রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

সন্তু লারমার সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক!

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিতর্কিত নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা পুনরায় সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়েছেন। এমন একটি কথাই তিনি বলেছেন গত ১ ডিসেম্বর। তার বক্তব্য এভাবেই ছাপা হয়েছে। (সমকাল, ২ ডিসেম্বর)। তিনি এর কোনো প্রতিবাদ জানাননি। শান্তিচুক্তির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের মতো অনিবার্য পথে যেতে বাধ্য হবে পাহাড়িরা’। তিনি সরকারের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের দাবি আদায়ের আন্দোলনকে গলাটিপে হত্যা করার জন্যই এ সরকার চুক্তি করেছিল। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে  সরকার যে মনোভাব দেখাবে, যে ধরনের ভূমিকা রাখবে, তার বিপরীতে কোন ভাষায় জবাব দিতে হবে, পাহাড়িরা তা জানে। ভাবতে অবাক লাগে এই অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান কিংবা তথ্য কমিশনার ড. সাদেকা হালিমের মতো ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকলেও তারা সন্তু লারমার এই ‘সশস্ত্র সংগ্রামের’ হুমকির কোনো প্রতিবাদ করেননি। এ ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের শামিল। সন্তু বাবু রীতিমতো হুমকি দিয়েছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করার। এটা রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ। অতীতে স্বাধীনতার পর পরই ভারতের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে চাকমাদের নিয়ে শান্তিবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে একটি শান্তিচুক্তি করে তারা মূল ধারায় ফিরে এসেছে বটে, কিন্তু তারা কখনো এ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়নি। লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম,  আজ সন্তু লারমা সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার হুমকি দেন!
আমরা সন্তু বাবুদের এই হুমকিতে রীতিমতো আতঙ্কিত। কেননা, শান্তির নামে চুক্তি সাক্ষরিত হলেও, সেখানে দীর্ঘদিন যাবত অশান্তি বিরাজ করছে। শান্তিচুক্তি সাক্ষরের ১৫ বছর যখন আমরা পার করছি, ঠিক তখনই পাহাড়ি এলাকায় ৪ জন বাঙালির অপহরণের সংবাদ কাগজে ছাপা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বাঙালি অপহরণ এবং চাঁদাবাজি এখন নিত্যনৈমিত্তিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। চাঁদা ছাড়া সেখানে কোনো কাজ হয় না। জনসংহতি সমিতির ক্যাডাররা এই চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নির্ধারণ করে দিয়েছে কোথায় কত টাকা চাঁদা দিতে হবে। সন্তু বাবু এই চাঁদাবাজির কোনো প্রতিবাদ করেননি কখনো। নিরীহ বাঙালিদের অপহরণ ও হত্যা করার ঘটনায়ও নিন্দা জানাননি সন্তু বাবু। উপরন্তু যে ‘শান্তিচুক্তি’র কথা সন্তু বাবু বলেন, সেই শান্তিচুক্তিকেই ‘ডেথ লেটার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে পাহাড়িদের আরেকটি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট বা ‘ইউপিডিএফ’। এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফ নেতা প্রসিত খীসা সন্তু লারমাকে ‘প্রতারক’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন, যা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে গত ১ ডিসেম্বর।
সরকার যে চুক্তি করে পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরেও সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সন্তু লারমার দাবির মুখে ইতোমধ্যে একাধিক সেনা ক্যাম্প সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এইসব সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে ওইসব অঞ্চল এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জনসংহতি সমিতি যে ভূমি সংস্কারের কথা বলছে, সেখানেও রয়েছে তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সরকার যদি ভূমি সংস্কার সংশোধনী প্রস্তাব পাস করে, তাহলে পার্বত্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারাবে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে (যুগান্তর, ৫ ডিসেম্বর, ২০১২)। সন্তু বাবুদের চাপে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন যেভাবে সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তাতে করে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত বাঙালিরা তাদের ভূমির অধিকার, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার হারাবে। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শুধুমাত্র পাহাড়িদের চাপের মুখে পড়ে সরকার বিদ্যমান আইনের সংশোধন করবে, তা হতে পারে না। সংসদে আইনটি পাস হবার আগে এর নেতিবাচক দিকগুলো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বিদ্যমান আইনের ৬(১)গ ধারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারাটি বিলুপ্ত করা হলে সরকারের অধিকগ্রহণকৃত ভূমি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা, সরকার ও স্থানীয় সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমি পাহাড়িদের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যাবে। এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত বাঙালিরা তাদের বসতবাড়ি, ফলের বাগান, পুকুরের মাছ চাষ ইত্যাদি থেকে উচ্ছেদের হুমকির মুখে থাকবে। পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিরাও এখানে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। বাংলাদেশের সংবিধান তাদেরকে অধিকার দিয়েছে এ অঞ্চলে থাকার ও বসবাস করার। এখন যদি বিদ্যমান আইনের ৬(১)গ ধারাটি তুলে দেয়া হয়, তাহলে তা হবে ১৯২৭ সালের রিজার্ভ ফরেস্ট আইন ও ১৯৭৮ সালের বন আইনের পরিপন্থী। এতে করে ১৯৫৮ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আদেশ, ১৯৭৯ সালের ৩১ মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে গৃহীত সব অধিগ্রহণ ও ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রম অবৈধ হয়ে যাবে। এমনকি জনস্বার্থে পার্বত্য অঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য অধিগ্রহণ করা ভূমি পাহাড়ি ব্যক্তির মালিকানায় চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। এ আইনে গৃহীত সংশোধনী পাস হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে রেভিনিউ (রাজস্ব) সংক্রান্ত কাজে জেলা প্রশাসনের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। দেশের প্রচলিত আইনও কার্যকর থাকবে না বিধায় আদালত কর্তৃক ভূমি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। তখন ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে তিন সার্কেল চিফ/রাজারা হেডম্যান কারবারীর মাধ্যমে রীতিনীতি, প্রথা-পদ্ধতি অনুসরণ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা, সামাজিক প্রভাব ইত্যাদি গুরুত্ব পাবে বেশি। এছাড়া এ সংশোধনী পাস হলে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব হয়ে যাবে। কমিশনের ৫ জন সদস্যের মধ্যে ৩ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর হওয়ায় যে কোনো সিদ্ধান্ত পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত বাঙালিদের বিপক্ষে চলে যাবে। বাঙালিদের স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুণœ হবে। এখনই বাঙালিরা পাহাড়ি এলাকায় চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন না। সংশোধনী গৃহীত হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত হবেন। এমনকি তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোও একটা সমস্যা হবে। আইনের ১৩(৩) উপধারা (নতুন) বিষয়ে বলা যায় যে, এই উপধারাটি সংযোজিত হলে কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাঙালিরা বঞ্চিত হবেন, শুধুমাত্র পাহাড়িরাই নিয়োগ পাবেন।
ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইনে বেশ কিছু প্রস্তাব দিলেও সেইসব প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। অতি সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে একচেটিয়াভাবে পাহাড়িদের স্বার্থ রক্ষা করে আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটিও একই মতামত দিয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়ে তা এখন সংসদে যাবে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে ভূমি সংস্কার সংশোধনী আইন পাস হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি পাহাড়ে শান্তি নিশ্চিত করেনি। এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব। কেউ কাউকে আস্থায় নিতে পারছেন না। বিশেষ করে পাহাড়ি নেতৃত্ব আদৌ মনে করে না যে বাঙালিদের এ অঞ্চলে থাকার অধিকার রয়েছে। সংবিধান বাঙালিদের এ অঞ্চলে থাকার অধিকার দিলেও, সন্তু লারমা গংরা তা মানতে নারাজ। একাধিকবার তিনি বাঙালিদের নোয়াখালীর চরে পুনর্বাসনের দাবি করেছেন। সরকারি তরফে এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। এমনিতেই পরিস্থিতি সেখানে শান্ত নয়, তার উপরে ভূমি সংস্কার সংশোধনী আইনটি যদি পাস হয়, তাহলে পরিস্থিতির সেখানে আরো অবনতি হবে। পাহাড়ি-বাঙালি বিদ্বেষ আরো বাড়বে। শুধুমাত্র পাহাড়িদের প্রাধান্য দিয়ে যেকোনো ভূমি সংস্কার সংশোধনী সারা জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সংশোধনী পাসের আগে পাহাড়ি এলাকায় বাঙালিদের মতামত নিতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত বাঙালিদের বাদ দিয়ে যে কোনো সংশোধনী বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেবে।

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে কিছু প্রশ্


খবরটা একটা সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে এভাবে 'আগে শাস্তি পরে অর্থ'। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংবাদটিতে বলা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরই বিশ্বব্যাংক অর্থ সহায়তা করবে। অন্যথায় বাংলাদেশ যে ১২০ কোটি ডলার ঋণের অর্থ পাবে না_ তা স্পষ্ট করেই বলেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি। বিশ্বব্যাংকের একটি তদন্ত প্রতিনিধি দল দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে আসেন গত ১ ডিসেম্বর। বিশ্বব্যাংকের আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গ্যাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বে এই কমিটিটি গঠন করেছিল। দুদক পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ব্যাপারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কতটুকু কী করেছে, তা দেখার জন্যই এই টিম বাংলাদেশে এসেছিলেন। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়টি বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশস্থ প্রতিনিধি অ্যালান গোল্ডস্টেইন তো স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন যে দুদককে অবশ্যই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার না হলে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে না। এখন দুদক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আদৌ শাস্তি দিতে পারবে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতি সাম্প্রতিককালে দুদকের চেয়ারম্যান বলেছেন, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির কিছু প্রমাণ মিলেছে। এই বক্তব্য আমাদের আশান্বিত করে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিষয়টি এখন বহির্বিশ্বে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। নিকট অতীতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত এক জরিপ রিপোর্টেও দুর্নীতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। টিআইবির জরিপে দেখানো হয়েছে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত। প্রকারান্তরে টিআইবি বলতে চাইছে সংসদ সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং তারা দুর্নীতিকে 'প্রমোট' করছেন। এই জরিপ নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমাদের জন্য যারা দুঃখজনক, তা হচ্ছে এ ধরনের রিপোর্ট বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। একদিকে পদ্মা সেতু, অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যখন বহির্বিশ্বে নষ্ট হয়েছে ঠিক তখনই আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টে ভয়াবহ অগি্নকা-ের ঘটনা ঘটল। এই ঘটনাও বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তির জন্য একটি খারাপ খবর। নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টের ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতা ওয়ালমার্টের সিদ্ধান্তের পর বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। ওয়ালমার্ট এখন আর বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক কিনবে না। ওয়ালমার্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে মালিকপক্ষ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে তারা আর মার্কিন আইনপ্রণেতা, মার্কিন শ্রমিক সংস্থা তথা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর 'প্রশ্নের' সম্মুখীন হতে চান না। যে কারখানায় অগি্নদগ্ধ হয়ে এত শ্রমিক মারা গেলেন ওই কারখানাতেই ওয়ালমার্টের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। এখন শুধু ওয়ালমার্টই নয়, বরং আরো বেশকিছু কোম্পানি এবং ইউরোপের বায়াররাও বাংলাদেশের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একদিকে যেমন ঝুঁকির মুখে থাকল, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বহির্বিশ্বে নষ্ট হলো। এর মধ্যদিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে কোনো একটি পক্ষ কী বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ধ্বংস করে ফায়দা ওঠাতে চায়? তৈরি পোশাকে বাংলাদেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই শিল্প খুব বেশিদিন হয়নি গড়ে উঠেছে। তবে দক্ষতা, নেতৃত্ব, কোয়ালিটি ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশে এই শিল্প বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেখা গেছে, বিশ্বে অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব দেখা দিলেও পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় 'হাউস' বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্রেতা। বাংলাদেশ যেমনি সস্তায় তৈরি পোশাক উৎপাদন করতে পারে ঠিক তেমনি আমাদের পণ্য মানসম্মত। তাই বিশ্বের বড় বড় নামকরা প্রতিষ্ঠান এখন বাংলাদেশে ভিড় করছে। বিশ্বে তৈরি পোশাক উৎপাদনের দিক দিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে চীন। তারপরই বাংলাদেশের স্থান। ভারতের অবস্থান আরো পেছনে। এটা সত্য, চীন এক সময় সস্তায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করত। এখন চীনে সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায় না। শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। ফলে চীন এখন আর আগের মতো সস্তায় তৈরি পোশাক উৎপাদন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে জন্যই বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়ছে। তখন এই শিল্পে যদি অস্থিরতা, কিংবা বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করা যায়, তাহলে অন্য একটি পক্ষ এ থেকে সুবিধা নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক আসরে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনাম আমাদের প্রতিপক্ষ। তারা তখন এ বাজারটা 'দখল' করে নিতে পারবে। বৈদেশিক আয়ের একটা অন্যতম উৎস হচ্ছে এই তৈরি পোশাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনায় রপ্তানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা আসতে পারে। বাংলাদেশ শতকরা ১৫ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করেই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাজার পেয়েছে। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জিএসপি (জেনারাইলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস) সুবিধা চাইছে। জিএসপি হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শুল্ক সুবিধা। বাংলাদেশসহ ১২৮টি দেশ এই সুবিধার আওতায়। যদিও তৈরি পোশাক এই সুবিধা পায় না। সিরামিক, সার ইত্যাদি ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা পায় বাংলাদেশ। আমেরিকার শ্রমিক সংগঠনগুলোর ফেডারেশন এএফএল আসছে। তাদের অভিযোগ বাংলাদেশের ইপিজেড তৈরি পোশাক এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত খাতে শ্রম অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও নেই। তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোতে 'কমপ্লাইয়েন্স' ইস্যুতে আমেরিকান 'বায়ার'রা সোচ্চার। 'কমপ্লাইয়েন্স'-এর অর্থ হচ্ছে ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সেই সাথে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে শুরু করে কারখানাগুলোতে অগি্ননিরাপত্তা এর অন্তর্ভুক্ত। 'বায়ার'দের প্রতিনিধিরা সরাসরি কারখানাগুলো পরিদর্শন করেন এবং 'কমপ্লায়েন্স'-এর ব্যাপারে তারা সন্তুষ্ট হলেই তারা অর্ডার দেন। ফলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবসা করতে চায়, তারা সঙ্গত কারণেই 'কমপ্লাইয়েন্স'-এর ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। শ্রমিকদের স্বার্থ তারা দেখার চেষ্টা করেন। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল, কারখানাগুলোতে 'কমপ্লাইয়েন্স'-এর ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি আমেরিকার লেবার সংস্থা অগি্নকা-ের বিষয়টিকে ইস্যু করবে এবং বাংলাদেশি পণ্যের আমদানিতেও তারা বাধা দেবে। জেএসপি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। আমি জানি না এই ভাবমূর্তি আরো কিভাবে ফিরিয়ে আনবো। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিন্তপুরের ঘটনাকে 'পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও কোনো এক প্রক্রিয়ায় ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি বলছেন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী যখন 'পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রের' কথা বলেন, তখন আমার ভয় হয় অগি্নকা-ের ঘটনায় যে ৫টি কমিটি গঠিত হয়েছে, তাদের পক্ষে প্রকৃত 'সত্য' উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে কি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই 'পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের' যথেষ্ট তথ্য আছে। আমরা খুশি হব তিনি যদি তা জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করেন। আমাদের এই সেক্টরটি নিয়ে 'ষড়যন্ত্র' হবে, তা আমরা চাই না। কঠোরহস্তে এই 'ষড়যন্ত্র' দমন করা প্রয়োজন। আমি তাজরিন গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই দায়ী করব। প্রতিটি ফ্লোরের গেটে তালা দেয়া, আগুন দেখেও সেটাকে মহড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা, কর্মকর্তাদের পালিয়ে যাওয়া। কর্মচারীর ৫০ কোটি টাকার ঋণ, বীমার টাকা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য গার্মেন্টে অগি্নকা-ের ঘটনা নতুন নয়। যখনই মানুষ মারা যায় তখনই সরকার 'ষড়যন্ত্রের' কথা বলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে তৎপর হতে দেখা যায়। তারপর যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। আমাদের শ্রমমন্ত্রী হঠাৎ করেই উৎসাহী হয়ে গেলেন। বললেন প্রতিটি কারখানায় তিনটি করে বহির্গমন পথ থাকতে হবে। না হলে ওই কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রায় ৪ হাজার তৈরি পোশাকের কারখানা বাংলাদেশে। অবিলম্বে সার্ভে, টিম করে কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হোক। প্রয়োজন হলে বন্ধ করে দেয়া হোক। আমাদের গার্মেন্ট কর্মীরা 'ফার্মের মুরগির' মতো ব্যবহৃত হতে পারে না। তাদের কারখানায় ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়া ফৌজদারি অপরাধ। বিজিএমইএও এই কাজটি করতে পারে নিয়মিত। যেখানে তালা মারা থাকবে, ওই কারখানাকে বিজেএমইএ কয়েক লাখ টাকা ফাইন করবে। এত বড় একটি অগি্নকা-ের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিল। আমাদের ভাবমূর্তি আবারো ঝুঁকির মধ্যে পড়ল। যেসব ক্ষেত্রে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, সেসব ক্ষেত্রগুলোর ব্যাপারে আমরা যদি কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করি, আমার ধারণা এতে করে আমরা আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সক্ষম হব। পদ্মা সেতু সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের তদন্ত টিম অত্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন। এ ক্ষেত্রে কোনো কিছু ধামাচাপা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুদক যদি এ কাজটি না করে, তাহলে এ জাতির জন্য আরো অনেক দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। টিআইবির রিপোর্টের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রক্রিয়া না দেখিয়ে আমাদের নীতি নির্ধারকরা যদি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেন, তা জাতির জন্যই মঙ্গল। আর স্বচ্ছ চরিত্রের অধিকারীদেরকেই জাতীয় সংসদে পাঠানো উচিত। তাজরিন গার্মেন্টে যা ঘটল, তার কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্বও সরকারের। যেখানে পুরো জাতির স্বার্থ জড়িত, সেখানে ধামাচাপা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেকগুলো ঘটনায় আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আমরা চাইব ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হোক। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ এ দেশটি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় অত্যন্ত নগ্নভাবে উপস্থাপিত হবে, আমরা কেউ তা চাই না। সরকারের দায়িত্বটি তাই অনেক বেশি।Daily JAI JAI DIN11.12.12

প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি


নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টসের ১২৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতা ওয়ালমার্টের সিদ্ধান্তের পর বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। ওয়ালমার্ট এখন আর বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক কিনবে না। ওয়ালমার্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে মালিকপক্ষ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে তারা আর মার্কিন আইন প্রণেতা, মার্কিন শ্রমিক সংস্থা তথা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ‘প্রশ্নের’ সম্মুখীন হতে চান না। যে কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে এত শ্রমিক মারা গেলেন, ওই কারখানাতেই ওয়ালমার্টের জন্য পোশাক তৈরি করা হতো। এখন শুধু ওয়ালমার্টই নয়, বরং আরো বেশ কিছু কোম্পানি এবং ইউরোপের বায়াররাও বাংলাদেশের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একদিকে যেমনি ঝুঁকির মুখে থাকলো, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বহির্বিশ্বে নষ্ট হলো। এর মধ্য দিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে ‘কোনো একটি পক্ষ’ কী বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ধ্বংস করে ফায়দা ওঠাতে চায়?
তৈরি পোশাকে বাংলাদেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই শিল্প খুব বেশিদিন হয়নি গড়ে উঠেছে। তবে দক্ষতা, নেতৃত্ব, কোয়ালিটি ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশ এই ‘শিল্পে’ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেখা গেছে  বিশ্বে অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব দেখা দিলেও পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ‘হাউজগুলো’ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্রেতা। বাংলাদেশ যেমনি সস্তায় তৈরি পোশাক উৎপাদন করতে পারে, ঠিক তেমনি আমাদের পণ্য মানসম্মত। তাই বিশ্বের বড় বড় নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাংলাদেশে ভিড় করছে। বিশ্বে তৈরি পোশাক উৎপাদনের দিক দিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে চীন। তারপরেই বাংলাদেশের স্থান। ভারতের অবস্থান আরো পেছনে। এটা সত্য, চীন এক সময় স্বস্তায় তৈরি পোশাক রফতানি করতো। এখন চীনে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। ফলে চীন এখন আর আগের মত স্বস্তায় তৈরি পোশাক উৎপাদন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে জন্যই বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়ছে। এখন এই শিল্পে যদি অস্থিরতা, কিংবা বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশী পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করা যায়, তাহলে অন্য একটি ‘পক্ষ’ এ থেকে সুবিধা নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক আসরে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনাম আমাদের প্রতিপক্ষ। তারা এখন এ বাজারটি ‘দখল’ করে নিতে পারবে।
বৈদেশিক আয়ের একটা অন্যতম উৎস হচ্ছে এই তৈরি পোশাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনায় রফতানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা আসতে পারে। বাংলাদেশ শতকরা ১৫ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করেই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাজার পেয়েছে।  তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস) সুবিধা চাইছে। জিএসপি হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শুল্ক সুবিধা। বাংলাদেশসহ ১২৮টি দেশ এই সুবিধার আওতায়। যদিও তৈরি পোশাক এই সুবিধা পায় না। সিরামিক, সার ইত্যাদি ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা পায় বাংলাদেশ। আমেরিকার শ্রমিক সংগঠনগুলোর ফেডারেশন এএফএল-সিআইও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জেএসপির সুবিধার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের অভিযোগ বাংলাদেশের ইপিজেড, তৈরি পোশাক এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত খাতে শ্রম অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও নেই। তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোতে ‘কমপ্লাইয়েন্স’ ইস্যুতে আমেরিকার ‘বায়ার’রা সোচ্চার। ‘কমপ্লাইয়েন্স’ এর অর্থ হচ্ছে ফ্যাক্টরীগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সেই সাথে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে শুরু করে কারখানাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা এর অন্তর্ভুক্ত। ‘বায়ার’দের প্রতিনিধিরা সরাসরি কারখানাগুলো পরিদর্শন করেন এবং ‘কমপ্লাইয়েন্স’ এর ব্যাপারে তারা সন্তুষ্ট হলেই তারা অর্ডার দেন। ফলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবসা করতে চায়, তারা সঙ্গত কারণেই ‘কমপ্লাইয়েন্স’-এর ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। শ্রমিকদের স্বার্থ তারা দেখার চেষ্টা করেন। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল, কারখানাগুলোতে ‘কমপ্লাইয়েন্স’-এর ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি আমেরিকার লেবার সংস্থা অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টিকে ইস্যু করবে এবং বাংলাদেশী পণ্যের আমদানিতেও তারা বাঁধা দেবে। জিএসপি সুবিধা পাবার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। আমি জানি না, এই ভাবমূর্তি আমরা কীভাবে ফিরিয়ে আনবো। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিন্তপুরের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ ও ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও কোনো এক পত্রিকায় ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও ছাপা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী যখন ‘পরিকল্পিত’ ও ‘ষড়যন্ত্র’র কথা বলেন, তখন আমার ভয় হয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে ৫টি কমিটি গঠন হয়েছে, তাদের পক্ষে প্রকৃত ‘সত্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে কী না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই ‘পরিকল্পনা’ ও ‘ষড়যন্ত্রের’ যথেষ্ট তথ্য আছে। আমরা খুশি হবো তিনি যদি তা জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করেন। আমাদের এই সেক্টরটি নিয়ে ‘ষড়যন্ত্র’ হবে, তা আমরা চাই না। কঠোর হস্তে এই ‘ষড়যন্ত্র’ দমন করা প্রয়োজন।
আমি তাজরিন গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই দায়ী করবো। প্রতিটি ফোরের গেটে তালা দেয়া, আগুন দেখেও সেটা মহড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা, কর্মকর্তাদের পালিয়ে যাওয়া, কোম্পানির ৫০ কোটি টাকার ঋণ, বিমার টাকা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য গার্মেন্টসে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন  নয়। যখনই মানুষ মারা যায়, তখনই সরকার ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে তৎপর হতে দেখা যায়, তারপর যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। আমাদের শ্রমমন্ত্রী হঠাৎ করেই উৎসাহী হয়ে গেলেন। বললেন, প্রতিটি কারখানায় তিনটি করে বহির্গমন থাকতে হবে। না হলে ওই কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রায় ৪ হাজার কারখানা বাংলাদেশে। অবিলম্বে সার্ভে টিম করে কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের চূড়ান্ত সময়সীমা দেয়া হোক প্রয়োজন হলে বন্ধ করে দেয়া হোক। আমাদের গার্মেন্টস কর্মীরা ‘ফার্মের মুরগী’র মত ব্যবহৃত হতে পারে না। তাদের ‘কারখানায় ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়া ফৌজদারী অপরাধ। বিজিএমইএও এই কাজটি করতে পারে নিয়মিত। যেখানে তালা মারা থাকবে, ওই কোম্পানিকে বিজিএমইএ কয়েক লাখ টাকা ফাইন করবে।
এত বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। মৃত্যুর মূল্য এক লাখ টাকা হতে পারে না। সরকারও সাহায্য করুক। বায়াররাও সাহায্য করছে। যারা মারা গেছেন, তাদের পরিবার যেন এ টাকা পায়- এটা নিশ্চিত করা হোক। তাজরিন ফ্যাশনের জন্য পুরো তৈরি পোশাক শিল্প একটা ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে না। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে আমরা ‘বায়ার’দের তথা আমেরিকার শ্রমিক সংগঠনের আস্থা অর্জন করতে পারি। তাজরিন ফ্যাশনের মালিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গ্রেফতারেরও দাবি করছি। সেই সাথে ‘কমপ্লাইয়েন্স’ ব্যবস্থা সব ফ্যাক্টরীতে বাস্তবায়ন করারও দাবি করছি। বিরোধী পক্ষকে দায়ী করে বক্তব্য দিলে তাতে করে মূল ঘটনা ‘চাপা’ পড়ে যাবে। ‘ষড়যন্ত্র’কারীরা আরো শক্তিশালী হবে। আর বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি আরো নষ্ট হবে।

দুর্নীতির কারণে দেশের ভাবমূর্তির অবনতি হয়েছে


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক পরিচালিত বিশ্বব্যাপী বার্ষিক জরিপে দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্রে গত এক বছরে বাংলাদেশের ২৪ ধাপ অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৬ ডিসেম্বর এটি প্রকাশিত হয়। টিআই পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচকে’ গত বছর বিশ্বের ১৮৩টি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যে সূচক করা হয়েছিল, তাতে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০ নম্বরে। আর এবার ১৭৬টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে ৫টির অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ এই দেশগুলো ধীরে ধীরে দুর্নীতির ব্যাপকতা থেকে নিজেদের কিছুটা হলেও বের করে আনতে পেরেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পারেনি বাংলাদেশ, সেই সঙ্গে পাকিস্তান। বাংলাদেশে দুর্নীতিজনিত পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের অবনতি হয়েছে ৫ ধাপ, কিন্তু বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে ২৪ ধাপ। স্কোরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়েছে। ২০১১ সালের ২৭ স্কোর কমে এবার হয়েছে ২৬। রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ নম্বরে।
বলা ভালো, এ রিপোর্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কোন ভূমিকা নেই। কিছুদিন আগে টিআইবির একটি রিপোর্ট নিয়ে (সংসদ সংদস্যদের নিয়ে) দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সংসদ সদস্যদের অনেকে টিআইবির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার কথাও বলেন। এখন টিআইবির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সেটা সহজেই অনুমেয়। সরকারি দল সংসদ সদস্যদের নিয়ে টিআইবির রিপোর্টটি যেমন প্রত্যাখ্যান করেছিল, ঠিক তেমনি টিআইর রিপোর্টটিও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ এই রিপোর্ট প্রকাশের পেছনে কোন ‘ষড়যন্ত্র’ রয়েছে বলে মনে করেন। আর দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ রিপোর্টটির ব্যাপারে সন্দিহান। তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম শক্তভাবে পরিচালনা করছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ১৩তম অবস্থান বহাল থাকার কথা নয়। অন্যদিকে বিএনপি যে টিআইর রিপোর্টে খুশি, তা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের বক্তব্যেই প্রমাণিত হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, টিআইর প্রতিবেদন যথার্থ। আমরা অতীতেও দেখেছি এ ধরনের একটি রিপোর্ট যখন প্রকাশিত হয়, তখন কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে দল দুটি পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান গ্রহণ করে। রিপোর্টটি গ্রহণ না করে সরকারি দল এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিষয়টি একরকম ‘ওপেন সিক্রেট’। বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতির সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। পদ্মা সেতু, হলমার্ক কেলেংকারি, ডেসটিনি গ্র“পের দুর্নীতি নিয়ে বলতে গেলে প্রতিদিনই আলোচনা হচ্ছে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে স্থান পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুদকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যেদিন টিআইর প্রতিবেদনটি ঢাকায় প্রকাশিত হয়, সেদিনও সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের যে বিশেষজ্ঞ প্যানেল টিম বাংলাদেশে এসেছিল, তারা অসন্তোষ নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেছে। দুদক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগে (তাদের ভাষায় দুর্নীতির ষড়যন্ত্র) যাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে, সেখানে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম নেই। অসন্তোষের এটাই মূল কারণ। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ টিমের মতে, কানাডার এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তারা যেহেতু একাধিকবার সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন এবং ১০ পার্সেন্ট ঘুষ দাবির সঙ্গে তার নামটি আছে, সেহেতু তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায় না।
শুধু পদ্মা সেতুতে ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের’ কথা কেন বলি, হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা। হলমার্কের এমডিকে গ্রেফতার করা হলেও অনেক রাঘববোয়ালই রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে। হলমার্ক ঋণ কেলেংকারিতে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা জড়িত থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের বড় দুর্নীতির আরও খবর রয়েছে বলে অনেকেই আশংকা করছেন। ডেসটিনির অর্থ কেলেংকারির দায়ভারও সরকার এড়াতে পারে না। যদিও ওই কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান এখন জেলে। আর পর্দার অন্তরালে চলে গেছেন ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা। অনেক দিন থেকেই রেন্টাল (ভাড়াভিত্তিক) ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। আর এ চাহিদা মেটাতে সরকার আশ্রয় নিয়েছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। মোট ৩২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে এ খাতে। অধিকাংশই ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে চালানো হয়। এ খাতে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। এখানেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ খাতে রাষ্ট্রের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ থেকে মুনাফা লুটেছেন একশ্রেণীর ব্যবসায়ী, যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের সঙ্গে জড়িত।
সুতরাং আজ যখন টিআইবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তখন আমি অবাক হই না। কারণ বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গে ‘রাঘববোয়ালরা’ জড়িত। তারা এতই ক্ষমতাবান যে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে সহজেই পার পেয়ে যান। তাদের কেউ ছুঁতে পারে না। শেয়ারবাজার থেকে অবৈধভাবে ১০ হাজার কোটি টাকা ‘লুট’ হয়েছিল। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, ওই কমিটি দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু তাদের একজনের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। পাচার করা টাকাও ফেরত আসেনি।
পৃথিবীর সব দেশেই দুর্নীতি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও হয়, এমনকি চীনেও শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির খবর আমরা পত্রপত্রিকা থেকে জেনেছি। আমাদের সঙ্গে ওই দেশগুলোর পার্থক্য এখানেই যে, ওই সব দেশে দুর্নীতি যদি প্রমাণিত হয়, তার শাস্তি ভয়াবহ। চীনের একটি শহরের মেয়র দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের একজন আইনপ্রণেতা দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে জেলে কাটিয়েছেন সারাজীবন। জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর হেলমুট কোল দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকি ভারতের মতো দেশেও প্রচুর দুর্নীতি হয়। কিন্তু সেখানকার তদন্ত সংস্থা ও বিচার বিভাগ অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রভাব খাটানোর কোন সুযোগ নেই। মন্ত্রী হয়েও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে জেলে গেছেন, এ ধরনের সাবেক ও ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর সংখ্যা অনেক। অস্বীকার করা যাবে না যে ভারত কিছুটা হলেও দুর্নীতিকে দমন করতে পেরেছে, যা আমরা পারিনি। আমাদের আইনে দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক ধারা রয়েছে। যেমন, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রমূলক অপরাধের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১২০(খ), দুর্নীতির উদ্যোগ গ্রহণের জন্য দণ্ডবিধির ৫১১ ধারা, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং পরস্পর যোগসাজশে অপরাধ সংঘটনের জন্য দণ্ডবিধির ১০৯ নম্বর ধারা। এসব ধারায় দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, বড় বড় দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকার তদন্ত কাজে প্রভাব খাটায়। তদন্ত কর্মকর্তারাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেন না। তাদের চাকরির ভয় থাকে। বদলির ভয় থাকে। অনেক সময় ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের’ উদ্দেশ্যে তদন্ত কাজ প্রভাবিত হয়। যে কারণে দেখা যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শাস্তি পান না। অথবা এমনভাবে তদন্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়, যা দিয়ে উচ্চ আদালতে দুর্নীতি প্রমাণ করা যায় না। বাংলাদেশ বোধকরি পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে বড় দুর্নীতি করেও অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়।
টিআইর রিপোর্টে আমরা আবারও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে প্রমাণিত হলাম। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের প্যানেল টিম হতাশ হয়েই বাংলাদেশ ছাড়ল। এর অর্থ পরিষ্কারÑ বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে সম্ভবত অর্থায়ন করছে না। একজন ব্যক্তি এখানে প্রাধান্য পেলেন। প্রাধান্য পেল না অর্থায়নের বিষয়টি। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এখন কী করবেন আমি জানি না। কিন্তু টিআইর রিপোর্ট আর বিশ্বব্যাংকের প্যানেলের হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনায় আমাদের জন্য অনেক ‘খারাপ’ খবর অপেক্ষা করছে। প্রসঙ্গত, দাতাগোষ্ঠী বাংলাদেশকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে মনে করতে পারে। এতে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। সাহায্যের ক্ষেত্রেও স্থবিরতা আসবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সুশাসনের ব্যাপারটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণার জš§ দেবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যে অর্জন, তা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় কিংবা দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক দৃষ্টি কেড়েছিল। ওবামার মতো ব্যক্তিও মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশকে ‘রেফার’ করতেন। এখন বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত আর দেয়া যাবে না। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাকের জন্য যে জিএসপি সুবিধা (শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) চেয়ে আসছে, এই সুবিধা পাওয়া আরও কঠিন হবে। মার্কিন প্রশাসন এটাকে সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করবে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র তার মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্ট (এমসিএ) থেকে বাংলাদেশকে প্রতিবছর যে ১০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল, এখন সেখান থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য ২০০৪ সালে এমসিএ গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ এখান থেকে কোন সাহায্য পায় না। দুর্নীতির এই বৃত্ত যদি বাংলাদেশ ভাঙতে না পারে, তাহলে এমসিএ থেকে সাহায্য বাংলাদেশ কোন দিনই পাবে না। সর্বশেষ পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ঘটনায় এমসিএ থেকে সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক দুর্বল হল।
উন্নয়নশীল বিশ্বে দুর্নীতি থাকবেই। এ দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করে রাখার মাধ্যমেই সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ বিশ্বকে অনেক কিছু দিতে পারে। হিলারি ক্লিনটন তার ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশকে একটি ‘সফ্ট পাওয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য বাংলাদেশকে যা করতে হবে তা হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজই সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে। টিআইএর একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গেল বছরও এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্নীতি রোধে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তির জন্য এটা খারাপ সংবাদ। আমরা গণতন্ত্রকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, সেই সমাজ আমরা গড়তে চাই। কিন্তু দুর্নীতিকে যদি ‘না’ না বলি, তাহলে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত সমাজ গড়তে পারব না। আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হবে। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে পারব না।
টিআইর রিপোর্টটি আমাদের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। এ রিপোর্টকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে, ‘ষড়যন্ত্র’ আবিষ্কার না করে নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে উদ্যোগী হন, তাহলে তারা ভালো করবেন। পদ্মা সেতু কিংবা হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এদেশ গুটিকয় লোকের জন্য বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে না।
Daily JUGANTOR
08.12.12

বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি


আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ড এবং ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে আমাদের পোশাকশিল্প শুধু যে অনিশ্চয়তার মুখেই থাকল, তা নয়; বরং বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তিও নষ্ট হলো। বিশ্বে তৈরি পোশাকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। চীন প্রথম হলেও চীনে শ্রমিক মজুরি বাড়ছে এবং চীন এখন আর তৈরি পোশাকে উৎসাহিত হচ্ছে না। চীন এখন আইটি তথা মাঝারি শিল্পে মনোনিবেশ করছে। এমনকি এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল যে চীন তার পোশাক শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে পারে। এখন নিশ্চিন্তপুরের 'হত্যাকাণ্ড' পুরো শিল্পকে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিল। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের বড় বাজার, সেই বাজার হারাতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে। স্পষ্টতই পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ এই বাজার হারাবে। এরই মধ্যে ওয়ালমার্ট বাংলাদেশ থেকে তার তৈরি পোশাক ক্রয় বাতিল করেছে। কেননা নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্ট ওয়ালমার্টকে বিশেষ ধরনের পোশাক সরবরাহ করত। এটা বন্ধ হয়ে গেল। এটা অন্যদের ক্ষেত্রেও একটা প্রচ্ছন্ন 'হুমকি'। নিশ্চিন্তপুরের 'হত্যাকাণ্ডের' সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম কিংবা ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস ফোরামের মতো সংগঠন তৎপর হয়েছে, এমনকি স্টেট ডিপার্টমেন্টও একটি মন্তব্য করেছে। তারা স্পষ্ট করেই বলছে, পোশাক শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। এ ধরনের মন্তব্য আমাদের জন্য একটি 'মেসেজ'- পোশাকশিল্প স্পষ্টতই ঝুঁকির মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে যেসব মানবাধিকার সংস্থা কাজ করে, তারা ওয়াশিংটনে এক ধরনের 'লবিস্ট' হিসেবে কাজ করে। কংগ্রেসম্যানদের তারা বাধ্য করে আইন প্রণয়ন করতে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তৈরি পোশাক শিল্পে জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধা চেয়ে আসছে। বাংলাদেশ এই সেক্টরে এ সুবিধা পায় না। কিছু কিছু সেক্টর, যেমন সিরামিক, সার, ফার্নিচার ইত্যাদি শিল্পে জিএসপি সুবিধা পায়। তৈরি পোশাকে পায় না। ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে প্রবেশ করছে। গুণগতমান ও সস্তা থাকায় বাংলাদেশি এ পণ্যের বড় বাজার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এখন এই জিএসপি সুবিধাও প্রশ্নের মুখে থাকল। আমি আশঙ্কা করছি, মার্কিন শ্রমিক সংগঠন তথা শ্রমিকস্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর 'চাপে' কংগ্রেসে একটি আইন প্রণীত হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা হতে পারে। এটা হলে বাংলাদেশের জন্য তা হবে এক ধরনের 'আত্মহত্যার শামিল'। কেননা আমাদের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্প একটা বড় অবদান রাখছে। ইউরোপের অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করায় সেখানে বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে না, এমনকি সেখান থেকে 'অর্ডার'ও কমে আসছে। ফলে শিল্প বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা যদি হ্রাস পায়, তা আমাদের অর্থনীতির জন্য হুমকি। তৃতীয়ত, 'কমপ্লায়েন্সে'র যে সুযোগ-সুবিধা মার্কিন ক্রেতারা দাবি করছে, তা নিশ্চিন্তপুরের ঘটনার পর আরো শক্তিশালী হবে। কমপ্লায়েন্সের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ওপর জোর দেবে। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে তারা চাইবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকে শুরু করে কারখানাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা এর অন্তর্ভুক্ত। 'বায়ার'দের প্রতিনিধিরা সরাসরি কারখানাগুলো পরিদর্শন করবেন এবং কমপ্লায়েন্সের ব্যাপারে তাঁরা সন্তুষ্ট হলেই তাঁরা অর্ডার দেবেন। ফলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়, তাঁরা সংগত কারণেই কমপ্লায়েন্সের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হবেন। শ্রমিকদের স্বার্থ তাঁরা দেখার চেষ্টা করবেন। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনায় প্রমাণিত হয়ে গেল, কারখানাগুলোতে কমপ্লায়েন্সের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আমেরিকার লেবার সংস্থা অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টিকে ইস্যু করবে এবং বাংলাদেশি পণ্যের আমদানিতেও তারা বাধা দেবে। জেএসপি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। আমি জানি না, এই ভাবমূর্তি আমরা কিভাবে ফিরিয়ে আনব। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিন্তপুরের ঘটনাকে 'পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে কোনো এক পত্রিকায় ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী যখন 'পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রের' কথা বলেন, তখন আমার ভয় হয়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে পাঁচটি কমিটি গঠিত হয়েছে, তাদের পক্ষে প্রকৃত 'সত্য' উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে কি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই 'পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের' যথেষ্ট তথ্য আছে। আমরা খুশি হব, তিনি যদি তা জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করেন। আমাদের এ সেক্টর নিয়ে 'ষড়যন্ত্র' হবে, তা আমরা চাই না। কঠোর হস্তে এ 'ষড়যন্ত্র' দমন করা প্রয়োজন।
আমি তাজরীন গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই দায়ী করব। প্রতিটি ফ্লোরের গেটে তালা দেওয়া, আগুন দেখেও সেটাকে মহড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা, কর্মকর্তাদের পালিয়ে যাওয়া, কম্পানির ৫০ কোটি টাকার ঋণ, বীমার টাকা ইত্যাদি প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, গার্মেেন্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। যখনই মানুষ মারা যায়, তখনই সরকার 'ষড়যন্ত্রের' কথা বলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে তৎপর হতে দেখা যায়। তারপর যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। আমাদের শ্রমমন্ত্রী হঠাৎ করেই উৎসাহী হয়ে গেলেন। বললেন প্রতিটি কারখানায় তিনটি করে বহির্গমন পথ থাকতে হবে, না হলে ওই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রায় চার হাজার কারখানা বাংলাদেশে। অবিলম্বে সার্ভে টিম করে কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের চূড়ান্ত সময়সীমা দেওয়া হোক। প্রয়োজন হলে বন্ধ করে দেওয়া হোক। আমাদের গার্মেন্টকর্মীরা 'ফার্মের মুরগির' মতো ব্যবহৃত হতে পারে না। তাদের 'কারখানায় ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেওয়া' ফৌজদারি অপরাধ। বিজিএমইএও কাজটি করতে পারে নিয়মিত। যেখানে তালা মারা থাকবে, ওই কম্পানিকে বিজিএমইএ কয়েক লাখ টাকা ফাইন করবে।
এত বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, আশুলিয়ায় শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় কিংবা রাষ্ট্রদূত মজিনার একাধিক বক্তব্যে এ হত্যাকাণ্ডের কথা উঠে এসেছে। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আজও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো নিশ্চিন্তপুরের দুর্ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র 'টিফফা' চুক্তি নিয়েও আমাদের 'চাপ' দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে তারা বলছে, এতে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি হবে। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন' (এমসিপি) গঠিত হলেও আজও বাংলাদেশ সেখান থেকে কোনো সাহায্য পায়নি। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্যই এ সংস্থা গঠিত হয়েছিল। এখন নিশ্চিন্তপুরের ঘটনার পর এমসিপি থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
নিশ্চিন্তপুরের 'দুর্ঘটনা' আমাদের জন্য অনেক শঙ্কা তৈরি করেছে। সরকার ও বিজিএমইএ যদি যৌথভাবে কাজ না করে, তাহলে আমাদের পোশাকশিল্প একটি বড় হুমকির মুখে থাকবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে প্রথমে।Daily KALERKONTHO06.12.12

উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ


সংবাদটি এভাবেই ছাপা হয়েছে দৈনিক সমকালের শেষের পাতায় গত ২০ নভেম্বর। বর্তমান সরকারের আমলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেওয়া হলো ১৬টি। সব মিলিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭১। দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে প্রায় ৩৬টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নানা কাহিনী আছে। এই \'কাহিনী\' জানেন শিক্ষামন্ত্রী। জানেন শিক্ষা সচিব। জানেন শিক্ষা উপদেষ্টাও। প্রধানমন্ত্রী যে জানেন না_ তাই-বা বলি কীভাবে? তবুও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর সবই দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। সর্বশেষ যে ৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হলো_ সরকারি দলের নেতা, ছাত্রলীগের সাবেক ছাত্রনেতা ও মহাজোট সরকারের শীর্ষ নেতা এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। যেখানে খোদ শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, \'বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেট বাণিজ্য\' হয়, সেখানে নতুন করে আরও ৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়ার কী যুক্তি থাকতে পারে, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। এতে পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে যে একটি অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হলো, তাতে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে উচ্চশিক্ষাকে যে \'পণ্য\' বানানো হলো, সেটাও-বা অস্বীকার করি কীভাবে?
নতুন করে ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়ার পর যে প্রশ্নটি আমার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক সরকারের কাজ কি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দিয়ে সরকার সমর্থকদের \'ব্যবসার পথ\' প্রশস্ত করে দেওয়া? এটাই কি সরকারের কাজ? আগামীতে যদি নতুন কোনো সরকার আসে, তাহলে তারাও তো একই কাজ করবে। সারাদেশই তো এখন দু\'ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মাঝে রয়েছে শিক্ষক সমাজ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সাংবাদিক সমাজ। একই সঙ্গে বিএনপিরও রয়েছে একই ধরনের সংগঠন। এখন সরকার সমর্থক রাজনৈতিক নেতারা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের \'মালিক-মোক্তার\' হয়ে যান, তাহলে তো ওইসব বিশ্ববিদ্যালয় \'আওয়ামী বিশ্ববিদ্যালয়\' হিসেবে পরিচিতি পাবে! তারপর রাজনৈতিক বিবেচনায় সার্টিফিকেটও দেওয়া হবে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিএনপি একই \'কর্ম\' করবে। জামায়াতের তো আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় আছেই! এরশাদ সাহেব ব্যাংক নিয়েছেন। এখন হয়তো রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই চেয়ে বসবেন!
আমরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে রীতিমতো \'জুয়া\' খেলছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর যে নজরদারি বাড়ানো দরকার, সেটা মঞ্জুরি কমিশন করছে না। ইউজিসির নাম পরিবর্তন হচ্ছে। জনবলও বাড়বে। সদস্য সংখ্যাও বাড়বে। তাতে কি উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো যাবে? এতে সরকারের খরচ বাড়ল। আমি অনেক দিন ধরেই বলে আসছি, শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেখভাল করার জন্য আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান দরকার। উচ্চশিক্ষা কমিশন দিয়েও হতে পারে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা একটি স্বাধীন শাখা থাকবে। এখানে নূ্যনতম ৩ থেকে ৪ জন সদস্য থাকবেন। আলাদা প্রশাসন থাকবে। না হলে মাত্র একজন সদস্যকে দিয়ে (যা এতদিন হয়ে আসছে) ৭১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে যুগের চাহিদা_ এটা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। এখানে মালিকপক্ষের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটাকে \'ব্যবসায়িক কেন্দ্র\' করা যাবে না। মালিকরা পুঁজি বিনিয়োগ করবেন বটে, কিন্তু ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি থেকে তা তারা করবেন না। করবেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে। কিন্তু কী হচ্ছে এই সেক্টরে? দারুল ইহসানের অবৈধ ক্যাম্পাস ৯৮টি। তারা বিজ্ঞাপন দিয়ে বলছে, সরকার তাদের অনুমতি দিয়েছে! অথচ ইউজিসির চেয়ারম্যান স্বয়ং বলছেন, \'আউটার ক্যাম্পাস\' অবৈধ। তাহলে কোন সাহসে এবং কাদের পরামর্শে এরা ছাত্র ভর্তি করছে? উচ্চ আদালতের নজরে কি আসছে না বিষয়টি? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি পারে না উদ্যোগী হয়ে চিরস্থায়ীভাবে আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ করে দিতে? \'শর্ষের মধ্যে যদি ভূত\' থাকে, তাহলে ভূত তাড়াব কীভাবে? প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয় দুটি। দু\'জন ভিসি। তারা দাবি করছেন, তারা অনুমোদিত। উত্তরার এশিয়ান ইউনিভার্সিটির অবস্থা ভয়াবহ। শুধু সার্টিফিকেট বাণিজ্যই নয়, মালিকানা দাবি করেছেন দুই ভাই। আরও ভয়াবহ_ শিক্ষকরা \'নোট\' বিক্রি করেন এবং ছাত্রদের তা কিনতে বাধ্য করেন। জন্মের পর থেকেই সাদেক সাহেব ভিসি। এখন তৈরি হচ্ছে তার ছেলে। সেও ভিসি হওয়ার পথে। ওখানে পড়ায় কারা? কী তাদের ডিগ্রি? অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষকদের দিয়ে চলছে \'বিশ্ববিদ্যালয়\'। এটা যেন একটা পারিবারিক ব্যবসাকেন্দ্র। ইবাইস নিয়েও একই সমস্যা। মালিকপক্ষ একাধিক। মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক-মোক্তার। যিনি মার্কিন দূতাবাসে চাকরি করতেন, তিনিও এখন ভিসি।
সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৩ শতাংশ শিক্ষকের (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষা সনদ জাল। আমার মনে হয়, এই সংখ্যা আরও বেশি হবে। ভুয়া পিএইচডি নিয়ে চাকরি নিয়েছেন অনেকে। আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমনি এক ভুয়া পিএইচডির খবর আমি নিজে কর্তৃপক্ষকে দিয়েছি। কিন্তু তাতে পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পিএইচডি ডিগ্রিও জাল। আমি অন্তত ১০ ভিসির নাম বলতে পারব, যারা কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা না করেই \'অধ্যাপক\' পদবি ব্যবহার করছেন! কী দুর্ভাগ্য এ জাতির! দেখার কেউ নেই। অভিভাবকরা অসহায়। তারা এক রকম বাধ্য হয়েই তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করে কিছু লোকের চাকরির সংস্থান হবে বটে (তাও আবার রাজনৈতিক বিবেচনায়), কিন্তু উচ্চশিক্ষার তাতে মানোন্নয়ন ঘটবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও উচ্চশিক্ষায় ধস নেমেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় অনিয়মের খবর উপাচার্য মহোদয় অবহিত হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার \'স্বার্থে\' তিনি নিশ্চুপ। এখানেও তিনি \'কম্প্রোমাইজ\' করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ১৩ লাখ লোকের ইন্টারভিউ নিয়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচনার কাহিনী সবার মুখে। কিন্তু বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক এখনও \'দ্বিগুণ উৎসাহে\' আরও পিএইচডি ছাত্র নিচ্ছেন। রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের \'পিএইচডি কাহিনী\' আর একদিন বলা যাবে। এই মুহূর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। যা করা খুব জরুরি তা হচ্ছে, অবিলম্বে একটি \'অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল\' গঠন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ধারণ করে দেওয়া, যাতে অভিভাবকরা \'মান\' দেখে তার সন্তানকে \'ভালো\' একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে পারেন। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের \'ডাটাবেজ\' তৈরি করা জরুরি, যাতে ভুয়া পিএইচডিধারীদের চিহ্নিত করা যায়। আমি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশে একটি শাখা স্থাপনেরও পক্ষপাতী। এতে আমাদের লাভ দুটি_ এক. আমাদের সন্তানরা পড়াশোনার একটা অংশ বিদেশে গিয়ে পড়তে পারবে; দুই. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেবে এবং তাদের শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকপক্ষ আবার এর বিরুদ্ধে। তারা \'ব্যবসা হারানোর\' আশঙ্কা করছেন। তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। এখন পুঁজি বাড়াতে চান। তাদের অনুরোধ করি, আপনারা গার্মেন্ট, আলু, পটোল ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করুন; বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়।
শিক্ষকতার একটি \'পরিণত বয়সে\' এসে মনে হয়েছে, এই সেক্টরটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধু আমাদের নেতৃত্বের অভাবে। আমাদের কোনো \'ভিশন\' নেই। আমরা ২০২১ সালে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চাই। কিন্তু আমরা সেই নেতৃত্ব কি প্রতিষ্ঠা করতে পারছি, যারা আমাদের একুশ শতকে একটি মাধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার \'রূপকল্প\' তৈরি করবে? আমরা লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তৈরি করছি, যারা মেধাহীন। নেতৃত্ব দেওয়ার \'কোয়ালিটি\' তাদের নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পারছে না রাজনৈতিকভাবে নিয়োগকৃত ভিসিদের কারণে। আমরা একটা সার্টিফিকেটসর্বস্ব জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি। ঘরে ঘরে এখন মাস্টার্স আর বিবিএ। একজন এসআইও এসেছিল পিএইচডি করতে! ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা বেড়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এদের সবাইকে ধারণ করতে পারে না বিধায়ই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
কিন্তু সার্টিফিকেট \'বিক্রির\' প্রতিষ্ঠান খুলে আর যাই হোক, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায় না।
Daily SAMAKAL
04.12.12

টিআইবি কেন শুধুই স্পর্শকাতর বিষয় বেছে নেয়

নিকট অতীতে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশে বড় ধরনের বিতর্কের ঝড় তুলেছে। তারা সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। কেননা সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করেন। রাষ্ট্রের যেখানে ভালো, সেখানে তারা সিদ্ধান্ত নেন। সংসদ সদস্যের মধ্যে যেমন সরকারি দলের সদস্যরা রয়েছেন, ঠিক তেমন রয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও; যদিও বিরোধী দল বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা অনেক দিন ধরেই সংসদে যাচ্ছেন না। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তারা অংশও নিচ্ছেন না। সংসদে তারা কেন যাচ্ছেন না, সে ব্যাপারে তারা যুক্তি উপস্থাপন করছেন বারবার। কিন্তু প্রশ্ন এখানে নয়, প্রশ্ন হচ্ছে টিআইবি যখন বলে ‘এমপিদের ৯৭ শতাংশই নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত’, তখন সঙ্গত কারণেই অনেক প্রশ্ন এসে যায়। এক. টিআইবি কীভাবে নিশ্চিত হলো এমপিদের প্রায় সবাই ‘নেতিবাচক’ কাজের সঙ্গে জড়িত? এই নেতিবাচক কাজের অর্থ কী? তারা কী যেসব নেতিবাচক কাজ সমাজে রয়েছে তার সব ক’টির সঙ্গেই জড়িত? দুই. যে গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে টিআইবি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হলো সেই গবেষণা পদ্ধতিটি কী সঠিক? পুরো গবেষণা প্রক্রিয়ার সঙ্গে কী সিনিয়র গবেষকরা কিংবা সিনিয়র অধ্যাপকরা জড়িত ছিলেন? তিন. অভিযোগ উঠেছে শুধু ৫টি পত্রিকার প্রতিবেদন বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, ফোকাস গ্রুপের আলোচনা ও তাদের চয়নকৃত ৪শ’ থেকে ৬শ’ ব্যক্তির মতামত নিয়ে গবেষণার কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে? প্রশ্ন হচ্ছে এই ৪শ’ থেকে ৬শ’ লোক-এরা কারা? আর টিআইবি কোন যুক্তিতে বা কোন নীতি অনুসরণ করে ওই ৫টি পত্রিকা বেছে নিল? চার. টিআইবি ১৪৯টি আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর জরিপ চালায়। প্রশ্ন হচ্ছে এই আসনগুলো বিবেচনায় নেয়ার মানদণ্ড কী? কোন যুক্তিতে বা বিচারে এই আসনগুলো বেছে নেয়া হলো? পাঁচ. উপরে উল্লিখিত ১৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৩ জন বিরোধী দলের। এখানে কোন মানদণ্ডকে অনুসরণ করে এই ১৩ জনকে বেছে নেয়া হলো? সেখানে জামায়াতে ইসলামী কিংবা জাতীয় পার্টির (নাজিউর রহমান মঞ্জুর) কোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কি? ছয়. গবেষণায় দেখানো হয়েছে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ সংসদ সদস্য ইতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত। এটা কী বৈসাদৃশ্য নয়? যেখানে ৯৭ ভাগই নেতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত, সেখানে ৫৩ ভাগ আবার ইতিবাচক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন কীভাবে? উপরন্তু এই ‘ইতিবাচক’-এর ব্যাখ্যাই বা কী? টিআইবির ওই রিপোর্ট নিয়ে জাতীয় সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা যে ভাষায় টিআইবি বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেছেন, তা গণতন্ত্রসম্মতও নয়। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এর প্রতিবাদ পাঠাবেন বার্লিনে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সদর দফতরে। এটাও অযৌক্তিক। কাজটি হয়েছে ঢাকায়, টিআইবির উদ্যোগে। এর সঙ্গে সদর দফতরের কোনো যোগাযোগ নেই। টিআইবি স্বাধীন। এখন টিআইবি যে জরিপ করেছে, সেই জরিপের পদ্ধতি, ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। টিআইবি ইতিমধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ৩১টি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব দিয়েছে। এখন জাতীয় সংসদ যা করতে পারে প্রয়োজন বোধ করলে তারা এই গবেষণাটি তিন থেকে চারজন অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে, তাদের দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারে। সামাজিক বিজ্ঞানে যারা গবেষণার সঙ্গে জড়িত, তাদের দিয়েই এই গবেষণাটি পরীক্ষা করা যেতে পারে। তাতে করে এটা বোঝা সহজ হবে, গবেষণাটিতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, তা সঠিক কি-না? টিআইবির প্রতি আস্থা রেখেই আমি বলতে চাই, এ ধরনের একটি সিরিয়াস গবেষণাটি একজন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এবং পরিসংখ্যান বিভাগের এক থেকে দু’জন অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে তাদের দিয়ে করানো উচিত ছিল। আমার ধারণা যাদের দিয়ে এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে তারা এ বিষয়ে খুব অভিজ্ঞ নন। প্রথমত, ১৪৯ জন সংসদ সদস্য বেছে নেয়া ঠিক হয়নি। যুক্তি হিসেবে এটা ধরে নিলেও প্রশ্ন আসবে এবং সে প্রশ্নটিই উঠেছে। ভালো হতো যদি ৩০০ আসনের নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হতো। সময় হয়তো লাগত। তাতে ক্ষতি কী? আমরা পরিষ্কার একটি ধারণা পেতাম। দ্বিতীয়ত, যাদের মতামত নেয়া হয়েছে তারা হচ্ছেন ‘সচেতন নাগরিক গোষ্ঠী’ বা ‘সনাক’-এর সদস্য। সনাক সরাসরি টিআইবির সঙ্গে জড়িত। টিআইবি এই সনাক সংগঠিত করে প্রতিটি জেলায়। এরা টিআইবির আদর্শ ও উদ্দেশ্য ‘প্রমোট’ করে ও টিআইবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। যেখানে সনাক নেই, সেখানে যেহেতু গবেষণা জরিপ পরিচালিত হয়নি, সে জন্য সঙ্গত কারণেই টিআইবির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এ ব্যাপারে টিআইবি যে যুক্তিই দিক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একটি ‘পূর্ব নির্ধারিত ধারণা নিয়ে’ গবেষণা কমিটি পরিচালিত হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মতো বিষয় নয়। তৃতীয়ত, ৫টি পত্রিকা নেয়াও ঠিক হয়নি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৫টি দৈনিক পত্রিকা রয়েছে,  যেগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এই ১৫টি পত্রিকা স্ক্যান করলে ক্ষতি কী হতো? এখানে আরো একটি প্রশ্ন, যে ১৪৯টি সংসদীয় এলাকায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে, সেখানে স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র কী বিবেচনায় নেয়া হয়েছে? স্থানীয়ভাবে পত্রিকায় এমন অনেক খবর ছাপা হয়, যা জাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্রে ছাপা হয় না। ওইসব সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরোধী পক্ষ রয়েছে। এমনকি তার নিজের দলের ভেতরেও ‘শত্র“’ আছে, যারা বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে স্থানীয় এমপিদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে স্থানীয় সাংবাদিককে প্ররোচিত করতে পারেন। আমি জানি না টিআইবি প্রকাশিত সংবাদগুলোর সত্যতা কীভাবে নিশ্চিত করেছে? যদি সনাক সদস্যদের দিয়ে সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে সেটিও ঠিক হয়নি। টিআইবির কাজের যে ধরন তাতে বিতর্ক হবেই। এতগুলো সেক্টর থাকতে এই মুহূর্তে টিআইবি এটা কেন বেছে নিল, সেটাও একটা প্রশ্ন। টিআইবি বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ পেয়ে থাকে। যারা এখানে কাজ করেন, তারাও প্রচুর অর্থ পেয়ে থাকেন। এমনকি একটি গবেষণাকর্ম শেষ হওয়ার পর ওই টিমকেও অতিরিক্ত কিছু অর্থ দেয়া হয়। এখানে যে প্রশ্নটি আমার কাছে মুখ্য তা হচ্ছে, দাতাদের দেয়া অর্থের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রাজনীতি’ আছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রদূত কিংবা কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধানের বক্তব্যই সেই রাজনীতিটা স্পষ্ট করে দেয়। তারা সুশাসনের কথা বলতে গিয়ে পরোক্ষভাবে ‘পরিবর্তনের’ কথাই বলেন। এরা প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেন, যা কোনো সভ্য দেশের মানুষ গ্রহণ করে নিতে পারে না। টিআইবির গবেষণা কর্মকাণ্ডে সেই দাতাগোষ্ঠীর রাজনীতিই প্রতিফলিত হয়। আরো একটা কথা- টিআইবির পরিচালনা পর্ষদে যারা আছেন, তাদেরও কারো কারো স্পষ্ট একটি ‘রাজনীতি’ আছে। জনশ্রুতি আছে, এরা তৃতীয় ধারার প্রবক্তা। পরিচালনা পর্ষদের কেউ কেউ অতীতে বা এখনো তৃতীয় ধারার প্রবক্তাদের হাতে হাত মিলিয়েছেন। তাদের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছেন, এখনো দিচ্ছেন।
ওই গবেষণার মধ্য দিয়ে এমন একটি উদ্যোগ নেয়া হলো যে, আমাদের আইন প্রণেতারা অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং প্রায় সবাই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ওই প্রতিবেদন এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেফার করা হবে। দাতারাও সাহায্যের শর্ত হিসেবে এটা বিবেচনায় নিতে পারেন। নিজের পক্ষে তারা বলতে পারেন ‘সৎ লোক’ রাজনীতিতে না থাকলে, তারা ঋণ দেবেন না। বিশ্বব্যাংকের সুশাসনের যে ধারণা, সেই ধারণা আরো শক্তিশালী হলো। তারা সরাসরি এমপিদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা বলবেন না। তারা বলবেন সুশাসনের কথা। ফলে এই রিপোর্টের মধ্য দিয়ে লাভবান হলো কারা? সরকার, বিরোধী দল, না দাতাগোষ্ঠী। এর মধ্য দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো নষ্ট হলো। এতদিন আমলাদের বলা হতো তারা অসৎ। এখন বলা হবে রাজনীতিবিদরা অসৎ। এমনিতেই সরকার একটা সংকটে আছে। নানা ইস্যুতে বহির্বিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। ইউনূস ইস্যু, পদ্মা সেতু, ড. মসিউর রহমান প্রমুখ ইস্যুতে সরকার যখন বিব্রত, ঠিক তখনই যোগ হলো আরো একটি ইস্যু আইন প্রণেতারাও অসৎ ও দুর্নীতিবাজ। এতে করে সরকারের অবস্থান দুর্বল হলেও সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হলো আরো বেশি। টিআইবি এটা করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারল না। আমাদের আইন প্রণেতারা সবাই ভালো, এটা আমি বলব না। কিন্তু এটাও তো সত্য, আমরা বারবার এই রাজনীতিবিদদের কাছেই ফিরে যাই। ভালো হোক, মন্দ হোক এরাই জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এদেশে ‘এক-এগারো’ যে কত বড় ক্ষতি করেছিল তা তো আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বিরাজনীতিকীকরণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে রাজনীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘এক-এগারো’র উদ্যোক্তারা। তাদের উদ্যোগ যদি সফল হতো, তাহলে এদেশ পরিচালিত হতো বিদেশি সংস্থা বা মুরব্বিদের দ্বারা। তাতে করে আমরা কতটুক ‘স্বাধীন’ থাকতে পারতাম, এ প্রশ্ন করাই যায় এখন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হিংসা, অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা অনেক বেশি। পরস্পরকে বিশ্বাস না করার সংস্কৃতি শক্তিশালী হচ্ছে। ক্ষমতা স্থায়ী করার ‘অভিযোগ’ও আছে। সবার ভালোর জন্য আমরা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করেছিলাম। ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেলেও এই ব্যবস্থা এখন পরিত্যক্ত। দশম সংসদ নির্বাচন কীভাবে হবে আমরা জানি না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। গাজীপুর ও টাঙ্গাইল উপনির্বাচন সরকারি দলের জন্য একটি মেসেজ। গাজীপুর ছিল ভোটারবিহীন। আর টাঙ্গাইলে বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেলেন। সরকার এ থেকে কী ‘শিক্ষা’ নেবে জানি না। তবে প্রতিনিধিত্ব ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। এই যখন পরিস্থিতি, তখনই এলো টিআইবির এই রিপোর্ট। এই রিপোর্ট নিয়ে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। বিচারপতি সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা প্রতিবেদন নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে টিআইবি স্পর্শকাতর জায়গাগুলো নিয়ে নেতিবাচক ফলাফল উপস্থাপন করছে কেন? আরো তো বেশকিছু জায়গা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কূটনীতি, সমাজসেবা-এসব বিষয় নিয়ে সিরিজ গবেষণা কেন করে না টিআইবি? শুধু স্পর্শকাতর জায়গাগুলো বেছে নেয় কেন? জনসমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে টিআইবি গবেষণা করুক। গবেষণার ফলাফল নিয়ে সেমিনার করুক। দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাক সেই বক্তব্য। তাতে মানুষ সচেতন হবে। শিক্ষায় আমাদের দুর্নীতি অনেক বেশি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে নিয়োগ-বাণিজ্য আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে সার্টিফিকেট-বাণিজ্য। এগুলো নিয়ে টিআইবি কাজ করে না কেন? একটা কাজ করেছিল বটে। তারপর ‘অদৃশ্য কারণে’ থেমে গেছে টিআইবি। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, দক্ষ প্রার্থীদের শিক্ষক থেকে বঞ্চিত করা, শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতিকীকরণ, আত্মীয়করণ-এসব এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন চিত্র। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে ‘সার্টিফিকেট বিতরণের’ কারখানা হিসেবে। টিআইবি যদি এ ব্যাপারে গবেষণার কোনো উদ্যোগ নেয়, এদেশের শিক্ষিত সমাজ তাকে সমর্থন করবে। আদালত, সংসদ, সেনাবাহিনী (এখনো হয়নি) নিয়ে যে কোনো ‘গবেষণা’ প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। বিতর্ক এড়াতে শিক্ষার্থীদের একেকটি প্যানেলকে যদি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাদের দিয়ে যদি ‘রিভিউ’ করা যায়, তাহলে বিতর্ক কম হবে। স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যদি গবেষণা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হয়, তাহলে যে বিতর্ক উঠবে, তাতে টিআইবির অগ্রযাত্রাই ব্যাহত হবে।
Daily MANOBKONTHHO
03.12.12

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কী হচ্ছে


কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্তৃক শিক্ষকদের আহত হওয়ার ঘটনা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ছাত্র সংগঠনের তাণ্ডব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক স্খলনজনিত কারণে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষকের পদোন্নতির উদ্যোগ ও তাতে শিক্ষকদের বাধাদান কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়ার যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রমাণ হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা চরমে উঠেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে খোদ সরকার সমর্থক শিক্ষকরা আহত ও বিব্রত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় ছাত্রলীগের হামলায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের শীর্ষস্থানীয় নেতা। ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষকের পদোন্নতিতে আপত্তি জানিয়েছেন। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ক্যাম্পাসে প্রথমবারের মতো একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং তাতে যৌন অপরাধীকে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, সেখানে ভিসি কী করে শাস্তিপ্রাপ্ত ওই শিক্ষকের পদোন্নতির উদ্যোগ নেন? যদিও শেষ মুহূর্তে তা তিনি স্থগিত করেছেন। এ জন্য তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন। এটা করলে ১৩৮তম সিন্ডিকেটের একটি সিদ্ধান্তকে তিনি লংঘন করতেন। সিন্ডিকেটের ওই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে পদোন্নতির নীতিমালা কী হবে। বিতর্কিত ওই শিক্ষক নীতিমালার শর্ত পূরণ করেননি। তিনি পদোন্নতি চান কিভাবে? আরও মজার ব্যাপার, বিতর্কিত ওই শিক্ষক আওয়ামী ঘরানার শিক্ষক হলেও তার পদোন্নতির তদবির করেছিলেন খোন্দকার মুস্তাহিদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ। অধ্যাপক হোসেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের চাপে মাথানত করবেন কেন?
আজ বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যানারে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরাই এ পদোন্নতির বিরোধিতা করছেন একটাই কারণেÑ আর তা হচ্ছে বিতর্কিত ওই শিক্ষক পদোন্নতির শর্ত পূরণ করেননি। শুধু তাই নয়, তিনি যে বিভাগে চাকরি করেন, ওই বিভাগে তার ‘ভূমিকা’ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। তার উদ্যোগে সিলেবাস ছাড়া এমফিলে ছাত্র ভর্তি করানো হয়েছে। এসব বিভাগে উচ্চতর কমিটি গঠন করা হয়েছে যাদের নিয়ে, খোদ তাদের কারও কারও এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি নেই। সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে এই উচ্চতর কমিটি গঠন করার উদ্যোগ এরই মধ্যে নানা বিতর্কের জš§ দিয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষককে দিয়ে উচ্চতর কমিটি গঠিত হয়েছে। যিনি কোনদিন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়েননি, ব্রিটিশ ভারত নিয়ে যার পিএইচডি গবেষণা এবং বর্তমানে প্রশাসনে উচ্চ পদে আসীন, তিনি এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে উচ্চতর শিক্ষা কমিটির সভাপতি। কার স্বার্থে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে? এখানেও অধ্যাদেশকে পাশ কাটিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতদিন শুনতাম রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের কথা। এখন দেখলাম ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ এমফিল, পিএইচডি কোর্সে ছাত্রও ভর্তি করানো হচ্ছে। যিনি কোনদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, তাকেও ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ উচ্চতর কোর্সে ভর্তি করানো হয়েছে। এটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাহিনী।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনে তিনি যান এবং প্রায় ক্ষেত্রেই তিনি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলেন। তিনি এটাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, শিক্ষার মানোন্নয়ন করা ছাড়া এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা টিকে থাকতে পারব না। চ্যান্সেলরের এ বক্তব্যটি সঠিক ও যুক্তিযুক্ত। আমার দুঃখ লাগে যখন দেখি বেসরকারি তো বটেই, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিরা পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে আদৌ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন না। বরং গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন।
দলীয়করণ ও আÍীয়করণের শীর্ষে পৌঁছে গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশেষ করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো প্রায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কাহিনী নিয়ে মজার সংবাদ পরিবেশন করেছিল একটি জাতীয় দৈনিক। ভর্তি পরীক্ষার ৫০ লাখ টাকা নিয়ে আর নিজের জন্য পাজেরো ক্রয় করে অধ্যাপক মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ শিক্ষার মানোন্নয়ন কতটুকু করলেন, জানি না। কিন্তু একটি প্রশ্নের তিনি জš§ দিলেনÑ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও আগামী দিনে একটি সার্টিফিকেট সর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে! এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হয়েছেÑ এই সংবাদও পত্রিকায় দেখেছি। দুদক কি আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে?
আমি আশান্বিত হয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নিয়োগে। তিনি বলেছিলেন, তিনি জাবিকে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চান। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হয়েছিলাম তার বক্তব্যে। কিন্তু তার বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চশিক্ষার অনিয়ম নিয়ে উপরে উল্লিখিত ঘটনা ঘটল। যাদের পিএইচডি নেই এবং সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োজিত (আইনানুযায়ী সহকারী অধ্যাপকরা পিএইচডি কমিটিতে থাকতে পারেন না), তাদের নিয়েই পিএইচডি কমিটি গঠিত হয়েছে। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষককেও তিনি পদোন্নতি দিতে চেয়েছিলেন। হায়রে শিক্ষক রাজনীতি! এখানে বিএনপি-আওয়ামী লীগ বলে কিছু নেই। বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা দু’বছর আগেও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন বামমনা শিক্ষকদের সঙ্গে। আজ ক্ষুদ্র স্বার্থে সেই বিএনপিপন্থী শিক্ষকরাই গেলেন ভিসির কাছে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির মাফ চাইতে। অথচ অভিযুক্ত ওই শিক্ষক আওয়ামী ঘরানার, অধ্যাপক আবদুল বায়েস যার নেতা। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিএনপি ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা তাদের নিজেদের স্বার্থে এক হয়েছেন। যদিও মূলধারার আওয়ামী লীগপন্থীরা আলাদা অবস্থান নিয়েছেন।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই একটি কারণে, তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের কোন গ্র“পকে সমর্থন করছেন না। অবশ্যই তিনি আওয়ামী ঘরানার লোক। এক-এগারোতে জেলেও গেছেন। মুক্তিযোদ্ধা এ শিক্ষক যখন ভিসির দায়িত্ব পেলেন, এরপর তিনি আওয়ামী লীগের শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে আর জড়াননি। এটা একটা শুভ লক্ষণ। আইনে যা আছে, সেটাই তিনি অনুসরণ করবেন। বিতর্কিত ওই শিক্ষকের ব্যাপারে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের চাপে পড়ে তিনি একটি ‘ভুল’ করতে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি বিষয়টি উচ্চ আদালতে ‘রেফার’ করবেন। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। উচ্চ আদালতের নির্দেশেই তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। সেদিন তৎকালীন ভিসিকে উচ্চ আদালত ডেকেছিলেন। তাকে ভর্ৎসনাও করেছিলেন। আজ মাননীয় বিচারপতিরা আবার বিষয়টি শুনবেন। গেল দু’বছরে তার ‘মনোভাবের’ পরিবর্তন যদি হয়ে থাকে, তিনি পদোন্নতি পেতেই পারেন। এটা তার অধিকারও বটে। কিন্তু তিনি যদি তার মনোভাব পরিবর্তন না করে থাকেন, তিনি পদোন্নতির জন্য বিবেচিত নাও হতে পারেন। মনে রাখতে হবে, যে ঘটনায় তিনি শাস্তি পেয়েছিলেন, তাতে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীর মতামতও আদালত নিয়েছিলেন। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওইসব আইনজীবীর মতামতও নিতে পারে। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। একটি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে অধ্যাপক হোসেন বিতর্কিত হবেন, আমরা কেউ-ই তা চাই না। আমার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হতে পারে এটি। আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের মাঝে অনেকেই আছেন, যারা ভিসি হতে চান। সুতরাং সব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নৈতিক স্খলনের ঘটনায় (যেখানে একজন শিক্ষককে যৌন হয়রানি করা হয়েছিল এবং তিনি মান-সম্মানের ভয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন) আমি লজ্জিত, দুঃখিত ও মর্মাহত। এসব কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ আমি হারিয়ে ফেলেছি। এখানে আর শিক্ষকতা করা যাবে বলে মনে হয় না।
রাজধানীর অদূরে ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক কাহিনী শুনলামÑ যিনি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ক্লাস নেবেন, তার ওই বিষয়ে কোন ডিগ্রিই নেই। উচ্চশিক্ষার এ হালহকিকত সম্পর্কে কি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অবগত আছেন? জাবিতে কোন কোন বিভাগে যাদের নিয়ে পিএইচডি, এমফিল কমিটি গঠিত হয়েছে, তাদের অনেকেরই উচ্চতর ডিগ্রি নেই। এদের নিয়ে কিভাবে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন করবেন শিক্ষামন্ত্রী? অন্য বিভাগের শিক্ষক এনে উচ্চশিক্ষার কমিটি হচ্ছে। কিন্তু আইন তা অনুমোদন করে না।
এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে অচিরেই উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। ‘পাজেরো’ গাড়ি ক্রয় করে জগন্নাথের ভিসি নিজের ‘ভিসিগিরি’ দেখিয়েছেন! কিন্তু জগন্নাথে শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি কী করেছেন? আড়াই থেকে তিন বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দলীয় বিবেচনায় কিছু ‘চেনা মুখকে’ অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। এতে করে অধ্যাপক পদের মানমর্যাদা তিনি অনেক নিচে নামিয়ে এনেছেন। রংপুর আর পাবনার ভিসিরা আÍীয়করণের রেকর্ড গড়েছেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, এর জবাব আমরা কার কাছে চাইব? আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় (জাহাঙ্গীরনগর) নিয়ে আমি আতংকিত। আগামী তিন থেকে চার বছর পর সিনিয়র শিক্ষকরা সবাই অবসরে যাবেন। তারপর? কারা হবেন ভিসি? কী তাদের কোয়ালিটি? অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি চলে যাবেন ঢাকায়। কিন্তু জাবির প্রশাসনে যে ‘সংকট’ তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে, তা তিনি ‘পরিষ্কার’ করবেন কিভাবে? ‘স্বপ্নের জাহাঙ্গীরনগরের’ কথা বলে তিনি সবার মাঝে একটা আবেদন সৃষ্টি করতে পেরেছেন বটে, কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে তার কোন ভূমিকা আমার চোখে পড়ে না। যাদের পিএইচডি নেই, কিংবা অন্য বিভাগের শিক্ষক নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই কমিটিকে আপনি যদি অনুমোদন দেন, তাহলে উচ্চশিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে একজন বিচক্ষণ মানুষ হিসেবেই এ জাতি জানে। এক-এগারোর সময়ে তিনি নতি স্বীকার করেননি। আজ তথাকথিত ‘শিক্ষক-রাজনীতির’ কারণে তিনি যদি আÍসমর্পণ করেন, তাহলে সেটা হবে তার ‘পরাজয়’। একজন ভিসি অন্যায়ের কাছে মাথানত করবেনÑ অন্তত অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে এটা আমি প্রত্যাশা করি না। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আপনি একটি ‘রিভিউ কমিটি’ গঠন করুন, আমরা সচেতন শিক্ষকরা সবাই আপনাকে সমর্থন করব।
Daily JUGANTOR
01.12.12

কোন পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম






আগামী ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ১৫ বছর পার করবে। এই পনের বছরে সেখানে অগ্রগতি হয়েছে কতটুকু? কতটুকু শান্তি সেখানে নিশ্চিত হয়েছে? এসব বিষয় আজ ভেবে দেখার পালা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যখন শান্তি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটা ছিল একটা বড় ধরনের অগ্রগতি। বিদ্রোহী 'চাকমা'দের মূল ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা ও বাঙালি ও পাহাড়িরা একসাথে মিলে মিশে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা এই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু হিসাব-নিকাশ মেলান যাক। সাধারণ পাহাড়িরা বাঙালিদের সাথে মিলে মিশে থাকলেও পাহাড়ি নেতৃত্ব, বিশেষ করে চাকমা নেতৃত্বের কারণে সরকারের উদ্যোগ বারবার নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ি নেতারা পাহাড়ে আদৌ বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন কিনা, সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিদ্রোহী চাকমাদের পুনর্বাসন, চাকরি, চাকমা নেতাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া স্থানীয় সরকারের আওতাধীন বেশ কিছু মন্ত্রণালয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর কিংবা বেশ কিছু সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ার পরও পার্বত্য নেতারা, বিশেষ করে চাকমা নেতারা এখনও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার, যিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তার স্ট্যাচু সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলেও, সেখানে সেনাবাহিনীর বীর সৈনিকদের স্মরণে কোনো স্ট্যাচু প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ সেনা সদস্যরা এ দেশটির রক্ষার জন্য নিজেদের রক্ত দিয়েছেন। আরো একটা প্রবণতা আমরা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি আর তা হচ্ছে বিদেশি নাগরিক, রাষ্ট্রদূতদের পার্বত্য চট্টগ্রামে গমন ও গোপনে পাহাড়ি নেতাদের সাথে বৈঠক। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ও সব ক্ষেত্রে, অর্থাৎ বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও, প্রায় ক্ষেত্রেই ওই সব বেঠকে সরকারি কর্মকর্তাদের থাকতে দেয়া হয় না। বিষয়টি আমাদের জন্য উদ্বেগের ও আতঙ্কের। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করে আসছি যে একটি চক্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করে সেখান থেকে ফায়দা ওঠাতে চায়। আর এই চক্রের সাথে বিদেশিরা সরাসরিভাবে জড়িত। এদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে ও আর্থিক সহযোগিতায় ইতোমধ্যে পাহাড়িদের নিয়ে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ওদেরকে উস্কানি দিচ্ছেন সাবেক গেরিলা নেতা ও জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমা। বিদেশি বিশেষ করে অস্ট্রেলীয় সরকারের ভূমিকা এখানে লক্ষ্য করার মতো। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রচুর পাহাড়ি ছাত্রদের বৃত্তি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যায়। 'অস-এড'-এর কোনো বৃত্তি বাঙালি ছাত্ররা পায় না, বা তাদের দেয়া হয় না। পাহাড়ি এলাকায় বাঙালিরা মানবেতর জীবনযাপন করলেও কোনো বিদেশি সাহায্য তারা পায় না। ইউএনডিপির কোনো প্রজেক্টে বাঙালিরা চাকরি পায় না। বাঙালিরা সেখানে এক রকম দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো বসবাস করছে, যা সংবিধানের ২৭ ও ২৮নং অনুচ্ছেদের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন। আমরা আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করছি যে সন্তু লারমা হচ্ছেন অন্যতম উস্কানিদাতা। সরকার পাহাড়িদের অনেক সুযোগ সুবিধা দিলেও সন্তু লারমা একের পর এক সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। রামুর ঘটনায় সর্বশেষ যে বক্তব্যটি তিনি দেন, তাও ছিল উস্কানিমূলক। এমনকি তিনি বারবার আদিবাসী সমাজ বলে যে বক্তব্য দেন, তাও সংবিধান বিরোধী। সংবিধানে আদিবাসী বলে কিছু নেই। আছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। আসলে এই মুহূর্তে পার্বত্য অঞ্চলে একাধিক সমস্যা রয়েছে। মূল সমস্যা একটিই আর তা হচ্ছে এ অঞ্চলে ব্যাপক খ্রিস্টীয়করণ। অথচ পাহাড়িদের, বিশেষ করে সন্তু বাবুদের কাছ থেকে অভিযোগে পাওয়া যায় যে পাহাড়িদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এটা একটা মিথ্যা প্রপাগা-া। পরিসংখ্যান বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপকহারে খ্রিস্টীয়করণ হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে গরিব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। তারপর এদের অনেককে চাকরি দেয়া হচ্ছে। পাহাড়ে বেশ কিছু খ্রিস্টীয় মিশনারি স্থাপিত হয়েছে। পাহাড়িদের ধর্মান্তরিত করে ওইসব স্কুলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চার্চ, সেখানে প্রতি রোববার পাহাড়িদের যাওয়া এক রকম বাধ্যতামূলক। বিদেশি নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে সফরের উদ্দেশ্য একটিই খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও পাহাড়িদের খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারে আকৃষ্ট করা। যে হারে পাহাড়ে খ্রিস্টধর্মের প্রসার বাড়ছে, তা আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরূপ। এক সময় এই খ্রিস্টীয় জনগোষ্ঠী বিদেশিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। পাঠক পূর্ব তিমুরের কথা স্মরণ করুন। পূর্ব তিমুর ছিল ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রদেশ। ইন্দোনেশিয়ার জনগণ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। তবে পূর্ব তিমুরের মানুষ ছিলেন খ্রিস্টীয় বিশ্বাসী। পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়ার সাথে সংযুক্তির পর সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারা শক্তিশালী হয়। শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধ। পরে পশ্চিমাদের স্বার্থেই ১৯৯৯ সালে পূর্ব তিমুর স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর স্বাধীনতার পর থেকে অস্ট্রেলিয়া পূর্ব তিমুরের রাজনীতিতে অন্যতম একটি শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার প্রভাব অনেক বেশি। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ সুদানের কথাও আমরা উল্লেখ করতে পারি। মুসলমান অধ্যুষিত সুদানকে ভেঙে খ্রিস্টীয় ধর্মে বিশ্বাসী দক্ষিণ সুদানকে একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের একটা শঙ্কা থেকেই গেল। বিদেশি নাগরিকদের ঘন ঘন পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়া, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সেখানে গোপন মিটিং করা, বিদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা ইত্যাদি আমাদের শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আরো কিছু তথ্য দিতে পারি। এক সময়, অতীতে আজকে যে 'সাতবোন রাজ্য' নামে পরিচিত সেখানকার মানুষ জঙ্গলে বাস করত ও প্রকৃতি পূজারী ছিল। তাদের কোনো ধর্ম ছিল না। প্রকৃতিকে, শক্তিকে, সূর্যকে তারা পূজা করত। ব্রিটিশদের নজর পড়ল এ অঞ্চলের দিকে। জঙ্গলে বাস করা মানুষদের শিক্ষিত করার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করল। সাথে গেল মিশনারিরা, যারা খ্রিস্টধর্ম প্রচার করত। ওই অঞ্চলে তারা চার্চ প্রতিষ্ঠা করল। ভালো ভালো কথা বলা, আর্থিক সাহায্য করা ইত্যাদিতে আকৃষ্ট হলো জঙ্গলের মানুষ। তারপর বছরের পর বছর গেল। আজ যদি পরিসংখ্যান নেয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে মিজোরামের ৯৯ ভাগ মানুষ আজ খ্রিস্টান। নাগাল্যান্ডের ৯০ ভাগ, মনিপুরের ৬০ ভাগ আর মেঘালয়ের প্রায় ১০০ ভাগ মানুষ আজ খ্রিস্টান। ব্রিটিশদের পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে। সেখানে খ্রিস্টান ধর্ম একটি শক্তি। সেখানে হিন্দু কিংবা মুসলমান ধর্মের বিকাশ ঘটেনি। ভারতের অন্যত্র ইসলাম ধর্মের বিকাশ ঘটলেও মিশনারিদের কারণে সাতবোন রাজ্যে ইসলামের বিকাশ ঘটেনি। আমাদের আতঙ্কের জায়গাটা হচ্ছে ওখানে মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশে মিজোরাম, তার উপরে ন্যাগাল্যান্ড, মনিপুর, অরুণাচল, মেঘালয়। আমাদের সিলেটের পাশেই রয়েছে আসাম ও মেঘালয়। আসামে কিছু মুসলমান থাকলেও, মেঘালয়ের প্রায় ১০০ ভাগই খ্রিস্টান। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহারে খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার লাভ করছে, তাতে করে পার্শ্ববর্তী ভারতের মিজোরাম, তথা সাতবোন রাজ্যের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা উৎফুলি্লত হতে পারেন। দুই অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে আগামী দিনগুলোতে। তাই অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাই কমিশনার যখন গোপনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন, তার উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সন্দেহমুক্ত থাকতে পারি না। শুধুমাত্র মানবিক কারণে তিনি যদি বান্দরবান গিয়ে থাকেন, তাহলে তার বাঙালি নেতাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছি যে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক ব্রিগেড সৈন্য ও ৩৫টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এর ফলে সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকা- বেড়েছে। পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্পগুলোতে এখন সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নিয়েছে। ওই অঞ্চলগুলো এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমাদের সন্তু বাবু এর কোনো প্রতিবাদ করছেন না। যখন বরকলে (২১ মে ২০১১) বড় ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছিল, তখনও প্রতিবাদ করেননি সন্তু বাবু। তথাকথিত 'ভূমি অধিকার' এর কথা বলে তিনি মূলত চাচ্ছেন' পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন'(?) এবং সেই সঙ্গে এই অঞ্চল থেকে বাঙালিদের বিতাড়ন। এর আগে তিনি একবার বাঙালিদের নোয়াখালীর চরে প্রত্যাবাসনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। এ ধরনের সাহস তিনি কোথায় পান, ভাবতেই অবাক লাগে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজ সন্তু লারমার ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেননি। বাঙালিরা তাদের অধিকার নিয়ে সেখানে থাকেন। সংবিধান তাদের সেই অধিকার দিয়েছে। পাহাড়িরা ভূমিপুত্র নন। বাঙালিদের মতো চাকমারাও এ অঞ্চলে প্রায় একই সময় বসবাস করতে শুরু করেন। চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল উত্তর ভারতের হিমালয়ের পাদদেশে। 'চম্বকনগর' নামক স্থানে ছিল তাদের ঐশ্বর্যম-িত রাজধানী। বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী চাকমাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে তারা দেশান্তরিত হয়ে আশ্রয় নেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরান এলাকায়। এক সময় তারা বাঙালিদের মতো সমতলেই বসবাস করতেন। ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সরকার পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু চাকমা নেতারা সরকারকে চাপে ফেলে একের পর এক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। অথচ বাঙালিরা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা এতটুকুও সুবিধা পাচ্ছেন না। অতীতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য সরকার রাঙামাটিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও চাকমা নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারণে তা আজো সম্ভব হয়নি। সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নের ব্যাপারে আন্তরিক। কিন্তু দেখা গেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছেন চাকমা গোষ্ঠী। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসাতে চাকমাদের প্রাধান্য। ম্রো বা খিয়াং জনগোষ্ঠী এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারের উচিত হবে এসব জনগোষ্ঠীর দিকে নজর দেয়া। সংবিধান অধিকার বলে বাঙালিরা সেখানে বসবাস করে আসছেন। চাকমারা বহিরাগত। বাঙালিদের মতো তারাও 'সেটলার'। সুতরাং বাঙালিদের সেটলার বলে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। আমরা চাইব সন্তু লারমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং সবাই মিলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করবেন।Daily JAI JAI DIN01.12.12

টিআইবির প্রতিবেদন ও বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা


সংবাদ শিরোনা
  গেল সপ্তাহে টিআইবির একটি প্রতিবেদন নিয়ে সারা দেশ জুড়ে বড় ধরনের ঝড় বয়ে গেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল নবম পার্লামেন্টের সংসদ সদস্যদের শতকরা ৯৭ ভাগ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। নেতিবাচক কর্মকাণ্ড হিসেবে টিআইবি বোঝাতে চেয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, ক্রয় সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ, নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন ইত্যাদি। মোট ১৪৯ জন এমপির উপর গবেষণা চালানো হয়, যাদের মাঝে ২৭ জন মন্ত্রীও আছেন। বাংলাদেশ তো বটেই, বাংলাদেশের বাইরেও টিআইবির একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সেই টিআইবির রিপোর্টে যখন মন্ত্রী তথা সরকারি দলের এমপিদের নেতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরে, তখন বুঝতে হবে দেশে সুশাসনের বড় অভাব। দেশটি ঠিকমত চলছে না। টিআইবির রিপোর্টে অতিরঞ্জিত করে কিছু বলা হয়নি। যা সত্য, গবেষণায় সেই সত্যটিই বেড়িয়ে এসেছে। সংবাদপত্রগুলোই এর সাক্ষী। প্রতিদিন সংবাদপত্রে সরকারি দলের যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর ছাপা হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে সরকারি দলের এমপিরা। টিআইবি তাদের রিপোর্টে ১৩৬ জন এমপির কর্মকাণ্ড উল্লেখ করেছে। আমার ধারণা আওয়ামী লীগের মোট ২৩১ জন এমপির ব্যাপারে যদি গবেষণা চালানো হত, একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যেত। সরকারি দলের ভাগ্য ভালো, টিআইবি তাদের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালায়নি।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি কিংবা ডেসটিনির ঘটনা, যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা ‘লুটপাট’ হয়েছে, সেখানে টিআইবির প্রতিবেদনে তার যে প্রতিফলন ঘটবে, সেটাই স্বাভাবিক। শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে ডেসটিনি প্রতিটির সাথে ক্ষমতাসীন দলের ঊর্ধ্বতন নেতা তথা ঊর্ধ্বতন সমর্থকরা জড়িত। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে অভিযোগ উঠেছে একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। ডেসটিনির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত ছিলেন একজন ঊর্ধ্বতন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, যিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি আরো কয়েকটি ব্যাংকও অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত। এটা তো স্পষ্ট উপর মহলের সাথে যোগসাজশ না থাকলে এটা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বিষয়টি আগেই ধরা পড়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেশ কেন ‘উপেক্ষিত’ হলো, তা জানা প্রয়োজন। দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সাবেক কর্মকর্তাদেরও তারা তলব করেছিল। কিন্তু আদৌ কী কোনো ‘ফল’ তাতে পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি এখনও দিব্যি ‘ঘুরে’ বেড়াচ্ছেন। তারা কেন গ্রেফতার হননি, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ব্যাংক চিঠি লিখে জানিয়েছিল পনের দিনের মধ্যে ঋণের অর্ধেক এক হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার। ওই টাকা হলমার্ক দেয়নি। নানা ছলাকলার আশ্রয় নিচ্ছে। রাষ্ট্র কী এত দুর্বল যে, হলমার্ক থেকে টাকা উদ্ধার করতে পারবে না? অভিযুক্ত ব্যক্তি ও ব্যক্তিদের বাইরে রেখে ‘তদন্ত’ কাজ করলে, তাতে কী ‘তদন্ত’ কাজে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকবে না? কোনো সভ্য দেশে এটা সম্ভব নয়। হাজার হাজার কোটি টাকা, এ টাকা জনগণের। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এ টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যদিও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ কমছে। একটি চক্র বাংলাদেশ ব্যাংক তথা গভর্নরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। একটি অসাধু চক্র সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে ‘ম্যানেজ’ করে হাতিয়ে নিয়েছিল কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর আগে শেয়ারবাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ‘লুট’ হয়েছে। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ রিপোর্টে এ ব্যাপারে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করলেও ‘অদৃশ্য শক্তি’র বলে পার পেয়ে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক ক্রিমিনালরা। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের নির্লিপ্ততা জনমনে সরকার সম্পর্কে মিশ্র ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। হলমার্কের ঘটনার যদি ‘বিচার’ না হয়, যদি আত্মসাৎ করা টাকা উদ্ধার না হয়, তাহলে মানুষ পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। সংবাদপত্রে এমন খবরও ছাপা হয়েছে যে, হলমার্ক কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা সদ্য ওএসডিতে যাওয়া ডিএমডি মো. মইনুল হক ছিলেন ট্রুথ কমিশনে আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ (আমার দেশ, ১৩ সেপ্টেম্বর)। আত্মস্বীকৃত এই দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করে হলমার্কের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রেখে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি তাই দাবি জানিয়েছিলেন অভিযুক্তদের গ্রেফতারের। সেটা করা হয়নি। এতেই প্রমাণ হয়, হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাথে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এ ধারণা আরো বদ্ধমূল হয় যখন জানা যায়, গেল বছর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি লিখিতভাবে অর্থমন্ত্রীকে জানালেও অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। হলমার্ক কেলেঙ্কারির দায়দায়িত্ব মুহিত সাহেব এড়াতে পারেন না। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। এখন এর সাথে যোগ হলো হলমার্কের ঘটনা।
আরো একটি সমস্যা সরকারের ভাবমূর্তি ুণœ করেছেÑ আর তা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিশেষ করে সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কূল-কিনারা না হওয়া। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড বিভক্ত সাংবাদিক সমাজকে একত্রিত করেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যের জন্য সমালোচিত হয়েছেন বারবার। সাংবাদিক সমাজে যারা সরকারের ‘বন্ধু’ বলে পরিচিত ছিলেন এই হত্যাকাণ্ডে তারাও আজ সরকারের পাশে নেই। সাংবাদিক সমাজ একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছেন এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনীদের খুঁজে বের করার। কিন্তু নয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ব্যর্থ। সর্বশেষ পরাগ অপহরণ ঘটনায় জড়িয়ে গেছে যুবলীগের এক কর্মকর্তা। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বটে। কিন্তু উদ্ধার হয়নি ৫০ লাখ টাকা। আজ পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে পুলিশ তথা র‌্যাবের কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও ‘মুক্তিপণ’ এর মতো ঘটনা ঘটেছে। যা আমাদের জন্য চিন্তার কারণ। অভিভাবকদের মধ্যে তাদের সন্তানদের জন্য একটা দুশ্চিন্তা থাকবেই। পুলিশ বিরোধী দলকে হেনস্তা আর লাঠিপেটা করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ছিনতাইকারী, অপহরণকারীকে গ্রেফতার করতে পারছে না এবং এই প্রবণতা রোধ করতেও পারছে না। শিশু পরাগ অপহরণের ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা কত অসহায়। আরো দুঃখজনক খবর হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, তা বন্ধেরও কোনো উদ্যোগ নেই।
আগামী কয়েকটি মাস সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়। একদিকে বিরোধী দলের সাথে রাজনৈতিক ‘দ্বন্দ্ব’ আরো তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে একাধিক ঘটনায় সরকারের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হচ্ছে। প্রথম ঘটনায় সরকার রেলের ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করেছে। এর আদৌ প্রয়োজন ছিল না। সাধারণ মানুষ রেলে চলাফেরা করে। ভাড়া কম থাকায় রেল যাত্রা তারা পছন্দ করে। ভাড়া বৃদ্ধি মানেই হচ্ছে সাধারণ মানুষের উপর আঘাত আসা। আমরা ভারতের উদাহরণ দেখাতে পারি। সাধারণত খুব কম ক্ষেত্রেই রেলের ভাড়া সেখানে বাড়ানো হয়। ভাড়া বাড়িয়ে কোনো দলই জনপ্রিয়তা হারাতে চায় না। তৃণমূলের রেলমন্ত্রী ভাড়া বৃদ্ধি করেছিলেন দলের সিদ্ধান্ত না নিয়ে। ফলে মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। নয়া রেলমন্ত্রী বিষয়টি বোঝেন কী না জানি না। কিন্তু রেলের ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা। মানুষ খুশি হবে না এই সিদ্ধান্তে। আমলাদের দ্বারা প্রণীত সিদ্ধান্ত যদি জনপ্রতিনিধিরা কোনো কিছু না বুঝেই গ্রহণ করেন, তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। দ্বিতীয় ঘটনা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে। যেখানে বিদ্যুতের চুরি রোধ করার কোনো উদ্যোগ নেই, সেখানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে সরকার কী লাভবান হবে? এতে তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা থাকলেও, তিনি মূলত আমলা, জনগণের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সরকার প্রধানকে তিনি সঠিক উপদেশটি দিয়েছিলেন বলে মনে হয় না।
পদ্মা সেতু, হলমার্ক, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, রেলের ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি একটি ঘটনাও সরকারের পক্ষে যায়নি। এমনিতেই কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, এটা নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ পরস্পর বিরোধী এক অবস্থান গ্রহণ করেছে। সংবিধান, নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন। যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়টি মুখ্য, সেখানে সরকারের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। এমনি এক পরিস্থিতিতে আসলো টিআইবির রিপোর্টটি। সরকারের প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে এর পেছনে সত্যতা আছে। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, তারা টিআইবির সদর দফতরে নালিশ জানাবেন। এতে করে কী ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ সংসদ সদস্যদের তাদের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা যাবে? আমার তা মনে হয় না। বরং তারা উৎসাহিত হতে পারেন। বরং সরকার যদি বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করে এবং টিআইবি যেসব সুপারাশি করেছে তা যদি অনুসরণ করে,আমার ধারণা এতে করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি ঘটবে। মনে রাখতে হবে টিআইবি’র এই রিপোর্ট এখন আন্তর্জাতিকভাবে ‘রেফার’ করা হবে। এটা সরকার নয়, রাষ্ট্রের জন্যও অমঙ্গল। আমরা এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। আর তার পথ একটাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে আসা। এটা সবার জন্যই মঙ্গল।

খালেদা জিয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দুটি কথা


খালেদা জিয়া সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করতে সরকার জামায়াতে ইসলামীকে পক্ষে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই সভায় জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগর আমির শামসুল ইসলাম এমপিও বক্তৃতা করেন। খালেদা জিয়া প্রশ্ন রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তলে তলে সরকারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। আমরা যাঁরা রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে লেখালেখি করি, তাঁদের কাছে খালেদা জিয়ার এই মন্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার এই মন্তব্যের পাশাপাশি ইদানীং ছাত্রশিবিরের কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রতিবেদন সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে। সরকারের দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতেই শিবির এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল। জোটের পক্ষ থেকে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্বও আছে। খালেদা জিয়া যে 'অভিযোগ'টি করেছেন, এ ধরনের অভিযোগ ইদানীং আমি শুনতে পাচ্ছি। বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যেই যখন বলেন, বর্তমান সরকারের আমলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শেষ হবে, তখন থেকেই বাজারে নানা 'গুজব' ভাসছে। এর কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা বলতে পারব না। তবে রাজনীতির ছাত্র হিসেবেই জানি, রাজনীতিতে স্থায়ী 'বন্ধু' বলে কিছু নেই। আজ যে 'শত্রু', কাল সে 'মিত্র'ও হতে পারে। ভারতে তৃণমূল কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের মিত্র ছিল। 'ছিল' বললাম এ কারণে যে সম্প্রতি তারা ইউপিএর মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের সঙ্গে থাকবে, নাকি বিজেপির সঙ্গে থাকবে- তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। অতীতে তো তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির সঙ্গেও গিয়েছিল। তাদের স্বার্থ যারা নিশ্চিত করবে, তাদের সঙ্গেই যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক অতীতে ভালো ছিল না। অথচ পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় নেতারা খালেদা জিয়াকে 'হাইপ্রোফাইল' ভিজিটে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বিএনপিকে আস্থায় নিতে তাদের দেরি হয়নি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির স্থায়ী মিত্র, তা বলা যাবে না। বিএনপি ইসলামী আদর্শ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। জামায়াতে ইসলামীও এই মতাদর্শের প্রবক্তা। সে জন্যই এই দল দুটির মধ্যে ঐক্য হয়েছিল; কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর একটা 'অতীত' আছে। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক ধরনের 'ঐক্য' করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে। এ ধরনের 'ঐক্য' হতেই পারে! তবে খালেদা জিয়াকে আমি সব সময় জামায়াতে ইসলামীর প্রতি 'দুর্বল' থাকতেই দেখেছি।
রাজনীতিতে 'ষড়যন্ত্র'তত্ত্ব বলে একটি কথা আছে। যাঁরা এই 'ষড়যন্ত্র'তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই এই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন যে খালেদা জিয়া অতিসম্প্রতি ভারত সফর করে এসেছেন। সেখানে তিনি লাল গালিচা সংবর্ধনা পেয়েছেন। খালেদা জিয়া তাঁর এই সফর 'সফল' হয়েছে বলে দাবি করেছেন। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় কোনো কোনো মহল থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরামর্শও নাকি দেওয়া হয়েছে! যদিও এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ থেকেই স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। খালেদা জিয়া নিজে বলেননি। এমনকি তরিকুল ইসলামের সংবাদ সম্মেলনেও এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি। তাই সংগত কারণেই ধরে নিচ্ছি, এর কোনো সত্যতা নেই। জামায়াতে ইসলামীর কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার হচ্ছে। বিচার নিয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। রামুতে খালেদা জিয়া আবারও বলেছেন, তিনিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান। তবে সেই বিচার হতে হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে। সুতরাং বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না, এটা বলা যায় না। জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নিশ্চয়ই আছে। তাদের দলীয় স্বার্থ যেখানে বেশি নিশ্চিত হবে, সেখানেই তারা যাবে, এটাই স্বাভাবিক। ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী- এটা তো অস্বীকার করা যাবে না। তারা আগামীতে ১৮ দলীয় জোটে থাকবে, এটা যেমন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তেমনি এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে জামায়াতে ইসলামী ১৮ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে 'তৃতীয় ধারা'র সূচনা করবে না। ইসলামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তবে আমার বিবেচনায় জামায়াত ১৮ দলীয় জোট ছাড়বে না। জামায়াত সমর্থক কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীর (ডাক্তার, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ার) সঙ্গে মাঝেমধ্যে আলাপে আমার মনে হয়েছে, তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে তুরস্কের 'জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' পার্টির মডেলে একটি পার্টি হিসেবে দেখতে চায়। খালেদা জিয়ার 'অভিযোগের' পেছনে সত্যতা যা-ই থাকুক না কেন, বাংলাদেশে একটি তথাকথিত 'তৃতীয় ধারার' বিকাশের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অনেক দিন ধরেই এই তৃতীয় ধারার কথা বলা হচ্ছে। এখন কার নেতৃত্বে এই তৃতীয় ধারা বিকশিত হবে? এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে? এরশাদ সাহেব তো একটি ইঙ্গিত ইতিমধ্যে দিয়েছেন যে জানুয়ারিতে তিনি ঢাকায় মহাসমাবেশ করে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন; কিন্তু যাঁরা এরশাদকে চেনেন, তাঁরা জানেন এ ধরনের বক্তব্য এরশাদ সাহেব বহুবার দিয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগেও একটি তৃতীয় ধারার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো আবেদন নেই। তাঁরা খুব একটা জনমত সৃষ্টি করতে পেরেছেন বলেও মনে হয় না। বাস্তবতা হচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি পক্ষ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি পক্ষ, অন্যটি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে একটি পক্ষ, যারা ইসলামী মূল্যবোধ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে বিএনপির রাজনীতির মূলত তেমন কোনো পার্থক্য নেই। অতীতে এরশাদ ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠন করে নির্বাচনও করেছিলেন। কিন্তু ফলাফল খুব সুবিধার ছিল না। সুতরাং ইসলাম-পছন্দ দলগুলো আলাদাভাবে জোট করলেও তাতে জনসমর্থন থাকবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। নানা কারণে খালেদা জিয়াও চাইবেন না জামায়াতে ইসলামী ১৮ দলীয় জোট ত্যাগ করুক। তিনি মূলত একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে 'বাজার' যাচাই করে দেখাচ্ছেন- বিতর্কিত হলেও ১৮ দলীয় জোটে জামায়াতই বড় দল। তাদের যেমন কর্মী রয়েছে, তেমনি রয়েছে আর্থিক ভিত্তি। তবে সরকার যদি জামায়াতকে 'যেকোনো প্রলোভন' দেখিয়ে ১৮ দলীয় জোট থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারে, তাতে তাদের 'সাফল্য' অনেক বেশি। এতে করে নিঃসন্দেহে বিএনপি দুর্বল হবে। তবে যেকোনো বিবেচনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে এই প্রক্রিয়া 'মেলানো' যাবে না। তরুণ প্রজন্ম চায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। তরুণ প্রজন্ম একটি 'শক্তি'। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সর্বশেষ নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের ভোটেই আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার 'অভিযোগ'টিকে আমি গুরুত্ব দিতে চাই না। বরং তাঁর মন্তব্য জামায়াতের গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি সাধারণ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। এতে করে বহির্বিশ্বে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব করেছিলেন বটে; কিন্তু তার কোনো জট খোলেনি। মোদ্দাকথা- বর্তমান সরকারকে অথবা প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখে কোনো সরকার বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে সংকট বাড়বে বৈ কমবে না। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আসরে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে। তাঁর চীন ও ভারত সফর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। চীনের আগামী রাষ্ট্রপ্রধান জি চিন পিং তাঁকে সাক্ষাৎ দিয়েছেন। এটা নিছক সাধারণ ঘটনা নয়। চীনা নেতারা খালেদা জিয়াকে যে গুরুত্ব দেন, এটা তার বড় প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলকে বিচারে যে মার্কিন নীতি, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান 'ছোট' করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একদিকে পূর্ব চীন সাগরভুক্ত দেশগুলো, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে 'চীনকে ঘিরে ফেলার' নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। ওবামার দ্বিতীয় প্রশাসনেও এই নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। ওবামার ১৯ নভেম্বর মিয়ানমার সফরকেও এই দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ওবামা প্রশাসন তাদের স্ট্র্যাটেজিতে মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবে। তবে ওবামা প্রশাসন কতটুকু সফল হবে, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলবে। এসব কারণে চীনা নেতাদের কাছে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি 'অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি' স্বাক্ষর করেছে। 'আকসা' চুক্তি নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। আকসা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন মেরিন সেনা বাংলাদেশে অবস্থান ও বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে পারবে। খালেদা জিয়ার গুরুত্ব তাই বাড়ছে। খালেদা জিয়া রামুতে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে কিছুটা কৌতূহল সৃষ্টি হলেও বাস্তবতাই বলে, জামায়াতে ইসলামীর কাছে বিএনপি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। খালেদা জিয়ার মন্তব্যের পর সরকার আরো সতর্ক হয়ে যাবে। জামায়াতে ইসলামী কোন জোটে যোগ দিল বা কোন জোটে থাকল, ওটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। সরকারের সাফল্য সেখানেই নিহিত।Daily KALERKONTHO27.11.12

সম্পর্কে কী আদৌ পরিবর্তন আসবে?

 প্রেসিডেন্ট ওবামার দ্বিতীয় টার্মে বিজয় ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি কিনটনের সম্ভাব্য বিদায়ের মধ্যদিয়ে যে প্রশ্নটি এখন উঠেছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিনি নীতিতে আদৌ পরিবর্তন আসবে কী না? যারা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কিছুটা খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে দু’দেশের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনের অসন্তোষের খবর আমরা সবাই জানি। ওবামার নির্বাচনের পরদিনও অর্থমন্ত্রী পুনরায় অধ্যাপক ইউনূস সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এর ফলে ওবামার নয়া প্রশাসন বিষয়টি খুব ভালো চোখে দেখবে বলেও মনে হয় না। ড. ইউনূস ইস্যুর বাইরেও ‘টিকফা’ ও ‘আকসা’ চুক্তি নিয়ে দু’ দেশের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। দু’টো চুক্তিই স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘চাপ’ আছে। এমনকি ‘টিকফা’ চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সুবিধা পাবে না, এমন কথাও বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা।  তার বক্তব্য পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। এখন বাংলাদেশ ওবামা প্রশাসনের সমর্থন পেতে ‘টিকফা’ এবং ‘আকসা’ চুক্তি স্বাক্ষর করে কী না সেটাই দেখার বিষয়। তবে এ দেশের মানুষ জানে না ‘টিকফা’ চুক্তি কী? এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সে ব্যাপারেও আমরা স্পষ্ট নই। দুঃখজনক হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে বিদেশে, এ ধরনের চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মহাজোট সরকারের আমলে এ ধরনের কোনো চুক্তি নিয়ে সংসদে আমরা আলোচনা হতে দেখিনি। মজিনার কথাবার্তা থেকে মনে হয়েছে বাংলাদেশী পণ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর বাংলাদেশী পণ্য মানেই তো তৈরি পোশাক। সেই তৈরি পোশাক রফতানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার একটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত প্রেসার খাটিয়ে সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় একটি ‘অংশীদারিত্ব সংলাপ’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ। এ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কিছুই নেই। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ নামে একটি চুক্তির প্রস্তাব করেছিল। ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতির সুযোগ সুষ্টি হবে। এই উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে আগামীতে। ‘আকসা’ চুক্তি প্রস্তাবের রেশ ফুরিয়ে যাবার আগেই মজিনা বললেন, ‘টিকফা’ চুক্তির কথা। এই চুক্তিটি আসলে কী, কিংবা এতে করে আমরা কতটুকু উপকৃত হব, এ ব্যাপারে বিস্তারিত আমরা অনেকেই জানি না। সংবাদপত্রেও এটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। তবে মজিনা বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষিত হবে। কীভাবে হবে, তা অবিশ্যি তিনি বিস্তারিত বলেননি। এমনকি এই চুক্তির সাথে ‘টিফা’ বা টিআইইএফএ চুক্তির কোনো যোগ আছে কীনা, তাও আমরা নিশ্চিত নই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই ‘টিফা’ চুক্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তাতে রাজী হয়নি। তখন বাংলাদেশের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র টিাইসিএফ চুক্তি করার প্রস্তাব করেছিল। চুক্তিটির পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইকনোমিক কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট’। বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে তাহলে বাংলাদেশ পাইরেটেড কোনো পণ্য বাজারজাত করতে পারবে না। শ্রমিকের মানও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। তাছাড়া ওষুধ প্রস্তুত ও রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেধশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডব্লিউটিওর কাছ থেকে ট্রিপসের আওতায় যে সুবিধা ভোগ করছে, তাও বাতিল হতে পারে। আসলে টিআইইএফএ’র এরই বিকল্প নাম হচ্ছে ‘টিফা’। এর বিস্তারিত কোনো পক্ষ থেকেই উপস্থাপন না করায় তাতে নানা সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি চুক্তির প্রস্তাব করে। তখন এর নাম ছিল ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ বা ‘টিফা’। ২০০২ সালে প্রণীত টিফার প্রথম খসড়াটিতে ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু কোনো  কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপত্তি থাকায় ২০০৫ সালে সংশোধিত টিফায় ৭টি ধারা ও ১৯টি প্রস্তাবনা বহাল থাকে। ওই সময় সংশোধিত টিফায় ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে বিনিয়োগ বাতিল করাসহ মামলার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র টিফা চুক্তির খসড়ায় ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর প্রস্তাবনায় মেধাস্বত্ব অধিকার, আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও পরিবেশগত সুরক্ষাÑ এই তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুধু এই তিনটি ধারাই নয়, বরং টিফা চুক্তির একাধিক ধারা ছিল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। যেমন বলা যেতে পারে মেধাস্বত্ব আইন। এটা মানলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ধস নামবে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর প্রায় ৫৫টি দেশে ওষুধ রফতানি করে। বাংলাদেশের ওষুধের মান আন্তর্জাতিক মানের। এখন মেধাস্বত্বের শর্তের কারণে বাংলাদেশ অন্য দেশের ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশ বা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একটি বিশেষ অধিকার রয়েছে। ওষুধের পেটেন্ট ব্যবহার করেই বাংলাদেশ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ তৈরি করছে, যা দিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই সুযোগ ভোগ করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে কী না, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে শ্রমমানের কথা বলছে, সেটা নিয়েও কথা আছে। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশের  শ্রমিকদের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইএলও’র মান বজায় রাখা কঠিন। ইউরোপের একজন শ্রমিক যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং শ্রমিকদের যে মান, তার সাথে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মানের বিচার করা যাবে না। ইউরোপে একজন শ্রমিকের যে অধিকার, সেই অধিকার বাংলাদেশের শ্রমিকদের নেই। এটাই বাস্তব। এই বাস্তবতা মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব শ্রমিক মানকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের শ্রমমানকে বিচার করা যাবে না। সুতরাং আজ ‘টিকফা’ বলি আর টিফা চুক্তি বলি, কোনো চুক্তিই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে না। বরং এ ধরনের চুক্তি মার্কিনীদের স্বার্থই রক্ষা করবে মাত্র। এ ধরনের কোনো চুক্তির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারকে কোনো মতেই মেলানো যাবে না। শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার আমাদের অধিকার। আমরা তো একের পর এক যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তি শূন্য। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি). থেকেও কোনো সাহায্য পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিভিন্ন দেশকে বড় অঙ্কের মঞ্জুরি সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে এমসিসি গঠন করেছিল মার্কিন কংগ্রেস। এর যুক্তি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া না হলেও ধারণা করা হচ্ছে গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, বিনিয়োগের পরিবেশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমসিসি থেকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ড. ইউনূসের বিষয়টিও যে অন্যতম একটি কারণ, তা জোসেফ ক্রাউলির একটি মন্তব্য থেকে জানা যায়। জোসেফ ক্রাউলি মার্কিন কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ারম্যান।
পদ্মা সেতু নিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন, ‘টিকফা’ চুক্তি না হলে বাংলাদেশেরই ক্ষতি। নিঃসন্দেহে এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্র এখানে নাক গলাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের কথা মতো আমরা যেমনি শ্রমমান নির্ধারণ করতে পারি না, ঠিক তেমনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, সেই সুযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। আমরা সমমর্যাদা ভিত্তিক সম্পর্ক চাই। হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়েও কথা আছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরে ৭ম নৌবহর ঘাঁটি তৈরি করতে পারেÑ এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘চীনকে ঘিরে ফেলার নীতি গ্রহণ করা। ওবামার প্রথম শাসনের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো ছিল না। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের (৫৩৯ বিলিয়ন ডলার) নিয়েও কথা আছে। পূর্ব এশিয়ায়ও যুক্তরাষ্ট্র চীন বিরোধী একটি এলায়েন্স গড়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকার সাথে বাংলাদেশ নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারে না। তাই ওবামার দ্বিতীয় টার্মে দু’ দেশের মাঝে সম্পর্ক উন্নত হবেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং আমি আশঙ্কা করছি বাংলাদেশের উপর মার্কিনি চাপ আরো বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওবামা প্রশাসনকে কতটুকু ছাড় দেয় সেটাই দেখার বিষয়। আমাদের প্রত্যাশ্যা বাংলাদেশ সমমর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলুক। যেখানে আমাদের কোনো ‘স্বার্থ’ নেই, সেখানে বা সেইসব চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না। আমরা ভারত-মার্কিনি স্বার্থে আমাদের জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিতে পারি না।