রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

সমাধান কোন পথে

সর্বশেষ
দেশের দুই শেয়ারবাজারেই বেশিরভাগ কোম্পানির দাম ও সূচকের ঊর্ধ্বগতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে আজকের লেনদেন
« পূর্ববর্তী সংবাদ

জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী পাস হওয়ার পর বিরোধী দল বিএনপি তথা চার দলের উদ্যোগে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার হরতাল পালিত হচ্ছে ৬ ও ৭ জুলাই। ইসলামী দলগুলোও ৩ জুলাই অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে। আগামী ১০ ও ১১ জুলাই তারা পালন করবে পূর্ণদিবস হরতাল। হঠাৎ করেই রাজনীতি অস্থির হয়ে উঠেছে। সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের কারণেই এই রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতা যে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে, তা অস্বীকার করার জো নেই।
এটা স্বীকার করতেই হবে যে সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করেছে। এখানে একটা মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে। আর তা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো লেখা হয়নি। শুধু আংশিক রায় পাঠ করে (মূল বিষয়টি) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। আর সেই আলোকেই এখন সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলো। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, সাত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেননি। কোনো কোনো বিচারপতির দ্বিমত আছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাঁদের মতামত জানা যাবে। রায়টি হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে সরকার পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু রায়ের মাত্র ৫১ দিনের মাথায় বিলুপ্ত করা হয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনী। ৪৬ দিনের মাথায় বাস্তবায়ন হয়েছে সপ্তম সংশোধনী মামলার রায়ও। আর পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় কার্যকর করতে সরকার এক বছর সময় নিয়েছিল। গত ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছেন। আর সপ্তম সংশোধনী মামলার রায় দেওয়া হয় গত ১৫ মে। দুটো মামলারই পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি।
স্পষ্টতই পঞ্চদশ সংশোধনীতে এমন বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যাতে মহাজোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও আপত্তি রয়েছে। যেমন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম'_এটা রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে মহাজোটের শরিক বাম রাজনৈতিক দলগুলোর। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা, বিশেষ করে পরবর্তী দুটো সংসদ নির্বাচন (দশম ও একাদশ) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাম দলগুলোর মৃদু প্রস্তাব ছিল। এর বাইরে চার মূলনীতি, বিশেষ করে, সমাজতন্ত্র বহাল রাখা (আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রেও এখন সমাজতন্ত্র নেই), মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক জোরদার ও সংরক্ষণ করার মূলনীতি বাদ দেওয়া, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা কিংবা অবৈধ ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা সমঝোতা প্রয়োজন ছিল, যা হয়নি। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপিও বলেছেন সে কথা। এক সংবাদ সম্মেলনে (২ জুলাই) তিনি স্বীকার করেছেন, সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। সমঝোতার কথা বলেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও। কিন্তু সমঝোতা কিভাবে হবে?
সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটা এখন সংবিধানের অংশ। এর বিরোধিতা করা যায় না। সংবিধান মেনেই রাজনীতি করতে হয়। বিএনপি তথা চার দল যতবারই হরতাল ডাকুক না কেন, এতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে, কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হবে_এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একটি সমঝোতার কথা বলেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন 'অন্তর্বর্তী সরকারের' কথা। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন বর্তমান সরকারের শেষ ৯০ দিন হবে অন্তর্বর্তী সরকার। এই ফর্মুলাও গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা ওই ৯০ দিন তো আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তারা প্রভাব খাটাবে না_এর গ্যারান্টি কে দেবে? দলীয়ভাবে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয় না, এর প্রমাণ শুধু মাগুরা উপনির্বাচনেই (১৯৯৪) আমরা পাইনি, বরং ভোলার উপনির্বাচনেও (২০১০) প্রমাণ পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, ইউপি নির্বাচনও পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি, এখানে সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং সরকারি দলের প্রভাব লক্ষ করা গেছে। আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি। গণতন্ত্রকে আমরা শক্তিশালী করতে চাচ্ছি বটে, কিন্তু সেই গণতন্ত্রকে আমরা দেখছি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টিতে। দল ও দলের আদর্শের ঊধর্ে্ব আমরা উঠতে পারিনি। তাই সংবিধান সংশোধনীর প্রশ্ন যখন এল, তখন সরকারি দল তাদের দলীয় স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠতে পারল না।
সত্যিকার অর্থেই সমঝোতার প্রশ্নটি এখন কঠিন। কেননা দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান এখন পরস্পরবিরোধী। কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দিতে নারাজ। অতীত থেকে আমরা এতটুকুও শিক্ষা নিইনি। দেয়ালের লিখন থেকেও আমরা এতটুকু শিখিনি। যাঁরা সরকারে থাকেন, তাঁদের কিছুটা সহনশীল হতে হয়। বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। গণতন্ত্রের এই স্পিরিট আমাদের দেশে কার্যকর হচ্ছে না। তাই অবশ্যম্ভাবীভাবে ফিরে আসছে ২০০৬ সালের অক্টোবরের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি(?)। আজ আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে না পারেন, তাহলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। তাই একটা সমঝোতা জরুরি।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে সামনে রেখেও এই সমঝোতা সম্ভব। এক. দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে না। নির্বাচন পরিচালনা করবে একটি নিরপেক্ষ কাউন্সিল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই নিরপেক্ষ কাউন্সিল গঠিত হবে। বিকল্প হিসেবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির (সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি নন) নেতৃত্বে একটি 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠিত হতে পারে, যাঁরা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এই 'এলডার্স কাউন্সিল' তিন অথবা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট হতে পারে। দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিরাই এই কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ সংক্রান্ত একটি বিল সংসদে উপস্থাপিত হতে পারে। শরিক দলের কোনো সদস্য এই বিল উপস্থাপন করতে পারেন। সরকার এই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে পারে। এতে করে সরকারের সৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত হবে। কিংবা বিরোধী দল হিসেবে সংসদে উপস্থিত এলডিপি সদস্য কর্নেল অলি আহমেদও এ ধরনের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন। দুই. স্পিকার স্ব-উদ্যোগে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনার একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি সরাসরি বিএনপির সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারেন। এতে বরফ গলতে পারে। তিন. রাষ্ট্রপতি নিজেও একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। সাংবিধানিকভাবে তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু তিনি তো জাতির অভিভাবক। সংকট মুহূর্তে তাঁর একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা জাতি আশা করতেই পারে। আমার বিশ্বাস, এর যেকোনো একটি সমঝোতার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
আমি সরকারের ভূমিকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। সরকারকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব কিছু সম্পন্ন করা ঠিক নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে কেউ কখনো জোর করে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। বাংলাদেশের ৪০ বছরের ইতিহাস অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এরশাদ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন বটে; কিন্তু গণ-অসন্তোষ তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়নি। বেগম জিয়া ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অথচ প্রথমদিকে তিনি রাজি ছিলেন না। পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করেছিল। সেদিন শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ব্যাপারে ছিলেন সোচ্চার। অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস! যিনি এক দিন নিজেকে দাবি করতেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে, তিনি নিজে এখন এই ব্যবস্থার বিরোধী। শেখ হাসিনা যদি আজ বিরোধী দলে থাকতেন, তিনি কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অবসান চাইতেন? এটা একটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
সংসদে সরকারের 'ব্রুট মেজরিটি' রয়েছে। এই ব্রুট মেজরিটি অনেক সময় দলের জন্য মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। ব্রুট মেজরিটির কারণে সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে বলেই আমার ধারণা। সরকারের যদি ব্রুট মেজরিটি না থাকত, তাহলে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দুইবার চিন্তা করত। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এখন একটা বাস্তবতা। ভালো হয়েছে, কি মন্দ হয়েছে, এই বিতর্কে না গিয়ে, জটিলতা না বাড়িয়ে বিরোধী দলের সহযোগিতা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়_এটাই বড় প্রশ্ন এখন। হার্ডলাইনে গিয়ে সমস্যার যেমনি কোনো সমাধান করা যায় না, ঠিক তেমনি গণতন্ত্রও বিনির্মাণ করা যায় না। পর পর হরতাল পালন করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের যদি উপলব্ধি হয়, তাতেই জনগণের মঙ্গল নিহিত।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
www.tsrahmanbd.blogspot.com

অন্তর্বর্তী সরকার কি কোনো সমাধান বয়ে আনবে

এই আচরণ সামরিক জান্তাকেও লজ্জা দেবে
সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব পাস হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, 'অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়ে বিএনপি যৌক্তিক প্রস্তাব দিলে আবার সংবিধান সংশোধন করা হবে।' এমনকি দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফও বলেছেন, বিএনপি সংসদে এসে নতুন প্রস্তাব দিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে 'অন্তর্বতী সরকার' তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প কি-না? দুই. এ ধরনের প্রস্তাবে বিএনপি তথা চারদল রাজি হবে কি-না? তিন. যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে কী?
অনেক সম্ভাবনা নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। মতামতও প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদপত্রে। একটা জিনিস এখন নিশ্চিত করেই বলা যায়, পঞ্চদশ সংশোধনী এখন সংবিধানের অংশ। এটা বাদ দেয়া যাবে না। অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে (যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষ পুনঃপ্রবর্তন, জাতীয় পরিচয় বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম তফসিল বামে অন্তর্ভুক্তি, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ইত্যাদি), এসব পরিবর্তন এখন সংবিধানের অংশ। এগুলো পরিবর্তনের আর সুযোগ নেই। রাজনীতি করতে হলে সংবিধানকে সামনে রেখেই রাজনীতি করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবর্তিত সংবিধানকে অস্বীকার করা যাবে না। সংবিধানের পরিবর্তনে বিএনপি তথা চারদলের আপত্তি রয়েছে। এর পেছনে যুক্তি যাই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই পরিবর্তনগুলো এখন সংবিধানের অংশ। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে; কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' এখন বাদ দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে ইসলামিক দলগুলো আপত্তি জানিয়েছে ও গত ৩ জুলাই অর্ধদিবস হরতালও পালন করেছে; কিন্তু এটা নিয়ে আর খুব বেশি দূর এগোনো যাবে না। ইচ্ছে করলেও ইসলামিক দলগুলো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। কেননা সংবিধান পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া আছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন না থাকলে সংবিধান সংশোধন করা যায় না। আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের সংসদে এই আসন আছে। তারা দ্বিতীয়বার সংবিধান সংশোধন করবে, এটা বিশ্বাস হয় না। সুতরাং স্পষ্টতই দেশ আজ এক গভীর সংকটে পতিত হলো। যেখানে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নূ্যনতম ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, তা পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে হয়নি।
গণতন্ত্রের অভিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরাকরের কোনো বিধান থাকতে পারে না_ এটা সত্য; কিন্তু আমরা গুলিয়ে ফেলি এক জায়গায়_ উন্নত বিশ্বের গণতন্ত্রের চর্চার সঙ্গে উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রের চর্চাকে একসঙ্গে মেলান যাবে না। পশ্চিমা ইউরোপে গণতন্ত্র চর্চার ইতিহাস অনেক পুরনো। আমরা সে স্তরে এখনো পেঁৗছতে পারিনি। আমাদের সমাজে গণতন্ত্রের বিকাশের স্বার্থেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো একটি ব্যবস্থা থাকা ছিল বাঞ্ছনীয়। এ জন্য সংবিধান যে পরিবর্তন করতে হয়েছিল, সেটাও অমূলক ছিল না। জিম্বাবুয়েতে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সেখানে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল, তার সমাধান হয়েছিল বিরোধী দলনেতা সাভাঙ্গিরাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তির মধ্য দিয়ে। অথচ জিম্বাবুয়ের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। এর আগে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে একই ধরনের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম কেনিয়াতে। প্রেসিডেন্ট কিবাকি ও বিরোধী দল নেতা রাইলা ওডিংগার মধ্যকার দ্বন্দ্বে সেখানে অনেক লোক মারা গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিদেশিদের মধ্যস্থতায় ওডিংগাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের মধ্য দিয়ে কেনিয়ার গণতন্ত্র একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছিল। কেনিয়ার সংবিধানেও কোনো প্রধানমন্ত্রীর পদ ছিল না। প্রথমে কেনিয়া ও পরে জিম্বাবুয়ের ঘটনাবলি প্রমাণ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে কোনো কোনো রাষ্ট্রকে কখনো কখনো সংবিধানবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী হলেও, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তা নেয়া হয়েছিল। আমি এরকম অনেক দৃষ্টান্ত দিতে পারবো, যেখানে গণতন্ত্রের স্বার্থেই রাষ্ট্র এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রকারন্তরে গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা ছিল এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের বিকাশমান গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করেছিল। এ ব্যবস্থা বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছিল। তবে ওই ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। তিনটি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরই ত্রুটিগুলো আরো স্পষ্ট হয়েছিল। যদি এই ত্রুটিগুলো দূর করা যেতো, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এতে করে আরো শক্তিশালী হতো।
নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়_ এটা তত্ত্বের কথা। বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা হলেও, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হতে পারে না। কেননা বর্তমান সরকারই সিইসি তথা নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবে। ফলে প্রশ্ন উঠবে তাদের আনুগত্য নিয়ে। এখন তো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই 'রাজনীতি' করেন না, আমলারাও রাজনীতি করেন। কেউ বিএনপির আমলা, কেউ আবার আওয়ামী লীগের আমলা। রাজনৈতিক বিবেচনায় সচিব নিয়োগ হচ্ছে। কেউবা আবার বঞ্ছিত হচ্ছেন। বিএনপির আমলে প্রমোশন না হওয়া ব্যক্তিরা বর্তমান সরকারের আমলে হুট করে সচিব পর্যন্ত হয়ে গেছেন_ এমন দৃষ্টান্তও আছে। তাই যাদের নিয়োগ দেয়া হবে, তাদের নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আর সরকার যে তাদের স্বার্থেই এসব পদে নিয়োগ দেবে, এটা বলাই বাহুল্য। তাহলে নিরপেক্ষতা থাকলো কই? নির্বাচন কমিশনকে অর্থের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তাদের নিজস্ব তেমন জনবল নেই। গ্রাম পর্যায়ে তারা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে 'ম্যানিপুলেশনের' সম্ভাবনা বেশি। তাই নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে_ তার গ্যারান্টি কে দেবে? আমরা ভারতের দৃষ্টান্ত দেই বটে; কিন্তু সেখানকার রাজনীতিবিদরা আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আর আমাদের এখানে আমলারা নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতিবিদদের। ভারতের দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
খালেদা জিয়া গত ১৬ জুন সংবাদ সম্মেলন করে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তিনি অন্য কোনো সিদ্ধান্ত মানবেন না এবং নির্বাচনে অংশও নেবেন না। পাঠক, ১৯৯৬ সালের ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে চেষ্টা করুন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। তাতে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। ফলে ওই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এমনকি ১৯৯৬ সালে এরশাদ সাধারণ নির্বাচন দিয়ে আওয়ামী লীগকে ওই নির্বাচনে নিয়ে এলেও তৃতীয় জাতীয় সংসদ স্থায়ী হয়নি বিএনপির অংশগ্রহণ না করার কারণে। ৫ম, ৭ম, ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল একটি কারণেই_ কারণ দুটি বড় দল ওইসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। দশম জাতীয় সংসদ নিয়ে আগাম মন্তব্য করা সঠিক নয়। নির্বাচন হবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। অনেক সময় বাকি। কিন্তু স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটা সমঝোতা প্রয়োজন। বিএনপিকে সংসদে এসে নতুন করে প্রস্তাব দিতে বলেছে আওয়ামী লীগ। এর কী আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? বেগম জিয়া দুটি জিনিস পরিষ্কার করেছিলেন। এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে অন্তত আগামী দুটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য, দুই. সংবিধানের ৫৮গ(৩) ধারায় সংশোধনী এনে সাবেক প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টার পদে নিযুক্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পরও সংসদে যে কেউ এ ব্যাপারে প্রস্তাব আনতে পারেন। সরকার যে কাউকে উৎসাহিত করতে পারেন এ ধরনের একটি প্রস্তাব আনতে। এমনকি একমাত্র নির্দলীয় সদস্যও এ প্রস্তাব আনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি এমপিরাও সেই প্রস্তাব সমর্থন করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। উচ্চ আদালতের রায় ও অভিমতের অনুসরণ করেও এ ধরনের প্রস্তাব আনা যায়। তবে সেটা সংবিধানের অংশ হবে না।
আওয়ামী লীগ যদি এককভাবে চলে, তাহলে আওয়ামী লীগ ভুল করবে। দেয়ালের লিখন বড় কঠিন, বড় বাস্তব। আর দেয়ালের লিখন থেকে আমরা কেউ শিখি না। কেউ শিক্ষাও নেই না। হরতাল কোনো সমাধানের পথ নয়। অতীতে হরতালের পর হরতাল আহ্বান করে আওয়ামী লীগ বাধ্য করেছিল ক্ষমতাসীন বিএনপিকে তাদের সিদ্ধান্ত মানতে। আজ বিএনপি একই স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছে। বিএনপি, চারদল কিংবা ইসলামী দলগুলো কতটুকু সফল হবে, ভবিষ্যৎই এটা নির্ধারণ করবে; কিন্তু দেশটির অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। দেশটি তো সবার। সংবিধান সংশোধনের পেছনে জনগণের মঙ্গল কতটুকু নিহিত আছে, আগামী দিনে তা বিচার হবে; কিন্তু রাজনীতিতে এ ধরনের বৈরিতা জাতির জন্য মঙ্গল নয়। আজ ও আগামীকাল লাগাতার হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপি তথা চার দল। সরকার পতনের কথা বলছে বিরোধী দল। সরকার গঠিত হওয়ার আড়াই বছরের মাথায় আমরা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছি। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সমাধানের পথ বের করতে হবে রাজনীতিবিদদের। আর উদ্যোগটা আসতে হবে সরকারের পক্ষ থেকেই। 
ড. তারেক শামসুর রহমান 
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,

সমাধান কোন পথে??



এটা কি ধরণের বর্বরতা
জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী পাস হওয়ার পর বিরোধী দল বিএনপি তথা চার দলের উদ্যোগে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার হরতাল পালিত হচ্ছে ৬ ও ৭ জুলাই। ইসলামী দলগুলোও ৩ জুলাই অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে। আগামী ১০ ও ১১ জুলাই তারা পালন করবে পূর্ণদিবস হরতাল। হঠাৎ করেই রাজনীতি অস্থির হয়ে উঠেছে। সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের কারণেই এই রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতা যে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে, তা অস্বীকার করার জো নেই।
এটা স্বীকার করতেই হবে যে সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করেছে। এখানে একটা মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে। আর তা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো লেখা হয়নি। শুধু আংশিক রায় পাঠ করে (মূল বিষয়টি) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। আর সেই আলোকেই এখন সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলো। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, সাত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেননি। কোনো কোনো বিচারপতির দ্বিমত আছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাঁদের মতামত জানা যাবে। রায়টি হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে সরকার পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু রায়ের মাত্র ৫১ দিনের মাথায় বিলুপ্ত করা হয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনী। ৪৬ দিনের মাথায় বাস্তবায়ন হয়েছে সপ্তম সংশোধনী মামলার রায়ও। আর পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় কার্যকর করতে সরকার এক বছর সময় নিয়েছিল। গত ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছেন। আর সপ্তম সংশোধনী মামলার রায় দেওয়া হয় গত ১৫ মে। দুটো মামলারই পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি।
স্পষ্টতই পঞ্চদশ সংশোধনীতে এমন বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যাতে মহাজোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও আপত্তি রয়েছে। যেমন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম'_এটা রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে মহাজোটের শরিক বাম রাজনৈতিক দলগুলোর। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা, বিশেষ করে পরবর্তী দুটো সংসদ নির্বাচন (দশম ও একাদশ) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাম দলগুলোর মৃদু প্রস্তাব ছিল। এর বাইরে চার মূলনীতি, বিশেষ করে, সমাজতন্ত্র বহাল রাখা (আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রেও এখন সমাজতন্ত্র নেই), মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক জোরদার ও সংরক্ষণ করার মূলনীতি বাদ দেওয়া, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা কিংবা অবৈধ ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা সমঝোতা প্রয়োজন ছিল, যা হয়নি। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপিও বলেছেন সে কথা। এক সংবাদ সম্মেলনে (২ জুলাই) তিনি স্বীকার করেছেন, সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। সমঝোতার কথা বলেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও। কিন্তু সমঝোতা কিভাবে হবে?
সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটা এখন সংবিধানের অংশ। এর বিরোধিতা করা যায় না। সংবিধান মেনেই রাজনীতি করতে হয়। বিএনপি তথা চার দল যতবারই হরতাল ডাকুক না কেন, এতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে, কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হবে_এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একটি সমঝোতার কথা বলেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন 'অন্তর্বর্তী সরকারের' কথা। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন বর্তমান সরকারের শেষ ৯০ দিন হবে অন্তর্বর্তী সরকার। এই ফর্মুলাও গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা ওই ৯০ দিন তো আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তারা প্রভাব খাটাবে না_এর গ্যারান্টি কে দেবে? দলীয়ভাবে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয় না, এর প্রমাণ শুধু মাগুরা উপনির্বাচনেই (১৯৯৪) আমরা পাইনি, বরং ভোলার উপনির্বাচনেও (২০১০) প্রমাণ পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, ইউপি নির্বাচনও পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি, এখানে সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং সরকারি দলের প্রভাব লক্ষ করা গেছে। আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি। গণতন্ত্রকে আমরা শক্তিশালী করতে চাচ্ছি বটে, কিন্তু সেই গণতন্ত্রকে আমরা দেখছি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টিতে। দল ও দলের আদর্শের ঊধর্ে্ব আমরা উঠতে পারিনি। তাই সংবিধান সংশোধনীর প্রশ্ন যখন এল, তখন সরকারি দল তাদের দলীয় স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠতে পারল না।
সত্যিকার অর্থেই সমঝোতার প্রশ্নটি এখন কঠিন। কেননা দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান এখন পরস্পরবিরোধী। কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দিতে নারাজ। অতীত থেকে আমরা এতটুকুও শিক্ষা নিইনি। দেয়ালের লিখন থেকেও আমরা এতটুকু শিখিনি। যাঁরা সরকারে থাকেন, তাঁদের কিছুটা সহনশীল হতে হয়। বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। গণতন্ত্রের এই স্পিরিট আমাদের দেশে কার্যকর হচ্ছে না। তাই অবশ্যম্ভাবীভাবে ফিরে আসছে ২০০৬ সালের অক্টোবরের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি(?)। আজ আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে না পারেন, তাহলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। তাই একটা সমঝোতা জরুরি।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে সামনে রেখেও এই সমঝোতা সম্ভব। এক. দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে না। নির্বাচন পরিচালনা করবে একটি নিরপেক্ষ কাউন্সিল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই নিরপেক্ষ কাউন্সিল গঠিত হবে। বিকল্প হিসেবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির (সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি নন) নেতৃত্বে একটি 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠিত হতে পারে, যাঁরা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এই 'এলডার্স কাউন্সিল' তিন অথবা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট হতে পারে। দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিরাই এই কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ সংক্রান্ত একটি বিল সংসদে উপস্থাপিত হতে পারে। শরিক দলের কোনো সদস্য এই বিল উপস্থাপন করতে পারেন। সরকার এই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে পারে। এতে করে সরকারের সৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত হবে। কিংবা বিরোধী দল হিসেবে সংসদে উপস্থিত এলডিপি সদস্য কর্নেল অলি আহমেদও এ ধরনের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন। দুই. স্পিকার স্ব-উদ্যোগে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনার একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি সরাসরি বিএনপির সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারেন। এতে বরফ গলতে পারে। তিন. রাষ্ট্রপতি নিজেও একটি উদ্যোগ নিতে পারেন। সাংবিধানিকভাবে তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু তিনি তো জাতির অভিভাবক। সংকট মুহূর্তে তাঁর একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা জাতি আশা করতেই পারে। আমার বিশ্বাস, এর যেকোনো একটি সমঝোতার দুয়ার খুলে দিতে পারে।




সংসদে সরকারের 'ব্রুট মেজরিটি' রয়েছে। এই ব্রুট মেজরিটি অনেক সময় দলের জন্য মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। ব্রুট মেজরিটির কারণে সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে বলেই আমার ধারণা। সরকারের যদি ব্রুট মেজরিটি না থাকত, তাহলে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দুইবার চিন্তা করত। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এখন একটা বাস্তবতা। ভালো হয়েছে, কি মন্দ হয়েছে, এই বিতর্কে না গিয়ে, জটিলতা না বাড়িয়ে বিরোধী দলের সহযোগিতা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়_এটাই বড় প্রশ্ন এখন। হার্ডলাইনে গিয়ে সমস্যার যেমনি কোনো সমাধান করা যায় না, ঠিক তেমনি গণতন্ত্রও বিনির্মাণ করা যায় না। পর পর হরতাল পালন করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের যদি উপলব্ধি হয়, তাতেই জনগণের মঙ্গল নিহিত
বুধবার, ৬ জুলাই ২০১১, কালের কন্ঠলেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tsrahmanbd@yahoo.com
www.tsrahmanbd.blogspot.com

আফগানিস্তান নিয়ে শংকা থেকেই গেল

 শিশুদের এ পরিণতির কি জবাব দেবেন ওবামা প্রশাসন
অতি সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খবর পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।  প্রথম খবরে ছিল প্রেসিডেন্ট ওবামার ৩৩ হাজার সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়টি, পশ্চিমা মিত্র শক্তির সাথে তালেবানদের আলোচনা এবং ওই আলোচনায় মোল্লাহ ওমরের মেয়ের জামাই মোতাসিম আগা জানের তালেবানদের প্রতিদিধিত্ব করা। তৃতীয়টি, কাবুলে অবস্থিত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তালেবানদের আক্রমণ ও ১৬ জনকে হত্যা করার ঘটনা। তিনটি ঘটনার সাথেই একটি যোগসূত্র রয়েছে-আর তা হচ্ছে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। একদিকে কাতারে তালেবানদের সাথে মিত্র শক্তির সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে যখন একটি আশার আলো দেখছেন কেউ কেউ, তখন হোটেলে হামলা চালিয়ে সেই আলোচনাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করছে তালেবানদের কেউ কেউ। এটা অনেকেই জানেন, আফগানিস্তানে তালেবানদের নামে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী এখন কাজ করছে। পুরো জঙ্গিগোষ্ঠীর উপর মোল্লাহ ওমরের একক কর্তৃত্ব নেই। এমনকি ‘অপারেশন’ পরিচালনার ক্ষেত্রে এক গ্রুপের সাথে অন্য গ্রুপের কোন সমন্বয়ও নেই। ফলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। চলতি বছর ১০ হাজার মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন বারাক ওবামা। আগামী বছর প্রত্যাহার করা হবে আরো ২৩ হাজার সৈন্য। আর ২০১৪ সালে সকল বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। এতে করে কী আফগানিস্তানে  স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে? এ প্রশ্ন এখন অনেকেই করছেন। বলা হয়, তালেবানদের সাথে আলোচনায় স্বয়ং মোল্লাহ ওমরের সম্মতি রয়েছে। এ কারণেই তিনি তার মেয়ের জামাইকে (তালেবানী আমলে অর্থমন্ত্রী) প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে হামলা প্রমাণ করে তালেবানরা কোন ধরনের আলোচনার পক্ষপাতী নন। সুতরাং আলোচনার ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলছে অনেকদিন ধরেই। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে একটি ‘বামপন্থি’ বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের পরপরই বিপ্লবীরা নিজেদের মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। আর এর সূত্র ধরে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটি দখল করে নিয়েছিল। এর ঠিক নয় বছর পর ১৯৮৮ সালে সাবেক সোভিয়েত নেতা গরবাচেভ আফগানিস্তান থেকে সকল সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। আর ২০০১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র বিমান আক্রমণ চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ৯/১১-এর ঘটনাবলীর সাথে জড়িত ওসামা বিন লাদেনকে তালেবানরা আশ্রয় দিয়েছে। এই অভিযোগ তুলে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটি দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই থেকে তাদের ‘দখলে’ রয়েছে দেশটি। যদিও হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের ‘নির্বাচিত’ প্রেসিডেন্ট। এখন ওবামার সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও এই ‘সম্ভাবনা’ এখন নানা প্রশ্নের জন্ম  দিয়েছে।
দু’টি কারণে ওবামা মূলত এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। এক. ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ওবামা দ্বিতীয় টার্মের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেখানে তার ইমেজ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। দুই. আফগান যুদ্ধের বিপুল খরচ বহন করা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এখন কথাবার্তা হচ্ছে, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি খরচের হিসাব দেয়া হয়, তা খুব আশার কথা বলে না। যেখানে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য চাকরির সংস্থান করতে পারছেন না, সেখানে ইরাক ও আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। চলতি বছর আফগান যুদ্ধের জন্য বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে ১২০ মিলিয়ন ডলার। STRAT FOR  নামে একটি গবেষণা সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদন (২৩ জুন, ১১) জানিয়েছে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত একজন মার্কিন সৈন্যের জন্য বছরে খরচ হয় ১ মিলিয়ন ডলার। এক গ্যালন তেল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহে (পরিবহন, নিরাপত্তা ইত্যাদি) খরচ হয় প্রায় ৪০০ ডলার। অপর একজন গবেষক দেখিয়েছেন আফগানিস্তানে ২০১১-১২ অর্থবছরে  যে অর্থ ব্যয় হবে তা দিয়ে নিন্মোক্ত কাজগুলো করা সম্ভব : ১. নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ৫৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ২. ২০২ মিলিয়ন ছাত্রকে তাদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে সাড়ে ৫ হাজার ডলার করে সাহায্য দেয়া, ৩. ১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বয়স্ক মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া, ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য আরো ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন শিক্ষক নিয়োগ করা, ৫. ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন পুলিশ অফিসার নিয়োগ করা এবং ৬. ৬৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বাড়িঘরে সস্তায় ‘সবুজ জ্বালানি’ (সৌর বিদ্যুত্) সরবরাহ করা। আফগান যুদ্ধের খরচ অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর।
কিন্তু এরপর কী? যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথে ফ্রান্সও জানিয়ে দিয়েছে তারাও সৈন্য প্রত্যাহার করবে। আর বৃটেন তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে ২০১৪ সালে। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই  ওবামার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু কারজাই এই সিদ্ধান্তে যতই সন্তুষ্ট হন না কেন, আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারজাই-এর পরিণতি হতে পারে অনেকটা ডা. নজিবুল্লাহর মত, যিনি আফগানিস্তানে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে ১৯৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে- ছিলেন। তালেবানরা ১৯৯২ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছেন তালেবানদের সাথে একটি সমঝোতায় যেতে। প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলেও কোন সমঝোতা হয়নি। সমস্যা হচ্ছে আফগানিস্তানে একাধিক তালেবান গ্রুপ সক্রিয়। এরা আবার গোষ্ঠীকেন্দ্রিকভাবে বিভক্ত। মোল্লাহ ওমরের নেতৃত্বাধীন অংশ দক্ষিণ আফগানিস্তানে সক্রিয়। গুলবুদ্দিন হেকমাতিয়ারের নেতৃত্বাধীন হেজবে ইসলামী গ্রুপ সক্রিয় কুনার ও নানগাহার প্রদেশে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সক্রিয় হাক্কানী নেটওর্য়াক, যার নেতৃত্বে রয়েছেন বাবা-ছেলে জালালুদ্দিন হাক্কানী ও সিরাজুদ্দিন হাক্কানী। পাকিস্তানপন্থি তালেবানদের সাথে এদের যোগাযোগ রয়েছে এবং পাকিস্তানের FATA অঞ্চলে এরা আশ্রয় পায়। বিশেষ করে সোয়াত ও বাজুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ‘তেহরিক ই নিফাজ ই সারিয়াত ই মোহাম্মদী’। নেতৃত্বে রয়েছেন সুফী মোহাম্মদ। দু’টি বিচ্ছিন্ন গ্রুপও এ অঞ্চলে তত্পর, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফাজলুল্লাহ ( ধারণা করা হয় নিহত) ও মৌলভী ফকির মোহাম্মদ। কাশ্মীরে তত্পর লস্কর ই তৈয়েবার সাথেও এদের যোগাযোগ রয়েছে। সেইসাথে যোগাযোগ রয়েছে ‘তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তান’-এর মত সংগঠনগুলোর সাথে। যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন গ্রুপের সাথে সমঝোতায় যাবে? মূল ধারার (মোল্লাহ ওমর) শীর্ষ পর্যায়ের দু’-একজন নেতার সাথে পরোক্ষ আলোচনা হলেও, তা কোন ফল দেয়নি। তাই একটা বড় প্রশ্ন রয়েই গেল। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ আফগানদের জন্য কিছু কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করলেও (স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি, চাকরি) তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়নি। সেখানে অর্থের অপচয় হয়েছে মাত্র। এখন ওবামার সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতিতে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে হয়ত, কিন্তু আফগান সমস্যার কোন সমাধান ডেকে আনবে না। আগামী ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসমর্থন বাড়াতে ওবামা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আফগান যুদ্ধে এ যাবত্ এক হাজার ৬০০-এর বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, আর আহত হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার সেনা। অভ্যন্তরীণভাবে একটা চাপ আছে বলেই ওবামা সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু এটা কোন সমাধান নয়। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে আফগান জনগণের উপর। উদ্যোগটি এখন নিতে হবে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকে। তালেবানদের সকল গ্রুপের সাথে আলোচনা যেমনি জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি এই আলোচনায় কারজাই সরকারের অংশগ্রহণও। শুধুমাত্র পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর জার্মানদের সাথে আলোচনা করলে চলবে না। এই আলোচনায় আফগান সরকারের প্রতিনিধিত্বও থাকা উচিত।
অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ব্যর্থ রাষ্ট্রের যে তালিকা প্রণয়ন করেছে, তাতে আফগানিস্তানের নাম রয়েছে শীর্ষে। দীর্ঘ যুদ্ধ, সু-শাসন নিশ্চিত করার ব্যর্থতা, অসম উন্নয়ন, বহি:শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত না হওয়া, দেশটির উদ্ভাস্তু পরিস্থিতি ইত্যাদি নানা কারণে আফগানিস্তানকে অন্যতম ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক আসরে এই ব্যর্থ রাষ্ট্রের কোন মর্যাদা নেই। প্রায়  ৩৩ বছর দেশটিতে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের কারণে একটি প্রজন্ম দেশের বাইরে বেড়ে উঠছে। এদের একটা অংশ ‘তালেবানী রাজনীতিতে’ সক্রিয় হচ্ছে, অপর অংশ বিদেশের মাটিতে বিদেশী সংস্কৃতিকে ধারণ করছে। অনেক আফগান পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশান্তরিত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে এরা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেকেই করেন, তা হচ্ছে আফগানিস্তানে তালেবানরা কী পুনরায় ফিরে আসছে? তালেবানরা যে একটি শক্তি, তা তারা আবারো প্রমাণ করলো। খোদ কাবুলে যখন হামলা হয়, তখন বুঝে নিতে হবে তালেবানরা কত শক্তিশালী। এখন ২০১৪ সালের দিকে আফগানিস্তান থেকে সকল বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে সেখানে একটি বড় ধরনের ‘শূন্যতার’ সৃষ্টি হবে। সেই ‘শূন্যতা’ আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীকে দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সংগত কারণেই তাই একটি ‘সমঝোতা’ দরকার। যে উদ্যোগটি ওবামা প্রশাসন নিয়েছেন, অর্থাত্ সরাসরি তালেবানদের সাথে আলোচনা, এই উদ্যোগটি ভালো। তবে এটা আরো ফলপ্রসূ হবে যদি যুদ্ধরত সকল গ্রুপের সাথে সংলাপ শুরু করা যায়। এটা না হলে আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধ’ থামবে না। আফগানিস্তানে একটি চিরস্থায়ী সমঝোতা দরকার। আর এজন্য প্রয়োজন সকল গ্রুপের সাথে আলোচনা।
মঙ্গল, ৫ জুলাই ২০১১, ২১ আষাঢ় ১৪১৮
ড. তারেক শামসুর রেহমান   
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কোন পথে আফগানিস্তান?

এই দৃশ্য শুধু আফগানিস্তান নয় পুরো বিশ্বকেই চোখ রাঙায়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে কোন পথে এখন আফগানিস্তান? এই সৈন্য প্রত্যাহার কি আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আদৌ কোনো সাহায্য করবে? প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সিদ্ধান্ত খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তার সামরিক উপদেষ্টাদের অনেককে অবাক করেছে এবং তারা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ওবামার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বছর ১০ হাজার মার্কিন সৈন্য দেশে ফিরে আসবে। আর বাকি ২৩ হাজার সেনা ফিরে আসবে আগামী সেপ্টেম্বরের (২০১২) আগে। এরপরও সেখানে মার্কিন সৈন্য থাকবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে নিয়োজিত রয়েছে। ২০০৯ সালে সেখানে যে বাড়তি ৩৩ হাজার সৈন্য পাঠানো হয়েছিল, সেই বাড়তি সেনাই প্রত্যাহার করে নিলেন ওবামা। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তান অভিযান সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি ঘোষণা করেছেন এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১৫ সালের আগেই আফগান বাহিনীর হাতে দেশটির নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে এবং ওঝঅঋ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঝবপঁৎরঃু অংংরংঃধহপব ঋড়ৎপব) এর আওতাধীন আফগানিস্তানে অবস্থানরত সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। বলা ভালো, আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবানরা ৯/১১ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছে, এই অভিযোগ তুলে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটি দখল করে নিয়েছিল এবং ডিসেম্বর (২০০১) হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বে একটি \'পুতুল সরকারকে\' সেখানে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু গত দশ বছরে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়নি। অনেকেই এখন বারাক ওবামার ঘোষণার সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত নেতা মিখাইল গরবাচেভের একটি ঘোষণার (১৯৮৮) মিল খুঁজতে পারেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল ১৯৭৯ সালে। আর ১৯৮৮ সালে গরবাচেভ আফগানিস্তান থেকে সব সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের (যা কার্যকর হয়েছিল ১৯৮৯ সালে) ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ৩৩ বছর ধরে সেখানে যুদ্ধ চলছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে গেলেও যুদ্ধ থামেনি। আজ ২০১২ বা ২০১৫ সালে সব বিদেশি সৈন্য আফগানিস্তান ছেড়ে গেলেও সেখানে যুদ্ধ থামবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
বিশ্বমানচিত্রে আফগানিস্তান

দুটি কারণে ওবামা মূলত এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। এক. ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ওবামা দ্বিতীয় টার্মের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেখানে তার ইমেজ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। দুই. আফগান যুদ্ধের বিপুল খরচ বহন করা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এখন কথাবার্তা হচ্ছে, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি খরচের হিসাব দেওয়া যায়, তা খুব আশার কথা বলে না। যেখানে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য চাকরির সংস্থান করতে পারছেন না, সেখানে ইরাক ও আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। চলতি বছর আফগান যুদ্ধের জন্য বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে ১২০ মিলিয়ন ডলার। ঝঞজঅঞ ঋঙজ নামে একটি গবেষণা সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদনে (২৩ জুন, ১১) জানিয়েছে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত একজন মার্কিন সৈন্যের জন্য বছরে খরচ হয় ১ মিলয়ন ডলার। এক গ্যালন তেল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহে (পরিবহন, নিরাপত্তা ইত্যাদি) খরচ হয় প্রায় ৪০০ ডলার। অপর একজন গবেষক দেখিয়েছেন, আফগানিস্তানে ২০১১-১২ অর্থবছরে যে অর্থ ব্যয় হবে তা দিয়ে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা সম্ভব : ১. নিম্নআয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ৫৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ২. ২০২ মিলিয়ন ছাত্রকে তাদের উচ্চশিক্ষাসম্পন্ন করতে সাড়ে ৫ হাজার ডলার করে সাহায্য দেওয়া, ৩. ১৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বয়স্ক মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন শিক্ষক নিয়োগ করা, ৫. ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন পুলিশ অফিসার নিয়োগ করা এবং ৬. ৬৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বাড়িঘরে সস্তায় \'সবুজ জ্বালানি\' (সৌরবিদ্যুৎ) সরবরাহ করা। আফগান যুদ্ধের খরচ অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর।
কিন্তু এরপর কী? যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সও জানিয়ে দিয়েছে, তারাও সৈন্য প্রত্যাহার করবে। আর ব্রিটেন তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে ২০১৪ সালে। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ওবামার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু কারজাই এই সিদ্ধান্তে যতই সন্তুষ্ট হন না কেন, আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারজাইয়ের পরিণতি হতে পারে অনেকটা ডা. নজিবুল্লাহর মতো, যিনি আফগানিস্তানে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে ১৯৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। তালেবানরা ১৯৯২ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছে, তালেবানদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যেতে। প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। সমস্যা হচ্ছে_ আফগানিস্তানে একাধিক তালেবান গ্রুপ সক্রিয়। এরা আবার গোষ্ঠীকেন্দ্রিকভাবে বিভক্ত। মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন অংশ দক্ষিণ আফগানিস্তানে সক্রিয়। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বাধীন হেজবে ইসলামী গ্রুপ সক্রিয় কুবার ও কান্দাহার প্রদেশে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সক্রিয় হাক্কানি নেটওয়ার্ক, যার নেতৃত্বে রয়েছে বাবা-ছেলে জালালুদ্দিন হাক্কানী ও সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। পাকিস্তানপন্থি তালেবানদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে এবং পাকিস্তানের ঋঅঞঅ অঞ্চলে এরা আশ্রয় পায়। বিশেষ করে সোয়াত ও বাজুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে \'তেহরিক-ই-নিফাজ-ই সারিয়াত-ই মোহাম্মদি\'। নেতৃত্বে রয়েছেন সুফি মোহাম্মদ। দুটি বিচ্ছিন্ন গ্রুপও এ অঞ্চলে তৎপর, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফজলুল্লাহ (ধারণা করা হয় নিহত) ও মৌলভী ফকির মোহাম্মদ। কাশ্মীরে তৎপর লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গেও এদের যোগাযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে \'তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান\'-এর মতো সংগঠনগুলোর সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতায় যাবে? মূলধারার (মোল্লা ওমর) শীর্ষ পর্যায়ের দু\'একজন নেতার সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা হলেও তা কোনো ফল দেয়নি। তাই একটা বড় প্রশ্ন রয়েই গেল। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ আফগানদের জন্য কিছু কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করলেও (স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি, চাকরি) তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়নি। সেখানে অর্থের অপচয় হয়েছে মাত্র। এখন ওবামার সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতিতে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে হয়তো, কিন্তু আফগান সমস্যার কোনো সমাধান ডেকে আনবে না। আগামী ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসমর্থন বাড়াতে ওবামা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আফগান যুদ্ধে এ যাবৎ এক হাজার ৬০০-এর বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ১২ হাজার সেনা আহত হয়েছেন। এর একটি প্রতিক্রিয়া আছে। ভুলে গেলে চলবে না, আফগানিস্তানে যথেষ্ট মার্কিনি স্বার্থ রয়েছে। মধ্য এশিয়ায় রয়েছে বিপুল জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) সম্পদ। এই জ্বালানি সম্পদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে। হেরাত ও হেলমান্দ প্রদেশে তারা নতুন দুটি বিমানবন্দর নির্মাণ করেছে। কিরঘিজস্তানের মানাস বিমানবন্দর তারা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে আফগানিস্তান পরিত্যাগ করবে, এটা আমি মনে করি না। ২০১২ সালের নির্বাচনের পর নতুন করে যদি আফগান স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়, আমি অবাক হবো না। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এখনও আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিরোধী।
সুত্রঃ দৈনিক সমকাল ,৩রা জুলাই ২০১১।
প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান 
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

কোন পথে চীন?

চীনের পার্লামেন্ট
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ১ জুলাই একানব্বই বছরে পা দিল। ১৯২১ সালের ১ জুলাই সাংহাইয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে জš§ লাভ করেছিল। এরপর অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি চীনা জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এই দীর্ঘ নব্বই বছরের যাত্রাপথ খুব সহজ ছিল না। প্রয়োজনে এবং জাতীয় স্বার্থে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে মাঝে মধ্যে সমাজতান্ত্রিক নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ১৯২৩ সালে সমাজতন্ত্রবিরোধী ও দক্ষিণপন্থী কুয়ো মিংতাং পার্টির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট গঠন, ১৯৪০ সালে মাও জে দং-এর ‘নয়া গণতন্ত্র’, ১৯৫৬ সালে ‘শত ফুল ফুটতে দাও’-এর নীতি, ১৯৬৫ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লব কিংবা মাও-এর মৃত্যুর পর (১৯৭৬) দেং জিয়াও পিং-এর উত্থান ও তার সংস্কার কর্মসূচি চীনকে আজ অন্যতম বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। মনে রাখতে হবে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গরবাচেভ সংস্কার আনতে গিয়ে দেশটি ভেঙে ফেলেছিলেন। গরবাচেভের সংস্কার কর্মসূচির মূলত দুটি দিক ছিল। এক. রাজনৈতিক সংস্কার, যাকে কিনা অভিহিত করা হয়েছিল ‘গ্লাসনস্ত’ হিসেবে, বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় দুয়ার খোলা নীতি। দুই. ‘পেরেস্ত্রইকা’ যার অর্থ পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন। গরবাচেভ ‘গ্লাসনস্ত’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সবকিছু ‘ওপেন’ করে দিয়েছিলেন। অনেকটা বহুদলীয় গণতন্ত্র, একটি ফেডারেল সিস্টেম, শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি তিনি চালু করেছিলেন। আর অর্থনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। ফলে বিপত্তি বাধিয়ে বসেছিলেন তিনি। ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তার ‘দুয়ার খোলা নীতি’র কারণে শক্তিশালী হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বিরোধী শক্তি। ওই শক্তিকে রোধ করা সম্ভব হয়নি গরবাচেভের পক্ষে। কিন্তু চীনে তথাকথিত ‘পেরেস্ত্রইকা’ এসেছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। চীন এখন বলছে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির কথা। কিন্তু চীনে ‘গ্লাসনস্ত’ আসেনি। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। গরবাচেভ ক্ষমতায় থাকার সময় সোভিয়েত সংবিধানের ৬ ও ৭ নং ধারা বাতিল ঘোষণা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। ওই দুটো ধারায় বলা হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির একক ক্ষমতা পরিচালনার কথা। সেনাবাহিনীর ওপরও পার্টির নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে এনেছিলেন গরবাচেভ। কিন্তু চীনা নেতৃবৃন্দ এ কাজটা করেননি। সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির নেতৃত্ব এখনও যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি চীনা সমাজকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির একক কর্তৃত্বও বজায় রয়েছে। এজন্য চীন এখনও টিকে আছে। কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুটি বড় দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মাঝে পার্থক্য এখানেই। তাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আগ্রহ থাকবে, এটা বলাই বাহুল্য। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি যেমন একদিন (১৯৩৪) লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়ে বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি আজও স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘নয়া চীন’কে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রায় ৮ হাজার মাইলব্যাপী ওই লংমার্চে অংশ নিয়েছিল প্রায় ১ লাখ মানুষ। বিশ্ব ইতিহাসে সেটা ছিল এক বিরল ঘটনা। উচিয়াং, চিনশা, তাতু নদীর মতো প্রাকৃতিক বাধা কিংবা জনমানবহীন লাজি বিশাল জলাভূমি পার হতে বিপ্লবীরা সেদিন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর আজও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একটি বড় সমাজতান্ত্রিক দেশের অবর্তমানে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি চীনকে একুশ শতকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।
কোন পথে এখন চীন? চীন কী একুশ শতকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারবে? চীন সম্পর্কে এসব প্রশ্ন এখন উঠেছে। চীন যখন কমিউনিস্ট পার্টির ৯০ বছরের পূর্তি উৎসব পালন করছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৭৩-৭৭) হেনরি কিসিঞ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন চীন সম্পর্কে। কানাডার টরেন্টোতে আয়োজিত একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানে কিসিঞ্জার বলেছেন, চলতি শতাব্দীতে চীন বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্বের সুযোগ পাবে না। তার যুক্তি, চীন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যায় বেশি জর্জরিত থাকবে। ফলে তার পক্ষে বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২৫ বছর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবেÑ এটাও মনে করেন কিসিঞ্জার। যদিও ওই বিতর্কে ইতিহাসবিদ নিয়াল ফার্গুসন এবং বেইজিংয়ের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডেভিড লি কিসিঞ্জারের সঙ্গে একমত হননি।
চীন অনেক বদলে গেছে। এক সময় যে চীন ছিল কৃষিনির্ভর, দারিদ্র্য যেখানে ছিল প্রকট, বাড়িতে রঙিন টিভি ছিল যেখানে স্বপ্ন, সেই চীন আজ বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বড় অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের পরই চীনের অর্থনীতি। ইতিমধ্যে জাতীয় উৎপাদনের দিক থেকে জাপানকেও ছাড়িয়ে গেছে চীন। আর যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে ২০২০ সালে। উৎপাদনের দিক থেকে চীনকে বলা হয় ‘সুপার পাওয়ার’। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার, মাইক্রোওয়েভ ও জুতা তৈরি হয়, তার তিন ভাগের দুই ভাগ উৎপাদন করে চীন। সেই সঙ্গে বিশ্বে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ৬০ ভাগ, ডিভিডির ৫৫ ভাগ, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০ ভাগ, শিশুদের খেলনার ৭৫ ভাগ ও ৩০ ভাগ পারসোনাল কম্পিউটার একা উৎপাদন করে চীন। সুতরাং এই চীনকে বিশ্ব উপেক্ষা করে কিভাবে? পরিসংখ্যান বলে, চীনে বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার। ফরচুন ম্যাগাজিন বিশ্বের বড় যে ৫০০টি বহুজাতিক কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে, তার মাঝে চীনের একারই রয়েছে ৩৭টি কোম্পানি। বিশ্বে যত জ্বালানি ব্যবহƒত হয়, তার মধ্যে শতকরা ১৬ ভাগ ব্যবহƒত হয় চীনে। জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে চীনের অবস্থান তৃতীয়। প্রতি বছর কয়েক কোটি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। ৩ লাখ ছাত্র প্রতি বছর বিদেশে পড়তে যায়। যেখানে ১৯৪৮ সালে শিক্ষার হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ, সেখানে এখন শতকরা ১০০ ভাগই শিক্ষিত। ২১ কোটি শিশু প্রতি বছর প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হয়। চীন ইতিমধ্যে ২০ কোটি লোককে চরম দারিদ্র্য থেকে তুলে আনতে পেরেছে। তবে চীনে এখনও দরিদ্র মানুষ আছে। বিশ্বব্যাংক প্রতিদিন আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসাব করে দরিদ্রের যে সীমারেখা টেনেছে, সেই হিসাবে চীনে এখনও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২১ কোটি।
চীনে এখন নতুন নতুন তাক লাগানো শহর গড়ে উঠছে। আকাশছোঁয়া সব ভবনের ছবি টাইমস ছেপেছিল ২০০৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায়। চীন বিশ্বের রূপান্তরযোগ্য জ্বালানির বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ‘সবুজ জ্বালানি’ (অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ) খাতে চীন গত বছর বিনিয়োগ করেছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় শতকরা ৩৯ ভাগ বেশি। বিশ্বজুড়ে গত বছর এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। চীন ২০২০ সালের দিকে এ খাত থেকে শতকরা ১৫ ভাগ বিদ্যুৎ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে চায়। চীনের ‘সবুজ জ্বালানি’ প্রকল্প উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত। স্কুলগুলোতে শেখান হয় ‘গ্রিন লিভিং’-এর কথা। কোন কোন শহরে রাস্তার বিদ্যুতের বাতি জ্বলে সৌরবিদ্যুতে। ১৯৪৯ সালের চীনের সঙ্গে ২০১১ সালের চীনকে মেলান যাবে না। কৃষিনির্ভর একটি দেশ এখন পরিণত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশে।
কিন্তু রাজনীতি? রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে? সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার চীন সফরের শেষ পর্যায়ে হংকংয়ে এসে বলেছিলেন, তিনি তার জীবদ্দশায় দেখে যাবেন চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে চীনে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবেÑ এ ব্যাপারে সবাই সন্দিহান। কেননা গণতন্ত্রের জন্য চীন প্রস্তুত নয়। ১২০ কোটি লোকের দেশ চীন। চীনে বাস করে ৫৬ জাতির লোক। দেশের শতকরা ৯৪ ভাগ লোকই হান জাতির। ২২টি প্রদেশ, ৫টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে আজকের চীন। এখানে পশ্চিমা ধাঁচের পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয়। তাই বলে চীনকে এখন ধ্র“পদী একটি মার্কসবাদী রাষ্ট্রও বলা যাবে না। তারা অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। পুঁজিবাদের বেশকিছু উপাদান (ব্যক্তিগত খাত, ইপিজেড, স্টক মার্কেট) এখন চীনে চালু রয়েছে। স্বাস্থ্য খাত পুরোপুরিভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেÑ এটা বলা যাবে না। চীন এখন যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একদিকে যেমন পাওয়া যায় ইউরোপের ঝড়পরধষ উবসড়পৎধপু’র ধারণা, ঠিক অন্যদিকে রয়েছে লাতিন আমেরিকার ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃরংস ও পূর্ব এশিয়ার ঘবড়-অঁঃযড়ৎরঃধৎরংস-এর উপাদান। এই তিনটির সংমিশ্রণে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জš§ হয়েছে চীনে। এটাকে ঠিক মার্কসবাদও বলা যাবে না, আবার পুঁজিবাদও বলা যাবে না। এক সময় চীনে কনফুসিয়াসের ধ্যান-ধারণা নিষিদ্ধ ছিল। আজ চীন কনফুসিয়াসকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পূজা করে। কনফুসিয়াসের অনেক চিন্তাধারা চীন এখন গ্রহণ করেছে। বাজার এখন চীনের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনা পণ্য এখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের বড় বিনিয়োগ এখন আফ্রিকাতে।
গরবাচেভ যে ভুলটি করেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে, সেই ভুল করেননি চীনা নেতৃবৃন্দ। তারা চীনকে বদলে দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তেমন কোন পরিবর্তন আনেননি। এখানে পরিবর্তন আসছে খুব ধীরগতিতে। আগে অত্যন্ত ক্ষমতাবান পলিটব্যুরোর সদস্যরা অবসর তেমন একটা পেতেন না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা থাকতেন পলিটব্যুরোর সদস্য হয়ে। এখন ক্ষমতাবানদের অবসরে যেতে হয়। ২০১২ সালে অবসরে যাবেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ও প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াও বাও। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং হু জিনতাও-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন। সি জিনপিং চলতি বছরের প্রথমদিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সংস্কারবাদী হিসেবেই তিনি পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, আজ থেকে ৩৪ বছর আগে চীনা সংস্কারের জনক দেং জিয়াও পিং যে সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, সেই ধারায় সি জিনপিংও একুশ শতকে চীনকে নেতৃত্ব দেবেন। এজন্যই মাইকেল এলিয়ট (Michael Elliot) লিখেছিলেন, ÔIn this century the relative power of the us. is going to decline, and that of China is going to rise. That cake was backed long ago (The Chinese Century Time, 22 January, 2007).
মাইকেল এলিয়ট মিথ্যা বলেননি। চীন আজ একটি শক্তি। এই শক্তিকে অবহেলা করা যাবে না। আর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সার্থকতা এখানেই যে তারা চীনকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
সুত্রঃ যুগান্তর ৩রা জুলাই,২০১১
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspotcom

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি (দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত দুই পর্বের শেষ পর্ব)

(গত পর্বের পর)
বর্তমান বাঙলাদেশের বৈদেশিক নীতি বলতে যা বোঝায়
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কারণে ভারত এটাকে তখন তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। তারা তখন ট্রানজিট সুবিধা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার দাবি করে। ভারতের যুক্তি—বাংলাদেশ যদি ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার সুবিধা দেয়, তাহলে এ খাতে যা আয় হবে তা দিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। ট্রানজিটের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় (১১ মার্চ ১৯৯৭) এবং ১২ মার্চ (১৯৯৭) নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ সম্পর্কে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করেন। তবে তখন তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ও ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফর করলেও তার সরকার দক্ষিণ তালপট্টিতে বাংলাদেশের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। তেলসম্পদসমৃদ্ধ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলটি (ব্লক নং ২১) শেখ হাসিনার সময়সীমায় অনুসন্ধান চালানোর জন্য কোনো লিজ বিডিং হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল মোশাররফ কর্তৃক নিউইয়র্কে শেখ হাসিনার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করায় ও বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বাংলাদেশে বোমা হামলায় ব্যবহৃত বোমার সরঞ্জাম পাকিস্তান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করায় (ডন, ইসলামাবাদ, যুগান্তর ২৩ জুন ২০০১) দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিই ঘটেছিল। উপরন্তু পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা সম্পত্তি আদায় ও বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিকদের (বিহারি) পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ভারত ও পাকিস্তান কর্তৃক পরপর কয়েকটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর (মে ’৯৮) উত্তেজনা হ্রাসে শেখ হাসিনা এ দুটি দেশের রাজধানী সফর করে কিছুটা হলেও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তারই উদ্যোগে পরে ঢাকায় ত্রিদেশীয় (পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ) শীর্ষ বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে পরবর্তীকালে অগ্রগতি হয়েছে কম। এ দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশী পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হয়নি এ দুটি দেশে।

শেখ হাসিনার সময়সীমায় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে আসেন। এর আগে তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছিলেন। ক্লিনটনের সফর ছিল নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পাওয়া। যদিও এটা স্পষ্ট, শেখ হাসিনা তার বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি যোগ দেন। ক্ষুদ্রঋণের ধারণা বাংলাদেশের, যা কি-না এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। শেখ হাসিনার সময়সীমায়ই বাংলাদেশ (১৯৯৬) সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যা ওয়াশিংটনে সমাদৃত হয়। বাংলাদেশ এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ‘সোফা’ চুক্তি (স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট) প্রত্যাখ্যান করলেও ‘হানা’ চুক্তি (হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিসট্যান্স নিড্স অ্যাসেসমেন্ট) স্বাক্ষর করে (২৯ জুলাই ’৯৮)। ‘হানা’ চুক্তির ধরন মানবিক। গত ৯ জুলাই ২০০১ মার্কিন কমান্ডার (প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের) অ্যাডমিরাল বেয়ারের বাংলাদেশ সফরের সময় ‘সোফা’ চুক্তির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আবারও তাদের আগ্রহ দেখায় এবং অ্যাডমিরাল বেয়ার বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সেনা মোতায়েনের কথাও বলেন। ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে একটি সমঝোতা স্মারকের পর ‘পিসকোর’ও বাংলাদেশে আসে। কিন্তু পরে ‘পিসকোর’ বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেয়।

সরকার গঠন করার পর তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীনকে বেছে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির আলোকে বাংলাদেশের জন্য চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। কিন্তু এ ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রাখতে পারেননি। বিশেষ করে, প্রথমবারের মতো ঢাকায় রাশিয়ার অস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা ও দ্বিতীয়ত, চীনের বদলে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করা (মোট মূল্য ১২৪ মিলিয়ন ডলার), এ দুটি ঘটনায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উষ্ণতায় কিছুটা ভাটা পড়ে। বাংলাদেশের বিমানবাহিনী অনেকটা চীনা যুদ্ধবিমাননির্ভর। চীনও মিগ-২৯এর চীনা ভার্সন সরবরাহ করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ চীনের বদলে রাশিয়াকে বেছে নিয়েছিল।

শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশ দুটি আঞ্চলিক জোটে যোগ দেয়। এর একটি ডি-৮ ও অপরটি বিমসটেক। বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিয়ে ডি-৮ গঠিত। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে তুরস্কে ডি-৮-এর প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলমানপ্রধান এ দেশগুলো ১০টি ক্ষেত্রে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে ডি-৮ গঠন করে। ৮টি দেশের মধ্যে ১০টি ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় স্থান পায়। এগুলো হচ্ছে বাণিজ্য, শিল্প, টেলিযোগাযোগ, তথ্য, অর্থ, ব্যাংকিং ও প্রাইভেটাইজেশন, পল্লী উন্নয়ন, কৃষি, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য। মূলত এই দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যেই এই জোট গঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কার্যক্রম ডি-৮-এর কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় ডি-৮-এর দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে বিমসটেক (ইওগঝঞঊঈ) গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে। পরে মিয়ানমার এ জোটে যোগ দেয়। বিমসটেক (নতুন নাম ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিকাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’) বলা হচ্ছে আসিয়ানের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সেতুবন্ধন। বলা হচ্ছে ‘বিমসটেক’ মত্স্যসম্পদ, কৃষি উত্পাদন ও বস্ত্রশিল্প বিষয়ে ব্যবসায় সমন্বয় সাধন করবে। পরিবহন ও পর্যটন খাতও ‘বিমসটেকে’র আওতাভুক্ত। চার জাতির সমন্বয়ে একটি যৌথ বিমান সংস্থা গঠনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
শেখ হাসিনা তার প্রথম সরকারের আমলে বৈদেশিক নীতিতে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেও এতে তিনি সফল হয়েছিলেন তা বলা যাবে না। বাংলাদেশের ৪৬টি কূটনৈতিক মিশনের মধ্যে ২০০০-০১ অর্থবছরে ১৯টিই নির্ধারিত রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবে ২৬টি মিশন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে (আজকের কাগজ, ২ জুলাই ২০০১)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পোশাক শিল্পের কোটা বজায় রাখার ব্যাপারেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিশ্বব্যাংক বেশক’টি দেশের ঋণ মওকুফ করে দিলেও বাংলাদেশ ওই দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে ব্রাসেলসের এলডিসির শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ বড় ভূমিকা পালন করে। তার সময়ে বিগত পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার ঘনঘন বিদেশ সফর আলোচনায় আসে। মোট ৪৯ বার তিনি বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এসব সফরকালে তিনি সোয়া আট মাস বিদেশে কাটিয়েছিলেন। সর্বাধিক ৭ বার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত একনাগাড়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন (মিয়ামিতে মেয়ের সন্তান জন্মদান উপলক্ষে) ২৩ দিন। ওই সময় মিয়ামিতে প্রধানমন্ত্রীর একটি কার্যালয় স্থাপন করতে হয়েছিল। অতীতের যে কোনো সরকারপ্রধানের চেয়ে তিনি তিন-চারগুণ বেশি বিদেশ সফর করেছেন। প্রায় ৬ লাখ কিলোমিটার তিনি বিমান ভ্রমণ করেন (আজকের কাগজ, ৩ জুলাই ২০০১)।

ইসলামিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে শেখ হাসিনার উদ্যোগের বড় প্রমাণ হচ্ছে ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসির সম্মেলনে যোগদান (পাকিস্তান, ১ মার্চ ১৯৯৭)। ওআইসির সম্মেলনে তার দেয়া ভাষণ বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছিল। তিনি তার ভাষণে ৭-দফা কর্মপরিকল্পনা পেশ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল— ১. ওআইসির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, ২. একটি অভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যকে সামনে রেখে সদস্য দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বাণিজ্য এলাকা প্রতিষ্ঠা, ৩. উদ্বৃত্ত সম্পদের দেশগুলো থেকে সম্পদ ঘাটতির দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন তহবিল গঠন, জনশক্তি ও প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা, ৪. ইসলামী উম্মাহর স্বার্থে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও এর অবস্থান সংহত করার বাস্তবসম্মত উপায় উদ্ভাবন, ৫. সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমন ও বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে কার্যকর স্থায়ী মধ্যস্থতা সালিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৬. মুসলিম দেশগুলোর মধ্য উত্তেজনা ও বিরোধ সৃষ্টির কারণগুলো প্রতিরোধে কার্যকর কর্মপদ্ধতির সম্প্রসারণ এবং ৭. একুশ শতকে ইসলামী উম্মাহর লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের একটি কার্যকর ও দক্ষ সংস্থা হিসেবে ওআইসি সচিবালয়কে জোরদার করা। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসলামী বিশ্বের প্রতি যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই শেখ হাসিনা এ ভাষণ দিয়েছিলেন।

বেগম জিয়া ও জোট সরকার
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের (২০০১-২০০৬) আমলে পরাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আর তা হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পূর্বমুখিতা। পূর্বের দেশগুলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে উপেক্ষিত ছিল। এ প্রসঙ্গে মিয়ানমারের কথা উল্লেখ করা যায়। মিয়ানমার বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ এবং মিয়ানমারের গ্যাস ও তেলসম্পদ আমাদের উন্নয়নে যথেষ্ট কাজে লাগতে পারে। কিন্তু গত ৩৬ বছরে এই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একরকম উপেক্ষিত ছিল। বেগম জিয়ার সময়সীমায় মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হয়। বেগম জিয়ার সময়সীমায় ‘কুনমিং উদ্যোগে’র কথা শোনা যায়। কুনমিং চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী। চট্টগ্রাম থেকে কুনমিংয়ের বিমানপথ মাত্র এক ঘণ্টার, ব্যাংককের সঙ্গে বিমানপথে যে দূরত্ব, তার চাইতেও কম। তাই চীন ২০০১ সালে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমার, ভারতের পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্য ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু জোটটি গঠিত হয়নি। কেননা ভারতের আগ্রহ এখন ১০ সদস্যবিশিষ্ট আসিয়ানের দিকে। ভারত কুনমিং উদ্যোগের পরিবর্তে মেকং-গঙ্গা সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নভেম্বরে (’০৭) ভারত আসিয়ানের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য একটাই—তা হচ্ছে আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করা। জোট সরকারের আমলে এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ আসিয়ানের আঞ্চলিক ফোরামের (এআরএফ) সদস্যপদ পেয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি আসিয়ানের সদস্য হওয়া যায় না। সদস্যপদ পেতে হলে প্রথমে এআরএফের সদস্য হতে হবে। তারপর ‘ডায়ালগ পার্টনার’, তারপর সদস্যপদপ্রাপ্তি। ভারত ইতোমধ্যে ‘ডায়ালগ পার্টনারে’র সম্মান পেয়েছে।

বাংলাদেশ এ লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। জোট সরকারের আমলে এআরএফের সদস্যপদপ্রাপ্তি ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধরনের সাফল্য। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এআরএফের ২৬তম সদস্য। জোট সরকারের সময় বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা মিয়ানমারে প্রচুর জ্বালানি সম্পদ রয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই সম্পদ দিয়ে বাংলাদেশ তার জ্বালানি সঙ্কটের একটা সমাধান খুঁজে পেতে পারে। মিয়ানমারের গ্যাসের ব্যাপারে ভারত আগ্রহ দেখিয়েছিল (বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে) কিন্তু জোট সরকার তাতে রাজি হয়নি। এমনকি চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এখন মিয়ানমার মেটাবে। মিয়ানমারের গ্যাস যাচ্ছে ইউনান প্রদেশে। ভারত একসময় উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি মিয়ানমারের গ্যাস নিতে চেয়েছিল। এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তও হয়েছিল। পরে ভারত পিছিয়ে যায়। আমাদের বৈদেশিক নীতির একটি ব্যর্থতা যে আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারিনি। শুধু তা-ই নয়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭-২০০৮) সমুদ্রসীমা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধের মতো একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে সমস্যা আছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গেছে।

শেখ হাসিনা ও মহাজোট সরকার
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হয়েছে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু সরকার পরিচালনার শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি অনেকটা একমুখী হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস ইস্যুতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরও বাতিল হয়েছে।

মহাজোট সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে গিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে। তবে বলা হচ্ছে, এই ট্রানজিট সুবিধা বহুপাক্ষিক আলোকে দেখা হবে। অর্থাত্ নেপাল ও ভুটানও সেই ট্রানজিট সুবিধা পাবে। ভারত এই দেশ দুটোকে সেই ট্রানজিট সুবিধা দেবে, শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরও ব্যবহার করতে পারবে ভারত। প্রধানমন্ত্রী যখন জানুয়ারিতে (২০১০) নয়াদিল্লি গিয়েছিলেন, তখন এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ওই সময় ওয়াদা করেছিলেন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে আর্থিক সাহায্যের। সেই সাহায্য কোন কোন খাতে দেয়া হবে, সে সংক্রান্ত একটি চুক্তিও ঢাকায় এরই মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের ওই ঋণচুক্তি বাংলাদেশে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। দেখা গেছে, ওই ঋণচুক্তির আওতায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে লাভবান হবে ভারত, বাংলাদেশ নয়। অথচ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, সে ব্যাপারে আদৌ তেমন অগ্রগতি হয়নি। যেমন বলা যেতে পারে গঙ্গার পানি চুক্তি ও তিস্তার পানি বণ্টনের কথা। গত ১ জানুয়ারি (২০১১) গঙ্গার পানি চুক্তির ১৫ বছর শুরু হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তা তো পায়ইনি, বরং পানিপ্রাপ্তির পরিমাণ দিন দিন কমেছে। জানুয়ারির (২০১০) ৩ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৫৬ হাজার ৩৭১ কিউসেক পানি কম পেয়েছে।

২০০৯ সালে এই সময় কম পেয়েছিল ৬০ হাজার কিউসেক (নয়া দিগন্ত, ১২ ডিসেম্বর, ২০১০)। এ ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি পর্যালোচনা করার সুযোগ আছে; কিন্তু বাংলাদেশ এই উদ্যোগটি নেয়নি। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে; কিন্তু ফলাফল শূন্য। ভারতের তেমন আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি। যৌথ নদী কমিশনের আলোচনায় বাংলাদেশের ব্যর্থতা এখানেই যে, বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো চুক্তিতে যেতে ভারতকে রাজি করাতে পারেনি। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে। নানা ধরনের ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশী পণ্য ভারতের বাজারে ঢুকতে পারছে না। সার্ক এখন অকার্যকর। স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী কলকাতায় ভারতের এই ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন (যুগান্তর, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১০)। ৬.৫ কিলোমিটার সীমান্ত এখনও চিহ্নিত হয়নি। বন্ধ হয়নি বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যা। তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ট্রানজিটের ক্ষেত্রে। সেখানে ভারতের স্বার্থ বেশি ও ভারত এ কারণেই ঋণ দিয়েছে। যেসব প্রকল্পের জন্য ঋণ দেয়া হয়েছে, তার সব ক’টিতে যে আমাদের ‘স্বার্থ’ জড়িত, তা আমি মনে করি না। ঢাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। এ খাতে অন্য কোনো দেশ থেকেও আমরা সাহায্য পেতাম। তবে তাতে হয়তো সময় লাগত। ভারত থেকে আমরা ঋণের টাকায় ডবল ডেকার বাস ও আর্টিকুলেটেড বাস কিনব। কিন্তু বাসের মূল্য নির্ধারণের কোনো সুযোগ আমাদের নেই।

ভারতীয় উত্পাদনকারীরা যে মূল্য নির্ধারণ করে দেবে, আমাদের তা মানতে হবে। যেসব প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে তাতে ব্যয় হবে ৬০০ কোটি ডলার। বাকি ৪০০ মিলিয়ন ডলারের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ঠিকমতো হয় না। আর এ ক্ষেত্রে এমনটা যদি হয় তবে ঋণের এই চুক্তি কাজে আসবে না। কিন্তু ঋণের টাকা যদি অব্যবহৃত থাকে, তাহলে অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে। সুদের হার নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই। ওই হার কত (১ দশমিক ৭৫), কিংবা এই হার বিশ্বব্যাংক বা এডিবির হারের চাইতে (পয়েন্ট ২৫ থেকে ১ ভাগ) বেশি না কম, এই বিতর্কের চাইতে যা বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তা হচ্ছে আমরা এ থেকে কতটুকু উপকৃত হব। ঋণের টাকায় ফ্লাইওভার হবে। উপকরণ প্লাস উপদেষ্টা নিতে হবে ভারত থেকে। ফ্লাইওভার তৈরি করার উপদেষ্টা আমাদের দেশেই আছেন; কিন্তু তাদের ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ কথা প্রযোজ্য নদী খননে ড্রেজার ক্রয়ে। ঋণের টাকায় যেসব স্থলবন্দর নির্মিত হবে, তাতে আমাদের রাস্তাঘাট প্রশস্ত হবে, কিন্তু ব্যবহার করবে ভারতীয় হেভি ট্রাক ও ২৮ চাকার ওডিসি বা ‘ওভার ডাইমেনশনাল কার্গো’। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছি। এখন ট্রানজিটের আওতায় হেভি ট্রাক চলাচল করতে হলে প্রশস্ত রাস্তা তো চাই। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরও ব্যবহার করবে ভারতীয় ট্রাক। এ জন্যও স্থলবন্দরের উন্নতি দরকার; কিন্তু কেউ একজন চিন্তা করলেন না চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের যে অবস্থা, তাতে ভারতীয় কনটেইনার হ্যান্ডল করার ক্ষমতা এই বন্দরের রয়েছে কি না?

সবচেয়ে বড় সমস্যা, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে রয়েছে নানা রাজনীতি। যেখানে বহির্নোঙরে কোনো কোনো জাহাজের অবস্থান সময় ১৫ দিন পার হয়ে যায়, জেটিতে ভেড়ার পর কনটেইনার খালাসে লেগে যায় ৭-৮ দিন, সেখানে আমরা আগামীতে ভারতীয় কনটেইনার হ্যান্ডল করতে দিই কীভাবে? এতে কি বাংলাদেশী আমদানি-রফতানি ঝুঁকির মুখে থাকবে না? বাংলাদেশ প্রায় ১১শ’ কোটি টাকা খরচ করে বাংলাদেশ ও ভারত অংশে মোট ১২০ কিলোমিটার গ্রিডলাইন স্থাপন করে ৩ বছর পর ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ এই টাকা ব্যয় করে কি আমরা নিজস্ব বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করতে পারতাম না? আমাদের বিদ্যুত্ দরকার। এই বিদ্যুতের একটা সম্ভাবনা রয়েছে নেপালে। সেখানে ত্রিদেশীয় (নেপাল-বাংলাদেশ-ভারত) উদ্যোগ একটা বড় সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ এটি চাইলেও, ভারত তা চাইছে না। প্রণব বাবু ঢাকায় বলে গেলেন বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানে যাওয়ার ট্রানজিট পাবে। ১৯৯৬-২০০১ সালে তোফায়েল আহমেদ যখন বাণিজ্যমন্ত্রী, ঢাকঢোল পিটিয়ে সেই ট্রানজিট তিনি চালু করেছিলেন। টিকে ছিল কি? মাত্র ১৫ মিনিট। তারপর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই আমরা বেরুবাড়ী দিয়েছিলাম। এ জন্য সংবিধান সংশোধনী (তৃতীয় সংশোধনী, ১৯৭৪) পর্যন্ত করতে হয়েছিল; কিন্তু আমরা বিনিময়ে আজও তিন বিঘা ফেরত পাইনি। আজও সীমান্ত চিহ্নিত হয়নি। সমুদ্রে আমাদের যে অধিকার, সেই অধিকারও আমরা পাইনি ভারতের আপত্তির কারণে। তাই মহাজোট সরকারের আড়াই বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যে ‘উন্নতি’, তা নিয়ে কথা উঠবেই। ভারত যদি একতরফা সুবিধা আদায় করে নেয়, তাহলে তা বিতর্কের মাত্রা বাড়াবে। ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরতা আমাদের স্বার্থ তথা পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করে পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ‘ব্যালান্স’ আনার চেষ্টা করছেন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বার্থেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নত করা দরকার। এই সম্পর্ক নানা জটিলতায় আটকে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী একটি আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মাঝে অন্যতম হলেও পরিবেশ কূটনীতিতে খুব একটা সাফল্য দেখাতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

উপসংহার
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থটাই হলো প্রধান। এই জাতীয় স্বার্থ বাংলাদেশে সবসময় রক্ষিত হয়েছে, তা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। সনাতন বৈদেশিক নীতিতে বিশ্বজুড়েই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ, জ্বালানি, বিদেশে কর্মসংস্থান ইত্যাদি ‘অপ্রচলিত ধারণা’ এখন বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশকে ২০২১ সাল সামনে রেখে (যখন বাংলাদেশের বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৫০ বছর) তার বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। বৈদেশিক নীতি ঢেলে সাজাতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি ও বিদেশে বাংলাদেশী কর্মীদের কর্মসংস্থানের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com
সূত্রঃ আমার দেশ, ০৩/০৭/১১]

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি (দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত দুই পর্বের প্রথম পর্ব)

পরিসর ছোট হয়ে এখন বৈদিশিক নীতি ভারতেই আটকে গেছে
কোনো রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা, জাতীয় নীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেই সঙ্গে নিজের অর্থনীতি বিকাশের প্রয়োজনে তার বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করে থাকে। এক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পায় বেশি। বাংলাদেশের গত চার দশকের বৈদেশিক নীতি পর্যালোচনা করলে এই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে। এক্ষেত্রে সবসময় যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে তা বলা যাবে না। বাংলাদেশের গত চার দশকের বৈদেশিক নীতি যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে বাহ্যত তিনটি ধারা আমরা প্রত্যক্ষ করি। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত একটি ধারা। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর, যা অব্যাহত থাকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। বৈদেশিক সম্পর্কের বর্তমান ধারায় কিছু কিছু পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাকে কোনো কোনো বিশ্লেষক ‘ভারতীয় মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই মডেলের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল : ১. সংসদীয় গণতন্ত্র, ২. সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় দলীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা, ৩. সমাজতান্ত্রিক সমাজকাঠামো ও ৪. ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি। মুজিবের বৈদেশিক নীতিতেও এই নীতি প্রতিফলিত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে যেসব দেশ তাকে সহযোগিতা করেছিল, সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরপরই তাদের সঙ্গে একটা ‘বিশেষ সম্পর্ক’ গড়ে তোলে। মুজিবের শাসনামলে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির কতগুলো বৈশিষ্ট্য আমরা উল্লেখ করতে পারি। এগুলো হচ্ছে— ১. সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন, ২. ভারতের নির্ধারক ভূমিকা। তবে আদর্শ হিসেবে জোটনিরপেক্ষতা অনুসরণ করা, ৩. অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ৪. চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা ইত্যাদি। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র ৪৩ মাস। ওই সময় ব্রেজনেভ (সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান) প্রণীত ‘যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি’র প্রতি সমর্থন, তত্কালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারের ৭-দফা দাবির প্রতি সমর্থন, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা শীর্ষক সম্মেলনের প্রতি সমর্থন ইত্যাদি কারণে বহির্বিশ্বে একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটা অ্যালায়েন্স গড়ে তুলছে। বহির্বিশ্বে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণেই বাংলাদেশ সোভিয়েত শিবিরে অবস্থান করছিল। অভ্যন্তরীণভাবে একটা ‘চাপ’ও ছিল। শেখ মুজিবের সময় ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা ছিল বিতর্কিত। তিনি ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিলেও, ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও গিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দেন তিনি। চীনের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের একটি উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি।

আগস্ট, ১৯৭৫-পরবর্তী বৈদেশিক নীতি
মুজিবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতেও পরিবর্তন আসে। সৌদি আরব ও চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এসব স্বীকৃতির ব্যাপারে নতুন সরকারের (খন্দকার মোশতাক) আগ্রহ দেখে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশ ‘ভারত-সোভিয়েত অক্ষ’ থেকে বের হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট-পরবর্তী ঘটনার মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি প্রথমে নিজেকে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে উন্নীত করেন (২৯ নভেম্বর ১৯৭৬) ও পরে বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন (২১ এপ্রিল ১৯৭৭)।

জেনারেল জিয়া তার বৈদেশিক নীতিতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের আমলে এই দিকটি ছিল উপেক্ষিত। জিয়া ধর্মীয় বন্ধনের কারণে ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইসলামের ব্রিজস্বরূপ। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানে গঠিত আল কুদ্স কমিটি কিংবা ১৯৮১ সালে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও অন্যতম সদস্য ছিল বাংলাদেশ। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ সম্পর্কিত এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। জেনারেল জিয়া ভারতের ভূমিকার ব্যাপারে কঠোর হয়েছিলেন। গঙ্গার পানি বণ্টনে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী ভারত ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের পানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ হাজার থেকে ৪৯ হাজার কিউসেক। কিন্তু মুজিবের মৃত্যুর পর ভারত গঙ্গা নদী থেকে একতরফাভাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে ও একই বছরে ৪২-জাতি ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ফারাক্কা প্রশ্ন উত্থাপন করে। পরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে প্রশ্নটি উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত উত্থাপিত হয়নি এবং ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতার শর্তে বাংলাদেশ ফারাক্কা প্রশ্নটি জাতিসংঘে আর তোলেনি। জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনেও (অক্টোবর ’৯৫) সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া ফারাক্কা প্রশ্নটি আবার উত্থাপন করেন। ১৯৭৭ সালে ভারতে জনতা সরকারের আমলে একটি চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ ৩৪ হাজার ৭০০ কিউসেক পানি পেয়েছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল পাঁচ বছরের। এরপর দীর্ঘদিন আর কোনো চুক্তি হয়নি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানির ভাগাভাগির প্রশ্নে নতুন আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে কাগজে-কলমে বাংলাদেশের পানির পরিমাণ বাড়লেও বাস্তব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের পর অনেক কম পানি পাচ্ছে। সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে জেনারেল জিয়ার অপছন্দ ছিল। তিনি যেভাবে ‘মস্কো টাইপ সমাজতন্ত্র’, ‘বিদেশতন্ত্র’ কিংবা ‘বাকশালতন্ত্রে’র কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাতে করে পরোক্ষভাবে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তার অপছন্দের কথা তিনি বলতে চেয়েছিলন। অপরদিকে চীনে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে শুধু সম্পর্কই বৃদ্ধি করেননি; বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে চীনের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান আগ্রাসনের (১৯৭৮) ব্যাপারেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা নিয়েছিল। জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি সাত্তার রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রথম সৌদি আরব সফরে গিয়েছিলেন। এটা ছিল জেনারেল জিয়ার বৈদেশিক নীতিরই ধারাবাহিকতা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
জেনারেল এরশাদ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে জেনারেল এরশাদ জিয়াউর রহমানের প্রণীত নীতিই প্রধানত মেনে চলেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে তার পতনের আগপর্যন্ত তিনি তার বৈদেশিক নীতিতে কোনো বৈচিত্র্য আনতে পারেননি। বরং ১৯৭৫ সালের আগস্ট-পরবর্তী যে রাজনৈতিক ধারা, সেই রাজনৈতিক ধারাই তিনি অনুসরণ করে গেছেন। এরশাদের বৈদেশিক নীতির কতগুলো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— ১. ইসলামিক বিশ্ব তথা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া, ২. চীনের প্রতি রাজনৈতিক তথা সামরিক নির্ভরশীলতা, ৩. সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতি কঠোর মনোভাব, ৪. সার্ককে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ, ৫. ভারতের প্রতি নমনীয় মনোভাব ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

এরশাদের আমলেই ফারাক্কায় পানি সরবরাহের ব্যাপারে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব হয়নি। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ তালপট্টি এবং ভারতে আশ্রিত উপজাতীয়দের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারেও এরশাদ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ তালপট্টিতে অবতরণ করেছিল। সেই থেকে দক্ষিণ তালপট্টি অন্যতম ‘ইস্যু’ হয়ে থাকলেও জেনারেল এরশাদ এ ব্যাপারে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে পারেননি। যেমনি পারেননি ভারতে আশ্রিত চাকমাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের লক্ষ্যে একটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে। তার শাসনামলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আরও অশান্ত হয়। ভারতের ব্যাপারে জেনারেল এরশাদের এই নমনীয় মনোভাব অভ্যন্তরীণভাবে নিন্দিত হয়েছিল। তবে জেনারেল এরশাদের বৈদেশিক নীতির একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ইসলামিক বিশ্ব তথা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া। ক্ষমতা দখল করার এক মাসের মধ্যে তার সৌদি আরব সফর এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি ইসলামিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক সাহায্যের ব্যাপারটিও এর সঙ্গে জড়িত। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে জেনারেল এরশাদের আমলে। ১৯৮৩ সালে ১৪ জন সোভিয়েত কূটনীতিককে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক গঠিত হয় তার আমলে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে। তবে উদ্যোগটি নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

বেগম জিয়া
১৯৯১ সালের অক্টোবরে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারির (১৯৯১) নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেছিলেন। বেগম জিয়া মূলত তার পূর্ববর্তী বিএনপি সরকার তথা জেনারেল জিয়ার বৈদেশিক নীতিই অনুসরণ করেন। বেগম জিয়ার বৈদেশিক নীতির উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে— ১. চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া, ২. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের আরও উন্নতি করা, ৩. আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’কে আরও কার্যকর করা, ৪. ইসলামিক বিশ্বের নেতা হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখা ও সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া এবং ৫. ভারতের সঙ্গে একটা সমঝোতায় উপনীত হওয়ার প্রচেষ্টা।
বেগম জিয়া একাধিকবার বেইজিং, ওয়াশিংটন ও সৌদি আরব সফর করেন। প্রতিটি স্থানেই তিনি উষ্ণ সংবর্ধনা পান ও বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়। তিনি ভারতও সফর করেন (২৬-২৮ মে ’৯২)। ভারত সফরের পর তিনি বলেছিলেন, এই দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। তবে তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গঙ্গার পানির ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারেননি। পানির ব্যাপারে কোনো চুক্তিতে উপনীত হতে না পারার ব্যর্থতা বেগম জিয়ার বৈদেশিক নীতির জন্য ছিল একটি দুঃখজনক ঘটনা। বেগম জিয়া এপ্রিল (’৯৩) অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সভানেত্রীত্ব করেন এবং সার্কের নেতৃত্ব দেন। এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাসের একটি পরিবেশ তৈরি করা ছিল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তার সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়নি। বেশকিছু অমীমাংসিত বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি বেগম জিয়ার আমলে।

বেগম জিয়ার সময়ে নিবারক কূটনীতির কথা বলা হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটা একটা নতুন উপাদান। বিশ্ব রাজনীতি থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে গুণগত পরিবর্তন এসেছে, তারই ফলশ্রুতিতে এসেছে নিবারক কূটনীতির এই ধারণা। নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ সমাধান করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের মাটিতে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করলেও বাংলাদেশ বার বার মিয়ানমারের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়িয়ে যায়। মিয়ানমারের উস্কানিমূলক তত্পরতা অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশ মূলত নিবারক কূটনীতির মূলনীতি অনুসরণ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। কিন্তু নীতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার রাজি হলেও রোহিঙ্গারা আজও তাদের বাসভূমে ফিরে যায়নি।

বেগম জিয়ার সময়সীমায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশের এই ভূমিকার প্রশংসা করে। বেগম জিয়ার সময়ে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন বেসরকারিভাবে বাংলাদেশ সফর করেন। বেগম জিয়ার সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রকটভাবে অনুভূত হয়। বিরোধী দলের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে বেগম জিয়া যখন ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারছিলেন না, তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূমিকা লক্ষ করা যায়। মার্কিন প্রশাসন এ সময় গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা, সহিংসতা পরিহার করা ইত্যাদি প্রশ্নে বেশকিছু মন্তব্য করে। ১৫ ফেব্রুয়ারির (’৯৬) বিতর্কিত নির্বাচন সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্র নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল।

শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘ঐকমত্যের সরকার’ পাঁচ বছরের টার্ম শেষ করে গত জুলাই ২০০১-এ। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই সরকার গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তখন তিনটি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে— ক. সার্বভৌম ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খ. বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি নবায়ন না করা, গ. দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। অন্যান্য আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নেও বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণ। এর বাইরে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, সার্ক ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা বিশ্বায়ন সম্পর্কে মেনিফেস্টোতে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারটিকে শেখ হাসিনা সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। যে কারণে আমরা দেখতে পাই, ১৯৯৬ সালের শেষদিকে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটি ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ভারতে আশ্রিত পাহাড়ি শরণার্থীরা বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রীচুক্তি আর নবায়ন করেনি। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ১৯৯৭ সালের ১৯ মার্চ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কোনো পক্ষ থেকেই চুক্তিটি নবায়ন করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি, যদিও চুক্তির ১১ নং ধারায় বলা হয়েছিল, দুটি দেশ ইচ্ছে করলে চুক্তি নবায়ন করতে পারবে। চুক্তি নবায়ন না করে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করেছিল। ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। এই চুক্তিটি করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করেছিল। ওই চুক্তিটির বৈশিষ্ট্য ছিল : ১. এটি ৩০ বছর মেয়াদি ও ২. শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। কিন্তু চুক্তিটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের চুক্তির চাইতে বর্তমান চুক্তিতে বাংলাদেশ কম পানি পাবে। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অবশ্য ছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে নেই। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কলকাতা বন্দরের জন্য ৪০ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ছিল না। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী একবার সংসদে স্বীকার করেছিলেন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পায়নি (ভোরের কাগজ, ১১ জুলাই ১৯৯৭)। কিন্তু নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার অন্যান্য নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহমান নদীর সংখ্যা ৫৪টি। ভারত শুধু গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়েই সমস্যা সৃষ্টি করেনি; বরং একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের কথাও বলছে। ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ভারত অভিন্ন ২৫টি নদীর ৪০টি স্থানে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো, যেমন বাঁধ, গ্রোয়েন, স্পার নির্মাণ করেছে বা নির্মাণকাজ শেষ করে এনেছে। বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আগামীতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সেই সরকারকে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে প্রায় ৫০ হাজার পাহাড়ি শরণার্থী ভারতের আশ্রয় থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিল। পরবর্তীকালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি শান্তিচুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমস্যার একটি সমাধানও পাওয়া গিয়েছিল। শান্তিচুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে শান্তি পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছিলেন। এটা তার সরকারের একটি সাফল্য সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ইতোমধ্যে বিদেশিদের সেখানে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের উদ্যোগের ঘটনায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও নষ্ট হয়েছে। শান্তিচুক্তি নিয়ে খোদ পাহাড়িদের মধ্যেই দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেও এপ্রিলে (২০০১) ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম, সীমান্ত সংঘর্ষে ১৬ বিএসএফ ও ৩ বিডিআর সদস্যের মৃত্যুতে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। উপরন্তু ভারতীয় সংসদে বিডিআর সদর দফতরে বোমাবর্ষণের হুমকি ও ঊর্ধ্বতন বাংলাদেশী সেনা অধিনায়কদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য এবং এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদ না করার ঘটনায় শেখ হাসিনার সরকার সমালোচিত হয়েছিল। সীমান্ত সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে বাজপেয়ি-হাসিনা শীর্ষ বৈঠকের একটি সম্ভাবনা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত ওই শীর্ষ বৈঠকটি আর অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয় তখন বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। এর একটি হচ্ছে, উপ-আঞ্চলিক জোটের সিদ্ধান্ত; দ্বিতীয়টি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার বাংলাদেশ সফরের সময় (জানুয়ারি ’৯৭) এটা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে, ভারত ও বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অপর দুটি দেশ নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনে রাজি হয়েছে। এই দেশগুলো হচ্ছে ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল। উপ-আঞ্চলিক জোটটি তখন উন্নয়নের চতুর্ভুজ বা South Asian Growth Quadrangle (SAGQ) নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এপ্রিলে (১৯৯৭) কাঠমান্ডুতে চারদেশীয় (বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান) পররাষ্ট্র সচিবদের যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ঝঅএছ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, যা পরে আর কার্যকর হয়নি।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর জায়গা হচ্ছে আন্তঃবাণিজ্য। বাংলাদেশ ভারতে যা রফতানি করে, আমদানি করে তার অনেক বেশি। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে ঘাটতি বাড়ছেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী শেখ হাসিনার সময়সীমার পাঁচ বছরে ভারতীয় পণ্য আমদানি বেড়েছে তিনগুণ। বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম কারণ হচ্ছে ভারতীয় নীতি। সাপটা চুক্তিতে বেশ কয়েকটি পণ্যের ব্যাপারে শুল্ক হ্রাস করার কথা বলা হলেও ভারত তা মানেনি। বাজপেয়ি বাংলাদেশ সফরের সময় ২৫ শ্রেণীতে ১০৯টি বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতকে ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজি করাতে পারেনি। এটা একটা ব্যর্থতা।

(বাকি অংশ আগামী পরবর্তী পোস্টে)।
ড. তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণা

এই ভুখা বাংলাদেশ কারো কাম্য নয়
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল যখন পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং দেশটিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে। ওই তালিকায় ১৭৭টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। অর্থাৎ ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় শীর্ষে যে দেশটি রয়েছে সোমালিয়া, সেই তালিকা ধরে বাংলাদেশ আছে ২৫ নম্বরে। তবে একটি আশার কথা_বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভালো। পাকিস্তান রয়েছে ওপরের দিকে, ১২তম স্থানে। পাঠক, এখানে ভারতের অবস্থান ৭৬, আর আফ্রিকার সেনেগালের ৮৫। যার অবস্থান যত নিচে, তার অবস্থান তত ভালো। তালিকায় স্থান পাওয়া প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে ১৪টিই আফ্রিকার। সোমালিয়া, সাদ, সুদান, কঙ্গো কিংবা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সেনেগালকে মেলানো যাবে না। তার কারণ একটাই, সেনেগালে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থাও দেশটির ভালো। বড় ধরনের কোনো জাতিগত দ্বন্দ্বেরও খবর পাওয়া যায় না দেশটি থেকে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় যে অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অব্যবস্থা বিরাজ করছে (পাকিস্তান, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কা), তার সঙ্গে ভারতকে মেলানো যাবে না। ভারতে অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। যে কারণে ঠিক ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে ভারতকে মেলানো যাবে না।

ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান প্রথমদিকে থাকা নিঃসন্দেহে একটি দুঃখজনক সংবাদ। আমাদের রাজনীতিবিদরা এটা নিয়ে ভাবেন কি না জানি না, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে এই ব্যর্থ রাষ্ট্রের 'বদনাম' নিয়ে আমরা গৌরব বোধ করতে পারি না। আমাদের অনেক কিছু আছে গৌরব করার মতো। আমাদের সেনাবাহিনী আজ বিদেশে শান্তি মিশনে কাজ করছে। তারা দক্ষ। আমরা তৈরি পোশাকে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছি। এক ধরনের দক্ষতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আমরা অর্জন করেছি এই ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ওষুধ আজ যাচ্ছে প্রায় ৬০টি দেশে। যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি, তাহলে এই ক্ষেত্রেও আমরা বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে পারব। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি কারণে আমাদের অর্জন ম্লান হতে বসেছে। আর এসব কারণেই আমরা ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছি।

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন মোট ১২টি ক্ষেত্র বা বিষয় সামনে রেখে রাষ্ট্রটি কতটুকু 'ব্যর্থ', তা নির্ণয় করে। এই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ওই রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি, অর্থনীতির নিম্নগতি, অসম উন্নয়ন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কা, জনসংখ্যার চাপ, উদ্বাস্তু, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুতি, সুশীল সমাজের মধ্যে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকা তৈরি করা হয়। এলিজাবেথ ডিকিসন (Elizabeth Dickison) ব্যর্থ রাষ্ট্র নিয়ে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে যে প্রবন্ধটি লেখেন (Failed States, 20, June), তাতে বাংলাদেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বিপর্যয়, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ক্ষতির সম্মুখীন বাংলাদেশ হবে, সে কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে দুজনই দরিদ্র। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি শুধু এক মিটার বাড়ে, তাহলে দেশটির ১৭ শতাংশ এলাকাই পানির নিচে চলে যাবে। ভাবতে কষ্ট লাগে, যখন দেখি বাংলাদেশের আগে অবস্থান করছে ক্যামেরুন, আর পরে লাইবেরিয়া। লাইবেরিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সেখানে গিয়েছিল। সেখানে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা উদ্বাস্তু পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। এর পরও সেখানে বর্তমানে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে, যা বাংলাদেশে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হুমকির মুখে। এ কারণেই তুলনামূলক বিচারে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে লাইবেরিয়া।

বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে ২৫ লাখ। আগামী ১০ বছরে এই ছোট্ট দেশে জনসংখ্যা হবে ২১ কোটি। এই জনসংখ্যাকে আমরা শক্তিতে পরিণত করতে পারিনি। অনেক আগেই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে লুট হয়ে দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। সংগত কারণেই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত দুষ্কৃতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ায় আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকা প্রণয়নে তাই এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কারণ যা, তা হচ্ছে, ব্যর্থ রাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া। আফগানিস্তান, পাকিস্তান কিংবা সোমালিয়া এর বড় প্রমাণ। জেমস ট্রাউব (James Traub) তাঁর একটি প্রবন্ধে (প্রকাশিতব্য July-August, Foreign Policy, Failed States) স্টুয়ার্ট পেট্রিকের (Stewart Patrick) গ্রন্থ Weaklines: The Brutal Truth-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। স্টুয়ার্ট পেট্রিক লিখেছেন, 'A middle ranking group of weak, but not yet failing states may offer more long term advantages to terrorists than either anarchic zone of strong states'। স্টুয়ার্ট পেট্রিকের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই। দরিদ্র জনগোষ্ঠীই ইসলামী জঙ্গিদের টার্গেট। তথাকথিত জিহাদের নামে এরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রিক্রুট করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্যটি গুরুত্বের দাবি রাখে। বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। এরা বেকার। এমনকি গ্র্যাজুয়েশন করেও এরা দলীয় সম্পৃক্ততা না থাকার কারণে কোনো চাকরি পাচ্ছে না। জঙ্গিরা এদেরই টার্গেট করে। ইসলামী জঙ্গি আন্দোলনে অর্থ একটা ফ্যাক্টর। আল-কায়েদা নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য ওসামা বিন লাদেন প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন।

ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণা এবং বাংলাদেশের তালিকাভুক্তি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ফরেন পলিসির গবেষকরা ১৭৭টি দেশের এক লাখ ৩০ হাজার সূত্র ঘেটে, তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকাভুক্তি করেছেন। বাংলাদেশ নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তার পেছনে কিছুটা হলেও যুক্তি আছে। গেল বার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৪। অর্থাৎ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। বাংলাদেশের পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নূন্যতম প্রশ্নে ঐকমত্য প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান যে পরিস্থিতি, তা তো শুধু অবনতির কথাই বলে। সংবিধান সংশোধন, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল একটা দলের এজেন্ডা হতে পারে না। এর সঙ্গে পুরো জাতির স্বার্থ জড়িত। এখন বিরোধী দলের কোনো মতামত ছাড়াই সংবিধান যদি সংশোধন করা হয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় (মন্ত্রিসভা তা অনুমোদন করেছে), তা সংকটকে আরো গভীরতর করবে। বিএনপি ৪৮ ঘণ্টা হরতালের কথা বলেছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব কিংবা সুশীল সমাজের সঙ্গে বিভক্তির কথাই বলছে। আর এসবই ব্যর্থ রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। তাই ব্যর্থ রাষ্ট্র নিয়ে কোনো বিতর্ক নয়। বরং চাই যৌথ উদ্যোগ, যা ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে পারবে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান
 অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ৩০/০৬/১১]