রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতি বদলাবে না


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এলো, তা হচ্ছে এই 'বিজয়' কি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আদৌ কোনো পরিবর্তন ডেকে আনবে? যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ কোনো বড় ভূমিকা পালন করে না। এর পরও হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর ও বাংলাদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এটা বলা সঙ্গত যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কিছুটা গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এবং চীন বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী হওয়ায় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আলোকে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা গুরুত্ব দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়। যেহেতু এ অঞ্চলে ভারত একটি শক্তি, সেহেতু ভারতকে সঙ্গে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে মার্কিন নীতিনির্ধারক, বিশেষ করে সামরিক নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আগ্রহটা আরও বেড়েছে। যে কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র একটি অক্ষ গড়ে উঠেছে। একদিকে ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে সেখানে 'যে শূন্যতার' সৃষ্টি হবে, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করেন সেই 'শূন্যতা' পূরণ হতে পারে ভারতকে দিয়ে, যা চূড়ান্ত বিচারে তার স্বার্থকে রক্ষা করবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে ভারত, যার পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার। ভারত সেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করছে। প্রচুর হাইওয়ে তৈরি করছে ভারত। এখানে সীমান্তবর্তী পাকিস্তান সরকারই উপেক্ষিত থেকেছে। আর ভারতের এই বিনিয়োগ সম্ভব হয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারকের সম্মতি দেওয়ার পরই। ধারণা করছি, ২০১৪ সালে মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হলে ভারতের তথাকথিত একটি 'শান্তিরক্ষী' বাহিনী সেখানে অবস্থান নেবে। অথবা ন্যাটোর একটি এশীয় সংস্করণ দেখতে পাব আমরা ওই সময়, যেখানে ভারতের একটি অংশগ্রহণ থাকবে। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো যখন গঠিত হয়েছিল, তার প্রথম এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, এই বাহিনী শুধু ইউরোপেই নিয়োজিত থাকবে। ন্যাটোর উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে 'ইউরোপের গণতন্ত্রকে' রক্ষা করা। ন্যাটোর সেই ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রথমবারের মতো আফগান যুদ্ধে ন্যাটো বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেহেতু ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা আর আফগানিস্তানে 'ঝুঁকি' নিতে চাইছে না, সেহেতু এ অঞ্চলকে ঘিরে ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ (সেটা ভিন্ন নামেও হতে পারে) হবে এবং ভারত তাতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। এই 'প্রক্রিয়ায়' বাংলাদেশেও জড়িত হবে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সুবিধা এখানেই যে, বাংলাদেশ সরকার 'ভারতের এই ভূমিকাকে', যা যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, সমর্থন করছে। সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে আরও দেখা যাবে, সম্প্রতি ভারত পারমাণবিক অস্ত্র বহনযোগ্য যে মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র (অগি্ন-৫) সাফল্যের সঙ্গে উৎক্ষেপণ করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নীতির ব্যাপারে যে নীতি গ্রহণ করেছে, ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র নীতির ব্যাপারে তার সেই নীতি পরস্পরবিরোধী। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তার মিত্র দেশগুলোকে ব্যবহার করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে এই কাজটি করছে না। বরং ভারতকে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে এই কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে পারমাণবিক চুক্তি রয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অত্যাধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটাই আর তা হচ্ছে, চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো। নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বেশ ক'টি ইস্যুতে দেশ দুটির মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বাংলাদেশ সফর করার আগে হিলারি ক্লিনটন বেইজিংও সফর করেছিলেন। সেখানে চীনা নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনা সফল হয়নি। চীনের সমরসজ্জা বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার একটি কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য চীন যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। চীন ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌ-শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করছে। এটি বিবেচনায় নিয়েই গড়ে উঠছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ, যে অক্ষে বাংলাদেশও একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্র্যাটেজি কিংবা শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে গড়ে ওঠা ÔContaintment theoryÕ-এর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই নীতি অবলম্বন করেছিল। এ কারণে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন। বাংলাদেশের সীমান্তে রয়েছে মিয়ানমার, যে দেশটির সঙ্গে চীনের কৌশলগত সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। চীনের সীমান্তবর্তী দেশ হচ্ছে মিয়ানমার। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে। সু চি এখন সংসদ সদস্য। অনেক পশ্চিমা দেশ এখন মিয়ানমারের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জেনারেল সেইন এখন তার সরকারকে একটি 'বেসামরিক অবয়ব' দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বাংলাদেশ ও ভারতকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে। এমনকি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিককালে, বিশেষ করে গেল ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে এসেছিলেন মারিয়া ওটেরো (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয় সম্পর্কিত ডেস্ক), রবার্ট ও'ব্লেক (সহকারী পররাষ্ট্র সচিব, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া ডেস্ক) এবং ওয়েন্ডি শেরম্যান (আন্ডার সেক্রেটারি রাজনৈতিক বিষয়াদি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)। গত ১৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা শীর্ষক একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন সহকারী পররাষ্ট্র সচিব (রাজনৈতিক বিষয়াদি) আন্দ্রে শাপিরো। অত্যন্ত গোপনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিংবা কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা সংবাদপত্রে জানানো হয়নি। নিরাপত্তা বিষয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দু'দেশ আলোচনা করল, কিন্তু জাতি তা জানল না। গোপনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত গোপনেই রাখা হলো। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের কোনো মন্তব্যও আমার চোখে পড়েনি। তবে বাংলাদেশে মার্কিন সেনা মোতায়েনের একটি সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। অনেকেরই মনে থাকার কথা, গত ২ মার্চ সিনেটের এক অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিটের বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত কমান্ডার অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের 'বিশেষ বাহিনী' মোতায়েন রয়েছে। এটি নিয়ে বাংলাদেশে গুঞ্জনের সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, কিছু সেনা রয়েছে, যারা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রশিক্ষণের জন্য আসে আবার চলেও যায়। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, 'তথাকথিত সন্ত্রাসীদের মোকাবেলার' জন্য(?) ভিন্ন নামে ও ভিন্ন পরিচয়ে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর লোকজন বাংলাদেশে রয়েছে। এর একটি আইনি কাঠামো দেওয়ার জন্যই ওই নিরাপত্তা শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও স্বীকার করে না যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক সময় আশ্রয় দিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। খালেদা জিয়ার নয়াদিলি্ল সফর ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রত্যয় নিঃসন্দেহে মার্কিন নীতিনির্ধারণদেরও খুশি করবে। বাংলাদেশ-ভারত ভালো সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য। বাংলাদেশ এখন 'টিফা' চুক্তির বদলে 'টিকফা' (ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম) চুক্তি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। একই সঙ্গে 'আকসা' (অ্যাকুইজিশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট) চুক্তির ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী। বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এখন বারাক ওবামা আবার নির্বাচিত হওয়ার পর এসব নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না। 'মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্ট' থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও এখন সৃষ্টি হলো। সব মিলিয়ে যা বলা যায় তা হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
Daily SAMAKAL
20.11.12

ওবামার এশিয়া সফর ও আমাদের পররাষ্ট্রনীতি


ওবামা মিয়ানমারে যাচ্ছেন আজ ১৯ নভেম্বর। তার এশিয়া সফরে তিনি তিনটি দেশে যাবেনÑ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া। দ্বিতীয় টার্মে বিজয়ী হওয়ার পর প্রথম সফর হিসেবে তিনি যখন মিয়ানমারকে বেছে নেন, তখন বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি, সেই স্ট্র্যাটেজিতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। আমেরিকান নীতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তাতে বাংলাদেশও একটি অংশ। বাংলাদেশের ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় একটি ‘যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ’ চুক্তি স্বাক্ষর, প্রস্তাবিত ‘আকসা’ (অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট) চুক্তি বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ। এ অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি, তাতে আগামীতে বাংলাদেশ একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। এখন এই স্ট্র্যাটেজিতে যোগ হল মিয়ানমারের নাম। ওবামার মিয়ানমার সফরের সুযোগটি আমরা গ্রহণ করতে পারতাম। যদিও একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি সামনে রেখেই ওবামা এ অঞ্চলে আসছেন। কম্বোডিয়ায় পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে তিনি যোগ দেবেন। আর থাইল্যান্ডে একটি সামরিক মহড়ায়ও উপস্থিত থাকবেন। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলাম না এবং ওবামাকেও বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানাতে পারলাম না। আমাদের স্বার্থেই এ সফর আমাদের প্রয়োজন ছিল।
আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ‘কাজে’ অত্যন্ত দক্ষ। তিনি ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। নিজে সব প্রটোকল ভেঙে শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীনই ছবি তোলেন এবং নিজের ‘অবস্থান’-এর কথা ভুলে গিয়ে ভিভিআইপিদের ‘অটোগ্রাফ’ নেন। পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন কিংবা সফলতার জন্য তার এই ‘ফটোগ্রাফি’ কিংবা ‘অটোগ্রাফ’ নেয়া আদৌ কোন ভূমিকা পালন করতে পেরেছে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে আমি নিশ্চিত কোন কোন ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোম্পানি তার তোলা ছবি ও ‘অটোগ্রাফ’ নিয়ে একটি প্রদর্শনী করতে পারে আগামীতে (প্রদর্শনীর নাম হতে পারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চোখে বিশ্ব)। কিছুদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকা তাদের প্রথম পাতার সংবাদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেছিল। তাতে দেখা যায়, গত ৪৬ মাসে তিনি ১৪৯ বার বিদেশ সফর করেছেন। ৪৫২ দিন সফরে বিদেশে কাটিয়েছেন। এর পরে যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কম্বোডিয়া ও লাওস সফর। তিনি জিবুতিতেও গিয়েছিলেন। এখন যাবেন রাশিয়া সফরে। তার পেছনে ২০০৯ সালে খরচ হয়েছিল ৬৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫ টাকা (হাত খরচ, দৈনিক ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, আনুষঙ্গিক ভাতা, ট্রানজিট ভাতা ইত্যাদি)। মাত্র ১৩টি দেশের খরচ ছিল ওটি। এরপর কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালের খরচ বের করতে পারেন। তার সফরের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে সেমিনারে অংশগ্রহণ। এসব সফরে দেশের স্বার্থ সুরক্ষা ও কূটনৈতিক দরকষাকষির কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশে, যেখানে কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি, সেখানে সেমিনারকেন্দ্রিক সফরে না যাওয়াই উত্তম। যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত রয়েছে, কিংবা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সুযোগ আছে, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্যই যাবেন। পত্রিকায় দেখলাম, আমাদের ‘রবীন্দ্রপ্রেমিক’ ও ‘চিত্রকলা বিশেষজ্ঞ’ পররাষ্ট্র সচিব জাতিসংঘের সিভিল সার্ভিস সমিতির সদস্য মনোনীত হয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে তার জন্য একটি বড় পাওয়া। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সাফল্য বয়ে আনতে পেরেছেন, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।
প্রসঙ্গে আসছি। ওবামার এশিয়া সফর আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারতÑ যদি ওবামাকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা আমরা করতে পারতাম। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো। ড. ইউনূসের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের নাম-যশ আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বারবার প্রশংসিত হয়েছে। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এটা আমাদের বড় পাওয়া। আমাদের সেনাবাহিনী প্রকারান্তরে আমাদের বৈদেশিক নীতির সাফল্যের পেছনে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দু-একটি বিষয় এখনও ঝুলে আছে। এর একটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের কোটামুক্ত সুবিধা। অনেক দিন থেকেই আমাদের ব্যবসায়িক নেতারা শুল্কমুক্ত কোটা সুবিধা চেয়ে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার অনেক দেশকেই এ সুবিধা দেয়। আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫ ভাগ শুল্ক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদের পণ্য (তৈরি পোশাক) নিয়ে মার্কিন বাজারে টিকে আছেন। আজ ওবামার সফরের মধ্য দিয়ে আমরা এ ধরনের একটি প্রতিশ্র“তি আদায় করতে পারতাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য সংস্থা ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন’ (এমসিসি) থেকে বাংলাদেশ কোন সাহায্য পাচ্ছে না। ২০০৪ সালে এমসিসি গঠিত হয়েছিল। ওবামার সফরের মধ্যে দিয়ে আমরা এ ব্যাপারে সুবিধা নিতে পারতাম। বিশ্বব্যাপী জঙ্গি উচ্ছেদে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার। এ লক্ষ্যে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় আমরা একটা ‘যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। ‘আকসা’ বা ‘অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট’ নিয়েও আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার সশস্ত্র বাহিনীর জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রাবিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ বিভিন্ন সুবিধার জন্য ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা পাবে। এই চুক্তির কিছু ধারা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকার ‘আকসা’ চুক্তি স্বাক্ষর করবে। যুক্তরাষ্ট্র ‘টিকফা’ বা ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট’ চুক্তিতে আগ্রহী। ‘টিফা’র পরিবর্তিত নামই হচ্ছে ‘টিকফা’। এখানে মার্কিন স্বার্থ অনেক বেশি। ‘আকফা’ ও ‘টিকফা’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক। ওবামার সফর অনুষ্ঠিত হলে এ ব্যাপারে একটি চুক্তি হতে পারত। ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে আদৌ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। দূতাবাস এবং রাষ্ট্রদূত তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। এটা সত্য, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মার্কিন রাষ্ট্রপতির ব্যস্ততা অনেক বেশি। তিনি এর আগে যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এসেছিলেন, তখনও একাধিক দেশ সফর করেছিলেন। এ ধরনের সফর অনেক আগেই নির্ধারিত থাকে। ‘হুট’ করে তা পরিবর্তন করা যায় না। তুলনামূলক বিচারে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমার মার্কিন প্রশাসনের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন নিজে বেসামরিক প্রেসিডেন্টের তকমা লাগিয়েছেন। বিরোধী নেত্রী অং সান সু চিকে উপনির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন। সু চি এখন সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভারতেও গেলেন। প্রেসিডেন্ট সেইনের এই ‘দুয়ার খোলা’ নীতির সুযোগ নিচ্ছেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অফিস আবার খোলা হয়েছে। কোকাকোলাও এসেছে। মিয়ানমারে রয়েছে বিপুল জ্বালানিসম্পদের (গ্যাস ও তেল) রিজার্ভ। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা আসবে এটাই স্বাভাবিক। ওবামার সঙ্গে যে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী আসবেন, তা বলে দিতে হয় না। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। ওবামা ভারতেও এসেছিলেন। তখনও আমরা সুযোগটি নিতে পারিনি। এখন মিয়ানমারে আসছেন। আমরা এই ‘সুযোগ’টিও কাজে লাগাতে পারলাম না। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আমরা আকৃষ্ট করতে পারলাম না। আমাদের অর্থমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দেশে বিনিয়োগ নেই। এর জন্য তিনি দায়ী করেন অধ্যাপক ইউনূসকে (?)। অথচ বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস কোনভাবেই জড়িত নন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ব্যাপারে দূতাবাসগুলোর কোন ভূমিকা নেই।
প্রসঙ্গক্রমে এসে গেল একটা কথাÑ বাংলাদেশ পর্তুগালে নতুন দূতাবাস খুলেছে। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চয়ই জানেন, সারা ইউরোপেই অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। মন্দার কারণে সেখানে একাধিক রাষ্ট্রে কৃচ্ছ্রসাধন চলছে। সরকারেরও পতন হয়েছে (গ্রিস, ইতালি)। পর্তুগালের অবস্থা আরও খারাপ। একক মুদ্রা হিসেবে ইউরো ব্যবহারকারী ১৭ দেশের এ অঞ্চলের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। শুধু ইউরো অঞ্চল নয়, ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তাই পর্তুগালে নয়া দূতাবাস খুলে আমাদের প্রাপ্তি কী? কিছুই না। বরং গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল সম্ভাব্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গওকঞ দেশগুলোর (মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক) কথা বলছেন, সেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়ানো উচিত। গওকঞ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারব বেশি।
বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন আসছে। সনাতন পররাষ্ট্রনীতি আর থাকছে না। এক্ষেত্রে আমাদের দূতাবাসগুলো পরিচালনায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অনেক দেশে দূতাবাস খোলা হয়েছে, যার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। খুব কম ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রদূতরা ‘সফলতা’ দেখাতে পারছেন। রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে সনাতন নিয়োগের প্রক্রিয়া বাতিল করাও প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি ‘সফ্ট স্টেট’ (ঝড়ভঃ ঝঃধঃব)। আমাদের অনেক কিছু দেয়ার আছে বিশ্বে। আমাদের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছেন না। বারাক ওবামাকে আমরা যদি বাংলাদেশে আনতে পারতাম, তাতে করে বিনিয়োগ বাড়ত। বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বিশ্বে উজ্জ্বল হতো। আমরা অধ্যাপক ইউনূসকে ব্যবহার করেও বারাক ওবামার বাংলাদেশ সফর নিশ্চিত করতে পারতাম। কিন্তু সেখানেও আমাদের ব্যর্থতা। অধ্যাপক ইউনূস আমাদের ‘সম্পদ’। এই সম্পদকেও আমরা আমাদের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারলাম না। একটি বড় দেশের প্রেসিডেন্ট যখন তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে যান, তখন ওই দেশের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়। এখন মিয়ানমারের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্ব আসরে বাড়বে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ল না।
Daily JUGANTOR
19.11.12

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি-কৌশল

দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রথম বিদেশ সফরে মিয়ানমার আসছেন ১৯ নভেম্বর। ওই সময় তিনি কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত আশিয়ান শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দেবেন। ওবামার মিয়ানমার সফরের গুরুত্ব অনেক। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট ‘সিভিলিয়ান’ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার দেশের ‘দুয়াল খুলে দিয়েছেন।’ মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, কোকাকোলার অফিস খোলা এবং সর্বশেষ ওবামার মিয়ানমার সফর প্রমাণ করে মার্কিন প্রশাসন পরিবর্তিত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারকে কত গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ওবামার উপস্থিতিতে থাইল্যান্ডে যে যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হবে, তাতে অংশ নিতে মিয়ানমারকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, দক্ষিণ এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র যে স্ট্র্যাটেজি রচনা করছে তাতে মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যেই মূলত ওবামা মিয়ানমারে আসছেন। ওই স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশও রয়েছে। পাঠক স্মরণ করার চেষ্টা করুন, টাইমস অব ইন্ডিয়ার অন লাইন সংস্করণে একটি সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল গত ৩১ মে। তাতে বলা হয়েছিল চট্টগ্রামে ঘাঁটি গড়ছে মার্কিন সপ্তম নৌবহর! যদিও বাংলাদেশ সরকার তা অস্বীকার করেছে। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও সংবাদটিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। দক্ষিণ  চীন সাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এ রকমটি চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ‘আকসা’ নামে একটি চুক্তিও করতে চাচ্ছে।
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে নানা কারণে। প্রথমত, ভারত মহাসগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌবাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে সেখানে যে ‘শূন্যতার’ সৃষ্টি হবে, সেই শূন্যতা পূরণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘শান্তিরক্ষী’ বাহিনী গঠন করা, যারা ২০১৪ সালে মার্কিন সৈন্যদের পরিবর্তে আফগানিস্তানে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত হবে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইসলামিক কট্টরপন্থিরা দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন করে একটি ঘাঁটি গড়তে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মোর্চা গঠন করা প্রয়োজন। চতুর্থত, এ অঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বিপুল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে গভীর সমুদ্রে। মার্কিন আইওসির এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এ কারণেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অবস্থান করে খুব সহজেই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায় এবং বাংলাদেশের নিকট-প্রতিবেশী চীনের রাজনৈতিক উত্থান-পতনে প্রভাব খাটানো সম্ভব। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পর পরই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্রান্ড স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি এ লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হিলারির সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল একটি যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর। এই সংলাপের আওতায় বছরে একবার বাংলাদেশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা মিলিত হবেন। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধবোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যাখ্যা নানাভাবে বিশ্লেষণ হতে পারে। সন্ত্রাসবাদ রোধে সহযোগিতার আলোকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সেটাই দেখার বিষয় এখন। আরো একটা কথা। তরুণদের এক সমাবেশে হিলারি ক্লিনটন যখন বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কথা বলেন, তখন আমাদের প্রখ্যাত মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট রবার্ট কাপলানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাপলান লিখেছেন দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উদ্দেশ্য একটাই-আর তা হচ্ছে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। বাংলাদেশের অবস্থান তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের আকৃষ্ট করবে। মার্কিন স্ট্র্যাটেজিতে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। চীন যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। চীন ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌ-শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে। চীন এ অঞ্চলে ‘মুক্তারমালার’ মতো বিভিন্ন সামুদ্রিক বন্দরে তার অবস্থান শক্তিশালী করে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। চীনের ‘মুক্তমালার’যে নেটওয়ার্ক, তাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গাওদার সমুদ্রবন্দর একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগর পার হয়ে এরাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এ পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। চীন যে তেল আমদানি করে তার ৮০ ভাগ এই মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনে যায়। তাই সঙ্গত কারণেই চীনের জন্য তার ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিটও থাকবে, যা কি-না ভারত মহাসাগরের সব নৌম্যুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্র ন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলঙ্কার হামবানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে চীন শ্রীলঙ্কার সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। সিটওয়েসহ আরো বেশক’টি বন্দরে রয়েছে চীনা উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম একটি পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি সেই স্ট্র্যাটেজিকে সামনে রেখেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ চুক্তি করতে আগ্রহী হয়েছে। আকসা চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। যতদূর জানা গেছে, এ ধরনের চুক্তি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রস্তাবিত আকসা চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘গাইডেড মিসাইল’সহ বেশ কয়েক ধরনের আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে। এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতা দেয়ার কথাও রয়েছে। এছাড়া থাকবে যৌথ মহড়া ও সংলাপের ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রাবিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ এ ধরনের বিভিন্ন সুবিধার জন্য বাংলাদেশে ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা পাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতিরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটির এক সময় নাম ছিল ‘ন্যাটো মিউচ্যুয়াল সার্পোট অ্যাক্ট’। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও সরবরাহ বিনিময় সহজ করার জন্য এটি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ওই অ্যাক্টে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে করে ন্যাটোর সদস্য নয়, এমন দেশগুলোর সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি করা যায়। চুক্তিটির নামেও পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তিটি এখন ‘আকসা’ চুক্তি নামে পরিচিত।
‘আকসা’ চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে না; বরং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনার যদি অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ইমেজ সংকটের মুখে পড়বে। একইভাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতেও বাধ্য। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ হতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তিও খুব কম। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর ও তথাকথিত প্রশিক্ষণগ্রহণ করে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না। তাই প্রস্তাবিত চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া জরুরি। চুক্তিটি নিয়ে সংসদে আলোচনা করারও প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের একটি চুক্তি বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের উসকে দিতে পারে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বেড়ে যেতে পারে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। সংসদকে অবহিত না করে এ ধরনের একটি চুক্তি যদি করা হয়, তাহলে সেই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
সুতরাং বাংলাদেশ যখন ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজির একটা অংশ হতে যাচ্ছে, ঠিক তখন মিয়ানমার সফরে আসছেন ওবামা। দীর্ঘদিন মিয়ানমার মার্কিন প্রশাসনের কাছে ছিল একটি ‘নিষিদ্ধ রাষ্ট্র’। সব ধরনের সাহায্য, বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন পরিবর্তন আসছে মিয়ানমারে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে গ্রান্ড স্ট্র্যাটেজি, তাতে মিয়ানমারকে যুক্ত করতে চায় মার্কিন প্রশাসন। চলতি বছরের জুন মাসে সিঙ্গাপুরে বিখ্যাত সাংগ্রিলা ‘ডায়লগ’-এর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  প্রতিবছরই এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এটা মূলত নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটা শীর্ষ সম্মেলন। ওই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রণতরীর সংখ্যা বাড়াবে। ২০১৩ সালে এই রণতরীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৬-এ। সুতরাং মার্কিন রণতরী চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পোর্ট অব কল’-এর সুবিধা নেবে, তা বলাই বাহুল্য। এ জন্যই তাদের প্রয়োজন ‘আকসা’ চুক্তি। সম্ভবত এটা বিবেচনায় নিয়েই ভারতীয় পত্রিকায় মন্তব্য করা হয়েছিল যে, চট্টগ্রাম বন্দরে ঘাঁটি গাড়ছে মার্কিন নৌবাহিনী। ওবামার মিয়ানমার সফর তাই নিছক সাধারণ একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর (ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান) সমন্বয়ে চীনবিরোধী একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে (ভারত, বাংলাদেশ এবং সম্ভাব্য মিয়ানমার) চীনের বিরুদ্ধে আরেকটি অ্যালয়েন্স গড়ে তোলা। উদ্দেশ্য একটাই-‘চীনকে ঘিরে ফেলার’ একটি নীতি। এই স্ট্র্যাটেজিতে মিয়ানমার নিজেকে জড়িত করবে বলে মনে হয় না। খুব দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। এ থেকে বাংলাদেশ কতটুকু সুবিধা নিতে পারে, সেটাই এখন লক্ষ্য করার বিষয়।
Daily MANOBKONTHO
18.11.12

ওবামার দ্বিতীয় টার্ম ও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক


ওয়াশিংটনে বারাক ওবামার দ্বিতীয় টার্মের বিজয় উৎসব যখন শেষ হয়ে যায়নি, ঠিক তখনই ঢাকায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আবারো একটি বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন। বললেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে ড. ইউনূস। সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ বহির্ভূতভাবে তিনি এই মন্তব্যটি করেন। ড. ইউনূস এই মুহূর্তে দেশে নেই। তিনি বিদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করছেন। ওবামার বিজয়ের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের একটি যোগসূত্র আছে। আর তা হচ্ছে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। ড. ইউনূসকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নেতিবাচক মনোভাব মার্কিন প্রশাসন কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। এ নিয়ে একাধিকবার তাদের মন্তব্য পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। ড. ইউনূসকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নেতিবাচক মনোভাব দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কেননা ডেমোক্রেটরা বরাবরই ড. ইউনূসকে একটি ভিন্ন চোখে দেখে আসছেন। ক্লিনটন পরিবারের বন্ধু তিনি। হিলারি ক্লিনটন ওবামার দ্বিতীয় টার্মে প্রশাসন না থাকলেও, তার একটি প্রভাব থেকে যাবে। তাঁকে ২০১৬ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ড. ইউনূস তার ব্যক্তিগত বন্ধুও। সুতরাং ড. ইউনূসকে নিয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের বারবার মন্তব্য, মার্কিন প্রশাসন আদৌ ভালো চোখে নেবে না। সম্পর্কের প্রশ্নে প্রস্তাবিত 'টিকফা' চুক্তি নিয়েও কথা আছে। একবার তো মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন 'টিকফা' না হলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাকে কোনো সুবিধা পাবে না। এমনকি রপ্তানি ক্ষেত্রে সমস্যাও তৈরি হতে পারে। 'আকসা' চুক্তির প্রস্তাব করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই চুক্তি নিয়েও কথা আছে। হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরের সময় একটি 'অংশিদারিত্ব সংলাপ' চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। এই চুক্তি নিয়েও কথা আছে। তবে এই মুহূর্তে আলোচিত বিষয় হচ্ছে 'টিকফা' চুক্তির ভবিষ্যৎ। এই চুক্তিটি আসলে কী, কিংবা এতে করে আমরা কতটুকু উপকৃত হব, এ ব্যাপারে বিস্তারিত আমরা অনেকেই জানি না। সংবাদপত্রেও এটা নিয়ে খুব একটা আলোচনাও হয়নি। তবে মজিনা বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষিত হবে। কীভাবে হবে, তা অবশ্য তিনি বিস্তারিত বলেননি। এমনকি এই চুক্তির সঙ্গে 'টিফা' বা টিআইইএফএ চুক্তির কোনো যোগ আছে কি না, তাও আমরা নিশ্চিত নই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই 'টিফা' চুক্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি। তখন বাংলাদেশের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র টিআইসিএফ চুক্তি করার প্রস্তাব করেছিল। চুক্তিটির পূর্ণ নাম হচ্ছে 'ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট'। বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে তাহলে বাংলাদেশ পাইরেটেড কোনো পণ্য বাজারজাত করতে পারবে না। শ্রমিকের মানও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। তাছাড়া ওষুধ প্রস্তুত ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডবিস্নউটিও'র কাছ থেকে ট্রিপসের আওতায় যে সুবিধা ভোগ করছে, তাও বাতিল হতে পারে। আসলে টিআইইএফের এরই বিকল্প নাম হচ্ছে 'টিফা'। এর বিস্তারিত কোন পক্ষ থেকেই উপস্থাপন না করায়, তাতে নানা সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি চুক্তির প্রস্তাব করে। তখন এর নাম ছিল 'ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট' বা 'টিফা'। ২০০২ সালে প্রণীত টিফার প্রথম খসড়াটিতে ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপত্তি থাকায় ২০০৫ সালে সংশোধিত টিফায় ৭টি ধারা ও ১৯টি প্রস্তাবনা বহাল থাকে। ওই সময় সংশোধিত টিফায় ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে বিনিয়োগ বাতিল করাসহ মামলার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র টিফা চুক্তির খসড়ায় ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর প্রস্তাবনায় মেধাস্বত্ব অধিকার, আন্তর্জাতিক শ্রম মান ও পরিবেশগত সুরক্ষা-এই তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুধু এই তিনটি ধারাই নয়, বরং টিফা চুক্তির একাধিক ধারা ছিল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। যেমন বলা যেতে পারে মেধাস্বত্ব আইন। এটা মানলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ধস নামবে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর প্রায় ৫৫টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। বাংলাদেশের ওষুধের মান আন্তর্জাতিক মানের। এখন মেধাস্বত্বের শর্তের কারণে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সংশ্লিষ্ট দেয়া বা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একটি বিশেষ অধিকার রয়েছে। ওষুধের পেটেন্ট ব্যবহার করেই বাংলাদেশ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ তৈরি করছে, যা দিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই সুযোগ ভোগ করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে কি-না, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে শ্রমমানের কথা বলছে, সেটা নিয়েও কথা আছে। এটা স্বীকার করতেই হবে যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আইএলওর মান বজায় রাখা কঠিন। ইউরোপের একজন শ্রমিক যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং শ্রমিকদের যে মান, তার সাথে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মানের বিচার করা যাবে না। ইউরোপে একজন শ্রমিকের যে অধিকার, সেই অধিকার বাংলাদেশের শ্রমিকদের নেই। এটাই বাস্তব। এই বাস্তবতা মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব শ্রমিক মানকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের শ্রমমানকে বিচার করা যাবে না। সুতরাং আজ 'টিকফা' বলি, আর টিফা চুক্তি বলি, কোন চুক্তিই বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করবে না। বরং এ ধরনের চুক্তি মার্কিনীদের স্বার্থই রক্ষা করবে মাত্র। এ ধরনের কোন চুক্তির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটাযুক্ত প্রবেশাধিকারকে কোনোমতেই মেলানো যাবে না। শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার আমাদেও অধিকার। আমরা তো একের পর এক যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তি শূন্য। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি) থেকেও কোন সাহায্য পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিভিন্ন দেশকে বড় অঙ্কের মজুরি সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে এমসিসি গঠন করেছিল মার্কিন কংগ্রেস। এর যুক্তি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া না হলেও ধারণা করা হচ্ছে গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, বিনিয়োগের পরিবেশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমসিসি থেকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ড. ইউনূসের বিষয়টিও যে অন্যতম একটি কারণ, তা জোসেফ ক্রাউলির একটি মন্তব্য থেকে জানা যায়। জোসেফ ক্রাউলি মার্কিন কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ারম্যান। পদ্মা সেতু নিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন 'টিকফা' চুক্তি না হলে বাংলাদেশেরই ক্ষতি। নিঃসন্দেহে এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্র এখানে নাক গলাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো আমরা যেমনি শ্রমমান নির্ধারণ করতে পারি না। ঠিক তেমনি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, সেই সুযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। ওবামার নীতিতে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে ১৯ নভেম্বর মিয়ানমার আসছেন ওবামা। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের ব্যাপারে মার্কিনি নীতিতে বড় পরিবর্তন আসছে। মিয়ানমার একটি 'দুয়ার খোলা নীতি' গ্রহণ করায় মিয়ানমার-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন দিকে টার্ন নিতে পারে। এ থেকে আমরা সুবিধা নিতে পারতাম। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এই বিষয়টি উষ্ণ। মিয়ানমারের পাশাপাশি ওবামাকে যদি বাংলাদেশে সফর করার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে তা বহির্বিশ্বে আমাদের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে পারত। এই সুযোগটি আমরা কাজে লাগাতে পারলাম না। ওবামার দ্বিতীয় টার্মে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই সম্পর্ককে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটি আজ পালন করতে হবে বাংলাদেশকেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর ভালোবাসেন। কিন্তু শুধু বিদেশ সফর দিয়ে একটা দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনা যায় না।Daily JAI JAI DIN17.11.12

মন্ত্রীদের কথাবার্তা ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি



সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দু’-একজন মন্ত্রীর কথাবার্তায় রাজনৈতিক দৈন্য আবার নতুন করে ফুটে উঠেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের লাইভ টকশোতে দেয়া হুমকির রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বলে বসলেন ‘তিনি রাজাকার’। আর বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ একটি বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন গত ৩০ অক্টোবর। শাজাহান খান সাবেক এক মন্ত্রীর ‘চোখ তুলে ফেলা’র হুমকি দিয়েছিলেন প্রকাশ্যেই একটি টিভি টকশোতে, যেখানে সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ র‌্যাবের এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ভারত সফরের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বনমন্ত্রী বললেন, তিনি সে দেশের শিবসেনার সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন। জঙ্গিবাদের তিনি উদ্যোক্তা। মুসলমানবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে তাদের উৎসাহিত করেছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর বক্তব্য পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রীরা এভাবে কথা বলতে পারেন কি-না? খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তার সম্পর্কে এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়। আমি অবাক হয়েছি শাজাহান খানের বক্তব্যে। তিনি কীভাবে রাজাকার বলেন, প্রকাশ্যে সাবেক একজন মন্ত্রীকে হুমকি দেন। আমাদের রাজনীতি থেকে ভদ্রতা, শালীনতা কি উঠে গেল? অবশ্যই মন্ত্রীরা বিরোধী দলের রাজনীতির সমালোচনা করবেন। কিন্তু প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া, এ কেমন রাজনীতি?
শাজাহান খান কি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেছেন, লাইভ অনুষ্ঠানে এ ধরনের একটি ‘কাণ্ড’ ঘটিয়ে তিনি তার মান-সম্মান বাড়াতে পেরেছেন কি-না? ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তিনি যে দল করেন সেই দল সংসদে এবং জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। তিনি সংসদ সদস্য নন বটে, কিন্তু অতীতে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। তিনি একটি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থার সদস্য। তার সঙ্গে ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব’ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মন্ত্রী শাজাহান খান তার সরকারের গুণগান গাইবেন, ব্যারিস্টার মিয়া সরকারের সমালোচনা করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা হতে হবে ভদ্রজনিত, শোভন ও মার্জিত। ভাষা প্রয়োগে আমাদের হতে হবে আরও সচেতন। একজন মন্ত্রী তুই তোকারি করবেন, চোখ তুলে ফেলার হুমকি দেবেনÑ এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি! আমি চিন্তাও করতে পারি না, মন্ত্রী হয়ে শাজাহান খান এ ধরনের কথা বললেন কীভাবে!
তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অনেকেই জানেন। তিনি শ্রমিক নেতা। শ্রমিকদের নিয়ে তিনি রাজনীতি করেন। পরিবহন শ্রমিকরাই হচ্ছে তার ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’। এই ‘অস্ত্র’ তিনি অতীতে সরকারের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। পরিবহন শ্রমিকদের নেতা আর মন্ত্রী এক কথা নয়। পরিবহন শ্রমিক নেতা হিসেবে তার ‘ব্যবহার’ আমরা গ্রাহ্য করতে পারি। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে তার এ ব্যবহার আমরা মানতে পারি না। সম্ভবত শাজাহান খান তার পুরনো ‘পরিচয়’ থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারেননি। সম্ভবত তিনি নিজেও ভুলে গেছেন তিনি এখন মন্ত্রী, এখন আর পরিবহন শ্রমিকদের নেতা নন। আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্ত্রী শাজাহান খান এমন একটি দলের নেতা ও মন্ত্রী, যে দল থেকে এ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকদের জš§ হয়েছিল। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদÑ এরা তো আওয়ামী লীগেরই নেতা ছিলেন। কিন্তু তারা কি কখনও অভদ্রজনিত আচরণ করেছেন? শাজাহান খান খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করেন। ভাসানীও তো খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। তার নাম ভাঙিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী হয়ে ভাসানীর সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু ভাসানী কি তাদের সঙ্গে কখনও অভদ্রজনিত আচরণ করেছেন? কখনও করেননি। ভাসানী জীবদ্দশায় শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুু একদিনের জন্যও ভাসানী সম্পর্কে কোন খারাপ কথা বলেছেন, এ ধরনের কোন রেকর্ড নেই। বরং ‘হুজুরের’ জন্য লুঙ্গি, গামছা বঙ্গবন্ধুই দিতেন। এজন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু। আর তার দলের হয়ে শাজাহান খান আজ একি আচরণ করলেন!
শাজাহান খান অতীতেও বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের উসকে দিয়েছিলেন। কারণ মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য তিনি অদক্ষ ড্রাইভারদের দায়ী করেছিলেন। এবং ড্রাইভারদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় অধ্যাপক মামুন শাজাহান খানেরও সমালোচনা করেছিলেন। আর তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিবহন শ্রমিকদের এক সমাবেশ থেকে অধ্যাপক মামুনকে হুমকি দেয়া হয়েছিল। ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে জুতা মারার ছবিও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। সারাদেশ যখন অদক্ষ ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি অদক্ষ ড্রাইভারদের পক্ষ অবলম্বন করে বলেছিলেন ‘ড্রাইভারদের গরু-ছাগল চিনলেই যথেষ্ট’! কী ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য! অদক্ষ ড্রাইভাররা যেখানে মহাসড়কে এক ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছে, সেখানে অদক্ষ বাসচালকদের সমর্থন করেছিলেন তিনি।
অনেকেরই মনে থাকার কথা, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধী দলের এক এমপি বিএনপির এক মহিলা এমপি (তিনি মাদারীপুরের একটি আসনের প্রতিনিধিত্ব করতেন) সম্পর্কে খোদ সংসদেই একটি অশোভন মন্তব্য করেছিলেন। একজন মহিলা এমপির সঙ্গে যখন ‘রাতের নারীদের’ তুলনা করা হয়, তখন ওই লোকটি সম্পর্কে মন্তব্য করতেও আমার রুচিতে বাধে। একজন নির্বাচিত এমপির রুচি কোন পর্যায়ে গেলে তিনি তার মহিলা সহকর্মী সম্পর্কে একটি অশোভন মন্তব্য করতে পারেন!
যিনি প্রকাশ্যে সাবেক একজন মন্ত্রীর চোখ তুলে নেয়ার হুমকি দেন, তিনি তো আমাদের সবার জন্যই হুমকি। তার সঙ্গে কোন গোলটেবিলে অংশ নেয়া কিংবা টকশোতে অংশ নেয়া আমার জন্যও এক ধরনের ঝুঁকি। যিনি অধ্যাপক মামুনকে হুমকি দিতে দ্বিধা করেননি, তিনি যে ব্যারিস্টার মিয়ার মতো একজন সিনিয়র সিটিজেনকে হুমকি দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমি তার ব্যবহারে লজ্জিত ও দুঃখিত।
মহাজোট সরকারে দু’-একজন মন্ত্রী আছেন, যারা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মন্ত্রীই নানা অভিযোগে অভিযুক্ত। বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী বেশি কথা বলেন। এটা তার স্বভাব। ‘খামোশ’ খ্যাত অর্থমন্ত্রী সরকারের জন্য বোঝা। ‘কালো বিড়াল’ খ্যাত সুরঞ্জিত বাবু নিজেকে যতই নির্দোষ বলে দাবি করেন না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে তার কোন ‘ইমেজ’ নেই। তিনিও সরকারের বোঝা। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের জন্য কোন সম্মান বয়ে আনতে পারেননি। মন্ত্রী রাজিউদ্দীন রাজু তার নিজ এলাকায় যেতে পারেন না। ‘ফটোগ্রাফার’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে কোন বড় অবদান রাখতে না পারলেও ‘বিশ্ব ভ্রমণে’ বোধ করি ইতিমধ্যে একটা ‘বিশ্বরেকর্ড’ করে ফেলেছেন! আরও দু’-চারজন মন্ত্রীর কথা নাইবা বললাম। বিশেষ করে সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারের ভাবমূর্তি আজ কোথায় নিয়ে গেছেন, সরকারপ্রধান এটা স্বীকার না করলেও সাধারণ মানুষ বোধ করি এটা বোঝে। তার কারণেই পদ্মা সেতু ঝুলে গেল! বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে, এটি নিশ্চিত হতে পারছি না। এখন এই কাতারে যোগ দিলেন শাজাহান খান। তাকে কিছু বলার বা শেখানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু তাকে বলতে পারিÑ মাননীয় মন্ত্রী এভাবে নয়। সরকারপ্রধান আপনাকে একটি বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী পদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আপনার এমন কিছু করা ঠিক নয়, যাতে আপনার নিজের, দলের, সেই সঙ্গে সরকারের অসম্মান হয়। মন্ত্রী হলে অনেক সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। বিরোধী দল সমালোচনা করবে। এটাই রাজনীতির নিয়ম। তাই বলে অশোভন আচরণ করবেন কেন?
একজন শাজাহান খানকে নিয়ে পুরো সরকারকে বিচার করা যাবে না, এটা সত্য। কিন্তু এটাও তো সত্য, ‘দুধে এক ফোঁটা চানা পড়লে পুরো দুধই নষ্ট হয়ে যায়’। যে সরকারে শাজাহান খানরা থাকেন, সেই সরকার সম্পর্কে মানুষ যদি কটূক্তি করে, আমি তাতে অবাক হব না। কোন ‘গুণে’ তিনি মন্ত্রী হয়েছেন, আমি বলতে পারব না। এটা সরকারপ্রধানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। সরকারপ্রধানের এটা সাংবিধানিক অধিকারÑ তিনি যে কাউকে মন্ত্রী বানাতে পারেন। তবে মন্ত্রীদের অতীত রেকর্ড বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এমনিতেই সরকারের সামনে নানা সমস্যা। হলমার্ক কেলেংকারি, ডেসটিনি, শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, কোন একটি ক্ষেত্রেও সরকারের জন্য কোন প্লাস পয়েন্ট নেই। আওয়ামী ঘরানার লোক হিসেবে পরিচিত প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার একটি উক্তিও (তুই চোর!) বলে দেয় বুদ্ধিজীবীদের মাঝে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে যেখানে সহনশীলতা খুবই প্রয়োজন, সেখানে কি-না কোন কোন মন্ত্রী ‘মাস্তানসুলভ’ আচরণ করেন! আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্ত্রিসভায় খুব কম সদস্যই আছেন, যাদের আমরা স্মরণে রাখতে পারি। যাদের কথা আমরা ‘রেফার’ করতে পারি। একজন শাজাহান খান আমাদের জন্য কোন গৌরব বয়ে আনবেন না। আর বন ও পরিবেশমন্ত্রী সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে চাই না। রাজনীতিতে নতুন। শুধু সরকারপ্রধানের কাছের মানুষ হওয়ার সুবাদে কোনরকম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই হঠাৎ করে মন্ত্রী হয়ে গেলেন। খালেদা জিয়া সম্পর্কে জনগণকে ভুল তথ্য দেয়া ঠিক নয়। তার বক্তব্যে একটি সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ রয়েছে। তাকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরের সমালোচনা হতেই পারে। সেটা হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক।
মন্ত্রীরা যদি এভাবে আচরণ করেন, তাহলে আমরা যাই কোথায়! পরবর্তী প্রজš§ কি শিখবে সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের কাছ থেকে? তারা তো জুনিয়রদের তৈরি করবেন ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য। তারা তো শেখাবেন। কিন্তু একজন শাজাহান খান কিংবা একজন হাছান মাহমুদ আমাদের ভালো কিছু শেখাতে পারছেন না। পরবর্তী প্রজšে§র কাছে তারা কোন ‘আদর্শ’ নেতা নন।
Daily JUGANTOR
10.11.12

অভিনন্দন ও কিছু প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামাই বিজয়ী হলেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দিকে অনেকের দৃষ্টি থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ইস্যুতে দু’দেশের মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়। অধ্যাপক ইউনূস ইস্যু, গ্রামীণ ব্যাংক, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ড, ‘আকসা’ কিংবা ‘টিকফা’ চুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট। এসব মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা প্রকাশ্যেই সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। এখন ওবামার বিজয়ের পর মার্কিন নীতিতে কী আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে? মনে হয় না। মার্কিন রাষ্ট্রদূত গত জুলাই মাসে প্রকাশ্যেই ‘টিকফা’ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা বলেছিলেন। তিনি এ-ও বলেছিলেন, ‘টিকফা’ না হলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত ও কোটা সুবিধা পাবে না। টিকফা হচ্ছে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট’। যদিও আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ২৯ জুলাই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের কারণে যে টিকফা চুক্তি হচ্ছে না, কথাটা সত্য নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না? না পারে না। জাতিসংঘের ২.৪ এবং ২.৭নং ধারা অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু ড্যান মজিনার বক্তব্য ছিল জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী। এটা দৃষ্টিকটুও। এদেশের মানুষ জানে না টিকফা চুক্তি কী? এ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সে ব্যাপারেও আমরা স্পষ্ট নই। দুঃখজনক হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে বিদেশে এ ধরনের চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মহাজোট সরকারের আমলে এ ধরনের কোনো চুক্তি নিয়ে সংসদে আমরা আলোচনা হতে দেখিনি। মজিনার কথাবার্তা থেকে মনে হয়েছে, বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর বাংলাদেশি পণ্য মানেই তো তৈরি পোশাক। সেই তৈরি পোশাক রফতানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার একটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত প্রেসার খাটিয়ে সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় একটি ‘অংশীদারিত্ব সংলাপ’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ। এ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কিছুই নেই।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ নামে একটি চুক্তির প্রস্তাব করেছিল। আকসা চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে আগামীতে। আকসা চুক্তি প্রস্তাবের রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই মজিনা বললেন টিকফা চুক্তির কথা। এ চুক্তিটি আসলে কী কিংবা এতে আমরা কতটুকু উপকৃত হব, এ ব্যাপারে বিস্তারিত আমরা অনেকেই জানি না। সংবাদপত্রেও এটা নিয়ে খুব একা আলোচনাও হয়নি। তবে মজিনা বলেছেন, এ চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষিত হবে। কীভাবে হবে, তা অবশ্য তিনি বিস্তারিত বলেননি। এমনকি এ চুক্তির সঙ্গে ‘টিফা’ বা ‘টিআইএফএ’ চুক্তির কোনো যোগ আছে কি না, তা-ও আমরা নিশ্চিত নই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই টিফা চুক্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি। তখন বাংলাদেশের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র টিআইসিএফ চুক্তি করার প্রস্তাব করেছিল। চুক্তিটির পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেট’। বাংলাদেশ যদি এ চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে, তাহলে বাংলাদেশ পাইরেটেড কোনো পণ্য বাজারজাত করতে পারবে না। শ্রমিকের মানও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। তাছাড়া ওষুধ প্রস্তুত ও রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডব্লিউটিও’র কাছ থেকে ট্রিপসের আওতায় যে সুবিধা ভোগ করছে, তা-ও বাতিল হতে পারে। আসলে টিআইএফএ’র এরই বিকল্প নাম হচ্ছে টিফা। কোনো পক্ষ থেকেই এর বিস্তারিত উপস্থাপন না করায় নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি চুক্তির প্রস্তাব করে। তখন এর নাম ছিল ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ বা টিফা। ২০০২ সালে প্রণীত টিফার প্রথম খসড়াটিতে ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপত্তি থাকায় ২০০৫ সালে সংশোধিত টিফায় ৭টি ধারা ও ১৯টি প্রস্তাবনা বহাল থাকে। ওই সময় সংশোধিত টিফায় ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে বিনিয়োগ বাতিলসহ মামলার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র টিফা চুক্তির খসড়ায় ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর প্রস্তাবনায় মেধাস্বত্ব অধিকার, আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও পরিবেশগত সুরক্ষা-এ তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুধু এ তিনটি ধারাই নয়, টিফা চুক্তির একাধিক ধারা ছিল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। যেমন বলা যেতে পারে মেধাস্বত্ব আইন। এটা মানলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ধস নামবে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর প্রায় ৫৫টি দেশে ওষুধ রফতানি করে। বাংলাদেশের ওষুধ আন্তর্জাতিক মানের। এখন মেধাস্বত্ত্বের শর্তের কারণে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশ বা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একটি বিশেষ অধিকার রয়েছে। ওষুধের পেটেন্ট ব্যবহার করেই বাংলাদেশ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ তৈরি করছে, যা দিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ সুযোগ ভোগ করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে শ্রমমানের কথা বলছে, সেটা নিয়েও কথা আছে। এটা স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইএলও’র মান বজায় রাখা কঠিন। ইউরোপের একজন শ্রমিক যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং শ্রমিকদের যে মান, তার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মানের বিচার করা যাবে না। ইউরোপে একজন শ্রমিকের যে অধিকার, সে অধিকার বাংলাদেশের শ্রমিকদের নেই। এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতা মানতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ব শ্রমিকমানকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের শ্রমমানকে বিচার করা যাবে না। সুতরাং আজ টিকফা বলি আর টিফা চুক্তি বলি, কোনো চুক্তিই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে না; বরং এ ধরনের চুক্তি মার্কিনিদের স্বার্থই রক্ষা করবে মাত্র। এ ধরনের কোনো চুক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারকে কোনোমতেই মেলানো যাবে না। শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার আমাদের অধিকার। আমরা তো যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক সুযোগ দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তি শূন্য। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি) থেকেও কোনো সাহায্য পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিভিন্ন দেশকে বড় অঙ্কের মজুরি সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে এমসিসি গঠন করেছিল মার্কিন কংগ্রেস। এর চুক্তি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া না হলেও ধারণা করা হচ্ছে গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, বিনিয়োগের পরিবেশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমসিসি থেকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ড. ইউনূসের বিয়টিও যে অন্যতম একটি কারণ, তা জোসেফ ক্রাউলির একটি মন্তব্য থেকে জানা যায়। জোসেফ ক্রাউলি মার্কিন কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের কো চেয়ারম্যান। পদ্মা সেতু নিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি এখানে প্রধান্য পাচ্ছে বেশি। আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন, ‘টিকফা চুক্তি না হলে বাংলাদেশেরই ক্ষতি’। নিঃসন্দেহে এসব বিষয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্র এখানে নাক গলাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো আমরা যেমন শ্রমমান নির্ধারণ করতে পারি না, ঠিক তেমনই বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, সে সুযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। আমরা সমমর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক চাই। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশও বিশ্বকে কিছু দিতে পারে। এখন ওবামা পুনর্নির্বাচিত হলেন। আমরা তাতে উৎফুল্ল। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত ও কোটা সুবিধা তিনি নিশ্চিত করবেন। এমসিসি থেকে যাতে সাহায্য পেতে পারি, সে ব্যাটারটিও তিনি নিশ্চিত করবেন। ওবামা যেমন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন; ঠিক তেমনি আমরাও প্রত্যাশা করি, আমাদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি তিনি সম্মান জানাবেন। আকসা বা টিকফা চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশিদের বন্ধুত্ব পাওয়া যাবে না; বরং পারস্পরিক স্বার্থ যাতে নিশ্চিত হয়, সে ব্যাপারটি দেখা জরুরি।
Daily MANOBKONTHO
09.11.12

ওবামার বিজয় এবং অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন


শেষ পর্যন্ত বারাক ওবামাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলেন। এটা নিয়ে কম আশঙ্কা ছিল না। জনমত জরিপগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস ছিল। তবে ৫ নভেম্বর অর্থাৎ নির্বাচনের এক দিন আগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্ট যে জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করেছিল (ওবামার পক্ষে ৫০ ভাগ ভোট, আর রমনির পক্ষে ৪৭ ভাগ ভোট) সেটাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো। তথাকথিত 'সুইং স্টেট'গুলোর ফলাফলও বারাক ওবামার পক্ষে গেল। আগামী ২০ জানুয়ারি (২০১৩) তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। প্রশ্ন হচ্ছে ওবামার এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদৌ কী কোনো নতুন 'বার্তা' বয়ে আনবে? অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বিশাল বেকারত্ব, রেকর্ড অতিক্রম করা ঋণ (১৬ ট্রিলিয়ন ডলার), সরকারের অনধিকার চর্চায় অচলপ্রায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক খাত, সেই সঙ্গে বৈদেশিক নীতিতে ওবামা কী আদৌ কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারবেন? সামনের দিনগুলো ওবামার জন্য যে সুখের হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। এটা সত্য, গেল মাসে এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ চাকরি পেয়েছেন। যেখানে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি চারজন একটি চাকরির পেছনে দৌড়াচ্ছেন, সেখানে নতুন করে প্রায় দুই লাখ লোকের চাকরি পাওয়া কম কথা নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণী এ থেকে উপকৃত হয়েছে। বারাক ওবামার টার্গেটই ছিল এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আর্থিক খাতকে এখন একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা বিখ্যাত কায়রো ভাষণে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে 'নতুন এক সম্পর্ক' গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে জঙ্গিবাদেরই জন্ম হয়েছে সেখানে। লিবিয়া থেকে সিরিয়া- সব জায়গায়ই আত্মঘাতী বোমাবাজির জন্ম হয়েছে। ওবামার 'আরব বসন্ত' নীতির এটা একটা বড় ব্যর্থতা। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের কিংবা লিবিয়ায় গাদ্দাফির উৎখাতের পর সেখানে ইসলামী কট্টরপন্থীরা শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়ায় আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 'আরব বসন্ত' তিউনেশিয়া, ইয়েমেন, মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সমস্যার কোনো সমাধান তিনি বের করতে পারেননি। তবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ওবামার পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির বক্তব্য এসব ইস্যুতে স্পষ্ট ছিল না। তাঁর অর্থনৈতিক তথা বৈদেশিক নীতি মানুষকে টানতে পারেনি। বরং গর্ভপাতের বিরোধিতা করা, অভিবাসীদের ব্যাপারে কঠোর হওয়া এবং সমকামীদের বিয়ের বিরোধিতা করায় তিনি হিসপানিক ও অভিবাসী আমেরিকানদের ভোট পাননি। তবে রমনি তাঁর চরম দক্ষিণপন্থী অবস্থান থেকে অনেক সরে এসেছিলেন। ওবামার বৈদেশিক নীতির সমালোচনা করলেও তিনি নিজে কোনো সুস্পষ্ট নীতি উপস্থাপন করতে পারেননি। বরং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠতা আরব বিশ্বে তাঁর অবস্থানকে অনেক দুর্বল করেছিল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে ১৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে, যেখানে ওবামা ও রমনির মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। নীরব ছিলেন। এ সবের মধ্যে রয়েছে মৃত্যুদণ্ড রদ প্রসঙ্গ, ৫১১৩টি পারমাণবিক ওয়্যারহেডের ভবিষ্যৎ, গুয়ানতানামো বের বন্দি শিবিরের ভবিষ্যৎ ও এই বন্দি শিবিরে নির্যাতনকারীদের বিচার, বাড়ি ব্যবসায় ধসের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় ড্রোন বিমান আক্রমণের ভবিষ্যৎ, নূ্যনতম বেতন ১০ ডলারে উন্নীত করা (প্রতি ঘণ্টায় বর্তমানে ৭.২৫ ডলার), ইরানে সম্ভাব্য বিমান আক্রমণের ব্যাপারে অসম্মতি, নির্বাচনী প্রচারণায় যে বিপুল অর্থ দাতাদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয় (চাঁদা) তা প্রত্যাখ্যান করা, জলবায়ু পরিবর্তন তথা উষ্ণতা হ্রাসে একটি কমিটমেন্ট, সবার জন্য চাকরির নিশ্চয়তা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুলি্লর ভবিষ্যৎ, লাদেনকে কেন ধরে এনে কোর্টে বিচার করা হলো না ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো সাধারণের মধ্যে আলোচিত হলেও কোনো একটি ইস্যুতেও ওবামা ও রমনির কোনো 'কমিটমেন্ট' নেই। উভয়ই বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। অথচ একজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মানুষ এসব বিষয়ে শুনতে চেয়েছিল। তিনটি বিতর্কের একটিতেও তাঁরা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি।
ওবামা ২০০৮ সালের নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক তথা অভিবাসী আমেরিকানদের ভোট পেয়েছিলেন। এবারও পেলেন। মহিলাদের ভোটও এবার পেলেন। অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে রমনি ধনিক শ্রেণীর ভোট পেয়েছেন বটে, কিন্তু মধ্যবিত্তদের টানতে পারেননি। তাঁর অর্থনৈতিক নীতিতে মানুষ আস্থা রাখতে পারেনি। রমনি একজন সফল ব্যবসায়ী। ধনী। ধনিক শ্রেণীকেই তিনি আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। ওবামার জন্য অর্থনীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বারবার বলেছেন, চার বছর আগে যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন তিনি, তা শেষ করতে আরো চার বছর সময় তাঁর প্রয়োজন। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করেছে বটে। কিন্তু অর্থনীতিকে বাগে আনার কাজটি সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ধনী ও গরিব শ্রেণীর মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অসমতা, দারিদ্র্য আর বৈষম্যই সেখানে 'আকুপাই মুভমেন্ট'-এর জন্ম দিয়েছে- যা ইতিমধ্যে প্রায় ৪২০ দিন অতিক্রম করেছে। এই বৈষম্য কমিয়ে আনার এক কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে ওবামাকে। কাজটি সহজ নয়। পরিসংখ্যান বলে, শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ৫ ভাগের ১ ভাগের মালিক হচ্ছেন জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ ভাগ মানুষ। ১৯৭০ সালে ধনী শ্রেণীর হাতে মোট আয়ের ৮ থেকে ৯ ভাগ অর্থ সঞ্চিত হতো। আজ ২০১২ সালে এসে তারা ভোগ করেন মোট সম্পদের ২৩ দশমিক ৫ ভাগ। ১০ ভাগ আমেরিকান দেশটির মোট বেতনের ৪৯.৭ ভাগ গ্রহণ করে। শীর্ষে থাকা ১ ভাগ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগের মালিক। জোসেফ স্ট্রিগলিৎজের মতে শীর্ষে থাকা ওই ১ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ ভাগ। এই ধনীরা এক রাতে জুয়া খেলায় হেরে যান লাখ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে Cosino Capitalism। অর্থাৎ জুয়ানির্ভর এক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের অপর পিঠে রয়েছে অন্ধকার এক চিত্র। ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন অর্থাৎ এক কোটি ৬৪ লাখ শিশু অত্যন্ত গরিব। ২০১০ সালে করপোরেট হাউসগুলোর প্রধান নির্বাহীর বেতন বেড়েছে শতকরা ২৩ ভাগ। এ ধরনের পরিসংখ্যান আরো দেখা যায়। এসব পরিসংখ্যান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঠিকমতো চলছে না। বৈষম্য দিনে দিনে বাড়ছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে। যে সমাজে শতকরা ৪৭ দশমিক ৮ ভাগ মানুষ 'ফুড স্ট্যাম্প' (খাদ্য সাহায্য)-এর ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজেই একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল, যেখানে মূল দুজন প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় করেছেন ৬০০ কোটি (কারো কারো মতে ১০০০ কোটি) ডলার। ওবামা বা রমনি আবার নিজের অর্জিত আয় থেকে এই অর্থ ব্যয় করেননি। তাঁরা প্রকাশ্যেই চাঁদা তোলেন। বড় বড় ব্যবসায়ী তথা করপোরেট হাউসগুলো তাঁদের চাঁদা দেয়। এটা বৈধ। ওই চাঁদার টাকায় তাঁরা নির্বাচন করেন। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারেন না বিধায় তৃতীয় কোনো শক্তিশালী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন না। এবারও প্রায় ২৫ জন তথাকথিত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউই থাকতে পারেননি। তাঁদের নামও কেউ জানে না। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে একটা সমতা ফিরিয়ে আনা, সবার জন্য চাকরি ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না বারাক ওবামার জন্য। মানুষ ওবামার ওপর আস্থা রেখেছে এটা সত্য, কিন্তু সেই আস্থার প্রতি কতটুকু সম্মান তিনি দেখাতে পারবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। ওবামার বিজয় অবশ্য একটি বিষয়কে নিশ্চিত করেছে আর সেটি হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে বিমান হামলার সম্ভাবনা সীমিত হওয়া। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে সংকট, ওবামা তার সমাধানের জন্য আলাপ-আলোচনার ওপরই গুরুত্ব দেবেন। রমনি বিজয়ী হলে হামলার সম্ভাবনা বাড়ত। তবে ওবামার জন্য মধ্যপ্রাচ্য হবে একটি 'টেস্ট কেস'। সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন কোনো দেশ থেকেই সুবাতাস আসছে না। 'আরব বসন্ত' সেখানে সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু জন্ম দিয়েছে নতুন এক সংকটের- জঙ্গিবাদের উত্থান। আত্মঘাতী বোমাবাজি সংস্কৃতির সেখানে জন্ম হয়েছে। ওবামার বৈদেশিক নীতির এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে পুরনো প্রেসিডেন্টকে নতুনভাবে পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি শপথ নেবেন। কিন্তু অর্থনীতির মন্দাভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না, বৈদেশিক নীতিতে 'সফলতা' পাবেন কি না, বিশ্বে একটি স্থিতিশীলতা তিনি উপহার দিতে পারবেন কি না, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।Daily KALERKONTHO09.11.12

মার্কিন অর্থনীতিতে কি সুবাতাস বইবে?









মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার বিজয়ের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে— তিনি কি একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি উপহার দিতে পারবেন? নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বারবারই বলছিলেন, তাকে আরেকবার সুযোগ দেয়া হোক, যাতে করে যেসব কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছেন, তা শেষ করতে পারেন। তার এসব কর্মসূচির অন্যতম হচ্ছে সবার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব ভালো, তা বলা যাবে না। সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ লাখ ৭১ হাজার মানুষ চাকরি পেলেও পরিস্থিতি আদৌ ভালো নয়। সদ্য পাস গ্রাজুয়েটরা চাকরি পাচ্ছেন না। একটি চাকরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন করে। মোট জনসংখ্যার প্রতি তিনজনের একজন গরিব। ৪৯ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। আর ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে ‘ফুড স্ট্যাম্প’ তথা খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ওবামার বিজয় কি তাদেরকে আদৌ আশাবাদী করবে? যে বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের কি তিনি ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ থেকে বের করে আনতে পারবেন?
তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে এসব প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে মনে আছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অসততা, দরিদ্রতা আর বৈষম্যের প্রতিবাদে ‘অক্যুপাই মুভমেন্ট’-এর জন্ম হয়েছে। সে মুভমেন্ট এরই মধ্যে পার করেছে ৪২০ দিন।
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ও সমাজতন্ত্রের পতনের পর বিশ্বব্যাপী একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, পুঁজিবাদই সমাজের মঙ্গল আনতে পারে(?)। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কনজারভেটিভ তাত্ত্বিক (ফুকুয়ামা) এ ধারণার সপক্ষে তাদের লেখনি অব্যাহত রাখেন। কিন্তু মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই প্রমাণ হলো, পুঁজিবাদও সমাজ বিকাশে কোনো অবদান রাখতে পারছে না; পুঁজিবাদী সমাজেই বড় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। বলা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কথা। ১৫ শতাংশ মানুষ সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগের মালিক জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ। ১৯৭০ সালে ধনী শ্রেণীর হাতে মোট আয়ের ৮-৯ শতাংশ সঞ্চিত হতো। ২০১১ সালে তারা ভোগ করেন মোট সম্পদের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ১০ শতাংশ আমেরিকান দেশটির মোট বেতনের ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোগ করেন। শীর্ষে থাকা ১ শতাংশ ধনী যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের মালিক। আর জোসেফ স্টিগলিেজর মতে, শীর্ষে থাকা এ ১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশ। এ ধনীরা এক রাতে জুয়া খেলায় হেরে যান লাখ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে Casino Capitalism। আরেক পরিসংখ্যান বলে, সেখানে ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি ৬৪ লাখ শিশু অত্যন্ত গরিব। জুকোট্টি পার্কে জমায়েত হওয়া অনেক তরুণ জানিয়েছিলেন, তারা গ্রাজুয়েশন সম্পন্নের পর চাকরি পাচ্ছেন না। অথচ ২০১০ সালে করপোরেট হাউসগুলোর প্রধান নির্বাহীর বেতন বেড়েছিল ২৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এই যে বৈষম্য, এ ধরনের বৈষম্য লক্ষ করা যায় পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশেই।
এক ধরনের ‘Class Warfare’ বা শ্রেণী যুদ্ধের সূচনা হয়েছে পুঁজিবাদী সমাজে। অক্যুপাই মুভমেন্টগুলো তার বড় প্রমাণ। এ শ্রেণী যুদ্ধের কথা বলেছিলেন কার্ল মার্কস। মার্কসের বিশ্লেষণে এমন শ্রেণী দ্বন্দ্ব কোনো সমাজে বিপ্লবের সূচনা করতে পারে। মার্কস ও এঙ্গেলস বিখ্যাত The Communist Manifesto গ্রন্থে এ দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘a fight that each time ended, either in a revolutionary reconstitution of society at large, or in the common ruin of the contending clases.’ অর্থাৎ দ্বন্দ্বের ফলে সমাজে বিপ্লবী পরিবর্তন আসবে অথবা উভয় শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটবে। মার্কস চূড়ান্ত বিচারে শোষিত শ্রেণীর ক্ষমতা গ্রহণের কথা বলেছিলেন। সমাজে শ্রেণী দ্বন্দ্ব সনাতন। আজ এত বছর পরও  সেই শ্রেণী দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটছে যেন অক্যুপাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মার্কস আজও বেঁচে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের এ শ্রেণী দ্বন্দ্বকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতেন, বলতে পারব না। তবে নোয়াম চমস্কির লেখনিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থার চমত্কার বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকে আখ্যায়িত করেছেন Plutonomy হিসেবে অর্থাৎ সম্পদশালী ধনী শ্রেণীনির্ভর একটি সমাজ। তিনি লিখেছেন, ‘Increasingly, wealth concentrated in the financial sector. Politicians faced with the rising cost of compaigns, were driven ever deeper into the packets of wealthy backers.’— এটাই হচ্ছে আসল কথা। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে ধনিক শ্রেণীর হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি এরাই পরিচালনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে বলা হয় ‘Billionaire Friendly’। ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে কংগ্রেস। ধনীদের টাকায় কংগ্রেস সদস্যরা নির্বাচিত হন। এরপর তারা ধনীদের আরও সুযোগ-সুবিধা দেন। নোয়াম চমস্কি তাই আমেরিকার অক্যুপাই মুভমেন্টে এতটুকুও অবাক হননি। তিনি লিখেছেন, ‘The most exciting aspect of the occupy movement is the construction of the linkages that are talking place all over. If they can be sustained and expanded, occupy can lead to dedicated efforts to set society on a more humane course.’ মার্কস যেখানে বিপ্লবের কথা বলেছেন, সেখানে চমস্কি বলছেন ‘More Human Course’-এর কথা। সারা বিশ্বে যে অক্যুপাই মুভমেন্ট পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে একটা সমন্বয় থাকা দরকার— এটাও চমস্কির অভিমত। স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র তথা পুঁজিবাদী সমাজে একটি পরিবর্তন আসন্ন। কেননা দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাদী সমাজে অসমতা ও বৈষম্য বাড়ছে। পশ্চিম ইউরোপ একসময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ইউরোপীয় ঐক্যে বড় ধরনের ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রিস ও ইতালির পরিস্থিতির রেশ ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর বিভক্তির কথা প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানি এ বিভক্তির পক্ষে। কেননা ইইউভুক্ত গরিব দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। এরা ঋণ গ্রহণ করে পরিশোধ করতে পারছে না। প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বেকার সমস্যা বাড়ছে। শ্রেণী বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। জার্মানি ইউরোপে ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হলেও দেশটিতে দারিদ্র্যের হার ৬ শতাংশ আর বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। সুইজারল্যান্ড ইইউ-এর সদস্য নয়। এখানে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৮ আর ৭ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বেলজিয়ামে এ হার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮ ও ১৫ শতাংশ। পর্তুগাল ঋণ সমস্যায় জর্জরিত। এখানে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ দশমিক ৩ ও ১৮ শতাংশ। শুধু ইউরোপের কথা কেন বলি। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা তাইওয়ানের মতো শিল্পোন্নত দেশেও অক্যুপাই মুভমেন্টের খবর আমরা জানি। কেননা এসব দেশেও বেকারত্ব বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ওই সব দেশেও অক্যুপাই মুভমেন্টের জন্ম হয়েছে।
বারাক ওবামার বিজয় তাই সঙ্গত কারণেই একটি প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। তারা চাকরি চান। সবার জন্য চান স্বাস্থ্যসেবা। মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কোনো ‘হেলথ ইন্স্যুরেন্স’ নেই। ওবামা স্বাস্থ্যসেবায় কিছু কাটছাঁট করতেও বাধ্য হয়েছিলেন। এখন দেখার বিষয়, তিনি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কত দূর যান। ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ঘাটতি নিয়ে ওবামা তার দ্বিতীয় টার্ম শুরু করবেন। তিনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ ঘাটতি চার ট্রিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনবেন। ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কর্মসূচি তার রয়েছে। মোটরগাড়িশিল্পকে বাঁচাতে প্রণোদনা দেয়াটা সরকারের সফলতা বলে মনে করেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালে তিনি আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবেন। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ সমাধান চান তিনি। এতে করে ইসরায়লি নেতৃত্ব যে খুশি হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওবামা জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। সামরিক ব্যয় বাড়ানোর বিপক্ষে ওবামা। আগামী এক দশকে এ খাতে ব্যয় সাড়ে ৪৮ কোটি ডলার কমাতে চান তিনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বরং বাংলাদেশকে কিছুটা হলেও যে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা গুরুত্ব দেন, সে নীতি অব্যাহত থাকবে। মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। এর কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য জটিলতা রয়ে গেছে। ‘টিকফা’ ও ‘আকসা’ চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। ওবামার বিজয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী তৈরি পোশাক পণ্যের (আরএমজি) শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো। যদিও শ্রমিকদের অধিকার, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ডের বিচার কিংবা অধ্যাপক ইউনুস ‘ইস্যু’তে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা কিছুটা ‘অসন্তুষ্ট’। তবে এটা কেটে যাবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে।
ওবামার বিজয় প্রমাণ করল, ২০০৮ সালে যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে প্রথমবারের মতো একজন আফ্রো-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিলেন, চার বছর পরও আমেরিকানরা আবারও তার ওপর আস্থা রাখলেন। এখন দেখার বিষয়, তিনি সে ‘আস্থার’ কতটুকু মর্যাদা দেন।
Daily BONIK BARTA
09.11.12

বিরোধী নেত্রীর বিদেশ সফর এবং গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনীতি যখন ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে, তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বেইজিং ও নয়াদিলি্ল সফর করলেন। ধারণা করছি, ৬ নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যাবেন এবং মার্কিন কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের সদস্যদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় করবেন। বিরোধীদলীয় নেত্রীর বিদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছে যে, ক্ষমতার \'কেন্দ্র\' বদলে যাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের \'ব্যর্থতা\'কে পুঁজি করে তিনি সমর্থন আদায়ের (?) জন্য বেইজিং ও নয়াদিলি্ল সফর করছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ভারত ও চীন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নানা কারণে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনীতি, তাতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে, বাংলাদেশ সেই প্রভাবের বাইরে থাকতে পারে না। উপরন্তু ভারত একটি অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হরিন্দর কোহলির মতে, আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। তখন মাথাপিছু আয় ৯৪০ ডলার থেকে ২২ হাজার ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত যেখানে অবদান রাখত মাত্র ২ ভাগ, তখন অবদান রাখবে ১৭ ভাগ। সুতরাং এই অর্থনীতির প্রভাব পার্শ্ববর্তী দেশের ওপর পড়বেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, একটি বড় দেশের পাশে যদি একটি ছোট দেশ থাকে, তাহলে ওই বড় দেশ ছোট দেশের ওপর প্রভাব খাটায়। মেদভেদেভের (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) ধারণা ্তুতড়হব ড়ভ চৎরারষবমবফ ওহঃবৎবংঃ্থ অনেকটা এ ধারণাকেই সমর্থন করে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অতিমাত্রায় \'ভারতমুখিতা\' সাম্প্রতিককালে বিতর্কের মাত্রা বাড়ালেও বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা ভারতের \'প্রভাব\' থেকে বের হয়ে আসতে পারব না। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা এক জায়গায়_ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারিনি। আমাদের \'প্রাপ্তি\' এখানে কম, ভারতের \'প্রাপ্তি\' অনেক বেশি। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালেই প্রধানমন্ত্রী ভারতে গেছেন। ফিরতি সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেন ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। এ ধরনের সফর ও পাল্টা সফরের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি \'ফ্যাক্টর\'। খালেদা জিয়া এটাকে বিবেচনায় নিয়েই ভারতে গেলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। চীন সফরের সময় চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জি জিন পিং, যিনি মার্চে (২০১৩) প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, খালেদা জিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। খালেদা জিয়া যে চীনা নীতিনির্ধারকদের কতটুকু আস্থায় আছেন এটা তার বড় প্রমাণ। নয়াদিলি্লতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ হয়েছে তা থেকেও ধরে নেওয়া যায় তার এই সফর নিছক সাধারণ কোনো ভ্রমণ নয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তা উপদেষ্টা, কিংবা লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেত্রী_ লিস্টে সবাই আছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা মূলত খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কিছু বিষয় বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ভারতকে দেওয়া ট্রানজিট কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সে ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী কিংবা তারা কী চায়। বলা ভালো, বিএনপি শুধু ভারতকে দেওয়া ট্রানজিটের পক্ষে নয়, বরং বিএনপি চায় সত্যিকার অর্থেই ট্রানজিটের বহুমাত্রিক ব্যবহার। অর্থাৎ নেপাল, ভুটান এমনকি চীনকেও ট্রানজিটের আওতায় আনা হোক। নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে সহযোগিতা, তাতেও বিএনপির পূর্ণ সায় নেই। টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধী বিএনপি। আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে পানি সমস্যার সমাধান চায় বিএনপি। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হোক_ ওটাও বিএনপি চায়। যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, খালেদা জিয়া ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের আস্থা অর্জন করতে পারলেন কি-না। যদি আস্থা অর্জন করতে পারেন, সেটা হবে তার জন্য বড় সাফল্য। ধারণা করছি, এখন খালেদা জিয়ার সফরের পরপরই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী নয়াদিলি্ল যাবেন। দীপু মনি তার ভারত সফর বাতিল করেছেন। অনেক বিষয় ঝুলে আছে। এর মধ্যে অন্যতম তিস্তার পানি বণ্টন। গওহর রিজভী না গেলেই বরং আমি অবাক হবো।
এটা স্পষ্ট, ভারত যেমনি ঠিক তেমনি চীনা নেতৃবৃন্দও \'নির্দিষ্ট কতগুলো বিষয়ে\' খালেদা জিয়ার অবস্থান জানতে চেয়েছে। \'চীনকে ঘিরে ফেলার\' যে নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামীতে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন নৌসেনা ঘাঁটি গড়বে। বাংলাদেশ চীনের নিকট প্রতিবেশী। চীনা নেতৃবৃন্দ যে এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার মনোভাব জেনেছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু যে প্রশ্নটি নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন, তা হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তি আদৌ নাক গলাচ্ছে কি-না! ২০১৩ বাংলাদেশে নির্বাচনের বছর। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই নির্বাচনের আয়োজন করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সুযোগ নেই। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। বিএনপি চাচ্ছে একটি নির্দলীয় সরকার, যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। সরকারের এতে সম্মতি নেই। ফলে দিন যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই সংকটের গভীরতা বাড়ছে। গত এক বছরে যেসব বিদেশি ভিআইপি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন, তারা প্রায় সবাই এক বাক্যে এ কথাটাই বলে গেছেন যে, সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নির্বাচন হোক। সুতরাং একটি প্রশ্ন থাকবেই_ দশম সংসদ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তাতে \'সব দলের\' অংশগ্রহণ থাকবে কি-না? বিএনপি জানিয়ে দিয়েছে, তারা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। খালেদা জিয়ার সরকারের সময় এ ব্যাপারে ভারতের বক্তব্য হয়তো তাকে জানানো হয়েছে। কেননা বাংলাদেশে যদি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেও স্পর্শ করতে পারে। ভারত সবসময়ই চায় বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা থাকুক। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, জাতিসংঘের চার্টার অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এটা কূটনীতির একটি বৈশিষ্ট্য। সুতরাং বাংলাদেশে কবে নাগাদ নির্বাচন হবে, তাতে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি করবে না_ এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয় নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন না। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যে কোনো ফর্মেই হোক, এ বিষয়টি উঠেছে। এটা কখনও কাম্য নয় যে, আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলব। বিদেশিরা কেন আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলবে? কথা বলবে? হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি যখন \'সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচনের\' কথা বলে গিয়েছিলেন, তাতে কি আমদের মান-মর্যাদা বেড়েছিল? আমরা এই সুযোগটি কেন করে দিলাম? পরিস্থিতি এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে যে, বিদেশি অতিথিরা প্রকাশ্যেই এ ব্যাপারে মন্তব্য করছেন। এটা শোভন নয় এবং এতে করে আমাদের মান-মর্যাদাও বাড়ে না। খালেদা জিয়া একটি বড় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দলটির একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়লেও তাতে দলটির খুব একটা ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না। লাখ লাখ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে এই দলটির প্রতি। দলটিকে আস্থায় না নিলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
Daily SAMAKAL
06.11.12

জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গে কিছু কথা

জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। গত ২১ অক্টোবর হোটেল র‌্যাডিসনে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা এই ঐক্যের ডাক দেন। একটি যৌথ ইশতেহারও প্রকাশ করা হয়েছে। যৌথ ইশতেহারে যেসব কথা বলা হয়েছে তা নতুন নয়। এদেশের সুশীল সমাজ বেশ কিছুদিন যাবতই এ ধরনের কথা বলে আসছে, কিন্তু তাদের এই ‘ঐক্যের ডাক’-এ বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমত, এই ‘ঐক্যের ডাক’ কাদেরকে নিয়ে? অধ্যাপক চৌধুরী কিংবা ড. হোসেন ঐক্যের ডাক দিলেই কি ‘ঐক্য’ প্রতিষ্ঠিত হবে? দ্বিতীয়ত, দুটি বড় দল বা দল দুটির নেতৃত্বে গঠিত জোটকে বাদ দিয়ে কী ‘জাতীয় ঐক্যে’ প্রতিষ্ঠা করা আদৌ সম্ভব? তৃতীয়ত, অধ্যাপক চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে অতীতে আ.স.ম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি ও কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা দলের একসঙ্গে একটি ‘তৃতীয় ধারা’ সূচনা করার কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল র‌্যাডিসনের অনুষ্ঠানে রব ও কাদের সিদ্দিকী দু’জনই অনুপস্থিত। নিজেদের মধ্যে যদি আদৌ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে বৃহত্তর ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে? এই মুহূর্তে আলোচনার বিষয় মূলত দুটি-একটি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সব দলের মতামতের ভিত্তিতে একটি ‘ফর্মুলা’ উদ্ভাবন। দ্বিতীয়টি, দুটি বড় জোটের বাইরে একটি তৃতীয় জোট বা ধারার সূচনা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে অধ্যাপক চৌধুরী ও ড. হোসেনের অবস্থান এক। তারা দু’জনই এবং তাদের দলও নির্বাচনের নিরপেক্ষতার স্বার্থে একটি তত্ত্বাবধায়ক ও নির্দলীয় সরকার চায়। কেননা ক্ষমতাসীন সরকারকে রেখে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই বা আগামীতেও থাকবে না। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে দলীয় কর্তৃত্ব এত বেশি যে, কেউই চান না ক্ষমতা ছেড়ে দিতে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই বটে, কিন্তু ভিন্ন নামে হলেও এ ধরনের একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে এরা দু’জন তৃতীয় ধারার কথা বলছেন বটে, কিন্তু রাজনীতিগতভাবে এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। কামাল হোসেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক। অন্যদিকে অধ্যাপক চৌধুরী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন এবং ইসলাম ধর্মের চেতনাকে লালন করেন। এ ক্ষেত্রে এদের মধ্যে সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব? বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১/১১-এর (১১ জানুয়ারি ২০০৭) ঘটনার পর আমরা তৃতীয় শক্তির কথা শুনেছিলাম। সেই তৃতীয় শক্তি বিকশিত হয়নি। আজ ঠিক ৫ বছর পর আবার তৃতীয় শক্তির কথা উঠেছে। গত ৭ জুন নাগরিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এই তৃতীয় শক্তি গড়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি বড় দল-আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় ধারা সৃষ্টির প্রয়াস অনেকদিন ধরেই নেয়া হচ্ছে, কিন্তু সমাজে আদৌ তা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এক সময় জাতীয় পার্টি বা বাম ধারার দলগুলোকে তৃতীয় ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হতো, কিন্তু জাতীয় পার্টি সেই অর্থে গ্রহণযোগ্য একটি তৃতীয় শক্তি না হয়ে উত্তরবঙ্গকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর বাম দলগুলোর আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এখন মাহমুদুর রহমান মান্নার উদ্যোগে গড়ে ওঠা নাগরিক ঐক্য আদৌ একটি তৃতীয় ধারার সূচনা করবে, এ বিশ্বাস রাখতে পারছি না কিংবা হুদা একটি তৃতীয় ধারার জন্ম দেবেন, এটাও মনে হয় না। এটা স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি অবিসাংবাদিত শক্তি। আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত দল। এদের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। যে কারণে ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনার পরও দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে দু’দু’বার সরকারও গঠন করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপি একটি ধারা তৈরি করেছে। বিএনপি আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি। এই বিকল্প শক্তি বাংলাদেশে একটি নির্দলীয় রাজনীতির সূচনা করেছে। পরিসংখ্যান বলে সংসদীয় রাজনীতিতে এই দল দুটির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রথম সংসদ থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবম সংসদ পর্যন্ত সংসদীয় রাজনীতির যে ধারা তাতে দেখা যায়, যেখানে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সেখানে বিএনপির অবস্থান বিরোধী শিবিরে। শক্তিশালী তৃতীয় কোনো পক্ষ বিকশিত হয়নি। স্বতন্ত্ররা প্রথম সংসদে (৪টি আসন), মুসলিম লীগ-আইডিএল দ্বিতীয় সংসদে (২০ আসন), জাতীয় পার্টি (৫ম, ৭ম, ৮ম, ৯ম) তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও জাতীয় পার্টি বরাবরই সরকারের অংশীদার। ফলে তৃতীয় শক্তি বিকশিত হতে পারেনি। এখন বাংলাদেশে একটি তৃতীয় শক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও আকার-ইঙ্গিতে বলছেন দাতারা। দুর্নীতির প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এসেছে। বলা হচ্ছে, এই তথাকথিত তৃতীয় শক্তি দুর্নীতিমুক্ত থাকবে। এই দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা বলছে নাগরিক ঐক্য। পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক তথা দাতা গোষ্ঠীর একটা বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সরাসরি দুর্নীতির প্রশ্ন তুলেছে। এই দুর্নীতির ইস্যুটি বিশ্বব্যাংক তথা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুব জনপ্রিয় একটি শব্দ। এটা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বে সরকার পরিবর্তন করায়। পাকিস্তানে তারা ইমরান খানকে সামনে নিয়ে এসেছে। মিসরে ‘আরব বসন্ত’ এ দুর্নীতির বিষয়টি ছিল মুখ্য। এখন মিসরে পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতন্ত্র বিনির্মাণে তরুণ সমাজ, সুশীল সমাজকে ‘প্রমোট’ করে। পাঠক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করুন। হিলারি ক্লিনটন তৃতীয় বা চতুর্থ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দেখা না করলেও তরুণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় তরুণদের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। এখন যারা নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে সংগঠিত হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তেমন একটা নেই। তারা মূলত সুশীল সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। সঙ্গত কারণেই যে আশঙ্কাটা থেকে যায়, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যে সুশীল সমাজকে ‘প্রমোট’ করছে তারাই কী নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে সংগঠিত হচ্ছে? অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী কিংবা ড. কামাল হোসেনেরও তেমন গ্রহণযোগ্যতা নেই।  কথিত তৃতীয় শক্তি নিয়ে দুটি বড় দল আবার পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করেছে। গত ২২ জুন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি তৃতীয় শক্তির উত্থান চাইছে। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর একদিন আগে বলেছেন, বিএনপি কোনো তৃতীয় শক্তিকে সমর্থন করে না। তবে নাগরিক ঐক্য যদি একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে তারা দল হিসেবে এটাকে সমর্থন করবে। মান্না আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি মূল ধারার আওয়ামী লীগের নন। এক সময় জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে যান, কিন্তু নেত্রীর কাছাকাছি যেতে পারেননি। সংস্কারবাদী হিসেবে তার একটা পরিচিতি আছে। এই পরিচয়ের কারণে এবং বিভিন্ন টকশোতে স্পষ্ট বক্তব্য রাখার কারণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না বলে অনেকের ধারণা। এ কারণেই তিনি নাগরিক ঐক্যের জন্ম দিয়েছেন-এমন কথা আছে। এর কিছুদিন পর হুদা দিলেন আরেকটি দলের জন্ম। নাগরিক ঐক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো তৃতীয় ধারা সূচনা করতে পারবে না। তাদের কোনো সুস্পষ্ট দিকদর্শনও নেই। এরা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। সুশীল সমাজকে দিয়ে রাজনীতি হয় না, অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি সম্ভব নয়। সুশীল সমাজের সঙ্গে আরো যারা আছেন তারা যদি রাজনীতিতে অবদান রাখতে চান, সেটা নিঃসন্দেহে একটা ভালো দিক। রাজনীতি করতে হলে তাদের মূল ধারার রাজনীতিতে আসতে হবে। মূল ধারার বাইরে গিয়ে কেউ অতীতে কোনো সুবিধা করতে পারেননি। ড. ইউনূস কিংবা ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্ব এখন শুধু সংবাদপত্রের পাতাতেই আছেন। অধ্যাপক ইউনূস চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি। রাজনীতি একটা ভিন্ন বিষয়। রাজনীতিবিদরা ভুল করতে পারেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারেন-এটা সত্য, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জনগণের সঙ্গে এরাই থাকেন। সাধারণ একজন মানুষ যখন কোনো সমস্যায় পড়েন, তখন তিনি ছুটে যান স্থানীয় নেতৃত্বের কাছে। তারাই তাদের আশ্রয়স্থল। ড. ইউনূস সাধারণ মানুষকে নিয়ে এখন ‘সামাজিক ব্যবসার’ কথা বলেন। কিন্তু তিনি কী আদৌ সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে কোনো দিন দাঁড়িয়েছেন? একজন কামাল হোসেনের কাছে কী সাধারণ মানুষ যেতে পারে? ড. কামাল হোসেনের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতা তাকে জাতীয় নেতায় পরিণত করতে পারেনি। আজ একজন মান্নার মধ্যে হতাশা কাজ করে। তার নিজের নির্বাচনী এলাকা কোনটি, এটা নিয়েও সমস্যা আছে। বগুড়াতে তিনি নির্বাচন করেছিলেন, কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি আর তার নির্বাচনী এলাকায় যাননি। একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিজীবী এক কথা নয়। মান্না আজ যে কথাগুলো বলছেন, সেই কথাগুলো তিনি দলীয় ফোরামে বললে ভালো করতেন। এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। ‘তৃতীয় শক্তি’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদৌ কোনো অবদান রাখতে পারবে না। তবে এটা ঠিক, বর্তমানে রাজনীতি যেভাবে চলছে, সে ধারায় রাজনীতি চললে একুশ শতকে আমরা বাংলাদেশকে যোগ্য স্থানে নিয়ে যেতে পারব না। দুটি বড় দলের মধ্যে সুস্পষ্ট দিকদর্শন নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা আমরা বলছি বটে, কিন্তু সেই অর্থে কোনো উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি না। নতুন নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না। দুটি বড় দলের নেতৃত্বের গাড়িতে যারা আছেন, তারা আগামী ৫-৬ বছর পর অবসরে যাবেন। তখন দলটি থাকবে বটে, কিন্তু নয়া নেতৃত্ব তো তৈরি হচ্ছে না। নয়া নেতৃত্ব তৈরি করার কোনো উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে না। ২০৫০ সালকে সামনে রেখে একটি রূপকল্প প্রণয়ন করা উচিত। আমাদের জনসংখ্যা, খাদ্য, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, সুপেয় পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দুটি বড় দলেরই বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত। এদের এসব বিষয়ে ‘সেল’ থাকা উচিত। গবেষণা সেল থাকা প্রয়োজন। ওই গবেষণা সেল দলের নীতিনির্ধারণ করবে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় এটাই নিয়ম। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া আর জনসমর্থন হারিয়ে অন্য দলের জন্য পথ করে দেয়া। এর কোনো বিকল্প নেই। আজ যারা তৃতীয় ধারার কথা বলছেন, এরা ভালো করতেন যদি স্ব-স্ব দলে থেকে দলকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারতেন, তারা তা করেননি। একজন আমলা, একজন শিক্ষাবিদ কিংবা একজন আইনজীবী বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারবেন না। তৃতীয় শক্তি বা জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও এ কথাগুলো গত ৪০ বছরই কোনো না কোনোভাবে শুনে আসছি, কিন্তু জাতীয় ঐক্য কী হয়েছে? এরা ভালো ভালো কথা বলেন, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু তাদের জনসমর্থন কতটুকু? হোটেল র‌্যাডিসনে বসে জাতীয় ঐক্য করা যায় না। মানুষকে সংগঠিত করতে হলে গ্রামে যেতে হবে। ঢাকা শহর আর টকশো দিয়ে বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশে যে শত শত গ্রাম, সেই গ্রামের সঙ্গে তাদের কারোরই যোগাযোগ নেই। তাই র‌্যাডিসনে বসে যে ঐক্যের ডাক তারা দিলেন তা শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
Daily MANOBKONTHO
04.11.12

খালেদা জিয়ার ভারত সফরে প্রাপ্তি


সাত দিনের বহুল আলোচিত ভারত সফরের পর খালেদা জিয়া গতকাল শনিবার ঢাকায় ফিরেছেন। এই সফর খোদ ভারতে যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও প্রচুর আলোচনা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ সফরকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? প্রথমত, এ সফরের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা খালেদা জিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনায় ভারতীয় নেতারা 'বেশ কিছু বিষয়ে' তাঁর অবস্থান জানতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ভারত তার প্রথাগত অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসেছে। এত দিন ভারত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকেই 'বন্ধু' মনে করত। এখন ভারত এ বৃত্ত ভাঙছে। আজ ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করতেও ভারতীয় নেতাদের এখন কোনো দ্বিমত নেই। এমনকি তাঁরা এরশাদকেও লাল গালিচা সম্মান দিয়েছিল নয়াদিল্লিতে। ভারত এ সফরকে অভিহিত করেছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের চলমান যোগাযোগের অংশ হিসেবে। আর কলকাতার আন্দবাজারের ভাষায়, 'নিঃশব্দ রণকৌশল পরিবর্তন'। ভারতের এই রণকৌশল পরিবর্তনে আমি অবাক হইনি। কেননা এর সঙ্গে ভারতের জাতীয় স্বার্থ জড়িত। ভারত তার জাতীয় স্বার্থ দেখবে। এ জাতীয় স্বার্থের আলোকে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। তাদের কাছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো ব্যাপার নয়। বিএনপি যদি তাদের জাতীয় স্বার্থের পথে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, তাহলে তারা বিএনপিকে 'বন্ধু' ভাববে- এটাই স্বাভাবিক, এটাই রাজনীতি। ভারতীয় নেতারা এটা উপলব্ধি করেছেন যে বাংলাদেশে জনমত এখন আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অনুকূলে নয়। তাই তাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনেই তারা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করবে- এটাই স্বাভাবিক। তৃতীয়ত, বিএনপি তার রাজনীতির কারণেই ভারতবিরোধী একটা অবস্থান নিয়েছিল- এ রকম একটা অভিযোগ রয়েছে। এখন বিএনপি যদি একটা 'বাস্তবমুখী' অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভারত এ শতাব্দীতেই অন্যতম একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এ বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। আমি মনে করি, এটা বিএনপির 'রিয়্যাল পলিটিক্স'-এর একটি অংশ। বিএনপি একই সঙ্গে চীনকেও আস্থায় নিয়েছে। রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই। জাতীয় স্বার্থই সনাতন। একসময় চীন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। এখন সেই চীনকে 'ঘিরে ফেলা'র নীতি নিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিএনপি তার পুরনো ধ্যান-ধারণা ধরে রাখবে- সেটা আমরা মেনে নিই কিভাবে? বাহ্যত, বিএনপি কখনো ভারতবিরোধী নয়। বিএনপির আমলেই অর্থনীতিতে ভারতকে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান। বিএনপি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদির ক্ষেত্রে যে অবস্থান নিয়েছিল, তা জাতীয় স্বার্থেই নিয়েছিল। এটাকে ভারতবিরোধিতা বলা যাবে না। অবশ্য এটা বিএনপির ব্যর্থতা যে তারা 'ভারতবিরোধী' ইমেজ ভাঙতে পারেনি। মিডিয়া না থাকায় তাদের বক্তব্য সঠিকভাবে প্রচারিত হয়নি বলেও আমার ধারণা। চতুর্থত, নয়াদিল্লিতে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় খালেদা জিয়া ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারতবিরোধী তৎপরতায় ব্যবহৃত হতে দেবেন না বলে যে আশ্বাস দিয়েছেন, এটাকে আমি 'পজিটিভলি' দেখছি। এটাও বিএনপির রিয়্যাল পলিটিক্সের অংশ। বাংলাদেশে ভারতের বিচ্ছিন্নতা গোষ্ঠীর অবস্থান শুধু বিএনপির আমলেই ছিল না, এ সমস্যা মূলত ভারতের। এ সমস্যা বাংলাদেশ জন্ম হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছিল। 'সাত বোন রাজ্যের' বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমাধান ভারতকেই করতে হবে! আজ আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে বিএনপিকে দোষারোপ করলেও, মূল সমস্যার দিকে তাঁরা দৃষ্টি দেননি। ভারত সরকার সামরিক বাহিনী দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। ওই 'ভুল' সিদ্ধান্তের জন্য ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। এ জন্য বিএনপিকে দায়ী করা যাবে না। পঞ্চমত, ভারত সফরে খালেদা জিয়া অতীত ভুলে সামনের দিকে তাকানোর কথা বলেছেন। এ সিদ্ধান্তও সঠিক। অতীতকে ধরে রেখে কোনো জাতি কখনো উন্নতির শিখরে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশ যেমন পারেনি, পারবে না ভারতও। একুশ শতকে এসে সারা বিশ্বই পরস্পর নির্ভরশীল একটা সম্পর্ক গড়ে তুলছে। 'সামনের দিকে তাকানোর' অর্থই হলো পরস্পর নির্ভরশীল একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা। 'ক্ষুদ্র দেশ' হিসেবে বাংলাদেশেরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। খালেদা জিয়া সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। দ্বিপাক্ষিকতার বেড়াজাল থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পোর্ট ব্যবহারসহ বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার আলোকে সম্পর্ক গড়তে হবে। এটাই একুশ শতকের চাহিদা। দ্বিপাক্ষিকতা একটি ভ্রান্ত নীতি। ট্রানজিটের একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এটা হতে হবে কানেকটিভিটির আলোকেই, যাতে সুদূর চীনকেও আমরা এই কানেকটিভিটির আওতায় আনতে পারি। মনে রাখতে হবে, চীনও একটি বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি। এই চীন আমাদের নিকট-প্রতিবেশী। এই চীনকে আমরা অস্বীকার করতে পারব না। খালেদা জিয়া এ কথাটাই ভারতীয় নেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ষষ্ঠত, মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে খালেদা জিয়ার আলাপচারিতায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। এই 'অ্যাপ্রোচ' থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা শিখতে পারেন। জাতীয় নেতাদের প্রতি সম্মান না জানালে কোনো জাতিই উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর শহীদ জিয়া আমাদের ইতিহাসের অংশ। কারো সঙ্গে কারো তুলনা করা যাবে না। দুজনই মহান ব্যক্তি। তাঁরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজ নির্মাণ করে গেছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যখন শহীদ জিয়ার প্রশংসা শুনি, তখন দুঃখ লাগে আমরা বাংলাদেশে এ ধরনের মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলাম না। সপ্তমত, খালেদা জিয়ার ভারত সফর নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা তথা মন্ত্রীরা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা ইতিবাচক নয়। 'ঘৃণা ও বিদ্বেষের যে রাজনীতি' সেই 'রাজনীতি' থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারলাম না। খালেদা জিয়ার সফরে আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় এ কথাটাই আবারও প্রমাণিত হলো। এই বৃত্ত আমাদের ভাঙতে হবে। অষ্টমত, খালেদা জিয়ার সফরের মধ্যে এটা আবারও প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটি 'ফ্যাক্টর'। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবেই হোক ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'প্রভাব' ফেলছে। এরশাদ ও খালেদা জিয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি ভারত সফর এখন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠল। এটা আমাদের রাজনীতির একটা দৈন্য যে আমরা ক্ষমতার 'উৎস' খুঁজছি অন্য জায়গায়!
খালেদা জিয়া তাঁর ভারত সফর শেষ করেছেন। কিন্তু এর একটা প্রভাব রাজনীতিতে থেকে যাবেই। তাঁর এই সফর ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেলেও, একটা আশঙ্কা থেকেই গেল। আর তা হচ্ছে, ভারত কি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশে একটি 'সেকেন্ড ফ্রন্ট' খুলছে? বিএনপিকে ব্যবহার করে ভারত কি তার 'স্বার্থ' চিরস্থায়ীভাবে আদায় করে নিতে চায়? বিএনপি কি বাংলাদেশে এ কারণে কোনো 'ইমেজ সংকটের' মুখে পড়বে? এর জবাব এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে ভারতীয় নেতাদের উদ্দেশ্য আসলে কী। খালেদা জিয়া ভারত সফর করে তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। এটা তাঁর নিজের ও দলের জন্য প্রয়োজন ছিল। ভারতকে বন্ধু মনে করার অর্থ এই নয়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ছাড় দেওয়া। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ইস্যু রয়েছে, যে ইস্যুগুলোর ব্যাপারে সাধারণ মানুষ চায় বিএনপি স্পষ্ট বক্তব্য রাখুক ও জনগণের পাশে থাকুক। এখন ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে বিএনপি জাতীয় স্বার্থে তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছে কি না। বাংলাদেশ যেমন ভারতের একটি বড় 'বাজার', আবার একটি 'অস্থিতিশীল বাংলাদেশ' ভারতের জন্য হুমকিও। তাই খালেদা জিয়ার সফরের পর ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে তার অবস্থান পরিবর্তন করছে কি না, সেটাও লক্ষ করার বিষয়। খালেদা জিয়া সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় নেতা। তিনি ভারতে লাল গালিচা সম্মান পাবেন, তাঁকে ভারতীয় নেতারা গুরুত্ব দেবেন- এটাই স্বাভাবিক।Daily KALERKONTHO04.11.12

লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি


গত ২১ অক্টোবর তৃতীয় দফা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে’ বারাক ওবামা বিজয়ী হলেও আগামী ৬ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও জনমত জরিপ ওবামার পক্ষে। নির্বাচনের প্রায় ১২ দিন আগে নিউইর্য়ক টাইমস, কিউনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়, সিবিএস, গ্যালপ কিংবা ব্ল-মবার্গ জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনে ওবামা বিজয়ী হবেন। আবার ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসির জনমত জরিপে দেখা গেছে, ১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে রমনি বিজয়ী হবেন। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, এ নির্বাচনে ‘সুইং স্টেট বা ব্যাটল গ্রাউন্ড স্টেটগুলো’ (কোন দলেরই সংখ্যাধিক্যহীন) একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এগুলোর ওপরই নির্ভর করবে একজন প্রার্থীর জয়-পরাজয়। এসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে ওহাইও, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, কলোরাডো, নর্থ ক্যারোলিনা, নেভাদা, আইওয়া ও উইসকনসিন। এসব রাজ্যের কোনটা ওবামার পক্ষে, কোনটা আবার রমনিকে সমর্থন করছে। তাই শেষ হাসিটি কে হাসবেন তা বলা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। আমেরিকার অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০, আর নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা ৫৩৮। একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে হলে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পেতে হবে। সাধারণ সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যসংখ্যার ভিত্তিতে এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটের সংখ্যা ৫৪ অথবা নিউইয়র্কের ৩৩। ছোট ছোট রাজ্য, যেমন মেইন (৪টি), সাউথ ডাকোটা (৪টি) কিংবা ওয়াওমিংয়ে (৩টি) নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা কম। কোন প্রার্থী কোন রাজ্যে বিজয়ী হলে সে রাজ্যে যে কয়টি নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট রয়েছে, তার পুরোটা তিনি পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে যে প্রার্থী হেরে যান, তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর কোন ভোট পান না। অর্থাৎ জনসাধারণের ভোটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হন না, নির্বাচিত হন নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। তবে জনসাধারণ ভোট দেয়। এটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। এখানে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘তৃতীয় পার্টি’র তেমন কোন অস্তিত্ব নেই। নামকাওয়াস্তে দু’-একটি দল (গ্রিন, কন্সটিটিউশন পার্টি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও তারা প্রচারণার দৌড়ে এগোতে পারেন না। প্রচারণায় একজন প্রার্থীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা ছোট ছোট দলের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। নির্বাচন দুটি বড় দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই দুই দলের প্রার্থীরা জনসাধারণ তথা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। এটা বৈধ। প্রার্থীদের প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। আগে প্রেসিডেন্ট বাছাই পদ্ধতি ছিল জটিল। প্রতিনিধি পরিষদে স্থানীয় অঙ্গ রাজ্যগুলোর প্রার্থীদের মধ্য থেকেই প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা ছিল। এর পর পার্টি ‘ককাসে’ প্রার্থী নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। আর ‘ককাস’ বা বাছাই ব্যবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রার্থী মনোনীত হয়ে প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৮৯-১৭৯৭)। তার কোন দল ছিল না। তিনি ফেডারেলিস্টদের ব্যানারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্মরণ করিয়ে দেই, প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কোন বেতন গ্রহণ করেননি। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই দলটি থেকেই এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বারাক ওবামা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। যদিও ওই সময় দলটির নাম ছিল ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকান। ১৮২৫ সাল পর্যন্ত এই দলটি থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কুইন্সি অ্যাডামস (ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট) ক্ষমতায় ছিলেন ১৮২৯ সাল পর্যন্ত। তারপর শুধু ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাম ধারণ করে এন্ড্র- জনসন ও মার্টিন ভ্যান বুরেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন (১৮৪১)। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে উইগ পার্টির আÍপ্রকাশ ঘটে। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত উইগ পার্টির প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরপর দলটির কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আব্রাহাম লিংকন (১৮৬১-১৮৬৫) ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট। এর পর থেকেই এই দুই পার্টি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সাধারণত একজন প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি মাত্র দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই ৩২তম প্রেসিডেন্টের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতাসীন থেকেও দ্বিতীয় টার্মের জন্য সেই প্রেসিডেন্ট বিজয়ী হতে পারেননি। সমসাময়িককালে জেরাল্ড ফোর্ড (৩৮তম প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান, ১৯৭৪-১৯৭৭), জিমি কার্টার (৩৯তম, ডেমোক্র্যাট, ১৯৭৭-১৯৮১) ও সিনিয়র জর্জ বুশের (৪১তম, রিপাবলিকান, ১৯৮৯-১৯৯৩) নাম উল্লেখ করা যায়। এখন দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার দ্বিতীয় টার্ম শুরু করতে পারেন কিনা। তার দ্বিতীয় টার্ম শুরু হবে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি।
প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা গেছে কতগুলো ইস্যু প্রাধান্য পায়। ওই ইস্যুগুলোর ব্যাপারে প্রার্থীদের অবস্থান দেখে ভোটাররা ভোট দেয়। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বিশাল বেকারত্ব, রেকর্ড অতিক্রম করা ঋণ (১৬ ট্রিলিয়ন ডলার) ও সরকারের অনধিকার চর্চায় অচলপ্রায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক খাত, সে সঙ্গে কিছু বৈদেশিক ইস্যু (ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও লিবিয়া) নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে। এসব ইস্যুতে দুই প্রার্থীর অবস্থান কিন্তু এক নয়। ওবামার বিরুদ্ধে রিপাবলিকান শিবিরের বড় অভিযোগ, তিনি গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা দিতে পারেননি। বেকারত্ব কমাতে পারেননি। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেছে। এটা সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কোন উন্নতি হয়নি গত চার বছরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন গরিব। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৪৯ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, সে সঙ্গে আরও ৫১ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ধনী-গরিবের একটা বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ রাষ্ট্রের সম্পদের ২৫ ভাগ নিয়ে যায়। এরা আবার সম্পদের ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই এক ভাগ মানুষের বার্ষিক আয় ২ কোটি ৭৩ লাখ ৪২ হাজার ২১২ ডলারের উপরে। কিন্তু বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি কাজের জন্য ন্যূনতম চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আরও খারাপ খবর হচ্ছে, ৪৭ দশমিক ৮ ভাগ পরিবার সরকারি খাদ্য সাহায্য বা ফুড স্টাম্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার কর্মজীবী। কিন্তু এদের আয় যথেষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করতে পারেননি, সেখানে স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট করেছেন, স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ে যথেষ্ট শিক্ষক দিতে পারেননি। সেখানে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছেন ‘তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র পেছনে। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছিল সব মিলিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপর (যুদ্ধ খরচ ৮০৬ বিলিয়ন, সৈনিকদের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ ৪২২ থেকে ৭১৭ বিলিয়ন)। আর আফগান যুদ্ধের খরচ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অংককেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু সেনা প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে ব্যয় হয়েছিল ৬ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে জনসংখ্যার ৯ দশমিক ১ ভাগ বেকার, সেখানে যুদ্ধের পেছনে এত বিপুল ব্যয় নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ওবামা সফল, তাও বলা যাবে না। ২০০৯ সালে কায়রো ভাষণে তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ‘নতুন এক সম্পর্ক’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে গিয়ে কোথাও কোথাও জঙ্গিবাদের জš§ হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনে আÍঘাতী বোমাবাজির জš§ হয়েছে। সাদ্দাম উৎখাতের পর সেখানে ইসলামী কট্টরপন্থীরা শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়াতে আসাদকে উৎখাত করতে গিয়ে দেখা গেল, অস্ত্র চলে গেছে জঙ্গিদের হাতে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ‘আরব বসন্ত’ তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, মিসরে পরিবর্তন ডেকে আনলেও সেখানে কী ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ‘পারমাণবিক সমস্যা’র কোন সমাধান তিনি বের করতে পারেননি। তবে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।
রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির সমর্থনও যে বেশি তা বলা যাবে না। তার অর্থনৈতিক তথা বৈদেশিক নীতি মানুষকে টানতে পারেনি। বরং গর্ভপাতের বিরোধিতা করা, অভিবাসীদের ব্যাপারে কঠোর হওয়া এবং সমকামীদের বিয়ের বিরোধিতা করায় তিনি হিস্পানিক ও অভিবাসী আমেরিকানদের ভোট পাবেন না। তবে রমনি তার চরম দক্ষিণপন্থী অবস্থান থেকে অনেক সরে এসেছেন। ওবামার বৈদেশিক নীতির সমালোচনা করলেও তিনি নিজে কোন সুস্পষ্ট নীতি উপাস্থাপন করতে পারেননি। বরং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে অতিঘনিষ্ঠতা আরব বিশ্বে তার অবস্থানকে অনেক দুর্বল করেছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অষঃবৎ ঘবঃ নামে একটি ভিন্নধর্মী অনলাইন ম্যাগাজিন ১৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে, যেখানে ওবামা ও রমনির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই (২৬ অক্টোবর)। এ সবের মাঝে রয়েছে মৃত্যুদণ্ড রদ অ্যাক্ট, ৫ হাজার ১১৩টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের ভবিষ্যৎ, গুয়ানতানামো বে’র বন্দিশিবিরের ভবিষ্যৎ এবং ওই বন্দিশিবিরে নির্যাতনকারীদের বিচার, বাড়ি ব্যবসায় ধসের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় ড্রোন বিমান আক্রমণের ভবিষ্যৎ, ন্যূনতম বেতন ১০ ডলারে উন্নীত করা (প্রতি ঘণ্টায় বর্তমানে ৭.২৫ ডলার), ইরানে সাম্ভাব্য বিমান আক্রমণের ব্যাপারে অসম্মতি, নির্বাচনী প্রচারণায় যে বিপুল অর্থ দাতাদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয় (চাঁদা) তা প্রত্যাখান করা, জলবায়ু পরিবর্তন তথা উষ্ণতা হ্রাসে একটি কমিটমেন্ট, সবার জন্য চাকরির নিশ্চয়তা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লির ভবিষ্যৎ, লাদেনকে কেন ধরে এনে কোর্টে বিচার করা হল না ইত্যাদি। এসব বিষয় সাধারণের মাঝে আলোচিত হলেও কোন একটি ইস্যুতেও ওবামা ও রমনির কোন ‘কমিটমেন্ট’ নেই। উভয়েই বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। অথচ একজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মানুষ এসব বিষয়ে শুনতে চায়। তিনটি বিতর্কের একটিতেও তারা এ ব্যাপারে কোন কথা বলেননি।
ওবামা ২০০৮ সালের নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক তথা অভিবাসী আমেরিকানদের ভোট পেয়েছিলেন। এবারও পাবেন। মহিলাদের ভোটও এবার পাবেন। অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে রমনি ধনিক শ্রেণীর ভোট পাবেন। সব মিলিয়ে বারাক ওবামার পাল্লা ভারী বলে ধারণা করা হলেও ‘সুইং স্টেট’গুলোর ভূমিকার কারণে ফলাফল শেষ মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে। গত ২৫ অক্টোবর ওবামা আগাম ভোট দিয়েছেন তার নিজ শহর ইলিনয়ের শিকাগো শহরে। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তবে শেষ হাসিটা কে হাসেন, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত।
Daily JUGANTOR
02.10.12