রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ’ কর্মসূচি ও বাংলাদেশ

 
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আজ ঢাকা আসছেন। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার ঢাকা আগমন। তবে বাংলাদেশে তিনি এসেছিলেন ২০১০ সালে, যখন তিনি দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরের গুরুত্ব অনেক। শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি কিংবা বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে একটি ‘মহাপরিকল্পনা’ নিয়েই তিনি যে বাংলাদেশে আসছেন, এটা ভাবা ঠিক নয়। বরং বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনের আগ্রহের অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন লাভ করা। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনা। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় রয়েছে ৬০টি দেশের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করা। মহাপরিকল্পনাটির মূলত দুটো অংশ। এক. সড়কপথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। চীন সড়ক পথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও সংযুক্ত করছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথেও, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। প্রাচীন সিল্ক রুটের আধুনিক সংস্করণ এটি। সরকারিভাবে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের যে মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে তাতে দেখা যায় চীনের সিয়ান থেকে উরুমকি, তুরস্কের ইস্তান্বুল এবং ইউরোপের স্পেনের মাদ্রিদ পর্যন্ত সড়কপথ তৈরি হবে, যা কিনা মধ্য এশিয়ার কিরঘিজস্তান, কাজাখস্তান হয়ে মস্কো, পোল্যান্ড, জার্মানির হামবুর্গ, হল্যান্ডের রটারডাম হয়ে মাদ্রিদে গিয়ে শেষ হবে। দুই. একই সঙ্গে চীন একটি মেরিটাইম তথা সামুদ্রিক সিল্ক রোডের মহাপরিকল্পনাও প্রণয়ন করছে। এই সামুদ্রিক সিল্ক রোডের মাধ্যমে একদিকে আফ্রিকার জিবুতি, মোমবাসা (কেনিয়া) বন্দরের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও মিয়ানমারকেও চীনের একটি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায় চীন।
কথা হচ্ছে, মধ্য এশিয়া, রাশিয়াসহ ‘মেরিটাইম সিল্ক রুট’ভুক্ত অনেক দেশ এই মহাপরিকল্পনায় সংযুক্ত হলেও ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থান এ ব্যাপারে স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা তাও জানা যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে আদৌ চিন্তাভাবনা করছে কিনা জানি না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক্যাল স্টাডিজে’ (বিস) দু’-একবার সেমিনার হয়েছে। বিস কর্মকর্তারা চীন সফরও করেছেন। কিন্তু খুব সিরিয়াস ধরনের কোনো গবেষণা সেখানে হয়নি। আমার কাছে কখনও মনে হয়নি বাংলাদেশ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড, বিশেষ করে মেরিটাইম সিল্ক রুটের ব্যাপারে খুব আগ্রহী। তবে বাংলাদেশ বিসিআইএম (বাংলদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কপথ নির্মাণের যে প্রস্তাব রয়েছে, তাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

বস্তুত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এবং মেরিটাইম সিল্ক রোডের আওতায় চীন দুটো ‘ইকোনমিক করিডোর’ সৃষ্টি করছে। একটি কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। দ্বিতীয়টি, চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের খাসগর থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়ক পথ। এই অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। কারণ এ সড়কপথটি বিতর্কিত ‘আজাদ কাশ্মীর’ ও ইসলামাবাদ হয়ে বেলুচিস্তান প্রদেশের ভেতর দিয়ে গাওদার সমুদ্রবন্দরে গিয়ে মিশেছে। এই অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে বেলুচ নেতাদের আপত্তি রয়েছে। বেলুচ নেতা ব্রাহামদাগ বুগতি চীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারত ওই অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে চীনের বড় আগ্রহ রয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও উপকৃত হতে পারে। ইতিমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও পাকিস্তান সফর করেছেন তার মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করতে। ঢাকা সফরের পর তিনি ভারতে যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি ব্রিকস-বিম্সটেক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শীর্ষ বৈঠকে যোগ দেবেন। ধারণা করছি, ব্রিকস-বিম্সটেক যৌথ শীর্ষ বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট তার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বিম্সটেক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাবেন।

বাংলাদেশ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনায় সংযুক্ত হলে অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু লাভবান হবে- এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। তবে ভারত মহাপরিকল্পনাটি খুব সহজভাবে নিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ ভারত মহাসাগরে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত-চীন দ্বন্দ্বের বিষয়টি তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় ভারত মহাসাগরীয় বিভিন্ন রাষ্ট্রে এই দুটো দেশ নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ করছে। জিবুতি, গাওদার, হামবানতোতা (শ্রীলংকা), মিয়ানমার, ইয়েমেন, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার, ওমান কিংবা কেনিয়ায় চীনের নৌ-ঘাঁটি নির্মাণের আগ্রহের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। জিবুতি ও মাদাগাস্কারে নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ শেষ হয়েছে। একইভাবে ভারত সিসিলি ও মৌরিতুসে নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ করছে। ২০১৫ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই দ্বীপরাষ্ট্র দুটো সফরের সময় এই নৌ-ঘাঁটি নির্মাণের কথা প্রথমবারের মতো জানা যায়। ভারত এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ফলে এ অঞ্চলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে উঠছে, যা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করবে আগামীতে। কাজেই চীনের মেরিটাইম সিল্ক রুট নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।

তবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করা যাবে না। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত হবে। চীনে পারস্য মহাসাগর অঞ্চলের জ্বালানি তেল এ পথে খুব অল্প সময়ে এবং মধ্য এশিয়ার তেল চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই জ্বালানি তেলের ওপর চীন নির্ভরশীল। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে চীন এই অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে তার ইউনান প্রদেশকেও সংযুক্ত করতে চায়। এটা করতে হলে কুনমিং-কক্সবাজার-কলকাতা সড়কপথ (যা কে-টু-কে নামে পরিচিত) নির্মাণ করতে হবে। ২০১৩ সালে চারটি দেশ এই সড়কপথ নির্মাণের ব্যাপারে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ২০১৪ সালে চীন সফরে যান, তখন তিনি কুনমিংয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ কুনমিং-কক্সবাজার সড়কপথ নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহী। সম্প্রতি জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বলেছেন, চীনের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়- আদৌ এই সড়ক পথটি নির্মিত হবে কিনা। নির্মিত হলে বাংলাদেশ সড়কপথে চীনা পণ্য আমদানি করতে পারবে। এতে সময় বাঁচবে ও পণ্যের মূল্য কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে বাংলাদেশ সংযুক্ত হতে পারে। এতে করে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবহার করে মধ্য এশিয়া থেকে জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) আমদানি করতে পারবে।

সুতরাং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি চীনের স্বার্থে প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেও একেবারে ফেলে দেয়া যাবে না। তবে এক্ষেত্রে ভারতের আপত্তির কারণে বাংলাদেশ তার স্বার্থ পূর্ণভাবে রক্ষা করতে পারবে না। চীন কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল। এতে করে আমরা লাভবান হতে পারতাম। কিন্তু ভারত কর্তৃক নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলা (শ্রীলংকার হামবানতোতায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যাপারেও চীন নিরাপত্তার প্রশ্নটি তুলেছিল), চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি এবং সর্বশেষ চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা- সব মিলিয়ে চীনের মেরিটাইম সিল্ক রুটের ব্যাপারে একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।

পাঠকদের জানিয়ে রাখি, চীনের মেরিটাইম সিল্ক রুটের ধারণা অনেক পুরনো। প্রাচীন চীনের মিং সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে জেং হি (১৩৭১-১৪৩৩), যিনি মা হি নামেও পরিচিত ছিলেন, তিনি বিশাল এক নৌবহর নিয়ে প্রায় ছয়শ’ বছর আগে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঘুরে বেড়াতেন। এভাবেই তিনি এ অঞ্চলের সঙ্গে চীনের একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আজ চীন মূলত সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই তার মেরিটাইম সিল্ক রুটের ধারণা নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। জানা যায়, ওই সময় মা হি বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। চীন ইতিমধ্যে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনার আওতাধীন ৬০টি দেশের সঙ্গে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন অব্দি ১২টি দেশের সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে (যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, চিলি, পেরু, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হংকং ও তাইওয়ান)। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, নরওয়েসহ গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও শুল্কমুক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ও ভারত এ তালিকায় নেই। শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক চুক্তি আমাদের জন্যও এক বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে মূলত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক। এর বাইরে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও চীন একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশ চীনে যা রফতানি করে, আমদানি করে তার চেয়ে বেশি। শুধু ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫,৮৬৫ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই। ধারণা করা হচ্ছে, চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় ২৫টি প্রজেক্টে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যের কথা ঘোষণা করা হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিলেও নিকট প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক রেখে একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় বেশি। চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের’ কোনো নজির নেই। চীনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির ধারাকে কোনো কোনো চীনা পর্যবেক্ষক ‘চীনা মার্শাল পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপকে পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, যা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে অভিহিত হয়েছিল। অনেকটা সেই পরিকল্পনার ধাঁচেই চীন এখন পুনর্গঠন ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, যাকে অভিহিত করা হচ্ছে ‘চায়না মার্শাল প্ল্যান’ হিসেবে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই পরিকল্পনার তিনটি অংশের কথা উল্লেখ করেছেন : ১. অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, ২. অন্য কোনো দেশকে ‘প্রভাব বলয়ের’ আওতায় না নেয়া, ৩. অন্য দেশে আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না করা। সাম্প্রতিক সময়ে চীন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক রক্ষা করছে, তাতে এই নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘আধিপত্য’ বা ‘কর্তৃত্ব’ করার প্রশ্নটি কখনও বড় হয়ে দেখা দেয়নি। আজ চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকা আসছেন। আমরা তাকে স্বাগত জানাই।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Jugantor
14.10.2016

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক

 

৩০ বছর পর একজন চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসছেন ১৪ অক্টোবর। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের প্রথম বাংলাদেশ সফরের আগে ১৯৮৬ সালে প্রথম সফরে এসেছিলেন তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট লি সি নিয়েন। এরপর ৩০ বছরে কোনো চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেননি। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণ ছিল। ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের মধ্য দিয়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে আরও শক্ত হয়েছে। ৩১ আগস্ট চীনা স্বীকৃতির ৪১ বছর পার হয়েছে। কিন্তু এ দুইটি দেশের মাঝে সম্পর্কের ইতিহাস ৪১ বছরের নয়। এ সম্পর্কের ভিত্তি হাজার বছর আগে রচিত হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীনা সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে জেং হি তযবহম ঐব (১৩৭১-১৪৩৩) তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল কূটনীতিক ও একজন সফল অ্যাডমিরাল। বেশকিছু জাহাজ নিয়ে আজকের যে ইউনান প্রদেশ (কুনমিং যার রাজধানী), সেখান থেকে তিনি দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে যেতেন। আর এভাবেই তিনি এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে একটা সম্পর্ক স্থাপন করেছিরেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার বাণিজ্যবহর নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভারতের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা কোজিকোডেতে তার মৃত্যু হয়। চীনের বর্তমান শাসকচক্র জেং হি’র (যিনি মা হি নামেও পরিচিত ছিলেন) সেই স্পিরিটকে ধারণ করেন, যে কারণে চীনের বৈদেশিক নীতির অন্যতম একটা দর্শন হচ্ছে বাণিজ্য। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সে বিশাল ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তার পেছনে কাজ করছে জেং হি’র চিন্তাধারা। অর্থাৎ এ অঞ্চলের দেশগুলোকে একটির সঙ্গে অন্যটিকে সংযুক্ত করা। জেং হি তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। আরা আজ আসছেন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প-িত, মনীষী অতীশ দীপঙ্কর চীনের তিব্বতেও গিয়েছিলেন বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য। আর সেখানেই তিনি দেহ ত্যাগ করেছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্ট ঢাকা থেকে ভারতের গোয়া যাবেন। সেখানে তিনি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন।
চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের গুরুত্ব অনেক। চীন বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায়। কক্সবাজারের নিকটবর্তী সোনাদিয়ায় তারা একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তা হয়নি। যদি চীনারা একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করত, তা ভারতের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করত বলে ভারতের ধারণা। কিন্তু এ গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতও লাভবান হতে পারত। ভারতীয় সাতবোন রাজ্যগুলোর পণ্য রফতানির একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি করত। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তির কারণে এ বন্দরটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হলো না। এখন তা সরিয়ে নেয়া হয়েছে পায়রা বন্দরে, যেখানে একটি ভারতীয় সংস্থা এটি নির্মাণ করছে। অভিযোগ আছে, ভারতীয় ওই সংস্থার এ ধরনের কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারপরও চীন এ প্রজেক্টে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এরই মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত এ ব্যাপারে তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি কোনো পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের সময় চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্প বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ‘ব্রেইন চাইল্ড’। এ প্রকল্পের আওতায় ৬১টি রাষ্ট্রকে চীন এক পতাকাতলে নিয়ে আসতে চাইছে। সামুদ্রিক পথকেও চীন সংযুক্ত করতে চাইছে। চীন ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির জন্য ব্যয় বরাদ্দ করেছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। চীন-পাকিস্তানে যে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি হচ্ছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার, তা এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। বেলুচিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্রবন্দরটি এ কর্মসূচির অন্তর্গত। এ অর্থনৈতিক করিডোর বেলুচিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের পাশ দিয়ে গেছে, যাতে ভারতের আপত্তি রয়েছে। বেলুচিস্তানেও এ ব্যাপারে অসন্তোষ আছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করেছে। এতে করে আরব সাগরে চীনে প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনেতিক করিডোর রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর চীনের নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত ‘ড্রেইট অব হরমুজ’ প্রণালি (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। বাংলাদেশ এ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি দিয়ে উপকৃত হতে পারে ভবিষ্যতে। এমনকি ভারতও এ কর্মসূচি থেকে উপকৃত হতে পারে বলে অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক (যেমন শ্যাম শরণ, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব) মন্তব্য করেছেন। ২০১৩ সালে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি চারটি দেশ তাদের সমর্থন জানিয়েছে। এ বিসিআইএম সহযোগিতা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির জন্য এ বিসিআইএম সহযোগিতা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে চীন সরকারিভাবে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর যে ম্যাপ প্রকাশ করেছে, তাতে কলকাতা সমুদ্রবন্দরকে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হলেও তাতে বাংলাদেশের কোনো সমুদ্রবন্দরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুতরাং এ ব্যাপারে বাংলাদেশে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তবে অতি সাম্প্রতিককালে চীন ও ভারতের মধ্যে যে ‘আস্থার’ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভারত চীনের এ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত হবে, সেটা একটি প্রশ্ন বটে। আর বাংলাদেশ ভারতকে উপেক্ষা করে এ প্রকল্পে যোগ দিতেও পারবে না। সুতরাং ভারতের অংশগ্রহণটা এ মুহূর্তে জরুরি। এরই মধ্যে একটি আশার কথা আমাদের শুনিয়েছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীরও আগ্রহ ছিল। সৈয়দ আশরাফের এ বক্তব্য সরকারের কোনো নীতিগত অবস্থান কিনা, তা স্পষ্ট নয়। চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সৈয়দ আশরাফের এ ‘পরিকল্পনা’ নিয়ে এগিয়ে যাবে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে মূলত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক। এর বাইরে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও চীন একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। বিমানবাহিনী বাংলাদেশে চীনা যুদ্ধবিমান সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামও আসে চীন থেকে। ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চীনের ওপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা আছে, যা ভারতের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো চোখে দেখেন না। সাম্প্রতিককালে অতিশয় এ নির্ভরশীলতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করছে। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। এ বাণিজ্যিক সম্পর্ক চীনের অনুকূলে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে রফতানি করে ৪৫৮ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করেছিল ৬ হাজার ৩২৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই যে বাণিজ্য ঘাটতি, তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৩ সালে চীন ৫ হাজার বাংলাদেশী পণ্য চীনে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি। চীনের বিনিয়োগও বাড়ছে। ২০১৩ সালে ১৮৬ চীনা উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছিলেন ৩২০ মিলিয়ন ডলার। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ধারণা করা হচ্ছে, ২৫টি প্রজেক্টে চীন ২০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের কথা ঘোষণা করবে। সুতরাং চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফর যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা চীনের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারি। বাংলাদেশ আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রাখবে। যে ১১টি দেশকে আগামীতে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বাংলাদেশের এ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় চীন আমাদের সহযোগী হতে পারে। উন্নয়নের একটা অন্যতম শর্ত হচ্ছে এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের সংযুক্ত করা ও তার কাঠামোগত উন্নয়ন। চীন এক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। চীন এরই মধ্যে বেশ ক’টি সেতু নির্মাণ করে দিয়েছে। যাতে করে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। চীন এখন বড় শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। ছোট ছোট কলকারখানা চীন অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। এক্ষেত্রে কম্বোডিয়া উপকৃত হচ্ছে। আমরাও এ সুযোগটি গ্রহণ করতে পারি। আমরা চীনাদের জন্য বেশ ক’টি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পাঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এমনকি চীনাদের সহযোগিতা নিয়ে আমরা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও চালু করতে পারি। আমাদের রয়েছে একটি শক্তিশালী তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু এ প্রজন্ম প্রশিক্ষিত নয়। দক্ষ নয়। যুক্তিহীনভাবে তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে এ তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশে বেকার সমস্যাকে প্রকট করছে। আমরা এ তরুণ শক্তিকে একটি প্রশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। এক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা আমরা নিতে পারি। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমাদের প্রতিকূলে। এ বাণিজ্যি ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনতে হবে। চীন যে ৫ হাজার পণ্যের (বাংলাদেশী) চীনা বাজারে প্রবেশের (শুল্কমুক্ত) সুযোগ করে দিয়েছিল, আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। অর্থাৎ ওই ৫ হাজার পণ্যের মধ্যে অনেক পণ্যই বাংলাদেশ উৎপাদন করে না। এক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক আর ওষুধ রফতানির ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। এজন্য চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের কজে লাগাতে হবে। চীন আফ্রিকায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে দেশটির বিনিয়োগ কম। এটা আমাদের এক ধরনের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে চীনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়। চীন ও ভারত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ। ভারত সীমান্তবর্তী দেশ হলেও চীন নিকট প্রতিবেশী। বাংলাদেশ এ দুইটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে এক ধরনের ‘ভারসাম্যমূলক নীতি’ গ্রহণ করছে। এ ‘ভারসাম্যমূলক নীতি’ বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। এটাই সঠিক নীতি। এখন চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক নতুন একটি উচ্চতায়ই শুধু নিয়ে যাবে না, বরং বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি সম্ভাবনারও সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশকে এখন ওই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
Daily Alokito Bangladesh
09.10.2016

চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর


আগামী ১৪ অক্টোবর চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এটা কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর। তবে বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এর আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট চীন স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর ঠিক ১১ বছর পর প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন লি সি আননিয়ান। মাঝখানে ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও কোনো চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসেননি। এখন শি চিনপিং বাংলাদেশে আসছেন। তবে শি চিনপিং সম্ভবত চীনা নেতাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ধারণা রাখেন। তিনি এর আগে ভারত সফর করে গেছেন। শ্রীলঙ্কায়ও তিনি গিয়েছিলেন। পাকিস্তানেও তিনি গিয়েছিলেন। এখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে আসছেন। তবে তাঁর এবারের সফর শুধু বাংলাদেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ঢাকা থেকে তিনি যাবেন ভারতের গোয়ায়; সেখানে তিনি অষ্টম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন। গোয়ায় ১৫ থেকে ১৬ অক্টোবর ব্রিকসের যে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে ভারত ও চীনের পাশাপাশি ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধানরাও যোগ দেবেন। মজার ব্যাপার, প্রায় একই সময় গোয়ায় বিমসটেক-ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। শেখ হাসিনা এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন। বিমসটেক বা ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’ হচ্ছে সাত জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান ও নেপাল এই সংস্থার সদস্য। তবে ভারত ব্রিকস-বিমসটেক যৌথ সম্মেলনে আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ সার্কের সদস্য। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত পাকিস্তানকে এই যৌথ শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়নি। অনেকেরই জানার কথা এরই মধ্যে ইসলামাবাদে যে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক সম্পর্কের ছাত্রদের কাছে ব্রিকস-বিমসটেক যৌথ শীর্ষ সম্মেলনটি যে গুরুত্ব পাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফরের গুরুত্ব অনেক। চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশে। ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও রয়েছে। চীনা নেতারা বরাবরই চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গিয়েছিলেন। তখন তিনি শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তখনো চীন সরকার তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে এবার শি চিনপিংয়ের ঢাকা তথা গোয়া সফরের তাত্পর্য অনেক। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, চীন কর্তৃক পাকিস্তানকে সমর্থন, ভারতীয় মহাসাগরে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব বৃদ্ধিতে ভারতীয় উদ্বেগ, ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতা ও চীনকে ঘিরে ফেলার মার্কিনি উদ্যোগ ইত্যাদি কারণের পরিপ্রেক্ষিতে চীনা প্রেসিডেন্ট ভারতে আসছেন। এমনকি অতি সম্প্রতি চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা ও চীনা সৈন্যদল কর্তৃক ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ কিংবা চীন কর্তৃক ব্রহ্মপুত্রের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া ভারত-চীন সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। একসময় ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। বলা হচ্ছিল, বিশ্বব্যাপী মার্কিন একক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতেই চীন ও ভারত এবং সেই সঙ্গে রাশিয়া একটি ‘ঐক্য’ গড়ে তুলছে। তবে চীন ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও এই দুটি দেশের মাঝে যে এক ধরনের ‘অবিশ্বাসের’ জন্ম হয়েছিল, তা লক্ষ করা যায়। এই ‘অবিশ্বাস’ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, চীন কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর ২০১৪ সালে চীন সফরের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা স্বাক্ষরিত হয়নি। কারণ ভারত এই সমুদ্রবন্দরকে, যার পরিচালনার ভার থাকার কথা ছিল চীনাদের হাতে (গাওদারের সমুদ্রবন্দর চীনারা পরিচালনা করে), তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অভিমত দিয়েছিলেন। একই অভিমত ছিল শ্রীলঙ্কার হামবানতোতায় চীনারা যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছিল, সে ব্যাপারেও। হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতিকে ভারত তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেছিল। সুতরাং সোনাদিয়ায় যদি চীনারা একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করত, তা ভারতের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করত বলে ভারতের ধারণা। কিন্তু এই গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতও লাভবান হতে পারত। ভারতীয় সাত বোন রাজ্যগুলোর পণ্য রপ্তানির একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি করত। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তির কারণে বন্দরটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হলো না। এখন তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে পায়রাবন্দরে, যেখানে একটি ভারতীয় সংস্থা এটি নির্মাণ করছে। অভিযোগ আছে, ভারতীয় ওই সংস্থার এ ধরনের কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তার পরও চীন এ প্রজেক্টে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এরই মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত এ ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি কোনো পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের সময় চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘ব্রেইন চাইল্ড’। এ প্রকল্পের আওতায় ৬১টি রাষ্ট্রকে চীন এক পতাকাতলে নিয়ে আসতে চাইছে। সামুদ্রিক পথকেও চীন সংযুক্ত করতে চাইছে। চীন ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির জন্য ব্যয় বরাদ্দ করেছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। চীন-পাকিস্তান যে অর্থনৈতিক করিডর তৈরি হচ্ছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার, তা এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। বেলুচিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্রবন্দরটি এই কর্মসূচির অন্তর্গত। এই অর্থনৈতিক করিডর বেলুচিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের পাশ দিয়ে গেছে, যাতে ভারতের আপত্তি রয়েছে। বেলুচিস্তানেরও এ ব্যাপারে অসন্তোষ আছে। এই অর্থনৈতিক করিডর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করছে। এতে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এই অর্থনৈতিক করিডরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর চীনের নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এই করিডর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ প্রণালি (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এই অর্থনৈতিক করিডর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে পণ্যের দামও কমে যাবে। বাংলাদেশ এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি দিয়ে উপকৃত হতে পারে ভবিষ্যতে। এমনকি ভারতও এই কর্মসূচি থেকে উপকৃত হতে পারে বলে অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক (যেমন—শ্যাম শরণ, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব) মন্তব্য করেছেন। ২০১৩ সালে বিসিআইএস (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি চারটি দেশ তাদের সমর্থন জানিয়েছে। এই বিসিআইএস সহযোগিতা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির জন্য এই বিসিআইএস সহযোগিতা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে চীন সরকারিভাবে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর যে ম্যাপ প্রকাশ করেছে, তাতে কলকাতা সমুদ্রবন্দরকে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হলেও তাতে বাংলাদেশের কোনো সমুদ্রবন্দরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুতরাং এ ব্যাপারে বাংলাদেশে আরো গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তবে অতি সাম্প্রতিককালে চীন ও ভারতের মধ্যে যে ‘আস্থার’ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভারত চীনের এই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত হবে সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আর বাংলাদেশ ভারতকে উপেক্ষা করে এই প্রকল্পে যোগ দিতেও পারবে না। সুতরাং ভারতের অংশগ্রহণটা এই মুহূর্তে জরুরি।
তবে একটি আশার কথা আমাদের শুনিয়েছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীরও আগ্রহ ছিল। তবে সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্য সরকারের কোনো নীতিগত অবস্থান কি না তা স্পষ্ট নয়। চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সৈয়দ আশরাফের এই ‘পরিকল্পনা’ নিয়ে এগিয়ে যাবে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে মূলত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও চীন একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। বিমানবাহিনী বহুলাংশে চীনা যুদ্ধবিমান সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামও আসে চীন থেকে। ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চীনের ওপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা আছে, যা ভারতের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো চোখে দেখেন না। সাম্প্রতিককালে অনিশ্চিত এই নির্ভরশীলতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করছে। এতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক চীনের অনুকূলে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করে ৪৫৮ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করেছিল ছয় হাজার ৩২৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
এই যে বাণিজ্য ঘাটতি, তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৩ সালে চীন পাঁচ হাজার বাংলাদেশি পণ্যের চীনে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি। চীনের বিনিয়োগও বাড়ছে। ২০১৩ সালে ১৮৬ জন চীনা উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছিলেন ৩২০ মিলিয়ন ডলার। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ধারণা করা হচ্ছে, ২৫টি প্রজেক্টে চীন ২০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের কথা ঘোষণা করবে। সুতরাং চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফর যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। চীন বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী দেশ। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের মনীষী অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য চীনে গিয়েছিলেন দশম শতাব্দীতে এবং ১০৫৩ সালে তিব্বতের লেখান গ্রামে ৭৩ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তাঁর দেহভস্ম ঢাকায় আনা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির আলোকে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারে না। বাংলাদেশ এই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। এখন চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।
Daily Kalerkontho
09.10.2016

নতুন ইতিহাস গড়ার আর মাত্র এক মাস বাকি!


গত ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রথম ‘প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের’ পর হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে জনমত বেশি পড়ায় (সিএনএনের মতে শতকরা ৬২ ভাগ হিলারির পক্ষে) তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। প্রথম নির্বাচনী বিতর্কের ব্যাপারে সর্বত্র আমি এক ধরনের উৎসাহ লক্ষ্য করেছি। এখানে খুব কম বাংলাদেশীই রয়েছেন, যারা এই ‘বিতর্ক’ দেখেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘বিতর্ক’ এবং এর ফলাফল নির্বাচনে আদৌ প্রভাব ফেলবে কি-না? ১৯৬০ সাল থেকেই এ ধরনের প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৬০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সব প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন দু’জন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী- রবার্ট এরিকসন এবং ক্রিস্টোফার ভাইজেন। তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, এ ধরনের বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনমত প্রভাবিত হয়। জনমতের কারণে ১৯৭০ সালে ফোর্ড হেরে গিয়েছিলেন। তিনি ভুল তথ্য পরিবেশন করেছিলেন। আজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা অনেকটা তেমনি। প্রথম বিতর্কে হিলারি যতটা স্বাভাবিক ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন, ট্রাম্প ছিলেন ঠিক তার উল্টো। এই বিতর্ক হিলারিকে এগিয়ে রাখল।

১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত যে রাজনৈতিক ইতিহাস, অর্থাৎ ২৪০ বছরের ইতিহাস, তাতে কোনো নারী প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এই প্রথম একজন নারী এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সেটা হবে আরেক ইতিহাস। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলন তথা নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে এটা হবে একটি মাইলফলক। পাঠকদের জানিয়ে রাখি, যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বড় অর্থনীতি ও বড় গণতন্ত্রের দেশ হলেও এখানে নারীদের ভোটের অধিকারের বয়স মাত্র ৯৬ বছর। দীর্ঘদিন এখানে নারীদের ভোটের অধিকার দেয়া হয়নি। এ নিয়ে নারী আন্দোলনের ইতিহাসও বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের মনোনয়ন পাওয়া এখানকার নারী আন্দোলনকে আরও উজ্জীবিত করবে। এখানে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কনজারভেটিভ সোসাইটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব সীমিত। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলে কংগ্রেসে ৫৩৫টি আসনে (সিনেট ১০০, প্রতিনিধি পরিষদ ৪৩৫) মাত্র ১০৭ জন নারী আইনপ্রণেতা রয়েছেন (ডেমোক্রেট ৭৬, রিপাবলিকান ২৮)। সিনেটে নারী প্রতিনিধি রয়েছেন ২০ জন (১০০ জনের মধ্যে অর্থাৎ শতকরা ২০ ভাগ), আর প্রতিনিধি পরিষদে রয়েছেন মাত্র ৮৪ জন (শতকরা ১৯ দশমিক ৩ ভাগ)। সুতরাং এই সীমিত প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে নারীর পূর্ণ অধিকার রক্ষিত হয়েছে, এটি বলা যাবে না। হিলারি ক্লিনটনের এই মনোনয়ন যুক্তরাষ্ট্রের নারী সমাজের জন্য বড় ধরনের একটি অগ্রগতি। ১৮৪৮ সালে সেনেকা ফলস কনভেনশনে প্রথমবারের মতো নারীদের ভোটাধিকারের দাবি জানানো হয়েছিল। আর এই কনভেনশনের ১৬৮ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র এবার একজন নারী প্রার্থী পেল, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

প্রায় ১০ কোটি মানুষ এই প্রথমবারের মতো টিভি পর্দায় হিলারি আর ট্রাম্পকে বিতর্কে অংশ নিতে দেখল। নিউইয়র্কে বসে আমি এ বিতর্ক দেখেছি। কিন্তু একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এ মুহূর্তে বিশ্বের এক নম্বর শক্তিধর দেশের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে যেসব বিষয় নিয়ে দু’জনের আলোচনা করা উচিত ছিল, তা তারা করেননি। এমনকি উপস্থাপকও এ ধরনের তেমন কোনো প্রশ্ন করেননি। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, তার কাছ থেকে এ ধরনের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ের একটা ব্যাখ্যা আশা করেছিল এখানকার সাধারণ মানুষ। তারা তা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে আফগান যুদ্ধের ১৫ বছর পার করেছে। ২ হাজার ২০০ মার্কিন সেনা এই যুদ্ধে মারা গেছেন। আফগানিস্তানের ১০ ভাগ এলাকা এখন তালেবানদের দখলে এবং আরও ২০ ভাগ এলাকা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছে, এ ব্যাপারে হিলারি ও ট্রাম্পের কোনো বক্তব্য ছিল না। এমনকি ইরাকের বিভক্তি কীভাবে রোধ করা যায়, সে ব্যাপারেও কোনো কথা বলেননি দুই প্রার্থী। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। চীন সেখানে তার শক্তি বৃদ্ধি করছে। এ ব্যাপারেও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল না হিলারি ও ট্রাম্পের। বিতর্কে আলেপ্পো (সিরিয়া), যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক মারণাস্ত্রের আধুনিকায়ন, প্রায় ২৫ লাখ মার্কিন সেনার- যারা অবসরে গেছেন- ব্যাপারেও কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায়নি। প্রথম বিতর্কের পরও ট্রাম্প তার হিলারি-বিদ্বেষী মনোভাব অব্যাহত রেখেছেন। ট্রাম্প অতিমাত্রায় দক্ষিণপন্থী, যুদ্ধাংদেহী, তিনি প্রয়োজনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু করে দিতে পারেন। তিনি অতিমাত্রায় রাশিয়াপন্থী। রাশিয়ায় তার বিশাল বিনিয়োগ আছে। পুতিনকে তিনি ওবামার চেয়েও যোগ্য নেতা মনে করেন। ফলে ট্রাম্পের অতি ‘রাশিয়াপ্রীতি’ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। ট্রাম্প মূলত মুনাফা অর্জনের বিষয়টিই বেশি বোঝেন। তার কাছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের সামাজিক কাঠামোর মানোন্নয়নের ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্ট নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মুসলমান ও মেক্সিকান বিদ্বেষী। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার কথাও বলেছেন তিনি। তিনি সেনাবাহিনীর ‘গৌরবকে’ আঘাত করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে ডেমোক্রেট শিবিরের পক্ষ থেকে। হিলারি যেখানে সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন, বেতন বৃদ্ধি, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন, সেখানে ট্রাম্প গুরুত্ব দিয়েছেন অভিবাসন রোধ করা ও চাকরির সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদির ওপর।

৮ নভেম্বর নির্বাচন। দুই প্রার্থীই প্রথম বিতর্কের পর প্রচারণায় ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছেন। হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্য, অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলা, মধ্যবিত্তকে আকৃষ্ট করা, স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা, টিম কেইনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেয়া- সব মিলিয়ে তার অবস্থান এখন শক্তিশালী বলেই মনে হয়। অন্যদিকে ট্রাম্পের কোনো বক্তব্যই সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। তিনি অভিজ্ঞ রাজনীতিকও নন। ওয়াশিংটন ডিসির রিপাবলিকান শিবিরেও তিনি খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। ৭০ বছর বয়সী ট্রাম্প বিপুল অর্থবিত্তের (ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) মালিক হলেও তিনি কেবল ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি একবার রিফর্ম পার্টির হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। তিনি অতীতে কখনও কোনো ‘রাজনৈতিক পদ’ গ্রহণ করেননি। টিভি উপস্থাপকও ছিলেন (রিয়েলটি শো, এবিসি)। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনের রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণাঢ্য। তরুণ আইনজীবী হয়ে তিনি রাজনীতির সম্পর্কে আসেন। কর্পোরেট আইনজীবী না হয়ে তিনি শিশু অধিকার, মাতৃ অধিকার নিয়ে তার কর্মময় জীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ফার্স্টলেডি, নিউইয়র্কের সিনেটর এবং সর্বশেষ সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তুলনামূলক বিচারে রাজনীতি, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে তার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এবং তিনি অভিজ্ঞ। পররাষ্ট্র তথা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই। ন্যাটো, আইএস ও ব্রেক্সিট প্রশ্নে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তার অজ্ঞতাই প্রকাশ পেয়েছে। নাফটা ও টিপিপি চুক্তির ব্যাপারেও তার অবস্থান হিলারির বিপরীতে। ট্রাম্প মনে করেন, নাফটা ও টিপিপি চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বেড়েছে। অথচ হিলারি মনে করেন, এ দুটো চুক্তির কারণে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে বেশি। ট্রাম্প মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চান। অন্যদিকে হিলারি মনে করন, মেক্সিকানরা মার্কিন অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন আছে ট্রাম্পের। ডেমোক্রেটরা গত আট বছরে (ওবামা প্রশাসন) যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের হাতে তুলে দিয়েছে- এই অভিযোগ ট্রাম্পের। অন্যদিকে হিলারি মনে করেন, চীনের সঙ্গে ‘সহযোগিতামূলক সম্পর্কই’ নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার অন্যতম শর্ত। ওবামার শাসনামলে আইএসের জন্ম হয়েছে এবং এজন্য ডেমোক্রেটরাই দায়ী, ট্রাম্পের এ ধরনের অভিযোগ স্বীকার করেন না হিলারি ক্লিনটন। হিলারি বলেছেন, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ১২২টি দেশ সফর করেছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মাইল ভ্রমণ করেছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য। অথচ ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। তবে ট্রাম্পের একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে তিনি সোজাসাপ্টা কথা বলেন। আক্রমণ করে কথা বলেন, যা হিলারি করেন না কখনও। তিনি তার বক্তৃতায় ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন সত্য; কিন্তু তা অনেক মার্জিত ভাষায়। তাই একটি প্রাক-গবেষণায় (সিন কোলারেসি পরিচালিত) যখন হিলারিকে সর্বোচ্চ নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে বিজয়ী হবেন বলে মন্তব্য করা হয়, আমি তাতে অবাক হই না। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ৫৩৮টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে হিলারি পাবেন ৩৪৭ ভোট, আর ট্রাম্প পাবেন ১৯১ ভোট। নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ে। অর্থাৎ হাউস অব কংগ্রেসের ৪৩৫ আর সিনেটের ১০০ সিট নিয়েই ৫৩৮টি নির্বাচকমণ্ডলী ভোট। ৫০টি রাজ্যের নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটও আলাদা আলাদা। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট ৫৫, আর নিউইয়র্কের ২৯। জনগণ ভোট দেয় বটে, কিন্তু তারা প্রেসিডেন্টকে নির্বাচন করে না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে রাজ্যে যে প্রার্থী বিজয়ী হবেন, তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিটি ভোট পেয়েছেন বলে ধরে নেয়া হয়।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিতর্ক ঘিরে ধরেছে দুই প্রার্থীকে। হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিতর্ক তাকে যথেষ্ট ভোগাচ্ছে। প্রথম বিতর্কেও তিনি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি বিদেশ মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্ধারিত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে বিদেশে যোগাযোগ করেছেন। ওইসব ই-মেইলের কিছু অংশ ফাঁস হয়েছে। ডেমোক্রেটদের দাবি, ট্রাম্পের প্ররোচনায় রাশিয়ার হ্যাকাররা এ ই-মেইল ফাঁস করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হিলারি ক্লিনটনের বাকি সব ই-মেইল প্রকাশ করা হোক। এটা নিঃসন্দেহে হিলারি ক্লিনটনের জন্য একটি মাইনাস পয়েন্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বিপদে আছেন। ডেমোক্রেট শিবির তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার। তার স্ত্রী (তৃতীয়) মেলানিয়ার মধ্য নব্বইয়ে তোলা নগ্ন ছবি (তিনি ফটো মডেল ছিলেন) প্রকাশিত হয়েছে, যা ট্রাম্পকে বিব্রত করেছে। সব মিলিয়ে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। তবে চূড়ান্ত বিচারে পাল্লা কোন দিকে হেলে পড়ে, এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। ১১টি রাজ্য (কলোরাডো, ফ্লোরিডা, আইওয়া, মিসিগান, নেভাদা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহিও, পেনসেলভেনিয়া, ভার্জিনিয়া ও উইসকনসিন) সম্পর্কে বলা হচ্ছে- এগুলো ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটস’। এ রাজ্যগুলো বিগত দুটো নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব রাজ্যের ভোটাররা এখনও দ্বিধাবিভক্ত। তাদের সুনির্দিষ্ট সমর্থন কোনো প্রার্থীর পক্ষেই নেই। কখনও তারা ডেমোক্রেটদের সমর্থন করে, কখনও রিপাবলিকানদের। এখন পর্যন্ত জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্প ব্যবধান অনেকটা কমিয়ে এনেছেন। ফলে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।

দুই প্রার্থীকে আরও দুটো ‘প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে’ অংশ নিতে হবে। পরবর্তী বিতর্ক ৯ অক্টোবর। এ সময়সীমার মধ্যে ট্রাম্প তার রেটিং বাড়াতে পারবেন কি-না, পারলে কতটুকু পারবেন, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক রিপাবলিকান সমর্থক ইতিমধ্যে হিলারিকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন। প্রথম বিতর্কের পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করে কিউবার সঙ্গে অবৈধ ব্যবসা করেছেন। প্রথম বিতর্ক শেষ হওয়ার এক সপ্তাহও পার হয়নি নতুন একটি জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে মিডিয়া (টাইমস-পিকেউন/লুসিড প্রেসিডেন্সিয়াল ট্রাকিং পোল)। এতে হিলারির ৫ পয়েন্টে এগিয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন বিতর্ক উঠেছে- ট্রাম্প নাকি এক সময় ‘পর্নো স্টার’ ছিলেন! সব মিলিয়ে নানা বিতর্ক, নানা প্রশ্নে আটকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণা। মিডিয়াগুলোও এখন অনেকটা দ্বিধাবিভক্ত। নিউইয়র্ক টাইমস সমর্থন করছে হিলারিকে।

তারপরও কথা থেকে যায়। প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে ‘জয়’ পাওয়া হিলারি ক্লিনটন কি তার এই বিজয়ের ধারা ধরে রাখতে পারবেন? ৮ নভেম্বর নির্বাচন। বাকি আছে মাত্র এক মাস। সময়টা খুব বেশি নয়। দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে হিলারি যদি ‘বিজয়ী’ হন, তাহলে তিনিই হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট- অনেক পর্যবেক্ষকই এটা নিশ্চিত করেছেন।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Jugantor
08.10.2016

সার্ক কি ভেঙে যাবে!



অনেকদিন থেকেই একটা কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে আসছে যে, সার্ক কি তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে? নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের পর যখন বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল) নামে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার আত্মপ্রকাশ ঘটে তখনই প্রস্তাবটি উঠেছিল যে, একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার ভেতরে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কীভাবে কাজ করবে? কিংবা উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে কি না? সার্ক ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে এমন কথাও বলেছিলেন তখন কেউ কেউ। সার্ক-এর বয়স একেবারে কম নয়। ৩১ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে সার্ক আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যতটুকু অবদান রাখার কথা ছিল, তা রাখতে পারেনি। দেশগুলোর মধ্যে অধিকারের মাত্রা ছিল বেশি, যা এখনও আছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কথাটা প্রয়োজন বেশি। অতি সম্প্রতি উরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সার্ক সম্মেলনে (নভেম্বর ২০১৬) যোগ দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ তার 'অভ্যন্তরীণ ঘটনায় পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের' পরিপ্রেক্ষিতে সার্ক সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্রীলংকা, ভুটান ও আফগানিস্তানও যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে সার্ক সম্মেলন (১৯৩৪) স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে এমন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে যে, আগামীতেও এ সম্মেলন আয়োজন করা যাবে কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা ভারত কর্তৃক 'সার্জিকাল স্ট্রাইক' দু'দেশের মাঝে যুদ্ধের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
অনেক পর্যবেক্ষকই এখন মনে করেন সার্ক তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মনোনয়নের ক্ষেত্রে সার্ক ৩১ বছর আগে গঠিত হলেও, সার্ক এর উন্নয়ন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে দরিদ্রতার হার বেড়েছে বৈ কমেনি। কিন্তু ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্যতম অঞ্চলগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু দরিদ্রতা এখানে কমেনি। পরিসংখ্যান বলছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে আফগানিস্তানে দরিদ্রতার হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৬ ভাগ। বাংলাদেশে এটা ৩২ ভাগ, নেপালে ২৫ ভাগ, পাকিস্তানে ২২ ভাগ, ভুটানে ১২ ভাগ, শ্রীলংকায় ৯ ভাগ, আর ভারতে ৩০ ভাগ। ভারতে হাজার হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের নিজস্ব কোনো পায়খানা নেই। তারা প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করেন। জাতিসংঘ প্রণীত মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এসডিজি অর্জনে পূর্ণ সক্ষম হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তবে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চাইতে ভালো। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ভারতের চাইতে অনেক এগিয়ে। পিছেয়ে আছে আফগানিস্তান। এক্ষেত্রে সার্ক .... কোনো বড় ভূমিকা নিতে পারেনি।
মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য লক্ষ রাখার মতো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চরিত্রগত দিক দিয়ে বেশি মাত্রায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রার দিক দিয়ে এই দুটো দেশের সঙ্গে অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। উপরন্তু রয়েছে এক ধরনের অবিশ্বাস পাকিস্তান ও ভারতের বৈরিতা ঐতিহাসিক। এই বৈরিতা দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরেও কমেনি। একইসঙ্গে ভারতের একটি 'বড়ভাই' সুলভে আচরণে আতঙ্কিত থাকে পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট দেশগুলো। শ্রীলংকা ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এসব দেশে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। এশিয়ার দ্বিতীয় অর্থনীতি এখন ভারতের। কিন্তু ভারতের এই অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভারত সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। এখানে বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পায়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে এই বহুপাক্ষিকতা কেন গুরুত্ব পায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সমস্যা জ্বালানি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ। এ অঞ্চলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও ভারত এটাকে ব্যবহার করছে তার নিজের স্বার্থে। ভারত ভুটানের সঙ্গে ও নেপালের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বটে, কিন্তু তা ত্রি-দেশীয় উদ্যোগে উৎপাদিত কোনো বিদ্যুৎ নয়। তাছাড়া এই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও নানা কথা আছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে ভুটান-বাংলাদেশ-নেপাল ও ভারতের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে, তা থেকে উপকৃত হতো এ অঞ্চলের জনগণ। কিন্তু তা হয়নি। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়েও কথা আছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারত রপ্তানি করে বেশি, আমদানি করে কম। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত। এখানেও সমস্যা ভারতকে নিয়ে। টেরিফ এবং প্যারাটেরিফের কারণে পণ্যের দাম বেশি হয়ে যায়, যাতে ভারতের আমদানিকারকদের আর আগ্রহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। এই সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। ভারত অনেক সময় সেবা কিছু পণ্যের শুল্ক সুবিধা দেয়ার কথা বলে বটে কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্য আদৌ উৎপাদিত হয় না।
ভারত ইতোমধ্যে সার্ক-এর ভেতরে সদ্য গঠিত উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত হয়েছিল ওই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) নামে পরিচিত। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সঙ্গত কারণেই সার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়_ ভারত বিবিআইএনের পাশাপাশি বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে অপর দুটি জোটের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বেশি। দুটো জোটেই পাকিস্তান নেই। এতে করে একটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে, ভারত চূড়ান্ত বিচারে সার্ক-এর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়_ চীন যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমার) জোটের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল (যা একসময় পরিচিত ছিল কুনসিং উদ্যোগ নামে) তাতেও সস্নথগতি আসতে পারে। বিসিআইএম জোট, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করবে, এই মুহূর্তে ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ভারতের এই মুহূর্তের স্ট্রাটেজি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। ফলে চীনের বন্ধু হিসেবে পাকিস্তানকে ভারত 'কূটনৈতিক জালে' আটকে ফেলে পাকিস্তানের ভূমিকাকে সংকুচিত করতে চাইছে। তাই আগামীতে ২০১৭ সালে নির্দিষ্ট সময়ে আদৌ সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এ ব্যাপারে আমি অন্তত নিশ্চিত নই। যেহেতু কাশ্মির নিয়ে উত্তেজনা এখনো রয়েছে এবং একটি 'সীমিত যুদ্ধ' এর সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না, সেহেতু এটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে, ১৯৩৪ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশেও অনুষ্ঠিত হবে না। দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর দারিদ্র্যতম অঞ্চলগুলোর একটি। এখন যদি দক্ষিণ এশিয়ার দুটি বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মিরের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মাঝে আন্তঃপ্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে তা এ অঞ্চলের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হলেও ভারতের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সেখানে কোনো টয়লেট সুবিধা নেই। ভারতে মেয়ে খুন হত্যার কাহিনী সারাবিশ্বে আজ আলোচিত। কৃষকদের আত্মহত্যার কাহিনী মানুষ জানে। একাধিক গবেষণা প্রবন্ধেও তা প্রকাশিতও হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ভারত এশিয়ার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অর্থনেতিক শক্তিতে পরিণত হলেও সাধারণ মানুষের নূ্যনতম যে চাহিদা, তা পূরণ করতে পারছে না। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত যদি সামরিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ায়, তাহলে তা ভারতের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই কথা প্রযোজ্য পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। জঙ্গিবাদ আজ পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জঙ্গিবাদের কারণে পাকিস্তানের 'জিডিপি গ্রোথ' এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। দরিদ্রতা, সমাজে অসমতা, ধর্মীয় উন্মত্ততা পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বিদেশে নষ্ট করছে। মার্কিন কংগ্রেস পাকিস্তানকে 'সন্ত্রাসী রাষ্ট্র' হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আবারও অস্ত্রসজ্জার উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে উপমহাদেশের পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল হচ্ছে। এতে করে সার্ক-এর উন্নয়ন যে বাধাগ্রস্ত হবে, এটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ান আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু সার্ক তেমনটি পারল না। শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে আস্থার অভাব অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ কর্তৃত্ব করার মানসিকতা ও ভারতের 'বড়ভাই' সুলভ আচরণ ইত্যাদি নানা কারণে সার্ক একটি গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক সহেযাগিতা সংস্থা হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। পাকিস্তান ভারত কর্তৃক কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তথ্য-প্রমাণসহ জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশনে (সেপ্টেম্বর ২০১৬) উপস্থাপন করেছে। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি ভারত বাতিল করার কথা বলছে। অথচ এই পানির ওপর পাকিস্তান আনেকটাই নির্ভরশীল। পাকিস্তান এখন বলছে প্রয়োজনে তারা ভারতে নির্মিত বাঁধ বোমা মেরে উড়িয়ে দিতেও দ্বিধা করবে না। দুটি দেশই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। ভারতে পারমাণবিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ সিভিলিয়ান প্রশাসনের হাতে থাকলেও পাকিস্তানে এই পারমাণবিক কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। ফলে একটা আতঙ্ক থাকলই।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বিকাশে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব। দীর্ঘ ৩১ বছরেও এই আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপিত হয়নি। এটা সার্কের বিকাশে অন্যতম সমস্যা। দ্বিতীয়ত, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় এই জঙ্গিবাদকে ব্যবহার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী। পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা (বিশেষ করে জই-ই মোহাম্মদ) যে প্রায়ই ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা চালায় তা প্রমাণিত। অভিযোগ আছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এসব জঙ্গিকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে থাকে। এত অভিযোগের পরও পাকিস্তান এটা বন্ধ করতে পারেনি। তৃতীয়ত, সার্কভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বাড়াতে পারেনি। দেখা গেছে এখনো সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। ফলে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মাঝে বাণিজ্যিক নির্ভরতা গড়ে ওঠেনি। চতুর্থত, ভারতের সঙ্গে প্রতিটি সার্কভুক্ত দেশের বিশাল বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে। ভারত এই ঘাটতি ব্যবহার করছে তার স্বার্থে। ভারত ঘাটতি কমাতে 'শুল্কমুক্ত' পণ্যের প্রবেশাধিকারের কথা বললেও, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেছে ওইসব পণ্য সার্কের কোনো কোনো দেশ (যেমন বাংলাদেশ) উৎপাদন করে না। ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফ কমানোর উদ্যোগ ভারত কখনো নেয়নি। পঞ্চমত, ভারত এ অঞ্চলে শুধু বড় অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং সামরিক শক্তিও বটে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের আচরণ বন্ধুসুলভ নয়। নেপাল ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কথাটা অনেক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য (ট্রানজিটের নামে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা নেয়া। ফেনী নদী থেকে এককভাবে পানি প্রত্যাহার ইত্যাদি।) এসব কারণের জন্যই সার্কের বিকাশ হচ্ছে না।
সার্ক এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভারত এখন উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকেই গুরুত্ব দেবে। বিবিআইএন-র মতো ভারত এখন শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের সমন্বয়ে অপর একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলবে। ফলে সার্ক ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে। ভারতের একটা বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে বর্তমানে নূ্যনতম ৪টি দেশে (ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল, আফগানিস্তান, শ্রীলংকা) যে সরকার রয়েছে, এই সরকারগুলো 'ভারতবান্ধব' সরকার হিসেবে পরিচিত। ফলে ভারতের ভূমিকা একটি বড় ভূমিকা পালন করে এখানে। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর জন্ম নেয়া সার্ক ৩১ বছর পার করলেও, এই সহ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার 'মৃত্যু' এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

(নিউইর্য়ক, যুক্তরাষ্ট্র)
Daily Jai Jai Din05.10.2016

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও নতুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

 

                
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন ২১ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। বিশ্বের ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এ  শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এবারের শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো এমন এক সময়, যখন বিশ্ব এই মুহূর্তে বড় দুইটি সমস্যার সম্মুখীন। প্রথমটি, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং দ্বিতীয়টি ব্যাপকভাবে অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যা। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে এই দুইটি সমস্যার সমাধানে বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের মাত্রা কীভাবে বেড়েছে, তার বড় প্রমাণ পাওয়া যায় যখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বড় শহরে (নিউইয়র্ক, মিনোসোটা, নিউজার্সি) সন্ত্রাসীরা ‘প্রেসারকুকার’ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এতে মানুষ মারা যায়নি সত্য; কিন্তু দুইটি ঘটনায় (নিউইয়র্ক ও মিনোসোটায়) আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন এবং অন্তত একটি ক্ষেত্রে ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। মিনোসোটায় যে জঙ্গি আটজনকে ছুরিকাঘাত করেছিল, সে পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার আগে আইএসের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং আইএস এটা স্বীকারও করেছিল যে, ‘ইসলামিক খেলাফতের’ সৈনিকরা এ কাজটি করেছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি ওরল্যান্ডের সমকামী ক্লাবে ওমর মতিন নামে এক আফগান-আমেরিকান আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছিল। ওমর মতিনও মৃত্যুর আগে আইএসের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। ফলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এখন আইএস বড় আতঙ্ক। আইএসের সদস্যরা এরই মধ্যে অভিবাসীদের মাঝে কতটুকু ‘প্রবেশ’ করতে পেরেছে, তার কোনো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও এটা তো সত্য, এখানে আইএসের এজেন্ট আছে। এই এজেন্টরা নতুন এক ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্ম দিয়েছে, যাকে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে বলেছেন, ‘নতুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। বাংলাদেশও যে ‘নতুন সন্ত্রাসের’ দ্বারা আক্রান্ত, এটাও প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। সন্ত্রাসীদের অর্থ, অস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন না দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি তিনি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার গুরুত্ব অনেক। কেননা এরই মধ্যে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, সন্ত্রাসী কর্মকা-ের পেছনে অর্থ একটি ফ্যাক্টর। যেখানেই সন্ত্রাসী কর্মকা- হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সব জায়গাতেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকায় হলি আর্টিজানে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল অর্থ এসেছিল। সুতরাং অর্থ একটি ফ্যাক্টর। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি এই অর্থ আদান-প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ হবে না। ১৫ বছর আগে নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার হামলা সংঘটিত করতে সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েক লাখ ডলার সরবরাহ করা হয়েছিল।
দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘১১ সেপ্টেম্বর’ (২০০১) সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ১৫ বছর পার করেছে। ২০০১ সালের ওই হামলা সারা বিশ্বের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল। সারা বিশ্বের মানুষ প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করেছিল সন্ত্রাসীরা কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। এত বছর পরও ৯/১১-কে নিয়ে যে ‘মিথ’, যে ‘বিতর্ক’, তার কোনো সমাধান হয়নি। ১১ সেপ্টেম্বর বিকালবেলা আমি ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে গিয়েছিলাম। একসময় এখানে ‘টুইন টাওয়ার’ ছিল, যা ৯/১১ এর হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন একটি ভবন ‘ফ্রিডম টাওয়ার’। কারা হামলা করেছিল বিমান হাইজ্যাক করে, তাদের পরিচয় পাওয়া গেছে সত্য (১৫ জন ছিলেন সৌদি নাগরিক); কিন্তু কে তাদের প্ররোচিত করেছিল, আল কায়দা এর সঙ্গে কতটুকু জড়িত ছিলÑ এ বিতর্কের আজও কোনো সমাধান হয়নি। একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল সত্য; কিন্তু কমিশনকে  কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি সরকার। চার-চারটি প্লেন কীভাবে একসঙ্গে হাইজ্যাক হলো, কেন চারটি বিমানের ‘ব্ল্যাক বক্স’ খুঁজে পাওয়া গেল না, কেন হাইজাকার কিংবা বিমানযাত্রীদের ডিএনএ টেস্ট করা হলো না এর কোনো সঠিক জবাব মানুষ আজও পায়নি। টুইন টাওয়ারের মতো সুউচ্চ ভবন কীভাবে একসঙ্গে ভেঙে পড়ল এটা নিয়েও বিতর্ক আছে। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটা ছিল ‘Controlled Demolition’, অর্থাৎ ‘নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস’। আরও স্পষ্ট করলে বলা যায়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভবন দুইটি ধ্বংস করা হয়েছিল। সাধারণত বড় বড় ভবন এভাবে ধ্বংস করা হয়, যাতে করে পাশের ভবনের কোনো ক্ষতি না হয়। একটি বিমান কোনো ভবনে আঘাত করলে, পুরো ভবনটি একসঙ্গে নিচের দিকে ভেঙে পড়ার কথা নয়। ‘টুইন টাওয়ার’ এর ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। পাশের তৃতীয় একটি ভবন ভেঙে গিয়েছিল অনেক পরে। কিন্তু সেখানে কোনো বিমান হামলা হয়নি। সুতরাং ৯/১১ নিয়ে বিতর্ক আছে এবং বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, ৯/১১ এর হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা দীর্ঘ ১৫ বছরেও শেষ হয়নি। একদিকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ার মতো দেশ যখন পরিপূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অন্যদিকে আফ্রিকায় জন্ম হয়েছে নতুন নতনু ফ্রন্টের। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর নামে আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নয়া কমান্ড ‘আফ্রিকম’ (AFRICOM)। দক্ষিণ এশিয়ায়ও এ ধরনের অপর একটি কমান্ড প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বরং বেড়েছে। ৯/১১-কে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ জেনেছিল আল কায়দার কথা। আর এখন মানুষ জানছে ইসলামিক স্টেটের কথা। কিন্তু সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি। এরই মধ্যে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা জনপ্রতি হাজার হাজার ডলার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পরিশোধ করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট একটি গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে, তাতে দেখান হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর পেছনে। তাদের তথ্য মতে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত খরচ করে ফেলেছে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অর্থ আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও পাকিস্তান যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালের বাজেটে আরও যুক্ত হচ্ছে ৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য, ৩২ বিলিয়ন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য, এবং যুদ্ধাহত সৈন্যদের জন্য আরও খরচপাতি। সব মিলিয়ে যুদ্ধের পেছনে খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ বিভিন্ন সূত্র থেকে ধার করা হয়েছে। রাষ্ট্রকে তা পরিশোধ করতে হবে সুদসহ। বছরের পর বছর সুদের পরিমাণ বাড়বে এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, ২০৫৩ সালে (যখন সব ঋণ পরিশোধ হবে) যুদ্ধের খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। জুয়ান কোল একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, ন্যূনতম ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে কী করা যেত (Juan Cole what did we buy with $5 trillion that the Iraq and Afganistan wars have cost us? Truth dig, Sept. 13, 2016)। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিদিন যদি ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা যায়, তাতেও এ টাকা শেষ হতে সময় নেবে ২৭৩ বছর। এ যুদ্ধে ৭ হাজার মার্কিন সৈন্য মারা গেছেন। ৫২ হাজার সৈন্য আহত হয়েছেন। আর ইরাকি ও আফগান জনগণের মৃত্যুর হিসাব কয়েক লাখ। ৪০ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে দেশান্তরিত হয়েছেন। জোয়ান কোলের মতে, আল কায়দা যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। ইরাকে কোনো আল কায়দা ছিল না। এমনকি সিরিয়ায়ও নেই। এই দুইটি দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও লিবারেলরা ক্ষমতায় ছিলেন এবং আছেন (সাদ্দাম হোসেন এবং আসাদ)। কিন্তু ‘যুদ্ধ’ সেখানে ইসলামিক জঙ্গিবাদের জন্ম দিয়েছে। দেশ দুইটি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কোনো ফল বয়ে আনেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য বেড়েছে। আয়বৈষম্য বেড়েছে। করপোরেট হাউসগুলো এ যুদ্ধ থেকে লাভবান হয়েছে। এ করপোরেট হাউসগুলোর স্বার্থেই এ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা। এ ব্যবসায় সাধারণ মানুষ লাভবান হয় না। লাভবান হয় বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। করপোরেট হাউসগুলো। আজ যখন নিউইয়র্ক, মিনোসোটা আর নিউজার্সিতে সন্ত্রাসী কর্মকা- হয়, তখন এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাধারণত মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা হয় কম। কিছু ওয়েবসাইট এবং অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্র রয়েছে, যেখানে বিষয়গুলো আলোচিত হয় বেশি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ সময় খোদ নিউইয়র্ক শহরে শত নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও যখন বোমা বিস্ফোরিত হয়, তখন এটা স্পষ্ট, যারাই এ কাজটি করেছে, তারা বিশ্ব নেতাদের একটি মেসেজ দিতে চায় আর তা হচ্ছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখনও শেষ হয়নি। তাহলে এর শেষ কোথায়? ১৫ বছর পার হয়েছে। যুদ্ধ এখনও চলছে। এক নয়া মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম হতে যাচ্ছে। তথাকথিত একটি জিহাদি রাষ্ট্রের এরই মধ্যে জন্ম হয়েছে। সেখানেই ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের লাভটা এখানেই। দুঃখজনক হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কিংবা মুসলিম বিশ্ব আজ দ্বিধাবিভক্ত। সেখানে কোনো ঐক্য নেই। সিরিয়া সংকটের আদৌ কোনো সমাধান হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিমান হামলার পর দীর্ঘ এক বছর পার হয়েছে। আইএসকে উৎখাত করা যায়নি।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ’ শুরু করার কথা বলছেন, এটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো একটি দেশের পক্ষে সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব নয়। সন্ত্রাসীদের কোনো সীমান্ত নেই। এদের কর্মকা- আজ আর শুধু সিরিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাও আজ হুমকির মুখে। সুতরাং ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাসী কর্মকা- মোকাবিলা করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সে কথাটাই উঠে এসেছে। অর্থ সরবরাহ বন্ধ ও সেই সঙ্গে একটি প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করাও দরকার। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা নেবে এটাই প্রত্যাশা সবার।
Daily Alokito Bangladesh
02.10.2016
 

অনিশ্চিত সার্কের ভবিষ্যৎ


হঠাৎ করেই কাশ্মীর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে কাশ্মীর সংক্রান্ত খবরাখবর। শুধু তাই নয়, কাশ্মীর নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধের আশংকা দেখছেন কেউ কেউ। গত জুলাই থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক ধরনের ‘অসহযোগ আন্দোলন’ চলে এলেও দু’দেশের মাঝে উত্তেজনা বাড়ে যখন শ্রীনগর-মুজাফফরাবাদ হাইওয়ের পাশে অবস্থিত উরির সীমান্ত ফাঁড়িতে ১৮ ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ভারতে। ৫ মিনিটের মধ্যে মানচিত্র থেকে পাকিস্তানের চিহ্ন মুছে ফেলার হুমকি দেয়া হয় ভারতের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে, ভারত সীমান্তে অবস্থিত পাকিস্তানি ফাঁড়িগুলোতে হামলা চালাতে পারে। পাকিস্তান ভারতীয় ‘হুমকিকে’ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, তা বোঝা যায় জেনারেল রাহিল শরিফের কোর কমান্ডারদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক ও বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পাল্টা হুমকিতে।

ভারত অভিযোগ করেছে, ১৮ ভারতীয় সৈনিকের হত্যার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দায়ী। পাক সেনাবাহিনী মূলত নওয়াজ শরিফের সিভিলিয়ান সরকারকে দুর্বল করতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাই এ কাজটি করেছে, যাতে করে পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নটি জাতিসংঘে তুলে বিশ্ব জনমত তার পক্ষে নেয়ার যে চেষ্টা করছে তা ভেস্তে যায়। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাক প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যভুক্ত ৫টি রাষ্ট্রকে চিঠি দিয়ে কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ এনেছেন। সব মিলিয়ে কাশ্মীর নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। এ উত্তেজনা সার্ক সম্মেলনের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ৯ ও ১০ নভেম্বর ইসলামাবাদে সার্ক (১৯তম) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইতিমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইসলামাবাদে যাচ্ছেন না। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানও সার্ক সম্মেলনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সার্কের চার্টারে বলা হয়েছে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর কোনো একটি যদি শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তাহলে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা যাবে না। তাই একটা বিষয় বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে- নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন স্থগিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত।

উরির ঘটনা ছাড়াও সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সার্ক সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণ না করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গত আগস্টে ইসলামাবাদে সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সম্মেলনে দু’দেশের মধ্যে একটি তিক্ততার সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল। এমনকি রাজনাথ সিং সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই তখন ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছিলেন। সম্মেলন চলাকালীন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে হাতে হাত মেলাননি। এটা ছিল কূটনৈতিক অসৌজন্যতা। রাজনাথ সিং পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসভবনে আয়োজিত ডিনারেও অংশ নেননি। সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে রাজনাথ সিং অভিযোগ করেছিলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাকিস্তান সাহায্য করছে বলেও তার অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বলেছিলেন, স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী বলা ঠিক হবে না। কাশ্মীরে ভারতের দখলদারিত্বের অভিযোগ এনে যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে, পাকিস্তান তাদের দেখছে ‘স্বাধীনতাকামী’ হিসেবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে (৭১তম) পাকিস্তান কাশ্মীর প্রসঙ্গটি তুলেছে। একইসঙ্গে ভারত কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘন করছে বলেও অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। ফলে একটি তিক্ততার সম্পর্ক ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। প্রথমবার তিনি মন্তব্য করেছেন পার্টির সিনিয়র নেতাদের সভায়। সেখানে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান বেলুচিস্তানে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে এবং সেখানে মানবাধিকার লংঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে। এরপর তিনি স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে (১৫ আগস্ট, ২০১৬) আবারও বেলুচিস্তানের প্রশ্নটি উত্থাপন করেন এবং বেলুচিস্তান, গিলগিট ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণ যে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সে কথাটাও তিনি উল্লেখ করেন। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ। তিনি বলেছিলেন, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত, মোদির বক্তব্যে এটা আবারও প্রমাণিত হল।

তৃতীয়ত, ভারত অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ভারতীয় বিমানঘাঁটি ব্যবহার

করতে পারবে।

চতুর্থত, অক্টোবরে আফগান সমস্যার সমাধানের জন্য নিউইয়র্কে একটি ত্রিদেশীয় (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যাতে পাকিস্তানকে ডাকা হয়নি। স্পষ্টতই, এ অঞ্চলে দুটি জোটের জন্ম হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অক্ষ, অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষ। এখানে বলা ভালো, চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। বেলুচিস্তানের গাওদারে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান হয়ে চীন যে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে, যাতে চীনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার, তা নিয়ে ভারতের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। এই অর্থনৈতিক করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়ান প্রদেশের খাসগর শহরের সঙ্গে গাওদার সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করবে। এতে করে আরব সাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। চীন এ অর্থনৈতিক করিডোরে রেলপথ, সড়কপথ ও তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত করছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ও চীনা পণ্য ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহনের প্রশ্নে এ করিডোর একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে চীনের জন্য। চীন বর্তমানে ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী (যেখান থেকে বিশ্বের ৩৫ ভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়) ব্যবহার করছে। এ অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন সময় বাঁচাতে পারবে। এতে করে পণ্যের দামও কমে যাবে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতাও (শতকরা ৮০ ভাগ চীনা জ্বালানি এ পথে সরবরাহ হয়) এতে করে কমবে। অনেক কম সময়ে চীনা পণ্য পৌঁছে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে নিউইয়র্কে। চীন তাই কোনো অবস্থাতেই চাইবে না এ অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হোক।

ইতিমধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে চীনও শরিক হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা করেছেন এবং কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। নওয়াজ শরিফ জাতিসংঘে দেয়া তার ভাষণে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতের অত্যাচার ও মানবাধিকার লংঘনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি একইসঙ্গে জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব বান কি মুনের কাছে ভারতীয় ‘অত্যাচার ও নিপীড়নের’ দৃশ্য সংবলিত ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন। তিনি কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করলেও বান কি মুন অবশ্য এ ব্যাপারে সায় দেননি। মুন কাশ্মীর প্রশ্নে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছিলেন। নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানির আলোচনায় ইরান কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থনের কথাও জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে কাশ্মীর প্রশ্নে একদিকে পাক-ভারত উপমহাদেশে উত্তেজনা যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে এ দুটি দেশের মধ্যে একটি ‘কূটনৈতিক যুদ্ধ’ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বালুচ নেতা ব্রাহামদাগ বুগতিকে দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আদালতে চীনের বিরুদ্ধে মামলা করার একটি উদ্যোগ নিচ্ছে, এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বলা ভালো, ৮ জুলাই (২০১৬) কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদিন কমান্ডার বুরহান ওয়ানিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী হত্যা করে। এরপর থেকেই কাশ্মীরের পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে এবং তা শেষ পর্যন্ত সার্ক সম্মেলনকে আক্রান্ত করেছে।

অনেক পর্যবেক্ষকই এখন মনে করেন, সার্ক তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ৩১ বছর আগে সার্ক গঠিত হলেও সংস্থাটির উন্নয়ন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বৈ কমেনি। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র্যতম অঞ্চলগুলোর একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস এখানে। কিন্তু দারিদ্র্য এখানে কমেনি। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৬ ভাগ। বাংলাদেশে এ হার ৩২, নেপালে ২৫, পাকিস্তানে ২২, ভুটানে ১২, শ্রীলংকায় ৯, আর ভারতে ৩০ ভাগ। ভারতে হাজার হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে, কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের নিজস্ব কোনো ল্যাট্রিন নেই। তারা প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করেন। জাতিসংঘ প্রণীত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) অর্জনে পূর্ণ সফল হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তবে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভালো। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পিছিয়ে আছে আফগানিস্তান। এ ক্ষেত্রে সার্ক ফোরাম কোনো বড় ভূমিকা নিতে পারেনি।

মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য রাখার মতো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চরিত্রগত দিক দিয়ে বেশি মাত্রায় মধ্যএশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রার দিক দিয়ে এ দুটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। উপরন্তু রয়েছে এক ধরনের অবিশ্বাস। পাকিস্তান ও ভারতের বৈরিতা ঐতিহাসিক। এ বৈরিতা দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরেও কমেনি। একইসঙ্গে ভারতের ‘বড়ভাইসুলভ’ আচরণে আতংকিত থাকে পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট দেশগুলো। শ্রীলংকা ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এসব দেশে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এখন ভারতের। কিন্তু ভারতের এ অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভারত সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড় উঠেছে এ দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। এখানে বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পায়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে এ বহুপাক্ষিকতা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সমস্যা জ্বালানি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ। এ অঞ্চলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও ভারত এটাকে ব্যবহার করছে তার নিজের স্বার্থে। ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ভারত। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বটে; কিন্তু তা ত্রিদেশীয় উদ্যোগে উৎপাদিত কোনো বিদ্যুৎ নয়। তাছাড়া এ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও নানা কথা আছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে তা থেকে উপকৃত হতো এ অঞ্চলের জনগণ। কিন্তু তা হয়নি। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়েও কথা আছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারত রফতানি করে বেশি, আমদানি করে কম। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত। এখানেও সমস্যা ভারতকে নিয়ে। ট্যারিফ ও প্যারাট্যারিফের কারণে পণ্যের দাম বেশি হয়ে যায়, যাতে ভারতের আমদানিকারকদের আর আগ্রহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। ভারত অনেক সময় বেশকিছু পণ্যের শুল্ক সুবিধা দেয়ার

কথা বলে বটে; কিন্তু বাংলাদেশে ওইসব পণ্য আদৌ উৎপাদিত হয় না।

ভারত ইতিমধ্যে সার্কের ভেতরে একটি উপআঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। মোদির ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত হয়েছে এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) নামে পরিচিত। এ উপআঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে সঙ্গত কারণেই সার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ভারত বিবিআইএনের পাশাপাশি বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে অপর দুটি জোটের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বেশি। দুটি জোটেই পাকিস্তান নেই। এতে করে একটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক- ভারত চূড়ান্ত বিচারে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, চীন যে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার) জোটের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল (যা একসময় পরিচিত ছিল কুনমিং উদ্যোগ নামে) তাতেও শ্লথগতি আসতে পারে। বিসিআইএম জোট, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং বাংলাদেশী পণ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করবে, এ মুহূর্তে তা ভারতের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। ভারতের এ মুহূর্তের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। ফলে চীনের বন্ধুৃ হিসেবে পাকিস্তানকে ভারত ‘কূটনৈতিক জালে’ আটকে ফেলে পাকিস্তানের ভূমিকাকে সংকুচিত করতে চাইছে।

এ পটভূমিতে এবং কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায়- যে ক্ষেত্রে একটি ‘সীমিত যুদ্ধের’ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না- ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন যদি দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে আন্তঃপ্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্র। ভারত যদি সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ায়, তাহলে তা দেশটির উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই কথা প্রযোজ্য পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। জঙ্গিবাদ আজ পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জঙ্গিবাদের কারণে পাকিস্তানের ‘জিডিপি গ্রোথ’ এখন সর্বনিু পর্যায়ে। দারিদ্র্য, সমাজে অসমতা, ধর্মীয় উন্মত্ততা বিদেশে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। মার্কিন কংগ্রেসে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আবারও অস্ত্রসজ্জার উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে উপমহাদেশের পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। এতে করে সার্কের উন্নয়ন যে বাধাগ্রস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘আসিয়ান’ আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু সার্ক তেমনটি পারল না। নিজেদের মধ্যে আস্থার অভাব, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, কর্তৃত্ব করার মানসিকতা, ভারতের ‘বড়ভাইসুলভ’ আচরণ ইত্যাদি নানা কারণে সার্ক একটি গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না।

এমনই যখন পরিস্থিতি তখন কাশ্মীর ইস্যু পুরো দৃশ্যপটকে আরও জটিল করে তুলল। এর সঙ্গে এখন যোগ হল সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের প্রশ্নটিও। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। এ চুক্তির ফলে পাকিস্তানের সেচব্যবস্থা সফল হয়েছে। পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি নদী এ চুক্তির ফলে উপকৃত হচ্ছে। এখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আভাস দিয়েছেন, তারা সিন্ধু পানিচুক্তি বাতিল করে দিতে পারেন। সার্কের ভবিষ্যৎ এখন সংকটাপন্ন।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Dily Jugantor
30.09.2016

কোন পথে জাতিসংঘ


 

জাতিসংঘ ৭১ বছরে পা দিয়েছে। সাধারণত প্রতি বছরই এ সময়টাতে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয় এবং বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা এ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে থাকেন। এবারও তারা এসেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন। তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণও দিয়েছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে, আর তা হচ্ছে জাতিসংঘ কি বিশ্ব সমস্যার সমাধানে কোনো বড় ভূমিকা পালন করতে পারছে? আর যদি না পেরে থাকে, তাহলে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তাও-বা কতটুকু? শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় তৃতীয় বিশ্বের; এমনকি মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বলেও অনেকে মনে করেন। বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ব্যর্থতা, ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য দূর করা, মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রপন্থী রাজনীতির বিকাশ, বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা রোধ করার ব্যর্থতা একুশ শতকে জাতিসংঘের ভূমিকাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিবাসন সমস্যা। এ নিয়ে সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরুর আগে একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেও, তা ছিল অনেকটা ‘লোক দেখানো’Ñ সেখানে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলই, এ ধরনের শীর্ষ সম্মেলন করে লাভ কী? বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানরা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। ৫ মিনিট করে সবাই বক্তব্য দেন (মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আবার একটু বেশি সময় দেয়া হয়)। তারপর ফটোসেশন হয়। ছবি তোলা হয়। পার্টি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকও করেন। সাইড লাইনে কেউ কেউ কথাও বলেন। তারপর যে যার মতো চলেও যান। লাখ লাখ ডলার খরচ করে এ ধরনের শীর্ষ সম্মেলন করার অর্থ কী, যদি কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা না-ই যায়! এ শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন একসময়ে, যখন সিরিয়ায় শিশুরা বোমাবর্ষণে মারা যাচ্ছে। আলেপ্পোতে মানুষ আটকে আছে। তাদের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। এমনকি খাদ্যদ্রব্য বহনকারী রেডক্রসের গাড়ির বহরের ওপর বোমাবর্ষণ করা হলে, রেডক্রস তাদের তৎপরতা বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া; এমনকি আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধ’ বন্ধ করতে পারেনি। এ যুদ্ধ ওইসব দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে এ প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত যে, জাতিসংঘ যদি যুদ্ধ থামাতে না পারে, যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে এ জাতিসংঘের প্রয়োজন কী? উন্নত বিশ্ব নিজেদের স্বার্থেই জাতিসংঘকে টিকিয়ে রাখছে।  ‘যুদ্ধ’ তাদেরই সৃষ্টি। সুতরাং ‘যুদ্ধ’ থেমে যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, ১৯৪৫ আর ২০১৬ এক নয়। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে যে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়েছিল, আজকে সেই জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি রাষ্ট্র। ১৯৪৫ সালে মাত্র ৫০টি দেশ নিয়ে জাতিসংঘ তার যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৪৫ সালে যে বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল, আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাকে মেলানো যাবে না। তবে এটা সত্য, কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাফল্য রয়েছে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় প্রথম যুদ্ধ ও কুয়েতকে শত্রুমুক্ত করা, এল সালভাদর, কম্বোডিয়া কিংবা নামিবিয়ায় পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া ও শান্তি ফর্মুলায় রাজি করানোর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছিল, যে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতিসংঘের একটি ভূমিকা রয়েছে। সাবেক যুগোসøাভিয়ার গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানো, কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানো ও সেখানে একটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, নেপালে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জাতিসংঘের উদ্যোগ যে কোনো বিবেচনায় প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর নামে যুক্তরাষ্ট্র যখন ১৫ বছর ধরে আফগানিস্তান, ইরাক আর সিরিয়ায় এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা করে আসছে, জাতিসংঘ সেই ‘যুদ্ধ’ বন্ধ করতে পারেনি। কোনো বড় উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। একটি পরিসংখ্যান দিই। ‘যুদ্ধে’ ইরাকি নাগরিকের মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯০ জন। আর যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধের পেছনে খরচ করেছে (ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে) এরই মাঝে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ২০১৭ সালের বাজেটে যা যুক্ত হবে, তা যোগ করলে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার। চিন্তা করা যায়, কি বিপুল পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করছে শুধু যুদ্ধের পেছনে? অথচ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি। বিশ্বে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের ব্যাপারে দেশটির ভূমিকা বড়। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে আফ্রিকা কিংবা দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণ এশিয়ায় বড় অবদান রাখতে পারত। ব্রাজিলের মতো দেশ, যারা কিনা অলিম্পিক আয়োজন করল, দেশটি একটি ‘বস্তির নগরীর’ দেশে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। জাতিসংঘের ভূমিকা এখানে গৌণ। সিরিয়া ও ইরাক থেকে প্রায় ৫০ লাখ অভিবাসী দেশান্তরিত হয়েছে। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার সময় কত নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, তার হিসাব কারও কাছেই নেই। জাতিসংঘ এ অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। বেঁচে থাকার আশায় এরা যখন ইউরোপের বনে-জঙ্গলে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়িয়েছে, জাতিসংঘ এদের সাহায্যে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। প্রশ্নটা তাই ঘুরেফিরে আসবেইÑ জাতিসংঘের প্রয়োজন তাহলে কী?
আসলে জাতিসংঘের কাঠামোয় উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো ভূমিকা নেই। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাকে হামলা চালিয়েছিল এবং দেশটি দখল করে নিয়েছিল, যা ছিল জাতিসংঘ সনদের বরখেলাপ। অথচ এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়া করাতে পারেনি জাতিসংঘ। সম্প্রতি ব্রিটেনের ওই সময়কার প্রধানমন্ত্রী টনি  ব্লেয়ার স্বীকার করেছেন, ইরাক আক্রমণ ছিল ভুল। কিন্তু তার এ ‘ভুল’ স্বীকারের জন্য ব্লেয়ার কিংবা ব্রিটেনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (হেগ) বিচারের সম্মুখীন করা যায়নি। ২০১১ সালে তথাকথিত ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’ এ অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। এ হামলার ফলে গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু দেশটি কার্যত এখন একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইরাক ও লিবিয়া একসময় ছিল সমৃদ্ধিশালী দুইটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক না কেন, মানুষ সেখানে শান্তিতে ছিল। রাষ্ট্র নাগরিক সুবিধা সেখানে নিশ্চিত করেছিল। আজ রাষ্ট্র দুইটি মূলত দুইটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং রাষ্ট্র দুইটি এখন কার্যত কয়েক টুকরায় ভাগ হয়ে গেছে। এর জন্য দায়ী কে? জাতিসংঘের ভূমিকাইবা এখানে কী? সিরিয়ায় যখন ইলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটল, যখন লাখ লাখ লোক দেশান্তরিত হলো, তখন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ‘মানবাধিকার রক্ষায় হস্তক্ষেপ’ করে সেখানে মেরিন সেনা পাঠায়নি। ১৯৯০ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো জাতিসংঘ সিরিয়ায় সাধারণ মানুষকে রক্ষায় বহুজাতিক সৈন্য পাঠায়নি। অর্থাৎ জাতিসংঘ এখানে বৃহৎ শক্তির স্বার্থের বাইরে যেতে পারেনি। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থেই সিরিয়ায় ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখছে। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধিতে শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ নেই। স্থায়ী পরিষদের সদস্যপদ পাঁচটি, যাদের ‘ভেটো’ পাওয়ার রয়েছে। অস্থায়ী সদস্য রয়েছে ১০টি। স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কোনো কার্যকরী হয়নি। জাতিসংঘের উদ্যোগে অনেক আগেই ঈড়সসরংংরড়হ ড়হ এষড়নধষ এড়াবৎহধহপব নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল জাতিসংঘে কীভাবে সংস্কার আনা যায়, সে ব্যাপারে একটি সুপারিশ করা। সিদ্ধার্থ রামপাল ও ইনভার কলিসন ছিলেন ওই কমিশনের যৌথ চেয়ারম্যান। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। ওই কমিশনের সুপারিশে নিরাপত্তা পরিষদে এক ধরনের ‘স্ট্যান্ডিং’ সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার সদস্য সংখ্যা হবে পাঁচ। এর মধ্যে দুইটি দেশ আসবে উন্নত দেশ থেকে, বাকি তিনটি দেশ আসবে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা থেকে। কিন্তু তাদের কোনো ‘ভেটো’ ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু ২১ বছরেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে থেকে জাপান ও জার্মানি ভেটো ক্ষমতাসহ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ চায়। উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে ভারত স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার। সেখানে আবার চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি রয়েছে। ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের। ভারতের দাবি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু ভারতের ব্যাপারে স্থায়ী সদস্যভুক্ত সবার সমর্থন রয়েছেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে উন্নত বিশ্বকে। বায়ুম-লে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের কারণেই বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘কপ’ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও এবং সর্বশেষ প্যারিস সম্মেলনে (কপ-২১) একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও, তা বাস্তবায়ন নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা জাতিসংঘের নেই। জাতিসংঘের সর্বশেষ সম্মেলনে (২০১৫) ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এর আগে গরষষবহহরঁস উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এটা বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৫ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অনেক দেশ এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পশ্চিমা বিশ্বের সাহায্য ও সহযোগিতার। সেই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের। এ কাজটি জাতিসংঘ করতে পারবে বলে মনে হয় না।
উদ্বাস্তু সমস্যা এ মুহূর্তে অন্যতম আলোচিত সমস্যা। ৫০ লাখ মানুষ (সিরিয়া-ইরাকের) এখন ‘যুদ্ধের’ কারণে অভিবাসী হয়েছেন। কিন্তু ইউরোপে এটা একটা বড় সমস্যার জন্ম দিয়েছে। ‘ইন্ট্রিগেশন’ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। উপরন্তু রয়ে গেছে ধর্মীয় সমস্যা। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো বড় ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
জাতিসংঘ ৭১ বছরে পা দিয়েছে। সময়টা একেবারে কম নয়। প্রতি বছর একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে আমরা অনেক ভালো ভালো কথা শুনি বটে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তা কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারেনি। শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্ব যে অর্থ ব্যয় করে, তা অর্থহীন। জাতিসংঘ মূলত একটি ‘টকিং ক্লাবে’ পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতারা আসেন। ছবি তোলেন। বক্তৃতা করেন। ব্যস এ পর্যন্তই। বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মুসলমান বিদ্বেষ বাড়ছে। একটি ‘মুসলমান বিদ্বেষী’ মনোভাব বিশ্বে অত্যন্ত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ বিশ্বের জনসংখ্যার ২৩ ভাগ হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী (১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ)। অথচ শান্তির ধর্ম ইসলামকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকা-কে এক করে দেখানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলইÑ প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক ব্যয় নিয়ে (২০১৬-১৭ বাজেট) এ প্রতিষ্ঠানটি আর কত দিন টিকে থাকবে? শুধু ফটোসেশন আর বক্তৃতা দেয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। সুতরাং জাতিসংঘের সংস্কারটা জরুরি। হ
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
25.09.2016

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন ও সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি?


সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে নিউইয়র্ক, মিনেসোটা আর নিউ জার্সিতে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আবারও প্রমাণ করল সন্ত্রাসীদের টার্গেটের শীর্ষে এখনও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরপর কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে আবার আতংক ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথম ঘটনা ঘটল মিনেসোটায়। একজন কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী, যে ১৫ বছর ধরে মিনেসোটায় বসবাস করছে, সে একটি শপিং মলে ছুরিকাঘাত করে আহত করল ৯ জনকে। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সংবাদ সংস্থা ‘আমাক’-এ দাবি করা হল, এ কাজটি তাদের সৈনিকরা করেছে। পুলিশ অবশ্য তাকে গুলি করে হত্যা করে। পরের ঘটনা নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। দুটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমা পাওয়া গেল। একটি বিস্ফোরিত হল। আহত হল ২৯ জন। অপর বোমাটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় ‘আবিষ্কার’ করল পুলিশ। নিউইয়র্কের গভর্নর জানালেন, এ সন্ত্রাসী ঘটনায় কোনো বিদেশী সম্পৃক্ততা নেই। অর্থাৎ সম্ভাব্য আইএস সংশ্লিষ্টতা তিনি অস্বীকার করলেন। তৃতীয় ঘটনা নিউ জার্সিতে। সেখানে অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া গেল ৫টি বোমা। উদ্ধার করতে গিয়ে একটি বোমা বিস্ফোরিত হল।

এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) জনমনে, মিডিয়ায় এখন প্রশ্ন একটিই- এই সন্ত্রাসী হামলার শেষ কোথায়? এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ ঘটল এমন একটি সময় যখন ১. যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১-এর ঘটনার (টুইন টাওয়ারে হামলা ও ধ্বংস করে দেয়া) ১৫ বছর পার করেছে, ২. জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে এবং বিশ্ব নেতারা নিউইয়র্কে জমায়েত হতে শুরু করছেন, ৩. মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (নভেম্বর) প্রচারণা এখন তুঙ্গে এবং অন্যতম প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য মুসলমানদের দায়ী করছেন এবং মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়ার হুমকি অব্যাহত রেখেছেন। যারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে উপরে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? বাস্তবতা বলে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়, সেখানে একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে। পাঠক, চলতি বছর অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবে বোমা হামলার ঘটনা স্মরণ করতে পারেন। যিনি হামলা চালিয়েছিলেন, তিনি একজন মুসলমান এবং হামলার আগে ইসলামিক স্টেটের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে এক পাকিস্তান বংশোদ্ভূত দম্পতির স্কুলে আত্মঘাতী হামলা এবং আইএসের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছিল। এখন যে বিষয়টি বহুল আলোচিত তা হচ্ছে- আইএস মার্কিন সমাজে কতটুকু ভিত গাড়তে পেরেছে? নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে তৈরি বোমা দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এবং এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, অভিবাসীদের দ্বারাই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে! মিনেসোটায় যে যুবক ৯ জন লোককে ছরিকাঘাত করে আহত করল, সে সোমালি বংশোদ্ভূত। সোমালিয়ায় আল শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে এবং আল শাবাব অতি সম্প্রতি আইএস নেতা বুগদাদির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। ফলে আইএসের পক্ষ থেকে ‘আমাক’ যখন মিনেসোটার ঘটনাকে ‘ইসলামী সেনার’ কাজ বলে অভিহিত করে, তখন এটাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ কম। তবে নিউইয়র্কের ঘটনায় তথাকথিত আইএসের সংশ্লিষ্টতা এখনও প্রমাণিত হয়নি। এফবিআই তদন্ত করছে। ধারণা করছি, হয়তো আগামীতে জানা সম্ভব হবে এ ঘটনার সঙ্গে আইএস আদৌ জড়িত ছিল কিনা। তবে যারা এ কাজটি করেছে, তারা সন্দেহাতীতভাবে দুটি বিষয় মাথায় রেখেছে- এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, দুই. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন।

এসব ‘সন্ত্রাসী ঘটনায়’ লাভবান হবেন ট্রাম্প। তার জনপ্রিয়তা বাড়বে। হয়তো কয়েক পয়েন্টে তিনি হিলারির চেয়ে এগিয়ে যাবেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় এ সন্ত্রাসী ঘটনাকে তার স্বার্থে ব্যবহার করবেন। তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার আক্রমণ আরও শাণিত করবেন। ফলে নির্বাচনে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বলে, যারাই এ কাজটি করেছে, তারা চাইছে ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ী হোন! ভবিষ্যৎই বলতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রে এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্বাচনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে। আমার কাছে সন্ত্রাস দমন প্রশ্নে হিলারির অবস্থানকে শক্তিশালী মনে হয়নি। ফলে পরোক্ষভাবে ট্রাম্প সুবিধা পাচ্ছেন বেশি। এখানে আবার ‘ইসরাইলি কানেকশনের’ প্রশ্নটি চলে আসে। অভিযোগ আছে, আইএসের জন্ম ও উত্থানের পেছনে ইসরাইলের একটা যোগসূত্র আছে। অনেক নিবন্ধে তথ্য ও উপাত্তসহ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ আইএস তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের নীতিনির্ধারকরা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি লবিও চাচ্ছে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে। সুতরাং একটি ‘আইএস ফোবিয়া’ তৈরি করে জনমতকে ট্রাম্পের দিকে নিয়ে যাওয়ার যে ‘তত্ত্ব’, তা অস্বীকার করি কীভাবে? ট্রাম্প নিজে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি তার ভালোবাসা ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করেছেন একাধিকবার। তিনি একবার প্রকাশ্যে বলেছেন, তার মেয়ে এক ইহুদি সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ তার মেয়ে-জামাই যে ইহুদি, এটা তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন। ফলে নির্বাচনে আইএস বিতর্ক কাজ করবে।

কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ১৫ বছর পার করেছে। ২০০১ সালের ওই হামলা সারা বিশ্বের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল। সারা বিশ্বের মানুষ প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করেছিল সন্ত্রাসীরা কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ৯/১১-কে নিয়ে যে ‘মিথ’, যে ‘বিতর্ক’, এত বছর পরও তার কোনো সমাধান হয়নি। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকালবেলা আমি গ্রাউন্ড জিরোতে গিয়েছিলাম। এক সময় সেখানে টুইন টাওয়ার ছিল, যা ৯/১১-এর হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন একটি ভবন ‘ফ্রিডম টাওয়ার’। যারা হামলা করেছিল বিমান হাইজ্যাক করে, তাদের পরিচয় পাওয়া গেছে সত্য (১৫ জন ছিলেন সৌদি নাগরিক), কিন্তু কে তাদের প্ররোচিত করেছিল, আল কায়দা এর সঙ্গে কতটুকু জড়িত ছিল- এ বিতর্কের আজও কোনো সমাধান হয়নি। একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল সত্য। কিন্তু কমিশনকে পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি সরকার। চার চারটি প্লেন কীভাবে একসঙ্গে হাইজ্যাক করা হল, কেন চারটি বিমানের ‘ব্ল্যাকবক্স’ খুঁজে পাওয়া গেল না, কেন হাইজ্যাকার কিংবা বিমানযাত্রীদের ডিএনএ টেস্ট করা হল না- এসব প্রশ্নের কোনো সঠিক জবাব মানুষ আজও পায়নি। টুইন টাওয়ারের মতো সুউচ্চ ভবন কীভাবে একসঙ্গে ভেঙে পড়ল এটা নিয়েও বিতর্ক আছে। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটা ছিল 'Controllad Demolition' অর্থাৎ ‘নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস’। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভবন দুটি ধ্বংস করা হয়েছে। সাধারণত বড় বড় ভবন এভাবে ধ্বংস করা হয়, যাতে করে পাশের ভবনের কোনো ক্ষতি না হয়। একটি বিমান কোনো ভবনে আঘাত করলে, পুরো ভবনটি একসঙ্গে নিচের দিকে ভেঙে পড়ার কথা নয়। টুইন টাওয়ারের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছিল। পাশের তৃতীয় একটি ভবন ভেঙে গিয়েছিল অনেক পরে। কিন্তু সেখানে কোনো বিমান হামলা হয়নি।

সুতরাং ৯/১১ নিয়ে বিতর্ক আছে এবং বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে ৯/১১-এর হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা দীর্ঘ ১৫ বছরেও শেষ হয়নি। একদিকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ার মতো দেশ যখন পরিপূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অন্যদিকে তখন আফ্রিকায় জন্ম হয়েছে নতুন নতুন ফ্রন্টের। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নয়া কমান্ড ‘আফ্রিকম’ (AFRICOM)। দক্ষিণ এশিয়াতেও এ ধরনের অপর একটি কমান্ড প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বরং বেড়েছে। ৯/১১-কে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ জেনেছিল আল কায়দার কথা। আর এখন মানুষ জানছে ইসলামিক স্টেটের কথা। কিন্তু সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি। ইতিমধ্যে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা জনপ্রতি হাজার হাজার ডলার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিশোধ করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইন্সটিটিউট একটি গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে। তাদের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও পাকিস্তান যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালের বাজেটে আরও যুক্ত হচ্ছে ৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য, ৩২ বিলিয়ন ডলার হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য এবং যুদ্ধাহত সৈন্যদের জন্য আরও খরচপাতি। সব মিলিয়ে যুদ্ধের পেছনে খরচ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ বিভিন্ন সূত্র থেকে ধার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রকে তা পরিশোধ করতে হবে সুদসহ। বছরের পর বছর সুদের পরিমাণ বাড়বে এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, ২০৫৩ সালে (যখন সব ঋণ পরিশোধ হবে) যুদ্ধের খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। জুয়ান কোল এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, ন্যূনতম ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে কী করা যেত (Juan Cole, What did we buy with $ 5 trillion that the Iraq and Afghanistan wars have cost us? Truthdig, Sept. 13, 2016)। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিদিন যদি ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা যায়, তাতেও এ টাকা শেষ হতে সময় লাগবে ২৭৩ বছর! এ যুদ্ধে ৭ হাজার মার্কিন সৈন্য মারা গেছেন, ৫২ হাজার সৈন্য আহত হয়েছেন। আর ইরাকি ও আফগান জনগণের মৃত্যুর হিসাব কয়েক লাখ। ৪০ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে দেশান্তরিত হয়েছেন। জুয়ান কোলের মতে আল কায়দা যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। ইরাকে কোনো আল কায়দা ছিল না। এমনকি সিরিয়াতেও নেই। এ দুটি দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও লিবারেলরা ক্ষমতায় ছিল বা আছে (সাদ্দাম হোসেন ও আসাদ)। কিন্তু ‘যুদ্ধ’ সেখানে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ জন্ম দিয়েছে। দেশ দুটি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কোনো ফল বয়ে আনেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য বেড়েছে। আয়-বৈষম্য বেড়েছে। কর্পোরেট হাউসগুলো এ যুদ্ধ থেকে লাভবান হয়েছে। এই কর্পোরেট হাউসগুলোর স্বার্থেই এই ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধ মানেই ব্যবসা। এ ব্যবসায় সাধারণ মানুষ লাভবান হয় না। লাভবান হয় বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্পোরেট হাউসগুলো।

আজ যখন নিউইয়র্ক, মিনেসোটা আর নিউ জার্সিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়, তখন এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাধারণত মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা হয় কম। কিছু ওয়েবসাইট ও অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্র রয়েছে, যেখানে বিষয়গুলো আলোচিত হয় বেশি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ সময় খোদ নিউইয়র্ক শহরে শত নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও যখন বোমা বিস্ফোরিত হয়, তখন এটা স্পষ্ট, যারাই এ কাজটি করেছে তারা বিশ্ব নেতাদের একটি মেসেজ দিতে চায়- আর তা হচ্ছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখনও শেষ হয়নি। তাহলে এর শেষ কোথায়? ১৫ বছর পার হয়েছে। যুদ্ধ এখনও চলছে। এক নয়া মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম হতে যাচ্ছে। তথাকথিত একটি জিহাদি রাষ্ট্রের ইতিমধ্যে জন্ম হয়েছে। সেখানে ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের লাভটা এখানেই। দুঃখজনক হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, কিংবা মুসলিম বিশ্ব আজ দ্বিধাবিভক্ত। সেখানে কোনো ঐক্য নেই। সিরিয়া সংকটের আদৌ কোনো সমাধান হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পর দীর্ঘ এক বছর পার হয়েছে। আইএসকে উৎখাত করা যায়নি।

নিউইয়র্কের বোমা বিস্ফোরণে অভিযুক্ত আহমদ খান রাহামিকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। এর মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের ‘ঘটনার’ হয়তো একটা সমাধান পাওয়া যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কি বন্ধ হবে? অভিযুক্ত রাহামি একা এ কাজ করেছেন, তা আমার মনে হয় না। আমার ধারণা, এ ঘটনার সঙ্গে শুধু রাহামি একাই জড়িত ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ নেটওয়ার্ক যদি ভেঙে ফেলা না যায় তাহলে নিউইয়র্কের মতো ঘটনা আরও ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর অভিবাসী রয়েছে। এদের মাঝে আইএস সমর্থকদের সংখ্যা বাড়ছে। অতি সম্প্রতি সিরিয়া থেকে বেশ কিছু শরণার্থী এসেছে। তাদের মাঝে আইএসের এজেন্ট যে নেই, তা হলফ করে বলা যাবে না। তাই একটা প্রশ্ন থেকে গেলই- যুক্তরাষ্ট্রে আদৌ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কিনা? তবে এ ঘটনা যে আগামী নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ ক্ষেত্রে যদি নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হন, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Jugantor
22.09.2016