রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

তুরস্ক কেন আমাদের জন্য একটি মডেল


তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন

তুরস্কের (এরজুরুম) আতাতুর্ক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান কিংবা তুরস্কের সুশীল সমাজের কারও কারও সঙ্গে মতবিনিময়ের পর আমার যে ধারণাটি বদ্ধমূল হয়েছে, তা হচ্ছে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য একটা মডেল হতে পারে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত তুরস্ক সম্পর্কে আমার একটা ভুল ধারণা ছিল। বিশেষ করে আশির দশকে জার্মানিতে থাকার সুবাদে সেখানে বসবাসকারী তুর্কি নাগরিকদের আমি কাছ থেকে দেখেছি। অর্ধশিক্ষিত তুর্কি নাগরিকরা জার্মানিতে শ্রমিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। জার্মানিতে থেকেও জার্মান সংস্কৃতি ধারণ না করায় তুর্কি নাগরিকদের সম্পর্কে সেখানে একটা খারাপ ধারণা ছিল। কিন্তু গত ২০ বছরে তুরস্ক যে কীভাবে বদলে গেছে, তা না দেখে বিশ্বাস করা যাবে না। সেখানকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেখানে শুধু স্থিতিশীলতাই উপহার দেননি, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেশটিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি উঠতি শক্তি। তাই আমার বারবার মনে হয়েছে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘তুরস্ক মডেল’কে অনুসরণ করতে পারে। প্রসঙ্গত, দুটো দেশই মুসলিমপ্রধান ও দেশ দুটোতে রাজনীতিতে সেনবাহিনীর হস্তক্ষেপের ইতিহাস আছে। তুরস্কের ‘জাতির পিতা’ মুস্তাফা কামাল পাশা। তিনি নিজে ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক। তার নেতৃত্বেই তুরস্ক অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিলোপ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ক প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্মলাভ করে। এর ঠিক ৩৭ বছর পর ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী জেনারেল সিমেল গুরসেলের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনী তিনবার ক্ষমতা দখল করেছিল। সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল এভরেন ১৯৮০ সালে। জেনারেল এভরেনের স্বাভাবিক অবসরের পর (১৯৮৯) সেনাবাহিনী আর ক্ষমতা গ্রহণ করেনি। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও দলটির পূর্ব নাম ইসলামিক ওয়েলফেয়ার পার্টির কারণে। দলটির নেতৃত্ব অত্যন্ত সত্ ও মেধাবী। ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতা এরবাকানের স্বাভাবিক মৃত্যু ও দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে দলটি আত্মপ্রকাশ করে। দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এরদোগান। ২০০২ সালের নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৩৪ ভাগ ভোট, আর ২০১১ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে তারা পায় ৪৯ ভাগ ভোট। এ থেকেই বোঝা যায় দলটির জনপ্রিয়তা কত বেশি। মাঝখানে ২০০৭ সালের নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৪৭ ভাগ ভোট। দলটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে এর নেতৃত্বের সারিতে যারা আছেন, তারা কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। সাবেক শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন। ফলে দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের ভূমিকাকে তারা সমর্থন করে। দ্বিতীয়ত, ইসলাম ও গণতন্ত্র যে একে অপরের পরিপূরক এবং ইসলাম গণতন্ত্রের শত্রু নয়, কিংবা গণতন্ত্র ইসলামের বিরোধী নয়, ক্ষমতাসীন দল এটা প্রমাণ করেছে। মানুষ এটা মেনে নিয়েছে। এটাই তুরস্কের ঐতিহ্য। কামাল আতাতুর্ক দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি তুরস্ককে একটি আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন। তাতে তিনি সফল হয়েছেন, সন্দেহ নেই। তিনি একটি বিষয় বিবেচনায় নেননি, আর তা হচ্ছে মুসলিম ঐতিহ্য। মুসলমানদেরকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেকে একজন ইউরোপিয়ান ভাবতেন। তুরস্কে মাদ্রাসা শিক্ষা ছিল। তা আতাতুর্ক নিষিদ্ধ করেছিলেন। বর্তমান সরকার সীমিত পরিসরে মাদ্রাসা চালু করেছে। মেয়েদের মাথায় ওড়না বা হিজাব ফিরে এসেছে। একসময় এই ওড়না ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছিল। মেয়েরা ওড়না পরতে পারত না। এখন সেই বাধা নেই। নিজের খুশি। কেউ পরে। কেউ পরে না। তবে ক্যাম্পাসে আমি শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ মেয়েকেই দেখেছি স্কার্ফ ব্যবহার করে না। ইসলাম ও গণতন্ত্রকে এক করে এরদোগান যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছেন তুরস্কে, এটা একটা মডেল। অনেক আরব দেশ, বিশেষ করে ‘আরব বসন্ত’-এর পর তারা এই রাজনীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে দলটিকে পুরোপুরি ইসলামিক শাসনে বিশ্বাসী, তা বলা যাবে না। তারা যথেষ্ট আধুনিকমনস্ক। তারা অনেকটা ফাতেহউল্লাহ গুলেনের ভাবধারার অনুসারী (ঞযব ারংরড়হ ধহফ রসঢ়ধপঃ ড়ভ ঋবঃযঁষষধয েঁষবহ)। ২০০৮ সালে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ফাতেহউল্লাহ গুলেনকে বিশ্বের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই বুদ্ধিজীবী তুরস্কের নাগরিক হয়েও তুরস্কে থাকেন না। থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ইসলাম যে আধুনিকমনস্ক একটি সমাজব্যবস্থা, তা গুলেনের লেখায় পাওয়া যায়। তাই তুরস্কের বাইরে ক্ষমতাসীন পার্টিকে (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) আল কায়দার মিত্র বলে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হলেও তা ধোপে টেকেনি। বরং তুরস্কের নেতৃত্ব সেই প্রথম থেকেই আল কায়দার কর্মকাণ্ডকে সমালোচনা করে আসছেন। এবং এখনও করছেন। মানুষ এটা গ্রহণ করেছে। যে কারণে তুরস্কে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নেই। মানুষ সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয়ও দেয় না। বর্তমান সরকারের এটা একটা বড় সাফল্য। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বের কারণে তুরস্ক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বে অন্যতম একটি শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। সারা ইউরোপ যেখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে, সেখানে বিশ্বমন্দা তুরস্কের অর্থনীতিকে এতটুকুও আঘাত করেনি। বরং ২০১০ সালে যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৯ ভাগ, তা ২০১১ সালে ১১ ভাগে উন্নীত হয়েছে। অনেক ইউরোপীয় দেশের তুলনায় তুরস্কে বেকার সংখ্যা কম (৯.২ ভাগ)। অথচ স্পেনে ২২.৬, গ্রিসে ১৭.৬, লিথুনিয়ায় ১৫.৫, যুক্তরাষ্ট্রে ৯.১ ও ফ্রান্সে ৯.৯ ভাগ। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দলটিকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করছে। চতুর্থত, দলটির বড় সাফল্য সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রমুখী করা। ৩৬৫ জন জেনারেল, আর ৭ লাখ ২০ হাজার সেনা সদস্যকে নিয়ে যে বিশাল সেনাবাহিনী তুরস্কের, ন্যাটোতে তার অবস্থান দ্বিতীয়। এই সেনাবাহিনী বরাবরই একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য ‘থ্রেট’ বা হুমকি। এরদোগান নিজে একটি কবিতা লিখে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে জেলে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি (২০০২) প্রধানমন্ত্রী প্রথমে হতে পারেননি। পরে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পার্লামেন্টে আসেন। সেই সেনাবাহিনীকে তিনি গণতন্ত্রমুখী করেছেন। সেনাবাহিনী এখন গণতন্ত্রের প্রতি ‘কমিটেড’। সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈরিতায় না গিয়ে, তাকে গণতন্ত্রের মূল ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এরদোগান যে সফলতা পেয়েছেন, তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ‘মডেল’। বিশেষ করে মিসর, তিউনিসিয়া কিংবা ইয়েমেন এই মডেল অনুসরণ করতে পারে। পঞ্চমত, তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে মধ্যএশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বে বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি ২০১২ সালে মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের বিনিয়োগ গিয়ে দাঁড়াবে ২২২ বিলিয়ন ডলার। মিসর (১৭৬ মিলিয়ন) ও ইরানের (১৭৬ মিয়িলন) মতো দেশেও গেল বছর বড় বিনিয়োগ ছিল তুরস্কের। ক্রয় সক্ষমতা অনুযায়ী (পিপিপি) তুরস্কের জিডিপি এখন ১ দশমিক ১১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ১৫ হাজার ৩৪০ ডলার, যা যে কোনো ইউরোপীয় দেশের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক তার বৈদেশিক নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও নানা কারণে এই সম্পর্ক এখন ‘শীতল’। ন্যাটোর সদস্য হলেও সকল ইস্যুতে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত, তা বলা যাবে না। তবে সিরিয়া সঙ্কটে পশ্চিমা বিশ্বের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। তুরস্কের সঙ্গে রয়েছে সিরিয়ার সীমান্ত। সিরিয়ার নাগরিকদের জন্য ‘মানবিক কারণে’ সীমান্ত খুলে দিয়েছে তুরস্ক। সিরিয়া সঙ্কটে ‘পশ্চিমা হস্তক্ষেপ’ তুরস্ক সমর্থন না করলেও বাশার আসাদ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিলে সঙ্কটের সমাধান হতে পারে, এটাও মনে করে তুরস্ক। সেই সঙ্গে সোমালিয়ার মতো মুসলমানপ্রধান দেশের সঙ্কট নিরসনে তুরস্কের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। এরদোগান নিজে সোমালিয়া সফর করে একটি মুসলমানপ্রধান দেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছেন। যুদ্ধপীড়িত সোমালিয়ার শত শত শিশুকে তুরস্কের বিভিন্ন স্কুলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে তুরস্ক সরকার। এর ফলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত আল সাহাব গ্রুপের প্রভাব সোমালিয়ায় কিছুটা হ্রাস পাবে। ইতোমধ্যে মোগাদিসুতে প্রথম বিদেশি সংস্থা হিসেবে তার্কিশ বিমান লাইন সপ্তাহে দু’বার তার ফ্লাইট শুরু করেছে। সোমালিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে তুরস্কের সীমান্তঘেঁষা মুসলিমপ্রধান মধ্যএশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার উদ্যোগ নিচ্ছে তুরস্ক। একসময় ওই অঞ্চলগুলোর ওপর দিয়েই প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’ চলে গিয়েছিল। তুরস্ক এখন সেই ‘সিল্ক রোড’ পুনরুজ্জীবিত করছে। মধ্যএশিয়ার জ্বালানি সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করতে চাইছে তুরস্ক। আর এ লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাকু-তিবিলিসি-সাইনহান গ্যাস পাইপলাইন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুরস্ককে আজ মুসলিম বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান দিয়েছে। একসময় মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদকে নিয়ে মুসলিম বিশ্ব স্বপ্ন দেখত। মাহাথির-পরবর্তী মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব সেই প্রত্যাশা শতকরা একশ’ ভাগ পূরণ করতে পারেননি। এ কারণে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে এখন এরদোগানের কথা ভাবা হচ্ছে। এরদোগান সকল গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে শুধু আজ তুরস্ককেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন না, বরং মুসলিম বিশ্বের জন্যও একটা ‘ইমেজ’ সৃষ্টি করেছেন। তবে তিনি যে সঙ্কটমুক্ত, তা বলা যাবে না। কুর্দিদের নিয়ে সমস্যা আছে। সেনাবাহিনীও শতকরা একশ’ ভাগ বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। যোগ্য নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে তিনি সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছেন। এরদোগানের সাফল্য এখানেই। বাংলাদেশ তুরস্কের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কিংবা নেতৃত্বের গুণাবলি থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।
লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tareque.rahman(a)aol.com

একজন কারসেন ও বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের কিছু কথা


একজন অধ্যাপক কারসেনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল অতি সম্প্রতি তুরস্কের এক শহরে। আমরা দুজনই একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলাম। আমরা সম্মেলনে কথা বলেছি জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে। অধ্যাপক কারসেন মূলত জার্মানের নাগরিক ও বর্তমানে ফ্রান্সের স্যাভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। পরিবেশ তার বিষয়। জার্মানিতে আমার উচ্চতর ডিগ্রি ও পরিবেশ কূটনীতিতে আমার আগ্রহ ইত্যাদি নানা কারণে অধ্যাপক কারসেনের সঙ্গে আমার সখ্য তৈরি হয়। সম্মেলন চলাকালীন ও অবসরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা জার্মান ভাষায় পরিবেশ নিয়ে কথা বলেছি। আমি অবাক হয়েছি বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে তার ধারণা দেখে। বিশ্বের উষ্ণতা বাড়লে বাংলাদেশের কত মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্ততে পরিণত হবে, তা তিনি জানেন। সেই পরিসংখ্যান তার কাছে আছে। বুড়িগঙ্গা নদীদূষণ, তিতাস নদীতে বাঁধ দেয়া ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ উঠল। অধ্যাপক কারসেনের বক্তব্য একটাই_ পরিবেশ বিপর্যয় রোধে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা খুব আশাপ্রদ নয়। পরিবেশ দূষণ রোধ ও বিশ্বের উষ্ণতা হ্রাসে শিল্পোন্নত দেশগুলো যে আন্তরিক নয়, সে কথাও বললেন অধ্যাপক কারসেন। অধ্যাপক কারসেন মিথ্যা বলেননি। শিল্পোন্নত দেশগুলোর এই ভূমিকাকে ক্রিশ্চিয়ান পেনেটি তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ঃৎড়ঢ়রপ ড়ভ পযধড়ং. ঈষরসধঃব পযধহমব ধহফ ঃযব হব িএবড়মৎধঢ়যু ড়ভ ঠরড়ষবহপব-এ উল্লেখ করেছেন_ ্তুঈষরসধঃব ঋধংপরংস্থ হিসেবে। বিশ্বের উষ্ণতা হ্রাসে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। অতি সম্প্রতি নাসা (ঘঅঝঅ) তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছে ২০১১ সাল ছিল গত ১৩২ বছরের ইতিহাসে ৯ম উষ্ণ বছর। গড়ে তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নাসা আশঙ্কা করছে গ্রিনল্যান্ডে যে বরফ জমা রয়েছে, তা যদি উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবার ফলে গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৭ মিটার বৃদ্ধি পাবে। তাই অবিলম্বে কার্বন ডাই অক্সাইড হ্রাসের কথা বলছে নাসা। আল গোর তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম বন্দরগুলোয় ইতিমধ্যে ৪ কোটি মানুষ মারাত্মক আকারের হুমকির মুখে আছে। আল গোর প্রশ্ন রেখেছেন, এন্টার্কটিকায় যে বরফ আছে, তা দ্রুত গলা শুরু করলে কী যে হবে? এ প্রশ্ন শত প্রতিনিধির মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে কোপেনহেগেনে, কানকুনে আর ডারবানে। ডারবান 'কপ' সম্মেলন শেষে যে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমাতে একটি চুক্তি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। আগামী বছর থেকে এ সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হবে এবং ২০২০ সাল থেকে ওই চুক্তিটি কার্যকর হবে। তবে একটি গ্রিন ফান্ড গঠনের ব্যাপারে শিল্পোন্নত দেশগুলো রাজি হয়েছে। এই ফান্ডের পরিমাণ হবে ১০০ বিলিয়ন ডলার। ৪০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে এই ফান্ড যাত্রা শুরু করবে। বিশ্বব্যাংক এই ফান্ডের ব্যবস্থাপনার তদারকি করবে।

ডারবান সম্মেলনের পর যে প্রশ্নটি আমার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, প্রতি বছর এ ধরনের সম্মেলন করে শেষ পর্যন্ত কী বিশ্বের উষ্ণতা রোধ করা সম্ভব হবে? বাংলাদেশের পরিবেশমন্ত্রী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরে এসে তিনি কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তাই 'কপ' সম্মেলন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। ইতিমধ্যে জাপান, কানাডা ও রাশিয়া কিয়োটো-পরবর্তী আলোচনা থেকে বেরিয়ে গেছে। সুতরাং বোঝাই যায়, এক ধরনের হতাশা এসে গেছে। আসলে বিশ্বের দেশগুলো এখন বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিশ্বের উষ্ণতা রোধকল্পে একেক গ্রুপের একেক এজেন্ডা। উন্নত বিশ্ব কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বের যে দাবি, তার মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আবার উন্নয়নশীল বিশ্বও একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। ধনী দেশগুলো এনেক্স-১-এ অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের জিডিপির শতকরা ৭৫ ভাগ এই দেশুগলোর। অথচ লোকসংখ্যা মাত্র বিশ্বের ১৯ ভাগ। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ করে সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৫১ ভাগ। অন্যদিকে গ্রুপ ৭৭-এর দেশগুলো (মোট ১৩০টি দেশ) বিশ্বের জনসংখ্যার ৭৬ ভাগ, জিডিপির মাত্র ১৯ ভাগ। কিন্তু কার্বন উদগিরণ করে ৪২ ভাগ। আবার সাগর পাড়ের দেশগুলো, যারা বিশ্বের জনসংখ্যা, জিডিপি ও কার্বন নিঃসরণ করে মাত্র ১ ভাগ, তাদের দাবি ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বর্তমান অবস্থার চেয়ে শতকরা ৮৫ ভাগ কমিয়ে আনার। বনাঞ্চলভুক্ত দেশগুলো, আবার 'রেইন ফরেস্ট কোয়ালিশন' হিসেবে পরিচিত, তারা বিশ্ব জনগোষ্ঠীর ১৯ ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। জিডিপির মাত্র ৩ ভাগ তাদের। আর মাত্র ৪ ভাগ কার্বন নিঃসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র একা কার্বন নিঃসরণ করে ২০ ভাগ, জিডিপির ৩০ ভাগ তাদের। অথচ জনসংখ্যা মাত্র বিশ্বের ৫ ভাগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিশ্ব জিডিপির ২৫ ভাগ ও জনসংখ্যার ৮ ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ করে ১৫ ভাগ। চীনকে নিয়ে সমস্যা এখন অনেক। চীন একা কার্বন নিঃসরণ করে ২১ ভাগ। বিশ্ব জনসংখ্যার ২০ ভাগই চীনা নাগরিক। জিডিপির ৬ ভাগ তাদের। প্রতিটি গ্রুপের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। সবাই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে কার্বন নিঃসরণের হার কমাতে চায়। জাতিসংঘ এটাকে বলছে কার্বন ঘনত্ব। অর্থাৎ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা মোট আয়ের (জিডিপি) অনুপাতে কার্বন ডাই অক্সাইড উদগিরণের হারকে কার্বন ঘনত্ব বা গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বলা হয়। উন্নয়নশীল বিশ্ব মনে করে এই হার মাথাপিছু জনসংখ্যা ধরে করা উচিত। কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের হার কমানো উচিত_ এটা মোটামুটিভাবে সবাই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু কে কতটুকু কমাবে, সে প্রশ্নের কোন সমাধান হয়নি। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন (এবং সেই সঙ্গে ভারতও) বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়ায়, সে কারণে এই দুটো দেশের কাছ থেকে 'কমিটমেন্ট' আশা করেছিল বিশ্ব। কিন্তু তা হয়নি। চীন প্রস্তাব করেছিল ২০০৫ সালের কার্বন ঘনত্বের চেয়ে দেশটি ২০২০ সালে শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কমাবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল তারা ১৭ ভাগ কমাবে। কিন্তু চীন ও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এখানে বলা ভালো, চীনের কার্বন ঘনত্ব ২.৮৫ টন, আর ভারতের ১০৮ টন। চীন ও ভারত দুটো দেশই বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে এই শতাব্দীতে। বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হরিন্দর কোহলির মতে, আগামী ৩০ বছরে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। মাথাপিছু আয় তখন ৯৪০ ডলার থেকে বেড়ে ২২ হাজার ডলারে উন্নীত হবে। ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত অবদান রাখত মাত্র ২ ভাগ, ৩০ বছর পর অবদান রাখবে ১৭ ভাগ। তবে এটা ধরে রাখতে হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৮ থেকে ৯ ভাগ। এ কারণেই ভারতকে নিয়ে ভয়_ তাদের কার্বন ঘনত্ব বাড়বে। কেননা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে হবে। আর তাতে করে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়বে। পাঠকদের এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৯৭ সালে কিয়োটো সম্মেলনে ১৬০টি দেশ অংশ নিয়েছিল এবং সেখানে যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৯০ সালের কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রার চেয়ে ৮ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ৭ শতাংশ, জাপান ৬ শতাংশ হ্রাস করার কথা। তাছাড়া সার্বিকভাবে ৫.২ শতাংশ গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের আইনগত বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল সবগুলো দেশকে ২০০৮-২০১২ সালের মধ্যে গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কিয়োটো চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও পরে বুশ প্রশাসন ওই চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে কিয়োটো চুক্তি কাগজে-কলমে থেকে গিয়েছিল।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে যে কটি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মাঝে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি বেড়ে গেলে উপকূলের মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশে প্রতি ৭ জনে ১ জন উদ্বাস্তু হবে। ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ কোপেনহেগেন সম্মেলনে পরিবেশগত উদ্ধাস্তুদের টহরাবৎংধষ ঘধঃঁৎধষ চধৎংড়হ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিল।
ডারবান সম্মেলনে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফাস্ট স্টার্ট ফান্ডে মাত্র পাওয়া গেছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সেখান থেকে পেয়েছে ১৩০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু আইলার কারণে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর হয়নি। সার্ক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ঐক্যবদ্ধভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সম্যাগুলো আমরা তুলে ধরবো। কিন্তু ডারবানে তা হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারত একই ফেরামে ছিল না। একটি আইনি বাধ্যবাধকতার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু তা নিয়েও প্রশ্ন আছেই। প্রযুক্তি হস্তান্তর সম্পর্কেও কোনো সমঝোতা হয়নি। কপ সম্মেলন এলেই বড় বড় কথা বলা হয়। কয়েক টন কার্বন নিঃসরণ করে সম্মেলন 'অনেক আশার কথা শুনিয়ে' শেষ হয় বটে; কিন্তু সে ক্ষেত্রে আগ্রগতি হয় খুব কমই। আগে সমস্যা ছিল উন্নত বিশ্বকে নিয়ে। এখন চীন ও ভারতও একটি সমস্যা। তাদের যুক্তি, নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাস করলে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। তাতে করে বাড়বে দরিদ্রতা। এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়। ফলে কপ সম্মেলন নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেলই। চলতি বছর কাতারে এ সম্মেলন হবে। কিন্তু চুক্তির ব্যাপারে অগ্রগতি কতটুকু হবে, বলা মুশকিল।
কিছুদিন আগে আমাদের পরিবেশমন্ত্রী আল গোরের সঙ্গে এন্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ যে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে, এটা বিশ্ববাসীকে জানাতেই আল গোর আমাদের পরিবেশমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এন্টার্কটিকায়। আল গোর নিজে তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে ২০৫০ সাল নাগাদ ২ থেকে আড়াই কোটি বাংলাদেশিকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করতে হবে। এর ফলে প্রচুর মানুষ হারাবে তাদের বসতি, তাদের পেশা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়া মানে কেবল বন্যা নয়, এর মানে লোনা পানির আগ্রাসন। ধানের আবাদ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ২ কোটি কৃষক পেশা হারিয়ে শহরে আশ্রয় নেবে_ এমন আশঙ্কাও করেছেন আল গোর। মিথ্যা বলেননি তিনি।
আজ যখন প্রফেসর কারসেন বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে কথা বলেন, তখন আমি তার বক্তব্যের মাঝে আল গোরের বক্তব্য খুঁজে পাই। এটা সত্য, বিশ্ব আজ বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা জানে। কিন্তু এই বিপর্যয় রোধে উন্নত বিশ্বের ভূমিকা খুবই সীমিত। এক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্যোগেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। উন্নত দেশের সাহায্যের আশায় বসে থাকলে চলবে না। অধ্যাপক কারসেন সে কথাই বলছিলেন আমাকে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Destiny 14.03.2012

http://www.dainikdestiny.com/index.php?view=details&type=main&cat_id=1&menu_id=54&pub_no=125&news_type_id=1&index=2&archiev=yes&arch_date=14-03-2012

বাংলাদেশ কি ইমেজ সংকটের মুখে পড়েছে



তারেক শামসুর রেহমান
সৌদি দূতাবাসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খালাফ আল আলীর হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম বিশ্বের সংবাদপত্র তথা মিডিয়ায় যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইমেজ সংকটের জন্য যথেষ্ট। যদিও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি কিংবা সৌদি উপরাষ্ট্রদূত জামির আল হিন্দ বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। এটা মূলত 'কূটনৈতিক ভাষা'। কূটনীতিকরা এভাবেই কথা বলেন। সৌদি আরব আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চমৎকার। এই একটি হত্যাকাণ্ড দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে যাচাই করা যাবে না- এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। যদি ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য, সৌদি সরকারের বক্তব্য, সেই সঙ্গে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধানরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করি, এটি আমাদের জন্য কোনো ভালো সংবাদ নয়। সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটল এমন একসময়, যখন ঢাকায় মার্কিন উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস শিয়ার বললেন, অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয় বাংলাদেশ। (আমার দেশ ৭ মার্চ)। এটি একটি স্পষ্ট বক্তব্য। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশকে কিভাবে দেখছে, এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে।
'বাংলাদেশ সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়'- এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলের প্রধান অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ডের একটি বক্তব্যের। ১ মার্চ উইলার্ড কংগ্রেস কমিটিকে জানিয়েছিলেন, 'সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী অবস্থান করছে। এর একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে মার্কিন ঘাঁটি নেই, সহযোগিতা আছে। এখন সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা যখন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন, তখন এই মার্কিন কর্মকর্তাদের 'বাংলাদেশ সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়' বক্তব্যটি সামনে চলে আসে।
আমার কাছে এই মুহূর্তে যা বিবেচ্য তা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া। সৌদি সরকারের প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুসরণ করলেও একটি মেসেজ তাতে আছে। খুনিদের গ্রেপ্তার ও সঠিক তদন্ত চায় সৌদি আরব। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেছেন।
এই 'দাবি' একটি মেসেজ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি যে কিভাবে নেবে, আমি জানি না।
কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি প্রকৃত দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হয় কিংবা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব না হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিলে ভালো করবে। এমনিতেই পুলিশের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি রীতিমতো হতাশ। রুনি-সাগরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজও কূলকিনারা হলো না। আমরা ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি এই হত্যাকাণ্ডের খবর। মিডিয়ায় লেখালেখির কারণে সম্ভবত এখানে একটি 'জজমিয়া নাটক' মঞ্চস্থ হয়নি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং রুনি-সাগরের হত্যাকাণ্ড মনিটর করছেন। আর আমি একটা ধন্দে পড়ে যাই। যদি সত্যি সত্যিই প্রধানমন্ত্রী মনিটর করে থাকনে, তাহলে এত দিন কেন লাগবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের যোগ্যতা ও দক্ষতা তাই সংগতকারণেই উঠবে। পুলিশ যদি মূল কাজ ফেলে 'অন্য কাজে' বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হত্যাকারীরা তো এ সুযোগ নেবেই। পুলিশের উচিত, মূল কাজে মনোনিবেশ করা ও তাদের দক্ষতা বাড়ানো। একজন 'থ্রি স্টার জেনারেল'-এর পদ সৃষ্টি করে কিংবা পুলিশ বাহিনীর জন্য পাঁচজন সিনিয়র সচিব সৃষ্টি করে যে পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা বাড়ানো যায় না, তা আবারও প্রমাণিত হলো খালাফ আল আলী হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী এই মন্ত্রণালয়ের দিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন।
মার্কিন কর্মকর্তা জেমস শিয়ার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন বলেন, 'বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়', তখন সরকারের পক্ষ থেকে এর একটা ব্যাখ্যা দাবি করা উচিত ছিল। কেননা প্রধানমন্ত্রী তো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নেই। এটা হচ্ছে বাস্তব কথা। বর্তমান সরকারের শাসনামলে গেল তিন বছরে আমরা কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লক্ষ করিনি। সন্ত্রাসীরা তেমনভাবে সংগঠিত হতে পারছে না। বিচ্ছিন্ন দু-একটি সংবাদ ছাপ হলেও তাদের তৎপরতা, সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ কিংবা জমায়েতের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশ অতিরিক্ত তৎপর হয়েছে। কিন্তু ওই সব নিষিদ্ধ ঘোষিত গ্রুপ কর্তৃক কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে আমরা দেখিনি। তাই অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী হামলায় বাংলাদেশ একটি ঝুঁকিমুক্ত দেশ, তা নিঃসন্দেহে বলা যাবে না। বাইরের সন্ত্রাসী হামলা? এটাও তো আমাদের চোখে ধরা পড়েনি। কিছু 'ভারতীয় সন্ত্রাসী' বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তাদের কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল না এ দেশে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের হস্তান্তরের ফলে ওই অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটেছে। এর বাইরে 'আল-কায়েদা' কিংবা 'লস্কর-ই-তৈয়বা'র মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের কোনো নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে কাজ করছে বলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমাদের কখনো অবহিত করেনি। ফলে মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। তার ওই বক্তব্যের উদ্দেশ্য কী- এ প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে।
আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করতে ভালোবাসেন। তিনি জানিয়েছেন, খালাফ আল আলীর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি সৌদি আরবেও যাবেন। তিনি যেতেই পারেন। তাতে করে কি ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হবে? বাংলাদেশি প্রায় ২৫ লাখ (প্রকারান্তরে ৩০ লাখ) নাগরিক এখন সৌদিতে কর্মরত। তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। ৭ মার্চ রাতে একটি চ্যানেলে অংশ নিতে গিয়ে সৌদি আরব থেকে প্রবাসীরা ফোন করে আমাদের তাঁদের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। এই আতঙ্কের খবরটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। এমনিতেই বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ক খুব উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে- এটা বলা যাবে না। গত ২০০৮ সাল থেকেই সৌদিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়োগ পরিপূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এটা আমাদের একটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেয়নি কখনো। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জনশক্তি বাজার যে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, আমাদের নীতিনির্ধারকরা তা আদৌ বিবেচনায় নেননি। আমাদের অদক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিদেশ সচিব পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই দিকটি বারবার এড়িয়ে গেছেন।
অথচ সৌদি আরব বাংলাদেশকে বাইরে রেখে নেপালের মতো দেশ থেকে কর্মী সংগ্রহ করে আসছিল। শুধু তা-ই নয়, সংবিধানে ২৫(২) ধারাটি সংযোজন করে আমরা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলাম। এটি ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল নির্দেশনা। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের ফলে সংবিধানের ওই ধারাটি এখন আর নেই। এতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে 'বিশেষ সম্পর্ক'-এর ওপর যে প্রভাব ফেলছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে এ প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যেতে পারে। মোটা দাগে যেটা বলা যায়, তা হচ্ছে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই উচিত এই হত্যাকাণ্ডের 'মোটিভ' খুঁজে বের করে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা। প্রায়াজনে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও নেওয়া যেতে পারে। দেশে এ মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। বিরোধী দল ১২ মার্চের কর্মসূচি পালন করে সরকারবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তিশালী করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, অতিদ্রুত হত্যাকাণ্ডের মোটিভটি সুস্পষ্ট করা। এটি একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড। এর কিনারার সঙ্গে আমাদের অনেক স্বার্থ জড়িত। একটি বিদেশি রাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে একটি সংবাদও কোনো কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এরই প্রতিধ্বনি আমরা দেখতে পাই Global threat নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে গত ৯ মার্চ। সেখানেও মধ্যপ্রাচ্যের ওই রাষ্ট্রটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটা চিন্তার কারণ। খুব দ্রুত আমরা যদি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে না পারি, তাহলে তা শুধু সৌদি আরবের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতেও এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। তাতে করে জনশক্তি রপ্তানিতে আরো ধস নামবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমবে। আর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী থাকবেন এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায়। আমাদের জন্য সত্যিকারার্থেই তা কোনো ভালো সংবাদ নয়।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Visa&pub_no=820&cat_id=2&menu_id=23&news_type_id=1&index=0

বিদ্যুতের জন্য কি কোনো ভালো খবর অপেক্ষা করছে

তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
গ্রীষ্ম পুরোপুরি শুরু না হলেও তাপমাত্রা বাড়ছে। কিন্তু এরই মধ্যে কোথাও কোথাও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এবার গ্রীষ্ম কেমন কাটবে তা নিয়ে একটা শঙ্কা এখন থেকেই তৈরি হয়েছে। যে হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, সে হারে বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে না। গেল ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল গড়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যা আগামি এপ্রিলে গিয়ে দাঁড়াবে ৭ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াটে। মার্চে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ৬ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। ধীরে ধীরে এই চাহিদা বাড়বে। মে-জুন মাসে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। কিন্তু সেই চাহিদার কতটুকু পূরণ হবে, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। এর ওপরে রয়েছে বোরো মৌসুমে চাষিদের বিদ্যুত্ চাহিদা। গত ৮ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, বোরো মৌসুমে প্রয়োজনে সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুেকন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এবার সেচের জন্য ৭ হাজার ৮৭৬টি নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ দেওয়া হবে। সংযোগ দেওয়ার বাকি রয়েছে ২৩ হাজার ২০৬টি। গত বছর বিদ্যুত্ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪১টি। বলা প্রয়োজন, দেশে বর্তমানে সাতটি সার কারখানায় দৈনিক প্রায় ২৯ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে কর্ণফুলী সার কারখানা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী এবার সেচে পিক আওয়ারে লোডশেডিং হবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ধারণা বিদ্যুত্ ঘাটতির পরিমাণ দু’হাজার মেগাওয়াট ছড়িয়ে যেতে পারে। এই যে বিদ্যুত্ পরিস্থিতি, তা কোনো আশার কথা বলে না। রাজনৈতিক সঙ্কটের পাশাপাশি চাহিদামতো বিদ্যুত্ সরবরাহ করা যদি না যায়, তা হলে স্বাভাবিক কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।
বিদ্যুত্ নিয়ে সঙ্কট আছে। চাহিদা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। কিন্তু সেভাবে উত্পাদন হচ্ছে না। হাজার হাজার ফ্ল্যাট এই ঢাকা শহরেই তৈরি হচ্ছে। এসব ফ্ল্যাটে কি আদৌ পূর্ণ বিদ্যুত্ সরবরাহ করা সম্ভব হবে? যদি না হয়, তা হলে যারা বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে নির্মীয়মান এই ফ্ল্যাটগুলো ক্রয় করেছেন, তারা এখন কী করবেন? আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক লাখ মানুষ। তাদের আয় রোজগারের কী হবে? ডেভেলপাররা যদি ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে না পারেন, তা হলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে যাবেন। সরকারের জন্য আদৌ তা কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না।
বিদ্যুত্ উত্পাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে। এই গ্যাস এখন ফুরিয়ে আসছে। চলমান গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার ২০০৯ সালে ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগ্রাম’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর অধীনে অতি দ্রুত নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের হাতে থাকা ৩, ৬, ৮ ও ১১ নম্বর ব্লকের মোট ৩ হাজার ১০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) সিসমিক জরিপের কাজ তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, স্থলভাগের ২৩টি ও অগভীর সমুদ্রের ৮টি ব্লককে পিএসসির আওতায় বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কনোকো ফিলিপস একটির দায়িত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসপ্রম এবং অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সান্তোসও শিগগিরই কাজ পাচ্ছে। এমন অভিযোগও উঠেছে যে স্থলভাবে সুনেত্রার মতো বিশাল মজুদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। কনোকো ফিলিপস যে দায়িত্বটি পেয়েছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের বিতর্ক হচ্ছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা এই চুক্তির বিরোধিতা করে দেশেব্যাপী প্রচুর গণসংযোগ করেছেন। তাদের যুক্তি একটাই-কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি করা যাবে না। গভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। কেননা মিয়ানমার এবং ভারত গভীর সমুদ্রে গ্যাস পেয়েছে। মািয়ানমারের গভীর সমুদ্রে প্রাপ্ত গ্যাস আগামী বছর যাবে থাইল্যান্ডে। চীনও এই গ্যাস কিনছে। এ ক্ষেত্রে যদি গ্যাস পাওয়া যায়, তা উত্তোলন ও জাতীয় গ্রিডে দিতে ন্যূনতম আরও পাঁচ থেকে ছয় বছর সময় প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে বিকল্প কী, এটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। যদিও একটা কথা ইদানীং শোনা যাচ্ছে যে, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বাপেক্স যে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (সম্ভাব্য মজুদ) গ্যাস আবিষ্কার করেছে, তা যদি উত্তোলনের ব্যবস্থা করা যায় তা হলে বিদ্যুত্ সঙ্কটের একটা সমাধান সম্ভব। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে এই মজুদও বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে, যদিও এখন পর্যন্ত সরকার বিষয়টি খোলাসা করেনি।
যেহেতু গ্যাসের একটি সঙ্কট আছে, তা হলে বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান আমরা কীভাবে করব? গ্যাসের বিকল্প হতে পারে কয়লা। এ পর্যন্ত দেশে পাঁচটি কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন। এ কয়লাসম্পদ ৭৩ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য। তবে উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ ২০ টিসিএফ গ্যাসের সমতুল্য ধরা যেতে পারে, যা ৩০ থেকে ৪০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কয়লা উত্তোলন নিয়েও বাংলাদেশে একটি বড় বিতর্ক রয়েছে। কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলা হবে, নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে তোলা হবে-এটা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করলে ছয় হাজার হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হবে এবং অনেককে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার বিপক্ষে। অথচ উন্মুক্ত পদ্ধতির একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে এই পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশ কয়লা তোলা যাবে। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে তুললে তোলা যাবে মাত্র ১০ শতাংশ কয়লা। বড়পুকুরিয়া কয়লাক্ষেত্রের বেলায় দেখা যাচ্ছে শতকরা ১০ ভাগ কয়লাও তোলা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অভিমত দিয়েছেন যে বড়পুকুরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন টনের বেশি কয়লা তোলা সম্ভব হবে না। পক্ষান্তরে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন টন কয়লা তোলা সম্ভব, যা বাংলাদেশের ৪০ থেকে ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা দেবে।
জ্বালানি খাতে কয়লা একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও তাতে এখন রাজনীতি ঢুকে গেছে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীর কয়লাখনি উত্তোলনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। তাতে মারা যান ছয় জন। এরা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। সেই থেকে ফুলবাড়ী কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি ঝুলে আছে। এ ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো কয়লানীতিও গ্রহণ করতে পারেনি, যদিও ২০০৭ সালের ১১ জুন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোমিন পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি ২০০৮ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। তাতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন, রফতানির সুযোগ না রাখা, দেশের চাহিদা পূরণের জন্য ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, খনির মুখে একটি বড় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করার বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু ওই রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি বর্তমান সরকার কোনো কয়লানীতিও গ্রহণ করেনি। ফলে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর আমাদের কোনো কাজে আসছে না। এখানে বলা ভালো, বিশ্বের ৪০ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পন্ন হয় কয়লা থেকে। বিশ্বের কয়েকটি দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ৭৯, চীন ৭৮, জার্মানি ৪৯, ভারত ৬৯, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯২ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতংশ। এখানে আরও একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও সরকার খুলনা ও চট্টগ্রামে দুটি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করছে আমদানিকৃত (ভারত) কয়লার ওপর নির্ভর করে। এই সেক্টরটিও আমরা ভারতের হাতে তুলে দিয়েছি।
অতীতে বিদ্যুত্ ঘাটতিতে সরকারি দলের সদস্যরাই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। গত ৩ আগস্ট (২০১১) বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিল। কমিটির সভায় সরকারের দেওয়া বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিসংখ্যানও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। সরকারি দলের এমপিরা যখন খোদ প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন, তখন বুঝতে কারও বাকি থাকে না পরিস্থিতি আদৌ ভালো নয়। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমাদের অর্থমন্ত্রী গত ১ জানুয়ারি বিদ্যুত্ ভবনে বিদ্যুত্ বিভাগের সঙ্গে এর আওতাধীন কোম্পানি ও সংস্থাগুলোর চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছিলেন আগামী তিন বছর বিদ্যুতের দাম বাড়তে থাকবে। যেখানে বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যুক্তিহীন। সাধারণ মানুষের এতে খুশি না হওয়ারই কথা। বিদ্যুত্ আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। সরকার যদি বিদ্যুতের এই চাহিদা পূরণ করতে না পারে, সেই সরকার অজনপ্রিয় হতে বাধ্য। বিদ্যুতের অভাব জনসাধারণের মাঝে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আগামী গ্রীষ্মে বুিদ্যত্ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সঙ্গে আরও যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সকালের খবর ০৬.০৩.২০১২
http://www.shokalerkhabor.com/online/details_news.php?id=66446&&+page_id=+67

তুরস্কের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে


ঢাকা থেকে তুরস্কের এরজুরুমের দূরত্ব কতটুকু বলতে পারব না। কিন্তু টার্কিস এয়ারলাইন্সের সহযোগী বিমান সংস্থা ওডুগোলোগোর বিমানে করে যখন সন্ধ্যাবেলায় এরজুরুমের বিমানবন্দরের টারমাকে পা রাখলাম, তখন সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি। অথচ আমি ঢাকা ছেড়েছিলাম প্লাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিয়ে। এরজুরুমের আতাতুর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সেখানে গেছি। উদ্দেশ্য প্রথম আনাতোলিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়া। সেখানে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় ২৬টি দেশের বিশেষজ্ঞরা। মূল বিষয় ছিল জীববৈচিত্র্য, ভ্রমণ ও পরিবর্তিত বিশ্ব নিয়ে আলোচনা করা। আমি নিজেও একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছি, যা প্রশংসিত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের সঙ্গে যাদের সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিল, সেসব দেশকে নিয়েই এ সম্মেলন। সম্মেলনে তাজিকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখিস্তান, আজারবাইজানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ভারত কিংবা পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন। আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়ার প্রতিনিধিরাও ছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে, একুশ শতকে এসে তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চায়। তাদের সেই যোগ্যতা রয়েছে এবং তাদের পক্ষে সেটা সম্ভবও। সম্মেলনে যোগ দেয়া কিংবা তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে আমার বারবার মনে হয়েছে আমরা তুরস্ক থেকে কত পিছিয়ে আছি। আজ তুরস্কের নেতৃত্ব দেশটিকে যেখানে নিয়ে গেছে, আমরাও তো পারতাম বাংলাদেশকে সেখানে নিয়ে যেতে। কেন পারলাম না? বরং মেধার দিক থেকে আমাদের প্রজš§ তুরস্ক থেকে অনেক এগিয়ে থাকলেও নেতৃত্বের প্রশ্নে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। প্রায় দু’সপ্তাহ তুরস্ক সফর করে তুরস্ক সম্পর্ক সবকিছু জানা সম্ভব নয়। কিন্তু ইস্তামবুল, আনকারায় যাদের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে, আমি জানতে চেয়েছি মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের অবস্থান কোথায়। তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘জামান’ (প্রচার সংখ্যা ১০ লাখ)-এর অঙ্গসংগঠন ঈওঐঅঘ ঘবংি অমবহপু’র বিদেশ ডেস্কের প্রধান ইয়াকুপ সালভারসি, ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (ওরা ভাইস রেক্টর বলে) প্রফেসর বজকুর্ট কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ড. জেনসের সঙ্গে আলাপ ও মতবিনিময় করে আমার মনে হয়েছে, ‘নতুন এক তুরস্ককে’ আমরা দেখতে পাব এই শতাব্দীতে। সেই মেধা, অর্থনৈতিক ভিত্তি তাদের রয়েছে। ইস্তামবুলে ঞঙচকঅচও’র মতো মিউজিয়াম তৈরি করে তারা তাদের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে রেখেছে। ঞঙচকঅচও-তে হজরত আলীর (রা.) ব্যবহƒত তলোয়ারও সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর দাড়ি মোবারক ও তার সাহাবিদের ব্যবহƒত পোশাক। হজরত আলী (রা.) যে তলোয়ারটি যুদ্ধে ব্যবহার করতেন, তা এত বড় ও চওড়া যে ভাবতে অবাক লাগে এই তলোয়ার দিয়ে তিনি কীভাবে যুদ্ধ করতেন।
তুরস্ক তাদের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেছে। প্রায় পাঁচশ’ বছরের পুরনো মসজিদও রয়েছে ইস্তামবুলে একাধিক। একটি জাতি তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে দেশটিকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তুরস্ক তার বড় প্রমাণ। ঞঙচকঅচও’র মিউজিয়ামটি দেখে আমার শাহবাগের মিউজিয়ামের কথাটি মনে হয়েছিল। আমরা কী সেখানে পুরোপুরিভাবে আমাদের অতীতকে সংরক্ষণ করতে পেরেছি? পারলে কতটুকু পেরেছি? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জনমত ও প্রতœতাত্ত্বিকদের দাবি উপেক্ষা করে ফ্রান্সের একটি জাদুঘরের জন্য পাঠানো হয়েছিল আমাদের কিছু প্রতœনিদর্শন। সাবেক আমলা (পাক আমলের সিএসপি) আইয়ুব কাদরী সব প্রতিবাদ উপেক্ষা করে নিজ ক্ষমতাবলে (শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা) আমাদের কিছু প্রতœনিদর্শন গিমের মিউজিয়ামে পাঠিয়েছিলেন। অভিযোগ আছে, সব প্রতœনিদর্শন ফেরত আসেনি। ভাবতে অবাক লাগে, বিষয়টি নিয়ে তেমন আর আলোচনা হল না এবং কাদরী সাহেবের ভূমিকা পর্দার অন্তরালেই থেকে গেল। পৃথিবীর কোন দেশেই এটা সম্ভব নয়। কেউ এটা চিন্তাও করতে পারে না। লাখ লাখ ডলারে এসব প্রতœনিদর্শন বিক্রি হয়। ওই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক চোরাকারবারির দল অত্যন্ত সক্রিয়। তারা এগুলো কিনে নেয় অল্প দাম দিয়ে। পরে অত্যন্ত চড়া দামে তা ইউরোপ তথা আমেরিকার বাজারে বিক্রি করে। তুরস্কেও এমনটি ঘটেছিল। কিন্তু ওরা পেরেছে। আমেরিকার মতো দেশ থেকে ওরা ওদের চুরি হয়ে যাওয়া প্রতœনিদর্শন ফেরত নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমরা পারিনি। অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে গিমের মিউজিয়ামে পাঠানো প্রতœনিদর্শনগুলো নিয়ে (যার একটা অংশ হারিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে) আর আলোচনা হয় না। একটা জাতি যদি তার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে না পারে, সে জাতি নিজেকে কখনও উন্নত করতে পারে না। ঞঙচকঅচও-তে আমি অটোমান সাম্রাজ্যের শাসকদের ব্যবহƒত পোশাক, অলংকারাদিও দেখেছি। আমাদের এই অঞ্চলের শাসকদের পাঠানো উপহার সামগ্রীও সেখানে প্রদর্শন করা হয়। লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কের মিউজিয়ামের চেয়ে কোন অংশে কম নয় ইস্তামবুলের ঞঙচকঅচও’র মিউজিয়ামটি।
ইস্তামবুলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বসফরাস চ্যানেল। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই এ চ্যানেলের কথা জানেন। এটাকে ওরা ওদের ভাষায় বলে ইড়মধুরপর। ইউরোপ আর এশিয়ার সংস্কৃতির এক যোগসূত্র হচ্ছে বসফরাস চ্যানেলের ওপর নির্মিত সেতুটি। এ চ্যানেল কৃষ্ণ সাগরের সঙ্গে মার্মার সাগরকে সংযুক্ত করেছে। পরে মার্মার সাগর আজিয়ান সাগরের সঙ্গে মিশে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে। যারাই ইস্তামবুলে যান, তারা ছোট্ট জাহাজে করে বসফরাস চ্যানেল দিয়ে দেড় ঘণ্টার এক সাগর ভ্রমণ করেন। বসফরাস চ্যানেলের একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে এশিয়া। দুই ঐতিহ্যই ধারণ করেছে ইস্তামবুল। বসফরাস চ্যানেল দিয়ে যখন সাগরে যাচ্ছি, তখন আমার মনে পড়ে গেল বুড়িগঙ্গার কথা। বসফরাস চ্যানেলের পানি এত স্বচ্ছ, এত পরিষ্কার। আর আমরা বুড়িগঙ্গাকে ইতিমধ্যে হত্যা করেছি। বুড়িগঙ্গার পানি এত দুর্গন্ধময় ও কালো যে শরীরে লাগলে তাতে চর্মরোগ হতে বাধ্য। বুড়িগঙ্গা পর্যটকদের জন্য আমরা আকর্ষণীয় করে তুলতে পারতাম। কিন্তু আমাদের দেশের পরিবেশমন্ত্রীরা আসেন আর যান, কেউ বুড়িগঙ্গা নিয়ে ভাবেন না। আমাদের মন্ত্রীরা তো ইস্তামবুলে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। তাদের কারোর কি বসফরাস চ্যানেল দেখার সময় বুড়িগঙ্গার কথা মনে হয়েছে? আমাদের বর্তমান পরিবেশমন্ত্রী অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। ‘পরিবেশ রক্ষায়’ বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি সুদূর এন্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রী বাহাদুরের সময় কি কখনও হয়েছে বুড়িগঙ্গার কালো পানি দেখার? সচিবালয় থেকে বুড়িগঙ্গার দূরত্ব কত? পাঁচ কিলোমিটার। মন্ত্রী সাহেব সুদূর এন্টার্কটিকায় যান। কিন্তু যান না বুড়িগঙ্গায়। আমরা পরিবেশ নিয়ে কথা বলি। পরিবেশ তথা জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলতে আমরা গিয়েছিলাম তুরস্কে। বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে সম্মেলনে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন ফ্রান্সের সাভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. কারমেন ডি জং। তিনি উদ্বিগ্ন জলবায়ু উদ্বাস্তু নিয়ে। পানি সমস্যা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি। সারা বিশ্ব তিনি চষে বেড়ান। পরিবেশ নিয়ে কথা বলেন। তাকে বুড়িগঙ্গার কথা বললাম। তিতাসে বাঁধ দেয়ার প্রশ্ন উঠল। পরিবেশবিদ প্রফেসর কারমেন জানতে চাইলেন পরিবেশমন্ত্রীর ভূমিকার কথা। আমার কোন জবাব ছিল না। আমরা সেই মন্ত্রী কবে পাব, যিনি বিদেশ সফর না করে নিজ দেশের পরিবেশ রক্ষায় নিরলস কাজ করে যাবেন। ড. কারমেন জানালেন, নদী রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাহায্য দেয়। বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে আমাদের পরিবেশমন্ত্রী কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলবেন?
সম্মেলনে অংশ নিয়ে আমার মনে হয়েছে, তুরস্কের কাছ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। তুরস্কের ইতিহাস ও সভ্যতা কয়েক হাজার বছরের পুরনো হলেও আধুনিক তুরস্কের যাত্রা ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর, যখন তুরস্ক মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে একটি রিপাবলিক হিসেবে আÍপ্রকাশ করে। এর আগে দেশটি ৬২৩ বছর অটোমান শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অটোমান শাসকরা সুলতান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের চেয়ে সাড়ে পাঁচগুণ বড় তুরস্ক। কিন্তু লোকসংখ্যা মাত্র সাড়ে ৭ কোটি, বাংলাদেশের অর্ধেক। বাংলাদেশ যদি জনসংখ্যার হার আরও কমিয়ে আনতে না পারে, তাহলে তা উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আটকে দেবে। তুরস্ক এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একটি মডেল। তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে যৌথ উদ্যোগে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার। তুরস্ক এখন একটি মধ্য আয়ের দেশ। ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী (পিপিপি) তুরস্কের জিডিপি এখন ১ দশমিক ১১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় (পিপিপি) বছরে ১৫ হাজার ৩৪০ ডলার। বিশ্ব অর্থনীতিতে তুরস্কের অবস্থান ১৫তম। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল ২০১১ সালে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন। তাতে তিনি তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করেছেন গওকঞ গ্র“পে, অর্থাৎ মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক বিশ্বে নতুন একটি অর্থনৈতিক ব্লক সৃষ্টি করেছে। জিম ও’নেইল এ চারটি দেশকে শুধু দ্রুতবর্ধনশীল উন্নয়নশীল বিশ্ব বলতে নারাজ। ২০০১ সালে তিনিই ইজওঈ-এর ধারণা দিয়েছিলেন (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন)। বাংলাদেশ গওকঞ মডেল অনুসরণ করতে পারে এবং এ ব্লকের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারে।
২০০২ সাল থেকেই জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির নেতৃত্বে একটি সরকার সেখানে স্থিতিশীলতা উপহার দিয়ে আসছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল (২০০৭ সাল থেকে) ও প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইপ এরদোগান অত্যন্ত জনপ্রিয়। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই। পর পর তিনবার এরদোগান প্রধানমন্ত্রী ও তার দল বিজয়ী হয়েছে (২০০২ সালে ৩৪ ভাগ, ২০০৭ সালে ৪৭ ভাগ আর ২০১১ সালে ৪৯ ভাগ ভোট)। প্রেসিডেন্ট গুল ও প্রধানমন্ত্রী এরদোগান ব্যক্তিজীবনে ইসলামিক জীবনধারা (তাদের স্ত্রীরা মাথায় হেজাব ব্যবহার করেন) অনুসরণ করলেও তারা কট্টর নন। তারা বাধ্য করছেন না সবাইকে ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলতে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের জন্য ‘হেজাব না পরার’ যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা তুলে নেয়া হয়েছে। আমি বেশ ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, মেয়েরা আদৌ হেজাব পরে না। জিন্স প্যান্ট পরা আধুনিক মেয়েদের ক্যাম্পাসে চলাফেরা আমাকে ইউরোপের দেশগুলোর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বে অভিযোগ রয়েছে যে, দলটি ইসলামপন্থী ও কট্টর। কিন্তু তুরস্কে আমি এ অভিযোগ শুনিনি। সেখানে আদৌ কোন জঙ্গিবাদী তৎপরতা নেই। একাধিক ফোরামে আমি আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন করেছি। জবাব পেয়েছি একটাই, সেখানে আল-কায়েদার কোন তৎপরতা নেই। একটি মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ যে ব্যক্তিজীবনে ইসলামকে ধারণ করেও আধুনিকমনস্ক হতে পারে, তুরস্ক তার বড় প্রমাণ। কামাল পাশা (যিনি জাতির পিতাও বটে) তুরস্কে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। তা আজও আছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে বটে, তবে তাতে মূলনীতিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। আমি তুরস্কে কোথাও শুনিনি যে, বিরোধী পক্ষ সরকারের ইসলামপন্থী কিছু কর্মকাণ্ডকে ‘জঙ্গিবাদী’ তৎপরতা বলে দাবি করছে (অথচ আমরা জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গটি বারবার টেনে আনছি)। অত্যন্ত ‘ক্লিন’ চরিত্রের অধিকারী এরদোগান ছিলেন ইস্তামবুলের মেয়র। বাংলাদেশ তুরস্কের এই ‘রাজনীতি’ থেকে কিছুটা শিখতে পারে। তুরস্ক মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তার পুরনো সম্পর্ক নতুন করে স্থাপন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। পুরনো ‘সিল্করোড’কে নতুন করে আবার ‘আবিষ্কার’ করছে তুরস্ক। চেষ্টা করছে ওই দেশগুলোকে একটি প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে। তুরস্ক হতে যাচ্ছে ‘সিল্করোড’ভুক্ত দেশগুলোর নেতা। বাকু-তিবিলিসি-সাইহান পাইপ লাইন (গ্যাস ও তেল) এ লক্ষ্যেই রচিত। চার বছর পর পর সেখানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর সংসদ নির্বাচনে যারা ন্যূনতম ১০ ভাগ ভোট পেয়েছে, সংসদে তারাই দলীয়ভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। যদিও ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের’ আলোকে সেখানে নির্বাচন হয়।
তুরস্ক আধুনিক মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ। একটি ইসলামপন্থী দলও যে জনসমর্থন পেতে পারে এবং আধুনিকমনস্ক একটি নীতি গ্রহণ করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একটি মডেল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে, তুরস্ক হচ্ছে তার বড় প্রমাণ। তুরস্ক থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Jugantor, 12.3.12

\'সিল্ক রোড\' ধরে যেতে যেতে




ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই \'সিল্ক রোড\' সম্পর্কে একটা ধারণা রাখেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের এরজুরুম শহর থেকে চলে যাওয়া \'সিল্ক রোড\' ধরে যখন একটি গ্রামে যাচ্ছি, তখন ইতিহাস ধরা দিল আমার কাছে। এরজুরুম শহরে এসেছি আতাতুর্ক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। ঊঝজটঈ সম্মেলন। এর অর্থ ঊঁৎড়অংরধহ ঝরষশ জড়ড়ফ টহরাবৎংরঃু পড়হাবহঃরড়হ. বলা যেতে পারে, সিল্ক রোডভুক্ত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা শিক্ষার্থীদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। আমাদের \'সিল্ক রোড\' দিয়ে যাওয়ার কোনো প্রোগ্রাম ছিল না। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছিল প্রফেসর জেকারিয়া আতাতুর্কের সৌজন্যে। মাইলের পর মাইল আমরা মাইনাস ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ভ্রমণ করেছি। তুরস্ক এই \'সিল্ক রোড\' নতুন করে তৈরি করেছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, মধ্য এশিয়ার মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো। ঐতিহাসিকভাবেই তুরস্কের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর একটা সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস বলে, আজকের তুরস্কের জনগোষ্ঠী একসময় মধ্যযুগে মধ্য এশিয়া থেকে এসেছিল। তাদের বলা হতো ঙমযুঁ ঞঁৎশং, অর্থাৎ টার্কিস ট্রাইজ। এগারো শতকে তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং এক সময় উরাল হ্রদ থেকে অঞ্চল ছেড়ে আজকের পারস্যে বসবাস করেন। তারাই জন্ম দিয়েছিলেন এৎবধঃ ঝবষরলঁশ সাম্রাজ্যের। ওই শতকের শেষ দিকে ওই সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে পূর্ব আনাতোলিয়ায়, আজকে যা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাসে আরও আছে, মোঙ্গলরা ১২৪৩ সালে ঝবষরলঁশ সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে। এর মধ্য দিয়ে জন্ম হয় অটোমান সাম্রাজ্যের। আর এর ঠিক ২১০ বছর পর ১৪৫৩ সালে বাইজেনটাইনদের পরাজিত করে এ অঞ্চলজুড়ে গড়ে ওঠে বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য, যে সাম্রাজ্য টিকেছিল ৬২৩ বছর। এসব ইতিহাসের কথা। আজ এত বছর পর সিল্ক রোড ধরে যেতে যেতে আমার বারবার মনে হয়েছিল, তুরস্ক কি সত্যিকার অর্থে একুশ শতকে নিজেকে নতুন এক অটোমান সাম্রাজ্য দেখতে চায়? তুরস্কে, বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এরজুরুমের আতাতুর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আলাপচারিতায় কেউই তুরস্ককে একটি আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখতে চাননি। তবে তুরস্ক এ অঞ্চলের উন্নয়নে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে, এটা তাদের অভিমত।
যারা সিল্ক রোড সম্পর্কে ধারণা রাখেন,তারা জানেন, সিল্ক রোডে দুটি রুট ছিল। একটি সড়কপথ, যা অনেক দেশের ওপর দিয়ে গেছে। অপরটি সাগররুট। তবে সড়কপথের সঙ্গে সাগররুটের একটা সংযোগ ছিল। প্রায় ৪ হাজার মাইল বিস্তৃত সিল্ক রোডটি এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের যোগসূত্র ঘটিয়েছে। ইতিহাসে আছে, চীনের হান রাজবংশের আমলে (খ্রিস্টপূর্ব ২০৬ থেকে ২২০), চীনের ব্যবসায়ীরা এই সড়ক ও সাগরপথ ধরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন। তারা চীন থেকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন চীনের বিখ্যাত সিল্ক কাপড়, শার্টিন, চা ও পোরসেলিনের দ্রব্যাদি। সাগররুটে তারা ভারতে আসতেন। এখান থেকে নিয়ে যেতেন মসলা, হাতির দাঁত এবং অলঙ্কারাদি। যেহেতু চীনারা সিল্ক কাপড়ের ব্যবসা করতেন, সে কারণেই তাদের ব্যবহৃত পথটি \'সিল্ক রোড\' হিসেবে পরিচিত। সড়কপথটি চীনের বিভিন্ন অঞ্চল হয়ে মঙ্গোলিয়া, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও আজকের তুরস্কে এসে শেষ হয়েছিল। এরপর ভূমধ্যসাগর হয়ে সাগররুটে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল ইউরোপের সঙ্গে। অন্যদিকে \'সি রুট\' বা সাগররুট ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও ভারত মহাসাগর হয়ে একদিকে সৌদি আরব ও মিসর, অন্যদিকে সোমালিয়ায় গিয়ে শেষ হয়েছিল। এই সিল্ক রোড নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে চীনের, আগ্রহ রয়েছে তুরস্কেরও। চীন মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে \'সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন\', যার সদস্য রাশিয়াও বটে। তুরস্কও গড়ে তুলেছে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। ঊঝজটঈ সম্মেলনে যোগ দিতে এসে আমার মনে হয়েছে, চলতি শতাব্দীতেই তুরস্ক সিল্ক রোডভুক্ত দেশগুলোকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে চায়। তবে একটা বড় প্রশ্ন থেকেই গেল, চীনের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে? এর জবাব শুধু ভবিষ্যৎই দিতে পারে। অস্বীকার করা যাবে না এ অঞ্চলে তুরস্ক অন্যতম একটি শক্তি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং মুসলিম দেশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে এর কূটনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে। যদিও এই সম্পর্কে এখন ভাটা পড়ছে। তুরস্কের অর্থনীতি, জনসাধারণের জীবনধারণের মান ইউরোপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি সময়ের ব্যাপার মাত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুরস্ক আমাদের জন্য একটি মডেলও। তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু মধ্য এশিয়ার দেশগুলো কেন, আমাদের জন্যও একটা আশার সঞ্চার করেছে। মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের বিনিয়োগও বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২ সালে মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের বিনিয়োগের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ২২২ বিলিয়ন ডলারে। মিসর (১৭৬ মিলিয়ন) ও ইরানের (১৭৬ মিলিয়ন) মতো দেশেও গত বছর বড় বিনিয়োগ ছিল তুরস্কের। ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী (পিপিপি) তুরস্কের জিডিপি এখন ১ দশমিক ১১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় (পিপিপি) বছরে ১৫ হাজার ৩৪০ ডলার। বিশ্ব অর্থনীতিতে তুরস্কের অবস্থান ১৫তম। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান ম্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও নেইল ২০১১ সালে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন। তাতে তিনি তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করেছেন গওকঞ গ্রুপে, অর্থাৎ মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ককে নিয়ে এসেছেন এক কাতারে। এই ৪টি দেশকে শুধু দ্রুত বর্ধনশীল, উন্নয়নশীল বিশ্ব বলতে তিনি নারাজ। এর চেয়ে আরও কিছু বেশি। তাই সঙ্গত কারণেই তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি মডেল। সারা আরব বিশ্ব যখন একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি, তখন তুরস্কের স্থিতিশীলতা সারাবিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। এ জন্যই টাইম ম্যাগাজিন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল গত বছর ২৮ নভেম্বরের সংখ্যায় (ঊৎফড়মধহরং ধিু)। তুরস্কে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি সরকার (২০০২ সাল থেকে ক্ষমতায়) সেখানে যে রাজনীতির জন্ম দিয়েছে, তার মূল কথা হচ্ছে \'ইসলাম ও গণতন্ত্র\', যা কি-না এখন \'আরব বসন্ত\'-পরবর্তী আরব বিশ্বের রাজনীতির মূল কথা। তিউনিসিয়া, মরক্কো কিংবা মিসরের রাজনীতি এখন \'ইসলাম এবং গণতন্ত্র\'কে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা মডেল। অভিযোগ উঠেছে, জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি কিছুটা ইসলামিক এবং মেয়েদের অধিকার রক্ষায় সচেতন নয়। অথচ আমরা পরিসংখ্যান পেয়েছি, তুরস্কের পার্লামেন্টে মহিলা এমপির সংখ্যা ৯ ভাগ থেকে ১৪ দশমিক ১ ভাগ বেড়েছে। কর্মজীবী মহিলাদের সংখ্যাও সেখানে কম নয়, ২৪ ভাগ (পুরুষ ৬৯.৬ ভাগ)। সেনাবাহিনী অতীতে বরাবরই তুরস্কে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। মোস্তফা কামাল পাশা নিজে ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক। তুরস্কের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা স্বীকৃত। এটা নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরোধ নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ৩৬৫ জন জেনারেল ও ৭ লাখ ২০ হাজার সেনাসদস্যকে নিয়ে গঠিত সেনাবাহিনীকে (ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম) গণতন্ত্রের মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের উদ্যোগ গণতান্ত্রিক বিশ্বে প্রশংসিতও হয়েছে। ২০১০ সালে তুরস্কের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৯ ভাগ, আর ২০১১ সালে তা উন্নীত হয়েছে ১১ ভাগে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশের তুলনায় তুরস্কের বেকার সংখ্যা কম, ৯.২ ভাগ (স্পেনে ২২.৬, গ্রিসে ১৭.৬, লিথুনিয়ায় ১৫.৫, যুক্তরাষ্ট্রে ৯.১ ফ্রান্সে ৯.৯১)। ইসলামমনস্ক একটি দল তুরস্কে ক্ষমতায় থাকলেও আল কায়দার কোনো তৎপরতা সেখানে নেই। দুর্নীতির তেমন কোনো অভিযোগও আমরা শুনিনি। তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি তুরস্ককে একটি অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে মুসলিম বিশ্বে। দারিদ্র্যপীড়িত সোমালিয়া থেকে শত শত শিশুকে তুরস্ক বৃত্তি দিয়ে ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে। দেশটির সাহায্যের পরিমাণও বাড়ছে মুসলিম বিশ্বে। সিল্ক রোড ধরে চলতে চলতে আমার মনে পড়ে গেল সেমিনারের মূল সম্মেলন কক্ষে অভ্যর্থনায় নিয়োজিত তরুণীদের একটি কথা। আলাপচারিতায় গুল আমাকে বলছিল,\'ঞূৎশরুব নরৎ ফূহুধ মূপূ ড়ষধপধশ\'_ আমি ওর কথা নোট করে নিয়েছিলাম। এর অর্থ তুরস্ক আগামী দিনে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে। জানি না এ কথার পেছনে কোনো
সত্যতা আছে কি-না। কিন্তু তুরস্ককে নিয়ে ভাবনার সুযোগ আছে যথেষ্ট।

প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান : শিক্ষক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Samakal,11.03.2012

টিপাইমুখ থেকে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প

তারেক শামসুর রেহমান
তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে যখন একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক তখনই ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত আমাদেরকে বড় ধরনের উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ নিয়েও একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে এখন যদি ভারত সরকার ২০০২ সালে নেয়া আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কেননা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি প্রত্যাহার করে গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া। আর গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়া হয় খরাপীড়িত হরিয়ানা ও তামিলনাড়ুতে। অন্যদিকে টিপাইমুখে কোনো বাঁধ নির্মিত হবে না বলে ভারত বারবার আশ্বাস দিলেও দেখা গেছে ভারত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প নিয়েও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতের টিপাইমুখে হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট নিয়ে গত ২২ অক্টোবর (২০১১) নয়াদিলি্লতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের এখন করণীয় কি? স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের ইতিহাসে বোধ করি এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আস্থা রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আস্থা রেখেই নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিতে হয়। যে কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এই জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব পায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রশ্নে এই জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গেল নভেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে টিপাইমুখ প্রশ্নে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাতে করে এই জাতীয় স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে যথেষ্ট। গত ২৪ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের কয়েকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক. টিপাইমুখ প্রশ্নে ভারতের বক্তব্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি আশ্বস্ত; দুই. যৌথ সমীক্ষা চায় বাংলাদেশ; তিন. বিরোধী দল কর্তৃক সরকারকে সহযোগিতার ঘোষণা 'ইন্টারেস্টিং'; চার. একটি উচ্চ প্রতিনিধি দলকে নয়াদিলি্ল পাঠানো হবে, পাঁচ. জেআরসির বৈঠকে টিপাইমুখ নিয়ে কখনো আলোচনা হয়নি; ছয়. নেপালের সঙ্গে ৩২৭ মিটার উঁচু জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন কেউ এ বিষয়ে কোনো কথা বলে না। শুধু টিপাইমুখ নিয়ে বলে। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে টিপাইমুখ প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা পরিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রশ্নে ভারতকে নিবৃত রাখা যায়নি এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নয়াদিলি্ল গিয়েছিল। কিন্তু এই প্রতিনিধি দল গেলেও ভারত টিপাইমুখে কাজ বন্ধ করে দেয়নি। এর আগে ২০০৯ সালেও একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল নয়াদিলি্ল তথা টিপাইমুখে গিয়েছিল। তাতে তো কোনো কাজ হয়নি। আবারো একটি প্রতিনিধি দল ভারতে গেল। তা 'লোক দেখানো' হয়ে গেল এখন। তবে কোনো সরকারি প্রতিনিধি দল না পাঠিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টিম সেখানে পাঠানো উচিত। বিরোধী দল একজন বা দুজন প্রতিনিধির নাম প্রস্তাব করবে, তাদেরও ওই টিমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তারা সেখানে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করবে এবং দেশে ফিরে এসে তা জাতিকে অবহিত করবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী সহযোগিতার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ করণীয় কী এ ব্যাপারে বিরোধী দলের মতামত নেয়া যেতে পারে। সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে, এই সুযোগে সেই আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। উদ্যোগটি নিতে হবে সরকারকেই। অতীতমুখিতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা অতীতের অভিজ্ঞতাকে টেনে নিয়ে আসি। টিপাইমুখের ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছে। অতীতমুখিতা সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং তিক্ততার জন্ম দেয়। অতীতে বিএনপি টিপাইমুখ নিয়ে কোনো কথা বলেনি বলে কী বর্তমান সরকার বলবে না! জনগণ তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণের দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের। মনে রাখতে হবে, বৃহত্তর সিলেট জেলা আজ বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটা একটা ইস্যু হয়ে যেতে পারে। সুতরাং সরকারি দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে টিপাইমুখ প্রশ্নে সোচ্চার হতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে, এটা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। একটি যৌথ সমীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে ভারত এ ধরনের প্রস্তাবে কখনই রাজি হবে না। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রস্তাব কাগজ-কলমে থেকে যেতে পারে। সরকার স্বউদ্যোগে একটি সমীক্ষা চালাতে পারে। ওই সমীক্ষায় বেরিয়ে আসবে পরিবেশগত কী কী সমস্যা হতে পারে বাঁধ নির্মাণ করার ফলে। বাংলাদেশ দাতাগোষ্ঠীর সহযোগিতাও নিতে পারে সমীক্ষা পরিচালনার জন্য। সমীক্ষার ওই ফলাফল নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা যেতে পারে। যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসির বৈঠকের কথাও বলা হচ্ছে। এ জন্য অতীতের কোনো বাংলাদেশ সরকারকেই দায়ী করা যাবে না। ভারত জেআরসির বৈঠকগুলো ব্যবহার করেছে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। জেআরসির বৈঠকের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকলেও, ভারতের আগ্রহ ছিল কম। আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে অবশ্যই ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্ব আসরে এ সমস্যাটা তুলে ধরাও প্রয়োজন। কেননা পরিবেশগত সমস্যার ব্যাপারে সারাবিশ্ব আজ অত্যন্ত সচেতন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে একটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, সেটা বলা কোনো অপরাধ নয়। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার সংক্রান্ত হেলসিংকি নীতিমালা, ১৯৯১ সালে প্রণীত ডাবলিন নীতিমালা, আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ কনভেনশন, জলাভূমি বিষয়ক কনভেনশন জীববৈচিত্র্য কনভেনশন, প্রতিটি আন্তর্জাতিক আইনে ভাটির দেশের অধিকার রক্ষিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওই আইনে বর্ণিত অধিকার বলেই দেশটির সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারে। অতীতে ভারত যখন একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক আসরে তার সমস্যার কথা তুলে ধরেছিল। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল। ডারবানে গেল ডিসেম্বরে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত পড়ঢ় ১৭ঃয সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বেশ কটি এনজিও বেসরকারি প্রতিনিধি দল হিসেবে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল। তারাও টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানাতে পারেনি। সারাবিশ্বই আজ বড় বড় বাঁধের ব্যাপারে সোচ্চার। বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজার হাজার লোক গৃহহীন হয়, স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে তারাও আশ্রয় নেয়_ এটা আজ আন্তর্জাতিকভাবেই সৃজিত একটি কাজ হিসেবে গণ্য হয়। মনিপুরে টিপাইমুখে ওই বাঁধটি নির্মিত হলে ওই এলাকার বেশ কিছু গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাবে। শত শত স্থানীয় আদিবাসী নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবেন। আন্তর্জাতিক আইন এটা অনুমোদন করে না। ভারত আরো একটি বিষয়ে লুকোচুরির আশ্রয় নিচ্ছে। টিপাইমুখের আরো উন্নয়নে আসামের কাছার জেলার ফুলেরতাল নামক স্থানে (সেচের জন্য) ভারত একটি ব্যারাজ তৈরি করছে। এর ফলে বরাক নদী থেকে ভারত কিছু পানি প্রত্যাহার করে নেবে। এই বিষয়টি ভারত খোলাসা করছে না। টিপাইমুখ নিয়ে চুক্তির কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও ফুলেরতাল ব্যারাজ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।
টিপাইমুখ নিয়ে মানুষের যে উৎকণ্ঠা, তা যে শুধু বাংলাদেশেই, তা নয়। বরং ভারতের 'সাত বোন' রাজ্যের মধ্যে তিনটি রাজ্যে মনিপুর, আসাম ও মিজোরামেও এই উৎকণ্ঠা আমরা লক্ষ্য করেছি। অতি সম্প্রতি ভারতের ওই রাজ্যগুলোর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়ে গঠিত হয়েছে 'কমিটি অব পিপলস অ্যান্ড এনভায়রনন্টে' (কোপে)। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে ওই অঞ্চলের যে ক্ষতি হবে, তার প্রতিবাদ করতেই তারা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা এখন 'কোপের' সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যৌথভাবেও বিষয়টি উত্থাপন করা যায়। মনে রাখতে হবে, ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। যতদূর জানা যায় তাতে দেখা গেছে ভারত সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতে ২২৬টি বড় বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করছে, যার লক্ষ্য হবে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ৯৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। মুখে মুখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যত আশ্বাসই দিন না কেন, ভারত অত্যন্ত কৌশলে টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন এলো আন্তঃনদী সংযোগ একল্পের পরস্পর উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রেও ভারত কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করতে পারে। ভারত অতীতের মতো কূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগ করে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করতে পারে 'তাঁরা এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়'। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে এ ধরনের আশ্বাসও আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পানিসম্পদমন্ত্রী গেল বছরের ২৬ নভেম্বর একটি সেমিনারে বলেছিলেন বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া ভারত টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাব। পানিসম্পদমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাঝে 'রাজনীতি' কতটুকু, কিংবা 'বাস্তবতা' কতটুকু, তা ভিন্ন প্রশ্ন। এই মুহূর্তে যা দরকার তা হচ্ছে ভারতকে ওইসব প্রকল্প বাতিল করতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া ও সেই সঙ্গে এই অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে হিমালয় অঞ্চলভুক্ত দেশ ও চীনের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা। আর অভ্যন্তরীণভাবে যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি তা হচ্ছে, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পরিত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
http://www.dainikdestiny.com/index.php?view=details&type=main&cat_id=1&menu_id=54&pub_no=109&news_type_id=1&index=2&archiev=yes&arch_date=07-03-2012

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংকটকে তীব্র করবে

তারেক শামসুর রেহমান
গত ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তা চলমান সংকটকে আরও গভীরতর করবে। এ দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে চারদলীয় জোট। চারদলীয় জোটের যে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি সরকারেরও উচিত তাদের বক্তব্য শোনা। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির আলোকে বিরোধী দল আগামী ১২ মার্চ ‘ঢাকা চলো কর্মসূচি’ পালন করবে বলে পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে। বিরোধী দল বারবার বলে আসছে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠেয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এ বক্তব্য আজ আর শুধু বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে না, এ দেশের অনেক রাজনীতিবিদ, সুশীলসমাজ এবং দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও এ দাবি উচ্চারিত হচ্ছে। এমনকি সরকারের শরিক দলের কারও কারও পক্ষ থেকেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ করা। এ সংলাপ সংসদে অথবা সংসদের বাইরেও হতে পারে। সরকারের যে কোন শরিক দলও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং গণতন্ত্রকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প নেই।
আমি যতদূর জানি, বিএনপি কর্তৃক আহূত ১২ মার্চের কর্মসূচিতে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর কোন কর্মসূচি নেই। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী বিএনপিও চায় প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। আমরাও তেমনটি চাই।
‘হানাদার বাহিনীর মতো গণহত্যা চালানোর ষড়যন্ত্র’ বলে প্রধানমন্ত্রী যে অভিযোগ এনেছেন তার পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে, আমরা জানি না। তবে প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্য আমাদের মনে নানা উৎকণ্ঠার জš§ দেবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য গণতন্ত্র বিকাশের ধারাকে ব্যাহত করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটা কোন শুভ সংবাদ হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে যে অভিযোগ করেছেন, আমি ধারণা করছি তার কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনে এসব তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেন।
স্বাধীনতার এ মাস আমাদের জন্য গর্বের। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও এ মার্চ মাসে যখন বিরোধী দল কোন কমর্সূচি দেয়, তখন বুঝতে হবে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আস্থার কত অভাব। তবে মার্চ মাস আমাদের জন্য শিক্ষার একটি মাসও বটে। ১৯৭১ সালের এ মার্চ মাসে আমরা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিলাম। আর বিএনপির ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির সঙ্গে সেই অসহযোগ আন্দোলনের কোন মিল নেই সত্য, কিন্তু শোষণ-অত্যাচার আর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার একটি মিল কেউ কেউ খুঁজে পেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, মার্চে আন্দোলন কেন? আসলে আন্দোলন কখনও দিন-ক্ষণ দেখে হয় না। বিএনপি ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১২ মার্চের কর্মসূচি দিয়েছে। এটা হঠাৎ ঘোষিত কোন কর্মসূচি নয়। এর পেছনে অন্য কিছুর গন্ধ খোঁজা ঠিক হবে না। বরং সরকার যদি সত্যিকার অর্থে আন্দোলনের কারণ অনুসন্ধান করত, আমার বিশ্বাস আমরা এ মার্চে এ ধরনের আন্দোলন দেখতাম না। উদ্যোগটি নিতে হবে সরকারকেই। সে সুযোগ এখনও আছে। দেশ আজ নানা সমস্যায় আক্রান্ত।
বিএনপি আজ আন্দোলন করছে। অতীতে আওয়ামী লীগও এ রকম ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেছে। আমরা চাই সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে এ দেশের রাজনীতি বিকশিত হোক। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে যে রাজনীতি, প্রকৃতপক্ষ সে রাজনীতি এ দেশের গণতন্ত্র বিকাশে সাহায্য করবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থেই দুই পক্ষের সহাবস্থান প্রায়োজন।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
http://jugantor.us/enews/issue/2012/03/04/news0438.htm

ব্লেকের বাংলাদেশ সফর এবং বিদ্যমান পরিস্থিতি

ভদ্রলোকের নাম রবার্ট ও ব্লেক জুনিয়র। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন। তাঁর দায়িত্বে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফরে এসে সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন, তাতে করে একটি মেসেজ তিনি দিয়ে গেলেন বলেই মনে হলো। এর আগেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু এভাবে তিনি স্পষ্ট করে কখনো বক্তব্য রেখেছেন বলে মনে হয় না। তাঁর বক্তব্যের নানা ব্যাখ্যা হতে পারে এখন। তিনি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সংকীর্ণ রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি আগামী নির্বাচন কিভাবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং সব দলের অংশগ্রহণ উপযোগী হবে, এর ফর্মুলা প্রধান দুই দলকে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করারও আহ্বান জানান। ব্লেকের বক্তব্য আসলে এমন একসময়, যখন বিএনপি আগামী ১২ মার্চ, ঢাকা চলো কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে। এর পাল্টা হিসেবে আওয়ামী লীগও ওই দিন কর্মসূচি দিয়েছে। বিএনপির দাবি মূলত একটাই_তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কিছুটা নমনীয় হয়ে যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতেও রাজি। কিন্তু আওয়ামী লীগের বক্তব্য বর্তমানে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বলে কিছু নেই। আর নির্বাচন হতে হবে সংবিধান অনুসরণ করেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বিশেষ করে এক-এগারোর (২০০৭) তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কের মাত্রা বাড়ালেও এর আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তেমন বিতর্ক হয়নি। ২০০৭ সালের এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কিত হয়েছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অসাংবিধানিক কিছু ভূমিকার কারণে। এর মধ্য দিয়ে পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করা যাবে না। নিঃসন্দেহে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতন্ত্রের পরিপন্থী। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থেই এবং গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করার জন্য এ ধরনের একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়েছে বাংলাদেশে।
গণতন্ত্রে পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখা ও বিরোধী দলকে গ্রহণযোগ্যতায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ জিনিসটির বড় অভাব। ফলে দেশে একের পর এক সংকট তৈরি হয়েছে, যা দেশকে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ একটি দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতিতে মহাপ্রলয় অবসম্ভাবী। একই ধরনের কথা বলেছিলেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও। তিনি গণবিস্ফোরণের একটি আশঙ্কা করেছেন (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ নভেম্বর ২০১১)। এ ধরনের বক্তব্য শঙ্কা তৈরি করে। সরকারে যাঁরা থাকেন, ক্ষমতা পরিচালনা করেন, তাঁদের সহনশীল হতে হয়। কিন্তু দলের সিনিয়র নেতা সৈয়দ আশরাফ একবার বলেছিলেন, বিএনপি অংশ নিক আর না নিক, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই নির্বাচন হবে (যুগান্তর ১৮ জুন, ২০১১)। এই বক্তব্য অনভিপ্রেত। এতে করে সংকটের মাত্রা বাড়বে, কমবে না। সৈয়দ আশরাফ সিনিয়র নেতা। তার এ ধরনের উক্তি শোভন নয়। এতে জটিলতা আরো বাড়বে। বরং খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি কিছু মন্তব্য করতে পারতেন। খালেদা জিয়া একাধিকবার জনসভায় বলে আসছেন। আর তা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে। তিনি লংমার্চে বারবার এ বক্তব্যটিই তুলে ধরেছেন। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। কিন্তু একটি নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বর্তমান সংবিধানের আলোকে প্রবর্তন করা সম্ভব। এ জন্য দরকার সরকারের সিনসিয়ারিটি। অর্থাৎ সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলেই নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
এমনকি সরকারের শরিকদের মধ্যেও অনেকে আছেন, যাঁরা মনে করেন সব ধরনের বিতর্ক এড়ানোর জন্য নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞের ধারণাও এমনটি। ওটা না করে সরকার এককভাবে নির্বাচন করলে মঞ্জুর বা কাজী জাফরের আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, সমাধান এখনো সম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে উচ্চ আদালতের রায়কে বিবেচনায় নিয়ে (দুই টার্ম এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সরকার নিজে অথবা শরিকদের কারোর মাধ্যমে একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। তখন আমার বিশ্বাস, আলোচনায় বিএনপি অংশ নেবে। আগে সংসদে এসে বিএনপিকে প্রস্তাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা যায়। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন আছে, এটা আমি বিশ্বাস করি। সংসদের বাইরেও আলোচনা হতে পারে। এমনকি তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমেও (যিনি বা যাঁরা দুই পক্ষের বন্ধু) আলোচনার সূত্রপাত করা যায়। আমি বিশ্বাস করি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এমন কিছু শুভবুদ্ধির মানুষ আছেন, যাঁরা চান আলাপ-আলোচনা হোক। সেটা যে সংসদেই হতে হবে, তার কোনো মানে নেই। এমনকি আমাদের 'সিনিয়র সিটিজেন'দের কেউ কেউও এগিয়ে আসতে পারেন।
দেশের সমস্যা এখন অনেক। অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। বেকারত্ব বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই। বৈদেশিক বিনিয়োগের অবস্থাও ভালো নয়। মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা বেশি কথা বলেন। সুশাসন নিয়ে নানা প্রশ্ন এখন। র‌্যাবের অনেক ভালো কাজ ম্লান হয়ে গেছে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায়। আমরা ভুলে যাই র‌্যাবকে এখন দেশের বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আসরে মানবাধিকারের প্রশ্নটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়। আমরা চাই না র‌্যাব একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দলের মতামত থাকা প্রয়োজন। কেননা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বিরোধী দলের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না।
কিন্তু সরকারের দৃষ্টি সেদিকে নেই। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেখানে বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করছে না। টিপাইমুখ বাঁধ প্রশ্নে খালেদা জিয়া সরকারকে সহযোগিতার কথা বললেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নেতিবাচক দৃষ্টিতে এর সমালোচনা করেছেন। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে সাধারণ জনগণের উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেলেও সরকার এর প্রতিবাদ করেনি। সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করে একটি তুঘলকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা দেশের মানুষ যখন নানা সমস্যায় জর্জরিত, তখন সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে। এ বিচার নিয়ে বিদেশে কথা উঠেছে, স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেছেন, বিচারের স্বচ্ছতার কথা। এমনই এক পরিবেশে যখন সর্বজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, বিচারকরা মুখ দেখে বিচার-অবিচার করেন (দিনকাল, ২৬ নভেম্বর ২০১১), তখন আমাদের একরাশ হতাশার মধ্যে ঠেলে দেয়। এই হতাশা সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও লক্ষ করি। আবদুল জলিল তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এভাবে_গুণ্ডাপাণ্ডা মনোনয়ন পেলে গণমুখী প্রশাসন হবে না। আর তোফায়েল আহমেদের মতে, ন্যাপ-সিপিবি আজ আওয়ামী লীগের কর্ণধার (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ নভেম্বর ২০১১)। এই যখন পরিস্থিতি, তখন সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের একটি সমঝোতা প্রয়োজন। ওই সমঝোতা হতে হবে নির্বাচনকে সামনে রেখে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও চায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন (মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনার বক্তব্য, যায়যায়দিন, ২৮ নভেম্বর ২০১১) এবং যেখানে সাবেক সিইসি নিজেই স্বীকার করেছেন, 'দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে হাজারো সমস্যা', সেখানে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকার এ ব্যাপারে যদি একটি 'সংলাপ'-এর উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল।
এটা সত্যিই দুঃখজনক যে আমাদের এ কথাগুলো শুনতে হচ্ছে একজন অতিথির মুখ থেকে। ব্লেক বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলবেন, এটা আমি চাই না। এটা অনেকটা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের শামিল। আমাদের রাজনীতি কী হবে, কোন পথে আমরা আমাদের সমস্যা সমাধান করব, বিষয়টি একান্তই আমাদের। যদিও ব্লেক যা বলেছেন, তা বোধ করি এ মুহূর্তে দেশের হাজার হাজার মানুষের একই অনুভূতি। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা 'দলীয় রাজনীতি' পরিত্যাগ করে একটি 'সংলাপে' অংশ নেবেন এবং ২০১৩ সালে দশম সংসদ নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে একটি 'ফর্মুলা' বের করবেন। সংবিধানের দোহাই দিয়ে দলীয়ভাবে নির্বাচন করা যাবে বটে, কিন্তু তাতে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে না এবং ওই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতাও থাকবে না। আমরা চাই আর না চাই, পছন্দ করি আর নাই করি, ব্লেক ঢাকায় এসে এই মেসেজটিই আমাদের দিয়ে গেলেন_একটি নির্বাচন হোক তাতে যেন সবার অংশগ্রহণ থাকে।
ড.তারেক শামসুর রেহমান
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বয়স যখন ৬৫



চাকরির বয়সসীমা
তারেক শামসুর রেহমান

শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে যেন কিছু 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' থাকে। ঢালাওভাবে একজন অসুস্থ, কর্মে অক্ষম, মেধাহীন, অযোগ্য শিক্ষক ৬৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করবেন_ এটি কাম্য নয়। সমাজ তার কাছ থেকে কিছু পাবে না। শিক্ষকতায় দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় 'দলীয় ক্যাডার' নিয়োগ দিয়ে আমরা এরই মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছি। আর নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের অবসর সংক্রান্ত আইনটি খসড়া আকারে রয়েছে। ভেটিংয়ের পর তা সংসদে উপস্থাপিত হবে

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর করা হচ্ছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা নীতিগতভাবে এ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। এখন 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক (অবসরগ্রহণ) বিশেষ বিধান আইন-২০১২' খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ধারণা করছি, সংসদের আগামী যে কোনো অধিবেশনে এই আইনটি পাস হবে। আগে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই সুবিধাটুকু গ্রহণ করতেন। এখন এই আইনটি সংসদে পাস হলে দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই ৬৫ বছর বয়সে অবসরগ্রহণ করবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এটি নিয়ে ক্ষোভ ছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না_ এটাই প্রত্যাশিত ছিল। এখন সরকার এই বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিল। এতে সরকারপ্রধান সব শিক্ষকের ধন্যবাদ পাবেন_ সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হলো, সেই উদ্দেশ্য সফল হবে কি? অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে কি তাদের কাছে জাতির যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হবে? আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অবসরের বয়সসীমা ৬৫-তে উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। কেননা, এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত একটি 'চাপ' আসবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার এই 'চাপ' সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ৬০ বছরের পর একজন সিনিয়র শিক্ষকের দেওয়ার কিছুই থাকে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, খুব বেশি শিক্ষক ৬০ বছরের পর তেমন একটা গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন না অথবা রাখতে পারেন না। অসুস্থতা তাকে পেয়ে বসে। এই বয়সে এসে অনেককেই দেখেছি প্রবাসে অবস্থানরত ছেলে বা মেয়ে এবং সেই সঙ্গে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পড়াশোনা, গবেষণা, ক্লাস নেওয়া ইত্যাদির পেছনে 'সময় দেওয়ার' প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কম। এর একটি বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। আমাদের যে সংস্কৃতি, তাতে পরিণত বয়সে এসে মানুষ সন্তানদের কাছে আবার ফিরে যায়। এটাই বাস্তব। গবেষণা তাকে টানে না। তবে ব্যতিক্রম যে নেই, তা আমি বলছি না। ব্যতিক্রমও আছে। কিন্তু আমরা অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিকে এই ৬৫ বছরের সুযোগ দিইনি। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি এই সমাজে এখনও আছেন, যারা ৬০ বছরেরও আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন, কিন্তু এখনও সক্রিয়। বই লিখছেন, সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন। নিঃসন্দেহে এই প্রজন্মের তরুণরা তাদের ক্যাম্পাসে পেলে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হতো। কিন্তু তা হয়নি। আমি আরও একটি কারণে অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছি। আর তা হচ্ছে ৬৫ বছর নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনেকেই (যারা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত) সরাসরি ৪০ বছর শিক্ষকতা করবেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? গবেষণা, পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য যেখানে বেশি, সেখানে তারা গবেষণায় মনোনিবেশ করবেন, পাঠ্যবই রচনা করবেন_ এটা আশা করা যায় না। অনেক তরুণ প্রভাষকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ শুনি, তাতে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি রীতিমতো আতঙ্কিত। আমার আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করায় সমাজ, রাষ্ট্র উপকৃত হবে_ এ বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এর ফলে এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শত শত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পক্ষ থেকেও দাবি উঠবে তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর। রাজনৈতিক সরকারের ওপর সঙ্গত কারণেই 'চাপ' আসবে এবং কোনো সরকারই চাইবে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হোক। একসময় সরকারও বাধ্য হবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়াতে। ফলে যা হবে, তা হচ্ছে 'ওপরের স্তরে' জট সৃষ্টি হবে এবং নতুনদের চাকরি পেতে অসুবিধা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরদের দুটো গ্রেড_ প্রফেসর ও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রফেসর হিসেবে নিজ পদে থাকলেও ১০ ভাগ কোটার কারণে কোনোদিনই 'সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর' হতে পারেন না। ফলে যা হবে, তা হচ্ছে সিনিয়র সচিবদের মতো 'সিনিয়র প্রফেসর' পদ সৃষ্টি করতে বাধ্য হবে সরকার। কেননা, রাজনৈতিক সরকার সব সময়ই চায় শিক্ষকদের সমর্থন। শিক্ষকদের খুশি করার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি 'সিনিয়র প্রফেসর' পদ আগামীতে সৃষ্টি করা হয়, আমি অবাক হব না। তবে এ ক্ষেত্রে যেন একটি নীতিমালা থাকে। সরকার সিনিয়র সচিবের ৮টি পদ সৃষ্টি করেছে। এতে সচিবদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আদৌ কি কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে? বয়সে সিনিয়র_ এটাই কি নীতিমালা? আসলে নীতিমালাটি হওয়া উচিত যোগ্যতার বলে। একজন সচিব বয়সের কারণে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদা পাবেন_ সেটি ঠিক নয়। তিনি যোগ্যতা দেখাতে পেরেছেন কিনা_ সেটাই হলো আসল কথা। সচিব সাহেবদের কাজ যদি হয় 'বিদেশ ভ্রমণ' আর 'দাতাদের নির্দেশনা' অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা, সেই সচিব 'যোগ্য' বলে বিবেচিত হবেন না। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মেধাশূন্য সচিবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর (২০১১) এ ধরনের একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। সচিবদের 'পারফরম্যান্সে' প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট_ এমন খবরও আছে ওই প্রতিবেদনে। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি করতে হয়েছে। আইজিকে 'থ্রি স্টার জেনারেলের' পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর জন্য ৫ জন সিনিয়র সচিবের পদও সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাতে রাষ্ট্র, সমাজ কতটুকু উপকৃত হলো? এখন সঙ্গত কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দাবি করবেন 'সিনিয়র প্রফেসর' পদ সৃষ্টি করার। তাদের কি ফেলে দিতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী?
এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ হোক_ আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে যেন কিছু 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' থাকে। ঢালাওভাবে একজন অসুস্থ, কর্মে অক্ষম, মেধাহীন, অযোগ্য শিক্ষক ৬৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করবেন_ এটি কাম্য নয়। সমাজ তার কাছ থেকে কিছু পাবে না। শিক্ষকতায় দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় 'দলীয় ক্যাডার' নিয়োগ দিয়ে আমরা এরই মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছি। আর নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের অবসর সংক্রান্ত আইনটি খসড়া আকারে রয়েছে। ভেটিংয়ের পর তা সংসদে উপস্থাপিত হবে। তারপর তা যাবে সংসদীয় কমিটিতে। এখানে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে এই কমিটি আমাদের জন্য একটা আস্থার জায়গা। তারা তা প্রমাণও করেছেন। শিক্ষকদের স্বার্থে আঘাত করে_ এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই কমিটি অতীতেও নেয়নি, আগামীতেও নেবে না। তবে সংসদীয় কমিটি শিক্ষকদের অবসরের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে পারে : (১) অবসরের বয়সসীমা ৬৫ করা হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে প্রমাণ করতে হবে_ তিনি শারীরিকভাবে 'ফিট' অর্থাৎ সুস্থ আছেন এবং নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে (এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা এড়িয়ে চলতে হবে); (২) ২+২=১ এর যে ফর্মুলা ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, তা অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ সরাসরি ৬৫ পর্যন্ত আইন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করলে ভালো হয়; (৩) এই সুযোগ তিনি পাবেন যিনি নিয়মিত এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন; (৪) শর্ত হিসেবে তাকে ৬০ বছরের পর নূ্যনতম একটি পাঠ্যবই রচনা করতে হবে। যদি তিনি তা না পারেন, তাহলে ৬৫ বছরে আবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না; (৫) ৬৫-তে যাওয়ার যোগ্যতা তিনিই অর্জন করতে পারবেন অথবা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যিনি অধ্যাপক পদে থাকাকালে নূ্যনতম একবার 'সেবাটিক্যাল লিভ' নিয়ে (এক বছর) একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন। যার কোনো গবেষণা গ্রন্থ নেই, তিনি ৬৫-তে যাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অধ্যাপক থাকাকালে তিনি যদি আদৌ কোনো এমফিল বা পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান না করে থাকেন, তিনিও যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। মোটকথা_ একটা নীতিমালা থাকুক। কিছু শর্ত থাকুক। যদি ঢালাওভাবে ৬৫ করা হয়, তাহলে তাতে 'রাজনীতি' ঢুকে যাবে। জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়েও তেমন উপকৃত হবে না।

প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রেহমান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য
tareque।rahman@aol.com
http://www.samakal.com.bd/details.php?news=23&view=archiev&y=2012&m=02&d=26&action=main&menu_type=&option=single&news_id=238729&pub_no=974&type=

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য প্রসঙ্গে



ড. তারেক শামসুর রেহমান
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন অতি সম্প্রতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, সীমান্তে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকা- চলতে থাকলে তিনি জাতিসংঘে নালিশ জানাবেন। তার এ বক্তব্য এভাবেই পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। কেননা ড. মিজান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলেও, তিনি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে কোথায় কোথায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তার দেখভালের দায়িত্ব তার সংস্থার ওপর অর্পিত হয়েছে। তিনি কতটুকু করতে পেরেছেন, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন; কিন্তু তিনি যখন সীমান্তে ভারতীয় রক্ষী বাহিনীর গুলিতে প্রায় প্রতিনিয়ত বাংলাদেশিরা মারা যাচ্ছেন, তখন তার ওই বক্তব্য গুরুত্বের দাবি রাখে বৈকি! তার ওই বক্তব্য এলো এমন এক সময় যখন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রধান ইউ কে বনশালের একটি বক্তব্যও ছাপা হয়েছে, যেখানে বনশাল স্পষ্ট করেই বলেছেন সীমান্তে গুলি চালনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কী ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথা! একের পর এক সীমান্ত হত্যা চলছে; কিন্তু কোনোভাবেই সীমান্তহত্যা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখন বনশালের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল, সীমান্তে হত্যা বিএসএফ আদৌ বন্ধ করবে না। এর আগে বাংলাদেশি হাবিবুর রহমানকে উলঙ্গ করে অত্যাচার করার দৃশ্য খোদ ভারতেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। ওই ঘটনায় প্রভাবশালী ভারতীয় দৈনিক দি হিন্দু বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এক পর্যায়ে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ক্ষমা না চাইলেও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। এটা নিয়ে অতীতে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে; কিন্তু সীমান্ত নির্যাতনের হার কমছে না_ উদ্বেগের কারণ এটাই। যখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কিংবা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সীমান্ত নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আজ ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে প্রকারন্তরে 'দোষ' স্বীকার করে নিলেন। তার এই সৎসাহসের জন্য তিনি নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তিনি বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা পাবেন, যদি তিনি এই নির্যাতন বন্ধে কার্যকর কোনো কর্মসূচি হাতে নেন। দুঃখ প্রকাশ করে হাবিবুর রহমানের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। আস্থা অর্জন করতে হলে নিতে হবে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা।
বিএসএফের নির্যাতন আজ চরম পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছে। হাবিবুর রহমানের নির্মম অত্যাচারের রেশ কাটতে না কাটতে গত ২৬ জানুয়ারি ছাপা হয়েছে আরেকটি সংবাদ_ কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গমারী সীমান্তে বাংলাদেশি আবদুল লতিফ লেবুর লাশ ফেরত দিয়েছে ভারতীয় পুলিশ। সরকারের এটা বড় ব্যর্থতা, সরকার শক্ত হাতে এ ধরনের হত্যাকা-ের প্রতিবাদ করতে পারছে না। বাংলাদেশের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিএসএফ এ সুযোগটি নিচ্ছে। দুঃখজনক হচ্ছে এটাই, বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর ভারতকে একের পর এক সুযোগ দেয়ার পরও বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি বাংলাদেশিদের লাশ। এটা কোন ধরনের বন্ধুত্বের নিদর্শন, এটা সহজেই অনুমান করা যায়। সত্যিকার ক্ষেত্রেই ভারত বাংলাদেশকে একটি বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন এখন। বাংলাদেশকে তাদের প্রয়োজন নানা কারণে। প্রায় ১৬ কোটি দেশের এই জনগোষ্ঠী ভারতের জন্য বিশাল একটা 'বাজার'। ভারত দেখছে তাদের স্বার্থ। তাই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশে এসে সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে বলে আভাস দিলেও তা আদৌ কার্যকর হয়নি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আদৌ সীমান্তহত্যা বন্ধে কোনো নির্দেশ দেননি। দিলে হাবিব বা লেবু হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, গত একযুগে বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১০০৬ জন বাংলাদেশি। খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল ও চীনের সঙ্গে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকলেও, শ্রীলঙ্কার সীমান্ত খুব বেশি দূরে নয়; কিন্তু কোনো একটি সীমান্তে কী এ ধরনের হত্যাকা- কখনো হয়েছে? চোরাকারবারির অভিযোগ তোলা হয়; কিন্তু ভারত-নেপাল সীমান্ত কিংবা ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাকারবারি বা মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা কম নয়। তাহলে এসব সীমান্তে ভারত হত্যাকা- চালায় না কেন? এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। আসলে ভারত বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে না। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে পারেননি। কাঁটাতারের বেড়ায় যখন কিশোরী ফেলানীর লাশ ঝুলে ছিল, সেদিন এর প্রতিবাদ করতে সাহস পর্যন্ত পায়নি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা। এই 'ব্যর্থতা' বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট করেছে। আমরা অবশ্যই ভারতের বন্ধুত্ব চাই। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা রাখতে পারে_ এটাও আমরা মনে করি; কিন্তু এই 'বন্ধুত্ব' এখন যেন একতরফা হয়ে যাচ্ছে। গত ২৬ জানুয়ারি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে একটি সংবাদ_ তাতে বলা হয়েছে, ভারতকে দ্রুত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য একজন উপদেষ্টার নেতৃত্বে (ড. মসিউর রহমান) একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এরা কাজ করছে অর্থাৎ এখানেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি তাগিদ। একই দিন কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হয়েছে আরেকটি সংবাদ_ গেল সেপ্টেম্বর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় যে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা আদৌ ভারতীয় মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয়নি এবং অনুমোদিতও হয়নি। কেননা এতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও বিজেপির আপত্তি রয়েছে। এর অর্থ কী? চুক্তি হল; কিন্তু তা কার্যকর করল না ভারত। কিন্তু আমরা নদীকে 'হত্যা' করে বাঁধ দিয়ে ভারতের ৪২ চাকার যান চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছি। এভাবে পৃথিবীর কোথাও নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়, এটা চিন্তাও করা যায় না। কোনো আইনই এই 'নদীহত্যা'কে সমর্থন করে না। অথচ আমরা করলাম। আমাদের স্বার্থ এত কী? দুঃখ লাগে এ কারণে যে, কোনো 'মন্ত্রী' সাহস করে 'নদীহত্যা' বন্ধের কথা বললেন না। কোথায় আমাদের পরিবেশমন্ত্রী?
আজ সীমান্তহত্যা নিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান যখন কথা বলেন, তখন আমরা উৎসাহিত হই। তিনি সেই অর্থে সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি বলতে পারেন। তার চাকরি হারানোর ভয়ও নেই। তার জাতিসংঘে নালিশ জানানোর সিদ্ধান্তটি সঠিক। এটাই জনগণের দাবি। কমিশনের পক্ষ থেকে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে সীমান্তহত্যার বিষয়টি তুলতে পারেন। এখানে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় তার নেই। তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব বলেই তিনি কাজটি করতে পারেন। তবে তিনি যদি না করেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনিও রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলেন। মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। সাময়িক বাহবা নেয়ার জন্যই তিনিও এ ধরনের কথা বলেছেন। তিনি অধ্যাপক মানুষ। তিনি এ কাজটি করবেন, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল করবেন_ আমাদের প্রত্যাশা এটাই।

http://www.dainikdestiny.com/index.php?view=details&type=main&cat_id=1&menu_id=54&pub_no=81&news_type_id=1&index=2&archiev=yes&arch_date=22-02-2012

মমতা আসলে কী চান?


তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
মমতা ব্যানার্জি আসলে কী চান? গেল সেপ্টেম্বরে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে একটি চুক্তিস্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে আপত্তি জানালেন মমতা। ঢাকাতেও এলেন না। তার আপত্তির কারণে পিছিয়ে গেল তিস্তার পানিবণ্টনের চুক্তিটি। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা যখন বাড়ছে, তখন মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করলেন, ফারাক্কায় বেশি পানি পাচ্ছে বাংলাদেশ। মমতার যুক্তি ফারাক্কা ব্যারাজের ১৩ নম্বর গেটটি খারাপ হয়ে গিয়েছিল গেল জুন মাসে। আর ১৬ নম্বর গেটটি খারাপ হয় ডিসেম্বরে। ফলে এই দুটো গেট দিয়ে চুক্তির অতিরিক্ত (?) পানি বাংলাদেশ পেয়েছে। তিনি এটাকে কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্র হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। মমতার এ ‘অভিযোগের’ পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে বলতে পারব না। কেননা এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বা ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার তার নয়াদিল্লির প্রতিনিধির পাঠানো এক প্রতিবেদনে (১৮ ফেব্র“য়ারি) জানিয়েছে, তিস্তা চুক্তি নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথাÑ আদৌ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না!
ভারতের রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জি একটি ‘আনপ্রেডিকটেবল ক্যারেক্টার’। তিনি কী করবেন, কখন করবেন বলা খুব মুশকিল। কেন্দ্রে তার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস জাতীয় কংগ্রেসের মিত্র। বেশ ক’জন মন্ত্রীও রয়েছেন কেন্দ্রে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস সমর্থন করেছিল মমতাকে। যদিও অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গে একটি ‘ক্ষেত্র’ তৈরি করে ফেলেছেন মমতা। বিধানসভার নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। মমতাকে নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমাদের সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা কেন জানি মমতাকে একটু বেশিই পছন্দ করেন। এর একটা কারণ হতে পারে মমতার পূর্বপুরুষ যশোরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি বাঙালি। এজন্য আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখনই নয়াদিল্লি গেছেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন ‘পদ্মার ইলিশ’, যা নাকি মমতার খুব পছন্দের। মমতা যখন পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী হলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী সব প্রটোকল ভেঙে ফোন করেছিলেন মমতাকে। কিন্তু মমতাকে বোঝা খুব কঠিন। মমতা বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াননি। মনমোহনের ঢাকা সফরের আগে একটি তিস্তাচুক্তির সমঝোতার কথা (বাংলাদেশ পাবে তিস্তার পানির ৪৮ ভাগ, আর ভারত ৫২ ভাগ) আমরা শুনেছিলাম। কিন্তু তখন মমতা গণমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে কোনভাবেই ২৫ ভাগের ওপরে পানি দেয়া সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকার মমতাকে এ বিষযে বোঝাতে পারেননি। গত ১৯ ফেব্র“য়ারি কলকাতা গিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব রঞ্জন মাথাই। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এখন তিস্তার রেশ কাটতে না কাটতে মমতা আপত্তি তুললেন, ফারাক্কায় বাংলাদেশ বেশি পানি পাচ্ছে। গঙ্গাচুক্তি নিয়েও এখন তার আপত্তি! কিন্তু মমতাকে খুশি করেই নতুন একটি ‘তিস্তা ফর্মুলা’ নিয়ে এগুতে চাচ্ছেন মনমোহন সিং।
নতুন ফর্মুলা অনুযায়ী যেটি স্পষ্ট তা হচ্ছে মমতাকে ‘খুশি’ করেই মনমোহন সিং তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিচ্ছেন। মমতা এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে ২৫ ভাগের বেশি পানি দেয়া যাবে না। এখন কেন্দ্র অনেকটা সেই সুরে সুর মিলিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। ভারতের প্রস্তাবে দুটি অংশ থাকছে। শিলিগুড়ির পাশে গজলডোবায় যে বাঁধ রয়েছে, সেখান থেকে ২৫ ভাগ দেয়া হবে বাংলাদেশকে। পরে দোমোহনিতে এসে যে পানি পাওয়া যাবে, সেখান থেকে মোট ৫০ ভাগ পানি দেয়া হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি, দোমোহনি এলাকা ‘রিচার্জ সাইট’। এখানে তিস্তার উপনদী থেকে এবং বৃষ্টির পানি থেকে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়, পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিচার্জ সাইট’। পানির পরিমাণ বেড়ে গেলে বাকি ২৫ ভাগ পানি দেয়া সম্ভব। এই যুক্তি মমতা ও তার উপদেষ্টাদের কাছে কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে, সে বিষয়ে অবশ্য আমরা নিশ্চিত নই। মমতা ব্যানার্জি তিস্তার পানি ভাগাভাগি, একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ নিশ্চিত করার ব্যাপারে কল্যাণ রুদ্রকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। কমিটি এই ফেব্র“য়ারিতেই তাদের রিপোর্ট দেবে। এটা বিবেচনায় রেখেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই এ মাসের ১৯ তারিখ কলকাতা গেলেন। ধারণা করা হচ্ছে ওই সময় নতুন ফর্মুলার আলোকে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হবে। যদিও এ দফায়ও মমতার মন গলেনি। মমতা ব্যানার্জির সম্মতি পাওয়ার পরই আগামী মার্চে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর করার কথা। শোনা যাচ্ছে ‘কাকাবাবু’ প্রণব মুখার্জিও নাকি আসবেন। উদ্দেশ্য একটাই, নয়া চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্মতি আদায় করা। প্রশ্ন হচ্ছে, নয়া চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে?
যতটুকু জানা গেছে, এটি হচ্ছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি। গঙ্গাচুক্তির মতো স্থায়ী কোন চুক্তি হবে না এটি। দ্বিতীয়ত, তিস্তার পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ একাই ফ্যাক্টর নয়, বরং সিকিমও একটি ফ্যাক্টর। অথচ সিকিমকে এই চুক্তির আওতায় আনা হয়নি। সিকিমের পবন চামলিং সরকার তিস্তাকে ব্যবহার করে ২৭টি হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। সিকিম থেকে প্রবাহিত ১৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ি তিস্তার মূল নদীতে এবং শাখা নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে সিকিম। একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন হয় ৫ শতাংশ পানি। একসঙ্গে ২৭টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র উৎপাদনে গেলে তিস্তায় কী পরিমাণ পানি থাকবে, এটা নিয়ে সন্দেহ করেছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গই বা কতটুকু পানি পাবে গজলডোবায়, কিংবা বাংলাদেশকেই বা কী পরিমাণ পানি দেবে ভারত, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তৃতীয়ত, একই নদীর ওপর এনএইচপিসির রয়েছে দুটি প্রকল্পÑ ৩৩২ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে রয়েছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এ কারণে তিস্তায় যথেষ্ট পানি থাকার কথা নয়। চতুর্থত, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। এর অংশ হিসেবে ২৫ বছর আগে তৈরি ৩০ কি.মি. দীর্ঘ বাঁ-হাতি খালে তিস্তা থেকে পানি নিয়ে এসে ছাড়া হয়েছে। এতে উপকৃত হয়েছে সেখানকার ১১ হাজার হেক্টর জমির সেচকাজ। বাংলাদেশকে না জানিয়ে উজানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পানি প্রত্যাহার করে নিতে পারে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন হয়েই রইল। বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করতে পারে। পঞ্চমত, ২০০৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ‘জাতীয় প্রকল্প’ হিসেবে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জেলার ৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৫ সালে। এই ব্যারাজ পুরোপুরিভাবে চালু হলে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি কমে যাবে শুধু তাই নয়, বরং ড্যামসংলগ্ন এলাকায় ভূমিধস বৃদ্ধি পাবে, নদীতে নুড়িপাথরের প্রবাহ বাড়বে, বিপুল পলি বাংলাদেশে প্রবেশ করে বাংলাদেশের নদী ভরিয়ে ফেলবে। ভূমিকম্পের সম্ভাবনাও বাড়বে। ইতিমধ্যে ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারাজের বিরূপ প্রভাবে লালমনিরহাটের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তাসহ ছোট-বড় ১২টি নদী নাব্য হারিয়ে আবাদি জমি ও খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে (আমার দেশ, ১৪ ফেব্র“য়ারি ২০১২)।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। চাতনাই থেকে এ নদী ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী পর্যন্ত এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার।
১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমাণ বা কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এরকম কোন বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মাঝে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। শুধু তাই নয়, ভারত তিস্তা ব্যারাজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দেয় এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে চরম হঠকারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
১৯৮৫ সালে ভারত তিস্তার উৎসমুখে গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করায় শুষ্ক মৌসুমে দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি সেচ প্রদানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সেচ প্রকল্পের উপকৃত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। ইরিগেবল এরিয়া (কৃষিযোগ্য ভূমি) ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর। বাংলাদেশ কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি নামক স্থানে ২৪ কোটি ৮৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় তিস্তা প্রকল্পের যে কাজ শুরু করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে অতিরিক্ত প্রায় ১৬.২১ লাখ মেট্রিক টন ধান ও ৪৩ হাজার টন গম উৎপাদিত হবে। এর বাজারদর ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু প্রধান নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে এখন পানিশূন্যতায় অসংখ্য চরের মরুদ্বীপে রূপান্তরিত হয়েছে। গত ১৫ ফেব্র“য়ারি সংবাদপত্রে (যুগান্তর) প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, তিস্তা ব্যারাজে পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করেছে। এক দিনের ব্যবধানে কমেছে ২ হাজার কিউসেক। ১৩ ফেব্র“য়ারি পানির পরিমাণ যেখানে ছিল ৪ হাজার কিউসেক, পরের দিন তা কমে এসে দাঁড়ায় ২ হাজার কিউসেকে। সেচনির্ভর বোরো আবাদে তিস্তার সেচ কমান্ড এলাকায় পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এভাবে পানি কমে গেলে বোরো আবাদ চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার আশংকা করছেন কৃষকরা। এই যখন পরিস্থিতি, তখন তিস্তার পানি ভাগাভাগিতে নতুন যে ফর্মুলা নিয়ে ভারত অগ্রসর হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। তিস্তার উজানে পানির প্রবাহ আরও হ্রাস পাবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বোরো আবাদে নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুর জেলার ১৩ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৪৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে না। এতে করে বাংলাদেশ বড় ধরনের খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হতে পারে।
তিস্তার পানিতে আমাদের ন্যায্য অধিকার রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত। বাংলাদেশের কোনভাবেই মমতার চাপের কাছে নতি স্বীকার করা ঠিক হবে না। বাংলাদেশকে চুক্তি করতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে নয়। মমতার সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রমাণ করল সত্যিকার অর্থেই তিনি বাংলাদেশের ‘বন্ধু’ নন। পানি নিয়ে তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন। তার উদ্দেশ্য, মনমোহন সিংকে চাপে রেখে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বেশি অর্থ আদায় করে নেয়া। তাই তিস্তার পানিবণ্টনের ‘নয়া ফর্মুলা’য় আদৌ জট খুলবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
http://jugantor.us/enews/issue/2012/02/22/news0022.htm

আরো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কার স্বার্থে


বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে যুগের চাহিদা। কিন্তু তার অর্থ এই নয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদেরকে 'সার্টিফিকেটসর্বস্ব' জাতিতে পরিণত করবে। ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রি তৈরি করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যাবে না। কলেজ শিক্ষক দিয়ে কলেজ চালানো যায়, বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায় না। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে নজরদারি বাড়ানোটা জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমতি দেয়া প্রয়োজন।ড. তারেক শামসুর রেহমান সংবাদটি ছাপা হয়েছে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি। সংবাদে বলা হয়েছে নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৯৩টি আবেদনপত্র জমা পড়েছে। চলতি মাসেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি। তবে কটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেয়া হবে, সে ব্যাপারে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে কোনো কথা বলা না হলেও, যেহেতু আবেদনকারীদের মাঝে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রয়েছেন, সেহেতু এটা ধরে নেয়া স্বাভাবিক যে নূ্যনতম ২০টা থেকে ৩০টা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে উদ্যোক্তা হিসেবে যাদের নাম পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তারা শুধু যে সরকারি দলের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট তা নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়ও বটে। এরপর কেউ কেউ ঢাকা শহরে প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার কথা বলছেন। অথচ সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ঢাকা শহরে নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হবে না। এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় এই আইনে পরিবর্তন আনা হয় কী না, সেটাই দেখার বিষয়। আমি রীতিমত আতঙ্কিত এই সংবাদে। দেশ তাহলে কোন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা কি উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়ন আদৌ নির্দেশ করে? ৯৩টি আবেদনের মধ্যে যদি 'রাজনৈতিক বিবেচনায়' ২০টিও চূড়ান্ত অনুমতি পায়, তাহলে কটি বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে দাঁড়াবে এই দেশটিতে? আমরা কি উচ্চ শিক্ষার নাম করে ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তৈরি করব? দেশে ইতোমধ্যে ৫৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে 'শিক্ষা বাণিজ্য'-এর অভিযোগ রয়েছে। এরা সার্টিফিকেট 'বিক্রি' করে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের নয়। এই অভিযোগটি আমার একার নয়, বরং মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের স্বয়ং। এবং গেল মাসে একজন ক্ষমতাবান উপদেষ্টাও একই অভিযোগ করেছেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে ইউজিসির চেয়ারম্যান যখন স্বয়ং 'বাণিজ্য'-এর অভিযোগ করেন, তিনি সেখানে ৮৫টি অনুমোদন করেন কীভাবে? রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইউজিসি কেন এই 'রাজনৈতিক চাপ' এ মাথা নোয়াবে? প্রধানমন্ত্রীর ওপর সবকিছু চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি। 'বাম ঘরানার' এই মানুষটি এখন এক ধরনের 'ফড়িয়া শিক্ষা ব্যবসায়ীদের' পাল্লায় পড়েছেন। উচ্চ শিক্ষা কোনো গার্মেন্ট ব্যবসা নয় যে এখান থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। মুনাফা অর্জন করার আরেক জায়গা রয়েছে। ঢাকা তো এখন 'দোকানদার'দের শহরে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বিক্রি করলেও কারো কিছু বলার নেই। ব্যবসা করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তাহলে 'বাণিজ্য' কেন? আর যদি 'বাণিজ্য' করতেই হয়, তাহলে সরকারকে এটা ঘোষণা দিতে হবে- এখানে যে কেউ পুঁজি বিনিয়োগ করে এখান থেকে 'মুনাফা' তুলে নিতে পারবেন! উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও তাহলে গার্মেন্ট শিল্পের মর্যাদা দিতে হবে! কথাটা শুনতে খারাপ শোনায়- কিন্তু বাস্তবতা কী তাই বলে না? যেখানে খোদ ৫৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্য আমরা বন্ধ করতে পারছি না, সেখানে ইউজিসির চেয়ারম্যান আরো ৮৫টি আবেদন চূড়ান্ত করেন কীভাবে? তাহলে কী ধরে নেবো 'শর্ষের মধ্যে ভূত' আছে! শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও ইউজিসির সদস্য থাকার সুবাদে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আমি বিরোধিতা করছি। কেননা এতে করে একদিকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে 'মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের' বিস্ফোরণ ঘটবে, যারা এক সময় 'মামা-খালুর' জোরে কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনের উচ্চ পদগুলো দখল করবে এবং আমরা পরিণত হব একটি মেধাশূন্য জাতিতে। কারা সেখানে শিক্ষক হবেন, এটা কী বিবেচনায় নিয়েছেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী? কারা বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য হয়েছেন এবং আগামীতে হবেন, তা কি আপনার অজানা মাননীয় মন্ত্রী? বিদেশি দূতাবাসে কাজ করা ব্যক্তি এখন উপাচার্য, নামের আগে অবৈধভাবে 'অধ্যাপক' লেখেন, আপনার মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে কী করণীয় কিছু নেই? না, আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নই (প্রয়োজনে আমি বিনা সম্মানীতে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে সাহায্য করতে রাজি আছি)। কিন্তু শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আমি 'কমপ্রোমাইজ' করতে রাজি নই। হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটকে বিশ্বের 'জব মার্কেটে' নিয়ে যেতে হলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই। আজ প্রায় ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সরকারি ও বেসরকারি) সঙ্গে কলেজের কোনো পার্থক্য আমি খুঁজে পাই না। সবগুলোতে বিবিএ চালু হয়েছে (এটা ভালো 'ব্যবসা'। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ 'ব্যবসা' ধরেছে)। বাংলায় পড়ানো হয় বিবিএ। নোট তৈরি করে দেন 'স্যাররা'। ক্লাসে উপস্থিত থাকার বালাই নেই। উপস্থিত থাকলেও, নোট বই খুলে লেখায় কোনো কারণ নেই। আর গ্রেডিং পান সর্বোচ্চ (আমাদের রাষ্ট্রপতি, যিনি চ্যান্সেলর, তিনি 'গোল্ড মেডেল'ও দেন তাদের)। আর ওইসব 'গোল্ড মেডেল'ধারীদের একজনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাননি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে শিক্ষার মান আজ কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, করপোরেট হাউসগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা জানেন। আগে বাংলায় পাস করেও ব্যাংকে চাকরি পাওয়া যেত। এখন বাংলার জায়গা দখল করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা। বেতন পনের হাজারেরও নিচে (আমাদের জামানায় আইপিএর এমবিএ'র সূচনা বেতন ছিল প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো, সেই আশির দশকে)। করপোরেট হাউসগুলো শোষণ করছে। আর এর ক্ষেত্র তৈরি করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেহেতু আবেদনকারীদের মধ্যে থেকে কাউকে কাউকে অনুমোদন দিতে হবে, সে ক্ষেত্রে কতগুলো নীতি অনুসরণ করা যায়। এক. সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিতে হবে তাদের শিক্ষার কারিকুলাম সীমাবদ্ধ থাকবে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর বাইরে কোনো বিষয়ের জন্য তারা ভবিষ্যতে আবেদন করতে পারবে না। দুই. একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় একেকটি বিষয় নিয়ে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পাবে। এক গাদা বিষয়ে তারা ছাত্র ভর্তি করাতে পারবে না। তিন. ফার্মেসি, আইটি, গার্মেন্ট, মেরিন সাইন্স, বিদেশি ভাষা, জাহাজ নির্মাণ প্রকৌশল, জিন প্রযুক্তি, অটো মেকানিকস্ কৃষি প্রযুক্তি তথা কৃষি বিজ্ঞান, নার্সিং, পরিবেশ, মহাশূন্য ইত্যাদি বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থেকে তিন চারটি বিষয় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারে। ফার্মেসি, গার্মেন্ট, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আমাদের মান আন্তর্জাতিকসম্পন্ন এবং আমরা একটি নেতৃত্বের আসনে রয়েছি। অন্যদিকে নার্সিং খাত, মেরিন সায়েন্স ও সাগর বিজ্ঞান, পরিবেশ ও কৃষি একটি অগ্রাধিকার খাত। বিদেশে প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং এসব ফিল্ডে আমরা প্রচুর জনশক্তি রপ্তানি করতে পারবো। এ জন্য বিদেশি ভাষা নির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত শিল্পে অন্যত্র রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যেতে পারে। আমি অবশ্যই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চাই। সেই সঙ্গে চাই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখাও এ দেশে আসুক। তাতে ক্ষতি কি? মালয়েশিয়াতে দেখেছি অনেক অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা সেখানে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে শিক্ষকরা এসেই পড়ান। ভারতে বেশক'টি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের গ্র্যাজুয়েটদের নাম বিশ্বব্যাপী। আমি চাই ওই সব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শাখা বাংলাদেশে স্থাপন করুক। এর ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কেননা এখন যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের একাডেমিক মানের চাইতে রাজনৈতিক আনুগত্যটাই অনেক বেশি। ফলে গবেষণা ও শিক্ষকতার চাইতে 'দলবাজি' করা তাদের প্রধান ও একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়বেই। অধ্যাপক আজাদ চৌধুরী একজন প-িত ব্যক্তি। তিনি 'রাজনীতি' করেন বটে, কিন্তু একাডেমিক পিউরিটি'র ব্যাপারে কোনোদিন 'কমপ্রোমাইজ' করেননি। অধ্যাপক মহব্বত খান এ দেশের শীর্ষস্থানীয় প-িত ব্যক্তি। আমার শিক্ষক তিনি। আমি মঞ্জুরি কমিশনে যে চেয়ারটি ছেড়ে এসেছি, সেই চেয়ারেই বসছেন আমার শিক্ষক অধ্যাপক মহব্বত খান, যাকে নিয়ে আমি গর্ব করি। অধ্যাপক খান শিক্ষক জীবনে শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে কোনো 'কমপ্রোমাইজ' করেননি। এই দুই প-িত ব্যক্তির কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমতি দেবে কী দেবে না, এটা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। ইউজিসি যে কাজগুলো করতে পারে, তা অনেকটা এরকম : ১. অবিলম্বে অ্যাক্সিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা, যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নির্ধারণ করে রেটিং করবে; ২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের 'ডাটাবেজ' তৈরি করা; ৩. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের পিএইচডির সম্মানি নির্ণয় করা (এ কাজটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হয়ে ইউজিসি করে যে কোনো বিদেশি ডিগ্রির ক্ষেত্রে); ৪. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ তথা পদোন্নতির জন্য একটা নীতিমালা তৈরি করা; ৫. উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানকে অগ্রাধিকার দেয়া; ৬. বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা; ৭. নিয়মিত মনিটর করা; ৮. ইউজিসির টিম দিয়ে আর্থিক আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখা; ৯. শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা; ১০. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা ইত্যাদি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে যুগের চাহিদা। কিন্তু তার অর্থ এই নয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদেরকে 'সার্টিফিকেটসর্বস্ব' জাতিতে পরিণত করবে। ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রি তৈরি করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যাবে না। কলেজ শিক্ষক দিয়ে কলেজ চালানো যায়, বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায় না। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে নজরদারি বাড়ানোটা জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমতি দেয়া প্রয়োজন। ড। তারেক শামসুর রেহমান: প্রফেসর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য ঃংৎধযসধহনফ@ুধযড়ড়।পড়স
http://www.jjdin.com/?view=details&archiev=yes&arch_date=20-2-2012&type=main&cat_id=1&menu_id=19