজতে ইসলামের নেতারা নিশ্চয়ই বিষয়টি উপলব্ধি করবেন। ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের যে দাবি করা হয়েছে (৭ নম্বর), তাও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা অনেক ইসলামী রাষ্ট্রেও ভাস্কর্য রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশি এনজিওদের কর্মকাণ্ড বন্ধের যে দাবি (১০ নম্বর) করা হয়েছে, এ ক্ষেত্রেও সরকার উদ্যোগী হয়ে বিষয়টি মনিটর করে দেখতে পারে। মোট কথা, ১৩ দফায় বেশ কিছু দাবি রয়েছে, যা সরকার ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করেছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নের পথে। আল্লামা শফীর সঙ্গে আলোচনায় সরকারের অবস্থানকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। আলোচকদের ব্যর্থতা সেখানেই। একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতের সঙ্গে তুলনা করে সরকারের মন্ত্রীরা আগে থেকেই এই সংগঠনকে 'শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, এটা ছিল ভুল।
৬ এপ্রিলের গণজমায়েতের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইসলামী গণজাগরণের জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে। তারা প্রমাণ করেছে, তাদের গ্রহণযোগ্যতায় নিতে হবে। সরকারের উচিত হবে না আরেকটি 'ফ্রন্ট' ওপেন করা। এখন একটি 'সংলাপ'ই পারে সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর করতে এবং হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থানে যেতে। ৬ এপ্রিলের পরও যদি সরকার গণজাগরণ মঞ্চ ও ঘাদানিককে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সরকার আবারও 'ভুল' করবে।Daily Kalerkontho10.04.13
অনিশ্চয়তার কৃষ্ণগহ্বরে দেশ
17:54
No comments
হঠাৎ করেই যেন দৃশ্যপট বদলে গেল। সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে কয়েক লাখ লোককে জমায়েত করল, সংবাদপত্রের ভাষায় যা ছিল ‘তৌহিদি জনতার মহাসমুদ্র’। অরাজনৈতিক এই সংগঠনটিকে নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যখন অংক কষতে শুরু করেছেন, তখন এ দেশের আমজনতা ৮ এপ্রিল হেফাজতের ডাকা হরতাল প্রত্যক্ষ করল। কিন্তু এর আগেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। ঢাকার একটি আদালত ৭ এপ্রিল বিকালে শীর্ষস্থানীয় ১০ বিএনপি নেতার জামিন নামঞ্জুর করলে এবং জেলে পাঠালে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আবারও গাড়ি পুড়েছে। ককটেল ফুটেছে। বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট ৯ ও ১০ এপ্রিল লাগাতার ৩৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত ও সংঘাতময়।
হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে বাধা দেয়া হয়েছিল। তাদের ওই লংমার্চের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। আর হরতাল আহ্বান করেছিল ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৭টি সংগঠন। ছুটির দিনে রাতের বেলায়ও আমরা হরতাল প্রত্যক্ষ করলাম। কিন্তু হরতাল আর অবরোধ উপেক্ষা করে মানুষ ঢাকার বাইরে থেকে হেঁটে শাপলা চত্বরের জমায়েতে যোগ দিয়ে যে নজির সৃষ্টি করল, সমসাময়িক বাংলাদেশের ইতিহাসে তা এক বিরল ঘটনা। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোন সহিংস ঘটনা ঘটেনি। কোন ককটেল ফোটেনি। সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে হেফাজতে ইসলাম প্রমাণ করল তারা একটি শক্তি। যারা ক্ষমতায় আছেন বা আগামীতে ক্ষমতায় যেতে চান, তাদের একটা মেসেজ দিয়ে গেল হেফাজতে ইসলাম। আর এর মূল কথা হচ্ছে, তারা একটি শক্তি। তাদের গ্রহণযোগ্যতায় নিতে হবে। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে দুটি শক্তিÑ একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট। এর বাইরে ইসলামপ্রিয় হেফাজতে ইসলাম আবির্ভূত হল তৃতীয় একটি শক্তি হিসেবে। এরা কোন রাজনৈতিক শক্তি নয়। রাজনীতি করতেও তারা আসেনি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এবং জামায়াতের রাজনীতির বিপক্ষে। মূলত ইসলাম ধর্মকে অবমাননা ও রাসূলে করীম (সা.)-কে নিয়ে বিভিন্ন ব্লগে বিরূপ মন্তব্য ও লেখালেখির প্রতিবাদেই তারা সংগঠিত হয়েছে এবং শান্তিপ্রিয়ভাবে তাদের জমায়েত শেষ হয়েছে। নিঃসন্দেহে বলতেই হবে, তারা একটা দৃষ্টান্ত রেখে গেল।
কিন্তু দৃশ্যপট বদলে গেল যখন নিু আদালত বিএনপির শীর্ষ নেতাদের জামিন দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। এর আগে রমনা থানায় দায়ের করা দুটি, পল্টন থানায় চারটি, শাহজাহানপুর থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে তারা জামিনে ছিলেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই আইন অনুযায়ী তারা নিু আদালতে আÍসমর্পণ করলেন। তাদের জেলে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি আবার সহিংস হয়ে উঠেছে। গেল মার্চের বেশ ক’টি দিন আমরা হরতাল প্রত্যক্ষ করেছি এবং দিব্যি দিয়েই বলতে পারি, এপ্রিল মাসের বাকি প্রায় পুরোটা সময়ই আমরা হরতালের মধ্যে থাকব। কোন্ দিকে যাচ্ছি আমরা? সরকার কি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবে? যা কি-না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আশংকা প্রকাশ করেছেন? নাকি দেশটি আবার এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
গত দু’দিন যেখানেই গেছি, সেখানেই আমাকে এ প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছেÑ দেশ কোন্ দিকে যাচ্ছে? একাত্তর টিভির টকশোতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম। ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্নÑ দেশ কোন্ পথে যাচ্ছে? আমি রাজনীতির গতিধারা নিয়ে চর্চা করি। বোঝার চেষ্টা করি চলমান রাজনীতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, বিএনপির শীর্ষ ১০ নেতা এখন জেলে গেলেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সবাই এখন জেলে। তার আগে থেকেই জেলে আছেন বিএনপির ত্যাগী নেতাদের তিনজনÑ রিজভী, জয়নুল আবদিন ফারুক ও আমানউল্লাহ আমান। বাংলাদেশে অতীতে এরকমটি কখনোই হয়নি। যে দলটি একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল এবং সর্বশেষ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার প্রায় ৩৩ ভাগ (আওয়ামী লীগের ৪৮ ভাগ), তাদের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক নয়। আমরা বারবার বলে আসছি, দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে এদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ মুখ থুবড়ে পড়বে। আর তাতে উপকৃত হবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো। পুলিশ বিএনপির এই শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ভাংচুর, গাড়ি পোড়ানোর মামলা করেছে। এ মামলাতেই তাদের জেল হল। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপির নেতারা আবারও উচ্চ আদালতে যাবেন। হয়তো উচ্চ আদালত থেকে জামিনও পাবেন। কিন্তু এরই মধ্যে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা সারবে কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, সরকারকে সব সময়ই সহিষ্ণু আচরণ করতে হয়। তাকে নমনীয় হতে হয়। কিন্তু সরকার বিএনপির নেতাদের ব্যাপারে নমনীয়, তা বলা যাবে না। এর আগে বিএনপির জমায়েতে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও শীর্ষ নেতাদের আহত করা (স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এখন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন) এবং বিএনপির অফিসে তল্লাশির নামে অফিস ভাংচুরের ঘটনা সুধীসমাজে সমর্থনযোগ্য হয়নি। অনেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব থাকবেই। রাজনৈতিক বৈরিতার নামই তো গণতন্ত্র! কিন্তু এ কোন্ বৈরিতা আমরা দেখছি? বিএনপির অফিস কেন ভাংচুর করা হবে? কেন প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করা হবে? কেনইবা নিু আদালতে বিএনপির নেতারা জামিন পাবেন না? সরকারের কর্মকাণ্ড থেকে মনে হচ্ছে, সরকার রাজনীতি থেকে বিএনপিকে উচ্ছেদ করতে চায়! জামায়াতের ব্যাপারে সরকার শক্ত অবস্থানে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কিংবা জামায়াতকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে সকারের অবস্থান এখন স্পষ্ট। কিন্তু বিএনপির বিরুদ্ধে তাদের এই সাঁড়াশি অভিযান ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে বলে মনে হয় না।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ আগামী কয়েক মাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে। একটি হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং অপরটি দশম সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ। গোটা জাতি প্রত্যাশা করছে, এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করা হোক, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। তিনি হবেন দলনিরপেক্ষ। রাষ্ট্রপতি সবার। এক্ষেত্রে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাম্য নয়। সুতরাং বিএনপির অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির সমর্থন ছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে সেই রাষ্ট্রপতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। বাংলাদেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে যিনি দায়িত্ব নেবেন, তিনি থাকবেন আগামী পাঁচ বছর। সময়কালটা যে কোন বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনেক হিসাব-নিকাশ আছে। বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, যা হবে আমাদের জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা। সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। বিএনপি তথা ১৮ দল এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছে না। বিএনপি গেছে এক দফায়Ñ সরকারের পদত্যাগ। সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ২৫ অক্টোবর পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় থাকবে কারা? প্রধানমন্ত্রীকে রেখে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনমতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এখানেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত বিতর্কের মাত্রা বাড়াবে।
হেফাজতে ইসলামের ঢাকায় সমাবেশ ও হরতাল পালনের পরপরই ১৮ দলের ৩৬ ঘণ্টার হরতাল প্রমাণ করে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি বড় ধরনের সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে এ সংকট থেকে বের হয়ে আসার পথটি বড় কঠিন। টানেলের শেষ প্রান্তে কোন আলো দেখা যাচ্ছে না। সরকার অনেকগুলো ‘ফ্রন্ট ওপেন’ করে ফেলেছে। গণজাগরণ মঞ্চ এক সময় একটা আবেদন সৃষ্টি করেছিল। এখন সেই আবেদন আছে বলে মনে হয় না। গণজাগরণ মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। সরকার স্পষ্টতই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যেতে চাচ্ছে। একটি ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলেই অনেকে মনে করেন। যে কারণে ঘোষিত কর্মসূচি বাদ দিয়েই আল্লামা শফীকে চট্টগ্রামে চলে যেতে হয়েছে। এখন হেফাজতকে গ্রহণযোগ্যতায় নিতে হলে গণজাগরণ মঞ্চের তৎপরতা বন্ধ বা সীমিত করতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। সরকার যদি ‘দুই নৌকায় পা’ দেয় তাহলে ভুল করবে। এ মুহূর্তে গণজাগরণ মঞ্চের চেয়ে হেফাজতে ইসলামকে সরকারের বেশি প্রয়োজন। একদিকে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যদিকে বিএনপিÑ উভয় শক্তিই ইসলামী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কথা বলে। একমাত্র হেফাজতের লাখ লাখ কর্মী জামায়াতের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। হেফাজত প্রমাণ করেছে, তাদের একটি সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী রয়েছে। এই কর্মী বাহিনী সরকারের জন্য একটি ‘অ্যাসেট’ হতে পারে, যদি সরকার হেফাজতের ১৩ দফার ব্যাপারে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এই ১৩ দফার কয়েকটি গ্রহণ করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু একটি সংলাপের। সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবে, এটা আমি মনে করি না। প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন জরুরি অবস্থা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে থাকা যায় না এবং জনগণের আস্থাও পাওয়া যায় না। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সরকারকে হয়তো এমনসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, যা আমরা কেউ চাই না।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার অভাব, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখা পরিস্থিতিকে দিন দিন জটিল করে তুলছে। সহিংস রাজনীতির কারণে এখন ঝুঁকির মুখে অর্থনীতি। সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে আরএমজি সেক্টর। হরতালের কারণে তৈরি পোশাক রফতানি বিলম্বিত হচ্ছে। এমন খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, বিলম্বে পৌঁছার কারণে তৈরি পোশাকের কনটেইনার ফেরত এসেছে। বিদেশী ক্রেতারা এখন অন্যত্র তৈরি পোশাকের বাজার খুঁজছেন। চীনে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের একটা বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও হরতালের রাজনীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোশাক শিল্প। উদ্বিগ্ন পোশাক রফতানিকারকদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ‘সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যে নির্বাচন’, সেই নির্বাচনের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে আসছে। প্রধান বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেয়া, তাদের জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানো পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। দশম সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বড় অনিশ্চয়তা।
পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে বিএনপি নির্বাচন সংক্রান্ত কোন আলোচনায় অংশ নেবে বলে মনে হয় না। এমনকি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও থাকছে নাÑ আরপিওতে এমনটিই আছে। ফলে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, যেখানে শুধু সরকারি দল আর তার সমর্থকরাই অংশ নেবে, বিএনপি তথা ১৮ দল অংশ নেবে না। নির্বাচন কমিশন হয়তো নির্বাচন সম্পন্ন করবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে সেই নির্বাচনের কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। মার্কিন অর্থনীতিতে ‘ফিসকাল স্মিক’-এর কথা আমরা শুনেছিলাম। অর্থাৎ খাদের কিনারে অর্থনীতি। যদি অর্থনীতিকে বাঁচানো না যায়, গভীর খাদে পড়ে যাবে অর্থনীতি, যেখান থেকে অর্থনীতিকে আর তুলে আনা যাবে না। ওবামা প্রশাসন সেই অর্থনীতিকে আপাতত রক্ষা করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ অনেকটা ‘খাদের কিনারে’ এসে দাঁড়িয়েছে। একটু ‘ধাক্কা’ খেলেই পড়ে যাবে গভীর খাদে। তাই ‘রাজনীতি’কে উদ্ধার করবে কে? আমাদের রাজনীতিকদের দিকে তাকিয়ে আছে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ। প্রয়োজন একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের। কঠোর অবস্থানে গিয়ে রাজনীতিকে খাদের কিনার থেকে বাঁচানো যাবে না। ইতিহাসের এক কঠিন সময় পার করছেন আমাদের রাজনীতিকরা। সিদ্ধান্ত নিতে যদি আমরা দেরি করি, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস বড় নির্মম। দেয়ালের লিখন থেকে আমরা শিক্ষা নেবÑ আমরা শুধু এ প্রত্যাশাই করতে পারি।
Daily JUGANTOR
09.04.13
‘হেফাজতের সব দাবি মানা সম্ভব নয়, আলোচনা হতে পারে’
03:30
No comments
স্টাফ রিপোর্টার: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে বিএনপি,
জামায়াতের মদতের অভিযোগ তুলে কোন মন্তব্য করলে তাদেরকে রাজনৈতিক দিকে ঠেলে
দেয়া হবে। সরকারের এমন কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এখন তাদের সঙ্গে
লিবারেল এপ্রোচে আলোচনা করা উচিত সরকারের। সিনিয়র কোন মন্ত্রী বা উপদেষ্টা
পর্যায়ের কোন নেতাকে তাদের সঙ্গে সমঝতার জন্য মনোনিত করা উচিৎ। সরকার এখানে
একটা ভুল করেছে। শুরুতেই জুনিয়র পর্যায়ের মন্ত্রীকে সমঝোতার জন্য পাঠিয়ে
আসলে আলেমদেরকে আন্ডারমাইন্ড করেছে। তোফায়েল আহমদ বা ওই পর্যায়ের কাউকে
পাঠাতে পারতো। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার মধ্যে বেশ কয়েকটা দফা আছে যেগুলোর
ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যেমন প্রথম দফাটিতে তারা দাবি করেছে
সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করতে। এটা
সরকার করতে পারে। ৯০শতাংশ মুসলিমদের দেশে এটা করলে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা
নয়। অনেক দেশে এমনটা আছেও বটে। দ্বিতীয় দফায় তারা দাবি করেছে, মহাসবী (স.)
এর অবমাননাকারীদের বিচারের ব্যাবস্থা করতে। এটাতে সরকার শুরুই করেছে।
কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আরও অভিযুক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করতেই পারে।
তারপর আরেকটা দাবি আছে ইসলামী প্রতীকগুলোকে অবমাননাকর টিভি অনুষ্ঠান ও
নাটক-সিনেমা বন্ধ করা। এটাও করা উচিত। তবে নারী-পুরুষের সহাবস্থান ও নারী
ক্ষমতায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ ২১শতকে এসে
আমরা এখন নারী পুরুষের মধ্যে বিভেদ করবো এটা হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্য তথা
আরবের অনেক দেশও এই নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। যেমন তিউনিসিয়ায়, মিশরে আরব
বসন্তের আগে থেকেই নারীরা পুরুষের পাশাপাশি স্বাধীনতা পেয়েছে। তিউনিসিয়ায়তো
পুরুষদের দ্বিতীয় বিবাহের বিধান নেই। ফলে নারীরা সেখানে অনেক অধিকার ভোগ
করে। তুরষ্কের নারীদের জীবনাচরণে আধুনিকতা এসেছে। এ সব দেশে আরব বসন্তের পর
ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় এলেও তারা এ বিষয়ে আফগানিস্তানের মতো কড়াকড়ি করে
নি। তাছাড়া ভাষ্কর্যকে মূর্তি আখ্যায়িত করে সেগুলো ভেঙে ফেলার যে দাবি তারা
করেছে তা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। মিশরেও ভাষ্কর্য রয়েছে।
এগুলো মেনে নেয়া অনেক কঠিন। আসলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী দলগুলো অনেক লিবারেল
হয়েছে। তারা কট্টর পন্থা থেকে অনেক বিষয় ছাড় দিয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে হেফাজতে
ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
তারেক শামসুর রেহমান বলেন, আমি মনে করি তাদের অধিকাংশ দাবি মেনে নেয়া যায়। দু-তিনটি ছাড়া বাকী দাবিগুলো যথেষ্ট লিবারেল। তারা তেমন কোন কঠোর কর্মসূচিও দেয়নি। লাগাতার কোন কর্মসূচি দেয় নি। তারা রাজনৈতিক কোন এজেন্ডাও আনেনি।
তারেক শামসুর রেহমান বলেন, আমি মনে করি তাদের অধিকাংশ দাবি মেনে নেয়া যায়। দু-তিনটি ছাড়া বাকী দাবিগুলো যথেষ্ট লিবারেল। তারা তেমন কোন কঠোর কর্মসূচিও দেয়নি। লাগাতার কোন কর্মসূচি দেয় নি। তারা রাজনৈতিক কোন এজেন্ডাও আনেনি।
Daily MANOBZAMIN interview
07.04.13
এ কোন বাংলাদেশ আমরা দেখছি!
16:52
No comments
এ
কোন বাংলাদেশের ছবি আমরা দেখছি। গত ৩ এপ্রিল সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে
দুর্ঘটনার শিকার আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথার ছবি। দুর্বৃত্তরা রেললাইনের
ফিশপ্লেট উপড়ে ফেলায় দুর্ঘটনার শিকার হয় তূর্ণা নিশীথা। এ ঘটনার রেশ শেষ
হয়ে যাওয়ার আগেই পরদিন একই ঘটনা ঘটল বগুড়ায়। হরতাল সমর্থকরা রেললাইনের
প্যান্ডেল ক্লিপ খুলে ফেলে। এতে করে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত, তা
হয়নি। কিন্তু দুষ্কৃতকারীদের টার্গেট কেন রেল? আর পুলিশ? মানবকণ্ঠ আমাদের
জানাচ্ছে গত পাঁচ মাসে রেলে ৯৮টি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ ফেব্র“য়ারির পর
থেকে অর্থাৎ যেদিন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে
মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় প্রদান করা হয়, সেদিনের পর থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত
রেলের ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি টাকা। আর রেল রাজস্ব হারিয়েছে ৫ কোটি টাকার।
রেলের সম্পদ তো কোনো দলের নয়, সরকারেরও নয়। এই সম্পদ রাষ্ট্রের। এই সম্পদের
যদি ক্ষতি হয়, সেই ক্ষতি তো রাষ্ট্রেরই। আমরা বারবার বলে আসছি সহিংসতা
কোনো রাজনৈতিক সমাধান বয়ে আনতে পারে না। বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট, তার
সমাধান করতে হবে রাজনৈতিকভাবেই। এক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি
দূরদৃষ্টিতার পরিচয় দিতে না পারেন, তাহলে দেশটি একটি ‘গভীর অনিশ্চয়তার
অন্ধকারে’ পতিত হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে অনেকেই অসন্তুষ্ট। এটা হতেই পারে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এই বৈরিতা থাকবেই। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই বৈরিতা রয়েছে। ভারতেও আছে, কিন্তু সহিংসতা কেন? কেন রেলের ফিশপ্লেট তুলে ফেলা হবে? যুগ যুগ ধরে রেল হচ্ছে সাধারণ মানুষের অন্যতম বাহন। ঢাকার বাইরের মানুষ অত্যন্ত কম ভাড়ায় রাজধানীতে আসতে পারেন অথবা অন্য স্থানে যেতে পারেন। এখন রেলই যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি তো সাধারণ মানুষেরই হবে। একটি অঞ্চলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য রেল যোগাযোগ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাতে ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। রেলের বগিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে কিংবা ফিশপ্লেট তুলে ফেলে রেল যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ করলেও তাতে করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না। যারা এই কাজগুলো করছে, হয়তো ক্ষোভে ও প্রতিবাদে করেছে, কিন্তু এটা অন্যায়। এটা অপরাধ। স্বাধীনতার ৪২ বছরে আমরা পা দিয়েছি। অতীতে কখনো এ রকমটি হয়নি। কখনো রেল এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেই সঙ্গে গেল দু’মাসে যে ১৭০ জন সাধারণ মানুষ মারা গেলেন, ৭ জন পুলিশ সদস্য মারা গেলেন, বেশ কয়েকজন আহত হলেন, এটাও অনাকাক্সিক্ষত। কোথাও কোথাও পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে। যে ১৭০ সাধারণ মানুষ মারা গেলেন, তাতে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সাধারণ একজন পুলিশ সদস্য তো এর জন্য দায়ী নন। তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। হুকুম তামিল করতে হয়েছে। আমি তাদের দোষ দিতে পারি না। এখানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের যে বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়ার কথা তা তারা দিতে পারেননি। এই নিবন্ধটি যখন লিখছি, তখন সংবাদপত্র থেকেই জানলাম বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে আবার আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। অপারেশনের পরেও তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না। তিনি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা আজ কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিএনপি বড় দল। তাদের জনসভায় গুলি হবে কেন? কেনই বা মি. খানের মতো একজন সিনিয়র নেতা আহত হলেন? পুলিশ গুলি চালিয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে রয়েছেন।
দুটি মূল রাজনৈতিক ইস্যুতে রাজনীতি এখন আবর্তিত এবং সংকটকে ঘনীভূত করেছে। এর একটি হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ্বিতীয়টি কোন পদ্ধতিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হোক আমরা সেটা অবশ্যই চাই কিন্তু সেই বিচারটা যেন হয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। এ ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু যখন বিশেষ আদালতে বিচার চলছে, তখন গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করে এবং দিনের পর দিন আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘটনা প্রকারান্তরে বিচার বিভাগের ওপর এক ধরনের ‘চাপ’ সৃষ্টি করার শামিল। সরকার তাদের চাপের মুখে আইনে বেশকিছু পরিবর্তন আনতেও বাধ্য হয়েছে। এরপর আর গণজাগরণ মঞ্চের কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি না। এর পরও রুমী ব্রিগেড গঠিত হয়েছে। গঠিত হয়েছে একটি নাগরিক সমাজ। এদের সবার দাবি একটিই-যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি। এভাবে কোনো দোষী ব্যক্তিকে চাপের মুখে থেকে কী ফাঁসি দেয়া যায়? আইনকে তার পথে চলতে দেয়া উচিত। বিজ্ঞ বিচারপতিরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে আর আন্দোলন না করাই মঙ্গল। কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আমরা জানতে পেরেছি ২৫ অক্টোবর বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। কিন্তু কার কাছে? বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখে কোনো ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ ফর্মুলা বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে ‘সকল দলের অংশগ্রহণের’ যে নির্বাচন, তা নিশ্চিত করা যাবে না। অক্টোবরের আগেই এ ব্যাপারে সমঝোতা হতে হবে।
ইতিমধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে আরো একটি ‘ফ্রন্ট’ তৈরি হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠন ‘ইসলামবিরোধী ব্লগ এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদকে (সা.) কটূক্তিকারীদের গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির’ দাবিতে শুক্রবার লংমার্চ করে গতকাল শনিবার ঢাকায় গণজামায়াতে করেছে। হঠাৎ করেই রাজনীতির মঞ্চে এই সংগঠনটি আবির্ভূত হয়েছে এবং এর প্রধান যিনি, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নাম এদেশের মানুষ আগে অতটা জানত না।
সরকার যদিও বেশ কয়েক ব্লগারকে মহানবীকে (সা.) কটূক্তি করে লেখালেখির অভিযোগে গ্রেফতারও করেছে, কিন্তু এটা অনেক দেরি হয়ে গেছে। হেফাজত এর আগে যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, ওই দাবিগুলোকে সরকার যদি ইতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে দেখত এবং একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে বা উপদেষ্টাকে আল্লামা শফীর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বটি দিত, তাহলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। পরে ব্লগারদের গ্রেফতার করেও লংমার্চ ঠেকানো যায়নি। এমনকি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৫টি সামাজিক সংগঠন শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশে যে হরতাল ডেকেছে, সরকার এ ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিতে পারত। একদিকে হরতাল, অন্যদিকে লংমার্চ পরিস্থিতিকে যে একটি সংঘাতময় অবস্থার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ধারণা করা হচ্ছে এখন হরতাল আর নাশকতার বৃত্ত বন্দি হয়ে পড়বে জনজীবন যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিএনপি ও জামায়াত এই লংমার্চকে সমর্থন করেছে। এই কাজটি যে বিরোধী দল করবে, এটা তো খুব স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সরকারের স্ট্র্যাটেজির অনেক অভাব ছিল।
সরকার এখন একের পর এক অনেক ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করছে। সরকার পরিস্থিতিকে সামাল কীভাবে দেবে, সেটাই দেখার বিষয়। এখানে সরকারের ‘রিয়েল পলিটিকস’ বা বাস্তবমুখী পদক্ষেপের বড় অভাব। হেফাজতে ইসলামকে ‘জামায়াতের আরেকটি ফ্রন্ট’ কিংবা ‘জামায়াতের ফাঁদে হেফাজত পা দিয়েছে’ এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করা যায় বটে, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা যাবে না। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আছেন, যারা ইসলাম ধর্ম চর্চা করেন। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিরোধী কথাবার্তা বলা ও নবী করিম (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করা ও ব্লগে এ নিয়ে লেখালেখি করা আর যাই হোক ইসলামপ্রিয় সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করে নেবে না। সরকারের অনেক আগেই উচিত ছিল হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একটা ‘ডায়ালগ’ ওপেন করা। এখন অভিযুক্ত ব্লগারদের গ্রেফতার করেও শেষ রক্ষা হলো না। শুধু তাই নয়, সরকার সমর্থক ২৫টি সংগঠনকে হরতাল পালন করার সুযোগ দিয়ে সরকার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বাকি সংগঠনগুলো হরতাল ডাকতেই পারে। এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সমাবেশের পাশাপাশি হরতাল পালন উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে। স্পষ্টতই বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদিকে রয়েছে বামমনা তথা ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা, অন্যদিকে রয়েছে ধর্মভিত্তিক শক্তি। মূল ধারা মূলত দুটি। এর বাইরে কোনো তৃতীয় ধারার অবস্থান নেই।
বাংলাদেশ এখন এক কঠিন সময় পার করছে। রাজনীতিকদের মাঝে অনাস্থা, অপর পক্ষকে সহ্য না করার মানসিকতা, ক্ষমতা ধরে রাখা ও দীর্ঘস্থায়ী করার মানসিকতা স্বাধীনতার ৪২ বছরে এসে দেশকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। পুলিশকে পিটিয়ে জখম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা যেমনি বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে রেলের মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করার এক আত্মঘাতী প্রবণতা। শুভবুদ্ধির মানুষের অভাব যেমনি পরিলক্ষিত হচ্ছে, ঠিক তেমনি একটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বও আমরা দেখছি না। হরতালের পর হরতাল হচ্ছে। অর্থনীতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে এসব কিছুর অবসান অত্যন্ত জরুরি। এই মুহূর্তে সরকার আর বিরোধী পক্ষ ও সেই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য আরো খারাপ খবর অপেক্ষা করছে। তাই প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক অথবা ত্রিপাক্ষিক একটি ‘সংলাপ’, যে ‘সংলাপ’-এর মধ্য দিয়ে আমরা একটা সমাধান খুঁজে পাব ও উত্তেজনা হ্রাস হবে।
Manobkontho
07.04.13
সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে অনেকেই অসন্তুষ্ট। এটা হতেই পারে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এই বৈরিতা থাকবেই। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই বৈরিতা রয়েছে। ভারতেও আছে, কিন্তু সহিংসতা কেন? কেন রেলের ফিশপ্লেট তুলে ফেলা হবে? যুগ যুগ ধরে রেল হচ্ছে সাধারণ মানুষের অন্যতম বাহন। ঢাকার বাইরের মানুষ অত্যন্ত কম ভাড়ায় রাজধানীতে আসতে পারেন অথবা অন্য স্থানে যেতে পারেন। এখন রেলই যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি তো সাধারণ মানুষেরই হবে। একটি অঞ্চলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য রেল যোগাযোগ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাতে ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। রেলের বগিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে কিংবা ফিশপ্লেট তুলে ফেলে রেল যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ করলেও তাতে করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না। যারা এই কাজগুলো করছে, হয়তো ক্ষোভে ও প্রতিবাদে করেছে, কিন্তু এটা অন্যায়। এটা অপরাধ। স্বাধীনতার ৪২ বছরে আমরা পা দিয়েছি। অতীতে কখনো এ রকমটি হয়নি। কখনো রেল এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেই সঙ্গে গেল দু’মাসে যে ১৭০ জন সাধারণ মানুষ মারা গেলেন, ৭ জন পুলিশ সদস্য মারা গেলেন, বেশ কয়েকজন আহত হলেন, এটাও অনাকাক্সিক্ষত। কোথাও কোথাও পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে। যে ১৭০ সাধারণ মানুষ মারা গেলেন, তাতে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সাধারণ একজন পুলিশ সদস্য তো এর জন্য দায়ী নন। তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। হুকুম তামিল করতে হয়েছে। আমি তাদের দোষ দিতে পারি না। এখানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের যে বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়ার কথা তা তারা দিতে পারেননি। এই নিবন্ধটি যখন লিখছি, তখন সংবাদপত্র থেকেই জানলাম বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে আবার আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। অপারেশনের পরেও তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না। তিনি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা আজ কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিএনপি বড় দল। তাদের জনসভায় গুলি হবে কেন? কেনই বা মি. খানের মতো একজন সিনিয়র নেতা আহত হলেন? পুলিশ গুলি চালিয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে রয়েছেন।
দুটি মূল রাজনৈতিক ইস্যুতে রাজনীতি এখন আবর্তিত এবং সংকটকে ঘনীভূত করেছে। এর একটি হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ্বিতীয়টি কোন পদ্ধতিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হোক আমরা সেটা অবশ্যই চাই কিন্তু সেই বিচারটা যেন হয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। এ ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু যখন বিশেষ আদালতে বিচার চলছে, তখন গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করে এবং দিনের পর দিন আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘটনা প্রকারান্তরে বিচার বিভাগের ওপর এক ধরনের ‘চাপ’ সৃষ্টি করার শামিল। সরকার তাদের চাপের মুখে আইনে বেশকিছু পরিবর্তন আনতেও বাধ্য হয়েছে। এরপর আর গণজাগরণ মঞ্চের কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি না। এর পরও রুমী ব্রিগেড গঠিত হয়েছে। গঠিত হয়েছে একটি নাগরিক সমাজ। এদের সবার দাবি একটিই-যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি। এভাবে কোনো দোষী ব্যক্তিকে চাপের মুখে থেকে কী ফাঁসি দেয়া যায়? আইনকে তার পথে চলতে দেয়া উচিত। বিজ্ঞ বিচারপতিরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে আর আন্দোলন না করাই মঙ্গল। কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আমরা জানতে পেরেছি ২৫ অক্টোবর বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। কিন্তু কার কাছে? বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখে কোনো ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ ফর্মুলা বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে ‘সকল দলের অংশগ্রহণের’ যে নির্বাচন, তা নিশ্চিত করা যাবে না। অক্টোবরের আগেই এ ব্যাপারে সমঝোতা হতে হবে।
ইতিমধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে আরো একটি ‘ফ্রন্ট’ তৈরি হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠন ‘ইসলামবিরোধী ব্লগ এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদকে (সা.) কটূক্তিকারীদের গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির’ দাবিতে শুক্রবার লংমার্চ করে গতকাল শনিবার ঢাকায় গণজামায়াতে করেছে। হঠাৎ করেই রাজনীতির মঞ্চে এই সংগঠনটি আবির্ভূত হয়েছে এবং এর প্রধান যিনি, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নাম এদেশের মানুষ আগে অতটা জানত না।
সরকার যদিও বেশ কয়েক ব্লগারকে মহানবীকে (সা.) কটূক্তি করে লেখালেখির অভিযোগে গ্রেফতারও করেছে, কিন্তু এটা অনেক দেরি হয়ে গেছে। হেফাজত এর আগে যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, ওই দাবিগুলোকে সরকার যদি ইতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে দেখত এবং একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে বা উপদেষ্টাকে আল্লামা শফীর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বটি দিত, তাহলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। পরে ব্লগারদের গ্রেফতার করেও লংমার্চ ঠেকানো যায়নি। এমনকি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৫টি সামাজিক সংগঠন শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশে যে হরতাল ডেকেছে, সরকার এ ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিতে পারত। একদিকে হরতাল, অন্যদিকে লংমার্চ পরিস্থিতিকে যে একটি সংঘাতময় অবস্থার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ধারণা করা হচ্ছে এখন হরতাল আর নাশকতার বৃত্ত বন্দি হয়ে পড়বে জনজীবন যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিএনপি ও জামায়াত এই লংমার্চকে সমর্থন করেছে। এই কাজটি যে বিরোধী দল করবে, এটা তো খুব স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সরকারের স্ট্র্যাটেজির অনেক অভাব ছিল।
সরকার এখন একের পর এক অনেক ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করছে। সরকার পরিস্থিতিকে সামাল কীভাবে দেবে, সেটাই দেখার বিষয়। এখানে সরকারের ‘রিয়েল পলিটিকস’ বা বাস্তবমুখী পদক্ষেপের বড় অভাব। হেফাজতে ইসলামকে ‘জামায়াতের আরেকটি ফ্রন্ট’ কিংবা ‘জামায়াতের ফাঁদে হেফাজত পা দিয়েছে’ এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করা যায় বটে, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা যাবে না। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আছেন, যারা ইসলাম ধর্ম চর্চা করেন। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিরোধী কথাবার্তা বলা ও নবী করিম (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করা ও ব্লগে এ নিয়ে লেখালেখি করা আর যাই হোক ইসলামপ্রিয় সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করে নেবে না। সরকারের অনেক আগেই উচিত ছিল হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একটা ‘ডায়ালগ’ ওপেন করা। এখন অভিযুক্ত ব্লগারদের গ্রেফতার করেও শেষ রক্ষা হলো না। শুধু তাই নয়, সরকার সমর্থক ২৫টি সংগঠনকে হরতাল পালন করার সুযোগ দিয়ে সরকার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বাকি সংগঠনগুলো হরতাল ডাকতেই পারে। এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সমাবেশের পাশাপাশি হরতাল পালন উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে। স্পষ্টতই বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদিকে রয়েছে বামমনা তথা ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা, অন্যদিকে রয়েছে ধর্মভিত্তিক শক্তি। মূল ধারা মূলত দুটি। এর বাইরে কোনো তৃতীয় ধারার অবস্থান নেই।
বাংলাদেশ এখন এক কঠিন সময় পার করছে। রাজনীতিকদের মাঝে অনাস্থা, অপর পক্ষকে সহ্য না করার মানসিকতা, ক্ষমতা ধরে রাখা ও দীর্ঘস্থায়ী করার মানসিকতা স্বাধীনতার ৪২ বছরে এসে দেশকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। পুলিশকে পিটিয়ে জখম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা যেমনি বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে রেলের মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করার এক আত্মঘাতী প্রবণতা। শুভবুদ্ধির মানুষের অভাব যেমনি পরিলক্ষিত হচ্ছে, ঠিক তেমনি একটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বও আমরা দেখছি না। হরতালের পর হরতাল হচ্ছে। অর্থনীতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে এসব কিছুর অবসান অত্যন্ত জরুরি। এই মুহূর্তে সরকার আর বিরোধী পক্ষ ও সেই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য আরো খারাপ খবর অপেক্ষা করছে। তাই প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক অথবা ত্রিপাক্ষিক একটি ‘সংলাপ’, যে ‘সংলাপ’-এর মধ্য দিয়ে আমরা একটা সমাধান খুঁজে পাব ও উত্তেজনা হ্রাস হবে।
Manobkontho
07.04.13
সরকারের পদত্যাগই কাম্য
00:19
No comments
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ১৭৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও ১৮০ কোটি ডলার আমানত রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্ত দিয়েছে কাতার। সেই সাথে কুয়েতের ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব পিছিয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দু’টি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রস্তাব ঝুলে আছে। বিশ্বব্যাংকের সাথে দ্বন্দ্ব ও বিরোধের সর্বশেষ জের হিসেবে বিশ্বব্যাংক ওয়াসার প্রকল্প থেকে ৯৮ মিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সংবাদপত্রে অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো প্রকাশিত হলেও সরকারের দৃষ্টি এদিকে নেই। সরকার এখনও ব্যস্ত ‘শাহবাগ আন্দোলন’ নিয়ে। নতুন করে সরকারি উদ্যোগে একটি ‘নাগরিক সমাজ’ গঠিত হয়েছেÑ উদ্দেশ্য একটাই তথাকথিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করা। যেখানে একটি বিচার হচ্ছে, সেখানে এভাবে আন্দোলনকে উসকে দেয়া ‘বিচার বিভাগের ওপর অনেকটা হস্তক্ষেপের সামিল’, এ ধরনের অভিযোগ সুশীল সমাজের কাছ থেকে উচ্চারিত হলেও সরকার ‘অন্ধ’ ও ‘বয়রা’। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আগ্রহ সরকারের নেই। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বাঁচাতে সরকার একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। আরো দুঃখজনক সংবাদ হচ্ছে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে সরকার ব্যবহার করছে তাদের স্বার্থে। গত ২৮ মার্চ সরকার প্রধান সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই, বাংলাদেশ তো বটেই, সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনী নিজেদের জড়িত করে না। প্রধানমন্ত্রী সেখানে একটি দলের প্রতি ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে কটাক্ষ করা ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করাসহ যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সময়োপযোগী নয়। এসব রাজনৈতিক বক্তব্য সেনাকুঞ্জে না দেয়াই মঙ্গল। এ দেশের মানুষ জানে ৩ নভেম্বর (১৯৭৫) এ দেশে কী ঘটেছিল। সেদিন তথাকথিত ‘সিপাই বিপ্লব’ নামে যারা সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, তারা আজ সরকারের শরিক, মন্ত্রীও হয়েছেন। সেনাবাহিনী হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মদতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, সেদিন সেনাবাহিনী দেশকে রক্ষায় রক্ত দিয়েছিল। দুঃখলাগে যখন দেখি সেদিন যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ করেছিল, সরকার তাদের নানান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে লালন-পালন করছে। অথচ বেশ কিছু সেনাক্যাম্প গুছিয়ে ফেলা হয়েছে। যার ফলে সেখানে নতুন করে জন্ম হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
বাংলাদেশ হচ্ছে অদ্ভূত একটা দেশ, যেখানে দুনীতিবাজদের রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় দেয়া হয়। মন্ত্রীকে ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতে গিয়ে ধরা পরেছিলেন মন্ত্রীর এপিএস। জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী পদত্যাগও করেছিলেন। কিন্তু সরকার প্রধান তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করে রেখে দিলেন। কিন্তু কেন? এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। সরকার দুর্নীতি দমন করছে না, বরং দুর্নীতি লালন করছে। সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু সরকারের কোনো উৎসাহ নেই দুর্নীতি দমনের। তাই এ সরকার যত বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততবেশি দুর্নীতি বাড়বে। যারা সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক, তারা লক্ষ্য করেছেন, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় সরকার বলেনি, কারা এই কাজগুলো করছে। আমরা একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা বললেও সরকার তা করেনি। অথচ কিছু মিডিয়াকে ব্যবহার করে দোষ চাপানো হচ্ছে বিরোধী দলের উপর। কোনো কোনো সংবাদপত্রে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল যে, মন্দিরে ও বৌদ্ধমঠে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা এই আগুন লাগিয়েছে। সরকার এ ক্ষেত্রে পারতো পূর্ণ তদন্ত করে দুষ্কৃতিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে। কিন্তু সরকার তার সমর্থকদের ‘প্রটেকশন’ দিয়ে যাচ্ছে।
গত ৩০ মার্চ আরো একটি উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়েছে একটি অনলাইন সংবাদপত্রে। উক্ত সংবাদে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশের হাতে নিরাপরাধ মানুষের মৃত্যু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গুলি করে মানুষ মারার নির্দেশের পর ‘জাতিসংঘে’র এই উদ্বেগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের আওতায় এই বিশেষজ্ঞ দলটি কাজ করে। তারা সম্প্রতি যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বাক স্বাধীনতা খর্ব করা, ন্যায় বিচারের অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। উক্ত বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ক্রিস্টোফ হেন্স দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করারও আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলের এই প্রতিবেদনটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আমরা বার বার বলে আসছিলাম প্রায় ১৭১ জন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে মারাত্মকভাবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে তারা যে মন্তব্য করেছে ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যে দাবি জানিয়েছে, তা মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে এই বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার এদিকে দৃষ্টি দিয়েছে কম। কিন্তু দ্রুত তথাকথিত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য একাধিক ‘ফ্রন্ট’ তৈরি করেছে। একটি তথাকথিত নাগরিক সমাজও গঠন করা হয়েছে সরকারের সুবিধাভোগী কিছু লোক নিয়ে। সুতরাং এই মুহূর্তে সরকারের কাছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করা অর্থহীন। এই মুহূর্তে দাবি একটাইÑ সরকারের পদত্যাগ। এই দাবির জন্য প্রয়োজনে লাগাতার হরতালের মতো কর্মসূচিও দিতে হবে। জনগণের সাময়িক কষ্ট হবে সত্য। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে মানুষ সাময়িক কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি।
05.04.13
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই
00:09
No comments
|
গত ২ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এটা অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল। গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফরের সময় এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এখন একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলো। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাশিয়া দেবে ৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। এর আগেও বণিক বার্তায় লিখেছিলাম, একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে থেকেও বাংলাদেশ এসব সিদ্ধান্ত নিল। বিশেষ করে জাপানের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দেশেও ফুকুসিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ তারা ঠেকাতে পারেনি। ফুকুসিমায় বিস্ফোরণ জাপানের অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, এ ব্যাপারে মোটামুটিভাবে আমরা সবাই অবগত। এখন যে প্রশ্নটি করা যায়, তা হচ্ছে রূপপুরের এ পারমাণবিক প্রকল্প কি আমাদের জ্বালানি সংকটের কোনো সমাধান বয়ে আনতে পারবে?
পারমাণবিক প্রকল্প ব্যয়বহুল তো বটেই, চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতেও অনেক সময়ের প্রয়োজন। আমাদের ন্যূনতম ছয় থেকে আট বছর অপেক্ষা করতে হবে এ প্রকল্পটি চালু হতে। অর্থাৎ ধরে নিচ্ছি ২০২০ সালের আগে রূপপুর থেকে কোনো বিদ্যুৎ পাব না। তাহলে বিদ্যুতের যে বিশাল চাহিদা, তা আমরা পূরণ করব কীভাবে? বিদ্যুৎ উত্পাদনের একটি বিকল্প সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই সম্ভাবনার এখন ‘মৃত্যু’ হতে বসেছে! আমাদের যে বিপুল কয়লাসম্পদ রয়েছে, তা দিয়ে চাহিদামতো বিদ্যুৎ পেতে পারি। কিন্তু এ কয়লার উত্তোলন আটকে আছে একটি ইস্যুতে— কোন পদ্ধতিতে আমরা কয়লা তুলব? সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে, নাকি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে। এখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার পক্ষে জনমত বেশি বলেই মনে হচ্ছে, যদিও একটি জাতীয় কমিটি এর বিরোধিতা করেছে। গত ৪ ডিসেম্বর সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন (যুগান্তর) থেকে জানা যায়, পরিকল্পনা কমিশন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার পক্ষে অভিমত দিয়েছে। এর আগে একটি সংসদীয় কমিটিও একই ধরনের অভিমত দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে কয়লার বিশাল রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও আমরা ভারত থেকে কয়লা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি। এ ব্যাপারে এরই মধ্যে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ভারতের কয়লা নিম্নমানের, সেটা একটা সমস্যা। অন্যদিকে খুলনায় যেখানে আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উত্পাদন হবে, তা সুন্দরবনের খুব কাছে। এতে করে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বড় ঝুঁকির মুখে থাকবে। স্থানীয় পর্যায়ে এর বিরোধিতা রয়েছে। এ বিরোধিতার খবর জাতীয় পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে। বলা ভালো, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এতে ব্যয় হবে ১৩ হাজার ২০০ কোটি ভারতীয় রুপি, যা কিনা বাংলাদেশী মুদ্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার সমান। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী আমদানি করা কয়লা নিয়ে এই কেন্দ্র দুটিতে বিদ্যুৎ উত্পাদন হবে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারত সমান অংশীদারিত্বে বিদ্যুকেন্দ্র দুটির ব্যয়ভার বহন করবে। চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। সংবাদপত্রে তা প্রকাশিতও হয়নি। তবে ভারতীয় কয়লা আমদানি কেন? আমাদের কি কয়লা সম্পদ নেই, যা দিয়ে আমরা বিদ্যুেকন্দ্র দুটি চালাতে পারি?
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাঁচটি কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন। এ কয়লা সম্পদ ৭৩ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য। তবে উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ ২০ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য ধরা যেতে পারে, যা ৩০ থেকে ৪০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ভালো জাতের বিটুমিনাস কয়লা পাওয়া গেছে। উত্তরাঞ্চলের বড়পুকুরিয়ায় যে কয়লা পাওয়া গেছে, তা ভূপৃষ্ঠের ১১৯ মিটার থেকে ৫৬০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত। মোট ছয়টি কয়লা স্তর পাওয়া গেছে, যার পুরুত্ব সর্বনিম্ন ৩ মিটার এবং সর্বোচ্চ ৮২ মিটার। মোট মজুদের পরিমাণ ৬০৩ মিলিয়ন টন। বর্তমানে কয়লাখনিটি ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতির মাধ্যমে উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। বড়পুকুরিয়া ছাড়াও জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে ভূপৃষ্ঠের ৬৪০ মিটার থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার গভীরতায় সাতটি কয়লাস্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। কয়লা এলাকার বিস্তৃতি প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এবং আনুমানিক মজুদের পরিমাণ ১ হাজার ৫৩ মিলিয়ন টন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফুলবাড়ীর এ কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয় ১৯৯৭ সালে এবং কয়লা মজুদ নিশ্চিত হয়েছে ৫৭২ মিলিয়ন টন।
জ্বালানি খাতে কয়লা একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও তাতে এখন ‘রাজনীতি’ ঢুকে গেছে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী কয়লাখনি উত্তোলনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। তাতে মারা যান ছয়জন। এরা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা করছিল। এখানে বলা ভালো, ১৯৯৪ সালে বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে সরকার ব্রকেন হিল প্রপার্টি সংক্ষেপে বিএইচপি নামে এক অস্ট্রেলীয় কোম্পানির সঙ্গে অনুসন্ধান চুক্তি করে। পরে ১৯৯৭ সালে ওই কোম্পানি এশিয়া এনার্জি নামে এক ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে লিজিং লাইসেন্স বিক্রি করে। এশিয়া এনার্জি ৩০ বছরের জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অধিকার লাভ করলেও বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার পাবে রয়েলটি হিসেবে উত্তোলিত কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ! এটাও বাংলাদেশে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে খনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও কোন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা লাভজনক, সে ব্যাপারেও দ্বিমত রয়েছে। একদল উন্মুক্ত পদ্ধতির পক্ষে। অন্যদল সুড়ঙ্গ পদ্ধতির পক্ষে। এমনকি বামমনা রাজনীতিকদের বক্তব্য থেকেও দেখা যায়, তারা সুড়ঙ্গ পদ্ধতির পক্ষে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ সুড়ঙ্গ পদ্ধতি আমাদের জন্য কতটুকু লাভজনক? ভারতের সেন্ট্রাল মাইন প্ল্যানিং অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. অজয় কুমার ঘোষ এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলা গেলে ফুলবাড়ী থেকে শতকরা ৯০ ভাগ কয়লা তোলা সম্ভব। এমনকি পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক ভূতত্ত্ববিদ ড. ইউনুস আকনও এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা সফলভাবে সম্ভব। ভারতে উত্পাদিত কয়লার শতকরা ৮১ ভাগ আসে উন্মুক্ত পদ্ধতি বা ওপেন কাস্ট মাইনিং থেকে। ‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবনা: অপ্রচলিত ধারণা’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেছি, ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে শতকরা ২০ ভাগের বেশি কয়লা তোলা সম্ভব হয় না (গবেষণাকর্মটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে)। বড়পুকুরিয়া কয়লা ক্ষেত্রের বেলায় দেখা গেছে, শতকরা ১০ ভাগ কয়লা তোলাও সম্ভব হচ্ছে না।
সরকার পারমাণবিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে শুধু একটাই কারণে। আর তা হচ্ছে দেশের বিপুল জ্বালানি চাহিদা মোকাবেলা করা। চূড়ান্ত বিচারে পারমাণবিক প্রকল্প কোনো সমাধান নয়। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য কয়লার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল (যেমন অস্ট্রেলিয়া ৭৯ শতাংশ, ভারত ৬৯, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯২ শতাংশ)। ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে বড় অভিযোগ— কৃষি তথা বসতভিটা অধিগ্রহণ, পানিশূন্যতা, ৪০ হাজার মানুষকে স্থানান্তর ইত্যাদি। জাতীয় কমিটি এ বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশন যে মতামত দিয়েছে, (যুগান্তর) তাতে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন
সম্ভব বলে জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সময়কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় ১ হাজার ২০০ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তাতে ১০-১২ হাজার বাসিন্দা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তাই রূপপুর প্রকল্প আমাদের জ্বালানিসংকটের কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উত্পাদন হয় গ্যাস থেকে (৮৭ শতাংশ), কয়লা (৩ দশমিক ৭ শতাংশ), বাকি ফার্নেস অয়েল, জলবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য উত্স থেকে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে, গ্যাসের রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারও হচ্ছে না। ফলে কয়লার ব্যাপারে আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশ এক বড় ধরনের ‘এনার্জি ট্র্যাপ’ বা জ্বালানি ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। গ্যাসের রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়া আর রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় আমাদের বিপুল জ্বালানি চাহিদার উত্স কয়লাই। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প কোনো সমাধান নয়। কয়লাই আমাদের ভরসা।
Bonik Barta
06.14.13
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে
16:57
No comments
গেল সপ্তাহে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে সংবাদপত্রে বেশ ক’টি খবর ছাপা হয়েছে। এসব খবর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কতটুকু চিন্তার খোরাক জোগাবে বলতে পারব না, কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে প্রকাশিত সংবাদগুলোর ব্যাপারে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। এরই মাঝে আবার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (অতীশ দীপঙ্কর) ‘দখলে’র খবরও ছাপা হয়েছে। যিনি দখল করেছেন, তিনি একজন সংসদ সদস্য এবং দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এতদিন শুনতাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে। এখন দেখলাম এ সেক্টরে ‘দখলের রাজনীতি’ও চলছে। এটা যেন একটা বড় বাণিজ্য সেক্টর! বিনিয়োগের খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু রিটার্ন ‘অনেক’! আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য ভুল করেননি। ঠিক জায়গাতেই হাত দিয়েছেন! কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কী হচ্ছে? গত সপ্তাহে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, উপাচার্যদের দুর্নীতির খোঁজে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থা। কী লজ্জার কথা! উপাচার্যদের দুর্নীতি খুঁজবে গোয়েন্দারা! এ সংবাদে অনেকে ভ্রƒ কুঁচকালেও আমি তাতে এতটুকুও অবাক হয়নি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৫। এই ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন উপাচার্য কে কী করেছেন, গত চার বছরে এর আমলনামা আর কোথাও না থাকলেও আছে সংবাদপত্রের পাতায়। এ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করা যায়। গত চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয়করণ, আÍীয়করণের যে রেকর্ড করেছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সেই সঙ্গে ছাত্রলীগের তাণ্ডব একাধিকবার সংবাদপত্রের খবর হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি হয়েছে।
আমাদের শিক্ষা সচিব একজন সজ্জন ব্যক্তি। কবি মানুষ। কবিরা সরকারি আমলা হলেও খুব একটা শক্ত গোছের মানুষ তারা হন না। তিনি যখন সংবাদপত্রকে বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, আইন সবার জন্য সমান, কেউ ক্ষমতার অপব্যহার করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে, তখন আমি আশ্বস্ত হই। কিন্তু যেসব উপাচার্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা আন্দোলনের মুখে অপসারিত হয়েছেন, তাদের কী হবে? শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, নোয়াখালী, রাজশাহী, জগন্নাথ, রংপুর, উš§ুক্ত, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়Ñ প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্যরা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করেছেন। তাহলে তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে? জানি বিষয়টা শোভন নয়। শিক্ষা সচিবের করারও কিছু নেই। কারণ বিষয়টা রাজনৈতিক! আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ ‘কাজটি’ করবেন, এই ভরসা রাখতে পারছি না। অনেক নাটকের জš§ দিয়েও রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি জলিল মিয়া এখনও বহাল তবিয়তে। জানি তার যাওয়ার সময় হয়ে আসছে (তার টার্ম শেষ হয়ে আসছে)। কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন তো থেকে গেলই। ইউজিসি সেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। একটা জনপ্রিয় দৈনিক তাদের সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘অভিযুক্ত ভিসিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে’। তবে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী কিছু করতে পারবেন না বলেই মনে হয়। কারণ জলিল মিয়ার খুঁটির জোর অনেক বেশি। শুধু রংপুরের ভিসি কেন? জগন্নাথ, রাজশাহী, ইসলামী, নোয়াখালী, উš§ুক্তÑ সব ভিসিই কি একই অপরাধে অপরাধী নন! তাদের বিচার করবে কে? যেসব অযোগ্য শিক্ষক, কর্মচারী, আÍীয়স্বজনদের ভিসিরা নিয়োগ দিয়ে গেছেন, তাদের ক্ষেত্রেই বা কী হবে? ইউজিসি তাদের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অপসারণের সুপারিশ করেছে। এই একজন জলিল মিয়াকে অপসারণ করলেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ইমেজ সংকট’ থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না। এ জন্য দরকার ব্যাপক সংস্কার। এটা সময়ের দাবি। আমরা এটা করতে যদি ব্যর্থ হই, তাহলে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না। ‘গোয়েন্দা সংস্থা ভিসিদের দুর্নীতির তদন্ত করবে’Ñ এটি শুধু ভিসিদেরই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককেই অসম্মানিত করল। আমি কারও দায়ভার নিতে রাজি নই। তাই প্রয়োজন অবিলম্বে ইউজিসির উদ্যোগে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা।
দুই
যুগান্তরের উপসম্পাদকীয় পাতায় ২৫ মার্চ একটি প্রতিক্রিয়া (খোলা জানালায় অসত্যের বেসাতি) লিখেছেন ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তার এই প্রতিক্রিয়া ছিল আমার সাপ্তাহিক কলাম ‘খোলা জানালা’য় প্রকাশিত একটি লেখার প্রতিবাদ। আমরা যখন লেখালেখি করি, যখন কোন একটি সত্যকে উšে§াচন করি, তখন কোন কোন মহল এটাকে ভালো চোখে দেখবে না, এটাই স্বাভাবিক। আমি এতে অন্যায় কিছু দেখি না। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে মিথ্যাটা বলল কে? আমি নাকি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন? আমার সৎ সাহস আছে। মিথ্যা তথ্য দিলে আমি অবশ্যই তা সংশোধন করব। করা উচিত। আমার ওই লেখাটি যদি কেউ পুনরায় পাঠ করেন, তাহলে দেখবেন শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে জগন্নাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার দু’-একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছি। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কথা। এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের কথা। তাহলে ‘সত্যের বেসাতি’ করল কে? প্রথমত, কে এই ড. জাহাঙ্গীর? তিনি তার পরিচয় দিয়েছেন লেখক ও গবেষক হিসেবে। তিনি মূলত তথ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান তথ্য অফিসার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ২২(১)(এফ) ধারা অনুযায়ী জাবির একজন সিন্ডিকেট সদস্য। এ তথ্যটি তিনি তার প্রতিক্রিয়ার ভেতরে উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তার অভিযোগ, ‘নির্বাচন কমিটির গোপন প্রতিবেদন’ আমি জানলাম কী করে? সঠিক কথা। আমি জেনেছি সমকাল, নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর। এবং সেই সঙ্গে শিক্ষক সমিতি ভিসিকে ঘেরাও করে এই নিয়োগের প্রতিবাদ করে যে স্মারকলিপি দিয়েছিল, তার সূত্র ধরে। তৃতীয়ত, আমার লেখায় উল্লেখ ছিল, যিনি কোনদিন অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করেননি, তিনি এ বিষয়ে শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না।
চতুর্থত, ড. জাহাঙ্গীর আরও একটি তথ্য গোপন করেছেন। সংবাদপত্রগুলো বলছে, তিনি ১৯৭৭-৭৮ (৭ম ব্যাচ) শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণী পেয়েছিলেন (পরে ইমপ্র“ভমেন্ট দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগ পান)। এ তথ্যটি ছাপা হয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্তে ২৪ জানুয়ারি, সমকালে ১৭ মার্চ, অনলাইন সংবাদপত্র ঢাকা টাইমসে ২৪ জানুয়ারি। অর্থাৎ সংবাদপত্র থেকেই এ তথ্য পাওয়া। তথ্যটি যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে ভুল করেছে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র, আমি শুধু উদ্ধৃতি দিয়েছি। তিনি কিন্তু পত্রিকায় কোন প্রতিক্রিয়া পাঠাননি। প্রতিবাদও করেননি। এখন জাবি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে এর ব্যাখ্যা দিতে পারে।
পঞ্চমত, প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আমার বিষোদগার করেছেন তিনি। এখানেও তথ্যের বিকৃতি! আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি এবং একই বিভাগ ও বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রির খবর একজন জাবির সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তার জানা থাকার কথা। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে কয়টি বই লিখেছি, এটাও বোধ করি তিনি সংগ্রহ করেছেন। একটু লিখলে কী ক্ষতি হতো?
ষষ্ঠত, একজন অতিরিক্ত প্রধান তথ্য অফিসার ও সেই সঙ্গে অত্যন্ত ক্ষমতাবান সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিটিকে প্রভাব খাটিয়েছেন বলে সবার ধারণা। তিনি ভালো করতেন, যদি তিনি প্রধান তথ্য অফিসার ও সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে পদত্যাগ করে ওই পদের জন্য আবেদন করতেন। তা তিনি করেননি। সহযোগী অধ্যাপক পদের জন্য কী কী যোগ্যতা (শিক্ষকতা) থাকা দরকার, তা সিন্ডিকেটই নির্ধারণ করে দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তা তার নেই। এখন আমি তাকে অনুরোধ করব, সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তিনি এ আইনটি পরিবর্তন করে ওই বিভাগে যোগদানের পথ প্রশস্ত করবেন। তাহলে কারও কিছু বলার থাকবে না এবং শিক্ষক সমিতিও আর কোন আপত্তি করবে না। আর যে ব্যক্তির কথা আমি উল্লেখ করেছি, তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই প্রায় দু’বছর। দীর্ঘদিন তিনি বিদেশে ছিলেন। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের এই শিক্ষক অধ্যাপক হয়েছেন অনেক আগে। মিডিয়া নিয়েই তিনি পিএইচডি করেছেন। তবে মজার কথা, তিনি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কোন ঘরানারই শিক্ষক নন। নতুন বিভাগে তার নিজের আগ্রহ আছে বলেও মনে হয় না। নতুন বিভাগে যোগ্য নেতৃত্ব দরকার, এটা বোঝাতেই তার কথা বলা।
আমার লেখার মূল স্পিরিট ছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে যদি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না হয়, তাহলে যোগ্য শিক্ষার্থী আমরা তৈরি করতে পারব না। এখানে ব্যক্তি ড. জাহাঙ্গীর আমার কাছে প্রধান নয়। আর একটি কথা, তথ্য অধিদফতরে ২৭ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতাকে কোনমতেই শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো যাবে না। আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদের নির্বাচনী বোর্ডে ছিলাম। আমি জানি এভাবে করা যায় না। করা গেলে তো সব পিএইচডিওয়ালা সচিব এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রফেসর হয়ে যাবেন! আর জাহাঙ্গীর সাহেব কি আকবর আলি খান কিংবা আতিকুজ্জামান খানের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে ফেললেন! তবে কথা তো থেকেই যায়। ভিসি মহোদয় তার নিয়োগ বাতিল করেননি। শুধু ‘ফেলে রেখেছেন’। কী করবেন, তিনি নিজেই তা ভালো বোঝেন।
তিন
আসলে মূল বিষয় হচ্ছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগে, উপাচার্য নিয়োগেÑ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন আনতে হবে। না হলে একুশ শতকের উপযোগী যে শিক্ষা ব্যবস্থা, তা আমরা গড়ে তুলতে পারব না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৩৮তম বার্ষিক প্রতিবেদনে শিক্ষক নিয়োগে নয়া প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব করেছে মঞ্জুরি কমিশন। প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ হবে কোন প্রক্রিয়ায়? শুধু ভিসির দয়ায়! আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়! এক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিশন গঠন করতে পারে, যারা সুনির্দিষ্ট মতামত দেবেন। নিুোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া যায় :
১. চারটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষকরা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেনÑ লিখিত পরীক্ষা, ডেমো, মৌখিক পরীক্ষা এবং সব পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট। প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা নম্বর থাকবে। ভিসিরা পরীক্ষা নেবেন না। ইউজিসির তত্ত্বাবধানে পিএসসির মতো একটি সংস্থা থাকবে, যারা এই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করবেন। ভিসিদের কর্তৃত্ব না থাকলে অযোগ্যদের নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ২. চার স্তরে যিনি সর্বোচ্চ স্কোর করবেন, তিনি দু’বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই দু’বছরে তাকে একটি গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করতে হবে (বিদেশে এমনটি আছে)। ৩. পিএইচডি ছাড়া কেউ সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন না। প্রভাষকদের অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিদেশে হলে ভালো হয়) পিএইচডি করতে হবে। ৪. পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্ট্রাকচার সিস্টেম তুলে দিতে হবে। এক্ষেত্রে যোগ্যতাই হবে প্রধান। ৫. প্রভাষকদের বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এ কাজটি করবে ইউজিসি। ৬. শুধু অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের মধ্য থেকে বিভাগের সভাপতি নির্বাচিত হবেন। ৭. উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি থাকবে। সার্চ কমিটির সদস্যরা সাংবিধানিক পদের অধিকারী হবেন। ৮. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘শিক্ষক রাজনীতি’ আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। কোন ধরনের নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে না। তথাকথিত নির্বাচন দলবাজের জš§ দেয়। ৯. আর্থিক সঙ্গতিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্য ও একজন সহ-উপাচর্য থাকবেন। ট্রেজারার থাকার আদৌ প্রয়োজন নেই। ট্রেজারারের দায়িত্বটি সহ-উপাচার্য পালন করতে পারেন। তাকে সহযোগিতা করবেন কম্পট্রোলার। ১০. শিক্ষক ও উপাচার্যদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো থাকবে। ১১. ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সি’তে উপাচার্যদের পদমর্যাদা বাড়াতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্যদের নানা কর্মকাণ্ড এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে, সংস্কার ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। সংস্কারটা করতে হবে এখনই। আমলা নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন কখনোই পরিবর্তন চাইবে না। তাই শিক্ষামন্ত্রী নন, একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই পারেন একটা বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে। না হলে আমাদের জন্য সামনের দিনগুলোয় আরও অনেক খারাপ খবর অপেক্ষা করছে।৮. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘শিক্ষক রাজনীতি’ আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। কোন ধরনের নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে না। তথাকথিত নির্বাচন দলবাজের জš§ দেয়। ৯. আর্থিক সঙ্গতিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্য ও একজন সহ-উপাচর্য থাকবেন। ট্রেজারার থাকার আদৌ প্রয়োজন নেই। ট্রেজারারের দায়িত্বটি সহ-উপাচার্য পালন করতে পারেন। তাকে সহযোগিতা করবেন কম্পট্রোলার। ১০. শিক্ষক ও উপাচার্যদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো থাকবে। ১১. ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সি’তে উপাচার্যদের পদমর্যাদা বাড়াতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্যদের নানা কর্মকাণ্ড এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে, সংস্কার ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। সংস্কারটা করতে হবে এখনই। আমলা নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন কখনোই পরিবর্তন চাইবে না। তাই শিক্ষামন্ত্রী নন, একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই পারেন একটা বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে। না হলে আমাদের জন্য সামনের দিনগুলোয় আরও অনেক খারাপ খবর অপেক্ষা করছে।
Daily JUGANTOR
05.04.2013
কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন জরুরি
16:38
No comments
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন সে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বিচারপতি (সাবেক) মির হাজার খান খোসোকে মনোনীত করেছে এবং তিনি শপথও নিয়েছেন। আগামী ১২ মে সেখানে সাধারণ নির্বাচন। এই সময়সীমায় বিচারপতি খোসো একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেতৃত্ব দেবেন। পাকিস্তানের নির্বাচিত সংসদ এই প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের টার্ম পূরণ করেছে। পাকিস্তানের ইতিহাসের জন্য সেটা একটা বড় খবর। পাকিস্তানের রাজনীতি, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি নানা কারণে অনেকেরই পাকিস্তানের ব্যাপারে একটা বিরূপ মনোভাব আমরা লক্ষ্য করি। পাকিস্তানে গণতন্ত্র সেভাবে বিকশিত হয়নি, এটা সত্য কথা। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তান একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যারা নিরপেক্ষভাবে পাকিস্তানের ১৪তম সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবেন। শুধু পাকিস্তানের কথা কেন বলি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য একটি দেশ, নেপালও সে দেশের প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করেছে। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্তটি নেয়।
পাকিস্তান ও নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পাকিস্তানে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল, পিপল্স পার্টি ও মুসলিম লীগের (নওয়াজ শরিফ) মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে একাধিকবার সেখানে সরকারের পতন ঘটেছে। পিপিপি নেত্রী বেনজির ভুট্টো দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু টার্ম পূরণ করতে পারেননি। ঠিক তেমনি মুসলিম লীগ নেতা নওয়াজ শরিফও দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনিও কোনোবারই তার টার্ম শেষ করতে পারেননি। এমনি এক পরিস্থিতিতে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০০৮ সালে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বেনজির ভুট্টো নিহত হলে দৃশ্যপট বদলে যায়। নির্বাচনে পিপিপি বিজয়ী হয় ও ১৭ মার্চ পিপিপি তাদের ৫ বছরের টার্ম শেষ করেছে।
একই কথা প্রযোজ্য নেপালের ক্ষেত্রে। নেপালে রাজতন্ত্র অবসানের পর সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে যে সাংবিধানিক পরিষদ গঠিত হয়েছিল, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য ছিল না। সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই নয়া সংসদ নির্বাচনের জন্য তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। পাকিস্তানে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বটে। কিন্তু পাকিস্তান নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ২৪ মার্চ করাচি ফিরে এসেছেন। তার দল নির্বাচনে অংশ নেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান দায়িত্ব নিয়েছেন বটে; কিন্তু অনেক প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। এসব ব্যাপারে কোনো সমঝোতা যদি না হয়, তাহলে কি আবার সেই সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করবে? সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানিকে ঘিরে বারবার সংবাদ হয়েছে। তার চাকরির মেয়াদ বেড়েছে। ক্ষমতা নেয়ার ব্যাপারে তার অনাগ্রহের কথা তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। এখন দেখার বিষয় পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা কতটুকু দূরদর্শিতার পরিচয় দেন।
নেপালে গঠিত হয়েছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আগামী ২১ জুন সেখানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর এ লক্ষ্যে ১৪ মার্চ একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন নেপাল সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি খিলরাজ রেগমি। প্রায় ১০ মাস ধরে সেখানে রাজনীতিতে অচলাবস্থা চলে আসছিল। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে একটি বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল নেপালে। মূলত চারটি প্রধান দলের পক্ষ থেকেই গত ১০ মাসে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু পার্লামেন্টের সমর্থন না পাওয়ায় কেউই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেননি। গত মে মাসে পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ওই সময়ে দেশটির জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রধান চারটি দল একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে নীতিগতভাবে একমত হয়ে বিচারপতি রেগমিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করেন। রেগমি ইতোমধ্যে শপথও নিয়েছেন। তার প্রধান ও একমাত্র কাজ হচ্ছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। এখানে মূল সমস্যা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছিল না। এমনকি মাওবাদীদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছিল। যারা বিশ্বরাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন অতি সম্প্রতি ইউরোপের একটি দেশ বুলগেরিয়ায় সরকার ভেঙে দেয়া হয়েছে। বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট রোজেন প্লেভনেলিয়েভ সাবেক কূটনীতিক মারিয়ান রায়কভকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। রায়কভ মে মাস পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন এবং মে মাসে তিনি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবেন। অনেকের মনে থাকার কথা অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে গ্রিসে পাপেন্দ্র সরকারের পতন ঘটেছিল। পরে সেখানে একজন বিচারপতি পাপাদেমাসের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং তিনি ইতোমধ্যে একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেমানান। কিন্তু কখনো-সখনো রাষ্ট্রকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার পরিপন্থী। গ্রিস, যেখানে এক সময় গণতন্ত্রের বীজ বপিত হয়েছিল, সেখানেও পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা গ্রহণ করতে। ২০০৭ সালে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়েতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছিল, অথচ সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। বৃহত্তর ঐক্য ও সঙ্কট এড়াতে সরকারকে সংবিধান-বহির্ভূত অনেক সিদ্ধান্তই নিতে হয়। এসব ঘটনা থেকে আমরা কী শিখছি? আন্দোলনের ফলে ছিল এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেটা ১৯৯৩-এর পরবর্তী সময়ের কথা। জামায়াতও সেদিন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। খালেদা জিয়া প্রথমে রাজি ছিলেন না। কিন্তু ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ কর্তৃক বয়কট এবং ১৩ দিনের ওই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পরে সপ্তম (১৯৯৬), অষ্টম (২০০১) ও নবম (২০০৮) সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়। এরপর সংবিধানে সংশোধনী এনে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের একটি রায় বড় ভূমিকা পালন করেছে। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে দশম সংসদ নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে? সরকার সংবিধান অনুসরণ করবে_ এটাই স্বাভাবিক। আর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। তবে এটাও সত্য, সব দলের, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা না হোক, একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশ গভীর সঙ্কটে পড়বে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানে কোনো সংশোধনী না এনেও, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। এটা নিয়ে সংলাপ প্রয়োজন। সংলাপে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। নবম সংসদে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার বয়স হবে মাত্র তিন মাস। এবং এই তিন মাসের মধ্যে ওই সরকার নির্বাচন পরিচালনা সম্পূর্ণ করতে বাধ্য থাকবে। প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন মাস আগে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। দুটি প্রধান দলের পক্ষ থেকে সমানসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে ওই সরকার গঠিত হবে। নিরপেক্ষতার স্বার্থে সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্যকে এ দায়িত্বটি দেয়া যায়। অথবা সর্বজন গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তির ব্যাপারে ঐকমত্যে পেঁৗছলে তিনি শূন্য আসনে বিজয়ী হয়ে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এ দায়িত্বটি পালন করবেন। নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আরপিওতে থাকতে হবে, যা সম্প্রতি বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব তিন মাস প্রধান দু'দলের নেত্রী সমমর্যাদা ভোগ করবেন। মোটা দাগে যে কথাটা বলা যায়, তা হচ্ছে নির্বাচনপূর্ব তিন মাস প্রধানমন্ত্রী নিজেকে 'অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী' হিসেবে ঘোষণা করলেও, তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ইন্তেকাল করায় দেশে নতুন করে একটি 'সঙ্কট' তৈরি হয়েছে। কে রাষ্ট্রপতি হবেন, এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ, এবং সেই সঙ্গে দুজন সিনিয়র সিটিজেন অধ্যাপক বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের অভিমতও গ্রহণযোগ্যতায় নেয়া প্রয়োজন। দেশের এ দুজন সিনিয়র সিটিজেন নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের দৃষ্টি এদিকে নেই। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে বিএনপি যে সম্মান ও উদারতা দেখিয়েছিল, সরকার তার প্রতি এতটুকুও সম্মান জানায়নি। গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের তো সরকার ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং নতুন করে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার নামে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। বগুড়ায় খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন সরকারের মন্ত্রীরা। শুধু তাই নয়_ অসৌজন্যমূলকভাবে খালেদা জিয়ার সমালোচনা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করারও হুমকি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে বিএনপির শ্রদ্ধা একটি সংলাপের তথা সমঝোতার সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও সেই সম্ভাবনার 'মৃত্যু' ঘটেছে বলে ধারণা করছি। ২৭ ও ২৮ মার্চ ১৮ দলের উদ্যোগে আবারো হরতাল পালিত হয়েছে সেই হরতালেও মানুষ মারা গেছে। হরতালে পুলিশের গুলি এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ১৭৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগে ও ১৮০ কোটি ডলার আমানত রাখাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্ত দিয়েছে কাতার। সেই সঙ্গে কুয়েতের ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব পিছিয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব ঝুলে আছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও বিরোধের সর্বশেষ জের হিসেবে বিশ্বব্যাংক ওয়াসার প্রকল্প থেকে ৯৮ মিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সংবাদপত্রে অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো প্রকাশিত হলেও, সরকারের দৃষ্টি এদিকে নেই। সরকার এখনো ব্যস্ত বিরোধী মত ঠেকাকে। নতুন করে সরকারি উদ্যোগে একটি 'নাগরিক সমাজ' গঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই_ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করা। যেখানে একটি বিচার হচ্ছে, সেখানে এভাবে আন্দোলনকে উসকে দেয়া 'বিচার বিভাগের ওপর অনেকটা হস্তক্ষেপের শামিল', এ ধরনের অভিযোগ সুশীল সমাজের কাছ থেকে উচ্চারিত হলেও, সরকার 'অন্ধ' ও 'বয়রা'। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আগ্রহ নেই।
সরকার এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং দেশকে কঠিন সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ একটাই_ আর তা হচ্ছে একটি তত্ত্বাবধায়ক তথা নিরপেক্ষ সরকার গঠনের লক্ষ্যে ১৮ দলীয় জোটের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা। সরকার যত দেরি করবে, ততই দেশ ও জাতির জন্য তা অমঙ্গল বয়ে আনবে। এত সঙ্কট, বিভেদ আর বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান আর নেপাল যদি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে আমরা তা পারব না কেন?
আসলে যা দরকার তা হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের শুভবুদ্ধির উদয়। শুভবুদ্ধির উদয় না হলে সঙ্কট আরো বাড়বে। জোর করে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব থাকতে পারে না। জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণই হচ্ছে সব ক্ষমতার উৎস। আজ একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যদি নির্বাচন হয়, আর সেই নির্বাচনে যদি মহাজোট সরকারকে আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসে (?) তাহলে কারো কিছু বলার নেই। দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সে কথাই বলছেন। মহাজোট সরকারের গত পাঁচ বছরের কর্মকা- বিচার-বিশ্লেষণ করার অধিকার দেয়া হোক জনগণকে। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু তা না করে এককভাবে একটি নির্বাচন করলে, সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কারো কাছেই থাকবে না। ১৮ দলীয় জোটকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। আর দায়িত্বটি সরকারের। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারই পারে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে।Daily JAI JAI DIN05.04.2013
কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ কি আসন্ন!
17:42
No comments
কোরীয় উপদ্বীপে এখন চলছে রণপ্রস্তুতি। উত্তর কোরিয়ার এক বিবৃতিতে গত শনিবার বলা হয়েছে 'দেশটিতে এখন 'যুদ্ধাবস্থা' বিরাজ করছে এবং দুই কোরিয়ার মধ্যকার সব বিষয় যুদ্ধকালীন সময় অনুযায়ী মোকাবিলা করা হবে। উত্তর কোরিয়ার তরুণ প্রেসিডেন্ট কিম জং উন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং করছেন, সমরাস্ত্রের নমুনা দেখছেন কিংবা উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে কিম উল সুং স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ আমেরিকাবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে- এ ধরনের ছবি ছাপা হয়েছে বিদেশি সংবাদপত্রে। একটা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সেখানে বিরাজ করছে। তবে এ মুহূর্তে এটা স্পষ্ট নয় আদৌ যুদ্ধ হবে কি না। তবে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এমন একটা সময় যখন একদিকে জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে গেল মার্চে চীনে নয়া প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন শি জিনপিং। বলার অপেক্ষা রাখে না, উত্তর কোরিয়ার সামরিক তথা অর্থনৈতিক সাহায্যের অন্যতম উৎস হচ্ছে চীন।
সাম্প্র্রতিক সময়গুলো কোরীয় উপদ্বীপে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন দায়িত্ব নিয়েছেন, তাও খুব বেশি দিন নয়। তাঁর বাবা কিম জং ইলের মৃত্যুর পর তিনি ওই তরুণ বয়সে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি মূলত উত্তর কোরিয়ায় একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে পারিবারিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর দাদা কিম ইল সুং ছিলেন উত্তর কোরিয়ার অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা। দাদার পর বাবা, এরপর নিজে উত্তর কোরিয়ার সমাজতান্ত্রিক সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গেল ফেব্রুয়ারি মাসেও দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে জনগণের ভোটে প্রথমবারের মতো একজন মহিলা সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি হচ্ছেন পার্ক গেউন হাই। মিসেস পার্কের বাবা দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক সেনাশাসক পার্ক চুং হি, যিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসেস পার্ক গত ১৯ ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, উভয় কোরিয়াতেই নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় আরেকটি পরিবর্তন লক্ষণীয়। আর তা হচ্ছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর কোরিয়া তৃতীয়বারের মতো পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। ফলে জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। তৃতীয় পরিবর্তনটি হচ্ছে, গেল মার্চ মাসে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর উদ্যোগে সামরিক মহড়া। প্রায় ৪০ হাজার সেনা এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এই সেনা মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম দূরপাল্লার বি-২ স্টিলথ বিমান ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিমান সুদূর মিসৌরির মূল ঘাঁটি থেকে উড়ে এসেছিল। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও লিবিয়া যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোথাও এই দূরপাল্লার পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য বিমান ব্যবহার করেনি। স্বাভাবিকভাবেই এটা উত্তর কোরিয়ার ওপর এক ধরনের মনস্তাত্তি্বক চাপ। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া তথা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য তাঁর মিসাইল ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়ে একটি ডিক্রিও জারি করেছেন।
এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে এই যে উত্তেজনা, তা কোনো যুদ্ধের জন্ম দেবে কি না? যাঁরা কোরীয় উপদ্বীপের রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা জানেন, এ অঞ্চলে উত্তেজনা কোনো নতুন খবর নয়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর পর থেকেই এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তবে উত্তেজনার পাশাপাশি দুই কোরিয়ার সংযুক্তির প্রশ্নেও এক ধরনের আলোচনাও চলে আসছিল অনেক দিন থেকে। এ ব্যাপারে একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দাই জং। ২০০০ সালের ১২ জুন দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানরা একটি শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। কোরিয়া বিভক্তকারী অসামরিক গ্রাম পানমুনজমে কিম মিলিত হয়েছিলেন প্রয়াত উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং ইলের সঙ্গে। এ অঞ্চলের গত ৫৩ বছরের রাজনীতিতে দুই কোরিয়ার নেতারা এর আগে আর কোনো শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হননি। এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ঠিক সাত বছর পর ২০০৭ সালের ২ অক্টোবর দুই নেতা রোহ মু হিউম (দক্ষিণ কোরিয়া) ও কিম জং ইলও (উত্তর কোরিয়া) মিলিত হয়েছিলেন দ্বিতীয়বারের মতো। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ও দুই জার্মানির একত্রীকরণের পর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি ছিল কোরীয় উপদ্বীপের দিকে। সেই থেকে অনেকে দুই কোরিয়ার একত্রীকরণের স্বপ্ন দেখছেন। এখানে বলা ভালো, কোরিয়া একটি বিভক্ত সমাজ। দুই কোরিয়ায় দুই ধরনের সমাজব্যবস্থা চালু রয়েছে। উত্তর কোরিয়া এখনো সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বহাল রেখেছে। উত্তর কোরিয়া চীনের অনুসরণ করে এখনো সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেনি। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। এক লাখ ২০ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট উত্তর কোরিয়ার লোকসংখ্যা দুই কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার। অন্যদিকে ৯৯ হাজার ২২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট দক্ষিণ কোরিয়ার লোকসংখ্যা চার কোটি ২৮ লাখ। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর মার্কিন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী কোরিয়ায় ঢুকে পড়ে এবং জাপানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কৌশলগত কারণে কোরিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করে। এক অংশে মার্কিন বাহিনী ও অন্য অংশে সোভিয়েত বাহিনী অবস্থান নেয়। সোভিয়েত সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে কোরিয়ার উত্তরাঞ্চলে (আজকে যা উত্তর কোরিয়া) একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের আহ্বানে সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও দেখা গেল নির্বাচন শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তার অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করলে যুদ্ধ বেঁধে যায়। জাতিসংঘ এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করার জন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ বাহিনী মাঞ্চুরিয়া সীমান্তে উপস্থিত হলে ১৯৫০ সালের ২৬ নভেম্বর চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং চীনা সৈন্যরা দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ১৯৫১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা পুনরুদ্ধার করে। ১৯৫১ সালের ২৩ জুন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়, কিন্তু তা কার্যকর হয় দুই বছর পর ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই। যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। আর চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এ ধরনের একটি সামরিক চুক্তি করে ১৯৬১ সালে। মূলত ১৯৫১ সালের পর থেকেই কোরীয় উপদ্বীপ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে।
কোরীয় উপদ্বীপের মূল সমস্যা একটি- উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম। উত্তর কোরিয়া ২০০৬ সালের অক্টোবরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে বিশ্বের অষ্টম পারমাণবিক শক্তির দেশ হিসেবে প্রমাণ করে। সেই থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সমস্যা উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে। তবে এটাও সত্য, এক সময় উত্তর কোরিয়ার যুক্তি ছিল তাদের বিপুল জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্যই এই পারমাণবিক কর্মসূচি। কিন্তু দেখা গেল উত্তর কোরিয়া তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক বোমা সংযুক্ত করেছে। এ নিয়ে ছয় জাতি আলোচনা (চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দুই কোরিয়া) শুরু হলেও অগ্রগতি হয়েছে অতি সামান্যই। এই ছয় জাতি আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ করা। কিন্তু এই ছয় জাতি আলোচনা থেমে গেছে। এই আলোচনায় এক পর্যায়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে ৫০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা দিয়ে উত্তর কোরিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রকল্পগুলো পরিদর্শনের 'চাপ' অব্যাহত রাখলে ছয় জাতি আলোচনায় স্থবিরতা দেখা দেয়। পশ্চিমাদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার কাছে ছয় থেকে ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করার ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ভয় এ কারণেই।
কোরীয় উপদ্বীপে সর্বশেষ যে উত্তেজনা ও উত্তর কোরিয়ার 'যুদ্ধাবস্থা' ঘোষণা এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, বলা কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে এখানে আদৌ যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উত্তর কোরিয়া এ ধরনের উত্তেজনা মাঝেমধ্যেই সৃষ্টি করে ও সেখান থেকে ফায়দা ওঠায়- ম্যাগাজিনটির মূল্যায়ন অনেকটা এ রকমই। ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়ার 'যুদ্ধাবস্থা' ঘোষণাকে আমলে নিলেও দক্ষিণ কোরিয়া আদৌ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, উত্তর কোরিয়ার সীমান্তের কাছে যেকোনো ধরনের সামরিক কার্যকলাপ অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। আর চীন উত্তেজনা কমানোর আরজি জানিয়েছে। এটা সত্য, এ অঞ্চলে উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা ছড়িয়ে যাবে অন্যত্র। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 'আরব বসন্ত'-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও বিতর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া কোনো ভালো খবর নয়। এতে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা, দুই কোরীয় নেতার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক (২০০৭-এর পর), এবং সেই সঙ্গে ছয় জাতি আলোচনা শুরু করা। যুদ্ধ কোরীয় উপদ্বীপে কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। এমনিতেই উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থার খবর একাধিকবার সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। দুই কোরিয়ার মধ্যে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ শুরু হলে তা উত্তর কোরিয়ার জন্য আরো অনেক দুঃখ-কষ্ট বয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রেরও উচিত হবে যৌথ মহড়ার কর্মসূচি বাতিল করে দক্ষিণ কোরিয়াকে একটি 'সংলাপ'-এ রাজি করানো। দুই কোরিয়ার মধ্যকার সংলাপ সব ধরনের উত্তেজনা হ্রাসে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।Daily KALERKONTHO02.04.13
Subscribe to:
Posts (Atom)










