রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ট্রাম্প, না বাইডেন




ট্রাম্প, না বাইডেন

কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট? ডোনাল্ড ট্রাম্প, না জো বাইডেন? আগামী ৩ নভেম্বর সেখানে নির্বাচন। নয়া প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। এরই মধ্যে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় পার্টিরই জাতীয় কনভেনশনে দলীয় প্রার্থিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে, বাইরের কোনো শক্তি নির্বাচনে আদৌ কোনো প্রভাব বিস্তার করবে কি না এটা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার জন্ম হয়েছে। ট্রাম্প ও বাইডেন পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন, যা সংবাদপত্রে ছাপাও হচ্ছে। অতীতের কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমনটি দেখা যায়নি। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দুই দলের সমর্থকরা সহিসংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। ২৯ আগস্ট অরেগনের পোর্টল্যান্ডে একটি বড় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ট্রাম্পপন্থী একটি মিছিলের কর্মীদের সংঘর্ষ হলে গুলিতে একজন নিহত হন। গত ২৫ মে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড পুলিশ কর্তৃক নিহত হওয়ার পর সারা যুক্তরাষ্ট্রেই এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। আর এর সর্বশেষ ঘটনা ঘটে অরেগনে।

এই ঘটনার জন্য বাইডেন দায়ী করেছেন ট্রাম্পকে। বলেছেন, ‘বেপরোয়াভাবে সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন ট্রাম্প।’ ট্রাম্প নিজে পোর্টল্যান্ডে কৃষ্ণাঙ্গদের জমায়েতের বিরুদ্ধে পাল্টা জমায়েতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর এ জন্য পোর্টল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক মেয়র টেড হোয়েলার দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। এদিকে জনপ্রিয় নিউজ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট এক জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে। জরিপে বলা হয়, ইলেকটোরাল কলেজের ৮৮ শতাংশ পেতে পারেন বাইডেন। ২৯ আগস্টের জরিপে দেখা যায়, জো বাইডেন পাবেন ইলেকটোরাল ভোটের ৩৪৭টি আর ট্রাম্প পাবেন ১৯১টি। মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। জিততে হলে পেতে হবে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট। ৫০টি ভোটের মধ্যে কোনো কোনো স্টেটে ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা বেশি, কোনোটায় আবার কম। তবে সব জরিপের ফলাফলই যে শেষ পর্যন্ত ‘সত্য’ হয়, তা বলা যাবে না। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও জনমত জরিপ শেষ পর্যন্ত সত্য হয়নি। ওই সময় জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত Battleground States-এর (মোট ছয়টি) ভোটেই ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাস ২৩১ বছরের, ১৭৮৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত (স্বাধীনতা ঘোষণা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই)। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৮৯-১৭৯৭)। তিনি ছিলেন ফেডারেলিস্ট পার্টির মনোনীত প্রার্থী। জর্জ অ্যাডামসও ছিলেন ফেডারেলিস্ট পার্টির প্রার্থী (১৭৯৭-১৮০১)। কিন্তু তৃতীয় প্রেসিডেন্টের (থমাস জেফারসন, ১৮০১-১৮০৯) শাসনামল থেকে ১৮২৯ সাল পর্যন্ত ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান পার্টি একসঙ্গে একক প্রার্থী হিসেবে চার টার্মে ক্ষমতায় ছিল। সপ্তম প্রেসিডেন্ট এন্ডু জ্যাকসনের (১৮২৯-১৮৩৭) সময় থেকেই ডেমোক্রেটিক পার্টি আলাদাভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। রিপাবলিকান পার্টির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্রাহাম লিংকন (১৬তম প্রেসিডেন্ট, ১৮৬১-১৮৬৫)। সেই থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দুটি বড় দল ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রথম দিকে অবশ্য তৃতীয় একটি দল উইগ পার্টির অস্তিত্ব ছিল। উইগ পার্টির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন (নবম প্রেসিডেন্ট, ১৮৪১); যদিও নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারেননি। ট্রাম্প হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট।

প্রতিটি নির্বাচনের সময়ই কিছু কিছু ‘ইস্যু’ প্রাধান্য পায়, যা ভোটারদের প্রভাবিত করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ভোটাররা ভোট দেন; কিন্তু যিনি বিজয়ী হন, তিনি ওই স্টেটের প্রতিটি ইলেকটোরাল কলেজের সব ভোট পেয়েছেন বলে গণ্য করা হয়। যদিও এবারে ‘ইস্যু’ আছে, বিশেষ করে বর্ণবাদ, শ্বেতাঙ্গ ‘সুপ্রিমেসি’, ১১.১ শতাংশ বেকার সমস্যা, কভিড-১৯ রোধে ব্যর্থতা, উৎপাদন খাতে ধস ও ব্যাপক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি, তথা দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর সূচনা—সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ভোটাররা তাঁকে দ্বিতীয় ট্রার্মের জন্য বেছে নেবেন কি না এটা একটা বড় প্রশ্ন।

Kalerkontho

9.9.2020

বাংলাদেশের বন্ধু প্রণব মুখার্জি


ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি চলে গেলেন। ৮৪ বছরের জীবনে তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও ভারতের রাষ্ট্রপতির পদসহ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একটি সম্ভাবনাও তার ছিল। কিন্তু ‘হিন্দি বলয়ের রাজনীতির’ কারণে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি।

ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি চিরচেনা রাজনীতির অঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তবে একজন সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে গত কয়েক বছর তিনি তার ভূমিকা পালন করে গেছেন।

গেল বছরের এই আগস্ট মাসেই ভারতের সর্বোচ্চ পদক ভারতরত্নে তাকে সম্মানিত করেছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তিনি কট্টর কংগ্রেসবিরোধী বিজেপি নেতাদের কাছেও সমান গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তার দীর্ঘ কংগ্রেসীয় রাজনীতি বিজেপি নেতাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি কখনও। একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদের সফলতা এখানেই।

একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল তার। ইন্দিরা গান্ধীই তাকে রাজনীতিতে প্রথম ব্রেক দিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথম রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। এই ‘বাঙালি বাবুর’ সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা ও দক্ষতায় আস্থা রেখেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। আর এর প্রতিদান হিসেবেই ১৯৭৩ সালে তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তিনি। সেই থেকেই তার যাত্রা শুরু। পেছনে আর তাকাতে হয়নি। একজন সফল মন্ত্রী এবং সর্বশেষ একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জি বারবার আলোচিত হবেন।

বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে তিনি বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল তার ‘আত্মার’ সম্পর্ক। স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির আদি বাড়ি নড়াইলে। তিনি যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তার পৈর্তৃক ভিটা দেখে যেতে ভোলেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করতেন (১৯৭৫-৮১), তখন প্রণব মুখার্জি আর তার স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রণব মুখার্জি ছিলেন তার প্রিয় ‘কাকা বাবু’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণব মুখার্জির পরিবারের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৫ সালে শুভ্রা মুখার্জি প্রয়াত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি ছুটে গিয়েছিলেন সমবেদনা জানাতে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া ও সাহায্য করার ব্যাপারে প্রণব মুখার্জি ছিলেন সক্রিয়। অনেক বাংলাদেশি রাজনীতিবিদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও সখ্য ছিল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নত করার ব্যাপারে তিনি বরাবরই ছিলেন বাংলাদেশের পাশে। তিনি চেষ্টা করেছেন তার অবস্থানে থেকে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৩ সালের মার্চে।

সেটা ছিল ১৯৭৪ সালের পর কোনো ভারতীয় রাষ্ট্রপতির প্রথম বাংলাদেশ সফর। দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৮ সালে, ব্যক্তিগত সফরে। তখন তিনি অবসর নিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ তাকে কার্যত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদাই দিয়েছিল। এ সফরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছিল।

একজন শিক্ষক (বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক) এবং পরে একজন রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৫০ বছরের। ১৯৬৯ সালে যে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা, তা শেষ হয় ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অবসরগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

পাঁচবার রাজ্যসভার সদস্য, দু’বার লোকসভার সদস্য ছিলেন তিনি। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান অভিজিৎ কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ও লোকসভার সদস্য। একমাত্র মেয়ে শর্মিষ্ঠা একজন নৃত্যশিল্পী। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেয়া প্রণব মুখার্জি একজন সফল রাজনীতিবিদ, একজন সফল মন্ত্রী, একজন সফল সংগঠক। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- সব জায়গাতেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন এবং থাকবেনও।

Jugantor

1.9.2020

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ কোন পথে

 

 

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে? সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবন একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ২০১৭ সালে যে ‘রোহিঙ্গা ঢল’ এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, গত ২৫ আগস্ট ছিল তার তৃতীয় বার্ষিকী। অর্থাৎ বর্তমান সংকট তিন বছর পার করে চার বছরে ‘পা’ দিল। কিন্তু বিশ্ব এই তিন বছরে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেনি। 

এটা ঠিক, রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৭ সালে যে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সে ব্যাপারে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ বা ‘আইসিজে’ একটি রায় দিয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু ওই রায় সংকট সমাধানে কোনো বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু এ ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি নেই। বরং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গেল জুন মাসেও রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর দিয়েছে আল-জাজিরা। এক প্রতিবেদনে তারা আমাদের জানিয়েছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০০ রোহিঙ্গা বসতি পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে রাখাইন ত্যাগ করতে। আরেকটি খবরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তিনজন সেনা সদস্যকে রাখাইনে ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কোর্ট মার্শাল করে শাস্তি দিয়েছে। 
যদিও এদের নামপরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি যখন আরও অবনতি ঘটেছে, তখন গত ২৯ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন। ওই ফোনালাপে তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রকাশিত এই ঘটনা কতগুলো প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। 

এক. গেল ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা জানানো হয়েছিল (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৮ ডিসেম্বর) কিন্তু নতুন করে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে মিয়ানমার সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তকে আদৌ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। 

দুই. রোহিঙ্গা সংকট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। আর তা হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার বারবার বলে আসছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন। সর্বশেষ আসিয়ান নেতাদের টেলি সম্মেলনেও মিয়ানমারের প্রতিনিধি একই কথা বলেছেন। এর অর্থ সারা বিশ্বের মতামতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। 

তিন. মিয়ানমারের কৌশল হচ্ছে রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্ত করা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের জমি এখন চীন ও জাপানি বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়েছে। রাখাইনে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে (Kyaukphyu), যেখান থেকে দেশটি বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখতে পারে। এখানে চীনের স্বার্থ অনেক বেশি। সুতরাং চীন কখনোই মিয়ানমারের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। রোহিঙ্গামুক্ত রাখাইনে চীন তার স্বার্থকে বড় করে দেখছে। 

চার. গেল ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ বা ‘আইসিজে’ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিল। তাতে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ, কোনো সামরিক ব্যবস্থা না দেওয়া, আলামত নষ্ট না করা, আদালতে চার মাস অন্তর রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আদালতের আদেশ মিয়ানমার মানছে না। তিনজন সেনা সদস্যের বিচার লোক দেখানো। আইসিজের আদেশ মিয়ানমারকে বাধ্য করেনি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে এবং তারা নেবেও না। 

পাঁচ. আসিয়ান শীর্ষ টেলি কনফারেন্সে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী এদের সন্ত্রাসী কর্মকন্ডের জন্য রিক্রুট করবে। এ ধরনের আশঙ্কাকে ফেলে দেওয়া যায় না। এতে করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। 

ছয়. রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর খবরও রিপোর্ট হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ^ব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই সুযোগটি নিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে। 

মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। এ বিষয়টি আমরা বারবার বলে এলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমনকি বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে চীন ও ভারত। চীন ও ভারতের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা এর কোনো ফল পাইনি। 

চীনের পাশাপাশি ভারতেরও বিনিয়োগ রয়েছে মিয়ানমারে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরের সময়ও মিডিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের সাহায্যের প্রশ্নটি উঠেছিল। কিন্তু আশ্বাসসের মধ্যেই তা থেকে গেছে। ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইন স্টেটে যেখানে রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম, সেখানে ভারতের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। ভারতের ‘কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের’ কথা অনেকেই স্মরণ করতে পারেন। এই প্রজেক্টের আওতায় ভারত রাখাইন স্টেটের সিটওয়েতে (Sittw) একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ের (একসময়ের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে এই সমুদ্রবন্দর (সিটওয়ে) ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে পণ্য পরিবহনে (সাত বোন রাজ্যে) এই রুটটি ব্যবহৃত হবে। কালাদান নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত বিধায় এটা ‘কালাদান প্রজেক্ট’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের চিন স্টেটের পালেটওয়া (Paletw) বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়ক পথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুই (Zorinpui) এর সঙ্গে। এই প্রজেক্টটি সম্পন্ন হলে একদিকে মিয়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাত বোন রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। সুতরাং ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। 

ভারতের ‘Act East Policy’র গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মিয়ানমার। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। চলতি বছরই ভারতের অর্থনীতি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে ও ২০২৫ সালের মধ্যে বিশে^র তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ দেশটিকে ১১তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে পরিণত করেছে। ভারতের ৩০টি কোম্পানির সেখানে বিনিয়োগর পরিমাণ ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার (চীনের বিনিয়োগ ২০ বিলিয়ন ডলার)। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও, মিয়ানমারের বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে পশ্চিমা বিশে^র কাছে একটি আকর্ষণীয় দেশে পরিণত করেছে। ভারতও এই প্রতিযোগিতায় আছে। সুতরাং রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যাবে বলে মনে হয় না। কূটনৈতিকভাবে ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে আছে। কিন্তু বড় কোনো ভূমিকা পালন করছে না। 

এ অবস্থায় আগামীতে সব রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। হয়তো কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নেবে। কিন্তু বড় অংশই রয়ে যাবে। আর এ কারণেই বাটিল লিন্টনার  Asia Times-এ লিখেছেন, ‘Rohingya refugees becoming Palestinians of Asia’ ফিলিস্তিনিদের মতো ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা! এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মিয়ানমারের অসহযোগিতা, আন্তর্জাতিক মতামতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ও রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। এ থেকে বের হওয়ার পথ মিয়ানমারকেই বের করতে হবে।

Desh Rupantor

1.9.2020

রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো ভালো সংবাদ নেই


রোহিঙ্গাদের জন্য ভালো কোনো সংবাদ নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজার এলাকায় বসবাস করছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করা হলেও এটা ছিল পরিকল্পনার শেষ অংশ। এর আগেও রোহিঙ্গাদের উৎখাত করা হয়েছিল।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতিক্রিয়া জানালেও মিয়ানমার এ ব্যাপারে কর্ণপাত করেনি। এমনকি চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি মামলা ও একটি অন্তর্বর্তীকালীন রায় এলেও মিয়ানমার কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। নিজ নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করলেও তা ছিল ‘লোক দেখানো’।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের তালিকা সরবরাহ করা হলেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছে না; বরং তথাকথিত ‘যাচাই-বাছাইয়ের’ নামে সময়ক্ষেপণ করছে। ফলে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফেরত যাবে কিংবা আদৌ যাবে কি না, এ ব্যাপারে সৃষ্টি হয়েছে একটা বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। এই যখন পরিস্থিতি, তখন বার্টিল লিন্টনারের একটি তথ্যবহুল লেখা ছাপা হয়েছে এশিয়ান টাইমসে ২৬ আগস্ট। লেখাটির শিরোনাম Rohingya Refugees Becoming Palestinians of Asia. লিন্টনার রোহিঙ্গাদের ‘এশিয়ার প্যালেস্টাইনিয়ান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; অর্থাৎ ফিলিস্তিনিরা যেভাবে নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত হয়ে দীর্ঘ ৭৩ বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যত্র বসবাস করছে, রোহিঙ্গাদের অবস্থা অনেকটা তেমনই। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে, আজ রোহিঙ্গাদের ব্যাপারেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্তে (ডিসেম্বর ২০১৯) মিয়ানমারের ভূমিকায় নিন্দা জানালেও জাতিসংঘ বাধ্য করাতে পারেনি মিয়ানমারকে, নিজ নাগরিকদের ফেরত নিতে। জাতিসংঘ তথা বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যর্থতা এখানেই।

এদিকে মিয়ানমার প্রস্তুত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচনের জন্য। ৮ নভেম্বর সেখানে সাধারণ নির্বাচন। অং সান সু চি ও তার দল ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি’ আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছে এবং সু চি বিজয়ী হবেন, এটাও অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু এ নির্বাচন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো ইতিবাচক ফল দেবে না। কেননা অং সান সু চি সরকারের মূল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর স্বার্থে তিনি কাজ করছেন। তিনি উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের (ধর্মীয় নেতা) পক্ষ অবলম্বন করে ‘রোহিঙ্গাবিরোধী’ একটি অবস্থান নিয়েছেন। সে কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। রোহিঙ্গা তথা মুসলমান বিদ্বেষ কোন পর্যায়ে গেছে, তা আবদুল রশিদের দৃষ্টান্ত দিয়ে আলজাজিরা তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে (২৫ আগস্ট ২০২০)।

আবদুল রশিদের জন্ম মিয়ানমারে, তার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে তার foreign roots বা ‘বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক’ থাকার। যদিও তিনি মিয়ানমারের নাগরিক। আলজাজিরা আমাদের জানাচ্ছে, মুসলমান ধর্মাবলম্বী প্রায় ১২ প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এ ঘটনা এ কথাই প্রমাণ করল যে, মিয়ানমারের সামরিক তথা রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায় না, মুসলমানরা সে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিক। মুসলমানদের সেখানকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাদ দেয়ার বিষয়টির সঙ্গে মিয়ানমারের নাগরিকত্বের বিষয়টি সরাসরিভাবে জড়িত। মিয়ানমারে ১৯৮২ সালে যে আইনটি (1982 Citizenship Law) পাস হয়েছে, এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে আবিষ্কার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান এখানেই নিহিত। এ আইনটি যতদিন পর্যন্ত না সংশোধন করা হবে, ততদিন একজন নাগরিকও মিয়ানমারে ফিরে যাবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে, সে তালিকা নিয়ে তারা যাচাই-বাছাই করছে। সময়ক্ষেপণ করছে। ভারত ও চীনের ভূমিকাও মিয়ানমারের পক্ষে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানুয়ারিতে মিয়ানমার সফর করেছেন। গত ১৯ বছরের মধ্যে কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য এটা ছিল প্রথম মিয়ানমার সফর। একাধিক কারণে ওই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে সারা বিশ্ব যখন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং আইসিজেতে একটি রায়ের জন্য যখন সবাই অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই চীনা প্রেসিডেন্ট মিয়ানমার সফর করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চীনা সমর্থন আবারও ব্যক্ত হয়েছিল এবং বিশ্ব আসরে মিয়ানমারের পাশে যে চীন থাকবে, তার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

ওই সফরে মিয়ানমার ও চীন ৩৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে; যার মধ্য দিয়ে চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। চীন রাখাইনে কিয়াউকপিউ (Kyaukpyu) গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এ ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। এ গভীর সমুদ্রবন্দরটি চীনের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চীনা জাহাজের প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ১২১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কিয়াউকপিউ-কুনমিং রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ ব্যাপারেও একটি চুক্তি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইউনান রাজ্যের পণ্য কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে রফতানি করা সহজ হবে। এটা মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরের অংশ। একসময় এ করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত ছিল, যা বিসিআইএম করিডর নামে পরিচিত ছিল (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার)। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে এ অর্থনৈতিক করিডরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

বিসিআইএম করিডরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে সোনাদিয়ার প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরটি। চীন এ বন্দরটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে সেই পরিকল্পনাটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। পাঠক, ভারতের ‘কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের’ কথা স্মরণ করতে পারেন। ভারত রাখাইন স্টেটের সিটওয়েতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ের (এক সময়ের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল।

বঙ্গোপসাগার ঘেঁষে এ সমুদ্রবন্দর (সিটওয়ে) ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে পণ্য পরিবহনে (সাত বোন রাজ্যে) এ রুটটি ব্যবহৃত হবে। কালাদান নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত বিধায় এটা ‘কালাদান প্রজেক্ট’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের চীন স্টেটের পালেটওয়া (Paletwa) বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়কপথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুই (Zorinpui)-এর সঙ্গে। এ প্রজেক্টটি সম্পূর্ণ হলে একদিকে মিয়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাত বোন রাজ্যগুলোয় পণ্য পরিবহন সহজ হবে। সুতরাং ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে।

ভারতের ‘Act East Policy’র গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মিয়ানমার। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। চলতি বছরই ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে ও ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্য বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ দেশটিকে ১১তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে পরিণত করেছে। ভারতের ৩০টি কোম্পানির সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার (চীনের বিনিয়োগ ২০ বিলিয়ন ডলার)। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একটি আকর্ষণীয় দেশে পরিণত করেছে। ভারতও এ প্রতিযোগিতায় আছে। সুতরাং রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যাবে বলে মনে হয় না।

কূটনৈতিকভাবে ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশে আছে। কিন্তু তার জাতীয় স্বার্থের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি যেতে পারছে না। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভারত যদি অবস্থান নেয়, তাহলে কালাদান প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মিয়ানমার অন্তরায় সৃষ্টি করবে। এখানে আরও একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- আর তা হচ্ছে, অং সান সু চি স্বয়ং ও মিয়ানমারের রাজনৈতিক কাঠামো, যা রোহিঙ্গাবিরোধী। লক্ষ করলে দেখা যাবে, গত বেশ কিছুদিন ধরে মিয়ানমারে একটি উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বিকাশ লাভ করেছে। এরা কট্টরপন্থী থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ধর্মগুরুদের প্রতি এদের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি। এরা সংস্কারে বিশ্বাসী নয়। এদের প্রচুর অনুসারী রয়েছে মিয়ানমারে। এ থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মিয়ানমারকে বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। অনেক সিরিয়াস পাঠক আশিন উইরাথুর কথা মনে করতে পারেন। তাকে নিয়ে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কভার স্টোরি করেছিল ২০১৩ সালের ১ জুলাই। কভার স্টোরির শিরোনাম ছিল ‘দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর’। তিনি প্রচণ্ড রকম মুসলমানবিদ্বেষী। এজন্য তাকে ‘মিয়ানমারের লাদেন’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তিনি মিয়ানমারে তরুণ বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের সংগঠিত করে মুসলানবিদ্ধেষী একটা সেন্টিমেন্ট গড়ে তুলেছিলেন।

এ সেন্টিমেন্টকে সু চি ধারণ করেন। অত্যন্ত ক্ষমতালিপ্সু সু চি এ মুসলমানবিদ্বেষী মনোভাবকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সু চির বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে তার বাবা আউং সানের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আউং সান ছিলেন তৎকালীন বার্মার স্বাধীনতাকামী নেতা, ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সার পর্যন্ত তিনি ছিলেন বার্মার প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে আউং সান প্রথমদিকে ছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী। পরবর্তী সময়ে তিনি পরিচিত ছিলেন মডারেট ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেট’ হিসেবে। এ আউং সানের সন্তান হিসেবে সু চি কীভাবে এখন কট্টর বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হলেন, সেটাই অবাক করার বিষয়!

এর পেছনে কাজ করেছে মূলত তার সুবিধাবাদী রাজনীতি। একদিকে তিনি সেনাবাহিনীকে খুশি রাখতে চান, যারা থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্মকে ‘প্রমোট’ করছে। সু চি মনে করছেন, সেনাবাহিনীকে হাতে রেখেই তিনি আবার ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু একটি সম্প্রদায়কে নির্বাচনে অংশ দিতে না দেয়া, তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা প্রকারন্তরে গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এটা গণতন্ত্র নয়। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ ইউসুফ (ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়) মন্তব্য করেছেন এভাবে- With election approaching in November 2020 Myanmar's government-sanctioned 'democracy without rights' may bring free election, but as long as ethnic clamming continues against Rohingya Muslims, any are claiming these election will smooth the path for democracy road to democracy is deluded (The Conversation, August 20, 2020); একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন, সে নির্বাচন শঠতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য তাই ভালো কোনো সংবাদ আগামী দিনে অপেক্ষা করছে না।

Jugsntor

30.8.2020

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও বিবিধ প্রসঙ্গ

 


করোনাকালে বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি উত্থান

করোনাকালে বিশ্ব রাজনীতিতে যেসব পরিবর্তন আসছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি দক্ষিণপন্থি উত্থান ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবর্তন। এই কর্তৃত্ববাদী শাসন সেখানে গণতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে সংকুচিত করেছে ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ায় এটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য একটি অশনিসংকেত। সনাতন গণতান্ত্রিক সমাজে যে চর্চা, অর্থাৎ মুক্তচিন্তা, অবাধ ভোটাধিকার, আইনের শাসন এ সবই অনেক দেশে ব্যাহত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং Internationl IDEA’র সমন্বয়ে ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে The Global Monitor of Covid-19’s Impact on Democracy and Human Rights নামে একটি উদ্যোগ, যারা ১৬২টি দেশে কভিড-১৯ কীভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আঘাত করছে, তা মনিটর করছে। ১৪ আগস্ট (২০২০) তাদের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় এশিয়ায় যেসব দেশে Authoritarian regime বা কর্তৃত্ববাদী শাসন রয়েছে, সেখানে মহামারীর সময় কিছু কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।

গত ৩০ মার্চের (২০২০) হাঙ্গেরির পার্লামেন্টে একটি আইন পাস হয়েছে। এই আইনবলে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জরুরি প্রয়োজনে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিল। এই আইনবলে তিনি ডিক্রি জারি করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায়ও থাকতে পারবেন। তার কর্মকান্ডের জন্য তাকে পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে হবে না। তিনি ইচ্ছে করলে দেশের প্রচলিত যে আইন রয়েছে, সেই আইনের বিরুদ্ধে যেতে পারবেন।

প্রয়োজন হলে সংবিধান স্থগিত রাখতে পারবেন। ভিক্টর ওরবান করোনাভাইরাসের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। এটা হচ্ছে একটা দৃষ্টান্ত, যেখানে ক্ষমতাসীনরা পৃথিবীর কয়েকটি দেশে এ ধরনের আইন পার্লামেন্টে পাস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। করোনাভাইরাস তাদের সবার জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নিঃসন্দেহে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী একটি বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি করেছে। এই সংকটকে কেন্দ্র করে এ থেকে সুবিধা নেওয়া, পার্লামেন্টে বিশেষ আইন পাস করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেওয়া প্রকারান্তরে একনায়কতন্ত্রী মানসিকতারই প্রতিফলন। একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ইউরোপে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল এর ইতিহাস মানুষ জানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদের ভস্মস্তূপ থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। এখন সেই ইউরোপেই, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতন তথা ‘ভেলভেট রেভ্যুলেশন’ (সাবেক চেকোস্লাভাকিয়ায় ভাসলাভ হাভেলের নেতৃত্বে) সেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বীজ বপন করলেও ভিক্টর ওরবানের মতো লোক তখন তার ‘কবর’ রচনা করতে চলেছেন। ২০১৮ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। শুধুমাত্র হাঙ্গেরিতে ওরবানের ঘটনাকে আমরা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাবতে পারতাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমরা বিশ্লেষণ করেছি। তাতে আমরা একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করেছি অর্থাৎ সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ আইন প্রণয়ন, ক্ষমতা শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে কুক্ষিগত করা, পার্লামেন্টের ক্ষমতা কমানো, বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা ইত্যাদি। আমরা আজারবাইজান, রাশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, ইসরায়েলের কিংবা তুরস্কের দৃষ্টান্ত দিতে পারব। এইসব দেশ গণতন্ত্রের প্রতি ‘কমিটমেন্ট’ এর কথা বলেছে। তাদের স্ব স্ব দেশের সংবিধানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সুযোগে তারা এখন নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করছেন। শীর্ষ নেতৃত্বের হাতকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

করোনাকালে আমরা বেলারুশের সর্বশেষ ঘটনা উল্লেখ করতে পারব। এই দেশটি এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বেলারুশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন আলেকজান্ডার লুকাসেনকো। ১৯৯৪ সাল থেকেই তিনি ক্ষমতায়। পঞ্চমবারের মতো তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন ২০১৫ সালে এবং ষষ্ঠবারের জন্য ৯ আগস্ট (২০২০) তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে ঘোষণা করা হলেও, নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও ভোটডাকাতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাভিতলানা সিকানউস্কায়া, যিনি প্রাণের ভয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট (২০২০) সেখানে স্মরণকালের বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্ষোভে ব্যাপক শ্রমিক সমাবেশ ঘটেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলছে। দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনামলে লুকাসেনকো এককভাবে দেশ চালাচ্ছেন। কভিড-১৯ এর সুযোগ নিয়ে তিনি অনেক ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে আজারবাইজানের দীর্ঘদিনের শাসক ইলহাম আলিয়েভ। ক্ষমতায় আছেন ২০০৩ সাল থেকে। তার বাবা হায়দার আলিয়েভও সে দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইলহাম করোনাভাইরাসের কারণে সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করেছেন। বিরোধীদের অফিস বন্ধ করে দিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়াতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১৫ এপ্রিল (২০২০)। অথচ, জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-হু’র পক্ষ থেকে বারবার ‘সামাজিক দূরত্বের’ কথা বলা হয়েছিল। সিঙ্গাপুর সরকার নাগরিকদের ‘ডাটা’ সংগ্রহ করছে, যা মানুষ মেনে নিয়েছে বলেই মনে হয়। এ কারণেই সিঙ্গাপুরে মৃত্যুর সংখ্যা কম। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুর্তাতে জুলাই মাসে (২০২০) আইন পাস করে নিজের হাতে অনেক ক্ষমতা নিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বাস্তবায়ন করছেন। থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীকে জরুরি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করতে প্রধানমন্ত্রী নতুন ডিক্রি জারি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ও-চা তার ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছেন। হাঙ্গেরির মতো পোল্যান্ডও একদলীয় পথে হাঁটছে। ক্ষমতাসীন ‘ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ সব ধরনের উপদেশ ও সাজেশন উপেক্ষা করে জুন মাসে (২০২০) প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। সেখানে আদৌ কোনো ‘লকডাউন’ কাজ করেনি। করোনাভাইরাসের সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না দিয়ে দলীয় প্রার্থী আন্দ্রেই দুদাকে পাস করিয়ে এনেছে দলটি। সেখানে নতুন আইন প্রণয়ন করে সরকারকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তানে করোনা শব্দটি পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে আইন করে। কম্বোডিয়ায় হুনসেন করোনার সুযোগে নিজের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছেন। বিরোধী দল ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টির শীর্ষস্থানীয় সব নেতাকে গ্রেপ্তার করে তিনি কার্যত দেশটিতে একদলীয় শাসন চালু করেছেন। হুনসেন ১৯৮৫ সাল থেকে ক্ষমতায়। আমরা আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিতে পারব, যেসব দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছেন। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ক্রিমিনাল চার্জ’ থাকা সত্ত্বেও তিনি আইন করে বিরোধীদলীয় জমায়েত নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে তার বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন গড়ে না ওঠে। তিনি বিরোধী দলকে ভেঙে এখন একটি কোয়ালিশন সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাশিয়ায় এই সুযোগে প্রেসিডেন্ট পুতিন নতুন নতুন সব আইন করছেন, যাতে করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুতিন চীনের মতো নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। তুরস্কের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

করোনাভাইরাস পুরো বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনেছে। এতে করে আগামীতে প্রতিটি দেশেই এর একাধিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাবে। এক্ষেত্রে সরকারগুলোর আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি। গণতান্ত্রিকভাবে এরা নির্বাচিত হলেও (জনগণের ভোট, পার্লামেন্টের সুপ্রিমেসি) করোনাভাইরাসের কারণে তারা আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছেন। তাই ওয়াশিংটন পোস্টে (৩ এপ্রিল, ২০২০) জশুয়া কুলান্টঝিক (Joshua Kurtantzick) হুনসেন, ওরকান, দুতার্তের নাম উল্লেখ করে বলেছেন এরা ধীরে ধীরে নিজের দেশকে গণতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসছেন। এই ‘গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে আসা’ই হচ্ছে একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটা। ওরবানের কর্মকান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তাকে সমালোচনা করেছেন। অতীতেও তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন, যখন হাজার হাজার সিরীয় অভিবাসী তার দেশে প্রবেশ করে জার্মানিতে ঢুকতে চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি শুধু খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয় দেবেন, মুসলমানদের দেবেন না। হুনসেনের কম্বোডিয়ায় বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণাসহ সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে তিনি জেলে পাঠিয়েছিলেন। আর দুতার্তের ‘ড্রাগ ওয়ার’ এর কথা কে না জানে? কোনো ধরনের আইনের মুখোমুখি না করে তিনি শত শত মানুষকে গুলি করে মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাদের তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘ড্রাগ ডিলার’ হিসেবে। ওইসব নেতা গণতন্ত্র চর্চা করেন না, গণতন্ত্রকে ধারণ করেন না, এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার, তাই তারা করছেন। এখন করোনাভাইরাস তাদের জন্য একটি ‘মহা সুযোগ’ সৃষ্টি করেছে তাদের ক্ষমতাকে আরও সংহত ও শক্তিশালী করতে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এ ধরনের ঘটনা কোনো ভালো খবর নয়।

Desh Rupantor

22.8.2020