রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

জাহাঙ্গীরনগর নিয়ে দুঃখবোধ



      
আমার দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সংবাদ ছাপা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ তথা অভিভাবকদের মাঝে এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে। আর সংবাদগুলো ছাপা হচ্ছে এমন একসময়, যখন প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে। প্রথম সংবাদটি ছাপা হয়েছিল গাছ কাটা নিয়ে। পাঁচটি ছাত্রাবাস তৈরির জন্য প্রায় এক হাজার গাছ কেটেছিল ছাত্রাবাস তৈরিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি সংস্থা। এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার এক মহাপরিকল্পনা। এর মাঝে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় হবে ৪৫০ কোটি টাকা। ছাত্ররা কাটা গাছে রক্ত মেখে তা নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছিল। ডালাস শহরে বসে এই সংবাদটি পাঠ করে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম। উন্নয়ন প্রয়োজন; কিন্তু এতগুলো গাছ কাটতে হবে? শিক্ষক ও ছাত্ররা ক্যাম্পাসে একত্র হয়ে মিছিল করেছিলেন সেদিন। তারপর এলো আরেকটি ভয়ঙ্কর সংবাদ- ঠিকাদারদের 'কাজ' নিশ্চিত করতে ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আর উপাচার্য নিজে নাকি স্বয়ং তা বিলি-বণ্টন করেছেন! যদিও পরে উপাচার্য তা অস্বীকার করেন। এদিকে খবর আসতে থাকল, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর অসন্তুষ্ট। পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেল, অসন্তুষ্টের অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে- ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জাবি ভিসির কাছে চাঁদা দাবি! সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেল, ৮ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর ভিসির সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করে তারা 'উন্নয়ন কাজ' সুষ্ঠু সম্পন্ন করার জন্য ৪ থেকে ৬ পার্সেন্ট চাঁদা দাবি করেন। ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম নিজে গণমাধ্যমকে ওই তথ্যটি দেন (যুগান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর)। ভিসি নিজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি তাকেও জানান। এরপর এলো আরও একটি খবর- ক্ষমা ছেয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন, যে চিঠি গণমাধ্যমে ছাপাও হয়েছে (সমকাল, ১৩ সেপ্টেম্বর)। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে 'মমতাময়ী নেত্রী' হিসেবে সম্বোধন করে তারা জানালেন, 'উপাচার্য ম্যামের স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।' তবে চিঠিতে তারা উপাচার্যের সঙ্গে হয় খারাপ আচরণ করেছেন ('কিছু কথা বলি'), তা তারা স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছেন (ওই)। কী ভয়ঙ্কর কথা! তাদের দাবি, উপাচার্যের স্বামী ও ছেলে এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত! যদিও উপাচার্য তা অস্বীকার করেছেন এবং এই অভিযোগকে 'মানহানিকর' বলে অভিহিত করেছেন। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীরা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। একদল মিছিল করেছে উপাচার্যের পক্ষে, অপর দল মিছিল করেছে উপাচার্যের বিপক্ষে। স্পষ্টতই বিশ্ববিদ্যালয় আজ দ্বিধাবিভক্ত। মজার কথা, যারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন, তারাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক।

এত বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলাম। অতীতেও উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। একাধিক উপাচার্যকে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ পর্যন্ত করতে হয়েছে। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট যেন একটু ভিন্ন। এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার এক মহাপরিকল্পনা। আমি যখন জুন মাসের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখনই ক্যাম্পাসে নানা গুজব শুনে এসেছিলাম। তখনই আমার কানে এসেছিল ওই দুর্নীতির কথা! শুনেছিলাম, টাকা ছাড়া এখানে কেউ কাজ করতে পারবে না। আমি কথাটা বিশ্বাস করিনি। কেননা একজন উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যরা কেন দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন? একজন উপাচার্য তো শিক্ষক। একজন শিক্ষক এবং তার পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাবেন- এই যে অভিযোগ, আমার তা ভাবতেও কষ্ট হয়! আমি উপাচার্যের স্বামীকে তেমন চিনতাম না। পরিচয় নেই। তিনি কখনও শিক্ষকতা করেননি। তবে শুনেছি, তিনি একসময় সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। অবসরে আছেন অনেক দিন ধরে। এখন ব্যবসা করেন। নতুন কলাভবনের একাধিক বিভাগে সিনিয়র শিক্ষকদের রুমে আমি তাকে নিয়মিত যেতে দেখেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত পাঁচ বছরে অতিরিক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব নিয়োগে ইউজিসির কোনো অনুমোদন ছিল না। আমার নিজের বিভাগে কর্মচারীর সংখ্যা এখন আট, সবই নতুন। একজনকে আমি পেয়েছিলাম, তিনি টাইপিস্ট হিসেবে নিয়োগ পেলেও ঠিকমতো কম্পিউটার ব্যবহার ও টাইপ করতে পারতেন না। আমার ভয়টা ছিল এখানেই। কর্মচারী আর কর্মকর্তাদের ভারে যদি বিশ্ববিদ্যালয় ভারাক্রান্ত হয়, তাহলে একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয় 'পোষ্য কোটায়' ভরে যাবে, মেধাবী ছাত্ররা তখন আর ভর্তি হতে পারবে না। কেননা কর্মচারী তথা কর্মকর্তারা কোটার সুবিধা নিয়ে তাদের সন্তানদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। কোনো কোনো বিভাগে এই পোষ্য কোটায় ভর্তির সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত হয়ে যায়।

ছাত্রলীগ নেতাদের চিঠিতে ফিরে যাই। তারা সুস্পষ্টভাবে উপাচার্যের স্বামী ও তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। এই অভিযোগটি গুরুতর। উপাচার্য তা অস্বীকার করেছেন। আমিও বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে চাই উপাচার্যের ওপর। উপাচার্য একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি কলঙ্কিত হবে, এটা একজন শিক্ষক হিসেবে উপাচার্য যেমনি চাইবেন না, ঠিক তেমনি আমিও চাইব না। ছাত্রলীগের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। অভিযুক্তদের একজন ডাকসুর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। প্রধানমন্ত্রী চান ডাকসুর মাধ্যমে দেশের আগামী নেতৃত্ব তৈরি হোক। এখন ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এটাও আমাকে কষ্ট দেয়। খোদ ডাকসুর সাধারণ সম্পাদককে যখন অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন দেশের আগামী নেতৃত্ব নিয়ে আমি শঙ্কিত। আগামী নেতৃত্বকে কি আমরা একটা বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিলাম না? ছাত্রলীগের নেতৃত্ব প্রায় সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বাজেট, জাহাঙ্গীরনগরের উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে বেশি। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার বাণিজ্য করেছেন, এমনটি আমরা এখনও শুনতে পাইনি। জানি না ভবিষ্যতে আমরা শুনতে পাব কি-না! উপাচার্য বলেছেন, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক তার বান্ধবীকে দিয়ে টাকার জন্য ফোন করাতেন। যদি এ ধরনের কোনো ফোন এসে থাকে এবং সেই ফোনালাপে কোন কোন বিষয় আলোচনা হয়েছে, তা বের করা কঠিন কিছু নয়। সরকার চাইলে সংশ্নিষ্ট ফোন কোম্পানির কাছ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। তথ্যগুলো পাওয়া আমাদের জন্য জরুরি।

উপাচার্য ফারজানা ইসলাম আমার সহকর্মী। তিনি শিক্ষক। এটাই তার পরিচয়। তিনি কেন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন? তার নিজের স্বার্থে, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তিনি অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন- এটা আমার প্রত্যাশা। তবে যেহেতু স্বয়ং শিক্ষকদের একটি অংশ থেকে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হতে বাধা কোথায়? তিনি অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি নিজের বিরুদ্ধে নিজে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন না। তবে বৃহত্তর স্বার্থে কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা তিনি জানিয়েছেন। এখন দুটি হলের নির্মাণ কাজ সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে; সবার সঙ্গে পরামর্শ করে নতুন ছাত্রাবাসের জায়গা নির্ধারণ করা হবে। এই সিদ্ধান্তটি ভালো। এই সিদ্ধান্তটি আগে নিলে এমন ক্ষতি হতো না। তবে টাকা দেওয়া হয়েছে কি হয়নি- এর ফয়সালা এখনও হয়নি। ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বীকার করেছেন, তারা জাবি উপাচার্যের কাছে 'ন্যায্য পাওনা' দাবি করেছিলেন (দি ডেইল স্টার, বাংলা, ১৪ সেপ্টেম্বর)। 'ঈদের খরচ' হিসেবে তারা ওই টাকা চেয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তার এই স্বীকারোক্তি কি সব সমস্যার সমাধান করবে? আদৌ তিনি বা জাবি ছাত্রলীগ টাকা পেয়েছিল কি-না, তার সমাধান এতে হলো না। তবে শোভন ও রাব্বানী দু'জনকেই ছাত্রলীগের পদ ছাড়তে হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই টাকা ভাগবাটোয়ারার বিষয়টি অনেক প্রশ্নকে সামনে আনল। এক. ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই সরকারি ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে, যার কোনোটা পত্রিকায় প্রকাশ পায়, কোনোটা পায় না। সুতরাং শত শত কোটি টাকার ওইসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনা দরকার। কেন্দ্রীয়ভাবে অথবা ইউজিসির মাধ্যমে এই কাজগুলো (ই-টেন্ডারসহ) সম্পন্ন করা যায় কি-না, তা ভেবে দেখতে হবে; দুই. উপাচার্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। নারী কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন ও মাসের পর মাস ঢাকা থেকে অফিস করার এন্তার অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য দক্ষ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগে একটি প্যানেল তৈরি করা যায় এবং সেই সঙ্গে 'এক টার্ম উপাচার্য' নিয়োগ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন; তিন. ইউজিসিকে আরও সক্রিয় করে উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা প্রয়োজন; চার. দুদক রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করেছিল। ছাত্র ও শিক্ষকদের এক অংশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত করতে পারে; পাঁচ. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন দিয়ে সরকারের 'নয়া নেতৃত্ব' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ভালো ফল দিচ্ছে না। ছাত্রনেতারা অসততার পরিচয় দিচ্ছেন। সরকারি ছাত্র সংগঠনের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আগামীর নয়া নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায়। এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড না নেওয়াই মঙ্গল।

শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ভাগবাটোয়ারার সংবাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। উপাচার্যের পরিবার এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকুক আর না থাকুক, উপাচার্যের মানসম্মান এতে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এখন শোভন আর রাব্বানীকে বিদায় নিতে হলো। তাতে করে কি উত্থাপিত অভিযোগের আদৌ কোনো নিষ্পত্তি হলো? কোনো পক্ষ থেকেই এটা প্রমাণিত হলো না যে, টাকাটা কোন পক্ষকে দেওয়া হয়েছিল। যে কারণেই এই অভিযোগটি অমীমাংসিত থেকে গেল। এটা ঠিক, প্রধানমন্ত্রী শোভন-রাব্বানীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে একটি 'মেসেজ' দিলেন। এই মেসেজটি সবার জন্যই প্রযোজ্য এখন। কিন্তু উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম যখন বলেন, 'দুর্নীতি যেই করুক তার তদন্ত হোক। যে বা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান নষ্ট করেছে, তার তদন্ত হোক। হয়তো আমার দুর্নীতি বের করতে গিয়ে অন্য কিছু বেরিয়ে আসবে' (বিডিনিউজ২৪.কম, ১৪ সেপ্টেম্বর); তখন তদন্তের বিষয়টিকে আমি গুরুত্ব দিই। তদন্ত হোক। সত্য বেরিয়ে আসুক।
Daily Samakal
19.09.2019

প্রশ্নটি নৈতিকতার


advertisement
বিএনপির একজন সংসদ সদস্যের ১০ কাঠা প্লটের আবেদনপত্র নিয়ে যে ‘বিতর্ক’ তার রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো আরও একটি সংবাদ। এবারের সংবাদের শিরোনাম একজন প্রভাবশালী সাংসদের স্ত্রীকে নিয়ে। ওই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য নন। তবে তিনি মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত একটি ছোট দলের সাধারণ সম্পাদক ও পরপর দুবার মহাজোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। সংবাদটি বের হয়েছে তার স্ত্রীকে নিয়ে, যিনি একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক। রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের তিনি শিক্ষক। ৮ বছর ধরে কলেজে তিনি কোনো ক্লাস নেন না। তবে নিয়মিত বেতন নেন। থাকেন স্বামীর সঙ্গে ঢাকায়। তবে তিনি নিজে ক্লাস না নিয়ে যে কাজটি করেন তা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধতুল্য। তিনি ‘একজন মিমি’কে ঠিক করে রেখেছেন। ওই মিমি মাঝে মধ্যে ক্লাস নেন। আর এর বিনিময়ে মিমি একটি মাসোহারা পান। আর কলেজ অধ্যক্ষের বক্তব্য এ রকম : ‘ওই সাংসদের স্ত্রী নিয়মিত কলেজে আসতে পারেন না। সে কারণে তিনি একজনকে ঠিক করে দিয়েছেন তার ক্লাস নেওয়ার জন্য।’ কী সাংঘাতিক কথা? যিনি নিজে শিক্ষক হয়েও আরেকজনকে ঠিক করে দেন ক্লাস নেওয়ার জন্য! আর কলেজ অধ্যক্ষও বা কী করে তার অনুমতি দিলেন? এই অপরাধের ভার তো তারও।
একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রী ঢাকায় স্বামীর পাশে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি শিক্ষক হতেই পারেন। এ ক্ষেত্রে তার উচিত ছিল কলেজ থেকে ছুটি নেওয়ার। কিন্তু তিনি তা না করে একজনকে ‘নিয়োগ’ দিলেন তার হয়ে কলেজে ক্লাস নেওয়ার জন্য। এটা কি তিনি পারেন? উপরন্তু তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা নেন। এটা কি নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে? তিনি একজন কলেজ শিক্ষক। তার কাছ থেকে তো তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু শিখবে? তিনি কী শেখালেন? আমি অবাক হয়ে যাই যখন তার স্বামী একজন সংসদ সদস্য হয়ে এই অনৈতিক কর্মকা-কে সমর্থন করেন! তার অজ্ঞাতে তার স্ত্রী ক্লাস না নিয়ে নিয়মিত কলেজে উপস্থিত না থেকে বেতন-ভাতা তোলেন, আর তিনি তা জানেন না, এটা আমি মানতে নারাজ। তিনি নিশ্চয়ই জানেন এবং জেনেশুনে তিনি স্ত্রীকে এই কাজটি করতে দিয়েছেন! একজন সংসদ সদস্য, যিনি দেশের জন্য আইন প্রয়োগ করবেন, জাতিকে নৈতিকতা শেখাবেন, তিনি কী করে নিজের স্ত্রীর অনৈতিক কর্মকা-কে সমর্থন করলেন? আমার দুঃখবোধ এখানেই। আমরা কার কাছ থেকে শিখব? তরুণ প্রজন্ম কাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাবে? ওই সংসদ সদস্য একটি বামদলের সাংসদ। তিনি অনেক ভালো ভালো কথা বলেন। কিন্তু ‘ঘরের মানুষ’ যখন অনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত থাকেন, তিনি নিশ্চুপ থাকেন কীভাবে? আমাদের আস্থার জায়গাটা আর থাকে কোথায়? এর আগে একজন বিএনপির সংসদ সদস্য ১০ কাঠার প্লট চেয়ে আবেদন করেন এবং আবেদনপত্রে ‘সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব’ এ কথা লিখে বড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। সরকারের বড় সমালোচক এই তরুণ সংসদ সদস্য টক শোতে অনেক জনপ্রিয়। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে তিনি যেতে পারলেন না। ১০ কাঠার একটি প্লট তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিল। এর কোনো প্রয়োজন তার ছিল না। তার কাছে সুযোগ ছিল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার। নিছক ব্যক্তিস্বার্থে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জানালেন, তার কোনো প্লট বা ফ্ল্যাট নেই। অথচ তার বাবার সহকর্মী ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, ওই সংসদ সদস্যের লালমাটিয়ায় ৩ কাঠার প্লট আছে। তিনি পৈতৃক সূত্রে এই প্লট ও এলিফ্যান্ট রোডের অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছেন (বাংলাদেশ জার্নাল, ২৭ আগস্ট)। তা হলে প্রশ্ন দাঁড়ায় ওই সংসদ সদস্য মিথ্যা বলেছেন কিনা? একজন সংসদ সদস্য এফিডেভিটে সত্য তথ্য উল্লেখ করবেন, এটাই কাম্য। এখন তার দেওয়া বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় রাজনীতিতে তার ‘অবস্থান’ দুর্বল হলো মাত্র। তিনি এ কাজটি না করলেও পারতেন। তার বাবা উজ্জ্বল এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তার বিশাল এক ভূমিকা ছিল। জীবদ্দশায় আওয়ামী লীগের তিনি সমালোচনা করে গেছেন। এখানে বাবার সঙ্গে তার রাজনৈতিক দর্শনের মিল আছে। কিন্তু অমিলটা এক জায়গায়। আর তা হচ্ছে তার প্রয়াত বাবা জীবিতকালে কোনো সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নেননি। কিন্তু মেয়ে হয়ে তিনি নিতে চাইলেন, যা কিনা তার বাবার আদর্শের পরিপন্থী। গৃহায়নমন্ত্রীকে লেখা তার চিঠি এবং ১০ কাঠার একটি প্লট চাওয়া এখন প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানকেও দুর্বল করল। প্রধান বিরোধী দলটি ক্ষমতায় নেই প্রায় ১৩ বছর। সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে ‘ব্যর্থ’ এই দলটিতে নানা সংকট চলছে। এখন শীতের পর তারা নতুন করে আন্দোলনের কথা বলছেন। কিন্তু এই দলের একজন সংসদ সদস্য যখন সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিতে চান, তখন দলটির ভাবমূর্তি নষ্ট হয় বৈকি। নিশ্চয়ই আমি একজন সংসদ সদস্যের কর্মকা- নিয়ে পুরো দলের কর্মকা-কে বিচার-বিশ্লেষণ করব না। এই দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। মানুষের কাছে দলটির জনপ্রিয়তা এখনো আছে। কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্নে দল যে ভুল করছে, এটা তার বড় প্রমাণ। দলটি যোগ্য লোকদের এখনো খুঁজে বের করতে পারেনি। টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তব এবং ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রতিফলন ঘটে না, ব্যক্তিস্বার্থ সেখানে বড় হয়ে দেখা দেয়। ওই সংসদ সদস্যই এর বড় প্রমাণ।
এটা ঠিক, ১০ কাঠার প্লট চেয়ে তিনি নৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। কিন্তু আমি তাকে দোষ দিই না। সব এমপিই তো প্লটসহ অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন। ইতোমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে প্লট দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনিও চাইলেন। তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। তিনি সরকারের কাছ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা না নিয়ে আগামীর সংসদ সদস্যদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু সুবিধাবাদিতা আর ব্যক্তিস্বার্থের যে রাজনীতি তাতে তিনি নিজেকে সমর্পণ করলেন। আমাদের দুঃখ এখানেই, দেশে ত্যাগী রাজনীতিবিদের জন্ম হচ্ছে না। সিনিয়র রাজনীতিবিদরা ধীরে ধীরে সবাই বয়সের ভারে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ আমাদের দরকার। যারা একুশ শতকে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু আমরা কি তা পাচ্ছি? ব্যক্তি সুবিধার কাছে অন্য সবকিছু হেরে যাচ্ছে।
আমরা এখন কাদের কাছে আস্থা রাখব? তরুণ রাজনীতিবিদ তৈরির জন্য আমরা ডাকসু নির্বাচন করলাম। নির্বাচনটি যাই হোক না কেন, সংবাদপত্র থেকে জানলাম ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক একটি হলে এসি রুমে থাকেন, যেখানে সাধারণ ছাত্ররা গাদাগাদি করে গণরুমে থাকে। ছাত্ররা সিট পায় না, আর তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ‘নেতা’ থাকেন এসি রুমে! আমরা ভবিষ্যৎ কেমন নেতা তৈরি করছি? এ জন্যই কী আমরা ডাকসু নির্বাচন দিয়েছিলাম? নৈতিকতা কোথায় গেল? আরও একটি সংবাদে আমি মর্মাহত। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শুল্কমুক্ত গাড়ির জন্য আবেদন করেছেন। তিনি তো আর মন্ত্রী নন! ভাই মন্ত্রী। তিনি কী করে এই সুবিধা চান? তা হলে তাকে অনুমতি দিলে তো সাবেক সব মন্ত্রীকেই এই সুযোগ দিতে হবে! রাষ্ট্র তো কোনো বৈষম্য করতে পারে না। সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রের সব নাগরিক সমান। তাই সাবেক অর্থমন্ত্রী কোনো বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন না। রাজনীতিবিদরা নিজেরা নিজেদের জন্য ‘সুযোগ’ তৈরি করে নিয়েছেন। এভাবে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে যদি ‘বিশেষ সুবিধা’ চান, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য আগামীতে সম্ভব হবে না। একটি ‘বিশেষ শ্রেণি’ যদি এভাবে সুযোগ-সুবিধা নিতে থাকেন তা হলে রাষ্ট্রের অন্যান্য শাখার কর্মকর্তারাও এক সময় এ ধরনের দাবি করে বসবেন। সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্যদের (শুধু অফিসার পর্যায়ে) এই সুযোগ আছে। এতে করে জনসাধারণের মাঝে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। অনেক উন্নত দেশে এ ধরনের ‘বিশেষ সুবিধা’ নেই। তাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে এ ধরনের ‘বিশেষ সুবিধা’ বিশেষ করে প্লট বরাদ্দ, শুল্কমুক্ত গাড়ি বাতিল করা উচিত। রাষ্ট্র নাগরিকদের মাঝে কোনো বৈষম্য তৈরি করতে পারে না।
একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রী অনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত থাকবেন বছরের পর বছর, একজন সংসদ সদস্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্লট চাইবেন, একজন ছাত্রনেতা বিলাসী জীবনযাপন করবেনÑ এ ধরনের সংবাদ আমাদের আহত করে। আমরা কার কাছে আস্থা রাখব? একজন সরকারি কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকা ঘুষ খান। একজন কর্মচারী শত শত কোটি টাকা অবৈধ পন্থায় অর্জন করেন। একজন ডিআইজি জেলখানা থেকে প্রতিদিন লাখ টাকা আয় করেন। এসব অবৈধ কর্মকা-। তাদের চিহ্নিত করে বিচার করা হচ্ছে। আর আজ যারা জাতিকে পথ দেখাবেন, তাদের অনৈতিক কর্মকা- যখন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তখন আস্থার জায়গাটা আর থাকে না কোথাও।
Daily Amader Somoy
18.09.2019

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর শেষ কোথায়

Image result for War in Afghanistan

গত ১১ সেপ্টেম্বর বুধবার যুক্তরাষ্ট্র যখন ৯/১১-এর ১৮ বছর পার করেছে, তখন একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে—‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ শেষ কোথায়? ১৮ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদা নামের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল। ওই হামলায় সন্ত্রাসীরা চারটি হাইজ্যাক করা বিমান ব্যবহার করেছিল। দুটি বিমান নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকায় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার দুটি ভবনে (যা টুইন টাওয়ার নামে পরিচিত ছিল) আছড়ে পড়েছিল, যার কারণে ভবন দুটি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দুই হাজার ৯৯৬ জন মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এত বড় সন্ত্রাসী হামলা অতীতে কখনো ঘটেনি। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। ১৮ বছর পার হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেনি। ২০১৯ সালে এসেও সেই যুদ্ধ আজও চলছে। গণমাধ্যমে তাই প্রশ্ন তোলা হয়েছে আর কত দিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এই যুদ্ধের ভার বহন করবে? ‘টুইন টাওয়ারে’ হামলার এক মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। যুক্তি ছিল—তৎকালীন আফগান তালেবান নেতা মোল্লা ওমর আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দিয়েছেন। তার পরের ইতিহাস সবাই জানে। ২০০১ সালে আফগানিস্তান, ২০০৩ সালে ইরাক, ২০১১ সালে লিবিয়া—একে একে ওই সব দেশের সরকারকে উত্খাত করা হয়েছিল, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘বন্ধু’ ছিল না। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সাদ্দাম হোসেন অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র (weapons of mans destruction) সংগ্রহ করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। অথচ যুদ্ধের পর জানা গেল, ওই ধরনের কোনো অস্ত্র সাদ্দাম হোসেনের ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের কারণে দেশটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আর যুদ্ধের পর দেশটি পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেয়েছিল মার্কিন কম্পানিগুলো। ইরাককে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল উত্তোলন করে সেই ‘বিল’ মেটাতে হয়েছিল।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—এর দ্বিতীয় ‘ক্ষেত্র’। তৃতীয় ‘ক্ষেত্র’ ছিল লিবিয়া। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে R2P (Responsibility to protect) তত্ত্ব ব্যবহার করেছিল—অর্থাৎ মানবিকতা রক্ষায় হস্তক্ষেপ। যুক্তিটি ছিল এ রকম—লিবিয়ার শাসক গাদ্দাফি সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাই সামরিক হস্তক্ষেপ জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র সেনাবাহিনী বোমাবর্ষণ করে (১৩ মার্চ ২০১১) সেখানে গাদ্দাফিকে উত্খাত করল। কিন্তু সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। রাষ্ট্রটি এখন কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় প্রশাসন নেই। যুদ্ধবাজরা একেকটি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। বাকি ছিল সিরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র R2P তত্ত্ব এখানেও প্রয়োগ করেছিল। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী স্টেট ও আল-নুসরা ফ্রন্টের (যাদের সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্ক ছিল) ইসলামিক জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিমান আক্রমণ চালিয়ে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—এর চতুর্থ ফ্রন্ট ওপেন করেছিল। একপর্যায়ে রুশ বিমান হামলার পর আইএস বা ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা সিরিয়া ও ইরাক থেকে উত্খাত হয়েছিল, এটা সত্য। কিন্তু এই জঙ্গিরা ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন দেশে। কিন্তু জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—এর কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন থাকলই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে এক ধরনের সংলাপে গেছেন, যখন আফগানিস্তানে একটি শান্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখন ১১ সেপ্টেম্বর তালেবানরা কাবুলে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে জানান দিল তারা কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে চায় না। অর্থাৎ গত ১৮ বছর ধরে আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধ’ চলছে। একসময় তালেবানের মোকাবেলায় সেখানে প্রথমবারের মতো ন্যাটো সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। সেই ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা সেখানে এখনো রয়ে গেছে। তালেবানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যে সংলাপ, তাতে তালেবানের দাবি ছিল একটি—আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। আর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল—আল-কায়েদার ওপর থেকে তালেবানের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এবং একই সঙ্গে মার্কিন দূতাবাস, স্থাপনা ও মার্কিনি সেনাদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু তালেবানরা মার্কিনি স্থাপনার ওপর সন্ত্রাসী হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর অর্থ পরিষ্কার—তালেবানের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সব উদ্যোগ ভেস্তে গেছে! সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকায়। মালি, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ইরিত্রিয়া কিংবা সোমালিয়ায় নতুন নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে, যারা আল-কায়েদা কিংবা ইসলামিক স্টেটের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। প্রসঙ্গত, বোকো হারাম (নাইজেরিয়া) ও আল-শাবাব (সোমালিয়া)-এর নাম উল্লেখ করা যায়। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা লিবিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন ডলার। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ায় ‘যুদ্ধে’ প্রাণ হারিয়েছে ১১ মিলিয়ন মানুষ। এর মধ্যে ইরাকে ৫০ লাখ, আফগানিস্তানে ৫০ লাখ, এমনকি সিরিয়ায়ও মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ লাখ। প্রায় ১০ লাখ সিরীয় নাগরিক যুদ্ধের কারণে দেশান্তরিত হয়েছে এবং এরা এখন জার্মানিতে বসবাস করছে। যুদ্ধ এই দেশগুলোকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। একটি নতুন প্রজন্ম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? খুব শিগগিরই এই যুদ্ধের যে শেষ হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। কেননা খোদ সিরিয়ায়ও আবার ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা সংগঠিত হচ্ছে, এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে। উপরন্তু ইরান সংকট সেখানে নতুন করে আরেকটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের যদি আরো অবনতি ঘটে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। আর এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ এক নতুন ধরনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে যাবে। তখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়বে বৈ কমবে না। যে আফগানিস্তানে ২০০১ সালে বিমান হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণ করে তালেবান জঙ্গিরা। ইরাকে এই সেপ্টেম্বর মাসে আশুরা মিছিলে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ৩১ জনকে হত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র গত ৩১ আগস্ট সিরিয়ার ইদলিনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। এর অর্থ পরিষ্কার, গত ১৮ বছরেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি। ফলে প্রশ্নটা থাকা স্বাভাবিক যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আদৌ শেষ হবে না!
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আজ বিশ্বব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একসময় ইউরোপ ছিল স্থিতিশীল একটি এলাকা। কিন্তু সন্ত্রাসীরা আজ প্যারিস, ব্রাসেলস কিংবা লন্ডনের মতো শহরে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। বলতে দ্বিধা নেই, বেশির ভাগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মুসলমানরা জড়িত। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদেরই বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশে মুসলমান ধর্মাবলম্বী কিছু তরুণ জিহাদি মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিল যুদ্ধ করতে। এদের কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারলেও এরাই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফিরে এসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। আবার এমন কথাও বলা হচ্ছে যে ২০১৭ সালে আইএস জঙ্গিরা সিরিয়া-ইরাক থেকে উত্খাত হলেও, তারা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে একটা ভয় থাকলই যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তাহলে এর পরিণতি কী?
স্পষ্টতই আফগানিস্তানে তালেবানরা অনেক শক্তিশালী। আফগান সরকারের অস্তিত্ব শুধু কাবুলেই সীমাবদ্ধ। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সব সেনা সদস্যকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে কাবুলে ঘানি সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ ক্ষেত্রে তালেবানরা কি আবার ক্ষমতা দখল করবে? একসময় (১৯৯৪-২০০১) তো তারা ক্ষমতায় ছিল। তথ্যগতভাবে তালেবানরা যতি আবার কাবুলে ক্ষমতা দখল করে, তাহলে এ অঞ্চলের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আফগানিস্তান কি আবারও প্রত্যক্ষ করবে সেই মধ্যযুগীয় শাসন? এই এলাকার শান্তি তথা স্থিতিশীলতার জন্য, তা কোনো ভালো খবর বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।
আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সংলাপ’ যখন ভেঙে গেছে, তখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির একটি ভিডিও বার্তা। ৯/১১ উপলক্ষে তিনি এই ভিডিও বার্তাটি ছাড়েন। তাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সব ইউরোপীয়, ইসরায়েলি ও রাশিয়ার স্থাপনার ওপর হামলার আহ্বান জানান।
SITE Intelligence আমাদের এই খবরটি দিয়েছে (এপির উদ্ধৃতি দিয়ে  Military Times, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। এটা সত্য, ইদানীং আল-কায়েদার তৎপরতার খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। তবে সীমিত আকারে তারা ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। এখন জাওয়াহিরির এই ভিডিও বার্তায় এটা প্রমাণ হয়ে গেল আল-কায়েদার তৎপরতা থামবে না। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এটা ঠিক, ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছেন। তিনি হোয়াইট হাউসে তালেবান নেতাদের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘সমঝোতায়’ গেলেও আল-কায়েদা কিংবা আইএসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কি সম্পর্কে জড়াবে—এটা একটা বড় প্রশ্ন। সেখানে সমঝোতা, না বৈরিতা—সেটাই বড় বিষয়। তাই প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক—‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—এর শেষ কোথায়?

Daily Kalerkontho
17.09.2019

লে

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও আফগান শান্তি আলোচনা

Image result for War in Afghanistan


যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘নাইন-ইলেভেন’-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ১৮ বছর পার করছে, ঠিক তখনই আল-কায়েদা নেতা আইমান আল জাওয়াহিরির একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নাইন-ইলেভেন’-এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ওই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আল-কায়েদার জঙ্গিরা দুটি বিমান নিয়ে নিউ ইয়র্কের বিশ^বাণিজ্য সংস্থার দুটি ভবনে (যা টুইন টাওয়ার নামে পরিচিত ছিল) হামলা চলায়। বিমান দুটি তারা হাইজ্যাক করেছিল। বিমান দুটি ‘টুইন টাওয়ার’-এ আছড়ে পড়ায় ভবন দুটি পরিপূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে ১৮ বছর। যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাসীন হয়েছেন। কিন্তু ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সূচনা করেছিল, তার অবসান হয়নি। ‘নাইন-ইলেভেন’-এর মর্মান্তিক ঘটনা যখন ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সারা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ স্মরণ করছে, ঠিক তখনই আল-কায়েদার বর্তমান নেতা জাওয়াহিরির ভিডিও বার্তা ছড়িয় পড়ল বিশ্ব মিডিয়ায়। ওই বার্তায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সব ইউরোপীয়, ইসরায়েলি ও রাশিয়ার স্থাপনার ওপর হামলার আহ্বান জানিয়েছেন। এর অর্থ কী? তাহলে কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না? এটা সত্য,বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার কর্মকাণ্ড এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না। এদের নেটওয়ার্ক অনেকটাই ভেঙে গেছে। বিচ্ছিন্নভাবে এরা ইয়েমেনে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। আফগানিস্তানে এদের কর্মকাণ্ড সীমিত। তারপরও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছেই। বিশেষ করে আফ্রিকাতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এমনি এক পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
আফগানিস্তানে একটি ‘শান্তির’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ইতিমধ্যে একাধিকবার আফগান তালেবানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এমনকি তিনি তালেবান নেতাদের হোয়াইট হাউজে পর্যন্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের আগের দিন কাবুলে মার্কিন দূতাবাসে হামলার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছিয়ে যান। তাই শান্তি আলোচনায় সৃষ্টি হয়েছে এক অনিশ্চয়তার। এখানে বলা ভালো, আল-কায়েদা ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই হামলা চালিয়েছিল। ওই ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ১২ বিলিয়ন ডলারের। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পরিশোধ করেছিল ৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের দাবিনামা। শুধু বিধ্বস্ত ভবন পরিষ্কার করতে ব্যয় হয়েছিল ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। এসব পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে, ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। যারাই এ কাজটি করে থাকুক না কেন, এর পেছনে ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্র। তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা আজও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি অনেকের কাছেই। যারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বিশ্বাস করেন, তারা বলার চেষ্টা করেন, ‘টুইন টাওয়ার’-এ হামলায় এতগুলো মানুষ মারা গেল, একজন ইহুদিও মারা গেল না? এটা কী কাকতালীয়, না ওর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন এলাকার একদম শেষ প্রান্তে টুইন টাওয়ারটি অবস্থিত ছিল। সাবওয়ের ওটাই ছিল সর্বশেষ স্টেশন। ওই এলাকা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ এলাকায় তথা টুইন টাওয়ারে ছিল। ওই এলাকায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অবস্থিত। আর সবাই এটা জানেন, ইহুদিরা এই এলাকার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে একজন ইহুদিও মারা যাবে না, এটা অনেকেই মানতে চান না।
ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। সেই যুদ্ধ আজও চলছে। ওই হামলায় প্রথমবারের মতো আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন আফগান তালেবান নেতা মোল্লাহ ওমর আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছেন, এই অভিযোগ তুলে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেশটি দখল করে নেয়। এরপর ২০০৩ সালে ইরাকে মারণাস্ত্র রয়েছে এই অভিযোগ তুলে ইরাকও দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপরের ঘটনা লিবিয়া ও সিরিয়ায়। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ থেমে থাকেনি এবং আল-কায়েদার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বন্ধ হয়নি। এরই মাঝে জন্ম হয়েছিল (সিরিয়া-ইরাক) ইসলামিক স্টেট নামে ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর। অব্যাহত মার্কিন ও রুশ বিমান হামলায় ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা ২০১৭ সালে সিরিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। ১৮ বছর ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সব উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকায়। মালি, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ইরিত্রিয়া কিংবা সোমালিয়ায় নতুন নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে, যারা আল-কায়েদা কিংবা ইসলামিক স্টেটের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। প্রসঙ্গত, বোকো হারাম (নাইজেরিয়া) ও আল-শাবাব (সোমালিয়া)-এর নাম উল্লেখ করা যায়।
আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা লিবিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন ডলার। ব্রাউন বিশ^বিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ায় ‘যুদ্ধে’ প্রাণ হারিয়েছেন ১১ মিলিয়ন মানুষ। এর মাঝে ইরাকে ৫০ লাখ, আফগানিস্তানে ৫০ লাখ এমনকি সিরিয়াতেও মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ লাখ। প্রায় ১০ লাখ সিরীয় নাগরিক যুদ্ধের কারণে দেশান্তরিত হয়েছেন এবং এরা এখন জার্মানিতে বসবাস করছেন। যুদ্ধ এই দেশগুলোক পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। একটি নতুন প্রজন্ম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? শিগগিরই এই যুদ্ধের শেষ হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল আফগান যুদ্ধ অবসানের। কিন্তু সে সম্ভাবনাও এখন পিছিয়ে গেল। এমনকি শান্তি আলোচনায়
তথাকথিত একটি ‘ঐকমত্যে’ উপনীত হওয়া সম্ভব হলেও, আফগানিস্তানে শান্তি নিশ্চিত হবে কি না বলা মুশকিল। কেননা, সেখানে শুধু তালেবানরাই একমাত্র ‘বিরোধীপক্ষ’ নয়। বরং আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরাও সেখানে তৎপর।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন তালেবান নেতাদের ওয়াশিংটনে ডাকার উদ্যোগ নিচ্ছেন (যা পরে পরিত্যক্ত হয়), তখন আল-কায়েদা একটা ভিডিও প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, প্রায় ১০০ আল-কায়েদা জঙ্গি মোটরসাইকেলে করে জাবুল প্রদেশের প্রাদেশিক হেডকোয়ার্টার দখল করে নিয়েছে (ভিডিওর শিরোনাম Fath operation in zabul)। এটা জুলাই ৩০-এর ঘটনা। যদিও আফগান সরকার এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই জাবুল প্রদেশসহ আরও দুটি প্রদেশ বাদাখাসান ও কুনার প্রদেশে আল-কায়েদা বেশ কিছুদিন ধরেই সক্রিয়। এর অর্থ হচ্ছে, তালেবানদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন একটি ‘সমঝোতায়’ উপনীত হলেও, আল-কায়েদা সেই সমঝোতায় আসবে কি না সে প্রশ্ন থাকলই। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের প্রশ্নটিও আছে ( Militants pose Major threat In Afganistan, Gandhara, July 02, 2019)। শীর্ষ ন্যাটো কমান্ডার জেনারেল অস্ট্রিন মিলার মে-জুন মাসে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আইএস আফগানিস্তান তথা আমাদের সবার জন্যই একটি সমস্যা’। একটি গণমাধ্যমে ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে এভাবে ‘আইএস সিরিয়া-ইরাকে তাদের খিলাফত হারানোর পর আফগানিস্তানে একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিচ্ছে।’ [দেখুন, মুসতাফা সারোয়ারের প্রবন্ধ S Militants pose Major threat In Afganistan, Gandhara, July 02, 2019। যুক্তরাষ্ট্রের উইলসন সেন্টারের গবেষক মাইকেল ক্যুগেলম্যানও মনে করেন, আফগানিস্তানে আইএসের তৎপরতা আমাদের সবার জন্যই একটি চিন্তার কারণ। আইএস যে খোদ রাশিয়া তথা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও হুমকি, তা স্বীকার করেছেন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রধান আলেকজান্ডার রবার্টনিকভও। এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর পাশাপাশি চীন ও পাকিস্তানের ভূমিকা ভবিষ্যতে কী হবে এটাও একটা বড় চিন্তা।
চীন এই সংকটে এত দিন নিশ্চুপ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের একটি ভূমিকা লক্ষণীয়। চীন সম্প্রতি আফগানিস্তানের তালেবান নেতাদের বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার চীন আফগান সরকার ও তালেবানদের মধ্যে এক ধরনের দূতিয়ালি করতে চায়। কেননা, চীনের স্বার্থ দুটি। এক. আফগানিস্তানের খনি উন্নয়নে চীন জড়িত। দুই. চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে চীন আফগানিস্তানকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। ভুলে গেলে চলবে না, চীনের সঙ্গে আফগানিস্তানের ৭৬ কিলোমিটারের এক সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের এক পাশে রয়েছে তাজিকিস্তান, অপর পাশে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের গিলগিট-বালটিস্তান, যে অঞ্চল হয়ে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সড়কপথটি বেলুচিস্তানের গাওদার সমুদ্রবন্দরে পৌঁছেছে। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ৮৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি চীন ও পাকিস্তানি সমুদ্রবন্দর গাওদারকে সংযুক্ত করেছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৬ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৬২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চীন স্বাভাবিক কারণেই এ সড়কের ‘নিরাপত্তা’ চাইবে। তাই তালেবানদের সঙ্গে তারা এক ধরনের সমঝোতায় যেতে চাচ্ছে। আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান একটি ফ্যাক্টর। এটা সবাই জানে, তালেবানদের অস্ত্রের একটা বড় উৎস হচ্ছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।
ফলে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি যে খুব সহজ, তা বলা যাবে না। ১৮ বছর পার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর অবসান ঘটায়নি। এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তানে যদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাস দমনে’ একটি বড় অবদান রাখতে পারবে। অন্যান্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘এই উদ্যোগ একই সঙ্গে একটি বড় অবদানও রাখতে পারবে
Daily Desh Rupantor
15.09.2019