রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

কোন পথে চীন

Image result for China in 70sগত ১ অক্টোবর চীন তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৭০ বছর পার করার পর যে প্রশ্নটি অনেকেই করার চেষ্টা করেন, তা হচ্ছে কোন পথে যাবে এখন চীন? আগামী ৩০ বছর, অর্থাত্ ২০৪৯ সাল পর্যন্ত, যখন চীন ১০০ বছরে পা দেবে, তত দিন পর্যন্ত কি চীন তার বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে টিকে থাকতে পারবে? এ প্রশ্নটি যথেষ্ট যৌক্তিক ও তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা ১৯৪৯ সালে মাও জেদং যে চীনা রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন, গত ৭০ বছরে চীনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের সাফল্য চোখে লাগার মতো। বিশ্ব আগামী দিনে কেমন চীন দেখবে? গত ১ অক্টোবর চীনের জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং যে ভাষণ দেন, তাতে আগামী দিনের চীন সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। আমার কাছে প্রেসিডেন্ট শির বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে—এতে করে আগামী দিনের চীনের রাজনীতি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। প্রথমত তিনি বলেছেন, কোনো শক্তি চীনের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না। অর্থাত্ চীন যে পথে তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনেছে, তা ধরে রাখবে ও বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে—‘চীনা ভাবধারা ও ঐতিহ্য অনুযায়ী সমাজতন্ত্রের বিকাশ’-এর যে নীতি চীন গ্রহণ করেছে, তা অব্যাহত থাকবে। চীন সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে না, এই মেসেজটিই দিলেন পার্টি চেয়ারম্যান শি চিনপিং। অবশ্যই ‘এই সমাজতন্ত্র’ পুরোপুরি মার্ক্সীয় দর্শন অনুসরণ করবে না। সত্তরের শেষের দিকে সমাজতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতির মিশেলে নতুন যে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক ধারণা’ চীন ধারণ করেছিল, তা অব্যাহত থাকবে। আর বাজার অর্থনীতির ধারণা চীনের ঐতিহ্যেরই অংশ, যার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় কনফুসিয়াস দর্শনের। চীন আগামী ৩০ বছর সমাজতন্ত্রকে পুরোপুরিভাবে পরিত্যাগ করবে না, আবার বাজার অর্থনীতিকেও পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করবে না। দ্বিতীয়ত শি বলেছেন, চীন শান্তিপূর্ণভাবে উন্নয়নপ্রক্রিয়া নিয়ে এগিয়ে যাবে। ‘এক চীন ও দুই নীতি’ অবলম্বন করে হংকং ও ম্যাকাওকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তির পথে কাজ করবে এবং এক চীন নীতি অবলম্বন করে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এক করার পথে তার প্রয়াস অব্যাহত রাখবে। প্রেসিডেন্ট শি এই আহ্বানটা জানালেন এমন এক সময় যখন গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে হংকংয়ে ‘গণবিক্ষোভ’ অব্যাহত রয়েছে। সেখানে স্বাধীনতার দাবি আরো শক্তিশালী হচ্ছে। তাইওয়ান চীনের অংশ—এই দাবি থেকেও চীন সরে আসেনি। ফলে হংকং, ম্যাকাও ও তাইওয়ান সম্পর্কে চীনা নীতি কী হবে, তা তিনি স্পষ্ট করলেন। তৃতীয়ত, তাঁর ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ ও দক্ষিণ চীন সাগর (South China Sea) নিয়ে চীনের এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তাঁর ভাষণে এগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য দিক। তবে এর বাইরে আরো বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। এক. চেয়ারম্যান শির নেতৃত্বে পলিটব্যুরোর সাতজন সদস্য তিয়ানানমেনের জাদুঘরে সংরক্ষিত মাও জেদংয়ের মাওসোলিয়াম পরিদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদন। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো চীনা নেতা মাওসোলিয়ামে গেলেন (সিএনবিসি নিউজ)। এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান শি এই প্রথমবারের মতো বিখ্যাত ‘মাও পোশাক’ পরে হাজির হলেন (সাধারণত তিনি ‘স্যুটেড-বুটেড’ হয়ে এ ধরনের অনুষ্ঠানে আসেন)। এটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে অনেক দিন পর চীনা নেতৃত্ব মাওয়ের অবদানকে স্মরণ করলেন। দুই. মার্চপাস্টে চীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র (ডিএফ-৪ মিসাইল, জে-২০ ফাইটার বিমান, যা পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য) প্রদর্শন করে। এর অর্থ পরিষ্কার—চীনকে সামরিক দিক দিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না। মার্চপাস্টে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনকেও দেখা গেল। ১৯৮৯ সালে চীনের তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে (তিয়ানানমেন) অপসারিত হন জিয়াং জেমিন। তিয়ানানমেনের ঘটনা নিঃসন্দেহে চীনের সমসাময়িক রাজনীতির জন্য একটি বড় ঘটনা। একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে বহুদলীয় গণতন্ত্র কতটুকু গ্রহণযোগ্য কিংবা তা আদৌ কাজ করবে কি না (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, তিনি জীবদ্দশায় চীনে গণতন্ত্র দেখে যাবেন), এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সংস্কারের প্রয়োজন আছে। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের পতন ঘটাবে, যেমনটি ঘটেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে। সুতরাং দেং জিয়াও পিংয়ের সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। ছাত্রদের চাপের মুখে গণতন্ত্র নয়।
চীন একটি বড় দেশ। বিপুল জনগোষ্ঠীর বাস এই দেশে। ৫৫টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি রয়েছে এ দেশে। এ দেশে পশ্চিমা গণতন্ত্র কাজ করবে না। আজকের যে চীন—দেশটিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার মূল কর্তৃত্ব শি চিনপিংয়ের। চীনের ৭০ বছরের রাজনীতিতে যে তিনজন অদূরদর্শী নেতার কথা বলা হয়, তাঁর একজন হচ্ছেন শি চিনপিং (বাকি দুজন মাও ও দেং)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি মাওকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ২০১৭ সালে বিখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল (১৪ অক্টোবর)। আর ২০১৮ সালে ফোর্বস (Forbes) তাঁকে শুধু বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবেই চিহ্নিত করেনি, বরং প্রভাব বিস্তারকারী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল (৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)। ফোর্বস তাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়েও ওপরে স্থান দিয়েছিল। ২০১২ সালের পর থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন (প্রেসিডেন্ট ২০১৩ থেকে)। পার্টির দায়িত্ব নিয়ে তিনি অর্থনীতিতে আরো সংস্কার আনেন। এ সময় Laogai পদ্ধতি, অর্থাত্  Reeducation through labour—এটা তিনি বদলে ফেলেন। এক সন্তানের যে চীনা নীতি, তা-ও তিনি বদলে ফেলেন। পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযান পরিচালনা করে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। বৈদেশিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই তিনি ২০১৩ সালে কাজাখস্তান সফরের সময় তাঁর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) উপস্থাপন করেন। বিআরআই (যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক থেকে আট ট্রিলিয়ন ডলার) প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের একটি দর্শন। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৬৫টি দেশকে চীনের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। বিআরআই দুইভাবে কাজ করবে—প্রথমত, সড়ক ও রেলপথে মধ্য এশিয়া, পাকিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ ইউরোপ পর্যন্ত সংযুক্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা হয়ে সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত তা সংযুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে চীনা পণ্য অতি দ্রুততার সঙ্গে ও সহজলভ্যে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে। চীন বিআরআইয়ের অধীন দেশগুলোকে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেবে। তবে এই চীনা ঋণ নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, ঋণ দিয়ে চীন ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলছে দেশগুলোকে। তবে বিআরআই নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, বিআরআই যে চীনকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি সফল হলে পৃথিবীর জনসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষ চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাংলাদেশও বিআরআইয়ের আওতায় চীন থেকে ঋণ নিচ্ছে। একজন গবেষক এলিজাবেথ ইকোনমি লিখেছেন, ‘Under XI, China now actively seeks international norms and institutions, and forcefully asserts its presence on the global stage।’ মিথ্যা বলেননি এলিজাবেথ ইকোনমি। চীনের আর্থিক ভিত্তি চীনকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে এবং চীনকে বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছে। বিআরআই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরো একটি উদ্দেশ্য কাজ করছে—তা হচ্ছে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মার্কিনি আগ্রাসনের মুখে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ Pivot to Asia’ পরিকল্পনায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। এর বিপরীতেই মার্কিনি প্রভাব কমাতে চীন তার বিআরআই পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে আগামী দিনে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর জন্ম দিতে পারে।
চীন এখন পরিপূর্ণভাবে বদলে গেছে। চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় (১৯৭৮) সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল, চীনা সৈন্যরা কোথাও কোথাও খালি পায়ে (বুট ছাড়া) যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সেই চীন এখন বদলে গেছে। যে চীনের নাগরিকরা একসময় তাদের ঘরে একটি সেলাই মেশিন থাকলে তা নিয়ে গর্ব করত, সেই চীন এখন বিশ্বের ধনী দেশগুলোর একটি। ২০১৯ সালের অভিক্ষণ অনুযায়ী বিশ্বে জিডিপিতে শীর্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র (২১৪৮২.৪১ বিলিয়ন ডলার)। এর পরের অবস্থান চীনের, ১৪১৭২.২০ বিলিয়ন ডলার  (STATICS TIMES, IMF, April 2018), কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে শীর্ষে থাকবে চীন (২৭৪৪৯.০৫ বিলিয়ন ডলার), যুক্তরাষ্ট্র নিচে নেমে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে (২১৪৮২.৪১ বিলিয়ন ডলার)। পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, উনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্রিটেনের হাতে
(Pax Britanica), বিংশ শতাব্দী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে (American century)| আর একুশ শতক হবে চীনের, চীনা ভাষায়
(Pinyin), যার আভিধানিক অর্থ The Chinese century। এই  Chinese century-B বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে একুশ শতকে। এ ক্ষেত্রে গত ৭০ বছরে চীনের যে অগ্রগতি, সে ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। চীন ছিল একটি কৃষিভিত্তিক সমাজ, কৃষিতে উত্পাদনের পরিমাণ যেখানে (১৯৪৯) ছিল ১১৩.১৮ মিলিয়ন টন, তা ২০১৮ সালে বেড়েছে ৬৫৭.৮৯ মিলিয়ন টন। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে চীন এখন ‘বিশ্ব উত্পাদন কারখানায়’ পরিণত হয়েছে।
মাথাপিছু আয় ছিল (১৯৫২) মাত্র ৫৪ ডলার, তা এখন ৯ হাজার ৭৩২ ডলার, অর্থাত্ ১৮০ গুণ বেশি বেড়েছে। জিডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৭.৯ বিলিয়ন ইউয়ান (১৯৫২), তা এখন বেড়েছে ৯০ হাজার ৩১ বিলিয়ন ইউয়ানে)। রিজার্ভ ছিল মাত্র ১০৮ মিলিয়ন ডলার (১৯৫২), ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ৩০ লাখ ৭২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ডলার। চীন এখন রপ্তানি করে চার হাজার ৬০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা ছিল মাত্র ১.১৩ বিলিয়ন ডলার ১৯৫০ সালে। প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন মানুষকে (৭৫ কোটি) চীন দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনতে পেরেছে। চীন এখন ১৪.১৭ ট্রিলিয়ন (১৩৬১০০০০ মিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতি। যা বিশ্বের দ্বিতীয় (কিন্তু পিপিপির হিসাবে প্রথম)। চীনের অর্থনীতির ৬০ শতাংশ এখন নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তিগত খাত। আর ৮০ শতাংশ চাকরি হচ্ছে ব্যক্তিগত খাতে। সুতরাং এই যে চীন, এই চীনকে অস্বীকার করা যাবে না। সুতরাং কেমন হবে আগামী দিনের চীন? চীনে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বহাল থাকবে, যা ধ্রুপদি মার্কসবাদ অনুসরণ করবে না। সেনাবাহিনী পার্টির প্রতি এখনো অনুগত। এখানে পশ্চিমা মডেলের কিংবা জাপানি মডেলের গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। অনেকটা ‘সিঙ্গাপুর মডেলে’ একদলীয় শাসন, কঠোর দুর্নীতিমুক্ত একটি শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে চীনে বিকশিত হবে। তবে ‘সিঙ্গাপুর মডেলের’ সঙ্গে পার্থক্য এখানে যে ‘সিঙ্গাপুর মডেল’ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কিছুটা ধারণ করে। আর চীনে সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে একটি সমাজব্যবস্থা বিকশিত হচ্ছে, যেখানে সিঙ্গাপুরের মতো দু-একটি বিরোধী দলের উপস্থিতি এখন অবধি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
Daily Kalerkontho
14.10.2019

একটি হত্যাকাণ্ড, অনেক প্রশ্ন

Image result for BUET Student Fahad Killing cartoon

একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বুয়েটে। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে সেখানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর যারা ফাহাদকে হত্যা করেছে, তারা সবাই বুয়েটের ছাত্র- এ দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন! আমরা ধরে নিতে পারি দেশের সেরা মেধাবীরাই বুয়েটে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। কিন্তু ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণ করল বুয়েটে মেধাবীদের পাশাপাশি খুনিরাও পড়তে যায়! এ ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং ৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের পর দেশের সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনেক প্রশ্ন সামনে এনেছে। এক. এটি একটি পরিষ্কার ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’। কারণ ফাহাদকে খুন করা হয়েছে ফেসবুকে দেয়া তার একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে, যেখানে তিনি সম্প্রতি ভারতকে গ্যাস, ফেনী নদীর পানি এবং মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ স্ট্যাটাসের কারণে বুয়েটের ছাত্রলীগের ছেলেরা খুশি হতে পারেনি। এ স্ট্যাটাসের জের ধরে তারা ফাহাদকে মারধর করে। তাতেই তিনি মারা যান। রাজনীতিতে অসহিষ্ণুতা কোন্ পর্যায়ে গিয়েছে, এটা তার বড় প্রমাণ। মতপ্রকাশের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। ফাহাদ একটা মতামত দিয়েছেন। তবে সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে তিনি সরকারপ্রধান কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এতে অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এর পেছনে কাজ করেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ভিন্নমতের অনুসারীদের সহ্য না করার মানসিকতা। এ মানসিকতা আজ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। এটা এলার্মিং।
দুই. অভিযুক্তরা সবাই ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার নেতা ও কর্মী। খুনের মামলায় যাদের গ্রেফতর করা হয়েছে, তারা সবাই খুনের ঘটনা স্বীকারও করেছে। শুধু বুয়েটই নয়, প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই টেন্ডারবাজি, অত্যাচার, তথাকথিত ‘টর্চার সেল’- প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়। ছাত্রলীগের এক সংগ্রামী ঐতিহ্য রয়েছে। এখনকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেই ঐতিহ্য ধারণ করেন না। সুতরাং সময় এসেছে ছাত্রলীগের ভেতরে বড় ধরনের ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানোর। বিশেষ করে আদর্শগতভাবে তাদের কীভাবে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করা যায, সে প্রচেষ্টা চালানো উচিত।
তিন. আমাদের জাতীয় নেতারা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা জন্ম দেয়ার জন্য দায়ী। উচ্চপর্যায় থেকে যখন বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, তখন তা প্রান্তিক পর্যায়ে চলে আসবে এটা স্বাভাবিক। এ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করা জরুরি। আর এ উদ্যোগটা নিতে হবে রাজনীতিকদেরই।
চার. প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে একটি শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। এখন দরকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা। ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করেছেন। এখন যা দরকার তা হচ্ছে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাদের আমলনামা গোয়েন্দাদের দিয়ে তদন্ত করা। শুদ্ধি অভিযানটা খুবই জরুরি। তাতে সরকারেরই লাভ।
পাঁচ. ফাহাদ হত্যাকাণ্ড এ যুক্তিকেই জোরালো করল যে, লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। কোনো ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্র রাজনীতি থাকবে না। ছাত্র রাজনীতি থাকতে পারে; কিন্তু তা হতে হবে শুধু ছাত্রদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। জাতীয় রাজনীতির বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে জাতীয় নেতাদের কাছে। কোনো দল কোনো ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রসংগঠনকে স্বীকৃতি দেবে না। জাতীয় দলগুলোর সমর্থক থাকতেই পারে; কিন্তু ক্যাম্পাসে তা প্রকাশ করার কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে তা সংসদে পাস করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এমন একটি আইন প্রণয়ন করা জরুরি। যেখানে দলীয় ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে।
ছয়. ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে যে প্রতিক্রিয়া দেখলাম, তা আমাদের একটা মেসেজ দেয়, আর তা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ আর হতাশা বিরাজ করছে। নানা কারণে মানুষের মাঝে এ হতাশা আছে। এ হতাশা থেকে কী করে বেরিয়ে আসা যায়, তা এখন দেখতে হবে। সরকারপ্রধানের দিকে তাকিয়ে আছে মানুষ। সাধারণ মানুষের ভরসা তার কাছেই।
সাত. ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা পর বুয়েটের ভিসি ক্যাম্পাসে যান। ফলে তার প্রতি শিক্ষার্থীদের যে ক্ষোভ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। একজন ভিসি কি এমনটি পারেন? তিনি তো ছাত্রদের অভিভাবক। একজন ‘পিতা’। একটা ছেলে খুন হল, তিনি এলেন না, জানাজায়ও অংশ নিলেন না। কেমন ভিসি তিনি? এটা অন্যায়, অপরাধও। তার জন্য বোধকরি পদত্যাগ করাই শ্রেয়! এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করল শিক্ষা মন্ত্রণালয় যাদেরকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়, তাদের সেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি আছে। গত ১০ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় যাদেরই ভিসি বানিয়েছে, তারা সবাই দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দিলে তা উচ্চশিক্ষা ও ছাত্রদের স্বার্থ যে দেখে না, বুয়েটের ভিসি এর সর্বশেষ উদাহরণ।
আট. বুয়েটের ছাত্ররা কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছে। এগুলো নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন বলা হয়েছে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে বুয়েট এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সুতরাং বুয়েটের সিন্ডিকেট, এ সিদ্ধান্তটি নিতে পারে। বুয়েট কর্তৃপক্ষ শিক্ষক সমিতিরও পরামর্শ নিতে পারে। সীমিত সময়ের জন্য হলেও ছাত্র রাজনীতি এবং র‌্যাগের নামে মানসিক নির্যাতন বন্ধ হোক। অভিযুক্ত ছাত্রদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, সে ব্যাপারে আইনি পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনেই ছাত্রত্ব বাতিল করা যায়। মামলা চালানো ও ফাহাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধানও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আছে। সিন্ডিকেট সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেয়া যায় কিনা, তা বুয়েট কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দেখতে পারে। ইতিমধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন। অর্থাৎ ছাত্রদের অনেক দাবি-দাওয়া মেনে নেয়া যায়। ছাত্রদের ১০ দফার মধ্যে বুয়েটের ভিসির পদত্যাগের দাবি নেই। ভিসি নিজেও জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। ফলে এ দাবিটি মুখ্য হচ্ছে না। যদিও বুয়েট অ্যালামনাই দাবি করেছে ভিসির পদত্যাগের।
নয়. যে ছাত্রের রুমে (শেরেবাংলা হল, রুম নং ২০১১) ফাহাদকে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়, সেই রুমের বাসিন্দা ছাত্রলীগের (বুয়েট) উপ-আইন সম্পাদক। এ লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত তাকে মামলার এজাহারে যুক্ত করা হয়নি এবং ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়নি। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠেছে। একজন নিরীহ ছাত্র যাতে হয়রানির স্বীকার না হন, এবং যে দোষী সেও যাতে মাফ না পায়, দুটি বিষয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতা পুলিশ খতিয়ে দেখবে।
ফাহাদ হত্যাকাণ্ড আমাদের ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি ‘ক্ষত’ সৃষ্টি করেছে। ছাত্র রাজনীতি আজ এ পর্যায়ে কেন এলো, তা ভেবে দেখা দরকার। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের বেপরোয়া আচরণের আবারও প্রকাশ ঘটল, যখন ছাত্রলীগের ছেলেরা জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এটা ভালো নয় এবং এতে করে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না। ছাত্রলীগের এ বেপরোয়া আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাগ কিংবা মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দিতে ছাত্রলীগের ছেলেরা সাধারণ ছাত্রদের বাধ্য করে। সাধারণ ছাত্রদের কোনো উপায় থাকে না, হলে থাকার স্বার্থেই তারা বাধ্য হয় মিটিং-মিছিলে যোগ দিতে। কিন্তু এতে করে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা বাড়বে না। সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থে কাজ করলেই জনপ্রিয়তা বাড়বে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এ ব্যাপারে একটি কঠোর নিদের্শনা দিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও প্রয়োজনে কিছু নির্দেশনা দিতে পারে। ছাত্রনেতারা টেন্ডারবাজি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। খোঁজ নিলে জানা যাবে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সিনিয়র নেতারা এ টেন্ডারবাজি করে ছাত্র অবস্থাতেই গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছে। এ ব্যাপারে শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা থাকা উচিত।
একজন বাবা হিসেবে ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে আমি ব্যথিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী- বুয়েটের শিক্ষকরা ফাহাদকে বাঁচাতে পারেননি। এতে ছাত্রদের যে ক্ষোভ ও দুঃখ, তাতে কোনো অন্যায় আমি দেখি না। তবে বুয়েটের একটা সম্মান আছে, মর্যাদা আছে। অপরাজনীতির কারণে দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি আরও নষ্ট হোক- আমরা তা কেউই চাইব না। ফাহাদ আর আমাদের মাঝে কোনোদিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার ‘মৃত্যু’ যদি আমাদের কিছু ‘শিক্ষা’ দিয়ে যায়- সেটাই হবে আমাদের বড় পাওয়া
Daily Jugantor
12.10.2019

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও আমাদের পররাষ্ট্রনীতি



প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর শেষ হয়েছে। গেল শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনটি প্রকল্পেরও উদ্বোধন করা হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর এটা ছিল প্রথম সফর। এর আগে ২০১৭ সালে তিনি ভারত সফর করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেকগুলো। প্রথমত, তিস্তার পানিবণ্টনের ব্যাপারে ভারত সরকারের একটি ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের একটি কার্যকর ভূমিকা। তৃতীয়ত, আসামের এনআরসি প্রশ্নে ভারত সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা। এ ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হলো? তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ২০১১ সালে দুই দেশের সরকার যে অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামোয় একমত হয়েছিল কবে তা বাস্তবায়ন হবে, বাংলাদেশের জনগণ অধীর আগ্রহে সেই অপেক্ষায় আছে’ (বিবিসি বাংলা)। যৌথ বিবৃতিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ভারত সরকার তিস্তায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেছে, যাতে দ্রুত সম্ভব একটি তিস্তাচুক্তি করা যায় (ওই)। এর আগেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছিল। এটা অনেকেই তখন জানেন যে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণেই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হচ্ছে না। তবে এবারের সফরে ৬টি অভিন্ন নদীর (মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতি, ধরলা, দুধকুমার) পানি কীভাবে ভাগাভাগি করা যায়, তার একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করতে যৌথ নদী কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরার সাবরুম শহরে সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ প্রশস্ত করতে যে অধিকতর প্রয়াস দরকার, দুই দেশ এ ব্যাপারে একমত হয়েছে। বলা ভালো, জাতিসংঘে সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে যে ভোটাভুটি হয়েছে তাতে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয়নি। এনআরসি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় উৎকণ্ঠার কারণ। সম্প্রতি নিউইয়র্কে হাসিনা-মোদি সাক্ষাতের পর বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় বলা হয়েছিল যে, এনআরসি প্রশ্নে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেইÑ এমনটাই মোদি শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে এনআরসি (আসামের নাগরিকপঞ্জি) সম্পর্কে কোনো কথা বলা হয়নি। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য, এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যৌথ বিবৃতিতে অভ্যন্তরীণ বিষয় স্থান পেতে পারে না। এক যুক্তিতে এটা ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে একটা উৎকণ্ঠা কাজ করেÑ তা হচ্ছে আসামের যে ১০ লাখ মুসলমান নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন (যাদের অভিহিত করা হয়েছে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে), তাদের আসাম রাজ্য সরকার বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করতে পারে! যদিও এটা হয়তো এই মুহূর্তে হবে না তবে তাদের অনেককে তথাকথিত ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বারবার হুমকি, এ ধরনের একটি সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে এই ১০ লাখ মুসলমান এক ধরনের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আলোচনায় তিনি সন্তুষ্ট (নিউজ এইট, বাংলা)। নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। প্রধানমন্ত্রী মোদি জানিয়েছেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আজ অন্যমাত্রা পেল।’ তিনি বলেছেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বন্ধুত্বের অন্যতম উদাহরণ বিশ্বের কাছে’।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও চীনের সম্পর্ক নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনেকেই কৌতূহল প্রকাশ করেছেন। ভারত সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়েছিলেন (জুলাই ২০১৯)। এটা নিয়ে কোনো কোনো ভারতীয় বিশ্লেষক একটি নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে ওই সফরকে দেখেছিলেন। বাংলাদেশ বেশি মাত্রায় চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে, এমন মন্তব্যও ছিল কারও কারও। বাংলাদেশ চীন থেকে দুটি সাবমেরিন কিনেছিল, এটা নিয়েও ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাউকে কাউকে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখেছি। তবে একজন বিশ্লেষক সি উদয় ভাস্কর ( C. Uday Bhaskar) একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে তা দেখেছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে তিনি লিখেছেন,  " India should not make Bangladesh pick sides between it and China " ( 2 October 2019 )। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। ভারতের এমন কোনো কিছু করা ঠিক হবে না, যা বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য চীনের পাশাপাশি ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে। তবে কিছু সমস্যা তো আছেই। বাংলাদেশ চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনায় যোগ দিয়েছে। কিন্তু ভারত দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিনি চীনা প্রধানমন্ত্রী লিকে ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিসিআইএমের অবকাঠামো খাত নির্মাণের আহ্বান জানালেও এতে ভারতের ‘ভূমিকা’ নিয়ে একটা প্রশ্ন আছেই। ভারত না চাইলে সিপিআইএম করিডরের ধারণা শুধু ধারণা পর্যায়েই থেকে যাবে।
চীনের আংশিক সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্প এখন বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে বা হবে। এ ক্ষেত্রে চীনা ঋণের শর্ত কী, সুদের হার কী, আমরা তা জানি না। সাম্প্রতিককালে ‘চীনা ঋণ’ নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঋণগ্রহীতা দেশগুলো এক ধরনের ‘চীনা ঋণফাঁদ’-এ পড়েছে এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে (শ্রীলংকা, কেনিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া)। তবে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি নিজে একজন অর্থনীতিবিদও বটে, তিনি আমাদের জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ‘আমরা যাতে চীনের ঋণের ফাঁদে না পড়ি, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছি (জাগোনিউজ, ২৮ জুন)। বলা হচ্ছে বাংলাদেশ যে চীনা ঋণ পাচ্ছে (৩১ বিলিয়ন ডলার), তা পাকিস্তানের সিপিইসির ( CPEC ) পর (৬০ বিলিয়ন ডলার) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণ (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ৫ জুলাই)। সুতরাং চীনা ঋণ নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। তবে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, চীনের প্রতি তিনি ঋণচুক্তির শর্তাবলি সহজ করার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক সময়ে তহবিল ছাড়ের আহ্বান জানিয়েছেন। চীন এই আহ্বানে কতটুকু ছাড় দিয়েছে, সে বিষয়ে অবশ্য আমরা তেমন কিছু জানি না। উন্নয়নকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি। এজন্য আমাদের বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ওবিওআরে যোগ দিয়েছে। এর ফলে চীনের ঋণ পাওয়া আমাদের জন্য সহজ। কিন্তু আমরা যেন শ্রীলংকার হামবানতোতা সমুদ্রবন্দরের অভিজ্ঞতার কথা ভুলে না যাই। মালয়েশিয়ার কথাও যেন আমাদের মনে থাকে। তবে চীনা ঋণ আমাদের প্রয়োজন আছে। চীন অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে থাকে। ওই ঋণ আমাদের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমরা ভারতীয় ঋণও গ্রহণ করছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ সফর করেছিলেন ২০১৫ সালের ২৭ মে। এর পর প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যান ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের ঋণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। চীনের মতো ভারতের জন্যও বিশেষ ইপিজেড তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সেখানে বিনিয়োগ করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তা স্বীকারও করেছেন। ৪০ বছরের ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাসরত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘তাদের ইচ্ছায়’ ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ভারতে প্রবেশ করে নাশকতামূলক কর্মকা- পরিচালনা করত। এখন তার অবসান হয়েছে। আমরা ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। আরও বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যে এখন ভারতের পণ্য যাচ্ছে। তবে দুদেশের মধ্যে সমস্যা যে নেই, তা নয়। যেমন তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো হয়নি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে। টিপাইমুখ বাঁধ ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও কথা আছে। বাংলাদেশ ভারতে তার বাণিজ্য রপ্তানি বাড়াতে পারছে না শুধু ট্যারিফ আর প্যারা ট্যারিফের কারণে। সীমান্ত হত্যা আজও বন্ধ হয়নি। গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে। তখন জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা বাড়বে ৩ গুণ। সুতরাং পানিবণ্টনের বিষয়টি নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের আলোচনা শুরু করাটা জরুরি। ভারতে পানি সংকট রয়েছে। এখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যদি বাস্তবায়িত হয়, তা হলে বাংলাদেশে পানি সংকট দেখা দেবে।
দক্ষিণ এশিয়া বড় ধরনের পানি সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে কীভাবে পানি সমস্যার সমাধান করা যায়। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে ‘রিজার্ভিয়ার’ নির্মাণ করে পানি ধরে রাখা ও শুষ্ক মৌসুমে তা ছেড়ে দেওয়াÑ এ ব্যাপারে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া দরকার। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় আমরা নতুন একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা শুনেছিলাম (বিপিআইএন)। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও পানি সমস্যার সমাধানে এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ভুটান ও নেপালে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানি সংরক্ষণের একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের উন্নয়নে এই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা বাংলাদেশ যদি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে তা হলে তা ভারতের সীমানার ওপর দিয়ে আসতে হবে। এতে করে ভারতের সম্মতির প্রয়োজন।
আমরা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর আস্থা রাখতে চাই। তিনি যখন বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আজ অন্যমাত্রা পেল’, তখন এই আস্থার জায়গাটা আরও বেড়ে যায়। এখন দেখার পালা এই আস্থার জায়গাটা কতটুকু পূরণ হয়।
Daily Amader Somoy
08.10.2019

সংবাদগুলো আমাদের কোনো বার্তা দেয় কি না


Image result for Climate change
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে একের পর এক সংবাদ ছাপা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। এই সংবাদগুলো নিংসন্দেহে আমাদের জন্য চিন্তার কারণ। আর সংবাদগুলো ছাপা হচ্ছে এমন এক সময় যখন সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বিশ^ব্যাপী একটা ‘ক্লাইমেট মার্চ’ হয়ে গেল। ১৬ বছর বয়সি সুইডেনের এক স্কুল শিক্ষার্থী গ্রেটা থানবার্গ বিশ^ব্যাপী এই ক্লাইমেট মার্চের ডাক দিয়ে বিশ^ সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের তালিকায় ইতোমধ্যে তার নাম উঠে গেছে। বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি যে পৃথিবী নামের গ্রহটির জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, তা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানিকে। অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন ও এর ব্যবহারের কারণেই বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেশি নির্গমন হচ্ছে, যাতে করে বাড়ছে বিশে^র উষ্ণতা। তাই বিশ^ব্যাপী গাছ লাগানোর একটি উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে গাছ কার্বন-ডাই-অক্সাইড ধরে রাখতে পারে। তাই বেশি বেশি করে গাছ লাগালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নির্গমন হবে কম।

বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সাগর মহাসাগরের পানি বৃদ্ধি পাবে, আর তাতে যেসব সমুদ্রপারের দেশের ক্ষতি হবে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কতটুকু সচেতনতা গড়ে তুলতে পেরেছি? সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো জানিয়েছেন, দেশটি ২ বিলিয়ন গাছ লাগাবে। নরওয়ে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করেছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে বিশে^র ২.২ বিলিয়ন একর জমিতে যদি গাছ লাগানো যায়, তাহলে বিশে^ যে কার্বন নির্গমন হয়, তার তিন ভাগের দুই ভাগ ধরে রাখতে পারবে। বিশে^ উষ্ণতা রোধ করার জন্য ২০১৫ সালে কপ-২১ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এ ব্যাপারে উদ্যোগটা কম। বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো আদৌ দায়ী নয়। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্ব।

শিল্পোন্নত ১০টি দেশ বিশে^র কার্বন নিঃসরণের ৬৭.৬ ভাগ নিজেরা নিঃসরণ করে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীন। দুঃখজনক হচ্ছে, ‘কপ-২১’-এ যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হয়ে এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। সারা বিশ^ যেখানে এটা স্বীকার করে নিয়েছে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি দায়ী, সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণিত সত্যকে বিশ^াস করতে চাইছেন না। বলা হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে।
এতে করে বাড়ছে সাগর মহাসাগরের জলরাশি। ডব্লিউএমও-এর সর্বশেষ রিপোর্টে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছেÑ কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অতীতের চেয়ে ২০১৫-১৯ সময়সীমায় ২০ শতাংশ হারে বেড়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে যেখানে সাগরের জলসীমার উচ্চতা বেড়েছে গড়ে ৩.২ মিলিমিটার সেখানে ২০১৫-১৯ সময়সীমায় বেড়েছে ৫ মিলিমিটারের ওপর (এবিসি নিউজ ২২ সেপ্টেম্বর)। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বারবার ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। দ্বীপাঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো আতঙ্কের মধ্যে আছে। এ ক্ষেত্রে বড় রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যে দায়িত্ব পালন করার কথা; যুক্তরাষ্ট্র তা পালন করছে না।

জাতিসংঘের ব্যর্থতা এখানেই যে, বিশে^র উষ্ণতা রোধে জাতিসংঘ সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সুতরাং ভয়টা এখানেই। কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, তা কতটুকু আবেদন রাখতে পারবে? ইকোনমিস্টের একটি কভার স্টোরি ‘দ্য ক্লাইমেট ইস্যু’ (২১ সেপ্টেম্বর)। এ প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে কীভাবে বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাময়িকীটি একটি তথ্য দিয়েছে।
তাতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে। ব্যক্তি পর্যায়ে এর পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রে ৫.৩ গিগাটন, মধ্যপ্রাচ্যে ২.৭ গিগাটন, ইউরোপে ৪.৯ গিগাটন, চীনে ৯.৮ গিগাটন, এশিয়া প্যাসিফিকে ৫.১ গিগাটন, ভারতে ২.৫ গিগাটন ইত্যাদি (বিশে^ গড় ৪.৬ গিগাটন, ২০১৭ সালের হিসাব)। বিকল্প জ্বালানির অভাব এবং না থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বেশিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। নিশ্চয়ই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটা উপলব্ধি করেন। তাই তিনি যখন কপ-২১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন, তার বিবেচনায় এটা ছিল। তবে এটা ঠিক, বিকল্প জ্বালানির উৎপাদন, গবেষণা ইত্যাদির দিকে তিনি নজর দিতে পারতেন।

এখন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা শিল্পোন্নত দেশগুলো উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে যে ক্ষতি হবে, তা হয়তো কাটিয়ে উঠতে পারবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার সোলার বা বায়ু এনার্জির প্রসার ঘাটিয়ে তারা এনার্জি চাহিদা পূরণ করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশসহ সাগরপারের দেশগুলো? অনেক দেশ এখন ঝুঁকির মধ্যে আছে। প্যারিস কপ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, উন্নত দেশগুলো পরিবেশ রক্ষায় উন্নয়নশীল, বিশেষ করে সাগরপারের দেশগুলোকে সাহায্য করবে। কিন্তু তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি গত চার বছরেও। বলা ভালো, উন্নত বিশে^র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ^ জিডিপির ৭৫ শতাংশ আর তারা কার্বন নিংসরণ করে ৬৭.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ এসব উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতিবছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে।

গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় দীপাঞ্চলের মানুষ ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রতি ৭ জনে একজন মানুষ উদ্ধাস্তুতে পরিণত হবে। বাংলাদেশ কোপেনহেগেন কপ সম্মেলন (২০০৯) এসব উদ্ধাস্ত মানুষকে ইউনিভার্সাল ন্যাচারাল পারসন হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এ দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি। বাংলাদেশ জাতিসংঘে এ দাবি আবারও উত্থাপন করেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় যে বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টিও। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বিশে^র উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে তার উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ অর্থায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিলেও, অভ্যন্তরীণভাবে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে কম। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেককে তিনটি করে গাছ লাগানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটা কম। বন অধিদফতরের কোনো উদ্যোগও আমার চোখে পড়ছে না। পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের একটি কাজে জড়িত হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারত। কিন্তু পরিবেশ কিংবা বন মন্ত্রণালয়, কারও কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

গাছের কোনো বিকল্প নেই। গাছ লাগানোর ব্যাপারে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। নিউজিল্যান্ড সরকার ১০০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছে পরিবেশ রক্ষার জন্য। দেশটি ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে চায়। এ জন্যই গাছ লাগানোর এই পরিকল্পনা। ফিলিপাইন নতুন একটি আইন প্রণয়ন করেছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী ১০টি গাছ না লাগালে তাকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি দেওয়া যাবে না। ইতোমধ্যে আইনটি ফিলিপাইনের আইন সভায় পাসও হয়েছে। ভারতের দৃষ্টান্ত দেই।
উষ্ণতা রোধকল্পে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে স্কুল শিক্ষার্থীরাসহ সবাই এক দিনে ২২ কোটি গাছ লাগিয়েছে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশের মোট বাসিন্দা ২২ কোটি। সবাই একটি করে গাছ লাগিয়েছে ১৪,৩০,৩৮১টি জায়গায়, যার মাঝে আছে ৬০ হাজার গ্রাম, আর ৮৩ হাজার জঙ্গলের চিহ্নিত এলাকা। এই তথ্যটি দিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যানাথ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ৩টি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ^ অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে উল্লেখ করেছিলেনÑ জলবায়ু পরিবর্তন একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি। এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শেখ হাসিনা সম্মেলনে বলেছিলেন, Climate change  is a security threat. We must act now. The time to act on climate changes, even slightly, I invite you to visit Bangladesh. I am ready to walk with you to show how climate change silently impacts the lives of million ( WEFORUM.ORG, 26 March 2019)। সুতরাং গাছের প্রয়োজনীয়তা যে কতটুকু তা যদি প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করে থাকতে পারেন, তাহলে পরিবেশমন্ত্রী, বনমন্ত্রী কিংবা অতি ক্ষমতাধর আমলারা তা অনুধাবন করছেন না কেন? পরিবেশ মন্ত্রণালয় না অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিরা বিদেশ সফর পছন্দ করেন। কপ সম্মেলনে তারা যান বারবার।

কিন্তু দেশে ফিরে এসে তাদের উদ্যোগগুলো কই? ভারতে আদিত্যনাথের মতো মানুষও যদি তার রাজ্যে ব্যাপক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন, আমাদের পরিবেশমন্ত্রী এমন ধরনের একটা উদ্যোগ নেন না কেন? আমি বিশ^াস রাখতে চাই, আমাদের পরিবেশমন্ত্রী ও আমলারা গাছ লাগানো সম্পর্কিত সংবাদগুলো পাঠ করেছেন। এ থেকে তারা যদি কিছু শিক্ষা নিয়ে থাকেন, আমাদের লাভটা সেখানেই।
Daily Shomoyer Alo
06.10.2019

এসব ভিসি লইয়া কী করিব?

শেষ পর্যন্ত গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এই পদত্যাগ করা ছাড়া তার কাছে আর বিকল্প কিছু খোলা ছিল না। যখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় এবং ফিরে এসে তার অপসারণের সুপারিশ করে, তখন তার কাছে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু তার এই পদত্যাগ সেখানে বিরাজমান সব সমস্যার সমাধান করবে না। জাতির পিতার নামে ও তার জন্মস্থানে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিনি কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ভাবতেও অবাক লাগে। সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের তিনি জানোয়ার বলে গালি দিয়েছেন, তাদের বাবা-মা নিয়ে কথা বলেছেন। একজন ভিসি কি এসব বলতে পারেন? কাদেরকে আমরা ভিসি বানিয়েছি? ছাত্রছাত্রীরা সেখানে ১২ দিন পর্যন্ত আন্দোলন করল, তার বিরুদ্ধে ঝাড়ূ মিছিল হলো, এটা একদিকে সব শিক্ষকের জন্য যেমন অপমানের, তেমনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও খারাপ সংবাদ। শুরুতেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি 'বিতর্কের' মধ্যে পড়ল। আমি মনে করি, তার পদত্যাগই যথেষ্ট নয়। তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। সংবাদপত্রে যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে শিক্ষক হিসেবে আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। একজন শিক্ষকই উপাচার্য হবেন; কিন্তু এ কেমন উপাচার্য আমরা পেলাম?

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ৩০ সেপ্টেম্বর এক সভায় সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো উপাচার্য বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বলেননি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সততা ও নৈতিকতার কথা উপাচার্যরা কি আদৌ শুনবেন কিংবা শুনলে কতটুকু শুনবেন? প্রধানমন্ত্রী ক্যাসিনো সম্রাটদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়ে একটা মেসেজ দিয়েছেন। আর মেসেজটি হচ্ছে পরিস্কার- কোনো দুর্নীতি ও অন্যায় তিনি সহ্য করবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ সাধারণ মানুষ সমর্থন করেছে। এখন বোধকরি সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানোর। কেননা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। অতি ক্ষমতাবান ভিসিরা প্রায় ক্ষেত্রেই কোনো আইন-কানুন মানছেন না। শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং একাধিক উপাচার্য নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হয়েছেন।

সর্বশেষ ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. জাকারিয়ার নিয়োগ বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। সেখানে উপ-উপাচার্যকে বলতে শোনা গেছে, 'তোমরা কয় টাকা দেওয়ার জন্য রেডি'- এই বক্তব্যটি। এর আগে দিনাজপুরে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের জনৈক সহকারী অধ্যাপক নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। জাবি ভিসির 'ঈদ সালামি' তো বহুল আলোচিত (দুই কোটি টাকা)। যদিও তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। শিক্ষকরা তাকে কালো পতাকা দেখাচ্ছেন প্রতিদিন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য দুই কোটি টাকার 'গোবর' কেলেঙ্কারিতেও অভিযুক্ত। এ সংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। সেখানকার শিক্ষকরা যে ১৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, এর ৩নং দফায় ভিসির বাসায় বিউটি পার্লার তৈরির অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী কর্মচারী তার সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করে ভিসির বাসার সামনে অনশন পর্যন্ত করেছিলেন। অথচ উপাচার্য দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পেয়েছিলেন। একসময় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই ভিসি শুধু গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণেই কি বারবার ভিসি হয়েছিলেন?



সম্প্রতি শাবিপ্রবির উপাচার্যের বিরুদ্ধে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ওই শ্বেতপত্রে তার বিরুদ্ধে ৫৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, টিএ-ডিএসহ প্রতি সপ্তাহে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় যাওয়া, নিজে একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, ব্যক্তিগত আক্রোশে কিছু শিক্ষকের 'আপগ্রেডেশন' স্থগিত করা ইত্যাদি। একটি জাতীয় দৈনিক উপাচার্যদের আমলনামা নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কিছুদিন আগে। আর ১৪ জন বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে ইউজিসি। এর মাঝে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়; পাবনা, রোকেয়া ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী দেখে এদের মনোনয়ন দিয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়েছিল? এদের আয়-সম্পত্তির হিসাব কি এনবিআর খতিয়ে দেখবে? যুবলীগ নেতাদের যদি আমলনামা নেওয়া হয়, যদি তাদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত ভিসিদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হবে না কেন?

ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সবাই আজ অভিযোগের কাঠগড়ায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে মালয়েশিয়ায় 'দ্বিতীয় হোম' বানাবেন, ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে ঢাকায় বসে গার্মেন্ট ব্যবসা করবেন, এনজিও চালাবেন, সকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাসে গিয়ে বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসবেন- এগুলোও অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ ধরনের অন্যায় করবেন- এটা সত্যিই দুঃখজনক। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিলে এরা এভাবেই পার পেয়ে যান। দুঃখ লাগে, যখন দেখি দু'একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন একটা সোচ্চার নন। শিক্ষকরা পদোন্নতির নীতিমালা নিয়ে যতটুকু সোচ্চার হয়েছেন, উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা তেমন সোচ্চার হননি। শিক্ষকরা জাতীয় আদর্শ। তারা যদি তাদের সহকর্মীদের (উপাচার্যরা তো তাদের সহকর্মীই) বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হন, তাহলে আগামীতে তারা আর কোনো সম্মান নিয়ে সমাজে বাস করতে পারবেন না।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবলিক) সংখ্যা এখন ৪৫টি। শিক্ষামন্ত্রী তার নিজ জেলা চাঁদপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিতও হয়েছে। আমার নিজের জেলা পিরোজপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলার মন্ত্রী। এসব বিশ্ববিদ্যালয় আদৌ শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে কি-না, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তবে ভয়টা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ তথা নির্মাণ কাজে যে দুর্নীতি হয়, তা আমরা বন্ধ করব কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন শতকোটি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকার এ ক্ষেত্রে উদার। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য হিসেবে আমি কিছু সুপারিশ রাখতে চাই, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করবে।

এক. রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় কর্মকাণ্ডে যিনি সম্পৃক্ত, তাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করবে। সেখান থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। উপাচার্যরা হবেন শুধু এক টার্মের জন্য। নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের অলিখিত বিধান বদলাতে হবে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি করেই শিক্ষকরা উপাচার্য হন। ফলে শিক্ষক রাজনীতি করতে গিয়ে তারা একটা 'বলয়' তৈরি করেন। আর ওই বলয়ের কারণেই উপাচার্য বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে যান এবং ওই সুবিধাভোগীদের স্বার্থে কাজ করেন।

দুই. শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির মতো একটি কমিশন গঠন করতে হবে। তিন পর্বের নিয়োগ প্রক্রিয়া সমর্থনযোগ্য। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আলাদা বোর্ড গঠন করতে হবে। ওই বোর্ডে একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। এই কমিশন ইউজিসির বাইরে কাজ করবে অথবা ইউজিসির অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে।

তিন. বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডারে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকা মানেই হচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপের পক্ষ হয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি।

চার. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোনো কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং টিভিতে 'পূর্ণকালীন' কাজ করেন। পৃথিবীর কোথাও এমনটি চিন্তা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা এ কাজটি করেন। জাবির উপাচার্য সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপ-উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন এবং বেশি সময় দেন। এটা তিনি পারেন না। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। এটার তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের 'সংকটের' মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে; তারা সরকারকে সুপারিশ করবে। ইউজিসির পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের 'নানা কাহিনী' আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করছে যে, এখনই সময়। এখনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে
Daily Samakal
05.10.2019

কোথায় দাঁড়িয়ে শিক্ষক সমাজ

Image result for Gopalganj University


আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে এ দিনটি পালিত হয়। মূলত ইউনেস্কো এ উদ্যোগটি নিয়েছিল। শিক্ষকরা জাতি গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য সামনে রেখেই এ দিবস পালন করা হয়। উদ্দেশ্যটি নিঃসন্দেহে ভালো ও প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যখন এ দিনটি পালন করতে যাচ্ছি, তখন একজন শিক্ষক হিসেবে আমার মাঝে অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা- শিক্ষক হিসেবে আমরা জাতি গঠনে কতটুকু অবদান রাখতে পারছি? আমি শঙ্কিত উচ্চশিক্ষা নিয়ে। আমার শঙ্কার কারণ সাম্প্রতিককালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে করে উচ্চশিক্ষা রীতিমতো প্রশ্নের মুখে আজ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের ব্যর্থতা ও নানারকম দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি উচ্চশিক্ষাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কাও সৃষ্টি করেছে। উপাচার্য নিয়োগে সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেয়া, একাধিক উপাচার্যের দুর্নীতির ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি বেড়েছে। এখন সময় এসেছে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার এবং ক্যাম্পাসে দুর্নীতি হ্রাস করার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হতে না পারে, যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশ আগামীতে বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারবে না। সামনে বাংলাদেশের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ। এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম আমাদের। এই তরুণ প্রজন্মকে যদি দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হবে। জাতিসংঘ ২০১৭ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে থাকা, আয় বৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ইত্যাদি নানা কারণে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এই মর্যাদা দেয়। ফলে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। দেশে এখন ৩ দশমিক ২ কোটি যুবক। আর বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ, যার মধ্যে কর্মে নেই ৪ কোটি ৮২ লাখ। অর্থাৎ কর্মে আছে ৬ কোটি মানুষ। তরুণ প্রজন্মই সারা বিশ্বে পরিবর্তন আনছে। চীন এর বড় উদাহরণ। আমরা যাদের জেনারেশন  Z বলছি (জন্ম ১৯৯৫ সালের পর), তারাই হচ্ছে ভবিষ্যৎ। তাদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠবে নতুন এক বিশ্ব।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন এখানেই- আমরা বাংলাদেশে এই জেনারেশন  Z-এর জন্য কী সম্ভাবনা তৈরি করছি? অর্থাৎ এই প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে ও যাচ্ছে। কিন্তু তাদের কি আমরা যোগ্য প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি? আমরা এক ‘বিসিএস প্রজন্ম’ গড়ে তুলছি। সবাই ছুটছে সরকারি চাকরির আশায়। একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারকে যখন দেখি তিনি পুলিশে চাকরি করছেন, বিসিএসের জন্য গাইড বই পড়ছেন, তখন ভাবি- এই প্রজন্ম দিয়ে আমরা কী করব? একজন ডাক্তার কেন পুলিশে যেতে চায়, আমরা তা নিয়ে ভাবি না। যারা পিএসসিতে মৌখিক পরীক্ষা দিতে বসেন, তাদের ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। সরকারি আমলারা তাদের সীমিত জ্ঞান নিয়ে সরকারি চাকরি করে অবসরে গিয়ে আবার বিশেষ মহলের আশীর্বাদে পিএসসির সদস্যপদে নিয়োগ পান। তারা কি জানেন কীভাবে চীনের জেনারেশন Z  প্রজন্ম চীনকে পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়ে দেশটিকে আজ এক বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছে? আর আমাদের ভিসিরা? কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরা? তারা কী প্রজন্ম তৈরি করছেন? বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ভাবনা এখানেই। ইউজিসির একজন চেয়ারম্যান পেয়েছিলাম আমরা, যিনি কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখেছি, তিনি নিত্য তার কলামে বিএনপি ও বেগম জিয়ার সমালোচনা করেছেন। এটা তার প্রধান ‘কাজ’ হওয়া উচিত ছিল না।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে যখন লিখছি, তখন শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য চোখে পড়ল। তিনি একটি অনুষ্ঠানে সততা ও নৈতিকতা দিয়ে কাজ করার জন্য উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এ আহ্বানটি জানালেন এমন একটি সময় যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। একজন ‘ক্যাসিনো সম্রাটের’ কাহিনী যখন পত্র-পত্রিকায় গত দু’সপ্তাহ ধরে আলোচিত হচ্ছে, তখন একাধিক উপাচার্য নিজেদের ‘শিক্ষা সম্রাট’ হিসেবে প্রমাণ করছেন! গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্যের কাহিনী তো সবার মুখে মুখে। তার নিজের বাসায় বিউটি পার্লার দেয়া, নারী কর্মচারী কর্তৃক তার সন্তানের পিতৃত্ব দাবি, ২ কোটি টাকার গোবর বাণিজ্য, নিজের ভাতিজাকে কর্মচারী থেকে একলাফে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, যেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা কত টাকা দেয়ার জন্য রাজি আছ’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১ অক্টোবর ২০১৯)। টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ আছে সেখানে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন সরকারি দলের এমপির নিজ সন্তান ও উপ-উপাচার্যের মেয়ের জামাইয়ের চাকরি পাওয়ার বিষয়টি সেখানে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বণিক বার্তা পত্রিকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দুর্নীতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। ওই দৈনিকে সরকারি অডিট অধিদফতরের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ভিসির বাসভবন নির্মাণে উপাচার্য নিজে প্রজ্ঞাপন শর্ত লঙ্ঘন করেছেন। ২০ কাঠা জমির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা, সরকারি নিরীক্ষকদের মতে তা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। পত্রিকার ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াটিই হয়েছে বর্তমান উপাচার্যের সময়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে জাবি ছাত্রলীগের নেতাদের ২ কোটি টাকা দেয়ার (যা ছাত্রলীগ নেতারা স্বীকার করেছেন) অভিযোগ উঠলেও তার সমাধান হয়নি। উপাচার্যের স্বামী ও সন্তানের বিরুদ্ধে স্বয়ং শিক্ষকরা অভিযোগ এনেছেন। শিক্ষকদের একটা অংশ তাকে ‘লাল কার্ড’ দেখিয়ে প্রতিদিন মিছিল করছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ৫৩টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা এ ব্যাপারে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ করেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, টিএ/ডিএ নিয়ে প্রতি সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় ঢাকায় যাওয়া (তার পরিবার ঢাকায় থাকে), নিজের গার্মেন্ট ব্যবসা (ঢাকায়) পরিচালনা করা ইত্যাদি। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত উপাচার্য ঢাকায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করেন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার একাধিক পত্রিকা সংবাদ করেছে যে, তিনি বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকেন। ঢাকায় একটি এনজিওর তিনি চেয়ারম্যান। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে একই সঙ্গে তিনি একটি বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিওর চেয়ারম্যান থাকতে পারেন কি? সকালে প্লেনে করে রংপুর গিয়ে অফিস করে বিকালে প্লেনে ঢাকায় ফিরে আসেন। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট একাধিকবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে রাত ১২টায় ক্লাস নিয়ে তিনি একবার ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ভিসি প্রতিদিন নাশতার বিল তুলতেন ৭ হাজার টাকা। দুদক তাকে নোটিশ পর্যন্ত করেছিল। সম্প্রতি ১৪ জন ভিসির বিরুদ্ধে ইউজিসি তদন্তে নেমেছে বলেও সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের জানাচ্ছে (জাগো নিউজ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। সর্বশেষ ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ‘জয় হিন্দ’ বলেছেন একটি অনুষ্ঠানে, যার কারণে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন কাদের সিদ্দিকী।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সংবাদ আমাদের আহত করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ করেছে সরকার। গত ১০ বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারি অনুদান বেড়েছে ৩৬১ শতাংশ। ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মান্নান বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, তিনি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম লক্ষ করেছেন। গবেষণার জন্য যে টাকা বরাদ্দ থাকে, কিছু শিক্ষক তা ভাগবাটোয়ারা করে নেন বলেও অধ্যাপক মান্নান স্বীকার করেছেন (বিবিসি বাংলা, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। এই সত্য কথাটা বলার জন্য তিনি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। আমি খুশি হতাম তিনি যদি ওইসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। তিনি তা নেননি। শুধু টাকা ভাগবাটোয়ারাই নয়, কোনো কোনো শিক্ষক হাউজিং ব্যবসায় জড়িয়ে গেছেন (জাহাঙ্গীরনগর)। কোনো কোনো শিক্ষক বেসরকারি টিভিতে ফুলটাইম চাকরি করেন (ঢাবি)। কেউ কেউ গবেষণা পরিচালক হিসেবে কোনো কোনো গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান থেকেও মাসিক বেতন নেন। উপাচার্যরা এসব জানেন। কিন্তু অত্যন্ত ক্ষমতাবান ওইসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ‘ব্যবস্থা’ নিতে পারেন না। দলীয় আনুগত্য আদায় করার জন্য গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তা তারা বিবেচনায় নেন না। এতদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল সার্টিফিকেট ‘বিতরণ’ করার। এখন অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারি অনুদানে চলা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেই এখন টাকার বিনিময়ে ‘সান্ধ্যকালীন কোর্স’, ‘উইকএন্ড কোর্স’ চালু করা হয়েছে। যারা কোনোদিন ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, তারাই লাখ টাকা দিয়ে ওইসব কোর্স করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট কিনে নিচ্ছেন। তথাকথিত পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েও তেলেসমাতি কাণ্ড চলছে। কোনো কোর্স ওয়ার্ক কিংবা লাইব্রেরি ওয়ার্ক না করে, ফুলটাইম চাকরি করেও যে পিএইচডি নেয়া যায়, তার প্রমাণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষামন্ত্রী নৈতিকতা ও সততার কথা বলেছেন। কিন্তু কোটি টাকা ঈদ সালামি দেয়া, নিজ বাসভবনে বিউটি পার্লার বসানো, ১০০ কোটি টাকা দিয়ে ভিসি বাংলো বানানো, কিংবা শিক্ষক নিয়োগে টাকা নেয়া- এগুলো কোন নৈতিকতার মাঝে পড়ে? প্রধানমন্ত্রী ‘ক্যাসিনো সম্রাট’দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে প্রশংসিত হয়েছেন। এখন শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করব ‘শিক্ষক সম্রাট’দের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করার। উপাচার্যদের নিয়োগ যথাযথ হচ্ছে না। একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ীকে যদি দুর্নীতি ও অন্যায়ের কারণে গ্রেফতার করা যেতে পারে, তাহলে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ভিসিরা মাফ পাবেন কোন যুক্তিতে? একটি কমিশন গঠন করে ভিসিদের অনিয়ম আর দুর্নীতির তদন্ত করা হোক। একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। আমি চাই জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হোক। অযোগ্য উপাচার্যদের কারণে উচ্চশিক্ষা আজ প্রশ্নের মুখে। কোটি কোটি তরুণ প্রজন্মের কাছে আমরা কোনো স্বপ্ন উপস্থাপন করতে পারছি না। ‘জেনারেশন জেড’ আমাদের কাছে বোঝা হয়ে উঠছে দিনে দিনে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ‘জেনারেশন জেড’ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারছে না। আমরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব এক ‘বিসিএস প্রজন্ম’ তৈরি করছি, যারা ধীরে ধীরে সমাজের জন্য এক ধরনের বোঝা হয়ে উঠছে। শিক্ষক হিসেবে এটা আমারও ব্যর্থতা। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার ভাবনা এটাই।
Daily Jugantor
05.10.2019

চীনা বিপ্লবের ৭০ বছর

Image result for China at 70


আজ ১ অক্টোবর চীন তার বিপ্লবের ৭০ বছর পালন করছে। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর প্রয়াত চীনা নেতা মাও সে তুং পেইচিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়ান আন মেন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক চীনা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছিলেন। তবে চীনা লংমার্চের পর (অক্টোবর ১৯৩৪-অক্টোরব ১৯৩৫) প্রকৃত অর্থেই বিপ্লবের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সাল থেকে। বিশেষ করে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের পর (১৯৩৭-৪৫)। ওই সময়টা ছিল চীনের গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৪৫-৪৯)। বিপ্লবের চূড়ান্ত মুহূর্তে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও লাল ফৌজবাহিনী চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী কুয়োমিনটাং দলকে পরাজিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। সেই থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। চীন আজ বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যতম একটি শক্তি। একসময় বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মাঝে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের মতো পৃথিবীর অনেক দেশের কমিউনিস্ট পার্টি ওই সময় প্রো-সোভিয়েত ও প্রো-চীন এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে সোভিয়েত নেতা গরবাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে সংস্কার আনতে গিয়ে পুরো দেশটিই ভেঙে দিয়েছিলেন। তার সংস্কার (অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক) সোভিয়েত ইউনিয়নকে একত্র রাখতে পারেনি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতেও সংস্কার এসেছে। চীনা নেতারা যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন। তারা সংস্কার করেছেন। তারা গরবাচেভ মডেলের ‘পেরেস্ত্রোইকা’ অর্থাৎ পুনর্গঠনে নিয়োজিত হয়েছেন। কিন্তু গরবাচেভের ‘গ্লাসনস্ত’-এর ধারণা, অর্থাৎ সবকিছু উন্মুক্ত করে দেওয়া, এটা গ্রহণ করেননি। গরবাচেভ ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপত্তি বাধিয়েছিলেন। ফলে ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। চীনে সংস্কার এসেছিল বিধায়, চীন আজ বিশ্বশক্তি। আজও চীনের ঐক্য টিকে আছে।
চীনের ৭০ বছরের যে রাজনীতি, সেই রাজনীতিকে আমরা কয়েক পর্বে ভাগ করতে পারি। একজন চীনা বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ ইকোনমি (Elizabeth C. Econmy) চীনের ইতিহাস নিয়ে এই বই লিখেছেন ‘The third Revolution’। এ ক্ষেত্রে এই ৭০ বছরের ইতিহাসকে তিনি তিন পর্ব হিসেবে দেখেছেন। প্রথম পর্বে মাও সে তুংয়ের সময়কাল, দ্বিতীয় পর্বে দেং জিয়াও পিং ও অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ, আর
তৃতীয় পর্বে শি জিন পিংয়ের উত্থান ও চীনকে বিশ্বশক্তিতে পরিণত করা। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যে সময়সীমা, তাতে আমরা দেখেছি, ‘চার কুচক্রীর’ (মাওয়ের স্ত্রী জিয়াও কুইয়ংয়ের নেতৃত্বে) উত্থান ও মাও সে তুংকে রেখে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা, অতি বাম রাজনীতি, ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ (১৯৫৮), যৌথ খামার ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ওই সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনে পরে বিতর্কিত হয়েছিল। ওই সময়সীমায় প্রচুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে গ্রামে যৌথখামারে কাজ করতে ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে জানা গিয়েছিল, সাংস্কৃতিক  বিপ্লবের কারণে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিলেন (১৯৫৮-৬১)। এটা ছিল অতি বামবাদের লক্ষণ (পাঠক, কম্বোডিয়ার পলপটের নেতৃত্বাধীন সময় কিংবা আলবেনিয়ার এনভার হোজার সময়কার কথা স্মরণ করতে পারেন)। চীনের ইতিহাসে এটা ছিল একটা কালো অধ্যায়। মাও সে তুং চীনা ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তার ভূমিকার কারণে তিনি সমালোচিত। চীনা নেতারা এখন স্বীকার করেন মাও ভুল করেছিলেন। দ্বিতীয় পর্বটা শুরু হয়েছিল দেং জিয়াও পিংয়ের উত্থানের মধ্য দিয়ে। দেং চীনকে বদলে দিয়েছিলেন। আধুনিক ‘চীনের সংস্কারের জনক’ হিসেবে যদি কাউকে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে তিনি হচ্ছেন দেং জিয়াও পিং। দেং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরপ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন উন্নয়নটা প্রয়োজন। পাঠক স্মরণ করতে পারেন তার একটি বিখ্যাত উক্তি ‘বিড়াল সাদা কী কালো, এটা বড় কথা নয়। বড় কথা বিড়াল ইঁদুর মারে কি না।’ এর ব্যাখ্যা পরিষ্কার উন্নয়ন চাই, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি চাই, তা যেকোনো সমাজব্যবস্থাতেই হোক না কেন। দেং তার এই ধরনের বক্তব্যের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন। পার্টি থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। ওই সময়টা (১৯৭৬-৮৯) ছিল অর্থনৈতিক সংস্কারের যুগ, যার ভিত্তি দেং করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে মনে রাখতে হবে দেং কোনো দিন পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন না। রাষ্ট্রের কোনো পদ তিনি গ্রহণ করেননি। শুধু পার্টির মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি ১৯৮২ সালে অবসরেও গিয়েছিলেন। ১৯৮৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ বর্তমান নেতা শি জিন পিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত চীন একটি অন্তরীণ সময়সীমা পার করেছে, যেখানে চীনা বিপ্লবের তৃতীয় জেনারেশনের নেতারা নেতৃত্বের সারিতে আসেন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারকে আর উচ্চতায় নিয়ে যান। ওই সময় ১৯৮৯ সালে চীন প্রত্যক্ষ করেছিল ‘তিয়ান আন মেনের’ ঘটনা। ছাত্ররা অতি গণতন্ত্রের দাবিতে ছয় সপ্তাহ পেইচিংয়ের বিখ্যাত ‘তিয়ান আন মেন’ স্কয়ারে অবস্থান নিয়েছিল। ওই সময় পার্টির নেতা ছিলেন জিয়াও জে মিন। অভিযোগ আছে, তিনি ছাত্রদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু দেং জিয়াও পিং ছিলেন এর বিরুদ্ধে। ফলে সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ছাত্রদের হটিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে অপসারিত হন জিয়াও জে মিন। ‘তিয়ান আন মেন’-এর ঘটনা নিঃসন্দেহে চীনের সমসাময়িক রাজনীতির জন্য একটি বড় ঘটনা। একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে বহুদলীয় গণতন্ত্র কতটুকু গ্রহণযোগ্য কিংবা তা আদৌ কাজ করবে কি না (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, তিনি জীবদ্দশায় চীনে গণতন্ত্র দেখে যাবেন), এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সংস্কারের প্রয়োজন আছে। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের পতন ঘটাবে, যেমনটি ঘটেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে। সুতরাং দেং জিয়াও পিংয়ের সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। ছাত্রদের চাপের মুখে গণতন্ত্র নয়। চীন একটি বড় দেশ। বিপুল জনগোষ্ঠীর বাস ওই দেশে। ৫৫টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি রয়েছে এ দেশে। এ দেশে পশ্চিমা গণতন্ত্র কাজ করবে না। আজকের যে চীন, দেশটিকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসার মূল কৃতিত্ব শি জিন পিংয়ের। চীনের ৭০ বছরের রাজনীতিতে যে তিনজন অদূরদর্শী নেতার কথা বলা হয়, তার একজন হচ্ছেন শি জিন পিং (বাকি দুজন মাও সে তুং ও দেং জিয়াও পিং)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি মাওকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ২০১৭ সালে বিখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট তাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল (১৪ অক্টোবর)। আর ২০১৮ সালে ফোর্বস (Forbes) তাকে শুধু বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবেই চিহ্নিত করেনি, বরং প্রভাববিস্তারকারী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল (৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। ফোর্বস তাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের চেয়েও ওপরে স্থান দিয়েছিল। ২০১২ সালের পর থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন (প্রেসিডেন্ট ২০১৩ থেকে)। পার্টির দায়িত্ব নিয়ে তিনি অর্থনীতিতে আরও সংস্কার আনেন। একসময় ‘aogai’ প্রদ্ধতি, অর্থাৎ ‘re-education through labour’ এটা তিনি বদলে ফেলেন। এক সন্তানের যে চীনানীতি, তাও তিনি বদলে ফেলেন। পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযান পরিচালনা করে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। বৈদেশিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই তিনি ২০১৩ সালে কাজাখস্তান সফরের সময় তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) উপস্থাপন করেন। বিআরআই (যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ থেকে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার) প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের একটি দর্শন। এর মাধ্যমে চীনকে বিশ্বের ৬৫টি দেশকে চীনের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। বিআরআই দুভাবে কাজ করবে প্রথমত, সড়ক ও রেলপথে মধ্য এশিয়া, পাকিস্তান ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াসহ ইউরোপ পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা হয়ে সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত তা সংযুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে চীনাপণ্য অতিদ্রুততার সঙ্গে ও সহজলভ্যে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে। চীন বিআরআইয়ের আওতায় দেশগুলোকে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেবে। তবে এই চীনা ঋণ নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, ঋণ দিয়ে চীন ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলছে দেশগুলোকে। তবে বিআরআই নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, বিআরআই যে চীনকে বিশে^র অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা সফল হলে পৃথিবীর জনসংখ্যার তিন ভাগের দুভাগ মানুষ চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাংলাদেশও বিআরআইয়ের আওতায় চীন থেকে ঋণ নিচ্ছে। একজন গবেষক এলিজাবেথ ইকোনমি লিখেছেন, ‘Under xi, china now activel seeks to shape international norms and institutions and Forcefully asserts it presence on the global stage’। মিথ্যা বলেননি এলিজাবেথ ইকোনমি। চীনের আর্থিক ভিত্তি চীনকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে এবং চীনকে বিশ^শক্তিতে পরিণত করেছে। বিআরআই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও একটি উদ্দেশ্য কাজ করছে তা হচ্ছে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মার্কিনি আগ্রাসনের মুখে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘Pivot to Asia’ পরিকল্পনায় ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। এর বিপরীতে মার্কিনি প্রভাব কমাতে চীন তার বিআরআই পরিকল্পনা এগিয়ে আছে। বলা হচ্ছে, ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে আগামী দিনে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলের স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর জন্ম দিতে পারে।
চীন এখন পরিপূর্ণভাবে বদলে গেছে। চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় (১৯৭৮) সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল, চীনা সৈন্যরা কোথাও কোথাও খালি পায়ে (বুট ছাড়া) যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সেই চীন এখন বদলে গেছে। যে চীনের নাগরিকরা তাদের ঘরে একটি সেলাই মেশিন থাকলে, তা নিয়ে গর্ব করত, সেই চীন এখন বিশ্বের ধনী দেশগুলোর একটি। ২০১৯ সালের অভিক্ষণ অনুযায়ী বিশ্বের জিডিপিতে শীর্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র (২১৪৮২.৪১ বিলিয়ন ডলার)। এর পরের অবস্থান চীনের, ১৪১৭২.২০ বিলিয়ন ডলার (STATICS TIMES, IMF, April-2018), কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে শীর্ষে থাকবে চীন (২৭৪৪৯.০৫ বিলিয়ন ডলার), যুক্তরাষ্ট্র নিচে নেমে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে (২১৪৮২.৪১ বিলিয়ন ডলার)। পরিসংখ্যানই বলে দেয় বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্রিটেনের হাতে (Pax Britanica), বিংশ শতাব্দী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে (American Century))। আর একুশ শতক হবে চীনের, চীনা ভাষায় বলা হয় চরহুরহ, যার আভিধানিক অর্থ The Chinese century ওই Chinese Century  বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে একুশ শতকে।
Daily Desh Rupantor
01.10.2019

চুয়াত্তর বছরের জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যবস্থা




advertisement
জাতিসংঘ চুয়াত্তর বছরে পা দিয়েছে। ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন জাতিসংঘ চার্টারে স্বাক্ষর করেছিল ৫০টি দেশের সরকারপ্রধানরা। আর ২৫ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ একটি বিশ্ব সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিবছরই সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এই অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অধিবেশনে যোগ দিয়ে ভাষণ দিয়েছেন। এটা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশন। এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর ১৮৫টি দেশে স্কুলের ছাত্ররা রাস্তায় বেরিয়ে এসে ক্লাইমেট প্রোটেস্ট (Climate Protest) মার্চে অংশ নিয়েছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। সুইডেনের ১৬ বছরের কিশোরী গ্রেটা থানবার্গের ব্যক্তিগত প্রতিবাদ কীভাবে বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রাক্কালে বিশ্ব তা প্রত্যক্ষ করেছে। দ্বিতীয়ত, পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের একটি সম্ভাবনা। সিরিয়া সংকটের সমাধান যখন এখনো হয়নি, লিবিয়া যখন কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এই অঞ্চলে চতুর্থ একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সুতরাং এই বিশ্ব সংস্থাটি আগামী ৭০ বছর টিকে থাকতে পারবে কিনা, সেটাও বড় প্রশ্ন এখন।
১৯৪৫ সাল থেকে ২০১৯ সময়টা একেবারে কম নয়। এই সময়সীমায় বিশ্বব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন এসেছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। কলোনিগুলো স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু একুশ শতকে এসে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে নানাবিধ সমস্যা। আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ব্যর্থতা, ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য দূর করা, মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রপন্থি রাজনীতির বিকাশ, বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব করার প্রবণতা এবং সর্বশেষ বিশ্বের উষ্ণতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জাতিসংঘের ব্যর্থতা এই বিশ্ব সংস্থাটির ভূমিকাকে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিটি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এটা বলা হচ্ছে যে, জাতিসংঘ উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা নিজ নিজ দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, জাতিসংঘকে সহায়তা করার আহ্বান জানান। এর পর আর জাতিসংঘকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তবে অনেক ব্যর্থতার মাঝেও জাতিসংঘের সাফল্য যে একেবারে নেই তা বলা যাবে না। ১৯৯০ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ ও কুয়েত শত্রুমুক্ত করা, এল সালভাদর, কম্বোডিয়া কিংবা নামিবিয়ায় পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া ও শান্তি ফর্মুলায় রাজি করানোর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছিল যে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, তাতে জাতিসংঘের একটি ভূমিকা রয়েছে। সাবেক যুগোসøাভিয়ায় গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো, কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধ মেটাতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠানো এবং সেখানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচন আয়োজন করা, নেপালে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে গৃহযুদ্ধ ঠেকানোর উদ্যোগ প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু সিরিয়া ও ইরাক থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ অভিবাসীর দেশত্যাগ জাতিসংঘ ঠেকাতে পারেনি। আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলছে সেই ২০০১ সাল থেকে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে দেশটি দখল করে নিয়েছিল। আজও সেখানে যুদ্ধ চলছে। জাতিসংঘ তালেবানদের সঙ্গে আফগান সরকারের কিংবা তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের কোনো মধ্যস্থতা করতে পারেনি। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর ইরাক আক্রমণ, ২০১১ সালে লিবিয়ায় মার্কিনি বোমা হামলায় গাদ্দাফিকে উৎখাতÑ কোনো ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছিল না। কিংবা জাতিসংঘ সেই ‘যুদ্ধ’ বন্ধ করতেও পারেনি। সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা ইয়েজদি নারীদের যৌন দাসীতে পরিণত করেছিলÑ জাতিসংঘ এটা বন্ধ করতে পারেনি। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হচ্ছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ বৃদ্ধিতে সংস্থাটির শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ নেই। স্থায়ী পরিষদের (৫ সদস্য) সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ১৫টি অস্থায়ী সদস্য (নিরাপত্তা পরিষদ) রয়েছে বটে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। জাতিসংঘের জন্মকালে (১৯৪৫) যে বৈষম্য জাতিসংঘ তৈরি করেছিল, সেই বৈষম্য আজও আছে। যদিও কিছু শিল্পোন্নত দেশ (জাপান ও জার্মানি) এবং উন্নয়নশীল দেশ থেকে অঞ্চল ভিত্তিতে কিছু দেশ (ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল) স্থায়ী পরিষদের সদস্য হতে চায়। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর বাধার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে না। জাতিসংঘ Commission on Global Governance  নামে একটি কমিশন গঠন করেছিল কীভাবে জাতিসংঘে সংস্কার আনা যায়, তা দেখার জন্য। কমিশন ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের সুপারিশ মহাসচিবের কাছে জমা দিয়েছিল। ওই সুপারিশে নিরাপত্তা পরিষদে এক ধরনের ‘স্ট্যান্ডিং’ সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার সদস্য সংখ্যা হবে পাঁচ। যার মধ্যে ২টি দেশ আসবে উন্নত বিশ্ব থেকে, বাকি ৩টি দেশ আসবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে। তাদের কোনো ‘ভেটো’ ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু দীর্ঘ ২৪ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ধরনের প্রস্তাব নিয়েও কথা আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ চায়। কিন্তু তাতে যদি ভেটো ক্ষমতা না থাকে তা হলে সঙ্গত কারণেই তাদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। জাপান ও জার্মানি স্থায়ী সদস্যপদ চায়। কিন্তু কোনো ভেটো ক্ষমতা ছাড়া তারা এটা গ্রহণ করে নেবে বলেও মনে হয় না। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী সদস্যপদে ভারতের সদস্যপদ গ্রহণযোগ্য হলেও বড় আপত্তি চীন ও পাকিস্তানের। ফলে স্থায়ী পদে সদস্য বৃদ্ধির প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি। জাতিসংঘের একটা বড় ব্যর্থতা বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধকল্পে প্যারিসে কপ-২১ সম্মেলনে গৃহীত জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারা। কপ-২১ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। ১৭৪টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জলবায়ু চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল। ওই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা হবে। বায়ুম-লে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারলেই বিশ্বের উষ্ণতা হ্রাস পাবে। বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো আদৌ দায়ী নয়। কিন্তু এসব দেশই বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
শিল্পোন্নত ১০টি দেশ বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ৬৭.৬ ভাগ নিজেরা নিঃসরণ করে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীন। দুঃখজনক হচ্ছে, কপ-২১-এ যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হয়ে কপ-২১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। সারাবিশ্ব যেখানে এটা স্বীকার করে নিয়েছে এবং বৈজ্ঞানিক সত্য যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি দায়ী, সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণিত সত্যকে বিশ্বাস করতে চাইছেন না। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এতে করে বাড়ছে সাগর-মহাসাগরের জলরাশি।  World Meteorological Organization( WMO)-এর সর্বশেষ রিপোর্টে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে- কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অতীতের চেয়ে ২০১৫-২০১৯ সময়সীমায় ২০ ভাগ হারে বেড়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে যেখানে সাগরের জলসীমার উচ্চতা বেড়েছে গড়ে ৩.২ মিলিমিটার, সেখানে ২০১৫-২০১৯ সময়সীমায় বেড়েছে ৫ মিলিমিটারের ওপর (এবিসি নিউজ, ২২ সেপ্টেম্বর)। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বারবার ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। দ্বীপাঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো আতঙ্কের মাঝে আছে। এ ক্ষেত্রে বড় রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যে দায়িত্ব পালন করার কথা, যুক্তরাষ্ট্র তা পালন করছে না। জাতিসংঘের ব্যর্থতা এখানেই যে, বিশ্বের উষ্ণতা রোধে জাতিসংঘ সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। জাতিসংঘের উদ্যোগে এখন Sustainable Development Goals  কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তা শেষ হবে ২০৩০ সালে। এর আগে নেওয়া হয়েছিল এমডিজি বা Millenium Developoment Goals । কিন্তু এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে যে বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতা দরকার, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা এমডিজির ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলো তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৭ শতাংশ সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ। Sustainable Development Goals এ রয়েছে ১৭টি এজেন্ডা। এ ক্ষেত্রে যে সাহায্য দরকার পড়বে, তা পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। জাতিসংঘ এই সাহায্যের ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে পারবে না। এমডিজির ক্ষেত্রেও পারেনি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অধিবেশন দুই কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক. বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জননিরাপত্তাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে বিশ্ব সংস্থার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। দুই. জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এটাও বাংলাদেশ বিশ্ব সভায় তুলে ধরছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ালেও, দুঃখজনক হলেও সত্যÑ জাতিসংঘের অধিবেশনে মূল প্রতিপাদ্যে এবার শরণার্থী ইস্যুটি স্থান পায়নি। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সাধারণ পরিষদের সাইড লাইনে বাংলাদেশ একাধিক ইভেন্টের আয়োজন করেছে ( Pars Today  ২৩ সেপ্টেম্বর)। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ আদৌ দায়ী নয় এ কথাটা বারবার বাংলাদেশ বলে আসছে। উন্নত বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ্ব জিডিপির ৭৫ শতাংশ, আর তারা কার্বন নিঃসরণ করে ৬৭.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ এসব উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতিবছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় দ্বীপাঞ্চলের মানুষ ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছেন। গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রতি ৭ জনে একজন মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। বাংলাদেশ কোপেনহেগেন কপ সম্মেলনে (২০০৯) এসব উদ্বাস্তু মানুষকে  Universal Natural Persons হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এ দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতিসংঘের এই শীর্ষ সম্মেলন শুধু ‘টকিংক্লাব’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কিছু ফল পাওয়া যায় সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Amader Somoy
02.10.2019