শেষ অবধি বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের ‘খোঁজ’ পাওয়া গেল। গত ১২ মে বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদপত্রে এটা ছিল শীর্ষ নিউজ এবং ‘টক অব দ্য টাউন।’ দীর্ঘ ৬২ দিন তার কোনো খোঁজ ছিল না। শুধু সংবাদপত্র থেকে আমরা জেনেছি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা উত্তরার একটি বাসা থেকে ১০ মার্চ রাতের বেলা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, সালাহ উদ্দিনকে অপহরণ ঘটনার সঙ্গে র্যাব জড়িত । এ নিয়ে ‘জল’ কম ঘোলা হয়নি। উচ্চ আদালতে পর্যন্ত বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল এবং উচ্চ আদালত একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ এপ্রিল ‘সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে পাওয়া গেল কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে’ বিষয়টির নিষ্পত্তি করে দিয়েছিলেন। এর আগে ১৬ মার্চ মহানগরী পুলিশ সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে বের করার জন্য জয়েন্ট কমিশনারের (ক্রাইম) নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল। এর মধ্য দিয়ে অন্তত একটি আশঙ্কার অবসান ঘটল। সালাহ উদ্দিন বেঁচে আছেন এবং তিনি ফিরে আসছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘উদ্ধার’ করতে পারেনি। কিংবা তিনি নিজে নিজেই ফিরে আসেননি। বরং তাকে ‘পাওয়া’ গেছে অন্য একটি রাষ্ট্রে উ™£ান্ত অবস্থায়। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থাকবেই। গুজবও থাকবে এবং চলমান রাজনীতিতে তা কিছুটা হলেও ঢেউ তুলবে। তার নিখোঁজ হওয়া এবং শিলংয়ে হঠাৎ করে ‘আবির্ভূত’ হওয়া এখন অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দেবে। এক. প্রশ্ন উঠবে এতদিন তিনি তাহলে কোথায় ছিলেন? বাংলাদেশের ভেতরে নাকি মেঘালয়েই? ঢাকা থেকে সিলেট, সিলেটের ডাউকি সীমান্ত থেকে শিলং, দূরত্ব কম-বেশি ৩৪০ কিলোমিটার। সড়কপথেই শিলং যাওয়া যায়। ডাউকি সীমান্তে খুব কড়াকড়ি ব্যবস্থা থাকে না। এ পথে অবৈধপথে ভারত অর্থাৎ মেঘালয় রাজ্যে বাংলাদেশিদের যাতায়াতও আছে। এ ক্ষেত্রে অবৈধ পথে তাকে কেউ নিয়ে গিয়ে শিলংয়ে যদি ছেড়ে দেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তখন সরকারের দায়িত্ব হবে এই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা এবং জাতিকে তা জানানো।
দুই. সালাহ উদ্দিন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ছিলেন না, এ ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো। এতে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবির সত্যতা প্রমাণিত হলো বটে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্য, একজন বাংলাদেশি নাগরিক কীভাবে ‘হাওয়া’ হয়ে গেলেন এ বিষয়টিও খোলাসা করা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগ্যতা, দক্ষতা আর গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নের সঙ্গে এই বিষয়টি সরাসরিভাবে জড়িত। তিন. সালাহ উদ্দিনের ‘নিখোঁজ’ রহস্যের ব্যাপারে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা মন্তব্য করেছিল এবং বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘অভিযুক্ত’ করার একটা প্রচেষ্টাও আমরাও দেখেছি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এতে করে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে র্যাবের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণœ করা হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কী বলে, সেদিকে দৃষ্টি থাকবে আমাদের। আমরা দেখতে চাইÑ তারা কী বলে এখন। চার. সালাহ উদ্দিন আহমেদের ‘আর্বিভাব’-এর ঘটনায় বিএনপি এক ধরনের নীরবতা পালন করলেও সরকারি দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এই ঘটনায় বিএনপির সমালোচনা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মন্তব্যটি ছিল এ রকমÑ এ ‘বিএনপির অন্তরালের ব্যাপার’। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘অন্তরালের রাজনীতি করলে অন্তর্ধানে যেতে হয়। আর বিপদ তখনই আসে।’ আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন সালাহ উদ্দিনের অন্তর্ধান নিয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করেছিল, সালাহ উদ্দিন লুকিয়ে ছিলেন। এখন বিএনপিকেই এসব অভিযোগের জবাব দিতে হবে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর। পরস্পরের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি না করাই মঙ্গল। আমরা চাইব ‘সত্য’ উদঘাটিত হোক। পাঁচ. সালাহ উদ্দিনের ‘ফেরত’ আসার ব্যাপারে একটি আইনগত জটিলতা আছে। তিনি শিলংয়ে যেভাবেই যান না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে তাকে শিলংয়ে পাওয়া গেছে পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া। এটা ভারতীয় আইনে একটি অপরাধ। তার বিরুদ্ধে শিলংয়ে একটি মামলা হয়েছেÑ এটা স্বাভাবিক। তিনি সেখানকার আইন ভঙ্গ করেছেন! আইনভঙ্গের অপরাধে তিনি অপরাধী। শিলং পুলিশ এখন দুটি কাজ করতে পারে। এক. আইনভঙ্গের অপরাধে তাকে কোর্টে তুলতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কোর্ট তাকে শাস্তি দিতে পারে। এবং অতঃপর বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ভারত তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। এটা সময়সাপেক্ষ। খুব তাড়াতাড়ি এ সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। দুই. অবৈধ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে শিলং পুলিশ তাকে ‘ডিপোর্ট’ করতে পারে। আমরা ‘পুশব্যাক’ করতে পারি। এ ক্ষেত্রেও তিনি বাংলাদেশ পুলিশের কাছে ‘অপরাধী’ বিবেচিত হবেন এবং বাংলাদেশ পুলিশ তাকে সীমান্তে গ্রেপ্তারও করতে পারে। তবে যেহেতু বিষয়টি এই মুহূর্তে ভারতীয় পুলিশের আওতায়। সে ক্ষেত্রে একটি ‘রাজনৈতিক বিবেচনা’ কাজ করবে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ভূমিকা এতে থাকবে। কেননা সালাহ উদ্দিন আহমেদ সাধারণ কোনো বাংলাদেশি নাগরিক নন। তিনি নিঃসন্দেহে একজন আলোচিত ও ভিআইপি ব্যক্তি। অনেক অঙ্কের হিসাব আছে এতে। ছয়. উত্তরার যে বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ওই বাসার ভাড়াটের ভূমিকা কী ছিল, এটাও তদন্ত করে দেখা উচিত। পুলিশের তদন্ত কমিটি ওই ভাড়াটের সঙ্গে কথা বলেছিল কি না কিংবা কী ‘তথ্য’ পাওয়া গিয়েছিল, এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এটা জানা প্রয়োজন। সাত. বাংলাদেশে সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। ওইসব মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। ফলে বাংলাদেশে তিনি ফিরে এলেও আইনের বাইরে যেতে পারবেন না। তাকে হয় উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য যেতে হবে নতুবা নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। বাংলাদেশের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারও করতে পারে। তার পরিবারের কাছে আপাতত ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আট. সালাহ উদ্দিনের ‘আবির্ভাবের’ ঘটনায় একটা সম্ভাবনারও জন্ম হলো যে, নিখোঁজ ইলিয়াস আলীও এমনি করে কোথাও ‘আবির্ভূত’ হতে পারেন। নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী এই প্রত্যাশাই করে আসছেন বারবার। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন। ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কিন্তু তা কোনোদিন প্রমাণিত হয়নি।
আমরা জানি সালাহ উদ্দিন আহমেদের ‘নিখোঁজ’ রহস্য কোনোদিন উন্মোচিত হবে কি না? এই ঘটনা থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। সংবিধানের ১১নং অনুচ্ছেদে জনগণের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩১নং অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে। ৩২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতিত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ একজন সালাহ উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি করেন। তিনি ‘নিখোঁজ’ হওয়ার আগে বিএনপির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটা কোনো ব্যক্তির জন্য অপরাধ হতে পারে না। তিনি গোপন স্থান থেকে বিবৃতি পাঠাতেন, তাতে অবরোধের কথা থাকতÑ এটি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও এটা করে তিনি যদি ‘অপরাধ’ করে থাকেন, তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত ছিল। দেশের আইনে এ ব্যাপারে বলা আছে। আইন অনুযায়ী তার শাস্তি হওয়াই কাম্য ছিল। কিন্তু ‘কিছু ব্যক্তি’ তাকে তুলে নিয়ে যাবে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘ ৬২ দিনেও তার খোঁজ পাবে নাÑ এটা কোনোমতেই কোনো ভালো খবর নয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র তার বিভিন্ন প্রশাসনিক যন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আমরা চাইব এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। রাজনীতিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। পার্থক্য না থাকলে তো আর রাজনীতি থাকে না! পথ ও মত ভিন্ন হবেই। তবে ভিন্নমত ও ভিন্নপথেই এক একটি দল তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। বিএনপি তথা ২০ দলের গত তিন মাসের আন্দোলন নিয়ে নানা কথা আছে। আন্দোলনের যে সহিংসতা রূপ আমরা দেখেছি, তাকে কোনো অবস্থাতেই সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা বলা যাবে না। বিএনপি যদিও বলেছে, তারা এই সহিংস কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের ডাকা আন্দোলনে যদি এ ধরনের কর্মকা- হয় তাহলে এর দায়ভার তো তারা এড়াতে পারে না। কিন্তু তাই বলে এ জন্য একজন ব্যক্তি সালাহ উদ্দিন আহমেদকে কতটুকু ‘অভিযুক্ত’ করা যাবে, সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন এখন।
রাজনীতি আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে, এটা একটা ভালো লক্ষণ। বিএনপি তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েও নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বয়কট করে। নির্বাচন ‘সুষ্ঠু’ হয়নি এটা যেমন সত্য কথা, ঠিক তেমনি বিএনপির নির্বাচন বয়কটও ঠিক হয়নি। তবে আমার বিবেচনায় সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি না দেওয়ায় একটা ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ‘ফিরে পাওয়া’কে কেন্দ্র করে বিএনপি কোনো বড় কর্মসূচি দেবে নাÑ এটাই সবার প্রত্যাশা। আমরা চাই সালাহ উদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ রহস্য উন্মোচিত হোক। জাতি জানুক কী এবং কেন ঘটেছিল ওই ঘটনা। নিশ্চয়ই সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশি গোয়েন্দাদের বলবেন তার ‘হারিয়ে যাওয়া’ ৬২ দিনের ‘কাহিনি’! এই কাহিনি জানতে বিএনপিকেও সহযোগিতা করতে হবে। বিএনপির সহযোগিতা ছাড়া প্রকৃত কাহিনি জানা যাবে না। মনে রাখতে হবে এই কাহিনি জানা সবার জন্যই মঙ্গল। আমরা অসহিষ্ণু এই রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। আমাদের চাই উন্নয়ন। রাজনৈতিক বৈরিতা যেন আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সালাহ উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে কোনো ‘রাজনীতি’ হোক আমরা তা চাই না। এ নিয়ে রাজনীতি উত্তপ্ত হোক, এটাও কারও কাম্য নয়। এ জন্য সবারই উচিত সংযত হয়ে কথা বলা। অহেতুক বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বললে, তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং শিলং থেকে তার ফিরিয়ে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে। সালাহ উদ্দিন আহমেদ তার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে ফিরে আসুক সুস্থ হয়ে, কায়মনোবাক্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই প্রার্থনা করছি।
Daily Amader Somoy
16.05.15
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In his Office at UGC Bangladesh
Prof Rahman With US Congressman Joseph Crowley
here you go!!!
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
During his stay in Germany
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
At Fatih University, Turkey during his recent visit.
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In front of an Ethnic Mud House in Mexico
বড় অর্থনীতির দুটি দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক
14:00
No comments
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৪ মে তিন দিনের সফরে চীন গেছেন। যে কোনো বিবেচনায় এই সফরকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। প্রথমত, অতি সাম্প্রতিককালে ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে এই দুই দেশ এক ধরনের ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ লিপ্ত হয়েছে। ভারতের বেশ কিছু কর্মকাণ্ড চীনে এক ধরনের অবিশ্বাসের জš§ হয়েছে। এই সফর সেই অবিশ্বাসকে কতটুকু ভাঙতে পারবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, ভারতের নীতি দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের ‘ভারতীয় মডেলের মনরো ডকট্রিন’-এর জš§ দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত অন্য কারো ‘কর্তৃত্ব’ সহ্য করবে না। শ্রীলঙ্কায় চীনের খুব কাছের বন্ধু প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসেকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত, ভুটানে চীনা দূতাবাস খোলার ব্যাপারে আপত্তি এবং নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে ভারতের অসন্তুষ্টি প্রমাণ করে ভারত চীনকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছে না। তৃতীয়ত, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা পণ্যের বিশাল এক ‘বাজার’ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য জায়গা করে নিতে পারছে না। ‘বাজার’ ধরে রাখার ব্যাপারে চীন ও ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন আগের চেয়েও স্পষ্ট। তবে এটাও সত্য, চীনের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে মোদির একটি আগ্রহ রয়েছে। যখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন একাধিকবার তিনি বেইজিং সফর করেছেন এবং চীনা মডেলে আগ্রহান্বিত হয়েছিলেন। গুজরাটে বড় চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। উপরন্তু গেল বছরের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট তার ভারত সফরে নয়াদিল্লি না নেমে সরাসরি আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে নেমেছিলেন এবং সব প্রটোকল ভেঙে নরেন্দ্র মোদি তাকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। তাই চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ব্রিকস ব্যাংক গঠনের উদ্যোক্তা এই দুটি দেশ। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি মার্কিন ডলার, যা কিনা চলতি বছর ১০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে চান উভয় দেশের নেতারা। যদিও এটা সত্য, বাণিজ্য ঘাটতি ২০০১-০২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ১০০ কোটি ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার কোটি মার্কিন ডলার
এখন এই বাণিজ্য ব্যবধান কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, চীনের উদ্বেগকে কীভাবে প্রশমিত করা যায় সেই চেষ্টাই নরেন্দ্র মোদি করবেন, তার বেইজিং সফরের সময়। তবে কতটুকু তিনি সফল হবেন, এ প্রশ্ন থাকবেই। কেননা ভারতের অনেক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যেই চীনা নেতারা তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘ইন্ডিয়ান ওসেন রীম’ বা আইওআর-এর একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে গত ২০-২২ মার্চ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত মহাসাগরভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া আইওআরের সদস্য। এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এমন একটি সময়, যখন ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজাচ্ছেন। তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই সঙ্গে এশিয়ায় ভারতকে অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বাদে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ সফর করেছেন। তার পররাষ্ট্র সচিবও ‘সার্ক যাত্রার’ অংশ হিসেবে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশ সফর করেছেন।
ভুবনেশ্বর শীর্ষ সম্মেলনের আগে নরেন্দ্র মোদি মরিশাস, সিসিলি ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। মরিশাস সফরের সময় মরিশাসের সঙ্গে সেখানে একটি ভারতীয় নৌঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কারÑভারত ভারতীয় মহাসাগরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ ব্যাপারে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি মৈত্রী জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত এবং ওই জোটে মরিশাস ও সিসিলিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ মধ্যাঞ্চলের সিসিলি, মরিশাস কিংবা সুদূরের ওমান-মোজাম্বিকও এই প্রক্রিয়ায় একীভূত হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ভারত তাই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে অন্যতম শক্তি হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে আবির্ভূত হতে চায়। এ ক্ষেত্রে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। চীন যে তার ‘মেরিটাইম সিল্করুট’-এর কথা বলছে, সেই ‘সিল্করুট’-এর সঙ্গে ভারতের এই অর্থনৈতিক স্বার্থ সাংঘর্ষিক। চীন ও ভারতের স্বার্থ মূলত এক ও অভিন্নÑভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজ নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন রীতিমতো প্রশ্নের মুখে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গেল সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফর এবং আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক তাকে অভ্যর্থনা জানানো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের সেই পঞ্চাশের দশকের দু’দেশের মাঝে সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিলেও অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে অতি সম্প্রতি দু’দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি (২০১৫) প্রধানমন্ত্রী মোদি অরুণাচল সফর করেন। সেখানে তিনি রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছে চীন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদির অরুণাচল সফরকে সমালোচনা করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, চীনা সরকার কখনোই ‘অরুণাচল প্রদেশ’কে স্বীকৃতি দেয়নি। বেইজিংয়ের মতে, চীনের অন্তর্গত তিব্বতের মনিয়ুল, লোয়ুল ও নিম্মসায়ুল এলাকা নিয়ে ‘তথাকথিত অরুণাচল’ গড়েছে নয়াদিল্লি। এই এলাকাগুলো এখনো ভারতের ‘বেআইনি দখলদারির কবলে রয়েছে।’ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অভিমত সঙ্গত কারণেই দু’দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।
অনেকেই স্মরণ করতে পারেন কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুমিও কিসিদা ভারতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি অরুণাচল প্রদেশ যে ভারতের, সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিসিদার ওই বক্তব্যে চীন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। চীন মনে করে ভারত জাপানকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। আগামী জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশ সফরেও আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব ও কর্তৃত্ব বাড়ছে। মোদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি প্রথম সফরে ভুটান গিয়েছিলেন। ওই সময় সেখানে চীনবিরোধী বক্তব্যও তিনি দিয়েছিলেন। চীন এখন অবধি ভুটানে তাদের দূতাবাস খোলার অনুমতি পায়নি শুধু ভারতের আপত্তির কারণে। নয়া পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকর তার দক্ষিণ এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে ভুটান হয়ে ২ মার্চ ঢাকা সফর করেন। এরপর যান পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে। ইতোমধ্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এ অঞ্চলে নতুন এক মেরুকরণের জš§ দিয়েছে। ওবামার ভারত (২৫ জানুয়ারি ২০১৫) সফর এই নয়া মেরুকরণের জš§ দিয়েছে। ভারতের নয়া পররাষ্ট্রনীতিতে এই মেরুকরণের কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা লক্ষ্য করেছেন যে, একুশ শতকে ভারত মহাসাগর প্রত্যক্ষ করবে ত্রিদেশীয় একটি প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র তার এশীয়-প্যাসিফিক ফ্লিট থেকে ৬টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে মোতায়েন করবে। এটি সম্পন্ন হবে ২০১৯ সালের মধ্যে। ভারত তার প্রাচীন ‘কটন রুট’কে আবার নতুন করে সাজাচ্ছে। এই ‘কটন রুট’ ধরে ভারতীয় পণ্য, বিশেষ করে তার সুতি কাপড় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। এমনকি এই ‘কটন রুট’ ধরে ভারতীয় ব্রাহ্মণরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া (বালি) ও কম্বোডিয়ায় হিন্দু ধর্মের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছিলেন। এ অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিকশিত ঘটেছিল এই ‘কটন রুট’ ধরে। এর আগে চীনা নেতা শি জিন পিং একটি ‘মেরিটাইম সিল্ক রুট’-এর কথা বলেছিলেন। এই ‘মেরিটাইম সিল্ক রুট’কে সামনে রেখে চীন বেশ কিছুদিন আগে তার বিখ্যাত ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছিল। চীন যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে তার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সামুদ্রিক বন্দরগুলোকে একত্রিত করতে চায়। এতে আরব সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর কর্তৃত্ব বেড়েছে। চীনের এই ‘মুক্তার মালা’ নীতির কারণে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মাল্লাকা প্রণালি, ইন্দোনেশিয়ার বালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে এরাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এই সমুদ্রপথ থাকছে চীনের নিয়ন্ত্রণে। কেননা এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। গাওদার (বেলুচিস্তান, পাকিস্তান) ও চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট ইউনিটও রয়েছে, যেখান থেকে চীন ভারত মহাসাগরের সব ধরনের নৌ-মুভমেন্ট লক্ষ্য করবে।
গাওদারের ঠিক উল্টো দিকে ভারত মহাসাগরের এক পাশে রয়েছে শ্রীলঙ্কার হামবানতোতা গভীর সামুদ্রিক বন্দর। এই সামুদ্রিক বন্দরটি চীন নির্মাণ করে দিয়েছে। এখানে চীনা নৌবাহিনীর সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টরা ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড’ তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেছিল। এ জন্য রাজাপাকসেকে ক্ষমতা পর্যন্ত হারাতে হয়েছিল। রাজাপাকসে অতিমাত্রায় চীনানির্ভর ছিলেন। এই চীনানির্ভরতা ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা খুব সহজভাবে নিতে পারেননি। সেখানে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নয়া প্রেসিডেন্ট গিরিসেনা দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি শ্রীলঙ্কাও ঘুরে এসেছেন অতি সম্প্রতি। স্পষ্টতই মোদি সরকার ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলগুলো নিয়ে যে নীতি প্রণয়ন করেছে তা চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। সুতরাং মোদির বেইজিং সফরে এই আস্থার সম্পর্ক কতটুকু ফিরে আসবে তা এক প্রশ্ন বটে। তবে চীনের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তারা জানেন চীনের বৈদেশিক নীতি এখন বিনিয়োগ ও ব্যবসানির্ভর। চীনারা কোনো দেশে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। চীনারা ব্যবসা বোঝে। ব্যবসা চায়। মোদি সরকার একটি ‘ব্যবসা ও বিনিয়োগনির্ভর’ নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতে যথেষ্ট চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দুই দেশই চাইবে তার নিজ নিজ স্বার্থ আদায় করে নিতে। আগামী শতাব্দী হবে চীন ও ভারতের। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি আর ভারত তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অর্থনীতি। ফলে এই দুটি বড় দেশের মধ্যে সম্পর্ক যদি ভালো থাকে, তাহলে তা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য মঙ্গল। বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্বে শান্তি ক্রমেই অধরা হয়ে যাচ্ছে অথচ শান্তির জন্য মানুষের আর্তনাদ রয়েছে সর্বত্র।
Daily Manobkontho
15.05.15
09:01
No comments
ভারত বাংলাদেশকে কখনো মর্যাদার চোখে দেখে না’
( ভিডিও)
আমাদের সময়.কম : ০৭/০৫/২০১৫

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেছেন, ভারতের আমলারা কখনো বাংলাদেশকে মর্যাদার চোখে দেখেন না। এটা ভারতের আমলাতন্ত্রের একটা বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। যে কারণে তারা সবসময় আমাদের ওপর এক ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতা চাপিয়ে দিতে চায় আর এর ফলে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। এসময় তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যেমন ভারত উন্নয়ন করতে পারে না তেমনি ভারতকে বাদ দিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে পারে না। দু’দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নির্ভর করছে দুদেশের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।
( ভিডিও)
আমাদের সময়.কম : ০৭/০৫/২০১৫
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেছেন, ভারতের আমলারা কখনো বাংলাদেশকে মর্যাদার চোখে দেখেন না। এটা ভারতের আমলাতন্ত্রের একটা বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। যে কারণে তারা সবসময় আমাদের ওপর এক ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতা চাপিয়ে দিতে চায় আর এর ফলে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। এসময় তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যেমন ভারত উন্নয়ন করতে পারে না তেমনি ভারতকে বাদ দিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়ন করতে পারে না। দু’দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নির্ভর করছে দুদেশের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।
গতকাল দিবাগত রাতে সময় টিভিতে প্রচারিত সম্পাদকীয় অনুষ্ঠানে মোদির
কারিশমা শীর্ষক এক টক শোতে তিনি এসব কথা বলেন। মুজতবা দানিশের উপস্থাপনায় এসময় সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব মুজতবা কবির উপস্থিত ছিলেন।
তারেক শামসুর রেহমান বলেন, মনমোহন সিংয়ের সরকার বলেছিলো, আমি সীমান্ত হত্যা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু আজো বন্ধ হয়নি’। আসলে ব্যাপারটা কোথায়? ব্যাপারটা আর কোথাও নয় ভারতের আমলাতন্ত্রের মধ্যে। ভারতীয় আমলাদের মধ্যে এক ধরনের জটিলতা আছে। এখনো সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। আমার মনে হয় এই হত্যা আগামিতেও বন্ধ হবে না। কিন্তু আমরা যদি দুই দেশ পরস্পরকে একটু গুরুত্ব দেই তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, আজকে ভারত কিন্তু ছোট্ট ভারত নেই। ভারত বিশ্বের একটা অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি এবং বলা হচ্ছে এই শতকে এশিয়া মহাদেশে চীন, ভারত এবং জাপান এই তিনটি অর্থনৈতিক শক্তি বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আগামী দিনে ভারত একটা শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভূমি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।
তিনি আরো বলেন, আজকে সীমান্ত হত্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য অনেক অনুরোধ জানানো হলেও এখনো তা ক্রমাš^য়ে বেড়েই চলেছে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি ¯^াক্ষরিত হয়েছিলো। এই দ্বি-পাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধি ¯^াক্ষর করেন। অবশেষে সম্প্রতি গত ৫ মে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সীমান্ত চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেশ কিছু ছিটমহল রয়েছে। সীমান্ত চুক্তির উদ্দেশ্য ছিলো দুই দেশের মধ্যে থাকা বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো পরস্পরকে হস্তান্তরের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা।
স্থানীয় সময়: ০৫৪০ ঘণ্টা , ৭ মে ২০১৫
সম্পাদনা: মুজতবা ফারুকী
শুধু সীমান্ত চুক্তি যথেষ্ট নয়
18:52
No comments
ছিটমহল
বিনিময়সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনীটি ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে অনুমোদিত
হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এক নয়া উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে
ভারতীয় সংবিধানের ১১৯৩৪৪ সংশোধনীটি প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হলো। এরপর এটি
অনুমোদনের জন্য কয়েকটি কক্ষের বিধানসভায় যাবে। তারপর রাষ্ট্রপতি তাতে
স্বাক্ষর করবেন। এগুলো এখন শুধু নিয়ম রক্ষার কার্যক্রম। তবে নিঃসন্দেহে
সীমান্ত চুক্তিটি ভারতীয় সংসদ অনুমোদিত হওয়ায় দীর্ঘ ৬৮ বছরের এক অমানবিক
পরিস্থিতিরই অবসান ঘটল না, বরং ভারতীয় সংসদ সদস্যরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে
বিলটি পাস করায় তা এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। বিলের বিরুদ্ধে কোনো
সাংসদ ভোট দেননি। এমনকি সংসদে বঙ্গবন্ধুর কথাও উচ্চারিত হয়েছে। সবচেয়ে যেটা
বেশি করে উল্লেখ করার মতো তা হচ্ছে, মোদি সরকার ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর
সাবেক ইউপিএ সরকার যেভাবে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেছিল, সেভাবে অবিকৃতভাবেই
বিলটি উপস্থাপন করল। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রশ্নে সবাই যে এক, এ
কথাটাই প্রমাণ করলেন ভারতীয় নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি
দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আমরা এই কাজটি করতে পারতাম কী না সন্দেহ।
ভারত যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কীভাবে ধারণ করে, এটা একটা বড় প্রমাণ। এ
থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। দ্বিতীয়ত, রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপনের সময়
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যে বক্তব্য রেখেছেন, তাও যথেষ্ট
গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এই চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য
দিয়ে বিশ্বের কাছে আমরা যে প্রতিবশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে
বিশ্বাসী, সেই বার্তাই পেঁৗছবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই
উক্তির যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। বলাই ভালো, প্রথমে আসামকে বাদ দিয়ে বিলটি
উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল মোদি সরকার। পরে কংগ্রেসের আপত্তির মুখে এবং আসাম
বিজেপিকে আস্থায় নিয়েই অবিকৃতভাবে, অর্থাৎ আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই বিলটি
প্রথমে উচ্চকক্ষে উত্থাপিত হয় এবং তা অনুমোদিত হয়। সীমান্ত চুক্তি (১৯৭৪)
এবং প্রটোকলের (২০১১) আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট ৭ হাজার ১১০
একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর
আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময় হবে। বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে
প্রায় ১৪ হাজার এবং ভারতীয় ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। এর
অর্থ হচ্ছে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ একর জমি পাবে বাংলাদেশ। আর
৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের ৭ হাজার ১১০ একর জমি পাবে ভারত। আসাম, মেঘালয় ও
পশ্চিমবঙ্গে এসব ছিটমহল রয়েছে।
এককভাবে মোদি সরকারকে এর জন্য কৃতিত্ব দেয়া যাবে না। বিগত ইউপিএ সরকারের অবদানও কম নয়। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত করার উদ্যোগ নিলেন তিনি। বিগত ইউপিএ সরকারের সঙ্গে তার পার্থক্য এখানেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি যারা পর্যালোচনা করেন, তারা জানেন মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেয়া। সেই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব 'মনরো ডকট্রিন'কে নয়া আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো 'শক্তি' প্রভাব বিস্তার করুক, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোনো শক্তিকেই পূর্ণ আস্থায় নিতে পারছে না ভারত। মোদি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মোদি প্রথমে ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি নেপাল ও শ্রীলংকা গেছেন। তিনি তার পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকরকে 'সার্ক যাত্রা'র অংশ হিসেবে ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। আগামী জুন মাসে তিনি আসছেন বাংলাদেশে। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের। এক্ষেত্রে কংগ্রেসের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই বিলটি সংসদে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা চান। অত্যন্ত প্র্যাগম্যাটিক মোদি জানেন কীভাবে বিরোধীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে তিনি আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তবে তাকে যেতে হবে অনেক দূর। তিনি ভালো করেই জানেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে, এর সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজন দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। বেশকিছু কাজ এখনো বাকি। মমতা ব্যানার্জি এটা নিয়ে আবার কোনো রাজনীতি করেন কী না, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। কেননা ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন বিধায় মোদির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল রাজ্যসভায় এটি পাস করানোর। তিনি ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রায় ৬০ হাজার ছিটমহলবাসীকে (?) তার আশ্রয় দিতে হবে এবং এজন্য তার অর্থের প্রয়োজন। যেখানে সুষমা স্বরাজ ৩ হাজার ছিটমহলবাসীর কথা বলছেন, যারা ভারতে যেতে চায়, সেখানে ৬০ হাজার মমতা কোথায় পেলেন? ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করেছে। তাহলে কী ধরে নেয়া যায়, এটা মমতার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একটি কৌশল! কেননা বিজেপির টার্গেট মমতাকে পশ্চিম বাংলা থেকে উৎখাত করা। কাজটি খুব সহজ নয়। হতে পারে বিজেপি যাতে এই চুক্তি থেকে কোনো 'সুবিধা' নিতে না পারে এবং পশ্চিম বাংলার ভোটব্যাংকে আঘাত করতে না পারে, সেজন্য মমতা এসব কথা বলছেন। তবে এটা সত্য, পশ্চিম বাংলা এবং আসামে চুক্তিবিরোধী তথা ভূমি গঠনবিরোধী একটা জনমত আছে। ২০১৬ সালে আসামেও বিধানসভার নির্বাচন। এটা কোনো কোনো শক্তি একটা ইস্যু করতে পারে। বাংলাদেশ মোদির ওপর আস্থা রেখেছিল। এর প্রতিদানও পেয়েছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা মোদি সমাধান করেছেন। আমরা ছোট দেশ হতে পারি। কিন্তু আমাদেরও দেয়ার আছে অনেক কিছু। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমরা ভারতের অর্থনীতি থেকে লাভবান হতে চাই। চাই নিজেদের আরো উন্নত করতে। স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এই সম্পর্কটা আমরা ধরে রাখতে চাই।
কিন্তু শুধু সীমান্ত চুক্তি বিলটি পাস করার মধ্য দিয়েই যেন সবকিছু থমকে না যায়। সুষমা স্বরাজ যে কথা রাজ্যসভায় বলেছেন, তা প্রমাণ করার জন্যই মোদি সরকারকে এখন যেতে হবে আরো অনেক দূর। আরো বেশ কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, তার সমাধান আয়োজন। প্রথমেই বলতে হয় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা। এ নিয়ে অনেক তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরও চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। এখানে ক্ষমতা একটি ফ্যাক্টর। তার আপত্তি রয়েছে। মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরের সময় তিনি আমাদের তার ওপর আস্থা রাখতে বলে গিয়েছিলেন। এখন ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। এই নির্বাচনে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি একটি ইস্যু হবে। তারপরও আমরা চাই এর আগেই একটি চুক্তি হোক। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ও ফুলেরতল ব্যারাজ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটবাসীর এক ধরনের আশঙ্কা ও উদ্বেগ রয়েছে। আস্থার নিদর্শনস্বরূপ ভারত এই কার্যক্রম 'স্ট্যাটাস শো' বজায় রাখতে পারে। মোদির ভারতের ভেতরই এই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। অথচ ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরো কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে বাংলাদেশে-ভারত বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়বেই। পরিসংখ্যান বলে এই বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের অনুকূলে। আর ভারত এই ঘাটতি তার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভাতরীয় পণ্য (চাল), বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ত্রিপুরায় একাধিকবার পরিবহন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের কর বা শুল্ক প্রদান করা হয়নি। বিনিময়ে নেপাল ও ভুটান ট্রানজিট পাবে_ এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। একটি স্থায়ী কাঠামোর আওতায় এই ট্রানজিট ব্যবস্থা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দু'দেশের জ্বালানি সংকট ও পানি সংকট মেটানোর জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায় কী না, সে ব্যাপারে সমীক্ষা চালানো উচিত। আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পেরেছি, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। আগামীতে এই ব্যবস্থার আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন। জঙ্গি তৎপরতা আমাদের উভয় দেশের জন্যই একটি সমস্যা। এ ব্যাপারে দু'দেশ যৌথ কর্মসূচি নিতে পারে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে একটি 'হটলাইন' স্থাপন করতে পারে। মোদি ক্ষমতা নেয়ার পরপরই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে খরা অঞ্চলে পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা কার্যকর হলে বাংলাদেশে পানিশূন্যতা দেখা দেবে। এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। সীমান্তে হত্যা একটি বড় সমস্যা। এখন সীমানা চিহ্নিত হওয়ায় এই সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে_ এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনারও প্রয়োজন আছে। কেননা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। পানির চাহিদাও বাড়বে। সুতরাং চুক্তিতে পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের উচিত এ ব্যাপারে ভারতকে রাজি করানো। আসলে মোদ্দা কথাটি হচ্ছে, আস্থার সম্পর্ককে আগে সম্প্রসারিত করা। দীর্ঘ ৪১ বছর ভারত চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির ফলশ্রুতিতে আমরা বেরুবাড়ি ভারতকে দিয়েছিলাম। আমাদের সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে তার সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েছিলাম। আজ এত বছর পর মোদি সরকার এর সাংবিধানিক বৈধতা দিলেন।
এক অমানবিক ও মানহানির পরিস্থিতি থেকে ছিটমহলের মানুষগুলো মুক্তি পেল। উভয় দেশের সরকারকেই এখন ছিটমহলবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই ভারত যে আস্থা প্রদর্শন করেছে, তা আরো সম্প্রসারিত করুক। পানি সমস্যার সমাধানে ভারত আন্তরিক হোক। ভারত 'বড় দেশ' হয়েও তার পার্শ্ববর্তী দেশকে সম্মান করতে জানে, এটা প্রমাণ করুক। চুক্তিটি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মোদির (জুন মাসে) সফরের পথ প্রশস্ত হলো। আমরা তাকিয়ে থাকলাম মোদির বাংলাদেশ সফরের দিক Daily Jai Jai Din 12.05.15
এককভাবে মোদি সরকারকে এর জন্য কৃতিত্ব দেয়া যাবে না। বিগত ইউপিএ সরকারের অবদানও কম নয়। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত করার উদ্যোগ নিলেন তিনি। বিগত ইউপিএ সরকারের সঙ্গে তার পার্থক্য এখানেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি যারা পর্যালোচনা করেন, তারা জানেন মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেয়া। সেই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব 'মনরো ডকট্রিন'কে নয়া আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো 'শক্তি' প্রভাব বিস্তার করুক, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোনো শক্তিকেই পূর্ণ আস্থায় নিতে পারছে না ভারত। মোদি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মোদি প্রথমে ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি নেপাল ও শ্রীলংকা গেছেন। তিনি তার পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকরকে 'সার্ক যাত্রা'র অংশ হিসেবে ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। আগামী জুন মাসে তিনি আসছেন বাংলাদেশে। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের। এক্ষেত্রে কংগ্রেসের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই বিলটি সংসদে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা চান। অত্যন্ত প্র্যাগম্যাটিক মোদি জানেন কীভাবে বিরোধীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে তিনি আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তবে তাকে যেতে হবে অনেক দূর। তিনি ভালো করেই জানেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে, এর সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজন দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। বেশকিছু কাজ এখনো বাকি। মমতা ব্যানার্জি এটা নিয়ে আবার কোনো রাজনীতি করেন কী না, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। কেননা ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন বিধায় মোদির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল রাজ্যসভায় এটি পাস করানোর। তিনি ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রায় ৬০ হাজার ছিটমহলবাসীকে (?) তার আশ্রয় দিতে হবে এবং এজন্য তার অর্থের প্রয়োজন। যেখানে সুষমা স্বরাজ ৩ হাজার ছিটমহলবাসীর কথা বলছেন, যারা ভারতে যেতে চায়, সেখানে ৬০ হাজার মমতা কোথায় পেলেন? ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করেছে। তাহলে কী ধরে নেয়া যায়, এটা মমতার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একটি কৌশল! কেননা বিজেপির টার্গেট মমতাকে পশ্চিম বাংলা থেকে উৎখাত করা। কাজটি খুব সহজ নয়। হতে পারে বিজেপি যাতে এই চুক্তি থেকে কোনো 'সুবিধা' নিতে না পারে এবং পশ্চিম বাংলার ভোটব্যাংকে আঘাত করতে না পারে, সেজন্য মমতা এসব কথা বলছেন। তবে এটা সত্য, পশ্চিম বাংলা এবং আসামে চুক্তিবিরোধী তথা ভূমি গঠনবিরোধী একটা জনমত আছে। ২০১৬ সালে আসামেও বিধানসভার নির্বাচন। এটা কোনো কোনো শক্তি একটা ইস্যু করতে পারে। বাংলাদেশ মোদির ওপর আস্থা রেখেছিল। এর প্রতিদানও পেয়েছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা মোদি সমাধান করেছেন। আমরা ছোট দেশ হতে পারি। কিন্তু আমাদেরও দেয়ার আছে অনেক কিছু। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমরা ভারতের অর্থনীতি থেকে লাভবান হতে চাই। চাই নিজেদের আরো উন্নত করতে। স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে দু'দেশের মাঝে আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এই সম্পর্কটা আমরা ধরে রাখতে চাই।
কিন্তু শুধু সীমান্ত চুক্তি বিলটি পাস করার মধ্য দিয়েই যেন সবকিছু থমকে না যায়। সুষমা স্বরাজ যে কথা রাজ্যসভায় বলেছেন, তা প্রমাণ করার জন্যই মোদি সরকারকে এখন যেতে হবে আরো অনেক দূর। আরো বেশ কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, তার সমাধান আয়োজন। প্রথমেই বলতে হয় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা। এ নিয়ে অনেক তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরও চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। এখানে ক্ষমতা একটি ফ্যাক্টর। তার আপত্তি রয়েছে। মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরের সময় তিনি আমাদের তার ওপর আস্থা রাখতে বলে গিয়েছিলেন। এখন ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভার নির্বাচন। এই নির্বাচনে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি একটি ইস্যু হবে। তারপরও আমরা চাই এর আগেই একটি চুক্তি হোক। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ও ফুলেরতল ব্যারাজ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটবাসীর এক ধরনের আশঙ্কা ও উদ্বেগ রয়েছে। আস্থার নিদর্শনস্বরূপ ভারত এই কার্যক্রম 'স্ট্যাটাস শো' বজায় রাখতে পারে। মোদির ভারতের ভেতরই এই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। অথচ ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরো কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে বাংলাদেশে-ভারত বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়বেই। পরিসংখ্যান বলে এই বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের অনুকূলে। আর ভারত এই ঘাটতি তার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভাতরীয় পণ্য (চাল), বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ত্রিপুরায় একাধিকবার পরিবহন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের কর বা শুল্ক প্রদান করা হয়নি। বিনিময়ে নেপাল ও ভুটান ট্রানজিট পাবে_ এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। একটি স্থায়ী কাঠামোর আওতায় এই ট্রানজিট ব্যবস্থা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দু'দেশের জ্বালানি সংকট ও পানি সংকট মেটানোর জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায় কী না, সে ব্যাপারে সমীক্ষা চালানো উচিত। আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পেরেছি, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। আগামীতে এই ব্যবস্থার আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন। জঙ্গি তৎপরতা আমাদের উভয় দেশের জন্যই একটি সমস্যা। এ ব্যাপারে দু'দেশ যৌথ কর্মসূচি নিতে পারে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে একটি 'হটলাইন' স্থাপন করতে পারে। মোদি ক্ষমতা নেয়ার পরপরই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে খরা অঞ্চলে পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা কার্যকর হলে বাংলাদেশে পানিশূন্যতা দেখা দেবে। এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। সীমান্তে হত্যা একটি বড় সমস্যা। এখন সীমানা চিহ্নিত হওয়ায় এই সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে_ এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনারও প্রয়োজন আছে। কেননা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। জনসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। পানির চাহিদাও বাড়বে। সুতরাং চুক্তিতে পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের উচিত এ ব্যাপারে ভারতকে রাজি করানো। আসলে মোদ্দা কথাটি হচ্ছে, আস্থার সম্পর্ককে আগে সম্প্রসারিত করা। দীর্ঘ ৪১ বছর ভারত চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির ফলশ্রুতিতে আমরা বেরুবাড়ি ভারতকে দিয়েছিলাম। আমাদের সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে তার সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েছিলাম। আজ এত বছর পর মোদি সরকার এর সাংবিধানিক বৈধতা দিলেন।
এক অমানবিক ও মানহানির পরিস্থিতি থেকে ছিটমহলের মানুষগুলো মুক্তি পেল। উভয় দেশের সরকারকেই এখন ছিটমহলবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই ভারত যে আস্থা প্রদর্শন করেছে, তা আরো সম্প্রসারিত করুক। পানি সমস্যার সমাধানে ভারত আন্তরিক হোক। ভারত 'বড় দেশ' হয়েও তার পার্শ্ববর্তী দেশকে সম্মান করতে জানে, এটা প্রমাণ করুক। চুক্তিটি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মোদির (জুন মাসে) সফরের পথ প্রশস্ত হলো। আমরা তাকিয়ে থাকলাম মোদির বাংলাদেশ সফরের দিক Daily Jai Jai Din 12.05.15
ফিরে পাওয়া আস্থার সম্পর্ক অটুট থাকুক
21:20
No comments
শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এবং নিম্নকক্ষ লোকসভায় সীমান্ত চুক্তিটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। ৮ মে লোকসভার অধিবেশন শেষ হয়ে গেছে। এই অধিবেশনে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদিত না হলে নানা জটিলতা তৈরি হতো। এবং তাতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু যে এক ধরনের অবিশ্বাসের জন্মই হতো তা নয়, বরং আগামী জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর অনিশ্চিত হয়ে যেত। এখন সীমান্ত চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হওয়ায় এক ধরনের স্বস্তির বাতাস বইছে নয়াদিল্লি প্রশাসনের অন্দর মহলে। তবে এই চুক্তি নিয়ে 'নাটকীয়তা' কম হয়নি। বড় আপত্তি এসেছিল আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে। আসামে ২০১৬ সালে, অর্থাৎ আগামী বছর সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। আসাম বিজেপি এটাকে ইস্যু করতে চেয়েছিল। আসাম বিজেপির ধারণা ছিল, এই সীমান্ত চুক্তিকে ইস্যু করেই তারা আসামে তাদের জনমত বাড়াতে পারবে এবং নির্বাচনে সাফল্য পাবে। কেননা তাদের কাছে দৃষ্টান্ত ছিল পশ্চিমবঙ্গের। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থবিরোধী এই যুক্তি তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তাঁর আপত্তির কারণে এখন অব্দি তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একটি তিস্তাচুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক হলেও শুধু পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে এখন অব্দি কোনো চুক্তি হয়নি। অতীতে ইউপিএ সরকারও তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকায় আসা ও চুক্তি স্বাক্ষরে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। মমতা তখন আসেননি। যদিও মমতা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা সফর করে গেছেন। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে তিনি পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে যাননি। কেননা ২০১৬ সালে সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। সুতরাং তিনি কোনো ঝুঁকি নেবেন না। ঠিক একই স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছিল আসাম বিজেপি। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরোধিতা করে আলাদা অবস্থান নিয়েছিল আসাম বিজেপি। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করায় এই সীমান্ত চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলো। এখানে বলা ভালো, সীমান্ত চুক্তিটি ঝুলেছিল অনেক দিন ধরে। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ ৪১ বছর ভারত এই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির বিনিময়ে আমরা বেরুবাড়ী ভারতকে দিয়েছিলাম এবং সংবিধানে তৃতীয় সংশোধনী এনে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদটি সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ভারত তা করেনি। দীর্ঘদিন তারা এই সীমান্ত বিরোধকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তবে ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের পর এর জট কিছুটা খুলতে থাকে। ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই সীমান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। ফিরে পাওয়া আস্থার সম্পর্ক অটুট থাকুক এর পরও সমস্যা ছিল আসাম বিজেপি ও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি ছিল। শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চুক্তিটি মেনে নেওয়ায় মোদি সরকারের পক্ষে সহজ হয় চুক্তিটি সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থাপনের। লোকসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে সমস্যা ছিলই। একপর্যায়ে আসামকে বাদ দিয়েই অর্থাৎ আসাম-বাংলাদেশ সীমান্ত চিহ্নিত না করেই কেন্দ্র উদ্যোগ নেয় উচ্চকক্ষে বিলটি উপস্থাপন করার। কিন্তু আপত্তি ওঠে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। কংগ্রেস সভানেত্রী আসামকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। এমনকি আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং আসাম কংগ্রেসের সভাপতি তরুণ গগৈও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে চিঠি লেখেন। শেষ মুহূর্তে কেন্দ্র আসাম বিজেপিকে বোঝাতে সক্ষম হয় এবং বিলটি অবিকৃতভাবেই, অর্থাৎ আসামকে অন্তর্ভুক্ত করেই উচ্চকক্ষে উত্থাপিত হয় এবং তা অনুমোদিতও হয়। সীমান্ত চুক্তি (১৯৭৪) এবং প্রটোকলের (২০১১) আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময় হবে। বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার এবং ভারতীয় ছিটমহলগুলোয় জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। এর অর্থ হচ্ছে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ একর জমি পাবে বাংলাদেশ। আর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের ৭ হাজার ১১০ একর জমি পাবে ভারত। আসাম, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গে এসব ছিটমহল রয়েছে।
এককভাবে মোদি সরকারকে এর জন্য কৃতিত্ব দেওয়া যাবে না। বিগত ইউপিএ সরকারের অবদানও কম নয়। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো উন্নত করার উদ্যোগ নিলেন তিনি। বিগত ইউপিএ সরকারের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য এখানেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি যাঁরা পর্যালোচনা করেন, তাঁরা জানেন মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া। সেই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব 'মনরো ডকট্রিন'কে নয়া আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কোনো 'শক্তি' প্রভাব বিস্তার করুক, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোনো শক্তিকেই পূর্ণ আস্থায় নিতে পারছে না ভারত। মোদি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মোদি প্রথমে ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি নেপাল ও শ্রীলঙ্কা গেছেন। তিনি তাঁর পররাষ্ট্রসচিব জয় শংকরকে 'সার্ক যাত্রা'র অংশ হিসেবে ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। আগামী জুন মাসে তিনি আসছেন বাংলাদেশে। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েই তিনি আসামকে অন্তর্ভুক্ত করে বিলটি সংসদে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা চান। অত্যন্ত প্রাগমেটিক মোদি জানেন কিভাবে বিরোধীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে তিনি আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি পেয়েছেন। তবে তাঁকে যেতে হবে অনেক দূর। তিনি ভালো করে জানেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে- এর সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিস্তার পানিচুক্তি, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা কমানো, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, দুই দেশের মধ্যে যৌথ জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে যৌথ কর্মপন্থা গ্রহণ, ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ, টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজের ব্যাপারে 'স্ট্যাটাস কো' অবলম্বন, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পে স্থিতাবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে মোদি সরকার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে- এটাই বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা। এখন ভারতীয় সংসদে স্থল সীমানা চুক্তির পূর্ণ অনুমোদন হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ মোদি সরকারের ওপর আস্থা রাখতেই পারে। এখন অতি দ্রুত যদি তিস্তার পানিবন্টন চুক্তিটি হয়, তাহলে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করবেন বাংলাদেশে। 'মোদি ম্যাজিক' দুই দেশের মাঝে বিরাজমান সমস্যা সমাধানে বড় অবদান রাখতে পেরেছে। অত্যন্ত কৌশলী ও অবিবেচক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও 'মোদি ম্যাজিকের' কাছে হেরে গেছেন! স্থল সীমানা এখন নির্ধারিত হলো। বাকি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি।
বাংলাদেশ মোদির ওপর আস্থা রেখেছে। এর প্রতিদানও পেয়েছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা মোদি সমাধান করেছেন। আমরা ছোট দেশ হতে পারি। কিন্তু আমাদেরও দেওয়ার আছে অনেক কিছু। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। আমরা ভারতের অর্থনীতি থেকে লাভবান হতে চাই। চাই নিজেদের আরো উন্নত করতে। স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এ সম্পর্কটা আমরা ধরে রাখতে চাই।
যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না
21:09
No comments
যুক্তরাজ্যের
হাউস অব কমন্সের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না। জনমত জরিপে বলা হয়েছিল, একটা
হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু তা হয়নি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই
কনজারভেটিভ পার্টি আবারও ক্ষমতায় থেকে গেল আগামী পাঁচ বছরের জন্য। ২০১০
সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা যে ফলাফল করেছিল, এবার তাদের ফলাফল গেলবারের
ফলাফলকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ সালে কনজারভেটিভরা পেয়েছিল ৩০৬ আসন। এবার এ
সংখ্যা ৩৩১। অন্যদিকে লেবার পার্টির ভরাডুবি হয়েছে। গেলবার তারা পেয়েছিল
২৫৮ আসন, আর এবার পেল ২৩২ আসন। ভরাডুবি ঘটেছে লিবারেল ডেমোক্রেটদের। গেলবার
তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৫৭, এবার তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮-এ। তবে অবাক
করা ঘটনা ঘটেছে স্কটল্যান্ড ন্যাশনালিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে। সর্বশেষ
নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র ৫টি আসন। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।
যুক্তরাজ্যের
এই নির্বাচন এখন অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিল। এক. যুক্তরাজ্যের গত
৯৩ বছরের যে গণতন্ত্র (১৯২২ থেকে), যেখানে মূলত দুটি প্রধান দলই ক্ষমতা
পরিচালনা করে, এই ধারা থেকে দেশটি এবারও বেরিয়ে আসতে পারল না।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এরাই সরকার গঠন করে। ২০১০ সালে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছিল বটে। সেবার সরকার
গঠনের জন্য কনজারভেটিভ দলের প্রয়োজন ছিল তৃতীয় একটি দলের সমর্থনের। লিবডেম
বা লিবারেল ডেমোক্রেটরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরনের প্রতি
সমর্থন দিয়ে যৌথভাবে একটি সরকার গঠন করেছিলেন এবং লিবডেম নেতা নিক ক্লেগ
উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার লিবডেমের বড় ধরনের পরাজয়
হয়েছে। এটা স্পষ্ট, ডেভিড ক্যামেরন এককভাবেই সরকার গঠন করবেন। তিনি এবার আর
কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন না। চারটি জাতি নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত এবং হাউস
অব কমন্সের আসনও সেভাবে নির্ধারিত। যেমন ইংল্যান্ডের রয়েছে ৫৩৩ আসন,
ওয়েলসের ৪০, নর্থ আয়ারল্যান্ডের ১৮ ও স্কটল্যান্ডের ৫৯। সব মিলিয়ে ৬৫০
আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য দরকার হয় ৩২৬টি আসন।দুই.
এই নির্বাচন প্রমাণ করল যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে
সম্ভাবনা ছিল, সে সম্ভাবনা এখন আর নেই। সাধারণ মানুষের আস্থা দুই বড় দলের
প্রতিই। তবে যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের এটা একটা সৌন্দর্য যে, দল যদি হেরে
যায়, তাহলে দলনেতা পরিবর্তন করে। এড মিলিব্যান্ড এখন আর লেবার পার্টির নেতা
থাকবেন না। একই সঙ্গে লিবডেমের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসবে। নিক ক্লেগের
পরিবর্তে আমরা এখন অন্য কাউকে দেখব লিবডেমের নেতৃত্বে। যুক্তিটি হচ্ছে,
দলের নেতৃত্ব যে ‘নীতি ও আদর্শ’ নিয়ে নির্বাচনে গেল, ভোটাররা তা গ্রহণ
করেনি। ফলে দলকে এখন নয়া নীতি ও আদর্শ খুঁজে বের করতে হবে।তিন.
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) এখন হাউস অব কমন্সে তৃতীয় শক্তিশালী দল
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ দলটি ৫৯টি আসনের মধ্যে ৫৬টি পেয়েছে। অথচ এ দলটি
স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বের করে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গড়তে
চায়। এটা ছিল তাদের স্লোগান। যদিও গেল সেপ্টেম্বরে (২০১৪) স্কটল্যান্ডে
স্বাধীনতার প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছিল, তাতে যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষেই ভোট
পড়েছিল বেশি। এখন এসএনপির নেত্রী নিকোলা স্টারজিওন কী ভূমিকা নেন, সেদিকে
অনেকের দৃষ্টি থাকবে। যদিও এরই মধ্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্কটল্যান্ডের
স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আবারও একটি গণভোটের উদ্যোগ নেবেন। ফলে তার ভবিষ্যৎ
রাজনীতি নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই।চার.
প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয়
ইউনিয়নে থাকবে কিনা, এটা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা যাচাই করে দেখার জন্য
২০১৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে একটি গণভোটের আয়োজন করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে
থাকা, না থাকা নিয়ে ব্রিটেনে একটা বিতর্ক আছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে আছে
বটে; কিন্তু ইউরোপীয় মুদ্রা ‘ইউরো’তে কখনোই যোগ দেয়নি। ১৯৫৭ সালে মাত্র
৬টি রাষ্ট্র নিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিটি (ইইসি) যাত্রা শুরু করে আজ তা
ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য তৎকালীন ইইসিতে যোগ
দেয়। আর ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের মাঝে ১২টি দেশ
অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু করে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশ ইউরো গ্রহণ করে।
কিন্তু যুক্তরাজ্য তাদের মুদ্রা পাউন্ডকে ধরে রেখেছে। তুলনামূলক বিচারে
ব্রিটেনের মানুষ কিছুটা কনজারভেটিভ। তারা মনে করে, ইইউ বা ইউরোতে যোগ দেয়ার
অর্থ হচ্ছে তাদের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া। তাই তারা
বারবার ইউরো গ্রহণ করার বিপক্ষে মত দিয়ে আসছে। এখন কনজারভেটিভদের বিজয় এ
প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে এলো যে, যুক্তরাজ্য কি অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপীয়
ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের
সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন একের পর এক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে
থাকে, তখন এই দেশে ব্যাপক হারে পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন
ঘটতে থাকে। আইনবলে এরা তখন যুক্তরাজ্যে থাকার ও চাকরি করার অধিকার রাখেন।
ফলে দেখা গেছে, আদি যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। এর
ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও ক্ষোভ জন্ম হয়েছে।
কনজারভেটিভরা বরাবরই অভিবাসন নীতির বিরোধী। নির্বাচনের ফলে এরই প্রতিফলন
ঘটেছে।পাঁচ. নির্বাচনের তিন বাঙালি
নারীর বিজয় প্রমাণ করল বাঙালিরা আজ বিশ্ব আসরে প্রতিষ্ঠিত। আমি যখন টিউলিপ
সিদ্দিকের বাংলায় দেয়া বক্তব্য শুনছিলাম, তখন আমার বারবার মনে হয়েছিল,
সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলা ভাষাও জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হবে
এবং বাংলা ভাষা অন্যতম একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্র একদিন অভিবাসীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব
আসরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করার পেছনে এই অভিবাসীদের অবদান ছিল
সবচেয়ে বেশি। আজ যুক্তরাজ্যও ধীরে ধীরে সেই পথে যাচ্ছে। শুধু তিনজন বাঙালি
নারী বলি কেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এবার মোট ২২ জন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত
এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মাঝে ভারতের ১০ জন, পাকিস্তানের ৮ জন ও
শ্রীলংকার একজন। আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে কোনো দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এমপি
যদি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন, আমি তাতে অবাক হব না। আমি তিনজন বাঙালি
নারীর ব্যাপারেও যথেষ্ট আস্থাশীল। এরা তিনজনই যথেষ্ট শিক্ষিত। টিউলিপ
সিদ্দিক মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, আর রূপা হক একটি কলেজের শিক্ষক ও পিএইচডি
ডিগ্রিধারী। তারা আগামী দিনগুলোতে লেবার পার্টির মূলধারার রাজনীতিতে যে বড়
অবদান রাখবেন, তা বলাই বাহুল্য। রুশনারা দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হলেন। তিনি
শ্যাডো বা ছায়ামন্ত্রীও ছিলেন। এখন টিউলিপ সিদ্দিক কিংবা রূপা হকের জুনিয়র
ছায়ামন্ত্রী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের জন্য এটা আরও বড় পাওয়া এ
কারণে যে, তাদের দু’জনের (রুশনারা ও টিউলিপ) বাংলাদেশের ব্যাপারে বড় আগ্রহ
রয়েছে। নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের
ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি,
মানবাধিকার নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্রিটেনে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির
ব্যাপক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখবেন, এ প্রত্যাশা এখন
অনেকেই করবেন।যুক্তরাজ্যের ভোটাররা
ডেভিড ক্যামেরন তথা কনজারভেটিভ পার্টির প্রতি আবারও আস্থা রাখলেন। ইউরোপের
সর্বত্র অর্থনীতিতে ব্যাপক মন্দাভাব দেখা দিলেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে তা
তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। ডেভিড ক্যামেরনের সরকার বেশ কিছু মানুষের জন্য
চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। এটা ছিল তার জন্য প্লাস পয়েন্ট। জিডিপি প্রবৃদ্ধির
ধারাও তিনি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এতেও মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি
যুক্তরাজ্যের মানুষের জন্য একটা পরিবর্তন আনতে চান- ভোটাররা তা বিশ্বাস
করেছে। ফলে তিনি আরও ৫ বছরের জন্য ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে রয়ে গেলেন। কিন্তু
সমস্যা যে নেই, তা নয়। আগামী দিনগুলো তার জন্য সুখের না-ও হতে পারে। ২০১৭
সালে গণভোটের কথা বলছেন তিনি। এখন তিনি যদি সত্যি সত্যিই গণভোটের আয়োজন
করেন এবং গণভোটে যদি মানুষ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়, তখন কী
হবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে যুক্তরাজ্য একাকী কি ইউরোপে থাকতে পারবে,
কিংবা একাকী থেকে তার অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু শক্তিশালী হবে, সেটা একটা
প্রশ্ন বটে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাটছাঁটের প্রস্তাব করেছেন
ক্যামেরন। ভোটাররা তা সমর্থন করেছে। লেবাররা এর বিরোধিতা করেও জনসমর্থন
পায়নি। এখন সত্যি সত্যি এ খাতে যদি বাজেট বরাদ্দ কমানো হয়, যদি এ খাতে আরও
বেসরকারীকরণ হয়, তাহলে তা নিুআয়ের মানুষদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তারা স্বাস্থ্যসেবা পাবে না। আর্থিক সংস্থান না থাকায় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত
হবে। একটা বড় ধরনের শংকা রয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়া তথা ক্যারিবীয় অঞ্চলের
অভিবাসীদের নিয়ে। তাদের অনেকেরই ভালো চাকরি নেই। আর্থিক সঙ্গতিও ভালো নয়।
এরা বিপদে পড়তে পারেন আগামী দিনে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসা
শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী নিয়েও সমস্যা আছে। ভাষাগত সমস্যার পাশাপাশি এরা নানা
রকম অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আইন না মানার প্রবণতা এদের মাঝে বেশি।যুক্তরাজ্যে
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা
ক্ষীণ। এই নির্বাচন যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ ৭৫০ বছরের গণতন্ত্রের ইতিহাসের
ধারাবাহিকতাই মাত্র। অনেক পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন একটা পরিবর্তন আসবে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনটি এলো না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লেবার পার্টিকে এখন নয়া
রাজনীতি ও নয়া দর্শন নিয়ে আসতে হবে।
Daily Jugantor
10.05.15
>চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে
21:04
No comments
ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৪ মে দুুই দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। তার এ
সম্ভাব্য চীন সফর ও চীন-ভারত সম্পর্ক অনেকের কাছেই এখন আলোচনার একটি বিষয়।
বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নৌ তৎপরতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর
অনেকের কাছেই এটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, অচিরেই ভারত ও চীন ভারত মহাসাগরের
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাবে। এ ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে
যখন ভারত তার প্রাচীন কটন রুটটি নতুন করে তার নৌ স্ট্র্যাটেজিতে
অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে মোদির চীন সফরের গুরুত্ব থাকবে অনেক বেশি।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্কের কারণে চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
অনেক। চীনকে ঘিরে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সামরিক তৎপরতা
সম্প্রসারিত করেছে ভারত মহাসাগরে। ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ
ফ্লিটের যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করা হবে। পূর্ব চীন সাগরে বেশ ক’টি বিতর্কিত
দ্বীপ রয়েছে, যে দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপান ও ফিলিপাইনের
দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন এ অঞ্চলে মার্কিন নৌ সেনা মোতায়েনের অর্থ হচ্ছে চীনের
ওপর পরোক্ষভাবে ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। একইসঙ্গে ভারত মহাসাগরে চীনের যথেষ্ট
স্বার্থ রয়েছে। চীন এ অঞ্চল ঘিরে যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে
(বন্দর স্থাপনা, রিফুয়েলিং স্টেশন ইত্যাদি), এটাও ভালো চোখে দেখছে না
যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে চীনের স্বার্থ খর্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগর (ভারত মহাসাগরভুক্ত
অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের তেল রিজার্ভের ৬০ ভাগ, আর গ্যাস রিজার্ভের তিন ভাগের
এক ভাগ) আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে
চীনের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়ার সমর্থনের। ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ অনুযায়ী এ
অঞ্চলে মস্কো, তেহরান, বেইজিং ও কলম্বোর মধ্যে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছিল, সে
ঐক্যকে দৃঢ় করতেই শি জিন পিং গেল সেপ্টেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। এর আগে
তিনি মস্কো যান। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে শি জিন পিং যে
বক্তব্য রাখেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে
অন্য দেশের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে শি জিন পিং হুশিয়ারি উচ্চারণ
করেছিলেন, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। চীনা
রাষ্ট্রপ্রধান গেল বছরের মাঝামাঝি ব্রাজিলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ
দিয়েছিলেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও
ব্রিকসের অন্যতম শক্তি। ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক জোট। ২০৫০ সাল
নাগাদ ব্রিকস দেশগুলোর মোট জিডিপির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮.৪ ট্রিলিয়ন
ডলার। (যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকবে ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার)। একই সময়
ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য সম্পর্ক ৩৪০ মিলিয়ন ডলার (২০১২)থেকে
বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৫০০ মিলিয়নে। প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মস্কো গিয়ে শিং জিন
পিং রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো সম্পর্ককে ঝালাই করে দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে ব্রিকস
সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, চীন নতুন অর্থনৈতিক জোটকেও বেশ গুরুত্ব
দিচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ কারণে যে,
চীনের নয়া নেতৃত্ব ন্যূনতম ১০ বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত চীনকে বিশ্ব
আসরে নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং চীনের পররাষ্ট্রনীতির গতি-প্রকৃতি বোঝার দরকার
আছে।
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। ২০১০ সালে
জিএনপির দিক থেকে জাপানকে ছাড়িয়ে যায় চীন। যেখানে ১৯৮০ সালে বিশ্ব
অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ ভাগ (যুক্তরাষ্ট্রের ২৫
ভাগ), সেখানে বলা হচ্ছে, ২০১৬ সালে ppp-এর হিসাব অনুযায়ী (purchasing,
price, parity) চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে।
উৎপাদনশীল পণ্যের বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দিক থেকে চীন এখন এক
মহাশক্তি। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার মাইক্রোওয়েভ ও জুতা উৎপাদিত হয়, তার তিন
ভাগের দুই ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। সে সঙ্গে বিশ্বের উৎপাদিত মোবাইল ফোনের
৬০ ভাগ, ডিভিডির ৫৫ ভাগ, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০ ভাগ, পারসোনাল কম্পিউটারের
৩০ ভাগ, শিশুদের খেলনার ৭৫ ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। ফলে বিশ্বব্যাপী চীনা
পণ্যের একটা বাজার তৈরি হয়েছে। চীনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২
ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। ফরচুন ম্যাগাজিন বিশ্বের বড় ৫০০ কোম্পানির কথা
উল্লেখ করেছে, সেখানে চীনের রয়েছে ৩৭টি কোম্পানি। বিশ্বের যত জ্বালানি
ব্যবহৃত হয় তার সঙ্গে এককভাবে চীনে ব্যবহৃত হয় তার ১৬ ভাগ। আর বিশ্বে
জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে তিন ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করে চীন। যে
কারণে চীনকে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পরিবেশ দূষণের কারণে চীনে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বেড়েছে শতকরা ২৯ ভাগ।
চীনে রয়েছে বিশাল এক তরুণ প্রজন্ম, যারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রতি বছর
২১ মিলিয়ন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। আর প্রতি বছর ৩ লাখ
শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায়। তারা ফিরেও আসে। ১৯৪৮ সালে
(স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে) যেখানে চীনে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ,
এখন সেখানে ১০০ ভাগ। অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে চীনে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক
পরিবর্তন এসেছে, তাতে প্রায় ২০ কোটি মানুষকে চীন অতি দরিদ্রতম অবস্থা
(প্রতিদিন জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ১.২৫ ডলার আয় হিসেবে) থেকে বের করে এনে
কিছুটা সচ্ছলতা দিয়েছে। যদিও বলা হয়, এখনও প্রায় ২০৭ মিলিয়ন লোক
দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন ধনী
ও গরিবের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের
মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে। বিশেষ অর্থনৈতিক
অঞ্চলগুলো এখন কর্মজীবী মানুষের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। মানুষের আয় যেখানে
বেশি। হাজার হাজার টাউনশিপ এখন তৈরি হয়েছে, যা বদলে দিয়েছে চীনের প্রত্যন্ত
অঞ্চলের জীবনযাত্রা। চীনকে নিয়ে খারাপ খবরও আছে। যেখানে ২০০৯ সালে জিডিপির
প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ ভাগ, ২০১২ সালে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক আট ভাগে।
মুদ্রাস্ফীতি তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। আর শহুরে বেকার সংখ্যা চার থেকে ছয় ভাগের
নিচে। এই যে চীন, এ চীনের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বটি এখন বর্তিয়েছে শি জিন
পিং-এর ঘাড়ে। কোন পথে এখন চীন? শি জিন পিং-এর এজেন্ডায় রাশিয়া ও ভারত
প্রাধান্য পেলেও এটা সত্য, অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। বেশ
কিছু বিশ্লেষকের লেখা পড়ে যা মনে হয়েছে, তা হচ্ছে শি জিন পিং এখন প্রথমেই
অগ্রাধিকার দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে। এক বিশাল দেশ চীন। প্রায়
৫৫ জাতি ও উপজাতি নিয়ে গড়ে উঠেছে চীন। ২২টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত
অঞ্চল, চারটি বিশেষ অঞ্চল ও ১৪৭টি বিশেষ এলাকা নিয়ে চীনা রাষ্ট্র।
রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই রাষ্ট্রটি ভেঙে যেতে পারে। এ কারণেই চীনা
নেতারা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সতর্ক থাকছেন। যে ভুল করেছিলেন গরবাচেভ,
সেই ভুল করেননি চীনা নেতারা। সেনাবাহিনী এখনও পার্টির প্রতি অনুগত। তাই
অর্থনৈতিক সংস্কারকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
ফুজিয়ান, ঝে ঝিয়াং কিংবা সাংহাই প্রদেশগুলো তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশি
সমৃদ্ধিশালী। প্রদেশে প্রদেশে যে বৈষম্য, গ্রাম আর শহরের মাঝে যে পার্থক্য,
তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে শি জিন পিং প্রশাসনকে। সেই সঙ্গে রয়েছে
প্রচুর বয়স্ক লোকের পেনশন ভাতা নিশ্চিত করা, পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা,
অসমতা ও দারিদ্র্য দূর করা। এটা হবে চীনা প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ।
দুর্নীতির বিষয়টিও তার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। পার্টির সিনিয়র নেতাদের
ব্যাপক দুর্নীতি এখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বে আলোচনার অন্যতম বিষয়। অভিযোগ
আছে, সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও দুই দশমিক সাত মিলিয়ন ডলার
সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ
করলে তা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়েছিল, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর
মায়ের নামে একটি কোম্পানির ১২০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার আছে। খোদ সাবেক
প্রেসিডেন্ট নিজেও অভিযুক্ত! যুক্তরাষ্ট্রের সুমবার্গ গ্রুপের মতে, শি
পরিবার ৩৭৬ মিলিয়ন ডলারের মালিক। শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সম্পর্কে এ ধরনের
অভিযোগ নয়া প্রেসিডেন্টের জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
একুশ শতকে
আমরা চীনকে দেখব অন্যতম শক্তি হিসেবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে
চীনের উত্থান বিশ্বের সব অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। ব্রিকসে চীন ও
ভারত অন্তর্ভুক্ত হলেও এশিয়ার এ দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এ
অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একটি ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিতে পারে। ভারতে জনগোষ্ঠীর
৩৭ দশমিক ০২ ভাগ দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করলেও আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারত
বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তখন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু
আয় ৯৪০ ডলার থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। ২০০৭ সালে যেখানে
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখত মাত্র ২ ভাগ, তখন অবদান রাখবে ১৭ ভাগ।
সুতরাং ভারতকে ফেলে দেয়া যাবে না। তাই কোনো কোনো বিশ্লেষক (জনাথন হোলসনাগ,
ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন) একটি সম্ভাব্য 'Chindia' ধারণার কথা বলেছেন, যেখানে
চীন ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এ ধারণা অমূলক নয়। সাম্প্রতিক চীন-ভারত
বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা নেতারা ভারত সফর করেছেন। সীমান্ত
সমস্যা নিয়েও (অরুণাচল) এক ধরনের ‘স্থিতাবস্থা’ বিরাজ করছে। ক্ষমতা বহন করে
ভারতবিরোধী তেমন কোনো কথা বলেননি। তিনি ভারত সফরও করেছেন।
একইসঙ্গে
চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশী নেতাদের সম্পর্কেও ধারণা রাখেন।
২০১২ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। খালেদা জিয়াকে
তিনি তখন বেইজিংয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী।
আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও গেল বছর বেইজিং
সফর করেছেন। ওই সফর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর
সাক্ষাৎ হয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের আগ্রহের কথা আবার
জানিয়েছে। ছয়টি মেগা প্রকল্পে চীন আমাদের ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশে চীনের
বিনিয়োগে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় ২০ দফা ইশতেহার প্রকাশিত
হয়েছিল এবং পাঁচটি দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ২০২১ সালে একটি উন্নত
দেশে পরিণত হতে চায়, এ ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে এবং চীন এ ব্যাপারে
বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। চার দেশীয় একটি ইকোনমিক করিডোর গড়ার ব্যাপারে
বাংলাদেশের আগ্রহকে চীন শুধু সমর্থনই করেনি, বরং এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বিসিআইএম নামে ওই অর্থনৈতিক জোটে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো,
চীনের ইউনান প্রদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারও রয়েছে। সুতরাং চীনের
পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও একটি ফ্যাক্টর। এ অঞ্চলের
ব্যাপারে মার্কিনি স্বার্থের ব্যাপারে চীন পুরোপুরি সজাগ। চীনা নেতৃত্ব
ভালো করে জানে, এ অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থকে নিউট্রাল করতে হলে দক্ষিণ
এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। পাকিস্তান, মিয়ানমার ও
বাংলাদেশ বরাবরই চীনের বন্ধু। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অতটা উষ্ণ ছিল না।
কিন্তু শি জিন পিংয়ের সফরের পর বরফ গলতে শুরু করেছে। চীনের বড় ভয়
যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। ব্যবসায়িক অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ দুইটি বিপদে
জড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যে Tram pacific partnership -এর কর্মসূচি
গ্রহণ করেছে, তা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
অনেকেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক (বিশেষ করে
নৌবাহিনীর উপস্থিতি) উপস্থিতি বাড়িয়েছে (বাংলাদেশ এ স্ট্রাটেজির আওতায়)।
ফলে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এবং ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ
করবে যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে অর্থাৎ ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ
রয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার সমন্বয়ে এ
অঞ্চলে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছে (প্রিমাকভ ডকট্রিন), তা মার্কিন স্বার্থকেও
আঘাত করছে। বেশ কিছুদিন আগে ওবামা বলেছিলেন, ইরান আগামী এক দশকের মধ্যে
পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের
উপস্থিতির মূল কারণ দুইটি- একদিকে ইরানের উত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা, অন্যদিকে
ধীরে ধীরে চীনকে ঘিরে ফেলা, অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সাবেক
সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলার যে নীতি (কনটেইনমেন্ট থিউরি) যুক্তরাষ্ট্র
গ্রহণ করেছিল তার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের এ স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে শি জিন পিং
নিজে অবগত। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন, তখন
তিনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে
সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো কোনো ভালো কূটনীতির পরিচয় দেয় না।’ এ বক্তব্য
প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ভূমিকাকে চীন ভালো চোখে দেখছে না।
ফলে
মোদির চীন সফরের গুরুত্ব অনেক। শুধু ব্যবসা ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতেই তিনি
যাচ্ছেন, এটি ঠিক আছে। কিন্তু চীনা নেতারা মোদির স্ট্র্যাটেজি বোঝার
চেষ্টা করবেন। শ্রীলঙ্কায় চীনা বন্ধুপ্রতিম একটি সরকারকে ‘উৎখাত’, কিংবা
নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা উপস্থিতিতে ভারতের শঙ্কা, ভুটানে চীনা দূতাবাস
খুলতে দিতে ভারতের আপত্তি এবং সর্বশেষ ভারত মহাসাগরে সিসিলি ও মরিসাসে
ভারতীয় নৌবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে আস্থার
সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখন দেখতে হবে, মোদির এ সফরের মধ্য
দিয়ে তিনি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ককে ফিরিয়ে আনতে পারেন কিনা।
Daily Alokito Bangladesh
10.05.15
Subscribe to:
Posts (Atom)










