রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

গ্রীস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ

গত ৫ জুলা্ই গ্রীসের গণভোটের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দাড়িয়েছে তা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে? গ্রীসের অর্থনীতি রক্ষায় (বেইল আউট)ঋণদাতা গোষ্ঠীর প্রস্তাব গ্রীস গ্রহণ করবে কি করবে না এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস এই গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। গণভোটের ফলাফলে দেখা যায় প্রস্তাবের পক্ষে (অর্থাৎ ঋণদাতা গোষ্ঠীর কঠিন শর্তের পক্ষে) ভোট পড়েছে শতকরা ৩৮.৬৯ ভাগ, অন্যদিকে প্রস্তাবের বিপক্ষে (অর্থাৎ ঋণদাতা গোষ্ঠীর শর্ত প্রত্যাখ্যান) ভোট পড়েছে শতকরা ৬১.৩১ ভাগ। এর অর্থ পরিস্কার। গ্রীস ইউরো জোনে থাকবে কিনা, এটা বড় প্রশ্ন এখন। এখানে বলা ভালো, ৩০ জুনের মধ্যে আইএমএফ এর ঋণের ১০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার পরিশোধের কথা ছিল গ্রীসের। কিন্তু গ্রীস সরকার তা পারেনি। ফরে রাষ্ট্রটি দেউলিয়া হয়ে যায়। তখনই প্রশ্ন ওঠে গ্রীস যদি ইউরো জোন থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ কি?
২০১১ সালের পর থেকেই সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত অভিন্ন ইউরোপের ধারণাটি কোন অমূলক ধারণা ছিল না। বরং ১৯৫৭ সালে ইউরোপীয়ান কমিউনিটি সৃষ্টির পর ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ম্যাসট্রিচট চুক্তি ছিল অভিন্ন ইউরোপ গঠনের লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ। ম্যাসট্রিচট চুক্তিতে একটি একক মুদ্রা ও একটি ইউরোপীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে সেভেন চুক্তি ও ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো চালুর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অভিন্ন এক ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল ইউরোপ। বলা ভালো, ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপীয় কমিউনিটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নাম ধারণ করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতোমধ্যে সম্প্রসারণ ঘটেছে। পূর্বে ইউরোপের সমাজতন্ত্রের পতনের পর ২০০৪ ও ২০০৭ সালে বেশ ক’টি পূর্ব ইউরোপের দেশ ইইউতে যোগ দিয়েছে। ইইউ’র সদস্য সংখ্যা এখন ২৮। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ইইউ’র ১৫ টি দেশের মাঝে ১১ টি দেশ ইউরো চালু করেছিল। এখন চালু রয়েছে ১৯টি দেশে। ইউরো চালু হওয়ার সময়ই ইউরো নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তখন বলা হয়েছিল ইউরোপের উত্তরের ধনী দেশগুলো ইউরো চালু হলে এ থেকে সুবিধা নিতে পারে। আজ এতবছর পর এই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হলো। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে ইউরো চালু হওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও, তিন বছর পর্যন্ত নিজ নিজ দেশের মুদ্রা চালু থাকে এবং ২০০২ সালের জুলাই মাসে ইউরোর কাগজী ও ধাতব মুদ্রা চালু হওয়ার পর পুরনো মুদ্রা বাতিল হয়ে যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা
গত নয় বছর ইউরো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা না দিলেও, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ইইউ এর কয়েকটি দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দেশগুলো ঋণ শোধ করতে না পেরে অনেকটা দেউলিয়া হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে গ্রীস, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই দেশগুলো অতিরি্ক্ত ঋণ নিয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দিতে পারছে না।
গ্রীসের পরিস্থিতি নিয়ে এখন নানা অঙ্ক কষা যায়। গ্রীস আদৌ আইএমএফ তথা ‘ট্রয়কা’ (আইএমএফ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এর ‘দুষ্টচক্র’ থেকে বের হয়ে আসতে পারবে কিনা, এটা একটা পশ্ন এখন। গ্রীসের এই দেউলিয়া হয়ে যাবার ঘটনা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রও যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, এটা এই প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো। ফলে ইউরোপের আরো অনেক দেশ নিয়ে এই প্রশ্ন থাকল। দ্বিতীয়ত, ঋণ দাতা সংস্থা, বিশেষ করে আইএমএফ এর অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা যে কোন দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না, এটাও প্রমাণিত হলো। বিশ্বব্যাংক তথা আইএমএফ এর নীতি একটি স্বাধীন অর্থনীতির পরিপন্থি। গ্রীসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আইএমএফ এর প্রেসক্রিপশন ছিল পেসশনের পরিমাণ কমানো, ট্যাক্স এর পরিমাণ বাড়ানো ইত্যাদি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর নীতি হচ্ছে ঋণগ্রহীতা দেশকে তার সুপারিশমালা অনুযায়ী চলতে বাধ্য করা। গ্রীসের বামপন্থি সরকার সেটা চায়নি।
ফলে দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে অর্থাৎ যখন সংকট শুরু হয় এরপর একের পর এক সরকারের পতন ঘটেছিল সেখানে। পরিস্থিতি কাটি্য়ে উঠতে সেখানে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সাইরিজা (Syriza)পার্টি বিজয়ী হয়ে বামমনা একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিল। কিন্ত ক্ষমতা গ্রহনের মাত্র ৬ মাসের মাথায় বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিলেন সিপ্রাসের নেতৃত্বাধীন Syriza-Anel সরকার। সিপ্রাস গণভোটের আয়াজন করে একটি ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্ত তিনি যে বিষয়টিকে জনগনের কাছে বেশি করে উপস্থাপন করেছিলেন তা হচ্ছে গ্রীক কী ‘ট্রয়কা’ এর কাছে আত্মসমর্পণ করবে, নাকি একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে টিকে থাকবে? মাত্র ৪০ বছর বয়সের সিপ্রাস তরুণ প্রজন্মের গ্রীসের রাজনীতিবিদ। একটি সম্মোহনী নেতৃত্ব তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। গ্রিক জনগণ একটি নতুন নেতৃত্বই চেয়েছিল। সিপ্রাস হচ্ছেন তাদেরেই প্রতিনিধি। তিনি আইএমএফ’র ফাঁদে ধরা দিতে চাননি। তিনি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাদের কিছু শর্ত মেনেছেন। কিন্ত তাতে গ্রীসের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসেনি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক কাঠামোগত সামঞ্জস্য এর আওতায় ঋণ দেয়। এটা শর্তযুক্ত ঋণ এবং ঋণগ্রহীতা দেশকে তা মানতে হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো (১৯৯১ পরবর্তী) এই কাঠামোগত সামঞ্জস্যের আওতায় (বাংলাদেশও) ঋণ পেয়ে থাকে। একই নিয়মে উন্নয়নশীল বিশ্বও ঋণ পাচ্ছে। কিন্ত তাতে করে কী ঋণগ্রহীতা দেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন এসেছে। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে-
১৯৭৭-১৯৮৫ সালে পেরুতে বিশ্বব্যাংকের ফর্মূলা অনুযায়ী কাঠামোগত মাথাপিছু আয় শতকরা ২০ ভাগ কমেছিল, মুদ্রাস্ফীতি ৩০ ভাগ বেড়ে দাড়িয়েছিল ১৬০ ভাগে। সেইসাথে বেড়েছিল বেকারত্ব। একই ফল দেখা যায় ফিলিপাইনে ১৯৮৪ সালে। সেখানে কাঠামোগত সামঞ্জস্যের ফলে মাথাপিছু প্রকৃত আয় ১৯৭৫ সালের পর্যায়ে চলে যায় এবং শ্রমিকদের আয় শতকরা ৪৬ ভাগ কমে যায়। অনেক গবেষক (মৃসার জর্জ, জেমস কোভার্ড) দেখিয়েছেন সাহায্যের একটা বড় অংশ বৈদেশিক উপদেষ্টা নিয়োগ এবং তাদের নীতি অনুসরনের ফলে দাতা দেশেই টাকাটা ফিরে গেছে। উল্লেখ করতে চাই বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের জুলাই মাস থেকেই এই তথাকথিত কাঠামোগত সামঞ্জস্যের আওতায় বৈদেশিক ঋন পেয়ে আসছে।

আমি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাতে পারবো এই নীতি অবলম্বনের ফলে সমাজতন্ত্র পরবর্তী পূর্ব ইউরোপে নব্বই এর দশকের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের জিএনপির পরিমাণ কমে গিয়েছিল। তাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তাদের প্রতিটি দেশের মুদ্রার মান অনেক কমে গিয়েছিল। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বেকার সমস্যা বেড়ে গিয়েছিল। পূর্ব ইউরোপের ওইসব দেশগুলো পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলেও, কোন একটি দেশও তখন অব্দি ১৯ সদস্য বিশিষ্ট ইউরো জোনে (যেখানে একক মুদ্রা হিসেবে ইউরো চালু রয়েছে) যোগ দিতে পারেনি। এখানে আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন। তা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক তথা আইএমএফ কর্তৃক ঋণ গ্রহনের সাথে উন্নয়নশীল বিশ্বের জাতীয়তাবাদী সরকারের পতনে একটা সম্পর্কও রয়েছে। যেমন গুয়েতেমালায় আরবেনজ সরকার ১৯৫৪ সালে, ডমিনিকান রিপাবলিকে বস ১৯৬৩ সালে, ব্রাজিলে গাউর্লাট ১৯৬৪ সালে, ঘানায় নক্রুমা ১৯৬৬ সালে, কিংবা আলেন্দে চিলিতে ১৯৭৩ সালে। চিলিতে আলেন্দে ১৯৭০-৭৩ সালে, আর্জেন্টিনায় ১৯৭২-৭৬ সালে পেরনিস্টরা, ব্রাজিলে গাউর্লাট সরকার বিশ্বব্যাংকের কোন ঋণ পায়নি। অথচ এরা যখন উৎখাত হয়, তখন সেখানে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য বেড়ে যায়। গ্রীসের পরিস্থিতি আজ এ আলোকেই বিশ্লেষণ করতে হবে।
উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই এই ‘ঋণের দুষ্টচক্র’ থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। গ্রীসের পরিস্থিতি আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের মতই হবে। এই দুটো দেশই অতীতে ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক তাদের স্বার্থেই দেশ দুটোকে আবারো ঋণ দিয়েছিল। যাতে দেশ দুটো ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারে। বা দিলে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিতে বাধ্য। এজন্যই ঋণের পরিমান বাড়লেও, পুঁজিবাদী সংস্থাগুলো তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য ভবিষ্যতে ঋণ দিয়ে যাবে। চূড়ান্ত বিচারে ‘ট্রয়কা’ তাদের স্বার্থেই গ্রীসকে আরো ঋণ দেবে। আর প্রশ্নটা এখানেই। এতে করে গ্রীসের অর্থনীতিকে আবারো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কিনা?
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নিয়েও একটু ভাববার সময় এসেছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের জুলাই মাস থেকে সম্প্রসারিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচীর আওতায় কাজ করে আসছে। এতে করে সরকারের ৯টি ক্ষেত্রে করনীয় কাজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে দাতাগোষ্ঠী, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএর পক্ষ থেকে। বাংলাদেশ ঋণ গ্রহন করে এ শর্ত মেনেই। এগুলো হচ্ছে গ্রহীতা দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা, সরকারি ব্যয় হ্রাস করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাদ্যসহ সেবামূলক খাত ও কৃষিখাতে ভর্তুকী হ্রাস করা, প্রকৃত মজুরী হ্রাস ও ঋণ সংকোচন, দাম নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার, জনসেবামূলক খাত, কৃষি উপকরণ, বিদ্যুৎ, রেলওয়ে বেসরকারীকরণ, উচু কর ও সুদের হার বাড়ানো, আমদানি অবাধ করা, মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। গ্রীসের ক্ষেত্রে আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছিল এর সাথে অনেক ক্ষেত্রেই এর মিল আছে। ফলে আইএমএফ এর শর্তের কারনে গ্রীস যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, বাংলাদেশ যাতে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে না পড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
গ্রীসের পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতি যে নতুন তা নয়। তাতে করে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনবে, এটা মনে করারও কোন কারন নেই। গ্রীসের নেতৃবৃন্দ দেখিয়েছেন কীভাবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একটি জাতি হিসেবে বেঁচে থাকা যায়। এটাই আমাদের জন্য শিক্ষা।
Prio.com
07.07.15

বিকল্প বিশ্বব্যাংক ও চীন-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

গেল সপ্তাহে একটি বড় ধরনের সংবাদের জন্ম হয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায়। চীনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে 'এশিয়ার ইনফ্রাকট্রাকসার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক' বা এশিয়ার অবকাঠামো বিনিয়োগে ব্যাংক (এআইআইবি)। এই ব্যাংকে বলা হচ্ছে বিকল্প বিশ্বব্যাংক। মোট ৫৭টি দেশ নিয়ে এই ব্যাংকের যাত্রা শুরু। মোট মূলধনের পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন জোগান দিয়েছে ২৯ দশমিক ৭৮ ভাগ অর্থ। এর পরের অবস্থান ভারতের। ভারতের অর্থের পরিমাণ ৮ দশমিক ৩৭ ভাগ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি ৪ দশমিক ৪৮ ভাগ।
ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অবস্থান আরো অনেক পরে। বলাই বাহুল্য যুক্তরাষ্ট্র যেমনি আইআইবির সদস্য হয়নি, ঠিক তেমনি জাপানও এর সদস্য নয়। বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশ এই ব্যাংকের সদস্য। সম্প্রতি গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবগতি হলে এবং রাষ্ট্রটি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে উন্নয়নশীল বিশ্বে আইএমএফের ঋণ নীতি আবারো আলোচনায় আসে। আইএমএফ শর্ত সাপেক্ষে গ্রিসকে আরো ঋণ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু গ্রিস সরকার তাতে রাজি হয়নি। ফলে রাষ্ট্রটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ইউরো জোন থেকে দেশটির সিটকে পড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এমনি একটি পরিস্থিতিতে এআইআইবির জন্ম যেসব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন এক চমক সৃষ্টি করতে পারে বলে অনেকের বিশ্বাস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যেভাবে ভারত মহাসাগরে এই দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তাতে এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। এখন দেখার পালা যৌথভাবে একটি বিকল্প বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠা করলেও, এই দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়।
চীন ও ভারত সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করলেও, ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে উভয় শক্তিই এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। প্রভাব বিস্তার করার এই যে প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতায় এ অঞ্চলের দেশগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আর ভারত ইতোমধ্যে অন্যতম একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভারত তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে শুরু করছে। ফলে এ অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা আগামীতে চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে।
ভারতের নীতি-নির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি সহ্য করবেন না। ভুবনেশ্বর আইওআর সম্মেলনে (মার্চ, ২০১৫) এই ম্যাসেজটি তারা দিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নয়া দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও এ দুটো দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলংকায় ভারতীয় প্রভাব বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে জাফনা কার্ড ব্যবহার করা, প্রমাণ করে ভারত ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়। ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন ভারত প্রাচীনকালে তার কটন রুট ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতা বিকাশে ভারতীয় প-িতরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
হাজার বছর আগে দক্ষিণের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র্র চোলের আমলে নৌবাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌবাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট, তাতে দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিশর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার, আবার অন্যদিকে শ্রীলংকা হয়ে সুমাত্রা, জাভা (মলি্লকা প্রণালি), হংকং, জাপান পর্যন্ত ভারতীয় বাণিজ্য রুট সম্প্রসারিত ছিল। মোদি সরকার এই কটন রুটকেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রাচীনকালে ভারতীয় তুলা তথা স্মৃতি এই সমুদ্র পথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। একদিকে চীনা নেতা শি জিন পিং তার সিল্ক রুটের ধারণা নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব যেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চান, এর প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত তার পুরনো কটন রুটের ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরি হবে সেখানেই। বাণিজ্যনির্ভর এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌবহরে বিমানবাহী জাহাজ আরো বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে।
বলা হয় একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি, চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিকল্প রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ভূমিকা রয়েছে বৈকি! জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ার মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ (জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে) তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে। সম্প্রতি চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং যে নয়া সিল্ক রুটের কথা বলেছেন, তা অন্য চোখে দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের ধারণা এতে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃক, প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন ২১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশে এই সিল্করোডটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সিল্করোডের মাধমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সুদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পেঁৗছে যেত। এর মধ্যদিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের নয়া প্রেসিডেন্টের নামকরণ করেছেন 'নিউ সিল্করোড ইকোনমিক বেল্ট'। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একই সঙ্গে একটি 'মেরিটাইম সিল্করুট'-এর কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় এই মেরিটাইম সিল্ক রুটের ধারণাও কয়েকশ বছরের। এই মেরিটাইম সিল্ক রুট ধরে চীনা অ্যাডমিরাল ঝেং হে (মা হে) ১৪০৫ সাল থেকে ১৪৩৩ সাল এই ২৮ বছর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে চীনা পণ্য নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৪২১-১৪৩১ সালে তিনি দুবার তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে এসেছিলেন। চীন এই নৌরুটটি নতুন করে আবার ব্যবহার করতে চায়। তবে কয়েকশ বছরের ব্যবধানে এই অঞ্চল অনেক বদলে গেছে। চীন আর একক শক্তি নয়। ভারত তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। আর যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়েই তার নিজের স্বার্থ আদায় করতে চায়। ফলে এটা স্বার্থ নয় ভারত-চীন সম্পর্ক আগামিতে কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হবে। কেননা ভারত মহাসাগরে চীন ও ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। মৎস্য সম্পদ থেকে শুরু করে জ্বালানি সম্পদ ও জ্বালানি সম্পদ সরবরাহের অন্যতম রুট হচ্ছে এই ভারত মহাসাগর। পরিবর্তিত রাজনীতির কারণে এই সামুদ্রিক রুটের গুরুত্ব বাড়ছে। এই সামুদ্রিক রুটের গুরুত্ব অনুধাবন করেই চীন এ অঞ্চলে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থও বিঘি্নত হচ্ছে। ভারত তাই এ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোতে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে এক ধরনের স্নায়ুবিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে এশিয়ার প্রভাবশালী এই দেশ দুটোর মধ্যে। গেল মে মাসে (২০১৫) রোড মোদি বেইজিং সফর করেন। ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে ভারতীয় তৎপরতা দি-পাক্ষিক আলোচনায় আদৌ স্থান না পেলেও, চীনা নেতারা বিষয়টি জানেন ও বোঝেনও। মোদি নিজে চীনের ব্যাপারে যতই আগ্রহী থাকুক না কেন, ভারতে একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র আছে। এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা পৃথিবীর শীর্ষ গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর একটি। এরা ভারতের স্বার্থকে সব সময় বড় করে দেখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ইতোমধ্যে ভারতের এক ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টদের চোখ এখন ভারত মহাসাগরের দিকে। ভারত মহাসাগরে শুধু যে বিশাল সম্পদই রয়েছে, তা নয়। বরং শিল্পের কার্গো শিপমেন্টের অর্ধেক পরিবাহিত হয় এই ভারত মহাসাগর দিয়ে। একই সঙ্গে ৩ ভাগের ১ ভাগ কার্গো ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৩ ভাগের ২ ভাগ, এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রাফিক পৃথিবীর অন্যত্র যেতে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ। পৃথিবীর আমদানিকৃত পণ্যের (তেলসহ) শতকরা ৯০ ভাগ পরিচালিত হয় এই সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে। সুতরাং এই সমুদ্র পথের নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি করে।
এই সমুদ্র পথে কর্তৃত্ব বৃদ্ধির প্রশ্নেই চীন ও ভারতের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিবাদ অনিবার্য। এই দ্বন্দ্ব ও বিবাদ দুই দেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির যে সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে, তা ভেস্তে যেতে পারে। ফলে এ আইআইবির বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদিও এটা সত্য চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন ব্যবসা ও বিনিয়োগকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ থাকলেও এই বিবাদকে এক পাশে সরিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট গেল বছরের সেপ্টেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। আর গত মে মাসে মোদি চীন সফর করে এলেন। এতেই বোঝা যায় দুই দেশই সীমান্ত বিরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, বরং একটি দ্বৈতনীতি গ্রহণ করছেন। ভারত মহাসাগরে উভয় দেশের স্বার্থ রয়েছে। এই স্বার্থ থাকবে। তবে ব্যবসা ও বিনিয়োগ নীতিতে উভয় দেশের নীতি এক ও অভিন্ন।
সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কর্তৃত্ব হ্রাস ও একটি সুস্থ অর্থনীতি প্রবর্তনে দুই দেশের অবস্থান এক। এ কারণেই এআইআইবি টিকে থাকবে। Daily Jai Jai Din 07.07.15

গ্রীষ্মের অর্থনৈতিক সংকট


গ্রীষ্মের অর্থনৈতিক সংকট শুধুমাত্র গ্রিসের ভবিষ্যৎকেই একটি অনিশ্চয়তার মাঝে ঠেলে দিয়েছে, তা নয়। বরং বিশ্বের  অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এটা একটা বড় আঘাত। গত ৩০ জুন ছিল গ্রিসে আইএমএফের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধ করার সর্বশেষ তারিখ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় গ্রিস কার্যত এখন একটি ঋণ খেলাপি রাষ্ট্রে পরিণত হলো। আজ ৫ জুলাই গ্রিস সরকার সে দেশে একটি গণভোটের আয়োজন করেছে। অর্থনীতি রক্ষায় (বেল আউট) এই গণভোট। গ্রিসের সিপ্রাস সরকার গণভোটে ঋণদাতাদের অতিরিক্ত বাজেট প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। এবং গণভোটে ‘না’-সূচক ভোট দেওয়ার জন্য জণগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা চাচ্ছেন জনগণ সেখানে ‘হ্যাঁ’-সূচক ভোট দিক। ‘না’-সূচক ভোট জয়যুক্ত হলে গ্রিস ইউরো জোন (১৯ দেশ) থেকে বেরিয়ে যাবে এবং তাদের নিজস্ব মুদ্রা ড্রাকমা পুনঃপ্রবর্তন করবে। এর মধ্য দিয়ে আগামীতে গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করতে পারে। একসময় এই ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে ঋণ ছিল ইউরোপবাসীর। এক ইউরোপের ধারণা কল্পনাই থেকে যেতে পারে এখন।
২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিন্ন ইউরোপের ধারণাটি কোনো অমূলক ধারণা ছিল না। বরং ১৯৫৭ সালে ইউরোপিয়ান কমিউনিটি সৃষ্টির পর ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ম্যাসট্রিট চুক্তি ছিল অভিন্ন ইউরোপ গঠনের লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ। ম্যাসট্রিট চুক্তিতে একটি একক মুদ্রা ও একটি ইউরোপীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে সেভেন চুক্তি ও ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো চালুর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অভিন্ন এক ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল ইউরোপ। বলা ভালো, ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপীয় কমিউনিটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নাম ধারণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এরই মধ্যে সম্প্রসারণ ঘটেছে। পূর্বে ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের পর ২০০৪ ও ২০০৭ সালে পূর্ব ইউরোপের বেশ কটি দেশ ইইউতে যোগ দিয়েছে। ইইউর সদস্যসংখ্যা এখন ২৮। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ইইউর ১৫টি দেশের মাঝে ১১টি দেশ ইউরো চালু করেছিল। এখন চালু রয়েছে ১৭টি দেশে। ইউরো চালু হওয়ার সময়ই ইউরো নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
এখন বলা হয়েছিল, ইউরোপের উত্তরের ধনী দেশগুলোতে ইউরো চালু হলে এ থেকে সুবিধা নিতে পারে। আজ এত বছর পর এই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হলো। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে ইউরো চালু হওয়ার হওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তিন বছর পর্যন্ত নিজ নিজ দেশের মুদ্রা চালু থাকে এবং ২০০২ সালের জুলাই মাসে ইউরোর কাগজি ও ধাতব মুদ্রা চালু হওয়ার পর পুরোনো মুদ্রা বাতিল হয়ে যায়। গত নয় বছর ইউরো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা না দিলেও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ইইউর কয়েকটি দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দেশগুলো ঋণ রোধ করতে না পেরে অনেকটা দেউলিয়া হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে গ্রিস ও ইতালির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরমে ওঠে। কিন্তু গ্রিসের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে খারাপ। সেখানে পাপাদ সরকারের পতন, বিচারপতি পাপাদেমাসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কিংবা ২০১৫ নির্বাচনে বামপন্থী এলেক্সিস সিপ্রাসের নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হলেও গ্রিস অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি শক্তি। অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ইউরো জোন এর অর্থনৈতিক সংকট ইইউর ভূমিকাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। এখানে বলা ভালো, ১৯৫৭ সালে মাত্র ছয়টি দেশ নিয়ে (বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড, লুক্সের্মবাগ) ইউরোপীয় ঐক্যের যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। ২৮টি দেশ এখন ইইউর  সদস্য। এর মাঝে আবার ২৪টি দেশ ন্যাটোর সদস্য। তবে জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনো ন্যাটোর সদস্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এই দুটো দেশকে ন্যাটোর সদস্যপদ দিতে চাচ্ছে, যাতে রাশিয়ার রয়েছে আপত্তি।
ইউরোপে এরই মাঝে বেশ কয়েকটি সংস্থার জন্ম হয়েছে যে সংস্থাগুলো ইউরোপীয় ঐক্যকে ধরে রেখেছে। যেমন বলা যেতে পারে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ইউরোপীয় কাউন্সিল, কাউন্সিল, ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় আদালত, নিরীক্ষক দফতর, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটি, আঞ্চলিক কমিটি, ইউরোপীয় ব্যাংক ও ইউরোপীয় মুদ্রা ইনস্টিটিউট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা। এই সংস্থাগুলো অভিন্ন ইউরোপের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা পুরো দৃশ্যপটকে এখন বদলে দিল। এখন শুধু ইউরোপই নয়, বরং খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে। যে যুক্তি তুলে একসময় ব্রিটেন ও ডেনমার্ক ইউরো জোনে (এক মুদ্রা নিজ দেশে চালু) যোগ দিতে চায়নি, সেই যুক্তিটি এখন সত্য বলে প্রমাণিত হলো। অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধারের কাজটি অত সহজ নয়। একটি দেশের সমস্যায় অন্য দেশ আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ইউরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়, তা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান কাঠামো আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি না?
২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তার ৫০তম পূর্তি উৎসব পালন করে, তখনই বর্ণিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইইউর মধ্যে বিভক্ত আছে। লুক্সেমবার্গ ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে ইউরোর মুদ্রার কথা উল্লেখ করেছিল। অথচ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে প্রমাণিত হয়েছিল ইউরোর সব দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। ব্রিটেন ও ডেনমার্ক প্রথম থেকেই ইউরোকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। পোল্যান্ড ও ইতালি চেয়েছিল ইউরোপের ক্রিশ্চিয়ান মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু ফ্রান্স এর বিরোধিতা করেছিল। দেশটি ধর্মকে আলাদা করতে চেয়েছিল। চেক রিপাবলিক ও প্রোল্যান্ড নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিলেও ফ্রান্স ও জার্মানি এটা নিয়ে চিন্তিত ছিল। এ কারণে যে নিরাপত্তার বিষয়টি যে কোনো সিদ্ধান্ত বলে রাশিয়াকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। জার্মানি ও স্পেন ইইউর জন্য নতুন একটি সাংবিধানিক চুক্তি করতে চাইলেও ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ড এর বিরোধী। পূর্বে ইউরোর সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নে ছিল। ১৯৮৯ সালের পর থেকে সমাজতন্ত্রের  দেশগুলো সোভিয়েত নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করে। সেখানে সমাজতন্ত্রের পতন হয় এবং দেশগুলো গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়। ২০০৪ সালের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে পারেনি। এই দেশগুলোর ওপর কোপেনহেগেন ফর্মুলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোপেনহেগেন ফর্মুলার কতগুলো শর্ত দেওয়া হয়েছিল, যা পরে করলে ইইউর সদস্য পদ পাওয়া যাবে। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল-গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু, মুক্তবাজারে অর্থনৈতিক প্রবর্তন, মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাদান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। এসব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কয়েকটি পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ইইউতে যোগ দেয়। বসনিয়া, হারজেগোভিনা কিংবা ক্রোয়েশিয়া এখনো ইইউতে যোগ দিতে পারেনি।
এখন অর্থনৈতিক সংকট সব সংকটকে ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ সংকট জর্জরিত ইউরোপে আবারও সংস্কার আশঙ্কা বাড়ছে। ২০১৩-২০১৪ সময়সীমায় ইউরো ব্যবহারকারী ইউরো জোনের শূন্য প্রবৃত্তি হয়েছিল। ইইউর প্রবৃত্তিও ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই ইউরোপ নিয়ে শঙ্কা থেকেই গেল। এখন ইইউর ঐক্য নিয়ে যে সন্দেহ, তা আরো বাড়বে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে দুই স্তরে বিভক্ত করার প্রস্তাব উঠেছে। জার্মানি ও ফ্রান্স একটি দুই স্তরবিশিষ্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাচ্ছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সার্কোজি খোলামেলাভাবেই এই বিভক্তির কথা বলেছিলেন। জার্মানির চ্যাঞ্চেলর মের্কেলও চাচ্ছেন একটা পরিবর্তন। তিনি বলেছেন এক নয়া ইউরোপ গড়ার কথা। যদিও এই বিভক্তির বিরোধিতা করেছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জোসে ম্যানুয়েল বাকোছ। এখন সত্যি সত্যি ইউরোপ ভাগ হয়ে যাবে কি না, কিংবা নতুন ইউরোপের স্বরূপ কী হবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে একটি পরিবর্তনকে আসন্ন তা গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছোট অর্থনৈতিক দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এটাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় ব্যর্থতা। তাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন যখন ইইউতে থাকা বা না থাকা নিয়ে গণভোট করতে চান, তখন ইউরোপের ঐক্য যে ফাটলের জন্য হয়েছে তারই ইঙ্গিত দিলেন তিনি। ক্যামেরন স্পষ্ট করেই বলেছেন আবারও যদি তখনই এসব সমস্যা নিয়ে উদ্যোগ নিতে না পারে, তাহলে ইউরোপ ব্যর্থ এবং ব্রিটিশরাও পতনের দিকে যেতে থাকবে। অতীতে ইইউর সম্পর্কে এত ভংয়কর কথা কেউ বলেননি। তখন ক্যামেরন সাহস করেই বললেন, জাপানের দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন সময় ইইউর জন্য। অর্থনীতি ও রাজনীতি সংকট যদি ইইউ কাটিয়ে উঠতে না পারে তাহলে এটা দিব্যি বলা যায় আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা এক ভিন্ন ইউরোপের চেহারা দেখতে পাব।
ব্রিটেনের মতো একটি বড় দেশ যদি ইইউ ত্যাগ করে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব থাকবে না। যেখানে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি জ্যাক্লদ জ্যাংকার অভিবাসীদের ব্যাপারে বিশেষ করে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে বসবাসের একটি পরিকল্পনা করছেন সেখানে ক্যামেরন এর বিরোধিতা করেছেন। জ্যাংকারের পরিকল্পনায় বিভিন্ন দেশের জন্য একটি অভিবাসী কোঠা রাখার কথা বলা হয়েছে। নয়া ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেরেশামে বলেছেন, এই কোঠা ব্যবস্থা ব্রিটেন মানবে না। এতে করে ইউরোপের দিকে অভিবাসীদের আশাকে উৎসাহিত করবে। এমনকি হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান কোঠা ব্যবস্থাকে বিকৃত মস্তিষ্কও অপ্রাপ্ত বলে অভিহিত করেছেন। এখানে বলা ভালো, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভূমধ্যসাগর অতিক্রমকালে শত শত অভিবাসী উদ্ধার হয়েছেন। অথবা নৌকা ডুবিতে মারা গেছেন। এসব অভিবাসীর টার্গেট হচ্ছে ইতালি, গ্রিস, সাইপ্রাস ও মাল্ট। অতিরিক্ত অভিবাসীর চাপ সামলাতে না পেরে এই দেশগুলো ইইউর কাছে প্রতিকার চেয়েছিল। গত বছর ইইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এক লাখ ৮৫ হাজার অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে আগামীতে এই অভিবাসী ইস্যু ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বড় বিতর্ক তুলবে।
তবে সব ছাড়িয়ে গেছে গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানাযায়, গ্রিসের সংসদের অধিকাংশ সদস্য ৫ জুলাইয়ের গণভোটের ‘না’ ভোটের পক্ষে মতামত দিয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, ঋণদাতা দেশগুলোকে সংস্কারের কথা বলেছিল। অর্থাৎ বাজেট কাটের কথা বলা ছিল তাতে শায় দেবে না। ধারণা করছি, গণভোটে ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হবে। এর অর্থ হচ্ছে গ্রিস ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে যাবে। শেষ অব্দি গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে কিংবা এমন হতে পারে গ্রিস ব্রিটেন ও ডেনমার্কের মতো অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের থেকেও নিজস্ব মুদ্রা তারা ব্যবহার করবে। যেসব ব্রিটেনে ইউরো চালু না হওয়ায় তখনো পাউন্ড সেখানে চালু রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, গ্রিস তার পুরোনো মুদ্রা ‘ড্রাকমা’ পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে ৫ জুলাইয়ের গণভোটের ফলাফলের ওপর। এখানে এ কথা বলা প্রয়োজন গ্রিস যদি ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে যায় এর একটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সারা বিশ্বের অর্থনীতিতেই পড়বে। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি স্টক এক্সচেঞ্জ  মার্কেটের পতন ঘটেছে। শুধু অস্ট্রেলিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেছে। মুদ্রা হিসেবে ডলারের মানও কমে গেছে। বলা হচ্ছে, প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০১৬ সালে এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ০.৩ কমে ভাগ কমে যাবে। সুতরাং সারা বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে আজ ৫ জুলাইয়ের গণভোটের দিকে।
Ntv Online
 ০৫ জুলাই ২০১৫, ১৮:৪৬ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০১৫, ০১:১২

হিলারি কিনটন কি হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট

হিলারি কিনটন কি হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট? জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একটি মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গেল সপ্তাহে যে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, এতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি কিনটনের সম্ভাব্য জয়ের চিত্রটিই ফুটে উঠেছে। আর এটা যদি হয়, তাহলে হিলারি কিনটন ইতিহাসের পাতায় ঢুকে যাবেন। বারাক ওবামাকে মনোনয়ন দিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি চমক সৃষ্টি করেছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। আর ২২৭ বছর পর হিলারি কিনটন হতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ১৭৮৯ সালে জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এরপর ৪৪ প্রেসিডেন্ট কখনো এক টার্ম, কখনো দু’টার্ম দায়িত্ব পালন করেছেন। বারাক ওবামার দু’টার্মের (৮ বছর) মেয়াদ শেষ হবে ২০১৬ সালের নভেম্বরে। ৮ নভেম্বর (২০১৬) সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ইতোমধ্যেই হিলারি কিনটন তার প্রার্থী পদ ঘোষণা করেছেন। ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ও ৬৭ বছর বয়সি হিলারি কিনটনের হোয়াইট হাউস, প্রশাসন ও আইন প্রণেতা হিসেবে অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। হোয়াইট হাউসে তিনি ছিলেন আট বছর, ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত একজন ফার্স্ট লেডি হিসেবে। এরপর নিউইয়র্ক থেকে একজন সিনেটর হিসেবে তিনি কংগ্রেসে আইন প্রণয়নে সহায়তা করেন ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেক্রেটারি অব স্টেট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর আগে ২০০৮ সালে তিনি বারাক ওবামার সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিাচরে তিনি ওবামার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। এরপর বারাক ওবামা তাকে মন্ত্রিপরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিলেও হিলারি কিনটন বারবারই আলোচনায় ছিলেন। মিডিয়া তাকে বারবার ফোকাস করেছে। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনার অবসান ঘটালেন তিনি। কিন্তু হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথটি কি মসৃণ? তিনি কি পারবেন ইতিহাস গড়তে? যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ২০০৮ সালে ওবামাকে নির্বাচিত করে ট্রাডিশনাল প্রথা ভেঙেছিলÑ একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এই ধারাবাহিকতায় এখন যুক্তরাষ্ট্র একজন নারী প্রেসিডেন্টকে পায় কি না, সেটিই দেখার বিষয়। তবে অনেক প্রশ্ন তো আছেই। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ এখনো কনজারভেটিভ। তারা একজন নারীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে নাও পারেন। অবশ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীরা সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ চার ডজন দেশে নারীরা এখনো রাষ্ট্র তথা সরকার পরিচালনা করে আসছেন। ইউরোপের অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান এখন নারী। ফলে একদিকে হিলারি কিনটনের সম্ভাবনা যেমিন আছে, তেমনি এটিও সত্যÑ তিনি কনজারভেটিভদের বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। বলা ভালো, জনগণের ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। নির্বাচিত হন নির্বাচকম-লীর ভোটে। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০। আর নির্বাচকম-লীর সংখ্যা ৫৩৮। সাধারণত সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের (প্রতিনিধি পরিষদ) সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে এই নির্বাচকম-লী গঠিত হয়। হিলারি কিনটনের জন্য সমস্যা হচ্ছে, কনজারভেটিভ রিপাবলিকানরা এখন কংগ্রেসের উভয়কক্ষ (সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ) নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ নির্বাচকম-লীর মধ্যে রিপাবলিকানরা ভারী। ২০১৬ সালে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। এতে যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব ফেরতে পারে। নতুবা কনজারভেটিভদের বলয় ভাঙা তার জন্য কঠিন হবে। উল্লেখ্য, হিলারিকে বলা হয় দুর্বলচিত্তের মানুষ। তার স্বামী বিল কিনটন যখন প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে যান, তখন স্ত্রী হিসেবে তিনি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেননি। অবশ্য ওই ঘটনার পরও তিনি স্বামীকে ‘ক্ষমা’ করে দিয়েছিলেন এবং বৈবাহিক জীবন টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনী প্রচারণায় হিলারি কিনটনকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এ জন্য হিলারি কিনটন কতটুকু মানসিক শক্তির অধিকারী হন, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। উপরন্তু কিনটন দম্পত্তির বিরুদ্ধে বেশকিছু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যখন এই দম্পতি হোয়াইট হাউস ছাড়নে, তখন তাদের আর্থিক ভিত্তি অত শক্তিশালী ছিল না। পরে নিউইয়র্কে ২৭ লাখ ডলারের একটি বাড়ি ও ওয়াশিংটনে ২৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তাদের অপর একটি বাড়ি ক্রয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। কিনটন ফাউন্ডেশন নিয়েও প্রশ্ন আছে। অভিযোগ আছে, অনেক বিদেশি রাষ্ট্র এই ফাউন্ডেশকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে তাদের ‘সুবিধা’ আদায় করে নিয়েছে। অবশ্যও দু’জনই বক্তৃতা আর সেমিনার করে বেশ অর্থ আয় করেন। একই সঙ্গে হিলারির বিরুদ্ধে বড় একটি অভিযোগ হচ্ছে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় লিবিয়ার বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে জঙ্গিবাদীদের হামলা, ওই হামলায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিহত হওয়ার ঘটনা ঠেকাতে এবং রাষ্ট্রদূতসহ অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। ওয়াশিংটনের পিউ রিচার্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈদেশিক নীতি ইস্যুতে মানুষ রিপাবলিকানদের বেশি বিশ্বাস করে। এটি হিলারি কিনটনের জন্য একটি মাইনাস পয়েন্ট। অতীতে ইরাক, বসনিয়া ও কসোভোয় ‘যুদ্ধ’ সমর্থন করেছিলেন হিলারি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী একটা জনমত তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তবে হিলারি কিনটনের বেশকিছু প্লাস পয়েন্টও রয়েছে। এক. তিনি পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ বুশের (সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ভাই ও সিনিয়র বুশের ছোট ছেলে) চেয়ে তিনি অনেক এগিয়ে আছেন। দুই. গেল বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এতে রিপাবলিকানরা বিজয়ী হলেও ইতোমধ্যে রিপাবলিকান স্রোতে উল্টা বাতাস বইছে। বিশেষ করে তরুণ ও গরিব আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তিন. যুক্তরাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী তরুণ প্রজন্ম রয়েছÑ যাদের নেতৃত্বে নিউইয়র্কসহ অন্যান্য শহরে ‘অক্যুপাই মুভমেন্ট’ পরিচালিত হয়েছিল। এই ‘শক্তি’ ডেমোক্র্যাটদের আবার ২০১৬ সালে কংগ্রেসে ফিরিয়ে আনতে পারে। তা হিলারিকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে। চার. ওবামা তার শেষ টার্মে এসে বেশকিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন (স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, তরুণদের উচ্চশিক্ষায় সাহায্য ইত্যাদি)Ñ যা তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। এই তরুণ প্রজন্মের সমর্থন পেতে পারেন হিলারি। পাঁচ. যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী একটি জনমত রয়েছে। তা বেশ শক্তিশালী। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেই মধ্যপ্রাচ্যে আইএসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়ে নতুন একটি ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করেছে। কোটি কোটি ডলার খরচ হয় যুদ্ধে। হিলারি যদি এই ‘যুদ্ধবিরোধী’ জনমতের সঙ্গে অবস্থান করেন, তাহলে তার সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ছয়. রিপাবলিকান শিবিরে তেমন শক্ত প্রার্থী নেই। এটা হিলারির জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। ডেমোক্র্যাট শিবিরে হিলারি কিনটনের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। প্রেসিডেন্ট ওবামা তাকে একজন সম্ভাব্য ‘ভালো প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তুলনামূলক বিচারে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অনেক পিছিয়ে আছেন। কৌশলী হিলারি অনেক আগে তার প্রার্থী পদ ঘোষণা করে প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখলেন। তবে যেতে হবে অনেক দূর। পার্টি ফোরাম ও কনভেনশনে তাকে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে নিজ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে। সেই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তাকে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। বড় বড় ব্যবসায়ী হাউস অর্থ জোগায়। হিলারিকে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটি সত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই প্রেসিডেন্ট পদে দলের পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ একটি দল (যেমনÑ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি) ক্ষমতায় দু’টার্ম থাকলেও পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকানদের মধ্যে থেকে থ্যারি ট্রুমান (১৯৪৫-৫৩) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষ থেকে। পরে অর্থাৎ ৩৪তম প্রেসিডেন্ট হলেন রিপাবলিকান দল থেকে (আইসেন হাওয়ার, ১৯৫৩-৬১)। ৩৫তম প্রেসিডেন্টে নির্বাচনে আবার পরিবর্তন। কেনেডির মৃত্যুর পর জনসন (১৯৬১-৬৯) ডেমোক্র্যাটদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। ১৯৬৯ সালে আবার পরিবর্তন। প্রেসিডেন্ট হলেন রিপাবলিকানরা (নিক্সন ও ফোর্ড, ১৯৬৯-৭৭)। এই ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট হন জিমি কার্টার (ডেমোক্র্যাট, ১৯৭৭-৮১), রিগ্যান (রিপাবলিকান, ১৯৮১-৮৯) ও জর্জ বুশ (রিপাবলিকান, ১৯৮৯-৯৩), বিল কিনটন (ডেমোক্র্যাট, ১৯৯৩-২০০১), বুশ-২ (রিপাবলিকান, ২০০১-০৮), ওবামা (২০০৮-১৬)। এই ধারা হিলারি কিনটন ভাঙতে পারবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। হিলারি কিনটনের ব্যাপারে যে কথাটা বলা যায়, তা হচ্ছে তিনি মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে একটি নতুন দিকদর্শনা আনেন। বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এখন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। ২০১০ সালে তিনি তার বিখ্যাত ঋড়ৎধিৎফ ফবঢ়ষড়ুবফ উরঢ়ষড়সধপু-এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। তিনি বিখ্যাত ঋড়ৎরমহ চড়ষরপু ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, ঞযব অংরধ চধপরভরপ যধং নবপধসব, ধ শবু ফৎরাবৎ ড়ভ মষড়নধষ ঢ়ধষরঃরপং ধহফ টঝ ঈড়সসরঃ ঃযবৎব রং বংংবহঃরধষ. তার এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল ৩টিÑ এক. এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকা, দুই. যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং তিন. এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, একুশ শতক হবে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক (চিন, জাপান, ভারত) কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি বিকশিত হবে। জন কেরি হিলারির স্থলাভিষিক্ত (পররাষ্ট্র সচিব) হয়েও হিলারির এই নীতি অব্যাহত রেখেছেন। এটা একটা বাস্তববাদী নীতি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হিলারি কিনটনের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী হতেই পারি। অনেকের স্মরণ থাকতে পারে, বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি বাংলাদেশকে একটি সফট পাওয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এটা বড় পাওয়া। তিনি যোগ্য ব্যক্তি। একটি সম্মোহনী শক্তি তার রয়েছে। একজন ‘চ্যাম্পিয়ন’-এর কথা তিনি বলেছেন। দেখতে হবে, ২০১৬ সালে কোন ‘চ্যাম্পিয়ন’ হোয়াইট হাউসে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। তবে এটি মনে রাখতে হবে, মার্কিন সমাজ বড় কনজারভেটিভ। একজন নারীকে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখবেনÑ এই মানসিকতা এখনো মার্কিন সমাজে তৈরি হয়নি। উপরন্তু একজন ধনী ব্যবসায়ী কোনাল্ড ট্রাম্প জেব বুশকে চ্যালেঞ্জ করে রিপাবলিকান প্রার্থী হতে মাঠে নেমেছেন। আমেরিকার ব্যবসায়ী শ্রেণি ও করপোরেট জগৎ তার পেছনে থাকতে পারে এবং চূড়ান্ত বিচারে তিনি যদি জেব বুশকে পরাজিত করতে পারেন, তাহলে নির্বাচনে একটি নতুন উন্মাদনা আনতে পারেন। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা আজ প্রশ্নের মুখে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চিন এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম চ্যালেঞ্জার। অনেকেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র চিন থেকে ঋণ গ্রহণ করে নিজের আর্থিক খাতের চাহিদা মেটায়। এ জন্য একজন যোগ্য প্রেসিডেন্টের দাবি উঠছে আমেরিকার সর্বত্র। ইউরোপে রাশিয়া নতুন করে মার্কিন নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এসব কিছু নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলবে। সুতরাং হিলারি কিনটনের সামনের দিনগুলো যে সুখের হবে, এটি মনে করার কারণ নেই। এখনো বাকি আছে অনেক দিন। অনেক প্রার্থীই মাঠে আছেন। কে হবেন চূড়ান্ত প্রার্থীÑ এটি এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে হিলারি কিনটন আর জেব বুশের পাল্লা যে ভারী, তা বলাই যায়। Daily Amader Somoy 05.07.15

ইউরোপের মানচিত্র কি বদলে যাবে!

গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং এর আগে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ২০১৬ সালেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের থাকা না থাকা নিয়ে একটি গণভোট করার সিদ্ধান্ত এমন একটা আশঙ্কার জš§ দিয়েছে যে, শেষ অবদি হয়তো আর অভিন্নœ ইউরোপের ধারণাটি টিকে থাকছে না। গত ৩০ জুন ছিল গ্রিসের ১০০ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা। গ্রিস ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঋণদাতা গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া শর্ত গ্রিস সরকার মানেনি। অর্থনীতি রক্ষায় তারা ৫ জুলাই এক গণভোটে যাচ্ছে। ওই গণভোটে যদি ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হয় (যা কিনা গ্রিক সরকার চাচ্ছে), তাহলে ইউরো জোন থেকে গ্রিস বেড়িয়ে যাবে। ইউরোর বদলে মুদ্রা হিসেবে দ্রাকমা আবারো পুনঃস্থাপিত হবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। অন্যদিকে ১১ মের নির্বাচনে (২০১৫) ব্রিটেনের কনজারভেটিক পার্টির পুনরায় ফিরে আসা প্রমাণ করল ব্রিটেনের মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, বরং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়েই ইউরোপে টিকে থাকতে চায়। এখন ব্রিটেনের পথেই এগুচ্ছে গ্রিস। আগামীতে পর্তুগাল ও ইতালিও যদি একই পথ অবলম্বন করে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যুক্তরাজ্যের গেল নির্বাচন অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জš§ দিয়েছিল। যুক্তরাজ্যের গত ৯৩ বছরের যে গণতন্ত্র (১৯২২ থেকে) যেখানে মূলত দুটি প্রধান দলই সমতা পরিচালনা করে এই ধারা থেকে যুক্তরাজ্য এবারো বেরিয়ে আসতে পারেনি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই কনজারভেটিক ও লেবার পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং এরাই সরকার গঠন করে। ২০১০ সালে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল বটে। সেবার সরকার গঠনের মধ্য কনজারভেটিভ দলের প্রয়োজন ছিল তৃতীয় একটি দলের সমর্থনের। লিভডেম বা লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরনের প্রতি সমর্থন দিয়ে যৌথভাবে একটি সরকার গঠন করেছিলেন এবং লিভডেম নেতা নিক ব্লেগ উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার ইইউ প্রশ্নে লিবডেমের বড় ধরনের পরাজয় হয়েছে। এই মুহূর্তে লিবডেমকে বাদ দিয়ে ডেভিড ক্যামেরন এককভাবেই সরকার গঠন করেছেন। তিনি এবার আর একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করেননি। চারটি জাতি নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত এবং হাউস অব কমনস’র আসনও সেভাবে নির্ধারিত। যেমন ইংল্যান্ডের রয়েছে ৫৩৩ আসন, ওয়েলস’র ৪০, নর্থ আয়ারল্যান্ডের ১৮ ও স্কটল্যান্ডের ৫৯। সব মিলিয়ে ৬৫০ আসনে সরকার গঠনের জন্য দরকার হয় ৩২৬টি আসন। এই নির্বাচন প্রমাণ করল যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে সম্ভাবনা ছিল, সে সম্ভাবনা আর নেই। সাধারণ মানুষদের আস্থা দুটি বড় দলের প্রতিই। তবে যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের এটা একটা সৌন্দর্য যে, দল যদি হেরে যায় তাহলে দল থেকে পরিবর্তন করে। এড মিলিব্যান্ড এখন আর লেভার পার্টির নেতা নন। তিনি পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে লিবডেমের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। নিক ক্লেগের পরিবর্তে আমরা এখন অন্য কাউকে দেখব লিবডেমের নেতৃত্বে। যুক্তিটা হচ্ছে দলের নেতৃত্ব যে ‘নীতি ও আদর্শ’ নিয়ে নির্বাচনে গেল, ভোটাররা তা গ্রহণ করেনি। ফলে দলকে এখন ‘নয়ানীতি ও আদর্শ’ খুঁজে বের করতে হবে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) এখন হাউস অব কমনস এ তৃতীয় শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দলটি স্কটল্যান্ডের ৫৯টি আসনের মধ্য ৫৬টি আসন পেয়েছে। অথচ এই দলটি স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বের করে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গড়তে চায়। এটা ছিল তাদের সেøাগান। যদিও গেল সেপ্টেম্বরে (২০১৪) স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছিল তাতে যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষেই ভোট পড়েছিল বেশি। এখন এসএসপির নেত্রী নিকোলা স্টারজিওন কী ভূমিকা নেন, সে দিকে অনেকের লক্ষ্য থাকবে। যদিও ইতোমধ্যেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আবারো একটি গণভোটের উদ্যোগ নেবেন। ফলে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। ইউরোপের মানচিত্র কি বদলে যাবে!প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন নির্বাচনের আগেই বলেছিলেন ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কিনা, এটা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা যাচাই করে দেখার জন্য আগামী ২০১৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে একটি গণভোটের আয়োজন করবেন। মানুষ এতে সায় দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা, না থাকা নিয়ে ব্রিটেনের একটা বিতর্ক আছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে আছে বটে, কিন্তু ইউরোপীয় মুদ্রা ‘ইউরো’ তে কখনই যোগ দেয়নি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৬টি রাষ্ট্র নিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিটি (ইইসি) যাত্রা শুরু করে আজ তা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য তৎকালীন ইইসিতে যোগ দেয়। আর ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের মাঝে ১২টি দেশ অভিন্ন মুদ্রা ইউরোপ চালু করে। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি দেশ (মোট ১৯টি) ইউরো গ্রহণ করে। কিন্তু যুক্তরাজ্য তাদের মুদ্রা পাউন্ডকে ধরে রেখেছে। তুলনামূলক বিচারে ব্রিটেনের মানুষ কিছুটা কনজারভেটিভ। তারা মনে করে ইইউ বা ইউরোতে যোগ দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের স্বীকয়তা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া। তাই তারা বারবার ইউরো গ্রহণ করার বিপক্ষে মত দিয়ে আসছে। এখন কনজারভেটিভদের বিজয় এই প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে আসল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি শক্তি। অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ইউরো জোন এর অর্থনৈতিক সংকট ইইউর ভূমিকাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। এখানে বলা ভালো ১৯৫৭ সালে মাত্র ৬টি দেশ নিয়ে (বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ) ইউরোপীয় ঐক্যের যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। ২৮টি দেশ এখন ইইউর সদস্য। এর মাঝে আবার ২৪টি দেশ ন্যাটোর সদস্য। তবে জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনো ন্যাটোর সদস্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি দেশকে ন্যাটোর সদস্য পদ দিতে চাচ্ছে, যাতে রাশিয়ার রয়েছে আপত্তি। ইউরোপে এরই মাঝে বেশ কয়েকটি সংস্থার জš§ হয়েছে, যে সংস্থাগুলো ইউরোপীয় ঐক্যকে ধরে রেখেছে। যেমন বলা যেতে পারে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ইউরোপীয় কাউন্সিল, কাউন্সিল, ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় আদালত, নিরীক্ষক দফতর, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটি, আঞ্চলিক কমিটি, ইউরোপীয় ব্যাংক ও ইউরোপীয় মুদ্রা ইনস্টিটিউট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা। এই সংস্থাগুলো অভিন্নœ ইউরোপের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা পুরো দৃশ্যপটকে এখন বদলে দিল। এখন শুধু ইউরোই নয়, বরং খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে। যে যুক্তি তুলে এক সময় ব্রিটেন ও ডেনমার্ক ইউরো জোনে (এক মুদ্রা নিজ দেশে চালু) যোগ দিতে চায়নি সেই যুক্তিটি এখন সত্য বলে প্রমাণিত হলো। অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধারের কাজটি অত সহজ নয়। একটি দেশের সমস্যায় অন্য দেশ আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ইউরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়, তা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান কাঠামো আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কিনা? ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তার পঞ্চাশতম পূর্তি উৎসব পালন করে তখনই বার্লিন ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ইইউর মাঝে বিভক্তি আছে। লুক্সেমবার্গ ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে ইউরোর মুদ্রার কথা উল্লেখ করেছিল। অথচ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছিল ইউরো সব দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। ব্রিটেন ও ডেনমার্ক প্রথম থেকেই ইউরোকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। পোল্যান্ড ও ইতালি চেয়েছিল ইউরোপের ক্রিশ্চিয়ান মূল্যবোধকে প্রধান্য দিতে। কিন্তু ফ্রান্স এর বিরোধিতা করেছিল। দেশটি ধর্মকে আলাদা রাখতে চেয়েছিল। চেক রিপাবলিক ও পোল্যান্ড নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিলেও ফ্রান্স ও জার্মানি এটা নিয়ে চিন্তিত ছিল এ কারণে যে, নিরাপত্তার বিষয়টিতে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ রাশিয়াকে খেপিয়ে তুলতে পারে। জার্মানি ও স্পেন ইইউর জন্য নতুন একটি সাংবিধানিক চুক্তি করতে চাইলেও ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডস ছিল এর বিরোধী। পূর্বে ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ১৯৮৯ সালের ‘ভেলভেট রেভ্যুলুশন’ এই দেশগুলোকে সোভিয়েত নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করে। সেখানে সমাজতন্ত্রের পতন হয় ও দেশগুলো গণতন্ত্রের পথে ধাবিত হয়। কিন্তু ২০০৪ সালের আগে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে পারেনি। এই দেশগুলোর ওপর কোপেনহেগেন ফর্মুলা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোপেনহেগেন ফর্মুলায় কতগুলো শর্ত দেয়া হয়েছিল। যা পূরণ করলেই ইইউর সদস্যপদ পাওয়া যাবে। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু, মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তন, মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এসব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কয়েকটি পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ইইউতে যোগ দেয়। বসনিয়া-হারজেগোভিনা, কিংবা ক্রোয়েশিয়া এখনো ইইউতে যোগ দিতে পারেনি। এখন অর্থনৈতিক সংকট সব সংকটকে ছাপিয়ে গেছে। ঋণ সংকটে জর্জরিত ইউরোপে আবারো মন্দার আশংকা বাড়ছে। ২০১৩-২০১৪ সময় সীমায় ইউরো ব্যবহারকারী ইউরো জোনের শূন্য প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ইইউর প্রবৃদ্ধিও ছিল শূন্যের কোটায়। তাই ইউরোপ নিয়ে শঙ্কা থেকেই গেল। এখন ইইউর ঐক্য নিয়ে যে সন্দেহ, তা আরো বাড়বে। ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে দু’স্তরে বিভক্ত করার প্রস্তাব উঠেছে। জার্মানি ও ফ্রান্স একটি দু’স্তর বিশিষ্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাচ্ছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজি খোলামেলাভাবেই এই বিভক্তির কথা বলেছিলেন। জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেলও চাচ্ছেন একটা পরিবর্তন। তিনি বলছেন এক নয়া ইউরোপ গড়ার কথা। যদিও এই বিভক্তির বিরোধিতা করেছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জোসে ম্যানুয়েল বারোসো। এখন সত্যি সত্যিই ইউরোপ ভাগ হয়ে যাবে কিনা, কিংবা ‘নতুন ইউরোপ’ এর স্বরূপ কি হবে, তা এই মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। তবে একটি পরিবর্তন যে আসন্ন, তা গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এটাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় ব্যর্থতা। তাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন যখন ইইউতে থাকা, না থাকা নিয়ে গণভোট করতে চান, তখন ইউরোপের ঐক্যে যে ফাটলের জš§ হয়েছে, তারই ইঙ্গিত দিলেন তিনি। ক্যামেরন স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আমরা যদি এখনই এসব সমস্যা নিয়ে উদ্যোগ নিতে না পারি তাহলে ইউরোপের পতন হবে এবং ব্রিটিশরাও পতনের দিকে যেতে থাকবে।’ অতীতে ইইউ সম্পর্কে এত ভয়ঙ্কর কথা কেউ বলেননি। এখন ক্যামেরন সাহস করেই বললেন। সামনের দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন সময় ইইউর জন্য। অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংকট যদি ইইউ কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে এটা দিব্যি দিয়েই বলা যায় আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা এক ভিন্ন ইউরোপের চেহারা দেখতে পাব। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই, এখন ৫ জুলাইয়ের পর গ্রিস যদি ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে তা ইউরোপের অন্যান্য দেশকে উৎসাহ জোগাতে পারে। এতে করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে থাকবে। বিশ্ব খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চীনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ বা এআইআইবি। জার্মানি কিংবা ডেনমার্কের মতো অনেক ইউরোপিয়ান দেশ ৫৭ সদস্য বিশিষ্ট এই ব্যাংকে যোগ দিয়েছে। বলা হচ্ছে এটা হচ্ছে এশিয়ার বিশ্ব ব্যাংক। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের খবরদারি যে কমবে তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। গ্রিস আইএমএফের শর্ত না মানায় এই সমস্যার মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্রটি দেউলিয়া হয়ে যায়। তবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও অতীতে আমরা দেখেছি ওই রাষ্ট্র দুটি এক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে শর্ত সাপেক্ষে আইএমএফ পুনরায় ঋণ দেয়। তবে গ্রিসের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তারা ৫ জুলাই গণভোট করবে। এতে করে তারা আইএমএফের চাপিয়ে দেয়া শর্ত মানবে কি মানবে না, এই সিদ্ধান্তটি হবে। শর্ত না মানার পক্ষেই জনমত বেশি। ফলে অন্য ঋণদাতা সংস্থাগুলোও এগিয়ে আসবে না। স্পষ্টতই ইউরোপ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকট থেকে ওরা কীভাবে বেরিয়ে আসে, সেদিকেই লক্ষ্য থাকবে সবার। কেননা এর সঙ্গে অনেক প্রশ্ন জড়িত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাওয়া এবং সর্বোপরি ইউরোপে চীন-রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়াÑসব কিছুই ঘটতে পারে একের পর এক। গ্রিস এআইআইবি ব্যাংকে যোগ দেয়নি। এখন হয়ত গ্রিস বাধ্য হবে এ ব্যাংকে যোগ দিতে এবং সহজ শর্তে ঋণও গ্রহণ করবে। তাই আগামী দিনের ইউরোপের দিকে লক্ষ্য থাকবে সবার। Daily Manobkontho 05.07.15

আজ গ্রিসে অর্থনীতি রক্ষার বড় পরীক্ষা

আজ ৫ জুলাই গ্রিসে অর্থনীতি রক্ষায় (বেইল আউট) গণভোট হতে যাচ্ছে। গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ৩০ জুনের মধ্যে ১০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার পরিশোধ করার ব্যর্থতা শুধু গ্রিসের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। বস্তুত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে ইউরো জোনের ভবিষ্যৎ। ৩০ জুন গ্রিসের ১০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গেছে। আইএমএফের কাছ থেকে এ ঋণ নিয়েছিল গ্রিস। গত ৫ বছর ধরেই গ্রিসের ঋণ সংকটজনিত পরিস্থিতি বিশ্বের গণমাধ্যমে স্থান পেয়ে আসছিল। এই ঋণ পরিস্থিতি ও ঋণ পরিশোধ করার ব্যর্থতার কারণে সেখানে সরকারের পতন পর্যন্ত ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আলেকসিস সিপ্রাসের নেতৃত্বে একটি বামপন্থী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকটের কোনো সমাধান দিতে পারছিল না সরকার। এমনই এক পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধে আরও অর্থ দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল আইএমএফ। কিন্তু তারা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। শর্তের মাঝে অন্যতম ছিল কঠোর ব্যয় সংকোচন। কিন্তু এই শর্তের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। উল্লেখ্য, এর আগের সরকার কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করলে সরকারের পতন ঘটে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সিপ্রাস প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে আইএমএফের এই শর্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন। শেষ মুহূর্তে সরকার ৫ জুলাই একটি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেয়। সরকার গণভোটে না ভোট দেয়ার জন্য গ্রিসের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউরো জোনের নেতারা গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে গ্রিসের পার্লামেন্টের সদস্যরা না ভোট দেয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন। এর অর্থ পরিষ্কার-না ভোট জয়যুক্ত হলে গ্রিস ইউরো জোন থেকে ছিটকে পড়বে। অর্থাৎ যে ১৯টি দেশ নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ইউরো চালু করেছিল, তাদের মধ্যে গ্রিস আর থাকতে পারবে না। এখানে বলা ভালো, বর্তমানে ২৮টি দেশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত। তবে সব দেশ এখনও তাদের নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ইউরো গ্রহণ করেনি। কোনো কোনো দেশ (ব্রিটেন, ডেনমার্ক) তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে ইউরো গ্রহণ করেনি। আবার কোনো কোনো দেশ ইউরো গ্রহণে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, সেসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। যেসব দেশে ইউরো চালু হয়েছে, ওই সব দেশকে নিয়েই ইউরো জোন গঠিত। যেমন- অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, সাইপ্রাস, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুস্কেমবার্গ, মাল্টা, হল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া ও স্পেন- এসব দেশ এর সদস্য। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো (যেমন- চেক রিপাবলিক, পোল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি) এখনও ইউরো জোনের বাইরে রয়েছে। গ্রিস ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে গেলে দেশটির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। বিকল্প হিসেবে গ্রিস সদ্যগঠিত চীনের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) দিকে তাকাতে পারে। এটা হলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কর্তৃত্ব আরও খর্ব হবে।তবে গ্রিসের পরিস্থিতি একটা শংকা তৈরি করেছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। ২০১৬ সালে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির থাকা, না থাকা নিয়ে একটি গণভোট করবে। স্পষ্টতই সমগ্র ইউরোপে অভিন্ন এক ইউরোপের ধারণা তখন কল্পনাতেই থেকে যেতে পারে। ২০১১ সালের পর থেকে অর্থনেতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিন্ন ইউরোপের ধারণাটি কোনো অমূলক ধারণা ছিল না। বরং ১৯৫৭ সালে ইউরোপিয়ান কমিউনিটি সৃষ্টির পর ১৯৯২ সালের ফেব্র“য়ারিতে স্বাক্ষরিত ম্যাসট্রিচট চুক্তি ছিল অভিন্ন ইউরোপ গঠনের লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ।ম্যাসট্রিচট চুক্তিতে একটি একক মুদ্রা ও একটি ইউরোপীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চে শেনজেন চুক্তি এবং ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো চালুর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অভিন্ন এক ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল ইউরোপ। বলা ভালো, ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপীয় কমিউনিটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নাম ধারণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিমধ্যে সম্প্রসারণ ঘটেছে। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের পর ২০০৪ ও ২০০৭ সালে বেশ কটি পূর্ব ইউরোপের দেশ ইইউতে যোগ দিয়েছে। ইইউর সদস্য সংখ্যা এখন ২৮। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ইইউর ১৫টি দেশের মধ্যে ১১টি দেশ ইউরো চালু করেছিল। এখন চালু রয়েছে ১৯টি দেশে। ইউরো চালু হওয়ার সময়ই এ মুদ্রা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইউরোপের উত্তরের ধনী দেশগুলো ইউরো চালু হলে এ থেকে সুবিধা নিতে পারে। আজ এত বছর পর এ আশংকাই সত্যে পরিণত হল। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে ইউরো চালু হওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও সদস্য দেশগুলোয় তিন বছর পর্যন্ত নিজ নিজ দেশের মুদ্রা চালু থাকে এবং ২০০২ সালের জুলাই মাসে ইউরোর কাগজি ও ধাতব মুদ্রা চালু হওয়ার পর পুরনো মুদ্রা বাতিল হয়ে যায়। গত নয় বছর ইউরো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা না দিলেও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ইইউর কয়েকটি দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দেশগুলো ঋণ শোধ করতে না পেরে অনেকটা দেউলিয়া হয়ে যায়। ইতিমধ্যে গ্রিস ও ইতালির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরমে ওঠেছে। কিন্তু গ্রিসের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে খারাপ। সেখানে পাপেন্দ্র সরকারের পতন, বিচারপতি পাপাদেমাসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কিংবা ২০১৫ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে বামপন্থী আলেকসিস সিপ্রাসের নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হলেও গ্রিস অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। বরং সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে।আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি শক্তি। অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ইউরো জোনের অর্থনৈতিক সংকট ইইউর ভূমিকাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। এখানে বলা ভালো, ১৯৫৭ সালে মাত্র ৬টি দেশ নিয়ে (বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড ও লুস্কেমবার্গ) ইউরোপীয় ঐক্যের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। ২৮টি দেশ এখন ইইউর সদস্য। এর মাঝে আবার ২৪টি দেশ ন্যাটোর সদস্য। তবে জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনও ন্যাটোর সদস্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ওই দুটি দেশকে ন্যাটোর সদস্যপদ দিতে চাচ্ছে, যাতে রাশিয়ার রয়েছে আপত্তি।ইউরোপে এরই মাঝে বেশ কয়েকটি সংস্থার জন্ম হয়েছে, যে সংস্থাগুলো ইউরোপীয় ঐক্যকে ধরে রেখেছে। যেমন বলা যেতে পারে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় আদালত, নিরীক্ষক দফতর, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটি, আঞ্চলিক কমিটি, ইউরোপীয় ব্যাংক ও ইউরোপীয় মুদ্রা ইন্সটিটিউট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা। এ সংস্থাগুলো অভিন্ন ইউরোপের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা পুরো দৃশ্যপটকে এখন বদলে দিল। এখন শুধু ইউরোপই নয়, বরং খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখে। যে যুক্তি তুলে একসময় ব্রিটেন ও ডেনমার্ক ইউরো জোনে (একক মুদ্রা নিজ দেশে চালু) যোগ দিতে চায়নি, সেই যুক্তিটি এখন সত্য বলে প্রমাণিত হল। অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধারের কাজটি অত সহজ নয়। একটি দেশের সমস্যায় অন্য দেশ আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ইউরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় তা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান কাঠামো আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি-না?২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তার পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসব পালন করে, তখনই বার্লিন ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইইউর মাঝে বিভক্তি আছে। লুস্কেমবার্গ ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে ইউরো মুদ্রার কথা উল্লেখ করেছিল। অথচ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছিল ইউরো সব দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। ব্রিটেন ও ডেনমার্ক প্রথম থেকেই ইউরোকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। পোল্যান্ড ও ইতালি চেয়েছিল ইউরোপের ক্রিশ্চিয়ান মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু এর বিরোধিতা করেছিল ফ্রান্স। দেশটি ধর্মকে আলাদা রাখতে চেয়েছিল। চেক রিপাবলিক ও পোল্যান্ড নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিলেও ফ্রান্স ও জার্মানি এটা নিয়ে চিন্তিত ছিল এ কারণে যে, নিরাপত্তার বিষয়টিতে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ রাশিয়াকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। জার্মানি ও স্পেন ইইউর জন্য নতুন একটি সাংবিধানিক চুক্তি করতে চাইলেও ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডস ছিল এর বিরোধী। পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ১৯৮৯ সালের ভেলভেট রেভ্যুলেশন এ দেশগুলোকে সোভিয়েত নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করে। সেখানে সমাজতন্ত্রের পতন হয় এবং দেশগুলো গণতন্ত্রের পথে ধাবিত হয়। কিন্তু ২০০৪ সালের আগে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে পারেনি। এ দেশগুলোর ওপর কোপেনহেগেন ফর্মুলা চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোপেনহেগেন ফর্মুলায় কতগুলো শর্ত দেয়া হয়েছিল, যা পূরণ করলেই ইইউর সদস্যপদ পাওয়া যাবে। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু, মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তন, মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।এসব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কয়েকটি পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ইইউতে যোগ দেয়। বসনিয়া হারজেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া এখনও ইইউতে যোগ দিতে পারেনি। এখন অর্থনৈতিক সংকট সব সংকটকে ছাপিয়ে গেছে। ঋণ সংকটে জর্জরিত ইউরোপে আবারও মন্দার আশংকা বাড়ছে। ২০১৩-১৪ সালে ইউরো ব্যবহারকারী ইউরো জোনের শূন্য প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ইইউর প্রবৃদ্ধিও ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই ইউরোপ নিয়ে শংকা থেকেই গেল। এখন ইইউর ঐক্য নিয়ে যে সন্দেহ, তা আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে দুই স্তরে বিভক্ত করার প্রস্তাব উঠেছে। জার্মানি ও ফ্রান্স একটি দুই স্তরবিশিষ্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাচ্ছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজি খোলামেলাভাবেই এ বিভক্তির কথা বলেছিলেন। জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলও চাচ্ছেন একটা পরিবর্তন। তিনি বলছেন এক নয়া ইউরোপ গড়ার কথা। যদিও এ বিভক্তির বিরোধিতা করেছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জোসে ম্যানুয়েল বারোসো। এখন সত্যি সত্যি ইউরোপ ভাগ হয়ে যাবে কি-না, কিংবা নতুন ইউরোপের স্বরূপ কী হবে, তা এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। তবে একটি পরিবর্তন যে আসন্ন, তা গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এটাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় ব্যর্থতা। তাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন যখন ইইউতে থাকা, না থাকা নিয়ে গণভোট করতে চান, তখন ইউরোপের ঐক্যে যে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে, তারই ইঙ্গিত মেলে। ক্যামেরন স্পষ্ট করেই বলেছেন, আমরা যদি এখনই এসব সমস্যা নিয়ে উদ্যোগ নিতে না পারি, তাহলে ইউরোপের পতন হবে এবং ব্রিটিশরাও পতনের দিকে যেতে থাকবে। অতীতে ইইউ সম্পর্কে এত ভয়ংকর কথা কেউ বলেননি। এখন ক্যামেরন সাহস করেই বললেন। সামনের দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন সময় ইইউর জন্য। অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংকট যদি ইইউ কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে এটা দিব্যি দিয়েই বলা যায়, আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা এক ভিন্ন ইউরোপের চেহারা দেখতে পাব।ব্রিটেনের মতো একটি বড় দেশ যদি ইইউ ত্যাগ করে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব আর থাকে না। অভিবাসী প্রশ্নে ক্যামেরনের সর্বশেষ বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে বেশ অসন্তুষ্ট। ব্রিটেনের পর এখন দৃষ্টি গ্রিসের দিকে।তবে সব ছাপিয়ে গেছে গ্রিসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গ্রিসের পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্য ৫ জুলাইয়ের গণভোটে না ভোটের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে, ঋণদাতা দেশগুলো যে সংস্কারের কথা বলেছিল, অর্থাৎ বাজেট কাটছাঁট করা, তাতে তারা সায় দেবে না। ধারণা করছি গণভোটে না ভোট জয়যুক্ত হবে। এর অর্থ হচ্ছে গ্রিস ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে যাবে। শেষ অব্দি গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি-না, সেটাও একটা প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে। কিংবা এমনও হতে পারে গ্রিস ব্রিটেন ও ডেনমার্কের মতো অবস্থান গ্রহণ করবে। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকেও নিজস্ব মুদ্রা তারা ব্যবহার করবে। যেমন ব্রিটেনে ইউরো চালু না হওয়ায় এখনও পাউন্ড সেখানে চালু রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, গ্রিস তার পুরনো মুদ্রা ড্রাকমা পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে আজকের গণভোটের ফলাফলের ওপর। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, গ্রিস যদি ইউরো জোন থেকে বেরিয়ে যায়, এর একটা মারাÍক প্রতিক্রিয়া সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে পড়বে। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি স্টক এক্সচেঞ্জ মার্কেটে দরপতন ঘটেছে। শুধু অস্ট্রেলিয়া স্টক একচেঞ্জ থেকেই ৩৫ বিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেছে। মুদ্রা হিসেবে ডলারের মানও কমে গেছে। বলা হচ্ছে, এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০১৬ সালে এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ০.৩ ভাগ কমে যাবে। তাই সারা বিশ্ব তাকিয়ে আছে আজ গ্রিসের গণভোটের দিকে।গ্রিসের এই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রও যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, এটা এই প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হল। ফলে ইউরোপের আরও অনেক দেশ নিয়ে এ প্রশ্ন থাকল। দ্বিতীয়ত, ঋণদাতা সংস্থা, বিশেষ করে আইএমএফের অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা যে কোনো দেশের স্বার্থরক্ষা করতে পারে না, এটা প্রমাণিত হল। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতি একটি স্বাধীন অর্থনীতির পরিপন্থী। গ্রিসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আইএমএফের প্রেসক্রিপশন ছিল পেনসনের পরিমাণ কমানো, ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়ানো ইত্যাদি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতি হচ্ছে ঋণগ্রহীতা দেশকে তার সুপারিশমালা অনুযায়ী চলতে বাধ্য করা।পাঠক, বাংলাদেশের কথা ভাবতে পারেন। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের জুলাই মাস থেকে সম্প্রসারিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির আওতায় কাজ করে যাচ্ছে। এক বছরে সরকারের ৯টি ক্ষেত্রে করণীয় কাজ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ৫৭টি দেশ নিয়ে চীনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবি। ব্রিটেন ও ডেনমার্ক (যারা ইউরো জোনে নেই) এর সদস্য। গ্রিস এ ব্যাংকে যোগ দিতে পারে।তবে আইএমএফ তার নিজের স্বার্থেই তাদের সুপারিশমালা কিছুটা নমনীয় করে গ্রিসকে তার অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেবে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফ নমনীয় হয়ে কিছু শর্ত প্রত্যাহার করে নিলে গ্রিস সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে, এমন কথাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস। আগামী ১০ জুলাই গ্রিসকে প্রাইভেট লগ্নিকারী সংস্থাগুলো থেকে নেয়া ২ বিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করতে হবে। ফলে সমস্যা একটা থাকলোই। এখন আবারও গ্রিসকে ঋণ দেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র সবুজ সংকেত পেলেই আজকের গণভোট বাতিল হতে পারে।গ্রিসের পরিস্থিতি আমাদের অনেকের জন্যই একটি শিক্ষা। আইএমএফের ফাঁদে পা দিলে একটি দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, গ্রিসের অবস্থা এর বড় প্রমাণ। Daily Jugantor 05.07.15

ভারত-চীন সম্পর্ক কোন পথে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঐতিহাসিক চীন সফরের পর এমন একটা ধারণা জন্ম হয়েছিল যে এশিয়ার এই দুটি দেশের মাঝে সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় উপনীত হবে। কিন্ত ২০১১ সালে মুম্বাই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী লাখভির ব্যাপারে অতিসম্প্রতি চীনের একটি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্পর্ক নিয়ে আবার নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লাখভিকে ইসলামাবাদের হাইকোর্ট মুক্তিদানের নির্দেশ দিলে ভারত এর প্রতিবাদে জাতিসংঘের দারস্থ হয়েছিল। ভারতের অভিযোগ ছিল লাখভির মুক্তিদানের নির্দেশ জাতিসংঘের ১২৬৭ নং প্রস্তাবের লঙ্ঘন। উক্ত প্রস্তাবে জঙ্গি ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। জাতিসংঘের যে নিষেধাজ্ঞা কমিটি রয়েছে, সেখানেই ভারত তার আপত্তি জমা দেয়।
গত ২৫ জুন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কমিটি প্রথমদিকে এজন্য পাকিস্তানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু চীনের আপত্তির কারণে ব্যাখ্যা চাওয়ার বিষয়টি আটকে গেল। চীনের যুক্তি ভারত যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। লাখভি জাতিসংঘ কর্তৃক চিহ্নিত সন্ত্রাসী। অভিযোগ আছে ২০১১ সালে মুম্বাই হামলায় ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন আর আহত হয়েছিলেন ১৬৫ জন। এর মূল পরিকল্পনা করেছিল লাখভি, যিনি পাকিস্তানের নাগরিক। এই ঘটনায় ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি দাগ লাগলো।
চীন ও ভারত সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করলেও, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উভয় শক্তিই এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।এ ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। প্রভাব বিস্তার করার এই যে প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতায় এ অঞ্চলের দেশগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে।
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আর ভারত ইতোমধ্যে অন্যতম একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ভারত তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। ফলে এ অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা আগামীতে চীন সম্পর্ককে আঘাত করবে। ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারকরা এখন একান্তেই বলছেন তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি মেনে চলতে পারবেন না। গুগলের আই ও আর সম্মেলনে (মার্চ ২০১৫) এই মেসেজটাই তারা দিয়েছেন্। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নয়া দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সাথে একাধিক পররাষ্ট্রচুক্তি এ দুটো দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় প্রভাব বাড়ানো এবং এবং ভবিষ্যতে ‘জাফনা কার্ড’ ব্যবহার করা প্রমাণ করে ভারত ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়।
ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, ভারত প্রাচীনকালে তার ‘কটন রুট’ ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতা বিকাশে ভারতীয় পন্ডিতরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। হাজার বছর আগে দক্ষিনের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোল এর আমলে নৌ বাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌ বাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট তাতে দেখা যায়- ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিসর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার আবার অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা হয়ে সুমাত্রা জাভা (মালাক্কা প্রণালী), হংকং, জাপান পর্যন্ত ভারতীয় বাণি্জ্য রুট সম্প্রসারিত ছিল।
মোদি সরকার এই ‘কটন রুট’কেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রাচীনকালে ভারতীয় তুলা এই সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। একদিকে চীনা নেতা শি জিনপিং তার ‘সিল্ক রুট’ এর ধারণা নিয়ে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। এর প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত তার পুরনো ‘কটন রুট’ এর ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরী হবে সেভাবেই। বাণিজ্যনির্ভর এই দ্বন্দ্ব শেষ অব্দি পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌ বহরে বিমানবাহী জাহাজ আরো বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌ বাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌ ঘাঁটি নির্মাণ করছে।
বলা হয়, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা রয়েছে বৈকি! জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপিইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সাথে যে বিবাদ (জাপান ও ফিলিপাইনের সাথে) তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটা পক্ষ নিয়েছে। অতিসম্প্রতি চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে ‘সিল্ক রুট’ এর কথা বলেছেন তা অন্য চোখে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের ধারণা এতে করে বিশাল এক এলাকা জুড়ে চীনা কর্তৃত্ব, প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশ এই সিল্ক রোডটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সিল্ক রোড এর মাধ্যমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সুদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল। চীনের নয়া প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন ‘নিউ সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একইসাথে একটি ‘মেরিটাইম সিল্করুট’ এর কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সাথে দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র পাঠিয়েছিল।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই মেরিটাইম সিল্করুটের ধারণাও কয়েক’শ বছরের। এই মেরিটাইম সিল্করুট ধরে চীনা এডমিরাল ঝেং হে (মা হে) ১৪০৫ সাল থেকে ১৪৩৩ সাল -এই ২৮ বছর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে চীনা পণ্য নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৪২১-১৪৩১ সালে তিনি দু’বার তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও এ এসেছিলেন। চীন এই নৌরুটটি নতুন করে আবার ব্যবহার করতে চায়। তবে কয়েক’শ বছরের ব্যবধানে এই অঞ্চল অনেক বদলে গেছে। চীন আর একক শক্তি নয়। ভারত তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। আর যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সাথে নিয়েই তার নিজের স্বার্থ আদায় করতে চা্য়। ফলে এটা স্পষ্ট নয় ভারত চীন সম্পর্ক আগামীতে কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে। কেননা ভারত মহাসাগরে চীন ও ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। মৎস্য সম্পদ থেকে শুরু করে জ্বালানী সম্পদ ও জ্বালানী সম্পদ সরবরাহের অন্যতম রুট হচ্ছে এই ভারত মহাসাগর। পরিবর্তিত এই রাজনীতির কারনে এই সামুদ্রিক রুটের গুরুত্ব বাড়ছে। এই সামুদ্রিক রুটের গুরুত্ব অনুধাবন করেই চীন এ অঞ্চলে তার নৌ বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এর ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হচ্ছে। ভারত তাই এ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোতে তার নৌ বাহিনীর উপস্থিতি ও কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে এক ধরনের ‘স্নায়বিক যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে এশিয়ার প্রভাবশালী এই দেশ দু’টোর মধ্যে।
গেল মে মাসে (২০১৫) নরেন্দ্র মোদি বেইজিং সফর করেন। ভারতীয় মহাসাগরভূক্ত অঞ্চলে ভারতীয় তৎপরতা দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় আদৌ স্থান না পেলেও, চীনা নেতারা বিষয়টি জানেন ও বোঝেনও। মোদি নিজে চীনের ব্যাপারে যতই আগ্রহী থাকুন না কেন, ভারতে একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র আছে। এবং ভারতের গোয়েন্দাসংস্থা পৃথিবীর শীর্ষ গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর একটি। এরা ভারতের স্বার্থকে সবসময় ‘বড়’ করে দেখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিন এশিয়ায় ইতোমধ্যে ভারতের এক ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের স্ট্রাটেজিস্টদের চোখ এখন ভারত মহাসাগরের দিকে। ভারত মহাসাগরে শুধু যে বিশাল সম্পদই রয়েছে তা নয়। বরং বিশ্বের ‘কার্গো শিপমেন্ট’ এর অর্ধেক পরিবাহিত হয় এই ভারত মহাসাগর দিয়ে। একইসাথে ৩ ভাগের ১ ভাগ কার্গো, ব্যবহৃত জ্বালানী তেলের ৩ ভাগের ২ ভাগ, এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রাফিক পৃথিবীর তাবৎ জায়গায় যেতে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ। পৃথিবীর আমদানীকৃত পণ্যের (তেলসহ) শতকরা ৯০ ভাগ পরিচালিত হয় এই সমুদ্র রুট ব্যবহার করে। সুতরাং এই সমদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি করে।
এই সমদ্রপথে কর্তৃত্ব বৃদ্ধির প্রশ্নেই চীন ও ভারতের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিবাদ অনিবার্য। এই দ্বন্দ্ব ও বিবাদ দু’দেশের মাঝে সম্পর্ক বৃদ্ধির যে সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল, তা ভেস্তে যেতে পারে। এই যখন পরিস্থিতি তখন আসলো লাখভি’র বিষয়টি। বলা ভালো লাখভির জামিন পাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সারা বিশ্ব যখন সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের নিন্দা জানিয়ে আসছে, তখন লাখভির বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরীফের উপস্থিতি পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি দিগন্তের সূচনা করলেও এখন এই ছোট ঘটনায় ভারত পাকিস্তানকে অবিশ্বাস করতে শুরু করবে এবং সম্পর্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা একটি অনিশ্চয়তার মাঝে আটকে থাকবে। একইসাথে চীন ও ভারতের মধ্যে সৃষ্টি হবে আস্থাহীনতা, যে আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। এখন লাখভির জামিনপ্রাপ্তি সবকিছু ওলট-পালট করে দিল। Prio.com 02.07.15

রাজ্জাকের ফিরে আসাটা মূল সমস্যার কোনো সমাধান নয়

মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) কর্তৃক অপহৃত বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাক ফিরে এসেছেন। অপহরণের আট দিন পর মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে ছেড়ে দেয়। এর আগে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাজ্জাকের এই ফিরে আসা মূল সমস্যা সমাধানের কোনো কথা বলে না। মূল সমস্যাটি হচ্ছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে, যারা ধর্মীয়ভাবে মুসলমান। বস্তুত গত মে মাস থেকেই রোহিঙ্গা সমস্যাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে আন্দামান সাগরে শত শত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি, তাদের মালয়েশিয়ায় পাচারের অপচেষ্টা, সাগরে মাসের পর মাস ভেসে থাকার পর বিশ্বব্যাপী যে বিতর্কের ঢেউ ওঠে, তাতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি সামনে চলে আসে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জোর করে এবং মানবপাচারকারীদের সহযোগিতায় মালয়েশিয়া পাচার করার সর্বশেষ উদ্যোগটি ছিল মূলত সেখানে যে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান চলছে, তারই ফল। নায়েক আবদুর রাজ্জাকের অপহরণের ঘটনাটি একই সূত্রে গাঁথা।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে ইউরোপের বসনিয়া-হারজেগোভিনার জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের তুলনা চলে। বসনিয়া একসময় ছিল যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ ছিল মুসলমান। সার্বরা ছিল সংখ্যালঘু, ৩১ শতাংশ। অথচ এই সার্বরাই ১৯৯১ সালের পর থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। ১৯৯২ সালের মার্চে সেখানে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ওই গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিলে সেখানে সার্বরা (যারা ধর্মীয়ভাবে অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান) ব্যাপকহারে মুসলমানদের গণহত্যা, ধর্ষণ আর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে, যা আন্তর্জাতিক আসরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। এই গণহত্যা ও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকলে ১৯৯৫ সালের মে মাসে সার্বীয় হেডকোয়ার্টারে ন্যাটো বিমান হামলা পর্যন্ত চালিয়েছিল। সেই গণহত্যায় যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের অনেকের বিচার হয়েছে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে। আজকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে নব্বইয়ের দশকের বসনিয়ার মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযানের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বসনিয়ায় সার্বরা যেমনটি চেয়েছিল বসনিয়াকে একটি সার্বীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা ও সার্বিয়ার সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি গ্রেটার সার্বীয় রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, আজকে মিয়ানমারের বৌদ্ধ নেতৃত্বও ঠিক তেমনটি চাচ্ছেন। তাঁরা চাচ্ছেন মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র হওয়ায় এবং বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ ধর্মীয়ভাবে মুসলমান হওয়ায় বাংলাদেশকে এই রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রোহিঙ্গারা ধর্মীয়ভাবে মুসলমান এবং শত বছর ধরে তারা আরাকান রাজ্যে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তারা এখন উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উচ্ছেদ অভিযানের শিকার। মিয়ানমারে সাম্প্রতিককালে বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছে। এই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রমোট করছে। এরা মূলত মিয়ানমারকে একটি পূর্ণ বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। আর এ লক্ষ্যেই তারা আরাকান প্রদেশে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের নিজস্ব ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করছে। তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটির ওপর যতটুকু না আক্রমণ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আক্রমণ হচ্ছে মুসলমানদের ওপর। পাঠকদের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের (১ জুলাই ২০১৩, When Buddhists Go Bad) কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বৌদ্ধ উগ্রবাদ কিভাবে মিয়ানমারে বিস্তার লাভ করছে, কিভাবে রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে ওই প্রতিবেদনে। আছে উগ্রবাদী বৌদ্ধ নেতা ভিরাথুর বক্তব্য, যাকে কিনা বলা হয় 'বার্মিজ বিন লাদেন'। ভিরাথু তাঁর উগ্রবাদী মতবাদের জন্য ২০০৩ সাল থেকে সাত বছর জেলে কাটিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাঁকেই এখন মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহার করছে। ভিরাথু মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যা, তার পেছনে কাজ করছে ওই উগ্র বৌদ্ধ মানসিকতা।

এই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ এখন মিয়ানমারের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এমনকি বিরোধী নেত্রী অং সান সু চিও এই উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতার বাইরে যেতে পারেননি। তিনি এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে সরাসরি সমর্থন না করলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নে এবং তাদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তার প্রতিবাদ করেননি। তাই রাজ্জাককে ধরে নিয়ে গিয়ে মিয়ানমারের ৫৪৪ জন নাগরিককে (যারা রোহিঙ্গা) যখন ফেরত নেওয়ার কথা বলল, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে রোহিঙ্গা সমস্যাটিই এর পেছনে কাজ করছে। অথচ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারের বিজিপি এই কাজটি করতে পারে না। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী (আর্টিকেল ৩) নায়েক আবদুর রাজ্জাকের অধিকার ছিল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত। তাঁর সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু লুঙ্গি পরিয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর ছবি আপলোড করে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে। আমাদের উচিত হবে বিষয়টি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখাকে অবহিত করা। কেননা, জাতিসংঘ চার্টারের ২৫ নম্বর ধারায় জাতিসংঘের ভূমিকা এ ব্যাপারে স্পষ্ট। একই সঙ্গে আমাদের উচিত হবে রোহিঙ্গা সমস্যায় বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর (যাদের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ভালো) সাহায্য ও সহযোগিতা নেওয়া। আমরা বিরোধী নেত্রী অং সান সু চির সহযোগিতাও চাইতে পারি। তবে তাঁর ক্ষমতা সীমিত। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডারের ভূমিকাই মুখ্য।
'রাজ্জাকের' অধ্যায়টি শেষ হলো বটে, কিন্তু এ ঘটনাই 'শেষ ঘটনা' হয়ে থাকবে না। মিয়ানমারের ব্যাপারে আমরা যদি শক্ত অবস্থানে যেতে না পারি, আমার ধারণা ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে। দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। এক. রোহিঙ্গা সমস্যাকে আন্তর্জাতিককরণ করা। দুই. অবৈধ ইয়াবা পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অতীতেও আক্রান্ত হয়েছিল। সীমান্ত বরাবর বিশাল অঞ্চলজুড়ে মিয়ানমার কর্তৃক পুঁতে রাখা ভূমি মাইন বিস্ফোরণে অতীতে (১৯৯৩ সালে) বাংলাদেশের ৫৩ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন ও ১২৮ জন চিরস্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ২০ হাজার নিয়মিত সৈন্য মোতায়েন করলে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক সীমান্ত নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে মিয়ানমার উভয় দেশকে পৃথককারী নাফ নদে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। এই বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে পরে ২০০০ সালের ডিসেম্বরে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছিল। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০১ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ৩৫ হাজার ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০ হাজার সৈন্য নিজ নিজ সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছিল। যদিও এটা সত্য, এরপর দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল এবং মিয়ানমার বাঁধ নির্মাণ কর্মসূচি স্থগিত রেখেছিল। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৬-২০০৮) বাংলাদেশ কর্তৃক গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান করায় (একটি কোরীয় কম্পানি কর্তৃক) মিয়ানমার সেখানে যুদ্ধজাহাজ পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ নেভিও সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারকে আস্থায় নিয়েছে, কিন্তু মিয়ানমার সেই আস্থার কোনো মর্যাদা দেয়নি।
রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যা, তার শুরু মূলত ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে। ওই সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত 'Operation Dragon'-এর শিকার হয়ে আরাকানের মুসলমানরা (রোহিঙ্গা) দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ছিল আকিয়াব (সিটওয়ে), পালেটবা, মিনশিয়া, মায়োহং, মাইবন, মংডু এবং রাথেডং অঞ্চলের অধিবাসী। ওই সময় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমার তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সব রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ১৯৭৮ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে আগত এক লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়। এদের সবার কাছেই মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত National Registration Card (NRC) ছিল। এরপর ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আবারও আরাকানে 'অপারেশন পিয়েথায়া' নামে আরেকটি অভিযান পরিচালনা করলে আবারও হাজার হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকায় আবৈধভাবে প্রবেশ করে এবং আশ্রয় নেয়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যত তা খুব একটা ফল দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমান বৃহত্তর কক্সবাজার এলাকায় অবৈধভাবে বসবাস করছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজার ৪৫ জন। এরা টেকনাফের কুতুপালং ও নোয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। কিন্তু অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ সরকার অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত 'মিয়ানমারের নাগরিক শুমারি ২০১৫' শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২২ কোটি টাকা। এই উদ্যোগটি ভালো। রোহিঙ্গাদের ওই দুটি ক্যাম্প থেকে নিঝুম দ্বীপে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাও করছে সরকার। এই উদ্যোগটিও ভালো। বাংলাদেশ সরকারকে এখন রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক 'ইয়াবা' আসছে। বাংলাদেশ ইয়াবার চালানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় রাজ্জাকের অপহরণের ঘটনাটি ঘটেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে 'ইয়াবার' প্রশ্নটিও তাঁর অপারেশনের সঙ্গে জড়িত। গত সাত বছরে ইয়াবার চোরাচালান বেড়েছে ১৭৭ গুণ। এই হিসাব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। ঢাকায় ইয়াবা বিক্রির রয়েছে পাঁচ শতাধিক স্পট (আমাদের সময়, ২৪ জুন)। আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩৯টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে, যেখান থেকে চোরাইপথে প্রতি মাসে সীমান্ত দিয়ে শত কোটি টাকার ইয়াবা চালান ঢুকছে বাংলাদেশে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার মাদকের বাজার রয়েছে। এর অর্ধেক দখল করে রেখেছে ইয়াবা (সকালের খবর, ২৪ জুন)। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, ইয়াবা পাচারের সঙ্গে মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা জড়িত। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এ কাজে জড়িয়ে গেছেন।
সুতরাং রাজ্জাককে ফিরিয়ে নিয়ে এসে আমরা যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি, তাহলে আমরা ভুল করব। কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে এবং আমাদের সীমান্তরক্ষীদের আরো সতর্ক রাখতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান এবং ইয়াবা চালান বন্ধ হলেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাস পাবে।
Dainil Kalerkontho
28.06.15

মিয়ানমারকে কতটুকু আস্থায় নেওয়া যায়

বিজেবির একজন সদস্য নায়েক আবদুর রাজ্জাককে অপহরণ এবং তাকে ফেরত দেওয়ার পর একটি প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, মিয়ানমারকে কতটুকু আস্থায় নেওয়া যায়? আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মিয়ানমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিয়ানমারের আচরণ দুই দেশের সম্পর্ককে এখন একটা বড় প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিয়েছে। মূলত রোহিঙ্গা-ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবনতি ঘটিয়েছে। অতীতে মিয়ানমার তার কথা রাখেনি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তারা ফিরিয়ে নেয়নি। যদিও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তারা কথা দিয়েছিল। সে কথা রাখেনি তারা। উপরন্তু সাম্প্রতিককালে শত শত রোহিঙ্গাকে বাধ্য করেছে অথবা প্রলোভন দেখিয়ে সাগরে ভাসতে বাধ্য করেছিল। সাগর-ভাসা শত শত রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্যোগ সফল না হলেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল। এ ঘটনার রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আবার ঘটেছিল রাজ্জাকের অপহরণের ঘটনা। স্পষ্টতই মিয়ানমারের এই ভূমিকা তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত নায়েক রাজ্জাকের অপহরণের এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে নানা প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত হবে না মিয়ানমারের ফাঁদে পা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যান্সি’ (ঝসধৎঃ উরঢ়ষড়সধপু) প্রদর্শন করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করে যেতে হবে। কেননা বাংলাদেশের কাছে মিয়ানমার নানাবিধ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই আসে এর ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের কথা। প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখ- নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে মিয়ানমার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। মিয়ানমারের পশ্চিমে বাংলাদেশ, পশ্চিম ও উত্তরে ভারত, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে চিন, পূর্বে থাইল্যান্ড ও লাওস। মিয়ানমারের এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিতে পারে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের সঙ্গে যে সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাতে করে বাংলাদেশ তার পণ্য নিয়ে সড়কপথে কেবল মিয়ানমারের বাজারেই নয়, বরং মিয়ানমার সরকারের সহযোগিতা নিয়ে পূর্বের অন্যান্য দেশের বাজারেও প্রবেশ করতে পারে (বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাজারে)। ঘুমধুম-মুসে হাইওয়ে চালু হলে সড়কপথেই চিনে যাওয়া সম্ভব। ঘুমধুম বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশি এলাকা। আর মুসে হচ্ছে চিনের সীমান্ত শহর।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উভয় দেশই বিমসটেক (ইওগঝঞঊঈ পরিবর্তিত নাম ইইওগঝঞঊঈ) এবং ইঈওগ জোটের সদস্য। যদিও প্রস্তাবিত ইঈওগ জোটটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভুটান ও নেপাল বিমসটেক জোটে যোগ দেওয়ায় এ জোটটি শক্তিশালী হয়েছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ডে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামে মিয়ানমারের কাঁচামালভিত্তিক ব্যাপক শিল্প-কারখানা স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক মিয়ানমারে বাংলাদেশি সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন চট্টগ্রাম এলাকায় বেশ কিছু সার কারখানা স্থাপন করে বাংলাদেশ মিয়ানমারে সার রপ্তানি করতে পারে। মিয়ানমারের আকিয়াব ও মংডুর আশপাশের অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর পাওয়া যায়। এসব কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিমেন্ট ও কাগজশিল্প বিকশিত হতে পারে। মিয়ানমারে প্রচুর জমি অনাবাদি রয়েছে। এ অবস্থায় মিয়ানমারের ভূমি লিজ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মান্দালয়-ম্যাগওয়ের তুলা আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধিষ্ণু গার্মেন্ট সেক্টরের কাঁচামাল হিসেবে তুলা মিয়ানমারের এই অঞ্চল থেকে আমদানি করতে পারে। গবাদি পশু আমদানি করার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশিরা মিয়ানমারে গবাদিপশুর খামারও গড়ে তুলতে পারে। মিয়ানমারের সেগুন কাঠ পৃথিবী-বিখ্যাত। আমাদের ফানির্চার শিল্পের চাহিদা মেটাতে পারে এই সেগুন কাঠ, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপে আমাদের ফার্নিচার শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারি। মিয়ানমারে মূল্যবান পাথর, যেমন রুবি, জেড, মোম আর মার্বেলসমৃদ্ধ। এসব মূল্যবান পাথর আমাদের জুয়েলারি শিল্পকে সমৃদ্ধ করে ভ্যালু-এডিশনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। ভারত-মিয়ানমার প্রস্তাবিত গ্যাস পাইপলাইন থেকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশও উপকৃত হতে পারে। ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে। এই গ্যাস তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতে নিয়ে যেতে চায়। অতীতে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের আপত্তি ছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ মিয়ানমারের গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে বিদ্যুৎ তথা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা পরে বাংলাদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের যে পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি, সেখানে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এ কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা-ইস্যু এবং সর্বশেষ নায়েক রাজ্জাকের অপহরণের ঘটনায় এই সম্পর্কে কিছুটা অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই অবিশ্বাসকে নিয়ে বেশিদূর যাওয়া ঠিক হবে না। একমাত্র ঝসধৎঃ উরঢ়ষড়সধপু-র মাধ্যমেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ককে আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। একদিকে মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে, আর অন্যদিকে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রোহিঙ্গা বিষয়টির সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই মিয়ানমারের চাপের কাছে আমাদের আত্মসমর্পণ করা যাবে না। রাজ্জাকের অপহরণের বিষয়টির সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রশ্নটিকে এক করে দেখাও যাবে না। যে ৫৪৪ জন মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত নেওয়ার শর্ত তারা জুড়ে দিয়েছিল, তাও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এসব আরাকানবাসী মিয়ানমারের নাগরিক। এদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার মাধ্যমে এসব মিয়ানমারের নাগরিকের নাগরিকত্ব যাচাই করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের শুরুতে যে গণশুমারি শুরু করেছে, তাতে আরাকানবাসী রোহিঙ্গাদের তারা ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড’ (এনআরসি) দিতে অস্বীকার করে আসছে। এই এনআরসি হচ্ছে মিয়ানমারের আইনগত বৈধ অধিবাসী হওয়ার অন্যতম শর্ত। কারও কাছে এনআরসি না থাকলে তিনি মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হন না। আরাকানে বংশপরম্পরায় বাস করা হাজার হাজার মুসলমান রোহিঙ্গাকে ইচ্ছাকৃতভাবেই এনআরসি দেওয়া হচ্ছে না। এদের চিহ্নিত করা হচ্ছে বাঙালি হিসেবে। এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মাঝে আলোচনায় স্থান পেলেও এর কোনো সমাধান হয়নি। সমস্যা হচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোনো আন্তর্জাতিক আইনকানুন, বিধি ইত্যাদি কিছুই মানে না। সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি না থাকায় কোনো দায়বদ্ধতাও সৃষ্টি হয়নি। সেখানে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সেনাবাহিনী যা চায়, সেটাই আইন। একটি সংসদ আছে বৈকি, কিন্তু তা সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এমনকি বিরোধী দল নেত্রী অং সান সু চিও ওদের স্বার্থেই কাজ করছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনো জোরালো দাবি কখনো উত্থাপন করেননি। এখনো করছেন না। তিনি সেনাবাহিনীর স্বার্থের বাইরে যেতে পারছেন না। একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়Ñ তা হচ্ছে সেখানে একটি উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের জন্ম। এই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘প্রমোট’ করছে। এরা মূলত মিয়ানমারকে একটি পূর্ণ বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। আর এ লক্ষ্যেই তারা আরাকান প্রদেশে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের নিজস্ব ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করছে। তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটির ওপর যতটুকু না আক্রমণ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আক্রমণ হচ্ছে মুসলমানদের ওপর। পাঠকদের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের (১ জুলাই, ২০১৩, ডযবহ ইঁফফযরংঃং এড় ইধফ) কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বৌদ্ধ উগ্রবাদ কীভাবে মিয়ানমারে বিস্তার লাভ করছে, কীভাবে রোহিঙ্গারা বৗদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে ওই প্রতিবেদনে। আছে উগ্রবাদী বৌদ্ধ নেতা ভিরাথুর বক্তব্য, যাকে কি না বলা হয় ‘বার্মিজ বিন লাদেন’। ভিরাথু তার উগ্রবাদী মতবাদের জন্য ২০০৩ সালে সাত বছর জেলে কাটিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাকেই এখন মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহার করছে। ভিরাথু মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যা, তার পেছনে কাজ করছে এই উগ্র বৌদ্ধ মানসিকতা।
আজ যে ৫৪৪ জন মিয়ানমারের নাগরিককে নিয়ে মিয়ানমার প্রশ্ন তুলেছে এবং যাদের তারা বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়, তার সঙ্গে নায়েক রাজ্জাকের অপহরণের কোনো মিল ছিল না। দুটি ভিন্ন বিষয়।
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন যে নায়েক রাজ্জাকের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছিল তা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী (আর্টিকেল-৩) নায়েক আবদুর রাজ্জাকের অধিকার ছিল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত। তার সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু লুঙ্গি পরিয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় তার ছবি আপলোড করে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছে। আমাদের উচিত হবে বিষয়টি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখাকে অবহিত করা। কেননা জাতিসংঘে চার্টারের ২৫ নম্বর ধারায় জাতিসংঘের ভূমিকা এ ব্যাপারে স্পষ্ট। একই সঙ্গে আমাদের উচিত হবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর (যাদের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ভালো) ‘সাহায্য ও সহযোগিতা’ নেওয়া। আমরা বিরোধী নেত্রী অং সান সু চির সহযোগিতাও চাইতে পারি। তবে তার ক্ষমতা সীমিত। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডারের ভূমিকাই মুখ্য।
মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়ে স্থানীয় সেনা কমান্ডারের ভূমিকা অনেক বেশি। ২০১১ সালের পর থেকে মিয়ানমারে কিছুটা সংস্কার আনলেও রাজনীতি এখনো ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে সেনাবাহিনী।
আমাদের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থে মিয়ানমারকে আমাদের প্রয়োজন রয়েছে, এটা স্বীকার করে নিয়ে একটা আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন জাতি হিসেবেই মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যেতে হবে। আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের নমনীয় হলে চলবে না আবার হটকারী কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া যাবে না। আর এ জন্যই দরকার ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’।
Daily Amader Somoy
28.06.15

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়নে নজর দিন

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন মেয়েদের রূপচর্চার জন্য বিউটি পারলার তৈরি করা হবে- এমনটাই জানিয়েছেন একজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা। সম্প্রতি স্কুল শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি উপস্থিত শিক্ষকদের এ কথাও জানাতে ভোলেননি যে, এ ব্যাপারে তার নাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথাও হয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যখন নানা বিভ্রান্তি দেশে ও বিদেশে, মেধার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমরা যখন খোদ নিজেদের বিতর্কিত করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কিনা বললেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য তৈরি হবে বিউটি পারলার! তিনি এ সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন এবং আমাদের আমলানির্ভর শিক্ষামন্ত্রী এতে সায় দেবেন, এটাও আমার মনে হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এতে সায় দেবেন কি-না, তাতে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। দেশের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট সচেতন। তিনি জানেন সব। কী করতে হবে, কোন সিদ্ধান্তটি নিতে হবে- এটা তিনি ভালোই বোঝেন। কিন্তু একজন আমলা কী করে এ ধরনের উদ্ভট কথা বলতে পারেন, তা আমার মাথায় আসে না। তিনি এ সংক্রান্ত সংবাদের কোনো প্রতিবাদও করেননি। তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি কথাটা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য একটি করে বিউটি পারলার তৈরি করা হবে।ওই আমলার এ উদ্ভট বক্তব্যে আমি বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত। যেখানে আমরা আমাদের মেয়েদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে চাই, সেখানে কিনা তাদের সৌন্দর্যচর্চার জন্য বিউটি পারলার! এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক সচেতন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ারের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েই ওরা চিন্তা করে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে। সৌন্দর্যচর্চা ওদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে বলে আমার কাছে কখনও মনে হয়নি। সুতরাং ওই সরকারি কর্মকর্তার উচিত ছিল ওদের এ চিন্তাভাবনাটা মাথায় রেখে পরিকল্পনার কথা বলা। স্কুলের পাঠ্য কার্যক্রমের বাইরেও ওদের আইটিসহ অন্যান্য শাখায় জ্ঞান দেয়া যায়। মেয়েরা যেসব হোস্টেলে থাকে, সেখানে বৈকালিক আইটি কোর্স করানো যায়। আইটি সেক্টরে রয়েছে বিশাল এক সম্ভাবনা। শিক্ষার্থীদের যদি ছোটকাল থেকেই আইটির বিভিন্ন শাখায় দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে ওরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আরও উন্নতি করতে পারবে। ওদের এ সেক্টরে দক্ষ করে গড়ে না তুলে ওই সরকারি কর্মকর্তা চাচ্ছেন তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিউটি পারলার করতে!এই যদি হয় আমাদের আমলাদের সচেতনতা, তাহলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে কীভাবে পরিণত হব, আমি বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমাদের শিক্ষা সেক্টরে রয়েছে নানা সমস্যা। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আজ রীতিমতো প্রশ্নের মুখে। জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আদৌ কোনো উন্নতির কথা বলে না। লন্ডনের টাইমের হায়ার এডুকেশন শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে ২০১৫ সালে শিক্ষার মানদণ্ডে এশিয়ার শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই। অথচ এক্ষেত্রে ওই সরকারি কর্মকর্তার কোনো উৎকণ্ঠা নেই। কোনো ভাবনা নেই। আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ২০২১ সালে কোন পর্যায়ে দেখতে চাই, সে ব্যাপারে তার কোনো ভাবনা নেই। লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএর একখানা সার্টিফিকেট নিয়ে জব মার্কেটে ঢোকার চেষ্টা করছে। কেউবা আবার ভদ্র কেরানি হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও আমাদের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। সেটিও আমরা করছি না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তৈরি করে আর যাই হোক আমরা শিক্ষার মান বাড়াতে পারিনি। কোটা ব্যবস্থা নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে। যেখানে জিপিএ-৫ নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে না, সেখানে কোটার কারণে ভর্তি হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থী। অযোগ্য এসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে জাতীয় জীবনে কোনো অবদান রাখতে পারছে না। বরং এরা জাতির জন্য বোঝাস্বরূপ। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আবার পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এদিকেও দৃষ্টি দেয়া দরকার। সরকারি কর্মকর্তার সময় কই এসব দেখার!জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের মাঝে শতকরা ৮০ জন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয়, তখন সত্যিকার অর্থে বিষয়টা আমাদের ভাবায়। পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর মাঝে কোনো কৃতিত্ব নেই। উত্তরপত্রগুলো সাধারণভাবে মূল্যায়ন করা ও নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এখন অভিভাবকরা বুঝতে পারবেন, জিপিএ-৫ পাওয়া সন্তানটি তাদের জন্য বোঝা হয়ে গেল। এক ধরনের হতাশা ওই সব শিক্ষার্থীর মাঝে এসে যাবে, যখন জিপিএ-৫ নিয়েও তারা কোথাও ভর্তি হতে পারবে না। এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের চিন্তাভাবনা করা উচিত। আমার ধারণা শিক্ষামন্ত্রীকে যারা পরামর্শ দেন, তারা সঠিক পরামর্শটি দেন না। সীমিত লাভ বা সুবিধা নিয়ে আর যাই হোক, সমাজে বড় পরিবর্তন আনা যায় না। মন্ত্রী নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি করবেন।মন্ত্রীকে উপদেশ দেয়ার ক্ষমতা আমি রাখি না। সব ব্যাপারেই যদি তিনি রাজনীতি খোঁজেন, তাহলে তা হবে বড় ভুল। শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। তাকে এখন ভাবতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। আমলারা আপনাকে সঠিক উপদেশটি দেন বলে আমার মনে হয় না। সুবিধাভোগী আমলারা আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই মূল বিষয় থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখছে। আপনি অতীতের দৃষ্টান্ত তুলে যুক্তি খাড়া করতে পারেন। কিন্তু তাও সমর্থনযোগ্য নয়। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাবে এটাই স্বাভাবিক। আমি ছোট ছোট বাচ্চাদের মেধাকে খাটো করে দেখতে চাই না। কিন্তু জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়িয়ে আমরা কি ওদের প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিলাম না? একটা শিশু কষ্ট করে শিখবে, জানবে, বুঝবে। বিষয়কে আয়ত্ত করবে। একটা প্রতিযোগিতা থাকবে ওদের ভেতরে। আর ভালো করার একটা জিদ তৈরি হবে ছোটবেলা থেকেই। এর বদলে তার জিপিএ-৫ প্রাপ্তি তাকে ভালো করে পড়াশোনা করার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করবে। ভবিষ্যতে সে যখন এই জিপিএ-৫ নিয়ে কোনো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না, তখন সে হতাশায় পড়ে যাবে। একসময় অসৎ পথে পা বাড়াবে।আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অনেক মেধাবী। তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ওদের নিজেদের মতো বড় হতে দেয়াই উচিত। তথাকথিত জিপিএ-৫ ওদের বড় করবে না। ওদের জীবনটা ওদেরই গড়তে দেয়া উচিত। ওরা শুধু সীমিত প্রশ্ন পড়ে, মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ নিয়ে জীবনকে বড় করে গড়ে তুলতে পারবে না। ওদের অনেক কিছু পড়াশোনা করা উচিত। বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিক্ষা- সবকিছু। জ্ঞানের রয়েছে এক বিশাল ভাণ্ডার। এর মাঝেই ওরা খুঁজে পাবে ওদের পৃথিবীকে। আমি জানি এই বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক মেধাবী হয়। অনেক কিছু জানতে চায়, শিখতে চায়। কিন্তু তাদের শেখাটাকে আমরা সীমিত করে দিচ্ছি। অযাচিতভাবে জিপিএ-৫ দিয়ে ওদের প্রত্যাশা আমরা বাড়িয়ে দিয়েছি। এটা ভালো নয়। এটা করে আমাদের নীতিনির্ধারকরা অভিভাবকদের কাছে বাহবা নিতে চেয়েছেন। হয়তো কোনো কোনো অভিভাবক এতে খুশি হবেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদুল হকের মতো এমন অনেক অভিভাবক আছেন, যারা খুশি হবেন না। একজন শিক্ষক যে কাজটি করেন, ফাহমিদুল হক সে কাজটিই করেছিলেন। নিজের মেয়ের জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। এটা সঠিক কী বেঠিক এ বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু যেটা বাস্তব তা হচ্ছে এ ঢালাওভাবে দেয়া জিপিএ-৫ তিনি সমর্থন করেননি। এটাই আমরা বলতে চাই। বেশি বেশি জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না। ওই সরকারি কর্মকর্তা যদি ওদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার কোনো অনুপ্রেরণা দিতেন, কোনো পরিকল্পনার কথা জানাতেন, আমি খুশি হতাম।উচ্চশিক্ষা নিয়েও আমার মাঝে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। আমি যা চেয়েছিলাম, তা পাইনি। আমার ছাত্ররা যারা শিক্ষক হয়েছে, ওদের কাছে আমার যা প্রত্যাশা, তা আমি পাইনি। শিক্ষকতা, গবেষণার চেয়ে তাদের কাছে রাজনীতি, আর্থিক আনুকূল্য এসব বিষয়ই বড়। অনেক শিক্ষককে দেখেছি দু-দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। অনেকটা প্রকাশ্যেই করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে জানে না, তা নয়। জানে। হয়তো তাদের প্রাথমিক অনুমতিও আছে। এটা কী করে সম্ভব আমি জানি না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্টটাইমের কথা বলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র বা অনুমতি নেন বটে (অনেকে তাও নেন না), কিন্তু কাজ করেন ফুল টাইম। দেখবে কে? মঞ্জুরি কমিশনের এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। তবে আমি একাধিকবার বর্তমান মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তখন অবশ্য তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন না। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। তিনি এ বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞাত। আমি খুশি হব যদি তিনি এ ব্যাপারে একটি নির্দেশনা দেন। কারণ উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে একটা হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ওই সরকারি কর্মকর্তাকেও বিষয়টি ভেবে দেখার আহ্বান জানাই।তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিউটি পারলার স্থাপন না করে শিক্ষা-সংক্রান্ত অন্য বিষয়গুলোর দিকে নজর দিলে ভালো করবেন। শক্ত হাতে শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখা দরকার। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি সেক্টরে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। স্কুলে শিক্ষকরা কতটুকু আন্তরিক, কিংবা প্রাইভেট টিউশনি কতটুকু বন্ধ হয়েছে, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে স্কুল শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়ে প্রাইভেট টিউশনি নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা উচিত। আমার মনে আছে, একজন অভিভাবক ভিকারুননিসা স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল পত্রিকায় প্রকাশের পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, তার মেয়ে যে জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাতে স্কুলের কোনো কৃতিত্ব নেই। তিনি একাধিক গৃহশিক্ষকের কাছে তার মেয়েকে পড়িয়েছেন। কৃতিত্ব তাদের। এ থেকেই বোঝা যায় ক্লাসে শিক্ষকদের আগ্রহ কম, আগ্রহ বেশি প্রাইভেট টিউশনিতে। তাতে পয়সা বেশি। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। না হলে আগামীতে স্কুল শিক্ষা শুধু গৃহ শিক্ষকতার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।কলেজ শিক্ষকতার হাল আরও খারাপ। মফস্বলে, এমনকি ঢাকার বাইরের কলেজগুলোতে ক্লাস হয় না। বাংলা ও ইংরেজি অনার্সের মতো বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের কলেজ শিক্ষকদের কাছে ব্যাচ করে প্রাইভেট পড়তে হয়। আমি অবাক হয়ে যাই যখন শুনি একজন কলেজ শিক্ষার্থীকেও প্রাইভেট পড়তে হয়! খোঁজ নিয়ে জেনেছি শিক্ষকরা আদৌ ক্লাসে যান না। তারা বাধ্য করেন ছাত্রদের প্রাইভেট পড়তে। এই হচ্ছে আমাদের কলেজ শিক্ষাব্যবস্থা। সরকার এদিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবে।আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। কলেজ শিক্ষকদের (সরকারি) নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ কলেজ শিক্ষকরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় কাজ করেন। এক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন দরকার। কলেজ শিক্ষকদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ন্যস্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে ৬টি বিভাগে ৬টি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে এবং প্রতিটি বিভাগে অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলোকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আনতে হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তথাকথিত স্বায়ত্তশাসনের নামে এক ধরনের নিজস্ব প্রশাসন চালু করেছে। শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা খুবই কম। উপাচার্য খেদাও অভিযান যেন একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষক রাজনীতি প্রায় ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং যা ভয়াবহ তা হচ্ছে, কোনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি আইন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিউটি পারলার স্থাপন না করে এসব দিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। বিশ্বে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর র‌্যাংকিং কত, তা নিশ্চয়ই ওই সরকারি কর্মকর্তা জানেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নিশ্চয়ই তিনি তা জেনেছেন। একুশ শতকের উপযোগী একটি শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি সরকারকে সহযোগিতা করবেন- এ প্রত্যাশা রইল। Daily Jugantor 26.06.15

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে চাই স্মার্ট ডিপ্লোমেসি

বিজেবির সদস্য নায়েক আবদুর রাজ্জাকের মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ কর্তৃক অপহরণ, আটদিন আটক রাখার পর তাঁকে ফেরত দেওয়া এবং সেই সঙ্গে তাঁকে জঙ্গি পরিচয়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মাঝে সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। এই ঘটনা ঘটল এমন একসময়, যখন আন্দামান সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে সারা বিশ্বব্যাপী মিয়ানমারের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে এই ঘটনায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিজেবির পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ ও একটি ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করলেও বিষয়টি সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে আকার-ইঙ্গিতে যে কথা বলা হচ্ছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়, নায়েক আবদুর রাজ্জাক অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তাঁর বিচার হবে। অথচ এই অভিযোগের পেছনে কোনো সত্যতা নেই। কেননা নায়েক রাজ্জাক ও তাঁর সঙ্গীরা বাংলাদেশের জলসীমানাতেই তাঁদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। মিয়ানমারের বিজিপি তাদের ওপর কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই গুলি করে এবং একজন বিজিবি সদস্যকে হত্যাও করে। আর রাজ্জাক যে অবৈধভাবে প্রবেশ করেননি, তার প্রমাণ মিলল বৃহস্পতিবার, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিজিপি এই কাজটি কেন করল? প্রকৃত পক্ষে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত কৌশলে এই কাজটি করেছে। সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সরকার মুসলমান ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে অমানবিক আচরণ করছে এবং তাদেরকে বাধ্য করছে দেশ ত্যাগ করতে, তা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। রোহিঙ্গা অভিবাসন সমস্যাটি এখন একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ফলে মিয়ানমার সরকারের ওপর একটা চাপ আছে। তাই পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে, যাতে সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে বেশি সময় ব্যায় করে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, এতে করে রোহিঙ্গা সমস্যাটি চাপা পড়ে যাবে। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় এই অপহরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এটা এমন এক স্পট, যেখান দিয়ে বাংলাদেশে চোরাপথে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা চালান হয়, এমনকি মানবপাচারও হয়।

পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনে অভিযোগ শোনা যায়, এসব চালান ও পাচারের সঙ্গে নাকি অনেক রাঘব-বোয়ালই জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশ এখন মানবপাচার ও ইয়াবা চোরাচালান রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এসব রাঘব-বোয়ালরা। ফলে বিজিবির ওপর একধরনের আক্রোশ তাদের ছিল। তারই প্রতিফলন ঘটেছে নায়েক রাজ্জাকের অপহরণ ঘটনার মধ্য দিয়ে। তৃতীয় আরেকটি সম্ভাবনার কথাও বলছে মিয়ানমারের কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ। তারা ৫৪৪ জন মিয়ানমারের নাগরিককে চিহ্নিত করেছে, যাদের তারা বলছে ‘বাঙালি’। এবং বাংলাদেশ যদি এদের ফেরত নেয়, তাহলে রাজ্জাককে ফেরত দেওয়া হবে।

আসলে রাজ্জাক অপহরণ ঘটনার সঙ্গে যে উদ্দেশ্যই কাজ করে থাকুক না কেন, এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যাটি যে একটি ফ্যাক্টর, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এখানে বলা ভালো, মিয়ানমারে ১৯৮২ সালে জাতীয়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড (এনআরসি) প্রণয়ন করেছিল, যা মিয়ানমারের আইনগত বৈধ অধিবাসীর নিশ্চয়তা দেয়। রোহিঙ্গাদের এই এনআরসির আওতায় আনা হয়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে মনে করে না। গত ৩৭ বছর মিয়ানমার সরকার বারবার চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করতে। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো বিপুলসংখক রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ওই সময় মিয়ানমার সরকার ‘অপারেশন ড্রাগন’ নামে ‘রোহিঙ্গা খেদাও’ অভিযান শুরু করেছিল। ফলে ওই সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও পাবর্ত্য চট্টগ্রামে রোহিঙ্গারা নিঃস্ব অবস্থায় আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে মিয়ানমার সরকার ‘অপারেশন পিরেথায়া’ নামে আবারও রোহিঙ্গা খেদাও অভিযানে নামে। বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হয়েছে, প্রায় চার লাখ অবৈধ রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজার এলাকায় বসবাস করছে। এদের অনেকেরই শরণার্থী হিসেবে কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। এরা নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, মিয়ানমার সরকার নতুন করে বৈধ নাগরিকদের গণনা শুরু করলে আবারও রোহিঙ্গা খেদাও অভিযান শুরু হয়। ফলে মে-জুন মাসে সাগরভাসি মানুষকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বড় ধরনের সংবাদের জন্ম হয়।

শেষ অব্দি নায়েক রাজ্জাক মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশের জিম্মা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে একটি প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত হবে না মিয়ানমারের ফাঁদে পা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘স্মার্ট ডিপ্লোমেসি’ প্রদর্শন করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করে যেতে হবে। কেননা বাংলাদেশের কাছে মিয়ানমার নানাবিধ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই আসে এর ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের কথা। প্রায় তিন লাখ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে মিয়ানমার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। মিয়ানমারের পশ্চিমে বাংলাদেশ, পশ্চিম ও উত্তরে ভারত।

উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে চীন, পূর্বে থাইল্যান্ড ও লাওস। মিয়ানমারের এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিতে পারে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের সঙ্গে যে সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাতে করে বাংলাদেশ তার পণ্য নিয়ে সড়কপথে কেবল মিয়ানমারের বাজারেই নয়, বরং মিয়ানমার সরকারের সহযোগিতা নিয়ে পূর্বের অন্যান্য দেশের বাজারেও প্রবেশ করতে পারে (বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাজারে)। ঘুমধুম-মুখে হাইওয়ে চালু হলে সড়কপথেই চীন যাওয়া সম্ভব। ঘুমধুম বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশি এলাকা। আর মুখে হচ্ছে চীনের সীমান্ত শহর।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উভয় দেশই বিমসটেক (BIMSTEC, পরিবর্তিত নাম BBIMSTEC) এবং BCIM জোটের সদস্য। যদিও প্রস্তাবিত BCIM জোটটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভুটান ও নেপাল বিমসটেক জোটে যোগ দেওয়ায় এই জোটটি শক্তিশালী হয়েছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম মিয়ানমারের কাঁচামালভিত্তিক ব্যাপক শিল্প-কারখানা স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক মিয়ানমারে বাংলাদেশি সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন চট্টগ্রাম এলাকায় বেশ কিছু সার কারখানা স্থাপন করে বাংলাদেশ মিয়ানমারে সার রপ্তানি করতে পারে। মিয়ানমারের আকিয়াব ও মংডুর আশপাশের অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর পাওয়া যায়। এসব কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সিমেন্ট ও কাগজশিল্প বিকশিত হতে পারে। মিয়ানমারে প্রচুর জমি অনাবাদি রয়েছে। এ অবস্থায় মিয়ানমারের ভূমি লিজ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মান্দালয়-ম্যাগওয়ের তুলা আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধিষ্ণু তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে তুলা মিয়ানমারের এই অঞ্চল থেকে আমদানি করতে পারে। গবাদি পশু আমদানি করার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশিরা মিয়ানমারে গবাদি পশুর খামারও গড়ে তুলতে পারে।

মিয়ানমারের সেগুনকাঠ পৃথিবী বিখ্যাত। আমাদের ফার্নিচার শিল্পের চাহিদা মেটাতে পারে এই সেগুনকাঠ, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপে আমাদের ফার্নিচার শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারি। মিয়ানমার মূল্যবান পাথর, যেমন রুবি, জেড, বোস আর মার্বেল সমৃদ্ধ। এসব মূল্যবান পাথর আমাদের জুয়েলারি শিল্পকে পুঁজি করে ভ্যালুএডিশনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। ভারত-মিয়ানমার প্রস্তাবিত গ্যাস পাইপলাইন থেকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশও উপকৃত হতে পারে। ভারতীয় সম্পদ রিলায়েন্স মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে। এই গ্যাস তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত নিয়ে যেতে চায়। অতীতে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের আপত্তি ছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ মিয়ানমারের গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে বিদ্যুৎ তথা জলবিদ্যুৎ উপাদন করতে পারে, যা পরে বাংলাদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলাদেশের যে পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি, সেখানে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এ কারণে ইস্যু এবং সর্বশেষ নায়েক রাজ্জাকের অপহরণের ঘটনায় সম্পর্কে কিছুটা অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই অবিশ্বাসকে নিয়ে বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। একমাত্র স্মার্ট ডিপ্লোমেসির মাধ্যমেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ককে আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।
Ntv online
25.06.15