রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

পররাষ্ট্র - কী পেল বাংলাদেশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের ঢাকা সফরের পর এর রেশ এখনও রয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ সফরকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সফরের রেশ আরও কিছুদিন থেকে যাবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও তা প্রভাব ফেলবে। তবে এটা সত্য, বিপুল এক সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে- এটা বলা যাবে না। তবে ভারতের প্রেক্ষাপটে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এক. তার এ সফরকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছিল। বিএনপি ও জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো, যাদের পরিচিতি ছিল ভারতবিরোধী দল হিসেবে, তারাও স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মোদির সফরের পর এ দুইটি দলই তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে;  বিরোধিতা করেনি। দুই. ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কটি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ তেমন একটা রক্ষিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন. মোদির তিনটি কর্মসূচি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সাক্ষাৎকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তিনি যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর, এটা বোঝা গেছে এবং মোদি যে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চান- এটাই প্রমাণিত হলো। তিনি সংসদ অধিবেশনে ভাষণ দেননি। অথচ শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পার্লামেন্টে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন। বর্তমান সংসদ নিয়ে যে একটি বিতর্ক আছে, সম্ভবত এটি বিবেচনায় নিয়েই তিনি সংসদে ভাষণ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে তরুণ প্রজন্মের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভারতের ইমেজ বাড়াতে চেয়েছেন। কেননা এদেশে একটা শক্ত ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। এ ভারতবিরোধী মনোভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে চান। এজন্য টার্গেট করেছেন তরুণ প্রজন্মকে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬৫ ভাগের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এদের নিয়েই মোদি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে রচনা করতে চান।

বলতে দ্বিধা নেই, মোদির এ সফরে বাংলাদেশের অনেক প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট কমিটমেন্ট নেই। তিনি শুধু মমতা ব্যানার্জিকে সফরসঙ্গী করেছিলেন; কিন্তু তাতে আসাম ও ত্রিপুরায় এক ধরনের অসন্তোষ আমরা লক্ষ করেছি। এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বলাই বাহুল্য কানেকটিভিটির নামে এ দুই রাজ্যে বাস চলাচল ও পণ্য পরিবহনের উদ্বোধন হয়েছে; কিন্তু শুরু হয়নি। অথচ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অনুপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরে চীনা কার্ডটি ব্যবহার করেছেন, এমন কথা ভারতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। ৮ জুন হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন ও এর আগে ২৮ মে নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো রয়টার্সের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় চীনের প্রভাব সঙ্কুচিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ঢাকা সফর করেন। এ সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলে কিনা, সেটা এখন দেখার বিষয়।

নরেন্দ্র মোদির এ সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্র সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকিছু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তা এক ধরনের হতাশার জন্ম দেবে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। যেমন, তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায়, আমাদের তা হতাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এসেছিলেন আবারও। কিন্তু তা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, পশ্চিম বাংলার স্বার্থেও নয়। তিনি এসেছিলেন মোদির অনুরোধে এবং মোদির স্বার্থে। এবারও আমরা তার কাছ থেকে কোনো কমিটমেন্ট পেলাম না। বরং তিনি বাংলাদেশ আত্রাই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে কলকাতায় এ অভিযোগ তুলে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর একটি অপচেষ্টা চালালেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের ইতিহাসে ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এবার হলো। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- মমতা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির পেছনে ছুরিকাঘাত করতে চান!

তিনি তিস্তার বদলে দৃষ্টিটা অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চান। ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে এটা অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারত অংশীদার হতে চায়। অংশীদার হওয়া এক জিনিস আর বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যাওয়া অন্য জিনিস। এখন পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে না? দুইটি ভারতীয় কোম্পানির (রিলায়েন্স ও আদানি) সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে? হলে, কতুটুকু হয়েছে? রিলায়েন্স করবে এলএনজি প্লান্ট। তরলীকৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ লাইন টেনে নেয়ার দায়িত্বটি বাংলাদেশের। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কত টাকায় আমরা কিনব কিংবা চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আর আদানি গ্রুপ ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটা সবাই জানে, ভারতীয় কয়লা নিকৃষ্টমানের। অথচ আমাদের পাঁচটি কয়লা খনিতে যে কয়লা পাওয়া যায়, তা উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কয়লা দিয়ে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলো না কেন? উপরন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের কেন এ সুযোগটি দেয়া হলো না? উন্মুক্ত টেন্ডারেও দুইটি ভারতীয় কোম্পানিকে এ কাজ দেয়া হয়নি। সরকারের অভিযোগ আছে, উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহেই এ ‘কাজ’ ভারতীয় কোম্পানি পেয়েছে। এটা এখন অনেকেই জানেন, আদানি গ্রুপ গুজরাটের ব্যবসায়ী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এ শিল্পগোষ্ঠীর অবদান ছিল অনেক। এখন এরা বাংলাদেশে একটি ‘কাজ’ পেল। হয়তো অনেকেই জানেন না, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। অথচ এ কাজে এদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রিলায়েন্স গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভারত থেকে যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? এ ঋণ নেয়া হবে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ কোনো ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেয়া দেশের কাছে দায়বদ্ধতা বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থ যেসব প্রকল্পে খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এ ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার), তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনও বলি না, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না। উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ভারতের দেয়া এই ঋণ সম্পূর্ণ শর্ত মুক্ত। 

টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হবে না, এ ধরনের একটি কমিটমেন্ট যৌথ ঘোষণাপত্রে থাকলেও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্ট নেই। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির কথা বলা হয়নি। বাংলাদেশ একটি নয়া উপআঞ্চলিক জোট বিবিআইএন (ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত- সাত বোন রাজ্য ও নেপাল) গঠনে রাজি হয়েছে। এটি যদি কার্যকরী হয়, তাহলে সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে। ভারত যে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল, তা তাদের কর্মকান্ডে প্রমাণিত হয়েছে। ভারত সার্কের অবলুপ্তি চায় না, চায় একটি দুর্বল সার্ক। তাদের টার্গেট হচ্ছে উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যাতে করে ভারতের সাত বোন রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব। এখন ‘কানেকটিভি’ চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ভারতের পণ্য কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের সাত বোন রাজ্যগুলোতে যাবে। এক্ষেত্রে ভারতের ঋণে অবকাঠামো উন্নয়ন হবে (বিশেষ করে চার লেনে রাস্তা হবে, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মিত হবে)। আর অদূর ভবিষ্যতে সাত বোন রাজ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করে সাত বোন রাজ্যগুলোর একটি বড় ব্যবসা কেন্দ্র হবে, যারা আমদানি-রফতানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে সাত বোন রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের যে বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছিল, তা হুমকির মুখে থাকবে। বাংলাদেশী পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদে ভারতকে সমর্থন জানিয়েছে। এতে করে আমরা জাপানের ‘অসন্তোষের’ শিকার হতে পারি। চীনও এটাকে ভালো চোখে দেখবে না। জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদে প্রার্থী হতে চায়। বাংলাদেশেরও উচিত হবে একইসঙ্গে জাপানকেও সমর্থন জানানো। না হলে বাংলাদেশে জাপানের সাহায্যের ব্যাপারে তা প্রভাব ফেলবে। 

নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্রে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। কিন্তু তা হতে হবে বহুপাক্ষিকভাবে এবং উপআঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ভারত যদি সব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর না করে এবং যা সাপটা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্ত, তাহলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বাংলাদেশের অনেক কিছু দেয়ার আছে ভারতকে। আর সেজন্যই প্রয়োজন ভারতের মানসিকতার পরিবর্তন। বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভারতের আমলাতন্ত্র এ কাজটি করছে না, ফলে এ দুই দেশের সম্পর্কে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মোদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে চাচ্ছেন। তিনি তা পারবেন কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে এটা সত্য, অন্যান্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নরেন্দ্র মোদির এ সফর ছিল ব্যতিক্রমধর্মী একটি সফর। তার কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক।
দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১৪.০৬.২০১৫ 

যে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় না

বিশাল একটা প্রত্যাশার ঢেউ জাগিয়ে নরেন্দ্র মোদি ঢাকা ছেড়েছেন গত ৭ জুন। এর আগে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে একটি আবেগময়ী ভাষণ দেন। কিন্তু মোদির এই সফর রেখে গেছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সফর সফল কী ব্যর্থ, আমার কাছে তা বড় বিবেচ্য নয়। আমার কাছে বিবেচ্য তিনি যে সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন, তার কতটুকু অর্জিত হবে এবং কবে হবে? মূলত চারটি বিষয়ের আলোকে মোদির ঢাকা সফরকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও কানেকটিভিটি। এর মাঝে অর্থনীতি ও কানেকটিভিটির বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। সংবাদপত্রে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের সাহায্য পাবে। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতের কাছে থেকে সম্মতি পাওয়া গেছে। এখানে সমস্যাটা হচ্ছে ভারতের ঋণের ধরন নিয়ে। ভারত এই ঋণ দিচ্ছে ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’-এর আওতায়। ভারত নিজে কখনো ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এ ঋণ গ্রহণ করে না (সর্বশেষ মোদির দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় ১ হাজার কোটি ডলার ঋণ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা যায়)। ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এখন বিশ্বে অচল। কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত এর আওতায় কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। কেননা তাতে নানা শর্ত থাকে। যেমন বলা যায় ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এ ঋণ নিলে ওই ঋণের আওতায় শতকরা ৭৫ ভাগ পণ্য আমাদের ওই দেশ (এ ক্ষেত্রে ভারত) থেকে কিনতে হবে। ঠিকাদার নিয়োগ হবে ওই দেশ থেকে। সুদ দিতে হবে শতকরা ১ ভাগ হারে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে বাংলাদেশকে জরিমানা গুনতে হবে শতকরা ৫ ভাগ হারে। এটা কোনো ভালো ঋণ নয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর সুযোগ নেই ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে আরো আলোচনা করার। এর আগে ভারতের কাছে থেকে ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এর আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ আমরা পেয়েছিলাম। এ ব্যাপারে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, এখন যেসব প্রকল্পে এই ঋণ ব্যয় হবে, তাতে আমাদের চেয়ে ভারতই উপকৃত হবে বেশি। ভারতের ঋণ এখানে বেশি। দুটো প্রকল্পের কথা আমি উল্লেখ করলাম একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চার লেনে উন্নীত করা। সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নেয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারত নিজেও সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। সড়কের পাশাপাশি আমরা ৫০০টি ডাবল ডেকার বাসও কিনব। এক্ষেত্রে বাসের মূল্য যা ভারতের নির্ধারণ করে দেবে, আমাদের তা মানতে হবে। এর চেয়ে সস্তায় অন্যত্র বাস পাওয়া গেলেও তা আমরা ক্রয় করতে পারব না। নৌ ট্রানজিটে বাংলাদেশ চেয়েছে ভুটান ও নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করতে। কেননা এ দুটো দেশ থেকে নৌপথে কাঠ ও বোল্ডার সহজে আনা যায়। কিন্তু ভারত প্রথমে এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। এখন তা মেনে নিয়েছে। ত্রিপুরার চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেননা সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির মুখে) আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের পণ্য রফতানি কিংবা আমদানিতে হিমশিম খাবে। সে ক্ষেত্রে ত্রিপুরা কিংবা ত্রিপুরার দেখাদেখি সাতবোন রাজ্যগুলো যদি এই বন্দর ব্যবহার করতে চায়, তাহলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে একাধিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, সাফটা চুক্তির আলোকে বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশাধিকারের বিশেষ সুবিধা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণ, ভুটান ও নেপালকে ট্রানজিট দেয়া ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি ক্ষেত্রে ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভারত রক্ষা করেনি। ফলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। যে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় নাতবে মোদির এই সফর নানা সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে আমাদের জন্য। মনে রাখতে হবে ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার মোট আয়তনের মধ্যে ৭২ ভাগ এলাকা একা ভারতের। মোট জনসংখ্যার ৭৭ ভাগ ভারতের। ভারতের অর্থনীতির অবস্থান (পিপিপি) বিশ্বে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ এবং জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৭ ভাগে গিয়ে দাঁড়াবে, যখন চীনের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ ভাগ। সুতরাং ভারতের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আমরা উপকৃত হতে চাই। অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় নদী খনন করা যেতে পারে, যাতে ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আমরা নৌপথ ব্যবহার করতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। ভারত কানেকটিভিটির কথা বলে বাস সার্ভিস চালু করেছে। কলকাতা থেকে যাত্রী নিয়ে বাস যাবে ত্রিপুরায়। আবার ত্রিপুরা থেকে বাস যাবে শিলং ও গৌহাটি। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহƒত হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুল্ক পাবে কিনা, বাংলাদেশি বাস এই রুটে চলাচল করতে পারবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কানেকটিভিটি সমর্থনযোগ্য ও এ যুগের বাস্তবতা। কিন্তু এই কানেকটিভিটির আওতায় ভুটান ও নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এটা যদি হয় তাহলে ভালো। আমরা তাতে উপকৃত হব। এই কানেকটিভিটির আওতায় আগামীতে যদি চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেটা আমাদের জন্যই মঙ্গল। কিন্তু তা কি হবে? সড়কপথে ভুটান ও নেপালের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তিস্তা ছিল আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় এক নম্বরে। কিন্তু আমরা আগেই জানতাম তিস্তা নিয়ে আলোচনা হবে না। হয়ওনি। তবে মোদির আশাবাদ তিস্তা চুক্তি হবে। ঢাকায় মমতা ব্যানার্জি এসেছিলেন বটে। কিন্তু তিস্তার জট এই মুহূর্তেই খুলবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ামের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্যে সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না এই দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানি বণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প হতে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্য ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালের তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এ দিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তার এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তিটি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়ই এটি বোঝেন। মমতা ব্যানার্জিকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। এখানে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। এখানে একটা কথা বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর (পশ্চিমবঙ্গ) একটি সমঝোতা যদি হয় তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণœ থাকে। আমরা যেন মমতা ব্যানার্জির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করি। বিদ্যুৎ সেক্টরে আমরা দুটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে? ভারতীয় কয়লায় এখানে বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি হবে। কিন্তু আমরা কেন বড় পুকুরিয়ার ভালো মানের বিটুমিনাস কয়লা ব্যবহার করত পারব না? এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে অপর একটি কোম্পানি। এখানেও নানা প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে, প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এই দুটি কোম্পানি। চিন্তা করা যায় কী বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আমরা ভারতীয়দের হাতে তুলে দিলাম? এতে হয়তো ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ নিয়ে রাজনীতি হবে। কোনো এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় কোম্পানি যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে পরিস্থিতি? অর্থনীতি খাতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। এভাবে কোনো দেশ তার বিদ্যুৎ সেক্টর বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বিদ্যুৎ যদি বেসরকারি তথা বিদেশিদের হাতে যায়, তাতে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু এর বেশি হলে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকে। মোদি তার পররাষ্ট্র নীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য একটা ভালো খবর এ জন্য যে, আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ভারত বড় অবদান রাখতে পারে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতীয় সহযোগিতায় আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারব। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভারতকে দেখতে হবে উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে। ভারত যদি বাংলাদেশে শুধু তার পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত করতে চায়, তাতে সমমর্যাদা নিশ্চিত হবে না। বরং ভারতীয় বন্ধুত্বকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে। ভারতকে বাংলাদেশেরও অনেক কিছু দেয়ার আছে। কিন্তু সেখানে তৈরি হয়ে আছে নানা জটিলতা। তাই সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে নরেন্দ্র মোদি তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে, সে সম্পর্কে আদৌ অবগত নন, তা বিশ্বাস করি না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জিটুজি পর্যায়ে বাংলাদেশ ‘শক্ত’ অবস্থানে যেতে পারে না। আমাদের আমলারা ভারতের আমলাদের সমকক্ষ নন। দেন-দরবারে তারা বড় দুর্বল। এমনকি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহেও তাদের রয়েছে সীমাবদ্ধতা। ফলে আমরা আমাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারি না। নরেন্দ্র মোদি ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশে এসেছেন। চুক্তিগুলোও হয়েছে তাদের স্বার্থে। তার পরও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। আমরা তার ওপর আস্থা রাখতে পারি। একটি পরস্পরনির্ভরশীল সম্পর্ক দু’দেশের সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মোদির এই সফরে আমাদের প্রত্যাশা মেটেনি সত্য কিন্তু মোদির ওপর ভরসা রাখতে চাই। দেখতে চাই তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক। Daily Manobkontho 14.06.15

কী পেল বাংলাদেশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের ঢাকা সফরের পর এর রেশ এখনও রয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ সফরকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সফরের রেশ আরও কিছুদিন থেকে যাবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও তা প্রভাব ফেলবে। তবে এটা সত্য, বিপুল এক সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে- এটা বলা যাবে না। তবে ভারতের প্রেক্ষাপটে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এক. তার এ সফরকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছিল। বিএনপি ও জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো, যাদের পরিচিতি ছিল ভারতবিরোধী দল হিসেবে, তারাও স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মোদির সফরের পর এ দুইটি দলই তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে; বিরোধিতা করেনি। দুই. ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ ক’টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ তেমন একটা রক্ষিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন. মোদির তিনটি কর্মসূচি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সাক্ষাৎকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তিনি যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর, এটা বোঝা গেছে এবং মোদি যে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চান- এটাই প্রমাণিত হলো। তিনি সংসদ অধিবেশনে ভাষণ দেননি। অথচ শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পার্লামেন্টে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন। বর্তমান সংসদ নিয়ে যে একটি ‘বিতর্ক’ আছে, সম্ভবত এটি বিবেচনায় নিয়েই তিনি সংসদে ভাষণ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে তরুণ প্রজন্মের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভারতের ইমেজ বাড়াতে চেয়েছেন। কেননা এদেশে একটা শক্ত ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। এ ভারতবিরোধী মনোভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে চান। এজন্য টার্গেট করেছেন তরুণ প্রজন্মকে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬৫ ভাগের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এদের নিয়েই মোদি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে রচনা করতে চান। বলতে দ্বিধা নেই, মোদির এ সফরে বাংলাদেশের অনেক প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘কমিটমেন্ট’ নেই। তিনি শুধু মমতা ব্যানার্জিকে সফরসঙ্গী করেছিলেন; কিন্তু তাতে আসাম ও ত্রিপুরায় এক ধরনের অসন্তোষ আমরা লক্ষ করেছি। এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বলাই বাহুল্য কানেকটিভিটির নামে এ দুই রাজ্যে বাস চলাচল ও পণ্য পরিবহনের উদ্বোধন হয়েছে; কিন্তু শুরু হয়নি। অথচ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অনুপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরে ‘চীনা কার্ড’টি ব্যবহার করেছেন, এমন কথা ভারতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। ৮ জুন হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন ও এর আগে ২৮ মে নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো রয়টার্সের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় চীনের প্রভাব সঙ্কুচিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ঢাকা সফর করেন। এ সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলে কিনা, সেটা এখন দেখার বিষয়। নরেন্দ্র মোদির এ সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্র সব ধরনের ‘বিতর্কের’ ঊর্ধ্বে, তা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকিছু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তা এক ধরনের ‘হতাশার’ জন্ম দেবে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। যেমন, তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায়, আমাদের তা হতাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এসেছিলেন আবারও। কিন্তু তা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, পশ্চিম বাংলার স্বার্থেও নয়। তিনি এসেছিলেন মোদির অনুরোধে এবং মোদির স্বার্থে। এবারও আমরা তার কাছ থেকে কোনো কমিটমেন্ট পেলাম না। বরং তিনি ‘বাংলাদেশ আত্রাই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে’ কলকাতায় এ অভিযোগ তুলে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর একটি অপচেষ্টা চালালেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের ইতিহাসে ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এবার হলো। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- মমতা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির পেছনে ছুরিকাঘাত করতে চান! তিনি তিস্তার বদলে দৃষ্টিটা অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চান। ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে এটা অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারত অংশীদার হতে চায়। অংশীদার হওয়া এক জিনিস আর বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যাওয়া অন্য জিনিস। এখন পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে না? দুইটি ভারতীয় কোম্পানির (রিলায়েন্স ও আদানি) সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে? হলে, কতুটুকু হয়েছে? রিলায়েন্স করবে এলএনজি প্লান্ট। তরলীকৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ লাইন টেনে নেয়ার দায়িত্বটি বাংলাদেশের। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কত টাকায় আমরা কিনব কিংবা চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আর আদানি গ্রুপ ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটা সবাই জানে, ভারতীয় কয়লা নিকৃষ্টমানের। অথচ আমাদের পাঁচটি কয়লা খনিতে যে কয়লা পাওয়া যায়, তা উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কয়লা দিয়ে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলো না কেন? উপরন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের কেন এ সুযোগটি দেয়া হলো না? উন্মুক্ত টেন্ডারেও দুইটি ভারতীয় কোম্পানিকে এ কাজ দেয়া হয়নি। সরকারের অভিযোগ আছে, উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহেই এ ‘কাজ’ ভারতীয় কোম্পানি পেয়েছে। এটা এখন অনেকেই জানেন, আদানি গ্রুপ গুজরাটের ব্যবসায়ী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এ শিল্পগোষ্ঠীর অবদান ছিল অনেক। এখন এরা বাংলাদেশে একটি ‘কাজ’ পেল। হয়তো অনেকেই জানেন না, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। অথচ এ কাজে এদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রিলায়েন্স গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভারত থেকে যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? এ ঋণ নেয়া হবে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ কোনো ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেয়া দেশের কাছে দায়বদ্ধতা বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থ যেসব প্রকল্পে খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এ ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার), তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনও বলি না, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না। উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ভারতের দেয়া এই ঋণ সম্পূর্ণ শর্ত মুক্ত। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হবে না, এ ধরনের একটি কমিটমেন্ট যৌথ ঘোষণাপত্রে থাকলেও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্ট নেই। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির কথা বলা হয়নি। বাংলাদেশ একটি নয়া উপআঞ্চলিক জোট বিবিআইএন (ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত- সাত বোন রাজ্য ও নেপাল) গঠনে রাজি হয়েছে। এটি যদি কার্যকরী হয়, তাহলে সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে। ভারত যে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল, তা তাদের কর্মকান্ডে প্রমাণিত হয়েছে। ভারত সার্কের অবলুপ্তি চায় না, চায় একটি দুর্বল সার্ক। তাদের টার্গেট হচ্ছে উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যাতে করে ভারতের সাত বোন রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব। এখন ‘কানেকটিভি’ চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ভারতের পণ্য কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের সাত বোন রাজ্যগুলোতে যাবে। এক্ষেত্রে ভারতের ঋণে অবকাঠামো উন্নয়ন হবে (বিশেষ করে চার লেনে রাস্তা হবে, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মিত হবে)। আর অদূর ভবিষ্যতে সাত বোন রাজ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করে সাত বোন রাজ্যগুলোর একটি বড় ব্যবসা কেন্দ্র হবে, যারা আমদানি-রফতানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে সাত বোন রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের যে বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছিল, তা হুমকির মুখে থাকবে। বাংলাদেশী পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদে ভারতকে সমর্থন জানিয়েছে। এতে করে আমরা জাপানের ‘অসন্তোষের’ শিকার হতে পারি। চীনও এটাকে ভালো চোখে দেখবে না। জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদে প্রার্থী হতে চায়। বাংলাদেশেরও উচিত হবে একইসঙ্গে জাপানকেও সমর্থন জানানো। না হলে বাংলাদেশে জাপানের সাহায্যের ব্যাপারে তা প্রভাব ফেলবে। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্রে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। কিন্তু তা হতে হবে বহুপাক্ষিকভাবে এবং উপআঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ভারত যদি সব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর না করে এবং যা সাপটা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্ত, তাহলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বাংলাদেশের অনেক কিছু দেয়ার আছে ভারতকে। আর সেজন্যই প্রয়োজন ভারতের মানসিকতার পরিবর্তন। বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভারতের আমলাতন্ত্র এ কাজটি করছে না, ফলে এ দুই দেশের সম্পর্কে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মোদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে চাচ্ছেন। তিনি তা পারবেন কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে এটা সত্য, অন্যান্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নরেন্দ্র মোদির এ সফর ছিল ব্যতিক্রমধর্মী একটি সফর। তার কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। Daily Alokito Bangladesh 14.06.15

তিনি এলেন কিন্তু জয় করতে পারলেন না

তিনি আবারো এলেন। কিন্তু জয় করতে পারলেন না। তিনি মমতা ব্যানার্জি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমবার এসেছিলেন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। আর এবার এলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী হয়ে। তবে একসঙ্গে নয়, আলাদাভাবে। প্রথম যখন এসেছিলেন তখন বাংলাদেশের মানুষ তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিল। কেননা বাংলায় কথা বলা একজন মানুষ, যার পারিবারিক রক্তের ধারা রয়েছে এই বাংলাদেশের যশোরে, তার কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেবারও তিনি আমাদের হতাশ করেছিলেন। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আমাদের যে সমস্যা, তাতে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এই মমতা। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি অযাচিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিস্তায় বেশি পানি দাবি করেছিলেন। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছিল। কিন্তু যার নাম মমতা, তিনি কিভাবে বাংলাদেশকে পানি দেন? ঢাকায় এসে তিনি বলেছিলেন তিনি 'কাঠবিড়াল হয়ে সেতুবন্ধের' মতো কাজ করে যেতে চান। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চান। কিন্তু তিনি কি তা করেছেন? না, করেননি। ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো আসার আগে তিনি বললেন নতুন এক কথা_ আত্রাই নদীতে বাংলাদেশ বাঁধ দিয়েছে। আর তাতে পশ্চিমঙ্গ কম পানি পাচ্ছে। এই হচ্ছেন মমতা। তিনি জানেন রাজনীতিকে কিভাবে জটিল করতে হয়। যেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাচ্ছে তিস্তায় একটি সমঝোতা, সেখানে 'আত্রাই' প্রসঙ্গ নতুন করে উত্থাপন করে কৌশলী মমতা এখন চাচ্ছেন তিস্তার প্রসঙ্গটি 'ডিপ ফ্রিজে' পাঠাতে। এটাই তার কৌশল। তিনি তিস্তায় পানি দেবেন না, যাতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে সম্পর্কের 'নয়া অধ্যায়'-এর সূচনা হয়েছে তা একটি প্রশ্নের মধ্যে থাকুক! বাংলাদেশ ভারতের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুক! তাতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে প্রশ্ন উঠুক এবং তিনি তাতে লাভবান হোন! ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন। তিনি চাইবেন না বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের 'নয়া অধ্যায়ে'র কারণে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ুক। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে (তিস্তার পানির উপকারভোগী) তার জনপ্রিয়তা তলানিতে। অথচ বাংলাদেশে এসে তিনি এমন ভাব দেখালেন যে তিনিই বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'হাসিনা দিদি' হিসেবে সম্বোধন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি কত আন্তরিক! প্রটোকল তার কাছে মুখ্য নয়, গৌণ। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যে এভাবে প্রকাশ্যে 'দিদি' বলে সম্বোধন করা যায় না মমতা ব্যানার্জির কাছে এটা বিবেচনায় আসেনি। এবার তার জন্য গণভবনে দুপুরের খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছিল। ১২ পদের খাবারের তালিকায় ইলিশ ছিল তিন পদের। সবাই জানেন বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি মমতার বিশেষ টান আছে। আগে মমতা যখন দিলি্লতে রেলমন্ত্রী ছিলেন তখন বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে যারাই নয়া দিলি্ল গেছেন (বিশেষ করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী) তারা অবধারিতভাবেই সঙ্গে নিয়ে গেছেন 'পদ্মার ইলিশ'। তাই ইলিশ প্রসঙ্গ এসেছিল (আপাতত রপ্তানি বন্ধ)। কিন্তু সারা জাতি ও মিডিয়া এবার তাকিয়ে ছিল মমতা তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার অনাপত্তির কথা জানিয়ে যাবেন। কেননা তিস্তায় পানিবণ্টনের সমস্যা একটাই_ আর তা হচ্ছেন মমতা। মমতার আপত্তির মুখে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। এমনকি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনো মমতার আসার কথা ছিল। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী এলেও শেষ মুহূর্তে মমতা তার আপত্তির কথা জানান। ফলে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি আর করা হয়নি। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তিস্তার ব্যাপারে মমতার দৃষ্টিভঙ্গির কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? সেবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি দুই দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন এ কথাটা। এর আগে ভারতীয় হাইকমিশনার কর্তৃক আয়োজিত 'বৈঠকী বাংলা'য়ও মমতা নিজেই বলেছিলেন তার ওপর 'আস্থা' রাখতে! স্থল সীমানা চুক্তি নিয়ে তার আপত্তি নেই, এটা অবশ্য তিনি প্রমাণ করেছেন। ঢাকায়ও এ কথাটা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন মমতা। কিন্তু তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার 'কমিটমেন্ট' কোথায়? সোজাসাপ্টা হিসাব হচ্ছে তিনি ঢাকায় এসে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আর কোনো 'কমিটমেন্ট' করে গেলেন না। এটাই মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক চরিত্র। যেখানে স্বার্থ রয়েছে সেখানে মমতা আছেন। তিস্তার পানির ব্যাপারে তার স্বার্থ অনেক বেশি। ২০১৬ সালে সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। এটাকে তিনি বিজেপির হাতে তুলে দিতে চান না। উত্তরবঙ্গে পানির চাহিদা বেশি। মমতা এটা জানেন ও বোঝেন। বলা ভালো, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে তিস্তায় পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল। এটা কাকতালীয় কি না জানি না। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কটি বিষয় অন্তরায় সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন অন্যতম। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটা আগ্রহ থাকলেও শুধু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। সেই মমতা ব্যানার্জিই এখন আবার ঢাকা ঘুরে গেলেন। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকা আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। তিস্তায় পানিবণ্টনের ব্যাপারে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি। ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায় ওই মাসের প্রথম পাঁচ দিনে তিস্তায় পানিপ্রবাহ ছিল ৫০০ কিউসিকের নিচে। সেচ প্রকল্পে পানি দেয়া দূরের কথা, শুধু নদী বাঁচানোর জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা আজ মৃত্যুমুখে। গত নভেম্বর থেকেই তিস্তার পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীতে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পানিপ্রবাহ রেকর্ড হয়। ফেব্রুয়ারি, ২০১৫-এর প্রথম চার দিনের হিসাবে দেখা গেছে প্রথম দিন পাওয়া গেছে ৪২৬ কিউসেক, দ্বিতীয় দিন ৪৭৫ কিউসেক, তৃতীয় দিন ৪৪৫ কিউসেক, আর চতুর্থ দিন ৪১৬ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয় (সকালের খবর : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)। যৌথ নদী কমিশন সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর আগে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ ভালো কিছু বলে তুলনার জন্য ওই সময়কালের হিসাবকে ঐতিহাসিক গড় প্রবাহ ধরা হয়। ওই ১২ বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে পানিপ্রবাহ ছিল ৫ হাজার ৯৮৬ কিউসেক। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৯৬৩ কিউসেকে। এ বছর নামল ৫০০ কিউসিকের নিচে। অথচ নদী রক্ষার জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক পানি। আর বিদ্যমান সেচ প্রকল্পের জন্য আরো সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক পানি দরকার। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি 'নোট ভারবাল' পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
মমতা ব্যানার্জির প্রথম ঢাকা সফরের আগে আমরা অনেক প্রত্যাশার কথা শুনেছি। তবে এটা সত্য, তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে এটা সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেন তাহলে এ দেশ বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে করে বাড়বে। মনে রাখতে হবে তিস্তায় পানিপ্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থন এটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা; লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ; রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা; কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরো একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানিবণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিন দিন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচ কাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা মমতার জন্য একটি 'রাজনৈতিক ইস্যু'।

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। এখন পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রতিটি তীরবর্তী রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানিসম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু এ 'যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তি'টি উপেক্ষিত থাকে যখন পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২ নাম্বার নীতিতে বলা হয়েছে পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। তিস্তার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হয়নি। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ 'জলপ্রবাহ কনভেনশন' নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করে। এ নীতিমালার ৬ নাম্বার অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার' কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ব্যাবহার অর্থাৎ এককভাবে তিস্তার পানির ব্যবহার এ 'যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা'র ধারণাকে সমর্থন করে না। আমরা আরো আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারব, যেখানে বাংলাদেশের অধিকারকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশসংক্রান্ত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের ১৪ নাম্বার অনুচ্ছেদ জলভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫ নাম্বার অনুচ্ছেদ প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর সংরক্ষণের যে কথা বলা হয়েছে তা রক্ষিত হচ্ছে না। এখানে সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু কোনো রাজ্য (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) এমন কিছু করতে পারে না যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। সমস্যাটা ভারতের। পশ্চিমবঙ্গকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই।
তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ এ নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারে না। এখন ঢাকায় দেয়া মমতার আগের বক্তব্যকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? তার ওপর আমাদের আস্থা রাখতে বলেছেন। কিন্তু আমরা আস্থাটা রাখি কিভাবে? ভারতীয় রাজনীতিতে 'মোস্ট আনপ্রেডিকটেবল ক্যারেক্টার' হচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। তার কথার কোনো মূল্য নেই। তার অতীত বলে, তিনি একসময় কংগ্রেসের মিত্র ছিলেন। আবার বেরিয়ে গেছেন। বিজেপির মিত্র ছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়ে গেছেন। সুতরাং তার ওপর আস্থা রাখাটা কঠিন।
তিনি যদি সত্যিই আন্তরিক হন তাহলে তিনি কল্যাণ রুদ্র কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি নিজে এ কমিশন গঠন করেছিলেন। কলকাতার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রুদ্র কমিশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দেয়া রিপোর্টে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গকে ক্ষতি না করেও বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আরেকজন পানি বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণবকুমার রায়। অধ্যাপক রায়ের অভিমত হচ্ছে তিস্তায় পানি নেই এ কথাটা ঠিক নয়। পানি মজুদ রাখা (বর্ষা মৌসুমে) ও ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
ঢাকায় তিনি এসেছিলেন শুধু নরেন্দ্র মোদির স্বার্থকে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের স্বার্থ তার কাছে প্রাধান্য নয়। একটি 'প্যাকেজ ডিল'-এর আওতায় তিনি মোদিকে স্থল সীমানা চুক্তিতে সমর্থন জানিয়েছেন। মোদি তাকে আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্যাকেজ ডিল-এর আওতায় নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী হলেন তিনি।
এমনিতেই সারদা কেলেঙ্কারি ও তৃণমূলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন নিয়ে সিবিআইর নজরদারিতে তিনি আছেন। ফলে মোদির সঙ্গে সম্পর্কটা দৃঢ় করে তিনি 'সমস্যাগুলো' থেকে বের হয়ে আসতে চান। এ মুহূর্তে তিনি তিস্তা চুক্তি চান না। সম্ভবত মোদি ওটা বোঝেন ও উপলব্ধি করেন। মোদির অগ্রাধিকার তালিকায় তিস্তা নেই, আছে কানেকটিভিটি। ফলে মমতা ঢাকা ঘুরে গেলেও তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে আশাবাদী কিছু ঘটবে না আগামীতে। তিস্তার পানিবণ্টনকে ইস্যু করে মোদির কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে নিতে চান মাত্র।
Daily jai Jai Din
11.06.15

তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করতে পারলেন কি?

নরেন্দ্র্র
নরেন্দ্র্র
নরেন্দ্র্র
মোদি বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশাল এক সম্ভাবনা জাগিয়ে। আবার চলেও গেলেন একরাশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু কতটুকু জয় করতে পারলেন বাংলাদেশের মানুষের মন? বলার অপেক্ষা রাখে না, রোববার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র্রে তিনি যখন বাংলাদেশের সালমা, সাকিব, নিশাত আর ওয়াসফিয়াদের প্রশংসা করছিলেন, তখন আমার মনে হয়েছিল, ভিন্ন এক ভারতীয় নেতাকে আমরা দেখছি। তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা চান। তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চান। তার সেই মনোমুগ্ধকর ভাষণ আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের অন্যতম নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তি উই হ্যাভ এ ড্রিম। আমি তুলনা করতে চাই না। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি যখন বলেন, সূর্য এখানে আগে ওঠে, এরপর আলো আমাদের (ভারত) এখানে যায়। এখানে যত আলোই হোক, আলো আমাদের ওখানেও যায়। একজন কবি, একজন রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় মানুষকে কাছে টেনেছেন, এটা অস্বীকার করা যাবে না। সেই ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের মার্চে ঢাকায় এসে এরকম এক উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছিলেন। তারপর ভারতের কত প্রধানমন্ত্রী এলেন, গেলেন। সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। মনমোহন সিংও এসেছিলেন। কিন্তু কেউই সেই প্রত্যাশা জাগাতে পারেননি। এবার ঢাকায় এসে মোদি যে প্রত্যাশার ঢেউ জাগিয়ে গেলেন, ভারত কি এটা ধরে রাখতে পারবে? আমলাতন্ত্রের ম্যারপ্যাঁচে এই সম্ভাবনার কি মৃত্যু ঘটবে? আগামী দিনগুলোই বলবে মোদি কতটুকু আন্তরিক। তবে আমার ধারণা, বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে। এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কিছু আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফর শেষ করেছেন। তার এ সফরে ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি আছে নেতিবাচক দিকও। তবে তুলনামূলক বিচারে নেতিবাচক দিকই বেশি। টিপাইমুখ বাঁধ হবে না- এটা যৌথ ঘোষণায় স্থান পেয়েছে। এর পেছনে বাংলাদেশের পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি ভারতীয় পরিবেশবাদীদেরও কৃতিত্ব দিতে হবে। তারাই সেখানে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে ভারতে যে চুক্তিটি হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ কী, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে না- এমন স্বীকারোক্তি নেই। তবে বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। এটা একটা কূটনৈতিক ভাষা। ভারতের উচ্চ আদালতের একটি রায় আছে এ ব্যাপারে। রায়ে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। ভারত এখন সেই রায়টি কীভাবে বাস্তবায়ন করে, সেটাই দেখার বিষয়।মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়া দেখা করেছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তিকে মোদি বিবেচনায় নেননি। এটাই হচ্ছে তার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। ঢাকায় এসে তিনি বলেছিলেন, ভারতে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্থলসীমানা চুক্তি তিনি সংসদের উভয় কক্ষে পাস করিয়ে নিয়েছিলেন। সব দলের সঙ্গে পরামর্শ করার এই যে মানসিকতা, সেই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটল বাংলাদেশে। এটা বাংলাদেশের নেতাদের জন্যও একটি মেসেজ হতে পারে। সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা সম্ভব। মোদি পেরেছেন ভারতে। রাজ্যসভায় তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও সেখানে তিনি সবার সমর্থন নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা পারিনি।নরেন্দ্র মোদির এই সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্র সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে তা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বেশকিছু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তা এক ধরনের হতাশার জন্ম দেবে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। প্রথমত, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় আমাদের তা হতাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এসেছিলেন আবারও। কিন্তু তা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থেও নয়। তিনি এসেছিলেন মোদির অনুরোধে এবং মোদির স্বার্থে। এবারও আমরা তার কাছ থেকে কোনো কমিটমেন্ট পেলাম না। বরং তিনি বাংলাদেশ আত্রাই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে- কলকাতায় এ অভিযোগ তুলে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর একটি অপচেষ্টা চালালেন। দীর্ঘ প্রায় ৪৩ বছরের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের ইতিহাসে ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এবার হল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- মমতা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির পেছনে ছুরিকাঘাত করতে চান।দ্বিতীয়ত, ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারত অংশীদার হতে চায়। অংশীদার হওয়া এক বিষয়, আর বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যাওয়া অন্য বিষয়। এখন পরিস্থিতি কী সেদিকেই যাচ্ছে না? দুটি ভারতীয় কোম্পানির (রিল্যায়েন্স ও আদানি) সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে? হলে কতটুকু হয়েছে? রিল্যায়েন্স করবে এলএনজি প্ল্যান্ট। তরলকৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ লাইন টেনে নেয়ার দায়িত্বটি বাংলাদেশের। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কিংবা চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আর আদানি গ্রুপ ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটা সবাই জানে, ভারতীয় কয়লা নিকৃষ্টমানের। অথচ আমাদের ৫টি কয়লা খনিতে যে কয়লা পাওয়া যায়, তা উন্নতমানের, বিটুমিনাস কয়লা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কয়লা দিয়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হল না কেন? উপরন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের কেন এ সুযোগটি দেয়া হল না? উন্মুক্ত টেন্ডারেও দুটি ভারতীয় কোম্পানিকে এ কাজ দেয়া হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহেই এ কাজ ভারতীয় কোম্পানি পেয়েছে। এটা এখন অনেকেই জানেন, আদানি গ্রুপ গুজরাটের ব্যবসায়ী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এই শিল্পগোষ্ঠীর অবদান ছিল অনেক। এখন তারা বাংলাদেশে একটি কাজ পেল। হয়তো অনেকেই জানেন না, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। অথচ এ কাজে এদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রিল্যায়েন্স গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।তৃতীয়ত, ভারত যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? এ ঋণ নেয়া হবে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেয়া দেশের কাছে দায়বদ্ধতা বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষা করবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থ যেসব প্রকল্প ব্যয় করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের, আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এ ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যে জনবল ও পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার), তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনও বলি না সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত (তারা অবশ্য বার্টার ট্রেড করত; আমাদের পণ্য নিত বিনিময়ে)। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না।মোদির সফরের প্রাক্কালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। যেমন বলা যেতে পারে তিস্তাসহ সব নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, ভারতের স্থলবন্দরগুলোতে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, এলসি ওপেন করার ব্যাপারে ভারতের সাতবোন রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকগুলোতে সুযোগ দান, কান্ট্রি অব অরিজিনের ঝামেলা দূর করা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভিসা সহজীকরণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাঁধা দূর করা। এতে কোনো একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশাবাদ ও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কম।আরও একটি কথা- যৌথ ঘোষণাপত্রে একটি উপ-আঞ্চলিক জোট বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাঠকদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এ ধরনের একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব ভারত অনেক আগেই দিয়েছিল। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ১৯৯৭) ভারত এই ৪টি দেশ নিয়ে (ভারতের সাতবোন রাজ্য) একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরবর্তীকালে এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন নাম হয় দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন চতুর্ভুজ (এসএজিকিউ)। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে কাঠমান্ডুতে চার দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের যে বৈঠক হয়েছিল, তাতে এসএজিকিউ গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছিল। সার্ক সম্মেলনেও এসএজিকিউ গঠনে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন এসএজিকিউর পরিবর্তে আমরা পেলাম বিবিআইএন। এটা অনেকেই জানেন, শুধু ভারতের কারণেই সার্ক বিকশিত হতে পারছে না। সার্কের একটি সম্ভাবনা থাকলেও তা বিকশিত হয়নি। এখন বিবিআইএন বাস্তবায়িত হলেও সেখানে ভারতের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়বে। ভারত তার সাতবোন রাজ্যের উন্নয়নে এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে ব্যবহার করবে। আর এতে ধীরে ধীরে সার্ক একটি অকার্যকর সংগঠনে পরিণত হবে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ১২-১৪ মে মালেতে স্বাক্ষরিত সাফটার (সাউথ এশিয়ান ফ্রি-ট্রেড অ্যারেঞ্জমেন্ট) ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত। সাফটা অনুযায়ী ২০০১ সালের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কোনো ধরনের ট্যারিফ, প্যারা-ট্যারিফ থাকার কথা নয়। সাফটায় বাংলাদেশকে কম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এতে করে বাংলাদেশী পণ্য ভারতে প্রবেশের ব্যাপারে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ তা পাচ্ছে না। আসলে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের একটি বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এখন কানেকটিভিটি চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় সাতবোন রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের যে বিশাল বাজার রয়েছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। দ্বিপাক্ষিকতা কোনো ভালো অ্যাপ্রোচ হতে পারে না। বহুপক্ষীয়ভাবেই সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তিকে আমরা সমর্থন করেছি এবং যৌথ ঘোষণাপত্রেও তা আছে। কিন্তু এতে করে অনেক প্রশ্নের জন্ম হতে পারে এখন। এক. জাপান এতে অখুশি হতে পারে। কারণ জাপানও স্থায়ী সদস্যপদ পেতে চায়। আমাদের জাপানকেও সমর্থন করা উচিত। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জাপানের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ অনেক বেশি। দুই. ভারতের স্থায়ী সদস্যপদে চীনের আপত্তি রয়েছে। এখন ভারতকে বাংলাদেশের সমর্থন চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিল। চীন অসন্তুষ্ট হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের ঠিক নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ বেশি। চীন সফর করে প্রধানমন্ত্রী একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করে আসছিলেন, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে একটু টিল্ট পলিসি, অর্থাৎ ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ চীনকে না দেয়া (এ পরিকল্পনা ভারতের আপত্তির কারণে বাতিল হয়েছে), কিংবা বিসিআইএম জোটকে (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) গুরুত্ব না দিয়ে বিবিআইএনকে গুরুত্ব দেয়ায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হতে বাধ্য। বিসিআইএম জোট বিকশিত না হলে (যা এখন কাগজে-কলমে থেকে যেতে পারে) আশিয়ানভুক্ত দেশে সঙ্গে আমাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। আমাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে না।নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য আর প্রতিশ্রুতির রেশ যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও কিছুদিনের জন্য থেকে যাবে, তা অস্বীকার করা যাবে না। নরেন্দ্র মোদি যখন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তার বক্তৃতায় আমাদের দেশের সাকিব-নিশাতদের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দেন, তখন একটা ধারণা জন্ম হয় যে, তিনি বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে চান। আমরা এমনটাই চাই। ভারতের ২,৩০৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি থেকে আমরাও উপকৃত হতে চাই। দেখতে চাই নিজেদের উন্নত দেশ হিসেবে। কিন্তু ভারতের আমলাতন্ত্রের মানসিকতায় আদৌ পরিবর্তন আসবে কি-না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। নরেন্দ্র মোদির দেয়া প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ভারত যদি শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে, বাংলাদেশের স্বার্থ না দেখে, তাহলে দিল্লির প্রতি অবিশ্বাস আরও বাড়বে। ব্যবসাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামীতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু দেখবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। Daily Jugantor 11.06.15

মোদির ঢাকা সফর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্কতি উচ্চারণ করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় তিনি বললেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়।’ তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। তিনি রাজনীতিক, কিন্তু একজন কবিও বটে। তার তিনটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কানায় কানায় পূর্ণ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে রোববার তিনি বললেন, ‘কেমন আছ? আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। আমরা তোমাদের সঙ্গে নিয়েই চলব।’ এই সেই মোদি, যাকে যুক্তরাষ্ট্র এক সময় তার দেশ সফরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তাকে ওবামা আমন্ত্রণ জানালেন। সেই মোদি বাংলাদেশে এলেন। দুদিন থাকলেন। চলেও গেলেন। কিন্তু কী রেখে গেলেন তিনি? বাংলাদেশের মানুষ তার বক্তব্যে কিংবা যৌথ ঘোষণাপত্রে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার ওপর কতটুকু আস্থা রাখতে পেরেছে? এতদিন বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের নীতিনির্ধারকরা যে মনোভাব দেখিয়ে আসছিলেন, সেই বৃত্ত কী নরেন্দ্র মোদি ভাঙছেন? নাকি আদৌ তিনি ভাঙতে পারবেন? যখন তিনি বলেন, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি এবং তোমাদের সঙ্গে নিয়েই চলব’, তখন এক নয়া ইতিহাস গড়ার তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। ভারতের যে কর্তৃত্ববাদী আচরণ, যে আচরণের কারণে শঙ্কিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ, সেই ‘পরিচয়’টা তিনি ভাঙতে চান। তার অগ্রাধিকার তালিকায় দক্ষিণ এশিয়া রয়েছে প্রথমে। তার এপ্রোচটাই হচ্ছেÑ ‘নেইবারহুড ফাস্ট’ অর্থাৎ পার্শ¦বর্তী পড়শি আমার প্রথম অগ্রাধিকার। তারপর অন্যদেশ। এটা সত্য বাংলাদেশে আসতে তিনি সময় নিলেন দীর্ঘ এক বছর। ২৬ মে (২০১৪) তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এলেন ৬ মে। থাকলেন দু’দিন। যদিও এর আগে তিনি ভুটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। তিনি যখন দায়িত্ব নেন তখন উপস্থিত ছিলেন ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। বিশাল এক প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা জাগিয়ে তিনি ঢাকা ত্যাগ করলেন রোববার রাতে। এই সফরে তিনি দেখা করলেন বেগম জিয়ার সঙ্গে। শুনলেন তার কথা। কথা বললেন ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি তুলে ধরলেন সম্ভাবনার কথা। বাংলাদেশের আরেক অগ্রগতির তিনি প্রশংসা করলেন। সালমা খাতুন, সাকিব আল হাসান কিংবা নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরিনের নাম উল্লেখ করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি একজন ‘খাঁটি বন্ধু’ হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করলেন। তার এই ঢাকা সফরের রেশ যে আরও কিছুদিন থেকে যাবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুদিনের ঢাকা সফরের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল? এই সফরকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা কিংবা কানেকটিভিটি এই তিন আলোকেই আমরা যদি মোদির এই সফরকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব পাল্লাটা ভারতের দিকেই বেশি হেলে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০০ কোটি ডলারের একটি আশ্বাস পেয়েছে। ভারতীয় অর্থে বাংলাদেশি বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। যেমন একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ককে চারলেনে উন্নীত করা হবে। এই ঋণ প্রকল্পের আওতায় ৫০০টি ভারতীয় বাসও কেনা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশর স্বার্থ নাকি ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে? এই সড়কে ভারতীয় পণ্য চলাচল করে। তথাকথিত কানেকটিটিভির আওতায় ভারতীয় পণ্য এখন কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতরে আশুগঞ্জ হয়ে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় যাবে। তাতে লাভ হলো ভারতেরই। বাস কেনা হবে ভারতীয়। চলবে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা শহর কী এখন এসব গাড়ি ধারণ করার ক্ষমতা রাখে? এমনিতেই যানজটে মানুষ অসহায়। রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। ঢাকার বাইরে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। সে ক্ষেত্রে গাড়ি চলার সুযোগ কোথায়? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিআরটিসির শত শত গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ এগুলো সারিয়ে তুলে চলাচলের উপযুক্ত করা যেত। তা অদৃশ্য কারণে বিআরটিসি করেনি। এখন আবার নতুন করে গাড়ি ক্রয় করা হবে। ভারতীয় ঋণের একটা সমস্যা হচ্ছে, এই ঋণ নেওয়া হয় সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায়, সেখানে ভারতীয় স্বার্থ থাকবে বেশি। আমি দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়ায় বলে আসছি সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কোনো ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেওয়া দেশের কাছে (এ ক্ষেত্রে ভারত) ঋণ গৃহীতা দেশের পরিপূর্ণ দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। ভারত যে দ্বিতীয়বারের মতো সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ দিল তাতে বাংলাদেশ নয়, বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে নিতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের, আর সুদাসল ছাড়াও রপ্তানি ব্যবসা হবে ভারতের। এই ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার) তা সরবরাহ করবে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রপ্তানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্টিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনো বলি না সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত (তারা অবশ্য বার্টার ট্রেড করত। আমাদের পণ্য নিত বিনিময়ে)। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না। মোদির সফরের প্রাক্কালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেকগুলো। যেমন বলা যেতে পারে তিস্তাসহ সব নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, ভারতের স্থলবন্দরগুলোতে অয়্যারহাউস নির্মাণ, এলসি ওপেন করার ব্যাপারে ভারতের সাত বোন রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকগুলোতে সুযোগদান, ‘কান্ট্রি অব অরিজিনের’ ঝামেলা দূর করা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভিসা সহজীকরণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করা। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের স্বার্থরক্ষিত হয়েছে কম। তবে ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছি, যা আমাদের আশান্বিত করেছে। যেমন বলা যেতে পারে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কথা। যৌথ ঘোষণাপত্রের ২১নং দফায় বলা হয়েছে যে, ভারত সাংবিধানিক কারণে এখন আর এ প্রকল্পে অগ্রসর হবে না। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। কেননা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ছিল। এ ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন কিন্তু থাকবেইÑ আর তা হচ্ছে ইতোমধ্যে সেখানে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, তার কী হবে? আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল। এসব যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। ভারত যদি সত্যিকার অর্থে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে না যায়, আমার ধারণা তাতে করে ভারত একদিকে যেমনি উপকৃত হবে, ঠিক তেমনি উপকৃত হবে বাংলাদেশও। কেননা ভারতের পরিবেশবাদীরাও এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তবে একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকারÑ আর তা হচ্ছে আন্তঃনদী সংযোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এটির নামকরণ করা হয়েছে বিবিআইএন। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত (সাতবোন রাজ্য) এবং নেপালের সহযোগিতায় একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে এবং ভারতের উদ্যোগেই সার্কের শীর্ষ সম্মেলনে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। এ ধরনের একটি উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইকে গুজরাল। তারই মতবাদ পরবর্তীকালে ‘গুজরাল ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এখন নরেন্দ্র মোদি নতুন আঙ্গিকে তা নিয়ে এলেন। বাংলাদেশ ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনে সমর্থন দিয়েছে। এটা যৌথ ঘোষণাপত্রে আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জাপানের ক্ষেত্রেও একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চায়। জাপানে আমাদের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। জাপানকে বাদ দিয়ে আমরা এককভাবে ভারতকে যদি শুধু এ পদে সমর্থন দিই, তাহলে বিতর্ক বাড়বে এবং জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে থাকবে। কয়েকটি ব্যাপারে বাংলাদেশকে এখন ভারতের সঙ্গে দেনদরবারে যেতে হবে। এক. তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের ‘চাপ’ অব্যাহত রাখা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা উপস্থিতি এবং নরেন্দ্র মোদির ‘মানবিক সমস্যা’ হিসেবে এই সমস্যাকে চিহ্নিতকরণ, আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করে না। সমস্যাটা ভারতের। সমাধান করতে হবে ভারতকেই। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কতটুকু বাগে আনতে পারবেন, সেটা একটা প্রশ্ন। দুই. দুটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে (রিলায়েন্স ও আদানি গ্রুপ) বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে চুক্তি হয়েছে, তা মনিটর করা এবং বাংলাদেশের স্বার্থে ক্ষতি হয়, এমন কিছু না করা। রিলায়েন্স মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত। পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই গ্যাস কোম্পানি ভারতে নিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে ত্রিদেশীয় পাইপলাইন (মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত) নির্মিত হবে। বাংলাদেশ এখান থেকে গ্যাস পাওয়ার ব্যাপারে রিলায়েন্সের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারে। তিন. ভারতের সঙ্গে ‘নতুন সম্পর্ক’ রচিত হওয়ায় বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চিন, ভারত ও মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডোর যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা দেখা। চার. ভারতের সাতবোন রাজ্যগুলো কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো। নরেন্দ্র মোদি ‘জাদু’ জানেন। তিনি জানেন কীভাবে মানুষকে কাছে টানা যায়। অতীতের যে কোনো ভারতের প্রধানমন্ত্রী (ইন্দ্রিরা গান্ধি বাদে) যা পারেননি, তা পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি। এই প্রথম বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল (জামায়াতসহ) নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে যে প্রত্যাশা তিনি সৃষ্টি করে গেলেন কিংবা যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে গেলন, তা এখন তাকে পূরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ। বন্ধুকে সম্মান জানাতে জানে। মোদির উপস্থিতিতেই বাংলাদেশ ভারতের আরেকজন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িকে সম্মাননা জানিয়েছে। আস্থার একটা ‘ভিত’ তৈরি হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এই ‘ভিত’ যেন নষ্ট হয়ে না যায়। কানেকটিভিটি দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের সঙ্গে সম্প্রসারিত হোক। দক্ষিণ এশিয়ার দুটি বড় সমস্যা পানি ও বিদ্যুৎ। এর সমাধান হোক আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। দ্বিপক্ষীয় নয়। বহুপক্ষীয় তথা আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে এ অঞ্চল থেকে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ উচ্ছেদ, সাগরভিত্তিক অর্থনীতিকে (ব্লু ইকোনমি) এ অঞ্চলের জনগণের মানোন্নয়নে ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব। ঢাকায় নরেন্দ্র মোদি আমাদের এ মেসেজটাই দিয়ে গেলেন। আমরা তার ওপর আস্থা রাখতেই পারি। Daily Amader Somoy 11.06.15

অভিবাসী সমস্যার সমাধান কোন পথে

সাম্প্রতিক আন্দামান সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক আসরে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করলেও এ সমস্যার সমাধান কোন পথে, তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। এ সমস্যা নিয়ে ২৯ মে ব্যাংককে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেও মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে কোনো সুস্পষ্ট সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সাগরে ভাসমান জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যেখানে মুসলমান ও রোহিঙ্গা নাগরিক হিসেবে পরিচিত, সেখানে মিয়ানমার সরকার এ সঙ্কটের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে সঙ্কট যেভাবে ছিল, সেভাবেই রয়ে গেছে। ভাসমান নাগরিকদের কারও কারও ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের আশ্রয় শিবিরে সাময়িকভাবে আশ্রয় মিলেছে সত্য; কিন্তু একটি অংশ সাগরে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। গণকবরেও স্থান হয়েছে কারও কারও- যাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের নাগরিক এবং যারা পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বন্দি জীবনযাপন করতেন। তারপর মুক্তিপণ না দেয়ায় তাদের হত্যা করা হয়। ২ জুন ঢাকায় সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত আট দেশের পুলিশ এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মিলিত হয়। সম্মেলনে পাচারকারীদের ধরতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও মূল সমস্যা রয়েই গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে রাজি করানো যায়নি। তাই প্রশ্ন অনেক। এ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি চক্র। এরা যেমন আছে বাংলাদেশে, মিয়ানমারে, ঠিক তেমনি আছে থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ায়। পাচারকারীরা মূলত টার্গেট করেছিল রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের, যারা মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের বাসিন্দা। মিয়ানমারে বেশ ক’বছর ধরেই এক ধরনের ‘এথনিক ক্লিনসিং’ অর্থাৎ অত্যন্ত সুকৌশলে মুসলমানদের আরাকান থেকে উৎখাত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মিয়ানমারকে একটি ‘বৌদ্ধ রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে চায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। আর এদের মদদ জোগাচ্ছে মিয়ানমারের শাসকচক্র। বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির ধর্ম। এরা অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু আরাকানে বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের কর্মকা- তা প্রমাণ করে না। যারা সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক, তারা লক্ষ করেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই আরাকানে জন্ম নেয়া ও সেখানে বসবাসরত মুসলমান নাগরিকদের (যারা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত) ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক বছর ধরে মিয়ানমারে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে না। মিয়ানমারের শাসকচক্র মনে করে, রোহিঙ্গারা মূলত চট্টগ্রামের অধিবাসী এবং তারা ‘অবৈধভাবে’ আরাকানে বসবাস করছেন। অত্যন্ত কৌশলে এদের বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়েছে একাধিকবার। এরপর একটি ‘চক্র’ এদের কৌশলে মালয়েশিয়ায় পাচার করার উদ্যোগ নেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় বাংলাদেশের মানব পাচারকারীরা। বাংলাদেশীরাও চাকরির আশায় যেতে চান মালয়েশিয়ায়। কৌশলে পাচারকারীরা এদের বড় সাম্পানে তুলে দিয়ে পরে থাইল্যান্ডের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয় এবং মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সমস্যাটি তৈরি হয়েছে এভাবেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশীদেরও নেয়া হয় এবং পরে তাদের কাছে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। রোহিঙ্গাদের বলা হয়েছিল মালয়েশিয়ায় আশ্রয় দেয়ার কথা। এখানে মিয়ানমার সরকারের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, তা হচ্ছে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের যোগসাজশে এ মানব পাচার চলে আসছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও খবর বের হয়েছে। এ মানব পাচারের ঘটনা যে এই প্রথম ঘটল, তা নয়। এর আগেও ঘটেছে। কিন্তু তা প্রকাশ পেয়েছে কম। এবারই সম্ভবত ব্যাপক মানব পাচারের ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে স্থান পেয়েছে। এখানে আরও একটি বিষয় দৃষ্টিকটু- এ মানব পাচারের ঘটনা নৌবাহিনী কিংবা কোস্টাল গার্ডের চোখ এড়িয়ে গেল কীভাবে? কোস্টাল গার্ডের না হয় সমুদ্রে থাকার বড় জাহাজ নেই। কিন্তু নৌবাহিনী? সমুদ্রসীমায় টহল দেয়া, বিদেশি মাছ ধরা ট্রলারকে বাংলাদেশী সমুদ্রসীমায় প্রবেশে বাধাদান, সমুদ্র সীমান্তরক্ষা এসবই তো নৌবাহিনীর কাজ। তাদের তো গভীর সমুদ্রে থাকার জাহাজ রয়েছে। অতি সম্প্রতি নতুন নতুন জাহাজ নৌবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে। লেবাননে শান্তি মিশনেও গিয়েছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। তাহলে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে সাগর পথে যে মানব পাচার হচ্ছে, তা তাদের দৃষ্টিতে এলো না কেন? স্থানীয় কমান্ডার কি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছিলেন? আরও দুর্ভাগ্য আমাদের যে, এ ঘটনায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। ভাবমূর্তি উদ্ধারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ভূমিকা নেয়, সেটাই দেখার বিষয় এখন। যারা সাগর থেকে উদ্ধার হয়েছেন তাদের সবার নাগরিকত্ব এখনও চিহ্নিত হয়নি। যারা শরণার্থী শিবিরে আছেন এবং যাদের নাগরিকত্ব চিহ্নিত হয়েছে, তাদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া উচিত। যারা রোহিঙ্গা এবং সাগরে ভাসছেন, ১৯৫১ সালের শরণার্থী সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৯৮ সালের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত আইন, এমনকি এ সংক্রান্ত ১৯৬৭ সালের প্রটোকল অনুযায়ী সাগরে ভাসমান মানুষগুলো এখন ‘শরণার্থী’ হিসেবে গণ্য হতে বাধ্য। জাতিসংঘ এদের দায়িত্ব নেবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো (এক্ষেত্রে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া) এসব শরণার্থীকে গ্রহণ করতে বাধ্য। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। আসিয়ানের দায়িত্ব এক্ষেত্রে বেশি। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার দায়িত্বটি নিতে হবে আসিয়ানকে। মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধ করতে। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন যদি বন্ধ হয়, তাহলে মানব পাচার হ্রাস পাবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি সিদ্ধান্তের দিকেও আমরা তাকাতে পারি। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে প্রায় এক বছর ধরে শত শত আফ্রিকান অভিবাসী ইতালিতে প্রবেশ করছে এবং করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে যারা ঢুকে পড়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট একটি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ এদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ২৮টি দেশের সর্বত্র পুনর্বাসন করা হবে (যদিও ব্রিটেনের টোরি সরকারের তাতে আপত্তি রয়েছে)। আসিয়ান এ ধরনের একটি কর্মসূচি নিতে পারে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে, আমি জানি না। কিন্তু এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও তাদের কোনো কর্মকা- আমার চোখে পড়েনি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের প্রচুর সমস্যা। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। এদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। একাধিকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। তাতে ফল শূন্য। এখন মানব পাচারের ঘটনার পর বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে অতি দ্রুত আলোচনা শুরু করবে কিনা, তাও অস্পষ্ট। এটা সত্য, আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিসিআইএম জোট কিংবা বিমসটেক জোটে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারও আছে। আমাদের স্বার্থ আছে। কিন্তু মানব পাচারের ঘটনায় আমরা কি চুপ করে থাকব? এর দায়ভার বাংলাদেশ একা কেন নেবে? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংক্রান্ত বিষয়টি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে জানান। মিয়ানমারের একটি প্রোপাগান্ডা আছে যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী। এরা যে বাংলাদেশী নয়, তা স্পষ্ট করা এবং আসিয়ান নেতাদের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা। অবিলম্বে মিয়ানমারের সঙ্গে এ ব্যাপারে একটি ‘সংলাপ’ শুরু করা; প্রয়োজনে বিমসটেক জোটকে এক্ষেত্রে ব্যবহার করা; ইইউর স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করে আসিয়ান নেতাদের এ ব্যাপারে রাজি করানো এবং রোহিঙ্গাদের আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে আরও সক্রিয় করা ও বাংলাদেশ থেকে সব মানব পাচার রুট মনিটর করা এবং বন্ধ করা; বাংলাদেশীরা যারাই এ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের মুখোমুখি করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। মানব পাচার সংক্রান্ত যে আইনটি রয়েছে, তা বেশ দুর্বল। এ আইনটি সংশোধন করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা সংবলিত আইন প্রণয়ন করা জরুরি। মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে মালয়েশিয়ায় যে অবৈধ কাজের সুযোগ নেই, তা বারবার বলা। সরকার উপজেলা চেয়ারম্যানদের এ কাজে ব্যবহার করতে পারে। এতে করে মালয়েশিয়া সম্পর্কে সব বিভ্রান্তি দূর হতে পারে। একটি বিশাল তরুণ প্রজন্ম এখন বেকার। স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে এদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া দরকার। ক্ষুদ্র ঋণের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। মিয়ানমার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে আজ স্বীকৃত। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ক’বছর আগে এ সমস্যাটিকে প্রাধান্য করে বৌদ্ধদের সন্ত্রাসী কর্মকা- নিয়ে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিল। এটি আজ অনেকের কাছেই স্পষ্ট যে, মিয়ানমার সরকার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা ধর্মীয়ভাবে মুসলমান, তাদের আরাকানছাড়া করা। এমনিতে রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে কোনো নাগরিক সুবিধা নেই। এখন অত্যন্ত কৌশলে তাদের দেশছাড়া করছে। আর এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছে পাচারকারীদের। বাংলাদেশী বলে এরা শত শত নাগরিককে নৌকায় তুলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের টনক কিছুটা নড়েছে বটে, এখন মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করতে হবে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে চীনকে ব্যবহার করেও মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। এ মানবিক সমস্যায় বাংলাদেশ চুপ করে থাকতে পারে না। Daily Alokito Bangladesh 07.06.15

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সুস্বাগতম


দুদিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি আজ ঢাকা আসছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে অনেক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে। ভারতের ব্যাপারেও এ দেশের মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি যেসব রাজনৈতিক দল এক সময় ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল, ভারতের ব্যাপারে তাদের আগ্রহেরও পরিবর্তন হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ মনোভাবের পরিবর্তন দুদেশের সম্পর্ককে এখন আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে অনেক কিছুই এখন নির্ভর করছে ভারতের আচরণের ওপর। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ভারত একটি বড় অবদান রাখতে পারে। ভারতের জিডিপির পরিমাণ ২ দশমিক ৩০৮ ট্রিলিয়ন ডলার (পিপিপিতে ৭.৯৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার)। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ ভাগ। বিশ্বের ৭ম বড় অর্থনীতি ভারতের (পিপিপিতে এর পরিমাণ তৃতীয়)। একটি বড় অর্থনীতির দেশের পাশে যদি একটি ছোট অর্থনীতির দেশ থাকে, তত্ত্বগতভাবে ওই ছোট অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হয়। এ জন্যই বলা হয় ভারতের বিশাল অর্থনীতির পাশে থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। যেমন বলা যেতে পারে, ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ৪৬৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, আর আমদানির পরিমাণ ৫৯৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ কিছুটা হলেও ভারতের এই আমদানি খাতে অবদান রাখছে। কিন্তু সেটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নানা কারণে। ফলে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। আর তা ভারতের অনুকূলে। বাংলাদেশের ৬৫৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই তুলনীয় নয়। কিন্তু যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে ভারতের মনোভাব। নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ায় (স্থলবন্দরে অয়্যারহাউস না থাকা, পণ্যে মেইড ইন কান্ট্রি অব অরিজিন নিয়ে প্রশ্ন তোলা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনের সনদ গ্রহণে বাধ্যবাধকতা, সাতবোন রাজ্যের ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলার সামর্থ্য না থাকা, ইত্যাদি) বাণিজ্য ভারসাম্যতা কমানো যাচ্ছে না। এখন এমন একটা ধারণার জন্ম হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে এসব ক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতি হবে। বাংলাদেশের মানুষ এটাই প্রত্যাশা করে। অনেকগুলো সম্ভাবনা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলের আওতায় নদী খনন করা যেতে পারে, যাতে করে ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আমরা নৌপথ ব্যবহার করতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে নদীপথে সব ধরনের পণ্য সরবরাহ করা যায় না। এটা পরিবর্তন প্রয়োজন। রাতের বেলা নৌযান চলাচলের অনুমতি এবং দক্ষ নাবিক নিয়োগ করাও জরুরি। সমুদ্রপথে কানেকটিভিটি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে ভারতের তিনটি সমুদ্রবন্দর সংযুক্ত-সংক্রান্ত একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। এটা ভালো ও সমর্থনযোগ্য। আইটি সেক্টরে এবং আইটি পার্ক গড়ার ক্ষেত্রে আমরা ভারতীয় দক্ষতা ও সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে পারি। সমুদ্র অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশ দুটি একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এখানে সমুদ্র অর্থনীতির কথা উল্লেখ করা যায়। একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এখানে, যা ব্লু অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত। আমাদের দক্ষ জনশক্তি নেই। এই দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আমরা ভারতের সহযোগিতা নিতে পারি। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে। শুধু ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৫৫৮ কোটি ডলার। দিনে দিনে এই ঘাটতি বাড়ছেই। বাংলাদেশ এই ঘাটতি কমাতে পারছে না। কারণ নানা ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। এই বাধা অপসারণের কথা বলা হলেও ভারতীয় আমলাতন্ত্রের কারণে তা দূর হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তি নিয়ে একটি জটিলতা আছে জানি। আগামীতে যে কোনো এক সময়ে এই চুক্তিটি হওয়া বাঞ্ছনীয়। যাতে করে দুদেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবহমান ৫৪টি নদীর ব্যাপারে একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করাও প্রয়োজন। শুধু গঙ্গার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে একটি চুক্তি হয়েছে। অথচ ভারত ফেনী নদী থেকেও পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা চালু হলে উভয় দেশই ৫৪ নদীর পানির সুবিধা পাবে। এ ক্ষেত্রে ভারত যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারেও একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। দক্ষিণ এশিয়া আগামীতে দুটি বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। জ্বালানি ও পানি সংকটের মুখে পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়া। উভয় ক্ষেত্রেই একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার অ্যাপ্রোচ গড়ে তুলতে হবে। ভুটান, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের সমন্বয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে জ্বালানি সংকট ও পানি সংকটের সমাধান সম্ভব। ভারত এটা করে না। ভারত দ্বিপাক্ষিকভাবে এসব সমস্যার সমাধান করতে চায়। দ্বিপাক্ষিকতা কখনোই কোনো ভালো অ্যাপ্রোচ হতে পারে না। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি সরকার একটি ব্যাখ্যা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। এটা আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার চুক্তি হবে, যাতে ভারতের ব্যবসায়ীদের আমরা উৎসাহিত করতে পারি সেখানে বিনিয়োগ করতে। আমরা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে নিজেরা সমৃদ্ধ হতে চাই। বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব নীতি নিয়ে মোদি তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছেন। তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশে তার সফর এ আলোকেই রচিত। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সফরসঙ্গী হওয়ায় তিস্তার পানিবণ্টনের পথটি আরও সহজ হলো। এটা নিঃসন্দেহেই মোদির একটি সাফল্য। তিনি পার্শ¦বর্তী দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের সমস্যার ব্যাপারে যে আন্তরিক সেটাই প্রমাণিত হলো। আমরা নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে স্বাগত জানাই। তবে প্রত্যাশা করি, মোদি সমস্যাগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ নেবেন।
মোদির সফরে কানেকটিভিটির বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বেশি। বিশেষ করে সড়কপথে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামো খাতে ভারত সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ঋণ দেবে। এ ধরনের ঋণ আমরা অতীতেও নিয়েছি। নিঃসন্দেহে এতে করে ভারতের সাতবোন রাজ্যের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন বেশি। সাতবোন রাজ্যের বাঙালি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ভেতর দিকে কলকাতায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। আধুনিক যুগে এ ধরনের কানেকটিভিটি নতুন কিছু নয়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি শুল্ক নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের বাসও যাতে এই রুটে চলাচল করতে পারে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কলকাতা-ঢাকা-শিলং-গৌহাটি একটি যাত্রীবাহী বাস পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছে। এটা ভালো। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভারতের সাতবোন রাজ্যের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। ত্রিপুরা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এক. চট্টগ্রাম বন্দরের সেই ধারণক্ষমতা আছে কি না? অর্থাৎ বাংলাদেশি পণ্য আমদানি-রপ্তানি বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গেল বছর চট্টগ্রাম বন্দর ১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করেছে, অথচ ২০০৯ সালে করেছিল ১ দশমিক ১৬ মিলিয়ন কনটেইনার। এর অর্থ হচ্ছে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে ভারতের সাতবোন রাজ্যের কনটেইনার যদি চট্টগ্রাম বন্দর আগামীতে ব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে একটা জট লেগে যেতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের এই সক্ষমতা আছে কি না, তা স্টাডি করা দরকার। দুই. এই কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে একটি মাশুল থাকা প্রয়োজন এবং সেই মাশুল যেন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। মাশুল নির্ধারণ করা ছাড়া কনটেইনার পরিবহন চালু করা ঠিক হবে না। তিন. সার্কের আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় নেপাল ও ভুটানের পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে এই দেশ দুটি যেন একই সুযোগ পায়, অর্থাৎ বাংলাদেশের একটি সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার সুযোগ পায়, সে ব্যাপারটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, এই দেশ দুটির বিকল্প কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। ফলে দেশ দুটির পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে নিঃসন্দেহে এটা ভালো হতো, যদি সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি আমরা নির্মাণ করতে পারতাম। ভারতের আপত্তির কারণে এই সমুদ্রবন্দরটি এখন সোনাদিয়ার পরিবর্তে পটুয়াখালীর পায়রাবন্দরে নির্মিত হতে যাচ্ছে।
সড়ক ট্রানজিটের ব্যাপারে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে বহুপাক্ষিকভাবে এই সড়ক ট্রানজিটটি যেন এখনই নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেন এখনই কানেকটিভিটি চুক্তির আওতায় ভারতীয় এলাকা অতিক্রম করে তার পণ্য নিয়ে সড়কপথে নেপাল ও ভুটান যেতে পারে। সেটা নিশ্চিত করা। আমরা জানতে পেরেছি ভারত নীতিগতভাবে এতে রাজি হয়েছে। এটা নরেন্দ্র মোদি সরকারের একটা দূরদর্শিতার পরিচয়। আঞ্চলিক সহযোগিতাকে তিনি যে গুরুত্ব দেন, এটা একটা বড় প্রমাণ। নৌ ট্রানজিটের ব্যাপারে তৃতীয় দেশকে (এ ক্ষেত্রে ভুটান ও নেপাল) অন্তর্ভুক্ত করার বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তে ভারত প্রথম আপত্তি জানালেও পরে সেই আপত্তি তুলে নিয়েছে। ফলে ভুটান থেকে বোল্ডার আর নেপাল থেকে কাঠ আমদানি করার পথ প্রশস্ত হলো। সস্তায় নদীপথে পণ্য সরবরাহ করা যায়। এতে খরচ কম পড়ে। এমনকি কানেকটিভিটির আওতায় কয়েকটি ভারতীয় সমুদ্রবন্দর যোগ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। সস্তায় পণ্য পরিবহন করা সহজ হবে। আসলে প্রাপ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা যদি বহুপাক্ষিকতার আালোকে সমস্যার সমাধান করতে চাই, তা আমাদের উভয় দেশের জন্যই মঙ্গল।
নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরের প্রাক্কালে কলকাতায় একটি বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিকের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে কয়েকটি কথা বলেছিলেন, যা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শান্তি ও স্থায়িত্ব নিয়ে আসবে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘উন্নয়নই দুদেশের সম্পর্ক মজবুত করার কাজে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।’ এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে দুদেশের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ ছোট হতে পারে কিন্তু বিশ্বকে এবং ভারতকে দেওয়ার আছে অনেক কিছু। নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে সে কথাই প্রমাণিত হয়েছে। এখন ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নে বিভিন্ন সেক্টরে ঋণ দিচ্ছে। এই ঋণ শর্তযুক্ত হলেও চূড়ান্ত বিচারে আমাদের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে তা বড় অবদান রাখবে। তাই নরেন্দ্র মোদির এই সফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদি প্রমাণ করলেন, তিনি বাংলাদেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। এটাই আমাদের প্লাসপয়েন্ট। আমরা নরেন্দ্র মোদির এই আন্তরিকতাকে ব্যবহার করে আরও অনেক দূর যেতে চাই। তার ঢাকা সফর সফল হোক, এ প্রত্যাশাই করি।
Daily Amader Somoy
06.06.15

মোদির সফরে নতুন সম্ভাবনা

একটা প্রশ্ন এখন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে যে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? অর্থাৎ এই সফরে বাংলাদেশ কী পাবে? প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশের পাল্লাটা ভারী হবে, নাকি ভারতের পাল্লা ভারী হবে? বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সফর অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত কৌশলী মোদি বেছে নিলেন এমন একটা সময়-যখন তিনি ঢাকায় এসে বলতে পারবেন আসলেই তিনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য কিছু নিয়ে এসেছেন। স্থল সীমানা চুক্তি, যা ভারতের সংসদের উভয় কক্ষে অনুমোদিত হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনের বিলে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরও করেছেন, এই মেসেজই তিনি দেবেন। কয়েকটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হবে। কিছু আর্থিক ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন এবং সে ব্যাপারে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যার কোনো একটির ব্যাপারে কোনো চুক্তি হবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রথমেই এসে যায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকায় আমাদের বলে গিয়েছিলেন ধৈর্য রাখার জন্য। আমরা অপেক্ষা করেছি। মোদি নিজে যে চেষ্টা করেননি, তেমনটি নয়। তিনি নিজে কলকাতায় মমতার সঙ্গে দু-দুবার কথা বলেছেন। এখন মমতা নিজে মোদির সফরসঙ্গী হচ্ছেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'তিস্তা কার্ডটা' শেষ পর্যন্ত বিজেপির হাতে তুলে দেবেন-এ প্রশ্ন থাকলই। ২০১৬ সালে বিধানসভার নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি উত্তরবঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। মমতা তিস্তায় ছাড় দেবেন, এটা মনে হয় না। তাই তিস্তার পানিবণ্টনের জট এই মুহূর্তে খুলবে না। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্র এখানে দুর্বল। কোনো রাজ্যের আপত্তিকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। তাই মোদি আসবেন। মমতার উপস্থিতিতে আগের মতোই প্রতিশ্রুতি দেবেন তিস্তা চুক্তি হবে! এখানে আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিস্তা নিয়ে যদি চুক্তি হয়ও, তা হবে ২০১৬ সালের পর।
বাংলাদেশের নয়, বরং ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক চুক্তি তথা এমওইউ স্বাক্ষরিত হবে ঢাকায়। যেমন ভারত আরো ১৫টি রুটে ট্রানজিট চাইছে এখন। ত্রিপুরা রাজ্য সরকার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে চাইছে প্রকাশ্যে। নৌ প্রটোকলের আওতায় নদীপথে তৃতীয় দেশের পণ্য চলাচলের যে প্রস্তাব বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে, তা বাতিলের অথবা পুনর্মূল্যায়নের দাবি করেছে ভারত।
এখানে বলা ভালো, মোদির সফরে এক নম্বর অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে এই কানেক্টিভিটি। এই কানেক্টিভিটির আওতায় আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। অর্থ জোগাবে ভারত সরকার। কেননা প্রয়োজনটা তাদের। ত্রিপুরায় পণ্য নিয়ে যেতে হলে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা প্রয়োজন। এ জন্য ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দেবে। এই ঋণ নিয়েও কথা আছে। সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে এই ঋণ পাবে বাংলাদেশ। সমস্যা এখানেই। পৃথিবীর কোনো দেশই এখন আর সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নেয় না। এর ফলে যারা ঋণ দেয় তাদের দেশ থেকে (এ ক্ষেত্রে ভারত) ৭৫ শতাংশ পণ্য কিনতে হবে। ঠিকাদারও নিয়োগ হবে ওই দেশ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে-সড়ক নির্মাণে বাংলাদেশের প্রযুক্তি, পণ্য কিংবা দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। আবার নির্দিষ্ট সময়ে প্রজেক্টের কাজ শেষ না হলে বাংলাদেশকে জরিমানা গুনতে হবে ৫ শতাংশ হারে। ফলে এই সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নেওয়া ঋণ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারত নিজেও সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে একাধিক-বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, সাফটা চুক্তির আলোকে বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশাধিকারের বিশেষ সুবিধা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণ, ভুটান ও নেপালকে ট্রানজিট দেওয়া ইত্যাদি।
তাই মোদির এই সফর নানা সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে আমাদের জন্য। মনে রাখতে হবে, ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার মোট আয়তনের মধ্যে ৭২ শতাংশ এলাকা একা ভারতের। মোট জনসংখ্যার ৭৭ শতাংশ ভারতের। ভারতের অর্থনীতির অবস্থান বিশ্বে তৃতীয় ও চতুর্থ এবং জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০১৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে, যখন চীনের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭.২ শতাংশ। সুতরাং ভারতের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আমরা উপকৃত হতে চাই। অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলের আওতায় নদী খনন করা যেতে পারে, যাতে ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আমরা নৌপথ ব্যবহার করতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে নদীপথে সব ধরনের পণ্য সরবরাহ করা যায় না। এটা পরিবর্তন প্রয়োজন। রাতের বেলা নৌযান চলাচলের অনুমতি এবং দক্ষ নাবিক নিয়োগ করাও জরুরি। সমুদ্রপথে কানেক্টিভিটি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে ভারতের তিনটি সমুদ্রবন্দর সংযুক্ত-সংক্রান্ত একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। এটা ভালো ও সমর্থনযোগ্য। আইটি সেক্টরে ও আইটি পার্ক গড়ার ক্ষেত্রে আমরা ভারতীয় দক্ষতা ও সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে পারি। সমুদ্র অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশ দুটি একসঙ্গে কাজ করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ভবিষ্যতে দুটি বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। জ্বালানি ও পানি সংকটের মুখে পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়া। উভয় ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক সহযোগিতার অ্যাপ্রোচ গড়ে তুলতে হবে। ভুটান, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের সমন্বয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে জ্বালানি সংকট ও পানি সংকটের সমাধান সম্ভব। ভারত এটা করে না। ভারত দ্বিপক্ষীয়ভাবে এসব সমস্যার সমাধান করতে চায়। দ্বিপক্ষীয়তা কখনোই কোনো ভালো অ্যাপ্রোচ হতে পারে না। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি সরকার একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। এটা আমরা আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আমরা উৎসাহিত করতে পারি সেখানে বিনিয়োগ করতে। আমরা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে নিজেরা সমৃদ্ধ হতে চাই। মোদির পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশে তাঁর সফর এ আলোকেই রচিত। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সফরসঙ্গী হওয়ায় তিস্তার পানিবণ্টনের পথটি আরো সহজ হলো। এটা নিঃসন্দেহে মোদির একটি সাফল্য। তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের সমস্যার ব্যাপারে যে আন্তরিক সেটাই প্রমাণিত হলো। আমরা নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে স্বাগত জানাই। Daily KalerKontho 04.06.15

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দুটি কথা

নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রাক্কালে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে_ এই সফরের মধ্যদিয়ে দুই দেশের সঠিক কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে? দুই দেশের মধ্যে বেশকিছু সমস্যা রয়েছে। এই সফরে সেসব সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, এ প্রশ্ন এখন সঙ্গত কারণেই উঠবে। মমতা ব্যানার্জিসহ আরো ৪ জন মুখ্যমন্ত্রীকে তার সঙ্গে নিয়ে আসার মধ্যদিয়ে নরেন্দ্র মোদি অন্তত একটি ম্যাসেজ দিতে চাচ্ছেন। আর তা হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোকে গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ তার থলিতে রয়েছে কানেকটিভিটির এজেন্ডা। এ ক্ষেত্রে মমতাকে সঙ্গে নিয়ে এসে তিস্তার পানিচুক্তি হবে_ এমন একটা ধারণা দিলেও এই সফরে এ চুক্তিটি হচ্ছে না। এটা একরকম নিশ্চিত।
মোদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য একটা ভালো খবর, এ জন্য যে আমাদের উন্নয়ন ও প্রতিক্রিয়ায় ভারত বড় অবদান রাখতে পারে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতীয় সহযোগিতায় আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারব। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখাতে হবে। ভারতকে দেখাতে হবে উন্নয়নের সহযোগিতা হিসেবে। ভারত যদি বাংলাদেশে শুধু তার পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত করতে চায়, তাতে করে সমমর্যাদা নিশ্চিত হবে না। বরং ভারতীয় বন্ধুত্বকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে। ভারতকে বাংলাদেশেরও অনেক কিছু দেয়ার আছে। কিন্তু সেখানে তৈরি হয়ে আছে নানা জটিলতা। তাই সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে নরেন্দ্র মোদি তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে, সে সম্পর্কে আদৌ অবগত নন, তা আমি বিশ্বাস করি না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জিটুজি পর্যায়ে বাংলাদেশের 'শক্ত' অবস্থানে যেতে না পারলেও, 'ট্রাকটু ডিপ্লোম্যাসির' আওতায় যেসব সেমিনার হয়, অর্থাৎ বেসরকারি পর্যায়ে দুই দেশের যেসব সভা-সেমিনার হয়, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটুকু তুলে ধরা হয়, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে। মোদির সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশের গবেষণামূলক সংস্থাগুলোর কাছে একটা প্রত্যাশ্যা ছিল তারা তথ্য-উপাত্তসহ বাংলাদেশের সমস্যাগুলো তুলে ধরবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, আমরা তা দেখতে পাইনি। তবে মাঝেমধ্যে দু'একটি তথাকথিত গবেষণা সংস্থার তৎপরতা আমাদের চোখে পড়ে বৈকি, কিন্তু দেখা যায় তারা বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতীয় স্বার্থকেই বড় বেশি করে দেখছেন। তারা ভারতীয় বন্ধুত্বকে বড় বেশি করে দেখছেন। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারতে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাটা তাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে কম। এমনকি বিরোধী দলের কাছ থেকে একটি গঠনমূলক পরামর্শও আমরা পাইনি কখনো। বিএনপির নিজস্ব কোনো 'থিংক ট্যাংক' নেই। তাদের নেতারা এখনো বিভ্রান্ত। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তারা কোন পর্যায়ে দেখতে চান, এর মূল্যায়নের চেয়ে তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের বিষয়টি। মূলত চারটি বিষয়ের আলোকে মোদির ঢাকা সফরকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও কানেকটিভিটি। এর মধ্যে অর্থনীতি ও কানেকটিভিটির বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভারত বাংলাদেশের বেশকিছু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। সংবাদপত্রে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে ভারতের কাছে ২৯৪ কোটি ডলারের সাহায্য চাইবে। ইতোমধ্যে ১৫টি প্রকল্প ভারতের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখানে সমস্যাটা হচ্ছে ভারতের ঋণের ধরন নিয়ে। ভারত এই ঋণ দিচ্ছে 'সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট'-এর আওতায়। ভারত নিজে কখনো 'সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট' ঋণ গ্রহণ করে না (সর্বশেষ মোদির দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় ১ হাজার কোটি ডলার ঋণ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা যায়)। 'সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট' এখন বিশ্বে অচল। কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত এর আওতায় কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। কেননা তাতে নানা শর্ত থাকে। যেমন বলা যায় 'সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট'-এ ঋণ নিলে ওই ঋণের আওতায় শতকরা ৭৫ ভাগ পর্যন্ত আমাদের ওই দেশ (এ ক্ষেত্রে ভারত) থেকে কিনতে হবে। ঠিকাদার নিয়োগের হবে ওই দেশ থেকে। সুদ দিতে হবে শতকরা ১ ভাগ হারে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে বাংলাদেশকে জরিমানা গুণতে হবে শতকরা ৫ ভাগ হারে। এটা কোনো ভালে ঋণ নয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুযোগ আছে ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে আরো আলোচনা করা। এর আগে ভারতের কাছ থেকে 'সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট'-এর আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ আমরা পেয়েছিলাম। এ ব্যাপারে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে সব প্রকল্পে এই ঋণ ব্যয় হবে, তাতে আমাদের চেয়ে ভারতই উপকৃত হবে বেশি। ভারতের স্বার্থ এখানে বেশি। দুটো প্রকল্পের কথা আমি উল্লেখ করলাম_ একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, যা কিনা সাতকোণ রাজ্যগুলোয় ভারতীয় পণ্য সরবরাহ সুবিধা হবে। এই ঋণের আওতায় সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। ভারত নিজেও সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট ও কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। সড়কের পাশাপাশি আমরা ৫০০টি ডবল ডেকার বাসও কিনব। এ ক্ষেত্রে বাসের মূল্য যা ভারত নির্ধারণ করে দেবে, আমাদের তা মানতে হবে। এর চেয়ে সস্তায় অন্যত্র বাস পাওয়া গেলেও তা আমরা ক্রয় করতে পারব না। নৌ ট্রানজিটের বাংলাদেশ চেয়েছে ভুটান ও নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করতে। কেননা ও দুটো দেশ থেকে নৌপথে কাঠ ও বোল্ডার সহজে আনা যায়। কিন্তু ভারত তার আপত্তি জানিয়েছে। ত্রিপুরার চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেননা সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরটি নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির মুখে) আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কিংবা আমদানিতে হিমশিম খাবে। সে ক্ষেত্রে ত্রিপুরা কিংবা ত্রিপুরার দেখাদেখি সাতকোণ রাজ্যগুলো যদি এই বন্দর ব্যবহার করতে চায় তাহলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে একাধিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, সাফটা চুক্তির আলোকে বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশাধিকারের বিশেষ সুবিধা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ, ভুটান ও নেপালকে ট্রানজিট দেয়া ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি বিষয়ে ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভারত রক্ষা করেনি। ফলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
ভারতের সঙ্গে আমাদের বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যা অমীমাংসিত। তিস্তার পানিচুক্তির কথা নাই বা বললাম, এর বাইরে আরো ৫২টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অথচ আমরা শুনতে পেয়েছি এবং জানতে পেরেছি ভারত আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যদিয়ে ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যে প্রবাহমান বেশ কয়েকটি নদীর পানি ভারত প্রত্যাহার করে খরা অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজ নিয়েও যে বাংলাদেশের আশঙ্কা তা দূর হয়নি। ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ আমরা পাইনি। বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। সীমান্ত হত্যা বন্ধের কোনো উদ্যোগ ভারত কখনো নেয়নি। ভিসা সহজীকরণের কথা বলা হলেও তা ভারতে এখনো বাস্তবায়ন করেনি। তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি।
এখন মমতা ব্যানার্জি আসছেন বটে। কিন্তু তিস্তার জট এই মুহূর্তেই খুলবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ামের সমভূমি দিয়ে লাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানিপ্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানি সমান ভাগ পেতে পারে না এই দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানিবণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুল্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী।
তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি, প্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তাচুক্তিটি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তাচুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখন মমতা ব্যানার্জি আবারো ঢাকায় আসছেন। এতে নরেন্দ্র মোদির হাত শক্তিশালী হলো বটে, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা তা পূরণ হবে না।
নরেন্দ্র মোদির সফরে বেশ কটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। কানেকটিভিটির আওতায় যে কটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সে প্রশ্ন উঠবেই। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। তিনি সমস্যাগুলো অনুধাবন করে সমাধানের উদ্যোগী হবেন। না হলে কানেকটিভিটি নিশ্চিত করে তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষিত হবে বটে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের বন্ধুত্ব হয়ত তিনি পাবেন না। আমরা নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানাই। তার বাংলাদেশ সফর সফল হোক। Daily Jai Jai Din 02.06.15

কবে খুলবে তিস্তার জট?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় আসছেন। গত ২৮ মে বিকালে গণমাধ্যমে এটা ছিল ব্রেকিং নিউজ। এর অর্থ কী, কিংবা এর মধ্য দিয়ে তিস্তার পানি বণ্টনের পথটি কি সহজ হয়ে গেল? জট কি খুলল? বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এটা যে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে থাকবে আরও কিছুদিন, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা ত্যাগ করা পর্যন্ত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মমতা ব্যানার্জির রাজনীতি যারা বোঝেন ও স্টাডি করেন, তাদের কাছে সঙ্গত কারণেই তার দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা সফর বেশ ইন্টারেস্টিং। এখন মোদির সঙ্গে সফরসঙ্গী হয়ে তার ঢাকায় আসার বিষয়টি নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। প্রথমত, তিনি ঢাকায় এলেও এখন তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তি হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ এটা পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তার পানি বণ্টনকে ইস্যু করে তিনি উত্তরবঙ্গে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান। এখন যদি চুক্তি হয় এবং তাতে যদি বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগের ওপর পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়, তা তার ভোট কাটবে। তিনি জনপ্রিয়তা হারাবেন। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন। এ ঝুঁকি তিনি এ মুহূর্তে নেবেন না। একটি সমঝোতায় তিনি রাজি হতে পারেন। তবে তা বিধানসভার নির্বাচনের পর। মোদির ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি যে হচ্ছে না, রোববার দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তা স্পষ্ট করেছেন। এবার ঢাকায় এসে মমতা সেই পুরনো কথাই বলবেন- তার ওপর আস্থা রাখতে বলবেন। দ্বিতীয়ত, তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে তিনি একবার একটি ফর্মুলা দিয়েছিলেন- শতকরা ৭৫ ভাগ পানি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেয়া। এ ফর্মুলায় বাংলাদেশ রাজি হবে, এটা মনে হয় না। তৃতীয়ত, মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে আহ্বায়ক করে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটা সুপারিশ করা। রুদ্র কমিশন তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন এবং যার আংশিক রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তিনি অভিমত দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এও মত দিয়েছিলেন ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমারও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু যতদূর জানা যায় মমতা ব্যানার্জি রুদ্র কমিশনের মতামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না, যে কারণে এ রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। আজ তিনি সেই রুদ্র কমিশনের ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগিতে রাজি হবেন, এটা মনে হয় না। চতুর্থত, তাহলে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঢাকায় সফরসঙ্গী হতে রাজি হলেন কেন? অতীতে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকায় আসা চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে তিনি বেঁকে বসেন। তাহলে এবার আসছেন কেন? যদি চুক্তি নাই হয়, তাহলে তার ঢাকায় উপস্থিতি কেন? এখানে বেশকিছু সম্ভাবনা আছে। একটি প্যাকেজ ডিলের আওতায় তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হতো না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি এ আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। তার ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছে।নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চান বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ এ তিনটি রাজ্য এ প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছেন এ তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা আসছেন। তিস্তা এক্ষেত্রে প্রধান বিষয় নয়। অনেক পরিকল্পনা তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যদি না কেন্দ্র আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করে। সামনে নির্বাচন। মমতা এ ঝুঁকিটি নিতে চাইবেন না।পঞ্চমত, কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইর একটি চাপ আছে মমতার ওপর। সারদা কেলেংকারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর সিবিআই তার নজরদারি বাড়িয়েছে। ফলে এ চাপকে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হয়ে থাকতে পারেন। ষষ্ঠত, মমতা ব্যানার্জি আবার বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দিতে পারেন। এক সময় তিনি এ জোটে ছিলেন। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। আগামীতে পশ্চিমবঙ্গে তার বিজয় নিশ্চিত করতে এবং সব কেলেংকারি থেকে মুক্ত হতে তিনি যদি আবারও এনডিএ জোটে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সপ্তমত, যতদূর জানা যায় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেননি একটাই কারণে। আর তা হচ্ছে মমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনঃপুত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। এবার মোদি তাকে কথা দিয়েছেন তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সঙ্গে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন। অষ্টমত, নরেন্দ্র মোদির এক নম্বর এজেন্ডা কানেকটিভিটির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গসহ সাত বোন রাজ্যের ৪টি জড়িত। এজন্য তিনি ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়েই ঢাকায় আসছেন (ত্রিপুরার মানিক সরকার, মেঘালয়ের মুকুল সাংমা, আসামের তরুন গগৈ, মিজোরামের লালখান হাওলা এবং পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি)। তার উদ্দেশ্য একটাইÑ বাংলাদেশকে দেখানো তার সিদ্ধান্তের পেছনে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ৫ রাজ্যের সমর্থন রয়েছে। নবমত, বাংলাদেশ সফর সফল করতে হলে নরেন্দ্র মোদির মমতাকে চাই-ই। স্থলসীমানা চুক্তি কার্যকর হলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সবচেয়ে বেশি জমি পাবে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ঢাকায় জমি হস্তান্তরের যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে, তাতে মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতির প্রয়োজন রয়েছে (একই কথা প্রযোজ্য আসামের ক্ষেত্রেও)। তাই মমতা আসছেন। এটা নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদির বড় সাফল্য। তিনি মমতা ব্যানার্জিকে আস্থায় নিতে পেরেছেন।এখন মমতা ব্যানার্জি আসছেন বটে। কিন্তু তিস্তার জট এ মুহূর্তেই খুলবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার।১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানি ৮০ ভাগ দুদেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না- এ দাবি উত্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানি বণ্টনের জট খোলেনি।এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেস কাজের উদ্বোধন করা হয়। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধু নামেই আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী।তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখন মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এলে নরেন্দ্র মোদির হাত শক্তিশালী হবে বটে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হবে না। নরেন্দ্র মোদির সফরে বেশ কটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। কানেকটিভিটির আওতায় যে কটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তাতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। ভারতীয় ঋণ প্রকল্প নিয়েও কথা আছে। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে নেয়া এসব ঋণ প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেসব বিষয় রয়েছে, সেসব বিষয়ে ভারত যদি কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা কমানো, শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করা, নৌ ট্রানজিটের আওতায় তৃতীয় পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা (এ ক্ষেত্রে নেপাল ও ভুটান), আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে বাংলাদেশের জ্বালানি ও পানি সমস্যার সমাধান করা- এ সবই বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে, নরেন্দ্র মোদির সফরে এসব বিষয়েরও জট খুলবে।নরেন্দ্র মোদি আসছেন। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের জন্য সুখবর। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমাদের উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারত সমমর্যাদার দৃষ্টিতে আমাদের দেখবে, আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি। ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সফরসঙ্গী করে নরেন্দ্র মোদি বোধকরি একটি মেসেজই দিতে চাচ্ছেন- সীমান্তবর্তী এ রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে। আর এ কানেকটিভিটির বিষয়টিই তার কাছে মুখ্য। কিন্তু বাংলাদেশ চায় কানেকটিভিটির পাশাপাশি ভারত তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখুক। মমতা ব্যানার্জিকে আস্থায় নেয়ার দায়িত্বটি নরেন্দ্র মোদির। এ দায়িত্ব বাংলাদেশের নয় Daily Jugantor 02.06.15