রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

মহাসংকটের আবর্তে দেশ

   
   
গত সোমবার ১৮ দলীয় জোটের বিক্ষোভ কর্মসূচি ও ঢাকায় বিএনপি অফিসের সামনে জনসভার পর বিএনপি অফিসে পুলিশের তল্লাশি এবং শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতারের পর একটা প্রশ্ন এখন অনেকের মাঝেই উঠেছে। আর তা হচ্ছেÑ দেশ এখন কোন পথে? ১৮ দলের বিক্ষোভ কর্মসূচি ও জনসভা ছিল পূর্বঘোষিত। কিন্তু ওই জনসভায় শেষ পর্যায়ে যা ঘটল, তা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিবিসির (বাংলা) ভাষ্য থেকে জানা গেছে, শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল সেই জনসভা। পুলিশের ভূমিকা ছিল অনেকটা পর্যবেক্ষকের। এক পর্যায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব যখন বক্তৃতা শেষ করছিলেন, তখন বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারপর যা ঘটল, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতাসহ গ্রেফতার হলেন শতাধিক নেতাকর্মী। টিভি চ্যানেলে দেখলাম মহাসচিবের কক্ষ ভেঙে পুলিশ গ্রেফতার করছে কর্মীদের। পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবারের হরতালের অজুহাত খুঁজতেই বিএনপি এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে, এ কথাও বলেছে পুলিশ। শুধু তাই নয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিএনপির অফিস থেকে বেশ কয়েকটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। সংঘর্ষের পর খালেদা জিয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির মিটিং করেন এবং বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয় যদি বৃহস্পতিবারের মধ্যে নেতাদের ছেড়ে দেয়া না হয়, তাহলে আগামী ১৮ ও ১৯ তারিখ আবার হরতাল পালন করা হবে। গতকাল মঙ্গলবারও ১৮ দল হরতাল পালন করেছে। এদিন দুপুরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ও আলতাফ হোসেন চৌধুরী মুক্তি পাওয়ার পর ১৮ ও ১৯ তারিখের হরতালের ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্ত কী হবে, তা অবশ্য জানা যায়নি।
সোমবারের অনাহূত ঘটনায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি জোটের (মহাজোট ও ১৮ দলীয় জোট) মাঝে আস্থার সংকট রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, বিএনপি তথা ১৮ দল হরতালের অজুহাত খুঁজছিল। আর এজন্যই তারা সোমবার সহিংস হয়ে উঠেছিল। এ বিতর্কে না গিয়ে যা বলা যায় তা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যখন একটি সংলাপের কথা বলেছেন, তখন পুলিশি অভিযান, গ্রেফতার কাম্য নয়। হরতাল হল। আবারও হরতাল হবে। কেন বিরোধী দলকে হরতাল ডাকতে হয়, এটা যদি নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে এ ধরনের হরতাল হতেই থাকবে। হরতাল নিষিদ্ধের আইন করেও কিছু হবে না। হরতাল হতেই থাকবে। হরতাল সাধারণ মানুষ তো বটেই, সরকার ও বিরোধী দল, কারও জন্যই কোন মঙ্গল ডেকে আনে না। বিগত কয়েকদিনের হরতালে গাড়ি পুড়েছে, ট্রেনের বগি পুড়েছে, মানুষ মারা গেছেÑ এ ক্ষতি তো রাষ্ট্রেরই। পুলিশের আরও মানবিক ও সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিকাশমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস’ (সিবিএম) ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সিবিএম বা আস্থার সম্পর্ক গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। সিবিএম না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। বিঘিœত হবে সুশাসন। আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে। এদেশে অনেক সম্ভাবনা আছে। এ সম্ভাবনাকে আমরা নষ্ট হতে দিতে পারি না। রাজনীতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তা দেখার দায়িত্ব সবার। বিরোধী দল ‘শত্র“’ নয়, বিরোধী দল গণতন্ত্রের ভাষায় ‘সরকারের একটি অংশ’। একজন সংসদ সদস্যকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে (অথবা ধস্তাধস্তিতে পড়ে গিয়ে!) বিরোধী দল যে সরকারের একটি অংশ, তা প্রমাণ করা যাবে না। বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়াটা জরুরি। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা করতে হবে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়েই। আর অফিসে হামলা ও নেতাদের গ্রেফতার সংকটকে আরও গভীরতর করবে মাত্র।
এদেশ ‘মহাসংকটে দেশ’Ñ এ অভিমত অনেকের। এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ফেব্র“য়ারিতে (২০১৩) মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ব্যাপক হারে বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ফেব্র“য়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ (জানুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ)। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ (জানুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ)। ঢাকায় অবস্থিত বিদেশী কূটনীতিকরা চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যখন সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়, থানা আক্রমণ করা হয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া হয়Ñ এসব আমাদের জন্য ভালো কোন খবর নয়। তাই বিদেশী কূটনীতিকরা যখন উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন সরকারের উচিত এ উদ্বেগকে বিবেচনায় নেয়া। ডা. দীপু মনি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি পুরো ঘটনার জন্য বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাতে চেয়েছেন। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এ ধারণাকেই সমর্থন করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলুক। তবে শাহবাগ চত্বরের তরুণ প্রজš§কে ঘরে ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে দীর্ঘদিন এ আন্দোলন চললে তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে সে ধরনের একটি আলামতই পাওয়া গেছে। গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামে একটি জনসভা আহ্বান করেছিল ১৩ মার্চ। কিন্তু তা প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে ইসলামপন্থীদের একটি জোট হেফাজতে ইসলাম। তারা ওইদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতালও আহ্বান করেছে। হেফাজতে ইসলামীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহামদ শফি। হেফাজতে ইসলামীর সঙ্গে জামায়াত জড়িত নয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে রোববার হাটহাজারী মাদ্রাসায় একটি দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই মাহফিলে ইসলামবিরোধী অপপ্রচার ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়ে অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ লেখার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রয়োজনে ‘শহীদী মৃত্যু’ বরণ করে নেয়ার শপথ নেয়া হয় (সমকাল, ১১ মার্চ)। যে কোন বিবেচনায় এ সংবাদটি উদ্বেগের। অতীতে কখনও আল্লামা শাহ আহামদ শফির নাম তেমন একটা শোনা যায়নি। বয়োবৃদ্ধ এ আলেম মানুষটি সক্রিয় হলেন শুধু একটি কারণেÑ আর তা হচ্ছে হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়ে অবমাননাকর লেখা, যা বিভিন্ন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার একটি কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আস্থায় নেয়া যায়নি। উপরন্তু গণজাগরণ মঞ্চ সরকারের সমর্থন নিয়ে একের পর এক জনসভা করে যাচ্ছে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, এটা প্রচার করলেও তাতে সাড়া দেয়নি ইসলামপন্থীরা। গণজাগরণ মঞ্চ তাদের চট্টগ্রামের কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে চাইছে। এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত। ওই সিদ্ধান্ত সংঘাত বাড়াবে মাত্র। আজ শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে সবাইকে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে।
সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা হল, সরকার ইসলামপন্থীদের কাছে টানতে পারেনি। জামায়াতকে টার্গেট করতে গিয়ে সব ইসলামপন্থীকে টার্গেট করা হয়েছে। শেষের দিকে সরকার ভুল ভাঙানোর উদ্যোগ নিলেও অনেক দেরি হয়ে গেছে। গণজাগরণ মঞ্চ যদি তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে, তাহলে ইসলামপন্থীরাও তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। সরকার সব ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করবে এটা ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন এক নয়। বিএনপি তথা ১৮ দল এখন এক দফায় গেছে। যদি সংলাপ না হয়, তাহলে সংকটের গভীরতা আরও বাড়বে। সংঘাত আরও বাড়বে। মানুষ থাকবে আতংকে।
রাজনীতি এখন ‘নো-রিটার্ন’ পর্যায়ে চলে গেছে। কেউ কারও অবস্থান থেকে এতটুকু পিছপা হতে রাজি নন। সংলাপের কথা মুখেই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু বাড়ছে সহিংসতা। এ সহিংসতা কোন সমাধান নয়। এটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে না। আজ যা প্রয়োজন তা হচ্ছে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা। সরকার হচ্ছে অভিভাবক। তাকে সহনশীল হতে হবে। নেতাদের হঠকারী বক্তব্য দেয়া পরিহার করতে হবে। আর বিরোধী দলকেও আগ্রহী হতে হবে সংলাপের ব্যাপারে। এটা ছাড়া এ মুহূর্তে কোন বিকল্প নেই। হরতাল আহ্বান করা ছাড়া বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোটের হয়তো বিকল্প কিছু ছিল না। কিন্তু মনে রাখতে হবে হরতাল কোন সমাধান বয়ে আনবে না। একমাত্র সংলাপই পারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উপহার দিতে এবং সমাধানের একটা পথ বাতলে দিতে। মির্জা ফখরুলসহ কয়েকজন নেতা মুক্তি পাওয়ায় সংলাপের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলা যায়। তাই আমরা চাইব, শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং জাতি এক ‘মহাসংকট’ থেকে মুক্তি পাক।
Daily JUGANTOR
13.3.13

কাশ্মীর ও রোহিঙ্গা ইস্যু দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার প্রশ্ন


সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কাশ্মীর ও রোহিঙ্গা সমস্যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে এই দুটো অঞ্চলের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিতিশীলতাকে যেমনি সংঘাতময় করেছে, ঠিক তেমনি উত্তেজনারও জন্ম দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাকর। কাশ্মীর নিয়ে অতি সম্প্রতি দেশ দুটো আবারো এক ধরনের 'মনস্তাত্তি্বক যুদ্ধ' এ লিপ্ত হয়েছে। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলওসির কাছে ভারতীয় সেনারা গলা কেটে অন্তত ১২ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে বলে জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক দলের কাছে অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। দেশটি আরো বলেছে, ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। একই সময় ২৯ জন বেসামরিক পাকিস্তানি নাগরিককেও হত্যা করেছে ভারতীয় সেনারা। পাকিস্তানের এই অভিযোগ সংক্রান্ত গোপন রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ভারতীয় দৈনিক 'দি হিন্দু'। এ ধরনের একটি রিপোর্ট যে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আজকের নয়। ১৯৯৭ সালের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে বলা হয়_ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অপহরণ, ধর্ষণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় কাশ্মীরে আজো হত্যাযজ্ঞ হচ্ছে। এখানে বলা ভালো ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় কাশ্মীর প্রশ্ন ছিল উহ্য। পরবর্তী সময়ে কাশ্মীরের মহারাজ্য ভারতে যোগ দেন কিন্তু এই সংযুক্তির সাথে কাশ্মীরের জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফলে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের পাহাড়ী জনগণ বিদ্রোহ করে। অক্টোবরের (১৯৪৭) এই বিদ্রোহের সূত্র ধরেই পাকিস্তান ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা কাশ্মীরের একটা অংশ দখল করে 'আজাদ কাশ্মীর' নামে একটি রাজ্য গঠন করেছিল, যা আজ পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃত। কাশ্মীর মূলত ৩টি এলাকায় বিভক্ত। মুসলমান অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চল, পূর্বে বৌদ্ধ প্রধান লাদাখ এবং দক্ষিণে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা জম্মু। জাতিসংঘে কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠানের একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও ভারত ওই সিদ্ধান্ত কখনো কার্যকর করেনি। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে যে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে : ১. কাশ্মীরী জনগণের প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আচরণ, ২. ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান, ৩. কাশ্মীরকে বৃহৎ ভারতের একটি 'কলোনিতে পরিণত করা। ভারত সংযুক্তির সময় কাশ্মীরীদের একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সে প্রস্তাব কখানোই কার্যকরী করা হয়নি। বরং ধীরে ধীরে সংবিধানের সেই ধারা (ধারা ৩৭০) সংশোধন করা হয়েছিল। ভারতীয় শাসকরা কাশ্মীরকে একটি 'বিশেষ মর্যাদা' দেয়ার বদলে কলোনিয়াল প্রভুদের মতোই ব্যবহার করে আসছেন। কাশ্মীরের ব্যবসা-বাণিজ্য আজ কাশ্মীরীদের হাতে নেই। কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সংম্পদ ও এর অর্থনীতির ওপর কাশ্মীরী জনগণের কোনো অধিকার নেই। এর নিয়ন্ত্রণ ভারও অকাশ্মীরীদের হাতে। এ কারণেই জনগণের অসন্তোষ বাড়ছিল। অতি সম্প্রতি এর সাথে যোগ হয়েছে সর্বভারতব্যাপী হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান। এতে করে মুসলমান প্রধান কাশ্মীরী জনগণ এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কাশ্মীরে ভারতীয় নেতাদের বিমাতাসুলভ আচরণ এবং সেনাবাহিনীর অত্যাচার সেখানে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনার জন্ম দিয়েছে। এই চেতনা অত্যন্ত শক্তিশালী। এটা স্পষ্ট যে, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান ছাড়া পাক-ভারত সম্পর্ক উন্নয়ন অসম্ভব। কাশ্মীর নিয়ে দুটো (১৯৪৭, ১৯৬৫) যুদ্ধ হলেও তাতে কোনো সমাধান হয়নি। ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তিতে কাশ্মীর প্রশ্নে স্থিতাবস্থা এবং জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়গুলো মীমাংসার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। এরপর দুটো দেশ লাহোর ঘোষণা (বাজপেয়ী ও নওয়াজ শরীফ) স্বাক্ষর করেছিল ১৯৯৯ সালে। লাহোর ঘোষণায় বলা হয়েছিল জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুসহ সব ইস্যু সমাধানে উভয়পক্ষ তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করবে। এই ধারাবাহিকতায় আগ্রা শীর্ষ সম্মেলনে (জুলাই ২০০১) অনুষ্ঠিত হলেও তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এমনকি ২০০১ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ একটি স্বায়ত্তশাসন দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নয়াদিল্লী এ ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেখাননি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে। লস্কর-ই-তৈয়বা বা আহলে হাদিস-এর নাম একাধিকবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এরা আজ একটি পক্ষ। এদের সাথে যদি আলোচনার কোনো উদ্যোগ নেয়া না হয়, তাহলে কাশ্মীরে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে না। এই স্থিতিশীলতা বিপন্ন হলে, তাতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াও আক্রান্ত হবে। পাকিস্তান ও ভারতও একটি ফ্যাক্টর। সিমলা, লাহোর ও আগ্রা ঘোষণার আলোকে কাশ্মীর প্রশ্নে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। কাশ্মীর সমস্যার পাশাপাশি অতি সম্প্রতি রোহিঙ্গা সমস্যা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গারা, যারা ধর্মীয়ভাবে মুসলমান, তারা মূলত মিয়ানমারের নাগরিক। শত বছর ধরে তারা মিয়ানমারে বসবাস করলেও, গেল বছর মিয়ানমার সরকার ব্যাপকহারে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের গ্রহণ করতে বাংলাদেশের ওপর 'চাপ' প্রয়োগ করে। এই ঘটনায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি চক্র অপতৎপরতায় লিপ্ত। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপকহারে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে এই রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্কের অবনতি হবে কিনা? এমনিতেই দুদেশের মাঝে সম্পর্ক যে উষ্ণ রয়েছে, তা বলা যাবে না। গত মে মাসেই (২০১২) তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে ও আইসির উদ্যোগে শরণার্থী বিষয়ক একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা সমস্যাটা তুলে ধরেছিলেন। তিনি সম্মেলনে অভিযোগ করেছিলেন যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সমাজে ক্ষতির প্রভাব ফেলবে। এর প্রতিক্রিয়ায় কিনা তা বলতে পারব না। কিন্তু বাংলাদেশ যখন রোহিঙ্গা সমস্যাটা আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়। ঠিক তার দু'সপ্তাহ পরেই গত ৩ জুন (২০১২) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুনরায় জাতিগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এই জাতিগত সহিংসতায় সেখানে প্রায় ৫২ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছিলেন। যদিও সেখানে এই জাতিগত সহিংসতার ইতিহাস আজকের নয়। বরং বেশ পুরনো। মূলত সেখানে বসবাসকারী কয়েক লাখ মুসলমান, যারা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত তাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে এ ধরনের জাতিগত সহিংসতায় ব্যাপকহারে রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। কক্সবাজার এলাকায় এসব রোহিঙ্গা নানা রকম অবৈধ কর্মকা-ে লিপ্ত। দু'দুটো ক্যাম্পে এরা বসবাস করে। জাতিসংঘের উদ্যোগ পরিচালিত এই দুটো ক্যাম্পে রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ২৮ হাজার। কিন্তু এর বাইরে আরো প্রায় দু'লাখ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করছে। স্পষ্টতই বাংলাদেশ আর অতিরিক্ত রোহিঙ্গা গ্রহণ করতে পারে না। অবৈধ রোহিঙ্গারা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বিনীতভাবে পশ্চিমা বিশ্বের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করা, তখন তিনি সঠিক কাজটিই করেছেন। বাংলাদেশ আর রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে পারে না। এতে করে দু'দেশের মাঝে একটা ভুল বোঝাবুঝির যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। আগামী যে কোনো মাসে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বাংলাদেশ সফরে আসছেন। সেটাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তবে আমরা রোহিঙ্গা প্রশ্নে চুপ করে বসে থাকতেও পারি না। রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের সাথে নব্বই এর দশকের ইউরোপের সাবেক যুগোসস্নাভিয়া রাষ্ট্রের অন্তর্গত বসনিয়া হারজেগোভিনার পরিস্থিতির তুলনা করতে পারি। শতকরা ৪৪ ভাগ মুসলমান জনগোষ্ঠী হত্যা ও ধর্ষণ ও উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়েছিলেন বসনিয়া হারজেগোভিনায়। সার্বিয়া এই দেশটিকে সার্বিয়ার একটি আশ্রিত রাজ্য বানাতে চেয়েছিল। বৃহৎ পরিসরে বসনিয়ার পরিস্থিতির সাথে আজকের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির অদ্ভুত এক মিল আমরা লক্ষ্য করি। মুসলমানরা রাখাইন রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও একটি 'বৌদ্ধ রাজ' কায়েমের লক্ষ্যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বৌদ্ধ জঙ্গিরা মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযানে নেমেছে। তারা সহযোগিতা পাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর। মিয়ানমারে সাবেক জেনারেল থেইন সেইন 'বেসামরিক' হলেও তার ক্ষমতার মূল উৎস সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানে কাজ করছে মিয়ানমারে একটি 'বৌদ্ধ রাজ' প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা। অংসান সূচিও এর বাইরে নন। তিনি রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের সমালোচনা করেননি। বরং পরোক্ষভাবে থেইন সেইন সরকারকে সমর্থন করেছিলেন। আমার ধারণা ব্যাপকহারে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করার সুযোগ দিয়ে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘিরে একটি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে পারে একটি 'চক্র' যাদের সাথে বৈদেশিক চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের বসবাসরত রোহিঙ্গারা নানা অপকর্মের সাথে যুক্ত। ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে তারা মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের জন্য নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নানা সমস্যা। চলতি ২০১৩ সালটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে নির্বাচন হবে, অথবা দেশগুলো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ভারতে নির্বাচন ২০১৪ সালে। তবে আগাম নির্বাচনও হতে পারে। এমনি এক পরিস্থিতিতে কাশ্মীর ও রোহিঙ্গা ইস্যু দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিয়েছে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে।Daily JAI JAI DIN 12.03.13

শুভবুদ্ধির উদয় হোক


প্রকাশ্য রাস্তায় শুয়ে আছেন দুই নারী। না, প্রকাশ্যে তাদের শুয়ে থাকার কথা নয়। তারা তা করেনওনি। দু\'জন নারীর একজন সংসদ সদস্য, হোক না বিরোধী দলের। অপরজন পুলিশি পোশাকে কনস্টেবল। দৈনিক সমকাল ৮ মার্চ যে ছবি প্রথম পাতায় ছেপেছে, তা অনেক কথা বলে। সারা জাতি যখন ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করছে, যখন নারী অধিকার নিয়ে একাধিক প্রচ্ছদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, ঠিক তখনই পাঁচ কলামব্যাপী সমকালের ছবিটি দেখিয়ে দিল বাংলাদেশে নারী অধিকার কীভাবে লঙ্ঘিত হয়! কীভাবে শাম্মী আক্তার এমপি মাইক্রোবাস থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, কীভাবে অনেকটা অচেতন অবস্থায় শরীফা পড়ে আছেন কালো রাজপথে, আমি সে প্রশ্ন তুলব না। আমি প্রশ্ন তুলব চারজন এমপির, যারা নারী, তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি-না? চারজন এমপিকে পুলিশ জোর করে মাইক্রোতে তুলেছে_ এ সংবাদ ছাপা হয়েছে প্রতিটি সংবাদপত্রে। টিভি চ্যানেলের কভারেজেও দেখা গেছে সে ছবি। ধরে নিচ্ছি, তারা আইন ভঙ্গ করে হরতালের কর্মসূচি পালন করছিলেন! কিন্তু তাই বলে চারজন সাংসদকে এভাবে চ্যাংদোলা করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে হবে? সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের যে সম্মান ও অধিকার তা কি তারা পেয়েছেন? একজন সাংসদ যদি এভাবে অপমানিত হন, তাহলে গোটা সংসদই অপমানিত হয়। পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে। এর আগেও সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুককে প্রকাশ্যে পিটিয়েছিল পুলিশ। রাষ্ট্র সেই সদস্যকে পুরস্কৃত করেছিল। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, \'ওই পেটানোর জন্যই তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।\' এভাবে পত্রিকায় সংবাদটি ছাপা হয়েছিল। সেদিন আমি মর্মাহত হয়েছিলাম। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমাদের আস্থার জায়গাটা তাহলে নষ্ট হয়ে যায়। জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি যদি সেদিন পুলিশকে প্ররোচিত করে থাকেন, তাহলে প্রচলিত আইনে তাকে গ্রেফতার বা বিচার করা যেত। কিন্তু এভাবে পেটানো! গায়ের জামা খুলে নেওয়া! আজ এমপি শাম্মী আক্তারের ক্ষেত্রে যা ঘটল, তা নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। আমি দুঃখিত এ কারণে যে, \'ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সিতে একজন সংসদ সদস্যের অবস্থান অনেক ওপরে। এই প্রবণতা ভালো নয়। সংসদীয় রাজনীতিতে এটা একটা \'কালো অধ্যায়\'।
দেশ একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের কারণে ইতিমধ্যে অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যে ৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, কী ছিল তাদের দোষ? তারা তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এই হত্যার দায়ভার কে নেবে? আমরা কি পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলছি না? এই প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়বে। এটা ভালো নয়। জাতির জন্য মঙ্গলও নয়। বলেছিলাম, সমকালের ৮ মার্চের ছবি অনেক কথা বলে। একজন নারী এমপি রাস্তায় পড়ে থাকবেন অচেতন অবস্থায়, তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ভালো খবর নয়। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছিল কি-না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেহেতু এ ঘটনায় একজন এমপি জড়িত, এ কাজটি করতে পারেন সংসদের স্পিকারও। যদিও এলাকাটি জাতীয় সংসদের অন্তর্ভুক্ত নয়, তারপরও সংসদের অভিভাবক হিসেবে তিনি এ কাজটি করতে পারেন। সৈয়দ আশরাফের একটি বক্তব্যকে আমি গুরুত্ব দিতে চাই। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে প্রস্তুত সরকার। আমি বিশ্বাস রাখতে চাই, এটা কথার কথা নয়। সৈয়দ আশরাফ আন্তরিক হবেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে একটা \'সংলাপ\' শুরু করবেন। বোধকরি শুধু বিদেশি দাতাদেরই কথা এটা নয়। এটা সব দেশবাসীর কথা। সংলাপ হোক। সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আর কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই সংলাপ হতে হবে। আমি জানি, সংলাপে কোন কোন বিষয় আলোচিত হবে। তারপরও প্রক্রিয়া শুরু হোক। দেশবাসী স্বস্তিতে থাকুক। ব্যবসায়ী নেতারা ঘন ঘন হরতাল বন্ধের ডাক দিয়েছেন। আমি এর সঙ্গে একমত। এই হরতাল বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। আরএমজি সেক্টরের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বদলে বিকল্প খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরএমজি ক্রেতাদের কাছে মিয়ানমার এখন বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। হরতাল চাই না বটে, কিন্তু হরতাল কেন হয়, এটাও বিবেচনায় নিতে হবে। কেন বিরোধী দলকে হরতাল ডাকতে হয়, এটা যদি সরকারের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে এ ধরনের হরতাল হতেই থাকবে। হরতাল নিষিদ্ধের আইন করেও কিচ্ছু হবে না। হরতাল হতেই থাকবে। হরতাল সাধারণ মানুষ তো বটেই, সরকার ও বিরোধী দল, কারও জন্যই কোনো মঙ্গল ডেকে আনে না। গত কয়েকদিনের হরতালে গাড়ি পুড়েছে, ট্রেনের বগি পুড়েছে, মানুষ মারা গেছে_ এই ক্ষতি তো রাষ্ট্রেরই! পুলিশের আরও মানবিক ও সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিকাশমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি \'কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস\' (সিবিএম) ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সিবিএম বা আস্থার সম্পর্ক গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। সিবিএম না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। বিঘি্নত হবে সুশাসন। আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে। এ দেশে অনেক সম্ভাবনা আছে। এই সম্ভাবনাকে আমরা নষ্ট হতে দিতে পারি না। রাজনীতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তা দেখার দায়িত্ব সকলের। এখানে বিরোধী দল \'শত্রু\' নয়, বিরোধী দল গণতন্ত্রের ভাষায় \'সরকারের একটি অংশ\'। একজন সাংসদকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে (অথবা ধস্তাধস্তিতে পড়ে গিয়ে!) \'বিরোধী দল যে সরকারের একটি অংশ\', তা প্রমাণ করা যাবে না। বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়াটা জরুরি। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা করতে হবে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়েই।
\'মহাসংকটে দেশ\'_ সমকালের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে (২০১৩) মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ব্যাপক হারে বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। পয়েন্ট টু পয়েন্টে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ (জানুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ)। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ (জানুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ০২ শতাংশ)। ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকরা চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যখন সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়, থানা আক্রমণ করা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়_ এসব আলামত আমাদের জন্য ভালো কোনো খবর নয়। তাই বিদেশি কূটনীতিকরা যখন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তখন সরকারের উচিত এই উদ্বেগকে বিবেচনায় নেওয়া। ডা. দীপু মনি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সম্ভবত তিনি পুরো ঘটনার জন্য বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাতে চাইবেন। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তা এই ধারণাকেই সমর্থন করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলুক। তবে শাহবাগ চত্বরের তরুণ প্রজন্মকে ঘরে ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে দীর্ঘদিন এই আন্দোলন চললে, তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গায়ক হায়দার হোসেন তার একটি গানে বলেছিলেন, \'৩০ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি! তার এই \'স্বাধীনতা\' হচ্ছে একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ, একটি সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ। একটি বাংলাদেশ যেখানে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি থাকবে না। হায়দার হোসেনের সঙ্গে দ্বিমত করা যাবে না। আজকের যে বাংলাদেশ, সমকালের ভাষায় \'মহাসংকটে যে দেশ\' সেখানে স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক ঐক্য, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখার যে রাজনীতি, সেই \'রাজনীতি\'ই পারে সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে। আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এটাই কামনা করি।
Daily Samakal
12.3.13

একুশ শতকে একজন সমাজতন্ত্রীর বিদায়


তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নের জাদুকর। হুগো শাভেজ। এখন প্রয়াত। একুশ শতকের বিপ্লবী। একুশ শতকের সমাজতন্ত্রী। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে যখন একের পর এক সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটেছিল, তখন হুগো শাভেজ জন্ম দিয়েছিলেন এক নতুন ধরনের সমাজতন্ত্রের। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে কিভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি করা যায়। ভেনিজুয়েলা এর বড় প্রমাণ। হুগো শাভেজ মার্কসবাদী ছিলেন না। কিন্তু মার্কসবাদের মূল স্পিরিটকে তিনি ধারণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এই সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মার্কসবাদী রাষ্ট্রের যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। এমনকি চীন 'সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি' প্রবর্তন করলেও, হুগো শাভেজ এই রাজনীতিকেও গ্রহণ করেননি। তবে তাঁর প্রচণ্ড সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতির সঙ্গে কেউ কেউ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা মাও জে দং-এর চীনা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রের কিছুটা মিল পাবে, এটা সত্য; কিন্তু তিনি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ছিলেন উজ্জ্বল। যদিও ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ তাঁকে আজকে এই অবস্থানে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল। যদি ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ না থাকত, তাহলে তাঁর পক্ষে একজন 'আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রী' হয়ে ওঠা সহজ ছিল কি না, সে প্রশ্ন থেকেই গেল। হুগো শাভেজের সাফল্য এখানেই যে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদে নিজে সম্পদশালী হননি। দেশকে যেমনি অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী করেছেন, ঠিক তেমনি তাঁর সম্পদের ভাগিদার করেছেন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোকে। তাঁর Petrocaribe Programm-এর মাধ্যমে টিকে আছে কয়েকটি ক্যারিবিয়ান দেশের অর্থনীতি। এ অঞ্চলের ১৭টি দেশ এই Petrocaribe Programm-এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে। কিউবার জ্বালানি তেলের উৎস হচ্ছে ভেনিজুয়েলার তেল। মোট চাহিদার তিন ভাগের দুই ভাগ সরবরাহ করে ভেনিজুয়েলা। প্রতিদিন এক লাখ ব্যারেল তেল কিউবায় সরবরাহ করে ভেনিজুয়েলা। কিউবা এই তেল ক্রয়ের অর্থ পরিশোধ করে অন্যভাবে। কিউবার প্রায় ৩৫ হাজার ডাক্তার, নার্স ও শিক্ষক এখন ভেনিজুয়েলাসহ ক্যারিবিয়ান দেশগুলোতে কাজ করছে। কিউবা সরকার তাদের বেতন দিচ্ছে ভেনিজুয়েলার দেওয়া তেলের বিনিময় অর্থ হিসেবে। আর এভাবেই হুগো শাভেজ লাতিন আমেরিকা তথা ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিলেন। তিনি গত ছয় বছরে নিকারাগুয়ার বামপন্থী সান্ডানিস্ট ওর্তেগা সরকারকে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে নিকারাগুয়ার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন। ডমিনিক ভেনিজুয়েলার কাছে ঋণী তিন বিলিয়ন ডলার। প্রতিদিন সেখানে সরবরাহ করা হয় ৩০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সাধারণত নগদ অর্থে ভেনিজুয়েলার তেলের অর্থ পরিশোধ করে না। আখ, চিনি, চাল, বিন্স ইত্যাদি বার্টার বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধ হয়। আর সুযোগ দেওয়া হয় ১৭ থেকে ২৫ বছর। এ অঞ্চল ঘিরে তিনি মার্কিনবিরোধী একটি জনমত গড়ে তুলেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী সিমন বলিভার (১৮১৩) হচ্ছেন তাঁর আদর্শ। সিমন বলিভার একদিন যেমনি স্পেনীয় শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, একুশ শতকে এসে শাভেজের সংগ্রাম ছিল অনেকটা তেমনি। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, খোদ যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থেকে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশকে (সিনিয়র) 'শয়তান' হিসেবে গালি দিয়েছিলেন। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি আমেরিকার কাছে তেল বেচবেন না। তাঁর 'যুদ্ধ' ছিল মূলত আমেরিকার করপোরেট হাউসগুলোর বিরুদ্ধে। তাঁর সমস্যা ছিল একটাই- ভেনিজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ। সিআইয়ের মতে, এই তেল রিজার্ভের পরিমাণ ১ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কি না সৌদি তেল রিজার্ভের চেয়েও বেশি। ২০০১ সালে (১৯৯৮ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হন) তিনি কংগ্রেসে Low of Hydrocarbon পাস করেন। আর এটা করতে গিয়ে তিনি মার্কিনি তেল কম্পানিগুলোর শত্রুতে পরিণত হন। এসকন, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, শেল, সেভরন সবারই আঁতে ঘা লেগেছিল ওই আইনটি পাস করার ফলে। ওই সব তেল কম্পানি সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের 'ম্যানেজ' করে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি সম্পদ লুটেপুটে খেত। আগে তেল সম্পদের ৮৪ ভাগ পেত ওই সব তেল কম্পানি। শাভেজ তা কমিয়ে এনে করলেন ৭০ ভাগ। সুতরাং তেল কম্পানিগুলোর বোষানলে পড়ে তিনি অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা হারিয়েছিলেন ২০০২ সালের এপ্রিলে। শাভেজকে বন্দি করে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই সময় মার্কিনি তেল কম্পানিগুলো সংসদের চেয়ারম্যান পেডরো কারমোনাকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণাও করেছিল। কারমোনা নিজে ওই তেল কম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতেন। তৎকালীন কারাকাসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস শাবিরোর ভূমিকাও লক্ষ করার মতো ছিল। কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শাভেজকে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল অভ্যুত্থানকারীরা। কেননা, তত দিনে জনসমর্থন চলে গেছে শাভেজের পক্ষে। বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কারাকাসসহ অন্য শহরগুলোতেও। মার্কিন করপোরেট হাউসগুলো নিজেরাই 'এক একটি রাষ্ট্র'। তাদের বাজেট অনেক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বাজেটের চেয়েও অনেক বেশি। ইতিহাসে আছে, মার্কিন তেল কম্পানিগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে টিকে থাকা যায় না। মোসাদ্দেক পারেননি ইরানে ১৯৫৩ সালে, যখন তিনি তেল কম্পানিগুলো জাতীয়করণ করেছিলেন। পারেননি আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট এলসিকে ১৯৯৩ সালে, যখন তিনি কাসপিয়ান সাগরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের স্বার্থে আঘাত করেছিলেন। উল্লেখ করা যায়, ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট আলফ্রেডো পালাসিওর নামও, যখন তিনি (২০০৫) বহুজাতিক তেল কম্পানি অক্সিডেন্টালের সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পেরেছিলেন শাভেজ। তাঁকে উৎখাত ও হত্যার চেষ্টা করা হলেও তিনি বারবার বেঁচে গেছেন। শুধু বহুজাতিক তেল কম্পানিগুলোই নয়, বরং মার্কিন বিলিওনিয়ান কচ ব্রাদার্স ও সেই সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হাইনজের (Heinz) সঙ্গেও তিনি বিরোধে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, এই কম্পানির মালিক মিসেস হাইন্জ হচ্ছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির স্ত্রী। হাইন্জ কম্পানির (সারা কেচআপ তৈরি করে) বিশাল বিনিয়োগে ছিল ভেনিজুয়েলায়। শত শত বিঘা সরকারি সম্পত্তি হাইন্জ তাদের নামে বন্দোবস্ত নিয়েছিল এবং সেখানে টমেটোর বাগান তৈরি করেছিল। শাভেজ ক্ষমতায় এসে ওই বন্দোবস্ত বাতিল করে দেন। ফলে হাইন্জ কম্পানি তার কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে ও শ্রমিকদের বরখাস্ত করে ২০০১ সালে। শাভেজ বন্ধ কারখানা জাতীয়করণ করেছিলেন এবং সব শ্রমিককে পুনর্বহাল করেছিলেন।
শাভেজের একটা বড় অবদান হচ্ছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে তিনি ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের বের করে আনতে পেরেছিলেন। শাভেজ ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে ভেনিজুয়েলার জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, যারা negroe indio (Black and indian) হিসেবে পরিচিত (জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ), তাঁরা থাকতেন অনেকটা বস্তিঘরে। তাঁদের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল না। আজ প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, সব ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিক্ষা শাভেজ নিশ্চিত করেছেন। দারিদ্র্য কমিয়ে এনেছেন। ১৯৯৮ সালে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ৪৯.৪ ভাগ, সেখানে ২০১১ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৫ ভাগে। এ পরিসংখ্যান জাতিসংঘের। ১৮টি লাতিন আমেরিকাভুক্ত দেশের মধ্যে ভেনিজুয়েলার আর্থসামাজিক অবস্থা সবচেয়ে ভালো। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের দিক ও আয়-বণ্টনের দিক দিয়ে ভেনিজুয়েলার অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী ভেনিজুয়েলায় বর্তমানে ৫০ মিলিয়ন মধ্যবিত্ত রয়েছে, যাঁরা এক নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছেন সেখানে। তাঁকে বলা হয় এ যুগের 'সিমন বলিভার'। সিমন বলিভার স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিলেন। আর শাভেজ যুদ্ধ করে গেছেন বিশ্বব্যাপী মার্কিনি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। এটা করতে গিয়ে কিংবা বলা যেতে পারে, তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকার কারণে বলিভিয়ার মোরালেস, ইকুয়েডরের রাফায়েল কারিয়া কিংবা নিকারাগুয়ার ওর্তেগার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সখ্য তৈরি হলেও, সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনীতির অধিকারী ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল চমৎকার। জীবিতকালীন সময়ে তিনি লিবিয়ার প্রয়াত নেতা গাদ্দাফির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। একই সঙ্গে শেষ দিন পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকেও সমর্থন করে গেছেন তিনি। এর পেছনে কাজ করেছিল তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা। লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে তিনি গঠন করেছিলেন ALBA বা The Bolivarian Alliance for the Peoples of our America নামক সংগঠনটি, যার সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১০। সিমন বলিভার সমগ্র লাতিন আমেরিকার জনগণকে American হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। শাভেজও বলতেন সে কথা। একই সঙ্গে CELAC বা The Community of Latin America and caribbeam state গঠনের উদ্যোক্তাও তিনি। দরিদ্র, বস্তিবাসী সাধারণ মানুষকে নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর দর্শন ছিল সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা। আর এটা করতে গিয়ে তিনি সিমন বলিভারের মতো বিপ্লবীকে বেছে নিয়েছেন আদর্শ হিসেবে। বলতেন, Bolivar is the fight that does not end, he is born every day in aurselves in his people, in the children, in the fight for life and social Justice। কেউ কেউ তাঁর এই আন্দোলনকে চিহ্নিত করেছেন Chavismo হিসেবে। কিন্তু একটি অভিযোগও আছে। Mestizo বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যে রাজনীতি, সেই রাজনীতি নতুন এক শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে ভেনিজুয়েলায় boli bourgeoisic. একটা ভয় ভেনিজুয়েলাকে নিয়ে রয়েই গেছে। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস বলে, একটি বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিবিপ্লবের জন্ম হয় সংঘাত আর বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। গুয়েতেমালা (১৯৫৪), চিলি (১৯৭৩), আর্জেন্টিনা (১৯৭৬), নিকারাগুয়া (১৯৯০) কিংবা কলম্বিয়া (১৯৪৮) এর বড় প্রমাণ। হুগো শাভেজ একটি 'বিপ্লব' সম্পন্ন করেছেন। ভেনিজুয়েলার mestizo শ্রেণী এই 'বিপ্লবকে' এখন সামনে নিয়ে যেতে পারবে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। হুগো শাভেজ ইতিহাসে একজন 'বিপ্লবী' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, হুগো শাভেজ- এই নামগুলো এখন উচ্চারিত হবে একসঙ্গে। বারবার।
Daily Kalerkontho11.3.13

সম্পর্ক নিয়ে যাবে আরো উচ্চতায়



ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফর শেষ করলেন। যদিও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নীতি নির্ধারণীতে অংশ নেন না। কিন্তু ব্যক্তিটি যেহেতু প্রণব মুখার্জি, সেহেতু তার এ সফরকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। কেননা অতীতে মন্ত্রী থাকার সময় বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনিই দেখাশোনা করতেন। সে কারণেই আমাদের সংবাদপত্র ও বিশ্লেষকরা যেমনি এ সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, ঠিক তেমনি ভারতীয় বাংলা পত্রপত্রিকাও এ সফরকে গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি এসেছিলেন মূলত মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ তাকে যে সম্মাননা দিয়েছে, তা বহন করতে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তথা একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে তার আলাপ প্রমাণ করে দুদেশের মাঝে দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর ব্যাপারেও তিনি সিরিয়াস। তার সফরে কিছু ‘ব্যক্তিগত কর্মসূচি’ থাকলেও ওই সফর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, ১৯৭৪ সালের পর এই দ্বিতীয়বারের মতো একজন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে এলেন। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা যে বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দেন, এটা তার বড় প্রমাণ। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘ঘনিষ্ঠ ও গভীরতর সম্পর্ক রচনার বিষয়টি সবসময় আমার হূদয় স্পর্শ করে।’ তিনি বাংলাদেশের তারুণ্যের উত্থানকে সম্মান জানিয়েছেন। তিনি প্রত্যাশা করেছেন, বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার অক্ষুণ্ন রাখার সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। এ ধরনের মন্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বের।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে ভারতের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি। বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের নীতির মূল কথা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের চলমান যোগাযোগ।’ আর এ নীতির আলোকেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে গেল বছর আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। এমনকি এরশাদও নয়াদিল্লি সফর করেছিলেন। যদিও নিরাপত্তার প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়া এবার প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে পারলেন না। কিন্তু এতে করে ভারতীয় নীতিতে পরিবর্তন আসবে— এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক ভারতীয় মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশের একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা একাধিকবার ভারত সফর করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ভারত আমাদের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নানা কারণে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনীতি, তাতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ‘ঐক্য’ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ সেই প্রভাবের বাইরে থাকতে পারে না। উপরন্তু ভারত একটি অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হরিন্দর কোহলীর মতে, আগামী ৩০ বছরে ভারত শিল্পের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। তখন মাথাপিছু আয় ৯৪০ থেকে ২২ হাজার ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত যেখানে অবদান রাখত মাত্র দুই ভাগ, তখন অবদান রাখবে ১৭ ভাগ। সুতরাং এ অর্থনীতির প্রভাব পার্শ্ববর্তী দেশের ওপর পড়বেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, একটি বড় দেশের পাশে যদি একটি ছোট দেশ থাকে, তাহলে ওই বড় দেশ ছোট দেশের ওপর প্রভাব খাটায়। মেদভেদেভের (সাবেক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) ধারণা, ‘Zone of privileged interest’ অনেকটা এ ধারণাকেই সমর্থন করে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অতিমাত্রায় ‘ভারতমুখিতা’ সম্প্রতি বিতর্কের মাত্রা বাড়ালেও বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা ভারতের ‘প্রভাব’ থেকে বের হয়ে আসতে পারব না। তবে এক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা এক জায়গায়— দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারিনি। আমাদের ‘প্রাপ্তি’ এখানে কম, ভারতের ‘প্রাপ্তি’ অনেক বেশি। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১০ সালেই প্রধানমন্ত্রী ভারত গেছেন। ফিরতি সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেন ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। এ ধরনের সফর ও পাল্টা সফরের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি ‘ফ্যাক্টর’। বেগম খালেদা জিয়া এটাকে বিবেচনায় নিয়েই ভারতে গিয়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। চীন সফরের সময় চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জি জিন পিং, যিনি মার্চে (২০১৩) প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, বেগম জিয়াকে সাক্ষাত্কার দেন। এর পর পরই বেগম খালেদা জিয়া যান নয়াদিল্লি। তবে চীনের চেয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা না থাকলেও ভারতের সঙ্গে আমাদের একাধিক সমস্যা রয়েছে, যার জট খোলেনি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর কিংবা প্রণব মুখার্জির সর্বশেষ ঢাকা সফরের পরও সমস্যার কতটুকু সমাধান হবে, সে প্রশ্ন রয়েই গেল। কেননা রাষ্ট্রপতি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি প্রত্যাশা করেছেন সব সমস্যার সমাধান হবে। অতীতেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় (২০১১) এ আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা যা ছিল, তা রয়ে গেছে। বিশেষ করে বলা যায়, বাংলাদেশ বড় ধরনের ভারতীয় পানি আগ্রাসনের সম্মুখীন। গঙ্গার পানিবণ্টনে একটি চুক্তি হয়েছে বটে। কিন্তু পানি আমরা পাচ্ছি না। ফারাক্কা পয়েন্টে পানি আসার আগেই উজানে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। তিস্তার পানিবণ্টনে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। পশ্চিম বাংলার আপত্তিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। সমস্যাটা ভারতের, সমাধান তাদেরই করতে হবে। বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বুঝিয়ে দেয়া যে, আন্তর্জাতিক নদী আইন আমাদের অধিকারকে সংরক্ষণ করছে। আমরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারি না। ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। খোদ ভারতের অভ্যন্তরে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে এই দুটো প্রজেক্ট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা পানি শূন্য হয়ে যাবে। মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাংলাদেশের মানুষ এটা সহ্য করে নেবে না। বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে হবে। দেশ হিসেবে আমরা ‘ছোট’ হতে পারি। কিন্তু আমরা সমমর্যাদার অধিকারী। ভারতের আচরণে সেই সমমর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে না। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আদৌ হবে, তা আমি মনে করতে পারছি না। এখানে ‘মমতা ফ্যাক্টর’ অন্যতম একটি বাধা, যদিও প্রণব মুখার্জি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিস্তা চুক্তি হবে। কিন্তু প্রশ্ন আছে অনেক। মমতাকে বোঝাতে ও রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। বাংলাদেশ তা অনুমোদন করেছিল। কিন্তু অনুমোদন করেনি ভারত। কারণ এ চুক্তি অনুমোদন করতে হলে ভারতের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। ভারত সরকার সংবিধান সংশোধনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে বটে, কিন্তু আপত্তি তুলেছে বিজেপি। সুতরাং বিষয়টি আবার ঝুলে গেল। সীমান্ত হত্যা প্রতিনিয়ত হচ্ছে। ভারত কথা দিয়েও কথা রাখেনি। ভারত ট্রানজিটের নামে করিডর পেলেও আমরা ট্রানজিট পাইনি। অশুল্ক বাধা দূর হয়নি। বাণিজ্যে যে ভারসাম্যতা, তা দূর করার কোনো উদ্যাগ নেই। তাই সম্ভাবনার একটা ক্ষেত্র তৈরি হলেও তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শুধুমাত্র ভারতের কারণে।
প্রণব বাবুর ঢাকা সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার ভারতীয় রাষ্ট্রপতিকে যে সম্মান দিয়েছে, তা এক কথায় বিরল। বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে সম্মান জানাতে জানে। এখন পালা ভারতের। সামনে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই সাধারণ নির্বাচন। বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে আমরা প্রত্যাশা করব প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের পর দুদেশের মাঝে বিভিন্ন ইস্যুতে যে বিরোধ রয়েছে, তা সমাধানে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এগিয়ে আসবেন। তবে অনেক প্রশ্ন উঠেছে তার সফরের পর, প্রণব মুখার্জি এ সফরে তরুণ প্রজন্মকে সমর্থন ও গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালীকরণের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা কোনো কোনো ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি এক ধরনের সমর্থন বলেই গণ্য করা হচ্ছে। এমনো কথা বলা হচ্ছে, ‘মৌলবাদ বিরোধিতার বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপতি’ (সংবাদ প্রতিদিন, ৫ মার্চ)। ‘হাসিনার পাশে আছে ভারত, এ বার্তা প্রণবের’ এমন মন্তব্যও করেছে কোনো কোনো গণমাধ্যম (বর্তমান, ৪ মার্চ)। কোনো কোনো গণমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতকে মুসলিম ব্রাদারহুডের (মিসর) সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এবং বলা হয়েছে, ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারত সমস্যায় পড়বে’ (সংবাদ প্রতিদিন)। বেগম খালেদা জিয়া নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে তার নির্ধারিত সাক্ষাত্কার বাতিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের মন্তব্য ছিল এরকম, ‘তার এই পদক্ষেপ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তো বটেই, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী বার্তা দিল।’ এ ধরনের মন্তব্যের পরও যেটা বলা যায়, তা হচ্ছে প্রণব বাবুর এ সফরের মধ্য দিয়ে ‘বড় কিছু’ হয়তো অর্জিত হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যে তার বন্ধুদের সম্মান দিতে জানে, তা প্রমাণিত হলো। ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের সম্মান আরো বাড়ল। ‘বাংলাদেশ সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চায় ভারত’— সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ ধরনের একটি খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আগামী নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবে এবং সব দলের অংশগ্রহণের ব্যাপারে বর্তমান মহাজোট সরকারকে উত্সাহিত করবে— এটা বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে। তার সফরের সময় টানা তিন দিন হরতাল হলো। একটি ককটেলও বিস্ফোরিত হলো তার হোটেলের সম্মুখে। এটা দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা ভুল সিগন্যাল পৌঁছে দিতে পারে নয়াদিল্লিতে। তার পরও প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
Daily Bonik Barta
09.03.13

দেশ যাচ্ছে কোন দিকে?

কতগুলো মানুষ মারা গেল এ ক’দিনে। লাশের সংখ্যা বাড়ছেই। দিনের পর দিন হরতাল হলো। বিএনপির হরতাল। জামায়াতের হরতাল, কিন্তু শেষটা কোথায়? এতগুলো জীবন চলে গেল, কাকে দায়ী করব আমরা? রাজনীতিকে? পুলিশকে? সরকারকে? কাকে আমরা দায়ী করব? একজন মানুষ যখন মারা যায়, অসহায় হয়ে যায় তার সংসার। যারা মারা গেছে, তাদের কারো স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। সেই স্ত্রী-সন্তান, মিডিয়া যাদের কোনো দিন খুঁজবে না, তাদের ভবিষ্যৎ কি? রাষ্ট্র তো তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে না! তাহলে? সমাজের বোঝা হয়ে গেল এইসব মানুষের সংসার। সবাই যে জামায়াতের সমর্থক, তা তো নয়।
তিন দিনের হরতালে জামায়াতকর্মীদের উন্মত্ততা ও জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বগুড়াসহ দেশজুড়ে জামায়াত যে কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে তা দেখেছে এ দেশের জনগণ। থানা আক্রমণ করেছে তারা, পুলিশকে পিটিয়ে মেরেছে এবং একপর্যায়ে থানা রক্ষা করতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল বগুড়াতে। রাজশাহীতে ট্রেনে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, আক্রমণ হয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর। এ অপপ্রবণতা চিন্তার কারণ।
২৮ ফেব্র“য়ারি যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পর কিংবা তার চারদিন আগে ২৪ ফেব্র“য়ারি মানিকগঞ্জের গোবিন্দল গ্রামে পুলিশ যে তাণ্ডবলীলা চালায়, স্বাধীন বাংলাদেশে এ রকমটি আগে আর কখনো ঘটেনি। ২৮ তারিখের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ অতিক্রম করছে। একটি সভ্য দেশে পুলিশ এভাবে মানুষ গুলি করে মারে, এ ঘটনার একটিও দৃষ্টান্ত দেখা যাবে না। ১৯৯৪ সালে আফ্রিকায় বুরোন্ডিতে হুতু তুতসি দ্বন্দ্বে কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। সেটা ছিল জাতিগত দ্বন্দ্ব। কিন্তু আজ এই স্বাধীন বাংলাদেশে, যেখানে গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে, সেখানে কী দেখলাম আমরা পাখির মতো গুলি করে মেরেছে পুলিশ। চ্যানেলের পর্দায় চোখ রেখে যখন এ ধরনের দৃশ্য দেখছি, তখন ভাবতে আমার সত্যিই কষ্ট হয়
এ কোন গণতান্ত্রিক দেশে আমরা বসবাস করছি? এ কোন ধরনের গণতন্ত্র? মানুষের মত প্রকাশের অধিকার থাকবে। এটা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। কিন্তু তাই
বলে গুলি করে মানুষ মারতে হবে? বিএনপির
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা এটি।
তার এই বক্তব্যকে অস্বীকার করা যাবে না। গণহত্যার প্রতিবাদে ৩ দিন হরতাল পালিত হয়েছে। ওই হরতালে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল পরোক্ষ। একটা ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছে। মানুষ বের হতে পারেনি ভয়ে। ২ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে অনেক ককটেল ফাটিয়ে যে ভয়ের আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষ ছিল আতঙ্কিত। এই স্বাধীনতার মাসে এমনটি হওয়া উচিত ছিল না। আমি অবাক হয়েছি পুলিশের বেপরোয়া ভূমিকা দেখে। কোনো রকম হুঁশিয়ারি না দিয়ে পুলিশ যখন গুলি করে, তখন প্রশ্ন ওঠে বৈকি! মাত্র ৩ দিন আগে ‘আকদ’ হয়েছিল হেলেনার। মাদ্রাসাপড়–য়া এই ছাত্রী নিজ বাড়িতেই গুলিবিদ্ধ হলো গোবিন্দল গ্রামে। মৃত্যুর সঙ্গে সে এখন লড়ছে। যদি বেঁচেও যায়, তার প্রশ্নের জবাব কে দেবে? তার তো কোনো অপরাধ ছিল না। নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হলো সে।
আজ দুঃখ লাগে, যখন দেখি মিডিয়া এ প্রশ্নে কোনো উচ্চবাচ্য করে না। নারীবাদীরা কোথায় আজ? একটা মেয়ে তিনদিন আগে যার ‘আকদ’ হয়েছে, কোন অপরাধে পুলিশ তাকে গুলি করল? হেলেনাকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন কুড়া-ভুসির দোকানদার নাসির। তাকে গুলি করে মারা হলো। সরিষা আনতে মাঠে গিয়েছিলেন কৃষক আলমগীর। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করল। মসজিদের ইমাম শাহআলম। তার কি দোষ ছিল? তাকে হত্যা করা হলো। প্রবাসী নাজিম উদ্দিন। তাকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন তার হাতে পুলিশের হাতকড়া ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২২ জনের নামে মামলা করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে আসামি নিরীহ ৪ হাজার গ্রামবাসী। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা হলো না, মামলা হলো নিরীহ গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে, যারা কেউই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না! এরপরের ঘটনা দেশজুড়ে, চট্টগ্রাম থেকে রংপুর।
এ কেমন রাজনীতি? বেগম জিয়া বললেন গণহত্যা। প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের সিনিয়র নেতারা এর সমালোচনা করলেন অত্যন্ত নগ্নভাষায়। রাজনীতির জন্য পৃথিবীতে উজ্জ্বল হয়ে আছে কয়েকটি নাম নেলসন ম্যান্ডেলা, সুয়েকর্নো, নেহরু, নাসের ও মাহাথির অনেক নাম। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে বিশ্বকে চিনিয়েছিলেন বাংলাদেশের নাম। মাত্র ৪২ বছরের মধ্যে এ রাজনীতিকে আমরা কোথায় নিয়ে গেলাম? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। সেটা তো সবাই-ই চায়। তিনটি রায় হয়েছে, কিন্তু একটি রায় নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে, তা কোনো মতেই কাম্য নয়। কিছু ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হয়েছে সাঈদীর রায়ে।
এটা স্বাভাবিক। তাদের কি অন্য কোনোভাবে নিবৃত্ত করা যেত না? পুলিশ কেন এত বেপরোয়া হলো? আমাদের সংবিধানে (৩৯-১, ৩৯-২ ক) তো সমাবেশ, মিটিং, মিছিল করার অধিকার স্বীকৃত। পুলিশের ভূমিকা কি কিছুটা বৈপরিত্য নয়? একদিকে প্রতিবাদী মানুষের (ধরে নিচ্ছি তারা জামায়াতি) গুলি করছে, অন্যদিকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের অবস্থান করতে দিয়েছে ও মিছিল করতে দিয়েছে। ব্রিটেনের একটি জনপ্রিয় সাইট Open Democracy-তে গত ২৭ ফেব্র“য়ারি একটি লেখা ছাপা হয়েছে (Shahbag : What revolution, Whose revolution)। প্রবন্ধটি লিখেছেন উইলিয়াম গমেজ, যিনি বাংলাদেশি ও এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনে কাজ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন এভাবে, ‘The ruling Awami league government is trying to override the existing political system to remain in power beyond their democratic, mandate. The purposive actions and structural forces behind thus movement make it very clear what and who, the movement is for : the ruling political elite. The shahbag movement was never a peoples movement, but has been designed to disrupt the processes of social revolution, by uprooting the governments political opponents from the field to avoid a political revolution at the next election’  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য এটি। উইলিয়াম গমেজ একজন শীর্ষস্থানীয় গবেষক। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre for Applied Human rights-এ তিনি ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত একটি সাইটে যখন এ ধরনের মন্তব্য প্রকাশিত হয়, তখন তাকে গুরুত্ব না দিয়ে পারা যায় না। আসলে সবকিছু ‘ঘটছে’ আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে। নির্বাচনের ৮-৯ মাস আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামনে চলে আসে। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, ঠিক তখনই বদলে যায় রাজনীতির দৃশ্যপট।
গণজাগরণ মঞ্চ যখন প্রথম সংগঠিত হতে শুরু করে, এদেশের প্রায় সব মানুষই এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছিল।
এমনকি বেগম জিয়া নিজেও এদের আবেগের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম শাহবাগ চত্বরের তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। এই দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুর্নীতির কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবর্মূতি আজ তলানিতে। এদেশের তরুণ প্রজন্ম যখন একাত্তরের ঘাতকদের বিচার চায়, আমি তখন আশান্বিত হই। কিন্তু শাহবাগ চত্বরে যা এখন প্রজন্ম চত্বর, সেখানে যখন দুর্নীতির স্লোগান উচ্চারিত হয় না, তখন আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। বিশ্ব ইতিহাস আজ তরুণদের।  যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যে ‘অক্যুপাই ম্যুভমেন্ট’ হয়েছে কিংবা কায়রোতে তাহরির স্কয়ারে যে আন্দোলন হয়েছে, সেখানে সমাজে অসমতা ও দুর্নীতির প্রশ্নটি ছিল মুখ্য। আজ আমরা বাংলাদেশে দেখলাম এর ঠিক উল্টোটি। অথচ আমাদের দেশে তরুণ সমাজের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। এরা প্রতিবাদী। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন ও পর্যায়ক্রমে এরশাদ তথা সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণরাই ‘প্রতিবাদের প্রতীক’ হয়ে আন্দোলন সংঘটিত করেছে। কিন্তু আজ আমরা কী দেখলাম? সরকারের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি একটি শ্রেণী।
এটা ভালো হতো যদি এ প্রশ্নে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতো, কিন্তু তা হয়নি। সাঈদীর ফাঁসির আদেশের পর প্রজন্ম চত্বর আবারো জেগে উঠেছে। তারা বলছে ,তারা রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না। এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। সরকারকেই তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। এখনো অনেক কাজ বাকি। আরো অনেক বিচার বাকি। গণজাগরণ মঞ্চ যদি আন্দোলন অব্যাহত রাখে, তখন বিচার বিভাগের ওপর তাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ আরো শক্তিশালী হবে। এটা ভালো নয়, মঙ্গলও নয়। এমন অভিযোগ পুষ্ট হোক তা আমাদের কাম্যও হতে পারে না। সাঈদীর রায় নিয়ে রাজনীতি যেভাবে উত্তপ্ত হচ্ছে, তাতে এই রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে।
প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা করা এবং সেই হত্যার বিচার না হওয়া দেশে সুশাসনের অভাবের কথাই বলে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই সুশাসনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক National Intelligence Council (NIC) ২০১২ সালের যে lobal Trends রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১৫টি রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তার একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। ওই তালিকায় এশিয়ায় যে ৩টি রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
অপর দুটি দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। যুক্তি হিসেবে NIC উল্লেখ করেছে সংঘাতময় পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা। বাংলাদেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি যে দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। আমরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে মেলাতে পারি না। তবে চাই একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সেই সঙ্গে সরকারি বাহিনী জনসাধারণের সঙ্গে ‘সেবক’-এর মতো আচরণ করবে, সেটাও আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই না গোবিন্দলসহ দেশজুড়ে যা ঘটল, সেই ঘটনা দ্বিতীয়বার না ঘটুকু। এ ধরনের গুলিবর্ষণ তথা হত্যার ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কাম্য নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কূটনীতিকদের এই আশঙ্কা ফেলে দেয়ার মতো নয় এবং এটাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত ৭ মার্চ বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের যে কথা বলেছেন সেই বক্তব্যকে বিবেচনায় নিয়েই অতিদ্রুত পূর্ব শর্ত ছাড়া সংলাপ সূচনা করতে হবে এবং এর মধ্যে দিয়েই সংকট  উত্তরণ সম্ভব। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ী মহল থেকে অর্থনীতির মন্দাভাবের যেসব কথা বলা হয়েছে তাও বিবেচনায় নিয়ে অতিদ্রুত সবাইকে সংযমের পরিচয় দিতে হবে।
পুলিশকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। জামায়াতের ব্যাপারে প্রয়োজন হলে একটি জাতীয় সংলাপ ডেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশ এক মহাসংকটে এই সত্য কোনো কারো পক্ষেই এড়ানো দুরূহ। এভাবে চলতে পারে না। কোনোভাবেই পরিস্থিতি আর নাজুক হতে দেয়া যাবে না।
Daily MANOBKONTHO
09.03.2013

একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বাস করছি


সংবাদ শির  
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন আলেকসিস ডি তকিউভিলে (Alexis de Tocqueville) তিনি লিখেছিলেন ‘I am for from denying that Newspapers in democratic countries lead citizens to do very illconsidered things in common, but without newspapers there would be hardly any common action at all. So they mend more ills than they cause.’ বাংলা করলে এটা অনেকটা এ রকম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রগুলো খুবই অবিবেচক সাধারণ কর্মকাণ্ডের দিকে নাগরিকদের চালিত করে, এটি আমি জোর দিয়ে অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু সংবাদপত্র ছাড়া সাধারণ কর্মকাণ্ড বলতে প্রায় কিছু থাকেই না। ফলে তারা যত ক্ষত তৈরি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সারায়। এই একটি বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে যে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে সমাজ উন্নয়নে, সমাজ বিকাশে সংবাদপত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। যুগে যুগে সংবাদপত্রের এ ভূমিকা স্বীকৃত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতন্ত্রের বিকাশ যেখানে ঝুঁকির মুখে থাকে, সেখানে সংবাদপত্র গণতন্ত্র বিকাশে একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই বলা যেতে পারে গণতন্ত্র ও স্বাধীন সংবাদপত্র পরস্পর পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪২ বছরে পা দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার প্রবক্তারা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সেই সাথে স্বাধীন সংবাদপত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজো সংবাদপত্র কর্মীদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তবে এটা বলতেই হয় আমাদের সংবিধানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চলমান রাজনীতির দিকে যখন তাকাই, তখন এটা বিশ্বাস হয় না। গেল সপ্তাহে গণমাধ্যমের ওপর হামলা আবারো প্রমাণ করল বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা কত ঝুঁকির মুখে। গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্র ও গণতন্ত্র পরস্পর পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। একটিকে ছাড়া অন্যটিকে চিন্তা করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে গেল সপ্তাহে যে ঘটনা ঘটল, তাতে করে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উকণ্ঠিত। নয়াদিগন্ত পত্রিকার গুদামে আগুন দেয়া হলো। গাড়ি পোড়ানো হলো। ঢাকার বাইরে নয়া দিগন্ত কিংবা আমার দেশ-এর মতো পত্রিকায় আগুন দেয়ার ঘটনা সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার পথে অন্তরায়।
বাংলাদেশে, আমরা ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে গর্ব করি। গেল ৪২ বছরে সংবিধানে ১৫টি সংশোধনী এসেছে। সংবিধান মূল সংবিধানে ফিরে গেলেও একাধিক ধারা ও উপধারা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদটি যেভাবে ছিল, তা রয়ে গেছে। ৩৯নং অনুচ্ছেদের ১নং ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। এই অনুচ্ছেদের ৩৯(২) ‘ক’ ও ‘খ’ ধারা দুটো আরো স্পষ্ট। ‘ক’তে বলা হয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের কথা এবং ‘খ’তে রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হইল। অর্থাৎ সংবিধানের পুরো ৩৯নং ধারাটিকে একজন সংবাদ কর্মীকে যেমনি অধিকার দিয়েছে তার মত প্রকাশ করার, ঠিক তেমনি একই সাথে রাষ্ট্র সংবাদপত্রকেও অনুমতি দিয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে প্রকাশিত হবার। সংবাদকর্মী তথা সংবাদপত্রের জন্য এই ধারাটি একটি রক্ষাকবজ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে মধ্যে এই ৩৯নং ধারাটি লঙ্ঘিত হয়। আদালত অবমাননার অভিযোগে আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যখন বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেদিন এ দেশের বিজ্ঞ আইনজীবীরা আদালতে ৩৯নং ধারা বার বার উল্লেখ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন ‘৩৯নং ধারা বলেই একজন সম্পাদক তার মত প্রকাশের অধিকার রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যখন জন্ম হয়, তখন ওই সময়ের জাতীয় নেতৃবৃন্দ এটা উপলব্ধি করেছিলেন বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, এখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে এই দেশটিতে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। তাই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সাথে যারা জড়িত ছিলেন, তারা সংবিধানে ৩৯নং ধারাটি জুড়ে দিয়েছিলেন। যদিও ৩৯নং ধারার সাথে ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদ দু’টিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ৩৯নং অনুচ্ছেদের পরিপূরক। ৩৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে চলাফেরার স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই ধারা বলে বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার বা চলাচল করার অধিকার রাখেন। আর ৩৭নং ধারায় বলা হয়েছে সমাবেশের স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদ একজন নাগরিককে জনসভা তথা শোভাযাত্রা করার অনুমতি দিয়েছে। সংবিধানের এই ৩৬, ৩৭ ও ৩৯ নং অনুচ্ছেদ যদি একসাথে পড়ি, তাহলে দেখবো এখানেই নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রের স্পিরিট। অর্থাৎ গণতন্ত্রের বিকাশ ও স্থায়ীত্বের বিষয়টি লুকিয়ে আছে। এই অনুচ্ছেদগুলোর কোনো একটি যদি লংঘিত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের অনেক কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের এই বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটা স্বীকার করতেই হবে ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে ৩৯নং অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশিত থাকলেও ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে আমরা ৩৯নং অনুচ্ছেদে যে রক্ষাকবচ ছিল, তাতে ছুরি বসিয়েছিলাম। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র রেখে বাকি সংবাদপত্রগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি ৪০নং অনুচ্ছেদে যেখানে পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল, তাও লঙ্ঘিত হয়েছিল। অনেক সংবাদপত্র কর্মীকে বেঁচে থাকার জন্য ভিন্ন পেশা বেছে নিতে হয়েছিল।
সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) মাধ্যমে একদলীয় তথা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীতে একদলীয় ব্যবস্থা রহিত করা হলেও, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে যায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকে। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী এনে আমরা পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি। আর ১৫ সেপ্টেম্বর (১৯৯১) দ্বাদশ সংশোধনীর ওপর যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তাতে সংসদীয় পদ্ধতি অনুমোদিত হয়। এই ফিরে যাওয়াকে আমি বলছি গণতন্ত্রের দ্বিতীয় যাত্রাপথ। এই দ্বিতীয় যাত্রাপথ ও গণতন্ত্রের বিকাশ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে নির্বাচন হচ্ছে। এক সরকারের বদলে অন্য আরেকটি সরকার আসছে। কিন্তু গণতন্ত্রের যে মূল কথা পরস্পরের প্রতি আস্থা, সেই আস্থা নেই। সংসদ হয়ে পড়েছে একদলীয়। জাতীয় পর্যায়ে অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও সংসদে তা আলোচিত হতে দেখি না। যেখানে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের শ্রদ্ধা জানানোর কথা, সেখানে জাতীয় সংসদে জাতীয় নেতাদের নিয়ে কটূক্তি করা হয়। সংসদে কালো পতাকা প্রদর্শন কিংবা স্লোগান দেয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে। তাই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয় বটে, কিন্তু শুধু নির্বাচন আয়োজন করার নাম গণতন্ত্র হতে পারে না। নির্বাচনের পাশাপাশি জড়িত মানবাধিকারের প্রশ্নটি। জড়িত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নটি। একটি সমাজে যদি মানবাধিকারের প্রশ্নটি নিশ্চিত করা যায়, যদি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে, তাহলে এই সমাজকে আমরা গণতান্ত্রিক বলতে পারবো। যদি সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম সত্যি কথা বলতে না পারে, তাহলে সেই সমাজকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে সচেষ্ট রয়েছি বটে, কিন্তু গণমাধ্যমের কর্মীরা যখন হত্যা কিংবা গুমের সম্মুখীন হন, তখন তা গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতদিন হয়ে গেল আমরা আজো জানতে পারলাম না কারা এবং কেন সাগর-রুনি সাংবাদিক দম্পত্তিকে হত্যা করেছিল। সংবাদপত্রের কর্মীরা  এই হত্যার বিচারের জন্য এখনও আন্দোলন করে যাচ্ছেন। সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীরা যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তখন গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় না। আমরা সেটা চাই বটে, কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্ষমতাসীনরা বরাবরই নির্লিপ্ত। সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখে, একটা ভয়ের আবহ তৈরি করে আর যাই হোক, সত্যিকারে গণতন্ত্র বিনির্মাণ করা যাবে না। আমরা চাই সংবাদপত্র লিখুক, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশিত হোক, সরকারের দোষত্রুটি ধরিয়ে দিক, সমাজে সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হোক, তাহলেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং গণতন্ত্রকে আমরা আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় নয়া দিগন্ত অফিসে আগুন লাগানো কিংবা আমার দেশসহ আরো কয়েকটি পত্রিকায় আগুন লাগানোর ঘটনা গণতন্ত্রের পেছনে ছুরিকাঘাতের সামিল। কিংবা সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করার যে ঘোষণা, তাও সুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন নয়। আমরা চাইবো শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং এ দেশে গণতন্ত্র চর্চা আরো শক্তিশালী হোক। শুধুমাত্র সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্যে দিয়েই এই গণতন্ত্র চর্চা শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতি সাম্প্রতিককালে শাহবাগ চত্বরে বারবার কয়েকটি বিশেষ পত্রিকা বন্ধের দাবি করা হচ্ছে। ওইসব পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন বন্ধেরও দাবি করা হচ্ছে। ধারণা করছি অচিরেই হয়তো বিজ্ঞাপনও কৌশলে বন্ধ করা হবে। কোনো সুস্থ সমাজে এভাবে কী পত্রিকা বন্ধ করার নজির আছে? ১৯৭৫ সালে বাকশালী ব্যবস্থা প্রবর্তন করে যখন ৪টি পত্রিকা রেখে বাকি সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছিল, আজ পরিস্থিতি অনেকটা সেদিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হলে, অথবা বিজ্ঞাপন দাতারা বিজ্ঞাপন না দেয়ার হুমকির মুখে থাকলে, ধীরে ধীরে ওইসব পত্রিকা ও চ্যানেল একটি বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে থাকবে। সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে কোনো কোনো এলাকায় দিগন্ত চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একটি জনপ্রিয় ব্লগ সোনার বাংলাদেশ ব্লক করে দেয়া হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যারা সত্য কথা বলেন, লেখেন, তারা আছেন ঝুকির মুখে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে এদের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া হয়েছে। একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বসবাস করছি। একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি প্রত্যাশিত নয় আমরা চাইবো পরিস্থিতির উন্নতি হোক।
01.03.2013

প্রণব মুখার্জির সফর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি


ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। নানা কারণে এই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। ৩৯ বছর পর একজন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে এলেন এবং তিনি একজন বাঙালিÑ এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। কিন্তু তার চেয়েও আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার কিছু কিছু বক্তব্য এবং সমস্যা সমাধানে তার আন্তরিকতা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যেসব সমস্যা রয়েছে, সে ব্যাপারে প্রণব মুখার্জি পূর্ণ অবগত। মন্ত্রী হিসেবে তিনি এর আগেও বাংলাদেশে এসেছেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রয়েছে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের ব্যাপারে তার আন্তরিকতার অভাব আমরা এতটুকু দেখিনি। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন জুন মাসে প্রণব মুখার্জি যখন রাজ্যসভার তরুণ সদস্য, তখন তিনি রাজ্যসভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ইন্দিরা গান্ধী প্রণব মুখার্জির আগ্রহ উপলব্ধি করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে তাকে বেশ ক’টি দেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তার সম্পর্ক চমৎকার। যে কারণে নয়াদিল্লিতে তিনি ছিলেন অন্যতম পরামর্শদাতা। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তাই কাদের সিদ্দিকী থেকে শুরু করে এইচএম এরশাদ কিংবা বেগম খালেদা জিয়া যারাই দিল্লি গেছেন, তারাই দেখা করেছেন প্রণব মুখার্জির সঙ্গে। তার দরজা বাংলাদেশীদের জন্য সব সময় খোলাই ছিল। একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নীতিনির্ধারণে কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন না, এটা সত্য। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি যখন হন প্রণব মুখার্জি এবং সমস্যাটি হয় বাংলাদেশকে নিয়ে, তখন তার মূল্যায়নকে অস্বীকার করতে পারেন না ভারতের নীতিনির্ধারকরা।
ঢাকায় আসার আগে তিনি একটি বাংলাদেশী সংবাদ সংস্থাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তার সেই বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় তার মন্তব্য কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তার দেয়া ভাষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এসব বিষয় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যেমন তিনি বলেছেনÑ ১. তিস্তার পানিবণ্টনসহ সব দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানে ভারত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; ২. নতুন নতুন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, মানুষে মানুষে সংযোগ, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে; ৩. বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রতি ভারতের আস্থা রয়েছে; ৪. গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আইনের শাসন এবং মানবাধিকার অক্ষুণœ রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণ সচেষ্ট থাকবেন; ৫. অভিন্ন জলবণ্টন ভারতের অগ্রাধিকার বিষয়; ৬. ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে বেড়ে উঠে সমৃদ্ধি লাভ করতে হবে; ৭. ভারত ও বাংলাদেশ ‘বিশেষ বন্ধনে’ আবদ্ধ। দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হচ্ছে ইত্যাদি।
ভারতের রাষ্ট্রপতির এ ধরনের মন্তব্য দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন বলেন, দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন আমরা এই মন্তব্যে আস্থা রাখতেই পারি। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? তিস্তা চুক্তি হবেÑ এমনটাই আশাবাদী ভারতের রাষ্ট্রপতি। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা হল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতার কারণে এ চুক্তি হয়নি। বলা হয়েছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময় (২০১২) এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। এরপর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু মমতা তার অবস্থান থেকে সরে এসেছেন, এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি জটিল। এ ব্যাপারে শুধু যে ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) আর বাংলাদেশই জড়িত, তা নয়। এ প্রশ্নে সিকিমের অংশগ্রহণও অনেকটা জরুরি। কারণ তিস্তার উৎপত্তি সিকিমে। সিকিম সরকার ইতিমধ্যে তিস্তার মূল প্রবাহ থেকে অনেক পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, সিকিম সরকার তিস্তা নদীর মূল প্রবাহের উপর ২৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করে প্রচুর পানি প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দিয়ে সিকিম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এমনকি ভারতের এনএইচপিসিও দুটো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জেলার ৯ লাখ হেক্টর জমির চাষাবাদ তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল।
মমতা পানি নিয়ে ‘রাজনীতি’ করেন। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে পশ্চিমবঙ্গ তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ভোটের রাজনীতির কারণে তিনি পানিবণ্টনের ব্যাপারে রাজি হবেন না। ইতিমধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বেরিয়ে গেছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রে তাদের কোন মন্ত্রীও নেই। ফলে তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে নয়াদিল্লি রাজি হলেও মমতার আপত্তির কারণে যে জটিলতা ছিল, সে জটিলতা থেকে যেতে পারে। ২০১৪ সালে ভারতে নির্বাচন। আবারও তৃণমূল একটি ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হবে। সুতরাং পানিবণ্টনের প্রশ্নটি একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থেকে গেল। ইতিমধ্যে ৩ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। ওই সংবাদে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে নয়াদিল্লি সংবিধান সংশোধন করতেও রাজি। রাজ্যের মতামতের গুরুত্ব থাকায় কেন্দ্র কখনও এককভাবে কোন চুক্তি করতে পারে না। কিন্তু এই সংবিধান সংশোধন করাও সহজ হবে না। কেননা বিজেপির সমর্থন এতে পাওয়া যাবে না। এমনকি ভারতের রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হবে বলে মন্তব্য করলেও বাস্তবক্ষেত্রে এটি নিয়েও সমস্যা রয়েছে। সীমান্ত সমস্যার সমাধানের ব্যাপারেও সংবিধান সংশোধন জরুরি। বাংলাদেশ-ভারত একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ১৯৭৪ সালে। বাংলাদেশ ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে সংবিধানে সংশোধনী এনেছে (তৃতীয় সংশোধনী, ১৯৭৪)। কিন্তু দীর্ঘ ৩৯ বছরেও ভারত তাদের সংবিধানে সংশোধনী এনে চুক্তিটি র‌্যাটিফাই করেনি। ফলে ছিটমহলগুলো নিয়ে সমস্যা রয়েই গিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আছে ১৭ হাজার ১৪৯ একর ভারতীয় ভূমি। আর ভারতের ভূখণ্ডে আছে ৭ হাজার ১১১ একর বাংলাদেশী ভূমি। এসব অঞ্চলের মানুষ এক মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রণব মুখার্জি সীমান্ত সমস্যার সমাধানের কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। দীর্ঘদিন পর ভারতীয় মন্ত্রিসভায় ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুমোদিত হলেও সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নটি এর সঙ্গে জড়িত। সংবিধান সংশোধনে কংগ্রেস সমর্থন পাবে না প্রধান বিরোধী দল বিজেপির। মন্ত্রিসভায় মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুমোদন এবং কংগ্রেস কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও বিজেপি বলছে, তারা এই সংশোধনীর বিরোধিতা করবে। ফলে সমস্যা যা ছিল, তা রয়ে যাবে।
প্রণব মুখার্জির আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন নেই। হয়তো তিনি সত্যি সত্যিই চান সমস্যাগুলোর সমাধান হোক। কিন্তু সমস্যা ভারতের আমলাতন্ত্র নিয়ে। সেই সঙ্গে রয়েছে ভারতের নীতিনির্ধারকদের ‘মাইন্ড সেট আপ’। তারা বাংলাদেশকে কখনও সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেছে, এটা আমি মনে করি না। ভারত বড় দেশ। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি হবে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি। ভারতে প্রচণ্ড দারিদ্র্য থাকলেও আগামী ৩০ বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে (বর্তমানে ৯৪০ ডলার)। ভারতের এই অর্থনীতি আমাদের অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করবে। আমাদের উন্নয়নে ভারত একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা তেমনটিই চাই। কিন্তু দেখা গেছে, দ্বিপাক্ষিকতার বেড়াজালে ভারত এককভাবে সুবিধা নিচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে যে সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানে ভারতের আগ্রহ কম। সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়ায় তা বাংলাদেশের মানুষদের ভারতবিদ্বেষী করে তুলেছে। ভারতীয় ঋণে ১৩টি প্রকল্প নির্ধারিত হলেও গত ২ বছরে মাত্র ২টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশী পণ্যের আমদানি বাড়ায়নি ভারত। বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নানা ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। বন্দি প্রত্যার্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তাতে ভারতের স্বার্থ বেশি। কানেকটিভিটির আড়ালে ভারতকে ট্রানজিট বা করিডোর দেয়া হলেও নেপাল ও ভুটানের জন্য তা সম্প্রসারিত হয়নি। পানি ব্যবস্থাপনার কথা প্রণব মুখার্জি বলেছেন বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের কোন উদ্যোগ কখনও পরিলক্ষিত হয়নি। ২০১১ সালে মালদ্বীপের আদ্দু সিটিতে ১৭তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুটান, ভারত, নেপাল ও চীনকে নিয়ে ‘গঙ্গা নদী অববাহিকা সংস্থা’ ও ‘ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকা সংস্থা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের প্রচণ্ড বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে সিকিম থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথা বাংলাদেশ বললেও ভারত তাতে সম্মতি দেয়নি (ভারতীয় এলাকার উপর দিয়ে এই বিদ্যুৎ আনতে হবে)। ‘কুনমিং উদ্যোগে’র ব্যাপারেও ভারতের সম্মতি পাওয়া যায়নি। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প কিংবা টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর করতে কোন উদ্যোগ নেয়নি ভারত। বরং এ নিয়ে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। সমুদ্রসীমা নিয়েও ভারতের সঙ্গে আমাদের বিবাদ আছে, যা এখন দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন।
তাই প্রণব বাবুর ঢাকা সফরের পর যে প্রশ্নটি থেকেই গেল তা হচ্ছে, এ সফরের পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা আছে, তা কি কাটবে? এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। ভারতীয় ‘মাইন্ড সেট আপে’ যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উন্নতি আসবে না। ভারতকে উদার মনোভাব নিয়ে আসতে হবে। আরও একটি কথা। প্রণব মুখার্জি এ সফরে তরুণ প্রজš§কে সমর্থন ও গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালীকরণের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা কোন কোন ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি এক ধরনের সমর্থন বলেই গণ্য করা হচ্ছে। এমনও কথা বলা হচ্ছে যে, ‘মৌলবাদ বিরোধিতার বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপতি’ (সংবাদ প্রতিদিন, ৫ মার্চ)। ‘হাসিনার পাশে আছে ভারত, এ বার্তা প্রণবের’Ñ এমন মন্তব্যও করেছে কোন কোন গণমাধ্যম (বর্তমান, ৪ মার্চ)। কোন কোন গণমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতকে ইসলামিক ব্রাদারহুডের (মিসর) সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ‘জামায়াত ক্ষমতায় আসলে ভারত সমস্যায় পড়বে’ (সংবাদ প্রতিদিন)। বেগম খালেদা জিয়া নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে তার নির্ধারিত সাক্ষাৎকার বাতিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের মন্তব্য ছিল অনেকটা এ রকম : ‘তার এই পদক্ষেপ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তো বটেই, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী বার্তা দিল।’
এ ধরনের মন্তব্যের পরও যেটা বলা যায় তা হচ্ছে, প্রণব বাবুর এ সফরের মধ্য দিয়ে ‘বড় কিছু’ হয়তো অর্জিত হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যে তার বন্ধুদের সম্মান দিতে জানে, তা প্রমাণিত হল। ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের সম্মান আরও বাড়ল। ‘বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চায় ভারত’Ñ সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রণব মুখার্জির এ ধরনের একটি মন্তব্যের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আগামী নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবে এবং নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ব্যাপারে একটি দৃঢ় অবস্থান নেবেÑ এটাই বাংলাদেশের মানুষ চায়। প্রণব মুখার্জি নয়াদিল্লিতে ‘রাইসিনা হিলে’ রাষ্ট্রপতি ভবনে ফিরে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষের যে ভালোবাসা তিনি নিয়ে গেলেন, তা যদি ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচক দৃষ্টিতে নেন, তাহলে তা দু’দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।
Daily JUGANTOR
06.03.2013

‘শাহবাগে প্রণবের সমর্থন খালেদা জিয়াকে বৈঠক বাতিলে উদ্বুদ্ধ করতে পারে’


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেছেন, শাহবাগের তরুণদের আন্দোলনে প্রণব মুখার্জির সমর্থন থাকার বিষয়টি খালেদা জিয়াকে সাক্ষাৎ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তবে খালেদার সাক্ষাৎ বাতিল করাটা ঠিক হয়নি। সৌজন্যের খাতিরে সাক্ষাৎ করাটা উচিত ছিল। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক শামসুর রেহমান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রণবের সফরকে সরকারি দলের পালে হাওয়া বলে ব্যাখ্যা করতে চাইছে। অনেকে বলছে, হাসিনার পাশের দাঁড়ানোর জন্য এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রকাশ করতেই প্রণব ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু ‘সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাওয়া’র বিষয়টি ভিন্ন একটি ইঙ্গিত বহন করে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে তার এ বক্তব্যটি এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি বার্তা দিয়েছেন। এই বক্তব্যের ফল হিসেবে আগামী নির্বাচনে ভারতকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় দেখা যাবে এমন আশা করতে পারে বাংলাদেশের মানুষ। এই সফরের মধ্য দিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের সম্মান বাড়লো বলে তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন।
তিস্তা ও সীমান্তচুক্তির ব্যাপারে প্রণবের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ভারতের প্রেসিডেন্ট আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, এর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির ভূমিকা জড়িত। মমতা এখন কেন্দ্রীয় সরকারে নেই। জোটেও নেই। তাই মমতাকে কেন্দ্রীয় সরকার রাজি করাতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, তিস্তার পানিবণ্টনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সিকিমের ভূমিকাও একটা ফ্যাক্টর। ইতিমধ্যেই সিকিম সরকার তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে ২৭টি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ করেছে। সুতরাং সিকিমও এ ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিতে পারে। এছাড়া সার্কের সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি প্রস্তাব ছিল, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা সংস্থা গঠনের। সেই প্রস্তাবে ভারত সমর্থন দেয়নি। সুতরাং বিষয়টি ভাবনার সৃষ্টি করে।
সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে ’৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই চুক্তি অনুসারে সিটমহল বিনিময় হওয়ার কথা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালেই সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ভারতের মন্ত্রিসভা গত ৩৯ বছরে তার অনুমোদন দেয়নি। সম্প্রতি অনুমোদন দিলেও তাদের সংবিধান সংশোধন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। কারণ, বিজেপি সংবিধানের সংশোধনীতে রাজি নয়। অর্থাৎ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণেই প্রণব মুখার্জির এই আশাবাদ বাস্তবায়নে সংশয় থেকে যাচ্ছে।
Daily MANOBJAMIN
( Interview, 5.3.13)

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সফর ও আমাদের বৈদেশিক নীতি


ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসছেন আজ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছে। আর এ সম্মাননা নিতেই ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশে আসা। ভারতের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন না। কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায় বলে কথা। একজন দক্ষ মন্ত্রী হিসেবে তিনি অতীতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে একজন 'বন্ধু' হিসেবেই জানে। বাংলাদেশের ব্যাপারে তাঁর রয়েছে বিশেষ দরদ। তাই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশে আসা দুই দেশের সম্পর্ককে যে একটি উচ্চতায় নিয়ে যাবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের 'বিশেষ সম্পর্ক' স্থাপন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির জন্য একটি 'টার্নিং পয়েন্ট' হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপড়েন চললেও প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এ সফর প্রমাণ করে ভারতের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায় সেটা ছিল 'নিঃশব্দ রণকৌশল পরিবর্তন'। আর সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, 'বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের চলমান যোগাযোগের অংশ।' নিঃসন্দেহে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এ মূল্যায়ন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফর যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। 'পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৈদেশিক নীতিতে উজ্জ্বল একটি অধ্যায়; যদিও ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল না।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি আমাদের নীতিনির্ধারকরা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালে মস্কো গিয়েছিলেন। এরপর কোনো সরকারপ্রধান মস্কো সফরে যাননি। রাশিয়া একটি বিশ্বশক্তি। অথচ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল না। এখন প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরের মধ্য দিয়ে নতুন করে সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র তৈরি হলো। এই সম্পর্ককে এখন আমাদের উন্নয়নের আলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যাঁরা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা জানেন ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক ছিল চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য ও সহযোগিতা আমাদের বাধ্য করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আসরে সোভিয়েত পক্ষ অবলম্বন করে বাংলাদেশ যে বৈদেশিক নীতি রচনা করেছিল, তা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভিন্ন ধারণার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তেমন উষ্ণ ছিল না; যদিও ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। বিশ্ব অর্থনীতিতেও রাশিয়া তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারছিল না। ফলে বাংলাদেশ রাশিয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরই পুরনো সম্পর্ককে ঝালাই করার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন মস্কো যান, তখন সংগত কারণে পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এদিকে থাকে। শেখ হাসিনার মস্কো সফরের সময় তিনটি চুক্তি ও ছয়টি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি দুটি। এক. প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে রাশিয়া থেকে সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয়। দুই. পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রস্তুতিমূলক অর্থায়নে সহযোগিতা। এখানে বাংলাদেশ ৫০ কোটি ডলার ঋণ পাবে। রূপপুরের পারমাণবিক কেন্দ্রের কারিগরি গবেষণার জন্য এই অর্থ। কেন্দ্র নির্মাণে কত টাকা লাগবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ ব্যাপারে পরে চুক্তি হবে। আপাতত দুই বছরের মধ্যে এই ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে কারিগরি গবেষণার জন্য। এর বাইরে যেসব এমইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও আট হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয় বিতর্ক বাড়াবে। সরকারের শেষ সময়ে এসে সরকার এত বিপুল অর্থ ব্যয় করার যখন উদ্যোগ নেয়, তখন বিতর্ক থাকবেই। প্রথম বিতর্ক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে বিনিয়োগ অনেক বেশি। তুলনামূলক বিচারে খরচ অনেক বেশি। সেই সঙ্গে রয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্নটি। রাশিয়া বিশ্বের অস্ত্রবাজারে অন্যতম বিক্রেতা। তাদের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এই অস্ত্র বিক্রি। স্টকহোমের পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে (সিপরি), রাশিয়া বর্তমানে অস্ত্র বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যে দেশটি এখনো বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশটি যখন আট হাজার কোটি টাকা দিয়ে অস্ত্র ক্রয় করে, তখন বিশ্বে বাংলাদেশের এ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই এবং তা উঠেছেও।
রাশিয়ার ঋণের ধরন (যা দিয়ে অস্ত্র কেনা হবে) দেখে বলা যায়, এটি নন-কনসেশনাল। বাংলাদেশে কোনো স্বীকৃত প্রতিরক্ষা নীতিমালা নেই। কাজেই কোন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই অস্ত্র কেনা হলো তা পরিষ্কার নয়। আমাদের সেনাবাহিনীর অস্ত্রের অন্যতম উৎস হচ্ছে চীন। এখন সেই স্বাভাবিক সোর্সকে বাদ দিয়ে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনা, সংগত কারণেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারে। তবে এটা যে পশ্চিমা বিশ্বে ভুল সিগন্যাল পৌঁছে দেবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। চীন বিষয়টি ভালো চোখে দেখবে না। ফলে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে যে আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাতে ভাটা পড়তে পারে। ইতিমধ্যে আইএমএফের পক্ষ থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। এখন আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়েও বিলম্ব হতে পারে। আইএমএফ বাংলাদেশকে ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার সুদমুক্ত ঋণ দেবে। এর প্রথম কিস্তি ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার আমরা পেয়ে গেছি। এখন দ্বিতীয় কিস্তি আটকে যেতে পারে। তবে আমাদের জন্য যা দুর্ভোগের, তা হচ্ছে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার আগে বিষয়টি আমরা জানলাম না। একজন সিনিয়র জেনারেল (অব.) একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অস্ত্র কেনা হয়েছে (আমার দেশ, ২০ জানুয়ারি)। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়ার অস্ত্র ক্রয়ে একটি 'তৃতীয় পক্ষ'-এর উপস্থিতি রয়েছে। এই চুক্তি নিয়ে যে অস্পষ্টতা, তা হচ্ছে এর সঙ্গে কোনো শর্ত যুক্ত কি না; যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কোনো শর্ত যুক্ত নেই। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অস্ত্র কেনায় সুদ দিতে হবে ৪.৫ শতাংশ। ব্যবহার করতে হবে এই ঋণ ২০১৩-১৭ সালের মধ্যে। আর ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০ কিস্তিতে ১০ বছর ধরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অস্ত্র ক্রয়ে কোনো অস্বচ্ছতা নেই। বলা হয়েছে, এই অস্ত্র সেনাবাহিনী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার করবে। এই পরিসংখ্যান নিয়েও কথা বলা যায়। বিশেষ করে সুদের হার বেশি বলেই মনে হয়। তবে আমার কাছে যা মনে হয় তা হচ্ছে, এই চুক্তি আমাদের বৈদেশিক ও সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত বহন করে। কেননা আমাদের বৈদেশিক নীতি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চীনের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের বিমান বাহিনী চীনা বিমান ব্যবহার করে। সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রও চীনের তৈরি। আমাদের সামরিক নেতৃত্ব চীনা যুদ্ধাস্ত্রের ওপর অনেক দিক থেকেই নির্ভরশীল। আমাদের উন্নয়নে চীন অন্যতম অংশীদার। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশীও। আমাদের উন্নয়নে চীনের উপস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই সরকারপ্রধান চীনে গিয়েছিলেন, এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও অতি সম্প্রতি চীনে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা দুজন লালগালিচা সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী কুনমিং-কক্সবাজার সড়ক ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে এই মহাসড়ক ও গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের চেহারা আগামী দশকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ হতে পারে এ অঞ্চলের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। চীন শ্রীলঙ্কার হামবানটোটায় (প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের জন্মস্থান) গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে দিয়েছে। সেখানে একটি বিমানবন্দরও চীন তৈরি করে দিয়েছে। সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন আগ্রহও দেখিয়েছিল। এটা নির্মিত হলে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের সাত বোন রাজ্যগুলো যেমন এটি ব্যবহার করতে পারবে, তেমনি পারবে চীন, তথা মিয়ানমারও। এখন সংগত কারণেই রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের এই সামরিক চুক্তি চীন খুব সহজভাবে নেবে বলে মনে হয় না। চীনারা এসব ক্ষেত্রে খুবই রক্ষণশীল। তারা খুব দ্রুতই প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বোধকরি এ ব্যাপারে কোনো সরকারি মন্তব্যও আমরা পাব না। তবে যা হবে, তা হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা আগ্রহের ঘাটতি আমরা দেখতে পাব। এই মার্চে চীনে নয়া নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করছে। শি জিন পিং ইতিমধ্যে পার্টিপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং মার্চে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও নেবেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর ধারণা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং খালেদা জিয়া যখন চীনে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এখন এই অস্ত্র ক্রয় চুক্তিতে চীনে বাংলাদেশ ইমেজ সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ফলে একটা ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক যে বাংলাদেশ আবার মস্কো-নয়াদিল্লি অক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সমাজে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ- তার একটির সমাধান হয়নি। বারবার ভারতের উচ্চ পর্যায় থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের কথা বলা হলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। ঢাকায় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ ঠিক একই কথা বলে গেলেন। তিস্তা চুক্তি হবে এমন কথাও সালমান বলেছেন। অথচ পশ্চিম বাংলার একজন মন্ত্রী বললেন উল্টো কথা- পশ্চিম বাংলার স্বার্থ রক্ষা হয় না এমন কোনো চুক্তিকে পশ্চিম বাংলা সমর্থন করবে না। তাহলে কী চুক্তি হতে যাচ্ছে? তাতে আদৌ বাংলাদেশের স্বার্থ কি রক্ষিত হবে? নাকি শুধু একটি চুক্তির জন্য একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? এ দেশের আমজনতা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। ভারতীয় ঋণের ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে দুই বছরে মাত্র দুটি বাস্তবায়িত হয়েছে। অনেক ইস্যু রয়ে গেছে, যার সমাধান আজও হয়নি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সরকারের আমলে গত চার বছরের পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের বড় অভাব। তবে বাংলাদেশ অকৃতজ্ঞ জাতি নয়। আমরা আমাদের 'বন্ধুদের' সম্মান জানাতে জানি। প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশের খাঁটি 'বন্ধু'। পারিবারিকভাবেও তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। তিনি নীতিনির্ধারণে কোনো প্রভাব খাটান না বটে। কিন্তু তাঁর মতামতকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার উপেক্ষা করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী আগস্টে নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। তিস্তা চুক্তি ওই সময়ই স্বাক্ষরিত হবে। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত হোক।Daily KALERKONTHO03.03.13

উত্তপ্ত রাজনীতি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

¦



২১ ফেব্রুয়ারি প্রজন্ম চত্বরে তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ ১৭ দিনের একটানা অবস্থান ধর্মঘটের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও ২২ ফেব্রুয়ারি জামায়াত সমর্থিত কয়েকটি ইসলামী দলের তা-বের পর আন্দোলনকারীরা আবার ফিরে এসেছে শাহবাগ চত্বরে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালও পালন করেছে ইসলামী দলগুলো। ২৮ ফেব্রুয়ারিও তারা হরতাল পালন করেছে জামায়াত নেতা সাঈদীর মামলার রায়ের প্রতিবাদে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের তৃতীয় রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন উত্তপ্ত। একদিকে শাহবাগ চত্বর দখল করে তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে জামায়াত সমর্থিত ইসলামী দলগুলো পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এর মাঝখানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কোনো অবস্থান নেই। এর আগে তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে নিষিদ্ধ করাসহ তাদের ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল। তাদের অন্যতম একটি দাবি ২৬ মার্চের মধ্যে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা। এর বাইরে অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজীবসহ আন্দোলনে নিহতদের হত্যাকারীদের ৭ দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার, জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের উৎস অনুসন্ধান করা, ট্রাইব্যুনালকে স্থায়ী রূপ দেয়া, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জামায়াতের অপরাধমূলক কর্মকা- প্রচার করা ইত্যাদি। শাহবাগ অক্যুপাই আন্দোলন আমাদের জন্য একটি মাইলস্টোন। আগামীদিনের রাজনীতিতে এর একটা প্রভাব থাকবেই। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, সরকার এ আন্দোলন থেকে ফায়দা উঠিয়েছে এবং বিএনপির আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। তরুণ প্রজন্মের একটা জয় হয়েছে সত্য। কিন্তু তারা একটা বড় প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তাদের কাছে অনেক বেশি। এখন সেই প্রত্যাশা তারা কতটুকু পূরণ করতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে এগিয়ে এসেছিল তরুণরা। এখন তাদের সবার মন জয় করতে হবে। শেয়ারবাজার থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে বাইরে পাচার হয়েছে। তদন্তে তা প্রমাণিতও হয়েছে। তরুণ সমাজকে এখন এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে। দ্রব্যাদির মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ আজ অসহায়। নতুন ভিত্তি বছর (২০০৫-০৬) অনুযায়ী ডিসেম্বরে (২০১২) মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। অথচ নভেম্বরে ছিল ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ডিসেম্বর (২০১২) মাসে চাল, আটা, ডাল, মাছ-মাংস, মসলা, দুধ ও তেলের দাম বেড়েছে। ওই সময় খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই সঙ্গে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের দাম বেড়েছে দশমিক ৩৮ শতাংশ। আমরা জানুয়ারির (২০১৩) পরিসংখ্যান যদি নেই, তাহলে দেখব, খাদ্যে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়েছে। এ মূল্যস্ফীতি কি আমাদের তরুণদের স্পর্শ করে না? শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ ১৭ দিন একনাগাড়ে, শাহবাগ চত্বরে অবস্থান করে রেকর্ড করল। কিন্তু জানল না তাদের বাবারা কী কষ্ট করে সংসার চালান? জিজ্ঞেস করল না বাবাকে সীমিত আয়ে বাবা কীভাবে সংসার চালান? নিউইয়র্কে অক্যুপাই মুভমেন্ট হয়েছিল অসমতা, বৈষম্য ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। মার্কিন সমাজে শ্রেণীতে শ্রেণীতে ব্যবধান বাড়ছে। একটি ধনিক শ্রেণীর জন্ম হয়েছে, যাদের কাছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব ছিল 'অক্যুপাই মুভমেন্ট'। কায়রোতে তাহরির স্কয়ারে আন্দোলন হয়েছিল স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে। ১৯৮১ সাল থেকেই ক্ষমতায় ছিলেন হোসনি মোবারক। গণতন্ত্র চর্চা সেখানে ছিল না। তরুণ প্রজন্ম সেখানে বিক্ষোভকে সংগঠিত করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে। আজ দেখলাম ভিন্ন চিত্র। সরকারই মদদ দিচ্ছে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ধর্মঘট করতে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ সিসি ক্যামেরা বসিয়েছিল ভালো, সন্দেহ নেই। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় পুলিশ যখন বিরোধীকর্মীদের পেটায়, গ্রেপ্তার করে, তখন একটি বৈসাদৃশ্য আমার চোখে ধরা পড়ে। একদল আন্দোলনকারীকে পুলিশ প্রটোকল দিচ্ছে আর অন্য আন্দোলনকারীকে পেটাচ্ছে। গ্রেপ্তার করছে। শত শত তরুণ এখন সরকারের কর্মকা-ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলে। সরকার ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা সংবিধানের মহাত্ম প্রচার করতে গিয়ে মুখে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেন। সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদের ১নং ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। এ অনুচ্ছেদের ৩৯(২) 'ক' ও 'খ' ধারা দুটো আরো স্পষ্ট। 'ক'-তে বলা হয়েছে 'প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের কথা এবং 'খ'-তে রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা। আজ যখন পুলিশ বিরোধীকর্মীদের পেটায় তখন ৩৯(১) ও ৩৯(২-ক) ধারা লঙ্ঘিত হয়। যখন শাহবাগে আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, সংগ্রাম বন্ধ ঘোষণা করার দাবি উত্থাপিত হয়, তখন সংবিধানের ৩৯(২)(ক) ধারাও লঙ্ঘিত হয়। সংবাদপত্র অফিসে যখন আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় (নয়া দিগন্ত), তখন শাহবাগের তরুণদের স্পিরিটে আমি বিভ্রান্ত হই। হতবাক হই। এদের উদ্দেশ্য বুঝতে আমার কষ্ট হয়। এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন আমরা হয়েছিলাম ১৯৭৫ সালে। যখন চারটি পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এ প্রজন্মের তরুণরা তা জানে না। জানে না সেদিন কোন উদ্দেশে ওইসব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে দাবি উঠেছিল ত্রিদলীয় ঐক্য জোট (আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ মো.) গঠন করার। তা গঠিতও হয়েছিল। এ ত্রিদলীয় ঐক্যজোটই এক দলীয় বাকশালে রূপান্তরিত হয়। আজো শাহবাগের চত্বরে দেখি সেই সব দলের মুখ। আওয়ামী লীগের ভেতরে, নীতি নির্ধারণীতে, মন্ত্রিসভায় সাবেক 'মস্কোপন্থীদের সংখ্যা বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তারা প্রভাবান্বিত করতে পেরেছিল। আজ এতবছর পর তারা প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছেন বলে আমার ধারণা। শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম আজ প্রতিবাদী। পুরো তথ্য, ইতিহাস তাদের জানা দরকার। তাই প্রতিবাদের যে ভাষা, তাতে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা থাকুক তাদের ওপর আস্থা রাখার জায়গাটা যেন নষ্ট না হয়। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়টি আজ আন্তর্জাতিক আসরে অন্যতম একটি আলোচিত বিষয়। কিন্তু ব্যক্তির দুর্নীতির কারণে আমাদের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। টিআই'র রিপোর্টেও আছে এ দুর্নীতির খবর। কিন্তু শাহবাগে দুর্নীতির কোনো সস্নোগান ছিল না। পদ্মা সেতু আর আবুল হোসেন পরস্পর সম্পর্কিত। কিন্তু কোনো সস্নেস্নাগান নেই। কেন নেই? শুভঙ্করের ফাঁকিটা এখানেই। গণমানুষের দাবি ছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করার। এ দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছিল। খালেদা জিয়া এ অসুস্থ শরীর নিয়ে রোডমার্চ করেছেন একাধিক। ঢাকায় সর্বকালের বৃহৎ গণজমায়েত করেছে বিএনপি। বিএনপি যখন ধীরে ধীরে এ আন্দোলনকে একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সৃষ্টি হয়েছিল এ শাহবাগকেন্দ্রিক গণআন্দোলন। এখন একটি বিজয় অর্জিত হয়েছে বটে! কিন্তু যেতে হবে অনেক দূর। গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো আন্দোলন চূড়ান্ত বিচারে স্থায়ী হয় না। আমি চাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ক্রয়মূল্য আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকবে। আমি চাই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তার বিচার। যারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, তাদের দাঁড় করানো হোক আসামির কাঠগড়ায়। যারা শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনির অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার। আমি বিশ্বাস করি তরুণ প্রজন্ম যদি এসব বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে সাধারণ মানুষ তাদের পাশে থাকবে। আবেগ দিয়ে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া যায় বটে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো অবদান রাখা যায় না। এ দেশের তরুণদের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন, কিংবা পরে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তরুণ সম্প্রদায়ের অবদান ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ দেশের তরুণ সমাজ একটি ইতিহাস রচনা করল। 'অক্যুপাই শাহবাগ' আজ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। বিশ্বের বড় বড় সংবাদপত্রে আজ অক্যুপাই শাহবাগ-এর নাম। এ নাম যুক্ত হলো অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে। যুক্ত হলো তাহরির স্কয়ারের সঙ্গে। এ আন্দোলন সৃষ্টি করল 'বাংলা বসন্ত' এর। মূল দাবি অবশ্যই থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে আমরা আদালতকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারি না। সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করে আইন পরিবর্তন হয়েছে। এখন পুরো বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে আপিল বিভাগের হাতে। তাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। আমরা কোনো পর্যায়েই আপিল বিভাগকে 'হুকুম' করতে পারি না? এ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যদি সব অনাচারের, সব দুর্নীতির বিচার হয়, এ আন্দোলনের সাফল্য সেখানেই নিহিত। তবে মনে রাখতে হবে এ আন্দোলন যেন কোনো অবস্থায়ই কোরআন বা ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত না হয়।Daily JAI JAI DIN02.03.13

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি


যারা ইতিহাস চর্চা করেন, তারা আলেকক্সিস দ্য একিউভিলের (অষবীরং ফব ঞড়পয়ঁবারষষব) লেখনির সঙ্গে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস লিখে তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন না। ফরাসি এই দার্শনিক গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের প্রয়োজজনীয়তা ও গুরুত্বের কথা বোঝাতে গিয়ে লিখেছিলেনÑ ‘ও ধস ভড়ৎ ভৎড়স ফবহুরহম ঃযধঃ হবংিঢ়ধঢ়বৎং রহ ফবসড়পৎধঃরপ পড়ঁহঃৎরবং ষবধফ পরঃরুবহং ঃড় ফড় াবৎু রষষ পড়হংরফবৎবফ ঃযরহম রহ পড়সসড়হ; নঁঃ রিঃযড়ঁঃ হবংিঢ়ধঢ়বৎং ঃযবৎব ড়িঁষফ নব যধৎফষু ধহু পড়সসড়হ ধপঃরড়হ ধঃ ধষষ. ঝড় ঃযবু সবহফ সড়ৎব রষষং ঃযধহ ঃযবু পধঁংব’। বাংলা করলে এটা অনেকটা এ রকমÑ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রগুলো যে খুবই অবিবেচক সাধারণ কর্মকাণ্ডের দিকে নাগরিকদের চালিত করে, এটি আমি জোর দিয়ে অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু সংবাদপত্র ছাড়া সাধারণ কর্মকাণ্ড বলতে প্রায় কিছু থাকবেই না। ফলে তারা যত ক্ষত তৈরি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সারায়। এই একটি বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে যে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে সমাজ উন্নয়নে, সমাজ বিকাশে সংবাদপত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। যুগে যুগে সংবাদপত্রের এই ভূমিকা স্বীকৃত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতন্ত্রের বিকাশ যেখানে ঝুঁকির মুখে থাকে, সেখানে সংবাদপত্র গণতন্ত্র বিকাশে একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। স্বাধীন সংবাদপত্র ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। তাই বলা যেতে পারে, গণতন্ত্র ও স্বাধীন সংবাদপত্র পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪২ বছরে পা দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার প্রবক্তারা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সেই সঙ্গে স্বাধীন সংবাদপত্রের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজও সংবাদপত্র কর্মীদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তবে এটা বলতেই হয়, আমাদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃত।
বাংলাদেশে আমরা ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান নিয়ে গর্ব করি। গেল ৪১ বছরে এই সংবিধানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মোট ১৫টি সংশোধনী সংবিধানে যুক্ত হয়েছে। উচ্চ আদালতের একটি রায়ের ফলে সংবিধান এখন মূল ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে গেছে। সংবিধান মূল সংবিধানে ফিরে গেলেও, একাধিক ধারা ও উপধারা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দ্বিমত আছে। মূল একটি প্রশ্নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও দ্বিধা বিভক্ত। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হলেও, এ প্রশ্নে বিরোধী দল এখন জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদটি যেভাবে ছিল, তা রয়ে গেছে। সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদের ১নং ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল’। এই অনুচ্ছেদের ৩৯(২) ‘ক’ ও ‘খ’ ধারা দুটো আরও স্পষ্ট। ‘ক’তে বলা হয়েছে ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের কথা এবং ‘খ’তে রয়েছে ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হইল’। অর্থাৎ সংবিধানের পুরো ৩৯নং ধারাটিতে একজন সংবাদকর্মীকে যেমনই অধিকার দিয়েছে তার মত প্রকাশ করার, ঠিক তেমনি একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংবাদপত্রকেও অনুমতি দিয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে প্রকাশিত হওয়ার। সংবাদকর্মী তথা সংবাদপত্রের জন্য এই ধারাটি একটি রক্ষাকবচ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে-মধ্যে এই ৩৯নং ধারাটি লংঘিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যখন জš§ হয়, তখন ওই সময়ের জাতীয় নেতারা এটা উপলব্ধি করেছিলেন বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে এই দেশটিতে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। তাই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তারা সংবিধানে ৩৯নং ধারাটি জুড়ে দিয়েছিলেন। যদিও ৩৯নং ধারার সঙ্গে ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদ দুটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ৩৯নং অনুচ্ছেদের পরিপূরক। ৩৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে চলাফেরার স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই ধারা বলে বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বা চলাচল করার অধিকার রাখেন। আর ৩৭নং ধারায় বলা হয়েছে, সমাবেশের স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদ একজন নাগরিককে জনসভা তথা শোভাযাত্রা করার অনুমতি দিয়েছে। সংবিধানের এই ৩৬, ৩৭ ও ৩৯নং অনুচ্ছেদ যদি একসঙ্গে পড়ি, তাহলে দেখব এখানেই নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রের স্পিরিট। অর্থাৎ গণতন্ত্রের বিকাশ ও স্থায়িত্বের বিষয়টি লুকিয়ে আছে এই অনুচ্ছেদগুলোর অন্তরালে। এর একটি যদি লংঘিত তাহলে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের অনেক কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের এই বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটা স্বীকার করতেই হবে, ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে ৩৯নং অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশিত থাকলেও ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা ৩৯নং অনুচ্ছেদে যে রক্ষাকবচ ছিল, তাতে ছুরি বসিয়েছিলাম। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র রেখে বাকি সংবাদপত্রগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি ৪০নং অনুচ্ছেদে যেখানে ‘পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা’র কথা বলা হয়েছিল, তাও লংঘিত হয়েছিল। অনেক সংবাদপত্র কর্মীকে বেঁচে থাকার জন্য ভিন্ন পেশা বেছে নিতে হয়েছিল।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) মাধ্যমে একদলীয় তথা রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একদলীয় ব্যবস্থা রহিত করা হলেও, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে যায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকে। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী এনে আমরা আবার সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি। আর ১৫ সেপ্টেম্বর (১৯৯১) দ্বাদশ সংশোধনীর ওপর যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তাতে সংসদীয় পদ্ধতি অনুমোদিত হয়। এই ফিরে যাওয়াকে আমি বলছি গণতন্ত্রের ‘দ্বিতীয় যাত্রাপথ’। এই ‘দ্বিতীয় যাত্রাপথ’ এ গণতন্ত্রের বিকাশ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে নির্বাচন হচ্ছে। এক সরকারের বদলে অন্য আরেকটি সরকার আসছে। কিন্তু গণতন্ত্রের যে মূল কথা পরস্পরের প্রতি আস্থা, সেই আস্থা নেই। সংসদ হয়ে পড়ছে একদলীয়। জাতীয় পর্যায়ে অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও সংসদে তা আলোচিত হতে দেখি না। যেখানে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের শ্রদ্ধা জানানোর কথা, সেখানে জাতীয় সংসদে নেতাদের নিয়ে কটূক্তি করা হয়। সংসদে কালো পতাকা প্রদর্শন কিংবা স্লোগান দেয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। তাই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয় বটে; কিন্তু শুধু নির্বাচন আয়োজন করার নাম গণতন্ত্র হতে পারে না। নির্বাচনের পাশাপাশি জড়িত মানবাধিকারের প্রশ্নটি। জড়িত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নটি। একটি সমাজে যদি মানবাধিকারের প্রশ্নটি নিশ্চিত করা যায়, যদি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে, তাহলে ওই সমাজকে আমরা গণতান্ত্রিক বলতে পারব। যদি সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম ‘সত্যি’ কথা বলতে না পারে, তাহলে সেই সমাজকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে সচেষ্ট রয়েছি বটে, কিন্তু গণমাধ্যমের কর্মীরা যখন হত্যা কিংবা গুমের সম্মুখীন হন, তখন তা গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতদিন হয়ে গেল আমরা আজও জানতে পারলাম না কারা এবং কেন সাগর-রুনী সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করেছিল। সংবাদপত্রের কর্মীরা এই হত্যার বিচারের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন। সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীরা যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তখন গণতন্ত্রকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় না। আমরা সেটা চাই বটে, কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্ষমতাসীনরা বরাবরই নির্লিপ্ত। সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখে, একটা ‘ভয়ের আবহ’ তৈরি করে আর যাই হোক সত্যিকারের গণতন্ত্র বিনির্মাণ করা যাবে না। আমরা চাই সংবাদপত্র লিখুক, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশিত হোক, সরকারর দোষ-ত্র“টি ধরিয়ে দিক, সমাজে সব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হোক, তাহলেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং গণতন্ত্রকে আমরা আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারব।
Daily JUGANTOR
91.03.13