রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ভারত বাংলাদেশকে কখনো মর্যাদার চোখে দেখে না
( ভিডিও)  
আমাদের সময়.কম : ০৭/০৫/২০১৫
Tarek Sumsur
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক . তারেক শামসুর রেহমান বলেছেন, ভারতের আমলারা কখনো বাংলাদেশকে মর্যাদার চোখে দেখেন না। এটা ভারতের আমলাতন্ত্রের একটা বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। যে কারণে তারা সবসময় আমাদের ওপর এক ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতা চাপিয়ে দিতে চায় আর এর ফলে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। এসময় তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যেমন ভারত উন্নয়ন করতে পারে না তেমনি ভারতকে বাদ দিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে পারে না। দুদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নির্ভর করছে দুদেশের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।

গতকাল দিবাগত রাতে সময় টিভিতে প্রচারিত সম্পাদকীয় অনুষ্ঠানে মোদির কারিশমা শীর্ষক এক টক শোতে তিনি এসব কথা বলেন। মুজতবা দানিশের উপস্থাপনায় এসময় সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক . সাদেকা হালিম সাবেক রাষ্ট্রদূত সচিব মুজতবা কবির উপস্থিত ছিলেন।

তারেক শামসুর রেহমান বলেন, মনমোহন সিংয়ের সরকার বলেছিলো, আমি সীমান্ত হত্যা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু আজো বন্ধ হয়নি আসলে ব্যাপারটা কোথায়? ব্যাপারটা আর কোথাও নয় ভারতের আমলাতন্ত্রের মধ্যে। ভারতীয় আমলাদের মধ্যে এক ধরনের জটিলতা আছে। এখনো সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। আমার মনে হয় এই হত্যা আগামিতেও বন্ধ হবে না। কিন্তু আমরা যদি দুই দেশ পরস্পরকে একটু গুরুত্ব দেই তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, আজকে ভারত কিন্তু ছোট্ট ভারত নেই। ভারত বিশ্বের একটা অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি এবং বলা হচ্ছে এই শতকে এশিয়া মহাদেশে চীন, ভারত এবং জাপান এই তিনটি অর্থনৈতিক শক্তি বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আগামী দিনে ভারত একটা শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভূমি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।

তিনি আরো বলেন, আজকে সীমান্ত হত্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য অনেক অনুরোধ জানানো হলেও এখনো তা ক্রমাš^য়ে বেড়েই চলেছে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে দিল্লিতে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি ¯^াক্ষরিত হয়েছিলো। এই দ্বি-পাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধি ¯^াক্ষর করেন। অবশেষে সম্প্রতি গত মে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সীমান্ত চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেশ কিছু ছিটমহল রয়েছে। সীমান্ত চুক্তির উদ্দেশ্য ছিলো দুই দেশের মধ্যে থাকা বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো পরস্পরকে হস্তান্তরের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা।

স্থানীয় সময়: ০৫৪০ ঘণ্টা , মে ২০১৫

সম্পাদনা: মুজতবা ফারুকী

শুধু সীমান্ত চুক্তি যথেষ্ট নয়

ছিটমহল বিনিময়সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনীটি ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে অনুমোদিত হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এক নয়া উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের ১১৯৩৪৪ সংশোধনীটি প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হলো। এরপর এটি অনুমোদনের জন্য কয়েকটি কক্ষের বিধানসভায় যাবে। তারপর রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করবেন। এগুলো এখন শুধু নিয়ম রক্ষার কার্যক্রম। তবে নিঃসন্দেহে সীমান্ত চুক্তিটি ভারতীয় সংসদ অনুমোদিত হওয়ায় দীর্ঘ ৬৮ বছরের এক অমানবিক পরিস্থিতিরই অবসান ঘটল না, বরং ভারতীয় সংসদ সদস্যরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বিলটি পাস করায় তা এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। বিলের বিরুদ্ধে কোনো সাংসদ ভোট দেননি। এমনকি সংসদে বঙ্গবন্ধুর কথাও উচ্চারিত হয়েছে। সবচেয়ে যেটা বেশি করে উল্লেখ করার মতো তা হচ্ছে, মোদি সরকার ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাবেক ইউপিএ সরকার যেভাবে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেছিল, সেভাবে অবিকৃতভাবেই বিলটি উপস্থাপন করল। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রশ্নে সবাই যে এক, এ কথাটাই প্রমাণ করলেন ভারতীয় নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আমরা এই কাজটি করতে পারতাম কী না সন্দেহ। ভারত যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কীভাবে ধারণ করে, এটা একটা বড় প্রমাণ। এ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। দ্বিতীয়ত, রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যে বক্তব্য রেখেছেন, তাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এই চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বের কাছে আমরা যে প্রতিবশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে বিশ্বাসী, সেই বার্তাই পেঁৗছবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই উক্তির যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। বলাই ভালো, প্রথমে আসামকে বাদ দিয়ে বিলটি উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল মোদি সরকার। পরে কংগ্রেসের আপত্তির মুখে এবং আসাম বিজেপিকে আস্থায় নিয়েই অবিকৃতভাবে, অর্থাৎ আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই বিলটি প্রথমে উচ্চকক্ষে উত্থাপিত হয় এবং তা অনুমোদিত হয়। সীমান্ত চুক্তি (১৯৭৪) এবং প্রটোকলের (২০১১) আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময় হবে। বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার এবং ভারতীয় ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। এর অর্থ হচ্ছে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ একর জমি পাবে বাংলাদেশ। আর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের ৭ হাজার ১১০ একর জমি পাবে ভারত। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে এসব ছিটমহল রয়েছে।
এককভাবে মোদি সরকারকে এর জন্য কৃতিত্ব দেয়া যাবে না। বিগত ইউপিএ সরকারের অবদানও কম নয়। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত করার উদ্যোগ নিলেন তিনি। বিগত ইউপিএ সরকারের সঙ্গে তার পার্থক্য এখানেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি যারা পর্যালোচনা করেন, তারা জানেন মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেয়া। সেই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব 'মনরো ডকট্রিন'কে নয়া আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো 'শক্তি' প্রভাব বিস্তার করুক, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোনো শক্তিকেই পূর্ণ আস্থায় নিতে পারছে না ভারত। মোদি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মোদি প্রথমে ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি নেপাল ও শ্রীলংকা গেছেন। তিনি তার পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকরকে 'সার্ক যাত্রা'র অংশ হিসেবে ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। আগামী জুন মাসে তিনি আসছেন বাংলাদেশে। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের। এক্ষেত্রে কংগ্রেসের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই বিলটি সংসদে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা চান। অত্যন্ত প্র্যাগম্যাটিক মোদি জানেন কীভাবে বিরোধীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে তিনি আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তবে তাকে যেতে হবে অনেক দূর। তিনি ভালো করেই জানেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে, এর সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজন দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। বেশকিছু কাজ এখনো বাকি। মমতা ব্যানার্জি এটা নিয়ে আবার কোনো রাজনীতি করেন কী না, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। কেননা ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন বিধায় মোদির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল রাজ্যসভায় এটি পাস করানোর। তিনি ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রায় ৬০ হাজার ছিটমহলবাসীকে (?) তার আশ্রয় দিতে হবে এবং এজন্য তার অর্থের প্রয়োজন। যেখানে সুষমা স্বরাজ ৩ হাজার ছিটমহলবাসীর কথা বলছেন, যারা ভারতে যেতে চায়, সেখানে ৬০ হাজার মমতা কোথায় পেলেন? ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করেছে। তাহলে কী ধরে নেয়া যায়, এটা মমতার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একটি কৌশল! কেননা বিজেপির টার্গেট মমতাকে পশ্চিম বাংলা থেকে উৎখাত করা। কাজটি খুব সহজ নয়। হতে পারে বিজেপি যাতে এই চুক্তি থেকে কোনো 'সুবিধা' নিতে না পারে এবং পশ্চিম বাংলার ভোটব্যাংকে আঘাত করতে না পারে, সেজন্য মমতা এসব কথা বলছেন। তবে এটা সত্য, পশ্চিম বাংলা এবং আসামে চুক্তিবিরোধী তথা ভূমি গঠনবিরোধী একটা জনমত আছে। ২০১৬ সালে আসামেও বিধানসভার নির্বাচন। এটা কোনো কোনো শক্তি একটা ইস্যু করতে পারে। বাংলাদেশ মোদির ওপর আস্থা রেখেছিল। এর প্রতিদানও পেয়েছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা মোদি সমাধান করেছেন। আমরা ছোট দেশ হতে পারি। কিন্তু আমাদেরও দেয়ার আছে অনেক কিছু। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমরা ভারতের অর্থনীতি থেকে লাভবান হতে চাই। চাই নিজেদের আরো উন্নত করতে। স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এই সম্পর্কটা আমরা ধরে রাখতে চাই।
কিন্তু শুধু সীমান্ত চুক্তি বিলটি পাস করার মধ্য দিয়েই যেন সবকিছু থমকে না যায়। সুষমা স্বরাজ যে কথা রাজ্যসভায় বলেছেন, তা প্রমাণ করার জন্যই মোদি সরকারকে এখন যেতে হবে আরো অনেক দূর। আরো বেশ কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, তার সমাধান আয়োজন। প্রথমেই বলতে হয় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা। এ নিয়ে অনেক তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরও চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। এখানে ক্ষমতা একটি ফ্যাক্টর। তার আপত্তি রয়েছে। মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরের সময় তিনি আমাদের তার ওপর আস্থা রাখতে বলে গিয়েছিলেন। এখন ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। এই নির্বাচনে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি একটি ইস্যু হবে। তারপরও আমরা চাই এর আগেই একটি চুক্তি হোক। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ও ফুলেরতল ব্যারাজ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটবাসীর এক ধরনের আশঙ্কা ও উদ্বেগ রয়েছে। আস্থার নিদর্শনস্বরূপ ভারত এই কার্যক্রম 'স্ট্যাটাস শো' বজায় রাখতে পারে। মোদির ভারতের ভেতরই এই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। অথচ ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরো কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে বাংলাদেশে-ভারত বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়বেই। পরিসংখ্যান বলে এই বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের অনুকূলে। আর ভারত এই ঘাটতি তার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভাতরীয় পণ্য (চাল), বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ত্রিপুরায় একাধিকবার পরিবহন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের কর বা শুল্ক প্রদান করা হয়নি। বিনিময়ে নেপাল ও ভুটান ট্রানজিট পাবে_ এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। একটি স্থায়ী কাঠামোর আওতায় এই ট্রানজিট ব্যবস্থা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দু'দেশের জ্বালানি সংকট ও পানি সংকট মেটানোর জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায় কী না, সে ব্যাপারে সমীক্ষা চালানো উচিত। আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পেরেছি, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। আগামীতে এই ব্যবস্থার আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন। জঙ্গি তৎপরতা আমাদের উভয় দেশের জন্যই একটি সমস্যা। এ ব্যাপারে দু'দেশ যৌথ কর্মসূচি নিতে পারে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে একটি 'হটলাইন' স্থাপন করতে পারে। মোদি ক্ষমতা নেয়ার পরপরই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে খরা অঞ্চলে পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা কার্যকর হলে বাংলাদেশে পানিশূন্যতা দেখা দেবে। এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। সীমান্তে হত্যা একটি বড় সমস্যা। এখন সীমানা চিহ্নিত হওয়ায় এই সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে_ এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনারও প্রয়োজন আছে। কেননা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। পানির চাহিদাও বাড়বে। সুতরাং চুক্তিতে পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের উচিত এ ব্যাপারে ভারতকে রাজি করানো। আসলে মোদ্দা কথাটি হচ্ছে, আস্থার সম্পর্ককে আগে সম্প্রসারিত করা। দীর্ঘ ৪১ বছর ভারত চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির ফলশ্রুতিতে আমরা বেরুবাড়ি ভারতকে দিয়েছিলাম। আমাদের সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে তার সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েছিলাম। আজ এত বছর পর মোদি সরকার এর সাংবিধানিক বৈধতা দিলেন।
এক অমানবিক ও মানহানির পরিস্থিতি থেকে ছিটমহলের মানুষগুলো মুক্তি পেল। উভয় দেশের সরকারকেই এখন ছিটমহলবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই ভারত যে আস্থা প্রদর্শন করেছে, তা আরো সম্প্রসারিত করুক। পানি সমস্যার সমাধানে ভারত আন্তরিক হোক। ভারত 'বড় দেশ' হয়েও তার পার্শ্ববর্তী দেশকে সম্মান করতে জানে, এটা প্রমাণ করুক। চুক্তিটি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মোদির (জুন মাসে) সফরের পথ প্রশস্ত হলো। আমরা তাকিয়ে থাকলাম মোদির বাংলাদেশ সফরের দিক Daily Jai Jai Din 12.05.15

ফিরে পাওয়া আস্থার সম্পর্ক অটুট থাকুক

শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এবং নিম্নকক্ষ লোকসভায় সীমান্ত চুক্তিটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। ৮ মে লোকসভার অধিবেশন শেষ হয়ে গেছে। এই অধিবেশনে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদিত না হলে নানা জটিলতা তৈরি হতো। এবং তাতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু যে এক ধরনের অবিশ্বাসের জন্মই হতো তা নয়, বরং আগামী জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর অনিশ্চিত হয়ে যেত। এখন সীমান্ত চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হওয়ায় এক ধরনের স্বস্তির বাতাস বইছে নয়াদিল্লি প্রশাসনের অন্দর মহলে। তবে এই চুক্তি নিয়ে 'নাটকীয়তা' কম হয়নি। বড় আপত্তি এসেছিল আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে। আসামে ২০১৬ সালে, অর্থাৎ আগামী বছর সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। আসাম বিজেপি এটাকে ইস্যু করতে চেয়েছিল। আসাম বিজেপির ধারণা ছিল, এই সীমান্ত চুক্তিকে ইস্যু করেই তারা আসামে তাদের জনমত বাড়াতে পারবে এবং নির্বাচনে সাফল্য পাবে। কেননা তাদের কাছে দৃষ্টান্ত ছিল পশ্চিমবঙ্গের। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থবিরোধী এই যুক্তি তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তাঁর আপত্তির কারণে এখন অব্দি তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একটি তিস্তাচুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক হলেও শুধু পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে এখন অব্দি কোনো চুক্তি হয়নি। অতীতে ইউপিএ সরকারও তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকায় আসা ও চুক্তি স্বাক্ষরে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। মমতা তখন আসেননি। যদিও মমতা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা সফর করে গেছেন। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে তিনি পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে যাননি। কেননা ২০১৬ সালে সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। সুতরাং তিনি কোনো ঝুঁকি নেবেন না। ঠিক একই স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছিল আসাম বিজেপি। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরোধিতা করে আলাদা অবস্থান নিয়েছিল আসাম বিজেপি। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করায় এই সীমান্ত চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলো। এখানে বলা ভালো, সীমান্ত চুক্তিটি ঝুলেছিল অনেক দিন ধরে। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ ৪১ বছর ভারত এই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির বিনিময়ে আমরা বেরুবাড়ী ভারতকে দিয়েছিলাম এবং সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদটি সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ভারত তা করেনি। দীর্ঘদিন তারা এই সীমান্ত বিরোধকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তবে ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের পর এর জট কিছুটা খুলতে থাকে। ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই সীমান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। ফিরে পাওয়া আস্থার সম্পর্ক অটুট থাকুক এর পরও সমস্যা ছিল আসাম বিজেপি ও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি ছিল। শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চুক্তিটি মেনে নেওয়ায় মোদি সরকারের পক্ষে সহজ হয় চুক্তিটি সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থাপনের। লোকসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে সমস্যা ছিলই। একপর্যায়ে আসামকে বাদ দিয়েই অর্থাৎ আসাম-বাংলাদেশ সীমান্ত চিহ্নিত না করেই কেন্দ্র উদ্যোগ নেয় উচ্চকক্ষে বিলটি উপস্থাপন করার। কিন্তু আপত্তি ওঠে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। কংগ্রেস সভানেত্রী আসামকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। এমনকি আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং আসাম কংগ্রেসের সভাপতি তরুণ গগৈও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে চিঠি লেখেন। শেষ মুহূর্তে কেন্দ্র আসাম বিজেপিকে বোঝাতে সক্ষম হয় এবং বিলটি অবিকৃতভাবেই, অর্থাৎ আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই উচ্চকক্ষে উত্থাপিত হয় এবং তা অনুমোদিতও হয়। সীমান্ত চুক্তি (১৯৭৪) এবং প্রটোকলের (২০১১) আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময় হবে। বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার এবং ভারতীয় ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। এর অর্থ হচ্ছে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ একর জমি পাবে বাংলাদেশ। আর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের ৭ হাজার ১১০ একর জমি পাবে ভারত। আসাম, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গে এসব ছিটমহল রয়েছে। এককভাবে মোদি সরকারকে এর জন্য কৃতিত্ব দেওয়া যাবে না। বিগত ইউপিএ সরকারের অবদানও কম নয়। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত করার উদ্যোগ নিলেন তিনি। বিগত ইউপিএ সরকারের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য এখানেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি যাঁরা পর্যালোচনা করেন, তাঁরা জানেন মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া। সেই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব 'মনরো ডকট্রিন'কে নয়া আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কোনো 'শক্তি' প্রভাব বিস্তার করুক, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোনো শক্তিকেই পূর্ণ আস্থায় নিতে পারছে না ভারত। মোদি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মোদি প্রথমে ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি নেপাল ও শ্রীলঙ্কা গেছেন। তিনি তাঁর পররাষ্ট্রসচিব জয় শংকরকে 'সার্ক যাত্রা'র অংশ হিসেবে ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। আগামী জুন মাসে তিনি আসছেন বাংলাদেশে। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েই তিনি আসামকে অন্তর্ভুক্ত করে বিলটি সংসদে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা চান। অত্যন্ত প্রাগমেটিক মোদি জানেন কিভাবে বিরোধীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে তিনি আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তবে তাঁকে যেতে হবে অনেক দূর। তিনি ভালো করে জানেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে- এর সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিস্তার পানিচুক্তি, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা কমানো, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, দুই দেশের মধ্যে যৌথ জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে যৌথ কর্মপন্থা গ্রহণ, ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ, টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজের ব্যাপারে 'স্ট্যাটাস কো' অবলম্বন, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পে স্থিতাবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে মোদি সরকার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে- এটাই বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা। এখন ভারতীয় সংসদে স্থল সীমানা চুক্তির পূর্ণ অনুমোদন হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ মোদি সরকারের ওপর আস্থা রাখতেই পারে। এখন অতি দ্রুত যদি তিস্তার পানিবন্টন চুক্তিটি হয়, তাহলে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করবেন বাংলাদেশে। 'মোদি ম্যাজিক' দুই দেশের মাঝে বিরাজমান সমস্যা সমাধানে বড় অবদান রাখতে পেরেছে। অত্যন্ত কৌশলী ও অবিবেচক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও 'মোদি ম্যাজিকের' কাছে হেরে গেছেন! স্থল সীমানা এখন নির্ধারিত হলো। বাকি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশ মোদির ওপর আস্থা রেখেছে। এর প্রতিদানও পেয়েছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা মোদি সমাধান করেছেন। আমরা ছোট দেশ হতে পারি। কিন্তু আমাদেরও দেওয়ার আছে অনেক কিছু। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমরা ভারতের অর্থনীতি থেকে লাভবান হতে চাই। চাই নিজেদের আরো উন্নত করতে। স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এ সম্পর্কটা আমরা ধরে রাখতে চাই।

যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না। জনমত জরিপে বলা হয়েছিল, একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু তা হয়নি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই কনজারভেটিভ পার্টি আবারও ক্ষমতায় থেকে গেল আগামী পাঁচ বছরের জন্য। ২০১০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা যে ফলাফল করেছিল, এবার তাদের ফলাফল গেলবারের ফলাফলকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ সালে কনজারভেটিভরা পেয়েছিল ৩০৬ আসন। এবার এ সংখ্যা ৩৩১। অন্যদিকে লেবার পার্টির ভরাডুবি হয়েছে। গেলবার তারা পেয়েছিল ২৫৮ আসন, আর এবার পেল ২৩২ আসন। ভরাডুবি ঘটেছে লিবারেল ডেমোক্রেটদের। গেলবার তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৫৭, এবার তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮-এ। তবে অবাক করা ঘটনা ঘটেছে স্কটল্যান্ড ন্যাশনালিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে। সর্বশেষ নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র ৫টি আসন। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে। যুক্তরাজ্যের এই নির্বাচন এখন অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিল। এক. যুক্তরাজ্যের গত ৯৩ বছরের যে গণতন্ত্র (১৯২২ থেকে), যেখানে মূলত দুটি প্রধান দলই ক্ষমতা পরিচালনা করে, এই ধারা থেকে দেশটি এবারও বেরিয়ে আসতে পারল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এরাই সরকার গঠন করে। ২০১০ সালে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছিল বটে। সেবার সরকার গঠনের জন্য কনজারভেটিভ দলের প্রয়োজন ছিল তৃতীয় একটি দলের সমর্থনের। লিবডেম বা লিবারেল ডেমোক্রেটরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরনের প্রতি সমর্থন দিয়ে যৌথভাবে একটি সরকার গঠন করেছিলেন এবং লিবডেম নেতা নিক ক্লেগ উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার লিবডেমের বড় ধরনের পরাজয় হয়েছে। এটা স্পষ্ট, ডেভিড ক্যামেরন এককভাবেই সরকার গঠন করবেন। তিনি এবার আর কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন না। চারটি জাতি নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত এবং হাউস অব কমন্সের আসনও সেভাবে নির্ধারিত। যেমন ইংল্যান্ডের রয়েছে ৫৩৩ আসন, ওয়েলসের ৪০, নর্থ আয়ারল্যান্ডের ১৮ ও স্কটল্যান্ডের ৫৯। সব মিলিয়ে ৬৫০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য দরকার হয় ৩২৬টি আসন।দুই. এই নির্বাচন প্রমাণ করল যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে সম্ভাবনা ছিল, সে সম্ভাবনা এখন আর নেই। সাধারণ মানুষের আস্থা দুই বড় দলের প্রতিই। তবে যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের এটা একটা সৌন্দর্য যে, দল যদি হেরে যায়, তাহলে দলনেতা পরিবর্তন করে। এড মিলিব্যান্ড এখন আর লেবার পার্টির নেতা থাকবেন না। একই সঙ্গে লিবডেমের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসবে। নিক ক্লেগের পরিবর্তে আমরা এখন অন্য কাউকে দেখব লিবডেমের নেতৃত্বে। যুক্তিটি হচ্ছে, দলের নেতৃত্ব যে ‘নীতি ও আদর্শ’ নিয়ে নির্বাচনে গেল, ভোটাররা তা গ্রহণ করেনি। ফলে দলকে এখন নয়া নীতি ও আদর্শ খুঁজে বের করতে হবে।তিন. স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) এখন হাউস অব কমন্সে তৃতীয় শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ দলটি ৫৯টি আসনের মধ্যে ৫৬টি পেয়েছে। অথচ এ দলটি স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বের করে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গড়তে চায়। এটা ছিল তাদের স্লোগান। যদিও গেল সেপ্টেম্বরে (২০১৪) স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছিল, তাতে যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষেই ভোট পড়েছিল বেশি। এখন এসএনপির নেত্রী নিকোলা স্টারজিওন কী ভূমিকা নেন, সেদিকে অনেকের দৃষ্টি থাকবে। যদিও এরই মধ্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আবারও একটি গণভোটের উদ্যোগ নেবেন। ফলে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই।চার. প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কিনা, এটা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা যাচাই করে দেখার জন্য ২০১৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে একটি গণভোটের আয়োজন করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা, না থাকা নিয়ে ব্রিটেনে একটা বিতর্ক আছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে আছে বটে; কিন্তু ইউরোপীয় মুদ্রা ‘ইউরো’তে কখনোই যোগ দেয়নি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৬টি রাষ্ট্র নিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিটি (ইইসি) যাত্রা শুরু করে আজ তা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য তৎকালীন ইইসিতে যোগ দেয়। আর ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের মাঝে ১২টি দেশ অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু করে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশ ইউরো গ্রহণ করে। কিন্তু যুক্তরাজ্য তাদের মুদ্রা পাউন্ডকে ধরে রেখেছে। তুলনামূলক বিচারে ব্রিটেনের মানুষ কিছুটা কনজারভেটিভ। তারা মনে করে, ইইউ বা ইউরোতে যোগ দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া। তাই তারা বারবার ইউরো গ্রহণ করার বিপক্ষে মত দিয়ে আসছে। এখন কনজারভেটিভদের বিজয় এ প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে এলো যে, যুক্তরাজ্য কি অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন একের পর এক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে থাকে, তখন এই দেশে ব্যাপক হারে পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন ঘটতে থাকে। আইনবলে এরা তখন যুক্তরাজ্যে থাকার ও চাকরি করার অধিকার রাখেন। ফলে দেখা গেছে, আদি যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। এর ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও ক্ষোভ জন্ম হয়েছে। কনজারভেটিভরা বরাবরই অভিবাসন নীতির বিরোধী। নির্বাচনের ফলে এরই প্রতিফলন ঘটেছে।পাঁচ. নির্বাচনের তিন বাঙালি নারীর বিজয় প্রমাণ করল বাঙালিরা আজ বিশ্ব আসরে প্রতিষ্ঠিত। আমি যখন টিউলিপ সিদ্দিকের বাংলায় দেয়া বক্তব্য শুনছিলাম, তখন আমার বারবার মনে হয়েছিল, সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলা ভাষাও জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হবে এবং বাংলা ভাষা অন্যতম একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। যুক্তরাষ্ট্র একদিন অভিবাসীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব আসরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করার পেছনে এই অভিবাসীদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। আজ যুক্তরাজ্যও ধীরে ধীরে সেই পথে যাচ্ছে। শুধু তিনজন বাঙালি নারী বলি কেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এবার মোট ২২ জন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মাঝে ভারতের ১০ জন, পাকিস্তানের ৮ জন ও শ্রীলংকার একজন। আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে কোনো দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এমপি যদি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন, আমি তাতে অবাক হব না। আমি তিনজন বাঙালি নারীর ব্যাপারেও যথেষ্ট আস্থাশীল। এরা তিনজনই যথেষ্ট শিক্ষিত। টিউলিপ সিদ্দিক মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, আর রূপা হক একটি কলেজের শিক্ষক ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তারা আগামী দিনগুলোতে লেবার পার্টির মূলধারার রাজনীতিতে যে বড় অবদান রাখবেন, তা বলাই বাহুল্য। রুশনারা দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হলেন। তিনি শ্যাডো বা ছায়ামন্ত্রীও ছিলেন। এখন টিউলিপ সিদ্দিক কিংবা রূপা হকের জুনিয়র ছায়ামন্ত্রী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের জন্য এটা আরও বড় পাওয়া এ কারণে যে, তাদের দু’জনের (রুশনারা ও টিউলিপ) বাংলাদেশের ব্যাপারে বড় আগ্রহ রয়েছে। নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, মানবাধিকার নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্রিটেনে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ব্যাপক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখবেন, এ প্রত্যাশা এখন অনেকেই করবেন।যুক্তরাজ্যের ভোটাররা ডেভিড ক্যামেরন তথা কনজারভেটিভ পার্টির প্রতি আবারও আস্থা রাখলেন। ইউরোপের সর্বত্র অর্থনীতিতে ব্যাপক মন্দাভাব দেখা দিলেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে তা তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। ডেভিড ক্যামেরনের সরকার বেশ কিছু মানুষের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। এটা ছিল তার জন্য প্লাস পয়েন্ট। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাও তিনি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এতেও মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের মানুষের জন্য একটা পরিবর্তন আনতে চান- ভোটাররা তা বিশ্বাস করেছে। ফলে তিনি আরও ৫ বছরের জন্য ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে রয়ে গেলেন। কিন্তু সমস্যা যে নেই, তা নয়। আগামী দিনগুলো তার জন্য সুখের না-ও হতে পারে। ২০১৭ সালে গণভোটের কথা বলছেন তিনি। এখন তিনি যদি সত্যি সত্যিই গণভোটের আয়োজন করেন এবং গণভোটে যদি মানুষ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়, তখন কী হবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে যুক্তরাজ্য একাকী কি ইউরোপে থাকতে পারবে, কিংবা একাকী থেকে তার অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু শক্তিশালী হবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাটছাঁটের প্রস্তাব করেছেন ক্যামেরন। ভোটাররা তা সমর্থন করেছে। লেবাররা এর বিরোধিতা করেও জনসমর্থন পায়নি। এখন সত্যি সত্যি এ খাতে যদি বাজেট বরাদ্দ কমানো হয়, যদি এ খাতে আরও বেসরকারীকরণ হয়, তাহলে তা নিুআয়ের মানুষদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাবে না। আর্থিক সংস্থান না থাকায় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে। একটা বড় ধরনের শংকা রয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়া তথা ক্যারিবীয় অঞ্চলের অভিবাসীদের নিয়ে। তাদের অনেকেরই ভালো চাকরি নেই। আর্থিক সঙ্গতিও ভালো নয়। এরা বিপদে পড়তে পারেন আগামী দিনে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী নিয়েও সমস্যা আছে। ভাষাগত সমস্যার পাশাপাশি এরা নানা রকম অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আইন না মানার প্রবণতা এদের মাঝে বেশি।যুক্তরাজ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই নির্বাচন যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ ৭৫০ বছরের গণতন্ত্রের ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই মাত্র। অনেক পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনটি এলো না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লেবার পার্টিকে এখন নয়া রাজনীতি ও নয়া দর্শন নিয়ে আসতে হবে। Daily Jugantor 10.05.15

>চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৪ মে দুুই দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। তার এ সম্ভাব্য চীন সফর ও চীন-ভারত সম্পর্ক অনেকের কাছেই এখন আলোচনার একটি বিষয়। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নৌ তৎপরতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর অনেকের কাছেই এটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, অচিরেই ভারত ও চীন ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাবে। এ ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে যখন ভারত তার প্রাচীন কটন রুটটি নতুন করে তার নৌ স্ট্র্যাটেজিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে মোদির চীন সফরের গুরুত্ব থাকবে অনেক বেশি। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্কের কারণে চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন অনেক। চীনকে ঘিরে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সামরিক তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে ভারত মহাসাগরে। ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ ফ্লিটের যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করা হবে। পূর্ব চীন সাগরে বেশ ক’টি বিতর্কিত দ্বীপ রয়েছে, যে দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপান ও ফিলিপাইনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন এ অঞ্চলে মার্কিন নৌ সেনা মোতায়েনের অর্থ হচ্ছে চীনের ওপর পরোক্ষভাবে ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। একইসঙ্গে ভারত মহাসাগরে চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। চীন এ অঞ্চল ঘিরে যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে (বন্দর স্থাপনা, রিফুয়েলিং স্টেশন ইত্যাদি), এটাও ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে চীনের স্বার্থ খর্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগর (ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের তেল রিজার্ভের ৬০ ভাগ, আর গ্যাস রিজার্ভের তিন ভাগের এক ভাগ) আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে চীনের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়ার সমর্থনের। ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ অনুযায়ী এ অঞ্চলে মস্কো, তেহরান, বেইজিং ও কলম্বোর মধ্যে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছিল, সে ঐক্যকে দৃঢ় করতেই শি জিন পিং গেল সেপ্টেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। এর আগে তিনি মস্কো যান। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে শি জিন পিং যে বক্তব্য রাখেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে শি জিন পিং হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। চীনা রাষ্ট্রপ্রধান গেল বছরের মাঝামাঝি ব্রাজিলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও ব্রিকসের অন্যতম শক্তি। ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক জোট। ২০৫০ সাল নাগাদ ব্রিকস দেশগুলোর মোট জিডিপির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। (যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকবে ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার)। একই সময় ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য সম্পর্ক ৩৪০ মিলিয়ন ডলার (২০১২)থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৫০০ মিলিয়নে। প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মস্কো গিয়ে শিং জিন পিং রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো সম্পর্ককে ঝালাই করে দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, চীন নতুন অর্থনৈতিক জোটকেও বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ কারণে যে, চীনের নয়া নেতৃত্ব ন্যূনতম ১০ বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত চীনকে বিশ্ব আসরে নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং চীনের পররাষ্ট্রনীতির গতি-প্রকৃতি বোঝার দরকার আছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। ২০১০ সালে জিএনপির দিক থেকে জাপানকে ছাড়িয়ে যায় চীন। যেখানে ১৯৮০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ ভাগ (যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ ভাগ), সেখানে বলা হচ্ছে, ২০১৬ সালে ppp-এর হিসাব অনুযায়ী (purchasing, price, parity) চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। উৎপাদনশীল পণ্যের বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দিক থেকে চীন এখন এক মহাশক্তি। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার মাইক্রোওয়েভ ও জুতা উৎপাদিত হয়, তার তিন ভাগের দুই ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। সে সঙ্গে বিশ্বের উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ৬০ ভাগ, ডিভিডির ৫৫ ভাগ, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০ ভাগ, পারসোনাল কম্পিউটারের ৩০ ভাগ, শিশুদের খেলনার ৭৫ ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। ফলে বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের একটা বাজার তৈরি হয়েছে। চীনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। ফরচুন ম্যাগাজিন বিশ্বের বড় ৫০০ কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে, সেখানে চীনের রয়েছে ৩৭টি কোম্পানি। বিশ্বের যত জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তার সঙ্গে এককভাবে চীনে ব্যবহৃত হয় তার ১৬ ভাগ। আর বিশ্বে জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে তিন ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করে চীন। যে কারণে চীনকে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে চীনে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বেড়েছে শতকরা ২৯ ভাগ। চীনে রয়েছে বিশাল এক তরুণ প্রজন্ম, যারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রতি বছর ২১ মিলিয়ন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। আর প্রতি বছর ৩ লাখ শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায়। তারা ফিরেও আসে। ১৯৪৮ সালে (স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে) যেখানে চীনে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ, এখন সেখানে ১০০ ভাগ। অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে চীনে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তাতে প্রায় ২০ কোটি মানুষকে চীন অতি দরিদ্রতম অবস্থা (প্রতিদিন জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ১.২৫ ডলার আয় হিসেবে) থেকে বের করে এনে কিছুটা সচ্ছলতা দিয়েছে। যদিও বলা হয়, এখনও প্রায় ২০৭ মিলিয়ন লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন ধনী ও গরিবের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এখন কর্মজীবী মানুষের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। মানুষের আয় যেখানে বেশি। হাজার হাজার টাউনশিপ এখন তৈরি হয়েছে, যা বদলে দিয়েছে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনযাত্রা। চীনকে নিয়ে খারাপ খবরও আছে। যেখানে ২০০৯ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ ভাগ, ২০১২ সালে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক আট ভাগে। মুদ্রাস্ফীতি তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। আর শহুরে বেকার সংখ্যা চার থেকে ছয় ভাগের নিচে। এই যে চীন, এ চীনের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বটি এখন বর্তিয়েছে শি জিন পিং-এর ঘাড়ে। কোন পথে এখন চীন? শি জিন পিং-এর এজেন্ডায় রাশিয়া ও ভারত প্রাধান্য পেলেও এটা সত্য, অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। বেশ কিছু বিশ্লেষকের লেখা পড়ে যা মনে হয়েছে, তা হচ্ছে শি জিন পিং এখন প্রথমেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে। এক বিশাল দেশ চীন। প্রায় ৫৫ জাতি ও উপজাতি নিয়ে গড়ে উঠেছে চীন। ২২টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, চারটি বিশেষ অঞ্চল ও ১৪৭টি বিশেষ এলাকা নিয়ে চীনা রাষ্ট্র। রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই রাষ্ট্রটি ভেঙে যেতে পারে। এ কারণেই চীনা নেতারা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সতর্ক থাকছেন। যে ভুল করেছিলেন গরবাচেভ, সেই ভুল করেননি চীনা নেতারা। সেনাবাহিনী এখনও পার্টির প্রতি অনুগত। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ফুজিয়ান, ঝে ঝিয়াং কিংবা সাংহাই প্রদেশগুলো তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশি সমৃদ্ধিশালী। প্রদেশে প্রদেশে যে বৈষম্য, গ্রাম আর শহরের মাঝে যে পার্থক্য, তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে শি জিন পিং প্রশাসনকে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রচুর বয়স্ক লোকের পেনশন ভাতা নিশ্চিত করা, পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা, অসমতা ও দারিদ্র্য দূর করা। এটা হবে চীনা প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ। দুর্নীতির বিষয়টিও তার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। পার্টির সিনিয়র নেতাদের ব্যাপক দুর্নীতি এখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বে আলোচনার অন্যতম বিষয়। অভিযোগ আছে, সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও দুই দশমিক সাত মিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়েছিল, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর মায়ের নামে একটি কোম্পানির ১২০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার আছে। খোদ সাবেক প্রেসিডেন্ট নিজেও অভিযুক্ত! যুক্তরাষ্ট্রের সুমবার্গ গ্রুপের মতে, শি পরিবার ৩৭৬ মিলিয়ন ডলারের মালিক। শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সম্পর্কে এ ধরনের অভিযোগ নয়া প্রেসিডেন্টের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। একুশ শতকে আমরা চীনকে দেখব অন্যতম শক্তি হিসেবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান বিশ্বের সব অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। ব্রিকসে চীন ও ভারত অন্তর্ভুক্ত হলেও এশিয়ার এ দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একটি ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিতে পারে। ভারতে জনগোষ্ঠীর ৩৭ দশমিক ০২ ভাগ দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করলেও আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তখন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় ৯৪০ ডলার থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। ২০০৭ সালে যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখত মাত্র ২ ভাগ, তখন অবদান রাখবে ১৭ ভাগ। সুতরাং ভারতকে ফেলে দেয়া যাবে না। তাই কোনো কোনো বিশ্লেষক (জনাথন হোলসনাগ, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন) একটি সম্ভাব্য 'Chindia' ধারণার কথা বলেছেন, যেখানে চীন ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এ ধারণা অমূলক নয়। সাম্প্রতিক চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা নেতারা ভারত সফর করেছেন। সীমান্ত সমস্যা নিয়েও (অরুণাচল) এক ধরনের ‘স্থিতাবস্থা’ বিরাজ করছে। ক্ষমতা বহন করে ভারতবিরোধী তেমন কোনো কথা বলেননি। তিনি ভারত সফরও করেছেন। একইসঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশী নেতাদের সম্পর্কেও ধারণা রাখেন। ২০১২ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। খালেদা জিয়াকে তিনি তখন বেইজিংয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী। আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও গেল বছর বেইজিং সফর করেছেন। ওই সফর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের আগ্রহের কথা আবার জানিয়েছে। ছয়টি মেগা প্রকল্পে চীন আমাদের ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় ২০ দফা ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছিল এবং পাঁচটি দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ২০২১ সালে একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়, এ ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে এবং চীন এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। চার দেশীয় একটি ইকোনমিক করিডোর গড়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহকে চীন শুধু সমর্থনই করেনি, বরং এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিসিআইএম নামে ওই অর্থনৈতিক জোটে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, চীনের ইউনান প্রদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারও রয়েছে। সুতরাং চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও একটি ফ্যাক্টর। এ অঞ্চলের ব্যাপারে মার্কিনি স্বার্থের ব্যাপারে চীন পুরোপুরি সজাগ। চীনা নেতৃত্ব ভালো করে জানে, এ অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থকে নিউট্রাল করতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। পাকিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বরাবরই চীনের বন্ধু। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অতটা উষ্ণ ছিল না। কিন্তু শি জিন পিংয়ের সফরের পর বরফ গলতে শুরু করেছে। চীনের বড় ভয় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। ব্যবসায়িক অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ দুইটি বিপদে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যে Tram pacific partnership -এর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অনেকেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক (বিশেষ করে নৌবাহিনীর উপস্থিতি) উপস্থিতি বাড়িয়েছে (বাংলাদেশ এ স্ট্রাটেজির আওতায়)। ফলে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এবং ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করবে যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে অর্থাৎ ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার সমন্বয়ে এ অঞ্চলে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছে (প্রিমাকভ ডকট্রিন), তা মার্কিন স্বার্থকেও আঘাত করছে। বেশ কিছুদিন আগে ওবামা বলেছিলেন, ইরান আগামী এক দশকের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির মূল কারণ দুইটি- একদিকে ইরানের উত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা, অন্যদিকে ধীরে ধীরে চীনকে ঘিরে ফেলা, অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলার যে নীতি (কনটেইনমেন্ট থিউরি) যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেছিল তার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের এ স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে শি জিন পিং নিজে অবগত। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন, তখন তিনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো কোনো ভালো কূটনীতির পরিচয় দেয় না।’ এ বক্তব্য প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ভূমিকাকে চীন ভালো চোখে দেখছে না। ফলে মোদির চীন সফরের গুরুত্ব অনেক। শুধু ব্যবসা ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতেই তিনি যাচ্ছেন, এটি ঠিক আছে। কিন্তু চীনা নেতারা মোদির স্ট্র্যাটেজি বোঝার চেষ্টা করবেন। শ্রীলঙ্কায় চীনা বন্ধুপ্রতিম একটি সরকারকে ‘উৎখাত’, কিংবা নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা উপস্থিতিতে ভারতের শঙ্কা, ভুটানে চীনা দূতাবাস খুলতে দিতে ভারতের আপত্তি এবং সর্বশেষ ভারত মহাসাগরে সিসিলি ও মরিসাসে ভারতীয় নৌবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখন দেখতে হবে, মোদির এ সফরের মধ্য দিয়ে তিনি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ককে ফিরিয়ে আনতে পারেন কিনা। Daily Alokito Bangladesh 10.05.15

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও কিছু ভাবনা

তি নটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যা হয়ে গেল, তা যে কোনো বিবেচনায় অনাকাক্সিক্ষত হলেও এখন তাকাতে হবে সামনের দিকে। সেই পুরনো ‘ক্ষত’ আমরা আবারও পর্যবেক্ষণ করছিÑ পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করা এবং সেই সঙ্গে বিদেশিদের ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ’। মার্কিন কংগ্রেসের একটি হাউস কমিটিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে কংগ্রেস সদস্যরা আলোচনা করেছেন। কয়েকজন বিশেষজ্ঞও মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ঢাকা সফরে এসে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যানও মন্তব্য করেছেন। এসব ‘মন্তব্য’ আমাদের কাছে খুব অপরিচিত নয়। এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বাংলাদেশ নিয়ে শুনানি হয়েছে এবং তা লিপিবদ্ধও হয়েছে। এ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কী? আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ফাটল ধরেছেÑ এটা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। কিন্তু তাই বলে বিদেশি রাষ্ট্রের কথামতো, নির্দেশমতো আমরা গণতন্ত্র বিনির্মাণ করব, এটাও ঠিক নয়। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ‘সমস্যা’ আছে। আর এ সমস্যা আমাদের নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। অন্য কেউ সমাধান করতে পারবে না। দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আমাদের দেশের আবহাওয়ায়, ঐতিহ্যে, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যেই আমরা গণতন্ত্র বিনির্মাণ করব। আর এই গণতন্ত্রের সঙ্গে পশ্চিমা গণতন্ত্রের কোনো মিল হবে না। আমরা মাঝারি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছি। আমাদের সক্ষমতা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এই সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তিকে ধারণ করেই আমরা গণতন্ত্রকে বিনির্মাণ করব, যেমনটি করেছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, রাশিয়া কিংবা তুরস্কÑ দক্ষিণ কোরিয়া। এখানে অবশ্যই একটা কথা বলা দরকার। এসব দেশ তথাকথিত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ধারণ করে বিনির্মাণ করলেও এদের সবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে দেশগুলো এক একটি উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল ‘ব্রিকস’ (BRIC) জোটের ধারণা দিয়েছিলেন (দক্ষিণ আফ্রিকা বছরে ২০০১ সালে ব্রিকসে যোগ দেয়)। সেই ‘ব্রিকস’ এখন বাস্তব সত্য। ‘ব্রিকস’-এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প আরেকটি ‘বিশ্বব্যাংক’ তৈরি হয়েছে (চিন যার মূল উদ্যোক্তা) এবং পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ এতে যোগ দিয়েছে। রাশিয়া এই জোটের অন্যতম সদস্য। এখন ২০১১ সালে জিম ও’নেইল MIKT অর্থনৈতিক জোটের কথা বলেছেন (মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক এই নয়া অর্থনৈতিক জোটের সদস্য)। একই সঙ্গে ২০১১ সালে জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাক গোল্ডস্টোন TIMBI জোটের প্রস্তাব করেছিলেন। তুরস্ক, ভারত, মেক্সিকো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া এই জোটের সদস্য। দেশগুলো সবই উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি। অধ্যাপক গোল্ডস্টোন যুক্তি দেখিয়েছিলেন, চিন ও রাশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হ্রাস পাবে এবং বৃদ্ধদের সামাজিক সুবিধা দেওয়ায় রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর তা প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশে জনগোষ্ঠী বাড়বে, তাতে করে বাড়বে বস্তির সংখ্যা। তবে বস্তিবাসীদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা যাবে। ফলে ব্রিকসের আবেদন কমবে, আর গুরুত্ব বাড়বে TIMBI জোটের। আমরা ‘ব্রিকস’ বলি আর ‘টিমবি’ জোট বলি, একটা মিল কিন্তু আছে। এসব দেশে এক ধরনের প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র আছে। সংসদ আছে। বিরোধী দলও আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে বেশি। যেমন বলা যেতে পারে তুরস্কের কথা। তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শতকরা ৮ ভাগ। যেখানে ইউরোপের প্রতিটি দেশে অর্থনীতিতে শ্লথগতি এসেছে, সেখানে তুরস্ক ইউরোপের অনেক দেশকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকে। ইন্দোনেশিয়ায়ও বিশাল এক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় অবদান রাখছে। এসব দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে মেলানো যাবে না। কিরঘিস্তানের প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ একবার বলেছিলেন ‘Western Democracy is not suitable for kyrgyzstan’ অর্থাৎ পশ্চিমা গণতন্ত্র কিরঘিস্তানের জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি যে গণতন্ত্র বিনির্মাণ করেছিলেন, তাকে বলা হয় ‘Consultative Democracy envisaging dialogues with influential social groups, would be more in keeping with his country's tradition (AP news, 23 march 2010)। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা এটাকে বলছেন ‘Consultative Democracy- অর্থাৎ জনতার সঙ্গে পরামর্শমূলক একটি ব্যবস্থা, যা কিরঘিস্তানের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ এসব দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে আমরা বিবেচনা করতে পারি। বাংলাদেশে রয়েছে একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় (যা কি না কলেজেরই নামান্তর!) কোনো সমাধান নয়। বরং বিভিন্ন পেশাজীবী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করে আমরা একটা দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে পারি, যারা অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ ভাগ ধরে রাখা (এখন যা ৫.৭ ভাগে নেমে আসার কথা), ২৪ মিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ, ২৭ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য, দরিদ্রতা ২৪ ভাগে কমিয়ে আনা, মাথাপিছু আয় ১১৯০ ডলারে উন্নীত করা, ১৩২৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, বছরে ৩৮৩ দশমিক ৪৩ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন করা (বাংলাদেশ চাল রপ্তানিও করছে), ২৪ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্ট ব্যবসা, ৭৭ লাখ গার্মেন্ট উদ্যোক্তাÑ এই যে পরিসংখ্যান, এই পরিসংখ্যান বলে আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে। আমরাও নয়া অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারি। এখন যা দরকার তা হচ্ছে শিক্ষিত, দক্ষ নেতৃত্ব, দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি হ্রাস, আয়ের সুষম বণ্টন এবং আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে মেলানো যাবে না। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে আমাদের নিজেদের মধ্যে যদি বিভেদ থাকে, তাহলে অসাংবিধানিক শক্তি তা থেকে সুযোগ নেবে। মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে যে বিষয়গুলো এসেছে, তা হচ্ছে : ১. রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান ত্বরান্বিত হবে; ২. ধর্মকে যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, তারা আরও জঙ্গিরূপ ধারণ করবে; ৩. বাংলাদেশের ‘রাজনীতি’ যেভাবে চলছে, তাতে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাধা না দেয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরও সহিংসরূপ পাবে এবং উগ্র ইসলামি দলগুলো আরও সহজে দল ভারী করতে পারবে। তবে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে এটাও বলা হয়েছে যে, এই শুনানি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। কোনো দেশের সরকারকে হেয় করার জন্য নয়। বরং একটি দেশ কীভাবে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, সে বিষয় মার্কিন প্রশাসনের নজরে আনা। যারা সেখানে বক্তব্য রেখেছেন তাদের কেউ কেউ এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, ২০০৭ সালের মতো আবারও বাংলাদেশকে সামরিক হস্তক্ষেপের পথে নিয়ে যেতে পারে! আবার সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যানও বলেছেন তারা উদ্বিগ্ন ও ভোটে যে অনিয়ম হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা দরকার। যদিও ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন বলেছে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে এবং অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। মার্কিন কংগ্রেসের মূল্যায়ন আমাদের কোনো আশার কথা বলে না। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা কিছুটা আছে বটে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত। জঙ্গিগোষ্ঠীরা খুব বেশি সমাজে প্রবেশ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এদের সমর্থকগোষ্ঠীও খুব সীমিত। ফলে জঙ্গিদের উত্থান নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে কোনো কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে বলা হচ্ছে। এটাও আমার কাছে মনে হয়েছে অতিরঞ্জিত। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্তও করা হয়েছে। তবে ‘হস্তক্ষেপ’ ও ‘সামরিক হস্তক্ষেপের’ যে আশঙ্কা কেউ কেউ মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে ব্যক্ত করেছেন, তাও অগ্রহণযোগ্য। কেননা এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, যাতে বিদেশি ‘হস্তক্ষেপের’ প্রয়োজন পড়বে! বাংলাদেশ আফগানিস্তান বা সিরিয়া-ইরাক নয়। বাংলাদেশের মাটিতে ‘তালেবান’ বা আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের আশঙ্কাও কম। বাংলাদেশে ইসলাম সহনীয়, মডারেট এবং শান্তিপ্রিয়। আমাদের ঐতিহ্যের ধারক হচ্ছে এই ইসলাম ধর্ম। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাকে যেভাবে ইসলাম ধর্মকে জঙ্গি মানসিকতায় রূপ দেওয়া হয়েছে (সেখানে বহিঃশক্তির ইন্ধন, সমর্থন, আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে), এ দেশে কোনোদিনই সম্ভব নয়। মানুষ এটা গ্রহণ করে নেবেও না। বাংলাদেশে আমরা শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের উত্থান দেখেছি। কিন্তু এদের কর্মকা-ের প্রতি কোনো শ্রেণির মানুষেরই এতটুকু সমর্থন ছিল না। বরং মানুষ এদের ধিক্কার জানিয়েছে। তাই অভিজিতের হত্যাকা-ের পূর্ণ তদন্ত দরকার। এই হত্যাকা-ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা আছে কিনা, থাকলে কতটুকু আছে, বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়া দরকার। তবে একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার বিবেচনায় যেটা স্পষ্ট, তা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিভেদ আর বিদ্বেষ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে এ থেকে সুবিধা নেবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী। আমরা যত দ্রুত আমাদের মধ্যকার বিভেদ দূর করতে পারব, ততই আমাদের মঙ্গল। তিনটি সিটি করপোরেশন তিনজন নগরপিতা পেয়েছে। নির্বাচনে কিছুটা ‘ত্রুটি’ ছিল সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু এটা তো স্বীকার করতেই হবে যে, এই নির্বাচনটির প্রয়োজন ছিল। ঢাকায় দীর্ঘ ১৩ বছর কোনো নির্বাচন হয়নি। আর নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে জনসেবা নিশ্চিত হয় না। অন্তত ঢাকার দুই সিটিতে জনসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি। এখানে সংস্কারটি প্রয়োজন। কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশলী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে আমরা কখনই আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্তরে নিয়ে যেতে পারব না। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের দলব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিকতা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠবে! এটাই আমাদের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যকে ধারণ করেই আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাব। গণতন্ত্র কম, উন্নয়নটাই আসলÑ এই দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশকে আগামীতে নয়া অর্থনৈতিক জোটে শরিক হতে সাহায্য করবে।

তিনজন নগরপিতার কাছে একটি খোলা চিঠি

বিগত ২৮ এপ্রিলের তিনটি নির্বাচনে যে ঘটনাই ঘটে থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে চট্টগ্রাম ও ঢাকা তিনজন নয়া নগরপিতা পেয়েছে। এই নগরপিতাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। 'বিজয়ী' হয়ে তিনজনই তাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এর আগে তারা নিজেরা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে তিন সিটির ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন নির্বাচনের পর সেই একই সুরে তারা কথা বললেন। নতুন মেয়ররা দায়িত্ব গ্রহণের আগেই সংবাদপত্রে তাদের অগ্রাধিকার কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন। ঢাকা উত্তরের মেয়র ব্যবসায়ী আনিসুল হকের পাঁচটি অগ্রাধিকার হচ্ছে তার ভাষায়_ পরিচ্ছন্ন ঢাকা, সবুজ ঢাকা, আলোকিত ঢাকা, শিশুদের স্কুল তৈরি এবং দারিদ্র্যের কর্মসংস্থান তৈরি। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনেরও রয়েছে ৫টি অগ্রাধিকার কর্মসূচি। এগুলো হচ্ছে_ 'যানজট নিরসন', 'দূষণমুক্ত, নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা', 'পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সেবা নিশ্চিত করা' 'পরিচ্ছন্ন', 'দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর মহানগরী' এবং 'দুর্নীতি, সন্ত্রাস', 'চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও নাগরিকদের নিরাপদ জীবন'। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে_ 'আবর্জনামুক্ত পরিচ্ছন্ন নগর', 'সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত নগর' এবং 'জলাবদ্ধতা নিরসন'। নিঃসন্দেহে 'নগরপিতারা' যেসব সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন, তা এই দুই নগরের প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে তারা কতটুকু সফল হবেন, এ প্রশ্ন এখন থাকলই। তবে এটা সত্য, নিজ দলের সরকার থাকায়, তাদের কম সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে বটে, কিন্তু একজন দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়রের কাছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কোনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কেননা তিনি তার মেধা, যোগ্যতা এবং দক্ষতাবলে আমলাদের 'অহেতুক হস্তক্ষেপ' কাঁটিয়ে উঠতে পারবেন। উপরন্তু এই তিন মেয়রের সঙ্গেই সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ রয়েছে। সরকার প্রধান নিজে এদের মনোনীত করেছেন। এদের তিনজনের এটাই বড় প্লাস পয়েন্ট। ফলে তারা নগরের সমস্যা সমাধানে কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সম্মুখীন হবেন না, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে প্রশ্ন তো আছে অনেক। বিএনপি কী করবে, বিএনপির কর্মসূচি কি হবে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা অনেক। বিএনপি কি তখন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবে। নাকি আবারো 'হরতাল-অবরোধের' ডাক দেবে_ গোটা একটা প্রশ্ন বটে। কেননা ওটা সত্যি বিগত ৯২ দিনের হরতাল-অবরোধের রাজনীতি ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি করতে পারেনি। সরকারের কর্মকা-ের প্রতি অনেক দলের বিরোধিতা থাকলেও বিএনপি এদের সবার সঙ্গে 'ঐক্য' করতে পারেনি। ফলে সুবিধা নিয়েছে সরকার। তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। সুশীল সমাজের মধ্যে সরকার তার সমর্থকদের সংখ্যা বাড়াতে পেরেছে_ এটাও সরকারের একটা প্লাস পয়েন্ট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর বিদেশি দাতাগোষ্ঠী বারবার বলে আসছে সব দলের অংশগ্রহণে একটা নির্বাচন হোক। তখন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে 'সব দলের অংশগ্রহণ' থাকলেও, দেখাগেল নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। জাল ভোট ও নির্বাচনে কারচুপি ঠেকাতে ইসির ব্যর্থতা একটা সংকট তৈরি করল যে আগামীতে যে কোনো নির্বাচনে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যতই বলুক, 'ভোট কারচুপি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন রয়েছে', কিংবা যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার গিবসন যতই 'ভোট অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত চান', বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে হবে। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর বিদেশি চাপ আরো বাড়বে, এটা দিব্যি দিয়ে বলা যায়। কিন্তু সরকার 'শক্ত' অবস্থানে রয়েছে, এটাও বাস্তব। নিঃসন্দেহে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে যা ঘটল, তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে আবারো এক মহা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিল। সুস্থ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের রাজনীতি বিকশিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আর থাকল না। ১৯৯২ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ফিরে এসেছিলাম, সংসদীয় রাজনীতি দেশে প্রবর্তিত হয়েছিল। 'নিজের ভোট নিজে দেব'_ এই সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। আজ ২৩ বছর পর মনে হলো আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি আবার! তরুণ প্রজন্মের জন্য কি রেখে যাচ্ছি_ এ প্রশ্নটাই তখন বড় হয়ে দেখা দেবে। একটা নির্বাচন হলো বটে। কিন্তু তাতে 'সব প্রশ্নের' জবাব মিললো না। তবুও একটি প্রত্যাশা থাকলই। সরকারি দল 'জিতেছে', কিন্তু এখন তাদের জিততে হবে সাধারণ মানুষের মন। তাদের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। কেননা সাধারণ মানুষদের নিয়েই রাজনীতি। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তিনজন সিটি মেয়রের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা এখন তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আন্তরিক হবেন। তাদের সুবিধা একটাই_ তারা সরকারি দলের নেতা ও সমর্থক। সরকারও তাদের সাহায্য করবে। কেননা দুটি বড় শহরের (ঢাকা ও চট্টগ্রাম) ভোটাররা যদি পূর্ণ নাগরিকসেবা পায় তাহলে তারা সবকিছু 'ভুলে' যাবে। প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। চট্টগ্রামের সমস্যা মূলত একটাই_ জলাবদ্ধতা। আর বৃহত্তর ঢাকার সমস্যা একাধিক। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন। উভয় সিটির মূল ও অভিন্ন সমস্যা কয়েকটি_ যানজট, জলাবদ্ধতা, (ঢাকা দক্ষিণ), মাদক, মশকের বিস্তার, দুর্নীতি। এসব ক্ষেত্রে নবনির্বাচিত 'নগরপিতাদের' বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। যানজট ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা। এটা সিটি মেয়রদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু মেয়ররা 'নাগরিকদের সেবা' দেয়ার স্বার্থে ডিএমপির সঙ্গে মিলে কর্মসূচি নিতে পারেন। যানজটের প্রধান সমস্যা ঢাকা শহরে অতিরিক্ত যানবাহন, রিকশার আধিক্য, পরিবহন শ্রমিকদের বিশেষ করে ড্রাইভারদের বেপরোয়া ভাব ও আইন মানতে অনীহা, রাস্তার মাঝখান থেকে যাত্রী ওঠানো, যেখানে সেখানে পার্কিং করা ইত্যাদি। সিটি মেয়ররা এই মুহূর্তে দুটো কাজ করতে পারেন দায়িত্ব নেয়ার পরপরই। এক. আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কর্মী নিয়োগ। এরা ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করবেন। বলাই বাহুল্য কেননা ট্রাফিক পুলিশের যানবাহন নিয়ন্ত্রণে 'ব্যর্থতা' চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এরা মূলকাজ বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকেন 'উপরি' আদায়ে। ফলে দেখা যায়, ভিআইপি সড়কেও রিকশা চলছে। ট্রাফিক পুলিশ নির্বিকার। একই সঙ্গে রাস্তার দু'পাশে গাড়ি পার্ক করা থাকে, যা মূল রাস্তাকে সংকুচিত করে দেয়। 'অদৃশ্য এক কারণে' ট্রাফিক পুলিশ কোনো কথা বলে না। দ্বিতীয়ত. খুব দ্রুত মহানগরীতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে দ্রুত ফাইনের বিধান কার্যকর করা। যারা আইন ভঙ্গ করবে, দ্রুত তাদের ফাইন করতে হবে। কোনো মামলা-মোকদ্দমা নয়, কেননা এতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়। আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত আছে সেনানিবাসের ভেতরে, বিশেষ করে জাহাঙ্গীর গেট গিয়ে যানবাহন কিভাবে চলাচল করে তা প্রত্যক্ষ করার। এক শহরে দুই আইন। সেনানিবাসের ভেতরে যানবাহনগুলো যদি শৃঙ্খলার ভেতরে চলাফেরা করে তাহলে ঢাকা শহরের অন্যত্র তা হবে না কেন? নবনির্বাচিত দুই মেয়রের কাছে এই আর্তি রাখলাম। মনে রাখতে হবে নগরবাসীদের সেবা দেয়া তাদের মূলকাজ। তাদের ডায়নামিক হতে হবে। রাজনৈতিক চাপ থাকতে পারে। বিশেষ করে সরকার সমর্থক পরিবহন সেক্টরের একাধিক শ্রমিক নেতা, মালিক নেতা যাদের কেউ শ্রমিকদের নেতাও বটে, তাদের চাপ থাকতে পারে। তখন মেয়রদের উদ্যোগটাই আসল। আমার ধারণা তাদের এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগ তাদের নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতেও সাহায্য করবে। নগর ভবনের দুর্নীতি একটা বড় সমস্যা। ঢাকায় অনেক কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন যারা সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন দুজনই ব্যবসায়ী। এরা এখন এই স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে কিভাবে নিষ্ক্রিয় করবেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এসব ঠিকাদারদের সঙ্গে 'আন্ডার ওয়ার্ল্ডে'র যোগাযোগ রয়েছে। অতীতে সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি নিয়ে করপোরেশন ভবনে রক্তারক্তি হয়েছে। খুনাখুনি পর্যন্ত হয়েছে। 'থ্রি স্টার', 'ফাইভ স্টার' গ্রুপের নাম এখন অনেকের মুখে মুখে। সাঈদ খোকন যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা কী তিনি করতে পারবেন? কেননা গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করবে তিতাস। সন্ত্রাস-মাদক, চাঁদাবাজি বন্ধের দায়িত্ব পুলিশের, পানি সমস্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। বিদ্যুৎ দেবে ডেসকো ও ডিপিডিসি। আর যানজট নিরসনে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। এখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোনো ভূমিকা নেই। তবে মেয়র সাহেব উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি ভিন্ন। তার জন্য কাজগুলো খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। বুড়িগঙ্গা পানি দূষণমুক্ত করার প্রক্রিয়া এত সহজ নয়। আমাদের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছেও এর কোনো সমাধান আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা একটা 'মেজর' সমস্যা। অথচ পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ উদাসীন। নদীদূষণ রোধে অনেক মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রয়াস দরকার। বিদেশে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হয় নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে। আর আমরা জেনেশুনে বুড়িগঙ্গা নদীকে 'হত্যা' করলাম। আমাদের আগের পরিবেশমন্ত্রী সুদূর অ্যান্টার্টিকায় গিয়েছিলেন পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে। বর্তমান পরিবেশমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পর একবারও বুড়িগঙ্গায় গেছেন কিনা সন্দেহ। ফলে আন্তরিকতার অভাবে বুড়িগঙ্গা আজ 'মৃত', এখানে কোনো জীবন নেই। আমি সাঈদ খোকনকে সাধুবাদ জানাই। তিনি এটাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বুড়িগঙ্গাকে চেনেন। এ এলাকাতেই তিনি বড় হয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তার ক্ষমতাবলে কথাবার্তা বলতে পারেন। তার উচিত একটি 'বিশেষ প্যানেল' তৈরি করা, যারা তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনেক অনিয়ম মানুষ ভুলে যাবে, যদি মানুষ প্রকৃত সেবাটি পায়। মেয়রদের কাছে তাই প্রত্যাশা থাকবেই তারা 'কাজ' করবেন, মুখের কথায় জনগণকে আশ্বস্ত করবেন না। আমরা চাই, নগর প্রশাসনে পরিবর্তন আসুক। এই প্রতিষ্ঠানটি হোক একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষ সেবা চায়। তারা যাতে না ভোগেন। 'সিটিজেন ডায়ালগ' এর কর্মসূচিও ভালো। এখানে উদ্যোগটাই আসল। Daily Jai Jai Din 06.05.15