রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

পানি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক


ভারত নিজেদের খরাকবলিত এলাকাগুলোতে পানির চাহিদা মেটাতে নদীর গতিপথ বদলে দেওয়া পরিকল্পনা কার্যকর করতে যাচ্ছে। এটা কার্যকর করতে গঙ্গা (পদ্মা) ও ব্রহ্মপুত্রের পানি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে ভারত। ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী গত মাসে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ভারতের ইন্টার লিংকিং রিভার্স বা আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৩০টি লিংক পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো সময় একটি লিংক পানি সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করবে। উমা ভারতী বিবিসিকে আরো জানিয়েছেন, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প হচ্ছে তাঁদের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। উমা ভারতী জানিয়েছেন, ৩০টির মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি লিংক নিয়ে তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন। যেকোনো সময় উত্তর ও মধ্য প্রদেশের মধ্যকার কেন-বেতওয়া লিংক উদ্বোধন করা হবে। উমা ভারতীর এই বক্তব্য আমাদের জন্য অনেক চিন্তার কারণ। কেননা আন্তনদী সংযোগ নিয়ে বাংলাদেশের অনেক উৎকণ্ঠা আছে। ভারত আন্তনদী সংযোগের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে নিলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নদ-নদীতে কোনো পানি থাকবে না। বাংলাদেশ প্রথম থেকেই আন্তনদী সংযোগের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। গত বছরের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় যে ৬৫ দফাসংবলিত যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে ২১ নম্বর দফায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল যে ভারত আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। এখন উমা ভারতীর বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্য কি ওই প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করল না? যৌথ ঘোষণায় যখন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তখন তা রক্ষা করার দায়িত্ব ওই রাষ্ট্রের। ভারতের এই ‘আচরণ’ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং তা দুই দেশের সম্পর্ককে একটি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে। বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা এর ব্যাখ্যা চাইবে। কিন্তু শুধু ‘ব্যাখ্যা চাওয়া’ই যথেষ্ট নয়। এখানে বলা ভালো, খোদ ভারতেই এই আন্তনদী সংযোগ নিয়ে বিতর্ক আছে। ভারতের পরিবেশবাদীরা প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন। এ নিয়ে তাঁরা সেখানে আন্দোলন পর্যন্ত করেছেন। এখানে বলা ভালো, ভারতে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প অর্থাৎ হিমালয় অঞ্চল থেকে উত্পন্ন নদীগুলোর পানি ৩০ খালের মাধ্যমে ভারতের খরাপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার এই যে মহাপরিকল্পনা, তার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৮০ সালে এই পরিকল্পনার কথা প্রথম জানা যায় এবং ২০০২ সালে বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে বিচারপতি এস এইচ কাপাডিয়ার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিমত দেন যে  পরিকল্পনাটি ভালো। তাই এটি বাস্তবায়ন এবং একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তা মনিটর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁরা। হাইকোর্ট ৩৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, ভারতের পরিবেশবাদীদের অনেকেই এই মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ভারতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পরিবেশবিদ বন্দনা সিভা বিজনেস টুডের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১৩ মার্চ ২০১৪) মন্তব্য করেছিলেন, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থার নামান্তর মাত্র। তিনি আরো মন্তব্য করেছিলেন এভাবে, ‘It has no hydrological or ecological soundness and is just part or the corruption and construction package that has ruined India’s ecosystem and life support base. This is the same lobby that aggravated the Uttarkhand disaster with its hydrological projects.’ আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা জীববৈচিত্র্য নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, বন্দনা সিভা তাঁদের অন্যতম। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আমাদের জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে মোট যে খরচ ধরা হয়েছে অর্থাৎ ৫৬০ হাজার কোটি রুপি, তা ভারতের জিডিপির ২৫ শতাংশ। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতাগোষ্ঠী থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে এবং ভারতে যাদের আয় ৪০০ থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে, তাদের প্রত্যেকের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১২ ডলার। বন্দনা জানিয়েছেন, তিনি নিজে কেন-বেতওয়ার (Ken-Betwar) এবং সারদা-যমুনা (Sharda-Jamuna) আন্তনদী সংযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাতে তিনি দেখতে পেয়েছেন খরাপীড়িত এলাকায় পানি নিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলা হয়, তা সত্য নয়। আমরা আরেকজন ভারতীয় পরিবেশবিদ রাজেন্দ্র সিংয়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। রাজেন্দ্র সিং ২০০১ সালে বিখ্যাত ম্যাগসেসাই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। আর ২০১৫ সালে তিনি পেয়েছেন ‘পানির নোবেল পুরস্কার’ হিসেবে খ্যাত ‘স্টকহোম ওয়াটার প্রাইজ’। ভারতে তিনি Water Man of India হিসেবে খ্যাত। বোঝাই যায় তাঁর কর্মকাণ্ড পানি নিয়ে। আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (১০ জুন ২০১৫) বলেছেন, ‘This will be disastrous for my country. It will displace a lot of people and cause undesirable effects, with floods in one side and drought on the other. River are not like roads. They have own gene pool and own life. Linkage of rivers will lead to privatisation of water resources.’ যে কথাটা বন্দনা সিভা বলেছেন, অনেকটা সেই সুরেই কথা বলেছেন ভারতের ‘ওয়াটার ম্যান’ রাজেন্দ্র সিং। এখানে যে একটা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে অর্থাৎ ভারতের করপোরেট জগতের বাসিন্দারা যে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাচ্ছে, এটাই মোদ্দাকথা। এখানে খরাপীড়িত এলাকায় পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টি মুখ্য নয়। পানির প্রবাহ না বাড়িয়েও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প যে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য, তা স্বীকার করেছেন ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্য ড. মিহির শাহ। তিনি গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এই প্রকল্পের ব্যাপারে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন (ইকোনমিক টাইমস, ৭ মার্চ ২০১৩)। ভারতের Working Group or Sustainable Ground Water Management-এর পরিচালক পিএস ভিজয়শংকর (P.S. Vijashankar) একটি সেমিনারে আসামের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বলেছিলেন, আসামে প্রচুর ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-উপরিভাগে পানি রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-বরাক অববাহিকায় মাথাপিছু পানির ব্যবহার সর্বোচ্চ ১৪০৫৭ কিউবিক মিটার। মাত্র এক ভাগ ভূ-উপরিভাগের (Surface Water) পানি ব্যবহৃত হয়, অথচ ৬৬ ভাগ পানি ব্যবহার করা সম্ভব। সারা ভারতে ভূ-গর্ভস্থ পানির মাত্র তিন ভাগ ব্যবহৃত হয়, অথচ ৩৫ ভাগ পানি রয়ে যায় অব্যবহৃত। এই পানি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এখানে বলা ভালো, প্রস্তাবিত এই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পে যেসব রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আসাম, সিকিম ও কেরালা এর বিরোধিতা করেছে। শুধু তামিলনাড়ু এর পক্ষে।
বলা হয়, ভারতের খরা এলাকার জন্য পানি দরকার। কিন্তু এক নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে খালের মাধ্যমে অন্য এলাকায় (দক্ষিণে) নিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। ভারতের ভাকরা বাঁধ নিয়ে একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল পাঞ্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশের জন্য ভাকরা থেকে পাওয়া পানি নয়, বরং ভূ-গর্ভস্থ পানি ও উন্নত কৃষিব্যবস্থা বেশি জরুরি। পাঞ্জাবের মোট ২০ শতাংশ এবং হরিয়ানার ৩১ শতাংশ চাষযোগ্য জমি বাঁধ নিয়ন্ত্রিত। এমনকি ৫০ বছর পর আজও সেখানকার বাস্তুহারা মানুষ কঠোর সংগ্রাম করে যাচ্ছে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুর জন্য। ওই গবেষণার ফলাফলই বলে দিচ্ছে নর্মদা বাঁধের উচ্চতা না বাড়িয়ে কিভাবে আরো বেশি পানি ও বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। সে বিষয়ে মাথা ঘামানো দরকার। নর্মদা বাঁধসংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তুহারা ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে কিভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে গুজরাট, মধ্য প্রদেশ ও মহারাষ্ট্র, যখন কিনা ওই সব রাজ্যে বাড়তি কোনো জমি নেই তাদের পুনর্বাসনের জন্য? তিহরি বাঁধের শিকার হয়েছে যারা, তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। কেননা না ইউপি, না কেন্দ্র সরকার—কোনোরূপ সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল তাদের সাহায্যার্থে। এখন আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প যে শুধু বাংলাদেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তা নয়। বরং খোদ ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটা বিবেচনায় নিচ্ছেন না।
এখানে আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। আন্তর্জাতিক আইনবিশারদ অধ্যাপক ওপেনহেইম বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রকে নিজ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা এমনভাবে পরিবর্তন করতে দেওয়া যাবে না, যার ফলে তা প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থার কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে। এ আলোকেই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পটি অবৈধ। যখন কোনো রাষ্ট্র একটি অভিন্ন সম্পত্তির উন্নতি, পরিবর্তন বা ধ্বংস সাধনের জন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ করে তখন ওই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন আরো বেশি সুনির্দিষ্ট, যখন তা আন্তর্জাতিক নদী সম্পর্কিত হয়। আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের সব কটি নদীই আন্তর্জাতিক নদী। তাই এসব নদীর একতরফা পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পানি প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র, অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। তা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি না করেই হতে হবে। কিন্তু ভারতের এই উদ্যোগে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে ভারত বাংলাদেশের ওপর এ প্রকল্পের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই উপেক্ষা করছে।
হেলসিংকি নীতিমালার অনুচ্ছেদ ২৯-এ বলা হয়েছে, এক অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অপর অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্রকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিষ্কাশন অববাহিকার পানি ব্যবহারের ব্যাপারে কৃত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করবে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার (আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত) ২ নম্বর নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। কিন্তু আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত একটি অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারমূলক পদ্ধতিতে অগ্রসর হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জলপ্রবাহ কনভেনশনটি গ্রহণ করা হয়। এই কনভেনশনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কনভেনশনের ৬ অনুচ্ছেদে যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্দিষ্টকরণে কতগুলো শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যবহার নির্ধারণে এ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সব কটি শর্তকে একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে বিবদমান দেশগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। জলপ্রবাহ কনভেনশনে উল্লিখিত নীতিমালার আলোকে ভারতে প্রস্তাবিত নদী সংযোগ প্রকল্পকে বিচার করলে দেখা যাবে ভারত সুস্পষ্টভাবে কনভেনশনে বিধিবদ্ধ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করছে। এমনকি জলাভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরামর্শ করবে এবং একই সঙ্গে জলাভূমির ও সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর সংরক্ষণের স্বার্থে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা এবং বিধিবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোকে ধ্বংস করার নামান্তর, যা কিনা রামসার কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করতে পারি। যেখানে ওই অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘উভয় পক্ষ সমতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, সেখানে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করা হলে, তা হবে উক্ত চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকারের চরম লঙ্ঘন।’
এখন উমা ভারতীর বক্তব্যকে আমরা কিভাবে নেব? উমা ভারতী নিশ্চয়ই তাঁর ব্যক্তিগত মত দেননি। তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের কথাই বিবিসিকে জানিয়েছেন। এখন ভারত সরকার যখন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে যাচ্ছে তখন স্পষ্টতই তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং মোদির ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরিত যৌথ ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে অতিদ্রুত বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করা।
Daily Kalerkontho
13.06.16

নতুন উচ্চতায় দু’দেশের সম্পর্ক

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফর করেছেন। পাঁচদিনের জন্য তিনি সৌদি আরব যান গত ৩ জুন। গত ৫ জুন তিনি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় করেন। বাংলদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উšে§াচন হলো। মুসলিম উম্মাহর শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ। দু’ দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমনে ৩৪টি মুসলিম দেশ নিয়ে সৌদি জোটের রূপরেখার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা তার প্রথম সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফর। এর আগে তিনি ২০১৩ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সৌদি আরব সফরের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, সৌদি আরবের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ তার সদস্য অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যে জোট গঠিত হয়েছে, বাংলাদেশ তাতে যোগ দেয়নি। সৌদি জোটে যোগ দেয়ায় সৌদি রাজ পরিবার বাংলাদেশকে যে গুরুত্ব দেয় সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশ সফরে  এসেছিলেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবাইর। সমসাময়িককালে কোনো সৌদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সেটা ছিল প্রথম বাংলাদেশ সফর। এতে প্রমাণিত হয়েছিল সৌদি আরব বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দেয়। তৃতীয়ত, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা ১২ লাখ ৮০ হাজার। এরা বাংলাদেশে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায় তা অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। তবে সৌদি আরবে শ্রমবাজার বর্তমানে বন্ধ। তবে ৭ জুন ২০১৬ তারিখে গণমাধ্যমে প্রকাশ, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব ৫ লাখ জনশক্তি নিতে নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। - সৌদি অর্থনীতিতে বর্তমানে এক ধরনের মন্দা চলছে। তেলের দাম সম্প্রতি কমে যাওয়ায় তা সৌদি অর্থনীতিতে আঘাত করেছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে নির্মাণ শিল্পে। সেখানে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন কোম্পানি থেকে প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এ রকম একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে সম্প্রতি। ফলে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে এই মুহূর্তে শ্রমিক নেবে কিনা, এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদির নতুন আগ্রহের কথা জানা গেল। তেলের দাম কমে যাওয়া ও সৌদি প্রতিরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় সৌদি আরবের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সৌদি আরবে প্রধানমন্ত্রীর এই রাষ্ট্রীয় সফরকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? এটা নিছক একটি রুটিন সফর নয়। এটা রাষ্ট্রীয় সফর। এই সফরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি বাদশাহর যেমনি আলোচনা হয়েছে তেমনি সৌদি শ্রমবাজার খুলে দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সৌদি জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গটিও আলোচিত হয়েছে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য। জোটভুক্ত দেশের সেনাবাহিনী গত মার্চ মাসে একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে সেখানে। একটি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ‘জধধফ-অষ-ঝযধসধধষ’ (ঘড়ৎঃয ঞযঁহফবৎ) নামে ওই মহড়ায় অংশ নিয়েছে জোটভুক্ত ২১ দেশের সেনাবাহিনী। আরো গুরুত্বপূর্ণ খবর হচ্ছেÑ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ গত ৯ মার্চ আলাদা আলাদাভাবে সৌদি আরব সফর করেছেন। দু’জনই সেখানে দুই দিন অবস্থান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তান এখন নীতিগতভাবে এই জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ তাই কোনো ‘সামরিক কার্যক্রমে’ অংশ নেয় কিনা সেটাই দেখার বিষয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। এখন বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেয়ায় বাংলাদেশ এই নীতি থেকে সরে আসবে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। উপরন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫তম অনুচ্ছেদ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, সংহতি ও উন্নয়নের’ কথা বলা হয়েছে। ২৫(ক) তে বলা হয়েছে বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে।’ অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ না করা আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথাও বলা হয়েছে এই অনুচ্ছেদে। তাই জোটে যোগ দিয়ে আগামীতে “অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করবে কিনা, ‘শক্তি প্রয়োগে’ অংশ নেবে কিনা, এ প্রশ্ন থাকলই। যদিও জোটের পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা কী হবে তা এই মুহূর্তে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এই জোটের উদ্যোগে রিয়াদে একটি কেন্দ্র হবে এবং এই কেন্দ্র সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী তথ্য-উপাত্ত ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে।” তবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ আমাদের জানিয়েছিল, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক অভিযান সমন্বয় ও তাতে সহায়তা করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোট গঠন করা হয়েছে।’ বাংলাদেশ আগে যুক্তি দেখিয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে অন্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ এই কেন্দ্রে থাকবে। তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যে নানা প্রশ্নের জš§ দিয়েছে। জোটের অন্যতম শরিক পাকিস্তান প্রথমে কিছুটা অবাকই হয়েছিল এই জোট গঠনে এবং জোটে পাকিস্তানের নাম থাকায়। পাকিস্তানের বক্তব্য হচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই জোটের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। আমি নিশ্চিত নই, এই জোট গঠনে বাংলাদেশের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা আদৌ হয়েছিল কিনা। সৌদি আরব এ ধরনের একটি জোট গঠন করতে যাচ্ছে কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনা হয়েছেÑএটাও আমাদের অনেকের জানা নেই। ফলে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন গত ১৫ ডিসেম্বর এই জোট প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন তখন বিষয়টি আমাদের অবাকই করেছিল। এমন হয়েছে কিনা সৌদি আরব একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে তা জোটবদ্ধ দেশগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে শুধু? এটা যদি সত্য হয় তাহলে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। জোট নিয়ে পাকিস্তানের প্রশ্ন তোলা এই সম্ভাবনাটকেই সামনে নিয়ে এসেছিল। যদিও এখন মনে হচ্ছে পাকিস্তান তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। আরো একটা কথা বলা দরকার। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যাদের নাগরিকদের প্রায় সবাই মুসলমান, ওই অঞ্চলের একটি দেশও জোটে যোগ দেয়নি। তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, কিরগিজস্তানÑ এই দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ও সোভিয়েত রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে গেলে এই দেশগুলো স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ’ যদি অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে থাকে জোটে যোগ দেয়ার ব্যাপারে, তাহলে মুসলমানপ্রধান এই দেশগুলো যোগ দিল না কেন? ইন্দোনেশিয়া বড় মুসলিম দেশ। এই দেশটিও নেই কেন? পাঠক, লক্ষ্য করুন কোন দেশগুলো যোগ দিয়েছে? বেনিন, সাদ, টোগো, জিবুতি, সুদান, সিয়েরালিওন, গ্যাবন, সোমালিয়া, মালদ্বীপÑএই দেশগুলোর সন্ত্রাস দমনে আদৌ কোনো অভিজ্ঞতা নেই বরং জাতিসংঘ এই দেশগুলোকে কখনো বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে আমন্ত্রণও জানায়নি। শুধু তাই নয়, সুদান, সিয়েরালিওন, সোমালিয়া, গিনি ইতিমধ্যে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব দেশে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারও নেই। তাহলে এই দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হলো কেন? দেশগুলো গরিব। আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। ধনী দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতার ওপর দেশগুলো নির্ভরশীল। এটাকে বিবেচনায় নিয়েই কি দেশগুলোকে সৌদি আরব তার জোটে রেখেছে? সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী জোটে ৩৪ দেশ যোগ দিয়েছে। এই জোটকে বলা হচ্ছে, ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম’ (আইএমএএফটি)। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেই এই জোটের জš§। এখানে কোনো একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কথা বলা হয়নি। সম্প্রতি সিরিয়া-ইরাকে জš§ নেয়া ইসলামিক স্টেট বা দায়েশের (আরবি নাম) বিরুদ্ধে আলাদা আলাদাভাবে বিমান হামলা পরিচালনা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ও রাশিয়া। অনেক আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে একটি জোট ‘দি গ্লোবাল কোয়ালিশন টু কাউন্টার আইএসআইএল।’ এখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, আইএসআইএল তথা ইসলামিক স্টেটের কথা। ৬৫টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই জোটের মূল টার্গেট জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। পরে এর পাশাপাশি গঠিত হয়েছিল আইএমএএফটি। একটির নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপরটির নেতৃত্বে সৌদি আরব। উভয় জোটের স্বার্থ কি এক? অর্থাৎ উভয় জোটই কি ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবহƒত হবে? বিষয়টি আমার কাছে অস্পষ্ট। কেননা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জোটে বাংলাদেশকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ ওই জোটে যোগ দেয়নি। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিল না কেন? নাকি ওই জোটে যোগ দেয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগে সৌদি জোটে যোগ দিলমার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ না দেয়ার পেছনে বাংলাদেশের জোট নিরপেক্ষ নীতির কথা আমাকে বলতে চেয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এক টিভি টকশোতে তিনি আমাকে এ ব্যাখ্যাই দিয়েছিলেন। তবে জানিয়েছিলেন, ‘অসামরিক ও জাতিসংঘের উদ্যোগে যে কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে।’ অর্থাৎ আমি ধরে নিয়েছি যদি কোনো ধরনের ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ ঘটনা ঘটে সিরিয়ায় তাহলে বাংলাদেশ মার্কিন জোটকে সহযোগিতা করবে এবং প্রয়োজনে জোটে যোগ দেবে। কিন্তু ইতোমধ্যে সৌদি জোট যার চরিত্র অনেকটা সামরিক, বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিয়েছে। ফলে সৌদি জোটে যোগ দেয়া নিয়ে প্রশ্ন যে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার কিছু দেশ রয়েছে, যে দেশগুলো উভয় জোটেই আছে (জর্দান, আরব আমিরাত, বাহরাইন, তুরস্ক, কুয়েত প্রভৃতি)। সৌদি আরব মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটেও আছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হঠাৎ করে বাংলাদেশ সফর কিংবা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সৌদি আরব গমন প্রমাণ করে সৌদি আরব তার সামরিক জোট নিয়ে সিরিয়াস। সেখানে একটি সামরিক মহড়ার আয়োজন করাও অনেক প্রশ্নের জš§ দিতে পারে। কিছুদিন ধরেই সৌদি আরব সিরিয়ায় একটি ‘সামরিক আগ্রাসন’ চালাতে পারে এমন কথা বলা হচ্ছে। এর প্রস্তুতি হিসেবে কি একটি সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছিল সৌদি আরব? তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি আদৌ আগামীতে কোনো সামরিক কার্যক্রমে তার দেশের সেনাবাহিনী পাঠাবে? বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে তারা কোনো রকমের ‘সেনা কার্যক্রমে’ অংশ নেবে না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে। এখন দেখতে হবে প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের পর এই প্রসঙ্গটি কোন পর্যায়ে আলোচিত হয়। আমাদের জাতীয় স্বার্থ হলো বড়। আমাদের শ্রমবাজার এখনো উš§ুক্ত হয়নি, এখন পর্যন্ত বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে আশাবাদ আর আগ্রহের মধ্যেই। সৌদি বিনিয়োগও আশাপ্রদ নয়। প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে সৌদি জোটে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি যে সৌদি আরবের প্রধান বিবেচিত বিষয় এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। শুধু সৌদি আরবের স্বার্থের কারণে বাংলাদেশ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থটাই হলো আসল। Daily Manobkontho 08.06.15

ওবামার এশিয়া সফর কী বার্তা দিয়ে গেল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার শাসনামলের শেষদিকে এসে এশিয়া সফর করে গেলেন। এ সফরে তিনি জাপানে জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার ভিয়েতনাম সফর। ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভিয়েতনামের মাটিতে তিনি পা রেখেছিলেন। এর আগে বিল ক্লিনটন ২০০০ সালে, আর জর্জ বুশ ২০০৬ সালে ভিয়েতনাম সফর করেছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর ২৫ বছরের ব্যবধানে ক্লিনটন প্রথম ভিয়েতনাম গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ভিয়েতনামের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। আর ওবামা হচ্ছেন তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলেন।

ওবামা এমন এক সময় ভিয়েতনাম সফর করলেন যখন দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সঙ্গে তার সীমান্তবর্তী অনেক দেশের (ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান) বিরোধ আছে। এমনকি চীনের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে তার যুদ্ধজাহাজ পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সঙ্গে একটি যৌথ নৌমহড়ায়ও অংশ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তার ভিয়েতনাম সফর এবং ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এ কথাই প্রমাণ করে যে, ভিয়েতনামকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে ‘তৈরি’ করছে! এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি, অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে একটি বলয় তৈরি করা, তাতে ভিয়েতনাম এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পার্টনার। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামকে সঙ্গে নিয়ে টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি করেছে। ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড পার্টনার। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে শতকরা ১২০০ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রফতানি করেছিল ১৭৩৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ আমদানি করেছিল ৯৯৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। আর ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৩০৯২১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার (রফতানি ৭০৭১ দশমিক ৭ মি. ডলার, আমদানি ৩৭৯৯৩ মি. ডলার)। ২০০৭ সালে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। ওবামা নিজেই বলেছিলেন, ভিয়েতনাম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু। কাজেই ওবামার ভিয়েতনাম সফর শুধু সাধারণ একটি সফর ছিল না। একদিকে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক বলয় সৃষ্টি করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে। আর এ মহাপরিকল্পনার অংশ ছিল ওবামার এই সফর। এখানে বলা ভালো, চীনের বিরুদ্ধে একটি সামরিক বলয় তৈরি করার অংশ হিসেবেই দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রকে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ফিলিপাইন এবং অতি সম্প্রতি ভারত দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নৌ ইস্টার্ন কমান্ডের চারটি গাইডেড মিসাইল সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ জাহাজগুলো দক্ষিণ চীন সাগর ও উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী যে নীতি, তাতে ভারতকেও পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে আমরা ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌ স্ট্র্যাটেজি নিয়ে লিখেছি। ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম নৌশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর তার অংশ হিসেবেই ভারত এই প্রথমাবরের মতো তাদের ইস্টার্ন কমান্ডের চারটি যুদ্ধজাহাজকে এ অঞ্চলে মোতায়েন করল। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। ভারত ভিয়েতনামের সঙ্গে চুক্তি করে এ অঞ্চলে তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

এখন ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ৩২০ কোটি ডলারের ছয়টি ইলেকট্রিক সাবমেরিন বিক্রির যুক্তরাষ্ট্রের একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দেবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় থার্ড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে দক্ষিণ কোরিয়া এ সিদ্ধান্তটি নিল। তবে চীনে আধা ঘণ্টারও কম সময়ে আঘাত হানতে সক্ষম এমন হাইপারসনিক গ্লিড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও মোতায়েন করা হয় সেখানে। চীন বিষয়গুলোকে খুব সহজভাবে দেখছে না। এতে করে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়বে। সর্বশেষ ওবামার সফর এতে একটি নতুন মাত্রা এনে দেবে।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। দক্ষিণ চীন সাগরের স্ট্র্যাটেজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। আগামী দিনে এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটারজুড়ে চীন সাগরের বিস্তৃতি। এ অঞ্চলটি চীনের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণে, ফিলিপাইনের পশ্চিমে, মালয়েশিয়ার উত্তরে, ব্রুনাইয়ের উত্তর-পশ্চিমে, ইন্দোনেশিয়ার উত্তরে এবং ভিয়েতনামের পূর্বে অবস্থিত। এ অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়েছে এ কারণে যে, দক্ষিণ চীন সাগরে প্রায় ২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে এবং গ্যাস রয়েছে ২৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার থেকে ৫৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার। চীনের প্রচুর ‘জ্বালানি ক্ষুধা’ রয়েছে। চীনের অর্থনীতি সঠিক পথে চলতে প্রচুর জ্বালানি দরকার। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যদি চীনের কর্তৃত্ব থাকে, তাহলে চীন তার জ্বালানি চাহিদা এখান থেকে মেটাতে পারবে। এ সমুদ্রপথটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ। এ কারণে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পৃথিবীর সমুদ্রপথে যত বাণিজ্য হয়, তার এক-তৃতীয়াংশ হয় এই পথে। চীন, জাপান, কোরিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার বাণিজ্যিক রুট হিসেবে এ পথকে ব্যবহার করে। দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত স্প্রাটলি, প্যারাসেল ও টনকিন উপসাগরে অবস্থিত কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে আশপাশের দেশ, বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার সঙ্গেই চীনের বিরোধ।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ অঞ্চলের অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব বেড়েছে একাধিক কারণে। শুধু চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’ কিংবা চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে একটি ঐক্য করার পাশাপাশি জাপানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মোকাবেলা করা, এ সাগর দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করার ব্যাপারে মার্কিন স্বার্থ রয়েছে। এর ওপর রয়েছে এ এলাকার তেল ও গ্যাসসম্পদের ওপর মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির লোলুপ দৃষ্টি। ফলে এ অঞ্চলটি যে আগামী দিনে প্রভাব বিস্তারের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি করতে আজ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান, এমনকি ভারতও তৎপর। যুক্তরাষ্ট্র এ দেশগুলোকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে। এটি বিশ্বের বড় সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটের একটি। বিশ্ব বাণিজ্যের ৩২ ভাগ এ পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এটি সংযুক্ত নয়। মূল ভূখণ্ড থেকে ১ হাজার নটিক্যাল দূরে এ দ্বীপগুলো অবস্থিত। জাপান এ রুটকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি করে এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। জাপান এ দ্বীপগুলোর নাম দিয়েছে সেনকাকু, যা চীনের কাছে পরিচিত দিয়াওইউ নামে। ঐতিহাসিকভাবে চীনের শিও হান রাজবংশের কর্তৃত্ব অনুযায়ী চীন এ অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে এলেও এ অঞ্চলের আশপাশের দেশগুলো তা মানতে নারাজ। জাপানের নিজস্ব কোনো তেল ও গ্যাস নেই। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর দেশটি পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। জাপান দৈনিক ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ সামুদ্রিক পথটি ব্যবহার করে আমদানি করে থাকে।

এ অঞ্চলের স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব থাকায় চীন এ অঞ্চলে নতুন করে একটি কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়েছে। সেখানে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের জন্য বড় বড় রানওয়ে তৈরি করছে। মিসাইল ব্যাটারি স্থাপন করেছে। এমনকি আগামীতে এখানে পারমাণবিক সাবমেরিন যাতে ‘ডক’ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও পাকাপাকি করেছে চীন। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি আতংক ছড়িয়ে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এ আতংককে ব্যবহার করছে তার স্বার্থে। ইতিমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের এ বিরোধটি জাতিসংঘের সামুদ্রিক বিপদ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত হয়েছে। ফিলিপাইন এর উদ্যোক্তা। তবে চীন এ শুনানিতে অংশ নেয়নি। চীন আদালতের কর্তৃত্ব মানতে চাইছে না। ফলে বিবাদ নিষ্পত্তি নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই গেছে।

দক্ষিণ চীন সাগরের এ বিরোধ যখন অনিষ্পন্ন, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলেন। এর ফলে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার অস্ত্র আমদানি শুরু করবে, যা কিনা এ অঞ্চলে এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতার জš§ দেবে। অতীতে চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের খবর আমরা জানি। ১৯৭৯ সালের মার্চে সেই যুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৩ সপ্তাহ। তখন চীনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামকে সমর্থন করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। আজ যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামকে ব্যবহার করছে চীনের বিরুদ্ধে। প্রেক্ষাপট এক। চীন এ অঞ্চলের তথা বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। অর্থনৈতিক তথা সামরিক দিক দিয়ে চীন অন্যতম একটি শক্তি। তাই ঘুরেফিরে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী ‘কনটেনমেন্ট থিওরি’, অর্থাৎ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলা ও সমাজতন্ত্রের পতন ঘটানোর কৌশল। দীর্ঘ ৪৬ বছর লেগেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলতে। আজ চীনকে নিয়ে শুরু হয়েছে ‘খেলা।’ চীনের পতন ঘটিয়ে চীনকে কয়েকটি রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে নতুন করে ‘কনটেইনমেন্ট থিওরি’ ব্যবহৃত হচ্ছে! সে কারণেই একদিকে ভিয়েতনাম (সেই সঙ্গে ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান), অন্যদিকে ভারত আজ ‘মার্কিন বন্ধু’, মার্কিন স্ট্রাটেজির অংশ তারা। খুব সঙ্গত কারণেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে নয়া স্নায়ুযুদ্ধের একটি নয়া রূপ।

চীন বিষয়গুলোকে যে খুব সহজভাবে নিয়েছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আগামী ৬ ও ৭ জুন বেইজিংয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ‘স্ট্র্যাটেজিক ও ইকোনমিক ডায়ালগ’ অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনে চীন দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। এই দীর্ঘ উপস্থিতি ও যৌথ নৌ মহড়াকে যে চীন ভালো চোখে দেখছে না, এটাও সম্মেলনে তারা জানাবে। গত ৩১ মে বেইজিংয়ের সংবাদপত্র ‘চায়না ডেইলির’ এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আগের মতো ভালো নয়। অতীতের পিংপং ডিপ্লোমেসির সেই স্পিরিট এখন আর নেই। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক মাত্রা দিয়েছিল। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এ চীন-যুক্তরাষ্ট্র অ্যালায়েন্স একটি ‘পক্ষ’ হিসেবে কাজ করেছিল। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রায় ২৫ বছর পর এই ঐক্যের এখন আর প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। উপরন্তু চীনও এখন আর সমাজতন্ত্রের পথে নেই। তবে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম একটি শক্তি। বিশ্বব্যাপী চীনা বিনিয়োগ, চীনা বাণিজ্য মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করছে। তাই ধীরে ধীরে দেশ দুটি একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওবামার ভিয়েতনাম সফর, ভিয়েতনামকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা এবং জি-৭কে চীনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করা- সবই একই পরিকল্পনার অংশ।

ওবামা তার ভিয়েতনাম সফরে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে গণহত্যা হয়েছিল (১৫ লাখ ভিয়েতনামবাসী ও ৫৮ হাজার মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু) তার জন্য ‘ক্ষমা’ চাননি। তিনি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বটে; কিন্তু তাতে করে দেশটি কতটুকু লাভবান হবে, সে প্রশ্ন থাকলই। Daily Jugantor 06.06.16

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক

প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন ২৯ মে। জাপানে জি-৭ আউটরিচ সভায় তিনি যোগ দিয়েছেন। সেখানে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, জার্মানির চ্যান্সেলর, কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর এ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে একটি উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি, এটাই স্বীকার করে নিলেন শিল্পোন্নত সাতটি দেশের নেতারা। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদারও হতে চায় এ দেশগুলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তারা উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় স্বীকৃতি। প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে তার বক্তৃতায় লক্ষ্যমাত্রার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও উত্তরণে প্রযুক্তি হস্তান্তর করার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। দরিদ্র দেশগুলোর সামর্থ্য বৃদ্ধির ব্যাপারে ধনী দেশগুলোর আরও তৎপর হওয়া উচিত বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন। আসলে এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। গরিব দেশগুলোকে সাহায্যের নামে ধনী দেশগুলোর ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল না হওয়া এবং একই সঙ্গে দরিদ্র দেশগুলোর সামর্থ্য বাড়ানো সময়ের দাবি। এটা করতে হলে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজন রয়েছে। গরিব দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে এ কথাগুলোই তুলে ধরেছেন। এখানে বলা ভালো, গেল এপ্রিলে জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ইশোহিদে মুগা জানিয়েছিলেন, ‘জি-৭ ইসে-শিমা’ সামিটে অর্থাৎ জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ লাওস, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাপুয়া নিউগিনির সরকারপ্রধানের পাশাপাশি শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি এ  আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন আফ্রিকার চাদের প্রেসিডেন্ট ইদরিস ডেবি ইটনো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো, লাওসের প্রধানমন্ত্রী থনলউন সিসে লিথ, পাপুয়া নিউগিনির প্রধানমন্ত্রী পিটার ও’নিল, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ও ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী নগুয়েন জুয়ান ফুক। মূলত তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে জাপান এই জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে এ ছয়টি দেশের সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা ও নারী উন্নয়ন। জাপানের এ আমন্ত্রণের পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাপান মনে করে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উন্নয়নে জাপানের একটি ভূমিকা রয়েছে এবং জাপান এ দেশগুলোকে আগামী দিনে পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করতে চায়। এক্ষেত্রে যে দেশগুলো সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল, জাপানের আগ্রহ ওই দেশগুলোর ব্যাপারে বেশি। আর আগামীতে জাপানে আফ্রিকার দেশগুলোর উন্নয়নে যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা বিবেচনা করেই আফ্রিকার দেশ চাদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমেই বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক ৪৪ বছর পার করেছে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাপান বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৪৪ বছর দুই দেশের সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধানমন্ত্রীই জাপান সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে জাপান সফর করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ১৪ বছরের মধ্যে সেটা ছিল কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। এর আগে ২০০০ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরে বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছিলেন।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অবদান রয়েছে যথেষ্ট। জাপান হচ্ছে বাংলাদেশের ১১তম রফতানি বাজার। জাপান বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে, তা উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে আমদানি করা পণ্যের শতকরা ২৬ ভাগ। বাংলাদেশের অবস্থান কম্বোডিয়ার পরে। কম্বোডিয়া আছে প্রথম অবস্থানে। পরিসংখ্যান বলে, ৫ বছরে জাপানে বাংলাদেশের পণ্যের রফতানি বেড়েছে আড়াই গুণ। তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ২০ গুণ। যদি বাণিজ্য সম্পর্ক আলোচনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে, বাণিজ্যে ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি জাপানের অনুকূলে। অঙ্কের হিসাবে এ ঘাটতির পরিমাণ ৬৪৬ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান সরকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর আরও উদ্যোগ নিচ্ছে। জাপান তার বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ১ ভাগ সম্পন্ন করে বাংলাদেশের সঙ্গে। এটা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশী পণ্য তার বাজার সৃষ্টি করতে পারে। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাপান সফর ও জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের পর বিনিয়োগ পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। গঙ্গা ব্যারাজ তৈরি, যমুনা ব্রিজে রেললাইন নির্মাণ, ঢাকায় ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ ও ঢাকার আশপাশে চারটি নদী দূষণমুক্ত করার ব্যাপারে জাপানি সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব প্রকল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। জাপানের পক্ষ থেকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার কথা বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট যৌক্তিক। জাপান যখন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, তখন তারা কতগুলো শর্ত জুড়ে দেয়। যেমন ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকল্প দুর্নীতিমুক্ত ও মসৃণ বাস্তবায়ন হতে হবে। বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও একটা বড় সমস্যা। নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম জাপান সফরের পর পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। জাপান তখন ৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই সঙ্গে কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্পে আরও ১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ব্যাপক আঞ্চলিক উন্নয়নের আলোকে জাপান এ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জাপান বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আহরণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইধু ড়ভ ইবহমধষ ওহফঁংঃৎরধষ এৎড়ঃিয ইবষঃ (ইরম ই ওহরঃরধঃরাব) এর আওতায় জাপান তার আগ্রহ দেখিয়েছে। এতে করে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে জাপানের আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে জাপান তার পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। এখন দেখতে হবে এ পরিকল্পনা চীনের ‘ওয়ান বেল্ট’ পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা! চীনের ‘ওয়ান বেল্ট’, যা কিনা পুরনো ‘সিল্ক রুট’ এর নব্য সংস্করণ এরই মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারতও তার প্রাচীন ‘কটন রুট’কে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। ফলে বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগর ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা লক্ষ্য করার মতো। জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জাপান ও বাংলাদেশের অবস্থান এক। জাপান (একই সঙ্গে জার্মানিও) আগামীতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের অন্যতম দাবিদার। জাতিসংঘ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় জাপানি নেতৃত্ব এখন স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় জাপানি সেনাবাহিনী এখন অংশ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাপানের ভূমিকাকে সমর্থন করে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য পদে জাপানের দাবিকেও বাংলাদেশ সমর্থন করে। জাপানের বৈদেশিক নীতিতে গণতন্ত্রায়ণের ওপর এখন বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এমনকি সাহায্যের শর্ত হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করার কথাও বলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে জাপানের আগ্রহ রয়েছে। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচন নিয়ে জাপানের কিছুটা ‘রিজার্ভেশন’ থাকলেও তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলেনি। এর বড় প্রমাণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম জাপান সফর এবং দীর্ঘ ১৪ বছর পর শিনজে আবের ঢাকা সফর। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গে জাপানের মূল্যায়ন হচ্ছেÑ ‘সবার উচিত জনগণের ভোটদানের সুযোগ সৃষ্টি করা।’ জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কুমি সাতোর মতে, ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কোনো শঙ্কা নেই, এটা সরকারকে প্রমাণ করতে হবে।’ নির্বাচন নিয়ে তাই কিছুটা ‘রিজার্ভেশন’ থাকলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ জাপানকে অন্যতম ‘বন্ধুদেশ’ হিসেবে মনে করে। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। ৪৪ বছরে একাধিক সরকার জাপান ও বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু তাতে করে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। এ ধারাবাহিকতায় আগামী দিনেও এ দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। তবে জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে জাপানের বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ এটাই প্রমাণ করে, জাপান সাগরবেষ্টিত দেশগুলোর ওপর, যারা পরিপূর্ণভাবে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতাতেই ইরম ই ওহরঃরধঃরাব-এর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা জাপানি সহযোগিতা নিয়ে আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারব।
বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক আসরে যেভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তা ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশে একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের উপরে ধরে রেখেছে। এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ৭ ভাগের উপরে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশের টার্গেট হচ্ছে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। এক্ষেত্রে জাপানের বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজন। আউটরিচ সম্মেলনে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছেÑ বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা ও নারী উন্নয়ন। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা সর্বত্র পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটা সমস্যা রয়েছে। জাপানি সহযোগিতায় এ সমস্যা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। একই কথা প্রযোজ্য নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রেও। যেখানে সমাজে জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী, সেখানে নারীদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় না রেখে সামগ্রিকভাবে একটা দেশের উন্নয়ন করা যায় না। জাপানের এ উদ্যোগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীও সায় দিয়েছেন।
জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ একদিকে যেমন বাংলাদেশকে বিশ্ব আসরে নতুন করে পরিচিত করেছে, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশও সুযোগ পেয়েছে তার অবস্থান তুলে ধরতে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এটি একটি বড় সাফল্য। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে।
Daily Alokito Bangladesh
05.06.16

২০ কেজি ইলিশ কি মমতার মন গলাতে পারবে?




বাংলাদেশ থেকে ২০ কেজি পদ্মার ইলিশ গেছে পশ্চিম বাংলায় মমতা ব্যানার্জির কাছে। কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্তাব্যক্তিরা তা যে মমতার হাতে তুলে দিয়েছেন, সে ছবিও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী 'শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ' পদ্মার এ ইলিশ পাঠালেন। বাংলাদেশিরা যে অতিথিপরায়ণ, প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো এই ২০ কেজি ইলিশই তার বড় প্রমাণ। মমতা ব্যানার্জি সম্প্রতি বিধানসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পশ্চিম বাংলায় সরকার গঠন করেছেন। এখন যে প্রশ্নটি সহজেই করা যায়, তা হচ্ছে এই ২০ কেজি ইলিশ কি মমতার মন গলাতে পারবে? তিস্তায় পানিবণ্টনের ব্যাপারে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি। ৬ ফেব্রুয়ারি (২০১৬) সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসের প্রথম পাঁচ দিনে তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ৫০০ কিউসিকের নিচে। বলা ভালো, সেচ প্রকল্পে পানি দেয়া দূরের কথা, শুধু নদী বাঁচানোর জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা আজ মৃত্যুমুখে। গত নভেম্বর থেকেই তিস্তার পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীতে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পানিপ্রবাহ রেকর্ড হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম চার দিনের হিসাবে দেখা গেছে, প্রথম দিন পাওয়া গেছে ৪২৬, দ্বিতীয় দিন ৪৭৫, তৃতীয় দিন ৪৪৫ আর চতুর্থ দিন ৪১৬ কিউসেক পানি। (সকালের খবর, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)। যৌথ নদী কমিশন সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর আগে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ ভালো ছিল বলে তুলনার জন্য ওই সময়কালের হিসাবকে ঐতিহাসিক গড় প্রবাহ ধরা হয়। ওই ১২ বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে পানিপ্রবাহ ছিল ৫ হাজার ৯৮৬ কিউসেক। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৯৬৩ কিউসেকে। এরপর তা নেমে যায় ৫০০ কিউসিকের নিচে। অথচ নদী রক্ষার জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক পানি। আর বিদ্যমান সেচ প্রকল্পের জন্য আরো ৩ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি দরকার। ওই সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি 'নোট ভারবাল' পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
মমতা ব্যানার্জির প্রথম ঢাকা সফরের আগে আমরা অনেক প্রত্যাশার কথা শুনেছি। তবে এটা সত্য, তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আমাদে জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে এটা সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি বিষয়টি হালকাভাবে দেখেন, তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে বাড়বে। মনে রাখতে হবে, তিস্তায় পানিপ্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকার নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থন_ এটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে ৪-৫ কিলোমিটার পুবে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই অতীতে মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরো একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানিবণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচকাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা বরাবরই মমতার জন্য একটি 'রাজনৈতিক ইস্যু'। সুতরাং মমতা তিস্তা চুক্তি করে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করবেন_ তা আমার কখনই বিশ্বাস হয়নি। তাই মমতায় আস্থা রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয়, তা হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের ওপর 'চাপ' অব্যাহত রাখা। আমরা ভারতের অনেক 'দাবি' পূরণ করেছি। মোদির আমলে সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে দুই দেশের সীমানা এখন চিহ্নিত। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর মমতা যদি তার ওপর রাখা আস্থার প্রতিদান না দেন, তাহলে তা যে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের জন্ম দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে রুদ্র কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই পানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব বলে সুপারিশ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়ও এ সুপারিশ সমর্থন করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই মমতা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে মমতাকে আস্থায় নেয়া সত্যিকার অর্থেই কঠিন। ঢাকায় আসার আগে আত্রাই প্রসঙ্গটি তুলে তিনি একটি 'জট' লাগিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ আত্রাইয়ের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি এক করে দেখেছেন। এটি একটি ভিন্ন বিষয়। আত্রাই নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তিস্তার পানিপ্রাপ্তি আমাদের অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে অন্য কোনো ইস্যুকে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সমুদ্রসীমাও নির্ধারিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক আসরে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়নি। আজকে প্রয়োজনে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে হবে। মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়টি ঝুলে থাকতে পারে না। লাখো লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। মমতা ব্যানার্জির দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে না। ভাটির দেশ হিসেবে তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার আমাদের রয়েছে। মমতা ব্যানার্জি এককভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিতে পারেন না। যদি তিনি তা করেন, তাহলে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে মমতাকে নয়, বরং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর আমাদের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মমতা বার বার রং বদলাচ্ছেন। একবার বলেছিলেন তিনি 'কাঠবিড়ালি' হবেন। আর একবার বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেবেন। স্পষ্টতই এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তিনি অন্যদিকে দৃষ্টি সরাতে চান।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। এখন পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : প্রতিটি তীরবর্তী রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানিসম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু ওই 'যুক্তি ও ন্যায়ের' ভিত্তিটি উপেক্ষিত থাকে যখন পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২ নাম্বার নীতিতে বলা হয়েছে : পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। তিস্তার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হয়নি। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ 'পানিপ্রবাহ কনভেনশন' নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করে। এ নীতিমালার ৬ নাম্বার অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার' কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ব্যবহার অর্থাৎ এককভাবে তিস্তার পানির ব্যবহার এই 'যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা'র ধারণাকে সমর্থন করে না। আমরা আরো আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারব, যেখানে বাংলাদেশের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশসংক্রান্ত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের ১৪ নাম্বার অনুচ্ছেদ, জলাভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫ নাম্বার অনুচ্ছেদ_ প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীসমূহের সংরক্ষণের যে কথা বলা হয়েছে, তা রক্ষিত হচ্ছে না। এখানে সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু কোনো রাজ্য (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) এমন কিছু করতে পারে না, যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। পশ্চিমবঙ্গকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই।
তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা চাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এ ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে মোদি সরকার একটি চুক্তিতে যেতে চায়। ইতোমধ্যে স্থলসীমানা চুক্তিতে সম্মতি দিয়ে মমতা ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন। এখন তিস্তার ব্যাপারেও তিনি পারেন। এটা কঠিন নয়। তিনি যদি সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে তিনি কল্যাণ রুদ্র কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি নিজে এ কমিশন গঠন করেছিলেন। কলকাতার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রুদ্র কমিশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দেয়া রিপোর্টে বলেছে, পশ্চিমবঙ্গকে ক্ষতি না করেও বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আরেকজন পানি বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক প্রণবকুমার রায়। অধ্যাপক রায়ের অভিমত হচ্ছে, তিস্তায় পানি নেই কথাটা ঠিক নয়। পানি মজুদ রাখা (বর্ষা মৌসুমে) ও ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
প্রশ্নটি আসে আন্তরিকতার। মমতা আদৌ আন্তরিক কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দিয়ে তিস্তা সংকটকে পাশ কাটানো যাবে না। বাংলাদেশ অতিদ্রুত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক আহ্বান করে ভারতের ওপর 'চাপ' অব্যাহত রাখতে পারে। সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিধায় মমতাকে আশ্বস্ত করা তাদের দায়িত্ব। না পারলে এ ব্যর্থতা মোদি সরকারের। এর দায়দায়িত্ব আমরা বহন করতে পারি না।
Daily Jai Jai Din04.06.16

ভারতের বিধান সভার নির্বাচন ও আমাদের শঙ্কার কারণ


ভিারতের পাঁচটি রাজ্যের বিধান সভার নির্বাচন হয়ে গেল। এ নির্বাচনে পশ্চিম বাংলায় মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল আসনে বিজয়ী হয়ে আরও পাঁচ বছরের জন্য থেকে গেল। আসামে বড় পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস শাসনের অবসান হয়েছে। বিজেপি বিজয়ী হয়ে সবাইকে অবাক করেছে। বিজেপি এখন সেখানে রাজ্য সরকার গঠন করবে। কেরালায় বামফ্রন্ট আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। তামিলনাড়–তেও ফিরে এসেছে জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে দল। জয়ললিতা আবারও মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আর পদুচেরিতে কংগ্রেস বিজয়ী হয়েছে। এ নির্বাচন কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ’র সরকার পরিচালনায় কোনো পরিবর্তন ডেকে আনবে না। তবে অনেকগুলো ‘মেসেজ’ অন্তত দিল। প্রথমত, বেশ কিছু দিন ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলো যেভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, সে ট্রেন্ডই বজায় থাকল। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিশাল বিজয় (২০১১ সালের বিধান সভার নির্বাচনের চেয়ে আরও ৩০টি আসন বেশি এবার) নয়াদিল্লির ওপর মমতার ‘চাপ’ আরও বাড়বে। মোদি আরও বেশি করে উপলব্ধি করবেন যে, তার মমতাকে আরও বেশি প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আসামে বিজেপির বিজয় নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদির হাতকে আরও শক্তিশালী করবে। তৃতীয়ত, জাতীয় কংগ্রেসের ভারতব্যাপী যে গ্রহণযোগ্যতা তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ‘রাহুল গান্ধী ম্যাজিক’ কোনো কাজ করছে না। এ মুহূর্তে ভারতের ২৯টি রাজ্যের মাঝে মাত্র ৫টিতে কংগ্রেস সরকারে আছে। ২০১৭-১৮ সময়সীমায় বিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মণিপুর, হিমাচল, কর্নাটক, মেঘালয় ও মিজোরামে। এসব রাজ্যে কংগ্রেস কী ফল করে, তা দেখার বিষয়। তবে সোনিয়া গান্ধীর ওপর চাপ বাড়ছে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে সামনে নিয়ে আসতে। রাহুলের চেয়ে প্রিয়াঙ্কা ‘ভোট ক্যাচার’। অনেকে এরই মধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন, প্রিয়াঙ্কার মাঝে একজন ‘ভাবি ইন্দিরা গান্ধী’ রয়েছে। কগ্রেস তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রিয়াঙ্কাকে নেতৃত্বের গাড়িতে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচনের ফলাফলের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। দুইটি কারণে এর গুরুত্ব বেড়েছে। এক. পশ্চিম বাংলায় মমতার আগামী পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থেকে যাওয়া একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করল যে, এবার হয়তো মমতা তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে তার সম্মতি দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগামীতে একটি তিস্তা চুক্তি হতে পারে। দুই. আসামে বিজেপির বিজয় ও সেখানে সরকার গঠন আমাদের জন্য একটা দুশ্চিন্তার কারণ। যদিও মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা আমাদের আশাবাদী করলেও আসামের হবু মুখ্যমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা আমাদের জন্য অনেক চিন্তার কারণ। মমতা যেখানে বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবেন, সেখানে আসামের হবু মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন ভিন্ন কথা। সোনোয়াল বিজয়ী হওয়ার পরপরই তথাকথিত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ২ বছরের মধ্যেই এ সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন, যা বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে। সোনোয়াল একথাও জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সীমান্তকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য দুই বছরের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। তিনি এরই মাঝে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার কাজটি সম্পন্ন করবেন। তিনি আসামের প্রতিটি নাগরিককে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) আওতায় আনবেন বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাও আমাদের জন্য আরেক চিন্তার কারণ। এর ফলে মুসলমানরা শুধু শুধু টার্গেট এবং হেনস্তার শিকার হবেন। বলা ভালো, আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। মমতা ব্যানার্জি সর্বানন্দ সোনোয়ালের মতো কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য রাখেননি, এটা সত্য। কিন্তু এটাও সত্য, মমতা ব্যানার্জিকে বিশ্বাস করা যায় না। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে নীতিগতভাবে রাজি হলেও শুধু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে চুক্তিটি হয়নি। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় তিনি তার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। আগেও এসেছিলেন একবার। বলেছিলেন, তার ওপর আস্থা রাখতে। তখন সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল, পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচনের (উত্তরবঙ্গ) কারণে তিনি কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি হচ্ছেন না। কেননা, এতে করে বিজেপি এটাকে ইস্যু বানিয়ে ফেলতে পারে। তাই নির্বাচনের পর প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের অনেকের কাছেÑ মমতা কী এখন রাজি হবেন একটি চুক্তি করতে? রুদ্র কমিশনের সুপারিশমালা তার কাছে আছে। এ কমিশনটি তিনিই করেছিলেন। অধ্যাপক কল্যাণ রুদ্র তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশকে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এমন মতামতও দিয়েছিলেন, ‘ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমারও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন বলে কলকাতার পত্রিকাগুলো আমাদের জানিয়েছিল। তবে যতদূর জানা যায়, মমতা ব্যানার্জি রুদ্র কমিশনের ব্যাপারে খুশি ছিলেন না। যে কারণে রুদ্র কমিশনের রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। এখন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি রুদ্র কমিশনের সুপারিশকে বিবেচনায় নেবেন কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। তবে এটাও সত্য, তার কাছে পশ্চিম বাংলার স্বার্থ আগে। কেন্দ্র তাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না। এক্ষেত্রে তিনি মোদির সঙ্গে একটি ‘সমঝোতায়’ যেতে পারেন। যেমনটি একটি সমঝোতায় তিনি স্থল সীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হতো না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি এ আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মমতা ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গÑ এ তিনটি রাজ্য এ প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছিলেন, এ তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা এসেছিলেন। তিস্তা এখানে প্রাধান্য ছিল না। অনেক পরিকল্পনা মমতা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যদি না কেন্দ্র আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করে। তখন সামনে নির্বাচন ছিল। মমতা তাই ঝুঁকিটি নিতে চাননি। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র একটি চাপও ছিল মমতার ওপর। সারদা কেলেঙ্কারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর সিবিআই’র নজরদারি ছিল বেশি। ফলে এ ‘চাপ’কে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হয়েছিলেন, কোনো চুক্তি করতে নয়। এখন মমতা ব্যানার্জি পুনরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দিতেও পারেন! অমিত শাহের গলায় সেই সুর। এক সময় তিনি এ জোটে ছিলেন। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। এখন পশ্চিমবঙ্গে তার বিজয় নিশ্চিত হয়েছে এবং সব কেলেঙ্কারি থেকে ‘মুক্ত’ হতে তিনি যদি আবারও এনডিএ জোটে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! তার ওপর আস্থা রাখা কঠিন। যতদূর জানা যায়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেননি তার একটাই কারণ। আর তা হচ্ছে, মমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনঃপূত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। ঢাকা সফরের আগে মোদি তাকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সঙ্গে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন। মমতা কথা বলেছিলেন। কূটনৈতিক ভাষায় বলেছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। এখন নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং মমতা বিজয়ী হয়েছেন। তিনি আগামী ৫ বছরের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। বিহারে নীতিশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে (বিহারের রাজধানী পাটনায়) তিনি যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটা মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার কোনো সহাবস্থান হয়নি। জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য করেছিল বামফ্রন্টের সঙ্গে। তার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য না করা কেন্দ্রে মোদি সরকারকে খুশি করে থাকবে। ফলে মমতা যদি না চান, তাহলে তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে মোদি সরকার তাকে চাপ দেবে না। আমাদের জন্য তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার স্বীকৃত। ভারত (এক্ষেত্রে পশ্চিম বাংলা) পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। পশ্চিম বাংলা তাই করছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পানিশূন্য হচ্ছে। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারীÑ এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে, এরকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমানভাগ পেতে পারে নাÑ এ দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানি বণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই তিস্তার পানিবণ্টনের দাবি করলেও শুধু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে এ চুক্তিটি হয়নি। এখন তিস্তার সঙ্গে যোগ হলো আসামে সীমান্ত ‘সিল’ করে দেয়ার ঘোষণা। দুইটি বিষয়ই আমাদের জন্য স্পর্শকাতর। এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। এ সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের অনেক ‘দাবি’ মেনে নিয়েছে। এখন যদি তিস্তার পানি চুক্তি না হয়, যদি আসামে মুসলমানরা নিগৃহীত হন, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটাতে বাধ্য।
Daily Alokito Bangladesh
29.05.16

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


 
গত ২২ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঢাকায় একটি বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি হত্যাকা- ও তথাকথিত আইএস বা ইসলামিক স্টেটের এসব হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবির আলোকেই এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করলে কতগুলো বক্তব্য পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার প্রায় একই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের শেষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুও যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে বলেছেন সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকা- সংগঠিত হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জড়িত এবং বিএনপি এসব হত্যাকারীদের শেল্টার দিয়েছে। অন্যদিকে শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, দেশে অতি সম্প্রতি যে ৩৭টি হত্যাকা- সংগঠিত হয়েছে_ তার ২৫টির সঙ্গে জেএমবি জড়িত। আর বাকি ৮টির সঙ্গে আনসারউল্লাহ বাংলা টিম ও ৪টির সঙ্গে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন জড়িত। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইইউর পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দেয়া হয়, তাতে বলা হয় এসব হত্যাকা- দেশের মানুষের মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতার জন্য হুমকি। ইইউ মনে করে বিশ্বে সহনশীল ও মুক্তচর্চার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম এতে করে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এসব হত্যাকা-ের কারণে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও ইইউর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। ইইউ অনেক দিন ধরেই বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে আসছে। তারা গণতান্ত্রিক আচরণ নিশ্চিত ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।
হঠাৎ করেই যেন বাংলাদেশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলো। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের তথাকথিত উত্থান নিয়ে দুজন মার্কিন মন্ত্রী ঘুরে গেছেন। এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবও। বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সরকার উৎখাতের জন্য_ এমন খবরও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে বলেছেন, মোসাদ বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোসাদের জড়িত থাকার বিষয়টি। অতীতে এরকমটি তেমন শোনা যায়নি। আদর্শগতভাবে মোসাদ আর বিএনপি দুই বিপরীত অবস্থানে থাকলেও, এখন সরকার উৎখাতে বিএনপি-মোসাদ সমঝোতা রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
বাংলাদেশে মোসাদ বিতর্ক এখন তুঙ্গে। বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী মোসাদ কানেকশনে বিতর্কিত হয়ে এখন পুলিশ রিমান্ডে। তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ তিনি মোসাদ এজেন্ট মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে ভারতের আগ্রায় 'গোপন বৈঠক' করেছেন। উদ্দেশ্য বাংলাদেশ সরকারকে উৎখাত করা। বিষয়টি রাজনীতিতে ভালো উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই ঘটনাটি ঘটল এমন এক সময় যখন বাংলাদেশকে নিয়ে বহির্বিশ্বে 'ষড়যন্ত্র' হচ্ছে। বাংলাদেশে তথাকথিত আইএসের উত্থানকে কেন্দ্র করে একাধিক মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশে এসেছেন এবং তাদের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। ঢাকা ঘুরে গেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবও। তিনিও জানিয়ে গেলেন ভারত সরকারের উদ্বেগের কথা। আর সর্বশেষ খবরে কলকাতার একটি জনপ্রিয় পত্রিকা আমাদের জানাচ্ছে যে আইএস সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে! এই সংবাদের পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে, তা আমাদের দেশের গোয়েন্দারা ভালো বলতে পারবেন। তবে এটা যে অবাস্তব একটি বিষয়, সেটা সবাই স্বীকার করবেন। কেননা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এভাবে কোনো জঙ্গিগাষ্ঠী একটি রাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে পারে না। এ ছাড়া যেখানে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে, সেখানে এ ধরনের 'পরিকল্পনা' অর্থহীন। তবে বাংলাদেশে মোসাদ কানেকশনের বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। এটি আরো গুরুত্ব পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কারণে। প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে বাংলাদেশিদের এক সভায় এই বিষয়টির অবতারণা করেছেন।
একজন ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যের সঙ্গে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিবের 'বৈঠক', নিঃসন্দেহে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেবে। ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আর এটা বিবেচনা করেই ইসরাইলের সঙ্গে কখনো কোনো পর্যায়ে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়নি বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসরাইলিদের সহযোগিতা বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করেছিল। যদিও এটা সত্য, ইসরাইল দীর্ঘদিন চেষ্টা করে আসছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করতে। বেশকিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভাগের একজন শিক্ষক একটি প্রসঙ্গে ইসরাইলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। ওই সময় কম বিতর্ক হয়নি। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইসরাইলি নেতাদের সঙ্গে যে কোনো ধরনের সম্পর্ক পরিহার করে আসছে বাংলাদেশ। তাহলে আসলাম চৌধুরী কীভাবে মেন্দি এন সাফারির সঙ্গে বৈঠক করেন? জনাব চৌধুরী একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বটে; কিন্তু তিনি বিএনপিকে একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি দলের সিনিয়র নেতা। এটা কি শুধু 'একটি ভুল'? তিনি কি কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার জালে আটকা পড়েছিলেন? ঘটনা যাই ঘটে থাকুক না কেন, বিএনপির এক সংকটকালিন সময়ে তিনি নিজ দলের অনেক ক্ষতি করেছেন। তিনি এখন পুলিশ রিমান্ডে আছেন। তাতে করে তার দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না। তিনি 'সব দায়-দায়িত্ব মাথায় নিয়ে' পদত্যাগ করতে পারতেন। অথবা দলের চেয়ারপারসন 'শৃঙ্খলা ভঙ্গের' অপরাধে দলের যুগ্ম মহাসচিবের পদ থেকে তাকে অপসারণ করতে পারতেন। এটা দলের জন্য মঙ্গল ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় যখন নানা চাপের মুখে আছে, তখন উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। একজন আনসার কমান্ডারকে খুন করা হলো। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে এটা ডাকাতির ঘটনা। আসলেই কি এটা ডাকাতি ছিল? আমি নিশ্চিত নই। বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, বসবাস, নানা রকম কর্মকা-, আমাদের জন্য নানা সংকট সৃষ্টি ক েছে। এদের কেউ কেউ বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তবে ভয়টা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিকাশ ঘটাচ্ছে। পাঠক নিশ্চয়ই রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) কথা স্মরণ করতে পারেন। ঝড়ঁঃয অংরধ ঞবৎৎড়ৎরংস ঢ়ড়ৎঃধষ এ বার্টিল লিনটনারের (ইবৎঃরষ খরহঃহবৎ) একটি প্রবন্ধ আছে। অনলাইনে পাঠক এটা পড়ে দেখতে পারেন। লিনটনার বলার চেষ্টা করেছেন যে আরএসওর অনেক জঙ্গি আফগানিস্তানের খোসত প্রদেশে ট্রেনিং নিয়েছেন। ট্রেনিং শেষ করে তাদের এই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য নাশকতামূলক ও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ানো। একটি আন্তর্জাতিক চক্র এই রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে। এরা রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র চায়। অর্থাৎ রাখাইন স্টেট তারা 'স্বাধীন করতে চায়। গহিন অরণ্যে ট্রেনিং হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন সূত্র থেকে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এরা পুরো ও অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে ফায়দা তুলতে চায়। তাই আনসার কমান্ডারের হত্যাকা-কে আমি শুধু ডাকাতি হিসেবে ভাবতে পারছি না। এটা রোগিঙ্গা জঙ্গিদের কাজ। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে আমরা রোহিঙ্গা সমস্যাকে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে যেতে পারিনি। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায় যারা রেজিস্টার্ড নন এবং মিয়ানমার এদের স্বীকারও করে না। ফলে এদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কাজটিও সহজ নয়। প্রচ- মুসলমান বিদ্বেষী অং সান সু চি এদের ব্যাপারে নির্বিকার। আমার মনে হয় খুব দ্রুত উখিয়ার গহিন অরণ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জঙ্গিদের উৎখাতের জন্য সেখানে সেনাবাহিনী পাঠানো উচিত। এবং সেনা মোতায়েন করাও জরুরি। নতুবা এই জঙ্গিরা কিছু বৈদেশিক শক্তির সহযোগিতায় এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এতে বিঘি্নত হতে পারে।
আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভক্তি আর বিভেদ বাড়ছে। রাজনীতিতে যে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, তা নেই। দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছে। আর এতে সুযোগ নিচ্ছে বাইরের শক্তিগুলো। বাংলাদেশে 'মোসাদ কানেকশন'-এর বিষয়টি এমনই। কিংবা জঙ্গি উত্থানের যে কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে এই 'অনাস্থা'র সম্পর্কটি। দুটি বড় দলের মধ্যে যদি 'ঐক্য' থাকত, তাহলে বাইরের কোনো শক্তিই আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে পারত না। আজ আসলাম চৌধুরীর মতো একজন নেতার পক্ষে বিএনপির নেতারা যত ছাপাই গান না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে তিনি দল ও সেই সঙ্গে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মান-সম্মানও ক্ষুণ্ন করেছেন। আসলাম চৌধুরী দলের শীর্ষপদ পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অবদান কী, তা জানেন না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? তিনি কি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কোনো বইপুস্তক পড়েননি? জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জিয়া মনে করতেন বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্রিজস্বরূপ। জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে তিনি ইসলামিক বিশ্বে ব্যাপকভাবে পরিচিত করেছিলেন। তখন থেকেই মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনতে শুরু করেছিল। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করেছিল। সুতরাং তার গড়া বিএনপি কী করে ইসরাইলের সঙ্গে 'ষড়যন্ত্র' করে? আসলাম চৌধুরী আজ অভিযুক্ত। টিভি প্রতিবেদনে দেখলাম তিনি সাংবাদিকদের 'ভি' চিহ্ন দেখাচ্ছেন। এর অর্থ কী? তিনি বিজয়ী হয়েছেন, এটা তিনি বোঝাতে চান! কীভাবে তিনি বিজয়ী হয়েছেন আমি বুঝতে অক্ষম।
বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভক্তি আর আস্থার অভাবের সুযোগ নিতে পারে ইসরাইল। ইসরাইল আসলাম চৌধুরীকে দীর্ঘদিন ধরেই 'ফ্রেম' করেছিল, এটাও আমার বিশ্বাস। আজ যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোসাদের 'ষড়যন্ত্র' নিয়ে কথা বলেন, আমি তাতে অবাক হইনি। এই 'ষড়যন্ত্র' নস্যাৎ করতে তাই প্রয়োজন দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব দলের মধ্যে আস্থার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। ইইউর বক্তব্যেও ফুটে উঠেছে এ কথাটি। ইইউ 'গণতান্ত্রিক আচরণ নিশ্চিত' করার যে আহ্বান জানিয়েছে, এর মধ্যদিয়ে সেই 'আশ্বাস আর বিশ্বাস' স্থাপনের কথাটাই বলতে চেয়েছে। তাই জঙ্গি উত্থান কিংবা মোসাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে দুটি বড় দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
Daily Jai jai Din28.05.16

ভারতের পানি রাজনীতির অবসান হোক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নটি অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। দু’দেশের মধ্য দিয়ে ৫৪টি নদী প্রবাহিত হলেও শুধু একটি নদীর অর্থাৎ গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তি হলেও বাকি নদীগুলোর পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয়নি। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অতীতে একটি চুক্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। এই যখন পরিস্থিতি তখন ভারত থেকে আসছে নানা উদ্বেগজনক সংবাদ। এই সংবাদগুলো আমাদের শুধু উদ্বিগ্নই করেনি, আমাদের নানা ‘প্রশ্নের’ মাঝেও ফেলে দিয়েছে। এ সংবাদগুলো আসছে এমন এক সময় যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারত যদি ইতিবাচক সাড়া না দেয়, তাহলে তা দু’দেশের সম্পর্ককে প্রশ্নের মাঝে ফেলে দেবে। এতে করে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হবে, তা থেকে সুবিধা নেবে ‘তৃতীয় পক্ষ’।

অনেকগুলো উদ্বেগজনক খবর আমরা সম্প্রতি পেয়েছি- এক. গত ১৬ মে ভারতের পানি সম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৩০টি লিংক ক্যানালের মাধ্যমে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি সরিয়ে নেয়া হবে। দুই. গত ১০ মে (২০১৬) ফারাক্কা পয়েন্টে বাংলাদেশ মাত্র ১৬ হাজার কিউসেক পানি পেয়েছে। গত বছর এ সময় পানির প্রবাহ ছিল ৬৭ হাজার কিউসেক (সকালের খবর, ১৬ মে ২০১৬)। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এটা বাংলাদেশের সর্বনিু পানিপ্রাপ্তি। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী নভেম্বর (২০১৫) থেকেই পদ্মায় পানি নেই। যার ফলে সংকটে রয়েছে ২১ জেলার ১২০টি নদী। তিন. তিস্তার পানি বণ্টনের প্রশ্নে যখন একটি অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তখনই ভারত গ্রীধারি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করছে। ভারত থেকে নেমে আসা এ নদী ধরলার সঙ্গে মিলিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এখন বাঁধ দেয়ার ফলে শুষ্ক মৌসুমে ধরলায় ভয়াবহ নাব্য সংকট দেখা দেবে। ধরলা পরিণত হবে মরা গাঙে। আর বর্ষায় দেখা দেবে ব্যাপক ভাঙন। গ্রীধারি নদী ভারতে উৎপত্তি হয়ে লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের নামমাটারি এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীটি আনুমানিক সাড়ে চার কিলোমিটার বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লালমনিরহাট জেলার কুঠিবাড়ি দিয়ে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে এটি ধরলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। অতীতে শতবর্ষের এই ধরলায় ছিল স্বাভাবিক পানি প্রবাহ। এবার এই নদীর পানি শুকিয়ে ধুঁ ধুঁ বালুচরে পরিণত হয়েছে (সমকাল, ২২ মে)।

এই তিনটি উদ্বেগজনক খবরের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও অনেক ইস্যু। ক. টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভারত বারবার বলে আসছে, টিপাইমুখে এমন কিছু করা হবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। এ ধরনের কথা ভারত আন্তঃনদী সংযোগের ক্ষেত্রেও বলেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে ভারত এই প্রকল্পে হাত দিয়েছে। ফলে আশংকাটা হচ্ছে, ভারত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প নিয়েও এগিয়ে যাবে। খ. মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরের আগে তিনি কলকাতার একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশ আত্রাই নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে! স্পষ্টতই মমতা তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার জন্যই আত্রাই প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। এখন মমতা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। ফলে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে শংকা থাকলই।

আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প সংক্রান্ত খবর নতুন নয়। গেল বছর বাংলাদেশ একটি ‘নোট ভারবাল’ও পাঠিয়েছিল। ওই নোটে বাংলাদেশের ভয়াবহ ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিশেষ কমিটির পঞ্চম বৈঠকে মানস-সংকোস-তিস্তা-গঙ্গা সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে (সকালের খবর, ২৩ জুলাই ’১৫)। শুধু সরকারের পক্ষ থেকে নয়, বরং তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই ইস্যুতে (ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প) সরকারকে বিএনপি সব ধরনের সাহায্য করতে প্রস্তুত। আন্তঃনদী সংযোগ ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে দেনদরবারে বিএনপি সরকারকে ‘ব্লাইন্ড সাপোর্ট’ দেবে বলেও বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। ধারণা করছি, বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনও এই ইস্যুতে সরকারের

পাশে থাকবে।

তবে বিষয়টি ভারত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত কি-না এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। যদিও ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতীর নাম উল্লেখ করে সংবাদটি প্রচারিত হয়েছে, তারপরও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাখ্যা এতে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত অতি দ্রুত বিষয়টির ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া। সাধারণত ‘নোট ভারবাল’ একটি রুটিন ওয়ার্ক। এটা কোনো প্রতিবাদ নয়। ভারত যদি সত্যি সত্যি এ প্রকল্প কার্যকর করে, তাহলে তা হবে মোদির ঢাকা সফরের সময় যে ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার বরখেলাপ। কারণ ৬৫ দফা সংবলিত যৌথ ঘোষণাপত্রের ২১নং দফায় বলা হয়েছে- ‘হিমালয় অঞ্চলের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে না নেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।’ এখন ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতীর বক্তব্য কিংবা ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিশেষ কমিটির পঞ্চম বৈঠকের সিদ্ধান্তটি কি যৌথ ঘোষণার ২১নং দফার পরিপন্থী নয়? সুতরাং বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

এখানে বলা ভালো, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি মূলত আজকের নয়। এই প্রকল্প নিয়ে খোদ ভারতেই বিতর্ক রয়েছে। এই বিশাল নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরে ৩০টি নদীকে ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ৩১টি খালের মাধ্যমে সংযোগ প্রদান করে ১৫০ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করার জন্য। প্রকল্পটির মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাওয়া হবে গঙ্গায়। সেখান থেকে তা নিয়ে যাওয়া হবে মহানন্দা ও কাবেরীতে। গোদাবরির পানি নিয়ে যাওয়া হবে কৃষ্ণায় এবং সেখান থেকে পেনার ও কাবেরীতে। নর্মদার পানি নিয়ে যাওয়া হবে সবরমতিতে। এই বিশাল আন্তঃঅববাহিকা পানি প্রত্যাহার প্রকল্প সম্পন্ন করার কথা ২০১৬ সালের মধ্যে। ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট একটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকারকে এ প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার পরামর্শ প্রদান করেছিল (আগে নির্ধারিত ৪৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের মধ্যে)। কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে যে, গঙ্গা-কাবেরী সংযোগ প্রকল্প কোনো নতুন ধারণা নয়। এ প্রকল্প কৌশলগতভাবে অগ্রহণযোগ্য ও অবাস্তব হওয়ায় আগেই বেশ কয়েকবার পরিত্যক্ত হয়েছিল। এ কাজের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, ভারত সরকারের এই প্রকল্প তার ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর জন্য কী ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে, তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত সব রীতিনীতির প্রতি নিদারুণ উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়েছে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ওপর মারাত্মক আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। তাছাড়া এ প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার ভয়াবহ প্রকৃতিগত পরিবর্তন সাধিত হতে পারে। এ প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের যেসব ক্ষতি হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এভাবে- ১. বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বর্তমানে পাওয়া প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের যে পানি থাকার কথা, তা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে। ২. বাংলাদেশের মিঠা পানির শতকরা ৮৫ ভাগের উৎস হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা। ব্রহ্মপুত্র থেকেই শতকরা ৬৫ ভাগ পানি পায় বাংলাদেশ। এ প্রকল্পের কারণে এই পানিপ্রাপ্তি বিঘ্নিত হতে পারে। ৩. ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে ভূউপরিস্থ পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে আর্সেনিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। ৪. মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় মৎস্য উৎপাদন কমে যাবে এবং জল পরিবহন ব্যাহত হবে। ৫. পানির অভাবে কৃষি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তঃনদী সংযোগ নিয়ে আমাদের উদ্বেগ যখন বাড়ছে, তখন তিস্তার পানি বণ্টনের প্রশ্নটিও আমাদের জন্য আরেক চিন্তার কারণ। এটিও ঝুলে আছে।

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন’কে বিবেচনায় নেয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি তীরবর্তী রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানি সম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু এই ‘যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিটি’ উপেক্ষিত থাকে যখন পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। তিস্তার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হয়নি। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘জলপ্রবাহ কনভেনশন’ নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করে। এই নীতিমালার ৬নং অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার’ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ব্যবহার, অর্থাৎ এককভাবে তিস্তার পানির ব্যবহার এই ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা’র ধারণাকে সমর্থন করে না।

আমরা আরও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারব, যেখানে বাংলাদেশের অধিকারকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশ সংক্রান্ত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের ১৪নং অনুচ্ছেদ, জলাভূমি বিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদ- প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীসমূহের সংরক্ষণের যে কথা বলা হয়েছে, তা রক্ষিত হচ্ছে না। এখানে সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু কোনো রাজ্য (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) এমন কিছু করতে পারে না, যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে। সমস্যাটা ভারতের। পশ্চিমবঙ্গকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই।

তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মাঝে রয়েছে। আমরা চাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এ ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, মোদি সরকার একটি চুক্তিতে যেতে চায়। ইতিমধ্যে স্থলসীমানা চুক্তিতে সম্মতি দিয়ে মমতা ব্যানার্জি ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন। এখন তিস্তার ব্যাপারেও তিনি এমনটি করতে পারেন। এটা কঠিন নয়। তিনি যদি সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে তিনি কল্যাণ রুদ্র কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি নিজে এই কমিশন গঠন করেছিলেন। কলকাতার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রুদ্র কমিশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দেয়া রিপোর্টে বলেছে, পশ্চিমবঙ্গকে ক্ষতি না করেও বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আরেকজন পানি বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়। অধ্যাপক রায়ের অভিমত হচ্ছে, তিস্তায় পানি নেই এ কথাটা ঠিক নয়। পানি মজুদ রেখে (বর্ষা মৌসুমে) ও ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির বিজয় যখন নিশ্চিত হয়েছে, তখন সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে, যে ‘আস্থা ও বিশ্বাস রাখার’ কথা তিনি ঢাকায় বলে গিয়েছিলেন, তা তিনি রাখবেন কি-না? চতুর মমতা তিস্তা চুক্তি না করে উত্তরবঙ্গে তার আসন বাড়িয়েছেন। আগেরবার তার আসন কম ছিল। তিস্তা চুক্তি নিয়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের আপত্তি আছে। তিনি শুধু ভোটের রাজনীতি বিবেচনা করেই ঢাকায় এসেও তিস্তা চুক্তিতে সম্মতি দেননি। এখন ভোট শেষ। ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। এখন একটি ‘প্যাকেজ ডিলে’ তিনি যেতে পারেন, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতার বিনিময়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি ‘গ্রিন সিগনাল’ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে তিস্তায় পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তি হলেও তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সেটাই বড়

প্রশ্ন এখন।

এটা সত্য, ভারতে বড় ধরনের পানি সংকট চলছে। পানির অভাবে সেখানে কৃষকের আত্মহত্যার খবরও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালু করতে পারে না। কিংবা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না করে বাংলাদেশকে পানিশূন্য করতে পারে না। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক আহ্বান অতি জরুরি। গেল বছর ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েও বাংলাদেশ কোনো ‘উত্তর’ পায়নি। বাংলাদেশ শুধু ভারতের আশ্বাসের ওপর বসে থাকতে পারে না। Daily Jugantor 27.05.16

মমতার বিজয় ও তিস্তার পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ

২৭ মে ২০১৬ তারিখ মমতা ব্যানার্জি পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিতে যাচ্ছেন। গত ৪ এপ্রিল পশ্চিম বাংলার বিধান সভায় নির্বাচন শুরু হয়ে শেষ হয় ৫ মে। ১৯ মে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায় বিপুল ভোটে পশ্চিম বাংলার মানুষ মমতার তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজয়ী করেছে। বিপুল ভোটে তার এই বিজয় (২৯৪ আসনের ২১১টিতে তার দল জয়ী), কেন্দ্রের সঙ্গে ‘হিসেব-নিকেশ’ ইত্যাদি বিষয়ে তার অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। ইতোমধ্যে বিজেপি সভাপতি তাকে পুনরায় এনডিএ জোটে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য তার এই বিজয়ের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে তার সম্মতি একটি বড় ফ্যাক্টর। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মমতার সম্মতি ছাড়া কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি দু’ দুবার বাংলাদেশে এসেছেন। একবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। কিন্তু প্রতিবারই তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আমাদের হতাশ করেছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে তিনি অযাচিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিস্তায় বেশি পানি দাবি করেছিলেন। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছিল। ঢাকায় এসে তিনি বলেছিলেন, তিনি ‘কাঠবিড়াল হয়ে সেতুবন্ধনের’ মতো কাজ করে যেতে চান। অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে এক ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চান। কিন্তু তিনি কি তা করেছেন? না, করেননি। ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো আসার আগে তিনি বলেছিলেন নতুন এক কথা আত্রাই নদীতে বাংলাদেশ বাঁধ দিয়েছে। আর তাতে পশ্চিমবঙ্গ কম পানি পাচ্ছে! তিনি জানেন রাজনীতিকে কিভাবে জটিল করতে হয়। যেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাচ্ছে তিস্তার ব্যাপারে একটি সমঝোতা, সেখানে ‘আত্রাই প্রসঙ্গ’ নতুন করে উত্থাপন করে কৌশলী মমতা চাচ্ছেন তিস্তার প্রসঙ্গটি ‘ডিপ ফ্রিজ’-এ পাঠাতে। এটাই তার কৌশল। তিনি তিস্তায় পানি দেবেন না, যাতে করে বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে যে সম্পর্কের ‘নয়া অধ্যায়’-এর সূচনা হয়েছে তা একটি প্রশ্নের মধ্যে থাকুক! বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কারণে পশ্চিম বাংলায় বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়–ক, এটা মমতা কখনো চাননি। পশ্চিম বাংলার উত্তরাঞ্চলে (তিস্তার পানির ওপর যারা নির্ভরশীল) তার জনপ্রিয়তা তলানিতে ছিল। ‘ভোটের হিসাবে’ তিনি তাই চাননি তিস্তার পানি বণ্টন হোক। তিনি দেখাতে চেয়েছেন তিনিই প্রকৃত বাংলাদেশের বন্ধু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘হাসিনা দিদি’ হিসেবে সম্বোধন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন তিনি আন্তরিক! প্রটোকল তার কাছে মুখ্য ছিল না, ছিল গৌণ। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যে এভাবে প্রকাশ্যে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করা যায় না, মমতা ব্যানার্জির বিবেচনায় এটা আসেনি। সেবার তার জন্য গণভবনে দুপুরের খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছিল। ১২ পদের খাবারের তালিকায় ইলিশ ছিল ৩ পদের। সবাই জানেন বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি মমতার বিশেষ টান আছে। আগে মমতা যখন দিল্লিতে রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে যারাই মমতার বিজয় ও তিস্তার পানি চুক্তির ভবিষ্যৎনয়াদিল্লি গেছেন (বিশেষ করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী), তারা অবধারিতভাবেই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘পদ্মার ইলিশ।’ তাই ইলিশ প্রসঙ্গ এসেছিল (আপাতত রফতানি বন্ধ)। মমতার সফরে কিন্তু সারা জাতি ও মিডিয়া তখন তাকিয়ে ছিল মমতা তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার অনাপত্তির কথা জানিয়ে যাবেন। কেননা তিস্তায় পানি বণ্টনের সমস্যা একটাই আর তা হচ্ছে মমতা। মমতার আপত্তির মুখে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। এমনকি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনো মমতার আসার কথা ছিল। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী আসলেও শেষ মুহূর্তে মমতা তার আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। ফলে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি আর হয়নি। এরপর অনেক সময় পেরিয় গেছে। কিন্তু তিস্তার ব্যাপারে মমতার দৃষ্টিভঙ্গির কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি দু’ দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন এ কথাটা। এর আগে ভারতীয় হাইকমিশন কর্তৃক আয়োজিত ‘বৈঠকি বাংলা’য়ও মমতা নিজেই বলেছিলেন তার ওপর ‘আস্থা’ রাখতে! স্থল সীমানা চুক্তি নিয়ে তার আপত্তি নেইÑএটা অবশ্য তিনি প্রমাণ করেছেন। ঢাকাতেও এ কথাটা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন মমতা। কিন্তু তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার ‘কমিটমেন্ট’ কোথায়? সোজা সাপটা হিসাব হচ্ছে তিনি ঢাকায় এসে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কোনো ‘কমিটমেন্ট’ করে যাননি। তিস্তার পানির ব্যাপারে তার স্বার্থ অনেক বেশি। এখন সেখানে বিধানসভার নির্বাচন শেষ। এটাকে তিনি বিজেপির হাতে তুলে দিতে চাননি। উত্তরবঙ্গে পানির চাহিদা বেশি। মমতা এটা জানেন ও বোঝেন। বলা ভালো, ১৯ ফেব্রুয়ারি (২০১৪) পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে তিস্তায় পানির সর্বনি¤œ প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল। এটা কাকতলীয় কি না জানি না। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ক’টি বিষয় অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল তার মাঝে তিস্তার পানি বন্টন অন্যতম। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটা আগ্রহ থাকলেও শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। সেই মমতা ব্যানার্জিই এখন আবার ক্ষমতায় এলেন। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকা আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। তিস্তায় পানি বণ্টনের ব্যাপারে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি (২০১৫) সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসের প্রথম ৫ দিনে তিস্তায় পানি প্রবাহ ছিল ৫০০ কিউসিকের নিচে। সেচ প্রকল্পের পানি দেযা দূরের কথা, শুধু নদী বাঁচানোর জন্যই দরকার এক হাজার কিউসেক। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা আজ মৃত্যুমুখে। গত নভেম্বর থেকেই তিস্তায় পানি প্রবাহ কমতে থাকে। বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীতে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পানি প্রবাহ রেকর্ড হয়। ফেব্রুয়ারি (২০১৫) মাসের প্রথম চার দিনের হিসাবে দেখা গেছে, প্রথম দিন পাওয়া গেছে ৪২৬ কিউসেক, দ্বিতীয় দিন ৪৭৫ কিউসেক, তৃতীয় দিন ৪৪৫ কিউসেক, আর চতুর্থ দিন ৪১৬ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয় (সকালের খবর, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। যৌথ নদী কমিশন সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর আগে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানি প্রবাহ ভালো ছিল বলে তুলনার জন্য এই সময়কালের হিসাবকে ঐতিহাসিক গড় প্রবাহ ধরা হয়। ওই ১২ বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে পানি প্রবাহ ছিল ৫৯৮৬ কিউসেক। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৯৬৩ কিউসেকে। এরপর তা নেমে যায় ৫০০ কিউসেকের নিচে। অথচ নদী রক্ষার জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক পানি। আর বিদ্যমান সেচ প্রকল্পের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি ‘নোট ভারবাল’ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। মমতা ব্যানার্জির প্রথম ঢাকা সফরের আগে আমরা অনেক প্রত্যাশার কথা শুনেছি। তবে এটা সত্য, তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে এটা সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতি নির্ধারকরা যদি বিষয়টিকে হাল্কাভাবে দেখেন তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ খুব বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে করে বাড়বে। মনে রাখতে হবে তিস্তায় পানি প্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থন এটা বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খাড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্দা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দু দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনের শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’ দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই অতীতে মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরো একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানি বণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে ক্রমেই। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচ কাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা বরাবরই মমতার জন্য একটি ‘রাজনৈতিক ইস্যু।’ সুতরাং মমতা তিস্তা চুক্তি করে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করবেন এটা আমার কখনই বিশ্বাস হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয় তা হচ্ছে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের ওপর ‘চাপ’ অব্যাহত রাখা। আমরা ভারতের অনেক ‘দাবি’ পূরণ করেছি। নরেন্দ্র মোদির আমলে সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে দু দেশের সীমানা এখন চিহ্নিত। দু দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর মমতা যদি তার ওপর রাখা আস্থার প্রতিদান না দেন, তাহলে তা যে দু দেশের সম্পর্কের মাঝে একটা অবিশ্বাসের জš§ দেবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে রুদ্র কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে পারেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই পানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব বলে সুপারিশ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়ও এই সুপারিশ সমর্থন করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই মমতা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ঢাকায় আসার আগে আত্রাই প্রসঙ্গটি তুলে তিনি একটি ‘জট’ লাগিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ আত্রাই-এর সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি এক করে দেখেছেন। এটি একটি ভিন্ন বিষয়। আত্রাই নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তিস্তায় পানি প্রাপ্তি আমাদের অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে অন্য কোনো ইস্যুর তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিকে সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সমুদ্র সীমানাও নির্ধারিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক আসরে। ‘দ্বিপাক্ষিক’ আলোচনায় সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়নি। আমাদের জরুরি প্রয়োজনে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আসরে উত্থাপন করা যেতে পারে। কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়টি ঝুলে থাকতে পারে না। Daily Manobkontho 26.05.16

মমতার বিজয় কি আমাদের দিগন্তে কোনো রুপালি রেখা?

শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস আবারও বিজয়ী হল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে। ২০১১ সালের নির্বাচনের চেয়ে এবার আরও ৩০টি আসন বেশি পেয়েছে তৃণমূল। ২৭ মে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। নির্বাচনের আগে জাতীয় কংগ্রেস ও বাম জোট একত্রিত হয়েছিল। কিন্তু তারা নিজেদের মমতার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। মমতা ছিলেন একাই একশ’। তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গ্রহণ করে নেয়নি। উপরন্তু জাতীয় কংগ্রেস ও বাম জোট ‘ঐক্য’ করলেও অনেক আসনেই বামরা কংগ্রেসের ভোট পায়নি বলে সংবাদপত্রের খবর। বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস যখন একাই ২১১টি আসন পায় (জাতীয় কংগ্রেস ৪৫, বাম ২৮, বিজেপি ও অন্যান্য ৭), তখন বুঝতে হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার অবস্থান অনেক শক্তিশালী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খোদ নিজে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেও মমতার ‘অবস্থান’ নড়াতে পারেননি। ফলে আগামী দিনগুলো মোদির জন্য যে খুব সুখের হবে, তা বলা যাবে না। তবে মোদির প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে আসামে বিজেপির বিজয়। সেখানে কংগ্রেস সরকারের পতন হয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিজয়ে আমরা কতটুকু আশাবাদী হব? তিস্তার পানি বণ্টনের প্রশ্নে মমতা ব্যানার্জির নাম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। এটা এখন স্পষ্ট যে, মমতা ব্যানার্জির কারণেই তিস্তা চুক্তিটি হয়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে নীতিগতভাবে রাজি হলেও শুধু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে চুক্তিটি হয়নি। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় মমতা তার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। পরেও এসেছিলেন একবার। বলেছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। তখন সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের (উত্তরবঙ্গ) কারণে তিনি কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ এতে করে বিজেপি এটাকে ইস্যু বানিয়ে ফেলতে পারে। তাই নির্বাচনের পর এখন বাংলাদেশের অনেকের প্রশ্ন- মমতা কি এখন রাজি হবেন একটি চুক্তি করতে? রুদ্র কমিশনের সুপারিশমালা তার কাছে আছে। এ কমিশনটি তিনিই করেছিলেন। অধ্যাপক কল্যাণ রুদ্র তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশকে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এমন মতামতও দিয়েছিলেন যে, ‘ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমারও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন বলে কলকাতার পত্রিকাগুলো আমাদের জানিয়েছিল। তবে যতদূর জানা যায়, মমতা ব্যানার্জি রুদ্র কমিশনের ব্যাপারে খুশি ছিলেন না, যে কারণে এ কমিশনের রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি রুদ্র কমিশনের সুপারিশকে বিবেচনায় নেবেন কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। তবে এটাও সত্য, তার কাছে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ আগে। কেন্দ্র তাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তিনি মোদির সঙ্গে একটি ‘সমঝোতায়’ যেতে পারেন। যেমন একটি সমঝোতায় তিনি স্থল সীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হতো না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মমতার ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ- এ তিনটি রাজ্য এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছিলেন এই তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা এসেছিলেন। তিস্তা এখানে প্রধান ছিল না। অনেক পরিকল্পনা মমতা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যদি না কেন্দ্র আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করে। তখন সামনে নির্বাচন ছিল। মমতা তাই ঝুঁকিটি নিতে চাননি। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইর একটি চাপও ছিল মমতার ওপর। সারদা কেলেংকারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর সিবিআইর নজরদারি ছিল বেশি। ফলে এই ‘চাপ’কে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হয়েছিলেন। কোনো চুক্তি করতে নয়। এখন মমতা ব্যানার্জি পুনরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দিতেও পারেন! অমিত শাহের গলায় সেই সুর। এক সময় তিনি এই জোটে ছিলেন। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ের পর ওসব কেলেংকারি থেকে ‘মুক্ত’ হতে তিনি যদি আবারও এনডিএ জোটে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! তার ওপর আস্থা রাখা কঠিন। যতদূর জানা যায়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেননি একটাই কারণে। আর তা হচ্ছে, মমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনঃপূত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। ঢাকা সফরের আগে মোদি তাকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সঙ্গে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন। মমতা কথা বলেছিলেন। কূটনৈতিক ভাষায় বলেছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। এখন নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং মমতা বিজয়ী হয়েছেন। তিনি আগামী ৫ বছরের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। বিহারে নীতিশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে (বিহারের রাজধানী পাটনায়) যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটা মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার কোনো সহাবস্থান হয়নি। জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য করেছিল বামফ্রন্টের সঙ্গে। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার ঐক্য না করার বিষয়টি কেন্দ্রে মোদি সরকারকে খুশি করে থাকবে। ফলে মমতা যদি না চান, তাহলে তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে মোদি সরকার তাকে চাপ দেবে না। আমাদের জন্য তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার স্বীকৃত। ভারত (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ তা-ই করছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পানিশূন্য হচ্ছে। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম থেকে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো ‘তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি’ এ দাবি তুলে ‘বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না’ এই দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানি বণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধু নামেই আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত। এক্ষেত্রে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে। ভারতকে আমরা ট্রানজিট দিয়েছি। ভারত থেকে আমরা বিদ্যুৎ কিনছি। বিবিআইএন নামে নতুন একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্ম হয়েছে। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা যদি ‘কাজ’ করে, তাহলে বদলে যাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি। বাংলাদেশ এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে উপকৃত হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘জটিলতা’ এখনও রয়ে গেছে। সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার ঘোষণা, অবৈধ অভিবাসীদের কথা বলে বাংলাদেশকে কটাক্ষ করা, সীমান্তে হত্যা অব্যাহত রাখা ইত্যাদি বিষয় দু’দেশের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিও। মমতা ঢাকায় এসে বলেছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য মানুষ আস্থা ধরে রাখতে পারে না। এর সমাধান বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জিকেই এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকায় তিনি বলেছিলেন, তিনি ‘কাঠবিড়ালির’ মতো ভূমিকা পালন করতে চান দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে। এখন তিনি অনেক সংহত। ভোটে হেরে যাওয়ার ভয় তার নেই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কিংবা বাম জোটও তার জন্য কোনো ফ্যাক্টর নয়। তাই আমরা চাই ‘কাঠবিড়ালি’ নয়, বরং তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে তিনি নিজে উদ্যোগ নেবেন। রুদ্র কমিশন যে ‘ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি’ ব্যবহারের কথা বলেছেন, সে অনুযায়ী অর্থাৎ প্রাপ্ত পানি ধরে রাখা ও তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এখন উদ্যোগটি নিতে পারেন মমতা স্বয়ং। না হলে বাংলাদেশকে তার পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ‘বিকল্প’ ভাবতে হবে। Daily Jugantor 21.05.16