রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে রাজনীতির লাভ-ক্ষতি

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে এ ফ্রদ্ধন্টের যাত্রা শুরু হয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এ কারণে যে, বিএনপি ২০ দলের বাইরে কয়েকটি ব্যক্তিনির্ভর দলকে একজোটে নিয়ে এসেছে। এ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ঐক্য হবে কি-না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। এর মধ্যে আবার বিকল্পধারা বেরিয়ে গেছে। যদিও বিকল্পধারার ঐক্যফ্রন্টের বাইরে থাকায় কোনো ক্ষতি হবে না বলেই আমার মনে হয়। কারণ একদিকে তাদের সে অর্থে সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আবার বিএনপির সঙ্গেও যে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ঐক্য হবে- সেটাও বলা যায় না। এমনিতেই জাতীয় ঐক্য গড়ার শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিকল্পধারার মতপার্থক্যের কথা সংবাদমাধ্যমের তরফে আমরা জেনেছি। বিকল্পধারার নানা শর্তও ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগী নেতাদের পক্ষে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে টানাপড়েন। সর্বশেষ শুক্রবার যুক্তফ্রন্টের শরিক জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসভবনের বৈঠকেও বাকবিতণ্ডার খবর আমরা জানি। শেষ পর্যন্ত অন্য শরিকদের ঐকমত্যে বি. চৌধুরীকে বাদ দিতে বাধ্য হন ড. কামাল হোসেন।

বিকল্পধারার দুটি দাবিতে অনড় থাকায় বলা চলে তাদের এ ঐক্যফ্রন্টের বাইরে অবস্থান। প্রথমত, জটিলতা দেখা দেয় স্বাধীনতাবিরোধী শব্দ নিয়ে। দ্বিতীয়ত, বিকল্পধারা জাতীয় সংসদের 'ক্ষমতার ভারসাম্য'র জন্য ঐক্য গড়ে তোলার আগে 'আসন বণ্টনে'র নিশ্চয়তা চেয়েছিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দলটি বিএনপিকে দেড়শ' আসন দিয়ে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে দেড়শ' আসন দেওয়ার দাবি তোলে। এর মাধ্যমে তারা মূলত বিএনপির একক প্রভাব দেখতে চায় না। এটি অবশ্য বিকল্পধারার বি. চৌধুরীর বারিধারার বাসভবনে শনিবারের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যেও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতির শর্ত মেনে নিতে হবে। জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর 'চক্রান্তে'র সঙ্গে বিকল্পধারা নেই। সঙ্গত কারণেই বিকল্পধারার সঙ্গে দূরত্বের কারণ স্পষ্ট।

কথা হলো, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আদৌ রাজনৈতিক কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি-না- সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে এটা ঠিক, বিষয়টি মিডিয়ায় যেভাবে কাভারেজ পাচ্ছে, এ ব্যাপারে মানুষের মধ্য যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাতে নিশ্চিতই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে, বিএনপি এখন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাইরে একটি পথ খুঁজে পেল। ড. কামাল হোসেনকে তারা সামনে পেল। বলা চলে, এর মাধ্যমে বিএনপি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান-সংকট কাটাতে পারছে। যদিও এখানে এ দু'জন মাইনাস হয়ে গেলেন।

বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সম্মিলিত এ যাত্রা প্রকারান্তরে এটা বোঝাচ্ছে যে, তারা জামায়াতে ইসলামীকেও মেনে নিল। যেহেতু জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে, তারা নিজেদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না। তবে জামায়াত স্বতন্ত্রভাবে কিংবা অন্য দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে। স্থানীয় নানা নির্বাচনে তাদের সেভাবে নির্বাচন করতে আমরা দেখেছিও। এখন জাতীয় নির্বাচনেও হয়তো তারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলেও তারা যে বিএনপি জোটকেই সমর্থন দেবে, তা বলা বাহুল্য। তাহলে বিকল্পধারার বিকল্প কী? ১৪ দল ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। আমার মনে হয়, তারা ১৪ দলের সঙ্গেই এখন জোট বাঁধবে। এর বাস্তব কারণ রয়েছে। কারণ মাহী বি চৌধুরী ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে ব্যবসা করেন; আবার মেজর (অব.) মান্নান ১৪ দলের সঙ্গেই জোট করতে চাইবেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি নির্বাচনী জোট হয়; গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার অবস্থান শক্তিশালী হবে বলেই মনে করি। বিশেষ করে ভোটের রাজনীতিতে তারা ব্যাপক লাভবান হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হবে।

নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তিসহ সাত দফা দাবি এবং সংসদ ও সরকারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ ১১ দফা লক্ষ্যের কথাও ঘোষণা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ৭ দফার প্রথম দফায় যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে; সংবিধানের নিরিখে তা দেখতে হবে। দ্বিতীয় দফায় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। এসব ব্যাপারে সরকার কতটা আন্তরিক হবে, সেটি দেখার বিষয়। তবে সরকার নিশ্চয় কিছু দাবি মেনে নিতে পারে। যেমন বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের দাবি মেনে নেওয়াও কঠিন নয়।

আমি তো মনে করি, বরং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে সরকারেরই লাভ হলো। এর মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনে আসার পথ উন্মুক্ত হলো। যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা সবাই বলে আসছে, এর মাধ্যমে আমরা তার আশা দেখতে পাচ্ছি। এ জন্য সরকারকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসা দরকার। এ ফ্রন্টকে সাধুবাদ জানিয়ে তাদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্ত আস্থার সংকট চলছে। বড় দুই দলের মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে রাজনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই আস্থাহীনতা দূর না হলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। আস্থাহীনতা দূর করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক জোটের মধ্যে আলোচনার বিকল্প নেই। ফলে আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। ১৪ দলীয় জোট ও এই ফ্রন্টের মধ্যে সমঝোতা অসম্ভব নয়। এখানে সরকারের দায়িত্বই বেশি। সরকারকে বেশি বেশি সমালোচনা না করে বরং কীভাবে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, সে জন্য সচেষ্ট হতে হবে। নির্বাচন কাছে চলে আসছে। মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। সে সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সে বিষয় মাথায় রেখেই সরকারের উচিত হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সাধুবাদ জানানো
Daily Samakal
15.10.2018

ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ ও বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব




ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাব বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে গেল সপ্তাহে। এর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। শেষ অবধি ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ ভারতের দক্ষিণ উড়িষ্যা ও উত্তর অন্ধ্র প্রদেশে আঘাত করেছিল। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে প্রায়ই আমরা এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় প্রত্যক্ষ করছি। আর এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমুদ্র ও মহাসাগরঘেঁষা দেশগুলো। ‘তিতলি’ যখন বাংলাদেশ ও ভারত অতিক্রম করল তার মাত্র কয়েক দিন আগে ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত করেছিল। এসবই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে। বাড়ছে ‘তিতলি’র মতো ঘূর্ণিঝড়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি হ্রাস করার ব্যাপারে বিশ্ব সম্প্রদায় প্যারিসে কপ-২১ চুক্তি স্বাক্ষর করলেও (২০১৫) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্বীকৃতির ফলে এ চুক্তিটি কার্যত এখন অকার্যকর হয়ে গেছে! ওই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী, তা-ও একটা বড় প্রশ্ন এখন। তবে এটা একটা প্লাসপয়েন্ট যে, বিশ্ব নেতাদের মাঝে একটা উপলব্ধিবোধ এসেছে, কার্বন নিঃসরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে। কাজটি নিঃসন্দেহে সহজ নয়। এর সঙ্গে বেশকিছু প্রশ্ন জড়িতÑ উন্নত বিশ্ব কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সাহায্য, জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’, উন্নত বিশ্বের নিজের কার্বন নিঃসরণ হার কমানোÑ ইত্যাদি বিষয় জড়িত! এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে লিমা কপ-২০ সম্মেলনে প্রতিটি দেশকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে নিজস্ব কর্মপদ্ধতি ও কাঠামো উপস্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ এটা করেছে। কিন্তু সব দেশ এটা করতে পেরেছে কিনা, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। চীন ও ভারতের মতো দেশের কার্বন নিঃসরণ নিয়েও কথা আছে। কেননা, দেশ দুটি সাম্প্রতিককালে বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনে যে কয়টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মাঝে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গেল ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আগামীতে। আইপিসিসির রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের কথা। অনেকের মনে থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর পরিবেশের ব্যাপারে বিশ্বজনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ২০১২ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকায় গিয়েছিলেন। আমাদের তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রীকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেখানে। সেটা ঠিক আছে। কেননা, বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে গেলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পরপর দুইবার বন্যা ও পরবর্তী সময়ে ‘সিডর’-এর আঘাতের সম্মুখীন হয়। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে আঘাত করে ‘আইলা’। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ব্যাপক খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয়। ওই সময় দেশে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ‘সিডর’-এর পর বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি বারবার বিশ্ব সভায় আলোচিত হচ্ছে! সিডরের ক্ষতি ছিল গোর্কির চেয়েও বেশি। মানুষ কম মারা গেলেও সিডরের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সিডরে ৩০ জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল ৯টি জেলা। ২০০ উপজেলার ১ হাজার ৮৭১ ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোট ১৯ লাখ ২৮ হাজার ২৬৫ পরিবারের ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫৬ জন সিডরের আঘাতপ্রাপ্ত ছিল। মারা গিয়েছিলেন ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। সিডর ও আইলার পর ২০১৩ সালে ‘মহাসেন’ বাংলাদেশে আঘাত করেছিল। যদিও এতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব আমরা পাইনি। সিডর ও আইলার আঘাত আমরা এখনও পরিপূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আইলার আঘাতের পর খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছায় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতা কোথাও কোথাও ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত। আইলায় ৮০ শতাংশ ফলদ ও বনজ গাছ মরে গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে আজ নোনা পানির আগ্রাসন। সুপেয় পানির বড় অভাব ওইসব অঞ্চলে। এরপর ‘মহাসেন’ আমাদের আবারও ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়ে গিয়েছিল। এখন আঘাত করল ‘তিতলি’। আমাদের মন্ত্রী-সচিব কিংবা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা বিদেশ সফর ও সম্মেলনে অংশ নিতে ভালোবাসেন। কানকুন, ডারবান, কাতার কিংবা তারও আগে কোপেনহেগেনে (কপ সম্মেলন) আমাদের পরিবেশমন্ত্রী গেছেন। আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য কোপেনহেগেনে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিশ্বজনমত আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। আমরা পরিবেশ রক্ষায় তাতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পাইনি।
বলা ভালো, বাংলাদেশ এককভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনরোধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে না। বাংলাদেশ এককভাবে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ও তা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের উষ্ণতারোধ করতে খুব একটা প্রভাব রাখবে না। এজন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক আসরে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিদেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এ সাহায্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। গেলবার যে বন্যা হলো, আবার আমাদের সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিল। বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় এখন এ দেশে স্বাভাবিক ব্যাপার; কিন্তু সিডর ও আইলার আঘাতে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছিল, সে ক্ষতি সারাতে সরকারের বড়োসড়ো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হলেও সেখানে ‘রাজনীতি’ ঢুকে গিয়েছিল। দলীয় বিবেচনায় টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভাবতে অবাক লাগে, যেসব এনজিও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেনি, যাদের কোনো অভিজ্ঞতাও নেইÑ শুধু দলীয় বিবেচনায় তাদের নামে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। জলবায়ু তহবিলের অর্থ যাওয়া উচিত ওইসব অঞ্চলে, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের  আঘাত বেশি, আর মানুষ ‘যুদ্ধ’ করে সেখানে বেঁচে থাকে। অথচ দেখা গেছে, জলবায়ুর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা দেওয়া হয়েছিল ময়মনসিংহ পৌরসভাকে, মানিকগঞ্জের একটি প্রকল্পে কিংবা নীলফামারী তিস্তা বহুমুখী সমাজকল্যাণ সংস্থাকে। সিরাজগঞ্জের প্রগতি সংস্থাও পেয়েছিল থোক বরাদ্দ। অথচ এমন প্রতিষ্ঠানের একটিরও জলবায়ু সংক্রান্ত কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
আমাদের জন্য তাই প্যারিস চুক্তির (২০১৫) গুরুত্ব ছিল অনেক। বাংলাদেশ পরিবেশগত নানা সমস্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশের একার পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই বাংলাদেশ আজ আক্রান্ত। সুতরাং বৈশ্বিকভাবে যদি বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি কমানো না যায়, তাহলে বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করাও সম্ভব হবে না। তাই একটি চুক্তি অত্যন্ত জরুরি ছিল। সেসঙ্গে আরও প্রয়োজন জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় বৈদেশিক সাহায্যের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং সেসঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের একটা ‘কমিটমেন্ট’। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমাদের যেতে হবে। সোলার বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, স্থানীয়ভাবে তাদের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। সুতরাং আর্থিক সাহায্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ব নেতারা বারবার সাহায্যের কথা বললেও সে সাহায্য কখনোই পাওয়া যায়নি। প্যারিস সম্মেলন (২০১৫) চলাকালীন বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ করেছিল জার্মান ওয়াচ নামে একটি সংস্থা। প্রতি বছর বৈশ্বিক জলবায়ু সূচক তারা প্রকাশ করে থাকে। শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীনই তারা প্রকাশ করেছিল বৈশ্বিক জলবায়ু সূচক-২০১৬। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝড়, বন্যা, ভূমিধস ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা এরা প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছে ৬ নম্বরে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে হন্ডুরাস। তারপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে মিয়ানমার, হাইতি, ফিলিপাইন ও নিকারাগুয়া। তাই প্যারিস চুক্তিটি ছিল আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সম্মেলন নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি হলেও তাতে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় ওই চুক্তি মূল্যহীন হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব নেতাদের সবাই, যারা প্যারিস কপ-২১ এ যোগ দিয়েছিলেন, তারা সবাই এখন প্যারিস চুক্তির ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করছেন। আমাদের বনমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছেন। নিউইয়র্কে (২০১৬) তিনি বলেছিলেন, এ ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ধরিত্রী বাঁচবে, সূচনা হবে নতুন যুগের। মন্ত্রী আরও জানিয়েছিলেন, চুক্তিটি বাস্তবায়নে আরও পাঁচ বছর সময় রয়েছে। এ সময়ে চুক্তির অস্পষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার সুযোগ রয়েছে। নিউইয়র্কে অনেক বিশ্বনেতাও বলেছেন, এ চুক্তি বিশ্বের দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। খাদ্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতেও চুক্তিটি অনন্য ভূমিকা রাখবে বলেও তারা অভিমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শুধু চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই বিশ্বের উষ্ণতা কমানো যাবে না। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশল নিজেদের মতো করে ঠিক করবে। এটাই হচ্ছে আসল কথা। নিজেদেরই কৌশল ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ কি তা পারবে? আমাদের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফর পছন্দ করেন। কিন্তু দূষণ কমানোর ব্যাপারে অত উৎসাহী নন। আমাদের পরিবেশমন্ত্রীও এ ব্যাপারে তেমন সক্রিয়, এটা আমার মনে হয়নি কখনও। দেশের ভেতরে প্রায়ই পরিবেশ দূষণের ঘটনা হরহামেশা পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। কিন্তু দূষণরোধ করার ব্যাপারে খুন কম উদ্যোগই লক্ষ করা গেছে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আমরা যতই সোচ্চার হই না কেন, আমাদের নিজেদের পরিবেশ রক্ষায় আমরা কতটুকু সচেতনÑ এ প্রশ্ন উঠবেই। কেননা প্যারিস চুক্তিতে নিজেদের কর্মপদ্ধতির উদ্ভাবনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আমরা কি ওই কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পেরেছি?
ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র মতো অতীতেও এ অঞ্চলে অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে জন্ম হয়েছে অনেক ঘূর্ণিঝড় এবং বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় তা আঘাত হেনেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭), নারগিস (২০০৮), আইলা (২০০৯), বিজলি (২০০৯), পাইলিন (২০১৩), নিলোফার (২০১৪) এ ধরনের অনেক ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি আমাদের মনে আছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণেই এমন হচ্ছে। এর জন্য বাংলাদেশ কোনোভাবেই দায়ী নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে এর ‘দায়’ বহন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাই দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে না এলে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
Daily Alokito Bangladesh
14.10.2018

রাজনীতিতে আস্থার সংকট


ইতোমধ্যে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের সাথে বিএনপি জাতীয় ঐক্য করেছে। এই ঐক্য অনেকটাই এখন ‘কাগুজে ঐক্য’ হয়ে গেছে। কেননা বরাবরের মতো জাতীয় ঐক্য করেই ড. কামাল হোসেন বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি কবে দেশে ফিরবেন কেউ বলতে পারে না। উপরন্তু বিএনপির সাথে বিকল্প ধারার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীর বক্তব্য পরিত্যাগ করেছে বিএনপি। বিএনপি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা জামায়াতকে ছাড়বে না। মাহী বি. চৌধুরী জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির অংশগ্রহণের প্রশ্নে কিছু শর্ত দিয়েছিলেন। তার একটি হচ্ছে বিএনপিকে জামায়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বিএনপি এটি করবে না। ফলে যে প্রত্যাশা নিয়ে ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য করেছিলেন, তা এখন শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল!
বিএনপি গত ৩০ সেপ্টেম্বরের জনসভায় একটি ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এই ৭ দফার মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে সকল দলের সাথে পরামর্শ করে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হয়। কেননা প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সুযোগ নেই। তার এই বক্তব্যকে ধারণ করেও বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছে করলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে এই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সংবিধানের ৫৫(১) ধারায় মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে। আর ৫৬(২) ধারায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংসদ সদস্যের বাইরে থেকে ‘টেকনোক্রেট কোটায়’ মন্ত্রী নিয়োগ করতে। সুতরাং নির্বাচনকালীন সময়ে মন্ত্রী পরিষদ গঠনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্য নন এবং বিএনপি সমর্থিত সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাটাই হলো আসল। বিএনপি যে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তাতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। যতদূর মনে আছে প্রধানমন্ত্রী নিজেও একবার ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার কথা বলেছিলেন। যেখানে এখনো ইভিএম মেশিন শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয়, সেক্ষেত্রে ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে অতি উৎসাহী সিইসির ইভিএম মেশিন নিয়ে বক্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। ইতোমধ্যে ইসিতে নতুন করে দ্বন্দ্বের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। একটি বড় অভিযোগ করেছেন চার জন কমিশনার। তাদের অভিযোগ কমিশনারদের না জানিয়ে সিইসি একাই অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটা একটা গুরুতর অভিযোগ। কিছুদিন আগে নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হবে এমন বক্তব্য দিয়ে তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য তার দেওয়া উচিত হয়নি। একটি বা দুটি সিটে ধানের শীষের প্রতীকী প্রার্থী দিয়ে বিএনপি ইচ্ছে করলে তার নিবন্ধন ধরে রাখতে পারে এটা একটা সাধারণ মানুষও বোঝে। অথচ সিইসি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তার নিজের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করলেন!
নির্বাচনের খুব বেশিদিন বাকি নেই। সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবি এখন শুধু দেশের ভেতর থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে না, বাইরে থেকেও উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার সংবিধানের কথা বারবার বলছে। অথচ সংবিধানের ভেতরেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রধানের আন্তরিকতাই হলো আসল। ২০১৪ এর পরিস্থিতির সাথে ২০১৮ এর পরিস্থিতি মেলানো যাবে না। ঐক্য প্রক্রিয়া শেষ অব্দি নির্বাচনি জোটে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে খোদ বিএনপিতেই নানা প্রশ্ন আছে। তবে সরকারকে ‘খালি মাঠে গোল না দেয়ার’ স্ট্র্যাটেজি বিএনপিকে নিতে হবে। বিএনপি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করে যে সরকার এককভাবে নির্বাচন করতে পারে এবং সংসদে একটি বিরোধী দলও ‘সৃষ্টি’ করা সম্ভব। সুতরাং একদিকে আন্দোলন, অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কৌশল নিয়েই বিএনপির এগিয়ে যাওয়া উচিত।
মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত বিএনপির নেতৃবৃন্দ। ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপির সমাবেশের পরও বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপিকে এটা ‘মোকাবিলা’ করেই নির্বাচনি প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের ধারা অব্যাহত রেখে নির্বাচনের পথে যেতে হবে । এজন্য জনগণের সামনে একটি বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সেটা এখনো করেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রত্যাশাই-বা কি তাও প্রকাশিত নয়।
বিএনপির উচিত জাতির সামনে একটি বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা, যা ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ উপস্থাপন করেছে। তার আগে যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, এমনকি বাম জোটের নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও তাদের প্রস্তাব নিয়ে মত-বিনিময় করা উচিত। তাদের প্রস্তাবে সব দল যে ঐকমত্য পোষণ করবে, তেমনটি না-ও হতে পারে। তবে সবার সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো একটি সমাধান হয়তো পাওয়া যাবে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে একটি যৌথ প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকার সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সংবিধান সংশোধন করার কারণে সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। বাধ্য করা না গেলে সরকার সংবিধান সংশোধন করবে না। এক্ষেত্রে বিএনপির দাবি সরকার মানবে বলে মনে হয় না।
ইতোমধ্যে সরকার ১৪ দলীয় জোটকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বাম দলীয় জোটের সাথে একধরনের ঐক্য করার কথা ভাবছে সরকার! এক্ষেত্রে যদি ন্যূনতম ঐক্যও হয়, এটাও ড. কামাল হোসেন তথা বিএনপির জন্য আরও একটি ‘মাইনাস পয়েন্ট’। তবে বাম ধারা আওয়ামী লীগের সাথে কোনো ঐক্যে যাচ্ছে না। তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘তৃতীয় ধারা’ সূচনা করতে চায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত ৪৭ বছরে ‘তৃতীয় ধারার’ কথা আমরা বারবার শুনেছি। কিন্তু মানুষ এই ধারাকে গ্রহণ করেনি। তবে এটা সত্য, এই তৃতীয় ধারার সাথে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতা রয়েছেন। কিন্তু মানুষ তাদের ‘ভোট’ দেয় না। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোরও যে ‘সমর্থন’ রয়েছে, বাম দলগুলোর তা নেই। কেন নেই? কেন বাম দলগুলো ভালো ভালো এবং ‘সত্য’ কথা বলেও মানুষের কাছে যেতে পারছে না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। ঘুরেফিরে সাধারণ মানুষের আস্থা ওই ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষ’-এ। তৃতীয় শক্তি হিসেবে ‘লাঙ্গলকেই’ মানুষ বেছে নিয়েছে শুধু এরশাদের ‘আঞ্চলিকতা প্রীতি’র কারণে।
রাজনীতি নয় বরং আঞ্চলিকতাই জাতীয় পার্টির মূল শক্তি। তবে লাঙ্গল কোনোদিনই ‘নৌকার’ বিকল্প হবে না, কিংবা ‘ধানের শীষ’-এর স্থান দখল করে নিতে পারবে না। বাস্তবতা যেহেতু ভোটের রাজনীতিতে ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষ’ অন্যতম ফ্যাক্টর, সেক্ষেত্রে এই দুটি বড় দলের মাঝে ‘আস্থার সম্পর্ক’ থাকা দরকার। এই আস্থার সম্পর্কই এ দেশের রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে। এখন এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় তা নির্ভর করে এই দুই দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের ওপর। একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ খুবই জরুরি।
Daily AmaderSomoy.com
06.10.2018

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা

এটা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত যে ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের যেকোনো এক দিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতাও লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করলেই সিনিয়র সাংবাদিকরা নির্বাচন নিয়ে তাঁর মনোভাব জানতে চান। জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে বরাবরের মতো গত ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী যখন একটি সংবাদ সম্মেলন করলেন তখনো নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল। এবং প্রধানমন্ত্রী এর জবাবও দিয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছেন। এক. তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন চায়। কোন দল নির্বাচনে আসবে, কে আসবে না—এটা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। এতে আমাদের কিছু করার নেই। দুই. নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ২০১৪ সালে চেষ্টা করেছিলাম সব দলকে নিয়ে একটা সরকার গঠন করব। আমরা ক্যাবিনেটে আলোচনা করব। দু-একটি দলের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বাকিদের সঙ্গে আলোচনা করব, এরপর সিদ্ধান্ত নেব। (কালের কণ্ঠ, ৪ অক্টোবর)। বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনকালীন সরকার—এই দুটি বিষয়ই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়। বিএনপি নির্বাচনে যাবে বলেই দলটির নেতারা বারবার বলে আসছেন। তবে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা মাঝেমধ্যে শর্ত জুড়ে দেন। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যখন দলীয় সিদ্ধান্তের কথা বলেন তখন বোধ করি তিনি এটাই বোঝাতে চাচ্ছেন যে বিএনপি যদি নির্বাচনে না-ও আসে, এ ব্যাপারে তাঁর করণীয় কিছু নেই। মিথ্যা বলেননি প্রধানমন্ত্রী। এটা তো ঠিক, কোনো দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি বাধ্য করতে পারেন না। এটা ওই দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট, তিনি নিউ ইয়র্কে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে এমন দলগুলোকে নিয়েই তিনি নির্বাচনকালীন একটি সরকার গঠন করবেন; যদিও সংবিধানে ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপিকে এ ধরনের একটি সরকারে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি ওই সরকারে যোগ দেয়নি। এখন সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়ে তিনি যদি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেন, সে ক্ষেত্রে ওই সরকারে বিএনপির থাকার কোনো সুযোগ নেই। কেননা দশম সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি বড় দল। তাদের একটা জনসমর্থন আছে। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকারে দলটির প্রতিনিধিত্বের সুযোগ কম। তবে সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, তাতে তিনি বিএনপিকে এই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সংবিধানের ৫৫(১) ধারায় মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে। আর ৫৬(২) ধারায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংসদ সদস্যের বাইরে থেকে ‘টেকনোক্র্যাট কোটায়’ মন্ত্রী নিয়োগ করতে। সুতরাং নির্বাচনকালীন মন্ত্রিপরিষদ গঠনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য নন এবং বিএনপি সমর্থিত সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাটাই হলো আসল। বিএনপি যে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যক্তিগতভাবে ইভিএম ব্যবহার করার পক্ষে কথা বলেছেন। তবে যেখানে এখনো ইভিএম ১০০ শতাংশ নির্ভরযোগ্য নয়, সে ক্ষেত্রে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এর আগে অতি উৎসাহী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ইভিএম নিয়ে বক্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। এরই মধ্যে ইসিতে নতুন করে দ্বন্দ্বের যে খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল, তার সমাধান হয়েছে। একটি বড় অভিযোগ করেছিলেন চারজন কমিশনার। তাঁদের অভিযোগ সিইসি কমিশনারদের না জানিয়ে একাই অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটা একটা গুরুতর অভিযোগ। কিছুদিন আগে নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হবে—এমন বক্তব্য দিয়ে সিইসি বিতর্কিত হয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য তাঁর দেওয়া উচিত হয়নি। একটি বা দুটি ‘সিটে’ ধানের শীষের প্রতীকী প্রার্থী দিয়ে বিএনপি ইচ্ছা করলে তার নিবন্ধন ধরে রাখতে পারে—এটা একটা সাধারণ মানুষও বোঝে। অথচ সিইসি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তাঁর নিজের নিরপেক্ষতা তিনি ক্ষুণ্ন করেছেন।
নির্বাচনের খুব বেশিদিন বাকি নেই। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবি আজ শুধু দেশের ভেতর থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে না, বরং বাইরে থেকেও উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার সংবিধানের কথা বারবার বলছে। অথচ সংবিধানের ভেতরেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের আন্তরিকতাই হলো আসল। ২০১৪ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৮ সালের পরিস্থিতিকে মেলানো যাবে না। ঐক্যপ্রক্রিয়া আলোচিত হলেও শেষ পর্যন্ত তা নির্বাচনী জোটে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে খোদ বিএনপিতেই নানা প্রশ্ন আছে। তবে সরকারকে খালি মাঠে গোল না দেওয়ার স্ট্র্যাটেজি বিএনপিকে নিতে হবে। বিএনপি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করে যে সরকার এককভাবে নির্বাচন করতে পারে এবং সংসদে একটি বিরোধী দলও গঠিত হতে পারে। সুতরাং একদিকে আন্দোলন, অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া—বিএনপির এই স্ট্র্যাটেজি নিয়েই এগিয়ে যাওয়া উচিত। মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত বিএনপির নেতারা। ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপির সমাবেশের পরও বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপিকে এটা মোকাবেলা করেই নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের ধারা অব্যাহত রেখে নির্বাচনের পথে যেতে হবে বিএনপিকে। এ জন্য জনগণের সম্মুখে একটি বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সেটা বিএনপি এখনো করেনি। বিএনপির একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশা কী, এটা বিএনপি নিশ্চিত করেনি। জাতির সম্মুখে একটি বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এই প্রস্তাব এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ উপস্থাপন করেছে। বিএনপির প্রস্তাবে নির্বাচকালীন সরকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। এর আগে যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, এমনকি বাম জোটের নেতাদের সঙ্গে তাদের প্রস্তাব নিয়ে মতবিনিময় করা উচিত। তাদের প্রস্তাবে সব দল যে ঐকমত্য পোষণ করবে, তেমনটি নয়। সুতরাং সবার সঙ্গে আলোচনা করলে একটি সমাধান হয়তো পাওয়া যাবে এবং সে ক্ষেত্রে সবাই মিলে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে একটি যৌথ প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সংবিধান সংশোধন করার কারণে সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। সরকার সংবিধান কেন সংশোধন করবে? যদি সরকারকে বাধ্য করা না যায়, তাহলে সরকার সংবিধান সংশোধন করবে না। এ ক্ষেত্রে বিএনপির দাবি সরকার মানবে—এটা আমার মনে হয় না। সরকার ১৪ দলীয় জোটকে আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেবে না, প্রধানমন্ত্রী এমনটাই বলেছেন। বামদলীয় জোটের সঙ্গে এক ধরনের ঐক্য করার কথা ভাবছিল সরকার। এ ক্ষেত্রে যদি ন্যূনতম ‘ঐক্যও’ হয়, এটাও ড. কামাল হোসেন তথা বিএনপির জন্য আরো একটি ‘মাইনাস পয়েন্ট’। তবে বাম ধারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ঐক্যে যাচ্ছে না। তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘তৃতীয় ধারা’ সূচনা করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ৪৭ বছরে এই ‘তৃতীয় ধারার’ কথা আমরা বারবার শুনেছি। কিন্তু মানুষ এটা গ্রহণ করে নেয়নি। এটা সত্য, এই তৃতীয় ধারার সঙ্গে অনেক ত্যাগী, ও যোগ্য নেতা রয়েছেন। কিন্তু মানুষ তাদের ভোট দেয় না। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোর যে ‘সমর্থন’ রয়েছে, বাম দলগুলোরও তা নেই। কেন নেই? কেন বাম দলগুলো ভালো ভালো এবং ‘সত্য’ কথা বলেও মানুষের কাছে যেতে পারছে না, এটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। ঘুরেফিরে সাধারণ মানুষের আস্থা ওই ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষে’। তৃতীয় শক্তি হিসেবে ‘লাঙলকেই’ মানুষ বেছে নিয়েছে শুধু এরশাদের ‘আঞ্চলিকতা প্রীতি’র কারণে। রাজনীতি নয়, বরং আঞ্চলিকতাই জাতীয় পার্টির মূল শক্তি। তবে লাঙল কোনো দিনই ‘নৌকার’ বিকল্প হবে না কিংবা ‘ধানের শীষে’র স্থান দখল করে নিতে পারবে না। বাস্তবতা যেহেতু ভোটের রাজনীতিতে ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষ’ অন্যতম ফ্যাক্টর, সে ক্ষেত্রে এই দুটি বড় দলের মধ্যে ‘আস্থার সম্পর্ক’ থাকা দরকার। এই ‘আস্থার সম্পর্কই’ এ দেশের রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে। এখন এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নির্ভর করে দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর। একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এই আস্থার সম্পর্কটা খুবই জরুরি। এই আস্থার সম্পর্কটা গড়ে উঠছে না। দোষারোপের রাজনীতির বৃত্ত থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারছি না। এই দুটি বড় দল, এক দল অন্য দলকে দোষী সাব্যস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে রাজনীতিতে। গায়েবি মামলার সংখ্যা বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের কড়া বার্তার পরও ‘গায়েবি’ মামলা করা থেমে নেই। মামলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আসামি করার ক্ষেত্রে ভালোভাবে যাচাই করার নির্দেশনা থাকলেও তা প্রতিপালন করা হচ্ছে না বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, জনৈক বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা দেশেই ছিলেন না; কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ‘উসকানি দেওয়ার’ অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা পুলিশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করে।
রাজনৈতিক এই ডামাডোলের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক সম্ভাবনাময়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকিং করপোরেশন এইচএসবিসি সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বিশ্বে ২০১০ সাল নাগাদ যেসব দেশের অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে সবার ওপরে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে ‘বিগেস্ট রাইজার্স’ বা সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চ। এইচএসবিসি বলছে, বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি সবচেয়ে বেশি হারে বাড়বে। জিডিপির আকার বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪২তম। ২০৩০ সালে ১৬ ধারা এগিয়ে বাংলাদেশ উঠে আসবে ২৬তম অবস্থানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৩ শতাংশ হারে। অর্থনীতির এই চিত্র আশার কথা বলে। কিন্তু অর্থনীতির এই চিত্র মুখ থুবড়ে পড়বে যদি দেশে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। এ ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনীতিতে আস্থার সম্পর্ক বজায় থাকা। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনে প্রতিটি দলই তাদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাবে। কিন্তু যদি আস্থার সম্পর্ক না থাকে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয় কিংবা সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তাহলে আমাদের জন্য তা কোনো শুভ সংবাদ বয়ে আনবে না। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আর সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে, আমাদের প্রত্যাশা এটাই।
Daily Kalerkontho
11.10.2018

রাজনীতিতে সুবাতাস কি বইবে?


আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যখন পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান নিয়েছে, ঠিক তখনই একটি ভালো খবর আমরা পেলাম গত ৬ অক্টোবর। চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করানো হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর হাইকোর্টের এক নির্দেশে বেগম জিয়াকে এই হাসপাতালে ভর্তি ও তার পছন্দমতো চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসা করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এর আগে অবশ্য তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করে আসছিলেন। তার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, বিএসএমএমইউ নিয়ন্ত্রণ করে সরকারপন্থি চিকিৎসক দল। এখানে তিনি ভালো চিকিৎসা পাবেন না। বেগম জিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার। আদালত শেষ অব্দি বিএসএমএমইউকে চিকিৎসার নির্দেশ দিলেন বটে, তবে বেগম জিয়ার পছন্দের চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসার অনুমতিও দিলেন। সরকার পক্ষও এ ব্যাপারে আপত্তি করল না। এর মধ্যে দিয়ে কি রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করল? বিএনপির পক্ষ থেকে যে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল তাতে এক নম্বর ছিল বেগম জিয়ার মুক্তি। বেগম জিয়ার এখন ‘মুক্তি’ হলো না বটে, কিন্তু তিনি এখন ভালো চিকিৎসা পাবেন। এর প্রয়োজন ছিল। তিন তিনবারের একজন প্রধানমন্ত্রী। তিনি যদি ‘চিকিৎসা’ না পান, তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বেগম জিয়ার চিকিৎসা আর রাজনীতি দুটো ভিন্ন বিষয়। সামনে নির্বাচন। বিএনপি ইতোমধ্যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘যোগ’ দিয়েছে। যদিও ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম শরিক বিকল্পধারার সঙ্গে বিএনপির একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ঐক্য প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে একটি লিয়াজোঁ কমিটিও গঠন করেছে। এই লিয়াজোঁ কমিটি ঐক্য প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে ‘কো-অর্ডিনেশন’ করবে। বিকল্পধারার পক্ষ থেকে যেসব দাবিদাওয়া উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেসব বিএনপি যে মানবে না, তা ইতোমধ্যে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। এতে করে একটা সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে যে, বিকল্পধারাকে বাদ দিয়েই ঐক্য প্রক্রিয়া একটি নির্বাচনী জোট গঠন করতে পারে বিএনপির সঙ্গে। অথবা বিএনপি ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে আন্দোলন করলেও, ২০-দলীয় জোটের ব্যানারেই নির্বাচন করবে; ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে নয়।
স্পিরিটটি হচ্ছে সরকারবিরোধী সব শক্তিকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনা। এ ক্ষেত্রে বিএনপি বড় দল হলেও, ড. কামালের নেতৃত্ব তারা মেনে নিয়েছে। যদিও ২০-দলীয় জোটে এই ঐক্য নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। এলডিপি, কল্যাণ পার্টি কিংবা ন্যাপের মতো সংগঠন জাতীয় ঐক্যজোটের ব্যাপারে খুব যে উৎসাহী, তা বলা যাবে না। এই দলগুলো দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আছে। এখন বিএনপি যদি ‘নতুন মিত্র’ পেয়ে এদের ‘পরিত্যাগ’ করে, তাহলে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে থাকবে। বিএনপির উচিত হবে ২০-দলীয় জোটকে সঙ্গে রেখেই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়া। জাতীয় ঐক্যজোট গঠিত হওয়ায় সরকারের কোনো ক্ষতি নেই। কেননা শেষ পর্যন্ত ঐক্যজোটের ব্যানারে বিএনপি থাকায় একটি শক্তিশালী বিরোধী জোটের জন্ম হলো। আর বিএনপিরও একটা প্লাসপয়েন্ট- আওয়ামী লীগ বিরোধী বেশ কয়েকটি দলকে তারা সঙ্গে পেল। কিন্তু দুটো প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। এক. নির্বাচনকালীন সরকার, দুই. সংসদ ভেঙে দেওয়া। ড. কামালও এ দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের মনোভাব এখনো অনমনীয়। সরকার বার বার সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। প্রশ্ন এখানেই- সরকারের দাবি মেনেই কি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাচ্ছে? এবং বিএনপি বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে ‘মাইনাস’ করেই কী নির্বাচনে যাচ্ছে! এসব প্রশ্ন বার বার আলোচিত হতে থাকবে। মানুষ একটি ভালো নির্বাচন চায়। চায় তার ভোট সে নিজে তার মানোনীত প্রার্থীকে দেবে। ভোট কেন্দ্র দখল, সিলমারা সংস্কৃতি, প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দান- এই যে ‘সংস্কৃতি’ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। এটা আওয়ামী লীগের জন্য যেমনি ভালো, তেমনি ভালো বিএনপিসহ অন্যান্য দলের জন্যও। একটা সুযোগ এসেছে। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপিকে নির্বাচনী ধারায় নিয়ে আসতে পারলে লাভ সরকারেরও। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করেছে। সেখানেও বিএনপি তাদের সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এক্ষেত্রে প্রধান দাবিটি হচ্ছে, সব দলের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সুযোগ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়েই তিনি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। তার এই বক্তব্যকে ধারণ করেও বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছে করলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে এই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সংবিধানের ৫৫(১) ধারায় মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে। আর ৫৬(২) ধারায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংসদ সদস্যদের বাইরে থেকে ‘টেকনোক্রেট কোটায়’ মন্ত্রী নিয়োগ করতে। সুতরাং নির্বাচনকালীন সময়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য নন এবং বিএনপি সমর্থিত সদস্যদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছেটাই হলো আসল। বিএনপি যে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তাতে নির্বাচন কমিশন পুনঃগঠন ও নির্বাচনে ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যক্তিগতভাবে ইভিএম মেশিন ব্যবহার করার পক্ষে কথা বলেছেন। তবে যেখানে এখনো ইভিএম মেশিন শতকরা একশ’ ভাগ নির্ভরযোগ্য নয়, সে ক্ষেত্রে ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এর আগে অতি উৎসাহী সিইসির ইভিএম মেশিন নিয়ে বক্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। ইতোমধ্যে ইসিতে নতুন করে দ্বন্দ্বের যে খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল তার সমাধান হয়েছে। একটি বড় অভিযোগ করেছিলেন চারজন কমিশনার। তাদের অভািযোগ, সিইসি কমিশনারদের না জানিয়ে একাই অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটা একটা গুরুতর অভিযোগ। এখন এর অবসান হয়েছে। কিছুদিন আগে নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হবে- এমন বক্তব্য দিয়ে সিইসি বিতর্কিত হয়েছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য তার দেওয়া উচিত হয়নি। একটি বা দুটি ‘সিটে’ ধানের শীষের প্রতীকী প্রার্থী দিয়ে বিএনপি ইচ্ছে করলে তার নিবন্ধন ধরে রাখতে পারে। এটা একটা সাধারণ মানুষও বোঝে। অথচ সিইসি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তার নিজের নিরপেক্ষতা তিনি ক্ষুণ্ন করেছেন।
নির্বাচনের খুব বেশি দিন বাকি নেই। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবি আজ শুধু দেশের ভেতর থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে, তেমনটি নয়। বরং দেশের বাইরে থেকেও উচ্চারিত হচ্ছে। কমনওয়েলথের মহাসচিব পেট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিবকে একটি চিঠি লিখেছেন। তাতে তিনি আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিএনপির মহাসচিব এই চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি এই চিঠির জবাব দেবেন। দাতা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বার বার সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। বিএনপি যে বড় ডায়লামা ‘ফেস’ করছে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। বেগম জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার চিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরও কিছু প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। তারপরও ধারণা করছি, নির্বাচন পর্যন্ত বেগম জিয়া বিএসএমএমইউতেই থাকবেন। তাকে আর নজিমুদ্দিন রোডে যেতে হবে না। ৭ অক্টোবর বিএনপি-যুক্তফ্রন্ট জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার বৈঠক হয়েছে। বিকল্পধারার মহাসচিব ছিলেন ওই বৈঠকে। এটা নিঃসন্দেহে একটি মেসেজ। বোঝাই যাচ্ছে যুক্তফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ বিকল্পধারাকে নিয়েই বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করতে যাচ্ছে। আবার বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের একটি বক্তব্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। গত শনিবার রাতে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে যেতেও আপত্তি নেই তাদের। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন থেকে কোনোভাবেই দূরে থাকবে না তার দল (সূত্র : ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি সংবাদ)। এখন দেখা যাচ্ছে, বিকল্পধারার মহাসচিব ও যুগ্ম মহাসচিব যে ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, তা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করার পরিপন্থী। তবে বিকল্পধারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে চাইলেও, চূড়ান্ত বিচারে তারা তা পারবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। কেননা প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ১৪ দলের জোটের সম্প্রসারণের পক্ষে নন। শেষ অব্দি বিকল্পধারা ‘একূল-ওকূল’- দুকূলও হারাতে পারে। বিকল্প ধারা ঐক্য প্রক্রিয়ায় আছে বটে, কিন্তু নির্বাচনী জোটে থাকবে কি না, তা বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের আস্থার সঙ্কট রয়েছে। এ দেশের রাজনীতি দুটি বড় দলই নিয়ন্ত্রণ করে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য, এই দুটি বড় দলের মধ্যেই আস্থার সঙ্কট রয়েছে। কেউ কাউকে আস্থায় নিতে পারছেন না। দুটি বড় দলের নেতৃবৃন্দ নিত্যদিন পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখছেন। টিভি টক-শোতে গিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। মানুষ এতে করে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই রাজনীতি বাংলাদেশের কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারছে না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করছে। ২০২৪ সালে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশ ২০৩০ সাল পর্যন্ত তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭-এর উপরে রাখবে। যেকোনো বিবেচনায় এটা একটা আশাব্যঞ্জক খবর। কিন্তু এর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি বিঘ্নিত হয়, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়বে। আমাদের সব অর্জন ব্যর্থ হবে। ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল বিশ্বে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সৃষ্টি হবে বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই আস্থার সম্পর্ক থাকাটা জরুরি। নির্বাচনের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই শঙ্কা বাড়ছে জনমানসে। কী হবে এবার? ২০১৮ সালে কি ২০১৪ সালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে? সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে নির্বাচনটি হয়েছিল (২০১৪) সত্য, কিন্তু জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। ১৫৩ জন সংসদ সদস্যের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা আর যাই হোক গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না। তাই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সব দল অংশগ্রহণ করুক, আমরা একটা স্থিতিশীল পরিবেশ পাই- সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বোধহয় এটাই।
Daily Bangladesher Khobor
09.10.2018

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি



সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বেশ ক’টি দেশে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রত্যেকটি দেশে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে অথবা বলা যেতে পারে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেখানে নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে। পাকিস্তান থেকে শুরু করে মালদ্বীপ, আর এর আগে নেপাল ও ভুটান সর্বত্রই পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সেখানে নয়া সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীন ও ভারতের বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। অর্থাৎ কোথাও ‘চীনাবান্ধব’ সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, কোথাওবা আবার ‘ভারতবান্ধব’ সরকার দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব পেয়েছে।
সর্বশেষ ‘বড়’ পরিবর্তনটা সাধিত হয়েছে মালদ্বীপে। বলা হয়, হাজারো দ্বীপের দেশ হচ্ছে মালদ্বীপ। সম্প্রতি মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন। নির্বাচনে শতকরা ৫৮ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। দেশটিতে সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যায়, সেখানে চীন ও ভারতের মধ্যে একধরনের ‘প্রভাব বলয় বিস্তারের’ প্রতিযোগিতা ছিল। নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে চীনাপন্থি বলে গণ্য করা হতো। অন্যদিকে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহকে ভারতপন্থি বলে বিবেচনা করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সেখানে সংকট শুরু হয়। মুখোমুখি অবস্থান নেন দেশটির আদালত। ওই সময় দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এক আদেশে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদসহ বিরোধীদলীয় নয়জন রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বহিষ্কৃত ১২ জন আইন প্রণেতাকে স্বপদে ফিরিয়ে আনারও আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি হলে দেশটির ৮৫ সদস্যের আইনসভায়ও ওই সময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যেত মালদ্বীপের বিরোধী দলগুলো। কিন্তু আবদুল্লাহ ইয়ামিন এতে রাজি ছিলেন না। পরিস্থিতির অবনতি হলে সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। এ সংকটের সময় চীন ইয়ামিনের পাশে এসে দাঁড়ায়। সম্ভাব্য ভারতীয় হস্তক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় হেলিকপ্টার প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি পর্যন্ত জানিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন অতিমাত্রায় চীনের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। চীনের বিনিয়োগও বাড়ছিল মালদ্বীপে। মালদ্বীপের কাছে চীন পাবে ১৩০ কোটি ডলার।
কোনো কোনো মহল থেকে অভিযোগ করা হয়, মালদ্বীপের চীনের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতাকে ভারত ভালো চোখে দেখেনি। একসময় শ্রীলঙ্কাকে নিয়েও ভারতের শঙ্কা ছিল। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে অতিমাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এটাকে ভারত দেখেছিল তার নিরাপত্তার প্রতি একধরনের ‘হুমকি’ হিসেবে। ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ভারত চায় না, চীন এ অঞ্চলে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বাড়াক। এখন মালদ্বীপে মোহাম্মদ সলিহর প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্তি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাবে ভারত। এটা স্পষ্ট, নয়া প্রেসিডেন্ট চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা কমাবেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করবেন। ভারত-মালদ্বীপ সম্পকর্কে আগের অবস্থায় নিয়ে আসবেন। অনেকটা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার মতো স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করবেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সলিহ। শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপে চীন এখন কিছুটা ব্যাকফুটে। ভারতের অবস্থান এখানে শক্তিশালী।
মালদ্বীপের পাশাপাশি ভুটানেও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর। ভুটানের অবস্থান, এর স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে ভারতপন্থি দল হিসেবে পরিচিত পিডিপির বড় ধরনের পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। এটা ছিল প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে ১৮ অক্টোবর। ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, সেই দলের দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ২০১৩ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে পিডিপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। এবার তাদের অবস্থান তৃতীয়। ২০১৩ সালে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ডিপিটি। এবারও তাদের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু যারা তৃতীয় হয়েছিল ডিএনটি, তারা সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথম অবস্থানে আছে। দলটির বয়স মাত্র অল্প কিছুদিনের। মজার ব্যাপার হলো, ডিএনটি দলের যিনি প্রধান, তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। ভুটানে ভারতের প্রভাব বেশি। প্রশাসন বেশি মাত্রায় ভারত নির্ভর। ভুটানের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি ভারত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে কারণে চীনের কোনো দূতাবাস খোলার অনুমতি দেয়নি ভুটান সরকার। ভুটানে যেতে হলে ভারতের ওপর দিতে যেতে হয়। ভুটান একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন দিয়ে ঘেরা, এমনকি ভুটানে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও তা যদি বাংলাদেশ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে এতে ভারতের সম্মতির প্রয়োজন হবে। মোদির ঢাকা সফরের সময় একট উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার (বিবিআইএন) কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এখন ভারতপন্থি দল হিসেবে পরিচিত পিডিপির হেরে যাওয়া ভুটানের রাজনীতিতে তা এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। এখন নয়া সরকার গঠিত হওয়ার পরই বোঝা যাবে, নয়া সরকার ভারত ও চীনের ব্যাপারে কী ভূমিকা নেয়।
নেপালের খবর আমরা সবাই জানি। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকার পর সেখানে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। ২০১৫ সালে সংবিধান প্রণয়ন করার পর সেখানে ১৫ ফেব্রুয়ারি (২০১৮) নির্বাচনের দুই মাস পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন কেপি শর্মা অলি। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ২৭৫ আসনের মধ্যে নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ৬৩ আসন। অন্যদিকে বাম জোট পেয়েছিল ১৭৪ আসন। এর মাঝে অলির নেতৃত্বাধীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির (ইউনাইটেড-মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট) আসন ১২১ আর পুষ্প কুমার দাহালের (প্রচ-) নেতৃত্বাধীন মাওবাদীদের আসন ৫৩। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টির ১৭, আর সমতাবাদী পার্টির আসন ১৬। অলির বিজয় একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেপালের ক্ষেত্রে। এতদিন ভারতের একটা প্রভাব ছিল নেপালে। অলি সেই ভারতীয় প্রভাব থেকে বের হয়ে এসে চীনের দিকে ঝুঁকছেন। নেপাল চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছে। নেপাল ও চীন রেলসংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছেন নয়া প্রধানমন্ত্রী। চীনের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায়ও অংশ নিচ্ছে নেপাল। নেপালের এ ভূমিকা ভারতের পছন্দ নয়। সংগত কারণেই ভারত এতে অসন্তুষ্ট। ফলে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব নেপালের রাজনীতিতেও এখন পড়ল। চলতি বছর বাংলাদেশে নির্বাচন। আর ২০১৯ সালের জুনে ভারতের লোকসভার নির্বাচন। পাঠকমাত্রই জানেন, পাকিস্তানে চলতি বছর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে ইমরান খানের নেতৃত্বে একটি নয়া সরকার সেখানে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। ইমরান খান অনেক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন পাকিস্তানে। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সেখানে খারাপ। চীনের ওপর নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের আরও বেড়েছে। আর আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০১৯ সালের এপ্রিলে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কিছু কিছু পরিবর্তন আসছে। নতুন নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্ম হয়েছে। চীন-ভারত দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটেছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। ভারত মহাসাগরজুড়ে বেশ কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজের সংখ্যা এবং সামরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলজুড়ে এখন চলছে একধরনের চাপা উত্তেজনা। গাওদারে ও হামবানতোতায় চীনা ডুবোজাহাজের উপস্থিতি ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ অঞ্চলে ভারত তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানে নয়া সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এরই মধ্যে মিইয়ে গেছে। পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। আগামীতে যে হবে, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে সার্ক একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলো এখন সার্কের পরিবর্তে বিমসটেককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে যারা বঙ্গোপসাগর অববাহিকায় অবস্থিত, নতুন এক শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্ম হচ্ছে। দ্রুত বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। নতুন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে।
এসব নতুন শক্তি নতুন রাজনীতি নিয়ে আসছে। পুরানো ট্র্যাডিশনাল শক্তিগুলোর প্রভাব ও প্রতিপত্তি কমছে। পাকিস্তান থেকে শুরু করে মালদ্বীপ, এমনকি ভুটানেও নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে। এখন দেখার পালা, এ নতুন শক্তি একুশ শতকে দক্ষিণ এশিয়াকে কোথায় নিয়ে যায়।
Daily Alokito Bangladesh
07.10.2018

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির প্রাপ্তি কী

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির যোগদান যে প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে, তা হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায় যোগদানের মধ্য দিয়ে বিএনপির প্রাপ্তি কী? বিএনপি কী পেল আসলে? রাজনৈতিক অঙ্কে বিএনপি কি বিজয়ী হলো, নাকি একটি ঝুঁকি নিল? এই মুহূর্তে মন্তব্য করা বোধহয় সঠিক হবে না, কিন্তু একটি মূল্যায়ন অবশ্যই করা যায়। প্রথমত, বিএনপি আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি জোটে নিজেদের জড়িত করতে পেরেছে। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট বিএনপির জন্য। এই জোট শেষ পর্যন্ত যদি একটি নির্বাচনী জোট হয়, তাহলেও বিএনপির লাভ। সিট বণ্টন নিয়ে আলোচনা কোন পর্যায়ে যাবে, বিএনপি কতটুকু ছাড় দেবে, সে প্রশ্ন ভিন্ন। এক্ষেত্রে বিএনপি একটি ‘মালয়েশিয়ান ফর্মুলা’ নিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া বিএনপিকে একটি সুযোগ করে দিল একাদশতম জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার। এর আগে বিএনপির নেতৃবৃন্দ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন বেগম জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। সব দলের অংশগ্রহণ যখন সবাই চাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য জোটের ব্যানারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও সুযোগ পেল। সরকারের জন্যও এটা ভালো। কিন্তু জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে মন্ত্রীদের অশালীন মন্তব্যে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, বেগম জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া কোনো সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেনি। তাদের পাঁচ দফায় বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নেই। ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা মনে করেন বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিএনপির। বিএনপি দলীয়ভাবে বেগম জিয়ার মুক্তি দাবি করতে পারে, তাতে তাদের আপত্তি নেই। তবে ঐক্য প্রক্রিয়া সবার মুক্তি দাবি করেছে। বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিটি সরাসরি পাঁচ দফায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায়, স্ট্র্যাটেজিক্যালি এটা বিএনপির একরকম ব্যর্থতা! চতুর্থত, ড. কামাল হোসেন বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যে মন্তব্যটি করেছিলেন, তাতে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে (অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেখে) নির্বাচনে যেতে নীতিগতভাবে তার আপত্তি নেই। পরে তিনি এর একটি ব্যাখ্যা দেন। তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তারা যে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, সরকার তা মেনে নিলে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে তার আপত্তি নেই। তবে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করেননি, এটাও তিনি জানিয়েছেন। পঞ্চমত, ড. কামাল ও বি চৌধুরী স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, জামায়াতকে মাইনাস না করলে এই ঐক্য হবে না। বিএনপির কাছে অগ্রাধিকার কী এখন? জামায়াত নাকি ঐক্য প্রক্রিয়া? জামায়াতের কিছু ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষিত একটি কর্মীবাহিনীও রয়েছে। অন্যদিকে গণফোরাম, জেএসডি, বিকল্প ধারা ‘কাগুজে সংগঠন’, এদের কোনো ‘ভোট ব্যাংক’ নেই। জামায়াতের বিরুদ্ধে একটা জনমত রয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলে জামায়াত এখনো আছে, যদিও জামায়াতের নিবন্ধন নেই। এ ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে যায়, তা দেখার বিষয়। বিএনপির জন্য বিষয়টি অত সহজ নয়। জামায়াতকে বাদ দিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত বিকল্পধারা, গণফোরাম, জেএসডির সঙ্গে ‘নির্বাচনী ঐক্য’ করে বিএনপি কতটুকু লাভবান হবে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। ষষ্ঠত, বিএনপির সঙ্গে ২০-দলীয় জোটে আছে এমন কয়েকটি দলের (কল্যাণ পার্টি, এলডিপি, ন্যাপ) ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কিছুটা ‘রিজার্ভেশন’ আছে বলেই মনে হয়। ২২ সেপ্টেম্বরের ‘নাগরিক সমাবেশে’ এই তিন দলের কোনো প্রতিনিধিই উপস্থিত ছিলেন না। এদের নেতিবাচক মনোভাবও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এই ‘ঘটনা’ প্রমাণ করে ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে ২০-দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এলডিপি, কল্যাণ পার্টি যদি ২০-দল থেকে বের হয়ে যায়, আমি অবাক হব না। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় কর্নেল (অব.) অলি আহমদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বাজারে একটি ‘গুজব’ রয়েছে। অতীতেও বিএনপির সঙ্গে এলডিপির দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এখন আবারো এলডিপি এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। সপ্তমত, বিএনপি ঐক্য প্রক্রিয়ায় আছে। কিন্তু মূল নেতা বিএনপির কেউ নন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরীর এক ধরনের ‘অ্যালার্জি’ রয়েছে বিএনপিকে নিয়ে। তিনি ও তার নানান বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তিনি বিএনপিকে বাদ দিয়েই যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে গণফোরামের ঐক্য চান! বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে সবারই কিছু কিছু নমনীয় হওয়া উচিত। বিএনপি একটি দুর্বল অবস্থানে আছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু দেশের জনগোষ্ঠীর ৩২ থেকে ৩৫ ভাগের সমর্থন রয়েছে বিএনপির প্রতি। বিএনপিকে বাদ দিয়ে কোনো বৃহৎ ঐক্যই কাজ করবে না। এক্ষেত্রে মাহী বি চৌধুরী যত কম কথা বলবেন, ততই বৃহৎ ঐক্যের জন্য তা মঙ্গল। অষ্টমত, ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে যে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে দুটি দাবি খুব গুরুত্বপূর্ণ- একটি হচ্ছে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও একটি নিরপেক্ষ সরকার। যদিও এর বিস্তারিত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি। এটা সত্য যে, এটা বিএনপিরও দাবি ছিল। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে, সরকার সংবিধানের বাইরে যাবে না। এক্ষেত্রে ড. কামাল হোসেন, যিনি সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তিনি এর একটি ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। সংবিধানের আলোকে কীভাবে একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি ফর্মুলা তিনি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা দেননি। এমনকি এই দাবি বিএনপির হলেও, বিএনপির পক্ষ থেকে কখনো নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি। সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রশ্নে সাংবিধানিক ব্যাখ্যাটা এ রকম- রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বছর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।’ (৭২-৩)। দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। এর অর্থ ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সংবিধানমতে এ সংসদ বলবৎ থাকবে। এক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে। তিনি সংসদ তখনই ভেঙে দেবেন, যখন এ ব্যাপারে সব দলের মধ্যে একটি ‘সমঝোতা’ হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই ‘সমঝোতা’ সম্ভব। অথবা বিকল্প হিসেবে আন্দোলনের মুখে সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করাও সম্ভব। কিন্তু বিএনপি সেই আন্দোলন করতে পারেনি। এখন ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে নিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়া ওই আন্দোলন করতে পারবে বলেও মনে হয় না। সরকারকে বাধ্য করা না গেলে সরকার সংসদ ভেঙে দেবে না। আর নির্বাচনকালীন সরকার? সংবিধানের ৫৭(৩) ধারায় বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এবং অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না।’ এর অর্থ কী? ডিসেম্বরে (২০১৮) নির্বাচন হবে। আর জানুয়ারিতে সরকার গঠিত হবে (২০১৯)। এই সময়সীমা পর্যন্ত শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যাচ্ছেন! সুতরাং সরকারের মন্ত্রীরা যে বলছেন শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে, এর একটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এই সরকারের অধীনেই সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল। তারা বুঝে শুনেই এই কাজটি করেছেন। বিএনপি বা ঐক্য প্রক্রিয়া যদি কোনো দিন সরকার গঠন করতে পারে, তারাও সংবিধান সংশোধন করতে পারবে! তবে এখানে একটা কথা বলা দরকার। একটি নির্বাচনকালীন সরকারের যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যদি প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকে। কেননা, সংবিধানের ৫৬(১)-এ বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রী যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেই রূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকিবেন।’ এখানে ৫৬(২) ধারায় এক দশমাংশ সদস্য (মন্ত্রিসভার) সংসদের বাইরে থেকে নেওয়ার বিধান রয়েছে। এই ধারা প্রয়োগ করে প্রধানমন্ত্রী ন্যূনতম দুই থেকে তিনজন সদস্যকে (বিরোধী দল, যারা সংসদে নেই) মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। এটা পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বিএনপি কিংবা ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে একটা ফর্মুলা দেওয়া যেতে পারত, কিন্তু তারা তা দেয়নি। হতে পারে, বিতর্ক হতে পারে এই বিবেচনায় এ ধরনের প্রস্তাব তারা দেয়নি। এখন এ ধরনের প্রস্তাব না থাকায়, সরকার যে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তা আমরা অস্বীকার করি কীভাবে?
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া মিডিয়ায় কিছুটা হলেও আলোড়ন তুলেছে। বাস্তব ক্ষেত্রে কিছু ‘কাগুজে সংগঠন’ নিয়ে বিএনপির প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। উপরন্তু বিএনপিকে নিয়ে ড. কামাল হোসেন যতটা না উৎকণ্ঠিত, তার চাইতে বেশি উৎকণ্ঠিত বিকল্পধারা, বিশেষ করে মাহী বি চৌধুরী নিজে। বিএনপি ‘দুর্বল অবস্থানে’ থাকায়, তাদের ‘চাপের মুখে’ রেখে বড় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে না। বিকল্পধারা কিংবা গণফোরামের মতো সংগঠনের কয়টি নির্বাচনী এলাকা রয়েছে, কিংবা দলীয়ভাবে তারা ক’জনকে প্রার্থী করতে পারবে- তা আমরা সবাই মোটামুটি জ্ঞাত। সুতরাং বিকল্পধারা যখন ‘বড় জোটে’ কার্যক্রম শুরু করার আগেই নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়, তখন ঐক্য প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বৈকি!
বিএনপি একটি ‘সঙ্কটে’ আছে, সন্দেহ নেই তাতে। বেগম জিয়া কিংবা তারেক রহমানের অবর্তমানে বিএনপির কার্যক্রমে কিছুটা হলেও শ্লথগতি এসেছে। কিন্তু কর্মীদের মধ্যে ঐক্য এখনো আছে। গত প্রায় দশ বছরে বিএনপির খুব কম সংখ্যক কর্মীই দল ত্যাগ করেছেন। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে কর্মীরা এখনো দলের প্রতি আস্থাশীল। তবে বিএনপির নেতৃত্বে আরো ‘নতুন মুখ’ আনা প্রয়োজন। যেসব নেতৃত্ব গত দশ বছরে রাস্তায় আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের উপদেষ্টা পরিষদে পাঠিয়ে নেতৃত্বের গুণাবলিতে প্রমাণিত তরুণ নেতৃত্বকে স্থায়ী পরিষদে পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন। বিএনপি নির্বাচনে যাক, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে তারা নির্বাচনে অংশ নিক। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। আর এ জন্য সরকারের দায়িত্ব যেমনি বেশি, ঠিক তেমনি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিরও দায় আছে। একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনই পারে দেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে।
Daily Bangladesher Khobor
02.10.2018


বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও বিএনপির রাজনীতি


বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপি যুক্ত হয়েছে। প্রবীণ আইনজীবী ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন এই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তা। গত ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে ‘নাগরিক সমাবেশে’ ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় চার নেতা যোগ দেন। সেই সঙ্গে রয়েছে বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টও। এর মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো বিএনপি। কিন্তু প্রশ্ন আছে অনেক। প্রথমত, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার কারণে বিএনপি কি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করবে? দ্বিতীয়ত, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে কি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতারা সবাই খুশি হলেন? তৃতীয়ত, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার কারণে বিএনপিকে এখন আন্দোলনের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে হবে। এতে কি তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকর্মীরা খুশি হবে? চতুর্থত, এই ঐক্য কি একটি নির্বাচনী ঐক্য হবে? এখানে মালয়েশিয়ান ফর্মুলা আদৌ কাজ করবে কি?
এই মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা শুধু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এই জোট গঠনের কথা বলছেন। নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি এখনো আলোচিত হয়নি। বলা হচ্ছে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের কথা। তবে এই আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া যদি ভেঙে যায়, আমি অবাক হব না! কেননা বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী প্রকাশ্যেই বলেছেন, তাঁরা ১৫০ আসন চাচ্ছেন ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতাদের কাছে, পরোক্ষভাবে বিএনপির কাছে। অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না চাচ্ছেন দুই বছরের জন্য তাঁদের ক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে! শুধু নেতারা একটি ঐক্যে মিলিত হয়েছেন। এরই মধ্যে ১৫০ আসন চাওয়া কিংবা দুই বছরের জন্য ক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব চাওয়া—বিষয়গুলো উত্থাপিত হওয়ায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা খুব ভালো চোখে দেখবেন বলে আমার মনে হয় না। এটা ঠিক, বিএনপি একটি বড় ‘সংকটে’ আছে। খালেদা জিয়ার জেল থেকে ‘মুক্ত’ না হওয়া ও তাঁর অসুস্থতা, তারেক রহমানের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সম্ভাব্য শাস্তি, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নামে শত শত মামলা দলটিকে বড় সংকটে ফেলে দিয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া তাঁরা নির্বাচনে যাবেন না। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে তাঁরা নির্বাচনে যাচ্ছেন। তবে চূড়ান্ত কথা বলার সময় বোধ হয় এখনো আসেনি।
এর আগে বিএনপির মহাসচিব জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। দেখা করেছেন একজন সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে। গত কয়েক দিন রাজনৈতিক ময়দান এটা নিয়ে ছিল উত্তপ্ত। মির্জা ফখরুল এটা নিয়ে কথা বলেছেন। সিনিয়র মন্ত্রীরা বলেছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করেছে। এখানে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। কথা উঠেছে বিএনপির মহাসচিব এই সফরে কী পেলেন? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলা ঠিক হয়েছে কি না—এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন যে চলমান রাজনৈতিক সংকটের বিষয়টি তিনি জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, জাতিসংঘ সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। তিনি আরো জানিয়েছেন, তাঁকে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং যেহেতু অতীতেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সহকারী মহাসচিবকে (জাতিসংঘের) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেহেতু এবার তিনি তাঁর সঙ্গেই দেখা করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে তিনি দেখা করেননি। মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, খুব শিগগির তাঁর দল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রূপরেখা প্রকাশ করবে। তিনি মনে করেন, বর্তমান সমস্যার একটি বড় সমাধান হলো বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা। তা বৃহত্তর জোটের মাধ্যমে এখন সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিএনপি যুগপৎ কর্মসূচির কথাও বলেছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বিএনপি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘে নালিশ দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা আরেক দফায় নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ দিয়েছে। তাঁর মতে, মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে একজন ডেস্ক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন (সমকাল, ১৮ সেপ্টেম্বর)। তোফায়েল আহমেদ এটা জানিয়ে দিতে ভোলেননি যে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই দুজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা, আস্থাহীনতা, পরস্পরকে অবিশ্বাস করার যে ‘রাজনীতি’, তা এখনো রয়ে গেছে। অথচ জাতীয় নির্বাচনের বাকি আছে তিন মাসেরও কম সময়। এ মাসেই শিডিউল ঘোষণা করা হবে। অথচ দুটি বড় দলের ‘অবস্থান’ পরস্পরবিরোধী।
মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। এটা কোনো ধরনের ‘নালিশ’ জানাতে নয়, বরং তাঁর মতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অবহিত করতেই তিনি জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিরোস্লাভ জেনকারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু মূল বিষয়টি হচ্ছে জাতিসংঘ আদৌ স্ব-উদ্যোগে কোনো দেশে নির্বাচন আয়োজন করতে পারে না। এটা সত্য, জাতিসংঘের অধীনে ‘ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স ডিভিশন’ নামে একটি শাখা আছে। এটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই শাখা পৃথিবীর প্রায় ১০০টি দেশে নির্বাচন আয়োজন করে আসছে। এরা বিভিন্ন দেশে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ‘টেকনিক্যাল সহযোগিতা’ দেয়, সেখানে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে, নির্বাচন যে ‘সুষ্ঠু’ হয়েছে, তা ‘সার্টিফাই’ করে ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে। তবে এ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এককভাবে স্ব-উদ্যোগে ‘ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স ডিভিশন’ কোনো দেশে নির্বাচনের আয়োজন, পর্যবেক্ষণ বা নির্বাচন মনিটর করতে পারে না। শুধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনই নয়, বরং ওই দেশের এবং বিবদমান গোষ্ঠীরও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। নেপালের দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি। ২০০৬ সালের নভেম্বরে নেপাল সরকার ও মাওবাদীদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই সময় সরকার ও মাওবাদীরা জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানায় সেখানে সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে সাংবিধানিক পরিষদ (সংসদ) গঠিত হবে, তা আয়োজন করে দেওয়ার জন্য। জাতিসংঘ মিশন সেই কাজটি শুরু করে ২০০৭ সালে। ২০০৮ সালের এপ্রিলে সেখানে সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের ‘ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স ডিভিশন’ তাদের লোকবল দিয়ে, পর্যবেক্ষক দিয়ে এই নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করে। কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধের পর জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল ১৯৯২-৯৩ সালে। সেখানে ওই সময় প্রায় ৪৬ দেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল (বাংলাদেশসহ)। এই কর্তৃপক্ষ সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল জাতিসংঘ। গৃহযুদ্ধের পর নামিবিয়ায় (১৯৮৯-১৯৯০) জাতিসংঘ একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন পরিচালনা করেছিল এবং সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে জাতিসংঘের ‘ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স ডিভিশন (ইএডি)’ নির্বাচন পরিচালনা করেছে (UNOWAS News, 14 December 2017)। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ওই সব দেশের পরিস্থিতিকে মেলানো যাবে না। ওই সব দেশে গৃহযুদ্ধ চলছিল, তারপর বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়, শান্তিচুক্তি হয় এবং জাতিসংঘ সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে এটা তো সত্য, অতীতে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে কথাও বলেছেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এখন মির্জা ফখরুল নিজে গেলেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তাঁদের অবহিত করলেন। জাতিসংঘের কর্তাব্যক্তিরা কি এসব বিষয়ে অবগত নন? নিশ্চয়ই তাঁরা জানেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে তাঁদের করার কিছু নেই। এটা ঠিক একটি নির্বাচনকালীন সরকারের কথা শুধু বিএনপিই বলছে না, বলতে গেলে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি বাদে প্রতিটি দলই একটি নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট কিংবা ঐক্যপ্রক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। বিএনপির পক্ষ থেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর তিন মাস ছুটি’ শীর্ষক একটি ফর্মুলার কথা মাঝেমধ্যে বলা হয়। কিন্তু এটাও অসম্পূর্ণ। তাহলে ওই সময় সরকার পরিচালনা করবে কে? উপরন্তু সরকার একটি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সংবিধান তাদের পক্ষে। সংবিধান তো প্রধানমন্ত্রীর ‘তিন মাস ছুটি’ অনুমোদন করে না! সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকার এই শেষ সময়ে সংবিধান সংশোধন করবে, এটা মনে হয় না। তাহলে ‘সমঝোতাটা’ হবে কিভাবে?
এখন বিএনপির জন্য ‘কাজটি’ সহজ হয়ে গেল। বিএনপির ‘নেতৃত্ব’ এখন চলে গেল ড. কামাল হোসেনের কাছে! বিএনপি যখন নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছিল তখন ড. কামাল হোসেন আর বি চৌধুরীর সঙ্গে ‘ঐক্য’ করে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার এবং না যাওয়ার বিভ্রান্তি দূর করল। বিএনপি এখন নির্বাচনে যাবে। সরকারের জন্যও এটা বড় ‘পাওয়া’, অন্তত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ‘পরিস্থিতি’ হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে! জাতীয় ঐক্যজোট এবং প্রকারান্তরে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি ‘বৈধতা’ দেবে। তবে সব কথা বলার সময় এখনো আসেনি। বিএনপির শীর্ষ পদগুলোতে কট্টরপন্থীরা এখনো আছেন। তথাকথিত ‘মালয়েশিয়ান ফর্মুলা’ কাজ না-ও করতে পারে। উপরন্তু ২০ দলীয় জোটে স্পষ্টতই অসন্তোষ আছে এবং তা জোটের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। জাতীয় ঐক্যজোট হয়েছে। এতে বিএনপি কতটুকু লাভবান হলো, সে প্রশ্ন থাকলই।
Daily Kaler Kontho
01.10.2018

ঐক্য প্রক্রিয়ায় অনৈক্যের সুর!




বিএনপি গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টের সাথে ঐক্য করেছে। কিন্তু এটি একটি নির্বাচনী ঐক্য হবে কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। সংসদীয় নির্বাচনে বিকল্প ধারায় কোনো ভিত্তি নেই। মাহী বি. চৌধুরীর নিজস্ব কোনো সংসদীয় এলাকা নেই। বাবা বি. চৌধুরীর নির্বাচনী আসনই তার আসন। দেশের ৬৪টি জেলার সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে তিনি যখন বিএনপিকে একধরনের ‘মুচলেকা’ দিতে বলেন, তখন তার ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী ও বাংলাদেশ বিরোধী হিসেবে জামায়াতকে সাথে নিতে চান না। কিন্তু তার নিজ দলের মহাসচিবকে নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে এবং যখন স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে, তখন এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চুপ। তিনি উচ্চাকাঙ্খী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার সেই ‘ইমেজ’ নেই। জাতীয় ঐক্য জোটের ব্যাপারে তিনি সুবিধা নিতে চাইছেন। এতে করে বিএনপিকে বাধ্য করতে পারে ঐক্য প্রক্রিয়ার বিরোধী অবস্থান নিতে । দ্বিতীয়ত, নাগরিক ঐক্যের কোনো নিবন্ধন নেই। মাহমুদুর রহমান মান্না একজন ব্যক্তি। তার হয়তো ‘ ইমেজ’ আছে, কিন্তু নেই সাংগঠনিক ভিত্তি। এমতাবস্থায় তিনি দাবি করে বসলেন, দু’বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাদের দিতে হবে! কোথায় নির্বাচন? কোথায় নির্বাচন বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা! দিল্লি তো অনেক দূর! এরই মাঝে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব? মাহী বি. চৌধুরী ও মান্নার বক্তব্য প্রকারন্তরে বিএনপিকে ঐক্য বিরোধী অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। এদের দু’জনেরই বোঝা উচিত, তাদের শক্তি কতটুকু? ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করেন কীভাবে?



এ ধরনের বক্তব্যের পাশাপাশি ড. কামাল হোসেন একটি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি দলের নয়, জনগণের ঐক্য চান। তার এ ধরনের কথা শুনতে ভালোই শোনা যায়। কিন্তু বিকল্প ধারার ওপর তার কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেই। এমনিতেই নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে ড. কামাল হোসেন নাকি বি. চৌধুরীর হাতে, এটা নিয়ে ঐক্যজোটে একধরনের আস্থাহীনতা আছে। ড. কামাল যৌথ নেতৃত্বের কথা বললেও। মাহী বি. চৌধুরী এটা মানছেন না! তিনি চান বি. চৌধুরীকে মূল নেতৃত্বে দেখতে। স্পিরিটটি হচ্ছে, সরকার বিরোধী সকল শক্তিকে একটি প্লাটফর্মে আনা। এ থেকে বিএনপি বড় দল হলেও ড. কামালের নেতৃত্ব তারা মেনে নিয়েছে। যদিও ২০ দলীয় জোটে এই ঐক্য নিয়ে একধরণের অস্বস্তি রয়েছে। এলডিপি, অন্যান্য পার্টি কিংবা ন্যাপের মতো সংগঠন জাতীয় ঐক্যজোটের ব্যাপারে খুব উৎসাহী তা বলা যাবে না। এই দলগুলো দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আছে। এখন বিএনপি যদি ‘নতুন মিত্র’ পেয়ে এদের ‘পরিত্যাগ’ করে, তাহলে বিএনপির গ্রহণযোগতা প্রশ্নের মুখে থাকবে। বিএনপির উচিত হবে ২০ দলীয় জোটকে সাথে রেখেই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়া।

জাতীয় ঐক্যজোট গঠিত হওয়ায় সরকারেরও এতে লাভ। কেননা শেষ পর্যন্ত ঐক্যজোটের ব্যানারে বিএনপি হয়তো নির্বাচনে অংশ নেবে। আর বিএনপির একটি প্লাসপয়েন্ট, নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্তটি তুলেছিল কামাল হোসেনর কাছে। কিন্তু দু‘টো পক্ষ এখনো অমীমাংসিত। এক. নির্বাচনকালীন সরকার, দুই. সংসদ ভেঙে দেওয়া। ড. কামালও এ দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের মনোভাব এখনো অনমনীয়। সরকার বারবার সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। সরকারের দাবি মেনেই কি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাচ্ছে? এবং বিএনপি বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে ‘মাইনাস’ করেই কী নির্বাচনে যাচ্ছে! এসব প্রশ্ন বারবার আলোচিত হতে থাকবে।

মানুষ একটি ভালো নির্বাচন চায়। চায় তার ভোট সে নিজে তার মনোনীত প্রর্থীকে দেবে। ভোট কেন্দ্র দখল, সিল মারা সংস্কৃতিক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাঁধা দান এই ‘সংস্কৃতি’ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। তা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। এটা আওয়ামী লীগের জন্য যেমনি ভালো, তেমনি ভালো বিএনপিসহ অন্যান্য দলের জন্যও। একটা সুযোগ এসেছে। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার একটি ভূমিকা রাখছে। এখন যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে ঐক্যকে ধরে রাখা। ঐক্য প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত হলে বিএনপি আবারও নির্বাচন বয়কটের ডাক দিতে পারে, যা কারও জন্যই কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না।
প্রবীন রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গত ২২ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হলেও, এক সপ্তাহ পেরুনোর আগেই একটি অনৈক্যের সুর শোনা যাচ্ছে। বিকল্প ধারাকে নিয়েই ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এখন বিকল্প ধারার নেতারাই বলছেন উল্টো কথা। বিশেষ করে বিকল্প ধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীর নানা বক্তব্য ঐক্য প্রক্রিয়ার বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তার দুটো বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এক. তিনি বলেছেন, বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে একাশ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঐক্য প্রক্রিয়ায় আসতে হবে। এটা মুখে বললে চলবে না। পত্রিকায় বিবৃতি ও লিখিত অঙ্গীকার করতে হবে। দুই. বিকল্প ধারা তথা যুক্তফ্রন্টকে একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনে ১৫০টি আসন ছেড়ে দিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় ঐক্যজোট যখন ‘কাজই’ শুরু করতে পারল না, এর আগেই বিকল্প ধারা শর্ত জুড়ে দিল! এর ফলে ঐক্য প্রক্রিয়া কী বাধাগ্রস্ত হবে না? যদিও ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য একটু ভিন্ন। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তিনি যে ঘোষণাপত্র দিয়েছেন, তাতে জামায়াত নিয়ে কোনো বক্তব্য ছিল না। যুক্তফ্রন্টকে দেড়শ আসন দেওয়া কিংবা দুই বছরের জন্য তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া, এগুলো কোনো সমস্যা না। বিএনপি বড় দল সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করেই একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। রাজনীতির দুটি ধারাই এই দুটি দল প্রতিনিধিত্ব করে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে একটি রাজনৈতিক ধারা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেটা সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালে পর থেকেই আওয়ামী লীগের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। গত প্রায় দশ বছর যাবৎ আওয়ামী লীগ সমতায়। তবে নিঃসন্দেহে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটি টেস্ট কেস। অন্যদিকে বিএনপিই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি শক্তি জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভুল রাজনীতি, দলের নেতাদের মাঝে একধরনের সুবিধাবাদীতা, সুনির্দিষ্ট রাজনীতি প্রণয়নে ব্যর্থতা জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প হিসাবে দাঁড় করাতে পারেনি। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদে এরকম একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টি এই সুযোগটি নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। একদিকে সরকারে থাকা, আবার বিরোধী দলে থাকা, দলীয় প্রধানের মন্ত্রীর পদ-মর্যাদায় সুযোগ-সুবিধা নিয়েও সরকারের বিরোধীতা করা সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টির এই ‘ভূমিকা’ সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে ঘুরে ফিরে বিএনপিই আলোচনায় আছে এবং বিএনপিকে কেন্দ্র করেই এখন প্রধান বিরোধী দলের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের বিএনপির অংশগ্রহণটা জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এই দায়িত্বটি পালন করতে পারবে কি?
Daily Amader Somoy.com
30.09.2018

অথঃ ‘উইপোকা’ তত্ত্ব!


ভারতের অত্যন্ত ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ ও বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ আসামে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের ‘উইপোকার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। সম্প্রতি রাজস্থানের এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, “আসামে অবৈধ অভিবাসীরা ‘উইপোকা’, এদের শিগগিরই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।” তার ভাষায়Ñ এই ‘অবৈধ অভিবাসীরা’ বাংলাদেশি! তার এ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর ইউরোপীয় শাখার পরিচালক এন্ড্রু স্ট্রোহলেইন বলেছেন, ‘অমিত শাহর মন্তব্য গণহত্যার প্রস্তুতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (আলজাজিরা, শীর্ষ নিউজ, ২৬ সেপ্টেম্বর)। বলা ভালো, চলতি বছরের ৩০ জুলাই আসামের রাজধানী গৌহাটি থেকে খসড়া নাগরিক নিবন্ধন তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে নিবন্ধের জন্য আবেদন করা ৩ কোটি ২৯ লাখ মানুষের মধ্যে ৪০ লাখ ৭ হাজার ৭০৮ জন বাদ পড়েন, যাদের একটা বড় অংশ মুসলমান। এনআরসি এই তালিকা প্রকাশ করে।
সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে, এনআরসির বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। ২০১৯ সালে ভারতে জাতীয় নির্বাচন। বিজেপি সরকার এটাকে ইস্যু করতে চায়। ভুলে গেলে চলবে না, আসামসহ ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলোর প্রায় সব ক’টিতে বিজেপি ও বিজেপি মিত্ররা ক্ষমতায়। অতি সম্প্রতি সেখানে যে বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল, তার মধ্য দিয়ে বিজেপি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী করেছে। আসামে বিজেপির নেতৃত্বাধীন একটি সরকার রয়েছে।
আসামের নাগরিকত্ব তালিকা নিয়ে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে সেখানে বাঙালি মুসলমানরা যে এক ধরনের আতঙ্কের মাঝে আছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও ভারতের সুপ্রিমকোর্ট বলেছেন, এখনই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, তারপরও কথা থেকে যায়। আগামী লোকসভা এবং পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি এ ইস্যু তুলে রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করে নিতে চায়। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সময় পার করছে। তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ইস্যুতে বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং তাতে করে লাভবান হবে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক ভালো এবং একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার (বিবিআইএন) আলোকে দেশ দুটি নতুন এক সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে। এমনি একসময় অমিত শাহরা মুসলমানদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।
সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা নতুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণার ব্যাপক বিস্তার ঘটে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার জন্ম হয়। বলা হয়, আঞ্চলিক সহযোগিতা হচ্ছে নয়া বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধের ভয়াবহতা যেখানে কমে এসেছিল, সেখানে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে অঞ্চল ভিত্তিতে দেশগুলো নিজেদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের মাঝে দেশগুলো এমন এক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, যা কিনা নয়া বিশ্বব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। একুশ শতকে এসে সেই ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। জন্ম হয় উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাটি নতুন; কিন্তু এ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বিপুল এক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা মূলত গড়ে ওঠে পাশাপাশি দুটি বা তিনটি রাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলের সঙ্গে। সেখানে পুরো রাষ্ট্রটি জড়িত থাকে না, জড়িত থাকে কিছু অঞ্চল। আর অঞ্চল ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা।
বাংলাদেশ সার্ক কিংবা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থায় জড়িত থাকলেও বিবিআইএন কিংবা বিসিআইএমের মতো উপ-আঞ্চলিক সংস্থায় নিজেকে জড়িত করেছে। বিবিআইএন (ইইওঘ) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা প্রথম জানা যায় ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময়। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে যে যৌথ ঘোষণাপত্রটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ৪১নং ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, উভয় প্রধানমন্ত্রী বিবিআইএনের আওতায় বিদ্যুৎ, পানি সম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও কানেকটিভিটি খাতে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছেন। এ বিবিআইএন হচ্ছে ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত (সাতবোন রাজ্য) ও নেপালকে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এ উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে এরই মধ্যে ঢাকা-শিলং-গোহাটি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। চালু হয়েছে খুলনা-কলকাতা বাস সার্ভিস। যশোর-কলকাতা বাস সার্ভিসও চালু হবে। কলকাতা-খুলনার মধ্যে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনও এরই মধ্যে চালু হয়েছে। রামগড়-সাবরুম সেতু নির্মাণ করছে ভারত। ফলে আগরতলার পণ্য পরিবহনে এখন এই সেতু ব্যবহার করে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করা যাবে। এর সবই হচ্ছে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে। ১৫ জুন (২০১৫) বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল আর ভুটানের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির অধীনেও চারটি দেশের মাঝে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলাচল করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফরের সময় ভুটান এতে রাজি হয়েছিল। তবে ভুটানের সংসদ আপত্তি তুলেছিল। সংসদে তা অনুমোদিতও হয়নি।
প্রসঙ্গক্রমেই আমরা প্রস্তাবিত বিসিআইএম জোট নিয়েও আলোচনা করতে পারি। বিসিআইএম (ইঈওগ) হচ্ছে অপর একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এ জোটে আছে বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ভারত (সাতবোন রাজ্যগুলো) ও মিয়ানমার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে তার চীন সফরের সময় এ বিসিআইএম করিডোরের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এটাকে একসময় ‘কুনমিং উদ্যোগ’ বলা হতো। চীন ২০০৩ সালে এ ধরনের একটি সহযোগিতার কথা প্রথম বলেছিল, যা পরবর্তী সময় বিসিআইএম নামে আত্মপ্রকাশ করে। এ জোটটি কার্যকর হলে কুনমিং (চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী) থেকে সড়কপথে বাংলাদেশ ও ভারতে আসা যাবে এবং পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে। ফলে চীনা পণ্যের দাম কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালে আসিয়ানে সৃষ্টি হচ্ছে মুক্তবাজার, যার ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য প্রবেশাধিকারের পথ সহজ হবে। বিসিআইএমের আওতায় কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক হবে। তিনটি রুটে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত সংযুক্ত হবে। বিসিআইএম জোটের সম্ভাবনা বিশাল। কারণ এ চারটি দেশের রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাসসম্পদ (মিয়ানমার), রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি (চীন ও ভারত), রয়েছে শিল্প (চীন), শক্তিশালী সার্ভিস সেক্টর, রয়েছে বিশাল অব্যবহৃত জমি (মিয়ানমার) ও সমুদ্রবন্দর (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার)। ফলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে আগামীতে, যদি বিসিআইএম জোটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি তো বটেই; বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেকাংশে প্রভাবিত করতে পারে এ জোট। বলাই বাহুল্য, এ চারটি দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ ভাগ। ১৯৯১ সালে বিসিআইএমের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল যেখানে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা আর ২৮৮ কোটি মানুষের বাস এ বিসিআইএম জোটভুক্ত দেশে। পূর্বে কুনমিং আর পশ্চিমে কলকাতা। মাঝখানে মান্দালয় ও ঢাকা। ভারত এ জোটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল এ কারণে যে, এতে করে আগামী দিনে ভারতের আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া সহজ হয় এবং তার পণ্য নিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করে আসিয়ানের বাজারে প্রবেশ করতে পারে। আমরাও এ সুযোগটি নিতে পারি।
কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। বিবিআইএন জোট যদি সফল হয়, তাহলে জোটভুক্ত চারটি দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। সিলেট হয়ে উঠতে পারে অন্যতম একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একই কথা প্রযোজ্য বিসিআইএমের ক্ষেত্রেও। সড়কপথ যদি প্রশস্ত হয়, যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মিয়ানমারের জ্বালানি সম্পদ তথা কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ব্যবহার করে তা বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে আমাদের অর্থনীতিতে। তাই কানেকটিভিটি ব্যবহার করতে হবে আমাদের সবার স্বার্থে। আমরা দেখতে চাই আমাদের স্বার্থ। কানেকটিভিটি ব্যবহার করে কোনো একটি দেশ লাভবান হবে, তা হতে পারে না। আমরাও চাই কানেকটিভিটি ব্যবহার করে আমাদের পণ্য নেপাল ও ভুটান যাক। সড়কপথে আমরা যেতে চাই কুনমিংয়ে। কিন্তু এজন্য যা দরকার, তা হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা যদি গড়ে ওঠে, তাহলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভারতের সদিচ্ছা নিয়ে। মোদির খুব ঘনিষ্ঠ অমিত শাহ। এখন তিনি বাঙালি মুসলমানদের, যারা আসামে বংশ পরম্পরায় বাস করে আসছেন, যারা সেখানে ভোট দেন, তাদের পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করে প্রকারান্তরে তিনি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে একটি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিলেন। মোদির ঢাকা সফরের সময় তার বক্তব্য প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এখন অমিত শাহরা উল্টো কথা বলছেন। ফলে বিজেপি সরকারের সদিচ্ছা প্রশ্নের মুখে থাকবেই। বাংলাদেশ ভারতকে যথেষ্ট দিয়েছে। সর্বশেষ ক্যাবিনেট মিটিংয়ে বাংলাদেশ ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। এটা ভারতের জন্য বড় পাওয়া। কিন্তু যেখানে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে, সেখানে বাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা, তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘোষণা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। এরই মধ্যে আসামের বাদ পড়া নাগরিকরা ফের নিবন্ধন করার সুযোগ পাচ্ছেন। আমরা আশা করব এ তালিকায় বাদ পড়া ৪০ লাখ মুসলমানের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে। এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করবে না, আমরা এটা প্রত্যাশা করি। তথাকথিত ‘উইপোকা’ তত্ত্ব যতবেশি কম ব্যবহার করা হবে, ততই মঙ্গল।
Daily Alokito Banglaesh
30.09.2018

একটি সিদ্ধান্ত ও কিছু মৌলিক প্রশ্ন


মন্ত্রিসভা ভারতকে দুটি বন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। ভারত এখন থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। এর ফলে কলকাতা থেকে ১ হাজার ৫৫৯ কিলোমিটার দূরত্বের আগরতলায় এতদিন যে পণ্য পরিবহনে সময় লাগত আট দিন, তা এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৌঁছে যাবে আগরতলায়। ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলোর আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রেও ব্যবহূত হবে এই দুটি পোর্ট। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পৃথিবীর অনেক দেশই, এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ অন্য দেশের পোর্ট ব্যবহার করে থাকে। এটি একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতীয় পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ওই বন্দর দুটি যদি ব্যবহূত হয়, তাতে করে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা? কিংবা চট্টগ্রাম ও মোংলা পোর্টের সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ না করার ফলে এই দুটি পোর্টের সক্ষমতা আছে কিনা ভারতীয় পণ্য হ্যান্ডলিং করার? ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের আমদানি-রফতানি বেড়েছে। এই আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহূত হয় বেশি। বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে ‘নেক্সট ইলেভেন’-এর অন্তর্ভুক্ত একটি দেশ। অর্থাৎ, যে ১১টি দেশ আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে অন্যতম শক্তি হিসেবে অবির্ভূত হচ্ছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। এর অর্থ পরিষ্কার- আগামীতে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাড়বে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ‘চাপ’ বাড়বে। মোংলা বন্দরের ব্যবহার কম। কেননা পলি জমে যাওয়ায় মোংলা বন্দরে জাহাজ তেমন একটা ভিড়তে পারে না। ফলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকেই ব্যবহার করতে হয়। এখানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আরেকটি সমস্যা- বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকা। কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কথা ছিল। চীনের এখানে অর্থায়ন ও বন্দরটি নির্মাণ করার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় (২০১৪) ওই চুক্তিটি স্বাক্ষরের কথা ছিল, কিন্তু স্বাক্ষর হয়নি। পরে জানা গেল, ‘একটি দেশের’ আপত্তির কারণে চুক্তিটি আমরা স্বাক্ষর করতে পারিনি। অথচ সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত হলে তাতে করে আমরা এবং সেই সঙ্গে ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলো ওই গভীর সমুদ্রবন্দরটি ব্যবহার করতে পারত। এমনকি চীনও এই সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারত। কেননা বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এই গভীর সমুদ্র পোর্টের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি ছিল। চীন যে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, বিসিআইএম করিডোর তার একটি অংশ। এর মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরের সঙ্গে কক্সবাজার সড়ক পথে সংযুক্ত হবে। এতে করে চীনা পণ্য সড়ক পথে কক্সবাজারে এসে গভীর সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বিদেশে রফতানি হবে। এর ফলে চীনা পণ্যের দামও কমে যাবে। বাংলাদেশ সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ না করায় চীন এখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে কাইয়াউকপিউতে (Kyaukphyu) একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। চীনের স্বার্থ এখানে অনেক বেশি।
সোনাদিয়ায় যদি আমরা একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে পারতাম, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর থেকে আমরা ‘চাপ’ কমাতে পারতাম। সময় ও দেশের প্রযোজনে পণ্য হ্যান্ডলিং ক্রমাগত বেড়ে গিয়ে বন্দরের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫.৫ শতাংশ। অথচ সেই সমানুপাতে জেটি-বার্থ, টার্মিনাল, ইয়ার্ড, ভারী যান্ত্রিক সরঞ্জামের মতো সুবিধাগুলো দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। মূল জাহাজ চলাচল চ্যানেলের দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় ভরাট হয়ে নাব্য হারাচ্ছে বন্দর। এ কারণে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ বহর থেকে আমদানি পণ্য লাইটারিং করতে গিয়েই সময় ও আর্থিক অপচয় বেড়ে যাচ্ছে। পোর্ট-শিপিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় ভারত যদি এ পোর্ট ব্যবহার করে, তাহলে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে চট্টগ্রাম বন্দরটি। কেননা নিজের সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে বন্দরটি। ২০২০ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে প্রায় ২৮ লাখ টিইইউএস (Twenty-Foot Equivalent unit, ২০ ফুট চওড়া ও ৮ ফুট উঁচু কনটেইনার)। তখন বন্দরের সক্ষমতায় ঘাটতি থাকবে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টিইইউএস কিংবা আরো বেশি। আজ কেবিনেটে ভারতকে এ বন্দর ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বটে। কিন্তু ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময়েই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল। ভারত অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্তুত নিয়ে রেখেছিল। যে কারণে ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। যাতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি সড়কপথে এবং ভবিষ্যতে রেল পথে ত্রিপুরা দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পরিবাহিত হতে পারে। দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুমেব আনন্দপাড়া থেকে রামগড়ের মহামুণি পয়েন্ট পর্যন্ত ৪১২ মিটার দীর্ঘ এবং ১৪.৮ মিটার চওড়া মৈত্রী সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে ভারত সরকার ১২৫ কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়েছে। তা ছাড়া ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে আখাউড়ার সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ তৈরি করা হচ্ছে, যা বন্দর থেকে সরাসরি কন্টেইনার আগরতলায় পৌঁছানোর প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের ব্যাপারে ‘চাপ’ কীভাবে বাড়ছে, তা একটি পরিসংখ্যান দিলে বোঝা যাবে। ২০১২-১৩ সালে এই বন্দর ব্যবহার করে আমদানি হয়েছে ৩,৮৩,১২,০২৮ টন, আর রফতানি হয়েছে ৫০,৫৯,৬৪০ টন। ২০১৪-১৫ সালে এর পরিমাণ ৪,৮৯,৪১,৪০৬ টন (আমদানি) ও ৫৮,৩৯,৯৮৬ টন (রফতানি)। ২০১৬-১৭ সময়সীমায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৬৪,৬৪,২৮৫ টন (আমদানি) ও ৬৭,০৯,৭৫৯ টন (রফতানি)। এর অর্থ একদিকে আমদানির পরিমাণ যেমনি বেড়েছে, ঠিক তেমনি রফতানির পরিমাণও বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, কার্গো হ্যান্ডলিং (টন) এ ২০১২-১৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৯৫ শতাংশ, ২০১৪-১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫.২১ শতাংশে, আর ২০১৫-১৬ সালে ১৫.২৮ শতাংশে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় আগামীতে কার্গো হ্যান্ডলিং কীভাবে বাড়বে। আরো কিছু পরিসংখ্যান দিই। ২০১৪ সালে এই বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৮ লাখ ৬৭ হাজার টিইইউএস। তখন জাহাজ আসা-যাওয়া করে ১ হাজার ৪৭টি। ২০১৫-১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ লাখ ৮৯ হাজার ৪৩৯ টিইইউএস (জাহাজ এসেছে ১১৯৩টি)। আর ২০১৬-১৭ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৮১টি টিইইউএস (জাহাজের সংখ্যা ১২৩০টি)। এর অর্থ কী? কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়ছে দিনে দিনে। সমুদ্রপথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এর মধ্যে আমদানি বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ ভাগ ও রফতানি বাণিজ্যের ৮০ ভাগই পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ গত সাত বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন কোনো কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়নি। অর্থাৎ পণ্য হ্যান্ডলিং বাড়লেও অবকাঠামো আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। তুলনামূলক বিচারে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা কম। ২০১৬-১৭ সালে মাত্র ৮৭টি বিদেশি জাহাজ এখানে ভিড়েছে (মোট জাহাজের সংখ্যা ৬২৩)। আর কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে মাত্র ৭৫.১১ লাখ টন (২০১৬-১৭)। এই বন্দরে নাব্য সঙ্কট রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকছেন চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে। মোদির ঢাকা সফরের পর ভারত কর্তৃক পাঠানো স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে (এসওপি) বাংলাদেশের বন্দর সুবিধার আওতায় ‘অগ্রাধিকার’ ভিত্তিতে তাদের জাহাজ জেটি-বার্থে ভেড়ানো ও পণ্যসামগ্রী ট্রানজিট মজুতের জন্য ‘বিশেষায়িত’ ইয়ার্ড চাওয়া হয়েছে। এখন অব্দি ‘ফি’ও নির্ধারিত হয়নি। কেবিনেটের সিদ্ধান্তের আগেই ২০১৫ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভারতীয় জাহাজ এমভি ইরাবতী স্টার ও এমভি ওশান গ্রুপ। এ সময় কোনো ধরনের ট্যারিফ, ফি, চার্জ, মাসুল কিংবা শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের তাই সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা জরুরি। পায়রাতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে বটে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের ‘চাপ’ কমাতে হলে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। পায়রাতে একটি ভারতীয় কোম্পানি (আদানি গ্রুপ) গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। চীন এখন কোনো ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী। কানেকটিভিটি এ যুগের চাহিদা। চট্টগ্রাম বন্দর শুধু ভারত কেন, অদূর ভবিষ্যতে নেপাল-ভুটান, এমনকি চীনও ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। বিষয়টি নিয়ে ভারত ও চীনের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অভিজ্ঞতা প্রচুর। চীন এ অঞ্চলে হামবানতোতা ও কলম্বো (শ্রীলঙ্কা) এবং গাওদারে (পাকিস্তান) গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে মিয়ানমারের কাইয়াউক পিউতে ছয়টি চীনা কোম্পানি এখন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় কোম্পানির অভিজ্ঞতা কম। তারপরও চীন ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত হতে পারে। এতে ভারত ও চীনের উভয়েরই লাভ।
বাংলাদেশ ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে যে কাজটি করা দরকার, তা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো।
Daily Bangladesher Khobor
 ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
 

মির্জা ফখরুলের জাতিসংঘ দর্শন!


মির্জা ফখরুল জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। এটা কোনো ধরনের নালিশ জানাতে নয়, বরং তার মতে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি অবহিত করতেই তিনি জাতিসংঘের সহকারী সেত্রেুটারি জেনারেল মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতিসংঘ কী স্ব-উদ্যোগে কোনো দেশের নির্বাচন করতে পারে? এটা সত্য জাতিসংঘের ‘ইলেকট্ররাল অ্যাসিসট্যান্স ডিভিশন (ইএডি)’ নামে একটি শাখা আছে। এটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই শাখা পৃথিবীর প্রায় ১০০টি দেশে নির্বাচন করে আসছে। এরা বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের আয়োজনের ক্ষেত্রে ‘টেকনিক্যাল সহযোগিতা’ দেয়, সেখানে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে, নির্বাচন যে ‘সুষ্ঠু’ হয়েছে তা ‘সার্টিফাই’ করে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে। তবে এ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এককভাবে, স্ব-উদ্যোগে ‘ইলেকট্ররাল অ্যাসিসট্যান্স ডিভিশন’ কোনো দেশে নির্বাচনের আয়োজন, পর্যবেক্ষণ বা নির্বাচন মনিটরিং করতে পারে না। শুধুমাত্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনই নয়, বরং ওই দেশের এবং বিবাদমান গোষ্ঠীরও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। নেপালের দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি।
২০০৬ সালের  নভেম্বরে নেপাল সরকার ও মাওবাদীর সাথে একটি শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়। ওই সময় সরকার ও মাওবাদীরা জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানায় সেখানে সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে সাংবিধানিক পরিষদ (সংসদ) গঠিত হবে, তা আয়োজন করে দেখার জন্য। জাতিসংঘ মিশন সেই কাজটি শুরু করে ২০০৭ সালে। ২০০৮ সালের এপ্রিলে সেখানে সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের ‘ইলেক্ট্ররাল অ্যাসিসট্যান্স ডিভিশন’ তাদের লোকবল দিয়ে, পর্যবেক্ষণ দিয়ে এই নির্বাচনের কাজটি সম্পন্ন করে। কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধের পর জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল ১৯৯২-৯৩ সালে, সেখানে ওই সময় প্রায় ৪৬ দেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল (বাংলাদেশসহ)। এই কর্তৃপক্ষ সেখানে নির্বাচর্নে আয়োজন করেছিল। ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল জাতিসংঘ। গৃহযুদ্ধের পর নামিবিয়ায় (১৯৮৯-৯০) জাতিসংঘ একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন পরিচালনা করেছিল এবং সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে জাতিসংঘের ‘ইলেক্ট্ররাল অ্যাসিসট্যান্স ডিভিশন’ (ইএডি) নির্বাচন পরিচালনা করেছে (দেখুন, টঘঙডঅঝ ঘবংি, ১৪ উবপবসনবৎ ২০১৭)। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ওইসব দেশের পরিস্থিতিকে মেলানো যাবে না। ওইসব দেশে গৃহযুদ্ধ চলছি, তারপর বিবাদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়। শান্তিচুক্তি হয় এবং জাতিসংঘ সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে এটা তো সত্য, অতীতে জাতিসংঘের ্উর্ধতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশের উতপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ সফর গেছেন। সরকার ও বিরোধী দলের সাথে কথাও বলেছেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এখনও মির্জা ফখরুল গেলেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তাদের অবহিত করলেন। জাতিসংঘের কর্তাব্যক্তিরা এসব বিষয়ে অবগত নন? নিশ্চয়ই তারা জানেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে তাদের কিছু করার নেই। এটা ঠিক একটা নির্বাচনকালীন সরকারের কথা শুধু বিএনপিই বলছে না, বলতে গেলে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি বাদে প্রতিটি দলই একটি নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট কিংবা ঐক্য প্রক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। বিএনপির পক্ষ থেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর তিন মাস ছুটি’ শীর্ষক একটি ফর্মুলা মাঝেমধ্যে বলা হয়। কিন্তু এটাও অসম্পূর্ণ। তাহলে ওই সময় সরকার পরিচালনা করবে কে? উপরুন্তু সরকার একটি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সংবিধান তাদের পক্ষে। সংবিধান তো প্র্রধানমন্ত্রীর ‘তিনমাস ছুটি’ অনুমোদন করে না! সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকার এই শেষ সময়ে এসে সংবিধান সংশোধন করবে, এটা মনে হয় না। তাহলে সমঝোতাটা হবে কীভাবে?
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় হয়ে গেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রচার বিষয়ক কর্মসূচি। তাতে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান। বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট ও যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার অ্যালিসন ব্লেইক। অনুষ্ঠানে এইচটি ইমাম বলেছেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই’। মঈন খান বলেছেন, ‘সুবিচার ছাড়া রাজনীতিতে শান্তি সম্ভব নয়’। বার্নিকাটের বক্তব্য, ‘গণতান্ত্রিক দেশে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ’। আর ব্লেইকের বক্তব্য ছিল এরকম, ‘নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হওয়া প্রয়োজন’।
এসবই হচ্ছে আসল কথা। নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এবং সবার কাছে  গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে আলোচনাটাই আসল। একটি সংলাপ প্রয়োজন। জাতিসংঘে গিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
Daily Amader Somoy.com
23.09.2018