রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ও কিছু কথা

প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে মোট ৩১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অন্তর্ভুক্ত। বাজেটে মোট ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা, আর আয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। ঘাটতি ৮০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে মোট বাজেটের ১১.৬ শতাংশ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের চেয়ে ১.৫ শতাংশ কমেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩.১ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ ছিল (২৯ হাজার ২১৩ কোটি টাকা) তা সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ কমিয়ে ২৮ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা করা হয়। শিক্ষা খাতে এ ব্যয় বরাদ্দ সর্বোচ্চ নয়। জনপ্রশাসনে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। তারপরও শিক্ষা খাতে এ ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে নানা কথা আছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি কিনা, এটি নিয়ে খোদ দেশ ও বিদেশে প্রশ্ন রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের (ইকোনমিস্ট) মাঝে ৪৭ ভাগ বেকার। একমাত্র আফগানিস্তান বাদে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার বেশি। শ্রীলঙ্কায় যেখানে এ হার মাত্র ৭ ভাগ, নেপালে ২০, পাকিস্তানে ২৮, আর ভারতে ৩৩, সেখানে বাংলাদেশে এ হার ৪৭। এটি নিঃসন্দেহে একটি উদ্বেগজনক বিষয়। যেখানে প্রতি বছর ১৩ থেকে ১৬ লাখ জনশক্তি চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, সেখানে বিভিন্ন কারণে (রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অন্যতম) এদেশে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। এ বেকারত্বের মাঝে আবার আছে কিছু 'ছায়া বেকারত্ব'। এদের দেখা যায় না বটে। কিংবা কোনো পরিসংখ্যানেও এরা আসে না। কিন্তু ছোটখাটো, অর্ধবেলা কাজ করে এরা জীবিকা নির্বাহ করছে।

আমরা দেশে এরই মধ্যে ৩৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৯টি। সব মিলিয়ে ১২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ক'টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানসম্মত দক্ষ গ্রাজুয়েট আমরা তৈরি করেছি? এর জবাব অত্যন্ত হতাশাজনক। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন অনেকটা সার্টিফিকেট সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ১০ থেকে ১৫ লাখ ছাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় পড়াশোনা করে। কিন্তু এখানে কি আদৌ পড়াশোনা হয়? শত শত কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। ঢাকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা কিংবা ইউজিসির কর্তাব্যক্তিরা জানেন না এ অনার্স কোর্স খুলে শত শত শিক্ষকের জন্য একটি 'ব্যবসার' সুযোগ করে দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। আমি অনেক কলেজের খবর জানি, সেখানে আদৌ কোনো ক্লাস হয় না। শিক্ষকরা কলেজে শিক্ষা দানের পরিবর্তে বাসায় ব্যাচের পর ব্যাচ 'প্রাইভেট' পড়ান। অথচ ওই শিক্ষকের কলেজে থাকার কথা। অনার্স পর্যায়ে কোনো ছাত্র প্রাইভেট পড়ে অথবা শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন, এটি আমাদের জামানায় আমরা না শুনলেও এটি হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সরকারি কলেজগুলোর একটি বাস্তব চিত্র। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আসেন, ভিসি যান, কিন্তু সংস্কার কেউ করেনন না। এটি এখন মূলত একটি সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভর্তি হয়ে চার বছর পর মেলে একখানা সার্টিফিকেট। ক্লাস না করে, সংসার ধর্ম পালন করে, কোনো টেঙ্ট বই না পড়েও যে একখানা অনার্স সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর বড় উদাহরণ। এ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশে উচ্চশিক্ষায় বড় অংশের বেকারত্ব সৃষ্টি করছে। দুঃখ লাগে, শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি এদিকে পড়েনি। তিনি আদৌ ভেবেছেন কিনা, তাতেও রয়েছে আমার সন্দেহ।

একুশ শতকে একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি জোর দিতে হবে প্রযুক্তিগত তথা আইটিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। এ আইটিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা একদিকে যেমনি বেকার সমস্যা সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে, ঠিক তেমনি বহির্বিশ্বে মানবসম্পদের একটি সুষ্ঠু ব্যবহারও হবে। আর তাই শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে, সিলেবাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে এবং শিক্ষা কাঠামোতেও আনতে হবে পরিবর্তন। এজন্যই গ্রাম পর্যায়ে স্কুল বাড়িয়ে, সরকারি অনুদান বাড়িয়ে প্রতিটি স্কুলকে মানবসম্পদ গড়ার একেকটি 'কারখানা' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সিঙ্গাপুর এ কাজটি করেছিল বিধায় ছোট এদেশটি আজ উন্নয়নশীল বিশ্বে একটি আদর্শ। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি কম। শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। তাতে করে উপকৃত হয়েছে কারা? বেতন খাতেই তো চলে যায় পুরো টাকা। সরকারি কলেজগুলোতে (সরকারি) অবকাঠামো খাতে কিছু উন্নয়ন হয়। কিন্তু এখানে মানসম্মত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন না কেউ। আর শিক্ষকরা এখন গুরুত্ব দেন 'প্রাইভেট পড়ানোর' ওপর। মানসম্মত শিক্ষা তাদের কাছে মুখ্য নয়। এসব দেখারও যেন কেউ নেই। অর্থমন্ত্রী যখন নতুন বাজেট উপস্থাপন করলেন তখন এ কথাটিই আবার মনে হলো। নিয়ম রক্ষার্থে তিনি শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছেন; কিন্তু যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে এ বিশাল ব্যয় দিয়ে আমরা উচ্চশিক্ষার কতটুকু মানোন্নয়ন করতে পারব? বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, আইটি সেক্টরের উন্নয়ন- এ বরাদ্দ দিয়ে আদৌ সম্ভব নয়। কেননা এ অর্থের মাঝে ১৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। আর ১৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বরাদ্দ, তাতে করে আমাদের উৎফুল্ল হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা এ টাকার খুব সামান্যই ব্যয় হয় উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের মাঝে একটি অংশ বরাদ্দ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। ২০০১-০২ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০২.২৪ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৭৫ ভাগ বরাদ্দ থাকে শিক্ষা খাতে (২০০১-০২)। এ পরিসংখ্যান বেড়েছে ০.৮৪ ভাগ ২০১০-১১ সালে। আবার যদি শুধু শিক্ষা খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে এ বরাদ্দ মাত্র ৭.৮৫ ভাগ (২০০১-০২) থেকে ৮.২২ ভাগ (২০১০-১১)। অর্থাৎ পরিসংখ্যানই বলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার পরিমাণ খুব বেশি নয়। সম্প্রতি শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে, বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। যদিও তুলনামূলক বিচারে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বাজেট শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম। তারপরও কথা থেকে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেবে দেখতে হবে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়ানো যায় এবং সরকারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা কমানো যায়। এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন আর তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়, তার খুব কম অংশই ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। বরাদ্দকৃত টাকার একটি সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভিসি মহোদয়রা উন্নয়ন খাতে কিংবা গবেষণায় যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল সেই টাকা নতুন শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যয় করেছেন। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি দলীয় কোটায়, স্থানীয় কোটায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। কিছু দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি নিজের মেয়ে, ভাই, আপন ভায়রা, শ্যালিকার মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়েকে শিক্ষক তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এ প্রবণতা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। অভিযোগ, জাহাঙ্গীরনগর এরই মধ্যে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে! ফলে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়ন বাজেট থেকে টাকা এনে শিক্ষক তথা কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। ২০১১-১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুুরি কমিশন (বিমক) কর্তৃক বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২২.৪০ কোটি টাকা। এর মাঝে ১৬৫.১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে শুধু শাসকদের বেতন দিতে। শিক্ষক যে টাকা বরাদ্দ করেন, তা দিয়ে বেতন, পেনশন, সাধারণ খরচ, শিক্ষা খরচ, যানবাহন মেরামত ও মূলধনের চাহিদা মেটানো হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় বেতন পরিশোধের পর যা থাকে, তা দিয়ে অন্যকিছু করা আর সম্ভব হয় না। ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান হয় না। তাদের নূ্যনতম চাহিদাও মেটাতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও খারাপ। তারা অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পেনশন দিতে পারে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একুশ শতকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরিভাবে সরকারি অর্থে পরিচালিত হবে, এ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি কল্যাণকামী অর্থনীতিও নয়। অর্থাৎ পশ্চিম ইউরোপের কোনো কোনো রাষ্ট্রে (যেমন জার্মানি), কিংবা নরডিকভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্র সব নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। ওইসব রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা একদম ফ্রি। আমরা সেখানে পড়াশোনা করেছি কোনো ধরনের টিউশন ফি ছাড়াই (শুধু ছাত্র সংসদের জন্য কিছু অর্থ দিতে হয়)। স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরিভাবে ফ্রি না হলেও বেকার ভাতা সেখানে রয়েছে। জার্মানি বা সুইডেনের অর্থনীতির পক্ষে সম্ভব সাধারণ নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি সে পর্যায়ে নেই। তবে যে পর্যায়ে রাষ্ট্র শিক্ষা খাতকে প্রমোট করে, তা ঠিক আছে। রাষ্ট্র শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ দেবে। তবে এখানে উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।

একুশ শতকে এসে একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। ছাত্র বেতন না বাড়িয়েও আয় বাড়ানো যায়। এজন্য কতগুলো বিকল্প নীতি নির্ধারকরা ভেবে দেখতে পারেন। প্রয়োজন পিপিপি অথবা বেসরকারি খাতকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগে উৎসাহিত করা। যেমন ব্যবসা প্রশাসন, অর্থনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যা ও ফার্মেসিতে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি পুঁজিতে ল্যাব হতে পারে, ছাত্রাবাস নির্মিত হতে পারে, ট্রেনিং প্রোগ্রাম হতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী রয়েছেন। প্রয়োজন একটি নীতি প্রণয়ন ও যোগাযোগ। একইসঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেকেন্ড ক্যাম্পাস কিংবা সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রাম (শুধু ব্যবসা প্রশাসন কোর্সই নয়) চালু করে তাদের আয় বাড়াতে পারে। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় এ উদ্যোগ নিতে পারে। গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা তেজগাঁওয়ে অবস্থিত টেঙ্টাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন। আর সেই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে দক্ষ জনশক্তি পেতে পারেন বড় বড় গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। গার্মেন্টের পর আমাদের একটি সম্ভাবনার খাত হচ্ছে ওষুধ শিল্প। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি বিভাগ রয়েছে। এক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগ করতে পারে। মোটকথা, আমাদের দৃষ্টিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় চলবে। কিন্তু এখানে বিনিয়োগে বেসরকারি খাতকে আমরা উৎসাহিত করতে পারি। বেসরকারি উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে বেশ ক'টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করছে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ভালো শিক্ষকও রয়েছেন। উদ্যোক্তারা যদি সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করবেন না কেন? আসলে এজন্য যা দরকার, তা হচ্ছে সুস্পষ্ট একটি নীতিমালা। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায় না। দলবাজ ভিসিরা এটি ব্যবহার করবেন তাদের স্বার্থে। দলবাজ শিক্ষকের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু দক্ষ জনশক্তি বাড়বে না। Daily Alokito Bangladesh 21.06.15

কালশীর হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর

অনেকটা অজান্তেই পার হয়ে গেল ঢাকার মিরপুরের কালশীর হত্যাকা-ের ঘটনা। খুব কম সংবাদপত্রেই ওই হত্যাকা-ের ফলোআপ প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছরের ১৪ জুন শবেবরাতের রাতে কালশীর বিহারি ক্যাম্পে একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এতে একই পরিবারের ৯ সদস্যসহ মারা যান ১০ ব্যক্তি। ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়েছিলÑ মৃত ব্যক্তিরা যাতে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে না পারেন, সে জন্য বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেীয়া হয়েছিল। স্থানীয় লোকদের অভিযোগ ছিলÑ ওই হত্যাকা-ের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য জড়িত। পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল স্থানীয় বাসিন্দা। এরপর দুটি মামলা হয়েছিল। এক বছর পর ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) সাইফুল ইসলাম একটি সংবাদপত্রে (একটি জাতীয় দৈনিক, ১৩ জুন) বলেছেন, কে আগুন দিয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে সংবাদপত্রটিকে তিনি জানাতে ভোলেননি যে, ‘তদন্ত চলছে’। একটি হত্যাকা-ে যখন ১০ ব্যক্তি মারা যান, এর তদন্ত করতে যদি এক বছর লাগে, তখন পুলিশের ওপর আমাদের আস্থাটা থাকে কই? পুলিশে যে অভিজ্ঞ ব্যক্তি নেই, তা তো নয়। পুলিশ পারে। অতীতেও পেরেছে। এই হত্যাকা-টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত ছিল।কালশী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যেমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ২৭ এপ্রিল (২০১৪) নারায়ণগঞ্জের অপহরণোত্তর ৭ খুনের ঘটনা কিংবা একই বছরের ২০ মে ফেনী শহরে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামের হত্যাকা-ের ঘটনা। এগুলো সবই মূলত একসূত্রে গাঁথা। আমাদের নষ্ট রাজনীতির প্রতিফলন ঘটেছে এসব হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। আর এসব হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে সুশাসনের অভাব প্রচ-ভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশে! যারা নীতিনির্ধারক তারা সুশাসনের এই অভাবটি অনুভব করেন কি না জানি না; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায় একের পর এক হত্যাকা- হচ্ছে এবং প্রতিটি হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়ভাবে সরকারদলীয় কর্তাব্যক্তিরা। আর প্রশাসন পালন করছে নির্লিপ্ত ভূমিকা। দেশে সুস্থ গণতন্ত্রচর্চা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ ধরনের হত্যাকা- আমাদের কোনো আশার বাণী শোনায় না।
আমাদের সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার স্বীকৃত। সংবিধানের ১১নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে। মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।’ এখন যে ঘটনা কালশীতে ঘটেছিল, যেখানে শিশু ও নারীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সেখানে সংবিধান বর্ণিত মানবসত্তার মর্যাদা থাকল কোথায়? বিহারিরা উর্দুভাষী। কিন্তু আমাদের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠনের যে স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, তাতে করে উর্দু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখতেই পারেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছর পরও উর্দু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মূল ধারায় আসেনি। এখানে ব্যর্থতা কার, সে প্রশ্ন খুব সহজেই উঠতে পারে। বিহারিরা নিজেদের এখনো পাকিস্তানি মনে করেন এবং পাকিস্তানে যেতে চান। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় যেসব সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে এই পাকিস্তানি নাগরিকদের পাকিস্তানে পুনর্বাসন। অতীতে বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা হলেও অগ্রগতি হয়েছে কম। মাত্র একটি ব্যাচ পাকিস্তানে ফিরে গেছে। গত ১০ বছর এ নিয়ে তেমন আলোচনার খবর আমাদের জানা নেই। এক সময়ে নওয়াজ শরিফ এদের পাকিস্তানে নিয়ে যেতে রাজি হলেও প্রচ- আপত্তি ছিল প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর। বেনজির এদের পাকিস্তানি না বলে বিহারি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন এরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, প্রায় ৫-৬ লাখ পাকিস্তানি নাগরিককে (সরকারিভাবে সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার) আমরা পাকিস্তানে যেতে অথবা পাকিস্তানকে গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারিনি। এসব পাকিস্তানি নাগরিক বিভিন্ন ক্যাম্পে (ঢাকা ও সৈয়দপুর) মানবেতর জীবনযাপন করেন। শিক্ষাদীক্ষাহীন এসব নাগরিকের কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন ঢাকার কালশীর যে এলাকায় তারা থাকেন এবং যেটা তাদের স্থায়ী ঠিকানা, এটা তাদের অপরাধ হতে পারে না। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এদের অনেকেই জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের নিজস্ব জমি থেকে উচ্ছেদের একটা ষড়যন্ত্রের কথা পত্রপত্রিকায় তখন প্রকাশ করা হয়েছিল। আর ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় তখন ছাপা হয়েছিল। বিহারিরা প্রকাশ্যেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না। যে তদন্ত হচ্ছে এক বছর ধরে তাতে প্রকৃত সত্য আদৌ বেরিয়ে আসবে কি না, আমার মতো অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে তাতে। তবে এই সংসদ সদস্য সম্পর্কে দৈনিক পত্রিকাটি আমাদের যে তথ্য দিয়েছিল (১৮ জুন ২০১৪) তাতে করে তার বিহারিদের ওই জমির ওপর লোলুপ দৃষ্টি থাকা অমূলক নয়। এই ব্যক্তি, যিনি রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন তার এসব অপকর্ম ঢাকতে। আমাদের দুঃখ এখানেই যে, এসব ‘ভূমিখোর’কে আমরা রাজনীতিতে সক্রিয় রেখেছি। দলের ছত্রচ্ছায়ায় ও প্রভাবে তারা নিজেদের পরিণত করেছেন এক একজন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবে’। একজন ব্যক্তি কী করে মিরপুরের গৃহায়নের দুয়ারীপাড়ার ৪৭৪টি প্লট, চিড়িয়াখানার ৩০০ কোটি টাকার সম্পত্তি, এমডিসি মডেল স্কুল, তুরাগ নদী কিংবা দুয়ারীপাড়ার জলাশয়ের জমি দখল করেন ভাবতেই অবাক হতে হয়। তার ক্ষমতার উৎস কোথায়? এই নষ্ট রাজনীতিই তাকে আজ এ জায়গায় নিয়ে এসেছে। একজন ইলিয়াস মোল্লা, নিজাম হাজারী কিংবা শামীম ওসমানের উত্থান তাই একই সূত্রে গাঁথা। তারা রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন তাদের সব অপকর্মের একটা সিঁড়ি হিসেবে। আর রাজনীতির কারণেই হয়তো দেখা যাবে হত্যাকা-ের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েও সবাই পার পেয়ে যাবেন। যদিও ওই সংসদ সদস্য তখন তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এক বছরেও তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়ায় জানা গেল না অনেক কিছুই।এই নষ্ট রাজনীতি আমাদের দেশে ত্যাগী রাজনীতিবিদদের জন্ম দিতে পারেনি। একুশ শতক উপযোগী যে শিক্ষিত, জ্ঞানী ও মেধাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ আমাদের দরকার, সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আমাদের তা উপহার দিতে পারছে না। রাজনীতি বেশি মাত্রায় পেশি ও সন্ত্রাসনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত নূর হোসেন কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-এ বিশ্বাস করেন, তারা নূর হোসেনের গ্রেপ্তারের একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেনÑ তিনি জেনেশুনেই কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাতে করে তাকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো সহজ না হয়। এটা সত্য, তাকে ঢাকায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া জটিল। এর সঙ্গে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া জড়িত। ভারতীয় আইনে তার বিচার হচ্ছে। শাস্তি হবে। তিনি সেখানে শাস্তি ভোগ করবেন। তারপর ফেরত পাঠানোর প্রশ্ন। তাই ৭ খুনের বিচার হবে, খুনিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবেÑ এটা আমরা আশা করতেই পারি। কিন্তু বাস্তবতা বড্ড কঠিন! আমার দুঃখবোধ ফেনীর ফুলগাজীর প্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হকের জন্য। তার হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত নিজাম হাজারী তখন ছিলেন সৌদি আরবে। এখন বাংলাদেশে। আর কালশী হত্যাকা-ে যার দিকে আঙুল নির্দেশ করা হয়েছিল, তার টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি কেউ। সংসদে তিনি আছেন দিব্যি, যদিও সংসদের কোনো আলোচনায় তিনি কখনো অংশ নিচ্ছেনÑ এ রকমটি আমার জানা নেই।কালশী হত্যাকা- আমাদের আস্থার জায়গায় একটা ক্ষত সৃষ্টি করেছে। রাজনীতিবিদ তথা জনপ্রতিনিধিরা নানা বিতর্কে নিজেদের জড়িত করে একটা বড় ধরনের আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছেন। এর বিচার যদি না হয়, তাহলে ‘আরেকটা কালশী’র জন্ম হবে। আরও একটা হত্যাকা- হবে, যা আমরা রোধ করতে পারব না। কালশী হত্যাকা- আমাদের বেশকিছু আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিহারিরা বাংলাদেশে থাকলেও এরা পাকিস্তানের নাগরিক। ফলে পাকিস্তানের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সোচ্চার হতে পারে! এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশবিরোধী একটি প্রোপাগান্ডায় নামতে পারে। তাতে করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং সেখানকার মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেকদিন থেকেই সোচ্চার। আগামীতে কালশীর হত্যাকা-কে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসে বিষয়টি যদি বাংলাদেশবিরোধী শক্তিগুলো উত্থাপনের চেষ্টা করে, আমি তাতে অবাক হব না। যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের যে সাহায্য পাওয়ার কথা, তাতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কালশী হত্যাকা- নিয়ে সংসদের যে ভূমিকা পালন করার কথা, সংসদ তা পালন করেনি। ফলে নয়া নির্বাচনের পক্ষে জনমত আরও শক্তিশালী হবে। সরকারি দলে একাধিক বিতর্কিত ব্যক্তি থাকায় সরকারি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ তখন ভাবমূর্তি-সংকটে পড়বে। দলটির জনপ্রিয়তাও এতে করে হ্রাস পেতে পারে! দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যত দ্রুত এই বিষয়টি উপলব্ধি করবেন, ততই দলের জন্য মঙ্গল। কালশী হত্যাকা-ের বিচার হোক। অন্তত একটি ক্ষেত্রে হলেও যেন আমরা বলতে পারি, ‘আমরা পেরেছি’। শুধু বিহারি বলে, ভিন্ন ভাষায় কথা বলে বিধায়, এই হত্যাকা-ের বিচার যদি না হয়, তাহলে তা হবে চরম মানবতা লঙ্ঘনের শামিল। আর একজন ব্যক্তি যখন দলকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেন, তখন দল এ ক্ষেত্রে উপকৃত হয় না। দলের জন্য তিনি হয়ে যান বোঝাÑ দলের নীতিনির্ধারকরা দ্রুত যদি এটা বোঝেন, তাতে সবার মঙ্গলই নিহিত। এক বছর পর কালশী হত্যাকা- নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে এসব হত্যাকা-ের বিচার না করে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছি, তা দেশ ও জাতির কোনো মঙ্গল ডেকে আনছে না Daily Amader Somoy 20.06.15

মোদির সফরে কী পেল বাংলাদেশ


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুদিনের ঢাকা সফরের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল? এই সফরকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, কিংবা কানেকটিভিটি এই তিন আলোকেই আমরা যদি মোদির এই সফরকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব পাল্লাটা ভারতের দিকেই বেশি হেলে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০০ কোটি ডলারের একটি আশ্বাস পেয়েছে। ভারতীয় অর্থে বাংলাদেশি বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। যেমন একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চারলেনে উন্নীত করা হবে। এই ঋণ প্রকল্পের আওতায় ৫০০টি ভারতীয় বাসও কেনা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ নাকি ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে? এই সড়কে ভারতীয় বাস চলাচল করে। তথাকথিত কানেকটিভিটির আওতায় ভারতীয় বাস এখন কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতরে আশুগঞ্জ হয়ে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা যাবে। তাতে লাভ হলো ভারতেরই। বাস কেনা হবে ভারতীয়। চলবে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা শহর কি এখন এসব গাড়ি ধারণ করার ক্ষমতা রাখে?

এমনিতেই যানজটে মানুষ অসহায়। রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। ঢাকার বাইরে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। সে ক্ষেত্রে গাড়ি চলার সুযোগ কোথায়? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিআরটিসির শত শত গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ এগুলো সারিয়ে তুলে চলাচলের উপযুক্ত করা যেত। তা
অদৃশ্য কারণে বিআরটিসি করেনি। এখন আবার নতুন করে গাড়ি ক্রয় করা হবে। ভারতীয় ঋণের একটা সমস্যা হচ্ছে এই ঋণ নেওয়া হয় সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট-এর আওতায়, যেখানে ভারতীয় ঋণ থাকে বেশি। আমি দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়ায় বলে আসছি, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কোনো ভালো ঋণ না। এতে করে ঋণ দেওয়া দেশের কাছে (এ ক্ষেত্রে ভারত) ঋণগ্রহীতা দেশের পরিপূর্ণ দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। ভারত যে দ্বিতীয়বারের মতো সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ দিল, তাতে বাংলাদেশ নয় বরং ভারতীয় ঋণই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের, আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এই ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার) তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। আবার এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনো বলি না সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত (তারা ... বার্টার ট্রেড করত। আমাদের পণ্য নিত বিনিময়ে)। ভারত কিন্তু তা করবে না।
মোদির সফরের প্রাক্কালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। যেমন বলা যেতে পারে, তিস্তাসহ সকল নদীর পানি ... বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, ভারতের স্থলবন্দরগুলোতে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, এলসি ওপেন করার ব্যাপারে ভারতের সাতবোন রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকগুলোতে সুযোগ দান, কান্ট্রি অব অরিজিন-এর ঝামেলা দূর করা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভিসা সহজীকরণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করা। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে কম। তবে ৬৫ দফা যৌথ ... কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছি, যা আমাদের আশান্বিত করেছে। যেমন বলা যেতে পারে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কথা। যৌথ ঘোষণায় ২১ নম্বর দফায় এটা বলা হয়েছে যে ভারত সাংবিধানিক কারণে এখন আর এ প্রকল্পে অগ্রসর হবে না। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। কেননা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ছিল। এ ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন কিন্তু থাকলই আর তা হচ্ছে এরই মধ্যে সেখানে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, তার কী হবে? আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল। এখন যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। ভারত যদি সত্যিকার অর্থে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে না যায়, আমার ধারণা তাতে করে ভারত একদিকে যেমনি উপকৃত হবে, ঠিক তেমনি উপকৃত হবে বাংলাদেশও। কেননা ভারতের পরিবেশবাদীরাও এই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তবে একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার আর তা হচ্ছে আন্তনদী সংযোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশ একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এটির নামকরণ করা হয়েছে বিবিআইএন। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত (সাতগেজ রাজ্য) এবং নেপালের সহযোগিতায় একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা সম্মেলনে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। এ ধরনের একটি উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল। তারই মতবাদ পরবর্তীকালে ‘গুজরাল ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এখন নরেন্দ্র মোদি নতুন আঙ্গিকে এটি নিয়ে এলেন। বাংলাদেশ ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনেও সমর্থন দিয়েছে। এটা যৌথ ঘোষণায় আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জাপানের ক্ষেত্রেও একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চায়। জাপানে আমাদের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। জাপানকে বাদ দিয়ে আমরা এককভাবে ভারতকে যদি শুধু এ পদে সমর্থন দিই, তাহলে বিতর্ক বাড়বে এবং জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে থাকবে।
 এনটিভি অনলাইন, ১৪.০৬.২০১৫

মোদির ঢাকা সফর ও চীন ফ্যাক্টর


মোদির ঢাকা সফর শেষ হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু যে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে কম, তা হচ্ছে একটি 'চীনা ফ্যাক্টর' তার এই সফরের পেছনে কাজ করছিল। অর্থাৎ এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করার একটা স্ট্র্যাটেজি নিয়েই মোদি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার ব্যাপারে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ অনেক দিনের। এখানে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের বর্তমান সরকারের সম্পর্কও ভালো। প্রধানমন্ত্রী চীন থেকেও ঘুরে এসেছেন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চীনের একটা অলিখিত প্রভাব রয়েছে। সেনা অফিসারদের একটা অংশ চীনে প্রশিক্ষিত। বিমানবাহিনী চীনা বিমানে সুসজ্জিত। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটা ভালো চোখে দেখছেন না। এ অঞ্চলে অন্য কেউ প্রভাব খাটাক এটা ভারত চায় না। শ্রীলঙ্কায় চীনের খুব কাছের বন্ধু প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসেকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত, ভুটানে চীনা দূতাবাস খোলার ব্যাপারে আপত্তি এবং নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে ভারতের অসন্তুষ্টি প্রমাণ করে ভারত চীনকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছে না। বলাই বাহুল্য, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা পণ্যের বিশাল এক 'বাজার' সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য জায়গা করে নিতে পারছে না। 'বাজার' ধরে রাখার ব্যাপারে চীন ও ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন আগের চেয়েও স্পষ্ট। তবে এটাও সত্য, চীনের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে মোদির একটি আগ্রহ রয়েছে। যখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন একাধিকবার তিনি বেইজিং সফর করেছেন এবং 'চীনা মডেলে' আগ্রহান্বিত হয়েছিলেন। গুজরাটে বড় চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। উপরন্তু গেল বছরের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট তাঁর ভারত সফরে নয়াদিল্লি না নেমে সরাসরি আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে নেমেছিলেন। এবং সব প্রটোকল ভেঙে নরেন্দ্র মোদি তাঁকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। তাই চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ব্রিকস ব্যাংক গঠনের উদ্যোক্তা এই দুটি দেশ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি মার্কিন ডলার, যা কি না চলতি বছর ১০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে চান উভয় দেশের নেতারা। যদিও এটা সত্য, বাণিজ্য ঘাটতি ২০০১-০২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ১০০ কোটি ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার কোটি মার্কিন ডলারে। এখন এই বাণিজ্য ব্যবধান কিভাবে কমিয়ে আনা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাবকে কিভাবে সংকুচিত করা যায় সে চেষ্টাই নরেন্দ্র মোদি করবেন। এটা তাঁর বৈদেশিক নীতির অংশ। তবে কতটুকু তিনি সফল হবেন, এ প্রশ্ন থাকবেই। কেননা ভারতের অনেক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যেই চীনা নেতারা তাঁদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত 'ইন্ডিয়ান ওসেন রিম' বা আইওআরের একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারতের ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে গত ২০-২২ মার্চ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত মহাসাগরভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া আইওআরের সদস্য। এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এমন একটি সময়, যখন ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজাচ্ছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই সঙ্গে এশিয়ায় ভারতকে অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। ইতিমধ্যে মালদ্বীপ ও পাকিস্তান বাদে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ সফর করেছেন। তাঁর পররাষ্ট্রসচিবও 'সার্ক যাত্রার' অংশ হিসেবে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশ সফর করেছেন। ভুবনেশ্বর শীর্ষ সম্মেলনের আগে নরেন্দ্র মোদি মরিশাস, সিসিলি ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। মরিশাসে সফরের সময় সে দেশের সঙ্গে সেখানে একটি ভারতীয় নৌ ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার, ভারত ভারতীয় মহাসাগরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ ব্যাপারে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি মৈত্রী জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। এবং ওই জোটে মরিশাস ও সিসিলিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ মধ্যাঞ্চলের সিসিলি, মরিশাস কিংবা সুদূরের ওমান-মোজাম্বিকও এই প্রক্রিয়ায় একীভূত হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ভারত তাই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে অন্যতম শক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে চায়। এ ক্ষেত্রে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। চীন যে তার 'মেরিটাইম সিল্করুট'-এর কথা বলছে, সেই 'সিল্করুট'-এর সঙ্গে ভারতের এই অর্থনৈতিক স্বার্থ সাংঘর্ষিক। চীন ও ভারতের স্বার্থ মূলত এক ও অভিন্ন-ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজ নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন রীতিমতো ভস্মের মুখে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গেল সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফর ও আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের সেই পঞ্চাশের দশকের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিলেও অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে অতিসম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি (২০১৫) প্রধানমন্ত্রী মোদি অরুণাচল সফর করেন। সেখানে তিনি রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল চীন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে তখন বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির অরুণাচল সফরকে সমালোচনা করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, চীনা সরকার কখনোই 'অরুণাচল প্রদেশ'কে স্বীকৃতি দেয়নি। বেইজিংয়ের মতে, চীনের অন্তর্গত তিব্বতের মারিযুল, লোয়ুল ও নিম্ন সায়ুল এলাকা নিয়ে অরুণাচল প্রদেশ গড়েছে নয়াদিল্লি। ওই এলাকাগুলো এখনো ভারতের 'বেআইনি দখলদারি'র কবলে রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অভিমত সংগত কারণেই দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুজিও কিসিদা ভারতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি অরুণাচল প্রদেশ যে ভারতের, সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিসিদার ওই বক্তব্যে চীন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। চীন মনে করে, ভারত জাপানকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি চীনও সফর করেছেন। কিন্তু তাতে করে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক বেড়েছে, এটা বলা যাবে না। চীন গভীর আগ্রহের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির 'নেইবারডে পলিসি' অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে পর্যবেক্ষণ করছে। মোদির ঢাকা সফরও এই পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ যায়নি। গত ৮ জুন মোদির ঢাকা সফরের পর ভারতীয় পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমস একটি চীনা পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে। সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া মন্তব্য করে যে মোদি তাঁর ঢাকা সফর শেষ করেছেন বাংলাদেশকে তিস্তার পানি বণ্টনে 'তৃষ্ণার্ত' রেখে ও 'হতাশায়' রেখে। সিনহুয়ার প্রতিবেদনে ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার জন্য মোদি যে অভিযুক্ত হয়েছিলেন, সে কথাটাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ২৮ মে নয়াদিল্লি থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন সঞ্জীব মিগলানি। ওই প্রতিবেদনে এটা উল্লেখ করা হয়েছিল যে মোদি ঢাকা যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর মাথায় আসছে চীনের প্রসঙ্গটি। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে চীনের ওপর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নির্ভরশীলতার কথা।
স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন বিশ্বে যে অস্ত্র বিক্রি করে, বাংলাদেশ সেই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৯ সালের মধ্যে চীন থেকে ২১৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি সাবমেরিন ক্রয় করবে, এমন তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের 'মুক্তার মালা' স্ট্র্যাটেজির আওতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, এমন একটি আশঙ্কা ভারতের ছিল, যা টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে। ফলে মোদির ঢাকা সফরের সময় এই 'চীনা কার্ডটি' যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তবে এটাও সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা এমন ধারণা রাখেন এবং জানেন চীনের বৈদেশিক নীতি এখন বিনিয়োগ ও ব্যস্ততানির্ভর। চীনারা কোনো দেশে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। চীনারা ব্যবসা বোঝে। ব্যবসা চায়। মোদি সরকারও একটি 'ব্যবসা ও বিনিয়োগনির্ভর' নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতে যথেষ্ট চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। দুই দেশই চাইবে তার নিজ নিজ স্বার্থ আদায় করে নিতে। আগামী শতাব্দী হবে চীন ও ভারতের। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি আর ভারত তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অর্থনীতি। ফলে ওই দুটি বড় অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক যদি ভালো থাকে, তাহলে তা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্যও মঙ্গল। এ জন্যই বেইজিংয়ে মোদি দুই দেশের সম্পর্ককে একুশ শতকের মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এখন দেখার পালা, এই 'মাইলফলক' বক্তব্যটির বাস্তবে কতটুকু প্রতিফলন ঘটে। চীনারা সাধারণত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলায় না, তারা হস্তক্ষেপও করে না, যা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা করে। ফলে এখানে দুই দেশের অ্যাপ্রোচের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। একটা মিল অবশ্যই আছে আর তা হচ্ছে-দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যনির্ভর ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়েছে বেশি। এ জন্যই এক ধরনের 'প্রতিযোগিতা' থেকে যাবেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে নিঃসন্দেহে এটা বলা যায়, মোদির ঢাকা সফর একটি বিশাল প্রত্যাশা জাগিয়ে শেষ হয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগনির্ভর বেশ কিছু চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশে ভারতের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। যদিও এটা সত্য, বাংলাদেশের অনেক আশাই এই সফরের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়নি। কৌশলগত দিক দিয়ে মোদির এ সফর একটি সফল সফর। তিনি বাংলাদেশি নেতাদের আস্থায় নিতে পেরেছেন। এতে করে বাংলাদেশে চীনা প্রভাব হ্রাস ও চীনের নয়া নেতৃত্ব যে 'ওয়ান রোড, ওয়ান বেল্ট' কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা হ্রাস পেলেও, অতীতে বাংলাদেশ চীন ও ভারতকে ব্যালেন্স করে একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করলেও, মোদির সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কটি কিছুটা হলেও ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মোদির বাংলাদেশ সফরের সাফল্য এখানেই।

কানেকটিভিটি : আমরা কোন পথে এগোবো?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরিত একটি ঘোষণা আমার বিবেচনায় যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। যে ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার ৪১নং ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, উভয় প্রধানমন্ত্রী বিবিআইএনের (BBIN) আওতায় বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও কানেকটিভিটি খাতে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছেন। এই বিবিআইএন হচ্ছে ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত (সাত বোন রাজ্য) ও নেপালকে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে এরই মধ্যে ঢাকা-শিলং-গৌহাটি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। আগামীতে খুলনা-কলকাতা এবং যশোর-কলকাতা বাস সার্ভিসও চালু হবে। কলকাতা-খুলনার মধ্যে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চালুরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। রামগড়-সাবরুম সেতু নির্মাণ করছে ভারত। ফলে আগরতলার পণ্য পরিবহনে এখন এই সেতু ব্যবহার করে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে ভারত আগামীতে মংলা বন্দরও ব্যবহার করতে পারবে, যে কারণে খুলনা-মংলা সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ভারত প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ৯২ কনটেইনার পণ্য তাদের তিনটি বন্দর- চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা বন্দরে নিয়ে গেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনো শুল্ক আদায় করেনি। এর সবই হচ্ছে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। গত ১৫ জুন বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল আর ভুটানের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে একটি চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে আগামী বছরের শুরুতে এ চারটি দেশের মাঝে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলাচল করতে পারবে। তবে ট্রানজিট ও চলাচলের অনুমতি সংক্রান্ত ফি নির্ধারণ হবে আলোচনার মাধ্যমে।
ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট বা কানেকটিভিটি- আমরা যে নামেই বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করি না কেন, মূল বিষয় হচ্ছে একটি- এই মুহূর্তে ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন। আর এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ড। বিশ্বের অন্য অঞ্চলের কানেকটিভিটি ঠিক এমনটি নয়। সেখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সড়ক, নৌ অথবা রেলপথে যাওয়া যায়। আমরা প্রায়ই ইউরোপের কথা বলি। এটা সত্য, সড়ক পথে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যায়। আমি জার্মানি থেকে ইংল্যান্ড গেছি বেলজিয়ামের ওপর দিয়ে। সেখানে শুল্ক দিতে হয়। আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করেই শুল্ক নির্ধারণ হবে। অর্থাৎ শুল্ক এখন অবধি নির্ধারিত হয়নি। এরই মধ্যে দুই রুটে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তবে পুরো উদ্যমে এই সার্ভিসটি চালু হতে আরও ২-৩ মাস লাগবে। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। এক. বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যে উন্নতি করতে হবে, তার ব্যয়ভার কে বহন করবে? দুই. এই দুই রুটে কি বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব বাস চালাতে পারবে?
প্রশ্নগুলোর জবাব এরই মধ্যে আমরা অনেকেই পেয়ে গেছি। এক্ষেত্রে পাঠকদের কিছু তথ্য দিতে চাই। ২০১২ সালে ট্যারিফ কমিশনের দেয়া রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে (যা কানেকটিভিটির জন্য প্রয়োজন হবে) প্রয়োজন হবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রেলপথে ব্যয় হবে ১৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা, সড়কপথে ৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, নৌপথে ৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, মংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে বাকি ৪৮৯ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের হার আরও বাড়বে। এতে বাংলাদেশের লাভ কতটুকু? পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, ভারতের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ ৭৬ থেকে সর্বনিু ১২ শতাংশ খরচ সাশ্রয় হবে। লাভটা ভারতের বেশি, আমাদের কম। কিন্তু ব্যয়ভার আমাদের। বিআইডিএসের গবেষক কেএএস মুরশিদ তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ লাভ সীমিত। তবে বিনিয়োগটা করতে হবে বাংলাদেশকেই। মোদির ঢাকা সফরের সময় ভারত যে আমাদের ২০০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব দিয়েছে, তার একটা অংশ ব্যয় হবে এ খাতে। বাংলাদেশকে সুদসহ মূল টাকা ফেরত দিতে হবে। এই ঋণের ধরন নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠলেও প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং জানিয়ে দিয়েছেন, এই ঋণের সঙ্গে কোনো শর্ত যুক্ত নেই। আমরা আশ্বস্ত হয়েছি বটে, কিন্তু ভারতের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদুভেন্দ্র মাথুরের বক্তব্য যখন টাইমস অব ইন্ডিয়ায় পড়ি (যা বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে), তখন কিছুটা খটকা লাগে বৈকি! মাথুর উল্লেখ করেছেন- ভারত যে ঋণ দেয়, এই ঋণচুক্তির শর্তানুযায়ী ঋণের অর্থে নেয়া প্রকল্পগুলোর অন্তত ৭৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে নিতে হবে। এসব পণ্য ও সেবার উৎপাদন প্রক্রিয়া হবে ভারতেই। শুধু বাংলাদেশই নয়, এই শর্তে নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপও মোট ৬০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। আর টাইমস অব ইন্ডিয়া আমাদের জানাচ্ছে, নতুন ঋণের টাকায় বাংলাদেশে নেয়া প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে ভারতে নতুন করে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
আমরা কানেকটিভিটির বিরুদ্ধে নই। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। এখানে আমরা আমাদের স্বার্থ দেখতে চাই। আমরাও চাই সড়কপথে আমাদের পণ্য নেপাল ও ভুটানে যাক। চুক্তি একটা হয়েছে বটে, তাতে আমরা কতটুকু উপকৃত হলাম- এর হিসাব-নিকাশ করা যাবে আরও কিছুদিন পর, যখন পুরোদমে কানেকটিভিটি কার্যকর হবে। এটি যদি শুধু দুপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলেই প্রশ্ন উঠবে। কানেকটিভিটির আওতায় আমরা চীনের কুনমিংও যেতে চাই। কিন্তু তা কি সম্ভব হবে আদৌ?
এই দ্বিপক্ষীয় কানেকটিভিটি ও থিম্পুতে চারদেশীয় মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট (এমভিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ভারত চারদেশীয় উপ-আঞ্চলিক জোট বিবিআইএনকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন সার্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে কি-না, এটা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এটাও একটা প্রশ্ন যে, ভারত বিবিআইএনকে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় ও তা কার্যকর করায় বিসিআইএম জোটের ভবিষ্যৎ কী? ভারত কি এখন চাইবে বিসিআইএম নিয়ে এগিয়ে যেতে। বিসিআইএম হচ্ছে অপর একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই জোটে আছে বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ভারত (সাত বোন রাজ্য) ও মিয়ানমার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে তার চীন সফরের সময় এই বিসিআইএম করিডোরের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এটাকে অনেকে কুনমিং উদ্যোগও বলেন। এখানে চীনের স্বার্থ বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশেরও স্বার্থ রয়েছে।
চীন ২০০৩ সালে প্রথম কুনমিং উদ্যোগের কথা বলেছিল, যা পরিবর্তিত হয়ে বিসিআইএম নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার, ভারত এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়ার পরই এই জোটের ধারণা শক্তিশালী হয়। এ জোটটি কার্যকর হলে কুনমিং (ইউনান প্রদেশের রাজধানী) থেকে সড়কপথে বাংলাদেশ ও ভারতেও আসা যাবে এবং পণ্য আনা-নেয়া যাবে। এর ফলে চীনা পণ্যের দাম কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালের মধ্যে আসিয়ানে সৃষ্টি হচ্ছে মুক্তবাজার, যার ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য প্রবেশাধিকারের পথ সহজ হবে। বিসিআইএমের আওতায় কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক হবে। তিনটি রুটে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত সংযুক্ত হবে। নর্থ রুটে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মিতকিহা হয়ে ভারতের লেদো পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। এ রুটে বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে না। এই রুটটি অনেক কঠিন। সাউথ রুটে ইউনান থেকে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর সোনাদিয়া পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। কুনমিং, মান্দালয় (মিয়ানমার) ও অ্যাওয়ে (মিয়ানমার) হয়ে এই রুটটি চট্টগ্রামে প্রবেশ করবে। পরে ঢাকা হয়ে কলকাতা যাবে। এখন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির কারণে) এই প্রস্তাবিত রুটটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তৃতীয় প্রস্তাবিত রুটটি হচ্ছে মিডল রুট। এই রুটটি ভালো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটাই প্রাচীন সিল্ক রুট। কুনমিং-ভামো-লাশিও-তামু (মিয়ানমার)-ইমফল (ভারত)-সিলেট-ঢাকা ও কলকাতা হচ্ছে এই রুট, যা কি-না ক২ক নামেও পরিচিত। অর্থাৎ কুনমিং থেকে কলকাতা। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, এই রুটে (২৮০০ কিলোমিটার) একটি মোটর র‌্যালি (২০১৩) চালু হয়েছিল।
বিসিআইএম জোটের সম্ভাবনা ছিল বিশাল। কারণ এই চারটি দেশের রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ (মিয়ানমার), রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি (চীন ও ভারত), রয়েছে শিল্প (চীন), শক্তিশালী সার্ভিস সেক্টর, রয়েছে বিশাল অব্যবহৃত জমি (মিয়ানমার) এবং সমুদ্রবন্দর (বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার)। ফলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে আগামীতে, যদি বিসিআইএম জোটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি তো বটেই, বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেকাংশে প্রভাবিত করতে পারে এই জোট। এই চারটি দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বিশ্ব জিডিপির ১০ ভাগ। ১৯৯১ সালে বিসিআইএমের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল যেখানে ১.২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১১ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৯০.২১ বিলিয়ন ডলারে। ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা আর ২৮৮ কোটি মানুষের বাস এই বিসিআইএম জোটভুক্ত দেশগুলোতে। পূর্বে রয়েছে কুনমিং আর পশ্চিমে কলকাতা। ভেতরে মান্দালয় আর ঢাকা। ভারত এ জোটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল এ কারণে যে, এতে করে আগামী দিনে ভারতের আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া সহজ হবে। ভারত ২০০৭ সালে আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এরই মধ্যে ভারত আসিয়ানের ডায়লগ পার্টনারের মর্যাদা লাভ করেছে (বাংলাদেশের অবস্থান আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামে)। ডায়লগ পার্টনারের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে পূর্ণ সদস্য। তাই এ জোটের ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ ছিল, যাতে করে দেশটি তার পণ্য নিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করে আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করতে পারে। এখন নরেন্দ্র মোদি সরকার বিসিআইএম নিয়ে আদৌ এগিয়ে যাবে কি-না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তার আগ্রহ বেশি বিবিআইএন জোট নিয়ে। ফলে বিসিআইএম জোট নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেল।
এরই মধ্যে আমরা লক্ষ করেছি, ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীন এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, নৌ তৎপরতা এবং জিবুতিতে একটি নৌঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ, এমনকি হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলংকায় সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এমনকি ভারত মহাসাগরভুক্ত সিসিলি, মরিশাসে ভারত নৌঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-এর যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে ৬০ দেশকে তিনি চীনের প্রভাব বলয়ের আওতায় আনতে চান। এর মধ্যে ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোও রয়েছে। এটা সেই পুরনো সিল্ক রোডেরই আধুনিক সংস্করণ। ভারত এতে উদ্বিগ্ন। ফলে ভারত তার সেই পুরনো কটন রুট নিয়েই চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হলেও এই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেশ দুটির মাঝে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করবে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও প্রভাবিত হতে বাধ্য। তাই বিবিআইএন জোট নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হলেও এ অঞ্চলে ভারতীয় কর্তৃত্ব বাড়বে। চীনের প্রভাব এর মাঝ দিয়ে সংকুচিত হবে। তাই খুব স্পষ্ট করেই বলা যায়, বিসিআইএম জোটের বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখানে চীনের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়বে, এটাই মনে করেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা। ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাবে না ভারত। আর বাস্তবতা হচ্ছে, বিবিআইএন বিকশিত হলে সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে এবং সার্ক একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হবে মাত্র। 
দৈনিক যুগান্তর, ১৮ জুন, ২০১৫

১৮ জুন, ২০১৫