রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

আবারো হরতাল


ড. তারেক শামসুর রেহমান
আবারো আমরা হরতাল প্রত্যক্ষ করলাম গত ৫ জুন। চারদলীয় জোট এই হরতাল আহ্বান করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৩১ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন উচ্চ আদালতের রায়ের পর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কোনো সুযোগ নেই। এর প্রতিবাদেই চারদলীয় জোট হরতাল পালন করলো। একটি সংবাদপত্র আমাদের জানাচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে এটা ছিল ১৭৪তম হরতাল। উচ্চ আদালতের রায় ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো প্রশ্ন এসে যায়। এক. উচ্চ আদালত সংবিধান সংশোধন করতে পারে কি না? দুই. প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটুকু গ্রহণযোগ্য?

সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে। চলতি সেশনেই তারা তাদের মতামত দেবেন এবং সংসদ এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নেবে। ধারণা করছি, প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর জাতীয় কমিটিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সুপারিশ করবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের। সংসদের ১৪২(১) ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে সংবিধানের কোনো বিধান সংযোজন, পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপনের ক্ষমতা রাখে সংসদ এবং মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি নিয়েই সংবিধান সংশোধন করা যায়। এখন উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল), এখন সেই আলোকেই সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংসদ রায়ের একটি অংশও (আরো দুটো টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকতে পারে) বিবেচনায় নিতে পারে। সুতরাং উচ্চ আদালতের রায়ই সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত, তা বলা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের কথা বলেছেন। কিন্তু এটা বাস্তবতা বির্বজিত। বাস্তবতা হচ্ছে এখনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা দরকার। দলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন হলে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের সংবিধানের অংশ। সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে (সংবিধানের ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ধারা)। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় তিন-তিনটি নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনটি নির্বাচনই বহির্বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচন আয়োজন করেছিল একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে অতীতে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল মুখ্য। ১৯৯৬ সালে বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বটে; কিন্তু আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল। আওয়ামী লীগের চাপের মুখেই ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যা কি না সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী নামে অভিহিত। সেদিন বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেদিন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেনি। বরং সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যা কি না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারও গঠন করেছিল। গেল ১৪ বছরে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো বড় ধলনের বিতর্ক হয়নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে বিতর্ক, তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন হয়েছে। সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এসব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। আজকে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলছেন, তারাই ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়েক সরকার ব্যবস্থার স্বপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবচেয়ে বেশি। যদি উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে হয়, তাহলে উচ্চ আদালতের সুপারিশও গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ পরবর্তী দু-দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় আয়োজন করা। এই সুপারিশ গ্রহণ করা না হলে, সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। একাধিক কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি, যাতে করে দলীয় সরকারের আওতায় আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। ভোলার উপনির্বাচনের দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে আছে। গত ২৪ এপ্রিল ২০১০ এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। সরকারি দল প্রভাব বিস্তার করেছে। সংবাদপত্রগুলোর মন্তব্যেই এর বড় প্রমাণ। 'ভোলায় কেন্দ্র দখলের মহোৎসব' এই মন্তব্য করেছিল নয়াদিগন্ত। প্রথম আলো লিখেছিল 'ভোটারদের পথে পথে বাধা। ভোট কেন্দ্রের বাইরে ও আশপাশে ভোটারদের বাধা দেয়া, হামলা এবং কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে'। মানবজমিন বলেছে, 'ব্যাপক সহিংসতা, জাল ভোট, এজেন্টদের পিটিয়ে বুথ থেকে বের করে দেয়া ও ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোলা-৩ আসনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।' ইত্তেফাকের মন্তব্য ছিল এরকম_ 'কোন কোন কেন্দ্র থেকে বিএনপি এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। বিএনপি কর্মীদের কুপিয়ে জখম করা হয়। জাল ভোট দেয়া হয়েছে'। অন্যান্য পত্রিকার মন্তব্যগুলো আর উল্লেখ করলাম না। এসব মন্তব্য আমাদের কী ইঙ্গিত দেয়? ইঙ্গিত দেয় একটাই_ আমাদের রাজনীতিবিদদের মনমানসিকতায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেখানে ভোলার উপনির্বাচন আমরা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে পারলাম না, সেখানে দলীয় সরকারের আওতায় জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করি কীভাবে? গণতন্ত্রের স্বার্থে পৃথিবীর অনেক দেশে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা ও একটি গ্রহণযোগ্য সমাজ-ব্যবস্থা উপহার দেয়ার স্বার্থেই সংবিধান বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দৃষ্টান্ত কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ে। এ দুটো দেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের নেতাকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে সেখানে গণতন্ত্র নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে আমরা বাংলাদেশে বিকাশমান গণতন্ত্রকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছিলাম। জাতীয় সংসদেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবলিত সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল। সেই থেকে সংসদে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলেননি। প্রধানমন্ত্রী আকারে-ইঙ্গিতে বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করা। একটা দলীয় সরকার যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) তথা কমিশনারদের মনোনয়ন দেয়, তখন ওই মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকেই। পাঠক, মনে করার চেষ্টা করুন নবম পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে বর্তমান সিইসি কী বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ১৯৭০ সালের মতো একটি নির্বাচন করবেন। ওই মন্তব্যের মধ্য থেকে তিনি তার মনের কথাটি হঠাৎ করেই বলে ফেলেছিলেন। আর মনের কথাটি হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো! ১৯৭০ সালের নির্বাচনে (যুক্ত পাকিস্তানে) আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। তাহলে এ ধরনের সিইসিদের দিয়ে কী সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়! আমাদের দুজন নির্বাচন কমিশনারও কম যান না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারা ঘন ঘন টিভি পর্দায় আসতে পছন্দ করতেন, অনেকটা টিভি তারকাদের মতো। দুজনই সাবেক আমলা এবং চাকরি জীবনে তাদের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ছিল। তারা কী এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারবেন যে, তারা বিএনপিকে দ্বিখ-িত করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি? নির্বাচন কমিশন বিএনপির সংস্কারবাদীদের সঙ্গে বৈঠক করে স্পষ্টতই বিএনপিকে ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিল। যেখানে নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা হারায়, সেখানে ওই নির্বাচন কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাই প্রশ্ন থাকবেই।
হরতাল হয়ে গেল। এই হরতালে আওয়ামী লীগ মাঠে নামেনি, এটা একটা ভালো লক্ষণ। ইচ্ছে করলে আওয়ামী লীগ তার কর্মীদের মাঠে নামাতে পারতো। তা তারা করেনি। এই হরতালই প্রমাণ করে দেয় একটি সমঝোতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা যাবে না। উচ্চ আদালতের রায় আর রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটা নিয়ে সংসদে বিতর্ক হোক এবং বিএনপি সেই বির্তকে অংশ নিক। আমরা বারবার বলে আসছি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রয়োজন, তবে বর্তমান কাঠামোয় নয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে কথা বলার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিএনপি সংসদে না এলেও, সংসদ সদস্যরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে পারেন। এক. সংবিধানের ৫৮(৩) ধারা পুরোপুরিভাবে বাদ দিয়ে একটা 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠন, যারা একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টাসহ দশজন উপদেষ্টাকে নিয়োগ করবেন; দুই. ৫৮গ(৪) পুরোপুরিভাবে বাতিল করে বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় জড়িত হতে নিরুৎসাহিত করা; তিন. ৫৮গ(৫), ৫৮গ(৬) পুরোপুরিভাবে বাতিল করা; চার. ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক করা; পাঁচ. কোনো নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত না নিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি সংসদের উপর ছেড়ে দিতে পারেন। যদি দলীয়ভাবে প্রভাব খাটানো না হয়, তাহলে আমার বিশ্বাস আওয়ামী লীগের অনেক সংসদ সদস্য রয়েছেন, যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে তাদের মতামত দিতে পারেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পক্ষে জাতি আবারো বিভক্ত হয়েছে। হরতাল আহ্বান করে বিএনপি তথা চারদলীয় জোট কঠোর অবস্থানে গেছে। পরস্পর বিপরীত এই অবস্থান জাতির জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। হ
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
 আমাদের বাঙলাদেশ

সুত্র ঃ দৈনিক ডেসটিনি

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিকল্প চিন্তা

বিশেষ কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পক্ষেমত দেয়ার পরও সুযোগ রয়েছে বিকল্প একটি প্রস্তাব সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। যেমন, সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে আগামী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ একটি নির্দলীয় সরকারের (তত্ত্বাবধায়ক কথাটা ব্যবহার না করাই শ্রেয়) অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে উচ্চ আদালতের রায়, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং সর্বশেষ ৫ জুন চারদলীয় জোট কর্তৃক হরতাল পালনের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, একটি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিনা। উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন। তবে এ রায় সর্বসম্মতিক্রমে হয়নি বলেই পত্রিকার ভাষ্যবলে আমরা জানতে পেরেছি। যদি সত্যি সত্যিই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে এ রায় হয়ে থাকে, তাহলে একটা প্রশ্ন থাকবেই যে, বিচারপতিদের কেউ কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে বাতিল করার পক্ষে ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী উচ্চ আদালতের রায়ের কথা বলেছেন। উচ্চ আদালত সংবিধান সংশোধন করতে পারেন না। সংবিধানের ১৪২(১) ধারা অনুযায়ী সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন কিংবা প্রতিস্থাপনের অধিকার রাখে জাতীয় সংসদ। উচ্চ আদালত শুধু মতামত দিতে পারেন, সংবিধানের কোন ধারার ব্যাখ্যা দিতে পারেন এবং কোন আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এখন উচ্চ আদালত একটি রায় দিয়েছেন, তাতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) বাতিল করা হয়েছে। এখন সংসদ ওই রায় বিবেচনায় নিতে পারে। সংসদের কাছে বিকল্প সুযোগও আছে। যেহেতু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তথা চার দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কথা বলছে, সেহেতু বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট এড়াতে সংসদ একটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের ৫৮(খ), ৫৮(গ) ও ৫৮(ঘ) ধারাগুলো নতুন একটি ধারা দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে পারে। এ জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদের উদার হতে হবে। বিএনপিকেও আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী থাকতে হবে।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি তাদের সুপারিশের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। সুপারিশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের কথা বলা হয়েছে। তবে এই সুপারিশই চূড়ান্ত নয় নিয়মানুযায়ী বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হবে, মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে, বিল তৈরি হবে, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের মধ্য দিয়ে টেকনিক্যালিটি যাচাই হবে, আবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে বিল আকারে তুলতে হবে। এরপর সংসদে আইন আকারে পাস করার আগে আবার কমিটিতে যাবে। সেখান থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর সংসদে ভোটের মাধ্যমে পাস হবে। পথটা দীর্ঘ। পাস হতেও সময় লাগে। সুতরাং তড়িঘড়ি করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। বিএনপি ও চারদলীয় জোট হরতাল আহ্বান করে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। সরকারি দল এটাকে বিবেচনায় নিতে পারে। এককভাবে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়, তাহলে সেটা হবে ভুল।
রাজনীতিতে সহনশীলতা থাকতে হয়। বিরোধী দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হয়। এর নামই গণতন্ত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় বটে এবং তা সাংবিধানিকভাবে বৈধও বটে। কিন্তু তা গণতান্ত্রিক স্পিরিটের পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক স্পিরিট হচ্ছে বিরোধী দলের মতামত নেয়া এবং বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতেই আইন প্রণয়ন করা। এটি না হলে এদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। এবং অসাংবিধানিক শক্তিগুলো এ থেকে ফায়দা উঠাবে। বিশেষ কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পক্ষে মত দেয়ার পরও সুযোগ রয়েছে বিকল্প একটি প্রস্তাব সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। যেমন, সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে আগামী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ একটি নির্দলীয় সরকারের (তত্ত্বাবধায়ক কথাটা ব্যবহার না করাই শ্রেয়) অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট ‘এলডার্স কাউন্সিল’ এই নির্বাচন পরিচালনা করবে। এই ‘এলডার্স কাউন্সিল’ গঠিত হবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি, একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে। বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এই ‘এলডার্স কাউন্সিল’ গঠন করা হবে। এরা ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করবে এবং কোন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাদের সহযোগিতার জন্য একটি উপদেষ্টামণ্ডলী থাকতে পারে। রাষ্ট্রপতি তার পদে বহাল থাকবেন। কিন্তু তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এই কাউন্সিল নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে পারবে। সেনাবাহিনীর সহযোগিতাও তারা নিতে পারবে। কোন অবস্থাতেই সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে কোন প্রক্রিয়ায় জড়িত করানো যাবে না। দ্বাদশ পার্লামেন্ট নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য সিইসি কিংবা নির্বাচন কমিশনারদের নিযুক্তিতে নিরপেক্ষতা যাতে নিশ্চিত হয়, সে ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দেশের আমলাদের মাঝে (সামরিক ও বেসামরিক) ‘রাজনীতি’ করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। চাকরিজীবনের শেষের দিনগুলোতে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং অবসরে যাওয়ার পরপরই তারা একেকজন ‘রাজনীতিক’ হয়ে যান। তাদের টার্গেট থাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া। এই প্রবণতা খারাপ। যাদের সঙ্গে এলাকার জনগণের কোন যোগাযোগ নেই, জনগণের দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার যারা হননি, তারা হঠাৎ করে এমপি হয়ে যান। তারা সঠিক অর্থে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না। এ জন্য আমলাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ন্যূনতম ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে। ফলে তারা সচিবালয়ে বসে কোন বিশেষ দলের পক্ষে কলকাঠি নাড়াতে পারবেন না। তারা যদি বুঝতে পারেন অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই তারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, তাহলে তারা নিরপেক্ষ থেকেই প্রশাসন পরিচালনা করবেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। প্রয়োজনে তাদের কর্মপরিধিও আরও বাড়ানো যেতে পারে। সাংবিধানিক পদে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তাদের নিয়োগের দায়িত্বটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল একটাই কারণেÑ আর তা হচ্ছে নিরপেক্ষ নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। অতীতে বারবার এমনটি হয়েছে। ‘মাগুরা সিনড্রম’ আমরা এখনও কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বলে মনে হয় না। বর্তমান সরকারের সময় ভোলায় যে উপ-নির্বাচন হয়ে গেল (২৪ এপ্রিল, ২০১০), তাতে সরকারি দলের ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, সন্ত্রাস, ইত্যাদি নানা কারণে উপ-নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যতটুকু না ভূমিকা ছিল, তার চেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল স্থানীয় নেতৃত্বের। স্থানীয় নেতৃত্ব এটাকে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছিল। ফলে তাদের প্রভাবে স্থানীয় প্রশাসন ছিল অসহায়। এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা। আমরা গণতন্ত্রকে ধারণ করলেও আমাদের মানসিকতায় কোন পরিবর্তন আসেনি। গণতন্ত্রকে আমরা আমাদের নিজেদের মতো করে দেখাতে চাই। যে কারণে মাগুরা কিংবা ভোলার মতো ঘটনা ঘটে। এই একটি বা দুটি ঘটনার জন্য দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থেই আরও দুই টার্ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধান দুটি দলের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। প্রধানমন্ত্রী, যিনি আওয়ামী লীগেরও প্রধান বটে, তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে বলছেন। অপরদিকে বিরোধী দল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে কথা বলছে। এক্ষেত্রে বেগম জিয়ার বক্তব্যে একটি সমস্যার কথাও এসেছেÑ সেটি হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখা হলে ৫৮গ(৩) ধারা মতে সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই হবেন প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু এবিএম খায়রুল হকের ব্যাপারে বেগম জিয়া তথা বিএনপির রয়েছে প্রবল আপত্তি। তিনি দুই-দুইবার অপরকে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। উপরন্তু তার দেয়া সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায় এবং বেগম জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি সংক্রান্ত রায় তাকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। এ জন্য বিএনপিকে সুস্পষ্ট ফর্মুলা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বিএনপি দুই টার্মের নিরপেক্ষ সরকারের ফর্মুলা উপস্থাপন করতে পারে। সংসদের আলোচনায়ও এ প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে বিএনপি। এমনকি বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের বিকল্প মতামত জানিয়ে দেয়াও সম্ভব। মোট কথা, বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করলেই চলবে না, বরং দলটিকে একটি বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। সরকার তখন ওই প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে পারবে না।
হরতাল দিয়ে নতুন করে যে ‘রাজনীতি’ শুরু হল, তাতে করে আগামীতে সংকট আরও বাড়তে পারে। লাগাতার হরতালের হুমকি দিয়েছে বিএনপি। সরকারের বয়স রয়েছে আরও প্রায় ৩২ মাস। সময়টা অনেক লম্বা। এরই সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের আশংকা করছি আমরা। দুটি বড় দলের মাঝে জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে তা সংকটকে আরও গভীরতর করবে মাত্র। ৫ মে’র হরতাল একটা দাবিকে উস্কে দিল। চাই সমঝোতা, চাই ন্যূনতম ঐক্য।
[পূর্বে প্রকাশ @ দৈনিক যুগান্তর -০৭ জুন ২০১১ ]

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে উত্তপ্ত রাজনীতি

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চারদলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার দাবিতে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে। এর আগে গত ৩১ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, উচ্চ আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কোনো সুযোগ নেই। বিতর্কটা উঠেছে সেখান থেকেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে উচ্চ আদালত একটি রায় দিয়েছিলেন। ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে রায়ে একথাও বলা হয়েছিল যে, প্রয়োজনে আরও দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় সংসদ। সংসদে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগেই প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্যটি করলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, উচ্চ আদালতের এই রায়টি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কমিটিকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। জাতীয় কমিটি এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। শেষ পর্যায়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। জাতীয় কমিটি এখনও তাদের রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপন করেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা কী সুপারিশ করবেন, আমরা জানিও না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দ্বারা তারা প্রভাবিত হবেন কিনা, সেটাও দেখার বিষয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্যটি করলেন, তা তার সরকারের বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নেব। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়নশীল দেশে যেভাবে গণতন্ত্র বিনির্মাণ হচ্ছে, তার সঙ্গে উন্নত বিশ্বের গণতন্ত্রকে মেলানো যাবে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রের ভিতকে আরও শক্তিশালী করার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ।
প্রধানমন্ত্রী আজ সংবাদ সম্মেলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কথা বললেন বটে, কিন্তু ১৯৯৪-৯৬ সালে তিনিই ছিলেন এর প্রবক্তা। ওই সময় আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিল। সংবিধান অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বটে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চয়ই এসব ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগের চাপের মুখেই ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যা কিনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী নামে অভিহিত। সেদিন বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেদিন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেনি। বরং সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যা কিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারও গঠন করেছিল। গেল ১৪ বছরে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো বড় ধরনের বিতর্ক হয়নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যে বিতর্ক, তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৩টি নির্বাচন হয়েছে। সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এসব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। আজ যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলছেন, তারাই ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন সবচেয়ে বেশি। যদি উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে হয়, তাহলে উচ্চ আদালতের সুপারিশও গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাত্ পরবর্তী দু-দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় আয়োজন করা। এই সুপারিশ গ্রহণ করা না হলে, সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। একাধিক কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসেনি, যাতে করে দলীয় সরকারের আওতায় আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। ভোলার উপনির্বাচনের দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে আছে। কী হয়েছিল ভোলার উপনির্বাচনে, একথা নিশ্চয়ই আমাদের সবার মনে আছে। গত ২৪ এপ্রিল, ২০১০ এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিল কিনা আসুন সংবাদপত্রগুলোর মন্তব্যের দিকে চোখ বুলাই। ‘ভোলায় কেন্দ্র দখলের মহোত্সব’ এই মন্তব্য করেছিল নয়াদিগন্ত। প্রথম আলো লিখেছিল, ‘ভোটারদের পথে পথে বাধা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে ও আশপাশে ভোটারদের বাধা দেয়া, হামলা এবং কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে’। মানবজমিন বলেছে, ‘ব্যাপক সহিংসতা, জাল ভোট, এজেন্টদের পিটিয়ে বুথ থেকে বের করে দেয়া ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোলা-৩ আসনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে’। ইত্তেফাকের মন্তব্য ছিল এ রকম, ‘কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে বিএনপি এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। বিএনপি কর্মীদের কুপিয়ে জখম করা হয়। জালভোট দেয়া হয়েছে’। অন্যান্য পত্রিকার মন্তব্যগুলো আর উল্লেখ করলাম না। এসব মন্তব্য আমাদের কী ইঙ্গিত দেয়? ইঙ্গিত দেয় একটাই—আমাদের রাজনীতিবিদদের মনমানসিকতায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেখানে ভোলার উপনির্বাচন আমরা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে পারলাম না, সেখানে দলীয় সরকারের আওতায় জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করি কীভাবে? দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের স্বার্থে পৃথিবীর অনেক দেশে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা ও একটি গ্রহণযোগ্য সমাজব্যবস্থা উপহার দেয়ার স্বার্থেই সংবিধান বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দৃষ্টান্ত কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ে। এ দুটি দেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে সেখানে গণতন্ত্র নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে আমরা বিকাশমান গণতন্ত্রকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছিলাম।
তৃতীয়ত, জাতীয় সংসদেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবলিত সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল। সেই থেকে সংসদে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলেননি। আজ যারা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য কী? কেন তারা বলছেন? চতুর্থত, প্রধানমন্ত্রী আকার-ইঙ্গিতে বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা। একটা দলীয় সরকার যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) তথা কমিশনারদের মনোনয়ন দেয়, তখন এই মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকেই। পাঠক, মনে করার চেষ্টা করুন নবম পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে বর্তমান সিইসি কী বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৭০ সালের মতো একটি নির্বাচন করবেন।’ ওই মন্তব্যের মধ্য থেকে তিনি তার মনের কথাটি হঠাত্ করেই বলে ফেলেছিলেন। আর মনের কথাটি ছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো! ১৯৭০ সালের নির্বাচনে (যুক্ত পাকিস্তানে) আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। তাহলে এ ধরনের সিইসিদের দিয়ে কি সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়? আমাদের দুজন নির্বাচন কমিশনারও কম যান না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারা ঘন ঘন টিভি পর্দায় আসতে পছন্দ করতেন, অনেকটা টিভি তারকাদের মতো। দুজনই সাবেক আমলা এবং চাকরি জীবনে তাদের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ছিল। তারা কি ওই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারবেন যে তারা বিএনপিকে দ্বিখণ্ডিত করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি? তথাকথিত সংস্কারবাদীদের নিয়ে ইসি মিটিং করেছিল। তারা সেদিন তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছিলেন। এখন দলীয় সরকার সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবে। আমরা অতীতে দেখেছি ‘জনতার মঞ্চ’ করে আমলাদের রাজনীতিতে আমরা টেনে এনেছিলাম। সেই যে আমলাদের মধ্যে আমরা ‘রাজনীতির বীজ’ ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম তা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। রাজনীতিবিদরা খুঁজে বেড়ান দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী আমলাদের। কোন কোন আমলা চাকরিরত অবস্থায় ‘কবিতা লিখে’, বঙ্গবন্ধুর গুণকীর্তন করে নিজের পথ প্রশস্ত করেন। আর তাদেরকেই বসান হয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে। তাই দলীয় সরকার যখন ইসিতে সিইসি কিংবা কমিশনারদের মনোনয়ন দেবে, তারা নিরপেক্ষ নন এবং তাদের দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করাও যায় না।
নির্বাচন হচ্ছে সরকার পরিবর্তনের মাপকাঠি। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রকে শুধু শক্তিশালীই করে না, বরং অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতা দখল করতে দেয় না। এখন তাই প্রশ্ন, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করব কীভাবে? বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাতে এখন দলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন হলে, সেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই গোয়ার্তুমি নয়, প্রয়োজন শুভবুদ্ধির পরিচয় দেয়া। আমরা এই শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে যদি ব্যর্থ হই, তাহলে ‘ওয়ান ইলেভেন’র মতো ঘটনা বার বার ঘটবে। চারদলীয় জোট আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে। এটা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প ছিল বলেও মনে হয় না। এই হরতাল সরকারকে একটা ‘মেসেজ’ পৌঁছে দিতে পারে। আর তা হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের একটি পরিবেশ তৈরি করা। বিএনপি এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ। চারদলীয় জোট এখনও প্রায় ৩৭ ভাগ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। এদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই সরকার এককভাবে যদি সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে চায়, তাহলে তারা ভুল করবে। এতে করে সংঘাত বাড়বে, সৃষ্টি হবে অস্থিতিশীলতার। গণতন্ত্রের বিকাশ তাতে ঘটবে না। তাই সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দিক—এটাই আশা করব।

প্রসঙ্গ মধ্যবর্তী নির্বাচন

সংসদ বর্জন, সংসদে দাঁড়িয়ে জাতীয় নেতাদের সম্পর্কে কটূক্তি করে কিংবা অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে আমরা সংসদকে অকার্যকর করে তুলেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দাবি উঠবে। জনমত তাতে বাড়বে বৈ কমবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রশ্নে দুই দলের বিভক্তি জাতিকেও বিভক্ত করেছে। এই বিভক্তি কাম্য নয় এবং সংসদীয় রাজনীতির জন্য তা ভালোও নয়।

এখন রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর এবং ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো বিধান সংবিধানে নেই_ এটা সত্য। সেই সঙ্গে এটাও সত্য, সব সময় সবকিছু সাংবিধানিক নিয়ম মেনে হয় না। সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে পারে বা দেয়। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার তার জনপ্রিয়তা যাচাই করার সুযোগ পায়। পৃথিবীর অনেক দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়েছে। অনেক সময় সরকার তার নিজের স্বার্থেই মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে থাকে। সরকার রাজি না হলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেওয়া যায় না। এটা সম্পূর্ণরূপে বর্তমান সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সরকার না চাইলে নির্বাচন কমিশনও এককভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজন করতে পারে না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টি একটি রাজনৈতিক ইস্যু। বিরোধী দল এটা চাইবে, আর সরকার তাতে রাজি হবে না_ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটাই বাস্তবতা। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতির অবস্থা যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়াই চলতি বছরের মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিটে পৌঁছার বড় একটি কারণ। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে ৪২ শতাংশ। এই ঘাটতির পরিমাণ ৫৫৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৯২ কোটি ডলার।

অন্যদিকে সেবা খাতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৭ কোটি ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিটেন্সে তেমন গতি না থাকায় চলতি হিসাবের ভারসাম্য বেশ চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতে যেমন সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের ঋণও বাড়ছে (১১ হাজার কোটি টাকার ওপরে)। বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে হতাশা। সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের দশ মাসে এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। উপরন্তু সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দুর্নীতি, ছাত্রলীগ নামধারীদের টেন্ডারবাজি দিন দিন বাড়ছেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের একটা অংশ সরকারি দল তথা সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সংসদেই এ অভিযোগ করেছেন। গত ২৬ মে পর্যন্ত শেয়ারবাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। তদন্ত কমিটি কিছু ব্যক্তিকে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটনায় চিহ্নিত করলেও সরকার লুট হয়ে যাওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকা উদ্ধার কিংবা দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যাপারে কোনো বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। ভরা মৌসুমেও চালের দাম কমেনি। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অর্থনীতির এই যে সামগ্রিক চিহ্ন, তা কোনো আশার কথা বলে না। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি যত যুক্তিহীনই হোক না কেন, সরকারের জন্য এটা একটা অশনিসংকেত। নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে_ এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকার যদি ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি শক্তিশালী হবে মাত্র।

আমরা পঞ্চম জাতীয় সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা সংসদীয় রাজনীতির স্পিরিটকে বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। সংসদ বর্জন, সংসদে দাঁড়িয়ে জাতীয় নেতাদের সম্পর্কে কটূক্তি করে কিংবা অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে আমরা সংসদকে অকার্যকর করে তুলেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দাবি উঠবে। জনমত তাতে বাড়বে বৈ কমবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রশ্নে দুই দলের বিভক্তি জাতিকেও বিভক্ত করেছে। এই বিভক্তি কাম্য নয় এবং সংসদীয় রাজনীতির জন্য তা ভালোও নয়। পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের যে অভাব, তা চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীরতর
করবে মাত্র।
[সূত্রঃ সমকাল, ০২/০৬/১১]

আরব বিশ্বের গণতন্ত্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত ১৯মে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেন তাতে আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার প্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করলেও, আরব বিশ্বে আদৌ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো কীনা, কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার স্বরূপ কী হবে এ প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আরব বিশ্বে বিশেষ করে আরবলীগভুক্ত ২২টি দেশে একটি ভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। যার সাথে দক্ষিণ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা পূর্ব ইউরোপের বিকাশমান গণতন্ত্রের সাথে মেলান যাবে না। এখানে রয়েছে ভিন্ন এক জগত্। একদিকে রয়েছে সামরিক বাহিনীর প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপস্থিতি (মিসর, তিউনেসিয়া, ইয়েমেন) তেমনি রয়েছে পারিবারিক উত্তরাধিকার (সিরিয়া, লেবানন)। রাজতন্ত্র কিংবা আমির শাসিত দেশ তো রয়েছেই (জর্ডান, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব)। আরব বিশ্বের তেল সম্পদ এ অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তবে তেল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার কিংবা জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ এ থেকে উপকৃত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। উপকৃত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি। এক্ষেত্রে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, তেল সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, আরবলীগভুক্ত কোমোরোস, জিবুতি, সোমালিয়া কিংবা ফিলিস্তিনের কোন তেল সম্পদ নেই। একই বিশ্বে বাস করেও সোমালিয়ার দারিদ্র্যতা চোখে লাগার মত। আবার এ অঞ্চলে ইসলামিক জঙ্গীবাদের যে উত্থান ঘটেছে তা কিন্তু সব আরব দেশে প্রত্যক্ষ করা যায় না। যেমন আলজিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা সোমালিয়ায় ইসলামিক জঙ্গীবাদি মনোভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সোমালিয়া কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাই এ অঞ্চলের গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ফ্রিডম হাউজ এই দেশগুলোকে নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল। তাতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কোন আশার কথা বলে না। ওবামা প্রশাসন গণতন্ত্রে উত্তরণের কথা বললেও ফ্রিডম হাউজের এই প্রতিবেদনে তাদের আশাভঙ্গ হতে পারে। ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রের যে বিকাশ,তাতে ইয়েমেনের অবস্থান ১৪৬, আরব আমিরাতের ১৪৮, সিরিয়ার ১৫৩, সুদানের ১৫১, লিবিয়ার ১৫৮,জিবুতির ১৫৪, মিসরের ১৩৮, আলজেরিয়ার ১০৫। শুধুমাত্র তুলনামূলক বিচারে বাহরাইনের অবস্থা ভালো, ৪৮। অর্থাত্ এখানে নির্বাচন হয়। একটি সংসদও সেখানে রয়েছে। বিরোধীদলের অস্তিত্বও রয়েছে। রাজতন্ত্র থাকলেও এক ধরনের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখানে গড়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নটি জড়িত। ফ্রিডম হাউজ এটা নিয়েও গবেষণা করেছে। তাতে দেখা যায়, (মোট ১৯৬টি দেশের মাঝে) সোমালিয়ার অবস্থান ১৮১, ইয়েমেনের ১৭৩, তিউনিসিয়ার ১৮৬, সিরিয়ার ১৭৮, লিবিয়ার ১৯৩, মিসরের ১৩০, জিবুতির ১৫৯, বাহরাইনের ১৫৩ ও আলজেরিয়ার  ১৪১। তখন ওবামা যখন গণতন্ত্রের কথা বলেন, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায় আরব বিশ্বে এই গণতন্ত্রের স্বরূপ কী। এখানে কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। রাজতন্ত্রের পাশাপাশি কোথাও কোথাও পারিবারিক শাসনও (সিরিয়ায়) বজায় রয়েছে। সেখানে দল ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। লিবিয়াতে গত মার্চ মাস থেকেই যুদ্ধ চলছে। সর্বশেষ ঘটনায় মিত্রপক্ষ সর্বাত্মক বিমান আক্রমণ  সেখানে শুরু করেছে । দীর্ঘ  দু’মাসেও গাদ্দাফিকে উত্খাত করা সম্ভব হয়নি। বারাক ওবামা তার ভাষণে লিবিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গাদ্দাফি যখন অপরিহার্যভাবে সরে যাবেন, ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হবেন, তখন দশকের পর দশকের দুর্দশার অবসান ঘটবে এবং লিবিয়া গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হবে’। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করাই হোয়াইট হাউজের উদ্দেশ্য। মাহমুদ জিবরিলের নেতৃত্বে লিবিয়ায় একটি ন্যাশনাল কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। কিন্তু লিবিয়ার ব্যাপক জনগোষ্ঠির সমর্থন এই কাউন্সিলের ব্যাপারে রয়েছে এটা মনে করারও কোন কারণ নেই। যুক্তযাষ্ট্রের পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা মাহমুদ জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করতেন। তাঁকে দিয়ে লিবিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। স্পষ্টতই লিবিয়া ইরাকের মত পরিস্থিতি বরণ করতে যাচ্ছে। ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কোন অনুমতি ছাড়াই বাগদাদ আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর দেশটি দখল করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে মালিকির নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়েছে সত্য, কিন্তু ইরাকে জন্ম হয়েছে এক নতুন সংস্কৃতির, আত্মঘাতী বোমাবাজি। আল-কায়দার ইরাকি সংস্করণের সেখানে জন্ম হয়েছে। সেখানে এখনই ৫০ হাজার আমেরিকান সেনা রয়েছে, যদিও তারা ‘কমব্যাট’ বা যুদ্ধরত অবস্থায় নয়। সাদ্দাম পরবর্তী এই যে রাজনীতি, তাকে আমরা কী গণতন্ত্র বলবো? একটা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ সেখানে জন্ম হয়েছে। আত্মঘাতী বোমাবাজদের কারণে কেউই আজ নিরাপদ নন। মালিকির অবস্থানও খুব শক্তিশালী নয়। সাদ্দাম হয়ত অপরাধ করেছেন। তার শাসনে স্বচ্ছতা ছিল না। কিন্তু এক স্থিতিশীল ইরাক তিনি উপহার দিয়েছিলেন। আজ সেই স্থিতিশীলতা ইরাকে নেই। লিবিয়ার পরিস্থিতিও সেদিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো এখন সেখানে স্থলযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। আর তার পরিণতিতে লিবিয়া হবে আরেক ইরাক। জিবরিল মালিকির ভূমিকা পালন করতে পারেন বটে, কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র লিবিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আরব বিশ্বের তেল সম্পদের কথাও ওবামা বলেছেন। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ইরাকে তেলের নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর হাতে। এখন লিবিয়ার তেল সম্পদ (রিজার্ভ ৪৬.৪ বিলিয়ন ব্যারেল) উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এটাই হচ্ছে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র মূল উদ্দেশ্য। বলে রাখি বিশ্বের তেলের যে রিজার্ভ, তার ৫৬ ভাগ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আর এই তেল সম্পদের উপর যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিম ইউরোপ পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল।
পর্যবেক্ষকরা আল-কায়দার উত্থান তথা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মূল কারণ হিসেবে ইসরাইলী আগ্রাসী নীতিকে দায়ী করেছেন। স্বাধীন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সেখানে সংকটকে আরো গভীরতর করেছে। বারাক ওবামা তার ভাষণে বলেছেন ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে সীমান্তরেখা হবে ১৯৬৭ সালের লাইন অনুসারে। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রয়েছে স্বাধীন একটি  ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। কিন্তু বাস্তবতা যা তা হচ্ছে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওবামার উপস্থিতিতেই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন অত্যন্ত কঠোর ভাষায়। এখানেই রয়েছে মূল সমস্যা। যতদিন ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে সংকট থাকবে। আর এই সংকটকে পুঁজি করে আল-কায়দার মত সংগঠনের জন্ম হবে এবং তাদের ‘জিহাদী’ তত্পরতা বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের এটাও অন্যতম একটি সমস্যা।
আজ বারাক ওবামা আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন বটে, কিন্তু ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কখনও বন্ধ করতে পারেনি। নিরীহ ফিলিস্তিনীদের হত্যা করে ইসরাইল মানবতাবিরোধী অপরাধ করলেও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলী নেতাদের বিচার করা যায়নি কখনো । আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে , কিন্তু তা হতে হবে তাদের  ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সামনে রেখে। ‘চাপিয়ে দেয়া গণতন্ত্র’ আরব বিশ্বের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিমান হামলা চালিয়ে একটি পুতুল সরকার সেখানে বসিয়ে দিয়ে তেল সম্পদকে কবজা করার নাম, আর যাই হোক গণতন্ত্র হতে পারে না।
প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ভাষণে ইন্টারনেট বিপ্লবের কথা বলেছেন। বলেছেন ইন্টারনেট সারা পৃথিবীতে মানুষের জানালা খুলে দিয়েছে। সেলফোন ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তরুণ সমাজকে যে কোন সমাজের চেয়ে অধিক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যে বিপ্লব ঘটাতে পারে, মিসর তার বড় প্রমাণ। আজ আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের যে ঢেউ উঠেছে, তাতে এই তরুণ সমাজ পালন করছে একটি বড় ভূমিকা। দুঃখজনক হলেও সত্য, তরুণ সমাজের একটা বড় অংশই সেখানে বেকার। তিউনিসিয়ায় গত ২৭ ডিসেম্বর ফল বিক্রেতা মোহম্মদ বউকুজিজি নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বউকুজিজি ছিলেন একজন বেকার কম্পিউটার গ্রাজুয়েট। পুরো আরব বিশ্বে এই তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা এখন অনেক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আলজেরিয়ায় ২৫ বছরের নিচে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ৪৭ দশমিক ৫ ভাগ। মৌরিতানিয়ায় এ সংখ্যা ৫৯ দশমিক ৩, মরক্কোয় ৪৭ দশমিক ৭, তিউনিসিয়ায় ৪২ দশমিক ১, লিবিয়ায় ৪৭ দশমিক ৪, মিসরে ৫২ দশমিক ৩, সিরিয়ায় ৫৫ দশমিক ৩, জর্ডানে ৫৪ দশমিক ৩, ইরাকে ৬০ দশমিক ৬, কিংবা সোমালিয়ায় ৬৩ দশমিক ৫। এরা একটি শক্তি। ক্ষমতাসীনদের একটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে এরা এসব তরুণ সমাজকে বুঝতে পারেননি। এরা একটি শক্তি। এরাই আরব বিশ্বে পরিবর্তনটা আনছে। আর প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ভাষণে এদের কথাই উল্লেখ করেছেন।
স্পষ্টতই আরব বিশ্ব একটি পরিবর্তনের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল National Endowment for Democracy। স্ট্রেট ডিপার্টমেন্ট বছরে ১০০ মিলিয়ন সাহায্য দেয় এই প্রতিষ্ঠানকে। এই সংস্থার মাধ্যমে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মিসরের গণ-অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত দু’টি সংস্থা April 6 movement কিংবা kafya কিংবা বাহরাইনের Center for Human Right-এর নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র (নিউইয়র্ক টাইমস ১৪ এপ্রিল, ২০১১)। উদ্দেশ্য একটাই— এ অঞ্চলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য তরুণ সমাজকে তৈরি করা। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সাথে পরিচিত করান। সমসাময়িক আরব বিশ্বের যে ইতিহাস, তাতে দেখা যায় ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উত্খাতের মধ্যে দিয়ে যে ‘বিপ্লব’-এর সূচনা হয়েছিল, সেটা ছিল পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সাথে কয়েকটি আরব বিশ্বের যুদ্ধ ও তাতে ব্যাপক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় অধ্যায়ের। তৃতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ইরানি ইসলামিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। প্রতিটি বিপ্লবই আরব বিশ্বে কিছু না কিছু পরিবর্তন ডেকে এনেছে। এখন তিউনিসিয়া ও মিসরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সেখানকার দীর্ঘদিনের সরকারের উত্খাতের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে চতুর্থ অধ্যায়। এই যে বিপ্লব, এই বিপ্লব আরব বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয় এখন।

আরব বিশ্বের গণতন্ত্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত ১৯মে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেন তাতে আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার প্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করলেও, আরব বিশ্বে আদৌ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো কীনা, কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার স্বরূপ কী হবে এ প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আরব বিশ্বে বিশেষ করে আরবলীগভুক্ত ২২টি দেশে একটি ভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। যার সাথে দক্ষিণ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা পূর্ব ইউরোপের বিকাশমান গণতন্ত্রের সাথে মেলান যাবে না। এখানে রয়েছে ভিন্ন এক জগত্। একদিকে রয়েছে সামরিক বাহিনীর প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপস্থিতি (মিসর, তিউনেসিয়া, ইয়েমেন) তেমনি রয়েছে পারিবারিক উত্তরাধিকার (সিরিয়া, লেবানন)। রাজতন্ত্র কিংবা আমির শাসিত দেশ তো রয়েছেই (জর্ডান, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব)। আরব বিশ্বের তেল সম্পদ এ অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তবে তেল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার কিংবা জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ এ থেকে উপকৃত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। উপকৃত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি। এক্ষেত্রে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, তেল সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, আরবলীগভুক্ত কোমোরোস, জিবুতি, সোমালিয়া কিংবা ফিলিস্তিনের কোন তেল সম্পদ নেই। একই বিশ্বে বাস করেও সোমালিয়ার দারিদ্র্যতা চোখে লাগার মত। আবার এ অঞ্চলে ইসলামিক জঙ্গীবাদের যে উত্থান ঘটেছে তা কিন্তু সব আরব দেশে প্রত্যক্ষ করা যায় না। যেমন আলজিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা সোমালিয়ায় ইসলামিক জঙ্গীবাদি মনোভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সোমালিয়া কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাই এ অঞ্চলের গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ফ্রিডম হাউজ এই দেশগুলোকে নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল। তাতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কোন আশার কথা বলে না। ওবামা প্রশাসন গণতন্ত্রে উত্তরণের কথা বললেও ফ্রিডম হাউজের এই প্রতিবেদনে তাদের আশাভঙ্গ হতে পারে। ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রের যে বিকাশ,তাতে ইয়েমেনের অবস্থান ১৪৬, আরব আমিরাতের ১৪৮, সিরিয়ার ১৫৩, সুদানের ১৫১, লিবিয়ার ১৫৮,জিবুতির ১৫৪, মিসরের ১৩৮, আলজেরিয়ার ১০৫। শুধুমাত্র তুলনামূলক বিচারে বাহরাইনের অবস্থা ভালো, ৪৮। অর্থাত্ এখানে নির্বাচন হয়। একটি সংসদও সেখানে রয়েছে। বিরোধীদলের অস্তিত্বও রয়েছে। রাজতন্ত্র থাকলেও এক ধরনের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখানে গড়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নটি জড়িত। ফ্রিডম হাউজ এটা নিয়েও গবেষণা করেছে। তাতে দেখা যায়, (মোট ১৯৬টি দেশের মাঝে) সোমালিয়ার অবস্থান ১৮১, ইয়েমেনের ১৭৩, তিউনিসিয়ার ১৮৬, সিরিয়ার ১৭৮, লিবিয়ার ১৯৩, মিসরের ১৩০, জিবুতির ১৫৯, বাহরাইনের ১৫৩ ও আলজেরিয়ার ১৪১। তখন ওবামা যখন গণতন্ত্রের কথা বলেন, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায় আরব বিশ্বে এই গণতন্ত্রের স্বরূপ কী। এখানে কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। রাজতন্ত্রের পাশাপাশি কোথাও কোথাও পারিবারিক শাসনও (সিরিয়ায়) বজায় রয়েছে। সেখানে দল ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। লিবিয়াতে গত মার্চ মাস থেকেই যুদ্ধ চলছে। সর্বশেষ ঘটনায় মিত্রপক্ষ সর্বাত্মক বিমান আক্রমণ সেখানে শুরু করেছে । দীর্ঘ দু’মাসেও গাদ্দাফিকে উত্খাত করা সম্ভব হয়নি। বারাক ওবামা তার ভাষণে লিবিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গাদ্দাফি যখন অপরিহার্যভাবে সরে যাবেন, ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হবেন, তখন দশকের পর দশকের দুর্দশার অবসান ঘটবে এবং লিবিয়া গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হবে’। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করাই হোয়াইট হাউজের উদ্দেশ্য। মাহমুদ জিবরিলের নেতৃত্বে লিবিয়ায় একটি ন্যাশনাল কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। কিন্তু লিবিয়ার ব্যাপক জনগোষ্ঠির সমর্থন এই কাউন্সিলের ব্যাপারে রয়েছে এটা মনে করারও কোন কারণ নেই। যুক্তযাষ্ট্রের পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা মাহমুদ জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করতেন। তাঁকে দিয়ে লিবিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। স্পষ্টতই লিবিয়া ইরাকের মত পরিস্থিতি বরণ করতে যাচ্ছে। ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কোন অনুমতি ছাড়াই বাগদাদ আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর দেশটি দখল করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে মালিকির নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়েছে সত্য, কিন্তু ইরাকে জন্ম হয়েছে এক নতুন সংস্কৃতির, আত্মঘাতী বোমাবাজি। আল-কায়দার ইরাকি সংস্করণের সেখানে জন্ম হয়েছে। সেখানে এখনই ৫০ হাজার আমেরিকান সেনা রয়েছে, যদিও তারা ‘কমব্যাট’ বা যুদ্ধরত অবস্থায় নয়। সাদ্দাম পরবর্তী এই যে রাজনীতি, তাকে আমরা কী গণতন্ত্র বলবো? একটা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ সেখানে জন্ম হয়েছে। আত্মঘাতী বোমাবাজদের কারণে কেউই আজ নিরাপদ নন। মালিকির অবস্থানও খুব শক্তিশালী নয়। সাদ্দাম হয়ত অপরাধ করেছেন। তার শাসনে স্বচ্ছতা ছিল না। কিন্তু এক স্থিতিশীল ইরাক তিনি উপহার দিয়েছিলেন। আজ সেই স্থিতিশীলতা ইরাকে নেই। লিবিয়ার পরিস্থিতিও সেদিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো এখন সেখানে স্থলযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। আর তার পরিণতিতে লিবিয়া হবে আরেক ইরাক। জিবরিল মালিকির ভূমিকা পালন করতে পারেন বটে, কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র লিবিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আরব বিশ্বের তেল সম্পদের কথাও ওবামা বলেছেন। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ইরাকে তেলের নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর হাতে। এখন লিবিয়ার তেল সম্পদ (রিজার্ভ ৪৬.৪ বিলিয়ন ব্যারেল) উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এটাই হচ্ছে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র মূল উদ্দেশ্য। বলে রাখি বিশ্বের তেলের যে রিজার্ভ, তার ৫৬ ভাগ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আর এই তেল সম্পদের উপর যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিম ইউরোপ পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল।

পর্যবেক্ষকরা আল-কায়দার উত্থান তথা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মূল কারণ হিসেবে ইসরাইলী আগ্রাসী নীতিকে দায়ী করেছেন। স্বাধীন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সেখানে সংকটকে আরো গভীরতর করেছে। বারাক ওবামা তার ভাষণে বলেছেন ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে সীমান্তরেখা হবে ১৯৬৭ সালের লাইন অনুসারে। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রয়েছে স্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। কিন্তু বাস্তবতা যা তা হচ্ছে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওবামার উপস্থিতিতেই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন অত্যন্ত কঠোর ভাষায়। এখানেই রয়েছে মূল সমস্যা। যতদিন ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে সংকট থাকবে। আর এই সংকটকে পুঁজি করে আল-কায়দার মত সংগঠনের জন্ম হবে এবং তাদের ‘জিহাদী’ তত্পরতা বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের এটাও অন্যতম একটি সমস্যা।

আজ বারাক ওবামা আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন বটে, কিন্তু ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কখনও বন্ধ করতে পারেনি। নিরীহ ফিলিস্তিনীদের হত্যা করে ইসরাইল মানবতাবিরোধী অপরাধ করলেও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলী নেতাদের বিচার করা যায়নি কখনো । আরব বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে , কিন্তু তা হতে হবে তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সামনে রেখে। ‘চাপিয়ে দেয়া গণতন্ত্র’ আরব বিশ্বের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিমান হামলা চালিয়ে একটি পুতুল সরকার সেখানে বসিয়ে দিয়ে তেল সম্পদকে কবজা করার নাম, আর যাই হোক গণতন্ত্র হতে পারে না।

প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ভাষণে ইন্টারনেট বিপ্লবের কথা বলেছেন। বলেছেন ইন্টারনেট সারা পৃথিবীতে মানুষের জানালা খুলে দিয়েছে। সেলফোন ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তরুণ সমাজকে যে কোন সমাজের চেয়ে অধিক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যে বিপ্লব ঘটাতে পারে, মিসর তার বড় প্রমাণ। আজ আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের যে ঢেউ উঠেছে, তাতে এই তরুণ সমাজ পালন করছে একটি বড় ভূমিকা। দুঃখজনক হলেও সত্য, তরুণ সমাজের একটা বড় অংশই সেখানে বেকার। তিউনিসিয়ায় গত ২৭ ডিসেম্বর ফল বিক্রেতা মোহম্মদ বউকুজিজি নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বউকুজিজি ছিলেন একজন বেকার কম্পিউটার গ্রাজুয়েট। পুরো আরব বিশ্বে এই তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা এখন অনেক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আলজেরিয়ায় ২৫ বছরের নিচে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ৪৭ দশমিক ৫ ভাগ। মৌরিতানিয়ায় এ সংখ্যা ৫৯ দশমিক ৩, মরক্কোয় ৪৭ দশমিক ৭, তিউনিসিয়ায় ৪২ দশমিক ১, লিবিয়ায় ৪৭ দশমিক ৪, মিসরে ৫২ দশমিক ৩, সিরিয়ায় ৫৫ দশমিক ৩, জর্ডানে ৫৪ দশমিক ৩, ইরাকে ৬০ দশমিক ৬, কিংবা সোমালিয়ায় ৬৩ দশমিক ৫। এরা একটি শক্তি। ক্ষমতাসীনদের একটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে এরা এসব তরুণ সমাজকে বুঝতে পারেননি। এরা একটি শক্তি। এরাই আরব বিশ্বে পরিবর্তনটা আনছে। আর প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ভাষণে এদের কথাই উল্লেখ করেছেন।

স্পষ্টতই আরব বিশ্ব একটি পরিবর্তনের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল National Endowment for Democracy। স্ট্রেট ডিপার্টমেন্ট বছরে ১০০ মিলিয়ন সাহায্য দেয় এই প্রতিষ্ঠানকে। এই সংস্থার মাধ্যমে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মিসরের গণ-অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত দু’টি সংস্থা April 6 movement কিংবা kafya কিংবা বাহরাইনের Center for Human Right-এর নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র (নিউইয়র্ক টাইমস ১৪ এপ্রিল, ২০১১)। উদ্দেশ্য একটাই— এ অঞ্চলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য তরুণ সমাজকে তৈরি করা। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সাথে পরিচিত করান। সমসাময়িক আরব বিশ্বের যে ইতিহাস, তাতে দেখা যায় ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উত্খাতের মধ্যে দিয়ে যে ‘বিপ্লব’-এর সূচনা হয়েছিল, সেটা ছিল পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সাথে কয়েকটি আরব বিশ্বের যুদ্ধ ও তাতে ব্যাপক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় অধ্যায়ের। তৃতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ইরানি ইসলামিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। প্রতিটি বিপ্লবই আরব বিশ্বে কিছু না কিছু পরিবর্তন ডেকে এনেছে। এখন তিউনিসিয়া ও মিসরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সেখানকার দীর্ঘদিনের সরকারের উত্খাতের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে চতুর্থ অধ্যায়। এই যে বিপ্লব, এই বিপ্লব আরব বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয় এখন।
[ পূর্বপ্রকাশ @ দৈনিক ইত্তেফাক ৩০-০৫-২০১১ ]

পাহাড়ে অসন্তোষ কার স্বার্থে

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। গত ২১ মে রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার দুর্গম মিতিঙ্গাছড়ি এলাকায় পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের চারজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মাঝে একজন হচ্ছেন অনিমেষ চাকমা, যিনি ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় নেতা। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইউপিডিএফের ডাকে গত ২৩ মে রাঙ্গামাটিতে পূর্ণদিবস সড়ক ও নৌ অবরোধ পালিত হয়েছে। এদিকে স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান বিবিসি’র বাংলা বিভাগকে জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হচ্ছে। যদিও এটা নিশ্চিত নয় যে সরকার এ ব্যাপারে নীতিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা। আমি ধরে নিচ্ছি, প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলা স্বরাষ্ট্র সচিব যখন এ ধরনের একটি বক্তব্য দেন, তখন এর পেছনে সত্যতা আছে। সরকার জনস্বার্থে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেই অধিকার সরকারের আছে। কিন্তু পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য শুধুই কি ইউপিডিএফ দায়ী? জনসংহতি সমিতি কি দায়ী নয়? জনসংহতি সমিতির ক্যাডাররা তো হত্যা করেছে ইউপিডিএফের নেতা ও কর্মীদের। একই অপরাধে তো দুটো সংগঠনই সমানভাবে দায়ী। নিষিদ্ধ করলে তো দুটো সংগঠনকেই নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। আসলে পাহাড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই এই হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড এই প্রথম নয়। অতীতেও বাঙালি মুসলমানদের হত্যা করেছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা, যাদের বেশিরভাগই জনসংহতি সমিতির সঙ্গে জড়িত।

পাহাড়ে সন্ত্রাস এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল পাহাড়ে শান্তি আসবে বলে। কিন্তু সেই শান্তি এখনও আসেনি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, শান্তিচুক্তির ফলে পাহাড়ে এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস কো’ বজায় থাকবে। অর্থাত্ যে যেখানে আছে, সে সেখানে থাকবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা লক্ষ্য করলাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করার পর পাহাড়িদের নেতা হিসেবে দাবিদার সন্তু লারমা একের পর এক যে বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন, তাতে তার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বারবার ফুটে উঠেছিল। তিনি একাধিকবার বাঙালিদের ওখান থেকে প্রত্যাহার করার দাবি করে আসছিলেন। এমনকি এক পর্যায়ে দাতা সংস্থা বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সন্তু বাবুর এই বক্তব্যকে পরোক্ষভাবে সমর্থনও করে। সন্তু বাবুর এ ধরনের বক্তব্য তাকে শুধু বিতর্কিতই করেনি, বরং তার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, সন্তু লারমা এ ধরনের বক্তব্য রাখার কোনো অধিকার রাখেন না। কেননা তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেনি। তিনি চাকমাদেরও এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন না। ইউপিডিএফও পাহাড়ি তথা চাকমাদের প্রতিনিধিত্ব করে। দ্বিতীয়ত, চাকমাদের মতো বাঙালিরাও সেখানকার ‘সেটলার’। বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করে। প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে নিঃসন্দেহে তারা সংখ্যায় কম ছিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠী ‘আদিবাসী’ নয়। বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী হচ্ছে সাঁওতাল ও খাসিয়ারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তিক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে পারে না।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশক’টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। তাতেও মন গলেনি সন্তু বাবুর। এরপরও তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে। তাদের কর্মযোগ্যতা, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অথচ সেই সেনাবাহিনীকে বারবার বিতর্কিত করছেন সন্তু বাবু। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা নিজেদের উত্সর্গ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। কিছু কিছু এলাকা থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করার ফলে ওইসব অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বরকলের ঘটনা এর বড় প্রমাণ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বরকলের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র আছে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা অস্ত্র সংগ্রহ করছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় অভিযোগ করা হয়েছিল, জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র ক্যাডাররা সব অস্ত্র জমা দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে ওই অভিযোগের পেছনে সত্যতা ছিল। শান্তিচুক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এর একটা ভালো দিক হচ্ছে, ভারতে আশ্রিত চাকমারা তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে এসেছেন। সরকার তাদের এককালীন টাকা দিয়ে পুনর্বাসিত করেছে। কিন্তু আমরা কখনও চাইব না পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। পূর্ব তিমুর ছিল এক সময় ইন্দোনেশিয়ার একটি অংশ, একটি প্রদেশ। কিন্তু খ্রিস্টান অধ্যুষিত পূর্ব তিমরুকে পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীন করেছিল তাদের স্বার্থে। পূর্ব তিমুর স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। আর দক্ষিণ সুদান, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে অতি সম্প্রতি গণভোটের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আগে দক্ষিণ সুদান ছিল সুদানের একটি অংশ। পূর্ব তিমুরের মতো দক্ষিণ সুদানে তেল পাওয়া গেছে। পশ্চিমাদের স্বার্থ এখানে অনেক। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের শঙ্কাটা তাই অনেক বেশি। আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভায়ও এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে (আমার দেশ, ১০ এপ্রিল, ২০১১)। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ঘন ঘন সফর, ইউএনডিপির কর্মকাণ্ড ইত্যাদি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

যারা দেশ, জাতি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবেন, তাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পার্বত্য সাধারণ উপজাতীয়রা গভীর জঙ্গলে বসবাস করে। তারা ছোটখাটো দোকান কিংবা জুম চাষ করে, কৃষিপণ্য বিক্রি করে অতি কষ্টে দিন যাপন করে। মিশনারিরা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এদের ধর্মান্তরিত করছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কী হারে উপজাতীয়রা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটা পরিসংখ্যান নিলেই জানা যাবে। উপজাতীয়দের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। শুধু তাই নয়, ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রজেক্টে পাহাড়ি ধর্মান্তরিত লোকদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। অথচ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা সেখানে চাকরি পাচ্ছে না। বাঙালিদের সঙ্গে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে। পাহাড়ি অঞ্চলে একজন উপজাতীয় ড্রাইভার যে বেতন পান, অনেক বাঙালি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও সেই বেতন পান না। পাহাড়ে স্পষ্টতই একটি বিভাজন তৈরি করা হয়েছে, যা সংবিধানের ১৯ নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কিন্তু দুঃখ লাগে, তথাকথিত সুশীল সমাজ কোনোদিনও এ প্রশ্নে মুখ খোলেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তারা মানববন্ধন করলেও, ওখানে বসবাসকারী বাঙালিরা যে ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সে ব্যাপারে একবারও তারা কথা বলেননি। বিদেশিরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানকে মূল রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করেছিল। স্থানীয় লোকদের ব্যাপক ধর্মান্তরিত করে তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধন করেছিল। আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও ওই একই ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এ ব্যাপারে সোচ্চার ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আজ বরকলের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পাহাড়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। পাহাড়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড সেখানে বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পগুলোতে ফের সেনাক্যাম্প স্থাপন করা দরকার। ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করাও ঠিক হবে না। কেননা সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংগঠনটি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচালনা করার অধিকার রাখে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়াও জরুরি। নির্বাচন না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাচ্ছে। আরও একটা কথা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এটা অবৈধ ও অশোভন। একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? আমরা বরকলের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। সরকার দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে—এটাই প্রত্যাশা করি।

একটি ছবি, অনেক প্রশ্ন

একটি ছবি ছাপা হয়েছে দৈনিক যুগান্তরের ১৯ মে’র সংখ্যায় প্রথম পাতায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কুশপুত্তলিকা দাহ করছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির কুশপুত্তলিকা দাহ! এটা কী কোন ‘সভ্য’ দেশে চিন্তা করা যায়? কেন একজন প্রধান বিচারপতি বিতর্কিত হবেন? সবাই প্রধান বিচারপতি হতে পারেন না। সবার সেই মেধা ও যোগ্যতা থাকে না। একজন বিচারপতি তো সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষটি। জাতি, সমাজ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সংকটের সময় তিনি হচ্ছেন ভরসারস্থল। আজ তিনিই কিনা বিতর্কিত হলেন! আমরা আমজনতা, আমরা দেখলাম তার কুশপুত্তলিকা দাহ করছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সমিতির নেতারা। এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না।
ছবিটি দেখে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, আমি জানি না। কিন্তু আমি কষ্ট পেয়েছি। বিচারপতি হক যদি নিরপেক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, তাহলে বোধকরি আমাদের এই কুশপুত্তলিকা দাহ করার ছবি দেখতে হতো না। বাংলাদেশের ৪০ বছরের জীবনে এভাবে অতীতে কোন প্রধান বিচারপতির কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। আমি সাবেক প্রধান বিচারপতিদের সঙ্গে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে মেলাতে পারলাম না, দুঃখিত আমি। আমাদের সাবেক প্রধান বিচারপতিদের অনেকেই জীবিত আছেন এবং তারা সবার শ্রদ্ধাভাজন। বিচারপতি হাবিবুর রহমান কিংবা বিচারপতি মোস্তফা কামাল আমাদের কাছে এক একজন আদর্শ। তারা যখন সমাজ, দেশ, জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন, লেখেন, আমি আগ্রহসহকারে তা পড়ি। বোঝার চেষ্টা করি তাদের মূল্যায়ন। তাদের মূল্যায়ন আমাকে সাহায্য করে সমাজকে বিশ্লেষণ করতে, রাজনীতির গতিপথ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে, তা অনুধাবন করতে। কিন্তু আমি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কাছ থেকে কী গ্রহণ করব? তিনি তো আমার আদর্শ হতে পারেন না। যার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়, তিনি হাজার হাজার মানুষের হƒদয় ভেঙে দেন। তিনি এ দেশের অতি সাধারণ মানুষের আদর্শ হতে পারেন না। কিন্তু বিচারপতি হাবিবুর রহমান, কিংবা বিচারপতি মোস্তফা কামালÑ এরা আদর্শ। আমি আমার অনেক প্রবন্ধে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের বক্তব্য উল্লেখ করেছি। এমনকি বিচারপতি মোস্তফা কামালের উদ্ধৃতিও আমি দিয়েছি। কিন্তু বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের উদ্ধৃতি আমি কী দেব! যেখানে তিনি নিজে আইনজীবীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেন না, সেখানে আমজনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন কিভাবে?
অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় তিনি দিয়েছেন। পঞ্চম সংশোধনী, সপ্তম সংশোধনী কিংবা ত্রয়োদশ সংশোধনীÑ সংবিধানের এসব সংশোধনী বাতিল হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। তার নেতৃত্বে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন। রায় নিয়ে মন্তব্য করা যাবে না। তাতে করে আদালত অবমাননা হয়ে যেতে পারে। আমি সাধারণ শিক্ষক একজন। আমি ঝুঁকি নিতে পারি না। ওই তিনটি রায় নিয়ে নানা মন্তব্য, নানা কথা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মুন সিনেমা হল নিয়ে মামলা হয়েছিল। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রায় দিলেন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের। বিচারপতি মুন সিনেমা হলের মালিকানার সঙ্গে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর কী সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছিলেন, আমি বলতে পারব না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মুন সিনেমা হলের আদি মালিক তার সিনেমা হল আর ফেরত পাননি। কিন্তু ইতিমধ্যে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়ে গেছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হল। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হল। আবার একই রায়ে বলা হল আগামী দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। এটা কি পরস্পরবিরোধী নয়। যদি বাতিল হয়, সব সময়ের জন্যই বাতিল। পরের দুটো কেন তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে? এটা কি এ জন্য যে, বিচারপতি খায়রুল হক নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন? সংবিধান তো তাই বলে। সংবিধানের ৫৮(খ) এবং বিশেষ করে ৫৮(গ)(৩) ধারায় যদি পরিবর্তন আনা না হয়, তাহলে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান।
যিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসরে গেছেন, তার তো চাওয়ার কিছু থাকতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা তাকে তো অনেক দিয়েছেন। সাধারণ নিয়মে তার প্রধান বিচারপতি হওয়ার কথা ছিল না। দু’দুবার অন্যকে ‘সুপারসিড’ করে তাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল। সর্বশেষ ঘটনা, বিচারপতি শাহ মোহাম্মদ আবু নাইম মোমিনুর রহমান পদত্যাগ পর্যন্ত করেছিলেন। বিচারপতি শাহ আবু নাইমের পদত্যাগের ঘটনাও বিচার বিভাগের জন্য কলংক। উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করে সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে পারত। এক্ষেত্রে শাহ মোহাম্মদ আবু নাইম মোমিনুর রহমানকে প্রধান বিচারপতি করা হলে তাতে ক্ষতির কিছু ছিল না। তিনিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারতেন না। যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বিশ্বাস করেন, তারা তো ‘ষড়যন্ত্র’ খুঁজবেনই। আমি আরও খুশি হতাম বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার আগের দিন যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, তখন যদি তিনি ঘোষণা করতেন তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন না, তাহলে তিনি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা বলেননি। বলেছেন, ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে সবকিছু। এটা ‘ডিপ্লোমেটিক অ্যানসার’। জবাব এড়িয়ে যাওয়া। তার এ জবাবই বলে দেয় তার কিছুটা হলেও ওই পদটির ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে। এটা আমাকে অবাক করেছে। একজন বিচারপতি তো সব লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকেন। এই রাষ্ট্র তো বিচারপতি ও বিজ্ঞ খায়রুল হককে অনেক কিছু দিয়েছে। তিনি কোন দিনই প্রধান বিচারপতি হতে পারতেন না। কিন্তু হয়েছেন। তাকে নিয়ে এত যখন বিতর্ক, তখন তার বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দেয়া উচিত তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন না। যেমনটি করেছিলেন বিচারপতি কেএম হাসান।
আরও একটি বিষয়ে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি কষ্ট পেয়েছি। তা হচ্ছে, তার স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। বিচারপতি খায়রুল হক আপিল বিভাগে আইনজীবীদের এনরোলমেন্ট নিয়ে লাগামহীন অনিয়ম আর স্বজনপ্রীতি করেছেন। কতিপয় মুখচেনা আর রাজনৈতিক আদর্শগতভাবে একই ঘরানার লোকদের এনরোলমেন্ট করে গেছেন তিনি। এর ফলে হাইকোর্ট বিভাগের অনেক যোগ্য আইনজীবীও আপিল বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বাদ পড়েছেন। এটা করা কি তার ঠিক হয়েছে? তিনি কেন রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেন না? এখন কেউ যদি তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়, তাহলে কি তিনি ভুল করবেন? বিচারপতিরা আমাদের নমস্য। তারা যদি কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে অনুপ্রাণিত কিংবা প্রভাবিত হন, তাহলে তা জাতির জন্য খারাপ। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সুন্দরবনে ‘প্রমোদ ভ্রমণে’ গিয়েছিলেন। তিনি সুন্দরবনে যেতেই পারেন। একজন নাগরিক হিসেবে এই অধিকার তার আছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কিভাবে সুন্দরবন ভ্রমণে গেছেন, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যুগান্তরের অপর একটি প্রতিবেদন। তিনি তো অতীতে অনেককে ‘শাস্তি’ দিয়েছেন। বিচারপতিদের হাত অনেক লম্বা। তারা যখন এজলাসে থাকেন, তখন কথা বলা যায় না, প্রশ্ন তোলা যায় না, তাতে আদালত অবমাননা হয়। এখন তিনি অবসরে। এখন সাহস করে বলা যায়। সত্য উদ্ঘাটিত হোক। তিনি যদি অন্যায় করে থাকেন, তারও ‘বিচার’ হওয়া উচিত। তিনি যদি সত্যি সত্যিই ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, প্রমোদ ভ্রমণের নামে সরকারি অর্থের অপচয় করে থাকেন, তাহলে দুদকের উচিত তাকে নোটিশ দেয়া। ব্যাখ্যা চাওয়া। অতীতে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে তো দুদক নোটিশ দিয়েছিল। কিংবা বিচারপতি খায়রুল হক নিজেও পারেন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরগুলোর একটা ব্যাখ্যা দিতে। না হলে প্রশ্ন থাকবেই। তারপরও আমি তাকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। কেননা তিনি আমাদের সাবেক প্রধান বিচারপতি। সংবাদপত্রে যখন লিড স্টোরি ছাপা হয়Ñ সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গেছেন খায়রুল হক (যুগান্তর, ১৮ মে), তখন তার প্রতি আস্থাটা কেন যেন আর থাকে না। আমার ধারণা অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন, বিচারপতি হক নিজেকে বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি যদি নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ থেকে প্রত্যাহার করে না নেন, তাহলে বিতর্ক বাড়বে। তিনি নিজে আরও বেশি বিতর্কিত হবেন। একসময় এমন সব ‘তথ্য’ বেরিয়ে আসবে, তাতে করে তিনি নিজে এবং সমগ্র জাতি আরও লজ্জিত হবে। তাকে উপদেশ দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তার সঙ্গে আমার আগামীতে দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে অনুরোধ করব, এ দেশের সাধারণ মানুষ অনেক কষ্টে থাকে, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত তারা। সুবিধাভোগীরা টাকার জোরে সব অন্যায়কে ‘জায়েজ’ করে নেয়। আপনি এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আপনাকে মানুষ মনে রাখবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে যদি আপনি দাঁড়ান, দুঃখী মানুষরা আপনাকে মনে রাখবে। মাওলানা ভাসানী কোনদিন ক্ষমতায় যাননি। ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতিও তিনি করেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষ, কৃষকদের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরদিন। দ্বিতীয় আরেকজন মাওলানা ভাসানীর জš§ হয়নি আজও। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আপনি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকুন, এটাই আমরা চাই। কেননা আপনি বিচারপতি এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর নিয়েছেন। আর আমাদের ভরসার স্থান এখনও উচ্চ আদালত। ওই আদালত এবং আদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আমরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেখতে চাই। ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন, মইনউদ্দিনের কী পরিণতি, আমরা সবাই তা জানি। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আমরা আপনাকে ওই কাতারে দেখতে চাই না।
আরও একটা কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার আমি পক্ষে। ভোলার উপনির্বাচন প্রমাণ করেছে আমরা এখনও দলীয় সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। আমাদের মানসিকতায় এখনও আমরা পরিবর্তন আনতে পারিনি। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সংবিধানের ৫৮(খ) ও ৫৮(গ)-তে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। সংবিধান সংশোধনের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছে, সেই কমিটি এই কাজটি করতে পারে। বিশেষ করে ৫৮গ(৩), ৫৮গ(৪), ৫৮গ(৬) ধারায় পরিবর্তন এনে এখানে বিচারপতিদের পরিপূর্ণভাবে বাদ দেয়া যেতে পারে। একটি ‘এলডার্স কাউন্সিল’ গঠন করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে বাধ্যবাধকতা ও নীতি নির্ধারণী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একজন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক অনেক বিতর্কের জš§ দিয়ে গেছেন। আগামীতে আরও বিতর্ক হোকÑ এটা কারোই কাম্য নয়।
[ পূর্ব প্রকাশ @ দৈনিক যুগান্তর ২৮ মে ২০১১]

আল-কায়েদার নতুন নেতৃত্ব এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকা-ের পর আল-কায়েদা নতুন একজন নেতা পেয়েছে। তার নাম সাইফ আল আদেল। তিনি এক সময় মিসরের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। অনেকটা অপরিচিত সাইফ আল আদেলের নির্বাচন অনেকেরই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কেননা তিনি এর আগে কখনো আলোচনায় আসেননি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন আল-কায়েদার দ্বিতীয় নেতা আইমান আল জাওয়াহিরী আল-কায়েদার নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু সেটা হলো না। তবে যতটুকু জানা গেছে, তাতে দেখা যায় সাইফ আল আদেল দীর্ঘদিন ধরেই আল-কায়েদার নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত হত্যাকা-ের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন। তিনি একজন সামরিক কৌশলবিদ। সম্ভবত এ কারণেই তিনি ওসামা বিন লাদেনের খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন। ওসামা তার মৃত্যুর আগে এ ব্যাপারে কোনো উইল করে গিয়েছিলেন কি না তা জানা না গেলেও সাইফ আল আনোয়ার নির্বাচন প্রমাণ করে তার ব্যাপারে দলীয় কমান্ডের কোনো আপত্তি নেই। এমনকি আল-কায়েদা যে সক্রিয় এটা আরো একটা বড় প্রমাণ। না হলে অতি দ্রুত তারা নেতা নির্বাচন করতো না। তবে তার এই নির্বাচন নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে এখন। আল-কায়েদার মাঝে কোনো বিভক্তি আছে কি না, সেটা লক্ষ্য রাখার বিষয়। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, আর তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এর যে সূচনা করেছিল, তার অবসান হবে না।
সর্বশেষ ওবামা যে ভাষণ দিয়েছেন, তাতে তিনি আরব বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য এক ধরনের মায়াকান্ন দেখালেও, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এ অবসানের কথা তিনি বলেননি। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিতৃষ্ণা মনোভাব অব্যাহত রয়েছে। ওবামার ২০০৮ সালে দেয়া কায়রো ভাষণ (যেখানে তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছিলেন) ও সর্বশেষ ভাষণেও এমন কোনো বক্তব্য দেননি, যা মুসলমানদের আস্থা অর্জন করতে পারে। তাই আল-কায়েদার তৎপরতা কমাবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আল-কায়েদা ইরাকি সংস্করণ। একই সঙ্গে অষ-য়ধবফধ রহ ওংষধসরপ সধমযৎধন আমেরিকার ঝধষধভরংঃ মৎড়ঁঢ় ভড়ৎ ঢ়ৎবধপযরহু পড়সনধঃ এবং অষ-য়ধবফধ রহ ঃযব অৎধনরধহ ভৎহরহংঁষধ-এর মতো সংগঠনগুলোর তৎপরতা বাড়বে। মৃত ওসামা তাদের জন্য তখন একই আদর্শ। জিহাদি তৎপরতা উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে তখন। ঙঢ়বৎঃরড়হ এবৎড়হরসড় নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এটা যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। তখন যে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র (অথবা অন্য কোনো রাষ্ট্র) হামলা চালাতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো অবদান রাখবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ওসামার মৃত্যুর পর এখন আফগানিস্তান থেকে খুব দ্রুত সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। কিন্তু এটি হবে না। কারণ আফগানিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এ অঞ্চল থেকে মধ্য এশিয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। মধ্য এশিয়ায় রয়েছে গ্যাস ও তেলের বড় রিজার্ভ। এ তেল ও গ্যাসের ব্যাপারে আরো রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানিগুলো (আইওসি)। ইতোমধ্যে বেশ কটি আইওসি (বিলি, মবেল, ইউনিকল, সেল, টোটাল) এ অঞ্চলে গ্যাস ও তেল উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে। মধ্য এশিয়ার এই জ্বালানি সম্পদের কারণে আগামী দিনে এ অঞ্চলে আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সখ্য, তা ভেঙে যেতে পারে মধ্য এশিয়ার এই জ্বালানি সম্পদের কারণে। ভারত ও চীনেরও আগ্রহ রয়েছে এই জ্বালানি সম্পদের ব্যাপারে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে চীন ইতোমধ্যে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গড়ে তুলেছে। যেখানে রাশিয়াও এর সদস্য। মধ্য এশিয়ার এই তেল ও গ্যাস চীন বা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যাবে এটা যুক্তরাষ্ট্র চাইবে না। তাই আফগানিস্তানে তার উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় যাবে।
ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন প্রশ্নের মুখে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয় শুধু সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকা- রোধ করতে। তখন মার্কিন কংগ্রেস এই অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন লাদেনের ঘটনায় দুই রাষ্ট্রের মাঝে আস্থার ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের জন্য সামনের দিনগুলো খারাপ। পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি নিজেদের মাঝে আস্থার সম্পর্ক বাড়াতে না পারেন, তাহলে তা পাকিস্তানের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। সন্ত্রাসীদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণভার চলে যেতে পারে, এই যুক্তি তুলে ওঅঊঅ পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণভার নিজেদের হাতে রাখার একটি উদ্যোগ নিতে পারে। স্পষ্টতই লাদেনের ঘটনায় প্রমাণিত হলো পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের লালন করে ও প্রশ্রয় দেয়। এই ঘটনায় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ল। ভারত এখন পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিতে পারে। ভারত যদি এটা করে, তাহলে তা উপমহাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়াবে মাত্র। প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০০৯ সালের জুন মাসে কায়রোতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সূচনার কথা তিনি বলেছিলেন। এখন, লাদেনকে হত্যার পরে এই আস্থায় চিড় ধরতে বাধ্য। কোনো মুসলিম দেশই এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথা বিবেচনা করে প্রকাশ্যে মার্কিন প্রশাসনের বিরোধিতা অথবা সমর্থন করেন না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ডড়ড়ফৎড় িডরষংড়হ ঈবহঃবৎ-এর গবেষকরাও বলেছেন লাদেনের হত্যাকা-ের ঘটনার পর আরব বিশ্বে ইসলামপন্থীদের উত্থান রোধ করা সম্ভব হবে না। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনির মধ্যে একটা সমঝোতা হবে, এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। এখন ইসরাইলের আগ্রাসী তৎপরতা আরো বাড়তে পারে। মিসরে ইসলামপন্থী হিসেবে খ্যাত 'ইসলামিক ব্রাদারহুড' পার্টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছে। বোঝাই যায় লাদেনের হত্যাকা- যে 'সহানুভূতির ঢেউ' সৃষ্টি করেছে, তা থেকে ফায়দা ওঠাতে চাচ্ছে আরব বিশ্বের ইসলামিক দলগুলো। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা একটি নতুন মাত্রা পাবে। এ অঞ্চলে ন্যাটোর এশীয়করণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের তথা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এবং ভারতের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে ন্যাটোর এশীয় সংস্কার, যা কিনা তথাকথিত 'নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হতে পারে ন্যাটো বাহিনী। মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ১৯৪৮ সালে এভাবেই ন্যাটো গঠিত হয়েছিল। এ ধরনের যে কোনো সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে। চীনও বিষয়টি সহজভাবে দেখছে না। ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকা-ের পর খুব দ্রুত ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাবুল সফর প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র চায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত একটা বড় ভূমিকা পালন করুক। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স এ অঞ্চলে নতুন করে এক ধরনের যুদ্ধের নাম দিতে পারে।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেছেন। চীন পাকিস্তানকে শুধু ৫০টি আধুনিক যুদ্ধ বিমান দিয়েই সাহায্য করছে না; বরং বিশ্ববাসীকে চীন জানিয়ে দিয়েছে সঙ্কটের এই মুখে চীন পাকিস্তানের পাশে থাকবে। এর অর্থ চীন-পাকিস্তান এবং রাশিয়াকে নিয়ে একটি পক্ষ গড়ে উঠতে পারে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে।
এরই মাঝে আল-কায়েদার নবনির্বাচিত নেতা সাইফ আল আদেল হুশিয়ারি দিয়েছে ব্রিটেনে হামলার। পাকিস্তানে তালেবান অনুসারি লাদেনের মৃত্যুর বদলা নিতে ন্যাটোর মালবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, তা হচ্ছে লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদ কমলো না, বরং বাড়ল এবং জঙ্গিরা এখন লাদেন হত্যার প্রতিশোধ নিতে আরো সংঘবদ্ধ।

ড. তারেক শামসুর রেহমান: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
আমাদের বাঙলাদেশ
প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক যায় যায় দিন
শুক্রবার ২৭ মে ২০১১ ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ ২২ জমাদিউস সানি ১৪৩২ বছর ০৫ সংখ্যা ৩৪৪  

বিন লাদেন-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির চালচিত্র

ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের পর অনেক প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। খোদ মার্কিন মুল্লুকেই এখন বলা হচ্ছে, লাদেন 'অপরাধী' হতে পারেন; কিন্তু কমান্ডো পাঠিয়ে তাঁকে হত্যা করা কোনো ধরনের আইনের মধ্যে পড়ে না। দোষীকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে_এটাই আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা। যাঁরাই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছেন (নাজি যুদ্ধাপরাধী, বসনিয়া, রুয়ান্ডা কিংবা লাইবেরিয়ার যুদ্ধাপরাধী) তাঁদের বিচার হয়েছে। লাদেনের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। উপরন্তু অ্যাবোটাবাদের বাড়িতে যে মার্কিনি অপারেশন পরিচালিত হবে, তা পাকিস্তানি প্রশাসন জানত। Global Post-এর ১২ মের সংখ্যায় বলা হয়েছে, ওসামা বিন লাদেন যে বাড়িতে থাকতেন, অপারেশনের দুই ঘণ্টা আগে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন এসে আশপাশের সব বাড়ির লোকজনকে বলে গিয়েছিল বাড়ির সব আলো নিভিয়ে রাখতে। পার্শ্ববর্তী এলাকা 'বিশাল টাউন'-এ বসবাসকারীরাও জানিয়েছেন, তাঁরা গভীর রাতের অপারেশনের আগে ওই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ করেছেন। অর্থাৎ পরিকল্পনা করেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে (হতে পারে সেটা সেনাবাহিনীর একটা অংশ) জানিয়েই অপারেশন Geronimo (বিন লাদেনকে হত্যা) পরিচালিত হয়েছিল। পাঁচ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন জানত ওসামা কোথায় আছেন (Foreign Policy Magayine ও গত ৪ মে প্রকাশিত একটি ছবি তার বড় প্রমাণ)। তাই সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন মার্কিন প্রশাসন এত দিন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখল এবং বিচারের জন্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করল না। তবে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, বিন লাদেনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর যে সূচনা যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, তার অবসান হবে কি না। এর জবাব হচ্ছে-না। যুক্তরাষ্ট্র এ ধারণা পরিত্যাগ করবে না। বরং বেশ কিছু মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রকে 'অকার্যকর বা সন্ত্রাসীদের মদদদাতা' আখ্যায়িত করে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা রাষ্ট্র ওইসব রাষ্ট্রকে এক ধরনের চাপের মুখে রাখতে পারে। একই সঙ্গে আল-কায়েদার তৎপরতা বন্ধ হবে বলেও মনে হয় না। AQI (ইরাক), AQIM (Al-Qaeda in Islamic Maghreb) কিংবা GSPC (Salafist Group for Preaching & Combat, Algeria), AQAP (AL-Qaeda in the Arabian Peninsula)-এর মতো সংগঠনের তৎপরতা বাড়বে। মৃত ওসামা তাদের জন্য এখন একটি আদর্শ। 'জিহাদি' তৎপরতা উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, 'Operation Geronimo' নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এটা যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। এখন যেকোনো রাষ্ট্রের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র (অথবা অন্য কোনো রাষ্ট্র) হামলা চালাতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো অবদান রাখবে না। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ওসামার মৃত্যুর পর এখন আফগানিস্তান থেকে খুব দ্রুত সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে; কিন্তু এটি হবে না। কারণ আফগানিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এ অঞ্চল থেকে মধ্য এশিয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। মধ্য এশিয়ায় রয়েছে গ্যাস ও তেলের বড় রিজার্ভ। এ তেল ও গ্যাসের ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অয়েল কম্পানিগুলোর (আইওসি)। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি আইওসি (বিলি, মবিল, ইউনিকল, শেল, টোটাল) এ অঞ্চলে গ্যাস ও তেল উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে। মধ্য এশিয়ার এই জ্বালানি সম্পদের কারণে আগামী দিনে এ অঞ্চলে 'আঞ্চলিক যুদ্ধের' সূচনা হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সখ্য তা ভেঙে যেতে পারে মধ্য এশিয়ার এই জ্বালানি সম্পদের কারণে। ভারত ও চীনেরও আগ্রহ রয়েছে এই জ্বালানি সম্পদের ব্যাপারে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে চীন ইতিমধ্যে 'সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন' গড়ে তুলেছে, যেখানে রাশিয়াও সদস্য। মধ্য এশিয়ার এই তেল ও গ্যাস চীন বা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যাক, এটা যুক্তরাষ্ট্র চাইবে না। তাই আফগানিস্তানে তার উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় যাবে। চতুর্থত, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন প্রশ্নের মুখে। প্রতিবছর পাকিস্তানকে তিন মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয় যুক্তরাষ্ট্র শুধু সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ড রোধ করতে। এখন মার্কিনি কংগ্রেস এই অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিন লাদেনের ঘটনায় দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের জন্য সামনের দিনগুলো খারাপ। পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতারা যদি নিজেদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক বাড়াতে না পারেন, তাহলে তা পাকিস্তানের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। সন্ত্রাসীদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণভার চলে যেতে পারে, এই যুক্তি তুলে IAEA পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণভার নিজেদের হাতে রাখার একটি উদ্যোগ নিতে পারে। স্পষ্টতই বিন লাদেনের ঘটনায় প্রমাণিত হলো, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের লালন করে ও প্রশ্রয় দেয়। এ ঘটনায় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ল। ভারত এখন পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিতে পারে। ভারত যদি এটা করে, তাহলে তা উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়াবে মাত্র। পঞ্চমত, বারাক ওবামা ২০০৯ সালের জুন মাসে কায়রোতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সূচনার কথা তিনি বলেছিলেন। এখন বিন লাদেনকে হত্যার পর এ আস্থায় চিড় ধরতে বাধ্য। কোনো মুসলিম দেশই এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথা বিবেচনা করে প্রকাশ্যে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের Woodrow Wilson Center-এর গবেষকরাও বলেছেন, বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর আরব বিশ্বে ইসলামপন্থীদের উত্থান রোধ করা সম্ভব হবে না। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে, এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। এখন ইসরায়েলের আগ্রাসী তৎপরতা আরো বাড়তে পারে। মিসরে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত 'ইসলামিক ব্রাদারহুড' পার্টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছে। বোঝাই যায়, বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ড যে 'সহানুভূতির ঢেউ' সৃষ্টি করেছে, তা থেকে ফায়দা ওঠাতে চাচ্ছে আরব বিশ্বের ইসলামিক দলগুলো। ষষ্ঠত, লাদেনের মৃত্যুর পর এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা একটি নতুন মাত্রা পাবে। এ অঞ্চল ন্যাটোর এশীয়করণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের তথা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এবং ভারতের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ, যা কি না তথাকথিত 'নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা'র স্বার্থে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হতে পারে। মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে ১৯৪৮ সালে এভাবেই ন্যাটো গঠিত হয়েছিল। এ ধরনের যেকোনো সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে। চীনও বিষয়টি সহজভাবে দেখবে না। সপ্তমত, বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের পর খুব দ্রুত ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাবুল সফর প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র চায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত একটা বড় ভূমিকা পালন করুক। ভারতের বড় বিনিয়োগ রয়েছে আফগানিস্তানে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারত চাইবে সুবিধা আদায় করে নিতে। অষ্টমত, যুক্তরাষ্ট্রের 'মোস্ট ওয়ানটেড পারসন' বিন লাদেনকে হত্যা করে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। ওই ঘটনার পর এক জরিপে দেখা গেছে, ওবামার জনপ্রিয়তা এখন ৬০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। আগামী বছর সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ওবামা দ্বিতীয় টার্মের জন্য তাঁর জয় নিশ্চিত করলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ যখন তাঁর 'স্বাস্থ্য পরিকল্পনা' নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত, তখন ওসামা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে ওবামা দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। মানুষ এখন আর স্বাস্থ্য খাত নয়, বরং ওসামা নিয়েই বেশি উৎসাহী এবং তাঁর হত্যাকাণ্ডে তারা খুশিও। যুক্তরাষ্ট্র এটাই চেয়েছে এবং তাতে সফল হয়েছে। নবমত, বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার এ প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে বারবার বিতর্কিত করছে। Humanitarian Intervention-এর নামে লিবিয়ায় বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিল, লিবিয়ায় গাদ্দাফিপরবর্তী নেতৃত্বকে তারা দেখতে চায়। লিবিয়ার তেলসম্পদ একদিকে যেমন তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি রয়েছে উত্তর আফ্রিকার (শাদ, নাইজার) বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের (তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, প্লাটিনাম) ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। লিবিয়া হচ্ছে 'গেটওয়ে'-এখান থেকে উত্তর আফ্রিকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো তার সামরিক কমান্ড AFRICOM প্রতিষ্ঠা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একুশ শতকে নতুন এক আফ্রিকাকে দেখতে চায়। একসময় যে অঞ্চলগুলো ছিল ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের উপনিবেশ (১৮৮৪ সালের বার্লিন সম্মেলন অনুযায়ী), সেই অঞ্চলগুলো এখন পরিণত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০১ সালে প্রণয়ন করেছিলেন Great Middle East Project। আজকে সমগ্র আরব বিশ্বে যে পরিবর্তনের ঢেউ, তার পেছনে রয়েছে এই মহাপরিকল্পনা। লিবিয়ায় Humanitarian Intervention ও বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ড মূলত একই সূত্রে গাথা, একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক রয়েছে।
বিন লাদেনকে হত্যা করার পর তাঁর বিচার করার আর কোনো সুযোগ থাকল না। ঠিক তেমনি তাঁর মুখ থেকে নাইন-ইলেভেনের ঘটনার প্রেক্ষাপটও জানা গেল না। কিন্তু পেন্টাগন যখন বেশ কিছু ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করে, তখন তাদের 'আসল উদ্দেশ্য'টি ফাঁস হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে, যে ব্যক্তিকে সারা বিশ্বের মানুষ বাড়িতে বসে ভিডিওতে দেখছে, এটা কি সম্ভব? তিন স্ত্রী এবং ১৭ সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন_এটা কি কল্পনা করা যায়? কোনো ইন্টারনেট বা ফোন ছিল না। তাহলে আল-কায়েদাকে পরিচালনা করতেন কিভাবে? এর জবাব এখন নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে সত্য বেরিয়ে আসবেই। এক দিন (১৯৭৯) ওসামাকে পেন্টাগনই সৃষ্টি করেছিল। তারাই তাঁকে এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। এখন তাঁর প্রয়োজনীয়তা আর নেই। তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্র যে শুধু ওসামা বিন লাদেনের ক্ষেত্রে এমনটি করল, তা নয়। বরং ইতিহাসে এর প্রমাণ আরো আছে। একজন মৃত বিন লাদেন বরং জিহাদি আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী ও উৎসাহী করবে মাত্র।

মমতার বিজয় আমাদের আশাবাদী করে না

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এখন মমতা ব্যানার্জি। দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টকে পরাজিত করে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রীর আসনটি ‘দখল’ করতে সমর্থ হলেও এ থেকে আমাদের উত্ফুল্ল হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। কেননা মমতা কেন্দ্রের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। এখন জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে আছেন। এক সময় বিজেপির সঙ্গেও ছিলেন। কেন্দ্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ’র (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) মিত্র ছিলেন মমতা। অনেকদিন থেকেই ক্ষমতার আশপাশে আছেন। আমাদের নেতা-নেত্রীরা যখনই নয়াদিল্লি যান, তখন দু’ব্যক্তির সঙ্গে অবশ্যই তারা দেখা করেন। তাদের একজন প্রণব মুখার্জি, অপরজন মমতা ব্যানার্জি। আমাদের নেতা-নেত্রীদের ধারণা তাদের দু’জনের সঙ্গে দেখা করলে, পদ্মার ইলিশ, মিষ্টি আর সিরামিকের উপহার সামগ্রী নিয়ে গেলে তারা বাংলাদেশের সমস্যার ‘সমাধান’ করে দেবেন। 
অতীতে জ্যোতি বসু যত দিন জীবিত ছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের আরেকটা ‘ভরসার স্থান’। কিন্তু বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান কী হয়েছে, আমরা তা সবাই জানি—আমাদের সমস্যা এখানেই। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদ অনুসরণ করে আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারছি না, সেখানে আমরা ভরসা করছি কখনও জ্যোতি বসুর ওপর, কখনও প্রণব, কখনও মমতার ওপর। কিন্তু আমরা ভুলে যাই তারা রাজনীতি করেন সর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। মমতা বা প্রণব বাবু বাংলায় কথা বললেও মূলত এরা ভারতীয়। ভারতের স্বার্থটা আগে। জ্যোতি বসু তো কমিউনিস্ট ছিলেন। আদি বাড়ি বাংলাদেশে। কমিউনিস্টরা সাধারণত নিপীড়িত ও শোষিত মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ায় বলে বলা হয়। কেননা তত্ত্বগতভাবে তারা আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু বাংলাদেশের কোন সমস্যাটা সমাধান করে দিয়েছেন জ্যোতি বসু? একটিও নয়। অথচ জ্যোতি বসুর নাম শুনলেই আমরা গদগদ হয়ে গেছি। কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ অমানবিকভাব তার লাশ ঝুলিয়ে রাখল কয়েক ঘণ্টা, সেদিন কি মমতা এর প্রতিবাদ করেছিলেন? তিনি তো তখন কেন্দ্রের মন্ত্রী, ইউপিএ জোটের শরিক। মমতা প্রতিবাদ করেননি। বাংলাদেশের মানুষদের মূল্যবোধের প্রতি সহমর্মিতাও দেখাননি। কারণ তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতি করেন, যেখানে বাংলাদেশকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। বাংলাদেশের স্বার্থ তাই ভারতীয় নেতাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি। যশোরের মেয়ে মমতা। তার জন্ম যশোরে হয়নি বটে, কিন্তু বাবার বাড়ি ছিল যশোরে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় তার পূর্বপুরুষ চলে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তিনি যে ধরনের নেত্রী, তাতে কেন্দ্র সরকার তার কথা শুনতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে মরুময়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শুধু ভারতের পানি প্রত্যাহারের কারণে, মমতা কি এ ব্যাপারে কোনো দিন কোনো কথা বলেছেন? কেউ কি সে কথা বলে?
নির্বাচনে বিজয়ের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ফোন করেছিলেন। এ কথাটা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের কাছ থেকে আমরা শুনিনি। তিনি ব্রিফিংও করেননি। আমরা জানলাম মমতা ব্যানার্জির মুখ থেকে (‘বাংলাদেশ থেকে হাসিনাদির ফোন পেয়েছি’)। প্রধানমন্ত্রী কি এটা করতে পারেন! প্রটোকল কি তাকে অনুমতি দেয়? একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী কী পারেন অন্য কোনো দেশের প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে? ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কি জার্মানির রাইনল্যান্ড ফালসের অতি সম্প্রতি নির্বাচনে বিজয়ী মুখ্যমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন? না, জানাননি। কেননা প্রটোকল অনুযায়ী তিনি তা পারেন না। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তা করলেন। তারপর শুনুন মমতা কী বলেছেন। মমতার ভাষায় ‘মনে হচ্ছে যেন দুই বাংলা এক হয়ে গেল’ (কালের কন্ঠ, ১৪ মে, পৃ.-১০)। কী ভয়ঙ্কর কথা! ‘দুই বাংলা এক হয়ে গেল’! কী বোঝাতে চাচ্ছেন মমতা? আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফোনে শুভেচ্ছা জানাবেন আর ভারতের নেতারা বলবেন ‘দুই বাংলা এক হয়ে গেল’—এটা তো আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি! আমরা তো এ জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করিনি। এ জন্য তো লাখ লাখ লোক মারা যায়নি।
স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে আমরা পা দিয়েছি। এই চল্লিশ বছরে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতের সঙ্গে আমাদের যত সমস্যা বেড়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের এ সমস্যা নেই। গত ১৬ মে ছিল ফারাক্কা দিবস। পানির ন্যায্য হিস্যা ও ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন মওলানা ভাসানী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেই নয়াদিল্লি ছুটে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে)। কিন্তু যতটুকু পানি আমাদের পাওয়ার কথা সে পানি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনো দিনই আমরা পাইনি। অথচ ওই চুক্তি নিয়ে কত ‘অর্জনের’ কথা বলা হয়। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও কোনো খবর নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের সংসদ সদস্যরা ‘প্রমোদ বিহারে’ গেলেন, হেলিকপ্টারে ঘুরলেন, জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করছে। ভারতীয় নেতারা আমাদের ‘ঘুম পাড়ানির গান শুনিয়ে’ আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা, বা নেপাল ও ভুটান এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভি ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভি ট্রাক যাবে কোনো ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুনতে থাকব সুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুত্ আসবে ভারত থেকে। কৈ সেই বিদ্যুত্? ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা ভারতে থাকলেও তা নানা ট্যারিফ ও প্যারা-ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। জানা গেছে, আগামী ৩ বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। অথচ ভারতে বাংলাদেশী ৬১টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে, যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা (দিনকাল, ১৭ মে)। বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এ জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি। এক্ষেত্রে মমতা বা প্রণব মুখার্জির মতো নেতারা কোনো দিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াননি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচ আমাদের নেতারা বারবার ভারতীয় ‘বাঙালি বাবুদের’ দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছে না। এর মূল কারণ, মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্দ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে, তার অপসারণের পেছনে ভারতের হাত ছিল। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা নেপালে অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে তারাই তৈরি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়। অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতা দূরীকরণে তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই আধিপত্যবাদী নীতির কারণেই ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বন্ধুশূন্য’ হতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি, প্রণব মুখার্জি—এরা সবাই মূলত এই আধিপত্যবাদী নীতিরই সমর্থন করছেন। সুতরাং আমাদের প্রধানমন্ত্রী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো দিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না—যতদিন না ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য ও সহযোগিতা অর্থহীন হয়ে গেছে ভারতের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে। ফেলানী যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানীরা তখন ভারতের ‘বন্ধুত্ব’ কোথায় প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে এ দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কীভাবে দেখে, ফেলানীর ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জি যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজয়ী হন, তখন আমাদের উত্সাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন তত্কালীন ভারতীয় সরকারের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তখন মমতা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা হচ্ছেন ভারতীয় রানজীতিতে ‘মোস্ট আনপ্রেডেকটিবল পার্সন’, যার ওপর আস্থা রাখা যায় না। যে কোনো সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার আঁতাত কতদিন স্থায়ী হয়, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন এখন। মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
www.tsrahmanbd.blogspot.com
তথ্যসুত্রঃ আমার দেশ। রোববার, ২২ মে ২০১১

যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন

বাপ্পির সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনের। চমত্কার একটি ছেলে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অন্য হাজারটা তরুণের মতো চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিচ্ছে না। উচ্চপর্যায়ের আত্মীয়-স্বজনও নেই বাপ্পির, যাকে ‘ধরে’ একটি চাকরি জোগানো সম্ভব। বাপ্পি তা করেনি। করার ইচ্ছেও নেই। বাপ্পি তথ্যপ্রযুক্তিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে ফ্রিল্যান্স আউটসোসিং করে সে প্রতিমাসে যা আয় করছে, তা অনেকের ঈর্ষার কারণ হতে পারে। মাত্র ২৩ বছরের যুবক বাপ্পি তাই ‘চাকরি’ নিয়ে ভাবে না। ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংই তার ধ্যান-ধারণা। এটা নিয়েই সে আরো এগিয়ে যেতে চায়। বাংলদেশের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) একটি বিশাল সম্ভাবনার খাত। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলাম তথ্যপ্রযুক্তি আউটসোসিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম ৩০টি দেশের মধ্যে। বাংলাদেশে মোট ১৫০টি আউটসোর্সিং ফার্মে প্রায় ২৫ হাজার কর্মী কাজ করছে। এ খাতে এ যাবত্ বাংলাদেশের উপার্জিত আয় খুব আশাব্যঞ্জক না হলেও ভারত আউটসোর্সিং করে আয় করেছে প্রায় ৬ হাজার কোটি রুপি। অথচ এই সম্ভাবনাময় খাতটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেরক প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী বেরুচ্ছে, যাদের অনেকেই বেকার থাকছে। ৩২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা বেরুচ্ছে, তাদের একটা বড় অংশই ‘জব মার্কেটে’ ঢুকতে পরছে না। এর মাঝে আবার সরকার নতুন করে বেশ ক’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ৫৮টি আবেদনের মধ্যে ৪২টির যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। এর অর্থ ন্যূনতম আরো অন্তত ৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে কোন কোন বিষয় পড়ানো হবে? ইউজিসির চেয়ারম্যান সাহেব বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে উত্সাহী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারে এর কী চাহিদা রয়েছে? একজন ছাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সাহিত্যে অর্নাস করে কোথায় চাকরি পাবে? এ ব্যাপারে শিক্ষানীতিতে কোন দিকনিদের্শনা নেই। যারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন, তাদেরও সুস্পষ্ট কোন চিন্তুা-ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। যে মুহূর্তে একটিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন নেই, সেখানে আরো ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। এখানে শুধু সার্টিফিকেট-বাণিজ্য হবে। আর এই সার্টিফিকেট-বাণিজ্য কেউ বন্ধ করতে পারবে না। অতীতেও আমরা পারিনি। এখন একজন বাপ্পি আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির আরো সম্প্রসারণ দরকার। সাধারণ বিষয়ে ছাত্র সংখ্যা না বাড়িয়ে, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে নতুন নতুন বিভাগ সৃষ্টি করে, সেখানে ছাত্র সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। তাহলে তথ্যপ্রযুক্তিতে আমরা একটা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারবো, যারা হাজার হাজার ‘বাপ্পির মতো’ তরুণ তৈরি করবে, যারা আর বেকার থাকবে না, সরকারকেও এদের কর্মসংস্থানের জন্য চিন্তা করতে হবে না। পৃথিবীর কোন দেশেই সরকার সবাইকে চাকরি দিতে পারে না বা দেয় না। বেসরকারি খাত যেমনি রয়েছে, তেমনি এখন সৃষ্টি হয়েছে আউটসোর্সিং। বাপ্পির মতো তরুণরা নিজের বাসায় থেকেই এই কাজগুলো করতে পারে। তার অফিসে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। নির্ধারিত সময়ে অফিস করারও কোন প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন যোগাযোগ ও নিজের যোগ্যতা বাড়ানো। এ খাতে বৈদেশিক আয়ের সম্ভাবনা প্রচুর। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এমনিতেই বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয়। বর্তমানে দেশে যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তার ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে হচ্ছে। আর মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ হচ্ছে বৈদেশিক উত্স থেকে, যা কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বক্তব্যটি আমাদের অর্থমন্ত্রীর। অর্থমন্ত্রী যখন এ ধরনের কথাবার্তা বলেন, তখন আমাদের চিন্তায় ফেলে দেয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, রেমিটেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। লিবিয়া তথা আরব বিশ্ব থেকে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সহজ কাজ নয়। সরকারের জন্য এটা একটা বাড়তি বোঝা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের জনশক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে। এরা রাজধানীতে এসে বস্তি তৈরি করছে। সৃষ্টি করছে নানা সমস্যা। পরিবেশ দুষণ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। খাদ্য নিরাপত্তা এখন ঝুঁকির মুখে। খাদ্য আমদানিতে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। এমনিতেই বিশ্ব নতুন করে এক ধরনের খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। এ কথা স্বীকার করেছেন সয়ং বিশ্ব ব্যাংকর প্রধান। তাই সংগত কারণেই বাংলাদেশের জন্য চিন্তাটা অনেক বেশি। দেশে খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে, এটা সত্য, কিন্তু সেই সাথে এটাও সত্য, জনসংখ্যাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও খুব আশার কথা বলে না। পত্র-পত্রিকায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে যেসব খবরা খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তা কোন আশার কথা বলে না। মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি (যুগান্তর, ৬ এপ্রিল)। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

আর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এ অস্থিরতার মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতির এ নাজুক পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা কোন আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। তাদের আশঙ্কা সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি, তারল্য সংকট, বিনিয়োগে বেহাল অবস্থা, প্রকট অবকাঠামো সমস্যা, নাজুক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতির উচ্চমাত্রা আর চাঁদাবাজির কারণে অধোগতিতে চলবে অর্থনীতির ধারা (ঐ)। অর্থনীতির এই অবস্থা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে সরকার একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মাঝে আছে। সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সাথে তারা অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ দাবি করেছে। এই রিপোর্টটি আদৌ কোনদিন প্রকাশিত হবে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কা আছে। ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত থেকে এ ব্যাপারে একটি রুলও ইস্যু হয়েছে। এই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে সরকারের ভাবমূর্তি যে নষ্ট হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মাত্র ৫ মিনিটের ব্যবধানে শেয়ারের সূচক যখন ৬০০ পয়েন্ট নিচে নেমে গিয়েছিল, তখন বুঝতে কারো বাকি থাকে না যে একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র এর সাথে জড়িত। সরকার কি তার দায় এড়াতে পারে? ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী রয়েছে শেয়ার মার্কেটে। এদের অসন্তোষ সরকারের জন্য কোন শুভ সংবাদ নয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখনও শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি হয়েছিল। তখন তদন্ত কমিটি ৩৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু তাদের একজনেরও বিচার হয়নি। ২০১১ সালে এসে তদন্ত কমিটিও কিছু দোষী ব্যক্তিকে কারসাজির সাথে জড়িত বলে অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু আদৌ বিচার হবে কী? না হলে অসন্তোষ বাড়বেই। উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সংবিধান পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটিতে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বিএনপি তাতে অংশ নেয়নি। জাতীয় কমিটি বিএনপির সাথে কথা বলতে চাইলেও বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এখানেও সেই ‘বিরোধ’ রয়ে গেল। সংবিধান একটি জাতির, এটা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নয়। এখানে বিশেষ করে এ ধরনের জাতীয় প্রশ্নে সরকারের সাথে বিরোধী দলের ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন। চল্লিশ বছরে পা দিয়েও আমাদের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করলো, জাতি হিসাবে আমরা আজো বিভক্ত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার যদি একক উদ্যোগে সংবিধান সংশোধন করে, তাহলে তা বিতর্কের মাত্রা আরো বাড়াবে মাত্র। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সরকারের জন্য একটি ‘গলার কাঁটা’। সারা বিশ্বব্যাপীই খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছে। এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এখানে রয়েছে একটি অসাধু চক্র, যারা উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যের (চাল, তেল, চিনি, আটা) মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে। বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘হুমকিও’ এখানে ব্যর্থ। নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চমূল্য সরকারের জন্য বড় হুমকি। অর্থনীতির মন্দার কারণে কৃচ্ছ সাধন যেখানে জরুরি, সেখানে সরকারি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটেছে। চাকরির ক্ষেত্রে (এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও) ‘প্রায়োরিটি’ পাচ্ছে সরকারি দলের লোকেরা। পদ্মা সেতু নির্মাণ এখন ঝুঁকির মুখে। বিদ্যুত্ যেখানে ‘প্রায়োরিটি’, সেখানে অনুত্পাদনশীল খাতে অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সর্বশেষ একটি প্রকল্পে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে ছাত্রলীগকে (কালের কণ্ঠ, ২১ এপ্রিল), যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার আলোকে দেশে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই।

বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগিতা, রাজনৈতিকভাবে একক কর্তৃত্ব করার প্রবণতা আরব বিশ্বে ‘বিপ্লবের’ জন্ম দিয়েছে। ‘আরব বসন্ত’-এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। ‘আরব বসন্ত’ থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে অনেক কিছু। আমরা এ থেকে আদৌ কোন শিক্ষা নেবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। তবে এটা সত্য, আরব বিশ্বের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তার সাথে আমাদের যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে। আমাদের এখানে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি রয়েছে। জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করে, যা আরব বিশ্বের কোথাও নেই। এদেশে একদলীয় শাসন কিংবা রাজতন্ত্রও নেই। তবে এদেশে অদক্ষ একটি তরুণ সমাজ আছে, যাদের মেধা আছে। এখন প্রয়োজন সেই মেধাকে ব্যবহার করা। এটা যে করা যাবে না, তা নয়। এটা করা যাবে। এর জন্য প্রয়োজন সুষুম পরিকল্পনা। প্রয়োজন দক্ষ লোকদের যোগ্য স্থানে বসানো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হাজার হাজার গ্র্যজুয়েট তৈরি করে, একটা ‘সংকট’ সৃষ্টি করছে। ‘জব মার্কেটে’ চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষাখাতকে আমরা যদি সম্প্রসারণ করতে পারতাম, তাহলে হাজারটা ‘বাপ্পির, জন্ম হতো, যারা সরকারের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে শুধুমাত্র ‘আউটসোসিং’ করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারত। বিষয়গুলো তাই বিবেচনায় নেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। 
[পূর্বে প্রকাশা @ দৈনিক ইত্তেফাক ১৯ মে ২০১১] 

বিরোধ থেকেই গেল

সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিরোধিতা রয়েই গেল। সংবিধান সংশোধন নিয়ে যে জাতীয় কমিটি গঠিত হয়েছে, তারা প্রধান বিরোধী দলকে সংলাপে ডাকলেও বিএনপি ওই সংলাপে যায়নি। কেন তারা যায়নি, তা তারা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েও দিয়েছে। এমনকি সংসদে এলডিপিকে প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র সদস্য ড. কর্নেল অলি আহমদও সংলাপে যোগ দেননি। আমাকে তিনি জানিয়েছেন, যে প্রক্রিয়ায় তাকে সংলাপে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তা শোভন ছিল না। অনেকটা দায়সারাগোছের কাজটি করেছে বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ব্যক্তিগতভাবে সংসদ ভবনের আটতলায় অবস্থিত কর্নেল অলির অফিসে যদি 'চা-পান' করতে যেতেন, তাহলে ভালো করতেন। এমনকি তিনি যদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন, সেটা তার অবস্থানকে জাতির কাছে আরও শক্তিশালী করত। এখন কিছুই হলো না। এমনকি খোদ মহাজোটের শরিকদের মধ্যেও সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে দ্বিমত আছে। যেখানে জাতীয় পার্টি রাষ্ট্রধর্ম চায়, সেখানে শরিক বাম ঘরানার ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদেরও অবস্থান ভিন্ন। তারা রাষ্ট্রধর্ম চান না। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, সংবিধানে যেমনি ধর্মনিরপেক্ষতা থাকছে, ঠিক তেমনি থাকছে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম'ও। এটা তো পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক। ভবিষ্যতে এটা নিয়েও একটি সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকছে কিনা তা অনিশ্চিত। তবে এতে কিছু কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। বিশেষ করে ৫৮গ(৩) ধারা নিয়ে এখন নানা কথা উঠেছে। এখানে 'ব্যক্তি' অর্থাৎ সাবেক প্রধান বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) মুখ্য হয়ে উঠেছেন, পদ্ধতিটি মুখ্য হয়ে ওঠেনি।

অতীতেও দেখা গেছে, ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতা ছাড়ার আগে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মুখ্য হয়ে উঠলেন। তখন আপত্তি উঠেছিল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। শুধু আপত্তি বললে ভুল বলা হবে। তারা এ প্রশ্নে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত ওই সময়ে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও তাতে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। এখন পরিস্থিতি অনেকটা সেদিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি অবসরে গেলেন ১৭ মে। এর পর কী হবে? কেন্দ্রবিন্দু এখন আবারও 'ব্যক্তিকে' নিয়ে। বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের পদত্যাগের পর ১৭ মে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক হবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান। তিনি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজন করবেন। বিএনপি ইতিমধ্যে তার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, আমরা বারবার আমাদের প্রধান বিচারপতিদের বিতর্কিত করছি। এরা আমাদের শ্রদ্ধাভাজন। জাতীয় গার্ডিয়ান। জাতিকে অনেক পথনির্দেশনাও দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যা করা যায় তা হচ্ছে, ৫৮গ(৩) ধারায় পরিবর্তন এনে এখানে একটি 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একজনের নাম প্রস্তাব করবে, যার ব্যাপারে কোনো আপত্তি উত্থাপন করা যাবে না। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, একজন শিক্ষাবিদ ও একজন বুদ্ধিজীবীর সমন্বয়ে এই 'এলডার্স কাউন্সিল' গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ৫৮গ(৪), ৫৮গ(৫) ও ৫৮গ(৬) ধারাগুলোর বিলুপ্তিও প্রয়োজন। এসব ধারায় একজন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ও রাষ্ট্রপতিকে তার দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণ করার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক করা ও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথাও সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কেউ কেউ সংবিধানের ৭০নং অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের কথা বলছেন। এটা পরিবর্তন করা ঠিক হবে না (দলের বিপক্ষে ভোটদান প্রসঙ্গে)। এটা করা হলে 'হর্স ট্রেডিং' হবে, সাংসদরা বিকিকিনির শিকার হবেন। সংবিধানের ষষ্ঠভাগে ৯৫, ৯৬ ও ৯৮নং অনুচ্ছেদেও পরিবর্তন প্রয়োজন। ষষ্ঠভাগে বিচারপতি নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন [৯৬(৩)] ও শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। সপ্তম ভাগে (১১৮নং অনুচ্ছেদ) নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা ও আর্থিকভাবে সরকারের ওপর নিরপেক্ষ না থাকার বিধান সংযোজন করা যেতে পারে।

সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদে যেখানে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস'-এর কথা বলা হয়েছে, তার কী হবে, সে ব্যাপারে অস্পষ্টতা রয়েই গেল। সংবিধানের ২(ক) ধারায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই কোনো পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না। তাতে করে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ভিন্ন ধারণার জন্ম দিতে পারে। ইসলামপন্থি দলগুলো এটা থেকে ফায়দা লুটতে পারে। ইউরোপের অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। আমেরিকার মতো রাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম যদি থাকে, তা হলে তাতে ক্ষতির কিছু নেই। রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা পরস্পরবিরোধী হলেও রাষ্ট্রধর্ম রাখলে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্রে তেমন কোনো বাধা আসবে না। এখন রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিলে সংবিধানের ২৫(২) ধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, যেখানে বলা হয়েছে_ 'রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।' এটা তো আমাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক চরিত্র। এটা যদি বাতিল হয়ে যায় তা হলে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ সংকটের মুখে পড়বে।

বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র বিকশিত হয়েছে, তাতে করে গণতন্ত্রের নামে প্রধানমন্ত্রীর এক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধানের ৫৫(১), ৫৫(২), ৫৬(১), ৫৮(২) ইত্যাদি ধারা এমনভাবে সংযোজিত হয়েছে যে, তাতে করে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে, যাকে 'প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র' হিসেবে অভিহিত করা যায়। এখানে মন্ত্রিসভার যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে গণতন্ত্রে এই যৌথ নেতৃত্বই আসল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতিকে কিছুটা ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষপাতী আমি। বর্তমান সংবিধানে ৪৮(৩) ধারায় রাষ্ট্রপতির দুটি ক্ষমতা আছে। এক. প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও দুই. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। এর বাইরে প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সম্পন্ন করবেন। এই ধারায় পরিবর্তন প্রয়োজন। শ্রীলংকা ও ফ্রান্স রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার দ্বারা পরিচালিত হলেও সংসদ ও প্রধানমন্ত্রী কিছু ক্ষমতা ভোগ করেন। আমরা বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা তুলে দিতে পারি। অতীতে সংবিধানে যে ১৪টি সংশোধনী আনা হয়েছে, তা কখনও গণভোটে প্রেরণ করা হয়নি। কিন্তু ১৪২(১) ধারায় গণভোটে প্রেরণের বিধান রয়েছে। এখন উচ্চ আদালতের রায়ে 'সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে গেছে'। যদি তাই হয়, তা হলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত ১৪১(ক)(১) ধারার কী হবে? ১৯৭২ সালের সংবিধানে তো জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো বিধান ছিল না। ঠিক তেমনি চতুর্থ সংশোধনীসহ আরও অনেক সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

সংবিধান সংশোধন খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। এখন যে দল বিগত নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের ৩২.৪৫ ভাগ ভোট পেয়েছিল (জোটগতভাবে প্রায় ৩৮ ভাগ), সংবিধান সংশোধনীতে তাদের যদি কোনো বক্তব্য না থাকে অথবা তাদের বক্তব্য যদি অন্তর্ভুক্ত করা না যায়, তা হলে তো প্রশ্ন থেকেই যাবে। প্রায় ৩৮ ভাগ জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা করা হবে এতে করে। প্রধান বিরোধী দলকে সংলাপে না আনার ব্যর্থতা বিশেষ কমিটিকে বহন করতে হবে। সংসদে সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সংবিধানের ১৪২(১)(আ) ধারামতে, সরকার সংবিধান সংশোধন করতে পারে। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। রাজনীতি হচ্ছে 'An art of the compromise. সরকারে যারা থাকেন, তাদের আরও সহনীয় হতে হয়। হতে হয় আরও উদার ও উন্মুক্ত। এখন সরকার যেভাবে চাচ্ছে, সেভাবেই সংবিধান সংশোধিত হচ্ছে। ফলে বিরোধ থেকেই গেল। যে রাজনীতি পরস্পর পরস্পরকে শত্রু মনে করে, যে রাজনীতি বিদ্বেষের জন্ম দেয়, সেই রাজনীতি থেকে ৪০ বছরেও আমরা বের হয়ে আসতে পারলাম না। দুঃখটা এখানেই।
[সূত্রঃ সমকাল, ১৮/০৫/১১]