রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বাংলাদেশের জনপ্রশাসনঃ বর্তমান প্রেক্ষিত

একটি দক্ষ, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির  পূর্বশর্ত। জনপ্রশাসন যদি দক্ষ না হয়, যদি রাজনৈতিক ভাবে নিরপেক্ষ না থাকতে পারে এবং দুর্নীতি মুক্ত না থাকে তাহলে দেশকে একটি শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড় করানো যায় না। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা হচ্ছেন রাষ্ট্রের প্রাণ। রাজনীতিবিদরা নীতিনির্ধারন করবেন আর জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা সেই নীতি বাস্তবায়ন করবেন। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে তাই নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনের গুরুত্ব অনেক বেশী। বিশ্বায়নের এই যুগে জনপ্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে  প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব।
বাংলাদেশে যে প্রশাসন তার কাঠামো মূলত বৃটিশ শাসন ও পরবর্তীকালে পাকিস্তান শাসনামলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বেশ কটি কমিশন গঠন করা হলেও জনপ্রশাসনের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রশাসনের অদক্ষতা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর কারন মূলত একটিই। আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি প্রদান [নয়া দিগন্ত, ২৩/০২/২০১২]। ঢালাও এই পদোন্নতির ফলে অনেক অযোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি পাচ্ছেন এবং যোগ্যদের বিবেচনায় নেয়া হচ্ছেনা। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের অভাবের ফলে [যুগান্তর , ২৩/০৯/২০১১] জনপ্রশাসনে কাজের গতি আসছেনা এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ছে। ঢালাও পদোন্নতির ফলে জনপ্রশাসনে সৃষ্টি হয়েছে বিশৃংখলা [আমার দেশ, ২৭/০২/২০১২]।  গত ৮ ফেব্র“য়ারী জনপ্রশাসনে কেন্দ্রীয় স্ত¬¬¬রে বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব পদে ১২৭, যুগ্ম সচিব পদে ২৬৪ এবং উপ সচিব পদে ২৫৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। মোট পদোন্নতি পেয়েছেন ৬৮১ জন। এছাড়া লিয়েনে এবং বিদেশে প্রশিক্ষনরত ২৮ জন যোগ করলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০৯ জন। এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে বিদ্যমান বিধি-বিধানের অপব্যবহারের মাধ্যমে অশুভ নীল নকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে [নয়া দিগন্ত, ১০/০২/২০১২]। দুঃখজনক হচ্ছে এটা করতে গিয়ে ৭০০ এর অধিক জ্যেষ্ঠ ও পদোন্নতি যোগ্য কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই ৮ ফেব্র“য়ারীকে অনেকে কালো দিবস হিসেবে অভিহিত করেছেন [নয়া দিগন্ত,১০/০২/২০১২]। যে অভিযোগটি গুরুতর তা হচ্ছে পিএসসি এর মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া বহু কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অভিযোগটি উঠেছে যারা পদোন্নতি পেয়েছেন, তারা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারী [নয়া দিগন্ত, ১০/০২/২০১২]। পদোন্নতির জন্য আবশ্যক সিনিয়র ষ্টাফ কোর্স এবং উচ্চতর প্রশাসনিক ও উন্নয়ন বিষয়ক কোর্স সম্পন্ন না করেই এবং অনেকে এসিআর জালিয়াতিসহ সততা ও সুনামের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন। কেউ কেউ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  একটি ডিগ্রীর সনদ ‘ক্রয়’ করে তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেছেন। অথচ ঐসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। একটি জাতীয় সংবাদ পত্রের প্রতিবেদনে [নয়া দিগন্ত, ১০/০২/২০১২] উল্লেখ করা হয়েছে যে ধর্মীয় অনুশাসন পালনে একনিষ্ঠ, দাঁড়ি, টুপি বা হিজাব পরিধানকারী কর্মকর্তারাও ঢালাওভাবে বাদ পড়েছেন। দুঃখজনক হচ্ছে উপ সচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদোন্নতি নীতিমালা ২০১২ এর ৪ (২) খ অনুচ্ছেদ নতুন করে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনাকে সামনে রেখেই ৪ (২) খ অনুচ্ছেদটি অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এর ফলে জনপ্রশাসনে পদোন্নতিতে কর্মকর্তার প্রথম নিয়োগকাল থেকে সার্বিক কার্যক্রম ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার।
জনপ্রশাসনে এভাবে  ঢালাও পদোন্নতি, যা কী না সুনামি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তা আমাদের দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করছে। যোগ্য ও মেধাবি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বাদ দেয়া, পদের চেয়ে দ্বিগুণ/ত্রিগুণ কর্মকর্তার পদোন্নতি [আমার দেশ, ২৬/০২/২০১২], কিংবা যোগ্য কর্মকর্তাদেরকে ওএসডি করা জনপ্রশাসনের জন্য কোন সুস্থ লক্ষণ নয়। জনপ্রশাসনে যে সব কর্মকর্তাকে ওএসডি হিসেবে রাখা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন একটি সার্কুলার দিয়ে তাদের ট্রেনিং, বিদেশ ভ্রমন ও লিয়েন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যারা সংযুক্তিতে আছেন, তারাও বৈধ সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যাদেরকে ন্যস্ত রাখা হয়েছে, তারা বেতনও পাচ্ছেন না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় গত ফেব্র“য়ারী, ২০১২ পর্যন্ত ওএসডি হিসাবে কর্মরত ছিলেন ৮৩৫ জন, আর গত তিনবছর ধরে আছেন ১২৩ জন [আমার দেশ, ২২/০২/২০১২]। দুঃখজনক হলেও সত্য, গেল আড়াই বছরে ওএসডি অবস্থায়  পিআরএল-এ গেছেন ২২৭ জন কর্মকর্তা। কর্মহীন অবস্থায় পিআরএল-এ যাওয়ায় সহকর্মীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার সুযোগ তারা পাননি। সারা জীবন যিনি জাতির জন্য, রাষ্ট্রের জন্য শ্রম দিলেন, মেধা দিলেন, তাকে বাধ্য করা হল পিআরএল-এ যেতে ওএসডি থাকা অবস্থাতেই। জনপ্রশাসনের জন্য এ ধরনের প্রবণতা কোন মঙ্গল বয়ে আনবেনা। বর্তমান সরকারের গত সাড়ে তিন বছরে দেশের বিভিন্নস্থানে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসক সহ জনপ্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে পাবনার জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তাবৃন্দ, টেকনাফ উপজেলার ইউএনও, কুমারখালি উপজেলা ইউএনও, বাগেরহাট, বাঘা, বিরল উপজেলার ইউএনও গন রাজনৈতিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। রাজনৈতিক চাপে তারা জনগনকে প্রকৃত সেবা দিতে পারছেন না। এর ফলে জনগন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি কোন কোন স্থানে স্থানীয় ক্ষমতাসীনরা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন, সেখানে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়নে সমস্যা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বাড়ছে দূর্নীতি। এবং সেই সাথে জনস্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না।
ইতোমধ্যে সচিবদের মধ্যে ৮টি সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করে এক তুঘলকি কান্ড ঘটানো হয়েছে  জনপ্রশাসনে। প্রায়শই জনগন সিনিয়র সচিব আর সিনিয়র সহকারী সচিব পদকে গুলিয়ে ফেলছে। পুলিশের মহাপরিদর্শককে সিনিয়র সচিব পদমর্যদা দেয়া হয়। তদুপরী পুলিশ বিভাগে একাধিক আইজিপি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।  এই সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি কিংবা পুলিশ বিভাগের জন্য সচিব পদমর্যাদার একাধিক আইজপি পদ সৃষ্টি জনপ্রশাসনে শৃংখলা ও কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য আদৌ করা হয়নি। বরং বিশেষ ব্যক্তিকে খুশি করা, একইসঙ্গে একটি বিশেষ গোষ্ঠিকে দিয়ে সুবিধা আদায় করার নিমিত্ত করা হয়েছে।
পুলিশ বিভাগ এখন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। অভিযোগ আছে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে যে ঢাকা শহরে যতগুলো থানা সৃষ্টি করা হয়েছে, সেখানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মূলত ২টি জেলার লোক। গোপালগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের পুলিশ কর্মকর্তাদের এসব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মাঝে আবার শতকরা ৮০ ভাগ কর্মকর্তা শুধুমাত্র গোপালগঞ্জের অধিবাসী। এর ফলে পুলিশ বিভাগের মত একটি গুরুত্বপূর্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা একটি বিশেষ জেলা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যার ফলে জনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে দূর্নীতি বাড়ছে-আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। অভিযোগ উঠেছে পুলিশ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। অতিসম্প্রতি নরসিংদীতে পুলিশ কর্তৃক বিচারক নিগৃহীতকরণ, ফেণীতে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটকে নিগৃহীতকরণ এবং শেরেবাংলা নগরে ফ্রাংকেনস্টাইন কায়দায় চিফহুইপের উপর আক্রমন থেকে স্পষ্ট যে পুলিশ বাহিনী দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করছে। অথচ পুলিশের স্বাভাবিক কাজ অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বিচারের কাজের সহায়তা করা। আর এ কাজটিতে গত সাড়ে তিন বছরে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। যেমন সাভারে ছয় ছাত্র হত্যা, সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা খুন, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যা, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা ইত্যাদি সহ অসংখ্য গুম ও হত্যা মামলায় পুলিশের ভূমিকায় জনমনে প্রশ্ন জেগেছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যে সব সচিব রয়েছেন, তাদের প্রায় অনেকেই ১৯৯৬ সালে  “জনতার মঞ্চ” এর সাথে জড়িত ছিলেন। এমনকি যিনি বারো বছর জনপ্রশাসন থেকে দূরে ছিলেন, তাকেও বর্তমান সরকার পদোন্নতি দিয়ে পরপর দুটি গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন করেছেন। সেই “জনতার মঞ্চ”এর সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ক্ষমতাধর সচিব এখন জনপ্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদেরকে প্রশাসনে রাখার জন্য চাকুরীর মেয়াদ হঠাৎ করে দুবছর বাড়ানো হয়েছে।  সাম্প্রতিক সময়ে পিএসসি কর্তৃক যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যারা পিএসসির সদস্য ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারী। এমনকি বর্তমানে যিনি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। অন্য সদস্যরা কেউ কেউ মন্ত্রী/এমপিদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ফলে সংগত কারনেই তাদের ভূমিকা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিতর্কিত হয়েছে। পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে গত সাড়ে তিনবছরে পুলিশ বিভাগে যারা এএসপি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তারা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
এখানে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে জনপ্রশাসন পরিচালনায় তার কোন সুনির্দিষ্ট আইন নেই। শুধুমাত্র বিধিমালা  দিয়েই চলছে গত ৪১ বছর  [ডেসটিনি, ১৭ এপ্রিল ২০১২]। শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদোন্নতির স্বার্থেই কোন আইন করা হয়নি। এখানে অভিযোগ উঠেছে যে আইন প্রনয়ন না হওয়ায়, সংবিধানের শুধু ১৩৩ অনুচ্ছেদই নয়, সংবিধানের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের নির্দেশনাও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
গত সাড়ে তিনবছরে  একের পর এক এডহক ভিত্তিতে আইন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সুনির্দিষ্ট আইন করা সম্ভব হয় নি। বর্তমান সরকারের সময় আছে মাত্র দেড় বছর। এ সময়ে সীমায় তাদের পক্ষে কোন আইন করাও সম্ভব হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে  ঈরারষ ঝবৎারপব অপঃ ২০১০ নামে একটি আইন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। পরে সরকারের উদ্যোগে এড়াঃ. ঊসঢ়ষড়ুববং অপঃ ২০১২    প্রস্তাব করা হয়। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি একচিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন সচিবালয়ের সব নিয়োগ হবে রাজনৈতিক বিবেচনায় [যুগান্তর, ৪ জুলাই, ২০১২]। তিনি আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করছেন। এটা অর্থমন্ত্রীর মস্তিস্কপ্রসূত। এর ফলে সচিবালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এটা সুস্থ প্রশাসনের জন্য কোন ভালো লক্ষন নয়। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বৃটিশ কাঠামো পেয়েছি। কিন্তু উপমহাদেশের কোন দেশে বিশেষ করে ভারত এমনকি মালয়েশিয়ায় কিংবা থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার মত দেশেও  জনপ্রশাসনে “আউটসোর্সিং” এর কোন সুযোগ নেই। “আউটসোর্সিং” এর নাম করে প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ, জনপ্রশাসনের উন্নয়নের জন্য প্রধান অন্তরায়। জাতীয় সংসদে সকল দলের সংসদ সদস্যগন বিশদ মতামত নিয়ে জনপ্রশাসন আইনটি প্রনীত হলে  কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলী, পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেত। এতে করে জনপ্রশাসনের উপর দলীয়করনের খড়গ অনেকাংশে কমত। বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার কালাকানুন থাকত নাÑমেধাবি কর্মকর্তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারতেন।
সম্প্রতি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দৃষ্টে দেখা যায় যে, দূর্নীতির কারনে বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋন চুক্তি বাতিল করা হয়। সেতু বিভাগ ও প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে দোষারুপ করা হয়েছে। তেমনি ভাবে রেলওয়ের নিয়োগবানিজ্যে কর্মকর্তাগনের সাথে মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রীকেও দায়ী করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে রাজনৈতিক বিবেচনায় গণনিয়োগে সাফল্য প্রদর্শনকারী একজন কনিষ্ঠ অতিরিক্ত সচিবকে পুরষ্কারস্বরূপ প্রায় শতাধিক কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে প্রথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অনুরুপ রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমের জন্য।
প্রায়শই জনগন ফুঁসে উঠছে সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উপর যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, সিটি কর্পোরেশন থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগকৃতের দৌরাত্ম্যের কারণে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন কি বিদেশে যেসব শ্রমিক হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মাধ্যমে কষ্টার্জিত বৈদিশিক মূদ্রা অর্জন করছেন তারাও আমাদের দূতাবাস সমূহ থেকে সময় মত সেবা পাচ্ছেনা। যতই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখাইনা কেন বাস্তবে দুর্বৃত্তায়ণের কারণে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে অনেক দূরে।    
একটি দেশ ও সরকারের মস্তিষ্ক হল জনপ্রশাসন। এই জনপ্রশাসনে যোগ্য লোকের দরকার। অযোগ্য, অদক্ষ ও মেধাহীন কর্মকর্তারা দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি পাওয়ার ফলে তারা নেগোসিয়েশন (দর কষাকষি)-এ কোন যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারছে না। ফলে তারা বিদেশে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এজন্য দরকার জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে সঠিক পদে পদায়নকরণ। এটা করা হলে প্রশাসনে অধিকতর গতিশীলতা আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া আন্তঃক্যাডার কলহ,  বদলি আতংক, পদায়ন বৈষম্য ইত্যাদি উপসর্গ দূর করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যদি দূর করা না যায়, তা হলে সেই প্রশাসন দিয়ে জাতির কোন মঙ্গল প্রত্যাশা করা যায় না।    




যুক্তরাষ্ট্রের বার্তার মর্মার্থ

ড্যান মজিনা ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। গত ১০ জুলাই প্রেস ক্লাবের \'মিট দ্য প্রেস\' অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। আমার বিবেচনায় ওই মন্তব্যের একটি নেতিবাচক দিক আছে। তিনি বলেছিলেন, \'এ দেশের পণ্য কিনতে মার্কিন ক্রেতারা ঝুঁকি না-ও নিতে পারেন।\' এই বক্তব্যটি আসলে এমন একটি সময়ে যখন পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। সরকার এখন চেষ্টা করছে এডিবি, আইডিবি কিংবা জাইকা থেকে এই ফান্ড জোগাড় করতে। কিন্তু কাজটি খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের কারণে অন্য দাতা সংস্থাগুলো আগ্রহী হবে বলেও মনে হয় না। সরকার এরই মাঝে আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বিশ্বব্যাংকের কাছে আর ধরনা তারা দেবে না। গত ৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় একটি সিদ্ধান্তও হয়েছে যে পদ্মা সেতু সরকার নিজেই করবে।

সরকার যদি নিজেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করে, এর প্রতিক্রিয়া, ৩৫ প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু আমি গুরুত্ব দিতে চাই ড্যান মজিনার বক্তব্যটিতে। যেখানে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে যেতে পারে(?)। এই বক্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বক্তব্য নয়। এটি রাষ্ট্রদূত মজিনার উপলব্ধি। তিনি দু\'সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে সম্প্রতি ঢাকায় ফিরে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই দু\'সপ্তাহে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, পেন্টাগন, মার্কিন কংগ্রেস ছাড়াও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসব কথাবার্তা থেকে তার মনে হয়েছে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপারে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা তথা ব্যবসায়ীরা একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর বাংলাদেশি পণ্য মানেই তো তৈরি পোশাক। সেই তৈরি পোশাক রফতানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার কী প্রতিক্রিয়া হবে আমরা কি তা আদৌ ভেবে দেখেছি? শুধু বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিলের কারণেই যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতায় কিছুটা দাগ লেগেছে, তা নয়। বরং শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর \'গুম\' হয়ে যাওয়ার ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ ইত্যাদি নানা কারণে মাঝে মধ্যেই দু\'দেশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ওপরে রয়েছে ড. ইউনূস ইস্যুটি।

যদিও মজিনা বলেছেন, \'পদ্মা সেতুর ঘটনায় ইউনূসের হাত নেই।\' এটাই সত্য এবং বাস্তব। কিন্তু ড. ইউনূসের আরেক \'বন্ধু\' রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তাদের অনেকেই গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. ইউনূসের অপসারণে খুশি হননি। খোদ হিলারি ক্লিনটনও অখুশি। ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই সংবাদটি যে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে পেঁৗছে গেছে এটা স্বাভাবিক। হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরের সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিনি সময় বের করতে পারেননি। কিন্তু ঠিকই ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এর মধ্যে দিয়ে তিনি একটি মেসেজ দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা ওই মেসেজটি বুঝতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। ঢাকা সফরে হিলারি ক্লিনটন ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধান ও গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। এরপর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। আজও ইলিয়াস আলী ফিরে আসেননি। তিনি মৃত, কি বেঁচে আছেন, আমরা কেউ তা জানি না। রাষ্ট্রের এতগুলো এজেন্সি তার অন্তর্ধান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারবে না_ এটা আশা করা যায় না। ঠিক তেমনি শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে কারা হত্যা করল, তা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানবে না, তা তো হতে পারে না। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ভূমিকা তাদের আরও বিতর্কিত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হলেও তাতে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন চিন্তা-চেতনার জন্ম হয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে। ক্লিনটনের সফরের সময় একটি \'অংশীদারি সংলাপ\' চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার বিস্তারিত আমরা কিছুই জানি না। অভিযোগ আছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ঘিরে ফেলার যে স্ট্র্যাটেজি রচনা করছে, তাতে এই চুক্তি একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত \'আকসা\' চুক্তি নিয়েও কথা আছে। \'আকসা\' চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রস্তাবিত এই চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রাবিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ বিভিন্ন সুবিধার জন্য \'পোর্ট অব কল\' সুবিধা পাবে। এই চুক্তি নিয়েও কথা আছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তি বাংলাদেশে মার্কিন ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনও চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়নি।

এর আগে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের যে সুযোগ চেয়েছিল তা পায়নি। বাংলাদেশকে তার তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে যে শুল্ক দিতে হয়, তাতে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারছি না। অথচ এলএসডির দেশ হিসেবে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ আমাদের পাওয়ার কথা। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য সংস্থা \'মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন\' থেকে বাংলাদেশ কোনো সাহায্য পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে হিলারি ক্লিনটনের সফরের সময় কোনো বক্তব্য বা সহযোগিতার আশ্বাসও আমরা পাইনি। ঢাকায় হিলারি ক্লিনটন \'গণতন্ত্রের জন্য সংলাপ\' ও \'পার্লামেন্টারি ডিবেট\'-এর কথা বলেছিলেন। এগুলো হচ্ছে তত্ত্বের কথা। আমরা সবাই জানি, গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখাটা যে জরুরি_ এ কথাটা আমরা বারবার বলে আসছি। কিন্তু এই \'সংলাপ\' বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি \'সংসদীয় ডিবেট\'ও তেমন কার্যকর নয় বাংলাদেশে। হিলারি ক্লিনটনের মুখ থেকে এ কথাটা বেরিয়ে এসেছিল সত্য, কিন্তু আদৌ \'সংলাপ\' অনুষ্ঠিত হবে_ এ আস্থাটা রাখতে পারছি না।

হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল_ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের \'নাক গলানো\'। ভারত কিংবা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এমনটা করে না। আমরা তেমন একটা \'ক্ষেত্র\' তৈরি করেছি, যেখানে বিদেশিরা আমাদের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় মন্তব্য করছে। ড্যান মজিনাও বললেন। আমরা একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করেছি। যাতে বিদেশিরা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটাচ্ছে। সরকার যদি আরও সতর্ক হতো, আমার বিশ্বাস তারা এ ধরনের মন্তব্য করতে সাহস পেত না।

পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে অনেকের আবেগ জড়িত। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সুতরাং যেভাবেই হোক সরকারকে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে হবে। নিজস্ব অর্থায়নে কাজটি করা সম্ভব। কিন্তু তাতে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হবে। সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। সর্বোপরি দুর্নীতির প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে তখন। যারা বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা জানেন বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল বিশ্বে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এ সংক্রান্ত অনেক গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে একটি প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুললে, ছলে-বলে-কৌশলে বাকি প্রকল্পগুলোও আটকে দেয় বিশ্বব্যাংক। আজ সে রকম একটি পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। তাদের এই সিদ্ধান্তে অন্যরাও প্রভাবিত হবে।

ড্যান মজিনার মন্তব্যে আমি একটি অন্য গন্ধ পাচ্ছি। মার্কিন আইন প্রণেতারা যদি সত্যি সত্যিই সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কোনো আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেন, তাহলে তা আমাদের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। তাই বাস্তবমুখী হওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা এই বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়নের কথাই বলি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া এখনও সম্ভব। উন্নয়নশীল বিশ্বে পুঁজি বিনিয়োগ করেই বিশ্বব্যাংক টিকে আছে। এটাই তাদের ব্যবসা। উন্নয়নশীল বিশ্বে সাহায্য না দিলে বিশ্বব্যাংক তার অস্তিত্ব নিয়ে হুমকির মুখে থাকবে। তাই অর্থায়নের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী পুনর্বিবেচনার যে কথা বলেছেন, সরকার এই নীতিটি গ্রহণ করলে ভালো করবে।

Daily SAMAKAL

15.7.12

তৃতীয় শক্তি’ রাজনীতিতে কী অবদান রাখবে?



রাজনীতিতে এখন আলোচনার বিষয় একটিÑ আর তা হচ্ছে তথাকথিত ‘তৃতীয় শক্তি’। গত ৭ জুন নাগরিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত একটি সেমিনারে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান জরুরি। বিষয়টি নতুন নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ৫-৬ বছর ধরে এই তৃতীয় শক্তির কথা বারবার বলা হচ্ছে। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ার একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সাধারণ মানুষের মাঝে আদৌ কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। একটি ‘কিংস পার্টি’কে লাইমলাইটে আনার উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছিল। এই তৃতীয় শক্তি হচ্ছে প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্বকারী দুটি বড় দলের দুই নেত্রীকে গৃহবন্দি করা হলেও দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের পক্ষেই দাঁড়িয়ে গেছে। কোন তৃতীয় শক্তি গড়ে ওঠেনি উচ্চ পর্যায় থেকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও।
দশম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আবারও উত্থাপন করা হয়েছে তৃতীয় শক্তির বক্তব্যটি। এখনও নির্বাচনের বাকি আছে দেড় বছর। দেড় বছর আগেই এ প্রশ্নটি কেন তোলা হল, এটা ভাববার বিষয়। এর সঙ্গে অনেক প্রশ্ন জড়িত। এ বক্তব্যকে হালকাভাবে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রথমত, তৃতীয় শক্তির ডাক যারা দিয়েছেন, তাদের মাঝে একজন বাদে বাকিদের জনগণের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না মূলত রাজনৈতিক শক্তি। বাকিরা অরাজনৈতিক। জনাব মান্না নিজে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল থেকে টিকিটও পেয়েছিলেন। কিন্তু বিজয়ী হতে পারেননি। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেছেনÑ এমন তথ্যও আমাদের কাছে নেই। ডিসিসি নির্বাচনে নিজের প্রার্থীপদ তিনি নিজেই ঘোষণা করেছিলেন। ডিসিসি নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন নাগরিক ঐক্য, নাগরিক উদ্যোগ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর আগে তিনি ব্যারিস্টার রফিক উল হককে সঙ্গে নিয়ে অপর আরেকটি সংগঠন করেছিলেন। এই সংগঠনটির অবলুপ্তি ঘটিয়ে তিনি নাগরিক ঐক্য গঠন করেছেন কিনা, সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়œ। নাগরিক ঐক্যের কোন সাংগঠনিক কাঠামো নেই। সংবিধান নেই। কর্মসূচি নেই। কিন্তু তিনি যখন বলেন, তিনি তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেবেন, তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যে অনুষ্ঠানে তিনি তৃতীয় শক্তি গড়ার কথা ঘোষণা করেছেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন দু’জন নামি ব্যক্তিÑ সাবেক আমলা এম হাফিজউদ্দিন খান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল। হাফিজ সাহেব মন্তব্য করেছেন, ‘তৃতীয় শক্তির উত্থান জরুরি’। একজন আমলা, আজীবন যিনি ব্যস্ত ছিলেন সরকারের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে, তিনি কিভাবে উপলব্ধি করলেন যে তৃতীয় শক্তির উত্থান জরুরি? আজীবন তো চাকরি করে গেছেন তিনি। জনসাধারণের সমস্যা সম্পর্কে যিনি আদৌ কোন ধারণা রাখেননি কোনদিন, তিনি কিভাবে উপলব্ধি করলেন বড় দুই শক্তি ব্যর্থ হয়েছে(?), এখন তৃতীয় একটি শক্তি দরকার। আমলা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কারও সঙ্গেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের কোন সম্পর্ক নেই। কোনদিন তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় তারা আদৌ গিয়েছিলেন কিনা, তাতে আমার সন্দেহ রয়েছে। এখন তারাই বললেন, তারা তিনশ’ সিটে প্রার্থী দেবেন। সাধারণ মানুষ কি এটা সহজভাবে নেবে? নেবে না।
দ্বিতীয়ত, এটা সত্য, মহাজোটের অবস্থা আদৌ ভালো নয়। এটা বুঝেই মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। আর এরশাদ সাহেব বারবার বলছেন, তারা এককভাবে নির্বাচন করবেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান মোটামুটি ভালো। এখন এই জনসমর্থনকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্যই কি তৃতীয় শক্তির কথা বলা হচ্ছে? কোন ‘মহল’ থেকে কি তৃতীয় শক্তির জš§ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
তৃতীয়ত, আমরা যদি বিগত ৮টি সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব ভোটপ্রাপ্তি তথা আসনপ্রাপ্তির দিক থেকে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ও জামায়াতে ইসলামী যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। এই দুটি দলের পক্ষ থেকে যদি তৃতীয় শক্তির ডাক দেয়া হতো, তার পেছনে যুক্তি থাকত। কিন্তু এই দল দুটি তা করেনি। এদের বাইরে গিয়ে যারা তৃতীয় শক্তির ডাক দিলেন, রাজনীতিতে ভোটের ইতিহাসে তাদের অবস্থান ‘শূন্য’।
তৃতীয় শক্তির কথা বলা আসলে ভাঁওতাবাজি। সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ ও বিদ্বেষ, তাকে অন্যদিকে ধাবিত করার একটি ব্যর্থ উদ্যোগ এটি। আরও একটি কথা এখানে লক্ষ্য করার বিষয়। আর তা হচ্ছে দাতাগোষ্ঠী, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। পাকিস্তানে তথাকথিত দুর্নীতির কথা বলে সেখানে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানকে মার্কিনি ও ইহুদি ‘লবি’ তুলে এনেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষের দিকে পাকিস্তানে নির্বাচন হবে এবং সবকিছু ঠিকমতো চললে ইমরান খান হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী(?)। ভারতে আন্না হাজারেকে দিয়েও যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। এখন বাংলাদেশে ‘একজন ইমরান খানে’র খুব প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের। পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক তথা দাতাগোষ্ঠীর একটি ‘বিরোধ’ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সরাসরি দুর্নীতির প্রশ্ন তুলেছে। এই ‘দুর্নীতি’র ইস্যুটি বিশ্বব্যাংক তথা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুব জনপ্রিয় একটি শব্দ। এটা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বে সরকার পরিবর্তন করায়। পাকিস্তানে তারা ইমরান খানকে সামনে নিয়ে এসেছে। মিসরে ‘আরব বসন্তে’ দুর্নীতির বিষয়টি ছিল মুখ্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা মিসরে আরব বসন্তকে সংঘটিত করেছিল তাদের নেতৃত্ব সারির অনেকেই ওয়াশিংটনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এখন মিসরে পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতন্ত্র বিনির্মাণে তরুণ সমাজ, সুশীল সমাজকে ‘প্রমোট’ করে। পাঠক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করুন। হিলারি ক্লিনটন তৃতীয় বা চতুর্থ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দেখা না করলেও তরুণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় তরুণদের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। এখন যারা নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে সংগঠিত হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তেমন একটা নেই। তারা মূলত সুশীল সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। সঙ্গত কারণেই যে আশংকা থেকে যায়, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যে সুশীল সমাজকে ‘প্রমোট’ করছে, তারাই কি নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে সংগঠিত হচ্ছে?
এই তথাকথিত তৃতীয় শক্তি নিয়ে দুটি বড় দল আবার পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করেছে। গত ২২ জুন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি তৃতীয় শক্তির উত্থান চাইছে। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর একদিন আগে বলেছেন, বিএনপি কোন তৃতীয় শক্তিকে সমর্থন করে না। তবে নাগরিক ঐক্য যদি একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আÍপ্রকাশ করে, তাহলে তারা দল হিসেবে এটাকে সমর্থন করবেন। যাকে কেন্দ্র করে এই নাগরিক ঐক্য বা তৃতীয় শক্তি, সেই মাহমুদুর রহমান মান্না সাপ্তাহিক ২০০০-এ লিখেছেন, জনগণ দুটো বড় দলের কাছে জিম্মি। জনগণের কথা শুনছে না এই দল দুটি। কিন্তু জনগণকে ওই দল দুটির কথা শুনতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, এই দল দুটো জনগণের কথা না শুনলে তৃতীয় শক্তির অভ্যুদয় ঘটবেই। তিনি বড় দল দুটোর নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন প্রত্যাশা করেছেন। একজন মান্না কি এই তৃতীয় শক্তির প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? জনাব মান্নার রাজনীতি স্বচ্ছ নয়। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও মূলধারার আওয়ামী লীগার নন। এক সময় জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। কিন্তু নেত্রীর কাছাকাছি যেতে পারেননি। সংস্কারবাদী হিসেবে তার একটা পরিচিতি আছে। এই পরিচয় এবং বিভিন্ন টক-শোতে স্পষ্ট বক্তব্য রাখার কারণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না বলে অনেকের ধারণা। এ কারণেই তিনি নাগরিক ঐক্যের জš§ দিলেন।
নাগরিক ঐক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন তৃতীয় ধারার সূচনা করতে পারবে না। তাদের কোন সুস্পষ্ট দিকদর্শনও নেই। তারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। সুশীল সমাজকে দিয়ে রাজনীতি হয় না, অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি সম্ভব নয়। সুশীল সমাজের সঙ্গে যারা আছেন, তারা যদি রাজনীতিতে অবদান রাখতে চান, সেটা নিঃসন্দেহে একটা ভালো দিক। রাজনীতি করতে হলে তাদের মূলধারার রাজনীতিতে আসতে হবে। মূলধারার বাইরে গিয়ে কেউ অতীতে কোন সুবিধা করতে পারেননি। ড. ইউনূস কিংবা ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্ব এখন শুধু সংবাদপত্রের পাতাতেই আছেন। অধ্যাপক ইউনূস চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি। রাজনীতি একটা ভিন্ন জিনিস। রাজনীতিকরা ভুল করতে পারেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারেনÑ এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জনগণের সঙ্গে তারাই থাকেন। সাধারণ একজন মানুষ যখন কোন সমস্যায় পড়েন, তখন তিনি ছুটে যান স্থানীয় নেতৃত্বের কাছে। তারাই তাদের আশ্রয়স্থল। ড. ইউনূস সাধারণ মানুষকে নিয়ে এখন ‘সামাজিক ব্যবসার’ কথা বলেন। কিন্তু তিনি কি আদৌ সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে কোনদিন দাঁড়িয়েছেন? একজন কামাল হোসেনের কাছে কি সাধারণ মানুষ যেতে পারে? ড. কামাল হোসেনের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তার সীমাবদ্ধতা তাকে জাতীয় নেতায় পরিণত করতে পারেনি। আজ একজন মান্নার মাঝে হতাশা কাজ করে। তার নিজের নির্বাচনী এলাকা কোনটি, এটা নিয়েও সমস্যা আছে। বগুড়াতে তিনি নির্বাচন করেছিলেন বটে, কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি আর তার নির্বাচনী এলাকায় যাননি। ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক একজন ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিজীবী এক কথা নয়। জনাব মান্না আজ যে কথাগুলো বলছেন, সেই কথাগুলো তিনি দলীয় ফোরামে বললে ভালো করতেন। এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এটা না বলে আরেকটি ‘দল’ গঠন করা, তৃতীয় শক্তির কথা বলা জনগণকে বিভ্রান্ত করার শামিল। এই তথাকথিত ‘তৃতীয় শক্তি’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদৌ কোন অবদান রাখতে পারবে না।
Daily JUGANTOR

14.7.12

প্রেসিডেন্ট মুরসি ও মিসরের ভবিষ্যৎ রাজনীতি


মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই নির্বাচনে আসলে কে জিতেছে? আর মূল ক্ষমতাই বা কার হাতে থাকবে? সবাই জানে এবং এটাই সত্য যে, ড. মোহম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি শপথও নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিসরের মূল ক্ষমতা রয়ে গেছে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিল বা 'স্ক্যাফ' (ঝঈঅঋ) এর হাতে। আর 'স্ক্যাফ' এর মূল ব্যক্তি হচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল হোসাইন তানতাবি। তানতাবি ১৯৯১ সাল থেকেই মিসরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট মুরসিকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টকে স্যালুটও করেছেন। এর মধ্য দিয়ে এটা বিশ্ববাসীকে জানান হয়েছে যে, 'স্ক্যাফ' বা সামরিক কাউন্সিল নয়া প্রেসিডেন্টকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু মিসরের বিকাশমান গণতন্ত্র নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে এবং আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে সত্যিকার অর্থেই মিসর কোন দিকে যাচ্ছে। যে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, সর্বোচ্চ সেনা পরিষদের সঙ্গে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক আগামীতে কোন পর্যায়ে উন্নীত হবে। সর্বোচ্চ সেনা পরিষদ কার্যত একটি 'সুপার কেবিনেট' হিসেবে কাজ করছে। ওই সেনা পরিষদে ১৯ জন সদস্য রয়েছেন, যারা শীর্ষ সেনা কমান্ডার। তারা অলিখিতভাবে অগাধ ক্ষমতা ভোগ করছেন। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তারা যা বলবেন, সেটাই আইন। অনেকেই জানেন সর্বোচ্চ সেনা পরিষদ মিসরের নয়া সংবিধানে সেনাবাহিনীর জন্য একটি ভূমিকা দাবি করে আসছে। এই সেনাজান্তা কিছুদিন আগে কতগুলো ডিক্রি জারি করে। ওইসব ডিক্রিতে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কমানো হয়। ডিক্রিতে বলা হয়েছে সেনা বাজেট, সেনা নেতৃত্ব কিংবা যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এমনকি খসড়া সংবিধান চূড়ান্ত করার আগে সর্বোচ্চ সেনা পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে এবং তা তিন মাসের মধ্যে গণভোটে পাস করাতে হবে। সেনা পরিষদ নির্বাচিত পার্লামেন্টকেও বাতিল ঘোষণা করেছিল। সর্বোচ্চ সেনা পরিষদের এই ভূমিকা স্পষ্টতই তাদেরকে বির্তকিত করেছে। তারা একটি সাংবিধানিক অধিকার চাচ্ছেন এবং এটা যদি স্বীকৃত হয়, তাহলে প্রশাসনে 'দ্বৈত প্রশাসনিক ক্ষমতার' জন্ম হবে। একদিকে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে থাকবে একটি প্রশাসন, যেখান একজন প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাবিনেট প্রেসিডেন্টকে সহযোগিতা করবেন। অন্যদিকে সর্বোচ্চ সেনা পরিষদের নেতৃত্বে একটি অদৃশ্যমান 'সুপার ক্যাবিনেট', যারা কোনো কোনো বিষয়ে তাদের ভেটো প্রয়োগ করবে। এই সেনা পরিষদ একটি সাংবিধানিক প্রণয়ন কমিটির নামও ঘোষণা করেছে। এর আগে নির্বাচিত সংসদ যে কমিটি গঠন করেছিল, তা সেনা পরিষদ বাতিল ঘোষণা করেছিল। এখন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কী করবেন? একদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা। মোহম্মদ মুরসির জন্য বিষয়টি যে খুব সহজ হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, মোহম্মদ মুরসি কী ইসলামের শারিয়াহ ভিত্তিক একটি সমাজ বিনির্মাণের উদ্যোগ নেবেন মিসরে? তার দল ইসলামিক ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা 'ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস' পার্টি। ইসলামিক ব্রাদারহুড একটি 'ধর্মভিত্তিক' রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে। মুরসি কী এ দিকেই মিসরকে চালিত করবেন? এই মুহূর্তে এটি স্পষ্ট নয়। তবে মুরসি অতটা কট্টরপন্থী নন। তিনি ইসলামপন্থী। তিনি ইসলাম আর গণতন্ত্রকে এক কাতারে দেখতে চান। আর এ কারণে তিনি 'ইসলামিক গণতন্ত্র' এর কথা বলছেন। সম্ভবত মিসর 'তুরস্ক মডেল' অনুসরণ করবে। তুরস্কে ইসলামপন্থীরা জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। তুরস্কের সেনাবাহিনী ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অনুসারী। মিসরের সেনাবাহিনীও অনেকটা তাই। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকারের দ্বন্দ্বের কথা সবাই জানেন। সেনাবাহিনী এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। যে কারণে সেখানে সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা কম। মুরসি এমনটি চাইবেন মিসরের জন্য। এ ক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সফল হবেন, তা শুধু আগামী দিনগুলোই বলতে পারবে। উপরন্তু ইসরায়েলের ব্যাপারে নয়া প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গী কী হবে, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। কেননা ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির কারণে সমগ্র আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কখনো ভালো হয়নি। ১৯৭৮ সালে মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও, এ সম্পর্ক কখনই উন্নত হয়নি। এমনকি মিসরের কট্টরপন্থীদের হাতে মিসরের সাবেক প্রেসিন্টে আনোয়ার সাদাতকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছিল। যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মুরসিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং নয়া প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন তিনি সব চুক্তির প্রতি সম্মান জানাবেন। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। কেননা ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব এখনো পরিপূর্ণভাবে 'ইসরায়েল বিরোধিতা' থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তারা যে প্রেসিডেন্টকে প্রভাব খাটাবেন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এখানেই এসে যায় 'রিয়েল পলিটিক্স' এর বিষয়টি। মুরসি এই 'রিয়েল পলিটিক্স' কতটুকু অনুসরণ করেন, সেটাই দেখার বিষয়। তবে আমি মোহম্মদ মুরসির সাম্প্রতিক দেয়া বক্তব্যে আশাবাদী। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি একটি জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি এই মুহূর্তে খুবই জরুরি। কেননা মিসর এখন একটি বিভক্ত সমাজ। একদিকে রয়েছে ইসলামিক কট্টরপন্থীরা, অন্যদিকে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষবাদী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মুবারক সমর্থকরা। ২০১১ সালে তেহরির স্কোয়ারের ১৭ দিনের 'বিপ্লব' নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল মিসরে। দীর্ঘ ১৭ দিন দখলে রেখেছিল 'বিপ্লবীরা'। মূলত তরুণরাই এই বিপ্লবের নায়ক। এরা সবাই যে ইসলামিক আদর্শকে পছন্দ করেন, তা নয়। তারা মুবারকের অপশাসন (১৯৮১ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন) থেকে মিসরকে 'মুক্ত' করতে চেয়েছিলেন। ওই তরুণরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে পেঁৗছে দিয়েছিলেন। এই তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ মুরসিকে সমর্থন করেছেন, এটা সত্য। কিন্তু মিসর ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র হোক, এটি তারা চাইবেন না। মিসর 'বিপ্লব'-এ নারীরা একটা বড় ভূমিকা রেখেছেন। সেনাবাহিনীর হাতে অনেক তরুণী নিগৃহীতও হয়েছিলেন। এরা নিশ্চয়ই চাইবেন না মিসরে নারীদের অধিকার সংকুচিত হোক, বাধ্যতামূলক পর্দাপ্রথা আরোপ করা হোক। মিসরের নারীরা যথেষ্ট স্বাধীন। তারা আধুনিকমনস্ক। পূর্ণ প্রর্দাপ্রথা তারা অনুসরণ না করলেও, শালীনতা তারা বজায় রেখে চলেন। নয়া নেতৃত্ব নিশ্চয়ই এটিও উপলব্ধি করে। মিসরে সংখ্যালঘু 'কপটিক খ্রিস্টান'রা কিছুটা আতঙ্কগ্রস্ত। তারা আশঙ্কা করছেন, তারা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। সম্ভবত এটা উপলব্ধি করেই নয়া প্রেসিডেন্ট অঙ্গীকার করেছেন নতুন সরকারে 'কপটিক খ্রিস্টান'দের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং নয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। মুরসি বাস্তববাদী। তিনি সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিয়েছেন। তিনি আধুনিকমনস্ক একজন মানুষ। প্রকৌশল বিদ্যায় আমেরিকা থেকে ডক্টরেট ডিগ্রিও নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন মাত্র ১২ বছরের। দীর্ঘ ৮৪ বছরের একটি সংগঠনের (ইসলামিক ব্রাদারহুড) প্রতিনিধি তিনি। দলে কট্টরপন্থী, উগ্র ধর্মীয় আদর্শে বিশ্বাসী এবং শারিয়াহ আইনভিত্তিক একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লোক অনেক রয়েছে। এদের 'চাপ'ও থাকবে তার ওপর। এই 'চাপ' উপেক্ষা করে ইসলামিক আদর্শ ও গণতন্ত্রকে একত্রিত করে 'নতুন এক মিসর' কীভাবে তিনি জন্ম দেন, সেটাই দেখার বিষয়।
আরব বিশ্বে যে বসন্তের ঢেউ বইছিল, তা এখন দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করছে। তিউনেসিয়ার পর মিসর_ একনায়কতান্ত্রিক সরকারের উচ্ছেদের পর জনগণের ভোটে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাসীন হয়েছে। এটা বিপ্লবের দ্বিতীয় স্তর। তৃতীয় স্তরে হয় কট্টরপন্থীরা ক্ষমতা নেবে, নতুবা আধুনিকমনস্ক ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করবে। এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী মুরসিকে চ্যালেঞ্জ করবে না। কিন্তু সেনা প্রশাসনে মুরসি যদি হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে একজন জেনারেল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হবেন, এটা নিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে তানতাবি অথবা সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হাফেজ আনান এই দায়িত্বটি নিতে পারেন। সেনাবাহিনী আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হতে পারে মিসরে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী রাজনীতি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে না, আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনা প্রশাসনেও হস্তক্ষেপ করবে না। এর বাইরে ড. মুরসি কট্টরপন্থী এমন কোনো নীতি গ্রহণ করবেন না, যা সেনাবাহিনীতে বিতর্ক সৃষ্টি করে। তিনি সবার প্রেসিডেন্ট হতে চান। আর সে কথাটাই বলেছেন তিনি। এখন দেখার পালা_ ড. মুরসির নেতৃত্বে 'নয়া মিসর' কীভাবে বিকশিত হয়।
Daily DESTINY
11.7.12

মেনন ভাইয়ের মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ

রাশেদ খান মেনন সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, সংসদের মেয়াদ থাকা অবস্থায় নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। তার যুক্তি হচ্ছে নির্বাচনের সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য যদি তার পদে বহাল থাকেন, তা হলে বর্তমান এমপি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে সমান সুযোগ (লেভেল প্লেইং ফিল্ড) থাকবে না। বর্তমান এমপি প্রশাসনের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবে। এই অসঙ্গতি দূর করতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাশেদ খান মেননের এই বক্তব্য প্রতিটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে গত ১ জুলাই। মেনন ভাইয়ের এই বক্তব্যের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। কেননা মহাজোটে থেকেও তিনি সত্য কথা বলতে পিছপা হননি। একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি তার অভিমতটি জাতির কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি নিজে এমপি এবং মহাজোট সরকারে তার দল ওয়ার্কার্স পার্টি প্রতিনিধিত্বও করছে। কিন্তু তাই বলে তিনি মহাজোট সরকারের সকল অনুসৃত নীতি অন্ধভাবে সমর্থন করেননি। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানে সংশোধনী এনেছে। গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ঘোষিত হয়েছে। সংশোধিত সংবিধানে বলা হয়েছে বর্তমান সরকারের শেষ তিন মাস এই সরকার ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ হিসেবে কাজ করবে। এবং সেই সরকার পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। অর্থাত্ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল শেষ হচ্ছে। এর আগের তিন মাস অর্থাত্ অক্টোবর ২০১৩-এর পর থেকে এই সরকার ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং তারাই নির্বাচন আয়োজন করবে। মন্ত্রীরা থাকবেন। এমপিরা থাকবেন। নির্বাচন হবে। তাতে প্রশাসন তো নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। বর্তমান সরকারের সময় ভোলার উপনির্বাচনের খবর আমরা জানি। অতীতে মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার জন্ম হয়েছিল। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করলেও এখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে কিছু নেই। সংবিধানে আরও বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মেনন। তার এই বক্তব্য হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সংবিধানে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের যে অসঙ্গতি,  তা কিন্তু নয় বরং সংশোধিত সংবিধানের বেশ কিছু জায়গায় এ ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। এসব অসঙ্গতি দূর করা প্রয়োজন। সংবিধানে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কিত অনুচ্ছেদের মধ্যে চরম অসঙ্গতি রয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বজায় রাখা হয়েছে। এটা ভালো ও যুক্তিযুক্ত। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে (২অ) বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু অষ্টম অনুচ্ছেদে [৮(১)] ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এটা একধরনের স্ববিরোধিতা। সংবিধানে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল চার নীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু ১৯৭২ আর ২০১২ এক নয়। ১৯৭২ সালে সমাজতন্ত্র আমরা চেয়েছি বটে; কিন্তু ২০১২ সালে এসে কোন সমাজতন্ত্র আমরা বাস্তবায়ন করব? সমাজতন্ত্রের কোন ‘মডেল’ আমরা অনুসরণ করব? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। রাশিয়া এখন আর মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। চীনকে পুরোপুরি মার্কসবাদী একটি রাষ্ট্র বলা যাবে না। চীনে এখন ‘সমাজতন্ত্রী বাজার অর্থনীতি’ চালু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কোন ‘মডেল’কে অনুসরণ করব? স্বাধীনতা আন্দোলনে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য ও সহযোগিতায় উত্সাহিত হয়ে একটি সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্র আমরা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ? সম্ভবত রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিত করতে সংবিধানের ২৫ (২) অনুচ্ছেদটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।’ নতুন সংবিধানে এই ধারাটি নেই। অথচ আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। এখন সংবিধানে ওই ধারাটি বাদ দেওয়ায় মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। সংবিধান সংশোধনের ফলে জাতীয় পরিচয় (২) আমাদের বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে আমরা তখন বাংলাদেশি। কিন্তু এ প্রশ্নে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর, বিশেষ করে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩টি নৃ-গোষ্ঠীর অবস্থান তো ভিন্ন। পাহাড়িরা তো বাঙালি নয়, তারা তাদের নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয়ে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাহাড়িদের বাঙালি হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নিলে সেদিন পাহাড়ে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। নয়া সংবিধান তারা মেনে নিয়েছেন এটা মনে করারও কোনো কারণ নেই। সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম তফসিল নামে নতুন তিনটি তফসিল সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাম, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ জিয়ার ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত হলে ক্ষতির কিছু ছিল না। সংবিধান সংশোধনীর (১৫তম) মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন (প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার) পুনর্গঠিত হয়েছে। কিন্তু সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে কি তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে? আর্থিক অভাবে সরকারের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে। তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে সংবিধানে কোনো রক্ষাকবচ নেই। অবৈধ ক্ষমতা দখলকে (৭অ)  রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু যারা অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন, তারা কি সব সময় সংবিধান মেনে চলেন? আমরা কি পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত দিতে পারি? পাকিস্তানে ১৯৭৩ সালের সংবিধানে এরকম একটা রক্ষাকবচ ছিল (ধারা ৬-১)। কিন্তু ১৯৭৩ সালের সংবিধান রচনার পর পাকিস্তানে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউল হকের মৃত্যুদণ্ড হয়নি। হয়েছিল জুলফিকার আলি ভুট্টোর।
বিএনপি এবং রাশেদ খান মেনন সংবিধান সংশোধন করার কথা বলেছেন। সংবিধানের ১৪২নং ধারায় সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংশোধিত হওয়ায় নতুন করে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে গেছে। নয়া প্রক্রিয়ায় যেতে হলে উচ্চ আদালতসহ বহু বাধা পেরুতে হবে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর (৭ই) বিধানাবলি সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিত-করণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধন এখন ‘অযোগ্য’ হবে। অর্থাত্ মৌলিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। এর ফলে ‘জাতির পিতা’ শিরোনামের অনুচ্ছেদ ৪-এ যা কিছু আছে (ছবি প্রদর্শন), তাতে সংশোধনী আনা সহজ হবে না। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইত্যাদি সংযুুক্তি (অনুচ্ছেদ ১৫০.২) সংশোধন কঠিন হবে। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি, জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিকতায় বাংলাদেশি বাতিল করা কিংবা ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করা খুব সহজ হবে না।
রাশেদ খান মেনন সংবিধানের এই অসঙ্গতিগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মেননের সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। সেনগুপ্তের অতিকথন তাকে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। ‘কালো বিড়াল’-এর কাহিনী মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। তারপরও তিনি একের পর এক বক্তব্য দিয়ে নিজেকে বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছেন। মেনন যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মহাজোট সরকারের বক্তব্য নয়। এটা তার দলের বক্তব্য এবং জনগণের একটা বড় অংশ এই বক্তব্য সমর্থন করে বলেই আমার ধারণা। এ দেশের সাধারণ মানুষও চায় দেশে একটি নির্বাচন হোক। কিন্তু সেই নির্বাচন যেন হয় নিরপেক্ষ। একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ  হবে না-এটাই স্বাভাবিক। মহাজোটে থেকেও তিনি জোটের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন। এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এভাবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।
রাশেদ খান মেনন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। ঐতিহ্যবাহী ছাত্র ইউনিয়নের তিনি ছিলেন সভাপতি, তার নামে ছাত্র ইউনিয়ন পরিচালিত হতো। এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির যারা প্রতিনিধিত্ব করে গেছেন, তাদের মধ্যে মেনন অন্যতম। আমরা যারা সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, আমাদের কাছে মেনন ভাই ছিলেন আদর্শ। প্রবাদ পুরুষ। প্রগতিশীল রাজনীতি থেকে উঠে আসা মানুষ। জাতির এক সঙ্কটের সময় তিনি যে মন্তব্যটি করলেন, তার গুরুত্ব রয়েছে যথেষ্ট। স্পষ্টতই জাতি আজ বিভক্ত। একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু দাবি উঠেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের। দাবি উঠেছে পুনরায় সংবিধান সংশোধনের। এমনিতেই রাজনীতি উত্তপ্ত। বহির্বিশ্বে আমাদের ‘ইমেজ’ নষ্ট হয়েছে নানা কারণে। সরকার এখনও হার্ডলাইনে। একটি সংলাপের কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হলেও তার জট খুলছে না। এমনই এক সময়ে রাশেদ খান মেনন গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বললেন। তার এই বক্তব্য সরকার যদি বিবেচনায় নেয়, তাতে জাতির মঙ্গল হতে পারে।
Daily SAKALER KHOBOR
10.7.12

পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান কি আসন্ন?

পাকিস্তানে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। নির্বাসিত এই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে গত ৩ জুলাই। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ মনে করেন দেশ রক্ষায় জনগণ আবার সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকছে। জেনারেল পারভেজ মোশাররফের এই বক্তব্য এলো এমন এক সময় যখন পাকিস্তানে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায় না মানায় প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি অযোগ্য হিসেবে ঘোষিত হন। তারপর যাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পিপিপি নিয়োগ দিয়েছিল (মকদুম শাহাবুদ্দিন), তার বিরুদ্ধে একটি নিম্ন আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। পরে রাজা পারভেজ আশরাফ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও উচ্চ আদালত তাকে দুই সপ্তাহ সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। ওই সময়সীমার মধ্যে রাজা পারভেজ আশরাফকে সুইজারল্যান্ড কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জারদারি অবৈধভাবে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার সুইস ব্যাংকে ট্রান্সফার করেছিলেন। তার স্ত্রী বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন অবৈধভাবে অর্জিত এই টাকা তিনি সুইস ব্যাংকে ট্রান্সফার করেছিলেন। এ ব্যাপারে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী গিলানি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে এই তদন্ত বন্ধ করেছিলেন। কেননা তার যুক্তি ছিল প্রেসিডেন্ট দায়মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু উচ্চ আদালতের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। তখন নয়া প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ যদি আবারো একই যুক্তি তোলেন যে প্রেসিডেন্ট দায়মুক্তি পেয়েছেন এবং সুইস কর্তৃপক্ষকে চিঠি না লেখেন, তাহলে তাকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হবে, তাকেও চলে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট জারদারি নিজেও বিপদে আছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এখনো পিপলস পার্টির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ব্যাপারেও আদালতের একটি রুলিং রয়েছে। তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভালো নয়। বর্তমান সরকারের মেয়াদ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে বর্তমান সরকার তার টার্ম পূর্ণ করতে পারবে না। আগামী নভেম্বরে সেখানে নির্বাচন হতে পারে। পাকিস্তানে অতীতে কখনই কোনো রাজনৈতিক সরকার তার টার্ম (৫ বছরের) শেষ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে পিপিপির নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এই টার্ম শেষ করে, তাহলে এটা হবে একটা রেকর্ড। এমনকি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের উত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে উচ্চ আদালতের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব আগামীতে কি ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তির পথ প্রশস্ত করল? ইমরান খান রাজনীতিতে এসেছেন কিছুদিন হলো। তিনি একটি দলও করেছেন_ 'তেহরিকই ইনসাফ'। তার মূল সেস্নাগান হচ্ছে দুর্নীতমুক্ত পাকিস্তান। উচ্চ আদালত গিলানির বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন, তার পেছনেও কাজ করছে এই দুর্নীতির প্রশ্নটি। এক সময় জারদারির পরিচিতি ছিল 'মি. টেন পারসেন্ট' হিসেবে। স্ত্রী বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন বড় বড় কন্ট্রাক্ট তিনি পাইয়ে দিতেন অর্থের বিনিময়ে। ওই টাকায় তিনি দুবাইয়ে বিশাল বাড়ি কিনেছেন। সুইজারল্যান্ড তথা লন্ডনেও রয়েছে তার সম্পদ। তবে তার প্রতিপক্ষ নওয়াজ শরীফও 'ধোয়া তুলসিপাতা' নন। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আগামীতে উচ্চ আদালত যদি নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে কোনো রুল ইস্যু করে আমি অবাক হবো না। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ইমরান খান সামনে চলে আসছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ত ইমরান খানের মধ্যে বিকল্প শক্তি দেখতে চাইবে। পারোক্ষভাবে ইসরাইলের সঙ্গেও ইমরান খানের যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইসরাইল অনেকদিন ধরেই চাইছে পাকিস্তান তাদের স্বীকৃতি দিক। এখন ইমরান খানকে যদি ক্ষমতায় আনা যায় তাহলে ইসরাইলের স্ট্র্যাটেজি তাতে সার্থক হবে। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ইমরান খানের ইসলামাবাদে যাওয়ার যাত্রাপথকে আরো প্রশস্ত করছে কি না, তা শুধু আগামী দিনগুলোই আমাদের বলতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে এই রায় ইসলামী কট্টরপন্থীদের স্ট্র্যাটেজিতে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন ডেকে আনবে? আমার তা মনে হয় না। পাকিস্তান বাহ্যত ধীরে ধীরে আরেকটি 'তালেবানি রাষ্ট্র'র দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী পাখতুন খোয়া প্রদেশে সনাতন রাজনীতির কোনো প্রভাব নেই। এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তানপন্থী তালেবানরা। উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানসহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব সীমান্ত প্রদেশ এখন ইসলামিক কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে। এদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানদের রয়েছে যোগাযোগ। এই অঞ্চলে একটি ইসলামপন্থী দল স্থানীয় ক্ষমতা পরিচালনা করে বটে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে কট্টরপন্থীরা। তাই এখানে দীর্ঘদিন যাবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানববিহীন ড্রোন বিমান হামলা পরিচালনা করে আসছে। কট্টরপন্থীদের প্রভাব দিনে দিনে বাড়ছেই। পাঁচ-ছয় বছর আগে পাকিস্তান সফরে গিয়ে কট্টরপন্থীদের যে 'শক্তি' আমি দেখেছিলাম আজ সেই 'শক্তি' কমেনি, বরং বেড়েছে। ইসলামবাদে গিলানি সরকারের পতন ঘটলেও পাকিস্তানি তালেবানদের তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়ছেই। পাকিস্তানে একটি পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। মনে রাখতে হবে আগামী ২০১৩-১৪ সাল পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেব। এর ফলে কারজাই সরকার আদৌ কাবুলে থাকতে পারবে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। মডারেট তালেবানদের সঙ্গে (যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে) কারজাই সরকারের যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে এ অঞ্চলে তার স্বার্থ পরিত্যাগ করবে, আমার তা মনে হয় না। ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে এক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে। চীনকে 'ঘিরে ফেলার' এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। ভারত হচ্ছে তার সঙ্গী। এ ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পাকিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি। একদিকে আফগানিস্তানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের পথ পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে। পাকিস্তান এই পথ সম্প্রতি (খাইবার উপত্যকা) খুলে দিতে রাজি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য বেলুচিস্তানের শামসী বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অতি জরুরি। পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তান থেকে ইরান সীমান্ত মাত্র ৭২ কি.মি. দূরে। তৃতীয়ত, গাওদারের গভীর সমুদ্রে রয়েছে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বেলুচিস্তানের গাওদার ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে তাই দরকার ইসলামাবাদে একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার। প্রশ্ন হচ্ছে কার নেতৃত্বে এই সরকার পরিচালিত হবে? একটি রাজনৈতিক সরকার, যে সরকার ইন্দো-আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিকে সমর্থন করবে এবং এ অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল স্ট্র্যাটেজি, সেই স্ট্র্যাটেজির অংশ হবে? নাকি একটি সামরিক সরকার? জেনারেল কিয়ানি, যিনি এখনো সেনা প্রধান, তিনি আলোচনায় আছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্ট্র্যাটেজে তৈরি করছে কিনা, তা বলা মুশকিল। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সেনা অভ্যুত্থানের সমর্থন করে না এবং পাকিস্তানে সেনা নেতৃত্বের ব্যাপারেও তাদের রিজার্ভেশন রয়েছে, তাই খুব সম্ভবত সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি সিভিলিয়ান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন জানাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ২৩ জন পাকিস্তান সেনার হত্যাকা-ে ক্ষমা চাওয়ায়, দুদেশের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে জটিলতা ছিল, তা কেটে গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানে একটি 'বন্ধুপ্রতিম' সরকার দরকার। বহিঃবিশ্বে এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছে যে ইমরান খান হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইতোমধ্যে পাকিস্তানে ও বহিঃবিশ্বে একটি 'ক্লিন ইমেজ' গড়ে তুলেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম তাকে জনপ্রিয় করেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে তিনি কতটুকু জনপ্রিয় তা এখন পরীক্ষিত নয়। অতীতে নির্বাচনে তার দল বয়কট করেছিল। সুতরাং প্রশ্ন থেকেই গেল। এ ক্ষেত্রে জেনারেল কিয়ানির একটি 'ইমেজ' রয়েছে। এর আগে সেনা অভ্যুত্থানের একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও, তার দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে, তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রথমত, রাজনীতিবিদরা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনরা দুর্নীতিগ্রস্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানপন্থী তালেবানরা দিনে দিন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। জ্বালানি সঙ্কট, পানির অভাব ও অর্থনীতির নিম্নগতি পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। মানুষের মাঝে হতাশা বাড়ছে। এসব কারণ মানুষের মাঝে হতাশ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই উচ্চ আদালতের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে। এর পেছনে সেনাবাহিনী যে আদৌ কলকাঠি নাড়াচ্ছে না, তা দিব্যি দিয়ে বলা যাবে না। সুতরাং একটি সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা শতকরা একশ ভাগ উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ পাকিস্তানে সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী একটি 'রাজনৈতিক পক্ষ'। এখন জেনারেল পারভেজ মোশাররফের এ ধরনের বক্তব্য সেনা নেতৃত্বকে ইন্ধন জোগালেও আমি অবাক হবো না। তবে একটি নির্বাচনের সম্ভাবনা সেখানে বেশি। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেনা সমর্থিত একটি সরকার (খুব সম্ভবত ইমরান খানের নেতৃত্বে) শুধু সেনাবাহিনীর স্বার্থই রক্ষা করবে না, বরং মার্কিন স্বার্থও রক্ষা করবে।
Daily JAI JAI DIN
09.07.2012

ইসলাম গণতন্ত্র ও আরব বিশ্বের রাজনীতি



অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ড. মোহাম্মদ মুরসি মিসরের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রথম দফা নির্বাচনে তিনি শতকরা ৫০ ভাগ ভোট নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়।দ্বিতীয় দফায় তিনি ভোট পান ৫২ শতাংশ, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শফিক পান ৪৮ শতাংশ। কিন্তু তারপরও তাঁকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করার ব্যাপারে পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্র চলে। কেননা অত্যধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বোচ্চ সেনা পরিষদ মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির এই নেতার বিজয়কে সহজভাবে মেনে নিতে পারছিল না। অনেকেরই মনে থাকার কথা, প্রথমে দলটির প্রার্থী ছিলেন সাইরাত এল সাতের। কিন্তু তাকে ষড়যন্ত্র করে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে ড. মুরসিকে প্রার্থী করা হয়। মুরসির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তা ঘোষণা করা হচ্ছিল না। এমনি এক পরিস্থিতিতে  তাহরির স্কয়ারে মানুষ আবার সমবেত হতে শুরু করে। ফলে সামরিক জান্তা এক সময় বাধ্য হয়ে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে মিসর এক নতুন যুগে প্রবেশ করলো।
আরব বিশ্বের পরিবর্তনটা প্রথম শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। সেখানে ২৩ বছরের শাসক জয়নুল আবেদিন বিন আলীর পতনের পর প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তাতে বিজয়ী হয়েছে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত এন্নাহদা পার্টি। ২১৭ আসনের সংসদে তারা পেয়েছে ৮৯টি আসন। এই ইসলামপন্থী দলটি ধর্মনিরপেক্ষ একটি দলের সাথে মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছে ইতোমধ্যে। নির্বাচনে বিজয়ী তিনটি দলের মাঝে সেখানে যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে এন্নাহদার নেতা হামদি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস ফর দি রিপাবলিক পার্টির মুনসেফ মারজুকি প্রেসিডেন্ট আর এত্তাকাতুল দলের মুস্তাফা বিন জাফর হয়েছেন স্পিকার। ঠিক এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মরক্কোয়। সেখানে অতি সম্প্রতি যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তাতে ইসলামপন্থী দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বিজয়ী হয়েছে। যদিও দলটি এককভাবে বিজয়ী হতে পারেনি। অনেকটা তিউনিসিয়ার মতই একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হতে যাচ্ছে মরক্কোতে। তিউনিসিয়ায় যেমনি ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা একটি প্লাটফর্মে একত্র হয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনটি হয়েছে এখন মরক্কোতে। এখানে ইসলামপন্থীরা এককভাবে বিজয়ী হয়েছে সত্য (৩৯৫ আসনের ১২০টিতে বিজয়ী), কিন্তু জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ঐক্য করতে হয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টি ও সোশ্যালিস্ট ইউনিয়ন অফ পপুলার ফোর্সের সাথে। জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নেতা আবদেলইয়া বারকিরানে হয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী এটাই হচ্ছে বাস্তববাদী নীতি।
মিসরে ড. মুরসির বিজয় প্রমাণ করলো ইসলামপন্থীদের ভিত সেখানে কত শক্তিশালী। অথচ এই শক্তিকে সেখানে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯২৮ সালে গঠিত হয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড, যে সংগঠনটির প্রতিনিধি হয়ে সাধারণ মানুষের ভোটে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন ড. মুরসি। এর আগে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া সংসদ নির্বাচনেও ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন, যদিও সেই নির্বাচন বাতিল করে দিয়েছে সর্বোচ্চ সেনা পরিষদ। ওই নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি ৪৩ দশমিক ৪ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল (মোট আসন ৪৯৮-এর মাঝে ২১৬)। অপর একটি ইসলামিক দল আল নূর পেয়েছিল ২১ দশমিক ৪ ভাগ ভোট (আসন ১০৯)। অথচ ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা পরাজিত হয়েছিল। ইজিপসিয়ান ব্লক (৬.৮ ভাগ ভোট), সোস্যাল ডোমাক্র্যাটিক পার্টি (৩.২ ভাগ), ফ্রি ইজিপসিয়ান পার্টির (৩ ভাগ) মতো ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। যদিও ইসলামপন্থীরা দু’টি ব্লকে (ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটিক এ্যালায়েন্স ও আল নূর পার্টির নেতৃত্বে ইসলামিক এ্যালায়েন্স) ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির উত্থানকে ঠেকানো যায়নি। ধারণা করছি আগামীতে সংসদের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি তাদের একক প্রাধান্য বজায় রাখতে পারবে। আরব বসন্ত-পরবর্তী আরব বিশ্বের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের উত্থান নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য  ঘটনা। এই ঘটনা সমগ্র আরব বিশ্বের চলমান রাজনীতিতে যে প্রভাব যোগাবে,  তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড তথা ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির বিজয় পশ্চিমা বিশ্ব ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক মনোভাব সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। ড. মুরসি জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু একটি ইসলামিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে তিনি কতটুকু উদ্যোগী হন, সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়। হোসনি মুবারকের উৎখাতের প্রাক্কালে ফেব্রুয়ারিতে (২০১১) মুসলিম ব্রাদারহুডের গাইডিং কাউন্সিলের সদস্য এচ্ছামএল এর সিয়ানের একটি প্রবন্ধ নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছিল (৯ ফেব্রুয়ারি)। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে, গণতন্ত্রে ইসলামিক মূল্যবোধকে স্বীকার করে না, সেই গণতন্ত্র মিসরবাসী গ্রহণ করে নেবে না। তিনি লিখেছিলেন, ইসলামিক দুনিয়ায় ইসলাম ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং যে গণতন্ত্রে ধর্মের ভূমিকা স্বীকৃত এবং জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়, সেই গণতন্ত্রই মিসরে বিকশিত হবে। অর্থাৎ  তার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইসলামিক ভাবধারায় গড়ে উঠবে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আর মুসলিম ব্রাদারহুড তেমনি একটি গণতান্ত্রিক সমাজই চায়। এচ্ছামএল এরসিয়ান একই সাথে আমাদের এ কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পশ্চিমা গণতন্ত্র মিসরের জন্য উপযুক্ত নয়। এখানে স্পষ্টতই একটি ইঙ্গিত ছিল যে, পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমা ধারার গণতন্ত্র মিসর গ্রহণ করবে না। এখানে সংবিধান তথা দৈনন্দিন কাজে ইসলামিক মূল্যবোধের প্রাধান্য থাকবেই। এ ক্ষেত্রে ড. মুরসিকে কিছুটা উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে মিসরের সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা কোনো অবস্থাতেই মিসরকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আরব বিশ্বের সর্বত্র ইসলামপন্থীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। মরক্কোতে সর্বশেষ নির্বাচনে বিজয়ী ইসলামিক দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এক সময় অত্যন্ত কট্টর ছিল। ২০১০ সালে দলটি মরক্কোর রাজধানীতে বিখ্যাত গায়ক এলটন জনের একটি কনসার্টের বিরোধিতা করেছিল। এলটন জন সমকামী। দলটি সমকামিতা ও প্রকাশ্যে মদ্যপানের বিরোধী। তারা কনসার্টের বিরোধিতা করেছিল এ কারণে। অথচ মরক্কোর বৈদেশিক অর্থের একটা বড় উৎস ট্যুরিজম ও বৈদেশিক বিনিয়োগ। এটা বিবেচনা করেই দলটি তখন আর এসব বিষয়ে কথা বলেনি। সর্বশেষ নির্বাচনে তারা গুরুত্ব দিয়েছে দারিদ্র্র্যদূরীকরণ ও তরুণদের চাকরির নিশ্চয়তা সম্পর্কিত সামাজিক  বিষয়াদি। দলটি এখন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও গণতন্ত্রের কথা বলছে। এটাই হচ্ছে বাস্তববাদী মনোভাব।
বদলে যাচ্ছে আরব বিশ্ব। সনাতন ইসলামিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এনেছে। আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরোধিতা করছে। সবচেয়ে বড় কথা ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর সাথে যে সহাবস্থান সম্ভব, তা প্রমাণ করেছে তিউনিসিয়া ও মরক্কোর ইসলামিক দলগুলো। দীর্ঘ দিন একনায়কতান্ত্রিক যে সমাজব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল আরব বিশ্বে, তাতে এখন পরিবর্তন আসছে। একটি আধুনিকমনস্ক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সেখানে জন্ম হতে যাচ্ছে, যেখানে ধর্ম একটি অংশ, কিন্তু কট্টরপন্থী ইসলামিক চিন্তাধারা আদৌ কোনো প্রভাব বিস্তার করছে না। গত ষাট বছরের আরব বিশ্বের রাজনীতিতে এটা চতুর্থ ধারা। ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উৎখাত ও জামাল আবদুল নাসেরের উত্থানের মধ্যে দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল, তা ২০১১ সালে এসে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। মাঝখানে ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে পরাজয় ও ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবে নতুন দু’টি ধারার জন্ম দিলেও, তা স্থায়ী হয়নি। এখন মডারেট ইসলামিক শক্তির উত্থান চতুর্থ ধারার জন্ম দিলো। এই ধারা কত দিন স্থায়ী হয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে ড. মুরসির উত্থানের মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্ন উঠেছে, তাহরির স্কয়ারের বিপ্লব কি ব্যর্থ হবে? ইতিহাসে এর প্রমাণ যে নেই, তা নয়। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে বিপ্লবের প্রথম দিকে ভার্সাই দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল। কিন্তু ৪ বছরের মধ্যে জ্যাকোবিনদের উত্থানে সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রথম পর্বে কেরোনস্ক্রিফে ক্ষমতায় বসালেও তিনি থাকতে পারেননি। নভেম্বরে কট্টরপন্থী বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করেছিল। ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জনগণ ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় বসায়। পাশ্চাত্যের বিভিন্নমুখী বিরোধিতার মুখেও ইসলামপন্থীরা গত চার দশক ধরে ক্ষমতায় আছে।
আমি মিসর নিয়ে আশাবাদী একটি কারণে, তা হচ্ছে ড. মুরসির ভূমিকা। ইসলাম মানেই যে কট্টরপন্থী এ মনোভাব তিনি ভেঙে দিয়েছেন। ইসলামিক রাজনীতি নিয়েও যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। সাধারণ মানুষ তাঁকে ভোট দিয়েছে। আসলেই আরব বিশ্বে ইসলামের একটা জোয়ার এসেছে। ইসলাম ধর্ম তাদের জীবনের একটা অংশ। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের চর্চা করেও যে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি উপহার দেয়া যায়, মিসর তার সর্বশেষ উদাহরণ। আরব বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও তুরস্ক ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনীতি সে দেশে উপহার দিয়েছে। আজ মিসরও সম্ভবত তুরস্কের মডেল অনুসরণ করতে যাচ্ছে। ইসলামিক মূল্যবোধকে স্বীকার করে নিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার যে রাজনীতি, এটি একটি ‘মডেল’ হয়ে উঠছে আরব বিশ্বের রাজনীতিতে। খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে যে গণতন্ত্র পশ্চিমা বিশ্বে বিকশিত হয়েছে, সেই গণতন্ত্র আরব বিশ্বে গ্রহণযোগ্য হবে না। আরব বিশ্বের জন্য যে গণতন্ত্র, সেখানে থাকতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ, থাকতে হবে ইসলামিক ঐতিহ্যের প্রকাশ। এই যে রাজনীতি, এই রাজনীতিই হচ্ছে ‘আরব বসন্ত’- পরবর্তী আরব বিশ্বের রাজনীতির মূল ধারা। এই মূল ধারার বাইরে যারা গেছে, তারাই ছিটকে পড়েছে। সর্বশেষ মিসরে ড. মুরসির বিজয় প্রমাণ করলোÑ ‘ইসলামিক গণতন্ত্র’ ছাড়া  আরব বিশ্বের কোনো বিকল্প নেই।

পাকিস্তান : যে গল্পের শেষ নেই


পাকিস্তানকে নিয়ে গল্পের যেন শেষ নেই। সম্প্রতিক সময়গুলোতে পাকিস্তানকে নিয়ে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে। মনে হচ্ছে, অদৃশ্য এক 'চিত্র নাট্যকার' যেভাবে 'নাটকের' দৃশ্যপট সাজিয়েছেন, সেভাবেই 'অভিনেতারা' অভিনয় করে যাচ্ছেন। অ্যাবোটাবাদে সামরিক গ্যারিসনের পাশে ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পাওয়া ও তাকে হত্যা করা উগ্র 'তালেবানি' রাজনীতির উত্থান, বেনজির ভুট্টোর মৃত্যু, বরখাস্ত হওয়ার পরও প্রধান বিচারপতির পুনরায় ফিরে আসা, মেমোগেট কেলেঙ্কারী, প্রধানমন্ত্রী গিলানি আদালত কর্তৃক অযোগ্য ঘোষণা, মনোনীত প্রধানমন্ত্রী মকদুম শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি, কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও রাজা পারভেজ আশরাফের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি সব কিছুই যেন একই বৃত্তে সাজানো। 'নাটকের' যে এখানেই শেষ তা বলা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী দৃশ্য দেখার জন্য। এ মুহূর্তে সেটি স্পষ্ট নয়। ধারণা করাও সম্ভব নয় কী হতে যাচ্ছে পাকিস্তানে। এতদিন পাকিস্তানে দ্বন্দ্ব ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সেনাবাহিনীর। এবার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে এবারের পরিবর্তনগুলো সাধিত হল। কিন্তু যারা পাকিস্তানের রাজনীতির কিছুটা খোঁজ-খবর রাখেন তারা ধারণা করছেন পর্দার অন্তরালে থেকে সেনাবাহিনী কলকাঠি নাড়াচ্ছে।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, অন্যদিকে খোদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে 'তালেবানি' তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। আগের চেয়ে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা পাকিস্তানের ব্যাপারে সোচ্চার। তারা বলছেন গত দশক ধরে দেশটিকে দেওয়া ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা কোনো কাজেই লাগেনি। মার্কিন কংগ্রেসে এমন কথাও উঠেছে যে পাকিস্তানে সব ধরনের সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান সম্পর্কে যখন এ ধরনের একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে, ঠিক তখনই গিলানিকে অযোগ্য ঘোষণা করল উচ্চ আদালত। এর মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান স্পষ্টতই একটি গভীর সংকটে পতিত হল।
কি হতে যাচ্ছে এখন পাকিস্তানে? সেখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সিনিয়র নেতা রাজা পারভেজ আশরাফ নয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি মজলিসে সুরার (সংসদ) সমর্থন পেয়েছেন। কেননা সেখানে কোয়ালিশন সরকারের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে শেষ রক্ষা হবে কি-না, বলা মুশকিল। তবে রাজা পারভেজ আশরাফের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি সব প্রশ্নের জবাব দেয় না। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারণে গিলানি অভিযুক্ত হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে নয়া প্রধানমন্ত্রী আদৌ কোনো উদ্যোগ নেবেন কি-না? পাকিস্তানের বর্তমান যে সংকট, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন জারদারি অবৈধভাবে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন এবং ওই টাকা সুইজারল্যান্ড পাচার করেছিলেন। এ নিয়ে পরে সুইজারল্যান্ডে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু (২০০৭) জারদারিকে ক্ষমতার পাদ-প্রদীপে নিয়ে আসে। তিনি ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুইজারল্যান্ডের ওই মামলার তদন্ত কাজ স্থগিত করতে প্রভাব খাটান; কিন্তু পাকিস্তানের উচ্চ আদালত আবার মামলা শুরু করার ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডকে অনুরোধ করতে গিলানির প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু গিলানি উচ্চ আদালতের এ নির্দেশ অমান্য করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট দায়মুক্তি পেয়েছেন। তাই তার পক্ষে সুইজারল্যান্ড কর্তৃক্ষকে চিঠি লেখা সম্ভব নয়। এ যুক্তি উচ্চ আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এখন নয়া প্রধানমন্ত্রী আশরাফ কী করবেন? তিনি কী চিঠি লিখবেন সুইজ কর্তৃপক্ষের কাছে, নাকি গিলানির পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন? নয়া প্রধানমন্ত্রী যদি গিলানিকে অনুসরণ করেন, তাহলে তিনিও যে আদালত অবমাননার শিকার হবেন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। উপরন্তু জারদারির ভূমিকা এখন কী হবে? তিনি কী রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে পারবেন? গিলানি অযোগ্য হয়েছেন বটে, কিন্তু এর জন্য তিনি এতটুকুও দায়ী নন। ইফতেখার-জারদারির দ্বন্দ্বে বলি হলেন গিলানি। জারদারির একটা বড় ব্যর্থতা তিনি এ সংকটে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা নওয়াজ শরিফের সমর্থন পাননি। মূলত 'আদালত অবমাননার' পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন নওয়াজ শরিফ স্বয়ং এমনকি বিচার বিভাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে লাভবান হবে কোন ব্যক্তি? অত্যধিক ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী তথা সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কেয়ানির ভূমিকাও বা কী এ সংকট? কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এ সংকট থেকে কোনো সুবিধা নেবে কি-না? এই সংকট থেকে বের হয়ে আসতে পাকিস্তান কী সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? আগামী ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পাকিস্তানের ইতিহাস বলে অতীতে কখনই কোনো সরকার তার টার্ম (৫ বছর) শেষ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে পিপিপির নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এই টার্ম শেষ করে, তাহলে এটা হবে একটা রেকর্ড। এমন কি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের উত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে উচ্চ আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে আগামীতে ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তির পথ কী উন্মুক্ত হল? ইমরান খান রাজনীতিতে এসেছেন কিছুদিন হল। তিনি একটি দলও করেছেন-'তেহরিক ইনাসফ।' তার মূল সেস্নাগান হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত পাকিস্তান। উচ্চ আদালত গিলানির বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন, তার পেছনেও কাজ করছে এ দুর্নীতির প্রশ্নটি। এক সময় জারদারির পরিচিত ছিল 'মি. টেন পারসেন্ট' হিসেবে। স্ত্রী বেনজির ভুট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন বড় বড় কনটাক্ট তিনি পাইয়ে দিতেন অর্থের বিনিময়ে। ওই টাকায় তিনি দুবাইয়ে বিশাল বাড়ি কিনেছেন। সুইজারল্যান্ডে রয়েছে তার সম্পদ। তবে তার প্রতিপক্ষ নওয়াজ শরিফও 'ধোয়া তুলসি পাতা' নন। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আগামীতে উচ্চ আদালত যদি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধেও কোনো রুল ইস্যু করে, আমি অবাক হব না। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ইমরান খান সামনে চলে আসছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইমরান খানের মাঝে বিকল্প শক্তি দেখতে চাইবে। পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সঙ্গেও ইমরান খানের যোগাযোগ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইসরায়েল অনেক দিন ধরেই চাইছে পাকিস্তান তাদের স্বীকৃতি দিক। এখন ইমরান খানকে যদি ক্ষমতায় আনা যায়, তাহলে ইসরায়েলের স্ট্র্যাটেজি তাতে স্বার্থক হবে। উচ্চ আদালতের রায় ইমরান খানের ইসলামাবাদে যাওয়ার যাত্রাপথকে আরো প্রশস্ত করছে কি-না, তা শুধু আগামী দিনগুলোই আমাদের বলতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ রায় ইসলামী কট্টরপন্থিদের স্ট্র্যাটেজিতে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন ডেকে আনবে? আমার তা মনে হয় না। পাকিস্তান বাহ্যত ধীরে ধীরে আরেকটি 'তালেবানি রাষ্ট্র'-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী পাখতুন খোয়া প্রদেশে সনাতন রাজনীতির কোনো প্রভাব নেই। এসব নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তানপন্থি তালিবানরা। উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরস্থানসহ সমগ্র উত্তর পূর্ব সীমান্ত প্রদেশ এখন ইসলামিক কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে। এদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালিবানদের রয়েছে যোগাযোগ। পাকিস্তানের এ অঞ্চলে একটি ইসলামপন্থি দল স্থানীয় ক্ষমতা পরিচালনা করে বটে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে কট্টরপন্থিরা। তাই এখানে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানববিহিন ড্রোন বিমান হামলা পরিচালনা করে আসছে। কট্টরপন্থিদের প্রভাব দিনে দিনে বাড়ছেই। পাঁচ ছয় বছর আগে পাকিস্তান সফরে গিয়ে কট্টরপন্থিদের যে 'শক্তি' আমি দেখেছিলাম আজও সেই 'শক্তি' কমেনি, বরং বেড়েছে। ইসলামবাদে গিলানি সরকারের পতন ঘটলেও, পাকিস্তানি তালেবানদের তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়ছেই।
পাকিস্তানে একটি পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান একজন নয়া প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। মনে রাখতে হবে আগামী ২০১৩-১৪ সাল পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এর ফলে কারজাই সরকার আদৌ কাবুলে থাকতে পারবে কি-না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। মডারেট তালিবানদের সঙ্গে (যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে) কারজাই সরকারের যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে এ অঞ্চলে তার স্বার্থ পরিত্যাগ করবে, আমার তা মনে হয় না। ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে এক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে। চীনকে 'ঘিরে ফেলার' এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। ভারত হচ্ছে তার সঙ্গী। এ ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পাকিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি। একদিকে আফগানিস্তানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের পথ পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে। পাকিস্তান এ পথ (খাইবার উপত্যকা) বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য বেলুচিস্তানের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে জরুরি। পাকিস্তানের প্রদেশ বেলুচিস্তান থেকে ইরান সীমান্ত মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। তৃতীয়ত, গাওদারের গভীর সমুদ্রে রয়েছে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে বেলুচিস্তানের গাওদার পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে তাই দরকার ইসলামাবাদে একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার। গিলানি সরকার মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারছিল না। তাই তাকে চলে যেতে হল। আগামীতে যিনিই আসবেন, তাকে মার্কিনি স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই স্বার্থ যদি রক্ষা করতে না পারে, তাহলে সেনাবাহিনীই হবে মার্কিনিদের বন্ধু। তথাকথিত 'গণতন্ত্র' পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ২ জন পূর্ণ জেনারেল, ২১ লেফটেন্যান্ট জেনারেল, আর ১৫০ মেজর জেনারেলকে নিয়ে পাকিস্তানের যে সেনাবাহিনী, সেই সেনাবাহিনীর দিকেই শেষ পর্যন্ত তাকাতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর 'নাটকের' এই দৃশ্যটি দেখার জন্য আমাদের আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।
Daily DESTINY
04.07.12

আরব বিশ্ব ও ইসলামী গণতন্ত্র


মিসরে মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এক ঘোষণায় তিনি বলেছেন, তিনি মিসরে \'ইসলামী গণতন্ত্র\' প্রতিষ্ঠা করতে চান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে এই \'ইসলামিক গণতন্ত্রে\'র ব্যাখ্যাটা একেবারেই নতুন। তবে সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, \'আরব বসন্ত\' আরব বিশ্বে যে পরিবর্তন ডেকে আনছে, তাতে তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও ইসলামিক আদর্শ তারা পুরোপুরিভাবে পরিত্যাগ করেননি। তারা ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে যাচ্ছেন। তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, মরক্কোতে এই ইসলামী গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। যে দেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা যে দেশগুলো ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত, ওই দেশগুলোতেই এই গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধকে তারা পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করেননি। আরব বিশ্বে তিউনিসিয়ায় ২৩ বছরের শাসক জয়নুল আবেদিন বিন আলির পতনের পর প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল, তাতে বিজয়ী হয়েছিল ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচিত এন্নাহদা পার্টি। এই দলটি (২১৭টি আসনের সংসদে ৮৯ আসনে বিজয়ী) একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলের সঙ্গে মিলে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনে বিজয়ী তিনটি দলের যে সমঝোতা হয়েছে তাতে এন্নাহদার নেতা হামদি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, কংগ্রেস ফর দ্য রিপাবলিক পার্টির মুনসেফ মারজুকি প্রেসিডেন্ট আর এত্তাকাতুল দলের মুস্তাফা বিন জাফর হয়েছেন সংসদের স্পিকার। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মরক্কোয়। সেখানে সম্প্রতি যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে তাতে ইসলামপন্থি দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (৩৯৫ আসনের ১২০টিতে বিজয়ী) একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টি ও সোশ্যালিস্ট ইউনিয়ন তার পপুলার ফোর্সকে সঙ্গে নিয়ে। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির নেতা আবদেলইয়া বারকিরানে হয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। এরপর মিসরের সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও অত্যধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বোচ্চ সেনা পরিষদ সেই নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করেছে। ওই নির্বাচনে ইসলামপন্থি ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল (আসন ২১৬, মোট আসন ৪৯৮) আর কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত আল নূর পেয়েছিল ২১ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট (আসন ১০৯)। এখন নতুন করে সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ফলে খুব একটা পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ড. মোহাম্মদ মুরসির বিজয়ের পর দলটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে বলেই মনে হয়। মুরসি ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির মনোনীত প্রার্থী। ড. মুরসি যে তিউনিসিয়া ও মরক্কোর অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন, তা তিনি ঘোষণাও করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি একটি ঐকমত্যের সরকার গঠন করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যিনি হবেন, তিনি হবেন নিরপেক্ষ। আরব বিশ্বে এই ইসলামিক গণতন্ত্র বিকশিত হলেও এই ধারা প্রথম লক্ষ্য করা যায় তুরস্কে। তুরস্কে ১৯৯৭ সালের পর থেকেই ইসলামপন্থিরা ক্ষমতায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের নেতৃত্বে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২০০২, ২০০৭ ও ২০১১ সালে পরপর তিনবার সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। তারা ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয়েই নতুন এক রাজনীতি তুরস্কের জনগণকেই উপহার দিয়েছেন। আর মানুষ তা গ্রহণও করে নিয়েছে। তারা মূলত তুরস্কের দার্শনিক ফাতেহউম্মান ওলেনের ভাবধারার অনুসারী। তারা পুরোপুরি ইসলামিক শাসনে বিশ্বাসী, এটা বলা যাবে না।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের তথা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির বিজয় পশ্চিমা বিশ্ব ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও ব্রাদারহুডের কট্টরপন্থি মনোভাব সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। ড. মুরসি জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলেছেন বটে; কিন্তু একটি ইসলামিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে তিনি কতটুকু ছাড় দেন, সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়। হোসনি মোবারককে উৎখাতের প্রাক্কালে ফেব্রুয়ারিতে (২০১১) মুসলিম ব্রাদারহুডের গাইডিং কাউন্সিলের সদস্য এচ্ছাম এল এরসিয়ানের একটি প্রবন্ধ নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছিল (৯ ফেব্রুয়ারি)। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, যে গণতন্ত্র ইসলামিক মূল্যবোধকে স্বীকার করে না, সেই গণতন্ত্র মিসরবাসী গ্রহণ করবে না। তিনি লিখেছিলেন, ইসলামিক দুনিয়ায় ইসলাম ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং যে গণতন্ত্রে ধর্মের ভূমিকা স্বীকৃত এবং জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়, সেই গণতন্ত্রই মিসরে বিকশিত হবে। অর্থাৎ তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইসলামিক ভাবধারায় গড়ে উঠবে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আর মুসলিম ব্রাদারহুড তেমনি একটি গণতান্ত্রিক সমাজ চায়। এচ্ছাম এল এরসিয়ান একই সঙ্গে আমাদের এ কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমা গণতন্ত্র মিসরের জন্য উপযুক্ত নয়। এখানে স্পষ্টতই একটি ইঙ্গিত ছিল যে, পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমা ধারার গণতন্ত্র মিসর গ্রহণ করবে না। এখানে সংবিধান তথা দৈনন্দিন কাজে ইসলামিক মূল্যবোধের প্রাধান্য থাকবেই। এ ক্ষেত্রে ড. মুরসিকে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মিসরে সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা কোনো অবস্থাতেই মিসরকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আরব বিশ্বের সর্বত্র ইসলামপন্থিরা কিছুটা নমনীয় হয়েছে। মরক্কোয় সর্বশেষ নির্বাচনে বিজয়ী ইসলামিক দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি একসময় অত্যন্ত কট্টর ছিল। ২০১০ সালে দলটি মরক্কোর রাজধানীতে বিখ্যাত গায়ক এলটন জনের একটি কনসার্টের বিরোধিতা করেছিল। এলটন জন সমকামী। দলটি সমকামিতা ও প্রকাশ্যে মদ্যপানের বিরোধী বলে তারা কনসার্টের বিরোধিতা করেছিল। অথচ মরক্কোর বৈদেশিক অর্থের একটা বড় উৎস ট্যুরিজম ও বৈদেশিক বিনিয়োগ। এটা বিবেচনা করেই দলটি তখন আর এসব বিষয়ে কথা বলেনি। সর্বশেষ নির্বাচনে তারা গুরুত্ব দিয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও তরুণদের চাকরির নিশ্চয়তা সম্পর্কিত সামাজিক বিষয়াদিতে। দলটি এখন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও গণতন্ত্রের কথা বলছে।
বদলে যাচ্ছে আরব বিশ্ব। সনাতন ইসলামিক দলগুলো তাদের কঠোর অবস্থানেও পরিবর্তন এনেছে। আল কায়দার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরোধিতা করছে। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর সঙ্গে যে সহাবস্থান সম্ভব, তা প্রমাণ করেছে তিউনিসিয়া ও মরক্কোর ইসলামিক দলগুলো। দীর্ঘদিন একনায়কতান্ত্রিক যে সমাজ ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল আরব বিশ্বে, তাতে এখন পরিবর্তন আসছে। একটি আধুনিকমনস্ক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যেখানে জন্ম হতে যাচ্ছে, সেখানে ধর্ম একটা অংশ, কিন্তু কট্টরপন্থি ইসলামিক চিন্তাধারা আদৌ কোনো প্রভাব বিস্তার করছে না। গত আট বছরের আরব বিশ্বের রাজনীতিতে এটা চতুর্থ ধারা। ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উৎখাত ও জামাল আবদুন নাসেরের উত্থানের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল তা ২০১১ সালে এসে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয় ও ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব নতুন দুটি ধারার জন্ম দিলেও তা স্থায়ী হয়নি। এখন মডারেট ইসলামিক শক্তির উত্থান চতুর্থ ধারার জন্ম দিল। এই ধারা কতদিন স্থায়ী হয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে ড. মুরসির উত্থানের মধ্য দিয়ে একটা প্রশ্ন উঠেছে_ \'তাহরির স্কয়ার\'-এর বিপ্লব কি ব্যর্থ হবে? ইতিহাসে এর প্রমাণ যে নেই তা নয়। ফ্রান্সে ১৭৮৯ সালের প্রথমদিকে ভার্সাই দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল। কিন্তু চার বছরের মধ্যে জ্যাকোবিনদের উত্থানে সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের প্রথম পর্বে কেরোনস্কিকে ক্ষমতায় বসালেও তিনি থাকতে পারেননি। নভেম্বরে কট্টরপন্থি বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করেছিল। ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্র উৎখাত হয়েছিল। কিন্তু রাজতন্ত্রের বদলে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামপন্থিরা ক্ষমতায় এলেও ২০০৯ সালে এসে দেখি মানুষের হতাশা ও গণবিক্ষোভ। তাই মিসর নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা থেকেই গেল।
হোসনি মোবারকের সময় মিসরে গণতন্ত্র ছিল না। এখন মুরসির উত্থান সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবে কি-না, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছি না। যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের শিক্ষক অধ্যাপক তারেক মাসুদ মনে করেন, ্তুউবসড়পৎধপু রহ ঊমুঢ়ঃ ড়ৎ ধহু ড়ঃযবৎ ঢ়ধৎঃ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ, রং হড়ঃ ংড়সবঃযরহম বি ংযড়ঁষফ ভবধৎ.্থ
এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ওবামা প্রশাসনের নীতিনির্ধারকরা অধ্যাপক তারেক মাসুদের কথায় কতটুকু আশ্বস্ত হতে পারবেন জানি না। তবে তাদের ভয় যে ইসলামপন্থিদের উত্থান নিয়ে, সে কথাটা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। আমাদের এখন দেখার পালা_ মিসরে পরিবর্তনটা কীভাবে আসে। মুরসি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।
Daily SAMAKAL
03.07.12

শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা নিয়ে কিছু প্রশ্ন



গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের সময়সীমা ৬৫ বছর করতে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক (অবসর গ্রহণ) (বিশেষ বিধান) বিল ২০১২’ উত্থাপন করা হয়েছে। ধারণা করছি সংসদের আগামী যেকোনো অধিবেশনে এই আইনটি পাস হবে। আগে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই সুবিধাটুকু গ্রহণ করতেন। এখন এই আইনটি সংসদে পাস হলে দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই ৬৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এটা নিয়ে ক্ষোভ ছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। এখন সরকার এই বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিল। এতে সরকারপ্রধান সকল শিক্ষকের ধন্যবাদ পাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হল, সেই উদ্দেশ্য সফল হবে কি?

অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে কি তাদের কাছে জাতির যে প্রত্যাশা তা পূরণ হবে? আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অবসরের বয়সসীমা ৬৫-তে উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। কেননা এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত একটি ‘চাপ’ আসবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার এই ‘চাপ’ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৬০ বছরের পর একজন সিনিয়র শিক্ষকের দেওয়ার কিছুই থাকে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, খুব কম শিক্ষকই ৬০ বছরের পর গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন না, অথবা রাখতে পারেন না। অসুস্থতা তাকে পেয়ে বসে। এই বয়সে এসে অনেকেই প্রবাসে অবস্থানরত ছেলে বা মেয়ে এবং সেই সঙ্গে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পড়াশোনা, গবেষণা, ক্লাস নেওয়া ইত্যাদির পেছনে ‘সময় দেওয়ার’ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কম। এর একটি বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে।

আমাদের যে সংস্কৃতি, তাতে পরিণত বয়সে এসে মানুষ সন্তানদের কাছে আবার ফিরে যায়। এটাই বাস্তব। গবেষণা তাকে টানে না। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা আমি বলছি না। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু আমরা অনেক জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিকে এই ৬৫ বছরের সুযোগ দিইনি। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি এই সমাজে এখনও আছেন, যারা ৬০ বছর বয়সের আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন, কিন্তু এখনও সক্রিয়। বই লিখছেন। সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে এই প্রজন্মের তরুণরা তাদেরকে ক্যাম্পাসে পেলে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও উত্সাহিত হতো। কিন্তু তা হয়নি। আমি আরও একটি কারণে অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছি, তা হচ্ছে ৬৫ বছর নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনেকেই (যারা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত) সরাসরি ৪০ বছর শিক্ষকতা করবেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? গবেষণা, পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য যেখানে বেশি, সেখানে তারা গবেষণায় মনোনিবেশ করবেন, পাঠ্যবই রচনা করবেন-এটা আশা করা যায় না। অনেক তরুণ প্রভাষকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ শুনি, তাতে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যত্ নিয়ে আমি রীতিমতো আতঙ্কিত। আমার আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করায় সমাজ-রাষ্ট্র উপকৃত হবে এ বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এর ফলে ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শত শত অফিসার ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকেও দাবি উঠেছে তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর। রাজনৈতিক সরকারের ওপর সঙ্গত কারণেই ‘চাপ’ আসবে। এবং কোনো সরকারই চাইবে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হোক। একসময় সরকারও বাধ্য হবে অফিসার ও কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়াতে। ফলে যা হবে তা হচ্ছে ‘ওপরের স্তরে’ জট সৃষ্টি হবে এবং নতুনদের চাকরি পেতে অসুবিধা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরদের দুটো গ্রেড-প্রফেসর ও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রফেসর হিসেবে নিজ পদে থাকলেও ১০ ভাগ কোটার কারণে কোনো দিনই ‘সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর’ হতে পারেন না। ফলে যা হবে, তা হচ্ছে সিনিয়র সচিবদের মতো ‘সিনিয়র প্রফেসরের’ পদ সৃষ্টি করতে বাধ্য হবে সরকার। কেননা রাজনৈতিক সরকার সব সময়ই চায় শিক্ষকদের সমর্থন। শিক্ষকদের খুশি করার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ‘সিনিয়র প্রফেসরের’ পদ আগামীতে সৃষ্টি করা হয়, আমি অবাক হব না। তবে এ ক্ষেত্রে যেন একটি নীতিমালা থাকে।

সরকার সিনিয়র সচিবের আটটি পদ সৃষ্টি করেছে। এতে সচিবদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আদৌ কি কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে? বয়সে সিনিয়র-এটাই কি নীতিমালা? আসলে নীতিমালাটি হওয়া উচিত যোগ্যতার বলে। একজন সচিব বয়সের কারণে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদা পাবেন, সেটি ঠিক নয়। তিনি যোগ্যতা দেখাতে পেরেছেন কি না, সেটাই হল আসল কথা। সচিব সাহেবদের কাজ যদি হয় ‘বিদেশ ভ্রমণ’ আর ‘দাতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী’ রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা, সেই সচিব ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হবেন না। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মেধাশূন্য সচিবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর (২০১১) এ ধরনের একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। সচিবদের ‘পারফরম্যান্সে’ প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট এমন খবরও আছে ওই প্রতিবেদনে। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি করতে হয়েছে। আইজিকে ‘থ্রি-স্টার জেনারেলের’ পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর জন্য পাঁচজন সিনিয়র সচিবের পদও সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে রাষ্ট্র, সমাজ কতটুকু উপকৃত হল? এখন সঙ্গত কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দাবি করবেন ‘সিনিয়র প্রফেসর’-এর পদ সৃষ্টি করার। তাদের কি ফেলে দিতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী?

এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ হোক আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে যেন কিছু ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ থাকে। ঢালাওভাবে একজন অসুস্থ, কর্মে অক্ষম, মেধাহীন, অযোগ্য শিক্ষক ৬৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করবেন এটি কাম্য নয়। সমাজ তার কাছ থেকে কিছু পাবে না। শিক্ষকতায় দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘দলীয় ক্যাডার’ নিয়োগ দিয়ে আমরা এরই মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। আর নয়। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের অবসর সংক্রান্ত আইনটি খসড়া আকারে রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তা সংসদে উপস্থাপিত হবে। সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব এখন অনেক বেশি। এখানে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে এই কমিটি আমাদের জন্য একটা আস্থার জায়গা। তারা তা প্রমাণও করেছেন। শিক্ষকদের স্বার্থে আঘাত করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই কমিটি অতীতেও নেয়নি, আগামীতেও নেবে না।

তবে সংসদীয় কমিটির শিক্ষকদের অবসরের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে পারে : (১) অবসরের বয়সসীমা ৬৫ করা হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি শারীরিকভাবে ‘ফিট’। অর্থাত্ সুস্থ আছেন এবং নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে (এ ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা এড়িয়ে চলতে হবে)। (২) ২ + ২ + ১ এর যে ফর্মুলা ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, তা অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাত্ সরাসরি ৬৫ পর্যন্ত আইন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করলে ভালো হয়। (৩) এই সুযোগ তিনি পাবেন, যিনি নিয়মিত এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন। (৪) শর্ত হিসেবে তাকে ৬০ বছরের পর প্রতিবছর একটি পাঠ্যবই রচনা করতে হবে। যদি তিনি তা না পারেন, তাহলে তিনি ৬৫ বছরে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না। (৫) ৬৫-তে যাওয়ার যোগ্যতা তিনিই অর্জন করতে পারবেন, অথবা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যিনি অধ্যাপক পদে থাকাকালীন ন্যূনতম একবার ‘সেবাটিক্যাল লিভ’ নিয়ে (এক বছর) একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন।

যার কোনো গবেষণা গ্রন্থ নেই, তিনি ৬৫-তে যাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অধ্যাপক থাকাকালীন তিনি যদি আদৌ কোনো এমফিল বা পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান না-করে থাকেন, তিনিও যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। মোট কথা, একটা নীতিমালা থাকুক, কিছু শর্ত থাকুক। যদি ঢালাওভাবে ৬৫ করা হয়, তা হলে তাতে ‘রাজনীতি’ ঢুকে যাবে। জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়েও তেমন উপকৃত হবে না। আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘ন্যূনতম পাওয়া’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছি না। আমি প্রশ্ন তুলছি নৈতিকতার। আমি যদি আমার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তা হলে কী অধিকার আছে আমার শিক্ষকতার পদকে দীর্ঘায়িত করার? আমি বাস্তবতাকে মেনে নিতে চাই। শুধু অবসরের বয়স পাঁচ বছর বাড়িয়ে রাষ্ট্রের কি ক্ষতিসাধন আমরা করছি না! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক তরুণ প্রভাষকের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে স্বয়ং তার শিক্ষকরাই প্রশ্ন তুলেছেন।

যিনি তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, তিনি এখন ৬৫ বছরের অবসরের সুবিধা ভোগ করবেন। একটি ‘বিতর্কিত’ থিসিস তত্ত্বাবধায়ন করে তিনি আদৌ বিভাগের কোনো সুনাম আনতে পারেননি। তিনি যদি ৬৫ বছর পর্যন্ত থাকেন, তিনি কী সুনাম আনবেন আর? আরেক ভদ্রলোক ‘ঘুষ’ দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ভিসির নির্দেশে মামলা হয়েছে। এখন যে ভদ্রলোক টাকা দিয়ে ‘শিক্ষক’ হতে চান, তিনি যদি ঘটনাক্রমে শিক্ষক হয়ে যান অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি জাতিকে কী দেবেন? তাদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ঘটনায় হতাশাগ্রস্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই অভিযোগ করেছেন টাকার বিনিময়ে সেখানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নয়া উপাচার্য বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখেননি বটে, কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি ‘কালো দাগ’ তো রয়েই গেল। তাই শিক্ষকদের বয়সসীমা বৃদ্ধিতে আমি খুশি হতে পারছি না। অনেক শিক্ষকই খুশি হবেন। আমি খুশি হব যদি এতে এখন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের সময়সীমা ৬৫ বছর করতে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক (অবসর গ্রহণ) (বিশেষ বিধান) বিল ২০১২’ উত্থাপন করা হয়েছে। ধারণা করছি সংসদের আগামী যেকোনো অধিবেশনে এই আইনটি পাস হবে। আগে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই সুবিধাটুকু গ্রহণ করতেন। এখন এই আইনটি সংসদে পাস হলে দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই ৬৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এটা নিয়ে ক্ষোভ ছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। এখন সরকার এই বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিল। এতে সরকারপ্রধান সকল শিক্ষকের ধন্যবাদ পাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হল, সেই উদ্দেশ্য সফল হবে কি?

অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে কি তাদের কাছে জাতির যে প্রত্যাশা তা পূরণ হবে? আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অবসরের বয়সসীমা ৬৫-তে উন্নীত করার সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। কেননা এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত একটি ‘চাপ’ আসবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার এই ‘চাপ’ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৬০ বছরের পর একজন সিনিয়র শিক্ষকের দেওয়ার কিছুই থাকে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, খুব কম শিক্ষকই ৬০ বছরের পর গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন না, অথবা রাখতে পারেন না। অসুস্থতা তাকে পেয়ে বসে। এই বয়সে এসে অনেকেই প্রবাসে অবস্থানরত ছেলে বা মেয়ে এবং সেই সঙ্গে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পড়াশোনা, গবেষণা, ক্লাস নেওয়া ইত্যাদির পেছনে ‘সময় দেওয়ার’ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কম। এর একটি বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে।

আমাদের যে সংস্কৃতি, তাতে পরিণত বয়সে এসে মানুষ সন্তানদের কাছে আবার ফিরে যায়। এটাই বাস্তব। গবেষণা তাকে টানে না। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা আমি বলছি না। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু আমরা অনেক জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিকে এই ৬৫ বছরের সুযোগ দিইনি। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি এই সমাজে এখনও আছেন, যারা ৬০ বছর বয়সের আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন, কিন্তু এখনও সক্রিয়। বই লিখছেন। সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে এই প্রজন্মের তরুণরা তাদেরকে ক্যাম্পাসে পেলে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও উত্সাহিত হতো। কিন্তু তা হয়নি। আমি আরও একটি কারণে অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছি, তা হচ্ছে ৬৫ বছর নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনেকেই (যারা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত) সরাসরি ৪০ বছর শিক্ষকতা করবেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? গবেষণা, পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য যেখানে বেশি, সেখানে তারা গবেষণায় মনোনিবেশ করবেন, পাঠ্যবই রচনা করবেন-এটা আশা করা যায় না। অনেক তরুণ প্রভাষকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ শুনি, তাতে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যত্ নিয়ে আমি রীতিমতো আতঙ্কিত। আমার আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫-তে উন্নীত করায় সমাজ-রাষ্ট্র উপকৃত হবে এ বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এর ফলে ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শত শত অফিসার ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকেও দাবি উঠেছে তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর। রাজনৈতিক সরকারের ওপর সঙ্গত কারণেই ‘চাপ’ আসবে। এবং কোনো সরকারই চাইবে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হোক। একসময় সরকারও বাধ্য হবে অফিসার ও কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়াতে। ফলে যা হবে তা হচ্ছে ‘ওপরের স্তরে’ জট সৃষ্টি হবে এবং নতুনদের চাকরি পেতে অসুবিধা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরদের দুটো গ্রেড-প্রফেসর ও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রফেসর হিসেবে নিজ পদে থাকলেও ১০ ভাগ কোটার কারণে কোনো দিনই ‘সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর’ হতে পারেন না। ফলে যা হবে, তা হচ্ছে সিনিয়র সচিবদের মতো ‘সিনিয়র প্রফেসরের’ পদ সৃষ্টি করতে বাধ্য হবে সরকার। কেননা রাজনৈতিক সরকার সব সময়ই চায় শিক্ষকদের সমর্থন। শিক্ষকদের খুশি করার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ‘সিনিয়র প্রফেসরের’ পদ আগামীতে সৃষ্টি করা হয়, আমি অবাক হব না। তবে এ ক্ষেত্রে যেন একটি নীতিমালা থাকে।

সরকার সিনিয়র সচিবের আটটি পদ সৃষ্টি করেছে। এতে সচিবদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আদৌ কি কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে? বয়সে সিনিয়র-এটাই কি নীতিমালা? আসলে নীতিমালাটি হওয়া উচিত যোগ্যতার বলে। একজন সচিব বয়সের কারণে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদা পাবেন, সেটি ঠিক নয়। তিনি যোগ্যতা দেখাতে পেরেছেন কি না, সেটাই হল আসল কথা। সচিব সাহেবদের কাজ যদি হয় ‘বিদেশ ভ্রমণ’ আর ‘দাতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী’ রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা, সেই সচিব ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হবেন না। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মেধাশূন্য সচিবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর (২০১১) এ ধরনের একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। সচিবদের ‘পারফরম্যান্সে’ প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট এমন খবরও আছে ওই প্রতিবেদনে। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি করতে হয়েছে। আইজিকে ‘থ্রি-স্টার জেনারেলের’ পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর জন্য পাঁচজন সিনিয়র সচিবের পদও সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে রাষ্ট্র, সমাজ কতটুকু উপকৃত হল? এখন সঙ্গত কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দাবি করবেন ‘সিনিয়র প্রফেসর’-এর পদ সৃষ্টি করার। তাদের কি ফেলে দিতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী?

এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ হোক আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে যেন কিছু ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ থাকে। ঢালাওভাবে একজন অসুস্থ, কর্মে অক্ষম, মেধাহীন, অযোগ্য শিক্ষক ৬৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করবেন এটি কাম্য নয়। সমাজ তার কাছ থেকে কিছু পাবে না। শিক্ষকতায় দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘দলীয় ক্যাডার’ নিয়োগ দিয়ে আমরা এরই মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। আর নয়। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের অবসর সংক্রান্ত আইনটি খসড়া আকারে রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তা সংসদে উপস্থাপিত হবে। সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব এখন অনেক বেশি। এখানে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে এই কমিটি আমাদের জন্য একটা আস্থার জায়গা। তারা তা প্রমাণও করেছেন। শিক্ষকদের স্বার্থে আঘাত করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই কমিটি অতীতেও নেয়নি, আগামীতেও নেবে না।

তবে সংসদীয় কমিটির শিক্ষকদের অবসরের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে পারে : (১) অবসরের বয়সসীমা ৬৫ করা হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি শারীরিকভাবে ‘ফিট’। অর্থাত্ সুস্থ আছেন এবং নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে (এ ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা এড়িয়ে চলতে হবে)। (২) ২ + ২ + ১ এর যে ফর্মুলা ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, তা অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাত্ সরাসরি ৬৫ পর্যন্ত আইন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করলে ভালো হয়। (৩) এই সুযোগ তিনি পাবেন, যিনি নিয়মিত এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন। (৪) শর্ত হিসেবে তাকে ৬০ বছরের পর প্রতিবছর একটি পাঠ্যবই রচনা করতে হবে। যদি তিনি তা না পারেন, তাহলে তিনি ৬৫ বছরে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না। (৫) ৬৫-তে যাওয়ার যোগ্যতা তিনিই অর্জন করতে পারবেন, অথবা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যিনি অধ্যাপক পদে থাকাকালীন ন্যূনতম একবার ‘সেবাটিক্যাল লিভ’ নিয়ে (এক বছর) একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন।

যার কোনো গবেষণা গ্রন্থ নেই, তিনি ৬৫-তে যাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অধ্যাপক থাকাকালীন তিনি যদি আদৌ কোনো এমফিল বা পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান না-করে থাকেন, তিনিও যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। মোট কথা, একটা নীতিমালা থাকুক, কিছু শর্ত থাকুক। যদি ঢালাওভাবে ৬৫ করা হয়, তা হলে তাতে ‘রাজনীতি’ ঢুকে যাবে। জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়েও তেমন উপকৃত হবে না। আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘ন্যূনতম পাওয়া’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছি না। আমি প্রশ্ন তুলছি নৈতিকতার। আমি যদি আমার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তা হলে কী অধিকার আছে আমার শিক্ষকতার পদকে দীর্ঘায়িত করার? আমি বাস্তবতাকে মেনে নিতে চাই। শুধু অবসরের বয়স পাঁচ বছর বাড়িয়ে রাষ্ট্রের কি ক্ষতিসাধন আমরা করছি না! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক তরুণ প্রভাষকের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে স্বয়ং তার শিক্ষকরাই প্রশ্ন তুলেছেন।

যিনি তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, তিনি এখন ৬৫ বছরের অবসরের সুবিধা ভোগ করবেন। একটি ‘বিতর্কিত’ থিসিস তত্ত্বাবধায়ন করে তিনি আদৌ বিভাগের কোনো সুনাম আনতে পারেননি। তিনি যদি ৬৫ বছর পর্যন্ত থাকেন, তিনি কী সুনাম আনবেন আর? আরেক ভদ্রলোক ‘ঘুষ’ দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ভিসির নির্দেশে মামলা হয়েছে। এখন যে ভদ্রলোক টাকা দিয়ে ‘শিক্ষক’ হতে চান, তিনি যদি ঘটনাক্রমে শিক্ষক হয়ে যান অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি জাতিকে কী দেবেন? তাদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ঘটনায় হতাশাগ্রস্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই অভিযোগ করেছেন টাকার বিনিময়ে সেখানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নয়া উপাচার্য বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখেননি বটে, কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি ‘কালো দাগ’ তো রয়েই গেল। তাই শিক্ষকদের বয়সসীমা বৃদ্ধিতে আমি খুশি হতে পারছি না। অনেক শিক্ষকই খুশি হবেন। আমি খুশি হব যদি এতে এখন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।  Daily SAKALER KHOBOR, 2.7.12