রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

লাস ভেগাসে হত্যাকাণ্ড, আইএস-সংশ্লিষ্টতা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি

লাস ভেগাস হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততা আছে কি নেই, আমার কাছে তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হচ্ছে, আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। এ হত্যাকা-ের আগে স্টিফেন প্যাডক যে ১ লাখ ডলার ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন, এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ফিলিপাইনের জঙ্গি কার্যক্রমে তিনি সহায়তা দিয়ে থাকতে পারেন! এখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুরবস্থার সুযোগে এ রকম দাতা এগিয়ে আসতে পারে। আরেকজন স্টিফেন প্যাডকের জন্ম হতে পারে! তাই রোহিঙ্গা পরিস্থিতির দিকে সবার দৃষ্টি থাকবেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন
ডালাস থেকে লাস ভেগাসের দূরত্ব গাড়িতে ১ হাজার ২১৮ মাইল। ডালাসে আমি বসবাস করি। ছোট শহর, হাইল্যান্ড ভিলেজ। ছিমছাম। মূলত কিছুটা ধনী ব্যক্তিরাই এখানে থাকেন। কোনো অ্যাপার্টমেন্ট নেই। সব নিজস্ব বাড়ি। দীর্ঘমেয়াদি লিজে বাড়ি কিনতে হয়। আমাদের এক প্রতিবেশী গেল ২ অক্টোবর গিয়েছিলেন লাস ভেগাসে। উদ্দেশ্য জুয়া খেলা। পাঠকমাত্রই জানেন, লাস ভেগাস কী জন্য বিখ্যাত। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় বড় ক্যাসিনো, যেখানে জুয়া খেলা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব হোটেলে জুয়া খেলা হয়, সাধারণত সেসব হোটেলে রাত্রীবাস ফ্রি; অর্থাৎ যারা জুয়া খেলতে আসেন, তারা থাকেন ফ্রি, আর জুয়া খেলে হয় হেরে যান, নয়তো আবার জিতে নিয়ে যান মিলিয়ন ডলার। গত ২ অক্টোবর ওই লাস ভেগাসেই ঘটল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকা-। একজন পেশাদার জুয়াড়ি স্টিফেন প্যাডক গুলি করে মারল ৫৯ জন সাধারণ মানুষকে। এ ঘটনায় হতবাক সারা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। আরও অবাক হয়েছে এটা শুনে যে, আইএস অর্থাৎ চরমপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত। আইএস তার দায় স্বীকারও করেছে। আইএসের জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নানা গুজব তৈরি হয়েছে। আসলেই কি আইএস জড়িত? আইএস দাবি করেছে, ৬৪ বছরের প্যাডক এক মাস আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। অনেকটা নিরীহ গোছের মানুষ ছিলেন প্যাডক। তার তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গি দলে যোগদান, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এফবিআই কিংবা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কেউ জানল না? নাকি আইএসের দাবি মিথ্যা? সত্যি হোক, মিথ্যা হোক, আইএস নিয়ে এ দেশে সন্দেহ বাড়ছে। এ ধরনের হত্যাকা- অতীতেও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এককভাবেই এসব হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে, যেসব ঘটনাকে Lone wolf attackহিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
লন্ডনের দি ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে গেল ২৭৫ দিনে ২৭৩টিLone wolf attack-এর ঘটনা ঘটেছে। আর বিখ্যাত সংবাদ সাময়িকী ইকোনমিস্ট ১৯৮২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হত্যাকা- ঘটেছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২০১২ সালের পর থেকে এ ধরনের হামলার প্রবণতা বেড়েছে। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন অরল্যান্ডো নাইটক্লাবে হামলার কথা (২০১৬, মৃত্যু ৪৯ জন); ক্যালিফোর্নিয়ার সানমারডিনোতে হত্যাকা-ের খবর (২০১৫, মৃত্যু ১৪ জন) কিংবা নিউটাউন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হত্যাকা-ের কথা (২০১২, মৃত্যু ২৭ জন)। সেসব হত্যাকা-ের সঙ্গে কখনোই কোনো জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠেনি; এখন উঠছে। উঠেছে এ কারণে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্স, ব্রাসেলস, জার্মানি কিংবা লন্ডনে জঙ্গি আক্রমণ বেড়েছে। আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা, যারা একসময় সিরিয়ায় যুদ্ধে করেছে, তারা এখন ইউরোপে ফিরে গিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গেল ২ বছরে যেসব জঙ্গি আক্রমণ হয়েছে, তাতে আইএসের সংশ্লিষ্টতা থাকা অবিশ্বাস্য কোনো বিষয় নয়। তবে লাস ভেগাসের হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্বীকার করবে কিনা, এটা একটা বড় প্রশ্ন।
যারা বিশ্বব্যাপী জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে কাজ করেন, তারা লক্ষ করেছেন, সিরিয়া-ইরাকের আইএসের কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসছে। আইএস সেখানে পরাজিত হয়েছে অনেকটা। তবে এখানে যেসব জঙ্গি
যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারা এখন সেখান থেকে সটকে পড়েছে। আগামীতে জঙ্গি কার্যক্রম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত হবে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। এক্ষেত্রে দুইটি দেশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন অনেকে। একটি ফিলিপাইনে অপরটি মিয়ানমারÑ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন অক্টোবর (২০১৭) সংখ্যায় অধ্যাপক জাকারি আবুজার (Zachary Abuza)একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ফিলিপাইনের জঙ্গিবাদের প্রসার নিয়ে। অধ্যাপক আবুজা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত  National War Collageএর একজন অধ্যাপক। তার প্রবন্ধের নাম Mayhem in Marawi ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি শহর মারাবি ((Marawi))সেখানে গত মে (২০১৭) থেকে ফিলিপাইনের সেনাবাহিনী আইএস-সংশ্লিষ্ট আবু সায়াফ গ্রুপের সঙ্গে যে যুদ্ধে লিপ্ত, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। গত ৪ মাসে সেখানে জঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন সেনাবাহিনীর ১৪৭ সদস্য এবং ৪৭ জন সিভিলিয়ান। জঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধে ওই শহরটি পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এ যুদ্ধের সঙ্গে সিরিয়া-ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে সিরিয়া ও ইরাকি বাহিনী যে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেনাবাহিনী এখনও মারাবি শহরের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণভার নিতে পারেনি। শহরটি এখন পরিপূর্ণভাবে পরিত্যক্ত। শহরের শতভাগ বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন সম্প্রসারিত হয়েছে ফিলিপাইনে। সিএনএন গেল ২৯ মে (২০১৭) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেÑPhillippines; The next ISIS stronghold?অর্থাৎ ফিলিপাইন কি হতে যাচ্ছে আইএসের পরবর্তী শক্তিশালী ঘাঁটি? ওই প্রতিবেদনে একটি মসজিদে আইএস কর্তৃত্ব তাদের পতাকা উত্তোলন করার দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম। এ অঞ্চলের তিনটি দেশেÑ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ায় গত ২ বছরে যেসব জঙ্গি কর্মকা- হয়েছে এবং যার সঙ্গে আইএস জড়িত, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে সিএনএনের প্রতিবেদনে। পাঠকদের সেখান থেকে কিছু তুলে দিচ্ছিÑ জুন ২৮, ২০১৬ কুয়ালালামপুরের একটি নাইটক্লাবে জঙ্গি হামলায় আটজনের মৃত্যু। জানুয়ারি ১৪, ২০১৬ জাকার্তায় সন্ত্রাসী হামলায় চারজনের মৃত্যু। জাকার্তায় মে ২৪, ২০১৭ সন্ত্রাসী হামলায় তিনজনের মৃত্যু। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের দাভাও শহরÑ সন্ত্রাসী বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু ১৪ জন। আর মারাবির ঘটনা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রতিটি ঘটনায় আইএস তার দায় স্বীকার করেছে। গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন তৎপর, যাদের সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ রয়েছে। যেমন বলা যেতে পারে মরো লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) কথা। এরা তৎপর সুলু দ্বীপপুঞ্জ এলাকায়। সুলু দীপপুঞ্জ এলাকায় Bangsamoro Islamic Freedom Fighters-I (BIFF) তৎপর। জাকার্তায় তৎপর জামেইয়া ইসলামিয়া। আবু সায়াফ গ্রুপ ও মাউটে গ্রুপও তৎপর দক্ষিণাঞ্চলে। আবার ব্রুনাইয়ে আবু সায়াফ গ্রুপ তাদের তৎপরতা সম্প্রসারিত করেছে। সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক Centre for Political Violence and Terrorism Research তাদের এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, আইএস সম্প্রতি সিরিয়া-ফেরত জঙ্গিদের নিয়ে এ অঞ্চলে নতুন একটি ব্রিগেড তৈরি করেছে, যার নাম Katibah Al Muhajirপুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ব্রিগেডের তৎপরতা রয়েছে। এ ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাপিলন নামে এক জঙ্গি। হাপিলন এসেছেন সুলু অঞ্চল থেকে। ২০১৬ সালে আইএস তাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আমির হিসেবে ঘোষণা করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মার্কিনি গোয়েন্দাদের মতে হাপিলন ইংরেজি বা আরবি ভাষা কিছুই বোঝেন না এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার জ্ঞানও সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ধরার জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছে। কয়েক হাজার জঙ্গি বর্তমানে এ অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত। ফলে আগামী দিনগুলোয় এ অঞ্চলে যে অস্থিরতা বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হলো রোহিঙ্গাদের নাম। ফিলিপাইনে জঙ্গি উত্থানের পাশাপাশি এখন রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যেতে পারে বলে অনেক গবেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সিএনবিসি (যুক্তরাষ্ট্র) টিভি চ্যানেল তাদের এক প্রতিবেদনে (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭) বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সুযোগ নিতে পারে। একটি আশঙ্কার কথা বলছেন অনেকে যে, রাখাইন অঞ্চল সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে সুলু অঞ্চলে (মিন্দানাও) অবস্থানরত জিহাদিরা সমুদ্রপথে রাখাইনে যেতে পারে এবং সেখানে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হতে পারে। সুলু অঞ্চল (ফিলিপাইন) আর রাখাইন অঞ্চলের অনেক মিল আছে। অস্ত্র আনা-নেয়া কিংবা সন্ত্রাসীদের মুভমেন্টের জন্য সমুদ্রপথ খুবই উপযোগী। ফলে ফিলিপাইনের জিহাদিরা যদি ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর মারাবি থেকে উৎখাত হয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়, আমি অবাক হব না। এখন পর্যন্ত আরাকানে আরাকান সালভেশন আর্মির খবর আমরা জানি, যাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর বাইরেও আরও কয়েকটি গ্রুপের অস্তিত্ব রয়েছে। মজার ব্যাপার, সালভেশন আর্মি খুব বড় সশস্ত্র সংগঠন নয়। কোচিন লিবারেশন ফোর্স মিয়ানমারের বড় বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এরা কোচিন প্রদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেনি। কোচিনরা ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। বোঝাই যায়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মুসলমানদের টার্গেট করেছে। এখন সালভেশন আর্মি কতটুকু রোহিঙ্গাদের স্বার্থ দেখে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। রোহিঙ্গারা অনেকেই বলেছেন, তারা এ সংগঠনটির ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। এরই মধ্যে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আইএসের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এ অঞ্চলের ব্যাপারে আইএসের আগ্রহ আছে, এটা বোগদাদির একটি বক্তব্যে আমরা জেনেছিলাম ২০১৪ সালেই। এখন নতুন করে ৭ লাখ রোহিঙ্গা (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর স্ট্যাটাস অনুযায়ী) বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের যে জঙ্গিরা টার্গেট করবে, এটা বলাই বাহুল্য। জঙ্গিরা সুযোগটি নেবে। রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে একটি সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। 
লাস ভেগাস হত্যাকা-ের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততা আছে কি নেই, আমার কাছে তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হচ্ছে, আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। এ হত্যাকা-ের আগে স্টিফেন প্যাডক যে ১ লাখ ডলার ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন, এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ফিলিপাইনের জঙ্গি কার্যক্রমে তিনি সহায়তা দিয়ে থাকতে পারেন! এখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুরবস্থার সুযোগে এ রকম দাতা এগিয়ে আসতে পারে। আরেকজন স্টিফেন প্যাডকের জন্ম হতে পারে! তাই রোহিঙ্গা পরিস্থিতির দিকে সবার দৃষ্টি থাকবেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ফিলিপাইনে জঙ্গি কার্যক্রমের পর রাখাইন রাজ্যে জঙ্গি কার্যক্রম কোন দিকে যায়, সেটাই এখন আমাদের সবার দেখার বিষয়। 


আলোকিত বাংলাদেশ ৮ অক্টোবর ২০১৭

মিয়ানমারে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কেন জরুরি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অতি সম্প্রতি ছাপা হয়েছে, যা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথম খবরটি এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।
মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণ-আদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামে এই আন্তর্জাতিক গণ-আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চি ও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্তে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক প্যানেল এই রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেন, যা কিনা জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাঠানো হবে। দ্বিতীয় খবরটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা ও ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা শান্তি দেওয়ার জন্যই এ অর্থ দেওয়া হবে! এখানে বলে রাখা ভালো, ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে; যাকে পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিল। ওই সময় শত শত যুবতী ইয়াজিদি মেয়েকে ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করুণ কাহিনি ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্তে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।
ওপরে উল্লিখিত দুটি সংবাদ বিচ্ছিন্ন হলেও একটা মিল আছে। আর তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। মালয়েশিয়ার পিপিটির কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এটি সিম্বলিক, অর্থাৎ প্রতীকী আদালত। কিন্তু এর একটি প্রতিক্রিয়া আছে। এ ধরনের ঘটনায় একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠনে সহায়তা করে থাকে। রোম স্ট্যাটিটিউটে (১৯৯৮, কার্যকর ২০০২) এ ধরনের আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ইরাকে এ ধরনের আদালত ভবিষ্যতে গঠিত হবে এবং আমার ধারণা, আমরা যদি মিয়ানমারের গণহত্যার ঘটনা সত্যিকারভাবে আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মিয়ানমারের ব্যাপারে একটা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা সম্ভব।

হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বসনিয়া হার্জেগোভিনার কসাই হিসেবে পরিচিত সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের (যিনি ছিলেন সর্বশেষ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট) বিচারের কাহিনি সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। মুসলমানদের ব্যাপক গণহত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বহুল আলোচিত স্রেব্রেনিচা গণহত্যার কাহিনি (১১-১৩ জুলাই ১৯৯৫) অনেকে স্মরণ করতে পারেন। ওই গণহত্যায় একটি কমিশন প্রমাণ পেয়েছিল যে আট হাজার ৩৭৩ জনকে (যাদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান) হত্যা করা হয়েছে, যাদের মাঝে ছিল শিশু, মহিলা ও কিশোর। এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্লোবোদান মিলোসেভিচ। সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা গণহত্যার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই ট্রাইব্যুনালের অস্তিত্বকাল ছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মিলোসেভিচ কারাগারে মারা গেলে এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জাতিসংঘ কসোভো গণহত্যার জন্যও মিলোসেভিচকে অভিযুক্ত করেছিল। এবং উভয় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর বিচার শুরু হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গণহত্যার, জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের, হত্যার, বিনা অভিযোগে বন্দি করে রাখা ও নিপীড়ন করার। ট্রাইব্যুনাল তাঁর মৃত্যুতে কোনো রায় দেননি। কিন্তু মোট ৬৬টি ঘটনা, হত্যাকাণ্ড ও জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি। রুয়ান্ডায় গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ওই সময়কার হুতু-তুতসি দ্বন্দ্ব ও গণহত্যার খবর। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত (৯৫৫) অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ প্রথম দিকে নির্লিপ্ত ছিল। এমনকি জাতিসংঘ প্রথম দিকে সেখানে যে গণহত্যা হয়েছে, তা স্বীকারও করেনি (রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ গণহত্যার কথা বলেছে)। কেননা গণহত্যা স্বীকার করলে সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী পাঠাতে হয়। একমাত্র গণহত্যা বন্ধের পরই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে একটি তথ্য অনুসন্ধান টিম পাঠাতে রাজি হয়। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের নামে সেখানে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। রুয়ান্ডায় হুতুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর তুতসি উপজাতির লোকেরা ছিল সংখ্যালঘু। আর সংখ্যালঘু তুতসিরাই গণহত্যা, ধর্ষণ আর জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়। প্রায় পাঁচ লাখ থেকে ৯ লাখ মানুষ এই জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে (১৯৯৪) মারা গিয়েছিল। বিচারে ৬১ জন গণহত্যাকারীর বিচার হয়েছিল। তাদের মধ্যে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পল কাগামের (যিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে ফ্রান্সের একটি আদালতে এখন বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সুদানের দারফুরে (পশ্চিম সুদান) গণহত্যার কথাও আমরা উল্লেখ করতে পারি। ২০০৩ সালে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। এ হত্যাকাণ্ডে সরকারি কর্মকর্তারা ও জানজাভেদ নামে একটি মিলিশিয়া গ্রুপ জড়িত ছিল। তারা দারফুরে বসবাসকারীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। মানুষজন হত্যা করেছিল। প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রায় ২৮ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। দারফুরের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (হেগে) গঠিত হয়েছিল এবং ২০০৯ সালের ৪ মার্চ আদালত সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বসিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে চীন ও রাশিয়া সুদানের ওমর আল বসিরকে সমর্থন করেছে। সুদানে এই দেশ দুটির যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। দারফুরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৭ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ২৬ হাজার শান্তিরক্ষী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এখানে আছে) সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু গণহত্যার জন্য কারো বিচার হয়েছেতেমনটি শোনা যায় না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর কোন কোন দেশে, যেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেখানে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গোতে ২০০৪ সালে, কম্বোডিয়ায় ২০০১ সালে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে যারা জড়িত, তাদের বিচার করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বিচারকার্য এখনো চলছে। আজ মিয়ানমারে যে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান তথা গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তা খোদ বাংলাদেশেই নয়, বরং জাতিসংঘও একে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা জেইদ রাদ আল হুসেইন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এই পাশবিকতার ঘটনা পাঠ্যপুস্তকের জন্য জাতিগত নিমূর্লের একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। রয়টার্স হুসেইনের বক্তব্য উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস-এর এক প্রতিবেদনে (Myanmar, Cambodia, and the oppurtunity for the U.S. Congress, September 07, 2017) বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে জাতিসংঘের সিরিয়াসলি কিছু করা উচিত। প্রতিবেদনে সিনেটর ম্যাককেইন ও কংগ্রেসম্যান এডওয়ার্ড রয়েস অং সান সু চিকে যে সহিংসতা বন্ধে চিঠি লিখেছেন, তা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে মিয়ানমারে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি শুনানি করার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। এই পাঁচ দফায় আছে(১) অবিলম্বে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, (২) জাতিসংঘের মহাসচিবের উচিত রাখাইনে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানো, (৩) মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, (৪) রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, (৫) কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর এ প্রস্তাবের ব্যাপারে অনেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত ও কার্যকর একটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো মিয়ানমারের সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরানি প্রেসিডেন্ট কিংবা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও আমরা একই সুর পেয়েছি। অর্থাৎ সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এর আগে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এগুলো অনেকটা এ রকম : ১. রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা, ২. একটি নিরাপদ এলাকা বা সেফ জোন প্রতিষ্ঠা করা, ৩. বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা যাতে নিজ বাসভূমে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করা, ৪. কফি আনান কমিশনের প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ৫. রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রপাগান্ডা বন্ধ করা, ৬. রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে না ফেরা পর্যন্ত তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। উভয় প্রস্তাবে মিল আছে যথেষ্ট। তবে আমি খুশি হতাম যদি ওই প্রস্তাবের সঙ্গে আরো একটি প্রস্তাব থাকত, যেখানে বাংলাদেশ গণহত্যার সুষুম তদন্ত দাবি করত। এটি একটি ন্যায্য দাবি। আমার ধারণা, ওআইসির দেশগুলো গণহত্যা বিচারের দাবিকে সমর্থন করবে।

আমরা বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। সেই বিচার এখনো চলছে। বিশ্বের যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, বাংলাদেশ তার সমলোচনা করেছে। এখন সু চি রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে ভুল তথ্য দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য খণ্ডন করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ তথ্য-প্রমাণসহ কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের রাখাইনে যাওয়ার দাবিও বাংলাদেশ করতে পারে। সেই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআর যাতে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করতে পারে সে ব্যাপারে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ জোর দিতে পারে।


বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ। এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করেছে। কিন্তু এটা যে একটা নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে থাকতে পারে না। এরই মধ্যে সু চি এক ভাষণে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। এখন এর প্রতিবাদই নয়, বরং এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্যও বাংলাদেশকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো তৎপর হতে হবে। আমাদের ব্যর্থতা রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য এ অঞ্চলে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিতে পারে, যা কিনা পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দিতে পারে ভবিষ্যতে। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এটি একটি পজিটিভ চিন্তাধারা। এখন রোহিঙ্গা প্রশ্নে শুধু মিয়ানমারের সঙ্গেই আলোচনা নয়, বরং বহুপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। খুব দ্রুত নয়াদিল্লি ও পেইচিংয়ে বিশেষ দূত পাঠানো উচিত। সনাতন কূটনৈতিক চ্যানেলের পাশাপাশি রাজনৈতিক চ্যানেলেও এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

মিয়ানমারের গণহত্যার বিচার কি আদৌ হবে

ন্তর্জাতিক সাম্প্রদায় মোটামুটিভাবে এখন নিশ্চিত হয়েছে যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা হয়েছে। এই গণহত্যায় শুধু মুসলমানদেরকেই যে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনটি নয়। বরং দেখা গেছে হিন্দুরাও আক্রান্ত্ম হয়েছে এবং তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে এসব গণহত্যাকারীর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আদৌ বিচার হবে কি-না। অতীতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। প্রায় ÿেত্রেই তার বিচার হয়েছে এবং দোষীদের শাস্ত্মি দেয়া হয়েছে। তবে এখানে বড় বাধা এখনও বৃহৎ শক্তিগুলো। বৃহৎ শক্তিগুলো যদি না চায়, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ বিচারের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত্ম নিতে পারবে না। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত্ম আমরা জাতিসংঘ থেকে যে খবর পেয়েছি, তাতে গণহত্যা কারীদের বিচারের কোনো কথা বলা হয়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বড় ধরনের মানবিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এদের, অর্থাৎ যারা বাংলাদেশ আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সাহায্য করার কথা বলেছে। কিন্তু এটাই সব নয়। যদি গণহত্যাকারীদের বিচার না হয়, তাহলে সেখানে গণহত্যাকারীদের হত্যাকা-কে সমর্থন করা হবে! এমনকি অন্যত্র যেসব হত্যাকা- হয়েছে (বসনিয়া, রম্নয়ান্ডা, সুদান), তাদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই মিয়ানমানের গণহত্যাকারীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। এদিকে মিয়ানমারের ওপর আন্ত্মর্জাতিক সম্প্রদায়ের 'চাপ' ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু তাতে মিয়ানমার সরকার এতটুকু নরম হয়েছে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত্ম সেখানে একটি অনুসদ্ধান টিম পাঠালেও, মিয়ানমার সরকার তাদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়নি। একটি আশঙ্কাজনক খবরও আমরা পেয়েছি আর তা হচ্ছে যেসব বাড়িঘর থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উৎখাত করা হয়েছে। সেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পুনর্বাসন হচ্ছে। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ওইসব বাড়ি-ঘর দখল করে নিচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কয়েক লাখ মিয়ানমারের নাগরিককে মিয়ানমার সরকার ফিরিয়ে নেবে, এখন কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। ফলে মিয়ানমার সরকারের অনাগ্রহের কারণে রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা বাড়ছে। এখনও রাখাইনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব সংগতকারণেই তাই সেখানকার যুদ্ধপরাধীদের বিচার জরম্নরি। সেব্রেনিসকায় কী হয়েছিল, তার কথা কী মনে আছে আপনাদের? সেইসব গণহত্যার (সেব্রেনিসকা, বসনিয়া) সাথে আজ মিয়ানমারের রাখাইনে যে গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে, তার সঙ্গে অদ্ু্ভত এক মিল আছে। সাব্রা ও সাতিলার (ংধনৎধ ধহফ ংযধঃরষধ) কথা মনে আছে। সাব্রা ও সাতিলা ছিল ফিলিস্ত্মিনিদের শরণার্থী ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে ইসরাইলি বিমান বোমা হামলা চালিয়ে ১৯৮২ সালের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ২০০০ ফিলিস্ত্মিনি শিশু, কিশোর আর মহিলাদের হত্যা করেছিল। সারা বিশ্বব্যাপী এর প্রতিবাদ উঠলে ইসরাইল একটি তদন্ত্ম কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত্ম কমিটি তৎকালীন প্রতিরÿামন্ত্রী (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) এরিয়েল শ্যারনকে দোষী সাব্যস্ত্ম করেছিল। শ্যারন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে শারনের কী হয়েছিল, তা অনেকের মনে থাকার কথা। তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর কোমায় থাকার পর তার মৃতু্য হয়েছিল। গণহত্যাকারীদের এভাবেই বিচার হয়। আর সেব্রেনিসকা? সেব্রেনিসকা হচ্ছে বসনিয়া হারজেগোভিনার একটি শহর। অধিবাসীদের অধিকাংশই মুসলমান। সেখানে সার্ব বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল (১৯৯৫ সালের ১১-১৩ জুলাই), তাতে ৮৩৭৫ জন মুসলমান নাগরিককে হত্যা করেছিল সাব যুদ্ধাপরাধীরা। আজ রাখাইনে যে গণহত্যা হয়েছে (যা জাতিসংঘ স্বীকার করেছে), তার সাথে সাব্রা-সাতিলা কিংবা সেব্রেনিসকার গণহত্যার অদ্ভুত এক মিল আছে। রাখাইনে শত শত গ্রাম আগুন নিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে সেখানকার সেনাবাহিনী যে নারকীয় ঘটনার সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসে এর সাথে হিটলারের গ্যাস চেম্বারে যে শত শত নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল, তার সাথে মেলান যাবে। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার নারী-পুরম্নষ ও শিশু দিনের পর দিন না খেয়ে হেঁটে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে- এ কাহিনী তো আজ সারাবিশ্বের মানুষ জানে। বিশ্ব মিডিয়ায় আজ স্থান পেয়েছে রোহিঙ্গাদের করম্নণ কাহিনী। পাঠক, ÿ্য করবেন সিরিয়া, লিবিয়া আর ইরাক থেকেও এভাবে লাখ লাখ শরণার্থী, যারা প্রায় সবাই ছিল মুসলমান, তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই প্রবণতা এখন আর সিরিয়াতে নেই বটে, কিন্তু ইতিমধ্যেই এসব অঞ্চলে ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ দেশান্ত্মরিত হয়েছে। সিরিয়া-ইরাকের পর এখন মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট, সেখানে মুসলমান শূন্য করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রাখাইনের অর্ধেকের বেশি মানুষ তাদের নিজ বাসভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অথচ সু চি এদের নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা মিথ্যাচারে ভরা। যে জন্য তাকে নোবেল শান্ত্মি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। তা এখন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। 
তিনি রাখাইন 'শান্ত্মি' নিশ্চিত করার পরিবর্তে এই সংকটককে আরও উসকে দিলেন। স্পষ্টতই মিয়ানমারের জেনারেলরা যা তাকে শিখিয়েছেন, তিনি তোতা পাখির মতো তা আউড়ে গেলেন মাত্র। তার ওই বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি নিজেও চাচ্ছেন রোহিঙ্গা মুসলমানরা দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে যাক। লÿ ÿ রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশে আশ্রয়। তাদের ওপর অত্যাচারের করম্নণ কাহিনীতে সারাবিশ্বের মানুষ যখন প্রতিবাদমুখর ও গণহত্যার দায়ে তার এবং সেই সাথে শীর্ষ স্থানীয় সেনা কমান্ডারদের বিচারের দাবি এখন জোরদার হচ্ছে তখন সু চি জাতির উদ্দেশ্য ভাষণ দিয়েছিলেন। বিশ্বের সর্বত্র তার ভাষণের ব্যাপারে একটা আগ্রহ ছিল। তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে কী বলেন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তার কর্মসূচি কী, এসব ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ছিল। সুতরাং তার ভাষণ নিয়ে সর্বত্র একটা আগ্রহ তৈরি হলেও তিনি হাতাশ করেছেন। এমনকি বিবিসির সাংবাদিকরা পর্যন্ত্ম তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতন প্রশ্নে মিথ্যা কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। মনে হচ্ছে সেনা শাসকরা যা তাকে শিখিয়েছেন তিনি তাই বলেছেন। তিনি তার ভাষণে মূল যে কথাগুলো বলেছেন, তা অনেকটা এরকম : ক. ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সামরিক বাহিনীর অভিযান বন্ধ রয়েছে, খ. রাখাইনে সবার জন্য শিÿা ও স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, গ. ৫০ ভাগ রোহিঙ্গা পালিয়েছে; ঘ. মুসলমানদের মিয়ানমার থেকে দলে দলে পাঠানো রহস্যময় ঙ. রাখাইনে আন্ত্মর্জাতিক পর্যবেÿকদের ঢুকতে দেয়া হবে ইত্যাদি। এসব বক্তব্যের মধ্যে সত্যতা আছে কতটুকু? পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই ঐতিহাসিকভাবেই রাখাইন স্টেটের মানুষ রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। এবং আন্ত্মর্জাতিকভাবে তা স্বীকৃতও বটে। কিন্তু সূ চি একবারও তার ভাষণে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেননি। তিনি বলেছেন, বাঙালি এবং মুসলমান। এর অর্থ হচ্ছে তিনি তার অবস্থান এতটুকুও পরিবর্তন করেননি। তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? তিনি 'যাচাই-বাছাই' সাপেÿে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার কথা বলেছেন কিন্তু তা সম্ভব কীভাবে? যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকের কাছেই নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো কাগজপত্র নেই। তাহলে তাদের নাগরিকত্ব সু চি সরকার নিশ্চিত করবেন কীভাবে? এটা একটা ভাঁওতাবাজি। 'লোক দেখানোর' নামে হয়তো আগামীতে কিছু শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার। কিন্তু অনেককেই তারা নেবে না। ফলে উখিয়া, টেকনাফে যে বিশাল রোহিঙ্গা জনবসতি গড়ে উঠছে তারা অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে থাকতে বাধ্য হবেন বছরের পর বছর। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সেনা অভিযান বন্ধ রয়েছে বলে যে কথা সু চি বলেছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা। কেননা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বিবিসি কিংবা আল জাজিরা যেসব সংবাদ প্রচার করেছে। তাতে স্পষ্ট দেখা গেছে, রোহিঙ্গা অধু্যষিত অঞ্চলে ফের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাহলে সূ চির বক্তব্যের পেছনে সত্যতা থাকল কোথায়? রাখাইনে সবার জন্য শিÿ, স্বাস্থ্যের সুবিধা আছে দাবি করেছেন সু চি। এটা যে কত বড় মিথ্যা কথা, তা রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা যে সাÿাৎকার দিয়েছে, তাতেই প্রমাণিত হয়েছে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হয়েছে করম্নণ কাহিনী যেখানে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের অন্যদের থেকে আলাদা করা হয়েছিল। প্রাথমিক স্কুলের শিÿা পাঠ শেষ হওয়ার পর কোনো রোহিঙ্গাকেই মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ শিÿার কোনো সুযোগ দেয়া হতো না। এরা এক অঞ্চল খেকে অন্য অঞ্চলে যেতে পারত না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তো চিন্ত্মাও করা যায় না। এমনকি বিয়ে করার জন্য তাদের অনুমতি নিতে হতো। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্ত্মর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে রাখাইন অঞ্চলে ২১৪টি গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সংস্থাটি স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবি তুলে দেখিয়ে দিয়েছে আগে ওইসব গ্রামে কি অবস্থা ছিল আর এখন কি অবস্থা হয়েছে। তাহলে সু চির কথায় যুক্তি থাকে কতটুকু


শতকরা ৫০ ভাগ মুসলমান পালিয়েছে। তাদের পালানো রহস্যজনক এ কথা বলেছেন সু চি। জীবন রÿার্থে যারা দিনের পর দিন না খেয়ে পাহাড় অতিক্রম করে শুধু বেঁচে থাকার আশায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা কেন পালাবে, তাদের তো বাধ্য করা হয়েছে। এই বাধ্য করার বিষয়টিকে সু চি আখ্যায়িত করেছেন 'পালানো' হিসেবে। আমার দুঃখ লাগে এই মানুষটির জন্য যখন তিনি দেশে অন্ত্মরীণ ছিলেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ তার মুক্তি দাবি করেছে। তার জন্য প্রার্থনা করেছে। তাকে নিয়ে আশাবাদী হয়েছে। অথচ তিনি যে একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ। প্রচ- মুসলমান বিদ্বেষী মানুষ, তা আমরা প্রথম জানতে পেরেছিলাম যখন তিনি অন্ত্মরীণ অবস্থা থেকে মুক্তি পান। সেই ২০১৫ সালের কথা তিনি তখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তখনও তিনি স্বীকার করে নেননি রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। আন্ত্মর্জাতিক সম্প্রদায় যখন মিয়ানমারের গণহত্যার ব্যাপারে সোচ্চার, যখন নিরাপত্তা পরিষদের ৭টি দেশ (মোট দেশ ১৫টি) নিরাপত্তা পরিষদে (জাতিসংঘ) মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে আলোচনার দাবি তুলেছে। ঠিক তখনই সু চি বিভ্রান্ত্ম বাড়ানোর জন্য নতুন করে আবার প্রস্ত্মাব করেছেন। কিছু শরণার্থীকে ফেরত নেয়া হবে! এটা এক ধরণের কালÿেপণ। অতীতেও অমরা দেখেছি, যারা বাংলাদেশে এসেছিল (১৯৭৮, ১৯৯২), তাদের একটা বড় অংশকেই তারা ফেরত নেয়নি। এটা তাদের এক ধরনের কৌশল। আলাপ আলোচনার নাম করে সময় ÿেপণ করা। তারা কখনই পুরো শরণার্থীদের ফেরত নেবে না। তথাকথিত আলাপ আলোচনার নামে সময় ÿেপণ করবে। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। মুসলমান শূন্য রাখাইনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদের পুনর্বাসন করা। গত ২২ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্রে এরকম একটি সংবাদই প্রকাশিত হয়েছে। শরণার্থী রোহিঙ্গা মুসলমানরা কেউই আর তাদের বসতবাড়ি ফেরত পাবে না। আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে তারা প্রমাণপত্রও দেখাতে পারবেন না। ফলে আশঙ্কটা হচ্ছে তাদেরকে ফিলিস্ত্মিনিদের মতো ক্যাম্প জীবনযাপন করতে হতে পারে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন একটি খবর এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণআদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে পিপলস ট্রাইবু্যনাল (পিপিটি) নামে এই আন্ত্মর্জাতিক গণআদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চিও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত্ম করেছে। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্ত্মে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত সদস্যদের বিচারক 
প্যানেল এই রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের জজ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেন, যা কি-না জেনেভায় জাতিসংঘ সাধারণ কাউন্সিলে পাঠান হবে। দ্বিতীয় খরবটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানের সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে। এই টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা ও ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন এই প্রস্ত্মাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) দেয়ার প্রতিশ্রম্নতি দেয়। যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা 'শান্ত্মি' দেয়ার জন্যই এই অর্থ দেয়া হবে। এখানে বলে রাখা ভালো ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজেদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। যাকে পরবর্তীতে জাতিসংঘ 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করেছিল। এ সময় শত শত যুবতি ইয়াজেদি মেয়েদের ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করম্নণ কাহিনী ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত্ম অনুযায়ী ইয়াজেদি সম্পদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্ত্মে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে। সুতরাং আমরাও চাইব মিয়ানমারে মুসলিম গণহত্যার ব্যাপারে একটি আন্ত্মর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হোক। 

জার্মানির নির্বাচন ও ইউরোপে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান

গত ২৪ সেপ্টেম্বর জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনে নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত অলন্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) পার্টি প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে যাওয়ায় তা শুধু একটি বড় ধরনের ঘটনারই জন্ম দেয়নি, বরং ইউরোপের সনাতনপন্থি রাজনীতিবিদদের একটি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চিন্তাটা হচ্ছে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান। এই ডানপন্থি উত্থান ইতোমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশে বিস্তৃত হয়েছে। জার্মানি বড় দেশ। বড় অর্থনীতি। বলা যেতে পারে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পর জার্মানিই হচ্ছে ইউরোপের নেতা। এখন সেই জার্মানিতেই যদি নব্য নাজিবাদের উত্থান ঘটে, তা যে একটা খারাপ সংবাদ বয়ে আনল, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এএফডির জন্ম মাত্র ৪ বছর আগে ২০১৩ সালে। মূলত মুসলমান বিদ্বেষ আর ব্যাপক হারে জার্মানিতে শরণার্থী আগমনকে কেন্দ্র করে (২০১৫ সালে ১৩ লাখ সিরীয়-ইরাকি শরণার্থীর জার্মানি প্রবেশ) এই দলটির জন্ম হয়। ইতোমধ্যে তারা জার্মানির ১৬টি প্রদেশের মধ্যে ১৩টি প্রদেশ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাবেক পূর্ব জার্মানি যেখানে এক সময় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানে এই দলটির (এএফডির) প্রতিপত্তি বেশি। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল নিজেও পূর্ব জার্মানি থেকে এসেছেন। নির্বাচনে এএফডি শতকরা ১২ দশমিক ৬ ভাগ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে ৯৪টি আসন (মোট আসন ৭০৯) নিশ্চিত করেছে। সংখ্যার দিক থেকে ৯৪টি আসন খুব বেশি নয়। কিন্তু ভয়টা হলো ইউরোপের প্রতিটি দেশে উগ্র ডানপন্থিরা একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। যেমন অস্ট্রিয়াতে ফ্রিডম পার্টি ভোট পেয়েছে ৩৫.১ (২০১৬), বেলজিয়ামে নিউ ফ্লেমিস অ্যালায়েন্স ২০.৩ ভাগ ভোট (২০১৪), ব্রিটেনে ইউকে আইপি ১২.৭ ভাগ ভোট (২০১৫), ডেনমার্কে পিপলস পার্টি ২১.১ ভাগ ভোট (২০১৫), ফিনল্যান্ডে ফিনস পার্টি ১৭.৭ ভাগ (২০১৫), ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২৭.৭ ভাগ (২০১৫), হাঙ্গেরিতে ফিডেস-কেডিএনপি ৪৪.৮ ভাগ (২০১৪), হল্যান্ডে পার্টি অব ফ্রিডম ১৩.১ ভাগ (২০১৭), পোল্যান্ড ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ৩৭.৬ ভাগ (২০১৫), সেøাভাকিয়ায় ন্যাশনাল পার্টি ৮.৬ ভাগ (২০১৬), সুইডেনে ডেমোক্রেটস ১২.৯ ভাগ (২০১৪), কিংবা সুইজারল্যান্ডে পিপলস পার্টি ২৯.৪ ভাগ (২০১৫)। এখন এসব উগ্র দক্ষিণপন্থি দলের তালিকায় যুক্ত হলো এএফডির (জার্মানি) নাম। অথচ এই দলটি ২০১৩ সালে পেয়েছিল মাত্র ৪.৭ ভাগ ভোট। ফলে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। শতকরা ৫ ভাগ ভোটের দরকার হয় পার্লামেন্টে যেতে। এই উগ্র ডানপন্থির উত্থান এখন ইউরোপের জন্য একটা হুমকি।
জার্মানিতে মের্কেল ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছেন বটে। কিন্তু এই নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, কট্টর দক্ষিণপন্থি ও নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত এএফডির উত্থান প্রমাণ করল, জার্মানিতে কট্টরপন্থিদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। আগামীতে এরা সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। জার্মানির ১৬টি স্টেটের মধ্যে ১৩টি স্টেটের পার্লামেন্টে এদের প্রতিনিধিত্ব আগেই নিশ্চিত হয়েছিল। এখন কেন্দ্রে এদের অবস্থান তৃতীয়। সবচেয়ে বড় স্টেট এবং কনজারভেটিভদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত বায়ার্ন প্রদেশে ১৯৪৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো সিএসইউ (সিডিইউর বিকল্প দল শুধু বায়ান স্টেটে) সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। এখানে এএফডি ভালো করেছে। ফলে আশঙ্কা থাকলই ধীরে ধীরে এএফডি সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। আমরা যেন ভুলে না যাই এডলফ হিটলার ও তার নাজি পার্টি জার্মানিতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল এবং হিটলার নির্বাচিত চ্যান্সেলর হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন। এখন এএফডি কী ধীরে ধীরে নাজি পার্টির অবস্থানে যাচ্ছে, সেটাই দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে ইউরোপে ব্যাপক শরণার্থী (সিরীয়, ইরাকি ও আফগানি) আফগানকে কেন্দ্র করে পুরো ইউরোপের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যায়। কট্টরপন্থিদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিজয় এই দক্ষিণপন্থি উত্থানকে আরও উৎসাহিত করেছে। ওই সময় দশ লাখের অধিক সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মের্কেল সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ তার সমালোচনা করেছিল। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিক বরাবরই সিরীয়-ইরাক শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার বিপক্ষে ছিল। মের্কেল যখন জার্মানিতে এসব শরণার্থী আসার সুযোগ করে দেন, তখন এই তিনটি দেশের সরকারপ্রধানরা এর সমালোচনা করেছিলেন। এখন তারা নতুন করে যুক্তি তুলবেন যে, তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। জার্মান নির্বাচন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় কট্টরপন্থিদের আরও উৎসাহিত করবে। অক্টোবর মাসে চেক রিপাবলিকের নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন্দ্রেই বাবিস ও তার দল ভালো করবে বলে সবার ধারণা। বাবিস অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্প স্টাইলে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান। বাবিস একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। চেক রিপাবলিকে তার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলারের মালিক। তিনি নিজে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান কিংবা পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের নেতা জারুজলাভ কাসিনিস্কির মতো দক্ষিণপন্থি নেতাদের উত্থান পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতির দৃশ্যপটকে বদলে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যেসব মডারেট নেতা আছেন, বিশেষ করে মের্কেল কিংবা ম্যাক্রোঁর (ফ্রান্স) মতো নেতাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, জার্মানিতে সম্ভাব্য একটি কোয়ালিশন সরকার (সিডিইউ-সিএমইউ, এফডিপি আর গ্রিন) যদি গঠিত হয়, তা হলে এই সরকারকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গেলা মের্কেল কতটুকু এই ঐক্যকে ধরে রাখতে পারবেন, এটাও একটা প্রশ্ন। কেননা অনেকগুলো জাতীয় প্রশ্নে এফডিপি ও গ্রিন পার্টির মধ্যে নীতিগতভাবে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি প্রশ্নে বড় পার্থক্য রয়েছে, তা হচ্ছেÑ গ্রিন পার্টি চাচ্ছে আগামীতে ২০টি কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার। কিন্তু ব্যবসাবান্ধব এফডিপি এর পক্ষে। তা হলে সমঝোতা হবে কীভাবে? এই মতপার্থক্য জার্মানিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি সংখ্যালঘু সরকার হয়তো গঠিত হতে পারে। কিন্তু মের্কেল তা চাচ্ছেন না। চতুর্থত, এএফডির বিজয় সরকারকে শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রায় ৮ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। তবে ২০১৭ সালে এই সংখ্যা কম। শুধু তাই নয়, জাতিগত বৈষম্যও বেড়ে যেতে পারে। এএফডির শীর্ষ নেতা আলেকজান্ডার গাউল্যান্ড গ্রিন পার্টির নেতাদের সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা অনাকাক্সিক্ষত। তিনি বলেছেন, এদের তুরস্কে চলে যাওয়া উচিত। জার্মানির অতীত নিয়ে তিনি প্রশংসামূলক মন্তব্য করেছেন, যা বিতর্ক বাড়িয়েছে। জ্যামাইকা কোয়ালিশন আগামীতে সরকার পরিচালনা করবে। কিন্তু সেই সরকার থাকবে নড়েবড়ে। ৭০৯ সিটের পার্লামেন্টে তাদের হাতে থাকবে মাত্র ৩৯৩ আসন। তাই বোঝাই যায় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া মের্কেলের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। টানা চারবার চ্যান্সেলর হয়ে অ্যাঙ্গেলা মের্কেল ইতিহাসে নাম লেখালেন। এক সময় পূর্ব জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষাবিদ (যার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে) রাজনীতিতে এসেছিলেন দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পরই। অতি সাধারণ জীবনযাপন করা মের্কেল এক সময় পূর্ব জার্মানিতে ছিলেন যখন তিনি বাসা ভাড়া দিতে পারতেন না। সঠিক নীতি, সাধারণ জীবন, শরণার্থীদের ব্যাপারে তার সহানুভূতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যকে ধরে রাখা, ট্রাম্পের কট্টরনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাকে বিশ্ব রাজনীতিতে অসাধারণ করেছে। তিনি এক সময়ের জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। অব্যাহত কট্টরপন্থিদের উত্থানের বিরুদ্ধে সীমিত কিছু কোয়ালিশন সিট নিয়ে তিনি আগামীতে কীভাবে জার্মানির নেতৃত্ব দেন, সেটাই দেখার বিষয়। তবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে কেন মানুষ এএফডির মতো দলকে ভোট দিল, তা খতিয়ে দেখা। মানুষ কী প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে এএফডিকে ভোট দিল? শুধু জাতিগত বৈষম্য, মুসলমান বিদ্বেষ কিংবা শরণার্থী বিরোধিতাই কী এএফডিকে জনপ্রিয় করল? এসব এখন খতিয়ে দেখতে হবে। মের্কেল কথা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বাধ্য হয়ে এএফডিকে সন্তুষ্ট করার জন্য যদি তার নীতিতে পরিবর্তন আনেন, তা হলে তা জার্মানির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। এএফডি চাচ্ছে ইউরো জোন থেকে জার্মান বেরিয়ে আসুক। এটা নিশ্চয়ই মের্কেল করবেন না। কিন্তু তিনি চাপে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কার আসতে পারে। ইইউতে জার্মানি বড় দেশ। দেশটির যে কোনো সিদ্ধান্ত ইইউর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণপন্থিদের ব্যাপক উত্থান পুরো ইউরোপের চেহারা আগামীতে বদলে দিতে পারে। শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। নির্বাচনে তেরেসা মে যেখানে সুবিধা করতে পারেননি। তিনি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন আরেকটি দলের ওপর। এখন অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের অবস্থা হতে যাচ্ছে তেমনটি। কট্টরপন্থি এএফডিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তাকে এখন দুটি বড় দল ও কোয়ালিশন পার্টনার এফডিপি ও গ্রিন পার্টিকে ছাড় দিতে হবে। এই দল দুটির মধ্যেও সমন্বয় করতে হবে। তিনি যদি ব্যর্থ হন, তা হলে নয়া নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই ঝুঁকিটি এ মুহূর্তে কোনো দলই নিতে চাইবে না। কেননা দ্রুত আরেকটি নির্বাচন মানে এএফডিকে আরও সুযোগ করে দেওয়া। নয়া নির্বাচন এএফডিকে একটি দরকষাকষি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি ক্ষমতাসীন সিডিইউ-সিএসইউকে বাধ্য করতে পারে গ্রিন পার্টিকে বাদ দিয়ে তাদের কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিতে! শুধু তাই নয়, সিডিইউর নেতৃত্ব থেকে মের্কেল সটকে পড়তে পারেন। আগামী ২৪ অক্টোবর পার্লামেন্টের অধিবেশন বসছে। মের্কেল চ্যান্সেলরের দায়িত্ব নেবেন। মোট চার-চারবার তিনি জার্মানিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। তিনি কনরাড অ্যাডেনাওয়ার হেলমুট কোল কিংবা উইলি ব্রান্ডের নামের তালিকায় নিজের নামটি অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হলেন বটে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতি। কট্টর দক্ষিণপন্থির উত্থান ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থান এই শক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন দেখার পালা ইউরোপ আগামীতে কোন দিকে যায়। ইউরো জোনের ব্যর্থতা আর কট্টরপন্থিদের উত্থান যদি ইইউতে ভাঙন সৃষ্টি করে আমি অবাক হব না।


মরকেলের বিজয় এবং জার্মান রাজনীতির ভবিষ্যৎ

জার্মানি বড় দেশ। বড় দেশ হওয়ার কারণে এখানে বরাবরই কোয়ালিশন রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। ১৯৬০ সালে চ্যান্সেলর ছিলেন কনরাড আডেনাওয়ার, সিডিইউ-সিএসইউ আর এফডিপি ছিল ক্ষমতায়। সে ধারাবাহিকতায় ১৯৭০, ১৯৮০, ১৯৯০, ২০০০ কিংবা ২০১০ সালে প্রতিবারই দেখা গেছে একটি কোয়ালিশন সরকার। এবারও হতে যাচ্ছে একটি কোয়ালিশন সরকার গেল ২৪ সেপ্টেম্বর জার্মানির পার্লামেন্টের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) অ্যাঞ্জেলা মরকেল তার ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন বটে; কিন্তু জার্মান রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অ্যাঞ্জেলা মরকেল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আছেন।

চতুর্থবারের মতো তিনি চ্যান্সেলর হতে যাচ্ছেন; কিন্তু ২০১৩ সালের মতো এবারও তিনি একটি গ্র্যান্ড কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পারবেন কিনা, সে ব্যাপারটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ২৪ অক্টোবর জার্মান পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসছে। এর আগেই কোয়ালিশন-সংক্রান্ত সব আলোচনা শেষ করতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান রাজনীতি মূলত দুইটি বড় দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) আর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি) নিয়ন্ত্রণ করলেও বরাবর তৃতীয় একটি দল ফ্রি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এফডিপি) সরকার গঠনে একটি ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে এ দৃশ্যপট পাল্টে যায়। নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ ভোট নিশ্চিত না হওয়ায় ২০১৩ সালে পার্লামেন্টে এফডিপির কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এবার এফডিপি পার্লামেন্টে ফিরে এসেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, জার্মান রাজনীতিতে নব্য নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত এএফডি বা অলটারনেটিভ ফর জার্মানির আবির্ভাব এবং পার্লামেন্টে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ। মাত্র ৪ বছর আগে দলটির জন্ম হয়। মূলত মুসলমানবিদ্বেষ আর শরণার্থীবিরোধী ভূমিকাই দলটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এএফডির উত্থান এখন প্রচলিত জার্মান রাজনীতির ধারাকে বদলে দিতে পারে।

মোট ৭০৯টি আসনের সংসদে সিডিইউ-সিএসইউর আসনসংখ্যা ২৪৬, এসপিডির ১৫৩, এফডিপির ৮০, এএফডির ৯৪, গ্রিন পার্টির ৬৭, আর দ্য লেফটের ৬৯। মূল ধারার দুইটি দল সিডিইউ ও এসপিডির আসন কমেছে। সিডিইউ-সিএসইউ (বায়ার্ন প্রদেশের সহযোগী) পেয়েছে শতকরা ৩৩ ভাগ ভোট (কমেছে ৮ দশমিক ৫ ভাগ ভোট), এসপিডি পেয়েছে ২০ দশমিক ৫ ভাগ ভোট (আসন কমেছে ৫ দশমিক ২ ভাগ ভোট), তৃতীয় দল হিসেবে আবির্ভূত নব্য নাজি পার্টি এএফডি পেয়েছে ১২ দশমিক ৬ ভাগ ভোট। এফডিপি ১০ দশমিক ৭ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ ভাগ), দ্য লেফট ৯ দশমিক ২ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ ভাগ), আর গ্রিন পার্টি পেয়েছে ৮ দশমিক ৯ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ভাগ)। বলা ভালো, জার্মানিতে নির্বাচনে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন প্রথা চালু রয়েছে। একজন ভোট দেন প্রার্থীকে এবং একই সঙ্গে দলকেও। চূড়ান্ত বিচারে কোন দল শতকরা কত ভোট পায়, তার ওপর নির্ভর করে ওই দল সংসদে কত আসন পাবে। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, একটি কোয়ালিশন সরকার হবে; কিন্তু তাতে কোন কোন দল থাকবে? ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর একটি গ্র্যান্ড কোয়ালিশন হয়েছিল। অর্থাৎ সিডিইউ-সিএসইউ আর এসপিডি ও গ্রিন পার্টি মিলে সরকার গঠন করেছিল। সরকার গঠনের জন্য ৩৫৪ আসন দরকার। আর সেটা সম্ভব হবে যদি এসপিডি সরকারে যোগ দেয়; কিন্তু এসপিডি সরকারে যোগ দিচ্ছে না। এক্ষেত্রে এ দুই বড় দলের সম্মিলিত আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৩৯৯। অন্যদিকে একটি জ্যামাইকা কোয়ালিশন কথাও বলছেন কেউ কেউ। জ্যামাইকা কোয়ালিশন অর্থাৎ জ্যামাইকা রাষ্ট্রের পতাকার রঙ তিন রঙেরÑ কালো, হলুদ আর সবুজ। জার্মানির রাজনৈতিক দলগুলো এ রঙ দিয়েই পরিচিত। যেমনÑ সিডিইউ-সিএসইউর রঙ কালো, এসপিডির লাল, গ্রিন পার্টির সবুজ, এফডিপির হলুদ, এএফডির (নব্য নাজি পার্টি) রঙ নীল আর লেফটের রঙ বেগুনি। এক্ষেত্রে দ্বীপরাষ্ট্র জ্যামাইকার পতাকা অনুসরণ করে যদি কালো, হলুদ আর সবুজের সমন্বয় হয় (অর্থাৎ সিডিইউ-সিএসইউ, এফডিপি আর গ্রিন), তাহলে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করা সম্ভব। অন্যদিকে যদি সিডিইউ-সিএসইউ এবং এফডিপির মধ্যে ঐক্য হয়, তাহলে সরকার গঠন করতে আরও দরকার ২৯টি সিট। ফলে কালো আর হলুদ এর সমন্বয় হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রতিটি দলই বলছে, তারা নব্য নাজি দল এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের ঐক্যে যাবে না। দ্য লেফট ৬৯টি আসন পেয়ে সংসদে পঞ্চম বৃহত্তম দল। কিন্তু তারা দক্ষিণপন্থী সিডিইউর সঙ্গে কোনো ঐক্যে যাবে না। এসপিডির একার পক্ষে কোনো সরকার গঠন করাও সম্ভব নয়। এর অর্থ হচ্ছে, একটি অনিশ্চয়তা থাকলই সরকার গঠন নিয়ে। এসপিডি যদি তাদের মত পরিবর্তন করে কোয়ালিশনে যোগ দেয়, তাহলে এ সরকার স্থায়িত্ব পাবে। যদি সরকারে যোগ না দেয়, তাহলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। নয়া নির্বাচনের সম্ভাবনাও ফেলে দেয়ার মতো নয়। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে এসপিডির চেয়ারম্যান মার্টিন গুলজের ওপর। এ নিয়ে দলের ভেতরে বিতর্ক বাড়তে পারে এবং মার্টিন গুলজ যদি তার দলের চেয়ারম্যানশিপ হারান, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। মরকেল ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছেন বটে; কিন্তু এ নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

প্রথমত, কট্টর দক্ষিণপন্থী নাজি পার্টি হিসেবে পরিচিত এএফডির উত্থান প্রমাণ করল জার্মানিতে কট্টরপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। আগামীতে এরা সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। জার্মানির ১৬টি স্টেটের মধ্যে ১৩টি স্টেটের পার্লামেন্টে এদের প্রতিনিধিত্ব আগেই নিশ্চিত হয়েছে। এখন কেন্দ্রে এদের অবস্থান তৃতীয়। সবচেয়ে বড় স্টেট এবং কনজারভেটিভদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত বায়ার্ন প্রদেশে ১৯৪৮ সালের পর এ প্রথমবারের মতো সিএসইউ (সিডিইউর বিকল্প দল শুধু বায়ার্ন স্টেটে) সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। এখানে এএফডি ভালো করেছে। ফলে আশঙ্কা থাকলই ধীরে ধীরে এএফডি সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে! আমরা যেন ভুলে না যাই, অ্যাডলফ হিটলার ও তার নাজি পার্টি জার্মানিতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল এবং হিটলার নির্বাচিত চ্যান্সেলর হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন। এখন এএফডি কি ধীরে ধীরে নাজি পার্টির অবস্থানে যাচ্ছে, সেটাই দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে ইউরোপে ব্যাপক শরণার্থী (সিরীয়, ইরাকি ও আফগানি) আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো ইউরোপের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যায়; কট্টরপন্থীদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিজয় এ দক্ষিণপন্থী উত্থানকে আরও উৎসাহিত করেছে। ওই সময় ১০ লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মরকেল সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন; কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ তার সমালোচনা করেছিল। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিক বরাবরই সিরীয়-ইরাক শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার বিপক্ষে ছিল। মরকেল যখন জার্মানিতে সেসব শরণার্থীকে আসার সুযোগ করে দেন, তখন এ তিনটি দেশের সরকারপ্রধানরা এর সমালোচনা করেছিলেন। এখন তারা নতুন করে যুক্তি তুলবেন যে, তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। জার্মান নির্বাচন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোয় কট্টরপন্থীদের আরও উৎসাহিত করবে। আগামী মাসে চেক রিপাবলিকের নির্বাচন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন্দ্রেই বাবিস ও তার দল ভালো করবে বলে সবার ধারণা। বাবিস অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্প স্টাইলে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান। বাবিস একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। চেক রিপাবলিকে তার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলারের মালিক। তিনি নিজে, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর ভিক্টর ওরবান কিংবা পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের নেতা জারুজলাভ কাসিনিস্কির মতো দক্ষিণপন্থী নেতা। এদের উত্থানে পুরো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যেসব মডারেট নেতা আছেন, বিশেষ করে মরকেল কিংবা ম্যাক্রোঁর (ফ্রান্স) মতো নেতাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, জার্মানিতে সম্ভাব্য একটি কোয়ালিশন সরকার (সিডিইউ-সিএসইউ, এফডিপি আর গ্রিন) যদি গঠিত হয়, তাহলে এ সরকারকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এক্ষেত্রে অ্যাঞ্জেলা মরকেল কতটুকু এ ঐক্য ধরে রাখতে পারবেন, এটাও একটা প্রশ্ন।

কেননা অনেকগুলো জাতীয় প্রশ্নে এফডিপি ও গ্রিন পার্টির মধ্যে নীতিগতভাবে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি প্রশ্নে বড় পার্থক্য রয়েছে, গ্রিন পার্টি চাচ্ছে আগামীতে ২০টি কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে; কিন্তু ব্যবসাবান্ধব এফডিপি এর পক্ষে। তাহলে সমঝোতা হবে কীভাবে? এ মতপার্থক্য জার্মানিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে একটি সংখ্যালঘু সরকার হয়তো গঠিত হবে; কিন্তু মরকেল তা চাচ্ছেন না। তৃতীয়ত, এএফডির বিজয় সরকারকে শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রায় ৮ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। তবে ২০১৭ সালে এ সংখ্যা কম। শুধু তা-ই নয়, এতে জাতিগত বৈষম্যও বেড়ে যেতে পারে। এএফডির শীর্ষ নেতা আলেকজান্ডার গাউল্যান্ড অতিসম্প্রতি গ্রিন পার্টির শীর্ষ নেতা সেম ওঁজদেমির এবং বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী ও গ্রিন পার্টির নেতা আইদান ওঁজগুজ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। দুইজনই তার্কিশ। এদের জন্ম জার্মানিতে, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা জার্মানিতেই। গাউল্যান্ড বলেছেন, এদের দুইজনকে তুরস্কে পাঠিয়ে দেয়া উচিত, যেখান থেকে তাদের বাবারা এসেছিলেন। এরা যদি পার্লামেন্টে এ ধরনের বক্তব্য দেন, তাতে জাতিগত বৈষম্য বাড়তে পারে। জার্মানি বড় দেশ। বড় দেশ হওয়ার কারণে এখানে বরাবরই কোয়ালিশন রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। ১৯৬০ সালে চ্যান্সেলর ছিলেন কনরাড আডেনাওয়ার, সিডিইউ-সিএসইউ আর এফডিপি ছিল ক্ষমতায়।


সে ধারাবাহিকতায় ১৯৭০, ১৯৮০, ১৯৯০, ২০০০ কিংবা ২০১০ সালে প্রতিবারই দেখা গেছে একটি কোয়ালিশন সরকার। এবারও হতে যাচ্ছে একটি কোয়ালিশন সরকার। তবে এবারের প্রেক্ষাপট যে একটু ভিন্ন, সন্দেহ নেই তাতে। এক্ষেত্রে এসপিডির সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকেই সমর্থন করেছেন। এসপিডি বিরোধী দলে থেকে যে ভূমিকা পালন করতে পারবে, সরকারে থেকে তা পারবে না। উপরন্তু সরকারে থাকলে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে নব্য নাজি পার্টি এএফডি, যা দলটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে এবং ইউরোপে কট্টরপন্থীদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি আরও বাড়িয়ে দেবে। এক্ষেত্রে জ্যামাইকা কোয়ালিশন আগামীতে সরকার পরিচালনা করবে। কিন্তু ওই সরকার থাকবে নড়েবড়ে। ৭০৯ সিটের পার্লামেন্টে তাদের হাতে থাকবে মাত্র ৩৯৩ আসন। সুতরাং বোঝাই যায়, কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়া মরকেলের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। টানা চারবার চ্যান্সেলর হয়ে অ্যাঞ্জেলা মরকেল ইতিহাসে নাম লেখালেন। এক সময় পূর্ব জার্মানিতে জন্ম নেয়া এই শিক্ষাবিদ (যার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে) রাজনীতিতে এসেছিলেন দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পরই। অতিসাধারণ জীবনযাপন করা মরকেলের এমন এক সময় ছিল, পূর্ব জার্মানিতে যখন তিনি বাসা ভাড়া দিতে পারতেন না। সঠিক নীতি, সাধারণ জীবন, শরণার্থীদের ব্যাপারে তার সহানুভূতি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ঐক্য ধরে রাখা, ট্রাম্পের কট্টরনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া তাকে বিশ্বরাজনীতিতে অসাধারণ করেছে। তিনি একসময় জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্লান্ডের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। অব্যাহত কট্টরপন্থীদের উত্থানের বিরুদ্ধে সীমিত কিছু কোয়ালিশন সিট নিয়ে তিনি আগামীতে কীভাবে জার্মানির নেতৃত্ব দেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কতটা বদলাবে জার্মানি?

জার্মানিতে গত ২৪ সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পর প্রশ্ন উঠেছে- এখন কোন পথে যাবে জার্মানিঅ্যাঙ্গেলা মার্কেল চতুর্থবারের জন্য চ্যান্সেলর হতে যাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচনে তার দল এক অর্থে পরাজিতও হয়েছে। আসন সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছেকমেছে ভোটপ্রাপ্তির হার। একই কথা প্রযোজ্য দ্বিতীয় বড় দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) ক্ষেত্রেও। তাদেরও আসন কমেছে। ভোটও কম পেয়েছে তারা। গেলবারের সঙ্গে এবারের পার্থক্যটা হচ্ছে- গত নির্বাচনের পর (২০১৩) একটি গ্রান্ড কোয়ালিশন হয়েছিল। সেই কোয়ালিশনে মার্কেলের নিজের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি (সিডিইউ) আর এসপিডি এবং সেই সঙ্গে গ্রিন পার্টি মিলে একটি ঐকমত্যের সরকার গঠিত হয়েছিল। এবারে বদলে যাচ্ছে সেই দৃশ্যপট। কোয়ালিশনে থাকছে না এসপিডি। তারপরও একটি কোয়ালিশন সরকার হবেআর তাতে যোগ দেবে ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টি (এফডিপি) এবং গ্রিন পার্টি। একটি ত্রিদলীয় ঐক্যজোট হবেযাদের মোট আসন ৩৯৩। সরকার গঠনের জন্য দরকার ৩৫৪ আসন। সরকার হয়তো গঠিত হবেকিন্তু প্রশ্ন থাকবে অনেক। যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জার্মান নেতারা এতদিন নিশ্চিত করেছিলেনতা কি বজায় থাকবেশরণার্থী সমস্যাজলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থান এফডিপি আর গ্রিন পার্টির। তাহলে এদের মাঝে সহাবস্থান হবে কীভাবেজার্মানিতে নব্য নাৎসি দল হিসেবে পরিচিত প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে যাওয়া অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) পার্টিকেই বা মের্কেল মোকাবেলা করবেন কীভাবে?

মোট ৭০৯ আসনের সংসদে সিডিইউ-সিএসইউর আসন সংখ্যা ২৪৬এসপিডির ১৫৩এফডিপির ৮০এএফডির ৯৪গ্রিন পার্টির ৬৭ এবং দি লেফটের ৬৯। সিডিইউ-সিএসইউ পেয়েছে ৩৩ ভাগ ভোট (কমেছে ৮ দশমিক ৫ ভাগ)আর এসপিডি পেয়েছে ২০ দশমিক ৫ ভাগ ভোট (আসন কমেছে ৫ দশমিক ২ ভাগ)। তৃতীয় দল হিসেবে আবির্ভূত নব্য নাৎসি হিসেবে পরিচিত এএফডি পেয়েছে ১২ দশমিক ৬ ভাগ ভোটএফডিপি ১০ দশমিক ৭ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ ভাগ)দি লেফট ৯ দশমিক ২ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ ভাগ)আর গ্রিন পার্টি পেয়েছে ৮ দশমিক ৯ ভাগ ভোট (আসন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ভাগ)।
বলা ভালোজার্মানিতে নির্বাচনে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেনটেশন প্রথা চালু রয়েছে। একজন ভোট দেন প্রার্থীকে এবং একইসঙ্গে দলকেও। চূড়ান্ত বিচারে কোন দল শতকরা কত ভোট পায়তার ওপর নির্ভর করে ওই দল সংসদে কত আসন পাবে। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছেএকটি কোয়ালিশন সরকার হবে বটেকিন্তু তাতে কোন কোন দল থাকবেসরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৫৪ আসন প্রাপ্তি সম্ভব হবে যদি এফডিপি ও গ্রিন পার্টি এতে যোগ দেয়। কেননা দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্টি ও সাবেক কোয়ালিশন পার্টনার এসপিডি জানিয়ে দিয়েছেতারা সরকারে যোগ দেবে না। তারা বিরোধী দলেই থাকতে চায়। এ ক্ষেত্রে মের্কেলের এফডিপি ও গ্রিন পার্টি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। নব্য নাৎসি হিসেবে পরিচিত এএফডির উত্থান শুধু মের্কেলকে নয়গোটা জার্মান রাজনীতিকেই এখন একটি বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পাঠকদের স্মরণ থাকার কথাগত বছরের এই সময় আমি যখন জার্মানি সফর করছিলামতখন যুগান্তরের পাঠকদের আমি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম এ দলটি সম্পর্কে। জার্মানিতে তখন (২০১৬) সিরীয় ও ইরাকি শরণার্থীদের নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। আমি ফ্রাঙ্কফুর্ট নগরীতে অনেক সিরীয় শরণার্থীকে দেখেছি। তারা জার্মান ভাষা তো জানেই নাইংরেজিও বলতে পারে না। ফ্রাঙ্কফুর্ট নগরীর মূল কেন্দ্র সাইল-এ আমি অনেক সিরীয় শরণার্থীকে ভিক্ষা পর্যন্ত করতে দেখেছি। এ সময়েই এএফডি পার্টি তার অবস্থান শক্তিশালী করে। ধীরে ধীরে তারা মুসলমান ও শরণার্থী বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করছিল। আমি তখন লিখেছিলাম- জার্মানি বদলে যাচ্ছে! এবার আমার ওই মন্তব্যেরই বাস্তব রূপ দেখলাম সাধারণ নির্বাচনে। তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এএফডি। তাদের নানা বক্তব্য এখন বড় ধরনের শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। এটা মার্কেলের জন্য চিন্তার কারণ। কেননা এএফডি দক্ষিণপন্থীদের ভোটই কেড়েছে। এর অর্থ হচ্ছেযারা একসময় সিডিইউর ওপর আস্থা রাখতেনতারা এখন আর সেই আস্থাটি রাখতে পারছেন না। তারা সমর্থন করছেন নতুন দল এএফডিকে। মার্কেল তাই নির্বাচনের পর বলেছেনতিনি খতিয়ে দেখবেন কেন ভোটাররা তার দল ছেড়ে গেল আর কেনই বা এএফডির মতো কট্টরপন্থী একটি দলকে ভোট দিল। কিন্তু তাতে কি এএফডির উত্থান ঠেকানো যাবে?
মের্কেল ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছেন বটেকিন্তু এ নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমতকট্টর দক্ষিণপন্থী ও নব্য নাৎসি পার্টি হিসেবে পরিচিত এএফডির উত্থান প্রমাণ করল জার্মানিতে কট্টরপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। আগামীতে এরা সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ১৩টির পার্লামেন্টে এদের প্রতিনিধিত্ব আগেই নিশ্চিত হয়েছিল। এখন কেন্দ্রে এদের অবস্থান তৃতীয়। সবচেয়ে বড় রাজ্য এবং রক্ষণশীলদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত বায়ার্ন প্রদেশে ১৯৪৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো সিএসইউ (সিডিইউর বিকল্প দলশুধু বায়ার্নে) সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। এখানে এএফডি ভালো করেছে। ফলে আশঙ্কাধীরে ধীরে সিডিইউ-সিএসইউর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে এএফডি। আমরা যেন ভুলে না যাই এডলফ হিটলার ও তার নাৎসি পার্টি জার্মানিতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন এবং হিটলার নির্বাচিত চ্যান্সেলর হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন। এখন এএফডি ধীরে ধীরে নাৎসি পার্টির অবস্থানে যাচ্ছে কিনা সেটিই দেখার বিষয়।
দ্বিতীয়ত২০১৫ সালে ইউরোপে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর (সিরীয়ইরাকি ও আফগান) আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো ইউরোপের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যায়। কট্টরপন্থীদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিজয় এই দক্ষিণপন্থী উত্থানকে আরও উৎসাহিত করেছে। ওই সময় ১০ লাখেরও বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মার্কেল সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ তার সমালোচনা করেছিল। হাঙ্গেরিপোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিক বরাবরই সিরীয়-ইরাকি শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার বিপক্ষে ছিল। মার্কেল যখন জার্মানিতে এসব শরণার্থী আসার সুযোগ করে দেনতখন এই তিনটি দেশের সরকারপ্রধান এর সমালোচনা করেছিলেন। এখন তারা নতুন করে যুক্তি তুলবেন যেতাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। জার্মান নির্বাচন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কট্টরপন্থীদের আরও উৎসাহিত করবে। আগামী মাসে চেক রিপাবলিকের নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন্দ্রেই বাবিস ও তার দল ভালো করবেন বলে সবার ধারণা। বাবিস অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্প স্টাইলে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। চেক রিপাবলিকে তার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলারের মালিক। বাবিসহাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান কিংবা পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের নেতা জারুজলাভ কাসিনিস্কির মতো দক্ষিণপন্থী নেতাদের উত্থান পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যেসব মডারেট নেতা আছেন তাদেরবিশেষ করে মার্কেল ও ম্যাত্রেঁদ্ধার (ফ্রান্স) মতো নেতাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়তজার্মানিতে সিডিইউ-সিএসইউএফডিপি আর গ্রিন পার্টির সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে সেই সরকারকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গেলা মার্কেল কতটুকু ঐক্য ধরে রাখতে পারবেনএটাও একটা প্রশ্ন। কারণ অনেক জাতীয় ইস্যুতে এফডিপি ও গ্রিন পার্টির মধ্যে নীতিগতভাবে মতপার্থক্য রয়েছে। যেমনগ্রিন পার্টি চাচ্ছে আগামীতে ২০টি কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে। কিন্তু ব্যবসাবান্ধব এফডিপি এর পক্ষে। তাহলে সমঝোতা হবে কীভাবেএই মতপার্থক্য জার্মানিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি সংখ্যালঘু সরকার হয়তো গঠিত হতে পারেকিন্তু মার্কেল তা চাচ্ছেন না।
চতুর্থতএএফডির বিজয় সরকারকে শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপে বাধ্য করতে পারে। ২০১৬ সালে প্রায় ৮ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। তবে ২০১৭ সালে এ সংখ্যা কম। শুধু তাই নয়জাতিগত বৈষম্যও বেড়ে যেতে পারে। এএফডির শীর্ষ নেতা আলেকজান্ডার গাউল্যান্ড গ্রিন পার্টির নেতাদের সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি বলেছেনএদের তুরস্কে চলে যাওয়া উচিত। জার্মানির অতীত নিয়ে তিনি প্রশংসামূলক মন্তব্য করেছেনযা বিতর্ক বাড়িয়েছে।
কাজেই আগামীতে সরকার পরিচালনা করবে যে কোয়ালিশনসেই সরকার থাকবে নড়বড়ে। ৭০৯ সিটের পার্লামেন্টে তাদের হাতে থাকবে মাত্র ৩৯৩ আসন। সুতরাং বোঝাই যায় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়া মার্কেলের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। টানা চার বছর চ্যান্সেলর হয়ে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন তিনি। এক সময়ের পূর্ব জার্মানিতে জন্ম নেয়া এই শিক্ষাবিদ (যার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে) রাজনীতিতে এসেছিলেন দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পরই। সঠিক নীতিসাধারণ জীবনযাপনশরণার্থীদের ব্যাপারে সহানুভূতিইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ধরে রাখাট্রাম্পের কট্টর নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান তাকে বিশ্ব রাজনীতিতে অসাধারণ করেছে। তিনি এক সময়ের জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। কট্টরপন্থীদের অব্যাহত উত্থানের মুখে সীমিতসংখ্যক কোয়ালিশন সিট নিয়ে তিনি আগামীতে কীভাবে জার্মানির নেতৃত্ব দেনসেটিই দেখার বিষয়। তবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছেকেন মানুষ এএফডির মতো দলকে ভোট দিল তা খতিয়ে দেখা। মানুষ কি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে এএফডিকে ভোট দিয়েছেশুধু জাতিগত বৈষম্যমুসলমান বিদ্বেষ কিংবা শরণার্থী-বিরোধিতাই কি এএফডিকে জনপ্রিয় করেছেএসব এখন খতিয়ে দেখতে হবে।
মার্কেল যদি এএফডিকে সন্তুষ্ট করার জন্য বাধ্য হয়ে তার নীতিতে পরিবর্তন আনেনতাহলে তা জার্মানির জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। এএফডি চাচ্ছে ইউরো জোন থেকে জার্মানি বেরিয়ে আসুক। এটা নিশ্চয়ই মার্কেল করবেন না। কিন্তু তিনি চাপে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কার আসতে পারে। ইইউতে জার্মানি বড় দেশ। দেশটির যে কোনো সিদ্ধান্ত ইইউর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণপন্থীদের ব্যাপক উত্থান পুরো ইউরোপের চেহারা আগামীতে বদলে দিতে পারে। শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেছে। সেখানে নির্বাচনে তেরেসা মে সুবিধা করতে পারেননি। তিনি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন আরেকটি দলের ওপর। এখন অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের অবস্থা হতে যাচ্ছে তেমনটি। কট্টরপন্থী এএফডিকে ব্যালেন্স করার জন্য তাকে এখন কোয়ালিশন পার্টনার এফডিপি ও গ্রিন পার্টিকে ছাড় দিতে হবে। এ দল দুটির মাঝেও সমন্বয় সৃষ্টি করতে হবে। তিনি যদি ব্যর্থ হনতাহলে আগাম নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী।