রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

চীনের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

হংকংয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে, ঠিক তখনই চীনের অর্থনীতি সম্পর্কে একটি ভালো খবর দিয়েছে আইএমএফ। আইএমএফ বা ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে অতিক্রম করেছে। ২০১৪ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে চীনের অর্থনীতির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ ২০০৫ সালে চীনের অর্থনীতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অর্ধেকের সমান। মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে অতিক্রম করল। আইএমএফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সাল নাগাদ চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চেয়ে শতকরা ২০ ভাগ হারে বাড়বে। নিঃসন্দেহে এই সংবাদটি চীনাভক্তদের আরও উৎসাহিত করবে। কিন্তু এতে করে চীনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবি কি কমে আসবে? আজ যখন হংকংয়ে আরও বেশি গণতন্ত্রের দাবি উঠেছে, তখন চীনেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। বিল কিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তিনি ১৯৯৭ সালে হংকংয়ে এসে একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জীবদ্দশায় চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, এটা তিনি দেখে যেতে চান। চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, এ ধরনের স্বপ্ন কেউ কেউ দেখেন বটে, কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। চীনের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পশ্চিমা সমাজের কোনো মিল নেই। ফলে চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, পশ্চিমা সমাজের কারও কারও এই চিন্তাধারা নিয়ে প্রশ্নই থেকে যাবে শুধু। অতি সম্প্রতি হংকংয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে, তখন নতুন করে চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি আবারও উঠল। কিন্তু যে প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা অনেকেই করেন না, তা হচ্ছে হংকং আর চীন এক নয়। হংকং তার পুঁজিবাদী সমাজকাঠামো নিয়েই চীনের সঙ্গে একত্রিত হয়েছিল। আর চীন বিশ্ব রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ২০১৪ সালে এসে চীনকে আর পুরোপুরি একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যাবে না। সেখানে সমাজতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে নতুন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। আর পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র বোধ করি হংকংয়ের সমস্যার কোনো সমাধান বয়ে আনতে পারবে না। তাই হংকংয়ের এই আন্দোলন কী আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে চীনের ওপর? গণতান্ত্রিক সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি, সেই সংস্কৃতি হংকংয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। চীনা নেতৃত্ব এটা মানবে না। কেননা এতে করে চীনের অন্যান্য অঞ্চলে এই আন্দোলনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে ২০১৭ সালে হংকংয়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যাপারে আরও কিছুটা ছাড় দিতে পারে চীন। প্রার্থীদের যে তালিকা চীন অনুমোদন করবে, সেখানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। হংকংয়ের বিকল্প হিসেবে সাংহাই, শেনঝেন কিংবা ওয়াংঝেন এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। হংকংয়ের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন আর সাধারণ চীনাদের আকৃষ্ট করে না। বরং শেনঝন কিংবা ওয়াংঝেনের মতো এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক জোন গঠিত হয়েছে, যেখানে জীবনযাত্রায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আয় বেড়েছে। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। শুধু তাই নয়, চীনা নেতৃত্ব চীনের অর্থনীতিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার মাধ্যমে চীনকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশে পরিণত করেছে। ২০৫০ সালের মধ্যেই চীন হবে প্রথম অর্থনীতি। ফলে সব ধরনের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে চীনা নেতৃত্ব সজাগ রয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং অত্যন্ত প্রাগমেটিক। তিনি চীনা অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করে দেবেন। জাতীয় স্বার্থকে তিনি গুরুত্ব দেবেন। একটি ‘মার্কিনি ষড়যন্ত্র’ সম্পর্কে তিনি ও তার পলিটব্যুরোর সদস্যরা সচেতন। চীনা অর্থনৈতিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তি করতে চাচ্ছে, তাতে চীনকে রাখা হয়নি। এটা চীনবিরোধী একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। চীনা নেতৃত্ব এটা বোঝেন। তাই চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে জন্ম হতে যাচ্ছে একটি ‘নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’, যা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আঘাত করবে। জন্ম দেবে বিকল্প একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার। এ লক্ষ্যেই ২০১৬ সালে ব্রিকস ব্যাংক আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। তাই হংকংয়ের তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন যে পরোক্ষভাবে চীনা নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল, এটা চীনা নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেছেন। চীনে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র বিনির্মাণ সম্ভব নয়। চীন গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্তও নয়। চীনে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চীনা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সেখানেই লুকায়িত। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এখন চাচ্ছে চীনও একাধিক চীনা রাষ্ট্রে বিভক্ত হোক। তবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনা সেনাবাহিনী এখনো পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। চীনা সেনাবাহিনী এখনো পার্টির নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। ফলে চীনে হংকংয়ের মতো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে অদূর ভবিষ্যতে চীনে একটি ‘সিঙ্গাপুর মডেল’-এর জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। চীন এখন আর ধ্রুপদী মার্কসবাদ দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত খাতের বিকাশ ঘটিয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’ নামে নতুন এক অর্থনীতি চালু করেছে। এর ফলও তারা পেয়েছে। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতি। সুতরাং হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন হংকংয়ের ব্যাপারে চীনা নীতিতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। চীন একটি বড় দেশ। প্রায় ৫৫ জাতি, উপজাতি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই চীনা রাষ্ট্রটি। ২২টি প্রদেশ, ৫টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, ৪টি বিশেষ অঞ্চল ও ১৪৭টি বিশেষ এলাকা নিয়ে যে চীনা রাষ্ট্র, রাজনৈতিক সংস্কার তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এই রাষ্ট্রটি ভেঙে যেতে পারে। এটা বলা যায়, একুশ শতক হচ্ছে চীনের। এই শতকে চীন অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী ২০৩৫ সালে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। এর পরিমাণ হবে শতকরা ৩০ শতাংশ। ভারতের অবস্থান দাঁড়াবে তৃতীয়, শতকরা ১৪.৩ ভাগ। জাপান তার অর্থনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। সুতরাং পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীন যে একটি ‘হুমকি’, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। তাই ‘চীনের ডানা’ কেটে ফেলতে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা যে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা বিশ্বে চীনের কর্তৃত্ব যদি বেড়ে যায়, তাহলে তা মার্কিনি স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। আফ্রিকায় চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যেখানে জ্বালানিসম্পদ রয়েছে, সেখানে চীন বড় বিনিয়োগ করেছে (যেমন সুদান)। মধ্য এশিয়ার জ্বালানিসম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর সমন্বয়ে চীন গড়ে তুলেছে ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (এসসিও)। রাশিয়াও এসসিওর সদস্য। এই এসসিওকে অনেকে সাবেক ওয়ারশ সামরিক জোটের (১৯৮৫ সালে অবলুপ্তি) বিকল্প ভাবছে। এখন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিকল্প একটি ‘বিশ্বব্যাংক’-এর কথাও বলছে চীন। ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্ব যতটুকু ‘সফল’ হয়েছিল, চীনের ক্ষেত্রে ততটুকু সফল হবে বলে মনে হয় না। চীনকে ভাঙাও সহজ হবে না। চীনে দরিদ্রতা আছে, এটা সত্য। এই দরিদ্রতা ইতোমধ্যে অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাই করছে চীনা নেতৃবৃন্দ। আইএমএফ সর্বশেষ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে চীন অন্যতম বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এখন চীনা নেতৃবৃন্দ যদি এই অর্থনৈতিক শক্তিকে চীনা জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের স্বার্থে ব্যয় করেন, তাহলে সেখানে অসন্তোষ জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখানে সঙ্গত কারণেই একটা কথা বলা প্রয়োজনÑ আর তা হচ্ছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে যেখানে সংস্কার কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে চীনে ব্যর্থ হলো না কেন? গত ২০ বছর এ প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। বলে রাখা ভালো, চীনে সংস্কার কর্মসূচি শুরু হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সংস্কার কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে। দেং জিয়াও পিং তার সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষের দিকে, ১৯৭৯ সালের পর। অর্থাৎ মাও সেতুংয়ের মৃত্যু ও তথাকথিত ‘চার কুচক্র’-এর অপসারণের পর দেং জিয়াও পিং পাদপ্রদীপের আলোকে চলে আসেন এবং সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যান। অন্যদিকে ১৯৮৫ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে গরবাচেভ ১৯৮৭-৮৮ সালে তার সংস্কার কর্মসূচি চালু করেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিও চালু করেছিলেন। ‘গ্লাসনস্ত’ আর ‘পেরেস্ত্রৈকা’ মতবাদের আলোকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার (ব্যক্তিগত পুঁজি, বিদেশি বিনিয়োগ, অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কমানো) ও রাজনৈতিক সংস্কারও চালু করেছিলেন (কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে অন্যান্য দলের জন্ম, নির্বাচনে অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ, সংবিধান সংশোধন করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি)। গরবাচেভ ভুলটা এখানেই করেছিলন। কিন্তু চীনারা এই ভুলটা করেনি। চীনে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক সংস্কার হয়নি। ফলে চীন এখনো টিকে আছে। শুধু চীন কিংবা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা কেন বলি? প্রায় প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশেই সংস্কার আনা হয়েছে, আর তা হচ্ছে অর্থনৈতিক সংস্কার। ভিয়েতনামে যে সংস্কার হয়েছে, তাকে তারা নামকরণ করেছে ‘দই মই’ হিসেবে। ফলে আজ হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে চীনের সমাজব্যবস্থাকে বিচার করা যাবে না। চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কম। চীন প্রমাণ করেছে, শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব। তবে আজকের চীনকে দিয়ে ২০৫০ সালের চীনকে বিচার করা যাবে না। চীনে কনফুসিয়াস মতবাদ (যা কমিউনিস্ট শাসনামলে নিষিদ্ধ ছিল) শক্তিশালী হচ্ছে। চীন এখন কনফুসিয়াসকে স্বীকার করে। এই কনফুসিয়াস মতবাদের মূল কথা হচ্ছে ব্যক্তি তথা পারিবারিক সমৃদ্ধি। চীন এটা ধারণ করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারটি প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। চীনে পশ্চিমা সমাজের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্র, পূর্ণ ব্যক্তিগত খাতনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে না। এখানে একদলীয় অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টিনির্ভর একটি সমাজব্যবস্থা থাকবে, যেখানে ধীরে ধীরে বিকল্প দু-একটি পার্টির জন্ম হবে। তবে সমাজে এদের কোনো প্রভাব থাকবে না। অর্থনীতি হবে মূল চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রীয় খাতের পাশাপাশি ব্যক্তিগত খাত আরও সম্প্রসারিত হবে ও তাদের প্রভাব বাড়বে। তবে অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি চীনের সমাজ তথা রাজনৈতিকব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কমিউনিস্ট পার্টির একক কর্তৃত্ব বজায় থাকবে বটে, তবে ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন। পলিটব্যুরোতে (পার্টি) স্থায়ী পদ বলে কিছু থাকবে না। শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হতে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনা করবেন। এ ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে বেসরকারি খাত থেকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা একজন টেকনোক্রেটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখালে আমরা অবাক হব না। স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির বাইরের লোকজনরাও আসতে পারেন। রাষ্ট্র পরিচালনা বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব হ্রাস পাবে। কিছু বিরোধী দলের কর্মকা-ে সরকার অনুমতি দিতে পারে। তবে তাদের কর্মকা- পরিচালিত হবে চীনের সংবিধানের আলোকে ও কমিউনিস্ট পার্টির ছত্রচ্ছায়ায়। সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির কর্তৃত্ব বজায় থাকবে। অর্থাৎ পার্টির ‘পলিটিক্যাল কমিশনার’ সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন। একজন প্রফেশনাল সেনা কর্মকর্তা সেনা নেতৃত্বে থাকবেন বটে। কিন্তু মূল ক্ষমতা থাকবে কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। এই সেনাবাহিনী শুধু চীনের রাষ্ট্রীয় অখ-তাকেই নিশ্চিত করবে না। বরং কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে। চীনে একটি শিক্ষিত, দক্ষ প্রফেশনাল শ্রেণির জন্ম হয়েছে, যারা সমাজতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়নি। কিন্তু অর্থনীতি তথা সমাজ উন্নয়নে তাদের ভূমিকা ব্যাপক। এই প্রফেশনাল শ্রেণি আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সম্পর্কিত করবে। তাই হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন মূল চীনা রাজনীতিতে এতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি গণতন্ত্রের কথা বলে চীনের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক না গলায়, তাহলে ভালো করবে। হংকংয়ের ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি খোদ চীনে আবারও ১৯৮৯ সালের ‘তিয়েন আনমেন’-এর ঘটনার (বেইজিংয়ে ছাত্র অসন্তোষ ও গণতন্ত্রের দাবি) পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায়, তাহলে তা চীন-মার্কিন সম্পর্ককে নানা জটিলতার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এটা কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। চীন এখন বিশ্বশক্তি। খোদ যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে মিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে থাকে। এ অবস্থায় চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি মার্কিন নীতিনির্ধারকরা অব্যাহতভাবে চীনের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলায়। আজকের চীন আর ১৯৯১ সালের সোভিয়েত ইউনিয়ন এক নয়। একটি শক্তিশালী চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও মঙ্গল। হংকংয়ের ‘অক্যুপাই সেন্ট্রাল’ আন্দোলন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। দীর্ঘ দুসপ্তাহের ওপরে চলা এ আন্দোলনে হংকংয়ের অর্থনীতি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে চীনের অর্থনীতিতে তা কতটুকু আঘাত করেছে, সেটা আমরা আগামী দিনেই যাচাই করতে পারব। তবে চীনের অর্থনীতি খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটা মনে হয় না। কেননা হংকংয়ের অর্থনীতির ওপর চীনের অর্থনীতি নির্ভরশীল নয়। ধারণা করছি ‘অক্যুপাই সেন্ট্রাল’ আন্দোলনের একটা সমাধান হবে। গত শুক্রবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে হংকং কর্তৃপক্ষের আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা ‘ফল’ বের হয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। এটা ভুলে গেলে চলবে না, এর আগেও হংকংয়ে এ ধরনের আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু তাতে হংকং ও চীনানীতিতে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। চীনে একবারই তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক’ আন্দোলন হয়েছিল। বেইজিংয়ের ‘তিয়েন আনমেন’ (১৯৮৯) আন্দোলনও চীনে রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারেনি। আজ প্রায় ২৬ বছর পর যারা আরেকটি তিয়েন আনমেনের স্বপ্ন দেখছেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী চীনা জনগণের কাছে রাজনৈতিক বিষয়াদি প্রাধান্য পায়নি কখনো। আর চীনে ‘একজন গরবাচেভ’ও নেই যিনি পুরো সমাজব্যবস্থা ভেঙে পশ্চিমা ধাঁচের সমাজব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ নেবেন। তাই হংকংয়ের ঘটনাবলি দিয়ে চীনকে বিচার করলে ভুল করা হব Daily Amader Somoy 14.10.14

বেলুচিস্তানেও গণভোটের দাবি

যুক্তরাজ্য থেকে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ স্কটিশরা স্বাধীন না হওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য ইউনিয়নের সঙ্গে রয়ে গেল বটে, কিন্তু এর রেশ গিয়ে লেগেছে পৃথিবীর অন্যত্র। পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ বেলুচিস্তানের একজন জাতীয়তাবাদী নেতা সেখানেও গণভোটের ডাক দিয়েছেন। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন নয়। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। এ অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বেলুচিস্তানে অবস্থিত একটি বিমান ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করত, যা পরে পাকিস্তান বন্ধ করে দেয়। এই অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিস্টদের কাছে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।ঐতিহাসিকভাবেই বেলুচিস্তান বিভক্ত। এর এক অংশ পাকিস্তানে, অপর অংশ ইরানে, যা ইরানের একটি প্রদেশ। এটি সিসতান বেলুচিস্তান নামে ইরানে পরিচিত। বেলুচিস্তানের দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর, আর উত্তরে আফগানিস্তান। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের আশ্রয়স্থলও রয়েছে এখানে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। চীনেরও উপস্থিতি রয়েছে বেলুচিস্তানে। ভারতেরও আগ্রহ রয়েছে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে। আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার পরিকল্পনার ছক কাটছে, তখন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে মার্কিন আগ্রহ নতুন করে এ অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সামনে নিয়ে এসেছে।বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, বেলুচিস্তানের দুই নেতা ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেঙ্গল ২০১০ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লি সফর করেছিলেন। এ দুই নেতা ফ্রান্স থেকে ভারতে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য, স্বাধীন বেলুচিস্তানের ব্যাপারে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তারা দিল্লিতে এসে এ কথাও বলেছিলেন, গত ৬২ বছর ধরে পাকিস্তান বেআইনিভাবে বেলুচিস্তান জবরদখল করে রেখেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে- এ অভিযোগও করেছেন এ দুই নেতা। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ঢাকার সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছিল তখন। একটি জাতীয় দৈনিকের (২০১০) নিজস্ব প্রতিবেদক কলকাতা থেকে এ প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন গত ৯ নভেম্বর। ওয়াহিদ বালুচ ও মুনির মেঙ্গলকে নয়াদিল্লিতে আসতে দেয়া এবং ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় নতুন করে তখন পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। ওয়াহিদ ও মুনিরের দিল্লি সফরের পর পাকিস্তানের অভিযোগ আরও শক্ত হয়েছিল।বেলুচিস্তানের ব্যাপারে বৃহৎ শক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহের অন্যতম কারণ এ অঞ্চলের গ্যাস সম্পদ। বেলুচিস্তানের সুই গ্যাস দিয়ে পাকিস্তানের জ্বালানি চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু এ অঞ্চল বরাবরই অবহেলিত। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে লাগেনি। ২০০১ সালে গঠিত হয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। এর নেতৃত্বে আছেন বেলুচ মারি, যিনি একসময় মস্কোতে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৫ সালে তারা সুই গ্যাসকেন্দ্রে হামলা চালালে তাদের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে তারা আলোচনায় আছেন। ইরানের সিসতান বেলুচিস্তানেও জুনদুল্লাহর নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।বেলুচিস্তানের অবস্থান আরব সাগর ঘেঁষে। এ কারণে স্থানটির প্রতি একদিকে যেমন আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, তেমনি আগ্রহ রয়েছে চীনের। অন্যদিকে ভারতের আগ্রহেরও কমতি নেই। এখানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। এ অঞ্চলকে যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় অথবা যদি বিচ্ছিন্নতা উসকে দেয়া যায়, তাহলে তা থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই ফায়দা লুটতে পারবে। আফগানিস্তানের একটি সীমান্ত রয়েছে বেলুচিস্তানের সঙ্গে। আফগান তালেবানরা এই সীমান্ত অতিক্রম করে বেলুচিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে- এ অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের, যে কারণে বেলুচিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রম রয়েছে। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভালো নয়। পাকিস্তানি তালেবানরা এখন পাকিস্তানের ভেতরেই আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সেনা অভিযানের ফলে তালেবানরা যদি সেখান থেকে উৎখাত হয়, তাহলে বেলুচিস্তান হবে তালেবানদের-পরবর্তী অভয়ারণ্য। সেক্ষেত্রে ২০০১ সালের অক্টোবরে যেমন বোমা হামলা চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তেমনটি আবারও ঘটতে পারে বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে। এ অঞ্চলে আরব সাগর ঘেঁষা গাওদার একটি সমুদ্রবন্দর। এর স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বন্দরটি তৈরি করে দিচ্ছে চীন, যেখানে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার। চীন মুক্তার মালা বা string of pearls-এর যে নীতি গ্রহণ করেছে, সেক্ষেত্রে গাওদার একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে এরাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্র পথ, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। কারণ এ পথ তার জ্বালানি সরবরাহের পথ। চীনের জ্বালানি চাহিদা প্রচুর। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিট থাকবে, যেখান থেকে ভারত মহাসাগরের সব ধরনের নৌ-মুভমেন্ট লক্ষ্য করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রেরও আগ্রহ রয়েছে গাওদারের ব্যাপারে। ইরানের সীমান্ত থেকে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে গাওদার। আর হরমুজ প্রণালী থেকে দূরত্ব মাত্র ৪০০ কিলোমিটার। এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের তেল পশ্চিম ইউরোপ, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হয়। ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের সদস্যরা যে কোনো সময়ে এই হরমুজ প্রণালীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যদি কোনো নৌ-অবরোধ সৃষ্টি করতে হয়(?) তাহলে গাওদার বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চীন তার পূর্বাঞ্চলে ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। এ ব্যাপারে একটি মহাপরিকল্পনাও তারা প্রণয়ন করছে। সুতরাং সঙ্গত কারণেই বেলুচিস্তান আগামী দিনগুলোতে উত্তপ্ত থাকবে। এবং বৃহৎ তথা কোনো কোনো আঞ্চলিক শক্তির কাছে স্বাধীন একটি বেলুচিস্তান রাষ্ট্র(?) আকর্ষণীয়। ২০০১ সালের জুলাইয়ে জেনস ইনফরমেশন গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বেলুচিস্তানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যথেষ্ট তৎপর।
ইরানি প্রদেশ সিসতান বেলুচিস্তান ছিল বরাবরই শান্ত ও স্থিতিশীল। ইতিহাসের কিংবদন্তি বীর রুস্তমের জন্ম এখানে। ইরানের শীর্ষস্থানীয় শিয়া নেতা আয়াতুল্লাহ আলী সিসতানির জন্ম ও এখানে। সিসতান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের ভাষা ও ধর্ম এক, তবে স্থানীয় ডায়ালেক্টে তারা কথা বলেন। বেলুচিস্তানের যে অংশ ইরানের সঙ্গে ছিল, তা একসময় যুক্ত ছিল ইরানের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের প্রদেশের সঙ্গে। কিন্তু রেজা শাহ ১৯৫৯ সালে সিসতানকে আলাদা প্রদেশ করেন। জুনদুল্লাহরা তাদের আন্দোলনকে বেলুচিস্তানে সম্প্রসারিত করছে। তাদের যুক্তি, বেলুচি ও পারস্ত্রীয়রা এক নন। তারা মনে করেন, পারস্ত্রীয়রা ইরানি হলেও সব ইরানি পারস্ত্রীয় নন। ইরানিদের মাঝে আজারি, বেলুচিরা রয়েছেন। সিসতানের ব্যাপারে দ্বন্দ্ব মূলত পারস্ত্রীয়দের সঙ্গে বেলুচিদের। এই দ্বন্দ্বটাকে জুনদুল্লাহ কাজে লাগাতে চায়। তারা সিসতানকে ইরান থেকে আলাদা করতে চায়। তবে একটি গ্রেটার বেলুচিস্তান গড়ার ডাক তারা দেয়নি। ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র জুনদুল্লাহকে প্রমোট করছে। জুনদুল্লাহর নেতা আবদুল মালেক রিগি একসময় তালেবানদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিতে তার ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে। জুনদুল্লাহরা সমর্থন পাচ্ছে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আনজুমান ই সিপাহ ই সাহাব ও লস্কর ই জানজাবি নামক দুটো সংগঠনের, যারা পাকিস্তানে শিয়া স্থাপনার ওপর একাধিকবার আক্রমণ চালিয়েছে।পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তান ও ইরানের প্রদেশ সিসতানের সমস্যা এক নয়। উভয় অঞ্চলের মানুষের মিল এক জায়গায়- তারা বেলুচি এবং উভয় অঞ্চলেই উন্নয়ন হয়নি। এ কারণে তাদের ক্ষোভ রয়েছে। পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা অর্থাৎ বেলুচিরা ক্রমেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। অন্য প্রদেশ থেকে মানুষ এসে সেখানে বসবাস করছে। অন্যদিকে সিসতানের সমস্যাটা মূলত অনুন্নয়ন। বেলুচিস্তান নিয়ে সমস্যা মূলত দুটি। এক. আফগানিস্তানের পশতুনরা আর বেলুচিস্তানের পাঠানরা এক হয়ে ভবিষ্যতে একটি পশতু রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবানদের যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে একদিন এ অঞ্চলে জন্ম হবে তালেবানমুক্ত পশতু রাষ্ট্র। পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন থাকবে এর ব্যাপারে। দুই. ইরান ও পাকিস্তানের বেলুচিস্তান মিলে একটি গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যদি কোনো ধরনের সহাবস্থান না হয়, তাহলে এই গ্রেটার বেলুচিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা আরও শক্তিশালী হবে। পাকিস্তানে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির কথা আগেই বলেছি। এছাড়া রয়েছে বেলুচিস্তান পিপলস ফ্রন্ট, যাদের
নেতৃত্বে গ্রেটার বেলুচিস্তান আন্দোলন শুরু হতে পারে।পাঠক, নব্বইয়ের দশকের সাবেক যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্রের কথা স্মরণ করতে পারেন। সার্বদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে একে একে স্বাধীন হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া (১৯৯১), বসনিয়া-হারজেগোভিনা (১৯৯২)। এরপর স্বাধীন হয়েছে মন্টিনেগ্রো, মেসিডোনিয়া ও পূর্ণ স্বাধীনতার পথে রয়েছে কসোভো। বলকানাইজেশনের প্রক্রিয়া ইরানেও আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি আগামীতে। ইরান ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যে সফট ওয়ার শুরু করেছে, তার উদ্দেশ্য একটাই- ইরানকে খণ্ডবিখণ্ড করা। বেলুচিস্তান দিয়েই(?) এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আগেই বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে অভিন্ন। ভারতের যে বিপুল জ্বালানি চাহিদা, তা দেশটি মেটাবে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে। এক. ইরান থেকে বেলুচিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (আসালুইয়ে-বন্দর আব্বাস-ইরানশহর-খুজদার-সুই-মুলতান-নয়াদিল্লি)। দুই. তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে নয়াদিল্লি (দুজুলেবাদ-হেরাত-কান্দাহার-কোয়েটা-মুলতান-ফাজিলকা-নয়াদিল্লি, ঞঅচও প্রজেক্ট)। বেলুচিস্তান ভারতের জন্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা এই দুটি প্রজেক্টের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।তাই বেলুচিস্তানের ঘটনাবলী যে আগামীতে বারবার আলোচিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্কটল্যান্ডের গণভোটের ঘটনা বেলুচিদের উৎসাহিত করেছে। তাদের দাবি, গণভোট হলে স্বাধীন বেলুচিস্তানের পক্ষেই ভোট দেবে বেলুচিরা। কারণ পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থেকে তারা দীর্ঘদিন বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। তাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে পাকিস্তানের অন্যত্র উন্নয়ন হচ্ছে। এক্ষেত্রে বেলুচিস্তান রয়ে যাচ্ছে অবহেলিত। বেলুচিদের অনেকে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। তবে স্কটল্যান্ডে গণভোট হয়েছে। কিন্তু বেলুচিস্তানে গণভোট হবে, এটা প্রত্যাশা করা যায় না। পাক সেনাবাহিনীতা কখনও চাইবে না। তবে একটি আওয়াজ তো উঠল। Daily Jugantor 03.10.14

চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফর ও চীনের পররাষ্ট্রনীতি

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি ভারত সফর শেষ করেছেন। অনেক কারণে এই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। এটি প্রেসিডেন্ট শি জিনের প্রথম ভারত সফর। তবে এর আগে ব্রাজিলে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিনি নয়াদিল্লি না নেমে সরাসরি গিয়ে নামলেন গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদে। মোদি তাকে নিজে গ্রহণ করলেন। এটিও একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। তৃতীয়ত, শি জিনের ভারত সফরের পরই ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত থেকে চীন তাদের সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। চতুর্থত, এই সফরের মধ্যে দিয়ে চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি দিক উন্মোচিত এবং চীন যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, এটি প্রমাণিত হলো। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন ও বোঝেন, তারা জানেনÑ ওবামা প্রশাসন সম্প্রতি চীনবিরোধী বেশকিছু কর্মসূচি নিয়েছে। এমনকি চীনকে ‘ঘিরে ফেলা’র একটি সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তার সামরিক তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে ভারত মহাসাগরে। ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ ফ্রিগেটের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে। পূর্ব চীন সফরভুক্ত বেশ কয়েকটি বিতর্কিত দ্বীপ রয়েছে। সে দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপান ও ফিলিপাইনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন এ অঞ্চলে মার্কিন নৌসেনা মোতায়েনের অর্থ হচ্ছে, চীনের ওপর পরোক্ষভাবে ‘চাপ’ প্রয়োগ করা। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে চীনের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। চীন এ অঞ্চল ঘিরে যে ‘মুক্তার মালা’নীতি গ্রহণ করেছে (বন্দর স্থাপনা, রিফুয়েলিং স্টেশন ইত্যাদি), এটিও ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে চীনের স্বার্থ খর্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত মহাসাগর (ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের তেলের রিজার্ভের ৬০ শতাংশ এবং গ্যাস রিজার্ভের তিন ভাগের এক ভাগ) আগামী দিনে প্রত্যক্ষ করবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে চীনের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়ার সমর্থনের। ‘প্রিমরভ ডকট্রিন’ অনুযায়ী এ অঞ্চলে মস্কো, তেহরান, বেইজিং ও কলম্বোর মধ্যে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছেÑ সেটিকে দৃঢ় করতেই শিং জিনপিংয়ের ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। এর আগে তিনি মস্কো গেছেন। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি যে বক্তব্য রাখেন, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেনÑ যা কি না যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। চীনা রাষ্ট্রপ্রধান দুই মাস আগে ব্রাজিলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও ব্রিকসের অন্যতম শক্তি। ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক জোট। ২০৫০ সাল নাগাদ ব্রিকস দেশগুলোর মোট জিডিপির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকবে ৩৮ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে)। একই সময় ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য সম্পর্ক ৩৪০ মিলিয়ন ডলার (২০১২) থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৫০০ মিলিয়নে। প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মস্কো গিয়ে শি জিনপিং রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো সম্পর্ককে ঝালাই করে নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, চীন নতুন অর্থনৈতিক জোটকেও বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, চীনের নয়া নেতৃত্ব ন্যূনতম ১০ বছর অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত চীনকে বিশ্ব আসরে নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং চীনের পররাষ্ট্রনীতির গতি-প্রকৃতি বোঝার দরকার আছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। ২০১০ সালে জিএনপির দিক থেকে জাপানকে ছাড়িয়ে যায় চীন। যেখানে ১৯৮০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ (যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ), সেখানে বলা হচ্ছেÑ ২০১৬ সালে চচচ-এর (চঁৎপযধংরহম, চৎরপব, চধৎরঃু) হিসাব অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। উৎপাদনশীল পণ্যের, বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দিক থেকে চীন এখন এক মহাশক্তি। বিশ্বের যত ফটোকপিয়ার, মাইক্রোওয়েভ ও জুতা উৎপাদিত হয়, এর ৩ ভাগের ২ ভাগ চীন একা উৎপাদন করে। সেই সঙ্গে বিশ্বে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ৬০, ডিভিডির ৫৫, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০, পারসোনাল কম্পিউটারের ৩০, ডিজিটাল ক্যামেরার ৫০, শিশুদের খেলনার ৭৫ শতাংশ চীন একা উৎপাদন করে। ফলে বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের একটা বাজার তৈরি হয়েছে। চীনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। ‘ফরচুন’ ম্যাগাজিন বিশ্বের যে বড় ৫০০ কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে, সেখানে চীনের রয়েছে ৩৭টি। বিশ্বে যত জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, এর মধ্যে এককভাবে চীনে ব্যবহৃত হয় ১৬ শতাংশ। আর বিশ্ব জ্বালানি তেলের ব্যবহারের দিক থেকে ৩ ভাগের ১ ভাগ ব্যবহার করে চীন। এ কারণে চীনকে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে চীনে ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেড়েছে শতকরা ২৯ ভাগ। চীনে রয়েছে বিশাল এক তরুণ প্রজন্ম। তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রতি বছর ২১ মিলিয়ন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি হন। আর প্রতি বছর ৩ লাখ শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যান। তারা ফিরেও আসেন। ১৯৪৮ সালে (স্বাধীনতার ঠিক এক বছর আগে) যেখানে চীনে শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ, এখন সেখানে শতভাগ শিক্ষিত। অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য চীনে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, এতে প্রায় ২০ কোটি মানুষকে চীন অতি দরিদ্রতম অবস্থা (প্রতিদিন জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ ডলার আয় হিসেবে) থেকে বের করে এনে কিছুটা সচ্ছলতা দিয়েছে। অবশ্য বলা হয়, এখনো প্রায় ২০৭ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চীনে একদিকে যেমন ধনী ও গরিবের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এখন কর্মজীবী মানুষের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। মানুষের আয় সেখানে বেশি। হাজার হাজার টাউনশিপ এখন তৈরি হয়েছে। তা বদলে দিয়েছে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনযাত্রা। চীনকে নিয়ে খারাপ খবর আছে। যেখানে ২০০৯ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ শতাংশ, ২০১২ সালে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে। মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৫ শতংাশ কম। আর শহরে বেকারে সংখ্যা ৪ থেকে ৬ শতাংশের নিচে। এই যে চীন, ওই চীনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বটি এখন বর্তিয়েছে শি জিনপিংয়ের ঘাড়ে। কোন পথে এখন চীন? তার এজেন্ডায় রাশিয়া ও ভারত প্রাধান্য পেলেও এটি সত্য, অভ্যন্তরীণ ইস্যুটি গুরুত্ব দিতে হবে। বেশকিছু বিশ্লেষকের লেখা পড়ে যা মনে হয়েছে, তা হচ্ছে শি জিনপিং এখন প্রথমেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে। এক বিশাল দেশ চীন। প্রায় ৫৫ জাতি ও উপজাতি নিয়ে গড়ে উঠেছে চীন। ২২টি প্রদেশ, ৫টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, ৪টি বিশেষ অঞ্চল ও ১৪৭টি বিশেষ এলাকা নিয়ে যে চীন রাষ্ট্র, রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে ওই রাষ্ট্রটি ভেঙেও যেতে পারে। এ কারণেই চীনা নেতারা রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সতর্ক থাকছেন। যে ভুল করেছিলেন গরভাচেভ, সেই ভুল করেননি চীনা নেতারা। সেনাবাহিনী এখনো পার্টির প্রতি অনুগত। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ফুজিয়ান, ঝে ঝিয়াং কিংবা সাংহাই প্রদেশগুলো তুলনামূলক বিচারে অনেক সমৃদ্ধশালী। প্রদেশে প্রদেশে যে বৈষম্য, গ্রাম আর শহরের মধ্যে যে পার্থক্যÑ তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে শি জিনপিং প্রশাসনকে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রচুর বয়স্ক মানুষের পেনশন-ভাতা নিশ্চিত, পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা, অসমতা ও দরিদ্রতা দূর করা। এটি হবে প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ। দুর্নীতির বিষয়টিও তার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। পার্টির সিনিয়র নেতাদের ব্যাপক দুর্নীতি এখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বে আলোচনার অন্যতম বিষয়। অভিযোগ আছে, সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়েছিল, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর মায়ের নামে একটি কোম্পানির ১২০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার আছে। খোদ সাবেক প্রেসিডেন্টও অভিযুক্ত! যুক্তরাষ্ট্রের সুমবার্গ গ্রুপের মতে, শি পরিবার ৩৭৬ মিলিয়ন ডলারের মালিক। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সম্পর্কে এ ধরনের অভিযোগ নয়া প্রেসিডেন্টের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। একুশ শতকে আমরা চীনকে দেখব অন্যতম শক্তি হিসেবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান বিশ্বের সব অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। ব্রিকসে চীন ও ভারত অন্তর্ভুক্ত হলেও এশিয়ার ওই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। ভারতে জনগোষ্ঠীর ৩৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করলেও আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এখন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় ৯৪০ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলারে। ২০০৭ সালে যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখত মাত্র ২ শতাংশ, সেখানে তখন অবদান রাখবে ১৭ শতাংশ। সুতরাং ভারতকে ফেলে দেওয়া যাবে না। তাই কোনো কোনো বিশ্লেষক (জনাথন হোলসলাগ, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন) একটি সম্ভাব্য ঈযরহফরধ ধারণার কথা বলেছেনÑ যেখানে চীন ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই ধারণা অমূলক নয়। সাম্প্রতিক সময়গুলোয় চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা নেতারা ভারত সফর করেছেন। সীমান্ত সমস্যা নিয়েও (অরুণাচল) এক ধরনের ‘স্থিতিবস্থা’ বিরাজ করছে। ক্ষমতা গ্রহণ করে শি জিনপিং ভারতবিরোধী তেমন কোনো কথা বলেননি। এখন ভারত সফর করলেন। নয়া চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে ধারণা রাখেন। ২০১২ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। বেগম জিয়াকে তিনি গত বছর বেইজিংয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী। আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন। ওই সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধামন্ত্রীর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের আগ্রহের কথা আবার জানিয়েছে। ৬টি মেগাপ্রকল্পে চীন আমাদের ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় ২০ দফা ইশতেহার প্রকাশিত এবং ৬টি দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ২০২১ সালে একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়Ñ এ ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে এবং চীন এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। চার দেশীয় একটি ইকোনমিক করিডোর গড়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহকে চীন শুধু সমর্থনই করেনি, বরং এ জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বিসিআইএম নামে ওই অর্থনৈতিক জোটে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, চীনের ইউনান প্রদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারও রয়েছে। সুতরাং চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও একটি ফ্যাক্টর। এ অঞ্চলের নিয়ে মার্কিনি স্বার্থের ব্যাপারে চীন পুরোপুরি সজাগ। চীনা নেতৃত্ব ভালো করে জানে, এ অঞ্চলে মার্কিনি স্বার্থকে নিউট্রাল করতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। পাকিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বরাবরই চীনের বন্ধু। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অতটা উষ্ণ ছিল না। এখন শি জিনপিংয়ের সফরের পর বরফ গলতে শুরু করেছে। চীনের বড় ভয় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ দুটি বিপদে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যে ঞৎধহং ঢ়ধপরভরপ ঢ়ধহঃহবৎংযরঢ়-এর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অনেকেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক (বিশেষ করে নৌবাহিনীর উপস্থিতি) উপস্থিতি বাড়িয়েছে (বাংলাদেশ এই স্ট্র্যাটেজির আওতায়)। ফলে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল এবং ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করবে যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে অর্থাৎ ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে শ্রীলংকা, চীন, ইরান ও রাশিয়ার সমন্বয়ে এ অঞ্চলে যে ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছে (প্রিমাকভ ডকট্রিন), তা মার্কিন স্বার্থকেও আঘাত করছে। বেশ কিছুদিন আগে ওবামা বলেছিলেন, ইরান আগামী এক দশকের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির মূল কারণ দুটিÑ একদিকে ইরাকের উলম্ফনকে চ্যালেঞ্জ করা, অন্যদিকে ধীরে ধীরে চীন ঘিরে ফেলা। অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলার যে নীতি (ফনটেইনমেন্ট থিউরি) যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেছিল, এর মতো। যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে শি জিনপিং অবগত। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। তখন তিনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো কোনো ভালো কূটনীতির পরিচয় দেয় না।’ এ বক্তব্য প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকাটি চীন ভালো চোখে দেখছে না। চীন অনেক বদলে গেছে। চীন এখন আর মার্কসবাদী-মাওবাদী আদর্শে বিশ্বাসী রাষ্ট্র নয়। তবে মাওবাদকে তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করছে, তাও বলা যাবে না। জীবনযাত্রার মানের উন্নতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাদের কাছে এখন প্রাধান্য। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ঘবড় অঁঃযড়ৎর ঞধৎরধহরংস নেতৃত্ব, লাতিন আমেরিকার ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃরংস এবং পশ্চিম ইউরোপের ঝড়পরধষ উবসড়পৎধপু-এর সমন্বয়ে চীন এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এই রাজনীতি থেকে ফেরার আর পথ নেই। তাই শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকবে সারা বিশ্ব। তিনি চীনে আরও সংস্কার আনেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। Daily Amader Somoy 30.09.14

সদ্য শেষ হওয়া পরিবেশ সম্মেলনে বাংলাদেশ কী পেল

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের ৬৯তম অধিবেশনের আগে পরিবেশসংক্রান্ত একটি বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়াতে উন্নত দেশগুলোর প্রতি তিনি আহ্বান জানান। বান কি মুন যে সম্মেলনের আহ্বান জানিয়েছেন, সেখানে নেগোসিয়েশনের কোনো সুযোগ ছিল না। এখানে দেশগুলোকে বলতে হয়েছে তারা জলবায়ু মোকাবেলায় কী ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন দেশে ইতোমধ্যে ৩২ লাখ সোলার সিস্টেম স্থাপনের পাশাপাশি ১৫ লাখ পরিবেশবান্ধব চুলা বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ দুর্যোগসহনীয় শস্য উৎপাদনও করছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে একটি সাত দফা কর্মসূচিও উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ উৎকণ্ঠার পরও উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের সম্মেলন আরো একবার বিতর্কিত হলো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর টর্নেডো এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপাারে পরিণত হয়েছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি বড় বড় শহরও আক্রান্ত হচ্ছে। সারাবিশ্বই আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। বায়ুম-লে গ্রিন হাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। ফলে সাগর, মহাসাগরে জন্ম হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, যা একসময় প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে উপকূলে। ধ্বংস করে দিচ্ছে জনপদ। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উপকূলবর্তী গ্রাম, ছোট ছোট শহর। 'মহাসেন' ছিল সেরকম একটি ঘূর্ণিঝড়। এর আগে আমরা 'সিডর' ও 'আইলার' সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সমুদ্রসৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে নামকরণের সুযোগ পায় ভারত মহাসাগরভুক্ত আটটি দেশ। প্রতিটি দেশকে চারটি করে নাম পাঠাতে হয়। এর মধ্য থেকে একটি নাম বেছে নেয়া হয়। একসময়ের শ্রীলংকার রাজা মহাসেন ধ্বংস করেছিলেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দির, সে কারণে ধ্বংসাত্মক ঝড়ের নাম রাখা হয়েছিল ধ্বংসের প্রতীক সেই নাম মহাসেনের নামে। এদিকে, এ অঞ্চলে পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হবে থাইল্যান্ডের দেয়া নামে। আর এর নাম হবে 'ফাইলিন'। মহাসেনের পর এখন ফাইলিনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি অতিবন্যা, অসময়ে বন্যা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যারা নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করেন, তারা জানেন সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা বিপুল পানির স্রোত বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে দিয়েছে। দেশের ১৭টি জেলা এ বন্যায় আক্রান্ত। হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অকাল বন্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে এ জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে হিমালয়ে। সেখানে বরফ গলছে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায়ও পরিবর্তন আসছে। অসময়ের বৃষ্টি প্রমাণ করে পরিবেশ কিভাবে বদলে যাচ্ছে। যে সময়ে বৃষ্টি হওয়ার কথা, সে সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না। শীতের ব্যাপ্তি কমেছে। মনে আছে গেল শীত আসতে আসতেই চলে গেল। এর ফলে বৃষ্টিতে সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মানুষ লড়াকু। 'সিডর' ও 'আইলার' পর তারা বুঝে গেছে এ ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গেই তাদের বসবাস করতে হবে। লোনা পানি তাদের জীবনযাত্রার মান হুমকির মুখে ঠেলে দিলেও এ লোনা পানির সঙ্গে 'যুদ্ধ' করেই তারা বেঁচে আছে। প্রকৃতিই তাদের শিখিয়েছে কিভাবে সব ধরনের প্রতিকূলতার সঙ্গে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। উপকূল এলাকার মানুষ আগের চেয়ে আজ অনেক সচেতন। সারাবিশ্ব জানে বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রতি সাতজনে একজন উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। এরা হবে জলবায়ু উদ্বাস্তু। আগামীতে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। বিশ্ববাসী জলবায়ু উদ্বাস্তুর সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয় ২০০৫ সালে, যখন বাংলাদেশে ভোলার চরাঞ্চল থেকে ৫ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ক্রিশ্চিয়ান পেনেনটি (ঈযৎরংঃরধহ চবহবহঃর) তার সদ্যপ্রকাশিত গ্রন্থ ঞৎড়ঢ়রপ ড়ভ পযধড়ং; ঈষরসধঃব পযধহমব ধহফ ঃযব হব িমবড়মৎধঢ়যু ড়ভ ঠরড়ষবহপব (২০১১)-এ উল্লেখ করেছেন সে কথা। পেনেনটি আরো উল্লেখ করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যেই ২২ মিলিয়ন অর্থাৎ ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল থেকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবে। আই পিসিসির রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের কথা। অনেকের মনে থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর পরিবেশের ব্যাপারে বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ২০১২ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। আমাদের পরিবেশমন্ত্রীকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সেখানে। তা ঠিক আছে। কেননা বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে গেলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পরপর দুবার বন্যা ও পরে 'সিডর'-এর আঘাতের সম্মুখীন হয়। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে আঘাত করে 'আইলা'। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সিডরের পর বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি বার বার বিশ্বসভায় আলোচিত হচ্ছে! সিডরের ক্ষতি গোর্কির চেয়েও বেশি। মানুষ কম মারা গেলেও, সিডরের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সিডরে ৩০ জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল ১৭টি জেলা। ২০০ উপজেলার ১ হাজার ৮৭১টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোট ১৯ লাখ ২৮ হাজার ২৬৫ পরিবারের ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ সিডরের আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিলেন ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকার। 'সিডর' ও 'আইলা'র পর 'মহাসেন' বাংলাদেশে আঘাত করেছিল। এতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব আমরা পাব না কোনো দিনই। 'সিডর ও 'আইলা'র আঘাত আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আইলার আঘাতের পর খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছায় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতা কোথাও ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত। আইলায় ৮০ ভাগ জলজ ও বনজ গাছ মরে গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে আজ লোনা পানির আগ্রাসন। সুপেয় পানির গড় অভাব ওইসব অঞ্চলে। এরপর 'মহাসেন' আমাদের আবারো ক্ষতিগ্রস্ত করে গেল। আর এখন অকাল বন্যা। আমাদের মন্ত্রী, সচিব কিংবা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফর ও সম্মেলনে অংশ নিতে ভালোবাসেন। কানকুন, ডারবান, কাতার কিংবা তারও আগে কোপেনহেগেন (কপ সম্মেলন) আমাদের পরিবেশমন্ত্রী গেছেন। আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য কোপেনহেগেনে প্লাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিশ্ব জনমত আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। আমরা পরিবেশ রক্ষায় বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পাইনি। বলা ভালো, বাংলাদেশ এককভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। বাংলাদেশ এককভাবে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ও তা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের উষ্ণতা রোধ করতে খুব একটা প্রভাব রাখবে না। এজন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক আসরে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বিদেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। কিন্তু এ সাহায্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। পরিবেশ বিপর্যয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। অতিসম্প্রতি যে বন্যা হলো, আবার আমাদের সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু সিডর ও আইলার আঘাতে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছিল সে ক্ষতি সারাতে সরকারের বড়সড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হলেও এখানেও 'রাজনীতি' ঢুকে গেছে। দলীয় বিবেচনায় টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে (কালের কণ্ঠ)। ভাবতে অবাক লাগে, যেসব এনজিও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেনি, যাদের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই, শুধু দলীয় বিবেচনায় তাদের নামে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জলবায়ু তহবিলের অর্থ পাওয়া উচিত ওইসব অঞ্চলে যেখানে ঘূর্ণিঝড়, সাগরের আঘাত বেশি আর মানুষ 'যুদ্ধ' করে সেখানে বেঁচে থাকে। অথচ দেখা গেছে, জলবায়ুর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা দেয়া হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভাকে, মানিকগঞ্জের একটি প্রকল্পে, কিংবা নীলফামারীর তিস্তা বহুমুখী সমাজকল্যাণ সংস্থাকে। সিরাজগঞ্জের প্রগতি সংস্থাও পেয়েছে থোক বরাদ্দ। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও জলবায়ুসংক্রান্ত কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। জলবায়ু তহবিলের টাকা বরাদ্দেও যদি 'রাজনীতি' ঢুকে যায় তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু থাকতে পারে না। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, বরাদ্দ পাওয়া এনজিওগুলোর সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্নীতি যদি এখানেও স্পর্শ করে তাহলে জলবায়ু ফান্ডে আর সাহায্য পাওয়া যাবে না। সচেতন হওয়ার সময় তাই এখনই। তবে উন্নত বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে আগামী বছরের শেষ দিকে প্যারিসে যে 'কপ' (কমিটি অন দ্য পার্টিজ) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে তাতে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। Daily JAI JAI DIN 30 September 2014

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি উপেক্ষিত দিক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেয়া হলেও দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়নি। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই এ দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। বছর দুয়েক আগে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান শ্রীলঙ্কা সফর করেননি। কিংবা মন্ত্রী পর্যায়ের কোনো সফরের খবরও আমাদের জানা নেই। অথচ শ্রীলঙ্কাকে এশিয়ার দুটি দেশ চীন ও জাপান যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। দীর্ঘদিন শ্রীলঙ্কা অস্থিতিশীল থাকলেও বেশ ক'বছর ধরে সেখানে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ফলে বিশ্ব আসরে শ্রীলঙ্কার গুরুত্ব বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ থেকেই ছুটে গিয়েছিলেন কলম্বোয়। এর আগে চীনা প্রেসিডেন্টও দেশটি সফর করে গেছেন। সেখানে এই দুটো দেশেরই বিনিয়োগ বেড়েছে। বিশেষ করে চীনের রয়েছে বিশাল এক বিনিয়োগ। বিশাল এক সম্ভাবনার দেশ শ্রীলঙ্কা। আমরা শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি। শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের পুরনো বন্ধু। যে ক'টি দেশ প্রথমদিকে (১৯৭২) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল শ্রীলঙ্কা তার মাঝে অন্যতম। তবে ইতিহাস বলে, ওই অঞ্চলটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাস থেকে জানা যায়, শ্রীলঙ্কার আদি রাজা ভিজয়ার (ঠরলধুধ) পূর্ব পুরুষ ছিল এ অঞ্চলের মানুষ। এক সময় বাংলাদেশের বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ এবং পশ্চিম বাংলার একটি অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছিল ভাংগা সাম্রাজ্য (অথবা বাংগা) বা ঠধহমধ করহমফড়স (ইধহমধ)। রাজা ভিজয়ার আদি পুরুষের জন্ম এই ভাংগা সাম্রাজ্যে। এক সময় এ অঞ্চল ও শ্রীলঙ্কা ব্রিটেনের কলোনি ছিল। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দেশটির পরিচিতি ছিল সিলোন হিসেবে। শুধু ব্রিটিশরাই ওই দেশটি দখল করেনি। পর্তুগিজরাও এসেছিল সেই ১৫০৫ সালের দিকে। গ্রিকরাও এসেছিল। তারা এর নামকরণ করেছিল ঞড়ঢ়ৎড়নধহব. আরব বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে এসে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিল। তারা শ্রীলঙ্কায়ও এসেছিল। তারা শ্রীলঙ্কার নামকরণ করেছিল ঝবৎবহফরন. পর্তুগিজরা এ অঞ্চলটির নামকরণ করেছিল ঈবরষধড়, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ঈবুষড়হ. অর্থাৎ ব্রিটিশরা পর্তুগিজদের দেয়া নামই রেখে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের তথা বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পর্কের আরেকটা কারণ বৌদ্ধ ধর্ম। মহারাজা অশোকের পুত্র ভিসু মাহিন্দ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য ওই অঞ্চল অর্থাৎ আজকের শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। ওই সময়ের এক রাজা দেভানাম (উবাধহধস) বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সেই থেকে শুরু। শ্রীলঙ্কার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ ভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মুসলমানরাও সেখানে আছেন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যোগসূত্র থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সম্পর্ক যে খুব উন্নত, তা বলা যাবে না। প্রায় ৪২ বছর আগে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও মাত্র ২০০৮ সালে দু'দেশের মাঝে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০০০-২০০১ অর্থবছরে বাংলাদেশ যেখানে রফতানি করেছিল ১৪ কোটি ২৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকার পণ্য, সেখানে ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ কোটি ৩৭ লাখ ২৪ হাজার টাকায়। এর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি রফতানি করে তাইওয়ান, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরে। আমরা যদি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমদানির পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে দেখব যেখানে ২০০০-২০০১ সালে আমদানি হয়েছে ৪৩ কোটি ১০ লাখ টাকার পণ্য, সেখানে ২০০৬-২০০৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ কোটি ১১ লাখ টাকায়। এর চেয়েও অনেক বেশি পণ্য আমরা আমদানি করি থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুর থেকে। সুতরাং বাণিজ্য বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশ তার পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চাইতে পারে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের চামড়াজাত দ্রব্য, মেলামাইন ও প্লাস্টিক সামগ্রী, নিটওয়্যার, সাবান ও সিরামিক সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে শ্রীলঙ্কায়। যদি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়, তাহলে বাংলাদেশী পণ্যের একটি বড় বাজার হতে পারে শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশী তৈরি পোশাক, চামড়া ও ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারে। আশার কথা, রাজাপাকসের সফরের সময় ওইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কায় জাতিগত দ্বন্দ্ব ছিল। সংখ্যালঘু তামিলরা ১৯৮৪-৮৫ সালের পর থেকে স্বাধীন একটি তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে আসছিল, যার নেতৃত্বে ছিল তামিল টাইগাররা। তামিল টাইগাররা একটি দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। যদিও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য তারা বিতর্কিত ছিল। ১৯৮৫ সালের পর থেকে কোনো সরকারই তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মাহেন্দ্র রাজাপাকসে। ২০০৯ সালের মে মাসে তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। এর আগে তিনি তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ওই যুদ্ধে টাইগার নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ নিহত হন। টাইগারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়াটা প্রয়োজন ছিল। কেননা গৃহযুদ্ধের কারণে সব ধরনের উন্নয়ন সেখানে বন্ধ হয়েছিল। এমনকি একসময় শ্রীলঙ্কা পোশাক শিল্পের নেতৃত্বে ছিল। তারা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করেছিল এ খাতে। পোশাক শিল্পের অনেক বিশেষজ্ঞ শ্রীলঙ্কার নাগরিক এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন পোশাক তৈরি কারখানায় কাজ করেন। যুদ্ধের পর সেখানে এক ধরনের স্থিতিশীলতা এসেছে। সেখানে বিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশ এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে। যৌথ উদ্যোগে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা সম্ভব। বলতে দ্বিধা নেই, সমসাময়িক শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে রাজাপাকসের জনপ্রিয়তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পেঁৗছেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কিংবা তামিল যুদ্ধের নায়ক জেনারেল ফনসেকার সঙ্গে তার বিরোধ তাকে কিছুটা বিতর্কিত করলেও টাইগারদের পরাজিত করায় সাধারণ সিংহলির মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ২০০৫ সালে তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি দ্বিতীয়বারের মতোও বিজয়ী হয়েছেন। ছয় বছর পর পর সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে সেখানে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে এবং রাজাপাকসের জন্য তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্টের পথ প্রশস্ত হয়েছে। রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার ফ্রিডম পার্টির নেতা। এ দলটি দীর্ঘদিন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাও ছিলেন এ দলটির নেতা। রাজাপাকসে দীর্ঘদিন ধরে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও বাংলাদেশে এর আগে আর আসেননি। বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানও ওই দেশে যাননি। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মাঝে কোনো বিরোধ নেই। বরং বেশ কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান এক ও অভিন্ন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, আঞ্চলিক সহযোগিতা ইত্যাদি নানা ইস্যুতে দু'দেশের অবস্থান এক। দুটো দেশই চায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হোক। দরিদ্রতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমস্যা। দরিদ্রতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে কলম্বো সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশন ১৯৯২ সালে তাদের খসড়া রিপোর্ট উপস্থাপন করেছিল। পরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক সম্মেলনে ওই ঘোষণা অনুমোদিত হয়েছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার শতকরা ৭৪ জন গ্রামে বাস করে। আর এদের মাঝে শতকরা ৮২ জনই দরিদ্র। এ দরিদ্রতা শ্রীলঙ্কায় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাংলাদেশেও। দেশ দুটি এখন দারিদ্র বিমোচনে কাজ করে যেতে পারে। শ্রীলঙ্কা একটি ছোট দেশ, বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের যে অর্জন, তা বিশ্বমানের। শুধু ক্রিকেট নিয়েই যে শ্রীলঙ্কা বিশ্ব জয় করেছে তা নয়, শ্রীলঙ্কা একটি শিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তুলেছে। শ্রীলঙ্কার গ্রাজুয়েটরা আজ অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপের সর্বত্র বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। দেশটির শিক্ষার হার প্রায় ৮৮ ভাগ। শিশুমৃত্যুর হার তারা কমিয়ে এনেছে। উচ্চশিক্ষায় তারা একটা মান অনুসরণ করে আসছে। ঢালাওভাবে তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনি। একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সেবিকাগোষ্ঠী (নার্স) রয়েছে শ্রীলঙ্কায়, যাদের যথেষ্ট চাহিদা আছে বিদেশে। আমরা এ সেক্টরে শ্রীলঙ্কার সহযোগিতা নিতে পারি। উচ্চশিক্ষার মডেলও আমরা গ্রহণ করতে পারি। ঢালাওভাবে সার্টিফিকেট বাণিজ্য না করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ যদি তৈরি করতে পারে, তাহলে শ্রীলঙ্কার মতো এ জনশক্তি হবে বাংলাদেশের সম্পদ। এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রণেতারা এ দেশটিকে কখনও বিবেচনায় আনেননি। যে কারণে বাংলাদেশের চার দশকের পররাষ্ট্রনীতিতে উপেক্ষিত থেকেছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে সার্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ঢাকা থেকেই। এরপর পর্যায়ক্রমে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শ্রীলঙ্কাতেও একাধিকবার সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে করে শ্রীলঙ্কার নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নেতাদের পরিচয় রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্কের যে গভীরতা, তা তৈরি হয়নি। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়নি। অথচ আমরা পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির যে কথা বলছি, সেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হচ্ছে আমাদের মূল টার্গেট। সেখানে এক বিশাল মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর ফলে আমাদের পণ্যের বিশাল এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। ভারত এরই মধ্যে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে একটি 'মুক্তবাজার' চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ভারত আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যও হতে চায়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি অনেক। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রবেশদ্বারকে আরও সহজ করতে পারে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়েছে। আমরা এ সমুদ্রবন্দরটি ব্যবহার করতে পারি। এতে করে সিঙ্গাপুরের বিকল্প হতে পারে হাম্বানটোটা। সময় ও অর্থ সাশ্রয়ও হবে এতে। শুধু তাই নয়, হাম্বানটোটার গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারি। চীন এ সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করে দিয়েছে। সোনাদিয়ায় আমরা একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চীন এ বন্দর নির্মাণে আগ্রহ দেখালেও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি হয়নি। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসবেন। ধারণা করছি, তখন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এ সময়সীমার মধ্যে আমরা হাম্বানটোটার গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং ভারতের মাদানি গ্রুপের প্রস্তাব স্টাডি করতে পারি। অর্থনীতিতে এখন আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্ব পাচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা। সদ্য শেষ হওয়া জেসিসির সভায় (নয়াদিলি্ল) চেন্নাই-মংলা-চট্টগ্রাম সমুদ্রপথ চালু ও তা সিঙ্গাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা এ সমুদ্রপথে কলম্বো অথবা হাম্বানটোটাকেও যোগ করতে পারি। মূল কথা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রণেতারা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারেন। Daily Alokito Bangladesh 29.09.14

কী পেল বাংলাদেশ

নয়াদিল্লিতে সদ্য শেষ হওয়া জেসিসি বা ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পরামর্শক কমিটির তৃতীয় সভার পর খুব সংগত কারণেই একটা প্রশ্ন উঠেছে- আর তা হচ্ছে কী পেল বাংলাদেশ? পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটা প্রথম বিদেশ সফর। তবে নিঃসন্দেহে তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখা করেছেন অনেকের সঙ্গেই। মোদি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল পর্যন্ত। তাই ওই সফরের গুরুত্ব আছে। কিন্তু কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে এ সফরের মধ্য দিয়ে? এ সফরের আগে ও পরে সফর নিয়ে এক ধরনের উচ্ছ্বাস আমি দেখেছি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। বাস্তবতা কী বলে? আমি যদি যৌথ ইশতেহার ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন বিশ্লেষণ করি, তাহলে কয়েকটি বিষয় পাব। এক. কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা আমাদের চেয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করবে বেশি। দুই. বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আবারও 'আশ্বাস' দেওয়া হয়েছে। তিন. ভারতের কলকাতার সারদা কেলেঙ্কারি ও একজন ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য কর্তৃক বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থায়নের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে; কিন্তু বিস্তারিত বলা হয়নি। চার. ভারতের প্রধানমন্ত্রী নতুন একটি অর্থনৈতিক জোট গঠনের কথা বলেছেন। পাঁচ. ২৭ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় মোদি-হাসিনা বৈঠক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশি মিডিয়ায়; কিন্তু আমরা ভুলে গেছি নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় বৈঠকটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো শীর্ষ বৈঠক নয়। এটা হবে একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ বা 'সাইড লাইন টক'। এ ধরনের সাক্ষাতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকে না। ছয়. ভারতে সরকারের পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় নীতিতে পরিবর্তন এসেছে- এটা বলা যাবে না।

কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। চেন্নাই হয়ে কলকাতা, অতঃপর বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্র উপকূল পথকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তার ঘটানো। এটা হয়তো ভালো। তাতে বাংলাদেশ-ভারত সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। এতে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে, তা ভবিষ্যতের ব্যাপার। সিঙ্গাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত এই বাণিজ্য রুট (?) বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কতটুকু আকৃষ্ট করতে পারবে, এটাও একটা প্রশ্ন। বাংলাদেশ ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য একাধিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এটা কি গ্রহণ করবেন? মনে হয় না। কারণ তাঁরা চান ব্যবসা করতে। সহজ-সরল কথায় জিনিস বিক্রি করতে। পুঁজি বিনিয়োগ তাঁরা করবেন না। ফলে বাংলাদেশের ওই প্রস্তাব কাগজ-কলমে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গুয়াহাটি-শিলং-ঢাকা বাস সার্ভিস চালুর বিষয়টি কিংবা মৈত্রী ট্রেনের বগির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি আগেই আলোচিত হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়; কিন্তু মৈত্রী ট্রেনে কেন যাত্রী বাড়ছে না, বিষয়টি তলিয়ে দেখা হয়নি। বাংলাদেশি যাত্রীরা মৈত্রী ট্রেনের যাত্রা পছন্দ করে; কিন্তু 'যাত্রী হয়রানি' বন্ধ না হলে বগির সংখ্যা বাড়িয়েও কোনো লাভ হবে না। গুয়াহাটি-শিলং বাস সার্ভিস শুনতে ভালো শোনায়; কিন্তু এ রুটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কে করবে? কবে হবে এসব কাজ। এসব ব্যাপারে কি কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে? ভাঙা পথে এসি বাস চললে, তাতে যাত্রী পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে অনেক। তিস্তার পানিবণ্টন, টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, স্থল সীমানা নির্ধারণ, শুল্ক কমানো ও বাংলাদেশি পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো, ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প, বন্দিবিনিময় ইত্যাদি। কোনো একটি বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট 'সিদ্ধান্ত' নেই। যৌথ ইশতেহারে বলা হয়েছে, তিস্তার পানি ভাগাভাগির বিষয়ে আগের প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকবে ভারত। এটা কূটনীতির ভাষা। এটা আশ্বাস। এই আশ্বাসে আমাদের সন্তুষ্ট হওয়ার কথা নয়। আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা চাই। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্যা মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে। মমতার জন্য তিস্তার পানি একটি 'রাজনৈতিক ইস্যু'। ২০১৬ সালে বিধানসভার নির্বাচন। লোকসভার নির্বাচনে তৃণমূলের পক্ষে বেশি ভোট পড়েছে। সুতরাং তিস্তা তাঁর জন্য একটা ইস্যু। এটা তিনি আবারও ব্যবহার করবেন। দিল্লিকে তিনি ছাড় দেবেন না এতটুকুও। তবে সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে তিনি বেকায়দায় আছেন। তৃণমূল-জামায়াত সম্পর্কের বিষয়টি মাহমুদ আলী-অজিত দোভালের আলোচনায় এসেছে। সিবিআই তদন্ত করছে। এখন এই সারদা কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র কিভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, এটা দেখার বিষয়। তবে ২০১৬ সালের আগে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভারতীয় অনলাইন সংবাদ সংস্থা ২৪ ঘণ্টা ২১ সেপ্টেম্বর আমাদের জানিয়ে দিয়েছে 'তিস্তার জল ও স্থল সীমান্ত চুক্তি নিয়ে জটিলতার অবসান হয়নি।' সীমানা চিহ্নিত করার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল সাবেক মনমোহন সরকার। রাজ্যসভায় একটি বিলও উপস্থাপিত হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, তা এখন আছে স্থায়ী কমিটিতে। আর তিস্তা নিয়ে বলা হয়েছে, 'সব দলের (অর্থাৎ তৃণমূলের সঙ্গে!) সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছার চেষ্টা চলছে।' অর্থাৎ আশ্বাস। চেষ্টা চলছে! এসবই কূটনীতির ভাষা। বলা ভালো, বাংলাদেশের ভেতরে রয়েছে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল আর ভারতে রয়েছে ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল। এদের কেউ ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়, কেউ চায় বাংলাদেশের সঙ্গে থাকতে। স্থানীয় বিজেপি আবার এর বিরোধী। আসাম বিজেপিও স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণের পক্ষে নয়। ফলে সংবিধান সংশোধনের জন্য আনীত বিল রাজ্যসভায় এবং পরে লোকসভায় অনুমোদিত হবে- এটা দেখার জন্য আমাদের আরো বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণের সঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের সংশোধন প্রশ্নটি জড়িত।
আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয়- এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছে ভারত সরকার। এটা বাংলাদেশিদের জন্য সুখকর। আমরা এটা জেনেছি একটি সংবাদমাধ্যমের নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো প্রতিবেদন থেকে। কিন্তু যত দূর জানা যায়, মোদি ক্ষমতা গ্রহণ করে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ও আছে মোদির পক্ষে। বাংলাদেশ আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে সে কথা বারবার বলে আসছে। এখন প্রকাশিত বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। সত্যিকার অর্থেই ভারত যদি এই প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে না যায়, তাহলে তাতে ভারতের পরিবেশবাদীরাই যে খুশি হবেন, তা নয়। বরং বাংলাদেশ বড় ধরনের পানি সংকট থেকে রক্ষা পাবে। একই কথা প্রযোজ্য টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রেও। মোদি সরকার সাবেক মনমোহন সিং সরকারের দেওয়া বক্তব্যই উল্লেখ করেছে মাত্র। তাদের ভাষায়, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভারতে ইতিমধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে এবং ভারত সরকার ৯ হাজার কোটি রুপি খরচও করে ফেলেছে। এ অর্থ তাহলে ব্যয় হলো কোথায়? গঙ্গা চুক্তি নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কেননা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। জনসংখ্যা তখন বাড়বে তিন গুণ। পানির চাহিদাও বাড়বে। সুতরাং চুক্তিতে পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের উচিত এ ব্যাপারে ভারতকে রাজি করানো। অনুপ চেটিয়াকে (উলফা নেতা ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী) ফেরত দেওয়া ও নূর হোসেনকে (নারায়ণগঞ্জ সাত খুনের আসামি) ফেরত আনার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। নূর হোসেন কলকাতায় একটি অপরাধ করেছেন। সেই অপরাধে তাঁর বিচার হচ্ছে। এখন বিচার চলাকালে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে কি না, এটা একটা আইনগত প্রশ্ন। তবে অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে এ বিষয়কে মেলানো যাবে না। অনুপ চেটিয়া নিজেই ভারতে যেতে চেয়েছেন। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও। সিদ্ধান্ত হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলার জেলা প্রশাসকরা অক্টোবরে দিল্লিতে মিলিত হবেন; কিন্তু তাতে সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে কি? যেদিন জেসিসির বৈঠক চলছে, সেদিনও বিএসএফের গুলিতে তিনজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। মোদির নেপাল, ভুটান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশকে নিয়ে উপ-আঞ্চলিক জোটের যে ধারণা, তাতে মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্তিও চাচ্ছেন। এতে নতুন একটা জোট গঠিত হতে পারে; যদিও বিসিআইএম জোট (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার) কাজ করছে এবং বাংলাদেশ এই জোট কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। এখন মোদির প্রস্তাবিত নয়া জোটের সঙ্গে বিসিআইএমের কী ভূমিকা থাকবে সেটা একটা প্রশ্ন হয়েই থাকবে। দুই দেশের বাণিজ্য ছয় বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের সম্প্রসারণে কোনো উদ্যোগের কথা বলা হয়নি। ট্যারিফ ও প্যারা-ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে বাজার পাচ্ছে না। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। আমরা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। আরো ৫০০ মেগাওয়াটের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। আসলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে হবে আঞ্চলিক ভিত্তিতে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও ভারত সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগ করে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে; কিন্তু ভারত এটা করছে দ্বিপক্ষীয়ভাবে।
ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জেসিসি বৈঠকে যোগদান এবং ভারত সফর কোনো বড় ধরনের সফলতা বয়ে আনতে পেরেছে- এটা বলা যাবে না। আমরা আশ্বাস পেয়েছি। এ ধরনের আশ্বাস আমরা আগেও পেয়েছিলাম। এ ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে মোদি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে- এটা বলা যাবে না। তবে আলাপ-আলোচনায় তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর প্রসঙ্গটি ভারতীয় পক্ষ উপস্থাপন করেনি। মোদি নির্বাচনের আগে ও পরে একাধিকবার এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।
একুশ শতকে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রভূমি হবে এশিয়া। দুটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক, সেই সঙ্গে জাপানের ভূমিকা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। জেসিসির বৈঠকের সময়ই চীনের প্রেসিডেন্ট ভারত সফরে এসেছিলেন। এর আগে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। এ অঞ্চল যে গুরুত্ব পাচ্ছে এটা এর বড় প্রমাণ। ভারত বড় শক্তি। আমাদের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থার সম্পর্ক যদি গড়ে তোলা না যায়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। ভারতের মনোভাবের পরিবর্তন তাই জরুরি। বাংলাদেশ শুধু এককভাবে দিয়ে যাবে; কিন্তু ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা আমরা পাব না- এ প্রবণতা সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।
Daily Kaler Kontho
24.09.14

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের সনদ বাতিল ও কিছু প্রশ্ন

চারজন সচিব, একজন যুগ্ম সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। দুদক ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। ভুয়া এই মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের ছবি ১৫ সেপ্টেম্বরের পত্র-পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। প্রথমে দুদক ও পরে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে জনপ্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন এ ধরনের অপকর্ম করেন, তখন সমাজটা যে কোথায় চলে গেছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগে। শীর্ষস্থানীয় এসব সচিবের মাঝে একজন আছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ও বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্বপ্রাপ্ত। একজন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়ে পদোন্নতি নেবেন, সুযোগ-সুবিধা নেবেন, এটা কাম্য হতে পারে না। তাই সঙ্গত কারণেই অনেক প্রশ্ন এখন উঠেছে। এক. মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলই কি যথেষ্ট? তারা অপরাধ করেছেন। প্রতিটি অপরাধেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়বে। এখন এ কাজটি করার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিচার করার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েরই। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা কি করবে? দুই. রাজনৈতিক কারণে অনেক বড় বড় অপরাধের বিচার হয় না। একজন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ছিলেন, তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কত গভীরে, তা বুঝতে আমাদের কারো কষ্ট হয় না। এখন তিনি বা তার সহকর্মী অভিযুক্তরা যে এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে ‘ব্যবহার’ করবেন না, এর গ্যারান্টি আমাদের কে দেবে? তবে সেই সঙ্গে এ কথাটাও সত্য, বর্তমান সরকার কেন একজন সচিবের অপকর্মের দায়ভার গ্রহণ করবে? এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি ব্যবসা করেন, তিনি বা তাদের রাষ্ট্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে, এটাই প্রত্যাশিত। তিন. অভিযুক্তরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ব্যবহার করে অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এর মাঝে আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও আছে। রাষ্ট্র কি এখন তাদের বাধ্য করবে ওইসব সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে? চার. অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কি স্বপদে থাকবেন? যদি স্বপদে থাকেন, তাহলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করবেন। তাদের সাময়িক চাকরিচ্যুত করাই কি মঙ্গল নয়? অভিযুক্তরা স্বপদে থাকলে নানা ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে আসবেন। পৃথিবীর কোথাও এভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘মাফ’ পেয়ে যান না, যা বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এমনকি ভারতেও প্রতিটি তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা মন্ত্রীদের পর্যন্ত ছাড় দেয় না। এখন দেখার পালা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী ঘটে। আমি দিব্যি বলতে পারি অভিযুক্তদের কারোরই বিচার হবে না। এরা বহালতবিয়তে থাকবেন।এ জাতির দুর্ভাগ্য যে, যারা স্বর্ণের ক্রেস্ট দেয়ার নামে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রতারণা করলেন, অপর দিকে আমাদের বিদেশি বন্ধুদের কাছে আমাদের সম্মান নষ্ট করলেন, রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিল না! এটা তো একটা অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে অপরাধ। এই অপরাধের জন্য যদি কেউ শাস্তি না পায়, তাহলে ছোটখাটো ঘটনায় অপরাধীদের আমরা শাস্তি দিতে পারি কি? পাঁচ. আবারো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতের কাছ থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের তালিকায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ছাড়া বাকিদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ স্থগিত থাকবে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও যদি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করতে হয়, এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। তাহলে কি এভাবেই চলতে থাকবে? এক সরকার যাবে আরেক সরকার আসবে আর সবাই নিজেদের মতো করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করবে? এটা কি ঠিক? এসব তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য কাজ করে। এক. রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া। নিজেদের কর্মীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা। দুই. সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। ভাতা, চাকরি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচুর আর্থিক সুবিধার নিশ্চয়তা থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে। তাই ‘একখানা’ সার্টিফিকেটের জন্য সবাই ব্যস্ত থাকেন, তদ্বির করেন। অবৈধ পন্থার আশ্রয় নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন থেকে চারজন শিক্ষকের নাম পত্র-পত্রিকায় এসেছে, যারা (ভুয়া) মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। একজন শিক্ষক কি পারেন এটা করতে? কোনো সার্টিফিকেট জমা না দিয়ে শুধু মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষইবা কিভাবে ওই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা দেয়? এটা তো নৈতিকতার প্রশ্ন। একজন শিক্ষক নিজে যদি অসৎ হন, তাহলে ছাত্রদের কি শিক্ষা দেবেন তিনি? মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা আদায় তো অপরাধের নামান্তর। সরকারি দলের হলেই মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি দলের না হলে মুক্তিযোদ্ধা নন-এই প্রবণতা একটি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরে দু’জন সাবেক উপাচার্য এ ধরনের একটি দাবি করেছেন বলে শোনা যায়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ‘প্রবণতা’ নিন্দনীয় এবং ঘৃণ্য নয় কি? ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেশে রয়েছে। আইনগতভাবে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা এখন ৬৫। এর পর আরো দু’বছর শিক্ষকতার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? যে সমাজে একজন অস্ত্রবাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন এবং রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দেয় না, সেই সমাজে একজন শুভবুদ্ধির মানুষ কতদিন শিক্ষক থাকতে পারেন? ৬৫ বছর কি তার জন্য যথেষ্ট নয়?
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট সংক্রান্ত খবর বাধ্য করল আরো একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে। আর তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভুয়া সার্টিফিকেটের ব্যবহার। হাজার হাজার ভুয়া পিএইচডি সার্টিফিকেটে দেশ এখন সয়লাব। একাধিক সাবেক সচিব এখন ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ আছে। একজন সাবেক সচিবের কথা বলি। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। লেখালেখি করেন। অর্থনীতি বিষয়ক লেখালেখি করে নামের আগে ডক্টরেট শব্দটি ব্যবহার করেন। তার ডক্টরেট ভুয়া এবং এর কোনো ব্যবহার করতে পারবেন না। একজন এনজিও কর্মকর্তার কথা বলি। তিনি দিব্যি ‘অধ্যাপক’ ও ‘ডক্টরেট’ পদবি ব্যবহার করছেন। আমি উভয় ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি এভাবে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার আইনত অপরাধ। একজন বেসরকারি ব্যাংকের এমডি আছেন। তিনি ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। আমার কাছে একাধিক ব্যক্তির পরিচিতি কার্ড রয়েছে, যেখানে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করা হয়েছে। একজন সচিব যদি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেখিয়ে ‘অপরাধী’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন, তাহলে একজন ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী অপরাধী হবেন না কেন? যারা সংবাদপত্রে ‘শিক্ষা বিট’ করেন, তারা তথাকথিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির খবর জানেন। দু’হাজার ডলারে কেনা যায় পিএইচডি ডিগ্রি! তারা রীতিমতো অফিস খুলে এই ব্যবসা করছেন! প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ রকম পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন উচ্চ আসনে। এখন দুদকের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি সেই ক্ষমতা আছে, তার ডিগ্রি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার? না, নেই। আর নেই বলেই ভুয়ারা এখন আসল সেজেছেন। ভুয়া পদবি ব্যবহার করে পত্রিকায় কলাম লিখছেন। বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরি পাওয়া যায়। আর ভুয়া সার্টিফিকেটের জন্য কারো শাস্তি হয়েছে, এ রকম দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারব না। এই দায়িত্বটি আসলে কার? শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বিদেশি ডিগ্রির সম্মান নির্ধারণ করে। মঞ্জুরি কমিশন একটি উদ্যোগ নিতে পারে। সব পিএইচডি ডিগ্রির (যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তাদেরটা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করে থাকেন) সমমান করিয়ে নেয়ার আহ্বান জানাতে পারে। এটি যত দ্রুত করা যায়, ততই মঙ্গল। যত দেরি হবে, ততই এক ধরনের ‘ল্যাজিটিম্যাসি’ তৈরি হয়ে যাবে।এক সময় এই ভুয়াদের চাপে আসলরা হারিয়ে যাবেন। এসব ভুয়া ডিগ্রিধারী যে কত শক্তিশালী তা সম্প্রতি প্রকাশিত বেশ ক’টি সংবাদ থেকে বোঝা গেল। ইন্টারমিডিয়েট পাস করা ব্যক্তিরা নেমেছেন দাঁতের ডাক্তারি করতে পদবি সাইনবোর্ড ও প্যাডে যুক্ত করে। আরেকজন রীতিমতো ‘অর্থোপেডিক সার্জন ডিগ্রি’ নিয়েছেন নিজেই! এরা নাকের ডগায় বসে ‘ডাক্তারি’ করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের হাতে ধরা পড়তে হয়েছে, কিন্তু বাকিদের কি হবে? এই ঢাকা শহরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের ভুয়া ডাক্তারের সংখ্যা অনেক। ক’জনের খবর র‌্যাব জানে? মোড়ে মোড়ে ওষুধের দোকান খোলা হচ্ছে। আর যারা এসব ওষুধের দোকান চালান, তাদের কারোরই কোনো প্রশিক্ষণ নেই। খেটে খাওয়া মানুষ এদের কাছে নিত্যদিন প্রতারিত হচ্ছেন। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে মানবকণ্ঠের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, স্বীকৃতিবিহীন ডিগ্রির যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন কতিপয় চিকিৎসক। এসব ডিগ্রিধারীর ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বিষয় দেখার দায়-দায়িত্ব কার? ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবদের বিষয়টি আমাদের চোখ খুলে দিল। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি সচিবালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা অন্যত্র আরো এ ধরনের ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা প্রতারণা করেন, তারা জাতির শত্রু। সমাজের শত্রু। এই ভুয়ারা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছেন। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়কে ডেকে আনে। একজন ভুয়ার অপকাণ্ডে আরেকজন ভুয়া উৎসাহিত হবে। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। Daily MANOBKONTHO 22.09.14

জেসিসির বৈঠক ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি

গামী 2০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে যোগ দিতে ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লি গেছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় যে কাঠামোগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তারই অংশ হিসেবে গঠিত হয়েছিল জেসিসি। ২০১২ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে জেসিসির প্রথম বৈঠক আর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুটি কারণে ওই জেসিসি বৈঠকের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে। ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেসব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেনি। জেসিসি বৈঠকে বাংলাদেশ নতুন করে ওই সমস্যাগুলো উত্থাপন করবে এবং ভারতের নয়া সরকারের মনোভাব জানতে চাইবে। বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক সময়গুলোয় বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ স্থাপন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চললেও ভারতীয় নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর প্রমাণ করে ভারতের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশকে কত গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায়, সেটা ছিল ‘নিঃশব্দ রণকৌশল পরিবর্তন।’ আর সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের চলমান যোগাযোগের অংশ।’ নিঃসন্দেহে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এই মূল্যায়ন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরও যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। ‘পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই’ করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৈদেশিক নীতিতে উজ্জ্বল একটি অধ্যায়। যদিও ১৯৭৫ সালের পর থেকে এই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল না। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি আমাদের নীতিনির্ধারকরা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালে মস্কো গিয়েছিলেন। এরপর কোনো সরকারপ্রধান মস্কো সফরে যাননি। রাশিয়া একটি বিশ্বশক্তি। অথচ দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল না। এখন প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরের মধ্য দিয়ে নতুন করে সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র তৈরি হলো। এই সম্পর্ককে এখন আমাদের উন্নয়নের আলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যারা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক ছিল চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য ও সহযোগিতা আমাদের বাধ্য করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আসরে সোভিয়েত পক্ষ অবলম্বন করে বাংলাদেশ যে বৈদেশিক নীতি রচনা করেছিল, তা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভিন্ন ধারণার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে অতিসাম্প্রতিককাল পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তেমন উষ্ণ ছিল না। যদিও ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। বিশ্ব অর্থনীতিতেও রাশিয়া তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারছিল না। ফলে বাংলাদেশ রাশিয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরই পুরনো সম্পর্ককে ঝালাই করার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন মস্কো গিয়েছিলেন, তখন সঙ্গত কারণেই পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এদিকে থাকে। শেখ হাসিনার মস্কো সফরের সময় তিনটি চুক্তি ও ছয়টি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ছিল দুটি। এক. প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে রাশিয়া থেকে সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয়। দুই. পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রস্তুতিমূলক অর্থায়নে সহযোগিতা। এখানে বাংলাদেশ ৫০ কোটি ডলার ঋণ পাবে। রূপপুরের পারমাণবিক কেন্দ্রের কারিগরি গবেষণার জন্য এই অর্থ। কেন্দ্র নির্মাণে কত টাকা লাগবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ ব্যাপারে পরে চুক্তি হবে। আপাতত দুবছরের মধ্যে এই ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে কারিগরি গবেষণার জন্য। এর বাইরে যেসব এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয় বিতর্ক বাড়াতে পারে। মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে এসে (২০১৩) সরকার এত বিপুল অর্থ ব্যয় করার যখন উদ্যোগ নিয়েছিল তখন বিতর্ক থাকবেই। প্রথম বিতর্ক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে বিনিয়োগ অনেক বেশি। তুলনামূলক বিচারে খরচ অনেক বেশি। সেই সঙ্গে রয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্নটি। রাশিয়া বিশ্বের অস্ত্র বাজারের অন্যতম বিক্রেতা। তাদের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এই অস্ত্র বিক্রি। পিস রিচার্স ইনস্টিটিউটের মতে, (সিপরি) রাশিয়া বর্তমানে অস্ত্র বিক্রির শীর্ষে। তাই বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যে দেশটি এখনো বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশটি যখন ৮ হাজার কোটি টাকা দিয়ে অস্ত্র ক্রয় করে, তখন বিশ্বে বাংলাদেশের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই এবং তা উঠেছে রাশিয়ার ঋণের ধরন (যা দিয়ে অস্ত্র কেনা হবে) দেখে বলা যায় এটি নন-কনসেশনাল। বাংলাদেশে কোনো স্বীকৃত প্রতিরক্ষা নীতিমালা নেই। কাজেই কোন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই অস্ত্র কেনা হবে তা পরিষ্কার নয়। আমাদের সেনাবাহিনীর অস্ত্রের অন্যতম উৎস হচ্ছে চীন। এখন সেই স্বাভাবিক বাদ দিয়ে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনা, সঙ্গত কারণেই আমাদের পররাষ্ট্র কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারে। তবে এটা যে পশ্চিমা বিশ্বে ভুল সিগন্যাল পৌঁছে দিতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চীন বিষয়টি ভালো চোখে দেখবে না। চীনারা এখন ব্যবসা বোঝে। রাজনীতি তাদের কাছে এখন মুখ্য নয়, বরং গৌণ। তবে অবসরপ্রাপ্ত যে কারও অপছন্দও এটি। একজন সিনিয়র জেনারেল (অব.) একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অস্ত্র কেনা হয়েছে (আমার দেশ, ২০ জানুয়ারি)। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়ার অস্ত্র ক্রয়ে একটি ‘তৃতীয় পক্ষ’-এর উপস্থিতি রয়েছে। এই চুক্তি যে অস্পষ্টতা, তা হচ্ছে এর সঙ্গে কোনো শর্ত যুক্ত কি না। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, শর্ত যুক্ত নেই। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অস্ত্র কেনায় সুদ দিতে হবে চার শতাংশ। ব্যবহার করতে হবে এই ঋণ ২০১৩-১৭ সালের মধ্যে। আর ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০ কিস্তিতে ১০ বছর ধরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, অস্ত্র ক্রয়ে কোনো অস্বচ্ছতা নেই। বলা হয়েছে, এই অস্ত্র সেনাবাহিনী রক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার করবে। এই পরিসংখ্যান নিয়েও কথা বলা যায়। বিশেষ করে সুদের হার বেশি বলেই মনে হয়। তবে আমার কাছে যা মনে হয়, তা হচ্ছে এটি আমাদের বৈদেশিক ও সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত বহন করে। কেননা আমাদের বৈদেশিক নীতি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চীনের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের বিমানবাহিনী চীনা বিমান ব্যবহার করে। সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রও চীনের তৈরি। আমাদের সামরিক নেতৃত্ব চীনা যুদ্ধাস্ত্রের ওপর অনেক দিন থেকেই নির্ভরশীল। আমাদের উন্নয়নে চীন অন্যতম অংশীদার। চীন আমাদের নিকট-প্রতিবেশীও। আমাদের উন্নয়নে চীনের উপস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই সরকারপ্রধান চীনে গিয়েছিলেন। এমনকি প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী বেগম জিয়াও অতিসম্প্রতি চীনে গিয়েছিলেন এবং তারা দুজন লালগালিচা সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী কুনমিং-কক্সবাজার সড়ক ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। যদিও কোনো চুক্তি হয়নি। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে এই মহাসড়ক ও গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের চেহারা আগামী দশকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ হতে পারে এ অঞ্চলের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। চীন শ্রীলংকার হামবানটোটায় (প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের জন্মস্থান) গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে দিয়েছে। সেখানে একটি বিমানবন্দরও চীন তৈরি করে দিয়েছে। এখন যতদূর জানা যায়, গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণে ভারতের একটি কোম্পানি আগ্রহও দেখিয়েছে। এটা নির্মিত হলে অদূরভবিষ্যতে ভারতের সাত বোন রাজ্যগুলো যেমনি এটি ব্যবহার করতে পারবে, তেমনি পারবে চীন তথা মিয়ানমারও। এখন সঙ্গত কারণেই একদিকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক, অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নানা কৌতূহলের জন্ম দেবে। বাংলাদেশ মূলত এই দুই নিকট-প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে। বাংলাদেশের স্বার্থ যেখানে বেশি, বাংলাদেশ সেখানেই যাবে। ভারতের ব্যাপারে আমাদের স্বার্থ অনেক বেশি। যে কারণে আমাদের পররাষ্ট্র নীতিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের যেমনি প্রয়োজন রয়েছে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার, ঠিক তেমনি আমাদেরও প্রয়োজন রয়েছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির। তবে সমস্যাগুলো যেভাবে ছিল, সেভাবেই রয়ে গেছে। কোনো সমাধান হয়নি। তিস্তার চুক্তি যেমনি হয়নি, ঠিক তেমনি টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও রয়ে গেছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। বাণিজ্য ঘাটতি কমছে না। শুল্ক প্রত্যাহার করার কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো প্রতিফলন নেই। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। এর ওপর আবার যোগ হয়েছে তথাকথিত বাংলাদেশি খেদাও অভিযান। মোদি নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ বাংলাদেশিদের বসবাসের কথা বলে আসছিলেন। এখন ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় একটি ‘সেল’ গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাদের কাজ হবে ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের’ মনিটর করা। তাই নয়া সরকার দিল্লিতে ক্ষমতাসীন হয়েও পুরনো নীতিই অনুসরণ করছে। বরং আরও কিছুটা কঠোর হয়েছে। এতে করে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা তৈরি হবে। এমনি এক পরিস্থিতিতে জেসিসির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বড় ধরনের ‘ব্রেক থ্রু’ অর্থাৎ সমস্যার সমাধান হবে, এটা মনে করা ঠিক হবে না। ভারত যদি বাংলাদেশের ব্যাপারে তার মনোভাবের পরিবর্তন না ঘটায়, তাহলে সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। হিতে বিপরীতও হতে পারে। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও শক্তিশালী হবে। ফলে বাংলাদেশকে ‘ভারতনির্ভর’ পররাষ্ট্র নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমরা ভারতকে ‘সবকিছু দেব’ বিনিময়ে আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা পাব না, এটা হতে পারে না। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শক্ত অবস্থানে গেলে সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হতে পারে। নয়তো শুধু ‘ভারতনির্ভর’ পররাষ্ট্রনীতি কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। জেসিসি সভায় শুধু আলোচনা হবে। সমস্যার সমাধানের কোনো দিকনির্দেশনা আমরা পাব না যদি না ভারত তার মনোভাবে পরিবর্তন আনে। Daily Amader Somoy 20.09.14

বল এখন মোদির কোর্টে

আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি সম্ভাব্য বৈঠকের কথা ইতিমধ্যে চাউর হয়ে গেছে। এটা কোনো সরকারি বৈঠক নয়। এটা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে যোগ দেবেন। প্রতিবেশী দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে যোগ দেন, তখন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি সেদিকে থাকবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির এই প্রথম বৈঠক দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখবে কি-না? ভারতে নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করে এটা স্পষ্ট করেছেন, তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেন। দক্ষিণ এশিয়া তার অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথম। এ কারণেই দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সরকারি সফরে তিনি ভুটান গিয়েছিলেন। তারপর তিনি যান নেপালে। বাংলাদেশে তিনি আসেননি বটে, কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের মনোভাব এবং সেই সঙ্গে দেশের অপর বড় দল বিএনপির মনোভাব তার জানা প্রয়োজন ছিল। সেটা তিনি জেনেছেন। যতদূর জানা যায়, আগামী জানুয়ারির দিকে তিনি সরকারি সফরে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তখন দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এর আগে নভেম্বরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেও হাসিনা-মোদি বৈঠক হবে। তবে সার্ক সম্মেলনে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচানার সুযোগ কম। সৌজন্য সাক্ষাৎকারে সাধারণ কথাবার্তাই বেশি হয়। অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়, যার কোনো ভিত্তি থাকে না। সার্ক চার্টারে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা উত্থাপনেরও কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং নিউইয়র্কে যে বৈঠকটি হবে, সেখানে সিরিয়াস কোনো আলোচনা হবে না। দুই নেতা পরস্পর পরস্পরকে চিনবেন, জানবেন, একজন অপরজনকে তার দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাবেন। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়তো সুযোগটি গ্রহণ করতে পারেন। সীমিত সুযোগে তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার কথা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারেন।ভারত বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। আমাদের উন্নয়নে ভারতের ভূমিকা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ভারত সমমর্যাদার দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখছে না। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতকে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তা পূরণে ভারত এগিয়ে আসেনি। বরং ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ভূমিকায় একটি বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব আমরা লক্ষ করেছি। মোদি নির্বাচনের আগে বারবার বলে আসছিলেন, ভারতে বাংলাদেশীরা অবৈধভাবে বসবাস করেন। পশ্চিমবঙ্গকে তিনি টার্গেট করেছেন। ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় আলাদা একটি সেল খুলেছেন, যাদের কাজ হবে তথাকথিত ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের’ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা ও মনিটর করা। সম্প্রতি বিজেপির সভাপতি ও মোদির দক্ষিণ হস্ত বলে পরিচিত অমিত শাহ কলকাতায় বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অধিবাসী ৫ গুণ বেড়েছে। সারদা কেলেংকারির ঘটনায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর নাম এসেছে। বলা হয়েছে, জামায়াতের মাধ্যমে জঙ্গি তৎপরতায় অর্থায়ন করেছে সারদা। ভারতের সিবিআই বিষয়টি তদন্ত করছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি যেহেতু স্পর্শকাতর, সেহেতু সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনও বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছে, সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যাপারে তিনি একটি বড় উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু তারপরও কংগ্রেস নেতাদের তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি বাংলাদেশের বিষয়টি নিজেই দেখভাল করতেন- এ রকম একটি কথা আমরা বরাবরই শুনতে পেয়েছি। একজন বাঙালি হয়ে বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে তিনি পূর্ণ অবগত ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ভূমিকা সীমিত থাকায় তিনি সমাধানের কোনো পথ বের করতে পারেননি। আসলে ভারতের আমলাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। আমলারা নীতিনির্ধারণে প্রভাব খাটায়। এ আমলাতন্ত্রের কারণেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ধীরে ধীরে তিক্ততায় পরিণত হয়েছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে প্রণব বাবুর বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে ‘সিমপ্যাথি’ থাকলেও সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ড. মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশ সফরে এসে আমাদের আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন, সমস্যার সমাধান হবে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্র“তি দিলেও তিনি দিল্লি ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে হত্যারঘটনা ঘটেছে। তার ঢাকা সফরের সময়ই আমরা শুনেছিলাম, মমতা ব্যানার্জির কারণে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করানোর দায়িত্বটি কেন্দ্রীয় সরকারের, বাংলাদেশ সরকারের এখানে কোনো ভূমিকা নেই।তিস্তা চুক্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। দু’বার ১৯৯৮ ও ২০০৭ সালে একটি চুক্তির কাছাকাছি আমরা চলে গিয়েছিলাম। সমানভাবে পানি বণ্টন করে কিছু পানি নদীতে রেখে দেয়ার একটি সিদ্ধান্তে দু’দেশ একপর্যায়ে রাজিও হয়েছিল। তারপরও চুক্তি হয়নি। এখন মূল সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি। এতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই। কিন্তু ভারত আমাদের সেই অধিকার নিশ্চিত করছে না। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও ভারত আমাদের বারবার মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং একাধিকবার বলেছেন, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? নয়াদিল্লিতে ইতিমধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সেখানে জলবিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণের। প্রায় ৯ হাজার কোটি রুপিও ব্যয় করা হয়ে গেছে। বাঁধটি যদি নির্মিত হয় তাতে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হবে, তা একাধিক সেমিনারে আলোচিত হয়েছে। এখানে আমাদের ব্যর্থতা, আমরা শক্ত অবস্থানে যেতে পারছি না। জেসিসির যৌথ ইশতেহারে এ সংক্রান্ত কোনো কথা বলা হয়নি। গঙ্গা চুক্তি আমরা করেছিলাম ১৯৯৬ সালে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। এর আগেই পদ্মায় পানি নেই। চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। ২০২৭ সালে লোকসংখ্যা বাড়বে তিনগুণ। যে বিপুল পানির চাহিদা থাকবে, তার কী হবে? চুক্তি অনুযায়ী পর্যালোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগটি আমরা নিচ্ছি কোথায়? অতীতে কখনও আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। সীমান্ত হত্যা আজও বন্ধ হয়নি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও একের পর এক সীমান্ত হত্যা হচ্ছে। এমন দৃষ্টান্ত নেই যেখানে বিজিবির গুলিতে কোনো ভারতীয় নাগরিক মারা গেছেন। প্রতিমাসেই মারা যাচ্ছেন নিরপরাধ বাংলাদেশী নাগরিকরা। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশী মারা গেছেন তার পরিসংখ্যান মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে আছে। এ নিয়ে একাধিক শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু হত্যা বন্ধ হয়নি। সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের সময়ও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সীমান্ত চিহ্নিত ও অপদখলীয় ভূমির ব্যাপারেও তিনি মুখ খোলেননি ঢাকায়। গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি কোনো। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ও ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের ব্যাপারে আমরা সবাই অবগত। ভারতের ভেতরে যারা রয়েছেন, তারা ভারতেই থাকতে চান। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের ভেতরে যারা রয়েছেন, তারা বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবেই থাকতে চান। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেই ১৯৭৪ সালে। তারপর কখনোই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার উদ্যোগ নেয়নি সংবিধান সংশোধন করার। সমস্যাটা তো আমাদের নয়। সমস্যাটা ভারতের। আজ প্রায় ৪০ বছর পরও এ কথাগুলো আমাদের বলতে হয়। এটা কি ভারতের সদিচ্ছা প্রমাণ করে? ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল ভারত। প্রণব বাবু ঢাকায় এসে ২০ কোটি ডলার অনুদানের কথা বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঋণের টাকা দিয়ে তো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না? ১৩ প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার অভাবে কিছু প্রকল্প আটকে আছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। ২০০৯-১০ সালে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১০-১১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৩-১৪ সালের পরিসংখ্যান যখন আমাদের হাতে আসবে, ধারণা করছি তা ৪ বিলিয়ন ডলারের অংক ছাড়িয়ে যাবে। ভারত মাঝেমধ্যে কিছু পণ্যের শুল্কমূল্য প্রবেশাধিকারের কথা বলে বটে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ এসব পণ্যের অনেকগুলোই রফতানি করে না। ভারতের অশুল্ক বাধা দূর করা নিয়েও ‘নানা কাহিনী’ আছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নানা ধরনের শুল্ক দূর করা যাচ্ছে না। ফলে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি সে তুলনায় বাড়ছে না। শুধু ঘাটতি বাড়ছেই। এটা আমাদের জন্য শংকার কারণ।ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টির একটা সমাধান হয়েছে সত্য, কিন্তু ২০১৫ সালে আমরা আদৌ বিদ্যুৎ পাব কি-না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। বাংলাদেশ বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকটের মুখে। বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বন্ধ অনেক কারখানায়। অথচ ভারত যদি আন্তরিক হয়, তাহলে আমাদের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। মহাজোট ও বর্তমান সরকারের গত ৬৮ মাসের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব ভারতের দিকে পাল্লা ভারি, আমাদের প্রাপ্তি কম। আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছি (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডর), কিন্তু ট্রানজিট ‘ফি’ এখনও নির্ধারণ হয়নি। বলা হচ্ছে, ট্রানজিটের বিষয়টি বহুপাক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল, ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনও ট্রানজিট পায়নি। ভারতের এ দুটি দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা। কিন্তু ইতিমধ্যে এ সুবিধা এ দুটি দেশকে নিশ্চিত করা হয়েছে এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। আগামীতে ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলো আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে- এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা হয়েছে। অথচ আমাদের ন্যূনতম প্রাপ্তির ব্যাপারে এতটুকু ভারতীয় উদ্যোগ আমরা লক্ষ করিনি। আজ তাই নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন, আমরা চাইব তার প্রতি সম্মান দেখিয়েই ভারত সমস্যাগুলোর সমাধানের উদ্যোগ নেবে। মোদি সরকারের জন্য একটি বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ বড় দরকার।ভারতের একগুঁয়েমির কারণে যদি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তাহলে তা থেকে সুবিধা নেবে জঙ্গিরা, বিশেষ করে আল-কায়দা। জাওয়াহিরি তার একটি ভিডিও বার্তায় দক্ষিণ এশিয়া ও মিয়ানমারে আল-কায়দার শাখা খোলার কথা ঘোষণা করেছেন। এটা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। উভয় দেশেই জঙ্গিরা আছে। দু’দেশ জঙ্গি দমনে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। মোদির জন্য বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। শেখ হাসিনা-মোদির সৌজন্য সাক্ষাৎকারেই সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না। আশা করাও ঠিক হবে না। তবে একটা আস্থার ভিত রচিত হতে পারে। নিঃসন্দেহে ‘বল’ এখন মোদির কোর্টে। উদ্যোগ নিতে হবে মোদি সরকারকেই। মোদি নিজে এবং তার উপদেষ্টারা যদি এটা না বোঝেন, তাহলে তা হবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের একটি বিষয়। মোদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সুতরাং বাংলাদেশ তার অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে বাদ যাবে না, এটা আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি। Daily JUGANTOR 20.09.14

পরিবেশ বিপর্যয় : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৬৯তম অধিবেশন বসছে। এবারের অধিবেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন অধিবেশন শুরুর আগে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য বিশ্বের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে বলা প্রয়োজন, বেশ ক'বছর ধরে জাতিসংঘের উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন (যা 'কপ' নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশগুলোর ব্যর্থতার কারণে কোনো সমঝোতায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা অতি সম্প্রতি প্রকাশিত দুটো রিপোর্ট থেকে বোঝা যায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুমন্ডলে ৩৯৬ পিপিপি (গ্যাসের একক) কার্বন-ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অন্তত ৩ পিপিপি বেশি, অন্যদিকে অতি সম্প্রতি পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে যে বন্যা দেখা দিয়েছে, তাতে এক কাশ্মীরেই পানির নিচে চলে গেছে ৩০০ গ্রাম। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, কিছুদিন আগে ঘূর্ণিঝড় 'মহাসেন' বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে আঘাত করেছিল। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর টর্নেডো এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি বড় বড় শহরগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। সারা বিশ্বই আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। ফলে সাগর, মহাসাগরে জন্ম হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের, যা একসময় প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে উপকূলে। ধ্বংস করে দিচ্ছে জনপদ। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উপকূলবর্তী গ্রাম, ছোট ছোট শহর। 'মহাসেন' ছিল সেরকম একটি ঘূর্ণিঝড়। এর আগে আমরা 'সিডর' ও 'আইলার' সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সমুদ্রে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুসারে নামকরণের সুযোগ পায় ভারত উপমহাসাগরভুক্ত আটটি দেশ। প্রতিটি দেশকে চারটি করে নাম পাঠাতে হয়। এর মধ্য থেকে একটি নাম বেছে নেয়া হয়। এক সময়ের শ্রীলঙ্কার রাজা মহাসেন ধ্বংস করেছিলেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বহু মন্দির। সে কারণে ধ্বংসাত্মক ঝড়ের নাম রাখা হয়েছিল ধ্বংসের প্রতীক সেই রাজা 'মহাসেন' এর নামে। এদিকে এ অঞ্চলে পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হবে থাইল্যান্ডের দেয়া নামে। আর এর নাম হবে ফাইলিন। 'মহাসেন'-এর পর এখন 'ফাইলিন'-এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি অতি বন্যা, অসময়ে বন্যা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যারা নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করেন, তারা জানেন সীমান্তের ওপর থেকে নেমে আসা বিপুল পানির স্রোত বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে দিয়েছে। দেশের প্রায় ১৭টি জেলা এ বন্যায় আক্রান্ত। হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যায়। অকাল বন্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে হিমালয়ে। সেখানে বরফ গলছে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। আমাদের দেশের আবহাওয়াতেও পরিবর্তন আসছে। অসময়ে বৃষ্টি প্রমাণ করে, পরিবেশ কীভাবে বদলে যাচ্ছে। যে সময়ে বৃষ্টি হওয়ার কথা সে সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না। শীতের ব্যাপ্তি কমছে। মনে আছে, গেল শীত আসতে আসতেই চলে গেল। ফলে কৃষিতে সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মানুষ লড়াকু। 'সিডর' ও 'আইলার' পর তারা বুঝে গেছে, এ ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গেই তাদের বসবাস করতে হবে। লোনা পানি তাদের জীবনযাত্রার মান হুমকির মুখে ঠেলে দিলেও এ লোনা পানির সঙ্গে 'যুদ্ধ' করেই তারা বেঁচে আছে। প্রকৃতিই তাদের শিখিয়েছে কীভাবে সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে হয়। আগের চেয়েও উপকূল এলাকার মানুষ আজ অনেক সচেতন সারা বিশ্ব জানে, বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তাতে আগামী দিনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে প্রতি সাতজনে একজন উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। এরা হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। আগামীতে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। বিশ্ববাসী জলবায়ু উদ্বাস্তুর সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয় ২০০৫ সালে, যখন বাংলাদেশে ভোলার চরাঞ্চল থেকে ৫ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ক্রিস্টিয়ান পেনেনটি (ঈযৎরংঃরধহ চবহবহঃর) তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ 'ঞৎড়ঢ়রপ ড়ভ ঈযড়ড়ংব : ঈষরসধঃব পযধহমব ধহফ ঃযব ঘব িএবড়মৎধঢ়যু ড়ভ ঠরড়ষবহপব (২০১১)'-এ উল্লেখ করেছেন সে কথা। পেনেনটি আরও উল্লেখ করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যেই ২২ মিলিয়ন অর্থাৎ ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল থেকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবে। আইপিসিসির রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কথা। অনেকের মনে থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর পরিবেশের ব্যাপারে বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এন্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। আমাদের পরিবেশমন্ত্রীকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেখানে। সেটা ঠিক আছে। কেননা বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে গেলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পর পর দু'বার বন্যা ও পরবর্তীকালে 'সিডর'-এর আঘাতের সম্মুখীন হয়। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে আঘাত করে 'আইলা'। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ব্যাপক খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয়। দেশে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। 'সিডর'-এর পর বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি বারবার বিশ্বসভায় আলোচিত হচ্ছে। সিডরের ক্ষতি গোর্কির চেয়েও বেশি। মানুষ কম মারা গেলেও সিডরের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সিডরে ৩০টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল ৯টি জেলা। ২০০ উপজেলার ১ হাজার ৮৭১টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯ লাখ ২৮ হাজার ২৬৫ পরিবারের ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৬ জন সিডরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিল ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। 'সিডর' ও 'আইলা'র পর 'মহাসেন' বাংলাদেশে আঘাত করেছিল। এতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব আমরা পাব না কোনো দিনই। 'সিডর' ও 'আইলা'র আঘাত আমরা এখনও পরিপূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আইলার আঘাতের পর খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছায় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতা কোথাও কোথাও ১ মিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত। আইলায় ৮০ ভাগ ফলদ ও বনজ গাছ মরে গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে আজ নোনা জলের আগ্রাসন। সুপেয় পানির বড় অভাব ওইসব অঞ্চলে। এরপর 'মহাসেন' আমাদের আবারও ক্ষতিগ্রস্ত করে গেল। আর এখন অকাল বন্যা। আমাদের মন্ত্রী, সচিব কিংবা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফর ও সম্মেলনে অংশ নিতে ভালোবাসেন। কানকুন, ডারবান, কাতার কিংবা তারও আগে কোপেনহেগেনে (কপ সম্মেলন) আমাদের পরিবেশমন্ত্রী গেছেন। আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য কোপেনহেগেনে প্লাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিশ্ব জনমত আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। আমরা পরিবেশ রক্ষায় ফাস্ট স্টার্ট ফান্ডে পাওয়া টাকার (বাংলাদেশের জন্য ১৩০ মিলিয়ন ডলার) ব্যাপারে উৎসাহী। আরও টাকা চাই। সেটা হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু 'তিতাসকে হত্যা' করে আমরা নিজেরাই (এর জন্য বিদেশিরা দায়ী নয়) যে বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলাম তার কী হবে? বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ব্যবহার করা হবে। এজন্য বছরে ৪ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হবে। বিদ্যুৎ আমাদের দরকার- সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু কয়লা পুড়িয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং তাতে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে, তা কী আমরা বিবেচনায় নিয়েছি? না, নিইনি। ভারতীয় ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে বটে; কিন্তু পরিবেশের প্রভাব নিরূপণের জন্য ইআইএ সমীক্ষা-তা করা হয়নি। রামপালের গৌরম্ভর কৈকরদশকাঠি ও সাতমারী মৌজায় ১ হাজার ৮৪৭ একর জমিতে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হবে, যা সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। কয়লা পোড়ানো হলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সালফার, নাইট্রিক এসিড বায়ুম-লে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে করে এসিড বৃষ্টি হবে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। সুন্দরবনের গাছ, উদ্ভিদ মরে যাবে। পশু-পাখির প্রজনন বাধাগ্রস্ত হবে। ধ্বংস হয়ে যাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কী অন্যত্র স্থানান্তরিত করা যেত না? আমাদের গর্ব এ সুন্দরবন। এর মধ্যে সুন্দরবনকে গ্লোবাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এমন কিছু করতে পারি না, যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম এ প্যারাবনের অস্তিত্ব হুমকির সৃষ্টি করে। রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত ইউনেস্কো কনভেশন লঙ্ঘন করেছি। মাননীয় মন্ত্রী, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? বর্তমান পরিবেশমন্ত্রী নতুন। আগে যিনি মন্ত্রী ছিলেন, তিনি এখন নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন যে সরকার গঠিত হয়েছে, সেই সরকারে তিনি জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) থেকে মন্ত্রী। পরিবেশ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা নেই। 'কপ' সম্মেলনগুলোতে তিনি অংশ নেননি। তবে ফাস্ট স্টার্ট ফান্ডে প্রাপ্ত টাকা নিয়ে যে দুর্নীতি হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি মুখ খুলেছেন। বলেছেন, এ ফান্ডের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রাপ্ত টাকা নিয়ে যে দুর্নীতি হয়েছে, এটা সত্য। দেখা গেছে, যারা কোনোদিন পরিবেশ নিয়ে কাজ করেননি, তারাও টাকা পেয়েছেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, এমন অভিযোগও উঠেছে। ফলে জলবায়ু ফান্ড থেকে যারা সত্যিকার অর্থে ভুক্তভোগী, তারা টাকা পাননি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত এবং যাদের জন্যই ফান্ড এসেছিল, তারা কোনো সাহায্য পাননি। বাংলাদেশ এককভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনরোধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে না। বাংলাদেশ এককভাবে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ও, তা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের উষ্ণতা রোধ করতে খুব একটা প্রভাব রাখবে না। এজন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক আসরে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিদেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। কিন্তু এ সাহায্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। পরিবেশ বিপর্যয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। অতি সম্প্রতি যে বন্যা হলো, আবার আমাদের সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিল। 'সিডর' ও 'আইলা'র আঘাতে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছিল, সেই ক্ষতি সারাতে সরকারের বড়সড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হলেও এখানেও 'রাজনীতি' ঢুকে গেছে। দলীয় বিবেচনায় টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। (কালের কণ্ঠ ২৭ মে)। ভাবতে অবাক লাগে, যেসব এনজিও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেনি, যাদের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই, শুধু দলীয় বিবেচনায় তাদের নামে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জলবায়ু তহবিলের অর্থ যাওয়া উচিত ওইসব অঞ্চলে যেখানে ঘূর্ণিঝড়, বন্যার আঘাত বেশি আর মানুষ 'যুদ্ধ' করে সেখানে বেঁচে থাকে। অথচ দেখা গেছে, জলবায়ুর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা দেয়া হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভাকে, মানিকগঞ্জের একটি প্রকল্পে কিংবা নীলফামারী তিস্তা বহুমুখী সমাজ কল্যাণ সংস্থাকে। সিরাজগঞ্জের প্রগতি সংস্থাও পেয়েছে থোক বরাদ্দ। অথচ এমন প্রতিষ্ঠানের একটিরও জলবায়ু সংক্রান্ত কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। জলবায়ু তহবিলের টাকা বরাদ্দেও যদি 'রাজনীতি' ঢুকে যায়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু থাকতে পারে না। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দেখা যায়, বরাদ্দ পাওয়া এনজিওগুলোর সঙ্গে সরকারি দলের নেতা ও কর্মীরা জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্নীতি যদি এখানেও স্পর্শ করে, তাহলে জলবায়ু ফান্ডে আর সাহায্য পাওয়া যাবে না। সচেতন হওয়ার সময় তাই এখনই। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ধারণা করছি, তিনি বিশ্ববাসীকে জানাবেন বাংলাদেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর সমর্থন রয়েছে। এখন যা দরকার, তা হচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে বিশ্বের উষ্ণতারোধ সংক্রান্ত কপ-২২ সম্মেলনে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা। বাংলাদেশের উচিত ওই সম্মেলনে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা। Daily ALOKITO BANGLADESH 19.09.14