রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

যোগসূত্রটি খুঁজে বের করতে হবে

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামিনিয়াম জয়শঙ্কর ঢাকা ঘুরে গেলেন ১৩ মে। তিনি ঢাকা এসেছিলেন নিশা দেশাই বিসওয়ালের ঢাকা সফরের পরপরই। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলেছেন জয়শঙ্কর। এমনকি ক’জন মুখচেনা সুশীলসমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে মতবিনিময়ও করেছেন। এরপর এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী মন্ত্রী উইলিয়াম ই. টড। এর বাইরে আরও বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে একের পর এক। যুদ্ধাপরাধী নিজামীর ফাঁসিকে কেন্দ্র করে তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছে। রাষ্ট্রদূত ডেভরিম ওসর্তুক ১২ মে রাতেই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন। একই ঘটনায় ইসলামাবাদ ও ঢাকায় দুই দূতকে পাল্টাপাল্টি তলব করা হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন সর্বনিু পর্যায়ে রয়েছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিবের সাক্ষাৎ রাজনীতিতে ঢেউ তুলেছে। আর সর্বশেষ ঘটনায় টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সশস্ত্র ব্যক্তিরা হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে আনসার কমান্ডারকে। সেই সঙ্গে নিয়ে গেছে ১১টি অস্ত্র ও ৫৭০ রাউন্ড গুলি। এ ঘটনাগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির হয়তো কোনো মিল নেই। কিন্তু সব কটিই যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তা বলা যাবে না। হঠাৎ করেই যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বহির্বিশ্বে আলোচিত হচ্ছে বেশি করে এবং বাংলাদেশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ক্রমেই।

জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের উদ্দেশ্যের মধ্যে যে সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি ছিল, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের জন্য দাওয়াত দিতেও এসেছিলেন। চলতি বছরের অক্টোবরে গোয়ায় বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী সেই সম্মেলনে যাতে যোগ দেন, তার দাওয়াত দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর। এটা তার ‘ডিউটি ভিজিট’ ছিল না। বাংলাদেশে একের পর এক যেসব হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, তাতে যে ভারত উদ্বিগ্ন এটা বলতেই মূলত জয়শঙ্করের ঢাকা আগমন। ভারত যে বাংলাদেশে তথাকথিত ‘জঙ্গি তৎপরতায়’ উদ্বিগ্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ এখানে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে গেলে (?) তা ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। সুতরাং জয়শঙ্কর যে তার দেশের উৎকণ্ঠার খবর দিতে এসেছিলেন, তা খুবই স্বাভাবিক। এ সফরে তিনি বলে গেলেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঢাকার পাশে থাকবে নয়াদিল্লি। এই ‘অ্যাপ্রোচ’ ঠিক আছে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জঙ্গি দমন সম্ভব হবে কি? জয়শঙ্করের সফরের সময় আমরা লক্ষ করলাম জঙ্গি দমনে একটি ত্রিদেশীয় অ্যাপ্রোচের (ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ) ব্যাপারে ভারতের আপত্তি। নিশা দেশাই এমনটি চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের তাতে আপত্তি রয়েছে। ভারত দ্বিপাক্ষিকভাবে জঙ্গি সমস্যা মোকাবেলা করতে চায়। এটা ভারতের বৈদেশিক নীতির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। ভারত এভাবেই সমস্যার সমাধান করে- অর্থাৎ দ্বিপাক্ষিকতা। অথচ আমরা আমাদের বৈদেশিক নীতিতে বহুপাক্ষিকতাকে গুরুত্ব দিই। জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এখন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে আমরা শুধু ভারতের সহযোগিতা নিয়ে কি এই উত্থান রোধ করতে পারব? যদিও এটা সত্য, জঙ্গিবাদ ঠেকাতে মার্কিন ‘অ্যাপ্রোচ’ আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী। তাই প্রশ্ন থাকলই। যেখানে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের কোনো ‘ঐক্য’ হচ্ছে না, সেখানে জঙ্গি দমন প্রশ্নেও কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।

জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের সময় দু’দেশের মাঝে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি আমাদের তথাকথিত নাগরিক সমাজের সঙ্গে এ ‘সহযোগিতা’ নিয়ে তিনি আলাপ-আলোচনাও করেছেন। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের যে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে, সেই সমস্যার সমাধানে ভারত কতটুকু কী করল, তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা হয়নি। বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে আলোচনা হল না। ফারাক্কা চুক্তির পর বাংলাদেশ স্মরণকালের সর্বনিু পানি পেয়েছে (২১-৩১ মার্চ বাংলাদেশ পানি পেয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেফ। এটা চুক্তির লংঘন)। এ বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এল না! তথাকথিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মুখেও উঠে এলো না এ কথাগুলো। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ব্যাপারে ভারত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তাও কেউ বললেন না। আর নাগরিক সমাজ! এরা কারা? এরা কি সব শ্রেণীর বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করেন? সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে যারা পরিচিত, তাদের দিয়ে সব নাগরিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করানো কি ঠিক? জঙ্গি দমনে ভারতের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন, সন্দেহ নেই তাতে। তবে এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকেই দেখা উচিত। শুধু ভারতের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং সেই সঙ্গে এ প্রশ্নে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে জঙ্গিবাদ দমন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে তুরস্ক যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা অনাকাক্সিক্ষত। তবে আমি এতে অবাক হইনি। কারণ তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির রাজনৈতিক দর্শন এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দর্শন এক ও অভিন্ন। এরা মূলত ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনীতি অনুসরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও একটি বন্ধুপ্রতিম রাজনৈতিক দলের স্বার্থে তুরস্ক এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। তবে তুরস্ক কখনোই কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। কারণ বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। এ স্বার্থ নষ্ট হোক, এটি তুরস্ক চাইবে না। আমার ধারণা, আগামীতে তুরস্ক বাংলাদেশে একজন নয়া রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত ‘স্মার্ট ডিপ্লোমেসি’ অনুসরণ করা। বাংলাদেশের উচিত হবে না তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করা। তবে পাকিস্তানের ব্যাপারে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সীমিত আকারে দূতাবাসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রদূতের পরিবর্তে কনস্যুলার বা মিনিস্টার পর্যায়ে দূতাবাসের প্রতিনিধিত্ব হতে পারে। করাচিতে একটি কনস্যুলেট থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে কি-না, তাও বিবেচনায় নিতে পারে সরকার।

একজন ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যের সঙ্গে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিবের ‘বৈঠক’ নিঃসন্দেহে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেবে। ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আর এটা বিবেচনা করেই ইসরাইলের সঙ্গে কখনও কোনো পর্যায়ে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়নি বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসরাইলের সহযোগিতা বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করেছিল। যদিও এটা সত্য, ইসরাইল দীর্ঘদিন চেষ্টা করে আসছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করতে। বেশকিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভাগের একজন শিক্ষক একটি প্রসঙ্গে ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। ওই সময় কম বিতর্ক হয়নি। এরপর থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ইসরাইলি নেতাদের সঙ্গে যে কোনো ধরনের সম্পর্ক পরিহার করে আসছে বাংলাদেশ। তাহলে আসলাম চৌধুরী কীভাবে মেন্দি এন সাফারির সঙ্গে ‘বৈঠক’ করেন! চৌধুরী একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বটে। কিন্তু তিনি বিএনপিকে একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি দলের সিনিয়র নেতা। এটা কি শুধু একটি ‘ভুল’? তিনি কি কোনো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার জালে আটকা পড়েছিলেন? ঘটনা যাই ঘটে থাকুক না কেন, বিএনপির এক সংকটের সময়ে তিনি নিজ দলের অনেক ক্ষতি করেছেন। তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। রোববার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না। তিনি ‘সব দায় দায়িত্ব মাথায় নিয়ে’ দল থেকে পদত্যাগ করতে পারতেন। অথবা দলের চেয়ারপারসন ‘শৃংখলা ভঙ্গের’ অপরাধে দলের যুগ্ম মহাসচিবের পদ থেকে তাকে অপসারণ করতে পারেন। এটা দলের জন্য মঙ্গল।

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় যখন নানা চাপের মুখে আছে, তখন উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। একজন আনসার কমান্ডারকে খুন করা হল। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে- এটা ডাকাতির ঘটনা! আসলেই কি এটা ডাকাতি ছিল? আমি নিশ্চিত নই। বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, বসবাস, নানা রকম কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য নানা সংকট সৃষ্টি করেছে। এদের কেউ কেউ বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তবে ভয়টা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিকাশ ঘটাচ্ছে। পাঠক, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) কথা স্মরণ করতে পারেন। South Asia Terrorism Portal-এ বার্টিল লিন্টনারের একটি প্রবন্ধ আছে। অনলাইনে পাঠক এটা পড়ে দেখতে পারেন। লিন্টনার বলার চেষ্টা করেছেন, আরএসও’র অনেক জঙ্গি আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশে ট্রেনিং নিয়েছেন। ট্রেনিং শেষ করে তাদের এ অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য, নাকশকতামূলক ও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ানো। একটি আন্তর্জাতিক চক্র এ রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে। এরা রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র চায়। অর্থাৎ রাখাইন স্টেটকে তারা ‘স্বাধীন’ করতে চায়। গহিন অরণ্যে ট্রেনিং হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন সূত্র থেকে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এরা পুরো এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে ফায়দা তুলতে চায়। তাই আনসার কমান্ডারের হত্যাকাণ্ডকে আমি শুধু ডাকাতি হিসেবে ভাবতে পারছি না। এটা রোহিঙ্গা জঙ্গিদের কাজ। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে, আমরা রোহিঙ্গা সমস্যাকে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে যেতে পারিনি। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায়। তারা রেজিস্টার্ড নন এবং মিয়ানমার এদের স্বীকারও করে না। ফলে এদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কাজটিও সহজ নয়। মুসলমানবিদ্বেষী অং সান সুচি এদের ব্যাপারে নির্বিকার। আমার মনে হয়, উখিয়ার গহিন অরণ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জঙ্গিদের উৎখাতের জন্য খুব দ্রুত সেখানে সেনাবাহিনী পাঠানো উচিত এবং সেনা মোতায়েন করাও জরুরি। নতুবা এই জঙ্গিরা কিছু বৈদেশিক শক্তির সহযোগিতায় এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এতে বিঘ্নিত হতে পারে।

জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি কানেকশনের প্রশ্নটি সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তবে তার সফরের সময় অনেক ঘটনাই ঘটল, যার একটির সঙ্গে অপরটির কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে। সুতরাং বিষয়গুলোকে হালকাভাবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশে আইএস নেই- একথা তথ্য-উপাত্ত সহকারে আমরা বারবার বলছি। একটি ‘শক্তি’ বাংলাদেশে আইএস আছে এমনটি প্রমাণ করতে চায়। আমরা যেন সেই ফাঁদে পা না দিই। খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের এগোতে হবে। কোনো হত্যাকাণ্ডের ‘মোটিভ’ আমরা আজও উদঘাটন করতে পারলাম না। খুনিদের ধরতে পারলাম না। চিহ্নিত করা গেল না কারা তাদের হত্যা করেছে। ফলে বহির্বিশ্বের ‘চাপ’ থাকবেই। জঙ্গি দমনে ভারত কেন, কোনো বৈদেশিক শক্তিরই আমাদের প্রয়োজন নেই। সমস্যার সমাধান আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ‘অ্যান্টি’ টেরোরিজম ইউনিটকে’ আরও শক্তিশালী করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। Daily Jugantor 17.05.16

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন : প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিলারি আর ট্রাম্পের মাঝেই

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আছে প্রায় ৬ মাস। ৮ নভেম্বর সেখানে নির্বাচন। এরই মধ্যে দুইটি দল, অর্থাৎ ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী প্রায় নিশ্চিত। হিলারি ক্লিনটন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পই পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। বিষয়টি অনেকটাই এখন নিশ্চিত। এক্ষেত্রে হিলারি যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন, তা প্রথম থেকেই অনেকটা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু নিশ্চিত ছিল না ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন। তবে একের পর এক অঙ্গরাজ্যগুলোর পার্টি প্রাইমারিতে বিজয়ী হয়ে ট্রাম্প তার মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেছেন। এ নিয়ে দলের মাঝে বড় ধরনের বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার ছোট ভাই জেব বুশ, যিনি সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন, তারা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তারা ট্রাম্পকে সমর্থন করবেন না। এমনকি সাবেক স্পিকারও এ কাতারে শরিক হয়েছেন। যদিও ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, এতে তার কিছু যায় আসে না। এরই মধ্যে দুইজন প্রার্থীই প্রাইমারিতে বিজয়ী হয়ে তাদের প্রার্থিতার সপক্ষে ডেলিগেটদের ভোট নিশ্চিত করেছেন। হিলারির পক্ষে ডেলিগেটদের সমর্থনের পাল্লা যথেষ্ট ভারি। ট্রাম্প একটু পিছিয়ে আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি, আর নির্বাচকম-লীর সংখ্যা ৫৩৮। সাধারণত সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে এ নির্বাচকম-লী গঠিত হয়। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকম-লীর ভোটের সংখ্যা ৫৪টি অথবা নিউইয়র্কের ৩৩টি। ছোট ছোট রাজ্য, যেমনÑ মেইন (চারটি), সাউথ ডাকোটা (চারটি) কিংবা ওয়াওসিভে (তিনটি) নির্বাচকম-লীর সংখ্যা কম। কোনো প্রার্থী কোনো রাজ্যে বিজয়ী হলে, সে রাজ্যে যে ক’টি নির্বাচকম-লীর ভোট রয়েছে, তার পুরোটা তিনি পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে যে প্রার্থী হেরে যান, তিনি নির্বাচকম-লীর কোনো ভোট পান না। অর্থাৎ জনসাধারণের ভোটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হন না, নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। তবে জনসাধারণ ভোট দেন। এটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তৃতীয় পার্টির তেমন কোনো অস্তিত্ব নেই। নামকাওয়াস্তে দুই-একটি প্রার্থী (গ্রিন, কনস্টিটিউশন পার্টি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও তারা প্রচারণার দৌড়ে এগোতে পারেন না। প্রচারণায় একজন প্রার্থীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা ছোট ছোট দলের পক্ষে সম্ভব নয় সংগ্রহ করা। নির্বাচন দুইটি বড় দল, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ দুই দলের প্রার্থীরা জনসাধারণ তথা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। এটা বৈধ। প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ও প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। আগে প্রেসিডেন্টের বাছাই পদ্ধতি ছিল জটিল। প্রতিনিধি পরিষদে স্থানীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রার্থীদের মধ্য থেকেই প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা ছিল। এরপর পার্টি ‘ককাসে’ প্রার্থী নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। আর ‘ককাস’ বা বাছাই ব্যবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ে মনোনীত হয়ে প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৮৯-১৭৯৭)। তার কোনো দল ছিল না। তিনি ফেডারেলিস্টদের ব্যানারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্মরণ করিয়ে দিই, প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করেননি। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই দলটি থেকেই গেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বারাক ওবামা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমদিকে দলটির নাম ছিল ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকান। ১৮২৫ সাল পর্যন্ত এ দলটি থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কুইন্সি এডামস (৬ষ্ঠ প্রেসিডেন্ট) ক্ষমতায় ছিলেন ১৮২৯ সাল পর্যন্ত। তারপর শুধু ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাম ধারণ করে এন্ড্রু জনসন ও মার্টিন ভ্যান বুরেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন (১৮৪১)। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে উইগ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত উইগ পার্টির প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরপর দলটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮৬১-১৮৬৫) ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। এরপর থেকেই এ দুই পার্টি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সাধারণত একজন প্রেসিডেন্ট ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি মাত্র দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র্র্রের এ ৩২তম প্রেসিডেন্টের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতাসীন থেকেও দ্বিতীয় টার্মের জন্য সেই প্রেসিডেন্ট বিজয়ী হতে পারেননি। সমসাময়িককালে জেরাল্ড ফোর্ড (৩৮তম প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান, ১৯৭৪-১৯৭৭), জিমি কার্টার (৩৯তম, ডেমোক্র্যাট, ১৯৭৭-১৯৮১), কিংবা সিনিয়র জর্জ বুশ (৪১তম, রিপাবলিকান, ১৯৮৯-১৯৯৩) এর নাম উল্লেখ করা যায়। এখন দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হিলারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউসে তার টার্ম শুরু করতে পারেন কিনা। নয়া প্রেসিডেন্টের টার্ম শুরু হবে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে।
প্রতিটি প্রাক-নির্বাচনেই দেখা গেছে, কতগুলো ইস্যু প্রাধান্য পায়। আর ওইসব ইস্যুর ব্যাপারে প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব দেখে পার্টি ককাসে ডেলিগেটরা ভোট দেন ও কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন। প্রার্থীদের একাধিক রাজ্যের ককাসে দলীয় অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। বিভিন্ন বক্তব্য এখানে প্রাধান্য পায় বেশি। যেমনÑ এবার প্রাধান্য পেয়েছে সিরিয়া, ইরান ইস্যু। চীনের প্রশ্নটিও এসেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়কার অর্থনৈতিক ইস্যুও রিপাবলিকান শিবিরে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি রিপাবলিকান ‘ককাসে’ ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্র সচিব থাকার সময় ব্যবহার করা ব্যক্তিগত ই-মেইল নিয়েও নানা কথা উঠেছে। রিপাবলিকানরা ওবামার অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজনের মাঝে একজন গরিব। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেখানে ৪৯ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, সেই সঙ্গে আরও ৫১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ধনী-গরিবের একটা বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদের ২৫ ভাগ নিয়ে যায়। এরা আবার সম্পদের ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এ এক ভাগ মানুষের বার্ষিক আয় ২ কোটি ৭৩ লাখ ৪২ হাজার ২১২ ডলারের উপরে। কিন্তু বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি কাজের জন্য ন্যূনতম চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আরও খারাপ খবর হচ্ছে, ৪৭ দশমিক ৮ ভাগ পরিবার সরকারি খাদ্য সাহায্য বা ফুড স্টাম্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার কর্মজীবী। কিন্তু এদের আয় যথেষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করতে পারেননি, যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট করেছেন, স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে যথেষ্ট শিক্ষক দিতে পারেননি, সেখানে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছেন ‘তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর পেছনে। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছিল সব মিলিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে (যুদ্ধ খরচ ৮০৬ মিলিয়ন, সৈনিকদের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ ৪২২ থেকে ৭১৭ মিলিয়ন)। আর আফগান যুদ্ধের খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু সেনা প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে ব্যয় হয়েছিল ৬ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে জনসংখ্যার ৯ দশমিক ১ ভাগ মানুষ বেকার, সেখানে যুদ্ধের পেছনে এত বিপুল ব্যয় নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। পররাষ্ট্রনীতিতে ডেমোক্র্যাটরা সফল, তাও বলা যাবে না। ২০০৯ সালের কায়রো ভাষণে ওবামা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ‘নতুন এক সম্পর্ক’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে সেখানে জঙ্গিবাদেরই জন্ম হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনে আত্মঘাতী বোমাবাজির জন্ম হয়েছে। সাদ্দাম উৎখাতের পর সেখানে ইসলামী কট্টরপন্থিরা শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়ায় আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ‘আরব বসন্ত’ তিউনিশিয়া, ইয়েমেন ও মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মিসরে আবার স্বৈরতন্ত্র ফিরে এসেছে। সেনা কর্তৃত্বে আবার ফিরে গেছে দেশটি। লিবিয়া কার্যত এখন নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। সেখানে তথাকথিত একটি ‘সরকার’ থাকলেও সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। উপরন্তু বেনগাজির কাছাকাছি শহর দারনা চলে গেছে ইসলামী স্টেট জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা এ শহরকে ইসলামিক স্টেটের সম্প্রসারিত অংশ বলে ঘোষণা করেছে। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং এসব অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের ব্যর্থতার দায়ভার বহন করতে হবে হিলারি ক্লিনটনকে, যদি তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হন। ডেমোক্র্যাটরা যে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি, এ অভিযোগ হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে উঠেছে। একসময় হিলারি নিজে ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্র সচিব (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ছিলেন। তিনি তার সময়ে লিবিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি। এটা তার একটা মাইনাস পয়েন্ট। উপরন্তু ক্লিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও নানা কথা আছে। হিলারি ক্লিনটন তার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত। এ প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি অনেক রাষ্ট্র থেকে ফান্ড পেয়েছে এবং তাদের স্বার্থে কাজ করেছে এমন অভিযোগ এরই মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে। প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকানরা ব্যবহার করছেন, এটাই স্বাভাবিক। যদিও বিখ্যাত সংবাদ মাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল কিংবা সিএনএন একাধিক জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেখানে হিলারি ক্লিনটনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আভাস দেয়া হয়েছে। সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তা হবে এক ইতিহাস।
মার্কিন নির্বাচন প্রচারণা এখন তুঙ্গে। যদিও প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। তারপরও এক ধরনের প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে দুই শিবিরেই, অর্থাৎ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরে। এসব প্রচারণায় ব্যক্তিগত বিষয়াদিও আলোচিত হচ্ছে। জুলাইয়ে যখন চূড়ান্তভাবে প্রার্থী মনোনীত হবেন, তখন দুই দলের দুইজন প্রার্থী খুব কম সময় পাবেন। মাত্র ৪ মাস সময় পাবেন। এ কারণেই দুইটি বড় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া ‘ককাসে’ অংশ নিয়ে প্রচারণার কাজটি সেরে নিচ্ছেন। তবে বলতেই হবে, একজন ব্যক্তি কখনও কখনও ফ্যাক্টর হয়ে যান। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নভেম্বরে নির্বাচকম-লীর ভোটে ‘বিজয়ী’ হন, তাহলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। আর হিলারি ‘বিজয়ী’ হলে, পরিবর্তন আসবে কম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা বক্তব্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেয়া হবে না’Ñ এ বক্তব্যে খোদ পোপ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ট্রাম্প আদৌ খ্রিস্টীয় ধর্মে বিশ্বাসী কিনা সে ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে! ‘মেক্সিকান অবৈধ অভিবাসীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে টেক্সাসে তিনি উঁচু বেড়া নির্মাণ করবেন’Ñ এ বক্তব্যও কনজারভেটিভরা অনেকে গ্রহণ করেননি। এজন্য দেখা যায়, টেক্সাসে ট্রাম্প বিজয়ী হতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যেখানে ট্রাম্পের বিনিয়োগ রয়েছে (কানাডা, পানামা, তুরস্ক) প্রতিটি জায়গাতেই তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। মজার কথা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন শুরু হয়, তখন রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্পকে সিরিয়াস প্রার্থী হিসেবে ভাবা হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি তার অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। বহুল আলোচিত সুপার টুইসডেতে হিলারি ও ট্রাম্প আলাদা আলাদাভাবে বিজয়ী হলেও এখনও বাকি আছে আরও ক’টি রাজ্যের বাছাই পর্ব। এক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট শিবিরে হিলারি ক্লিনটনের প্রার্থী পদ প্রায় ‘নিশ্চিত’ হলেও ট্রাম্পের উত্থান রিপাবলিকান শিবিরের ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ধরে নেয়া হয়, তিনিই রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পাবেন। তবে নানা বিষয়ে ট্রাম্প যে ‘বিতর্ক’ সৃষ্টি করেছেন, তাতে করে নির্বাচকম-লী চূড়ান্ত বিচারে, অর্থাৎ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে। আর এটাই হবে হিলারির জন্য প্লাস পয়েন্ট। এখনও কিছু প্রাইমারি বাকি আছে। প্রার্থীদের সবাইকে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের প্রাইমারিতেই অংশ নিতে হয় এবং তার পক্ষে সমর্থন আদায় করতে হয়। ফলে দলীয় প্রাইমারিগুলো নিয়ে হিলারি  এবং ট্রাম্প উভয়েই ব্যস্ত। তবে যেহেতু ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শিবিরে অনেকেই তাদের প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, ফলে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় হিলারি আর ট্রাম্প থাকবেন বলেই মনে হয়।
Daily Alokoto Bangladesh
15.05.16

বাংলাদেশে আইএস বিতর্ক ও আমাদের শঙ্কা


বাংলাদেশে আইএস বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন ঢাকা ঘুরে গেলেন নিশা দেশাই বিসওয়াল। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ কিংবা ‘সন্ত্রাসীগোষ্ঠী যেখানে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করছে তা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই’—নিশা দেশাইয়ের এ ধরনের বক্তব্যের পরও আইএস নিয়ে বাংলাদেশের প্রশ্ন রয়েই গেল। তথাকথিত আইএস বা আল-কায়েদার হাতে মারা গিয়েছিলেন নিখিল জোয়ার্দার। দর্জি। ধর্মীয়ভাবে সনাতন ধর্মের অনুসারী। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করার অভিযোগে ২০১২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছিল। তিনি জেলও খেটেছিলেন ২২৪ দিন। এটাই কি ‘অপরাধ’ যে তিনি মহানবী সম্পর্কে কটূক্তি করেছিলেন! যথারীতি SITE ইন্টেলিজেন্স আমাদের জানাচ্ছে, আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে! এই আইএস নিয়ে মহাবিতর্ক এখন বাংলাদেশে। এর আগে একই কায়দায় খুন হন কলাবাগানের বাসিন্দা ও ইউএসএইডে কর্মরত জুলহাজ ও তাঁর ‘বন্ধু’ তনয়। তাঁদের ‘অপরাধ’ কী? জুলহাজ সমকামীদের পত্রিকা ‘রূপবান’ সম্পাদনা করতেন এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতেন। এটাই কি ‘অপরাধ’? এর একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি। শুধু মার্কিন রাষ্ট্রদূতই নন, স্বয়ং কেরি ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের বক্তব্যটি ছিল স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে আইএস আছে এ কথা সরকারকে বিশ্বাস করতে হবে।’ এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা—যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশে আইএস আছে এবং সরকার যেন তা স্বীকার করে নেয়। বাংলাদেশে আইএস নেই—এ কথা বারবার বলে আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পুলিশপ্রধানও বললেন, ‘পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশকে ইরাক-সিরিয়া বানাতে চায়।’ বাংলাদেশে আইএস বিতর্কটা সাম্প্রতিক সময়ের। আর আইএসের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ম্যাগাজিন ‘দাবিগ’-এ এ-সংক্রান্ত খবর খুব কমই ছাপা হয়েছে। অভিজিৎ, খিজির খান, দীপন, অনন্ত, কোনিও হোশি, রেজাউল করিম, নীলাদ্রি, তাবেল্লা আর সর্বশেষ জুলহাজ, তনয় ও নিখিল। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরপরই খুব দ্রুততার সঙ্গে সাইট ইন্টেলিজেন্সে খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে। সাইট কোনো গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান নয়, যা গবেষকরা তাঁদের গবেষণার কাজে ব্যবহার করেন। এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান, যারা ইসলামিক উগ্রপন্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা বিবিএস প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘বিক্রি’ করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এর বড় ‘ক্রেতা’। এর যিনি পরিচালক (রিটা কাট্জ), তিনি একসময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদে কাজ করতেন। প্রতিষ্ঠানটি মোসাদের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। এ প্রশ্ন আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও। কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইএসের স্থানীয় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার খবর স্থানীয়ভাবে প্রচার করা হয়নি। আমার নিজের মনেও নানা প্রশ্ন আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যখন বারবার বলে আসছেন যে এ দেশে ‘হোমগ্রোন’ জঙ্গি আছে, অর্থাৎ স্থানীয় জঙ্গি, তখন আরেকজন সিনিয়র মন্ত্রী ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কী করে বলেন, বাংলাদেশে আফগান ট্রেনিংপ্রাপ্ত আট হাজার আল-কায়েদা জঙ্গি রয়েছে! এতে দুই মন্ত্রী যখন দুই ধরনের ও পরস্পর বিপরীতমুখী বক্তব্য দেন তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘কনফিউশন’ তৈরি হয়। মানুষ এখন কোনটা বিশ্বাস করবে? বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের তথা আইএসের তথাকথিত উত্থান নিয়ে একটা ‘বক্তব্য’ই থাকা উচিত। বাংলাদেশ সরকার বারবার আইএসের থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। সেটাই সঠিক। কেননা আইএস তাদের স্ট্র্যাটেজিতে কখনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে না। প্যারিস, ব্রাসেলস কিংবা জাকার্তায় আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন যে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল, তাতে ‘সন্ত্রাস সৃষ্টি’ করাই ছিল মুখ্য, ব্যক্তিকে টার্গেট করে তারা হামলা চালায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক স্থানে হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে কোনো একটি ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। আইএসের মুখপত্র ‘দাবিগ’-এ অতি সম্প্রতি জনৈক শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে, যাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে আইএসের প্রধান হিসেবে। এটা যে একটা ভুয়া নাম, এটা সবাই স্বীকার করে। ফলে আজ যখন পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশে আইএস আছে, এই স্বীকারোক্তি আদায় করে নিতে চায় তখন প্রশ্ন উঠবেই। আইএস আছে, এই যুক্তি তুলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক ‘যুদ্ধ’-এর সূচনা করেছে অনেক দেশেই। মধ্যপ্রাচ্যের পর তাদের দৃষ্টি এখন আফ্রিকার দিকে। দক্ষিণ এশিয়াও তাদের নজরে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প মিডিয়ার যাঁরা পাঠক, তাঁরা দেখেছেন বিভিন্ন গবেষক তথ্য-উপাত্ত সহকারে দেখিয়েছেন করপোরেট হাউসগুলোর স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা করে। David Vine তাঁর গ্রন্থ Base Nation : How Us Military Bases Abroad Harm America and the World-এ উল্লেখ করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সেনা ছাউনি রয়েছে, তা পরিচালনা কিংবা মেইনটেন করতে শুধু ২০১৪ সালেই খরচ হয়েছে ১৫৬ বিলিয়ন ডলার (আফগানিস্তান ও ইরাকসহ)। এর বাইরে রয়েছে যুদ্ধ খরচ ও বেতন-ভাতাদি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মজীবী নাগরিকদের কাছ থেকেই এ টাকা নেওয়া হয়, যার পরিমাণ জনপ্রতি বছরে ১০ থেকে ৪০ হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে ৯-১১-এর ঘটনার সঙ্গে (টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা) যে টাকার খেলা জড়িত, তার প্রমাণও আছে। একটি নয়, একাধিক গবেষণা প্রবন্ধে ও গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই টুইন টাওয়ার হামলায় কারা সুবিধা পেয়েছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর গ্রাউন্ড জিরোকে (যেখানে টুইন টাওয়ার ছিল) কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য। ২০১৪ সালে আমি গ্রাউন্ড জিরোতে দেখে এসেছি সেখানে দাঁড়িয়ে গেছে সুউচ্চ নতুন একটি ভবন। আর এই ভবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে বিশাল এক বাণিজ্য। করপোরেট হাউসগুলোর ব্যবসা সেখানে রমরমা। আফগান যুদ্ধ শুরু করার পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের খরচের পরিমাণ ছয় ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে (এক হাজার বিলিয়নে এক ট্রিলিয়ন)। আর এ থেকে ব্যবসা করেছে মার্কিন কন্ট্রাক্টররা। কিন্তু শান্তি ও স্থিতিশীলতা আফগানিস্তানে ফিরে আসেনি। পাঠক, ইরাকের কথা স্মরণ করতে পারেন। ইরাক আক্রমণের (২০০৩) আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। প্রতিটি ইরাকিকে খাদ্যের নিশ্চয়তা দেবেন। কার্যত ইরাক এখন ভেঙে যাওয়ার মুখে। জঙ্গিবাদ, আইএসের উত্থান ইরাককে কার্যত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। কিন্তু ইরাকের অবকাঠামো নির্মাণে যে বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, তা পেয়েছে শুধু মার্কিন কন্ট্রাক্টররা (বেকটেল গ্রুপের কথা পাঠক স্মরণ করতে পারেন, যার চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি)। ইরাক অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করে ‘বিল’ মিটিয়েছে। লিবিয়ার কথা একইভাবে উল্লেখ করা যায়। ওবামা অনেকটা বুশকে অনুসরণ করে লিবিয়ায় বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই লিবিয়ায় আজ কার্যত কোনো সরকার নেই। জঙ্গিরা (আইএস) এখন লিবিয়ার একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। তথাকথিত নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে পৃথিবীর অনেক দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্ম হয়, যারা নিজ নিজ দেশের প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। উত্তর নাইজেরিয়ায় ২০০২ সালে বোকো হারাম (আসল নাম ‘দ্য পিপলস অব দ্য সুন্নিস প্রিয়েচিং অ্যান্ড জিহাদ) নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল, যারা এখন মালি, নাইজার, চাদ, ক্যামেরুনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ‘অপারেট’ করছে। নাইজেরিয়ার শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেও এই সেনাবাহিনী বোকো হারাম দমনে ব্যস্ত। মিসরে জন্ম হয়েছে ‘আনসার বায়াত আল মাকডিস’। সিরিয়ায় রয়েছে বুশরা ফ্রন্ট। ইয়েমেনে রয়েছে আল-কায়েদার উপস্থিতি। এসব সংগঠনের অনেকেই আইএসের প্রতি এরই মধ্যে আনুগত্য প্রকাশ করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় ‘কাতিবা বুসানতারা’ আইএসের আনুগত্য স্বীকার করেছে এবং জানুয়ারিতে জাকার্তায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে (AFRICOM)। আফ্রিকায় রয়েছে (নাইজার) ইউরোপিয়ানের মতো প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, যার অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। মার্কিন কন্ট্রাক্টরদের আগ্রহ এখানে বিশাল। ২৮টি আফ্রিকান দেশে টঝ-অভত্রপধহ ঈড়সসধহফ (AFRICOM) রয়েছে। এর বাইরে FINTLOCK of US Training Exercise Africa নামে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীকে জঙ্গি দমনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। শুধু তা-ই নয়, ২৮টি দেশে Trans Sahara Counter Terrorism Partnership কর্মসূচির আওতায় প্রায় এক হাজার ৩০০ মার্কিন সৈন্য এখন নিয়োজিত রয়েছে। পাঠক লক্ষ করবেন, লিবিয়াকে বলা হয় ‘গেটওয়ে টু আফ্রিকা’। অর্থাৎ এখান থেকে আফ্রিকায় যাওয়া যায়। ফলে এখানে যদি (লিবিয়া) একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার থাকে, তাহলে এখান থেকে আফ্রিকা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা সম্ভব। এ কথাগুলো কাদের উদ্দেশে হচ্ছে? ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধের নামে যুক্তরাষ্ট্র একক কর্তৃত্ব করতে চায় এবং প্রতিটি দেশ থেকে ‘সুবিধা’ আদায় করে নিতে চায়। যাঁরা অধ্যাপক Michel Chossudovsky-র বহুল আলোচিত গ্রন্থ America’s War on Terrorism পড়েছেন, তাঁরা দেখেছেন অধ্যাপক চসুডোভস্কি তথ্য-উপাত্তসহ দেখিয়েছেন, কারা টুইন টাওয়ার হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য কী। অধ্যাপক চসুডোভস্কি কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। কানাডায় থাকেন এবং সেখানে একটি গবেষণা কেন্দ্র পরিচালনা করেন। তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘টুইন টাওয়ার’ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের যত বেশি ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে লাভ হয়েছে অনেক বেশি। তাই আজ যখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, জন কেরি কিংবা অ্যান্টনি ব্লিংকেন (ডেপুটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বাংলাদেশে আইএস আছে বলে দাবি করেন এবং বাংলাদেশকে তা স্বীকার করতে বলেন, তখন স্পষ্টতই ওপরে উল্লিখিত তথ্যগুলো সামনে চলে আসে। বাংলাদেশে ‘হোমগ্রোন’ জঙ্গি আছে। সরকার জননিরাপত্তার প্রতি খুব বেশি সজাগ নয়। কিন্তু যে প্রশ্নটি আমাকে ভাবিত করে, তা হচ্ছে বার্নিকাটের সঙ্গে আলোচনা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, ‘সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সেল গঠন করবে’—এর অর্থ কী? ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী যে অভিযান, তাতে কি বাংলাদেশ অংশ নিতে যাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘দ্য গ্লোবাল কোয়ালিশন টু কাউন্টার আইএসআইএল’, তাতে কি বাংলাদেশ যোগ দেবে তখন? বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দিয়েছিল (ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম)। কিন্তু বাংলাদেশ মার্কিন জোটে যোগ দেয়নি। ৫৯টি দেশ মার্কিন জোটে যোগ দিয়েছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এই জোটে যোগ দিলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারতও এর সদস্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন থেকেই চাচ্ছে বাংলাদেশ ‘সোফা’ (States of Forces Agreement) ও ‘আকসা’ (Acquisition of Cross Servicing Agreement) চুক্তিতে যোগ দিক। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মার্কিনি ‘চাপ’ উপেক্ষা করে আসছে। বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিতে রাজি হয়, তাহলে বিনা ভিসায় মার্কিন সেনা সদস্যরা বাংলাদেশে আসতে পারবে, অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে এবং তারা যদি কোনো ‘অন্যায়’ করে তাদের বাংলাদেশি আইন কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সোপর্দ করা যাবে না। তবে বাংলাদেশ এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারি সংলাপ চুক্তি ও TICFA চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন তথাকথিত আইএসের উপস্থিতিকে (?) স্বীকার করে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি চাচ্ছে বাংলাদেশকে তাদের সামরিক বলয়ে নিয়ে যেতে? এগুলো স্পষ্টতই স্পেসেকুলেশন। ধারণা মাত্র। এর সঙ্গে বাস্তবতা কতটুকু, তা হয়তো এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। আগামী দিনগুলোই প্রমাণ করবে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতি কোন পর্যায়ে উপনীত হবে। যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, তা তখন স্পষ্ট হবে। তাই বলে সাম্প্রতিককালে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার সঙ্গে কারা জড়িত, এটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এখন পর্যন্ত উদ্ঘাটিত হয়নি। পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার এই ব্যর্থতা আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই, আমার কাছে এই বিতর্ক মূল্যহীন। কেননা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই আমাদের জন্য খারাপ সংবাদ। এই সংবাদগুলো বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। আমাদের দূতাবাসগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত আমাদের দূতাবাস এসব হত্যাকাণ্ডের ‘সঠিক ব্যাখ্যা’ মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে পারেনি। সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে জন কেরির মতো ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করার সৎসাহস পেতেন না। বাংলাদেশে স্থানীয় জঙ্গি আছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারাই জড়িত। আমি এসব হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলব না। বাংলাদেশকে এরা অস্থির করতে চায়। এখন আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা, তাদের যদি রাজনৈতিক চরিত্র থাকে, তা-ও বলা এবং দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। পুলিশ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পুলিশি প্রহরা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা কোনো সমাধান নয়। সবাইকে পুলিশি নিরাপত্তা রাষ্ট্রের চরিত্রকে বদলে দিতে পারে। জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন সব দল ও মতের ঐক্য এবং সেই সঙ্গে জনসচেতনতা। জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করার মধ্য দিয়েই আমরা পারি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে। Daily Kaler Kontho 15,05.16

জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন ও বাংলাদেশ

সাতটি অগ্রসর দেশের জোট জি-সেভেনের নেতারা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টায় বছরে একবার শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। চাপমুক্ত পরিবেশে অন্তরঙ্গ আলোচনা চালানোর উদ্দেশ্যে বার্ষিক এই সম্মেলন সাধারণত রাজধানী থেকে দূরের কোনো অবকাশকেন্দ্রে আয়োজন করা হয়। জোটের সদস্যরা পালাক্রমে শীর্ষ সম্মেলনের স্বাগতিক দেশের দায়িত্ব পালন করে থাকে। সেই হিসাবে ২০০৮ সালে জাপানের উত্তরের দ্বীপ হোক্কাইডোতে সর্বশেষ সম্মেলনের আয়োজন করার পর ২০১৫ সালে পরবর্তী বৈঠকের আয়োজন দেশটির করার কথা ছিল। 
২০০০ সালের গ্রীষ্মে দক্ষিণের দ্বীপ ওকিনাওয়ায় জাপান অগ্রসর দেশের জোটের শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করার সময় রাশিয়াকে ধনী রাষ্ট্রসমূহের এই জোটের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছিল এবং তখন থেকে প্রায় দেড় দশক কাল ধরে জোটটি জি-৮ জোট নামে পরিচিতি পায় এবং জোটভুক্ত রাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটি। এই আটের হিসাবের মারপ্যাঁচেই জাপানের আয়োজন করা পরবর্তী দুটি সম্মেলনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ১৬ বছর। ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিয়ে সেই অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে যুক্ত করে নিলে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে এবং সেই উষ্মার জের হিসেবে সেই একই বছর রাশিয়াকে জি-৮ থেকে খারিজ করে দেওয়া হলে জোট আবারও স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের জি-৭ জোট নামে আগের পরিচিতি ফিরে পায়। এবারের সম্মেলন হচ্ছে সংকুচিত আকারের তৃতীয় সম্মেলন। 
পশ্চিমের অগ্রসর দেশগুলোর আগের সেই অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক দাপট এখন অনেকটাই সংকুচিত। এর কারণ অবশ্য নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের আবির্ভাব এবং বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার হারানো অবস্থান আংশিকভাবে হলেও ফিরে পাওয়া। এরপরও সাতটি রাষ্ট্রের শীর্ষ বৈঠক এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বরাজনীতিতে যার প্রভাব একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক দিক থেকে জোটের তিনটি সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানির অবস্থান হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ।
স্বাগতিক দেশ জাপানের আয়োজনে এবারের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে মধ্য জাপানের মিয়ে জেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত দ্বীপ ইসে-শিমায়। এর অল্প দূরেই আছে জাপানের পবিত্রতম শিন্তো মন্দির ইসে-জিঙ্গু। 
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করা। শীর্ষ বৈঠকের আগে ও পরে মন্ত্রী পর্যায়ের গোটা দশেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। জাপানের বিভিন্ন শহরে সে রকম বৈঠক এপ্রিল মাসের গোড়া থেকে শুরু হয়েছে এবং শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে সেপ্টেম্বর মাসে। তবে সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বের নজর মের ২৬ ও ২৭ তারিখে নির্ধারিত নেতাদের শীর্ষ বৈঠকের দিকেই মূলত নিবদ্ধ।
শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি উপায় জি-৭ জোটের নেই। ফলে সেসব সিদ্ধান্তকে জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠনের সামনে রাখা সুপারিশ হিসেবে গণ্য করা মনে হয় অনেক বেশি যুক্তিসংগত। এবারের শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতির সামনে দেখা দেওয়া হুমকি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়ন পর্যন্ত বিস্তৃত নানা রকম বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে চলা আলোচনা ও সম্মেলনের বিভিন্ন সুপারিশকে আরও অর্থবহ করে তোলার উদ্দেশ্যে কয়েক বছর ধরে সম্মেলন চলাকালে নির্বাচিত কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। আগের কয়েকটি সম্মেলনে সাধারণত উন্নয়নশীল কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। জোট এই উদ্যোগের নামকরণ করেছে আউট-রিচ বা যেটাকে আমরা অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা বলে আখ্যায়িত করতে পারি। এবারের সম্মেলনে এই আউট-রিচ উদ্যোগ অবশ্য ভিন্ন অবয়ব লাভ করতে চলেছে এবং তা বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। 
জি-৭ সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ জাপান এবারের আউট-রিচ বৈঠককে ভিন্ন অবয়বের একটি শীর্ষ বৈঠকে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জোটবহির্ভূত সাতটি উন্নয়নশীল দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ নেয়। এর উদ্দেশ্য হলো, ধনী দেশের নেতারা বিশ্ব সমস্যা সমাধানে কী ভাবছেন এবং কী করতে চাইছেন, সেসব প্রশ্নে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা। জাপান যেহেতু অগ্রসর সাতটি দেশের জোটের একমাত্র এশীয় প্রতিনিধি এবং এবারের সম্মেলন যেহেতু এশিয়া মহাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখে এশিয়ার কয়েকটি দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জি-৭ নেতাদের সঙ্গে নির্বাচিত সাতটি উন্নয়নশীল দেশের নেতাদের আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে সম্মেলনের শেষ দিন, ২৭ মে।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আউট-রিচ বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য জাপানের নির্ধারণ করে নেওয়া শর্তাবলির ভিত্তিতে এশিয়া মহাদেশের ছয়টি রাষ্ট্রের পাশাপাশি আফ্রিকা ইউনিয়নের সভাপতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনরত দেশের নেতাকেও আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এশিয়ার ছয়টি বাছাই দেশের মধ্যে তিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে আসিয়ান জোটের সদস্যভুক্ত ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওস। অন্যদিকে এশিয়ার দ্বীপদেশ হিসেবে জি-৭ শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়েছে শ্রীলঙ্কা ও সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল পাপুয়া নিউগিনি। আর সর্বশেষ শর্ত, অবকাঠামো চাহিদা থাকা দেশ হিসেবে জি-৭ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭ মের বিশেষ বৈঠকে যোগ দিতে জাপান ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বিশ্বের সাতটি অগ্রসর দেশের নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনার সুযোগ পাবেন তিনি।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের এই আউট-রিচ বৈঠকে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বসার এই দুর্লভ সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হলে নেতাদের আস্থা লাভ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু অঘটন নিয়ে অগ্রসর দেশের নীতিনির্ধারকেরা বেশ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে জঙ্গিবাদীদের হাতে একের পর এক মানুষ খুন হওয়া এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করায় প্রশাসনের ব্যর্থতা। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করায় জাপানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভ্রমণে দেশটির নাগরিকদের জন্য জারি করা সতর্কতা এখনো তুলে নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, গত বছর অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে একজন জাপানি নাগরিক নিহত হওয়ার পর এই সতর্কতা জারি করা হয়। 
বাংলাদেশে জাপান ও অন্যান্য অগ্রসর দেশের সরকার ও ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে হত্যাকারীদের কেবল শনাক্ত করা নয়, তাদের বিচারের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারলে জি-৭ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি অনেক বেশি অর্থবহ হবে আশা করি। 

বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা



২২ এপ্রিল ২০১৬ তারিখ জাতিসংঘের সদর দফতরে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? বিশ্বে উষ্ণতা বেড়ে গেলে বাংলাদেশের যে ব্যাপক ক্ষতি হবে তা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৭০টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করল। বাকি দেশগুলো স্বাক্ষর করবে ২০১৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে। তারপর এই চুক্তিটি প্রতিটি দেশের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হতে হবে। তখন এটা আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হবে। কিন্তু বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার কাজটি খুব সহজ হবে না। চুক্তিতে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী সংস্থাগুলোর অসহযোগিতা, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প ও সহজলভ্য না করার ব্যর্থতার কারণে এই প্যারিস চুক্তিটি ২০২০ সালের পর কতটুকু কার্যকরী হবে এই প্রশ্ন থাকলই। একটা বড় প্রশ্ন নিয়ে নিউইয়র্কে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ হলো বটে তবে আমাদের আরো বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এটা সত্য বিশ্ব নেতাদের মধ্যে একটা উপলব্ধিবোধ এসেছে যে, কার্বন নিঃসরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে। কাজটি নিঃসন্দেহে সহজ নয়। এর সঙ্গে বেশ কিছু প্রশ্ন জড়িত। উন্নত বিশ্ব কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সাহায্য, জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় টেকনোলজি ট্রান্সফার, উন্নত বিশ্বের নিজের কার্বন নিঃসরণ হার কমানো ইত্যাদি বিষয় জড়িত। এর আগে গেল ডিসেম্বরে লিমা কপ-২০ সম্মেলনে প্রতিটি দেশকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে নিজস্ব কর্মপদ্ধতি ও কাঠামো উপস্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ এটা করেছে। কিন্তু সব দেশ এটা করতে পেরেছে কিনা এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। চীন ও ভারতের মতো দেশের কার্বন নিঃসরণ নিয়েও কথা আছে। কেননা দেশ দুটি সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনে যে ক’টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতিবছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আগামীতে। আইপিসিসির রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের কথা। অনেকের মনে থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর পরিবেশের ব্যাপারে বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এন্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। আমাদের তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রীকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেখানে। বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে গেলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পরপর দু’বার বন্যা ও পরবর্তীতে ‘সিডর’-এর আঘাতের সম্মুখীন হয়। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে আঘাত করে ‘আইলা।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ব্যাপক খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয়। দেশে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ‘সিডর’-এর পর বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি বারবার বিশ্ব সভায় আলোচিত হয়। সিডরের ক্ষতি ছিল গোর্কির চেয়েও বেশি। মানুষ কম মারা গেলেও সিডরের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সিডরে ৩০ জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল ৯টি জেলা। ২০০ উপজেলার ১ হাজার ৮৭১টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোট ১৯ লাখ ২৮ হাজার ২৬৫ পরিবারের ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ সিডরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিলেন ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র পর ‘মহাসেন’ বাংলাদেশে আঘাত করেছিল। যদিও এতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব আমরা পাইনি। ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র আঘাত আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আইলার আঘাতের পর খুলনার দাকোপা, কয়রা ও পাইকগাছায় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর করা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতা কোথাও কোথাও ১ মিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত দেখা দেয়। আইলায় ৮০ ভাগ ফলদ ও বনজ গাছ মরে গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে আজ নোনা জলের আগ্রাসন। সুপেয় পানির বড় অভাব ওইসব অঞ্চলে। এরপর ‘মহাসেন’ আমাদের আবারো ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়েছিল। আমাদের মন্ত্রী, সচিব কিংবা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তা-ব্যক্তিরা বিদেশ সফর ও সম্মেলনে অংশ নিতে ভালোবাসেন। কানকুন, ডারবান, কাতার কিংবা তারো আগে কোপেনহেগেন (কপ সম্মেলন) আমাদের পরিবেশ মন্ত্রী গেছেন। আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য কোপেনহেগেনে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিশ্ব জনমত আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। আমরা পরিবেশ রক্ষায় তাতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পাইনি।
বাংলাদেশ এককভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনরোধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে না। বাংলাদেশ এককভাবে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ও তা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের উষ্ণতা রোধ করতে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না। এ জন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক আসরে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিদেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এই সাহায্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। পরিবেশ বিপর্যয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। গেলবার যে বন্যা হলো আবার আমাদের সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিল। বন্যা, অতি বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় এখন এ দেশে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ‘সিডর’ ও আইলার আঘাতে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছিল সেই ক্ষতি সারাতে সরকারের বড় বড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হলেও ওখানে ‘রাজনীতি’ ঢুকে গিয়েছিল। দলীয় বিবেচনায় টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ভাবতে অবাক লাগে যেসব এনজিও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেনি এবং এ ব্যাপারে যাদের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই শুধু দলীয় বিবেচনায় তাদের নামে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। জলবায়ু তহবিলের অর্থ যাওয়া উচিত ওইসব অঞ্চলে যেখানে ঘূর্ণিঝড়, সাগরের আঘাত বেশি আর মানুষ ‘যুদ্ধ’ করে সেখানে বেঁচে থাকেন। অথচ দেখা গেছে জলবায়ুর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা দেয়া হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভাকে, মানিকগঞ্জের একটি প্রকল্প কিংবা নীলফামারী তিস্তা বহুমুখী সমাজকল্যাণ সংস্থাকে। সিরাজগঞ্জের প্রগতি সংস্থাও পেয়েছে থোক বরাদ্দ অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও জলবায়ুসংক্রান্ত কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।
আমাদের জন্য তাই প্যারিস চুক্তির (২০১৬) গুরুত্ব অনেক। বাংলাদেশ পরিবেশগত নানা সমস্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশের একার পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই বাংলাদেশ আজ আক্রান্ত। সুতরাং বৈশ্বিকভাবে যদি বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি কমানো না যায় তাহলে বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয়রোধ করাও সম্ভব হবে না। তাই একটি চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে আরো প্রয়োজন জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় বৈদেশিক সাহায্যের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং সেই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ‘কমিটমেন্ট।’ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমাদের যেতে হবে। সোলার বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন স্থানীয়ভাবে তাদের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। সুতরাং আর্থিক সাহায্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত জরুরি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য বিশ্ব নেতারা বারবার সাহায্যের কথা বললেও সেই সাহায্য কখনোই পাওয়া যায়নি।
প্যারিস সম্মেলন (২০১৫) চলাকালে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ করেছিল জার্মান ওয়ার্চ নামে একটি সংস্থা। প্রতি বছর বৈশ্বিক জলবায়ু সূচক তারা প্রকাশ করে থাকে। শীর্ষ সম্মেলন চলাকালেই তারা প্রকাশ করেছিল বৈশ্বিক জলবায়ু সূচক ২০১৬। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝড়, বন্যা, ভূমিধস ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা এরা প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছে ৬ নম্বরে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে হন্ডুরাস। তারপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে মিয়ানমার, হাইতি, ফিলিপাইন ও নিকারাগুয়া। তাই প্যারিস চুক্তিটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওই সম্মেলন নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি হলেও তাতে যদি আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকে তাহলে ওই চুক্তি মূল্যহীন হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে বিশ্ব নেতাদের সবাই যারা প্যারিস কপ-২১-এ যোগ দিয়েছিলেন তারা সবাই এখন প্যারিস চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আমাদের বনমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছেন নিউইয়র্কে। তিনি বলেছিলেন, এ ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ধরিত্রী বাঁচবে, সূচনা হবে নতুন যুগের। মন্ত্রী আরো জানিয়েছিলেন, চুক্তিটি বাস্তবায়নে আরো পাঁচ বছর সময় রয়েছে। এই সময়ে চুক্তির অস্পষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার সুযোগ রয়েছে। নিউইয়র্কে অনেক বিশ্বনেতাও বলেছেন এই চুক্তি বিশ্বের দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। খাদ্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তি বজায় রাখতেও চুক্তিটি অনন্য ভূমিকা রাখবে বলেও তারা অভিমত পোষণ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শুধু চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই বিশ্বের উষ্ণতা কমানো যাবে না। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশল নিজেদের মতো করে ঠিক করবে এবং এটাই হচ্ছে আসল কথা। নিজেদের কৌশল ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ কি তা পারবে? আমাদের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফর পছন্দ করেন। কিন্তু দূষণ কমানোর ব্যাপারে অত উৎসাহী নন। আমাদের পরিবেশমন্ত্রীও এ ব্যাপারে তেমন সক্রিয় এটা অনেকেরই মনে হয়নি। দেশের ভেতরে প্রায়শই পরিবেশ দূষণের সংবাদ হরহামেশা পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে দেখি। কিন্তু তার কোনো কার্যকরী ভূমিকা চোখে পড়েনি। সুন্দরবনের কাছাকাছি একটি কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করে আমরা বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে রয়েছি। পরিবেশবাদীরা এর বিরোধিতা করলেও সরকার এ ব্যাপারে এখনো অনড়। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, বড় দল বিএনপি এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিলেও বামসংগঠনগুলো সোচ্চার। তারা সুন্দরবন পর্যন্ত লংমার্চের আয়োজন করেছিল। বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ব্যবহার করা হবে। এ জন্য বছরে ৪ মিলিয়ন টন কয়লা ভারত থেকে আমদানি করতে হবে। বিদ্যুৎ আমাদের দরকার সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু কয়লা পুড়িয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং তাতে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে তা কি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি? না, নেইনি।
ভারতীয় ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে বটে, কিন্তু পরিবেশের প্রভাব নিরূপণের জন্য ইআইএ সমীক্ষায় তা করা হয়নি। রামপালের গৌরম্ভর কৈকরদশ কাঠি ও সাতমারি মৌজায় ১ হাজার ৮৪৭ একর জমিতে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হবে যা সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। কয়লা পোড়ানো হলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার, নাইট্রিক এসিড বায়ুমণ্ডলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে এসিড বৃষ্টি হতে পারে এবং তাহলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। সুন্দরবনের উদ্ভিদ মরে যাবে, নষ্ট হবে জীববৈচিত্র্য। পশুপাখির প্রজনন বাধাগ্রস্ত হবে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কি অন্যত্র স্থানান্তরিত করা যেত না? আমাদের গর্ব এই সুন্দরবন। ইতোমধ্যে সুন্দরবনকে গ্লোবাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এমন কিছু করতে পারি না যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম এ প্যারাবনের অস্তিত্ব হুমকির সৃষ্টি করে। রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণসংক্রান্ত ইউনেস্কো কনভেনশন লঙ্ঘন করছি। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আমরা যতই সোচ্চার হই না কেন বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠবে, আমরা আমাদের নিজেদের পরিবেশ রক্ষায় কতটুকু সচেতন। তাই প্যারিস চুক্তিতে যখন নিজেদের কর্মপদ্ধতির উদ্ভাবনের কথা বলা হয় তখন প্রশ্নটা ওঠে আমরা সচেতন কতটুকু। জাতিসংঘ কিংবা বিশ্ব নেতারা এসে আমাদের পরিবেশ দূষণ রোধ করা ঠিক করে দিয়ে যাবে না। এটা ঠিক করতে হবে আমাদের নিজেদের। এটাই হচ্ছে প্যারিস চুক্তির মূল কথা।
Daily Manobkontho
10.05.16

নিশা দেশাইয়ের ঢাকা সফর ও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক




নিশা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং চলেও গেছেন। নিশা দেশাই যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বেশ ক’টি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিরাও হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অফিসার ও পরবর্তী সময়ে ইউএসএইডে কর্মরত জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু তনয়। জুলহাজ-তনয় হত্যাকা-ের পরপরই নিশা দেশাই ঢাকা আসেন এবং এসব হত্যাকা- নিয়ে মন্তব্য করেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে ফোন করেছিলেন। স্পষ্টতই এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র জুলহাজ-তনয় হত্যাকা-কে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। ঢাকায় এসে নিশা দেশাই মন্তব্য করেছিলেন, জুলহাজ-তনয় হত্যাকা-ের সঙ্গে জঙ্গিরা জড়িত। তিনি আরও বলেছিলেন, এসব হত্যাকা-ে আল কায়দাসহ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএস যেভাবে দায় স্বীকার করছে, তা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, জঙ্গিবাদ নির্মূলে বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। নিশা দেশাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগাম কোনো তথ্য থাকলে তা বাংলাদেশকে দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। নিশা দেশাইয়ের ঢাকা সফরের পরপরই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জুলহাজ হত্যা তদন্তের শেষ দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
সব মিলিয়ে নিশা দেশাইয়ের বাংলাদেশ সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আপাতদৃষ্টিতে জুলহাজ-তনয় হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে নিশার সফর সম্পন্ন হয়েছে, এটা ভাবলে আমরা ভুল করব। সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। জিএসপি সুবিধা বাতিল হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে। জিএসপি সুবিধা বাতিল হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছিল। এর পেছনে রাজনীতি আছে, এমন মন্তব্যও করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো জঙ্গি প্রশ্নটি। যখন বাংলাদেশ সরকার বারবার বলে আসছে বাংলাদেশে আইএস নেই, সেখানে নিশা দেশাই বলে গেলেন, পরোক্ষভাবে আইএস আছে! এখন দেখতে হবে, এ দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর পর্যন্ত যায়। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, রানা প্লাজা ও তাজরীন গার্মেন্টে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা জিএসপি সুবিধা বাতিলের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। এ কর্মপরিকল্পনা পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে, এটা বলা যাবে না। অসংখ্য নারী শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পড়ে জিএসপি সুবিধা বাতিলের ক্ষেত্রে। যদিও এটা সত্য, শুধু তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ বেশি। তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে আমরা ১৫ দশমিক ৬২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের অবস্থান ধরে রেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে এখন ভিয়েতনাম। আর এ ভিয়েতনামের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র অতিসম্প্রতি টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি করেছে। এ চুক্তির আওতায় ভিয়েতনাম শুল্কমুক্তভাবে তার তৈরি পোশাক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঝুঁকির মুখে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা ভালো, চীনের পরই ভিয়েতনাম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বড় রফতানিকারক। অর্থাৎ চীন বেশি রফতানি করে। তারপর ভিয়েতনাম। পরিসংখ্যান বলছে, তৈরি পোশাকে ভিয়েতনামের রফতানি বাড়ছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ হারে। এখন টিপিপির ফলে এটা আরও বাড়বে। ২০১৫ সালেই ভিয়েতনাম পোশাক রফতানি খাতে ২৮ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ভিয়েতনাম  ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক রফতানি ৫০ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া ৮ হাজার ১৭৮ কোটি ডলারের মধ্যে চীনের ২ হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। তার পরের অবস্থানই ভিয়েতনামের ৯২৬ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া রয়েছে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে। চতুর্থ ও পঞ্চম যথাক্রমে মেক্সিকো এবং ভারত। দেশ দুইটির রফতানি যথাক্রমে ৩৭৩ ও ৩৪০ কোটি ডলার। বিজিএমইএ’র দেয়া তথ্যমতে, ২০১৪ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪৮৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রফতানি প্রবৃদ্ধি (যুক্তরাষ্ট্রে) কমেছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আমাদের শঙ্কার কারণটা এখানেই। এমনিতেই যখন জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল হলো না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষর করল। এক্ষেত্রে টিপিপির ফলে আমাদের তৈরি পোশাক খাত যে ঝুঁকির মুখে আছে, তা আমরা কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারব, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
জিএসপি সুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালের হংকংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত দেয়ার শর্ত কার্যকর করতে রাজি হয়েছিল। এতে করে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, অনুন্নত বিশ্ব পশ্চিমা উন্নত দেশে তাদের পণ্যের আওতা বাড়াতে পারবে। তবে একটা প্রশ্ন ছিল, পণ্যের মান ও উৎস নির্ধারণ নিয়ে। এ দুইটি বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে। হংকং সম্মেলনের ৮ বছর পর ২০১৩ সালের ৩ থেকে ৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সর্বশেষ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক)। বালি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এসব বাণিজ্য সংস্থা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বটে; কিন্তু ‘বালি ঘোষণায়’ কোন পক্ষ কী পেল, কিংবা বাণিজ্য বৈষম্যের শিকার অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন হবে কিনা, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে এ প্রশ্নগুলোই আবারও উত্থাপিত হয়েছে। আমাদের জিএসপি সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাকে কোনো জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে না। তারপরও অন্যান্য পণ্যে যতটুকু সুবিধা পেত বাংলাদেশ, তাও ২০১৩ সালের জুন থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত প্রথমে তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এক. শ্রমমান, দুই. শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকা-ের পূর্ণ তদন্ত ও বিচার এবং তিন. ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ঢাকার টিকফার প্রথম বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র আকার-ইঙ্গিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ‘রুলস অব অরিজিন’র কঠিন শর্তে আটকে আছে। ধনী দেশগুলো এটা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৬১.৩ ভাগ জিএসপি সুবিধার আওতায়। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে মোট রফতানির প্রায় ৬০ ভাগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে বাংলাদেশ। বলা ভালো, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৭৮ ভাগ হচ্ছে তৈরি পোশাক। এ তৈরি পোশাকের ৬০ ভাগ যায় ইউরোপে, আর ২৫ ভাগ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তৈরি পোশাক আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস হলেও  এ খাতের সঙ্গে জড়িত নানা ‘প্রশ্ন’ এর ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা ও বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করতে পারেনি। দরকষাকষিতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আমলানির্ভর আমাদের মন্ত্রণালয়ের আমলারা বিদেশ সফর, সম্মেলনে অংশগ্রহণ ইত্যাদিকেই প্রাধান্য দেন বেশি। এখানে দক্ষ জনশক্তির বড় অভাব। বিজেএমইএ’ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাদের গবেষণা ‘সেল’ও শক্তিশালী নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে ‘রুল অব অরিজিন’, ‘এটি ডাম্পিং’ ও ‘কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা’, শ্রমমান ইত্যাদি নানা টেকনিক্যাল প্রশ্ন জড়িত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়ও আমরা এসব প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে যেতে পারিনি।
আমাদের সমস্যা এখানেই। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ইস্যুগুলোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আসরে আমরা আমাদের অবস্থান জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি। প্রতিপক্ষ এ থেকে সুবিধা নিয়েছে। তৈরি পোশাকের ব্যাপারে আমাদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। এখানে এক ধরনের শৈথিল্য কাজ করেছিল প্রথম থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র যে ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল, তার সবই বাস্তবায়ন হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তবে এটা সত্য, এ ১৬ দফার বেশ ক’টি আমরা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে কথাটা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে তারা ১৬ দফার পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। আংশিক বাস্তবায়ন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো জঙ্গিবাদের প্রশ্নটি। যুক্তরাষ্ট্র এখন চাচ্ছে, বাংলাদেশ স্বীকার করুক এদেশে আইএস ও আল কায়দা আছে। কিছুদিন আগে তথ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন, বাংলাদেশে ৮ হাজার আল কায়দা জঙ্গি আছে! কোন যুক্তিতে, কোন তথ্যমতে, তথ্যমন্ত্রী ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’কে এ তথ্যটি দিয়েছিলেন, আমি জানি না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর এ ধরনের সংগঠনের বাংলাদেশে উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে আসছেন।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা যদি জঙ্গি প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলেন, তা শুধু বিভ্রান্তি বাড়ায়ই না, বরং এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তি এ থেকে সুবিধা নেবে, এটাই স্বাভাবিক। জিএসপি নিয়ে সমস্যা আছে। তার সমাধান হয়নি। এখন জঙ্গিবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপ’ আরও বাড়ল। এ ‘চাপ’ কি বাংলাদেশ উপেক্ষা করতে পারবে? সচেতন পাঠক জানেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে ‘আকসা’ এবং ‘সোফা’ নামে দুইটি চুক্তি করতে চাচ্ছে। এর বাইরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যে জোটটি গঠিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রশ্নটি। কোনো একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সম্মতি জানায়নি। এখন নিশা দেশাইয়ের সফরের পর বাংলাদেশ জঙ্গি দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অর্থ কী? বাংলাদেশ কি তাহলে ‘সোফা’ ও ‘আকসা’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে? সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোটেও যোগ দেবে? আর এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে? এসব প্রশ্নের জবাব এ মুহূর্তে দেয়া যাবে না। নিশা দেশাইয়ের সফরের পর বাংলাদেশ কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, এর জন্য আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।
daily Alokito Bangladesh
08.05.16

প্রধানমন্ত্রীর উক্তি, নিশা দেশাইয়ের সফর ও কিছু প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ মে সংসদে বলেছেন, এ দেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই। জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অনেকে খেলতে চাইবে কিন্তু সে খেলা আমি খেলতে দেব না। প্রধানমন্ত্রী যখন এ ধরনের একটি উক্তি করেন তখন নিশা দেশাই বিসওয়াল তার ঢাকা সফর শেষ করেছেন। নিশা দক্ষিণ এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন বিশেষ ‘একটি উদ্দেশ্য’ নিয়ে। তিনি দেখাও করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা ও পরে ইউএসএইডে কর্মরত জুলহাজ মান্নান ও তার ‘বন্ধু’ তনয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিশা দেশাইয়ের ঢাকা সফর সম্পর্কিত। এ ব্যাপারে তিনি মন্তব্যও করেছেন। তার মন্তব্যের মধ্যে অনেকগুলো বিষয় আছে : ১. সন্ত্রাসীগোষ্ঠী যেভাবে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে, তা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই; ২. যুক্তরাষ্ট্র জুলহাজ হত্যা তদন্তের শেষ দেখতে চায় এবং ৩. জঙ্গি নির্মূলে বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। মোটাদাগে তার বক্তব্যের মধ্য থেকে এই বক্তব্যগুলোই বেরিয়ে এসেছে। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নিশা দেশাই বিসওয়াল কি কোনো মেসেজ দিয়ে গেলেন? সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গুপ্ত হত্যা বেড়েছে। আর তাতে সাধারণ মানুষ নন, মূলত আক্রান্ত হচ্ছেন ‘বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি’। যেমন- জুলহাজ-তনয়। এরা দু’জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পক্ষে কথা বলতেন। সমকামী আন্দোলনের মুখপত্র রূপবান পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন জুলহাজ। কিছু দিন আগে একজন পুলিশ আক্রান্ত ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন আশুলিয়ায়। দু’জন বিদেশীকে (তাভেল্লা ও কুনিও হোশি) হত্যা করা হয়েছিল। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করা এমন ব্যক্তিরাও (নিখিল) হত্যার শিকার হয়েছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক (রেজাউল করিম) যিনি ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করতেন না, সংস্কৃতিমনস্ক ছিলেন, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইএস এবং আল কায়দার স্থানীয় শাখার দায় স্বীকারের কাহিনী ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচারিত হয়েছে। তথাকথিত আল কায়দা কিংবা আইএসের জড়িত হওয়ার ‘কাহিনী’ নিয়ে নানা বিতর্ক আছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মানুষ এটা বিশ্বাস করে না। তবে বহির্বিশ্বে বিভ্রান্তি আছে। প্রচারণা আছে। যেভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যম বাংলাদেশে আইএস আছে বলে ‘প্রমাণ’ করতে চায়, তা আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী। অনেকটা ‘চাপিয়ে দেয়ার’ মতো বিষয় হয়ে গেছে! আমার নিজের মনেও নানা প্রশ্ন আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে যখন বারবার বলে আসছেন, এ দেশে ‘হোমগ্রোন’ জঙ্গি আছে, অর্থাৎ স্থানীয় জঙ্গি, তখন আরেকজন সিনিয়র মন্ত্রী ভারতের দ্য ‘হিন্দু’ পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কী করে বলেন বাংলাদেশে আফগান ট্রেনিংপ্রাপ্ত ৮ হাজার আল কায়দা জঙ্গি রয়েছে। দুই মন্ত্রী যখন দু’ধরনের বক্তব্য দেন, তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘কনফিউশন’ তৈরি হয়। মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে? বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের তথা আইএসের তথাকথিত উত্থান নিয়ে একটা ‘বক্তব্যই’ থাকা উচিত। বাংলাদেশ সরকার বারবার আইএস থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। সেটাই সঠিক। কেন না আইএস তাদের স্ট্র্যাটেজিতে কখনও ব্যক্তিকে টার্গেট করে না। প্যারিস, ব্রাসেলস কিংবা জাকার্তায় আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন যে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল, তাতে ‘সন্ত্রাস সৃষ্টি’ করাই ছিল মুখ্য, ব্যক্তিকে টার্গেট করে তারা হামলা চালায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেকগুলো স্থানে হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে কোনো একটি হামলার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়নি। আইএসের মুখপত্র ‘দাবিক’-এ অতিসম্প্রতি জনৈক শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে, যাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশে আইএসের প্রধান হিসেবে। এটা যে একটা ভুয়া নাম, এটা সবাই স্বীকার করে। ফলে আজ যখন পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশে আইএস আছে, এই স্বীকারোক্তি আদায় করে নিতে চায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। আইএস আছে, এই যুক্তি তুলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক ‘যুদ্ধ’র সূচনা করেছে অনেক দেশেই। মধ্যপ্রাচ্যের পর তাদের দৃষ্টি এখন আফ্রিকার দিকে। দক্ষিণ এশিয়াও তাদের নজরে আছে। আমার বিবেচনায় তিনটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, যা পরোক্ষভাবে নিশা দেশাইয়ের ঢাকা সফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে তথাকথিত জঙ্গি উত্থানকে কেন্দ্র করে এই তিনটি বিষয় এখন আবর্তিত হচ্ছে। ১. বাংলাদেশ ‘সোফা’ ও ‘আকসা’ চুক্তি করুক; ২. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিক এবং ৩. জঙ্গি দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে একটি ‘যৌথ টিম’ গঠন করুক। সোফা বা ‘স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট’-সংক্রান্ত চুক্তি করার দাবি অনেক পুরনো। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশের সঙ্গেই এ ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ। এটা এক ধরনের সামরিক চুক্তিও বটে। অন্যদিকে ‘আকসা’ বা ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ চুক্তির প্রস্তাব অতিসাম্প্রতিক সময়ের। দুটি চুক্তিরই বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ধরনের চুক্তির ফলে বাংলাদেশে সীমিত কিছুসংখ্যক মার্কিন সেনার স্থায়ী-অস্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত হবে। এদের বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার ব্যাপারে কোনো ভিসা লাগবে না। বাংলাদেশে উপস্থিতকালে তারা যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত করে থাকে, তাদের বাংলাদেশী আইনে বিচার করা যাবে না। গুরুতর ‘মানবতাবিরোধী’ অপরাধের জন্য তাদের কাউকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে তুলে দেয়াও যাবে না। চুক্তিবলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশের সামুদ্রিক বন্দরে ‘প্রোটোকল’ সুবিধা পাবে। জ্বালানি গ্রহণ করতে পারবে। এ চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশ তার আপত্তি অব্যাহত রেখেছে। এখন তথাকথিত জঙ্গি দমনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এসব চুক্তি স্বাক্ষর করতে ‘চাপ’ দিতে পারে। ‘দ্য গ্লোবাল কোয়ালিশন টু কাউন্টার আইএসআইএল’ নিয়েও কথা আছে। ৫৮ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এবং আইএসবিরোধী এই জোটে বাংলাদেশ এখনও যোগ দেয়নি, যদিও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এটি মূলত ইউরোপীয় জোট। তবে কাতার, আরব আমিরাত, তুরস্ক, ওমান, সৌদি আরবের মতো দেশ আছে। ভারত কিংবা পাকিস্তান এ জোটে নেই। অন্যদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম’-এ বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি আরও জোরালো হয়েছে তাদের জোটে যোগ দিতে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিলে আমি অবাক হব না। তথাকথিত ‘নাইন-ইলেভেন’-এর পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করলে পৃথিবীর অনেক দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্ম হয়, যারা স্ব স্ব দেশের প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। উত্তর নাইজেরিয়াতে ২০০২ সালে ‘বোকো হারাম’ (আসল নাম ‘দ্য পিপল অব দ্য সুন্নিস প্রিয়েচিং অ্যান্ড জিহাদ’) নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল, যারা এখন মালি, নাইজার, সাদ, ক্যামেরুনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ‘অপারেট’ করছে। নাইজেরিয়ার শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেও এই সেনাবাহিনী ‘বোকো হারাম’ দমনে ব্যস্ত। মিসরে জন্ম হয়েছে ‘আনসার বায়াত আল মাকডিস’। সিরিয়ায় রয়েছে নুসরা ফ্রন্ট। ইয়েমেনে রয়েছে আল কায়দার উপস্থিতি। এসব সংগঠনের অনেকটি আইএসের প্রতি ইতিমধ্যে আনুগত্য প্রকাশ করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় ‘কাতিবা নুসানতারা’ আইএসের আনুগত্য স্বীকার করেছে এবং জানুয়ারিতে জাকার্তায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। আফ্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে (AFRICOM)। আফ্রিকায় রয়েছে (নাইজার) ইউরেনিয়ামের মতো প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। যার অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। মার্কিন কনট্রাকটরদের আগ্রহ এখানে বিশাল। ২৮টি আফ্রিকান দেশে US-African Command (AFRICMN) রয়েছে। এর বাইরে FINTLOCK of US Training Exercise Africa নামে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীকে জঙ্গি দমনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। শুধু তাই নয়। ২৮টি দেশে Trans Sahara Counter Terrorism Partnership কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৩০০ মার্কিন সৈন্য এখন নিয়োজিত রয়েছে। পাঠক লক্ষ্য করবেন লিবিয়াকে বলা হয় ‘গেটওয়ে টু আফ্রিকা’। অর্থাৎ এখান থেকে আফ্রিকাতে যাওয়া যায়। ফলে এখানে যদি (লিবিয়া) একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার থাকে, তাহলে এখান থেকে আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তখন বাংলাদেশে কী একটি ‘ক্ষেত্র’ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে, যাতে করে বাংলাদেশকে মার্কিন সামরিক প্রভাব বলয়ে আনা যায়? বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। ভারত মহাসাগরে ক্রমান্বয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর এক ধরনের ‘প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র’ সৃষ্টি হয়েছে। ভারত মহাসাগরে এবং মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে। যুগান্তরে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধে আমি বিষয়টা স্পষ্ট করেছি। চীনের এক ধরনের জ্বালানি ক্ষুধার কারণে, দক্ষিণ চীন সাগর রুটের গুরুত্বের কারণে এবং একই সঙ্গে মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্ব চীনকে এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। চীনের আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ পরিবাহিত হয় গালফ অব এডেন এবং মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। সৌদি আরবে (২২ ভাগ) এবং ইরান (১২ ভাগ) থেকে চীন সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর বাইরে লিবিয়া, কুয়েত, ইরাক ও ওমান থেকে ৪ ভাগ হারে তেল আমদানি করে চীন। তাই খুব সঙ্গত কারণেই ভারত মহাসাগরে চীন তার নৌবাহিনীর উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাঠকদের আরও একটি তথ্য দেই। চীন জিবুতিতে এই প্রথমবারের মতো তাদের একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। বছরে এ জন্য চীন জিবুতি সরকারকে দেবে ২০ মিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, প্রায় ১২ বিলিয়ন অর্থ ব্যয় করে চীন জিবুতিতে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করছে। সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলন করে এ বন্দরটি তৈরি করা হবে। দক্ষিণ চীন সাগরেও চীন সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলন করে কৃত্রিম একটি দ্বীপ তৈরি করেছে। ফলে ভারত মহাসাগর ও মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের এই তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র যে খুব ভালো চোখে দেখবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে তার পাশে চাইছে। চীনকে এক ধরনের ঘিরে ফেলার নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কার কথাই মনে করিয়ে দেয়। ওই সময় টার্গেট ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাকে ঘিরে ফেলার নীতি নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ফেলতে সময় নিয়েছিল ৪৫ বছর। আজ দৃশ্যপটে রয়েছে চীন। চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ। ২০২৫ সালের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে টপকিয়ে এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে চীন। সুতরাং চীনকে ভেঙে কয়েক টুকরা করার স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করা হয়েছে। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট। আর বাংলাদেশ হচ্ছে চীনের নিকট প্রতিবেশী। সুতরাং বাংলাদেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশকে ‘ব্যবহার’ করে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ব্যাপারে তাদের নীতি আরও সম্প্রসারণ করতে পারে। আর তাই জঙ্গি কার্ড যে ব্যবহৃত হবে, এটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্র এই ‘জঙ্গি কার্ড’ ব্যবহার করেই বাংলাদেশে ঘাঁটি গাঁড়তে চাইছে! বাংলাদেশকে তাই সতর্ক হতে হবে। কোনো ‘শক্তির’ প্ররোচনায় পা দেয়া ঠিক হবে না। বৃহৎ শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে বাংলাদেশকে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। পরস্পরের প্রতি দোষারোপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা থেকে সুবিধা নেবে তৃতীয় পক্ষ। জঙ্গিবাদ আজ বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যার ছিটেফোঁটা বাংলাদেশে লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর জন্য বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। পুলিশ বিভাগে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠিত হয়েছে। এখন দরকার এদের প্রশিক্ষণ দেয়া, শক্তিশালী করা। এ ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা ব্যক্তিরা অন্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবেন না, কাজও করবেন না। সাইট ইন্টেলিজেন্সের নামে বাংলাদেশে আইএস আছে, এটা প্রচার করে একটা পক্ষ সুবিধা নিচ্ছে। তাদের ‘তৈরি ফাঁদে’ আমরা পা দিতে পারি না। যত ‘চাপ’ই আসুক না কেন, বাংলাদেশ স্বউদ্যোগেই জঙ্গিদের দমন করতে পারবে। তাই নিশা দেশাইয়ের সফরের মধ্য দিয়ে তিনি যে মেসেজই দিয়ে যান না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ উগ্র ধর্মান্ধদের কোনোদিন সমর্থন করেনি। আগামীতেও করবে না। এ ক্ষেত্রে জঙ্গি দমনে কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে আমাদের জড়িত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আফগানিস্তান আর ইরাকের দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে আছে। আমরা যেন তা ভুলে না যাই।
Daily Jugantor
09.05.16

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য ও বাংলাদেশে আইএস বিতর্ক

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস (ইসলামিক স্টেট) আছে এবং এ কথা বাংলাদেশকে স্বীকার করতে হবে। ঢাকার কলাবাগানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল অফিসার জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এ কথা বলেছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সেল গঠন করবে। প্রশ্ন হচ্ছে জুলহাজ-তনয়কে কারা হত্যা করল? আইএস? নাকি আল কায়দার উপমহাদেশ শাখা? ঝওঞঊ ইন্টেলিজেন্স অবশ্য বলছে, এটা আল কায়দার উপমহাদেশ শাখার কাজ। এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকেও একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ঝওঞঊ কারও দায় স্বীকারের কথা তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেনি। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, মাত্র কিছুদিন আগে আইএসের মুখপত্র ‘দাবিগ’-এর ১৪তম সংখ্যায় জনৈক শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ওই হানিফ বাংলাদেশে আইএসের প্রধান। বাংলাদেশে আইএসের ঘাঁটি রয়েছে এবং এখান থেকে ভারত ও মিয়ানমারে আক্রমণ পরিচালনা করবে আইএস। বিবিসি বাংলা ১৩ এপ্রিল এ সংবাদটিও প্রচার করেছিল। এখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত দাবিগের কথারই প্রতিধ্বনি করলেন।
এটা সত্য সাম্প্রতিক সময়ে আইএস তাদের কর্মকা- বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারিত করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ায় যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়, তার পেছনে আইএস জড়িত রয়েছে বলে আইএস দাবি করেছে। আইএস তার ‘দূরবর্তী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল বলে তাদের মুখপত্র দাবিগে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ জন্য তারা সিরিয়া ও ইরাকে যেসব ইন্দোনেশীয় যুবক ‘যুদ্ধে’ অংশ নিয়েছিল, তাদের দিয়ে তারা ‘কাতিবা নূসানতারা’ নামে একটি ব্রিগেড গঠনও করেছিল। ওই ব্রিগেডই জাকার্তায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল। আইএস পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে নতুন একটি রাজ্যের ঘোষণা দিয়েছে। তারা এর নামকরণ করেছে খোরাসান। এই খোরাসান রাজ্যের একজন আমিরের নামও তারা প্রকাশ করেছে। তার নাম আমির শায়খ হাফিজ সাঈদ খান। দাবিগের ১৩তম সংখ্যায় তার একটি সাক্ষাৎকারও প্রচার করা হয়েছে। দাবিগে বলা হয়েছে, মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল হচ্ছে খোরাসান। মধ্যযুগে যেমনটা ছিল, তেমন করে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, প্রায় সমগ্র আফগানিস্তান, দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ভারত ও চিনের একটা অংশকে খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত করে এ অঞ্চল দখলে নিতে চায় আইএস। আইএস আফ্রিকার দিকেও তাদের প্রভাব সম্প্রসারিত করেছে। সিরিয়ায় পাঠকদের স্মরণ থাকার কথা গত ৭ মার্চ (২০১৬) নাইজেরিয়ার সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘বোকো হারাম’ আইএসের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। বোকো হারাম ইতোমধ্যে তাদের ‘সন্ত্রাসী কর্মকা-’ উত্তর নাইজেরিয়া থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী নাইজার, সাদ, ক্যামেরুন ও মালিতে সম্প্রসারিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলের দরিদ্রতা, অসমতা বোকো হারামের উত্থানের পেছনে দায়ী। অতি সম্প্রতি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে যে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে, তা ইউরোপে তাদের তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই করা। ইউরোপে যে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠিত হবে, তাকে তারা বলছে ‘আমিরাত অব আন্দালুসিয়া’ (ঊসরৎধঃব ড়ভ অহফধষঁংরধ)। লিবিয়ার উপকূলীয় শহর দারনাকে আইএসের প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আইএসের টার্গেট হলো মাগবের অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। তবে একটা প্রশ্ন আছেÑ তা হচ্ছে আইএসের সঙ্গে আল কায়দার সম্পর্ক কী হবে? কেননা মধ্যপ্রাচ্যের তথা উপসাগরীয় অঞ্চলে আল কায়দার একটা বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং তারা অ্যাকটিভ। বলা ভালো আল কায়দার তাত্ত্বিক হচ্ছেন আবু মুসাব আল সুরি। সুরি আল কায়দার স্ট্র্যাটেজির কথা বলতে গিয়ে ঝঢ়রফবৎ ডবন-এর কথা বলেছেন। অর্থাৎ মাকড়সারা যেমনি এখানে সেখানে জাল তৈরি করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে এবং সেই জাল ভেঙে দিলে অন্যত্র গিয়ে ঠিক তেমনি জাল তৈরি করে, আল কায়দার স্ট্র্যাটেজিও ঠিক তেমনি। ছোট ছোট গ্রুপে অঞ্চলভিত্তিক তারা সংগঠিত হয় এবং তাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা অন্যত্র গিয়ে সংগঠিত হয়, ঠিক মাকড়সারা যেমনটি করে। অষ-ছধবফধ রহ অৎধনরধহ চবহরহংঁষধ, অষ-ছধবফধ রং ওংষধসরপ গধমৎবন, অষ-ছধবফধ রহ ওৎধয় এভাবেই সংগঠিত। এর বাইরে তারা ভিন্ন নামে অপারেট করে। যেমন আল নুসরা ফ্রন্ট (সিরিয়া), আল-গামা আল ইসলামিয়া। এ দুটো সংগঠনের সঙ্গে আদর্শগতভাবে আল কায়দার মিল আছে। এখানে ইসলামিক স্টেট জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে তাদের অমিলের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আল কায়দার সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের আদর্শগতভাবে অমিল রয়েছে। আল কায়দা যেখানে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক শাসন চায়, সেখানে ইসলামিক স্টেট চায় একটি ইসলামিক খিলাফত। অর্থাৎ একটি খিলাফত রাষ্ট্রের আওতায় সব ইসলামিক রাষ্ট্র একত্রিত হবে। সেখানে একজন খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান থাকবেন। আল কায়দার সঙ্গে পার্থক্য এখানেই যে, আল কায়দায় খিলাফতের পরিবর্তে ইসলামিক আমিরাতে বিশ্বাসী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উপমহাদেশে আল কায়দা কী আদৌ স্থান করে নিতে পেরেছে? ভারতে এর কোনো স্থান নেই। পাকিস্তানে তালেবানদের প্রভাব বেশি, আল কায়দা তার শাখা স্থাপন করতে পেরেছে, এমন খবর আমাদের জানা আছে। তবে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকতে পারে। আর বাংলাদেশে তাদের আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী হিসেবে যারা পরিচিত তাদের সঙ্গে আল কায়দার যোগাযোগ আছে, এমন কোনো তথ্যভিত্তিক প্রমাণও আমাদের কাছে নেই। ফলে বাংলাদেশে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে এটা বলা যাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশকে বারবার টার্গেট করা হয়েছে। গত বেশ কিছুদিন ধরেই ঝওঞঊ ইন্টেলিজেন্স প্রচার করে আসছে, বাংলাদেশে যেসব হত্যাকা- সাম্প্রতিক সময়ে হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গে আইএস জড়িত। ঝওঞঊ হচ্ছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা, যারা তথ্য-উপাত্ত ‘বিক্রি’ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা তথা গোয়েন্দা সংস্থা এর ক্রেতা। আর এটি পরিচালনা করেন রিটা কাটস নামে এক মহিলা, যিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে একসময় কাজ করতেন। তবে বাংলাদেশে জঙ্গি থাকলেও আইএস নেই। এটা সত্য, বাংলাদেশে ইসলামকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি উগ্রবাদ প্রচার করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে ইসলামের নামে যারা উগ্রবাদ প্রচার করছে তারা বিভ্রান্ত। আল কায়দা কিংবা ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের মেলানো যাবে না। তবে এটা সত্য, কোনো কোনো মন্ত্রী, সরকারের সমর্থক বুদ্ধিজীবী যখন মিডিয়ায়, টিভির টক শোতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, তখন তা দেশে নয় বরং বিদেশেও বিভ্রান্তি তৈরি করে। বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান। এখানে উগ্রবাদী ইসলামিক দল আছে। ফলে বাংলাদেশ যে কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশ একটি মডারেট ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দেশ। এখানে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। উগ্রবাদকে মানুষ পছন্দ করে না। সাধারণ মানুষের মাঝে এদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই জঙ্গিবাদকে নিয়ে যত কম কথা বলা যায়, ততই মঙ্গল। মনে রাখতে হবে, দলের সিনিয়র নেতারা, মন্ত্রীরা যদি জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলেন, তাতে সমর্থকরা প্রভাবিত হন। তাই তাদের সংযত কথাবার্তা বলা উচিত। জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমরা কেন, কোনো দেশই এ সমস্যার বাইরে নয়। এ সমস্যার সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সরাসরিভাবে জড়িত। এ ক্ষেত্রে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মাঝে সমঝোতা প্রয়োজন। জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনো ‘ব্লেমগেম’ নয়, বরং সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে যদি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে ‘তৃতীয় পক্ষ’ এটা থেকে ফায়দা ওঠাবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে তাই প্রয়োজন এই মুহূর্তে একটি সমঝোতার। এটি যত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।
এখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত যখন প্রকাশ্যেই বললেন, ‘বাংলাদেশে আইএস আছে (?) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বললেন ‘সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সেল গঠন করবে’ তখন এর একটি ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। ‘যৌথ সেল’-এর অর্থ কী? মার্কিন গোয়েন্দারা বাংলাদেশে এসে কাজ করবে? বাংলাদেশে কী ‘বিশেষ মার্কিন বাহিনী’র সদস্যকে মোতায়েন করা হবে? এগুলো সবই স্পেসেকুলেশন। সবই ধারণা মাত্র। আমাদের ভয়ের কারণটা এখানেই ‘সন্ত্রাস দমনের’ নামে যুক্তরাষ্ট্র যেখানেই সাময়িকভাবে নিজেদের জড়িত করেছে, সেখানে সন্ত্রাস দমন তো দূরের কথা, সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি, বরং সন্ত্রাসের মাত্রা বেড়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকা- ‘জিইয়ে’ রেখে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে। পাঠক, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিতে পারেন। আমার আতংকটা সেখানেই, আইএসের উগ্রবাদ দমনে বার্নিকাট ‘বাংলাদেশে আইএস আছে’ এ কথা বলে কী কোনো ইঙ্গিত করেছিলেন কিনা?
একাধিক কারণে বাংলাদেশ ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে চিনের উত্থান, অন্যদিকে চিন-রাশিয়া মৈত্রী, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে। ভারত মহাসাগর ক্রমেই মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফিটের কর্মকা- এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে ভারত মহাসাগরে। অনেকেই মনে করতে পারেন ২ মার্চ (২০১২) মার্কিন সিনেটের এক অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফিটের (বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত) তৎকালীন কমান্ডার অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ বাহিনী’ মোতায়েন রয়েছে। এ নিয়ে ওই সময় বাংলাদেশে কম বিতর্ক হয়নি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ বেশ কটি চুক্তিতে আবদ্ধ (যেমন অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি ২০১৩, টিকফা চুক্তি ইত্যাদি), সেখানে সন্ত্রাস দমনে ‘যৌথ কর্মসূচি’ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অনেকেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে ঝঙঋঅ (ঝঃধঃঁং ড়ভ ঋড়ৎপবং অমৎববসবহঃ) চুক্তি ও ‘আকসা’ নামে (অপয়ঁরংরঃরড়হ ধহফ ঈৎড়ংং ঝবৎারপরহম অমৎববসবহঃ) দুটি চুক্তি করতে চাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাময়িক উপস্থিতি, জ্বালানি গ্রহণ, ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ এখন অবধি এ ব্যাপারে সম্মতি না দিলেও, ‘চাপ’-এ আছে। ফলে ঝওঞঊ-এর ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের অস্তিত্ব ‘আবিষ্কার’ এবং বার্নিকাটের মন্তব্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ সেল গঠন করার ঘোষণার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। এটা সত্য, বিশ্বে মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য যেখানে বেশি, সেখানেই ইসলামের নামে উগ্রবাদ জন্ম হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, সোমালিয়া এমনকি দক্ষিণ থাইল্যান্ডের নারাথিওয়াত, পাটানি ইয়ালা অঞ্চল (যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ) ইসলামের নামে উগ্রবাদ বিস্তার লাভ করছে। নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম কিংবা সোমালিয়ায় আল শাবাব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর খবর আমরা জানি। সেখানে ‘সন্ত্রাস দমনে’ মার্কিন সেনাবাহিনী পাঠানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখানে পাঠকদের কিছু তথ্য দিতে চাই। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকায় তাদের প্রথম সেনা কমান্ড অঋজওঈঙগ (টঝ-অভৎরপধহ ঈড়সসধহফ) প্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে আফ্রিকার ২৮টি দেশে ১৩০০ মার্কিন সেনা ঈড়ঁহঃবৎ ঞবৎৎড়ৎরংস কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত। ২০০৫ সাল থেকেই বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ঋওঘঞখঙঈক বা টঝ ঞৎধরহরহম ঊীবৎপরংব নামে মার্কিন সেনারা তৎপর। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ক্যামেরুনে ৩০০ সেনা পাঠিয়েছে। সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার দৃষ্টি আফ্রিকাতে সম্প্রসারিত করছে। আফ্রিকার তেলসম্পদের দিকে এখন তাদের দৃষ্টি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সম্প্রসারিত হচ্ছে ভারত মহাসাগরের দিকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা চাই রাজশাহী অধ্যাপক হত্যাকা- থেকে শুরু করে ঢাকার কলাবাগানের জোড়া খুনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হোক। আমাদের জীবন নিরাপদ হোক।
Daily Amader Somoy
03.05.16

ওআইসি জাতিসংঘ ও প্রসঙ্গ কথা

১৫ এপ্রিল তুরস্কের প্রাচীন রাজধানী ইস্তানবুলে ওআইসি বা ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এ সম্মেলনে ওআইসি’র অন্তর্ভুক্ত ৫৭টি দেশের মধ্যে ৩০টি দেশের সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ওআইসি’র সদস্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি যোগ দেননি। ওই সম্মেলনটি একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, ৩০টি দেশের সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধান, তারা সবাই মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের একটি সম্মেলনে উপস্থিতি হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে, এমন একটি সময় তারা উপস্থিত ছিলেন যখন মুসলিম বিশ্ব নানা সংকটে নিমজ্জিত। দ্বিতীয়ত, ওআইসি সম্মেলনে মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতিসংঘের বিকল্প ‘আরেকটি জাতিসংঘ’ গঠনের চিন্তাভাবনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বয়ং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এ ধরনের কথাবার্তা বলেছেন। ফলে ওআইসি’র সম্মেলনটি নিছক একটি ‘সম্মেলন’র মধ্য দিয়েই শেষ হয়নি; বরং এর একটি প্রতিক্রিয়া থেকে যাবেই। বলা ভালো, বিশ্বে এক-চতুর্থাংশের বেশি স্থানে কৌশলগত অবস্থানে থাকলেও বৈশ্বিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। শুধু তাই নয়, মুসলমান বিশ্বে অসম্মান আর বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ফলে ৩০ জন রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে যখন ‘বিকল্প একটি জাতিসংঘের’ কথা বলা হয়, তখন এটাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। জাতিসংঘ যে উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না, এ অভিযোগ অনেক পুরনো। তবে জাতিসংঘের সাফল্য যে একেবারে নেই, তা বলা যাবে না। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ ও কুয়েতকে শত্রুমুক্ত করা, এল সালভাদর, কম্বোডিয়া কিংবা নামিবিয়ায় পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া ও শান্তি ফর্মুলায় রাজি করানোর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছিল যে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যে বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, তাতে জাতিসংঘের একটা ভূমিকা রয়েছে। সাবেক যুগোসøাভিয়ার গৃহযুদ্ধ থামাতে সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো, কাপুচিয়ায় গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে সেখানে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েন ও পরবর্তী সময় সেখানে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা, এমনকি নেপালেও নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ তার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে আফ্রিকায় যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করার মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগও লক্ষণীয়। তবে ব্যর্থতার পাল্লাটা যেন ভারি। অতি সম্প্রতি হাজার হাজার সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থী যখন ইউরোপে প্রবেশ করে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, জাতিসংঘ তাদের দেশত্যাগ ঠেকাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে হামলা চালালো এবং যে যুদ্ধের শুরু করেছিল, জাতিসংঘ ১৪ বছর পরও সেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাক দখল করে এবং সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করে, যা ছিল জাতিসংঘ চার্টারের বরখেলাপ। ২০১১ সালে তথাকথিত ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’Ñ এ অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ওই হামলায় গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং রাষ্ট্রটি এখন কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অস্ত্রবাজরা এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় প্রশাসন নেই। অথচ একই অভিযোগ উঠেছে সিরিয়া ও ইরাকে গড়ে ওঠা তথাকথিত একটি ‘জিহাদি রাষ্ট্র’র বিরুদ্ধে, আর নেতৃত্বে রয়েছে সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা। অভিযোগ আছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি লবির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে এ জঙ্গিগোষ্ঠী ‘ইসলামী স্টেট’র উত্থান ঘটেছে। এরা হাজার হাজার সিরীয় নাগরিককে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করছে। অথচ এখানে তথাকথিত ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’র তত্ত্ব প্রয়োগ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি জাতিসংঘের কোনো উদ্যোগও আমরা লক্ষ করছি না। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধিতে শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ নেই। স্থায়ী পরিষদে রয়েছে পাঁচটি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া) এবং ১০টি অস্থায়ী দেশ। অস্থায়ী দেশগুলো ২ বছর পর পর অঞ্চলভিত্তিতে নির্বাচিত হয়। কিন্তু স্থায়ী পরিষদের একটি রাষ্ট্র ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে যে কোনো সিদ্ধান্তের মৃত্যু ঘটাতে পারে। কিন্তু অস্থায়ী সদস্য দেশগুলো তেমনটি পারে না। তাই অনেক দিন থেকেই উন্নয়নশীল বিশ্ব স্থায়ী পরিষদে তাদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আজও তা নিশ্চিত হয়নি। তবে অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, জাতিসংঘের উদ্যোগে অনেক আগেই ঈড়সসরংংরড়হ ড়হ এষড়নধষ এড়াবৎহধহপব নামে একটি কমিশন গঠন করেছিল। ওই কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল জাতিসংঘে কীভাবে সংস্কার আনা যায়, সে ব্যাপারে একটি সুপারিশ করা। সিদ্ধার্থ রামপাল ও ইনগভার কার্লসন ছিলেন ওই কমিশনের যৌথ চেয়ারম্যান। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। ওই কমিটির সুপারিশে নিরাপত্তা পরিষদে এক ধরনের ‘স্ট্যান্ডিং’ সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, আর সদস্যসংখ্যা হবে পাঁচ। এর মাঝে দুইটি দেশ আসবে উন্নত দেশ থেকে, আর বাকি তিনটি দেশ আসবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে। কিন্তু তাদের কোনো ‘ভেটো’ ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু ২০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো ‘ভেটো’ ক্ষমতাসহ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ চায়। যেমন ভারতের কথা বলা যেতে পারে। ভারত এখন এশিয়ায় চীনের পর দ্বিতীয় অর্থনীতি। ২ ট্রিলিয়ন ডলারের (২ লাখ কোটি ডলার) অর্থনীতি ভারতের। ভারতের পাশাপাশি জাপানও এখন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চায়। এ লক্ষ্যে জাপানের সংবিধান সংশোধন করে প্রথমবারের মতো বিদেশে জাপানি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর এবং পাঁচটি পশ্চিমা শক্তির সমর্থন এতে পাওয়া যাবেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। জাতিসংঘের অনেক ব্যর্থতা আছে। সীমাবদ্ধতা আছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে সমস্যা আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কর্মসূচি হালকাভাবে নেয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। যেমন বলা যেতে পারে, গরষষবহরঁস উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং (গউএ) কর্মসূচির কথা। এ গউএ গোলের টার্গেট ছিল উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। প্রায় ১৬ বছর আগে জাতিসংঘ এ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। এ কর্মসূচির সময়সীমা শেষ। ফলে ২০১৫ সালে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব এ ঝউএ অর্জনে কতটুকু সফলতা পাবে, সে প্রশ্ন থাকলই। কেননা মুসলিম বিশ্ব আজ হাজারটা সংকটে নিমজ্জিত। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের কারণে মুসলিম বিশ্ব, বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া আর ইয়েমেন আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। যে ইরাক ও সিরিয়া একসময় বিশ্ব সাংস্কৃতিক সভ্যতার অংশ ছিল, তা আজ অতীত। প্রাচীন সভ্যতা আজ ধ্বংস করা হয়েছে। হাজার হাজার বছরের পুরনো সভ্যতা আজ মাটিতে মিশে গেছে। এর জন্য মুসলিম বিশ্ব নিজেরা দায়ী নয়Ñ দায়ী বাইরের শক্তি। আয়লানের মতো শত শত শিশু যখন শুধু জীবন বাঁচাতে সিরিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং মারা যায়, তখন বিশ্ব নির্বিকার। এমনকি ওআইসিকেও আমরা কোনো উদ্যোগ নিতে দেখি না। আর জাতিসংঘ? সিরিয়ায় যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা পালন করেনি। হাজার হাজার সিরীয় উদ্বাস্তু যখন পশ্চিম ইউরোপের পথেপ্রান্তরে ‘শুধু একটু আশ্রয়ের’ আশায় মাসের পর মাস ঘুরে বেড়ায়, তখন তথাকথিত মানবাধিকার কমিশনের কোনো ভূমিকা আমরা দেখি না। তাই ইস্তানবুুল সম্মেলনে যখন বিকল্প একটি জাতিসংঘের কথা বলা হয়, তখন এর পেছনে একটি যুক্তি আছে বলেই আমার মনে হয়। জাতিসংঘ ৭০ বছরে পা দিয়েছে। সময়টা একেবারে কম নয়। প্রতি বছর একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে আমরা অনেক ভালো ভালো কথা শুনি বটে; কিন্তু তা উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারেনি। বরং সাম্প্রতিক বেশ ক’টি রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে গেছে, প্রাচীন ঐতিহ্য নষ্ট করা হয়েছে কিংবা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে; কিন্তু জাতিসংঘ তা বন্ধ করতে পারেনি। শিশু আয়লান কুর্দির মতো শত শত শিশুর জীবন রক্ষা করতেও পারেনি জাতিসংঘ। তাই আগামী ৭০ বছর অর্থাৎ ২০৮৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ টিকে থাকতে পারবে, এটা নিশ্চিত হতে পারছি না। এক কথায় যদি বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। কিন্তু জাতিসংঘ বিশ্বের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, আমরা তা বলতে পারি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় রাষ্ট্রের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে এ অনুমতি নেয়নি। জাতিসংঘের চার্টারে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় কোনো রাষ্ট্রের ‘হস্তক্ষেপ’ না করার কথা বলা হলেও আমরা দেখেছি, সিরিয়া ও ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যাপারে ‘অন্যরাষ্ট্র’, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে। ফলে জাতিসংঘ অনেকটা বড় রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে। খুব কম ক্ষেত্রেই ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে। তাই বিকল্প একটি জাতিসংঘ না হোক, অন্তত ওআইসিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ওআইসিভুক্ত দেশগুলো নিজেরা অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত। প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিও আমরা লক্ষ করি। ওআইসিভুক্ত ধনী দেশগুলোর বড় ভূমিকা আছে। সিরীয় উদ্বাস্তুদের বিভিন্ন মুসলিম বিশ্বে বসবাসের সুযোগ করে দিতে পারত ওআইসি। তাদের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারত। কিন্তু ওআইসি’র ব্যর্থতা এখানেইÑ সিরীয় সংকট যখন ঘনীভূত হচ্ছে, তখন ওআইসি সমস্যা সমাধানে তেমন উদ্যোগ নিতে পারেনি। ২১ শতকে এসে ওআইসিকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। নয়া পরিকল্পনা নিতে হবে। নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভেদ দূর করতে হবে। তাহলেই ওআইসি বিশ্বে অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে। Daily Alokito Bangladesh 01.05.16

উদ্ঘাটিত না হলে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে

এ কোন বাংলাদেশকে আমরা দেখছি! মাত্র দু’সপ্তাহ আগে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পক্ষ থেকে যখন ঘোষণা করা হল বাংলাদেশে আইএস ঘাঁটি করতে যাচ্ছে এবং সেখানে একজন দলীয় প্রধান আছেন (শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ), এ বক্তব্যের রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই দেশে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দুটি ঘটনা ঘটল। প্রথম ঘটনায় চাপাতির কোপে হত্যা করা হল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে। এর একদিনের মাথায় ঢাকার কলাবাগানে হত্যা করা হল মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয়কে। আর সাইট ইন্টেলিজেন্স বরাবরের মতো প্রকাশ করল, ‘এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আল কায়দার উপমহাদেশ শাখা।’ এর আগে সিজারি তাভেল্লা (সেপ্টেম্বর ২০১৫) ও কুনিও হোশি (অক্টোবর ২০১৫) হত্যাসহ আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ করে সাইট দাবি করেছিল, ‘এসব হত্যাকাণ্ডে আইএস জড়িত।’ আর সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আইএস আছে এবং বাংলাদেশ সরকারকে তা বিশ্বাস করতে হবে।’ এর আগে সরাসরিভাবে কখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়নি যে বাংলাদেশে আইএস আছে। অবশ্য আকার-ইঙ্গিতে তারা বারবার বলার চেষ্টা করেছে, এখানে আইএস বা আল কায়দা আছে।

বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু দিন ধরেই একটি চাপের মুখে আছে। এখন বার্নিকাট সরাসরি বললেন, আইএস আছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারও বক্তব্যেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করে নেয়া হয়নি। শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করলেন একটা কথা- ‘সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সেল গঠন করবে।’ এর আগে অবশ্য তথ্যমন্ত্রী ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, বাংলাদেশে আল কায়দা আছে। এটা নিয়ে অনেককে আমি উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখেছি। একজন সিনিয়র মন্ত্রী যখন আল কায়দা আছে বলে স্বীকার করেন, আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন নিজে (২৭ এপ্রিল) বলেন, বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই, কিন্তু জঙ্গি আছে; তখন এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয় বৈকি। জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে যে আল কায়দার উপমহাদেশ শাখা জড়িত (বাংলাদেশে এরা অপারেট করছে আনসার আল ইসলাম নামে), তা তো ইতিমধ্যে সাইট ইন্টেলিজেন্স আমাদের জানিয়েই দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইএস নেই, কিন্তু জঙ্গি আছে, এমন কথা কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। তথ্যমন্ত্রী যখন কথা বলেন, তখন বোধকরি আমরা ধরে নিতেই পারি এটা সরকারের অবস্থান। যদিও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এখন অব্দি এ ধরনের কোনো স্বীকারোক্তি আমরা শুনিনি। আমাদের ভয়টা হচ্ছে এখানে- এখন একজন মন্ত্রী বলছেন আল কায়দা আছে, কাল যদি আরেকজন মন্ত্রী বলেন আইএস আছে(?), তখন আমরা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযান, তার আওতায় এসে যাব! যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশে সন্ত্রাসীদের নির্মূলের নামে সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও সেসব দেশে সন্ত্রাস দমন হওয়া তো দূরের কথা, সন্ত্রাসের মাত্রা সেখানে আরও বেড়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া- যেখানেই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, সেখানে সন্ত্রাসের মাত্রা কীভাবে বেড়েছে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এখন এ ‘খেলায়’ বাংলাদেশকেও কি জড়ানো হচ্ছে?

বাংলাদেশে আইএস বা আল কায়দার ঘাঁটি রয়েছে, এ ধরনের ‘তত্ত্ব’ যারা উপস্থাপন করেছেন কিংবা করতে চান, তারা সত্য বলছেন না। কেননা আইএস যেভাবে তাদের সংগঠন পরিচালনা করে, বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব আমার চোখে ধরা পড়েনি। বলতে গেলে নেইও। আর যারা বাংলাদেশে আল কায়দা আছে বলে মনে করেন এবং বলেনও, তারা আবু মুসাব আল সুরির 'Global Resistance Movement' বইটি পড়ে দেখতে পারেন। বইটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর অংশবিশেষ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। আবু মুসাবকে বলা হয় আল কায়দার তাত্ত্বিক। কীভাবে একটি জিহাদি সংগঠন পরিচালিত হবে (স্পাইডার ওয়েব বা মাকড়সার জাল তত্ত্ব) তার বর্ণনা আছে এতে। আল কায়দার সন্ত্রাসীরা এ তত্ত্ব তাদের অপারেশন পরিচালনার সময় ব্যবহার করে। এদের স্ট্র্যাটেজির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো উগ্র সংগঠনের মিল আছে বলে আমার কখনোই মনে হয়নি। তবে এটা সত্য, দেশে কিছু উগ্র সংগঠন রয়েছে। এরা ইসলামের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং মানুষ এদের পছন্দও করে না। বাংলাদেশ একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ। সে ক্ষেত্রে মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখানে মানুষ এদের ‘রাজনীতি’ গ্রহণ করে নেয়নি কোনোদিন। তাই সাম্প্রতিক সময়ের সব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আইএস জড়িত বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা বাহ্যত নিছক বিভ্রান্তিকর একটি অপচেষ্টা। প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। লন্ডনের Institute for Economics and Peace প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের একটি তালিকা তুলে ধরে। Global Terrorism Index 2014 সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২০১৫ সালে প্রকাশিত) ইরাককে যেখানে সন্ত্রাসকবলিত দেশ হিসেবে এক নম্বরে দেখানো হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে। এতে বোঝা যায়, সন্ত্রাসের কারণে বাংলাদেশে ঝুঁকি কত কম। মোট ১৬২টি দেশ নিয়ে এ গবেষণা হয়েছিল। যেহেতু সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং কর্পোরেট হাউসগুলোর স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্ব একে টিকিয়ে রাখছে, সেহেতু বাংলাদেশের মতো দেশে এর ছিটেফোঁটা যে লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ কখনোই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ছিল না এবং এখনও নেই। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Reader Supported News আমাদের জানাচ্ছে, ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে ৬৫০০ ভাগ হারে। আর সন্ত্রাসী আক্রমণের হার বেড়েছে ৪৫০০ ভাগ হারে। মূলত যেখানে মার্কিন সেনার উপস্থিতি ছিল (ইরাক ও আফগানিস্তান), সেখানেই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৪ সালে ৭৪ ভাগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে ৫টি দেশে- ইরাক, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও সিরিয়ায়। তাই কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকায় ফেলা যাবে না। বাংলাদেশ অতীতে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড মোকাবেলায় যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রশংসা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের Country Report on Terrorism 2014-এ স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি। South Asia Terrorism Portal-এও বাংলাদেশের এ ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। বাংলাদেশ Global Coalition to Counter ISIL-এ যোগ না দিলেও Global Fund for Community Engagement and Resilience-এর বোর্ড মেম্বার। এটির জন্ম হয় ২০১৪ সালে। ফলে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বাংলাদেশের স্পষ্ট কমিটমেন্ট রয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসকে জড়ানো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের একটি উদ্যোগ বলেই আমার মনে হয়েছে। এর পেছনে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ যে নেই, তা হলফ করে বলা যাবে না।

আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এখন যত দ্রুত সম্ভব প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের মোটিভ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। এটা যদি অনুদ্ঘাটিত থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সম্পর্কে বিদেশে বিভ্রান্তি বাড়বেই। এটা আমাদের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। বাংলাদেশ এখন Global Coalition of Counter ISIL-এ যোগ দিতে পারে। আইএসের জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং সিরিয়া-ইরাক থেকে আইএস জঙ্গিদের উৎখাতের ব্যাপারে পশ্চিমা উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ সংহতি প্রকাশ করেছে ইতিমধ্যে। তবে সর্বশেষ জুলহাজ-তনয় হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনটা জরুরি। একই সঙ্গে সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশে সব দলের ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। আমরা যদি ‘ব্লেম গেমের’ আশ্রয় নিই, তাহলে এ থেকে সুযোগ নেবে তৃতীয় পক্ষ। জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ড নিছক একটি সাধারণ ঘটনা নয়। যারা হত্যা করেছে, তারা প্রশিক্ষিত খুনি ও বাংলাদেশী। কিন্তু তাদের কারা প্ররোচিত করেছে, কোন ‘শক্তি’ এর পেছনে কাজ করেছে, এটা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অনেক ‘প্রশ্ন’ ও ‘জিজ্ঞাসা’ থেকে গেল। জানি না আমাদের গোয়েন্দারা এসবের কোনো জবাব আমাদের দিতে পারবেন কি-না। সেই সঙ্গে আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন- জঙ্গিবাদ প্রশ্নে একজনেরই বক্তব্য প্রদান করা ভালো। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন বক্তব্য দিলে তা বিভ্রান্তি বাড়ায়। আমাদের তথ্যমন্ত্রী প্রায়ই জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে আমাদের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, এমনকি আইনশৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ জঙ্গিবাদ নিয়ে এমনসব কথা বলেন, যা শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায়। এখন যেদিকে বেশি দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন তা হচ্ছে- এক. প্রতিটি ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। না হলে এক ধরনের আস্থার সংকট সৃষ্টি হবে। দুই. বাংলাদেশে ‘কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’ ফোর্সকে আরও শক্তিশালী করা। এ ক্ষেত্রে দক্ষ তরুণ অফিসারদের নিয়োগ দেয়া। তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেয়া। তিন. গোয়েন্দা কার্যক্রমে শৈথিল্য রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা শহরে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। রাতে তল্লাশি বেড়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। এটা যেন স্থায়ী হয়। মনিটরিং যেন বাড়ানো হয়। একটা ঘটনা ঘটল, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কিছুদিন থাকল, তারপর তৎপরতা থেমে গেল- এমনটি যেন না হয়। চার. যদি আইএস (বা আল কায়দা) থেকে থাকে, তা স্পষ্ট করা হোক। পাঁচ. জঙ্গি প্রশ্নে রাষ্ট্রের একজন মুখপাত্র কথা বলবেন। সবাই কথা বললে নানা রকম বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

জঙ্গি কার্যক্রম পুলিশি তৎপরতার কারণে থেমে থাকবে, এটা আমার মনে হয় না। হয়তো জঙ্গিরা প্রস্তুত হচ্ছে। পরবর্তী টার্গেট ঠিক করছে। আর নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন যদি সত্য হয়, তাহলে পরবর্তী টার্গেট হবেন মুক্তচিন্তার যে কোনো একজন বুদ্ধিজীবী! এ দানবের হাত থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। তাই প্রয়োজন জনসচেতনতার। প্রয়োজন সন্ত্রাস প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যের। ‘ব্লেম গেমের’ রাজনীতি জঙ্গিদের হাতকে আরও শক্তিশালী করবে মাত্র। কোনো বড় দল যদি সত্যি সত্যিই জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে, আমরা চাইব ওই দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হোক। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মে জঙ্গিবাদের কোনো সুযোগ নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। সেখানে তিনি সূরা আন আমের ১৫১ আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন এভাবে : ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না’। কাজেই উগ্রপন্থীরা ইসলামের নামে গলা কেটে যাদের হত্যা করছে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না। যারা এ ধরনের কাজ করছে তারা বিভ্রান্ত। তারা দেশে একটি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। এ বিষয়গুলো আজ ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। জুলহাজ হত্যার পর গত এক সপ্তাহ ধরে টিভি চ্যানেলগুলো এটা নিয়ে অনেক টকশো করেছে। শুধু একটি চ্যানেলে (বিটিভি নয়) আমি দেখলাম ইসলামী চিন্তাবিদদের এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ ধরনের অনুষ্ঠান আরও হওয়া উচিত, যাতে করে বিভ্রান্তরা মূলধারায় ফিরে আসতে পারে। জঙ্গি তৎপরতায় অর্থ একটা ফ্যাক্টর। আমার ধারণা, জঙ্গিদের কাছে বিভিন্ন সূত্র থেকে বিদেশ থেকে অর্থ আসছে। এটা বন্ধ করার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

আমরা নিশ্চিত হতে চাই, আমরা যারা শিক্ষক, সংবাদপত্রের কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী বা অভিনেতা-অভিনেত্রী- আমরা কেউই জঙ্গিদের পরবর্তী টার্গেটে পরিণত হব না। ইসলাম মানবতার ধর্ম, শান্তির ধর্ম। আততায়ীর গুলি এ ধর্ম পালনে, বিশ্বাসে আমাকে যেন ভীত না করে। বেঁচে থাকার স্বাভাবিক গ্যারান্টি আমরা সবাই চাই। রাষ্ট্র আমাদের এতটুকু নিশ্চয়তা দেবে, এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

আরও একটা কথা। কূটনৈতিকভাবেও আমাদের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য সিনেটর কার্ডিন এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের শিকড় চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই অভিমত যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথবিষয়কমন্ত্রী হুগো সোয়্যারের। জাতিসংঘের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি জুলহাজ-তনয় হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন এভাবে : দোষীদের দায়মুক্তি অসহিষ্ণুতা আরও বাড়িয়ে দেবে। এ ধরনের মন্তব্য আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। আমরা যদি সব হত্যার (অভিজিৎ থেকে জুলহাজ-তনয় পর্যন্ত) বিচার করতে ব্যর্থ হই, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের চাপে এবং পশ্চিমা মিডিয়ার প্রচারণায় বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব স্বীকৃতি পেয়ে যাবে! এরপর মার্কিন চাপের কাছে আমরা ‘হেরে’ যাব। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হক একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন অতি সম্প্রতি। তিনি বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশকে ইরাক-সিরিয়া বানাতে চায়। পুলিশের সর্বাধিনায়ক যখন এ ধরনের কথা বলেন তখন তা আমাদের ভাবনায় ফেলে দেয় বৈকি। তাই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার জন্য সব পক্ষকে আহ্বান জানাই। Daily Jugnator 01.05.16