রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্ত ও প্রসঙ্গ কথা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। ভারতে মোদি সরকারের সময়ে এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হতে যাচ্ছে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস ও খোদ বিজেপি এই ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধী ছিল। কিন্তু তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত তাদের আপত্তি তুলে নেন। ভারতীয় লোকসভার বিদেশ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভায় এ সংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, লোকসভার চলতি শীতকালীন অধিবেশনেই এই বিলটি পাস হবে। এরপর এটি যাবে রাজ্যসভায়। সেখানেও কোনো আপত্তি থাকবে না। এর মধ্যদিয়ে ২০১৫ সালের অধীবেশনেই ভারতীয় সংবিধানের সংশোধনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এর ফলে ১৬২টি ছিটমহলের ৫১ হাজার মানুষ উপকৃত হবে। এই ১৬২টি ছিটমহলের মধ্যে ১১১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের অভ্যন্তরে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের পূর্ণ কর্তৃত্ব এখন বহাল হবে। অন্যদিকে ৫১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রয়েছে, যা ভারত এখন ফিরে পাবে। বলা ভালো দীর্ঘদিন এই ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়টি ঝুলে ছিল। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতকে তার এলাকা ফেরত দিলেও দীর্ঘ ৪০ বছরে বাংলাদেশ তার এলাকা ফেরত পায়নি। এখন চূড়ান্তভাবে ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আরো বেশকিছু বিষয় রয়েছে, সে ব্যাপারেও ভারতের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে ছিটমহল বিনিময়ের মতো বাকি সমস্যাগুলো সমাধানে ভারত উদ্যোগ নেবে। ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। আমাদের উন্নয়নে ভারতের ভূমিকাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভারত সমমর্যাদার দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখছে না। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতকে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা সেই প্রত্যাশা পূরণে ভারত এগিয়ে আসেনি। বরং ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকায় একটি বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব আমরা লক্ষ্য করেছি। মোদি নির্বাচনের আগে বার বার বলে আসছিলেন ভারতে বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে বসবাস করেন। পশ্চিমবাংলাকে তিনি টার্গেট করেছেন। ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় আলাদা একটি সেল খুলেছেন, যাদের কাজ হবে তথাকথিত 'বাংলাদেশি' অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা ও মনিটর করা। কিছুদিন আগে বিজেপির সভাপতি ও মোদির দক্ষিণহস্ত বলে পরিচিত অমিত শাহ কলকাতায় বলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অধিবাসী পাঁচগুণ বেড়েছে। সারদা কেলেঙ্কারির ঘটনায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর নাম এসেছিল। বলা হয়েছিল জামায়াতের মাধ্যমে জঙ্গি তৎপরতায় অর্র্থায়ন করেছে সারদা। ভারতের সিবিআই বিষয়টি তদন্ত করছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি যেহেতু স্পর্শকাতর, সেহেতু সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনও বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিল সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যাপারে তিনি একটি বড় উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু তারপরও কংগ্রেস নেতাদের তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ভারতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি বাংলাদেশের বিষয়টি নিজেই দেখভাল করতেন_ এরকম একটি কথা আমরা বরাবরই শুনতে পেয়েছি। একজন বাঙালি হয়ে বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে তিনি পূর্ণ অবগত ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ভূমিকা সীমিত থাকায় তিনি সমাধানের কোনো পথ বের করতে পারেননি। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সমস্যাগুলোর জট খোলেনি। আসলে ভারতের আমলাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। এই আমলারা নীতি-নির্ধারণে প্রভাব খাটায়। এই আমলাতন্ত্রের কারণেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ধীরে ধীরে তিক্ততায় পরিণত হয়েছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে প্রণব বাবু বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে 'সমব্যথী' থাকলেও সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনকি ড. মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০১১ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রণব বাবুর মতো তিনিও আমাদের আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছিলেন যে সমস্যার সমাধান হবে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি দিলি্ল ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত হত্যা হয়েছিল। তার ঢাকা সফরের সময়ই আমরা শুনেছিলাম মমতা ব্যানার্জির কারণে কোনো তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করানোর দায়িত্বটি কেন্দ্রীয় সরকারের, বাংলাদেশ সরকারের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। দুবার ১৯৯৮ ও ২০০৭ সালে একটি চুক্তির কাছাকাছি আমরা চলে গিয়েছিলাম। দুই দেশের মধ্যে সমানভাবে পানি বণ্টন করে কিছু পানি নদীতে রেখে দেয়ার একটি সিদ্ধান্তে দুই দেশ একপর্যায়ে রাজিও হয়েছিল। তারপরও চুক্তি হয়নি। এখন মূল সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি। এতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্যা। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই। কিন্তু ভারত আমাদের সেই অধিকার নিশ্চিত করছে না। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও ভারত আমাদের বার বার মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং একাধিকবার বলেছিলেন, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? নয়া দিলি্লতে ইতোমধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সেখানে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার। প্রায় ৯ হাজার কোটি রুপিও ব্যয় করা হয়ে গেছে। বাঁধটি যদি নির্মাণ হয়, তাতে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হবে, তা একাধিক সেমিনারে আলোচিত হয়েছে। এখানে আমাদের ব্যর্থতা আমরা শক্ত অবস্থানে যেতে পারছি না। জেসিসির যৌথ ইশতেহারে এসংক্রান্ত কোনো কথা বলা হয়নি। গঙ্গাচুক্তি আমরা করেছিলাম ১৯৯৬ সালে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। এর আগেই পদ্মায় পানি নেই। চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। ২০২৭ সালে লোকসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। যে বিপুল পানির চাহিদা থাকবে তার কী হবে? চুক্তি অনুযায়ী পর্যালোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগটি আমরা নিচ্ছি কই? অতীতে কখনো আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। সীমান্ত হত্যা আজো বন্ধ হয়নি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও একের পর এক সীমান্ত হত্যা হচ্ছে। এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যেখানে বিজেপির গুলিতে কোনো ভারতীয় নাগরিক মারা গেছেন। প্রতি মাসেই মারা যাচ্ছেন নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিকরা। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, তার পরিসংখ্যান 'অধিকার'-এর কাছে আছে। একাধিকবার শীর্ষপর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। বার বার আমরা শুনেছি একটি কথা_ সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে। কিন্তু সেই হত্যা বন্ধ হয়নি। মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে মানসিকতা। ভারতের নীতি-নির্ধারকরা বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখছে না। বাংলাদেশকে তারা দাবিয়ে রাখতে চায়। ফলে সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। একই কথা প্রযোজ্য ছিটমহল বিনিময়ের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ তার আন্তরিকতা দেখিয়েছে। কিন্তু ভারত দেখায়নি। এমনকি ছিটমহল বিনিময়ের ক্ষেত্রে ভারত শেষ পর্যন্ত রাজি হলেও দীর্ঘ ৪০ বছর ছিটমহলের বাসিন্দারা অবর্ণনীয় ও মানবেতর জীবনযাপন করেছে। ভারতীয় রাজনীতিবিদরা এদিকে দৃষ্টি দেননি। তবে মমতা ব্যানার্জির সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবেই। কেননা কিছু 'শর্ত' মমতা ব্যানইর্জ জুড়ে দিয়েছেন। উপরন্তু প্রায় ২ লাখ কোটি রুপি ঋণ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। এর সমাধান না হলে মমতা বেঁকে বসতে পারেন আবারো। ছিটমহলসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ভারতের সদিচ্ছা প্রমাণ করে না। ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল ভারত। প্রণব বাবু ঢাকায় এসে ২০ কোটি ডলার অনুদানের কথা বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঋণের টাকা দিয়ে তো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না? ১৩টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার অভাবে কিছু প্রকল্প এখনো আটকে আছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। ২০০৯-১০ সালে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১০-১১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারে। আর ২০১৩-১৪ সালের পরিসংখ্যান যখন আমাদের হাতে আসবে, ধারণা করছি তা ৪ মিলিয়ন ডলারের অঙ্ককে ছাড়িয়ে যাবে। ভারত মাঝেমধ্যে কিছু পণ্যের শুল্কমূল্য প্রবেশাধিকারের কথা বলে বটে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ এসব পণ্যের অনেকই রপ্তানি করে না। ভারতের অশুল্ক বাধা দূর করা নিয়েও 'নানা কাহিনী' আছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নানা ধরনের শুল্ক দূর করা যাচ্ছে না। ফলে ভারত বাংলাদেশের রপ্তানি সেই তুলনায় বাড়ছে না। শুধু ঘাটতি বাড়ছেই। এটা আমাদের জন্য শঙ্কার কারণ। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টির একটা সমাধান হয়েছে সত্য, কিন্তু আদৌ ২০১৫ সালেও আমরা বিদ্যুৎ পাব_ এ ব্যাপারটি আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। বাংলাদেশ বড় ধরনের বিদ্যুৎ সঙ্কটের মুখে। বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বন্ধ অনেক কারখানায়। অথচ ভারত যদি আন্তরিক হয়, তাহলে আমাদের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। মহাজোট ও বর্তমান সরকারের গত ৬৮ মাসের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব ভারতের পাল্লা ভারী, আমাদের প্রাপ্তি কম। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছি (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডোর), কিন্তু ট্রানজিট 'ফি' এখনো নির্ধারণ হয়নি। বলা হচ্ছে ট্রানজিটের বিষয়টি বহুপাক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনো ট্রানজিট পায়নি। ভারতের এ দুটো দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা। কিন্তু ইতোমধ্যে এই সুবিধা দুটো দেশকে নিশ্চিত করা হয়েছে_ এ কথা আমাদের জানা নেই। আগামীতে ভারতের 'সাতবোন' রাজ্যগুলোও আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে_ এসংক্রান্ত একটি সমঝোতাও স্বাক্ষরিত হয়েছে। অথচ আমাদের যে নূ্যনতম প্রাপ্তি, সে ব্যাপারে এতটুকু ভারতীয় উদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করিনি। আজ তাই নরেন্দ্র মোদি এখন ভারতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন, আমরা চাইলে তার প্রতি সম্মান দেখিয়েই ভারত সমস্যাগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেবে। কেননা নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য একটি বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ বড় দরকার। ভারতের একগুঁয়েমির কারণে যদি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও অবনতি ঘটে, তাহলে তা থেকে সুবিধা নেবে জঙ্গিরা, বিশেষ করে আল-কায়েদা। জাওয়াহিরি তার একটি ভিডিও বার্তায় দক্ষিণ এশিয়া ও মিয়ানমারে আল-কায়েদার শাখা খোলার কথা ঘোষণা করেছেন। এটা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। উভয় দেশেই জঙ্গিরা আছে। এখন দুই দেশ জঙ্গি দমনে এক সঙ্গে কাজ করতে পারে। মোদির জন্য বাংলাদেশের জনগণের আস্থা অর্জন করাটা জরুরি। ছিটমহল বিনিময় করে এই আস্থাটা নিঃসন্দেহে অর্জিত হতে পারে। আমরা চাই ভারত-বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসুক। 'বড়ভাই' সুলভ আচরণ বন্ধ করুক। অতীতে কংগ্রেস সরকার সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে বাংলাদেশ থেকে ফায়দা নিয়েছে মাত্র। এতে একটি শক্তিশালী ভারতবিরোধী মনোভাব বাংলাদেশে জন্ম হয়েছে। মোদি সরকার অন্তত একটি সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই Daily Jai Jai Din 09.12.14

মার্কিন সমাজে বৈষম্য বাড়ছ

ছোট ঘটনা যে কত বড় হয়ে দেখা দিতে পারে, মিসৌরির ফার্গুসন আর নিউইয়র্কের দুটো ঘটনা এর বড় প্রমাণ। ফার্গুসনের ঘটনা ৯ আগস্টের। আর নিউইয়র্কের ঘটনা ১৭ জুলাইয়ের। দুটো ঘটনায় গ্র্যান্ডজুরি অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের হত্যাকা-ে অভিযুক্ত করেননি। তবে দুটো ঘটনায়ই গ্র্যান্ডজুরি রায় দিয়েছেন অতি সম্প্রতি। নিউইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ মধ্য বয়সের মানুষ এরিক গার্নারকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। কিন্তু গ্র্যান্ডজুরি অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে খালাস দিলেন। আর ফার্গুসনকে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেন উইলসন প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে। তার নাম মাইকেল ব্রাউন। এটি নিয়ে তখনই আন্দোলন হয়েছিল। শত-শত দোকানপাট ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তিন মাস পর ওই হত্যাকা-ের যখন বিচার শুরু হলো, তখন ২৪ নভেম্বর বিচারকার্যে সহায়তাকারী জুরিরা অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেন উইলসনকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিলেন। অর্থাৎ জুরিদের চোখে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেন। যেখানে মিডিয়ায় বলা হচ্ছে, তিনি কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ব্রাউনকে গুলি ও হত্যা করেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, মার্কিন সমাজে এখনো বৈষম্য রয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা এখনো রয়ে গেছে এবং প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, যেখানে শেতাঙ্গদের সংখ্যা বেশি, সেখান থেকেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যারা ইতিহাসের ছাত্র, তাদের অনেকেরই মনে থাকার কথাÑ যুক্তরাষ্ট্রের মানবতাবাদী নেতা ড. মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তিÑ ‘আমার একটি স্বপ্ন ছিল’। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে (ওয়াশিংটন ডিসি) হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন সেই দুঃখ-কষ্টের কথাÑ যেখানে মার্কিন সমাজে কৃষ্ণঙ্গরা এক সময় দাস হিসেবে এ দেশে এসেছিল। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষ হিসেবে সমমর্যাদা পায়নি কখনো। লুথার কিং হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গের উপস্থিতিতে সেদিন বলেছিলেন, I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed. We hold these truths to be self evident; that all men one created equal. I have a dream that one day on the red hills of georgia the sons of former slaves and the sons of former sloweowners will be able to sit down together at a table of brotherhood. আজ যখন এ নিবন্ধটি লিখছি, তখন লুথার কিংয়ের ওই উক্তিটির কথা মনে পড়ে গেল। মাইকেল ব্রাউনের হত্যাকা- আবারও প্রমাণ করল লুথার কিংয়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মার্টিন লুথার কিং স্বপ্ন দেখেছিলেন, এই যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। সবাই এক দেশের নাগরিক। সবাই মানুষ। দাস ও মালিকদের সন্তানরা সব ভেদাভেদ ভুলে এক টেবিলে বসে নতুন এক সমাজ নির্মাণ করবে। ৪০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এই দ্বন্দ্ব দূর হয়নি। ফার্গুসন কর্তৃক মাইকেল ব্রাউনের হত্যাকা- এর বড় প্রমাণ।এটি দুঃখজনক যে, জুরিরা অভিযুক্ত ডেরেন উইলসনকে অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন। এ নিয়ে গত কয়েক দিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। আমি ভয়ে ভয়ে গত দুদিন সাবওয়েতে চলাফেরা করেছি। বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু বড় কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। এখানে যে বৈষম্য আছে, কৃষাঙ্গরা যে নিগৃহীতÑ তা প্রমাণিত। কৃষাঙ্গরা তাদের যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে না। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা এখন ৩০৮ মিলিয়ন। এই জনসংখ্যা আবার মোট ৬টি ‘রেসিয়াল গ্রুপ’-এ বিভক্ত। এই গ্রুপগুলো হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ, আলাস্কা নেটিভ, এশিয়ান, কৃষাঙ্গ বা আফ্রো-আমেরিকান, হিসপানিক বা লাতিনো ও নেটিভ হাওয়াইয়ান। শ্বেতাঙ্গরা বড় গোষ্ঠীÑ শতকরা ৭৪ দশমিক ৮ ভাগ। এরপর হচ্ছে হিসপানিক বা লাতিনো অভিবাসী (তারাও সেখানে মূলত শ্বেতঙ্গ বা মিশ্র গোষ্ঠী)Ñ শতকরা ১৬ দশমিক ৩ ভাগ। কৃষাঙ্গ তৃতীয় জনগোষ্ঠীÑ ১৪ দশমিক ১ ভাগ। এশীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫ দশমিক ৬ ভাগ। মজার কথা হচ্ছে, শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ এসেছে জার্মান থেকে। এই সংখ্যা ১৬ দশমিক ৯০ ভাগ। এরপরের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী এসেছে আয়ারল্যান্ড থেকেÑ শতকরা ১১ দশমিক ৫০ ভাগ। মনে করিয়ে দিই, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির পূর্বপুরুষ এসেছিলেন আয়ারল্যান্ড থেকে। প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের পূর্বপুরুষ ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিবাসী। এই যুক্তরাষ্ট্রে দাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের আনা হয়েছিল ভার্জিনিয়ার জেমস টাউন শহরে ১৬১৯ সালে। তাদের তামাক চাষে কৃষি শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ওই জনগোষ্ঠীই আফ্রো-আমেরিকান হিসেবে পরিচিত। তবে পরে ক্যারিয়ান দীপগুঞ্জ থেকে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটা অংশ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছে। লাতিনো জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশই এসেছে মেক্সিকো থেকে। তাদের সংখ্যা ১০ দশমিক ২৯ ভাগ। তাদের নিয়েই এখন বড় সমস্যা। অবৈধ অভিবাসীদের একটা বড় অংশই হচ্ছে এই মেক্সিকান। একটা কথা এখানে না বললেই নয়। যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অভিবাসীদের দেশ। শত-শত বছর আগে এ দেশে মূলত ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা এসে বসবাস করতে শুরু করে। এই যুক্তরাষ্ট্রের মূল অধিবাসী ছিল ‘রেড ইন্ডিয়ান’। তাদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন একটা সীমিত কোটায় এসে পৌঁছেছে। তাদের ক্ষুদ্র একটা অংশ এখন নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করে। মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ কম। আজকের যে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতিÑ এই যুক্তরাষ্ট্রকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে ওই শ্বেতাঙ্গ অভিবাসী ও তাদের পরবর্তী বংশধররা। শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা এখানে যেসব কোম্পানি পরিচালনা করছে, এর মূলধনের পরিমাণ বছরে ৭৭৫ মিনিয়ন ডলার। তারা আয় করে বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলার। প্রতি ১০ কর্মীর মধ্যে একজন অভিবাসী। প্রতিবছর স্থায়ীভাবে এ দেশে থাকার অধিকার পান ৩ লাখ ৭৬ হাজার অভিবাসী। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন। তবে কোনো দেশই শতকরা ৭ ভাগের বেশি অভিবাসীর কোটা অতিক্রম করতে পারে না। ২০১৩ সালে ‘গ্রিন কার্ড’ দেওয়া হয়েছে ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন (৪৩ লাখ) অভিবাসীকে। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন। ২০০৮ সালে যেখানে ৫০ হাজার চিনা ছাত্র দেশে ফিরে গেছে, সেখানে ২০১১ সালে ফিরে গেছে ১ লাখ ৮০ হাজার। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ২৮ ভাগ ব্যবসা শুরু করেছেন অভিবাসীরা। অথচ জনসংখ্যার মাত্র ১২ দশমিক ৯ ভাগ তারা। শীর্ষ ৫০০ বড় কোম্পানি বা ব্যবসার মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ প্রথম জেনারেশনের অভিবাসী বা তাদের সন্তানরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব কোম্পানির মধ্যে আছে, অঞ্ঞ, ঢ়ৎড়পঃবৎ ড়ভ এধসনষব, এড়ষফসধহ ংধপযং, ঢ়ভরুবৎ, বইধু, এড়ড়মষব, ষহঃবষ, কৎধভঃ, ঈরমহধ, শড়যষ ইত্যাদি। চিন্তা করা যায়, বিশ্বব্যাপী নামকরা এসব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীরা! শুধু তাই নয়Ñ পরিসংখ্যান আরও বলছে, বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একটা বড় অংশ এই অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে। যেমনÑ বলা যেতে পারে সিমেন্সের কথা। ফরচুন ম্যাগাজিনের গবেষণায় দেখা গেছে, এই কোম্পানির ৬৩ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করেন অভিবাসীরা। গবৎপশ-এর ক্ষেত্রে ৬৫ ভাগ, ঈড়ংপড়-এর ৬০ ভাগ, এবহবৎধষ ঊষবপঃৎরপ-এর ৬৪ ভাগ, ছঁধষপড়স-এর ৭২ ভাগ অভিবাসীরা নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং বারাক ওবামা যখন অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন, এর পেছনে একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন কারণে। প্রায় ৫ লাখ নাগরিকÑ যাদের একটা বড় অংশ মেক্সিকো তথা লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের অধিবাসী এবং স্প্যানিশভাষী, তারা এই সুযোগ পাবেন। তাদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু ‘গ্রিন কার্ড’ দেওয়া হবে না। অথাৎ স্থায়ী থাকার অধিকার তারা পাবেন না। ফলে এই অবৈধ বসবাসকারীদের আর তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। বেশি সুযোগ তারা পাবে, যারা শিশু অবস্থায় এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু মা-বাবা অবৈধ থাকায় তারাও অবৈধ হয়ে গেছে। অনেকে আছেন, ১০ বছর থাকার পরও তাদের ‘গ্রিন কার্ড’ হয়নি। ওবামার এই ঘোষণা তাদের কাজ করার অনুমতি দেবে। তবে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি আপাতত দেবে না। দুই ক্যাটাগরিতে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক. কৃষি শ্রমিক। তারা কাজ করার বৈধ অনুমতি পাবেন। নিউইয়র্কের আপার স্টেটে বাংলাদেশিদের বেশ কয়টি কৃষি ফার্ম রয়েছে। এখানে বাংলাদেশিরাই কাজ করেন। তারা নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সবজির জোগান দেন। এখানে অবৈধ কিছু বাংলাদেশি কাজ করেন। তারা কাজ করার অনুমতি পাবেন। তবে বেশি সুযোগ পাবে মেক্সিকানরা। তারা প্রচুর সংখ্যায় এ দেশে আছে। কৃষি শ্রমিক থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমে তাদের অংশগ্রহণ বেশি। কোনো আমেরিকান বেকার থাকলেও সাধারণত এসব কাজ তারা করে না।সাধারণত কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বেকার, কাজ না করার মানসিকতা বেশি। তারা শিক্ষা-দীক্ষায়ও বেশি দূর যেতে পারে না। ফলে তাদের ভাগ্যে ভালো চাকরি জোটে না। স্কুলের সীমানা পার হতে পারে না অনেকেই। তাই বেকার জীবন তাদের বেছে নিতে হয়। বেছে নিতে হয় ‘ঘেটো’ জীবন। মিসৌরিতে যেখানে মাইকেল ব্রাউনের হত্যাকা- ঘটেছিল, ওই এলাকা কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত। সেখানে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম। এখন ওই একটি ঘটনায় বৈষম্যের বিষয়টি আবার সামনে এলো। এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটল না। এর আগেও ঘটেছে। এতে উচ্চমহলে কোনো বড় উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্ট ওবামা এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন, ধৈর্য ধরতে বলেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা আছে। তবে তারা শক্তিশালী নয়। তাদের রাজনৈতিক শক্তিও দুর্বল। হঠাৎ করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আবার তা থেমেও যায়। ফার্গুসনের ঘটনার এভাবেই অবসান হবে। তবে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বৈষম্য ও দ্বন্দ্ব থেকেই যাবে। Daily Amader Somoy 08.12.14

বিজয়ের ৪৪ বছর : বৈদেশিক নীতিতে সফলতা ও ব্যর্থতা




বিজয়ের ৪৪ বছরে পা দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন, তা হচ্ছে আমাদের জাতীয় স্বার্থ। এই জাতীয় স্বার্থের আলোকেই আমাদের ৪৪ বছরের বৈদেশিক নীতির সফলতা ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা করতে হবে। এই ৪৪ বছরে বৈদেশিক নীতিতে সফলতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। তবে একটি সফল পররাষ্ট্রনীতির জন্য যে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন ছিল, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। কোনো কোনো ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি ছিল প্রবল, যা কোনো জাতীয় ঐকমত্যের জন্ম দিতে পারেনি। গত ৪৪ বছরের রাজনীতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বারবার আলোচিত হয়েছে এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এই সম্পর্ক একটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল নানা মাত্রিক। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়েছে, এটা বলা যায়। বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন যে একটি ফ্যাক্টর ও বাংলাদেশ যে চীনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, এটা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তেমন উন্নত হয়নি। বেশ কয়েকটি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বিভক্তি বেশ স্পষ্ট।

বৈদেশিক নীতিতে সফলতার কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয়, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি শুধু উজ্জ্বলই করেনি, বরং বলা যেতে পারে বাংলাদেশ যে একটি 'সফট পাওয়ার'-এর দেশ এ কথাটা প্রমাণ করেছে। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে বাংলাদেশের প্রশংসা আমরা শুনতে পেয়েছি। বাংলাদেশ যে মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে তেমনটি নয়, বরং সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও অবদান রেখেছে। নামিবিয়া কিংবা কম্পুচিয়ায় বিবদমান দলগুলোর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে একটি অনন্য ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী।

সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষাকে পরিচিত করতে সেনাবাহিনীর অবদানকে স্বীকার করা যায় না। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা এ জন্য যে মন্ত্রণালয় এটিকে পুঁজি করে মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশের স্বার্থকে আরো সম্প্রসারিত করতে পারেনি। লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনে আমাদের স্বার্থ রয়েছে। পণ্যের বাজার, কৃষি বিশেষজ্ঞদের কর্মক্ষেত্র তৈরি, ডাক্তার কিংবা আইটি প্রফেশনালদের জন্য একটি বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে দু-দুবার নির্বাচিত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য সম্মানের। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় নির্বাচিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। কিন্তু এই রিজার্ভের সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। একটা আশার কথা- সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা গেলেও বাংলাদেশ প্রায় ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতির চাকা ঘুরেছে; যদিও এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেখানে দক্ষ শ্রমশক্তির একটা বাজার থাকলেও এ ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং অদক্ষ শ্রমিকরা যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তার প্রতিকারের ব্যাপারেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মহাজোট সরকারের সময় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছে। ট্রানজিট (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডর) নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিতর্ক থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে তা কার্যকরও হয়েছে, যদিও ট্রানজিট ফি এখনো নির্ধারিত হয়নি। বলা হচ্ছে ট্রানজিটের বিষয়টি বহুপাক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনো ট্রানজিট পায়নি। ভারতের এ দুটি দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কথা। কিন্তু এরই মধ্যে ওই সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে- এ তথ্য আমাদের জানা নেই। এমনকি ভারতের 'সাত বোন' রাজ্যগুলো কর্তৃক চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্য খালাস করতেই হিমশিম খাবে। এ ক্ষেত্রে সাত বোন রাজ্যের পণ্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভারত অবকাঠামো খাতে যে ঋণ দিয়েছে, তাও বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণের মতোই এই ঋণ দিয়ে ভারতীয় পণ্য ও সেবা কিনতে আমরা বাধ্য। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যে উন্নয়ন ও সহযোগিতা-সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার গুরুত্ব অনেক বেশি। ওই চুক্তিতে যে 'ভাষা' ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হয়েছে বেশি করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। গত প্রায় ছয় বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের পাল্লাটা ভারী, বাংলাদেশের প্রাপ্তি তুলনামূলক বিচারে কম। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তিস্তা চুক্তি এখনো হয়নি। সীমান্তে বিএসএফ দিয়ে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি।

বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ও ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের ব্যাপারেও কোনো সমাধান হয়নি। ভারত আমাদের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। এতে ১৩টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির একটি চুক্তি হলেও তাতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে ওই সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল কম। যৌথ অংশীদারি সংলাপ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং জলদস্যুতার মতো আন্তর্দেশীয় অপরাধবোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিশ্লেষকের লেখনীতে এটা বেরিয়ে এসেছে যে এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে একটি জোট গড়ে তোলার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান মার্কিন প্রভাব, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে ওঠার আলোকেই হিলারির সফরকে বিশ্লেষণ করা যায়। হিলারির ওই সফরেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের সব পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের যে দাবি, তা এখন বাতিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র 'টিফা'র বদলে এখন 'টিআইসিএফ' (ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম) চুক্তি করতে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ 'মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন' (এমসিসি) থেকে ভবিষ্যতে সাহায্য পাবে- এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও আমরা পাইনি। তবে হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যে আমি আশাবাদী। তরুণদের সঙ্গে এক আড্ডায় তিনি বাংলাদেশকে একটি Soft Power হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। যেকোনো বিবেচনায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। বিশ্ব শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে কিংবা আরএমজি সেক্টরে বিশ্ব আসরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি 'শক্তি' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। হিলারি ক্লিনটন সেটিই স্বীকার করে গিয়েছিলেন। যাঁরা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের উচিত হবে বাংলাদেশের এই অর্জনকে ধরে রাখা। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার নিশ্চিত হওয়ায় এই সম্ভাবনা এখন আরো বাড়ল। তবে যেতে হবে অনেক দূর। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে এরই মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। রানা প্লাজায় এক হাজার ১২৭ জন পোশাককর্মীর মৃত্যু, গার্মেন্টশিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালু, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড, গার্মেন্টশিল্পে শ্রমমান বজায় রাখার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ড. ইউনূস ইস্যু। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে।

অতি সম্প্রতি একজন সিনিয়র মন্ত্রীর নিশা দেশাই কিংবা মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা কোনো অবস্থায়ই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করা অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু আমরা সেই সুযোগটি করে দিয়েছি। তবে কোনো নীতিনির্ধারক শালীনতাবর্জিত কথা বলবেন, সেটাও কাম্য নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিশ্বে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হলেও প্রধানমন্ত্রীর চীন ও জাপান সফর এই নেতিবাচক ধারণা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা হলেও সাহায্য করেছে। জাপান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আর্থিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। জাপানের কাছ থেকে আমরা বড় ধরনের সাহায্য পেয়ে থাকি এবং প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময়ও এই সাহায্যের ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চীনের পররাষ্ট্রনীতি এখন ব্যবসানির্ভর। 'আইডোলজি' এখানে প্রাধান্য পায় না। ফলে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ সব কিছুই আবর্তিত হচ্ছে চীনের ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণের আলোকে। বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বিসিআইএমের (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার) ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহী এবং এ লক্ষ্যে একটি টিম কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে বিশাল মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গড়ে উঠছে, সেই বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।

৪৪ বছর একটি রাষ্ট্রের জন্য কম সময় নয়। এই সময়সীমায় বৈদেশিক নীতিতে যেমন সফলতা এসেছে, ঠিক তেমনি ব্যর্থতাও একেবারে কম নয়। তবে বাংলাদেশকে এখন তাকাতে হবে ২০৫০ সালের দিকে। সনাতন বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি বাড়াতে হবে। একটি বিশেষ দেশ বা বিশেষ এলাকাকে কেন্দ্র করে বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করলে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে ব্যর্থ হব। মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক নীতির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি দেশ তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে জাতীয় স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে, এ প্রশ্ন উঠবেই।
Daily Kalerkontho
 07 December 2014, Sunday

অভিবাসী প্রশ্নে ওবামার নির্বাহী আদেশের ব্যবচ্ছেদ

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিবাসীদের বৈধতা নিয়ে যে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, তা ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমি অনেক বাংলাদেশী-আমেরিকানের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা আদৌ খুশি নন। এমনকি ওবামার এ আদেশ পুরো জাতিকেই দুভাগে ভাগ করে দিয়েছে। রিপাবলিকানরা এতে আদৌ খুশি নন। ওবামা এ নির্বাহী আদেশ জারি করলেন এমন এক সময় যখন মার্কিন কংগ্রেসে তার পূর্ণ সমর্থন নেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল ডেমোক্রেটিক পার্টি হেরে গেছে। অর্থাৎ কংগ্রেস এবং হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে (প্রতিনিধি পরিষদ) ডেমোক্রেটিক পার্টির কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এর অর্থ হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ওবামা চাইলেও কোনো আইন কংগ্রেসে পাস করাতে পারবেন না। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এর বিরোধিতা করবে। তবু ওবামা রিপাবলিকানদের চ্যালেঞ্জ করে এ নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। রিপাবলিকানরা খুব সহজে এটা মেনে নেবে এমনটি কেউই মনে করছেন না। ফলে এ অভিবাসী প্রশ্নেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কংগ্রেসের দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে।মার্কিন সমাজের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অভিবাসন। অভিবাসীরা বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন এবং নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছেন। আপনি যদি নিউইয়র্কের সাবওয়েতে (মেট্রো রেল) ভ্রমণ করেন, তাহলে দেখবেন বিভিন্ন জাতির মানুষ। এরা সবাই শ্বেতাঙ্গ বটে, কিন্তু বিভিন্ন দেশ থেকে এসে বংশপরম্পরায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এদের সন্তানরা নতুন আমেরিকার জন্ম দিয়েছে। আদি আমেরিকান বলতে কেউ নেই। আদি আমেরিকান, অর্থাৎ রেড ইন্ডিয়ানরা এখন নির্দিষ্ট এলাকায়, অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন। কয়েক বছর আগে নিউমেক্সিকো রাজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সৌজন্যে রেড ইন্ডিয়ানদের একটি গ্রাম দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এরা সংখ্যায় কম। মূলধারায় বিচরণ করেন না। উচ্চশিক্ষাও তেমন নেন না। এদের মধ্য থেকে অতীতে কখনও কেউ সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। তবে এদের গ্রামের একজন গভর্নর আছেন। তাদের প্রশাসন তারা নিজেরাই চালান। সরকার তাদের আর্থিক সহযোগিতা করে। এর বাইরে আইরিশ, স্কটিশ, পোলিশ, রাশিয়ান, মেক্সিকান, ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা বেশি। তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন।নিউইয়র্কে সম্ভবত প্রায় ১০০ দেশের অভিবাসী বসবাস করছেন। এ নগরীরও তাদের প্রয়োজন রয়েছে। এদের ছাড়া নিউইয়র্ক শহর চলবে না। এরা সস্তায় শ্রম দেন। আমি ম্যানহাটনে একজনকে পেয়েছিলাম, যিনি ভালো ইংরেজি বলতে পারেন না। রাস্তায় নির্মাণ কাজ করেন। শ্বেতাঙ্গ। কিন্তু গ্রিনকার্ড হোল্ডার। এ ধরনের কাজ অভিবাসী শ্বেতাঙ্গদের সন্তানরা করবে না। ম্যানহাটনে যে হাসপাতালে আমি চিকিৎসা নিয়েছি, সেখানে একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী আলিয়া মন্টেনেগরো থেকে এসেছিলেন ৪০ বছর আগে। এখন পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি মুসলমান। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের ভাড়া বাড়িতে থাকেন। কেননা শহরে থাকার সামর্থ্য তার নেই। এ নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে শত শত সুউচ্চ ভবন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখায় তিনি অবদান রাখছেন। এদের ছাড়া বড় বড় শহর অচল। এখন রিপাবলিকানরা যতই বিরোধিতা করুক না কেন, এদের প্রয়োজন আছে।এ অভিবাসী কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখছেন। ফরচুন ম্যাগাজিনের ১৬ জুন সংখ্যায় (২০১৪) জেনিফার আলসেভারের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে (ইমিগ্রেন্টস : অ্যামেরিকাস জব ক্রিয়েটার)। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না অভিবাসীদের অংশগ্রহণ ছাড়া। তিনি ওই প্রবন্ধে বেশকিছু পরিসংখ্যানও দিয়েছেন। পরিসংখ্যানে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা অনেকটা এরকম : ১. অভিবাসীরা যেসব কোম্পানি পরিচালনা করছেন, তার মূলধনের পরিমাণ বছরে ৭৭৫ বিলিয়ন ডলার। আর আয় করেন ১০০ বিলিয়ন ডলার; ২. প্রতি ১০ জন কর্মীর মাঝে একজন অভিবাসী; ৩. প্রতিবছর স্থায়ীভাবে এ দেশে থাকার অধিকার পান ৩ লাখ ৭৬ হাজার অভিবাসী; ৪. ২০১৩ সালে গ্রিনকার্ড দেয়া হয়েছে ৪৩ লাখ অভিবাসীকে। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ; ৫. ২০০৮ সালে যেখানে ৫০ হাজার চীনা ছাত্র দেশে ফিরে গেছে, সেখানে ২০১১ সালে ফিরে গেছে ১ লাখ ৮০ হাজার জন; ৬. ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ২৮ ভাগ ব্যবসা শুরু করেছে অভিবাসীরা, অথচ তারা জনসংখ্যার মাত্র ১২ দশমিক ৯ ভাগ; ৭. শীর্ষ ৫০০ বড় কোম্পানির মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী বা তাদের সন্তানরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে AT&T, Procter & Gamble, Goldman Sachs, Pfizer, eBay, Google, Intel, Kraft, Cigna, Kohl ইত্যাদি। চিন্তা করা যায়, বিশ্বব্যাপী নামকরা এসব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীরা। শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যান আরও বলছে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একটা বড় অংশ এসব অভিবাসীর নিয়ন্ত্রণে। যেমন বলা যেতে পারে সিমেন্সের কথা। ফরচুন ম্যাগাজিনের গবেষণায় দেখা গেছে, এ কোম্পানির ৬৩ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে অভিবাসীরা। Merck-এর ক্ষেত্রে ৬৫ ভাগ, CISCO-এর ৬০ ভাগ, General Electric-এর ৬৪ ভাগ, Qualcom-এর ৭২ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে অভিবাসীরা।
সুতরাং বারাক ওবামা যখন অভিবাসীদের বৈধতা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন, তখন এর পেছনে একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে নানা কারণে। প্রায় ৫ লাখ নাগরিকের, যাদের একটা বড় অংশ মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের অধিবাসী এবং স্পেনিশ ভাষাভাষী, তারা এ সুযোগ পাবেন। তাদের কাজ করার অনুমতি দেয়া হবে। কিন্তু গ্রিনকার্ড দেয়া হবে না। অর্থাৎ স্থায়ী থাকার অধিকার তারা পাবেন না। ফলে এসব অবৈধ বসবাসকারীকে আর তাদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। বেশি সুযোগ পাবে তারা, যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছে; কিন্তু বাবা-মা অবৈধ থাকায় তারাও অবৈধ হয়ে গেছে। অনেকে আছেন, যাদের ১০ বছর থাকার পরও গ্রিনকার্ড হয়নি। ওবামার এ ঘোষণা তাদের কাজ করার অনুমতি দেবে। কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি আপাতত দেবে না। দুই ক্যাটাগরিতে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক. কৃষি শ্রমিক। এরা কাজ করার বৈধ অনুমতি পাবে। নিউইয়র্কের আপার স্টেটে বাংলাদেশীদের বেশ কটি কৃষি ফার্ম রয়েছে। এখানে বাংলাদেশীরাই কাজ করেন। তারা নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশীদের সবজির জোগান দেন। এখানে কিছু অবৈধ বাংলাদেশী কাজ করেন। তারা কাজ করার অনুমতি পাবেন। তবে বেশি সুযোগ পাবে মেক্সিকানরা। তারা প্রচুর সংখ্যায় এ দেশে আছেন। কৃষি শ্রমিক থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমে তাদের অংশগ্রহণ বেশি। কোনো আমেরিকান বেকার থাকলেও সাধারণত এসব কাজ তারা করেন না। ফলে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সেক্টরে এদের প্রয়োজন আছেই। তবে বৈধতা পাওয়ায় অনেক সমস্যার জন্ম হবে। এক. অভিবাসীদের সন্তানরা তখন স্কুলে যাবে এবং তাদের স্কুলের খরচ রাজ্যগুলোকে বহন করতে হবে। রিপাবলিকানরা এতে আপত্তি তুলবে এবং তাতে সমস্যা হবে। দুই. সরকারি হাসপাতালগুলোকে তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এতে খরচ বাড়বে। ফেডারেল সরকারকে এ খরচ দিতে হবে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এ বাজেট বরাদ্দ দেবে না। তিন. অভিবাসীদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় আর্থিক সহায়তার প্রশ্নটিও আসবে। এখানে সবাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে। পরে চাকরি করে তারা তা পরিশোধ করেও দেয়। এখন যে অভিবাসীর সন্তান, সে তার বাবার ওয়ার্ক পারমিটের সুযোগে এখানে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা চাইবে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলশিক্ষা ফ্রি হলেও কলেজ শিক্ষা ফ্রি নয়। এখন রাষ্ট্র যদি তা না দেয়, তাহলে সংবিধানের দোহাই তুলে মামলা-মোকদ্দমা হতে পারে। অভিবাসনবিরোধীরা এ প্রশ্ন তুলতে পারে। এমনকি ডেমোক্রেট আইন প্রণেতাদেরও কেউ কেউ এটি চাইবেন না। কারণ ভোটের জন্য তাদের স্থানীয় জনগণের কাছে যেতে হয়। স্থানীয় জনগণ এটা চাইবে না। এমনকি কৃষ্ণাঙ্গরাও এটা পছন্দ করবে না। সুতরাং ওবামার এ ঘোষণা যে খুব জনপ্রিয় হয়েছে, এটা বলা যাবে না।ডিসেম্বরে বাজেট পাস হতে হবে। ওবামা তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করবেন। কিন্তু রিপাবলিকানরা তা অনুমোদন করবে না। ফলে এ ডিসেম্বরেই নতুন করেই দ্বন্দ্ব শুরু হবে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কংগ্রেসের। শাটডাউনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে আবার। কংগ্রেস বাজেট পাস না করলে অনেক ফেডারেল বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাবে গতবারের মতো। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই একটা শংকা থেকেই গেল। ইতিমধ্যে অনেক রিপাবলিকান নেতার কথায় এ বক্তব্যই প্রতিফলিত হয়েছে যে, তারা খুব সহজে ওবামার এ আদেশটি মেনে নেবেন না।ওবামার এ আদেশে বাংলাদেশীরা কতটুকু সুবিধা পাবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যেখানে ভারতীয় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা ৫ লাখ বলা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশী অভিবাসীর সংখ্যা কত, এর কোনো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী আছেন। তারা মূলত বড় বড় শহরে বসবাস করেন। তাদের অনেকে এ আদেশের আওতায় নাও আসতে পারেন। কেননা তাদের অনেকের বাবা-মা এ দেশে থাকেন না। ফলে এ আদেশ তাদের জন্য কার্যকর হবে না। তবে একটা আশংকা থেকেই গেল যে, তারা অবৈধ থেকে যেতে পারেন। তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা কার্যকর নাও হতে পারে। তবে অনেক ভারতীয় আছেন, যাদের সন্তানরা আইটি সেক্টরে পড়াশোনা করে। তাদের জন্য একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। গেল বছর যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী ৭২ হাজার অভিবাসীকে ডিপোর্ট করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই সব বাবা-মার প্রায় ৫ হাজার সন্তান এখন ফস্টার হোমে বসবাস করছে। সেখানকার টিভিতে Orange Is the New Black নামে একটি সিরিয়াল সম্প্রচারিত হয়। এতে অভিনয় করছেন মিস ডায়ানে গুয়েয়ারআরো। তিনি একজন অভিবাসীর সন্তান। তিনি ফস্টার হোমে বড় হয়েছেন। সিরিয়ালটি অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে। মিস ডায়ানের অভিনয় সবাইকে ছুঁয়ে যায়। ১৪ বছর বয়সে তার বাবা-মাকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একা একা বড় হওয়া ডায়ানে এখন দক্ষ অভিনেত্রী। এ ধরনের ডায়ানের সংখ্যা এখন অনেক।ওবামার নির্বাহী আদেশ অবৈধ অভিবাসীদের জন্য একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও তা অভিবাসীদের কতটুকু স্বস্তি দেবে, তা নিশ্চিত করে এখনই বলা যাচ্ছে না। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যখন কংগ্রেসের অধিবেশন বসবে, তখনই বোঝা যাবে কংগ্রেস সদস্যরা প্রেসিডেন্টের এ আদেশকে কিভাবে দেখবেন। তবে বিষয়টি খুব সহজেই সমাধান হয়ে যাবে, এটা বলা যাবে না। কংগ্রেসকে একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে। কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের প্রতি কতটুকু সম্মান দেখাবে- এ প্রশ্ন থাকলই। Daily Jugantor 04.12.14

এই প্রাণহানির বিচার কে করবে?

জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী মৃত্যুর খবরটি আমি পেয়েছি ঢাকা শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে। আমার পিএইচডি গবেষক জসিম আমাকে যখন মৃত্যু সংবাদটি দিল, তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, আমি আর টকশোতে জগ্লুল ভাইকে আমার সঙ্গে পাব না। মনে আছে যুক্তরাষ্ট্র আসার আগের দিন রাতে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেদিন ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর, রোববার। একুশের রাতে আমি আর জগ্লুল ভাই ছিলাম অতিথি। উপস্থাপক পান্না আর প্রযোজক রবি অনেকটা জোর করেই অনুষ্ঠানটা করলেন। কেননা পরদিন আমার ফ্লাইট এবং জগ্লুল ভাইও যাবেন আমেরিকাতে মেয়ের কাছে। রবির রুমে চা পান করতে করতে জগ্লুল ভাইকে আমার ডালাসের নাম্বার দিয়েছিলাম। বলেছিলাম ফোন করতে। তারপর আমি জানিও না জগ্লুল ভাই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন কিনা। কাকতালীয়ভাবে প্রযোজক রনিও নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে ডালাসে রনির কথাও হয়েছে। কিন্তু জগ্লুল ভাইয়ের সঙ্গে আর কথা হয়নি।>যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ওবামা খুব শিগগিরই কংগ্রেসের সঙ্গে এক বিতর্কে জড়িয়ে যাবেন। এই ডিসেম্বরেই বাজেট পাস হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেবেছি নিশ্চয়ই কোনো চ্যানেল এই বিষয়টি নিয়ে অনুষ্ঠান করবে। তাছাড়া ওবামা আসছেন ভারতে। সুতরাং একটা প্রোগ্রাম হবে এবং অবধারিতভাবে জগ্লুল ভাই আমার সঙ্গে থাকবেন। অনেকবার এটা ভেবেছি। কিন্তু জসিম যখন আমাকে দুঃসংবাদটি দিল, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। জগ্লুল ভাইয়ের মতো একজন প্রবীণ সাংবাদিককে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এটা তো হত্যাকাণ্ড! এর বিচার কে করবে? ইতোমধ্যে কতবার আমরা এই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে লিখেছি। কত সহস্রবার সম্পাদকীয়, উপসম্পাকীয় লেখা হয়েছে। কত শতবার সেমিনার হয়েছে। কিন্তু কেউ সাহস করে পরিবহন চালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারল না। মিশুক মুনীরের  মৃত্যুর পর মৌন গণজমায়েত হয়েছে। প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু ঘাতক ওই ড্রাইভার এখন ‘মুক্ত’। এ দেশের আইন এ দেশের সমাজ ঘাতকদের বিচার করতে পারেনি। কেননা ঘাতকরা সরকারি নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকে। আইন, বিচার বিভাগ ঘাতকদের ছুঁতে পারে না। যেখানে মন্ত্রী নিজে বলেন, ‘ড্রাইভাররা গরু-ছাগল চিনলেই যথেষ্ট। তাদের সড়কে চলাচলের জন্য নির্দেশিকা পড়ার দরকার নেই,’ তখন ভাবতে কষ্ট লাগে ওই মন্ত্রী দিব্যি&এখনো ক্ষমতায় আছেন! মনে আছে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন পত্রিকায় ওই মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলন। তার পরের খবর অনেকেই স্মরণ করতে পারেন-মামুন ভাইয়ের বিরুদ্ধে জুতা মিছিল হয়েছিল। জগ্লুল ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু তাতে কার কী এসে যায়মিডিয়া জগতে জনপ্রিয় একটি মুখ জগ্লুল চৌধূরীর মৃত্যু যদি এভাবে হয় এবং ঘাতককে যদি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না যায়, তাহলে এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। জগ্লুল ভাইয়ের এমন মুত্যু একেবারে সাদাচোখে দেখলেও তা মৃত্যু নয়। সে ফ হত্যাকান্ড। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু বিচার হবে এই আস্থাটা রাখতে পারছি না। অতীতে কোনো একটি সড়ক হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি। একটিরও না। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বিচার পাননি তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের। পাননি মিশুক মুনীরের পরিবার। পাননি হাজার হাজার মা-বাবা-ভাই-বোন-স্বামী যাদের এ সমাজ চেনে না। আর বিচার না পাওয়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে।>অদক্ষ বাস চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এদের যারা চালায় তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সিঁড়িতে এদের অবস্থান। যখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্ন ওঠে, ঠিক তখনই এরা পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। জিম্মি করে ফেলে তারা সাধারণ মানুষদের। এক সময় মানুষ বাধ্য হয়ে মেনে নেয় এটা নিয়তির বিধান বলে। এক সময় ভুলেও যায়। জগ্লুল ভাই মিডিয়ার মানুষ। কিন্তু তার পরও মিডিয়া ভুলে যাবে। অথচ মিডিয়া আজ যথেষ্ট শক্তিশালী। মিডিয়াই ঘাতক বাস চালককে খুঁজে বের করতে পারে। এই ঘটনায় একটা অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। কিন্তু বিচার হবে তা নিশ্চিত বলতে পারব না। কিংবা পুলিশ আদৌ কোনো তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে কিনা, সেটাও আমার অজানা। শুধু বলতে পারি পুলিশি তৎপরতা যথেষ্ট নয়। পুলিশ ইচ্ছে করলে খুঁজে বের করতে পারে। এটিএন নিউজ, যেখানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি না ফেরার জগতে চলে গেলেন, তারাও পারে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘাতককে খুঁজে বের করতে। এটিএন নিউজ কী তা করবে? যে যায়, সে চলে যায়। পৃথিবী কারোর জন্য বসে থাকে না। জগ্লুল ভাই চলে গেছেন। আগের মতোই সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কোথাও ছন্দপতন ঘটেনি। কিন্তু সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী যে দিন জগ্লুল ভাই মারা যান, তার পরের দিনও খোদ ঢাকা শহরে মারা গেছেন আরো দু’ব্যক্তি একইভাবে। মৃত্যুর এই বিষয়টি যেন স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারো যেন দেখার কিছু নেই। সংবাদপত্র আমাদের জানাচ্ছে ২০০৯ সাল থেকে এখন অবধি ১০২টি বড় সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। আর ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পুলিশ ভাষ্যমতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৮ হাজার ২৭০ জন। কিন্তু তার চাইতে অনেক বেশি মৃত্যুর সংখ্যা দিয়েছে বুয়েটের একটি গবেষণা সংস্থা- তাদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১১ সালে মারা গিয়েছেন ১৮ হাজার মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ আর থানা পুলিশ করে না। ফলে অনেক দুর্ঘটনার খবর পুলিশ জানে না ও তারা লিপিবদ্ধও করে না।জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর মৃত্যুর পর সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয় একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই ‘তদন্ত’ কমিটির ‘তদন্ত’ রিপোর্ট কোনোদিনই আলোর মুখ দেখবে না হয়তো। দায়সারা গোছের ওই তদন্ত কমিটি করা হয় শুধু সান্ত¡না দেয়ার জন্য। এই সব তদন্ত কমিটির ব্যাপারে কারোরই আগ্রহ থাকে না। যে পরিবার তাদের নিকট আত্মীয়দের হারিয়েছেন, তাদের তো নয়ই। ফলে কখনোই এ ধরনের কোনো তদন্ত কমিটি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এটা ঠিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাদের ওপর, তারা এক চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। শুধু সড়কে ‘হত্যাকাণ্ডই’ নয় বরং গত কয়েক বছর ঢাকা-শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। দায়িত্বশীলরা তা আর যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। অসহায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করছেন শুধু সড়কেই। এ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ হাজারটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও, ফলাফল শূন্য। এই যানজটের একটা বড় কারণ হচ্ছে বেপরোয়া বাস চালকদের যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো। এমনকি বড় বড় সড়কগুলোতে মানুষ হাত তুলে গাড়ি থামাচ্ছে। তারপর নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা বাস থামিয়ে নেমে যাচ্ছে। এ জন্য বাসের হেলপারটা যতটুকু দায়ী, তার চাইতে দায়ী কম নন যাত্রীরা। তারা নিয়ম-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা করছেন না। হাজারটা প্রতিবেদনে যানজটের কারণ হিসেবে এই বিষয়টি উল্লেখ করলেও, বাসস্ট্যান্ড ছাড়া বাস বা মিনিবাসের যেখানে সেখানে থামানো বন্ধ করা যাচ্ছে না। ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ মনে হয় হাল ছেড়ে দিয়েছে। যতদিন না যাত্রীদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাসে উঠতে বাধ্য করা যাবে, ততদিন পর্যন্ত সড়কে এই যানজট থাকবেই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গত বেশ কিছুদিন ধরে সাধারণ পথচারীদের অবৈধ রাস্তা পার, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে চলাচল কিংবা ওভারব্রিজ ব্যবহার না করায় দ্রুত ফাইনের ব্যবস্থা করছে। এটা নিঃসন্দেহে এ প্রশংসার দাবিদার। তবে এই প্রক্রিয়া সারা বছর চালু রাখতে হবে। এতে পথচারীদের মাঝে এক ধরনের ভয় ও আইন মেনে চলার প্রবণতা কাজ করবে। এক সময় পুলিশের ভয়েই হোক অথবা ফাইনের ভয়েই হোক নিয়মানুযায়ী চলাচল করবে। এখন পুলিশ যদি বাস ও মিনিবাস চালকদের ব্যাপারে এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেয়, আমার বিশ্বাস এতে বেপরোয়া চালকরাও এক ধরনের ভয়ের মাঝে থাকবে এবং সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে। ঢাকায় প্রচুর মানুষ বেড়েছে। প্রশাসনের একটা বড় ব্যর্থতা যে, সরকার ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। গাড়ি চালকদের একাধিকবার জরিমানা করে ও সতর্কবাণী জারি করা সত্ত্বেও তাদের কোনো অবস্থাতেই নিয়মের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। মহাসড়কের অবস্থা আরো খারাপ। বাস চালকদের মাঝে সড়কে দ্রুত চলার প্রতিযোগিতা হাজারটা দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। আমরা বারবার বলে আসছি সড়ক ও মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানোর কথা। কিন্তু তা হয়নি। কাগজ-কলামে হাইওয়ে পুলিশের অস্তিত্ব রয়েছে বটে। কিন্তু তাদের কোন ভূমিকা নেই। তারা কোথায় ডিউটি করেন, এটা একটা প্রশ্ন বটে। মহাসড়কে কোথাও কোথাও সিসিক্যামেরা বসানো, স্পিডব্রেকারের সংখ্যা বাড়ানো, কত মাইল স্পিডে গাড়ি চালানো যাবে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশকে পরামর্শ দেয়া হলেও, সুনির্দিষ্টভাবে পুলিশ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বলা যাবে না। এসব পরামর্শ কাগজ-কলামেই থেকে গেছে। বিদেশের উদাহরণ আমরা দেব না। মেক্সিকোর মতো দেশেও আমি দেখে এসেছি সেখানে নির্দিষ্ট স্পিডেই গাড়ি চালাতে হয়। স্পিড কেউ বাড়ায় না টহলরত পুলিশের ভয়ে। আমাদের এখানে মহাসড়কে টহল পুলিশ দেখি না। ঢাকা-সাভার মানিকগঞ্জ মহাসড়কে প্রায়শই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারপরও হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়েনি। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকটের প্রশ্ন তোলা হয়। এই প্রশ্নও অবান্তর। যে জনবল আছে, এর সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমেই সড়ক-মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।জগ্লুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় ৩০ বছরের। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থাকা অবস্থাতেই যখন লেখালেখি করতাম, তখন থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। আরেকটি সম্পর্কও ছিল। তিনি ও তার স্ত্রী উভয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন, যেখান থেকে আমিও পাস করেছি। তার স্ত্রীও খুব সম্ভবত সহযোগী অধ্যাপক পদে থেকেই অবসরে গিয়েছিলেন। প্রেসক্লাবে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতো। আমি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক জটিল বিষয়, তত্ত্বের বিষয়ে সাধারণ পাঠকদের কাছে সাধারণভাবেই উপস্থাপন করতাম। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর আমার নিজের লেখা বেশ কটি বইও রয়েছে। জগ্লুল ভাই এ সবের প্রশংসা করতেন। কোনো একটি লেখার সূত্র ধরেই বিষয়ের গভীরে যেতে চাইতেন আমার সঙ্গে আলাপচারিতায়।আগ্রহ ছিল তার বেশি। আমি তাকে বিভিন্ন জার্নালের কথা বলতাম, যেখানে ভালো মূল্যায়ন পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির। তিনি সেসব পড়তেন। বয়স খুব একটা না হলেও কিছুটা দুর্বল তাকে আমি দেখেছি সাম্প্রতিক সময়গুলোতে। বোধকরি তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। তবে মানুষের আয়ু বেড়েছে। ৬৫ বছর বয়স কোনো অবস্থাতেই বেশি বয়স বলা যাবে না। মানুষের জন্ম হয় মৃত্যুর জন্যই। কিন্তু এ কেমন মৃত্যু? বাস চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিং এর কারণে তার মতো একজন মানুষকে না-ফেরার দেশে নিয়ে গেল। আমি জানি এই মৃত্যু আমাদের সচেতন করবে না। রাষ্ট্র আরো সচেতন হবে না। মানুষ কিংবা যারা প্রশাসন চালান, তারা এক সময় ভুলে যাবেন। এটাই বোধকরি নির্মম সত্য যে পেছনের ঘটনাবলি আমরা মনে রাখি না। তবুও আবারো অনুরোধটি রাখতে চাই-যনবাহন চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা হোক। বেপরোয়া চালকদের দ্রুত আইনে বিচার এবং লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা করা হোক। যে কোনো দুর্ঘটনাকে (সড়কে) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে দ্রুত আইনে এর সব রকম ব্যবস্থা করা হোক। আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করে সড়কে এবং মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হোক। প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করা হোক। এই দাবিগুলো খুব বেশি নয়। যারা পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি করেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হোক। চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হোক। পুরনো মিনিবাস সড়ক থেকে তুলে ফেলা হোক। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হোক। ঢাকায় রাস্তা বাড়েনি। এখন আর বাড়ানো যাবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু গাড়ি বেড়েছে প্রচুর। গাড়ি চলাচলে যদি নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে যানজট কমানো সম্ভব।সড়ক দুর্ঘটনায় জগ্লুল ভাইয়ের মৃত্যু সর্বশেষ মৃত্যু এটা আমি বলতে চাই না। কিন্তু সবার মৃত্যুই যেন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এ প্রত্যাশা তো আমি করতেই পারি। যাদের স্বেচ্ছাচারিতা-অদক্ষতা-অযোগ্যতা-উন্মত্ততার কারণে অহরহ প্রাণ ঝরে যাচ্ছে তাদের যদি কঠোর দণ্ড নিশ্চিত করা না যায় তাহলে এমন অনাকাক্সিক্ষত-অনভিপ্রেত-মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সরকারকে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। Daily Manobkontho 04.12.14

ওবামার ভারত সফর ও প্রসঙ্গ কথা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং জানুয়ারিতে রিপাবলিকান ডে অনুষ্ঠানে নয়াদিল্লিতে উপস্থিত থাকবেন। হোয়াইট হাউস বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বলা ভালো, সেপ্টেম্বরে (২০১৪) মোদি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর তিনি বারাক ওবামার আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন যান এবং ওবামার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হন। তখন মোদি তাকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। ওবামা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ওবামা এর আগেও নয়াদিল্লি সফর করেছেন। ২০১৫ সালের প্রথমদিকে তিনি আবারও যাবেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। পরিস্থিতি যা তাতে রিপাবলিকানদের পাল্লা ভারি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে (নভেম্বর ২০১৪) রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ঘটেছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে ওবামা যখন ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান, তখন অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়। এক. যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নিম্নের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকাও তেমন গুরুত্ব পায়নি। দুই. এর আগে ওবামা চীন সফরে গিয়েছিলেন। কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাসের ব্যাপারে চীন-যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি হয়েছে সত্য; কিন্তু অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তিন. ভারত ও চীন বিশ্বের উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি। এ দুই শক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করবে। চীন ও ভারত উভয়েই এশিয়ার উঠতি শক্তি। মোদি নিজে একদিকে চীন, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছেন। সেপ্টেম্বরে তার যুক্তরাষ্ট্র সফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ তিন সরকারের (চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যকার সম্পর্ক বেশ কিছু দিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের মাঝে আলোচিত হতে থাকবে। একদিকে চীন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উভয় শক্তির পাশে ভারসাম্য রক্ষা করে ভারতের স্বার্থ মোদি কতটুকু রক্ষা করতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়। ভুলে গেলে চলবে না, ভারত ও চীন উভয়ই 'ব্রিকস' এর সদস্য। 'ব্রিকস' সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে একটি ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার, যা ২০১৬ সাল থেকে কাজ শুরু করার কথা। উপরন্তু চীন নতুন করে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের সময় (২০১৪) একই সময়ে তিনি মালদ্বীপ ও শ্র্রীলঙ্কাও সফর করেছেন। এ দুটি দেশে বিপুল চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্টের পাকিস্তানেও আসার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি পাকিস্তানে যাননি বটে। কিন্তু চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও চীন সফর করে এসেছেন। এ অবস্থায় এটা বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা স্বার্থ বাড়ছে। ওয়াশিংটন এটা যে বোঝে না, তা নয়। এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াতে হলে ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের 'দূরত্ব' কমাতে হবে। ওবামা প্রশাসনের কাছে মোদির গুরুত্ব তাই অনেক বেশি। এরই মধ্যে আফগানিস্তানে একজন নয়া প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিয়েছেন। ২০১৪ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা থাকলেও নয়া আফগান প্রেসিডেন্ট নতুন একটি নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় আরও বেশ কিছু দিনের জন্য মার্কিনি সৈন্য রাখতে চান। এ ধরনের একটি চুক্তি করতে বিগত আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তখন একটি নয়া নিরাপত্তা চুক্তি ও ভারতীয় ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এটা অনেকেই জানেন, ওবামা প্রশাসন চাচ্ছে ভারত আফগানিস্তানে একটি বড় ভূমিকা পালন করুন। আফগানিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়নে কিংবা শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে ভারতের বড় ভূমিকা রয়েছে। যতদূর জানা যায়, আফগানিস্তানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটিও রয়েছে। এখন মোদি মার্কিনি স্বার্থ রক্ষা করে আফগানিস্তানের ব্যাপারে আরও বড় কোনো কর্মসূচি নেন কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। ফলে ওয়াশিংটনে মোদি-ওবামা শীর্ষ বৈঠক যে অনেকের কাছেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক। তবে এ বৈঠক কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে, এটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। প্রতিরক্ষা খাতে ১০ বছর মেয়াদি যে সহযোগিতা চুক্তি তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। দুই দেশের স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত। সমুদ্র নিরাপত্তার ব্যাপারে দুই দেশের মনোভাব এক ও অভিন্ন। এ ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, সে ব্যাপারেও চুক্তি হয়েছে। আজমীর, আহমেদাবাদ শহর আর বিশাখাপত্তম সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ করবে। সেইসঙ্গে ভারতের ছোট ছোট ৫০০ শহরে 'সোলার এনার্জি' চালু করবে যুক্তরাষ্ট্র। বেসরকারি খাতে এখানে বিনিয়োগ বাড়বে। সন্ত্রাস দমনেও দুই দেশের মনোভাব এক। লস্কর-ই-তৈয়্যেবা, জয়স-ই-মোহাম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠনে অর্থায়নের ব্যাপারটি গুরুত্ব পেয়েছে বেশি। এ জঙ্গি সংগঠনে অর্থায়ন বন্ধে দুই দেশই কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে। বেসরকারি খাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ব্যাপারে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে কোনো কোনো ইস্যুতে ভারতের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেনি ওবামা প্রশাসন। বিশেষ করে ইরাক-সিরিয়ায় ইসলামিক জঙ্গী গোষ্ঠী। ইসলামিক স্টেটের আগ্রাসন রোধে ১৫ দেশীয় যে আন্তর্জাতিক একটি অ্যালায়েন্স গঠিত হয়েছে ওবামা প্রশাসন চেয়েছিল ভারত সেই অ্যালায়েন্সে যোগ দিক। কিন্তু ভারত তাতে রাজি হয়নি। যদিও খোদ ভারতের নিরাপত্তাও আজ হুমকির মুখে। আল কায়দার উপমহাদেশীয় শাখা গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারকে এ শাখার আওতায় আনা হয়েছে। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে যে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে সুনি্ন জঙ্গি গোষ্ঠী 'ইসলামিক স্টেট'র উত্থান ও আরব দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি কোয়ালিশন গঠিত হলেও ভারত এতে যোগ না দেয়ায় নিশ্চয়ই নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। ভারত আরব রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতে মুসলমান ধর্মাবলম্বী এক বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। মুসলমানদের সঙ্গে মোদি সরকারের সম্পর্ক ভালো, তা বলা যাবে না। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় মোদি নিজে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ওই দাঙ্গায় প্রায় ১ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। সম্ভবত মার্কিনি চাপ উপেক্ষা করে যে কোনো আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনে যোগ না দিয়ে মোদি সম্ভবত একটি মেসেজ দিতে চেয়েছেন। আর তা হচ্ছে, আইএস'র (ইসলামিক স্টেট) বিষয়টি আরব বিশ্বের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত কোনো অংশ হতে পারে না। উপরন্তু এতে করে ভারতের মুসলমানদের মধ্যে একটি ভিন্ন বার্তা পেঁৗছে যেতে পারে। ভারত এক্ষেত্রে একটি 'নিরপেক্ষ' অবস্থানই গ্রহণ করেছে। ভারতের এ ভূমিকাকে অনেকেই সমর্থন করবেন। ভারত যে মার্কিনি স্বার্থে সব সময় কাজ করে না, এটা আবারও প্রমাণিত হলো। ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়। শুধু জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনে যোগ না দেয়ার পাশাপাশি একটি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তির ব্যাপারে মোদি কোনো 'কমিটমেন্ট' করেননি। মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন- এমন অভিমত ভারতের নীতিনির্ধারকদের। অন্যদিকে টিপিপি চুক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশের সঙ্গেই এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। তবে কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে এখনও উপনীত হয়নি। টিপিপিতে ভারতের অংশগ্রহণ বা না থাকা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। কেননা এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে এতে ভারতের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে তা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইবে। এ জন্যই ওবামার ভারত সফর। ওবামা মিয়ানমারও সফর করেছেন। এখন মোদি সরকারে যদি অতি মাত্রায় মার্কিনি-ভীতি কাজ করে তবেই চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। এতে করে নতুন স্নায়ুযুদ্ধেই এরা জয়ী হতে পারে। মার্কিন নীতি এমনই আগ্রাসী হয়ে উঠছে। ইউক্রেন কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে। রাশিয়াকে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলার অংশ হিসেবেই ইউক্রেনকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ন্যাটোর ৫নং ধারাবলে ইউক্রেনকে নিরাপত্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ইউক্রেনে রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা বলে গণ্য করা হয়। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে 'অবিশ্বাসের' জন্ম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্নে নতুন কিছু খুঁজতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং চীন-যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহ থাকবে অনেকের। মোদির ওয়াশিংটন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছিল। আর এখন ওবামা আসছেন ভারতে। এ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগর এলাকায় তার নজরদারি বাড়িয়েছে। প্যাসিফিক এলাকা থেকে ছয়টি যুদ্ধ জাহাজ সরিয়ে এনে যুক্তরাষ্ট্র তা ভারত মহাসাগরে মোতায়েন করবে। ২০১৭ সালের মধ্যে এ মোতায়েন সম্পন্ন হবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ভারত মহাসাগর যে 'উত্তপ্ত' হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আওতায় বাংলাদেশও পড়ে। বাংলাদেশ ওই সম্পর্কের বাইরে থাকতে পারে না। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে তার পলিসি প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ওই সম্পর্কের বাইরে থাকতে পারে না। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে ভালো, তা বলা যাবে না। নানা ইস্যুতে সম্পর্ক আগের মতো নেই। বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মাঝে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কমিয়ে আনা প্রয়োজন। শীর্ষ পর্যায়ে কোনো মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশ ভ্রমণ করেননি। ওবামা বাংলাদেশ সফর করবেন-এমন প্রত্যাশা ছিল অনেকের। দুই দুইবার পাশের দেশ মিয়ানমারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসছেন। ভারতেও আসছেন। কিন্তু বাংলাদেশ এ তালিকায় বাদ পড়ল। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সেক্রেটারি অব স্টেটের বাংলাদেশ সফরও তাদের কার্যতালিকায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র নীতিতে এ ব্যর্থতা চোখে লাগার মতো। দুই দেশের মাঝে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই, তা সত্য। তবে জিএসপি সুবিধা না পাওয়ায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর খুশি নন। অন্যদিকে মার্কিন অনুরোধ উপেক্ষা করে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে আইএসবিরোধী কোনো জোটে যোগ দেয়নি। সব মিলিয়ে আমাদের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা প্রয়োজন। আগামীতে ভারত সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেয়া যায়। নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়টির দিকে নজর দিতে পারেন। মোদ্দাকথা, ওবামার আগামী ভারত সফর থেকে বাংলাদেশও ফায়দা ওঠাতে পারে। তবে ভারতের 'কৌশল'ও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে এক ধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করছে। এটাই আমাদের জন্য একটি 'শিক্ষা'। Daily Alokito Bangladesh 01.12.14

বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দেশীয় জঙ্গিবাদের স্বরূপ

সম্প্রতি জঙ্গিবাদ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ ছাপা হয়েছে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়। এগুলো দেশের জন্য কোনো ভালো সংবাদ নয়। ভারতের বর্ধমানের খগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় বলা হয়, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী জঙ্গিরা এর সঙ্গে জড়িত। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হল। তারপর ভারতীয় গোয়েন্দারা বাংলাদেশে এলেন। তারা বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন। মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ ভারতীয় পক্ষকে ১০ জঙ্গি ও ৪৯ জন সন্ত্রাসীর একটি তালিকা দিয়েছে, যারা পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধভাবে বসবাস করছে। তৃতীয় খবরটি এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সূচক ২০১৪ প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রকাশ করেছে ইন্সটিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস নামে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সূচক ২০১৪-এ ১৬২টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে।
এ তিনটি ঘটনাকে যদি একসঙ্গে মেলান যায়, তাহলে কতগুলো প্রশ্ন ওঠে। এক. বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আছে, এর অস্তিত্ব আছে এবং জঙ্গিরা বাংলাদেশের বাইরে ভারতেও তৎপর। এ ঘটনা বাংলাদেশের ইমেজের জন্য খারাপ। এতে করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নজরদারিতে চলে যাবে এবং আগামীতে বাংলাদেশের ওপর বৈশ্বিক চাপ আরও বাড়বে। দুই. তিনটি জঙ্গি সংগঠনের কথা মোটামুটিভাবে আমরা জানি এবং এদের তৎপরতা সীমিত আকারে হলেও আছে। জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম এবং আনসারুল্লাহ বাংলাটিম। এদের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা গেছে, এটা বলা যাবে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এদের তৎপরতার খবর মাঝে-মধ্যে সংবাদপত্রে ছাপা হয় এখনও। এখানে বাংলাদেশের পুলিশ তথা গোয়েন্দাদের ভূমিকার প্রশ্নটি চলে আসে। তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে, এই প্রশ্নটিও আছে। সরকার পুলিশ প্রশাসনের জন্য অনেক কিছু করেছে। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে সিনিয়র পদ অনেক বাড়ানো হয়েছে। এতে করে কি তাদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো গেছে? জঙ্গি দমনে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল দরকার। এখানে বেশ ঘাটতি আছে। এ বিষয়টির দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
একসময় র‌্যাব যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইকে গ্রেফতারের কৃতিত্ব র‌্যাবের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাবের কর্মকাণ্ড (সন্ত্রাস দমনে) তেমন চোখে পড়ে না। র‌্যাবকে অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপরন্তু র‌্যাবের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আসরেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে র‌্যাবকে দিয়ে জঙ্গি দমনের বিষয়টি এখন আর তেমনভাবে আলোচিত হয় না।
দুই. বাংলাদেশের জঙ্গিরা এখন পশ্চিমবঙ্গে তৎপর! এ খবরটি ভারতীয় গোয়েন্দাদের। এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে, তা বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের বর্ধমানে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশ যদি ভারতীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্যকে স্বীকার করে নেয়, তাহলে বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় চাপ আরও বাড়বে। একসময় ভারতীয় গোয়েন্দারা বাংলাদেশে এসে কাজ শুরু করবে! এতে করে বাংলাদেশের জঙ্গি দমনের ব্যর্থতা (?) প্রশ্নের মুখে থাকবে। বাংলাদেশের উচিত বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করা। তবে ভারতে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা আছে, বসবাস করে, এটা মোটামুটিভাবে স্পষ্ট। নিশ্চয়ই এসব সন্ত্রাসীর সঙ্গে ভরতীয় সন্ত্রাসীদের একটা যোগসূত্র আছে। এই যোগসূত্রটি ভেঙে দিতে হবে। বাংলাদেশের জঙ্গিরা ভারতে আশ্রয় নিতে পারে। সীমান্ত অতিক্রম করা কঠিন কিছু নয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা সৎ নন। তাদের ম্যানেজ করা কঠিন কিছু নয়। উপরন্তু চোরাকারবারিরাও রয়েছে। এদের ম্যানেজ করে বাংলাদেশের জঙ্গিরা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে পারে। এটা স্বাভাবিক। এখন বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের উচিত হবে তৎপরতা বাড়ানো।
তিন. জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ ও ভারতের খোলামন নিয়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। এই সহযোগিতায় যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না। এক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সুবিধা আদায় করে নিতে চাইবে। যা কি-না যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য ভালো খবর নয়।
চার. বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা দমনের স্বার্থে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম প্রশ্নে ঐকমত্য হওয়া প্রয়োজন। না হলে জঙ্গিরা এর সুযোগ নেবে। এ মুহূর্তে যে সংসদ কার্যক্রম রয়েছে, তার ভূমিকা নিয়ে জনমনে ও বুদ্ধিজীবী সার্কেলে নানা প্রশ্ন আছে। সংসদ কার্যকর নয়- এটা জাতীয় পার্টিও স্বীকার করে। বিএনপি বড় দল। সংসদে না থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এ দলটির ভূমিকা বড় ও ব্যাপক। সন্ত্রাস দমনে বিএনপিরও একটি ভূমিকা আছে। এ ভূমিকাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিয়ে সরকারের উচিত বিএনপির সঙ্গে একটা সহাবস্থান গড়ে তোলা। আমি বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসবাদ দমনে ও জঙ্গি উৎখাতে বিএনপি আন্তরিক। এখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যদি জঙ্গি দমনে এক হয়, তাহলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই দুটি দলের মাঝে বিভক্তি ও বিদ্বেষ এত বেশি যে, এর সুযোগ নিচ্ছে জঙ্গিরা। তারা সংগঠিত হচ্ছে। সুতরাং বড় দল দুটির মাঝে সমঝোতা দরকার।
পাঁচ. জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উত্থান জঙ্গিবাদে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছে। এদের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের যোগাযোগ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। তবে আল কায়দার উপমহাদেশীয় শাখা ইতিমধ্যে সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার নিয়ে এ শাখা গঠিত। এদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের কোনো খবর আমাদের জানা নেই। তবে আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, এরা সংগঠিত হচ্ছে। ভারতে ইসলামী জঙ্গিরা রয়েছে। এদের তৎপরতার খবরও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এদের সঙ্গে আল কায়দা কিংবা আইএসের সম্পর্ক কী, তা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এ কাজটি করা অত্যন্ত জরুরি। তবে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা জানেন আল কায়দা ও আইএসের মধ্যে নীতিগতভাবে ও জঙ্গি তৎপরতার দিক দিয়ে পার্থক্য রয়েছে। আইএস যেখানে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করছে এবং ইতিমধ্যে ইরাক-সিরিয়ার একটি বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে (সুন্নিস্তান), সেখানে আল কায়দা এখনও গেরিলা কায়দায় তাদের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। আইএসের মতো তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনীও নেই। এ দুই সশস্ত্র গ্র“পের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। উপরন্তু আল কায়দার সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্পর্ক বা তাদের শাখা থাকলেও আইএসের শাখা নেই। এমনকি পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা লিবিয়ার মতো দেশে যেখানে জঙ্গি তৎপরতা রয়েছে, সেখানে আইএসের কোনো শাখা নেই। সুতরাং বাংলাদেশ বা ভারতে আইএস এ মুহূর্তে কোনো শাখা নাও খুলতে পারে। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের উত্থানে উৎসাহিত হবে, এটা স্বাভাকি। সব জঙ্গির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাই জরুরি।
আল কায়দা তার জঙ্গি তৎপরতা পরিচালিত করে সীমিত জায়গায় সংগঠিত হয়ে, যাকে বিশ্লেষকরা স্পাইডার ওয়েভ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাকড়সা যেভাবে ছোট জায়গায় জাল বোনে এবং ওই জাল ভেঙে গেলে আবার অন্যত্র গিয়ে জাল বোনে, আল কায়দার স্ট্র্যাটেজি অনেকটা তেমনি। তারা এক জায়গায় একত্রিত হয়। সেখানকার স্থাপনার ওপর আক্রমণ করে এবং তা ধ্বংস করে দেয়। পরে আবার অন্যত্র গিয়ে আক্রমণ করে। বাংলাদেশের জঙ্গিদের মধ্যে তেমন স্ট্র্যাটেজি চোখে পড়ে না। এদের বড় কোনো কর্মকাণ্ড সম্প্রতি আমাদের চোখে পড়েনি। এরা যে খুব শক্তিশালী তাও আমার কখনও মনে হয়নি। মাঝে মাঝে দু-একজন ধরা পড়ে। তবে এদের কোনো কর্মকাণ্ড নেই। আমাদের আইন-শৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে এরা সংগঠিত হতে পারছে না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, জঙ্গিবাদ একটা বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলিমপ্রধান অঞ্চলেই এদের তৎপরতা। এ জঙ্গি তৎপরতা এখন সুদূর আফ্রিকার যেখানে মুসলমান জাতি রয়েছে, সেখানেও সম্প্রসারিত হয়েছে। নাইজেরিয়া, সাদ, সুদানের মতো দেশেও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, জঙ্গি তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে এখন আফ্রিকায় সম্প্রসারিত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডেও জঙ্গিরা তৎপর। ইন্দোনেশিয়ায়
এদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তশালী। ফলে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশকে এরা টার্গেট করবে, এটাই স্বাভাবিক। সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনটা তাই এ কারণেই।
জঙ্গিবাদ মানবতার শত্রু। আল কায়দা কিংবা আইএস যেভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, বাংলাদেশের মানুষ কখনোই সেটা সমর্থন করবে না। জঙ্গিবাদী ইসলাম আসলেই কোনো ইসলাম নয়। গলা কেটে, বোমা বানিয়ে মানুষ হত্যা করার নাম ইসলাম হতে পারে না। ইসলাম মানবতার ধর্ম। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। কিন্তু যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে, বোমা বানায়, এদের কোনো গণভিত্তি নেই। মানুষ এদের সমর্থনও করবে না। তবে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তকারীরা রয়েছে। বাংলাদেশেও আছে। তাই এ মাটিতে জঙ্গি গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। ইসলামের নামে এরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় আমরা তাই শংকিত। বর্ধমানের জঙ্গি তৎপরতার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা দরকার। এজন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দাদের ওপর নির্ভর না করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা প্রয়োজন। এটা ভারতীয় জঙ্গিদের কাজও হতে পারে। মমতা ব্যানার্জি সরকারের ভূমিকা কী এটাও আমাদের জানা দরকার। এখানে কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কাজ করছে কি-না, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ আমরা জানি, মোদি সরকারের এখন প্রধান টার্গেট হচ্ছে মমতা ব্যানার্জিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উৎখাত করা। তাই বলে আমরা যেন কোনো ধরনের আত্মতুষ্টিতে না ভুগি। আমাদের দেশে জঙ্গিরা আছে। এরা হয়তো তেমনভাবে সংগঠিত নয়। তবে আছে এবং সুযোগ পেলেই এরা তৎপর হয়ে ওঠে। ত্রিশালের জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা এর বড় প্রমাণ। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভক্তি ও বিদ্বেষ বাড়ছে। সংসদ কার্যকর নয়। রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে জঙ্গিরা।
সরকার জঙ্গি দমনের কথা বলছে বটে; কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে যে প্রচারণা দরকার, সেটি হচ্ছে না। গোয়েন্দা তৎপরতা আরও বাড়ানো দরকার। সেটিও হচ্ছে না। গোয়েন্দাদের অন্যত্র ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। তবে একটি আশার কথা অবশ্যই আছে- এ জঙ্গি তৎপরতা বড় কোনো হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি। তাই বলে আমরা চুপচাপ বসে থাকলে এদের তৎপরতা বাড়বে বৈ কমবে না। বাংলাদেশে সীমিত আকারে হলেও জঙ্গি তৎপরতা আছে। এ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। জঙ্গিবাদ যে মানবতার শত্রু এ প্রচারণার ওপরই এখন গুরুত্ব দেয়া উচিত বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে Daily Jugantor 29.11.14

ইসলামিক স্টেটের উত্থানকে কেন গুরুত্ব দিতে হবে

ইসলামিক জঙ্গিবাদী সংগঠন আইএস বা ইসলামিক স্টেটের কর্মকা- এখন আর শুধু ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই জঙ্গিবাদী সংগঠনের তৎপরতা সম্প্রসারিত হয়েছে লিবিয়া, মিসর ও তিউনিসিয়াতেও। এমনকি উত্তর আফ্রিকাতেও এদের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। তবে এসব দেশে জঙ্গিরা আইএসের ব্যানারে তাদের কর্মকা- পরিচালনা না করলেও, স্থানীয়ভাবে সংগঠিত ইসলামিক জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হচ্ছে লিবিয়া। লিবিয়ার শহর দারনা এখন ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রণে। ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে এই শহরটি বেনগাজি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ইসলামিক জঙ্গিরা শহরটি দখল করে পরে তারা শহরটি ইরাক-সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক স্টেটের ‘বারকা প্রদেশ’ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরব বসন্তর ব্যর্থতাই আরব বিশ্বে ইসলামিক জঙ্গিদের ক্ষমতা দখলে উৎসাহিত করেছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফি-পরবর্তী সময়সীমায় দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর জন্ম হয়নি। সেখানে নামেমাত্র একটি সরকার রয়েছে। কিন্তু ওই সরকারের কোনো কর্মকা- নেই। বরং ইসলামিক জঙ্গিরা এখন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। এককভাবে কোনো একটি বিশেষ জঙ্গিগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে লিবিয়া নেই। রাজধানী এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করছে ‘ফজর লিবিয়া’ নামে একটি জঙ্গিগোষ্ঠী। অন্যদিকে, দারনা প্রথমে দখল করে নেয় ‘ইসলামিক ইয়ুথ সুরা কাউন্সিল’। জঙ্গিগোষ্ঠী আনসার আল শারিয়া থেকে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে এই ইসলামিক ইয়ুথ কাউন্সিল গঠন করে। এদের সঙ্গে ‘আল বাতার ব্রিগেড’ যোগ দেয়। এবং নিজেদের ইসলামিক স্টেটের সম্প্রসারিত অংশ বলে ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে দারনা ইসলামিক খেলাফত রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কেননা ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যভাগ নিয়ে যে বিশাল এক খেলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এরই প্রদেশ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করেছে দারনা শহরের জঙ্গিরা। এটা নিঃসন্দেহে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং সেই সঙ্গে উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশের জঙ্গিদের উৎসাহিত করবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। যদিও আমাদের কাছে এমন কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই, এ দেশের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আইএস বা আল কায়েদার কোনো যোগাযোগ রয়েছে। এ সংগঠন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করে। তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন মুসলিম দেশে যেসব জঙ্গি সংগঠন কাজ করছে, তারা এখন প্রকাশ্যেই আইএসকে সমর্থন করছে এবং আইএসের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যেমন বলা যেতে পারে নাইজেরিয়ায় হারাম, ফিলিপাইনের আবু মায়াখ গ্রুপ, পাকিস্তানের তালেবান গোষ্ঠী। একটা কথা আমাদের জানা দরকার, জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উত্থান নতুন একটি পথ দিয়েছে। তবে আল কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখা ইতোমধ্যে সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার নিয়ে এই শাখা গঠিত। এটি আমাদের জানা নেই। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তারা সংগঠিত হচ্ছে। ভারতে ইসলামি জঙ্গিরা রয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আল কায়েদার ও আইএসের সম্পর্ক কী, তা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা জানেন আল কায়েদা ও আইএসের মধ্যে নীতিগতভাবে ও জঙ্গি তৎপরতার দিক দিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আইএস যেখানে সশস্ত্র যুদ্ধ করছে এবং ইতোমধ্যে ইরাক-সিরিয়ার একটি বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সেখানে আল কায়েদা এখনো তাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপরন্তু আল কায়েদার সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্ক বা তাদের শাখা থাকলেও আইএসের শাখা অন্যত্র নেই। এমনকি পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা লিবিয়ার মতো দেশে, যেখানে জঙ্গি তৎপরতা রয়েছে, সেখানে আইএসের কোনো শাখা নেই। সুতরাং বাংলাদেশ বা ভারতে আইএস এই মুহূর্তে কোনো শাখা না-ও খুলতে পারে। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থানে উৎসাহিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। সব জঙ্গির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাই জরুরি। আল কায়েদা তার জঙ্গি তৎপরতা পরিচালনা করে সীমিত জায়গায় সংগঠিত হয়ে, আক্রমণ করে, যাকে বিশ্লেষকরা ‘স্পাইডার ওয়েভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাকড়সা যেভাবে ছোট জায়গায় জাল বোনে এবং ওই জাল ভেঙে গেলে আবার অনত্র গিয়ে জাল বোনে। আল কায়েদার স্ট্র্যাটেজি অনেকটা তেমনই। তারা এক জায়গায় একত্র হয়। ওখানকার স্থাপনার ওপর আক্রমণ করে। এবং তা ধ্বংস করে দেয়। পরে আবার অন্যত্র গিয়ে আক্রমণ করে। বাংলাদেশের জঙ্গিদের তেমন একটা স্ট্র্যাটেজি চোখে পড়ে না। এদের বড় কোনো কর্মকা- সম্প্রতি আমাদের চোখে পড়েনি। ওরা যে খুব শক্তিশালী, তা-ও আমার কখনোই মনে হয়নি। মাঝেমধ্যে দু-একজন ধরা পড়ে। তবে এদের কোনো কর্মকা- নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে এরা সংগঠিত হতে পারছে না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, জঙ্গিবাদ একটা বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলিমপ্রধান অঞ্চলেই এদের তৎপরতা। এই জঙ্গি তৎপরতা এখন সদূর আফ্রিকায়, যেখানে মুসলমান খ্যাতি রয়েছে, সেখানেও সম্প্রসারিত হয়েছে। নাইজেরিয়ার বোকো হারামের উত্থান এর বড় প্রমাণ। পূর্বাঞ্চলের একটি এলাকা এদের নিয়ন্ত্রণে। চাদ, সুদানের মতো দেশেও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, জঙ্গি তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে এখন আফ্রিকায় সম্প্রসারিত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডেও জঙ্গিরা তৎপর। ইন্দোনেশিয়ায় এদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশকে এরা টার্গেট করবে, এটাই স্বাভাবিক। সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনটা তাই এ কারণেই।জঙ্গিবাদ মানবতার শত্রু। আল কায়েদা কিংবা আইএস যেভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, বাংলাদেশের মানুষ ওই জঙ্গিবাদকে কখনোই সমর্থন করবে না। জঙ্গিবাদী ইসলাম আসলেই কোনো ইসলাম নয়। গলা কেটে, বোমা মেরে মানুষকে হত্যা করার নাম ইসলাম হতে পারে না। ইসলাম মানবতার ধর্ম। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। কিন্তু যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে, বোমা বানায়, এদের কোনো গণভিত্তি নেই। মানুষ এদের সমর্থনও করবে না। তবে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তকারীরা রয়েছে। বাংলাদেশেও আছে। তাই এই মাটিতে জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। ইসলামের নামে এরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনায় আমরা তাই শঙ্কিত। বর্ধমানের জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশের জঙ্গিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটা চিন্তার কারণ। প্রথমত, এই ঘটনা প্রমাণ করল বাংলাদেশের জঙ্গিদের সঙ্গে ভারতীয় জঙ্গিদের একটা সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, ভারতীয় জঙ্গিদের সহযোগিতাতেই বাংলাদেশি জঙ্গিরা এ কাজটি করেছে। ভয়টা হচ্ছে বাংলাদশি জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি তথা আইএসের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, আইএস বিশ্বব্যাপী একটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। খেলাফতের ধারণা অনেক পুরনো। এখন খোদ আইএসের শীর্ষ কমান্ডাররাও বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী ও উৎসাহী হতে পারে! বাংলাদেশ একটি মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল। মানুষ যেহেতু ধর্মভীরু, এ ক্ষেত্রে মানুষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব।বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের তৎপরতা ও দক্ষতা আরও বাড়ানো দরকার। গোয়েন্দাদের যদি অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে জঙ্গি দমনে তাদের তৎপরতা হ্রাস পাবে।বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিস্মিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিএনপি আবারও বড় ধরনের আন্দোলনের কথা বলছে। ফলে দেশে যদি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তাহলে জঙ্গিরা এই সুযোগটি তাদের কাজে লাগাবে। তাই ইসলামিক স্টেটের উত্থান ও লিবিয়ার শহর দারনায় একটি প্রদেশ গঠনের ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের যে সূচক প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। শায়খ আবদুর রহমানের মতো জঙ্গি নেতা ও তাদের দলের তৎপরতা আমরা জানি। সুতরাং আমরা যদি এখনই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিই, তাহলে আমরা ভুল করব। সন্ত্রাসবাদকে কোনো অবস্থাতেই প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। একে পরিপূর্ণভাবে নির্মূল করার মধ্য দিয়েই দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখা সম্ভব। জঙ্গি তৎপরতা বাড়লে এর আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়বে। এতে ব্যাহত হবে গণতন্ত্রচর্চা।নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র Daily Amader Somoy 25.11.14

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নয়া মোড়

গেল বছর (২০১৩) আইএসের নাম প্রথম শোনা যায়। তখন এর নাম ছিল ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভান্ট (আইএসআইএল)। ইতিহাসে সিরিয়া, জর্দান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক, সাইপ্রাস ও দক্ষিণ তুরস্ক নিয়ে যে বিশাল এলাকা, তা 'লেভান্ট' নামে পরিচিত। জঙ্গিরা এই নামটি তখন ধারণ করে। তবে ১৯৯৯ সালে 'জামাত আল তওহিদ ওয়াল জিহাদ' নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে মূলত এটি সংগঠিত হয়েছিল। পরে 'আল-কায়েদা ইন ইরাক' নাম ধারণ করে। এই সংগঠনের মূলত সুন্নিনির্ভর ও ইরাকের সুন্নিপ্রধান এলাকায় প্রভাব বেশি। ২০০৬ সালে ইরাকে সুন্নি প্রভাবাধীন মুজাহিদিন সুরা কাউন্সিলে সংগঠনটি যোগ দেয়। ২০১৩ সালে সারা বিশ্ব প্রথমবারের মতো আবু বকর বুগদাদির নাম জানতে পারে। তবে ২৯ জুন (২০১৪) বুগদাদি একটি খেলাফতের ডাক দিলে সংগঠনটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। তখন সংগঠনটি নতুন নাম ধারণ করে আইএস বা ইসলামিক স্টেট। আল-কায়েদার সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্ক কী, এটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে আল-কায়েদা আইএসের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কেন সম্পর্ক ছিন্ন করেছে- এটি নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। কেউ বলার চেষ্টা করছেন আইএসের নৃশংসতা এর বড় কারণ। কেউ বলছেন জিহাদি নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে- এ জন্যই বিরোধের জন্ম হয়েছে। এদের রাজনীতি মূলত জিহাদি, সালাফি ও ওয়াহাবি মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হয়। আল-কায়েদা জিহাদি ও ওয়াহাবি মতবাদ অনুসরণ করলেও খেলাফতের কথা বলেনি কখনো। আইএস খেলাফতের কথা বলেছে। আর বুগদাদি নিজেকে খলিফা বা আমিরুল মুমেনিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যা আল-কায়েদার নেতা লাদেন বা জাওয়াহিরি নিজেকে ঘোষণা করেননি। তবে এটা বলতেই হবে, আইএসের নৃশংসতা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। একাধিক মার্কিন সংবাদকর্মীর গলা কেটে হত্যা করে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়ে একটি ভয়ের আবহ তৈরি করেছে আইএস। অতি সম্প্রতি কোবানিতে যুদ্ধরত এক কুর্দি তরুণী যোদ্ধার গলা কেটে জনৈক আইএস যোদ্ধার উল্লসিত ছবিও ইন্টারনেটে প্রকাশ পেয়েছে। আল-কায়েদা তার শত্রুদের হত্যা করত বটে; কিন্তু এভাবে গলা কেটে হত্যা করত না। তবে আইএসের উত্থান অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম প্রশ্ন, কোন শক্তি আইএসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে? যত দূর জানা যায়, আইএসের যোদ্ধারা প্রতি মাসে বেতন পায়। অর্থের পরিমাণটা নেহাত কম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই অর্থ কোত্থেকে এসেছে? শুধু দখলকৃত অঞ্চলের (তিকরিত, মসুল) তেল বিক্রি করে এই অর্থ জোগান দেওয়া কি সম্ভব? অস্ত্রই বা আসছে কোত্থেকে? কারা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আইএসের যোদ্ধারা এরই মধ্যে দক্ষ একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছে। তাদের কারা প্রশিক্ষণ দিল? তৃতীয় প্রশ্ন, কে এই আবু বকর বুগদাদি? কারা তাঁকে সামনে নিয়ে এলো? বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদা স্বীকৃত। এখন বিকল্প আরেকটি ফোর্স তৈরি করে কোনো 'শক্তি' কি চাচ্ছে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে? যদি মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বজায় থাকে, তাহলে তা তো মার্কিন অর্থনীতির চাঙ্গাভাব বজায় রাখতে সাহায্য করবে। কারণ মার্কিন অর্থনীতি তো 'যুদ্ধ অর্থনীতি'। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মার্কিন অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। অস্ত্র বিক্রি বাড়ে। ব্যবসা বৃদ্ধি পায় যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে। ইরাক এর বড় প্রমাণ। এ ধরনের হাজারটি প্রশ্ন এখন উঠেছে এবং রাজনৈতিক পণ্ডিতরা এসব প্রশ্নের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবেন।

তবে নিঃসন্দেহে কোবানির যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দৃশ্যপটকে পাল্টে দিতে পারে। কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসন তথা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশ্নটি এখন সামনে এলো। চারটি দেশেই কুর্দিদের বসবাস। কুর্দিদের এলাকায় রয়েছে জ্বালানি সম্পদ, তেল। ইরান কুর্দিদের তেল পরিশোধন করে। অন্যদিকে ইরান থেকে গ্যাস কেনে কুর্দিরা। ইরাকি কুর্দিরা এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। তাদের নিজস্ব পতাকা, পার্লামেন্ট ও সেনাবাহিনী আছে। ১৯২৩ সাল থেকেই কুর্দিরা তাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে আসছে। ইরাকি কুর্দিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। ইসরায়েলের সঙ্গেও কুর্দি নেতাদের সম্পর্ক ভালো। বর্তমান সংকট এ অঞ্চলে একটি কুর্দি রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দিল। এই রাষ্ট্র অনেকটা তাইওয়ান মডেলে গড়ে উঠতে পারে। কোবানির যুদ্ধ ও আইএসের উত্থান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করল। একসময় মনে হয়েছিল আসাদের দিন শেষ। এখন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা, যাদের মধ্যে আরব রাষ্ট্রগুলোও আছে, তারা চাচ্ছে আসাদ থাকুক। মার্কিনি ছত্রচ্ছায়ায় আসাদবিরোধী যে ফ্রন্টের জন্ম হয়েছিল এবং যারা আসাদকে উৎখাতের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে, এখন তারা আর আসাদবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। তাদের টার্গেট এখন ইসলামিক স্টেট। ফলে সুবিধা পাচ্ছেন আসাদ। ইসরায়েলও এখন পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে আসাদকে। একসময় গোলান মালভূমি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সিরিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছিল। স্ট্র্যাটেজিক্যালি এর গুরুত্ব অনেক। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন ইসরায়েলের মনোভাব নমনীয়।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছিল, আইএসের উত্থানে ইরানকে নিয়ে এখন আর তেমন উদ্বেগ নেই মার্কিন প্রশাসনের। একসময় ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে, যেখানে ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করছে- এমন অভিযোগ ছিল, মার্কিন তথা ইসরায়েলি বিমান হামলার একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এখন সেই প্রশ্ন 'অতীত'। যুক্তরাষ্ট্রের এখন প্রয়োজন ইরানকে। আইএসের উত্থান এ অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা ও অবস্থানকে শক্তিশালী করল। ইরাক এখন ভেঙে যাওয়ার মুখে। কুর্দিরা স্বাধীন হয়ে গেলে আর সুন্নি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি 'জিহাদি রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠিত হলে শিয়ারা একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে ইরাকের অস্তিত্ব বহন করবে। আর ইরাক ভেঙে গেলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় 'পরাজয়'।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সীমানা বদলে যাচ্ছে। কোনো কোনো মহল থেকে আভাস দেওয়া হচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি রাষ্ট্র ভেঙে (সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, সৌদি আরব ও ইয়েমেন) ভবিষ্যতে ১৪টি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সিরিয়া-ইরাক যুদ্ধ এর বড় প্রমাণ। এই যুদ্ধ স্থায়ী হবে এবং অলিখিতভাবে এসব রাষ্ট্রের জন্ম হবে। আর এ লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আইএসের জন্ম হয়েছিল। রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে সৌদি আরব, কাতার আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আইএসের জন্ম। আইএসের জন্মের পেছনে যে 'শক্তিই' দায়ী থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
Daily Kalerkontho
23.11.14

আমেরিকার মানুষ পরির্তন চেয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেল ৪ নভেম্বর। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। দুপুরে টেক্সাসের ডালাসের হাইল্যান্ড ভিলেজ উপশহরের একটি ভোট কেন্দ্র। হেরিটেজ এলিমেন্টারি স্কুলে এই ভোট কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছে। এই স্কুলটি আমাদের দেশের প্রাইমারি স্কুলের মতো। পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত বাচ্চারা এখানে পড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলেই চলে যায় মিডেল স্কুলে। স্কুলের আশপাশে কোনো প্রচারণা নেই। প্রার্থীদের কোনো এজেন্টও নেই। কেউ একজন এলেন না ভোটের জন্য। আমাকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটার। আমি ভোটার নই, দর্শক। দুপুরে আমার মতো দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকে দেখলাম না উৎসাহী হয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমেরিকান নাগরিকদের আগ্রহ কম। এটা নিয়ে দীর্ঘদিনই বিতর্ক হচ্ছে। আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে আমরা প্রশংসা করি। হাজারটা উদাহরণ দিই। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতির হার কম। যদিও এখানে পোস্টাল ব্যালটেরও সুযোগ আছে। মানুষ কাজ করে। ভোটের জন্য এখানে কোনো ছুটি থাকে না। যারা কাজ করেন, তারা কাজ ফাঁকি দিয়ে অথবা ছুটি নিয়ে ভোট দিতে যান না। কাজ শেষে ভোট দিতে যান। এ জন্য কোনো কোনো ভোট কেন্দ্র সন্ধ্যা ৭টা অথবা ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মানুষ তার কাজ শেষে ভোট দিয়ে বাড়ি যায় অথবা যারা এই বিড়ম্বনা এড়াতে চান, তারা আগেই ভোট দিয়ে দেন পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে। শুধু হেরিটেজ এলিমেন্টারি স্কুলেই যে ভোটারদের উপস্থিতি কম, তা নয়। বরং প্রতিটি ভোট কেন্দ্রেরই মোটামুটি একই চিত্র দেখা যায়। হেরিটেজ এলিমেন্টারি স্কুলের প্রবেশ মুখে দুটি পোস্টার দেখলাম মাত্র। দু’জন প্রার্থীর। ছোট একটি কাগজে দিকনির্দেশনা দেয়া কোথায় ভোট হচ্ছে। কোনো জটলা নেই। কোনো হৈহল্লা নেই। ভোটের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যাও কম। সাধারণত বাসায় বাসায় ভোটার নম্বরের কাগজপত্র পাঠানো হয়। না পেলেও সমস্যা নেই। নিজের আইডি দেখে ভোট দেয়া যায়। দু’ভাবে ভোট দেয়া যায়। ইলেক্ট্রনিক ভোট অথবা সাধারণ ভোট। ইলেক্ট্রনিক ভোট ও বোতাম টিপে ভোট দিতে হয়। আরো একটা কথা। শুধু কংগ্রেস সদস্য বা সিনেটর নির্বাচনের জন্যই ভোট হয়নি এবার। জনগণ ভোট দিয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন শীর্ষ প্রশাসনিক পদে কাদের বসানো হবে, তাদের জন্যও। কি অদ্ভুত জিনিস, যিনি হাইল্যান্ড ভিলেজ শহরের পুলিশ প্রধান হবেন কিংবা পরিবেশ বিভাগের প্রধান হবেন, তাকে ভোট দিল জনগণ। অর্থাৎ ওইসব পদ আমলাপ্রধান নয়, আমাদের দেশের মতো। এখানে জনগণ তাদের নির্বাচিত করে। ফলে এক ধরনের দায়বদ্ধতা থাকে। এরা অর্থাৎ শহরপ্রধানরা মাসে একবার সভা করেন। সমস্যার কথা শোনেন। নাগরিকরা সরাসরি প্রশ্ন করেন। এটাই আমেরিকার গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এটা কি বাংলাদেশে সম্ভব? খোদ জনগণের প্রতিনিধি, অর্থাৎ এমপিদেরই তো পায় না মানুষ। ভোটের সময়ই দেখা পেল। এরপর তো আর পাওয়া যায় না। যিনি শহরের সব স্কুলের প্রধান। তিনিও মিটিং করেন অভিভাবকদের নিয়ে। বাচ্চাদের স্কুলগুলোও দেখেছি এটা বাংলাদেশে চিন্তা করাও যায় না। এর মধ্য দিয়েই এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। বলা ভালো এবারে নির্বাচন হয়ে গেল ৪৩৫ আসনবিশিষ্ট প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে। আর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে। সিনেট সদস্যরা ৬ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। আর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ২ বছরের জন্য।কিন্তু নির্বাচন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। তার দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হেরে গেছে নির্বাচনে। ফলে প্রশাসন পরিচালনা করা তার জন্য একটি সমস্যা হবে। তিনি চাইলেও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না রিপাবলিকানদের বিরোধিতার মুখে। ডিসেম্বরে বাজেট পাস করতে হবে। যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য তিনি কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত টাকা চেয়েছেন। কংগ্রেস এই অর্থ ছাড় নাও করতে পারে। ইতোমধ্য অবৈধ অভিবাসী ও ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার প্রশ্নে তিনি রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। ফলে জটিলতা থাকলই। গত প্রায় দু’মাস যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে দেখেছি অনেক সাধারণ আমেরিকান ওবামার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে বাংলাদেশি-আমেরিকানরা বরাবরই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে অনেক বাঙালিকে দেখেছি, তারা ভোট দিতে যাননি। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনেকেরই কোনো আগ্রহ দেখিনি। অনেক আমেরিকানও ভোট দেননি। আমি যে এলাকাতে থাকি, এটা মোটামুটি শিক্ষিত এলাকা। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা আইটি বিশেষজ্ঞ। আলাপ করে দেখেছি অনেকেই ভোট দিতে যাননি।মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়ি ছিল এবার অন্যতম একটা আলোচিত বিষয়। এই কালো টাকাকে এরা বলছে ‘ডার্ক মানি।’ ৪ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই কালো টাকা ব্যয় করা হয়েছে প্রধানত রিপাবলিকান প্রার্থীরা কীভাবে বিজয়ী হবেন সে জন্য। নির্বাচনী প্রচারণায়, বিশেষ করে দলীয়ভাবে অপর পক্ষকে (এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের) হেয়প্রতিপন্ন করার জন্যই এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রেসপনসিভ পলিটিকস তাদের গবেষণায় এই কালো টাকার একটি হিসাব দিয়েছে। তারা জানিয়েছে মধ্যবর্তী এই নির্বাচনে মোট ব্যয় হয়েছে ৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। শুধু নেতিবাচক প্রচারণার কাজে বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। চিন্তা করা যায়! তাও আবার পুরো নির্বাচনের জন্য নয়। মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ সিনেট আসন ও পুরো প্রতিনিধি পরিষদের আসনের জন্য। ২০০৮ সালে কালো টাকা খরচের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৫১ বিলিয়ন আর ২০১০ সালে ছিল ৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন। ২০১২ সালেও প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। কিভাবে খরচ হয় এ টাকা? মূলত টিভি বিজ্ঞাপন বাবদ, বিল বোর্ড নির্মাণ বাবদ অর্থাৎ প্রচারণার কাজেই এ টাকা ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে এক দল অপর দলের বিভিন্ন সমালোচনা করে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয়। এটা বৈধ। প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র কিংবা কর্মকাণ্ড স্থান পায় কম। সেন্টার ফর রেসপনসিভ পলিটিক্স তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে কীভাবে নেতিবাচক প্রচারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালের সিনেট নির্বাচনে ইতিবাচক প্রচারণা ছিল ৪৩ দশমিক ১ ভাগ আর নেতিবাচক প্রচারণা ছিল ৪৩ দশমিক ৭ ভাগ। ২০১৪ সালে তা বেড়েছে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৫ ভাগ ও ৫৫ ভাগ। অর্থাৎ নেতিবাচক প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। তেমনি প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ২৭ দশমিক ৬ ভাগ (২০১০) থেকে বেড়েছে ৪১ দশমিক ৪ ভাগ (২০১৪)। ইতিবাচক প্রচারণা ছিল ৫২ (২০১০) ও ৪৭ দশমিক ৬ ভাগ (২০১৪)। গভর্নর পদে নির্বাচনে এই নেতিবাচক প্রচারণা বেড়েছে ৩৩ ভাগ (২০১০) থেকে ৪৭ দশমিক ৮ ভাগ (২০১৪)। সুতরাং বোঝাই যায় এই নেতিবাচক প্রচারণা এবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে। এখানে বলা ভালো, বিভিন্ন বেসরকরি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এই নেতিবাচক প্রচারণায় টাকা দিয়ে থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্স ৩১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার, ক্রসরোড সিপিএস ২৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন, লীগ অব কনজারভেটিভ ভোটারস ৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন, ন্যাশনাল রাইফেলস অ্যাসোসিয়েশন ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার ইত্যাদি। দেখা গেছে, এসব সংগঠনের মূল টার্গেট হচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা এবং তাদের প্রচারণার অর্থ হচ্ছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিজয়ী করানো। ফলাফলে দেখা গেছে এই কালো টাকার প্রভাবে রিপাবলিকান প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ৪ নভেম্বরের (২০১৪) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন অনেক গুরুত্ব বহন করে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর মার্কিন রাজনীতির অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে এখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের (২০১২) দু’বছর পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিনেটের তিন ভাগের এক ভাগ আসনের আর হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের পুরো আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিনেট সদস্যরা ৬ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাজ্যের গভর্নর, কিছু রাজ্যের কংগ্রেসের, কোনো কোনো শহরের মেয়রের নির্বাচনও একই সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৪ নভেম্বর মোট ৪৭১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ছিল হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের ৪৩৫টি আসন ও সিনেটের ৩৬টি আসন। একই সঙ্গে প্রায় ৪৮টি গভর্নর পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এর আগে প্রেসিডেন্ট ওবামার ডেমোক্র্যাটিক দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল সিনেট। ১০০ সিনেট সিটের ৫৩টি আসন ছিল ডেমোক্র্যাটদের। এখন তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৫-এ। রিপাবলিকানদের হাতে এখন ৫২টি আসন। দু’জন রয়েছেন নিরপেক্ষ। অন্যদিকে ৪৩৫ আসনের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ২৩৩টি আসন (এখন ২৪৩) আর ডেমোক্র্যাটদের ছিল ১৯৯ আসন (এখন ১৭৯)। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই আসন বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে নানা জটিলতায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। গেল বছর ‘শাট ডাউন’-এর মতো ঘটনাও ঘটেছিল। বর্তমানে দুটি ইস্যুতে (এবোলা ও আইএসের উত্থান) ওবামা বিপদে আছেন। এখন কংগ্রেসে তার সমর্থন না থাকলে আগামীতে তার সরকার পরিচালনায় সমস্যা হবে। বুশের সময় সিনেট ছিল ডেমোক্র্যাট পার্টির দখলে। বুশ নিজে ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির সদস্য। মজার ব্যাপার, ওই সময় অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদও ছিল ডেমোক্র্যাটদের দখলে। পরিস্থিতি বদলে গেল প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সময়। ক্লিনটনের সময় ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট নিয়ন্ত্রণ করেছে রিপাবলিকানরা অথচ প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ছিলেন ডেমোক্র্যাট। আবার প্রেসিডেন্ট বুশের (জুনিয়র) সময়সীমায়ও প্রথম দিকে ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট নিয়ন্ত্রণ করেছে রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট ওবামার দু’টার্মে (২০০৮ সালে তিনি প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন) দু’রকম দৃশ্য দেখা যায়। ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদে তার দল ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর প্রথম থেকে (২০০৮ থেকে) এখন অব্দি সিনেট ডেমোক্র্যাটদের দখলে। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ চলে যায় রিপাবলিকানদের দখলে। ফলে চলতি ২০১৪-এর মধ্যবর্তী নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ক্লিনটনের সময়কার পরিস্থিতির মতো (যখন কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ করেছে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি)। একটি পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকছে প্রেসিডেন্সি। কিন্তু কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ করবে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি। ফলে আগামী ২ বছর ওবামাকে নানা ঝামেলা পোহাতে হবে।
নির্বাচনে ওবামার দল হেরে গেল বটে, কিন্তু তাতে প্রেসিডেন্ট ওবামার পদত্যাগের কোনো সুযোগ নেই অথবা তাকে পদত্যাগ করানোও যাবে না। তবে প্রশাসন পরিচালনায় তিনি সমস্যায় পড়বেন এবং তাকে রিপাবলিকানদের সমর্থন নিয়েই প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে। রিপাবলিকানরা তাদের পছন্দমতো বিল কংগ্রেসে পাস করতে পারবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তাতে ‘ভেটো’ দিতে পারবেন। অন্যদিকে ওবামার অনেক ইচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে না, কেননা তাতে রিপাবলিকানদের সমর্থন থাকবে না। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা এখন নানা অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন। রিপাবলিকানরা এখন ইরাক-সিরিয়ায় আমেরিকান মেরিন সেনা পাঠাবে, যা ওবামা পাঠাননি। রিপালিকানরা মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশকে, বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়াকে ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিতে পারে। ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা নেই। যুদ্ধে এখন প্রতিদিন খরচ হচ্ছে ৩ লাখ ডলার। এ জন্য জনগণকে ট্যাক্স দিতে হবে অতিরিক্ত। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে এই বিল অনুমোদন করবে। সামাজিক খাত এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্বাস্থ্য খাত সংকুচিত হবে। কর্পোরেট হাউসগুলোর সুবিধা আরো বাড়বে। কারণ তারাই রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় এনেছে। রিপাবলিকানরা তাদের স্বার্থ দেখবে। ধনীরা আরো ধনী হবে। গরিবরা আরো গরিব হবে। নতুন চাকরির বাজার সৃষ্টি হবে না। যে ৮০ লাখ বেকার হয়েছিল অতীতে, এই সংখ্যা আরো বাড়বে। নয়া গ্রাজুয়েটরা চাকরি পাবে না। ছাত্ররা সরকারের কাছ থেকে যে আর্থিক সহযোগিতা পায় (গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার জন্য এবং যা পরে তাদের চাকরি পেয়ে পরিশোধ করতে হয়) তাতে স্থবিরতা আসবে। নতুন করে কোনো ঋণ দেয়া হবে না। এই ঋণের পরিমাণ এখন ১ ট্রিলিয়ন ডলার। একটি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ‘অফ শোর ড্রিলিং’-এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য এই ‘অফ শোর ড্রিলিং’ পরিবেশবাদীদের হতাশ করবে। বিশ্বব্যাপী কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাসের যে দাবি (যুক্তরাষ্ট্র বড় কার্বন নিংসরকারী দেশ), তা থেকে পিছিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র। বৈদেশিক সাহায্য ও সুযোগ-সুবিধা হ্রাস পাবে। ইমিগ্রেটদের জন্য কোনো ভালো খবর থাকবে না আগামী দিনগুলোতে। একটি নির্বাচন হয়েছে। আমার সুযোগ হয়েছে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে সত্য, কিন্তু সাধারণ মানুষের হতাশা আরো বেড়েছে। তবে একটা কথা সত্য, মানুষ এখানে পরিবর্তন চেয়েছে। সেই পরিবর্তনটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ধনীদের রাষ্ট্র এবং ধনীরাই যে প্রশাসন পরিচালনা করে, এটা আবারো প্রমাণিত হলো।
হাইল্যান্ড ভিলেজ, ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র Daily Manob Kontho 23.11.14

পরাশক্তির সম্পর্ক ও নয়া বিশ্ব

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিপুল বিজয়ের পর এখানকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মাঝে একটা প্রশ্ন উঠেছে, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক এখন কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো এখন বেশ সতর্ক। রিপাবলিকান পার্টি এখন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে। ফলে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির আড়ালে কংগ্রেস একটি বড় ভূমিকা পালন করবে এবং প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করবে একটি কনজারভেটিভ নীতি গ্রহণ করতে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি আক্রমণ এবং চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করার ব্যাপারে কংগ্রেস বেশকিছু নীতি গ্রহণ করতে পারে। এমনকি আইএস দমনে ইরানের সহযোগিতা চেয়ে ওবামা খামেনিকে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে আপত্তি তুলেছেন রিপাবলিকানরা। ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সম্ভাবনাও এখন প্রশ্নের মুখে থাকল। ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। ন্যাটো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে চায় ও ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য মোতায়েন করতে চায়- এ অভিযোগ রাশিয়ার দীর্ঘদিনের। ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে (২০১৪) পূর্ব ইউক্রেনে বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ইউক্রেনের যে চুক্তি হয়েছে, ওই চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য ওবামা পুতিনকে অনুরোধ করেছেন। বেইজিংয়ে ওবামা-পুতিন সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, রুশ সৈন্যরা ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্ত অতিক্রম করেছে। তারা বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মাঝে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল রাশিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। এ নিয়ে সেখানে যুদ্ধ চলছে এবং তাতে প্রায় চার হাজার নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করেছে জাতিসংঘ। এখন রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেয়, সেদিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক। কংগ্রেস নির্বাচনে তার সমর্থকদের পরাজয়ের পর প্রথম সফর হিসেবে ওবামা চীনে যান। সেখানে তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (অ্যাপেক) সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর যান মিয়ানমারে ইস্ট এশিয়া সামিটে যোগ দিতে। মিয়ানমারে এটা তার দ্বিতীয় সফর। দ্বিতীয়বার নির্বাচনের পরপরই (২০১২) তিনি মিয়ানমার সফর করেছিলেন। এরপর যান অস্ট্রেলিয়ায় জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক আগামীতে কোনদিকে গড়ায়, এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের আগ্রহ এখন অনেক বেশি। অভিযোগ আছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে 'ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলার' এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চীনকে দুর্বল করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নিচ্ছে 'ট্রান্সপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট' বা টিপিপিএফটি করার। প্রস্তাবিত এ চুক্তিতে চীনকে রাখা হয়নি। অথচ এশিয়ার তথা প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি চীন। ২০০৯ সালে প্রথম টিপিপিএফটির কথা জানা যায়। এখন এ চুক্তির আওতায় আছে ১১টি দেশ- অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, চিলি, মালয়েশিয়া, মেঙ্েিকা, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ২০১২ সালে এ অঞ্চলের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আর সেবা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৪২ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব জিডিপির ৪০ ভাগ এ অঞ্চলের। আর বিশ্ব বাণিজ্যের ২৬ ভাগ পরিচালিত হয় এ অঞ্চলে। কিন্তু চীনকে বাদ দিয়ে এ চুক্তি নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। আগামী বছর এ চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। রিপাবলিকানরা চাইবে অতি দ্রুত এ চুক্তিটি স্বাক্ষর হোক। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, চীন এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের দুটি বড় অর্থনীতির একটি জোট গঠিত হলো। দক্ষিণ কোরিয়া অনেক আগেই মধ্যম সারির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রফতানির ২৬ দশমিক ০৫ ভাগ রফতানি হয়েছে চীনে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৯ ভাগ। বলা হচ্ছে, ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানি (এ অঞ্চলে) বাড়বে ৩০০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির ৩৯ দশমিক ৫ ভাগ। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ২১৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এখন প্রশ্ন থাকবে, টিপিপিএফটি চালু হলে চীন-দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের ওপর তা কতটুকু প্রভাব ফেলবে? একইসঙ্গে চীন, রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিলকে নিয়ে ব্রিকস ব্যাংক গড়ে উঠেছে, যা কিনা বিশ্বব্যাংকের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে যাচ্ছে। চীন এরই মধ্যে 'এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গঠন করেছে। বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশ এ ব্যাংকের ব্যাপারে এরই মধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে চীনের এ ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্র আগামীতে খুব ভালোভাবে নেবে বলে মনে হয় না। তবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের এ ভূমিকাকে অস্বীকার করতে পারবে না। কেননা যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস ও তেল আহরণ ক্ষেত্র, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ও কৃষিতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক খারাপ হলে এ বিনিয়োগে তা প্রভাব ফেলবে। সামরিক ক্ষেত্রেও পারস্পরিক অবিশ্বাস আছে। চীন রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে 'সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন' নামক একটি সংস্থা গড়ে তুলেছে। মধ্য এশিয়ায় তথা জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করছে এ সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, পূর্ব চীন সাগরে চীন একটি 'ওয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোন' গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ বিতর্কিত ও তেল সম্পদসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে চীন অন্য কারও কর্তৃত্ব স্বীকার করে না। এটা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করার শামিল। এ অঞ্চলে চীনের ভূমিকাকে অনেক পর্যবেক্ষক 'চীনা মনরো ডকট্রিন' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত 'মনরো ডকট্রিনের' সময় যা ছিল ইউরোপীয় শক্তি (অর্থাৎ মার্কিন এলাকায় কোনো ইউরোপীয় শক্তির জড়িত থাকাকে চ্যালেঞ্জ করা)। এক্ষেত্রে চীনা এলাকায় কোনো বিদেশি শক্তির (জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র) জড়িত থাকার বিষয়ে চীনের অপছন্দ। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় মহাসাগর অঞ্চলে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক স্প্রি্রটের ছয়টি যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় মহাসাগরে মোতায়েন করা হবে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে 'ঘিরে ফেলার' যে নীতি প্রণয়ন করেছে, তার অংশ হিসেবেই ভারতীয় মহাসাগরে এ যুদ্ধজাহাজগুলো মোতায়েন করা হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করে না। বলা ভালো, ভারত মহাসাগরে চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। চীনের জ্বালানি সম্পদের প্রায় ৬০ ভাগ চীন এ পথে আমদানি করে। চীন কোনো অবস্থাতেই চাইবে না এ জ্বালানি সম্পদ সরবরাহে কোনো বাধা আসুক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরকে একত্রিত করে চীন তার 'মুক্তার মালা' নীতি প্রণয়ন করেছে। অর্থাৎ এ অঞ্চলে চীন তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নৌজাহাজের উপস্থিতি এক ধরনের স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করবে চীনের ওপর। চীন এটা ভালো চোখে নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। ফলে আগামীতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা নতুন করে এক 'স্নায়ুযুদ্ধের' জন্ম দিতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ সময়কার পরিস্থিতিকে মেলান যাবে না। ওই সময় বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই পরাশক্তির প্রভাব বিস্তার করার মানসিকতার কারণে ওই সময়ে বড় ধরনের যুদ্ধের সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল। যুদ্ধ হয়নি বটে। কিন্তু দীর্ঘসময় বিশ্বকে একটি উত্তেজনার মধ্যে রেখেছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল সত্য; কিন্তু তা ছিল সাময়িক। ২০ বছর পর নতুন আঙ্গিকে 'স্নায়ুযুদ্ধ' শুরু হয়েছে। তবে পার্থক্যটা হলো স্নায়ুযুদ্ধে একসময়কালে পক্ষ ছিল দুটি- যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখন পক্ষ বেশ ক'টি। চীন, ভারত এমনকি ইরানও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর। এখন দেখতে হবে, এ শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়। এখানে প্রয়োজন একটি 'রিয়েল পলিটিকসের'। অর্থাৎ বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করা। বিশ্ব নেতারা যদি এ বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ না করেন, তাহলে বিশ্বে উত্তেজনা থাকবেই। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, এ বাস্তববাদী নীতির বড় অভাব। যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' সূচনা করে মুসলিম বিশ্বকে পদানত রাখার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছে। দেশটি আফগানিস্তানে যুদ্ধের সূচনা করে, তা এখন সম্প্রসারিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরাক-সিরিয়ায় সীমিত যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের সীমানাও পরিবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের ওপরও 'চাপ' বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হচ্ছে রাজনীতিতে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কনজারভেটিভ রিপাবলিকানদের দখলে চলে যাওয়ায় বিশ্ব-রাজনীতিতে উত্তেজনার সম্ভাবনা আরও বাড়ল। Daily Alokito Bamgladesh 23.11.14