রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বিচারপতি ইফতেখার ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ




আমাদের দেশের অনেকেই বিচারপতি ইফতেখার মোহম্মদ চৌধুরীর নামের সঙ্গে পরিচিত। তিনি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। নানা কারণে তিনি মিডিয়ায় আছেন দীর্ঘদিন ধরে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাঁকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করেছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি পাকিস্তানে এককভাবে প্রতি জেলার বারগুলোতে সভা করে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে তিনি স্বপদে বহাল হন। কিন্তু তিনি আলোচনায় আছেন এখনো। জুনের প্রথম সপ্তাহে দুটি ঘটনায় তিনি আবারও আলোচনায় আসেন। প্রথমটিতে নিজের ছেলের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি একটি রুল ইস্যু করেছেন। তাঁর ছেলে আরসালান ইফতেখার ও ধনাঢ্য রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মালিক রিয়াজ হোসেনের মধ্যে অবৈধ অর্থ লেনদেনের সংবাদ প্রকাশিত হলে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করেন। দ্বিতীয়টিতে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে প্রতীকী সাজা দিয়েছিলেন আদালত অবমাননার দায়ে। এতে করে তাঁর সংসদ সদস্যপদ চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় পরিষদের স্পিকার ফাহমিদা মির্জা গত ২৪ মে এক রুলিংয়ে গিলানিকে দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনে রেফারেন্স পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ইফতেখার মোহম্মদ চৌধুরী গিলানি ও ফাহমিদা মির্জাকে আদালতে তলব করেন। দুটো ঘটনাই পাকিস্তানের পরিপ্রেক্ষিতে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। প্রথমটিতে বলা যায়, আইন যে অন্ধ, তা প্রমাণিত হলো। আর দ্বিতীয়টিতে বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন দেশটি শাসন করেছে। এ ক্ষেত্রে বিচারপতিদের ভূমিকা খুব উজ্জ্বল নয়। সেনাশাসনের বৈধতাও তাঁরা দিয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম বোধ করি ইফতেখার মোহম্মদ চৌধুরীর ক্ষেত্রে। বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় তিনি বারগুলোর সমর্থন পেয়েছেন। এখন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্ব দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল। তবে যে জিনিসটি বিচারপতি ইফতেখার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা হচ্ছে বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব। প্রেসিডেন্ট জারদারির বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডে মামলার পুনঃ তদন্তের নির্দেশ, প্রধানমন্ত্রী গিলানিকে দোষী সাব্যস্ত করা কিংবা পার্লামেন্টের স্পিকারকে আদালতে তলব করা- এসব সিদ্ধান্ত অত সহজ ছিল না। পাকিস্তান যখন ধীরে ধীরে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গ্রহণ করছে, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্ব কোনো ভালো খবর নয় দেশটির জন্য। যেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে বিচার বিভাগ পালন করে মুখ্য ভূমিকা, সেখানে বিচার বিভাগ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে বিচার বিভাগের সঙ্গে সংসদের দ্বন্দ্বের একটি খবর যখন বড় ধরনের একটি 'ঘটনার' জন্ম দিয়েছে, তখন পাকিস্তানের ঘটনাবলির সঙ্গে কেউ কেউ একটি 'মিল' খোঁজার অপচেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু পাকিস্তানের ঘটনাবলির সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাবলির মিল খোঁজা অর্থহীন। পাকিস্তানে পুরো বিচার বিভাগ সংসদের সঙ্গে এক ধরনের কর্তৃত্বের প্রশ্নে বিতর্কে জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে এমনটি হয়নি। বাংলাদেশে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের রায় নিয়ে অনাহূত এক বিতর্কে জড়িয়ে গেছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে কার ক্ষমতা বেশি, কে কর্তৃত্ব করবে, সংবিধান কাকে কতটুকু ক্ষমতা দিয়েছে- এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই 'বিরোধ'কে কেউ কেউ 'অশনিসংকেত' হিসেবে মনে করছেন। গণতন্ত্রের জন্য 'হুমকি' হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন কেউ কেউ।
বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ঢাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে থাকা হাইকোর্টের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে যে রায় দিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে জাতীয় সংসদের স্পিকারের দেওয়া বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল ও আদালত অবমাননাকর বলে মন্তব্য করেছিলেন। স্পিকার বলেছিলেন, 'আদালতের রায়ে জনগণ ক্ষুব্ধ হলে বিচার বিভাগকেও তারা রুখে দাঁড়াতে পারে' (সমকাল, ৬ জুন)। স্পিকারের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই আদালত স্পিকার সম্পর্কে ওই মন্তব্যটি করেছিলেন। তবে কোনো রুল দেননি। রায়ে আদালত স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, 'আদালত কখনো সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিরুদ্ধে নয়।' কিন্তু আদালতের মন্তব্য নিয়ে সংসদে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। সংসদে গত ৫ জুনের আলোচনায় বিচারপতি চৌধুরীর অপসারণ চেয়েছেন সংসদ সদস্যরা। বলা হয়েছে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে। তোফায়েল আহমেদের মতো একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য বিচারপতি চৌধুরীকে আখ্যায়িত করেছেন 'স্যাডিস্ট' হিসেবে। একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল সাহেব। তিনি কী করে একজন বিচারপতিকে 'স্যাডিস্ট' বলেন? এতে করে তো আদালত অবমাননা হয়ে গেল! তিনি যখন বলেন 'বিচারপতিদেরকেও বুঝতে হবে বিচারপতিদের বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা' (সমকাল), তখন কি এই বক্তব্য বিচারপতিদের বিরুদ্ধে এক ধরনের হুমকি হয়ে গেল না? কোনো ব্যক্তি কি এ ধরনের কথা বলতে পারেন? একজন সংসদ সদস্য নিশ্চয়ই আইনের ঊধর্ে্ব নন। আরেকজন সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বিচারপতি চৌধুরীকে 'মানসিক বিকারগ্রস্ত' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বললেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করার কথা। স্পিকার এ ব্যাপারে একটি রুলিং দিয়েছেন রবিবার। কিন্তু সামান্য একটি বিষয় নিয়ে যা ঘটে গেল, তাতে আমরা দুঃখিত; লজ্জিতও বটে। বিচারপতি চৌধুরী স্পিকারের বক্তব্যকে সরাসরি 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' বলেননি, বলেছেন 'রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল'। এ ব্যাপারে আদালত কোনো রায়ও দেননি। কিন্তু সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে আমি হতাশ। একজন বিচারপতিকে আমরা কিভাবে 'স্যাডিস্ট' বা 'মানসিক বিকারগ্রস্ত' বলি? একজন সাধারণ মানুষের ব্যাপারেও তো আমরা এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে পারি না। আর যেভাবে 'পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনার' কথা বলা হয়েছে, তা কি এক ধরনের হুমকি নয়? তাঁরা সবাই সিনিয়র সংসদ সদস্য। তাঁদের কাছ থেকে আমি আরো 'ম্যাচিরওরড' বক্তব্য আশা করেছিলাম। তাঁরাই তো জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন।
বিচার ও আইন বিভাগ কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গকে একটির বিরুদ্ধে অন্যটিকে দাঁড়া করানো যায় না। প্রতিটি অঙ্গ তার নিজ নিজ অবস্থানে থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করে যায়। আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের স্বার্থে কাজ করে যান। আর বিচার বিভাগ জনগণের আস্থার একটি প্রতীক। জনগণের নিরাপত্তার গ্যারান্টিও দেন উচ্চ আদালত। রাষ্ট্র যখন জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়, তখন সাধারণ মানুষের ভরসার স্থল হয় আদালত। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে চিনি না। জানিও না। ভবিষ্যতে জানা ও চেনার সম্ভাবনাও কম। তবে এই বেঞ্চের বেশ কয়েকটি রায়ে আমি আস্থার একটি জায়গা খুঁজে পেয়েছি। নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা কাউসার নাসরীন একজন ছাত্রীকে যৌনকর্মী হিসেবে সাব্যস্ত করায় এই বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই ইউএনওকে আদালতে তলব করেছিলেন। ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু কামনা করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। এই বেঞ্চ ওই ঘটনায় একটি রুল ইস্যু করেন। পুলিশের একাধিক 'অপকর্মের' বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছিলেন ওই বেঞ্চ। এভাবেই উচ্চ আদালত সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল ইস্যু করেন। এটা তো একটা আস্থার জায়গা। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন স্বৈরাচারী আচরণ করে, তখন মানুষ কোথায় যাবে? তাদের ভরসার স্থল তো আদালত। এই বেঞ্চটি শত শত মানুষের দুঃখ, কষ্ট, অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে পারেননি সত্য, কিন্তু আদালতের নজরে যখনই কোনো 'ঘটনা' আনা হয়েছে, আদালত এ ব্যাপারে ভিকটিমের পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমার আস্থাটা বেড়ে গেছে। আমি এই আস্থার জায়গাটা নষ্ট হতে দিতে পারি না। আদালতের সিদ্ধান্তে কোনো পক্ষ (এ ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ বিভাগ) যদি 'ক্ষতিগ্রস্ত' হয়ে থাকে, সে পক্ষের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ ছিল। আমি অবাক হয়েছি, যখন দেখেছি পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম আলোচনার সূত্রপাত করলেও, স্পিকার নিজেই মন্তব্য করে বসলেন। সংসদ সদস্যরা আলোচনায় অংশও নিলেন না। আরো মজার কথা আদালতের রায়ের পর সড়ক ও জনপথ বিভাগের দখলে থাকা কয়েকটি ভবন ও কক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে বুঝিয়েও দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই রায়টি নিয়ে এত 'লঙ্কাকাণ্ড' ঘটে গেল!
যে 'ঘটনা' বিচার ও আইন বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করাল, তা সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শুভ নয়। হাইকোর্টের একটি রায় নিয়ে কয়েকজন সিনিয়র সংসদ সদস্য যে প্রতিক্রিয়া দেখালেন, তা দৃষ্টিকটু। তাঁদের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেই বলছি, তাঁরা যদি উত্তেজিত না হয়ে, সংযত হয়ে পুরো বিষয়টি আলোচনা করতেন, তাহলে তা শোভন হতো। ভালো হতো। কিন্তু কেন জানি মনে হয়েছে, তাঁরা হুমকির সুরে কথা বলছেন। আদালত একটি কথা বলেছেন। কোনো রুল দেননি। পুরো বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ১০ জুলাই পরবর্তী তারিখও নির্ধারিত রয়েছে। অথচ সংসদে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচারপতির 'বিচারের'ও দাবি উঠল। আমরা চাই, ৫ জুন সংসদে যে আলোচনার সূত্রপাত, তার সমাপ্তিও হোক সেখানে। বিষয়টি নিয়ে আর আলোচনা হোক, আমরা তা চাই না। আইন তার নিজ গতিতেই চলুক। স্পিকারের রুলিংয়ের পর এটা নিয়ে আর আলোচনা হোক, আমরা তা চাই না। স্পিকার পুরনো পার্লামেন্টারিয়ান। রাষ্ট্রের তিন নম্বর ব্যক্তি তিনি। জাতির আশা-ভরসার একটা জায়গা। তিনিই তো আমাদের পথ দেখাবেন।Daily KALERKONTHO17.6.12

রাষ্ট্রের দুই স্তম্ভের মধ্যে বিরোধ কাম্য নয়


রাষ্ট্রের দুই স্তম্ভ, জাতীয় সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব এখন রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম বিষয়। স্পিকারের একটি বক্তব্য নিয়ে এই দ্বন্দ্বের সূচনা। এ ক্ষেত্রে স্পিকারের পক্ষে বলতে গেলে পুরো সংসদ দাঁড়িয়ে গেছে। স্পিকারের বক্তব্যকে তারা সমর্থন করেছেন। অন্য দিকে একজন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে পুরো বিচার বিভাগ দাঁড়িয়ে গেছে, এটা বলা যাবে না। এমনকি আইনজীবীরা সবাই যে বিচারপতি চৌধুরীর পক্ষে আছেন, তাও নয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা যা বলছেন তার মর্ম দাঁড়ায় এ রকমÑ জাতীয় স্বার্থে সংসদ ও উচ্চ আদালতের সংযত আচরণ করা উচিত। দেশের শীর্ষ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, কারোরই এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ অপর একটি অঙ্গকে আঘাত করে। প্রতিটি অঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে আমাদের। অন্য দিকে বিচারকদের কাছে রাজকীয় আচরণ ও ভাষা প্রত্যাশা করেছেন ব্যারিস্টার এম. আমীর উল ইসলাম। তার মতে, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ হোক, এটা আমরা কখনই চাইবো না। সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সংঘাত শেষ না হলে সামনে খারাপ দিন আসছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত আইনজীবী ড. এম. জহির। তিনি বলেছেন, দু’টি অঙ্গের মধ্যে ঝগড়া অশনিসঙ্কেত। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন বিচারপতিদের কাছ থেকে বিচারিক ভাষা ও সংবিধানিক বক্তব্য আশা করেছেন। ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, আদালত স্পিকারকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা যেমন ঠিক হয়নি, তেমনি আদালতকে নিয়ে সংসদে এমপিরা যে মন্তব্য করেছেন, তাও সমুচিত হয়নি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদে আলোচনার বিষয় নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা বা আদালত কোন কার্যধারা গ্রহণ করতে পারেন না। তেমনি সংসদ সদস্যদের উচিত কার্যপ্রণালী বিধি মেনে কারও বিরুদ্ধে সমালোচনা করা। তিনি বলেন, সংসদ ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি হলে দেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মতে আদালত যেমন  সংসদের আলোচনা নিয়ে মন্তব্য করে সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন, তেমনি সংসদেরও উচিত হয়নি আদালতের কোন বিচারপতিকে নিয়ে সংসদে কটূক্তি করা। স্পষ্টই বোঝা যায় বিচার বিভাগের সাথে সংসদের দ্বন্দ্বকে ভালো চোখে দেখেননি এ দেশের সুশীল সমাজ। দুর্ভাগ্য এটাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের রায় নিয়ে অনাহূত এক বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এ ক্ষেত্রে কার ক্ষমতা বেশি, কে কর্তৃত্ব করবে, সংবিধানে কাকে কতটুকু ক্ষমতা দিয়েছে, এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই বিরোধকে কেউ কেউ ‘অশনিসঙ্কেত’ হিসেবে মনে করছেন। গণতন্ত্রের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন কেউ কেউ।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ঢাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে থাকা হাইকোর্টের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে যে রায় দিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে জাতীয় সংসদে স্পিকারের দেয়া বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল ও আদালত অবমাননাকর বলে মন্তব্য করেছিলেন। স্পিকার বলেছিলেন, আদালতের রায়ে জনগণ ুব্ধ হলে বিচার বিভাগকেও তারা রুখে দাঁড়াতে পারে’ (সমকাল, ৬ জুন)। স্পিকারের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই আদালত স্পিকার সম্পর্কে ঐ মন্তব্যটি করেছিলেন। তবে কোন রুল দেননি। রায়ে আদালত স্পষ্ট করেই বলেছিলেন ‘আদালত কখনো সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিরুদ্ধে নয়’। কিন্তু আদালতের মন্তব্য নিয়ে সংসদে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা ছিল অনাকাক্সিত। সংসদে গত ৫ জুনের আলোচনায় বিচারপতি চৌধুরীর অপসারণ চেয়েছেন সংসদ সদস্যরা। বলা হয়েছে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে। তোফায়েল আহমদের মত একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য বিচারপতি চৌধুরীকে আখ্যায়িত করেছেন ‘স্যাডিস্ট’ হিসেবে। একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল সাহেব। তিনি কী করে একজন বিচারপতিকে ‘স্যাডিস্ট’ বলেন? এতে করে তো আদালত অবমাননা হয়ে গেল! তিনি যখন বলেন, ‘বিচারপতিদেরকেও বুঝতে হবে বিচারপতিদের বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা’ (সমকাল), তখন কি এই বক্তব্য বিচারপতিদের বিরুদ্ধে এক ধরনের হুমকি হয়ে গেল না? কোন ব্যক্তি কি এ ধরনের কথা বলতে পারে? একজন সংসদ সদস্য নিশ্চয়ই আইনের ঊর্ধ্বে নন। একজন সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বিচারপতি চৌধুরীকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত  বললেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করার কথা। কিন্তু সামান্য একটি বিষয় নিয়ে যা ঘটে গেল, তাতে আমরা দুঃখিত ও লজ্জিতও বটে। বিচারপতি চৌধুরী স্পিকারের বক্তব্যকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলেননি, বলেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এ ব্যাপারে আদালত কোন রায়ও  দেননি। কিন্তু সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে আমি হতাশ। একজন বিচারপতিকে আমরা কিভাবে ‘স্যাডিস্ট’ বা ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ বলি? একজন সাধারণ মানুষের ব্যাপারেও তো আমরা এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে পারি না। আর যেভাবে ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, তা কি এক ধরনের হুমকি নয়? এরা সবাই সিনিয়র সংসদ সদস্য। এদের কাছ থেকে আমি আরো ‘ম্যাচিওরড’ বক্তব্য আশা করেছিলাম। এরাই তো জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন।
বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গকে একটির বিরুদ্ধে অন্যটিকে দাঁড় করানো যায় না। প্রতিটি অঙ্গ স্ব স্ব অবস্থানে থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করে যায়। আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতীক। জনগণের নিরাপত্তার গ্যারান্টিও দেন উচ্চ আদালত। রাষ্ট্র যখন জনগণের উপর নিপীড়ন চালায়, তখন সাধারণ মানুষের ভরসার স্থল হচ্ছে আদালত। আদালতের সিদ্ধান্তে কোন পক্ষ (এ ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ বিভাগ) যদি ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়ে থাকে, তার আপিল বিভাগে যাবার সুযোগ ছিল। আমি অবাক হয়েছি যখন দেখেছি পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম আলোচনার সূত্রপাত করলেও স্পিকার নিজেই মন্তব্য করে বসলেন। সংসদ সদস্যরা আলোচনায় অংশও নিলেন না। আরো মজার কথা, আদালতের রায়ের পর সড়ক ও জনপথ বিভাগের দখলে থাকা কয়েকটি ভবন ও কক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে বুঝিয়েও দেয়া হয়েছে। অথচ ঐ রায়টি নিয়ে এত ‘লঙ্কাকাণ্ড’ ঘটে গেল।
যে ‘ঘটনা’ বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করালো, তা সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শুভ নয়। হাইকোর্টের একটি রায় নিয়ে কয়েকজন সিনিয়র সংসদ সদস্য যে প্রতিক্রিয়া দেখালেন, তা দৃষ্টিকটু। তাদের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেই বলছি, তারা যদি উত্তেজিত না হয়ে, সংযত হয়ে পুরো বিষয়টি আলোচনা করতেন, তাহলে তা শোভন হতো, ভালো হতো। কিন্তু কেন জানি মনে হয়েছে তারা হুমকির সুরে কথা বলছেন। আদালত একটা কথা বলেছেন, কোন রুল দেননি। পুরো বিষয়টি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ১০ জুলাই পরবর্তী তারিখও নির্ধারিত রয়েছে। অথচ সংসদে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচারপতির ‘বিচারের’ও দাবি উঠলো। আমরা চাই ৫ জুন সংসদে যে আলোচনার সূত্রপাত, তার সমাপ্তিও হোক সেখানে। গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে  সংসদের পাশাপাশি বিচার বিভাগের ভূমিকা অনেক ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে আইন পাস করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। ঠিক তেমনি হাইকোর্ট একটি রুল ইস্যু করলেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের দু’টি স্তম্ভের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থা এ দেশে গণতন্ত্রকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারে। আমরা যদি এ ব্যাপারে আরো সচেতন হই, আমাদের মঙ্গল তাতেই নিহিত।

দুটি সংবাদ ও অনেক প্রশ্ন

 
দুটি সংবাদই ছাপা হয়েছে আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায়। প্রথম সংবাদটি দেশের এক মন্ত্রীকে নিয়ে, অপর সংবাদটি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে। আমাদের দেশের মন্ত্রীর নাম দিলীপ বড়-য়া, যিনি শিল্পমন্ত্রী আর দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাওবির প্রেসিডেন্টের নাম জয়েস বান্দা, যিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন মাত্র দু’মাস। একটি কাগজে দিলীপ বড়-য়া সম্পর্কে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল গত ৫ জুন। বাম ঘরানার এই রাজনীতিক, যিনি একটি ছোট্ট দলের প্রধান এবং বোধকরি এখনও স্বপ্ন দেখেন(?) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও শোষণমুক্ত সমাজের, তার সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলÑ মন্ত্রী হয়েই তিনি ও তার পরিবার ছয় ছয়টি প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। নিজের নামে দুটি, স্ত্রীর নামে ১টি, মেয়ের ও ভাইপোর নামে ১টি প্লট নিয়েছেন অভিজাত এলাকায়। উত্তরা ও পূর্বাচলে ১১ কাঠা প্লটের মালিক তিনি। দিলীপ বাবু এখানেই থেমে থাকেননি। চট্টগ্রামেও ৫ কাঠার একটি প্লটের জন্য আবেদন করেছেন। পাঠকদের স্মরণ থাকার কথা, একটি সার কারখানা সফরে গেলে তাকে দামি গাড়ি উপহার(!) দেয়া হয়েছিল। ওই গাড়িটি উপহার দেয়া হয়েছিল এমন এক সময় যখন ওই সার কারখানার ওভারহোলিং নিয়ে দুর্নীতির নানা খবর পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। স্মরণ করতে পারছি না, পত্রপত্রিকায় এই সংবাদটি ছাপা হলে দিলীপ বাবু ওই গাড়িটি (এসিসহ) ফেরত দিয়েছিলেন কিনা? তবে শিল্পমন্ত্রী, যার কোন নিজস্ব আয় নেই, তিনি ইতিমধ্যে সব প্লটের মালিকানা ছেড়ে দিয়েছেন কিনা, তা বলতে পারব না। অন্তত এক সপ্তাহ পরেও এ সংক্রান্ত কোন খবর বা ছেড়ে দেয়ার সংবাদ আমার চোখে পড়েনি। এই হল আমাদের মন্ত্রী কাহিনী।
এবার শুনুন জায়েস বান্দা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য কেনা বিমান ও গাড়ির বহর বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য বিমানের পেছনে বছরে খরচ হয় ২ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড। আর প্রেসিডেন্টের বহরে রয়েছে ৬০টি লিমুজিন। একটি ছোট রাষ্ট্র মালাওবি একজন রাষ্ট্রপতির পেছনে এত খরচ করতে পারে না। তিনি ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসন আরোহণের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে লন্ডনে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, তাতে যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমানে করে, যাত্রী হয়ে।
সারা বিশ্বে এখনও মন্দা চলছে। গ্রিসসহ ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। ফ্রান্সের নয়া প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলন্দ দায়িত্ব গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের বেতন কমিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে আফ্রিকার একটি গরিব দেশ মালাওবি যে বিশ্ব মন্দায় আক্রান্ত হয়েছে, এটাই স্বাভাবিক। তাই মিসেস বান্দা যখন কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ নেন, তার এই সিদ্ধান্তটি সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান্ড্র- মিশেলও মিসেস বান্দার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে কিছুটা ছোট মালাওবি (৪৫,৭৪৭ বর্গমাইল)। লোকসংখ্যা মাত্র দেড় কোটি। বাংলাদেশের জিডিপির চেয়ে কম, মাত্র ৫ দশমিক ৬৭৩ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয়ও (৩৫১ ডলার) বাংলাদেশের চেয়ে কম।
প্রেসিডেন্ট বান্দা কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটা কি আমাদের জন্য চিন্তার কোন খোরাক জোগায় না? প্রেসিডেন্ট বান্দা সঠিক কাজটিই করেছেন উড়োজাহাজ বিক্রি করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. বিঙ্গু মুথারিকা নিজের জন্য এ বিমানটি কিনেছিলেন। যে দেশের মানব উন্নয়ন সূচক ০.৪৯৩, সে দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারবর্গের জন্য ৬০টি লিমুজিন গাড়ি থাকতে পারে না। থাকার কোন প্রয়োজন নেই। বিক্রি করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে সঠিক কাজটিই করেছেন বান্দা। আজ শুধু বান্দার কথা কেন বলি, চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত গ্রিসেও সরকার বেতন কমাতে বাধ্য হয়েছে। অথচ আমাদের মতো দেশে কৃচ্ছ্রসাধনের কোন উদ্যোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশ সফরে যান, তার সফর সঙ্গীর সংখ্যা থাকে প্রায় ১০০। সাংবাদিকরা তো বটেই, অনেক বুদ্ধিজীবী, দলীয় নেতাকর্মীরাও তার সফরসঙ্গী হন। যাদের খরচ বহন করে রাষ্ট্র। ব্যবসায়ীরা তার সফরসঙ্গী হন বটে, তবে সম্ভবত ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নিজেদের খরচ মেটান। এটা একটা ট্রাডিশনে পরিণত হয়েছে। অতীতেও এমনটি হয়েছে। কিছুদিন আগে (২০০৯) কপ-১৫ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যোগ দিয়েছিলেন। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত কপ-১৫ সম্মেলনে তার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। ব্যানার হাতে বেল্লা সেন্টারের সামনে দাঁড়ানো তাদের ছবিও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সংসদ সদস্যরা ‘আইলা’ কিংবা ‘সিডর’ উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াননি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই বিদেশে যাবেন। জাতীয় স্বার্থে এ কাজটি তিনি করবেন। সেক্ষেত্রে এত বড় একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এতে রাষ্ট্রের খরচ বাড়ে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশ যান, তখন তার সঙ্গে এত বড় একটি প্রতিনিধি দল যায় না। আমরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি।
দিলীপ বড়-য়া একটা নয় একাধিক প্লট নিয়েছেন। এর বাইরে অন্য কোন ‘সুবিধা’ তিনি নিয়েছেন কিনা জানি না। প্লট নেয়ার কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। তবে বলেছেন, পারলে তিনি ১২টি প্লটই নিতেন। কেননা তার ১২ জন আÍীয় প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী যে ‘রাজনীতি’ করেন, তার দলের কিছু কর্মীর ঢাকা শহরে থাকার জায়গাও নেই, চাকরিও নেই। তারা কি কোনদিন একটি প্লটের কথা ‘চিন্তা’ করেছে? মাননীয় মন্ত্রী, রাজউক কিন্তু শুধু এ জমানাতেই প্লট দিচ্ছে না। আগেও দিয়েছে। তখন আপনি আবেদন করলেন না কেন? ৬টি প্লট আপনাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। আপনার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও আপনাকে আমি চিনি ও জানি। প্রয়াত মান্নান ভূঁইয়ার বাসায় (যখন মন্ত্রী ছিলেন না) আপনি গিয়েছিলেন। কেন গিয়েছিলেন, সে কথা না হয় নাইবা বললাম। কিন্তু নিউইয়র্কে আপনাকে যারা চেনে, তারা যখন ফোন করে আমাকে আপনার প্লট প্রাপ্তির কথা জিজ্ঞেস করে, আমি তাদের জবাব দিতে পারি না। ওরা আপনাকে চেনে। আপনি নিউইয়র্কে গিয়ে ওদের সঙ্গেই ছিলেন। এ দেশে বাম রাজনীতি করা অনেক মানুষ রাজনীতির কারণে ‘শেষ’ হয়ে গেছেন। সে রাজনীতি ভুল ছিল কিনা, তারা তা কখনও চিন্তা করেননি। রাজনীতিটাকেই আঁকড়ে ধরেছেন। মারাও গেছেন। নিঃস্ব হয়ে ‘অন্যের দয়ায়’ বেঁচে আছেনÑ এ সংখ্যা একেবারে কম নয়। আবার এ দৃশ্যও আছেÑ এক সময় ‘বাম’ রাজনীতি করে এখন শত কোটি টাকার মালিক। সাবেক সোভিয়েত রাজনীতির সমর্থক, যারা ১৯৭২-৭৪ সময়সীমায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তারা আজ অনেকে মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের বড় নেতা। আবার গণবাহিনী গঠন করে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের (১৯৭২-৭৪) পতন ঘটাতে চেয়েছিলেন, তারা আজ বড় সুবিধাভোগী। এমপি। কারও বা আবার মন্ত্রীর সমান মর্যাদা। কিভাবে মানুষ বদলে যায়!
প্লট পাওয়া কোন অপরাধ নয়। প্লট তিনি পেতেই পারেন। কিন্তু দৃষ্টিকটু তখনই, যখন মন্ত্রী হয়ে তিনি ওই প্লটটি পান। আগে পেলে একথা উঠত না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি যদি আবেদন করতেন, তিনি ভালো করতেন। সেটাই শোভন ছিল। তখন কোন প্রশ্ন উঠত না। আজ উঠেছে। একজন বাম রাজনীতি করা লোকের কাছে, এটা আশা করা যায় না। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকার কথা তার। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় একটা প্লট না পেলে কি তার জীবন ‘অপূর্ণ’ থাকত? অনেকেরই তো সরকারি প্লট নেই। আমার নিজেরও নেই। তাতে কী হয়েছে? একটা প্লট বা ফ্ল্যাট আমাকে ‘পূর্ণতা’ এনে দেবে না।
যে রাজনীতির ভেতর দিয়ে দিলীপ বড়-য়া বেড়ে উঠেছেন, সেই ‘রাজনীতি’ তাকে ক্ষমতায় বসায়নি। জনগণের ভোটে তিনি নির্বাচিতও হননি। ভোটে দাঁড়ালে ১০০ ভোট পেতেন কিনা সন্দেহ। তবুও তিনি মহাজোট সরকারের মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতায় তিনি শপথ নিয়েছেন। কিন্তু লোভ-লালসা তিনি ত্যাগ করতে পারলেন না। প্লটের হাতছানি তার রাজনৈতিক কমিটমেন্টকে ধূলিসাৎ করে দিল। লোভ-লালসার কাছে তিনি আÍসমর্পণ করলেন। প্রেসিডেন্ট বান্দার সঙ্গে পার্থক্য এখানেই। একটি গরিব দেশের প্রেসিডেন্ট বান্দা। বিলাসবহুল বর্তমান লিমুজিন গাড়ি তার প্রয়োজন নেই। ফ্রান্সের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট আগের বেতন রাখতে পারতেন। কিন্তু মন্দার কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তিনি মন্ত্রীদের বেতন কমিয়ে দিয়েছেন। এটাই সঠিক। আমাদের মন্ত্রী দিলীপ বড়-য়া পারতেন এ ধরনের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। কিন্তু তিনি পারলেন না। বরং দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনিও দুর্নীতির (?) ঊর্ধ্বে নন। এতদিনের তার রাজনৈতিক আদর্শ, কমিটমেন্ট আজ মিথ্যা প্রমাণিত হল। আমাদের দুঃখটা এখানেই। তিনিও গতানুগতিক পথে হাঁটলেন। মন্ত্রী হওয়া মানেই গাড়ি, বাড়ি, প্লটের মালিক হওয়া। মন্ত্রী দিলীপ বড়-য়া আজ সেই ‘পথেরই পথিক’।
Daily JUGANTOR
13.06.12

বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে দুটি কথা

আমরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দাবি করছি, সেখানে এই হত্যাকা- ও এর বিচার না হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকের স্বার্থেই আমিনুলের হত্যাকা-ের বিচার হওয়া উচিত। এদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকা-ের ব্যাপারে হিলারি ক্লিনটনের একটি মন্তব্যের যে প্রতিক্রিয়া অর্থমন্ত্রী দেখিয়েছিলেন, তা শোভন ছিল না। ব্যক্তি ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় কী করেছেন, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, বিশ্বজুড়েই ড. ইউনূসের অনেক 'বন্ধু' রয়েছেন। ড. ইউনূসের অপসারণের ঘটনায় তারা আহত হয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় কোনো একটি ক্ষেত্রে তাকে রাখা গেলে ক্ষতি কি? তিনি নিশ্চয়ই এখন আর আগের মতো গ্রামীণ ব্যাংকে প্রভাব খাটতে পারছেন না। সরকার এই বিষয়টি ভেবে দেখলে ভালো করবে। এমসিএ বা মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্টস থেকে আমরা সহায়তা পাচ্ছি না। বড় বাধা আমাদের দুর্নীতি। এই দুর্নীতি আমরা রোধ করতে পারছি না। পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। ঢাকা সফরে এসে জাপানি উপ-প্রধানমন্ত্রীও বলে গেলেন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার। বিএনপিও বলছে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার জন্য। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। আমাদের স্বার্থেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলা উচিত। হিলারি ক্লিনটন মূলত এ কথাগুলোই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বলে গেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বিষয়গুলো আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ সরকার না হলে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মনোভাব প্রতিফলিত হবে না। সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে হলে তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। হিলারি ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্ব ঢাকায় এসে এ কথাটাই আমাদের বলে গেছেন। সরকার যদি এটা উপলব্ধি করতে না পারে, তাহলে সরকার ভুল করবে। আমাদের কাছে প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে জাতির বৃহত্তম স্বার্থের খাতিরে সরকার এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সংবিধানসম্মত ছিল না। যেমন ২০০৮ সালে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের কথা আমরা বলতে পারি। এ দুটি দেশে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ ছিল না সংবিধানে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট মুগাবে (জিম্বাবুয়ে) সাবাঙ্গিরাইকে প্রধানমন্ত্রী ও কেনিয়াতে প্রেসিডেন্ট কিনাকি বিরোধী দলনেতা অডিংগাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। আজ গ্রিসের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পাকিস্তানের দৃষ্টান্তও দিতে পারি। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের সংসদেও একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন আয়োজন করার। আমরা চাই দেশে তত্ত্বাবধায়ক তথা নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার একটা ঘোষণা সরকার দিক। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করা সম্ভব। গ্রিস আমাদের জন্য একটা উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা ওই উদাহরণটা অনুসরণ করতে পারি।
একজন সাবেক বিচারপতি গ্রিসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচিত হেেছন। এই জুনে সেখানে নির্বাচন। গ্রিসের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশেও তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছেন। আসলে মূল বিষয়টি হচ্ছে সংবিধানই সবকিছু নয়। প্রয়োজনে জাতির স্বার্থে সংবিধানের বাইরে গিয়েও কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আমাদের রাজনীতিবিদরা গ্রিস বা কেনিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন কীনা, সেটাই দেখার বিষয় এখন। তবে একটি আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গেল বুধবার বলেছেন, সংলাপ হবে, তবে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো নিয়ে নয়। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও ইঙ্গিত দিয়েছেন একটি নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো নিয়ে মহাজোটের মাঝে আলোচনা হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে পরিষ্কার। সরকার একটু নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। এটা নিশ্চয়ই অনেকেই স্বীকার করবেন, ২০০৮ সালের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই সরকারের অনেক অনিয়ম, বিশেষ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন আহমেদের বিতর্কিত ভূমিকা গোটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সে ধরনের একটি সরকার কেউই চাইবে না। তবে একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সেই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো কী হবে, সেটা নিয়েই সংলাপ হতে পারে। এখানে বিভিন্ন ফর্মুলা নিয়ে মতবিনিময় হতে পরে। তাই সৈয়দ আশরাফের মতো একজন সিনিয়র নেতা যখন বলেন আলোচনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, তখন এটাকে আমি 'পজিটিভলি' নিতে চাই। তত্ত্বাবধায়ক না হোক বিকল্প একটি ব্যবস্থা আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়েই বের হয়ে আসতে পারে। আমার বিশ্বাস নির্বাচন পরিচালনায় একটি নিরপেক্ষ সরকারের আদল আমরা আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে বের করতে পারব। এক সময় তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও আমরা উদ্ভাবন করেছিলাম। ঠিক তেমনি আজো নতুন একটি পদ্ধতি আমরা বের করতে পারব। এ জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে আস্থা ও বিশ্বাস। সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যদি এই আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলেই সম্ভব একটা সমাধানে পেঁৗছানোর। এখন সরকার একটা তারিখ প্রস্তাব করুক। বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাক। আমার বিশ্বাস বিরোধী দল সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেবে।
Daily DESTINY
13.6.12

জাবিতে অস্থিতিশীলতা কাম্য নয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়া উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যখন স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে, ঠিক তখনই নতুন করে আন্দোলনের একটি খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এতদিন আন্দোলনে ছিল \'শিক্ষক সমাজ\'। এবার আন্দোলনে নামছেন \'মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা\' নামক একটি সংগঠনের ব্যানারে নবনিযুক্ত শিক্ষকরা। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. হাসিবুর রহমান, যিনি পদত্যাগকারী উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের অভিযোগ, \'শিক্ষক সমাজে\'র নেতা অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসেন আন্দোলন চলাকালীন \'অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে\' বলে যে দাবি করেছেন, তা মিথ্যা। তারা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে অধ্যাপক হোসেনের বিচারও দাবি করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। \'শিক্ষক সমাজে\'র নেতৃবৃন্দ গত ২৬ মে নবনিযুক্ত উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে এ ঘটনার প্রতিবাদও জানিয়েছেন। এটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা কাম্য হতে পারে না। আমি যতদূর জানি, \'শিক্ষক সমাজে\'র নেতা অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসেন ঢালাওভাবে নবনিযুক্ত সকল শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আনেননি। তিনি কেন, শিক্ষক সমাজের অনেক নেতাই, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সিনিয়র শিক্ষক, তারা একাধিকবার এই অভিযোগটি তুলেছেন। গণমাধ্যমেও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেদিন যদি এর প্রতিবাদ উঠত, তাহলে অভিযোগটি এত দূর গড়াত না। অভিযোগ অভিযোগই। এর মাঝে সত্যতাও থাকতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে। কিন্তু এটা নিয়ে দু\'পক্ষ পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে, এটা তো কাম্য হতে পারে না। নয়া উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিশ্বমানে উন্নত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে চান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হলেও, তিনি শিক্ষক সমাজের সমস্যা সম্পর্কে জানেন। দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন, এটা আমি বিশ্বাস করি না। তিনি জানেন ও বোঝেন। সমস্যা সমাধানে তাকে সময় দিতে হবে। তিনি যখন সবে দায়িত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন, তখন \'মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা\' একটি কর্মসূচি দিয়ে জাবি প্রশাসনকে একটি বিব্রতকর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কর্মসূচি দেওয়ার তো আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। তারা স্মারকলিপি দিয়েছেন, এটা কি যথেষ্ট ছিল না? এভাবে একজন সিনিয়র শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনাটা অশোভন, দৃষ্টিকটু। আমরা কি এতে করে প্রকারান্তরে সিনিয়র-জুনিয়র ব্যবধান তৈরি করছি না? অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের একজন। আজ যারা \'মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা\' ব্যানারে সমবেত হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই তার ছাত্রতুল্য, ছাত্রও বটে। এতে করে কি সিনিয়র শিক্ষকদের অসম্মানিত করা হলো না? যে দুইশ\' শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন গত তিন বছরে, এটা অস্বাভাবিক। আমাদের অনেক ছাত্র শিক্ষক হয়েছেন। আবার অনেক \'ভালো\' ছাত্রও শিক্ষক হতে পারেননি। তাদেরও ক্ষোভ থাকতে পারে। বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদনও দেখেছি। কিন্তু তাতে করে কোনো নিয়োগই বাতিল হয়ে যায় না। অতীতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হয়েছে, এটা আমার জানা নেই। সুতরাং এ বিষয়টি নিয়ে \'জল ঘোলা করার\' কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমরা সবাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও থাকব কিছুদিন (আমি ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ষাট বছরেই অবসরে যাব)। যারা আজ নিয়োগ পেলেন, তারা থাকবেন প্রায় ৪০ বছর, অর্থাৎ ধরে নিচ্ছি ২০৫২ সাল পর্যন্ত। তাদের অনেক পথ যেতে হবে। একুশ শতকের একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। \'স্বপ্নের জাহাঙ্গীরনগর\' গড়ার যে প্রত্যয় উপাচার্য ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব তরুণ প্রভাষকদের। বিশ্ব জুড়েই তরুণরা পরিবর্তন আনছেন। নিউইয়র্কের \'অকুপাই মুভমেন্ট\' ২৫১ দিন অতিক্রম করল গত ২৬ মে। আর এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে আধুনিকমনস্ক তরুণরা। শক্তিশালী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে তারা দাঁড়িয়ে গেছে। আরব বিশ্বে পরিবর্তনের সূচনা করেছিল এই তরুণরাই। \'আরব বসন্ত\' ও তরুণ সমাজের অবদান নিয়ে সারা বিশ্ব আজ সোচ্চার। \'মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা\' ব্যানার তৈরি না করে বরং তরুণ প্রভাষকরা যদি \'পরিবর্তনের পক্ষে আমরা\' ব্যানার তৈরি করে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত রাখতেন, আমি খুশি হতাশ। কেননা তরুণদের পক্ষেই পরিবর্তন সম্ভব। তারা যে যোগ্য, এটা তাদেরই প্রমাণ করতে হবে। বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি নিয়ে প্রমাণ করতে হবে \'আমরাও পারি\'। শুধু শুধু আন্দোলনের নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতা কেন? আমরা নিশ্চয়ই এটা স্বীকার করব, ইতিমধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। \'শিক্ষক সমাজ\' আন্দোলন করেছিলেন একটা যৌক্তিক দাবি তুলে। কিছুটা হলেও সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে। ভিসি পদত্যাগ করেছেন। আমরা নয়া ভিসি পেয়েছি। আবার আন্দোলন কেন? এতে করে কি নতুন করে সেশনজট তৈরি হবে না? \'মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আমরা\' কর্মসূচি দিলে শিক্ষক সমাজও নতুন করে কর্মসূচি দেবে। এতে করে লাভ কার? ভিসি মহোদয় কি শিক্ষকদের এই দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যস্ত থাকবেন, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উন্নয়নের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন! আমাদের তো সবার উচিত, নয়া ভিসিকে সহযোগিতা করা, যাতে করে তিনি অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারেন। তার সামনে তো এখন অনেক কাজ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি সকল শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব করে। তরুণ শিক্ষকরা যদি মনে করে থাকেন, তাদের অপমান করা হয়েছে, তারা শিক্ষক সমিতির কাছে অভিযোগটি তুলতে পারেন। সমিতি বিষয়টি দেখতে পারে। আমরা তো এভাবেই সমস্যার সমাধান করি। সবচেয়ে বড় কথা, একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এর পেছনে সত্যতা আছে কি নেই, আমরা জানি না। তবে অভিযোগটি বেশ পুরনো। এ ক্ষেত্রে তরুণ শিক্ষকরা দাবি করুক একটি নিরপেক্ষ তদন্তের, যাতে করে প্রকৃত \'সত্য\' বেরিয়ে আসবে। আমরা তো তেমনটি চাই। এটা তাদের জন্যও ভালো। কেননা আগামী দিনে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে সিনিয়র অনেক শিক্ষক অবসরে যাবেন। নাসিম আখতাররাও থাকবেন না তখন। তরুণরাই তো তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় চালাবে। এ জন্যই তাদের দাবি হওয়া উচিত ছিল তদন্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও এ কাজটি করতে পারে। নয়া উপাচার্য বলেছেন, ১৯৭৩ সালের জাবি আইন অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখানে তিনি গড়ে তুলবেন। এটা শুভ লক্ষণ। এ জন্য অনেক কাজ তাকে করতে হবে। সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের আগে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বের নির্বাচন করতে হবে। ডিন নির্বাচনও বাকি। ধারণা করছি, সিন্ডিকেটের কয়েকটি পদেরও নির্বাচন হবে। আমি জানি, উপাচার্য মহোদয় \'কমিটমেন্ট\' রক্ষা করার মানুষ। এ সিদ্ধান্তগুলো তিনি একে একে নেবেন। একাডেমিক শৃঙ্খলাও ফিরিয়ে আনবেন তিনি। সামনে প্রথম পর্বের ভর্তি পরীক্ষা। এখানেও প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। ৬ জুন বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে। ক্লাস শুরু হচ্ছে নতুন করে। এ সময় এমন কোনো কাজ আমাদের করা উচিত নয়, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়। আমরা সবাই সামনের দিকে তাকাতে চাই। পেছনের দিকে নয়। কে যোগ্য, কে অযোগ্য, কে অন্যায় করেছে, কার বিচার আমরা করব_ এসব নিয়ে যদি আমরা ব্যস্ত থাকি, তাহলে মূল কাজ থেকে আমরা পিছিয়ে যাব। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা আসছে। আসুন, সবাই মিলে এই স্থিতিশীলতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করি এবং উপাচার্য মহোদয়কে তার কাজগুলো করতে দিই। তরুণ সমাজের প্রতি আমার আস্থাটা অনেক বেশি। আমরা যা পারিনি, তা তরুণরাই করবে। আমার এই আস্থায় যেন কোনো ঘাটতি না থাকে।
Daily SAMAKAL
13 June 2012

খবরগুলো কোনো আশার কথা বলে না

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব খবরাখবর ছাপা হয়েছে, তা কোনো আশার কথা বলে না। একের পর এক যেসব খবরাখবর পত্রিকায় আসছে, তাতে করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা হতে বাধ্য। গত ২৫ মে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে সংবাদপত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করা হয়েছে। বিরোধী দলের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে সঙ্কুুচিত করা হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। সরকারি পর্যায় দুর্নীতি আজ মারাত্মক এক সমস্যা। লন্ডনের অ্যামনেস্টির রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে একই দিন। তাতে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ধরনের প্রতিবেদন সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না। এমনকি লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকায় যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের হস্তক্ষেপের শামিল। ইকোনমিস্ট কখনো কোনো পাকপরবর্তী দেশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করার উপদেশ দিতে পারে না। মোট কথা এ ধরনের সংবাদ আমাদের হতাশার মাঝে ঠেলে দেয়। ঢাকায় সৌদি নাগরিক খালাফ আল আলীকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করেছিল। আজো আমরা তার কূলকিনারা করতে পারলাম না। গেল মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস শিয়ার বলে গিয়েছিলেন, অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয় বাংলাদেশ (আমার দেশ, ৭ মার্চ)। সব সংবাদকে একত্রিত করলে কেন জানি মনে হয় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি ইমেজ সঙ্কটের মুখে পড়েছে। প্রতিটি প্রকাশিত সংবাদে সরকার তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রতিবাদ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি নাগরিক খালাফ আল আলী হত্যাকা-ে সে দেশের সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ছিলেন, তা ছিল আমাদের জন্য একটি 'ম্যাসেজ'। সৌদি মিডিয়া, ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত খুনিদের গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছিলেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছিলেন। এই 'দাবি' একটি ম্যাসেজ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি যে কীভাবে নিয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি প্রকৃত দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হয় কিংবা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব না হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিলে ভালো করবেন। এমনিতেই পুলিশের সাম্প্রতিক কর্মকা- নিয়ে আমি রীতিমত হতাশ। রুনি-সাগরের হত্যাকা- নিয়ে আজো কূলকিনারা হলো না। আমরা ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি এই হত্যাকা-ের খবর। মিডিয়ায় লেখালেখির কারণে সম্ভবত এখানে একটি 'জজ মিয়া নাটক' মঞ্চস্থ হয়নি। কিন্তু মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন 'প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং রুনি-সাগরের হত্যাকা- মনিটর করছে, তখন আমি একটা দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। যদি সত্যি সত্যিই প্রধানমন্ত্রী মনিটর করে থাকেন যে, তাহলে এতদিন কেন লাগবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও দক্ষতা তাই সঙ্গত কারণেই উঠবে। পুলিশ যদি মূল কাজ ফেলে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হত্যাকারীরা তো এ সুযোগ নেবেই। পুলিশের উচিত মূল কাজে মনোনিবেশ করা ও তাদের দক্ষতা বাড়ানো। পুলিশ বাহিনীতে একজন থ্রি স্টার জেনারেলের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর জন্য ৫ জন সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করে সরকার পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা বাড়াতে চেয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের পিটিয়ে পুলিশ যা করল, তাতে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এই মন্ত্রণালয়ের দিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন। মার্কিন কর্মকর্তা জেমস শিয়ার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন বলেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিমুক্ত নয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে এর একটা ব্যাখ্যা দাবি করা উচিত ছিল। কেননা প্রধানমন্ত্রী তো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে বলেছিলেন বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা- নেই। এটাই হচ্ছে বাস্তব কথা। বর্তমান সরকারের শাসনামলে গেল সাড়ে তিন বছরে আমরা কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- লক্ষ্য করিনি। সন্ত্রাসীরা তেমনভাবে সংগঠিত হতে পারছে না। বিচ্ছিন্ন দু'একটি সংবাদ ছাপা হলেও তাদের তৎপরতা সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ কিংবা জমায়েতের মাধ্যমেই তা সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশ অবশ্য তৎপর হয়েছে। কিন্তু ওইসব নিষিদ্ধ ঘোষিত গ্রুপ কর্তৃক কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত হতে আমরা দেখিনি। তাই অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী হামলায় বাংলাদেশ একটি ঝুঁকিমুক্ত দেশ, তা নিঃসন্দেহে বলা যাবে না। বাইরের সন্ত্রাসী হামলা? এটাও তো আমাদের চোখে ধরা পড়েনি। কিছু ভারতীয় সন্ত্রাসী বাংলাদেশে পালিয়ে ছিল। কিন্তু তাদের কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা- ছিল না এ দেশে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের হস্তান্তরের ফলে ওই অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটেছে। এর বাইরে 'আল-কায়দা' কিংবা লস্করে তৈয়েবা'র মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের কোনো নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে কাজ করছে বলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমাদের কখনো অবহিত করেনি। ফলে মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য প্রশ্ন থেকেই গেল। তার ওই বক্তব্যের উদ্দেশ্য কী-এ প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ সফর করতে ভালোবাসেন। তিনি জানিয়ে ছিলেন, খালাফ আল আলীর মৃত্যুর ঘটনার প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এতদিন পার হওয়ার পরও সত্য বেরিয়ে আসেনি। তাতে করে কী আমাদের ভাবমূর্তি আদৌ উজ্জ্বল হয়েছে? বাংলাদেশি প্রায় ২০ লাখ (প্রকান্তরে ৩০ লাখ) নাগরিক এখন সৌদিতে কর্মরত। তাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। গত ৭ মার্চ রাতে একটি চ্যানেলে অংশ নিতে গিয়ে সৌদি আরব থেকে প্রবাসীরা ফোন করে আমাদের তাদের আতঙ্কের কথা জানিয়েছিলেন। এই আতঙ্কের খবরটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। এমনিতেই বাংলাদশে-সৌদি আরব সম্পর্ক খুব উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এটা বলা যাবে না। গত ২০০৮ সাল থেকেই সৌদিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়োগ পরিপূণভাবে বন্ধ করেছে। এটা আমাদের একটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বিষয়টির ওপর গরুত্ব দেয়নি কখনো। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জনশক্তি বাজার যে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদন, আমাদের নীতি নির্ধারকরা তা আদৌ বিবেচনায় নেয়নি। আমাদের অদক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিদেশ সচিব পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই দিকটি বারবার এড়িয়ে গেছেন। অথচ সৌদি আরব বাংলাদেশকে বাইরে রেখে নেপালের মতো হিন্দু প্রধান দেশ থেকে কর্মী সংগ্রহ করে আসছিল। শুধু তাই নয়, সংবিধান ২৫(২) ধারাটি সংযোজন করে আমরা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গরুত্ব দিয়েছিলাম। এটি ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল নির্দেশনা। কিন্তু সংবিধান সশোধনের ফলে সংবিধানের এই ধারাটি এখন আর নেই। এতে করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে 'বিশেষ সম্পর্ক' এ যে প্রভাব ফেলছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। সৌদি আররেব সঙ্গে সম্পর্ককে এ প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যেতে পারে। মোট দাগে যেটা বলা যায়, তা হচ্ছে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই উচিত এই হত্যাকা-ের 'মোটিভ' খুঁজে বের করা এবং হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা। প্রয়োজনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো বিশ্বসেরা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও নেয়া যেতে পার। দেশে এ মুহূর্তে যুদ্ধপরাধীদের বিচার চলছে। বিরোধী দল একের পর এক কর্মসূচি পালন করে সরকার পতনের আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তিশালী করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে অতি দ্রুত হত্যাকা-ের মোটিভটি সুস্পষ্ট করা। এটি একটি স্পর্শকাতর হত্যাকা-। এর সঙ্গে আমাদের অনেক স্বার্থ জড়িত। একটি বিদেশি রাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে একটি সংবাদও কোনো কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এরই প্রতিধ্বনী আমরা দেখতে পাই এষড়নধষ ঞযৎবধঃ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে গত ৯ মার্চ। সেখানেও মধ্যপ্রাচ্যের ওই রাষ্ট্রটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটা চিন্তার কারণ। খুব দ্রুত আমরা যদি এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে না পারি, তাহলে তা শুধু সৌদি আরবের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতেও এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। তাতে করে জনশক্তি রপ্তানিতে আরো ধস নামবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমবে। আর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী থাকবেন এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায়। আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই তা কোনো ভালো সংবাদ নয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতি যদি আরো একটু উন্নত করা যায়, তাতে ক্ষতির কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীকে একটা দায়বদ্ধতার মাঝে আনা উচিত। এমনিতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে, তা নিয়ে বড় বিতর্ক রয়ে গেছে। এমনি এক সময় বিদেশের পত্রি-পত্রিকায় এ ধরনের সংবাদ ছাপা হলে, তা কখনোই আমাদের জন্য কোনো শুভ সংবাদ হতে পারে না। তাই আমি বিশ্বাস করি সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে উদ্যোগ নেবে।
 Daily JAI JAI DIN
09.06.12

আমাদের বৈদেশিক নীতি

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪১ বছরে পা দিয়েছে গেল মার্চ মাসে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ২০১২ সালের ২৬ মার্চ, এই সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি যদি পর্যালোচনা করা যায়, তাহলে মূলত তিনটি ধারা আমরা লক্ষ্য করব। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত একটি ধারা। দ্বিতীয় ধারার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর, যা অব্যাহত থাকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তৃতীয় ধারার সূচনা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এই তিনটি ধারাতেই কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আমরা লক্ষ্য করি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, (ক) সংসদীয় গণতন্ত্র (খ) সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় দলীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা (গ) সমাজতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো, (ঘ) ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতি। কোনো কোনো বিশ্লেষক এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, এটা ছিল অনেকটা 'ভারতীয় মডেল'। ওই সময়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। যেমন_ (ক) সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের 'বিশেষ সম্পর্ক' স্থাপন (খ) ভারতের নির্ধারক ভূমিকা। তবে আদর্শ হিসেবে জোট নিরপেক্ষতা অনুসরণ করা, (গ) অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর যে সম্পর্ক উন্নয়ন, (ঘ) চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন ৪৩ মাস। ওই সময় ব্রেজনেভ (সাবেক সোভিয়েত ইউনিযনের রাষ্ট্রপ্রধান) প্রণীত যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির প্রতি সমর্থন, তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারের ৭ দফা দাবির প্রতি সমর্থন, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা শীর্ষক সম্মেলনের প্রতি সমর্থন ইত্যাদি কারণে বহিঃবিশ্বে একটা ধারণা জন্ম হয়েছিল যে বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটা অ্যালায়েন্স গড়ে তুলছে, যা এ অঞ্চলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থকে রক্ষা করবে। বহিঃবিশ্বে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণেই বাংলাদেশ ওই সময় সোভিয়েত শিবিরে অবস্থান করছিল এবং সোভিয়েত-ভারত সম্পর্কের কারণে এটা এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও ছিল। অভ্যন্তরীণভাবে একটা 'চাপ'ও ছিল, যারা মনে করতেন সোভিয়েত সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশে 'সমাজতন্ত্র' নির্মাণ করা যাবে না। এই সময় ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা ছিল বিতর্কিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিলেও ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও গিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের একটা উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি। ১৯৭৫ সালের আগস্টের নিয়োগান্তুক ঘটনার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর আগে ১৯৭৫ সালে যে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, তা বাতিল ঘোষিত হয়। সৌদি আরব ও চীন বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৫ সালের আগস্ট পরবর্তী ঘটনার মধ্যে দিয়ে শহীদ জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জিয়া মনে করতেন, বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইসলামের ব্রিজ স্বরূপ। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে। আল কুদস কমিটি ও ১৯৮১ সালে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও সদস্য ছিল বাংলাদেশ। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী পরিষদের সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ সম্পর্কিত ঘচঞ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। জেনারেল জিয়া ভারতের ভূমিকার ব্যাপারে কঠোর হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে ও একই বছরে ৪২ জাতি ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ফারাক্কা প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিল। পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রশ্নে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি চীনের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক বৃদ্ধিই করেননি বরং, বাংলাদেশর বৈদেশিক নীতিতে চীনের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় করে তুলে ছিলেন। সাবেক সোভিয়েত উন্নয়ন কর্তৃক আফগান আগ্রাসনের (১৯৭৮) ব্যাপারেও বাংলাদেশ কঠোর হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বেগম জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার (১৯৯৬-২০০১) বৈদেশিক নীতি ছিল জিয়া প্রণীত বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে এরশাদ, বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার সরকারের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। তবে শেখ হাসিনার সময় চীনের ওপর থেকে 'সামরিক নির্ভরতা' কিছুটা হ্রাস করে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। এরশাদের সময় (১৯৮২-১৯৯০) পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়েছিল। ১৯৮৩ সালের ১৪ জন সোভিয়েত কূটনীতিককে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পশ্চিমা বিশ্বে তিনি সমাদৃত হয়েছিলেন। তার আমলেই ১৯৮৫ সালে সার্ক আত্মপ্রকাশ করে, যদিও এর উদ্যোগটা নিয়েছিলেন শহীদ জিয়া। তবে ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ তালপট্টি দখল করে নিলেও, তিনি ভারতের ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে পারেননি। বেগম জিয়ার (১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬) বৈদেশিক নীতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, (ক) চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া (খ) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো উন্নতকরণ (গ) আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ককে আরো কার্যকরী করা (ঘ) সৌদি আরব-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া (ঙ) ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা। বেগম জিয়ার সময় নিবারক কূটনীতি প্রয়োগ করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেয়। তার আমলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। বেগম জিয়ার দ্বিতীয় টার্মে (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ পূর্বমুখী বৈদেশিক নীতির সূচনা করে, যা ছিল আগে উপেক্ষিত। বেগম জিয়ার সময় চীন 'কুনমিং উদ্যোগ' এর কথা বলে (চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমার, ভারতের উত্তর পূবাঞ্চলের রাজ্যগুলো ও থাইল্যান্ডের সমন্বয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। কিন্তু ভারতের আগ্রহ ছিল 'গঙ্গা-মেকং সহযোগিতার' ওপর, যে কারণে 'কুনমিং উদ্যোগ' এর আর জট খোলেনি। ভারত এখন আসিয়ান-এর সদস্য হতে চায়। যে কারণ কুনমিং উদ্যোগ-এ যেখানে চীনের জড়িত হওয়ার কথা রয়েছে, সে ব্যাপারে তার আগ্রহ কম। বেগম জিয়ার সময়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য সঙ্কটে মিয়ানমার আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে। শেখ হাসিনা দুই টার্মের জন্য ক্ষমতাসীন হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি হয়েছিল। যদিও তার আমলে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তিটি তিনি আর নবায়ন করেননি। ভারতে আশ্রিত পাহাড়ি শরণার্থীদের তিনি দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তার আমলে সার্ক-এর ভেতর একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সিদ্ধান্ত (ঝঅএছ) গৃহীত হয়েছিল। যদিও তা কার্যকরী হয়নি। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য আমদানি বাড়ে ৩ গুণ। ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান পর পর কয়েকটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে তিনি শান্তি স্থাপনের একটি উদ্যোগ নেন, যা প্রশংসিত হয়। তার সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে সফরে আসেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ সিটিঝিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে 'হানা' চুক্তিও (হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিসটেন্স নিডস অ্যাসেসমেন্ট) স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। তিনি ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ক্ষুদ্র ঋণ শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন। তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীনকে বেছে নিলেও সামরিক ক্ষেত্রে চীনের ওপর থেকে পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতা তিনি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার আমলে ঢাকায় রাশিয়ার অস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ওই সময় চীনের বদলে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছিল (মূল্য ১২৪ মিলিয়ন ডলার) চীন মিগ-২৯ বিমান সরবরাহ করতে রাজী হলেও বাংলাদেশ ওই বিমান রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করেছিল। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশ দুটি আঞ্চলিক জোট ডি-৮, বিমসটেক-এ যোগ দেয়। তিনি ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে (ইসলামাবাদ মার্চ, ১৯৯৭) যোগ দিয়ে ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি একটি অভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠারও দাবি জানিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি একটি মহাজোট সরকার গঠন করেছেন। মহাজোট সরকারের সময় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছে। ট্রানজিট (ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা করিডোর) নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিতর্ক থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এবং ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে তা কার্যকরীও হয়েছে, যদিও ট্রানজিট ফি এখনো নির্ধারিত হয়নি। বলা হচ্ছে ট্রানজিটের বিষয়টি আপেক্ষিকতার আলোকে দেখা হবে। কিন্তু দেখা গেল ভারত একপক্ষীয়ভাবে তা ব্যবহার করছে, ভুটান বা নেপাল এখনো ট্রানজিট পায়নি। ভারতের এ দুটো দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা। কিন্তু ইতোমধ্যে এই সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে_ এ তথ্য আমাদের জানা নেই। এমনকি ভারতের 'সাতবোন' রাজ্যগুলো কর্তৃক চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি যেভাবে বাড়ছে তাতে করে আগামী দিনগুলো বাংলাদেশি পণ্য খালাস করতেই হিমশিম খাবে। এ ক্ষেত্রে 'সাতবোন' রাজ্যের পণ্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। ভারত অবকাঠামোখাতে যে ঋণ দিয়েছে, তাও বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণের মতোই এই ঋণ দিয়ে ভারতীয় পণ্য ও সেবা কিনতে আমরা বাধ্য। মনমোহন সিং এর ঢাকা সফরের সময় যে উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার গুরুত্ব অনেক বেশি। ওই চুক্তিতে যে 'ভাষা' ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে করে ভারতীয় স্বার্থই রক্ষিত হয়েছে বেশি করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। গত সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে ভারতের পাল্লাটি ভারী, বাংলাদেশের প্রাপ্তি তুলনামূলক বিচারে কম। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তিস্তা চুক্তি হয়নি। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি সিটমহল ও ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি সিটমহলের ব্যাপারেও কোনো সমাধান হয়নি। ভারত আমাদের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। এতে ১৩টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলো আটকে আছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতি। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ ভারতের নেই। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমাদানির একটি চুক্তি হলেও, তাতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশে সফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে ওই সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বাংলাদেশের প্রাপ্তিও এখানে কম। যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধরোধ ও নিরাপত্তা সংহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। তবে ধারণ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিশ্লেষকের লেখনিতে এটা বেরিয়ে এসেছে যে, এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে একটি জোট গড়ে তোলার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান মার্কিনী প্রভাব, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে ওঠার আলোকেই হিলারি সফরকে বিশ্লেষণ করতে হবে। হিলারির ওই সফরেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশ তার পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবশোধিকারের প্রতিশ্রুতি পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র 'টিফা'র বদলে এখন 'টিআইসিএফ' (ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরাম) চুক্তি করতে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ 'মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসি) থেকে ভবিষ্যতে সাহায্য পাবে এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও আমরা পাইনি। তবে হিলারি ক্লিনটনের একটি বক্তব্যে আমি আশাবাদী তরুণদের সঙ্গে এক আড্ডায় তিনি বাংলাদেশকে একটি ঝড়ভঃ চড়বিৎ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। যে কোনো বিবেচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে কিংবা আরএমজি সেক্টরে বিশ্ব আসরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি 'শক্তি' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। হিলারি ক্লিনটন সেটাই স্বীকার করে গেলেন। যারা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের এই 'অর্জন'কে ধরে রাখা। সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার নিশ্চিত হওয়ায়, ওই সম্ভাবনা এখন আরো বাড়ল। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থটাই হলো মূল কথা। পররাষ্ট্রনীতি এমনভাবে পরিচালিত করা উচতি, যাতে সর্বদা জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়। এই স্বার্থ সব সময় রক্ষিত হয়েছে, এটা বলা যাবে না। আমাদের সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনাগুলোকে আমরা যদি কাজে লাগাতে পারি, আমাদের সাফল্য সেখানেই নিহিত/.... Daily JAI JAI DIN6.6.12

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রসঙ্গে



একটি ‘যুদ্ধের’ কথা বলেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মন্ত্রী তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকও তিনি। গত ২৭ মে ১৪ দলের বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার পথ যদি রুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে ‘যুদ্ধ’ শুরু হয়ে যাবে। প্রতীকী অর্থে সৈয়দ আশরাফ যা বলতে চেয়েছেন, তা বোধ করি এ দেশের লাখ লাখ মানুষেরও কথা। আদৌ কি সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে? কিংবা গঠিত হবে কি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? নির্বাচনের বাকি আছে দেড় বছর। কিন্তু একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে। আর তা হচ্ছে আগামী নির্বাচন কারা পরিচালনা করবেÑ ক্ষমতাসীন সরকার, নাকি নির্দলীয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? সৈয়দ আশরাফ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু এর ব্যাখ্যা তিনি দেননি। তিনি এবং মহাজোট সরকারের নেতৃবৃন্দ বলছেন, বিরেধী দল এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাঠামোর ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দিক। সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাপারটি পরিপূর্ণভাবে খোলাসা হয় না। অনেক প্রশ্ন এখন রয়ে গেছে। এক. কাদের নিয়ে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে? দুই. অনির্বাচিতরা কি এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে থাকবেন? তিন. বর্তমান সরকার কি মেয়াদের শেষের তিন মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে কাজ করবে? চার. বিরোধী দল বা জোট যদি কোন প্রস্তাব না দেয়, তাহলে কি সরকার উদ্যোগী হয়ে একটি প্রস্তাব দেবে? পাঁচ. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাপারে যে ‘সংলাপ’, তা কি দুই জোটের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ছয়. সুশীল সমাজের কোন প্রস্তাব কি গ্রহণযোগ্যতায় নেয়া হবে?
সৈয়দ আশরাফের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবের মাঝে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে। কেননা প্রধানমন্ত্রী বারবার বলে আসছেন, এমনকি সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্যের একদিন আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের একটি বক্তব্যও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘যে কোন সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন সম্ভব’। সিইসি কি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন না যে, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন সম্ভব? বলতে গেলে সবাই যখন একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছেন, সেখানে সিইসির উচিত ছিল চুপচাপ থাকা। সিইসি তার বক্তব্যের যে ব্যাখ্যাই দিন না কেন, নির্বাচন কমিশন যে সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে না, সেটা আবারও প্রমাণিত হল। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন আমাদের সামনে একটি ‘মডেল’ থাকলেও আমরা সেখান থেকে কিছুই শিখিনি। একজন টিএন সেশানের (সাবেক ভারতীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার) বড্ড দরকার ছিল এ দেশে। দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন সে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। অতীতেও হয়নি। আগামীতেও হবে না। সুতরাং একটি ‘নিরপেক্ষ সরকার’ আমাদের দরকার, যারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। এই ‘নিরপেক্ষ সরকার’-এর কথা হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বারবার বলছেন। এখন সৈয়দ আশরাফ যে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’-এর কথা বলছেন, সেই সরকার যদি ‘নিরপেক্ষ সরকার’ হয়, তাতে ক্ষতির কিছু নেই। খালেদা জিয়া একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু আমার ধারণা ২০০৭-০৮ মেয়াদের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই একই ধরনের সরকার তিনি নিজেও চান না। একাধিকবার তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সমালোচনা করেছেন। ওই ধরনের একটি সরকার তিনি চাইবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলতে তিনি একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের কথাই বলতে চেয়েছেন। বিএনপি এ ধরনের একটি সরকারের কাঠামোর ব্যাপারে প্রস্তাব রাখতে পারে। এমনও হতে পারে, সংসদের যে কোন একজন সদস্যের (এ ক্ষেত্রে জোটভুক্ত কেউ অথবা একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য নিজেও) উত্থাপিত একটি ‘বিল’ বিএনপি সমর্থন করতে পারে। এটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হলে ভালো হয়। কিন্তু সংসদকে আমরা যেভাবে অকার্যকর করে ফেলেছি, সেখানে এ ধরনের প্রস্তাব বিতর্কের মাত্রা বাড়াবেই মাত্র। ১৪ দলীয় জোটে দুটি দলÑ ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে। তারাও সৈয়দ আশরাফের প্রস্তাবিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’-এর ধারণার সঙ্গে একমত। তবে বিস্তারিত তারাও খোলাসা করেননি। মাঝে মধ্যে জনাব রাশেদ খান মেনন সরকারের মৃদু সমালোচনা করেন বটে, কিন্তু তিনি বর্তমান সরকারকে নিয়েই যে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’-এর ধারণা, তা সমর্থন করেন কি না, সে ব্যাপারে আমি স্পষ্ট নই। তার দলের কোন চিন্তাধারার খবরও আমরা জানি না। অন্যদিকে জনাব ইনু খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর বাহবা পেলেও, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি নিজেকে একজন ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেন। জনাব ইনুর অতীত ইতিহাস খুব স্বচ্ছ নয়। গণবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কিংবা আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা মিডিয়া কর্মীদের কাছে ব্যাপক পরিচিত। তিনি যখন ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মুলার কথা বলেন, তখন ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ প্রশ্নে তার বক্তব্য কোন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ‘নিরপেক্ষ সরকার’-এর প্রশ্নে একটি ঐকমত্য প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আগামী দু-এক মাসের মধ্যে যদি কোন ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে রাজনীতিতে আরও অস্থিরতা বাড়বে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। সৈয়দ আশরাফ আলোচনার কথা বলেছেন বটে, কিন্তু ‘বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার’ ধরনের মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। সৈয়দ আশরাফকেই স্পষ্ট করতে হবে তারা দলীয় সরকারের বাইরে গিয়ে একটি ‘নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ চান। এখানে বিভিন্ন ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এলডার্স কাউন্সিল, সাংবিধানিক পদের অধিকারী তিন ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল, সরকার ও বিরোধী দলের মনোনীত সমানসংখ্যক প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল, আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধ একজন বাংলাদেশীর সমন্বয়ে একটি সরকার ইত্যাদি নানা সম্ভাবনা নিয়ে সংলাপ হতে পারে। বিভিন্ন গুণীজনের কাছ থেকেও তাদের মতামত নেয়া যেতে পারে। মোট কথা, একটি সরকার, যে সরকারের সঙ্গে মহাজোট সরকারের কোন সম্পর্ক থাকবে না, সেই সরকারের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা উত্তম। কিন্তু বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দলীয় মানসিকতার বাইরে বেরোতে পারেন না। ফলে তত্ত্বগতভাবে নির্বাচিতদের দিয়ে সরকার গঠন করা যায় বটে, কিন্তু তা আদৌ কোন ফল বয়ে আনতে পারবে না। আরও একটা কথা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। যে ‘অভিযোগে’ বিরোধী দলের ৩৩ জন নেতাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল, সেই ‘অভিযোগ’ নিয়ে প্রশ্ন আছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, পাঁচজন এমপিকে পর্যন্ত জেলে যেতে হয়েছিল। উচ্চ আদালত এমপিদের জামিন ও বাকিদের ব্যাপারে রুল ইস্যু করেছেন বটে, কিন্তু এতে দুটি বড় দলের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাসের যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, তা ‘পূরণ’ হবে কিভাবে? আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। সরকারকেই নমনীয় হতে হবে। যারা হার্ডলাইনে গিয়ে ‘সমস্যার’ সমাধান চান, তারা দেয়ালের লিখন পড়েননি। ইতিহাস বড় নির্মম। ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে এ দেশে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইতিহাসে কিভাবে চিহ্নিত হয়েছে ওই নির্বাচনগুলো? ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে ইতিহাস থেকে আমরা কেউ শিক্ষা নিই না। তবুও আমরা আস্থা রাখতে চাই রাজনীতিবিদদের ওপর। কেননা তারাই জাতিকে পথ দেখাবেন। একুশ শতকে তারাই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন। আমাদের সমস্যা অনেক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদন, লন্ডনের অ্যামনেস্টির মূল্যায়ন কিংবা দি ইকোনমিস্টে যা লিখেছে, তাতে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়নি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। আবার তারাই এক হয়ে জাতির বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদে তো আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলাম। সিদ্ধান্তটা তো সেদিন সংসদেই হয়েছিল। আজ সংসদে সে রকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষতি কী? তত্ত্বাবধায়ক না হোক, একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার হতে পারে। এর রূপরেখা কী হবে, তা আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। বিএনপি যদি একটি প্রস্তাব দেয়, একটি ‘বিল’ সংসদে উপস্থাপন করে; আমি মনে করি তার মাধ্যমেও আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। খালেদা জিয়া নিজেও একটি প্রস্তাব দিতে পারেন। সেটা সংসদেই যে দিতে হবে, তার কোন মানে নেই। একটি ‘প্রস্তাব’, তা যে কোনভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। না হলে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর হবে না।
একজন সিনিয়র মন্ত্রী ও দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক যখন একটি ‘যুদ্ধের’ কথা বলেন, তখন আমরা আতংকিত হই। ভয়ে ভয়ে থাকি। পুরনো অনেক স্মৃতি আমাদের মনে পড়ে। আমরা ‘যুদ্ধ’ চাই না। চাই শান্তি। চাই পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা।
Daily JUGANTOR
4.6.12

কোন পথে দক্ষিণ এশিয়া



কোন পথে এখন দক্ষিণ এশিয়া! দক্ষিণ এশিয়া তথা সার্কভুক্ত আটটি দেশের প্রায় প্রতিটি দেশেই এক ধরনের অস্থিরতা বজায় রয়েছে। ভুটান বাদে বাকি সাতটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে। নেপালে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ শেষ পর্যন্ত থেকেই গেল। রাজনৈতিক দলগুলো নেপালের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত পার্লামেন্ট এখন বাতিল হয়ে গেল। আগামী নভেম্বরে সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মালদ্বীপে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গুরু হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট নাশিদের উৎখাতের পর সেখানে স্থিতিশীলতা এসেছে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ও সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়া মামুন আবদুল গাইয়ুমের প্রভাব ও কর্তৃত্ব রয়েছে ড. মোহাম্মদ ওযয়াহিদের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর। ইসলামী মৌলবাদীরাও সেখানে তৎপর। শ্রীলঙ্কার জন্যও রয়েছে খারাপ খবর। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘ। আফগানিস্তানের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। ২০১৪ সালে সেখান থেকে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে কট্টরপন্থী তালেবানদের তৎপরতা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে হামিদ কারজাইয়ের ক্ষমতায় টিকে থাকা একটা প্রশ্নের মাঝে থেকে যাবে। এর বাইরে ভারত ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে খুব ভালো, তা বলা যাবে না। পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। বিচার বিভাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। আইএসআইয়ের ভূমিকা বহির্বিশ্বে উন্নত হয়নি। পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে চালকবিহীন মার্কিনি ড্রোন বিমান হামলা বন্ধ হয়নি সংসদে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের পরও। এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছে। ইউপিএ জোটে ভাঙনের ইঙ্গিত শোনা যাচ্ছে। ২০১৪ সালে সেখানে সাধারণ নির্বাচন। এর চেয়েও বড় কথা_ দক্ষিণ এশিয়ার দুটি বড় দেশ পাকিস্তান ও ভারত এক ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ভারত অগি্ন-৫ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর পাকিস্তান হাতেফ গজনবী নানক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। অগি্ন এবং হাতেফ পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য। এর রেশ শেষ হতে না হতেই ভারত 'আকাশ' ও পাকিস্তান হাতেফ ৯ নামে আরো দুধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশ দুটি এক ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষায় লিপ্ত হল। এতে করে দেশ দুটির দরিদ্রতা দূরীকরণ কর্মসূচি ব্যাহত হতে বাধ্য। এর কী আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল? প্রশ্ন হচ্ছে, বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে দরিদ্রতার মাঝে রেখে দুদেশের এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোন দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে? পাঠকদের একটা ধারণা দিয়ে রাখি। একটা দূরপাল্লার (যেমন অগি্ন-৫) মিসাইলের মূল্য ৫ লাখ ৬৯ হাজার ডলার থেকে ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। একটি ক্রস সিমাইলের (সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য) মূল্য ১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে এগার কোটি টাকা)। আর বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের (যা ভারত ইতিমধ্যে অর্জন করেছে) মূল্য ৬ লাখ ডলার। এই টাকা এ খাতে ব্যয় না করে তা হাসপাতাল বা শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা যেত। এমনকি ভারতে চরম দরিদ্রতম রাজ্য হিসেবে পরিচিত (দারিদ্র্যের কারণে যেখানে মাওবাদীদের তৎপরতা বেশি) মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ কিংবা ঝাড়খন্ডে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু করতে পারত। ভারত তা করেনি। মুম্বাইয়ের চাকচিক্যময় ছবি দেখে ভারতের মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচার করা যাবে না। ভারতে ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে গত ১০ বছরে আত্মহত্যা করছে_ এরকম একটি সংবাদ সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান থেকে এ ধরনের সংবাদ তেমন একটা শোনা যায় না। এ কারণেই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, এমডিজি (মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) অর্জনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে ভালো।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। সিপরির (ঝওচজও) বার্ষিক গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৮০ মিলিয়ন ডলার খরচ করবে। জিডিপিতে প্রতিরক্ষা খাতে প্রবৃদ্ধির হার ২.৫ ভাগ থেকে ৩ ভাগ। ২০০০ সালের পর প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে শতকরা ৬৪ ভাগ। ওই সময়সীমায় ভারতে যে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তার মাঝে রাশিয়া একাই সরবরাহ করেছে ৮২ ভাগ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা ভারত ইতিমধ্যে তার নৌবহরে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারত ভারত মহাসাগর অন্যতম নৌশক্তিরূপে আবির্ভূত হতে চায়। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের নৌবাহিনীতে যেখানে জাহাজের সংখ্যা ১৩৫টি, সেখানে ভারতের জাহাজ রয়েছে ১০৩টি। অর্থাৎ প্রায় কাছাাকছি। ভারতের উদ্দেশ্য যে কী তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কেনার জন্য চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ১১ মিলিয়ন ডলার মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ১২৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। যেখানে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক মানুষ নূ্যনতম টয়লেট সুবিধা পায় না, ৩১ ভাগ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে (যা কীনা জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত অতি দরিদ্রের মানদ-), সেখানে শত শত কোটি রুপি ভারত ব্যয় করছে অস্ত্র খাতে। ইতিমধ্যে এটা প্রমাণিত হয়েছে, অগি্ন-৫ উৎক্ষেপণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত এ অঞ্চলে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিরূপে আবির্ভূত হোক। সদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করেছে। তার টার্গেট মূলত চীন, চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। আর এ লক্ষ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ গড়ে উঠছে। ভারত এখন আর পাকিস্তানকে 'অন্যতম শত্রু' বলে মনে করে না। ভারতের অন্যতম 'শত্রু' এখন চীন। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এখানে এক ও অভিন্ন। হিলারি ক্লিনটন সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল এটি_ ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। আমরা ইতিমধ্যে দৈনিক ডেসটিনিতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি আর বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটন। মিসেস ক্লিনটনের ঝুড়িতে যে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যে মার্কিন স্ট্রাটেজি, অর্থাৎ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামরিক বলয়, সেই বলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারতকে দিয়ে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অগি্ন-৫ ও আকাশ উৎক্ষেপণ এই স্ট্রাটেজিরই একটি অংশ। ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কিংবা ভারতকে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত করার উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে বলতে পারব না; কিন্তু যে দেশ তার দরিদ্রতা দূরীকরণে কোনো বড় কর্মসূচি নিতে পারে না কিংবা কৃষকের আত্মহত্যা রোধ করার উদ্যোগ নিতে পারে না, সেই দেশ অগি্ন-৫ মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন করে আমাদের জন্য কোনো 'মডেল' হতে পারে না। আগামী দিনে ভারতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেমনি বাড়বে তেমনি বাড়বে কন্যা শিশুর ভ্রূণ হত্যার প্রবণতাও। একটি সভ্য সমাজে যা কল্পনাও করা যায় না। অগি্ন-৫ উৎক্ষেপণ ছিল একটি প্রহসন মাত্র। আর পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে ভারতের চেয়ে ভালো, তা বলা যাবে না। পাকিস্তান কার্যত আরেকটি 'তালেবানি রাষ্ট্রে' পরিণত হতে যাচ্ছে। একুশ শতকে এসেও পাকিস্তানের কোনো কোনো প্রদেশে মেয়েদের শিক্ষা সীমিত। তালেবান নারীরা মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে_ এ রকম সংবাদ আমরা একাধিকবার পাঠ করেছি। পাকিস্তানের মতো দেশে, যেখানে তারা জঙ্গি তৎপরতা দমন কতে পারছে না, সেখানে শাহীন (১৮০০ মাইল দূরপাল্লা) কিংবা হাতফ গজনবীর (১৮০ মাইল দূরে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন) মতো মিসাইল উদ্ভাবন করে পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিযোগিতাকে উসকে দিল মাত্র। পাকিস্তান বা ভারতের এ থেকে লাভবান হবার কিছু নেই। এতে করে দুদেশের দরিদ্রতা আরো বাড়বে। আর লাভবান হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র ব্যবসায় তাদের প্রসার বাড়বে। ইতিমধ্যে খবর বেরিয়েছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬৬ কোটি ডলার ব্যয়ে ১৪৫টি হালকা কামান আমদানি করছে। এক সময় তথাকথিত 'নিরাপত্তা সুরক্ষার' নাম করে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে সাহায্য করেছিল (বিবিসি, ডিসেম্বর ১৬, ২০১০)। এখানে বলা ভালো, ভারত ও পাকিস্তান এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণের ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপার মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে ভারতের ব্যাপারে তার নীতির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উপমহাদেশে আগামী দিনগুলোতে এই প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে মনে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় ওই পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। প্রভাব বলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দুই বস্নকে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৫৪৯ মিলিয়ন (প্রতিদিনের আয় ১ ডলার ২৫ সেন্ট হিসেবে)। ২০০৫ সালে তা দাঁড়ায় ৫৯৫ মিলিয়নে। আর বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ৬৫০ মিলিয়নের কাছাকাছি। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, ২৫০ মিলিয়ন শিশু অপুষ্টির শিকার। ৩০ মিলিয়ন শিশু কোনোদিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মোট নারী জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ রক্তশূন্যতায় ভোগে। ভারতে প্রতি ৩ জনের মাঝে ১ জন দরিদ্র। ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জন্য টয়লেটের কোনো সুবিধা নেই। আর প্রতিদিন ভারতে মারা যায় ৫ হাজার শিশু। এই যে পরিসংখ্যান, এই পরিসংখ্যান কোনো আশার কথা বলে না। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দরিদ্রতা বিমোচনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে দরিদ্রতা কমেনি। অথচ দুটি বড় দেশ ভারত ও পাকিস্তান আজ কোটি কোটি ডলার খরচ করছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে। দক্ষিণ এশিয়ার এই মুহূর্তে সমস্যা হচ্ছে দরিদ্রতা দূর করা, জাতিগত দ্বন্দ্বের অবসান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও সেই সঙ্গে জেন্ডার সমতা আনা। ব্যাপক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা হচ্ছে জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দ এ দিকে দৃষ্টি দিলে ভালো করবেন।
Daily DESTINY
6.6.12

কী হতে যাচ্ছে ১০ জুনের পর


একটা প্রশ্ন এখন অনেকের মনে- কী হতে যাচ্ছে ১০ জুনের পর? বিরোধী দল একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ১০ জুন হচ্ছে ওই সময়সীমা। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে বিরোধী দলের দাবি সরকারকে মেনে নিতে হবে। আর যদি সরকার না মানে, তাহলে ঢাকায় আহূত জনসভায় বেগম জিয়া নতুন কর্মসূচি দেবেন। প্রশ্নটা সেখানে, নতুন কর্মসূচি কী? হরতাল, লাগাতার হরতাল? অবরোধ? নাকি অন্য কিছু? বিরোধী দল বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আর সরকার বলছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখানেই জট লেগে আছে। খুলছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও বিরোধী দল রাজি হতে পারে। কিন্তু এর কাঠামো কী? সংবিধান যদি অনুসরণ করি, তাহলে ব্যাপারটা এ রকম যে সরকার তার মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে নির্বাচন করবে এবং ওই সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে চিহ্নিত হবে। সরকার কি তাহলে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথাই বলতে চাইছে? যদিও সৈয়দ আশরাফ বিষয়টি খোলাসা করেননি। তবে মন্ত্রীদের কথাবার্তায় তো সে কথাই মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও অনেকটা এভাবেই বলছেন। এতে করে জট খুলবে না। কোনো সংলাপও হবে না। বলতে গেলে এ দেশের সুশীল সমাজের প্রায় সবাই বলছেন একটি সংলাপ হোক, একটি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো দাঁড় করানো হোক, যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করবে। হিলারি ক্লিনটন বলে গেলেন সে কথা। তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করলেন ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত। আর সর্বশেষ গত ৩০ মে এদের সুরে সুর মেলালেন অ্যালিস্টার বার্ট, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মন্ত্রী। বললেন, 'বাংলাদেশে অবাধ, সুষুম ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আশা করে যুক্তরাজ্য। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে কথা বললেন না বটে, কিন্তু সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বললেন।' একটি সংলাপ হবে, এমনটাও আশা করলেন তিনি। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই প্রশ্নই তো ফিরে আসছে- সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমরা নিশ্চিত করব কিভাবে?
সরকার হার্ডলাইনে গেছে, এ কথাটা সরাসরিই বলেন মন্ত্রীরা। এর প্রমাণ তো আমরা পাচ্ছিই। পাঁচজন এমপিসহ বিরোধী দলের ৩৩ জন নেতা-কর্মীকে জেলে পাঠানো হয়েছিল যে 'অভিযোগের' পরিপ্রেক্ষিতে, সেই অভিযোগটি নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। অভিযোগটি গুরুতর- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মুখে বাসে অগি্নসংযোগ। পাঁচজন এমপি ছাড়া পেয়েছেন। বাকিরা পাননি, যাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবও। তাঁর বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় অভিযোগ এনে চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে। ফলে ঝুলে গেছে সংলাপ-প্রক্রিয়া। এসব সংলাপ হবে, ওই বিশ্বাসটা রাখতে পারছি না। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। পুলিশ এখন নিয়ন্ত্রণহীন। কেউ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সাংবাদিক পেটানো থেকে শুরু করে আদালতপাড়ায় তরুণীর শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ ঘটনায় পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতীতেও একাধিকবার আদালত পুলিশ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির নির্দেশ দিয়েছেন। ভর্ৎসনা করেছেন, তাতে কিছু একটা হয়েছে বলে মনে হয় না। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশকে 'সার্টিফিকেট' দেন, যেখানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের পুলিশের কাছ থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন, যেখানে অত্যন্ত ক্ষমতাবান আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব 'ষড়যন্ত্র' আবিষ্কার করেন, সেখানে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠবে- এটাই তো স্বাভাবিক। আমরা কি ভুলে গেছি বহির্বিশ্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ মনিটর করা হচ্ছে। অ্যালিস্টার বার্ট বলে গেলেন, তাঁরা র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠায় র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ দেওয়া বন্ধ করেছেন। লন্ডনের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবাধিকারবিষয়ক রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। আর সাপ্তাহিক ইকোনমিস্টের যে রিপোর্ট, তা তো আমাদের জন্য কোনো আসার কথা বলে না। রাজনীতির বাইরেও অর্থনীতির যে সূচক, তাতেও তো কোনো ভালো খবর নেই। গড়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি এখন ১০.৮৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ৪১.৪৭ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে মাত্র ৮.৪১ শতাংশ। অথচ আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১১.২২ শতাংশ। টাকার মান কমেছে। বাজেট এলেই ভয় হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় কোন কোন জিনিসের দাম আবার বেড়ে যাচ্ছে! কুইক রেন্টাল নিয়ে 'নানা' কাহিনী। এ কাহিনী সাধারণ মানুষ জানে না। বোঝে না। কিন্তু বোঝে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ মাঝেমধ্যে আসে মাত্র। এখন শোনা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম আবার বাড়বে! আগামী দেড় বছর সরকারের জন্য অনেক কঠিন সময়। একটা সমঝোতা যদি না হয়, তাহলে পরিস্থিতি যে অসহনীয় হয়ে উঠবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। একটি সমঝোতা এখন কিভাবে সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী তথা বর্তমান মন্ত্রিপরিষদকে ক্ষমতায় রেখে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেই সরকার বিরোধী দল কেন, কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে না। সরকার এ ক্ষেত্রে যদি ষষ্ঠ সংসদের মতো একটি ঝুঁকি নেয়, তাহলে ভুল করবে। আমরা আর ইয়াজউদ্দিন মার্কা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাব না- এটা ঠিক আছে। কিন্তু সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে তত্ত্বাবধায়ক না হোক, অন্য কোনো নামে একটি নির্দলীয় সরকার গঠন করতে হবে। বিএনপি যদি নিজেরাই একটা 'ফর্মুলা' দেয়, তাতেও আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। আর সেটা যে সংসদেই হতে হবে, তার কোনো মানে নেই। বিএনপি ১১ জুনের মহাসমাবেশে এই 'ফর্মুলা' উপস্থাপন করতে পারে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ দেশের দুটি অবিসংবাদিত শক্তি। দুটি শক্তিই প্রায় সমানসংখ্যক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল এ কথাই প্রমাণ করে। এ ক্ষেত্রে কখনো আওয়ামী লীগ জনসমর্থনে এগিয়ে থাকে, কখনো থাকে বিএনপি। সুতরাং এটা উপলব্ধি করেই একটা সমঝোতা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ যদি ভালো কাজ করে থাকে, তাহলে জনগণ আবার দলটিকে ক্ষমতায় পাঠাবে। আর জনসমর্থন নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। গণতন্ত্র এ কথাটাই শেখায়। সংবিধানের যুক্তি তুলে ধরা হয় বটে, কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস বলে সংবিধানের বাইরে গিয়েও সমঝোতা হয়েছে। যেমন- কেনিয়া ও জিম্বাবুয়েতে ২০০৮ সালে। সরকার ও বিরোধী দল মিলেই সেখানে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করে আসছে। আসলে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে আন্তরিকতা। বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ যদি আন্তরিক হয়, তাহলে সমাধান সম্ভব। হার্ডলাইন কখনো মঙ্গল ডেকে আনে না।Daily KALERKONTHO6.6.12

আবারও মার্কিন সপ্তম নৌবহর!


সংবাদটি ছাপা হয়েছে ভারতীয় পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণে গত ৩১ মে। দৈনিক সকালের খবর সংবাদটি ছাপে গত ২ জুন। তাতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ঘাঁটি গাড়ছে সপ্তম নৌবহর। যদিও তা অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ। পত্রিকাটি উদ্ধৃতি দিয়েছে ভারতের টিভি চ্যানেল টাইমস নাউ-এর। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরকালে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি গাড়তে চাইছে। এর মধ্য দিয়ে জাপান থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের দিয়াগো গার্সিয়া পর্যন্ত এশিয়ার প্রায় পুরোটাতেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে। এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে আরও একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ বা ‘অ্যাকুইজিশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট’ দিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। দুটো সংবাদই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় যে কৌশলগত সংলাপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার পরপরই যখন এ ধরনের সংবাদ ছাপা হয়, তখন এর গুরুত্ব বাড়ে বৈকি! এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শেষ পর্যায়ে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ওপর ‘চাপ’ প্রয়োগ করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যাওয়া। তাতে অবশ্য মার্কিন প্রশাসন সফল হয়নি। ইতোমধ্যে সকালের খবর-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমি বলেছি বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিনিদের আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে নানা কারণে। প্রথমত, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌবাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে সেখানে যে ‘শূন্যতা’র সৃষ্টি হবে, সেই ‘শূন্যতা’ পূরণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘শান্তিরক্ষী’ বাহিনী গঠন করা, যারা ২০১৪ সালে মার্কিন সৈন্যদের পরিবর্তে আফগানিস্তানে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত হবে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইসলামিক কট্টরপন্থীরা দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন করে একটি ঘাঁটি গড়তে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মোর্চা গঠন করা প্রয়োজন। চতুর্থত, এ অঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বিপুল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে (গভীর সমুদ্রে)। মার্কিনি আইওসির এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য এ কারণেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অবস্থান করে খুব সহজেই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায় এবং বাংলাদেশের নিকট-প্রতিবেশী চীনের রাজনৈতিক উত্থান-পতনে প্রভাব খাটানো সম্ভব। হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পরপরই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি এ লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
হিলারির সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল একটি যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর। এই সংলাপের আওতায় বছরে একবার বাংলাদেশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা মিলিত হবেন। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধ রোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যাখ্যা নানাভাবে বিশ্লেষণ হতে পারে। ‘সন্ত্রাসবাদ রোধে সহযোগিতার’ আলোকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয় সেটাই দেখার বিষয় এখন। আরও একটা কথা। তরুণদের এক সমাবেশে হিলারি ক্লিনটন যখন বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কথা বলেন, তখন আমাদের প্রখ্যাত মার্কিন স্ট্র্যাটেজিস্ট রবার্ট কাপলানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাপলান লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উদ্দেশ্য একটাই-আর তা হচ্ছে চীনের প্রভাবকে সঙ্কুচিত করা। বাংলাদেশের অবস্থান তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আকৃষ্ট করবে। মার্কিন স্ট্র্যাটেজিতে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। চীন যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌ-শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে। চীন এ অঞ্চলে ঝঃত্রহম ড়ভ চবধত্ষং বা ‘মুক্তার মালা’র মতো বিভিন্ন সামুদ্রিক বন্দরে তার অবস্থান শক্তিশালী করে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। চীনের ঝঃত্রহম ড়ভ চবধত্ষং-এর যে নেটওয়ার্ক, তাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গাওদার সমুদ্রবন্দর একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগর পার হয়ে অ্যারাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্রপথ, এ পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। চীন যে তেল আমদানি করে তার ৮০ ভাগ এই মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনে যায়। তাই সঙ্গত কারণেই চীনের জন্য তার ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাওদারে চীনা নৌবাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিটও থাকবে, যা কিনা ভারত মহাসাগরের সকল নৌ মুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের  সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের  কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদারের দূরত্ব মাত্র ১৮০ নটিক্যাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। তামিল টাইগারদের সঙ্গে যুদ্ধে চীন শ্রীলঙ্কা সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। সিটওয়েসহ আরও বেশ ক’টি বন্দরে রয়েছে চীনা উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে, তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌবাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম একটি পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি সেই স্ট্র্যাটেজিকে সামনে রেখেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ চুক্তি করতে আগ্রহী হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। যতদূর জানা গেছে, এ ধরনের চুক্তি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রস্তাাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘গাইডেড মিসাইল’সহ বেশ কয়েক ধরনের আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে। এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার কথাও রয়েছে। এ ছাড়া থাকবে যৌথ মহড়া ও সংলাপের ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রাবিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ এ ধরনের বিভিন্ন সুবিধার জন্য বাংলাদেশে ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা পাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশে উপস্থিতিরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটির একসময় নাম ছিল ‘ন্যাটো মিউচুয়্যাল সাপোর্ট অ্যাক্ট’। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও সরবরাহ বিনিময় সহজ করার জন্য এটি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই অ্যাক্টে পরিবর্তন আনা হয় যাতে করে ন্যাটোর সদস্য নয় এমন দেশগুলোর সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি করা যায়। চুক্তিটির নামেও পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তিটি এখন ‘আকসা’ চুক্তি নামে পরিচিত।
‘আকসা’ চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে না। বরং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনার যদি অংশ হয়, তা হলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে ইমেজ সঙ্কটের মুখে পড়বে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতেও বাধ্য। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ হতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তিও খুব কম। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর ও তথাকথিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না। তাই প্রস্তাবিত চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া জরুরি। চুক্তিটি নিয়ে সংসদে আলোচনা করারও প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের একটি চুক্তি বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের উসকে দিতে পারে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বেড়ে যেতে পারে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। সংসদকে অবহিত না করে এ ধরনের একটি চুক্তি যদি করা হয়, তাহলে সেই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
‘আকসা’র রেশ শেষ হতে না হতেই এখন প্রকাশিত হল চট্টগ্রামে সপ্তম নৌঘাঁটি স্থাপনের খবরটি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য কিছুটা পাওয়া গেলেও তা স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা পরোক্ষভাবে এটা স্বীকার করে নিয়েছেন। গত ২ জুন সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ‘সাংগ্রিলা ডায়ালগে’ প্যানেট্টা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রণতরীর সংখ্যা বাড়াবে। ২০১৩ সালে এই রণতরীর সংখ্যা ৬-এ দাঁড়াবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভারতীয় পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তার পেছনে কিছুটা হলেও সত্যতা রয়েছে। খুব সঙ্গত কারণেই তাই যে প্রশ্নটি আসবে তা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে যেকোনো মার্কিন রণতরী মোতায়েন বাংলাদেশের জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে কি না। এর জবাব না-বাচক। অর্থাত্ এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না। বরং চীনের সঙ্গে আমাদের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, তাতে অবিশ্বাস জন্ম হতে পারে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে আসতে পারে স্থবিরতা। অথচ আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য চীনের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এ ধরনের মোতায়েনের খবর অস্বীকার করলেও সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এখন আগামী দিনগুলোই প্রমাণ করবে প্রকাশিত সংবাদটির পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে।
Daily SAKALER KHOBOR
4.6.2012

বাংলাদেশকে চীনের শত্রু বানানোর ষড়যন্ত্র

হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের রেশ শেষ হতে না হতেই শোনা গেল ‘আকসা’র খবর। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ‘আকসা’ বা ‘অ্যাকুইজেশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট’ নিয়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটন আলোচনা শুরু করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে কার স্বার্থে আমরা ‘আকসা’ চুক্তি করতে যাচ্ছি? আদৌ এ ব্যাপারটি পর্যালোচনা করে দেখা হয়েছে কি না? কিংবা আমরা কি এটা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, এতে করে আমাদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে? বিষয়টি সম্পর্কে দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, বিশেষ করে যারা নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, তারা কতটুকু ধারণা রাখেন, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। হিলারি কিনটনের সফরের পর পরই যখন ‘আকসা’ নিয়ে বাংলাদেশ আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তখন এ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

পাঠক, স্মরণ করার চেষ্টা করুন হিলারি কিনটনের ঢাকা সফরের দু’ সপ্তাহ আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি সামরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই ‘সংলাপ’-এ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী অ্যান্ড্রু শ্যাপিরো। সংলাপের বিষয় তথা কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। কোন প্রেস ব্রিফিংও হয়নি। বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। এরপরই আমরা দেখলাম হিলারি কিনটনের সফরের সময় যৌথ অংশিদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিরও বিস্তারিত আমরা জানি না। শুধু বলা হয়েছে, এই সংলাপের আওতায় বছরে একবার বাংলাদেশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা মিলিত হবেন। তখন আমরা শুনলাম ‘আকসা’র কথা। এখানেও একটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে নানা কারণে। প্রথমত, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌ বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একটি এ্যালায়েন্স গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে, সেখানে যে ‘শূন্যতার’ সৃষ্টি হবে সেই ‘শূন্যতা’ পূরণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘শান্তিরক্ষী’ বাহিনী গঠন করা, যারা ২০১৪ সালে মার্কিন সৈন্যদের পরিবর্তে আফগানিস্তানে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত হবে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইসলামিক কট্টরপন্থীরা দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন করে একটি ঘাঁটি গড়তে পারে। সে কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি সন্ত্রাস বিরোধী মোর্চা গঠন করা প্রয়োজন। চতুর্থত, এ অঞ্চলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বিপুল জ্বালানি সম্পদ রয়েছে (গভীর সমুদ্রে)। মার্কিনী আইওসির এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের জন্য এ কারণেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অবস্থান করে খুব সহজেই মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা যায় এবং বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী চীনের রাজনৈতিক উত্থান পতনের প্রভাব খাটানো সম্ভব। হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের পর  পরই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্র্যান্ড স্ট্রাটেজি রচিত হয়েছ্ ে‘আকসা’ চুক্তি এ লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে।
হিলারির সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল একটি যৌথ অংশিদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর। এই সংলাপের আওতায় বছরে একবার বাংলাদেশ ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা মিলিত হবেন। চুক্তিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, সহিংস চরমপন্থা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও জলদস্যুতার মত আন্তঃদেশীয় অপরাধ রোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যাখ্যা নানাভাবে বিশ্লেষণ হতে পারে। ‘সন্ত্রাসবাদ রোধে সহযোগিতার আলোকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সেটাই দেখার বিষয় এখন। আরো একটা কথা তরুণদের এক সমাবেশে হিলারি কিনটন যখন বাংলাদেশের স্ট্রাটেজিক গুরুত্বের কথা বলেন, তখন আমাদের প্রখ্যাত মার্কিন স্ট্রাটেজিক রবার্ট কাপলানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কাপলান লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উদ্দেশ্য একটাইÑ আর তা হচ্ছে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করা। বাংলাদেশের অবস্থান তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আকৃষ্ট করবে। মার্কিন স্ট্রাটেজিতে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে। এটাই হচ্ছে মোদ্দাকথা। চীন যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ভারতকে চীনের  বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌ শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে।  চীন  এ অঞ্চলে String of Pearls বা ‘মুক্তার মালার’ মত বিভিন্ন সামুদ্রিক বন্দরে তার অবস্থান শক্তিশালী করে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। চীনের String of Pearls-এর যে নেটওয়ার্ক, তাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গাওদার সমুদ্র বন্দর একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগর পার হয়ে এরাবিয়ান গালফ পর্যন্ত যে সমুদ্র পথ এ পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় চীন। চীন যে তেল আমদানি করে তার ৮০ ভাগ এই মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনে যায়। তাই সঙ্গত কারণেই চীনের জন্য তার ভারত মহাসাগর উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাওদারে চীনা নৌ বাহিনীর একটি ছোট্ট ইউনিটও থাকবে, যা কি না ভারত মহাসাগরের সকল নৌ মুভমেন্ট মনিটর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গাওদার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ থেকে গাওদার এর দূরত্ব মাত্র ১৮০ ন্যাটিকাল মাইল। আর ইরান সীমান্ত রয়েছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। চীন এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে গাওদার সমুদ্র বন্দর উন্নয়নে। চীন তার দক্ষিণাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে মধ্য এশিয়ার গ্যাস এই গাওদার বন্দর দিয়েই পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে চায়। চীন শ্রীলংকার হামবানটোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। তামিল টাইগারদের সাথে যুদ্ধে চীন শ্রীলংকা সরকারকে সমর্থন করেছিল। মিয়ানমারে রয়েছে চীনের নৌ বাহিনীর একটি রাডার স্টেশন। সিটওয়েসহ আরো বেশ ক’টি বন্দরে রয়েছে চীনের উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীন যে বিশাল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলছে,তা মূলত তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। চীনের এই জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করা ও চীনের নৌ বাহিনীর ভূমিকাকে খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সাথে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি মোর্চা গড়ে তুলছে, যাতে বাংলাদেশকে অন্যতম একটি পার্টনার হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্রাটেজি সেই স্ট্রাটেজিকে সামনে রেখেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ‘আকসা’ চুক্তি করতে আগ্রহী হয়েছে। ‘আকসা’ চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। যতদূর জানা গেছে, এ ধরনের চুক্তি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রস্তাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘গাইডেড মিসাইল’সহ বেশ কয়েক ধরনের আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে। এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতা দেয়ার কথাও রয়েছে। এ ছাড়া থাকবে যৌথ মহড়া ও সংলাপের ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত ‘আকসা’ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রা বিরতি, সাময়িক অবস্থানসহ এ ধরনের বিভিন্ন সুবিধার জন্য বাংলাদেশ ‘পোর্ট অব কল’ সুবিধা পাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বাংলাদেশ উপস্থিতিরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তথ্য ঘেটে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটির এক সময় নাম ছিল ‘ন্যাটো মিউচ্যুয়াল সাপোর্ট অ্যাক্ট’। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও সরবরাহ বিনিময় সহজ করার জন্য এটি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই অ্যাক্টে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে করে ন্যাটোর সদস্য নয় এমন দেশগুলোর সাথে এ ধরনের একটি চুক্তি করা যায়। চুক্তিটির নামেও পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তিটি এখন ‘আকসা’ চুক্তি নামে পরিচিত।
‘আকসা’ চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে না। বরং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনার যদি অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ বহিঃবিশ্বে ইমেজ সংকটের মুখে পড়বে। একই সাথে চীনের সাথে সম্পর্কের অবনতি হতেও বাধ্য। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড স্ট্রাটেজির অংশ হতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তিও খুব কম। শুধু যুক্তরাষ্ট্র সফর ও তথাকথিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারবো না। তাই প্রস্তাবিত চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া জরুরি। চুক্তিটি নিয়ে সংসদে আলোচনা করারও প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের একটি চুক্তি বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের উসকে দিতে পারে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বেড়ে যেতে পারে, যা কোনমতেই কাম্য নয়। সংসদকে অবহিত না করে এ ধরনের একটি চুক্তি যদি করা হয়, তাহলে সেই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।