রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

আঞ্চলিক সহযোগিতা, নাকি প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা

এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ব্যাপারে তিন দিনব্যাপী একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ‘ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা’ শীর্ষক এ সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ। এ সিম্পোজিয়ামে ভারতের হাইকমিশনার ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতও বক্তৃতা করেন। সিম্পোজিয়ামে খোলামেলাভাবেই বলা হয়, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য সবাইকে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সবার আগে প্রয়োজন খোলা মন নিয়ে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করা। সম্মেলনে এটিও বলা হয় বাংলাদেশ খোলা মন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে অন্য দেশগুলোর কাছ থেকেও একইভাবে বিনিময় আশা করে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নে এ ধরনের একটি সম্মেলন বা সিম্পোজিয়ামের গুরুত্ব অনেক বেশি, তবে এখানে প্রশ্ন আছে ভারতের ভূমিকা নিয়ে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকেও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। ভারত ত্রিদেশীয় (বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার) একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলছে বটে, কিন্তু একইসঙ্গে ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলছে, যা কিনা আগামীতে এ অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে। সিরিয়াস পাঠকমাত্রই জানেন, ঢাকায় শেষ হওয়া এ সিম্পোজিয়ামের আগে ২০ থেকে ২২ মার্চ ভারতের ভুবনেশ্বরে ‘ইন্ডিয়ান ওসেন রিম’ বা আইওআর একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা ভারতের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান যেসব বক্তব্য রেখেছেন, তাতে এটি স্পষ্ট যে, ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনকে এককভাবে কর্তৃত্ব করতে দেবে না। ফলে একদিকে ভারত যখন আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলছে, অন্যদিকে আবার এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। এখানে দুইটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক. মিয়ানমার ধীরে ধীরে ‘উন্মুক্ত’ হয়ে যাচ্ছে। দুই. যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং ভারতের সঙ্গে একটি কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে চীনবিরোধী একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে চায়। তাই ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ভূমিকা ত্রিদেশীয় এ আঞ্চলিক সহযোগিতাকে কতটুকু প্রভাবিত করে, তা দেখতে হবে। গবেষকরা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। বলা ভালো, ওবামা তার শাসনামলে দুইবার ভারত সফর করেন। ২৫ জানুয়ারি তিনি ভারত সফর করে গেছেন। ওবামার এ সফরের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার জট খুলেছিল। সমস্যা ছিল ভারতের পক্ষ থেকে। কেননা ২০১০ সালে ভারতে পরমাণু দায়বদ্ধতা আইন পাস হওয়ার পর গোটা প্রক্রিয়াটি থমকে গিয়েছিল। কেননা ওই আইনে বলা হয়েছিল কোনোরকম দুর্ঘটনা ঘটলে, তার দায় নিতে হবে ইউরেনিয়াম সরবরাহকারী মার্কিন সংস্থাগুলোকে। এখন একটি বীমা কোম্পানি গঠন করা হয়েছে, তারা এ দুর্ঘটনার দায়ভার বহন করবে। ফলে পরমাণু সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগে আর কোনো বাধা থাকল না। ওবামা ভারতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য ৪০০ কোটি ডলার তহবিলের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ব্যাংক এ অর্থ জোগাবে। এ অর্থের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ২০০ কোটি ডলার দেয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ১০ বছরের জন্য এ চুক্তি নবায়ন করা হযেছে, যেখানে একসঙ্গে গবেষণা ও অস্ত্র তৈরির কথা রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় রাসায়নিক বা জৈব প্রতিরক্ষা কর্ম তৈরি, রোল অন রোল অব ইনটেলিজেন্স এবং নজরদারি বিমান তৈরিতে ভারতকে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলছিল দুই পক্ষ। যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তানভিত্তিক ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর নামও উল্লেখ করা হয়েছিল। একইসঙ্গে দুই পক্ষ সাইবার হুমকি মোকাবিলায় তথ্য আদান-প্রদানে সম্মত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘ভূমিকা’ এবং সেই ভূমিকার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অ্যালায়েন্সকে নতুন করে সামনে নিয়ে এলো। পার্শ্ববর্তী দুইটি দেশ চীন ও পাকিস্তানের যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তাতে প্রমাণ হয়, দেশ দুইটি খুব খুশি নয়। চীনের প্রেসিডেন্ট ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে যে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন, তাতে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ‘ওয়াশিংটন চাইছে ভারত ও চীনের মধ্যে যেন একটি সহজাত শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব তৈরি হয়।’ আর পাকিস্তান বলেছে, ‘নিরাপত্তা পরিষদে যোগ্য নয় ভারত।’ ওবামা ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদে সমর্থন করেছিলেন। এখানে বলা প্রয়োজন যে, অতি সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় সরকার পরিবর্তন হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে অতিমাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং শ্রীলঙ্কাকে অতিমাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিলেন। এ নির্ভরশীলতা একটি নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করেছিল, যা ভারত খুব ভালো চোখে নেয়নি। এখন শ্রীলঙ্কার নয়া সরকার বলছে, তারা শ্রীলঙ্কা-চীন সম্পর্ক নতুন করে পুনঃবিবেচনা করবে। এমনকি শ্রীলঙ্কায় চীনের বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নয়া প্রধানমন্ত্রী। ফলে শ্রীলঙ্কায় সরকার পরিবর্তনে ‘ভারতের একটি ভূমিকা’ নিয়ে কথা উঠেছে। চীনবিরোধী কথাবার্তা বলার মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কা-চীন সম্পর্ক এখন প্রশ্নের মুখে থাকল। অপরদিকে শ্রীলঙ্কা-ভারত সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠল। এটি স্পষ্ট যে, এ অঞ্চলে বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান কিংবা বাংলাদেশে চীনের একটি ‘ভূমিকা’র ব্যাপারে ভারতের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দারা খুব খুশি ছিল না। ভারত চীনের এ ভূমিকাকে আরও সঙ্কুচিত করতে চায়। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, গেল বছরের মাঝামাঝি মোদি ক্ষমতাসীন হয়ে প্রথম বিদেশ সফরে ভুটানে গিয়েছিলেন। তখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গিয়েছিল যে, চীন ভুটানে দূতাবাস খুলতে চায়, এ ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটিকে নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণের আলোকে দেখেনি।অরুণাচল নিয়ে ভারত ও চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো। চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফর ও গুজরাটে সরাসরি চীনা প্রেসিডেন্টকে সংবর্ধনা জানানোর পরও চীন অরুণাচল রাজ্যের ওপর থেকে তার ‘দাবি’ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, এটি বলা যাবে না। এর অর্থ হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। এমনকি কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার কথা ছিল চীনের তাও এখন বাতিল করা হয়েছে। এখন এটি নির্মাণ করা হবে পায়রা বন্দরে। এখানেও নিরাপত্তাটার প্রশ্নটি উঠেছে। ভারত চায় না এ অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক তথা অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাক। এখানেই তাই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রও চায় না এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাক। ওবামার ভারত সফরের পেছনে এ উদ্দেশ্যটিও কাজ করেছিল মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে। তাই প্রশ্ন থাকলই, ওবামার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে কে লাভবান হয়েছিল? ভারত না যুক্তরাষ্ট্র? ওবামাকে ভারতে নিয়ে আসার ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন। এতে করে তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির কিছুটা হলেও অগ্রগতি হবে। এর আগে পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি ‘ভাইব্রান্ট গুজরাট’ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা ভারতে আসবেন। এখন বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এবং তাতে মার্কিনি বিনিয়োগকারীদের জন্য রক্ষাকবচ থাকায়, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ল। ওবামা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ীপদে ভারতের প্রার্থিতা সমর্থন করে ভারতকে কাছে টানার একটি উদ্যোগ নিলেন বটে। কিন্তু তিনি যদি ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ‘ব্যবহার’ করেন, তাহলে ভুল করবেন এবং ভারতও যদি এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে চীনবিরোধী একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলে তাও এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না! এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। এখানে ‘সীমিত যুদ্ধ’ এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে! চীনের সঙ্গে প্যাসিফিক অঞ্চল ফিলিপাইন, জাপানের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে এ অঞ্চলে। পূর্ব চীন সমুদ্রে জাপান এবং দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব ও বিবাদ একাধিকবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ফায়দা উঠাতে চায়। অনেকের স্মরণ থাকার কথা কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি অরুণাচল রাজ্য যে ভারতের, সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ফুমিও কিসিদার এ বক্তব্যে চীনের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায়। চীন অরুণাচল রজ্যের ওপর তার দাবি পরিত্যাগ করেনি। চীন মনে করে, ভারত জাপানকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে এবং সেই সঙ্গে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্ক একটি ভিন্ন মেসেজ পৌঁছে দিতে পারে বেইজিংয়ে। স্পষ্টতই প্রভাব বিস্তারের এক অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে ভারত ও চীন। বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশ এ প্রতিযোগিতায় নিজেকে জড়িত করতে পারে না। তবে এটি সত্য, আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী। এ কারণে বাংলাদেশ বিসিআইএম জোটের ব্যাপারে তার আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ভারত (উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলো) এবং মিয়ানমারকে নিয়ে প্রস্তাবিত বিসিআইএম জোটটি গঠিত। কিন্তু ভারত মহাসাগর নিয়ে উত্তেজনা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে এ জোটটি বিকশিত হবে না। ফলে বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি একটি বড় ধাক্কা খাবে। ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ত্রিদেশীয় সিম্পোজিয়ামটি শেষ হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য সিম্পোজিয়ামে এ অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা, কিংবা চীনের ভূমিকা এবং প্রস্তাবিত বিসিআইএম জোট নিয়ে আলোচনা হয়েছে কম। নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে আমরা উপকৃত হতে পারি। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার আমাদের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই চীনের সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টি করে এ আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো বড় অবদান রাখতে পারবে না। Daily Alokito Bangladesh 19.04.15

কেমন হল প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার

নির্বাচনে ইশতেহার প্রকাশ করা আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি অংশ। জাতীয় পর্যায়ে যেসব নির্বাচন হয় সেখানে বড় দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে থাকে। অর্থাৎ তারা কমিটমেন্ট করে থাকেন ক্ষমতায় গেলে কী কী প্রতিশ্রুতি পালন করবেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ নির্বাচনী ইশতেহার নিয়েও বেশ আলোচনা হয়। ২৮ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। যে কোনো বিবেচনায় এ নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ায় এ নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে একাধিক দল ও প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে। যদিও আইনে বলা আছে, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন দলনিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে; কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তার দলের প্রার্থীদের (মেয়র) নাম ঘোষণা করেছেন এবং নিজে কাউন্সিলর প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। বিএনপি নেত্রীও নিজে উপস্থিত থেকে বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তবে লক্ষণীয়, জাতীয় পর্যায়ে সরকারের ১৪ দলের প্রতিনিধিরা থাকলেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলো আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আবার একই কথা প্রযোজ্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ক্ষেত্রেও। এক্ষেত্রে বড় দল দুটি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দেখা গেছে, ঢাকা সিটি (দুটি) কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত আলাদা আলাদাভাবে (বিশেষ করে কাউন্সিলর প্রার্থীদের ক্ষেত্রে) প্রার্থী দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত কিছুটা নাখোশ এমন খবরও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ চমক দেখিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তরের প্রার্থী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে চমক দিয়েছেন। নেতৃত্বের গুণে, গ্রহণযোগ্যতায় আনিসুল হক ভালো প্রার্থী এবং যোগ্য প্রার্থী, তাতে কারও কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটা তো স্বীকার করতেই হবে, তার এ প্রার্থীপদ নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েও (তিনি ২২টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক) হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী তার নিজের কোনো গাড়ি নেই! কোনো বাড়ি নেই! এমনকি তিনি সম্পদের যে হিসাব দেখিয়েছেন, তা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থী সাঈদ খোকনের ব্যাপারেও বিতর্ক রয়েছে। ১১৮ কোটি টাকার দাবিদার একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের কিছুটা অংশ পরিশোধ করে (তার মোট ঋণ ২০০ কোটি টাকা, দৈনিক মানবকণ্ঠ) তিনি তার প্রার্থিতা টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু একবার যদি তিনি বিজয়ী হয়ে যান, এ ব্যাংক ঋণ কি তিনি আদৌ পরিশোধ করবেন? আনিসুল হকেরও ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ১৫১ কোটি টাকা (দৈনিক মানবকণ্ঠ)।অন্যদিকে তাবিথ আউয়ালের প্রার্থিতা খোদ বিএনপি সমর্থকদের যথেষ্ট চমক দিয়েছে। মির্জা আব্বাস বিতর্কিত নানা কারণে। তার ব্যক্তিগত আচরণ, সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বিএনপি সমর্থকদের প্রভাবিত করবে। এ ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত ইমেজ এবং বিগত ৯২ দিনের আন্দোলন, গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার কাহিনী সাধারণ ভোটারদের কতটুকু প্রভাবিত করবে- এটা একটা বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে তাবিথ আউয়াল আদৌ আনিসুল হকের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবদুল আউয়াল মিন্টু থাকলে আজ ভিন্ন ইতিহাস রচিত হতে পারত। মিন্টু সাহেবের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো সমঝোতার অংশ কি-না, তা আগামী দিনেই বোঝা যাবে। এখানে বিএনপির হাই কমান্ডকে কতটুকু অন্ধকারে রাখা হয়েছিল, কেন হয়েছিল, এ প্রশ্ন উঠবেই। নিশ্চয়ই নির্বাচনের পর হাইকমান্ড এর হিসাব মেলাবে। তবে আমি ঢাকা উত্তরের অনেক বিএনপি সমর্থক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। তাদের মধ্যে আমি এক ধরনের হতাশা দেখেছি। বাবা আর ছেলে এক হতে পারেন না। তাবিথের বিএনপি সংশ্লিষ্টতার কোনো ইতিহাস নেই। জামায়াত কি পরোক্ষভাবে তাকে সমর্থন করছে! এর চেয়ে মিসেস নাসরিন আউয়াল ভালো প্রার্থী হতে পারতেন।নির্বাচনী ইশতেহার একটি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বলতে দ্বিধা নেই, ভোটাররা নির্বাচনী ইশতেহার দেখে ভোট দেন না। ভোট দেন ব্যক্তি দেখে, মার্কা দেখে, বিশেষ করে কে কোন দলের প্রার্থী- এটা বিবেচনায় নিয়েই ভোট দেন। তবুও ইশতেহারে যেসব কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আনিসুল হক অনেক আগেই তার কর্মসূচি উপস্থাপন করেছেন। আনিসুল হক আলোকিত ও পরিবেশবান্ধব নগরী উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার দেয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : স্মার্ট ও অংশগ্রহণমূলক সুশাসিত ঢাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, ধনী-গরিব সবার জন্য মানবিক এক ঢাকা, দুর্নীতিমুক্ত সিটি কর্পোরেশন, বিনিয়োগ বাড়ানো, ৩৬টি ওয়ার্ডে আধুনিক ডে কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সিটি কার্ড, পৃথক সাইকেল লেন, ৩৬ ওয়ার্ডের ৭২ জন সুনাগরিককে প্রতিবছর পুরস্কৃত করা, মশক নিধন কর্মসূচি, হকারমুক্ত ফুটপাত ইত্যাদি। অন্যদিকে সাঈদ খোকন তার নির্বাচনী ইশতেহারে ৫ অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার এ পাঁচ অগ্রাধিকার হচ্ছে- যানজট নিরসন, দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর মহানগরী, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, নাগরিকদের নিরাপদ জীবন। ঢাকাকে ডিজিটাল মহানগরী করা, বস্তি উন্নয়ন, হরিজন সম্প্রদায়ের সামাজিক মর্যাদা, মহানগরের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।যদি সরকারের সমর্থনপুষ্ট দুজন প্রার্থীর ইশতেহার বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে উভয় ইশতেহারই প্রতিশ্রুতিতে ভরা। অর্থাৎ তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে তারা এ কাজগুলো করবেন, তা সুস্পষ্ট করে বলেননি। ঢাকা মহানগরীর সমস্যা অনেক। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, যানজট, সুশাসন, জলাবদ্ধতা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, আবাসন ইত্যাদি। সিটি কর্পোরেশনের ২৮ ধরনের কাজ করে সরকারের ৫৬টি সংস্থা। এদের মাঝে সমন্বয় করার কাজটি কঠিন। প্রশাসনের সর্বত্র আমলাতন্ত্রের শক্ত অবস্থান রয়েছে। কোনো নির্বাচিত মেয়রের পক্ষে এ আমলাতন্ত্রের প্রভাব উপেক্ষা করা কঠিন। মেয়ররা চাইলেও আমলাতন্ত্রের লালফিতা সবকিছু আটকে দেবে। এজন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। যেমন জলাবদ্ধতা। ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও এটি বড় সমস্যা। একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকার বিশাল এলাকা ডুবে যায়। সাঈদ খোকনের নির্বাচনী এলাকার একটা বিশাল অংশ চলে যায় পানির নিচে। কোনো ইশতেহারেই এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কেন? এখানে একটা মাস্টার প্ল্যান করা দরকার। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীদের সহযোগিতা নিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। তাদের দক্ষতা, কমিটমেন্ট, সততা ও নেতৃত্বকে আমরা নগরবাসীর এ সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে পারি। এ ধরনের একটি প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার প্রশ্ন জড়িত। সেনাবাহিনী ছাড়া দুর্নীতিমুক্তভাবে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও আমরা কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু জনাব খোকনের এ ধরনের কোনো চিন্তাধারার খবর আমার জানা নেই। উপরন্তু বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত ও এর নাব্য বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে তিনি এটি করবেন? তিনি কি আদৌ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন? বুড়িগঙ্গার পানি এখন কুচকুচে কালো, বাজে গন্ধ এবং কোনো মাছ এই পানিতে বাস করতে পারে না। একজন মেয়র চাইলেও তা পারবেন না। এর সঙ্গে পরিবেশ মন্ত্রণালয় জড়িত। তবে রাইন নদীর ইতিহাস আমি জানি। এ প্রসঙ্গ নিয়ে আমি ২০১২ সালে তুরস্কে এক জার্মান বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, ইইউ এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। আমি ঢাকায় এসে যুগান্তরে এ কথা লিখেছিলাম। দুঃখজনক হচ্ছে, ওই সময় পরিবেশমন্ত্রী যিনি ছিলেন, তার দৃষ্টি এতে আকৃষ্ট হয়নি। আমাদের পরিবেশমন্ত্রী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আমলারা বিদেশে যেতে পছন্দ করেন। তারা কী জ্ঞান অর্জন করেন, তারাই জানেন। কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ আমরা দেখি না!উভয় প্রার্থীই যানজট নিরসনের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা ভুলে যাই এ কাজটি করার দায়িত্ব তাদের নয়। এ ক্ষেত্রে ডিএমপির ভূমিকা সবচেয়ে বড়। অসাধু কর্মচারীদের দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেখানে মন্ত্রী স্বয়ং বাস শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করেন, সেক্ষেত্রে যে মানুষ খুন করেও ড্রাইভাররা পার পেয়ে যাবেন, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি করবেন- এর সমাধান মেয়ররা কীভাবে দেবেন? একটা দৃষ্টান্ত দেই- যারা জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যান, তারা দেখেছেন সেখানে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন চলাফেরা করছে। রাতেও রিকশায় আলো দেখতে পাবেন। কই সেখানে তো যানজট সৃষ্টি হয় না? তাহলে ঢাকার অন্যত্র হচ্ছে কেন? ওই এলাকায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কোনো সুযোগ নেই। শৃংখলা সেখানে মানতে হয়। আমাদের নির্বাচিত মেয়ররা এ থেকে শিখতে পারেন।এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি দলের প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে আছেন। অনেক আগে থেকেই আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন স্ব স্ব প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের একজন তাবিথ আউয়াল মাঠে থাকলেও মাঠে নেই মির্জা আব্বাস। তার স্ত্রী তার হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বাংলা নববর্ষের দিন খালেদা জিয়া পল্টনে জাসাসের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এক ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। একই দিন আদর্শ ঢাকা আন্দোলন সিটি নির্বাচন সামনে রেখে একটি ১৭ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেছে। এটাকেও নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ধরা যেতে পারে। যদিও তারা বলেছেন, আলাদাভাবে দুটি সিটি কর্পোরেশনের জন্য দুটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। এত দেরি করে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করলে তা ভোটারদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার সময় তারা কম পাবেন। তবে খালেদা জিয়া যদি ঢাকায় পথসভা করতে পারেন, তা ভোটারদের কিছুটা হলেও উদ্দীপ্ত করবে। আদর্শ ঢাকা আন্দোলন যে ১৭ দফা উপস্থাপন করেছে, সেখানেও সুস্পষ্ট কোনো কর্মসূচি নেই। এ ১৭ দফার মাঝে রয়েছে মহানগর ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, মহানগরীর সড়ক যানবাহন ও পরিবহন ব্যবস্থা,শিক্ষা বিস্তার ও রোগ প্রতিরোধ, পরিবেশ সুরক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃংখলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ইত্যাদি। কিন্তু তারা কীভাবে এসব বাস্তবায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সমস্যাটা এখানেই। যারা এটা প্রণয়ন করেছেন, তাদের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। একটি নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে। বলা থাকে, তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হলে তারা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। তাদের ১৭ দফা মূলত এক ধরনের দাবি। কোনো পরিকল্পনা নেই। মজার ব্যাপার, ঢাকা মহানগরীর (দুটি সিটি কর্পোরেশন) মূল সমস্যা সমাধানের জন্য একটি নগর সরকার গঠন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকার এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখায়নি। তাই সরকারি দলের প্রার্থীরা এ ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্টও করেননি। পৃথিবীর অনেক দেশে বড় বড় শহরে নগর সরকার রয়েছে।অবশ্য বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বৃহস্পতিবার তার যে ইশতেহার প্রকাশ করেছেন সেখানে বলা হয়েছে, আদর্শ ঢাকা গড়ে তুলতে তার প্রথম পদক্ষেপই থাকবে নগর সরকার চালুর ইস্যু বাস্তবায়ন। এছাড়া ইশতেহারে তার উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকারের মধ্যে আরও রয়েছে- ঢাকা উত্তরের সড়ক উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রশাসনিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, আইনশৃংখলা ইত্যাদি।আমরা একাধিক ইশতেহার এবং একই সঙ্গে ১৭ দফার একটি কর্মসূচি পেয়েছি। বাম সমর্থকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তারাও ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের আবেদন কম। আমরা ইশতেহার তথা দাবি পেলাম বটে; কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা উল্লেখ না থাকায় ভোটারদের মাঝে এর কোনো আবেদন থাকবে বলেও মনে হয় না। একটি নির্বাচন হবে সত্য; কিন্তু তাতে মহানগরীর লাখ লাখ মানুষের সমস্যার সমাধান হবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। Daily Juganytor 18.04.15

অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল

তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল। এ ক্ষেত্রে ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন যতটা আলোচিত হচ্ছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে ততটা আলোচনা হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন যেন একটা প্রেস্টিজ ইস্যু দুটি বড় দলের জন্য। নির্বাচনকে সামনে রেখে বেগম জিয়া গুলশানের অফিস থেকে ‘অবরুদ্ধ’ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়েছেন! নিজ বাসভবন ‘ফিরোজায়’ তিনি ফিরে গেছেন ৯২ দিন তার অফিসে ‘অবরুদ্ধ’ থাকার পর! আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। অথচ এই জামিন নিয়েও কম ‘কাণ্ড’ হয়নি। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গুলশান থানায় কোর্ট থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পৌঁছায়নি। কিন্তু ওই ৯২ দিনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে এবং আমি জানি না ইতিহাস ওই ৯২ দিনকে আগামীতে কিভাবে মূল্যায়ন করবে। নিত্যদিন বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, ঢাকা মেডিকেলে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন সাধারণ মানুষের আহাজারি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমদের ‘হারিয়ে যাওয়া’ এবং ১৩৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে ‘ইতিহাস’ রচিত হয়েছে, তা কিভাবে স্থান পাবে রাজনীতির পাতায়? বিএনপি কি ব্যর্থ হয়েছে? সরকার কতটুকু লাভবান হয়েছে? এর হিসাব-নিকাশ যেন হঠাৎ করেই উঠে গেছে। সংবাদপত্র, অন্য মিডিয়া আর টকশোতে এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। কতটুকু স্বচ্ছ হবে এই নির্বাচন? প্রচারণার দিক দিয়ে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। সংবাদপত্রে প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে তাদের ছবি। আর বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা কোথাও নেই। ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষে গণসংযোগ করছেন তার স্ত্রী। আর উত্তরের বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা থাকলেও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। তার আবেদনপত্রের ‘ত্রুটি’ নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। একটি ‘ভুলের’ জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেননি। তাই একটি প্রশ্ন এসেই যায় তার মতো একজন ‘বিজ্ঞ’ মানুষ কেন জেনে-শুনে এই ছোট্ট ভুলটি করলেন? নাকি সরকারের কোনো কোনো মহলকে খুশি করার জন্যই তিনি এই ‘ভুলটি’ করেছেন? প্রধামন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়ে বাজারে নানা কথা চাউর হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তরে বিএনপি আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালকে সমর্থন করেছে। এতে কি সরকারি দলের হেভিওয়েট প্রার্থী আনিসুল হকের সঙ্গে আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে? এক কথায় এর জবাব হচ্ছে, না। তাবিথ আউয়াল আদৌ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তিনি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হয় না। বরং মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন করে বিএনপি কি চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে পারত না? সেটি হলো না। তারপরও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন যে নেই তা নয়। সরকার যদি এখন ইসিকে সহযোগিতা না করে, তাহলে ইসির একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব নয়। সরকার সমর্থকরা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন! ইসি এ ক্ষেত্রে কতটুকু শক্তিশালী হতে পারবে এ প্রশ্ন থাকলই। নির্বাচনী এলাকায় কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসি এ ব্যাপারে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এখন সরকার ইসির পরামর্শ কতটুকু গ্রহণ করে সেটি দেখার বিষয়। একটি জটিলতা রয়েই গেল ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) ওয়ার্ড সংখ্যা নিয়ে। উত্তরের লোকসংখ্যা ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ আর ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩৬। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের লোকসংখ্যা কম, কিন্তু ওয়ার্ড সংখ্যা বেশি। লোকসংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৩ আর ওয়ার্ড ৫৭টি। ফলে এখানে এক ধরনের বৈষম্য রয়েছে। নির্বাচনের আগেই এই বৈষম্য দূর করা উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ফলে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।ক। তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে আমরা জানি না। বিএনপির প্রার্থীরা প্রচারণায় অংশ নিতে পারলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আর না পারলে সরকারি দলের প্রার্থীরা ‘খালি মাঠে’ গোল দেবেন। প্রশ্ন এখানেইÑবিএনপি এই সুযোগটি কেন দিল? বিএনপির ব্যাপক সমর্থক রয়েছে। আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেন, একটা নৈতিক সমর্থন তো বিএনপির জন্য আছে। ফলে বিএনপি কি এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারবে? বিএনপি আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আর সেটা প্রত্যক্ষ হোক কিংবা পরোক্ষ হোক। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে বিএনপির ‘অবস্থান’ শক্তিশালী হবে মাত্র। দীর্ঘদিন যাবত দেশে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। সরকার ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো আস্থার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল না। বেগম জিয়া সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে ৩ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করলে কোনো একটি দাবিও সরকার মানেনি। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কতটুকু সফল হয়েছে বলা মুশকিল। তাই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলই। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নির্বাচনে যারা কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন ২০ দলের পক্ষ থেকে তাদের মাঝে ১৮৩ জন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি (যুগান্তর, ১ এপ্রিল)। আর বিএনপির ৪৪ জেলা অফিসে তালা (যুগান্তর, ২ এপ্রিল)। এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূলে নয়। ১০ এপ্রিল এই নিবন্ধটি যখন তৈরি করছি, তখনো তথাকথিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হয়নি! নির্বাচনের যখন এখনো তিন সপ্তাহ বাকি নেই, তখনো ঢাকাতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা কেউই মাঠে নেই। চট্টগ্রামে নোমান-আমীর খসরু মাহমুদকে বেশ তৎপর দেখালেও ঢাকাতে কাউকেই আমরা মাঠে দেখছি না। তা হলে কি বিএনপি এই নির্বাচনকে সিরিয়াসলি নেয়নি? লন্ডন থেকে তারেক রহমানের কোনো বক্তব্যও আমরা দেখছি না। যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করেন তারা নানা ‘তত্ত্ব’ উপস্থাপন করতে পারেন এখন! বিএনপির প্রার্থীরা এবং নেতারা যদি মাঠে না থাকেন, যদি প্রচারণায় অংশ না নেন, তাহলে কি নির্বাচনটা একদলীয় হয়ে যাবে না? বিএনপি কি সেটাই চাচ্ছে? বিএনপি কি বিশ্বকে আরো একবার দেখাতে চাইছে এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়? এতে বিএনপির লাভ কতটুকু হবে তা বলা মুশকিল। তবে এটা তো সত্য, বিএনপির এই ‘ধারণা’ আরো শক্তিশালী হবে। আরো একটা বিষয় বেশ দৃষ্টিকটু আর তা হচ্ছে বিএনপিকে কিনা ‘এমাজউদ্দীন ফর্মুলায়’ নির্বাচনে যেতে হলো! এমাজউদ্দীন আহমদ বিএনপি সমর্থিত বুদ্ধিজীবী। তার এই ‘ফর্মুলা’ নিয়ে নানা কথা হতে পারে। তবে সিনিয়র নেতাদের ‘অন্ধকারে’ রাখা কোনো ভালো কথা নয়। আরো একটা কথা আছে এবং তাহলো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন সরকারি দলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন, তখন অনেক প্রশ্ন ওঠে। এটা বুঝতে কারো বাকি থাকে না, সরকারপ্রধান কত সিরিয়াস। নিঃসন্দেহে এটা দল তথা সরকারের জন্য একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হয়ে সরকার দেখাতে চাইবে বিএনপির কোনো জনপ্রিয়তা নেই। এ জন্যই বিএনপির নির্বাচনে মাঠে থাকা উচিত। ডজন ডজন মিডিয়া কর্মী ও ক্যামেরার উপস্থিতিতে নির্বাচনে জালিয়াতি এবং কারচুপির সুযোগ থাকবে কম। ডজন ডজন মিডিয়া কর্মী ও ক্যামেরার উপস্থিতিতে নির্বাচনে জালিয়াতি এবং কারচুপির সুযোগ থাকবে কম। তাই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল। কিছু ‘কিন্তু’, কিছু ‘যদি’র মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলো যাবে। বিএনপি আবারো হরতাল-অবরোধের ডাক দিলে অবাক হব না। এর আগে শুধু নির্বাচনের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামকে হরতালমুক্ত রাখা হয়েছিল। এর অর্থ পরিষ্কার বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে চায়। নতুন করে আবারো হরতালের ডাক দিয়ে বিএনপি বুঝিয়ে দিল আগামীতেও এই হরতাল আসতে পারে! যদিও বলতে দ্বিধা নেই, হরতালের তেমন একটা ‘প্রভাব’ এখন আর নেই। হরতালের ‘ধার’ কমে গেছে। তাই অনেক জল্পনা-কল্পনার মধ্য দিয়ে তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পুরো জাতির দৃষ্টি এখন সেদিকে। ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা গেছে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, নাকি একতরফাভাবে হবে! এই নির্বাচন পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপট যেমনি বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি এই নির্বাচন সংকট আরো গভীরতর করতে পারে। এটা তো ঠিক এক ধরনের স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি আমি দেখেছি। কে জিতল, কে হারল এটা বড় কথা নয়। নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে হতে দেয়া আমাদের সবার জন্যই মঙ্গল। সরকারেরও হারানোর কিছু নেই। কিন্তু বিশ্ববাসীকে দেখানোর সুযোগ থাকবে যে, তাদের সময়েও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব এবং এটা সরকারের ‘অবস্থানকে’ আরো শক্তিশালী করতে পারবে। বিএনপিকে ‘মূল ধারায়’ রাখতে হবে। অবরোধ-হরতাল আর পেট্রলবোমার দুঃসহ স্মৃতি আমরা ভুলে যেতে চাই। একটা ‘আস্থার সম্পর্ক’ কিছুটা হলেও স্থাপিত হয়েছে। বেগম জিয়া এখন জামিনে মুক্ত। এই আস্থার সম্পর্কটাকে এখন আরো পুষ্ট করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন যেন এই ‘আস্থার সম্পর্কে’ কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। Daily Manobkontho 16.04.15

একটি নির্বাচন সব প্রশ্নের জবাব দেবে না

দীর্ঘ ৯২ দিনের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে গিয়ে বোধকরি দেশের মানুষ ও গণমাধ্যম এখন নির্বাচনমুখী। যদিও এটি তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, মূল্যায়ন আর টিভি টকশোর বদৌলতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন, বিশেষ করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণের) নির্বাচন নিয়ে উৎসাহটাই বেশি। দুঃসহ সেই স্মৃতি এখন আর কেউ স্মরণ করতে চান না। খালেদা জিয়াকে নিয়ে সরকারের যে জটিলতা, তাও কেটে গেছে। খালেদা জিয়া এখন মুক্ত। কিন্তু অনেক যদি এবং অনেক কিন্তু আছে। সাময়িক এই যে সমঝোতা, তা কি টিকে থাকবে? বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে যেমন দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, ঠিক তেমনি সরকারও বিএনপির ব্যাপারে একটি নরম অবস্থান নিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। এজন্য কাউকেই এককভাবে কৃতিত্ব দেয়া যাবে না। সরকার ও বিএনপির নেতারা উভয় শক্তি এটা উপলব্ধি করেছেন যে, তাদের একটা এক্সিট রুট দরকার, যাতে করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন এই পথ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে নেপথ্যে বেশকিছু শক্তি, যার মাঝে বাইরের শক্তিও রয়েছে। তারা সবাই মিলে কাজ করেছেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ এটা স্বীকার করেছেন যে, পর্দার অন্তরালে বিএনপির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। এটা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, একটা সমঝোতা হয়েছিল বিধায়ই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং খালেদা জিয়া জামিন পেয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর এই তথাকথিত সমঝোতা ভেঙে যেতে পারে। সরকারের ভেতরকার কারও কারও বক্তব্যে এমন একটা আশংকার জন্ম হয়েছে। যেমন বলা যেতে পারে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর একটি বক্তব্য। ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় দেয়া এক বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ১৩০টি মামলা তৈরি হচ্ছে! কথাটির পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে আমি বলতে পারব না। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কেউ এ ধরনের বক্তব্য দেননি। হাসানুল হক ইনু সরকারের মন্ত্রী এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তিনি চালান। ফলে তার এ বক্তব্যকে আমি হালকাভাবে উড়িয়ে দিতে পারি না। এখন দেখতে হবে এসব মামলা হয় কি-না? যদি হয়, তাহলে সাময়িক যে সমঝোতা, তা ভেঙে পড়বে। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়া জামিন পেলেও বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা, ২০ দলের কোনো কোনো নেতা, বিএনপির প্রচুর কর্মী এখনও জেলে অথবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা যদি শেষ অবধি জামিন না পান, তাহলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ৯৩টি ওয়ার্ডের (ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনের) বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকেই মামলার আসামি। তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। দক্ষিণের বিএনপির মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস নিজে প্রচারণায় অংশ নিতে পারছেন না। তার স্ত্রী তার হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফলে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সবার জামিন হওয়া ও প্রচারণার জন্য সময় পাওয়া যাবে না। কাজেই এটা একরকম নিশ্চিত, অনেকটা প্রচারণা ছাড়াই বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এই নির্বাচনে মার্কা (দলীয়) ব্যবহার করা যায় না। একেক প্রার্থীর একেক মার্কা। কে বিএনপির, কে নিরপেক্ষ- এটা যাচাই করা ভোটারদের পক্ষে কষ্ট হয়ে দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্লাস পয়েন্ট অনেক। তারা অনেক আগে থেকেই প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। ফলে নির্বাচনের ফল নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। আমরা ইতিমধ্যে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনে গেছি কারা সরকারদলীয় কাউন্সিলর প্রার্থী, আর কারা বিএনপিদলীয় প্রার্থী। ফলে অংকের হিসাব কষাটা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পর কী হবে? তিনটি মেয়র পদে সরকারি প্রার্থীদের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। চট্টগ্রামে যিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন (এবারও তিনিই প্রার্থী), তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ। চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধানে তিনি আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। ফলে সেখানকার ভোটারদের কাছে মনজুর আলমের গ্রহণযোগ্যতা একটা প্রশ্নের মুখে আছে। অন্যদিকে ঢাকার দুই প্রার্থী সবার কাছেই পরিচিত মুখ। তবে তারা দুজন (সাঈদ খোকন ও আনিসুল হক) বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। অনেক নাটকের পর সাঈদ খোকনকে সরকারপ্রধানের ইচ্ছায় প্রার্থী করা হয়েছে। তার পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু তার অতীত ক্লিন নয়। অন্যদিকে আনিসুল হক মিডিয়ায় পরিচিত মুখ হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি কতটুকু সততার পরিচয় দিয়েছেন, সে প্রশ্ন আছে। একটি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী আনিসুল হকের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ১৫১ কোটি টাকা, আর সাঈদ খোকনের ২০০ কোটি টাকা। আনিসুল হক হলফনামায় তার সম্পত্তির যে বিবরণ দিয়েছেন, তা কি ঢাকা উত্তরের ভোটাররা বিশ্বাস করেছেন? যিনি কোটি কোটি টাকা আয় করেন, তার নিজস্ব কোনো গাড়ি, বাড়ি নেই। ২২টি প্রতিষ্ঠানের যিনি মালিক, তার হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী মোট সম্পত্তির মূল্য ২৬ কোটি টাকা মাত্র! আসলে ব্যবসায়ীদের প্রার্থী না করানোই মঙ্গল। তারা কি তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ উপেক্ষা করতে পারবেন? অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস খোদ বিএনপি সমর্থকদের মাঝেই বিতর্কিত। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে তার সম্পর্কের তিক্ততার খবর সবাই জানেন। নিউইয়র্ক প্রবাসী খোকার সমর্থকরা মির্জা আব্বাসকে কতটুকু সমর্থন করবেন, এটা এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তরের বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মনোনয়নপ্রাপ্তি নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। তাকে সাধারণ মানুষ চেনে না। চেনে না বিএনপির কর্মীরাও। চেনে না মিডিয়া। তিনি কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, আমি বুঝতে অক্ষম। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্ররা এক্ষেত্রে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজতে পারেন। বাবা (আবদুল আউয়াল মিন্টু) ছেলের জন্য প্রার্থী পদ ছেড়ে দিয়েছেন, নাকি পরোক্ষভাবে জামায়াত প্রার্থী (তাবিথের শ্বশুর জামায়াতের শীর্ষ নেতা) ছেলেকে সুযোগ দিয়েছেন, নাকি বেয়াইয়ের (সরকারের এক উপদেষ্টা) প্রভাবের কারণে এবং মামলা থেকে ও নিজ ব্যবসায়িক স্বার্থে আনিসুল হককে সুযোগ দেয়ার জন্য সরে দাঁড়িয়েছেন- এসব তত্ত্ব নিয়ে বারবার আলোচনা হতে থাকবে। ঢাকা দক্ষিণে একাধিক বিএনপি প্রার্থী মেয়র পদে আবেদন করলেও (সালাম, ড. রিপন) ঢাকা উত্তরে কেন প্রার্থী হিসেবে শুধু আউয়াল মিন্টু থাকলেন? তাবিথ তো কোনো দিন বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি? অথচ বিএনপির অনেক শীর্ষনেতা এ এলাকায় থাকেন। তারা কেউ আবেদন করলেন না কেন? সরকারপ্রধান অনেক কৌশলী। আনিসুল হকের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে চেয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এক্ষেত্রে ব্যর্থ! নাকি হতাশ। ২০ দলের গত প্রায় তিন মাসের আন্দোলনে বিএনপি কতটুকু লাভবান হয়েছে, এ প্রশ্ন এখন সুধী সমাজে উঠেছে। নিশ্চয়ই বিএনপির নেতৃত্ব এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। তবে রাজনীতি বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে যা প্রতীয়মান হয়েছে, তা হচ্ছে : ১. আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় নেতৃত্বের সঙ্গে একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়। খালেদা জিয়া বিকল্প নেতৃত্ব (তারেক রহমানের অবর্তমানে) তৈরি করতে পারেননি। ২. বিএনপির স্থায়ী পরিষদের সদস্যরা আন্দোলনে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেননি। খালেদা জিয়াকে সাহায্যও করতে পারেননি। অথচ স্থায়ী পরিষদের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও খন্দকার মাহবুব হোসেন এককভাবে বিএনপির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবচেয়ে বেশি। সে কারণেই বোধকরি স্থায়ী পরিষদ পুনর্গঠনের প্রশ্ন উঠেছে। ৩. বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিভক্তি ছিল। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা দুভাগে ভাগ হয়ে যান। পরবর্তী সময় তারা এক প্লাটফর্মে দাঁড়ালেও নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভক্তি আছে। ৪. ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বহিঃবিশ্বে একটা নেতিবাচক ধারণার জন্ম হলেও অভ্যন্তরীণভাবে বিএনপি এটাকে পুঁজি করতে পারেনি। ৫. ২০ দলের সমর্থক অন্য ছোট ছোট দলগুলোর কাগুজে নেতারা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। একজন ছিলেন স্বঘোষিত নিজ বাসভুমে আবদ্ধ, অন্যজন কলাম লিখে আর টকশো করে সময় পার করেছেন! আন্দোলনে আদৌ তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও এরা সক্রিয় নন। এদের বিরুদ্ধে মামলা না থাকলেও এদের সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। ৬. সরকারবিরোধী, আবার ২০ দলের সঙ্গেও সম্পর্কিত নন- এমন কিছু ব্যক্তিত্বসর্বস্ব রাজনীতিক আছেন, যাদের সঙ্গে ন্যূনতম এক ইস্যুতে এক ধরনের ঐক্য করার প্রয়োজন ছিল, যা বিএনপি পারেনি। ফলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও আগামী আন্দোলন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলই। নির্বাচনে যখন ২০ দলীয় জোটের ১৮৩ জন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি (যুগান্তর, ১ এপ্রিল), কিংবা ৪৪ জেলা অফিসে যখন তালা (যুগান্তর, ২ এপ্রিল), তখন বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কী ফল করে, কিংবা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আদৌ নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কি-না, এ প্রশ্নও রয়েছে। সরকারের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে পেরেছে। এটা তো সত্য, বিএনপি না এলে এই নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হতো। তখন এমাজউদ্দীন ফর্মুলায় একদিকে খালেদা জিয়ার জামিন, অন্যদিকে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণকে সবাই স্বাগত জানালেও নির্বাচন সব প্রশ্নের জবাব দেবে না। ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনের আমি কোনো সম্ভাবনা দেখি না। সিনিয়র মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আমাকে বলেছেন, পরবর্তী নির্বাচন ২০১৯ সালে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। আর আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হবে পৌর নির্বাচন। এসব নির্বাচনও দলীয়ভাবে হয় না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দলীয় স্থানীয় নেতারাই এসব নির্বাচনে অংশ নেন। বিএনপির স্থানীয় নেতারাও এসব নির্বাচনে অংশ নেবেন। বিএনপি নির্বাচন বয়কট করতে আর পারবে না। সেজন্যই এই তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। এই নির্বাচনে যদি সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। তবে ভয়টা হচ্ছে, সিটি নির্বাচনের যখন মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি আছে, তখন নির্বাচনী প্রচারণায় নেই বিএনপির প্রার্থীরা। নির্বাচন মানেই যে প্রতিযোগিতা, নির্বাচন মানেই যে সবার জন্য সমান সুযোগ- এ বিষয়টি আমরা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হতে পারছি না। রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য প্রয়োজন কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার্স বা আস্থার সম্পর্ক। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই আস্থার সম্পর্ক কতটুকু স্থাপিত হবে এ প্রশ্ন থাকলই। এ নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। কিন্তু এ নির্বাচন আমাদের সব প্রশ্নের জবাব দেবে না। ১৩ এপ্রিল, ২০১৫ Daily Jugantor

জলবায়ু উদ্বাস্তু ও আমাদের করণীয়

রাজনীতির ডামাডোলে অনেকটা মিডিয়ার অজান্তেই খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী জলবায়ু উদ্বাস্তু সংক্রান্ত একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মেলন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটি সম্মেলনের যথেষ্ট গুরুত্ব থাকলেও মিডিয়ায় সম্মেলন সংক্রান্ত খবরাদি আমার চোখে পড়েনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংগঠন ‘ন্যানসেন ইনিশিয়েটিভ’ এর সহযোগিতায় এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। আর এতে অংশ নেয় দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতে মহাসাগরভুক্ত ১৪টি দেশের সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। খুলনায় এ ধরনের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য নিঃসন্দেহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে। আর বাংলাদেশের যেসব এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে রয়েছে বৃহত্তর খুলনা এলাকা। ‘সিডর’ ও ‘আইলায়’ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো এ এলাকাতেই অবস্থিত। এ অঞ্চলের মানুষ আজও ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র বিপর্যয় থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে যে ক’টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় উপকূলের মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি সাতজনে একজন মানুষ আগামীতে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ কোপেনহেগেন করা সম্মেলনে পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের Universal natural person হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। অর্থায়নের ব্যাপারটি নিয়েও নানা জটিলতা রয়েছে। ফাস্ট স্টার্ট ফান্ডে পাওয়া গিয়েছিল মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সেখান থেকে পেয়েছিল ১৩০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এ অর্থ সাহায্য বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। স্বয়ং পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একটি অনুষ্ঠানে প্রশ্ন তুলেছেন এর স্বচ্ছতা নিয়ে। বলেছেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ যাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এ অর্থ ঠিকমতো খরচ হচ্ছে কিনা তা মনিটরের ব্যবস্থা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নেই (২০ আগস্ট ২০১৪)। দুর্নীতি এখানে ভর করছে। যারা সত্যিকার অর্থেই জলবায়ু উদ্বাস্তু, তারা সাহায্য পাচ্ছে না। লিমা সম্মেলনে অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও কোনো সমাধান হয়নি অথচ এ প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি উন্নয়নশীল বিশ্ব তথা সাগরপাড়ের দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি করে। উন্নত দেশগুলো এ বিষয়টিকে এড়িয়ে চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, এমনকি ভারতে কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। (পাঠক, রামপালে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা চিন্তা করতে পারেন)। বাংলাদেশ বা মালদ্বীপের মতো দেশে সোলার বিদ্যুৎ ও বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও এ ক্ষেত্র দুইটি বারবার উপেক্ষিত থেকে গেছে। গরিব দেশগুলোর কাছে এ প্রযুক্তি সহজলভ্য নয়। প্রযুক্তি হস্তান্তরে উন্নত দেশগুলোর গড়িমসি চোখে লাগার মতো। লিমা সম্মেলনে (২০১৪) নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, প্রতিটি দেশ ছয় মাসের মধ্যে নিজের দেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনার ব্যাপারে নিজস্ব কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন ও উপস্থাপন করবে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রামপালে ভারতীয় কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি করছে বাংলাদেশ। এতে পরিবেশ দূষণ তো হবেই। একইসঙ্গে কার্বন নিঃসরণের মাত্রাও বাড়বে। ইটের ভাটায় কয়লা ব্যবহৃত হয়, যা বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়ায়। এখন বাংলাদেশকে লিমা ঘোষণা বাস্তবায়ন করে একটি কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। দেখার বিষয় বাংলাদেশ এখন কী করে। নিঃসন্দেহে লিমা ঘোষণা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে প্রশ্ন থাকলই। উন্নত বিশ্ব শেষ পর্যন্ত প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কিনা, এর জন্য আমাদের আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে, কংগ্রেসের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের দ্বন্দ্বের আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত লিমা ঘোষণার ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলে কিনা, সেটাই দেখার বিষয় এখন। তবে আগামী বেশ কয়েক মাস এ নিয়ে বেশ দেনদরবার হবে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক আসরে দেনদরবার করবে। জাতিসংঘ উদ্যোগী হবে। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এক্ষেত্রে জাতিসংঘের করার কিছুই নেই। কেননা উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি রাজি না হয়, তাহলে প্যারিস সম্মেলনে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে না। এজন্যই খুলনা সম্মেলনের গুরুত্ব রয়েছে। সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো অক্টোবরে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। খুলনা ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের ব্যস্তচ্যুতি একটি নির্মম সত্য। এ সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে। ব্যস্তচ্যুতি ঠেকাতে এবং অগত্যা ব্যস্তচ্যুতদের সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী তথা ধনী ও উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিমালা তৈরি করা একান্ত জরুরি।’ এছাড়া ব্যস্তচ্যুত অভিবাসীদের সুরক্ষার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন, তাদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে তেমন কোনো কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয়নি। বাংলাদেশ এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বলেও আমার জানা নেই। অথচ দ্বীপাঞ্চল থেকে মানুষ প্রতিদিনই উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে, বড় বড় শহরে আশ্রয় নিয়ে এবং বস্তিজীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। হাজার হাজার মানুষ তার পারিবারিক পেশা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ এদের পুনর্বাসনের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় স্থান পেলেও বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যারা চালান, তারা কতটুকু সচেতন, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সম্প্রতি একটি শঙ্কার কথা আমাদের জানিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবি। বাংলাদেশ এ জলবায়ু পরিবর্তনে কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এডিবির রিপোর্টে সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এডিবি জানিয়েছে, ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশ করে কম হতে পারে। আর চলতি শতাব্দী শেষে এ ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৯ শতাংশ। আর বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে পারে ৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এডিবির ওই রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ার অপর দুইটি দেশ নেপাল ও মালদ্বীপের ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯ আগস্ট (২০১৪) ঢাকায় এডিবির এ রিপোর্টটি উপস্থাপন করা হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে, তা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। শুধু এডিবির রিপোর্টেই নয়, বরং জাতিসংঘের রিপোর্টেও এ ক্ষতির দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে একাধিকবার। প্রতি বছরই জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা কপ বা ‘কমিটি অব দ্য পার্টিস’ নামে পরিচিত, সেখানেও বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যার কথা উঠে আসে। বাংলাদেশের যারাই পরিবেশমন্ত্রী থাকেন, তারা সেটা করেন, ‘কপ’ সম্মেলনে যান। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরই মধ্যে নাসা আরও একটি আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। নাসা আশঙ্কা করছে, গ্রিনল্যান্ডে যে বরফ জমা রয়েছে, তা যদি উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৭ মিটার বৃদ্ধি পাবে। তাই কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাসের কথা বলছে নাসা। আল গোর তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন, বিশ্বের বৃহত্তম বন্দরগুলোয় এরই মধ্যে ৪ কোটি মানুষ মারাত্মক প্লাবনের হুমকির মুখে আছে। আল গোর বিশ্বের ১০৭ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে (বাংলাদেশের সাবেক বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদও ছিলেন ওই দলে) গিয়ে ছিলেন অ্যান্টার্কটিকায় শুধু জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য। কিন্তু বিশ্ব সম্প্রদায় এখনও নীরব। প্রতি বছরই ‘কপ’ সম্মেলনে ভালো ভালো কথা বলা হয়। কোপেনহেগেন থেকে ডারবান সম্মেলন, বলা হয়েছিল ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমাতে একটি চুক্তি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা শুরু হলেও বাংলাদেশ কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। ডিসেম্বরে সমাপ্ত লিমা সম্মেলনে বলা হয়েছিল, ছয় মাসের মধ্যে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রতিটি দেশ নিজস্ব কর্মপদ্ধতি ও কাঠামো উপস্থাপন করবে। প্রতিটি দেশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নিজস্ব কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন করার। অর্থাৎ তারা নিজেরাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর পন্থা বের করবে। প্রশ্নটা এখানেই। বাংলাদেশ কি কোনো কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে? এটি কে করবে? পরিবেশ না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়? আমাদের আমলারা বিদেশে ‘ভ্রমণে’ যেতে পছন্দ করেন। সম্মেলনে যোগ দিয়ে যে ‘হাতখরচ’ পাওয়া যায়, তা নিয়ে কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকেন তারা! দেশে ফিরে এসে এরকম ‘ভুলে’ যান সবকিছু। তাই খুলনা সম্মেলনে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হক যখন বলেন, শুধু ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪ কোটি ৬ লাখ মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ৬ এপ্রিল)। তখন তার এ বক্তব্যে তাকে আমি সাধুবাদ দিতে পারি না। কেননা ‘জলবায়ু কূটনীতি’তে বাংলাদেশের ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখানে ব্যর্থ। বলা হয়েছে, অক্টোবরে জেনেভা সম্মেলনে ‘খুলনা ঘোষণা’ উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ কী ভূমিকা পালন করে, আমরা তা দেখতে Daily Alokito Bangladesh 12.04.15

সমঝোতা নাকি অন্য কিছু!

খা লেদা জিয়া তার নিজ বাসভবনে ফিরে গেছেন। দীর্ঘ ৯২ দিন গুলশানের অফিসে তার ‘অবরুদ্ধ’ থাকার কাহিনির আপাতত অবসান হয়েছে। তিনি যখন আদালতে যান গত রোববার, তখন যাওয়ার পথে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি, যদিও তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। আইনগতভাবে খালেদা জিয়ার জামিনপ্রাপ্তি, নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়া, বিএনপির অফিসের সম্মুখ থেকে প্রথম দিকে পুলিশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে বিএনপির অফিস খোলার সুযোগ সব কিছুই ঘটেছে গত প্রায় তিন মাস ধরে চলা ‘অবরোধ আর হরতাল’ কর্মসূচির পর। এটি কী একটি সমঝোতার ফলশ্রুতি? নাকি অন্য কিছু? সমঝোতার কথা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের একজন এবং বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক। এইচটি ইমাম ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের মন্তব্য ছাপা হয়েছে পত্র-পত্রিকায়। জনাব ইমাম ৬ এপ্রিল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো বাইরে প্রকাশ্যে বলব না’। আর লে. জেনারেল (অব.) মাহবুব বলেছেন, ‘সমঝোতা বা আলোচনা যাই বলুন, কিছু তো হয়েছেই। না হলে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতো না।’ আর বিএনপির একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ স্বীকার করেছেন, ‘সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও বিএনপিপন্থী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছেন।’ যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, কোনো সমঝোতা হয়নি, তবে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এর অর্থ কী? ‘কিছু একটা হয়েছে এবং তা পর্দার অন্তরালে।’ ‘কিছু একটা হয়েছে’ বিধায় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হননি। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কোর্ট থেকে গুলশান থানায় পৌঁছায়নি দীর্ঘ ৩২ দিন পরও! নিঃসন্দেহে এটি সরকারের শুভবুদ্ধির লক্ষণ। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কে সমঝোতা করেছে, সমঝোতার ফলশ্রুতিতে আমরা কী পাচ্ছি কিংবা কে লাভবান হলো, কার ক্ষতি হলোÑ এসব আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। বড় কথাÑ এক ধরনের ‘অস্থিরতা’ থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা কী আস্থা রাখতে পারি এই ‘অস্থিরমুক্ত’ দেশ আমাগীতেও আমরা দেখতে পাব? বিএনপি তথা ২০ দল আগামীতে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দেবে না? যদিও জামায়াতের উদ্যোগে গত ৭ ও ৮ এপ্রিল হরতাল পালিত হয়েছে। গাড়িও পুড়েছে কোথাও-কোথাও। তবে বিএনপি এই হরতালে ‘নিরপেক্ষ’ থেকেছে! তাদের কোনো সমর্থনের খবর আমরা জানি না। নিঃসন্দেহে খালেদা জিয়ার জামিন তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থকদের উজ্জীবিত করবে। এই নির্বাচনকে আমরা বারবার গুরুত্ব দিয়েছি। সরকার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকায় আমি সন্তুষ্ট নই। নির্বাচন কমিশনারের এখন দায়িত্ব বিএনপিকে ‘সহযোগিতা’ করা, যাতে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকেন। এটি বলতেই হবে, সরকারপ্রধান সিটি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দিয়ে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, ‘নির্বাচনী স্রোতে’ বিএনপি অংশ নেওয়ায় এই স্ট্র্যাটেজি সফল হয়েছে। আন্দোলনের চেয়ে বিএনপি এখন নির্বাচনমুখী, যদিও বিএনপি বলছেÑ তারা একই সঙ্গে নির্বাচনও করবে, আবার আন্দোলনও করবে। তবে চূড়ান্ত বিচারে বিএনপি যদি নির্বাচনী মাঠে না থাকে, তাহলে তা সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে না। একই সঙ্গে বহির্বিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে ‘ক্ষতের’ সৃষ্টি হয়েছে, ২৮ এপ্রিলের সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সেই ‘ক্ষত’কে আরও বাড়াবে। সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে ‘ব্যবধান’ আরও বাড়বে। ক্ষতি হবে দেশ ও জাতির। বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা একটা প্রশ্নের মুখে আছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্বটি তাদের। ৯৩টি ওয়ার্ডের (ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন) বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, পোলিং বুথে এজেন্টদের অবস্থান নিশ্চিত করা, একটি শান্তিপূর্ণ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রাখা (অভিযুক্ত হলে কীভাবে আইনি সহযোগিতায় জটিলতা দূর করা সম্ভব, তা দেখা) এবং তাদের নিরাপত্তা দেওয়া, একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। আইন তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। নির্বাচনের এক মাস আগে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পুলিশ প্রশাসনের ‘নিয়ন্ত্রণ’ এর দায়িত্বটি নির্বাচনে কমিশনের ওপর বর্তায়। অর্থাৎ ইসির আন্ডারে কাজ করে পুলিশ প্রশাসক। ফলে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। আইন বলে ওই সময় নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোনো প্রার্থীকে, কোনো পোলিং এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। সুতরাং ইসির মুখের কথায় চিড়ে ভিজবে না। কমিশনকে ক্ষমতা প্রয়োগ করে তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন এটি পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এই নির্বাচন দুটি বড় দলের জন্য ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’। কোনো ধরনের ‘প্রভাব’ বিস্তার না করে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে দেওয়া সরকারের জন্য মঙ্গল। এর মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করাতে পারবে যে, সরকার এ ধরনের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। অতীতে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (সিলেট, গাজীপুর, খুলনা ইত্যাদি) সরকারের কোনো ‘হস্তক্ষেপের’ রেকর্ড নেই। কোনো ধরনের কারচুপিও হয়নি। আরেকবার সুযোগ এসেছে সরকারের কাছে, এটি বিশ্ববাসীকে দেখানো যে, সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। আমরা যেন ভুলে না যাই পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকিয়ে আছে এই নির্বাচনের দিকে। শেষ অবধি ‘যে কোনো যুক্তি তুলে ধরে’ বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট (২) করে, তা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। বিএনপির জন্যও এটি ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি মূল ধারায় যাওয়ার একটি সুযোগ পাচ্ছে! এবং দীর্ঘ ৯২ দিনের ওপরের আন্দোলনের একটি ফল আমরা দেখতে পাব ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায়। একই সঙ্গে তাদের আন্দোলনের পেছনে কতটুকু জনসমর্থন আছে, তাও বোঝা যাবে। যদিও সারা দেশের মানুষের পাল্স এতে বোঝা যাবে না। কিন্তু তার পরও দুটিবড় শহরের মানুষের মনোভাব এতে বোঝা যাবে। দেশের মানুষের পার্লস বুঝতে এই নির্বাচনের ফলকে আমরা একটি মাপকাঠি হিসেবে ধরতে পারি। সে জন্যই বিএনপির নির্বাচনী মাঠে থাকা জরুরি। আমরা একটি ভালো নির্বাচন চাই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে। দেশে গত প্রায় ৯২ দিন ধরে যে অসহনীয় পরিবেশ বিরাজ করছিল, এ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল। আমাদের সবার জন্যই তা মঙ্গল ছিল। ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস’-এর যে কথা আমরা বারবার বলে আসছি, খালেদা জিয়ার জামিনপ্রাপ্তি, তাতে একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে আস্থার সম্পর্কটি স্থাপিত হবে কি না, সে ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছি না। নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অনেক আগেই প্রচারণা শুরু করেছিলেন সরকারি দল-সমর্থক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। উপরন্তু ঢাকায় একজন ব্যবসায়ী প্রার্থী অনেক আগে থেকেই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ‘মতবিনিময়’ শুরু করে নির্বাচন বিধিভঙ্গ করলেও ইসির কোনো ‘ভূমিকা’ আমরা দেখিনি। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করেনি। এই নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, এটি সত্য কথা। তবে আগেই উল্লেখ করেছি, জাতীয় রাজনীতিতে এর একটি প্রভাব থাকবে। ইসি এবং পরোক্ষভাবে সরকারের দায়িত্ব যেমনি বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে রাখা, ঠিক একই সঙ্গে বিএনপির উচিত হবে ‘সব প্রতিকূলতা’ উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘জনমত’ যাচাই করা। এটি ঠিক ডজন-ডজন মিডিয়াকর্মীর উপস্থিতিতে ‘কারচুপি’ করাটা অতসহজ হবে না। কোনো না কোনো মিডিয়ায় এটি আসবেই। এই যুগে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শুধু তাই নয়, বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও এ নির্বাচন ‘পর্যবেক্ষণ’ করবেন। ফলে ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচনের একটি সম্ভাবনা কিন্তু আছেই! এ ক্ষেত্রে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর প্রশ্নটি এসেই যায়Ñ বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা, তাদের সমর্থকরা কতটুকু প্রচারণা চালাতে পারবেন! খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ায় অনেক বিএনপি প্রার্থী ও সমর্থক এখন আদালতে যাবেন জামিন পাওয়ার জন্য। সবার ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হবে কি না, এটিও দেখার বিষয়একটি কথা এখানে বলা প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সরকার যে ‘নীতি’ অনুসরণ করেছে (আদালত কর্তৃক জামিন দিয়ে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ), তা যদি বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা না হয়, তাহলে ‘জটিলতা’ বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে একটি নির্বাচন বয়কটের (২) পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে! সেটি হবে না, আমরা এটিই প্রত্যাশা করি। মোট কথা, উভয় দলের জন্যই একটি সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে অতীত ‘ভুলে’ সামনের দিকে তাকানোর। বিএনপি নিশ্চয়ই গত তিন মাসের ‘আন্দোলন’ থেকে অনেক কিছুই শিখেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি করবেন যে, তাদের ব্যর্থতা কোথায়! এককভাবে খালেদা জিয়া এখনো একটি ‘শক্তি’। বিএনপির হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তার কোনো বিকল্প নেই। প্রায় ৩৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিন-তিন বার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’তে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি থেকে নিশ্চয়ই তিনি কিছু ‘শিখেছেন’। দলের সিনিয়র নেতারা, যারা স্থায়ী পরিষদে রয়েছেন, তাদের সবার সমর্থন তিনি পেয়েছেন, তা বলা যাবে না। তাই দল গোছানোর কাজটি তাকে এখন করতে হবে। সমঝোতা হোক আর নাই হোক, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছুটা স্বস্তির বাতাস এখন বইছে। হরতাল ও অবরোধের রাজনীতির বাইরে বিএনপি ‘নতুন এক রাজনীতি’ করার সুযোগ পাবে। বিএনপি এখন কী ধরনের কর্মসূচি দেয়, সেদিকে তাকিয়ে থাকবে সবাই। সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য, সরকার যদি আবারও ‘কঠোর’ হয়, তাহলে রাজনীতিতে আবারও অশান্তি দেখা দিতে পারে। অন্তত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত একটু সুবাতাস বয়ে যাক! বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠে রেখে সরকার অনেকভাবেই লাভবান হতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি করবেন। Daily Amader Somoy 11.4.15

জনমতের সঠিক প্রতিফলন চাই

তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম একটি বিষয় এখন। দুটি বড় দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য এ নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকাকেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং বলা যেতে পারে, নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও একটা প্রভাব ফেলবে। সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেষ্টা করবে এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করতে। তবে তুলনামূলক বিচারে সরকারের অবস্থান অনেক ভালো। একটা কথা এখানে বলা ভালো। চট্টগ্রামের চেয়ে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। এই তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক 'রাজনৈতিক অঙ্ক' এখন কষা যায়। প্রথমত, সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কার্যত এখন দলভিত্তিক নির্বাচনে পরিণত হয়েছে; যদিও আইনে বলা আছে নির্দলীয় নির্বাচনের কথা। দলভিত্তিক নির্বাচনে আমি খারাপ কিছু দেখি না। কেননা অতীতে যাঁরাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়েছেন তাঁরা সবাই স্থানীয়ভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর দলীয় সমর্থন নিয়েই তাঁরা নির্বাচন করেন। নির্দলীয় কোনো ব্যক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয়ী হন। বিগত উপজেলা নির্বাচন এর বড় প্রমাণ। সুতরাং দলীয়ভাবে যদি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করা যায়, তাতে বরং আমরা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরো উন্নত করতে পারব। এ নির্বাচনের আরেকটি দিক আমার ভালো লেগেছে। আর তা হচ্ছে, সরকারি দল কর্তৃক নয়া নেতৃত্ব সৃষ্টি করা ও 'যোগ্য প্রার্থীকে' মনোনয়ন দেওয়া। ঢাকা উত্তরের সরকারদলীয় প্রার্থী নির্বাচন সবাইকে অবাক করলেও এটা তো স্বীকার করতেই হবে একজন 'যোগ্য' প্রার্থীকে প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিয়েছেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ব্যবসায়ীদের প্রার্থী না করানোই মঙ্গল। একবার যদি তিনি উত্তরের নগরপিতা হয়ে যান, সিটি করপোরেশন পরিচালনায় তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থ উপেক্ষা করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে আগামী দিনগুলোতে তাঁর নামের প্রতি তিনি সুবিচার নাও করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় দলের জন্যও এ নির্বাচন একটি 'এক্সিট রুট' হতে পারে। বিশেষ করে বিএনপি তথা ২০ দলের জন্য। ২৯ মার্চ থেকে যে সপ্তাহ শুরু হয়েছে, সেখানে বিএনপি 'অবরোধের' ডাক দিয়েছে বটে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাদ দিয়ে হরতালের ডাকও দিয়েছে। বিএনপির এ কর্মসূচি এখন দলটিকে মূলধারার রাজনীতিতে আসতে সাহায্য করবে না। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা(?) এখনো আছে কিছু 'যদি'কে সামনে রেখে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব বিএনপিকে 'সহযোগিতা' করা, যাতে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকেন। তৃতীয়ত, সরকারপ্রধান নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। 'নির্বাচনী স্রোতে' বিএনপি অংশ নেবে- এই স্ট্র্যাটেজি সফল হয়েছে। আন্দোলনের চেয়ে বিএনপি এখন নির্বাচনমুখী; যদিও বিএনপি বলছে, তারা একই সঙ্গে নির্বাচনও করবে আবার আন্দোলনও করবে। চূড়ান্ত বিচারে বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে(?), তাহলে তা সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে না। বহির্বিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে 'ক্ষতের' সৃষ্টি হয়েছে, ২৮ এপ্রিলের সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সেই 'ক্ষত'কে আরো বাড়াবে। সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে 'ব্যবধান' আরো বাড়বে। ক্ষতি হবে দেশ ও জাতির। চতুর্থত, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা একটা প্রশ্নের মুখে আছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্বটি তাদের। ৯৩টি ওয়ার্ডের (ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন) বিএনপির কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, পোলিং বুথে এজেন্টদের অবস্থান নিশ্চিত করা, একটি শান্তিপূর্ণ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকা (অভিযুক্ত হলে কিভাবে আইনি সহযোগিতায় জটিলতা দূর করা সম্ভব, তা দেখা) এবং তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া, একটি 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'-এর পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। আইন তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। নির্বাচনের এক মাস আগে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পুলিশ প্রশাসনের 'নিয়ন্ত্রণ'-এর দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়। অর্থাৎ ইসির অধীনে কাজ করে পুলিশ প্রশাসন। ফলে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। আইন বলে ওই সময় নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোনো প্রার্থীকে, কোনো পোলিং এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। সুতরাং ইসির মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে না! কমিশনকে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন এটি পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। পঞ্চমত, এ নির্বাচন দুটি বড় দলের জন্যই 'প্রেস্টিজ ইস্যু'। কোনো ধরনের 'প্রভাব' বিস্তার না করে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে দেওয়া সরকারের জন্য মঙ্গল। এর মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করাতে পারবে যে সরকার এ ধরনের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। অতীতে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (সিলেট, গাজীপুর, খুলনা ইত্যাদি) সরকারের কোনো 'হস্তক্ষেপের' রেকর্ড নেই। কোনো ধরনের কারচুপিও হয়নি। আরেকবার সুযোগ এসেছে সরকারের কাছে, এটা বিশ্ববাসীকে দেখানো যে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। আমরা যেন ভুলে না যাই, পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকিয়ে আছে এ নির্বাচনের দিকে। শেষ অব্দি 'যেকোনো যুক্তি তুলে ধরে' বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট(?) করে, তা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। বিএনপির জন্যও এটা 'প্রেস্টিজ ইস্যু'। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি মূলধারায় যাওয়ার একটি সুযোগ পাবে! আর দীর্ঘ ৮২ দিনের ওপরের আন্দোলনের একটা ফলাফল আমরা দেখতে পাব ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায়। তাদের আন্দোলনের পেছনে কতটুকু জনসমর্থন আছে, তা বোঝা যাবে; যদিও সারা দেশের মানুষের পালস এতে বোঝা যাবে না। কিন্তু তার পরও দুটি বড় শহরের মানুষের মনোভাব এতে বোঝা যাবে। দেশের মানুষের পালস বুঝতে এই নির্বাচনের ফলাফলকে আমরা একটা মাপকাঠি ধরতে পারি। সে জন্যই বিএনপির নির্বাচনী মাঠে থাকা জরুরি। আমরা একটা ভালো নির্বাচন চাই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে। দেশে গত প্রায় ৮২ দিনে যে অসহনীয় পরিবেশ বিরাজ করছে, এ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের সবার জন্যই তা মঙ্গল। তাই ৯ এপ্রিলের দিকে তাকিয়ে থাকবে সবাই। কেননা ওই দিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চূড়ান্ত বিচারে ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে কাদের প্রার্থিতা টিকে আছে। অনেকের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাবে নানা কারণে, এটা স্বাভাবিক। তখনই বোঝা যাবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারা থাকছেন, তাঁদের রাজনৈতিক চরিত্র কী। এই নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, এটা সত্য কথা। তবে আগেই উল্লেখ করেছি, জাতীয় রাজনীতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। ইসি এবং পরোক্ষভাবে সরকারের দায়িত্ব যেমন বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে রাখা, ঠিক একই সঙ্গে বিএনপির উচিত হবে 'সব প্রতিকূলতা' উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে 'জনমত' যাচাই করা। এটা ঠিক ডজন ডজন মিডিয়াকর্মীর উপস্থিতিতে 'কারচুপি' করাটা অত সহজ হবে না। কোনো না কোনো মিডিয়ায় এটা আসবেই। এই যুগে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও এ নির্বাচন 'পর্যবেক্ষণ' করবেন। ফলে 'সুষ্ঠু' নির্বাচনের একটা সম্ভাবনা কিন্তু আছেই! এ ক্ষেত্রে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'-এর প্রশ্নটি এসেই যায়- বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা, তাঁদের সমর্থকরা কতটুকু প্রচারণা চালাতে পারবে! বিএনপি সমর্থক মেয়র পদপ্রার্থী (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ) রয়েছেন একাধিক। এর মধ্যে আমি কোনো অন্যায় দেখি না। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনের একটি পথ প্রশস্ত হতে পারে! তাই নির্বাচন কমিশনের 'দায়িত্ব ও কর্তব্য' অনেক বেশি। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের, পোলিং এজেন্টদের অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা-মোকদ্দমা রয়েছে। প্রকাশ্যে আসতে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে একটি 'স্টেটাস কো' পন্থা অবলম্বন করা যায় কি না, তা 'চিন্তা' করা যেতে পারে- অর্থাৎ প্রার্থীদের আপাতত কোনো হয়রানি না করা। আমরা একটি ভালো নির্বাচন চাই। চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। চাই জনমতের সঠিক প্রতিফলন। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চলমান 'রাজনৈতিক সংকট' কাটিয়ে উঠতে অনেক সাহায্য করতে পারে। Daily Kalerkontho 07.04.15

সিটি করপোরেশন নির্বাচন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কতটুকু বদলে দিতে পারবে

৩ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কী চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলে দিতে পারবে? বিএনপির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি তথা ২০ দল যখন আবার হরতাল-অবরোধের কর্মসূচিতে ফিরে যায়, তখন এই ‘আস্থার সম্পর্ককে বড় ধরনের ক্ষতি করে দিয়েছে। মোটা দাগে বলা যায়, আদৌ আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়নি! এখন একটি নির্বাচন হবে বটে, কিন্তু তাতে দেশের রাজনীতিতে কোনো সুবাতাস বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। বলতে দ্বিধা নেই, এই নির্বাচন একটি সম্ভাবনা জাগিয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে উৎসাহ এবং উদ্দীপনা আমি দেখেছি। নির্বাচনের একটি আমেজ আছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে হাজারটা শঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। এটা অনেকেই স্বীকার করবেন, বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণায় না থাকে, তাহলে নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না। জনমত প্রতিফলনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এ ক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীদের অবর্তমানে (?) নির্বাচনে আদৌ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। এ ধরনের একটি নির্বাচন আয়োজন করে (?) নির্বাচন কমিশন কতটুকু তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবে, সে প্রশ্ন এখন উঠেছে। ৯ এপ্রিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর আগের দিন পর্যন্ত বলা যাবে না, বিএনপি নির্বাচনে থাকবে, কী থাকবে না। অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব বিএনপিকে নির্বাচনী ধারায় ধরে রাখা ও সুযোগ দেওয়া, যাতে নির্বাচনে একটি প্রতিযোগিতার আবহাওয়া তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর। এটা সবাই স্বীকার করবেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্বটি তাদের। ৯৩টি ওয়ার্ডের (ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন) বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, এজেন্টদের বুথে অবস্থান নিশ্চিত করা, একটি শান্তিপূর্ণ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। এক কঠিন বাস্তবাতার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রাখা (অভিযুক্ত হলে কীভাবে আইনি সহযোগিতায় জটিলতা দূর করা সম্ভব, তা দেখা) এবং তাদের নিরাপত্তা দেওয়া, একটি লেভেল প্লেইং ফিল্ডের পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। আইন তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। নির্বাচনের এক মাস আগে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পুলিশ প্রশাসনের ‘নিয়ন্ত্রণ’র দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের উপর বর্তায়। অর্থাৎ ইসির আন্ডারে কাজ করবে পুলিশ প্রশাসন। ফলে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। আইন বলে ওই সময় নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোনো প্রার্থীকে, কোনো পোলিং এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। সুতরাং ইসির মুখের কথায় চিড়ে ভিজবে না। কমিশনকে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে তার বিপক্ষে ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন এটি পারবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়এই নির্বাচন দুটো বড় দলের জন্যই প্রেস্টিজ ইস্যু। কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে দেখা সরকারের সময়কার এ ধরনের নির্বাচন হস্তক্ষেপ করে না। অতীতে যে কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (সিলেট, গাজীপুর, খুলনা ইত্যাদি) সরকারের কোনো হস্তক্ষেপের রেকর্ড নেই। কোনো ধরনের কারচুপির হয়নি। কয়েকবার সুযোগ এসেছে সরকারের কাছে, এটা বিশ্ববাসীকে দেখানো যে সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। আমরা যেন ভুুলে না যাই পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকিয়ে আছে এই নির্বাচনের দিকে। শেষঅবদি যে কোনো যুক্তি তুলে ধরে বিএনপি যদি নির্বাচন কয়কট (!) করে তা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। বিএনপির জন্যও এটা প্রেস্টিজ ইস্যু। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বিএনপি মূল ধারায় যাবার একটি সুযোগ পাবে। এবং দীর্ঘ ৮২ দিনের উপরে আন্দোলনের একটা ফলাফল আমরা দেখতে পাব ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায়। তাদের আন্দোলনের পেছনে কতটুকু জনসমর্থন আছে তা বোঝা যাবে। যদিও সারা দেশের মানুষের পালস এতে বোঝা যাবে না। কিন্তু তারপরও দুটি বড় শহরের মানুষের মনোভাব এতে বোঝা যাবে। দেশের মানুষের পালস বুঝাতে এই নির্বাচনের ফলাফলকে আমরা একটা মাপকাঠি হিসেবে ধরতে পারি। সে জন্যই বিএনপির নির্বাচনী মাঠে থাকা জরুরি। আমরা একটা ভালো নির্বাচন চাই। একটি সুষ্ঠ নির্বাচন আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে। দেশে গত প্রায় ৮২ দিন যাবৎ যে অসহনীয় পরিবেশ বিরাজ করছে, এ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের সবার জন্যই তা মঙ্গল। তাই ৯ এপ্রিলের দিকে তাকিয়ে থাকবে সবাই। কেননা ওই দিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এরই মাঝে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চূড়ান্ত বিচারে ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে কাদের প্রার্থিতা টিকে আছে। অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে নানা কারণে। এটা স্বাভাবিক। তখনই বোঝা যাবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারা থাকছেন, তাদের রাজনৈতিক চরিত্র কী। এই নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, এটা সত্য কথা। তবে আগেই উল্লেখ করেছি জাতীয় রাজনীতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। ইসি এবং পরোক্ষভাবে সরকারের দায়িত্ব যেমনি বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে রাখা, ঠিক একইসঙ্গে বিএনপির উচিত হবে ‘সকল প্রতিকূলতা’ উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘জনমত’ যাচাই করা। এটা ঠিক ডজন ডজন মিডিয়াকর্মীর উপস্থিতিতে ‘কারচুপি’ করাটা অত সহজ হবে না। কোনো না কোনো মিডিয়ায় এটা আসবেই। এই যুগে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শুধু তাই নয় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও এই নির্বাচন ‘পর্যবেক্ষণ’ করবেন। ফলে ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচনের একটা সম্ভাবনা কিন্তু আছেই। এ ক্ষেত্রে লেভেল প্লেইং ফিল্ডের প্রশ্নটি এসেই যায়Ñ বিএনপিসমর্থিত প্রার্থীরা, তাদের সমর্থকরা কতটুকু প্রচারণা চালাতে পারবেন! বিএনপি সমর্থক মেয়র প্রার্থী (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ) রয়েছেন একাধিক। এর মাঝে আমি কোনো অন্যায় দেখি না। কেননা কোনো কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী শেষ মুহূর্তে (মেয়র প্রার্থী) নানা জটিলতায় কিংবা মামলা-নাশকতা সংক্রান্ত জটিলতায় তাদের প্রার্থীপদ হারিয়েছেন। (যেমন, উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টু)। সেজন্যই দ্বিতীয় প্রার্থী মাঠে ছিল। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনের একটি পথ প্রশস্ত হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনারের ‘দায়িত্ব ও কর্তব্য’ অনেক বেশি। বিএনপিসমর্থিত প্রার্থীদের, পোলিং এজেন্টদের অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা-মোকদ্দমা রয়েছে। প্রকাশ্যে আসতে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন। প্রার্থীদের আপাতত কোনো হয়রানি করাও যাবে না। একটা ব্যাপারে আমি অন্তত উৎসাহ বোধ করছিÑ আর তা হচ্ছে ব্যবসায়ী নেতা কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের একটি উক্তি। তিনি ৩০ মার্চ বলেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর যেকোনো সময় সব দলের অংশগ্রহণে আরও একটি নির্বাচন হতে পারে। বাহ্যত তিনি জাতীয় নির্বাচনের ইঙ্গিত করেছেন। তার এই বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কেননা তিনি ব্যবসায়ীদের সংগঠন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি। তিনি আওয়ামী লীগের উপষ্টাম-লীর সদস্যও বটে। তবে তিনি উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে আরেকটি নির্বাচনের কথা বলেছেন কিনা, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। এটা তো সত্য, নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয়, যদি সুষ্ঠু হয় এবং ভোটে কারচুপি না হয়Ñ আমার বিশ্বাস একটি জাতীয় নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে তাতে। বিএনপি যদি সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তারা ‘বর্তমান সরকারের’ অধীনেই জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নেবে। এটা সরকারের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। সরকারের সাফল্য এখানেই যে বিএনপি ‘অবরোধ আর হরতালের’ কর্মসূচি ছেড়ে নির্বাচনী মাঠে শরিক হয়েছে। তারা একটি ‘বেরিয়ে যাবার’ পথ খুঁজে পেয়েছে। তাদের নির্বাচনী মাঠে রাখার দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের। জানি না, শেষঅবদি এই ‘সঠিক দায়িত্বটি’ নির্বাচন কমিশন পালন করতে পারবে কী না? আমরা সনাতন রাজনৈতিক বলয়ে ফিরে যেতে চাই। রাজনীতিতে বড় বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকবেই। প্রতিযোগিতাহীন একটি নির্বাচন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পারবে না। আর একই কথা প্রযোজ্য হরতাল-অবরোধের রাজনীতির ক্ষেত্রেও। হরতাল আর অবরোধের সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ধারাকেও শক্তিশালী করে না। সিটি করপোরেশনের নির্বাচন তাই একটা সম্ভাবনা তৈরি করছে বড় দলগুলোকে বাংলাদেশে মূল ধারার রাজনীতিতে আসার। দায়িত্বটি তাই সবারÑ সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান বিরোধী দলের। নির্বাচনে যদি বিএনপি প্রার্থীরা অংশ নেয়, তাহলে নির্বাচনটা জম-জমাট হবে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আর বিএনপি যদি নির্বাচনী মাঠে না নামে, তাহলে একতরফা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা যেমনি থাকবে না, তেমনি বহির্বিশ্বে সরকারের অবস্থানও দুর্বল হবে। আমরা সাধারণ নাগরিক তেমনটি চাই না। এই নির্বাচনটি হোক বিএনপির জন্য একটি ‘এক্সিট রুট’ বা সংকট থেকে বের হয়ে যাবার একটি পথ। অন্যদিকে সরকারের জন্যও হোক একটি ‘এক্সিট রুট’Ñ যেখানে সরকার ‘সকল দলের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত করে বিশ্বকে দেখাতে পারবে তাদের আমলেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এটাই হোক এই মুহূর্তের রাজনীতি। একটি সুযোগ এসেছে সবার জন্য। এই সুযোগটি যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে আমাদের জন্য যে আরও দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে, তা বলাই যায়। Daily Amader Somoy 06.04.15

চার দশকের বৈদেশিক নীতি

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৪৪ বছর পার করেছে গত ২৬ মার্চ। একটি দেশের বৈদেশিক নীতির জন্য সাড়ে চার দশক একেবারে কম সময় নয়। এই সাড়ে চার দশকে সাফল্য যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। এই সাড়ে চার দশকের বৈদেশিক নীতি পর্যালোচনা করলে আমরা মূলত তিনটি ধারা লক্ষ্য করব। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত একটি ধারা। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর, যা অব্যাহত থাকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এই তিনটি ধারাতেই কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আমরা লক্ষ্য করি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল : ক. সংসদীয় গণতন্ত্র, খ. সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় দলীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা, গ. সমাজতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো, ঘ. ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি। কোনো কোনো বিশ্লেষক এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে এটা ছিল অনেকটা ‘ভারতীয় মডেল’। ওই সময় বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। যেমন- ক. সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ স্থাপন, খ. ভারতের নির্ধারক ভূমিকা। তবে আদর্শ হিসেবে জোট নিরপেক্ষতা অনুসরণ করা, গ. অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ঘ. চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন ৪৩ মাস। ওই সময় ব্রেজনেভ (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান) প্রণীত ‘যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি’র প্রতি সমর্থন, তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারের ৭ দফা দাবির প্রতি সমর্থন, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা শীর্ষক সম্মেলনের প্রতি সমর্থন ইত্যাদি কারণে বহিঃবিশ্বে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, বাংলাদেশ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটা অ্যালায়েন্স গড়ে তুলছে, যা এ অঞ্চলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থকে রক্ষা করবে। বহিঃবিশ্বে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণেই বাংলাদেশ ওই সময় সোভিয়েত শিবিরে অবস্থান করছিল এবং সোভিয়েত-ভারত সম্পর্কের কারণে এটা এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও ছিল। অভ্যন্তরীণভাবে একটা ‘চাপ’ও ছিল যারা মনে করতেন সোভিয়েত সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশে ‘সমাজতন্ত্র’ নির্মাণ করা যাবে না। এই সময় ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা ছিল বিতর্কিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিলেও ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও গিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের একটা উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি। ১৯৭৫ সালের আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর আগে ১৯৭৫ সালে যে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, তা বাতিল ঘোষিত হয়। সৌদি আরব ও চীন বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৫ সালের আগস্ট-পরবর্তী ঘটনার মধ্য দিয়ে শহীদ জেনারেল জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জিয়া মনে করতেন বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইসলামের ব্রিজ স্বরূপ। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে। আল কুদস কমিটি ও ১৯৮১ সালের ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও সদস্য ছিল বাংলাদেশ। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী পরিষদের সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ সম্পর্কিত এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। জেনারেল জিয়া ভারতের ভূমিকার ব্যাপারে কঠোর হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে ও একই বছরে ৪২ জাতি ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ফারাক্কা প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিল। পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রশ্নে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি চীনের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক বৃদ্ধিই করেননি, বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে চীনের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আফগান আগ্রাসনের (১৯৭৮) ব্যাপারেও বাংলাদেশ কঠোর হয়েছিল। হোসাইন মুহম্মদ এরশাদ, বেগম জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার (১৯৯৬-২০০১) বৈদেশিক নীতি ছিল জিয়া প্রণীত বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে এরশাদ, বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার সরকারের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। তবে শেখ হাসিনার সময় চীনের ওপর থেকে ‘সামরিক নির্ভরতা’ কিছুটা হ্রাস করে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। এরশাদের সময় (১৯৮২-১৯৯০) পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়েছিল। ১৯৮৩ সালে ১৪ জন সোভিয়েত কূটনীতিককে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পশ্চিমা বিশ্বে তিনি সমাদৃত হয়েছিলেন। তার আমলেই ১৯৮৫ সালে সার্ক আত্মপ্রকাশ করে, যদিও এর উদ্যোগটা নিয়েছিলেন শহীদ জিয়া। তবে ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ তালপট্টি দখল করে নিলেও, তিনি ভারতের ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে পারেননি। বেগম জিয়ার (১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬) বৈদেশিক নীতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল- ক. চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া, খ. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও উন্নতকরণ, গ. আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ককে আরও কার্যকরী করা, ঘ. সৌদি আরব-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া, ঙ. ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা। বেগম জিয়ার সময় নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেয়। তার আমলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। বেগম জিয়ার দ্বিতীয় টার্মে (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী বৈদেশিক নীতির সূচনা করে, যা ছিল আগে উপেক্ষিত। বেগম জিয়ার সময় চীন ‘কুনমিং উদ্যোগ’ এর কথা বলে (চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমার, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ও থাইল্যান্ডের সমন্বয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা)। কিন্তু ভারতের আগ্রহ ছিল ‘গঙ্গা-মেকং সহযোগিতার’ ওপর, যে কারণে ‘কুনমিং উদ্যোগ’-এর আর জট খোলেনি। ভারত এখন আসিয়ানের সদস্য হতে চায়। যে কারণে ‘কুনমিং উদ্যোগ’-এ যেখানে চীনের জড়িত হওয়ার কথা রয়েছে, সে ব্যাপারে তার আগ্রহ কম। যদিও বিসিআইএম নিয়ে কথা শোনা যায়। বেগম জিয়ার সময় মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য সংকটে মিয়ানমার আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে। শেখ হাসিনা দুই টার্মের জন্য ক্ষমতাসীন হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি হয়েছিল। যদিও তার আমলে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তিটি তিনি আর নবায়ন করেননি। ভারতে আশ্রিত পাহাড়ি শরণার্থীদের তিনি দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তার আমলে সার্কের ভেতরে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সিদ্ধান্ত (========) গৃহীত হয়েছিল। যদিও তা কার্যকরী হয়নি। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য আমদানি বাড়ে ৩ গুণ। ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান পরপর কয়েকটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে তিনি শান্তি স্থাপনের একটি উদ্যোগ নেন, যা প্রশংসিত হয়। তার সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে ‘হানা’ চুক্তিও (হিউম্যানিটোরিয়ান অ্যাসিসটেন্স নিডস অ্যাসেসমেন্ট) স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। তিনি ১৯৯৭ সালের ফেব্র“য়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীনকে বেছে নিলেও, সামরিক ক্ষেত্রে চীনের ওপর থেকে পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতা তিনি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার আমলে ঢাকায় রাশিয়ার অস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ এ সময় চীনের বদলে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছিল (মূল্য ১২৪ মিলিয়ন ডলার)। চীন মিগ-২৯ বিমান সরবরাহ করতে রাজি হলেও বাংলাদেশ ওই বিমান রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করেছিল। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশ দুটি আঞ্চলিক জোট ডি-৮ ও বিমসটেক এ যোগ দেয়। তিনি ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে (ইসলামাবাদ, মার্চ ১৯৯৭) যোগ দিয়ে ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি একটি অভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠারও দাবি জানিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি একটি মহাজোট সরকার গঠন করেছিলেন। মহাজোট সরকারের সময় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছিল। ট্রানজিট (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডোর) নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিতর্ক থাকলেও, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে তা কার্যকরীও হয়েছে, যদিও ট্রানজিট ফি এখনও নির্ধারিত হয়নি। বলা হচ্ছে ট্রানজিটের বিষয়টি বহুপাক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারতের এ দুটি দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা। কিন্তু ইতিমধ্যে এ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে- এ তথ্য আমাদের জানা নেই। এমনকি ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলো কর্তৃক চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে করে আগামী দিনগুলো বাংলাদেশী পণ্য খালাস করতেই হিমশিম খাবে। এ ক্ষেত্রে ‘সাতবোন’ রাজ্যের পণ্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভারত অবকাঠামো খাতে যে ঋণ দিয়েছে, তাও বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণের মতোই এ ঋণ দিয়ে ভারতীয় পণ্য ও সেবা কিনতে আমরা বাধ্য। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যে উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। ওই চুক্তিতে যে ‘ভাষা’ ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে করে ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হয়েছে বেশি করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। গত প্রায় ছয় বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে ভারতের পাল্লাটা ভারি, বাংলাদেশের প্রাপ্তি তুলনামূলক বিচারে কম। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তিস্তা চুক্তি এখনও হয়নি। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধের প্রতিশ্র“তি দেয়া সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি সিটমহল ও ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি সিটমহলের ব্যাপারে একটি সমাধানের কথা এখন বলা হচ্ছে। তবে এখন অব্দি ভারতের সংবিধান সংশোধন করা হয়নি। ভারত আমাদের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। এতে ১৩টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। এ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির একটি চুক্তি হলেও, তাতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে ওই সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল কম। যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধবোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিশ্লেষকের লেখনিতে এটা বেরিয়ে এসেছে যে, এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে একটি জোট গড়ে তোলার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান মার্কিনি প্রভাব, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে ওঠার আলোকেই হিলারির ওই সফরকে বিশ্লেষণ করা যায়। যদিও হিলারির ওই সফরেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশ তার সব পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের যে দাবি তা এখন বাতিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘টিফা’র বদলে এখন ‘টিকফা’ চুক্তি করেছে (ট্রেড অ্যান্ড ইনভেসমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট) চুক্তি করেছে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশন (এমসিসি) থেকে ভবিষ্যতে সাহায্য পাবে- এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও আমরা পাইনি। তবে হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরের সময় তার একটি বক্তব্যে আমি আশাবাদী। তরুণদের সঙ্গে এক আড্ডায় তিনি বাংলাদেশকে একটি Soft power হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। যে কোনো বিবেচনায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। বিশ্ব শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে কিংবা আর এমজি সেক্টরে বিশ্ব আসরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি ‘শক্তি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। হিলারি ক্লিনটন সেটাই স্বীকার করে গিয়েছিলেন। যারা পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের এ অর্জনকে ধরে রাখা। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার নিশ্চিত হওয়ায়, এ সম্ভাবনা এখন আরও বাড়ল। তবে যেতে হবে অনেক দূর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে ইতিমধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। রানা প্লাজায় ১ হাজার ১২৭ জন পোশাক কর্মীর মৃত্যু, গার্মেটশিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালু, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড, গার্মেন্ট শিল্পে শ্রম মান বজায় রাখার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ড. ইউনূস ইস্যু। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। অতি সম্প্রতি দুটো সংবাদ ছাপা হয়েছে, যেখানে আমাদের একজন নীতিনির্ধারক (সরকারের) সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ আর মার্কিন জুনিয়র মন্ত্রী নিশা দেশাইকে ‘দু’আনার মন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এ ধরনের মন্তব্য ওয়াশিংটন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেবে। তবে এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিশ্বে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হলেও, প্রধানমন্ত্রীর চীন ও জাপান সফর (২০১৪) এই নেতিবাচক ধারণা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা হলেও সাহায্য করেছে। জাপান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আর্থিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। জাপানের কাছ থেকে আমরা বড় ধরনের সাহায্য পেয়ে থাকি এবং প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময়ও এই সাহায্যের ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্র“তি পাওয়া গেছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চীনের পররাষ্ট্রনীতি এখন ব্যবসা নির্ভর। ‘আইডোলজি’ এখানে প্রাধান্য পায় না। ফলে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ সবকিছুই অবর্তিত হচ্ছে চীনের ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণের আলোকে। বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার)-এর ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহী এবং এ লক্ষ্যে একটি টিম কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় যে বিশাল মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গড়ে উঠছে, সেই বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। প্রায় ৪৪ বছর একটি রাষ্ট্রের জন্য কম সময় নয়। এই সময়সীমায় বৈদেশিক নীতিতে যেমনি সফলতা এসেছে, ঠিক তেমনি ব্যর্থতাও একেবারে কম নয়। তবে বাংলাদেশকে এখন তাকাতে হবে ২০৫০ সালের দিকে। সনাতন বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি বাড়াতে হবে। একটি বিশেষ দেশ বা বিশেষ এলাকাকে কেন্দ্র করে বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করলে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না। বৈদেশিক নীতির মূল কথাই হচ্ছে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া। জাতীয় স্বার্থের সফল বাস্তবায়ন ছাড়া বৈদেশিক নীতিতে সফলতা পাওয়া যায় না। আমাদের ৪৪ বছরের বৈদেশিক নীতির সফলতা ও ব্যর্থতা এই আলোকেই পর্যালোচনা করতে হবে। এই ৪৪ বছরে বৈদেশিক নীতিতে সফলতা যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। তবে একটি সফল পররাষ্ট্রনীতির জন্য যে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন ছিল, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। কোনো কোনো ইস্যুতে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি ছিল প্রবল, যা কোনো জাতীয় ঐকমত্যের জন্ম দিতে পারেনি। গত ৪৪ বছরের রাজনীতিতে জাতিগতভাবে আমাদের বিভক্তি বৈদেশিক নীতি পরিচালনায় আমাদের সফলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। কূটনীতিতে অদক্ষতা, ব্যক্তি স্বার্থ, নেগোসিয়েশনে আমাদের ব্যর্থতা, ‘বিশেষ দেশ’মুখী পররাষ্ট্রনীতি, সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ চিহ্নিত করতে আমাদের কূটনীতিকদের ব্যর্থতা বিশ্ব আসরে আমাদের অবস্থানকে গত ৪৪ বছরেও নিশ্চিত করতে পারেনি। Daily Jugantor ( Supplement ) 05.04.15

সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন থেকেই গেল

তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হবে ২৮ এপ্রিল। ১ ও ২ এপ্রিল প্রার্থিতা বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। ৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর বোঝা যাবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারা কারা থাকছেন। চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী মোটামুটি নিশ্চিত। ২০ দল ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুজন প্রার্থী আছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদ্বয় নিশ্চিত থাকলেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এখনও নিশ্চিত হয়নি। একাধিক প্রার্থী রয়েছেন মাঠে। কোনো কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীর শেষ মুহূর্তে প্রার্থীপদ 'নানা কারণে' বাতিল হয়েছে। উপরন্তু বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বয়কটও করতে পারে! নির্বাচন নিয়ে এখন নানা 'অঙ্ক কষা' শুরু হয়েছে। সরকারের ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা, বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি- নানা প্রশ্ন এখন এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আবর্তিত হচ্ছে। তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই, ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন প্রয়োজন ছিল। আট বছর নির্বাচন হয়নি এখানে। সর্বশেষ মেয়র ছিলেন বিএনপির। তার মেয়াদ শেষের পরও নির্বাচন হয়নি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনসেবা নিশ্চিত করা যায়। আমলা দিয়ে জনসেবা নিশ্চিত করা যায় না। ঢাকা শহরের মানুষ এ জনসেবা পাচ্ছে না বেশকিছু দিন ধরে। মশক নিধন কর্মসূচিসহ অনেক জনসেবামূলক কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এ মশক নিধন কর্মসূচিতে। তাহলে এ টাকা কোথায় যাচ্ছে? কে এ থেকে সুবিধা নিচ্ছে? জনপ্রতিনিধিরা থাকলে, তাদের দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু আমলারা থাকলে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। সে জন্যই আসন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি প্রশংসার যোগ্য। নিঃসন্দেহে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা চাচ্ছেন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়ে 'সব রাজনৈতিক দল'কে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করার একটি সুযোগ দেয়া। কিন্তু যে প্রশ্ন এখনও অনেকেই করেন, তা হচ্ছে বিএনপি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবে তো! ঢাকা উত্তরের বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থী পদ বাতিল হয়েছে। এখানে বিএনপির 'শক্ত' কোনো প্রার্থী নেই। আউয়াল মিন্টু শক্ত প্রার্থী ছিলেন। মুক্ত ঢাকার মেয়র তিনি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি খোদ বিএনপির হাইকমান্ডের সমর্থনের অভাবে। এখন তার ছেলে তাবিদ আউয়াল প্রার্থী। কিন্তু তাবিদ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। যে যুক্তিতে তার প্রার্থী পদ বাতিল হয়েছে, আইনগতভাবে তা সঠিক। তাহলে প্রশ্ন এসে যায়, তিনি জেনেশুনে এই 'ভুল' করেছেন, নাকি সরকারের কোনো কোনো মহলকে খুশি করার জন্যই তিনি এ 'ভুল'টি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এ প্রশ্নও অনেকে করেছেন। তাহলে উত্তরে বিএনপির অবস্থান কী হবে? বিএনপি কী তাহলে তাবিদ আউয়ালকে সমর্থন করবে, নাকি মাহী বি চৌধুরীকে সমর্থন করবে? যদিও মাহী চৌধুরীর বিকল্পধারা ২০ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ঢাকার দক্ষিণে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি। মির্জা আব্বাস, সালাম ও আসাদুজ্জামান রিপনের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। অথচ আব্বাসের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে একাধিক। অনেক মামলায় জামিন না নেয়ায় তিনি আইনের দৃষ্টিতে 'ফেরারি'। প্রশ্নটা এখানেই। বিএনপি আবারও হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার। বিএনপি একদিকে আন্দোলনেও থাকবে, অন্যদিকে নির্বাচনেও অংশ নেবে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি তার জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার পরীক্ষা করে ফেলতে চায়। তবে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি সুযোগ এসেছে। নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং সন্ত্রাসমুক্ত হবে- এটা ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে। এমনিতেই ইসি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক হারিয়েছে। এখন সুযোগ এসেছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর। এটা তো সত্য, সরকার যদি ইসিকে সহযোগিতা না করে তাহলে ইসির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব নয়। সরকার সমর্থকরা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। ইসি এক্ষেত্রে কতটুকু শক্তিশালী হতে পারবে, এ প্রশ্ন থাকলই। নির্বাচনী এলাকায় কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসি এ ব্যাপারে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এখন সরকার ইসির পরামর্শ কতটুকু গ্রহণ করে, সেটি দেখার বিষয়। একটি জটিলতা আছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) ওয়ার্ড সংখ্যা নিয়ে। উত্তরের লোকসংখ্যা ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩, আর ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩৬। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লোকসংখ্যা কম; কিন্তু ওয়ার্ড সংখ্যা বেশি। লোকসংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৩, আর ওয়ার্ড ৫৭টি। ফলে এখানে এক ধরনের বৈষম্য রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ বৈষম্য দূর করা সম্ভবও হবে না। ফলে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। নির্বাচনের জন্য যে বিষয়টি বেশ জরুরি, তা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি 'লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড' তৈরি করা। ইসি কি এটা পারবে? বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা, সাবেক কাউন্সিলর হয় পলাতক, নতুবা মামলার আসামি। কেউবা আবার গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন। এদের কেউ যদি প্রার্থী হনও তারা তো ভয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তাহলে কী নির্বাচনটা একপক্ষীয় হয়ে যাবে না? তাদের জন্য নূ্যনতম যে সুযোগ, সেটি নিশ্চিত হবে কীভাবে? সরকারি দলের ঘোষিত প্রার্থীরা এরই মধ্যে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। একজন ব্যবসায়ী, একজন সংসদ সদস্য, একজন সাবেক মেয়রপুত্র- এদের বিলবোর্ডে নির্বাচনের আগেই ঢাকা শহরে ছেয়ে গিয়েছিল। তারা এটা পারেন না। নির্বাচনে 'জয়ী' হওয়ার আগেই যদি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়, তাতে ইসির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি! শুধু তাই নয়, প্রার্থীরা আদৌ ঋণখেলাপি কিনা, এটাও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর কাছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পাওনা ছিল ১১৮ কোটি টাকা। তিনি বাড়ি বিক্রি করে টাকার কিছুটা পরিশোধ করেছেন, এমন তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মাঠে আছেন। কিন্তু ব্যবসায়ী প্রার্থীর খবর কী? তিনি আদৌ ঋণখেলাপি কিনা, ঋণ রিশিডিউল করেছেন কিনা, আমরা জানি না। এমন ধনী ব্যক্তিরা, ব্যবসায়ীরা যখন প্রার্থী হন এবং তাদের কাছে ব্যাংকের পাওনা থাকে ১০০ কোটি টাকার উপরে, তারা যখন 'নগরপিতা' হতে চান, তখন আমাদের দুঃখ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সিটি করপোরেশনের মতো জায়গাতে, ব্যবসায়ীদের প্রার্থী না করাই মঙ্গল। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসায়িক 'স্বার্থ' থাকে। হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের কাজ হয় সিটি করপোরেশনগুলোতে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ থাকাটাই স্বাভাবিক। এ তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, আমরা জানি না। বিএনপির প্রার্থীরা অংশ নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আর না নিলে সরকারি দলের প্রার্থীরা 'খালি মাঠে' গোল দেবে! এখন এখানেই বিএনপি এ সুযোগটি দেবে কিনা? বিএনপির ব্যাপক সমর্থক রয়েছে। আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেন, একটা নৈতিক সমর্থন তো বিএনপির জন্য আছে। ফলে বিএনপি কি এ সুযোগটি কাজে লাগাবে না? বিএনপি আন্দোলনের বিকল্প হিসেবেও এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেটা প্রত্যক্ষ হোক কিংবা পরোক্ষ হোক। দীর্ঘদিন ধরে দেশে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকার ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো আস্থার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। খালেদা জিয়া সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করলেও কোনো একটি দাবিও সরকার মানেনি। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা একরকম 'ভেস্তে' গেছে! তাই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। যদিও জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের মতো সিনিয়র নেতারা বলেছেন, বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবে। ২০ দলীয় জোটে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এমন কথাও আমাদের জানিয়েছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। তাই ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে বিএনপি মাঠে আছে কী নেই। তবে চূড়ান্ত মুহূর্তে বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে, আমি অবাক হব না(?) নির্বাচন বয়কটের জন্য যথেষ্ট যুক্তি বিএনপির আছে। প্রথমত, বিএনপি সমর্থিত শত নাগরিক কমিটি মনোনয়নপত্র তথা নির্বাচনের তারিখ পেছানোর দাবি করলেও নির্বাচন কমিশন তাতে রাজি হয়নি। নির্বাচন কমিশন খুব দ্রুত নির্বাচনটি করতে চায়। দ্বিতীয়ত, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মাঠে যেতে পারছেন না। প্রচারণা চালাতে পারছেন না- এমন খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি তাদের অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী (যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ রয়েছে) গ্রেফতার হতে পারেন, এমন কথা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। ফলে বিএনপি একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। তৃতীয়ত, খালেদা জিয়া স্থায়ী পরিষদ কিংবা ২০ দলীয় জোট কারও সঙ্গেই কোনো মিটিং করছেন না বা মিটিং করতে পারছেন না। ফলে দল কোনো সুস্পষ্ট নীতিও গ্রহণ করতে পারছে না। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ মূলত পরিচালিত হচ্ছে শত নাগরিক কমিটির মাধ্যমে, যেখানে স্থায়ী পরিষদের সদস্যরা থাকছেন উপেক্ষিত। চতুর্থত, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন তার দলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন, তখন এটা বুঝতে কারও বাকি থাকে না, সরকারপ্রধান কত সিরিয়াস। এটা দল তথা সরকারের জন্য একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। নির্বাচনে 'বিজয়ী' হয়ে সরকার দেখাতে চাইবে বিএনপির কোনো জনপ্রিয়তা নেই! এজন্যই বিএনপির নির্বাচনে মাঠে থাকা উচিত। ডজন ডজন মিডিয়াকর্মী ও ক্যামেরার উপস্থিতিতে নির্বাচনে জালিয়াতি ও কারচুপির সুযোগ থাকবে কম।তাই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল। কিছু 'কিন্তু' কিছু 'যদি'র মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলো যাবে। বিএনপি আবারও হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছিল। শুধু নির্বাচনের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামকে হরতালমুক্ত রাখা হয়েছিল। এর অর্থ পরিষ্কার, বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে চায়। নতুন করে আবারও হরতালের ডাক দেয়ার অর্থ হচ্ছে আগামীতেও এ হরতাল আসতে পারে! যদিও বলতে দ্বিধা নেই, হরতালের তেমন একটা 'প্রভাব' এখন আর নেই। হরতালের 'ধার' কমে গেছে। তাই অনেক জল্পনাকল্পনার মধ্য দিয়ে তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সারা জাতির দৃষ্টি এখন এদিকে। ৯ এপ্রিলের পরই বোঝা যাবে নির্বাচনটি আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, নাকি একতরফাভাবে হবে! এ নির্বাচন পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে যেমনি বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি এ নির্বাচন সঙ্কটকে আরও গভীরতর করতে পারে। Daily Alokito Bangladesh 05.04.15

প্রাচীন কটন রুট : ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা

ভারত মহাসাগরে ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের কাছে এখন আলোচনার অন্যতম একটি বিষয়। বিশেষ করে গেল মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত মহাসাগরভুক্ত তিনটি দেশ- মরিশাস, সিসিলি ও শ্রীলংকা সফর এবং এর ঠিক পরপরই ভারতের ভুবনেশ্বরে ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সংস্থা ইন্ডিয়ান ওশেন রিমের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন প্রমাণ করে দেশটি ভারত মহাসাগরে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইতিমধ্যে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলগুলোয় চীনের একরকম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীন যে 'String of Pearls' বা ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে, তার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সামুদ্রিক বন্দরগুলোকে একত্রিত করতে চায়। এতে করে আরব সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর কর্তৃত্ব বেড়েছে। চীনের এ মুক্তার মালা নীতির কারণে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী, ইন্দোনেশিয়ার বালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, তা থাকছে চীনের নিয়ন্ত্রণে। কারণ এটি তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। গাওদারে (বেলুচিস্তান, পাকিস্তান) চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিটও রয়েছে, যেখান থেকে চীন ভারত মহাসাগরের সব ধরনের নৌ-মুভমেন্ট লক্ষ্য করবে। গাওদারের ঠিক উল্টো দিকে ভারত মহাসাগরের এক পাশে রয়েছে শ্রীলংকার হামবানতোতা গভীর সামুদ্রিক বন্দর। এ সামুদ্রিক বন্দরটি চীন নির্মাণ করে দিয়েছে। এখানে চীনা নৌবাহিনীর সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ভারতের স্ট্রাটেজিস্টরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেছিল। এজন্য রাজাপাকসেকে ক্ষমতা পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। রাজাপাকসে অতিমাত্রায় চীনানির্ভর ছিলেন। এ চীনা নির্ভরতা ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা খুব সহজভাবে নিতে পারেননি। শ্রীলংকায় সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নয়া প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি শ্রীলংকা ঘুরে এসেছেন অতি সম্প্রতি। স্পষ্টতই মোদি সরকার ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলগুলো নিয়ে যে নীতি প্রণয়ন করেছে, তা চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি সহ্য করবেন না। ভুবনেশ্বর সম্মেলনে এ বার্তাটিই তারা দিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নতুন দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও এ দুটি দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলংকায় ভারতীয় প্রভাব বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে ‘জাফনা কার্ড’ ব্যবহার প্রমাণ করে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে ভারত তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়। ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, ভারত প্রাচীনকালে তার ‘কটন রুট’ ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার বিকাশে ভারতীয় পণ্ডিতরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। হাজার বছর আগে দক্ষিণের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের আমলে নৌ-বাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌ-বাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট, তাতে দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিসর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার, অন্যদিকে শ্রীলংকা হয়ে সুমাত্রা, জাভা (মালাক্কা প্রণালী), হংকং, জাপান পর্যন্ত ভারতীয় বাণিজ্য রুট সম্প্রসারিত ছিল। মোদি সরকার এ কটন রুটকেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রাচীনকালে ভারতীয় তুলা তথা সুতি এ সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেত। একদিকে চীনা নেতা শি জিন পিং তার ‘সিল্ক রুটের’ ধারণা নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত তার পুরনো কটন রুটের ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরি হবে সেখানেই। বাণিজ্যনির্ভর এ দ্বন্দ্ব শেষ অবদি পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌবহরে বিমানবাহী জাহাজ আরও বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ করছে। বলা হয়, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি- চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ (জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে) তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যে নয়া সিল্ক রুটের কথা বলছেন, তা অন্য চোখে দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এতে করে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃত্ব, প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২ হাজার ১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশ এ ‘সিল্ক রোড’টি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ রুটের মাধ্যমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সুদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের নয়া প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন ‘নিউ সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একইসঙ্গে একটি মেরিটাইম সিল্ক রুটের কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ মেরিটাইম সিল্ক রুটের ধারণাও কয়েকশ’ বছর আগের। এ মেরিটাইম সিল্ক রুট ধরে চীনা এডমিরাল ঝেং হে (মা হে) ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সাল- এই ২৮ বছর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে চীনা পণ্য নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৪২১-১৪৩১ সালে তিনি দু’বার তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে এসেছিলেন। চীন এ নৌরুটটি নতুন করে আবার ব্যবহার করতে চায়। তবে কয়েকশ’ বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চল অনেক বদলে গেছে। চীন আর একক শক্তি নয়। ভারত তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। আর যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়েই তার নিজের স্বার্থ আদায় করতে চায়। ফলে এটা স্পষ্ট নয় ভারত-চীন সম্পর্ক আগামীতে কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে। ভারত মহাসাগরে চীন ও ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। মৎস্য সম্পদ থেকে শুরু করে জ্বালানি সম্পদ ও জ্বালানি সম্পদ সরবরাহের অন্যতম রুট হচ্ছে এ ভারত মহাসাগর। পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির কারণে এ সামুদ্রিক রুটের গুরুত্ব বাড়ছে। এ রুটের গুরুত্ব অনুধাবন করেই চীন এ অঞ্চলে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হচ্ছে। ভারত তাই এ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোতে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে এক ধরনের ‘স্নায়ুবিক যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে এশিয়ার প্রভাবশালী এ দেশ দুটির মধ্যে। আগামী মে মাসে নরেন্দ্র মোদি বেইজিং যাবেন। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে ভারতীয় তৎপরতা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় হয়তো স্থান পাবে না। কিন্তু চীনা নেতারা বিষয়টি জানেন ও বোঝেন। মোদি নিজে চীনের ব্যাপারে যতই আগ্রহী থাকুন না কেন, ভারতে একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র আছে এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা পৃথিবীর শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি। তারা ভারতের স্বার্থকে সব সময় বড় করে দেখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিমধ্যে ভারতের এক ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের স্ট্রাটেজিস্টদের চোখ এখন ভারত মহাসাগরের দিকে। ভারত মহাসাগরে শুধু যে বিশাল সম্পদই রয়েছে, তা নয়। বরং বিশ্বের কার্গো শিপমেন্টের অর্ধেক পরিবাহিত হয় এ ভারত মহাসাগর দিয়েই। একইসঙ্গে ৩ ভাগের ১ ভাগ কার্গো, ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৩ ভাগের ২ ভাগ এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রাফিক পৃথিবীর অন্যত্র যেতে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ। পৃথিবীর আমদানিকৃত পণ্যের (তেলসহ) শতকরা ৯০ ভাগ পরিচালিত হয় এ সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে। এ সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি করে। ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ভারত-চীন দ্বন্দ্বে আক্রান্ত হবে এ অঞ্চলের দেশগুলো। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এই চীন-ভারত দ্বন্দ্ব নতুন একটি ‘জটিলতার’ জন্ম দিয়েছে। কেননা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার চীন ও ভারতের সঙ্গে ‘ভারসাম্যমূলক’ কূটনীতি অবলম্বন করেছে। যদিও অনেকেই বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের কূটনীতি বেশিমাত্রায় ভারতনির্ভর, তবে প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালের মার্চে চীন সফরে গিয়েছিলেন। ওই সফরে তিনি কুনমিংও গিয়েছিলেন এবং কুনমিং-কক্সবাজার সড়ক নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এখন এ সড়ক নির্মাণের প্রশ্নটি এবং বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার) জোটের জন্ম ও বিকাশ প্রশ্নের মুখে থাকল। কারণ চীন-ভারত দ্বন্দ্বে এই আঞ্চলিক জোটের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনের কুনমিং উদ্যোগের পরিবর্তিত নাম বিসিআইএম জোট। এখানে চীনের স্বার্থ বেশি। এ জোট গঠিত হলে চীনা পণ্য সড়কপথে বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে বিদেশে রফতানি সম্ভব হবে। অনেকের স্মরণে থাকতে পারে, সোনাদিয়ার অদূরে যে গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করার কথা ছিল, তাতে চীন যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছিল। ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চীনের এটি নির্মাণ করে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ পরিকল্পনা এখন পরিত্যক্ত। গভীর সমুদ্রবন্দরটি এখন নির্মিত হবে পায়রাবন্দরে। একনেকে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মূল কারণ ভারতের আপত্তি। এর সঙ্গে ভারত তার নিরাপত্তার প্রশ্নটি তুলেছে। এমনকি ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটাও মনে করেন, এ গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত হলে চীনা পণ্যে এ অঞ্চল ছেয়ে যাবে। এতে ভারতীয় পণ্য মার খাবে। ফলে বিসিআইএম আঞ্চলিক জোট নিয়ে প্রশ্ন থাকলই। উল্লেখ্য, ভুটানে চীনা দূতাবাস খোলার ব্যাপারেও ভারতের আপত্তি রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা, পণ্যের অবাধ চলাচল, সম্পদের আহরণ ইত্যাদির ব্যাপারে আগামী দিনগুলোতে চীন ও ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলো এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যেতে পারে। আঞ্চলিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিশ্ব বিকশিত হচ্ছে। এখানে সামরিক দ্বন্দ্বের চেয়ে বাণিজ্যিক নির্ভরতার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতে দারিদ্র্য থাকলেও দেশটি আঞ্চলিক শক্তি তো বটেই, বড় অর্থনৈতিক শক্তিতেও পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত। আর চীন দূর প্রতিবেশী। চীনের সঙ্গে আমাদের সীমান্তের দূরত্ব খুব বেশি নয়। দুটি দেশের উন্নয়ন থেকেই আমরা উপকৃত হতে পারি। অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য কাটিয়ে উঠে চীন ও ভারত যদি নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে এ অঞ্চলের দেশগুলো উপকৃত হবে। সেই পঞ্চাশের দশকে হিন্দি-চীন ভাই ভাই সম্পর্ক, পঞ্চশীলার ধারণা (যা ন্যামের জন্ম দিয়েছিল) এ দুটি দেশের মাঝে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। একুশ শতকে এসে বৈরিতা নয়, বরং আস্থার সম্পর্ক এ অঞ্চলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এখন দেখার পালা আগামী দিনগুলোতে এ দেশ দুটি বৈরিতা কতটুকু কমিয়ে আনতে পারে। Daily Jugantor 04.04.15