ইউক্রেনের
পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীকবলিত এলাকায় একটি যাত্রীবাহী মালয়েশিয়ান বিমান
ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই পরাশক্তির মাঝে এক ধরনের
'প্রস্ক্রিওয়ার' এর সম্ভাবনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ১৬ মার্চ ক্রিমিয়ায়
গণভোট ও রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি, রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে ইউক্রেনের
পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, ইউক্রেন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের
সামরিক সাহায্য ইত্যাদি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মাঝে
সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আর সর্বশেষ ঘটনায় যোগ হলো মালয়েশিয়ার যাত্রীবাহী
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা
'ভুল করে' এ যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট
ওবামা ওই ঘটনার জন্য পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে দায়ী করেছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে
আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এ হামলায় জাতিসংঘের
নিরাপত্তা পরিষদ শনিবার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নেদারল্যান্ডস জাতীয় শোক
দিবস ঘোষণা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ইউক্রেনের
পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিল হচ্ছে। নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম
হয়েছে, যাকে অভিহিত করা হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ-২ হিসেবে। মূলত মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকান্ডের কারণে এ অঞ্চলে এক ধরনের উত্তেজনার
জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ কিংবা রাশিয়ার
সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে ন্যাটোর সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এবং
রাশিয়াকে 'ঘিরে ফেলার' সদূরপ্রসারী মার্কিন চক্রান্তের কারণে এ অঞ্চলে
উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই
চাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ জর্জিয়া ও ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। ২০০৮
সালে রাশিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার সীমিত যুদ্ধের (ওসেটিয়া প্রশ্নে) কথাও উল্লেখ
করা যেতে পারে। 'ব্লাক সি'র অপর পাশের দেশগুলো (বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড,
রুমানিয়া) এরই মধ্যে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে। তুরস্ক ও গ্রিস আগে থেকেই
ন্যাটোর সদস্য। জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনও ন্যাটোর সদস্য নয়। অনেকেই স্মরণ
করতে পারেন, ইউক্রেন সঙ্কটের জন্ম হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের উৎখাতের
মধ্য দিয়ে। গণঅভ্যুত্থানে তিনি উৎখাত হলেও অভিযোগ আছে, তার উৎখাতের পেছনে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। রুশপন্থী ওই নেতা ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তারপর ঘটল ক্রিমিয়ার ঘটনা। ক্রিমিয়ার ঘটনায়
রাশিয়াকে জি-৮ থেকে বহিষ্কার ও দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা
হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নের সমাধান এখনও হয়নি তা হচ্ছে, রাশিয়াকে 'বয়কট' করে
পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাবে কীভাবে? সেনাবাহিনী
পাঠিয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বটে; কিন্তু পুরো
ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে? কোনো কোনো
মহল থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করার। কিন্তু
বাস্তবতা কী তা বলে? পাঠকমাত্রই জানেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে সমগ্র
পূর্ব ইউরোপ, যে দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাবে
ছিল, তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরিপূর্ণভাবে রাশিয়ার
গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের রিজার্ভ হচ্ছে রাশিয়ায়। মূলত তিনটি পথে এ গ্যাস
যায় ইউরোপে। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা এক সময় সাবেক সোভিয়েত
ইউনিয়নের বস্নকে ছিল, তারাও এখন জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে
পারেনি। তিনটি পাইপলাইন, নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়
বছরে ৫৫ মিলিয়ন কিউসিক মিটার (বিসিএম), বেলারুশ লাইনে সরবরাহ করা হয় ৩৬
বিসিএম আর ইউক্রেন লাইনে সরবরাহ করা হয় ১০৭ বিসিএম। এখন ইইউর নিষেধাজ্ঞা
আরোপের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া যদি এ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক
বড় ধরনের জ্বালানি সঙ্কটে পড়বে ইউরোপ। যদিও রাশিয়ার বৈদেশিক আয়ের অন্যতম
উৎস হচ্ছে এ গ্যাস বিক্রি। এটা সত্য, রাশিয়া অত্যন্ত সস্তায় বেলারুশ ও
ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ দেশ দুটি আবার রাশিয়ার
গ্যাসের রিজার্ভ গড়ে তুলে সরাসরি পশ্চিম ইউরোপে তা বিক্রি করে কিছু 'আলাদা
অর্থ' আয় করে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৯ সালে ইউক্রেন ও বেলারুশের
সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হয়েছিল 'গ্যাসওয়ার'
অর্থাৎ গ্যাসযুদ্ধ। ইউক্রেনে অত্যন্ত সহজ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করত রাশিয়া।
কিন্তু ইউক্রেন অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইউরোপে একটি সঙ্কট তৈরি
করে। শুধু গ্যাস নয়, রাশিয়া বেলারুশকে সস্তা দামে তেলও দেয়। ওই তেল আবার
বেলারুশ অধিক মূল্যে ইউরোপে বিক্রি করে। Druzhba অথবা Friendship
পাইপলাইনের মাধ্যমে এ গ্যাস ও তেল সরবরাহ করা হতো। বেলারুশের ক্ষেত্রেও একই
সমস্যা হয়েছিল। তারা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই
হয়েছিল। রাশিয়া পাইপলাইনে গ্যাস ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আবার
নতুন আঙ্গিকে এ 'গ্যাসওয়ার' শুরু হওয়ার একটা সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে। রাশিয়া
ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে,
রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা 'গ্রাসপ্রোম' ইউক্রেনের কাছে পাবে ২ বিলিয়ন
ডলার। এ টাকা ইউক্রেন পরিশাধ করতে পারছে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের
নামে আইএমএফের কাছ থেকে ইউক্রেনের যে বিলিয়ন ডলার অর্থ পাওয়ার কথা ছিল,
তাতে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে রাশিয়া যদি
ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা
দেবে সমগ্র ইউরোপে (সমগ্র ইইউর গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ জোগান দেয় রাশিয়া আর
জার্মানি দেয় ৪০ ভাগ)। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ২২ বছর পর নতুন করে আবার দুই
পরাশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা মাথাচাড়া
দিয়ে উঠেছে। রাশিয়া চায় এ অঞ্চলের ওপর তার যে পরোক্ষ 'প্রভাব', তা বজায়
রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে রাশিয়ার এ 'প্রভাব' কমাতে। ফলে নতুন
করে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। নতুন করে একটি প্রশ্ন উঠেছে- রাশিয়াকে বাদ দিয়ে
ইউরোপের নিরাপত্তা অর্থহীন। রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়েই ইউরোপের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে হবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর
একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ন্যাটোকে রাশিয়ার পরামর্শকের ভূমিকা দেয়া
হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২৭ মে প্যারিসে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর
করেছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ও সার্বেক মার্কিন
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সেইসঙ্গে ন্যাটো সদস্যভুক্ত অন্য দেশের
সরকারপ্রধানরাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়াকে
একটি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অনেকটা সেই 'কনটেইনমেন্ট থিউরির'
মতো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী
কৃষ্ণসাগর বা বস্নাক সির পশ্চিমে রুমানিয়ার মিখাইল কোগলেনাইসেআনুতে রয়েছে
ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। আফগানিস্তানে সেনা ও রসদ সরবরাহের জন্য এ বিমান
ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। গেল বছর কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী
যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে
নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই চাইছে জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগ দিক। এটা
যদি হয়, তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে মার্কিন সেনাবাহিনী। রাশিয়ার
সমরনায়করা এটা মানবেন না। আজকে ইউক্রেনের পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের
হস্তক্ষেপ, এ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন-সবকিছুতে ক্রমেই মার্কিনি স্বার্থ স্পষ্ট
হচ্ছে।
এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলকৃত পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেন
সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রেখেছে। রাশিয়ার প্রবল আপত্তির মুখে এ অভিযানের
পরিপ্রেক্ষিতে পুরো পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ৭ এপ্রিল সংবাদপত্রে
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুধু পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওডেসায় কমপক্ষে
৩৬ জন নিহত হয়েছেন। পূর্বাঞ্চলের আরেকটি শহর ক্রামাটোরস্কে ঘরে ঘরে লড়াই
চলছিল। ওই 'গৃহযুদ্ধ' শুধু যে ইউক্রেনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা বলা যাবে
না। ওই পরিস্থিতি সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
রয়েছে। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন পর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের
মাঝে একটা 'প্রস্ক্রিওয়ার' এর জন্ম দিয়েছে। এ 'যুদ্ধে' কোন পক্ষ জয়ী হবে,
এটা আশা করাও ঠিক হবে না। বরং এ উত্তেজনায় বিশ্বের অন্যত্র অন্য দেশগুলোও
আক্রান্ত হতে পারে। এমনিতেই বিশ্ব পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। গাজায়
ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি চরমে
উঠেছে। বিশ্ব সম্প্রদায় সেখানে একরকম নিশ্চুপ। এমনকি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এ
গণহত্যা বন্ধের ব্যাপারে জাতিসংঘের কোনো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হয়নি। সেখানে
শিশু ও নারী হত্যার ঘটনা প্রতিদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে, সেখানে পশ্চিমা
বিবেক নিশ্চুপ! গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ
আরোপের কথাও চিন্তা করছে না। গাজায় এ গণহত্যার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী
নেতানিয়াহু সরাসরিভাবে দায়ী। আজকে বসনিয়ার গণহত্যাকারীদের কিংবা রুয়ান্ডার
মানবতাবিরোধী অপরাধীদের যদি দি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার হতে
পারে, তাহলে আজকে গাজায় নিরপরাধ শিশু ও নারী হত্যাকারী প্রধানমন্ত্রী
নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি সেনা নেতৃত্বেরও বিচার হওয়া উচিত। আজকে মার্কিন
নেতারা বলছেন, যারা মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ১৭-এর বিমানে
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু তাদের
মুখ থেকে একবারও বের হলো না, গাজার হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। আসলে সেই
ক্ষমতা মার্কিন নেতাদের নেই। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি লবি দ্বারা চালিত।
তাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক উৎস হচ্ছে ইহুদি লবি। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য,
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ফিলিস্তিনি এলাকায়
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেননি! তিনি তার পররাষ্ট্র সচিবকে
ওই এলাকায় পাঠিয়েছিলেন, এটা সত্য। কিন্তু ওই পর্যন্তই। 'লোক দেখানো' একটি
দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাকে দেখি মালয়েশিয়ান বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার
ঘটনায় অতি দ্রুত রাশিয়ার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে। অথচ এ বিমান বিধ্বস্ত
হওয়ার ঘটনায় কারা সত্যিকার অর্থে জড়িত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ ঘটনায় ২৯৫ জন
যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন, এটা নিঃসন্দেহে একটা দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু কারা
দোষী? ওবামা নিজে ইউক্রেনের বিদ্রোহীদের দিকে আঙুল নির্দেশ করেছেন। কিন্তু
সাধারণত যাত্রীবাহী বোয়িং বিমানগুলো ৩৩ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে যায়। ওই
বিমানকে আঘাত করার সক্ষমতা বিদ্রোহীদের না থাকারই কথা। তবে মালয়েশিয়ান এক
মন্ত্রী বলেছেন, তাদের কাছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে জাপানি এক মেজরের কথোপকথনের
অডিও টেপ রয়েছে। তার দাবি, এ ঘটনায় ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দায়ী।
আসলে
প্রকৃত তদন্ত ছাড়া এটা প্রমাণ করা যাবে না যে, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায়
কারা জড়িত। রাজনীতিতে 'ষড়যন্ত্রতত্ত্ব' নামে একটি তত্ত্ব আছে। সাধারণত
বৃহৎ শক্তিগুলো একটা 'ঘটনা' থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে নেয়ার জন্য আরেকটি
'ঘটনার' জন্ম দেয়। এটা এমনও হতে পারে, গাজার হত্যাকান্ড থেকে দৃষ্টি সরিয়ে
দেয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। অথবা সিরিয়া-ইরাকের পরিস্থিতিকে ধামাচাপা
দেয়ার উদ্দেশ্যেও এ ঘটনা ঘটানো হতে পারে। এসবই ধারণা মাত্র। তবে এটা সত্য,
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মার্কিনি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে একটা জনমত
তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সবচেয়ে বেশি সমালোচনা
করছে। রাশিয়ার ভূমিকা অতীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার কথাই স্মরণ
করিয়ে দেয়। কোনো কোনো বিশ্লেষকের লেখনীতে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর কথাও বলা হচ্ছে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া এক ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এ
প্রতিযোগিতা হচ্ছে প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা। প্রতিটি ক্ষেত্রে এ
অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ্য করি। এরই মধ্যে 'ব্রিকস' সিদ্ধান্ত নিয়েছে
বিশ্ব অর্থনীতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কতৃত্ব খর্ব করার লক্ষ্যে বিকল্প
একটি ব্যাংক গঠন করার। প্রস্তাবিত ব্যাংকটির নাম দেয়া হয়েছে 'নিউ
ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক'। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত চীন, ভারত,
রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিক্রসের সদস্য। ব্রাজিলের রাজধানী
ব্রাসিলিয়ায় সদ্য শেষ হওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ফলে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বে নতুন করে মেরুকরণ ঘটছে এবং উদীয়মান শক্তিগুলো
একত্রিত হচ্ছে। এরা যে বিশ্বব্যাপী মার্কিনি খবরদারির বিরুদ্ধে একত্রিত
হবে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। ইউক্রেনের ঘটনাবলি দিয়েই শুরু হলো এ
অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও
রাশিয়াকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Alokito Bangladesh
23,07.14
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In his Office at UGC Bangladesh
Prof Rahman With US Congressman Joseph Crowley
here you go!!!
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
During his stay in Germany
Prof Dr Tareque Shamsur Rahman
At Fatih University, Turkey during his recent visit.
Prof Dr Tareque Shamsur Rehman
In front of an Ethnic Mud House in Mexico
হেগের আদালতের সিদ্ধান্ত ও আমাদের করণীয়
17:11
No comments
হেগের
আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ
ছিল, এর একটি সমাধান করে দিয়েছেন। এই রায় নিয়েও দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও দুটি
বড় দল যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তা তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে আমরা
উপলব্ধি করতে পারছি। সরকারি দল বলছে, ‘এটা তাদের বিজয়।’ এমনকী এটাও বলা
হচ্ছে, ৫ জানুয়ারি সংসদের নির্বাচন হয়েছিল বলেই এই রায় পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
বাংলাদেশ। মজার ব্যাপার, বাংলাদেশের সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এই ইস্যু
নিয়ে ‘অতি আগ্রহ’ দেখালেও ভারতের কোনও আগ্রহ দেখিনি। ভারতে ক্ষমতাসীন
বিজেপির কোনও নেতৃবৃন্দের কোনও মন্তব্য আমি পাঠ করিনি- যাতে তারা দাবি
করেছেন, এই রায়ে তারা ‘বিজয়ী’ হয়েছেন। এমনকী বাংলাদেশের সংবাপদত্রে যেভাবে
লেখালেখি হচ্ছে, ভারতে সেভাবে দেখিনি। অনেক সংবাদপত্রে রায়ের খবরটিও
প্রকাশিত হয়নি। এখন একটি রায় বের হয়েছে। কিন্তু আমাদের যেতে হবে অনেক
দূর। দক্ষিণ তালপট্টি আমরা হারিয়েছি- এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে,
একসময় আমরা এই জেগে ওঠা দ্বীপটি দাবি করেছিলাম এবং আওয়ামী লীগও অতীতে যখন
ক্ষমতায় ছিল (১৯৯৬, ২০০৮-বর্তমান) কিংবা বিরোধী দলে ছিল (১৯৯১-২০০১), তখনও
তারা এ দ্বীপটি বাংলাদেশের নয়- এমন দাবি করেনি। এখন ২০১৪ সালে এসে সালিশি
আদালতের বিচারপতিরা স্বচক্ষে ওই দ্বীপটির অস্তিত্ব দেখতে পাননি। এটিই
বাস্তবতা। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের দুর্বল উপস্থাপনায়ও বেশ ত্রুটি ছিল। তারা
সঠিক ম্যাপ উপস্থাপন করতে পারেননি। যে ম্যাপটি তারা ব্রিটিশ লাইব্রেরি
থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, এতে ভুল তথ্য সংযোজিত ছিল। আদালত এটি গ্রহণ করেননি।
তবে মজার ব্যাপার, ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ এ দ্বীপটি জেগে ওঠার পর থেকে
দ্বীপটির ওপর বাংলাদেশের দাবি অব্যাহত রাখলেও কখনও ম্যাপে দক্ষিণ
তালপট্টিকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তাই প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই ওঠে, বাংলাদেশের
কোনও সরকারই কেন এটি করেনি? ভারতের আপত্তির কারণে যদি দ্বীপটি ম্যাপে
অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তাহলে সরকারগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তো থাকবেই। এখানে
বলা ভালো, ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব
মিয়ানমার ও ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বাংলাদেশের
আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১২
সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আমরা একটা রায়
পেয়েছি। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত
হয়েছে। এখন ভারতের সঙ্গেও এই সীমা নির্ধারিত হল। সমুদ্রের সীমানা
নির্ধারণের বিষয়টি বেশ জটিল। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বর্তমানে বলবৎ
রয়েছে ৩ৎফ টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঃযব খধি ড়ভ ঝবধ (টঘঈখঙঝওওও)। এই
আইন ১৯৮২ সালে গৃহীত এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর। ভারত ১৯৯৫ সালের
২৭ জুন আর মিয়ানমার ১৯৯৬ সালের ২১ মে টঘঈখঙঝওওও অনুমোদন করে। আর বাংলাদেশ
অনুস্বাক্ষরের পর তা অনুমোদন করে ২০০১ সালের ২৭ জুলাই। আইন অনুযায়ী
অনুমোদনের ১০ বছরের মধ্যে সমুদ্রসীমায় দাবির পক্ষে তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন
করতে হয়। টঘঈখঙঝ১১১-এর ধারা ২৮৭, এনেক্স ঠওও, আর্টিকেল-১ অনুযায়ী বাংলাদেশ
ইতোমধ্যেই তার দাবি উপস্থাপন করেছিল। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে
ঞবৎৎরঃড়ৎরধষ ধিঃবৎ ধহফ গধৎরঃরসব ২০ হড়ং অপঃ ১৯৭৪ গেজেট আকারে প্রকাশ করে।
এই অ্যাক্টের বেজলাইন ৬০ ফুট সমুদ্র গভীরতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা
হয়। ভারত ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের এই দাবির বিরোধিতা করে এই
যুক্তিতে, সর্বপশ্চিমের পয়েন্ট তার (ভারতের) ২১ মাইল ভেতরে চলে গেছে। এর
পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরেই সমুদ্রসীমা নির্ধারণ
নিয়ে আলোচনায় বসে। এখানে বলা ভালো, কোন নীতি অনুসরণ করে ওই বিবাদ নিষ্পত্তি
করা হবে- এটি নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে পরস্পরবিরোধী অবস্থান ছিল।
মিয়ানমার ও ভারত চেয়েছে ‘সমদূরত্ব’নীতি অনুসারণ করে এই বিবাদের নিষ্পত্তি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ চেয়ে এসেছে, ‘সমতা’নীতি। ‘সমদূরত্ব’-পদ্ধতি বা নীতি
অনুসরণ করলে বঙ্গোপসাগরের ওপর যথাক্রমে দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে
দুটি সীমারেখা টানা হতো। ফলে বাংলাদেশ সমুদ্র অঞ্চলের ওপর তার অধিকার
হারাত। অন্যদিকে ‘সমতা’-পদ্ধতি অনুসরণ করলে সোজা দক্ষিণ দিকে এই সীমারেখা
টানা হবে। তবে এটিও সত্য, আন্তর্জাতিক আইনে সমদূরত্ব এবং সমতানীতি- দুটোই
স্বীকৃত এবং দুটোই অনুসরণ করা হয়। এক্ষেত্রে দুপক্ষ যদি আলাপ-আলোচনায় কোনও
সমঝোতায় উপনীত হতে না পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে দেশ দুটোকে
যেতে হবে। সেক্ষেত্রে আদালতের রায় দেশ দুটো মানতে বাধ্য। তখন বাংলাদেশ ও
ভারত কোনও আপত্তি উপস্থাপন করতে পারবে না। রায় মানতে হবে। আপিলেরও কোনও
সুযোগ নেই। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী কোনও দেশ বেজলাইন থেকে সমুদ্রের
দিকে ২০০ মাইল পর্যন্ত একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে দাবি করতে পারে। সব
দেশের ক্ষেত্রে সমান দূরত্বের এই বিধানকে সমদূরত্বনীতি বলা হয়। তবে যদি
দুটি বা ততোধিক দেশের উপকূলরেখা পরস্পর-বিপরীতভাবে বা বক্রভাবে বিরাজ করে,
তাহলে সমদূরত্বের নীতি কার্যকর হবে না। কারণ এতে কোনও একটি দেশ তার ন্যায্য
পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই সেক্ষেত্রে টঘঈখঙঝ- এর ৭৪ ধারা অনুযায়ী
দেশগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণতার নীতির ভিত্তিতে
সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য একাধিক বিষয় বিবেচনায় আনতে বলা
হয়েছে। দেশের উপকূলের রেখা বিন্যাস, এর বক্রতা, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি। অথচ
বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সমুদ্র উপকূল পরস্পর বক্র আকারে বিরাজ করলেও তারা
দীর্ঘদিন তা গণ্য করেনি, বরং সমদূরত্বের নীতির আলোকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের
দাবি করে আসছিল। এখন আদালত এই সমুদূরত্বের নীতি গ্রহণ না করে কিছুটা সমতা ও
ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে এ রায়টি দিল। এখন এ রায়টি নিয়ে আমরা যত কম বির্তক
করব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমাদের এখন সামনে তাকাতে হবে। দক্ষিণ তালপট্টি
নিয়ে শুধু-শুধু বিতর্ক করলে আমরা আর কোনও দিনই দক্ষিণ তালপট্টি ফিরে পাব
না। এটি সত্য, দক্ষিণ তালপট্টির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। এখানে
প্রচুর গ্যাস, তেল ও মিনারেল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর আশপাশে আমাদের
যে অঞ্চল রয়েছে, সেখানে আমরা তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান চালাতে পারি। শুধু
দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে ‘বিবাদ’ করলে আমরা বঙ্গোপসাগরে যে বিশাল সম্ভাবনা
রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারব না। এই রায়ের ফলে বঙ্গোপসাগরে আমাদের
সীমানা নির্ধারিত হল। বঙ্গোপসাগর হচ্ছে বিশাল এক সম্ভাবনার জায়গা। প্রায় ২
দশমিক ২ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিশাল এই বঙ্গোপসাগর। এই
বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর বৃহৎ উপসাগর, আগামী প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদ।
বঙ্গোপসাগর থেকে পানি, লবণ, শক্তি, মৎস্যসহ বিভিন্ন মিনারেলস পাওয়া যাবে।
যতটুকু এলাকাই আমরা পেয়েছি, সেখানে যদি অনুসন্ধান চালানো যায়- তাহলে বিশাল
এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মিয়ানমার
গভীর সমুদ্রে যে গ্যাস ও তেল পেয়েছে, তা এখন চীন ও থাইল্যান্ডে রপ্তানি
করছে। ভারত এখানে বিনিয়োগ করেছে। এই গ্যাস ভারতেও যাবে। অথচ পাশের দেশ হওয়া
সত্ত্বেও আমাদের বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতার কারণে মিয়ানমারের এই গ্যাস আমরা
আমদানি করতে পারলাম না। ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানি ভিসাখাপট্টমের কাছে
বঙ্গোপসাগরে ২০০৩ সালে ৭ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস পেয়েছিল। সেই গ্যাস এখন
উত্তোলিত হচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদার এক শতাংশ গ্যাস আসে গভীর
সমুদ্র থেকে। ভারত এখন প্রাপ্ত গ্যাসকে এলএনজিতেও রূপান্তর করছে। ভারতের ৭০
শতাংশ তেল আমদানি হয় (প্রধানত প্যারসীয় অঞ্চল থেকে) বঙ্গোপসাগর রুট
ব্যবহার করে। এর পরিমাণ ২০১৫ সালে বাড়বে ৮৫ শতাংশে। আর চীনের বঙ্গোপসাগরের
ওপর নির্ভরতার হার শতকরা ৬০ ভাগ। এশিয়ার বড় অর্থনীতি ভারত ও চীন। তাদের
জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে। ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলেও চাহিদার
মাত্র ৩ শতাংশ সরবরাহ করা হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। ভারত এখন
বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতি। ভারতের জ্বালানি চাহিদা বাড়বেই। ফলে বঙ্গোপসাগরে
তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ভারত বাড়াবেই। আমাদের উচিত হবে এখন দ্রুত গভীর ও
অগভীর সমুদ্রে যে ২৮টি ব্লক (তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান), এর কোনও কোনওটির-
যেগুলো নিয়ে আদালতের রায়ে সুস্পষ্ট হয়েছে, সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা।
এক্ষেত্রে অনুসন্ধানে বাপেক্সের দক্ষতা আছে কি না, তা আমি নিশ্চিত নই। আমরা
ইতোমধ্যে কিছু ব্লক বিদেশি কোম্পানিকে দিয়েছি। বাকিগুলো নিয়ে দ্রুত আলোচনা
হতে পারে। সমুদ্রবিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে অবহেলিত। একমাত্র দুটো
বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়টি একাডেমিক কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু
গবেষণার পরিধি সীমিত। এক্ষেত্রে সরকার ‘বিস’কে শক্তিশালী করতে পারে। সেখানে
গবেষণার সুযোগ অনেক বেশি। এখানে বঙ্গোপসাগর নিয়ে পৃথক একটি উইং থাকতে
পারে। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও সিঙ্গাপুরের সাউথ ইস্ট এশিয়ান
ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বিস যৌথভাবে বঙ্গোপসাগর নিয়ে গবেষণা চালাতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনক্লোজ ডেস্কটি শক্তিশালী করাও জরুরি। সমুদ্র আইন
নিয়ে দেশে কাজ করা মানুষের সংখ্যা কম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন
অনুষদগুলো যথেষ্ট জনশক্তি তৈরি করতে পারছে না। হেগের রায় দেখিয়ে দিল,
আমাদের কাজ এখনও অনেক বাকি। এখন রায়ের ফলে আমরা যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি,
তাহলে খুব বেশিদূর যেতে পারব না। সমুদ্রের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে,
প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্যও প্রয়োজন। সুতরাং দায়িত্ব
এখন আরও বাড়ল। গভীর সমুদ্রে মহীসোপানের ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
সিদ্ধান্ত হতে আরও ৪ থেকে ৫ বছর লেগে যাবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত আমাদের
অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা এখন
নির্ধারিত হয়েছে। এ সীমানা নিয়েই এখন আমাদের দ্রুত এগোতে হবে।
Daily AMADER SOMOY
17.07.14
দক্ষিণ তালপট্টি হারিয়ে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলাম?
15:16
No comments
প্রথমে
মিয়ানমার ও পরে ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নির্ধারিত হওয়ার পর যে
প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, সমুদ্রভিত্তিক বিশাল যে
অর্থনীতি, তার কতটুকু আমরা কাজে লাগাতে পারব? কিংবা সমুদ্র অর্থনীতিকে বোঝা
ও ব্যবহারের জন্য যে জনশক্তি আমাদের দরকার, তা কি আমাদের আদৌ আছে? দ্য
হেগের সর্বশেষ রায়ের পর সবার দৃষ্টি এখন এদিকেই থাকবে। এই রায়ের পর ‘সমুদ্র
জয় হয়েছে’ বলে একটি অতি উৎসাহী ভাব আমি কারও কারও মাঝে লক্ষ্য করেছি। আসলে
সমুদ্র জয় করা যায় না। সমুদ্র হচ্ছে বিশাল। বিশাল এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার খুব কম অংশই আমরা আহরণ করতে পারি। সমুদ্রের বিশাল
সম্ভাবনা এখনও অনাবিষ্কৃত। আমরা সাধারণত জানি, গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস
পাওয়া যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার গভীর সমুদ্র থেকে তেল ও
গ্যাস আহরণ করছে। কিন্তু এখানে কোবালরিচ ক্রাস্ট, পলিমেটালিক সালফাইড,
পলিমেটালিক নডিউলস ও গ্যাস হাইড্রেটের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ সাগরের
তলদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তা আহরণের প্রযুক্তি ও জনশক্তি আমাদের নেই।
তাছাড়া উপকূলজুড়েই রয়েছে জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, মোনজাইট ও গারনেটসহ
অনেক ধরনের খনিজ পদার্থ। ক্রুক্ড স্যান্ড ও হেভি মিনারেলস তো আছেই। ‘ব্লাক
ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত খনিজ হচ্ছে ইলমেনাইট। বাংলাদেশে এর প্রচুর মজুদ
রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বলা ভালো, হেভি মিনারেলস ব্যবহার হয় ধাতব
শিল্প, বিমান ও রকেট শিল্প এবং রেডিও-ইলেকট্রনিকের মতো শিল্পে। আর গ্যাস
হাইড্রেট হচ্ছে এক ধরনের বলের মতো, যা থেকে মিলবে গ্যাস। নডিউলস সালফাইড
থেকে মিলবে কপার, ম্যাগনেসিয়াম, নিকেল ও কোবাল্টের মতো দুষ্প্রাপ্য ও
মূল্যবান খনিজ পদার্থ (যায়যায়দিন, ১৩ জুলাই ২০১৪)।সমুদ্রে প্রচুর মৎস্য
সম্পদ রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সাগর-মহাসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে।
তবে বঙ্গোপসাগরে কত প্রজাতির মাছ রয়েছে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
বিচ্ছিন্নভাবে দু’একটি গবেষণা চালানো হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে পূর্ণাঙ্গ
চিত্র উঠে এসেছে বলে মনে হয় না। এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি। আমরা অতীতে
কখনও সমুদ্রকে গুরুত্ব দিইনি। সমুদ্রের সম্পদ যে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে শুধু
বাঁচিয়ে রাখতে পারবে, তা নয়। বরং এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে
আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারব। সমুদ্রের ঢেউ
নিয়েও কথা থেকে যায়। পশ্চিমা বিশ্বে এটা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে,
এই ঢেউ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এই প্রযুক্তি বা জনশক্তি আমাদের
নেই- এটা আমরা স্বীকার করতেই পারি। তবে ভবিষ্যতে যে এই প্রযুক্তি এ দেশে
আসবে না, তা আমরা বলতে পারি না। পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন
প্রযুক্তি আসছে। পশ্চিমা বিশ্বেও সমুদ্র নিয়ে গবেষণা বাড়ছে। সুতরাং আমরাও
পিছিয়ে থাকতে পারি না।
আমাদের সমুদ্র সীমানা এখন আন্তর্জাতিকভাবে
স্বীকৃত। এটা নিয়ে বিতর্ক কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে কে জয়ী হয়েছে, কে হেরে গেছে এ বিতর্ক না তোলাই মঙ্গল। এটা সত্য,
সমুদ্রসীমায় একটি বড় অংশই আমরা পেয়েছি। কিন্তু পুরোটা আমরা পাইনি। যে ৬
হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় আমরা হারিয়েছি, সেখানেই রয়েছে প্রাকৃতিক
গ্যাসের বিপুল রিজার্ভ। তালপট্টি দ্বীপ ওই ৬ হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটারের
অন্তর্ভুক্ত। তবে এর আশপাশে যে অঞ্চল, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত, সেখানেও
প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের অনেকে এখন রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের নাম জানেন। অধ্যাপক রহমান
একবার বলেছিলেন, ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের একটি সংস্থা দক্ষিণ তালপট্টি এলাকায়
বিপুল রিসোর্সের কথা উল্লেখ করেছিল। সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান এ তথ্যটি
সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন। এদিকে ফার্স্ট পোস্ট নামে ভারতের একটি সংবাদ
সংস্থা জানিয়েছে, জাতিসংঘ সমুদ্রসীমা রায়ের মাধ্যমে হাড়িয়াভাঙ্গা নদী ও
দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা লাভ করায় ভারত বিপুলভাবে লাভবান হয়েছে।
রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, হাড়িয়াভাঙ্গা নদী যেখানে সাগরে মিশেছে, সেখান থেকে
প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণের একটি খাঁড়িতে ভারত ২০০৬ সালে ১০০ ট্রিলিয়ন
ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পেয়েছিল। হাড়িয়াভাঙ্গার মজুদ গ্যাসের
পরিমাণ ভারতের কৃষ্ণ-গোদাবারি অববাহিকার পুরো মজুদের প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ
গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে ২৮ ব্লকে এলাকাটিকে ভাগ
করেছিল, তার মধ্যে ২১ নং ব্লকে অন্তর্ভুক্ত ছিল দক্ষিণ তালপট্টি। ব্যক্তিগত
আলাপচারিতায় ও টিভি টকশোতে অধ্যাপক হোসেন মনসুর (চেয়ারম্যান, পেট্রোবাংলা)
জানিয়েছেন, দক্ষিণ তালপট্টি এলাকায় জ্বালানি সম্পদ আছে (তেল ও গ্যাস) এ
তথ্য তার জানা নেই। আমি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নই। ফলে কার বক্তব্য সত্য, এটা
নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ভারত বঙ্গোপসাগরে ১০০ টিসিএফ গ্যাস ও ২ বিলিয়ন ব্যারেল
তেল আবিষ্কার করেছে। মিয়ানমার করেছে ৭.৭ টিসিএফ গ্যাস। ২০০৬ সালে ভারত
সরকার তাদের ২৪টি গভীর সমুদ্র ব্লক টেন্ডার প্রদানের জন্য দরপত্র আহ্বান
করে। এর মধ্যে ব্লক ডি ২৩ (৮৭০৬ বর্গকিলোমিটার) ও ব্লক ডি ২২ (৭৭৯০
বর্গকিলোমিটার) বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ১৯৯১ সালের ২১টি ব্লকের অনেক অংশজুড়ে
রয়েছে। এখন নতুন রায়ের ফলে দেখতে হবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্লকগুলোর ক’টি
এবার পুনর্বিন্যাস করতে হবে। মহিসোপান নিয়েও একটা বিভ্রান্তি আছে। এমনকি
‘ধূসর এলাকা’ নিয়েও আছে প্রশ্ন।তবে এটা বলতেই হবে, এ রায় বাংলাদেশের
জন্য বিশাল এক সম্ভাবনা সৃষ্টি করল। বাংলাদেশের সালিশি আদালতে যাওয়ার
সিদ্ধান্তটিও ছিল সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত। চূড়ান্ত মুহূর্তে ভারত আলোচনার
প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই ১৯৭৪ সাল থেকেই আলোচনা চলে আসছিল। ফলাফল ছিল শূন্য।
উল্লেখ্য, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বর্তমানে বলবৎ রয়েছে 3rd United
Nations Convention on the Law of Sea (UNCLOS III)। এটি ১৯৮২ সালে গৃহীত
এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর। ভারত ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন ও মিয়ানমার
১৯৯৬ সালের ২১ মে UNCLOS III অনুমোদন করে। বাংলাদেশ অনুমোদন করে অনেক পরে,
২০০১ সালের ২৭ জুলাই (অনুস্বাক্ষর ১৯৮২)। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ১০ বছরের
মধ্যে সমুদ্রসীমার দাবির পক্ষে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে হতো। বাংলাদেশ
২০১১ সালের জুলাইয়ের পর তথ্য-উপাত্ত জমা দেয়ার পরই আদালত এ সিদ্ধান্ত নিল।
এখন আদালতের এ রায় আমাদের জন্য যেমন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করল, ঠিক তেমনি
দায়িত্বও বেড়ে গেল।সমুদ্রে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। প্রচুর তেল/গ্যাস
সম্পদের পাশাপাশি খনিজ ও মৎস্য সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু মিঠা
পানির মাছের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের আমিষের একটা সম্ভাবনা
হল সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ। এ সম্পদ আহরণে আমাদের পর্যাপ্ত আধুনিক ট্রলার
নেই। ছোট ছোট নৌকা বা ছোট ট্রলারে করে মৎস্য আহরণ করা হয়। কিন্তু এগুলো
গভীর সমুদ্রে যেতে পারে না। ফলে আমাদের এলাকা থেকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে
থাইল্যান্ড ও ভারতীয় জেলেরা। বাংলাদেশ সরকারকে এখন উদ্যোগী হয়ে বড় বড়
ট্রলার তৈরি ও মৎস্যজীবীদের মাঝে সমবায়ের ভিত্তিতে বিতরণ করতে হবে, যাতে
তারা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি আমাদের নেই। সমুদ্র
নিয়ে গবেষণা হয় কম। বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের স্বার্থে কিছু গবেষণা করে।
কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ
আছে। চট্টগ্রামে একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে
সরকার। এসব সিদ্ধান্ত ভালো। বরিশাল ও পটুয়াখালী (যা সমুদ্র এলাকায়
অবস্থিত) বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রয়োজনে নৌবাহিনী ও সমুদ্র অধিদফতর থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের এসব
বিভাগে নিয়োগ দিতে হবে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আইন অনুষদ
আছে, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে সমুদ্র আইন সংক্রান্ত একটি বিষয় চালু করতে
হবে।দীর্ঘদিন পর মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত
হল। কিন্তু কাজ অনেক বাকি। সরকারের একটি বড় উদ্যোগের প্রতি তাকিয়ে থাকবে
এখন সবাই। এখন বিজয় উৎসবের সময় নয়। এ নিয়ে কৃতিত্ব নেয়ারও কিছু নেই। আমরা
ভারতের দৃষ্টান্ত দেখে শিখতে পারি। ভারতে এটা নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি।
লেখালেখি তেমন চোখে পড়েনি। একটা রায় হয়েছে এবং আমাদের অধিকার স্বীকৃত
হয়েছে। এখন দেখতে হবে এই ‘অধিকারকে’ আমরা কীভাবে ব্যবহার করি। আমরা দুটি
রায়ই পেলাম। রায়ের আলোকে অতি দ্রুত সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে আমাদের
কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এজন্য সমুদ্র অধিদফতরকে আরও শক্তিশালী
করতে হবে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের UNCLOS ডেস্ককে আরও শক্তিশালী
করাও জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরুণ কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠিয়ে এ
বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গোপসাগর হচ্ছে ২ দশমিক ২
মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এক বিশাল এলাকা। এর মাঝে একটা সীমিত এলাকা আমাদের।
তবে এখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। শুধু মৎস্য সম্পদ আহরণ করে আমরা
আমাদের আমিষের ঘাটতি মেটাতে পারি। আগামী দিনে বঙ্গোপসাগরের স্ট্রাটেজিক
গুরুত্ব বাড়বে। একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারত এ অঞ্চলে তাদের নৌ তৎপরতা
বাড়াচ্ছে। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের শতকরা ৫০ ভাগ পরিচালিত হয় এই রুট দিয়ে।
আর চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের শতকরা ৬০ ভাগ বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভরশীল।
সুতরাং আগামী দিনে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বাড়বে। এজন্য আমাদের নৌবাহিনী ও
কোস্টগার্ডকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বহিঃসমুদ্রে টহল বাড়াতে হবে।
বঙ্গোপসাগর নিয়ে গবেষণার পরিধি বাড়াতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় ‘বিস’ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘বিস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা
প্রতিষ্ঠান। তবে সেখানে বঙ্গোপসাগর নিয়ে কোনো কাজ হয় না। এখন হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও যৌথভাবে গবেষণাকর্ম
পরিচালনা করা সম্ভব। আমরা একটা ‘রায়’ পেয়েছি বলে যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি,
তাহলে আমরা ভুল করব। আমাদের কাজ আরও বাড়ল। আমাদের যেতে হবে অনেক দূর।
মহিসোপানের
বিষয়টিরও সমাধান হয়নি। এটা সমাধান করবে জাতিসংঘের অপর একটি সংস্থা। ২০০
নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় মহিসোপান। উপরের অংশ,
অর্থাৎ জলরাশি দিয়ে মহিসোপানের বিচার করা হয় না। মহিসোপানের বিচার করা হয়
পানির নিচের অংশ দিয়ে, যেখানে তেল, গ্যাসসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে।
মহিসোপানে আমাদের সীমানা নির্ধারিত হলেই আমরা মহিসোপানে অর্থাৎ সাগরের নিচে
আমাদের কর্মকাণ্ড চালাতে পারব। এই মহিসোপানের সীমানা নির্ধারণের জন্য
আমাদের ন্যূনতম চার থেকে ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০
নটিক্যাল মাইলকে মহিসোপানের সীমানা ধরা হয়। বাংলাদেশ ২০১১ সালে তার
মহিসোপানের দাবি জাতিসংঘে জমা দেয়। মোট ৫২টি দেশের আবেদনপত্র জাতিসংঘ
বিবেচনা করছে।এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকারকে এখন খুব
দ্রুত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। রায়ের পর সরকার সময় পাবে ৫ বছর।
নিয়মানুযায়ী কোনো দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর প্রথম ৫ বছর সামুদ্রিক
সম্পদ আহরণের জন্য ইন্টারন্যাশনাল সি-বেড অথরিটিকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে
হয় না। কিন্তু ৫ বছরের পর থেকে আহরিত মোট সামুদ্রিক সম্পদের একটা অংশ এই
কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য
সমুদ্র অধিদফতরকে রেখেও একটি বৃহৎ পরিসরে পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি
হয়ে পড়েছে। নৌবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া সিনিয়র কর্মকর্তাদের এই কর্তৃপক্ষের
সঙ্গে জড়িত করা প্রয়োজন। এর ফলে তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে আমরা কাজে লাগাতে
পারব। একজন অদক্ষ আমলাকে দিয়ে এই কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।
একটা রায় পেয়েছি। এটা নিয়ে যদি আমরা বসে থাকি, আমরা অনেক বড় ভুল করব
Daily JUGANTOR
16.07.14
'নতুন গোলপোস্ট' তত্ত্ব!
15:09
No comments
অবসরের বয়স যখন সাতষট্টি!
16:50
No comments
পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের অবসরের বয়স ৬৭-তে উন্নীত করার দাবি
জানিয়েছেন। গেল সপ্তাহে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকরা মানববন্ধন
করেছেন। শিক্ষকদের এ দাবির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি আছে। এরই মধ্যে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা
বাস্তবায়ন করেছে। ধারণা করছি, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় একই পথ অনুসরণ করবে।
বিশেষ করে সবাই তাকিয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ
সিদ্ধান্ত নিলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় খুব দ্রুত এ সিদ্ধান্ত নেবে। তবে
কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় অবসরের বয়সসীমা ৬৭ নির্ধারণ করে সামগ্রিকভাবে এটা
আইনে পরিণত করতে পারবে না। এজন্য সংসদে আইন প্রণয়ন করতে হবে। বলা ভালো,
বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫-তে উন্নীত
করেছিল। এখন আবার এটা যদি ৬৭-তে উন্নীত করা হয়, তাহলে নানা প্রশ্নের জন্ম
দেবে। অতিরিক্ত এ দুই বছরের বেতন কোত্থেকে আসবে, সে প্রশ্ন থাকবেই। অর্থ
মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সমর্থন এতে নেই। ফলে একটা
বড় জটিলতা নিয়েই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন অবসরের বয়স ৬৭ বছরের
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। বলাই বাহুল্য, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার এ
চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৬০
বছরের পর একজন সিনিয়র শিক্ষকের দেয়ার কিছুই থাকে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও
সত্য, খুব কম শিক্ষকই ৬০ বছরের পর তেমন একটা গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত
রাখেন না। অথবা রাখতে পারেন না। অসুস্থতা তাকে পেয়ে বসে। এ বয়সে এসে অনেকেই
দেখেছি, প্রবাসে অবস্থানরত ছেলে বা মেয়ে এবং সেইসঙ্গে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে
সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পড়াশোনা, গবেষণা, ক্লাস নেয়া
ইত্যাদির পেছনে 'সময় দেয়ার' প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কম। এর একটি বাস্তব
ভিত্তিও রয়েছে। আমাদের যে সংস্কৃতি, তাতে পরিণত বয়সে এসে মানুষ সন্তানদের
কাছে আবার ফিরে যায়। এটাই বাস্তব। গবেষণা তাকে টানে না। তবে ব্যতিক্রম যে
নেই, তা আমি বলছি না। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু আমরা অনেক জ্ঞানী ও গুণী
ব্যক্তিকে ৬৫ বছরের সুযোগও দেইনি। অনেক পন্ডিত ব্যক্তি এ সমাজে এখনও আছেন,
যারা ৬০ বছরেরও আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন; কিন্তু এখনও সক্রিয়।
বই লিখছেন। সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন। নিঃসন্দেহে এ প্রজন্মের তরুণরা তাদের
ক্যাম্পাসে পেলে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হতো। কিন্তু তা হয়নি। আরও
একটি কারণে অবসরের বয়স ৬৭-তে উন্নীত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করা যেতে
পারে। তা হচ্ছে ৬৭ বছর নির্ধারণ করে দেয়ায় অনেকেই (যারা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত)
সরাসরি ৪০ বছর শিক্ষকতা করবেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা নিয়োগ পেয়েছেন,
তাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? গবেষণা, পাঠ্যদানের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য
যেখানে বেশি, সেখানে তারা গবেষণায় মনোনিবেশ করবেন, পাঠ্যবই রচনা করবেন- এটা
আশা করা যায় না। অনেক তরুণ প্রভাষকের বিরুদ্ধে এমনসব অভিযোগ শুনি, তাতে
করে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি রীতিমতো আতঙ্কিত। আমার আস্থার জায়গাটা
নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৭-তে
উন্নীত করায় সমাজ, রাষ্ট্র উপকৃত হবে- এ বিশ্বাস রাখতে পারছি না। এরই মধ্যে
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শত শত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পক্ষ থেকেও
দাবি উঠেছে, তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর। রাজনৈতিক সরকারের ওপর সঙ্গত
কারণেই 'চাপ' আসবে এবং কোনো সরকারই চাইবে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল
হোক। এক সময় সরকারও বাধ্য হবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা
বাড়াতে। ফলে যা হবে, তা হচ্ছে 'উপরের স্তরে' জট সৃষ্টি হবে এবং নতুনদের
চাকরি পেতে অসুবিধা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরদের দুটো গ্রেড-
প্রফেসর ও সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রফেসর হিসেবে নিজ
পদে থাকলেও, ১০ ভাগ কোঠার কারণে কোনোদিনই 'সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর' হতে
পারেন না। ফলে যা হবে তা হচ্ছে, সিনিয়র সচিবদের মতো 'সিনিয়র প্রফেসর' পদ
সৃষ্টি করতে বাধ্য হবে সরকার। কেননা রাজনৈতিক সরকার সব সময়ই চায়
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমর্থন। শিক্ষকদের খুশি করার জন্য পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি 'সিনিয়র প্রফেসরের' পদ আগামীতে সৃষ্টি করা হয়, আমি তাতে
অবাক হব না। তবে এক্ষেত্রে যেন একটি নীতিমালা থাকে। সরকার সিনিয়র সচিবের
আটটি পদ সৃষ্টি করেছে। এতে করে সচিবদের পাশে সিনিয়র-জুনিয়র পদ সৃষ্টি করা
হয়েছে। কিন্তু আদৌ কী কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে? বয়সে সিনিয়র- এটাই
কি নীতিমালা? আসলে নীতিমালাটি হওয়া উচিত যোগ্যতার ফলে। একজন সচিব বয়সের
কারণে সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদা পাবেন, সেটি ঠিক নয়। তিনি যোগ্যতা দেখাতে
পেরেছেন কিনা, সেটাই হলো আসল কথা। সচিব সাহেবদের কাজ যদি হয় 'বিদেশ ভ্রমণ'
আর 'দাতাদের নির্দেশনা' অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা, সেই সচিব
'যোগ্য' বলে বিবেচিত হবেন না। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী মেধাশূন্য সচিবের
সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক আগে ২৮ সেপ্টেম্বর (২০১১) এ ধরনের একটি সংবাদ
ছাপা হয়েছিল একটি জাতীয় দৈনিকে। সচিবদের 'পারফরম্যান্সে' প্রধানমন্ত্রী
অসন্তুষ্ট এমন খবরও ছিল ওই প্রতিবেদনে। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে সিনিয়র সচিবের
পদ সৃষ্টি করতে হয়েছিল। আইজিকে 'থ্রিস্টার জেনারেলের' পদমর্যাদা দেয়া
হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর জন্য পাঁচজন সিনিয়র সচিবের পদও সৃষ্টি করা হয়েছে,
তাতে করে রাষ্ট্র, সমাজ কতটুকু উপকৃত হলো? এখন সঙ্গত কারণেই পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দাবি করবেন 'সিনিয়র প্রফেসর'-এর পদ সৃষ্টি করার।
তাদের কী ফেলে দিতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী!
এখানেই
এসে যায় মূল প্রশ্নটি। শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৭ হতে পারে তাতে আপত্তি নেই।
কিন্তু এখানে যেন কিছু চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকে। ঢালাওভাবে একজন
অসুস্থ, কর্মে অক্ষম, মেধাহীন, অযোগ্য শিক্ষক ৬৭ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা
করবেন- এটি কাম্য নয়। সমাজ তার কাছ থেকে কিছু পাবে না। শিক্ষকতায়
দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় 'দলীয় ক্যাডার' নিয়োগ
দিয়ে আমরা এরই মাঝে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংস করে ফেলেছি। আর নয়।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের অবসরসংক্রান্ত আইনটি সংশোধন হতে পারে। সবাই যখন সবকিছু পাচ্ছেন,
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পাবেন না কেন, তাদের দায়িত্ব এখন আরও
বেশি। এখানে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
শিক্ষাসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা
প্রশংসিত হয়েছে। নবম সংসদে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওই কমিটি ছিল আমাদের
জন্য একটা আস্থার জায়গা। তারা তা প্রমাণও করেছেন। শিক্ষকদের স্বার্থে আঘাত
করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এ কমিটি অতীতেও নেয়নি, আগামীতেও নয়া কমিটি নেবে না।
তবে সংসদীয় কমিটি শিক্ষকদের অবসরের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায়
নিতে পারে- ১. অবসরের বয়সসীমা ৬৭ করা হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে প্রমাণ
করতে হবে তিনি শারীরিকভাবে 'ফিট'। অর্থাৎ সুস্থ আছেন এবং নিয়মিত ক্লাস
নেয়ার ক্ষমতা তার আছে (এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা এড়িয়ে
চলতে হবে), ২. ২+২+১ এর যে ফর্মুলা, তা নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজাতে হবে। নয়া
ফর্মুলা আসতে পারে অর্থাৎ সরাসরি ৬৭ পর্যন্ত আইন না করে ধাপে ধাপে তা
কার্যকর করলে ভালো হয়, ৩. এ সুযোগ তিনি পাবেন, যিনি নিয়মিত এমফিল এবং
পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন, ৪. শর্ত হিসেবে তাকে ৬০ বছরের পর
প্রতি বছর একটি পাঠ্যবই রচনা করতে হবে। যদি তিনি তা না পারেন, তাহলে তিনি
৬৭ বছরে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না, ৫. ৬৭-তে যাওয়ার যোগ্যতা
তিনি অর্জন করতে পারবেন, অথবা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যিনি অধ্যাপক পদে
থাকাকালীন নূ্যনতম একবার 'সেবাটিক্যাল লিভ' নিয়ে (এক বছর) একটি গবেষণা
গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার কোনো গবেষণাগ্রন্থ নেই, তিনি ৬৭-তে যাওয়ার জন্য
যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অধ্যাপক থাকাকালীন তিনি যদি আদৌ কোনো এমফিল বা
পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান না করে থাকেন, তিনিও যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন
না। মোট কথা একটা নীতিমালা থাকুক। কিছু শর্ত থাকুক। যদি ঢালাওভাবে ৬৭ করা
হয়, তাহলে তাতে 'রাজনীতি' ঢুকে যাবে। জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র শিক্ষকদের অবসরের
বয়সসীমা বাড়িয়েও তেমন উপকৃত হবে না।
আমি
নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নূ্যনতম পাওনা
নিয়ে কোনো প্রশ্ন করছি না। আমি প্রশ্ন রাখছি নৈতিকতার। আমি যদি আমার
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে কী অধিকার আছে আমার শিক্ষকতার পথকে
দীর্ঘায়িত করার? আমি বাস্তবতাকে মেনে নিতে চাই। শুধু অবসরের বয়স আরও দুই
বছর বাড়িয়ে রাষ্ট্রের কী ক্ষতিসাধন আমরা করছি না। আজ যারা নতুন প্রজন্ম
শিক্ষকতায় আসছেন, তারা জাতিকে কী দেবেন? এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক তরুণ প্রভাষকের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে স্বয়ং তার
শিক্ষকরাই প্রশ্ন তুলেছেন। যিনি তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, তিনি তখন ৬৭ বছরের
অবসরের সুবিধা ভোগ করবেন। একটি 'বিতর্কিত' থিসিস তত্ত্বাবধায়ন করে তিনি
আদৌ বিভাগের কোনো সুনাম আনতে পারেননি। তিনি যদি ৬৭ বছর পর্যন্ত থাকেন,
তিনি কী সুনাম আনবেন আর? আর এক ভদ্রলোক 'ঘুষ' দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। সাবেক ভিসির নির্দেশে মামলা
হয়েছিল। এখন যে ভদ্রলোক টাকা দিয়ে 'শিক্ষক' হতে চান, তিনি যদি ঘটনাক্রমে
শিক্ষক হয়ে যান অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি জাতিকে কী দেবেন? তাদের কাছ
থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের
ঘটনায় হতাশাগ্রস্ত।
তাই পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার শিক্ষকদের অবসরের
বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। একইসঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক
সংস্কার প্রয়োজন। দেশে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউই খেয়াল
করছেন না, এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে
ভালো শিক্ষকের অভাবে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করে ফেলেছি। সব বিশ্ববিদ্যালয়
একটি আইনে এখনও চলছে না। মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথাকথিত সিনেট আছে,
যেখানে গণতান্ত্রিকভাবে ভিসিরা 'নির্বাচিত' হচ্ছেন। ওই নির্বাচন নিয়েও
প্রশ্ন আছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট নির্বাচন হয় না বছরের পর বছর।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার এটা একটা বড় ব্যর্থতা। সরকারের দৃষ্টি এদিকে
নেই। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পদোন্নতির নীতিমালা একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক
রকম। এতে করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষার
ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচ- অনিয়ম হচ্ছে। কোনো রকম
যাচাই-বাছাই ছাড়াই পিএইচডি ও এমফিল কোর্সে ছাত্র ভর্তি করানো হচ্ছে। সরকারি
কর্মকর্তারা, পুলিশের সিনিয়র অফিসাররা, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পিএইচডি
নিচ্ছেন। ভর্তি হচ্ছেন। একজন পূর্ণ চাকুরে কোনো ধরনের ফিল্ডওয়ার্ক কিংবা
লাইব্রেরি ওয়ার্ক ছাড়া পিএইচডি করেন কীভাবে? এখানে দেখভাল করার কেউ নেই।
চতুর্থত, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভাগ খোলা হচ্ছে। আর
সেইসব বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে অন্য ডিসিপ্লিনের। অনেকটা যেন
প্রাইমারি স্কুলের মতো। যে কেউ যে কোনো বিষয় পড়াতে পারে। কোথাও কোথাও
সহকারী অধ্যাপকরাও বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এতে করে
উচ্চশিক্ষার মান রক্ষিত হচ্ছে না।
শিক্ষকরা
তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়াতে চাচ্ছেন। কোনো কোনো পেশায় বাড়ানো হয়েছে।
এক্ষেত্রে শিক্ষকদের বাড়ানো হবে না কেন? এটা হতেই পারে। কিন্তু শিক্ষক
রাজনীতির জন্য যদি এ বয়সসীমা বাড়ানো হয়, তাহলে তা সমর্থনযোগ্য হবে না।
সিনিয়র শিক্ষকরা 'রাজনীতি' করেন। অভিযোগ আছে, শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয়
থাকার জন্যই এ বয়সসীমা বাড়ানো। বয়সসীমা বাড়ানোর আগে উচ্চশিক্ষার মানের দিকে
দৃষ্টি দেয়া দরকার। সিনিয়র শিক্ষকরা, ভিসিরা এটি করছেন না, দুঃখটা এখানেই।
তাই অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে দৃষ্টি
দেয়া হোক। একুশ শতকে এসে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পারিবারিক
বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। মেধার চেয়ে এখানে 'রাজনীতি' প্রাধান্য পাচ্ছে
বেশি। সংস্কারটা তাই জরুরি।
Daily ALOKITO BANGLADESH
11.07.14
এ রায়কে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে
16:53
No comments
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের রায় দিয়েছে দ্য হেগে অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন। এ রায় প্রকাশ করা হয়েছে গত মঙ্গলবার। রায় প্রকাশকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এ রায়ে বাংলাদেশই জয়ী হয়েছে। কিন্তু পুরো রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সালিশি কোর্ট বাংলাদেশের পুরো দাবি মেনে নেননি। বাংলাদেশের দাবি ছিল ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ পেয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ৬ হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ কম পেয়েছে। বাংলাদেশের দাবি ছিল ভূমির মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রি সোজা রেখা টেনে সীমানা চিহ্নিত করার। আর ভারত দাবি করেছিল সমুদ্রের তট বিবেচনায় রেখে এ রেখা ১৬২ ডিগ্রি করার। আদালত এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষেরই যুক্তি গ্রহণ করেননি। আদালতের রায়ে মূল বিন্দু থেকে ১৭৭.৩ ডিগ্রি রেখা টানা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সমতা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে যে সীমানা রেখা নির্ধারণের দাবি করেছিল, তা বাহ্যত এ রায়ের ফলে স্বীকৃতি পেল। আদালত নিজস্ব মতামত, তারা সমতার ভিত্তিতেই এ রায় দিয়েছেন। ভারতের দাবি ছিল সমদূরত্বের নীতিতে সীমানা নির্ধারণ করার। আন্তর্জাতিক আইনে দুটিই স্বীকৃত।
তবে সীমানা নির্ধারণের এ রায়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ তালপট্টির ওপর তার অধিকার হারিয়েছে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশ সীমান্তে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি জেগে ওঠে। দ্বীপটি ছিল খুলনা-বাগেরহাটের দক্ষিণে। আমাদের রায়মঙ্গল নদী এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার অদূরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় এ দ্বীপটি জেগে উঠেছিল। নদীর মোহনা থেকে ২ কিলোমিটার দূরে এর অস্তিত্ব ছিল। ১৯৭৪ সালে মার্কিন স্যাটেলাইটে আড়াই হাজার বর্গমিটারের এ দ্বীপটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। পরে দ্বীপটির আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার বর্গমিটার। তবে দ্বীপটির মালিকানা দাবি করেছিল ভারত। বাংলাদেশী এলাকায় এর নাম দক্ষিণ তালপট্টি হলেও ভারতীয় এলাকায় এর নাম হল পূর্বাশা। ১৯৭৮ সালের মার্চে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সেখানে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করে। বাংলাদেশ দ্বীপটির ব্যাপারে যৌথ সমীক্ষার প্রস্তাব করলেও ভারতের কাছে তখন তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ তালপট্টিতে অবতরণ করে। বাংলাদেশ তখন দক্ষিণ তালপট্টি থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানালেও ভারত তাতে রাজি হয়নি। তবে সাম্প্রতিককালে দ্বীপটির অস্তিত্ব আর ধরা পড়েনি। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার একবার প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, এ দ্বীপটির কোনো অস্তিত্ব নেই। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরাও এটা স্বীকার করেছেন যে, দ্বীপটির এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা তো বাস্তবতা, ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় মরু অঞ্চলের বরফ গলছে। ফলে সাগর-মহাসাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে দক্ষিণ তালপট্টি তার অস্তিত্ব হারিয়েছে কি-না, তা একমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা সম্ভব।
এখানে আরও একটা প্রশ্ন- বাংলাদেশ সালিশি আদালতে দক্ষিণ তালপট্টির দাবি করে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছিল কি-না? সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা স্বীকার করেছেন, ২০১০ সালে সরকার বাংলাদেশের যে মানচিত্র তৈরি করেছিল, তাতে ওই দ্বীপটির অর্থাৎ দক্ষিণ তালপট্টির কোনো অস্তিত্ব নেই। কোর্টও তার রায়ে বলেছেন, দক্ষিণ তালপট্টির কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা নাকি নিজেরা দেখে গেছেন। এখন এ রায়ের ফলে এই এলাকা আমরা পুরোপুরিভাবে হারালাম। এ এলাকা এখন ভারতের। এক সময় আমরা গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্লক ২১-এর অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম এ এলাকাটিকে। এ এলাকায় বিশাল জ্বালানি সম্পদের রিজার্ভ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ সম্পদ এখন স্থায়ীভাবে ভারতের হয়ে গেল।
তবে কোর্টের রায়ে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই খুশি। এ রায়ে উভয় রাষ্ট্রের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন। তিনি বলেছেন, এ বিজয় বন্ধুত্বের বিজয়। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সাধারণ মানুষের বিজয়। বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় ৩ লাখ বর্গকিলোমিটার। রায়ের ফলে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের মধ্যে অবস্থিত সব ধরনের খনিজ ও অখনিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এতদিন দক্ষিণ তালপট্টিতে কোনো দেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালায়নি। এখন ভারত চালাবে। আমাদের করার কিছু নেই।
এখানে বলা ভালো, ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মিয়ানমার ও ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আমরা একটা রায় পেয়েছি। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হয়েছে। এখন ভারতের সঙ্গেও এ সীমা নির্ধারিত হল। সমুদ্রের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি বেশ জটিল। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বর্তমানে বলবৎ রয়েছে 3rd United Nations Convention on the Law of Sea (UNCLOS III)। এই আইন ১৯৮২ সালে গৃহীত এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর। ভারত ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন, আর মিয়ানমার ১৯৯৬ সালের ২১ মে UNCLOS III অনুমোদন করে। আর বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষরের পর তা অনুমোদন করে ২০০১ সালের ২৭ জুলাই। আইন অনুযায়ী অনুমোদনের ১০ বছরের মধ্যে সমুদ্রসীমার দাবির স্বপক্ষে তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করতে হয়। UNCLOSS III-এর ধারা ২৮৭, এনেক্স VII, আর্টিকেল ১ অনুযায়ী বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তার দাবি উপস্থাপন করেছিল। এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে Territorial Waters and Maritime Zones Act 1974 গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এ অ্যাক্টের বেইজ লাইন ৬০ ফুট সমুদ্র গভীরতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত বংলাদেশের এ দাবির বিরোধিতা করে এই যুক্তিতে যে, সর্ব পশ্চিমের পয়েন্ট তার (ভারতের) ২১ মাইল ভেতরে চলে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরেই সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় বসে। আরও বলা ভালো, কোন নীতি অনুসরণ করে এ বিবাদ নিষ্পত্তি করা হবে, তা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে পরস্পরবিরোধী অবস্থান ছিল। মিয়ানমার ও ভারত চেয়েছে সমদূরত্ব নীতি অনুসরণ করে এ বিবাদের নিষ্পত্তি। অন্যদিকে বাংলাদেশ চেয়ে এসেছে সমতা নীতি। সমদূরত্ব পদ্ধতি বা নীতি অনুসরণ করলে বঙ্গোপসাগরের ওপর যথাক্রমে দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দুটি সীমারেখা টানা হতো। ফলে বাংলাদেশ সমুদ্র অঞ্চলের ওপর তার অধিকার হারাত। অন্যদিকে সমতা পদ্ধতি অনুসরণ করলে সোজা দক্ষিণ দিকে এ সীমারেখা টানা হবে। তবে এটাও সত্য, আন্তর্জাতিক আইনে সমদূরত্ব ও সমতা নীতি দুটিই স্বীকৃত এবং দুটিই অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষ যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতায় উপনীত হতে না পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে দেশ দুটিকে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে আদালতের রায় দেশ দুটি মানতে বাধ্য। এখন বাংলাদেশ ও ভারত কোনো আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না। রায় মানতে হবে। আপিলেরও কোনো সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী কোনো দেশ বেইজলাইন থেকে সমুদ্রের দিকে ২০০ মাইল পর্যন্ত একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে দাবি করতে পারে। সব দেশের ক্ষেত্রে সমান দূরত্বের এ বিধানকে সমদূরত্ব নীতি বলা হয়। তবে যদি দুটি বা ততোধিক দেশের উপকূল রেখা পরস্পর বিপরীতভাবে বা বক্রভাবে বিরাজ করে, তাহলে সমদূরত্বের নীতি কার্যকর হবে না। কারণ তাতে কোনো একটি দেশ তার ব্যাখ্যা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে UNCLOS-এর ৭৪ ধারা অনুযায়ী দেশগুলোকে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণতার নীতির ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে, আর এজন্য একাধিক বিষয় বিবেচনায় আনতে বলা হয়েছে। যেমন দেশের উপকূলের রেখা বিন্যাস, তার বক্রতা, তার দৈর্ঘ্য ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সমুদ্র উপকূল পরস্পর বক্র আকারে বিরাজ করলেও তারা দীর্ঘদিন তা গণ্য করেনি, বরং সমদূরত্বের নীতির আলোকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দাবি করে আসছিল। এখন আদালত এ সমদূরত্বের নীতি গ্রহণ না করে কিছুটা সমতা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে এ রায়টি দিল।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উপকূল নাজুক এবং নিরন্তর পলি জমার কারণে তীরের গভীরতাও খুব কম। অপরদিকে ভারত ও মিয়ানমারের উপকূল উত্তল বা কনভেক্স, অর্থাৎ তাদের উপকূল সমুদ্রের ভেতরে ঢুকে গেছে। আর আমাদের উপকূল হল অবতল বা কনকেভ। সমুদ্র এখানে উপকূলের ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে উপকূল আঁকাবাঁকা হয়, পলি বেশি জমা পড়ে। বাংলাদেশের এ অবস্থান এখন আদালত মেনে নিল।
আমার ধারণা, আদালত অতীতের কয়েকটি রায়ের আলোকেই এ রায়টি দিলেন। সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের যে অবস্থান তার সঙ্গে ইউরোপের তিনটি দেশ জার্মানি, ডেনমার্ক আর নেদারল্যান্ডসের অবস্থানের একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। বাংলাদেশের মতো মাঝখানে অবস্থান জার্মানির। একদিকে ডেনমার্ক অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস। সবাই তেল সমৃদ্ধ সাগর নর্থ সিতে তেল অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিল। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে তিনটি দেশই ১৯৬৭ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে যায়। ওই মামলায় একদিকে ছিল জার্মানি (আজকে যেমন বাংলাদেশ), অপর পক্ষে ছিল ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডস (এ ক্ষেত্রে ভারত ও মিয়ানমার)। ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের দাবি ছিল সমদূরত্বের নীতি অনুসরণ করার। ১৯৬৯ সালে আদালত রায় দিয়েছিলেন সমদূরত্বের নীতিতে নয়, বরং ন্যায়পরায়ণতার নীতির ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে।
২০১২ সালে হামবুর্গে ইটলসের রায়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছিল। এখন দ্য হেগে সালিশি আদালতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হল। এতে করে কোনো একটি পক্ষ বিজয়ী হয়েছে এটা বলা যাবে না। একটা ভালো জিনিস হয়েছে- তা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে একটা বিবাদ জিইয়ে ছিল। দীর্ঘ আলোচনায় কোনো ফল মেলেনি। বাংলাদেশ আলোচনায় সময়ক্ষেপণ না করে সালিশি আদালতে গিয়ে এবং নিজেদের খরচায় (ট্রাইব্যুনাল ও সদস্যদের খরচ দুপক্ষ সমানভাবে ভাগ করবে। আইনজীবীর খরচ তো আছেই) একটি রায় পেল, এটি একটি ভালো দিক। এখন এ রায়কে অনুসরণ করে সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করছে এর সফলতা। এটা নিয়ে যদি রাজনীতি হয়, তাহলে তা হবে একটি দুঃখজনক ঘটনা। সাধারণ মানুষের কল্যাণেই এ রায়কে এখন ব্যবহার করতে হবে।
Daily JUGANTOR
১০ জুলাই, ২০১৪
আসল কথাটি ফাঁস করে দিলেন সুষমা
17:46
No comments
শেষ
পর্যন্ত আসল কথাটি ফাঁস করে দিলেন সুষমা স্বরাজ। আসাম বিজেপির সঙ্গে
সাক্ষাৎকারের সময় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন তার ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে
বাংলাদেশি নেতাদের চুক্তি নিয়ে কোনো কথা হয়নি। এ তথ্যটি আমাদের দিয়েছে
ভারতীয় দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়া ৩ জুলাই। সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর শেষ হয়েছে
বেশ কয়েকদিন হলো। কিন্তু তার রেশ এখনো রয়ে গেছে। ভারতীয় পত্রপত্রিকা তো
বটেই, বাংলাদেশি পত্রপত্রিকাগুলোয়ও সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের 'পোস্ট
মর্টেম' এখনো চলছে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়া একটি ভারতীয় সংবাদপত্রে
সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সেখানে তিনি বেশ কিছু কথা বলেছেন, যা তিনি আগে কখনো
বলেননি।
নিঃসন্দেহে সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের একটি গুরুত্ব আছে। এখন অনেক
সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি যদি আমরা মোটা দাগে এই সফরকে বিশ্লেষণ করি।
ভারতে নয়া সরকার বাংলাদেশকে যে তাদের বৈদেশিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ
অবস্থানে রেখেছে, তা কার্যত ভারত আজ স্বীকার করে নিল। ভারত 'জি টু জি'
সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ 'সরকার টু সরকার' সম্পর্ক। কোনো বিশেষ দলকে
তারা সমর্থন করবে না। তবে ভারতের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অতীতে আওয়ামী
লীগের সঙ্গে একটি 'বিশেষ সম্পর্ক' স্থাপন করেছিল ভারতীয় কংগ্রেস। এ
ক্ষেত্রে বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অতীতে কংগ্রেস-আওয়ামী লীগের
মতো কোনো পার্থক্য থাকবে কি? বিজেপি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাকে তাদের
বৈদেশিক নীতিতে অন্যতম এজেন্ডাভুক্ত করেছে। ভুটান সফরের পর প্রকাশিত যৌথ
ইশতেহার পর্যালোচনা করলে এই নিরাপত্তার বিষয়টি বোঝা যায়। বাংলাদেশের সঙ্গেও
সম্পর্কের প্রশ্নে এ নিরাপত্তা ইস্যুটি প্রাধান্য পাবে। বিশেষ করে
সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের অংশগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় চীনের
ভূমিকা ভারতের নিরাপত্তাকে বিঘ্ন করবে কিনা, এটা ভারত নিশ্চিত হতে চায়।
এখন কিছু আশ্বাস পাওয়া গেছে। তাতে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। এই
আশ্বাস অতীতেও পেয়েছি। ঢাকা-শিলং-গৌহাটি বাস চালুর সিদ্ধান্ত, মৈত্রী
এক্সপ্রেসের ট্রেন সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন ৪টি বর্ডার হাট চালু, কিংবা ৬৫
বছরের বেশি ও ১৩ বছরের কম বয়সীদের ৫ বছরের মাল্টিপাল ভিসা (এ নিয়ে প্রশ্ন
আছে)। ইস্যুর যে নীতিগত সিদ্ধান্ত তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ খুব বেশি রক্ষিত
হয়নি। বাস্তবতা হচ্ছে_ তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে কোনো
'কমিটমেন্ট' নেই। সীমান্ত হত্যা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই। তার অ্যারাইভাল
ভিসা প্যাকেজ ঘোষিত হয়নি। অশুল্ক বাণিজ্য বাধা অপসারণে কিছু হয়নি। ভারতে
বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল প্রচারে কোনো উদ্যোগের কথা বলে যাননি সুষমা। এসবই
বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল। খালেদা-সুষমা বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত
হলো মোদি সরকার খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর
বলে মনে করে। এমনকি খালেদা জিয়া স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে
দেখা করার মধ্য দিয়ে ভারত যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর তা
বিএনপিও স্বীকার করে নিয়েছে। তবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, প্রতিটি দেশ বাংলাদেশে 'সকল দলের অংশগ্রহণে' একটি
নির্বাচনের কথা বলেছে, সেখানে সুষমা স্বরাজ এ ধরনের কোনো কথা বলেননি। বরং
বলা হয়েছে 'অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান জনগণকেই খরতে হবে।' এতে সরকারের
প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থনই প্রকাশ পায়। 'দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই'_
খালেদা জিয়ার এ ধরনের উক্তির একটা ব্যাখ্যা হতে পারে এরকম_ বিএনপি চায় ভারত
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এরকম একটি
অভিযোগ উঠেছে। এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দৈনতা। আমরা আমাদের
রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারি না। আমাদের দ্বারস্থ হতে হয় বিদেশিদের।
এবারই যে এরকমটি হলো তা নয়। এর আগেও হয়েছে। সুষমার এই সফরে প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার নয়াদিলি্ল সফর নিশ্চিত হলো। এটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুষমার এই সফর বাংলাদেশের স্থিতিশীল রাজনীতির জন্য কোনো
মেসেজ নেই। খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে কোরবানির পর পরই আন্দোলনের কথা বলেছেন।
ফলে বছর না ঘুরতেই হয়তো আমরা আবারো 'হরতালের রাজনীতি' প্রত্যক্ষ করব।
এক কথায় সুষমা স্বরাজের এই সফরের মধ্য দিয়ে বড় কিছু অর্জিত হয়নি। আগামী ৫
বছর বিজেপি ক্ষমতায় থাকবে। অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এই সময় সীমায়
তিস্তাচুক্তি হবে কিংবা সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধন
হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তিস্তার পানিবণ্টন পশ্চিমবঙ্গে একটি
রাজনৈতিক ইস্যু। মমতা ব্যানার্জি এটা হাতছাড়া করতে চাইবেন না। কেননা ২০১৬
সালে সেখানে বিধানসভার নির্বাচন। নির্বাচনে পানির বিষয়টি তিনি দলীয়
স্বার্থে ব্যবহার করবেন। আর সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান আন্তরায় হচ্ছে
আসাম বিজেপি। সুতরাং বিজেপির পক্ষে এটি রামসভায় পাস করিয়ে আইনে পরিণত করা
সহজ হবে না। একই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো কিংবা সীমান্ত হত্যা বন্ধের
বিষয়টি একান্তই মানসিকতার ব্যাপার। ভারতের ব্যুরোক্রেসি বাংলাদেশকে
সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে না। ফলে রাজনৈতিক নেতারা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী
মনমোহন সিং) সীমান্তে হত্যাকা- হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেও,
হত্যাকা- হচ্ছে। কাজ হচ্ছে না তবে একটা কথা এখানে বলা দরকার। সুষমা
স্বরাজকে যে সম্মান বাংলাদেশ দিয়েছে, তাতে ভারতের উচিত হবে বাংলাদেশের
সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আরো ইতিবাচক হওয়া। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ত্রিপুরায় ১০
হাজার টন খাদ্যশস্য পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ হয়ে
আগরতলা যাবে এই খাদ্যশস্য। এর জন্য রাস্তাঘাট ও ব্রিজও বাংলাদেশ তৈরি করে
দেবে। বাংলাদেশের এই 'উদ্যোগ'-এর প্রতিদান হিসেবে ভারত আমাদের কী দেবে, তাই
দেখার বিষয় এখন। বাংলাদেশ শুধু দেবে, আর ভারত তার স্বার্থে বাংলাদেশকে
ব্যবহার করবে, এই মানসিকতায় ভারতের নেতারা যদি পরিবর্তন না আনেন, তাহলে দুই
দেশের সম্পর্ক উন্নত হবে না। সুষমা স্বরাজ চলে গেছেন। কিন্তু জয় করে যেতে
পেরেছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু অনেক প্রশ্ন তিনি রেখে গেছেন তার এই সফরের
মধ্য দিয়ে। মিডিয়া এবং জাতীয় নেতারা যেভাবে তার এই সফরকে চিহ্নিত করেছেন
এবং অতি উৎসাহভাব প্রকাশ করেছেন, তা কোনো ভাল লক্ষণ নয়। এতে আমাদের দৈন্যই
প্রকাশ পেয়েছে। কিছুদিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ এসেছিলেন।
তাকে নিয়ে এত নাচানাচি হয়নি। অথচ আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জাপান কিংবা
চীনের অবস্থান ভারতের চেয়ে বেশি। এমনকি খালেদা জিয়ার সব প্রটোকল ভেঙে
হোটেলে গিয়ে সুষমার সঙ্গে দেখা করা নিয়েও কথা উঠেছে। খোদ ভারতীয় পত্রিকা এ
নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভারত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর সন্দেহ নেই
তাতে। কিন্তু এখন সবাই মিলে যদি ভারতকে তোষামোদ করে চলি। তাহলে ভারতের
ব্যুরোক্রেসি এ সুযোগ নেবেই। ভারতকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হলে, সেভাবে
আচরণ করাই মঙ্গল। আমরা তা করিনি।
আমরা বারবার বলে আসছি ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমাদের শক্ত
অবস্থানে যেতে হবে। এটা ঠিক ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ভারত এক ধরনের
নীরবতা অবলম্বন করেছিল। এই নীরবতাই সমর্থনের শামিল। বাংলাদেশে ভারতের
প্রচুর স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের বিশাল বাজার। ১৬ কোটি মানুষের দেশ
এই বাংলাদেশে ভারতের বিক্রি করার অনেক কিছু আছে। এবং ভারত তা করছে। উপরন্তু
ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তাদের একটা পথ
দরকার। তাও তারা পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রাপ্তির খ্যাতি শূন্য। আমাদের
পণ্যের যে বাজার সৃষ্টি হয়েছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয়, তা এখন
ভারতীয় পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশ তার বাজার
হারাচ্ছে। এমনিতেই বাংলাদেশ তার পণ্য নিয়ে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে পারছে
না। আমরা বারবার এ কথাগুলো বলছি। যখন মনমোহন সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখনও
বলেছি। এখন যখন সুষমা এলেন, তখনও বললাম। কিন্তু তাতে এতটুকু দৃষ্টি দেয়নি
ভারত। অথচ আমরা সুষমা স্বরাজকে যেভাবে সম্মান দিলাম তা সমসাময়িককালে বিরল
একটি ঘটনা। এখন ভয় হচ্ছে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময়, ওই সফরটা না জানি
কেমন হয়।
সুষমা স্বরাজ নয়াদিলি্ল ফিরে গিয়ে সাক্ষাৎকারে খাঁটি কথাই বলেছেন_ চুক্তি
নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। এটাই স্বাভাবিক। যে সরকারের বয়স মাত্র এক মাস, সে
সরকার হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিন্তু আমাদের 'অতি উৎসাহ'
ভারতে একটি ভুল সিগনাল পেঁৗছে দিতে পারে। ভারতীয় ব্যুরোক্রেসি আমাদের
দুর্বল ভাবতে পারে। দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে এটা ভালো নয়। ধারণা করছি,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরই নয়াদিলি্ল যাবেন। আমাদের প্রত্যাশা হবে
তিনি বাংলাদেশের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরবেন। আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই।
কিন্তু তাদের আধিপত্য নয়। তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক
আইন আমাদের পক্ষে। আর সীমান্তচুক্তি করতে ভারত বাধ্য। বিজেপি সরকার এটা
চাইলেই পারে। কেননা দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সংবিধানে সংশোধন করার ক্ষমতা
তারা সংসদে রাখেন। তাই প্রয়োজন মানসিকতা পরিবর্তনের। সুষমা স্বরাজের
সর্বশেষ মন্তব্য এটাই মনে করিয়ে দিল অতি উৎসাহ কখনো কোনো মঙ্গল ডেকে আনে না
Daily JAI JAI DIN
09.07.14
অনিশ্চয়তার আবর্তে জিএসপি-সুবিধা
16:53
No comments
জিএসপি-সুবিধা
ফিরে পেতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তায় অনেক কিছু করতে হবে।
গত ৪ জুলাই বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের এক
প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জিএসপি-সুবিধা
ফিরে পেতে বাংলাদেশের সব উদ্যোগ আপাতত ব্যর্থ হল। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজে জুন
মাসে ওয়াশিংটনে গিয়েও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে
তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী এ সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক
হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এভাবে অসহযোগিতা
চালিয়ে যায়- তাহলে টিকফা বাস্তবায়নে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।যুক্তরাষ্ট্রে
বাংলাদেশি পণ্যের বাজার ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে আমরা
শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই ০.৫ শতাংশ পণ্যে। অর্থের পরিমাণে এর পরিমাণ ২৬
মিলিয়ন ডলার। আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার,
প্লাস্টিক, খেলনা প্রভৃতি পণ্যে। অথচ এসব সেক্টরে খুব কম পণ্যই আমরা
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করি। আমাদের পণ্যের বড় বাজার হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই
খাতে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশ হারে। শতকরা ১৫ দশমিক ৬২ ভাগ হারে
শুল্ক দিয়ে আমরা তৈরি পোশাকের বিশাল এক বাজার গড়ে তুলেছি যুক্তরাষ্ট্রে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী গেল ৫ বছরে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পে শুল্ক দেওয়া হয়েছে ৩
মিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে একটা তথ্য আমাদের
দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তুলনামূলক বিচারে অন্যান্য শিল্পোন্নত তথা
মধ্যসারির উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি শুল্ক
দেয়। যেমন- মার্কিন বাজরে পণ্য পাঠাতে ভিয়েতনাম শুল্ক দিচ্ছে ৮.৩৮,
ইন্দোনেশিয়া ৫.৩০, তুরস্ক ৩.৫৭, চীন ৩.০৮, ফিলিপাইন ২.৯৭, ইতালি ২.৪৯, ভারত
২.২৯, থাইল্যান্ড ১.৭৯, স্পেন ১.৭৭ শতাংশ ইত্যাদি। এখানেও একধরনের
বিভ্রান্তি রয়েছে। পোশাকশিল্পে ইন্দোনেশিয়া, চীন কিংবা ভিয়েতনাম, ভারত
আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব দেশ যে পরিমাণ শুল্ক দেয়- বলা হচ্ছে তা কি শুধু
পোশাক শিল্পের জন্য, নাকি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? সাংবাদিকরা
এ প্রশ্ন করেছিলেন ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারি
বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানিকে। তিনি বলেছেন, টিকফার আওতায় স্বল্পোন্নত
দেশ হিসেবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে
শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ, চীন, হংকং কিংবা
ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি শুল্ক দেয়- এটা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের
বাংলাদেশ মতো ‘মোস্ট ফেভারড ন্যাশনস’ হিসেবে সুবিধা পায়। সমস্যাটা এখানেই।
বাংলাদেশ কি তাহলে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে? ডিলানি কি ভুল তথ্য দিয়েছেন?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চুক্তির খুঁটিনাটি বড় জটিল।
এগুলো বোঝা ও ব্যাখ্যা দেওয়ার বিশেষজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়ে। যে ‘সেলটি’, সেখানে যারা কাজ করেন, তারাও দক্ষ নন। যতদূর
জানি, প্রতিটি পণ্যের আলাদা শুল্ক। এমনকী তৈরি পোশাকেও হাজারটা ‘আইটেম’
আছে। সব আইটেম বাংলাদেশ তৈরি করে না, রপ্তানিও করে না। প্রতিটি আইটেমের
শুল্ক আলাদা। এখানে আমাদের আলোচকরা সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছেন কি না- আমার
সন্দেহ হয়! তাই মাইকেল ডিলানির বক্তব্য উল্লেখ করেই বাংলাদেশের উচিত আরএমজি
(তৈরি পোশাক) সেক্টরে অতিরিক্ত শুল্কের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা।
জিএসপি-সুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালে হংকংয়ে
অনুষ্ঠিত বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে
শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার শর্ত কার্যকর করতে রাজি হয়েছিল। এতে একটা ধারণার
জন্ম হয়েছিল, অনুন্নত বিশ্ব পশ্চিমা উন্নত দেশে তাদের পণ্যের আওতা বাড়াতে
পারবে। তবে একটা প্রশ্ন ছিল পণ্যের মান ও উৎস নির্ধারণ নিয়ে। এই দুটো বিষয়
নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে। হংকং সম্মেলনের দীর্ঘ ৮
বছর পর গত বছরের ৩-৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সর্বশেষ বিশ্ববাণিজ্য
সংস্থার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠক)। বালি সম্মেলনের মধ্য
দিয়ে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বটে কিন্তু ‘বালি
ঘোষণা’য় কোন পক্ষ কী পেল কিংবা বাণিজ্যবৈষম্যের শিকার অনুন্নত দেশগুলোর
জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল।
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে
এ প্রশ্নগুলোই আবারও উত্থাপিত হয়েছে। আমাদের জিএসপি-সুবিধা পাওয়ার কথা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকে কোনও জিএসপি-সুবিধা দিচ্ছে না। তারপরও
অন্যান্য পণ্যে যতটুকু সুবিধা পেত বাংলাদেশ, তাও গত জুন (২০১৩) থেকে স্থগিত
রাখা হয়েছে। জিএসপি-সুবিধা স্থগিত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ৩টি
প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এক. শ্রমমান, দুই. শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম
হত্যাকা-ের পূর্ণ তদন্ত ও বিচার এবং তিন. ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ঢাকার
টিকফার প্রথম বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র আকার-ইঙ্গিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল।
শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ‘রুলস অব অরিমিন’-এর কঠিন শর্তে
আটকে আছে। ধনী দেশগুলো এটা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৬১.৩ শতাংশ জিএসপি-সুবিধার আওতায় তৈরি পোশাকের
ক্ষেত্রে মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে বাংলাদেশ।
বলা ভালো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৭৮ শতাংশ হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই তৈরি
পোশাকের ৬০ শতাংশ যায় ইউরোপে আর ২৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে। তৈরি পোশাক আমাদের
আয়ের অন্যতম উৎস হলেও এ খাতের সঙ্গে জড়িত নানা ‘প্রশ্ন’-এর ব্যাপারে সঠিক
ব্যাখ্যা ও বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করতে পারেনি। দরকষাকষিতে আমাদের
অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আমলানির্ভর আমাদের মন্ত্রণালয়ের আমলারা ‘বিদেশ
সফর’, ‘সম্মেলনে অংশগ্রহণ’ ইত্যাদিকেই প্রধান্য দেন বেশি। এখানে দক্ষ
জনশক্তির বড় অভাব। বিজেএমইএও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাদের গবেষণা
‘সেল’ও শক্তিশালী নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে রুলস অব
অরিজিন, ‘অ্যান্টিডাম্পিং’ ও ‘কাউন্টার ভেইলিং ব্যবস্থা’, ‘প্রেফারেন্স
ইরোসন’, শ্রমমান ইত্যাদি টেকনিশাল প্রশ্ন জড়িত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের
অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়ও আমরা এসব
প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে যেতে পারিনি। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠক
শেষ হয়েছিল। এতে আমাদের প্রাপ্তি কী ছিল? আমাদের প্রাপ্তির খাতাটা ছিল
শূন্য। জিএসপি-সুবিধার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ‘কমিটমেন্ট’ ছিল না।
যদিও ডিলানি তখন বলেছিলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমস্যা
সমাধানে করাই টিকফার লক্ষ্য। এটা একটা ‘কূটনৈতিক জবাব’। যুক্তরাষ্ট্র
বলেছে, তারা চুক্তির ১৬ অনুচ্ছেদের সবটির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু যে
প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যে উঠেছে, এর কোনও সুস্পষ্ট জবাব আমরা
পাইনি। টিকফা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের
ট্যাক্স-সুবিধা দেবে। এতে আমরা কতটুকু সুবিধা পাব? যুক্তরাষ্ট্রের
কম্পানিগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে বাংলাদেশ। এতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু
অর্জিত হবে? যুক্তরাষ্ট্র টেলিকমিউনিকেশন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য,
যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করবে। ফলে এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। এতে কি
সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? সেবা খাত কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? শিক্ষা,
স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে থাকবে। শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ
কমবে। স্বাস্থ্য খাত বেসরকারিকরণ হবে। ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। শস্যবীজ,
চাল, গম ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে মার্কিন বহুজাতিক কম্পানিগুলোর হাতে।
আমরা একরকম জিম্মি হয়ে যাব মার্কিন কম্পানিগুলোর কাছে। জিএমও ফুড নিয়ে
যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশে এটি সম্প্রসারিত হবে। ফলে
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকব আমরা। মেধাস্বত্ব আইনের দোহাই তুলে কৃষি, ওষুধ,
কম্পিউটার ইত্যাদি একতরফাভাবে মার্কিন কম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ওষুধ
শিল্প ‘বিশেষ সুবিধা’ ভোগ করলেও এই শিল্প এখন ঝুঁকির মুখে থাকবে। বিশ্বের
৮৭ দেশে আমরা সস্তায় ওষুধ সরবরাহ করি। প্যাটেন্ট ক্রয় করে বাংলাদেশ সস্তায়
ওষুধ তৈরি করে। এটা এখন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ বাজারেও ওষুধের
মূল্য বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ‘কোন কম্পিউটার’ তৈরি বন্ধ হয়ে গেলে
কম্পিউটারের মূল্য অনেকগুণ বেড়ে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব ক্ষেত্রে
বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এখন চুক্তি অনুযায়ী
যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি পূরণ করতে বাধ্য। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনায় আমরা
জিএসপি-সুবিধা আর জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির কারণে বিশেষ সুবিধা দাবি করেছি।
কিন্তু এটা এখন স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি-সুবিধাকে তাদের ‘রাজনৈতিক
স্বার্থে’ ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের শ্রমমান আর পশ্চিম ইউরোপের শ্রমমান যে
এক নয়, তা আমরা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের ব্যর্থতা, আশুলিয়ার শ্রমিকনেতা
আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে পারিনি। সীমিত পরিসরে ট্রেড
ইউনিয়ন করার অধিকার থাকলেও তা যে শ্রমিকদের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না- এ
বিষয়টিও আমরা স্পষ্ট করতে পারিনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত বছরের
জুনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি-সুবিধা স্থগিত করে। এরপর এই
সুযোগ ফেরত পেতে বাংলাদেশকে করণীয় ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এই অ্যাকশন প্ল্যানের অনেক কিছুই বাংলাদেশ বাস্তবায়ন
করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ব্যাখ্যা ভিন্ন। বাণিজ্যমন্ত্রী একাধিকবার
বলেছেন, বেঁধে দেওয়া শর্তের অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে কিছু শর্ত
যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়। যেমন- বলা যেতে পারে, ১২০টি শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধন দেওয়া,
শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া, বেসরকারি
খাতে গড়ে ওঠা ‘অ্যালায়েন্স’ ও ‘অ্যাকর্ড’কে কারখানা পরিদর্শনে সহায়তা করা
ইত্যাদি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, গার্মেন্ট খাতে বাংলাদেশের আরও কিছু
করা উচিত ছিল। শ্রম আইন সংস্কারে তেমন অগ্রগতি নেই। উপরন্তু বিজেএমইএ
সভাপতি অতিসম্প্রতি শ্রমিকনেতাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করায় তা
মার্কিন প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উল্লেখ্য, বিজিএমইএ সভাপতি
আতিকুল ইসলাম সম্প্রতি শ্রমিকনেতা নজরুল ইসলাম খান ও রায় রমেলা চন্দের
নেতৃত্বাধীন গ্রুপ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ নেতাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত
করেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেরি হার্ফ এর তীব্র
প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এখন বাণিজ্যমন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া জানালেন, তা
কতটুকু সঠিক হয়েছে- সে প্রশ্নও উঠতে পারে। টিকফা চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে
জিএসপি-সুবিধার বিষয়টি তিনি এক করে দেখেছেন। স্পষ্ট করেই বলেছেন, এতে টিকফা
বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গত বছর বাংলাদেশ টিকফা চুক্তি
স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা করেছিল, দেশটিকে
জিএসপি-সুবিধা দেওয়া হবে এবং বাংলাদেশি গার্মেন্টের শুল্কমুক্ত
প্রবেশাধিকারের একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেটি হল না। এর মধ্য দিয়ে
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এখন।
Daily Amader Somoy
06.07.14
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে গবেষণা হোক
16:47
No comments
এলেন দেখলেন নাকি জয়ও করলেন
18:10
No comments
সুষমা
স্বরাজের ঢাকা সফরে কী পেল বাংলাদেশ? ভারতের নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪০
ঘণ্টার ঢাকা সফর ছিল নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এলেন, দেখলেন। কিন্তু
জয় করতে পারলেন কি? খুব ব্যস্ত সময় তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ,
বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করা-সব মিলিয়ে তার এ সফর 'শুভেচ্ছা' সফর
বলা হলেও, এটা ছিল হাইপ্রোফাইল একটি ভিজিট। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও তিনি
সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ সফরের তিনটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এক.
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি স্টাডিজ (বিস)
কর্তৃক আয়োজিত নীতিনির্ধারণী একটি বক্তব্য। এখানে তিনি মোদি সরকারের
দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা তুলে ধরেছেন। দুই. প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয়
বৈঠক। তিন. খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। তার এ সফর বাংলাদেশ অত্যন্ত
গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া
হয়, যা কিনা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে
দেয়া হয়নি। এমনকি কিছুদিন আগে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা
রাব্বানিও এ সংবর্ধনা পাননি। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিজে তাকে গেট পর্যন্ত
এসে গ্রহণ করেছেন এবং বিদায় জানিয়েছেন। খালেদা জিয়া তার সঙ্গে দেখা করতে
সোনারগাঁও হোটেলে পর্যন্ত গেছেন। এটা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ কী পরিমাণ
গুরুত্ব দিয়ে তার এ সফরকে বরণ করেছে। কিন্তু আমাদের প্রাপ্তি কী? আমাদের
প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছে? নিঃসন্দেহে কোনো একটি ক্ষেত্রেও আমাদের প্রত্যাশা
পূরণ হয়নি। তিস্তার পানি চুক্তি কিংবা স্থল সীমানা চুক্তির ব্যাপারে শুধু
আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ আমরা পেয়েছি, তার এ
সফর থেকে। এর একটি হচ্ছে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশ প্রশ্নে
সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনীতিতে যাবে না ভারত'। দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে, তিস্তা
চুক্তির ব্যাপারে ভারতে জাতীয় ঐকমত্যের চেষ্টা করা হবে। অর্থাৎ তিস্তা
চুক্তির ব্যাপারে মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে
দিলি্ল। তৃতীয়ত, বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান
বাংলাদেশের জনগণকেই করতে হবে। ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় কোনো ধরনের
হস্তক্ষেপ করবে না। চতুর্থত, স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে নয়াদিলি্ল
তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। মোটা দাগে এসব ছিল সুষমা স্বরাজের আশাবাদ,
কোনো ধরনের স্পষ্ট 'কমিটমেন্ট' তিনি করেননি। তবে বিদ্যুৎ রফতানি, মৈত্রী
ট্রেনের বগির সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদি দুই-একটি চুক্তি হয়েছে, যা বলাই
বাহুল্য, তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তাই প্রশ্ন থাকবেই এ সফর নিয়ে। এ সফর সফল
কিংবা ব্যর্থ এটা বলার আগে আমাদের কতগুলো বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। এক.
সুষমা স্বরাজের সঙ্গে আমাদের জাতীয় নেতাদের একটি ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার
ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। আমাদের জাতীয় নেতাদের তিনি চেনেন, জানেন এবং তাদের
রাজনীতি সম্পর্কে তিনি ভালো ধারণা রাখেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে,
ব্যক্তিগত সখ্য বা পরিচয় সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে কোনো বড় ভূমিকা পালন করে
না। দুই. জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ভারতীয় নেতাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রশ্নে সাবেক ইউপিএ সরকারের প্রণীত নীতি থেকে মোদি
সরকার একটা 'ইউ টার্ন' নেবে, যারা এ মনোভাব পোষণ করেন, তারা একটা 'বোকার
স্বর্গে' বাস করছেন। তিন. সুষমা স্বরাজের এ সফর ছিল মূলত একটি 'রুটিন
ওয়ার্ক'। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মনোভাব জানার
প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটাও বিবেচনায় নিতে হবে যে, মোদি সরকারের অগ্রাধিকার
তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। যে কারণে আমরা দেখি, মোদির শপথ গ্রহণ
অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার সরকার তথা রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো
হয়েছিল। মোদি নিজে ভুটান প্রথম সফর করে এ মেসেজটাই দিলেন যে, তিনি দক্ষিণ
এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে চান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ
সম্পর্কের ভিত্তি কী? শুধু ভারতের জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করা? নাকি দক্ষিণ
এশিয়ার উন্নয়ন? তাই খুব সঙ্গত কারণেই দক্ষিণ এশিয়ায় আগামী দিনে ভারতের
ভূমিকা কী হবে, সে ব্যাপারে লক্ষ্য থাকবে অনেকের। সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর এ
আলোকেই দেখতে হবে।
তিস্তার পানি চুক্তি ও সীমান্ত চুক্তির
ব্যাপারে বিজেপির অবস্থান আমরা মোটামুটি জানি। চূড়ান্ত বিচারে নরেন্দ্র
মোদিকে যদি মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় প্রশ্নে কোনো
'কমপ্রোমাইজ' করতে হয়, তাহলে মোদি মমতার সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন
না। এতে করে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি চলে যাবে 'ডিপ ফ্রিজে'। আন্তঃনদী
সংযোগের কথাও তিনি বলেছেন। মনে রাখতে হবে, ২০১৬ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধান
সভার নির্বাচন। তিস্তা একটা ইস্যু সেখানে। সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারেও
বিজেপির প্রচন্ড আপত্তি ছিল। বিজেপির বিরোধিতার কারণেই কংগ্রেস সরকারের সময়
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। চুক্তিটি ভারতীয় মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল।
একটি বিল রাজ্যসভায় উপস্থাপিতও হয়েছিল। কিন্তু বিজেপির আপত্তির কারণে এটা
নিয়ে আর তখন আলোচনা হয়নি। এখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার এ বিষয়টিকে
গুরুত্ব দেবে, এটা আমার মনে হয় না। এর বাইরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং
ট্রানজিট প্রশ্নে দুই দেশের মাঝে আস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, সে ব্যাপারে নয়া
সরকার কোনো উদ্যোগ নেবে বলে মনে হয় না। আমাদের পররাষ্ট্র সচিব মার্চ মাসের
শেষের দিকে নয়াদিল্লি গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের
সঙ্গে কথা বলেছেন। নির্বাচনের আগে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব যখন নয়াদিলি্ল
যান, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি যাচাই করছে। স্পষ্টতই তিনি
তখন কোনো সুখবর নিয়ে আসতে পারেননি। এটা মোটামুটিভাবে আমরা সাবাই জানি,
কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। যে
কারণে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ বেশ কিছু
চুক্তি করেছিল। ভারত গেল ৫ বছর বাংলাদেশের কাছ থেকে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা
নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সে অর্থে তেমন সুবিধা পায়নি। তখন নয়াদিলি্লতে সদ্য
গঠিত মোদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে গিয়ে
দাঁড়ায়, সেটা দেখার বিষয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করেই বলা যায়, জাতীয়
স্বার্থের প্রশ্নে ভারতের নীতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয়
না। এরই মধ্যে খবর বের হয়েছে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে
করিডোর পেতে যাচ্ছে ভারত। আরুণাচল থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের ভেতর দিয়ে
বিদ্যুৎ যাবে বিহারে। একইসঙ্গে চলতি বছরই বহুল বিতর্কিত রামপাল বিদ্যুৎ
কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারত। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং
নয়াদিলি্লতে মোদি সরকার এসব প্রকল্প বাতিল করবে, এটা মনে করার কোনো কারণ
নেই। বাংলাদেশ তখন তার স্বার্থ আদায়ে কতটুকু শক্ত অবস্থানে যেতে পারে,
সেটাই হচ্ছে আসল কথা। সে কারণেই সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু অত্যন্ত কৌশলী তিনি। তিনি ঢাকায় এসে এমন কোনো মন্তব্য করেননি যে,
তাতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পিছপা ধারণার জন্ম হয়।
তিনি নিজে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি, যা বলার তা বলেছেন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আকবর উদ্দীন। তিনিও মেপে মেপে কথা বলেছেন।
এমনকি খালেদা জিয়া-সুষমা স্বরাজ সাক্ষাৎকারের সময় 'দেশে কোনো গণতন্ত্র
নেই' বলে খালেদা জিয়া যে মন্তব্য করেছেন, সে ব্যাপারেও কোনো মন্তব্য করেননি
সুষমা। তবে মূল প্রশ্ন আবর্তিত হবে ভারত সরকারের মনোভাবের ওপর। এ মনোভাব
আধিপত্যসুলভ। এ মনোভাবে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল একটা
সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এখানে নরেন্দ্র মোদির ভুটান সফর উল্লেখ করা
প্রয়োজন। চীন ও বাংলাদেশ ওই সফর থেকে একটা মেসেজ পেতে পারে। অতীতে ভারতে
কোনো সরকারপ্রধানই ভুটানকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। ভুটান-ভারত বাণিজ্যিক
সম্পর্কও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। তবে ভুটানের একটা স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে।
আর এটা বিবেচনায় নিয়েই মোদি ভুটানে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ভুটান সফরের
পর যেসব সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে, তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যেমন ভুটানে
মোদির সফরের পরপরই ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোগরে এক বিবৃতিতে বলেছেন,
'ভুটানে দূতাবাস খুলতে চীনকে অনুমতি দেয়া হবে না। উল্লেখ্য, ভুটানের সঙ্গে
কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সম্প্রতি খুব তোড়জোড় শুরু করেছে চীন।
চীনের এ উদ্যোগে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন ভারত। শুধু তাই নয়, সফর শেষে এক
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থে দুই দেশ (ভারত ও ভুটান) একে অপরকে
সাহায্য করবে।' মোদির ভুটান সফর ও যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর এটা
স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ভুটান ও ভারতের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ একই। ভারতের
সীমান্তে চীনের 'আগ্রাসন' আর ভুটানের উত্তরেও চীনের 'আগ্রাসন' একই রকমের
উদ্বেগের কারণ। চীনের সম্ভাব্য 'আগ্রাসন' রোধে ভারত ও ভুটান একে অপরকে
সাহায্য করবে বলেও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতের
জি-নিউজ আমাদের জানাচ্ছে, ভারত চীন সীমান্তে দ্বিগুণ সেনা মোতায়েন করেছে।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর চীন শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং
চীনা হামলা বাড়ছে। বলা ভালো, ভারত-চীন সীমান্তে ইন্দো-তিব্বত বর্ডারে
পুলিশের ঘাঁটি রয়েছে। মোতায়েন রয়েছে ১৫ হাজার সেনা। এখন দ্বিগুণ সেনা
মোতায়েনের বিষয়টি এবং ভুটানে চীনা দূতাবাস না খোলার সিদ্ধান্ত ভারত-চীন
সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ বলা হয়েছিল, মোদির জমানায় চীন-ভারত
সম্পর্কের উন্নতি হবে। এমনকি মোদির শপথ নেয়ার পরপরই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
নয়াদিলি্ল সফর এ আভাসই দিয়েছিল, এ দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে।
এখন মনে হচ্ছে, চীনের ব্যাপারে মোদির মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে। চীনকে ভারত
এখন এ অঞ্চলে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করছে। এ অঞ্চলের
উন্নয়নে চীন নাক গলাক, তা ভারত কোনোভাবেই চাইবে না। আমরা মোদির শাসনামলে
ইন্ডিয়া ডকট্রিনের নতুন এক রূপ দেখতে পাব। মোদির ভুটান সফরের সময় চীন
প্রসঙ্গ প্রকাশ্যে আলোচিত হলেও, বাংলাদেশে সুষমা স্বরাজের সফরের সময় এ
প্রসঙ্গটি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে একটা খবর এসেছে, সোনাদিয়ায় গভীর
সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ভারত নিজেও অংশীদার হতে চায়। এবং বলা হয়েছে, এ
ব্যাপারে বাংলাদেশ-ভারত আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এখানেই রয়েছে মূল প্রশ্নটি।
সোনাদিয়ায় চীনের ভূমিকা কী হবে এবং তা ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে
দেখা দেবে কিনা-এটা নিশ্চিত হতে চায় ভারত। স্পষ্ট করেই বলা যায়, চীনের
সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও দক্ষিণ এশিয়া তথা বঙ্গোপসাগরীয়
এলাকায় চীনের সামরিক উপস্থিতিকে ভারত খুব হালকাভাবে নেবে না। দক্ষিণ এশিয়ায়
ভারত তার অলিখিত কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। নেপালের পর ভুটানে এখন তার কর্তৃত্ব
বাড়ল। একটি নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের আওতায় এ দেশগুলোকে একত্রিত করতে চায়
ভারত। সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের সময় পরোক্ষভাবে এ প্রসঙ্গটি এসেছে। যে
কারণে দেখা যায়, আগামীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রসঙ্গটি নিয়ে ভারতের
সঙ্গে আমাদের আলোচনা হবে। অনেকের মনে থাকার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার চীন সফরের সময় এ চুত্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু
চূড়ান্ত মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। এবং বলা হয়, এ নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনার
প্রয়োজন রয়েছে।
সুষমা স্বরাজ ঢাকা ছেড়েছেন শুক্রবার। কিন্তু রেখে
গেছেন নানা প্রশ্ন। অনেক প্রত্যাশা জাগিয়ে তিনি ঢাকা এসেছিলেন। সাধারণ
মানুষের ধারণা ছিল, তিনি সুস্পষ্ট কোনো কমিটমেন্ট করে যাবেন। কিন্তু তিনি
তা করেননি। সেটা বোধ হয় সম্ভবও নয়। ভারতে নয়া সরকারের বয়স এক মাস পার হয়েছে
মাত্র। এ এক মাসের মধ্যে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে-এটা প্রত্যাশা
করাও ভুল। মোদি সরকারের নিজের প্রচুর সমস্যা রয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে
রাজ্যের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। মমতা
ব্যানার্জি নিঃসন্দেহে মোদির জন্য মাথাব্যথার একটা কারণ। মমতাকে উপেক্ষা
করে মোদি কোনো কিছুই করবেন না। তবে সুষমা স্বরাজ একটা প্রত্যাশা জাগিয়ে
গেলেন। ধারণা করছি, চলতি বছরের কোনো এক সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে
যাবেন। আগামী দুই থেকে তিন মাস মোদি ব্যস্ত সময় পার করবেন। তিনি ব্রিকস
সম্মেলনে যোগ দেবেন। অতঃপর তিনি জি-২০ সম্মেলনে যাবেন। মাঝখানে তার টোকিও
যাওয়ার কথা। সেপ্টেম্বরে যাবেন নিউইয়র্ক। এর আগে শেখ হাসিনার জন্য সময় বের
করা হবে কঠিন একটি কাজ।
সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ খুব
বেশি কিছু পায়নি বটে; কিন্তু তিনি একটা প্রত্যাশা জাগিয়ে গেলেন। এখন
বাংলাদেশের মানুষ তাকিয়ে থাকবে মোদি সরকারের পরবর্তী কর্মকান্ডের ওপর।
বিরাজমান সমস্যাগুলোর ব্যাপারে মোদি সরকার যদি বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ
নেয়, তা মোদির জনপ্রিয়তাকে বাংলাদেশে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এখন দেখার
পালা মোদি সরকার কী পদক্ষেপ নেয়।
Daily ALOKITO BANGLADESH
03.07.14
টিআইবিকে ধন্যবাদ দিতে চাই
18:03
No comments
ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-কে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। ৩০ জুন টিআইবি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক একটি
গবেষণা প্রকাশ করেছে। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতি এবং
ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে
দেশ টিভি ওই রাতেই একটি টকশোর আয়োজন করেছিল, যেখানে মঞ্জুরি কমিশনের
চেয়ারম্যান অধ্যাপক আজাদ চৌধুরীর সঙ্গে আমিও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম।টিআইবির
এই রিপোর্ট নিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী মৃদু আপত্তি জানিয়েছেন। তার অবস্থান
(ইউজিসির চেয়ারম্যান) থেকে এটা করা খুবই স্বাভাবিক। আমি এতে খুব অবাক হইনি।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা দুর্নীতি রোধে তিনি কোনো কার্যকর
ব্যবস্থা নিতে পারেননি, বাস্তবতা এটাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরপর দুই
টার্মের ভিসি হিসেবে তিনি নিজেকে অত্যন্ত যোগ্য একজন উপাচার্য হিসেবে
প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু কেন জানি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি)
তার সেই যোগ্যতা আজ প্রশ্নের মুখে। একটা জিনিস আমরা হয়তো ভুলে যাই- একজন
দক্ষ চেয়ারম্যান যদি মঞ্জুরি কমিশনে না থাকেন, তাহলে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। পদসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে,
জনবলও বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরা
রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে রাজনৈতিক চাপের কাছেই আÍসমর্পণ করেছেন। তারা
তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা,
নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্য ইত্যাদি নানা কারণে মঞ্জুরি কমিশনের
কর্মকাণ্ড আজ অনেকটা স্থবির। ভাবতে খারাপ লাগে, এক সময় মঞ্জুরি কমিশনের
আমিও সদস্য ছিলাম। তখন আমাদের কর্মকাণ্ড মিডিয়ায় প্রশংসিত হয়েছিল। আজ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে ইউজিসির সদস্যদের
ভূমিকাকে খুব আলোচিত হতে দেখি না। এটা এখন অনেকটা কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়েছে।অধ্যাপক আজাদ চৌধুরী আমার প্রিয় মানুষদের একজন। আমি তাকে
শ্রদ্ধা করি। টকশোতে তিনি আইনের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন। মিথ্যা বলেননি
তিনি। ইউজিসি শুধু সুপারিশ করতে পারে। কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার
ক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু ইউজিসি কিছু করতে পারে না, এটা আমি বিশ্বাস করি
না। টিআইবির গবেষণায় আছে সরাসরি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ। টিআইবি যেসব অভিযোগ
উত্থাপন করেছে, তার মাঝে রয়েছে : ১. উচ্চশিক্ষাকে লাভজনক পণ্যে পরিণত করেছে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, ২. স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অ্যাক্রিডিটেশন
কাউন্সিল ৪ বছরেও গঠন না করা, ৩. শিক্ষার নামে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, ৪.
মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক আইন ভঙ্গকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ও সনদ বাতিল না
করা, ৫. নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব, অনুমোদনে
স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেন, ৬. মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগসাজশে
ইউজিসি কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগ অদৃশ্য উপায়ে মীমাংসা হওয়া, ৭. শাস্তি
প্রদান না করে বারবার আলটিমেটাম দিয়ে দায়িত্ব সম্পন্ন করা, ৮. ইউজিসিকে না
জানিয়ে সাধারণ তহবিলের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, ৯. শিক্ষকদের
পারফরম্যান্স মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার, ১০. যোগ্যতা কম এবং বিষয় সম্পর্কে
উচ্চতর কোনো ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো শিক্ষককে বিভাগীয় প্রধান
করা, ১১. ট্রাস্টি বোর্ডের কোনো কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সুবিধা
লাভ, ১২. ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি দেখিয়ে উপাচার্য পদ গ্রহণ এবং অবৈধভাবে
অধ্যাপক পদবি ব্যবহার (দূতাবাসে চাকরি করা লোক এখন উপাচার্য এবং কোনোদিন
যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেননি, তারাও এখন উপাচার্য!), ১৩. ১২
বছরে স্থায়ী সনদ গ্রহণ না করা, ১৪. ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া কোর্স কারিকুলাম
পড়ানো, ১৫. শিক্ষার্থীদের কাছে বাধ্যতামূলক নোট বিক্রি করে অবৈধ অর্থ সম্পদ
অর্জন, ১৬. অযোগ্য ও অদক্ষ লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, ১৭. পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের নাম ব্যবহার করে ছাত্রদের আকর্ষণ করা, ১৮.
ক্লাস না করিয়ে, পরীক্ষা না নিয়ে, ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই টাকার বিনিময়ে
সনদ বিক্রি, ১৯. গবেষণায় কোনো অর্থ ব্যয় করা হয় না, ২০. প্রশ্ন বলে দেয়া,
অতিরিক্ত নম্বর দেয়ার জন্য শিক্ষকদের বাধ্য করা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে
উপঢৌকন নেয়া, যৌন হয়রানি, ২১. ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব,
আর্থিক লেনদেন ইত্যাদি। মোটা দাগে এসবই অভিযোগ। এসব অভিযোগের পেছনে সত্যতা
যে নেই, তা বলা যাবে না।এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে ঝুঁকছে। মানহীন এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার
হাজার শিক্ষার্থী নিত্য জব মার্কেটে প্রবেশ করছে এবং তারা রাজনৈতিক
সংশ্লিষ্টতাকে ব্যবহার করে সরকারি পদগুলো পেয়ে যাচ্ছে। তারা সমাজকে কী
দেবে, সঙ্গত কারণেই সে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা ধীরে ধীরে একটি সার্টিফিকেট
সর্বস্ব জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সনদ বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত করেছি। অথচ দেখার কেউ নেই।টিআইবির
এ রিপোর্ট তাই যুগোপযোগী। মাত্র ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে করা এই গবেষণা
হয়তো পূর্ণাঙ্গ নয়। আমি অনুরোধ করব, টিআইবি বাকি ৫৭ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও
দ্বিতীয় আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করবে। আমি মনে করি, ইউজিসির উচিত হবে এ
রিপোর্টটিকে বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন করা
যায়, সে ব্যাপারে শিগগিরই একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া। ইউজিসি একটি তদন্ত
কমিটি গঠন করেছে তিনজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নিয়ে। এই কমিটি
কী রিপোর্ট দেবে জানি না। কিন্তু তাদের কেউ কেউ নিজেরাও অভিযুক্ত। রাজনৈতিক
বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও আছে। ফলে এই কমিটি লোক
দেখানো কমিটি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ইউজিসি যে কাজগুলো এখন করতে
পারে তা হচ্ছে : ১. বিতর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে একটি শক্ত
অবস্থান নেয়া। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে পরিবর্তনের সুপারিশ ও সরকারের
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা; ২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে
শক্ত অবস্থানে যাওয়া। সমস্যাটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিয়েই। সর্ষের ভূত
সেখানেই। আমার বিশ্বাস, ছাত্রতুল্য শিক্ষা সচিব মঞ্জুরি কমিশনের
চেয়ারম্যানের অবস্থানের বাইরে যেতে পারবেন না। শিক্ষকের দাবি নিয়ে তিনি এ
কাজটি আদায় করে নিতে পারেন; ৩. জনমত সৃষ্টি করাও জরুরি। জাতিকে বারবার
জানানো প্রয়োজন শিক্ষা নিয়ে কারা অনিয়ম করছে। তাদের বয়কট করাও প্রয়োজন।
একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের কাছে এর চেয়ে বড় সমাধান আর কিছু হতে পারে না। তিনি এ বিষয়টি কতটুকু উপলব্ধি করেন, আমার সন্দেহ রয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান পদ কিংবা একজন প্রতিমন্ত্রীর সম্মান কখনও তার মর্যাদাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি তার সীমাবদ্ধতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতা তাকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে মুক্তি দেবে না। শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা কিসিমের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে। যারা কোনোদিন ঢাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগরে অনার্স পর্যায়ে ভর্তি হতে পারেননি যোগ্যতা না থাকার কারণে, তারা তখন টাকার বিনিময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার মান কতটুকু বাড়ল, সে প্রশ্ন করাই যায়। এভাবে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স নয়, বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্বিতীয় শিফট অথবা দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না। মেধাহীনদের ডিগ্রি দিয়ে, ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী জন্ম দিয়ে আমরা আর যাই করি না কেন, আমরা উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে পারব না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যতদিন এ বিষয়গুলো বুঝবেন, ততই আমাদের মঙ্গল।সেদিনের টকশোতে ইউজিসির চেয়ারম্যান আমাকে বলেছিলেন, ঢালাওভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মন্তব্য করা ঠিক নয়, যা টিআইবি করেছে বলে তিনি মনে করেন। এটা ঠিক, দুচারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান ধরে রেখেছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের নামিদামি ব্যক্তিদের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যিনি আজীবন সচিবালয়ে কাটিয়েছেন, কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংক থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তিনি কী করে অধ্যাপক হয়ে যান? একই সঙ্গে আইনজীবী আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এটা কীভাবে সম্ভব! ইউজিসিকে নিয়ে সমস্যাটা এখানেই। একটি অদৃশ্য সম্পর্ক ইউজিসির নেতাদের আদৌ কোনো মনিটরিং ব্যবস্থায় যেতে দিচ্ছে না। টিআইবি বলছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের কথা। এক্ষেত্রে ইউজিসি তার দায়িত্বটি পালন করছে না। কোর্স চালু হলেও সেখানে শিক্ষক আছে কি-না, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি-না, কারা সেখানে পড়াচ্ছে, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী- এসব ইউজিসি মনিটর করছে না। অথচ আইনে কোথাও বাধা নেই। উচ্চ আদালতে মামলা করে কিছু অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। ইউজিসি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করে তাদের দায়িত্বটি পালন করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য যে আলোচনা প্রয়োজন, তা তারা সিরিয়াসলি করেননি। অথবা করলেও তাতে দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানেই ইউজিসির সীমাবদ্ধতা।আসলে মঞ্জুরি কমিশনে যারা আসেন, তারা অনেকটা চাকরি করতে আসেন। তাদের কোনো ভিশন নেই। নেই কোনো কমিটমেন্ট। তারা ভুলে যান জাতি তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। ইউজিসিতে আসা কোনো চাকরি হতে পারে না। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি আছে। তারা যদি কিছু করতে না পারেন, তাহলে দায়িত্বটি না নেয়াই মঙ্গল। এ জাতির বড় দুর্ভাগ্য এখানেই যে, রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদেরই এখানে নিয়োগ দেয়া হয় (সদস্য ও চেয়ারম্যান), তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নের মুখে থাকে। বয়সের ভারে ক্লান্ত কেউ কেউ শেষ সময়টা এখানেই কাটিয়ে যান। ভুলে যান তাদের অনেক কিছুই করার আছে। আমি কাউকে খাটো করছি না। কিন্তু আস্থার জায়গাটা আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের একটা সংস্থা আছে। তাদের একমাত্র কাজ অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য তদবির করা। অন্য কোনো কাজ যেন তাদের নেই। কী করে এখানে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায়, কী করে দুর্নীতি নির্মূল করা যায়, কী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়- এসব দিকে তাদের দৃষ্টি নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক নেতৃত্ব নেই। এগুলো পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, তাদের সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিলেও তা থাকছে উপেক্ষিত। ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন উপাচার্যকে এ জাতি জানে ও চেনে? কজনের সেই যোগ্যতা আছে? তদবির আর অর্থের জোরে উপাচার্য হওয়া ব্যক্তিদের কোনো ভিশন থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।আমরা এভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চলতে দিতে পারি না। অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রয়োজনে দুদক তদন্ত করুক। টিআইবি যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের কথা বলেছে, সে ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুগের চাহিদা মেটাচ্ছে। তাই বলে তারা এ জাতিকে একটি সার্টিফিকেট সর্বস্ব জাতিতে পরিণত করবে- আমরা তা হতে দিতে পারি না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করছে না। সর্ষের মধ্যের ভূত না তাড়ালে আমরা মেধাশূন্য এক জাতিতে পরিণত হব। টিআইবির এই রিপোর্ট আমাদের জন্য একটি ওয়েক-আপ কল। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। Daily JUGANTOR 03.07.14
একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের কাছে এর চেয়ে বড় সমাধান আর কিছু হতে পারে না। তিনি এ বিষয়টি কতটুকু উপলব্ধি করেন, আমার সন্দেহ রয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান পদ কিংবা একজন প্রতিমন্ত্রীর সম্মান কখনও তার মর্যাদাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি তার সীমাবদ্ধতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতা তাকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে মুক্তি দেবে না। শিক্ষা এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা কিসিমের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে। যারা কোনোদিন ঢাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগরে অনার্স পর্যায়ে ভর্তি হতে পারেননি যোগ্যতা না থাকার কারণে, তারা তখন টাকার বিনিময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার মান কতটুকু বাড়ল, সে প্রশ্ন করাই যায়। এভাবে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স নয়, বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্বিতীয় শিফট অথবা দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না। মেধাহীনদের ডিগ্রি দিয়ে, ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী জন্ম দিয়ে আমরা আর যাই করি না কেন, আমরা উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে পারব না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যতদিন এ বিষয়গুলো বুঝবেন, ততই আমাদের মঙ্গল।সেদিনের টকশোতে ইউজিসির চেয়ারম্যান আমাকে বলেছিলেন, ঢালাওভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মন্তব্য করা ঠিক নয়, যা টিআইবি করেছে বলে তিনি মনে করেন। এটা ঠিক, দুচারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান ধরে রেখেছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের নামিদামি ব্যক্তিদের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যিনি আজীবন সচিবালয়ে কাটিয়েছেন, কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংক থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তিনি কী করে অধ্যাপক হয়ে যান? একই সঙ্গে আইনজীবী আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এটা কীভাবে সম্ভব! ইউজিসিকে নিয়ে সমস্যাটা এখানেই। একটি অদৃশ্য সম্পর্ক ইউজিসির নেতাদের আদৌ কোনো মনিটরিং ব্যবস্থায় যেতে দিচ্ছে না। টিআইবি বলছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের কথা। এক্ষেত্রে ইউজিসি তার দায়িত্বটি পালন করছে না। কোর্স চালু হলেও সেখানে শিক্ষক আছে কি-না, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি-না, কারা সেখানে পড়াচ্ছে, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী- এসব ইউজিসি মনিটর করছে না। অথচ আইনে কোথাও বাধা নেই। উচ্চ আদালতে মামলা করে কিছু অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। ইউজিসি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করে তাদের দায়িত্বটি পালন করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য যে আলোচনা প্রয়োজন, তা তারা সিরিয়াসলি করেননি। অথবা করলেও তাতে দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানেই ইউজিসির সীমাবদ্ধতা।আসলে মঞ্জুরি কমিশনে যারা আসেন, তারা অনেকটা চাকরি করতে আসেন। তাদের কোনো ভিশন নেই। নেই কোনো কমিটমেন্ট। তারা ভুলে যান জাতি তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। ইউজিসিতে আসা কোনো চাকরি হতে পারে না। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি আছে। তারা যদি কিছু করতে না পারেন, তাহলে দায়িত্বটি না নেয়াই মঙ্গল। এ জাতির বড় দুর্ভাগ্য এখানেই যে, রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদেরই এখানে নিয়োগ দেয়া হয় (সদস্য ও চেয়ারম্যান), তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নের মুখে থাকে। বয়সের ভারে ক্লান্ত কেউ কেউ শেষ সময়টা এখানেই কাটিয়ে যান। ভুলে যান তাদের অনেক কিছুই করার আছে। আমি কাউকে খাটো করছি না। কিন্তু আস্থার জায়গাটা আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের একটা সংস্থা আছে। তাদের একমাত্র কাজ অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য তদবির করা। অন্য কোনো কাজ যেন তাদের নেই। কী করে এখানে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায়, কী করে দুর্নীতি নির্মূল করা যায়, কী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়- এসব দিকে তাদের দৃষ্টি নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক নেতৃত্ব নেই। এগুলো পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, তাদের সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিলেও তা থাকছে উপেক্ষিত। ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন উপাচার্যকে এ জাতি জানে ও চেনে? কজনের সেই যোগ্যতা আছে? তদবির আর অর্থের জোরে উপাচার্য হওয়া ব্যক্তিদের কোনো ভিশন থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।আমরা এভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চলতে দিতে পারি না। অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রয়োজনে দুদক তদন্ত করুক। টিআইবি যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের কথা বলেছে, সে ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুগের চাহিদা মেটাচ্ছে। তাই বলে তারা এ জাতিকে একটি সার্টিফিকেট সর্বস্ব জাতিতে পরিণত করবে- আমরা তা হতে দিতে পারি না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করছে না। সর্ষের মধ্যের ভূত না তাড়ালে আমরা মেধাশূন্য এক জাতিতে পরিণত হব। টিআইবির এই রিপোর্ট আমাদের জন্য একটি ওয়েক-আপ কল। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। Daily JUGANTOR 03.07.14
Subscribe to:
Posts (Atom)










