রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

মমতায় কতটুকু আস্থা রাখা যায়

আগামী ১৯ মে নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের ফল ঘোষণা করবে। ৪ এপ্রিল এই নির্বাচন শুরু হয়েছে এবং ছয় পর্বের নির্বাচন শেষ হবে ৫ মে। ধারণা করা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস পুনরায় ক্ষমতায় আসছে। প্রশ্নটা তাই- মমতায় কতটুকু আস্থা আনতে পারব আমরা। কেননা মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি। ভারতীয় রাজনীতিতে তিনি এমন এক চরিত্র, যাকে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা তার ওপর আস্থা রেখেছিলাম। তিনি কথা রাখেননি। দুদফা বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রথমবার এসেছিলেন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। আর পরের বার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী হয়ে। তবে একসঙ্গে নয়, আলাদা করে এসেছিলেন। প্রথম যখন এসেছিলেন তখন বাংলাদেশের মানুষ তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিল। কেননা বাংলায় কথা বলা একজন মানুষ, যার পারিবারিক রক্তের ধারা রয়েছে এই বাংলাদেশের যশোরে, তার কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেবার তিনি আমাদের হতাশ করেছিলেন। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আমাদের যে সমস্যা, তাতে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এই মমতা। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি অযাচিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিস্তায় বেশি পানি দাবি করেছিলেন। কিন্তু তার পরও বাংলাদেশের মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছিল। কিন্তু যার নাম মমতা, তিনি কীভাবে বাংলাদেশকে পানি দেন? ঢাকায় এসে বলেছিলেন, তিনি কাঠবিড়াল হয়ে সেতুবন্ধের মতো কাজ করে যেতে চান! অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে এক ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চান। কিন্তু তিনি কী তা করেছেন? না, করেননি। ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো আসার আগে তিনি বলেছিলেন নতুন এক কথা আত্রাই নদীতে বাংলাদেশ বাঁধ দিয়েছে। আর তাতে পশ্চিমবঙ্গ কম পানি পাচ্ছে! এই হচ্ছে মমতা। তিনি জানেন রাজনীতিকে কীভাবে জটিল করতে হয়। যেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাচ্ছে তিস্তায় একটি সমঝোতা, সেখানে আত্রাই প্রসঙ্গ নতুন করে উত্থাপন করে কৌশুলী মমতা এখন চাচ্ছেন তিস্তার প্রসঙ্গটি ‘ডিপফ্রিজে’ পাঠাতে। এটাই তার কৌশল।
তিনি তিস্তার পানি দেবেন না, যাতে করে বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে যে সম্পর্কের ‘নয়া অধ্যায়’-এর সূচনা হয়েছে, তা একটি প্রশ্নের মধ্যে থাকুক। বাংলাদেশ ভারতের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুক! তাতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে প্রশ্ন উঠুক এবং তিনি তাতে লাভবান হন। ৪ এপ্রিল-৫ মে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন। তিনি চান না বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘নয়া অধ্যায়ের’ কারণে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়–ক। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে (তিস্তার পানির উপকারভোগী) তার জনপ্রিয়তা তলানিতে। অথচ বাংলাদেশে এসে তিনি এমন ভাব দেখিয়েছিলেন যে, তিনিই বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হাসিনা দিদি হিসেবে সম্বোধন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি কত আন্তরিক। প্রটোকল তার কাছে মুখ্য ছিল না, ছিল গৌণ। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যে এভাবে প্রকাশ্যে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করা যায় না, মমতা ব্যানার্জির কাছে এটা বিবেচনায় আসেনি। সেবার তার জন্য গণভবনে দুুপুরের খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছিল। ১২ পদের খাবারের তালিকায় ইলিশ ছিল ৩ পদের। সবাই জানেন বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি মমতার বিশেষ টান আছে। আগে মমতা যখন দিল্লিতে রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে যারাই নয়াদিল্লি গেছেন (বিশেষ করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী), তারা অবধারিতভাবেই সঙ্গে নিয়ে গেছেন ‘পদ্মার ইলিশ’। তাই ইলিশ প্রসঙ্গ এসেছিল (আপাতত রপ্তানি বন্ধ) মমতার সফরে। কিন্তু সারা জাতি ও মিডিয়া সেবার তাকিয়ে ছিল মমতা তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার অনাপত্তির কথা জানিয়ে যাবেন। কেননা তিস্তার পানিবণ্টনের সমস্যা একটাই আর তা হচ্ছে মমতা। মমতার আপত্তির মুখে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। এমনকি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখনো মমতার আসার কথা ছিল। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী এলেও, শেষ মুহূর্তে মমতা তার আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। ফলে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি আর করা হয়নি। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তিস্তার ব্যাপারে মমতার দৃষ্টিভঙ্গির কি কোন পরিবর্তন এসেছে? গেলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি দু’দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন এ কথাটা। এর আগে ভারতীয় হাইকমিশনার কর্তৃক আয়োজিত ‘বৈঠকি বাংলা’য়ও মমতা নিজেই বলেছিলেন তার ওপর ‘আস্থা’ রাখতে। স্থলসীমানা চুক্তি নিয়ে তার আপত্তি নেই এটা অবশ্য তিনি প্রমাণ করেছেন। ঢাকাতেও এ কথাটা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন মমতা। কিন্তু তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার ‘কমিটমেন্ট’ কোথায়? সোজাসাপ্টা হিসাব হচ্ছে, তিনি ঢাকায় এসে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কোনো ‘কমিটমেন্ট’ করে যেতে চাননি। এটাই মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক চরিত্র। যেখানে স্বার্থ রয়েছে, সেখানে মমতা আছেন। তিস্তার পানির ব্যাপারে তার স্বার্থ অনেক বেশি। এখন সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। এটাকে তিনি বিজেপির হাতে তুলে দিতে চান না। উত্তরবঙ্গে পানির চাহিদা বেশি। মমতা এটা জানেন ও বোঝেন। বলা ভালো, ১৯ ফেব্রুয়ারি (২০১৪) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে তিস্তায় পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল। এটা কাকতালীয় কিনা জানি না। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ক’টি বিষয় অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল, তার মাঝে তিস্তার পানিবণ্টন অন্যতম। এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটা আগ্রহ থাকলেও শুধু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। সেই মমতা ব্যানার্জিই এখন আবার ক্ষমতায় আসছেন। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকা আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। তিস্তায় পানিবণ্টনের ব্যাপারে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি (২০১৫) সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসের প্রথম ৫ দিনে তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ৫০০ কিউসেকের নিচে। বলা ভালো, সেচ প্রকল্পে পানি দেওয়া দূরের কথা, শুধু নদী বাঁচানোর জন্যই দরকার এক হাজার কিউসেক। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা আজ মৃত্যুমুখে। গত নভেম্বর থেকেই তিস্তার পানিপ্রবাহ কমতে থাকে।
বাংলাদেশের লালমনিরহাটে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীতে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পানিপ্রবাহ রেকর্ড হয়। ফেব্রুয়ারি (২০১৫) মাসের প্রথম চার দিনের হিসাবে দেখা গেছে, প্রথমদিকে পাওয়া গেছে ৪২৬ কিউসেক, দ্বিতীয় দিন ৪৭৫ কিউসেক, তৃতীয় দিন ৪৪৫ কিউসেক আর চতুর্থ দিন ৪১৬ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয় (একটি জাতীয় দৈনিক, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। যৌথ নদী কমিশন সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর আগে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ ভালো ছিল বলে তুলনার জন্য ওই সময়কালের হিসাবকে ঐতিহাসিক গড়প্রবাহ ধরা হয়। ওই ১২ বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে পানিপ্রবাহ ছিল ৫৯৮৬ কিউসেক। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৯৬৩ কিউসেকে। এরপর তা নেমে যায় ৫০০ কিউসেকের নিচে। অথচ নদী রক্ষার জন্যই দরকার ১ হাজার কিউসেক পানি। আর বিদ্যমান সেচ প্রকল্পের জন্য আরও সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক পানি দরকার। ওই সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি ‘নোট ভারবাল’ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
মমতা ব্যানার্জির প্রথম ঢাকা সফরের আগে আমরা অনেক প্রত্যাশার কথা শুনেছি। তবে এটা সত্য, তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে এটা সরাসরি সম্পৃক্ত। আমাদের নীতিনির্ধারক করা, যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেন, তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এতে করে বাড়বে। মনে রাখতে হবে তিস্তায় পানি প্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা ব্যানার্জির আপত্তি বা সমর্থন এটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্দা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে।
ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুদেশের মন্ত্রীপর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ, ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুদেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এরপর যুক্ত হয়েছিল ক্ষমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই অতীতে মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরও একটা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানিবণ্টনে সিকিমকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কেননা সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচকাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা বরাবরই মমতার জন্য একটি ‘রাজনৈতিক ইস্যু’। তাই মমতা তিস্তা চুক্তি করে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে এটা আমার তখনই বিশ্বাস হয়নি। তাই মমতায় আস্থা রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয় তা হচ্ছে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা। আমরা ভারতের অনেক দাবি পূরণ করেছি। মোদির আমলে সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে দুদেশের সীমানা এখন নিশ্চিত। দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর মমতা যদি তার ওপর রাখা আস্থার প্রতিদান না দেন তাহলে তা যে দুদেশের সম্পর্কের মাঝে একটা অবিশ্বাসের জন্ম দেবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে রুদ্র কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে পারেন, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই পানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেওয়া সম্ভব বলে সুপারিশ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়ও এই সুপারিশ সমর্থন করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই মমতা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
Daily Amader Somoy
11.04.16

পানামা পেপারস ও কিছু কথা

পানামা পেপারস কেলেংকারি এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম একটি আলোচিত বিষয়। পৃথিবীর বড় রাষ্ট্রগুলোর শীর্যস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীর ট্যাক্স ফাঁকির ঘটনা ফাঁস হয়ে গেছে পানামা পেপারসের মাধ্যমে। পানামার আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার কাছে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি ছিল। এসব গোপন নথিতে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক তথা তাদের আত্মীয়স্বজনের অর্থ পাচার আর ট্যাক্স ফাঁকির তথ্য ছিল। মোসাক ফনসেকা এটি নিজে ফাঁস করেনি। ফাঁস করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা- ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে)। যতদূর জানা যায়, বিশ্বনেতাদের এ ট্যাক্স ফাঁকি ও টাকা পাচারের তথ্য প্রথম জানতে পারে জার্মানির একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘সুডডয়েচে সাইটুং’। পরে এটি আইসিআইজে পায়। সেই সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের কাছেও এসব তথ্য যায়। তবে প্রথম প্রকাশ করে আইসিআইজে। যেহেতু পানামায় নিবন্ধিত আইনি পরামর্শক সংস্থা মোসাক ফনসেকা এসব ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের অপ্রদর্শিত অর্থ, ট্যাক্স ফাঁকি ও অর্থ পাচারে সহায়তা করেছে এবং তাদের কাছেই তথ্যগুলো সংরক্ষিত ছিল, এ জন্য ফাঁস হওয়া ঘটনাকে পানামা পেপারস নামে অভিহিত করা হয়েছে। বলা ভালো, যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে তা ১৯৭৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ দীর্ঘ এ সময়সীমায় সংস্থাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানদের অর্থ পাচারে সহায়তা করে আসছে।

যেসব নথিপত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে রীতিমতো অবাক হতে হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, সৌদি বাদশাহ সালমান, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাম আছে এতে। এমনকি সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত গাদ্দাফি এবং সাদ্দাম হোসেনের নামও আছে। সেই সঙ্গে আছে লিওনেল মেসি, ফিফার মহাসচিব জেরোমে ভালকে, মিশেল প্লাতিনি ও অমিতাভ বচ্চনের নামও। বাংলাদেশী বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর নামও আছে এ তালিকায়।

পানামা পেপারসের এ ট্যাক্স ফাঁকির ঘটনা অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. পাঠক লক্ষ্য করবেন চীন ও রাশিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের নাম থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্সের কোনো সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের নাম এখনও আসেনি। কেন? দুই. এ ঘটনা এই সময় ঘটল কেন? এর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে উৎখাতের ‘নীতি’ অনুসরণ করে আসছে, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কি-না? তিন. অর্থ পাচার কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সঙ্গে মোসাক ফনসেকার সম্পর্ক কী, কিংবা কীভাবে ফনসেকা তার গ্রাহকদের নিরাপত্তা দেয়? চার. এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?

চীনে দুর্নীতির বিষয়টি সাম্প্রতিককালে একটি বড় আলোচিত বিষয়। শি জিন পিং ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছেন। শীর্ষস্থানীয় পার্টি ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের ইতিমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে- এ ধরনের সংবাদ আমরা সংবাদপত্র থেকে জেনেছি। কিন্তু শি জিন পিং নিজে কিংবা তার আত্মীয়স্বজন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং তারা মোসাক ফনসেকার মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছেন, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তবে সাবেক চীনা প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে আগেও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ভ­াদিমির পুতিন যেভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করছেন, সে ব্যাপারে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। একবার প্রেসিডেন্ট, আবার প্রধানমন্ত্রী, আবার প্রেসিডেন্ট- এভাবে পুতিন ক্ষমতায় আছেন দীর্ঘদিন ধরেই। ক্ষমতায় থেকে একটা সুবিধাভোগী শ্রেণী তিনি গড়ে তুলেছেন। অভিযোগের তীর তার মেয়ে কাতেরিনা ও মেয়েজামাই কিরিল শামালভের দিকে। শামালভ সাম্প্রতিককালে রাশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন বলে পশ্চিমা গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ। পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার এক বন্ধুর নামে তিনি ২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে অফশোর শেল কোম্পানি গঠন করেছেন। চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে যথারীতি এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তবে চীনের সরকারি গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস বলছে, পানামা পেপারসের সঙ্গে শক্তিশালী একটি ‘পক্ষ’ জড়িত। এবং তথ্য ফাঁস করে যুক্তরাষ্ট্র প্রকারান্তরে লাভবান হয়েছে। বলা ভালো, উইকিলিকসে তথ্য ফাঁস হয়েছিল ২০১০ সালে। এখন তার চেয়েও অনেক বেশি তথ্য (২ দশমিক ৬ টেরাবাইট, ১ কোটি ১৫ লাখ নথি এবং ২ লাখ শেল কোম্পানির নাম) ফাঁস হয়েছে। এর সঙ্গে শুধু হ্যাকাররা জড়িত বলে মোসাক ফনসেকার কর্মকর্তারা দাবি করলেও কোনো বড় ধরনের শক্তির সহযোগিতা ছাড়া এটা ফাঁস করা সম্ভব নয়। তবে ফনসেকার ডকুমেন্টে যাদের নাম আছে তারা অর্থ পাচারে কিংবা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ায় কতটুকু জড়িত, সেটা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। কিন্তু তথ্য গোপন নিশ্চিত করতে না পারার দায়-দায়িত্ব ফনসেকা এড়াতে পারে না। শুধু তাই নয়, অধ্যাপক ভ্যালেনতিন কাতসোনভ ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল লিখেছিলেন (Operation Offshore Leak, Global Research), মোসাক ফনসেকার কাছে এ ধরনের তথ্য আছে। এমনকি যতদূর জানা যায়, জার্মান পত্রিকাটি দু’বছর আগেই এ তথ্যগুলো পেয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন এসে যায়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যখন বলা হয়, ফনসেকার কাছে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে, তাহলে সংস্থাটি এসব নথির নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক হল না কেন?

প্রায় ৪০টি দেশে মোসাক ফনসেকার অফিস আছে। তারা সাধারণ কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান নয়। এসব গোপন নথি তারা সুরক্ষা করবে না, এটা বিশ্বাস করা যায় না। সে কারণেই প্রশ্নটা এসে যায়, কোনো বৃহৎ শক্তি কি এর পেছনে আছে? দ্বিতীয়ত. ‘করাপশন অ্যাজ এ প্রপাগান্ডা ওয়েপন’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক রবার্ট পেরি। এটিও প্রকাশিত হয়েছে ‘গ্লোবাল রিসার্চে’ ৫ এপ্রিল ২০১৬-তে। গ্লোবাল রিসার্চ টরন্টোতে নিবন্ধিত একটি গবেষণা সংস্থা। এটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক মিশেল চসুডোভস্কি। বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি নিয়ে তার প্রতিষ্ঠান এবং তিনি নিজে কাজ করেন। এখানে রবার্ট পেরি দুটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এক. এ গোপন তথ্য ফাঁসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তনের (বিভিন্ন দেশের) যে নীতি, তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে যে ‘কালার রেভ্যুলেশন’ হয়েছে (জর্জিয়া, কিরঘিজস্তান, ইউক্রেন, এমনকি আরব বসন্তও), তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ একটা যোগসূত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার’ নামে অর্থ সহায়তা করে থাকে। আমি নিজে ‘আরব বসন্তের’ ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি কীভাবে তরুণ নেতৃত্বকে (মিসরের) যুক্তরাষ্ট্র উদ্বুদ্ধ করেছিল মোবারকবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে। ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানোকোভিচ একটি ‘গণআন্দোলনে’ উৎখাত হয়েছেন ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ক্ষমতায় এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রোসেনকো, যিনি এখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। অভিযোগ আছে, ওই ‘গণআন্দোলনের’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক, তাতে করে রাশিয়ার সীমান্তে মার্কিন সেনা মোতায়েন করে রাশিয়াকে একটি স্নায়বিক চাপে রাখা যাবে। এ ‘আন্দোলন’ সফল হয় এবং ইয়ানোকোভিচ (যিনি ছিলেন সে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট) অপসারিত হন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইয়ানোকোভিচ উৎখাত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল শুধু অর্থনীতিতে কিছুটা ‘গতি’ আনার জন্য। অভিযোগ আছে, এ অর্থ প্রেসিডেন্ট প্রোসেনকো ‘নয়-ছয়’ করেছেন। তার নামে টাকা পাচার হয়েছে এবং মোসাক ফনসেকা তাকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। প্রশ্নটা এ কারণেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যেখানে বেশি (যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই), সেখানে তারা সরকার পরিবর্তন ঘটায়। ইরাক, লিবিয়া এর বড় প্রমাণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হোসনি মোবারককে প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় আসমা মাহফুজদের (মিসরের তাহরির স্কোয়ার আন্দোলনের নেতা) দিয়ে তথাকথিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুরসিকে কিছুদিন ক্ষমতায় রেখে মিসরে ‘গণতন্ত্র চর্চা’ চালু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন সেসব অতীত। ফিল্ড মার্শাল সিসিকে নিয়েই রচিত হবে এখন নয়া স্ট্র্যাটেজি। তাই আমার ধারণা, ইউক্রেনেও সরকার পরিবর্তন আসন্ন। তাই রবার্ট পেরি যে আশংকার কথা বলেছেন, তা ফেলে দেয়ার নয়।

এখানে যে প্রশ্নটা অনেকেই করেন তা হচ্ছে, টাকা পাচারের জন্য কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির জন্য এ ধরনের অফশোর শেল কোম্পানিগুলোকে বেছে নেয়া হয় কেন? আর পানামাই বা কেন? এ প্রসঙ্গে যেটা বলা দরকার তা হচ্ছে, পৃথিবীতে বেশ কিছু দ্বীপপুঞ্জশাসিত দেশ বা এলাকা রয়েছে (যেমন- ভারজিন আইল্যান্ড, কেম্যান আইল্যান্ড, সিসিলি, কুক আইল্যান্ড), যেখানে হাজার হাজার কোম্পানি রেজিস্ট্রি করে ওই কোম্পানির নামে সেখানকার ব্যাংকে অর্থ রাখা যায়। এসব দ্বীপপুঞ্জের কোনো কোনোটিতে এখনও ব্রিটিশ কর্তৃত্ব রয়েছে (ভারজিন আইল্যান্ড, কেম্যান আইল্যান্ড। কুক আইল্যান্ডের কর্তৃত্ব নিউজিল্যান্ডের হাতে)। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো (যেমন- জার্মানির ডয়েচে ব্যাংক, হংকংভিত্তিক এইচএসবিসি, যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ব্যাংক, ফ্রান্সের সোসাইটি জেনারেল) এসব দ্বীপপুঞ্জে হাজার হাজার কোম্পানি রেজিস্ট্রি করে ওই কোম্পানির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যবসা করে। যেমন ডয়েচে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে ৫০০ কোম্পানি। ব্যাংক সোসাইটি জেনারেল করেছে ২ হাজার ৩০০ কোম্পানি। যে কেউ নাম গোপন করে এসব ব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে কোম্পানি খুলতে পারে। ব্যবসা করতে পারে। আর মোসাক ফনসেকার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এদের আইনি সহযোগিতা করে। এখানে কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না। ফলে এসব দ্বীপপুঞ্জ ব্যবসায়ীদের জন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে কোম্পানি রেজিস্ট্রি করে পৃথিবীর বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। তারা যদি নিজ দেশে ব্যবসা করত, তাহলে তাদের প্রচুর ট্যাক্স দিতে হতো। যেমন- বিখ্যাত অ্যাপেল (Appel) কোম্পানির কথা বলা যেতে পারে, যারা এখন Sixty Eight Research নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে অটোমোবাইল ব্যবসায় (গবেষণা ও উন্নয়ন) পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। অস্ট্রেলিয়ায় অনেকে ব্যবসা করেন, যাদের মূল কোম্পানি সিঙ্গাপুরে রেজিস্ট্রিকৃত। কেন? অস্ট্রেলিয়ায় কর্পোরেট ট্যাক্স ৩৫ ভাগ, আর সিঙ্গাপুরে মাত্র ১৭ ভাগ। ফলে তাদের কম ট্যাক্স দিতে হয়। অফশোর দ্বীপপুঞ্জগুলোতে কোম্পানি রেজিস্ট্রি করে ব্যবসা করা বৈধ। অনেক ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘কমিশন বাণিজ্য’ করেন। মিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তারা যে কমিশন পান, তা জমা হয় এসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এর খোঁজ কেউ নেয় না। নিজ দেশের ট্যাক্স কর্তৃপক্ষও তা জানে না। ওইসব ব্যক্তিকে দায়ীও করা যাবে না। পানামা কেন? পানামায় মোসাক ফনসেকার মতো কোম্পানি কী সুবিধা পায়? আমি একটু খোঁজখবর নিয়েছি। তাতে দেখেছি পৃথিবীর ৮০টি দেশ ইতিমধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটিকে বলা হচ্ছে Multilateral Competent Authority Agreement। এটি ২০১৪ সালের অক্টোবরে বার্লিনে (জার্মানি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ট্যাক্সসংক্রান্ত সব তথ্য বিনিময় করবে, যাতে করে যেসব প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তাদের আইনি আওতায় আনা যায়। পানামা এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। এর অর্থ হচ্ছে মোসাক ফনসেকার মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব তথ্য রয়েছে, তা তারা দিতে বাধ্য নয়। এ কারণেই মোসাক ফনসেকার গ্রাহক সংখ্যা অনেক বেশি।

কর ফাঁকি দেয়া কিংবা অর্থ পাচার করার কাহিনী আজকের নয়। আফ্রিকার সেনাশাসকরা অতীতে কোটি কোটি ডলার নিজ দেশ থেকে পাচার করেছেন (পাঠক, নাইজেরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল সানি আবাচার সুইজারল্যান্ডে গোপনে রক্ষিত অর্থের কথা স্মরণ করুন)। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গাব্রিয়েল জুকম্যান Hidden Wealth of Nation Held Offshore শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের মোট সম্পদের ৮ ভাগ (যার পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এখন এসব দ্বীপপুঞ্জভিত্তিক হাজার হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো এসব অর্থ আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগ করে। অধ্যাপক জুকম্যান একটি আতংকের খবর আমাদের জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট সম্পদের ৫৭ ভাগ, রাশিয়ার ৫০ ভাগ, আফ্রিকার ৩০ ভাগ ও দক্ষিণ আমেরিকার ২২ ভাগ এসব অফশোর আইল্যান্ডে বিভিন্ন কোম্পানির নামে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তা আমাদের চিন্তার অনেক খোরাক জোগাবে বৈকি!

পানামা পেপারস বিশ্বে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযুক্ত আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ড গুনলাগসন পদত্যাগ করেছেন। টিআইর চিলি শাখার প্রধান দেলাভেসু পদত্যাগ করেছেন এবং টিআইর ওই শাখা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের স্ত্রী তাহমিনা দুররানী শরিফ পরিবারের সব সম্পত্তি, যা পানামা পেপারসে উল্লেখ করা হয়েছে, তা পাকিস্তানের জনগণের নামে দান করার দাবি জানিয়েছেন (ট্রিবিউন, ৭ এপ্রিল)। মিসেস দুররানী মনে করেন, এর মাধ্যমে শরিফ পরিবারের ‘পাপ মোচন’ সম্ভব। নিঃসন্দেহে শরিফ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দুররানীর এ বক্তব্য নওয়াজ শরিফের অবস্থানকে দুর্বল করবে। ভারতে মোদি সরকার যেসব ভারতীয় ব্যক্তির নাম পানামা পেপারসে রয়েছে, তা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। পানামা বলছে, তারা ট্যাক্সের ব্যাপারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আরও উদ্যোগ নিচ্ছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাও এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। সব মিলিয়ে পানামা পেপারস বিশ্বে একটি বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে।

অর্থ পাচার কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির ঘটনা ফাঁস করার পেছনে আদৌ কোনো ‘উদ্দেশ্য’ আছে কি-না, কিংবা কোনো ‘শক্তি’ এ থেকে ফায়দা ওঠাতে চায় কি-না, তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। Daily Jugantor 11.4.16

কেমন হলো প্রথম দফা প্রশ্ন এ নিয়েই

পাঁচ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার প্রথম দফার নির্বাচন শুরু হয়েছে গত ৪ এপ্রিল। আসন মাত্র ১৮টি। প্রথম দফায় দ্বিতীয় পর্বে ভোট হবে ১৭ এপ্রিল ৫৬ আসনে। নির্বাচন হচ্ছে আসামেও। কেমন হলো এই নির্বাচন? কলকাতার পত্রিকাগুলো এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। জঙ্গলমহলে বড় ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অনেকে। চরমপন্থি মাওবাদীদের এলাকা হচ্ছে এই জঙ্গলমহল। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মাওবাদীরা এখানে সক্রিয় ছিল। কিন্তু মাওবাদাী নেতা কৃষানজির মৃত্যুর পর এই আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত। মাওবাদীরা ভোট বয়কটের ডাক দিলেও তাতে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রায় ৮০ ভাগের ওপরে ভোট পড়েছে ১৮টি আসনে। অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই প্রথম দফা ভোট শেষ হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন দু’-একটি ‘ঘটনা’ ঘটেছে। ভোট কারচুপি (ওরা বলছে ছাপ্পা ভোট), মাস্তানি ও শাসক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের ভোট কেন্দ্রে সন্ত্রাস ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে। তবে নির্বাচন কমিশনকে দেখলাম তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনার খবরও আমরা দেখলাম পত্রপত্রিকায়। মমতা ব্যানার্জির টার্গেট দেখলাম বিজেপির চাইতে বেশি কংগ্রেসের দিকে। এক সভায় তিনি বলেছিলেন ‘পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাইনবোর্ড বন্ধ হয়ে যাবে!’ আমাদের দেশের নেতানেত্রীরাও এভাবে কথা বলেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ আমি পত্রপত্রিকায় দেখলাম না। বলার অপেক্ষা রাখে না এই নির্বাচন খোদ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সর্বভারতব্যাপীও এর একটা গুরুত্ব রয়েছে। বিজেপি এখানে দুর্বল। দুর্বল কংগ্রেসও। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা শতকরা একশ’ ভাগ এমন কথাই বলছে জনমত জরিপগুলো। মুশকিল হচ্ছে চূড়ান্ত ফলাফল জানার জন্য অমাদের অপেক্ষা করতে হবে মে মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা ভোট হবে ১৭ এপ্রিল (৫৬ আসন), তৃতীয় দফা ২১ এপ্রিল (৬২ আসন), চতুর্থ দফা ২৫ এপ্রিল (৪৯ আসন), ৫ম দফা ৩০ এপ্রিল (৫৩ আসন) এবং ষষ্ঠ দফা ৫ মে (২৫ আসন)। মোট আসন ২৯৪। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সাল থেকে বামফ্রন্ট সেখানে ক্ষমতায় ছিল। সেই ক্ষমতার দুর্গে আঘাত করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে। পতন ঘটেছিল বামফ্রন্টের একক মমতা। মমতা ব্যানার্জি গত ৫ বছর যেভাবে ক্ষমতা পরিচালনা করেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা কমে গেছে এটা বলা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই। ২০১১ সালের বিধান সভার নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। আর এবার ঘটল উল্টোটি, অর্থাৎ কংগ্রেস এবার জোট গড়েছে বামফ্রন্টের সঙ্গে। জরিপে বিজেপির ঝুলিতে মাত্র ১টি আসন যেতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। আসামের ক্ষেত্রে জরিপ বলছে ১২৬ আসনের আসাম বিধানসভায় কংগ্রেস মাত্র ৩৬টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি-অসম গণপরিষদ আর বিপিএফ জোট পেতে পারে ৭৮ আসন। এর বাইরে মাওলানা বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বাধীন ও আইইউডিএফ পেতে পারে ১০ আসন। আসামে ক্ষমতায় আছে তরুণ গগৈর নেতৃত্বে একটি কংগ্রেস সরকার। তবে জনমত জরিপ যে সব সময়ই সত্য প্রমাণিত হয় তা নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুটি রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। কেননা তিস্তার পানি বাইরের বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় এক সঙ্গে আসার কথা ছিল। আসছিলেন। এসেছিলেন পরে আরো একবার। বলেছিলেন তিস্তা চুক্তির জন্য অপেক্ষা কেমন হলো প্রথম দফা প্রশ্ন এ নিয়েইকরতে হবে। আমরা জানতাম এটি খোদ পশ্চিমবঙ্গে একটি ইস্যু। নির্বাচনে বিএজপি এটা ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। তাই অত্যন্ত কৌঁসুলি মমতা তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে বিধানসভার নির্বাচনের আগে কোনো ‘কমিটমেন্টে’ যেতে রাজি হননি। তাই এই নির্বাচনটি আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় এসে তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন ‘অপেক্ষা করার’ জন্য। এখন দেখা যাক নির্বাচনের পর এই অপেক্ষার পালা শেষ হয় কী না! তবে বলা যেতে পারে সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনের গুরুত্ব আছে। এই বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসে ঐক্য করেছে বামফ্রন্টের সঙ্গে। অথচ গেল বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নির্বাচনী মিত্র ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বলা যেতে পারে মমতা ব্যানার্জি এক সময় যুব কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। তবু কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। কংগ্রেস বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তেমন জনমত তৈরি করতে পারেনি। কংগ্রেসের ব্যর্থতাই মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছিল। এবারে কংগ্রেস ফিরে গেছে বাম শিবিরে। শুধু তাই নয় বাম জোট ও কংগ্রেসের সঙ্গে যে নির্বাচনী ঐক্য হয়েছে সেখানে মুলায়ম সিংয়ের সমাজবাদী পার্টি, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সংযুক্ত জনতা দলকে দুটি করে আসন দেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গেও মহাজোট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলো। বিহারে বিজেপি উৎখাতে সেখানে মহাজোট গঠিত হয়েছিল। সংযুক্ত জনতা দলনেতা নীতিশ কুমারকে সেদিন সমর্থন দিয়েছিল সবাই রাষ্ট্রীয় জনতা দল (লালু প্রসাদ), মুলায়ম সিংয়ের সমাজবাদী পার্টি। এমনকি পাটনায় মহাজোট সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন মমতা ব্যানার্জি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক, জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ প্রমুখ। মুলায়ম সিং যাদব ও তার ছেলে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদব ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলেও তাদের সমর্থন ছিল। বিহারে মহাজোটের অন্যতম শরিক কংগ্রেসের সুপ্রিমো রাহুল গান্ধী, সিপিএম নেতা সীতাবাম ইয়েচুরিও উপস্থিত ছিলেন। ফলে কেন্দ্রে মোদিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি মহাজোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই। পশ্চিমবঙ্গে এর কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও এখানে তৃণমূল হয়েছে টার্গেট। এখানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে অন্যরা। বিধানসভার এই নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপি আবারো অভিবাসী ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে। মোদি, অমিত শাহ কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে অনাকাক্সিক্ষত বাংলাদেশি অভিবাসীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। অনেক বলার চেষ্টা করেছেন যে এসব কথার কথা। কিন্তু এটা তো সত্য ভারতে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে এই ‘মুসলমান বিদ্বেষ’ লক্ষ্য করা গেছে। পরিসংখ্যান বলছে পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর ২৭ ভাগ হচ্ছে মুসলমান। এই জনগোষ্ঠীর মাঝে ১০ ভাগ আবার উর্দুভাষী। অবশিষ্টরা বাংলাভাষী। উর্দুভাষাীরা মমতাকে পছন্দ করেন। আর বাংলাভাষীরা এতদিন সিপিএম ও কংগ্রেসকে সমর্থন করে আসছিলেন। এদের একটা অংশ ইদানীং মমতার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। মোদি যখন লোকসভা নির্বাচনের আগেও বাংলা ভাষাভাষীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তখন মমতা এদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। উল্লেখ্য, মমতার পূর্ব পুরুষরা এক সময় যশোরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে মমতার বাপ-দাদারা কলকাতায় চলে যান। মমতার জš§ কলকাতায়। এখন বিধানসভার নির্বাচনের আগে ‘বাংলাদেশ বিরোধী’ কথাবার্তা, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার ঘোষণা সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে একটি ভুল মেসেজ পৌঁছে দিতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিকে পশ্চিম বাংলা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নেবে এবং সমস্যা সমাধানের উদ্যোগী হবে। ঢাকায় মমতা বলে গিয়েছিলেন তার ওপর আমরা যেন আস্থা রাখি। তিনি এও বলেছিলেন দু’দেশের সমস্যার সমাধানে তিনি দ্যুতিয়ালি করবেন। তিনি ঢাকায় নিজেকে ‘কাঠবিড়ালির’ ভূমিকার সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। এখন আমরা দেখতে চাই তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করেন কি-না? মমতা অত্যন্ত চালাক। তার যেখানে স্বার্থ আছে, কংগ্রেসের সঙ্গেও তিনি সখ্য করেছিলেন। আবার কংগ্রেসকে ছেড়ে আসতেও তার বেশি সময় লাগেনি। বিজেপির সঙ্গেও কেন্দ্রে ছিলেন। আবার বিজেপিকে ছেড়েও এসেছিলেন। বিহারে নিতীশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ভারতব্যাপী একটি মহাজোট গঠনের যে সম্ভাবনার জš§ হয়েছিল মমতার কারণে তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। তার দলের নেতাকর্মীদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার এন্তার প্রমাণ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। সর্বশেষ দুর্নীতির খবর কলকাতায় উড়াল সেতু নির্মাণে ধস। যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই উড়াল সেতুটি নির্মাণ করেছিল তারা অদক্ষতার অভিযোগে অনেক রাজ্যেই নিষিদ্ধ। অথচ এই কোম্পানিটি পশ্চিমবঙ্গে কাজ পেয়েছিল। হয়তো শেষ অবধি তৃণমূল কংগ্রেসই বিজয়ী হবে। কিন্তু এতে করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর উপকার কতটুকু হবে এ প্রশ্ন থাকবেই। পশ্চিমবঙ্গবাসী সম্ভবত আরো একবার তার ওপর আস্থা রাখতে যাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিকল্প একমাত্র মমতাই। বিজেপি কিংবা কংগ্রেসের কোনো নেতা নেই যে মমতার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। একমাত্র বামফ্রন্ট পারলেও বামফ্রন্টের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বাবুর প্রতি মানুষের আস্থা কম। তাই অঙ্কের হিসাব অনুযায়ী মমতাই থেকে যাচ্ছেন। এতে করে তিস্তার পানির বণ্টন হবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। Daily Manobkontho 11.04.16

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আমাদের স্বার্থ

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শুরু হয়েছে। প্রথম দফার প্রথম পর্বের নির্বাচন শেষ হলেও শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৫ মে। আর ফল ঘোষণা করা হবে ১৯ মে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, তা যেন অনেকটা বাংলাদেশের কার্বন কপি। বহুল আলোচিত দৈনিক আনন্দবাজারে ৭ এপ্রিল তাদের এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘তালাবদ্ধ গণতন্ত্র’ হিসেবে। আর ৮ এপ্রিল তাদের সম্পাদকীয়তে কোনো কোনো ভোট কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভোট পড়াকে বলা হয়েছে ‘ভুতুড়ে কা-’ হিসেবে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মন্তব্য করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, এভাবে ‘মওত, মানি, আউর ধোঁকা, সিন্ডিকেটরাজ চলছে বাংলায়।’ সব মিলিয়ে নির্বাচনটি ভালো হচ্ছে এটা বলা যাবে না। গোপীবল্লভ ডালকাঠি গ্রামের ভোট কেন্দ্রে তৃণমূলের পক্ষে ভোট না পড়ায় দলের নেতাকর্মীরা গ্রামের খাবার পানির জন্য যে একমাত্র টিউবওয়েলটি রয়েছে, তা তালাবদ্ধ করে চলে যায়। বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে আর জল দেয়া সম্ভব নয়। নির্বাচন নিয়ে নানা কাহিনী ছাপা হচ্ছে। তবে এ নির্বাচন নিয়ে আমাদের স্বার্থ অনেক। আমরা চাই, তিস্তার পানিবণ্টন। আবার এটি পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইস্যুও। তিস্তার পানিবণ্টনকে ইস্যু করে মমতা ব্যানার্জি উত্তরবঙ্গে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন। অতীতে যদি চুক্তি হতো এবং তাতে যদি বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগের ওপর পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হতো, তাতে মমতার ভোট কাটত। তিনি জনপ্রিয়তা হারাতেন। এখন মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ হবে। তাই ঝুঁকি তিনি নেননি ভোটের স্বার্থে। একটি ‘সমঝোতায়’ তিনি এখন রাজি হতে পারেন। তবে তা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নয়। ঢাকায় এসে তিনি সেই পুরনো কথা-ই বলেছিলেন। তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছিলেন। বলা ভালো, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে তিনি একবার একটি ফর্মুলা দিয়েছিলেনÑ শতকরা ৭৫ ভাগ পানি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেয়া। এ ফর্মুলায় বাংলাদেশ রাজি হয়নি তখন। কেননা এতে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে আহ্বায়ক করে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একটা সুপারিশ করা। রুদ্র কমিশন তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন এবং যার আংশিক রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে তিনি অভিমত দিয়েছিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এও মত দিয়েছিলেন যে, ‘ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমারও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু যতদূর জানা যায়, মমতা ব্যানার্জি রুদ্র কমিশনের মতামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে কারণে রুদ্র কমিশনের রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। আজ তিনি সেই রুদ্র কমিশনের ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগিতে রাজি হবেনÑ এটা মনে হয় না। তাহলে তিনি কি নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবে রাজি হয়ে এখন নির্বাচনের পর একটি চুক্তিতে রাজি হবেন? অতীতে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকায় আসা চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে তিনি বেঁকে বসেছিলেন। পরে এসেছিলেন মোদির সঙ্গে। কিন্তু কোনো চুক্তিতে সম্মত হননি। নির্বাচনের পর তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন তা দেখার বিষয়। এখানে অনেক সম্ভাবনা আছে। একটি ‘প্যাকেজ ডিল’ এর আওতায় তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হতো না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি এ আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মমতা ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ এ তিনটি রাজ্য এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছিলেন ওই তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা এসেছিলেন। তিস্তা এখানে প্রাধান্য ছিল না। অনেক পরিকল্পনা মমতা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যদি না কেন্দ্র আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করে। তখন সামনে নির্বাচন ছিল। মমতা তাই ঝুঁকিটি নিতে চাননি। তখন কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইএ’র একটি চাপ ছিল মমতার ওপর। সারদা কেলেঙ্কারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর সিবিআই’র নজরদারি ছিল বেশি। ফলে এ ‘চাপ’কে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হয়েছিলেন। কোনো চুক্তি করতে নয়। তবে মমতা ব্যানার্জি আবার বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দিতে পারেন। এক সময় তিনি এ জোটে ছিলেন। কেন্দ্র্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। এখন যদি পশ্চিমবঙ্গে তার বিজয় নিশ্চিত হয় ও সব কেলেঙ্কারি থেকে ‘মুক্ত’ হতে তিনি যদি আবারও এনডিএ জোটে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! যতদূর জানা যায়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেননি একটাই কারণে। আর তা হচ্ছে, মমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনঃপূত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। ঢাকা সফরের আগে মোদি তাকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সঙ্গে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন।
মমতা কথা বলেছিলেন। কূটনৈতিক ভাষায় বলেছিলেন, তার ওপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। এখন নির্বাচন শেষ হবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি ৫ বছরের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পাবেন। বিহারে নীতিশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে (বিহারের রাজধানী পাটনায়) তিনি যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটা মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা  জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার কোনো সহাবস্থান হলো না। জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য করল বামফ্রন্টের সঙ্গে। তার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য না করা কেন্দ্রে মোদি সরকারকে খুশি করে থাকবে। ফলে মমতা যদি না চান, তাহলে তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে মোদি সরকার তাকে চাপ দেবে না। আমাদের জন্য তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার স্বীকৃত। ভারত (এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ তাই করছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পানিশূন্য হচ্ছে। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটির ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার আগে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর গাড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ ধরনের কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি এ দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানিবণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম  ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ওই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তিটি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়ই এটি বোঝেন। মমতা ব্যানার্জিকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। এখানে একটা কথা বিবেচনায় নিতে হবে। এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের পর (পশ্চিমবঙ্গ) একটি সমঝোতা যদি হয়, তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণœ থাকে। আমরা যেন মমতা ব্যানার্জির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করি।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের পরপরই আমাদের উচিত হবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি উত্থাপন করা। আমাদের দাবি ভারত সরকারের কাছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে নয়। আমরা শুধু স্মরণ করিয়ে দেব, মমতা ব্যানার্জি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। আস্থা রাখতে বলেছিলেন। সামনে বর্ষার পরে আসছে শুষ্ক মৌসুম। সুতরাং তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নে আলোচনাটা জরুরি।
তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা চাই, এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। এক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে মোদি সরকার একটি চুক্তিতে যেতে চায়। এরই মধ্যে স্থল সীমানা চুক্তিতে সম্মতি দিয়ে মমতা ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন। এখন তিস্তার ব্যাপারেও তিনি পারেন। এটা কঠিন নয়। তিনি যদি সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে তিনি কল্যাণ রুদ্র কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি নিজে এ কমিশন গঠন করেছিলেন। কলকাতার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রুদ্র কমিশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দেয়া রিপোর্টে বলেছে, পশ্চিমবঙ্গকে ক্ষতি না করেও বাংলাদেশকে শতকরা ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আরেকজন পানি বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়। আগেই উল্লেখ করেছি, অধ্যাপক রায়ের অভিমত হচ্ছে তিস্তায় পানি নেই কথাটা ঠিক নয়। পানি মজুদ রাখা (বর্ষা মৌসুমে) ও ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। সে কারণেই বিধানসভার নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জিকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে যখন চিহ্নিত করা হচ্ছে, তখন এ প্রশ্নটা করাই যায় যে, ‘আস্থা ও বিশ্বাসের’ কথা তিনি ঢাকায় বলে গিয়েছিলেন, তা তিনি রাখবেন কিনা? নির্বাচন শেষ হবে ৫ জুন। ৫ বছর অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে থাকছেন। এক্ষেত্রে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে তার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককেই উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে না, বরং তিনি বাংলাদেশেও তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারবেন। এখন দেখার পালা, ১৯ মে’র পর তিনি আমাদের কোনো সুখবর দেন কিনা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আমাদের মুখ্য নয়। আমাদের কাছে বিবেচ্য, আমাদের স্বার্থ। আর তিস্তার পানিবণ্টনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বার্থ নিশ্চিত হতে পারে।
Daily Alokito Bangladesh
10.04.16

বঙ্গোপসাগরে ভারতের মিসাইল পরীক্ষা ও পরাশক্তির দ্বন্দ্ব

ঘটনাটি ছোট্ট। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী একটি প্রতিক্রিয়া রয়েছে। গত মার্চ মাসের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন থেকে পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত। এতে চীনের কোনো প্রতিক্রিয়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত না হলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মার্ক টোনার বলেছেন, এই মিসাইল পরীক্ষা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করবে। তিনি এ অঞ্চলের দেশগুলোকে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার ও উন্নয়ন কমিয়ে আনারও আহ্বান জানিয়েছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন, ভারত মহাসাগরে তিনটি পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত) তত্পরতা সাম্প্রতিক সময়গুলোয় বেড়েছে। এতে এ অঞ্চলে ‘প্রভাববলয় বিস্তারের’ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে একদিকে চীন ও ভারত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এই ‘দ্বন্দ্ব’কে কেন্দ্র করে ভারত মহাসাগরের অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোও ‘আক্রান্ত’ হচ্ছে। চীন যখন তার ওয়ান বেল্ট ওয়ান কোড কর্মসূচির আওতায় এ অঞ্চলের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করছে, ঠিক তখনই ভারত এগিয়ে এসেছে তার প্রাচীন ‘কটন রুট’ নিয়ে। ভারত এরই মধ্যে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে তার তত্পরতা বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও ব্রুনেইয়ের সঙ্গে চুক্তি করে সেখানে তার সামরিক তত্পরতা নিশ্চিত করেছে। এর আগে ভারত শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে যুদ্ধজাহাজ বিক্রমাদিত্যকে পাঠিয়েছিল। চীন-ভারত দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন অতি সম্প্রতি আন্দামান ও নিকোবর অঞ্চল তার বলে দাবি করেছে। পাঠকরা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন, কলম্বোতে গেল বছর চীনা ডুবোজাহাজের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কায় সরকার পর্যন্ত পরিবর্তন হয়েছিল। এই ডুবোজাহাজের উপস্থিতিকে ভারত দেখেছিল তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে। সাবেক শ্রীলঙ্কান রাষ্ট্রপতি রাজাপাকসে ছিলেন অতিমাত্রায় চীনানির্ভর। চীন শ্রীলঙ্কার হামবানতোতা ও কলম্বোয় দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি খুব সহজভাবে দেখেনি ভারত। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেখানে এক ধরনের হস্তক্ষেপ করে এবং সিরিসেনাকে রাজাপাকসের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে দাঁড় করায়। অবশ্য নির্বাচনে সিরিসেনা বিজয়ী হয়েছিলেন, এটা সত্য। ভারতে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় মহাসাগর তথা মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলকে ঘিরে নয়া ভারতীয় স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়েছে। গেল বছর (মার্চ) ভারতের ওড়িশার ভুবনেশ্বরে ভারতীয় মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘ইন্ডিয়ান ওশেন’-এর একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশও তাতে অংশ নিয়েছিল। সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সুস্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ভারত মহাসাগরে চীনের প্রবেশ ভারতের কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়। ভুবনেশ্বর শীর্ষ সম্মেলনের আগে মোদি সরকার মরিশাসে ভারতীয় ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে একটি চুক্তি করেছে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি মৈত্রী জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। এই জোটে মরিশাস ও সিসিলিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখারও উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল তথা ভারত মহাসাগর আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা। এই দুটি অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ‘সামরিক তত্পরতা’ লক্ষণীয়। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে একটি সামরিক ঐক্যজোট গঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন তার নৌবাহিনীর তত্পরতা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। কারণ এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। এদিকে ভারতও ভারত মহাসাগরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভারতের নৌবাহিনীর ‘নিউ ইস্টার্ন ফ্লিট’-এ যুক্ত হয়েছে বিমানবাহী জাহাজ। রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। আন্দামান ও নিকোবরে রয়েছে তাদের ঘাঁটি। ফলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা এর মধ্যেই চীন ও ভারতের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক ও দক্ষিণ এশিয়ার কর্তৃত্ব নিয়ে চীন ও ভারতের অবস্থান এখন অনেকটা পরস্পরবিরোধী। যেখানে চীনা নেতৃত্ব একটি নয়া ‘মেরিটাইম সিল্করুট’-এর কথা বলছে, সেখানে মোদি সরকার বলছে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক করিডর’-এর কথা। স্বার্থ মূলত এক ও অভিন্ন—এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই এশিয়ার এ দুটি বড় দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। আর এটাকেই কাজে লাগাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
একসময় মার্কিনি গবেষকরা একটি সম্ভাব্য চীন-ভারত অ্যালায়েন্সের কথা বলেছিলেন। জনাথন হোলসলাগ ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখিত একটি প্রবন্ধে Chindia (অর্থাৎ চীন-ভারত)-এর ধারণা দিয়েছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের (২০১৪ সাল) পর ধারণা করা হয়েছিল যে দেশ দুটি আরো কাছাকাছি আসবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা, চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সর্বশেষ চীনের আন্দামান-নিকোবর অঞ্চল দাবি দেখে মনে হয়েছে এই সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। নতুন আঙ্গিকে ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিনে’র ধারণা আবার ফিরে এসেছে। এই ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’ মনরো ডকট্রিনের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কারো কর্তৃত্ব ভারত স্বীকার করে নেবে না। একসময় এই এলাকা অর্থাৎ ভারত মহাসাগরীয় এলাকা ঘিরে ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ (২০০৭ সালে রচিত। শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার ঐক্য)-এর যে ধারণা ছিল, শ্রীলঙ্কায় সিরিসেনার বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা এখন আর কাজ করবে না। ফলে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী ধারণাকে আরো শক্তিশালী করতে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীনের ইউনান রাজ্য, ভারতের সাতবোন, মিয়ানমার) যে আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাতে এখন শ্লথগতি আসতে পারে। সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত এখন আর বিসিআইএম ধারণাকে ‘প্রমোট’ করবে না। আর বাংলাদেশের একার পক্ষে চীন ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে ‘বিসিএম’ ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না। ভারত এখন উপ-আঞ্চলিক জোট বিবিআইএনের কথা ভাবছে।
ভারতের কর্তৃত্ব করার প্রবণতা এ অঞ্চলের দৃশ্যপটকে আগামী দিনে বদলে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও লক্ষণীয়। ভারত বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। এখানে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ছে। ফলে এখানে মার্কিনি স্বার্থ থাকবেই। এ অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থের অপর একটি কারণ হচ্ছে চীন। চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’র একটি অপকৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘কৌশলগত সম্পর্কে’ নিজেদের জড়িত করেছে। এই দুই দেশের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। তবে ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ স্ট্র্যাটেজি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ স্ট্র্যাটেজি শুধু প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে রচিত হলেও এখন তা সম্প্রসারিত হয়েছে ভারত মহাসাগরে। একই স্ট্র্যাটেজির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে ভারত মহাসাগরকে, যাকে ওবামা আখ্যায়িত করেছেন 'Pivot to Asia' হিসেবে। বাংলাদেশও এই স্ট্র্যাটেজির আওতায়। এই স্ট্র্যাটেজির অন্তর্ভুক্ত চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য এখানে মোতায়েনরত যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ ফ্লিটের ছয়টি যুদ্ধজাহাজকে ভারত মহাসাগরে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। এতে চীনা নেতাদের উদ্বেগ ও শঙ্কা বাড়ছে। অতি সম্প্রতি ওয়াশিংটনে (১ এপ্রিল) যে চতুর্থ পারমাণবিক নিরাপত্তা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, সেখানে ওবামার সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আলাপচারিতায় চীনা নেতা তাঁদের উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে Terminal High Altitude Area Defense (THAAD) আলোচনা শুরু করেছে; যদিও বলা হচ্ছে THAAD এক ধরনের মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় আগত শত্রুপক্ষের মিসাইল ধ্বংস করা)। কিন্তু চীন মনে করছে, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোকে চীন মনে করছে তাদের ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে’র প্রতি এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। ওবামা-শি চিনপিং আলোচনায় এই প্রসঙ্গগুলো উত্থাপিত হয়েছে এবং শি চিনপিং এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে চীন এ ধরনের ‘কর্মকাণ্ড’ সহ্য করবে না। স্পষ্টতই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভূমিকা’ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তাতে এটা স্পষ্ট, ওই ভূমিকা এই অঞ্চলে চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। ফলে এ অঞ্চল অর্থাৎ ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে আগামী দিনগুলোতে যে এক ধরনের প্রভাববলয় বিস্তার করার প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মধ্যেই মিয়ানমারে একটি নয়া সরকার গঠিত হয়েছে। অং সান সু চি আগামী দিনে মিয়ানমারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ভূমিকা’ পালন করতে যাচ্ছেন। মিয়ানমারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাড়ছে। মিয়ানমারের জ্বালানিসম্পদ, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে গ্যাস ও তেল প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে আগামী দিনে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। এই জ্বালানিসম্পদের ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে ভারতেরও, যেখানে ভারতের বিনিয়োগ বাড়ছে। স্পষ্টতই ভারত মহাসাগরকে ঘিরে একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন ও মধ্যখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজ নিজ স্ট্র্যাটেজি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই স্ট্র্যাটেজি এই দেশগুলোর স্বার্থে কতটুকু আঘাত করে কিংবা এই স্ট্র্যাটেজি আদৌ কোনো ‘সংঘর্ষের’ পর্যায়ে রূপ নেয় কি না, তা দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। Daily Kalerkontho 10.04.16

তিস্তার জট খুলবে কি?

পশ্চিমবাংলার বিধানসভার নির্বাচন শুরু হলো আজ। সম্প্রতি জরিপে বলা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছে। ২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিল এবং মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। এখন যে প্রসঙ্গটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি পুনরায় ক্ষমতায় এলেও তিস্তার পানিবণ্টনের সমস্যার কি সমাধান হবে?তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তার পানিচুক্তি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ওই চুক্তিটি সাক্ষরিত হবার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জির কারণে। তখন অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক বলেছিলেন, বিধানসভার নির্বাচন থাকায় মমতা তখন কোনো চুক্তিতে সম্মত হননি। কেননা এটা পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তার পানিবণ্টনকে ইস্যু করে তিনি উত্তরবঙ্গে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন। তখন যদি চুক্তি হত এবং তাতে বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগের ওপর পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হত, তাতে তার ভোট কাটত। তিনি জনপ্রিয়তা হারাতেন। এখন এই এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ হবে, তাই ঝুঁকি তিনি নেননি ভোটের স্বার্থে। একটি ‘সমঝোতায়’ আসতে তিনি এখন রাজি হতে পারেন। তবে তা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নয়। ঢাকায় এসে তিনি সেই পুরনো কথাই বলেছিলেন—তার উপর আস্থা রাখতে। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তার পানিচুক্তি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ওই চুক্তিটি সাক্ষরিত হবার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জির কারণে। তখন অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক বলেছিলেন, বিধানসভার নির্বাচন থাকায় মমতা তখন কোনো চুক্তিতে সম্মত হননি। কেননা এটা পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তার পানিবণ্টনকে ইস্যু করে তিনি উত্তরবঙ্গে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন। তখন যদি চুক্তি হত এবং তাতে বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগের ওপর পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হত, তাতে তার ভোট কাটত। তিনি জনপ্রিয়তা হারাতেন। এখন এই এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ হবে, তাই ঝুঁকি তিনি নেননি ভোটের স্বার্থে। একটি ‘সমঝোতায়’ আসতে তিনি এখন রাজি হতে পারেন। তবে তা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নয়। ঢাকায় এসে তিনি সেই পুরনো কথাই বলেছিলেন—তার উপর আস্থা রাখতে। দ্বিতীয়ত, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একবার তিনি একটি ফর্মুলা দিয়েছিলেন—শতকরা ৭৫ ভাগ পানি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেয়া। এই ফর্মুলায় বাংলাদেশ রাজি হয়নি তখন। কেননা এতে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। তৃতীয়ত, মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের পানি-বিশ্লেষক কল্যাণ রুদ্রকে আহবায়ক করে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একটা সুপারিশ করা। রুদ্রকমিশন তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন (যার আংশিক রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল), পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এও মত দিয়েছিলেন যে, ‘ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমারও তার সাথে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু যতদূর জানা যায়, মমতা ব্যানার্জি রুদ্রকমিশনের মতামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে কারণে রুদ্রকমিশনের রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। আজ তিনি সেই রুদ্রকমিশনের ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগিতে রাজি হবেন, এটা মনে হয় না।
চতুর্থত, তাহলে তিনি কী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবে রাজি হয়ে এখন নির্বাচনের পর একটি চুক্তিতে রাজি হবেন? অতীতে মনমোহন সিংয়ের সাথে তার ঢাকায় আসা চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে তিনি বেঁকে বসেছিলেন। পরে এসেছিলেন মোদির সঙ্গে। কিন্তু কোনো চুক্তিতে সম্মত হননি। নির্বাচনের পর তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, তা দেখার বিষয়।
এখানে অনেকগুলো সম্ভাবনা আছে। একটি ‘প্যাকেজ ডিল’র আওতায় তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হত না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি এই আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মমতা ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে।
আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ এই তিনটি রাজ্য এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছিলেন এই তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা এসেছিলেন। তিস্তা এখানে প্রধান বিষয় ছিল না। অনেক পরিকল্পনা মমতা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না যদি না কেন্দ্র তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে। তখন সামনে নির্বাচন ছিল। মমতা তাই ঝুঁকিটি নিতে চাননি।
পঞ্চমত, কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআিই’র একটি চাপ ছিল মমতার উপর। সারদা কেলেঙ্কারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের উপর সিবিআই তার নজরদারী বাড়িয়েছে। ফলে এই ‘চাপ’কে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সাথে ঢাকায় আসতে রাজি হয়েছিলেন। কোনো চুক্তি করতে নয়।
ষষ্ঠ. মমতা ব্যানার্জি পুনরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা) জোটে যোগ দিতে পারেন। একসময় তিনি এই জোটে ছিলেন। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন।এখন যদি পশ্চিমবঙ্গে তার বিজয় নিশ্চিত হয়ও সব কেলেঙ্কারি থেকে ‘মুক্ত’ হতে তিনি যদি আবারো এনডিএ জোটে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সপ্তম. যতদূর জানা যায়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে ঢাকায় আসেননি একটাই কারণে; আর তা হচ্ছে, ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সাথে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনোপুত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না।
ঢাকা সফরের আগে মোদি তাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সাথে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন। মমতা কথা বলেছিলেন। কূটনৈতিক বিষয়ে বলেছিলেন তার উপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। এখন নির্বাচন শেষ হবে। এবং সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি আগামী পাঁচ বছরের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পাবেন।
বিহারে নীতিশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে (বিহারের রাজধানী পাটনায়) তিনি যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটা মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সাথে তার কোনো সহাবস্থান হল না। জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য করল বামফ্রন্টের সাথে। তার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য না করা কেন্দ্রে মোদি সরকারকে খুশি করে থাকবে। ফলে মমতা যদি না চান, তাহলে তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে মোদি সরকার তাকে চাপ দেবে না।
আমাদের জন্য তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার স্বীকৃত। ভারত (এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ তাই করছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পানিশূন্য হচ্ছে।
উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে লাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে এই নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে।
ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশে অংশের মোট ক্যাচমেট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রীপর্ষদের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানিপ্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্যে রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে প্রম্তাবনা উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানিবণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচপ্রকল্প হতে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে।
এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচপ্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচপ্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচপ্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারী জেলার অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তা প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ বাস্তবায়ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে।
কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধু নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত।এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তিটি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তা চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয় এটা বোঝেন। মমতা ব্যানার্জিকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। এখানে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। একটা কথা বিবেচনায় নিতে হবে। এপ্রিল মাসে বিধানসভা নির্বাচনের পর (পশ্চিমবঙ্গ) একটি সমঝোতা যদি হয়, তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে। আমরা যেন মমতা ব্যানার্জির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করি।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের পর পরই আমাদের উচিত হবে দ্বিমাসিক আলোচনায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রসঙ্গটি উপস্থাপন করা। আমাদের দাবি ভারত সরকারের কাছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে নয়। আমরা শুধু স্মরণ করিয়ে দেবো, মমতা ব্যানার্জি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। আস্থা রাখতে বলেছিলেন। সামনে শুষ্ক মৌসুম আসছে। সুতরাং তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নে এখনই আলোচনা শুরু করা জরুরী। Poriborton 04.04.16

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ও বিবিধ প্রসঙ্গ



পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন সামনে রেখে আবারো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রশ্নটি চলে এসেছে। ৪ তারিখ পশ্চিমবঙ্গের (একই সঙ্গে আসামেরও) বিধা সভার ২৯৪ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ দুই রাজ্যে একাধিক জনসভায় বক্তৃতা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। এরা তিনজনই একই সুরে অনেকটা 'বাংলাদেশবিরোধী' কথাবার্তা বলেছেন। মোদি নিজে বলেছেন বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসী আসছে এবং এদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে! পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশবিরোধী একটা জনমত সৃষ্টি করার বিজেপির কৌশল অনেক পুরনো। যদিও মমতা ব্যানার্জি এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাই ওই নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় মমতা ব্যানার্জি কথা দিয়েছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। আমরা চাই তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করবেন। এটা আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা। মোদির সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি ঢাকায় এলেও, মমতা তখন কোনো চুক্তিতে রাজি হননি। কেননা এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তার পানিবণ্টনকে ইস্যু করে তিনি উত্তরবঙ্গে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন। তখন যদি চুক্তি হতো এবং তাতে যদি বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগের ওপর পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হতো, তাতে তার ভোট কাটত। তিনি জনপ্রিয়তা হারাতেন। এখন এই এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ হবে তাই ঝুঁকি তিনি নেননি ভোটের স্বার্থে। একটি 'সমঝোতায়' তিনি তখন রাজি হতে পারেন। তবে তা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। ঢাকায় এসে তিনি সেই পুরনো কথাই বলেছিলেন। তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে তিনি একবার একটি ফর্মুলা দিয়েছিলেন_ শতকরা ৭৫ ভাগ পানি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেয়া। এ ফর্মুলায় বাংলাদেশ রাজি হয়নি তখন। কেননা এতে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। তৃতীয়ত, মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে আহ্বায়ক করে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একটি সুপারিশ করা। রুদ্র কমিশন তার সুপারিশে যা উল্লেখ করেছিলেন তার আংশিক পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে তিনি অভিমত দিয়েছিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়েও বাংলাদেশে তিস্তার ৫০ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। তিনি এও মত দিয়েছিলেন যে, 'ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি' ব্যবহার করে তিস্তার পানি মজুদ করা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণবকুমারও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু যতদূর জানা যায় মমতা ব্যানার্জি রুদ্র কমিশনের মতামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে কারণে রুদ্র কমিশনের রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেননি। আজ তিনি সেই রুদ্র কমিশনের ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগিতে রাজি হবেন, তা মনে হয় না। চতুর্থত, তাহলে তিনি কি নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবে রাজি হয়ে এখন নির্বাচনের পর একটি চুক্তি করবেন? অতীতে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ঢাকায় আসা চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেছিলেন। পরে এসেছিলেন মোদির সঙ্গে। কিন্তু কোনো চুক্তিতে সম্মত হননি। নির্বাচনের পর তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, তা দেখার বিষয়। এখানে অনেক সম্ভাবনা আছে। একটি প্যাকেজ ডিলের আওতায় তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল সমর্থন না করলে বিলটি পাস হতো না। কেন্দ্র থেকে তার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা দরকার। নরেন্দ্র মোদি ওই আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মমতা ঢাকায় আসার ব্যাপারেও সেই মানসিকতা কাজ করেছিল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল কানেকটিভিটির প্রশ্নটি। তিনি ভারতের এক অঞ্চলকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ_ এ তিনটি রাজ্য এ প্রক্রিয়ায় জড়িত। মোদি এজন্যই চেয়েছিলেন ওই তিন রাজ্যের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। তাই মমতা এসেছিলেন। তিস্তা এখানে প্রাধান্য ছিল না। অনেক পরিকল্পনা মমতা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না যদি না কেন্দ্র আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করে। তখন সামনে নির্বাচন ছিল। মমতা তাই ঝুঁকিটি নিতে চাননি। পঞ্চমত, কেন্দ্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইর একটি চাপ ছিল মমতার ওপর। সারদা কেলেঙ্কারি, তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর সিবিআই তার নজরদারি বাড়িয়েছে। ফলে এ 'চাপ'কে অনেকটা নিউট্রাল করতে তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হয়েছিলেন, কোনো চুক্তি করতে নয়। ষষ্ঠত, মমতা ব্যানার্জি পুনরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএতে যোগ দিতে পারেন। একসময় তিনি এ জোটে ছিলেন। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছেন। এখন যদি পশ্চিমবঙ্গে তার বিজয় নিশ্চিত হয় ও সব কেলেঙ্কারি থেকে 'মুক্ত' হতে তিনি যদি আবারো এনডিএতে ফিরে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সপ্তমত, যতদূর জানা যায় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেননি একটাই কারণে। আর তা হচ্ছে মমতাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে চাচ্ছিল, যা মমতার মনঃপূত হয়নি। ভারতের সংবিধানে রাজ্য সরকারের কিছুটা অধিকার স্বীকৃত। রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র এককভাবে কোনো চুক্তি করতে পারে না। ঢাকা সফরের আগে মোদি তাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি ঢাকায় তিস্তার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করবেন না এবং তিস্তার ব্যাপারে ঢাকার সঙ্গে কোনো কথা হবে না। যদি কথা বলতেই হয়, এ ব্যাপারে মমতাই কথা বলবেন
মমতা কথা বলেছিলেন। কূটনৈতিক ভাষায় বলেছিলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। এখন নির্বাচন শেষ হবে এবং সব কিছু ঠিক থাকলে তিনি আগামী পাঁচ বছরের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পাবেন। বিহারে নীতিশকুমারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে (বিহারের রাজধানী পাটনায়) তিনি যোগ দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটা মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার কোনো সহাবস্থান হলো ন। জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য করল বাম ফ্রন্টের সঙ্গে। তার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য না করা কেন্দ্রে মোদি সরকারকে খুশি করে থাকবে। ফলে মমতা যদি না চান, তাহলে তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে মোদি সরকার তাকে চাপ দেবে না। আমাদের জন্য তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার স্বীকৃত। ভারত (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ তাই করছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে এলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা; লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ; রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা; কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া ১ হাজার ৭১৯ কিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানিপ্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এ রকম কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি_ এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না, এ দাবি উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর তিস্তার পানিবণ্টনের জট খোলেনি। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়ার ৩৫টি উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক ও শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালের আগস্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের প্রথম ফেজ কাজের উদ্বোধন করে। এরপর ভারত ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে। এর ফরে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। এদিকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার (নীলফামারীর অন্তর্গত) বাহাগিলি নামক স্থানে তিস্তার দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। কিন্তু পানির অভাবে তিস্তা এখন নামে আছে। পানি নেই বললেই চলে। ভরাট হয়ে গেছে ৬৫ কিলোমিটার নদী। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন, ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি সেখানে স্বীকৃত। এখানে ভারতের কাছে চাওয়ার কিছু নেই। মমতা ব্যানার্জির আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা চুক্তিটি হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তিস্তু চুক্তি না হলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়ই তা বোঝেন। মমতা ব্যানার্জিকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। এখানে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। এখানে একটি কথা বিবেচনায় নিতে হবে। চলতি বিধানসভা নির্বাচনের পর (পশ্চিমবঙ্গ) একটি সমঝোতা যদি হয়, তাতে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। আমরা যেন মমতা ব্যানার্জির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করি।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের পরপরই আমাদের উচিত হবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নটি উত্থাপন করা। আমাদের দাবি ভারত সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে নয়। আমরা শুধু স্মরণ করিয়ে দেব মমতা ব্যানার্জি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। আস্থা রাখতে বলেছিলেন। সামনে শুষ্ক মৌসুম আসছে। সুতরাং তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্নে এখনই আলোচনা শুরু করা জরুরি। সেই সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের যে ঘোষণা দিয়েছেন, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানোর প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশ থেকে কোনো অভিবাসী ভারতে যায় না। যারা পশ্চিমবঙ্গে কিংবা আসামে বাংলা ভাষায় কথা বলেন, তারা সবাই ভারতের নাগরিক। তুাদের সবার নাগরিকত্বের সনদপত্র আছে। রেশনকার্ড আছে। তারা সবাই ভারতের নাগরিক। তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা কোনো বন্ধুসুলভ আচরণ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পেঁৗছেছে। দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে। ভারতকে আমরা ট্রানজিট দিয়েছি। ভারত থেকে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। নতুন একটি উপ আঞ্চলিক সহযোগিতার (বিবিআইএম) প্রস্তাব করা হয়েছে।
ধারণা করছি, আগামী এক দশকে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিপূর্ণভাবে বদলে যাবে। বাংলাদেশ এ থেকে উপকৃত হবে। কিন্তু সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের ঘোষণা করা, অবৈধ অভিবাসীদের কথা বলে বাংলাদেশকে কটাক্ষ করা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলে না। আমরা ধারণা করছি এ সবই নির্বাচনী কথা। ভোট কাটতে রাজনীতিবিদরা এ ধরনের কথা বলে থাকেন। আমরা খুশি হতাম যদি মমতা ব্যানার্জি এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ করতেন। তিনি তা করেননি। এখন মমতা যদি বিধানসভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় থেকে যান, আমাদের প্রত্যাশা একটাই তিনি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন এবং একটি চুক্তিতে উপনীত হতে কেন্দ্রকে রাজি করাবেন। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এটাই।
Daily Jai Jai Din04.04.16

কী ঘটবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে

আজ সোমবার ৪ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন। পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো অতি সহজ ছিল না। কিন্তু কাজটি করতে পেরেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তার দল যখন বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়, তখন তিনি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী। প্রথমে তিনি বিধানসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। পরে ছয় মাস পর বিধানসভার একটি উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাকে বিধানসভায় আসতে হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের ওই বিজয় (২৯৪ আসনে ১৮৫টি, শরিক কংগ্রেসের ৪১, বামফ্রন্ট ৬৩) সেদিন এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ১৯৭৭ সালের পর থেকেই ওই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট। ২০১১ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল ‘মমতা যুগের’। আজ আবার সুযোগ এলো ভোটের রাজনীতিতে মমতাকে পরখ করার। আদৌ কি সেখানে পরিবর্তন আসবে? কিংবা গেল পাঁচ বছর মমতার সাফল্যই বা কী?

এখানে অবশ্য আরও একটা কথা বলা দরকার। তা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের পাশাপাশি আসামের বিধানসভার নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৪ এপ্রিল বিধানসভার ৬৫ আসনে প্রথম পর্যায়ের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে এ দুই রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই কেন্দ্রীয় সরকারের নেতাদের। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ দুই রাজ্যে জনসভায় বক্তৃতা করেছেন। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও এসেছিলেন এ অঞ্চলে। যদিও জনমত জরিপ বলছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে সরানো হবে কঠিন কাজ। তবে পরিবর্তন আসতে পারে আসামে। এবিপি আনন্দ ও নিয়েলসেনের একটি যৌথ জনমত জরিপ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ৪৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট পেতে পারে ৪৪ শতাংশ ভোট। বিজেপি ৫ শতাংশ এবং অন্যরা ৬ শতাংশ ভোট পেতে পারে। ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল পেতে পারে ১৭৮টি। আর বামফ্রন্ট-কংগ্রেস পেতে পারে ১১০টি আসন।

পাঠক স্মরণ করুন, ২০১১ সালের বিধানসভার নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। আর এবার ঘটল উল্টোটি, অর্থাৎ কংগ্রেস এবার জোট গড়েছে বামফ্রন্টের সঙ্গে। জরিপে বিজেপির ঝুলিতে মাত্র একটি আসন যেতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। আসামের ক্ষেত্রে জরিপ বলছে ১২৬ আসনের আসাম বিধানসভায় কংগ্রেস মাত্র ৩৬টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি-অসম গণপরিষদ আর বিপিএফ জোট পেতে পারে ৭৮ আসন। এর বাইরে মাওলানা বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বাধীন এআইইউডিএফ পেতে পারে ১০ আসন। আসামে ক্ষমতায় আছে তরুণ গগৈর নেতৃত্বে কংগ্রেস। তবে জনমত জরিপ যে সবসময়ই সত্য প্রমাণিত হয়, তা নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দুটি রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের। কারণ তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় মমতা ব্যানার্জিও সঙ্গে এসেছিলেন। বলেছিলেন, তিস্তা চুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমরা জানতাম এটি খোদ পশ্চিমবঙ্গে একটি ইস্যু। নির্বাচনে বিজেপি এটা মমতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। তাই অত্যন্ত কৌশলী মমতা তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে বিধানসভার নির্বাচনের আগে কোনো ‘কমিটমেন্টে’ যেতে রাজি হননি। তাই এ নির্বাচনটি আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় এসে তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন ‘অপেক্ষা করার’ জন্য। এখন দেখা যাক নির্বাচনের পর এ অপেক্ষার পালা শেষ হয় কি-না।

তবে বলা যেতে পারে, সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচনের গুরুত্ব আছে। প্রথমত, এ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ঐক্য করেছে বামফ্রন্টের সঙ্গে। অথচ গেল বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নির্বাচনী মিত্র ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। স্মরণ করা যেতে পারে, মমতা ব্যানার্জি একসময় যুব কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। যুব কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। কংগ্রেস বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তেমন জনমত তৈরি করতে পারেনি। কংগ্রেসের ব্যর্থতাই মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছিল। এবার কংগ্রেস ফিরে গেছে বাম শিবিরে। শুধু তাই নয়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে যে নির্বাচনী ঐক্য হয়েছে, সেখানে মুলায়াম সিংয়ের সমাজবাদী পার্টি, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সংযুক্ত জনতা দলকে দুটি করে আসন দেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গেও মহাজোট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হল। বিহারে বিজেপি উৎখাতে সেখানে মহাজোট গঠিত হয়েছিল। সংযুক্ত জনতা দল নেতা নীতিশ কুমারকে সেদিন সমর্থন দিয়েছিল সবাই- রাষ্ট্রীয় জনতা দল (লালুপ্রসাদ), মুলায়াম সিংয়ের সমাজবাদী পার্টি। এমনকি পাটনায় মহাজোট সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন মমতা ব্যানার্জি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক, জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ প্রমুখ। মুলায়াম সিং যাদব ও তার ছেলে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদব ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলেও তাদের সমর্থন ছিল। বিহারে মহাজোটের অন্যতম শরিক কংগ্রেসের সুপ্রিমোর পুত্র রাহুল গান্ধী, সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরিও উপস্থিত ছিলেন। ফলে কেন্দ্রে মোদিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি মহাজোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই। পশ্চিমবঙ্গে এর কিছুটা হলেও প্রতিফলন ঘটেছে। যদিও এখানে তৃণমূল হয়েছে টার্গেট। এখানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে অন্যরা।

দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপি আবারও অভিবাসী ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে। মোদি, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে তথাকথিত বাংলাদেশী অভিবাসীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি প্রকাশ পেয়েছে। অনেকে বলার চেষ্টা করেছেন, এসব কথার কথা। কিন্তু এটা তো সত্য- ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে এই ‘মুসলমান বিদ্বেষ’ লক্ষ্য করা গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর ২৭ শতাংশ হচ্ছে মুসলমান। এ জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ আবার উর্দুভাষী। অবশিষ্টরা বাংলাভাষী। উর্দুভাষীরা মমতাকে পছন্দ করেন। আর বাংলাভাষীরা এতদিন সিপিএম ও কংগ্রেসকে সমর্থন করে আসছিলেন। এদের একটা অংশ ইদানীং মমতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মোদি যখন লোকসভা নির্বাচনের আগে বাংলা ভাষাভাষীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, তখন মমতা এদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। উল্লেখ্য, মমতার পূর্বপুরুষরা একসময় যশোরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে মমতার বাবা-দাদারা কলকাতায় চলে যান। মমতার জন্ম কলকাতায়। এখন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘বাংলাদেশবিরোধী’ কথাবার্তা, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের ঘোষণা সঙ্গতকারণেই বাংলাদেশে একটি ভুল মেসেজ পৌঁছে দিতে পারে।

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, এমনকি তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বোমাবাজির (খগড়াগড় বোমা বিস্ফোরণ) অভিযোগ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে মমতার কোনো বিকল্প নেই। তিনি পশ্চিমবঙ্গে নিজেকে একটি ‘প্রতিবাদী চরিত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দীর্ঘ ১২ বছর (ক্ষমতায় যাওয়ার আগে) তিনি একাকী লড়াই করে গেছেন বামদের ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য। ২০০৬ সালে হুগলির সিঁন্দুরে মোটর কারখানা গড়ার বিরুদ্ধে তিনি কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে কৃষি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন কৃষি জমিতে কেমিক্যাল কারখানা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছিল, তিনি এর প্রতিবাদ করে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। নন্দীগ্রামে সেদিন পুলিশ গুলি চালিয়ে ১৪ কৃষককে হত্যা করেছিল। তিনি দীর্ঘ ২৬ দিন সিঁন্দুর আর নন্দীগ্রামের ঘটনার প্রতিবাদে অনশন পর্যন্ত করেছিলেন। ‘আজীবন প্রতিবাদী’ অথচ ‘ঠিক পাশের বাড়ির মেয়েটির’ মতো একটি ইমেজ মমতা ব্যানার্জি গড়ে তুলেছিলেন। সাধারণ সুতির শাড়ি, পায়ে স্যান্ডেল পরা মমতা ব্যানার্জি নিজে একাই একশ’। পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর বিকল্প তিনি নিজে। পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস মমতা ব্যানার্জির কারণে একরকম বিলীন হওয়ার পথে। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগও আছে। তিনি নিজে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তার দলের নেতাকর্মীদের মাঝে দুর্নীতি আছে। বর্ধমানে জঙ্গিদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল, যা দমন তথা নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী লালন করার অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করেনি। ফলে গত ৫ বছরে তার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা হয়েছে কম। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে একাধিকবার তিনি বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন। তিস্তা চুক্তি করার ব্যাপারে তার ওপর ‘চাপও’ আছে। সে চাপ তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। এখন দেখতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিধানসভা নির্বাচনে কী করে।

জনমত সমীক্ষা যদি সত্য হয়, তাহলে ভোটের শতকরা হিসাবে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস ‘ঐক্যের’ সঙ্গে তার প্রাপ্ত ভোটের হারের ব্যবধান খুব কম- ৪৫ ও ৪৪ শতাংশ- অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে মমতা আবারও অন্য একরকম ‘চাপের’ মুখে থাকবেন। কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে মহাজোট গঠনের পরিকল্পনা (বিহার মডেল) ‘আঁতুড় ঘরেই’ ভেস্তে যেতে পারে। বিহার মডেল কাজ করলেও ভারতব্যাপী এ মডেল একটি বড় ধাক্কা খেতে পারে। আর এতে করে লাভ হবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের। ভারতীয় রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জি ‘মোস্ট আনপ্রেডিকটেবল’ ক্যারেক্টর। তাকে বোঝা খুব কঠিন। বিজেপির সঙ্গে কেন্দ্রে তিনি ছিলেন। আবার বেরিয়েও এসেছিলেন। আবারও যেতে পারেন। গেল বিধানসভার নির্বাচনে সোনিয়া গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় তৃণমূল কংগ্রেসের মঞ্চে এসে বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। এবার সোনিয়া নেই। সোনিয়া এবার বাম ঘরানায় আশ্রয় নিয়েছেন। যৌথ একক প্রার্থী মনোনয়নে কংগ্রেসের সঙ্গে বামদের কোনো কোনো আসনে সমঝোতা হয়নি, এটা সত্য। এতে সুবিধা নিতে পারে তৃণমূল। মমতা ব্যানার্জি আবারও বিজয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী থেকে যাচ্ছেন বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। এখন দেখতে হবে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে তার ব্যবধানটা কী দাঁড়ায়। মমতা বিজয়ী হলেও আমাদের আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ তিনি প্রথমে দেখবেন পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ। সেক্ষেত্রে তিস্তার পানি বণ্টনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। Daily Jugantor 04.04.16

জঙ্গি তৎপরতা : প্যারিস থেকে লাহোর

গত নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে যে ‘সন্ত্রাসী হামলার ঢেউ’-এর সৃষ্টি হয়েছিল, তা ব্রাসেলস হয়ে সর্বশেষ ঘটনায় লাহোরে আছড়ে পড়ল। প্যারিস কিংবা ব্রাসেলস হামলার সঙ্গে একটা ‘মিল’ থাকলেও লাহোরে একই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে, তা বলা যাবে না। প্যারিস আর ব্রাসেলস হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল ইসলামিক স্টেট বা আইএসের জঙ্গিরা। অন্যদিকে লাহোরে এ সন্ত্রাসী হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেছে ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) ভেঙে গঠিত হওয়া কট্টরপন্থি ‘জামাত উল আহরার’। এটা এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, ‘জামাত উল আহরার’-এর সঙ্গে আইএসের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। আইএস তাদের স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন এনেছে। কিছু দিন আগ পর্যন্ত আইএস তার সন্ত্রাসী কর্মকা- সীমাবদ্ধ রেখেছিল সিরিয়া ও ইরাকে। ইন্দোনেশিয়ার ঘটনাবলি দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে, আইএস যে ‘দূরবর্তী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, তার অংশ হিসেবেই তারা ‘কাতিনা নুসানতারা’ নামে সেখানে একটি সংগঠন গড়ে তুলে বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে ইসলামিক জঙ্গিরা তৎপর। এদের কর্মকা- একাধিকবার আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্ম দিয়েছে। ফিলিপাইনে আবু সায়াফ গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা ইন্দোনেশিয়ায় জামিয়া ইসলামিয়ার হাতে বিদেশি নাগরিকদের হত্যাকা-ের ঘটনা এ দেশ দুটো সম্পর্কে বিশ্বে একটি বাজে ধারণার জন্ম দিয়েছে। এ অঞ্চলে আইএসের নেটওয়ার্ক কতটুকু সম্প্রসারিত হয়েছে, তা জানা না গেলেও আল কায়েদার প্রভাব আছে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আল কায়েদা একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকা- বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের জঙ্গিরাও যে এতে করে উৎসাহিত হবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
সাম্প্রতিক সময়গুলোয় জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে জড়িত করলেও অভিযুক্ত জঙ্গিদের ব্যক্তিজীবন ও তাদের জীবনধারা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। প্যারিস হামলার মূল পরিকল্পনাকারী আবদেল হামিদ আবাউদ নিজে কোনোদিন কোরআন পড়েননি। নামাজও পড়তেন না। তার চাচাতো বোন হাসনা পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জীবনে বিশ্বাসী ছিলেনÑ এমনটাই জানা যায়। ফলে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই বলেই অনেকে মনে করেন।
যে প্রশ্নটি এখন অনেকেই করার চেষ্টা করেন, তা হচ্ছে এর শেষ কোথায়? প্যারিস কিংবা ব্রাসেলস ট্র্যাজেডিই কী শেষ? যেভাবে ব্রাসেলসে এখনো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে তাতে করে কি এ ধরনের হামলা আগামীতে রোধ করা সম্ভব হবে? এর জবাব সম্ভবত না বাচক। কেননা ইউরোপে তো বিশাল এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে আইএস। একটি ‘শক্তি’ তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছে। সম্ভবত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে এ আন্দোলনের পেছনে। সুদূরপ্রসারী একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানো হচ্ছে। এবং আগামীতেও হবে বলে আশঙ্কা করছি। কতগুলো উদ্দেশ্য পরিষ্কার। ৯/১১-এর পর যেভাবে একটি ‘মুসলমানবিদ্বেষী’ মনোভাব সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে গিয়েছিল, আজ প্যারিস ও ব্রাসেলস ঘটনাবলির পর সারা ইউরোপেও তেমনি একটি ‘মুসলমানবিদ্বেষী’ মনোভাব ছড়িয়ে গেছে। এখানে মুসলমানরা (যেসব শরণার্থীকে ইতোমধ্যে ইউরোপে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে) সব সময় থাকবেন এক ধরনের ‘নিরাপত্তাবলয়’-এর ভেতর। তাদের সব কর্মকা- মনিটর করা হবে। তারা ইউরোপে আশ্রয় পেয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের এক ধরনের ‘বস্তি’ জীবনযাপনে বাধ্য করা হবে। তাদের জন্য তৈরি করা হবে ‘কংক্রিটের বস্তি’ এবং সেখানেই তাদের বসবাসে বাধ্য করা হবে। ইউরোপের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা নিষিদ্ধ করা হবে। জার্মানিতে হিটলার যেভাবে ইহুদিদের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ রাখতেন কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী যুগে যেভাবে হোমল্যান্ড সৃষ্টি করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে রাখা হতো, অনেকটা সেভাবেই সিরীয় মুসলমান অভিবাসীদের এখন এক ধরনের ‘ফোটো’ জীবনযাপনে বাধ্য করা হবে। উগ্রপন্থিরা তথা কনজারভেটিভরা প্যারিস ঘটনায় ‘উপকৃত’ হয়েছে। ফ্রান্সে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তারা নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। এখন তাদের দিয়ে এক ধরনের ‘নোংরা রাজনীতি’ করানো হবে। অর্থাৎ ‘ইউরোপ হবে মুসলমানমুক্ত’Ñ এ ধরনের একটি সেøাগান ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে পোল্যান্ডসহ বেশ কটি দেশ মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের বাদ দিয়ে খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বী শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সেখানে কট্টরপন্থিরা সক্রিয় হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এর বড় প্রমাণ। তার মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব রুখতে আইএসকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘অবস্থান’ করতে সাহায্য করবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৬৫ দেশের সমন্বয়ে একটি আইএসবিরোধী অ্যালায়েন্স রয়েছে। রাশিয়া এ জোটে নেই। কিন্তু রাশিয়া আলাদাভাবে আইএসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। তবে অচিরেই আইএসবিরোধী অভিযানে ফাটল দেখা দেবে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে যদি ফাটল থাকে, তাতে লাভ ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের। অধ্যাপক চস্সুডোভস্ক্রি তার বহুল আলোচিত ঞযব মষড়নধষরুধঃরড়হ ড়ভ ধিৎ : ধসবৎরপধ’ং ষড়হম ধিৎ ধমধরহংঃ যঁসধহরঃু গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের সর্বত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ‘হাত’ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে যে অভিযান পরিচালনা করে আসছে তাতে মূলত তিনটি উদ্দেশ্য কাজ করছে। গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সরকার পরিবর্তন। ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে এ স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করা হয়েছে। সিরিয়ার ক্ষেত্রে এ স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করা হলেও তা সফল হয়নি। এ স্ট্র্যাটেজি কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারেনি। যেসব দেশে এ স্ট্র্যাটেজি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানে দারিদ্র্য বেড়েছে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে এবং এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে (ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া)। মানবাধিকার রক্ষা ও পশ্চিমা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা এখানে কোনো সুফল বয়ে আনেনি।
ইউরোপ কিংবা পশ্চিম আফ্রিকায় অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী কর্মকা-ে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেখানে সন্ত্রাসীরা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। সন্ত্রাসীরা প্যারিস কিংবা ব্রাসেলসের সমাজজীবনের কত গভীরে প্রবেশ করেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একাধিক স্থানে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। খোদ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ যখন একটি স্টেডিয়ামে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করছিলেন, ওই স্টেডিয়ামের বাইরে তখন তিন আত্মঘাতী বোমারু নিজেদের বিস্ফোরণের মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়েছিল। গোয়েন্দারা এটা আঁচ করতে পারেনি। চিন্তা করা যায়, সন্ত্রাসীরা কালাসনিকভ রাইফেল ব্যবহার করে ‘পাখির মতো’ নির্বিচারে একটি কনসার্ট হলে মানুষ হত্যা করেছিল? এ রাইফেল সিরিয়া থেকে আসেনি। সংগ্রহ করা হয়েছিল ফ্রান্সের ভেতর থেকেই। ফ্রান্সে যে এ রকম একটি হামলা হতে পারে তা ইসলামিক স্টেটের প্রপাগান্ডা ম্যাগাজিন ‘দাবিক’-এ (উধনরয়) ফেব্রুয়ারির সপ্তম সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছিল। ফ্রান্সে কেন, সারা ইউরোপীয় রাষ্ট্র তথা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এখানেই যে ‘দাবিক’-এ অভিযুক্ত আবাউদের (ফ্রান্সে তার পরিচিতি ছিল আবু উমর আল বালঝিকি নামে) সাক্ষাৎকার ছাপা হলেও তা প্রতিরোধে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। যেমনটি তারা নিতে পারেনি নিউইয়র্কে ‘টুইন টাওয়ার’-এর ক্ষেত্রেও।
২০০১ সালে অস্তিত্ব ছিল আল কায়েদার। আজ দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামিক স্টেট। টার্গেট একটাইÑ মুসলমানবিরোধী একটা জনমত গড়ে তোলা। ২০০১ সালের পর দীর্ঘদিন মুসলমানবিরোধী একটা মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন মুসলমানরা, যারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তারা সেখানে একটা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। সেই পরিবেশ থেকে বের হয়ে এসে মুসলমানরা যখন মার্কিন সমাজে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, ঠিক তখনই ক্যালিফোর্নিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকা-ে আইএসের সম্পৃক্ততা ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিল। তাসফিন-রিজওয়ান দম্পতি যে বাড়িতে থাকতেন, সেখানে পুলিশ ‘হানা’ দিয়ে বেশ কিছু বিস্ফোরকও পেয়েছে। এ খবরও আমরা পেয়েছি পত্রপত্রিকা থেকে। এই ঘটনা মার্কিন সমাজে যে প্রভাব ফেলবে, মুসলমানবিদ্বেষী একটা মনোভাব যে আবারও সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে, তা এক রকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব কেন শক্তিশালী হয়েছে, তার স্পষ্ট কারণও রয়েছে। তুলনামূলক বিচারে মার্কিন সমাজে মুসলমানরা অতটা ভয়ঙ্কর নয়, বরং শান্ত ও শিক্ষিত। মাত্র ১ শতাংশ মুসলমান বাস করে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০৫০ সালে তা হবে ২ দশমিক ১ শতাংশ। মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার হারে দ্বিতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী। এমনকি মার্কিনিদের চেয়েও মুসলমানরা শিক্ষিত। প্রথম অবস্থানে রয়েছে ইহুদিরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২ হাজার ৫শ মসজিদ রয়েছে, যে মসজিদগুলো প্রধানত জাতিগতভাবেই প্রতিষ্ঠিত। যেমনÑ বাংলাদেশি মুসলমানদের যেমনি নিজস্ব মসজিদ রয়েছে, তেমনি পাকিস্তানি, আমেরিকানদেরও আলাদা মসজিদ রয়েছে। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর এই মসজিদগুলো বারবার আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশি আমেরিকানরা যেখানে বসবাস করেন (বিশেষ করে নিউইয়র্কে), সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তারা বাসাবাড়িতে মার্কিন পতাকা উত্তোলন করে রেখেছেন দীর্ঘদিন। সেই পরিস্থিতি অবশ্য এখন আর নেই। তবে সর্বশেষ ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনাবলির পর মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাবটা আবার চাঙ্গা হবে এবং রিপাবলিকানরা এটাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইস্যু করবেÑ এটা দিব্যি দিয়ে বলা যায়। একই ঘটনা ঘটবে ইউরোপে, বিশেষ করে যেসব দেশে মুসলমানরা বেশি বসবাস করে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, বেলজিয়াম, ইতালি বড় টার্গেট। এসব দেশে মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব শুধু শক্তিশালীই হবে না, বরং দক্ষিণপন্থিদের স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, জার্মানি ও ফ্রান্সের স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনে দক্ষিণপন্থিরা ভালো ফল করেছে।
এই জঙ্গি তৎপরতা এখন সম্প্রসারিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। পাকিস্তানে জঙ্গি তৎপরতা অনেক পুরনো। এই জঙ্গি তৎপরতা খোদ পাকিস্তানের অস্তিত্বকে এখন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীও আজ অসহায়। সর্বশেষ ঘটনায় লাহোরে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নির্বাচনী এলাকা, সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীরা পাকিস্তান সমাজের কত গভীরে প্রবেশ করেছে। এই জঙ্গি তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে যেতে পারে। ভয়ের কারণ এটাই। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে যদি এই সমস্যার মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে এই অঞ্চলে জঙ্গিবাদের আরও বিস্তার ঘটবে। চলতি বছরের শেষের দিকে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তানের সর্বশেষ জঙ্গি হামলা সেখানে একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এই জঙ্গি তৎপরতা সব ধরনের উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। দারিদ্র্যের পাশাপাশি এই সন্ত্রাসবাদ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমস্যা। ব্রাসেলস হামলার পর লাহোরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৭২ জনের (যাদের মাঝে নারী ও শিশু অনেক) মৃত্যুর ঘটনা থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু।
Daily Amader Somoy
03.04.16

ব্রাসেলসের ঘটনা যে বার্তা দিয়ে গেল

২২ মার্চ ২০১৬ তারিখে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্যাসেলসে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের সন্ত্রাসী হামলার পর যে প্রশ্নটি এখন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে এই সন্ত্রাসী হামলা কী বার্তা দিয়ে গেল আমাদের। ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দরের বহির্গমন বিভাগে দুটি বিস্ফোরণ এবং এর ঘণ্টাখানেক পর মায়লবেক মেট্রো স্টেশন বোমা হামলায় ৩৬ জন নিহত হয়েছেন আর আহত হয়েছেন ২৭০ জন। ১৩ নভেম্বর (২০১৫) প্যারিসে একাধিক জঙ্গি হামলা হয়েছিল এবং তাতে মারা গিয়েছিলেন ১২৯ জন সাধারণ মানুষ। এই দুটি হামলার পেছনে একটি যোগসূত্র আছে এবং তা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সংস্থা এপি জানাচ্ছে যে, ইউরোপজুড়ে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাতে ৪০০ প্রশিক্ষিত যোদ্ধা পাঠিয়েছে আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেট। এরা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হামলা চালাতে পারে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। কিছুদিন আগে জার্কাতায় যে বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়েছিল তার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেছিল আইএস। প্যারিসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরপরই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে ইসলামিক জঙ্গিরা হোটেল রেডিসনে ১৭০ বিদেশিকে জিম্মি করেছিল। জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে ২৭ বিদেশি সেদিন মারা গিয়েছিলেন। সম্প্রতি পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলামিক জঙ্গিদের তৎপরতা বেশ লক্ষণীয়।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মালির উত্তরে বা তুয়ারেগ অঞ্চলে ন্যূনতম চারটি ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর খবর আমরা জানি, যারা সেখানে একটি ‘জিহাদি যুদ্ধ’ পরিচালনা করছে। একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও তারা কাজ করে যাচ্ছে। এই চারটি সংগঠন হচ্ছে আনসার দ্বীন, আল কায়েদা ইন ইসলামিক মাগরেব, মোজওআ ও আল মুয়াক্কিন বি ডিমা। সম্প্রতি ‘সাহেল জোন’-এর অন্তর্ভুক্ত মালি, মৌরিতানিয়া ও নাইজারে ইসলামিক জঙ্গিদের তৎপরতা বেড়েছে। মাগরেবভুক্ত এ অঞ্চলের বাইরে নাইজেরিয়াতে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী বোকো হারামের নৃশংস ঘটনাবলি সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছিল। বোকো হারামের জঙ্গিরা কিশোরী মেয়েদের স্কুল থেকে অপহরণ করত এবং তারা জঙ্গি কমান্ডারদের তথাকথিত যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করত। শত শত বিরোধী মেয়েদের অপহরণের পর আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। বোকো হারাম সম্প্রতি ইসলামিক স্টেটের নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। একিউআইএম চাচ্ছে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। ২০০৭ সালে তারা এই ঘোষণা দেয়। আলজেরিয়া, লিবিয়া, মালি, মরক্কো ও তিউনেশিয়ায় তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে নাইজেরিয়াতে বোকা হারাম ও আনসারুর মতো সংগঠন একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। নাইজার ও ক্যামেরুনেও তাদের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হয়েছে। বলা হয় নাইজেরিয়ার ৩৬টি প্রদেশের মাঝে ১৪টিতে বোকো হারামের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী আর মালিতে ২০১১ সালে জঙ্গি সংগঠন আনসার দ্বীন সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শারিয়া আইন বলবৎ করেছে। ফলে এ অঞ্চলগুলো একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশ এক সময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ফলে এসব দেশের অনেক মানুষ ফ্রান্স, বিশেষ করে রাজধানী প্যারিসে বসবাস করেন। এদের দ্বিতীয় তথা তৃতীয় জেনারেশন ফ্রান্সে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পেলেও এরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। চাকরির ক্ষেত্রে সামাজিক দিক দিয়ে এরা বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছিলেন। আর এই সুযোগটি নিয়েছিল আইএস। এরা তরুণ সমাজের মাঝে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছিল। ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম এক্ষেত্রে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করেনি। এর বড় প্রমাণ হাসনাআইত বুলাচেনের ঘটনা, যিনি ইউরোপে প্রথম নারী আত্মঘাতী হিসেবে পরিচিতি পান। বুলাচেন কিছুদিন আগ পর্যন্ত পশ্চিমা পোশাক ও পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট ছিলেন। তার বন্ধুরা ইংল্যান্ডের টেলিগ্রাফকে জানিয়েছিল হাসনা ব্যক্তিজীবনে জিন্স প্যান্ট, কোকাকোলা আর পশ্চিমা সংগীতে বুঁদ হয়ে থাকতেন। তার কাছে ইসলাম ধর্মের কোনো আবেদন ছিল না। হঠাৎ করেই তিনি ‘হিজাবি’ হয়ে যান এবং জিহাদি তৎপরতায় জড়িয়ে যান। আইএসের সমর্থক হাসনা বুলাচেন পুলিশের আক্রমণের মুখে গত ১৯ নভেম্বর প্যারিসে নিজেকে উড়িয়ে দেন। আইএস এভাবেই তরুণ প্রজšে§র ভেতরে তার ‘প্রভাব’ বিস্তার করেছিল।
সিরিয়ায় আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটের নাম প্রথম শোনা যায় ২০১৩ সালে। তখন সংগঠনটির নাম ছিল ইসলামিক স্টেট আর ইরাক অ্যান্ড লেভান্ট। এই এলাকার ঐতিহাসিক নাম লেভান্ট। জঙ্গিরা এই নামটি গ্রহণ করেছিল। পরে নামটি পরিবর্তন করে। তবে ১৯৯১ সালে জামায়াত আল তওহিদ ওয়াল জিহাদ নামে একটি সংগঠনের ব্যাপারে মূলত এটি সংগঠিত হয়েছিল। পরে এরা ‘আলকায়েদা ইন ইরাক’ নাম ধারণ করে। এই সংগঠনটি মূলত সুন্নি প্রভাবাধীন ও সুন্নি সম্প্রদায়নির্ভর। ২০০৬ সালে ইরাকে সুন্নি প্রভাবাধীন মুজাহিদিন শূরা কাউন্সিলে সংগঠনটি যোগ দেয়। ২০১৩ সালে সারা বিশ্ব প্রথমবারের মতো আবু বকর বুগদাদির নাম জানতে পারে। ২০১৪ সালের ২৯ জুন বুগদাদি একটি খেলাফতের ডাক দিলে সংগঠনটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। তখন সংগঠনটি নতুন নাম ধারণ করে আইএস বা ইসলামিক স্টেট। তবে আলকায়েদার সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্ক কী এটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে, ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে আইএসের সঙ্গে আলকায়েদার কোনো সম্পর্ক নেই। আল কায়েদার রাজনৈতিক দর্শন ও ইসলামিক স্টেটের রাজনীতির মাঝে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। দুটি সংগঠনই মূলত জিহাদি, গালাফি ও ওয়াহাবি মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হয়। আল কায়েদা জিহাদি ও ওয়াহাবি মতবাদ অনুসরণ করলেও খেলাফতের কথা বলেনি কখনো। আইএস খেলাফতের কথা বলেছে। বুগদাদি নিজেকে খলিফা বা আমিরুল মুমেনিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন যা আল কায়েদার নেতা লাদেন যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেননি। বুগদাদি নিজেকে সব মুসলিম বিশ্বের নেতা বা খলিফা হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে দাবি করেছেন সব মুসলমানের দায়িত্ব হচ্ছে এই খেলাফতের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা। তিনি মুসলমান প্রধান সব দেশকে নিয়ে এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন  দেখেন। অন্যদিকে আল কায়েদা স্ট্রাটেজি হচ্ছে ছোট ছোট আমিরাত প্রতিষ্ঠা করা। আল কায়েদা মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অপারেট করে। কিন্তু আইএস তা করে না। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না আল কায়েদা ও আইএস উভয় সংগঠনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার জš§ দেয়া। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় স্ট্রাটেজি রয়েছে। এখানে তার স্বার্থ অনেক। স্বার্থ রয়েছে ফ্রান্সেরও। বাহরাইন ও কাতারে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে আমিরাত ও সাইপ্রাসে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সস্তায় তেল পাওয়া যায়। এই তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। লিবিয়ার তেলের ওপর ৩টি পশ্চিমা দেশের নির্ভরশীলতা ইতোমধ্যে অনেক প্রশ্নের জš§ দিয়েছে। ইতালির প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের ২৯ ভাগ আসে লিবিয়া থেকে। ফ্রান্সের ও স্পেনের এই নির্ভরশীলতার হার যথাক্রমে ১৪ ভাগ ও ১০ ভাগ। তারা চাইবে সস্তায় তেল নিতে। সিরিয়ায় খুব বেশি তেল সম্পদ নেই। কিন্তু এই তেলই এখন ইসলামি স্টেটের জঙ্গিদের আয়ের অন্যতম উৎস। আইএস প্রতিদিন তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ৪০ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। কালোবাজারে তা বিক্রি করে। এর মূল্য বছর হিসাবে ৩২ কোটি ডলার আর প্রতিদিনের তেল বিক্রির অর্থ জমা হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের ফান্ডে। এই ফান্ড ব্যবহƒত হয় জঙ্গিদের মাসিক বেতন (৪৩০ ডলার থেকে ১ হাজার ডলার) ও সেই সঙ্গে বিদেশে জঙ্গি তৎপরতার কাজে। যেমন বলা যেতে পারে প্যারিসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রায় ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা।
আইএস তার ‘দূরবর্তী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা পাক-ভারত উপমহাদেশে সম্প্রসারিত করার কথা বলছে। এটা আমাদের জন্য চিন্তার কারণ। বড় ধরনের সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে এখন ভারত ও বাংলাদেশ। পাকিস্তান ইতোমধ্যে তাদের প্রভাব বলয়ে চলে গেছে। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এ অঞ্চলের মানুষ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পছন্দ করে না। কিন্তু সন্ত্রাসীদের কাছে তারা অনেক সময় জিম্মি হয়ে যান। আইএসের এটাই স্ট্রাটেজি। জিম্মি করে মানুষ হত্যা করা। ভারত ও বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দুটি দেশ। এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাই বেছে নেয় আইএসের জঙ্গিরা। জাকার্তার ঘটনা এর বড় প্রমাণ। বলা হচ্ছে, প্রায় ৭০০ ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক সিরিয়ায় আইএসের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিল। এরাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। ভারত কিংবা বাংলাদেশের কারা কারা সিরিয়ায় গিয়েছিল তার পরিসংখ্যান জানাটা জরুরি। ভারতীয় গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে সক্রিয় থাকলেও আমরা বারবার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলতে শুনেছি বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই। আমরাও তেমনটাই মনে করি। কিন্তু এ দেশে জঙ্গি আছে। তাদের কেউ কেউ যে আইএসের আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়নি তা স্পষ্ট করে বলা যাবে না। কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন এ দেশে নিষিদ্ধ। এসব সংগঠনের শীর্ষ নেতারা আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতে পারেন। ভয়টা এখানেই। সর্বশেষ পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে খোরাসান অঞ্চলে ইসলামিক স্টেট তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি সম্প্রসারিত করেছে। তারা ঘোষণা করেছে ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের ‘খিলাফত’ সম্প্রসারিত করার। বিষয়টাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি বিশ্বাস করি পুলিশের যে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটটি গঠিত হয়েছে, তারা বিষয়টি দেখছে। এই ইউনিটি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
ব্যাসেলসে সন্ত্রাসী হামলার পর আমি একাধিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ পড়েছি। প্রতিটি গবেষণা প্রবন্ধে আইএসের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখার জন্য বলা হয়েছে। আইএসের মুখপত্র ‘দাবিগ’ ম্যাগাজিনে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করা হয়েছে যে, আইএসের পরবর্তী টার্গেট হচ্ছে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, স্পেন আর ইতালি। এসব অঞ্চল থেকে ‘থার্ড জেনারেশনের’ যেসব মুসলমান সম্প্রদায়ের তরুণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘জিহাদি’ যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সিরিয়া গিয়েছিল, আইএস তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর জন্য। প্যারিস ও ব্রাসেলসে হামলা যে হলো এটা তার বড় প্রমাণ। আইএসের উদ্দেশ্য পরিষ্কার ইউরোপবাসীকে এক ধরনের ‘শাস্তি’ দেয়া। কেননা সিরিয়ার আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে বিমান হামলা শুরু করেছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী মিত্র। ফলে আইএস এক ধরনের ‘প্রতিশোধ’ নিতে চেয়েছে। Institute for the Study of war-এ গত ২৫ মার্চ (২০১৬) হার্লিন গাম্ভীর (Harleen Gambhir) যে প্রবন্ধটি লেখেন (ISISÕS Campaign in Europe) তাতে এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। আইএসের জঙ্গিরা (Crusoder Belgium) যে প্রতিশোধ নিয়েছে তাও বলা হয়েছে।ফলে ইউরোপে যে জঙ্গি তৎপরতা কমে যাবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সমগ্র ইউরোপে যে মুসলমানবিদ্বেষী একটি জনমত গড়ে উঠবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ইউরোপে মুসলিম প্রধান দেশগুলো থেকে বিশেষ করে পাক-ভারত-বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে অভিযান প্রক্রিয়া আরো কঠিন হবে। সিরিয়া থেকে যেসব অভিবাসী ইউরোপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা মানবেতর জীবনযাপন করবেন। স্বদেশে কিংবা তুরস্কে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকির মুখে তারা এখন থাকবেন। স্থানীয়ভাবে দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো আরো শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় নির্বাচনে তারা ভালো করবে। চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে সেখানে গণভোট হবে। গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় পড়তে পারে। অর্থাৎ ৯/১১- এর পর যুক্তরাষ্ট্রে যে ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছিল আজ ১৫ বছর পর ইউরোপে ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইউরোপ বদলে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ আর কখনো এ ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েনি। সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণপন্থিরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে সমর্থন ছুড়ে দিতে পারে। সুতরাং ব্রাসেলস হামলার একটি প্রতিক্রিয়া থেকে যাবেই। - Daily Manobkontho 31.03.16