সারা বিশ্বের মানুষ যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, ঠিক তখনই ইস্তানবুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ব্রেক্সিট অর্থাৎ ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে ব্রিটেনে জাতিগত বিদ্বেষের জš§ দিয়েছে। আর ইস্তাম্বুলে হামলা বিশ্বের সর্বত্র মুসলমান বিদ্বেষকে আরো শক্তিশালী করেছে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এই হামলার জন্য সরাসরি আইএস জঙ্গিদের দায়ী করেছেন। এই হামলা চলতি বছরের মার্চ মাসে ব্রাসেলসে সন্ত্রাসী হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দিল। সিরিয়া থেকে আইএসের বিরুদ্ধে আসাদ বাহিনীর বিজয়ের খবর যখন আসছে এবং আইএস যখন তাদের দখলকৃত এলাকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, ঠিক তখনই বহির্বিশ্বে আইএস তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছে। পাঠক মনে করতে পারবেন চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডে একটি সমকামী ক্লাবে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়েছিল (যাতে মারা গিয়েছিলেন ৪১ জন মানুষ), সেখানেও আইএসের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল।
ইস্তানবুলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্রিটেনের ব্রেক্সিটের কোনো মিল নেই, এটা সত্য। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে একটা মিল আছে উভয় ঘটনাতেই মুসলিমবিরোধী জনমত শক্তিশালী হচ্ছে। ব্রিটেনে জাতিগত বিদ্বেষের ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটেনে আশ্রয় নেয়া প্রায় ৩০ লাখ অভিবাসী, যাদের প্রায় সবাই মুসলমান, তারা টার্গেট হয়েছেন। তাদের ব্রিটেন ত্যাগ করার হুমকি দিয়ে পোস্টার টানানো হয়েছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে স্থানীয়ভাবে বসবাসরত মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক দেখেছি। আর নিউইয়র্কে এসেও দেখলাম অনেক বাংলাদেশি মুসলমান যারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তাদের সবার মাঝেই এক ধরনের শঙ্কা ও আতঙ্ক। কেউ কেউ কোনো কারণ ছাড়াই হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ৯/১১ পরবর্তী পরিস্থিতি এখনো ফিরে আসেনি বটে, কিন্তু মানুষ এসব নিয়ে আলোচনা করছে। কেননা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্যতম প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব ঘটনা তার স্বার্থে ব্যবহার করছেন এবং মুসলমান বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। তবে এটা তো স্বীকার করতেই হবে সমসাময়িক ইতিহাসে ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের ঢেউ তুলেছে।
ইইউ মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আসরে এর গুরুত্ব বেড়েছে। প্রায় ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তন বেষ্টিত ইইউর জনসংখ্যা ৫০৮ মিলিয়ন। ২৮টি দেশ একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়নে আবদ্ধ হলেও নিজস্ব পার্লামেন্ট, নিজস্ব সরকার ও নিজস্ব সংবিধান তারা বজায় রেখেছে। ফলে দেখা যায় পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই ইইউর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে। ওই দেশগুলোতে আবার ইইউর মিশনও রয়েছে (যেমন বাংলাদেশ)। নিঃসন্দেহে ইইউ অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ইইউর জিডিপির পরিমাণ ১৯ দশমিক ২০৫ ট্রিলিয়ন ডলার (সাধারণ হিসেবে ১৬ দশমিক ২২০ ট্রিলিয়ন ডলার), যা বিশ্বের তৃতীয় বড় অর্থনীতি। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৮৫২ ডলার (পিপিপি, সাধারণ হিসেবে ৩১ দশমিক ৯১৮ ডলার), যা বিশ্বের ১৮তম। এই অর্থনৈতিক শক্তির বলেই ইইউ বর্তমানে অন্যতম একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেখা গেছে অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ ইস্তাম্বুলে বোমা হামলা ব্রেক্সিট ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গেএকটি ‘অবস্থান’ নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইইউর সেই ‘অবস্থান’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবস্থান’ এর বাইরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রায়ন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ইইউ সোচ্চার। এখন খুব সঙ্গতকারণেই ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ইইউ দুর্বল হয়ে যাবে। এতে করে বিশ্ব আসরে তার গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে।
প্রশ্ন হচ্ছে ব্রিটেন কি এখনই ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে? জনমতে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় হয়েছে বটে, কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি কি? ইইউর গঠনের জন্য যে লিসবন চুক্তির প্রয়োজন ছিল, তার ৫০তম ধারায় বলা আছে যে কোনো দেশ ইইউর কাঠামো থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ওই দেশের সাংবিধানিক আইন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ওই দেশের পার্লামেন্ট, জনগণ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। ব্রিটেনের জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তা অনুমোদন করবে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। তবে ব্রিটেন এখন থেকে দু’বছর সময় পাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। তবে এই গণভোটের রায়ের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড অ্যালেন গ্রিন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, এই রায়টি বাধ্যতামূলক নয়, বরং এক ধরনের উপদেশমূলক। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন সরকার এই রায় ‘উপেক্ষা’ করতে পারে। এ ব্যাপারে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে, এটা তার অভিমত। বাস্তবতা হচ্ছে এই রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। পার্লামেন্টে এই রায় অনুমোদিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের ইইউতে থাকার পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ভোটাররা তার কথা শোনেনি। ব্রেক্সিটবিরোধী ক্যাম্পেনে বিরোধী লেবার পার্টির যে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল তা তারা করেনি। অথচ লেবার পার্টির এমপিদের প্রায় ৯০ ভাগই ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। যে অভিযোগটি উঠেছিল ইইউ ছাড়লে ব্রিটিশ আরো গরিব হয়ে যাবে। এই অভিযোগটির কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি ভোটাররা। মূলত ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন এই গণভোটে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। অতি সাম্প্রতিকালে ব্যাপক হারে সিরীয়, ইরাকি ও আফগান নাগরিকদের ইউরোপে আগমন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের ভোটারদের মাঝে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের মাঝে এমন একটা শঙ্কার জš§ হয় যে, ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসন গ্রহণের ফলে ব্রিটেন তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। এদের মাঝে একটা ‘ইসলামফোবিয়াও’ কাজ করেছিল। এটা উস্কে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন এবং গণভোটে বেক্সিটের পক্ষে রায় পড়লে, তিনি তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ক্যামেরন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে, অর্থাৎ ইইউর পক্ষে জনসংযোগ করলেও মন্ত্রিসভার দুই সদস্য মাইকেল নেভি ও বরিস জনসন এর বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থাৎ তারা ছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষে। ব্রিটেনের প্রবীণদের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি ক্যামেরন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধীরা যুক্তি তুলে ধরেছিলেন একটিই ইইউ না যুক্তরাজ্য? ইইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেন ফরাজ সেøাগান তুলে ধরেছিলেন যুক্তরাজ্যের পক্ষেই। তাতে তিনি জয়ী হলেন। এই জয় তাকে যদি ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিঃসন্দেহে ফরাজ এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। মানুষ তার কথায় আস্থা রেখেছে। গেল বছর ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অভিবাসন আগমন, ব্রিটেনের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ইত্যাদি কারণে ক্যামেরন বাধ্য হয়েছিলেন গণভোট দিতে। সেই গণভোটেই শেষ পর্যন্ত তার পরাজয় ঘটল। তিনি যা চেয়েছিলেন, তাতে কোনো সমর্থন ছিল না যুক্তরাজ্যবাসীর। তিনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন। তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরে পার্টি কনভেনশনে নতুন নেতা নির্বাচিত হবে। শুধু কনজারভেটিভ পার্টি কেন বলি, বিরোধী লেবার পার্টিতেও এর বড় ধাক্কা লেগেছে। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের চেয়ারও এখন টলটলয়মান। তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন লেবার পার্টির অনেক এমপি। যদিও করবিন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। বলেছেন তিনি নেতৃত্বের প্রশ্নে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পশ্চিমা গণতন্ত্রের এটাই সৌন্দর্য যখন দলীয় নেতা তার নীতি জাতীয় পর্যায়ে অনুমোদন করতে পারেন না, তখন তিনি পদত্যাগ করেন। অতীতে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এ রকমটি হয়েছে। নেতা পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচনে হেরে গিয়ে দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ক্যামেরন সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন। সম্ভবত জেরেমি করবিনকেও যেতে হবে। ব্রিটেনের এই গণভোট আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। যুক্তরাজ্যে রয়েছে আমাদের পোশাক শিল্পের বড় বাজার। তৈরি পোশাক রফতানিতে এখন ধস নামতে পারে। কেননা পাউন্ডের মুদ্রামান হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাজ্যের আমদানিতে শ্লথগতি আসতে পারে। বাংলাদেশিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত ‘কারিশিল্প’ হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশিদের অভিবাসন প্রক্রিয়াতেও নানা প্রতিবন্ধকতা আসবে এখন। অন্যদিকে আগামী ২ বছরের মধ্যে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় নতুন করে ব্রিটেনের সঙ্গে আমাদের নানা চুক্তি করতে হবে। পাউন্ডের মান কমে যাওয়ায় ব্রিটেনের বিনিয়োগেও শ্লথগতি আসবে। একই সঙ্গে ইইউ’র সহযোগিতাও সংকুচিত হবে। বাংলাদেশ নিজেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আক্রান্ত। এনিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদের ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণার জš§ হয়েছে। বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই, এ বিতর্কেও সমাধান হয়নি। বরং গুলশানে স্প্যানিশ হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নৃশংস হামলা এবং আইএস কর্তৃক ঘটনার দায় স্বীকারের মধ্য দিয়ে এই বিতর্ক আরো উসকে দিল। অরল্যান্ডের পর ইস্তানবুলে আইএসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য অনেক চিন্তার কারণ। আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ব্রেক্সিট কিংবা ইস্তানবুলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোটাই আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
Daily Manobkontho
10.07.2016
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In his Office at UGC Bangladesh
Prof Rahman With US Congressman Joseph Crowley
here you go!!!
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
During his stay in Germany
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
At Fatih University, Turkey during his recent visit.
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In front of an Ethnic Mud House in Mexico
ব্রেক্সিট কী মেসেজ দিয়ে গেল
14:23
No comments
একসময় যে ইইউকে মানুষ দেখত অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে, সেই ইইউ এখন বিভ্রান্ত, হতাশাগ্রস্ত এবং দিকনির্দেশনাহীন। ব্রিটেনকে বাদ দিয়ে যে ইইউ, তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হবে। বিশ্ব আসরে ইইউ তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। ফলে আগামী দিনে ইইউ কীভাবে আবির্ভূত হয়, তার ভূমিকা কী হয়, অধিবাসীদের ব্যাপারে তারা কোন নীতি গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।
তারেক শামসুর রেহমান
ব্রেক্সিট (ব্রিটেন প্লাস এক্সিট) কি কোনো মেসেজ দিয়ে গেল? বলা হচ্ছে, গত ২৩ জুন ব্রিটেনে যে গণভোট হয়ে গেল, যাতে ৫২ ভাগ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে যে রায় দিয়েছে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাঙনের পথ ত্বরান্বিত করবে। এ যুক্তি একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐক্যবদ্ধ ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে তার যাত্রা করেছিল, ২০ বছর পর এসে এর প্রথম ধাক্কা লেগেছিল গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে। প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ গ্রিস একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সংকটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারেনি। বরং দেখা গেছে, একপর্যায়ে গ্রিস দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গ্রিসকে তার অস্তিত্ব ঠেকিয়ে রাখতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যে, গ্রিস ইইউ ও ইউরোপ জোন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা পুনরায় গ্রিসের মুদ্রা 'দ্রাকমা'তে ফিরে যাবে_ এমন একটি পরিকল্পনার কথাও শোনা গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি বটে, কিন্তু গ্রিসের পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, যে লক্ষ্যে ইইউ গঠিত হয়েছিল সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ইউউ। এর পরই এলো ব্রিটেনের গণভোটের প্রশ্নটি। আসলে বেশ কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতি যদি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে ইইউর ভেতরেই দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে_ ধনী রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে একটি পক্ষ এবং গরিব রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে আর একটি পক্ষ। ধনী রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্স ইইউর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বেশি প্রভাব খাটাত। অন্যদিকে গরিব দেশগুলো বিশেষ করে গ্রিস, পর্তুগাল, ইতালি ইইউর কাছ থেকে যে প্রত্যাশা করেছিল তা তারা পাচ্ছিল না। ফলে ইইউর মধ্যেই সংকট গভীরতর হচ্ছিল। এরই মধ্যে বড় বিপর্যয় ঘটল ব্রিটেনের গণভোটে। প্রধানমন্ত্রী গেল বছরের নির্বাচনের আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ব্রিটেন ইইউতে থাকবে কি থাকবে না, এ ব্যাপারে তিনি গণভোট দেবেন। তিনি দিলেন এবং তিনি হেরে গেলেন। তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটেন ইইউতে থাকুক। কিন্তু ব্রিটেনবাসী তা চাইল না।
তাহলে এখন কী হবে? অনেক সম্ভাবনার এখন জন্ম হবে এবং কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেছেন। এটাই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। ক্যামেরনের নীতি মানুষ গ্রহণ করেনি। এখন কনজারভেটিভ পার্টিতে শুধু যুক্তরাজ্যের জন্য নয়া নীতি গ্রহণ করতে হবে। নয়া নেতা নির্বাচন হবে অক্টোবরে। অর্থাৎ অক্টোবরে ব্রিটেন একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পাবে। লেবার পার্টির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। কেননা বর্তমান লেবার নেতৃত্ব ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন। ফলে লেবার নেতৃত্বকেও এর দায় বইতে হবে। ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত খোদ স্কটল্যান্ডে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ডে গণভোট হয়েছিল স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে। গণভোটে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল স্বাধীন স্কটল্যান্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে। শতকরা মাত্র ৪৫ ভাগ ভোটার ভোট দিয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষে, বাকি ৫৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল ব্রিটেনের সঙ্গে থাকার জন্য। ফলে সেবার স্কটল্যান্ড স্বাধীন হয়নি। এখন ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্কটল্যান্ড ইইউতে ব্রিটেনের জায়গাটি নিতে চায়। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টুরগিওন বলেছেন, তিনি পুনরায় স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট চান। এ গণভোট এবার স্কটল্যান্ডের ভাগ্য খুলে দিতে পারে। স্কটল্যান্ড ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে পারে এবং বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে যোগ দিতে পারে। ব্রিটেনের এ গণভোট সমগ্র ইউরোপে একটি জাতীয়তাবাদী চেতনা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণপন্থীদের হাত এতে শক্তিশালী হতে পারে। ফ্রান্স ও গ্রিস, এমনকি ইতালি হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্র যারা ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করতে পারে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা মেরিন লি পেন ও তার দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টি সেখানে গণভোটের ডাক দিয়েছে। তার দলও ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। যদিও এটা সত্য, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি নিজেরা এ গণভোটের আয়োজন করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষমতাসীনরা এ গণভোটের পক্ষে নন। এ গণভোট জার্মানির দক্ষিণপন্থীদের আরো উৎসাহিত করতে পারে। এমনিতেই জার্মানিতে বিপুলসংখ্যক সিরীয় শরণার্থীর উপস্থিতি নিয়ে জার্মান সমাজে বিভক্তি আছে। তথাকথিত শরণার্থীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি ও আইএসের জঙ্গিরা লুকিয়ে আছে_ এ অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে শরণার্থী শিবিরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এখন ব্রেক্সিটের ঘটনা জার্মানির দক্ষিণপন্থীদের আরো উৎসাহ জোগাবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীরা ভালো করেছে। এখন দক্ষিণপন্থীরা জার্মানিতে ইইউ ছাড়ার ডাক দিতে পারে। ব্রেক্সিটের ঘটনা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বকে বাধ্য করবে বড় সংস্কার আনতে। অনেক রাষ্ট্র এখন (পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক ও সুইডেন) নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করার উদ্যোগ নেবে। ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অর্থনৈতিকভাবে ইইউকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবে। ব্রিটেনের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। জেপি মরগ্যানের মতো বেশকিছু বড় বড় ব্যাংক ইতোমধ্যেই ব্রিটেনে তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ঘোষণা করেছে। এতে সেখানে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। অন্যত্র চলে যাবে ব্যবসা। ক্ষতি হবে স্থানীয় অর্থনীতির। অন্যদিকে ইইউর অবাধ চলাচল ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগে পূর্ব ইউরোপ থেকে (পোল্যান্ড, চেক ইত্যাদি) যারা লন্ডনে অভিবাসী হয়েছিলেন তারা থাকবেন এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে। ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে টাকার দাম পাউন্ডের সঙ্গে বিনিময় হারে দুর্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ টাকার দাম কমে যাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। প্রচুর বাংলাদেশি উদ্যোক্তা লন্ডনে আছেন। তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে ব্রিটেনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা কমে যাবে। আর এমজি (তৈরি পোশাক) সেক্টরে রপ্তানি কমে যাবে।
ব্রেক্সিটের ঘটনা আদৌ ব্রিটেনকে বিশ্ব আসরে একটি শক্তি হিসেবে পরিণত করতে পারবে না। এটা সত্য, ব্রিটেনের ভোটাররা ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পক্ষে রায় দিল। কিন্তু তাতে তারা খুব লাভবান হবে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বরং ইইউতে থেকে ব্রিটেন বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল। এখন তাতে ছন্দপতন ঘটল। অনেক প্রশ্ন এখন থাকবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেমন হবে আগামী দিনের ব্রিটেন? ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে থাকবে, তাও একটা প্রশ্ন। এখন ব্রিটেনকে ইইউভুক্ত প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তি করতে হবে। যেসব ইইউ নাগরিক ব্রিটেনে কাজ করেন তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এমনকি ব্রিটেনের যেসব নাগরিক ইইউভুক্ত দেশে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন কিংবা ইইউর সদর দপ্তরে নিয়োজিত, তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। সব মিলিয়ে ব্রেক্সিটের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ধরনের ঘটনা। ব্রিটেনের কেউ কেউ ২৩ জুনকে বলছেন 'স্বাধীনতার দিন'। কিন্তু আগামী দিনগুলোই বলবে এ 'স্বাধীনতা' ব্রিটেনকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পারবে। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা বড় বড় অর্থনৈতিক জোটের জন্য একটি খারাপ সংবাদ। শুভসংবাদ কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদের জন্য। ইউরোপে এ কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদ বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। এ ইতিহাস অনেকে জানেন। সুতরাং ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাই শেষ কথা নয়।
একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন। খোদ যুক্তরাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া পড়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডও স্কটল্যান্ডের পথ অনুসরণ করে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে থাকতে চায়। লন্ডনের নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক খানের প্রতি হাজার হাজার মানুষ আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে। শুধু তাই নয়, ১০ লাখ আবেদন জমা পড়েছে পুনরায় যুক্তরাজ্যে আরেকটি গণভোট আয়োজন করার। এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে যুক্তরাজ্যের সর্বত্র। এর ঢেউ এসে পড়েছে এখানে, এই যুক্তরাষ্ট্রে। প্রচ- মুসলমান ও অভিবাসনবিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি এই গণভোটের ফলাফলে। তিনি ব্রিটেনবাসীকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন ইতোমধ্যে। মুসলমানমুক্ত, অভিবাসনমুক্ত এবং সর্বোপরি ইইউমুক্ত ব্রিটেনকে তিনি দেখতে চান। এরই মধ্যে ইইউর দুই বড় শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্স মাঠে নেমেছে। জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের উদ্যোগে গত সোমবার বার্লিনে ইইউর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয়েছে। তিনি ব্রিটেনকে ধীরে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এ ধীরে চলার অর্থ কী? গণভোটের রায় তো প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন অস্বীকার করতে পারবেন না। এ নিয়ে তার দলের একটা অংশ ব্রেক্সিটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কয়েকজন মন্ত্রী ও লন্ডনের সাবেক মেয়র জনসন ছিলেন এই শিবিরে। তারা চাচ্ছেন খুব দ্রুতই গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর হোক। স্পষ্টতই বিষয়টি হাউস অব কমন্সে আলোচিত হবে। সেখানে দীর্ঘ বিতর্ক হবে। কিন্তু গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা যাবে না কোনোমতেই। নিঃসন্দেহে এ রায় একটি মেসেজ দিয়ে গেল। এ রায় প্রমাণ করল ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী জনমত শক্তিশালী হচ্ছে। এখন অন্য দেশগুলোতেও এ জনমত প্রভাব ফেলবে।
একসময় যে ইইউকে মানুষ দেখত অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে, সেই ইইউ এখন বিভ্রান্ত, হতাশাগ্রস্ত এবং দিকনির্দেশনাহীন। ব্রিটেনকে বাদ দিয়ে যে ইইউ, তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হবে। বিশ্ব আসরে ইইউ তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। ফলে আগামী দিনে ইইউ কীভাবে আবির্ভূত হয়, তার ভূমিকা কী হয়, অধিবাসীদের ব্যাপারে তারা কোন নীতি গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র
Daily Jai Jai Din
10.07.2016
জঙ্গি তৎপরতা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
13:44
No comments
একের পর এক জঙ্গি হামলায় সাধারণ মানুষের মাঝে জঙ্গিবিরোধী একটি জনমত যখন শক্তিশালী হচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে- এই জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল ‘সহনশীল ইসলাম’ ধর্মের অনুসারী একটি দেশ হিসেবে। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনা বদলে দিল সবকিছু। গত ক’দিন আমি এখানে (নিউইয়র্ক) বেশ ক’জন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছি। ম্যানহাটনের ওয়েল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের ডাক্তারদের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশ ক’বছরের। এরা আমার চিকিৎসা করেন। আমার হৃদযন্ত্রে ‘স্টেন্ট’ এরাই লাগিয়েছিলেন। কিন্তু গত সপ্তাহে যখন ‘ফলোআপ’ চিকিৎসার জন্য গেলাম, দেখলাম এক ভিন্ন মনোভাব। এক ধরনের উষ্মা, ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা লক্ষ করলাম তাদের মনোভাবে। মুখে তারা বললেন না বটে, কিন্তু প্রকাশ ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন কী বলতে চাচ্ছেন তারা। আমি তাদের দোষ দিই না। বিশেষ করে হলি আর্টিজানের হত্যাযজ্ঞের পরপরই যখন শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের পাশেই জঙ্গিরা আক্রমণ করল এবং সেই সংবাদটি স্থানীয় গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেল, তখন আমি কাউকে দোষ দিতে পারি না।
দশ-পনেরো বছর আগের বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশকে কেউই মেলাতে পারবে না। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটছে। হলি আর্টিজানের ঘটনার ৬ দিন পর তিন বাংলাদেশী জঙ্গি রাকা থেকে এক ভিডিও বার্তায় আবারও হামলার হুমকি দিয়েছিল। আর সেই হুমকি তারা কার্যকর করল শোলাকিয়ায় হামলার মধ্য দিয়ে। তাই ৭ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস যে সম্পাদকীয়টি প্রকাশ করেছে, তাতে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। সম্পাদকীয়তে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে, তা আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। ‘জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে’, ‘এ ঘটনা সহনশীল রাজনীতির যে ধারা তাতে বড় ক্ষত সৃষ্টি করবে’ কিংবা ‘এটা বিষাক্ত রাজনীতিকে আরও লালন করবে’- নিউইয়র্ক টাইমসের এসব সম্পাদকীয় মন্তব্যের (‘শক অ্যান্ড ডিনায়েল ইন বাংলাদেশ’, ৭ জুলাই) সঙ্গে হয়তো অনেকে একমত হবেন না; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এ থেকে আমাদের রাজনীতিকরা কী শিক্ষা নেবেন, তাও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। রাজনীতিকদের মধ্যে অনৈক্য এখনও স্পষ্ট। খালেদা জিয়া একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। টিভি টকশোতে দেখলাম সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা এ ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এই সন্ত্রাসী ঘটনায় বাংলাদেশের অনেক ‘ক্ষতি’ হয়ে গেল। এই ক্ষতি বাংলাদেশ কীভাবে কাটিয়ে উঠবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। এক সময় বাংলাদেশ ‘সহনীয় ইসলামে’র দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের এই ‘সহনীয় ইসলাম’ চর্চার প্রশংসা করেছেন এবং একটি মডারেট ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনা বদলে দিল সবকিছু।
বাংলাদেশে জঙ্গিরা তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে- এই তথ্যটি এখন ব্যাপকভাবে পরিচিতি পাবে। এতে করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। দুঃখ লাগে তখনই যখন দেখি বাংলাদেশকে সোমালিয়া কিংবা আফগানিস্তানের কাতারে ফেলে দেয়ার একটি উদ্যোগ পশ্চিমা বিশ্বে নেয়া হয়। বাংলাদেশ কখনও সোমালিয়া কিংবা আফগানিস্তান হবে না। আফগানিস্তানে জঙ্গিদের প্রতি সেখানকার সাধারণ মানুষের প্রচ্ছন্ন একটা সমর্থন থাকলেও বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতাকে মানুষ সমর্থন করে না। এটি বাস্তব সত্য। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি বিরোধ বাড়ে, দ্বন্দ্ব বাড়ে, দলগুলো যদি পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতা উসকে দেয়ার অভিযোগ আনে, তাতে করে সুযোগ পাবে জঙ্গিরাই। জঙ্গি দমনে ন্যূনতম প্রশ্নে সব দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। হলি আর্টিজানের পর শোলাকিয়ার ঘটনা একটা মেসেজ দিয়ে গেল। এই মেসেজ যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অনুধাবন করতে না পারে, সেটা হবে আমাদের জন্য দুঃখজনক ঘটনা।
আর্থিকভাবেও বাংলাদেশের ক্ষতির আশংকা আছে। জাপান ও ইতালি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ। দুটি দেশেরই বিশাল বিনিয়োগ আছে বাংলাদেশে। অথচ এই দুই দেশের নাগরিকরাই বেশি প্রাণ হারালেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের খবর আমরা পত্রিকায় দেখেছি। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এ দেশে আসতে যেমনি সাহস পাবেন না, ঠিক তেমনি এসব দেশের অর্থে পরিচালিত সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে পারে। জাইকার কথা আমরা শুনেছি। পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হয়, তাহলে জাইকা বাংলাদেশ থেকে চলেও যেতে পারে! ঠিক তেমনি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের যেসব সাহায্যদাতা সংস্থা রয়েছে, তারাও চলে যেতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থাকবে এখন ঝুঁকির মুখে। বড় বড় ক্রেতারা এখানে আসতে সাহস পাবে না। তারা চলে যাবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়। মিয়ানমার হতে যাচ্ছে আমাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। টিপিপি চুক্তির ফলে ভিয়েতনাম এখন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক থাকল একটি অনিশ্চয়তার মুখে। সুতরাং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সরকারকে এখন বড় উদ্যোগ নিতে হবে। যে নিরাপত্তাহীনতার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশনের অভাব রয়েছে তাদের মধ্যে। প্রচুর অর্থ ব্যয় করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আমরা পাচ্ছি না। তথাকথিত সিসিটিভির ব্যবহার এখন প্রশ্নের মুখে। বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আসত। বাংলাদেশে এ রকমটি হয় না কখনও।
প্রধানমন্ত্রী জঙ্গি দমনে জনসচেতনতার কথা বলেছেন। এটা সত্য কথা, জঙ্গিবিরোধী একটা জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রতিটি সরকারি স্থাপনায়, বড় বড় বিপণিবিতানে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কড়াকড়ি ব্যবস্থা আরোপ করা প্রয়োজন। গুলশান-বারিধারা এলাকাকে পরিপূর্ণভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করে এখান থেকে সব বাণিজ্যিক স্থাপনা, বিপণিবিতান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এই এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। এ এলাকা কূটনীতিকপাড়া হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার নিরাপত্তা দিতে না পারলে অনেক রাষ্ট্র নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে দূতাবাস দিল্লি অথবা ব্যাংককে সরিয়ে নেবে!
বস্তুত হলি আর্টিজানের ঘটনার পর শোলাকিয়ার ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিল। অনেক বিদেশী এ দেশে প্রাণ দিলেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এ ঘটনা সব দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কতিপয় জঙ্গির কাছে বাংলাদেশ মাথানত করতে পারে না। জনসচেতনতা আর ঐক্যবদ্ধ সমাজই পারে এদেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে। সেই সঙ্গে যে বিষয়টি জরুরি তা হচ্ছে, জঙ্গি দমনে করণীয় নির্ধারণের প্রশ্নে সরকার একটি ‘সংলাপ’ আহ্বান করতে পারে। সব বিধিবদ্ধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি ‘সংলাপ’ শুরু করতে পারে। মনে রাখতে হবে, সংলাপ চলাকালীন যদি দলগুলোর অতীত ভূমিকা আলোচিত হয়, তা কোনো ফল বয়ে আনবে না। অতীতমুখিতা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অতীত নয়, বরং সামনের দিকে তাকাতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস যেভাবে বলছে- কারা কারা এই জঙ্গি হামলার উৎসাহদাতা, অর্থের জোগানদাতা- তা খুঁজে বের করা জরুরি। এখানে যেন কোনো ‘রাজনীতি’ কাজ না করে, অপর পক্ষকে দমন করার কোনো অভিপ্রায় যেন কাজ না করে। গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় যেন এক ধরনের শৈথিল্য আছে। তাদের মোটিভেশন দরকার। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বক্তব্যের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনায় একজনের বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। নানাজন বক্তব্য দিলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
জঙ্গি দমন প্রশ্নে কতগুলো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এক. তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আইএস সম্পৃক্ততার দাবি সরকার উড়িয়ে দিচ্ছে না।’ এর অর্থ কী? আমরা এর ব্যাখ্যা কীভাবে করব? ইনু সাহেব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি যখন পরোক্ষভাবে অনেকটা স্বীকার (?) করে নেন বাংলাদেশে আইএস থাকতে পারে, তখন কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা স্বীকার করেন না। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্ত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলে তাতে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে। জঙ্গি প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়াই শ্রেয়। এখানে অন্য কেউ উপযাচক হয়ে বক্তব্য দিলে বহির্বিশ্বে তার বক্তব্যকে ‘কোট’ করা হবে। বাংলাদেশে আইএস আছে, এ ধরনের স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে বিদেশী সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা (?) এতে বাড়তে পারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে, ঠিক তখনই ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকা ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের উল্লেখ করে বলেছে, ‘জেএমবিকে ব্যবহার করে ভারতকে টার্গেট করছে আইএস।’ বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থান ভারতের নিরাপত্তাকে বিঘিœত করতে পারে (?)- এ প্রশ্ন ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতৃবৃন্দ তুলতে পারে। দুই. ইতিমধ্যে কলকাতার আনন্দবাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, গুলশানের জঙ্গি হামলা তদন্ত করতে ভারত তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) বিশেষ একটি টিমকে বাংলাদেশে পাঠাবে। তবে এটা স্পষ্ট নয় ইতিমধ্যে ওই টিম বাংলাদেশে এসেছে কিনা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশে কোনো বিদেশী সংস্থা আসছে না। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। দু’দেশের গোয়েন্দাদের মাঝে তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। এ মুহূর্তে সেটা বড় প্রয়োজন। আমি মনে করি, ভারতীয় গোয়েন্দাদের আরও সক্রিয় হওয়া দরকার। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবির নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময় (২০১৬) দু’জন বাংলাদেশী নাগরিক হাফিজ শেখ ও সেলিম রেজা গ্রেফতার হয়েছিল জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে। ফলে এটা স্পষ্ট, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশী ও ভারতীয় জঙ্গিদের তথাকথিত ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ হয়। বাংলাদেশে হলি আর্টিজানে যারা জঙ্গি হামলা চালিয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ বর্ধমানে হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তাই জঙ্গি উৎখাতে ভারতের গোয়েন্দারা যদি তৎপর না হন, তাহলে এরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে নাশকতা করবে। তাই এনএসজি পাঠানোর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গি দমন ও জঙ্গি নির্মূলের জন্য যথেষ্ট। ভারতকে এখন পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ করতে হবে। তিন. শোলাকিয়ার ঘটনায় নিহত জঙ্গি আবির হোসেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর আগে হলি আর্টিজানে হামলায় নিহত জঙ্গিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। আবিরও নিখোঁজ ছিল বেশ কয়েক মাস। তাই প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল (এটা অন্য নামেও হতে পারে) গঠন করা জরুরি, যাদের কাজ হবে ছাত্রদের ডাটাবেজ তৈরি করে অনুপস্থিত ছাত্রদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া। ছেলেরা যাতে বিপথগামী না হয়, এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও উচিত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। চার. কলকাতার আনন্দবাজারের খবর (৮ জুলাই), বাংলাদেশে আরও জঙ্গি হামলা হতে পারে এবং জঙ্গিরা একটি বড়সড় রিজার্ভ বেস তৈরি করেছে রাজধানীর ১৫ কিলোমিটার বৃত্তের মধ্যে। বাংলাদেশের গোয়েন্দারাই বলতে পারবেন এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে। তবে আরও জঙ্গি হামলার আশংকাকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি না।
জঙ্গি তৎপরতা একটি বাস্তব সত্য। আমাদের তরুণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ বিপথগামী হয়েছে। এই বিপথগামী তরুণ সমাজকে মিডিয়া রক্ষা করতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামিক স্কলারদের ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও তাদের ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। যাদের টিভির পর্দায় নিত্য দেখা যায়, তারা বেশি মাত্রায় সরকার ঘেঁষা। তাদের বক্তব্যে ‘প্রকৃত সত্য’ ফুটে ওঠে না কখনও। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যেও তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই হলি আর্টিজান আর শোলাকিয়ার ঘটনা জাতিকে কতটুকু ঐক্যবদ্ধ করবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিকদের ওপর। এই দুই ঘটনা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জঙ্গি দমনে একসঙ্গে কাজ করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। কিছু বিভ্রান্তকারী তরুণের কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করতে পারি না।
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
Daily Jugantor
10.07.2016
কোন পথে বাংলাদেশ
13:39
1 comment
এ কোন বাংলাদেশকে আমরা দেখছি? হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা, হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু, বিদেশ প্রতিক্রিয়াÑ সব মিলিয়ে যে প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এসেছে তা হচ্ছে, এরপর কী? এত দিন বিচ্ছিন্নভাবে আমরা জঙ্গিদের হামলা দেখেছি। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে জঙ্গিরা টার্গেট করে তাদের হত্যা করেছে। বিদেশিদের টার্গেট করে হত্যা করেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরোহিতদের কিংবা খ্রিস্টীয় ধর্ম প্রচারকদের হত্যা করেছে জঙ্গিরা। এ নিয়ে ৬ থেকে ৭ মাস আমরা বিতর্ক করেছি। টিভিতে আমরা আলোচনা করেছি। এক পক্ষ বলার চেষ্টা করেছে, ওইসব হত্যাকা-ের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা জড়িত এবং বিএনপির ইন্ধন তাতে ছিল! এবং আইএস কোনোভাবেই এর সঙ্গে জড়িত নয়! বড় কোনো জঙ্গি হামলা হতে পারেÑ এটা আমরা কোনোদিনই চিন্তা করিনি। কিন্তু আমাদের হিসাব বদলে দিল। গোয়েন্দাদের সব ধরনের সতর্কতা ব্যর্থ করে দিল ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে পারে এবং ঘটলও! এত দিন আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী, টিভির কিছু পরিচিত মুখ বারবার বলার চেষ্টা করেছেন এদেশের মাদরাসাগুলো জঙ্গি তৈরি করে! কোনো কোনো মহল থেকে কওমি মাদরাসা বন্ধেরও দাবি জানানো হয়েছিল। এখন গুলশানের ঘটনায় যেসব জঙ্গির নাম ও পরিচিতি পাওয়া গেছে, তাদের একজন বাদে কেউই মাদরাসাপড়–য়া ছাত্র নয়, বরং ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ও বিদেশ থেকে পাস করে আসা ধনী পরিবারের সন্তানরা জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত এবং তারাই এ জঙ্গি অপারেশনটি পরিচালনা করেছে। এরপরও মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার বন্ধ হবে কিনা জানি না; কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনায় আমাদের চোখ খুলে দিল।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আমাদের নীতিনির্ধারকরা কতগুলো বিষয়ের দিকে এখন দৃষ্টি দিতে পারেন। এক. শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে তাকালে আমরা ভুল করব। বরং ৩৭ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবলিক) যেমনি নারী নির্যাতন সেল রয়েছে, ঠিক তেমনি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে (পাবলিক ও প্রাইভেট) নিজস্ব উদ্যোগে একটি ‘জঙ্গি পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করতে হবে। একজন সিনিয়র অধ্যাপক এর দায়িত্বে থাকবেন। এই সেলের কাজ হবে ক্যাম্পাসে অনিয়মিত ছাত্রদের তালিকা তৈরি করে তা মনিটর করা, তাদের অভিভাকদের সহায়তা নেয়া এবং প্রতি মাসে একটা রিপোর্ট পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে দেয়া। কাজটা পুলিশি কাজÑ সন্দেহ নেই তাতে। কারণ এটা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। একটি ডাটাবেজ তৈরি করাও জরুরি, যাতে ছাত্রের পূর্ণ তথ্য তাতে থাকবে। বিশেষ করে আইটি সেক্টরে পড়–য়া ছাত্রদের দিকে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। দুই. যে তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের এত আশাবাদ, সেই তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ বিভ্রান্ত হচ্ছে জঙ্গিবাদী আদর্শে। ইন্টারনেট এর একটা বড় মাধ্যম, যার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ‘ভ্রান্ত ইসলামে’ আকৃষ্ট হচ্ছে। এটা যে প্রকৃত ইসলাম নয়, এটা তারা বোঝে না। ইন্টারনেটে বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে। বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাদের ‘ব্রেইন ওয়াশ’ করা হচ্ছে। সুতরাং এক্ষেত্রে যা করা দরকার তা হচ্ছে, ইন্টারনেটে নজরদারি বাড়ানো। প্রযুক্তিবিদদের সহযোগিতা নিয়ে এটা সম্ভব। ইন্টারনেট আমাদের জন্য অপার এক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু ক্ষতিও করছে। বিভ্রান্তকারীরা তরুণ সমাজকে জঙ্গিবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে। যে তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে, সেই তরুণের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে পরজন্মের কথা! ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে জিহাদি মনোভাব। জানানো হচ্ছে, কীভাবে বোমা তৈরি করতে হয়। ঢাকায় গুলশানে হামলাকারীরা আত্মঘাতী ছিল। তারা জানত, তাদের পরিণতি কী হবে। তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল ‘বেহেশতের’ কথা। তাই সেনা কমান্ডো হামলার চূড়ান্ত মুহূর্তে তারা বলেছিল ‘বেহেশতে’ যাওয়ার কথা! তাদের এই যে মগজ ধোলাই, এটা করা হয়েছিল ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তাই ইন্টারনেটের কার্যকলাপ, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারা কারা ওইসব ‘সাইটে’ ভ্রমণ করে, তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ানোও জরুরি। তিন. যেসব তরুণ এ সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অংশ নিয়েছিল, তারা ৫ থেকে ৬ মাস আগে বাসা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। তাদের অভিভাবকরা সবাই পুলিশ স্টেশনে জিডি করেছিলেন। পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। পুলিশ সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই অভিভাবকদের দোষ দেয়া যাবে না। ২০ বছরের এক তরুণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পুলিশের ভূমিকাকে আমি তাই গুরুত্ব দিতে চাই। কিন্তু পুলিশ প্রশাসনে শৈথিল্য এসেছে। তারা দায়িত্ব পালনে শতকরা ১০০ ভাগ সফলÑ এটা বলতে পারছি না। তাই মোটিভেশন দরকার। প্রশিক্ষণ দরকার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এ ঘটনায় আরও প্রমাণিত হলো। একজন তরুণ ৬ মাস আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, তার হদিস পুলিশ পাবে নাÑ এটা দুঃখজনক। নিব্রাস ইসলাম, মীর মুবাশ্বের, রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল কিংবা মিনহাজরা ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়ার পর ৫ থেকে ৬ মাস কোথায় ছিল, কীভাবে ছিল তা জানা দরকার। আমার ধারণা, তাদের সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রশিক্ষণের জন্য। যদি তাই হয়, তাহলে এর পেছনে কোন শক্তি সক্রিয় ছিল, তা অভ্যন্তরীণ কোনো ‘শক্তি’ কিনা, তা জানা দরকার। অভ্যন্তরীণ শক্তির যোগসাজশ থাকা বিচিত্র কিছু নয়। এদের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই ‘হলি আর্টিজানে’ অপারেশন চালাতে পারত না জঙ্গিরা। তাই অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আরও একটা কথা বলা দরকার। সিরিয়ায় আইএসের উত্থানের পর থেকে ইউরোপ এবং বাংলাদেশের কিছু তরুণ সিরিয়ায় গেছে। সাধারণত এরা তুরস্ক হয়েই সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া যেতে পারে, তারা বিমানবন্দর ব্যবহার করেছে। যদি তাই হয়ে থাকে, বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য থাকার কথা। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা দরকার। কোনো ধরনের শৈথিল্য যেন এ কাজে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়। হলি আর্টিজানে হামলার পরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরও এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ছাত্রের সংবাদ ছাপা হয়েছে, যে ৩ মাস থেকে নিখোঁজ। এর অর্থ আমার কাছে পরিষ্কারÑ আরও কিছু তরুণকে ‘মগজ ধোলাই’ করে সম্ভবত সিরিয়া নিয়ে যাওয়া হয়েছে! এ ব্যাপারে গোয়েন্দা তৎপরতা আমরা আশা করছি।
চার. এ সন্ত্রাসী ঘটনায় বাংলাদেশের অনেক ‘ক্ষতি’ হয়ে গেল। এ ‘ক্ষতি’ বাংলাদেশ কীভাবে কাটিয়ে উঠবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। একসময় বাংলাদেশ ‘সহনীয় ইসলাম’ এর দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের এ ‘সহনীয় ইসলাম’ চর্চার প্রশংসা করেছেন এবং একটি মডারেট ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনা বদলে দিল সবকিছু। বাংলাদেশে জঙ্গিরা তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেÑ এ সত্যটি এখন ব্যাপকভাবে পরিচিতি পাবে। এতে করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। দুঃখ লাগে, এখনই যখন দেখি বাংলাদেশকে সোমালিয়া কিংবা আফগানিস্তানের কাতারে ফেলে দেয়ার একটি উদ্যোগ পশ্চিমা বিশ্বে নেয়া হয়! বাংলাদেশ কখনও সোমালিয়া কিংবা আফগানিস্তান হবে না। আফগানিস্তানে জঙ্গিদের প্রতি সাধারণ জনগণের প্রচ্ছন্ন একটা সমর্থন থাকলেও বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতাকে মানুষ সমর্থন করে না। এটি বাস্তব সত্য। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি বিরোধ বাড়ে, দ্বন্দ্ব বাড়ে, দলগুলো যদি পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতা উসকে দেয়ার অভিযোগ আনে, তাতে করে সুযোগ পাবে জঙ্গিরাই। জঙ্গি দমনে ন্যূনতম প্রশ্নে সব দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন। হলি আর্টিজানের ঘটনা একটা মেসেজ দিয়ে গেল। এ মেসেজ যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অনুধাবন করতে না পারে, সেটা হবে আমাদের জন্য দুঃখজনক ঘটনা।
পাঁচ. আর্থিকভাবেও বাংলাদেশের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। জাপান ও ইতালি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুইটি দেশ। দুইটি দেশেরই বিশাল বিনিয়োগ আছে বাংলাদেশে। অথচ এ দুই দেশের নাগরিকরাই বেশি প্রাণ হারালেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের খবর আমরা পত্রিকায় দেখেছি। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এদেশে আসতে যেমন সাহস পাবেন না, ঠিক তেমনি এসব দেশের অর্থে পরিচালিত সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে পারে। জাইকার কথা আমরা শুনেছি। পরিস্থিতি যদি আরও অবনতি হয়, তাহলে জাইকা বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে পারে ঠিক, তেমনি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের যেসব সাহায্যদাতা সংস্থা রয়েছে, তারাও চলে যেতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থাকবে এখন ঝুঁকির মুখে। বড় বড় ক্রেতা এখানে আসতে সাহস পাবে না। তারা চলে যাবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়। মিয়ানমার হতে যাচ্ছে আমাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। টিপিপি চুক্তির ফলে ভিয়েতনাম এখন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক থাকল একটি অনিশ্চয়তার মুখে। সুতরাং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সরকারকে এখন বড় উদ্যোগ নিতে হবে। যে নিরাপত্তাহীনতার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশনের অভাব রয়েছে তাদের মাঝে। প্রচুর অর্থ ব্যয় করার পরও কাক্সিক্ষত ফল আমরা পাচ্ছি না। তথাকথিত সিসিটিভির ব্যবহার এখন প্রশ্নের মুখে। বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আসত। বাংলাদেশে এরকমটি হয় না কখনও।
প্রধানমন্ত্রী জঙ্গি দমনে জনসচেতনতার কথা বলেছেন। এটা সত্য কথা। জঙ্গিবিরোধী একটা জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রতিটি সরকারি স্থাপনায়, বড় বড় বিপণিবিতানে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা প্রয়োজন। গুলশান-বারিধারাকে পরিপূর্ণভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করে এখান থেকে সব বাণিজ্যিক স্থাপনা, বিপণিবিতান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এ এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। এ এলাকা কূটনিতিকপাড়া হিসেবে পরিচিত। এ এলাকার নিরাপত্তা দিতে না পারলে, অনেক রাষ্ট্র নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে দূতাবাস দিল্লি অথবা ব্যাংককে সরিয়ে নেবে! তাই হলি আর্টিজানের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিল। অনেক বিদেশি প্রাণ দিলেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এ ঘটনার পর সব দল ও মতের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে। কতিপয় জঙ্গির কাছে বাংলাদেশ মাথানত করতে পারে না। জনসচেতনতা আর ঐক্যবদ্ধ সমাজই পারে এদেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে।
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
Daily Alokito Bangladesh
10.07.2016
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ও বাংলাদেশ
20:04
No comments
ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জিম্মি অভিযান শেষ হয়েছে। ২৮ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ শেষ হয়েছে বটে, কিন্তু রেখে গেছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব প্রশ্ন বারবার আলোচিত হতে থাকবে। এক. ‘হলি আর্টিজান বেকারিতে’ যে সন্ত্রাসী হামলা হল, তা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদেরই একটি অংশ। এই সন্ত্রাসী হামলা হল তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলার পর পরই। প্যারিস, ব্রাসেলস্ কিংবা ওরল্যান্ডের পর পরই ঘটল ঢাকায় এই জঙ্গি হামলা- এগুলো সবই একই সূত্রে গাথা। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটেছে, তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকায় এই হামলা হল। তবে এটাই সত্য, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় এই জঙ্গি হামলা হয়েছে। দুই. বাংলাদেশে আইএস আছে, কী নেই, এই বিতর্ক এই জঙ্গি হামলার পর আরও শক্তিশালী হল। সন্ত্রাসীরা যেভাবে জিম্মিদের হত্যা করে এবং তা আইএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে, তা সাধারণত ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরাই করে থাকে। অতীতে তাদের প্রকাশিত ভিডিওতে তারা দেখিয়েছে কীভাবে গলা কেটে জিম্মিদের তারা হত্যা করে। হলি আর্টিজানে জিম্মিদের জঙ্গিরা এভাবেই হত্যা করেছে। ফলে এখন বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আরও শক্তিশালী হল। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আইএসের ব্যাপারে তারা তাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করেন কীনা। তিন. জঙ্গি ঘটনায় একাধিক রাষ্ট্র সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের কমান্ডোরা (সেনা, নৌ, বিমান, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত) প্রমাণ করল, তারা যে কোনো জঙ্গি হামলা মোকাবেলা করতে সক্ষম। ফলে আদৌ আমাদের বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। অনেকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাস তথা আইএসবিরোধী জোটে যোগ দিক। বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেয়নি। যে কোনো বিদেশী শক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে সন্ত্রাস দমনে অংশ নিলে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এর বড় প্রমাণ। সুতরাং বাংলাদেশ এই ‘ভুল’ করতে পারে না। চার. গুলশানের মতো সুরক্ষিত এলাকায় কী করে ৭ জঙ্গি বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢুকল, এটা খুঁজে দেখা খুবই জরুরি। আমি দেখেছি গুলশান-বারিধারা ঢোকার রাস্তায় অনেকদিন থেকেই পুলিশি তল্লাশি পোস্ট আছে। বারিধারায় যে টিভি চ্যানেলটি রয়েছে, সেখানে আমি নিয়মিত যাই। ওই পুলিশি পোস্ট সেখানে একটি জটলার সৃষ্টি করে। এ রাস্তা ধরেই হলি আর্টিজানে যেতে হয়। পুলিশ এখানে তল্লাশি পোস্ট বসিয়েছে। কিন্তু এর বাইরে আরও যেসব ঢোকার রাস্তা রয়েছে, সেখানে কী কোনো তল্লাশি পোস্ট বসানো হয়েছিল? না হয়ে থাকলে এটা পুলিশ প্রশাসনের বড় ভুল। একইসঙ্গে ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজারের হত্যাকাণ্ডের পর পুরো গুলশান এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছিল। অর্থাৎ হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা ছিল। সেখানে তাহলে জঙ্গিদের ‘রুকস্যাক’ টিভি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করার দৃশ্য ধরা পড়ার কথা। এটা কি ধরা পড়েছিল? নাকি তাভেল্লা সিজারের হত্যাকাণ্ডের সময় যেভাবে সিসি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হয়েছিল, বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, সে রকম একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পাঁচ. অভিযোগ উঠেছে আগেই সেখানে গুলি মজুদ করে রাখা হয়েছিল। অথবা অন্য কোনো উৎস কিংবা গুলশান এলাকা থেকে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করা হয়েছিল। এরও একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। খোদ রাজধানীতে জঙ্গিরা যদি একে-২২ রাইফেল ব্যবহার করতে পারে, এটা তো আমাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ছয়. এই সন্ত্রাসী ঘটনা প্রমাণ করল গুলশানের দূতাবাস এলাকা অরক্ষিত। এটা ভিন্ন মেসেজ বিদেশে পৌঁছে দিতে পারে। সাধারণত বিদেশে দেখেছি দূতাবাস এলাকায় সাধারণ চলাচল নিয়ন্ত্রিত। গুলশান-বারিধারায় তা নেই। তাই অবিলম্বে এই এলাকায় জনসাধারণের অবাধ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক। যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হোক। এই এলাকার ভেতর দিয়ে প্রচুর কর্মজীবী মানুষ বাড্ডা তথা কুড়িল এলাকায় নিত্য যাতায়াত করেন। ওদের জন্য বিকল্প যাতায়াতের পথ বের করা জরুরি। যেহেতু দূতাবাস এলাকা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, সে কারণে গুলশান এলাকা থেকে অবিলম্বে সব ধরনের রেস্টুরেন্ট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হোক। না হলে এই এলাকা ঝুঁকির মুখে থাকবে। আমাদের পুলিশ প্রশাসন তাভেল্লা সিজারের হত্যাকাণ্ডকে সিরিয়াসলি নেয়নি। নিলে হলি আর্টিজানের ঘটনা ঘটত না। সাত. যারা জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশে ও বিদেশে কাজ করেন, তারা জানেন আইএস এই রমজান মাসে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলার হুমকি দিয়েছিল। এই হুমকির বাস্তবায়ন হয়েছিল আফগান-আমেরিকান এক নাগরিক কর্তৃক ওরল্যান্ডে সমকামী ক্লাবে ৪১ জনের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। তারপর ঘটল ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে হামলা। যতদূর জানি বাংলাদেশে আইএস হামলা চালাতে পারে, এরকম একটি হুমকি দিয়েছিল আইএস। কিন্তু আমাদের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কি এ ব্যাপারে অবগত ছিলেন না? তারা কি এটা মনিটর করেননি? প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তাদের কাজ কী? যারা এই ফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন, তাদের ভূমিকা নিয়ে কেউ যদি প্রশ্ন করে, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমি বারবার বলে আসছি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ফোর্সের কর্মকাণ্ড শুধু জঙ্গি তৎপরতা মনিটরিং, তথা জঙ্গি নির্মূলে স্ট্র্যাটেজি গ্রহণের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। এই ফোর্সকে আরও শক্তিশালী, তথা যুগোপযোগী করার জন্য এই ফোর্সে সেনা কমান্ডোদের পদায়ন করাও জরুরি। প্রয়োজনে সিভিলিয়ান বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। হলি আর্টিজানের সন্ত্রাসী ঘটনার পর সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটা ভেবে দেখতে পারেন। আট. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত। যদি তাই হয়, তাহলে এ প্রশ্ন উঠতেই পারে সরকার এই পরিকল্পনারোধে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? দেশে তো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলছে। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, ১২ হাজারের ওপর মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের একটা বড় অংশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শেষ হওয়ার আগেই হলি আর্টিজানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। ফলে এই হত্যাকাণ্ডে পুরো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতাকে একটি প্রশ্নের মুখে ফেলল। নয়. এই হত্যাকাণ্ড যেসব জঙ্গি অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ৫ জনকেই পুলিশ খুঁজছিল বলে দাবি করেছেন আইজিপি। পুলিশের লিস্টে তাদের নাম ছিল বলেও তার দাবি। এদিকে সাইট ইন্টেলিজেন্স ৫ জন জঙ্গির ছবি নামসহ প্রকাশ করেছে তাদের ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র সেই ছবি ছেপেছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখন উচিত হবে এ ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দেয়া। পুলিশ সূত্র থেকে কয়েকটি নাম দেয়া হয়েছে। ডাকনাম। কিন্তু পূর্ণ পরিচয়, পারিবারিক ইতিহাস জানা দরকার। সাইট ইন্টেলিজেন্স যে ছবি ব্যবহার করেছে, তাতে দেখা যায় জঙ্গিরা অস্ত্র হাতে, পেছনে আইএসের পতাকা ও মনোগ্রাম নিয়ে ছবি তুলেছে। সম্ভবত এটা এমন হতে পারে যে জঙ্গিরা সিরিয়া গিয়েছিল এবং সিরিয়া থেকেই তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থান করে কোনো জঙ্গি এ কাজে অংশ নেয়নি বলে আমার ধারণা। তবে এটা বলা যেতে পারে জঙ্গিরা প্রশিক্ষিত ছিল এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘র্যাকি’ করেই তাদের টার্গেট নির্ধারণ করেছিল। বিতর্ক এড়াতে তাই একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা জরুরি। দশ. হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ড বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট করেছে। নিরাপদ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক সময় বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের এই ভূমিকা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বড় ধরনের ‘ক্ষতির’ সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ। বিদেশীরা বাংলাদেশের ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে। ২৫ বিলিয়ন ডলারের যে তৈরি পোশাক শিল্প, তাতে অনিশ্চয়তা আসতে পারে। ইতিমধ্যে আমরা যেটা জেনেছি তা হচ্ছে- অনেক পুরনো ক্রেতা নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশে আসতে তাদের অপারগতার কথা জানিয়েছেন। নতুন করে অর্ডারও দিচ্ছেন না। ফলে তৈরি পোশাক নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলই। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিএনএন দীর্ঘ সময় ধরে সম্প্রচার করেছে, তা এক নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে এখানে। মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে এক সময় পরিচিত ছিল এই দেশটি। এখন একটা আশংকার জন্ম হয়েছে যে দেশটিকে সোমালিয়া কিংবা নাইজেরিয়ার কাতারে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। বাংলাদেশে স্বীকৃত আইএস নেই। কিন্তু জেএমবি কিংবা এবিটির মতো জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। হরকাতুল জিহাদ-ই-ইসলামী-বাংলাদেশ (হুজিবি) যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্বীকৃত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের (২০০৮) তালিকায় রয়েছে। এ তালিকায় এখন আরও বেশক’টি সংগঠনের নাম যুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশীদের জন্য এটা কোনো ভালো খবর নয়। নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে বিজয়ী হন, তাহলে বাংলাদেশীরা বিপদে পড়তে পারেন। এ ঘটনায় অনেকেরই সঙ্গে আমি কথা বলেছি। দেখেছি, তারা আতংকে রয়েছেন। এখন বাংলাদেশের ইমেজ থাকল একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। হলি আর্টিজানের সন্ত্রাসী হামলা শেষ ঘটনা নয় বলেই আমার ধারণা। সাধারণত সন্ত্রাসীরা প্রতিশোধ নেয়। ফলে কমান্ডো হামলায় ৬ জন জঙ্গি নিহত হওয়ায় জঙ্গিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আমাদের সতর্ক হতে হবে। গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাক কারখানায় নজরদারি বাড়াতে হবে। যেন কোনো শৈথিল্য না থাকে। জঙ্গিদের হত্যা করে কিছু জিম্মিকে আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি বটে, কিন্তু বেশ ক’জন বিদেশীকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। রাতে উদ্ধার অভিযান চালানো যেত কিনা, এটা নিয়ে এখন বিতর্ক করার সময় নয়। এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে দুটি বড় দল যদি পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগ করে, তা সুযোগ তৈরি করে দেবে জঙ্গিদের। খালেদা জিয়ার উচিত হবে সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। আর সরকার প্রধানেরও উচিত হবে জঙ্গি দমনে বিএনপির সহযোগিতা চাওয়া। এই সহযোগিতা যদি তিনি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে তা হবে তার বড় ‘রাজনৈতিক বিজয়’। অতীত ঘেঁটে আক্রমণাত্মক বক্তব্য শুধু তিক্ততাই বাড়াবে। হলি আর্টিজানের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর একটি সদূরপ্রসারী প্রভাব আছে, আমরা যেন এ কথাটা ভুলে না যাই। Daily Jugantor 04.07.2016
কোন পথে ইউরোপের রাজনীতি
17:39
No comments
ড. তারেক শামসুর রেহমান সম্পাদকীয়
আপডেট: ১২:০০:০০ AM, রবিবার, জুলাই ৩, ২০১৬
ইউরোপীয় রাজনীতি এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৭ সালে ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিউনিটি (ইইসি) তার যাত্রা শুরু করেছিল। ইইসি পরে ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২৩ বছর পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভাঙন
দেখা দিল
ব্রিটেনের গণভোটে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু ব্রিটেনে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেনি, বরং সারা বিশ্বেই এটা নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। ২৩ জুনের ভোট গ্রহণের পর এ বিতর্কের মাত্রা আরও ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপে ব্রিটেনের স্ট্যাটাস এখন কী হবে, ইইউ’র সঙ্গে সম্পর্কইবা কী হবে আগামীতে, কিংবা স্কটল্যান্ড কি আগামীতে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবেÑ এসব প্রশ্ন এখন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। শুধু ব্রিটেনের সংবাদপত্রই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোতেও ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও গেল সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা চিন্তারও কারণ বটে। কেননা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে তার পাশে পেয়েছে। সিরীয় সংকট, ইরাকে সামরিক আগ্রাসন, লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ করে গাদ্দাফিকে উৎখাতÑ প্রতিটি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটেন। এমনকি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে সমর্থন না করলেও ব্রিটেন সমর্থন করে আসছিল বারবার। ফলে ব্রিটেনের প্রতি বরাবরই একটা ‘সফট কর্নার’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে ওবামা প্রশাসন চেয়েছিলেন ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকুক। ব্রিটেন ইইউতে থাকলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বেশি। এজন্যই গণভোটের আগে প্রেসিডেন্ট ওবামা ছুটে গিয়েছিলেন লন্ডনে। প্রকাশ্যে আবেদন জানিয়েছিলেন ব্রিটেনবাসীর প্রতি, তারা যেন ইইউতে থাকে। কিন্তু ওবামার আবেদনের প্রতি সম্মান জানায়নি ব্রিটেনের ভোটাররা। শতকরা ৫২ ভাগ মানুষ রায় দিলেন ইইউ ছেড়ে যাওয়ার। তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে যে একটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে, এটাই স্বাভাবিক। তাই পররাষ্ট্র সচিব জন কেরিকে দ্রুত ছুটে যেতে হয়েছে লন্ডনে। গেল সপ্তাহে তিনি গেছেন। কথা বলেছেন, ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে। তার মন্তব্য ছাপাও হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এখন যে প্রশ্নটি ওয়াশিংটনকে ভাবিত করেছে, তা হচ্ছে একটি দুর্বল যুক্তরাজ্য কতটুকু মার্কিনি স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে? এখানে বলা ভালো, গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২ বছরের মধ্যে ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ছেড়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ সময় ব্রিটেন ইইউ’র সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে না।
ইইউ মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট হলেও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আসরে এর গুরুত্ব বেড়েছে। প্রায় ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তন-বেষ্টিত ইইউ’র জনসংখ্যা ৫০৮ মিলিয়ন। ২৮টি দেশ একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়নে আবদ্ধ হলেও নিজস্ব পার্লামেন্ট, নিজস্ব সরকার ও নিজস্ব সংবিধান তারা বজায় রেখেছে। ফলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই ইইউ’র অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে। ওই দেশগুলোতে আবার ইইউ’র মিশনও রয়েছে। (যেমন বাংলাদেশ)। নিঃসন্দেহে ইইউ অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ইইউ’র জিডিপির পরিমাণ ১৯ দশমিক ২০৫ ট্রিলিয়ন ডলার (সাধারণ হিসাবে ১৬ দশমিক ২২০ ট্রিলিয়ন ডলার), যা বিশ্বের তৃতীয় বড় অর্থনীতি। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৮৫২ ডলার (পিপিপি, সাধারণ হিসাবে ৩১ দশমিক ৯১৮ ডলার), যা বিশ্বের ১৮তম। এ অর্থনৈতিক শক্তির বলেই ইইউ বর্তমানে অন্যতম একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেখা গেছে, অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ একটি ‘অবস্থান’ নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইইউ’র সেই ‘অবস্থান’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবস্থান’ এর বাইরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রায়ন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ইইউ সোচ্চার। এখন খুব সঙ্গতকারণেই ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায়, ইইউ দুর্বল হয়ে যাবে। এতে করে বিশ্ব আসরে তার গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিটেন কী এখনই ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে? জনমতে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় হয়েছে বটে; কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি কী? ইইউ’র গঠনের জন্য যে লিসবন চুক্তির প্রয়োজন ছিল, তার ৫০তম ধারায় বলা আছে, যে কোনো দেশ ইইউ’র কাঠামো থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ওই দেশের সাংবিধানিক আইন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ওই দেশের পার্লামেন্ট, জনগণ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। ব্রিটেনের জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তা অনুমোদন করবে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। তবে ব্রিটেন এখন থেকে ২ বছর সময় পাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। তবে এ গণভোটের রায়ের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড অ্যালেন গ্রিন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখে তিনি মন্তব্য করেছেন, এ রায়টি বাধ্যতামূলক নয়, বরং এক ধরনের উপদেশমূলক। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সরকার এ রায় ‘উপেক্ষা’ করতে পারে। এ ব্যাপারে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে, এটা তার অভিমত। বাস্তবতা হচ্ছে, এ রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। পার্লামেন্টে এ রায় অনুমোদিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।
ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের ইইউতে থাকার পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ভোটাররা তার কথা শোনেনি। ব্রেক্সিট বিরোধ ক্যাম্পেইনে বিরোধী লেবার পার্টির যে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল তা তারা করেনি। তখন লেবার পার্টির এমপিদের প্রায় ৯০ ভাগই ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। যে অভিযোগটি উঠেছিলÑ ইইউ ছাড়লে ব্রিটিশ আরও গরিব হয়ে যাবে। এ অভিযোগটির কোনো সত্যতা খোঁজে পায়নি ভোটাররা। মূলত ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন এ গণভোটে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক ব্যাপক হারে সিরীয়, ইরাকি ও আফগান নাগরিকদের ইউরোপে আগমন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের ভোটারদের মাঝে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের মাঝে এমন একটা শঙ্কার জন্ম হয় যে, ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসন গ্রহণের ফলে ব্রিটেন তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। এদের মাঝে একটা ‘ইসলামফোবিয়াও’ কাজ করেছিল। এটা উসকে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্র্যাম্প। তিনি ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন এবং গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় পড়লে, তিনি তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ক্যামেরন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে, অর্থাৎ ইইউ’র পক্ষে জনসংযোগ করলেও মন্ত্রিসভার দুই সদস্য মাইকেল গেভি ও বরিস জনসন এর বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থাৎ তারা ছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষে। ব্রিটেনের প্রবীণদের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি ক্যামেরন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিরোধীরা যুক্তি তুলে ধরেছিলেন একটিইÑ ইইউ বা যুক্তরাষ্ট্র। ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফরাজ সেøাগান তুলে ধরেছিলেন যুক্তরাজ্যের পক্ষেই। তাতে তিনি জয়ী হলেন। এ জয় তাকে যদি ভবিষ্যৎ এ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিঃসন্দেহে ফরাজ এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। মানুষ তার কথায় আস্থা রেখেছে। গেল বছর ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অভিবাসন আগমন, ব্রিটেনের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ইত্যাদি কারণে ক্যামেরন বাধ্য হয়েছিলেন গণভোট দিতে। সেই গণভোটেই শেষ পর্যন্ত তার পরাজয় ঘটল। তিনি যা চেয়েছিলেন, তাতে কোনো সমর্থন ছিল না যুক্তরাজ্যবাসীর। তিনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন। তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। অক্টোবরে পার্টি কনভেনশনে নয়া নেতা নির্বাচিত হবে। শুধু কনজারভেটিভ পার্টি কেন বলি, বিরোধী লেবার পার্টিতেও এর বড় ধাক্কা লেগেছে। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের চেয়ারও এখন টলটলায়মান। তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন লেবার পার্টির অনেক এমপি। যদিও করবিন এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। বলেছেন, তিনি নেতৃত্বের প্রশ্নে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পশ্চিমা গণতন্ত্রের এটাই সৌন্দর্য, যখন দলীয় নেতা তার নীতি জাতীয় পর্যায়ে অনুমোদন করতে পারেন না, তখন তিনি পদত্যাগ করবেন। অতীতে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এ রকমটি হয়েছে। নেতা পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচনে হেরে গিয়ে দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ক্যামেরন সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন। সম্ভবত জেরেমি করবিনকেও যেতে হবে।
ব্রিটেনের এ গণভোট আরও অনেক বিষয়ের জন্ম দিয়েছে। এক. এক ধরনের জাতিগত বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মুসলমান তথা এশিয়ান অধ্যুষিত এলাকায় বর্ণবাদী প্লাকার্ড ও ফেস্টুন প্রদর্শন করা হয়েছে। তাতে এশিয়ানদের ব্রিটেন ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। শুধু এশিয়ানই নন, বরং পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা পোল্যান্ড ও লাটভিয়ার শ্বেতাঙ্গ নাগরিকরাও এ জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অবাধ চলাচলের (শেভেন চুক্তির বলে) সুবিধা নিয়ে পোল্যান্ডের অধিবাসীদের একটা অংশ লন্ডনে বসবাস ও চাকরি করতেন। এরা এখন হুমকির মুখে আছেন। একদিকে চাকরি হারানোর, অন্যদিকে জাতিগত হামলার। দুই. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠান লন্ডনে অবস্থানরত তাদের অফিস থেকে কর্মী ছাঁটাই এবং অফিস ইউরোপের অন্য শহরে সরিয়ে নেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এটা ব্রিটেনের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে। অর্থনীতি দুর্বল হবে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের মান আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে তা গিয়ে আঘাত হানবে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে। ব্রিটেনের জিডিপিতে তখন শ্লথগতি আসবে। যুক্তরাষ্ট্র তার বাজার হারাবে। রফতানি আয়ে ধস নামবে। তিন. বাংলাদেশী তথা ভারতীয়রা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের ব্যবসা মার খাবে। বাজার সংকুচিত হয়ে আসবে। ইউরোপে রফতানি কমে যাবে। নয়া ট্যারিফের মুখোমুখি হবে ব্রিটিশ পণ্য। বাংলাদেশ কিংবা ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমে যাবে। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসবে। ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগও তেমন একটা হবে না। বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আগামী ১ বছর ব্রিটেনের রাজনীতি ও অর্থনীতি একটা অস্থিরতার মধ্যে থাকবে। ব্রিটেনের অর্থনীতির স্বার্থেই ব্রিটেনকে ইইউ’র সঙ্গে একটা ‘সমঝোতায়’ যেতে হবে। সেই ‘সমঝোতাটি’ যে কী, তাতে ব্রিটেন কতটুকু লাভবান হবে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ইউরোপের ঐক্যকে একটি বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল। আগামীতে এক ইউরোপের প্রশ্নে নানা কথা, নানা প্রশ্ন শোনা যাবে। এতে করে নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার একটি নতুন রূপও আমরা দেখতে পাব। চূড়ান্ত বিচারে এতে করে লাভ হবে পরোক্ষভাবে রাশিয়ার। ইউরোপের বিভক্তি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। কেননা অতীতে ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার বিরোধিতা করে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল। রাশিয়া ব্রিটেনের অবস্থানকে ভুলে যায়নি। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভক্তি যত বাড়বে, ততই লাভ রাশিয়ার।
ইউরোপীয় রাজনীতি এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৭ সালে ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিউনিটি (ইইসি) তার যাত্রা শুরু করেছিল। ইইসি পরে ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২৩ বছর পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভাঙন দেখা দিল। এ ভাঙন শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Daily Alokito Bangladesh
03.07.2016
Daily Alokito Bangladesh
03.07.2016
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ
15:18
No comments
গেল ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা নিয়ে ব্রিটেনে যে গণভোট হয়ে গেল, তার ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভবিষ্যৎকে একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই ফলাফল সুনামির মতো আঘাত হেনেছে ব্রিটেনসহ বিশ্ব আসরে। গণভোটে দেখা গেছে, শতকরা ৫২ ভাগ মানুষ চায় ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে আসুক। অর্থাৎ ব্রিটেন তার আলাদা অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে টিকে থাকুক। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টি ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সিদ্ধান্ত ব্রিটিশরা গ্রহণ করে নেয়নি। বরং ইউকে ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি ও তার নেতা নাইজেল ফরাজের বক্তব্য গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ ফরাজ চেয়েছিলেন যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে আলাদা হোক, ভোটাররা সেটাই চেয়েছে। জনমতে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন ব্রিটেনের হাউস অব কমন্স এটি অনুমোদন করবে। এজন্য যুক্তরাজ্য সময় পাবে দু’বছর। বাস্তবক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যখন বেরিয়ে যাবে, তখন এটি হবে দ্বিতীয় ঘটনা, যেখানে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক জোট থেকে একটি রাষ্ট্র বেরিয়ে গেল। গ্রিনল্যান্ড প্রথম রাষ্ট্র যে ১৯৮৫ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি (ইইসি) থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ওই সময় অবশ্য ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির অস্তিত্ব ছিল। তখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গঠিত হয়নি। ইইউ গঠিত হয় ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে।
ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে আমি অবাক হইনি। কারণ গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপ একটি সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকট সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘ট্রয়কা’ শক্তির (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) কাছে জিম্মি হয়ে গিয়েছিল গ্রিস। গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকট প্রমাণ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের মডেল গ্রিসের রাজনীতি তথা অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। এরপর ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসনের ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার অভিবাসী সিরিয়া ও ইরাক ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমায়। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি পুরো ইউরোপের দৃশ্যপট বদলে দেয়। ইইউ এসব অভিবাসীকে ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিলে তা বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। অভিবাসনবিরোধী একটা জনমত শক্তিশালী হয়। কোথাও সরকারি শিবিরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এখন ব্রেক্সিটের ঘটনা জার্মানির দক্ষিণপন্থীদের আরও উৎসাহ জোগাবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীরা ভালো করেছে। এখন দক্ষিণপন্থীরা জার্মানিতে ইইউ ছাড়ার ডাক দিতে পারে। ব্রেক্সিটের ঘটনা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বকে বাধ্য করবে বড় সংস্কার আনতে। অনেক রাষ্ট্র এখন (পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক ও সুইডেন) নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করার উদ্যোগ নেবে। ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অর্থনৈতিকভাবে ইইউকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবে। ব্রিটেনের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। জেপি মরগ্যানের মতো বেশ কিছু বড় ব্যাংক ইতিমধ্যেই ব্রিটেনে তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ঘোষণা করেছে। এতে সেখানে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। অন্যত্র চলে যাবে ব্যবসা। ক্ষতি হবে স্থানীয় অর্থনীতির। অন্যদিকে ইইউর অবাধ চলাচল ও স্থানীয় বসবাসের সুযোগে পূর্ব ইউরোপ থেকে (পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক ইত্যাদি) যারা লন্ডনে অভিবাসী হয়েছিলেন, তারা থাকবেন এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। চাকরি চলে যাওয়ার আশংকাও বাড়বে। ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে টাকার দাম পাউন্ডের সঙ্গে বিনিময় হারে দুর্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ টাকার দাম কমে যাবে। বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। প্রচুর বাংলাদেশী উদ্যোক্তা লন্ডনে আছেন। তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে ব্রিটেনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা কমে যাবে। আরএমজি (তৈরি পোশাক) সেক্টরে রফতানি কমে যাবে।
ব্রেক্সিটের ঘটনা আদৌ ব্রিটেনকে বিশ্ব আসরে একটি ‘শক্তিতে’ পরিণত করতে পারবে না। এটা সত্য, ব্রিটেনের ভোটাররা ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পক্ষে রায় দিলেন। কিন্তু এতে করে তারা খুব লাভবান হবেন কি-না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বরং ইইউতে থেকে ব্রিটেন বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল। এখন তাতে ছন্দপতন ঘটল। অনেক প্রশ্ন এখন থাকবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেমন হবে আগামী দিনের ব্রিটেন? ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে থাকবে, সেটাও একটা প্রশ্ন। এখন ব্রিটেনকে ইইউভুক্ত প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি করতে হবে। যেসব ইইউ নাগরিক ব্রিটেনে কাজ করেন, তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এমনকি ব্রিটেনের যেসব নাগরিক ইইউভুক্ত দেশে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন, কিংবা ইইউর সদর দফতরে নিয়োজিত, তাদের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। সব মিলিয়ে ব্রেক্সিট সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ধরনের ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ব্রিটেনের কেউ কেউ ২৩ জুনকে বলছেন ‘স্বাধীনতার দিন’। কিন্তু আগামী দিনগুলোই বলবে এই ‘স্বাধীনতা’ ব্রিটেনকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পারবে। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা বড় বড় অর্থনৈতিক জোটের জন্য একটি খারাপ সংবাদ। শুভ সংবাদ কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদীদের জন্য। ইউরোপে এই কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদ বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। এ ইতিহাস অনেকে জানেন। সুতরাং ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাই শেষ কথা নয়।
একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন। খোদ যুক্তরাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া পড়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডও স্কটল্যান্ডের পথ অনুসরণ করে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে থাকতে চায়। লন্ডনের নবনির্বাচিত মেয়র সাদিক খানের প্রতি হাজার হাজার মানুষ আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে। শুধু তাই নয়, ১০ লাখ আবেদন জমা পড়েছে পুনরায় যুক্তরাজ্যে গণভোট আয়োজন করার। এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে যুক্তরাজ্যের সর্বত্র। এর ঢেউ এসে পড়েছে এখানে, এই যুক্তরাষ্ট্রেও। প্রচণ্ড মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসনবিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি এই গণভোটের ফলাফলে। তিনি ব্রিটেনবাসীকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন ইতিমধ্যে। মুসলমানমুক্ত, অভিবাসনমুক্ত এবং সর্বোপরি ইইউমুক্ত ব্রিটেনকে তিনি দেখতে চান। এরই মাঝে ইইউর দুই বড় শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্স মাঠে নেমেছে। জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের উদ্যোগে গত সোমবার বার্লিনে ইইউর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয়েছে। তিনি ব্রিটেনকে ধীরে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এই ধীরে চলার অর্থ কী? গণভোটের রায় তো প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন অস্বীকার করতে পারবেন না। এ নিয়ে তার দলের একটা অংশ ব্রেক্সিটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কয়েকজন মন্ত্রী ও লন্ডনের সাবেক মেয়র জনসন ছিলেন এই শিবিরে।
এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এক. যুক্তরাজ্য চলে গেলে ইইউর আর্থিক কাঠামোয় এর কতটুকু প্রভাব পড়বে? দুই. যুক্তরাজ্য কি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে? এর জবাব এ মুহূর্তে দেয়া কঠিন। যুক্তরাজ্য বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। জি ৭-এর সদস্য এবং নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যও যুক্তরাজ্য। দুর্বল যুক্তরাজ্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না বিশ্ব আসরে। যুক্তরাজ্যের জিডিপির পরিমাণ ২ দশমিক ৬৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার (ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে- পিপিপি), আর সাধারণ হিসাবে এর পরিমাণ ২ দশমিক ৮৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের ৫ম। অন্যদিকে মাথাপিছু আয় সাধারণ হিসাবে ৪৩ হাজার ৭৭১ ডলার, যা বিশ্বের ১৩তম, আর পিপিপিতে এই হিসাব ৪১ হাজার ১৫৯ ডলার। বড় অর্থনীতি হওয়ায় ইইউতে তাদের চাঁদার পরিমাণও বেশি। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে ইইউ ফান্ডে যুক্তরাজ্যের দেয়া চাঁদার পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড। যদিও যুক্তরাজ্য আবার ইইউ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড অনুদান পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে এই অনুদান দেয়া হয়েছে। ব্রেক্সিটবাদীরা এটাকেই ব্যবহার করেছিলেন। কট্টরপন্থী নেতা ফারাজ এক টুইট বার্তায় অভিযোগ করেছিলেন, ইইউর সঙ্গে সংযুক্তির কারণে প্রতিদিন যুক্তরাজ্যের খরচ হয় ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ড। যদিও এটা কীভাবে ব্যয় হয়, তার হিসাব তিনি দেননি। ব্রেক্সিটবাদীদের (যারা ইইউ ছাড়তে চেয়েছিল) অভিযোগ ছিল, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও ইইউ থেকে সেভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পায়নি ব্রিটেন।
পাঠকদের জানিয়ে রাখি, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলস নিয়েই আজকের যুক্তরাজ্য। ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড এক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র গঠনে সম্মতি হয়। ১৮০১ সালে আয়ারল্যান্ড এই কাঠামোয় যোগ দেয়। এর আগে ১৫৩৫-১৫৪২ সালে ইংল্যান্ডের রাজা ওয়েলস দখল করে তা ইংল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত করেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত স্কটল্যান্ড কিংবা উত্তর আয়ারল্যান্ড কি ইংল্যান্ডের সঙ্গে থাকবে? আগেই উল্লেখ করেছি, স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির প্রধান নিকোলা স্টুরজিওন ও তার দল ইংল্যান্ড থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চান এবং ইইউতে যোগ দিতে চান। আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনও স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে। কী হবে বলা মুশকিল এই মুহূর্তে। কিন্তু এটা বিবেচনায় নিতে হবে যে, গণভোটে স্কটল্যান্ডে শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ ভোট দিয়েছে ইইউতে থাকার পক্ষেই। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোটের প্যাটার্নও ঠিক এমনটি। ফলে এটা বোঝাই যায়, গণভোটে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোটের ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের আগামী দিনের রাজনীতি লক্ষ্য করার বিষয়। ব্রিটেনের এই গণভোট শুধু স্কটিশ আর আইরিশ কট্টরপন্থীদেরকেই উৎসাহিত করবে না, বরং দেখা গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বেশ ক’টি দেশের কট্টরপন্থীরা এতে আরও উৎসাহিত হয়েছেন। অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির সাবেক সভাপতি নর্বার্ট হোফারও চান অস্ট্রিয়াকে ইইউ থেকে বের করে আনতে। বিশ্লেষকরা অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন, যুক্তরাজ্যের পর অস্ট্রিয়া দ্বিতীয় রাষ্ট্র যারা ইইউতে থাকা-না থাকা নিয়ে গণভোট করতে পারে। এ কাতারে আরও আছেন বেলজিয়ামের ফ্লেমিন ন্যাশনালিস্ট পার্টির প্রধান টম ভ্যান গ্রাইকেন, ডেনমার্কের ড্যানিশ পিপলস পার্টির ক্রিশ্চিয়ান থালেসেন, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্টের মারিয়েন লি পেন, জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মানির ফ্রক পেট্টি, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর ন্যাশনাল কনজারভেটিভ ফ্রিডেসজ পার্টির ভিক্টর অরবান, ইতালির ফাইভ স্টার ম্যুভমেন্টের বেপ্পে গ্রিল্লো, হল্যান্ডের ডাচ পার্টি ফর ফ্রিডমের নিয়ন্ট উইল্ডাস। এই উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি এখন ব্রেক্সিটের ঘটনায় উৎসাহিত হবে। ফলে আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান ইউরোপীয় রাজনীতিতে কেমন হবে, এর স্ট্রাকচার কী হবে, এ প্রশ্ন থাকলই।
বলতে দ্বিধা নেই, ইউরোপে হাজার হাজার সিরীয় ও ইরাকি অভিবাসীর উপস্থিতির কারণে ইউরোপজুড়ে যে অভিবাসনবিরোধী জনমত গড়ে উঠেছে, তার রেশ ধরেই ব্রিটেনের নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নিলেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার। স্পষ্টতই যে ধারণাকে কেন্দ্র করে ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার যাত্রা শুরু করেছিল, তা এখন মুখ থুবড়ে পড়ল। ইউরোপে আরও পরিবর্তন আসবে। আর সেই পরিবর্তনটুকু দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
Daily Alokito Bangladesh
03.07.2016
ব্রেক্সিট কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতন ত্বরান্বিত করবে
16:30
1 comment
ব্রেক্সিট কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতন ত্বরান্বিত করবে
অ- অ অ+
ব্রিটেনের মানুষ গত ২৩ জুনের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। এটা অনেকটা অপ্রত্যাশিত ছিল। ইউরোপ কেন, বলা যেতে পারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নেতারা চেয়েছিলেন, ব্রিটেন ২৮ সদস্যবিশিষ্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকুক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বয়ং ব্রিটেনে এসে ব্রিটেনবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা যেন ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দেয়। জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলাঁদও চেয়েছিলেন, ব্রিটেন ইইউতে থাকুক। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন ভোটাররা যেন ইইউতে থাকার পক্ষেই রায় দেয়। কিন্তু সেটি হলো না। ৫২ শতাংশ ভোটার রায় দিল বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে, আর ৪৮ শতাংশ দিল থাকার পক্ষে। এর অর্থ পরিষ্কার, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ যেমন অতীতে কখনো চায়নি ব্রিটেন ইইউতে যোগ দিয়ে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলুক, এবারও ৪৩ বছর পর তারা চাইল না ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকুক। বলা ভালো, ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যাত্রা শুরু করে। তবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে ইউরোপীয় কোল ও স্টিল কম্পানি গঠনের মধ্য দিয়ে। এই কম্পানিই পরে ১৯৬৭ সালে ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিশনের (ইইসি) জন্ম দেয়, যার পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ছয়টি দেশ (ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, ইতালি, হল্যান্ড ও জার্মানি) নিয়ে ইইসির যাত্রা শুরু। ব্রিটেন ইইসিতে যোগ দেয় ১৯৭৩ সালে। ইইসি কিংবা ইইউ মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অর্থনৈতিক জোটটি একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং বলা যেতে পারে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ইইউ একটি শক্তি। ব্রিটেনের বরাবরই ইইউতে যোগদানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন ছিল। যে কারণে ব্রিটেন ইউরো জোনে যোগ দেয়নি। অর্থাৎ তাদের মুদ্রা পাউন্ড তারা বহাল রেখেছিল। ইইউ ১৯৯৯ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা একটি একক মুদ্রা চালু করবে। ২০০২ সালে সেই একক মুদ্রা ইউরো তারা চালু করে। কিন্তু ইইউভুক্ত সব দেশ এই মুদ্রা গ্রহণ করেনি। মাত্র ১৯টি দেশ এই মুদ্রা চালু করেছিল নিজস্ব মুদ্রার বিলুপ্তি ঘটিয়ে।
ইইউ মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আসরে এর গুরুত্ব বেড়েছে। প্রায় ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তনবেষ্টিত ইইউর জনসংখ্যা ৫০৮ মিলিয়ন। ২৮টি দেশ একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়নে আবদ্ধ হলেও নিজস্ব পার্লামেন্ট, নিজস্ব সরকার ও নিজস্ব সংবিধান তারা বজায় রেখেছে। ফলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ইইউর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে। এই দেশগুলোয় আবার ইইউর মিশনও রয়েছে (যেমন বাংলাদেশ)। নিঃসন্দেহে ইইউ অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ইইউর জিডিপির পরিমাণ ১৯.২০৫ ট্রিলিয়ন ডলার (সাধারণ হিসাবে ১৬.২২০ ট্রিলিয়ন ডলার), যা বিশ্বের তৃতীয় বড় অর্থনীতি। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৮৫২ ডলার (পিপিপি, সাধারণ হিসাবে ৩১,৯১৮ ডলার), যা বিশ্বের ১৮তম। এই অর্থনৈতিক শক্তির বলেই ইইউ বর্তমানে অন্যতম একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেখা গেছে, অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইইউ একটি ‘অবস্থান’ নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইইউর সেই ‘অবস্থান’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবস্থান’-এর বাইরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রায়ণ ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ইইউ সোচ্চার। এখন খুব সংগত কারণেই ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ইইউ দুর্বল হয়ে যাবে। এতে করে বিশ্ব আসরে তার গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিটেন কি এখনই ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে? জনমতে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় হয়েছে বটে, কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি কী? ইইউ গঠনের জন্য যে লিসবন চুক্তির প্রয়োজন হয়েছিল, তার ৫০তম ধারায় বলা আছে, যেকোনো দেশ ইইউর কাঠামো থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ওই দেশের সাংবিধানিক আইন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ওই দেশের পার্লামেন্ট, জনগণ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। ব্রিটেনের জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তা অনুমোদন করবে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। তবে ব্রিটেন এখন থেকে দুই বছর সময় পাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। এই গণভোটের রায়ের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড অ্যালেন গ্রিন। ফিন্যানশিয়াল টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখে তিনি মন্তব্য করেছেন যে এই রায়টি বাধ্যতামূলক নয়, বরং এক ধরনের উপদেশমূলক। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সরকার এই রায় ‘উপেক্ষা’ করতে পারে। এ ব্যাপারে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে, এটা তাঁর অভিমত। বাস্তবতা হচ্ছে এই রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। পার্লামেন্টে ওই রায় অনুমোদিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের ইইউতে থাকার পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিলেন। কিন্তু ভোটাররা তাঁর কথা শোনেনি। ব্রেক্সিটবিরোধী ক্যাম্পেইনে বিরোধী লেবার পার্টির যে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল, তা তারা করেনি। অথচ লেবার পার্টির এমপিদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। যে অভিযোগটি উঠেছিল, ইইউ ছাড়লে ব্রিটেন আরো গরিব হয়ে যাবে। এই অভিযোগটির কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি ভোটাররা। মূলত ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন এই গণভোটে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। অতি সাম্প্রতিককালে ব্যাপকহারে সিরীয়, ইরাকি ও আফগান নাগরিকদের ইউরোপে আগমন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের ভোটারদের মধ্যে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের মধ্যে এমন একটা সংশয়ের জন্ম হয় যে ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসী গ্রহণের ফলে ব্রিটেন তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। তাদের মধ্যে একটা ‘ইসলাম ফোবিয়া’ও কাজ করেছে। এটা উসেক দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন। এবং গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় পড়লে, তিনি তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ক্যামেরন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে অর্থাৎ ইইউর পক্ষে জনসংযোগ করলেও মন্ত্রিসভার দুই সদস্য মাইকেল গেভি ও ররিস জনসন এর বিরোধিতা করেন। অর্থাৎ তাঁরা ছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষে। ব্রিটেনের প্রবীণদের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি ক্যামেরন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধীরা যুক্তি তুলে ধরেছিলেন একটিই—ইইউ না যুক্তরাজ্য? ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফরাজ স্লোগান তুলে ধরেছিলেন যুক্তরাজ্যের পক্ষেই। তাতে তিনি জয়ী হলেন। এই জয় তাঁকে যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিঃসন্দেহে ফরাজ এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। মানুষ তাঁর কথায় আস্থা রেখেছে। গেল বছর ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি বিজয়ী হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অভিবাসী আগমন, ব্রিটেনের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ইত্যাদি কারণে ক্যামেরন বাধ্য হয়েছিলেন গণভোট দিতে। সেই গণভোটেই শেষ পর্যন্ত তাঁর পরাজয় ঘটল। তিনি যা চেয়েছিলেন, তাতে কোনো সমর্থন ছিল না যুক্তরাজ্যবাসীর। তিনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন।
তাহলে এখন কী হবে? অনেক সম্ভাবনার এখন জন্ম হবে। এবং কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেছেন। এটাই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। ক্যামেরনের নীতি মানুষ গ্রহণ করেনি। এখন কনজারভেটিভ পার্টিতে শুধু যুক্তরাজ্যের জন্য নয়া নীতি গ্রহণ করতে হবে। নয়া নেতা নির্বাচিত হবেন অক্টোবরে। অর্থাৎ অক্টোবরে ব্রিটেন একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পাবে। দুই. লেবার পার্টির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। কেননা বর্তমান লেবার নেতৃত্ব ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন। ফলে লেবার নেতৃত্বকেও এর দায় বইতে হবে। তিন. ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত খোদ স্কটল্যান্ডে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ডে গণভোট হয়েছিল স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে। গণভোটে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, স্বাধীন স্কটল্যান্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে। মাত্র ৪৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষে, বাকি ৫৫ শতাংশ ভোট দিয়েছিল ব্রিটেনের পক্ষে থাকার জন্য। ফলে সেবার স্কটল্যান্ড স্বাধীন হয়নি। এখন ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় স্কটল্যান্ড ইইউতে ব্রিটেনের জায়গাটি নিতে চায়। স্কটল্যান্ডের ফাস্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টুরগিওন বলেছেন, তিনি পুনরায় স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট চান। এই গণভোট এবার স্কটল্যান্ডের ভাগ্য খুলে দিতে পারে। স্কটল্যান্ড ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে পারে! এবং বেরিয়ে গিয়ে ইইউতে যোগ দিতে পারে। চার. ব্রিটেনের এই গণভোটের ফলে সমগ্র ইউরোপে একটি জাতীয়তাবাদী চেতনা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণপন্থীদের হাত এতে করে শক্তিশালী হতে পারে। ফ্রান্স ও গ্রিস, এমনকি ইতালি হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্র, যারা ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করতে পারে। এরই মধ্যে ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা মেরিন লি পেন ও তাঁর দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টি সেখানে গণভোটের ডাক দিয়েছে। তাঁর দলও ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। যদিও এটা সত্য, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি নিজেরা এই গণভোটের আয়োজন করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষমতাসীনরা এই গণভোটের পক্ষে নয়। পাঁচ. এই গণভোট জার্মানির দক্ষিণপন্থীদের আরো উৎসাহিত করতে পারে। এমনিতেই জার্মানিতে বিপুলসংখ্যক সিরীয় শরণার্থীর উপস্থিতি নিয়ে জার্মান সমাজে বিভক্তি আছে। তথাকথিত শরণার্থীবিরোধীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মবিরোধীদের সংখ্যা বেশি। শরণার্থীদের মধ্যে আইএসের জঙ্গিরা লুকিয়ে আছে—এই অভিযোগ তুলে এরই মধ্যে শরণার্থী শিবিরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এখন ব্রেক্সিটের ঘটনা জার্মানির দক্ষিণপন্থীদের আরো উৎসাহ জোগাবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীরা ভালো করেছে। এখন দক্ষিণপন্থীরা জার্মানিতে ইইউ ছাড়ার ডাক দিতে পারে। ছয়. ব্রেক্সিটের ঘটনা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বকে বাধ্য করবে বড় সংস্কার আনতে। অনেক রাষ্ট্র এখন (পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক ও সুইডেন) নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতি সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করার উদ্যোগ নেবে। সাত. ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অর্থনৈতিকভাবে ইইউকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবে। ব্রিটেনের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। জেপি মরগ্যানের মতো বেশ কিছু বড় ব্যাংক এরই মধ্যে ব্রিটেনে তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ঘোষণা করেছে। এতে করে সেখানে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। অন্যত্র চলে যাবে ব্যবসা। ক্ষতি হবে স্থানীয় অর্থনীতির। অন্যদিকে ইইউর অবাধ চলাচল ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগে পূর্ব ইউরোপ থেকে (পোল্যান্ড, চেক ইত্যাদি) যারা লন্ডনে অভিবাসী হয়েছিল, তারা থাকবে এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে। আট. ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। প্রচুর বাংলাদেশি উদ্যোক্তা লন্ডনে আছেন। তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে ব্রিটেনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা কমে যাবে। আরএমজি (তৈরি পোশাক) সেক্টরে রপ্তানি কমে যাবে।
ব্রেক্সিটের ঘটনাবলিই যে শেষ ঘটনা, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ধারণা করছি, ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে। এতে করে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামো ভেঙে যায়, তাও বিচিত্র কিছু নয়।
Daily Kalerkonthoteo
29.06.16
Daily Kalerkonthoteo
29.06.16
চীন-ভারত অ্যালায়েন্সের কথা
19:16
No comments
এক সময় মার্কিন গবেষকরা একটি সম্ভাব্য চীন-ভারত অ্যালায়েন্সের কথা বলেছিলেন। জনাথন হোলসলাগ ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন লিখিত একটি প্রবন্ধে চীন-ভারত এর ধারণা দিয়েছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের (২০১৪) পর ধারণা করা হয়েছিল যে দেশ দুটি আরো কাছাকাছি আসবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা, চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সর্বশেষ চীনের আন্দামান-নিকোবর অঞ্চল দাবি দেখে মনে হয়েছে এই সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। নতুন আঙ্গিকে ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিনের’ ধারণা আবার ফিরে এসেছে। এই ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’ মনকো ডকট্রিনের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কারো কর্তৃত্ব ভারত স্বীকার করে নেবে না। এক সময় এই এলাকা অর্থাৎ ভারত মহাসাগরীয় এলাকা ঘিরে ‘প্রিমাকভ ডকট্রিন’ (২০০৭ সালে রচিত। শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার ঐক্য)-এর যে ধারণা ছিল শ্রীলঙ্কায় সিরিসেনার বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা এখন আর কাজ করছে না। ফলে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী ধারণাকে আরো শক্তিশালী করতে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীনের ইউনান রাজ্য, ভারতের সাতকোন, মিয়ানমার) যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তাতে এখন শ্লথগতি আসতে পারে। সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত এখন আর বিসিআইএম ধারণাকে ‘প্রমোট’ করবে না। আর বাংলাদেশের একার পক্ষে চীন ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে ‘বিসিএম’ ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না। ভারত এখন উপ-আঞ্চলিক জোট বিবিআইএন জোটের কথা বলছে। ভারতের কর্তৃত্ব করার প্রবণতা এ অঞ্চলের দৃশ্যপটকে আগামী দিনে বদলে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও লক্ষণীয়। ভারত বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। এখানে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ছে। ফলে এখানে মার্কিন স্বার্থ থাকবেই। এ অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থের আবার একটি কারণ হচ্ছে চীন। চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’র একটি অপকৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘কৌশলগত সম্পর্কে’ নিজেদের জড়িত করেছে। এই দুই দেশের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। তবে ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মাঝে অবিশ্বাসের জš§ হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ স্ট্র্যাটেজি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরেই আবতিত হচ্ছে। অর্থাৎ এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ স্ট্র্যাটেজি শুধু প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে রচিত হলেও এখন এর সম্প্রসারিত হয়েছে ভারত মহাসাগরে। একই স্ট্র্যাটেজির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে ভারত মহাসাগরকে যাকে ওবামা আখ্যায়িত করেছেন ‘Pivot to ara’ হিসেবে। বাংলাদেশ এই স্ট্র্যাটেজির আওতায়। এই স্ট্র্যাটেজির অন্তর্ভুক্ত চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য এখানে মোতায়েনরত যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ ফ্লিটের ৬টি যুদ্ধজাহাজকে ভারত মহাসাগরে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে গুরুত্ব আরো বেড়েছে। এতে চীনা নেতাদের উদ্বেগ ও শঙ্কা বাড়ছে। অতি সম্প্রতি ওয়াশিংটনে (১ এপ্রিল) যে চতুর্থ পারমাণবিক নিরাপত্তা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সেখানে ওবামার সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের আলাপচারিতায় চীনা নেতা তাদের উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে Terminal High Altifude Area Defense (THAAD) আলোচনা শুরু করেছে। যদিও বলা হচ্ছে, THAAD এক ধরনের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় আগত শত্রুপক্ষের মিসাইল ধ্বংস করা। ঞঐঅঅউ ব্যাটারি প্রতিস্থাপনের খরচ পড়বে ৮২৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার)। কিন্তু চীন মনে করছে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহƒত হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোকে চীন মনে করছে তাদের ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। ওবামা-শি জিন পিং আলোচনায় এই প্রসঙ্গগুলো উত্থাপিত হয়েছে এবং শি জিন পিং এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, চীন এ ধরনের ‘কর্মকাণ্ড’ সহ্য করবে না। স্পষ্টতই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভূমিকা’ নানা প্রশ্নের জš§ দিয়েছে। এতে এটা স্পষ্ট, এই ভূমিকা এই অঞ্চলে চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। ফলে এ অঞ্চল অর্থাৎ ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চল আগামী দিনগুলোতে যে এক ধরনের প্রভাব বলয় বিস্তার করার প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতোমধ্যে মিয়ানমারে একটি নয়া সরকার গঠিত হয়েছে। অং সান সূচি আগামীতে মিয়ানমারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ভূমিকা’ পালন করতে যাচ্ছেন। মিয়ানমারকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাড়ছে। মিয়ানমারের জ্বালানি সম্পদ, বিশেষ করে গভীর সমুদ্র গ্যাস ও তেল প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে মিয়ামানরের আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে এক ধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। এই জ্বালানি সম্পদের ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে ভারতেরও। যেখানে ভারতের বিনিয়োগ বাড়ছে। স্পষ্টতই ভারত মহাসাগরকে ঘিরে একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন এবং মাঝখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজ নিজ স্ট্র্যাটেজি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই স্ট্র্যাটেজি এই দেশগুলোর স্বার্থে কত টুকু আঘাত করে কিংবা এই স্ট্র্যাটেজি আদৌ কোনো ‘সংঘর্ষের’ পর্যায়ে রূপ নেয় কিনা তা দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো দক্ষিণ চীন সাগরের প্রশ্নটির। ফলে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের রাজনীতি আগামীতে আরো উত্তপ্ত হবে এবং ধীরে ধীরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হতে পারে।
- Daily Manobkontho 27.06.16
- Daily Manobkontho 27.06.16
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্নায়ুযুদ্ধের ছায়া
17:18
No comments
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের ছায়া পড়তে শুরু করেছে। এক সময় বিশেষ করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধের বিস্তার লাভ করেছিল। সেই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। আজ ২১ বছর পর স্নায়ুযুদ্ধের নতুন এক রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। আমার সাম্প্রতিক ভিয়েতনাম সফর, জি-৭ সম্মেলনে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ভূমিকার সমালোচনা, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত সাংগ্রিলা সংলাপে চীনের হুশিয়ারি এবং সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওয়াশিংটন সফরের সময় ভারতের এনএসজিতে (বিশ্বের পরমাণু সরবরাহকারী গোষ্ঠী) অন্তর্ভুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রমাণ করে নতুন করে এক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া তথা প্যাসিফিক অঞ্চলে। এখানে স্পষ্টতই চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ভারতকেও পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে নিঃসন্দেহে এবারকার ভিয়েতনাম সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সঙ্গে তার সীমান্তবর্তী অনেকগুলো দেশের (ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান) বিরোধ আছে। এমনকি চীনের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে তার যুদ্ধজাহাজ পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সঙ্গে একটি যৌথ নৌ-মহড়ায়ও অংশ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তার ভিয়েতনাম সফর এবং ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এ কথাই প্রমাণ করে যে, ভিয়েতনামকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে ‘তৈরি’ করছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে একটি বলয় তৈরি করা, তাতে ভিয়েতনাম এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পার্টনার। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামকে সঙ্গে নিয়ে টিপিপি বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি করেছে। ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড পার্টনার। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে শতকরা ১ হাজার ২০০ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রফতানি করেছিল ১ হাজার ৭৩৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ আমদানি করেছিল ৯ হাজার ৯৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। আর ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৩০ হাজার ৯২১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার (রফতানি ৭ হাজার ৭১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার, আমদানি ৩৭ হাজার ৯৯৩ মিলিয়ন ডলার)। ২০০৭ সালে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। ওবামা নিজেই বলেছিলেন, ভিয়েতনাম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ওবামার ভিয়েতনাম সফর শুধু সাধারণ একটি সফর ছিল না। একদিকে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক বলয় সৃষ্টি করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে। আর এ মহাপরিকল্পনার অংশ ছিল ওবামার এ সফর। এখানে বলা ভালো, চীনের বিরুদ্ধে একটি সামরিক বলয় তৈরি করার অংশ হিসেবেই দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রকে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ফিলিপাইন এবং অতি সম্প্রতি ভারত দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নৌ-ইস্টার্ন কমান্ডের চারটি গাইডেড মিসাইল সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ জাহাজগুলো দক্ষিণ চীন সাগর ও উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কারÑ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী যে নীতি, তাতে ভারতকেও পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে আমরা ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌ-স্ট্র্যাটেজি নিয়ে লিখেছি। ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম নৌশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর তারই অংশ হিসেবেই ভারত এ প্রথমবারের মতো তাদের ইস্টার্ন কমান্ডের চারটি যুুদ্ধজাহাজকে এ অঞ্চলে মোতায়েন করল। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। ভারত ভিয়েতনামের সঙ্গে চুক্তি করে এ অঞ্চলে তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
এখন ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ৩২০ কোটি ডলারের ছয়টি ইলেকট্রিক সাবমেরিন বিক্রির যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলে নতুন করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দেবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে দক্ষিণ কোরিয়া এ সিদ্ধান্তটি নিল। তবে চীনে আধা ঘণ্টারও কম সময়ে আঘাত হানতে সক্ষম এমন হাইপারসনিক গ্লিড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও মোতায়েন করা হয় সেখানে। চীন বিষয়গুলোকে খুব সহজভাবে দেখছে না। এতে করে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়বে। সর্বশেষ ওবামার সফর এতে একটি নতুন মাত্রা এনে দেবে।
এখানে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। দক্ষিণ চীন সাগরের স্ট্র্যাটেজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। আগামী দিনে এ অঞ্চলের রাজনীতির উত্থান-পতন বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটারজুড়ে রয়েছে চীন সাগরের বিস্তৃতি। এ অঞ্চলটি চীনের মূল ভূখ-ের দক্ষিণে, ফিলিপাইনের পশ্চিমে, মালয়েশিয়ার উত্তরে, ব্রুনাইয়ের উত্তর-পশ্চিমে, ইন্দোনেশিয়ার উত্তর এবং ভিয়েতনামের পূর্বে অবস্থিত। এ অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়েছে এ কারণে যে, দক্ষিণে চীন সাগরে প্রায় ২৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে এবং গ্যাস রয়েছে ২৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার থেকে ৫৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার। চীনের প্রচুর ‘জ্বালানি সুধা’ রয়েছে। চীনের অর্থনীতিকে সঠিক পথে চলতে প্রচুর জ্বালানি দরকার। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে যদি চীনের কর্তৃত্ব থাকে, তাহলে চীন তার জ্বালানি চাহিদা এখান থেকে মেটাতে পারবে। এ সমুদ্রপথটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ। এ কারণে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পৃথিবীর সমুদ্রপথে যত বাণিজ্য হয়, তার এক-তৃতীয়াংশ হয় এ পথে। চীন জাপান, কোরিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার বাণিজ্যিক রুট হিসেবে এ পথকে ব্যবহার করে। দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত স্প্রাটলি, প্যারাসেল ও টনকিন উপসাগরে অবস্থিত কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে আশপাশের দেশ বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার সঙ্গেই চীনের বিরোধ। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ অঞ্চলের অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব বেড়েছে একাধিক কারণে। শুধু চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’ কিংবা চীনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে একটি ‘ঐক্য’ করার পাশাপাশি জাপানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মোকাবিলা করা, এ সাগর দিয়ে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করার ব্যাপারে মার্কিনি স্বার্থ রয়েছে। এর উপরে রয়েছে এ এলাকার তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর মার্কিনি বহুজাতিক কোম্পানির লোলুপ দৃষ্টি। ফলে এ অঞ্চলটি যে আগামী দিনের প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করতে আজ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান, এমনকি ভারতও তৎপর। যুক্তরাষ্ট্র এ দেশগুলোকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে। এটি বিশ্বের বড় সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটের একটি। বিশ্ববাণিজ্যের ৩২ ভাগ এ পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। চীনের মূল ভূখ-ের সঙ্গে এটি সংযুক্ত নয়। মূল ভূখ- থেকে ১ হাজার নটিক্যাল দূরে এ দ্বীপগুলো অবস্থিত। জাপান এ রুটকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি করে এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। জাপান এ দ্বীপগুলোর নাম দিয়েছে সেনকাকু, যা চীনের কাছে পরিচিত দিয়াওইউ নামে। ঐতিহাসিকভাবে চীনের শিও হান রাজবংশের কর্তৃত্ব অনুযায়ী চীন এ অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে এলেও আশপাশের দেশগুলো তা মানতে নারাজ। জাপানের নিজস্ব কোনো তেল ও গ্যাস নেই। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর দেশটি পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। জাপান দৈনিক ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ সামুদ্রিক পথটি ব্যবহার করে আমদানি করে থাকে।
এ অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব থাকায় চীনও এ অঞ্চলে নতুন করে একটি কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়েছে। সেখানে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের জন্য বড় বড় রানওয়ে তৈরি করছে। মিসাইল ব্যাটারি স্থাপন করেছে। এমনকি আগামীতে এখানে পারমাণবিক সাবমেরিন যাতে ‘ডক’ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও পাকাপাকি করেছে চীন। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এ আতঙ্ককে ব্যবহার করছে তার স্বার্থে। এরই মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের এ বিরোধটি জাতিসংঘের সামুদ্রিক বিবাদ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত হয়েছে। ফিলিপাইন এর উদ্যোক্তা। তবে চীন এ শুনানিতে অংশ নেয়নি। চীন আদালতের কর্তৃত্ব মানতে চাইছে না। ফলে বিবাদ নিষ্পত্তি নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই গেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের এ বিরোধ যখন অনিষ্পন্ন, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভিয়েতনামের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলেন। এর ফলে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার অস্ত্র আমদানি শুরু করবে, যা কিনা এ অঞ্চলে এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। অতীতে চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমরা জানি, ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে সেই যুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৩ সপ্তাহ। তখন চীনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামকে সমর্থন করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। আজ যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামকে ব্যবহার করছে চীনের বিরুদ্ধে। প্রেক্ষাপট এক। চীন এ অঞ্চলের তথা বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। অর্থনৈতিক তথা সামরিক দিক দিয়ে চীন অন্যতম একটি শক্তি। তাই ঘুরেফিরে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ‘কনটেইনমেন্ট থিওরি’, অর্থাৎ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলা ও সমাজতন্ত্রের পতন ঘটানোর এ দীর্ঘ ৪৬ বছর লেগেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলতে। আজ চীনকে নিয়ে শুরু হয়েছে ‘খেলা’। চীনের পতন ঘটিয়ে চীনকে ‘কয়েকটি চীনা রাষ্ট্রে’ পরিণত করার লক্ষ্যে নতুন করে ‘কনটেইনমেন্ট থিওরি’ ব্যবহৃত হচ্ছে! সে কারণেই একদিকে ভিয়েতনাম (সেই সঙ্গে ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান), অন্যদিকে ভারত আজ ‘মার্কিনি বন্ধু’, মার্কিনি স্ট্র্যাটেজির অংশ তারা। খুব সঙ্গত কারণেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে ‘নয়া স্নায়ুযুদ্ধ’র এক নয়া রূপ! আর এই নয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্সে ভারত পালন করতে যাচ্ছে একটি বড় ভূমিকা। যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিয়েছে বিশ্বের পরমাণু সরবরাহকারী গোষ্ঠী বা এনএসজিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তির। (৪৮ দেশ এর সদস্য। চীনের আপত্তি আছে ভারতের ব্যাপারে)। মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম বা এমটিসিতে ভারত ঢুকতে চায়। নীতিগতভাবে তাতে সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এতে অত্যাধুনিক মিসাইল টেকনোলজি পাবে ভারত। ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে চায় এফ-১৬, এফ-১৮ জঙ্গি বিমান। এটা স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক এখন অনেক উষ্ণ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি তাতে ভারত পালন করতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। চীনের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামার ভিয়েতনাম সফর কিংবা মোদির ওয়াশিংটন সফর মূলত সবই একই সূত্রে গাঁথা। তাই আগামী দিনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ থাকবে অনেকের। এ অঞ্চলের রাজনীতি, বহিঃশক্তির ইন্ধন নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। হ
Daily Alokito Bangladesh
26.06.16
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব বাড়ছে
19:55
No comments
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের অরল্যান্ডো শহরের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ১৪ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আবারও মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ১৪ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (যা ৯/১১ নামে পরিচিত) টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যে ব্যাপক মুসলমানবিদ্বেষী একটি মনোভাবের জন্ম হয়েছিল, আজ অরল্যান্ডোর ঘটনা সেই পুরনো স্মৃতিকে উসকে দিল। অরল্যান্ডোর একটি সমকামী রেস্তোরাঁয় আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে ৪৯ জন সাধারণ মানুষকে। আর যিনি একাই এই হত্যাকাণ্ড চালালেন, তিনি ওমর মতিন, একজন মুসলমান; কিন্তু আফগান-আমেরিকান নাগরিক। ৯/১১-এর ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত ছিল কট্টরপন্থী সৌদি নাগরিকরা, যারা আল-কায়েদার মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিমান হাইজ্যাক করে টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে দিয়েছিল। আজ অরল্যান্ডোতে যিনি হামলা চালালেন, তিনিও মুসলমান; কিন্তু তিনি তাঁর মুসলিম ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। ৯/১১-এর ঘটনার পেছনে ছিল একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা। কিন্তু অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তি ওমর মতিনের ভূমিকাই প্রধান। এখন পর্যন্ত যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, তিনি নিজেই এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। এখানে মিলটা হচ্ছে ৯/১১-এর সময় জানা গিয়েছিল ওই ঘটনার সঙ্গে আল-কায়েদা জড়িত, আর মতিন নিজে হত্যাকাণ্ড চালানোর আগে তাঁর সঙ্গে আইএস বা ইসলামিক স্টেটের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে গেছেন। অর্থাৎ আইএস এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। কিন্তু তার অতীত ইতিহাস বলে ধর্ম নয়, বরং সমকামীবিরোধিতাই তাঁকে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি উগ্র ইসলামী মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, এমন কোনো তথ্য মার্কিন সংবাদপত্রগুলো আমাদের দিতে পারেনি। তিনি সিরিয়ায় গেছেন, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, এমন তথ্যও নেই। এমনকি তিনি যে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যে সংস্থায় কাজ করতেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির হয়ে কাজ করে। ফলে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, একজন তথাকথিত সন্ত্রাসীকে নিশ্চয়ই তাদের হয়ে কাজ করার সুযোগ দেবে না। ফলে একটা প্রশ্ন এলোই—ওমর মতিন কি কারো ‘হয়ে’ কাজ করেছিলেন? তাঁকে কি কেউ বা কোনো পক্ষে ব্যবহার করেছিল? সামনে নির্বাচন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার জন্যই কি এই হত্যাকাণ্ড? কোনো কিছুকেই অস্বীকার করা যায় না। ৯/১১-এর ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। অনেক প্রশ্নের কোনো জবাব আজও পাওয়া যায়নি। তাই অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ আমেরিকাবাসী জানবে, এই আস্থাটি রাখতে পারছি না। ইতিমধ্যে ফ্লোরিডার প্রসিকিউশনের অফিস থেকে বলা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ বের করতে এক বছরের ওপরে সময় লেগে যাবে। এরই মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা ‘থিওরি’ উঠবে এবং নির্বাচনে কট্টরপন্থীরা এটাকে ইস্যু করে নির্বাচনী হাওয়া তাদের পক্ষে নিতে চাইবে। রাজনীতির মাঠে তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প সোচ্চার। জনমত জরিপ তাঁর পক্ষে না থাকলেও, তিনি আবারও মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। মুসলমানদের তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে চান। এবং মুসলমান অভিবাসীদের জন্য দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে চান! অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তাই বারবার সংবাদপত্রে আসছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে যেন এটাই আলোচনার মূল বিষয়।
অরল্যান্ডোর ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন আইএসের নামটি আলোচনায় এসেছে, ঠিক তেমনি এসেছে ‘রেডিক্যাল ইসলাম’-এর বিষয়টিও। কিছুদিন আগে আইএসের জনৈক মুখপাত্র এই রমজান মাসে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর কথা বলেছিলেন। তখন যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থীরা সেই মুখপাত্রের বক্তব্যটিই সামনে নিয়ে এসেছে। বলার চেষ্টা করেছে, আইএসই অরল্যান্ডোর এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে ওমর মতিনের হামলার আগে পাঠানো বার্তা, যেখানে তিনি আইএসের প্রতি তাঁর আনুগত্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আসলেই কি ওমর মতিন আইএসের সদস্য ছিলেন? যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো গবেষক একাধিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে দেখাতে চেয়েছেন, প্রকৃত অর্থেই ওমর মতিন কোনো সালাফি দর্শনে উদ্বুদ্ধ ছিলেন না। সালাফিস্টরা আদি ইসলাম ধর্মে আস্থাশীল, কট্টরপন্থী এবং ইসলাম প্রবর্তনের প্রথম যুগে যে ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ছিল তা কায়েম করতে চায়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ইসলাম ধর্মে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তা তারা মানতে নারাজ। প্রকৃত অর্থে একজন সালাফিস্ট (আইএস) যেভাবে জীবন যাপন করেন, ওমর মতিন সেভাবে জীবন যাপন করতেন না। যেমন একজন সালাফিস্ট কখনো মদপান করেন না। কিন্তু ওমর মতিন নিয়মিত অরল্যান্ডোর ওই সমকামী ক্লাবে (পালস) খেতেন এবং মদপান করতেন। সালাফিস্টরা কখনো সময় কাটানোর জন্য ‘মদের দোকানে’ আড্ডা দেন না। সালাফিস্টরা সমকামীদের ঘৃণা করেন। কারণ ইসলাম ধর্মে সমকামিতা নিষিদ্ধ। কিন্তু পাওয়া তথ্য মতে, ওমর মতিন সমকামীও ছিলেন। সমকামীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটে এক ধরনের ‘অ্যাপ’ ব্যবহার করে। ওমর মতিন তা-ই করতেন। টিভিতে দুজনের বক্তব্য আমি দেখেছি, যাঁরা বলেছেন ওমর মতিন তাঁদের সঙ্গে ‘সমকামী সম্পর্ক’ স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। সালাফিস্টরা সাধারণত মুখমণ্ডলে দাড়ি রাখেন। এটা এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ওমর মতিন ছিলেন ‘ক্লিন শেভড’। সালাফিস্টরা সাধারণ শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর (লেবানন) সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেন না ধর্মীয় আনুগত্যের কারণে। কিন্তু ওমর মতিনের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, তিনি কোনো এক সময় হিজবুল্লাহ সংগঠনের ব্যাপারে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সালাফিস্টরা সাধারণত তাঁদের স্ত্রীদের ধর্মীয় বিধান মতে পর্দাপ্রথা তথা হিজাব পরতে ‘বাধ্য’ করেন। কিন্তু মতিনের প্রথম স্ত্রী সিতোরা ইউসুফি এবং দ্বিতীয় স্ত্রী নুর সালমান—কেউই হিজাবি ছিলেন না। তিনি তাঁদের পর্দা করতেও বাধ্য করেননি। ধর্ম সম্পর্কে ওমর মতিনের জ্ঞান ছিল সীমিত। শিয়া-সুন্নির পার্থক্য তিনি জানতেন না। নিয়মিত মসজিদে যেতেন কিংবা নামাজ আদায় করতেন, এমন তথ্যও পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে কট্টরপন্থী ইসলামিক গ্রুপগুলোর সঙ্গে তিনি সম্পর্ক রক্ষা করতেন, এমন তথ্যও এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তবে এফবিআই দু-দুবার তাঁর ব্যাপারে তদন্ত করেছে, এমন তথ্য আমরা পেয়েছি এবং দু-দুবারই এফবিআই তাঁকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী মোটিভ কাজ করেছিল? তিনি হতাশাগ্রস্ত, বিকারগ্রস্ত ছিলেন। উগ্র মানসিকতার অধিকারী তিনি ছিলেন। প্রথম স্ত্রীকে তিনি পেটাতেন, এটা স্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন। এ কারণে মাত্র চার মাসের বৈবাহিক জীবন তাঁর ছিল সিতোরা ইউসুফির সঙ্গে। তাহলে শুধু রাগ, ক্ষোভ আর হত্যাশা থেকেই কি তিনি এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিলেন? ওটাও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। শুধু সমকামীবিদ্বেষ থেকে (তাঁর বাবার ভাষ্য মতে) ওমর মতিন এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন? এটাও অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। কেননা তিনি অনিয়মিত ‘পালস’ নামের এই সমকামী ক্লাবে যেতেন, নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষ তাঁকে ব্যবহার করেছে? উদ্দেশ্য ক্লিয়ার—যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবকে আরো উসকে দেওয়া? সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিজয়ী করতেই কি এই হত্যাকাণ্ড? ৯/১১-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আফগানিস্তান, পরে ইরাক দখল করে নিয়েছিল। ২০০১ সালের পর তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই যুদ্ধ চলছে। ফলাফল? আফগানিস্তানে এখনো যুদ্ধ চলছে। গত সপ্তাহেই ন্যাটো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে ন্যাটোর সেনাবাহিনী আরো কিছুদিনের জন্য থাকবে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে সত্য, কিন্তু ইরাক ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে লিবিয়া ও সিরিয়াও। আফ্রিকায় বোকো হারাম, আল-শাবাবের মতো সংগঠনের জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, তার শেষ হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানবিদ্বেষ কিছুটা কমেছে। তখন অরল্যান্ডোর এই হত্যাকাণ্ডে মুসলমানবিদ্বেষ আবার বাড়ল। অরল্যান্ডোর এই হত্যাকাণ্ডে আইএস নতুন একটি মাত্রা পেল। আইএসের কর্মকাণ্ড সিরিয়া-ইরাক ছাড়িয়ে ইউরোপের পর এখন যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রসারিত হলো। আইএস মার্কিন সমাজে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছে, এটা নিয়ে একদিকে বিতর্ক বাড়বে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলমান সমাজে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে আইএস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কী? আমি দুটি সার্ভে রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতে চাই। দুটি সার্ভে রিপোর্টই পিউ (Pew) গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ওয়াশিংটন) থেকে পরিচালিত হয়েছে। পিউ ২০১৫ সালে বেশ কিছু মুসলমানপ্রধান দেশে আইএসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি গবেষণা চালায়। যেমন লেবাননে শতভাগ মানুষ আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। জর্দানে এই সংখ্যা ৯৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৭৯ শতাংশ, ফিলিস্তিনে ৮৪ শতাংশ, তুরস্কে ৭৩ শতাংশ, নাইজেরিয়ায় ৬৬ শতাংশ, বুরকিনা ফাসোতে ৬৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৬৪ শতাংশ, সেনেগালে ৬০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ মুসলমানপ্রধান দেশের মানুষ আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। আবার এসব দেশে আইএসের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ (তুরস্ক), ৪ শতাংশ (ইন্দোনেশিয়া), নাইজেরিয়ায় রয়েছে ১৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১১ শতাংশ, সেনেগালে ১১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ আইএস মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের একটা পরিসংখ্যান দিই। পিউ ২০১৬ সালে এই গবেষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ মানুষ আইএসকে অন্যতম হুমকি হিসেবে মনে করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মনে করে ৭৬ শতাংশ মানুষ। সাইবার আক্রমণকে ৭২ শতাংশ মানুষ হুমকি মনে করে (ইইউয়ের ৫৪ শতাংশ) আর পরিবেশ বিপর্যয়কে হুমকি মনে করে ৫৩ শতাংশ (ইইউ ৬৬ শতাংশ)। পিউয়ের এই গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে আইএসের হুমকিকে তারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ফলে অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ড, আইএসের সংশ্লিষ্টতা যে মার্কিন সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, এটা বলাই বাহুল্য। এর প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে। মসজিদগুলোতে পুলিশি পাহারা বাড়ানো হয়েছে। মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় নজরদারি বেড়েছে। মুসলমানপ্রধান দেশগুলো থেকে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় এক ধরনের পরোক্ষ কড়াকড়ি আরোপ হতে যাচ্ছে। নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প যদি বিজয়ী হন (?), তাহলে দৃশ্যপট বদলে যাবে। মুসলমানরা, বিশেষ করে অভিবাসী মুসলমানরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে। আর রিপাবলিকান আধ্যুষিত অঞ্চলে (যেমন টেক্সাস) তাদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হবে। সুতরাং অরল্যান্ডোর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়।
Daily kalerkonthoteo
23.06.2016
Subscribe to:
Posts (Atom)











