রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

সুচির অপেক্ষার পালা বাড়ল

শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য হলো। নভেম্বরের (২০১৫) সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও অং সান সুচি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না। মিয়ানমারে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার বিদ্যমান। আর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে অং সান সুচি প্রেসিডেন্ট পদে যোগ্য বলে বিবেচিত হলেন না। তার সন্তানরা বিদেশি নাগরিক, সংবিধানের এই বিশেষ ধারাটির কারণে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েও তার পক্ষে সম্ভব হলো না প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়া। তার দল প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করে অং সান সূচি দীর্ঘদিনের বন্ধু টিন কি আউকে। দেশটির আইন প্রণেতারা পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে এ পদে নির্বাচিত করেন। ৬৯ বছর বয়সী টিন কি আউ পার্লামেন্টের দুই কক্ষের ৬৫২ ভোটের মধ্যে ৩৬০টি ভোট পান। টিন কি আউ-এর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে সূচির বিজয় বলে চিহ্নিত হলেও টিন কি আউ, যিনি অং সান সুচির খুব ঘনিষ্ঠ এবং ধারণা করা হচ্ছে তিনি হতে যাচ্ছেন একজন ‘প্রস্ক্রি প্রেসিডেন্ট।’ মূল ক্ষমতা থেকে যাবে অং সান সুচির হাতে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি একাধিকবার মিটিং করেছেন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে। বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায় সুচি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধানকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন নির্বাচিত সংসদ বর্তমান সংবিধান সাময়িকভাবে ‘স্থগিত’ করবে। অথবা প্রেসিডেন্ট এক অধ্যাদেশ বলে সংবিধান সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা ঘোষণা করবেন। বিনিময়ে সুচি সেনাবাহিনীকে ১৪ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা দেবেন। কিন্তু অত্যন্ত ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী তাতে রাজি হয়নি। ফলে সুচিকে বাধ্য হয়েই উচ্চ কক্ষ ও নি¤œ কক্ষ থেকে তার দলের দুই নেতাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দিতে হয়। নির্বাচনে একজন বিজয়ী হবেন এবং বাকি দুজন (মোট ৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন) ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাবেন। এর অর্থ হচ্ছে নির্বাচনে এনএলডির দুই প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন এবং তৃতীয় ব্যক্তি সেনা সমর্থিত, যিনি একই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এখানে নির্বাচন হবে বটে। কিন্তু এই নির্বাচনে কেউ হেরে যায় না। এখানে বলা ভালো সংসদে সুচির দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এরা সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবেন না। কেননা সংবিধান অনুযায়ী সংবিধানের যে কোনো পরিবর্তনে সেনাবাহিনী ‘ভেটো’ দিতে পারবে। ফলে অং সান সুচি গেল নির্বাচনে বিজয়ী হলেও এবং তার দল থেকে একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেও পর্দার অন্তরালে মূল ক্ষমতা থেকে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর হাতে। সুচি ইতোমধ্যে ‘বিতর্কিত’ হয়েছেন তার কোনো কোনো বক্তব্যের জন্য। তিনি বিদেশি গণমাধ্যমে নিজের মনোনয়ন যেভাবে তুলে ধরেছিলেন তাতে করে তার এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ফুটে উঠেছিল। যেখানে তার উচিত ছিল একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা, ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়া, এটা না করে তিনি এক ধরনের ‘হুমকির সুরে’ সরকার পরিচালনার কথা বলেছিলেন। গণতন্ত্রের নামে এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ আমরা কোনো কোনো দেশে লক্ষ্য করি। মালয়েশিয়ায় ক্ষমতাসীন জোট গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণের জš§ দিয়েছেন। সিঙ্গাপুরে এক দলীয় (পিপলস অ্যাকশন পার্টি) শাসন বজায় রয়েছে। যদিও জনগণই তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। কম্পুচিয়ায় সমাজতন্ত্র পরবর্তী কাঠামোয় এক দলীয় (পিপলস পার্টি) শাসন বর্তমান। থাইল্যান্ডে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাগ্রহণ করলেও সেখানে থাকসিন সিনাওয়াত্রার দলের প্রভাব অনেক বেশি। তার নামেই তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা বিজয়ী হয়েছিলেন এবং সরকারও গঠন করেছিলেন। সমাজতন্ত্র পরবর্তী মধ্য এশিয়ার প্রতিটি দেশে গণতন্ত্রের নামে এক দলীয় কর্তৃত্ব বজায় রয়েছে। আমরা বেলারুশের কথাও বলতে পারি। এখানে নির্বাচন হচ্ছে বটে, কিন্তু কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে নেয়া হচ্ছে। এখন অং সান সুচির দল কি এ পথেই যাচ্ছে? ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে তাকে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের কোনো উদ্যোগ তিনি নিতে পারবেন না। কেননা সেনাবাহিনী এই উদ্যোগকে সমর্থন করবেÑএটা মনে হয় না। ফলে প্রশ্ন থেকেই গেল। জনগণই যে ‘সব ক্ষমতার উৎস’ মিয়ানমারের সংসদ নির্বাচন এই কথাটা আবার প্রমাণ করেছিল। এই নির্বাচন পরবর্তী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক শক্তিকে নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করেছিল। দুঃখের কথা এই প্রথমবারের মতো সেখানে সংসদে কোনো মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে মুসলমানদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরো দানা বাঁধবে। উগ্রপন্থি বৌদ্ধরা মুসলিম নিধন ও উৎখাতে এতে আরো উৎসাহিত হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। অর্থাৎ মার্চ মাসে যখন সংসদ বসছে, তারপর ২০২১ সাল পর্যন্ত এই সংসদ টিকে থাকার কথা। সময়টা অনেক লম্বা। নতুন সংসদ নির্বাচনের পর সুচি প্রায় চার মাস সময় পেয়েছিলেন হাতে। সুচি ওই সময়টা কাজে লাগিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি ‘সমঝোতায়’ যেতে। সম্ভবত এটাই তার জন্য শেষ সময়। ২০১০ সালেও একটি নির্বাচন হয়েছিল। তার দল ঠিক সময়মতো নিবন্ধন করতে না পারায় অথবা নিবন্ধন না করায় ৫ বছর পিছিয়ে গিয়েছিলেন সুচি। এবারো যদি তিনি ভুল করতেন, তাহলে তাকে অপেক্ষা করতে হতো ২০২১ সাল পর্যন্ত। সময়টা অনেক বেশি। সুচির বয়স গিয়ে দাঁড়াবে তখন ৭৪। এরপর তার পক্ষে আর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সম্ভব হবে না। সে কারণেই তিনি মিয়ানমারের সামাজে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে মেনে নিয়েছেন। আমরা তার বাস্তবমুখী একটি সিদ্ধান্তই আশা করেছি। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে মিয়ানমার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সড়ক পথ চালু হলে এই সড়ক পথ একদিকে যেমনি আমাদের চীনের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে অন্যদিকে আমরা আমাদের পণ্য নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও যেতে পারব। আমাদের পণ্যের বিশাল এক বাজার সৃষ্টি হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উভয় দেশই বিমসটেক (BIMSTEC, পরবর্তিত নাম BBIMSTEC) এবং BCIM জোটের সদস্য। যদিও প্রস্তাবিত BCIM জোটটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভুটান ও নেপাল বিমসটেক জোটে যোগ দেয়ায় এই জোটটি শক্তিশালী হয়েছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামে মিয়ানমারের কাঁচামালভিত্তিক ব্যাপক শিল্প-কারখানা স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক মিয়ানমারে বাংলাদেশি সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন চট্টগ্রাম এলাকায় বেশ কিছু সার কারখানা স্থাপন করে বাংলাদেশ মিয়ানমারে সার রফতানি করতে পারে। মিয়ানমারের আকিয়াব ও মংড়ুর আশপাশের অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর পাওয়া যায়। এসব কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিমেন্ট ও কাগজ শিল্প বিকশিত হতে পারে। মিয়ানমারে প্রচুর জমি অনাবাদী রয়েছে। এ অবস্থায় মিয়ানমারের ভূমি লিজ নিয়ে  বাংলাদেশের জন্য চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মান্দালয়-ম্যাগওয়ের তুলা আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধিষ্ণু গার্মেন্টস সেক্টরের কাঁচামাল হিসেবে তুলা মিয়ানমারের এই অঞ্চল থেকে আমদানি করতে পারে। গবাদিপশু আমদানি করার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশিরা মিয়ানমারে গবাদিপশুর খামারও গড়ে তুলতে পারে। মিয়ানমারের সেগুন কাঠ পৃথিবী বিখ্যাত। আমাদের ফানির্চার শিল্পের চাহিদা মেটাতে পারে এই সেগুন কাঠ। যার ওপর ভিত্তি করে আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপে আমাদের ফানির্চার শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারি। মিয়ানমারে মূল্যবান পাথর, যেমন রুবি, জেড, বোম আর মার্বেলসমৃদ্ধ। এসব মূল্যবান পাথর আমাদের জুয়েলারি শিল্পকে সমৃদ্ধ করে ভ্যালুএডিশনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ও চীনের সমন্বয়ে যে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে (বিসিআইএম) সেখানেও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং মিয়ানমারে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু মিয়ানমারকে নিয়ে প্রশ্ন অনেক। মিয়ানমারে একটি নির্বাচন হয়েছিল বটে। কিন্তু এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি জšে§র সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে না। দীর্ঘ ৫৪ বছর সেখানে যে সংস্কৃতির জš§ হয়েছে, তা হুট করে ভেঙে ফেলা যাবে না। সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে যে প্রভাব, তা হ্রাস করা যাবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সেনাবাহিনীর একটি নির্বাচন দেয়া প্রয়োজন ছিল। সেটা তারা দিয়েছে। কিন্তু তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে, এটা আমার মনে হয় না। মিসরের মতো পরিস্থিতিরও জš§ হতে পারে মিয়ানমারে। ‘আরব বসন্ত’ মিসরে পরিবর্তন ডেকে এনেছিল। সেনা নিয়ন্ত্রিত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেঙে পড়েছিল কায়রোর ‘তেহরির স্কোয়ার’ এর দীর্ঘ ১৭ দিনের গণঅবস্থানের কারণে। তার পরের ঘটনা সবাই জানেন। হোসনি মোবারকের ক্ষমতা হস্তান্তর, একটি নির্বাচন, নির্বাচনে ড. মুরসির বিজয় (জুন ২০১২) এবং পরবর্তীতে (২০১৩) সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফিল্ড মার্শাল সিসির ক্ষমতাগ্রহণ। ‘আরব বসন্ত’ মিসরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এখন মিয়ানমার কি সেদিকেই হাঁটছে। সেনাবাহিনী নির্বাচন ও সংসদকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু সব ‘সুযোগ-সুবিধা’ তারা ছেড়ে দেবেন, এটা মনে হয় না। এক্ষেত্রে সুচিকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটা সহাবস্থানে যেতে হবে। নতুবা তিনি ‘পর্দার অন্তরালে’ থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারবেন না। এর অর্থ পরিষ্কার সেনা সমর্থন তিনি পেলেন না। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে টিন কি আউকেই সামনে নিয়ে আসলেন। তিনি নিজে আদৌ প্রার্থী না হয়ে সংবিধান মেনে নিলেন। এর মাধ্যমে তিনি সেনাবাহিনীর আস্থা অর্জন করতে পারেন। সরকার তার ‘ভূমিকা’ নিয়েও প্রশ্ন থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ মর্যাদায় তিনি একটি ‘পদ’ পেতে পারেন। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বিচ্ছিন্নতাবাদী ৮টি গ্রুপের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু চুক্তির বাইরে আরো বিচ্ছিন্নবাদী গ্রুপ রয়েছে। এদেরও চুক্তির আওতায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক সংস্কারটা খুবই জরুরি। বৈদেশিক বিনিয়োগে দীর্ঘদিন এ দেশে বন্ধ ছিল। এখন এটি উš§ুক্ত। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে বিপুল জ্বালানি সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আসলেই এই সম্পদ আহরণ সম্ভব। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা মিয়ানমারে আসতে শুরু করেছেন। এখন ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতির’ কারণে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা আরো উৎসাহিত হবেন। রোহিঙ্গা সমস্যা বহির্বিশ্বে মিয়ানমারের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট করেছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক অমানবিক জীবনযাপন করছে। সুচি এদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি উগ্র বৌদ্ধ মানসিকতায় নিজেকে সম্পর্কিত করেছিলেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার ভোট প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সেটা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর কাছ থেকে মানুষ আরো বেশি কিছু প্রত্যাশা করে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া, তাদের চলাচলে বাধা নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়া কিংবা তাদের নিজ বাসভূমিতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। নয়া সরকার এই কাজটি করবে এটাই মানুষ প্রত্যাশা করে।
১৯৬২ সালের পর মিয়ানমার এই প্রথমবারের মতো একজন সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট পেল। নয়া প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। দীর্ঘ ৫৪ বছর সামরিক বাহিনী সেখানে ক্ষমতা পরিচালনা করেছে। ফলে সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়নি। সংবাদপত্র যেখানে স্বাধীন নয়, বিচার বিভাগও স্বাধীন নয়। এগুলো সবই একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য প্রয়োজন। এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নিতে যাচ্ছে। ৩১ মার্চ নয়া প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব নেবেন। একটি সরকারও গঠিত হবে তখন। ফলে নতুন এক মিয়ানমারকে দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র। Daily Manobkontho 16 March 2016

বিএনপি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?




আগামী ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশন। এটি বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল। এই কাউন্সিল নিয়ে কর্মীদের মধ্যে যেমন ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তেমনি সুশীলসমাজের মধ্যেও একটা প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে বিএনপি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়া অবিসংবাদিত নেত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন। তার জনপ্রিয়তা সেদিন তুঙ্গে উঠেছিল। এই জনপ্রিয়তা তার দলকে ১৯৯০ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিল। তিনি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তারপর থেকে আর তাকে পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। তার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়া এবং নির্বাচন বয়কট করার ডাক দিয়ে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়ে দলটি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে 'সহিংস রাজনীতির' জন্ম হয় তার জন্য অভিযুক্ত করা হয় বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে। শত শত নেতাকর্মীর নামে মামলা করা হয়। শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীদের নামে শত শত মামলা হয়। এমনকি আজো শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ 'বাস পোড়ানোর' মামলা থেকে নিষ্কৃতি পাননি। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এরকম ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এভাবে কোনো দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অতীতে কখনো এভাবে মামলা-মোকদ্দমা ও জেল-জুলুম মোকাবেলা করেননি। এতকিছুর পরও বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপির অবর্তমানে জাতীয় পার্টি 'বিএনপির অবস্থান'টা নিতে পারেনি। বিএনপি এখনো প্রধান বিরোধী দল। ফলে সঙ্গত কারণেই বিএনপি যখন এরকম একটি বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের কাউন্সিল করতে যাচ্ছে তখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি তাদের দিকেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই সংবাদপত্র যখন মন্তব্য করে 'বিএনপি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে', তখন তা যুক্তিসঙ্গত বৈকি! তবে এই কাউন্সিলের ওপর অনেককিছু নির্ভর করছে। দলটিকে গোছানো দরকার। নেতৃত্বের সারিতে পরিবর্তনও প্রয়োজন। বেগম জিয়া কিংবা তারেক রহমানকে চ্যালেঞ্জ করার দলের কেউ নেই বটে, কিন্তু শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তন, যারা দল ত্যাগ করেছিলেন কিংবা বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তাদের ফিরিয়ে আনা_ এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য এগুলোই জরুরি।
গেল পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপি ৩৭ বছরে পা রেখেছে। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এই ৩৭ বছর একেবারে কম সময় নয়। দলটি একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া এই রাজনৈতিক দলটি বর্তমানে এক কঠিন সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। বোধকরি অতীতে কখনই দলটি এ ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েনি। যারা রাজনীতির গতি প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেন তারা জানেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দলটির একটি শক্ত অবস্থান আছে। তিনবার দলটি ক্ষমতায় ছিল (১৯৭৮-১৯৮২, ১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬)। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির একটি অবস্থান আছে। ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্ষমতা থেকে বিএনপির উৎখাতের পর ওইসময় যখন বিএনপির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ছিল ঠিক তখনই একজন গৃহবধূ থেকে (১৯৮৩) রাজনীতির পদপ্রদীপে আসেন বেগম জিয়া। এখন তিনিই বিএনপির অবিসংবাদিত নেত্রী। তাকে কেন্দ্র করেই বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ৯০-এ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যে বেগম জিয়াকে দেখেছিল একজন অবিসংবাদিত নেত্রী হিসেবে, সেই বেগম জিয়াকে এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বয়স বেড়েছে। অসুস্থ তিনি। ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনে অংশ না নেয়া কিংবা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে যে সহিংস রাজনীতির জন্ম হয়েছে এ দেশে, তা ব্যক্তিগতভাবে বেগম জিয়া তথা বিএনপির রাজনীতিকে উজ্জ্বল করেনি। বেগম জিয়াকে আমার এমন মনে হয়েছে 'নিঃসঙ্গ একজন নাবিক হিসেবে, যিনি আদৌ জানেন না কোনদিকে এবং কোন পথে বিএনপি নামক 'জাহাজ'টিকে তিনি পরিচালনা করবেন। এক সন্তানহারা, অন্য সন্তান অনেক দূরে, নেতাকর্মীরা জেলে। 'নিঃসঙ্গ বেগম জিয়া' এখন একাই বিএনপি।
বর্তমানে বিএনপি নানা সমস্যায় আক্রান্ত_ এটা তো অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি দল গোছানোর কথা বলছে। তবে অতীতে বিএনপির কয়েকজন নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা আছে। বিএনপি ভাঙার 'গুজব' এ কারণেই। বেগম জিয়াকে দিয়ে হবে না, কিংবা 'জিয়ার আদর্শে ফিরে যেতে হবে'_ এ ধরনের বক্তব্য যখন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুখ থেকে বের হয় তখন গুজবের নানা ডালপালা গজায়।
মীর্জা ফখরুল জামিন পেলেও কেউ কেউ জেলে আছেন এখনো। অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা আছে। আর যারা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন, ওই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করেছে সরকার। এর অর্থ পরিষ্কার_ মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ত রাখতে চায় সরকার, যাতে করে তারা 'আন্দোলনে' নিজেদের জড়িত করতে না পারেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে এমনটি কখনই দেখা যায়নি_ এত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা। ফলে এসব নেতাকর্মীরা আর রাজপথে সক্রিয় হতে পারবেন না। বেগম জিয়াকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনসংক্রান্ত ধারা) বিচার, জিয়া চেরিটেবল ট্রাস্ট মামলা কিংবা গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় শাস্তি দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা, একই সঙ্গে ডান্ডি ডায়িং মামলায় তারেক রহমানকে শাস্তি দিয়ে তাকেও অযোগ্য ঘোষণার মধ্যদিয়ে সরকার 'মাইনাস ওয়ান' ফর্মুলার দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। এ ক্ষেত্রে বেগম জিয়াকে নির্বাচন 'অযোগ্য ঘোষণা' করা হলে আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি নির্বাচনের জন্য যোগ্য হবেন কিনা জানি না। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রশ্ন হবে তখন অবান্তর। বেগম জিয়াই বিএনপির মূল শক্তি। বেগম জিয়া যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন বিএনপির 'বিকল্প নেতৃত্ব' নির্বাচনে অংশ নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বেগম জিয়া কিংবা তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপি সংগঠিত হবে_ এটাও আমার মনে হয় না। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা যদি 'মাইনাস ওয়ান' ফর্মুলা কার্যকর করতে চান, আমার ধারণা তা কোনো কার্যকর 'ফল' দেবে না। 'আসল বিএনপি' কিংবা নাজমুল হুদার 'ফালতু কথাবার্তায়' মানুষ খুব আস্থাশীল এটা আমার মনে হয় না। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েও সরকার খুব লাভবান হয়নি। জাতীয় পার্টি এখন নানা 'জটিলতার' মুখে। ফলে সরকারের কাছে এখন বিকল্প পথ দুটি। এক. বিএনপিকে যে কোনোভাবে আস্থায় নিয়ে ২০১৭ সালের প্রথমদিকে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়া। দুই. অথবা সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষেরদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। যে কোনো সময়ের চেয়ে সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। উপরে উলি্লখিত দুটি সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি, অর্থাৎ প্রথমটির ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ কম। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনটিই সরকার করতে চায়। কিন্তু প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে যদি ২০১৮ সালের শেষে নির্বাচন হয়, তাহলে সমস্যা যা ছিল তাই থেকে যাবে। বিএনপির সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা যাবে না। সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দলও বলে গেছে, 'সকল দলের অংশগ্রহণের' স্বার্থে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এখনই সংলাপ শুরু হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সরকার তাতে সায় দেবে বলে মনে হয় না।
এটা স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশে একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিকল্পই বিএনপি, ঘুরেফিরে এটা প্রমাণিত। দশম সংসদে জাতীয় পার্টি পারেনি। তাই যে কোনো বিবেচনায় বিএনপির সঙ্গে একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা সরকারের জন্য জরুরি। কেননা বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের উপরে, যেখানে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি এসেছে। এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে হলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। আর এর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই এই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা সবাই বলেন, সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরের সংসদীয় রাজনীতির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় পার্টি সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারছে না। জাতীয় পার্টিতে দ্বন্দ্ব আছে সরকারের থাকা না থাকা নিয়ে। ফলে সংসদকে আরো গ্রহণযোগ্য, আরো অর্থবহ এবং সর্বোপরি একটি সঠিক জাতীয় নীতি প্রণয়নে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা বাঞ্ছনীয়। আর বিএনপিই সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারে। বলা বাহুল্য, বিএনপি সংসদে না থাকলেও বিএনপি যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অপরিহার্য অংশ, দাতাগোষ্ঠী এটা স্বীকার করে এবং তারা সবাই বিএনপিকে মূলধারার রাজনীতিতে দেখতে চায়। ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের অবস্থানও আমার ধারণা, অনেকটা সেরকম। সরকারের ভূমিকা তাই এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এটা স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্যতম দুটি শক্তি। এই দুটি দল দুটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে এই দুটো দলের একটিকে বাদ দিয়ে যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তা স্থায়ী হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল জনগণের ভোটে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এরশাদীয় জামানায় যে সংসদ নির্বাচন হয়েছিল তাতে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় ওই সংসদ টিকে থাকেনি। ১৯৮৮ সালের সংসদও টেকেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অংশ না নেয়ার কারণে। এ দু'দলের অংশগ্রহণ থাকার কারণেই ৫ম সংসদ (১৯৯১), ৭ম সংসদ (১৯৯৬), ৮ম সংসদ (২০০১) ও ৯ম সংসদ (২০০৮) গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকায় ৫ জানুয়ারির (২০১৪) দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপি অনেক নমনীয় হয়েছে এবং তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া অনেক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে বিএনপি সরকারের সঙ্গে একটি 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে' যেতে চায় এবং যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বটি অনেক বেশি বলেই আমার মনে হয়েছে। যদিও এটা সত্য একটি 'আস্থার সম্পর্ক' গড়ে তুলতে হলে বিএনপিরও দায়িত্ব অনেক। তাই যে কোনো বিবেচনায় আগামী ১৯ মার্চের কাউন্সিল অধিবেশন বিএনপির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এক. স্থায়ী পরিষদকে পুনর্গঠন করা এবং বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো। এ ক্ষেত্রে একজন উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে পারেন। উপদেষ্টা পরিষদে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যাদের সাংগঠনিক কাঠামোয় আনা যায়। দুই. বিএনপির জন্য একটি 'থিংক ট্যাঙ্ক' গঠন জরুরি। আমি পৃথিবীর অনেক রাজনৈতিক দলের খবর জানি, যেখানে দলের রাজনীতি সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে একটি 'থিংক ট্যাঙ্ক' গঠন করা হয়। এই 'থিংক ট্যাঙ্ক' দলের জন্য নীতি-নির্ধারণ করেন। এ ক্ষেত্রে দশটি সেক্টরকে ভাগ করে বুদ্ধিজীবীদের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আনা যায়। তিন. সাংগঠনিক কাঠামো আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিভাগের জন্য একজন করে সাংগঠনিক সম্পাদক থাকা দরকার। যুগ্ম মহাসচিবের সংখ্যাও বাড়ানো দরকার। চার. ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি কো-চেয়ারম্যান ও কার্যকরী সভাপতির পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কেননা দুর্নীতির মামলায় বেগম জিয়ার যদি শাস্তি হয়ে যায় তাহলে দলের দেখভাল কে করবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। পাঁচ. আগামী ২০৫০ সালকে সামনে রেখে বিএনপির একটি 'কর্ম পরিকল্পনা' উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বিএনপি ২০৫০ সালকে কিভাবে দেশটিকে দেখতে চায় এটা জানা দরকার।
সুষ্ঠুভাবে কাউন্সিলটি সম্পন্ন হোক_ এটা আমরা চাই। সরকার কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না এটাও কাম্য। এই কাউন্সিলের মধ্যদিয়ে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা, সেটাই দেখার বিষয় এখন।
Daily   Jai Jai Din
15.03.16

প্রশ্নবিদ্ধ মিয়ানমারের গণতন্ত্র

গেল নভেম্বরে মিয়ানমারের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) গত ১০ মার্চ দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের জন্য নিুকক্ষ থেকে টিন কিয়াউকে (Htin kyaw) এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে হেনরি ভ্যান থিওকে উচ্চকক্ষ থেকে মনোনয়ন দিয়েছে। নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের নেতৃত্বাধীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিও (ইউএসডিপি) তাদের প্রার্থী দিয়েছে। সেনাবাহিনীও প্রার্থী দেবে। মোট তিনজন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন ৩১ মার্চ, থেইন সেইনের টার্ম শেষ হওয়ার পর। এনএলডি-প্রধান অং সান সু চি দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না, এটা আগেই জানা গিয়েছিল। এবং বলা হচ্ছিল, সু চির খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন কেউ একজন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত তা-ই হল। সংসদের উভয় কক্ষে এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে তাদের প্রার্থীই বিজয়ী হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সু চির খুব ঘনিষ্ঠ টিন কিয়াউ হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। টিন কিয়াউ সু চির মায়ের নামে পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার স্ত্রী এনএলডির একজন এমপি এবং তার শ্বশুর এনএলডির কো-ফাউন্ডার ছিলেন।

এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সেনাশাসনের অবসান হতে যাচ্ছে বটে; কিন্তু মিয়ানমারের বিকাশমান গণতন্ত্র নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। টিন কিয়াউ প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি কি একজন ‘পুতুল প্রেসিডেন্ট’ হবেন? তার সঙ্গে অং সান সু চির সম্পর্ক কী হবে কিংবা সেনাবাহিনীর সঙ্গেই বা তার সম্পর্ক কী হবে- এসব প্রশ্ন আলোচিত হতে থাকবে বারবার। বলা হচ্ছে, সু চি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারেন! তিনি ভারতের ‘সোনিয়া গান্ধীর’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন কিনা- এসব প্রশ্নও এখন পশ্চিমা মিডিয়ায় তোলা হচ্ছে। সেনাবাহিনী প্রধানের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার ভূমিকার দিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের বিকাশমান গণতন্ত্র একটি প্রশ্নের মুখে থাকল।

স্বাধীনতা-পরবর্তী মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু থাকলেও ১৯৬২ সালের পর থেকেই সেনাবাহিনী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই জেনারেল নে উইন সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি (বিএসপিপি) গঠন করেছিলেন। ঠিক একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় ১৯৮৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর। তখন গঠন করা হয়েছিল ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি। এরই ধারাবাহিকতায় পরে গঠন করা হয়েছিল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। জেনারেল থেইন সেইন ২০১০ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে এ দলটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এখনও তিনি দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে সামরিক বাহিনী অত্যন্ত কৌশলে সু চিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার ব্যাপারে সংবিধান প্রণয়ন করেছে। সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সাল থেকেই সামরিক জান্তা জাতীয় পর্যায়ে একটি জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করে আসছিল। এবং ২০১০ সালের আগেই একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী যিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনি কোনো বিদেশীকে বিয়ে করতে পারবেন না। এক নাগাড়ে ২০ বছরের ওপর বিদেশে থাকলে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না। এবং যিনি প্রার্থী হবেন, তার সন্তান, বাবা ও মাকে মিয়ামনারে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক হতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী সু চি সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন বটে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসেবে যোগ্য বিবেচিত হননি। অবশ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও কথা আছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয় না। সংসদ প্রেসিডেন্টকে নির্বাচন করে। এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হন (৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন), পরে তাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

মিয়ামনারের সংবিধান অনুযায়ী রাজনীতিতে, বিশেষ করে সংসদীয় রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব বজায় রাখা হয়েছে অনেকটা ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো জমানার (১৯৬৬-১৯৯৮) ‘গোলকার’ মডেলের মতো। মিয়ানমারের পার্লামেন্ট দুই কক্ষবিশিষ্ট- House of Representative (Pyithu Hluttaw, নিম্নকক্ষ) ও House of Nationalities (Amyotha Hluttaw, উচ্চকক্ষ)। নিুকক্ষের সদস্য সংখ্যা ৪৪০, যেখানে সেনা প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ১১০ জনের, যাদের নিয়োগ দেন সেনাপ্রধান। আর উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা ২২৪, যার মাঝে ৫৬ জন সেনাবাহিনীর। এখানে বলা ভালো, অত্যন্ত ক্ষমতালিপ্সু জেনারেল থেইন সেইন ধীরে ধীরে ক্ষমতার শীর্ষে চলে এসেছেন। প্রথমে এসপিডিসির নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল থান সু। কিন্তু থান সুকে একসময় সরিয়ে দিয়ে থেইন সেইন চলে আসেন মূল ক্ষমতায়। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন থেইন সেইন। পরে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ থেকে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করে আসছিলেন। ২০১২ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে অং সান সু চির সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। নির্বাচনে বিজয়ের পর সু চি একাধিকবার থেইন সেইনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। এমনকি সেনাপ্রধানের সঙ্গেও সু চির একাধিক বৈঠকের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেনাপ্রধান সংবিধানের বাইরে যেতে রাজি হননি। তিনি সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীস্বার্থ দেখবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সামনে মিসরের দৃষ্টান্ত আছে। সাময়িক সময়ের জন্য সেনাবাহিনী সেখানে বেসামরিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু গোষ্ঠীস্বার্থের কারণে তারা আবার ক্ষমতায় এসেছে। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

সংবিধান অনুযায়ী মিয়ানমারে এখন প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদও নেই। নির্বাচনের পরপরই সু চি বলেছিলেন, ‘সংবিধানে যাই লেখা থাকুক, তিনিই হবেন মূল ব্যক্তি।’ প্রশ্ন এখানেই। সংবিধান অনুযায়ী এই প্রথমবারের মতো একজন বেসামরিক প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা নিতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় ক্ষমতার বাইরে থেকে সু চি যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যান, সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য। ‘বিচক্ষণ’ সু চি কি তা করবেন? তিনি দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটা সহাবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যারা গত এক বছর এনএলডি নেত্রী অং সান সু চির ভূমিকা ও বক্তব্য খেয়াল করেছেন, তারা দেখবেন তিনি সেনাবাহিনীবিরোধী কোনো বক্তব্য দেননি। কিন্তু সেনাবাহিনীর আস্থা কতটুকু তিনি পেয়েছেন, তা নিশ্চিত নয়। মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরাও একটি ফ্যাক্টর। সেনাবাহিনী এ উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। প্রচণ্ড মুসলমানবিদ্বেষী ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীরা মাবাথা (অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রটেকশন অব রেস অ্যান্ড রিলিজিয়ন) সংগঠনের ব্যানারে সংগঠিত হয়েছে। এদের সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য সু চি নির্বাচনে ১ হাজার ৭১১ আসনের (সংসদের উভয় কক্ষ, ১৪টি রাজ্যের সংসদ ও বিভিন্ন অঞ্চল) একটিতেও কোনো মুসলমান প্রার্থী দেননি। সরকারি দল এসপিডিসিও কোনো মুসলমান প্রার্থী দেয়নি। এমনকি নির্বাচনের আগে সু চি রাখাইন স্টেট সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সমর্থনে তিনি সেখানে কোনো বক্তব্য দেননি। সিরিয়াস পাঠকরা লক্ষ্য করে থাকবেন, ২০১২ সালের পর থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপকতা এবং শত শত রোহিঙ্গার নৌকাযোগে মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যাপারেও সু চির কোনো বক্তব্য নেই। মিয়ানমারের বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে না। মিয়ানমার সরকার মনে করে, রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ ইতিহাস বলে, শত বছর ধরেই রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে।

উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাচ্ছে। সু চি এ প্রক্রিয়ার পুরোপুরি বাইরে নন। তিনি জানেন, ক্ষমতা পেতে হলে তার উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। তাই উগ্রপন্থীরা যখন মুসলমানদের হত্যা করছে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করতে, তখন তিনি নিশ্চুপ। মিয়ানমারের মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারেও তার কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তিনি যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল সুবিধাবাদিতায় ভরা। তাই বলা যাবে না তিনি সর্বজন গ্রহণযোগ্য একজন নেত্রী। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনের আগে একদিকে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক ধরনের ‘সহাবস্থানে’ গিয়েছিলেন, অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিষয়ে নিশ্চুপ থেকে তিনি উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অবস্থানকেই সমর্থন করেছিলেন। এতে করে তিনি নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হয়েছেন সত্য। কিন্তু সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি সমাজব্যবস্থা সেখানে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হবে, সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। তিনি যদি কঠোর অবস্থানে যান এবং ক্ষমতা ‘পরিচালনা’ করতে চান, তাহলে তা সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর জেনারেলদের প্ররোচিত করতে পারে। তিনি ‘রিয়েল পলিটিকসের’ পরিচয় দেবেন, এটাই সবাই প্রত্যাশা করে। এ মুহূর্তে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করা, গণতন্ত্রকে সংহত করা এবং শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করা। অনেকটা ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তো-পরবর্তী মডেল অনুসরণ করতে পারেন তিনি। সেখানে সেনাবাহিনী এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘কমিটেড’। একই সঙ্গে সু চি প্রেসিডেন্টের পদটিকে একটি ‘নিয়মতান্ত্রিক পদে’ পরিণত করার উদ্যোগ নিতে পারেন। সাংবিধানিকভাবে এটা এখন সম্ভব নয়। সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হলে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়েই তা করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি অত সহজ নয়। সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে যে ‘লিখিত সুবিধা’ ভোগ করে আসছে তা ছেড়ে দেবে, এটা মনে হয় না।

মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় রাষ্ট্রই বিসিআইএম ও বিবিআইএমএস জোটের সদস্য। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির জন্য এ দুটি জোটের গুরুত্ব অনেক বেশি। যদিও সেখানে দীর্ঘ সেনাশাসন থাকায় দু’দেশের মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য মিয়ানমারে রফতানি করে আমদানি করে তার চেয়ে বেশি। ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশ রফতানি করেছিল ৫ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য (২০১২-১৩ সালে এর পরিমাণ ১৩ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন), আর আমদানি করেছিল ২৯ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য (২০১২-১৩ সালে এর পরিমাণ ৮৪ মিলিয়ন)। অথচ বিশাল এক সম্ভাবনার দেশ মিয়ানমার। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণের অন্যতম উৎস হতে পারে মিয়ানমার। সুতরাং সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার সম্ভাবনার অনেক দুয়ার খুলতে পারে।

এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে সু চির ওপর। ‘রিয়েল পলিটিকস’ নাকি সরাসরি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিবাদ- কোনটা বেছে নেবেন সু চি? দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি অন্তরীণ ছিলেন। তিনি জানেন সেনাবাহিনী মিয়ানমারে কত শক্তিশালী। ক্ষমতা পেতে হলে সেনাবাহিনীকে আস্থায় নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তার সামনে মিসরের দৃষ্টান্ত আছে। সাময়িকভাবে সেখানে ড. মুরসিকে ক্ষমতা দিয়েছিল সেনাবাহিনী। সুযোগ বুঝে তারা আবার ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ‘বিচক্ষণ’ সু চি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিবাদে গিয়ে তার তেমন কোনো লাভ হবে না। ক্ষমতা পেতে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন। স্বামীর মৃতদেহ তিনি দেখতেও পারেননি। দুই ছেলে ব্রিটেনে, যাদের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ নেই। ফলে সু চির আগামী দিনগুলো সত্যিকার অর্থেই লক্ষ্য রাখার বিষয়। নিঃসন্দেহে তার ভূমিকার ওপর মিয়ানমারে গণতন্ত্রের অনেক কিছু নির্ভর করছে। জন ফিসার বিবিসির অনলাইনে লিখেছেন (৯ মার্চ), যারা সু চির মাঝে ‘একজন নেলসন ম্যান্ডেলাকে’ খুঁজতে চেয়েছিলেন, তারা আশাহত হবেন। ফিসার লিখেছেন, শেষদিন পর্যন্ত সু চি চেষ্টা করেছেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটা ‘সমঝোতায়’ যেতে। তিনি চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী আপাতত সংবিধান ‘স্থগিত’ করুক। বিনিময়ে সু চি সেনাবাহিনীকে ১৪ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা দিতে চেয়েছিলেন। আর নিক ডেভিস গার্ডিয়ানে (৯ মার্চ) লিখেছেন, সেনাবাহিনী যে ‘ক্ষমতা’ ভোগ করছে, তা তারা ছাড়বে না। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। ক্যাবিনেটে তিনটি পদে সেনাবাহিনী মনোনয়ন দেবে সাংবিধানিক নিয়মে। এ তিনটি পদ হচ্ছে স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা। এর অর্থ হচ্ছে, মিয়ানমারে একটি বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাউন্সিল নিয়ন্ত্রণ করবে সেনাবাহিনী। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব না নিলে (অথবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারে না থাকলে) সু চি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলেও থাকতে পারবেন না। কাজেই সরকারে একটি ‘রাজনৈতিক আবহ’ তৈরি হল বটে; কিন্তু পর্দার অন্তরালে ‘মূল ক্ষমতা’ থেকে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর হাতে। টিন কিয়াউ একজন ‘প্রক্সি প্রেসিডেন্ট’ হলেও সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও পারবেন না কিংবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও করতে পারবেন না। Daily Jugantor 14.03.16

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা




সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবাইর গত ৮ মার্চ হঠাৎ করেই বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। তার এই সফর সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার আগে থেকে অবগত ছিল না এবং পত্রপত্রিকায় এসংক্রান্ত কোনো সংবাদও এর আগে ছাপা হয়নি। উপরন্তু সমসাময়িককালে ঊর্ধ্বতন কোনো সৌদি মন্ত্রীর এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। তার এই ঢাকা সফর ইতোমধ্যে নানা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এটা কি রুটিন সফর ছিল? নাকি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সামনে রেখে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন? সৌদি মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রদূতের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, সন্ত্রাস দমনে সৌদি আরবের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে শ্রমিক অভিবাসন, বিনিয়োগ ইত্যাদি প্রশ্নও আলোচিত হয়েছে। তবে স্পষ্টতই সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। এখানে বলা ভালো, সৌদি অর্থনীতিতে বর্তমানে এক ধরনের মন্দা চলছে। তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় তা সৌদি অর্থনীতিতে আঘাত করেছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে নির্মাণশিল্পে, সেখানে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন কোম্পানি থেকে প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। এ রকম একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে অতিসম্প্রতি। ফলে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে এই মুহূর্তে শ্রমিক নেবে, এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু তেলের দাম কমে যাওয়া ও সৌদি প্রতিরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় সৌদি আরবের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাহলে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? এটা নিছক একটি রুটিন সফর ছিল না। বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন।
সেটা তাহলে কী? পাঠক স্মরণ করতে পারেন সাম্প্রতিককালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য। জোটভুক্ত দেশের সেনাবাহিনী এই মার্চ মাসে একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে সেখানে। একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ‘জধধফ-অষ-ঝযধসধধষ’ (ঘড়ৎঃয ঞযঁহফবৎ) নামে ওই মহড়ায় অংশ নিয়েছে জোটভুক্ত ২১ দেশের সেনাবাহিনী। আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর হচ্ছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ গত ৯ মার্চ আলাদাভাবে সৌদি আরব সফর করেছেন। দুজনই সেখানে দুদিন অবস্থান করেন। ধারণা করা হয়, পাকিস্তান এখন নীতিগতভাবে এই জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ তাই কোনো ‘সামরিক কার্যক্রমে’ অংশ নেয় কিনা, সেটা দেখার বিষয়। এখানে বলা ভালো, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’ এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। এখন এই জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ এ নীতি থেকে সরে আসবে কিনাÑ সেটা একটা প্রশ্ন। উপরন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে ২৫তম অনুচ্ছেদে ‘আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, সংহতি ও উন্নয়নের’ কথা বলা হয়েছে। ২৫ (ক)-তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও মাইন নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে।’ অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথাও বলা হয়েছে এ অনুচ্ছেদে। জোটে যোগ দিয়ে আগামীতে অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করবে কিনা, ‘শক্তি প্রয়োগে’ অংশ নেবে কিনাÑ এ প্রশ্ন থাকলই। যদিও জোটের পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা কী হবে তা এ মুহূর্তে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই জোটের উদ্যোগে রিয়াদে একটি কেন্দ্র হবে এবং এই কেন্দ্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী তথ্য-উপাত্ত ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে। তবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ আমাদের জানিয়েছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক অভিযান সমন্বয় ও তাতে সহায়তা করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোট গঠন করা হয়েছে।’ বাংলাদেশ আরও যুক্তি দেখিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে অন্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ এই কেন্দ্রে থাকবে। তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জোটের অন্যতম শরিক পাকিস্তান প্রথমে কিছুটা অবাকই হয়েছিল এই জোট গঠনে এবং জোটে পাকিস্তানের নাম থাকায়। পাকিস্তানের বক্তব্যÑ তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই জোটের ঘোষণা করা হয়েছিল। আমি নিশ্চিত নই, এই জোট গঠনে বাংলাদেশের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা আদৌ হয়েছিল কিনা। সৌদি আরব এ ধরনের একটি জোট গঠন করতে যাচ্ছে কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনা হয়েছে এটাও আমাদের অনেকের জানা নেই। ফলে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন গত ১৫ ডিসেম্বর এই জোট প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন, তখন বিষয়টি আমাদের অবাকই করেছিল। এমন হয়েছে কিনাÑ সৌদি আরব একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তা জোটবদ্ধ দেশগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে শুধু? এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। জোট নিয়ে পাকিস্তানের প্রশ্ন তোলা এই সম্ভাবনাটাকেই সামনে নিয়ে এসেছিল। যদিও এখন মনে হচ্ছে পাকিস্তান তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
এখানে আরও একটা কথা বলা দরকার। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, যাদের নাগরিকদের প্রায় সবাই মুসলমান। ওই অঞ্চলের একটি দেশও জোটে যোগ দেয়নি। তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, কিরঘিজিস্তানÑ এ দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ও সোভিয়েত রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে গেলে, এ দেশগুলো স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ যদি অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে থাকে জোটে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাহলে মুসলমানপ্রধান এ দেশগুলো যোগ দিল না কেন? ইন্দোনেশিয়া বড় মুসলিম দেশ। এ দেশটিও নেই কেন? পাঠক, লক্ষ করুন কোন দেশগুলো যোগ দিয়েছে? বেনিন, সাদ, টোগো, জিবুতি, সুদান, সিয়েরালিওন, গ্যাবন, সোমালিয়া, কমোরোস, মালদ্বীপÑ এই দেশগুলোর সন্ত্রাস দমনে আদৌ কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বরং জাতিসংঘ এই দেশগুলোকে কখনো বিশ্ব শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে আমন্ত্রণও জানায়নি। শুধু তাই নয়, সুদান, সিয়েরালিওন, সোমালিয়া, গিনি ইতোমধ্যে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব দেশে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারও নেই। তাহলে এ দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হলো কেন? দেশগুলো গরিব। আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। ধনী দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতার ওপর দেশগুলো নির্ভরশীল। এটাকে বিবেচনায় নিয়েই কী দেশগুলোকে সৌদি আরব তার জোটে রেখেছে?
বলা ভালো, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী জোটে ৩৪ দেশ যোগ দিয়েছে। এ জোটকে বলা হচ্ছে ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেরোরিজম’ (আইএমএএফটি)। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেই এ জোটের জন্ম। এখানে কোনো একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কথা বলা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া-ইরাকে জন্ম নেওয়া ইসলামিক স্টেট বা দায়েসের (আরবি নাম) বিরুদ্ধে আলাদাভাবে বিমান হামলা পরিচালনা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ও রাশিয়া। অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে একটি জোটÑ ‘দি গ্লোবাল কোয়ালিশন টু কাউন্টার আইএসআইএল।’ এখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, আইএসআইএল তথা ইসলামিক স্টেটের কথা। ৬৫টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই জোটের মূল টার্গেট জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। পরে এর পাশাপাশি গঠিত হয়েছিল আইএমএএফটি। একটির নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরটির নেতৃত্বে সৌদি আরব। উভয় জোটের স্বার্থ কী এক? অর্থাৎ উভয় জোট কী ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে? বিষয়টি আমার কাছে অস্পষ্ট। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জোটে বাংলাদেশকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ এ জোটে যোগ দেয়নি। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিল না কেন? নাকি ওই জোটে যোগ দেওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগে সৌদি জোটে যোগ দিল? মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ না দেওয়ার পেছনে বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষ নীতির কথা আমাকে বলতে চেয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এক টিভি টক শোতে তিনি আমাকে এ ব্যাখ্যাই দিয়েছিলেন। তবে জানিয়েছিলেন, ‘অসামরিক ও জাতিসংঘের উদ্যোগে যে কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে।’ অর্থাৎ আমি ধরে নিয়েছি যদি কোনো ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে সিরিয়ায় তাহলে বাংলাদেশ মার্কিন জোটকে সহযোগিতা করবে এবং প্রয়োজনে জোটে যোগ দেবে। তখন সৌদি জোটে, যার চরিত্র অনেকটা সামরিকÑ বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিল। ফলে সৌদি জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন যে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছু দেশ রয়েছে যে দেশগুলো উভয় জোটেই আছে (জর্ডান, আরব আমিরাত, বাহরাইন, তুরস্ক, কুয়েত ইত্যাদি)। সৌদি আরব মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটেও আছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হঠাৎ করে বাংলাদেশ সফর কিংবা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সৌদি আরব সফর প্রমাণ করে সৌদি আরব তার সামরিক জোট নিয়ে সিরিয়াস। সেখানে একটি সামরিক মহড়ার আয়োজন করাও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরেই সৌদি আরব সিরিয়ায় একটি ‘সামরিক আগ্রাসন’ চালাতে পারেÑ এমন কথা বলা হচ্ছে। এর প্রস্তুতি হিসেবে কী একটি সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে সৌদি আরব? তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কী আদৌ আগামীতে কোনো সামরিক কার্যক্রমে তার দেশের সেনাবাহিনী পাঠাবে? বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে তারা কোনোরকমের ‘সেনা কার্যক্রমে’ অংশ নেবে না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে। এখন দেখতে হবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের পর বাংলাদেশের নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসে কিনা? সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সৌদি বিনিয়োগেরও খুব একটা সম্ভাবনা আমি দেখছি না। সুতরাং সৌদি জোটের যে কোনো সামরিক কার্যক্রমে বাংলাদেশ অংশ নেবে কিনা, তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
Daily Amader Somoy
13.03.16

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

আজ বৃহস্পতিবার জানা যাবে মিয়ানমারের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হতে যাচ্ছেন। এটা একরকম নিশ্চিত যে অং সান সু চি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারছেন না। তবে তাঁর দল এনএলডির নেতৃত্বে সেখানে একটি সরকার গঠিত হবে। মিয়ানমারের নয়া সরকারের ওপর এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে ‘কালাদান প্রজেক্ট’ এবং বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে নয়া সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে বহুল আলোচিত কানেক্টিভিটির নামে একটি ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভারতের এক অঞ্চল থেকে (কলকাতা) অন্য অঞ্চলে (ত্রিপুরা ও আসাম) যাত্রীসেবা চালু হয়েছে। এবং সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহনও হবে ভবিষ্যতে; যদিও চুক্তিতে, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরিত হয়, কোথাও ‘ট্রানজিট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে ‘কানেক্টিভিটি’ শব্দটি। কালাদান প্রজেক্টটির সঙ্গে এই ট্রানজিটের বিষয়টি জড়িত। অর্থাৎ কলকাতা থেকে মিজোরামে পণ্য পরিবহনের (মিয়ানমারের ওপর দিয়ে) লক্ষ্যেই এই কালাদান প্রজেক্টটি ভারত হাতে নিয়েছিল এবং ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ভারত ৪৫০ কোটি রুপিও বরাদ্দ করেছে (দ্য হিন্দু, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। কিন্তু মিয়ানমারে এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হওয়ার পর ভারত এই কালাদান প্রজেক্ট নিয়ে কত দূর এগিয়ে যাবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় কলকাতা থেকে পণ্য এখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ত্রিপুরায় পরিবহন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ত্রিপুরা দিয়েও সেই পণ্য মিজোরামে পরিবহন সম্ভব। মিজোরামের সঙ্গে সীমান্ত (পূর্বে) রয়েছে মিয়ানমারের এবং উত্তরে বাংলাদেশের। মিজোরামের পশ্চিমে ত্রিপুরা আর সীমান্ত রয়েছে আসামের সঙ্গেও। ফলে কানেক্টিভিটির দুটি পথ (কলকাতা-ঢাকা-ত্রিপুরা এবং কলকাতা-ঢাকা-আসাম) ব্যবহার করেই একই সঙ্গে ত্রিপুরা থেকে মিজোরামে কিংবা আসাম থেকেও মিজোরামে পণ্য পরিবহন সম্ভব। এতে অর্থ ও সময়ও সাশ্রয় হবে। একসময় ভারত এই কালাদান (মিয়ানমারের কালাদান নদীর নামানুসারে এই প্রজেক্টটির নামকরণ হয়েছে) প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিল। এতে তিন পথে (সমুদ্র, নদী ও সড়ক) ভারতের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। প্রথম পর্যায়ে কলকাতা থেকে জাহাজে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে পণ্য নেওয়া হবে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সিটওয়ে (আকিয়াব) সমুদ্রবন্দরে। এই পথে ৫৩৯ কিলোমিটার সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে হবে। অতঃপর ভারতীয় পণ্য সিটওয়ে থেকে কালাদান নদীপথ ব্যবহার করে নিয়ে যাওয়া হবে নদীবন্দর পালেটওয়ায় (মিয়ানমারের চিন স্টেট), যার দূরত্ব ১৫৮ কিলোমিটার। এরপর সেই পণ্য সড়কপথে ১২৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নিয়ে যাওয়া হবে মিজোরাম সীমান্তে। বোঝাই যায় কলকাতা থেকে পথটি দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ। মজার কথা, সিটওয়ে সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন ও সড়কপথ উন্নয়নে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে, তার পুরোটাই বহন করবে ভারত। বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্য এখানেই। বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হবে। সড়ক উন্নয়নের সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ভারত আমাদের ঋণ দেবে এবং সেই ঋণ আমাদের সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। বলা ভালো, কালাদান প্রজেক্টে প্রথম পর্যায়ে (সিটওয়ে সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, নতুন টার্মিনাল তৈরি) ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে ৪৯ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার। আরাকান রিভার্স নেটওয়ার্কের তথ্য মতে ২০১৪-১৫ সালে এই প্রজেক্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা শেষ হয়নি। ভারত এই প্রজেক্ট পরিত্যাগ করেছে এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কিন্তু মোদির ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এই প্রজেক্ট নিয়ে আদৌ এগিয়ে যাবেন কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী এই প্রজেক্টের ব্যয় এরই মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, মিয়ানমার এই প্রজেক্টের কোনো ব্যয়ভার বহন না করলেও ভারতীয় পণ্য ও যানবাহনের নিরাপত্তা দেবে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। কেননা মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দীর্ঘদিনের। এবং কালাদান প্রজেক্টে যেসব রুট ব্যবহূত হবে, সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িত। তবে চুক্তি অনুযায়ী এসব রুটে (নদী ও সড়ক) মিয়ানমারের পণ্য এবং জনসাধারণ পরিবহন করা যাবে না। কালাদান প্রজেক্টের পাশাপাশি বিসিআইএম (BCIM) জোটটির কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। ভারত এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়ার পরই এই বিসিআইএম জোটের ধারণা শক্তিশালী হয়। এই জোট কার্যকর হলে কুনমিং (চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী) থেকে সড়কপথে বাংলাদেশ ও ভারতেও আসা যাবে এবং পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে। এর ফলে চীনা পণ্যের দামও কমে যাবে। উপরন্তু ২০২০ সালের মধ্যে আসিয়ানে মুক্তবাজার সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য প্রবেশাধিকারের পথ সহজ হবে। বিসিআইএমের আওতায় কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক হবে। তিনটি রুটে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত সংযুক্ত হবে। নর্থ রুটে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের Myitkyha হয়ে ভারতের Ledo পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। এই রুটে বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে না। রুটটি অনেক কঠিন। সাউথ রুটে ইউনান থেকে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর সোনাদিয়া পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। কুনমিং মান্দালয় (মিয়ানমার) হয়ে এই রুট চট্টগ্রামে প্রবেশ করবে। পরে ঢাকা হয়ে কলকাতা যাবে। এখন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির কারণে) এই প্রস্তাবিত রুটের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তৃতীয় প্রস্তাবিত রুটটি হচ্ছে মিডল রুট। এই রুট ভালো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহূত হচ্ছে। এটিই প্রাচীন সিল্ক রুট। কুনমিং Bhamo-Lashio-Tamu (মিয়ানমার), ইম্ফল (ভারত), সিলেট-ঢাকা ও কলকাতা হচ্ছে এই রুট, যা কিনা ক২ক নামেও পরিচিত। অর্থাৎ কুনমিং থেকে কলকাতা। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, এই রুটে (২৮০০ কিলোমিটার) একটি মোটর শোভাযাত্রা (২০১৩) চালু হয়েছিল। এই জোটের সম্ভাবনা ছিল বিশাল। কেননা এই চারটি দেশের (বিসিআইএম) রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ (মিয়ানমার), রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি (চীন ও ভারত), রয়েছে শিল্প (চীন), শক্তিশালী সার্ভিস সেক্টর, রয়েছে বিশাল অব্যবহূত জমি (মিয়ানমার) এবং সমুদ্রবন্দর (বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার)। ফলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে ভবিষ্যতে, যদি বিসিআইএম জোটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি তো বটেই, বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেকাংশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এই জোট। এই চারটি দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বিশ্ব জিডিপির ১০ শতাংশ। ভারত বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। জাপানকে টপকে এশিয়ায় দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ ভারত। এ অঞ্চলের উন্নয়নে ভারত বড় অবদান রাখতে পারে। ফলে বিসিআইএম জোটে ভারতের সংযুক্তি এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে। আমাদের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি অর্থাৎ পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসিয়ানে আগামী দিনে একটি মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখানে রয়েছে একটি বিশাল বাজার। এই বাজার আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আমেড-৮-এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বে বাংলাদেশ যে একটি সহনীয় ইসলাম (মডারেট ইসলাম) ধারণ করে, এই ধারণা আরো শক্তিশালী হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে ‘এশিয়া মিডলইস্ট ডায়ালগ-৮’ (আমেড-৮)-এর প্রস্তাব করেছিল। আমেড-৮-এর অন্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিসর, জর্দান, কুয়েত ও বাহরাইন। আমেড-৮-এর কথা প্রথম শোনা গিয়েছিল ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময়। এরপর আমেড-৮ নিয়ে তেমন কথাবার্তা শোনা যায়নি। ফলে আজ যখন মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নিতে যাচ্ছে, একদিকে তা এ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে যেমন উৎসাহ জোগাবে, অন্যদিকে তেমনি একটি অর্থনৈতিক জোট এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। মনে রাখতে হবে, নয়া বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম উপাদান হচ্ছে আঞ্চলিক সহযোগিতা। এত দিন মিয়ানমারে একটি ‘সামরিক সরকার’ ক্ষমতায় থাকায় এই আঞ্চলিক সহযোগিতা বিস্তার লাভ করতে পারেনি। মিয়ানমার আমাদের জন্য অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে। মিয়ানমারে রয়েছে প্রচুর জ্বালানি সম্পদ। ভারত গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছে। এই গ্যাস এখন পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত তার নিজ দেশে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ এই পাইপলাইন থেকে সুবিধা নিতে পারে। উপরন্তু মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ উত্পাদনও সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষিক্ষেত্রেও বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশে গো-মাংসের যে বিপুল চাহিদা তা মেটাতে পারে মিয়ানমার। এ জন্যই মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বৃদ্ধি করার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এটা সত্য, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুই দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্কে ঘাটতি রয়েছে। মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে ‘ইয়াবা’ প্রবেশের বিষয়টি কিংবা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বিজিবি সদস্যদের হত্যা করার একাধিক ঘটনা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ততার সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে একটি গণতান্ত্রিক সরকার যত বেশি উদার, একটি সামরিক সরকার ততটা উদার নয়। এখন অং সান সু চি প্রেসিডেন্ট না হলেও সরকারের ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব থাকবে। এবং তিনিই হবেন ‘ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট’! তাঁর সম্মতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর করা যাবে না। সু চি বাংলাদেশ ও ভারতে যথেষ্ট জনপ্রিয়। এ দুটি দেশের রাজনীতির গতিধারা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ধারণা রাখেন। সুতরাং মিয়ানমারে এনএলডির নেতৃত্বাধীন একটি সরকার এ অঞ্চলের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার সৃষ্টি করল। Daily Kalerkontho 10/03.16

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

কেমন হবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন? ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রথম দফা ভোটগ্রহণ হবে ২২ মার্চ। দ্বিতীয় দফায় ৩১ মার্চ। পর্যায়ক্রমে আরো কয়েক দফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ৪ জুন শেষ হবে ইউপি নির্বাচন। তবে এই নির্বাচন নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা, সহিংসতামুক্ত নির্বাচন হবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধছে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী ‘চাপে আছে বিএনপির প্রার্থীরা।’ একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউপি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখে আছেন বিএনপির কিছু প্রার্থী।’ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও চাপ মোকাবিলা করছেন। নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় এক দফা বাধার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও বিএনপি প্রার্থীদের অনেকেই এখন নতুন ধরনের চাপ মোকাবিলা করছেন। ওই জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর একটি বক্তব্যেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির ১১৪টি ইউপিতে প্রার্থী থাকছে না। তিনি অভিযোগ করেছেন, এই ১১৪ জন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। শাসক দলের প্রার্থীদের জিতিয়ে দিতে নির্বাচন কমিশন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও তার অভিযোগ। যদিও সরকারের মন্ত্রীরা কিংবা সিনিয়র নেতারা এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভিন্নভাবে। তাদের বক্তব্য, বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন কিংবা বিএনপির বক্তব্যের পেছনে সত্যতা যাই থাকুক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ হচ্ছে না। ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ না থাকায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হচ্ছে না। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে কোনো নির্বাচনকে নির্বাচন বলা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কিনা, এই প্রশ্ন থাকল। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচনের (জাতীয় সংসদ) পর পর্যায়ক্রমে উপজেলা নির্বাচন, ৩টি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ও পৌরসভায় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনই শুদ্ধ হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন হলেও এর ওপর ভবিষ্যৎ ও রাজনীতির অনেক কিছু নির্ভর করছে। এই নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, যদি স্থানীয়ভাবে সরকারি দলের নেতা ও কর্মীদের দৌরাত্ম, ভোটকেন্দ্র দখল, সিল মারার প্রবণতা রোধ করা না যায়, তাহলে প্রমাণিত হবে সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। ইতোমধ্যেই অনেকগুলো কারণ সৃষ্টি হয়েছে যা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। প্রথমত, একাধিক ক্ষেত্রে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটা নতুন একটি উপসর্গ। প্রভাব খাটিয়ে হুমকি দিয়ে, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিরোধী পক্ষের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি। এখানে স্থানীয় প্রশাসন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকায়, স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীরা এর সুযোগ নিচ্ছেন। স্থানীয় নেতারা মনে করছেন তিনি বা তারা মনোনয়ন পেলে তারা বিজয়ী হবেন। ফলে সম্ভাব্য ‘বিজয়ের’ জন্য তারা স্থানীয় পর্যায়ে যা যা করা দরকার, তাই তারা করছেন। তৃতীয়ত, মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘মনোনয়ন’ ক্রয় করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে যিনি চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তিনি চাইবেন যে কোনো মূল্যে তার বিজয় নিশ্চিত করতে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিযে প্রশাসন রয়েছে, তারা নানাবিধ কারণে সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেতে সাহস পান না। মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দান ও অভিযুুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত সত্যতায় পরিণত হয়েছে। প্রথম দফায় ২২ মার্চ ৭৫২টি, দ্বিতীয় দফায় ৩১ মার্চ ৭১০টি, তৃতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, চতুর্থ দফায় ৭ মে ৭২৮টি, পঞ্চম দফায় ২৮ মে ৭১৪টি এবং ষষ্ঠ দফায় ৪ জুন সর্বশেষ ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ প্রায় ৩ মাস স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের উত্তাপ থাকবে। এখন প্রথম দফা নির্বাচনের আগেই মাঠ পর্যায়ে যে ‘চিত্র’ আমরা দেখছি তা আমাদের হতাশায়ই ফেলে দেবে। তাই একটি শুদ্ধ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন চেয়ারম্যান পদে দলের পরিচয় ও প্রতীকে অনুষ্ঠিত হলেও সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত (মহিলা) সদস্য পদে আগের মতোই নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নির্ধারিত সময়েই ইউপি নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক। সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকাজ পরিচালনা করার ব্যাপারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা (৫৯ ধারা) রয়েছে। সুতরাং ইউপি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার প্রশংসা পেতেই পারে। তবে সরকারের উচিত উত্থাপিত অভিযোগগুলো দ্রুত খতিয়ে দেখা। অভিযোগগুলো যদি খতিয়ে দেখা না হয় তাহলে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেইং ফ্লিড’ তৈরি হবে না। অর্থাৎ সবার জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি না হলে প্রশ্ন থাকবেই। প্রার্থীরা যখন মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারেন, বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ কম। নির্বাচন কমিশন বিষয়গুলো তথা অভিযোগগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেখতে পারে অভিযোগগুলোর পেছনে আদৌ কোনো সত্যতা আছে কিনা। নির্বাচন কমিশনের জন্য সুযোগ এসেছিল তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর। নির্বাচনে অনিয়মরোধ, স্থানীয় মস্তানদের নিয়ন্ত্রণ করা, বিরোধী দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী মাঠে সমঅবস্থানের সুযোগ করে দেয়া, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে কঠোর হওয়াÑনির্বাচন কমিশন এই কাজগুলো যদি নিশ্চিত করতে পারত তাহলে এ দেশে নির্বাচনী সংস্কৃতি নতুন একটি রূপ পেত। এটা না পারার কিংবা ব্যর্থতার দায়টা এখন সরকারের চেয়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর বেশি বর্তাবে। আমরা এক অদৃশ্য অরাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আটকে আছি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে যে পন্থায় বিকশিত হয়, ব্যক্তি তার অধিকার নির্বিঘেœ প্রয়োগ করতে পারে, প্রশাসন যেখানে থাকে নিরপেক্ষ, এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এখানে বিলুপ্ত হচ্ছে! গণতান্ত্রিক রীতি এখানে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে, রাজনীতিতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাব বাড়ছে। যেনতেন প্রকারেই হোক ক্ষমতা ধরে রাখাই হচ্ছে যেন মূল লক্ষ্য। আমরা যদি এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারি তাহলে আমাদের জন্য আরো খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। এ নিয়ে আমরা বিতর্ক করতে পারি। পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করতে পারি। কিন্তু তাতে করে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। মূল ধারার রাজনীতিতে যদি বড় দলগুলো বাইরে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক জটিলতা বৃদ্ধি পায়। সংকটের মাত্রা বাড়ে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন ও পরে তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকেও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি অতি উৎসাহীদের অগণতান্ত্রিক আচরণের জন্য। বুথ কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপারে প্রকাশ্যে সিল মারা, বিরোধীদলীয় প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এসব ঘটনার যে দৃশ্য জাতি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে দেখেছে তা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ভালো খবর নয়। এখন শুধু বিএনপিই বলছে না, বরং সরকারের ‘মিত্র’ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ সাহেবও অনেকটা হতাশার সুরে বলেছেন দেশে গণতন্ত্র চর্চার কোনো সুযোগ নেই! সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কিংবা সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, সেই দৃশ্য আমরা আর দেখতে চাই না। পৌর নির্বাচনেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। এটা আমরা কেউই চাইনি। কিন্তু ইসি আমাদের সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। পৌরসভা নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচন সরকারের জন্যও একটা প্লাস পয়েন্ট। এই নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ নিয়েছে এবং এতে সব দলের অংশগ্রহণের যে সংস্কৃতি তা নিশ্চিত করে সরকার তার অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে পারে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে কিংবা সরকারি প্রভাব থাকলে সরকারের ভূমিকা দুর্বল হবে। বহির্বিশ্বে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠবে। বিদেশি বন্ধুদের কাছে সরকার তার গ্রহণযোগ্যতা আরো হারাবে। এক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কি পরিবর্তন আসে সেটাই দেখার বিষয়। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ সাহেব জাতীয় পার্টির একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচন কমিশনকে এর আগে তিনি ‘মেরুদণ্ডহীন’ বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন। জনাব এরশাদের এই বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা তিনি এখনো মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। সরকার থেকে তিনি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাও পান। ফলে তার বক্তব্য সরকারের একটা অংশের বক্তব্য বলে মানুষ ভুল করতে পারে। জনাব এরশাদ নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে পদত্যাগ করেননি। জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা এখনো মন্ত্রিপরিষদে আছেন। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে ২০১৭-এর প্রথম দিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারি না! সরকার এখন আগামী এক বছর ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিত করে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রেখে, দুর্নীতি রোধ করে সরকারি দলের জন্য একটা ‘ক্ষেত্র’ সৃষ্টি করতে পারে। এটাকে পুঁজি করেই সরকারি দল নির্বাচনে যেতে পারে। এ কারণেই আমার বিবেচনায় ইউপি নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে একটি টেস্ট কেস যাতে সরকারি মনোভাব বোঝা যাবে। কিন্তু যদি নির্বাচনটি ভালো না হয়, যদি শেষ মুহূর্তে বিএনপি আবারো নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয়, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি বাংলাদেশে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন যে মাত্রা যোগ হবে তা আমাদের গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে না। আমাদের জন্য সেটা হবে দুঃখের। নির্বাচনে বিএনপিকে রাখাই হবে সরকারের এক নম্বর অগ্রাধিকার। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলেও সরকার পতনের কোনো সম্ভাবনা নেই। পৌর নির্বাচনের পর আবারো ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষ’-এর মাঝে ‘ভোটযুদ্ধ’ শুরু হতে যাচ্ছে। এবারো ইউপি নির্বাচনে ভোটাররা দলীয়ভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন চেয়ারম্যান পদের জন্য। ব্যক্তি এখানে মুখ্য হবে না। ফলে ভোটের এই রায় প্রমাণ করবে আওয়ামী লীগ তার জনপ্রিয়তা কতটুকু বাড়াতে পেরেছে কিংবা বিএনপির প্রতি মানুষের সমর্থন কতটুকু আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দুটি বড় দলই হচ্ছে এখন পর্যন্ত রাজনীতির নিয়ন্ত্রক এই বাস্তবতাকে বোধ করি আমরা কেউই অস্বীকার করত পারি না। তবে এই বাস্তবতাকে সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা কতটুকু সম্মান দেখাবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। একটা ভালো নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে উঠুক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক। মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের স্থানীয় নেতৃত্বকে নির্বাচিত করুক ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে এ প্রত্যাশা আমাদের সবার। Daily Manobkontho 08.03.16

প্রার্থিতায় এগিয়ে হিলারি ও ট্রাম্প

আগামী ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুটি বড় দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া এখন চলছে। গত ১ মার্চ মঙ্গলবার সুপার টুয়েসডেতে ১১ রাজ্যে দুটি বড় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় ককাসে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দুজনÑ হিলারি ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডাস। অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবিরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকে তিনজনের মাঝেÑ ডোনাল্ড ট্রাম্প, টেড ক্রুজ ও মার্কো রুবিও। ধারণা করা হয়, বহুল আলোচিত সুপার টুয়েসডেতে যে প্রার্থী বিজয়ী হবেন, তিনিই চূড়ান্ত বিচারে দলীয় মনোনয়ন পাবেন। ১১ রাজ্যের দলীয় ডেলিগেটদের ভোটে ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী বাছাইয়ে হিলারি ক্লিনটন বিজয়ী হয়েছেন ৭ রাজ্যেÑ আলবামা, জর্জিয়া, টেনেসি, ভার্জিনিয়া, আরাকানসাস, টেক্সাস ও ম্যাসাচুসেটস। বার্নি স্যান্ডাস বিজয়ী হয়েছেন বাকি ৪টিতেÑ ভারমন্ট, ওকলাহামা, মিনোসেটা ও কলরাডো। একই সঙ্গে রিপাবলিকান শিবিরে বিতর্কিত ডোনাল্ড ট্রাম্পও বাছাই পর্বে বিজয়ী হয়েছেন ৭ রাজ্যেÑ আলবামা, জর্জিয়া, আরাকানসাস, ম্যাসচুসেটস, ভারমন্ট, টেনেসি ও ভার্জিনিয়া। টেড ক্রুজ ৩টিতেÑ টেক্সাস, ওকলাহামা ও কলরাডো। আর মার্কো রুবিও মাত্র একটি রাজ্যে মিনোসেটাতে বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় হিলারি আর ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ রিপাবলিকানদের প্রতিযোগিতা বাছাই পর্বে টেড ক্রুজ আরও দুটি অঙ্গ রাজ্যে বিজয়ী হলেন। উনি এখনো রিপাবলিকানদের মনোনয়ন প্রার্থীতায় এখনো তিনি আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি, আর নির্বাচকম-লীর সংখ্যা ৫৩৮। সাধারণত সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে এই নির্বাচকম-লী গঠিত হয়। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকম-লীর ভোটের সংখ্যা ৫৪টি অথবা নিউইয়র্কের ৩৩টি। ছোট ছোট রাজ্য, যেমন মেইন (৪টি), সাউথ ডাকোটা (৪টি) কিংবা ওয়াওসিঙ (৩টি) এ নির্বাচকম-লীর সংখ্যা কম। কোনো প্রার্থী কোনো রাজ্যে বিজয়ী হলে, সে রাজ্যে যে কটি নির্বাচকম-লীর ভোট রয়েছে, তার পুরোটা তিনি পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে যে প্রার্থী হেরে যান, তিনি নির্বাচকম-লীর কোনো ভোট পান না। অর্থাৎ জনসাধারণের ভোটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হন নাÑ নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। তবে জনসাধারণ ভোট দেন। এটিই হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। এখানে আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তৃতীয় পার্টির তেমন কোনো অস্তিত্ব নেই। নামকা ওয়াস্তে দু-একটি প্রার্থী (গ্রিন, কনসটিটিউশন পার্টি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও তারা প্রচারের দৌড়ে এগোতে পারেন না। প্রচারে একজন প্রার্থীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা ছোট ছোট দলের পক্ষে সম্ভব নয় সংগ্রহ করা। নির্বাচন দুটি বড় দল, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ দুদলের প্রার্থীরা জনসাধারণ তথা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। এটি বৈধ। প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ও প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। আগে প্রেসিডেন্টের বাছাই পদ্ধতি ছিল জটিল। প্রতিনিধি পরিষদে স্থানীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে থেকেই প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা ছিল। এরপর পার্টি ‘ককাসে’ প্রার্থী নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। আর ‘ককাস’ বা বাছাই ব্যবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রার্থী মনোনীত হয়ে প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৮৯-১৭৯৭)। তার কোনো দল ছিল না। তিনি ফেডারেলিস্টদের ব্যানারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্মরণ করিয়ে দিই, প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করেননি। বলা হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই দল থেকেই গেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বারাক ওবামা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম দিকে দলটির নাম ছিল ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকান। ১৮২৫ সাল পর্যন্ত এই দলটি থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কুইন্সি এডামস (ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট) ক্ষমতায় ছিলেন ১৮২৯ সাল পর্যন্ত। তারপর শুধু ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাম ধারণ করে এন্ডু জনসন ও মার্টিন ভ্যান বুুরেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন (১৮৪১)। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে উইগ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত উইগ পার্টির প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরপর দলটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আব্রাহাম লিংকন (১৮৬১-১৮৬৫) ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। এরপর থেকেই এ দুই পার্টি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সাধারণত একজন প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি মাত্র দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই ৩২তম প্রেসিডেন্টের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ ক্ষমতাসীন থেকেও দ্বিতীয় টার্মের জন্য সেই প্রেসিডেন্ট বিজয়ী হতে পারেননি। সমসাময়িককালে জেরাল্ড ফোর্ড (৩৮তম প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান, ১৯৭৪-১৯৭৭), জিমি কার্টার (৩৯তম ডেমোক্র্যাট, ১৯৭৭-১৯৮১) কিংবা সিনিয়র জর্জ বুশের (৪১তম, রিপাবলিকান, ১৯৮৯-১৯৯৩) নাম উল্লেখ করা যায়। এখন দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হিলারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউসে তার টার্ম শুরু করতে পারেন কিনা। নয়া প্রেসিডেন্টের টার্ম শুরু হবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রতিটি প্রাক-নির্বাচনেই দেখা গেছে কতগুলো ইস্যু প্রাধান্য পায়। আর ওইসব ইস্যুর ব্যাপারে প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানোভাব দেখে পার্টি ককাসে ডেলিগেটরা ভোট দেন ও কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন। প্রার্থীদের একাধিক রাজ্যের ককাসে দলীয় অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। বিভিন্ন বক্তব্য এখানে প্রাধান্য পায় বেশি। যেমন এবার প্রাধান্য পেয়েছে সিরিয়া, ইরান ইস্যু। চিনের প্রশ্নটিও এসেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়কার অর্থনৈতিক ইস্যুও রিপাবলিকান শিবিরে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি রিপাবলিকান ‘ককাসে’ ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্র সচিব থাকার সময় ব্যবহার করা ব্যক্তিগত ই-মেইল নিয়ে নানা কথা উঠেছে। রিপাবলিকানরা ওবামার অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজনের মাঝে একজন গরিব। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেখানে ৪৯ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। সেই সঙ্গে আরও ৫১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার দিকে ধীরে-ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ধনী-গরিবের একটা বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদের ২৫ শতাংশ নিয়ে যায়। এরা আবার সম্পদের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই ১ শতাংশ মানুষের বার্ষিক আয় ২,৭৩,৪২,২১২ ডলারের ওপরে। কিন্তু বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি কাজের জন্য ন্যূনতম চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আরও খারাপ খবর হচ্ছে, ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার সরকারি খাদ্য সাহায্য বা ‘ফুড স্টাম্প’-এর ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার কর্মজীবী। কিন্তু তাদের আয় যথেষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করতে পারেননি, যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট করেছেন, স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে যথেষ্ট শিক্ষক দিতে পারেননি, সেখানে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছেন ‘তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর পেছনে। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছিল সব মিলিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে (যুদ্ধ খরচ ৮০৬ বিলিয়ন, সৈনিকদের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ ৪২২ থেকে ৭১৭ বিলিয়ন)। আর আফগান যুদ্ধের খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু সেনা প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে ব্যয় হয়েছিল ৬ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে জনসংখ্যার ৯ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বেকার, সেখানে যুদ্ধের পেছনে এত বিপুল ব্যয় নিয়ে সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। পররাষ্ট্র নীতিতে ডেমোক্র্যাটরা সফল, তাও বলা যাবে না। ২০০৯ সালে কায়রো ভাষণে ওবামা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ‘নতুন এক সম্পর্ক’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে সেখানে জঙ্গিবাদেরই জন্ম হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনে আত্মঘাতী বোমাবাজির জন্ম হয়েছে। সাদ্দামের উৎখাতের পর সেখানে ইসলামি কট্টরপন্থিরা শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়াতে আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ‘আরব বসন্ত’ তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। মিসরে আবার স্বৈরতন্ত্র ফিরে এসেছে। সেনা কর্তৃত্বে আবার ফিরে গেছে দেশটি। লিবিয়া কার্যত এখন নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। সেখানে তথাকথিত একটি ‘সরকার’ থাকলেও সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। উপরন্তু বেনগাজির কাছাকাছি শহর দারনা চলে গেছে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা এই শহরকে ইসলামিক স্টেটের সম্প্রসারিত অংশ বলে ঘোষণা করেছে। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং এসব অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের ব্যর্থতার দায়ভার বহন করতে হবে হিলারি ক্লিনটনকে যদি তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হন। ডেমোক্র্যাটরা যে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি, এ অভিযোগ হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে উঠেছে। এক সময় হিলারি নিজে ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্র সচিব (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ছিলেন। তিনি তার সময়ে লিবিয়ার নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি। এটি তার একটি মাইনাস পয়েন্ট। উপরন্তু ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও নানা কথা আছে। হিলারি ক্লিনটন তার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি অনেক রাষ্ট্র থেকে ফান্ড পেয়েছে। এবং তাদের স্বার্থে কাজ করছেÑ এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে উচ্চারিত হয়েছে। এটি প্রাক-নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানরা ব্যবহার করছেন। এটিই স্বাভাবিক। যদিও বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল কিংবা সিএনএন একাধিক জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেখানে হিলারি ক্লিনটনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আভাস দেওয়া হয়েছে। সেটি যদি সত্য হয়, তাহলে তা হবে এক ইতিহাস।
মার্কিন নির্বাচনী প্রচার এখন তুঙ্গে। যদিও প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। তারপরও এক ধরনের প্রচার শুরু হয়ে গেছে দুই শিবিরেইÑ অর্থাৎ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরে। এসব প্রচারে ব্যক্তিগত বিষয়াদিও আলোচিত হচ্ছে। জুলাই মাসে যখন চূড়ান্তভাবে প্রার্থী মনোনীত হবেন, তখন দুদলের দুই প্রার্থী খুব কম সময় পাবেন। মাত্র ৪ মাস সময় পাবেন। এ কারণেই দুটি বড় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া ‘ককাসে’ অংশ নিয়ে প্রচারের কাজটি সেরে নিচ্ছেন। তবে বলতেই হবে একজন ব্যক্তি কখনো কখনো ফ্যাক্টর হয়ে যান। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নভেম্বরে নির্বাচকম-লীর ভোটে ‘বিজয়ী’ হন, তাহলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। আর হিলারি ক্লিনটন জয়ী হলে, পরিবর্তন আসবে কম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা বক্তব্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না’Ñ এ বক্তব্যে খোদ পোপ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেনÑ ট্রাম্প আদৌ খ্রিস্টীয় ধর্মে বিশ্বাসী কিনা, সে ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে! ‘মেক্সিকান অবৈধ অভিবাসীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে টেক্সাসে তিনি উঁচু বেড়া নির্মাণ করবেন’Ñ এ বক্তব্যও কনজারভেটিভরা অনেকে গ্রহণ করেননি। এ জন্য দেখা যায়, টেক্সাসে ট্রাম্প বিজয়ী হতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যেখানে ট্রাম্পের বিনিয়োগ রয়েছে (কানাডা, পানামা, তুরস্ক) প্রতিটি জায়গায়ই তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। মজার কথাÑ প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন শুরু হয়, তখন রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্পকে সিরিয়াস প্রার্থী হিসেবে ভাবা হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি তার অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। বহুল আলোচিত সুপার টুয়েসডেতে হিলারি-ট্রাম্প আলাদাভাবে বিজয়ী হলেও এখনো বাকি আছে আরও ৩৫টি রাজ্যে বাছাইপর্ব। এক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট শিবিরে হিলারি ক্লিনটনের প্রার্থীপদ প্রায় ‘নিশ্চিত’ হলে রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্পের প্রার্থীপদ শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত এটি বলা যাবে না। জেব বুশ প্রতিযোগিতায় আর নেই। টেড ক্রুজ আর মার্কো রুবিও রিপাবলিকান শিবিরে এখনো তাদের প্রার্থীপদ টিকিয়ে রাখছেন। তবে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় যদি হিলারি আর ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আমি অবাক হব না। সেই সম্ভাবনাই এখন বেশি
Daily Amader Somoy
08.03.16

কেমন চলছে মোদির ভারত

এ কোন ভারতকে আমরা দেখছি? প্রথম ঘটনাটি হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ভেমুলা দলিত শ্রেণীর প্রতিনিধি। খুব কম দলিত শ্রেণীর প্রতিনিধিই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। ভেমুলা পেয়েছিলেন। কিন্তু এ উচ্চশিক্ষাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে এবং সেই সঙ্গে তার চার বন্ধুকে ‘সন্ত্রাসী ও ভারতবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করে। এর প্রতিবাদে ভেমুলা ও তার বন্ধুরা ক্যাম্পাসের ভেতরে তাঁবু টানিয়ে বসবাস করতে থাকেন শুধু এ আশায় যে, কর্তৃপক্ষ তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করায় রোহিত ভেমুলা গত ১৭ জানুয়ারি আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যা করার আগে একটি ‘সুইসাইড নোটে’ তিনি লিখে যান- দলিত শ্রেণীতে জন্মই তার মৃত্যুর কারণ! দ্বিতীয় ঘটনা গত ১২ ফেব্রুয়ারি দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের। ওইদিন ক্যাম্পাসে উগ্রপন্থী আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধে একটি ছাত্রসভার আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র ইউনিয়ন। সভায় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি কানহাইয়া বক্তৃতা করেন। ওই সভায় কাশ্মীরের বেশ কিছু ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ ওঠে কানহাইয়া ‘দেশদ্রোহী’ এবং ওই সভায় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান উঠেছিল। এ অভিযোগে তাকে পেটানো হয় এবং পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এরপর আরও দুই ছাত্র উমর খালিদ ও অনির্বাণ ভট্টাচার্য ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ মাথায় নিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এ ঘটনায় ভারতের পার্লামেন্ট উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল এবং রাজ্যসভার অধিবেশন চারবার মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছিল। সর্বশেষ ঘটনাটি হরিয়ানার। সেখানে জঠরা আন্দোলন গড়ে তুলে দিল্লিতে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। জঠদের এ আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল আরও বেশ কয়েকটি রাজ্যে। জঠরা মূলত কৃষিজীবী। কৃষি শ্রমিক। কিন্তু তারা ভারতে ওবিসি অর্থাৎ ‘আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস’ হিসেবে স্বীকৃত নন। তারা নিঃসন্দেহে একটি অনগ্রসর শ্রেণী। তাদের জন্য কোনো কোটা নেই চাকরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ওবিসি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য তারা আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এখানে সমস্যা হচ্ছে উচ্চ আদালতের একটি রায়। এতে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষা ও আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়াটাকে অনগ্রসরতা বলা যাবে না।’ দলিতরা যে কোটা সুবিধা পায়, জঠরা সেই সুবিধা পায় না। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর গত দেড় বছরে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তা বহির্বিশ্বে দেশটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে না। ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম একটি অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারত তার সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। ভারতে কৃষকরা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে- এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ৩ জন দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হন, অথচ তারা জনগোষ্ঠীর ৫ ভাগের ১ ভাগ। জাতপাতের সমস্যা ভারতে অনেক বেশি। দীর্ঘ প্রায় ৬৯ বছরেও এ সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। নিঃসন্দেহে গত দেড় বছরে মোদি নিজেকে একজন উদ্যমী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলে আদভানীর (যিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন) মতো নেতাকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি বড় তা হচ্ছে, তিনি ‘গরিব দেশের ধনী প্রধানমন্ত্রী।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে স্বাগত জানাতে (জানুয়ারি ২০১৫) তিনি ১০ লাখ রুপির স্যুট পরিধান করে প্রমাণ করেছিলেন তিনি আসলে ধনিক শ্রেণীরই প্রতিনিধি! যে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি কৈশোরে ট্রেনের কামরায় কামরায় চা বিক্রি করতেন, মা পরের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে সংসার চালাতেন (মে, ২০১৫ সংখ্যা টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদকের কাছে তা তিনি স্বীকারও করেছেন), সেই মোদির সঙ্গে এখন কর্পোরেট জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্কই বেশি। ট্রেনের চা বিক্রেতাদের মতো সাধারণ ভারতীয়দের কাছে এখন তিনি ‘অনেক দূরের মানুষ’। তিনি যখন বিদেশ যান, তখন তার সঙ্গে যান ব্যবসায়ীরা, যান কর্পোরেট হাউসের প্রতিনিধিরা। কিন্তু গত দেড় বছরে তার শরীরে দশ লাখ রুপির স্যুট উঠলেও দরিদ্র ভারতের চেহারা তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি। কৃষকদের আত্মহত্যার প্রবণতা তিনি দূর করতে পারেননি। ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রামের মতে, জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল, আজ তৃতীয় অবস্থানে (সাধারণ নিয়মে এ অবস্থান সপ্তম)। আর গত বছর জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চীনের চেয়ে বেশি হবে। যেখানে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে শতকরা ৭ দশমিক ২ ভাগ, সেখানে ভারতের হবে ৭ দশমিক ৭ ভাগ। নরেন্দ্র মোদি এ ভারতকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনও গরিব। জনগোষ্ঠীর ৫৩ শতাংশের কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এ কাজটি নিত্য সম্পন্ন করেন। পরিসংখ্যান বলে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। চিন্তা করা যায়, প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১০)! পাঁচ বছর আগের এ পরিসংখ্যানে খুব পরিবর্তন এসেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রায় ৮০ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার। ৭০ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে। শুধু দারিদ্র্যের কথা কেন বলি, নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৮৬ হিসাবে ধরে) ১৪৬, ভারতের সেখানে ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণ এত ঘটনা ঘটার পরও বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে তৈরি ছবি (যা বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি) ‘গুলাব গ্যাং’য়ের (উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে গ্রামের সত্য কাহিনী) কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। মোদি গত দেড় বছরে এদের জন্য কী করেছেন? যদিও মাত্র দেড় বছরে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়, কিংবা বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য চাকরির সংস্থান করাও সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু দারিদ্র্য কমানো তার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মোদির গুজরাট মডেল নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। গুজরাটে তিনি সড়ক-মহাসড়ক করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে গুজরাটে তার আমলে কম ছিল, মাত্র ১৩ দশমিক ৪ ভাগ (২০১২-১৩ সালে আসামে ছিল ২১.১ ভাগ, উত্তরখণ্ডে ২০.৮ ভাগ, মহারাষ্ট্রে ১৯.৮ ভাগ)। শিশু মৃত্যুর হার গুজরাটে হাজারে ৩৮, অথচ কেরালায় ১২, তামিলনাড়–তে ২১, মহারাষ্ট্রে ২১। শিশুজন্ম দেয়ার সময় মাতৃ মৃত্যুর হার গুজরাটে ৯.৫, কেরালায় ৩.৩, তামিলনাড়–তে ৫, মহারাষ্ট্রে ৫.২ ভাগ। যেখানে গুজরাটে খাবার পানি নিশ্চিত করা হয়েছে জনগোষ্ঠীর ৮৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষের, সেখানে পাঞ্জাবে এ হার ৯৭.৬, উত্তর প্রদেশে ৮৭.৮, দিল্লিতে ৯৭.২ শতাংশ। পাকা ঘর রয়েছে হরিয়ানায় ৯৪.৮, দিল্লিতে ৯৪.৭, উত্তরখণ্ডে ৯৩.৯ ভাগ মানুষের। অথচ গুজরাটে এ হার মাত্র ৭৫.৭ ভাগ। ইন্ডিয়ান সেনসাস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কাজেই ‘গুজরাট মডেল’ কীভাবে সারা ভারতের জন্য একটা মডেল হবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি তিনি গড়ে তুলেছেন গুজরাটে। কিন্তু এতে করে সাধারণ মানুষের প্রতি তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এখন তিনি এই মানসিকতায় যদি ভারতকে পরিচালনা করতে চান, তিনি ভুল করবেন। দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা নরেন্দ্র মোদি এখন আর ভারতের দরিদ্রতম মানুষগুলোকে স্মরণ করেন না। কাজ-পাগল মানুষ তিনি, সন্দেহ নেই তাতে। মাত্র ৩ ঘণ্টা তিনি ঘুমান এ কথাটা নিজেই স্বীকার করেছেন টাইম প্রতিবেদকের কাছে। ‘কম সরকার, অনেক বেশি প্রশাসন’- এই হচ্ছে তার দৃষ্টিভঙ্গি। এতে করে ভারতকে কতটুকু বদলে দিতে পারবেন তিনি? টাইম মোদিকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল। শিরোনাম ছিল Why Modi Matters। মোদি কেন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলেই গোধরায় ট্রেনে ৫৪ জন হিন্দু পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে গুজরাটে হাজারের মতো মুসলমান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওবামা তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় চীনা প্রেসিডেন্ট ছুটে গিয়েছিলেন আহমেদাবাদে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং মাত্র দেড় বছরে শীর্ষ বিশ্ব নেতাদের তালিকায় নিজের নামটাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন (টাইম সাময়িকীর মতে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী নেতার একজন তিনি)। তাই খুব সঙ্গত কারণেই মোদি বারবার আলোচনায় থেকেছেন। তবে তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সমাজে বৈষম্য দূরীকরণের ব্যাপারে কোনো বড় উদ্যোগ নিতে পারেননি। তাই অসন্তোষ বাড়ছে। মোদির জমানায় দলিত শ্রেণী প্রতিনিয়ত কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইন্ডিয়া টুডের উল্লিখিত প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, দলিত শ্রেণীর স্কুল ত্যাগের হার শতকরা ৫০ ভাগ। প্রতিদিন দু’জন করে দলিত খুন হচ্ছেন। দুটি করে বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মোদি নিজে নিম্নশ্রেণী থেকে উঠে এলেও এ শ্রেণীর মানুষদের তিনি এখন আর প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি এখন উচ্চশ্রেণীর প্রতিনিধি। মোদি বলেছেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর গত এক বছরে তিনি দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ উপহার দিতে পেরেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি প্রধান পাহারাদার, দেশের সম্পদের পাহারাদার। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (ভারত নির্মাণ) অভিযানকে অতিরঞ্জিত প্রচার বলে মন্তব্য করা হয়েছে। মোদি সরকারের কাছে বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও কর্মসংস্থানের হাল যথেষ্ট খারাপ বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল গেল বছর মোদি সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতে ‘মোদির এক বছর : উচ্ছ্বাসের পর্ব শেষ, সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, “ভারতে এক বছর আগে পরিবর্তন ও আর্থিক পুনরুজ্জীবনের আশায় নরেন্দ্র মোদি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু এবার চূড়ান্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে মোদি সরকার। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযান শুরু করলেও ভারতের অর্থনীতি খুঁড়িয়েই চলছে।” আর নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, মোদির অধিকাংশ কর্মসূচি এখনও কথার কথাই রয়ে গেছে। পত্রিকাটির মতে, দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার এখনও বেহাল। ব্যবসায়িক উদ্যোগও তেমন দানা বাঁধছে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবেও চাপে পড়েছেন মোদি। সমাজের দলিত শ্রেণী তার ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে এখন। এসব মূল্যায়ন মোদি সম্পর্কে কোনো ভালো ধারণা দেয় না। নিশ্চয়ই গত দেড় বছরে মোদি অনেক কিছু শিখেছেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, তিনি নিজস্ব একটি স্টাইল তৈরি করেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত একাই নেন। মনমোহন সিং বেশি মাত্রায় সোনিয়া গান্ধীনির্ভর ছিলেন। এখানেই মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে মোদির পার্থক্য। নরেন্দ্র মোদির প্লাস পয়েন্ট এটাই। দলে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই। তারপরও তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ আছে। দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, গত আগস্টে (২০১৫) ভারতের ৬৯তম স্বাধীনতা দিবসে এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি ভারতকে ঘুণপোকার মতো খেয়ে ফেলেছে। উপরের পর্যায় থেকে আমাদের এ কাজ শুরু করতে হবে।’ ভাষণে তিনি কিছু প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে আছে ১০০০ দিনের মধ্যে সব গ্রামে বিদ্যুৎ। তিনি বলেছিলেন, ‘স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া’। নতুন ভারত গড়ার স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন। একসময়ের ট্রেনের কামরার চা বিক্রেতা মোদির শরীরে ১০ লাখ টাকা দামের স্যুট উঠেছে সত্য; কিন্তু রোহিত ভেমুলাদের মতো দলিত শ্রেণীর প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা তিনি এতটুকু নিশ্চিত করতে পারেননি। ভারতে সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে নারী ধর্ষণ আর মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব। মোদির জমানায় হিন্দুত্ববাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দুত্ববাদ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেন এসব হচ্ছে? রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কলকাতা) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকারের মতে এর কারণ দুটি। এক. জওহরলাল নেহেরুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সরকার বা বিজেপি দলের নিয়ন্ত্রণ চাপানোর প্রবল ‘গৈরিক’ ইচ্ছা, আর দুই. ওখানকার এবং সারা দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শায়েস্তা করা। এর পেছনে কারণ যাই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে, যে প্রতিশ্র“তি দিয়ে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই প্রতিশ্র“তি ফিকে হয়ে আসছে। হিন্দুত্ববাদ, মাস্তানি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ভারতের রাষ্ট্রীয় চরিত্রকে কলংকিত করছে বারবার। ভারতকে একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ পরিণত করার সংঘ পরিবারের দাবি আবারও উঠছে। গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য এটা কোনো ভালো খবর নয়। Daily Jugantor 06.03.16

বিনা ভোটে নির্বাচন কোনো নির্বাচন নয়


অভিযোগটি গুরুতর। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে ১১৪টি ইউপিতে তাদের কোনো প্রার্থী থাকছে না। কারণ বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাঁধা অথবা তুচ্ছ অভিযোগে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার। আগামী ২২ মার্চ প্রথম দফায় যে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে চেয়ারম্যান পদে ১১৪টি ইউপিতে কোনো নির্বাচন হচ্ছে না। মোট ৪ হাজার ২৭৫টি ইউপি নির্বাচনে প্রথম দফায় ৭৫২টি ইউপিতে ভোটগ্রহণ হবে। এখন বিএনপির অভিযোগের যদি সত্যতা থাকে তাহলে ৭৫২টির মধ্যে ১১৪টিতেই আদৌ নির্বাচন হচ্ছে না। তাহলে এই নির্বাচনকে কি আমরা নির্বাচন বলব? দ্বিতীয় দফায় (৩১ মার্চ) নির্বাচন হওয়ার কথা ৭১০টিতে। তাহলে সেখানেও কি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে? পাঠক, নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন গত ৩০ ডিসেম্বর যে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে ফেনী, পরশুরাম, দাগনভূঞা পৌরসভা নির্বাচনে সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে কী হয়েছিল। সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনে ৪৮টির আসনের ৪৪ জন প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। শুধু একটি জেলার কথাই উল্লেখ করলাম। অন্য অনেক জেলাতেও একই ধরনের সংবাদ আমরা পাই। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের সংখ্যা ১১৪ কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কেননা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এ সংখ্যা উল্লেখ করেছেন ৫১ বলে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়াকে হানিফ বলেছেন 'সরকারের উন্নয়নের প্রতি আস্থা' বলে। তার বক্তব্য 'কেউ যদি স্থানীয় উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করে প্রার্থী না হন সে ক্ষেত্রে আমাদের কী অপরাধ? (সমকাল, ২৯ ফেব্রুয়ারি)। এ প্রশ্ন আসতেই পারে_ কী অপরাধ? কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়া হচ্ছে_ এমন খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। সরকারি দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও নানা কথা আছে। আসলে নির্বাচন মানেই তো এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে ওই এলাকার জনগণের অর্থাৎ ভোটারদের আর সুযোগ থাকল না তাদের প্রার্থী পছন্দ করার। আমাদের সংবিধানের ৫৯(১) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, 'আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে'। এখানে বলা আছে, 'নির্বাচিত ব্যক্তিদের' কথা। এখন নির্বাচনের আগেই ১১৪ জন কিংবা ৫১ জনই যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তাহলে কি সংবিধা লঙ্ঘন হয় না? আরো একটা কথা_ আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনেও আমরা এমনটি দেখেছিলাম। ৩৩ জন মেয়র প্রার্থীর (আওয়ামী লীগ) বিরুদ্ধে মামলা ছিল। সৎ প্রার্থী না দিলে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় না। দল তাদের প্রার্থী না করে সৎ প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে পারত। এটা হলে ভালো হতো। আওয়ামী লীগ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। সৎ প্রার্থী না হলে স্থানীয় পর্যায়ে সৎ রাজনীতি উপহার দেয়া যায় না। বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা থাকে বেশি। আওয়ামী লীগ এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। উপরন্তু যে ৭টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়' নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেখানে কী ধরনের 'পরিস্থিতি' বিরাজ করছিল তা আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের জানার কথা। 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়' বিজয়ী হওয়ার কাহিনী দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিজয়ী মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে 'ব্যবসায়ী প্রার্থীদের' প্রবণতা বেশি ছিল। ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৬৫২ জন ব্যবসায়ী, অর্থাৎ শতকরা ৭২ দশমিক ১২ ভাগ ব্যবসায়ী ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলেই ব্যবসায়ীদের আধিক্য বেশি ছিল। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদের ১৬৫ জন (শতকরা ৭৪ দশমিক ৬৬ ভাগ), আর বিএনপির ১৬২ জন (শতকরা ৭৮ দশমিক ৬৪ জন) ছিলেন ব্যবসায়ী (সূত্র সুজন, ঢাকা)। এদের মধ্যে অনেকেই বিজয়ী হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে_ ব্যবসায়ীরা যখন মেয়র হন কিংবা ইউপি চেয়ারম্যান হন তখন তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠে, নিরপেক্ষভাবে কি স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা করতে পারবেন? পৌরসভায় কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ হয়। একজন ব্যবসায়ীর এ ক্ষেত্রে স্বার্থ থাকে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কি এ ধরনের মেয়র পাওয়া সম্ভব, যিনি ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊধর্ে্ব থাকবেন? বাস্তবতা বলে এটা সম্ভব নয়। আর সম্ভব নয় বলেই দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। আরো একটা কারণে ওই নির্বাচন গুরুত্ব বেশি ছিল। দলীয়ভাবে নির্বাচন হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতীক 'দাড়িপাল্লা' নিয়ে নির্বাচন করতে পারেনি। তবে জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে ছিল। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। পেয়েছেন মাত্র একটি আসন। বিএনপির হাইকমান্ড এটি জানে। লিখিতভাবে অথবা প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে বিএনপি ২টি আসন দিয়েছিল জোটভুক্ত এলডিপি ও জাতীয় পার্টিকে (জাফর)। এর বাইরে ধারণা করছি প্রায় ২৬টি আসনে বিএনপি জামায়াতকে ছাড় দিয়েছিল। বলাই বাহুল্য জামায়াত প্রার্থীরা নির্বাচনে ভালো করেনি। ইসিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। দলটি নিষিদ্ধ ঘোষণার পর্যায়ে রয়েছে। সরকার সম্ভবত আইনি প্রক্রিয়াতেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জামায়াতের কর্মকা- নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে জামায়াত সমর্থকরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তাদের পরিচয় স্থানীয়ভাবে ভোটাররা জানে। ওইসব আসনে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। ফলে ওই নির্বাচন প্রমাণ করেছে জামায়াতের প্রতি জনসমর্থন এতটুকুও নেই। এই জনসমর্থন নিয়ে জামায়াত নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করবে (অনেকটা তুরস্কের মডেলে) যদি জামায়াতকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই পৌর নির্বাচন প্রমাণ করেছিল বিএনপি জামায়াতকে যেমনি ছাড়বে না, ঠিক তেমনি জামায়াতও বিএনপিকে ছাড়বে না। এই দুটি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটা 'বিভক্তির' উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কোনো 'কাজ' দেয়নি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের একটা যোগাযোগ আছে। পৌর নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনেও এটা প্রতিফলিত হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউপি নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের বিএনপি সমর্থন করবে বলে আমার ধারণা।
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। উপজেলা, সিটি করপোরেশন (৩টি), পৌর নির্বাচনের পর এখন ইউপি নির্বাচন, প্রতিটি নির্বাচন শুদ্ধ না হলেও বিএনপির অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ফিরে এসেছে। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। কিন্তু তাতে নির্বাচন বন্ধ থাকেনি এবং কোনো অসাংবিধানিক শক্তিও ক্ষমতায় আসেনি। ওই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় সরকার বহির্বিশ্বে কিছুটা নিন্দা কুড়িয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু কোনো সরকারই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়নি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরও প্রধানমন্ত্রী জাপান ও চীন সফর করেছেন। এরপর উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্বাচনই ভালো হয়নি। বরং নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে_ জালভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্র দখল, বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দান। এই যে 'সংস্কৃতি' এটা গণতন্ত্রের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। আর সে জন্যই প্রশ্ন উঠেছে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে সর্বসম্মতভাবে একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার। অতি সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়াসংক্রান্ত কমিটির প্রধান জিন ল্যাম্বার্ট ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিমতটি দিয়েছিলেন। তার মতে সিদ্ধান্তটি নিতে হবে বাংলাদেশকেই। আর সে ব্যাপারে দ্রুতই আলোচনা শুরু করা দরকার। ল্যাম্বার্টের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কেননা সংবিধানে বলা আছে কিভাবে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে আলোচনা কিংবা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার কী প্রয়োজন? কিন্তু বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে। বিএনপিকে জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতির ধারায় আনতে হলে আলোচনাটা জরুরি। একটা 'পথ' যদি বের করা না যায় তাহলে বিএনপি ওই নির্বাচনে (সম্ভাব্য তারিখ ২০১৯, জানুয়ারি) অংশ নেবে কিনা তা নিশ্চিত করে কেউই এখন বলতে পারবে না। তবে বিএনপি নেতাদেরও বুঝতে হবে নির্বাচন 'প্রতিহত' করার ঘোষণা গণতন্ত্র সম্মত নয়। বিএনপির জন্য সুযোগ এসেছে মূল ধারার রাজনীতিতে ফিরে আসার। কিন্তু কিভাবে? দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দলীয় সরকারের (ওই সময় সরকার থাকে নির্বাচনকালীন সরকার। তাদের কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে না) অধীনে নির্বাচন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতি একটু ভিন্ন। বুদ্ধিজীবীরা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারতেন। আমি দুঃখজনকভাবে অনেক তথাকথিত সুশীলকে দেখছি টকশোতে, যারা কিছুদিন আগেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলতেন, পত্রিকায় কলাম লিখতেন, আজ দেখি তারা টকশোতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে দেখি যারা সাংবিধানিক পদে আছেন, শপথ নিয়েছেন, তারা টকশোতে দলীয় রাজনৈতিক বক্তব্য রাখছেন। অতীতে কখনই এমনটি হয়নি। অতীতেও রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ভিসিরা ছিলেন। মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানরা ছিলেন। তারা সাধারণত 'রাজনৈতিক বক্তব্য' এড়িয়ে চলতেন। আজ পাল্টে গেছে সব। আর এভাবেই আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পাল্টে দিয়েছি। পাল্টে দিয়েছি নির্বাচনের সংস্কৃতি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র হয়েছিলেন তারা এখন দাবি করেন নিজেদের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলছে ইউপি নির্বাচনে।
অতীতে যখন সংবাদপত্রগুলো আমাদের বলেছিল প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, শতাধিক পৌরসভায় হামলা, সংঘাত, গুলি, ব্যালট ছিনতাই, বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা, কিংবা যখন বহিরাগতদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকে জাল ভোট প্রদানের দৃশ্য প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল অথবা ভাঙা ব্যালট বাক্স জঙ্গলে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়ার ছবি ছাপা হয়েছিল তখন আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়। এই যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতি সুস্থ গণতন্ত্রচর্চার জন্য সহায়ক নয়। এই সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ ও দূরত্ব আরো বৃদ্ধি করে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে হয়ে পড়ে একদলীয়। লঙ্ঘিত হয় মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সুস্থ চিন্তার চর্চা। ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে এই কথাগুলো আবারো বলা যায়।
মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাঁধা দিয়ে ক্ষমতা অাঁকড়ে থাকা যায় বটে, কিন্তু দলীয় সরকারের ভাবমূর্তি তাতে উজ্জ্বল হয় না। এই মানসিকতায় যদি পরিবর্তন আনা না যায়, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই অর্থহীন হয়ে পড়বে। আজ তাই সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাববার। এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি 'স্টেক হোল্ডার'কে আজ এগিয়ে আসতে হবে।
Daily Jai Jai Din03.03.16

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রসঙ্গে



পরপর তিনটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের প্রাথমিক বাছাইয়ে শেষপর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই ধরে নিয়েছেন যে, শেষপর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পই মনোনয়ন পাবেন চলতি বছরের ৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন হিলারি ক্লিনটন। মোটামুটিভাবে এটা এখন বলতেই হয়, হিলারি ক্লিনটন বরাবরই ডেমোক্রেট দলের প্রাথমিক বাছাইয়ে ফেভারিট ছিলেন না।

একসময় ধারণা করা হয়েছিল, জেব বুশই মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। কিন্তু সর্বশেষ প্রাথমিক বাছাইয়ে জেব বুশ ছিটকে পড়েন। এবং মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে যান ডোনাল্ড ট্রাম্প, টেড ক্রুজ ও মার্কো রুবিও। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এখন অনেক ভাল। যদিও বিতর্কিত নানা বক্তব্যের জন্য তিনি বারবার সমালোচিত হয়ে আসছেন। মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়া, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-মেহিকো সীমান্তে উঁচু দেয়াল দিয়ে মেহিকোর অধিবাসীদের ঠেকান, একইসঙ্গে কর ফাঁকির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান শিবিরে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। এখন জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে দুটো দলের চূড়ান্ত প্রার্থী কে হন, তা দেখার জন্যে। 
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি, আর নির্বাচক মণ্ডলীর সংখ্যা ৫৩৮ জন। সাধারণত সিনেট ও হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভ-এর সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতেই এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটের সংখ্যা ৫৪টি, অথবা নিউইয়র্কের ৩৩টি। ছোট ছোট রাজ্য, যেমন মেইন (৪টি), সাউথ ডাকোটা (৪টি) কিংবা ওয়াওসিঙ (৩টি) এ নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা কম।
প্রার্থী কোন রাজ্যে বিজয়ী হলে, সে রাজ্যে যে কটি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট রয়েছে তার পুরোটা তিনি পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে যে প্রার্থী হেরে যান, তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর কোনও ভোট পান না। অর্থাৎ জন সাধারণদের ভোটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হন না, নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। তবে জনসাধারণ ভোট দেন। এটাই হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য।
এখানে আরো একটি কথা বলা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তৃতীয় পার্টির তেমন কোনো অস্তিত্ব নেই। নাম কা ওয়াস্তে দু’একটি প্রার্থী (গ্রিন, কনসটিটিউশন পার্টি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও, তারা প্রচারণার দৌড়ে এগুতে পারেন না। প্রচারণায় প্রার্থীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা ছোট ছোট দলের পক্ষে সম্ভব নয় সংগ্রহ করা। নির্বাচন দুটি বড় দল, ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই দুই দলের প্রার্থীরা জনসাধারণ তথা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। এটা বৈধ। প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ও প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। আগে প্রেসিডেন্টের বাছাই-পদ্ধতি ছিল জটিল। প্রতিনিধি পরিষদে স্থানীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে থেকেই প্রেসিডেন্ট বাদে মনোনয়ন সংগ্রহ করার ব্যবস্থা ছিল। এরকম পার্টি ‘ককাসে’ প্রার্থী নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। আর ‘ককাস’বা বাছাই ব্যবস্থায় চূড়ান্তপর্যায়ে প্রার্থী মনোনীত হয়ে প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৮৯-১৭৯৭)। তার কোনো দল ছিল না। তিনি ফেডারেলিস্টদের ব্যানারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
স্মরণ করিয়ে দেই, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করেন নি। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই দলটি থেকেই গেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ওবামা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম দিকে দলটির নাম ছিল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকান। ১৮২৫ সাল পর্যন্ত এই দল থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কুইন্সি এডামস (৬ষ্ঠ প্রেসিডেন্ট) ক্ষমতায় ছিলেন ১৮২৯ সাল পর্যন্ত। তারপর শুধু ডেমোক্রেটিক পার্টি নাম ধারণ করে এন্ড্রু জনসন ও মার্টিন ভ্যান বুরেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন (১৮৪১) এরপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে উইগ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত উইগ পার্টির প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরপর দলটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আব্রাহাম লিংকন (১৮৬১-১৮৬৫) ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। এরপর থেকেই এই দুই পার্টি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
সাধারণত একজন প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি মাত্র দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই ৩২তম প্রেসিডেন্টের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আরো একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতাসীন থেকেও দ্বিতীয় টার্মের জন্য সেই প্রেসিডেন্ট বিজয়ী হতে পারেন নি। সমসাময়িককালে জেরাল্ড ফোর্ড (৩৮তম প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান, ১৯৭৪-১৯৭৭), জিমি কার্টার (৩৯তম, ডেমোক্রেট, ১৯৭৭-১৯৮১), কিংবা সিনিয়র জর্জ বুশ (৪১তম, রিপাবলিকান, ১৯৮৯-১৯৯৩)-এর নাম উল্লেখ করা যায়। এখন দেখা যাক যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হিলারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউজে তার টার্ম শুরু করতে পারেন কিনা। তার প্রথম টার্ম শুরু হবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে।
প্রতিটি একক নির্বাচনেই দেখা গেছে কতগুলো ইস্যু প্রাধান্য পায়। আর ওইসব ইস্যুগুলোর ব্যাপারে প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব দেখে পার্টি ‘ককাসে’ ডেলিগেটরা ভোট দেন ও কোন বিশেষ ব্যক্তিকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন। প্রার্থীদের একাধিক রাজ্যের ‘ককাসে’ দলীয় অন্য প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। বিভিন্ন বক্তব্য এখানে প্রাধান্য পায় বেশি। যেমন এবার প্রাধান্য পেয়েছে সিরিয়া, ইরান ইস্যু। চীনের প্রসঙ্গটিও এসেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেট দলীয় প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়কার অর্থনৈতিক ইস্যুও রিপাবলিকান শিবিরে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি রিপাবলিকান ‘ককাসে’ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্র সচিব থাকার সময় ব্যবহার করা ব্যক্তিগত ই-মেইল নিয়েও নানা কথা উঠেছে। রিপাবলিকানরা ওবামার অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজনের মাঝে একজন গরীব। পরিসংখ্যানে দেখা যায় সেখানে ৪৯.১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে, সেই সাথে আরো ৫১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্রসীমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ধনী-গরীবের একটা বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদের ২৫ ভাগ নিয়ে যায়। এরা আবার সম্পদের ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই একভাগ মানুষের বার্ষিক আয় ২৭৩৪২২১২ ডলারের উপরে। কিন্তু বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১টি কাজের জন্য নূন্যতম ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আরো খারাপ খবর হচ্ছে ৪৭.৮ ভাগ পরিবার সরকারি খাদ্য সাহায্য বা ফুড স্ট্যাম্প এর উপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার কর্মজীবী। কিন্তু এদের আয় যথেষ্ট নয়।
প্রেসিডেন্ট ওবামা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করতে পারেননি, সেখানে স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট করেছেন, স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে যথেষ্ট শিক্ষক দিতে পারেননি, সেখানে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছেন ‘তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর পেছনে। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছিল সব মিলিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে (যুদ্ধে খরচ ৮০৬ মিলিয়ন, সৈনিকদের চিকিৎসাবাবদ ও অন্যান্য খরচ ৪২২ থেকে ৭১৭ মিলিয়ন)। আর আফগান যুদ্ধের খরচ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার অংককেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু সেনা প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে ব্যয় হয়েছিল ৬ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে জনসংখ্যার ৯.১ভাগ মানুষ বেকার, সেখানে যুদ্ধের পেছনে এত বিপুল ব্যয় নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। পররাষ্ট্র নীতিতে ওবামা সফল, তাও বলা যাবে না। ২০০৯ সালে কায়রো ভাষণে তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে ‘নতুন সম্পর্ক’গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে সেখানে জঙ্গিবাদেরই জন্ম হয়েছে। ইরাকে, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন আত্মঘাতী বোমাবাজি হ্রাস হয়েছে। সাদ্দামের উৎখাতের পর সেখানে ইসলামী কট্টরপন্থীরা শক্তিশালী হয়েছে।
সিরিয়াতে আসাদের উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ‘আরব বসন্ত’ তিউনেশিয়ায়, ইয়েমেনে মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মিসরে আবার স্বৈরতন্ত্র এসেছে। সেনা কর্তৃত্বে আবার ফিরে গেছে দেশটি। লিবিয়া কার্যত এখন নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। সেখানে তথাকথিত একটি ‘সরকার’ থাকলেও, সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। উপরন্তু বেনগাজির কাছাকাছি শহর দাবনা চলে গেছে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা এই শহরকে ইসলামিক স্টেটের সম্প্রসারিত অংশ বলে ঘোষণা করেছে। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং এসব অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের ব্যর্থতার দায়ভার বহন করতে হবে হিলারিকে।
ডেমোক্রেটরা যে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, এই অভিযোগ হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে উঠবেই। একসময় হিলারি নিজে ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্র সচিব (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) ছিলেন। তিনি তার সময়ে লিবিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি। এটা তার একটা মাইনাস পয়েন্ট। উপরন্তু ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও নানাকথা আছে। হিলারি ক্লিনটন তার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি অনেক রাষ্ট্র থেকে ফান্ড পেয়েছে, এবং তাদের স্বার্থে কাজ করেছে-এসব অভিযোগ ইতোমধ্যেই উচ্চারিত হয়েছে।এটা প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকানেরা ব্যবহার করেছেন, এটাই স্বাভাবিক। যদিও বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গেল সপ্তাহে একটি জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেখানে হিলারি ক্লিনটনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আভাস দেয়া হয়েছে।
মার্কিন নির্বাচনের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। যদিও প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। তারপরও সব ধরনের প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে দুই শিবিরেই—অর্থাৎ রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট শিবিরে। এইসব প্রচারণায় ব্যক্তিগত বিষয়াদিও আলোচিত হচ্ছে। জুলাই মাসে যখন চূড়ান্তভাবে প্রার্থী মনোনীত হবেন, তখন দু’দলের দু’জন প্রার্থী খুব কম সময় পাবেন। মাত্র ৪ মাস সময় পাবেন। এ কারণেই দুটি বড় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া ‘ককাসে’অংশ নিয়ে প্রচারণার কাজটি সেরে নিচ্ছেন। তবে বলতেই হবে একজন ব্যক্তি কখনো কখনো ফ্যাক্টর হয়ে যান। যেমন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নভেম্বরে নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে ‘বিজয়ী’হন, তাহলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। আর হিলারি ‘বিজয়ী’হলে পরিবর্তন আসবে কম।
Poriborton
01.03.16