রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন ও অসমতার গল্প

বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সংস্থা জি-২০-এর শীর্ষ সম্মেলন জামার্নির হামবুর্গে শেষ হয়েছে গত ৮ জুলাই। নানা কারণে এবারের শীর্ষ সম্মেলন গুরুত্ব পেয়েছে অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রথমবারের মতো জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিলেন। পুতিনের সঙ্গে তাঁর বৈঠকও হয়েছে প্রথমবারের মতো। কিন্তু বৈঠক হয়নি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের। কিন্তু সব ছাপিয়ে যে বিষয়টি গণমাধ্যমে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অসম অন্যায় বাণিজ্যনীতি আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এই আন্দোলন সহিংসতার রূপ নিয়েছিল হামবুর্গে। বিদেশি গণমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের হাতে প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছিল। তাতে লেখা ছিল—‘ওয়েলকাম টু হেল’, ‘Kapitalism kills’, ‘G-20 welcome 2 HELL’। প্ল্যাকার্ডের আর ফেস্টুনের ভাষা বলে দেয়, বিক্ষোভকারীরা বড় দেশগুলোর অসম বাণিজ্য, করপোরেট হাউসগুলোর একচ্ছত্র ব্যবসা, আর অসমতা জার্মানির মতো একটি পুঁজিবাদী দেশের সমাজেও কিভাবে আঘাত করেছে। এই অসমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে আমরা দেখেছি ‘অকুপাই মুভমেন্ট’-এ। নিউ ইয়র্কের ছোট্ট জুকোটি পার্কে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, সেই আন্দোলন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি সত্য; কিন্তু একটা মেসেজ পৌঁছে দিয়েছিল। বিশ্বের বড় বড় শহরে এই ‘অকুপাই মুভমেন্টের’ জন্ম হয়েছিল। এই মুভমেন্টের টার্গেট ছিল পুঁজিবাদীব্যবস্থা। অসমতা দূর করার দাবি তারা জানিয়েছিল। আজ হামবুর্গে বিক্ষোভকারীরা যখন বড় ধরনের বিক্ষোভের জন্ম দিল, তারা প্রকারান্তরে একটা মেসেজই দিল। আর তা হচ্ছে, অসমতা ও অসম বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের এখনো পরিসমাপ্তি ঘটেনি।

পাঠকদের এখানে জি-২০ দেশগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের ধনী দেশগুলো এই জি-২০-এর অন্তর্ভুক্ত। এ দেশগুলোই বিশ্ব অর্থনীতি, তথা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর অনেক দেশের রাজনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে জি-২০-এর কোনো কোনো দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরিভাবে জড়িত। জি-২০ দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ১০৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার (পিপিপি অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে)। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের (১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার), চীনের (২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন  ডলার) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার) মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তিও রয়েছে। এসব দেশে দুর্নীতি রয়েছে, কর ফাঁকি দেওয়ার কাহিনি রয়েছে। পানামা পেপারসের কর ফাঁকির কাহিনি গেল বছর সারা বিশ্বে বড় ধরনের ঝড় তুলেছিল। ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বের দুর্নীতির কথা বলে। অথচ ওই পানামা পেপারস থেকে জানা গিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি চীনের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাঁরা আছেন, তাঁরা নানা ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ ক্ষমতাসীনরা অন্যত্র পাচার করে দিয়েছেন। ফলে ওই সব সমাজে বৈষম্য ছিল এবং এখনো আছে। চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশেও বৈষম্য আছে। সেখানে ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য আছে। লন্ডনের গার্ডিয়ান (১৩ অক্টোবর, ২০১৫) আমাদের জানিয়েছিল যে বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের কাছে বিশ্বের মোট সম্পদের অর্ধেক এখন কেন্দ্রীভূত। ক্রেডিট সুইসের গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে। অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন কিংবা কর ফাঁকির কারণে বিশ্বে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্বের বর্তমান জনগোষ্ঠী (মার্চ ২০১৬) প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৪বিলিয়ন  জনগোষ্ঠীকে ধরা হয় কর্মক্ষম, যাদের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ডলারের নিচে (৭০ শতাংশ)। বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের হাতে কী পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত, অক্সফাম তার একটি হিসাব দিয়েছে। বিশ্বের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৫০ ট্রিলিয়ন ডলার। এখান থেকে ৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ মাত্র ৩ শতাংশ সম্পদের মালিক ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী। আবার ৩১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ (১২ দশমিক ৫ শতাংশ) রয়েছে এক হাজার তিন মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর কাছে। ১১২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার (৪৫ দশমিক ২ শতাংশ) সম্পদ রয়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৪ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর কাছে, যাদের সবার সম্পদের পরিমাণ ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি করে। এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বিশ্বে ধনী লোকের সংখ্যা বাড়ছে এবং ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য বাড়ছে। আমরা যে পরিসংখ্যান পাই, তাতে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ধনী লোকের বাস যুক্তরাষ্ট্রে। তবে আশ্চর্যের বিষয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী লোকের বাস চীনে। চিন্তা করা যায়? চীন এখনো একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। তবে চীনের রাজনীতিতে প্রয়াত তেং শিয়াও পিংয়ের উত্থানের পর অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এটাকে তারা বলছে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি। এর ফলে চীনে অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো হয়েছে। ব্যক্তি পুঁজির সেখানে বিকাশ ঘটেছে। ফলে হাজার হাজার ধনী ব্যবসায়িক শ্রেণির জন্ম হয়েছে, যারা অসৎ পন্থা অবলম্বন করে ‘ধনী’ হয়েছে। অথচ চীনে দারিদ্র্য আছে। যে ২০টি দেশে ধনী লোকের সংখ্যা বেশি সেখানে প্রতিটি দেশে দারিদ্র্য আছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (১ দশমিক ৯০ ডলার, প্রতিদিন) সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষের (চরম দারিদ্র্য) বাস এশিয়ায়। এমনকি উত্তর আমেরিকায় (যেখানে ধনী লোকের বাস বেশি), সেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ০ দশমিক ৩ মিলিয়ন। ধনী লোকের কাছে ওই যে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত, তা দিয়ে সব ধরনের রোগবালাই দূর করা সম্ভব। ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাথাপিছু পাঁচ ডলার ব্যয়ে বিশ্বের ৪০ লাখ মা ও শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। নিম্ন আয়ের দেশে মা ও শিশুর সেবা পৌঁছে দিতে তাদের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন ৬২০ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাথাপিছু ৬ দশমিক ৭ ডলার। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। সম্পদশালী ব্যক্তিদের সম্পদ আরো বাড়ছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে। আর ধনী ব্যক্তিদের সম্পদকে আরো বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে মোসাক ফনসেকার মতো প্রতিষ্ঠান। যারা থাকছে আইনের ঊর্ধ্বে। তারা সাধারণ কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান নয়। গ্রাহকদের গোপন নথি তারা সুরক্ষা করবে না, এটা বিশ্বাস করা যায় না। সে কারণেই প্রশ্নটা এসে যায়, কোনো বৃহৎ শক্তি কি এর পেছনে আছে? একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ লিখেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক রবার্ট পেরি (Robert Parry)। প্রবন্ধের নাম ‘করাপশন অ্যাজ এ প্রপাগান্ডা উইপন’। এটি ছাপা হয়েছে ‘গ্লোবাল রিসার্চ’-এ ৫ এপ্রিল ২০১৬ সালে। গ্লোবাল রিসার্চ টরন্টোতে নিবন্ধিত একটি গবেষণা সংস্থা। এটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক মিসেল চসুডোভস্কি (Michel Chossudovsky)। বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং তিনি নিজে কাজ করেন। এখানে রবার্ট পেরি দুটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এক. এই গোপন তথ্য ফাঁসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেজিম চেঞ্জ’ (Regime change) বা ‘সরকার পরিবর্তনের’ (বিভিন্ন দেশের) যে ‘নীতি’, তার সঙ্গে একটা মিল থাকতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে কালার রেভল্যুশন’ হয়েছে (জর্জিয়া, কিরঘিজস্তান, ইউক্রেন, এমনকি আরব বসন্তেও), তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ একটা যোগসূত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার’ নামে অর্থ সহায়তা করে থাকে। আমি নিজে ‘আরব বসন্ত’-এর ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, কিভাবে তরুণ নেতৃত্বকে (মিসরের) যুক্তরাষ্ট্র উদ্বুদ্ধ করেছিল মুবারকবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে। ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানোকোভিচ একটি ‘গণ-আন্দোলনে’ উত্খাত হয়েছিলেন ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ক্ষমতায় এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রোসেনকো, যিনি এখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। অভিযোগ আছে, ওই ‘গণ-আন্দোলনের’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল। কেননা যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক, তাতে করে রাশিয়ার সীমান্তে মার্কিনি সেনা মোতায়েন করে রাশিয়াকে একটি স্নায়ুবিক চাপে রাখা যায়। এই ‘আন্দোলন’ সফল হয়েছিল এবং ইয়ানোকোভিচ (যিনি ছিলেন সে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট) অপসারিত হয়েছিলেন। মজার ব্যাপার, ইয়ানোকোভিচ উত্খাত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল শুধু অর্থনীতিতে কিছুটা ‘গতি’ আনার জন্য। অভিযোগ আছে, এই অর্থ প্রেসিডেন্ট প্রোসেনকো আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর নামে টাকা পাচার হয়েছে এবং মোসাক ফনসেকা তাঁকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। প্রশ্নটা এ কারণেই যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যেখানে বেশি (যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই), সেখানে তারা সরকার পরিবর্তন ঘটায়। ইরাক, লিবিয়া এর বড় প্রমাণ। একসময় হোসনি মুবারকের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় আসমা মাহফুজদের (মিসরের তাহরির স্কোয়ার আন্দোলনের নেত্রী) দিয়ে তথাকথিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুরসিকে কিছুদিন ক্ষমতায় রেখে ‘গণতন্ত্র চর্চা’ মিসরে চালু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন সেসব অতীত। ফিল্ড মার্শাল সিসিকে নিয়েই রচিত হবে এখন নয়া স্ট্র্যাটেজি। তাই আমার ধারণা, পারসীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের যে রাজনীতি, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী একটি পরিকল্পনার ফল পাওয়া যায় না। তবে একটি প্রয়াস হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই জি-২০ভুক্ত দেশগুলো প্যারিসে স্বাক্ষরিত জলবায়ু চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই দেশগুলো বলেছে, প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যৌথ ঘোষণায় জলবায়ু চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জি-২০ সম্মেলন শেষ হয়েছে। ট্রাম্প-পুতিন আলোচনায় সিরিয়ার এক অংশে যুদ্ধবিরতিতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। বোধ করি এটাই জি-২০-এর সাফল্য। কিন্তু যে সহিংসতা ও বিক্ষোভ সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল, তা একটি বার্তা দিয়ে গেল ধনী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থেই ‘এক’ থাকবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের সমস্যা, দারিদ্র্য কিংবা বাণিজ্যে সমতা আনা, কোনোটাই তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে না। অতীতেও পায়নি।
Daily Kalerkontho
11.07.2017

যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক কোন পথে


সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে যে ঐতিহাসিক যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন, তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। ২০১৫ সালে ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন; কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিলেন। ট্রাম্প গত সপ্তাহে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রমাণের ক্ষেত্রে নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প ঘোষিত নীতি অনুযায়ী মার্কিন নাগরিকদের কিউবা ভ্রমণ আরও কঠিন পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর আরও কড়াকড়ি ব্যবস্থার আরোপ করা হবে। শীর্ষ স্থানীয় ঔপনাসিক কর্মকর্তারা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন ভ্রমণ ও বাণিজ্যের ফলে মার্কিন অর্থ কিউবার সেনাবাহিনীর হাতে যাচ্ছে। আর তা বন্ধ করতেই তিনি এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন। এই যুক্তি কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা একটি বড় প্রশ্ন এখন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র কিউবা সম্পর্ক একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল এখন। এই অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা সম্পর্ক অনেক দিন ধরেই আলোচনার একটি বিষয়। কিউবা কী আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতি পরিত্যাগ করবে, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও হাভানায় সরকারের উৎখাতের উদ্যোগ নেবে_ এসব প্রশ্ন বার বার মিডিয়ায় ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের লিখনীতে উঠে আসছিল। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বওে পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ধাচের সমাজতন্ত্রের পতনের রেশ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল, তখন বলতে গেলে সারাবিশ্বের দৃষ্টি একরকম নিবদ্ধ ছিল কিউবার দিকে। কেননা কিউবা ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অন্যতম সম্পর্ক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল কিউবার অর্থনীতির অন্যতম উৎস্য এবং সেই সঙ্গে নিরাপত্তার অন্যতম গ্রান্টার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে কিউবা টিকে থাকতে পারবে কিনা- এ প্রশ্নটিও বার বার উচ্চারিত হয়েছিল একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের। আগ্রাসনের মুখে থেকে কিউবা তার অস্তিত্ব টিকে রাখতে পারবে কিনা, এটা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। আরও একটি প্রশ্ন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে আলোচিত হচ্ছিল তা হচ্ছে কিউবা কী আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে? কেননা চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশেও স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সেখানে পরিবর্তন এসেছে। এই দুটি দেশ এখন আর ধ্রুপদি মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। তাই খুব সংগত কারণেই প্রশ্ন ছিল কিউবা চীন বা ভিয়েতনামের পথ অনুসারণ করবে কিনা? কিউবা চীনের মতো সবকিছু উন্মুক্ত করে দেয়নি; কিন্তু সেখানে পরিবর্তন এসেছে।
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ছিল কিউবার নিরাপত্তাহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কিউবার একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকার করে নেয়নি। বরং কিউবায় বিপ্লবের পর (১৯৫৯), কিউবা সরকার যখন ল্যাটিন আমেরিকাজুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চাইল, চে গুয়েভারা যখন 'বিপ্লব' সম্পন্ন করার জন্য কিউবা সরকারের মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে বলিভিয়ায় গেলেন সেখানেই তাকে পরে হত্যা করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের কাছে ভিন্ন একটি বার্তা পেঁৗছে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায়নি তার প্রভাবাধীন এলাকায় অন্য কোনো শক্তি প্রভাব খাটাক।
মনরো ডকট্রিক এর আদলে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে এ এলাকায় তথা ল্যাটিন আমেরিকায় তার পূর্ণ কর্তৃত্ব। কিন্তু কিউবার বিপন্ন যুক্তরাষ্ট্রের এই হিসাব নিকাশ এ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবা বিপ্লবের মাত্র দু'বছরের মাঝে ১৯৬১ সালে ভাড়াটে কিউবানদের দিয়ে কিউবা সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা চালায়। সিআইএর অর্থে পরিচালিত এই অভিযান অব পিগসের অভিযান হিসেবে খ্যাত। বলাই বাহুল্য ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। ঠিক এর পরের বছর ১৯৬২ সালের অক্টেবরে কিউবা সংকট একটি পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করেছে। এটা বিবেচনায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র একটি নৌ-অবরোধ আরোপ করে যাতে করে কিউবায় কোনো ধরনের সামরিক মারণাস্ত্র সরবরাহ করা না যায়। এই নৌ অবরোধ আনেকটা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্ক থেকে তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দীর্ঘ ১৩ দিন এই নৌ অবরোধ বহাল ছিল। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে মিসাইল প্রত্যাহার করে নিলে সোভিয়েত ইউনিয়নও কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে গেলেও সংকট থেকে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে এই অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে কিউবা যুদ্ধ করে আসছিল।
প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্কোন্নয়নেরও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। এটি করা তার জন্য খুব সহজ ছিল না। কেননা ওমাবাকে এ সংক্রান্ত একটি আইন পাস করতে হতো। কিন্তু সমস্যাটা ছিল কংগ্রেসে। তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এখন নিয়ন্ত্রণ করত রিপাবলিকানরা। রিপাবলিকানরা ওবামার উদ্যোগের ব্যাপারে খুশি ছিলেন না। আমি একাধিক কংগ্রেস সদস্য তথা সিনেটরের বক্তব্য দেখেছি, যেখানে তারা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওবামার ওই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। সিনেটর জন ম্যাককেইন ও সিনেটর লিডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামার বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওই সিদ্ধান্ত বিশেষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সংকুচিত করবে। অন্যদিক সিনেটর রয় বস্নান্ট মনে করেন এই ঘোষণা রাউল ক্যাস্ত্রোকে ক্ষমতায় রাখতে সাহায্য করবে। ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর রবাট মেনডেজ মনে করেন প্রেসিডেন্ট ওবামার ওই সিদ্ধান্ত হচ্ছে কিউবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও স্বৈরশাসনকে স্বীকার করে নেয়ার শামিল। সিনেটর মেনডেজ নিজে কিউবান- আমেরিকান। এতে করে যা হবার তাই হয়েছিল_ কিউবার ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো আইনকেই কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি। ফলে ওবামার ঘোষণা ও উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত একটি ঘোষণা হিসেবেই থেকে গিয়েছিল কাগজ কলমে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন এনে তাদের দাবি কিউবায় আরও বেশি গণতন্ত্রায়ন। আরও বেশি অর্থনৈতিক উদারীকরণ। মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও উন্নতি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কার। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে কিউবা সবকিছু উন্মুক্ত করে দেয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভের সংস্কার কর্মসূচির ফলাফল তাদের অজানা নয়। সংস্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, আনতে গিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়েছিল। চীন ও ভিয়েতনামে অর্থনৈতিক সংস্কার এসেছে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার সেখানে আসেনি। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কার কর্মসূচির 'পেরেসক্রোইকা' বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু 'গ্রাসনোস্ট' কার্যকর হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। কিউবাতে কোনোটাই আসেনি। চীন তার সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে এখন ঋণ গ্রহণ করছে। ভিয়েতনামও কম যায়নি। যে ভিয়েতনাম প্রায় ৪০ বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'যুদ্ধ' করেছে, তারাই আজ যুক্তরষ্ট্রের অন্যতম মিত্র। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ব্যয় ৩০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের যে বিশাল চাহিদা আর একটি বড় অংশ ভিয়েতনাম সরবরাহ করছে। এখানে রাজনীতি আগ্রাধিকার পায়নি। পেয়েছে বাণিজ্য। এখন কিউবা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাও দেখার বিষয়। তবে হুট করে দু'দেশের সম্পর্কে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। প্রেসিডেন্ট রাহুল ক্যাস্ত্রো অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন ওবামার ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কিউবার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিউবার জনগণ এখনও কিউবার সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তবে এটাও ঠিক বিশ্বায়নের এই যুগে কিউবা 'একা একা' চলতে পারবে না। দেশটিকে 'দুয়ার উন্মুক্ত' করে দিতে হবেই। দেশের অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ এখনো সরকার নিয়ন্ত্রিত। কিছু কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সারাদেশে এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। বেসরকারি খাত সম্প্রসারনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্যুারিজম খাত। এ খাত কিছুটা উন্মুক্ত করা হয়েছে। আরও উম্মুক্ত করা হলে, যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল চেন ব্যবসায়ীরা ওই খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিউবারত সীমিত আকারে ডলার বাণিজ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানরত কিউবান আমেরিকান পাঠানো অর্থ এখন নিয়মিত কিউবাতে আসছে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে একটা সমস্যা রয়েছে। কিউবা প্রতিদিন এক লাখ ব্যারেল তেল অত্যন্ত কম মূল্যে ভেনিজুয়েলা থেকে পেয়ে আসছে। এর বিনিময়ে কিউবা ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক দিচ্ছে। এইসব ডাক্তার নার্স আর শিক্ষক এখন ভেনিজুয়েলার হয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে কাজ করছে। পুরো ব্যয়বার বহন করছে ভেনিজুয়েলা। প্রয়াত হুগো শ্যাভেজ এই পরিকল্পনা শুরু করলেও বর্তমান প্রসিডেন্ট মাদুরো এই পরিকল্পনা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। কেননা ভেনিজুয়েলার রম রমা তেল ব্যবসার দিন শেষ। অর্থনীতি আগের মতো আর শক্তিশালী নয়। রাজধানী কারাকাসে বিশাল বিশাল ভবন খালি পরে আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসছেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ভেনিজুয়েলার ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আবারও করা হয়েছে। যখন ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্কে উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছেলেন। তার ঠিক একদিন পর ১০ ডিসেম্বর ২০১৫ এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মেনডেজ ভেনিজুয়েলার জনগণের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। গত এপ্রিল থেকেই সেখানে অসন্তোষ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে কিউবা ভেনিজুয়েলা থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাবার সম্ভাবনা কম। এমনি এক পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন। ফলে কিউবা যে নতুন করে সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। দু'দেশের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় রয়ে গেছে। ওবামা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি কিউবাকে রাষ্ট্র পরিচালিত সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে বাদ দেবেন। ট্রাম্প এটি করবেন কি-না, তা নিশ্চিত নয়। দ্বিতীয়ত, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় নেয়া কিউবানদের দেশে ফেরত পাঠাবেন না। এমন একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু ট্রাম্প কী এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখবেন? এমনিতেই ৬টি মুসলমান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ব্যাপারে ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কিছুটা হলেও বিজয়ী হয়েছেন । তখন অবৈধ কিউবানদের ব্যাপারে তিনি যদি সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ট্রাম্প অনেককিছুই বদলে দিতে চান। তার অনেক সিদ্ধান্ত বিশ্বে নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো কিউবা প্রশ্ন। ট্রাম্পের সাম্প্র্রতিক সিদ্ধান্ত রাউল ক্যাস্ত্রোর সরকারেকে একটি 'চাপ'-এর মুখে রাখল। এর ফলে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং ল্যাতিন আমেরিকায় এর প্রভাব আগামীতে বারবার আলোচিত হতে থাকবে।
Daily Jai Jai Din10.07.2017

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও সামাজিক অসংগতি

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সফরের পাশাপাশি হামবুর্গে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এসব সফরের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বহির্বিশ্বে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে, তেমনি মোদি এসব সফরের মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন একটি ‘ধারা’ সৃষ্টি করলেন। বিশেষ করে মোদির ইসরাইল সফর যে কোনো বিবেচনায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও (১৯৯২) এ প্রথম একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরাইল সফর করলেন। শুধু তা-ই নয়, এ সফরে তিনি ফিলিস্তিনি এলাকায় যাননি এবং ফিলিস্তিনি কোনো নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে ভারত অতীতে বরাবরই তাদের পাশে থেকেছে। এ প্রথম ভারত সরাসরি ইসরাইলিদের সমর্থন করল। মোদির এ সফরকে ইসরাইলি নেতৃত্ব যে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা বোঝা যায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রটোকল ভেঙে সরাসরি বিমানবন্দরে গিয়ে মোদিকে অভ্যর্থনা জানানোয়। সেখানে মোদির নামে একটি ফুলেরও নামকরণ করা হয়েছে। মোদিকে নেতানিয়াহু ‘দোস্ত’ হিসেবেও সম্বোধন করেন। মোদির এ সফরে কৃষি, মহাকাশ গবেষণা, সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত সাতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিগত বছরগুলোয় ভারত ও ইসরাইল প্রতিরক্ষা এবং সন্ত্রাস দমনে একসঙ্গে কাজ করে আসছে। বর্তমানে ভারতে তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে ইসরাইল। প্রতি বছর দুই দেশের মাঝে ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবসা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ নেতা ইসরাইল সফরে গেলে রামাল্লায় ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করলেও মোদি তা করেননি। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ভারতের যে সনাতন সমর্থন, তা থেকে ভারত বেরিয়ে এলো। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নতুন দিক। এর আগে মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। ওই সফরও ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ৬ মাসের শাসনামলে মোদিই হচ্ছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সরকারপ্রধান, যিনি হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পেলেন।
মোদির এ দুইটি সফর খোদ ভারতে ও বহির্বিশ্বে যথেষ্ট গুরুত্ব পেলেও অভ্যন্তরীণভাবে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বড় কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেননি। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যা তিনি বন্ধ করতে পারেননি। তার শাসনামলে কৃষকের আত্মহত্যার হার বেড়েছে বৈ কমেনি। এটি অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনা ও বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভারতের সাময়িকী ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত তিনজন দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হন, অথচ এরা জনগোষ্ঠীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ। জাতপাতের সমস্যা ভারতে অনেক বেশি। দীর্ঘ ৬৯ বছরেও এ সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
নিঃসন্দেহে গেল ৩ বছরে মোদি নিজেকে একজন উদ্যমী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলে আদভানির (যিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন) মতো নেতাকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি বড়, তা হচ্ছে তিনি ‘গরিব দেশের ধনী প্রধানমন্ত্রী’। প্রেসিডেন্ট ওবামাকে স্বাগত জানাতে (জানুয়ারি ২০১৫) তিনি ১০ লাখ রুপির স্যুট পরিধান করে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি আসলে ধনী শ্রেণীরই প্রতিনিধি! একসময় যে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি কৈশোরে ট্রেনের কামরায় কামরায় চা বিক্রি করতেন, মা পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন (২০১৫ সালের মে মাসে টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদকের কাছে তা তিনি স্বীকারও করেছেন), সেই মোদির সঙ্গে এখন করপোরেট জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্ক বেশি। ট্রেনে চা বিক্রেতাদের মতো সাধারণ ভারতীয়দের কাছে এখন তিনি ‘অনেক দূরের মানুষ’। তিনি যখন বিদেশ যান, তখন তার সঙ্গে যান ব্যবসায়ীরা, যান করপোরেট হাউসের প্রতিনিধিরা। গেল ৩ বছরে তার শরীরে ১০ লাখ রুপির স্যুট উঠেছে সত্য; কিন্তু দরিদ্র ভারতের চেহারা তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি। কৃষকের আত্মহত্যার প্রবণতা তিনি দূর করতে পারেননি। ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজম প্রোগ্রামের মতে, জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল; আজ তৃতীয় অবস্থানে (সাধারণ নিয়মে এ অবস্থান সপ্তম)। আর গেল বছর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল; তাতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চীনের চেয়ে বেশি হবে। যেখানে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ ভাগ, সেখানে ভারতের হবে ৭ দশমিক ৭ ভাগ। নরেন্দ্র মোদি এ ভারতকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৩৭ ভাগ মানুষ এখনও গরিব। ৫৩ ভাগ জনগোষ্ঠীর কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এই ‘কাজটি’ নিত্যসমাধান করেন। পরিসংখ্যান বলে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। চিন্তা করা যায়, প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায়, ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ৮ সেপ্টেম্বর ২০১০)! ৭ বছর আগের এ পরিসংখ্যানে খুব যে পরিবর্তন এসেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শুধু দারিদ্র্য কেন বলি, প্রায় ৮০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার। ৭০ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেখানে অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৮৬-কে হিসাবে ধরে) ১৪৬, ভারতের সেখানে ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণের এত ঘটনা ঘটার পরও বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে তৈরি ছবি (যা বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি) গুলাব গ্যাংয়ের (উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখ-ে গ্রামের সত্য কাহিনী) কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। মোদি গেল ৩ বছরে এদের জন্য কী করেছেনÑ যদিও মাত্র ৩ বছরে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়, কিংবা বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য চাকরির সংস্থান করাও সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু দারিদ্র্য কমানো তার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তার ‘গুজরাট মডেল’ নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। গুজরাটে তিনি সড়ক-মহাসড়ক করেছেন; কিন্তু সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে গুজরাটে তার আমলে কম ছিল, মাত্র ১৩ দশমিক ৪ ভাগ (২০১২-১৩ সালে আসামে ছিল ২১.১ ভাগ, উত্তরখ-ে ২০.৮ ভাগ, মহারাষ্ট্র ১৯.৮ ভাগ)। শিশুমৃত্যুর হার গুজরাটে হাজারে ৩৮, অথচ কেরালায় ১২, তামিলনাড়– ২১, মহারাষ্ট্র ২১। শিশু জন্ম দেয়ার সময় মাতৃমৃত্যুর হার গুজরাটে ৯.৫, কেরালায় ৩.৩, তামিলনাড়–তে ৫, মহারাষ্ট্র ৫.২। যেখানে গুজরাটে খাওয়ার পানি নিশ্চিত করা হয়েছে জনগোষ্ঠীর ৮৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষের, সেখানে পাঞ্জাবে এ সংখ্যা ৯৭.৬, উত্তর প্রদেশে ৮৭.৮, দিল্লিতে ৯৭.২। পাকা ঘর হরিয়ানায় ৯৪ দশমিক ৮ ভাগ মানুষের, দিল্লির ৯৪.৭, উত্তরখ-ের ৯৩.৯, অথচ গুজরাটে মাত্র ৭৫.৭ ভাগ। ইন্ডিয়ান সেনসাস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা। ফলে ‘গুজরাট মডেল’ কীভাবে সারা ভারতের জন্য একটা মডেল হবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি তিনি গড়ে তুলেছেন গুজরাটে; কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের প্রতি তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এখন এ মানসিকতায় তিনি যদি ভারতকে পরিচালনা করতে চান, তিনি ভুল করবেন। দারিদ্র্য দূর হবে না।
দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা নরেন্দ্র মোদি এখন আর দরিদ্রতম মানুষকে স্মরণ করেন না। কাজপাগলা মানুষ তিনি, সন্দেহ নেই তাতে। মাত্র ৩ ঘণ্টা তিনি ঘুমান এ কথাটা নিজেই স্বীকার করেছেন টাইম প্রতিবেদকের কাছে। ‘কম সরকার, অনেক বেশি প্রশাসন’ এ হচ্ছে তার অ্যাপ্রোচ। তাতে ভারতকে কতটুকু বদলে দিতে পারবেন তিনি? টাইম মোদিকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল। শিরোনাম ছিল Why Modi Matters.মোদি কেন গুরুত্বপূর্ণ? তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলেই গোধরায় ট্রেনে ৫৪ হিন্দু পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে গুজরাটে হাজারের মতো মুসলমান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এবং ওবামা তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় চীনা প্রেসিডেন্ট ছুটে গিয়েছিলেন আহমেদাবাদে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং মাত্র ৩ বছরে শীর্ষ বিশ্বনেতাদের তালিকায় নিজের নামটাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন (টাইম সাময়িকীর মতে, বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী নেতার একজন তিনি)। তাই খুব সংগত কারণেই মোদি বারবার আলোচনায় থাকলেও দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সমাজে যে বৈষম্য, তা দূরীকরণের ব্যাপারে কোনো বড় উদ্যোগ নিতে পারেননি। তাই অসন্তোষ বাড়ছে। মোদির জমানায় দলিত শ্রেণী যে কীভাবে প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইন্ডিয়া টুডের ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলিত শ্রেণীর স্কুল ত্যাগের হার শতকরা ৫০ ভাগ। প্রতিদিন দুইজন করে দলিত ‘খুন’ হচ্ছেন। দুইটি করে বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মোদি নিজে নিম্নশ্রেণী থেকে উঠে এলেও এ শ্রেণীর মানুষের তিনি এখন আর প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি এখন উচ্চশ্রেণীর প্রতিনিধি। ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মোদি বলেছিলেন, তিনি গেল ৩ বছরে দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ উপহার দিতে পেরেছেন! তিনি বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি প্রধান পাহারাদার, দেশের সম্পদের পাহারাদার। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (ভারত নির্মাণ) অভিযানকে অতিরঞ্জিত প্রচার বলে মন্তব্য করা হয়েছে। মোদি সরকারের কাছে বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও কর্মসংস্থানের হাল যথেষ্ট খারাপ বলেও মন্তব্য করেছে তারা। প্রভাবশালী দৈনিক ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে ২০১৫ সালে মোদি সরকারের ১ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতে ‘মোদির ১ বছর উচ্ছ্বাসের পর্ব শেষ, সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ‘ভারতে ১ বছর আগে পরিবর্তন ও আর্থিক পুনরুজ্জীবনের আশায় নরেন্দ্র মোদি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন; কিন্তু এবার চূড়ান্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে মোদি সরকার। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার’ অভিযান শুরু করলেও ভারতের অর্থনীতি খুঁড়িয়েই চলছে। আর নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, মোদির অধিকাংশ কর্মসূচি এখনও কথার কথাই রয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার এখনও বেহাল। ব্যবসায়িক উদ্যোগেও তেমন দানা বাঁধছে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিকভাবেও চাপে পড়েছেন মোদি। সমাজের দলিত শ্রেণী তার ওপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে এখন।
এসব মূল্যায়ন মোদি সম্পর্কে কোনো ভালো ধারণা দেয় না। নিশ্চয়ই গেল ৩ বছরে মোদি অনেক কিছু শিখেছেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, তিনি নিজস্ব একটি স্টাইল তৈরি করেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত একাই নেন। এখানেই মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার পার্থক্য। মনমোহন সিং বেশিমাত্রায় সোনিয়া গান্ধীনির্ভর ছিলেন। নরেন্দ্র মোদির প্লাস পয়েন্ট এটাই। দলে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই। তারপরও তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ আছে। দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এটা কেউ স্মরণ করেন কিনা জানি না, ২০১৫ সালের আগস্টে ভারতের ৬৯তম স্বাধীনতা দিবসে এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি ভারতকে ঘুণপোকার মতো খেয়ে ফেলেছে। উপরের পর্যায় থেকে আমাদের এ কাজ শুরু করতে হবে।’ ভাষণে তিনি কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মাঝে আছে ১ হাজার দিনের মাঝে সব গ্রামে বিদ্যুৎ। তিনি বলেছিলেন, স্ট্যান্ডআপ ইন্ডিয়া। ঘোষণা করেছিলেন নতুন ভারত গড়ার প্রত্যয়। ভারতে জাঠ আন্দোলন এখন তার ‘স্ট্যান্ডআপ ইন্ডিয়ার’ পথে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ভারত পৃথিবীর বড় গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ আর মানুষের মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই, এ ‘সত্যটি’ বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। ভারতে গণতন্ত্র আছে এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এটাও সত্য, সেখানে সমাজে মানুষের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমাজে মাত্র পাঁচ ভাগ মানুষ ব্রাহ্মণ অর্থাৎ তারা কুলিন শ্রেণী। অন্যদিকে নিচু তথা দলিত শ্রেণীর সংখ্যা শতকরা ১৩ ভাগ ও অনগ্রসর শ্রেণীর সংখ্যা ১৩ ভাগ। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণীকে যদি ধরা হয়, তাহলে এ সংখ্যা শতকরা ২৮ ভাগ। দলিতরা সমাজের অনগ্রসর শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত হলেও এই দলিতদের নিয়েই ‘রাজনীতি’ করে অনেকে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগই করেননি, বরং ধনী ব্যক্তিতেও পরিণত হয়েছেন। মায়াবতী এর বড় প্রমাণ। ভারতের রাজনীতিবিদরা তাদের নিজেদের স্বার্থেই এ ‘জাতপাত’ এর ব্যবস্থা স্বাধীনতার এত বছর পরও টিকিয়ে রেখেছেন। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে অঙ্গীকার করেছিলেন, কৃষকের উন্নয়নে তিনি কাজ করবেন; কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি ব্যবসা বোঝেন। তাই ব্যবসার স্বার্থেই তিনি বিদেশে যাচ্ছেন। চীন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং সর্বশেষ ইসরাইল। এতে ভারতকে তিনি অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন; কিন্তু তা উত্তরপ্রদেশের কিংবা ঝাড়খ-ের কৃষকের জন্য কোনো ‘ভালো সংবাদ’ নিয়ে আসতে পারেনি। স্যুটেড-বুটেড হয়ে তিনি যখন ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ছবির পোজ’ দেন, তখন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে উত্তর প্রদেশের এক গ্রামের কৃষকের আত্মহত্যার কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মোদিকে আমি তখন আর মেলাতে পারি না! ২০১৯ সালে সেখানে নির্বাচন। মোদি যদি বিদেশ ভ্রমণের চেয়ে এখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে বেশি নজর দেন, তিনি ভালো করবেন।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সফরের পাশাপাশি হামবুর্গে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এসব সফরের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বহির্বিশ্বে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে, তেমনি মোদি এসব সফরের মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন একটি ‘ধারা’ সৃষ্টি করলেন। বিশেষ করে মোদির ইসরাইল সফর যে কোনো বিবেচনায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও (১৯৯২) এ প্রথম একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরাইল সফর করলেন। শুধু তা-ই নয়, এ সফরে তিনি ফিলিস্তিনি এলাকায় যাননি এবং ফিলিস্তিনি কোনো নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে ভারত অতীতে বরাবরই তাদের পাশে থেকেছে। এ প্রথম ভারত সরাসরি ইসরাইলিদের সমর্থন করল। মোদির এ সফরকে ইসরাইলি নেতৃত্ব যে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা বোঝা যায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রটোকল ভেঙে সরাসরি বিমানবন্দরে গিয়ে মোদিকে অভ্যর্থনা জানানোয়। সেখানে মোদির নামে একটি ফুলেরও নামকরণ করা হয়েছে। মোদিকে নেতানিয়াহু ‘দোস্ত’ হিসেবেও সম্বোধন করেন। মোদির এ সফরে কৃষি, মহাকাশ গবেষণা, সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত সাতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিগত বছরগুলোয় ভারত ও ইসরাইল প্রতিরক্ষা এবং সন্ত্রাস দমনে একসঙ্গে কাজ করে আসছে। বর্তমানে ভারতে তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে ইসরাইল। প্রতি বছর দুই দেশের মাঝে ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবসা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ নেতা ইসরাইল সফরে গেলে রামাল্লায় ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করলেও মোদি তা করেননি। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ভারতের যে সনাতন সমর্থন, তা থেকে ভারত বেরিয়ে এলো। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নতুন দিক। এর আগে মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। ওই সফরও ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ৬ মাসের শাসনামলে মোদিই হচ্ছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সরকারপ্রধান, যিনি হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পেলেন।
Daily Alokito Bangladesh
09.07.2017

কিউবা প্রশ্নে পুরনো বৃত্তে যুক্তরাষ্ট্র?



কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কি আবারও পুরনো বৃত্তে ফিরে যাচ্ছে? দীর্ঘ ৫৪ বছর পর দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কি আবার ভেস্তে যেতে বসেছে? এসব প্রশ্ন উঠেছে এ কারণে যে, অতি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গেল সপ্তাহে তিনি এক নির্বাহী আদেশে তার পূর্বসূরি বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা বাতিল ঘোষণা করেছেন। ফলে কিউবার ওপর বাণিজ্য ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আবার বহাল হয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে খুব নিম্ন পর্যায়ে। তবে কিউবা ভ্রমণের ব্যাপারে ভ্রমণকারীরা কঠোর পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। স্পষ্টতই এর অর্থ পরিষ্কার- দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হল।


বলা ভালো, ওবামা এক ঐতিহাসিক সফরে হাভানায় গিয়েছিলেন ২০১৬ সালের ২০ মার্চ। এর আগে ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করেছিল। ১৯২৮ সালে আমেরিকার ৩০তম প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের (১৯২৩-১৯২৯) পর ওবামা ছিলেন দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট, যিনি কিউবা সফর করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায় কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৬১ সালের ‘বে অব পিগসের’ ঘটনার (ক্যাস্ট্রো সরকারকে উৎখাত চেষ্টা) পর থেকে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ‘চাপ’ ছিল। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ছিল। পুরো স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বারবার উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ উত্তেজনা হ্রাস এবং দু’দেশের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়নের ‘উদ্যোগ’ নিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু সেই উদ্যোগও এখন কাগজ-কলমে থেকে যাচ্ছে। ট্রাম কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। কিউবায় যারা ক্ষমতাসীন, তাদের তিনি আখ্যায়িত করেছেন ‘নিষ্ঠুর কমিউনিস্ট শাসক’ হিসেবে। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, কিউবায় সংস্কার আনতে হবে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে, অবাধ নির্বাচন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে নতুন চুক্তি করবে না আমেরিকা। ওবামা অবশ্য কোনো শর্ত আরোপ করেননি। তবে ট্রাম্প যেসব কথা বলেছেন, বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অবাধ নির্বাচন কিংবা মুক্তবাজারের কথা আমরা ওই সময়েই শুনেছিলাম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কিউবার সমাজতান্ত্রিক সমাজে এসব শর্ত পূরণ করা আদৌ সম্ভব কিনা? ফিদেল ক্যাস্ট্রো মারা গেছেন। আগামী বছর রাউল ক্যাস্ট্রো অবসর নেবেন। কিউবা রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি বটে; কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অর্থাৎ অর্থনীতি ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন এনেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যাপক সংস্কার ছাড়া কিউবার সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কার নয়, বরং আরও অর্থনৈতিক সংস্কার আসবে। ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এসেছে। সোভিয়েত নেতা গরবাচেভ উভয় ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে গিয়ে বড় ‘ভুল’ করেছিলেন। তার ‘পেরেস্ত্রয়কা’কে অনেকেই সমর্থন করলেও ‘গ্লাসনস্ত’কে সমর্থন করেননি। চীনে রাজনৈতিক সংস্কার তথা রুশ ভাষায় ‘গ্লাসনস্ত’ আসেনি। এসেছে ‘পেরেস্ত্রয়কা’ অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংস্কার। ভিয়েতনামেও এসেছে অর্থনৈতিক সংস্কার। ওরা যাকে বলছে ‘দই মই’। বাকি ছিল কিউবা। সেখানে কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার এসেছে। আগামীতেও আসবে। কিউবা এটিকে ঠিক সংস্কার বলছে না। বলছে ‘আপডেট’, যাকে স্প্যানিশ ভাষায় বলা হচ্ছে Lineamientos। এর মাধ্যমে কিউবা বোঝাতে চাইছে, তারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কিছুটা ‘পরিবর্তন’ আনতে চায়। তারা কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কার এনেছে এবং আরও সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন সরকারের কাছে যেসব অব্যবহৃত জমি রয়েছে, তা ‘লিজ’ দেয়া হচ্ছে এবং ১০ বছর পর ওই জমির মালিকানা চলে যাচ্ছে তার কাছে, যিনি ‘লিজ’ নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত খাত উন্মুক্ত করা হচ্ছে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে- ট্যুরিজম, হোটেল ব্যবসা ও ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। তিনটি প্রদেশের (হাভানা, মায়ালেক, আর্টেমিমা) শতকরা ৭০ ভাগ কৃষি জমি বাজার দর অনুযায়ী বিক্রি করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে কৃষি পণ্যের জন্য ‘হোলসেল মার্কেট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৭ লাখ একর জমি ব্যক্তিগত খাতে বিক্রি হয়েছে। কৃষকদের কাছে ওই জমি বিক্রি করার কথা বলা হলেও দেখা গেছে যারা কিনেছেন তাদের মধ্যে শতকরা ৭৭ ভাগের কৃষিকাজে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।

সমাজতান্ত্রিক সমাজেও বেকার আছে, ছদ্ম বেকার আছে, যা সরকারিভাবে স্বীকার করা হয় না। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য কিউবা সরকার সেখানে ‘নিজ উদ্যোগে কর্মসংস্থানে’র একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটাকে তারা বলছে Cuentapropistas। এর মধ্য দিয়ে ১৮ লাখ লোকের (২০১৫) কর্মসংস্থান হয়েছে। ৪৯৮টি সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। আগামীতে এটা আরও তিনগুণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিউবায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ‘ফ্রি’। কর্মক্ষম মানুষ (পুরুষ ৬০, মহিলা ৫৫) অবসর নিতে পারেন। লাতিন আমেরিকায় মানুষের গড় আয়ুর বিচারে কিউবার অবস্থান দ্বিতীয়। সামাজিক খাতে বরাদ্দ থাকে জাতীয় বাজেটের শতকরা ৫৫ ভাগ (এখন ৫১ ভাগ) এবং জিডিপির ৩৭ ভাগ। মাসের নির্দিষ্ট দিনে রেশনেরও ব্যবস্থা আছে। যদিও এখন কিউবা এ রেশনের পরিবর্তে অন্যভাবে মানুষকে রাষ্ট্রীয় সেবা দিতে চাচ্ছে। সরকার প্রতিটি পরিবারকে একটি বাড়ি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেউ ২০ বছর একটি বাড়িতে বসবাস করলে ওই বাড়ির মালিকানা তার হয়ে যায়। তবে বাড়ির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। প্রায় ১০ লাখ ইউনিট বাড়ি করার কথা বলছে সরকার।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছে কিউবা। এজন্য বিশেষ বিশেষ শিল্প এলাকাও প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। একজন বিনিয়োগকারী ৮ বছর ট্যাক্স সুবিধা পাবেন। এখানে কিছুটা সমস্যা আছে। কর্মীদের এক্ষেত্রে বেতন দেবে সরকার। অর্থাৎ কিউবান ‘পেসো’ দিয়ে তাদের মজুরি পরিশোধ করা হবে। কিন্তু সরকার ওইসব বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ‘হার্ড কারেন্সিতে’ অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রায় মজুরি গ্রহণ করবে। কিউবার অর্থ ব্যবস্থায় দু’ধরনের অর্থের প্রচলন আছে- ‘ন্যাশনাল পেসো’ ও ‘কনভার্টেবল পেসো’। দু’ধরনের মুদ্রার মানেরও পার্থক্য রয়েছে। ‘কনভার্টেবল পেসো’র মান কমিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুই মুদ্রার মান এক। তবে ২৫ ‘ন্যাশনাল পেসোর’ বিনিময়ে ১ ‘কনভার্টেবল পেসো’ পাওয়া যায়, যা বিনিময়যোগ্য। অদ্ভুত এ ‘ব্যবস্থা’ একটি জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যায়। সীমিত আকারে ক্রেডিট কার্ডও চালু রয়েছে। অবকাঠামো ক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নয়নও চোখে পড়ে না। কিউবার বৈদেশিক আয়ের একটা বড় অংশ আসে ভেনিজুয়েলা থেকে। ভেনিজুয়েলা ‘বার্টার ট্রেডে’র মাধ্যমে অত্যন্ত কম মূল্যে কিউবাকে জ্বালানি তেল দেয়। বিনিময়ে কিউবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে তা পরিশোধ করে। প্রয়াত ভেনিজুয়েলার নেতা হুগো শাভেজ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য একটি প্রকল্প চালু করেছিলেন অনেক আগে। সেখানে বিপুল পরিমাণ কর্মী দিয়ে কিউবা সাহায্য করছে। তবে ভেনিজুয়েলার অবস্থা বর্তমানে খারাপ। ফলে কিউবাকে দেয়া সেই আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

একসময় মনে করা হতো সমাজতান্ত্রিক সমাজে আদৌ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন চীনের প্রয়াত নেতা দেং জিয়াও পিং। তার একটি বিখ্যাত উক্তি- ‘বিড়াল সাদা কী কালো সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা বিড়াল ইঁদুর মারে কিনা?’ অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক নাকি বাজারনির্ভর সেটি মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে উন্নয়ন। তাই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রেখেই চীনের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। চীনা নেতারা এর সফলতাও পেয়েছিলেন। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি চীন এখন কমিয়ে আনছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের এ আর্থিক ভিত্তির জন্ম দিয়েছিলেন দেং জিয়াও পিং। চীনকে অনুসরণ করে ভিয়েতনামও ‘দই মই’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সেখানে সংস্কার হচ্ছে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক কাঠামোয় (চীন ও ভিয়েতনাম) একদলীয় শাসন বজায় রয়েছে। তবে একটা পরিবর্তন এনেছে চীন- তা হচ্ছে সিনিয়র নেতাদের অবসর। সিনিয়র নেতারা আজীবন তাদের স্ব স্ব ‘পদ’ ধরে রাখতে পারবেন না। রাষ্ট্রপ্রধানরা দু’টার্মের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। এখন কিউবাও এ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। চীন ও ভিয়েতনামে সেনাবাহিনী এখনও পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীনে। পার্টির ‘মিলিটারি কমিশন’ সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করে। চীনা সেনাবাহিনী পার্টির প্রতি অনুগত আছে বিধায় চীন এখনও ভেঙে যায়নি। কিউবায় সেনাবাহিনী এখনও কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি দায়বদ্ধ। কিন্তু ফিদেল ও রাউল ক্যাস্ট্রো-পরবর্তী সেনাবাহিনী কতটুকু দায়বদ্ধ থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিউবা নিয়ে একটা বড় ভয় হচ্ছে, রাউল ক্যাস্ট্রো-পরবর্তী কিউবার নেতৃত্ব কি কোনো ধরনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাবে? অথবা ট্রাম্প প্রশাসন কিউবায় ‘রেজিম চেঞ্জ’ অর্থাৎ সরকারের শীর্ষপদে পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেবে কিনা? মধ্যপ্রাচ্যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এ ধরনের একটি নীতি আছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ওই নীতি বাস্তবায়ন করা যত সহজ ছিল, কিউবায় অত সহজ হবে না। কারণ সেখানে সেনাবাহিনী এখনও পার্টির প্রতি দায়বদ্ধ। মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেলকে কিউবার পরবর্তী নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। তিনি সবার সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারবেন কিনা? এ ক্ষেত্রে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। ২০১৮ সালে সেখানে পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। এ পার্টি কংগ্রেসে যদি তরুণ নেতৃত্ব আসে, তাহলে তারা চীনের মতোই বদলে দিতে পারেন কিউবার সমাজকে।

কিউবার ‘সমাজতন্ত্রের মডেল’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। মানুষ সেখানে অখুশি তা বলা যাবে না। কিন্তু ট্র্যাম্প নতুন করে যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তা এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করবে। আবার নতুন করে ‘মার্কিন আগ্রাসনের’ মুখোমুখি হতে পারে কিউবা! কিউার ওপর যদি অব্যাহত চাপ আসতে থাকে, তাহলে এ অঞ্চলে নতুন করে নতুন রূপে ‘স্নায়ুযুদ্ধের’ সূচনা হতে পারে। কিউবা তার স্বার্থেই আবার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করবে। তাই দেখার বিষয় যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক এখন কোন দিকে যায়।
Daily Jugantor
05.07.2017

ঈদ-পরবর্তী রাজনীতির চালচিত্র


ঈদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। ঈদ করতে রাজনীতিবিদরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলেন। তারা সবাই মোটামুটি এখন ঢাকায়। বাজেটও সংসদে পাস হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ঈদ-পরবর্তী রাজনীতি। কেমন হবে এই রাজনীতি? দুটি বড় দলের মাঝে আস্থাহীনতার যে সংকট রয়েছে, তা কি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব? এসব এখন আলোচনার মূল বিষয়। টিভি টক শোতে ঘুরেফিরে এখন এসবই আলোচিত হচ্ছে। যদিও সব আলোচনা এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। ঈদ-পরবর্তী রাজনীতিতে কতগুলো বিষয় লক্ষণীয়। এক. ৩০ জুলাই থেকে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে। দুই. খালেদা জিয়া লন্ডন যাচ্ছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেই খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করবেন। তিন. নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। আর সরকার কমিশনকে সহায়তা করবে। এটাই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারÑ এ ভাষ্য আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন নেতাদের। মোটামুটি এই তিনটি বিষয় নিয়েই এখন আলোচনা। নির্বাচনের একটি আমেজ আমরা পেতে শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই নৌকার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। আর খালেদা জিয়া একটি অনুষ্ঠানে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মাঝে ১৮ জুন মির্জা ফখরুলের ওপর হামলা হয়েছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। ওই হামলার জন্য বিএনপি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করেছে। আর ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ওটা ছিল ‘নাটক’! এর অর্থ পরিষ্কার, যে আস্থার সম্পর্কের কথা আমরা বলছি, তা তো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। ওবায়দুল কাদের মির্জা ফখরুলের ওপর হামলার পরপরই বললেন, ‘এ ধরনের হামলা অন্যায়। কোনোভাবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারা ওই হামলা চালিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ এই বক্তব্যের দুদিন পরই বললেন, ওই হামলা ছিল একটা নাটক। দুটো বড় দল যখন নির্বাচনে আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন এ ধরনের হামলা অনাকাক্সিক্ষত। সব দলের অংশগ্রহণে একটা নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপির এজেন্ডা আছে। এজেন্ডা আছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিরও। এই তিনটি দলই নির্বাচনে এক একটি ফ্যাক্টর। বিএনপি সহায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে খালেদা জিয়া নির্বাচনে যেতে চান না। কিন্তু নির্বাচন হবে তো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ও সংবিধানের অধীনে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলেও সরকার নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে, যেমনটি করেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। বিএনপি এখন একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলছে। কিন্তু এর রূপরেখা এখন অবধি উপস্থাপন করেনি। তবে সেই রূপরেখা সরকার যে মানবে, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। মোটামুটিভাবে যেভাবেই হোক, একটি নির্বাচনী আমেজ ফিরে এসেছে। টিভি টক শোতেও দেখলাম এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি নিজেও একাধিক টক শোতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, দিন যত যাচ্ছে খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজার বিষয়টি অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজা নিয়ে মন্তব্য করেন, তখন বুঝতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। যদিও এটা আইনের বিষয়। আদালত ও উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা আগাম মন্তব্য করে বিষয়টিকে উসকে দিলেন মাত্র। আসলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হোক, এটা আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান। আরেকটি ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো নির্বাচন হোকÑ আমরা তা কেউই চাই না। বিদেশিরাও তা চান না। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) আমাদের জন্য কোনো সুখকর দিন ছিল না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন নিয়ে দুটো বিষয় ছিল। এক. সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, দুই. বাস্তবতা। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করার প্রয়োজন ছিল। এটা নিয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আস্থার সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ২০১৪-পরবর্তী যে কোনো সময় একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা, যেমনটি করেছিল বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ (যে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।) কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বারবার আলোচিত হতে থাকবে। ষষ্ঠ সংসদে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। আর দশম জাতীয় সংসদে বিএনপি অংশ নেয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় দুটি নির্বাচনেরই প্রয়োজন ছিল। তবে তুলনামূলক বিচারে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে বেশি। ১৫৪টি সংসদীয় আসনে (৩০০ আসনের মাঝে, আওয়ামী লীগের ১২৮, ওয়ার্কার্স পার্টির ২, জাসদ ৩, জাপা-মঞ্জু ১, জাতীয় পার্টি-এরশাদ ২০) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া, ৫ জেলায় কোনো নির্বাচন না হওয়া কিংবা ৫২ ভাগ জনগোষ্ঠীর ভোট না দেওয়ার সুযোগ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। এটা নিয়ে যে যুক্তিই আমরা টিভির টক শোতে দেখাই না কেন, এতে করে দেশে কোনো আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) এই আস্থার সম্পর্ক ছিল বিধায় আমরা দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী এনে দেশে পুনরায় সংসদীয় রাজনীতির ধারা প্রবর্তন করেছিলাম। সেদিন বিএনপি সংসদীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ধারণা করেছিলাম ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে পারছি বলে মনে হচ্ছে না। মির্জা ফখরুলের ওপর হামলা হচ্ছে সর্বশেষ উদাহরণ, যেখানে আস্থার ঘাটতি আমরা দেখতে পেলাম। শুভবুদ্ধির যে কোনো মানুষ স্বীকার করবেন, এটা অন্যায়। ওই ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন (তাদের মিছিল করা ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে), তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে এ ধরনের দু-একটি ঘটনায়। ইতোমধ্যে ১৪ দলের বৈঠকে সরকারের নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে শরিকদের অসন্তোষের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে (কালের কণ্ঠ, ৩ জুলাই)। প্রশাসনে সেবার মান, চালের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি আলোচনা করে বলা হয়, ‘এটা (চালের মূল্যবৃদ্ধি) নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা। নির্বাচনের আগে এসব ঘটনা ভোটের ওপর প্রভাব ফেলবে’ (ঐ)। গত ২ জুলাই শরিক দলের সভায় এ ধরনের যেসব কথাবার্তা হয়, তা একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। চালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে কতটুকু প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী, কতটুকু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা দায়ী, এগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। না হলে তা ভোটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ চালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি জড়িত। চালের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর একটা কথাÑ চালের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে কিন্তু কৃষকরা উপকৃত হন না। উপকৃত হন মিলমালিকরা, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। আশার কথা, চাল আমদানি হয়েছে এবং দ্রুত চালের ঊর্ধ্বমূল্যের পতন ঘটেছে। নির্বাচনের বাকি আছে ১৮ মাস। জানুয়ারি (২০১৯) অথবা ডিসেম্বরে (২০১৮) নির্বাচন হবে। এটাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এই সময়সীমায় দুটি বড় দলই তাদের নিজ নিজ এজেন্ডা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাবে। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের এজেন্ডাকে প্রাধান্য দেবে। পদ্মা সেতুর মতো সাফল্য, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, রিজার্ভ বাড়ানো ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলোÑ নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সমাধান হবে কীভাবে? নির্বাচন কমিশন তত্ত্বগতভাবে স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ডিসি, এসপিরা থাকার কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। নির্বাচন নিয়ে আরেকটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটুক আমরা তা চাই না। সবাই নির্বাচনে অংশ নিক। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা গেছে বটে, কিন্তু দেশে নির্বাচনী সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটেছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটা কোনো ভালো খবর নয়। দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। আমরা ইতোমধ্যে একটি হাস্যাস্পদ সংসদের জন্ম দিয়েছি। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের আসনে আছে বটে। আবার তারা মন্ত্রীও হয়েছেন। পার্টিপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দলের ওপর কর্তৃত্ব আছে বলে মনে হয় না। ফলে জাতীয় পার্টি বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা হয়নি। এ কারণে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদে থাকা দরকার। না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। গত তিন বছরে অনেক জাতীয় ইস্যু সংসদে আলোচিত হয়নি। অনেক সময় সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ বসেনি। এর অর্থÑ অনেক সংসদ সদস্যই সংসদীয় কার্যক্রমের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন সেই ‘পরিস্থিতি’ থেকে ফিরে আসতে হবে। বিএনপি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। কেননা এই সংসদ নির্বাচনে (একাদশ জাতীয় সংসদ) বিএনপি অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। উপরন্তু নেতাকর্মীদের স্থানীয়ভাবে ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার স্বার্থেও বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া জরুরি। তাই বিএনপির জন্য একটি ‘স্পেস’ দরকার। তবে বড় কথা হলো, আমাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিএনপি নিঃসন্দেহে এখন যথেষ্ট দুর্বল। মামলা-মোকদ্দমা আর কোর্টে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে তাদের দিন যাচ্ছে। সিনিয়র অনেক নেতা এখন আর সক্রিয় নন। কোনো বড় আন্দোলনও তারা গড়ে তুলতে পারছেন না। তার পরও বিএনপির একটা বড় জনসমর্থন আছে। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই নির্বাচনে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। হুদা কমিশনের ব্যাপারে বিএনপির যত রিজার্ভেশনই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনের প্রশ্নে এই হুদা কমিশনের সঙ্গেই বসতে হবে বিএনপিকে। বিএনপি বড় দল। হুদা কমিশন নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবে। ফলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির একটা ভালো ‘ডায়ালগ’ প্রয়োজন। সাধারণ ভোটাররা একটা ভালো নির্বাচন চায়। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে, এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। তাই কোন দল আগামী ৫ বছরের জন্য কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে, তা বিবেচনা করার সুযোগ দিতে হবে ভোটারদের। বিএনপি একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করুক। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বিরাজমান সমস্যাগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করতে চায়, তার পরিকল্পনা উপস্থাপন করুক। আমরা যারা আমজনতা, আমরা চাই সেই পরিকল্পনা দেখে আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। ২০১৪ সাল আসবেই। কিন্তু আমরা তা ভুলে যেতে চাই। তাকাতে চাই সামনের দিকে। ২০১৪ সালের জানুয়ারির ঘটনা দিয়ে সবকিছু বিচার করতে চাই না। তাই সুযোগ এসেছে আরও একবার। একটি সমঝোতা হোক। গড়ে উঠুক আস্থার সম্পর্ক।
Amader Somoy
04.07.2017

মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রসঙ্গ কথা


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করেছেন। ওবামা প্রশাসনের আমলে তিনি এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফর করলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ছয় মাসের মধ্যে তিনিই দক্ষিণ এশিয়ার সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি, যিনি ওয়াশিংটন সফর করলেন। এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হলো, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রশাসন ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে যে নীতি প্রণয়ন করেছিল, তা ট্রাম্প প্রশাসন অব্যাহত রাখল। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই, বারাক ওবামা দু-দুবার ভারত সফর করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ওই সময়। শুধু তা-ই নয়, ওবামা তাঁর সর্বশেষ সফরে (জানুয়ারি ২০১৫) ভারতের ‘রিপাবলিকান ডে’র অনুষ্ঠানে মার্চপাস্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওবামার সঙ্গে প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ভারতে এসেছিলেন। ভারত একটি বিশাল বাজার। অনেক আগেই ভারত দেশটির অর্থনীতি ‘ওপেন’ করে দিয়েছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা প্রবেশ করতে চায়। এরই মধ্যে আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠান ভারতে ‘ব্যবসা’ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এই সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেয়, এটা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, এ সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয়রা ট্রাম্পের প্রচারণায় কয়েক মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল। তখনই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে তিনি আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করার মাত্র ছয় মাসের মাথায় মোদি যখন রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রিত হন, তখনই এটা নিশ্চিত হয়ে যায় এই সম্পর্ক আগামী দিনে আরো উন্নত হবে। মোদির এই সফরে অনেক প্লাস পয়েন্ট আছে। এক. তিনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের আগেই হোয়াইট হাউসে দাওয়াত পেলেন। এটা মোদির কূটনৈতিক বিজয় এবং পাকিস্তানের জন্য এক ধরনের ‘কূটনৈতিক পরাজয়ের’ শামিল। দুই. গত ২৬ জুন হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় সন্ত্রাস দমন তথা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করছে। যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, পাকিস্তান যেন সন্ত্রাসীদের তার মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে আক্রমণ চালাতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত এবং সেখান থেকেই তারা ভারতে আক্রমণ চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এটা এখন স্বীকার করে নিল। পাকিস্তানে গঠিত ও প্রশিক্ষিত দুটি জঙ্গি সংগঠন ‘জইশ-ই-মোহাম্মদ’ ও ‘লস্কর-ই-তৈয়বা’র ব্যাপারে ও তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে—এ কথাও যৌথ বিবৃতিতে আছে। উপরন্তু কাশ্মীরের জঙ্গি নেতা তথা ‘হিজব-উল মুজাহিদীন’-এর নেতা সৈয়দ সালাউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে এটা ভারতের ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্বীকার করে নিয়েছে। তিন. মোদির ওয়াশিংটন সফর ও ট্রাম্প-মোদি যৌথ বিবৃতি পাকিস্তান সমালোচনা করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যারা কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন করে, তাদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। ’ এর অর্থ পরিষ্কার, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে!
সন্ত্রাস দমনে ভারতের অবস্থান এখন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সমর্থিত হওয়ায় বিশ্বে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো এবং পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল হলো। পাকিস্তান যে সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়, তা-ও এখন ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিল। চার. ভারত এখন ২.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্রয় করবে। এর মধ্যে ড্রোন বিমানও আছে। ভারত যুক্তি দেখিয়েছিল, ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করার জন্যই এই ‘ড্রোন বিমান’ ব্যবহৃত হবে। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তপ্রতিযোগিতা বাড়বে। পাকিস্তান এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকবে। তারাও বিভিন্ন সূত্র থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করবে। এরই মধ্যে চীন পাকিস্তানে ১০০ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে বলে ঘোষিত হয়েছে। পাঁচ. মোদির এই সফর ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চীনও ভালো চোখে দেখবে বলে মনে হয় না। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে একটা প্রশ্নের মুখে আছে। ব্রিকস ও ব্রিকস ব্যাংক গঠিত হওয়ার পর একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে ভারত ও চীন যৌথভাবে বিশ্ব আসরে কাজ করবে। বিশেষ করে মার্কিনি আগ্রাসন ও মার্কিনি স্বার্থের বিরুদ্ধে চীন ও ভারত (সেই সঙ্গে রাশিয়া) একসঙ্গে কাজ করবে এবং মার্কিনি স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করবে। কিন্তু ট্রাম্প মোদিকে এই অ্যালায়েন্স থেকে বের করে আনতে পেরেছেন কি না, সেটাই দেখার বিষয় এখন। এর মধ্যেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীন-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। মোদি যখন ওয়াশিংটনে তখন চীন-ভারত সীমান্তে কিছুটা উত্তেজনা লক্ষ করা গেছে। সিকিমের সীমান্তরেখা অতিক্রম করে চীনা সেনারা ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত দুটি বাংকার গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, চীন তিব্বতের নাথুলা মাস দিয়ে ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মানস সরোবরে যাওয়ার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে প্রতিবাদপত্রও পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা প্রভাব কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দিনে ভারতকে ব্যবহার করতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলো ও সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের বিরোধ রয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতীয় নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধজাহাজ সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের গভীর সমুদ্রে ভারতীয় কম্পানি তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। ভারতীয় এসব কর্মকাণ্ড চীন ভালোভাবে নেয়নি। অন্যদিকে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচি ভারত সমর্থন করেনি। এই মহাপরিকল্পনায় বিশ্বের ৬৫টি দেশ অংশ নিলেও ভারত যোগ দেয়নি। এই মহাপরিকল্পনার একটি অংশ হচ্ছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর, যা চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সাগরকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। ভারত এ ব্যাপারে তার আপত্তি জানিয়েছে। কেননা এই অর্থনৈতিক করিডরের একটি অংশ পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের ওপর দিয়ে গেছে, যা ভারত তার নিজের এলাকা বলে মনে করে। ট্রাম্প প্রশাসন চীন-ভারত দ্বন্দ্বকে নিজের কাজে লাগাতে চায়। ছয়. মোদির এই সফরে আফগান ইস্যুতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত আফগানিস্তানে একটি ‘বড় ভূমিকা’ পালন করুক। আফগান স্ট্র্যাটেজিতে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসঙ্গে কাজ করবে। এর ফলে আফগান সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, তা একটা প্রশ্ন হয়েই রইল। কেননা আফগান ইস্যুতে পাকিস্তানকে যদি অন্তর্ভুক্ত করা না যায়, তাহলে আফগান সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এতে সংকট আরো বাড়বে। পাকিস্তান তালেবানদের সঙ্গে একটি ‘সংলাপ’-এর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থেমে গেছে। উপরন্তু তালেবানদের পাশাপাশি সেখানে ইসলামিক স্টেট-এর জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতাও বাড়ছে। ফলে আফগান ইস্যুতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কতটুকু ফল দেবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন।
মোদির ওয়াশিংটন সফর নিঃসন্দেহে ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য। ট্রাম্প মোদির এই সফরকে দেখছেন তাঁর ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি মোদির কাছে ভারতের বাজার আরো উন্মুক্ত করে দিতে বলেছেন, যাতে মার্কিন বিনিয়োগ আরো বাড়ে। ট্রাম্প বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথাও বলেছেন। বলা ভালো, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অনুকূলে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র ভারতে রপ্তানি করেছে সাত হাজার ৬৯৪.৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ আমদানি করেছে ১৫ হাজার ১৪০.৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য ঘাটতি (চার মাসে) সাত হাজার ৪৪৫.৯ মিলিয়ন ডলার। যদি ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান দিই, তাতে দেখা যায় এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৩৮০.১ মিলিয়ন ডলার (২০১৫ সালে এই ঘাটতি ছিল ২৩ হাজার ৩৩৭.১ মিলিয়ন ডলার)। একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেবেন, এটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন ট্রাম্প। ‘ফরবিস’ যে ১৫টি দেশকে বিনিয়োগের জন্য ‘উত্তম’ বলে বিবেচনা করছে, ভারত তার অন্যতম। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলো ভারতে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
বলা হয়, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের একটা কৌশলগত দিক রয়েছে। ওবামা প্রশাসনের আমলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। এই চুক্তিবলে উভয় দেশ তার নিজ দেশের সামরিক ঘাঁটি অন্য দেশকে ব্যবহার করতে দেবে। এর অর্থ হচ্ছে, আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পারসীয় অঞ্চলের সংকটে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিকভাবে জড়িত হয়, তাহলে ভারতীয় বিমান ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী রিফুয়েলিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। অতীতে চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে (নভেম্বর ১৯৯০-জুন ১৯৯১) ভারত এই অধিকার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু বিতর্ক ওঠায় পরে তা বাতিল করা হয়। মোদি সরকার আবার এই সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। ২০০৮ সালে বিগত ইউপিএ সরকার চুক্তিটি স্বাক্ষর করলেও মোদি সরকারের সময় এটি অনুমোদিত হয়। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতে একটি পারমাণবিক চুল্লি বসাবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকাজে ব্যবহৃত হবে। একটি বীমা তহবিলও গঠন করা হবে। ওবামা প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে ভারত ছোট আকারের ‘সাভেন মিনি’ নামে ছোট ড্রোন বিমান তৈরি করবে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি অতি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তিবলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিস টাটা কম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ভারতে F-16 বিমান নির্মাণ করবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত অংশীদার’। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগর ক্রমান্বয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের ‘মুক্তার মালা’ স্ট্র্যাটেজির (String of Pearls) আওতায় চীন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এখানে গাওদার সমুদ্রবন্দর চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চীনা বাহিনীর ছোট্ট ইউনিট রয়েছে, যা ভারত মহাসাগরের নৌ-মুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে চীন শ্রীলঙ্কা সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। বেশ কয়েকটি বন্দরে রয়েছে চীনা উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে, তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে টিকফা চুক্তি করেছে। এখন ‘আকসা’ চুক্তি করতে চাচ্ছে। ট্রাম্প-মোদি যৌথ বিবৃতিতে ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ দমনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার’ কথা বলা হয়েছে। ফলে এই তথাকথিত ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’ দমন আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ এর বাইরে থাকবে না।
মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হলো। এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও সেই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার বিষয় এখন।
Daily Kaler Kontho
04.07.2017

সৌদি আরব কি আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?





পরস্যীয় অঞ্চলে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে কাতারের যে দ্বন্দ্ব সে দ্বন্দ্ব কী শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে কাতার আক্রমণ করতে উদ্বুদ্ধ করবে? ঈদের আগে একটি ১৩ দফা দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই ১৩ দফা মানতে হবে। না মানলে কী হবে এটা বলা হয়নি। তবে সৌদি আরব কর্তৃক কাতার আক্রমণের একটি সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই এই ১০ দিনের আলটিমেটাম শেষ হবে। তখন কী হবে? অনেক সম্ভাবনা এখানে আছে। ১. সৌদি আরব সীমিত পাল্লার বিমান আক্রমণ চালাতে পারে, ২. সৌদি আরব তার নেতৃত্বাধীন যে সামরিক জোটটি রয়েছে, তা ব্যবহার করতে পারে, ৩. ইতিমধ্যে যে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে তাতে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে; ৪. সৌদি আরব বিষয়টি জাতিসংঘে তুলতে পারে এবং জাতিসংঘ কর্তৃক কাতারের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ এবং পরবর্তীতে একটি শান্তিরক্ষা বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিতে পারে; ৫. 'রিজেন চেঞ্জ'-এর উদ্যোগ নিতে পারে সৌদি আরব। এক্ষেত্রে মার্কিন সহযোগিতা পাবে কাতার। এই পাঁচটি 'অপশনে'র কোনটি সৌদি আরব নেবে বলা মুশকিল। তবে সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব যে আরও ঘণীভূত হবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এখানে বলা ভালো যে, ১৩টি শর্ত দেয়া হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্তাবলি হচ্ছে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন, আলজাজিরা টিভি স্টেশন বন্ধ, ব্রাদারহুড, হামাসের মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন, তুরস্কের সেনা ঘাঁটি বন্ধ, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি। তবে এসব দাবি কাতার মানবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দোহা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তার আগে কাতারের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তুরস্ক সেনা ঘাঁটি প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তুরস্ক ও কুয়েত মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। এই মধ্যস্থতার আদৌ কোনো ফল দেবে কিনা বলা মুশকিল। ইতিমধ্যে কুয়েত ও তুরস্কের নেতা সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। সৌদি আরব এর আগে ইয়েমেনের সঙ্গে এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইয়েমেনে 'হুথি' বিদ্রোহীদের ওপর সৌদি বিমান হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, এটা বলা যাবে না। এই 'হুথি' বিদ্রোহীদের সমর্থন করছে ইরান। হুথিরা মূলত শিয়া ধর্মাবলম্বী। ইরান এদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। ফলে এখানেও সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায়।
তাহলে পারস্যীয় উপমহাসাগরের রাজনীতি এখন কোন পথে? সেখানে আরেকটি যুদ্ধ কী আসন্ন? সৌদি আরবসহ উপমহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন এবং সেই সঙ্গে মিসর, ইয়েমেন এবং মালদ্বীপ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। রমজান ও ঈদের পরও কাতারে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি সেখানে দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে এবং সম্ভাব্য একটি যুদ্ধের সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। অতীতেও পারস্যীয় অঞ্চলে যুদ্ধ হয়েছে। পাঠক মাত্রই স্মরণ করতে পারেন ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম গালফ যুদ্ধ হয়েছিল। ইরাক ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে কুয়েত দখল করে নিলে কুয়েতের সমর্থনে এবং জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৩৯টি দেশের সেনাবাহিনী দখলদার ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে উৎখাত করেছিল। ওই যুদ্ধে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয় গালফ যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালের মার্চে। এবার ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ইরাকের কাছে মারণাস্ত্র রয়েছে, যা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরাক দখল করে নিয়েছিল। এর পরের কাহিনী আমরা সবাই জানি। সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে ইরাক আজ বাহ্যত তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সেখানে জন্ম হয়েছিল ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি সংগঠনের, যারা সিরিয়ার একটি অংশ দখল করে সেখানে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। সেখানে দীর্ঘদিন যাবত এক ধরনের অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে এবং আইএসকে সেখান থেকে উৎখাত করা যায়নি। এখন যে প্রশ্নটি খুব সহজেই করা যায় তা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উত্থানকে কেন্দ্র করে সেখানে যে 'যুদ্ধ' চলছে, তা কী এখন গালফ অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে? একটি সৌদি-কাতার যুদ্ধ কী আসন্ন? আর যদি 'যুদ্ধ' আদৌ শুরু হয় তাহলে বিশ্ব রাজনীতি কোনদিকে যাবে? আর বাংলাদেশের অবস্থানই বা কী হবে? এ বিষয়ে আলোচনার আগে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন তা হচ্ছে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে হঠাৎ এই দ্বন্দ্ব কেন? এই দ্বন্দ্বের পেছনে সৌদি আরবের যুক্তি হচ্ছে কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড ও হামাসের মতো ইসলামিক সংগঠনগুলোকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে আসছে, যা সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এর পেছনে কিছুটা হয়ত সত্যতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যা সত্য, তা হচ্ছে ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্ব কে দেবে, এ নিয়ে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে এক ধরনের 'সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা' চলছে। সৌদি আরবে দুটি পবিত্র মসজিদ রয়েছে_ আল মসজিদ আল হারাম (মক্কা শরিফ) ও আল মসজিদ আল নববী (মদিনা শরিফ)। বিশ্বের সব মুসলমানের জন্য এই মসজিদ দুটি পবিত্রতম স্থান। আর সৌদি বাদশাহ হচ্ছেন এই মসজিদ দুটির জিম্মাদার। এর মধ্যদিয়ে সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দাবিদার। মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন, মুসলিম বিশ্বের দরিদ্রতা দূর করার জন্য যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব সৌদি আরব যেমন পালন করে আসছে তেমনি যখন ইসরায়েলি বোমায় ফিলিস্তিনের গাজা শহর (২০১৪) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল তখন অন্যান্য মুসলিম বিশ্ব তথা ওআইসির যে 'ভূমিকা' পালন করার কথা ছিল তা তারা করেনি। এখানে এগিয়ে এসেছিল কাতার। কাতারের বর্তমান যে শাসক তার একটি আলাদা 'এপ্রোচ' রয়েছে। যদিও সৌদি অর্থনীতি আর কাতারের অর্থনীতি_ একসঙ্গে মেলানো যাবে না। সৌদি অর্থনীতি অনেক বড় ও অনেক শক্তিশালী। এই বিশাল অর্থনীতি বিশ্বের দরিদ্রতম মুসলমান বিশ্বের জন্য তেমন ব্যয় হয় না। সুতরাং এমনি এক পরিস্থিতিতে যদি সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে বিরোধ বাঁধিয়ে দেয়া যায় তাহলে এ থেকে ফায়দা নিতে পারবে ইসরায়েল। ইনন পরিকল্পনায় এমনটিই ছিল। মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভেদ ও সংঘাত লাগিয়ে রাখা। আর চূড়ান্ত বিচারে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র তৈরি করা। মুসলমান বিশ্ব যত বেশি বিভক্ত থাকবে তত বেশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল হবে। একসময় একটি বৃহত্তর ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠিত হবে এবং ইসরায়েলের স্বপ্ন সফল হবে। তাই এ অঞ্চলের প্রতিটি উত্থান-পতনের সঙ্গে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার একটি যোগসূত্র আছে। অতি সম্প্রতি ইরানি পার্লামেন্টে ও ইমাম খোমেনির মাজারে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে ইরান এর জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করলেও এর পেছনে মূলত রয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি সৃষ্টি করা ও এ অঞ্চলে নতুন একটি 'ফ্রন্ট' ওপেন করে উত্তেজনা জিইয়ে রাখা এবং ইরানকে উসকে দেয়া। ইরানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে 'স্ট্রেইট অব হরমুজ' যে প্রণালি দিয়ে পারস্যীয় উপসাগরের তেল বহিঃবিশ্বে যায়। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয় তার ২০ ভাগ এই পথে পরিবাহিত হয়, যার পরিমাণ ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রতিদিন)। সুতরাং এ অঞ্চলে যে কোনো দ্বন্দ্বে এই জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে। অন্যদিকে কাতারে রয়েছে বিশ্বের বড় গ্যাস রিজার্ভ। প্রতিমাসে বিশ্বে যে পরিমাণ তরল গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি হয় তার মধ্যে কাতার একাই সরবরাহ করে ৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। কাতারের এলএনজি ও পাইপ লাইনে বরবরাহকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল আরব আমিরাত। এমনকি ভারত, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া কাতার থেকে এলএনজি ক্রয় করে। এই এলএনজি সরবরাহে যদি বিঘ্ন ঘটে তাহলে বিশ্বে উত্তেজনা বাড়বে। কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক ও ইরান। একমাত্র সীমান্ত বন্দর (সৌদি আরবের সঙ্গে) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তুরস্ক সেখানে খাদ্য ও সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনিতেই সেখানে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আগামীতে কী হবে সেটাও দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে পারস্যীয় উপসাগরে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। এই উত্তেজনা সৌদি-কাতারকে কোনো ধরনের 'যুদ্ধের' দিকে ঠেলে দেবে না এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। কেননা কোনো যুদ্ধই এ অঞ্চলের জনগণের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সমাধান ও মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন কুয়েতের আমির। আমরা বিশ্বাস করি সৌদি ও কুয়েতের নেতৃত্বের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু যে প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে উত্থাপিত তের দফার কী হবে? আলজাজিরা আরব বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে আমি নিজে আলজাজিরা নিয়মিত দেখতাম। এখন তা যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কাতার আলজাজিরা বন্ধ করে দেবে এটা মনে হয় না। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি লবি চাচ্ছে আলজাজিরা বন্ধ হোক। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত এ ফাঁদে পা দিল মাত্র। তুরস্ক তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেবে এটা মনে করারও কোনো কারণ নেই। তুরস্ক সেটা স্পষ্ট করেছে। কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড কিংবা হামাসের মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে আনতে পারে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও নিম্ন পর্যায়ে রাখতে পারে। এতে করে একটা 'স্ট্যাটাস কো' বজায় থাকতে পারে। তবে বলাবাহুল্য এ অঞ্চলে উত্তেজনা থাকবে। সৌদি আরব চাচ্ছে তার নেতৃত্বে যে সামরিক জোটটি গঠিত হয়েছে, তাতে কাতার আর্থিকভাবে আরও ব্যাপক অংশ নিক। প্রিন্স সালমান, যিনি এখন ভবিষ্যৎ সৌদি রাজা। মাত্র ৩১ বছর বয়স তার। তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবেন। তার নিজস্ব কিছু চিন্তাধারা আছে। তিনি শুধু ইরানের কাছ থেকেই সম্ভাব্য একটি 'আক্রমণ' আশা করছেন। তার ভয় ইরানকে নিয়ে, কাতারকে নিয়ে নয়। তাই সামরিক জোটকে তিনি ন্যাটোর আদলে গড়ে তুলতে চান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরও সমর্থন রয়েছে তাতে। আজকে এই যে সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব তার পেছনে কাজ করছে এই সমীকরণটি_ কাতারকে চাপে রেখে সুবিধা আদায় করে নেয়া। তাই সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে যুদ্ধ হয়ত হবে না এবং কাতার হয়ত শেষ অবধি কোনো না কোনো সৌদি ফর্মুলায় রাজিও হয়ে যেতে পারে। জুলাই মাসে পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেয় সেটাই আমাদের দেখার বিষয়।
Daily Jai Jai Din03.07.2017

পারস্য উপসাগরীয় সংকটের সমাধান কোন পথে


তাহলে যুদ্ধ কি আসন্ন? সৌদি আরব এরই মধ্যে ইয়েমেনে হুথিগোষ্ঠী, যা শিয়া তথা ইরান সমার্থিত, নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বোমা বর্ষণ করে সেখানে একটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করেছে। এখন কুয়েতে আগ্রাসন চালিয়ে দ্বিতীয় আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করতে চাইবে না খুব সহজেই। কিন্তু ইসরাইলি ও আমেরিকান লবির চাপে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত কী করে, বলা মুশকিল। সৌদি আরব এরই মধ্যে মুসলমানপ্রধান দেশগুলো নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করেছে (বাংলাদেশ এর সদস্য)। মজার ব্যাপার, কাতার ও তুরস্ক ওই জোটের সদস্য। অথচ এ সংকটে তুরস্কের অবস্থান কাতারের পক্ষে। সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বৃহৎ শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সৌদি আরবের পক্ষে। অন্যদিকে রাশিয়া সমর্থন করছে কাতারকে। আর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান কাতারের পক্ষে। ফলে একটি যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় (?), তাহলে ইরান জড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। সেখান থেকে প্রতিদিন ১৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। বিশ্বে যে জ্বালানি তেল সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়, তার ২০ ভাগ এই ‘স্ট্রেট অব হরমুজ’ থেকে পরিবাহিত হয়। এখন ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ড যদি এ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা বিশ্বে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলই যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধের অনুমোদন দেবে কিনা? যুদ্ধ না হলেও এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। একদিকে সিরিয়া সংকটের যখন কোনো সমাধান হয়নি, তখন সৌদি-কাতার যুদ্ধ নতুন আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ হলো। সৌদি লবি এখন যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তার অনেকগুলোই কাতারের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়ার দাবি উঠেছে। এটা কাতার করবে না। আলজাজিরা যেসব প্রতিবেদন সম্প্রচার করে, তা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং মিসরবিরোধী। ফলে এ দেশগুলো এ সম্প্রচার চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। এটা কাতার বন্ধ করবে না। তুরস্কের সেনাঘাঁটি বন্ধ করার দাবি উঠেছে। তুরস্ক কাতারের নিরাপত্তা দিচ্ছে এবং কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই কাতার এটিও চাইবে না। হামাস ও ইসলামিক ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কাতার হয়তো কিছুটা নমনীয় হতে পারে। এ ব্যাপারে কাতার চায় একটি ‘ডায়ালগ’, অর্থাৎ আলাপ-আলোচনা। আরব লিগ অথবা জিসিসি এ উদ্যোগটি নিতে পারে। একটা কথা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন আর তা হচ্ছে, যদি কাতারের ওপর ‘চাপ’ অব্যাহত রাখা হয়, তাহলে কাতার বেশি মাত্রায় ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কাতার-ইরান-রাশিয়া-তুরস্ক একটি সামরিক জোট গঠিত হলেও আমি অবাক হব না।
সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, এ মুহূর্তে তা বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কাতারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক সেখানে ৫০০ সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোন কোন মার্কিন সাময়িকীতে কাতারে ‘রেজিম চেঞ্জ’ এর আভাস দেয়া হয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা (?) নিয়ে কাতারের শাসনকর্তা আমির তামিম বিন হামাদ আল থানিকে উৎখাত করতে পারে! তবে বিষয়টি অত সহজ নয়। তুরস্কের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি আমিরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তবে আল থানি পরিবার, যারা ১৯৭২ সাল থেকে কাতার শাসন করে আসছেন, এ পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ১৯৯৫ সালের জুনে বর্তমান শাসক তামিম বিন হামাদ তার বাবা আমির খলিফাকে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে’র মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা নিজের হাতে করায়ত্ত করেছিলেন। এখন পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে কিনা, সেটাও বলার বিষয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মাঝে বিবাদ ও সংঘাত সমগ্র মুসলিমবিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কুয়েতি আমিরের দূতিয়ালিও ব্যর্থ হয়েছে। কোনো ফল তাতে পাওয়া যায়নি। কাতারের আমিরের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের পর ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি জানিয়েছেন, তার দেশ কাতারের পাশে থাকবে। ফলে পরিস্থিতি জুলাই মাসে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
পারস্য উপসাগরে জিসিসিভুক্ত চারটি দেশের সঙ্গে কাতারে দ্বন্দ্বের সমাধান হবে কোন পথে? সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এ অঞ্চলের দিকে। সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের যুদ্ধ হবে কি হবে না, এ নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম এখন ‘অতি উৎসাহী’। এরই মধ্যে ১৩ দফা দেয়া হয়েছে কাতারকে এবং সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ১০ দিন। এ ১০ দিন শেষ হয়ে যাবে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই। তারপর কী? অনেক প্রশ্ন এখন সামনে। এ ১৩ দফা বাস্তবায়নে সৌদি আরব-আরব আমিরাত লবি কি কাতারকে বাধ্য করাতে পারবে? সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারকে কোনো অংশেই মেলানো যাবে না। সৌদি আরব অনেক বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। উপরন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বে রয়েছে একটি সামরিক জোট। প্রিন্স সালমান, যিনি এখন সৌদি আরবের দেশরক্ষামন্ত্রী, তিনি কি এই সামরিক জোটকে কাতারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। এরই মধ্যে ওই সংকটের নেপথ্যে ‘নায়ক’ হিসেবে ইসরাইলের নাম কোনো কোনো পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসরাইল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ সংকটে জড়িয়ে গেছে। ইসরাইলের উদ্দেশ্য হচ্ছে আরব দেশগুলোর স্বীকৃতি, ন্যূনতম অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটা মদদ আছে এই সংকটে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ট্রাম্প মে মাসে তার প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানে আরব-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে অস্ত্র বিক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই সম্মেলনে তিনি হামাস ও ইসলামিক ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় কাতারের সমালোচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে ইরানেরও সমালোচনা করেছিলেন। এর পরপরই পারস্য উপসাগরে এ সংকটের জন্ম হয়। অথচ সৌদি আরব ও কাতার উভয় রাষ্ট্রই ইসলামিক ঐক্য সংস্থা ও জিসিসির সদস্য। এ সংকট শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। কিংবা ওআইসি ও জিসিসি একটি উদ্যোগ নিতে পারত; কিন্তু তা হলো না। দিন যতই যাচ্ছে ততই সংকটের গভীরতা বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে ওই সংকট যদি বাড়ে, যদি আদৌ একটি ‘যুদ্ধ’ শুরু হয়ে যায়, তাহলে লাভ হবে কার? কাতার, সৌদি আরব কিংবা আরব আমিরাত কোনো দেশেরই লাভ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্পষ্ট করে বলা যায়, এতে লাভ হবে ইসরাইলের। পাঠকদের এ প্রসঙ্গে ইনন পরিকল্পনা (Yinon Plan) সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চাই। যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে অনেক রাষ্ট্র ভেঙে যাবে। আর তাতে লাভ ইসরাইলের। কট্টরপন্থী ওদেদ ইনন (Oded Yinon)  ১৯৮২ সালে বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসে ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বৃহত্তর ইসরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এ পরিকল্পনায় বৃহত্তর ইসরাইলি রাষ্ট্রটি হবে একদিকে নীল নদ, অন্যদিকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। একই সঙ্গে বর্তমানে এ অঞ্চলে যেসব রাষ্ট্র রয়েছে, তা ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিভিত্তিক ও নৃতাত্ত্বিক একাধিক রাষ্ট্র হবে। ওই রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মে মাসে রিয়াদে আরব-আমেরিকান সম্মেলনে যোগদান, সৌদি আরবের সঙ্গে ১১ হাজার ডলারের অস্ত্রচুক্তি স্বাক্ষর, তার ইসরাইল সফর, কাতারের সঙ্গে কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সম্পর্কছেদ, কায়রোয় গোপনে সিসি-নেতানিয়াহু সাক্ষাৎ মূলত সব একই সূত্রে গাঁথা। কাতারে ক্ষমতার পরিবর্তন ও কাতারের বিশাল গ্যাস রিজার্ভের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিশ্বের তৃতীয় বড় গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে কাতারে (রাশিয়া ও ইরানের পর) কাতারের ডলফিন পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস আরব আমিরাতে সরবরাহ করা হয়। এ গ্যাস দিয়ে আরব আমিরাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আরব আমিরাত চায় কম মূল্যে এ গ্যাস। ইউরোপেও যায় কাতারের গ্যাস। কাতার তার গ্যাস দিয়ে এলএনজি তৈরি করে, যা বিশ্বে রফতানি করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে কাতার থেকে এলএনজি কেনার জন্য একটি চুক্তি করেছিল। এখন সমুদ্রেও কাতারি গ্যাস রফতানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, কাতারের অর্থনীতিতে ধস নামানো। মাত্র ২৬ লাখ লোকের দেশ কাতার, যে লোক সংখ্যার একটা বড় অংশ আবার পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশ থেকে যাওয়া। আদি কাতারিরা মূলত সরকারি কাজ করেন। আধাদক্ষ জনগোষ্ঠী কাজ করে কনস্ট্রাকশন সেক্টরে, যার শতভাগ উপমহাদেশের মানুষ। অথচ কাতারের জিডিপির পরিমাণ ৩৫৩ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯৪ ডলার, যা সৌদি আরবের চেয়ে বেশি (৫৫ হাজার ২২৯ ডলার)। এ সংকটের পেছনে কাতারের জ্বালানি সম্পদ এবং কাতারের বিশাল অর্থনীতি একটা ফ্যাক্টর। বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে কাতারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ (বিশেষ করে ইসরাইলি স্বার্থ) আদায় করার একটি ‘উদ্যোগ’ আমরা আগামীতে লক্ষ করব। যুক্তরাষ্ট্র কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে এবং জাতিসংঘকেও বাধ্য করতে পারে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে ইসরাইল। এক তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন কংগ্রেসে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা সম্পর্কিত একটি বিল জমা দেয়া হয়েছে। বিলটি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসে’র কমিটিতে জমা দেয়া হয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রেসপনসিভ পলিটিকস’ (ওয়াশিংটন) এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব কংগ্রেস সদস্য এ বিল উত্থাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তারা ২০১৬ সালের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের সময় প্রত্যেকে ইসরাইলি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১০ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ ডলার ‘সাহায্য’ পেয়েছেন। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসির পক্ষ থেকেও ওইসব কংগ্রেসম্যানকে আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়েছে। ক্রিড নিউটন ‘ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউসে’ যে প্রবন্ধটি লেখেন (জুন ১২, ২০১৭), তাতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসে’র ফরেন রিলেশন্স কমিটির সদস্য কংগ্রেসম্যান এড রয়েস ও এলিয়ট অ্যাঙ্গেল একেকজন প্রায় ২ লাখ বা তারও বেশি অর্থ ‘গ্রহণ’ করেছেন। এর অর্থ পরিষ্কার একটি সৌদি-ইসরাইল-আরব আমিরাত লবি চাচ্ছে, কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হোক। তারা এজন্য ওয়াশিংটনে ‘লবিজ ফার্ম’ও নিয়োগ করেছে। কাতারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি আনা হয়েছে, অর্থাৎ কাতার সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছে, তার পেছনে সত্যতা কতটুকু এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড, হামাস কিংবা হিজবুল্লাহ গ্রুপকে সমর্থন করছে, এর পেছনে সত্যতা আছে। এখানে সমস্যাটা মূলত ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, সৌদি আরব না কাতারের হাতে সমস্যাটা মূলত সেখান থেকেই শুরু। সাম্প্রতিকালে মুসলিমবিশ্বের যে সংকট, সে সংকটের সমাধানের ব্যাপারে সৌদি আরব কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। হামাস ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং তাদের নেতৃত্বে একটি সরকারও গঠিত হয়েছিল, যা ইসরাইলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। গাজা নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। আর ইসরাইলি ট্যাংক এবং বিমান যখন গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল, তখন এগিয়ে এসেছিল কাতার। এমনকি সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া সংকটেও কোনো সৌদি ভূমিকা ছিল না। আফ্রিকার মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর দারিদ্র্য (সুদান, দারফুর, সাদ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া) দূরীকরণে সৌদি আরবের কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেই। অথচ সৌদি আরবের অর্থনীতি ১ দশমিক ৮০৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। এ অর্থ সৌদি রাজপরিবারের শত শত প্রিন্স ও প্রিন্সেস নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাস ও কাজে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে কাতারের তরুণ আমিরের নিজস্ব একটি চিন্তাভাবনা আছে। ২০১২ সালে কাতার প্রায় ১০০টি দেশে, যার মাঝে মুসলমানপ্রধান দেশ বেশি, ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল যাতে এ গরিব দেশগুলো এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে। কাতার একটি ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও (আয়তন ১১ হাজার ৫৮৬ বর্গকিলোমিটার) সুদান-সাদ দ্বন্দ্বে, সুদানের দারফুর সংকটে, জিবুতি-ইরিত্রিয়া দ্বন্দ্বে এবং আফগানিস্তানের তালেবান সংকটে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছেÑ যা সৌদি আরবের নীতিনির্ধারক, বিশেষ করে যুবরাজ প্রিন্স সুলতানের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে মুসলিমবিশ্বে সৌদি আরবের গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নের মুখে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সংকটের গভীরতা বেড়েছিল। এখানে বলা ভালো, সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের যুদ্ধ এই প্রথম নয় এর আগেও ১৯৯২ সালে, ২০০২ সালে ও ২০১৪ সালে সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিল এবং দোহা থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন।
Daily Alokito Bangladesh
02.07.2017

পারস্য উপসাগরে সংকটের নেপথ্যে

পারস্য উপসাগরীয় সংকটের নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়েছে। কাতারের সঙ্গে জিসিসিভুক্ত চারটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন এবং কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার পর এখন জিসিসি বা গালফ সহযোগিতা সংস্থার ওই চারটি দেশের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে এবং সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ দিন। এই দাবিগুলো কাতারকে মানতে হবে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আলজাজিরা টিভি বন্ধ করা, ইরান তথা হামাস ও ইসলামিক ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইত্যাদি। এখন যে প্রশ্নটি অনেকেই করেন, তা হচ্ছে সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বে লাভবান হচ্ছে কে? এর জবাব দেওয়ার আগে কয়েকটি তথ্য আমরা উল্লেখ করতে পারি। এক. একটি গণমাধ্যম (Ahlul Bayt News Agency, June 22, 2017 ) আমাদের খবর দিয়েছে, ইরান-সৌদি সংকট সৃষ্টি হওয়ার পর জুন মাসে ১৮টি ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেখানে পুরো আরববিশ্ব ইসরায়েলি আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে, সেখানে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের নেতার দাবিদার ও গুরুত্বপূর্ণ দুটি মসজিদের (মসজিদ আল হারাম, মক্কা শরিফ ও মসজিদ আল নববী, মদিনা শরিফ) জিম্মাদার সৌদি রাজবংশ রক্ষায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত আমাদের অনেক চিন্তার মাঝে ফেলে দেয়। দুই. যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাধর্মী একটি জার্নালের (Oriental Review. Org June 21, 2017) একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের গোপন আলোচনা চলছে এবং নীতিগতভাবে অনেক ক্ষেত্রে তারা ঐকমত্য পোষণ করেছে। যেহেতু ইসরায়েল ও সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রধান শত্রু হচ্ছে ইরান, সেহেতু ইসরায়েলের যেমনি প্রয়োজন রয়েছে সৌদি সাহায্যের, ঠিক তেমনি সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে সম্ভাব্য ইরানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম একটি নীতি হচ্ছে, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত মে মাসে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর এ লক্ষ্যেই রচিত হয়েছিল। ইসরায়েল সৌদি আকাশসীমানা তার বিমান সংস্থা ঊখঅখ-এর জন্য ব্যবহার করতে চায়। এ নিয়েও আলোচনা চলছে। সৌদি আরব ২০০২ সালে ইসরায়েলের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যদি ইসরায়েল অধিকৃত আরব এলাকা ফিরিয়ে দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করে, এর বিনিময়ে সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে। সৌদির এই প্রস্তাব আরব লিগও অনুমোদন করেছিল। তিন. সৌদি রাজপরিবারের এক সন্তান প্রিন্স খালিদ বিন ফারহান আল সৌদের একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে (মিডল ইস্ট মনিটর)। ওই বক্তব্যে প্রিন্স ফারহান দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমানকে রাজা হিসেবে দেখতে চায়। প্রিন্স ফারহানের সঙ্গে অবশ্য বর্তমানে সৌদি রাজপরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। চার. ইসরায়েল ইনন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কট্টরপন্থি ওদেদ (Oded Yinon ) ১৯৮২ সালে বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসে ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বৃহত্তর ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এই পরিকল্পনায় বৃহত্তর ইসরায়েলি রাষ্ট্রটি হবে একদিকে নীলনদ অন্যদিকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সঙ্গে বর্তমানে এ অঞ্চলে যেসব রাষ্ট্র রয়েছে, তা ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিভিত্তিক ও নৃতাত্ত্বিকভিত্তিক একাধিক রাষ্ট্র হবে। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মে মাসে রিয়াদে আরব-আমেরিকান সম্মেলনে যোগদান, সৌদি আরবের সঙ্গে ১১ হাজার ডলারের অস্ত্রচুক্তি স্বাক্ষর, তার ইসরায়েল সফর, কাতারের সঙ্গে কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সম্পর্কচ্ছেদ, কায়রোতে গোপনে সিসি-নেতানিয়াহু সাক্ষাৎ মূলত সবই একটি সূত্রে গাঁথা। কাতারে ক্ষমতার পরিবর্তন ও কাতারের বিশাল গ্যাস রিজার্ভের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্বের তৃতীয় বড় গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে কাতারে (রাশিয়া ও ইরানের পর)। কাতারের ডলফিন পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস আরব আমিরাতে সরবরাহ করা হয়। ওই গ্যাস দিয়ে আরব আমিরাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আরব আমিরাত চায় কম মূল্যে এই গ্যাস। ইউরোপেও যায় কাতারের গ্যাস। কাতার তার গ্যাস দিয়ে এলএনজি তৈরি করে, তা বিশ্বে রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে কাতার থেকে এলএনজি কেনার জন্য একটি চুক্তি করেছিল। এখন সমুদ্রেও কাতারি গ্যাস রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই কাতারের অর্থনীতিতে ধস নামানো। মাত্র ২৬ লাখ লোকের দেশ এই কাতার, যে লোকসংখ্যার একটা বড় অংশ আবার পাক-ভারত-বাংলাদেশ থেকে যাওয়া। আদি কাতারিরা মূলত সরকারি কাজ করেন। আদা দক্ষ জনগোষ্ঠী কাজ করে কনস্ট্রাকশন সেক্টরে। যার শতকরা একশ ভাগ উপমহাদেশের মানুষ। অথচ কাতারের জিডিপির পরিমাণ ৩৫৩ দশমিক ১৪৩ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯৪ ডলার, যা কিনা সৌদি আরবের চেয়ে বেশি (৫৫ হাজার ২২৯ ডলার)। এই সংকটের পেছনে কাতারের জ্বালানিসম্পদ এবং কাতারের বিশাল অর্থনীতি একটা ফ্যাক্টর। বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে কাতারের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ (বিশেষ করে ইসরায়েলি স্বার্থ) আদায় করার একটি ‘উদ্যোগ’ আমরা আগামীতে লক্ষ করব। যুক্তরাষ্ট্র কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে এবং জাতিসংঘকেও বাধ্য করতে পারে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে ইসরায়েল। এক তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন কংগ্রেসে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা সম্পর্কিত একটি বিল জমা দেওয়া হয়েছে। বিলটি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস’-এর কমিটিতে জমা দেওয়া হয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রেসপনসিভ পলিটিক্স’ (ওয়াশিংটন)-এর তথ্য অনুযায়ী যেসব কংগ্রেস সদস্য এই বিল উত্থাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তারা ২০১৬ সালের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের সময় প্রত্যেকে ইসরায়েলি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১০ লাখ ৯৭৯৬ ডলার ‘সাহায্য’ পেয়েছেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসি’র পক্ষ থেকেও ওইসব কংগ্রেসম্যানকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। ক্রিড নিউটন ‘ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউসে’ যে প্রবন্ধটি লেখেন (জুন ১২, ২০১৭) তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের ফরেন রিলেশন্স কমিটির সদস্য কংগ্রেসম্যান এড রয়েস ও এলিয়ট এঙ্গেল এক একজন প্রায় ২ লাখ বা তার ওপরে অর্থ ‘গ্রহণ’ করেছেন। এর অর্থ পরিষ্কার একটি সৌদি-ইসরায়েল-আরব আমিরাত লবি চাচ্ছে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হোক। তারা এ জন্য ওয়াশিংটনে ‘লবিজ ফার্ম’ও নিয়োগ করেছে। কাতারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি আনা হয়েছে অর্থাৎ কাতার সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছে। তার পেছনে সত্যতা কতটুকু, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড, হামাস কিংবা হিজবুল্লাহ গ্রুপকে সমর্থন করছে এর পেছনে সত্যতা আছে। এখানে সমস্যাটা মূলত ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, সৌদি আরব না কাতারের হাতে সমস্যাটা মূলত সেখান থেকেই শুরু। সাম্প্রতিককালে মুসলিম বিশ্বের যে সংকট, সেই সংকটের সমাধানের ব্যাপারে সৌদি আরব কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। হামাস ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং তাদের নেতৃত্বে একটি সরকারও গঠিত হয়েছিল, যা ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। গাজা নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। আর ইসরায়েলি ট্যাংক এবং বিমান যখন গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল, তখন এগিয়ে এসেছিল কাতার। এমনকি সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া সংকটেও কোনো সৌদি ভূমিকা ছিল না। আফ্রিকার মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর দরিদ্রতা (সুদান, দারফুর, সাদ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া) দূরীকরণে সৌদি আরবের কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেই। অথচ সৌদি আরবের অর্থনীতি ১ দশমিক ৮০৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। এই অর্থ সৌদি রাজপরিবারের শত শত প্রিন্স ও প্রিন্সেস নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাস ও কাজে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে কাতারে তরুণ আমিরের নিজস্ব একটি চিন্তাভাবনা আছে। ২০১২ সালে কাতার প্রায় ১০০টি দেশে যার মধ্যে মুসলমানপ্রধান দেশ বেশি ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল, যাতে করে এই গরিব দেশগুলো এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে। কাতার একটি ছোট্ট দেশ হওয়া সত্ত্বেও (আয়তন ১১ হাজার ৫৮৬ বর্গকিলোমিটার) সুদান-সাদ দ্বন্দ্বে, সুদানের দারফুর সংকটে জিবুতি-ইরিত্রিয়া দ্বন্দ্বে এবং আফগানিস্তানের তালেবান সংকটে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা সৌদি আরবের নীতিনির্ধারক, বিশেষ করে যুবরাজ প্রিন্স সুলতানের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এতে করে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নের মুখে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সংকটের গভীরতা বেড়েছিল। এখানে বলা ভালো, সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের দ্বন্দ্ব এই প্রথম নয়। এর আগেও ১৯৯২, ২০০২ ও ২০১৪ সালে সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিল এবং দোহা থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। সৌদি আরব-কাতার দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, এই মুহূর্তে বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক সেখানে ৫০০০ সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো কোনো মার্কিন সাময়িকীতে কাতারে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর আভাস দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা (?) নিয়ে কাতারের শাসনকর্তা আমির তামিম বিন হামাদ আল থানিকে উৎখাত করতে পারে। তবে বিষয়টি তত সহজ নয়। তুরস্কের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি আমিরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তবে আল থানি পরিবার যারা ১৯৭২ সাল থেকে কাতার শাসন করে আসছে, এই পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ১৯৯৫ সালের জুন মাসে বর্তমান শাসক তামিম বিন হামাদ তার বাবা আমির খালিফকে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্র’-এর মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা নিজের হাতে করায়ত্ত করেছিলেন। এখন পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখার বিষয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে বিবাদ ও সংঘাত সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে কুয়েতি আমিরের দূতিয়ালিও ব্যর্থ হয়েছে। কোনো ফল তাতে পাওয়া যায়নি। ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাতারের আমিরের টেলিফোন আলাপের পর ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি জানিয়েছেন, তার দেশ কাতারের পাশে থাকবে। ফলে পরিস্থিতি জুলাই মাসে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে এটা তো ঠিক, এই সংকটের মধ্য দিয়ে বড় লাভ হলো ইসরায়েলের। আরববিশ্বের কোনো দেশকে নিয়ে ইসরায়েলের ভয় নেই। তার একমাত্র ভয় ইরানকে নিয়ে। কেননা ইরানের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি রয়েছে এবং যেটা আশঙ্কা করা হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সমঝোতা ভেঙে পড়বে, এখন সেটাই হতে যাচ্ছে। কোনো আরব বা মুসলিম দেশের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি থাকুক, এটা ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের কাম্য নয়। তাই ইরানের সঙ্গে আরববিশ্বের বিবাদ লাগিয়ে দিয়ে ইরানবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায় ইসরায়েল এবং তাতে সে সফলও হয়েছে। বর্তমান সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বের একটি দিক হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অবস্থান। এই সুযোগে ইসরায়েল আরববিশ্বকে তার পতাকাতলে নিয়ে আসবে। আরববিশ্বকে বাধ্য করবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে। এই সংকটে ইসরায়েলের আরেকটি লাভ হলো। মিসরের সানাফি দ্বীপটি এখন দিতে হবে সৌদি আরবকে। এতে করে আকাবা উপসাগরকে মিসরের আঞ্চলিক জলের উৎস থেকে আন্তর্জাতিক পানির উৎসে পরিণত হবে, যা ইসরায়েলি প্রকল্পে পানি সরবরাহ করতে পারবে। তাই অঙ্কের হিসাবটা যদি মেলানো যায় তাহলে দেখা যাবে সৌদি-কাতার সংকটের নেপথ্যে ছিল ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসন। সংকট সৃষ্টি করে ইসরায়েল সুবিধা নিতে চায়। তবে ইরান ও তুরস্কের বলিষ্ঠ ভূমিকা পরিস্থিতিকে কোনদিকে নিয়ে যায় সেটাই দেখার বিষয়। এ সংকট থেকে যে আরববিশ্ব আদৌ লাভবান হবে না, তা বলাই বাহুল্য
Daily Amader Somoy
29.06.2017

একটি অশনিসংকেত



বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার ওপর হামলা হয়েছে এমন একটি সময়ে যখন খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো এক ইফতার অনুষ্ঠানে ‘ধানের শীষ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রী সুইডেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক অনুষ্ঠানে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মির্জা ফখরুল ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলা আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। নির্বাচনের বাকি আছে আরও অনেকটা সময়। এখনই যদি মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদের মতো শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলা হয়, তাহলে সামনের দিনগুলো নিয়ে মানুষ আতঙ্কে থাকবেই। এ হামলা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা অন্যায়। এই হামলায় কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে আমি স্বাগত জানাই। তবে তার বক্তব্য যেন শেষ পর্যন্ত কাগজ-কলমেই থেকে না যায়।

‘সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন’ দরকার। ২০১৪ সালের জানুয়ারির ‘সিনড্রম’ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? বিএনপি উত্থাপিত নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে একটা সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে আছে। জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় খালেদা জিয়া জেলে যেতে পারেন, এরকম একটা সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ। নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হতে পারে, এটাও সম্ভব। আবার বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখনও শত শত মামলা আছে- এটাও বাস্তব। তবে খালেদা জিয়া যখন ‘ধানের শীষ’-এর পক্ষে ভোট চান, তখন তো মেসেজটি স্পষ্ট- বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে যখন ‘আস্থার সম্পর্ক’ গড়ে তোলাটা জরুরি, তখন মির্জা ফখরুল আর আমীর খসরু মাহমুদের ওপর হামলা হল। এটা কোনো ভালো খবর নয়। আমাদের তা নানা চিন্তার মাঝে ফেলে দেবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখনও কিছু ‘জটিলতা’ আছে। বিএনপি সহায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। শেখ হাসিনাকে তারা প্রধানমন্ত্রী রেখে নির্বাচনে যেতে চায় না। কিন্তু নির্বাচন হবে তো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ও সংবিধানের অধীনে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলেও সরকার নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে, যেমনটি করেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। বিএনপি এখন একটি ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার’-এর কথা বলছে। কিন্তু এর রূপরেখা এখন অব্দি উপস্থাপন করেনি। তবে সেই রূপরেখা সরকার যে মানবে, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। মোটামুটিভাবে যেভাবেই হোক একটি নির্বাচনী আমেজ ফিরে এসেছে। টিভি টকশোতেও দেখলাম এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি নিজেও একাধিক টকশোতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, দিন যত যাচ্ছে খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজা একটি অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজা নিয়ে মন্তব্য করেন, তখন বুঝতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। যদিও এটা আইনের বিষয়। আদালত ও উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা আগাম মন্তব্য করে বিষয়টিকে উসকে দিলেন মাত্র। আসলে ‘সব দলের অংশগ্রহণ’-এ একটি নির্বাচন হোক, এটা আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান। আরেকটি ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো নির্বাচন হোক- আমরা তা কেউই চাই না। বিদেশিরাও চান না।

৫ জানুয়ারি (২০১৪) আমাদের জন্য কোনো সুখকর দিন ছিল না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন নিয়ে দুটো বিষয় ছিল। এক. সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং দুই. বাস্তবতা। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করার প্রয়োজন ছিল। এ নিয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে ‘আস্থার সম্পর্ক’ গড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ২০১৪-পরবর্তী যে কোনো সময় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা, যেমনটি করেছিল বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ (যে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল) কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বারবার আলোচিত হতে থাকবে। ষষ্ঠ সংসদে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। আর দশম জাতীয় সংসদে বিএনপি অংশ নেয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় দুটি নির্বাচনেরই প্রয়োজন ছিল। তবে তুলনামূলক বিচারে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে বেশি। ১৫৪টি সংসদীয় আসনে (৩০০ আসনের মাঝে আওয়ামী লীগের ১২৮, ওয়ার্কার্স পার্টির ২, জাসদ ৩, জাপা-মঞ্জু ১, জাতীয় পার্টি-এরশাদ ২০) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া, ৫ জেলায় কোনো নির্বাচন না হওয়া কিংবা ৫২ ভাগ জনগোষ্ঠীর ভোট না দেয়ার সুযোগ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। এটা নিয়ে যে যুক্তিই আমরা টিভির টকশোতে দেখাই না কেন, তা দেশে কোনো আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ ছিল বিধায় আমরা দ্বাদশ সংবিধানে সংশোধনী এনে দেশে পুনরায় সংসদীয় রাজনীতির ধারা প্রবর্তন করেছিলাম। সেদিন বিএনপি সংসদীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ধারণা করেছিলাম, ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ‘আস্থার ঘাটতি’ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে না।

এরপর এলো চলতি ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারির ঘটনা। বিএনপির ‘কালো পতাকা’ দিবসে পুলিশি হামলা প্রমাণ করল ‘আস্থার সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত সহজ নয়। আস্থার সম্পর্কের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিএনপিকে ‘স্পেস’ দেয়া। অর্থাৎ বিএনপিকে তার কর্মসূচি পালন করতে দেয়া। এটা সত্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল, তার দায়ভার বিএনপি এড়াতে পারে না। বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারার সংস্কৃতি আর যাই হোক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মানানসই নয়। ওই ঘটনায় বিএনপি তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলো। কিন্তু আন্দোলন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। অর্থাৎ সরকারের পতন হয়নি। কিন্তু সহিংসতায় অনেক মানুষ মারা গেছে। অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের করুণ কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। টিভি পর্দায় তাদের আর্তি দেখে সাধারণ মানুষ কেঁদেছে। এ জন্য মানুষ বিএনপির ওপরই দোষারোপ করেছে। এটা থেকে বিএনপি বের হয়ে আসতে পারেনি। তারপরও কথা থেকে যায়। বিএনপি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকেছে। এটা সরকারের জন্য একটা প্লাস পয়েন্টও বটে। সরকার বিএনপিকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পেরেছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে, যাতে করে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি অংশ না নিলে (?) জটিলতা থেকে যাবে। তাতে করে কেউই লাভবান হবে না। সরকার তো নয়ই, বিএনপিও নয়। তাই সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশের জন্য আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠা জরুরি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরও একটি আস্থার সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারত। তা হয়নি। দুই বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ব্যস্ত থেকেছে পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখতে। ২০১৪ সালে একটি নির্বাচন হয়েছিল। কেন হয়েছিল, কী জন্য হয়েছিল এটা আমরা সবাই জানি। রাজনীতিকরাও জানেন। ভালো করেই জানেন। বাস্তবতা হচ্ছে, ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা গেছে বটে; কিন্তু দেশে নির্বাচনী সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটেছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটা কোনো ভালো খবর নয়। দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শক্তিশালী একটি বিরোধী দল থাকা দরকার। আমরা ইতিমধ্যে একটি হাস্যস্পদ সংসদের জন্ম দিয়েছি। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ‘আসনে’ রয়েছে, আবার তারা মন্ত্রীও হয়েছে। দলে রাজনৈতিক সমীকরণের প্রশ্নে মতবিরোধ রয়েছে বলেও জানা যায়। ফলে জাতীয় পার্টি বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা হয়নি। এ কারণে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদে থাকা দরকার। না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। গত তিন বছরে অনেক জাতীয় ইস্যু সংসদে আলোচিত হয়নি। অনেক সময় সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ বসেনি। এর অর্থ অনেক সংসদ সদস্যই সংসদীয় কার্যক্রমের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এখন সেই ‘পরিস্থিতি’ থেকে ফিরে আসতে হবে। বিএনপি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ এই সংসদ নির্বাচনে (একাদশ জাতীয় সংসদ) বিএনপি অংশ না নিলে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। উপরন্তু নেতাকর্মীদের স্থানীয়ভাবে ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার স্বার্থেও বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়া জরুরি। তাই বিএনপির জন্য একটি ‘স্পেস’ দরকার। তবে বড় কথা হল, আমাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিএনপি নিঃসন্দেহে এখন যথেষ্ট দুর্বল। মামলা-মোকদ্দমা আর কোর্টে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে তাদের দিন যাচ্ছে। সিনিয়র অনেক নেতা এখন আর সক্রিয় নন। কোনো বড় আন্দোলনও তারা গড়ে তুলতে পারছে না। তারপরও বিএনপির একটা বড় জনসমর্থন আছে। বিএনপিকে আস্থায় নিয়েই নির্বাচনে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। হুদা কমিশনের ব্যাপারে বিএনপির যত রিজার্ভেশনই থাকুক, বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনের প্রশ্নে এই হুদা কমিশনের সঙ্গেই বসতে হবে বিএনপিকে। বিএনপি বড় দল। হুদা কমিশন নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির একটা ভালো ‘ডায়ালগ’ প্রয়োজন। সাধারণ ভোটাররা একটা ভালো নির্বাচন চায়। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে, এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। তাই প্রতিযোগিতা থাকবেই। এই প্রতিযোগিতা হতে হবে রাজনৈতিক ও কর্মসূচিভিত্তিক। একুশ শতকে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চায় দলগুলো, কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে, তা দেখতে চায় সাধারণ মানুষ। সে জন্য ‘রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু তা যদি ‘ব্যক্তিগত পর্যায়ে’ চলে যায়, তা কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাই ‘আস্থার সম্পর্ক’ থাকাটা জরুরি। চলতি ২০১৭ সালটি হবে এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ পর্যবেক্ষণ করার সময়।

নির্বাচন হতে এখনও বাকি অন্তত ১৮ মাস। ২০১৯ সালের জানুয়ারির ৩ মাস আগে যে কোনো সময় এই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখনই যদি মির্জা ফখরুলের ওপর হামলা হয়, তাহলে তো অন্য কোনো শীর্ষ নেতা গণসংযোগে যাবেন না। বিএনপির নেতারা এমনকি কোনো কোনো গণমাধ্যম পেছনে সাবেক এক মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছেন। ওই ঘটনার ব্যাপারে রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হাছান মাহমুদ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপির গাড়িবহর দু’জন পথচারীকে চাপা দেয়ায় উত্তেজিত লোকজন এ কাজটি করেছে। এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে, সে প্রশ্ন আছে। কেননা কোনো সংবাদপত্রেই ঘটনাটা এভাবে আসেনি। বিএনপি যদি ত্রাণ বিতরণ করে তাতে ক্ষতি কী? সারা জাতিই তো রাঙ্গামাটির ঘটনায় শোকাহত। বিএনপি বড় দল। তারা ত্রাণ দিতে যেতেই পারে। তাদের বাধা দেয়া ঠিক হয়নি। এটাকে ‘অন্যায়’ বলেছেন ওবায়দুল কাদের। আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। আমি খুশি হব, যারা অভিযুক্ত এবং যাদের নাম পত্র-পত্রিকায় এসেছে, তাদের যদি আইনের আওতায় আনা হয়। আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। সরকারি দল হলেই তিনি মাফ পাবেন, আইন তো সে কথা বলে না। তাই পুলিশ নিজে উদ্যোগী হয়েই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে পারে। আমরা চাই আইনের সঠিক প্রয়োগ। আমরা চাই একটা সুস্থ পরিবেশ। আমরা চাই আগামী দিনগুলো যেন শঙ্কামুক্ত হয়। আমরা একটা কথা ভুলে যাই। মির্জা ফখরুলের ওপর হামলার এই ছবি বিদেশি গণমাধ্যমেও ছাপা হবে। এতে করে একটা ভুল মেসেজ চলে যেতে পারে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আমাদের অনেক অর্জন আছে। এই অর্জন যেন এ ধরনের ঘটনায় ম্লান হয়ে না যায়।
Daily Jugantor
29.06.2017