রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

মোদির ঢাকা সফর ও চীন ফ্যাক্টর


মোদির ঢাকা সফর শেষ হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু যে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে কম, তা হচ্ছে একটি 'চীনা ফ্যাক্টর' তার এই সফরের পেছনে কাজ করছিল। অর্থাৎ এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করার একটা স্ট্র্যাটেজি নিয়েই মোদি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার ব্যাপারে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ অনেক দিনের। এখানে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের বর্তমান সরকারের সম্পর্কও ভালো। প্রধানমন্ত্রী চীন থেকেও ঘুরে এসেছেন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চীনের একটা অলিখিত প্রভাব রয়েছে। সেনা অফিসারদের একটা অংশ চীনে প্রশিক্ষিত। বিমানবাহিনী চীনা বিমানে সুসজ্জিত। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটা ভালো চোখে দেখছেন না। এ অঞ্চলে অন্য কেউ প্রভাব খাটাক এটা ভারত চায় না। শ্রীলঙ্কায় চীনের খুব কাছের বন্ধু প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসেকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত, ভুটানে চীনা দূতাবাস খোলার ব্যাপারে আপত্তি এবং নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে ভারতের অসন্তুষ্টি প্রমাণ করে ভারত চীনকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছে না। বলাই বাহুল্য, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা পণ্যের বিশাল এক 'বাজার' সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য জায়গা করে নিতে পারছে না। 'বাজার' ধরে রাখার ব্যাপারে চীন ও ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন আগের চেয়েও স্পষ্ট। তবে এটাও সত্য, চীনের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে মোদির একটি আগ্রহ রয়েছে। যখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন একাধিকবার তিনি বেইজিং সফর করেছেন এবং 'চীনা মডেলে' আগ্রহান্বিত হয়েছিলেন। গুজরাটে বড় চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। উপরন্তু গেল বছরের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট তাঁর ভারত সফরে নয়াদিল্লি না নেমে সরাসরি আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে নেমেছিলেন। এবং সব প্রটোকল ভেঙে নরেন্দ্র মোদি তাঁকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। তাই চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ব্রিকস ব্যাংক গঠনের উদ্যোক্তা এই দুটি দেশ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি মার্কিন ডলার, যা কি না চলতি বছর ১০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে চান উভয় দেশের নেতারা। যদিও এটা সত্য, বাণিজ্য ঘাটতি ২০০১-০২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ১০০ কোটি ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার কোটি মার্কিন ডলারে। এখন এই বাণিজ্য ব্যবধান কিভাবে কমিয়ে আনা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাবকে কিভাবে সংকুচিত করা যায় সে চেষ্টাই নরেন্দ্র মোদি করবেন। এটা তাঁর বৈদেশিক নীতির অংশ। তবে কতটুকু তিনি সফল হবেন, এ প্রশ্ন থাকবেই। কেননা ভারতের অনেক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যেই চীনা নেতারা তাঁদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত 'ইন্ডিয়ান ওসেন রিম' বা আইওআরের একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারতের ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে গত ২০-২২ মার্চ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত মহাসাগরভুক্ত বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া আইওআরের সদস্য। এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এমন একটি সময়, যখন ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজাচ্ছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই সঙ্গে এশিয়ায় ভারতকে অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। ইতিমধ্যে মালদ্বীপ ও পাকিস্তান বাদে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ সফর করেছেন। তাঁর পররাষ্ট্রসচিবও 'সার্ক যাত্রার' অংশ হিসেবে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশ সফর করেছেন। ভুবনেশ্বর শীর্ষ সম্মেলনের আগে নরেন্দ্র মোদি মরিশাস, সিসিলি ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। মরিশাসে সফরের সময় সে দেশের সঙ্গে সেখানে একটি ভারতীয় নৌ ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার, ভারত ভারতীয় মহাসাগরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ ব্যাপারে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি মৈত্রী জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। এবং ওই জোটে মরিশাস ও সিসিলিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ মধ্যাঞ্চলের সিসিলি, মরিশাস কিংবা সুদূরের ওমান-মোজাম্বিকও এই প্রক্রিয়ায় একীভূত হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ভারত তাই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে অন্যতম শক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে চায়। এ ক্ষেত্রে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। চীন যে তার 'মেরিটাইম সিল্করুট'-এর কথা বলছে, সেই 'সিল্করুট'-এর সঙ্গে ভারতের এই অর্থনৈতিক স্বার্থ সাংঘর্ষিক। চীন ও ভারতের স্বার্থ মূলত এক ও অভিন্ন-ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজ নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন রীতিমতো ভস্মের মুখে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গেল সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফর ও আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের সেই পঞ্চাশের দশকের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিলেও অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে অতিসম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি (২০১৫) প্রধানমন্ত্রী মোদি অরুণাচল সফর করেন। সেখানে তিনি রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল চীন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে তখন বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির অরুণাচল সফরকে সমালোচনা করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, চীনা সরকার কখনোই 'অরুণাচল প্রদেশ'কে স্বীকৃতি দেয়নি। বেইজিংয়ের মতে, চীনের অন্তর্গত তিব্বতের মারিযুল, লোয়ুল ও নিম্ন সায়ুল এলাকা নিয়ে অরুণাচল প্রদেশ গড়েছে নয়াদিল্লি। ওই এলাকাগুলো এখনো ভারতের 'বেআইনি দখলদারি'র কবলে রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অভিমত সংগত কারণেই দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুজিও কিসিদা ভারতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি অরুণাচল প্রদেশ যে ভারতের, সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিসিদার ওই বক্তব্যে চীন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। চীন মনে করে, ভারত জাপানকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি চীনও সফর করেছেন। কিন্তু তাতে করে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক বেড়েছে, এটা বলা যাবে না। চীন গভীর আগ্রহের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির 'নেইবারডে পলিসি' অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে পর্যবেক্ষণ করছে। মোদির ঢাকা সফরও এই পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ যায়নি। গত ৮ জুন মোদির ঢাকা সফরের পর ভারতীয় পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমস একটি চীনা পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে। সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া মন্তব্য করে যে মোদি তাঁর ঢাকা সফর শেষ করেছেন বাংলাদেশকে তিস্তার পানি বণ্টনে 'তৃষ্ণার্ত' রেখে ও 'হতাশায়' রেখে। সিনহুয়ার প্রতিবেদনে ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার জন্য মোদি যে অভিযুক্ত হয়েছিলেন, সে কথাটাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ২৮ মে নয়াদিল্লি থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন সঞ্জীব মিগলানি। ওই প্রতিবেদনে এটা উল্লেখ করা হয়েছিল যে মোদি ঢাকা যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর মাথায় আসছে চীনের প্রসঙ্গটি। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে চীনের ওপর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নির্ভরশীলতার কথা।
স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন বিশ্বে যে অস্ত্র বিক্রি করে, বাংলাদেশ সেই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৯ সালের মধ্যে চীন থেকে ২১৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি সাবমেরিন ক্রয় করবে, এমন তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের 'মুক্তার মালা' স্ট্র্যাটেজির আওতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, এমন একটি আশঙ্কা ভারতের ছিল, যা টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে। ফলে মোদির ঢাকা সফরের সময় এই 'চীনা কার্ডটি' যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তবে এটাও সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা এমন ধারণা রাখেন এবং জানেন চীনের বৈদেশিক নীতি এখন বিনিয়োগ ও ব্যস্ততানির্ভর। চীনারা কোনো দেশে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। চীনারা ব্যবসা বোঝে। ব্যবসা চায়। মোদি সরকারও একটি 'ব্যবসা ও বিনিয়োগনির্ভর' নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতে যথেষ্ট চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। দুই দেশই চাইবে তার নিজ নিজ স্বার্থ আদায় করে নিতে। আগামী শতাব্দী হবে চীন ও ভারতের। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি আর ভারত তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অর্থনীতি। ফলে ওই দুটি বড় অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক যদি ভালো থাকে, তাহলে তা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্যও মঙ্গল। এ জন্যই বেইজিংয়ে মোদি দুই দেশের সম্পর্ককে একুশ শতকের মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এখন দেখার পালা, এই 'মাইলফলক' বক্তব্যটির বাস্তবে কতটুকু প্রতিফলন ঘটে। চীনারা সাধারণত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলায় না, তারা হস্তক্ষেপও করে না, যা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা করে। ফলে এখানে দুই দেশের অ্যাপ্রোচের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। একটা মিল অবশ্যই আছে আর তা হচ্ছে-দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যনির্ভর ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়েছে বেশি। এ জন্যই এক ধরনের 'প্রতিযোগিতা' থেকে যাবেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে নিঃসন্দেহে এটা বলা যায়, মোদির ঢাকা সফর একটি বিশাল প্রত্যাশা জাগিয়ে শেষ হয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগনির্ভর বেশ কিছু চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশে ভারতের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। যদিও এটা সত্য, বাংলাদেশের অনেক আশাই এই সফরের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়নি। কৌশলগত দিক দিয়ে মোদির এ সফর একটি সফল সফর। তিনি বাংলাদেশি নেতাদের আস্থায় নিতে পেরেছেন। এতে করে বাংলাদেশে চীনা প্রভাব হ্রাস ও চীনের নয়া নেতৃত্ব যে 'ওয়ান রোড, ওয়ান বেল্ট' কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা হ্রাস পেলেও, অতীতে বাংলাদেশ চীন ও ভারতকে ব্যালেন্স করে একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করলেও, মোদির সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কটি কিছুটা হলেও ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মোদির বাংলাদেশ সফরের সাফল্য এখানেই।

কানেকটিভিটি : আমরা কোন পথে এগোবো?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরিত একটি ঘোষণা আমার বিবেচনায় যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। যে ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার ৪১নং ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, উভয় প্রধানমন্ত্রী বিবিআইএনের (BBIN) আওতায় বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও কানেকটিভিটি খাতে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছেন। এই বিবিআইএন হচ্ছে ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত (সাত বোন রাজ্য) ও নেপালকে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে এরই মধ্যে ঢাকা-শিলং-গৌহাটি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। আগামীতে খুলনা-কলকাতা এবং যশোর-কলকাতা বাস সার্ভিসও চালু হবে। কলকাতা-খুলনার মধ্যে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চালুরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। রামগড়-সাবরুম সেতু নির্মাণ করছে ভারত। ফলে আগরতলার পণ্য পরিবহনে এখন এই সেতু ব্যবহার করে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে ভারত আগামীতে মংলা বন্দরও ব্যবহার করতে পারবে, যে কারণে খুলনা-মংলা সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ভারত প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ৯২ কনটেইনার পণ্য তাদের তিনটি বন্দর- চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা বন্দরে নিয়ে গেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনো শুল্ক আদায় করেনি। এর সবই হচ্ছে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। গত ১৫ জুন বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল আর ভুটানের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে একটি চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে আগামী বছরের শুরুতে এ চারটি দেশের মাঝে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলাচল করতে পারবে। তবে ট্রানজিট ও চলাচলের অনুমতি সংক্রান্ত ফি নির্ধারণ হবে আলোচনার মাধ্যমে।
ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট বা কানেকটিভিটি- আমরা যে নামেই বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করি না কেন, মূল বিষয় হচ্ছে একটি- এই মুহূর্তে ভারতের এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন। আর এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ড। বিশ্বের অন্য অঞ্চলের কানেকটিভিটি ঠিক এমনটি নয়। সেখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সড়ক, নৌ অথবা রেলপথে যাওয়া যায়। আমরা প্রায়ই ইউরোপের কথা বলি। এটা সত্য, সড়ক পথে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যায়। আমি জার্মানি থেকে ইংল্যান্ড গেছি বেলজিয়ামের ওপর দিয়ে। সেখানে শুল্ক দিতে হয়। আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করেই শুল্ক নির্ধারণ হবে। অর্থাৎ শুল্ক এখন অবধি নির্ধারিত হয়নি। এরই মধ্যে দুই রুটে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তবে পুরো উদ্যমে এই সার্ভিসটি চালু হতে আরও ২-৩ মাস লাগবে। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। এক. বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যে উন্নতি করতে হবে, তার ব্যয়ভার কে বহন করবে? দুই. এই দুই রুটে কি বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব বাস চালাতে পারবে?
প্রশ্নগুলোর জবাব এরই মধ্যে আমরা অনেকেই পেয়ে গেছি। এক্ষেত্রে পাঠকদের কিছু তথ্য দিতে চাই। ২০১২ সালে ট্যারিফ কমিশনের দেয়া রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে (যা কানেকটিভিটির জন্য প্রয়োজন হবে) প্রয়োজন হবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রেলপথে ব্যয় হবে ১৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা, সড়কপথে ৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, নৌপথে ৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, মংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে বাকি ৪৮৯ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের হার আরও বাড়বে। এতে বাংলাদেশের লাভ কতটুকু? পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, ভারতের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ ৭৬ থেকে সর্বনিু ১২ শতাংশ খরচ সাশ্রয় হবে। লাভটা ভারতের বেশি, আমাদের কম। কিন্তু ব্যয়ভার আমাদের। বিআইডিএসের গবেষক কেএএস মুরশিদ তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ লাভ সীমিত। তবে বিনিয়োগটা করতে হবে বাংলাদেশকেই। মোদির ঢাকা সফরের সময় ভারত যে আমাদের ২০০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব দিয়েছে, তার একটা অংশ ব্যয় হবে এ খাতে। বাংলাদেশকে সুদসহ মূল টাকা ফেরত দিতে হবে। এই ঋণের ধরন নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠলেও প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং জানিয়ে দিয়েছেন, এই ঋণের সঙ্গে কোনো শর্ত যুক্ত নেই। আমরা আশ্বস্ত হয়েছি বটে, কিন্তু ভারতের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদুভেন্দ্র মাথুরের বক্তব্য যখন টাইমস অব ইন্ডিয়ায় পড়ি (যা বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে), তখন কিছুটা খটকা লাগে বৈকি! মাথুর উল্লেখ করেছেন- ভারত যে ঋণ দেয়, এই ঋণচুক্তির শর্তানুযায়ী ঋণের অর্থে নেয়া প্রকল্পগুলোর অন্তত ৭৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে নিতে হবে। এসব পণ্য ও সেবার উৎপাদন প্রক্রিয়া হবে ভারতেই। শুধু বাংলাদেশই নয়, এই শর্তে নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপও মোট ৬০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। আর টাইমস অব ইন্ডিয়া আমাদের জানাচ্ছে, নতুন ঋণের টাকায় বাংলাদেশে নেয়া প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে ভারতে নতুন করে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
আমরা কানেকটিভিটির বিরুদ্ধে নই। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। এখানে আমরা আমাদের স্বার্থ দেখতে চাই। আমরাও চাই সড়কপথে আমাদের পণ্য নেপাল ও ভুটানে যাক। চুক্তি একটা হয়েছে বটে, তাতে আমরা কতটুকু উপকৃত হলাম- এর হিসাব-নিকাশ করা যাবে আরও কিছুদিন পর, যখন পুরোদমে কানেকটিভিটি কার্যকর হবে। এটি যদি শুধু দুপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলেই প্রশ্ন উঠবে। কানেকটিভিটির আওতায় আমরা চীনের কুনমিংও যেতে চাই। কিন্তু তা কি সম্ভব হবে আদৌ?
এই দ্বিপক্ষীয় কানেকটিভিটি ও থিম্পুতে চারদেশীয় মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট (এমভিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ভারত চারদেশীয় উপ-আঞ্চলিক জোট বিবিআইএনকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন সার্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে কি-না, এটা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এটাও একটা প্রশ্ন যে, ভারত বিবিআইএনকে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় ও তা কার্যকর করায় বিসিআইএম জোটের ভবিষ্যৎ কী? ভারত কি এখন চাইবে বিসিআইএম নিয়ে এগিয়ে যেতে। বিসিআইএম হচ্ছে অপর একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই জোটে আছে বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ভারত (সাত বোন রাজ্য) ও মিয়ানমার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে তার চীন সফরের সময় এই বিসিআইএম করিডোরের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এটাকে অনেকে কুনমিং উদ্যোগও বলেন। এখানে চীনের স্বার্থ বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশেরও স্বার্থ রয়েছে।
চীন ২০০৩ সালে প্রথম কুনমিং উদ্যোগের কথা বলেছিল, যা পরিবর্তিত হয়ে বিসিআইএম নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার, ভারত এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়ার পরই এই জোটের ধারণা শক্তিশালী হয়। এ জোটটি কার্যকর হলে কুনমিং (ইউনান প্রদেশের রাজধানী) থেকে সড়কপথে বাংলাদেশ ও ভারতেও আসা যাবে এবং পণ্য আনা-নেয়া যাবে। এর ফলে চীনা পণ্যের দাম কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালের মধ্যে আসিয়ানে সৃষ্টি হচ্ছে মুক্তবাজার, যার ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য প্রবেশাধিকারের পথ সহজ হবে। বিসিআইএমের আওতায় কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক হবে। তিনটি রুটে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত সংযুক্ত হবে। নর্থ রুটে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মিতকিহা হয়ে ভারতের লেদো পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। এ রুটে বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে না। এই রুটটি অনেক কঠিন। সাউথ রুটে ইউনান থেকে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর সোনাদিয়া পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। কুনমিং, মান্দালয় (মিয়ানমার) ও অ্যাওয়ে (মিয়ানমার) হয়ে এই রুটটি চট্টগ্রামে প্রবেশ করবে। পরে ঢাকা হয়ে কলকাতা যাবে। এখন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির কারণে) এই প্রস্তাবিত রুটটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তৃতীয় প্রস্তাবিত রুটটি হচ্ছে মিডল রুট। এই রুটটি ভালো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটাই প্রাচীন সিল্ক রুট। কুনমিং-ভামো-লাশিও-তামু (মিয়ানমার)-ইমফল (ভারত)-সিলেট-ঢাকা ও কলকাতা হচ্ছে এই রুট, যা কি-না ক২ক নামেও পরিচিত। অর্থাৎ কুনমিং থেকে কলকাতা। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, এই রুটে (২৮০০ কিলোমিটার) একটি মোটর র‌্যালি (২০১৩) চালু হয়েছিল।
বিসিআইএম জোটের সম্ভাবনা ছিল বিশাল। কারণ এই চারটি দেশের রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ (মিয়ানমার), রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি (চীন ও ভারত), রয়েছে শিল্প (চীন), শক্তিশালী সার্ভিস সেক্টর, রয়েছে বিশাল অব্যবহৃত জমি (মিয়ানমার) এবং সমুদ্রবন্দর (বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার)। ফলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে আগামীতে, যদি বিসিআইএম জোটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি তো বটেই, বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেকাংশে প্রভাবিত করতে পারে এই জোট। এই চারটি দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বিশ্ব জিডিপির ১০ ভাগ। ১৯৯১ সালে বিসিআইএমের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল যেখানে ১.২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১১ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৯০.২১ বিলিয়ন ডলারে। ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা আর ২৮৮ কোটি মানুষের বাস এই বিসিআইএম জোটভুক্ত দেশগুলোতে। পূর্বে রয়েছে কুনমিং আর পশ্চিমে কলকাতা। ভেতরে মান্দালয় আর ঢাকা। ভারত এ জোটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল এ কারণে যে, এতে করে আগামী দিনে ভারতের আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া সহজ হবে। ভারত ২০০৭ সালে আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এরই মধ্যে ভারত আসিয়ানের ডায়লগ পার্টনারের মর্যাদা লাভ করেছে (বাংলাদেশের অবস্থান আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামে)। ডায়লগ পার্টনারের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে পূর্ণ সদস্য। তাই এ জোটের ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ ছিল, যাতে করে দেশটি তার পণ্য নিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করে আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করতে পারে। এখন নরেন্দ্র মোদি সরকার বিসিআইএম নিয়ে আদৌ এগিয়ে যাবে কি-না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তার আগ্রহ বেশি বিবিআইএন জোট নিয়ে। ফলে বিসিআইএম জোট নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেল।
এরই মধ্যে আমরা লক্ষ করেছি, ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীন এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, নৌ তৎপরতা এবং জিবুতিতে একটি নৌঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ, এমনকি হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলংকায় সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এমনকি ভারত মহাসাগরভুক্ত সিসিলি, মরিশাসে ভারত নৌঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-এর যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে ৬০ দেশকে তিনি চীনের প্রভাব বলয়ের আওতায় আনতে চান। এর মধ্যে ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোও রয়েছে। এটা সেই পুরনো সিল্ক রোডেরই আধুনিক সংস্করণ। ভারত এতে উদ্বিগ্ন। ফলে ভারত তার সেই পুরনো কটন রুট নিয়েই চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হলেও এই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেশ দুটির মাঝে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করবে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও প্রভাবিত হতে বাধ্য। তাই বিবিআইএন জোট নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হলেও এ অঞ্চলে ভারতীয় কর্তৃত্ব বাড়বে। চীনের প্রভাব এর মাঝ দিয়ে সংকুচিত হবে। তাই খুব স্পষ্ট করেই বলা যায়, বিসিআইএম জোটের বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখানে চীনের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়বে, এটাই মনে করেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা। ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাবে না ভারত। আর বাস্তবতা হচ্ছে, বিবিআইএন বিকশিত হলে সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে এবং সার্ক একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হবে মাত্র। 
দৈনিক যুগান্তর, ১৮ জুন, ২০১৫

১৮ জুন, ২০১৫

পররাষ্ট্র - কী পেল বাংলাদেশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের ঢাকা সফরের পর এর রেশ এখনও রয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ সফরকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সফরের রেশ আরও কিছুদিন থেকে যাবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও তা প্রভাব ফেলবে। তবে এটা সত্য, বিপুল এক সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে- এটা বলা যাবে না। তবে ভারতের প্রেক্ষাপটে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এক. তার এ সফরকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছিল। বিএনপি ও জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো, যাদের পরিচিতি ছিল ভারতবিরোধী দল হিসেবে, তারাও স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মোদির সফরের পর এ দুইটি দলই তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে;  বিরোধিতা করেনি। দুই. ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কটি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ তেমন একটা রক্ষিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন. মোদির তিনটি কর্মসূচি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সাক্ষাৎকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তিনি যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর, এটা বোঝা গেছে এবং মোদি যে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চান- এটাই প্রমাণিত হলো। তিনি সংসদ অধিবেশনে ভাষণ দেননি। অথচ শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পার্লামেন্টে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন। বর্তমান সংসদ নিয়ে যে একটি বিতর্ক আছে, সম্ভবত এটি বিবেচনায় নিয়েই তিনি সংসদে ভাষণ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে তরুণ প্রজন্মের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভারতের ইমেজ বাড়াতে চেয়েছেন। কেননা এদেশে একটা শক্ত ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। এ ভারতবিরোধী মনোভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে চান। এজন্য টার্গেট করেছেন তরুণ প্রজন্মকে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬৫ ভাগের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এদের নিয়েই মোদি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে রচনা করতে চান।

বলতে দ্বিধা নেই, মোদির এ সফরে বাংলাদেশের অনেক প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট কমিটমেন্ট নেই। তিনি শুধু মমতা ব্যানার্জিকে সফরসঙ্গী করেছিলেন; কিন্তু তাতে আসাম ও ত্রিপুরায় এক ধরনের অসন্তোষ আমরা লক্ষ করেছি। এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বলাই বাহুল্য কানেকটিভিটির নামে এ দুই রাজ্যে বাস চলাচল ও পণ্য পরিবহনের উদ্বোধন হয়েছে; কিন্তু শুরু হয়নি। অথচ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অনুপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরে চীনা কার্ডটি ব্যবহার করেছেন, এমন কথা ভারতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। ৮ জুন হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন ও এর আগে ২৮ মে নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো রয়টার্সের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় চীনের প্রভাব সঙ্কুচিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ঢাকা সফর করেন। এ সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলে কিনা, সেটা এখন দেখার বিষয়।

নরেন্দ্র মোদির এ সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্র সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকিছু বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তা এক ধরনের হতাশার জন্ম দেবে- এটা অস্বীকার করা যাবে না। যেমন, তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায়, আমাদের তা হতাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এসেছিলেন আবারও। কিন্তু তা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, পশ্চিম বাংলার স্বার্থেও নয়। তিনি এসেছিলেন মোদির অনুরোধে এবং মোদির স্বার্থে। এবারও আমরা তার কাছ থেকে কোনো কমিটমেন্ট পেলাম না। বরং তিনি বাংলাদেশ আত্রাই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে কলকাতায় এ অভিযোগ তুলে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর একটি অপচেষ্টা চালালেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের ইতিহাসে ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এবার হলো। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- মমতা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির পেছনে ছুরিকাঘাত করতে চান!

তিনি তিস্তার বদলে দৃষ্টিটা অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চান। ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে এটা অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে ভারত অংশীদার হতে চায়। অংশীদার হওয়া এক জিনিস আর বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যাওয়া অন্য জিনিস। এখন পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে না? দুইটি ভারতীয় কোম্পানির (রিলায়েন্স ও আদানি) সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এতে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে? হলে, কতুটুকু হয়েছে? রিলায়েন্স করবে এলএনজি প্লান্ট। তরলীকৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ লাইন টেনে নেয়ার দায়িত্বটি বাংলাদেশের। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কত টাকায় আমরা কিনব কিংবা চুক্তির বিস্তারিত আমরা জানি না। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আর আদানি গ্রুপ ভারতীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এটা সবাই জানে, ভারতীয় কয়লা নিকৃষ্টমানের। অথচ আমাদের পাঁচটি কয়লা খনিতে যে কয়লা পাওয়া যায়, তা উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কয়লা দিয়ে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলো না কেন? উপরন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা বিদ্যুৎ সেক্টরে বড় বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের কেন এ সুযোগটি দেয়া হলো না? উন্মুক্ত টেন্ডারেও দুইটি ভারতীয় কোম্পানিকে এ কাজ দেয়া হয়নি। সরকারের অভিযোগ আছে, উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহেই এ ‘কাজ’ ভারতীয় কোম্পানি পেয়েছে। এটা এখন অনেকেই জানেন, আদানি গ্রুপ গুজরাটের ব্যবসায়ী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এ শিল্পগোষ্ঠীর অবদান ছিল অনেক। এখন এরা বাংলাদেশে একটি ‘কাজ’ পেল। হয়তো অনেকেই জানেন না, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। অথচ এ কাজে এদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রিলায়েন্স গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভারত থেকে যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে? এ ঋণ নেয়া হবে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নেয়া ঋণ কোনো ভালো ঋণ নয়। এতে করে ঋণ দেয়া দেশের কাছে দায়বদ্ধতা বরং ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থ যেসব প্রকল্পে খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এ ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার), তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনও বলি না, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত। ভারত কিন্তু তা করবে না। বার্টার ট্রেডে ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা হয় না। উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ভারতের দেয়া এই ঋণ সম্পূর্ণ শর্ত মুক্ত। 

টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হবে না, এ ধরনের একটি কমিটমেন্ট যৌথ ঘোষণাপত্রে থাকলেও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্ট নেই। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির কথা বলা হয়নি। বাংলাদেশ একটি নয়া উপআঞ্চলিক জোট বিবিআইএন (ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত- সাত বোন রাজ্য ও নেপাল) গঠনে রাজি হয়েছে। এটি যদি কার্যকরী হয়, তাহলে সার্ক দুর্বল হয়ে যাবে। ভারত যে সার্কের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল, তা তাদের কর্মকান্ডে প্রমাণিত হয়েছে। ভারত সার্কের অবলুপ্তি চায় না, চায় একটি দুর্বল সার্ক। তাদের টার্গেট হচ্ছে উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, যাতে করে ভারতের সাত বোন রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব। এখন ‘কানেকটিভি’ চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ভারতের পণ্য কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের সাত বোন রাজ্যগুলোতে যাবে। এক্ষেত্রে ভারতের ঋণে অবকাঠামো উন্নয়ন হবে (বিশেষ করে চার লেনে রাস্তা হবে, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মিত হবে)। আর অদূর ভবিষ্যতে সাত বোন রাজ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করে সাত বোন রাজ্যগুলোর একটি বড় ব্যবসা কেন্দ্র হবে, যারা আমদানি-রফতানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে সাত বোন রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের যে বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছিল, তা হুমকির মুখে থাকবে। বাংলাদেশী পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদে ভারতকে সমর্থন জানিয়েছে। এতে করে আমরা জাপানের ‘অসন্তোষের’ শিকার হতে পারি। চীনও এটাকে ভালো চোখে দেখবে না। জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদে প্রার্থী হতে চায়। বাংলাদেশেরও উচিত হবে একইসঙ্গে জাপানকেও সমর্থন জানানো। না হলে বাংলাদেশে জাপানের সাহায্যের ব্যাপারে তা প্রভাব ফেলবে। 

নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর ও যৌথ ঘোষণাপত্রে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। কিন্তু তা হতে হবে বহুপাক্ষিকভাবে এবং উপআঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ভারত যদি সব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর না করে এবং যা সাপটা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্ত, তাহলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বাংলাদেশের অনেক কিছু দেয়ার আছে ভারতকে। আর সেজন্যই প্রয়োজন ভারতের মানসিকতার পরিবর্তন। বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভারতের আমলাতন্ত্র এ কাজটি করছে না, ফলে এ দুই দেশের সম্পর্কে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মোদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে চাচ্ছেন। তিনি তা পারবেন কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে এটা সত্য, অন্যান্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নরেন্দ্র মোদির এ সফর ছিল ব্যতিক্রমধর্মী একটি সফর। তার কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক।
দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১৪.০৬.২০১৫ 

যে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় না

বিশাল একটা প্রত্যাশার ঢেউ জাগিয়ে নরেন্দ্র মোদি ঢাকা ছেড়েছেন গত ৭ জুন। এর আগে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে একটি আবেগময়ী ভাষণ দেন। কিন্তু মোদির এই সফর রেখে গেছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সফর সফল কী ব্যর্থ, আমার কাছে তা বড় বিবেচ্য নয়। আমার কাছে বিবেচ্য তিনি যে সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন, তার কতটুকু অর্জিত হবে এবং কবে হবে? মূলত চারটি বিষয়ের আলোকে মোদির ঢাকা সফরকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও কানেকটিভিটি। এর মাঝে অর্থনীতি ও কানেকটিভিটির বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। সংবাদপত্রে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের সাহায্য পাবে। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতের কাছে থেকে সম্মতি পাওয়া গেছে। এখানে সমস্যাটা হচ্ছে ভারতের ঋণের ধরন নিয়ে। ভারত এই ঋণ দিচ্ছে ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’-এর আওতায়। ভারত নিজে কখনো ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এ ঋণ গ্রহণ করে না (সর্বশেষ মোদির দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় ১ হাজার কোটি ডলার ঋণ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা যায়)। ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এখন বিশ্বে অচল। কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত এর আওতায় কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। কেননা তাতে নানা শর্ত থাকে। যেমন বলা যায় ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এ ঋণ নিলে ওই ঋণের আওতায় শতকরা ৭৫ ভাগ পণ্য আমাদের ওই দেশ (এ ক্ষেত্রে ভারত) থেকে কিনতে হবে। ঠিকাদার নিয়োগ হবে ওই দেশ থেকে। সুদ দিতে হবে শতকরা ১ ভাগ হারে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে বাংলাদেশকে জরিমানা গুনতে হবে শতকরা ৫ ভাগ হারে। এটা কোনো ভালো ঋণ নয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর সুযোগ নেই ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে আরো আলোচনা করার। এর আগে ভারতের কাছে থেকে ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’ এর আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ আমরা পেয়েছিলাম। এ ব্যাপারে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, এখন যেসব প্রকল্পে এই ঋণ ব্যয় হবে, তাতে আমাদের চেয়ে ভারতই উপকৃত হবে বেশি। ভারতের ঋণ এখানে বেশি। দুটো প্রকল্পের কথা আমি উল্লেখ করলাম একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চার লেনে উন্নীত করা। সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নেয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারত নিজেও সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে কোনো ঋণ গ্রহণ করে না। সড়কের পাশাপাশি আমরা ৫০০টি ডাবল ডেকার বাসও কিনব। এক্ষেত্রে বাসের মূল্য যা ভারতের নির্ধারণ করে দেবে, আমাদের তা মানতে হবে। এর চেয়ে সস্তায় অন্যত্র বাস পাওয়া গেলেও তা আমরা ক্রয় করতে পারব না। নৌ ট্রানজিটে বাংলাদেশ চেয়েছে ভুটান ও নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করতে। কেননা এ দুটো দেশ থেকে নৌপথে কাঠ ও বোল্ডার সহজে আনা যায়। কিন্তু ভারত প্রথমে এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। এখন তা মেনে নিয়েছে। ত্রিপুরার চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেননা সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির মুখে) আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের পণ্য রফতানি কিংবা আমদানিতে হিমশিম খাবে। সে ক্ষেত্রে ত্রিপুরা কিংবা ত্রিপুরার দেখাদেখি সাতবোন রাজ্যগুলো যদি এই বন্দর ব্যবহার করতে চায়, তাহলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে একাধিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, সাফটা চুক্তির আলোকে বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশাধিকারের বিশেষ সুবিধা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণ, ভুটান ও নেপালকে ট্রানজিট দেয়া ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি ক্ষেত্রে ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভারত রক্ষা করেনি। ফলে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। যে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় নাতবে মোদির এই সফর নানা সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে আমাদের জন্য। মনে রাখতে হবে ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার মোট আয়তনের মধ্যে ৭২ ভাগ এলাকা একা ভারতের। মোট জনসংখ্যার ৭৭ ভাগ ভারতের। ভারতের অর্থনীতির অবস্থান (পিপিপি) বিশ্বে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ এবং জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৭ ভাগে গিয়ে দাঁড়াবে, যখন চীনের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ ভাগ। সুতরাং ভারতের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আমরা উপকৃত হতে চাই। অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় নদী খনন করা যেতে পারে, যাতে ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আমরা নৌপথ ব্যবহার করতে পারি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। ভারত কানেকটিভিটির কথা বলে বাস সার্ভিস চালু করেছে। কলকাতা থেকে যাত্রী নিয়ে বাস যাবে ত্রিপুরায়। আবার ত্রিপুরা থেকে বাস যাবে শিলং ও গৌহাটি। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহƒত হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুল্ক পাবে কিনা, বাংলাদেশি বাস এই রুটে চলাচল করতে পারবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কানেকটিভিটি সমর্থনযোগ্য ও এ যুগের বাস্তবতা। কিন্তু এই কানেকটিভিটির আওতায় ভুটান ও নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এটা যদি হয় তাহলে ভালো। আমরা তাতে উপকৃত হব। এই কানেকটিভিটির আওতায় আগামীতে যদি চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেটা আমাদের জন্যই মঙ্গল। কিন্তু তা কি হবে? সড়কপথে ভুটান ও নেপালের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তিস্তা ছিল আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় এক নম্বরে। কিন্তু আমরা আগেই জানতাম তিস্তা নিয়ে আলোচনা হবে না। হয়ওনি। তবে মোদির আশাবাদ তিস্তা চুক্তি হবে। ঢাকায় মমতা ব্যানার্জি এসেছিলেন বটে। কিন্তু তিস্তার জট এই মুহূর্তেই খুলবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ামের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্যে সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না এই দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানি বণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প হতে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্য ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালের তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এ দিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তার এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তিটি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়ই এটি বোঝেন। মমতা ব্যানার্জিকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। এখানে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। এখানে একটা কথা বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর (পশ্চিমবঙ্গ) একটি সমঝোতা যদি হয় তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণœ থাকে। আমরা যেন মমতা ব্যানার্জির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করি। বিদ্যুৎ সেক্টরে আমরা দুটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে? ভারতীয় কয়লায় এখানে বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি হবে। কিন্তু আমরা কেন বড় পুকুরিয়ার ভালো মানের বিটুমিনাস কয়লা ব্যবহার করত পারব না? এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে অপর একটি কোম্পানি। এখানেও নানা প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে, প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এই দুটি কোম্পানি। চিন্তা করা যায় কী বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আমরা ভারতীয়দের হাতে তুলে দিলাম? এতে হয়তো ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ নিয়ে রাজনীতি হবে। কোনো এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় কোম্পানি যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে পরিস্থিতি? অর্থনীতি খাতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। এভাবে কোনো দেশ তার বিদ্যুৎ সেক্টর বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বিদ্যুৎ যদি বেসরকারি তথা বিদেশিদের হাতে যায়, তাতে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু এর বেশি হলে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকে। মোদি তার পররাষ্ট্র নীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য একটা ভালো খবর এ জন্য যে, আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ভারত বড় অবদান রাখতে পারে। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতীয় সহযোগিতায় আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারব। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভারতকে দেখতে হবে উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে। ভারত যদি বাংলাদেশে শুধু তার পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত করতে চায়, তাতে সমমর্যাদা নিশ্চিত হবে না। বরং ভারতীয় বন্ধুত্বকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে। ভারতকে বাংলাদেশেরও অনেক কিছু দেয়ার আছে। কিন্তু সেখানে তৈরি হয়ে আছে নানা জটিলতা। তাই সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে নরেন্দ্র মোদি তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে, সে সম্পর্কে আদৌ অবগত নন, তা বিশ্বাস করি না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জিটুজি পর্যায়ে বাংলাদেশ ‘শক্ত’ অবস্থানে যেতে পারে না। আমাদের আমলারা ভারতের আমলাদের সমকক্ষ নন। দেন-দরবারে তারা বড় দুর্বল। এমনকি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহেও তাদের রয়েছে সীমাবদ্ধতা। ফলে আমরা আমাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারি না। নরেন্দ্র মোদি ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশে এসেছেন। চুক্তিগুলোও হয়েছে তাদের স্বার্থে। তার পরও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। আমরা তার ওপর আস্থা রাখতে পারি। একটি পরস্পরনির্ভরশীল সম্পর্ক দু’দেশের সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মোদির এই সফরে আমাদের প্রত্যাশা মেটেনি সত্য কিন্তু মোদির ওপর ভরসা রাখতে চাই। দেখতে চাই তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক। Daily Manobkontho 14.06.15