রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট




যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। দুজন প্রার্থী, হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক আর রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশনে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন। সেই থেকে বিতর্কের মাত্রাটা বেড়েছে। দুজন প্রার্থীই নানা বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন এরই মধ্যে। গত ৭ সেপ্টেম্বর এনবিসির সিকিউরিটি ফোরামের বিতর্কে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে অনেক বেফাঁস মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ওবামার চেয়ে ভালো প্রেসিডেন্ট মনে করেন। তিনি হিলারি ক্লিনটনের সমালোচনা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, সাবেক ফার্স্ট লেডি এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আগামী ৮ নভেম্বর যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, তাতে ডেমোক্রেটিক পার্টি তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাল। ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার পর বিগত ২৪০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারী কখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এই প্রথম একজন নারী এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সেটা হবে আরেক ইতিহাস। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলন তথা নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে এটা হবে একটি মাইলফলক। পাঠকদের জানিয়ে রাখি, যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বড় অর্থনীতি ও বড় গণতন্ত্রের দেশ হলেও এখানে নারীদের ভোটের অধিকারের বয়স মাত্র ৯৬ বছর। দীর্ঘদিন এখানে নারীদের ভোটের অধিকার দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে নারী আন্দোলনের ইতিহাসও বিভিন্ন গল্পে পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের মনোনয়ন পাওয়া এখানকার নারী আন্দোলনকে আরো উজ্জীবিত করবে। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কনজারভেটিভ সোসাইটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব সীমিত। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলে, কংগ্রেসে ৫৩৫টি আসনে (সিনেট ১০০, প্রতিনিধি পরিষদ ৪৩৫) মাত্র ১০৭ জন নারী আইন প্রণেতা রয়েছেন (ডেমোক্র্যাট ৭৬ জন, রিপাবলিকান ২৮ জন)। সিনেটে নারী প্রতিনিধি রয়েছেন ২০ জন (২০ শতাংশ), আর প্রতিনিধি পরিষদে রয়েছেন মাত্র ৮৪ জন (১৯.৩ শতাংশ)। সুতরাং এই সীমিত প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে নারীর পূর্ণ অধিকার রক্ষিত হয়েছে, এটি বলা যাবে না। হিলারি ক্লিনটনের এই মনোনয়ন যুক্তরাষ্ট্রের নারী সমাজের জন্য বড় ধরনের একটি অগ্রগতি। ১৮৪৮ সালে সেনেকা ফলস কনভেনশনে (Seneca Falls  Convention) প্রথমবারের মতো নারীদের ভোটাধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল। আর ওই কনভেনশনের ১৬৮ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র এবার একজন নারী প্রার্থী পেল, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রায় প্রতিদিনই হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেকেই করার চেষ্টা করছেন, তা হচ্ছে এই দুজনের একজন যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন এবং ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করবেন তখন কি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে? ট্রাম্পের অভিযোগ, হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে ওবামা প্রশাসনের নীতিই তিনি অব্যাহত রাখবেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা আইএসকে সৃষ্টি করেছিল এবং হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে আইএস আরো শক্তিশালী হবে ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা আরো ঝুঁকির মুখে থাকবে। ট্রাম্পের আরো অভিযোগ, ওবামা টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তি করে অনেক মার্কিনির চাকরি হারানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে এই চুক্তি তথা নাফটা চুক্তির (কানাডা, মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে মুক্তবাজার) ব্যাপারে তিনি পুনর্মূল্যায়ন করবেন। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের অর্থনৈতিক ‘প্রভাব’ বাড়ছে। এই প্রভাব তিনি কমাতে চান। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবিরের বক্তব্য হচ্ছে, ট্রাম্প অতিমাত্রায় দক্ষিণপন্থী, যুদ্ধংদেহী। তিনি প্রয়োজনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু করে দিতে পারেন! তিনি অতিমাত্রায় রাশিয়াপন্থী। রাশিয়ায় তাঁর বিশাল বিনিয়োগ আছে। পুতিনকে তিনি ওবামার চেয়েও যোগ্য নেতা মনে করেন। ফলে ট্রাম্পের অতি ‘রাশিয়াপ্রীতি’ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। ট্রাম্প মূলত মুনাফা অর্জনই বোঝেন। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের সামাজিক কাঠামোর মানোন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর কোনো কমিটমেন্ট নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মুসলমান ও মেক্সিকানবিদ্বেষী। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার কথাও বলেছেন তিনি। তিনি সেনাবাহিনীর ‘গৌরব’কে আঘাত করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে ডেমোক্র্যাট শিবিরের পক্ষ থেকে। হিলারি যখন সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন, বেতন বৃদ্ধি, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন, সেখানে ট্রাম্প গুরুত্ব দিয়েছেন অভিবাসন রোধ করা ও চাকরির সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদির ওপর।
৮ নভেম্বর নির্বাচন। দুই প্রার্থীই চূড়ান্ত মনোনয়নের পর প্রচারণায় ব্যাপক অংশ নিচ্ছেন। হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্য, অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলা, মধ্যবিত্তকে আকৃষ্ট করা, স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা, টিম কেইনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া। সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থান এখন শক্তিশালী বলেই মনে হয়। অন্যদিকে ট্রাম্পের কোনো বক্তব্যই সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তিনি পুরনো রাজনীতিবিদও নন। ওয়াশিংটন ডিসির রিপাবলিকান শিবিরেও তিনি খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। ৭০ বছর বয়সী ট্রাম্প বিপুল অর্থবিত্তের (ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) মালিক হলেও ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি একবার রিফর্ম পার্টির হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। তিনি অতীতে কখনো কোনো ‘রাজনৈতিক পদ’ গ্রহণ করেননি। টিভি উপস্থাপকও ছিলেন (রিয়ালিটি শো, এবিসি)। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনের রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণাঢ্যময়। তরুণ আইনজীবী হয়ে তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। করপোরেট আইনজীবী না হয়ে তিনি শিশু অধিকার, মাতৃ অধিকার নিয়ে তাঁর কর্মময় জীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ফার্স্ব লেডি, নিউ ইয়র্কের সিনেটর এবং সর্বশেষ সেক্রেটারি অব স্টেট বা বিদেশমন্ত্রী। তুলনামূলক বিচারে রাজনীতি, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে তাঁর স্পষ্ট ধারণা রয়েছে এবং তিনি অভিজ্ঞ। পররাষ্ট্র তথা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই। ন্যাটো প্রশ্নে, আইএস প্রশ্নে, ব্রেক্সিট প্রশ্নে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অজ্ঞতাই স্পষ্ট হয়েছে। নাফটা ও টিপিপি চুক্তির ব্যাপারেও তাঁর অবস্থান হিলারির বিপরীতে। তিনি মনে করেন, নাফটা ও টিপিপি চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বেড়েছে। অথচ হিলারি মনে করেন, এই দুটি চুক্তির কারণে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে বেশি। ট্রাম্প মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চান। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন, মেক্সিকানরা মার্কিন অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন আছে ট্রাম্পের। ডেমোক্র্যাটরা গত আট বছরে (ওবামা প্রশাসনে) যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের হাতে তুলে দিয়েছে—এই অভিযোগ ট্রাম্পের। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন, চীনের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কই নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার অন্যতম শর্ত। ওবামার শাসনামলে আইএসের জন্ম হয়েছে এবং এ জন্য ডেমোক্র্যাটরাই দায়ী, ট্রাম্পের এ ধরনের অভিযোগ স্বীকার করেন না হিলারি ক্লিনটন। হিলারি বলেছেন, তিনি বিদেশমন্ত্রী থাকার সময় ১২২টি দেশ সফর করেছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মাইল ভ্রমণ করেছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যই। অথচ ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। তবে ট্রাম্পের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, তিনি সোজাসাপ্টা কথা বলেন। আক্রমণ করে কথা বলেন, যা হিলারি পারেন না কখনো। তিনি তাঁর বক্তৃতায় ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন সত্য, কিন্তু তা অনেক মার্জিত ভাষায়। তাই একটি প্রাক-গবেষণায় (সিন কোলারোসি কর্তৃক পরিচালিত) যখন হিলারিকে সর্বোচ্চ নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে বিজয়ী হবেন বলে মন্তব্য করা হয়, আমি তাতে অবাক হই না। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে ৫৩৮ জন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে হিলারি পাবেন ৩৪৭ ভোট আর ট্রাম্প পাবেন ১৯১ ভোট। নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ে।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিতর্ক ঘিরে ধরেছে দুই প্রার্থীকে। হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিতর্ক তাঁকে যথেষ্ট ভোগাচ্ছে। সর্বশেষ এনবিসির বিতর্কেও তিনি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি যখন বিদেশমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি বিদেশ মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্ধারিত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে বিদেশে যোগাযোগ করেছেন। ওই সব ই-মেইলের কিছু অংশ ফাঁস হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ট্রাম্পের প্ররোচনায় রাশিয়ার হ্যাকাররা এই ই-মেইল ফাঁস করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হিলারি ক্লিনটনের বাকি সব ই-মেইল প্রকাশ করা হোক। এটা নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের জন্য একটি মাইনাস পয়েন্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বিপদে আছেন। ডেমোক্র্যাট শিবির তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার। তাঁর স্ত্রী (তৃতীয়) মেলানিয়ার মধ্য নব্বইয়ে তোলা নগ্ন ছবি (তিনি ফটো মডেল ছিলেন) প্রকাশিত হয়েছে, যা ট্রাম্পকে বিব্রত করেছে। সব মিলিয়ে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। তবে চূড়ান্ত বিচারে পাল্লা কোন দিকে হেলে পড়ে, এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। ১১টি রাজ্যের কথা বলা হচ্ছে (কলোরাডো, ফ্লোরিডা, আইওয়া, মিশিগান, নেভাদা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইয়ো, পেনসিলভেনিয়া, ভার্জিনিয়া ও উইসকনসিন) যাদের বলা হচ্ছে ‘ব্যাটেল গ্রাউন্ড স্টেটস’। এই রাজ্যগুলো বিগত দুটি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব রাজ্যের ভোটাররা এখনো দ্বিধাবিভক্ত। তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সমর্থন কোনো প্রার্থীর পক্ষেই নেই। কখনো তারা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করে, কখনো রিপাবলিকানদের। এত দিন পর্যন্ত জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্প ব্যবধান অনেকটা কমিয়ে এনেছেন। ফলে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
Daily Kalerkontho
22.09.2016

চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব কি বড় সংঘর্ষের জন্ম দেবে



চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হ্যাংঝুতে সদ্য শেষ হওয়া জি-২০ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন করে আবারও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের দুইটি বড় অর্থনীতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশ দুইটি জি-২০ এর সদস্য। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতির দেশগুলোকে নিয়ে জি-২০ গঠিত। প্রতি বছরই একবার করে এ দেশগুলো একটি শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়। এবারও তারা মিলিত হয়েছিল চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হ্যাংঝুতে। কিন্তু এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তিক্ততার জন্ম হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন হ্যাংঝুতে পৌঁছলেন তখন তাকে প্রটোকল অনুযায়ী লালগালিচা সংবর্ধনা জানানো হয়নি। অথচ জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেয়া অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের, বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। ওবামাকে লালগালিচা সংবর্ধনা না দেয়া ছিল অনাকাক্সিক্ষত। এজন্য চীন কোনো দুঃখ প্রকাশও করেনি। এমনকি ওবামার সফর সঙ্গীদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার পর্যন্ত করা হয়েছিল। ওবামার জি-২০ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যেও চীনের প্রতি এক ধরনের ‘হুমকি’ ছিল। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যে দ্বন্দ্ব এবং সেখানে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র যে অখুশি, তাও ওবামার বক্তব্যে ফুটে উঠেছিল। সম্মেলনে ওবামা বলেছিলেন, চীন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করলে, তাকে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে। সিএনএনের ফারিদ জাকারিয়াকে ওবামা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা করে, চীন দায়িত্বশীল আচরণ করবে। এ ধরনের মন্তব্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ফিলিপাইনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক আদালত সম্প্রতি একটি রায় দিয়েছেন। তাতে তারা বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জের ব্যাপারে চীনের দাবি অযৌক্তিক। বলা ভালো, শুধু ফিলিপাইনেই নয়, বরং ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া এমনকি জাপানেরও দাবি রয়েছে এ দ্বীপগুলোর ব্যাপারে। আন্তর্জাতিক আদালত ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিলেও চীন তা মানছে না। যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় তার সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ফলে সঙ্গত কারণেই চীন মার্কিন কর্মকা-ে অখুশি। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তার সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গেও একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই চুক্তিটি, যা লেমোয়া (LEMOA- Logistic Exchange Memorandum of Agreement) নামে অভিহিত, তা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ চুক্তি ভারতকে আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও দুইটি চুক্তি নিয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে এবং ধারণা করছি, শিগগিরই ভারত এ দুইটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করবে। এর একটি হচ্ছে সিসমোয়া (CISMOA- Communications Interpretability and Security Memorandum of Agreement) এবং অপরটি হচ্ছে বেকা (BECA- Basic Exchange and Cooperation Agreement for Geospatial Cooperation)। সিসমোয়া চুক্তির ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব তথ্য পাবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ‘বেকা’ চুক্তির আওতায় বিভিন্ন স্থানের ডিজিটাল মানচিত্র ও সমীক্ষা রিপোর্টের ব্যবহারের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং এ ধরনের চুক্তির ধরন এবং এর ব্যবহার যে ভারতকে আরও বেশি মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রায় ১৬ বছর যাবৎ ভারতের রাজনীতিতে, বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এর ফলে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণসহ সব ধরনের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যা শুধু অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সরবরাহ করছে। ভারত এখন নিউক্লিয়ার সাপ্লাইস গ্রুপ বা এনএসজি’র সদস্য হতে চায়, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতকে এ অঞ্চলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মনে করে, একুশ শতকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য প্রণীত নীতির আওতাভুক্ত। এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন, এ অঞ্চলের তিনটি শক্তির (চীন, ভারত, জাপান) মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলের গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওবামার ‘Pivot to Asia’ পলিসির প্রধান বিষয় হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। এ অঞ্চলের উত্থান-পতনে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূমিকা রাখতে চায়। চীনের ভূমিকাকে খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা দু’দুবার ভারত সফর করেছেন। প্রতিবারই তিনি বিশাল এক ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারত গেছেন এবং একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। শুধু তাই নয়, ওবামা তার ভারত সফরের সময় ভারতের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এতেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলের ব্যাপারে তার একটা স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৬ সালের মার্চে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘রাইমিনা ডায়ালগে’ যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ষষ্ঠ ফ্লিটের প্রধান অ্যাডমিরাল হ্যারি হারিস এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন। তবে এ ধরনের  প্রস্তাব নতুন নয়। জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজে আবে এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন ২০০৬-০৭ সালে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রস্তাব Quadrilateral Initiative হিসেবে পরিচিত। এ থেকেই বোঝা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের Pivot to Asia পলিসির আসল উদ্দেশ্য কী। চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি বৃদ্ধি ও দক্ষিণ চীন সাগরের চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামে সাপ্লাই লাইনের জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য তাই পরিষ্কারÑ এ অঞ্চলভুক্ত জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতকে সংযুক্ত করে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি বুঝতে আমাদের সহজ হবে যদি আমরা অতি সাম্প্রতিক এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, তার দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্র গেল জুলাইয়ে (২০১৬) ফিলিপাইনের নৌবাহিনীকে USA Boutwell নামে একটি বড় ধরনের ডেস্ট্রয়ার সরবরাহ করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ রাখা ও প্রয়োজনে চীনা জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা। বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সঙ্গে Enhanced Defense Cooperation নামে একটি চুক্তি করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে আসছে। এ চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা অথবা মেরিন সেনাকে স্থায়ীভাবে মোতায়েনের সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে South East Asia Maritime Security Initiative (MSI) এর আওতায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র South East Asia Maritime Law Enforcement Initiative গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমুদ্রসীমার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও প্রশিক্ষণ দেয়া। মূল কথা একটাইÑ চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে দাঁড় করানো।
চীনের জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব অনেক। এ কারণেই চীন চায় না তার প্রভাবাধীন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তি সামরিক তৎপরতা চালাক। শুধু স্ট্র্যাটেজিক কারণেই এ এলাকার গুরুত্ব বাড়েনি, বরং বাণিজ্যিক রুট হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুট এটি। বছরে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য এ পথে পরিবহন করা হয়। বিশাল এক জ্বালানি রিজার্ভ রয়েছে এ অঞ্চলে। প্রায় ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল, ১৯০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস ও ১০ মিলিয়ন টন মাছের এক বিশাল ভা-ার রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। চীনের জ্বালানি সুধা’র কথা সবাই জানে। চীন তার অর্থনৈতিক কর্মকা- অব্যাহত রাখতে হলে তার জ্বালানি প্রয়োজন। চীন তার জ্বালানি চাহিদা মেটায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সুতরাং চীন খুব স্বাভাবিকভাবেই চাইবে, দক্ষিণ চীন সাগরের নিচে যে বিশাল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তা ব্যবহার করতে। কিন্তু মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর লোলুপদৃষ্টি পড়েছে এ অঞ্চলের দিকে। আর তাদের স্বার্থে কাজ করছে মার্কিন সেনা ও নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী দাবি করছে, তাদের সাপ্লাই রুটের জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের সামুদ্রিক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনে মার্কিন মেরিন সেনাদের সহায়তার জন্য এ রুটটির নিরাপত্তা তারা চায়। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ভিন্নÑ সাপ্লাই রুটের নাম করে এ অঞ্চলে যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের ওপর এক ধরনের ‘চাপ’ প্রয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যে সৎ নয়, তা বোঝা যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। Foreign Military Financing কিংবা Development of Asian Reassurance এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামকে সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে, যার অন্যতম একটি দিক হচ্ছে প্রশিক্ষণ দেয়া ও ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে সহযোগিতা করা। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অন্যদিকে ভারতও ভিয়েতনামকে ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত ভিয়েতনাম নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত রয়েছে। ভারতের নৌবাহিনীর চারটি জাহাজকে দক্ষিণ চীন সাগরে সম্প্রতি মোতায়েন করা হয়েছিল। এজন্যই অনেকের দৃষ্টি এখন দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে। অনেকেই ধারণা করছেন, দক্ষিণ চীন সাগরের বিশাল জ্বালানি রিজার্ভের কারণে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষ অনিবার্য! কীভাবে চীনে আক্রমণ চালানো হবে, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠিত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক (গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান) RAND একটি সিরিয়াস গবেষণা কর্মও পরিচালনা করে। বলা হয়ে থাকে, পেটাগনের উদ্যোগ এবং অর্থায়নে এ গবেষণা কর্মটি পরিচালিত হয়েছে। সিরিয়াস পাঠকরা War with China শীর্ষক গবেষণা কর্মটি ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খুঁজে দেখতে পারেন।
বিশ্ব রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। এক সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে প্রভাব বলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তি, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ এর জন্ম হয়েছিল, যা ইতিহাসে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। দীর্ঘ ৪৬ বছর, অর্থাৎ ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এ স্নায়ুযুদ্ধ বহাল ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধেরও অবসান ঘটে। আজ দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন আর ইউরোপ দুই পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) মাঝে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রভূমি নয়। বরং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল হচ্ছে এমন একটি জায়গা, যাকে কেন্দ্র করে নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হচ্ছে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট হচ্ছে চীন! এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’। এখন চীনকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়েই নতুন করে তৈরি হয়েছে আরেকটি ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি’। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্দেশ্যকে চীন যে চ্যালেঞ্জ জানাবে, এটাই স্বাভাবিক। হ্যাংঝুতে চীন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্বে স্থিতিশীলতার জন্য চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। এ দুইটি দেশের মাঝে সম্পর্কের যদি অবনতি ঘটে, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়াবে মাত্র। বিশ্ব আসরে চীন ও রাশিয়া এক কাতারে অবস্থান করছে। চীন সিরিয়া সংকটে যুদ্ধ বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থবিরোধী। সুতরাং চীন-মার্কিন সম্পর্ক এখন কোন দিকে যায়, সেদিকে লক্ষ থাকবে অনেকের।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
18.09.2016

জঙ্গিবাদ দমনে মার্কিন সহযোগিতা প্রশ্নে কিছু কথা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকা ও নয়াদিলি্ল সফরের সময় জঙ্গিবাদ দমন প্রশ্নে দুটো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক. কেরির ভাষায় 'আমরা বলেছি আইএসের নেটওয়ার্ক দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। তারা দেশীয় সংগঠনের সাথে যুক্ত'। আল জাজিরা আর রয়টার্সের প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে জন কেরি মনে করেন বাংলাদেশে আইএস আছে। দুই. জঙ্গি দমনে অতিরিক্ত গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগমূলক সহযোগিতার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র এক হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ভয়েস অব আমেরিকা আমাদের তিনজনের ডালাস থেকে আমি, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলী রিয়াজ এবং ঢাকা থেকে ইশফাক এলাহি চৌধুরীর সঙ্গে এক টেলি কনফারেন্সের আয়োজন করে। ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক শ্রোতা প্রশ্ন করেন। সবার প্রশ্নের ধরন ছিল একটিই_ যুক্তরাষ্ট্র যে সহযোগিতার কথা বলছে, তাতে করে কী জঙ্গি দমন কার্যক্রম সফল হবে? ভোক্তার শ্রোতাদের পাশেই যে এই প্রশ্নের উদ্বেগ করেছে, তেমনটি নয়। বরং দেশে অনেকের মনেই এ ধরনের প্রশ্ন উঠেছে যে এই সহযোগিতার ধরনটি আসলে কেমন হবে? এবং জঙ্গি দমনে আমরা সফলতা পাব কিনা? কেননা যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গি দমনে যেখানেই হাত বাড়িয়েছে (আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক) সেখানে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে বৈ কমেনি। ভারতেও তিনি জঙ্গিবাদের কথা বলেছেন। কিন্তু কোনো সহযোগিতার কথা বলেননি। ভারত এ ধরনের সহযোগিতা কখনো চায়ওনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের সময় একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাতে মার্কিন বিমান ভারতীয় বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে জঙ্গিবিরোধী যে কোনো অভিযানে ভারতীয় ঘাঁটি ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকল। আমি এর আগের লেখাগুলোতে বলতে চেষ্টা করেছি যে জঙ্গিবাদ আজ একমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে এই সমস্যাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটা আঞ্চলিক যোগসূত্রও রয়েছে। বাংলাদেশে 'হোমগ্রোন' জঙ্গি রয়েছে। এদের সীমিত কর্মকা- আমরা অতীতে দেখেছি। সাম্প্রতিককালে এইসব 'হোমগ্রোন' জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিশেষ করে আইএসের একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা, তিন বাংলাদেশির ভিডিও টেপে হামলার হুমকি, শোলাকিয়ায় ঈদগাহ ময়দানের পাশে জঙ্গি হামলা_ সব মিলিয়ে স্থানীয় 'হোমগ্রোন' জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। এই মুহূর্তে তাই প্রয়োজন জনসচেতনতার। জঙ্গি দমনে করণীয় নির্ধারণের জন্য সরকারের উচিত একটি 'জাতীয় সংলাপ' আহ্বান করা। সকল রাজনৈতিক দলগুলোর (বিধিবদ্ধ ও নিবন্ধিত) সঙ্গে সরকার একটি 'সংলাপ' শুরু করতে পারে। আলোচ্য সূচিতে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে সরকার। মনে রাখতে হবে সংলাপ চলাকালীন সময়ে যদি দলগুলোর অতীত ভূমিকা আলোচিত হয়, তা কোনো ফল বয়ে আনবে না। অতীতমুখিতা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অতীত নয়, বরং সামনের দিকে তাকাতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস যেভাবে বলছে কারা কারা এই জঙ্গি হামলার উৎসাহদাতা, অর্থের যোগানদাতা, তা খুঁজে বের করা জরুরি। এখানে যেন কোনো 'রাজনীতি' কাজ না করে, অপর পক্ষকে দমন করার কোনো অভিপ্রায় যেন কাজ না করে। গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় যেন এক ধরনের শৈথিল্য আছে। তাদের মোটিভেশন দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বক্তব্যের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনায় একজনের বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। নানাজন বক্তব্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। জঙ্গি দমন প্রশ্নে কতগুলো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশে আইএস সম্পৃক্ততার দাবি সরকার উড়িয়ে দিচ্ছে না। এর অর্থ কী? আমরা এর ব্যাখ্যা কীভাবে করব। ইনু সাহেব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি যখন পরোক্ষভাবে এটা অনেকটা স্বীকার (?) করে নিলেন যে বাংলাদেশে আইএস থাকতে পারে, তখন কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা স্বীকার করেননি। ফলে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্ত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলে তাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে। জঙ্গি প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। এখানে তথ্যমন্ত্রী উপযাচক হয়ে যখন বক্তব্য দেন, বহির্বিশ্বে তার বক্তব্যকেই 'কোট' করবে। তখন কেরি বললেন সে কথা। তথ্যমন্ত্রী ঠিকই জানেন বাংলাদেশে আইএস আছে, এই স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা (?) এতে বাড়তে পারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে, ঠিক তখনই ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র উল্লেখ করে বলেছে 'জেএমবিকে ব্যবহার করে ভারতকে টার্গেট করছে আইএস'। বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থান ভারতের নিরাপত্তাকে বিস্মিত করতে পারে (?) এপ্রশ্ন ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতারা তুলতে পারেন। কলকাতার আনন্দবাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছিল গুলশানের জঙ্গি হামলা তদন্ত করতে ভারত তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজির বিশেষ একটি টিমকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। তবে এটা স্পষ্ট নয় ইতোমধ্যে ওই টিম বাংলাদেশে এসেছিল কিনা? পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি সংস্থা আসছে না। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। দু'দেশের গোয়েন্দাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। এই মুহূর্তে সেটা বড় প্রয়োজন। আমি মনে করি ভারতীয় গোয়েন্দাদের নিজ দেশে আরো সক্রিয়া হওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবির নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দু'জন বাংলাদেশি নাগরিক হাফিজ শেখ ও সেলিম রেজা ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে। ফলে এটা স্পষ্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশি এবং ভারতীয় জঙ্গিদের তথাকথিত ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানে যেসব জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল তাদের প্রশিক্ষণ ওই বর্ধমানে হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তাই জঙ্গি উৎখাতে ভারতের গোয়েন্দারা যদি তৎপর না হন তাহলে এরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে নাশকতা করবে। তাই এনএসজি পাঠানোর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গি দমন ও জঙ্গি নির্মূলের জন্য যথেষ্ট। ভারতকে এখন পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ করতে হবে। শোলাকিয়ার ঘটনায় নিহত জঙ্গি আবির হোসেন ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর আগে হলি আর্টিজানে হামলায় নিহত জঙ্গিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আবিরও নিখোঁজ ছিল বেশ কয়েক মাস। তাই বিষয়টি এখন জরুরি যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি 'জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল' (এটা অন্য নামেও হতে পারে) গঠন করতে হবে, যাদের কাজ হবে ছাত্রদের ডাটাবেজ তৈরি করে অনুপস্থিত ছাত্রদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া। ছেলেরা বিপথগামী কেন হয় এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও উচিত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও এ ধরনের একটি নির্দেশনা গেছে সত্য। কিন্তু তাতে করে সিদ্ধান্তটি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারতীয় এনএসজির যেমন আমাদের প্রয়োজন নেই, তেমনি প্রয়োজন নেই কোনো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বাংলাদেশে উপস্থিতি। এতে বরং আরো জটিলতা বাড়বে। বিদেশি গোয়েন্দারা কোনো কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন। কিংবা আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারেন। এতে করে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। জঙ্গি তৎপরতা একটি বাস্তব সত্য। আমাদের তরুণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ বিপথগামী হয়েছে। মিডিয়া এই বিপথগামী থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে ইসলামিক স্কলারদের ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও, তাদের ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। যাদের টিভির পর্দায় নিত্য দেখা যায়, তারা বেশি মাত্রায় সরকার ঘেঁষা। তাদের বক্তব্যে 'প্রকৃত সত্য' ফুটে ওঠে না কখনো। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝেও তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই হলি আটির্জান আর শোলাকিয়ার ঘটনায় জাতিকে কতটুকু ঐক্যবদ্ধ করবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের ওপর। এই দুই ঘটনা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জঙ্গি দমনে একসঙ্গে কাজ করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। কতিপয় বিভ্রান্তকারী তরুণের কাছে আমরা আত্মসর্মপণ করতে পারি না। এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভরসা। বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে একটি 'সফট পাওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। বিশেষ করে বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান, পোশাক শিল্পে আমাদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা, ওষুধ শিল্পের মান ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য আসনে গেছে। এখন কিছু বিভ্রান্তকামী যুবকের জন্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের রাজনীতিবিদদের দূরদর্শিতা দেখানোর সময় এখনই। এটা সত্য হলি আর্টিজানের ঘটনায় কিছু বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক এবং বিন্দনীয়। কিন্তু সন্ত্রাসীরা যখন হঠাৎ করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটায়, তা রোধ করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। ওরল্যান্ডের সমকামী ক্লাবে একজন সন্ত্রাসী ওমর মতিন যখন হামলা চালিয়ে ৪৯ জন মানুষকে একাই হত্যা করেছিল, তখন ওই হত্যাকা-কে কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দারা বন্ধ করতে পারেনি। প্যারিসে, ব্রাসেলসে কিংবা ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলাও বন্ধ করা যায়নি। সুতরাং সন্ত্রাসীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এটা রোধ করার জন্য একদিকে যেমন দরকার জনসচেতনতা অন্যদিকে তেমনি দরকার প্রশিক্ষিত, দক্ষ জনবল। জঙ্গি দমনে আমাদের বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। বৈদেশিক সহযোগিতায় দেশে বিদেশি গোয়েন্দাদের আসার সুযোগ করে দেয়ার চাইতে এই মুর্হূতে বড় প্রয়োজন আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমরা নিতে পারি। এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু বিদেশি গোয়েন্দাদের এ দেশে আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে না। জন কেরি চলে গেছেন। কিন্তু সমঝোতার ও সহযোগিতার যে কথা তিনি বলে গেছেন, আমরা নিশ্চিত নই, এর ধরনটা কী হবে? আমরা এমন কিছু করব না যাতে করে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। আমাদের স্বার্থটা এখানে প্রধান। জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে আছে। স্থানীয় জঙ্গিরা চেষ্টা করছে আইএসের সঙ্গে একটা 'সম্পর্ক' তৈরি করতে। আমরা আস্থা রাখতে চাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। এরা জঙ্গি দমনের জন্য যথেষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে সব জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে খ্যাত তামিম চৌধুরীর 'অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭' এ নিহত হওয়ার ঘটনা এর বড় প্রমাণ। তাই মার্কিনি সহযোগিতার আলোকে প্রয়োজন তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে Daily Jai Jai Din 12.09.2016

এ অঞ্চলের ত্রিভুজ রাজনীতি বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে?

 
Image result for Indian Ocen rivalry
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যখন গত আগস্টের শেষে বাংলাদেশ ও ভারত সফর করছিলেন, ঠিক প্রায় একই সময় ওয়াশিংটনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পানিকর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বৈশ্বিক রাজনীতি এশিয়া-প্যাসিফিক তথা ভারত মহাসাগরে প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার আলোকে এ চুক্তির গুরুত্ব অনেক। এর মধ্য দিয়ে একদিকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে বড় ধরনের অবিশ্বাস। এ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন ও অনেক সম্ভাবনার জন্ম হবে।
 
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জোটনিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে আসছে। বলা যেতে পারে, ষাটের দশকে যে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল (ন্যাম), তার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল ভারত। যদিও অতীতে, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউয়িনের মধ্যকার সম্পর্ক ভারতের জোটনিরপেক্ষ নীতিকে একটি প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিলেও ভারত বরাবর সচেষ্ট থেকেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে। সবসময়ই ভারত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বক্তব্যকে ওই সময়ে সমর্থন করেছে এমন নয়। কিন্তু ভারতের বর্তমান ‘অবস্থান’ দেখে মনে হচ্ছে, ভারত তার জোটনিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে আসছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তি এর বড় প্রমাণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এরপর ভারতকে আর কখনও এ ধরনের সামরিক চুক্তি করতে দেখা যায়নি। তবে চন্দ্রশেখর যখন ভারতে সীমিত সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন কুয়েত যুদ্ধে (কুয়েত থেকে ইরাকি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার; প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ) মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে ভারতের পোর্টে জ্বালানি নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর প্রতিবাদের মুখে চন্দ্রশেখর সরকার শেষ পর্যন্ত এ অনুমোদন বাতিল করে।

এখন ভারত যে সামরিক চুক্তি করল, তাতে দু’দেশ (ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) পরস্পরের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগটি ভারতের জন্য যত না প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্যপ্রাচ্যে একটি মারাত্মক যুদ্ধে (সিরিয়ায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে) মার্কিন বিমানবহর ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে রিফুয়েলিংয়ের জন্য। এ চুক্তিটি, যা লেমোয়া (LEMOA- Logistic Exchange Memorandum of Agreement) নামে অভিহিত হচ্ছে, তা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ চুক্তি ভারতকে আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও দুটো চুক্তি নিয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, এবং ধারণা করছি অতি শিগগিরই ভারত এ দুটো চুক্তিতেও স্বাক্ষর করবে। এর একটি হচ্ছে সিসমোয়া (CISMOA- Communications Interoportability and Security Memorandum of Agreement) এবং অপরটি হচ্ছে বেকা (BECAÑ Basic Exchange and Cooperation Agreement for Geo special Cooperation)। সিসমোয়া চুক্তির ফলে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব তথ্য পাবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে বেকা চুক্তির আওতায় বিভিন্ন স্থানের ডিজিটাল মানচিত্র ও সমীক্ষা রিপোর্টের ব্যবহারের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং এ ধরনের চুক্তির ধরন এবং এর ব্যবহার যে ভারতকে আরও বেশি মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত প্রায় ১৬ বছর ধরে ভারতের রাজনীতিতে বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণসহ সব ধরনের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যা শুধু অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সরবরাহ করছে। ভারত এখন নিউক্লিয়ার সাপ্লাইস গ্রুপ বা এনএসজির সদস্য হতে চায়, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রও সমর্থন করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতকে এ অঞ্চলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মনে করে, একুশ শতকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য প্রণীত নীতির আওতাভুক্ত। এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন, এ অঞ্চলের তিনটি শক্তির (চীন, ভারত, জাপান) মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অন্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চল গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ওবামার 'Pivot to Asia' পলিসির প্রধান বিষয় হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। এ অঞ্চলের উত্থান-পতনে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূমিকা রাখতে চায়। চীনের ভূমিকাকে খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা দু’-দু’বার ভারত সফর করেছেন। প্রতিবারই তিনি বিশাল এক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারত গেছেন। এবং একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। শুধু তাই নয়, ওবামা তার ভারত সফরের সময় ভারতের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এতেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলের ব্যাপারে আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গত মার্চে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘রাইসিনা ডায়ালগে’ যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ষষ্ঠ ফ্লিটের প্রধান অ্যাডমিরাল হ্যারি হারিস এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন।

তবে এমন প্রস্তাব নতুন নয়, জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন ২০০৬-০৭ সালে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রস্তাব Quadrilateral Initiative হিসেবে পরিচিত। এ থেকেই বোঝা যায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের Pivot to Asia পলিসির আসল উদ্দেশ্য কী। চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধি এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামে ‘সাপ্লাই লাইনের’ জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য তাই পরিষ্কার- এ অঞ্চলভুক্ত জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে সংযুক্ত করে একটি সামরিক অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি বুঝতে আমাদের সহজ হবে যদি আমরা অতি সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, তার দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্র গত জুলাইয়ে ফিলিপাইনের নৌবাহিনীকে USA Boutwell নামে একটি বড় ধরনের ডেস্ট্রয়ার সরবরাহ করেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখা এবং প্রয়োজনে চীনা জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা।

গত বেশকিছু দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সঙ্গে Enhanced Defense Cooperation নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে আসছে। এই চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা অথবা মেরিন সেনাকে স্থায়ীভাবে মোতায়েনের সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের South East Asia Maritime Security Initiative (MSI)-এর আওতায় ৪২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র South East Asia Maritime Law Enforcement Initiative গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমুদ্রসীমার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, প্রশিক্ষণ দেয়া। মূল কথা একটাই- চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে দাঁড় করানো।

এ প্রসঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ‘দি সিল্ক রোড ইকনোমিক বেল্ট অ্যান্ড মেরিটাইম সিল্ক রোড’ (বহুল প্রচারিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) নামে যে নীতি প্রণয়ন করেছেন, তাতে ৬০ দেশকে চীন তার বাণিজ্যিক কাঠামোয় নিয়ে আসতে চাইছে। এতে করে চীনের সঙ্গে সড়কপথে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যেমন যুক্ত হবে, ঠিক তেমনি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও সামুদ্রিক পথে সংযুক্ত হবে। এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের খরচ হবে ৪ থেকে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ও শীর্ষস্থানীয় বড় অর্থনীতির সঙ্গে টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এবং ট্রান্স আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ নামে যে দুটো চুক্তি করেছে, তার বিকল্প হিসেবেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ হচ্ছে এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি। সিরিয়াস পাঠকরা স্মরণ করতে পারেন চীনের ‘String of Pearl’ বা মুক্তারমালা প্রকল্পের কথা, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সমুদ্রবন্দরগুলোকে এক নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে চাইছে চীন। চীনের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। এ অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী জাহাজ এ অঞ্চলে ঘোরাফেরা করছে। এ অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত সম্প্রতি চীনের দাবি খারিজ করে দিলেও চীন তা মেনে নেয়নি। ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তার ঢেউ এসে লাগবে ভারত মহাসাগরেও। সুতরাং চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার তৎপরতা বাড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই জন কেরির বাংলাদেশ ও ভারত সফরকে এ দৃষ্টিতেই আমাদের দেখতে হবে। মোদির জমানায় ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও বেড়েছে। ভারতে মার্কিন বিনিয়োগ বেড়েছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজির অংশ। ভারতকে তার প্রয়োজন এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোর জন্য। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তা ভারতকে গুরুত্ব দিয়েই আবর্তিত হবে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি একদিকে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে আস্থাহীনতা ঘটাবে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। বেলুচিস্তান নিয়ে মোদি সম্প্রতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে পাকিস্তান অখুশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, চীনের সরকারি প্রচারমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে প্ররোচনা দেয়ার। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ মিলিয়ন ডলার, তা নিয়ে ভারতের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্কে। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই এ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা চাইবে না।

বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। অতি সম্প্রতি লন্ডনে বেলুচ ছাত্র সংগঠন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। পাকিস্তান মনে করে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দেয়ার পেছনে ভারতের ইন্ধন রয়েছে। মজার ব্যাপার, ইরান নিয়ন্ত্রিত বেলুচিস্তানের চাহবারে ভারত একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। একইসঙ্গে চাহবার থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করছে ভারত। এ রেলপথ চাহবার থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। চলতি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈঠকের প্রাক্কালে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে (যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-আফগানিস্তান)। এ বৈঠকে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি।

এ অঞ্চলের রাজনীতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এক সময় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপাক্ষিকতা প্রাধান্য পেত। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা (সামরিক ও বাণিজ্যিক) আগামীতে চীনের সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ১৬ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। এরই মাঝে খবর বেরিয়েছে, চীন অত্যন্ত গোপনে তিব্বতে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে দিয়েছে। তিব্বতের এক বিমানবন্দরে জে-২০ স্টেলথ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। ভারত অরুণাচলে ক্ষেপণাস্ত্র এবং লাদাখে শতাধিক ট্যাংক মোতায়েন করার পরিপ্রেক্ষিতেই চীন জে-২০ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে বলে পত্রপত্রিকাগুলো আভাস দিয়েছে। ফলে এ ধরনের সূক্ষ্ম অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ভারত ও চীনের মাঝে।

এরই মধ্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এই প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দেবে মাত্র। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়বে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের রাজনীতি বদলে যাচ্ছে। ভারত ভিয়েতনামকে ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। মোদি ভিয়েতনাম সফর করেছেন। এর আগে ওবামা ভিয়েতনাম সফর করে গেছেন। ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পশ্চিমা দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করতে পারবে। স্পষ্টতই বদলে যাচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক এবং সেই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি। এরই মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে গোয়ায় যাবেন ১৫ অক্টোবর। এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তার ছোঁয়া এসে লাগবে বাংলাদেশেও। এসব পরিবর্তনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
Daily Jugantor
10.09.2016

সার্ক শীর্ষ সম্মেলন কি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে


৯ ও ১০ নভেম্বর ইসলামাবাদে সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে (২৬-২৭ নভেম্বর) ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছে, তাতে করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি এ সম্মেলনে যোগ দিতে তার অপারগতার কথা জানান, তাহলে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পিছিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকবে না। সার্কের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। আগেও বেশ কয়েকবার সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পিছিয়েছিল। এ অঞ্চলের রাজনীতির উন্নয়নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই মিডিয়ায় আলোচিত হয়ে আসছে। এ সম্পর্ক কখনও খুব উচ্চতায় উপনীত হয়েছিল, তা বলা যাবে না। মাঝেমধ্যে এ দুই দেশের মাঝে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে, মাঝেমধ্যে আবার উত্তেজনার জন্ম হয়। এতে করে সার্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এবারও তেমন একটি অনিশ্চয়তার জন্ম হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে চির বৈরী এ দেশ দুইটির মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, সেই আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ফলে সার্কের মধ্যকার এ দুইটি বড় দেশের মাঝে অনাস্থা সার্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক যেভাবে বিকশিত হয়েছে, সে তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত সার্ক সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সার্ক ডিসেম্বরে ৩১ বছর পার করবে। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে সার্কের জন্ম হয়েছিল। সার্কের চার্টারে প্রতি বছর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে কারণে ন্যূনতম ৩০টি শীর্ষ সম্মেলন এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। প্রধানত ভারতের আপত্তির কারণে অতীতে একাধিকবার সার্ক সম্মেলন পিছিয়ে গিয়েছিল। কেননা সার্কের চার্টারে বলা আছে, সদস্যভুক্ত কোনো একটি দেশ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তাদের অপারগতার কথা জানালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ক্ষেত্রেও এমনটির জন্ম হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি ভারত আপত্তি জানায়, তাহলে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের আপত্তি কেন থাকবে? অতি সম্প্রতি এ অঞ্চলে একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যাতে করে ভারতের অংশগ্রহণ না করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আগস্টে ইসলামাবাদে সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সম্মেলনে দুই দেশের মধ্যে একটি তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল। এমনকি রাজনাথ সিং সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছিলেন। সম্মেলন চলাকালীন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে হাতে হাত মেলাননি। এটা ছিল কূটনৈতিক অসৌজন্যতা। রাজনাথ সিং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসভবনে আয়োজিত ডিনারেও অংশ নেননি। সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে রাজনাথ সিং পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। বিশেষ করে, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাকিস্তান সাহায্য করছে বলেও তার অভিযোগ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বলেছিলেন, স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী বলা ঠিক হবে না। কাশ্মীরে ভারতের দখলদারিত্বের অভিযোগ এনে যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে, পাকিস্তান তাদের মনে করছে ‘স্বাধীনতাকামী’ হিসেবে। চলতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (অক্টোবর, ২০১৬) পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নটি তুলতে পারে বলে জানা গেছে। ভারত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ পাকিস্তানের। ফলে একটি তিক্ততার সম্পর্ক এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। প্রথমবার তিনি মন্তব্য করেছেন পার্টির সিনিয়র নেতাদের সভায়। সেখানে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান বেলুচিস্তানে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে। এরপর তিনি স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে (১৫ আগস্ট, ২০১৬) আবার বেলুচিস্তানের প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং বেলুচিস্তান, গিয়েগিট ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণ যে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সে কথাটাও তিনি উল্লেখ করেন। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারতাজ আজিজ। তিনি বলেছিলেন, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত, মোদির বক্তব্যে এটা আবারও প্রমাণিত হলো। তৃতীয়ত, ভারত অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভারতীয় বিমান ঘাঁটি অদূর ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারবে। চতুর্থত, চলতি অক্টোবরে আফগান সমস্যা সমাধানের জন্য নিউইয়র্কে একটি ত্রিদেশীয় (ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যাতে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। স্পষ্টতই এ অঞ্চলে দুইটি জোটের জন্ম হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অক্ষ, অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষ। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ‘আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার তাতে ভারতের প্রচ- আপত্তি রয়েছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপ লাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবিস্থত ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ প্রণালি (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্ক। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই এ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা চাইবে না। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। অতি সম্প্রতি লন্ডনে বেলুচ ছাত্র সংগঠন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। পাকিস্তান মনে করে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উসকে দেয়ার পেছনে ভারতের ইন্ধন রয়েছে। মজার ব্যাপার, ইরান নিয়ন্ত্রিত বেলুচিস্তানের চাহবারে ভারত একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। একইসঙ্গে চাহবার থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করছে ভারত। এ রেলপথ চাহবার থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটা সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভারত আফগানিস্তানের ব্যাপারে একটি বড় ভূমিকা পালন করুক। চলতি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈঠক প্রাক্কালে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে (যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-আফগানিস্তান)। এ বৈঠকে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। পাকিস্তান মনে করছে, এতে করে তার জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা পাকিস্তান এরই মধ্যে আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল।
এ অঞ্চলের রাজনীতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। একসময় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপাক্ষিকতা প্রাধান্য পেত। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা (সামরিক ও বাণিজ্যিক) আগামীতে চীনের সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যাবে, বলা মুশকিল। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং ১৬ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। এরই মাঝে খবর বেরিয়েছে, চীন অত্যন্ত গোপনে তিব্বতে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে দিয়েছে। তিব্বতের এক বিমানবন্দরে চীন জে-২০ স্টেলথ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। বলা হচ্ছে, অরুনাচলে ভারত ব্রহ্ম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ও লাদাখে শতাধিক ট্যাঙ্ক মোতায়েনের পরিপ্রেক্ষিতেই চীন জে-২০ ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে বলে পত্রপত্রিকা  আমাদের আভাস দিয়েছে। ফলে এ ধরনের সূক্ষ্ম আন্তঃপ্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ভারত ও চীনের মাঝে। এরই মাঝে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, এই প্রতিযোগিতাকে উসকে দেবে মাত্র। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়বে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে এসব কারণেই।
অনেক পর্যবেক্ষকই এখন মনে করেন, সার্ক তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সার্ক ৩১ বছর আগে গঠিত হলেও সার্কের উন্নয়ন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে দরিদ্রতার হার বেড়েছে বৈ কমেনি। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু দরিদ্রতা এখানে কমেনি। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে আফগানিস্তানে দরিদ্রতার হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৬ ভাগ। বাংলাদেশে এই হার ৩২, নেপালে ২৫, পাকিস্তানে ২২, ভুটানে ১২, শ্রীলঙ্কায় ৯, আর ভারতে ৩০ ভাগ। ভারতে হাজার হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের নিজস্ব কোনো পায়খানা নেই। তারা প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করে। জাতিসংঘ প্রণীত মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এমডিজি অর্জনে পূর্ণ সফল হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তবে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভালো। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পিছিয়ে আছে আফগানিস্তান। এক্ষেত্রে সার্ক ফোরাম কোনো বড় ভূমিকা নিতে পারেনি।
মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য লক্ষ রাখার মতো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চরিত্রগত দিক দিয়ে বেশিমাত্রায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রার দিক দিয়ে এ দুইটি দেশের সঙ্গে অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। উপরন্তু রয়েছে এক ধরনের অবিশ্বাস। পাকিস্তান ও ভারতের বৈরিতা ঐতিহাসিক। এ বৈরিতা প্রায় ৭০ বছরেও কমেনি। একইসঙ্গে ভারতের একটি ‘বড়ভাই’সুলভ আচরণে আতঙ্কিত থাকে পার্শ্ববর্তী ছোট দেশগুলো। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এসব দেশে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। এশিয়ার দ্বিতীয় অর্থনীতি এখন ভারতের। কিন্তু ভারতের এ অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভারত সাধারণত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। এখানে বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পায়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে এ বহুপাক্ষিকতা জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সমস্যা জ্বালানি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ। এ অঞ্চলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও ভারত এটাকে ব্যবহার করছে তার নিজের স্বার্থে। ভারত ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বটে, কিন্তু তা ত্রিদেশীয় উদ্যোগে উৎপাদিত কোনো বিদ্যুৎ নয়। তাছাড়া ওই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও নানা কথা আছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে ভুটান-বাংলাদেশ-নেপাল ও ভারতের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে তা থেকে উপকৃত হতো এ অঞ্চলের জনগণ। কিন্তু তা হয়নি। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়েও কথা আছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারত রফতানি করে বেশি, আমদানি করে কম। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত। এখানেও সমস্যা ভারতকে নিয়ে। টেরিফ এবং প্যারা-টেরিফের কারণে পণ্যের দাম বেশি হয়ে যায়, যাতে ভারতের আমদানিকারকদের আর আগ্রহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। এ সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। ভারত অনেক সময় বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক সুবিধা দেয়ার কথা বলে বটে, কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্য আদৌ উৎপাদিত হয় না।
ভারত এরই মধ্যে সার্কের ভেতরে একটি উপআঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত হয়েছে এই উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) নামে পরিচিত। এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে সংগত কারণেই সার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ভারত বিবিআইএনের পাশাপাশি বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে অপর দুইটি জোটের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বেশি। দুইটি জোটেই পাকিস্তান নেই। এতে করে একটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে, ভারত চূড়ান্ত বিচারে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, চীন যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমার) জোটের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল (যা একসময় পরিচিত ছিল কুনমিং উদ্যোগ নামে) তাতেও শ্লথ গতি আসতে পারে। বিসিআইএম জোট, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং বাংলাদেশী পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করবে, এ মুহূর্তে ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ভারতের এ মুহূর্তের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। ফলে চীনের বাহু হিসেবে পাকিস্তানকে ভারত ‘কূটনৈতিক জালে’ আটকে ফেলে পাকিস্তানের ভূমিকাকে সংকুচিত করতে চাইছে। তাই নভেম্বরে নির্দিষ্ট সময়ে সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এ ব্যাপারে আমার শঙ্কা থেকেই গেল।

ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito bangladesh
11.09.2016

বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে

বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঢাকা সফরের আগে ঢাকা ঘুরে গেছেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী (আন্তর্জাতিক সহযোগিতা) রোরি স্টুয়ার্ট। টেরেসা মের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া রোরি স্টুয়ার্টের এটা প্রথম বাংলাদেশ সফর। গত ২৩ জুন ব্রিটেনে গণভোট ও গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর ব্রিটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশে ব্রিটেনের সহযোগিতার ধরন নিয়ে আলোচনা করতেই রোরি স্টুয়ার্ট বাংলাদেশে এসেছিলেন। এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফরে আসছেন। বাংলাদেশ সফরকালে চীনা প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মিলিত হবেন। এ দুই নেতা ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ভারত সফর করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোয়ায় অনুষ্ঠিত বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) সম্মেলনে যোগ দেবেন। আর চীনা প্রেসিডেন্ট শি যোগ দেবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে। গোয়াতেই এই শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ভারত বর্তমান ব্রিকসের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) চেয়ারম্যান। সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি বহুল আলোচিত নাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, জন কেরির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো বেড়েছে।জন কেরির ঢাকা সফর অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিল। গত চার বছরে এটা ছিল কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিতীয় ঢাকা সফর। ২০১২ সালের মে মাসে তৎকালীন  মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফর করে গেছেন। হিলারি ক্লিনটন বর্তমানে ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রার্থী হিসেবে নভেম্বরের (২০১৬) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে জন কেরির সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেরির সঙ্গে এসেছিলেন নিশা দেশাই বিসওয়াল, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া-সংক্রান্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নিশা দেশাই এর আগে একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট ধারণা রয়েছে। সুতরাং কেরি তাঁর ঢাকা সফরে যখন নিশা দেশাইকে সঙ্গে নিয়ে আসেন তখন বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দেয়। মূলত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তাতে বাংলাদেশ একটি শক্ত অবস্থানে আছে। দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা ও ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতার প্রেক্ষাপট যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ যে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে, এটা কেরি স্বীকার করেছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি প্লাস পয়েন্ট। কেননা বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন এখনো শ্লথগতি চলছে তখন বাংলাদেশ তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে ধরে রেখেছে। তৈরি পোশাক নিয়ে হাজারটা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বাংলাদেশের অনুকূলে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৩০৫২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমদানি করেছে ৪৩৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মাত্র ছয় মাসে ঘাটতির পরিমাণ ২৬১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে ঘাটতি ছিল ৫০৪৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে আছে। সুতরাং কেরি যখন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করেন তখন সত্যটাই তিনি তুলে ধরেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ২০১২ সালে হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরের সময় তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘সফট পাওয়ার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অর্থাৎ বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ যে একটি শক্তি এবং বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা যে রয়েছে, হিলারি ক্লিনটন সেটা স্বীকার করে গিয়েছিলেন। আর আজ চার বছর পর কেরিরও স্বীকারোক্তি মিলল।
কেরির ঢাকা সফরে জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রশ্নটিও এসেছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চেয়েছে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করতে ও গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় করতেও দুই দেশ রাজি হয়েছে। বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়েছে। জঙ্গিবাদ, জিএসপি সুবিধা ইত্যাদি প্রশ্নে বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্র কার্যত বাংলাদেশের এই ভূমিকাকে সমর্থন করে গেছে। একটা জিনিস আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। সত্তরের দশকের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। বাংলাদেশ আজ বিশ্বকে দিতে পারে। বাংলাদেশের সামর্থ্য বেড়েছে। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দক্ষতা, যোগ্যতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা আজ বিশ্ব স্বীকৃত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রশংসা করার মতো। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সংলাপ পার্টনার। নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর একবার সংলাপে মিলিত হয়। দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সন্দিহান। বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে তার ভূমিকা পালন করে আসছে। দক্ষিণ চীন সফরের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ভারত মহাসাগরের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব দিনে দিনে বাড়ছেই। ফলে খুব সংগত কারণেই চীনের যে এ অঞ্চলের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এ অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী জাহাজ এ অঞ্চলে ঘোরাফেরা করছে। এ অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত সম্প্রতি চীনের দাবি খারিজ করে দিলেও চীন তা মেনে নেয়নি। চীন ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তার টেউ এসে লাগবে ভারত মহাসাগরেও। সুতরাং চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার তৎপরতা বাড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই জন কেরির বাংলাদেশ ও ভারত সফর এ দৃষ্টিতেই আমাদের দেখতে হবে। মোদির জমানায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো বেড়েছে। ভারতে মার্কিন বিনিয়োগ বেড়েছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজির অংশ। ভারতকে তার প্রয়োজন এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোর জন্য। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, সেই নীতি ভারতকে আস্থায় নিয়েই তৈরি করা। অর্থাৎ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোকেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক রচিত হবে। আলাদা করে  বাংলাদেশের ব্যাপারে কোনো নীতি প্রণয়ন করবে না যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না, যাতে ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজন খুব বেশি।
এ প্রসঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ‘দ্য সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট অ্যান্ড মেরিটাইম সিল্ক রোড’ (বহুল প্রচারিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) নামে যে নীতি প্রণয়ন করেছেন, তাতে ৬০ দেশকে চীন তার বাণিজ্যিক কাঠামোয় নিয়ে আসতে চাইছে। এতে চীনের সঙ্গে সড়কপথে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যেমন সংযুক্ত হবে, ঠিক তেমনি দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও সামুদ্রিক পথে সংযুক্ত হবে। এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের খরচ হবে চার থেকে আট ট্রিলিয়ন ডলার। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ও শীর্ষস্থানীয় বড় অর্থনীতির সঙ্গে টিপিপি বা ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এবং ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ নামে যে দুটি চুক্তি করেছে, তার বিকল্প হিসেবেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ হচ্ছে এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি। সিরিয়াস পাঠকরা স্মরণ করতে পারেন চীনের String of Pearls প্রজেক্টের কথা। এ প্রজেক্টের আওতায় চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক সমুদ্রবন্দরকে ‘মুক্তার মালা’র মতো একসঙ্গে সংযুক্ত করেছে। প্রতিটি বন্দরেই চীনের নৌবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী চীন ভারত মহাসাগরে অবস্থিত একাধিক দেশে তাদের নৌঘাঁটি নির্মাণের চেষ্টা করছে। জিবুতি, গাওদার (বেলুচিস্তান), হামবানতোতা (শ্রীলঙ্কা), মিয়ানমার, ইয়েমেন, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার, ওমান কিংবা কেনিয়ায় চীনা নৌঘাঁটি নির্মাণের আগ্রহের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। জিবুতি ও মাদাগাস্কারে নৌঘাঁটি নির্মাণ শেষ হয়েছে। চীনের এই নৌঘাঁটি নির্মাণের বিষয়টিকে ভারত খুব সহজভাবে নেয়নি। ভারতও একইভাবে সিসিলি ও মৌরিতুসের দুটি দ্বীপে ভারতের নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। ২০১৫ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী মোদির এই দ্বীপ দুটি সফরের সময় এই নৌঘাঁটি নির্মাণের কথা প্রথমবারের মতো জানা যায়। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারত তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেছিল। ভারত বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে পরাজয়বরণ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে সেখানে সিরিসেনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। ভারত মহাসাগর কিংবা দক্ষিণ চীন সাগর প্রশ্নে বাংলাদেশ কোনো পক্ষ অবলম্বন করেনি। চীন বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী। চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ গুরুত্ব দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়েছিলেন ২০১৪ সালে। তখন বেশ কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বেশ কয়েকটি মৈত্রী সেতু চীন তৈরি করে দিয়েছে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতেও চীনা কন্ট্রাক্টরদের ভূমিকা রয়েছে। চীন বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী। গত ২১ মার্চ ঢাকায় কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিকাবের একটি অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত মা সিং ছিয়াং বলেছিলেন, প্রয়োজনে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চীন এ কাজটি করতে চায়। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য চীনের অনুকূলে থাকলেও চীন এরই মধ্যে পাঁচ হাজার বাংলাদেশি পণ্যের সে দেশে বাজারজাতকরণে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। চীনা বিনিয়োগও বাড়ছে দিনে দিনে। ২০০২ সালে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আমাদের সীমান্ত থেকে চীনের দূরত্ব খুব বেশি দূরে নয়। চীন এই মুহূর্তে এশিয়ার অর্থনীতিতে এক নম্বরে এবং ভারতের অবস্থান তৃতীয়। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন ও ভারত যে ফ্যাক্টর, তা অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশ এই দুটি দেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে আসছে। বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়। এ ক্ষেত্রে চীন আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে সাহায্য করবে বলে চীনা রাষ্ট্রদূত আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। চলতি আগস্ট মাসে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৪১ বছর পার হবে। এমনি সময়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ঢাকায় আসছেন। নিঃসন্দেহে এটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সাফল্য। একুশ শতকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে ‘নেক্সট ইলেভেন’ (গোল্ডম্যান স্যাকস-এর মূল্যায়নে) দেশগুলোর কাতারে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে সেই লক্ষ্যে সাজিয়ে এটা অর্জন করা। প্রধানমন্ত্রীর জাপান ও চীন সফর, জন কেরির ঢাকা সফর ও চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা আগমন যে আমাদের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হবে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। Daily Kalerkontho 06.09.2016

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অতি সম্প্রতি বেশকিছু পরিবর্তন হয়েছে। ২৩ আগস্ট তুরস্কের সেনাবাহিনী সিরিয়ার অভ্যন্তরে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সেই সামরিক অভিযানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সিরীয় শহর জারাব্লুস দখল করেছে এবং ওই শহরটি আইএসমুক্ত করেছে। তুরস্কের সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তুরস্ক সফর করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন। সিরিয়া প্রশ্নে জেনেভায় কেরি-লেভারভ বৈঠক করেছেন এবং আগামী বছরের শুরুতে একটি শান্তি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। সিরিয়ার সংকট নিয়ে এই যখন পরিস্থিতি- তখন চীন জানিয়েছে, তারা সিরিয়ায় যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে। এ যুদ্ধবিমানগুলো কোথায় মোতায়েন করা হবে কিংবা কোনো সিরীয় বিমানঘাঁটি থেকে তা পরিচালনা করা হবে কিনা, সে ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলেও এটা বলা হয়েছে- এ বিমানগুলো সিরিয়ায় জঙ্গি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালাবে। চীনের এ ভূমিকা নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইতিমধ্যে আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমানগুলো গত এক বছর ধরে বিমান হামলা করে আসছে। এখন এর সঙ্গে যোগ দিল চীন। এরদোগানের রাশিয়া সফরের পরপরই তুরস্ক সিরিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। আইএস নির্মূলের প্রশ্নে তুরস্কের যেমন একটি ভূমিকা রয়েছে, ঠিক তেমনি সিরিয়ায় আসাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা, লাখ লাখ সিরীয় নাগরিকের দেশান্তরের ঘটনায়ও তুরস্কের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। প্রতিটি ক্ষেত্রে তুরস্কের রাজনীতি, তুরস্কের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান গুরুত্বের দাবি রাখে। সুতরাং তুরস্কে যখন একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান (১৫ জুলাই, ২০১৬) সংঘটিত হয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই এর একটি প্রতিক্রিয়া তুরস্কের রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতিতেও থাকবে। বিশেষ করে সিরিয়া সংকটের সমাধান, আইএসকে পরিপূর্ণভাবে নির্মূলের প্রশ্নে তুরস্কের ভূমিকা কী হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন এখন। এ ক্ষেত্রে দুটো বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তুরস্কে মার্কিন সেনা রয়েছে এবং একাধিক বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট রয়েছে, তাতে তুরস্ক অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। তুরস্কের ব্যাপারে রাশিয়ারও স্বার্থ রয়েছে। তুরস্ক রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ নয়। ব্ল্যাক সী বা কৃষ্ণসাগর এ দেশ দুটোকে আলাদা করেছে। এ দেশ দুটোর মাঝে আছে আবার তিনটি দেশ- জর্জিয়া, আরমেনিয়া ও আজারবাইজান। জর্জিয়াকে ন্যাটো সদস্যভুক্ত করার আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের। জর্জিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ‘সীমিত যুদ্ধের’ খবর আমরা জানি। অন্যদিকে আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের ‘অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে’ তুরস্ক ও রাশিয়া পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। তবে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় (২০১৪), কৃষ্ণসাগরের গুরুত্ব বেড়েছে। এখানে রয়েছে রাশিয়ার বড় নৌঘাঁটি। কৃষ্ণসাগরের পাশ ঘেঁষে রয়েছে তুরস্কের বিখ্যাত বসফোরাস প্রণালী ও মারমারা সাগর। ইস্তাবুলের বিখ্যাত বসফোরাস প্রণালী হচ্ছে প্রাচ্য ও পশ্চিমের অদ্ভুত এক মিলন স্থান। এই মারমারা প্রণালী ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণসাগরকে সংযুক্ত করেছে। রাশিয়ার নৌ-স্ট্রাটেজিস্টরা এ কারণেই তুরস্ককে গুরুত্ব দেন বেশি। সুতরাং তুরস্কে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যতটুকু ভূমিকাই পালন করে থাকুক না কেন, দুই পরাশক্তির (রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র) এতে একটা ‘যোগসূত্র’ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের ‘সনাতন সম্পর্ক’ থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়গুলোয় প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছিল না ওয়াশিংটন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধও লক্ষণীয়। অন্যদিকে স্ট্যাটেজিক গুরুত্বের কারণে রাশিয়া তুরস্কে এমন একটি সরকার চাইবে, যা তার স্বার্থরক্ষা করবে। বিশ্ব আসরে রাশিয়াকে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে তুরস্ককে আস্থায় নেয়া প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের কারণে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারমাণবিক সমঝোতা’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ইরান এ অঞ্চলের অন্যতম উঠতি শক্তি, যা কিনা বিশ্ব এখন গ্রহণযোগ্যতায় নিয়েছে। ফলে খুব সঙ্গতকারণেই এ অঞ্চলে যদি রাশিয়া-ইরান-তুরস্ক একটি ‘ঐক্য’ গড়ে ওঠে, তাহলে তা বিশ্ব রাজনীতিতেও যে প্রভাব ফেলবে, তা বলাইবাহুল্য। মনে রাখতে হবে, ইতিমধ্যে বেশকিছু ইস্যুতে চীন-রাশিয়া ঐক্য গড়ে উঠেছে। দেশ দুটো এসসিও বা ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে’র সদস্য। ভারত এ জোটের অবজারভার। অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ভারত এবং আরও বেশক’টি দেশের সমন্বয়ে একটি ‘বিকল্প বিশ্ব ব্যাংক’ (ব্রিকস ব্যাংক) গড়ে উঠেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করছে। ফলে দুই পরাশক্তির মাঝে এক ধরনের প্রভাব বলয়ের রাজনীতি শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানের কারণে এ দুই পরাশক্তি তুরস্কের ব্যাপারে যে আগ্রহী হয়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করে আসছে। ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হচ্ছে তুরস্ক। ন্যাটোর পারমাণবিক অস্ত্রের একটা মজুদ আছে তুরস্কে; যা কিনা রাশিয়ার বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে আগামীতে। সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাশিয়া যে তুরস্কের পাশে এসে দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কেরও একাধিক স্বার্থ কাজ করছে। প্রথমত সিরিয়া সংকটে কুর্দিদের একটি গ্রুপ কুর্দিজ ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি (পিওয়াইডি) অত্যন্ত সক্রিয়। রাশিয়া পিওয়াইডিকে সমর্থন করে এবং মস্কোয় তাদের একটি লিয়াজোঁ অফিস খুলতেও অনুমতি দিয়েছে। তুরস্ক মনে করে পিওয়াইডি হচ্ছে কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টির (পিকেকে) একটি অঙ্গসংগঠন। পিকেকে তুরস্ক ও ইরাকি কুর্দিস্তানে তৎপর। দলটি ১৯৮৪ সালের পর থেকে তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে সব সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। দলটি তুরস্কে নিষিদ্ধ। এখন তুরস্ক মনে করছে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে পিকেকে তথা পিওয়াইডির ওপর থেকে রাশিয়ার সমর্থন কমে যাবে এবং পিকেকে তুরস্কের অভ্যন্তরে যে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তা হ্রাস পাবে। দ্বিতীয়ত রাশিয়ার গ্যাস। প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার (১ হাজার ২০০ কোটি ডলার) ব্যয়ে একটি পাইপলাইন নির্মিত হচ্ছে, যার মাধ্যমে রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপে যাবে (টার্কিস স্ট্রিম প্রজেক্ট)। ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যা কিনা ইউক্রেনের মাধ্যমে (সাউথ স্ট্রিম) সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ইউক্রেন সংকট গভীর হলে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পুতিন তার তুরস্ক সফরের সময় এ বিকল্প ‘টার্কিস স্ট্রিম’ গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর ফলে রাশিয়ার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষ্ণসাগরের নিচ দিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশে সরবরাহ করা হবে। গ্যাস পাইপলাইন চালু হলে তা তুরস্কের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। তৃতীয়ত, তুরস্ক ও রাশিয়া একটি ‘যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ফলে তুরস্ক তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং রাশিয়াকে এখন ‘কাছের বন্ধু’ ভাবছে। এ ‘নয়া সম্পর্ক’ সিরিয়া সংকট থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। সিরিয়ায় আসাদ বিরোধিতা থেকে তুরস্ক এখন সরে আসবে এবং আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী বাহিনীগুলো এখন আর তুরস্ক সরকারের সহযোগিতা পাবে না। তুরস্কের এ ‘অবস্থান’ কিছুটা হলেও এ অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তবে এ পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দুজন প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নির্বাচনী প্রচারণার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের কোনো নজির নেই। চীন বোঝে ব্যবসা। আদর্শ এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে না। তবে সিরিয়া প্রশ্নে চীনের ভূমিকা আসাদের পক্ষেই। এ কারণে চীন সিরিয়ায় অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিগগিরই দামেস্ক যাচ্ছেন এবং চীন আসাদের সমর্থনে এখন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে। সঙ্গতকারণেই তাই একটি প্রশ্ন ওঠে- তা হচ্ছে, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ তাহলে কী? তুরস্কের অবস্থান পরিবর্তন কী সিরিয়ায় কোনো ধরনের পরিবর্তন আনবে? এর জবাব এ মুহূর্তে দেয়া কঠিন। তবে সিরিয়া নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, তা লক্ষণীয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান যখন রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে তার নির্ভরশীলতা কমাতে চাচ্ছেন, তখনই ২৩ আগস্ট আংকারা ছুটে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর বেইজিংয়ে দেখা হয়েছে ওবামার সঙ্গে এরদোগানের। উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে রাখা। জো বাইডেন যখন আংকারায় তখনই তুরস্ক সিরিয়ায় সবচেয়ে বড় ধরনের মিলিটারি অপারেশন শুরু করেছে। তুরস্ক বলছে, তার এ মিলিটারি অপারেশনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী শহর জারাব্লুস থেকে আইএস জঙ্গিদের উৎখাত করা। কিন্তু সিরিয়ার ভেতরে এ ধরনের তুর্কি সামরিক অভিযানের নিন্দা করেছে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ার কুর্দিদের সংগঠন ওয়াইপিজি বা ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্স’। ওয়াইপিজি বলছে এটা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের শামিল। জো বাইডেনের আংকারা সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ জুলাই ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান এবং এ অভ্যুত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে- এ অভিযোগের পর প্রথম কোনো যুক্তরাষ্ট্রের নেতা আংকারা সফর করলেন। এতে করে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কতটা উন্নত হবে বলা মুশকিল। কিন্তু তুরস্কের অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলে সিরীয় রাজনীতিতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। এখানে বলা ভালো, সিরিয়া এখন কার্যত কয়েকভাগে ভাগ হয়ে আছে এবং এক-একটি এলাকা এক-একটি জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছে। আসাদ সমর্থিত সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আলেপ্পোর কিছু অংশ, দামেস্ক, হাসা ও হোমসের মতো বড় বড় শহর। অন্যদিকে আইএসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পালমিরা, রাকা (অলিখিত আইএসের রাজধানী), দেইর আজ জোর ও কোবানির মতো শহরগুলো। উত্তরাঞ্চলের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে অপর একটি জঙ্গিগোষ্ঠী- সাবেক নুসরা ফ্রন্ট, বর্তমানে যাদের নাম জাবহাত ফাতেহ আল শাম। দামেস্কর আশপাশে ছোট ছোট বিদ্রোহী গ্রুপও কাজ করছে। এক বছর আগে সিরিয়ায় আইএস অবস্থানের ওপর রাশিয়ার যুদ্ধবিমান বিমান হামলা শুরুর পর আইএসের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে বটে; কিন্তু তাদের উৎখাত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত বিশাল হামলায়ও আইএস দুর্বল হয়েছে- এটা বলা যাবে না। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সিরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৩০০ মার্কিন সেনা রয়েছে, যারা কোনো কোনো বিদ্রোহী গ্রুপের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। এরা সিরিয়া সরকারের আমন্ত্রণে সেখানে যাননি। গেছেন বিদ্রোহী গ্রুপ, বিশেষ করে কুর্দি গ্রুপগুলোকে সহায়তা করতে। যুক্তরাষ্ট্র চায় আসাদ সরকারের উৎখাত। অন্যদিকে রাশিয়া চাচ্ছে আসাদ সরকার ক্ষমতায় থাকুক। কুর্দিদের ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’কে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করছে। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত ও অধ্যুষিত এলাকায় একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের দাবি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। এ দুই শক্তির বাইরে (যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) সৌদি আরব ও কাতার জিহাদিদের আর্থিক সহায়তা করছে, যারা আইএসের পক্ষ হয়ে এখন একটি ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করছে। সিরিয়ার এই যে পরিস্থিতি, এ পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে তুরস্ক একটি ফ্যাক্টর। শত শত জিহাদি তুরস্ক সীমান্ত দিয়েই সিরিয়ায় প্রবেশ করে আইএসের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। ফলে সিরিয়ার সংকটে তুরস্কের একটা ভূমিকা থাকবেই। তবে খুব দ্রুত সিরিয়া সমস্যার সমাধান হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরেও সিরিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে রাজনীতির চিত্র ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। তুরস্কের অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলে আসাদ সরকার আরও শক্তিশালী হবে। তবে আইএস পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হবে কিংবা উৎখাত হবে- এমনটি মনে হচ্ছে না; বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের স্বার্থেই সিরিয়া সংকট জিইয়ে রাখবে। ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র Daily Jugantor 05.09.2016

কেরির সফরে কী পেল বাংলাদেশ

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার বাংলাদেশ সফর শেষ করলেন ২৯ আগস্ট। মাত্র ৯ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফরে তিনি জেনেভা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপর তিনি গেছেন নয়াদিল্লিতে। কিন্তু জন কেরির এই সফরে কী পেল বাংলাদেশ? যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা, তা কি পূরণ হয়েছে জন কেরির এ সফরের মধ্য দিয়ে? অনেকগুলো ইস্যুতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের ‘শীতল সম্পর্ক’ বজায় রয়েছে। জন কেরির এই সফরে তার একটির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয়নি আমার। মনে রাখতে হবে, জন কেরি ওবামা প্রশাসনের শেষ সময়ে এসে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। আগামী নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। একজন নয়া প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি। একজন সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী (হিলারি ক্লিনটন) এ নির্বাচনে বিজয়ী হলেও জন কেরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন কিনা, তা নিশ্চিত নয়। ফলে জন কেরির এ সফর ছিল অনেকটা ‘রুটিন ওয়ার্ক’। তার মূল সফর ছিল নয়াদিল্লি। সেখানে তিনি দ্বিতীয় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল ডায়ালগে অংশ নেন। একাধিক কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণেই নয়, বরং কৌশলগত কারণে এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে ভারতের। বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছে। ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব বেড়েছে। এই অঞ্চলে চীনের নৌবাহিনীর তৎপরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই নয়, বরং ভারতেরও চিন্তার কারণ। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা বাড়ছে। এ অঞ্চলের কর্তৃত্বের প্রশ্নে চীনের দাবি খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক আদালত। রায় হয়েছে ফিলিপাইনের পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে এ অঞ্চলে। এর আশপাশে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে। চারটি ভারতীয় যুদ্ধজাহাজও এ এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে নীতি, তার প্রধান দুই স্তম্ভ হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর। এ অঞ্চলে আগামী দিনগুলো প্রত্যক্ষ করবে বড় ধরনের উত্তেজনা। সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অত বেশি না থাকলেও ভারতের গুরুত্ব অনেক বেশি। তারপরও জন কেরির এ সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক্ষেত্রে জন কেরির ঢাকায় দেয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তিনি টুইট করেছেন। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ কিংবা প্রধান বিরোধী দল নেত্রীর সাক্ষাতের পর তাদের নিজ নিজ পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয়া হয়েছে। আল জাজিরা একটি প্রতিবেদন দিয়েছে কেরির ঢাকা সফরের পর। এমনকি রয়টার্সও এমন একটি সংবাদ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের কোনো পত্র-পত্রিকার অনলাইনে আমি দেখিনি। কেরির ঢাকা সফরে এটি আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
আল জাজিরা এবং রয়টার্সের বক্তব্য অনেকটা একই রকম। জন কেরি মনে করেন, ‘বাংলাদেশে আইএসের সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিদের সম্পর্ক রয়েছে। এরকম তথ্য তাদের কাছে আছে’ (রয়টার্স)। আইএস বিশ্বব্যাপী যে আটটি সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, তার একটির অস্তিত্ব রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় (আল জাজিরা, ২৯ আগস্ট)। বিষয়টি আমাদের জন্য বেশ স্পর্শকাতর। অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের ‘চাপের’ মুখে আছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ স্বীকার করুক বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে(?)। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে আইএস বা ইসলামী স্টেটের কোনো অস্তিত্ব নেই, তবে ‘হোম গ্রোন’ অর্থাৎ স্থানীয় জঙ্গি রয়েছে, যারা চেষ্টা করছে আইএসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গে আইএস জড়িত রয়েছে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স দাবি করে আসছে। অভিযোগ আছে, সাইট ইন্টেলিজেন্স নামক জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার অর্থে ও তাদের স্বার্থে পরিচালিত হয়। আমরা অনেক দিন থেকেই বলে আসছি, সাইটটি কোনো ধরনের গবেষণা ও তথ্যউপাত্ত ছাড়াই বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব সংবাদ পরিবেশন করে আসছে, তার উদ্দেশ্য সৎ নয়। বরং আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি, ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা যারাই সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন (যেমন নিশা দেশাই বিসওয়াল, দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী), তারা আকার-ইঙ্গিতে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব রয়েছে, এটা বলতে চেয়েছেন। এখন কেরিও অনেকটা সে সুরে কথা বলে গেলেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আগের মতোই রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, ‘আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে।’ বাংলাদেশের এই ‘অবস্থান’ই সঠিক। আমাদের পর্যবেক্ষণে কখনও মনে হয়নি যে, বাংলাদেশে আইএস আছে। স্থানীয় জঙ্গিরা চেষ্টা করছে আইএসের সঙ্গে একটা ‘সম্পর্ক’ তৈরি করতে। কেরির সফরে দুই দেশ জঙ্গি লড়াইয়ে অতিরিক্ত গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এটা ভালো সিদ্ধান্ত। কেননা বাংলাদেশ প্রথম থেকেই বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকা-ের নিন্দা জানিয়ে আসছে। সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্সের’ অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। তবে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ধরন পাল্টেছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিতে পারি। আমাদের গোয়েন্দাদের আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ যে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে, এটা স্বয়ং কেরি স্বীকার করে গেছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। কেননা বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন এখনও শ্লথগতি চলছে, তখন বাংলাদেশ তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপর ধরে রেখেছে। তৈরি পোশাক নিয়ে হাজারো প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের রফতানি বেড়েছে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যও বাংলাদেশের অনুকূলে। কেরির উপস্থিতিতে বাংলাদেশ জেএসপি সুবিধার বিষয়টি পুনর্বার উল্লেখ করেছে। জেএসপি, বিশেষ করে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টির ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবি ন্যায্য। কেননা বাংলাদেশ এরই মধ্যে জেএসপি প্রশ্নে সব শর্ত পূর্ণ করেছে। সুতরাং বাংলাদেশের জেএসপি সুবিধা প্রাপ্তির দাবিটি ন্যায্য। গোল্ডম্যান স্যাকসের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ‘নেক্সট ইলেভেন’ভুক্ত দেশগুলোর অন্যতম। অর্থাৎ আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ১১টি দেশ আত্মপ্রকাশ করছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ তার লক্ষ অর্জন করতে সক্ষম হবে। কেরির সফরের সময় এরকম একটি মেসেজ বাংলাদেশ দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার কথা কেরি বলেছেন। এক টুইট বার্তায় কেরি বলেছেন, ২০৫০ সালের দিকে বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি লোক বাস্তুচ্যুত হবে। এর অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা কেরি স্বীকার করে নিলেন। বাংলাদেশ অতীতে প্রতিটি জলবায়ু সংক্রান্ত ‘কপ’ শীর্ষ সম্মেলনে এই বাস্তুচ্যুতদের কথা বলে আসছে। সারা বিশ্বই এখন স্বীকার করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মাঝে বাংলাদেশ অন্যতম। সুতরাং এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। বিশেষ করে নবায়নকৃত জ্বালানির ক্ষেত্রে এ সহযোগিতাটা বড় প্রয়োজন।
জন কেরি ঢাকা সফরকালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং একান্তে কথা বলেছেন। এটা ভালো। প্রটোকল অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দেখা করার কথা নয়। তিনি দেখা করেছেন। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, বেগম জিয়া নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছেন। আর মীর্জা ফখরুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘মার্কিন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।’ এ ধরনের বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা একটি ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। বরং বিএনপির উচিত হবে, আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং সে মতে কাজ করা। জনগণের আস্থা পেতে হলে জনগণের কাছে যাওয়াই মঙ্গল। বিদেশিদের প্রতি নির্ভরশীলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক নয়।
জন কেরির ঢাকা সফর সংক্ষিপ্ত ছিল। তারপরও এই সফরের কিছুটা গুরুত্ব রয়েছে। যদিও তার এই সফর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য কোনো দিকনির্দেশনা দেবে না। জন কেরি ওবামা প্রশাসনের শেষ সময়ে এসে ঢাকা সফর করলেন। আগামী নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নয়া প্রশাসন হোয়াইট হাউসে স্থলাভিষিক্ত হবে। ফলে জন কেরি বাংলাদেশের ব্যাপারে কোনো মার্কিন নীতি পরিবর্তনও করতে পারবেন না। তিনি নয়া প্রশাসনে (যদি ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে বিজয়ী হয়) থাকবেন কিনা, তাও স্পষ্ট নয়। মূলত ভারতকে কেন্দ্র করেই দক্ষিণ এশিয়া সংক্রান্ত মার্কিন নীতি প্রণীত হয়েছে। জন কেরি ঢাকা সফর শেষ করে নয়াদিল্লি গিয়েছিলেন। একই সময় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও এসেছিলেন ওয়াশিংটনে। একটা নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতেই বোঝা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের অবস্থান কত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি তাতেও ভারত একটি ফ্যাক্টর। ভারতকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে এমন কোনো ‘সম্পর্ক’ স্থাপন করবে না, যাতে ভারতের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। জন কেরির সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ হচ্ছেÑ বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের ‘উন্নয়ন মডেল’ স্বীকৃতি পেয়েছে। জঙ্গি দমনে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ যেসব সমস্যার সম্মুখীন, তার মোকাবিলায় সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। এ ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে আগামী দিনগুলোয়।
ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
02.09.2016

একটি জনমত জরিপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য প্রসঙ্গে

সবচেয়ে বড় মার্কেট রিসার্চ সংগঠন ইপসস মোরি ইউরোপের ৯টি দেশে পরিচালিত একটি সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে গত ৪ আগস্ট (দি ইকোনমিস্ট ৬ আগস্ট, ২০১৬)। জনমত জরিপে দেখা গেছে গত ২৩ জুন ব্রিটেনে গণভোটের সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ব্রিটেনকে এখনো কষ্ট দিচ্ছে! অর্থাৎ ইইউভুক্ত ধনী দেশগুলোর জনগণ এখনো মনে করে ব্রিটেনের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো ভালো খবর নয়। ইউরোপের ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতেই এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায় ওই ৯টি দেশের শতকরা ৫৫ ভাগ মানুষ মনে করে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত (ব্রেক্সিট) ব্রিটেনের জন্য একটি খারাপ সিদ্ধান্ত। ৫৮ ভাগ মানুষ মনে করে পুরো ইইউর জন্যও এটি খারাপ। ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছে রাশিয়া। সুইডেনের ৬৮ ভাগ মানুষ মনে করে ইইউর জন্য সিদ্ধান্তটি ভালো ছিল না। সুইডেনের মানুষ মনে করে ব্রেক্সিটের ফলে এ অঞ্চলের ব্যাপারে রাশিয়ার হুমকি আরো বাড়বে এবং রাশিয়া এ থেকে ফায়দা নেবে। অন্যদিকে ফ্রান্সের ৬৪ ভাগ মানুষ মনে করে ব্রেক্সিটের ফলে অর্থনৈতিকভাবে ইইউ আরো দুর্বল হবে। এখন ব্রিটেনের ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত কি হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। জনমত জরিপে তা প্রতিফলিত হয়েছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে ২৮ ভাগ মানুষ মনে করে ইইউ ব্রিটেনের ব্যাপারে কঠোর হবে। আর ২৬ ভাগ মানুষ মনে করে ইইউ ব্রিটেনের ব্যাপারে নরম হবে। বলা ভালো ইউরোপের ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত স্পেন, বেলজিয়াম, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরিতে এই জনমত জরিপ পরিচালনা করা হয়।
এই জনমত জরিপের মধ্যে দিয়ে ইউরোপের মানুষগুলোর মধ্যকার শঙ্কা ও উদ্যোগ প্রকাশিত হয়েছে। গত ২৩ জুন ব্রিটেনে যখন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তখন আমি যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর এই আগস্ট মাসে আমি এখইইউরোপে। ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে যেমনি হতাশা দেখেছি, এখন ঠিক দুই মাস পর জার্মানি এসেও মানুষের মাঝে এই হতাশা দেখলাম। এর মধ্যে দিয়ে ইউরোপীয় ঐক্য বড় ফাটলের সৃষ্টি হলো এবং যা আরো সম্প্রসারিত হতে পারে, এমন আভাসও পেলাম আমি এখানে এসে। অর্থাৎ এক ধরনের অনিশ্চয়তা এখনো আছে। তাহলে এখন কি হবে? অনেকগুলো সম্ভাবনার এখন জš§ হয়েছে এবং কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেছেন এবং টেরেসা সে দায়িত্ব নিয়েছেন। এটাই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। ক্যামেরনের নীতি মানুষ গ্রহণ করেনি। এখন কবজারভেটিভ পার্টিতে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের জন্য নয়ানীতি গ্রহণ করতে হবে। নয়া নেতা নির্বাচিত হয়েছেন টেরেসা মে। একটি জনমত জরিপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য প্রসঙ্গেঅর্থাৎ ব্রেক্সিটের ঘটনায় ব্রিটেন একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। লেবার পার্টির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। কেননা বর্তমান লেবার নেতৃত্ব ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন। ফলে লেবার নেতৃত্বকেও এর দায় বইতে হবে। ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত খোদ স্কটল্যান্ডে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর স্কটল্যান্ডে গণভোট হয়েছিল স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে। গণভোটে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল স্বাধীন স্কটল্যান্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে। শতকরা মাত্র ৪৫ ভাগ ভোটার ভোট দিয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষে, বাকি ৫৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল ব্রিটেনের পক্ষে থাকার জন্য। ফরে সেবার স্কটল্যান্ড স্বাধীন হয়নি। এখন ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্কটল্যান্ড ইইউতে ব্রিটেনের জায়গাটি নিতে চায়। স্কটল্যান্ডের ফাস্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টুরগিওন বলেছেন তিনি পুনরায় স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট চান। এই গণভোট এবার স্কটল্যান্ডের ভাগ্য খুলে দিতে পারে। স্কটল্যান্ড ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে পারে এবং বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে যোগ দিতে পারে। ব্রিটেনের এই গণভোট সমগ্র ইউরোপে একটি জাতীয়তাবাদী চেতনা আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণপন্থিদের হাত এতে করে শক্তিশালী হতে পারে। ফ্রান্স ও গ্রিক, এমনকি ইতালি হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্র, যারা ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করতে পারে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থি নেতা মেরিন লি পেন ও তার দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টি সেখানে গণভোটের ডাক দিয়েছে। তার দলও ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। যদিও এটা সত্য ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন পার্টি কনজারভেটিভ পার্টি নিজেরা এই গণভোটের আয়োজন করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষমতাসীনরা এই গণভোটের পক্ষে নয়। এই গণভোট জার্মানির দক্ষিণপন্থিদের আরো উৎসাহিত করতে পারে। এমনিতেই জার্মানিতে বিপুল সংখ্যক সিরীয় শরণার্থীর উপস্থিত নিয়ে জার্মানি সমাজে বিভক্তি আছে। তথাকথিত শরণার্থীদের মাঝে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি ও আইএসের জঙ্গিরা লুকিয়ে আছে এই অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে শরণার্থী শিবিরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এখন ব্রেক্সিটের ঘটনা জার্মানির দক্ষিণপন্থিদের আরো উৎসাহিত জোগাবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দক্ষিণপন্থিরা ভালো করেছে। এখন দক্ষিণপন্থিরা জার্মানিতে ইইউ ছাড়ার ডাক দিতে পারে। ব্রেক্সিটের ঘটনা এখইইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বকে বাধ্য করবে বড় সংস্কার আনতে। অনেক রাষ্ট্র এখন (পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক ও সুইডেন) নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করার উদ্যোগ নেবে। ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অর্থনৈতিকভাবে ইইউকে একটি ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দেবে। ব্রিটেনের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। জেপি মরগ্যান মতো বেশ কিছু বড় বড় ব্যাংক ইতোমধ্যেই ব্রিটেনে তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ঘোষণা করেছে। এতে করে সেখানে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। অন্যত্র চলে যাবে ব্যবসা। ক্ষতি হবে স্থানীয় অর্থনীতির। অন্যদিকে ইইউর অবাধ চলাচল ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগে পূর্ব ইউরোপ থেকে (পোল্যান্ড, চেক ইত্যাদি) যারা লন্ডনে অভিবাসী হয়েছিলেন তারা থাকবেন এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে টাকার দাম পাউন্ডের সঙ্গে বিনিময়ে হারে দুর্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ টাকার দাম কমে যাবে। বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে বাধ্যগ্রস্ত হবে। প্রচুর বাংলাদেশি উদ্যোক্তা লন্ডনে আছেন। তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে ব্রিটেনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা কমে যাবে। আর এমজি (তৈরি পোশাক) সেক্টরে রফতানি কমে যাবে। ব্রেক্সিটের ঘটনা আদৌ ব্রিটেনকে বিশ্ব আসরে একটি ‘শক্তি’ হিসেবে পরিণত করতে পারবে না। এটা সত্য ব্রিটেনের ভোটাররা ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু তাতে করে তারা খুব লাভবান হবেন কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বরং ইইউতে থেকে ব্রিটেন বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল। এখন তাতে ছন্দপতন ঘটল। অনেক প্রশ্ন এখন থাকবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেমন হবে আগামী দিনের ব্রিটেন? ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে থাকবে, সেটাও একটা প্রশ্ন। এখন ব্রিটেনকে ইইউভুক্ত প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তি করতে হবে। যে সব ইইউ নাগরিক ব্রিটেনে কাজ করে, তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এমন কি যে সব ব্রিটেনের নাগরিক ইইউভুক্ত দেশে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন কিংবা ইইউর সদর দফতরে নিয়োজিত তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। সব মিলিয়ে বেক্সিটের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ধরনের ঘটনা। ব্রিটেনের কেউ কেউ ২৩ জুনকে বলছেন ‘স্বাধীনতার দিন।’ কিন্তু আগামী দিনগুলোই বলবে এই ‘স্বাধীনতা’ ব্রিটেনকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পারবে। নিঃসন্দেহে এই ঘটনা বড় বড় অর্থনৈতিক জোটের জন্য একটি খারাপ সংবাদ। শুভ সংবাদ কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদের জন্য। ইউরোপে এই কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদ বিশ্ব যুদ্ধের জš§ দিয়েছিল। এ ইতিহাস অনেকে জানেন। সুতরাং ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাই শেষ কথা নয়। একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন। খোদ যুক্তরাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া পড়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের পথ অনুসরণ করে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে থাকতে চায়। লন্ডনের নব নির্বাচিত মেয়র সাদিক খানের প্রতি হাজার হাজার মানুষ আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে। শুধু তাই নয় ১০ লাখ আবেদন জমা পড়েছিল পুনরায় যুক্তরাজ্যে আরেকটি গণভোট আয়োজন করার তবে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে যুক্তরাজ্যের সর্বত্র। এর ঢেউ এসে পড়েছে এখানে এই যুক্তরাষ্ট্রে। প্রচণ্ড মুসলমান ও অভিবাসনবিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি এই গণভোটের ফলাফলে। তিনি ব্রিটেনবাসীকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন ইতোমধ্যে। মুসলমানমুক্ত, অভিবাসনমুক্ত এবং সর্বোপরি ইইউমুক্ত ব্রিটেনকে তিনি দেখতে চান। এরই মাঝে ইইউর দুই বড় শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্স মাঠে নেমেছে। জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের উদ্যোগে গত জুলাই মাসে বার্লিনে ইইউর শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়েছে। তিনি ব্রিটেনকে ধীরে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এই ধীরে চলার অর্থ কি? গণভোটের রায় তো প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে অস্বীকার করতে পারবেন না। এ নিয়ে তার দলের একটা অংশ ব্রেক্সিটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কয়েকজন মন্ত্রী ও লন্ডনের সাবেক মেয়র জনসন ছিলেন এই শিবিরের। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এক, যুক্তরাজ্য চলে গেলে ইইউর আর্থিক কাঠামোয় তাতে কতটুকু প্রভাব পড়বে? দুই, যুক্তরাজ্য কি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে? এর জবাব এই মুহূর্তে দেয়া কঠিন। যুক্তরাজ্য বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। জি-৭ এর সদস্য এবং নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যও যুক্তরাজ্য। দুর্বল যুক্তরাজ্যের কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না বিশ্ব আসরে। যুক্তরাজ্যের জিডিপির পরিমাণ ২ দশমিক ৬৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার (ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে পিপিপি). আর সাধারণ হিসেবে এর পরিমাণ ২ দশমিক ৮৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার। যা বিশ্বের ৫ম। অন্যদিকে মাথা পিছু আয় সাধারণ হিসেবে ৪৩৭৭১ ডলার, যা বিশ্বের ১৩তম, আর পিপিপিতে এই হিসাব ৪১১৫৯ ডলার। বড় অর্থনীতি হওয়ায় ইইউতে তাদের চাঁদার পরিমাণও বেশি। এক পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ সালে ইইউ ফান্ডে যুক্তরাজ্যের দেয়া চাঁদার পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড। যদিও যুক্তরাজ্য আবার ইইউ থেকে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান পেয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে এই অনুদান দেয়া হয়েছে। ব্রেক্সিট বাদীরা এটাকেই ব্যবহার করেছিলেন। কট্টরপন্থি নেতা ফারাজ এক টুইট বার্তায় অভিযোগ করেছিলেন ইইউর সঙ্গে সংযুক্তির কারণে প্রতিদিন যুক্তরাজ্যের খরচ হয় ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ড। যদিও এটা কিভাবে ব্যয় হয়, তার হিসাব তিনি দেননি। ব্রেক্সিটবাদীদের (যারা ইইউ ছাড়তে চেয়েছিল) অভিযোগ ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও, ইইউ থেকে সেভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পায়নি ব্রিটেন। সুতরাং ইইউর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলোই। ব্রিটেনের নয়া প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে জানিয়ে দিয়েছেন গণভোটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই বেড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে। তবে লন্ডনের মিডিয়া আমাদের জানাচ্ছে টেরেসা মে হয়তো আরো এক বছর সময় নিতে পারেন। তিনি ইইউর সঙ্গে দ্রুত আলাপ-আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে আমরা সত্যিকার অর্থে এখন জানি না কেমন হবে আগামী দিনের ইউরোপ। ব্রিটেন বাদে যে ইউরোপ, তা রাশিয়ার চাপ কতটুকু সহ্য করত পারবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সুতরাং জনমত জরিপে এক অনিশ্চিত ইউরোপের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি। Daily Manob Kontho 02.09,2016