রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের গুণগত মান নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন

বেশ ক’বছর ধরেই শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়ে চলেছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু এখন বোধ হয় সময় এসেছে ভেবে দেখার। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সেই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ায় নিঃসন্দেহে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু তাতে মানসম্মত শিক্ষা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। উপরন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি আদৌ কতটুকু ভাবেন, তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন করেননি। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০১-০২ অর্থবছরে যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি ৯৭ লাখ, তা ২০১০-১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ১ লাখ ৩০ হাজার ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকার মধ্যে পেয়েছে ১৩ হাজার ৩৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৬ হাজার ১১৩ কোটি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৯ হাজার ১০৮ কোটি ও ২২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। উক্ত সময়ে মোট বাজেটের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার ৪১৪ কোটি ও ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। ২০০১-০২ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ থাকে, তার একটা অংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। আলোচনার সুবিধার্থে ২০০১-০২ ও ২০১০-১১ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করছি। ২০০১-০২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩ কোটি ৫৭ লাখ আর ২০১০-১১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। জাতীয় বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকে শিক্ষা খাতে (২০০১-০২)। এ পরিসংখ্যান বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪  শতাংশ ২০১০-১১ অর্থবছরে। আবার যদি শুধু শিক্ষা খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে— এ বরাদ্দ মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ (২০০১-০২) থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ (২০১০-১১) হয়েছে। অর্থাত্ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার পরিমাণ খুব বেশি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে, বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও। যদিও তুলনামূলক বিচারে উন্নয়নশীল অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম।
তার পরও কথা থেকে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেবে দেখতে হবে— কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়ানো যায় এবং সরকারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা কমানো যায়। এখানে আরো একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, তা হচ্ছে— বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার খুব কম অংশই ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উন্নয়ন খাতে কিংবা গবেষণায় যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, উপাচার্য মহোদয়রা সেটি শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যয় করেছেন। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা দলীয় কোটায়, স্থানীয় কোটায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। কযেকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর একটি প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি নিজের মেয়ে, ভাই, আপন ভায়রা, শ্যালিকার মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়েকে শিক্ষক তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটা রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এ প্রবণতা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। জাহাঙ্গীরনগর এরই মধ্যে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়ন বাজেট থেকে অর্থ এনে শিক্ষক তথা কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। ২০১১-১২ অর্থবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্জুরি কমিশন (বিমক) কর্তৃক বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৬৫ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে শিক্ষকদের বেতন দিতে। বিমক যে বরাদ্দ দেয় তা দিয়ে বেতন, পেনশন, সাধারণ খরচ, শিক্ষা খরচ, মেরামত ও মূলধনের চাহিদা মেটানো হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বেতন পরিশোধের পর যা থাকে, তা দিয়ে অন্য কিছু করা আর সম্ভব হয় না। ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান হয় না। তাদের ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরো খারাপ। তারা অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পেনশন দিতে পারে না। ঢাকার পাশাপাশি দ্বিতীয় বরাদ্দ পাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময় বেতন খাতে ব্যয় করেছে ১০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা (বিমক বরাদ্দ ১৩৯ কোটি), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ (বিমক বরাদ্দ ১১৩ কোটি ৭৫ লাখ), বুয়েট ৪৭ কোটি ৮০ লাখ (বিমক বরাদ্দ ৭১ কোটি ৯০ লাখ), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ৫২ কোটি টাকা (বিমক বরাদ্দ ৭৮ কোটি ৬০ লাখ)। চলতি বছরে এ ‘চাপ’ আরো বাড়বে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের কারণে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ কিংবা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে ৩৬টি) প্রতিষ্ঠা শিক্ষার মানোন্নয়নকে নির্দেশ করে না। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা যদি আমরা বিবেচনায় নিই, তাহলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যত্ এখন অন্ধকার। এক বিষয়ের ছাত্রকে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন বিভাগ খুলে সেসব বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখানে দেখভাল করার কেউ নেই।
একুশ শতকে এসে একটা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। ছাত্র বেতন না বাড়িয়েও আয় বাড়ানো যায়। এজন্য নীতিনির্ধারকরা কতগুলো বিকল্প ভেবে দেখতে পারেন। ১. পিপিপির মাধ্যমে অথবা বেসরকারি খাতকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিনিয়োগে উত্সাহিত করা যেতে পারে। যেমন— ব্যবসায় প্রশাসন, অর্থনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যা, ফার্মেসি বিভাগগুলোয় বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি পুঁজিতে ল্যাব স্থাপন, ছাত্রাবাস নির্মাণ ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী রয়েছেন। প্রয়োজন এখন একটি সুষ্ঠু নীতি প্রণয়ন। ২. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেকেন্ড ক্যাম্পাস কিংবা সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রাম (শুধু ব্যবসা প্রশাসন কোর্সই নয়) চালু করে তাদের আয় বাড়াতে পারে। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় এ উদ্যোগ নিতে পারে। ৩. গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা তেজগাঁওয়ে অবস্থিত টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন। আর সেই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে দক্ষ জনশক্তি পেতে পারেন বড় বড় গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। ৪. গার্মেন্টের পর আমাদের একটা সম্ভাবনায় খাত হচ্ছে ওষুধশিল্প। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি বিভাগ রয়েছে। এক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগ করতে পারে। মোট কথা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় চলবে— এ মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। নইলে একুশ শতকে আমাদের যে দক্ষ জনশক্তি দরকার, সেটি আমরা তৈরি করতে পারব না।
Bonik Barta
17.06.2013

সিটি নির্বাচনের ফলাফল এবং জাতীয় রাজনীতি


এটা এখন একটা 'ওয়ান মিলিয়ন ডলার' এর প্রশ্ন- সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে এ ধরনের একটি নির্বাচনে যখন সরকারি দলের সমর্থকরা হেরে যান, তখন হাজারটা প্রশ্ন এসে ভিড় করে। এই নির্বাচনের ফলাফল কি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে? বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো মেনেই নির্বাচনে যাবে? আগামী দিনগুলোয় এ রকম হাজারটা প্রশ্ন রাজনীতির ময়দানে ঘুরপাক খাবে। নিঃসন্দেহে এই চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন একটি 'লিটম্যাস টেস্ট'। জনসাধারণের পালস বোঝার জন্য তা যথেষ্ট। কিন্তু 'হুট' করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। রাজনীতির ছাত্র হিসেবে আমি এই নির্বাচনের ফলাফলকে দেখেছি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রথমত, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়নি। ছোটখাটো দু-একটি ঘটনা, রাজশাহীতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, খুলনায় ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা কিংবা রাজশাহীতে ইভিএম মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বড় করে দেখার সুযোগ নেই। শতকরা ৬০ ভাগের ওপর ভোট পড়েছে। এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন এক ধরনের কৃতিত্ব নিতেই পারে। সেই সঙ্গে সরকারের ভূমিকাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল। মানুষ মনে করে নির্বাচনের মধ্য দিয়েই পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব। তৃতীয়ত, বিএনপি সেনা মোতায়েনের দাবি জানালেও শুধু র‌্যাব ও বিজিবিকে দিয়ে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনের সময় এই প্রশ্নটি তুলতেই পারে। তারা আরপিওতে সেনা মোতায়েন না করার যে বিধান রেখেছে, এটা সঠিক- এ প্রশ্নটি এখন ইসি তুলতেই পারে। চতুর্থত, এই নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়ে সরকার এটা বলতেই পারে যে একটি 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের' আওতায়ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক তথা নিরপেক্ষ সরকারের দাবির কোনো প্রয়োজন নেই- এ প্রশ্ন তখন সরকারের নীতি নির্ধারকরা তুলতেই পারেন।
আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, সরকারের নীতিনির্ধারকরা তখন হাজারটা যুক্তি দেখাবেন যে দলীয় সরকারের আওতায়ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব! এখানে যে বিষয়টি মুখ্য, তা হচ্ছে এটা স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন। এই নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের তুলনা করা যাবে না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাজ করে স্থানীয় ইস্যু। যেমন সিলেটের সাধারণ মানুষ মেয়র কামরানের পারফরম্যান্সে খুশি ছিলেন না। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে তাঁর ব্যর্থতা ছিল চরমে। উপরন্তু নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর 'দ্বিতীয় স্ত্রী'র আবিষ্কারের ঘটনা(?) নারী ভোটারদের প্রভাবিত করে থাকতে পারে। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে খুলনায়ও। দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তালুকদার আবদুল খালেক ছিলেন ব্যর্থ। উপরন্তু তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ এমনসব কাণ্ড করেছেন, যা তাঁকে বিতর্কিত করেছে। তিনি মানুষের আস্থা হারিয়েছেন। খুলনার পাইওনিয়ার মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় (ইসলাম ধর্ম শিক্ষা) তালুকদার আবদুল খালেককে হজরত উমর (রা.)-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এটা অনভিপ্রেত এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এটা ভালো চোখে নেননি। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণে (রিকশাওয়ালাকে থাপ্পড় মারার ঘটনা) অনেকে অখুশি ছিলেন। এটা সত্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দলীয়ভাবে হয়নি। কিন্তু দেখা গেল চূড়ান্ত বিচারে দুটি বড় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাঁদের প্রার্থীর পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। মন্ত্রীরা নির্বাচনবিধি লঙ্ঘন করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছেন। অর্থমন্ত্রী জাইকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বাদ দিয়ে সিলেটে চলে গিয়েছিলেন। তিনি রিকশায় চড়ে এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করেও তাঁর 'নিরপেক্ষতা' নিশ্চিত করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে ইসির যতটুকু কঠোর হওয়া উচিত ছিল, তারা ততটুকু কঠোর হতে পারেনি। ইসির ভূমিকা তাই প্রশ্নের মধ্যে থেকেই গেল। সিলেটে রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা কিছুটা হলেও নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকাকে প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিয়েছে। যখন সিলেটের ১২৮টি কেন্দ্রের ফলাফল রাতের মধ্যেই এসে গিয়েছিল, তখন তিনি বিরোধী ১৮ দলের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করতে ইতস্তত করছিলেন। এ নিয়ে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে তাঁর তর্কও হয়। রিটার্নিং অফিসার পরদিন, অর্থাৎ রোববার দুপুরে এটা ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। পরে শনিবার রাতেই আরিফুল হক চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই একটি 'ছোট্ট' ঘটনা প্রমাণ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ ধরনের আচরণ করতে পারেন। এরই মধ্যে সংবাদপত্রে খবর বের হয়েছে যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার তার প্রশাসনকে সাজাচ্ছে। এই জুন মাসেই বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বেশ কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। এর মাঝে যোগ্যতা নেই, মেধাহীন- এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে জনপ্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের আত্মতুষ্টিতে ভুগেছেন। বলেছেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তিনি এটা ভাবতেই পারেন। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে একটি 'রাজনৈতিক প্রশ্ন' রয়েছে। আর তা হচ্ছে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের আওতায় এই নির্বাচন সম্পন্ন করা। মনে রাখতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন আর জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন এক নয়। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জাতীয় কোনো ইস্যু কাজ করেনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ইস্যু কাজ করবে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনির দুর্নীতি, সরকারের অদক্ষতা, সুশাসনের অভাব ইত্যাদি ইস্যু বড় হয়ে দেখা দেবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের 'প্লাস পয়েন্ট' তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও উচিত হবে না শেখ হাসিনাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। বিএনপি এরই মধ্যে তার অবস্থান কিছুটা হলেও পরিবর্তন করেছে। বিএনপি নেতারা এখন নিরপেক্ষ সরকারের ওপর জোর দিচ্ছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন কম। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেভাবে অংশ নিয়েছেন, সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকলে এই স্বতঃস্ফূর্ততা আর থাকবে না। অংশগ্রহণ কম হবে। তাই দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্পষ্টবাদী হিসেবে পরিচিত ওবায়দুল কাদের যখন সিটি করপোরেশনের ফলাফলের পর মন্তব্য করেন 'ওয়েক আপ কল ফর দ্য রুলিং পার্টি', তখন সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি নিয়ে ভাববেন- এটিই প্রত্যাশা করি। জনগণের বাইরে গিয়ে কেউ কখনো কোনোদিন টিকে থাকতে পারেনি। দেয়ালের লিখন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমাদের রাজনীতিবিদরা এ কাজটি করেন না, দুঃখটা এখানেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখন ভাবতে হবে ভুলটা কোথায়? একজন কামরান কিংবা একজন তালুকদার খালেক হারেননি, হেরেছে তার দল আওয়ামী লীগ। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। কামরান, খালেক কিংবা হিরন উন্নয়ন কাজ কম করেননি। তার পরও যে ভোটাররা ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাঁদের সবাইকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিল, আজ তারা মুখ ফিরিয়ে নিল কেন? যে তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটাররা ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিয়েছিল, এবার তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। তারা চেয়েছে পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তন ব্যক্তির চেয়ে দলের বেশি। মানুষের মাঝে হতাশা বাড়ছে, দুর্নীতি, কোনো কোনো মন্ত্রীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, হেফাজতের সমাবেশে রাতের বেলায় গুলি করে মানুষ মারা ইত্যাদি কোনো একটি ঘটনাও সরকারের জনপ্রিয়তাকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়নি। এখন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন থেকে সরকার যদি কিছু শেখে, সেটা হবে আমাদের জন্য স্বস্তির কারণ। এই নির্বাচন বিএনপির হাতকে যেমন শক্তিশালী করল, ঠিক তেমনি সরকারের জন্যও একটা 'ওয়েক আপ কল'। সরকার এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে যদি কিছু শেখে, সেটা আমাদের বড় ধরনের একটা স্বস্তি দেবে আর শঙ্কা ও উৎকণ্ঠার হাত থেকে আমাদের বাঁচাবে।Daily KALERKONTHO17.06.13

বাজেটে শিক্ষা খাত এবং অন্য কিছু প্রসঙ্গ

অর্থমন্ত্রী ২০১৩-১৪ সালের জন্য যে বিশাল বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে নানাজন নানা কথা বলেছেন। এই বাজেটকে ‘পরাবাস্তব’, ‘উচ্চাভিলাষী’, ‘নির্বাচনবান্ধব’, কিংবা ‘বিগ বিউটিফুল বেলুন’ ইত্যাদিতে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহাজোটের শরিকরাও যে সন্তুষ্ট তা বলা যাবে না। বাজেট যে উচ্চাভিলাষী তা স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন। বাজেটে ইতিবাচক দিকগুলোর চাইতে নেতিবাচক দিকগুলোই বেশি। বাজেটের যে আকার ধরা হয়েছে সে আকারের অর্থায়ন কীভাবে হবে এর নির্দেশ রয়েছে বটে কিন্তু যেসব সূত্র থেকে তা হবে বলে ধরা হয়েছে সেটা কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এ নিয়ে সঙ্গতই প্রশ্ন আছে। মহাজোট সরকারের এটা শেষ বাজেট। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর হচ্ছে বর্তমান সংসদের শেষ দিন। সে কারণে সরকার যে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়ন করবে, এতে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। বিশাল আকারের সরকারের বাজেট আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। ব্যয় হবে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। ঘাটতি ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এ ঘাটতি সরকার মেটাবে কীভাবে? অবশ্যই সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। বলা হয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ দাঁড়ালো সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। ফলে দেশে শিল্পায়ন হবে না। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে না। এতে একদিকে বাড়বে বেকার সমস্যা, অন্যদিকে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান কীভাবে হবে এর কোনো দিকনির্দেশনা নেই এ বাজেটে। শিক্ষিত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই শিক্ষিত শ্রেণীকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাদের কর্মহীন থাকাটা সুবার্তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা দেশ ধীরে ধীরে একটি সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সংলাপ এর সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল তার ‘মৃত্যু’ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন সংলাপের কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনি এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না। যেহেতু এটা নির্বাচনমুখী বাজেট, সেহেতু সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা জনগণকে আকৃষ্ট করবে। এর একটি হচ্ছে পদ্মা সেতু। বিশাল অঙ্ক বরাদ্দ রাখা হয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য। নিজ অর্থায়নে সরকার এই সেতুটি করতে যাচ্ছে। এটা একটা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সরকার কাজটি করতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এ খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করার ফলে সরকারকে অনেক অগ্রাধিকারভুক্ত খাতে কাটছাঁট করতে হবে। ওইসব খাত থেকে অর্থ এনে পদ্মা সেতুতে ব্যয় করতে হবে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যে সমস্যা আমাদের সংকটে নিপতিত করেছে এর প্রেক্ষাপট সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। গত ১১ জুন ২০১৩ বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জোহানেস জুট অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র বিষয়ে এক্সটার্নাল এক্সপার্ট প্যানেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি তার হাতে তুলে দেন। আমরা জানি না এই প্রতিবেদনে কি আছে। তবে বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তাতে আশঙ্কা করছি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে বাজেটে। বলা হয়েছে ফ্ল্যাট ও জমিতে এ টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে এভাবে কালো টাকা সাদা করায় অর্থনীতিতে ভালো প্রভাব পড়েনি। এতে সুবিধাভোগী কিছু মানুষ উপকৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এ থেকে সুবিধা পায়নি। কালো টাকা শিল্পে বিনিয়োগ হয়নি। নতুন কোনো শিল্প হয়নি। ফলে সৃষ্টি হয়নি কর্মসংস্থান। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শতকরা ১১ দশমিক ৩ ভাগ। টাকার হিসাবে ২৫ হাজার ১১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এখানে রয়েছে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। মোট ৪টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে এ বাজেট। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সেই হিসেবে এটা খুব বরাদ্দ নয়। এখানে রয়েছে মজার কাহিনী। বলা হয়েছে, বাজেট বরাদ্দ দিয়ে ১ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩২৫টি মাদ্রাসা ও ৬০০ কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে ২০ হাজার ৫শ’ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া দেয়া হবে। অতীতেও আমরা দেখেছি অনেক স্কুলে কম্পিউটার দেয়া হয়েছে। অথচ সারাবছর ওই কম্পিউটার হেডমাস্টার মহাশয়ের রুমে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়েছে। কেননা স্কুলগুলোতে কম্পিউটার প্রশিক্ষক নেই।
ফলে কোথাও বাক্সবন্দি, কোথাও ‘শোপিস’ হিসেবে কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে এসব দেয়ার ফল কী হলো? ছাত্ররা এ থেকে আদৌ উপকৃত হয়নি। এসব ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে যা দরকার ছিল তাহলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনবল নিয়োগ দেয়া। কিন্তু তা না করে কাল্পনিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটানোর ফল শূন্য হয়েছে। এবার ছিল ল্যাপটপ আর মাল্টিমিডিয়া। মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে এ ল্যাপটপ চালাবে কে? মাল্টিমিডিয়া কোথায় চালানো হবে? যেখানে প্রশিক্ষক নেই, জীর্ণশীর্ণ ভবন, বিদ্যুৎ নেই, সেখানে মাল্টিমিডিয়া কার কাজে আসবে? নাকি কোনো বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্যই কোটি কোটি টাকার এই বাণিজ্য? এসব ব্যক্তি চাহিদামাফিক ল্যাপটপ আর মাল্টিমিডিয়া সরবরাহ এবং নিজেদের আখের গোছানোর পথটা প্রশস্ত করবেন? সরকার কি এভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চায়? সরকারের উচিত ছিল স্কুল পর্যায়ে প্রতিটি স্কুলে একাধিক কম্পিউটার প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া। সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক সচিব আছেন। তিনি চান গ্রামগঞ্জে মানুষদের ‘ছাগল না দিয়ে ল্যাপটপ দেয়া হোক।’ শুনতে কথাটা ভালোই শোনায়। কিন্তু সচিব সাহেব তা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ‘তত্ত্ব’ দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্রদের গ্রামগঞ্জে ল্যাপটপ চালানো শেখাবে কে? সে রকম জনবল কি নিয়োগ দেয়া হয়েছে? ইতোমধ্যে এসব কিছুর নামে নানা অপচয় হয়েছে। এই অপচয়ের অর্থ বাস্তবসম্মত খাতে ব্যয় করা যেত এবং সুফলভোগী হতে পারত শিক্ষার্থীরা। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে এমন ভাবনা অসঙ্গত নয় কিন্তু এসব বাস্তবায়নে যা যা করা দরকার তা না করে সুফল লাভের আশা করা দুরাশা মাত্র।
বাজেট ব্যয় বরাদ্দের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে সুদ। এখানে ব্যয় হবে ১২ দশমিক ৫ ভাগ অর্থ। বোঝাই যাচ্ছে সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়বে। ফলে তাকে বেশি সুদ দিতে হবে। যেখানে জনপ্রশাসনে বরাদ্দ ১০ দশমিক ৬ ভাগ অর্থ সেখানে কৃষিতে মাত্র ৩ দশমিক ৬ ভাগ। এর অর্থ কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ৫ দশমিক ১ ভাগ অর্থ। এই বিপুল অর্থ ব্যয় হবে বেসরকারি খাত থেকে কেনা বিদ্যুতের পেছনে। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনবে। অথচ নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই। এটা ঠিক, বর্তমান সরকার ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিয়েছে। কিন্তু কারা এতে উপকৃত হয়েছে। কাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। অথচ এর মাশুল দিয়েছে সাধারণ মানুষ। বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। আগামীতে ‘চাপ’ কমানোর জন্য জ্বালানি তেল ও বিদ্যতের দাম বাড়ানো হবে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে। রানা প্লাজার ১ হাজার ১২৩ জন মানুষের মৃত্যুর পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের শ্রমমান নিয়ে কথা উঠেছে। সরকারের উচিত ছিল এ খাতের উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা। সরকার সেটা করেনি। অর্থমন্ত্রী এ খাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ৭ দশমিক ২ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। এটা যে সম্ভব হবে না, এটা অনেক অর্থনীতিবিদই এখন বলছেন। এমনকি মূল্যস্ফীতি ৭ ভাগের মধ্যে রাখার বিষয়টিও হবে কঠিন। বিশ্বব্যাপী এখনো অর্থনীতি এক ধরনের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিতে স্থবিরতা আছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে শ্লথগতি আছে। অথচ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাবকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই এ বাজেটে। বাজেটের বড় দুর্বলতার দিক হচ্ছে-হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ সরকারি সোনালী ব্যাংক থেকে যে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল, সেই অর্থোদ্ধারে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। নেই ডেসটিনি কর্তৃক পাচারকৃত অর্থোদ্ধারের বিষয়টিও। আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে এর নেতিবাচক প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের যা কিছু করণীয় ছিল সে পথে সরকার যায়নি।
বর্তমান সরকারের আমলে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছি আছে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিতে ঋণ বিতরণ সফল হয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ সবচেয়ে বেশি। এগুলো সরকারের প্লাস পয়েন্ট। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রয়েছে। চাল আমদানি করতে হয়নি। এটা প্রমাণ হয়েছে আমাদের কৃষকরা প্রায় ১৬ কোটি লোকের যে খাদ্য দরকার তার উৎপাদন করতে সক্ষম। চালের দাম বাড়লেও এখনো তা মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যেই আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে প্রশংসা করা যায় না। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের সমস্যা আন্তর্জাতিক আসরে আমাদের ভার্বমূর্তি নষ্ট করেছে। এর প্রয়োজন ছিল না। রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন বেশ কটি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে-এরও কোনো দরকার ছিল না। পিপিপি বাস্তবায়নে বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও এর কোনো বাস্তবায়ন নেই।
সরকার বলেছিল প্রতিটি ঘরে একজনকে কাজ দেয়া হবে। সরকার সেটাও পারেনি। বাজেটের পর পরই বাজারে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এখন অবধি বড় কোনো প্রভাব আমরা দেখিনি। বাজেটে এমন কোনো কোনো পণ্যের (রিফ্রেজেটার, মেমোরি কার্ড, সিমকার্ড, ভারতীয় বিস্কুট, ক্যামেরা) শুল্ক কমানো হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আদৌ এসব পণ্যের দাম কমবে কি না, সে ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। আবার কোনো কোনো পণ্যের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে (শিশুখাদ্য, গুঁড়ো দুুধ, মোবাইল ইত্যাদি)। তার যুক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে। নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর ফলে সংবাদপত্র শিল্পে কালোছায়া পড়বে। দেশের জনমতের বাহক হিসেবে পরিচিত সংবাদপত্রের জন্য বাড়তি শুল্ক আরোপ গোটা শিল্পের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে নানা মহল থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে শুধু সংবাদপত্র সংশ্লিষ্টরাই নন, সচেতন অনেকেই এই প্রস্তাবের পক্ষে নন। এটিই সঙ্গত এবং স্বাভাবিক। সবার প্রতিক্রিয়া আমলে নিয়ে এই প্রস্তাবটি সংশোধন করা হবে এ প্রত্যাশা সচেতন সবার।
সরকারের শেষ সময় এসে অর্থমন্ত্রী একটি রাজনৈতিক বাজেট দিলেন। এই বাজেট বিশাল অঙ্কের। বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাব সব মিলিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার বিষয়টি একটা প্রশ্নের মধ্যেই থেকে যাবে। সব মিলিয়ে এ বাজেট যেসব প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে সেসব প্রশ্নের উত্তর যা-ই আসুক না কেন, অর্থমন্ত্রী কিংবা সরকারের তরফে। আমাদের বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেট অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির বাজেট শুধুই এবং সামনে লক্ষ্য হিসেবে রয়েছে জাতীয় নির্বাচন।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক




সহযোগিতার নতুন মডেল!

চীনের নয়া রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে দু'দিনব্যাপী এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন গত ৮ জুন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে ওবামা 'সহযোগিতার নতুন মডেল' হিসেবে আখ্যায়িত করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ওবামা এটা স্পষ্ট করেছেন যে, সাইবার হ্যাকিং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পথে অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, চীনা হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে অনেক গোপন তথ্য পাচার করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। যদিও চীনা প্রতিনিধি দল এর ব্যাখ্যা দিয়েছে অন্যভাবে। তারা বলেছে, সাইবার নিরাপত্তা ইস্যুতে দ্বন্দ্ব নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে চায় চীন। উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে দু'দেশ কাছাকাছি এসেছে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে দু'দেশ অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস Hydroflurocarbon (HFC নির্গমন হ্রাসেও ঐকমত্যে পেঁৗছেছে। বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দু'দেশ HFCর পরিমাণ ৯০ গিগাটনে নামিয়ে আনবে। বলা ভালো, এয়ারকন্ডিশনারে ঐঋঈ ব্যবহৃত হয়। তা বায়ুমণ্ডলে ১৫ বছর পর্যন্ত থাকে। এক সময় রেফ্রিজারেটর ও এয়ারকন্ডিশনারেCFC গ্যাস ব্যবহৃত হতো। ১৯৯০ সালের মনট্রিল প্রটোকল অনুযায়ী CFC গ্যাস নিষিদ্ধ। এর পর থেকে CFCর পরিবর্তে HFC ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের কাছে ওবামা-শ জিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। যদিও শীর্ষ বৈঠকে কোনো বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, তবুও এই শীর্ষ বৈঠকের প্রয়োজন ছিল। কেননা, দুটি বড় অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার টানাপড়েন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি উত্তেজনা বয়ে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী একক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একমাত্র শক্তি হচ্ছে চীন। চীনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঊধর্ে্ব। বিশ্বের ৫০০টি বহুজাতিক সংস্থার মধ্যে চীনের রয়েছে ৩৭টি। বিশ্বের জ্বালানির শতকরা ১৬ ভাগ চীন ব্যবহার করে। আর জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে চীনের অবস্থান তৃতীয়। চীন যেসব দেশ থেকে জ্বালানি ক্রয় করে (ইরান), সেখানে যথেষ্ট মার্কিনি স্বার্থ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চীন বিশ্বের রূপান্তরযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। চীন গত বছর এ খাতে সাড়ে ৫ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির পর তার স্থান। ইতিমধ্যে জাতীয় উৎপাদনের দিক দিয়ে চীন জাপানকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বে যত ফটোকপি, মাইক্রোওয়েভ ও জুতা উৎপাদন হয়, তার তিন ভাগের দু'ভাগ উৎপাদন হয় চীনে। বিশ্বের মোবাইল ফোনের শতকরা ৬০ ভাগ চীন একাই উৎপাদন করে। একই সঙ্গে বিশ্বের মধ্যে ডিভিডি শতকরা ৫৫ ভাগ, ক্যামেরা ৫০ ভাগ, পারসোনাল কম্পিউটার ৩০ ভাগ, শিশুদের খেলনা ৭৫ ভাগ চীন একাই উৎপাদন করে। চীনের এই অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বড় ধরনের আঘাত হানছে। প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করছে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে চীনের যে বিনিয়োগ, তাতে উৎকণ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আফ্রিকায় চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। লাতিন আমেরিকাতে এর পরিমাণ বেড়েছে ১ বিলিয়ন থেকে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। আর এশিয়াতে বেড়েছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। সুদান ও কম্বোডিয়ায় বিনিয়োগের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে চীন। অন্যদিকে সুদানের পাশাপাশি ইরানের তেল সেক্টরে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। ২০০৯ সালে চীন ইরানের তেল ও গ্যাস সেক্টরে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। আগামী ৫ বছরে এই সেক্টরে তারা বিনিয়োগ করবে ১২০ বিলিয়ন ডলার। ইরানের তেলের অন্যতম ক্রেতা আজ চীন। আন্তর্জাতিক অবরোধ উপেক্ষা করে চীন ইরান থেকে তেল আমদানি করছে। বিষয়টি মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। অনেকেরই জানার কথা, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে ঋণ নেয়। এই ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার। এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনের উপস্থিতি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের চিন্তার অন্যতম কারণ। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাসহ সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে যে এক ধরনের 'শূন্যতার' সৃষ্টি হবে, সেই শূন্যতা চীন পূরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। চীন ইতিমধ্যে আফগানিস্তানের লোগার প্রদেশের আইনাক (অুহধশ) নামক স্থানে কপার ফিল্ড উন্নয়নে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। নেপালের মহাসড়ক নির্মাণ, সীমান্ত পোর্ট নির্মাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন জড়িত রয়েছে। মিয়ানমারে মহাসড়ক নির্মাণ, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে চীন। মিয়ানমারের সমুদ্র উপকূলে যে বিশাল গ্যাস রিজার্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে, তা এখন পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশে যাবে। আর ঐতিহাসিকভাবেই চীনের সঙ্গে সামরিক চুক্তি রয়েছে মিয়ানমারের। মিয়ানমারে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে চীন। তারা পাকিস্তানেও (গাওদার) গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। কারাকোরাম পর্বতমালায় সড়কপথও নির্মাণ করছে চীন। শ্রীলংকায় হামবানতোতায় (প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের এলাকা) গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে চীন। এই পোর্ট পুরোপুরি চালু হবে ২০২০ সালে। একই সঙ্গে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে চীন এই দ্বীপরাষ্ট্রটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও তৈরি করছে। হামবানতোতায় ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি তাদেরই তৈরি করে দেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের এই যে বিশাল বিনিয়োগ, তা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অজানা নয়। এমনকি বাংলাদেশেও বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। বাংলাদেশেও সোনাদিয়া দ্বীপের গভীরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় চীন। ভারত মহাসাগরভুক্ত বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করে চীন যে ংঃৎরহম ড়ভ ঢ়বধৎষং বা মুক্তার মালার নীতি গ্রহণ করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র নয়; ভারতের স্বার্থেও আঘাত হানছে।
ভারত মহাসাগর আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে এক ধরনের 'স্নায়ুযুদ্ধ'। এখানে কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এই বিপুল জলসীমা, তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। এ অঞ্চলজুড়ে গাওদার (বেলুচিস্তান, পাকিস্তান), হামবানতোতা (শ্রীলংকা), সিটওয়ে, কিয়াউক-পাইউই বন্দরে (মিয়ানমার) রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর রিফুয়েলিং সুবিধা ও সাবমেরিন ঘাঁটি। কোকো দ্বীপপুঞ্জও চীনা নৌবাহিনী ব্যবহার করে। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। তার জ্বালানি চাহিদার শতকরা ৮০ ভাগ এ অঞ্চলে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে শ্রীলংকা পর্যন্ত ভারত মহাসাগর। তারপর এই মহাসাগর হয়ে মালাক্কা প্রণালী (মালয়েশিয়া) অতিক্রম করে ইন্দোনেশিয়ার পাশ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর যাওয়ার যে সমুদ্রপথ, এই পথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। যুক্তরাষ্ট্রও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম নৌ-শক্তি। এ অঞ্চলে চীনা নৌ-শক্তির উপস্থিতি তার কাম্য নয়। অথচ জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তার জন্যও এই রুটটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠুক_ চীন তা কখনও চাইবে না। এমনকি মধ্য এশিয়ার গ্যাস গাওদার বন্দরের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের পূর্বাঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার এক বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রকল্পও হাতে নিয়েছে চীন। এ জন্য ভারত মহাসাগর তার নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রও চায় এই অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব থাকুক। কেননা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগর তথা গাওদার পোর্টের গুরুত্ব রয়েছে। গাওদার থেকে 'স্ট্রেইট অব হরমুজ'-এর দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল (এ পথ দিয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে)। আর ৭২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ইরান সীমান্ত। বেলুচিস্তানের মরুভূমিতে কিছুদিন আগ পর্যন্ত একটি বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করত। সুতরাং আগামী দিনে ভারত মহাসাগর অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে মার্কিন সমরনায়কদের কাছে।
তাই নয়া চীনা নেতাকে জানার প্রয়োজন ছিল মার্কিন প্রশাসনের। শি জিনপিংয়ের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক এখন স্থাপিত হলো। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে 'টিকফা' আর মালদ্বীপের সঙ্গে 'সোফা' চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়, যা চীনা নেতৃবৃন্দ খুব সহজভাবে নেবেন বলে মনে হয় না। তাই ওবামা দু'দেশের সম্পর্ককে যতই 'সহযোগিতার নতুন মডেল' বলুন না কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
Daily SAMAKAL
16.06.13

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আশাব্যঞ্জক নয়

অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা দিয়ে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো সুযোগ নেই। ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বিশাল বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ হাজার ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শতকরা ১১ দশমিক ৩ ভাগ। এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। ঋণের সুদের জন্য যে টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে সেটা সর্বোচ্চ, শতকরা ১২ দশমিক ৫ ভাগ। সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে আমরা উচ্চশিক্ষার কতটুকু মানোন্নয়ন করতে পারব? বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষার মানোন্নয়ন বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, আইটি সেক্টরের উন্নয়ন এ বরাদ্দ দিয়ে আদৌ সম্ভব নয়। কারণ এ অর্থের মধ্যে ১১ হাজার ৯৩৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। আর ১৩ হাজার ১৭৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয় হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পেছনে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বরাদ্দ, তাতে আমাদের উৎফুল্ল হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এ টাকার খুব সামান্যই ব্যয় হয় উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটা অংশ বরাদ্দ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। ২০০১-০২ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৯৩.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০২.২৪ কোটি টাকায়। ২০০১-০২ সালে জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৭৫ ভাগ বরাদ্দ ছিল শিক্ষা খাতে। ২০১০-১১ সালে এ হার বেড়ে হয়েছে ০.৮৪ ভাগ। আবার যদি শুধু শিক্ষা খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, এ বরাদ্দ মাত্র ৭.৮৫ ভাগ (২০০১-০২) থেকে ৮.২২ ভাগ (২০১০-১১)। অর্থাৎ পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার পরিমাণ খুব বেশি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে। বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। যদিও তুলনামূলক বিচারে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম। তারপরও কথা থেকে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেবে দেখতে হবে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়ানো যায় এবং সরকারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা কমানো যায়। এখানে আরও একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজনÑ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, তার খুব কম অংশই ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উন্নয়ন খাতে কিংবা গবেষণায় যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, উপাচার্য মহোদয়রা সেই টাকা শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যয় করেছেন।

প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দলীয় কোটায়, স্থানীয় কোটায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। গেল সপ্তাহে একটি জাতীয় দৈনিক ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি নিজের মেয়ে, ভাই, আপন ভায়রা, শ্যালিকার মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়েকে শিক্ষক তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটা রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এ প্রবণতা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। জাহাঙ্গীরনগর ইতিমধ্যে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে! ফলে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়ন বাজেট থেকে টাকা এনে শিক্ষক তথা কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। ২০১১-১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২২.৪০ কোটি টাকা। এর মাঝে ১৬৫.১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে শুধু শিক্ষকদের বেতন দিতে। ইউজিসি যে টাকা বরাদ্দ করে তা দিয়ে বেতন, পেনশন, সাধারণ খরচ, শিক্ষা খরচ, যানবাহন মেরামত ও মূলধনের চাহিদা মেটানো হয়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেতন পরিশোধের পর যা থাকে, তা দিয়ে অন্যকিছু করা আর সম্ভব হয় না। ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান হয় না। তাদের ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও খারাপ। তারা অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পেনশন দিতে পারে না।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একুশ শতকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি সরকারি অর্থে পরিচালিত হবে কি-না, এ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি কল্যাণকামী অর্থনীতি নয়। অর্থাৎ পশ্চিম ইউরোপের কোনো কোনো রাষ্ট্রে (যেমন জার্মানি) কিংবা নরডিকভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্র সব নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সে পর্যায়ে যেতে পারেনি। ওইসব রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা একদম ফ্রি। আমরা সেখানে পড়াশোনা করেছি কোনো রকম টিউশন ফি ছাড়াই (শুধু ছাত্র সংসদের জন্য কিছু অর্থ দিতে হয়)। স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি ফ্রি না হলেও বেকার ভাতা সেখানে রয়েছে। জার্মানি বা সুইডেনের অর্থনীতির পক্ষে সম্ভব সাধারণ নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি সে পর্যায়ে নেই। তবে যে পর্যায়ে রাষ্ট্র শিক্ষা খাতকে প্রমোট করে, তা ঠিক আছে। রাষ্ট্র শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ দেবে। তবে এখানে উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।

একুশ শতকে এসে একটা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। ছাত্র বেতন না বাড়িয়েও আয় বাড়ানো যায়। এজন্য কতগুলো বিকল্প নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখতে পারেন। প্রয়োজন পিপিপি অথবা বেসরকারি খাতকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। যেমন ব্যবসায় প্রশাসন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি বিদ্যা, ফার্মেসিতে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি পুঁজিতে ল্যাব হতে পারে, ছাত্রাবাস নির্মিত হতে পারে, ট্রেনিং প্রোগ্রাম হতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী রয়েছেন। প্রয়োজন একটি নীতি প্রণয়ন ও যোগাযোগ। একই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেকেন্ড ক্যাম্পাস কিংবা সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রাম (শুধু ব্যবসা প্রশাসন কোর্সই নয়) চালু করে তাদের আয় বাড়াতে পারে। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় এ উদ্যোগ নিতে পারে। গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ট্রেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করতে পারে। আর সেই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে দক্ষ জনশক্তি পেতে পারে বড় বড় গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। গার্মেন্টের পর আমাদের একটা সম্ভাবনার খাত হচ্ছে ওষুধ শিল্প। প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি বিভাগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগ করতে পারে। মোট কথা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় চলবে। কিন্তু এখানে বিনিয়োগে বেসরকারি খাতকে আমরা উৎসাহিত করতে পারি। বেসরকারি উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে বেশ ক’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করছে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ভালো শিক্ষকও রয়েছেন। উদ্যোক্তারা যদি সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করবেন না কেন?

আসলে এজন্য যা দরকার তা হচ্ছে সুস্পষ্ট একটি নীতিমালা। ইউজিসি এ নীতিমালাটি তৈরি করতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইউজিসিতে সেই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্ব নেই। ওখানে যারা যান, তারা যেন অনেকটা ‘চাকরি’ করতে যান! এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের একটা ভুল ‘মেসেজ’ পৌঁছে দেয়ার সম্ভাবনা আছে। তাদের আন্দোলনে যেতে প্ররোচিত করতে পারে কোনো পক্ষ। কিন্তু আমরা যদি ছাত্রছাত্রীদের গবেষণার ক্ষেত্র বাড়াতে পারি, যদি চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি, আমার ধারণা ছাত্রছাত্রীরা তা মেনে নেবে।

মূল বিষয়টি হচ্ছে, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মানের উন্নতির জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, আমাদের অর্থমন্ত্রী বললেন, বরাদ্দকৃত অর্থে ১ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩২৫ মাদ্রাসা ও ৬০০ কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ করবেন। আরও ২০ হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া তিনি সরবরাহ করবেন। স্কুলের অবকাঠামো নির্মাণে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। সেটা রাষ্ট্র অবশ্যই করবে। কিন্তু স্কুলে ল্যাপটপ? মাল্টিমিডিয়া? অর্থমন্ত্রী কি জানেন ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি শিক্ষক রয়েছে? ল্যাপটপ চালানোর জন্য ক’জন প্রশিক্ষক স্কুলগুলোতে আছেন? রাষ্ট্র কি প্রতিটি স্কুলে আইটি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে? এ বিষয়টি খুবই জরুরি। স্কুলে মাল্টিমিডিয়া না দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া দেয়া উচিত। প্রতিটি রুমে (যেখানে ক্লাস হয়) যদি ল্যাপটপসহ মাল্টিমিডিয়া স্থাপন করা যায়, আমার ধারণা, এতে শিক্ষার মানের অনেক উন্নতি হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি রয়েছে। মাল্টিমিডিয়াগুলো ব্যবহƒত হবে, কোনো অবস্থাতেই ‘শো-পিস’ হিসেবে থেকে যাবে না।

বাজেটে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য না থাকায় আমি রীতিমতো হতাশ হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে দলীয় কর্মীদের চাকরির একটা জায়গা হিসেবে। দলীয়করণ, আÍীয়করণ, স্থানীয়করণ ইত্যাদির কারণে উচ্চশিক্ষা আজ প্রশ্নের মুখে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে আমরা উচ্চশিক্ষাকে এখন প্রশ্নবিদ্ধ করেছি। শুধু তাই নয়, অজপাড়াগাঁয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে একধরনের বৈষম্যও তৈরি করেছি। রাজনৈতিক বিবেচনায় এমফিল, পিএইচডি কোর্সে ছাত্র ভর্তি করিয়ে উচ্চশিক্ষাকে আমরা হাস্যাস্পদ করে তুলেছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এক্ষেত্রে অসহায়। শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় শিক্ষা নিয়ে গর্ব করেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী কি উচ্চশিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে জ্ঞাত? আমার ধারণা, তার করার কিছু নেই। তিনি অসহায় ও অসৎ রাজনীতির কাছে জিম্মি! এ প্রবণতা চলতে থাকলে আগামীতে আমরা লাখ লাখ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তৈরি করব, হাজার হাজার পিএইচডি ডিগ্রিধারী বেরুবে, কিন্তু তাতে করে শিক্ষার মানোন্নয়ন কতটুকু হবে? অর্থমন্ত্রী আবার পার্লামেন্টে দাঁড়াবেন। বাজেটে বরাদ্দকৃত খাতগুলো সম্পর্কে বক্তব্য রাখবেন। উচ্চশিক্ষার এ বিষয়টি সম্পর্কে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু তা আমাকে আশাবাদী করে না।

Daily JUGANTOR

14.06.13

বিষয়টি উদ্বেগের


বিষয়টি উদ্বেগের এবং তা অগ্রহণযোগ্য। টিআইবি ২ জুন 'পার্লামেন্ট ওয়াচ' শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এক সুপারিশে সংসদ বর্জন রোধে আইন করার সুপারিশ করেছে। তারা মোট ২২ দফা সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশ তথা টিআইবির ভূমিকা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, টিআইবি কি এখন দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে? তাদের আদৌ কি এখতিয়ার রয়েছে রাজনীতি সম্পর্কে কথা বলার? তারা কি তাদের মূল কাজ বাদ দিয়ে অন্য 'কাজে' নিজেদের সম্পৃক্ত করছে না? মূল বিষয়টি হচ্ছে রাজনীতি। এই রাজনীতিতে বিদেশি আর্থিক সাহায্যে পরিচালিত সংস্থার 'হস্তক্ষেপ' নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে বাধ্য। আরো লক্ষ রাখার বিষয়, টিআইবি এ ধরনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার এমন একটা সময় বেছে নিল, যখন বিরোধী দল সংসদে যোগ দিয়েছে। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন বারবার বলছেন, তথাকথিত 'তৃতীয় শক্তি'কে আর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে না, ঠিক তখনই টিআইবি এ ধরনের একটি তথাকথিত গবেষণা নিয়ে এলো!
আমরা অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করছি, টিআইবি মাঝেমধ্যে এ ধরনের তথাকথিত 'গবেষণা' উপস্থাপন করে সমাজে একটি বিশেষ 'মেসেজ' পেঁৗছে দিতে চাচ্ছে। তাদের প্রতিটি গবেষণায় মারাত্মক মেথোডলজিক্যাল ত্রুটি রয়েছে। আগেও আমরা এ ব্যাপারে টিআইবিকে সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু টিআইবি এ ব্যাপারে আদৌ দৃষ্টি দিয়েছে বলে মনে হয় না। লক্ষ করলে দেখা যাবে, টিআইবি যাঁদের নিয়ে এ ধরনের সিরিয়াস গবেষণাকর্ম পরিচালনা করে, তাঁদের অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। কোনো সিরিয়াস গবেষক, অধ্যাপক, পরিসংখ্যানবিদের পরামর্শ তারা নিয়েছে, এ রকম 'তথ্য' আমাদের জানা নেই। আরো দেখা যাবে, কিছু 'পরিচিত মুখ'কে তারা সব সময়ই আমন্ত্রণ জানায়। এসব 'পরিচিত মুখ' আবার সব বিষয়ে 'বিশেষজ্ঞ'! বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি আর এখন সংসদীয় গণতন্ত্র। তাঁরা অর্থনীতি নিয়ে যেমন মন্তব্য করেন, ঠিক তেমনি মন্তব্য করেন সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়েও! তাঁরা সর্ববিশেষজ্ঞ! সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যদি তাঁরা 'এ কাজ' করেন, আমি তাকে সমর্থন জানাব। এই সমাজে আরো নানা বিষয় রয়েছে, যেখানে অনিয়ম হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। কই, টিআইবি কি এসব নিয়ে কাজ করছে? গত সপ্তাহে একটি জনপ্রিয় দৈনিক দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে অনিয়মের খবর ছেপেছে। এটা বড় ধরনের দুর্নীতি, সরকারি টাকা লুটপাটের শামিল। টিআইবি নীরব কেন? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম এখন চরম পর্যায়ে। ইউজিসি এখানে ব্যর্থ। যদি সচেতনতা সৃষ্টি টিআইবির মূল কাজ হয়ে থাকে, তাহলে টিআইবি এ ব্যাপারে কথা বলছে না কেন? তাই সংগত কারণেই যে প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে উঠবে, তা হচ্ছে টিআইবি তথাকথিত এ ধরনের গবেষণার নামে 'নিজেদের মতবাদ' জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে! তাদের উদ্দেশ্য সৎ নয়।
সংসদ বর্জন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। অতীতে আওয়ামী লীগও সংসদ বয়কট করেছে। এখন বিএনপি করছে। সংসদ বর্জন আমরা কেউ চাই না। কিন্তু এর জন্য আইন করতে হবে? সব কাজ কী আইন দিয়ে করা সম্ভব? এখানে প্রয়োজন মানসিকতা পরিবর্তনের। পরস্পরের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা যদি স্থাপন করা না যায়, তাহলে আইন করেও 'সংসদ বর্জন' বন্ধ করা যাবে না। টিআইবি এদিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করত। টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছে। এটা ঠিক আছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু একটা জিনিস আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি, তা হচ্ছে টিআইবি একজন এমপির অনুপস্থিতির 'অর্থমূল্য' নির্ধারণ করল কিভাবে? তাদের হিসাব অনুযায়ী এর 'অর্থমূল্য' নূ্যনতম তিন হাজার ৫৫৮ টাকা! তারা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, বিরোধী জোটের সংসদ বর্জনের অর্থমূল্য প্রায় চার কোটি এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা! তারা যেভাবে হিসাব কষেছে, তা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন আছে। আমি ইতিমধ্যে দু-একজন পরিসংখ্যানবিদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা সবাই টিআইবির এই 'মূল্যায়নের' সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। টিআইবি প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান গবেষণা উপস্থাপনকালে বলেছেন, 'সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বর্জনের কোনো সুযোগ নেই।' কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। ভারতের মতো দেশেও সংসদ বর্জন হয়েছে, তবে এটা সত্য, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওয়াকআউটের ব্যাপার তো হরহামেশাই ঘটে। গ্রিসের সংসদেও আমরা বামপন্থীদের সংসদ বয়কটের কথা জানি। টিআইবির প্রতিবেদনে সংসদ কার্যকর করার জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ নিয়েও প্রশ্ন আছে।
আজ টিআইবি যখন একটি রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করে ও কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করে, তখন সুশীল সমাজ কর্তৃক বহুল আলোচিত 'তৃতীয় শক্তির' উত্থানের সঙ্গে তার কোথায় যেন একটা 'মিল' রয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরবর্তী সময়ে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বাইরে একটি তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই তৃতীয় শক্তি গঠনের উদ্যোগ এখনো আছে। এই তৃতীয় শক্তির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে সুশীল সমাজ। যারা বিশ্ব রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখে, তারা জানে উন্নয়নশীল বিশ্বে সুশীল সমাজের উত্থানের পেছনে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আর এর পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র। যাঁরা 'আরব বসন্ত'-এর প্রেক্ষাপট জানেন, তাঁরা জানেন কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র ওই দেশে (মিসর, ইয়েমেন) সুশীল তথা তরুণ সমাজকে প্রমোট করেছিল। লক্ষ করলে দেখবেন, বাংলাদেশে যাঁরাই সুশীল সমাজের উত্থান নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের সবারই এনজিও আছে এবং মাঠ পর্যায়ে তাঁরা এনজিও-কর্মীদের তাঁদের স্বার্থে ব্যবহার করেন। ঢাকায় একবার তথাকথিত সুশীলদের নিয়ে একটা মহাসম্মেলনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রথম সারির কয়েকজন সম্পাদক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের মেধা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। বরং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাঁরা দেশের উন্নয়নের জন্য অনেক অবদান রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে পারেন। একজন সম্পাদক হিসেবে কিংবা একজন এনজিও কর্ণধার হিসেবে রাজনীতিককে আপনারা নির্দেশ দিতে পারেন না! টিআইবির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা সবাই সুশীল। একজন সাবেক আমলা, একজন সাবেক উপদেষ্টা, বিশিষ্ট কয়েকজন শিক্ষাবিদ, যাঁদের প্রায় সবাইকে একটি 'নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের অনুসারী' বলে ধরে নেওয়া হয়, তাঁরা সংসদীয় গণতন্ত্র কিভাবে চলবে, তার বয়ান দিতে পারেন না। তাঁদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণ তাঁদের চেনেও না। কোনো দিন নিজ এলাকায় গিয়েছেন, এটাও মনে হয় না। ঢাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে রাজনীতির দিকনির্দেশনা না দেওয়াই মঙ্গল। যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য কিছু করতে চান, তাহলে যেতে হবে গ্রামে। রাজনীতিবিদদের নিয়ে প্রশ্ন হয়তো আছে। তাঁদের সততা, মেধা, শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁরাই কোনো বিপদে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। সুশীল বাবুরা কিন্তু যান না।
টিআইবি ১০০ শতাংশ বিদেশি ফান্ডনির্ভর। 'পার্লামেন্ট ওয়াচ' প্রকল্পে তারা দাতা সংস্থার কাছ থেকে কত কোটি টাকা বাজেট পেয়েছে, অনুসন্ধানী কোনো সাংবাদিক তা খুঁজে বের করতে পারেন। রিপোর্টে তথ্য আছে। কিন্তু শুধু কিছু তথ্য দিয়ে সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বা গণভোট দিয়ে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে না। প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন। এই বিষয়টি যদি নিশ্চিত হয়, তাহলে সংসদ অধিবেশন বর্জনের প্রবণতা আর থাকবে না। এই বিষয়টি নিয়ে টিআইবি কাজ করুক। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করুক। আইন করে কখনো কোনো রাজনৈতিক বিষয়ের সমাধান করা যায় না।Daily KALERKONTHO10.06.13

জাতীয় স্বার্থ ও মহাজোট সরকারের পররাষ্ট্রনীতি

পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি দেশ জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখেই তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে। মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এরই মধ্যে সরকার চার বছর পাঁচ মাস অতিক্রম করেছে। মহাজোট সরকারের শেষ সময় এসে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে এ সরকার তাদের গৃহীত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছে। এ নিয়ে বিতর্ক আছে এবং কোনো কোনো ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক আসরে সরকার বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে না পারলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দুটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এক. অতিমাত্রায় ভারতনির্ভরতা, যা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে নতুন একটি মাত্রা এনেছে। দুই. রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ, যা কিনা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়গুলোর কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফরের সময় সে দেশের সঙ্গে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয়-সংক্রান্ত দুটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ অস্ত্র ক্রয় আমাদের যেমন একদিকে সনাতন অস্ত্র সরবরাহকারীর (চীন) কাছ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে আসবে, অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর আমাদের সামরিক তথা রাজনৈতিক নির্ভরতা বাড়াবে।
মহাজোট সরকারের সময় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছে। ট্রানজিট (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডোর) নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিতর্ক থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে তা কার্যকরও হয়েছে, যদিও ট্রানজিট ফি এখনো নির্ধারিত হয়নি। বলা হচ্ছে, ট্রানজিটের বিষয়টি বহুপাক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল, ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনো ট্রানজিট পায়নি। এ দুটো দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা ভারতের। কিন্তু এরই মধ্যে এ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে— এ তথ্য আমাদের জানা নেই। এমনকি ভারতের ‘সাত বোন’ রাজ্যগুলো কর্তৃক চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনগুলোয় পণ্য খালাস করতেই হিমশিম খাবে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ‘সাত বোন’ রাজ্যের পণ্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভারত অবকাঠামো খাতে যে ঋণ দিয়েছে, তাও বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর ঋণের মতোই এ ঋণ দিয়ে ভারতীয় পণ্য ও সেবা কিনতে আমরা বাধ্য। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যে উন্নয়ন ও সহযোগিতা-সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার গুরুত্ব অনেক বেশি। ওই চুক্তিতে যে ‘ভাষা’ ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে করে ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হয়েছে বেশি করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। গত সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে ভারতের পাল্লাটা ভারী, বাংলাদেশের প্রাপ্তি তুলনামূলক বিচারে কম। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তিস্তা চুক্তি হয়নি। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়া তা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ও ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের ব্যাপারেও কোনো সমাধান হয়নি। ভারত আমাদের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। এতে ১৩টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলো আটকে আছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। এ ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির একটি চুক্তি হলেও তাতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের প্রাপ্তিও এখানে কম। যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধ রোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিশ্লেষকের লেখনীতে এটা বেরিয়ে এসেছে যে, এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে একটি জোট গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান মার্কিন প্রভাব, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে ওঠার আলোকেই হিলারির সফরকে বিশ্লেষণ করতে হবে। হিলারির ওই সফরেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশ তার পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ‘টিফা’র বদলে এখন ‘টিআইসিএফ’ (ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম) চুক্তি করতে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন’ (এমসিসি) থেকে ভবিষ্যতে সাহায্য পাবে, এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও আমরা পাইনি। তবে হিলারি ক্লিনটনের একটি বক্তব্যে আমি আশাবাদী। তরুণদের সঙ্গে এক আড্ডায় তিনি বাংলাদেশকে একটি ঝড়ভঃ চড়বিৎ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। যেকোনো বিবেচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে কিংবা আরএমজি সেক্টরে বিশ্ব আসরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি ‘শক্তি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। হিলারি ক্লিনটন সেটাই স্বীকার করে গিয়েছিলেন। যারা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের এ অর্জনকে ধরে রাখা। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার নিশ্চিত হওয়ায়, এই সম্ভাবনা এখন আরো বাড়ল। তবে যেতে হবে অনেক দূর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে এরই মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। রানা প্লাজায় ১ হাজার ১২৭ জন পোশাককর্মীর মৃত্যু, গার্মেন্টশিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালু, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড, গার্মেন্টশিল্পে শ্রমমান বজায় রাখার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ড. ইউনূস ইস্যু। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। অতি সম্প্রতি দুটো সংবাদ ছাপা হয়েছে, যা আমাদের উদ্বেগের জন্য যথেষ্ট। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিএসপি সুবিধা বাদ দিতে ওবামা প্রশাসনের ওপর শ্রম অধিকার রক্ষায় জড়িত মার্কিন সংগঠনগুলোর চাপ বাড়ছে। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের কেউ কেউ গার্মেন্ট সেক্টরের শ্রমমান ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টের সব আইটেমে জিএসপি সুবিধা পায় না। কিছু কিছু পণ্যে জিএসপি সুবিধা পায়। এসব পণ্যের সবগুলো আবার বাংলাদেশ রফতানিও করে না। বাংলাদেশ অনেক দিন থেকেই গার্মেন্ট সেক্টরে এ জিএসপি সুবিধা চেয়ে আসছে। চলতি জুনেই এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ছিল। এখন পুরো জিএসপি সুবিধা ঝুলে গেল। দ্বিতীয় আরো একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনার বিষয়টি। এ-সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ৩১ মে। ন্যাটোর ওয়েবসাইটেও বিষয়টি আছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কূটনীতিকরা ১৫ মে ব্র্যাসেলসে ন্যাটোর সদর দফতর পরিদর্শন করেছেন এবং ন্যাটোর এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন বাংলাদেশের কোনো পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়নি এবং বাংলাদেশ এ থেকে কতটুকু উপকৃত হতে পারে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করা হয়নি। তবে ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক কনসেপ্ট সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা মোটামুটি ধারণা রাখেন। ন্যাটোর লিসবন শীর্ষ সম্মেলনে ২০১০ সালে এ ধারণাপত্র গ্রহণ করা হয়েছিল।
এ ধারণাপত্রের মূল বিষয়টি হচ্ছে ন্যাটোর সম্প্রসারিত ভূমিকা। ন্যাটোর কর্মকাণ্ড এখন আর শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা দক্ষিণ এশিয়ায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশ যদি সম্প্রসারিত এ কর্মসূচিতে নিজেকে জড়িত করে, তা যে অভ্যন্তরীণভাবে বিতর্কের মাত্রা বাড়াবে, তা বলা যায়। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকাণ্ড ভারত মহাসাগর এলাকায় সম্প্রসারিত করেছে। আগামীতে মার্কিন ষষ্ঠ ফ্লিটের বেশকয়টি জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রসীমায় মোতায়েন করা হবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, আগামী দিনগুলোয় দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়বে। সঙ্গত কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা প্রশ্নের মধ্যে থেকে যাবে। তবে এখানে একটা কথা বলা বাঞ্ছনীয়। শেখ হাসিনার প্রথম টার্মের (১৯৯৬-২০০১) পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বর্তমান টার্মের পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ করা যায়। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে প্রথম টার্মে তিনি যতটা না ‘স্পষ্ট’ ছিলেন, এবার তিনি অনেক বেশি ‘স্পষ্ট’। তবে তার প্রথম টার্মেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত হয়েছিল। প্রথম টার্মে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে ‘হানা’ (হিউম্যানিটোরিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্স নিডস অ্যাসেসমেন্ট) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ক্ষুদ্র ঋণ শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এই সময় বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছিল (১২৪ মিলিয়ন ডলার), যা পরে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। তার দ্বিতীয় টার্মেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন। আসলে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া উচিত বেশি। মহাজোট সরকারের আমলে এ স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে।
 Bonik Barta 
09.06.2013

পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কোনো সমাধান নয়

দেশের দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলের কোনো এক চরে করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৯ মে ‘দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পরমাণু শক্তির গুরুত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হতে যাচ্ছে রূপপুরে। রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি কমিশন রোসাটসের সহযোগিতায় এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার দুই চুল্লিবিশিষ্ট এ পারমাণবিক কেন্দ্রটি নির্মিত হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। এখন পর্যন্ত রূপপুরে কাজ শুরু হয়নি। তারপরও প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দিলেন। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিরোধিতা রয়েছে। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারেও পরিবেশবাদীরা বিরোধিতা করেছেন। ফুলবাড়ীর ঘটনা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ফুলবাড়ীর ঘটনা আমরা স্মরণ করতে পারি। ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা করেছিল স্থানীয় জনগণ। তারা বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছিলেন। তাদের সেই আশঙ্কার পেছনে সত্যতাও ছিল। ফুলবাড়ীর জনগণ সেদিন কয়লা তুলতে দেয়নি। আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি চালিয়েছিল ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট। গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ৬ ব্যক্তি। সেদিনের সে আন্দোলন বাংলাদেশে একটি ইতিহাস রচনা করেছিল। আজ যখন রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হতে যাচ্ছে, তাতে আশঙ্কা একটা থেকেই গেল- আর তা হচ্ছে, ফুলবাড়ীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে রূপপুরেও। যদিও রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়া এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমাদের ন্যূনতম আরও ৬ থেকে ৮ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এখানে পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা ফুলবাড়ীর চেয়ে অনেক বেশি। এখানে নিরাপত্তা ঝুঁকিটাও অনেক বেশি। রূপপুরে যেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছে, তার পাশ ঘেঁষে একটি নদী বয়ে গেছে। ঝুঁকিটা এ কারণেই। ফুকুসিমার পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর রূপপুরের ব্যাপারে আমাদের একটা শঙ্কা থাকবেই। বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা বিষয়টি যে হাল্কাভাবে নেবেন, তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। ফুকুসিমা কিংবা চেরনোবিলের চেয়ে অনেক বেশি ঘনবসতি রূপপুরে। রাশিয়ার সঙ্গে যে ৫০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে, তা দিয়ে গবেষণা করা হবে। ধারণা করছি, এই গবেষণায় নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বেশি। বলা হচ্ছে, ৫ স্তরবিশিষ্ট একটি নিরাপত্তা বলয় থাকবে এবং তৃতীয় জেনারেশনের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানো হবে। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটুকু নিশ্চিত হওয়া যাবে, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।

জাপানের ফুকুসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ বিস্ফোরণের (২০১১) রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ যখন রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুরে পারমাণবিক চুল্লি তৈরির জন্য একটি সমঝোতায় যায়, তখন সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে বিতর্ক বাড়বেই। জাপান প্রযুক্তিবিদ্যায় শীর্ষে অবস্থান করলেও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বলা হচ্ছে, মধ্য আশির দশকে (১৯৮৬) রাশিয়ার চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল ফুকুসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিস্ফোরণ। চেরনোবিলের বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়া ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। গরুর দুধ, গুঁড়া দুধ, শাক-সবজি, ফলমূল সব কিছুতেই ছড়িয়ে পড়েছিল তেজস্ক্রিয়া। প্রায় ২৬ বছর পরও চেরনোবিল ও তার আশপাশের এলাকা বিপদমুক্ত নয়। ইউরোপের বেশ কিছু দেশ থেকে কৃষিপণ্য রফতানি কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এখন বাংলাদেশও গেল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। কিন্তু এর নিরাপত্তা আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।

পরমাণু প্রকল্প খুব ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণও। দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণু শক্তির ব্যবহার খুবই কম। ভারতে মোট জ্বালানির মাত্র ২ ভাগ এবং পাকিস্তানের এক ভাগ আসে পরমাণু জ্বালানি থেকে। যদিও এ দুটো দেশ পরমাণু শক্তি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা খোদ ভারতেও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। গেল বছর পাকিস্তান চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চীন পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে দেবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ তৃতীয় দেশ, যারা পরমাণু শক্তির উৎপাদনে যাবে। সাধারণত ৬০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ৫০০ মেগাওয়াটের ওপরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যায়। ৫০০ মেগাওয়াটের ওপরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে উৎপাদন খরচ কম হয়। কিন্তু এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হয়। প্রচলিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রতি মেগাওয়াটের জন্য গড়ে খরচ হয় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে পরমাণু কেন্দ্রে এই খরচ হয়েছে দেড় থেকে ২ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে খরচ হবে দেড় মিলিয়ন বা ১৫০ কোটি টাকা। জাপানে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রতি ইউনিটে ৪ ডলার ৮০ সেন্ট। জাপানে কয়লায় খরচ হয় ৪ ডলার ৯৫ সেন্ট এবং গ্যাসে ৫ ডলার ২১ সেন্ট। দক্ষিণ কোরিয়ায় পরমাণুতে ২ ডলার ৩৪ সেন্ট, কয়লায় ২ ডলার ১৬ সেন্ট আর গ্যাসে ৫ ডলার ৬৫ সেন্ট। ফ্রান্সে পরমাণুতে ২ ডলার ৫৪ সেন্ট, কয়লায় ৩ ডলার ৩৩ সেন্ট ও গ্যাসে ৩ ডলার ৯২ সেন্ট।
বর্তমানে বিশ্বে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তার ১৩.৫ ভাগই পরমাণু শক্তি থেকে। এগুলো সবই উন্নত দেশে অবস্থিত। বিশ্বে ২৮টি পরমাণুভিত্তিক ৪২০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মাঝে ফ্রান্সে ৫৯টি। ফ্রান্সে মোট বিদ্যুতের ৭৯ শতাংশ উৎপাদিত হয় পরমাণু শক্তি থেকে। বেলজিয়ামে বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ৫৮টি। দেশটির মোট বিদ্যুতের ৫৮ ভাগই পারমাণবিক। সুইডেনে ৪৪ ভাগ, কোরিয়ায় ৪০ ভাগ, জাপানে ৫৫ ভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২০ ভাগ বিদ্যুৎ পরমাণু শক্তিনির্ভর। ফুকুসিমার পর জাপান নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে এবং বিকল্প শক্তির কথা ভাবছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে চীনে ৯ হাজার, ভারতে ৪ হাজার ১২০ ও পাকিস্তানে ৪২৫ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ২০১০ সালের মধ্যে চীন ৪০ হাজার, ভারত ২০ হাজার ও পাকিস্তান ৭ হাজার মেগাওয়াটের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। অনেকেই জানেন, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমতি নিতে হয়। বাংলাদেশ এই অনুমতি পেয়েছিল ২০০৭ সালের জুনে। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়টা হচ্ছে এর রক্ষণাবেক্ষণ। দক্ষ জনশক্তি আমাদের নেই। এর অর্থ দীর্ঘদিন রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের থেকে যাবে। দ্বিতীয় আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, জনবসতির ঘনত্ব। রূপপুরে যেখানে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সেখানে আশপাশে জনবসতি রয়েছে। এ জনবসতি অপসারণ করা হবে একটি বড় সমস্যা। এ ছাড়া বাংলাদেশে এমন কোনো বিরাট এলাকা নেই, যেখানে কেন্দ্রটি স্থাপন করা যায়।
আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। আগামী ২০২০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ১৬ হাজার ৮০৮ মেগাওয়াটে। তখন এ চাহিদা আমরা মেটাব কীভাবে? সম্ভবত পারমাণবিক বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের কয়লার একটা সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে একটা ‘রাজনীতি’ ঢুকে গেছে। কয়লা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুললে কয়লা খনির সর্বোচ্চ ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করতে পারব বটে; কিন্তু বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরিত করতে হবে। উপরন্তু ভূগর্ভস্থ বিপুল পানি অপসারণ করতে হবে। তাতে করে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে। কোনো জনপ্রিয় সরকারই এই অপ্রিয় কাজটি করতে চাইবে না। দলটি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকিতেও থাকবে।
বাংলাদেশের মতো অধিক ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের একটা ঝুঁকি থাকবেই। ঝুঁকির বিষয়টি থাকা সত্ত্বেও সরকার এ সিদ্ধান্তটি নিল। কেননা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে বিকল্প জ্বালানির কোনো উৎস নেই। গ্যাসসম্পদ সীমিত হয়ে আসার কারণে পারমাণবিক বিদ্যুৎই আমাদের ভরসা। তবে সরকারের যে কাজটি করা উচিত তা হচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তার কথাটি স্থানীয় জনগণকে বোঝানো, যাতে করে এখানে কোনো ধরনের আন্দোলনের জন্ম না হয়। উপরন্তু যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা এবং অন্যত্র জমি বরাদ্দের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে জ্বালানি সম্পদের উৎস সীমিত হয়ে আসায়, বাংলাদেশ আগামী দশকে বড় ধরনের একটি ‘জ্বালানি ফাঁদ’-এ পড়তে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি ‘সমাধান’ হলেও সমস্যা রয়ে গেছে অনেক। তাই প্রধানমন্ত্রী যখন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলেন, তখন আমাদের মাঝে নানা শঙ্কা কাজ করে। নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে বড় গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এটা সত্য। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এক্ষেত্রে কোনো সমাধান নয়। আমাদের কয়লা রয়েছে। আমরা কয়লা সম্পদ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারি। এ বিষয়টির যত দ্রুত সমাধান করা যায়, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

Daily Alokitobangladesh

09.06.13

দুই দলকেই তরুণ নেতৃত্বের দিকে তাকাতে হবে



বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। গত ১ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও কী নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা বলেননি। বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি তিন বছর কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ না করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। তার এ বক্তব্য খণ্ডন করেছেন বিএনপির মহাসচিব। শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নন, একাধিক মন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে বিষোদগার করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে যেসব অশালীন বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে উকিল নোটিশও পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রীরা হঠাৎ করে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলেন কেন? তারেক রহমান এখনও অসুস্থ। পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। সপ্তাহে তিনবার তাকে ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। একটি অনুষ্ঠানে (লন্ডনে) তিনি অংশ নিয়েছিলেন ২০ মে। সেখানে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এ বক্তব্য যখন ছাপা হয় সংবাদপত্রে, তখন দুদক অতি দ্রুত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে এবং আদালত তা মঞ্জুরও করেন। তারপর শুরু হয় নানা তৎপরতা। মন্ত্রীরা বলতে শুরু করলেন, তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে একাধিক মন্ত্রীর বক্তব্য প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হতে থাকল পত্রিকাগুলোতে। অথচ তারেক রহমান কী এমন বক্তব্য দিয়েছেন যে তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে? এ ধরনের বক্তব্য কি দেশের ভেতরে থেকে অন্য রাজনীতিকরা দিচ্ছেন না? টিভির টকশোতে যারা কথা বলছেন, তারা কি এর চেয়ে সিরিয়াস কথা বলছেন না? কই, তাদের বিরুদ্ধে তো এ ধরনের কোনো অভিযোগের কথা শুনিনি? তাহলে তারেক রহমানকে নিয়ে এ প্রশ্ন উঠল কেন?
তারেক রহমান একটি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। তার দল তাকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কাউন্সিলে নির্বাচিত করেছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লন্ডনে আছেন। কিন্তু তিনি তো রাজনীতি থেকে অবসর নেননি? তিনি দলীয় সভায় বক্তব্য রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি দলের তরুণ প্রজšে§র প্রতিনিধি। আগামী দিনের বিএনপির নেতা। দল তাকে চাইবে এবং তিনি নিজেও দলীয় কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে একাধিক মন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা শোভন নয়, কাম্যও নয়।
তারেক রহমান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় সন্তান। মা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন। পারিবারিক রাজনীতির ধারাই তাকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে। যেমন এনেছিল শেখ হাসিনাকে। আমরা ভারতে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের দৃষ্টান্ত দিই। পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবারের কথা বলি। পারিবারিক রাজনীতির ধারায় তারা রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু আমরা কি জানি, ভারতে এই পারিবারিক রাজনীতির ধারা শুধু নেহেরু-গান্ধী পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতে এ ধরনের বেশ কিছু পরিবারের জš§ হয়েছে, যারা পারিবারিক রাজনীতির ধারা অনুসরণ করে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। প্রাচীন ভারতীয় একটি শ্লোক হচ্ছেÑ ঠধংঁফবাধ কঁঃঁসনধশধস। এর ইংরেজি করা হয়েছে এভাবেÑ ‘ধষষ ঃযব টহরাবৎংব রং ধ ভধসরষু’ অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই হচ্ছে একটা পরিবার। রাজনীতির পারিবারিকীকরণের পেছনে ভারতে এই সংস্কৃতির শ্লোকটি আদর্শ হিসেবে কাজ করে। তাই ভারতে রাজনীতির পারিবারিকীকরণের বিষয়টি স্বাভাবিক একটি বিষয়। কেউ এটা নিয়ে কথাও বলে না। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত, বিদেশ থেকে ডিগ্রিধারী।
এ তরুণ প্রজšে§র কারণেই ভারত অর্থনীতিতে জাপানকেও অতিক্রম করল। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিই। একসময় ভারতে সীমিত সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চরণ সিং। তার ছেলে অজিত সিং এখন বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। দেবগৌড়াও ভারতে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার ছেলে এখন কর্নাটক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। শারদ পাওয়ার ভারতের কৃষিমন্ত্রী। তার মেয়ে সুপ্রিয়া সুলে এখন সংসদ সদস্য। মন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহর ছেলে ওমর আবদুল্লাহ এখন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী। তার জামাই শচীন পাইলট রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শচীনের বাবা রাজেশ পাইলটকে রাজীব গান্ধী রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন। বর্ষীয়ান রাজনীতিক মুলায়ম সিং যাদবের ছেলে অখিলেশ যাদব এখন এমপি এবং উত্তর প্রদেশের ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী। তামিলনাড়-তে করুনানিধি পরিবার রাজনীতিতে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ৮২ বছর বয়সেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী। ছেলে স্ট্যালিন উপ-মুখ্যমন্ত্রী। আরেক ছেলে আজহাগিরি কেন্দ্রে কোয়ালিশনের কোটায় মন্ত্রী। ভাইয়ের ছেলে দয়ানিধি মারানও কেন্দ্রের মন্ত্রী। স্ত্রী ও মেয়ে কানিমোঝি রাজনীতিতে সক্রিয় ও এমপি। পাঞ্জাবে বাদল পরিবার, বিহারে যাদব পরিবার, মধ্যপ্রদেশে পাওয়ার পরিবার, অন্ধ্রপ্রদেশে রেড্ডি পরিবার যুগের পর যুগ রাজ্য-রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এক সময়ের দক্ষিণের ছবির নায়ক রামা রাও কিংবা রামচন্দ্রনের পরিবার সেখানকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন। স্ত্রী, উপপতœী আর সন্তানরা একধরনের প্রভাব বলয় তৈরি করছেন সেখানে। অনেকটা কর্পোরেট হাউসের মতো তারা রাজ্য চালান।
আরও দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। মনিপুরের পিএ সাংমার মেয়ে অগাথা সাংমা ৩০ বছর হওয়ার আগেই কেন্দ্রে মন্ত্রী। রাজস্থানে সিন্ধিয়া রাজপরিবার আবার বিভক্ত। রাজমাতা সিন্ধিয়া করেন বিজেপি। ছেলে মাধব রাও কংগ্রেস সদস্য। বোন বসুন্ধরা রাজে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী (বিজেপি)। সাবেক মন্ত্রী (দলিত) জগজীবন রামের মেয়ে মিরা কুমারী এখন লোকসভার স্পিকার। উড়িষ্যাতে পাটনায়েক পরিবার ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করাও যায় না। তার নিজের নামেই এখন একটি দল আছে। রাজনীতির পারিবারিকীকরণ ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি অন্যতম দিক।
শুধুই কি পাক-ভারত-বাংলাদেশেই এ রাজনীতি? ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কোরাজান অ্যাকিনোর ছেলে সে দেশের প্রেসিডেন্ট এখন। ২৩ জন সিনেটরের মধ্যে ১৫ জন এসেছেন পারিবারিক ধারায়। আফ্রিকার দেশ এঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট জোসে এদোয়ার্দো দস সানতসের (১৯৭৯ সাল থেকে) কাজিন ফার্নানদো দা পিদাদে দায়াস দস সানতস সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। মেয়ে ইসাবেল সানতস এঙ্গোলার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও মন্ত্রী। আর্জেন্টিনার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নেসতার র্কিচনারের (২০০৩-২০০৭) স্ত্রী ক্রিস্টিনা র্কিচনার এখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। সেনা কর্মকর্তা জুয়ান পেরোন (১৯৪৬-৫৫, ১৯৭৩-৭৪) প্রেসিডেন্ট হয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তার স্ত্রী মারিয়া পেরোনও প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন (১৯৭৪-৭৬)। আজারবাইজান (হায়দার আলিয়েভের ছেলে ইলহাম আলিয়েভ), বতসোয়ানা (সেরেতসে খামা, স্ত্রী রুথ খামা ও ছেলে ইয়ান খামা), মিয়ানমার (অং সানের মেয়ে অং সান সু চি), কঙ্গো (ল’রা কাবিলা ও তার ছেলে জোসেফ কাবিলা), জায়ারের (সেসে সেকো মবুতুর ছেলে নজাঙ্গা মবুতু) দৃষ্টান্তও আমরা দিতে পারি।
এ তালিকা আরও বাড়ানো যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও (বুশ পরিবার) এ প্রবণতা রয়ে গেছে। সুতরাং তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। এই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও বঙ্গবন্ধুর নাতি সজীব ওয়াজেদ জয়ও রাজনীতিতে আসবেন। সেটা আজ অথবা কাল। রাজনীতিতে তাকে আসতে হবেই। তবে যত দ্রুত তিনি রাজনীতিতে আসবেন, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। জয় এরই মধ্যে রংপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত হয়েছেন। প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। তবে সক্রিয় নন। ধারণা করছি, আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে আমরা তাকে সক্রিয় হতে দেখব। অন্যদিকে তারেক রহমান অনেক আগেই সক্রিয় হয়েছেন। জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে গেছেন, যেটা একসময় তার বাবা শহীদ জিয়া করতেন। রাজনীতিতে থাকলে অভিযোগ উঠবেই। তার বিরুদ্ধেও উঠেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ২০টি, যার মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরে ২০ কোটি টাকার বেশি অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অভিযোগ, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ইত্যাদি। তার বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। এর মাঝে কতগুলোর সত্যতা রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সরকার মামলাগুলো সক্রিয় করেছে। শিগগিরই শুনানির তালিকায় মামলাগুলো দেখা যাবে। আর বিএনপির ভাষ্য হচ্ছে, ‘সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ তারেক রহমানকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্যই। সরকার এভাবে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ লন্ডনে তারেক রহমানের একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক মন্ত্রী যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাতে করে বিএনপির ভাষ্যকেই সত্য বলে ধরে নিতে পারেন অনেকে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তারেক রহমান মন্ত্রী বা এমপি ছিলেন না। তিনি ‘ক্ষমতাবান’ ছিলেন, এটা সত্য। যদি তিনি অন্যায় করে থাকেন, অবশ্যই আইন তা দেখবে। কিন্তু যেভাবে এবং যে ভাষায় তাকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখা হয়েছে, তা অশোভন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। রাজনীতিকদের মধ্যে ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। আমরা যদি অপর পক্ষকে সম্মান জানাতে না পারি, তাহলে নিজেও সম্মান পাব না। রাজনীতিকদের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য না থাকলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হবে না। গণতন্ত্রকে আমরা উচ্চতর পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারব না।
একুশ শতকে বাংলাদেশ এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এখন নতুন প্রজšে§র নেতাদের দিকে তাকাতে হবে। ভারত এরই মধ্যে নতুন প্রজšে§র নেতাদের সামনে নিয়ে এসেছে। রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বের সারিতে চলে এসেছেন। পার্টির ভেতরে নয়া তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত হয়েছে ‘রাহুল গান্ধী ব্রিগেড’। তারা সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে ‘অ্যাড্রেস’ করছেন এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাইমারি শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন এবং জনপ্রিয়তাও পাচ্ছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ একসময় যারা গরম করতেন, তাদের প্রায় সবাই সত্তর বছর বয়স অতিক্রম করেছেন, অথবা ছুঁই ছুঁই করছেন। দশম সংসদে তাদের অনেককেই দেখা যাবে না। আওয়ামী লীগকে নয়া নেতৃত্বের দিকে তাকাতে হবে। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যারা আছেন, তারা অনেকেই বয়োজ্যেষ্ঠ। নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত। আন্দোলনে মাঠে থাকেন না। আজ বিএনপির নেতৃত্বকে বিষয়টি বুঝতে হবে। নেতৃত্ব সারিতে ‘নতুন মুখ’ না আনলে বিএনপি আন্দোলনে গতি আনতে পারবে না। দলে তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতা তাই বাড়বেই।
রাজনীতিতে পারিবারিক নেতৃত্ব শুধু আমাদের দেশেই নয়, বরং পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। তাই তারেক রহমান কিংবা সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। এমন একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের তৈরি করা দরকার, যেখানে রাজনীতিকরা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতে শিখবেন। রাজনীতি দিয়েই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করবেন, ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে নয়। তারেক রহমানের বয়স এখনও কম। সবে চল্লিশ অতিক্রম করেছেন। তাকে যেতে হবে অনেক দূর। তবে এ বয়সেও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, এমন দৃষ্টান্ত দেয়া যায় ভূরি ভূরি। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন বয়সে তরুণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট কেনেডি মধ্য ত্রিশের ঘরে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। আর চল্লিশের ঘরেই প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন বারাক ওবামা। তরুণ প্রজš§ অনেক সাহসী। অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা বেশি বয়সীরা সাধারণত পারেন না। তরুণরাই আরব বসন্তকে প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন করেছিল। এই তরুণরাই যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমাজে ‘অক্যুপাই মুভমেন্টে’র জš§ দিয়েছে, যা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ থেকে দেশে।
আমি এই তরুণ প্রজšে§র প্রতি আস্থাশীল। তারেক রহমান নিশ্চয়ই ‘অতীত’ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, যা তাকে আগামী দিনে পথ চলতে সাহায্য করবে। বিএনপির লাখ লাখ কর্মী তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ তার ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ ঘটাতে পারে। তিনি অবশ্যই দেশে আসবেন। তবে বোধ করি সে সময় এখনও আসেনি।
Daily JUGANTOR
07.06.13

শাপলা ম্যাসাকার : বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই

হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতা আল্লামা শফী সম্প্রতি দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে রাতের বেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও বায়তুল মোকাররমের ফুটপাথের দোকানগুলোতে তথাকথিত হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। আল্লামা শফী সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন রেখেছেন পায়জামা, পাঞ্জাবী পরা ও ইলেকট্রিক করাত দিয়ে অল্প সময়ে শত শত গাছ কাঁটলো কারা? কারা পবিত্র কুরআন শরিফে আগুন দিয়েছে? তার এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছে দৈনিক মানব জমিন এ গত ৩০ মে। আল্লামা শফী হেফাজতে ইসলামির নেতা হলেও, তার একটা ধর্মীয় পরিচয় আছে। তিনি সবার মুরুব্বী। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করেন। এমনকি বর্তমান সরকারও তাঁকে কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান পর্যন্ত করেছেন। গত ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে সারাদেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। শাপলা চত্বরে অবস্থানকারী হাজার হাজার মানুষ ‘প্রতিবাদের অংশ’ হিসেবে রাতের বেলা অবস্থান করে ভোর বেলায় চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু অতর্কিতে কমান্ডো স্টাইলে ঘুমন্ত অবস্থায় রাতের লাইট নিভিয়ে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। তাতে প্রচুর লোক মারা যায়। ওই হত্যাকাণ্ড নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। কতজন মানুষ সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নানা মত আছে। এখানে এই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি যে বিষয়টি মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে, তা হচ্ছে বায়তুল মোকাররম এলাকায় ফুটপাথের দোকানে আগুন দেয়া ও পবিত্র কুরআন শরিফ পোড়ানো। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। কুরআন পোড়ানোর ঘটনাকে দিয়ে মূল ঘটনাকে আড়াল করা। আমরা সেদিন প্রশ্ন করেছিলাম এবং ্ পত্রিকাতেই লিখেছিলাম কারা এই কাজটি করলো? যেসব তরুণ জীবন দর্শন হিসেবে ইসলাম ধর্মকে বেছে নিয়েছে, পবিত্র কুরআন যাদের জীবন, মানস গঠনে সাহায্য করে, যারা নিজের জীবন দিয়ে হলেও কুরআন শরিফকে রক্ষা করে, তারা কী করে কুরআন পোড়ায়। আল্লামা শফী যথার্থই বলেছেন, বিশেষ ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ এই কাজটি করে দোষ চাপিয়েছে হেফাজতে ইসলামের ওপর। এ দেশের সুধী সমাজের কেউ কেউ এভাবেই শাপলা চত্বরের ওই দিনের ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও আমরা লক্ষ্য করেছি এ ক্ষেত্রে সরকারের নীরবতা। কেন সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করলো না? আমরা আরো লক্ষ্য করলাম সরকার, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ফুটপাথে যেসব দোকানী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সরকার কেন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করছে না। এটা একটা গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধ যেই করে থাকুক, তার কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। একজনের অপরাধ অন্যজনের ঘাড়ে চাপানো ঠিক নয়। পাঠক, আপনাদের অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা এম কে আনোয়ার কুরআন শরিফ পোড়ানোর ঘটনার সাথে জনৈক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার নাম উল্লেখ করেছিলেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন। কী অদ্ভুত দেশ! যারা কুরআন পোড়ালো,তাদের কাউকেই পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলো না। কথা বলায় জেলে গেলেন আনোয়ার সাহেব। পাঠক, আপনাদের আরো একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এসব ক্ষেত্রে অর্থাৎ বড় ধরনের জমায়েত মিটিং-মিছিলে পুলিশের ভিডিও টিম থাকে। তারা সবকিছু ধারণ করে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস পুলিশের কাছে এই দিনের বায়তুল মোকাররমের ঘটনার ভিডিও আছে। তাহলে পুলিশ ভিডিও দেখে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে না কেন? যারা নিয়মিত সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো ‘ভিজিট’ করেন, তারা স্পষ্ট করে দেখেছেন কিছু তরুণ করাত দিয়ে গাছ কাটছে। এদের মুখায়ন স্পষ্ট। পুলিশ কী পারে না ওই ছবি পত্রিকায় রিলিজ করে জনগণকে এদের পরিচিতি জানাতে? পুলিশ ওই ছবি প্রকাশ করে এদের নাম, ঠিকানা জনগণের কাছে আহ্বান করতে পারে। পুলিশ এ কাজটি করছে না কেন? হেফাজতের তরুণ কর্মীরা ঢাকা চেনে না। অনেকেই প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন। চিড়া, গুড় ছিল তাদের সাথে। তারা করাত নিয়ে ঢাকায় আসবে, এটা কী বিশ্বাসযোগ্য কথা? করাত বহন করার সময় বাসে কিংবা মিছিলে তা তো পুলিশের দেখার কথা। আসলে পুরো বিষয়টিতে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। অভিযোগ চাপানো হয়েছে হেফাজতের ওপর। হেফাজতের মহাসচিবকে সুস্থ শরীরে গ্রেফতার করা হলো। রিমান্ডে নেয়া হলো বারবার। আর অসুস্থ এবং অনেকটা ‘মৃত্যুর মুখ’ থেকে তাঁকে জামিন দেয়া হলো গত ৩০ মে। হেফাজতের নেতারা বারবার বলেছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক সংগঠন করেন না। ভবিষ্যতে তারা রাজনৈতিক সংগঠন করবে না। ভবিষ্যতে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও যেতে চান না। তারা ঈমান-আকিদা নিয়ে কাজ করেন। গরিব ছাত্রদের পড়ান। ধর্মশিক্ষা দেন। রাজনীতির সাথে তাদের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। তারা ঢাকায় সমাবেশ করেছে (যার অনুমতি সরকার দিয়েছে)। শুধুমাত্র রাসূলে করিম (সা.) এর অবমাননার প্রতিবাদে। তাদের ১৩ দফার মধ্যে কোথাও সরকারের পদত্যাগের কথাটি নেই। অথচ তাদেরকে আজ টার্গেট করা হলো। ওই দিনের ঘটনায় কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হযেছিল, তার একটি পরিসংখ্যান অবশ্য আগের লেখাতে দিয়েছি। আজ তাই সকল বিভ্রান্তি এড়াতে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। আজকে এ ঘটনার যদি সুষ্ঠু বিচার না হয়, তাহলে স্বার্থান্বেষী মহল উৎসাহিত হবে এবং এ ধরনের অপকর্ম করে দোষ চাপানোর সুযোগ পাবে অন্য দলের ওপর। হেফাজতের ওই দিনের সমাবেশ নিয়ে সরকারি দলের বক্তব্য তো আমরা দেখেছি। বারবার বলা হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে যে হেফাজতের ওই কর্মসূচিতে অর্থায়ন করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। খোদ হেফাজতের আমীর এর প্রতিবাদ করলেও এই ‘অভিযোগ’ এখনও অব্যাহত রয়েছে। এই দোষারোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমরা যতদিন না বের হয়ে আসতে পারবো, ততদিন আমাদের দেশে গণতন্ত্রের বিনির্মাণের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে। গণতন্ত্রের অর্থ নয় একদলীয় শাসন। গণতন্ত্র শেখায় পরমত সহিষ্ণুতা। গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা।  এই বিশ্বাস ও আস্থা না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে তাই প্রশ্ন থাকবেই। এখানে নির্বাচন হয়। সরকার পরিবর্তন হয়। কিন্তু শুধু নির্বাচনের নামই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের যে মূল স্পিরিট, বিরোধী পক্ষকে সহ্য করে নেয়ার যে মানসিকতা, আস্থায় নেয়ার যে ‘রাজনীতি’, এই সংস্কৃতি এখানে গড়ে ওঠেনি। অথচ ৪২ বছর আমরা পার করেছি। হেফাজতকে নিয়ে যে মিথ্যাচার, তা বন্ধ হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, অনেক কওমী মাদরাসা একরকম বন্ধ হয়ে গেছে। ছাত্র ও শিক্ষকরা সেখানে শিক্ষা নিতে ও শিক্ষা দিতে যেতে পারছে না পুলিশের ভয়ে। কোনো কোনো মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। একটা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বিরাজ করছে কওমী মাদরাসাগুলোতে। সরলপ্রাণ ছাত্র-ছাত্রীদের কী দোষ?  এরা তো এখন রাজনীতির শিকার হলো? এই উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাস অনেক পুরনো। ইতিহাস বলে ১৮৬৬ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ক্যালকাটা মাদরাসা’। ১৯৪৭ সালে কলকাতার মাদরাসার আরবি শাখাটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় আলিয়া মাদরাসা। এটি পরে সরকারি করা হয়। পরে বেসরকারি উদ্যোগে গঠিত হয় কওমী মাদরাসা। হাজার হাজার তরুণ, গরিব কিন্তু মেধাবী তারা এখন কওমী মাদরাসায় পড়াশুনা করেন। এখানে সরকারি অনুদান নেই। সাধারণ মানুষের সাহায্যে এবং কোনো কোনো ইসলামী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব কওমী মাদরাসা পরিচালিত হয়। এখানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অতীতে এ দেশের গুণী অনেক ব্যক্তি শৈশবে মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবুল কালামও এক সময় মাদরাসার ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশে কওমী মাদরাসায় যারা পড়ে তারা সাধারণ ঘরের সন্তান।
গরিব, পিতৃহারা,অনাথ যাদের রাষ্ট্র দেখভাল করতে পারে না, তাদের আশ্রয়স্থল হচ্ছে এই কওমী মাদরাসা। কিন্তু এদের সম্পর্কে সমাজের একটি শ্রেণীর নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। প্রচারণার কারণে এদেরকে জঙ্গি, উগ্রবাদী ইত্যাদিতে ভূষিত করা হচ্ছে। তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে এসব কওমী মাদরাসাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। এই প্রবণতা সমাজে কখনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। ৫ মের হেফাজতের সমাবেশ নিয়ে কওমী মাদরাসার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। এটি ঠিক নয়। এ জন্য আল্লামা শফী যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন, এটাই ঠিক। দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। অতীতে কোনো কোনো ঘটনায় সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আজ যদি সরকার এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করে, আমার বিশ্বাস তা সকল প্রশ্নের জবাব দেবে। এর মধ্যে দিয়েই আমরা দুষ্কৃতিকারীদের চিহ্নিত করতে পারবো। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এ ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনীতি উত্তপ্ত হচ্ছে। বিদেশী দাতাগোষ্ঠী, এমনকি সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশা, সকলদলের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একটি নির্বাচন, সেই নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এখনও দূর হয়নি। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সরকার বারবার প্রত্যাখ্যান করছে। অথচ সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন (আমাদের অর্থনীতি ২১ মে, ২০১৩)। তাতে তিনি বলেছেন, এটা সম্ভব যদি রাজনীতিবিদরা এক হতে পারেন। যদিও তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন যে ১. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে, ২. অনির্বাচিতদের নিয়ে এই সরকার করা যাবে না, ৩. বিচারপতি হক নিজে কোনো দায়িত্ব নেবেন না, ৪. পূর্ণাঙ্গ রায়ে (ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত) আরো দু’ টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কথা বলা হয়েছে, ৫. গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য রাজনীতিতে সুস্থিরতা প্রয়োজন। বলা প্রয়োজন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বাতিল ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা রাজনীতিতে বড় ধরনের সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। এখন যেহেতু তিনি বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্ভব, সেহেতু একটা উদ্যোগ সরকার নিতে পারে।
আমি আল্লামা শফীর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে চাই। বাংলাদেশকে একটি ‘জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র’ বানাতে (?) সকল ধরনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। এ দায়িত্ব আজ সবার। তাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও সেই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের মধ্যে দিয়ে সকল ধরনের বিভ্রান্তির অবসান সম্ভব।
07.06.13

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক প্রসঙ্গ

পাকিস্তান একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। গত ১১ মে’র নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মুসলিম লীগ (এন) নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করে। গত ৪ জুন তিনি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির কাছে শপথ নিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই পদটির মধ্যে তিনি যেন কেমন বেমানান! কেননা দু-দু’বার তিনি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু একবারও তিনি টার্ম পূরণ করতে পারেননি। ১৯৯০ ও ১৯৯৭ সালে দু-দু’বারই নির্বাচনে বিজয়ী হলেন। কিন্তু পাকিস্তানের অন্যতম ‘রাজনৈতিক শক্তি’ সেনবাহিনীর কাছে তিনি কখনোই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। ১৯৯৩ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসহাক খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করলেও পেছনে ছিল সেনাবাহিনী। আর ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর সেনাপ্রধানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পরিণতিতে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু এবার? তিনি কী পারবেন তার ৫ বছরের টার্ম পূরণ করতে? এ প্রশ্নের জবাব এই মুহূর্তে দেয়া কঠিন। তবে সেনাপ্রধান জেনারেল কায়ানি তার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের দু’জনের ছবি পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। তবে কায়ানিকে নিয়ে তার ভয় কম। কেননা সামনের নভেম্বরেই কায়ানির দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একজন নয়া সেনাপ্রধান পাচ্ছে পাকিস্তান এই বছরেই। তার সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সম্পর্ক কেমন হয়, সে ব্যাপারটার প্রতিও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। নওয়াজ শরিফের জন্যও এটা একটা কঠিন পরীক্ষা। কোনো আস্থাভাজন জেনারেলকে কি তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করবেন? দু’জন পূর্ণ জেনারেল ও ২১ লেফটেন্যান্ট জেনারেলের মধ্য থেকেই তাকে বেছে নিতে হবে নয়া সেনাপ্রধানকে। কায়ানির মতোই একজন পাঞ্জাবি জেনারেল যে পাক সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
তাই এসব কথা ইতোমধ্যে চাউর হয়ে গেছে যে, নয়া সেনাপ্রধান অথবা সেনাবাহিনী যা চাইবে এর বাইরে যেতে পারবেন না নয়া প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে, তা হচ্ছে পাকিস্তানপন্থি তালেবানের সঙ্গে সরকারের সংলাপ ও সংলাপের ভবিষ্যৎ, ভারতের সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী এখন যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, সেনাবাহিনীর স্বার্থ যাতে বিঘিœত না হয়, সেটা বিবেচনায় নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। এ ক্ষেত্রে সরাসরি বিবাদে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম। সিভিল প্রশাসনকে ক্ষমতায় রেখেই সেনাবাহিনী তাদের প্রভাব অব্যাহত রাখবে।
এই নির্বাচন পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি সরকার তার টার্ম শেষ হওয়ার পরই এই নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। দ্বিতীয় যে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এই নির্বাচন সম্পন্ন হলো।পাকিস্তানে ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে সংবিধানের ২০তম সংশোধনী এনে সেখানে পরবর্তী নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। সাবেক বিচারপতি মির হাজার খান খোসো ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেন। তারা সাফল্যের সঙ্গে এই সংসদ নির্বাচনে (১৪তম) পরিচালনা করলেও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে রেখে গেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে যে জঙ্গিবাদ পাকিস্তানের অস্তিত্বকে এখন প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নয়া সরকার এই জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে এখন কী পদক্ষেপ নেবে তা দেখার বিষয়। তিনটি প্রধান জঙ্গি সংগঠনের কথা বলা যায়। যাদের কর্মকাণ্ড আজ আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপক সমালোচিত। তেহরিকে তালেবান, লস্কর-ই-তৈয়্যেবা ও জইসই মোহাম্মদ।
এর মধ্যে লস্কর-ই-তৈয়্যেবা ও জইসই মোহাম্মদ পাকিস্তানের বাইরে ভারতে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পোক্ত। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে হামলার জন্য এই দুই জঙ্গি সংগঠনকে দায়ী করা হয়। এ দুটি সংগঠনের তৎপরতার কারণে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নত হয়নি। অন্যদিকে তেহরিকে তালেবান বেশিমাত্রায় আফগানিস্তানের তালেবানের দ্বারা প্রভাবিত। এরা পাকিস্তানের ভেতরেই এদের সন্ত্রাসী তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ইসলামবিরোধী রাজনীতিকদের হত্যা, জনসভায় আত্মঘাতী বোমা হামলা এদের অন্যতম কর্মকাণ্ড। নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরিফ ও ইমরান খান এদের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব করেছিলেন। এই সংলাপ আদৌ অনুষ্ঠিত হয় কি-না, সেটা বড় প্রশ্ন এখন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের অত্যন্ত ক্ষমতাধর বিচার বিভাগ, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মোহাম্মদ চৌধুরীর ভূমিকা এখন লক্ষ্য রাখার বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে তার ভূমিকা, বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির ক্ষমতা হারানো, মকদুম শাহাবুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন অযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি ঘটনায় প্রধান বিচারপতি তথা বিচার বিভাগের ভূমিকা এখন প্রশ্নের মুখে। এই বিচার বিভাগের কারণেই সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ বেশ কিছুদিন গৃহবন্দি ছিলেন। নির্বাচনে তার প্রার্থিতা অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিল। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তাই বিচার বিভাগকে Activist judges হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় নয়া সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়। পশ্চিমা পর্ষবেক্ষকরা অনেকেই মন্তব্য করেছেন, বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী অবসর নিলেও উচ্চ আদালতে যেসব সিনিয়র বিচারপতি রয়েছেন, তারা বিচারপতি চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নয়া সরকার তথা নয়া প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিসহ নানা জটিলতার মধ্যে জড়িয়ে যেতে পারেন। নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। সেই মামলা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হঠাৎ করে বিচার বিভাগ এ ধরনের কার্যক্রম শুরু করবে না।
সম্ভবত তারা অপেক্ষা করবে আরো কিছুদিনের জন্য। পর্দার অন্তরালে থেকে সেনাবাহিনী কী কলকাঠি নাড়ে, সেটাও দেখার বিষয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিচার বিভাগের একটা ‘সখ্য’ রয়েছে। তবে নওয়াজ শরিফের মূল সমস্যা হচ্ছে অর্থনীতি। পাকিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা খুবই শোচনীয়। প্রায় ১৮০ মিলিয়ন, অর্থাৎ ১৮ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৩ শতাংশ। বৈদেশিক রিজার্ভে যা আছে, তা দিয়ে মাত্র দু’মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহও কম। বাজেট ঘাটতির হার শতকরা ৮ শতাংশ। বেকার সমস্যা প্রকট। বিনিয়োগের পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। জাতিসংঘের ঐউজ (Human Development Report) অনুযায়ী ১৮৬ দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪৬-এ। বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক বিচারে পাকিস্তানে চেয়ে ভালো। বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ৫৫ শতাংশই অশিক্ষিত। পাখতুনখোয়া প্রদেশ কিংবা FATA এলাকায় শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের স্কুলে না যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। এমনকি দাঙ্গা-বিক্ষুব্ধ করাচি শহরের চার ভাগের এক ভাগ শিশু স্কুলে যায় না। তবে পাঞ্জাব প্রদেশে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। আইএমএফ’র সঙ্গে প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা আটকে আছে। নয়া সরকারের জন্য এটা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছে তা এখন মানতে বাধ্য হবে নয়া সরকার। বিনিয়োগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি। ১৫ বছর আগেও পাকিস্তান ছিল বিদ্যুতে সারপ্লাস। তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের পরিস্থিতিকে মেলানো যাবে না। বিদ্যুতের লোডশেডিং এখন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার পাকিস্তানে। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, অসমতা ইত্যাদি নানা সমস্যা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থাকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে।
এদিকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নয়া সরকারকে নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে। পাকিস্তান-ইরান গ্যাস পাইপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। পাকিস্তান তার জ্বালানি সংকট মেটাতে ইরান থেকে গ্যাস আমদানি করা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তাতে আপত্তি রয়েছে। এমনিতেই পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে অব্যাহত ড্রোন বিমান হামলা এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি করেছে। বিগত সরকার এই ড্রোন বিমান হামলা বন্ধের ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। নয়া সরকারের জন্য বিষয়টি হবে বেশ স্পর্শকাতর। কেননা এই ড্রোন হামলা পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি জনমত তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণায় ইমরান খান ড্রোন বিমান গুলি করে ফেলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের তেমন উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি পাকিস্তানের কারাগারে একজন ভারতীয় বন্দির মৃত্যুকে (যিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর এজেন্ট ছিলেন) কেন্দ  করে এই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এখন পাকিস্তানের কেন্দ ীয় সরকারের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশে উন্নয়ন ঘটলেও খোদ বেলুচিস্তানে এর ছোঁয়া লাগেনি। বরং বেলুচিদের অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনী দিয়ে তাদের জাতীয় নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে। বেলুচিস্তানে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম হয়েছে, যারা স্বাধীন বেলুচ রাষ্ট্রের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ এখন নানা প্রশ্নের মুখে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বেলুচিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বেলুচিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ইরানি প্রদেশ সিসতান বেলুচিস্তানের। অন্যদিকে বেলুচিস্তানের গাওদারে রয়েছে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। চীন এই বন্দরটি নির্মাণ করে দিয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনা নৌ-বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গাওদারের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। এমনকি সিসতান বেলুচিস্তানের সঙ্গে একত্রিত হয়ে অদূর ভবিষ্যতে একটি গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠন বিচিত্র কিছু নয়। ভারত মহাসাগরে জ্বালানি সরবরাহ লাইন নিশ্চিত রাখা কিংবা তেহরানের কেন্দ ীয় সরকারকে ‘চাপে’ রাখার কাজে এই বেলুচিস্তান আগামী দিনে বাইরের শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অনেকেরই মনে থাকার কথা, বেলুচিস্তানের গভীর মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান ঘাঁটি ছিল। ২০১২ সালে পাকিস্তানের আপত্তির মুখে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটিটি বন্ধ করে দেয়।
সুতরাং নয়া সরকার বেলুচিস্তানের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়, সে ব্যাপারে লক্ষ্য থাকবে অনেকের। পাকিস্তানে অব্যাহত জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ নেই। সরকারের আয় কমে গেছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহও কম। এখন নয়া সরকারের দায়িত্ব হবে বিদেশিদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। একটি তরুণ প্রজšে§র জন্ম হয়েছে পাকিস্তানে। মোট ভোটারের তিন ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এই তরুণ প্রজন্ম। ইমরান খান হচ্ছেন এই তারুণ্যের প্রতীক। যদিও তার বয়স ৬০। তথাপি এই তরুণদের নিয়েই এক ‘নয়া পাকিস্তানের’ গল্প শুনিয়েছেন ইমরান খান। তিনি যাদের নির্বাচনে প্রার্থী করেছিলেন, তাদের বেশিরভাগের বয়স ৩৫-এর নিচে। এই তরুণ সমাজকে নিয়ে এখন কাজ করতে হবে নয়া সরকারকে।
নির্বাচনের পর পরই একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, নওয়াজ শরিফ হয়তো এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবেন না।
 কিন্তু নির্বাচনের পর পরই ১৮ জন স্বতন্ত্র এমপি পাকিস্তান মুসলিম লীগকে (এন) সমর্থন দেয়ায় দলটি সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের দল পেয়েছিল ১২৬টি আসন। ১৮ জনের সমর্থন থাকায় এ সংখ্যা এখন ১৪৪। সংরক্ষিত (৭৭) আসন থেকে দলটি পাবে ৩৭ আসন। অর্থাৎ ৩৪২ আসনের সংসদে নওয়াজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন ১৭১টি আসন। তারপরও তিনি একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন বলে আমার ধারণা। এ ক্ষেত্রে ইমরানের দল কোয়ালিশনে যোগ না দিলেও সরকারকে সমর্থন করবে। তবে নওয়াজ শরিফ চাইবেন ইমরান খান সরকারে যোগ দিন। এ ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠবেন ইমরান খান। ইসলামপন্থি মাওলানা ফজলুর রেহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামের সমর্থনও তিনি পেয়েছেন। তালেবানের সঙ্গে সংলাপে জেইউআই-এফ তাকে সমর্থন করেছে। পাকিস্তানে ‘শান্তির’ জন্য তেহরিকে তালেবানের সঙ্গে যে কোনো ‘সমঝোতা’ পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
তারপরও কথা থেকে যায়। পাকিস্তানকে ক্রিকেটের মতোই বলা হয় ‘আনপ্রেডিকটিভ কান্ট্রি’। অর্থাৎ পাকিস্তানকে নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো মন্তব্য করা যায় না। পাকিস্তানে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনই গণতন্ত্রের বিজয়কে নিশ্চিত করতে পারবে না।
একইভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি নিয়েও একটা প্রশ্ন থেকে গেল। বাংলাদেশে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর অত্যাচারের ব্যাপারে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু বিগত পাক সরকার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয়নি। বাংলাদেশে আটকে পড়া আড়াই লাখ পাকিস্তানি নাগরিকের (যারা বিহারি হিসেবে পরিচিত) পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও ঝুলে আছে। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনার পরিমাণ ১৯৭৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ছিল ২৪৪৬ কোটি টাকা, যা বর্তমান অঙ্কে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান ওই অর্থ পরিশোধ করেনি। দু’দেশের বাণিজ্য চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পরিস্থিতি পাকিস্তানের অনুকূলে।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যতা কমিয়ে আনার ব্যাপারেও পাকিস্তানের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সপ্তম সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন নওয়াজ শরিফ ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে। তৃতীয়বারের মতো নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আমাদের প্রত্যাশা দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে তিনি উদ্যোগ নেবেন এবং বিরাজমান সমস্যার সমাধানে একটা পদক্ষেপ নেবেন। অনেক সমস্যাই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। উভয় দেশের বৃহৎ স্বার্থেই এসব কিছুর নিরসন খুব দরকার।
Daily Manobkontho
05.06.13

বাজেট ও শিক্ষা

সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় এলেই আমরা যারা শিক্ষকতায় আছি, তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ি শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ল কি বাড়ল না, তা বিশ্লেষণ করতে। এবারও হবে। শিক্ষা খাতে এবারও বাজেট বরাদ্দ বাড়বে, প্রতি বছরই বাড়ছে। শিক্ষা একটা বড় খাত। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অনেক শিক্ষক, অনেক কর্মচারী। তারপর রয়েছে শত শত কলেজ। কলেজ শিক্ষকরা আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন। কিন্তু বেতন দেয় সরকার। প্রমোশনও দেয় সরকার। আজ এতটা বছর হয়ে গেল কোনো মন্ত্রীকে বলতে শুনলাম না শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কী করা উচিত। সরকার বেতন দিচ্ছে। দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। কেউ পড়াতে পারল কি পারল না, তা দেখার কেউ নেই। এতদিন শুনতাম দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ। এখন দেখছি দলীয় বিবেচনায় হরদম পিএইচডি আর এমফিলে ভর্তি করানো হচ্ছে! অভিজ্ঞ শিক্ষক আছে কি নেই, এর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আরও অবাক কাণ্ড, যার নিজেরই পিএইচডি নেই, অধ্যাপকও নন, সদ্য পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষক পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক! যার নিজেরই পিএইচডি নেই, এমফিলও নেই, তিনি এখন পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান করছেন! এমনকি পিএইচডির কোর্সও নিচ্ছেন! জাহাঙ্গীরনগরের এই ঘটনা উপাচার্য মহোদয় জানেন। বিজ্ঞ উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগরকে 'স্বপ্নের জাহাঙ্গীরনগর' বানাতে চেয়েছিলেন। আমরা উৎফুল্ল হয়েছিলাম। কিন্তু সেনা কর্মকর্তারা যে হারে জাহাঙ্গীরনগরের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন, আর আমরা তা দিব্যি অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছি, তাতে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে অচিরেই প্রশ্ন উঠবে। দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা দেন অর্থমন্ত্রী। গেলবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি পুরোটা সময়। বয়স হয়েছে। তবে বিনীতভাবে তাকে একটা কথা বলতে চাই_ শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর অর্থ নয় শিক্ষার মানোন্নয়ন। শিক্ষক সংখ্যা বাড়িয়েও মানোন্নয়ন হবে না। যেহেতু সরকার টাকা দেয়, মানোন্নয়নের ব্যাপারটিকেও সরকারকে ভাবতে হবে। শুধু ডিগ্রি নিয়ে আমরা দেশে উচ্চ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়াতে পারব মাত্র, কিন্তু দেশকে পরিচালনা করার যে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব তা তৈরি করতে পারব না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন, সরকারি ও বেসরকারি। বেসরকারিতে সরকারের কর্তৃত্ব নেই। কোনো অর্থকড়িও সরকার দেয় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেয়। কিন্তু কেমন চলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো? সরকার যে টাকা দেয় তার খুব কম অংশই ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপাচার্য মহোদয়রা উন্নয়ন খাতে কিংবা গবেষণায় যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেই টাকা শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যয় করেছেন। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা দলীয় কোটায়, স্থানীয় কোটায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। গেল সপ্তাহে একটি জাতীয় দৈনিক ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ওপর একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি নিজের মেয়ে, ভাই, আপন ভায়রা, শ্যালিকার মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়েকে শিক্ষক তথা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটা রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। এই প্রবণতা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। জাহাঙ্গীরনগর ইতিমধ্যে একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়ন বাজেট থেকে টাকা এনে শিক্ষক তথা কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। ২০১১-১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (বিমক) কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২২.৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬৫.১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে শিক্ষকদের বেতন দিতে। বিমক যে টাকা বরাদ্দ করে তা দিয়ে বেতন, পেনশন, সাধারণ খরচ, শিক্ষা খরচ, যানবাহন মেরামত ও মূলধনের চাহিদা মোটানো হয়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেতন পরিশোধের পর যা থাকে তা দিয়ে অন্যকিছু করা আর সম্ভব হয় না। ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান হয় না। তাদের নূ্যনতম চাহিদাও মেটাতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও খারাপ। তারা অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পেনশন দিতে পারে না। ঢাকার পাশাপাশি দ্বিতীয় বরাদ্দ পাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময় বেতন খাতে ব্যয় করেছে ১০০.৫০ কোটি টাকা (বিমক বরাদ্দ ১৩৯ কোটি), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭৩.৫০ কোটি (বিমক বরাদ্দ ১১৩.৭৫ কোটি), বুয়েট ৪৭.৮০ কোটি (৭১.৯০ কোটি), জাহাঙ্গীরনগর ৫২ কোটি (৭৮.৫০ কোটি)। চলতি বছরে এই 'চাপ' আরও বাড়বে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের কারণে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগে কিংবা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে ৩৬টি) প্রতিষ্ঠা শিক্ষার মানোন্নয়নকে নির্দেশ করে না। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির যেসব খবর প্রকাশ হয়েছে, তা যদি আমরা বিবেচনায় নেই, তাহলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার। এক বিষয়ের ছাত্রকে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন বিভাগ খুলে সেসব বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে দেখভাল করার কেউ নেই। একুশ শতকে এসে একটা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। ছাত্র বেতন না বাড়িয়েও আয় বাড়ানো যায়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মঞ্জুরি কমিশনের নাম পরিবর্তন করে উচ্চশিক্ষা কমিশন করবে। সদস্য সংখ্যা হবে ৯ জন। তাতে মূল উদ্দেশ্য সফল হবে কি? তাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কতটুকু? এতে সরকারের খরচ আরও বাড়ল।
আজ যখন অর্থমন্ত্রী সরকারের সর্বশেষ বাজেট দিতে যাচ্ছেন, তখন আমি চাইব কীভাবে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায়, তার একটি দিকনির্দেশনা তাতে থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে নানা কাহিনী। এটি কার্যত একটি সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ১০ থেকে ১২ লাখ ছাত্রছাত্রী। কোর্স পড়ানোর মতো শিক্ষক আছে কি নেই, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনার্স কোর্স মায় মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। বছরের সব সময় পরীক্ষা লেগে আছে। ফলে ক্লাস হয় না। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দিতে হয়। তাদের ভরসা ওই ঢাকার 'বাকুশা' মার্কেটের নোট বই। নোট বই পড়ে, ক্লাস না করেই অনার্স ও মাস্টার্স পাস। কোনো উপাচার্যই এই উদ্যোগটি নেননি_ কীভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো যায়। সমাধান একটাই, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে (সব কর্মচারীকে আত্তীকরণ করে) ছয় বিভাগে ছয়টি একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিভাগের সব কলেজ থাকবে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। সেখানে ক্লাস হবে নিয়মিত। ছয় বিভাগে ছয়টি বড় কলেজকে সামনে রেখে এই ধারণা বাস্তবায়ন করা যায়। প্রয়োজন একটি উদ্যোগের। একটি স্বার্থান্বেষী মহল এটি চায় না। গাজীপুরের মূল প্রশাসনিক ভবনে শুধু গবেষণানির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। বিদেশে এ ধরনের 'মডেল বিশ্ববিদ্যালয়' আছে। আমরা অস্ট্রেলিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিপিপির আওতায় আনা যায় কি-না, অর্থমন্ত্রী বিষয়টি চিন্তা করে দেখতে পারেন। বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন। অনেকেরই এ সম্পর্কে ধারণা নেই। এখানে সরকারি খাতের সঙ্গে বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করতে হবে। এদেশে অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। তারা বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করেছেন। তাদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে গেছে। যদি উৎসাহিত করা যায় তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনিয়োগ করতে রাজি হবেন। এ ব্যাপারে মঞ্জুরি কমিশন একটা ধারণাপত্র উপস্থাপন করতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা যায়। কোনো শিল্পপতির নামে ছাত্রাবাস বা নতুন ভবন তৈরি করা যায়। বিদেশে তো আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেখেছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি অর্থায়ন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি অর্থায়নের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। শুধু শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষার মানোন্নয়ন নির্দেশ করে না।
Daily SAMAKAL
04.06.13