রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ভারতে দলিত আন্দোলন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

ভারতে দলিত আন্দোলন নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে। দলিত, যারা ভারতের অবহেলিত জনগোষ্ঠী, তাদের ডাকা ‘ভারত বন্্ধ’-এ ১০ জন দলিত শ্রেণির মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এর মাঝে পাঁচজনই মারা গেছে মধ্যপ্রদেশে। গত ২ এপ্রিল ভারতজুড়ে যে ‘বন্্ধ’-এর ডাক দেওয়া হয়েছিল, তা সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। দলিত বিক্ষোভকারীরা ভারতজুড়ে রেলপথ, রাজপথ বন্ধ করে দিয়েছিল। ভারতের এই দলিত ক্ষোভে চাপে রয়েছে বিজেপি সরকার। ভারতের দলিতদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে সুপ্রিমকোর্টের একটি রায়। দলিতদের ওপর নিগ্রহ রুখতে ১৯৮৯ সালে ‘এসসি/এসটি প্রিভেনশন অব অ্যাট্রোসিটি অ্যাক্ট’ নামের একটি আইন তৈরি করা হয়েছিল তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকারের আমলে। ২০১৫ সালে সেই আইনের সংশোধনী আনা হয়। সেখানে ওই আইনেক আরও সক্রিয় করা হয়েছিল। উচ্চবর্ণের কেউ যদি তফসিলি জাতি-উপজাতি সম্প্রদায়ের কারও মাথা বা গোঁফ কমিয়ে দেন, কাউকে যদি দলিত বলে অপমান করেন, সে ঘটনাকেও জামিন-অযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হয় ওই সংশোধনীতে। কিন্তু সম্প্রতি ওই তফসিলি জাতি-উপজাতি নির্যাতন রোধ আইন নিয়ে একটি রায় দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্ট। সুপ্রিমকোর্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ সংক্রান্ত কোনো মামলা করার আগেই প্রাথমিক তদন্ত করতে হবে। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো মামলা হলে অভিযুক্তকে আগাম জামিনও দেওয়া যেতে পারে। আর এ রায়ে কংগ্রেস এবং ভারতের বিরোধী দলসহ বিজেপির দলিত নেতারাও ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, দলিতদের হাতে আগে যে অধিকার ছিল, শীর্ষ আদালতের রায়ে সেটা খর্ব হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে। 
সাম্প্রতিক সময়গুলোয় অন্ধ্রপ্রদেশে দলিত ছাত্রনেতা রোহিত ভেমুলার অস্বাভাবিক মৃত্যু, গুজরাটের উনা বা সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের ভিমা কোরেগাঁওয়ে একের পর এক দলিত নির্যাতনের ঘটনায় ভারতে ফুঁসে উঠেছে দলিত শ্রেণি। বেশ কিছুদিন ধরে নৃশংসতা প্রতিরোধ আইনের (এসসি/এসটি) অপ্রয়োগের ব্যাপারে সোচ্চার ছিল উচ্চবর্ণের কিছু সংগঠন। ক্ষমতাসীন বিজেপির কিছু উচ্চবর্ণের নেতার ইন্ধন ছিল এতে। এরপর রায়টি এলো, যা নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত করবে দলিতদের। প্রতিবাদটা সেখান থেকে শুরু। শুধু তা-ই নয়, দলিত নেতা ও গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দলিতদের কাছে ক্ষমতা চেয়ে নিক মোদি, নইলে আমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করব।’ (বাংলা ৯ এপ্রিল ২০১৮)। এরই মধ্যে জিগ্নেশের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। অভিযোগ ‘মানুষের মধ্যে অস্থিরতা’ সৃষ্টি! ভারতীয় দ-বিধির ১৫৩, ১৮৮, ১১৭ এবং ৩৪ ধারায় জিগ্নেশের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। 
ভারত স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও দলিত অর্থাৎ নিম্নশ্রেণি একধরনের শঙ্কায় আছে। শুধু দলিত শ্রেণি কেন বলি, ভারতের মুসলমানরাও একধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন। আসামে প্রায় ৫০ লাখ বাঙালি মুসলমান এখন ‘পুশব্যাক’-এর ঝুঁকির মধ্যে আছেন। সেখানে নাগরিকত্ব চিহ্নিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে এই ৫০ লাখ মুসলমান ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তারা বাংলাদেশ থেকে গেছেন, এমন অভিযোগে তোলা হয়েছে! বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় কোর্সগুলো বাতিলের একটি উদ্যোগের খবরও মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আলিয়া ইউনিভার্সিটির থিওলজির ১১টি স্টাডি সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। (বাংলা, ৯ এপ্রিল ২০১৮)। এতে সেখানকার মুসলিম সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ৭১ বছরের এই যে ভারত, এই ভারতকে নিয়ে আমরা কতটুকু আশাবাদী হতে পারব? গণপিটুনিতে মৃত্যু, কুসংস্কারবিরোধিতাকারীদের মৃত্যু, ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যা কিংবা ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা, হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে যারা অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের ফের হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তন)Ñ এসব ঘটনা ভারতীয় মূল্যবোধের পতনের উদাহরণ। মোদি এর আগে নিজে বলেছেন, অবৈধ মুসলমানদের (?) ভারত থেকে বের করে দেওয়ার। টার্গেট করা হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানদের। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে শতকরা ২৪.৬৪ ভাগ হচ্ছেন মুসলমান, ১৮৯ মিলিয়ন, মোট জনগোষ্ঠীর ১৩৪ কোটি। ২০৫০ সালে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩১০ মিলিয়ন, যা বিশ্বের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ১১ ভাগ। অথচ এই মুসলমানরাই আজ নির্যাতনের শিকার। মোদির এই হিন্দুত্ববাদের দর্শনে উৎসাহিত হয়ে উত্তরপ্রদেশের এক সংসদ সদস্য সুরেন্দ্র সিং প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে, মুসলমানদের হিন্দু বানানো হবে।’ একুশ শতকে এসে মানুষ দেখছে ভারতীয় গণতন্ত্রের এক রূপ!
এই গণতন্ত্র উগ্র হিন্দুত্ববাদকে উসকে দেয়; কিন্তু কৃষকের ঋণ পেিশাধে সহায়তা করতে পারে না। এই গণতন্ত্র ভারতে শত শত হাজার কোটিপতি সৃষ্টি করেছে; কিন্তু ধর্ষণ বন্ধ করতে পারেনি। ইন্ডিয়া টুডে সাময়িকীর মতে, প্রতিদিন অন্তত তিনজন দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হন। অথচ এরা জনগোষ্ঠীর ৫ ভাগের মাত্র ১ ভাগ। জাতপাতের সমস্যা ভারতে অনেক বেশি। ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু এই গণতন্ত্র হায়দরাবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। দলিত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বটে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ‘সন্ত্রাসী ও ভারতবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছিল। প্রতিবাদে রোহিত আত্মহত্যা করেছিল। ভারতে গণতন্ত্র ধনীদের আরও ধনী করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ৬০ কোটি মানুষের সেখানে কোনো ‘টয়লেট’ নেই। সেই টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। ২ দশমিক ৩০৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভারতের (পিপিপিতে ৭ দশমিক ৯৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার); কিন্তু কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে।
ভারতে কৃষক আত্মহত্যার ‘কাহিনি’ নতুন নয়। খরা কিংবা প্রচুর বৃষ্টি ইত্যাদি কারণে প্রচুর কৃষক আত্মহত্যা করে থাকে। মোদি যখন ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের বিধানসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন, তখন তিনি এক স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে ৪৭৭টি জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। ৩ লাখ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছিলেন। ৫ হাজার ১৮৭টি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ৩৯ লাখ অনুসারী তার টুইটারে। আর ফেসবুকে নির্বাচনের আগে তার ‘লাইক’-এর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি খুব কমই গ্রামে গেছেন। তবে ২৯ দেশ সফর করে এরই মধ্যে বিশ্বনেতাদের কাতারে তার নামকে স্থান দিতে পেরেছেন। কী পরিমাণ বদলে গেছেন মোদি, তার বড় প্রমাণ ১০ লাখ রুপির স্যুট পরে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ। একসময় ট্রেনে ট্রেনে চা বিক্রি করে যিনি কৈশোরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সেই মোদি কৃষক লাল সিংয়ের জন্য গত এক বছরে কোনো আশার বাণী নিয়ে আসেননি। গরিব ঘরের সন্তান হয়েও মোদি এখন অভিজাততন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতপাতে বিভক্ত ভারতীয় সমাজের জন্য তিনি কোনো ‘মডেল’ হতে পারেননি এখনও। জমি অধিগ্রহণ বিল নিয়েও একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। কংগ্রেস এটাকে পুঁজি করে ভারতব্যাপী একটা জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেও তাতে তারা খুব লাভবান হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিন্তু ভারতের জন্য যে সমস্যাটা প্রকট, অর্থাৎ সমাজে অসংগতি, তা মোদি দূর করতে পারেননি।
নিঃসন্দেহে গত তিন বছরে মোদি নিজেকে একজন উদ্যমী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলে আদভানির (যিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন) শত নেতাকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন; কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি বড়, তা হচ্ছে তিনি ‘গরিব দেশের ধনী প্রধানমন্ত্রী’। প্রেসিডেন্ট ওবামাকে স্বাগত জানাতে (জানুয়ারি ২০১৫) তিনি ১০ লাখ রুপির স্যুট পরিধান করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন আসলে ধনী শ্রেণিরই প্রতিনিধি! একসময় যে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি কৈশোরে ট্রেনের কামরায় কামরায় চা বিক্রি করতেন, মা পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন (মে মাসের ২০১৫ টাইম সাময়িকীর প্রতিবেকের কাছে তা তিনি স্বীকারও করেছেন), সেই মোদির সঙ্গে এখন করপোরেট জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্ক বেশি। ট্রেনে চা বিক্রেতাদের মতো সাধারণ ভারতীয়দের কাছে এখন তিনি ‘অনেক দূরের মানুষ’। তিনি যখন বিদেশ যান, তখন তার সঙ্গে যান ব্যবসায়ীরা, যান করপোরেট হাউজের প্রতিনিধিরা। কিন্তু গত তিন বছরে তার শরীরে দশ লাখ রুপির স্যুট উঠেছে সত্য; কিন্তু দরিদ্র ভারতের চেহারা তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি। কৃষকের আত্মহত্যার প্রবণতা তিনি দূর করতে পারেননি। ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রামের মতে, জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল, আজ তৃতীয় অবস্থানে (সাধারণ নিয়মে এই অবস্থান সপ্তম)। আর গত বছর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ভারতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি চীনের চেয়ে বেশি হবে। যেখানে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ ভাগ, সেখানে ভারতের হবে ৭ দশমিক ৭ ভাগ। নরেন্দ্র মোদি এই ভারতকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের জনগোষ্ঠীর ৩৭ ভাগ মানুষ এখনও গরিব। ৫৩ ভাগ জনগোষ্ঠীর কোনো টয়লেট নেই, যারা প্রকাশ্যেই এই কাজটি নিত্য সমাধান করেন। পরিসংখ্যান বলে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গরিব মানুষের বাস ভারতে, যাদের দৈনিক আয় বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত ১ দশমিক ২৫ সেন্টের নিচে। চিন্তা করা যায়, প্রতিদিন ভারতে ৫ হাজার শিশু মারা যায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১০)! সাত বছর আগে এই পরিসংখ্যানে খুব পরিবর্তন এসেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শুধু দরিদ্রতা কেন বলি, প্রায় ৮০ কোটি লোকের দৈনিক আয় ২ দশমিক ৫০ ডলার; ৭০ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে। নারী-পুরুষের পার্থক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেখানে অবস্থান (জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৮৬-কে হিসাবে ধরে) ১৪৬, ভারতের সেখানে ১৩৬। নারী নির্যাতন আর নারী ধর্ষণ এত ঘটনা ঘটার পরও বন্ধ হয়নি। নারী নির্যাতনের কাহিনি নিয়ে তৈরি ছবির (যা বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি) গুলাব গ্যাং (উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখ-ে গ্রামের সত্য কাহিনি) কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। মোদি গত ৩ বছরে এদের জন্য কী করেছেন? যদিও মাত্র তিন বছরে দরিদ্রতা কমানো সম্ভব নয় কিংবা বিপুল তরুণ প্রজন্মের চাকরির ব্যবস্থাও তিনি করতে পারেননি; জাতপাতের যে সমস্যা, তারও কোনো সমাধান হয়নি। মোদির ‘গেরুয়া বিপ্লব’ এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ আমরা দেখলাম ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যগুলোয়। ত্রিপুরাসহ এখানে বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। কিন্তু দলিতদের অসন্তোষ যদি অব্যাহত থাকে, যদি মুসলমানরা একধরনের অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে মোদির জন্য তো বটেই, গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। ভারত বড় দেশ। সেখানে এত বছর পরও জাতপাতের বৈষম্য থাকবে, তা কাম্য হতে পারে না। 
দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ১৬ মার্চ ২০১৮

সিরিয়া সংকটের নয়া মোড়

সিরিয়া সংকট একটি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। ১৩ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিমান বাহিনী। এক বক্তব্যে ট্রাম্প সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনেন। দামেস্কের পার্শ্ববর্তী একটি ছোট্ট শহর দৌমায় ৭ এপ্রিল এ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয় বলে তিনি অভিযোগ আনেন। এখন সিরিয়া আক্রমণের এই নির্দেশ সিরিয়া সংকটকে আরও ঘনীভূত করল। এ হামলা হল এমন এক সময়, যখন পুতিন আঙ্কারায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আর ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। এখন দেখার পালা রাশিয়া কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া দেখায়। নিরাপত্তা পরিষদে (১০ এপ্রিল) কথিত রাসায়নিক হামলা নিয়ে বৈঠকের সময় রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা আসে। বৈঠকে কথিত হামলা নিয়ে নতুন তদন্ত শুরু করার যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব রাশিয়ার ভেটোর মুখে বাতিল হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত প্রস্তাবটিতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ভেটো দেয়, আর চীন ভোটদানে বিরত থাকে। সব মিলিয়ে সিরিয়া সংকট যখন আট বছরে পা রাখল, তখন নতুন করে এ সংকট একটি ‘মাত্রা’ পেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকিতে। একটি সম্ভাব্য রুশ-মার্কিন ‘যুদ্ধ’র সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। স্পষ্টতই সিরিয়ার যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা বললেও, এখন বলা হচ্ছে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস পরিপূর্ণভাবে উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কিছু মার্কিন সেনা থাকবে। সেখানে তারা ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে কাজ করছে। যদিও আইএস সেখান থেকে পরিপূর্ণভাবে উৎখাত না হলেও আগের মতো আইএসের অস্তিত্ব আর নেই। তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন গ্রুপ এখনও আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এদের যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করছে। অন্যদিকে রাশিয়া সাহায্য করছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে। একই সঙ্গে আসাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইরানও।
অনেকের স্মরণ থাকার কথা কুর্দি শহর কোবানিকে আইএসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সালে সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য যদি আমরা সত্য বলে ধরে নেই, তাহলে এটা স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তাদের উপস্থিতি আরও অনেক দিনের জন্য রাখতে চায়। তারা সিরিয়ায় আরও দুই হাজার সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে চায়। আর তাই তারা ব্যবহার করতে চায় ওয়াইপিজিকে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানে। তুরস্কের এটা পছন্দ নয়। ওয়াইপিজি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে তা তুরস্কের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এক সময় ওয়াইপিজির সঙ্গে রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ আছে রাশিয়ার উপদেষ্টারা আফরিনে ওয়াইপিজির পক্ষে কাজ করত। কিন্তু ওয়াইপিজি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিতীয় ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করায় রাশিয়া কুর্দিদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। এবং সর্বশেষ খবর অনুযায়ী আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানের ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো আপত্তি ছিল না। এখানে বৃহৎ শক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর একটি ভূমিকা লক্ষ্য করার মতো। সিরিয়ার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে স্পষ্টতই দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে রাশিয়ার কারণেই আসাদ সরকার টিকে গেল। এখানে রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া একটি পক্ষ। আর যুক্তরাষ্ট্র আসাদবিরোধী। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া জোটের বিরুদ্ধে। তুরস্ক তার জাতীয় স্বার্থের কারণেই রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া শিবিরে অবস্থান করছে।সিরিয়া যুদ্ধে এখন অনেক ‘ফ্রন্টের’ জন্ম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান- সবারই সিরিয়ায় স্বার্থ রয়েছে। এরপর যোগ হয়েছে ইসরাইল। কিছুদিন আগে তুরস্ক কর্তৃক ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংসের পর ইসরাইল এটাকে হালকাভাবে নেবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তুরস্ক সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত আফরিন দখল করে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। অথচ দেশ দুটো ন্যাটোর সদস্য। তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া থেকে অস্ত্রও কিনছে তুরস্ক। এই অস্ত্র কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আফরিনে তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্রের ভালো না লাগারই কথা। তুরস্কে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড হয়েছে, তা কুর্দি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে হয়েছে বলে তুরস্কের অভিযোগ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কুর্দি অঞ্চল মানবিজকে নিয়ে। মানবিজ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি শহর। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অবস্থান রয়েছে, যারা সেখানে ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে কর্মরত রয়েছে। তুরস্ক মানবিজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোগেল সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে আদৌ কোনো চিন্তাভাবনা করছেন না। তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, পেন্টাগন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সকে তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবে। এ ফোর্স তুরস্কের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আফরিন শহর মুক্ত করার জন্য ‘যুদ্ধ’ করছে। ফলে সিরিয়া সংকট নতুন একটি মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আফরিন অঞ্চল থেকে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি উচ্ছেদ হলেও, তারা পাল্টা লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও বিস্মিত করবে। জেনেভায় জাতিসংঘের উদ্যোগে যে শান্তি আলোচনা চলে আসছিল, তা কোনো ফল বয়ে আনতে পারছিল না। অন্যদিকে রাশিয়ার সোচিতে যে বিকল্প শান্তি আলোচনা চলছিল, তাতেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ২৯ জানুয়ারি সোচিতে যে শান্তি আলোচনা আহ্বান করা হয়েছিল, সিরিয়ারবিরোধী পক্ষ তাতে যোগ না দেয়ায় কার্যত সেই উদ্যোগও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে এ প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই উঠবে যে সিরিয়ার রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা কাটবে কী? সিরিয়া থেকে আইএসের মতো জঙ্গি গোষ্ঠী এক রকম উচ্ছেদ হয়েছে। বিশেষ করে বছর দু’এক আগে মার্কিন ও রাশিয়ার বিমান হামলার পর আইএস সিরিয়ায় দুর্বল হয়ে যায়। তারা ২০১৪ সালের পর থেকে যেসব এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল এবং যেসব এলাকায় তারা তথাকথিত একটি ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, ওই বিমান হামলায় তা ধ্বংস হয়ে যায়। আইএস সিরিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়; কিন্তু রাশিয়ার বিমান হামলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ ওঠে রাশিয়ার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে আসাদবিরোধী বেশকিছু বিদ্রোহী গ্রুপ, যারা আইএস এর সঙ্গে জড়িত ছিল না। এ যখন পরিস্থিতি, তখন আফরিনে তুরস্ক সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। তুরস্ক তার সামরিক আগ্রাসনের জন্য যুক্তি দেখিয়েছে। তুরস্ক বলছে তারা শহরটিকে সন্ত্রাসীদের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেবে না। এ সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ন্যাটোভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসনের একদিন আগে সিরিয়ার তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায় কুর্দিদের নিয়ে শক্তিশালী সীমান্তরক্ষী বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) নেতৃত্বেই এ পরিকল্পনা করে যুক্তরাষ্ট্র। পিকেকে তুরস্কে নিষিদ্ধ। ওয়াইপিজি হচ্ছে পিকেকের সামরিক শাখা। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তুরস্কের অভ্যন্তরে যেসব সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে পিকেকের হাত রয়েছে বলে তুরস্ক অভিযোগ করেছিল। আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানে সিরিয়ার জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ আরও বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুর্দি ওয়াইপিজি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এ হামলা ট্রাম্প প্রশাসনকে ন্যাটোভুক্ত তুরস্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে সিরিয়ার রাকা শহর থেকে আইএসকে উৎখাতে ওয়াইপিজির সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু তুরস্ক ওয়াইপিজি-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতাকে ভালো চোখে নেয়নি। তুরস্কের ভয় ছিল কুর্দি বিদ্রোহীরা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের অংশবিশেষ নিয়ে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। সিরিয়ার কুর্দিরা বেশির ভাগই দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে। পিকেকের সশস্ত্র শাখা ওয়াইপিজি বা পিপলস ডিফেনস ইউনিট (YPG) ২০১২ সালে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বপারের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকেই তুরস্ক এক ধরনের অস্বস্তিতে ছিল। বলা ভালো ১৯৮৪ সাল থেকেই পিকেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ চালিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাহলে সিরিয়া সংকটের সমাধান হবে কোন পথে? সেখানে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে আসাদকে রাখা, না রাখা নিয়ে একটি ‘ডিবেট’ আছে। সিরিয়ায় আসাদবিরোধী অনেক ‘পক্ষ’ রয়েছে, যারা একদিকে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধেও ‘যুদ্ধ’ করছে, আবার ক্ষমতা দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষেও লিপ্ত। দুটি বড় শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াও সিরিয়া সংকটে নিজেদের জড়িত করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে জেনেভাতে একটি শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু ওই সম্মেলনে এখন অব্দি একটি শান্তি ফর্মুলা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে রাশিয়ার উদ্যোগে সোচিতেও আসাদবিরোধীদের নিয়ে একটি শান্তি সম্মেলন আয়োজন করে আসছে ক্রেমলিন। কিন্তু সেখানেও কোনো সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ সোচি বৈঠক বয়কট করেছে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ, যাদের কেউ কেউ জেনেভা সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিল। জেনেভা সম্মেলনে যোগ দিতে বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে একটি ‘হাই নেগোসিয়েশনস কমিটি’ (এইচএনসি) গঠিত হয়েছিল। কিন্তু কমিটির মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। এইচএনসি সৌদি আরব সমর্থিত। তবে কুর্দিদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এখানে দ্বন্দ্ব আছে। বস্তুত ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম হওয়া এইচএনসির কোনো ভূমিকা নেই।
তাহলে সমাধানটা হবে কীভাবে? সিরিয়ার পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই জটিল হয়ে পড়েছে। এখানে কার্যত দুটি বড় শক্তির অবস্থান পরস্পর বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই কুর্দিদের নিয়ে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ আসাদবিরোধী একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে তুরস্কের সমর্থন না পাওয়া। কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থান ও সমর্থন তুরস্ক ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব কমান। এক্ষেত্রে সুন্নি ধর্মাবলম্বী তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল মিত্র হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। বরং তুরস্ক ও ইরান এক ধরনের অ্যালায়েন্সে গেছে। রাশিয়া আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল। কিন্তু রাশিয়া চায় না আসাদ অপসারিত হোক। আসাদকে রেখেই রাশিয়া এক ধরনের সমাধান চায়। এখানে তুরস্কের আপত্তি থাকলেও, বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ রাশিয়ার মিত্র। রাশিয়া নিজ উদ্যোগে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে চায়। সে জন্যই সোচিতে সিরিয়ার সকল দল ও মতের প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেছিল রাশিয়া, যাকে তারা বলছে ‘সিরিয়ান কংগ্রেস অব ন্যাশনাল ডায়ালগ’। কিন্তু সেখানেও বিরোধ আছে। নানা মত ও পক্ষের প্রায় ১৫০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, একটা বড় অংশ এতে অংশ নেয়নি। সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ ‘সিরিয়ান নেগোসিয়েশন কমিশন’ এ সম্মেলনে অংশ নেয়নি। সিরিয়া সংকটের মূলে রয়েছে সব মত ও পথকে একটি কাঠামোয় আনা। সেখানে সুন্নি, শিয়া, দুর্জ, আলাউত মতাবলম্বীসহ বিভিন্ন সামরিক গ্রুপও রয়েছে। আসাদ সমর্থকরাও একটি পক্ষ। কিছু ইসলামিক গ্রুপও রয়েছে, যারা আইএসের বিরোধিতা করেছিল। সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করা সহজ কাজ নয়। যদিও সোচিতে সবাই সিরিয়ার অখণ্ডতা রক্ষায় একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারা ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছেন। তারপরও কথা থেকে যায়- বড় বিরোধী দলের অবর্তমানে এ সমঝোতা আদৌ কাজ করবে কিনা?
আপাতত সিরিয়া সংকটের কোনো সমাধান হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী নয়া স্নায়ুযুদ্ধের যে সূচনা হয়েছে, তার প্রভাব এখানেও পড়েছে। রাশিয়ার যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে সিরিয়ায়। সিরিয়ার পোর্ট আর বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করছে রাশিয়া। সীমিত আকারে রাশিয়ার সেনা সদস্যরাও সেখানে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যরাও ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে সিরিয়ার একটি অঞ্চলে কর্মরত। তুরস্কের সেনাবাহিনী সিরিয়ার ভেতরেই অবস্থান করছে। এদিকে ইসরাইলি বিমান বাহিনী সিরিয়ার একটি বিমান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এ হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের যে সমর্থন রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। এর অর্থ হচ্ছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবেই হোক ইসরাইল সিরীয় সংকটের একটা অংশ হয়ে গেল। তাই আপাতদৃষ্টিতে সিরিয়া সংকটের সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। প্রেসিডেন্ট আসাদ ক্ষমতায় থেকে গেলেন বটে, কিন্তু তিনি যে দেশটিকে পেয়েছেন, তা পুনর্গঠনে তার আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। আইএস উৎখাত হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ থামছে না। প্রশ্ন হচ্ছে এই যুদ্ধ আর কতদিন প্রলম্বিত হবে? এর জবাব বোধ হয় এ মুহূর্তে কারোরই জানা নেই।

রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


লন্ডনে গত ৪ মার্চ একজন রুশ ডাবল এজেন্ট সার্গেই স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টাকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় রুশ-মার্কিন সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সার্গেই স্ক্রিপাল ছিলেন রুশ গোয়েন্দা। কিন্তু তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হয়েও কাজ করতেন। নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করে তাঁকে ও তাঁর মেয়েকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সার্গেই স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টার ব্যাপারে অভিযোগ আনা হয় রুশ গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে। প্রথমে ব্রিটেন ২৩ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করলে যুক্তরাষ্ট্রও তার দেশে অবস্থানরত ৬০ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। সর্বশেষ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ২৫টি দেশ মোট ১৩৯ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া তার দেশ থেকে ১৫০ জন পশ্চিমা কূটনীতিককেও বহিষ্কার করে। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর এর আগে আর এত বড় কূটনীতিক বহিষ্কার ও পাল্টাবহিষ্কারের ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে যাচ্ছে! এতগুলো দেশ একসঙ্গে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ানোর ঘটনা স্নায়ুযুদ্ধকালের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধকালেও দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব, অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্ব একজোট হলেও রাশিয়ার পক্ষে এখনো কোনো দেশকে দেখা যায়নি। তবে চীনের বক্তব্য রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করছে।
রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি সাম্প্রতিক সময়ে নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের ঘটনা। রাশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মনোভাব নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনা। পুতিন যখন খোলামেলাভাবেই বর্তমান রাশিয়াকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জায়গায় নিয়ে যেতে চান তখন ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত রাশিয়ার ‘প্রভাববলয় বিস্তারের’ উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, রাশিয়ার অনেক সিদ্ধান্ত (ক্রিমিয়ার সংযুক্তি, পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমর্থন, সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে সমর্থন) যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের মনঃপূত হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে (জি-৮ থেকে বহিষ্কার, অর্থনৈতিক অবরোধ) যুক্তরাষ্ট্র বড় ভূমিকা পালন করেছিল। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি। এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়বে। ২৭ বছর আগে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছিল। আজ নতুন করে আবার উত্তেজনার জন্ম হলো। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে পারমাণবিক হুমকি আসায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সম্প্রতি ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তও পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে।
এখন যে প্রসঙ্গটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এই ছোট ছোট পারমাণবিক বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত কি শেষ পর্যন্ত একুশ শতকের তৃতীয় দশকে নতুন করে এক ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে? এ মুহূর্তে হয়তো এটা আঁচ করা যাবে না। কিন্তু নিশ্চিত করেই বলা যায় চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একটা পাল্টা কর্মসূচি গ্রহণ করবে। উত্তর কোরিয়া অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত পাল্লার পারমাণবিক হামলার কথা বলে আসছে। এখন এই আশঙ্কা আরো বাড়ল। গত ২৪ জানুয়ারি দ্য নেশন পত্রিকায় Alice Slater-এর একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, পৃথিবীর ৮০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আর সেনাবাহিনী মোতায়েন করা আছে এক লাখ ৩৮ হাজার। অন্যদিকে ৯টি দেশে রাশিয়ার ২৬ থেকে ৪০টি ঘাঁটি রয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী রাশিয়া কম্বোডিয়ার তিনটি সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার জন্য কম্বোডিয়া সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে। পাঠক, সিরিয়ার পরিস্থিতি স্মরণ করতে পারেন। সিরিয়ায় কুর্দি অঞ্চলে একসময় রাশিয়ার ঘাঁটি ছিল। পরবর্তী সময়ে তুরস্কের সামরিক আগ্রাসনের আগেই সেই ঘাঁটি প্রত্যাহার করে নেয় রাশিয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এখনো আছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমানঘাঁটি আছে। সিরিয়ার তারতাস ও লাতাকিয়া সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে রাশিয়ার নৌবাহিনী। ফলে পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এক ধরনের ‘প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার—দেশ দুটি তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এর বাইরে রয়েছে চীন ও ভারত। চীনকে টক্কর দিতে আফ্রিকায় সেনাঘাঁটি গড়ছে ভারত (সিসিলি)। জিবুতিতে রয়েছে চীনা ঘাঁটি।
আন্তর্জাতিক পরিসরে, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া এক ধরনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ঘুরেফিরে সেই স্নায়ুযুদ্ধকালের মানসিকতায় ফিরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপ্তি বাড়াচ্ছে। এই মানসিকতা আরো স্পষ্ট হবে ভবিষ্যতে। ছোট পারমাণবিক বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত এ রকমই একটি সিদ্ধান্ত, যার মধ্য দিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতার সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, আকারে ছোট হলেও কম ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার শক্তি থাকে ২০ কিলোটনের মতো; যদিও এই বোমার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের নাগাসাকি শহরে একই ধরনের বিস্ফোরণ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আর তাতেই ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হচ্ছে, ‘যতই সীমিত হোক না কেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা রাশিয়াকে অনুধাবন করাতে এই কৌশল কাজে দেবে।’ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘কৌশল’ আদৌ কোনো কাজ দেবে বলে মনে হয় না। বরং এই ‘কৌশল’ নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দেবে, যার আলামত আমরা এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছি।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন পম্পেওর মতো একজন কট্টরবাদী ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে তাঁর কঠোর মনোভাবের খবর সবাই জানে। অথচ টিলারসন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার পক্ষপাতী ছিলেন। ট্রাম্প-কিম জং উন আলোচনা আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। কেননা উত্তর কোরিয়া এ আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তা এখন থমকে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কথা বলছে, যা কিনা এক ধরনের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’র সূচনা করতে পারে। চীন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং চীন এর বিরুদ্ধে আলাদা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এখন পম্পেও কিভাবে এ ইস্যুগুলো ‘অ্যাড্রেস’ করবেন, তিনি ট্রাম্পকে কী উপদেশ দেবেন, সেটাই দেখার বিষয়। ওবামা প্রশাসনের আমলে বিশ্বে এক ধরনের স্থিতাবস্থা ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্তির পর গত এক বছরে বিশ্বে নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছে। এখন দেখার পালা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে বাঁক নেয়।
এমনিতেই অভ্যন্তরীণভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নানা ‘ঝামেলায়’ আছেন। হোয়াইট হাউস প্রশাসনে যাঁদের তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নেই। কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, কাউকে আবার ট্রাম্প পদচ্যুত করেছেন। নারী কেলেঙ্কারিও তাঁকে ছাড়ছে না। একের পর এক যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, যা কিনা তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করছে। এ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে নেওয়ার জন্যই কি তিনি ৬০ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলেন? এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। কেননা এখন পর্যন্ত এটি প্রমাণিত হয়নি যে স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। এটি এক ধরনের অনুমান। আর অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই পশ্চিমা দেশগুলো এক এক করে কূটনীতিকদের বহিষ্কার করল। এর মধ্য দিয়ে এখন বেশ পরিবর্তন আসবে।
এক. রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ঘটনায় ইউরোপে রুশ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যাবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র তথা সামরিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এই গোয়েন্দা সংস্থা (এসভিআরআরএফ) একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এসভিআরআরএফ কেজিবির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন একসময় কেজিবির শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। এ ঘটনা নিঃসন্দেহে পুতিনের হাতকে অনেক দুর্বল করবে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, পুতিন সম্প্রতি ছয় বছরের জন্য আবারও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সুতরাং এ ঘটনার এখানেই যে সমাপ্তি তা বলা যাবে না। দুই. এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং সেই সঙ্গে সাইবার আক্রমণের ঘটনাবলি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন ২০১৪ সালের ঘটনাবলি। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নেয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী; যদিও পরবর্তী সময়ে ক্রিমিয়ার জনগণ গণভোটে রাশিয়ার সঙ্গে এই সংযুক্তিকে সমর্থন করেছিল। কৃষ্ণ সাগরের পাশে ক্রিমিয়া অবস্থিত এবং রাশিয়ার নৌবাহিনীর জন্য ক্রিমিয়ার অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সংযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে মেনে নেয়নি। ক্রিমিয়া ছিল ইউক্রেনের অংশ। এখানে ২০১৪ সালে তথাকথিত গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ভিক্টর ইয়ানোকোভিচ সরকারের পতন ঘটে। অভিযোগ আছে ইয়ানোকোভিচ, যিনি ছিলেন অনেকটা মস্কোঘেঁষা, তাঁর উত্খাতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ভূমিকা ছিল। রাশিয়া এখন পূর্ব ইউক্রেনে তাদের তত্পরতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট পেট্রো প্রোসেনকোকে উত্খাতের উদ্যোগ নিতে পারে। তিন. চীন-রাশিয়া সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সার্গেই স্ক্রিপালের হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্ব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন তার সমালোচনা করেছে। চীন কোনো মার্কিন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেনি সত্য, কিন্তু নৈতিকভাবে রাশিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি কারো জন্যই কোনো ভালো খবর নয়। প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষমতায় থাকবেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সুতরাং পুতিনকে আস্থায় নিয়েই বিশ্বে স্থিতিশীলতা আসবে। পারমাণবিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। আস্থাহীনতার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে তা বিশ্বে উত্তেজনা ছড়াবে মাত্র। স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বে কোনো মঙ্গল ডেকে আনেনি। সুতরাং নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হলে তা-ও কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না।
Daily Kalerkontho
10.04.2018

জার্মানির অভিজ্ঞতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি

জার্মানি
জার্মানি সম্পর্কে আমার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। আমার গবেষণা, আমার উচ্চশিক্ষা সবই জার্মানিতে। জার্মান একত্রীকরণ কিংবা ‘ভেলভেট রেভ্যুলেশন’-এর অভিজ্ঞতা আমি কাছ থেকে দেখেছি।
আর সেসব অভিজ্ঞতার কথাও আমি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছিলাম ওই সময়। জার্মান ভাষায় জার্মানিকে আমি বলি Zweite Heimatland, অর্থাৎ দ্বিতীয় মাতৃভূমি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিবছরই একবার জার্মানিতে বেড়াতে যাই। কিন্তু এবারের যাওয়াটা ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। আমন্ত্রণটা এসেছিল জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।
Diversity and co-existence of Religions in Germany প্রোগ্রামের আওতায় জার্মান সরকার বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও মিডিয়া তথা সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা একটিভ তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমরা মোট ছয়জন ছিলাম।
আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে জার্মান সরকার সেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের একই জায়গায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। দেখেছি কীভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ছিল এক ধরনের শিক্ষা সফর। দেখেছি পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে কীভাবে মসজিদ, গির্জা, আর ইহুদি উপাসনালয়গুলো একসঙ্গে কাজ করে। কোনো বিরোধ নেই, কোনো ধর্মীয় উন্মাদনা নেই। যে যার মতো ধর্ম চর্চা করে যাচ্ছেন। এমনকি সব ধর্মকে এক পতাকাতলে আনার একটি উদ্যোগও আমরা লক্ষ্য করেছি। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে আজকের জার্মানি। এজন্য চ্যান্সেলর মার্কেল নিশ্চয়ই কৃতিত্ব নিতে পারেন। তিনি তা প্রাপ্যও বটে। ২০১৫ সালের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে পারেন অনেকে, যখন লাখ লাখ সিরীয় অভিবাসী ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। শত শত শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছিল ভূমধ্যসাগরে, যার সঠিক পরিসংখ্যান কেউ কোনোদিন দিতে পারবে না। শিশু, কিশোর, তরুণ-তরুণীদের সেসব দৃশ্য, বনে-জঙ্গলে, পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল দূরে অবস্থিত কোনো আশ্রয় কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া- আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের কারণে সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছিল।
এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন ইউরোপে। অনেক রাষ্ট্র সেদিন সিরীয় শরণার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়নি- যুক্তি একটাই- এরা মুসলমান, এরা প্রবেশ করলে খ্রিস্টীয় সমাজে বড় ধরনের ভারসাম্যের সৃষ্টি হবে। এমন কথাও বলা হয়েছিল যে, শুধু যারা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী তাদের গ্রহণ করা হবে। সারা ইউরোপে সেদিন এন্টি-মুসলমান একটা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন এঞ্জেলা মার্কেল। তিনি জানতেন সিরীয় মুসলমান শরণার্থীদের আশ্রয় দিলে তিনি একটি রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে থাকবেন।
কেননা এর পরপরই ছিল জার্মানির সাধারণ নির্বাচন। সারা ইউরোপ যখন সিরিয়ার মুসলমানদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন এঞ্জেলা মার্কেলের সরকার ১০ লাখ শরণার্থীকে তার দেশে আশ্রয় দিয়েছিল। কাজটি সহজ ছিল না।
তিনি রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মানবিকতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। জার্মান সরকার এদের শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, বরং তারা উদ্যোগ নিয়েছে ওইসব শরণার্থীকে জার্মান সমাজের সঙ্গে ‘ইন্টিগ্রেট’ বা অন্তর্ভুক্ত করতে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যাতে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে, সব ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে- জার্মান সরকারের এমন উদ্যোগও প্রশংসা পেয়েছে সর্বত্র। এ সফরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এ ধরনের একটি শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকায়। বার্লিনের Reinickendorf এ আমরা শরণার্থী কমিশনার তথা শরণার্থী প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গেও। তারা জানিয়েছেন কীভাবে ওই সংকটকালীন সময়ে তারা সিরীয় শরণার্থীদের জন্য বাসস্থান ও শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। এ বিষয়ে শরণার্থী সমন্বয়ক অলিভার রাবিস আমাদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি ছোট্ট গ্রামের পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে তারা কীভাবে শরণার্থীদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন, সে ব্যাপারেও তারা আমাদের জানিয়েছেন। শরণার্থী সমস্যা নিয়ে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও আমাদের সংলাপ হয়েছে।
সেই সংলাপ ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। শরণার্থীদের গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ, একটি আইনি কাঠামোয় আনা, তাদের আগ্রহ ও সহযোগিতার মনোভাব তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কাজটি সম্পন্ন করা অত সহজ ছিল না। এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে একটি ‘ডাটাবেজ’-এর আওতায় আনা, জার্মানির সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- ইত্যাদি কাজগুলো তারা নিরলসভাবে করে গেছেন মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে।
সংলাপে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত জার্মান আইনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন মিসেস রাবেয়া হাথাওয়ে, যিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ সালে জার্মানিতে ৮৯০০০০ শরণার্থী রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিল। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা কমে এসে দাঁড়ায় ২৮০০০০ এ। আর ২০১৭ সালে মাত্র ১৮৬৬৪৪ জন আবেদন করেছে।
আবেদনকারীর একটা বড় অংশ সিরিয়ার নাগরিক। এরপর ইরাক, আফগানিস্তান ও ইরিত্রিয়ার স্থান। Reinickendorf এ আমাদের সঙ্গে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী হিসেবে আসা একজন সিরিয়ার আইনজীবী, যিনি এখন জার্মানিতে কমিউনিটি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। শরণার্থীদের ব্যাপারে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আদম পাচারকারীরা সক্রিয়। এরা ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে টাকার বিনিময়ে শরণার্থীদের জার্মানিতে নিয়ে আসছেন।
CUCULA নামে একটি সংগঠন বার্লিনে শরণার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে। মিস জেসি মেদারনাক আমাদের জানিয়েছিলেন শরণার্থীদের জার্মানির মূল ধারায় মিশতে হলে তাদের প্রশিক্ষণ দরকার। এজন্য তারা তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে নানাবিধ উদ্যোগ নিচ্ছেন। এখানেই পরিচয় হয়েছিল সিরিয়া থেকে আসা এক তরুণের, যিনি কাঠমিস্ত্রি, এখন অন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
আমাকে জানালেন ৫ হাজার ইউরোর বিনিময়ে আদম পাচারকারীরা তাকে বার্লিনে পৌঁছে দিয়েছে। জার্মান সরকারের মানবিকতার বিষয়টি তখনই ফুটে উঠে, যখন তারা সবকিছু জেনেও সিরীয় শরণার্থীদের সে দেশে থাকতে দিয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তারা করেছেন। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। আমাদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল The House of owe এ যাওয়ার এবং তাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগের কথা শোনার। House of owe হচ্ছে তিনটি ধর্মের (ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদিবাদ) একটি মিলনস্থল। যেখানে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করার খবর আমরা জানি, যেখানে ইহুদি ধর্ম আর ইসলাম ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বিভেদ ফিলিস্তিন সংকটকে গভীর থেকে গভীরতর করেছে, সেখানে জার্মানিতে এ তিনটি ধর্মের মাঝে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একটি প্রজেক্টের আওতায় একই জায়গায় তিন ধর্মের উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য বিপুল অর্থ আসবে বেসরকারি খাত থেকে ও ব্যক্তিগত দান থেকে। প্রজেক্টের স্থান আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন ইমাম ওসমান ওরস।
একই ভবনে তিন ধর্মের মিলনমেলা। থাকবে আলাদা আলাদা লাইব্রেরি। বহুতল ভবন হবে এটি। আগামী বছর শুরু হবে কাজ। ওরা এর নামকরণ করেছে House of one। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এ রকমটি আছে কিনা আমার জানা নেই। House of one আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল জেরুজালেমের কথা। এ জেরুজালেম শহরেই তিন ধর্মের- ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদিবাদের ধর্মীয় স্থাপনা আছে। জার্মানিতে, বার্লিনে এমনটাই হতে যাচ্ছে। তবে পার্থক্যটি হল একই ভবনে হতে যাচ্ছে তিন ধর্মের ধর্মস্থান, মসজিদ, গির্জা আর সিনোগোগ। বার্লিনে থাকাকালীন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মসজিদ, সিনোগোগ আর গির্জায়। একটি সিনোগোগে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গাইড জোচিন শেফার আমাদের জানিয়েছিলেন ওই সিনোগোগটি যা কয়েকশ’ বছরের পুরনো, তা হিটলারের সময় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল।
অনেক দিন থেকেই তা আবার চালু হয়েছে। দুটি মসজিদে আমরা গিয়েছিলাম- একটি আরবি মসজিদ, অপরটি তুর্কি মসজিদ। মসজিদগুলো সবার জন্যই উন্মুক্ত। আরবি মসজিদের ভেতরকার কারুকার্য চোখে দেখার মতো। কয়েক মিলিয়ন ইউরো খরচ হয়েছে এ মসজিদটি তৈরি করতে। এখানে জার্মান সরকারের কোনো আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায় না। সৌদি আরব বা কোনো আরব দেশ থেকেও কোনো সাহায্য আসে না। চাঁদায় ও দানে চলে এ মসজিদ।
অন্যদিকে তুর্কি মসজিদের জন্য জমি দিয়েছিল জার্মান সরকার। তুর্কি নাগরিকদের দানেই চলে মসজিদটি। তবে তুরস্ক সরকার একজন ইমামকে এখানে পাঠান। তিনি ধর্মীয় কর্তব্যগুলো পালন করেন। তুরস্ক সরকার তাকে বেতন দেয়। নির্দিষ্ট সময় পর তিনি তুরস্কে ফিরে যান। তখন আরেকজন আসেন। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন এক তরুণ তুর্কি দম্পতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল, যারা মসজিদে বিয়ে করতে এসেছেন। সাবেক পূর্ব জার্মানির ব্রান্ডেনবুর্গ (Brandenburg) শহরে ব্রান্ডেনবুর্গ ক্যাথেড্রাল দেখতে যাওয়া ছিল আমাদের জন্য অনেক অভিজ্ঞতার।
বার্লিন শহর থেকে প্রায় দেড়-দু’ঘণ্টার জার্নি। সাবেক সমাজতান্ত্রিক শাসনামলেও এ ক্যাথেড্রালটি খোলা ছিল। পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি এটাকে বন্ধ করে দেয়নি। তবে মানুষ আসত কম, এ কথা জানালেন ক্যাথেড্রালের একজন কর্মী। এখানে একটি মিউজিয়ামও আছে। পুরনো অনেক ধর্মীয় ঐতিহ্য এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কয়েকশ’ বছরের পুরনো এ ক্যাথেড্রালের মিউজিয়ামে কয়েকশ’ বছরের আগের রাজাদের চিঠিও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কিউরেটর ড. কর্ড-জর্জ হাসেলম্যান আমাদের পূর্ব জার্মানির ঐতিহ্যে দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে তিনি জানেন এবং মাস্টার্স পর্যায়ে বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তার থিসিস লেখার অভিজ্ঞতা আছে- এ কথাটা জানাতেও তিনি ভোলেননি। চমৎকার মিশুক মানুষ। অত্যন্ত হৃদ্যতার সঙ্গে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ব্রান্ডেনবুর্গ শহর অতীতে উপেক্ষিত ছিল। এখানে কোনো শিল্প-কারখানা নেই। ফলে তরুণ প্রজন্ম চলে যায় শিল্পোন্নত শহরগুলোতে। পুরনো শহর।
ছোট ছোট রাস্তা। পরিবেশবান্ধব। শহুরে জীবনের ছোঁয়া এখানে পাওয়া যায় না। কিন্তু ছিমছাম। শান্ত। কিছুটা দারিদ্র্যের ছাপও লক্ষ্য করলাম। পুরনো বাড়িগুলোর সংস্কারও হয়নি তেমন। তবে একটা মজার কথা শুনলাম অনেকের কাছ থেকেই। গির্জা সদস্য সংখ্যা দিন দিন কমছে। প্রতিটি জার্মান নাগরিককে চার্চ কর দিতে হয়, যদি তিনি কোনো গির্জার সদস্য হন। সদস্য না হলে কর দিতে হয় না। চার্চের সদস্য না হওয়ার পেছনে এটা কোনো কারণ কীনা, এর জবাব কেউ আমাকে দিতে পারলেন না। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আন্তঃধর্ম সম্পর্ক বৃদ্ধিকে জার্মান সরকার যে কত গুরুত্ব দেয়, তার বড় প্রমাণ আমরা পেলাম জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে। সেখানে একটি টাস্কফোর্স পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে (Responsibility of the Religions for Peace)। এই টাস্কফার্সের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ মতবিনিময় হয়েছে। বাংলাদেশে ধর্ম কী ভূমিকা পালন করে, আমরা তা বলেছি। টাস্কফোর্সের প্রধান ক্রিস্টোফ রোমহিল্ড একজন ফাদার।
তাকে সহযোগিতা করছেন কূটনৈতিক কোরের সদস্য ড. সিলকে লেসনার ও টিমবার্সাট। আলোচনায় তারা জানালেন ধর্মকে তারা গুরুত্ব দেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সংহতি স্থাপন, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই তাদের কাজ। জার্মান পররাষ্ট্রনীতির এটি একটি দিক। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মীয় সম্প্রীতি এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী। এটা জার্মান সরকার অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখে।
লাঞ্চে আমরা পরিচিত হয়েছিলাম জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক গেহার্ড আলমারের সঙ্গে। এক চমৎকার মানুষ তিনি। বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা ডেস্কের প্রধান তিনি। বার্লিনের ভারডারসার মার্কেট-১ এ অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরনো ভবনের ছাদে আমাদের নিয়ে গেলেন মি. আলমার। সেখান থেকে দেখালেন বার্লিন শহরকে। আমার জার্মান ভাষা শুনে তিনি আমাকে প্রশংসাও করেছিলেন। বিপুলসংখ্যক মুসলমান ধর্মাবলম্বী সিরীয় শরণার্থীদের জার্মানিতে উপস্থিতি জার্মানির রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে কিছুটা বদলে দিলেও জার্মান সরকারের সুস্পষ্ট নীতির কারণে সেখানে সমাজে বড় কোনো প্রতিক্রিয়া পড়েনি। জার্মান সরকারের নীতির মূল কথাই হচ্ছে ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন ধর্মের মাঝে সহাবস্থান। এ নীতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর সে কারণেই, এঞ্জেলা মার্কেল এত বেশি জনপ্রিয়। তিনি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে শরণার্থীদের আটকে দেননি (যা অনেক ইউরোপীয় দেশ করেছে), বরং মানবিকতার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরা খুব কাছ থেকে বদলে যাওয়া জার্মানিকে দেখলাম। দুই বার্লিন এখন এক শহর। শহরটি বড় হয়েছে। এটি একটি বড় আন্তর্জাতিক শহরে পরিণত হয়েছে। পূর্ব বার্লিনে সেই বিখ্যাত বার্লিন দেয়ালের ভগ্নাংশ এখন সেভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে। তারা এটা সংরক্ষণ করেছে। বার্লিন দেয়ালে ম্যুরাল আঁকার জন্য তারা বিশ্বের বড় বড় আর্টিস্টদের বার্লিনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তারা যে ছবি এঁকেছেন, তা দেখার মতো। একটি ছবিতে দেখলাম ব্যঙ্গ করে রিগ্যান-গরবাচেভের চুমু খাবার ছবিও আঁকা হয়েছে। পূর্ব বার্লিনে এখনও সেই কনডোনিয়ামগুলো আছে। বৃহৎ জনশক্তিকে বসবাসের সুযোগ করে দেয়ার জন্য দুই রুমের (এক বাথরুম) শত শত উঁচু ভবন তৈরি করা হয়েছিল। সেই ভবনগুলো এখনও তেমনি আছে। তেমনি একটি ভবনে আমার ছাত্র আল আমিন ও তার স্ত্রীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম দু’দিনের জন্য। দুই জার্মানির একত্রীকরণের পর অ্যাপার্টমেন্টগুলো বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। জার্মানি এখন এনার্জি ‘সেভ’ করছে। এটাও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
ইউরোপের রাজনীতিতে জার্মানির প্রভাব পড়ছে। ইউরোপে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি বাড়লেও, কোনো কোনো দেশে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল (ফ্রান্স), জার্মানিতে তেমনটি হয়নি। মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ৪ দশমকি ৪ ভাগ। ফলে এখানে মুসলমানদের নিয়ে তেমন কোনো সংকট নেই। শতকরা ২৯ ভাগ রোমান ক্যাথলিক, শতকরা ২৭ ভাগ প্রোটেসটানদের দেশ জার্মানিতে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থান একটি বড় উদাহরণ। আমাদের জার্মানি সফরের সময় সরকারি কর্মকর্তা, গির্জা ও মসজিদ পরিচালনাকারী এবং সেই সঙ্গে এনজিও গ্রুপগুলোর সঙ্গে আলোচনায় আমার মনে হয়েছে জার্মানি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও বিভিন্ন ধর্মের মাঝে সহাবস্থান ও সম্প্রীতির যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটাই সঠিক নীতি। এ সঠিক নীতিই ইউরোপে জঙ্গিবাদকে নিরুৎসাহিত করবে।
Daily Jugantor
09.04.2018

যুক্তরাষ্ট্র কি স্নায়ুযুদ্ধের ধারণায় ফিরছে

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া স্ব-স্ব দেশ থেকে কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ঘটনার রেশ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই গত ১ এপ্রিল রাশিয়া সিরিয়া থেকে সকল মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। নিউজউইক ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় নিযুক্ত রাশিয়ার বিশেষ দূত আলেকজান্ডার লাভরেনটিয়েভ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে যুক্তিতে সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতি রাখতে চায়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের সামরিক উপস্থিতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এখন একে অপরকে ‘শত্রু’ ভাবছে, অনেকটা স্নায়ুযুদ্ধকালীন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে যে ‘সম্পর্ক’ বিরাজ করছিল, ঠিক তেমনি একটি পরিস্থিতির দিকে দেশ দুটি এখন এগিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বিভিন্ন ইস্যুতে দেশ দুটি পরস্পরবিরোধী একটা অবস্থান গ্রহণ করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (২০১৬) রাশিয়ার পরোক্ষ হস্তক্ষেপ, সিরিয়ায় আসাদের পক্ষ অবলম্বন ইত্যাদি কারণে দেশ দুটির মাঝে বড় ধরনের আস্থাহীনতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষুদ্র আকারের পরমাণু বোমা তৈরি করার, যা কীনা বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দেওয়ার একটা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই যখন ঘটনা, তখন ব্রিটেন প্রথমে ২৩ জন রুশ কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল। অভিযোগ ছিল, ব্রিটেনে বসবাসরত এক সময়ের রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য সার্গেই স্ক্রিপালকে হত্যার। স্ক্রিপাল ছিলেন ডবল এজেন্ট। তিনি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করলেও, তিনি একই সঙ্গে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকেও তথ্য সরবরাহ করতেন। তাই স্ক্রিপালকে যখন নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়, তখন অভিযোগ ওঠে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে। ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত অনুুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। তারা সবাই মিলে ১৩৯ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া বহিষ্কার করে ১৫০ জন পশ্চিমা কূটনীতিককে, যার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের কূটনীতিকরাও আছেন। এই বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নতুন করে দু’দেশের মাঝে (যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, এর মধ্য দিয়ে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছিল আজ থেকে ২৭ বছর আগে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছিল। একটা সময় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ইউরোপে প্রভাব-বলয় বিস্তারের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির মাঝে এক ধরনের ‘যুদ্ধের’ আশঙ্কার জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ওই পরিস্থিতি বহাল ছিল, যা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধকালীন দীর্ঘ সময়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে দুই পরাশক্তির কাছে যে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল, তা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ভোর হওয়ার আগে বিশ্বে ‘ট্রিনিটি’ নামের বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে দ্বিতীয় আরেকটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই বোমাই জাপানের আত্মসমর্পণ এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানকে ত্বরান্বিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের রেশ ধরে ১৯৪৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৬০ সালে সাহারা মরুভূমিতে ফ্রান্স, ১৯৪৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল মন্টেপেলো দ্বীপে ব্রিটেন, এবং ১৯৬৪ সালে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঝিনজিয়াং প্রদেশের পারমাণবিক পরীক্ষার এলাকায় চীন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে বিশ্ব আসরে নাম লিখিয়েছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আংশিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়মিত কৌশলগত অস্ত্র সীমিতকরণ আলোচনা (সল্ট) শুরু করে। ১৯৭০ সালের মার্চে নতুন করে আর কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের যাতে বিস্তার না ঘটে, সে লক্ষ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭৯ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সল্ট চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পারমাণবিক অস্ত্রের বিলোপ সাধনে প্রেসিডেন্ট বুশ ও গর্বাচেভ কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি (স্ট্রাট) স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় স্ট্রাট-২ চুক্তি। ওই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস করা হয়। ১৯৯৫ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিকে (এনপিটি) ২৫ বছরের জন্য স্থায়ী রূপ দিতে জাতিসংঘে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এখানে আরো একটি কথা বলা প্রয়োজন। ভারত ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো এবং ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয়বারের মতো, পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো, আর ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। এর বাইরে ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়। যদিও ইসরাইলের এ ব্যাপারে কোনো স্বীকারোক্তি নেই। বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সর্বশেষ যে তথ্য (২০১৭) আমরা পাই, তাতে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৬ হাজার ৮০০টি, রাশিয়ার কাছে ৭ হাজার, যুক্তরাজ্যের কাছে ২১৫, ফ্রান্সের কাছে ৩০০, চীনের কাছে ২৭০, ভারতের কাছে ১২০-১৩০টি, পাকিস্তানের কাছে ১৩০-১৪০, উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-২০টি পারমাণবিক ওয়্যারহেড রয়েছে। একটি ওয়্যারহেড একাধিক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করতে পারে। আরো একটি কথা। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ১২২টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। এখন ৫০টি দেশ চুক্তিটি অনুমোদন করলেই ৯০ দিন পর এটি কার্যকর হবে। তবে এই চুক্তি কয়টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। পরমাণু যুদ্ধ এড়াতে সাত দশকের প্রচেষ্টার পর প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করতে বৈশ্বিক ওই চুক্তিটি হয়েছিল। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশের আলোচকরা ১০ পাতার চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছিলেন। চুক্তির পক্ষে পড়েছিল ১২২টি ভোট। একটি ভোট পড়েছে বিপক্ষে। দেশটি হচ্ছে নেদারল্যান্ডস। সিঙ্গাপুর ভোটদানে বিরত ছিল। ভোটে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরাইল- বিশ্বের এই ৯টি পরমাণু অস্ত্র শক্তিধর দেশের কোনো আলোচনা ও ভোটাভুটিতে ছিল না। জাপানও আলোচনা বয়কট করে। এখন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার, ছোট ছোট পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত এবং সিআইএ প্রধান পম্পিওর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি বিশ্বে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ছোট পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্তে চীন ও রাশিয়া তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। মস্কো মনে করে, মার্কিন পরিকল্পনা সংঘাতপূর্ণ ও যুদ্ধের উসকানিমূলক। এ ধরনের পরিকল্পনা রাশিয়াবিরোধী বলেও মনে করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর চীন মনে করে, ‘শান্তি ও উন্নয়নে অপরিহার্য বৈশ্বিক প্রবণতা বজায় রাখা দরকার। তবু বিরুদ্ধে না গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরমাণু অস্ত্রের মালিক যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তা অনুসরণ করে চলা। আমরা আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধকালীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসবে। চীনকে অযৌক্তিকভাবে পরমাণু হুমকি মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে চীনের নীতি সব সময়ই আত্মরক্ষামূলক- চীনের ওটাই বক্তব্য। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি স্পষ্টভাবেই পরমাণু অস্ত্র বিস্তারবিরোধী আন্তর্জাতিক আইনের (এনপিটি) লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত রাশিয়া স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। একটা আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকেই। ইউক্রেন নিয়েও এর আগে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে দ্বন্দ্ব ছিল। অভিযোগ আছে, ইউনেকোভিচকে (রাশিয়া সমর্থিত) উৎখাত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ব ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক খারাপ। কেননা, ইউক্রেন মনে করে রাশিয়ার মদদে পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। পূর্ব ইউক্রেন অনেকটা ক্রিমিয়ার মতো রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি চায়। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। রাশিয়ার এখানে আপত্তি। যদি ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়, তাহলে ইউক্রেনের মাটিতে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে, যা কীনা রাশিয়ার নিরাপত্তার প্রতি এক ধরনের হুমকি বলে রাশিয়া মনে করে। রাশিয়ার আপত্তিটা সে কারণেই। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই এই এলাকায় রাশিয়ার ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকাকেও ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এটা তো স্পষ্ট, রাশিয়ার হস্তক্ষেপে (বিমান হামলা) সিরিয়া থেকে আইএস বিতাড়িত হয়েছে। আবার সিরিয়ায় আসাদ সরকারও টিকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ,  রাশিয়ার বিমান হামলায় আসাদবিরোধী শক্তিও (যারা আইএসের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছিল) ধ্বংস হয়ে গেছে। রাশিয়া আসাদের পক্ষ অবলম্বন না করলে, সিরিয়ার পরিস্থিতি আজ অন্যরকম হতো। এই অঞ্চলজুড়ে রাশিয়া-ইরান-তুরস্ক একটা অক্ষ গড়ে উঠছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী। সঙ্গত কারণেই রাশিয়ার ভূমিকাকে খুব ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যাতে ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন, তাতে রাশিয়া প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল- এটা তখন প্রকাশ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনে এটা নিয়ে এখন তদন্ত চলছে। ফলে নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পর ট্রাম্পের প্রো-রাশিয়া বক্তব্য থেকে মনে করা হয়েছিল তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে যাবেন। তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে একটা ‘ইউ টার্ন’ নিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি এখন অনেকটাই রাশিয়াকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান, সিরিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা রাশিয়ার স্বার্থকে আঘাত করছে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি আস্থাহীন সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দেবে। রাশিয়া ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আসরে অনেকটা ‘একঘরে’ হয়ে পড়েছে। জি-৮ থেকে রাশিয়াকে অনেক আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন স্ক্রিপাল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দু’দেশের মাঝে সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটল। যে কোনো বিবেচনায় এটা কোনো ভালো খবর নয়।
স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর একটি স্থিতিশীল বিশ্ব আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আবার উত্তেজনা বাড়ছে। এই উত্তেজনা বিশ্বকে আবারো বিভক্ত করে ফেলতে পারে। আবারো শুরু হতে পারে ‘প্রভাব বলয় বিস্তারের’ রাজনীতি। আর এই ‘রাজনীতি’ই জন্ম দেবে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের।
বাংলাদেশের খবর ৮ এপ্রিল ২০১৮

পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি


তিনটি পরাশক্তিÑ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম একটি বিষয়। গেল মার্চ মাসের প্রথম দিকে লন্ডনের স্যালিসবারিতে সাবেক রুশ কর্মকর্তা (যিনি ছিলেন একজন ডাবল এজেন্ট) সার্গেই স্ক্রিপালকে হত্যা করার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্ব যখন রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমাবিশ্বের মধ্যে একধরনের ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ লক্ষ্য করছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের একধরনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে স্পষ্টই বিশ্ব আবারও দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাবিশ্ব, অন্যদিকে রাশিয়া-চীন অক্ষ। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে দ্বন্দ্বটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। ওই সময় চীনের অবস্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের জায়গা দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। আর চীন রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করছে। উল্লেখ্য, সার্গেই স্ক্রিপাল হত্যাকা-ের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাবিশ্ব ১৩৯ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ১৫০ জন পশ্চিমা কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। চীন কোনো বিদেশি কূটনীতিক বহিষ্কার না করলেও রাশিয়াকেই সমর্থন করেছে।
তবে কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ঘটনা নতুন নয়। আমরা যদি সাম্প্রতিককালে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব এর আগেও কূটনীতিকদের বহিষ্কারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০১, ২০১০ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্র রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছিল। এর পাল্টা ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে রাশিয়াও মার্কিন কূটনীতিকদের তার দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল। তবে এবার পার্থক্যটা হলো ২৫টি পশ্চিমা দেশ একসঙ্গে রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করল। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এটা স্পষ্ট, যা মার্কিন প্রশাসন বলছে, তারা তাদের বন্ধু, বিশেষ করে ব্রিটেনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটেনের রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র শুধু সমর্থনই করেনি, বরং তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে লক্ষ করার বিষয়, চীন কিংবা ভারতের মতো বড় দেশ, এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোও ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। ৪ মার্চ স্যালিসবারি শহরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দু-সপ্তাহ আমি ইউরোপে ছিলাম। জার্মানি, পোল্যান্ডে কিংবা চেক রিপাবলিকে আমি এ ঘটনার তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখিনি। জার্মান টিভিতে আমি সে দেশের পার্লামেন্টের বিতর্ক দেখেছি। সেখানে নব্যগঠিত অ্যাঞ্জেলা মরকেলের কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম শরিক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (্এসপিডি) একজন এমপি রলফ ম্যুটজেনিচ জার্মান সরকারের কিছুটা সমালোচনা করে বলেছিলেন, তদন্তে এখনও প্রমাণিত হয়নি কে বা কারা রুশ গোয়েন্দাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করল। তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই খুব দ্রুত কূটনীতিক বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। এরপর একজন সংসদ সদস্য, ইয়র্গেন ট্রিটিন বললেন, এ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করবে। এখানে বলা ভালো, জার্মানি চার রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। জার্মান সংসদে এই বিতর্ক প্রমাণ করল জার্মানিতে এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস, যিনি এসপিডি দলের সদস্য, তিনি রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ব্যাপারে শক্ত অবস্থানে আছেন। স্পষ্টই সেখানকার বামমনা রাজনৈতিক দলগুলো এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত। পোল্যান্ড চার ও চেক রিপাবলিক তিন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করলেও ওয়ারশতে আমার স্বল্প অবস্থানকালে আমি দেখেছি, এটা নিয়ে সেখানে তেমন উত্তেজনা নেই। তেমন আলোচনাও নেই। পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিকে দক্ষিণপন্থিরা এখন ক্ষমতায়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনায় রাশিয়া মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। রাশিয়া বলছে, নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যার কাজটি মূলত ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা।
এ-ই যখন পরিস্থিতি, তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে একধরনের বাণিজ্যযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ১২৮ পণ্যে চীনের অতিরিক্ত শুল্কারোপের কঠোর জবাব দিতে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৩০০ চীনা পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এ তালিকা চূড়ান্ত না হলেও এগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কারোপ করে ২০১৮ সালে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থ আদায়ের চিন্তাভাবনা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তবে এরই মধ্যে পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, গাড়িসহ ১০৬টি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র এসব পণ্য রপ্তানি বাবদ চীন থেকে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে। বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনা স্টিলের ওপর করারোপ করার পরিপ্রেক্ষিতেই চীন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চীন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের একতরফা ও সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধের গুরুতর লঙ্ঘন। ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ চীন-যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের স্বার্থই রক্ষা করবে না। এটি বিশ্ববাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তি। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিমাণ (প্রথম) ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৭ হাজার ১৪৪ মিলিয়ন ডলার, সেখানে চীনের অর্থনীতি ১ কোটি ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৫৭ মিলিয়ন ডলার (দ্বিতীয়)। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে (পিপিপি) চীন প্রথম, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়। এর পরিমাণ যথাক্রমে ২ কোটি ৩১ লাখ ৯৪ হাজার ৪১১ মিলিয়ন ডলার (চীন) ও ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৭ হাজার ১৪৪ মিলিয়ন ডলার (যুক্তরাষ্ট্র)। ফলে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তি দুটি দেশের এমন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বের বাজারব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে চীনা পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের শেয়ারবাজার কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের দুর্ভোগে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এতে চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হবেন ভোক্তারা।
পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল। তিন পরাশক্তির মাঝে একধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্পের আরও একটি সিদ্ধান্ত বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে। এ সিদ্ধান্ত বিশ্বের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। আগামী মে মাসে যখন ট্রাম্প-কিম জং উন (উত্তর কোরিয়ার নেতা) বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তখন ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়াকে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, শেষ পর্যন্ত কিম জং উন ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক না-ও করতে পারেন।
এর মধ্য দিয়ে এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এই ছোট ছোট পারমাণবিক বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত কি শেষ পর্যন্ত একুশ শতকের তৃতীয় দশকে নতুন করে একধরনের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে? এই মুহূর্তে হয়তো এটা আঁচ করা যাবে না। কিন্তু নিশ্চিত করেই বলা যায় চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া একটা পাল্টা কর্মসূচি গ্রহণ করবে। উত্তর কোরিয়া অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত পাল্লার পারমাণবিক হামলার কথা বলে আসছে। এখন এই সম্ভাবনা আরও বাড়ল। গত ২৪ জানুয়ারি ‘দ্য ন্যাশন’ পত্রিকায় Alice Slater-এর একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেনÑ পৃথিবীর ৮০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আর সেনাবাহিনী মোতায়েন করা আছে ১ লাখ ৩৮ হাজার। অন্যদিকে ৯টি দেশে রাশিয়ার ২৬ থেকে ৪০টি ঘাঁটি রয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, রাশিয়া কম্বোডিয়ার তিনটি সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার জন্য কম্বোডিয়া সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে। পাঠক সিরিয়ার পরিস্থিতি স্মরণ করতে পারেন। সিরিয়ায় কুর্দি অঞ্চলে একসময় রাশিয়ার ঘাঁটি ছিল। পরে তুরস্কের সামরিক অভিযানের আগেই সে ঘাঁটি প্রত্যাহার করে নেয় রাশিয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এখনও আছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমানঘাঁটি আছে। সিরিয়ার তারতাস ও লাতকিয়া সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে রাশিয়ার নৌবাহিনী। এ কারণে পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একধরনের ‘প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার, দেশ দুটি তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এর বাইরে রয়েছে চীন ও ভারত। চীনকে টক্কর দিতে আফ্রিকায় সেনাঘাঁটি গড়ছে ভারত (সিসিলি)। জিবুতিতে রয়েছে চীনা ঘাঁটি। আন্তর্জাতিক পরিসরে, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া একধরনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ঘুরে ফিরে সেই স্নায়ুযুদ্ধকালের মানসিকতায় ফিরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপ্তি বাড়াচ্ছে। এই মানসিকতা আরও স্পষ্ট হবে আগামীতে। ছোট পারমাণবিক বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত এ রকমই একটি সিদ্ধান্ত, যার মধ্য দিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতার সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, আকারে ছোট ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার শক্তি থাকে ২০ কিলোটনের মতো। যদিও এই বোমার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের নাগাসাকি শহরে একই ধরনের বিস্ফোরণে ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আর তাতেই ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হচ্ছে, যতই সীমিত হোক না কেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা রাশিয়াকে অনুধাবন করাতে এই কৌশল কাজে দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল আদৌ কোনো কাজে দেবে বলে মনে হয় না। বরং এই কৌশল নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দেবে, যার আলামত আমরা পেতে শুরু করেছি।
স্পষ্টই পরাশক্তিগুলো তাদের নিজ নিজ স্বার্থের কারণে পরস্পরবিরোধী একটি অবস্থান নিয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান নতুন করে আবারও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

সিরিয়া যুদ্ধের আট বছর

১৫ মার্চ সিরিয়ার যুদ্ধ আট বছরে পা দিয়েছে। আরব বসন্ত যখন তুঙ্গে, তখন ২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন দমাতে আসাদ সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। নাটকীয়ভাবে তখন উত্থান ঘটে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস)। এরপরের কাহিনি আমরা সবাই জানি। একপর্যায়ে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা ইরাক ও সিরিয়ার একটা অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র, যারা সেখান থেকে সমগ্র মুসলিমবিশ্বে খেলাফতের ডাক দেয়। এতে বিভ্রান্ত হন মুসলিমবিশ্বের হাজার হাজার মানুষ। এদের অনেকে তথাকথিত ‘জিহাদি যুদ্ধে’ অংশ নেওয়ার জন্য সিরিয়ায় যান। কিন্তু এখন সেসব অতীত। অব্যাহত মার্কিন ও রুশ বিমান হামলার কারণে আইএসের পতন হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রিত যেসব এলাকা ছিল, সেখান থেকে তারা বিতাড়িত হয়েছে। ‘আরব বসন্তে’ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো থেকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকরা উৎখাত হলেও ব্যতিক্রম ছিলেন আসাদ। তিনি সিরিয়ায় এখনও আছেন। বলা যেতে পারে, সরাসরি রাশিয়ার সাহায্যের কারণেই টিকে গেলেন আসাদ; কিন্তু কতদিনÑ সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সিরিয়া যুদ্ধে আইএস উৎখাত হয়েছে সত্য; কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী পূর্ব ঘৌতায় আসাদ বাহিনী তাদের বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। সেখানে সরকারবিরোধী বিদ্রোহী বাহিনী শক্ত অবস্থানে আছে। পূর্ব ঘৌতা এখন পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধ চলছে উত্তরাঞ্চলীয় আফরিন শহরেও। সেখানে কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের সেনাবাহিনী তাদের সেনা অভিযান অব্যাহত রেখেছে। 
সিরিয়া যুদ্ধে এখন অনেকগুলোর ‘ফ্রন্টের’ জন্ম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরানÑ সবারই সিরিয়ায় স্বার্থ রয়েছে। এরপর যোগ হয়েছে ইসরাইল। তুরস্ক কর্তৃক ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংসের পর ইসরাইল এটাকে হালকাভাবে নেবেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তুরস্ক সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত আফরিন দখল করে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। অথচ দেশ দুটি ন্যাটোর সদস্য। তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া থেকে অস্ত্রও কিনছে তুরস্ক। এই অস্ত্র কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আফরিনে তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্রের ভালো না লাগারই কথা। তুরস্কে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- হয়েছে, তা কুর্দি সন্ত্রাসীদের কাজ বলে তুরস্কের অভিযোগ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কুর্দি অঞ্চল মানবিজকে নিয়ে। মানবিজ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি শহর। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অবস্থান রয়েছে, যারা সেখানে ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে কর্মরত। তুরস্ক মানবিজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোগেল সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে আদৌ কোনো চিন্তাভাবনা করছেন না। তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, পেন্টাগন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সকে তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবে। এই ফোর্স তুরস্কের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আফরিন শহর মুক্ত করার জন্য ‘যুদ্ধ’ করছে। ফলে সিরিয়া সংকট নতুন একটি মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আফরিন অঞ্চল থেকে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি উচ্ছেদ হলেও তারা পাল্টা লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন সিরিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়কে আরও বিস্মিত করবে। জেনেভায় জাতিসংঘের উদ্যোগে যে শান্তি আলোচনা চলে আসছিল, তা কোনো ফল বয়ে আনতে পারছিল না। অন্যদিকে রাশিয়ার সোচিতে যে বিকল্প শান্তি আলোচনা চলছিল, তাতেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ২৯ জানুয়ারি সোচিতে যে শান্তি আলোচনা আহ্বান করা হয়েছিল, সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ তাতে যোগ না দেওয়ায় কার্যত সে উদ্যোগও এখন প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে। ফলে একটা প্রশ্ন সংগত কারণেই উঠেছে যে, সিরিয়ার রাজনীতি এখন কোন পথে? সিরিয়া থেকে আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠী একরকম উচ্ছেদ হয়েছে। বিশেষ করে বছর দুয়েক আগে মার্কিন ও রাশিয়ার বিমান হামলার পর আইএস সিরিয়ায় দুর্বল হয়ে যায়। তারা ২০১৪ সালের পর থেকে যেসব এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল এবং যেসব এলাকায় তারা তথাকথিত একটি ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, ওই বিমান হামলায় তা ধ্বংস হয়ে যায় এবং আইএস সিরিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়; কিন্তু রাশিয়ার বিমান হামলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ ওঠে, রাশিয়ার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে আসাদবিরোধী বেশকিছু বিদ্রোহী গ্রুপ, যারা আইএসের সঙ্গে জড়িত ছিল না। এ-ই যখন পরিস্থিতি, তখন আফরিনে তুরস্ক সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। তুরস্ক তার সামরিক আগ্রাসনের জন্য যুক্তি দেখিয়েছে। তুরস্ক বলছে, তারা শহরটিকে সন্ত্রাসীদের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেবে না। এই সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ন্যাটোভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসনের এক দিন আগে সিরিয়ার তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায় কুর্দিদের নিয়ে শক্তিশালী সীমান্তরক্ষী বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) নেতৃত্বেই এই পরিকল্পনা করে। পিকেকে তুরস্কে নিষিদ্ধ। ওয়াইপিজি হচ্ছে পিকেকের সামরিক শাখা। সাম্প্রতিক সময়গুলোয় তুরস্কের অভ্যন্তরে যেসব সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে পিকেকের হাত রয়েছে বলে তুরস্ক অভিযোগে করেছিল। আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযান সিরিয়ার জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ আরও বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুর্দি ওয়াইপিজি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই হামলা ট্রাম্প প্রশাসনকে ন্যাটোভুক্ত তুরস্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গেল অক্টোবরে (২০১৭) সিরিয়ার রাকা শহর থেকে আইএসকে উৎখাতে ওয়াইপিজির সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু তুরস্ক ওয়াইপিজি-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতাকে ভালো চোখে নেয়নি। তুরস্কের ভয় ছিল, কুর্দি বিদ্রোহীরা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের অংশবিশেষ নিয়ে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। সিরিয়ার কুর্দিরা বেশিরভাগই দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে। পিকেকের সশস্ত্র শাখা ওয়াইপিজি বা ‘পিপলস ডিফেনস ইউনিট’ (ণচএ) ২০১২ সালে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বপাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই তুরস্ক একধরনের অস্বস্তিÍতে ছিল। বলা ভালো, ১৯৮৪ সালে থেকেই পিকেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অনেকের স্মরণ থাকার কথা, কুর্দি শহর কোবানিকে আইএসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সালে সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের বক্তব্য যদি আমরা সত্য বলে ধরে নিই তাহলে এটা স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তাদের উপস্থিতি রাখতে চায়। তারা সিরিয়ায় দুই হাজার সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে চায়! আর তাই তারা ব্যবহার করতে চায় ওয়াইপিজিকে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানে। তুরস্কের এটা পছন্দ নয়। ওয়াইপিজি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে তা দেশটির (তুরস্ক) সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। একসময় ওয়াইপিজির সঙ্গে রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ আছে, রাশিয়ার উপদেষ্টারা আফরিনে ওয়াইপিজির পক্ষে কাজ করতেন। কিন্তু ওয়াইপিজি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিতীয় ‘ফ্রন্ট’ ওপেন করায় রাশিয়া কুর্দিদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় এবং সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানের ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো আপত্তি ছিল না। এখানে বৃহৎ শক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর একটি ভূমিকা লক্ষ করার মতো। সিরিয়ার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে স্পষ্টই দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে, রাশিয়ার কারণেই আসাদ সরকার টিকে গেল। এখানে রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া একটি পক্ষ; আর যুক্তরাষ্ট্র আসাদবিরোধী। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া জোটের বিরুদ্ধে। তুরস্ক তার জাতীয় স্বার্থের কারণেই রাশিয়া-ইরান-সিরিয়ার শিবিরে অবস্থান করছে।
তাহলে সিরিয়া সংকটের সমাধান হবে কোন পথে? সেখানে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে আসাদকে রাখা না রাখা নিয়ে একটি ‘ডিবেট’ আছে। সিরিয়ায় আসাদবিরোধী অনেকগুলো ‘পক্ষ’ রয়েছে, যারা একদিকে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধেও ‘যুদ্ধ’ করছে, আবার ক্ষমতা দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষেও লিপ্ত। দুটি বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও সিরিয়া সংকটে নিজেদের জড়িত করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে জেনেভায় একটি শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু ওই সম্মেলনে এখন অবধি একটি শান্তি ফরমুলা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে রাশিয়ার উদ্যোগে সোচিতেও আসাদবিরোধীদের নিয়ে একটি শান্তি সম্মেলন আয়োজন করে আসছে রাশিয়া। কিন্তু সেখানেও কোনো সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ সোচি বৈঠক বয়কট করেছে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ, যাদের কেউ কেউ জেনেভা সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিল। জেনেভা সম্মেলনে যোগ দিতে বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে একটি হাইনেগোশিয়েশনস কমিটি (এইচএনসি) গঠিত হয়েছিল। কিন্তু কমিটির মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। এইচএনসি সৌদি আরব সমর্থিত। তবে কুর্দিদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এখানে দ্বন্দ্ব আছে। বস্তুত ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম হওয়া এইচএনসির কোনো ভূমিকা নেই।
তাহলে সমাধানটা হবে কীভাবে? সিরিয়ার পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই জটিল হয়ে পড়েছে। এখানে কার্যত দুটি বড় শক্তির অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টই কুর্দিদের নিয়ে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ আসাদবিরোধী একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে তুরস্কের সমর্থন না পাওয়া। কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থান ও সমর্থন তুরস্ক ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি স্ট্রাটেজি হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব কমানো। এক্ষেত্রে সুন্নি ধর্মাবলম্বী তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল মিত্র হতে পারত; কিন্তু তা হয়নি। বরং তুরস্ক ও ইরান এক ধরনের অ্যালায়েন্সে গেছে। রাশিয়া আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল। কিন্তু রাশিয়া চায় না আসাদ অপসারিত হোক। আসাদকে রেখেই রাশিয়া এক ধরনের সমাধান চায়। এখানে তুরস্কের আপত্তি থাকলেও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ রাশিয়ার মিত্র। রাশিয়া নিজ উদ্যোগে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে চায়। সেজন্যই সোচিতে সিরিয়ার সব দল ও মতের প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেছিল রাশিয়া, যাকে তারা বলছে ‘সিরিয়ান কংগ্রেস অব ন্যাশনাল ডায়ালগ’। কিন্তু সেখানেও বিরোধ আছে। নানা মত ও পক্ষের প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও একটা বড় অংশ এতে অংশ নেয়নি। সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ ‘সিরিয়ান নেগোসিয়েশন কমিশন’ এই সম্মেলনে অংশ নেয়নি। সিরিয়া সংকটের মূলে রয়েছে সব মত ও পথকে একটি কাঠামোয় আনা। সেখানে সুন্নি, শিয়া, দুর্জ, আলাউট মতাবলম্বীসহ বিভিন্ন সামরিক গ্রুপ রয়েছে। আসাদ সমর্থকরাও একটি পক্ষ। কিছু ইসলামিক গ্রুপও রয়েছে, যারা আইএসের বিরোধিতা করেছিল। সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করা সহজ কাজ নয়। যদিও সোচিতে সবাই সিরিয়ার অখ-তা রক্ষায় একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারা ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছেন। তারপরও কথা থেকে যায়Ñ বড় বিরোধী দলের অবর্তমানে এই সমঝোতা আদৌ কাজ করবে কিনা। 
আপাতদৃষ্টিতে সিরিয়ার সংকটের কোনো সমাধান হচ্ছে না। সিরিয়ার যুদ্ধ আট বছরে পা দিয়েছে। এতে কী পেয়েছেন আসাদ? সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে প্রায় ১ কোটি মানুষকে। জামার্নিতে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক লাখ সিরীয় নাগরিক। গেল বছর আমি এসব শরণার্থীকে জার্মানির ফ্রাংকফুট শহরে ভিক্ষা করতে পর্যন্ত দেখেছি। আমি এখন বার্লিনে। আবারও এসেছি। এবার এসেছি জার্মান সরকারের আমন্ত্রণে। কিন্তু সিরিয়া নিয়ে কোনো আশার কথা আমি শুনিনি। আসাদ ক্ষমতায় থেকে গেছেন বটে; কিন্তু তিনি একটি বিধ্বস্ত দেশ পেয়েছেন। দেশটির পুনর্গঠন হবে বড় সমস্যা। তার আগে দরকার যুদ্ধ বন্ধ। পূর্ব ঘৌতায় যে অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, ছোট ছোট শিশুর মৃত্যু আর যন্ত্রণার ছবি যে-কোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধ থামছে না। বৃহৎ শক্তিগুলোর অবস্থান পরস্পরবিরোধী হওয়ায় সিরিয়ায় যুদ্ধ থামছে না। তাই সিরিয়া যুদ্ধ আট বছরে পা রাখলেও কোনো ভালো খবর আমরা শুনতে পাচ্ছি না। 
আলোকিত বাংলাদেশ ২৫ মার্চ ২০১৮

নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা

মতামত
সাবেক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সার্গেই স্ক্রিপালকে ব্রিটেনের একটি শহর স্যালিসব্যারিতে নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যা ও তার মেয়েকে আহত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে এখন আলোড়ন চলছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে ব্রিটেন ২৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। আর তার রেশ ধরে যুক্তরাষ্ট্রও ৬০ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।
এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ২৫টি পশ্চিমা দেশ থেকে ১৩৯ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাশিয়াও এর মধ্যে তার দেশে কর্মরত ১৫০ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এ প্রথমবারের মতো রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটল। এ ঘটনা নিঃসন্দেহে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করল। তবে কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনা একেবারে নতুন নয়। আমরা যদি সাম্প্রতিককালে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকে তাকাই তাহলে দেখব এর আগেও কূটনীতিকদের বহিষ্কারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০১, ২০১০ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্র রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছিল। এর পাল্টা ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে রাশিয়াও মার্কিন কূটনীতিকদের তার দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল। তবে এখানে পার্থক্যটা হল ২৫টি পশ্চিমা দেশ একসঙ্গে রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করল, এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
এ ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এটা স্পষ্ট, যা মার্কিন প্রশাসন বলছে, তারা তাদের বন্ধু, বিশেষ করে ব্রিটেনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটেনের রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র শুধু সমর্থনই করেনি বরং তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে লক্ষ্য করার বিষয় চীন কিংবা ভারতের মতো বড় দেশ, এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোও ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। ৪ মার্চ স্যালিসব্যারি শহরে এ ঘটনাটি ঘটেছিল। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দু’সপ্তাহ আমি ইউরোপে ছিলাম। জার্মানি, পোল্যান্ডে কিংবা চেক রিপাবলিকে আমি এ ঘটনার তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখিনি।
জার্মান টিভিতে আমি জার্মান পার্লামেন্টের বিতর্ক দেখেছি। সেখানে সদ্যগঠিত এঞ্জেলা মার্কেলের কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম শরিক সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) একজন এমপি রলফ ম্যুটজেনিচ জার্মান সরকারের কিছুটা সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তদন্তে এখনও প্রমাণিত হয়নি কে বা কারা রুশ গোয়েন্দাকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছে। তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই খুব দ্রুতই কূটনীতিক বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। অপর একজন সংসদ সদস্য যিনি গ্রিন পার্টির সদস্য, ইয়র্গেন ট্রিটিন বললেন, এ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘটনা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করবে।
এখানে বলা ভালো, জার্মানি ৪ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। জার্মান সংসদে এ বিতর্কে প্রমাণ করল, জার্মানিতে এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস, যিনি এসপিডি দলের সদস্য, তিনি রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ব্যাপারে শক্ত অবস্থানে আছেন। স্পষ্টতই সেখানকার সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত। পোল্যান্ড ৪ ও চেক রিপাবলিক ৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করলেও, ওয়ারশ’তে আমার স্বল্প অবস্থানকালে আমি দেখেছি, এটা নিয়ে সেখানে তেমন উত্তেজনা নেই; তেমন আলোচনাও নেই। পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিকে দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায়। পোল্যান্ডে আমি অনেকের সঙ্গে আলাপ করে দেখেছি- সেখানে সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব একরকম নেই বললেই চলে।
এমনকি যে ‘সলিডারিনস’ সংগঠনটি পোল্যান্ডে সমাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল, সেই ‘সলিডারিনস’ও (যা পরে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়) এখন অস্তিত্বহীন। লেস ভ্যালেসা এখনও বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি রাজধানী ওয়ারশ’তে থাকেন না, থাকেন গাদানস্কে; তিনি রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ৪৬০ আসনবিশিষ্ট সংসদের নিম্নকক্ষে (সেজেম) দক্ষিণপন্থী ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (২৩৪ আসন) এখন ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউজ মোরাভিয়েকি।
তবে মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেইজ দুদার হাতে। চেক রিপাবলিকেও দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায়- আন্দ্রেই বাবিস সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। ফলে দেশ দুটো যে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। এখানে স্মরণ করিয়ে দেই, স্ক্রিপালকে হত্যার ব্যাপারে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে রাশিয়া। এখন যে প্রশ্নটি এর মধ্যেই উচ্চারিত হয়েছে তা হচ্ছে, এ কূটনীতিক বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে? সম্ভাব্য দিকগুলো হচ্ছে-
এক. রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ঘটনায় ইউরোপে রুশ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যাবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র তথা সামরিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এ গোয়েন্দা সংস্থা (এসভিআরআরএফ) একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এসভিআরআরএফ কেজিবির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এক সময় কেজিবির শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। এ ঘটনা নিঃসন্দেহে পুতিনের হাতকে অনেক দুর্বল করবে। তবে ভুলে গেলে চলবে না পুতিন সম্প্রতি ছয় বছরের জন্য আবারও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সুতরাং এ ঘটনার এখানেই যে সমাপ্তি ঘটবে তা বলা যাবে না।
দুই. এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং সেইসঙ্গে সাইবার আক্রমণের ঘটনাবলী। পাঠক স্মরণ করতে পারেন ২০১৪ সালের ঘটনাবলী। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নেয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী। যদিও পরবর্তী সময়ে ক্রিমিয়ার জনগণ গণভোটে রাশিয়ার সঙ্গে এ সংযুক্তিকে সমর্থন করেছিল। কৃষ্ণসাগরের পাশে ক্রিমিয়া অবস্থিত এবং রাশিয়ার নৌবাহিনীর জন্য ক্রিমিয়ার অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সংযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে মেনে নেয়নি। ক্রিমিয়া ছিল ইউক্রেনের অংশ। এখানে ২০১৪ সালে তথাকথিত গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন ভিক্টর ইয়ানোকোভিচ সরকারের পতন ঘটে। অভিযোগ আছে, ইয়ানোকোভিচ যিনি ছিলেন অনেকটা মস্কো-ঘেঁষা, তার উৎখাতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। প্রেট্রো প্রোসেনকো এখন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। একজন ধনী ব্যবসায়ী প্রোসেনকো পশ্চিমা-ঘেঁষা। মস্কোর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয়। পূর্ব ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক খারাপ। কেননা ইউক্রেন মনে করে রাশিয়ার মদদে পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। পূর্ব ইউক্রেন অনেকটা ক্রিমিয়ার মতো রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি চায়।
যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। রাশিয়ার এখানেই আপত্তি। যদি ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয়, তাহলে ইউক্রেনের মাটিতে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে, যা রাশিয়ার নিরাপত্তার প্রতি এক ধরনের হুমকি বলে রাশিয়া মনে করে। রাশিয়ার আপত্তিটা সে কারণেই। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই এ এলাকায় রাশিয়ার ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। একইসঙ্গে সিরিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকাকেও ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এটা তো স্পষ্ট রাশিয়ার হস্তক্ষেপে (বিমান হামলা) সিরিয়া থেকে আইএস বিতাড়িত হয়েছে। আবার সিরিয়ায় আসাদ সরকারও টিকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রাশিয়ার বিমান হামলায় আসাদবিরোধী শক্তিও (যারা আইএসএ’র বিরুদ্ধেও যুক্ত করেছিল) ধ্বংস হয়ে গেছে। রাশিয়া আসাদের পক্ষ অবলম্বন না করলে, সিরিয়ার পরিস্থিতি আজ অন্যরকম হতো। এ অঞ্চলজুড়ে রাশিয়া-ইরান-তুরস্ক একটা অক্ষ গড়ে উঠছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী। সঙ্গত কারণেই রাশিয়ার ভূমিকাকে খুব ভালো চোখে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যাতে ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে বিজয়ী হন, তাতে রাশিয়া প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল- এটা এখন প্রকাশ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনে এটা নিয়ে এখন তদন্ত চলছে। ফলে ট্রাম্পের নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের প্রো-রাশিয়া বক্তব্য থেকে মনে করা হয়েছিল ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে যাবেন। এখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে একটা ‘ইউটার্ন’ নিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি এখন অনেকটাই রাশিয়াকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান, সিরিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা রাশিয়ার স্বার্থকে আঘাত করছে।
পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে বলা মুশকিল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী রাশিয়া ১৫০ বিদেশি কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে ৬০ জন হচ্ছেন মার্কিন কূটনীতিক। এদের এখন মস্কো ছাড়তে হবে। এখন স্পষ্টতই একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপ ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করায় এ দেশগুলো এখন ‘রাশিয়ার জ্বালানি বয়কটের’ মুখে পড়তে পারে। অনেকেই জানেন পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তিনটি পাইপলাইনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে রাশিয়ার গ্যাস এখন পূর্ব ইউরোপ থেকে পশ্চিম ইউরোপে যায়। ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানির জন্য এখন রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া যদি এ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে ইউরোপ।
কী হতে পারে এখন? পল ক্রেইগ রবার্টস লিখেছেন, On the verse of Nuclear War? এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হল? এটা তার আশঙ্কা। ফিনিয়ান কুনিনহাম লিখেছেন। Skripal Poison sage just another Episode in Wests propaganda campaign to Corral Russia অর্থাৎ এটা এক ধরনের রাশিয়াবিরোধী প্রোপাগান্ডা। ‘Corral’ বলছেন কুনিনহাম- রাশিয়াকে খোঁয়াড়ে নিক্ষেপ করল। তবে একটি ভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ৩০ মার্চ ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে। লিখেছেন অড আর্নে ওয়েসটাড (Odd arne westad)- প্রবন্ধের শিরোনাম Has a nwe cold war Really Begun? নতুন করে কি স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হল? এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা।
নয়া স্নায়ুযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেল? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা এটাকে ব্যাখ্যা করেছেন স্নায়ুযুদ্ধ-২ হিসেবে। বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। উত্তেজনা রয়েছে। এ উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Jugantor
02.04.2018

কোরীয় উপদ্বীপের রাজনীতি কোন পথে


উত্তর কোরিয়া থেকে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খবর এসেছে গেল সপ্তাহে। প্রথম খবরটি ছিল উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন অত্যন্ত গোপনে চীন সফরে যান এবং সেখানে তিনি চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হন। পরে অবশ্য শি জিনপিং ও কিম জং উনের ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়। যদিও কী বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন, তা কোনো পক্ষ থেকেই বলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বৈঠকের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই কিম জং উন চীনে গিয়েছিলেন। সাধারণত উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে তাদের স্ত্রীদের দেখা যায় না। কিম জং উনের প্রয়াত বাবা কিম জং ইল কিংবা দাদা কিম উল সুংও জীবদ্দশায় চীনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে তাদের স্ত্রীদের কখনোই দেখা যায়নি। এবার কিম জং উনের সঙ্গে তার স্ত্রীকে দেখা গেছে ছবিতে। এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। দ্বিতীয় খবরটিও প্রায় একই সময়ের। ২৭ এপিল দুই দেশের সীমান্তবর্তী বেসামরিক অঞ্চল পানমুনজম গ্রামে বৈঠকে বসবেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর। কেননা উত্তর কোরিয়ার পরপর কয়েকটি পারমাণবিক পরীক্ষার পর দক্ষিণ কোরিয়া তার দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে মার্কিনিthaad (Terminal High Altitude Area Defense) ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কোরিয়া কর্তৃক নিক্ষেপিত যে-কোনো ক্ষেপণাস্ত্র মহাশূন্যেই ধ্বংস করে দিতে পারবে। ফলে সেসব ক্ষেপণাস্ত্র আর দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো হামলা চালাতে পারবে না।thaad ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে বসানো হলেও এর খরচ কে বহন করবে, এটা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের একধরনের মতানৈক্য চলে আসছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি, যেহেতু এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দক্ষিণ কোরিয়ার স্বার্থে নেওয়া হয়েছে, সুতরাং দক্ষিণ কোরিয়াকেই এই অর্থ বহন করতে হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের তাতে আপত্তি। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি মে মাসে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে মিলিত হবেন। সব মিলিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। উত্তর কোরিয়ার রসদ, খাদ্য ও জ্বালানির উৎস হচ্ছে চীন। সুতরাং কিম জং উন চীনে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মুন জায়ে ইনের সঙ্গে তার আলোচনায় কোরিয়ার একত্রীকরণের প্রশ্নটি কতটুকু আলোচিত হবে, সেটাও একটা প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে দুই কোরিয়ার একত্রীকরণের প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে আসছে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০৬ সালের অক্টোবরে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর থেকেই উত্তর কোরিয়া আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়েই উত্তর কোরিয়া বিশ্বে অষ্টম পারমাণবিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরপর থেকেই উত্তর কোরিয়ার ব্যাপােের এ অঞ্চলের, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের আতঙ্ক বাড়তে থাকে। এরপর থেকেই আলোচনা শুরু হয় কীভাবে উত্তর কোরিয়াকে পরমাণুমুক্ত করা সম্ভব। একপর্যায়ে চীনের উদ্যোগে ২০০৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি উত্তর কোরিয়া একটি চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া অবিলম্বে তার ইয়ংবাইওনে (Yongbyon)পারমাণবিক চুল্লিটি বন্ধ করে দেয়, যেখানে পশ্চিমাবিশ্বের ধারণা উত্তর কোরিয়া ছয় থেকে দশটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারত। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া ৫০ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তার পারমাণবিক চুল্লিগুলো পরিদর্শনেরও সুযোগ করে দেয়। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে ৫০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এরপর ২০০৭ সালের অক্টোবরে দুই কোরিয়ার মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট রোহ মু হিউম ২ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া যান এবং সেখানকার প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলের (বর্তমানে প্রয়াত) সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করেন। এটা ছিল দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠক। এর আগে ২০০০ সালের ১২ জুন দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রথমবারের মতো একটি শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। কোরিয়া বিভক্তকারী অসামরিক গ্রাম পানমুনজমে সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দাই জং মিলিত হয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলের সঙ্গে। এ অঞ্চলের গেল ৫৩ বছরের রাজনীতিতে ওই ঘটনা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর আগে আর দুই কোরিয়ার নেতারা কোনো শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হননি। স্নায়ুযুদ্ধপরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ও দুই জার্মানির একত্রীকরণের (১৯৯০) পর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এখন কোরীয় উপদ্বীপের দিকে। সেই থেকে দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। অনেকেরই মনে থাকার কথা, ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দাই জংকে ‘দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণের অব্যাহত প্রচেষ্টা’র জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
কোরিয়া একটি বিভক্ত সমাজ। দুই কোরিয়ায় দুই ধরনের সমাজব্যবস্থা চালু রয়েছে। উত্তর কোরিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু রয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় রয়েছে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। ১ লাখ ২০ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট উত্তর কোরিয়ার লোকসংখ্যা মাত্র ২ কোটি ২৫ লাখ। আর ৯৯ হাজার ২২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট দক্ষিণ কোরিয়ার লোকসংখ্যা ৪ কোটি ২৮ লাখ। একসময় যুক্ত কোরিয়া চীন ও জাপানের উপনিবেশ ছিল। ১৯০৪-০৫ সালে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যকার যুদ্ধের পর কোরিয়া প্রকৃতপক্ষে জাপানের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯১০ সালের ২৯ আগস্ট জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে কোরিয়াকে সাম্রাজ্যভুক্ত করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর মার্কিন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী কোরিয়ায় ঢুকে পড়ে ও জাপানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কৌশলগত কারণে কোরিয়াকে দু-ভাগ করে। এক অংশে মার্কিন বাহিনী ও অপর অংশে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাহিনী অবস্থান নেয়। সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতিতেই কোরিয়ার উত্তরাঞ্চলে (আজকের যা উত্তর কোরিয়া) একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে নিউ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে নবগঠিত কোরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি একীভূত হয়ে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে। জাতিসংঘের আহ্বানে সেখানে নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও দেখা গেল নির্বাচন শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায়ই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তার অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করলে যুদ্ধ বেধে যায়। জাতিসংঘ এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করার জন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ বাহিনী মাঞ্চরিয়া সীমান্তে উপস্থিত হলে ১৯৫০ সালের ২৬ নভেম্বর চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় এবং চীনা সৈন্যরা দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ১৯৫১ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা পুনরুদ্ধার করে। ১৯৫১ সালের ২৩ জুন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কার্যকর হয় ২ বছর পর ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই। এরপর থেকে কার্যত উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া দুটি রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখে আসছে। ১৯৫৩ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তিবলে দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও উত্তর কোরিয়ায় কোনো চীনা সৈন্য নেই। উত্তর কোরিয়া চীনের সঙ্গে ১৯৬১ সালে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। গেল ৭০ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় একাধিক সরকার গঠিত হলেও উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়েছে দুইবারÑ ১৯৯৪ সালে কিম উল সুংয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র কিম জং ইল ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘদিন কিম জং ইল অসুস্থ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর এখন তার ছোট সন্তান কিম জং উনকে সেখানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি যদি দায়িত্ব পালনকালে দুই কোরিয়ার একত্রীকরণের উদ্যোগ নেন, সেটা হবে একুশ শতকের শুরুতে একটি বড় ধরনের ঘটনা। তবে যে-কোনো মুহূর্তে সংঘর্ষ সেখানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। উত্তর কোরিয়া তাদের প্রধান পরমাণু স্থাপনা ছাড়াও গোপনে আরও কয়েকটি স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে বলে দক্ষিণ কোরিয়া অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে উত্তর কোরিয়া আরও পরমাণু পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনাও করছে। এজন্য তারা সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে। এ হারে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হলে আগামী (২০১৮) মে মাস নাগাদ প্রয়োজনীয় এক হাজার মিটার সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শেষ হবে। এর অর্থ হচ্ছে উত্তর কোরিয়া আরও পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে পারে। এতে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না; যুদ্ধ হবে কি না বলা মুশকিল। কেননা উত্তর কোরিয়া যেখানে বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে, সেখানে তারা এত বড় ঝুঁকি কি নেবে? উত্তেজনা জিইয়ে রেখে তারা সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। ইতোমধ্যে উত্তর কোরিয়া সেখানে একটি হাইড্রোজের বোমারও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার বড় বন্ধু চীন। চীন যদি তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে উত্তর কোরিয়া ‘একা’ হয়ে পড়বে। তখন আলোচনায় যাওয়া ছাড়া তার কোনো বিকল্প থাকবে না। উত্তর কোরিয়া বারবার বলে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু পশ্চিমাবিশ্ব এবং দক্ষিণ কোরিয়া এই কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছে না। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও একইসঙ্গে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের হুমকিতে এ অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়াগামী সব বিমান ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল চীন। এখনও তা বহাল আছে। উত্তর কোরিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান কিম জং উনের ভূমিকার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন পশ্চিমাবিশ্বÑ এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। উন কিছুটা খ্যাপাটে ধরনের। নিজের ক্ষমতা কুক্সিক্ষগত করতে তিনি নিজ আত্মীয়স্বজন, সৎভাইকে ‘খুন’ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। এমনকি তাকে পরিপূর্ণ সম্মান না দেওয়ায় সিনিয়র জেনারেল ও সাবেক দেশরক্ষামন্ত্রীকে পর্যন্ত তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠিয়েছিলেন। এমনই একজন খ্যাপাটে ব্যক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ কিংবা কোরিয়ার একত্রীকরণের লক্ষ্যে আদৌ কোনো সমঝোতায় উপনীত হবেন, এটা বিশ্বাস করা যায় না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু ভূমিকা নতুন করে আবার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিকার অর্থেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে’ যেতে চায়? ট্রাম্প তার প্রশাসনে কট্টরপন্থিদের নিয়োগ দিয়েছেন। এরা যুদ্ধ চায়। যুদ্ধ মানেই মার্কিন অর্থনীতির চাঙাভাব। ফলে প্রস্তাবিত ট্রাম্প-কিম আলোচনায় কোন বিষয়টি স্থান পাবে, তা-ও স্পষ্ট নয়। তবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প-কিম আলোচনার গুরুত্ব অনেক। বিশ্বে উত্তেজনা বাড়ছে। নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়েছে। কোরিয়া উপদ্বীপ হচ্ছে এমন একটি জায়গা, যেখানে পারমাণবিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। এক্ষেত্রে কিম জং উনের চীন সফর, আগামী ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে বৈঠক এবং আগামী মে মাসে ট্রম্প-কিম বৈঠকের সম্ভাবনা এ অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস করতে সাহায্য করবে। অঞ্চলের মানুষ এটাই প্রত্যাশা করছে।
Daily Alokito bangladesh
01.04.2018