রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

জিএসপি সুবিধার পাশাপাশি টিপিপি চুক্তি নিয়েও ভাবতে হবে

খবরটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১২২টি দেশের জন্য জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধা পুনর্বহাল হলেও তাতে বাংলাদেশের নাম নেই। এরই মধ্যে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে টিপিপি বা ট্রান্সপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনা শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে পারবে। এর অর্থ পরিষ্কার-যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তা এখন দখল করে নেবে ভিয়েতনাম। আর তখন বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাবে। এমনিতেই বাংলাদেশি তৈরি পোশাকশিল্প প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর থেকেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড ইউনিয়ন ও সেই সঙ্গে বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে গিয়েছিল, যা কি না জিএসপি সুবিধা বাতিলের ব্যাপারে একটা 'ভূমিকা' রেখেছিল। যদিও এটা সত্য, প্রায় ১৬ শতাংশ (১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ) শুল্ক পরিশোধ করেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের বাজার সৃষ্টি করেছি। এখন টিপিপি চুক্তির ফলে ভিয়েতনাম শুল্কমুক্তভাবে তাদের তৈরি পোশাক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যাবে। ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ইতিমধ্যেই চীনের পর ভিয়েতনাম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বড় রপ্তানিকারক। এখানে একটা কথা বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছুদিন ধরেই প্যাসিফিক অঞ্চলভুক্ত ১১টি দেশের সঙ্গে টিপিপি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছিল। এই দেশগুলো হচ্ছে-অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। এ আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। তবে এই টিপিপির বিরুদ্ধে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই একটি বড় বিরোধিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে এই ১২টি দেশ বিশ্বের ৪০ শতাংশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। অভিযোগ আছে, বড় বড় করপোরেট হাউসগুলো এই চুক্তি থেকে লাভবান হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট হাউসগুলো ব্যাপক সম্প্রসারিত হবে। বিশেষ করে গ্যাট চুক্তিতে TRIP বা Trade Related Intellectual Property Rights-এর আওতায় উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশ (বাংলাদেশসহ) নিজস্ব 'প্যাটেন্ট' আইনের আওতায় উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছিল। টিপিপিতে 'বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা' অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখন বহুজাতিক কম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে উন্নত প্রযুক্তি খরিদ করতে হবে। কৃষি খাত ও ওষুধ শিল্প এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। টিপিপি চুক্তিতে এমন কথাও বলা আছে যে বহুজাতিক কম্পানিগুলো টিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত যেকোনো জাতীয় সরকারের বিরুদ্ধে Investors- state dispute settlement (ISDS)-এর আওতায় মামলাও করতে পারবে। বলা আছে, সরকারগুলো এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, যাতে টিপিপির মূল স্পিরিটকে আঘাত করে। টিপিপি মূলত একটি 'ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট' হলেও মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কর্তৃত্ব ও প্রভাব এতে স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্রের এই করপোরেট স্বার্থই এখানে বড়। এমনকি টিপিপি চুক্তির ‘legislative certification’-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ওই সব দেশের আইনও বদল করতে পারবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক ছিল। চিলির মতো দেশও আপত্তি জানিয়ে আসছিল। এই ১২টি দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা (যাঁদের মধ্যে সংসদ সদস্যও আছেন) একটি খোলা চিঠিতে এই চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। অনেকে বলার চেষ্টা করেছেন যে এ চুক্তিটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও পরিপন্থী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তথাকথিত 'মুক্ত বাণিজ্য' আর পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের 'লোভে' ভিয়েতনামের মতো দেশও এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ছূড়ান্ত বিচারে এ চুক্তির টার্গেট হচ্ছে বিশ্ববাজারে তথা যুক্তরাষ্ট্রে চীনের 'বাণিজ্যিক আধিপত্য' কমানো। ভিয়েতনাম তখন নিজের স্বার্থেই এই চুক্তি স্বাক্ষর করল। পরিসংখ্যান বলছে, তৈরি পোশাকে ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়ছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ হারে। টিপিপির ফলে এটা আরো বাড়বে। ২০১৫ সালেই ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি খাতে ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ভিয়েতনাম ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক রপ্তানি ৫০ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া আট হাজার ১৭৮ কোটি ডলারের মধ্যে চীনের দুই হাজার ৯৭৯ কোটি ডলার। তার পরের অবস্থানই ভিয়েতনামের, ৯২৬ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া রয়েছে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে। চতুর্থ ও পঞ্চম যথাক্রমে মেক্সিকো ও ভারত। দেশ দুটির রপ্তানি যথাক্রমে ৩৭৩ ও ৩৪০ কোটি ডলার। বিজিএমইর দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৪ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪৮৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি (যুক্তরাষ্ট্রে) কমেছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আমাদের শঙ্কার কারণটা এখানেই। এমনিতেই যখন জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল হলো না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষর করল। এ ক্ষেত্রে টিপিপির ফলে আমাদের তৈরি পোশাক খাত যে ঝুঁকির মুখে আছে, তা আমরা কিভাবে কাটিয়ে উঠতে পারব, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
জিএসপি সুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার শর্ত কার্যকর করতে রাজি হয়েছিল। এতে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে অনুন্নত বিশ্ব পশ্চিমা উন্নত দেশে তাদের পণ্যের আওতা বাড়াতে পারবে। তবে একটা প্রশ্ন ছিল, পণ্যের মান ও উৎস নির্ধারণ নিয়ে। এই দুটো বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে। হংকং সম্মেলনের দীর্ঘ আট বছর পর ৩-৭ ডিসেম্বর ২০১৩ ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সর্বশেষ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক)। বালি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বটে; কিন্তু 'বালি ঘোষণায়' কোন পক্ষ কী পেল কিংবা বাণিজ্য বৈষ্যমের শিকার অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে এ প্রশ্নগুলোই আবারও উত্থাপিত হয়েছে। আমাদের জিএসপি সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাকে কোনো জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে না। তার পরও অন্যান্য পণ্যে যতটুকু সুবিধা পেত বাংলাদেশ, তাও ২০১৩ সালের জুন থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এক. শ্রমমান, দুই. শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পুনঃ তদন্ত ও বিচার। তিন. ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র আকার-ইঙ্গিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ 'রুলস অব অরিজিন'-এর কঠিন শর্তে আটকে আছে। ধনী দেশগুলো এটা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৬১.৩ শতাংশ জিএসপি সুবিধার আওতায়। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে বাংলাদেশ। বলা ভালো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৭৮ শতাংশ হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই তৈরি পোশাকের ৬০ শতাংশ যায় ইউরোপে, আর ২৫ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তৈরি পোশাক আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস হলেও এ খাতের সঙ্গে জড়িত নানা 'প্রশ্ন'-এর ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা ও বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করতে পারেনি। দরকষাকষিতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আমলানির্ভর আমাদের মন্ত্রণালয়ের আমলারা 'বিদেশ সফর', 'সম্মেলনে অংশগ্রহণ' ইত্যাদিকেই প্রাধান্য দেন বেশি। এখানে দক্ষ জনশক্তির বড় অভাব। বিজিএমইএ-তারাও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাদের গবেষণা 'সেল'ও শক্তিশালী নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে 'রুলস অব অরিজিন', 'এন্টি ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা', 'প্রেফারেন্স ইরোসন', শ্রমমান ইত্যাদি নানা টেকনিক্যাল প্রশ্ন জড়িত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়ও আমরা এসব প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে যেতে পারিনি।
২৮ এপ্রিল ২০১৪ ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠক শেষ হয়েছিল। এতে আমাদের প্রাপ্তি কী ছিল? আমাদের প্রাপ্তির খাতাটা ছিল 'শূন্য'। জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো 'কমিটমেন্ট' ছিল না। যদিও তখন বলা হয়েছিল, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমস্যার সমাধান করাই টিকফার লক্ষ্য। এটা একটা 'কূটনৈতিক জবাব'। যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা চুক্তির ১৬ অনুচ্ছেদের সবগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মহলে ইতিমধ্যে উঠেছে, তার কোনো সুস্পষ্ট জবাব আমরা পাইনি। টিকফা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের ট্যাক্স সুবিধা দেবে। তাতে আমরা কতটুকু সুবিধা পাব? যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে বাংলাদেশ। তাতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু অর্জিত হবে? যুক্তরাষ্ট্র টেলিকমিউনিকেশন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করবে। এতে এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। তাতে কী সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? সেবা খাত কী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে থাকবে। বিশ্বের ৮৭টি দেশে আমরা ওষুধ সরবরাহ করি। এটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জিএসও ফুড নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বিতর্ক আছে। বহুজাতিক কম্পানিগুলো বাংলাদেশে জিএসও ফুডের বাজার সৃষ্টি করতে পারে, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। টিপিপি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, তার কোনো সুষ্ঠু গবেষণা এখনো হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কতটুকু সচেতন, আমি নিশ্চিত নই। এখন জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল না হওয়ায় টিপিপি চুক্তিটিও আমাদের জন্য কোনো 'বিষফোড়া' হিসেবে সৃষ্টি হয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়। জিএসপি পুনর্বহাল না হওয়ায় বাণিজ্যমন্ত্রী এটাকে 'রাজনৈতিক কারণ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক কারণ জড়িত নয়। বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যে ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা পেশ করেছিল, তার সবই বাস্তবায়ন হয়েছে-এটা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো। এখন আমাদের টিপিপি নিয়েও সিরিয়াসলি ভাবতে কবে। বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও তাঁর কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু বরফ গলেনি। তৈরি পোশাকের জন্য নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক তথা আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাটা তাই জরুরি। Daily Kalerkontho 19.08.15

ভবিষ্যতের পথ মসৃণ নয়

গত ১৪ আগস্ট ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মাঝে ‘নয়া সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি দিন। ওইদিন কিউবার রাজধানী হাভানায় দীর্ঘ ৫৪ বছর পর আবারো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানো হয়। ১৯৬১ সালে এই পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়েছিল। আবার এই পতাকা উঠল। গত ডিসেম্বর (২০১৪) থেকেই দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। ১৭ ডিসেম্বর বারাক ওবামা পুনরায় কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার কথা বলেন। এরই ফলে ২১ জানুয়ারি থেকে আলোচনা শুরু হয় এবং গত ২০ জুলাই ওয়াশিংটনে কিউবা তার দূতাবাস খোলে। এর আগে গত ১২ এপ্রিল (২০১৫) মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় আমেরিকান দেশগুলোর তিনদিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলনে ওবামা ও কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো এক ঐতিহাসিক বৈঠক করেছিলেন। দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে, এটা ভালো দিক। কিন্তু যেতে হবে অনেকদূর। মার্কিন কংগ্রেস এখন নিয়ন্ত্রণ করে রিপাবলিকানরা। তারা যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ককে কীভাবে দেখে, সেটাই বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক অনেকদিন ধরেই আলোচনার একটি বিষয় হয়েছিল। কিউবা কি আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতি পরিত্যাগ করবে, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘আবারো’ হাভানায় সরকারের উৎখাতের উদ্যোগ নেবে এসব প্রশ্ন বারবার মিডিয়ায় ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের লেখনীতে উঠে আসছিল। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব ইউরোপে ‘সোভিয়েত ধাঁচের’ সমাজতন্ত্রের পতনের রেশ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল তখন বলতে গেলে সারাবিশ্বের দৃষ্টি এক রকম নিবদ্ধ ছিল কিউবার দিকে। কেননা কিউবা ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অন্যতম ক্ষেত্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল কিউবার অর্থনীতির অন্যতম উৎস সেই সঙ্গে নিরাপত্তার অন্যতম গ্যারান্টার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে কিউবা টিকে থাকতে পারবে কিনা এ প্রশ্নটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসনের’ মুখে থেকে কিউবা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা, এ নিয়েও প্রশ্ন ছিল। আরো একটি প্রশ্ন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে আলোচিত হচ্ছিলÑতা হচ্ছে কিউবা কি আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে? কেননা চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশেও স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পরিবর্তন এসেছে। এই দুটি দেশ এখন আর ধ্রুপদী মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। তাই খুব সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন ছিল কিউবা চীন বা ভিয়েতনামের পথ অনুসরণ করবে কিনা? কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ছিল কিউবার নিরাপত্তাহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র কখনই কিউবায় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকার করে নেয়নি। বরং কিউবায় বিপ্লবের পর (১৯৫৯) কিউবা সরকার যখন লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চাইল, চে গুয়েভারা যখন ‘বিপ্লব’ সম্পন্ন করার জন্য কিউবা সরকারের মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে বলিভিয়ায় গেলেন (সেখানেই তাকে পরে হত্যা করা হয়), তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের কাছে ভিন্ন একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কখনই চায়নি ‘তার প্রভাবাধীন এলাকায়’ অন্য কোনো ‘শক্তি’ প্রভাব খাটাক। ‘মনরো ডকট্রিন’ এর আদলে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে এ এলাকায় তথা লাতিন আমেরিকায় তার পূর্ণ কর্তৃত্ব। কিন্তু কিউবার বিপ্লব যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘হিসাব-নিকাশ’-এ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবা বিপ্লবের মাত্র দু’বছরের মধ্যে ১৯৬১ সালে ভাড়াটে কিউবানদের দিয়ে কিউবা সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা চালায়। সিআইয়ের অর্থে পরিচালিত এই অভিযান ‘বে অব পিগস’-এর অভিযান হিসেবে খ্যাত। বলাই বাহুল্য ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। ঠিক এর পরের বছর ১৯৬২ সালের অক্টোবরে ‘কিউবা সংকট’ একটি পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনার জš§ দিয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে, যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করেছে, এটা বিবেচনায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র একটি নৌ অবরোধ আরোপ করে যাতে কিউবায় কোনো ধরনের সামাজিক মারণাস্ত্র সরবরাহ করা না যায়। ওই নৌ অবরোধ অনেকটা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতের পথ মসৃণ নয়সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্ক থেকে তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দীর্ঘ ১৩ দিন ওই নৌ অবরোধ বহাল ছিল। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে মিসাইল প্রত্যাহার করে নিলে সোভিয়েত ইউনিয়নও কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে গেলেও সংকট থেকে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে ওই অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে কিউবা ‘যুদ্ধ’ করে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরও মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্ক উন্নয়নের ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বললেও এটি খুব সহজ হবে না। কেননা ওবামাকে এ সংক্রান্ত একটি আইন পাস করাতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে কংগ্রেসে তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এখন নিয়ন্ত্রণ করে রিপাবলিকানরা। রিপাবলিকানরা ওবামার উদ্যোগের ব্যাপারে খুশি নন। একাধিক কংগ্রেস সদস্য তথা সিনেটরের বক্তব্য শুনেছি, যেখানে তারা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওবামার এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। সিনেটর জন মেককেইন ও সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সংকুচিত করবে। অন্যদিকে সিনেটর রয় ব্লান্ট মনে করেন, এই ঘোষণা রাহুল ক্যাস্ট্রোকে ক্ষমতায় রাখতে সাহায্য করবে। ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর রবার্ট মেনডেজ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সিদ্ধান্ত হচ্ছে কিউবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও স্বৈরশাসনকে স্বীকার করে নেয়া। সিনেটর মেনডেজ নিজে কিউবা-আমেরিকান। এতে ধারণা করা স্বাভাবিক যে, কিউবার ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো আইনকে কংগ্রেসকে অনুমোদন দেবে না। ফলে ওবামার ঘোষণা ও উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ‘একটি ঘোষণা’ হিসেবেই থেকে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের দাবি কিউবায় আরো বেশি গণতন্ত্রায়ণ। আরো বেশি অর্থনৈতিক উদারীকরণ। মানবাধিকার পরিস্থিতির আরো উন্নতি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কার। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে কিউবা সব কিছু ‘উš§ুক্ত’ করে দেবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভের সংস্কার কর্মসূচির ফলাফল তাদের অজানা নয়। সংস্কার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আনতে গিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়েছিল। চীন ও ভিয়েতনামে অর্থনৈতিক সংস্কার এসেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কার কর্মসূচির ‘পেরেস্ক্রোইকা’ বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু ‘গ্লাসনোস্ট’ কার্যকরী হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। কিউবাতে কোনোটাই আসেনি। চীন তার সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে এখন ঋণ গ্রহণ করছে। ভিয়েতনামও কম যায়নি। যে ভিয়েতনাম প্রায় ৪০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারাই আজ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের যে বিশাল চাহিদা তার একটা বড় অংশ ভিয়েতনাম সরবরাহ করছে। এখানে ‘রাজনীতি’ অগ্রাধিকার পায়নি। পেয়েছে বাণিজ্য। এখন কিউবা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাও দেখার বিষয়। তবে হুট করে দু’দেশের সম্পর্কে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। প্রেসিডেন্ট রাহুল ক্যাস্ট্রো ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ওবামার এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কিউবার রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিউবার জনগণ এখনো কিউবার সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক বিশ্বায়নের এই যুগে কিউবা ‘একা একা’ চলতে পারবে না। দেশটিকে ‘দুয়ার উš§ুক্ত’ করে দিতে হবেই। দেশের অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ এখনো সরকার নিয়ন্ত্রিত। কিছু কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সারাদেশে এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্যুরিজম খাত। এ খাত কিছুটা উš§ুক্ত করা হয়েছে। আরো উš§ুক্ত করা হলে, যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল চেন ব্যবসায়ীরা এই খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিউবাতে সীমিত আকারে ‘ডলারবাণিজ্য’ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কিউবার আমেরিকান পাঠানো অর্থ এখন নিয়মিত কিউবাতে আসছে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহƒত হচ্ছে। তবে একটা সমস্যা রয়েছে। কিউবা প্রতিদিন এক লাখ ব্যারেল তেল ‘অত্যন্ত কম মূল্যে’ ভেনিজুয়েলা থেকে পেয়ে আসছে। এর বিনিময়ে কিউবা ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক দিচ্ছে। এসব ডাক্তার, নার্স আর শিক্ষক এখন ভেনিজুয়েলার হয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে কাজ করছেন। পুরো ব্যয়ভার বহন করছে ভেনিজুয়েলা। প্রয়াত হুগো শ্যাভেজ এই পরিকল্পনা শুরু করলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাদুরো এই পরিকল্পনা কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারবেন, এ প্রশ্ন ইতোমধ্যেই উঠেছে। কেননা ভেনিজুয়েলার রমরমা তেল ব্যবসার দিন শেষ। অর্থনীতি আগের মতো আর শক্তিশালী নয়। রাজধানী কারাকাসে বিশাল বিশাল ভবন খালি পড়ে আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসছেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ভেনিজুয়েলার ওপর বাণিজ্যিক, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যখন ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেন, তার ঠিক একদিন পর ১০ ডিসেম্বর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মেনডেজ ‘ভেনিজুয়েলার জনগণের বিজয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। গত এপ্রিল থেকেই সেখানে অসন্তোষ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেশ কয়েকজন ভেনিজুয়েলার ভিআইপির ব্যাপারে। সম্পদ আটক থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ভেনিজুয়েলার মারাত্মক মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির। এটা সত্য, হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ভেনিজুয়েলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এর চাইতেও খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কলম্বিয়ায় কিংবা মেক্সিকোতে, যেখানে গেল বছর ৪৩ স্কুলশিক্ষার্থীকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। কিন্তু সেখানে কোনো বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ভেনিজুয়েলার বিষয়টি যে পরিপূর্ণ রাজনৈতিক, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। এখন খুব সংগত কারণেই ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিনী ‘চাপ’ যদি বাড়ে তাহলে কিউবাকে দেয়া তাদের আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তা কিউবার অর্থনীতিকে আঘাত করবে। কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে খোদ যুুক্তরাষ্ট্রও উপকৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাত মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স, কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে পারছে না। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা বড় অংশ আসছে বাইরে থেকে। এ ক্ষেত্রে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা জগদ্বিখ্যাত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই চাহিদা পূরণ করতে পারে। ২০০২ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো এ ধরনের একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি। গেল বছর পশ্চিম আফ্রিকায় মারাত্মক ইবোলো রোগ ছড়িয়ে পড়ায়, কিউবার স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গেছেন। এখন কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নত হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতে উপকৃত হতে পারে। তবে মূল সমস্যাটিই হচ্ছে মানসিকতার। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের মানসিকতায় কী পরিবর্তন আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। গত ১৪ আগস্ট হাভানায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে মার্কিন পতাকা উত্তোলনকালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব জনকেরি বলেছেন, কিউবা এখন আর শত্রু নয়, বন্ধু। বাস্তব ক্ষেত্রে এই ‘বন্ধুত্ব’ কতটুকু প্রতিফলিত হয়, তাও দেখার বিষয় এখন। তবে সম্পর্ক জোরদারকরণের পথটা মসৃণ নয় এবং এ ক্ষেত্রে বেশি প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। Daily Manobkontho 19.08.15

শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও রাজাপাকসের প্রত্যাবর্তন

আজ ১৭ আগস্ট শ্রীলঙ্কার সংসদ নির্বাচন। যদিও শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান, তারপরও এ নির্বাচনকে ঘিরে সারা শ্রীলঙ্কা তথা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখানে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়, ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে হেরে যান। সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজাপাকসে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে চাচ্ছেন। তিনি হতে চান প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনের আগে বিবিসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রাজাপাকসে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। শ্রীলঙ্কায় সংসদের আসন সংখ্যা ২২৫। দু’টি মিত্র জোট এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি নেতৃত্বাধীন একটি জোট, অন্যদিকে রাজাপাকসের শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্স। জানুয়ারির (২০১৫) নির্বাচনে বিজয়ী মিথ্রিপালা সিরিসেনা একসময় রাজাপাকসের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সিরিসেনা রাজাপাকসেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত করেন। অথচ রাজাপাকসে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সিরিসেনা রাজাপাকসের সমর্থন করেছিলেন। উপরন্তু তিনি রাজাপাকসের দল শ্রীলঙ্কান ফ্রিডম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এক্ষেত্রে বিশেষ মহলের পরামর্শে সিরিসেনা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। মজার ব্যাপার, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী রনিল বিক্রমাসিংহে নিজে প্রার্থী না হয়ে সিরিসেনাকে সমর্থন করেন। ধারণা করা হয়, ভারতের একটি মহল রাজাপাকসের নিশ্চিত বিজয় ঠেকাতেই সিরিসেনাকে সমর্থন করতে ইউপিএ নেতৃবৃন্দকে চাপ দেন। সিরিসেনা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে তার প্রথম বিদেশ সফরে দিল্লি যান। তাই বোঝাই যায় তিনি সরকার পরিচালনায় বেশিমাত্রায় ভারতের ওপর নির্ভরশীল হবেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন। ২০০৭ সালের পর থেকে শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার সমন্বয়ে এ অঞ্চলে যে ঐক্য গড়ে উঠছে এবং যা ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিত, তা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থকে আঘাত করছে। চীনের এ অঞ্চল ঘিরে যে মুক্তার মালা নীতি তা ভারত মহাসাগরে তার কর্তৃত্বকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রণীত। ভারত মহাসাগরে চীনের শক্তি বৃদ্ধিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপও মনে করছে ভারত। ফলে শ্রীলঙ্কায় একটা পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। মনে রাখতে হবে, চীন একদিকে বেলুচিস্তানের গাওদার বন্দর তৈরি করে দিয়েছিল, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার হামবানতোতায়ও একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে দিয়েছে। ফলে ভারত এটা খুব সহজভাবে মেনে নেয়নি। অভিযোগ আছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কায় সরকার পরিবর্তনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কেননা, হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতের সমর নায়করা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেছিলেন। এজন্যই দলে ভাঙন সৃষ্টি করে সিরিসেনাকেই রাজাপাকসের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয় এবং রাজাপাকসে হেরে যান। এর পরপরই সিরিসেনা নয়াদিল্লি যান। আর নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কা সফর করেন গত মে মাসে, বাংলাদেশে আসার আগে। কিন্তু এখন সংসদ নির্বাচন হচ্ছে আজই। এক্ষেত্রে সিরিসেনার ভারতমুখিতা ভোটারদের আবার রাজাপাকসের নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টিমুখী করতে পারে। তাই সিরিসেনাকে খুব হিসাব করে চলতে হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় জাতীয়তাবাদী চেতনা অত্যন্ত শক্তিশালী। ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাক, এটা সিংহলিরা কখনোই ভালো চোখে দেখছেন না। অতীত ইতিহাসটা ভারতের জন্য কোনো ভাল সংবাদ নয়। তামিল বিদ্রোহীদের হাতে সেখানে মারা গেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ললিত আথুলাথদালি, গামিনি দেশানায়েকে এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে তামিলদের অভিযোগ ছিল, শ্রীলঙ্কার শাসকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে তিনি শ্রীলঙ্কার তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের একটি চুক্তির বিনিময়ে তামিল বিদ্রোহ দমন করতে ভারতীয় সেনারা তামিল অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করেছিল। ফলাফলটা অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন। ১২শ’ ভারতীয় সেনা মারা গিয়েছিল সেখানে। বাধ্য হয়ে ভারত ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৮৭ সালে ভারত-শ্রীলঙ্কা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন রাজীব গান্ধী ও শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস জয়াবর্ধনে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রেমাদাসা এর বিরোধিতা করেছিলেন। এ বিরোধিতাকে সামনে রেখেই প্রেমাদাসা ১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ী হন। আজ শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে সেই ‘দৃশ্যপট’ লক্ষণীয়। ভারতীয় প্রভাব সেখানে বাড়ছে। সিরিসেনা সেই ভারতীয় স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। নির্বাচনের আগে তিনি একাধিকবার চীনবিরোধী বক্তব্য রেখেছিলেন। এমনকি নয়া প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা দিয়েছিলেন চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি তিনি বাতিল করবেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে সত্যি সত্যিই তা করেছেন। ভারতের মোদি সরকারের সঙ্গে এখন অনেক ব্যবসায়ী শ্রেণী ভিড় করেছে। গত ১১-১৩ জানুয়ারি (২০১৫) গুজরাটে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ভাইব্রাই গুজরাট’ সম্মেলন। ওই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি যোগ দিয়েছিলেন। ফলে মোদি সরকারকে যারা ক্ষমতায় বসিয়েছেন, সেই ব্যবসায়ী শ্রেণি (যেমন, আদানি গ্রুপ) চাইবে মোদি সরকারকে ব্যবহার করে ভারতের বাইরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে। শ্রীলঙ্কায় দ্বন্দ্বটা এভাবেই তৈরি হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, শ্রীলঙ্কার ব্যাপারে চীনের শুধু যে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে তা নয়। বরং চীন যে ম্যারিটাইম সিল্করুটের কথা বলেছে, শ্রীলঙ্কা তার অংশ। বাংলাদেশের কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল চীন। সেটা এখন আর হচ্ছে না। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, রাজাপাকসের কিছু ভুলের কারণে শ্রীলঙ্কার জনগণ তার ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনি অনেক সিদ্ধান্ত দিলেও তা তার নিজের ও দলের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেননি। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ তার ওপর শতভাগ সন্তুষ্ট ছিল না। শ্রীলঙ্কায় চীনের অর্থে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও ভারতকে ‘উপেক্ষা’ করা এবং তামিল-মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়া তার পতনকে ত্বরান্বিত করে। উপরন্তু ছিল পারিবারিক দুর্নীতি ও ক্ষমতা করায়ত্ত করার প্রচেষ্টা। এটা ছিল তার জন্য একটা শিক্ষা। নিশ্চয়ই সিরিসেনা এটা থেকে শিখেছেন। কিন্তু ভারত কী আদৌ চাইবে রাজাপাকসের প্রত্যাবর্তন? যদি রাজাপাকসের জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়, তাহলে তিনি সরকার গঠন করবেন। এক্ষেত্রে একটা বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে। সিরিসেনার সঙ্গে এক ধরনের ‘জোট’-এ আবদ্ধ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে ও তার জোট। এখন সেই সংসদে যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত রাজাপাকসে ও তার সমর্থকরা চলে আসেন, সেটা খুব সুখের হবে না সিরিসেনার জন্য। আরো একটা সমস্যা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বাতিল করবেন। ওই সংশোধনী বলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার। নির্বাচনে তার সমর্থক রানিল বিক্রমাসিংহে হেরে গেলে তাকে তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। সমস্যাটা তৈরি হবে নির্বাচনের পর পরই। সিরিসেনা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন নির্বাচনে রাজাপাকসে বিজয়ী হলেও তিনি তাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন না। তিনি দলের সিনিয়র কাউকে এ দায়িত্বটা দিতে চান। এখানে বলা ভালো, রাজাপাকসের নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি ভেঙে গেছে। এক অংশ প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সঙ্গে রয়েছে, যারা একটি নির্বাচনী ঐক্য করেছে রানিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে। অন্য একটা অংশ, ধারণা করা হয় একটা বড় অংশ ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজাপাকসে। এটা স্পষ্ট নয় ফ্রিডম পার্টির কোন অংশটি জনপ্রিয়। সিরিসেনা ফ্রিডম পার্টির একটা অংশের চেয়ারম্যান, যিনি প্রার্থী তালিকায় রাজাপাকসের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে দেননি। অন্যদিকে রাজাপাকসে আলাদাভাবে ফ্রিডম পার্টির একটা অংশকে সংগঠিত করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এখানে বলা ভালো, রাজাপাকসে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। এরপর ২০১০ সালেও বিজয়ী হন। সংবিধান সংশোধন করে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সিরিসেনার কাছে হেরে যান। এই নির্বাচন শ্রীলঙ্কার রাজনীতির জন্য অনেক কিছু। যদি রাজাপাকসে তার চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হন, তাহলে শ্রীলঙ্কা বড় ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী ভারত কী ভূমিকা নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। Daily Ajker Potrika 17.08.15

জিএসপি সুবিধা না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলই


গত ১০ আগস্ট বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মার্কিন বাজারে ১২২টি দেশের জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধা পুনর্বহাল হয়েছে। আর এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। এ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী ও দু-একজন বিশেষজ্ঞ বলার চেষ্টা করছেন যে, জিএসপি না পাওয়ার মূলে রয়েছে দুদেশের তিক্ত সম্পর্ক। নিঃসন্দেহে এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। গেল বছর জুন মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী নিজে ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী এর প্রতিক্রিয়ায় তখন বলেছিলেন, এই ঘটনায় টিকফা চুক্তি বাস্তবায়নে সমস্যা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বাজার ৪.৮ মিলিয়ন ডলারের। এর মাঝে আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই ০.৫ ভাগ পণ্যে, অর্থের পরিমাণে তার পরিমাণ ২৬ মিলিয়ন ডলার। আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, খেলনা প্রভৃতি পণ্যে। অথচ এসব সেক্টরে খুব কম পণ্যই আমরা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করি। আমাদের পণ্যের বড় বাজার হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই খাতে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে ১২ ভাগ হারে। শতকরা ১৫ দশমিক ৬২ ভাগ হারে শুল্ক দিয়ে আমরা তৈরি পোশাকের বিশাল এক বাজার গড়ে তুলেছি যুক্তরাষ্ট্রে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গেল ৫ বছরে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পে শুল্ক দেওয়া হয়েছে ৩ মিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে একটা তথ্য আমাদের দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তুলনামূলক বিচারে অন্যান্য শিল্পোন্নত তথা মধ্যসারির উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি শুল্ক দেয়। যেমন, মার্কিন বাজারে পণ্য পাঠাতে ভিয়েতনাম শুল্ক দিচ্ছে ৮.৩৮ ভাগ, ইন্দোনেশিয়া ৫.৩০, তুরস্ক ৩.৫৭, চিন ৩.০৮, ফিলিপাইন ২.৯৭, ইতালি ২.৪৯, ভারত ২.২৯, থাইল্যান্ড ১.৭৯, স্পেন ১.৭৭ ভাগ ইত্যাদি।
এখানেও এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। পোশাকশিল্পে ইন্দোনেশিয়া, চিন কিংবা ভিয়েতনাম, ভারত আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব দেশ যে পরিমাণ শুল্ক দেয় বলা হচ্ছে, তা কি শুধু পোশাকশিল্পের জন্য? নাকি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? সাংবাদিকরা এ প্রশ্ন করেছিলেন ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানিকে (২০১৪)। তিনি বলেছিলেন, টিকফার আওতায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চিন, হংকং কিংবা ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি শুল্ক দেয়, এটা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ চিনের মতো ‘মোস্ট ফেভারড ন্যাশনস’ হিসেবে সুবিধা পায়। সমস্যাটা এখানেই। বাংলাদেশ কি তাহলে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে? ডিলানি কি ভুল তথ্য দিয়েছেন? আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চুক্তির খুঁটিনাটি বড় জটিল। এগুলো বোঝা ও ব্যাখ্যা দেওয়ার বিশেষজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। যে ‘সেলটি’ সেখানে কাজ করে, তারাও দক্ষ নন। যতদূর জানি প্রতিটি পণ্যের আলাদা আলাদা শুল্ক। এমনকি তৈরি পোশাকেও হাজারটা ‘আইটেম’ আছে। সব আইটেম বাংলাদেশ তৈরি করে না, রপ্তানিও করে না। প্রতিটি আইটেমের শুল্ক আলাদা। এখানে আমাদের আলোচকরা সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছেন কি না, আমার সন্দেহ হয়! তাই মাইকেল ডিলানির বক্তব্য উল্লেখ করেই বাংলাদেশের উচিত আরএমজি (তৈরি পোশাক) সেক্টরে অতিরিক্ত শুল্কের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা।
জিএসপি সুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত শিল্প-বাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার শর্ত কার্যকর করত রাজি হয়েছিল। এতে করে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, অনুন্নত বিশ্ব পশ্চিমা উন্নত দেশে তাদের পণ্যের আওতা বাড়াতে পারবে। তবে একটা প্রশ্ন ছিল পণ্যের মান ও উৎস নির্ধারণ নিয়ে। এই দুটো বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে। হংকং সম্মেলনের দীর্ঘ ৮ বছর পর গত ৩-৭ ডিসেম্বর (২০১৩) ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সর্বশেষ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক)। বালি সম্মেলনের মধ্যে ছিল বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বটে, কিন্তু ‘বালি ঘোষণায়’ কোন পক্ষ কী পেল কিংবা বাণিজ্য বৈষম্যের শিকার অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে এই প্রশ্নগুলোই আবারও উত্থাপিত হয়েছে। আমাদের জিএসপি সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাকে কোনো জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে না। তারপরও অন্যান্য পণ্যে যতটুকু সুবিধা পেত বাংলাদেশ, তাও গত জুন (২০১৩) থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এক. শ্রমমান, দুই. শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকা-ের পূর্ণ তদন্ত ও বিচার, তিন. ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ঢাকার টিকফার প্রথম বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র আকার-ইঙ্গিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ‘রুলস অব অরিজিন’-এর কঠিন শর্তে আটকে আছে। ধনী দেশগুলো এটা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৬১.৩ ভাগ জিএসপি সুবিধার আওতায়। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ ভাগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে বাংলাদেশ। বলা ভালো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৭৮ ভাগ হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই তৈরি পোশাকের ৬০ ভাগ যায় ইউরোপে আর ২৫ ভাগ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তৈরি পোশাক আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস হলেও এ খাতের সঙ্গে জড়িত নানা ‘প্রশ্ন’-এর ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা ও বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করতে পারেনি। দরকষাকষিতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আমলানির্ভর আমাদের মন্ত্রণালয়ের আমলারা ‘বিদেশে সফর’, ‘সম্মেলনে অংশগ্রহণ’ ইত্যাদিকেই প্রাধান্য দেন বেশি। এখানে দক্ষ জনশক্তির বড় অভাব। বিজিএমইএ তারাও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাদের গবেষণা ‘সেল’ও শক্তিশালী নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে ‘রুলস অব অরিজিন, ‘এন্টি ডাম্পিং’ ও ‘কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা’, ‘প্রেফারেন্স ইরোসন’, শ্রমমান ইত্যাদি নানা টেকনিক্যাল প্রশ্ন জড়িত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়ও আমরা এসব প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে যেতে পারিনি।
গত ২৮ এপ্রিল (২০১৪) ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠক শেষ হয়েছিল। এতে আমাদের প্রাপ্তি কী ছিল? আমাদের প্রাপ্তি খাতাটা ছিল ‘শূন্য’। জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কমিটমেন্ট ছিল না। যদিও ডিলানি তখন বলেছিলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমস্যা সমাধান করাই টিকফার লক্ষ্য। এটা একটা ‘কূটনৈতিক জবাব’। যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা চুক্তির ১৬ অনুচ্ছেদের সবগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যে উঠেছে, তার কোনো সুস্পষ্ট জবাব আমরা পাইনি। টিকফা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের ট্যাক্স সুবিধা দেবে। তাতে আমরা কতটুকু সুবিধা পাব? যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে বাংলাদেশ। তাতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু অর্জিত হবে? যুক্তরাষ্ট্র টেলিকমিউনিকেশন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করবে। এতে করে এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। তাতে করে কি সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? সেবা খাত কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে থাকবে। শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমবে। স্বাস্থ্য খাত বেসরকারিকরণ হবে। ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। শস্যবীজ, চাল, গম ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে। আমরা একরকম জিম্মি হয়ে যাব মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে। জিএসও ফুড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশে এটি সম্প্রসারিত হবে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকব আমরা। মেধাস্বত্ব আইনের দোহাই তুলে কৃষি, ওষুধ, কম্পিউটার ইত্যাদি একতরফাভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ‘বিশেষ সুবিধা’ ভোগ করলেও এই শিল্প এখন ঝুঁকির মুখে থাকবে। বিশ্বের ৮৭ দেশে আমরা সস্তায় ওষুধ সরবরাহ করি। প্যাটেন্ট ক্রয় করে বাংলাদেশ স্বস্তায় ওষুধ তৈরি করে। এটা এখন বন্ধ হয়ে যেতে পারে! অভ্যন্তরীণ বাজারেও ওষুধের মূল্য বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ‘কোন কম্পিউটার’ তৈরি বন্ধ হয়ে গেলে কম্পিউটারের দাম অনেকগুণ বেড়ে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এখন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি পূরণ করতে বাধ্য। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনায় আমরা জিএসপি সুবিধার দাবি, আর জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির কারণে বিশেষ সুবিধা দাবি করেছি। কিন্তু এটা এখন স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধাকে তাদের ‘রাজনৈতিক স্বার্থে’ ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের শ্রমমান আর পশ্চিম ইউরোপের শ্রমমান যে এক নয়, তা আমরা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের ব্যর্থতা, আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে পারিনি। সীমিত পরিসরে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকলেও তা যে শ্রমিকদের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে নাÑ এ বিষয়টিও আমরা স্পষ্ট করতে পারিনি।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত জুন (২০১৩) যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। এরপর এই সুযোগ ফেরত পেতে বাংলাদেশকে করণীয় ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে এই অ্যাকশন প্ল্যানের অনেক কিছুই বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ব্যাখ্যা ভিন্ন। বাণিজ্যমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, বেঁধে দেওয়া শর্তের অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে কিছু কিছু শর্ত যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যেমন বলা যেতে পারে, ১২০টি শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধন দেওয়া, শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া, বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা ‘অ্যালায়েন্স’ ও ‘অ্যাকর্ড’কে কারখানা পরিদর্শনে সহায়তা করা ইত্যাদি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র মনে করে গার্মেন্ট খাতে বাংলাদেশের আরও কিছু করা উচিত ছিল। শ্রম আইন সংস্কারে তেমন অগ্রগতি নেই। উপরন্তু বিজিএমইএ’র সভাপতি গেল বছর এক অনুষ্ঠানে শ্রমিক নেতাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাতে মার্কিন প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম, একই সঙ্গে শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খান ও রায় রমেশ চন্দ্রের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ শ্রমিক নেতাদের ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেরি হার্ফ এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তখন। এটা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি।
২০১৩ সালে তাজরীন ফ্যাশনের কারখানায় অগ্নিকা- ও রানা প্লাজাধসে ১২শর বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার পরই যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ দেনদরবার করে এলেও বাংলাদেশ আর জিএসপি সুবিধা ফিরে পায়নি। এর মধ্য দিয়ে আর্থিকভাবে বাংলাদেশ যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কারণে’ বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট তা অস্বীকার করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যে ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা পেশ করেছিল, তার সব যে বাস্তবায়ন হয়েছে, তা বলা যাবে না। ওই ১৬ দফার বেশ কয়েকটির ব্যাপারে অগ্রগতি ভালো। তবে এটাও সত্য, বেশ ক’টি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের আস্থায় যেতে হলে বাংলাদেশকে ওই অ্যাকশন প্ল্যানের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আরও একটি বিষয় আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ (ভিয়েতনাম), এই টিপিপির আওতাধীন, আমাদের পোশাক বাজারের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এই টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ফলে মার্কিন বাজারে ভিয়েতনাম শুল্কমুক্তভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ পাবে। ফলে বাংলাদেশ একদিকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে, অন্যদিকে তার বাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকির মুখে থাকবে। তাই বাংলাদেশ আগামীতে জিএসপি সুবিধা ফেরত পাবে কি না, এ প্রশ্ন থাকলই। 
Daily Amader Somoy
17.08.15

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় বড় বিতর্ক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আছে আরও ১৪ মাস। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুদলের প্রার্থীদের মনোনয়ন দৌড়ের প্রতিযোগিতা এখন তুঙ্গে। ডেমোক্রেট দলের পক্ষ থেকে হিলারি ক্লিনটনের প্রার্থিতা একরকম নিশ্চিত হলেও রিপাবলিকান দলের প্রার্থিতা নিয়ে আছে নানা জটিলতা। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক তীব্র নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দলীয় নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে নির্বাচনের আগেই রিপাবলিকান পার্টির ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মনোনয়ন দৌড়ে একসময় এই রিয়েল এস্টেট মোগল বেশ এগিয়ে থাকলেও তার বিতর্কিত সব মন্তব্যের কারণে শেষ পর্যন্ত হয়তো সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ছোট ভাই জেব বুশই মনোনয়ন পাবেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, হিলারি ক্লিনটন প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণায় একটি বড় আবেদন সৃষ্টি করেছেন। ১৭৮৯ সালে জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ২২৭ বছর পর হিলারি হতে পারেন প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। মনোনয়ন দৌড়ে তিনি এগিয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয়া এবং ৬৭ বছর বয়সী হিলারি ক্লিনটন শুধু একজন আইন প্রণেতা হিসেবেই নয়; হোয়াইট হাউস ও প্রশাসনেও তার অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। হোয়াইট হাউসে তিনি ছিলেন আট বছর, ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত একজন ফার্স্ট লেডি হিসেবে। এরপর নিউইয়র্ক থেকে সিনেটর হিসেবে তিনি কংগ্রেসে আইন প্রণয়নে সহায়তা করেন ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এর পর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর আগে ২০০৮ সালে তিনি বারাক ওবামার সঙ্গে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তিনি ওবামার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। এরপর বারাক ওবামা তাকে মন্ত্রিপরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিলেও হিলারি ক্লিনটন বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। মিডিয়া তাকে বারবার ফোকাস করেছে। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটালেন তিনি।কিন্তু হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথটি কি মসৃণ? তিনি কি পারবেন ইতিহাস গড়তে? যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ২০০৮ সালে ওবামাকে নির্বাচিত করে ট্রেডিশন ভেঙেছিল- একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এ ধারাবাহিকতায় এখন যুক্তরাষ্ট্র একজন নারী প্রেসিডেন্টকে চায় কি-না সেটাই দেখার বিষয়। তবে অনেক প্রশ্ন তো আছেই। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ এখনও কনজারভেটিভ। তারা একজন নারীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চাইতে নাও পারেন। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীরা সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ বেশ কিছু দেশে নারীরা এখনও রাষ্ট্র তথা সরকার পরিচালনা করে আসছেন। ইউরোপের অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান এখন নারী। ফলে একদিকে হিলারি ক্লিনটনের সম্ভাবনা যেমন আছে তেমনি এটাও সত্য, তিনি কনজারভেটিভদের বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। বলা ভালো, জনগণের ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০ আর নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা ৫৩৮। সাধারণত সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের (প্রতিনিধি পরিষদ) সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে এ নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। হিলারি ক্লিনটনের জন্য সমস্যা হচ্ছে কনজারভেটিভ রিপাবলিকানরা এখন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ (সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ) নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ নির্বাচকমণ্ডলীর মধ্যে রিপাবলিকানদের পাল্লা ভারি। ২০১৬ সালে এক-তৃতীয়াংশ আসনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুবা কনজারভেটিভদের বলয় ভাঙা তার জন্য কঠিন হবে। উল্লেখ্য, হিলারিকে বলা হয় দুর্বল চিত্তের একজন মানুষ। তার স্বামী বিল ক্লিনটন যখন প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় মনিকা লিউনেস্কির সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন স্ত্রী হিসেবে তিনি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেননি। যদিও ওই ঘটনার পর তিনি স্বামীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং বৈবাহিক জীবন টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনী প্রচারণায় হিলারি ক্লিনটনকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে হিলারি কতটুকু মানসিক শক্তির পরিচয় দেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।ক্লিনটন দম্পতির বিরুদ্ধে বেশ কিছু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। যখন এই দম্পতি হোয়াইট হাউস ছাড়েন, তখন তাদের আর্থিক ভিত্তি খুব শাক্তিশালী ছিল না। কিন্তু পরে তাদের নিউইয়র্কে ২৭ লাখ ডলারের একটি বাড়ি এবং ওয়াশিংটনে ২৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারের আরেকটি বাড়ি ক্রয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীরা। ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও প্রশ্ন আছে। অভিযোগ আছে, অনেক বিদেশী রাষ্ট্র এ ফাউন্ডেশনকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে তাদের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। যদিও দুজনই বক্তৃতা আর সেমিনার করে বেশ অর্থ আয় করেছেন। একই সঙ্গে হিলারির বিরুদ্ধে বড় একটি অভিযোগ হচ্ছে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় লিবিয়ার বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে জঙ্গিবাদীদের হামলা এবং ওই হামলায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিহত হওয়ার ঘটনা ঠেকাতে পারেননি এবং রাষ্ট্রদূতসহ অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। ওয়াশিংটনের পিউ রিচার্স ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈদেশিক নীতি ইস্যুতে মানুষ রিপাবলিকানদের বেশি বিশ্বাস করে। এটা হিলারি ক্লিনটনের জন্য একটা মাইনাস পয়েন্ট।অতীতে হিলারি ইরাক, বসনিয়া ও কসোভোয় যুদ্ধ সমর্থন করেছিলেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী একটা জনমত তার বিরুদ্ধে যেতে পারে। তবে হিলারি ক্লিনটনের বেশ কিছু প্লাস পয়েন্টও রয়েছে। এক. তিনি পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থী জেব বুশের (সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ভাই ও সিনিয়র বুশের ছোট ছেলে) চেয়ে তিনি অনেক এগিয়ে আছেন। দুই. গেল বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে রিপাবলিকানরা বিজয়ী হলেও ইতিমধ্যে রিপাবলিকান স্রোতে উল্টো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বিশেষ করে তরুণ ও গরিব আমেরিকান ভোটারদের মাঝে ডেমোক্রেটিক পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তিন. যুক্তরাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী তরুণ প্রজন্ম রয়েছে, যাদের নেতৃত্বে নিউইয়র্কসহ অন্যান্য শহরে অক্যুপাই মুভমেন্ট পরিচালিত হয়েছিল। এ শক্তি ডেমোক্রেটদের আবার ২০১৬ সালে কংগ্রেসে ফিরিয়ে আনতে পারে, যা হিলারিকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে। চার. ওবামা তার শেষ টার্মে এসে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন (স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, তরুণদের উচ্চশিক্ষায় সাহায্য ইত্যাদি), যা কি-না তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। এ তরুণ প্রজন্মের সমর্থন পেতে পারেন হিলারি। পাঁচ. যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী একটি জনমত রয়েছে, যা বেশ শক্তিশালী। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আইএসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়ে নতুন একটি ফ্রন্ট ওপেন করেছে। কোটি কোটি ডলার খরচ হয় যুদ্ধে। হিলারি যদি এই যুদ্ধবিরোধী জনমতের সঙ্গে অবস্থান করেন, তাহলে তার সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ছয়. রিপাবলিকান শিবিরে তেমন কোনো শক্ত প্রার্থী নেই। এটা হিলারির জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। সর্বশেষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারীবিদ্বেষী মন্তব্য হিলারির অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।ডেমোক্রেট শিবিরে হিলারি ক্লিনটনের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। প্রেসিডেন্ট ওবামা তাকে একজন সম্ভাব্য ভালো প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তুলনামূলক বিচারে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অনেক পিছিয়ে আছেন। কৌশলী হিলারি অনেক আগে তার প্রার্থী পদ ঘোষণা করে প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রেখেছেন। তবে এখনও যেতে হবে অনেক দূর। পার্টি ফোরামে ও কনভেনশনে তাকে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে নিজ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে। সেই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তাকে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। বড় বড় ব্যবসায়ী হাউস নির্বাচন উপলক্ষে অর্থ জোগায়। হিলারিকে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটা কতটুকু সম্ভব হবে, তা বলা এ মুহূর্তে কঠিন।হিলারি ক্লিনটনের প্লাস পয়েন্ট অনেক। তিনি বৈদেশিক নীতিতে একটা পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে যে 'Forward deployed diplomacy' প্রণয়ন করেছিলেন, তা এ অঞ্চলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ এ কূটনীতির মূলকথা হচ্ছে, এ অঞ্চলের রাজনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করা। জন কেরি (যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন) হিলারি ক্লিনটন প্রণীত এ নীতি নিয়ে এগিয়ে গেলেও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও উন্নত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে চীনের একটি বিমানবন্দর নির্মাণ, বিতর্কিত টিপিপি চুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া (যেখানে চীনকে এ চুক্তির আওতায় রাখা হয়নি) ইত্যাদি কারণে দুদেশের সম্পর্কের মাঝে সেই আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিলারি ক্লিনটন চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কোন পর্যায়ে উন্নীত করতে পারবেন, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। উপরন্তু রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে আইএসএর উত্থান এবং ইরানের সঙ্গে ৬ জাতি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি। ওবামা এ চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে এনেছেন সত্য। কিন্তু রিপাবলিকান সমর্থিত কংগ্রেস এ চুক্তি অনুমোদন না করলে জটিলতা আরও বাড়বে। হিলারি ক্লিনটনের জন্যও বিষয়টি খুব সহজ হবে না।স্পষ্টতই রিপাবলিকান শিবিরে খুব শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অর্থের বলে মাঠে থাকলেও নারীবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে খোদ রিপাবলিকান শিবিরেই আস্থা হারিয়েছেন। অন্যদিকে জেব বুশ মাঠে থাকলেও তিনিও বিতর্কিত। ফ্লোরিডার গভর্নর থাকার সময়ে ফ্লোরিডার ভোট গণনায় তার হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তার বড় ভাই জর্জ বুশকে প্রেসিডেন্ট হতে সাহায্য করেছিল। ১৪ মাস একেবারে কম সময় নয়। হয়তো এরই মাঝে রিপাবলিকান শিবিরে কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। ঘটনা যেদিকেই মোড় নিক না কেন, হিলারি ক্লিনটন যে শক্ত অবস্থানে আছেন, তা বলাই বাহুল্য। Daily Jugantor 16.08.15

কী পেলেন জাবির শিক্ষকরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা কমানোর একটি সিদ্ধান্ত সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে কয়েকদিন আগে। ওই সংবাদে বলা হয়েছে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৭ বছর থেকে কমিয়ে ৬৫ বছরে করা হয়েছে। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট অনেকটা 'জোর করেই' শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর থেকে ৬৭ বছরে উন্নীত করেছিল। আবার এক বছর পর একই ভিসির নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট তা কমিয়ে আবার ৬৫-এ আনলেন। এর আগে অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী জাবির উপাচার্য ও কয়েকজন শিক্ষককে ডেকেছিলেন। উপাচার্যকে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছিলেন সরকার এই ৬৭ বছরের অবসরের বয়সসীমা মানবে না। এর পর পরই জাবির সিন্ডিকেট শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা কমিয়ে আনল। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে, যা শুধু শিক্ষকদের অবসরের সঙ্গেই সম্পর্কিত নয়, বরং এর সঙ্গে সমাজে শিক্ষকদের 'অবস্থান'-এর বিষয়টিও জড়িত। প্রথমত, শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৭-এ উন্নীত করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কেননা আইনানুযায়ী সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫। এখন এককভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট যে সিদ্ধান্ত গত বছর নিয়েছিল, তা ছিল অবৈধ। এর পেছনে যে 'রাজনীতি'ই কাজ করুক না কেন, সিন্ডিকেটর ওটা করা উচিত হয়নি। আমাকে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান চেয়ারম্যানও বলেছিলেন, সরকার এটা অনুমোদন করবে না। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। দ্বিতীয়ত, যে ১১ জন সিনিয়র শিক্ষককে ৬৭ বছরের 'সুযোগ' দেয়া হয়েছিল, জাবির সিন্ডিকেট কি এখন তাদের অসম্মানিত করল না? গত এক বছরে এদের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় হয়েছে এক কোটি টাকার ওপরে। এই টাকা মঞ্জুরি কমিশন বরাদ্দ করেনি। তাহলে কোন খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই টাকা বরাদ্দ করল? এই টাকা এখন 'অ্যাডজাস্ট' হবে কিভাবে? মঞ্জুরি কমিশন কি তা মানবে? যদি ওই ১১ জন শিক্ষকের প্রাপ্য টাকা থেকে এই টাকা কেটে নেয়া হয়, তাহলে তারা কি মানবেন? কিংবা যদি তাদের এক বছরের সমপরিমাণ টাকা 'অন্য খাত' থেকে দেয়া হয়, তাহলে তা কি 'অবৈধ' হবে না? যুক্তি হিসেবে বলা যায় তারা তো গত এক বছর শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার সম্মানী তো তারা পেতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উৎস থেকে যদি তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়, সেখানেও ভবিষ্যতে 'অডিট' আপত্তি উঠতে পারে। তৃতীয়ত, বিশেষ বিবেচনায় ওই ১১ জন শিক্ষককে যদি বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়, তাহলে ২০১৫ সালের জুন মাসে যারা গেলেন অবসরে, তারাও তো এরকমটি চাইতে পারেন! না হলে তারাও তো বৈষম্যের প্রশ্নটি তুলতে পারেন। চতুর্থত, নীতি-নির্ধারকদের একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এটা শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর সেটি হচ্ছে যোগ্যতাসম্পন্ন এবং দেশকে, জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য শিক্ষক কি তৈরি হচ্ছে? আজ ৬৫ বছর বয়সের পর ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী কিংবা চট্টগ্রামের যেসব শিক্ষক 'অবসরে' গেলেন, তাদের বিকল্প কি তৈরি হয়েছে? 'অধ্যাপক' তো আছেন শত শত। কজন সেই যোগ্যতা রাখেন? যতদিন শিক্ষক 'রাজনীতি' থাকবে, ততদিন দেশে 'যোগ্য' শিক্ষক তৈরি হবে না। একাধিক সদ্য নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যকে চিনি, যারা এখন ব্যস্ত থাকেন টিভির রাতের টক-শোতে সরকারের গুণগান গাওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের সময় তাদের কোথায়? একজন তথাকথিত উপাচার্যের কথা বলি। ঢাকার বাইরের একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তিনি। সদ্য নিয়োগ পাওয়া। রাজনীতি বিজ্ঞান তার বিষয় নয়। কিন্তু টিভি টকশোতে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখি। খোঁজ নিয়ে দেখেছি তিনি নিজে ফোন করে অনুষ্ঠানে আসতে আগ্রহ দেখান। এখন একজন উপাচার্য যদি সপ্তাহের চারদিনই টকশোতে থাকেন, তিনি ঢাকার বাইরের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ চালান কিভাবে? অনেকেই বলেন, তিনি ঢাকা থেকেই নাকি অফিস করেন! সত্য-মিথ্যা জানি না। তাকে যখন টিভির নব ঘুরালেই সর্বত্র দেখি, তখন আমার মনেও এ প্রশ্ন উদয় হয় বৈকি! কী জানি 'ডিজিটাল যুগে' হয়তো এটা সম্ভব। জানি না শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের এখন কর্মকা- মনিটর করেন কিনা? যদিও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এসব উপাচার্যের ক্ষমতার উৎস অন্যত্র। শিক্ষামন্ত্রী এদের কিছুই করতে পারবেন না। চতুর্থত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলও 'ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স'-এ তাদের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলনের পেছনে যুক্তি কতটুকু আছে, তা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু একজন ডেপুটি সেক্রেটারির পদমর্যাদাসম্পন্ন জেলা প্রশাসক যখন একজন উপাচার্যকে অসম্মানিত করেন, তখন সঙ্গতকারণেই উপাচার্যদের তথা সিনিয়র শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্ন ওঠে বৈকি! আমলারা একটি অভিযোগ প্রায়ই করেন। আমার এক ছাত্রকেও সেদিন ফেসবুকে মন্তব্য করতে দেখলাম_ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুব কম সময়ে 'অধ্যাপক' হয়ে আজ। এর পেছনে কিছুটা সত্যতা আছে, আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু সচিবালয়ে যারা আছেন, তাদের শিক্ষকতার যোগ্যতা কোন পর্যন্ত? বিভাগের ভালো ছাত্রটি কি সিভিল সার্ভিসে যান, না কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান? সচিবরা একাধিক সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি করেছেন। পুলিশ বিভাগেও সচিব পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তা আছেন। সরকার এ পদ সৃষ্টি করেছেন বটে; কিন্তু শিক্ষকদের সেই সুযোগ কই? পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই শিক্ষকরা আলাদা সম্মান পান। শিক্ষকতার স্বার্থকতা এখানেই। কিন্তু শিক্ষকরা দাবি করতে পারেন না সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃষ্টি করার। 'সিলেকশন গ্রেডের' অধ্যাপক নামে একটি পদ আছে। কিন্তু সব অধ্যাপকরা এই পদে যেতে পারেন না। এখন আমার মনে হয় সময় এসেছে 'সিনিয়র অধ্যাপক' পদ সৃষ্টি করার। যারা নূ্যনতম ৫ থেকে ৭ বছর অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন, তারা সরাসরি 'সিনিয়র অধ্যাপক' পদে পদোন্নতি পাবেন। তবে রাষ্ট্র উপার্জন তথা অধ্যাপকদের আলাদাভাবে মর্যাদা দিতে পারে। কোনো রাষ্ট্র যদি অধ্যাপকদের মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রে কোনোদিন ভালো অধ্যাপক তৈরি হবে না। ভালো ছাত্ররা কোনোদিন শিক্ষকতা পেশায় আসবে না। পে-স্কেলে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকার একটি কমিটি গঠন করেছে। আমার বিশ্বাস কমিটি নিশ্চয়ই এ বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। এ ক্ষেত্রে ওই কমিটির বিবেচনার জন্য আমি কিছু সুপাারিশ রাখতে চাই। এক. সিনিয়র শিক্ষকদের সচিব পদমর্যাদা দেয়া হোক। আর সিনিয়র শিক্ষকদের পদমর্যাদা নির্ধারিত হবে নূ্যনতম ৫ থেকে ৭ বছর নিজ পদে থাকার পর। দুই. অধ্যাপক পদে পদোন্নতির নীতিমালায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। পিএইচডি ডিগ্রি, মৌলিক গ্রন্থ, উচ্চতর গবেষণা, বিদেশি ডিগ্রি ছাড়া কাউকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। বিশেষ করে পদোন্নতির নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি। এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতির নীতিমালা একবার। তিন. শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি। এখন উপাচার্যের ব্যক্তিগত স্বার্থ, নিজ জেলা, বিশেষ একটি জেলা, আত্মীয়তার বন্ধন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। যা করা উচিত, তা হচ্ছে পিএসসির আদলে মঞ্জুরি কমিশনের আওতায় আলাদা একটি কমিশন গঠন করা, যাদের কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয় তথা কলেজ শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখভাল করা। গত বেশ কয়েক বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের তুঘলকি কা--কারখানা হয়েছে। যিনি কোনো বিশেষ বিভাগে কোনোদিন পড়াশোনা করেননি, উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই, তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাই কমিশন গঠনের বিষয়টি খুবই জরুরি। কমিশন এ ধরনের সুপারিশ করতে পারে।
জাবির শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা নিয়ে খুব সঙ্গতকারণেই এসব প্রশ্ন আলোচিত হলো। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো 'রাজনীতি' থাকা উচিত নয়। আমি অনেক জাবি শিক্ষককে চিনি, যারা ২০১৪ সালেই ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ৬৭ বছরের সুযোগ নেননি। তারা অবসর নিয়েছেন। অথচ শারীরিকভাবে তারা সবাই সুস্থ এবং জাতিকে আরো কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং কোনোরকম রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ব্যবহার না করেই তারা অবসরে চলে গেছেন। তারা যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, সেই দৃষ্টান্ত অন্যরা অনুসরণ করলে ভালো করতেন। এখানে বলা ভালো জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বলে কিছু নেই। দুই মতাদর্শের শিক্ষকরাই এক প্লাটফর্মে কাজ করেন। শিক্ষক সমিতিতেও এই 'ঐক্য' কাজ করে। সারাদেশজুড়ে বিএনপির সমর্থকরা জেল-জুলুম আর মামলার ঝামেলায় 'ব্যস্ত' থাকলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা দলীয়ভাবেই প্রশাসনের অংশ। সিন্ডিকেটে যেমনি তাদের প্রতিনিধি রয়েছে, তেমনি প্রশাসনেও রয়েছে তাদের প্রতিনিধি। আর এই 'ঐক্যের' ফলেই ওই ১১ জন শিক্ষকের অবসরের বয়সসীমা ৬৭ বছরে উন্নীত হয়েছিল। এখন তা আবার ৬৫ বছরে কমিয়ে আনায় উপাচার্য মহোদয় নিশ্চয়ই শিক্ষামন্ত্রীর সাধুবাদ পাবেন, কিন্তু অনেক শিক্ষকই তাতে মনঃক্ষুণ্ন হবেন। আরো একটা কথা শিক্ষকদের পাশাপাশি অফিসারদের অবসরের বয়সসীমাও ৬২ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। এখন এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার তথা কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকা উচিত। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীরা অবসরে যান ৫৯ বছর বয়সে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার ও কর্মচারীরা ৬২ বছরে অবসরে যেতেই পারেন। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই সমতা যেন থাকে। না হলে প্রশ্ন উঠবে, যেমনি প্রশ্ন উঠেছিল শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা নিয়ে।
এখন শিক্ষকদের বয়সসীমা ৬৫ বছরে কমিয়ে আনায় আমার সিনিয়র সহকর্মীদের জন্য আমার দুঃখবোধ রইল। অনেকটা অসম্মানের সঙ্গে তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন ত্যাগ করবেন। তাদের নিজেদেরও উচিত ছিল এই 'বিতর্কে' না জড়ানো। দীর্ঘদিন তারা শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার বাইরে থেকেও সমাজকে সেবা করা যায়। আমরা চাই না জাবির শিক্ষক সমিতি এটা নিয়ে 'রাজনীতি' করুক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করি বটে, কিন্তু অর্থের জন্য আমাদের তাকাতে হয় সরকারের দিকে। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা যেতে পারি না। আমি যুক্তি হিসেবে মেনে নিই অবসরের বয়সসীমা ৬৭-তে উন্নীত করা যায়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা যেখানে ৫৯-এ অবসরে যান, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ৬ বছর বাড়িয়ে ৬৫-তে থাকাই যুক্তিযুক্ত। সুতরাং জাবির সিন্ডিকেট আবার ৬৫-তে ফিরে এসে সঠিক কাজটিই করেছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে সামনের দিকে তাকাই। Daily Jai Jai Din 11.08.15

ছিটমহলগুলো এখন ইতিহাসের অংশ

ছিটমহলগুলো এখন ইতিহাসের অংশ
 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থাকা ১৬২টি ছিটমহল এখন ইতিহাসের অংশ। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির সময় কৃত্রিমভাবে এবং অযৌক্তিকভাবে ছিটমহলগুলো এই দুটি দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর উত্তরাধিকারসূত্রে বাংলাদেশ এই ছিটমহলগুলো পায়। ১৬২টি ছিটমহলের মধ্যে ১১১টি ছিল বাংলাদেশের ভেতরে। কিন্তু এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের ছিল না। গত ৩১ জুলাই রাত ১২টা অর্থাৎ ১ আগস্ট ২০১৫ সাল থেকে এই অঞ্চল বাংলাদেশের। সেখানে এখন প্রথমবারের মতো উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। অন্যদিকে বাকি ৫১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের, যা ছিল ভারতের ভেতরে। এখন সেই অঞ্চলটি ভারতের।
দীর্ঘ ৬৮ বছর এই দুটি অঞ্চলের মানুষ অর্থাৎ ১৬২টি ছিটমহলের মানুষ এক অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে আসছিল। তাদের কোনো নাগরিক অধিকার ছিল না। স্বাস্থ্যসেবা সেখানে নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষা যেখানে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল তারা। ফলে দেখা গেছে শিশু বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। কৈশোরেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল তাদের স্বপ্নগুলো। এসব এখন ইতিহাসের অংশ। ১ আগস্ট থেকে ১১১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা এক ‘নতুন স্বাধীনতার’ স্বাদ উপভোগ করছেন। তারা অনেকেই ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে বলেছেনÑ তারা এখন ‘স্বাধীন’ হয়েছেন। তাদের মধ্যে দেখা গেছে উল্লাস আর বাঁধভাঙা আহাদ। এখানে বলা ভালোÑ ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি একটি স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই চুক্তির আওতায় ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে বেরুবাড়ী লাভ করে। বাংলাদেশ পেয়েছিল দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা এবং সেখানে যাওয়ার জন্য তিনবিঘা করিডোর। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে ওই চুক্তিটি অনুমোদন করলেও ভারত দীর্ঘদিন এই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ফলে ছিটমহলগুলোতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হয়নি। তবে ১৯৯২ সালে ভারত বাংলাদেশকে তিনবিঘা করিডোর ইজারা দিয়েছিল।
ভারতের পক্ষ থেকেও একটা সমস্যা ছিল সংবিধান সংশোধনের। ১৯৭৪ সালের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভারতে যতগুলো সরকারই ছিল, তারা এই সংবিধান সংশোধনের দোহাই তুলে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় এই চুক্তিটি পাস হওয়া এবং চুক্তি পাস হওয়ার সঙ্গে সংবিধান সংশোধনী অনুমোদন হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তবে এটা ঠিক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং সরকার ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংবিধান সংশোধন বিলটি ভারতের রাজ্যসভায় উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তখন তা পাস হয়নি। এর আগে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে একটি প্রটোকল স্বাক্ষর হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাদের নিজ নিজ নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার এবং ছিটমহলগুলো দুদেশের মধ্যে বিনিময়েরও একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। বাকি কাজগুলো পরে সম্পন্ন করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। মোদি সরকার ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে ‘কমিটেড’ ছিল। ফলে ৫ মে (২০১৫) ভারতের মন্ত্রিসভায়, ৬ মে রাজ্যসভায় ও ৭ মে লোকসভায় বিলটি অনুমোদন হয়। তবে ছোট্ট একটি ত্রুটি থাকায় (শততম সংবিধান সংশোধন), তা পরে আবার ১১ মে রাজ্যসভায় উত্থাপন করা হয় এবং অনুমোদন হয়। ২৮ মে ভারতের রাষ্ট্রপতি বিলটিতে স্বাক্ষর করলে তা সংবিধান সংশোধন আকারে গৃহীত হয়। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় (৬ জুন) এটা ছিল বাংলাদেশের জনগণের জন্য তার ‘উপহার’।
দীর্ঘ ৬৮ বছর পর কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই ছিটমহলগুলো নিজ নিজ রাষ্ট্রের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। ইতিহাসের ছাত্রমাত্রই জানেন ১৯৭৪ সালে ভারত মহাদেশ বিভক্তির আগে তৎকালীন কুচ রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারি-স্বত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার মধ্যে। একইভাবে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারদের কিছু তালুক ছিল কুচবিহার সীমানার ভেতরে। এ নিয়ে তারা সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হওয়ায় এই ছিটমহলগুলোর জন্ম হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ভারত বিভক্তির সময় হায়দরাবাদের নিজামের মতো কুচ রাজারাও ‘প্রিসলি স্টেট’-এর মর্যাদা ভোগ করতেন। পরে ১৯৪৯ সালে কুচবিহারের রাজা ভারতে যোগ দেন এবং তার রাজ্যটি পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলায় পরিণত হয়। কিন্তু সমস্যা থেকে গিয়েছিল। ১৯৫৮ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ছিটমহলগুলোকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিষয়টি তখন ভারতের আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পাকিস্তান শাসনামলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো রাষ্ট্রই পরে আর নেহেরু-নুন চুক্তি নিয়ে এগিয়ে যায়নি। এরপর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং ১৯৭৩ সালের পর থেকেই ছিটমহল বিনিময় নিয়ে আলোচনা চলে আসছিল। এখন সেই আলোচনার ইতি ঘটল এবং একটি দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে ছিটমহলের বাসিন্দারা মুক্তি পেলেন। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজনÑ ছিটমহলগুলো চিহ্নিত হলেও ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্ত ও অপদলীয় ভূমির ব্যাপারেও একটা ফয়সালা হয়েছে।
স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। ১১১টি ছিটমহলের ৪০ হাজার ৪৭০ নাগরিক এখন বাংলাদেশের নাগরিক, যাদের মধ্যে মাত্র ৯৭৯ জন ভারত যেতে চেয়েছেন। অন্যদিকে ৫১টি ছিটের ১৪ হাজার নাগরিক এখন ভারতের নাগরিক। এতে ১৭১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ৭১১০ দশমিক ০২ একর জমি। এই সংযুক্তির মধ্য দিয়ে ছিটের বিলুপ্তি ঘটল বটে, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছে নানা ‘প্রশ্ন’। যে উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে গর্ব করছেন, তাদের উৎসাহে ভাটা পড়তে পারে, যদি আমরা তাদের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে এখনই নজর না দিই। এ খাতে ১১১টি ছিটমহলে অতি দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। উচ্চশিক্ষার (মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) পাশাপাশি তাদের জন্য স্থানীয়ভাবে চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার স্বার্থে ডাক্তারদের সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘সামাজিক বেষ্টনী’র আওতা এ এলাকায় সম্প্রসারিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এ অঞ্চলে অধিক পুলিশ স্টেশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যাতে এ অঞ্চলে নিয়মিত যান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জমির পরিমাণ, দখল ও মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু রাষ্ট্রীয় আইন সেখানে কার্যকর ছিল না সেহেতু স্থানীয়ভাবে দলিলের ভিত্তিতে জমি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এসব কাগজ-দলিল যাচাই-বাছাই করে তার বৈধতা দিতে হবে। ছিটমহলের জমির সব রাজস্ব-কর মওকুফ করতে হবে। রাষ্ট্রের উদ্যোগে জমিসংক্রান্ত সিএস পর্চা ও তৎপরবর্তী রেকর্ড পর্চা নাগরিকদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে। যারা জমি সার্ভে করেন তারা যাতে অসৎ না হোন, সেদিকে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ২০১১ সালে জনগণনায় যারা নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি, অথচ তারা ছিটমহলের নাগরিকÑ তাদের দ্রুত নাগরিকত্ব দিতে হবে এবং যারা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে ভারতে যেতে চেয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ যদি আসতে চান তাদেরও একটি সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পাশ কাটিয়ে অতিদ্রুত এ অঞ্চলের জন্য থোক বরাদ্দ দিতে হবে। মনে রাখতে হবেÑ এ অঞ্চলের মানুষ বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের মতো ছিল না। তাদের কোনো নাগরিক অধিকার ছিল না। আজ তারা এই অধিকার পেয়েছে। আজ সবার উচিত এই অঞ্চলের মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। ইতোমধ্যে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের একটি ইতিবাচক মনোভাব আমরা লক্ষ করেছি। জমিসংক্রান্ত বিবাদ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ-সংক্রান্ত খবরও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তবে আশার কথাÑ সরকার বলছে, অতিদ্রুত সেখানে জমি জরিপ শুরু হবে। স্থানীয়দের নিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠিত হবে। যারা জমি বিক্রি করতে চান, তারা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তা বিক্রি করতে পারবেন। এমনকি আরও একটি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেসব জমির রেকর্ড ভারতের কুচবিহার রাজ্যের ভূমি অফিসে রয়ে গেছে, সেসব রেকর্ড ভারত থেকে আনা হবে। এদিকে পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাঈন উদ্দিন বলেছেন, সাবেক ছিটমহলগুলোতে বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা এ এলাকার বাসিন্দাদের ভোটার করার চিন্তা করছে। এগুলো সবই ‘পজিটিভ’ দিক। এখন যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা হচ্ছে এসব প্রতিশ্রুতি যেন কাগজ-কলমে থেকে না যায়। যদি দ্রুত ‘উদ্যোগ’ নেওয়া না হয়, তাহলে সাবেক ছিটমহলবাসীদের মাঝে হতাশা নেমে আসবে। আমরা চাই না তেমনটি হোক। এত বড় একটি অর্জন, তা যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ‘নষ্ট’ হয়ে না যায়।

পরিবহন শ্রমিকদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য


গত কয়েকদিন সিএনজি অটোরিকশা চালকরা মহাসড়ক অবরোধের নামে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল তার ব্যাখ্যা আমরা কিভাবে দেব? মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা চালকরা অবরোধ, বিক্ষোভ, যানবাহন ভাঙচুর করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায় না অথচ মহাসড়কে সব ধরনের অটোরিকশা তথা নসিমন-করিমন ইত্যাদি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি ছিল সঠিক। আমরা যারা নিয়মিত মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করি, আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে মহাসড়কে ব্যাপকহারে দুর্ঘটনার জন্য মূল দায়ী এই অটোরিকশা ও নসিমন-করিমন ইত্যাদি। গত ঈদের পর অনেক সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গেছেন। ফলে সব কিছু বিবেচনা করে সরকার যখন ১ আগস্ট থেকে মহাসড়কে সব ধরনের অটোরিকশা নিষিদ্ধ করে, সেটা ছিল যৌক্তিক। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে পরিবহন শ্রমিকরা তথা অটোরিকশা চালকরা যখন নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট নয় তাদের এই ‘ক্ষমতার’ উৎস কোথায়? তারা কিভাবে এই সাহস পায়? কে বা কারা তাদের পর্দার অন্তরালে থেকে পরিচালনা করে? তাদের পেছনে কোনো ‘শক্ত শক্তি’ যদি না থাকত তাহলে তারা এই অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারত না। প্রচলিত আইনকে চ্যালেঞ্জ করা, সরকারি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া, একটা বড় অপরাধ। এটা শাস্তিযোগ্য। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা অতীতে একাধিকবার সরকারকে চ্যালেঞ্জ করলেও, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিচার হয়নি। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন প্রবীণ সাংবাদিক জগ্লুল আহমেদ চৌধুরীর ‘হত্যাকাণ্ডের’ মর্মন্তুদ ঘটনাটি। পরিবহন শ্রমিকরা তাকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা করেছিল। কিন্তু হত্যাকারীর বিচার হয়নি। সংবাদপত্রগুলো ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোচ্চার হলেও সেই হত্যাকারীকে রাষ্ট্র চিহ্নিত করতে পারেনি। মহাসড়কগুলো আজ পরিবহন শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। মিশুক মুনীরের মৃত্যুর ঘটনাটি নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি! ঘাতকদের বিচার হয় না। তাদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ে। আইন ঘাতকদের বিচার করতে পারে না। কেননা ঘাতকরা সরকারি নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকে। আইন, বিচার বিভাগ ঘাতকদের ছুঁতে পারে না। যেখানে মন্ত্রী নিজে বলেন, ড্রাইভাররা গরু-ছাগল চিনলেই যথেষ্ট এবং তাদের সড়কে চলাচলের জন্য পথ নির্দেশিকা পড়ার দরকার নেই, তখন ভাবতে কষ্ট লাগে ওই মন্ত্রী দিব্যি এখনো ক্ষমতায় আছেন! মনে আছে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন পত্রিকায় ওই মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলেন। তারপরের খবর অনেকেই স্মরণ করতে পারেন মামুন ভাই’র বিরুদ্ধে জুতা মিছিল হয়েছিল। জগ্লুল ভাই’র মৃত্যু নিয়ে অনেকেই লিখেছিলেন। কিন্তু তাতে কার কী এসে যায়? মিডিয়া জগতে জনপ্রিয় একটি মুখ জগ্লুল আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যু যদি এভাবে হয় এবং ঘাতককে যদি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না যায়, তাহলে এর চাইতে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। এটা মৃত্যু নয়, এটা হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আদৌ কোনোদিন বিচার হবে এই আস্থাটা রাখতে পারছি না। অতীতে কোনো একটি সড়ক হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি। একটিরও না। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বিচার পাননি তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের। পায়নি মিশুক মুনীরের পরিবার। পাননি হাজার হাজার মা, যাদের এ সমাজ চেনে না আর বিচার না পাওয়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। গত ঈদে মহাসড়কে যেসব ‘হত্যাকাণ্ড’ হয়েছে, তার একটিরও বিচার হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অদক্ষ যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এদের যারা চালান তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সিঁড়িতে এদের অবস্থান। যখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্ন ওঠে ঠিক তখনই এরা পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। জিম্মি করে ফেলে তারা সাধারণ মানুষদের। এক সময় মানুষ বাধ্য হয়ে মেনে নেয় এটা নিয়তির বিধান বলে। এক সময় ভুলেও যায়। মিডিয়া বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু যতটুকু পালন করার কথা মিডিয়া ততটুকু পালন করছে কি? একটা ‘ঘটনা’ ঘটলে মিডিয়া তৎপর হয়! কিন্তু এক সময় মিডিয়ার তৎপরতাও আর থাকে না। ঈদের সময় এত মানুষ মারা গেল। কিন্তু মিডিয়ার যতটুকু ‘ভূমিকা’ পালন করার কথা ছিল তা আমরা দেখিনি। অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অশুভ উদ্যোগের বিরুদ্ধে সবার উচিত ছিল প্রতিবাদ করার। কিন্তু আমরা তা পারিনি। এই খোদ ঢাকা শহরেই অটোরিকশা চালকদের আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, ‘ব্যক্তিগত অটোরিকশা’র অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা দিব্যি জনপরিবহনের কাজে ব্যবহƒত হচ্ছে। পুলিশ বিষয়টি দেখছে না অথচ দায়িত্বটি তো তাদের। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে বন্ধ হয়নি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। পুলিশের গাফিলতি এখানে চোখে লাগার মতো। এতকিছুর পরও মহাসড়কে ‘হত্যা’ বন্ধ হয়নি। অটো নৈরাজ্যের চতুর্থ দিনেও মানুষ মারা গেছে। তারপরের দিনও খোদ ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনার খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। মৃত্যুর এই বিষয়টি যেন স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারো যেন দেখার কিছু নেই! সংবাদপত্র আমাদের জানাচ্ছে, ২০০৯ সাল থেকে এখন অব্দি ১০২টি বড় সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে আর ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পুলিশ ভাষ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৮ হাজার ২৭০ জন। কিন্তু এর চাইতে অনেক বেশি মৃত্যুর সংখ্যা দিয়েছে বুয়েটের একটি গবেষণা সংস্থা তাদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১১ সালে মারা গেছে ১৮ হাজার মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ আর থানা-পুলিশ করে না। ফলে অনেক দুর্ঘটনার খবর পুলিশ জানে না ও তারা লিপিবদ্ধ করে না।
অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য আবারো প্রমাণ করল পরিবহন শ্রমিকদের দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনাটা জরুরি। মাত্র কয়েক কিলোমিটারের রাস্তায় তিন চাকার যান চলাচল না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে দুর্ঘটনা রোধ করার স্বার্থেই। মহাসড়কগুলোতে যে মৃত্যুফাঁদ তৈরি হয়েছে এ থেকে বেরিয়ে আসার পথ ওই একটাই মহাসড়কে তিন চাকার সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করা। আরো একটা কথা। সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে চলাচল করছে বিভিন্ন ধরনের ১০ লাখ গাড়ি, যাদের কোনো অনুমোদন নেই। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী সারাদেশে ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ভুয়া লাইসেন্সধারী ড্রাইভার এখন সড়ক ও মহাসড়কগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। চলছে ফিটনেসবিহীন হাজার হাজার গাড়ি। গত ৩ আগস্ট হাইকোর্ট ভুয়া লাইসেন্স জব্দ করার একটি নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ কতটুকু পালিত হবে আমরা জানি না। কিন্তু এই নির্দেশ প্রমাণ করে সড়ক ও মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাদের ওপর তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। শুধু সড়কে ‘হত্যাকাণ্ড’ই নয়, বরং গত কয়েক বছর ঢাকা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এটা আর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অসহায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করছেন শুধু সড়কেই। এ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ হাজারটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও ফল শূন্য। এই যানজটের একটা বড় কারণ হচ্ছে বেপরোয়া বাস চালকদের যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো। এমনকি রাজধানীর বড় বড় সড়কে মানুষ হাত তুলে গাড়ি থামাচ্ছেন। তারপর নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা বাস থামিয়ে নেমে যাচ্ছেন। এ জন্য বাসের হেলপারটা যতটুকু দায়ী, তার চাইতে বেশি দায়ী যাত্রীরা। তারা নিয়ম-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা করছেন না। হাজারটা প্রতিবেদনে যানজটের কারণ হিসেবে এই বিষয়টি উল্লেখ করলেও বাসস্ট্যান্ড ছাড়া বাস বা মিনিবাসের যেখানে সেখানে থামানো বন্ধ করা যাচ্ছে না। ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ মনে হয় হাল ছেড়ে দিয়েছে। যতদিন না যাত্রীদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাসে উঠতে বাধ্য করা যাবে, ততদিন পর্যন্ত সড়কে এই যানজট থাকবেই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কিছুদিন আগে সাধারণ পথচারীদের অবৈধ রাস্তাপার, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে চলাচল কিংবা ওভারব্রিজ ব্যবহার না করায় দ্রুত ফাইনের ব্যবস্থা করেছিল। এটা ছিল নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এই প্রক্রিয়া সারা বছর চালু রাখতে হবে। এতে পথচারীদের মাঝে এক ধরনের ভয় ও আইন মেনে চলার প্রবণতা কাজ করবে। এক সময় পুলিশের ভয়েই হোক অথবা ফাইনের ভয়েই হোক নিয়মানুযায়ী চলাচল করবে। এখন পুলিশ যদি বাস ও মিনিবাস চালকদের ব্যাপারে এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেয়, আমার বিশ্বাস এতে বেপরোয়া চালকরাও এক ধরনের ভয়ের মাঝে থাকবে এবং সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে। সড়ক-মহাসড়ক কেন হয়ে থাকবে মৃত্যু ফাঁদ? এমনটি তো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ জন্য সরকারের যা যা করণীয় সবই করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। ঢাকায় প্রচুর মানুষ বেড়েছে। সুশাসনের একটা বড় ব্যর্থতা যে সরকার ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। গাড়ি চালকদের একাধিকবার ফাইন ও সতর্কবাণী জারি করা সমন্বয়ে তাদের কোনো অবস্থাতেই নিয়মের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। সড়ক ও মহাসড়কের অবস্থা আরো খারাপ। এখানে বাসচালকদের মাঝে সড়কে দ্রুত চলার প্রতিযোগিতা হাজারটা দুর্ঘটনার জš§ দিচ্ছে। আমরা বারবার বলে আসছি সড়ক ও মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানোর কথা। কিন্তু তা হয়নি। কাগজ-কলমে হাইওয়ে পুলিশের অস্তিত্ব রয়েছে বটে। কিন্তু তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তারা কোথায় ডিউটি করে, এটা একটা প্রশ্ন বটে। মহাসড়কে কোথাও কোথাও সিসি ক্যামেরা বসানো, স্পিড ব্রেকারের সংখ্যা বাড়ানো, কত মাইল স্পিডে গাড়ি চালানো যাবে তা নিদিষ্ট করে দেয়া এমন বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশকে পরামর্শ দেয়া হলেও কোনো সুনির্দিষ্টভাবে পুলিশ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বলা যাবে না। এসব পরামর্শ কাগজ-কলমেই থেকে গেছে। বিদেশের উদাহরণ আমরা দেব না। মেক্সিকোর মতো দেশেও আমি দেখে এসেছি সেখানে নির্দিষ্ট স্পিডেই গাড়ি চালাতে হয়। স্পিড কেউ বাড়ায় না টহলরত পুলিশের ভয়ে। আমাদের এখানে মহাসড়কে টহল পুলিশ আমি দেখি না। ঢাকা-সাভার-মানিকগঞ্জ মহাসড়কে প্রায়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারপরও হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়েনি। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকটের প্রশ্ন তোলা হয়। এই প্রশ্নও অবান্তর। যে জনবল আছে, তার সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমেই মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আমরা বারবার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে লিখি। টক-শোতে আলোচনা করি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তবে এবারের প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন বলেই মনে হয়। মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন বন্ধ করা হয়েছে। আমাদের দাবি সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে যেন সরে না আসে। সেই সঙ্গে হাইকোর্টের ‘নির্দেশনা’ পালনের ব্যাপারেও সরকার আন্তরিক হবে এও প্রত্যাশা। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জব্দ না করলে মহাসড়কে দুর্ঘটনারোধ করা যাবে না। তবে মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে তিন চাকার যানবাহন চলাচলের জন্য একটি করে বাই লেন করার ব্যাপারেও সরকার চিন্তাভাবনা করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই অটোরিকশা ও নসিমনগুলোকে মহাসড়কে উঠতে দেয়া যাবে না। আরো একটা কথা। ঢাকার বাইরে ব্যাটারিচালিত রিকশা দিব্যি চলাচল করছে। এর চালকরা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ঢাকা শহরে এটা বন্ধ হয়েছে বটে কিন্তু ঢাকা শহরের বাইরে আমিনবাজারের দিকে গেলেই এই ব্যাটারিচালিত রিকশা আমি দেখেছি। এমনকি খোদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও এসব রিকশা চলাচল করছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনুমতি দিল কিভাবে? যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন না। প্রয়োজনে পদত্যাগ করবেন। মন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকুক। কোনো ধরনের ‘চাপ’ এর কাছে আত্মসমর্পণ করলে সুশাসনের জন্য তা হবে একটি দুঃখজনক ঘটনা। সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকুক। মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বন্ধ থাকুক সব ধরনের তিন চাকার যান। নিষিদ্ধ হোক লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন সব গাড়ি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছা ও কঠোর অবস্থানের কোনোই বিকল্প নেই। সরকার যদি অনড় থাকে যে, কোনো রকম অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ড কেউ চালাতে পারবে না তাহলে কারোরই সাধ্য নেই এমনটি করার। আমরা এমনটিই প্রত্যক্ষ করতে চাই।
Daily Manobkontho
09.08.15

আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে ভারতেই বিতর্ক রয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প-সংক্রান্ত একটি সংবাদ আমাদের অনেক উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ওই সংবাদে বলা হয়, ভারতে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, ওই কমিটির পঞ্চম বৈঠকে মানস-সংকোশ-তিস্তা-গঙ্গা সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সংবাদে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। বেশকিছু প্রশ্ন সামনে রেখে এ সিদ্ধান্তটিকে বিশ্লেষণ করা যায়। এক. যেখানে ভারতের পরিবেশবাদীরা এবং সিনিয়র প্রকৌশলীরা এ প্রকল্পকে অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য বলছেন এবং এর বিরোধিতা করে আসছেন, সেখানে হঠাৎ করে মোদি সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কেন উদ্যোগ নিচ্ছে? দুই. যেখানে গেল জুনে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ৬৫ দফা সংবলিত যৌথ ঘোষণার ২১নং দফায় অঙ্গীকার করা হয়েছে ‘ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়’, সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে কি যৌথ ঘোষণায় দেয়া এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হল না? তিন. ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভার নির্বাচন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কি বিধানসভার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক আছে? চার. তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ‘আস্থার সম্পর্কে’ কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলে কি ভারতের কোনো কোনো মহল তিস্তা থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে রাখতে চায়? আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন, কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের কথা বলা, কিংবা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক- সবকিছু এখন নানা ‘কিন্তু’ এবং নানা ‘প্রশ্ন’কে ঘিরে আবর্তিত হবে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প অর্থাৎ হিমালয় অঞ্চল থেকে সৃষ্ট নদীগুলোর পানি ৩০টি খালের মাধ্যমে ভারতের খরাপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার এই যে মহাপরিকল্পনা, তার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৮০ সালের দিকে এই পরিকল্পনার কথা প্রথম জানা যায় এবং ২০০২ সালে বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিচারপতি এসএইচ কাপাডিয়ার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিমত দেন, এ পরিকল্পনাটি ভালো। তাই এটির বাস্তবায়ন এবং একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তা মনিটর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা। হাইকোর্ট ৩৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, ভারতের পরিবেশবাদীদের অনেকেই এ মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ভারতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পরিবেশবাদী বন্দনা সিভা ‘বিজনেস টু ডে’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১৩ মার্চ ২০১৪) মন্তব্য করেছিলেন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থার নামান্তর মাত্র। তিনি আরও মন্তব্য করেছিলেন এভাবে- 'It has no hydrological or ecological soundness, and is just part of the corruption/ construction package that has ruined India's eco-system and life support base. This is the same lobby that aggravated the Uttarkhand disaster with its hydrological projects.' আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা জীববৈচিত্র্য নিয়ে যারা কাজ করেন, বন্দনা সিভা তাদের অন্যতম। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আমাদের জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে মোট যে খরচ ধরা হয়েছে অর্থাৎ ৫৬০ হাজার কোটি রুপি, যা ভারতের জিডিপির শতকরা ২৫ ভাগ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতাগোষ্ঠী থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে এবং ভারতে যাদের আয় ৪০০ ডলার থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে তাদের প্রত্যেকের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১২ ডলার। বন্দনা জানিয়েছেন তিনি নিজে কেন-বেতওয়ার (Ken-Betwar) এবং সারদা-যমুনা (Sharda-Jamuna) আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাতে তিনি দেখতে পেয়েছেন, খরাপীড়িত এলাকায় পানি নিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলা হয়, তা সত্য নয়। আমরা আরেকজন ভারতীয় পরিবেশবিদ- রাজেন্দ্র সিংয়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। রাজেন্দ্র সিং ২০০১ সালে বিখ্যাত ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। আর ২০১৫ সালে তিনি পেয়েছেন ‘পানির নোবেল পুরস্কার’ হিসেবে খ্যাত ‘স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ’। ভারতে তিনি Water Man of India হিসেবে খ্যাত। বোঝাই যায় তার কর্মকাণ্ড পানি নিয়ে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১০ জুন ২০১৫) তিনি বলেছেন,'This will be disastrous for my country. It will displace a lot of people and cause undesirable effects, with floods in one side and drought on the other. Rivers are not like roads. They have own gene pool and own life. Linkage of rivers will lead to privatization of water resources.' যে কথাটা বন্দনা সিভা বলেছেন, অনেকটা সেই সুরেই কথা বলেছেন রাজেন্দ্র সিং। এখানে যে একটা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে, অর্থাৎ ভারতের কর্পোরেট জগতের বাসিন্দারা যে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাচ্ছে, এটাই মোদ্দাকথা। এখানে খরাপীড়িত এলাকায় পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টি মুখ্য নয়। পানির প্রবাহ না বাড়িয়েও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য, তা স্বীকার করেছেন ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্য ড. মিহির শাহ। তিনি গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এই প্রকল্পের ব্যাপারে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন (ইকোনমিক টাইমস, ৭ মার্চ ২০১৩)। ভারতের Working Group on Sustainable Ground Water Management-এর পরিচালক পিএস বিজয় শংকর একটি সেমিনারে আসামের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বলেছিলেন, আসামে প্রচুর ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিভাগে (সারফেস) পানি রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-বরাক অববাহিকায় মাথাপিছু পানির ব্যবহার সর্বোচ্চ ১৪,০৫৭ কিউবিক মিটার। মাত্র ১ ভাগ ভূউপরিভাগের পানি ব্যবহৃত হয়, অথচ ৫৬ ভাগ পানি ব্যবহার করা সম্ভব। সারা ভারতে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্র ৩ ভাগ ব্যবহৃত হয়, অথচ ৩৫ ভাগ পানি রয়ে যায় অব্যবহৃত। এ পানি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এখানে বলা ভালো, প্রস্তাবিত এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে যেসব রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আসাম, সিকিম ও কেরালা এর বিরোধিতা করেছে। শুধু তামিলনাড়ু এর পক্ষে। বলা হয়, ভারতের খরা এলাকার জন্য পানি দরকার। কিন্তু এক নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে খালের মাধ্যমে অন্য এলাকায় (দক্ষিণে) নিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। ভারতের ভাকরা বাঁধ নিয়ে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশের জন্য ভাকরা থেকে পাওয়া পানি নয়, বরং ভূগর্ভস্থ পানি ও উন্নত কৃষি ব্যবস্থা বেশি জরুরি। পাঞ্জাবের মোট ২০ শতাংশ এবং হরিয়ানার ৩১ শতাংশ চাষযোগ্য জমি বাঁধ নিয়ন্ত্রিত। এমনকি ৫০ বছর পর আজও সেখানকার বাস্তুহারা মানুষ কঠোর সংগ্রাম করে যাচ্ছে মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুর জন্য। ওই গবেষণার ফলাফলই বলে দিচ্ছে নর্মদা বাঁধের উচ্চতা না বাড়িয়ে কীভাবে আরও বেশি পানি ও বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে মাথা ঘামানো দরকার। নর্মদা বাঁধ-সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তুহারা ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র, যখন কিনা ওই সব রাজ্যে বাড়তি কোনো জমি নেই তাদের পুনর্বাসনের জন্য? তিহরি বাঁধের শিকার হয়েছে যারা, তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। কারণ, না ইউপি, না কেন্দ্র সরকার, কোনোরূপ সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল তাদের সাহায্যার্থে। এখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যে শুধু বাংলাদেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তা নয়। বরং খোদ ভারতও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন : আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। আন্তর্জাতিক আইনবিশারদ অধ্যাপক ওপেনহেইম বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রকে নিজ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা এমনভাবে পরিবর্তন করতে দেয়া যাবে না, যার ফলে তা প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থার কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে। এ আলোকেই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। যখন কোনো রাষ্ট্র একটি অভিন্ন সম্পদের উন্নতি, পরিবর্তন বা ধ্বংস সাধনের জন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ করে, তখন ওই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন আরও বেশি সুনির্দিষ্ট যখন তা আন্তর্জাতিক নদী সম্পর্কিত হয়। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের সবক’টি নদীই আন্তর্জাতিক। এসব নদীর একতরফা পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পানি প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার-সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। তা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি না করেই হতে হবে। কিন্তু ভারতের এ উদ্যোগে একটা বিষয় সুস্পষ্ট- ভারত বাংলাদেশের ওপর এ প্রকল্পের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই উপেক্ষা করছে। হেলসিংকি নীতিমালার অনুচ্ছেদ ২৯-এ বলা হয়েছে, এক অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অপর অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্রকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিষ্কাশন অববাহিকার পানির ব্যবহারের ব্যাপারে কৃত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করবে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার (আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত) ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। কিন্তু আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত একটি অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারমূলক পদ্ধতিতে অগ্রসর হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জলপ্রবাহ কনভেনশনটি গ্রহণ করা হয়। এ কনভেনশনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কনভেনশনের ৬নং অনুচ্ছেদে যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্দিষ্টকরণে কতগুলো শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্ধারণে এ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সবক’টি শর্তকে একইসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে বিবদমান দেশগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। জলপ্রবাহ কনভেনশনে উল্লিখিত নীতিমালাগুলোর আলোকে ভারতে প্রস্তাবিত নদী সংযোগ প্রকল্পকে বিচার করলে দেখা যাবে, ভারত কনভেনশনে বিধিবদ্ধ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন করছে। এমনকি জলাভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদ অনুসারে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরামর্শ করবে এবং একইসঙ্গে জলাভূমির এবং সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর সংরক্ষণের স্বার্থে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোকে ধ্বংস করার নামান্তর, যা কি-না রামসার কনভেনশনের সুস্পষ্ট লংঘন। আমরা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৯নং অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করতে পারি। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, উভয়পক্ষ সমতা, ন্যায়পরায়ণতা ও পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, সেখানে আন্তঃনদী সংযোগে প্রকল্পে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করা হলে তা হবে ওই চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকারের চরম লংঘন। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। পানির বণ্টন বা পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ভারতীয় সংবিধানের ২৪৬নং ধারা এবং ৭ম সিডিউল অনুযায়ী কোনো রাজ্যের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহের অধিকার সেই রাজ্যের। এখানে কেন্দ্র কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। অতীতে কৃষ্ণা নদীর পানির ব্যবহার, প্রত্যাহার ও পানি সংরক্ষণ নিয়ে তিনটি রাজ্য- মহারাষ্ট্র, কর্নাটক আর অন্ধ্রের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, যা ভারতে আন্তঃরাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের এক সংকট সৃষ্টি করেছিল। এই বিবাদ মীমাংসার জন্য একটি ট্রাইব্যুনালও গঠিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যগুলোর প্রাপ্ত অধিকার স্বীকার করে ওই ট্রাইব্যুনাল একটি রায় দিয়েছিল। আজ বেশ ক’টি রাজ্যের আপত্তির মুখে কীভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। আসলে মোদিকে ঘিরে একটি ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা চান ব্যবসা। আর এই প্রকল্পটি হচ্ছে বিশাল একটা ব্যবসার জায়গা, যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬০ হাজার কোটি রুপি, যা দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ব্যবহৃত হবে। কোর্টের রায় অনুযায়ী তা এখন ১০ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ অর্থটাই হচ্ছে মূল কারণ। তবে আমরা বসে থাকতে পারি না। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে একটি ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েছে। এটা যথেষ্ট নয়। অতি দ্রুত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন এবং প্রকাশিত সংবাদটির ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে একটি ব্যাখ্যাও চাওয়া উচিত। Daily Jugantor ০৭ আগস্ট, ২০১৫

>প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগ

রাজনীতিতে কিছুটা 'স্থিতিশীলতা' ফিরে আসায় কোনো কোনো মহল থেকে আবারও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। সংবাদপত্রগুলোতেও এ নিয়ে লেখালেখি দেখছি। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকদের কারো মুখ থেকেই এটা স্পষ্ট হয়নি যে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে ইচ্ছুক! গেল ৫ জানুয়ারি (২০১৪) একটি নির্বাচন হয়ে গেছে। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ আরো বেশ কয়েকটি দলের অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচনটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবেও কোনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এবং দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার 'সব দলের অংশগ্রহণে' একটি নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে। যদিও নির্বাচনের বিষয়টি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে বিদেশি দাতাগোষ্ঠী যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করে, তখন তা শুধু দৃষ্টিকটুই নয়; বরং অগ্রহণযোগ্যও। আমাদের দুর্ভাগ্য, কোনো জাতীয় ইস্যুতেই আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি এবং এখনো পারছি না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন অসাংবিধানিক নয়। বরং সরকার নতুন করে 'ম্যান্ডেট' নেওয়ার জন্য আগাম নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী আগামী ২০১৯ সালের জানুয়ারির তিন মাস আগে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে সরকার পুনরায় জনগণের 'ম্যান্ডেট' নেওয়ার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে পারে। এটা তো সত্য, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পাঁচ জেলায় আদৌ কোনো ভোট হয়নি, ৫২ শতাংশ ভোটার তাঁদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি কিংবা ১৫ জেলায় মাত্র একটি করে আসনে নির্বাচন হয়েছে। সুতরাং সরকার তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলেও, তাতে করে কি 'সব দলের অংশগ্রহণ' নিশ্চিত হবে? আরো স্পষ্ট করে বলতে হয়, বিএনপি কি ওই নির্বাচনে অংশ নেবে? বিএনপি এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। বিকল্প হিসেবে তারা জাতিসংঘের তথা বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচন চায়। কিন্তু এ দাবির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। এটা সত্য, সরকার অত্যন্ত 'কৌশলে' সংবিধান সংশোধন করেছে এবং উচ্চ আদালতের আংশিক রায়কে বিবেচনায় নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। সেই অর্থে এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপিকে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার দাবি অব্যাহত রেখে, আগামী নির্বাচন অথবা মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে একটি 'নয়া ফর্মুলা' নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এটা সত্য, বিএনপি বড় দল। সংসদীয় রাজনীতিতেও দলটির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। সুতরাং সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া যে সংসদ কার্যকর হয় না কিংবা গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় না, বর্তমান সংসদ এর বড় প্রমাণ। কোনো জাতীয় ইস্যুতেই বর্তমান সংসদ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। 'নামকাওয়াস্তে' একজন বিরোধীদলীয় নেতা আছেন বটে; কিন্তু তাঁর ভূমিকা সংসদীয় রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে পারেনি। উপরন্তু তাঁর দল (জাতীয় পার্টি) একসঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারের অংশ হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তিই শুধু বাড়েনি, বরং বাংলাদেশ এমন এক 'ব্যবস্থার' জন্ম দিয়েছে, যা বিশ্বের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরল একটি ঘটনা। এ 'ঘটনা' জাতীয় পার্টিকে পুনরায় ভাঙন অথবা অস্তিত্বহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমার ধারণা, একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বর্তমান কাঠামো নিয়ে টিকে থাকবে না। একটি অংশ আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে যাওয়া কিংবা আরেকটি জাতীয় পার্টির জন্ম নেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এক সময় বিএনপির বিকল্প হিসেবে জাতীয় পার্টিকে ভাবা হতো। এখন সে সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সুতরাং সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত তখনই নেবে, যখন বিএনপি অথবা বিএনপির একটি বড় অংশ এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখাবে। প্রশ্ন এখানেই। তাহলে কি সরকার বিএনপিকে ভাঙার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে? বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত। কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং বেশ কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রীর এ ব্যাপারে মন্তব্য করা এই প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে এলো যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে এক ধরনের হতাশা আছে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ের অনেকেই এখন নিষ্ক্রিয়। অনেকেই জেলে আছেন, অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা আছে। আর যাঁরা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন, এই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করেছে সরকার। এর অর্থ পরিষ্কার- মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের 'ব্যস্ত' রাখতে চায় সরকার, যাতে করে তাঁরা 'আন্দোলনে' নিজেদের জড়িত করতে না পারেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে এমনটি কখনোই দেখা যায়নি- এত বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা! ফলে এসব নেতা-কর্মী আর রাজপথে সক্রিয় হতে পারবেন না। খালেদা জিয়াকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনসংক্রান্ত ধারা) বিচার কিংবা জিয়া চেরিটেবল ট্রাস্ট মামলায় শাস্তি দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা, একই সঙ্গে ড্যান্ডি ডায়িং মামলায় তারেক রহমানকে 'শাস্তি' দিয়ে তাঁকেও অযোগ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার 'মাইনাস ওয়ান' ফর্মুলার দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে 'অযোগ্য ঘোষণা'(?) বিএনপি খুব সহজভাবে নেবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্ন হবে তখন অবান্তর। খালেদা জিয়াই বিএনপির মূল শক্তি। খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে অংশ না নেন, বিএনপির 'বিকল্প নেতৃত্ব' নির্বাচনে অংশ নেবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপি সংগঠিত হবে- এটাও আমার মনে হয় না। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি 'মাইনাস ওয়ান' ফর্মুলা কার্যকর করতে চান, আমার ধারণা তা কোনো কার্যকর 'ফল' দেবে না। 'আসল বিএনপি' কিংবা নাজমুল হুদার 'বেহুদা কথাবার্তায়' মানুষ খুব আস্থাশীল- এটা আমার মনে হয় না। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েও সরকার খুব লাভবান হয়নি। জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বহীনতার মুখে। ফলে সরকারের কাছে এখন বিকল্প পথ দুটি। এক. বিএনপিকে যেকোনোভাবে আস্থায় নিয়ে ২০১৬ সালের শেষের দিকে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেওয়া। দুই. অথবা সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। যেকোনো সময়ের চেয়ে সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। সরকার ওপরে উল্লিখিত যেকোনো একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথম ক্ষেত্রে সরকারকে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। বিএনপি যতই 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার' কিংবা 'জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচনের' কথা বলুক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে কিছুটা নমনীয় হতে হবে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা না করলে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। আর আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা যাবে না। এখন বিএনপিকে আস্থায় নিতে হলে সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করাটা জরুরি। এটাকে ভিত্তি করে সংলাপ শুরু করা যেতে পারে এবং আমার ধারণা, এতে করে একটা পথ বের হওয়া সম্ভব। বিএনপির একটা ফর্মুলা বা প্রস্তাব উপস্থাপন করাও জরুরি, যাতে বর্তমান সংবিধানকে মেনেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে 'সব দলের অংশগ্রহণ' সম্ভব। এখানে বলা ভালো, 'সব পক্ষ' যদি রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কোনো দেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয় না। নেপাল, নামিবিয়া কিংবা কম্পুচিয়ায় জাতিসংঘ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। সেটা সম্ভব হয়েছিল সব বিবদমান গ্রুপের সম্মতির ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিভক্তি স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে কিভাবে বিএনপিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আনা যায়, এটা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। খালেদা জিয়াকে 'মাইনাস' করে কোনো সমাধান খুঁজলে তা কোনো সমাধান দেবে না। বরং এতে করে আরো জটিলতা বাড়বে। একাধিক কারণে বিএনপির সঙ্গে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা সরকারের জন্য জরুরি। প্রথমত, বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে, যেখানে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি এসেছে। এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে হলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। আর এর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই এই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু গত দেড় বছরের সংসদীয় রাজনীতির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় পার্টি সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারছে না। ফলে সংসদকে আরো গ্রহণযোগ্য, আরো অর্থবহ এবং সর্বোপরি একটি সঠিক জাতীয় নীতি প্রণয়নে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা বাঞ্ছনীয়। আর বিএনপিই সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারে। তৃতীয়ত, বিএনপি সংসদে না থাকলেও, বিএনপি যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অপরিহার্য অংশ, দাতাগোষ্ঠী এটা স্বীকার করে এবং তারা সবাই বিএনপিকে মূল ধারার রাজনীতিতেই দেখতে চায়। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের অবস্থানও অনেকটা সে রকম। সরকারের ভূমিকা তাই এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। চতুর্থত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্যতম দুটি শক্তি। এই দুটি দল দুটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে, এই দুটি দলের একটি বাদ দিয়ে যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তা স্থায়ী হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল জনগণের ভোটে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এরশাদীয় জমানায় যে সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও, বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় ওই সংসদ টিকে থাকেনি। ১৯৮৮ সালের সংসদও টেকেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ না নেওয়ার কারণে। এ দুই দলের অংশগ্রহণ থাকার কারণেই পঞ্চম সংসদ (১৯৯১), সপ্তম সংসদ (১৯৯৬), অষ্টম সংসদ (২০০১) ও নবম সংসদ (২০০৮) গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকায় ৫ জানুয়ারির (২০১৪) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও, যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়। তাই সিদ্ধান্তটি এখন নিতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন সব প্রশ্নের কোনো জবাব দেবে না। আস্থার সম্পর্ক যদি গড়ে না ওঠে, যদি 'কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস' তৈরি না হয়, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়েও কোনো লাভ নেই। নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চাকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এই উপলব্ধি বা বোধটুকু যদি না আসে তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জানিয়েও তাতে কোনো ফল আসবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচন হোক; কিন্তু তাতে যেন 'সব দলের অংশগ্রহণ' থাকে। Daily Kalerkontho 04.08.15

বিএনপি কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারবে



সাম্প্রতিক সময়ে এটা একটা বহুল আলোচিত বিষয় যে, বিএনপি কি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? টিভি টক শোতে, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে, একাধিক মন্ত্রীর বক্তব্যে ঘুরেফিরে একটা কথাই আসছে যে, বিএনপি কি তার ‘অবস্থান’ ধরে রাখতে পারবে? এমন কথাও বলা হচ্ছে, বিএনপি এখন ভেঙে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে! বিএনপি ভেঙে যাবে কি যাবে না, এটা নিয়ে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা যত বেশি না ‘কনসার্ন’, তার চেয়ে বেশি ‘কনসার্ন’ দেখি আমি কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সোচ্চার আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। ঈদের পর পরই খালেদা জিয়ার বিচারের জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল হবে এবং তাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হবে (যুগান্তর, ১২ জুলাই)Ñ তথ্যমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য সঙ্গত কারণেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। এমনকি গত ২৮ জুলাই ক্যাবল টিভি দর্শক ফোরাম আয়োজিত গোল্ডেন ওয়ার্ল্ড সেরা সাংবাদিক পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনি যে মন্তব্যটি করেন, তাও আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। তিনি ওই অনুষ্ঠানে বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান দল থেকে সরে দাঁড়ালেই বিএনপি শক্তিশালী হবে (আরটিএনএন, ২৮ জুলাই)। জনাব ইনু ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তার নিজের দল ভেঙেছে কয়েকবার, কয়েক টুকরায়। তিনি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, দল কাকে রাখবে, কাকে রাখবে না- এটা স্বাভাবিকভাবেই দলের নেতাকর্মীদের সিদ্ধান্ত। এখন আগ বাড়িয়ে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে জেলে পাঠানোর (?) কথা বললে, এটা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এ ধরনের মন্তব্য না করাই মঙ্গল।
তবে বিএনপি নানা সমস্যায় আক্রান্ত এটা তো অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি দল গোছানোর কথা বলছে। তবে বিএনপির কয়েকজন নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা আছে। বিএনপি ভাঙার ‘গুজব’ এ কারণেই। ‘বেগম জিয়াকে দিয়ে হবে না’ কিংবা ‘জিয়ার আদর্শে ফিরে যেতে হবে’Ñ এ ধরনের বক্তব্য যখন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুখ থেকে বের হয়, তখন গুজবের নানা ডালপালা গজায়। মির্জা ফখরুল জামিন পেলেও অনেকেই জেলে আছেন এখনো। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা আছে। আর যারা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন, ওই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করেছে সরকার। এর অর্থ পরিষ্কারÑ মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ‘ব্যস্ত’ রাখতে চায় সরকার। যাতে করে তারা ‘আন্দোলনে’ নিজেদের জড়িত করতে না পারেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে এমনটি কখনোই দেখা যায়নিÑ এত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা! ফলে এসব নেতাকর্মী আর রাজপথে সক্রিয় হতে পারবেন না। বেগম জিয়াকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন-সংক্রান্ত ধারা) বিচার কিংবা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় শাস্তি দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা, একই সঙ্গে ড্যান্ডি ডায়িং মামলায় তারেক রহমানকে শাস্তি দিয়ে তাকেও অযোগ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার মাইনাস ওয়ান ফর্মুলার দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। এ ক্ষেত্রে বেগম জিয়াকে নির্বাচনে ‘অযোগ্য ঘোষণা’ (?) বিএনপি খুব সহজভাবে নেবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রমাণ হবে তখন অবান্তর। বেগম জিয়াই বিএনপির মূল শক্তি। বেগম জিয়া যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, বিএনপির ‘বিকল্প নেতৃত্ব’ নির্বাচনে অংশ নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বেগম জিয়া কিংবা তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপি সংগঠিত হবে এটাও আমার মনে হয় না। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মুলা কার্যকর করতে চান, আমার ধারণা তা কোনো কার্যকর ‘ফল’ দেবে না। ‘আসল বিএনপি’ কিংবা নাজমুল হুদার ‘ফালতু কথাবার্তা’য় মানুষ খুব আস্থাশীল এটা আমার মনে হয় না। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েও সরকার খুব লাভবান হয়নি। জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বহীনতার মুখে। ফলে সরকারের কাছে এখন বিকল্প পথ দুটি। বিএনপিকে যে কোনোভাবে আস্থায় নিয়ে ২০১৬ সালের শেষের দিকে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেওয়া। অথবা সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। যে কোনো সময়ের চেয়ে সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। সরকার উপরোল্লিখিত যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথম ক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। বিএনপি অতীতে যতই ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ কিংবা জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচনের কথা বলুক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে কিছুটা নমনীয় হতে হবে। বিএনপির নেতাকর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা না করলে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। আর আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা যাবে না। এখন বিএনপিকে আস্থায় নিতে হলে সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করাটা তাই জরুরি। এটাকে ভিত্তি করে সংলাপ শুরু করা যেতে পারে এবং আমার ধারণা এতে করে একটা পথ বের হওয়া সম্ভব। বিএনপির একটা ফর্মুলা বা প্রস্তাব উপস্থাপন করাও জরুরি। যাতে বর্তমান সংবিধানকে মেনেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ‘সকল দলের অংশগ্রহণ’ সম্ভব। এখানে বলা ভালো, ‘সকল পক্ষ’ যদি রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কোনো দেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয় না। নেপাল,
নামিবিয়া কিংবা কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। সেটা সম্ভব হয়েছিল সব বিবদমান গ্রুপের সম্মতির ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিভক্তি স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে কীভাবে বিএনপিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আনা যায়, এটা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। বেগম জিয়াকে ‘মাইনাস’ করে কোনো সমাধান খুঁজলে, তা কোনো সমাধান দেবে না। বরং এতে করে আরও জটিলতা বাড়বে। একাধিক কারণে বিএনপির সঙ্গে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা সরকারের জন্য জরুরি। বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপরে, যেখানে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি এসেছে। এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে হলে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। আর এর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই এ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু গত দেড় বছরের সংসদীয় রাজনীতির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় পার্টি সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারছে না। ফলে সংসদকে আরও গ্রহণযোগ্য, আরও অর্থবহ এবং সর্বোপরি একটি সঠিক জাতীয় নীতি প্রণয়নে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা বাঞ্ছনীয়। আর বিএনপিই সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারে। বলা চলে, বিএনপি সংসদে না থাকলেও বিএনপি যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অপরিহার্য অংশ, দাতাগোষ্ঠী এটা স্বীকার করে এবং তারা সবাই বিএনপিকে মূল ধারার রাজনীতিতেই দেখতে চায়। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের অবস্থানও অনেকটা সে রকম। সরকারের ভূমিকা তাই এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এটা স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্যতম দুটি শক্তি। এ দুটি দল দুটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে, এ দুটি দলের একটাকে বাদ দিয়ে যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তা স্থায়ী হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল জনগণের ভোটে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এরশাদীয় জমানায় যে সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় ওই সংসদ টিকেনি। ১৯৮৮ সালের সংসদও টেকেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অংশ না নেওয়ার কারণে। এ দুদলের অংশগ্রহণ থাকার কারণেই ৫ম সংসদ (১৯৯১), ৭ম সংসদ (১৯৯৬), ৮ম সংসদ (২০০১) ও ৯ম সংসদ (২০০৮) গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকায় ৫ জানুয়ারি (২০১৪) দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
পরিবর্তিত পরস্থিতিতে বিএনপি অনেক নমনীয় হয়েছে এবং তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া অনেক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে, বিএনপি সরকারের সঙ্গে একটি ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে’ যেতে চায় এবং যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। বিএনপি নেত্রী ও বিএনপির মুখপাত্রের ৪টি বক্তব্য দুটি বড় দলের মাঝে একটি ‘বরফ গলা’র সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে বলে আমার ধারণা। এক. বেগম জিয়া বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। এর অর্থ বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে এখন আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। দুই. সৈয়দ আশরাফ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, তিনি দলনিরপক্ষভাবেই এ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবেন। বিএনপির মুখপাত্র এ বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন. ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগকে বিএনপি সমর্থন করেছে এবং বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ইস্যুতে তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। চার. বিএনপির পক্ষ থেকে ‘স্বাভাবিক রাজনীতি’ করার দাবি জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন একটা ধরপাকড়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বিএনপি মুখপাত্র নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করছেন। এখন দেখার পালা বিএনপিকে বড় সমাবেশ করতে সরকার দেয় কি না।
তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, আগামী দিনের রাজনীতি আবর্তিত হবে বিএনপির আচরণের ওপর। বেগম জিয়া দল পুনর্গঠন করে জানুয়ারির দিকে নতুন করে আন্দোলনের কথা বলছেন। সরকার যদি বিএনপিকে আস্থায় নিতে না পারে, তাহলে বিএনপি তো আন্দোলনে যাবেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আন্দোলনের ধরনটা কী হবে। বিএনপি যতই বলার চেষ্টা করুক তারা ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ করবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে ভয় তো একটা আছেইÑ আন্দোলন না আবার সহিংস রূপ ধারণ করে? তাই বিএনপিকে আস্থায় নেওয়াটা জরুরি এবং একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা থাকাও ভালো। ইতোমধ্যে বিএনপির থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, বিএনপি চার শর্তে নির্বাচনে যেতে পারে। এ চারটি শর্ত হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানো, নিরপেক্ষ প্রশাসন, মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে দেওয়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই একটি সরকার। যদিও আমরা নিশ্চিত নই এটা অধ্যাপক এমাজের ব্যক্তিগত অভিমত নাকি বিএনপি এ অভিমতগুলো ধারণ করে। এ চারটি শর্ত নিয়েও কথা আছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই নির্বাচন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন একটি সরকার হবে বটে, কিন্তু তাতে বিএনপির অন্তর্ভুক্তি কীভাবে সম্ভব, এটা একটা প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের প্রস্তাবটি ভালো এবং তা হওয়া দরকার। নির্বাচন কমিশন তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিষয়টি আপেক্ষিক। আর সংসদ নির্বাচনের আগে ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
এখন নির্বাচন তো অনেক দূরের কথা। বিএনপির শীর্ষ নেতারা কীভাবে মামলা-মোকদ্দমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন কিংবা বেগম জিয়া কীভাবে দল গোছাবেন, সে ব্যাপারেই আগ্রহ থাকবে অনেকের। নিঃসন্দেহে বিএনপি গঠিত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো এক কঠিন সময় পার করছে। এরশাদের শাসনামলে বিএনপি ভাঙার উদ্যোগ খুব একটা সফল হয়নি। বেগম জিয়াকে ঘিরেই বিএনপির রাজনীতি। বেগম জিয়ার সুস্থতা, তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির মামলার রায়, দল পুনর্গঠনে ‘নানা জটিলতা’ কাটিয়ে ওঠাÑ এসব কিছুর ওপরই নির্ভর করছে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি। আর এটি দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
Amader Somoy
02.08.15