রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

চীন-নেপাল সম্পর্ক ও ভারতের পররাষ্ট্রনীতি

Image result for chinese president's visit to Nepal


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসি। অর্থাৎ তার পররাষ্ট্রনীতিতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে তিনি অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন। এটা যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তা হলে দেখা যাবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে তিনি বরাবরই পার্শ¦বর্তী দেশগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। এ তালিকায় চীন-ভারত সম্পর্কও আছে। কিন্তু গত ১৩ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেপাল সফর ও নেপালের সঙ্গে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর স্পষ্টতই নরেন্দ্র মোদির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসির ক্ষেত্রে এটা একটা ‘চপেটাঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। কেননা ট্রেডিশনালি নেপালের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অনেক বেশি। নেপালের রাজনীতি, অর্থনীতি বেশি মাত্রায় ভারতনির্ভর। কিন্তু এখন নেপাল বেশি মাত্রায় চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ায় নেপাল ভারতের ‘প্রভাব বলয় বিস্তারের’ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলো কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।
সাম্প্রতিক সময়গুলোয় দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটা একটা চিন্তার কারণ। চীন তার বহুল আলোচিত ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ মহাপরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় নরেন্দ্র মোদি চীনের প্রভাবকে খর্ব করতে তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’Ñ ‘প্রতিবেশীরাই প্রথম’ এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, নরেন্দ্র মোদি তার ২০১৫ সালে ঢাকা সফরের সময় বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল) নামে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু চীনের প্রসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালকে গুরুত্ব দেওয়ায় নরেন্দ্র মোদির নীতি কিছুটা দুর্বল হতে বাধ্য। নেপালের চীনের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার কারণও আছে। ভারতের ওপর নেপালের ‘নির্ভরশীলতা’ এবং এই ‘নির্ভরশীলতা’ অতীতে ভারত তার নিজ স্বার্থে ব্যবহার করায় নেপালের বর্তমান বাম সরকার ধীরে ধীরে চীনের দিকে ঝুঁকছিল। ভারত অতীতে একাধিকবার নেপালে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে সংকট তৈরি করেছিল। নেপালের বিপুল অর্থনৈতিক চাহিদা নেপালকে চীন-নেপাল অর্থনৈতিক করিডর গঠনে উৎসাহিত করেছিল। এই অর্থনৈতিক করিডরের আওতায় লাসা (তিব্বত)-খাসা ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ভারতের ওপর থেকে নেপাল তার নির্ভরশীলতা অনেক কমাতে পারবে। আরেকটি পরিকল্পনা হচ্ছে চীনের কিনঘি (ছরহমযর) প্রদেশের গলমুদের (এড়ষসঁফ) সঙ্গে তিব্বতের লাসার রেল সংযোগ স্থাপন। এতে করে তিব্বতকে চীনের অর্থনীতির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে নেপালও সুবিধা পাবে। চীন নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহায়তা করছে এবং দেশটিকে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাও দিয়েছে। নেপাল চীনের ওবিওআর (ঙইঙজ) মহাপরিকল্পনায়ও যোগ দিয়েছে। ভুটানেও চীনের প্রভাব পড়ছে। চীনের সঙ্গে ভুটানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেখানে ভারতের প্রভাব বেশি। দোকলাম নিয়ে সীমান্ত সমস্যা (ভুটানের সঙ্গে) তা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। এটা ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টরা খুব ভালো চোখে নেবে না। তাই একটা প্রশ্ন থাকবেই শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবে কিনা? নাকি শুধুই একটি ‘ফটোসেশন’ হয়েছে মামাল্লাাপুরমে? প্রেসিডেন্ট শি নেপালে যাওয়ার আগে ভারতে গিয়েছিলেন।
আরও বেশ কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যেখানে চীন ও ভারতের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ভারত চীনের বিরুদ্ধে ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে, যা চীনা স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। ছটঅউ এমন একটি জোট (জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া তার সঙ্গী), যা চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে এবং ভারতের পক্ষে আগামীতে কাজ করতে পারে। চীন জিবুতিতে তার প্রথম সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। ভারত মৌরিতুস ও সিসিলিজে নৌঘাঁটি স্থাপনের পক্ষে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারত মালাবার ২০১৯ নৌ-সামুদ্রিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে। এ ধরনের মহড়া ভারত মহাসাগরে চীনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও ভারত-চীন বৈরিতা লক্ষ করা যায়। অরুণাচল ভারতের একটি রাজ্য হলেও চীন এই রাজ্যের কর্তৃত্ব দাবি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মৈত্রীও চীনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব কোন দিকে যায়, সেদিকে লক্ষ আছে অনেকের। বলতে দ্বিধা নেই, বেশ কিছু ইস্যুতে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান হয়নি। ২০১৭ সালের দোকলাম ঘটনায় ওই দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে এই উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পায়। অরুণাচল প্রদেশের ওপর থেকে চীন তার দাবি পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেনি। কাশ্মীরের লাদাল নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান। ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের অন্যতম দাবিদার। কিন্তু চীনের এখানে আপত্তি রয়েছে। ভারত পারমাণবিক শক্তি ও পারমাণবিক সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্য হতে চায়। এখানেও আপত্তি চীনের। ভারত-চীন বাণিজ্য সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়েছে, কিন্তু তা ভারতের প্রতিকূলে। অর্থাৎ চীন ভারতে রপ্তানি করে বেশি, ভারত থেকে আমদানি করে কম (চীনে ভারতের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার, আর চীন থেকে আমদানি ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭)। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনের প্রভাব ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। শ্রীলংকায় (হাসবানতোতা গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি) কিংবা মালদ্বীপে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ভারত তার নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। এ কারণেই একজন বিশ্লেষক সুধীর ভৌমিক লিখেছেন (হাতি ও ড্রাগনের নাচ : শি-মোদি সম্মেলন কি শুধুই প্রদর্শনী, সাউথ এশিয়া মনিটর, অক্টোবর ১৫), যে, ‘শি সন্ত্রাস নিয়ে ভারতের উদ্বেগের সঙ্গে একমত হওয়ায় এবং কাশ্মীর ইস্যুকে সেভাবে উপস্থাপন না করায় মোদি ও তার টিম এটা নিয়ে খুশি হয়েছে।’ সুধীর ভৌমিক বিবিসির বাংলা বিভাগের সাবেক সাংবাদিক এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ব্যাপারে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। সুধীর ভৌমিক আরও লিখেছেনÑ ‘দুই শীর্ষ নেতা সম্পর্কের নেতিবাচক দিকগুলোকে চাপা দিয়ে এটাকে আবার স্বাভাবিক গতিতে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন।’ এটি একটি ইতিবাচক মন্তব্য। কিন্তু এশিয়ার এই দুটি বড় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তথা ভারত মহাসাগরের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে চীনের উহানে দুই নেতা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় মামাল্লাপুরমে (তামিলনাড়–) দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হলো। আগামী বছর হবে চীনে পরবর্তী আলোচনা। ফলে দেশ দুটি নিজেদের মধ্যকার বিরোধ কিংবা এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে ভারতের যে আশঙ্কা, তা কতটুকু কমিয়ে আনতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়। যারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন তাদের কাছে ঈযরহফরধ শব্দটি অপরিচিত নয়। চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বোঝাতে এ শব্দটি অনেক বিশ্লেষক ব্যবহার করেন। ভারত ও চীন বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দুটি দেশ। এদের মধ্যকার সম্পর্ক ও বৈরিতা আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির দিকনিদের্শনা দেবে। বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন, এ দেশ দুটি যদি ন্যূনতম ইস্যুতে এক হয়, তা হলে শুধু এ অঞ্চলই নয়, বরং বিশ্বের রাজনৈতিক দৃশ্যপটও বদলে যাবে। অংরধহ পড়হঃঁৎু-র যে কথা বলা হচ্ছে, তা বিকশিত হবে এই দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের ওপর। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) দেশ দুটির মোট জিডিপি ৩৫ দশমিক ৬২৪ ট্রিলিয়ন ডলার। আর সাধারণ নিয়মে এর পরিমাণ ১৬ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। দুটি দেশ নিয়ে আয়তন হচ্ছে ১ কোটি ২৯ লাখ ২৮ হাজার ৬১ বর্গকিলোমিটার। চিন্তা করা যায়, কী বিশাল এলাকা নিয়ে দেশ দুটি বিশ্ব মানচিত্রে অবস্থান করছে। প্রায় একই সময় দেশ দুটি স্বাধীন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিগত ৭০ বছরে চীন তার সুষ্ঠু অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কারণে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে পেরেছে। কিন্তু ভারত তা পারেনি। ভারতের দারিদ্র্য প্রবল। অতীতে দেশ দুটির মধ্যে অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। পঞ্চাশের দশকে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ সেøাগান উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। অর্থাৎ এই দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক যে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি ‘মডেল’ হতে পারে, তা তারা প্রমাণও করেছিলেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন কিংবা ‘পঞ্চশীলা’ মুভমেন্টে (যা ন্যামের জন্ম দিয়েছিল) জড়িত থেকে ঈযরহফরধ ধারণা বিশ্বে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই সম্পর্ক আর টিকে থাকেনি। ১৯৬২ সালে দেশ দুটি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। একটা আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস দেশ দুটোর মাঝে আছে।
এখন এই অক্টোবরেই শি জিনপিং ভারত সফর করলেন। এর পর নেপালে গেলেন। একজন চীনা প্রেসিডেন্ট ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম নেপাল সফর করলেন। একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। নেপাল-চীন সম্পর্ক চীনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই নেপালের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার পালা চীন-নেপাল সম্পর্ককে ভারত কীভাবে দেখে? ভারত যদি এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে, তা হলে তা নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আরও উন্নত করবে। এতে ভারতের লাভ। কিন্তু মালদ্বীপের পরিস্থিতি প্রমাণ করে, এ অঞ্চলে চীনের অব্যাহত প্রভাবের ব্যাপারে ভারত সন্দিহান।
Daily Amader Somoy
28.10.2019

একজন বুবলী ও পঞ্চাশ লাখ সার্টিফিকেটের গল্প


Image result for Nusrat parliament member Bangladesh
একজন বুবলী আজ শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তিনি একজন সংসদ সদস্য। সংরক্ষিত নারী আসনে তিনি সরকারি দলের সম্মানিত সদস্য। তিনি আলোচনার জন্ম দিয়েছেন একটি কারণে। আর তা হচ্ছে অবৈধ পন্থা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। একে একে সাতজন 'নকল পরীক্ষার্থী' তার হয়ে পরীক্ষা দিল। আটকে গেল 'অষ্টম পরীক্ষার্থী'। একটি টিভি চ্যানেল আমাদের জানিয়ে দিল, ওই বুবলী নিজে পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে নকল পরীক্ষার্থী দিয়ে তার হয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছিলেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে তাকে বহিস্কার করেছে এবং জানিয়ে দিয়েছে- তিনি আর কোনোদিন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় কোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। নকল পরীক্ষার্থী সাজিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার এই যে ঘটনা এবং তা যদি হয় একজন সংসদ সদস্যের, তাহলে ভাবতে অবাক লাগে, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে গেছি!

একজন সংসদ সদস্য গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিতেই পারেন। এটা তার নাগরিক অধিকার। একজন আইন প্রণেতা হিসেবে নিশ্চয় এটা জানেন- তার কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। তিনি দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন; আইন প্রণয়নে সরকারকে সহযোগিতা করবেন। এখন কি-না তিনি নিজেই জালিয়াতির আশ্রয় নিলেন? যদিও তিনি জানিয়েছেন, আগের সাতটি পরীক্ষা তিনি নিজেই বোরকা পরে দিয়েছেন। এ জন্য কেউ তাকে চিনতে পারেনি। কথাটা কি আদৌ সত্যি? অষ্টম পরীক্ষা তিনি দেননি, তিনি অসুস্থ ছিলেন। তার এপিএস তাকে না জানিয়ে অন্য একজনকে বসিয়ে পরীক্ষা দেওয়ায়! প্রশ্ন হচ্ছে, তার এই বক্তব্য কি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় খতিয়ে দেখবে? অবশ্যই এটা খতিয়ে দেখা সম্ভব। তদন্ত কমিটি বুবলীর হাতের লেখার সঙ্গে উত্তরপত্রগুলো মিলিয়ে দেখতে পারে। কিন্তু উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কি এটি পারে? উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় একজন সংসদ সদস্যকে কি তদন্ত কমিটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তার হাতের লেখা পরীক্ষা করাতে পারবে? তবে স্বচ্ছতার স্বার্থেই বুবলী নিজের হাতের লেখা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন। এর মাধ্যমে হয়তো তার সম্মান কিছুটা হলেও ফিরে পাওয়া সম্ভব। না হলে তিনি নিজের, দলের, এমনকি সংসদের যে ক্ষতি করলেন, সেই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। এমনিতেই সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি খুব উজ্জ্বল নয়। এখন এর সঙ্গে যোগ হলো সংসদ সদস্যের পরীক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিষয়টি।

এই যখন পরিস্থিতি তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন একটি 'সুখবর'- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত ২৭ বছরে ৫০ লাখ শিক্ষার্থীকে 'গ্র্যাজুয়েশন' ডিগ্রি দিয়েছে (দৈনিক শিক্ষা, ২১ অক্টোবর)। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এই ৫০ লাখ সার্টিফিকেট বিতরণ করে তিনি যদি কৃতিত্ব নিতে চান, আমি বিনীতভাবে তার সঙ্গে দ্বিমত করব। শত শত কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। কলেজগুলোতে অনার্সসহ মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। কিন্তু এই শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু মানসম্মত? কলেজগুলোতে কি নিয়মিত ক্লাস হয়? অনেক দিন থেকেই এটা বলা হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাহ্যত একটি 'সার্টিফিকেট বিতরণ' কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে! সারাবছর ক্লাস না করে, চাকরি করেও যে ডিগ্রি নেওয়া যায়- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার বড় প্রমাণ। সেখানে নিয়মিত ক্লাস হয় না। ছাত্রদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করানো- মফস্বল ও জেলা শহরের সরকারি কলেজগুলোর এটা সাধারণ চিত্র। নিজ জেলা শহরে দেখেছি, শিক্ষকরা কলেজে ক্লাস নেওয়ার চেয়ে বাসায় 'ব্যাচ বাই ব্যাচ' ছাত্র পড়াতে আগ্রহী হন বেশি। ইংরেজি, বাংলা তো বটেই; সমাজবিজ্ঞান কিংবা ইসলামের ইতিহাসের মতো বিষয়েও অনার্স পর্যায়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। ঢাকার নিউমার্কেটের 'বাকুশা মার্কেটের গাইড বইগুলো হচ্ছে এখন সাধারণ ছাত্রদের একমাত্র ভরসা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো শিক্ষা কার্যক্রম নেই। অর্থাৎ নিজেরা ক্লাস নেয় না। কিন্তু শিক্ষক আছেন অনেক। তাহলে তাদের কাজ কী? তাদের কাজ হচ্ছে শত শত, হাজার হাজার উত্তরপত্র পরীক্ষা করা। এতে শিক্ষার্থীর সঠিক মূল্যায়ন কখনোই হয় না। আর কলেজ পর্যায়ে যারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন, তারা প্রায় ক্ষেত্রেই আশ্রয় নেন অসততার। অন্যদের এমনকি শিক্ষার্থীর আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও খাতা দেখান।

এ ধরনের ঘটনা শত শত, যার কোনোটাই কেউ জানে না। তাই উপাচার্যের ৫০ লাখ সার্টিফিকেট দেওয়ার মাঝে কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং সময় এসেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মুশকিল হচ্ছে, আমরা প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দু'জন মন্ত্রী আছেন। ইউজিসি আছে; ইউজিসির সদস্যরা আছেন। মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব আছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। উচ্চশিক্ষার স্বার্থেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে সাত বিভাগে ৭টি অথবা প্রস্তাবিত পদ্মা বিভাগসহ ৮টি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি বিভাগে যেসব কলেজ রয়েছে (সরকারি ও বেসরকারি) সেসব কলেজকে একেকটি প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। পুরোনো অনেক ভালো কলেজ আছে। সেসব কলেজে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। ওই সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সাধারণ শিক্ষার চাহিদা ফুরিয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষা দেশে বেকারত্বের জন্ম দিচ্ছে। এরা সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আইটি সেক্টরের এক বিশাল চাহিদা রয়েছে দেশে ও বিদেশে। জাপান বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট কিছু সেক্টরে জনবল নিচ্ছে। আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এটা ভেবে দেখতে পারেন। শুধু জাপান বলি কেন? আগামী ১০ বছরে ইউরোপের অনেক দেশ দক্ষ জনবল সংকটের মুখে পড়বে। সেই 'শূন্যস্থান' আমরা পূরণ করতে পারি। এ জন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

বিদেশি ভাষা শিক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজটি করতে পারে। এতে অনেকে উৎসাহিত হবেন এবং সীমিত আর্থিক সুযোগে তরুণ প্রজন্ম জাপানিসহ অন্যান্য ভাষা শিখতে পারবে, যা তাদের বিদেশে কর্মসংস্থানে সহায়তা করবে। আমাদের দুঃখটা এখানেই, উপাচার্যরা 'রাজনৈতিক বিবেচনায়' নিয়োগ পান বটে, কিন্তু তাদের দূরদর্শিতা নেই। ১০০ কোটি টাকা দিয়ে উপাচার্য ভবন নির্মাণকে (বণিক বার্তা) আমরা গুরুত্ব দিই, কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা যুগোপযোগী শিক্ষাকে আমরা গুরুত্ব দিই না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বড় বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের সুযোগ ছিল অনেক কিছু করার। গাজীপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিশাল একাডেমিক ভবন রয়েছে, তা অনেকটাই অব্যবহূত। মাঝে মাঝে সেখানে শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। অথচ এখানে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (এএনইউ) এ ক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে। এএনইউ একটি গবেষণামূলক বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের শিক্ষা প্রশাসকরা এটা ভাবেন না, বোঝেনও না যে, এ দেশে বিশাল এক জনগোষ্ঠী তরুণ। এরা এখন ছোটে বিসিএসের পেছনে। সকালে লাইব্রেরিগুলোতে গেলে দেখা যায়, ছাত্ররা বিসিএসের সিলেবাস অনুসরণ করে তাদের পড়াশোনা চালাচ্ছে; নিজের যে বিষয়, তার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। এই 'বিসিএস প্রজন্ম' আমাদের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। অথচ এরাই আমাদের স্বপ্ন। এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। রাখতে পারছে না সমাজ উন্নয়নে তারা কোনো বড় অবদান। ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, একশ'র ওপরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা 'সার্টিফিকেটসর্বস্ব' একটি জাতি তৈরি করছি! অথচ একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার আওতায় আমরা একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারতাম। সেই সুযোগ এখনও আছে। তাই ৫০ লাখ সার্টিফিকেট ইস্যু করার মধ্যে কোনো সফলতা নেই। এই ৫০ লাখ সার্টিফিকেটধারী সমাজে কী অবদান রাখছে, এটা খোঁজ নিলেই বোঝা যাবে আমাদের সফলতাটুকু কোথায়। একজন বুবলী এমপি হয়ে অনেকের মতো
একখানা সার্টিফিকেট চেয়েছেন। তাতে দোষের কী? স্বামীর হত্যাকাণ্ডই তাকে  সামনে নিয়ে এসেছে। আওয়ামী পরিবারের সদস্য তিনি। তবে এ কাজটি তিনি না করলেও পারতেন। একজন বুবলীর ঘটনা কিংবা ৫০ লাখ সার্টিফিকেটের বিষয়টি নিয়ে যদি মন্ত্রী ভাবেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে, যদি 'চিন্তা-ভাবনা' করার একটা দুয়ার খুলে যায়, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তাতেই বেশি খুশি হবো
 Daily Samakal
27.10.2019

ভিসিদের কথকতা

Image result for VC Mizan of Jagannath Uni

ভিসিদের ‘নানা কাহিনি’ থেকে যেন আমরা বের হয়ে আসতে পারছি না। উপাচার্যদের নানা কাহিনি প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে। গোপালগঞ্জ বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন সে খবর পুরনো। এখন আরেক ভিসি একটি বিতর্কিত মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তিনি জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান। তিনি বলেছেন, তাকে যুবলীগের সভাপতি করা হলে তিনি উপাচার্য পদটি ছেড়ে দেবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটা নিয়ে ঝড় বইছে।
সমালোচনার পাল্লাটা যেন একটু বেশিই। তার এই মন্তব্যের অনেকগুলো দিক আছে। এক. তিনি একটি রাজনৈতিক পদ চান এবং খুব লীগের মাঝে সংকট চলছে, তা থেকে তিনি সংগঠনটিকে বের করে আনতে চান। আমি এতে অবাক হইনি। কেননা উপাচার্য হবার পরও তিনি যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের এক নম্বর সদস্য। তিনি সেখান থেকে পদত্যাগ করেননি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি কুমিল্লা উত্তর থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন। কাউন্সিলদের ট্যাগ লাগানো ছবি তিনি নিজের ফেসবুকে ‘আপলোড’ করেছিলেন। সুতরাং একজন ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি’ একটি সংগঠনের দায়িত্ব নেবেন তাতে অবাক হবার কিছু নেই। তবে প্রশ্নটি নৈতিকতার। তিনি উপাচার্য হয়ে সরাসরি দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন কি না?
এটা ঠিক রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় আনুগত্যের প্রতি যারা ‘কমিটেড’, তারাই ভিসি হন এবং হয়ে আসছেন। তখন আর সিনিয়রিটি মানা হয় না। অনেকে ভিসি হয়েছেন, অধ্যাপক হিসেবে ‘সিলেকশন গ্রেড’ও পাননি। এবং কোনো কোনো
ভিসি আবার একই সঙ্গে ‘এনজিও
ব্যবসাও’ করেন।
বিদেশ থেকে টাকা এনে এনজিও চালান, আবার সপ্তাহে দু’দিনের জন্য ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক মীজানের দোষ কোথায়? তবে তিনি যদি প্রেসিডিয়ামের পদ থেকে পদত্যাগ করতেন, তাহলে তিনি ভালো করতেন। দুই. রাজনীতিতে ‘মেরিওটোক্র্যাসি’ দরকার। তিনি যুবলীগের চেয়ারম্যান হলে বরং ভালোই হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি। তিনি যোগ্য ব্যক্তি নিঃসন্দেহে। তবে যেহেতু এই মুহূর্তে বিতর্ক উঠেছে, সেহেতু তিনি ভিসি হিসেবে পদত্যাগ করে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে নিজেকে জড়িত করুন। তাতে ভিসি পদের সম্মান বাড়বে। সম্প্রতি ১৪ জন ভিসির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে ইউজিসি (জাগো নিউজ, ২২ সেপ্টেম্বর)। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী দেখে এদের মানোন্নয়ন দিয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়েছিল? এদের আয় সম্পত্তির হিসাব কি এনবিআর খতিয়ে দেখবে? যুবলীগ নেতাদের যদি আমলনামা নেওয়া হয়, যদি তাদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত ভিসিদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হবে না কেন? দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাউকে তিনি ছাড় দেবেন না।
একজন প্রধানমন্ত্রী কত সাহসী হলে নিজ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে র‌্যাবকে নির্দেশ দেন। অন্যায় আর দুর্নীতি, যারা যারা করবে তাদের কারও মাফ নেই। এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সর্বত্র পরিচালিত হোক। যারা ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে, দলের নাম ভাঙিয়ে দিব্যি আরাম-আয়াসে দিন কাটাচ্ছে তাদেরও আনা হোক আইনের আওতায়। আওয়ামী লীগ এসব দুর্নীতিবাজদের ধারণ করতে পারে না। ব্যাংকার, ব্যাবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সবাই আজ অভিযোগের কাঠগড়ায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে মালয়েশিয়ায় ‘দ্বিতীয় হোম’ বানাবেন, ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে ঢাকায় বসে গার্মেন্টস ব্যবসা করবেন, এনজিও চালাবেন, সকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাসে গিয়ে বিকালের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসবেনÑ এগুলোও অন্যায়।
বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ ধরনের অন্যায় করবেন, এটা সত্যিই দুঃখজনক। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিলে, এরা এভাবেই পার পেয়ে যান। দুঃখ লাগে যখন দেখি দুয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়া অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন একটা সোচ্চার নন। শিক্ষকরা পদোন্নতির নীতিমালা নিয়ে যতটুকু সোচ্চার হয়েছেন, উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা তেমন সোচ্চার হননি। শিক্ষকরা জাতীয় আদর্শ। তারা যদি তাদের সহকর্মীদের (উপাচার্যরা তো তাদের সহকর্মীই) বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হন, তাহলে আগামীতে তারা আর
কোনো সম্মান নিয়ে সমাজে বাস করতে পারবেন না।
দেশে বিশ^বিদ্যালয়ের (পাবলিক) সংখ্যা এখন ৪৫টি। শিক্ষামন্ত্রী তার নিজ জেলা চাঁদপুরেও একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিতও হয়েছে। আমার নিজের জেলা পিরোজপুরেও একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলার মন্ত্রী। এসব বিশ^বিদ্যালয় আদৌ শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে কি না, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তবে ভয়টা হচ্ছে বিশ^বিদ্যালয়ে নিয়োগ এবং নির্মাণ কাজে যে দুর্নীতি হয়, তা আমরা বন্ধ করব কীভাবে? বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে এখন শত কোটি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকার এ ক্ষেত্রে উদার। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক ও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য হিসেবে আমি কিছু সুপারিশ রাখতে চাই, যা বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করবে। ১. রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় কর্মকাণ্ডে যিনি সম্পৃক্ত তাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে থেকে উপাচার্য নিয়োগ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করবে। সেখান থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। উপাচার্যরা হবেন শুধু এক টার্মের জন্য। ২. নিজ বিশ^বিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের অলিখিত বিধান বদলাতে হবে। নিজ বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি করেই শিক্ষকরা উপাচার্য হন। ফলে শিক্ষক রাজনীতি করতে গিয়ে তারা একটা ‘বলয়’ তৈরি করেন। আর ওই বলয়ের কারণেই উপাচার্য ‘বিশেষ গোষ্ঠীর’ কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে যান এবং ওই সুবিধাভোগীদের স্বার্থে কাজ করেন। ৩. শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির মতো একটি কমিশন গঠন করতে হবে। তিন পর্বের নিয়োগ প্রক্রিয়া সমর্থনযোগ্য। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা বোর্ড গঠন করতে হবে।
ওই বোর্ডে একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। এই কমিশন ইউজিসির বাইরে কাজ করবে। অথবা ইউজিসির অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে। ৪. বিশ^বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডারে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকা মানেই হচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপের পক্ষ হয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি। ৫. পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে, কোনো কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং টিভিতে ‘পূর্বকালীন’ কাজ করেন। পৃথিবীর কোথাও এমনটি চিন্তা করা যায় না। বিশ^বিদ্যালয় আইনের
ফাঁকফোকর দিয়ে তারা এ কাজটি করেন। জাবির উপাচার্য সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ের একজন উপ-উপাচার্য বিশ^বিদ্যালয়ের গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। এটা তিনি পারেন না। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। এটা তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশ^বিদ্যালয়গুলো এক ধরনের ‘সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ^বিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে, যারা সরকারকে সুপারিশ করবে। ইউজিসির পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি সব বিশ^বিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। তিনি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন। একজন সাবেক বিচারপতি এর নেতৃত্ব দেবেন। সাবেক উপাচার্য অথবা মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানরা এর সদস্য হতে পারেন। শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে, তাতে তিনি সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
উপাচার্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নানা অভিযোগে উপাচার্য নামক প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। ১৭ অক্টোবর ইউজিসির একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী তাদের কঠোরভাবে বিশ^বিদ্যালয়গুলো তদারকি করতে বলেন। সমস্যা হয়েছে এখানেই এই তদারকিটি হচ্ছে না। ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ কতটুকু কার্যকরী হবে, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই। অধ্যাপক মীজানের বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করলেও, এর একটি নেতিবাচক দিক আছে। তার ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ বিশ^বিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা তৈরি করতে পারে। দলীয়ভাবে বিশ^বিদ্যালয়গুলো যে পরিচালিত হচ্ছে, এ ধারণা আরও শক্তিশালী হবে।
Daily Shomoyer Alo
27.10.2019


আমাদের মেনন ভাই

Image result for Rashed Khan Menon cartoon
তিনি আমাদের সবার প্রিয় মেনন ভাই। রাশেদ খান মেনন। ৭৬ বছর বয়সের মেনন ভাইকে আমার ইদানীং অচেনা লাগে! এক সময় যিনি ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা, ১৯৬৩-৬৪ সালে ডাকসুর ভিপি, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যার অবিসংবাদিত ভূমিকা এ দেশের তরুণ সমাজের কাছে ছিল একটা আদর্শ, সেই মেনন ভাইকে কেন জানি এখন আর চিনতে পারি না।
বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যখন ষাটের দশকে এ দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে বিভক্তি এসেছিল, তখন এর রেশ ধরে বিভক্তি এসেছিল ছাত্র আন্দোলনেও। এ দেশের বাম ছাত্র রাজনীতিও দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল তখন। মেনন ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন অংশ পিকিংপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল, আর মতিয়া চৌধুরী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মস্কোপন্থী ধারার।
ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা মেনন ভাই, যার রাজনীতির একটা বড় অংশ কেটেছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতা করে, স্বাধীনতার পরপর তিনি ন্যাপের (ভাসানী) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে হেরে গিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
তবে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৭৯) বিজয়ী হয়ে তিনি সংসদে এসেছিলেন। ১৯৯১ সালেও আমরা তাকে সংসদে দেখেছি। কিন্তু কখনোই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নয়। ২০০৮ সালে যখন ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয়, তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন এ জোটে যোগ দেয় ওয়ার্কার্স পার্টি। মেনন পরে মন্ত্রী হন।
বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই ১৯৮০ সালে গঠিত হয়েছিল ওয়ার্কার্স পার্টি। অমল সেন ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। রাশেদ খান মেনন ছিলেন সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। এরপর ‘রাজনৈতিক প্রশ্নে’ একাধিকবার ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙনের মুখে পড়েছে। দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ একাধিকবার নেয়া হলেও সব ক্ষেত্রে তা সফল হয়েছে, বলা যাবে না।
যারা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, তারা আলাদাভাবে নিজেদের সংগঠিত করেছেন। হায়দার আকবর খান রনো একসময় রাশেদ খান মেননের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করে ২০০৮ সালে তিনি আলাদাভাবে (পুনর্গঠিত) ওয়ার্কার্স পার্টিকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে তিনি ও তার সহকর্মীরা পুনর্গঠিত ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশে (সিপিবি) যোগ দেন এবং তার সংগঠনের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাশেদ খান মেনন যখন ১৪ দলে যোগ দেন, তখন তা পার্টির ভেতরে বড় ধরনের ‘রাজনৈতিক ঝড়’ সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেননি। তারা চেয়েছিলেন একটি তৃতীয় ধারার রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে। অভিযোগে আছে, মেনন ভাইয়ের ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতি, জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদে যাওয়ার আগ্রহ তাকে ১৪ দলীয় জোটে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এখন কেন তিনি সরকারবিরোধী অবস্থান নিলেন!
সম্প্রতি বরিশালে পার্টির এক সভায় তিনি বলেছেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, গেল নির্বাচনে (২০১৮) জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি দেশের মানুষ।’ একটা সহজ-সরল স্বীকারোক্তি। তার এ বক্তব্য অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশব্যাপী ক্যাসিনোবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে এবং জনাব মেননের নাম যখন এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তখনই কি তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন?
নির্বাচন তো হয়েছে প্রায় ১০ মাস আগে। তাহলে এতদিন পর কেন তিনি এ কথা বললেন? কেন তিনি জানুয়ারি মাসে, নির্বাচনের পরপরই এ কথা বললেন না? ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও একটা ‘বিতর্ক’ আছে, যেখানে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব মেনন ওই নির্বাচনেও ‘বিজয়ী’ হয়েছিলেন এবং মন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু ওই নির্বাচন নিয়ে তিনি কোনো কথা বা মন্তব্য করেছেন বলে শোনা যায় না। তাহলে কি এবার মন্ত্রী হতে না পারার ‘বেদনা’ থেকেই তিনি এ ধরনের কথা বলেছেন?
জনাব মেনন প্রতি মাসে ‘ক্যাসিনো কিং’ সম্রাটের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ‘সম্মানী’ নিতেন- এটি স্বয়ং সম্রাটের স্বীকারোক্তি। এর পেছনে আদৌ কি সত্যতা আছে? নাকি সম্রাট নিজেকে বাঁচানোর জন্যই এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন? নির্বাচনে জনগণ তাকে ভোট দেয়নি- এ ধরনের বক্তব্যের পর তার সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা কতটুকু নৈতিকতার মধ্যে পড়ে? তার জন্য এই মুহূর্তে পদত্যাগ করাই কি শ্রেয় নয়? তার আরও একটি বক্তব্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেছেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৯ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে! এ বক্তব্যটি অত্যন্ত ‘সেনসেটিভ’।
এনবিআরের উচিত এ ব্যাপারে তার কাছ থেকে তথ্য চাওয়া। জনাব মেনন সিনিয়র রাজনীতিক। আমরা ধরে নেব তিনি যা বলেন, নিশ্চয়ই তার পেছনে সত্যতা আছে। নিশ্চয়ই তিনি কোনো ‘ফালতু’ কথা বলবেন না। কিন্তু সরকারে থাকা ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম অংশীদার হিসেবে তিনি যখন এ ধরনের কথাবার্তা বলেন, তখন সেটা সরকারকে যে একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়, তা বলাই বাহুল্য।
প্রশ্ন হচ্ছে, জনাব মেনন এ ধরনের বক্তব্য এ মুহূর্তে কেন দিলেন? নিজেকে ‘লাইমলাইটে’ আনতেই কি এ ধরনের বক্তব্য? তিনি ১৪ দলীয় জোটে আছেন। জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছেন। ওই নির্বাচন নিয়ে তার প্রশ্ন থাকতেই পারে। তাহলে কি এ প্রশ্নগুলো ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থাপন করা উচিত ছিল না? আরও একটি প্রশ্ন। জনাব মেনন যে কথাগুলো বলেছেন, (‘জনগণ ভোট দিতে পারেনি’, ‘৯ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে’) তা কি তার নিজের, নাকি ওয়ার্কার্স পার্টিও এটা মনে করে? আমি ধরে নিতে চাই, এ ধরনের বক্তব্য ওয়ার্কার্স পার্টিরও বক্তব্য। তাই যদি হয়, তাহলে ওয়ার্কার্স পার্টির ১৪ দলীয় জোটে থাকার কোনো যুক্তি নেই।
ওয়ার্কার্স পার্টি বা রাশেদ খান মেননের উচিত হবে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এ বক্তব্য নিয়ে ‘কাস্তে-হাতুড়ি’ (পার্টি প্রতীক) প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে অংশ নেয়া। ঢাকার যে আসনের তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই আসনের জনগণকে পুনরায় একটি সুযোগ দেয়া উচিত, যাতে তারা পুনরায় তার মতামতের পক্ষে রায় দিতে পারে। তবে জনাব মেনন জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, পদত্যাগের প্রশ্ন আসে না। তার মতে, ‘এটা তো শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্ন জড়িত আছে। পদত্যাগ না করেও ভোটের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যায়’ (Pars Today, ২২ অক্টোবর)।
জনাব মেনন মনে করেন, ‘নির্বাচনে জনগণ ভোট না দেয়ার’ তার যে বক্তব্য, তা শুধু নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করলেই চলবে না, এর সঙ্গে নাকি রাজনৈতিক প্রশ্ন জড়িত। তাহলে এ রাজনৈতিক প্রশ্নটি কী? ‘জনগণ ভোট দেয়নি’- এ বক্তব্য ১৪ দল বা সরকার ধারণ করে না।
তাহলে কোন যুক্তিতে আপনি ১৪ দলে থাকবেন? আপনি রাজনীতি করেন, এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আপনার অবদান আছে। আপনার এ ধরনের বক্তব্য আরও অনেক দল ধারণ করে। জনাব মেনন, আপনার রাজনৈতিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলব, আপনি আপনার বক্তব্য নিয়ে ১৪ দল নয়, বরং আলাদা প্লাটফর্মে যান। সেখান থেকে রাজনীতি করুন।
রাশেদ খান মেনন সম্পর্কে যেসব খবরাখবর ছাপা হচ্ছে, তা আমাকে অবাক করে। যুগান্তরের (২০ অক্টোবর) একটি খবর- ‘টেন্ডারপ্রতি ৫ পার্সেন্ট কমিশন নিতেন মেনন’। বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া রিমান্ডে এ তথ্যটি দিয়েছেন। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন ‘ক্যাসিনো কিং’ সম্রাট। এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে বলা কঠিন। তবে এটা তো ঠিক, ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযানের সময় ক্যাসিনো থেকে আর্থিক সুবিধাভোগীদের নামের একটি তালিকা উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। ওই তালিকায় ৫ নম্বরে আছে মেননের নাম। তার নামের পাশে লেখা আছে ১০ লাখ। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা (মাসে) পেতেন রাশেদ খান মেনন।
যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি ইয়ংমেন্স ক্লাবের পরিচালনা কমিটির সভাপতি, তার ক্লাবে ক্যাসিনো খেলা হয়, এটা তিনি জানেন না- এই বক্তব্য কি গ্রহণযোগ্য? তিনি অস্বীকার করেছেন বটে; কিন্তু দায়-দায়িত্ব এড়াবেন কীভাবে? ওই ক্লাবের অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি পদত্যাগ করেছেন, এমন কোনো সংবাদ তো আমাদের কাছে নেই! একজন বাম রাজনীতি করা মানুষ, যার নিজের কোনো সুস্পষ্ট আয়ের উৎস নেই, তার স্ত্রীর সম্পদ কী করে বাড়ে ২২ গুণ (জাগো নিউজি, ১ ডিসেম্বর ২০১৮)? আর নিজের সম্পদ বাড়ে ৪ গুণ? গত ১০ বছরে মেননের বাৎসরিক আয় বেড়েছে ৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকার বেশি।
অবস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টাকার বেশি। স্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। নবম ও দশম নির্বাচনী হলফনামায় তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তি না থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ২৪০ টাকা। একই সঙ্গে মিসেস মেননের, যিনি এখন সংসদ সদস্য, তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ২২ গুণ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৩০ টাকা (জাগো নিউজি, ১ ডিসেম্বর ২০১৮)।
এ দেশের বাম রাজনীতি করা অনেক পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা আমি জানি। কিন্তু বাম রাজনীতি করে সুনির্দিষ্ট কোনো ধরনের আয়ের উৎস যার নেই, তার উত্তরায় বাড়ি কিংবা ঢাকা ক্লাবে মেয়ের জাক-জৌলসে বিয়ের ঘটনা অতীতে বারবার আলোচিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি থাকাকালে মেননের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। ভিকারুননিসা নূন ও আইডিয়াল কলেজের ভর্তি বাণিজ্যের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
সুস্পষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও হাইভোল্টেজ তদবিরের কারণে কোনো সংবাদই ছাপাতে পারেনি সংবাদপত্রগুলো (যুগান্তর)। এখন তার ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একজন রাজনীতিবিদের ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কলঙ্কের। এর মধ্য দিয়ে তার অতীতের সব কর্মকাণ্ড ‘মুছে’ গেল।
রাশেদ খান মেননকে নিয়ে এ সংবাদগুলো আমাকে আশাবাদী করে না। তরুণ বয়সে আমাদের সবার আদর্শ ছিলেন তিনি। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা আমাদের সবার মেনন ভাই সত্যিকার অর্থেই মওলানা ভাসানীর অনুসারী হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন, এই ছিল সবার প্রত্যাশা। কিন্তু এ কেমন রাশেদ খান মেননকে আমরা দেখছি? এই রাশেদ খান মেননকে আমি আর চিনতে পারি না।

Daily Jugantor
26.10.2019

‘চেন্নাই কানেক্ট’ ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি


সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ভারত ঘুরে গেছেন। তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে শি চিনপিং এবং নরেন্দ্র মোদি যে বৈঠকে মিলিত হন, তাকে বলা হচ্ছে ‘চেন্নাই কানেক্ট’। এটা ছিল অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। ২০১৭ সালে চীনের উহানে দুই নেতা মিলিত হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় মামাল্লাপুরমে তারা আবার মিলিত হলেন। আগামী বছর এই অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অব্যাহত থাকবে এবং মোদি চীনে যাবেন। এশিয়ার দুটি বড় অর্থনীতির দেশ হচ্ছে চীন ও ভারত। বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস এই দেশ দুটিতে। বিশ^ অর্থনীতিতে (জিডিপি) ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে যে হিসাব (পিপিপি) তাতে শীর্ষে অবস্থান করছে চীন (সাধারণ হিসেবে চীনের অবস্থান দ্বিতীয়)। আর পিপিপিতে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। পিপিপিতে চীনের জিডিপির পরিমাণ ৫৮ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার আর ভারতের ৪৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। এখন এই দেশ দুটির মধ্যে যদি সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে বিশে^র অর্থনীতির চেহারা যে বদলে যাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকলোই যে, ‘চেন্নাই কানেক্ট’ এই সম্পর্ক বৃদ্ধিতে কতটুকু অবদান রাখবে? প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ এ প্রশ্নটি তুলেছে গত ১৫ অক্টোবর।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে চীন-ভারত সম্পর্ক খুব ভালো যাচ্ছে না। বিভিন্ন ইস্যুতে দেশ দুটির মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। উপরন্তু চীন দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াচ্ছে, এটা ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টদের জন্য চিন্তার কারণ। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে দুই ব্যক্তি এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেনÑ একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর, অন্যজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা দোভাল। মোদির খুব ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা তারা দুজন। ভারত যে তার ‘মনরো ডকট্রিনের’ ভারতীয় সংস্করণ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে জয়শংকর-দোভাল জুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এই ডকট্রিনের মূল কথা হচ্ছে ভারত মহাসাগরে ভারত অন্য কোনো দেশের ‘কর্তৃত্ব’ সহ্য করবে না। ইঙ্গিতটা স্পষ্টত চীনের দিকে। চীন ভারত মহাসাগরে তার কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছে। প্রায়ই এ অঞ্চলে চীনের সাবমেরিন চলাচল করে। চীন শ্রীলঙ্কার হামবানতোতায় যে গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করেছে এবং বন্দরটি পরিচালনার ভার ৯৯ বছরের জন্য পেয়েছে, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা সাবমেরিন ডকিং করেছিল। এটা ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের গাওদার ও মিয়ানমারের Kyaukphyu গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা সাবমেরিন ডকিং করতে পারে। এ চিন্তাও ভারতের আছে। ফলে চীন ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কটি কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, সে ব্যাপারে লক্ষ থাকবে অনেকের।
চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের আগে ও পরে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, যাতে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা যে খুশি হবেন, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রথমত, চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পেইচিং সফর করেন এবং কাশ্মীর প্রশ্নে চীনের সমর্থন আদায় করতে তিনি সমর্থ হন। কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত যে নীতি অবলম্বন করেছে (কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল) এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছে, চীন তাকে সমর্থন করছে এবং পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে দেখা যায়, মামাল্লাপুরমে দুই নেতা কাশ্মীর প্রশ্নে কোনো কথা বলেননি। অথচ ভারতের রাজনীতি, বিশেষ করে মোদির রাজনীতির জন্য কাশ্মীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এ ক্ষেত্রে মোদি ব্যর্থ হলেন চীনের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কাশ্মীর প্রশ্নে কোনো সমর্থন আদায় করতে।
দ্বিতীয়ত, চীনা প্রেসিডেন্ট ভারত সফর শেষ করে নেপাল সফরে যান এবং নেপালের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা যে চীন-নেপাল সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখবেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। নেপালে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ভারতকে চিন্তায় ফেলে দেবে। ভারতের ওপর অতীতে নেপালের নির্ভরশীলতা এবং এই ‘নির্ভরশীলতা’ ভারত তার নিজ স্বার্থ ব্যবহার করার কারণে নেপাল ধীরে ধীরে চীনের দিকে ঝুঁকছিল। ভারত অতীতে একাধিকবার নেপালে জ¦ালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে সংকট তৈরি করেছিল। নেপালের বিপুল অর্থনৈতিক চাহিদা নেপালকে চীন-নেপাল অর্থনৈতিক করিডর গঠনে উৎসাহিত করেছিল। এই অর্থনৈতিক করিডরের আওতায় লাসা (তিব্বত)-খাসা ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ভারতের ওপর থেকে নেপাল তার নির্ভরশীলতা অনেক কমাতে পারবে। আরেকটি পরিকল্পনা হচ্ছে চীনের কিনঝি ( Qinghi ) প্রদেশের গলমুদের ( Golmud ) সঙ্গে তিব্বতের লাসার রেল সংযোগ স্থাপন। এতে করে তিব্বতকে চীনের অর্থনীতির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে নেপালও সুবিধা পাবে। চীন নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহায়তা করছে এবং দেশটিকে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাও দিয়েছে। নেপাল চীনের ওবিওআর ( OBOR ) মহাপরিকল্পনায়ও যোগ দিয়েছে। ভুটানেও চীনের প্রভাব পড়েছে। চীনের সঙ্গে ভুটানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেখানে ভারতের প্রভাব বেশি। দোকলাম নিয়ে সীমান্ত সমস্যা (ভুটানের সঙ্গে) তা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। এটা ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টরা খুব ভালো চোখে নেবেন না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকবেই ‘চেন্নাই কানেক্ট’ দুদেশের সম্পর্ক জোরদারে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবে কি না? নাকি শুধুই একটি ‘ফটোসেশন’?
তৃতীয়ত, আরও বেশ কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যেখানে দুদেশের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ভারত চীনের বিরুদ্ধে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলগুলোর সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গড়ে তুলছে, যা চীনা স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। ( QUAD ) এমন একটি জোট (জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া তার সঙ্গী), যা চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে এবং ভারতের পক্ষে আগামীতে কাজ করতে পারে। চীন জিবুতিতে তার প্রথম সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। ভারত মৌরিতুস ও সিসিলিজে নৌঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারত মালাবার ২০১৯ নৌ-সামুদ্রিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে। এ ধরনের মহড়া ভারত মহাসাগরে চীনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও ভারত-চীন বৈরিতা লক্ষ করা যায়। অরুণাচল ভারতের একটি রাজ্য হলেও চীন এই রাজ্যের কর্তৃত্ব দাবি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মৈত্রী চীনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে চীন-ভারত যুদ্ধ কোনদিকে যায়, সেদিকে লক্ষ আছে অনেকের। বলতে দ্বিধা নেই, বেশ কিছু ইস্যুতে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান হয়নি। ২০১৭ সালে দোকলাম ঘটনায় এই দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও পরে এই উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পায়। অরুণাচল প্রদেশের ওপর থেকে চীন তার দাবি পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেনি। কাশ্মীরের লাদাখ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান। ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অন্যতম দাবিদার। কিন্তু চীনের এখানে আপত্তি রয়েছে। ভারত পারমাণবিক শক্তি ও পারমাণবিক সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্য হতে চায়। এখানেও আপত্তি চীনের। ভারত চীন-বাণিজ্য সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়েছে, কিন্তু তা ভারতের প্রতিকূলে। অর্থাৎ চীন ভারতে রপ্তানি করে বেশি, ভারত থেকে আমদানি করে কম (চীন ভারতের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার আর চীন থেকে আমদানি ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭)। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনের প্রশ্নে ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। শ্রীলঙ্কায় (হামবানতোতা গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি) কিংবা মালদ্বীপে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ভারত তার নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। এ কারণেই একজন বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক যখন লেখেন, ‘হাতি ও ড্রাগনের নাচ : শি-মোদি সম্মেলন কি শুধুই প্রদর্শনী (সাউথ এশিয়া মনিটর, অক্টোবর ১৫), তখন একটা প্রশ্ন থাকলই ‘চেন্নাই কানেক্ট’ আদৌ কোনো শুভ ফল বয়ে আনবে কি না? চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং মামাল্লাপুরম শীর্ষ সম্মেলনকে আখ্যায়িত করেছেন এভাবে  ‘নতুন যুগ শুরু হলো দুদেশের সম্পর্কে’। তার এই বক্তব্যে আন্তরিকতার সুর আছে। কিন্তু ভারতে কট্টরপন্থিরা এখন ক্ষমতায়। তাদের ‘আগ্রাসী’ নীতি দুদেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন থাকবেই। একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী দক্ষিণ এশিয়ার জন্য চীন ও ভারতের মধ্যে একটি আস্থাশীল সম্পর্ক বজায় থাকা অত্যন্ত জরুরি। না হলে যেকোনো বৈরিতা এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
Daily Desh Rupantor
21.10.2019

প্রশ্নের মুখে ভারতের গণতান্ত্রিক সংহতি


কাশ্মীরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল
কাশ্মীর সংকট শুরু হওয়ার দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও এ সংকট থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না ভারত। গেল সপ্তাহে কাশ্মীর নিয়ে একাধিক সংবাদ ছাপা হয়েছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে বেমানান।
গত ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, কাশ্মীরে দমন-নীতি গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভারতের সাপ্তাহিক ফ্রন্টলাইনে আনন্দ ভক্ত লিখেছেন, কাশ্মীর বড় ধরনের আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে এবং অবরুদ্ধ উপত্যকার চারপাশে চক্বর দিলে এর আগাম পূর্বাভাস কারও দৃষ্টি এড়াবে না (১৫ অক্টোবর)।
এদিকে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের ভর্ৎসনার মুখেও পড়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসন। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বলছে, ‘যা বলবেন মেনে নেবেন, ধরে নেবেন না।’ কাশ্মীরে ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে সুপ্রিমকোর্ট এক শুনানিতে এ ধরনের কথা বলেছে (আনন্দবাজার, ১৬ অক্টোবর)। কাশ্মীর এখনও অশান্ত, অবরুদ্ধ। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর অত্যাচার এখন আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছে।
খোদ ভারতেও মোদি সরকারের এ সিদ্ধান্ত বড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ভারতীয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের পথে এত পথ এগোনার পর এবং প্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করে এখন যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তার জন্য আমাদের সুনাম নষ্ট হোক- একজন ভারতীয় হিসেবে এসব বিষয়ে আমি গর্ববোধ করতে পারছি না।’
সরকারের অজুহাত ও যুক্তির পেছনে অমর্ত্য সেনের মন্তব্য হচ্ছে ‘এটা তো উপনিবেশবাদের পুরনো অজুহাত। এভাবেই ব্রিটিশরা এ দেশকে ২০০ বছর ধরে শাসন করেছে।’ ভারতের সুপ্রিমকোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কান্দে কাটজুর মন্তব্যটি ছিল আরও কঠিন। তিনি বলেছেন, ভারতে এখন এমন কিছু ঘটছে, যা নাজি যুগে জার্মানিতে সংঘটিত ঘটনার কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় (সূত্র : ম্যাটার্স ইন্ডিয়া)।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ কাশ্মীরকে একটি আলাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন (newsx.com, ২৮ সেপ্টেম্বর)। গত দুই মাস বিবিসি, সিএনএন ও আল জাজিরা কাশ্মীরে নির্যাতন নিয়ে যেসব সংবাদ প্রকাশ করেছে, তা ভারতের গণতন্ত্রের চর্চার সঙ্গে বেমানান। কাশ্মীরে এ নির্যাতন আর গুমের ঘটনা ভারতীয় গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ভারতীয় গণতন্ত্রের এক ভিন্ন চিত্র এখন আমরা পাই। এটা গণতন্ত্রের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী।
কাশ্মীরে নারী নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরার জন্য ভারতের কয়েকজন নারী অ্যাক্টিভিস্টের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। তারা ২৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের ‘Fact Finding’ উপস্থাপন করেন। তারা কাশ্মীরের ঘটনাবলিকে ‘human tragedy’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন (newslaundry.com, ২৪ সেপ্টেম্বর)।
সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, ১৩ হাজার কাশ্মীরি তরুণকে তুলে নেয়া হয়েছে, তাদের খবর পরবর্তী সময়ে আর পাওয়া যায়নি। সিপিআই, ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান উইম্যান, প্রগতিশীল মহিলা সংস্থা ও মুসলিম উইম্যান ফোরামের প্রতিনিধিরা ১৭ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর অবরুদ্ধ কাশ্মীর সফর করেন। এ সফরের পরপরই তাদের পর্ষবেক্ষণ গণমাধ্যমে উপস্থাপন করেন।
বিশিষ্ট লেখিকা অরুন্ধতী রায়ও বলেছেন, কাশ্মীরে দুর্বৃত্তের মতো আচরণ করছে মোদি সরকার। তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক ও গবেষক রামচন্দ্র গুহ ওয়াশিংটন পোস্টে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘India was a miracle democracy; but it is time to downgrade its credential’। তার বক্তব্য পরিষ্কার- ভারত রাষ্ট্রটি অনেক জাতি ও উপজাতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। সেখানে উত্তরাঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। আচার-আচরণ, ধর্ম, সংস্কৃতির মাঝেও পার্থক্য রয়েছে।
তার মতে, ভারত হচ্ছে ‘A Nation of maû Nations’। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও প্র্যাকটিস ভারতকে এক কাঠামোয় রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এখন সেই গণতন্ত্রকে আর প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র বলা যাবে না।
মিথ্যা বলেননি রামচন্দ্র গুহ। বিশাল এক দেশ ভারত। অনেক ধর্মের অনুসারীদের বাস এ ভারতে। জনসংখ্যার ৭৯ দশমিক ৮০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এর পরেই মুসলমানদের স্থান, জনসংখ্যার হার ১৪ দশমিক ২৩ ভাগ। খ্রিস্ট ও শিখ ধর্মাবলম্বীদের হার যথাক্রমে ২.৩০ ও ১.৭২ ভাগ। ২০ কোটির ওপর মুসলমানের এই সংখ্যাটি যে কোনো মুসলমানপ্রধান দেশের চেয়ে বেশি।
বর্ণ, ধর্ম ও জাতিভিত্তিকভাবে বিভক্ত ভারতকে এক কাঠামোয় রাখতে ভারতীয় সংবিধান প্রণেতারা একদিকে যেমন দলিত শ্রেণির (নিু শ্রেণির, অশিক্ষিত মানুষ) জন্য সংবিধানে এক ধরনের রক্ষাকবচ রেখেছেন, অন্যদিকে বিশেষ বিশেষ রাজ্যের জন্য (যেমন উত্তর-পূর্বাঞ্চল, কাশ্মীর, অন্ধপ্রদেশ) বিশেষ মর্যাদা তথা সীমিত স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন।
উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট- একটি ফেডারেল রাষ্ট্র-কাঠামোয় কিছু রাজ্যকে কিছু সুবিধা দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আওতায় ভারতীয় ঐক্যকে টিকিয়ে রাখা। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ ৭২ বছর এ ঐক্য টিকে থাকলেও এখন তাতে ফাটল দেখা দিয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ, কিংবা হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এখন ভারতীয় ঐক্যের জন্য নিয়মিত হুমকি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলে আসছিল, তা একটা পর্যায়ে স্তিমিত হয়ে এলেও কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ায় নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ অসন্তোষ এখন অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং একইসঙ্গে ৩৫-এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর ‘আলাদা মর্যাদা’ পেত।
এ ধরনের ‘বিশেষ সুবিধা’ (স্থানীয়দের চাকরি-শিক্ষা ক্ষেত্রে সুবিধা, স্থায়ী নাগরিকের মর্যাদা ইত্যাদি) শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেই যে প্রযোজ্য ছিল তা নয়, অন্য বেশকিছু রাজ্য এখনও সাংবিধানিকভাবে এ ধরনের ‘বিশেষ সুবিধা’ ভোগ করে থাকে। ৩৭১-এ ও ৩৭১-জি ধারা বলে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় জনগোষ্ঠী অনেকটা কাশ্মীরিদের মতো একই ধরনের সুবিধা পায়।
পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জমির ওপর, বন ও খনিজসম্পদের ওপর ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকৃত। তাদের কোনো কর দিতে হয় না। চাকরির ক্ষেত্রেও রয়েছে অগ্রাধিকার। এ অঞ্চলে সংবিধানের অনেক ধারা কার্যকর নয়। সেখানে দেশীয় আইন, ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্পত্তি ও জমির হস্তান্তরও নিজস্ব নিয়মে চলে।
সংবিধানের ৩৬৮ ধারার ভিত্তিতে ৩৭১ নম্বর ধারায় ৯টি রাজ্যকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। কাশ্মীরের বাইরে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও অন্ধপ্রদেশ রয়েছে সেই তালিকায়। ৩৭১-বি ধারায় কিংবা ২৪৪-এ ধারা অনুযায়ী আসাম বেশকিছু সুবিধা পেয়ে থাকে।
৩৭১-ডি ও ই ধারায় অন্ধপ্রদেশে শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণসহ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রপতির হাতে। ৩৭১-এইচ ধারা মতে অরুণাচল রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত উল্টে দিতে পারেন কেন্দ্র থেকে নিযুক্ত রাজ্যপাল।
সুতরাং যেসব অঞ্চল বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে নাগাল্যান্ড, মিজোরামে বিক্ষোভ হয়েছে এবং স্থানীয় নেতারা কঠোর হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জম্মু ও কাশ্মীর দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় অনেক রাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দার্জিলিংয়েও পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি প্রকাশ্যে এসেছে।
দার্জিলিংয়ের পৃথক রাজ্য গড়ার নেতা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চ্চার বিমল গুরুং আত্মগোপনস্থল থেকে এক বার্তায় দার্জিলিংকেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এটি একটি অশনিসংকেত। অন্যান্য রাজ্য থেকেও এ ধরনের দাবি উঠতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কি শুধু ‘মিশন কাশ্মীর’ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন? নাকি অন্য অঞ্চলগুলোর ব্যাপারে সংবিধানে যে সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তাও খর্ব করার উদ্যোগ নেবেন? কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে জনঅসন্তোষ গড়ে উঠছে, তা যদি কেন্দ্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে অন্যান্য ও পশ্চাৎপদ রাজ্যগুলোর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সংবিধানের রক্ষাকবচগুলো বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
তবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে ওই সিদ্ধান্ত মুসলমানবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী।
ভারতের সংবিধান প্রণেতারা এ ধরনের রক্ষাকবচ দিয়েই দেশটির ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোকে ‘এক’ রাখতে চেয়েছেন। দীর্ঘদিন কোনো সরকারই এই রক্ষাকবচের ওপর হাত দেয়নি। কারণ তারা জানতেন সংবিধানে লিপিবদ্ধ এসব রক্ষাকবচে যদি ‘হাত’ দেয়া হয়, তাহলে ভারতের সংহতি বিনষ্ট হবে।
ভারত ভেঙে যেতে পারে! বিজেপি সরকারের কাশ্মীর প্রশ্নে নেয়া সিদ্ধান্ত এখন একদিকে সংবিধানকে যেমন আঘাত করেছে, তেমনি ভারতের সংহতি ও ঐক্যকেও আঘাত করেছে। একইসঙ্গে ভারতের গণতান্ত্রিক সংহতিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এমনিতেই ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে, ভারতের গণতন্ত্র হচ্ছে ‘election only democracy’। অর্থাৎ এ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচকেন্দ্রিক।
গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট অনেক ক্ষেত্রেই এখানে অনুপস্থিত। পারিবারিক শাসন তথা পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি (স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে কিছু পরিবার), দলিতদের ব্যবহার করে স্থানীয় তথা জাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা (মায়াবতী, লালু প্রসাদ), ক্রিমিনালদের সংসদে প্রতিনিধিত্ব (৪৩ শতাংশ সংসদ সদস্যের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে, দ্য হিন্দু, ২৬ মে ২০১৯) ভারতীয় গণতন্ত্রকে সনাতন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে পৃথক করেছে।
মোদি জমানায় এটি নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে- তা হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি অব্যাহত রাখা। রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন সাম্প্রদায়িক নীতি প্রমোট করা হচ্ছে, যা সনাতন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নামে এক ধরনের ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’ (ধনী গোষ্ঠীর সুবিধা নেয়া) সনাতন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেও এখন চ্যালেঞ্জ করছে। এ কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রতিনিধি হচ্ছেন মোদি।
সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, কাশ্মীরে জমি কিনে কর্পোরেট জগতের ‘বস’রা কাশ্মীরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন; যেখানে সাধারণ কাশ্মীরিদের কিংবা কাশ্মীরের জনগণের প্রতিনিধিত্বকারীদের কোনো ভূমিকা নেই।
একদিকে কাশ্মীর, অন্যদিকে আসামে এনআরসি- সব মিলিয়ে এক অনিশ্চয়তার পথে হাঁটছে ভারত। তাই দীপক সিনহা যখন সাউথ এশিয়া মনিটরে লেখেন, ‘ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ধূমায়িত ক্ষোভ’ (১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯), তখন ভারতের ভবিষ্যৎ আমাদের ভাবিত করে। ভারতের অনেক কিছু দেখার আছে। আমাদের উন্নয়নের অংশীদার ভারত।
গত ১২ অক্টোবর চীনা প্রেসিডেন্ট ভারত সফর শেষ করেছেন। শি জিনপিং-মোদি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কাশ্মীর ইস্যু স্থান পায়নি। স্পষ্টতই এটা মোদি সরকারের জন্য খুব ভালো খবর নয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে কাশ্মীর প্রশ্নে মোদি সরকার সমর্থন আদায় করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে কাশ্মীর প্রশ্নে মোদি-অমিত শাহ জুটির সিদ্ধান্ত তার সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয় কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।
Daily Jugantor
19.10.2019

বুয়েটের ছাত্ররাজনীতি ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

Image result for BUET student movement Dhaka


বুয়েটের তরুণ মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশের তথাকথিত ছাত্ররাজনীতিকে একটি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আবরার হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করল তথাকথিত লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি আর যাই হোক, সাধারণ ছাত্রদের কোনো মঙ্গল ডেকে আনতে পারে না। তথাকথিত এই ছাত্ররাজনীতি এক শ্রেণির তরুণ প্রজন্মকে খুনি বানাচ্ছে, তৈরি করছে দানব। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির যে ঐতিহ্য, তার সঙ্গে এই রাজনীতিকে মেলানো যাবে না। তাই ছাত্ররাজনীতি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করার পরিবর্তে, তৈরি করছে এমন এক প্রজন্মকে, যারা পরমতসহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী নয়। তরুণ বয়সেই তাদের মাঝে গড়ে উঠছে অপর মতকে সহ্য না করার মানসিকতা। দেশের শ্রেষ্ঠ
সন্তানরা পড়াশোনা করে বুয়েটে। আমরা যাদের ‘জেনারেশন জেড’ (Genaration Z)  বলছি, এই জেনারেশনের ছাত্ররা বুয়েটে পড়াশোনা করে। একুশ শতক হচ্ছে ‘জেনারেশন জেড’-এর জেনারেশন। এই জেনারেশনই আমাদের আশা-ভরসা। আমাদের পথ দেখাবে। বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে উন্নত বিশ্বর কাতারে। এই অস্ট্রিন (যুক্তরাষ্ট্র) শহরে আমি যখন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারদের ঢাকা থেকে সরাসরি রিক্রুট হতে দেখি, তখন শত হতাশার মাঝেও একটা আশার আলো দেখি। কিন্তু বিশ-ত্রিশ বছর আগের বুয়েট, আজ বদলে গেল কীভাবে? কীভাবে এবং কেন বুয়েটের মেধাবী ছাত্রটি একটি নিরপরাধ সাধারণ একটি ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলে? যারা তাকে পিটিয়ে মারল তাদের একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে। সেই ছাত্রসংগঠনটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সেই ছাত্রসংগঠনটি এখন ‘আসামির কাঠগড়ায়’। অথচ একসময় এই ছাত্রসংগঠনের একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বের সারিতে ছিল এই ছাত্রসংগঠনটি। মাত্র ৪৮ বছরের মাঝে এই ছাত্রসংগঠনটির অধঃপতন ঘটল কেন? এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সিরিয়াসলি ভাবা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে আস্থাহীনতা ও বিদ্বেষ এত বেশি যে, তা তরুণ প্রজন্মকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। এই তরুণ প্রজন্ম দলের শীর্ষ নেতাদের আস্থা অর্জন করার জন্য তাই এমন অনেক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করে, যা দলের জন্যও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য তাই একটি সুস্থধারার রাজনীতি প্রবর্তন করা জরুরি। আর এ উদ্যোগটা নিতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে একটি শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। এখন দরকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা। চাঁদা দাবিতে অভিযুক্ত হয়ে ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করেছেন। এখন যা দরকার, তা হচ্ছে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাদের আমলনামা খতিয়ে দেখা। দরকার তদন্ত করা। শুদ্ধি অভিযানটা খুবই জরুরি। এতে বরং সরকারেরই লাভ বেশি। আবরার হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করল লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। শুধু বুয়েট নয়, কোনো ক্যাম্পাসেই দলীয় ছাত্ররাজনীতি থাকবে না। ছাত্ররাজনীতি থাকতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে শুধু ছাত্রদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। জাতীয় রাজনীতির বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে জাতীয় নেতাদের কাছে। কোনো দল কোনো ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রসংগঠনকে স্বীকৃতি দেবে না। জাতীয় দলগুলোর সমর্থক থাকতেই পারে। কিন্তু ক্যাম্পাসে তা প্রকাশ করার কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করতে হবে। বিশ^বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এমন একটি আইনপ্রণয়ন করা জরুরি, যেখানে দলীয় ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতিও নিষিদ্ধ থাকবে। বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, তা যেকোনো বিবেচনায় আমাদের একটি পজিটিভ বার্তা দেয়। বুয়েট কর্তৃপক্ষ সেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। নিষিদ্ধ হয়েছে শিক্ষকরাজনীতিও। প্রধানমন্ত্রী তো জানিয়ে দিয়েছেন যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের আইন বলে সেখানে তথাকথিত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। বুয়েটে এ ধরনের আইন ছিল। কিন্তু অতীতের কোনো উপাচার্যই ওই আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারেননি ছাত্রনেতাদের চাপে। এখন সম্ভব হলো, তাও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর। এখন অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ও বুয়েটকে অনুসরণ করতে পারে।
আবরার হত্যাকাণ্ড আমাদের ছাত্ররাজনীতির জন্য একটি ‘ক্ষত’ সৃষ্টি করেছে। ছাত্ররাজনীতি আজ এ পর্যায়ে কেন এলো, তা ভেবে দেখা দরকার। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের বেপরোয়া মনোভাব আবারও ধরা পড়ল যখন বুয়েটের ঘটনার পর ছাত্রলীগের ছেলেরা জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের ওপর হামলা  চালায়। এটা ভালো নয় এবং এতে করে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যাবে না। ছাত্রলীগের এই বেপরোয়া মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাগ কিংবা মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দিতে ছাত্রলীগের ছেলেরা সাধারণ ছাত্রদের বাধ্য করে। সাধারণ ছাত্রদের কোনো উপায় থাকে না। হলে থাকার স্বার্থেই তারা বাধ্য হয় মিটিং-মিছিলে যোগ দিতে। কিন্তু এতে করে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা বাড়ানো যাবে না। সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থে কাজ করলেই জনপ্রিয়তা পাওয়া যাবে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এ ব্যাপারে একটি কঠোর নির্দেশনা দিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে কিছু নির্দেশনা দিতে পারে। ছাত্রনেতারা টেন্ডারবাজি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। খোঁজ নিলে জানা যাবে, সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সিনিয়র নেতারা এই টেন্ডারবাজি করে ছাত্র অবস্থাতেই গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছে। এ ব্যাপারে শীর্ষপর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা থাকা উচিত।
আবরার হত্যাকাণ্ডে আমি ব্যথিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী আমার বুয়েটের সহকর্মীরা আবরারকে বাঁচাতে পারেননি। এতে ছাত্রদের যে ক্ষোভ ও দুঃখ, তাতে কোনো অন্যায় আমি দেখি না। তবে বুয়েটের একটা সম্মান আছে, মর্যাদা আছে। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি অপরাজনীতির কারণে তার ভাবমূর্তি আরও নষ্ট হোক আমরা তা কেউই চাইব না। আবরার তার নিজের জীবন দিয়ে আমাদের ‘জাগিয়ে’ গেল। আমরা এত দিন ‘ঘুমিয়ে’ ছিলাম। আমরা জেগে উঠতে শুরু করছি। তরুণ প্রজন্ম আমাদের অহংকার। আমাদের আশা-ভরসার জায়গা। তরুণ প্রজন্ম ইয়াবায় আসক্ত হবে, টেন্ডারবাজি করবে, খুনি-মস্তানবাহিনী তৈরি করবে এটা কোনো সুস্থধারার লক্ষণ না। বুয়েটের ছাত্ররা শেষ পর্যন্ত তাদের পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে এবং বুয়েট কর্তৃপক্ষ তা মেনেও নিয়েছে। ছাত্ররা ভর্তি পরীক্ষা শুরু করার ব্যাপারে তাদের সম্মতি দিয়েছে। সরকার ও বুয়েট কর্তৃপক্ষের জন্যও সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে। খুনিরা ছাত্র হতে পারে; কিন্তু এই খুনিদের কোনো ‘চরিত্র’ থাকে না। এদের আজীবনের জন্য বুয়েট থেকে বহিষ্কার করা হোক। সাময়িক বহিষ্কার আন্দোলনরত ছাত্রদের আস্থায় নেওয়া যাবে না। আরও একটা কথা খুনিদের রাজনৈতিক চরিত্র যাই থাকুক না কেন, এই ঘটনা যেন ‘দ্বিতীয় আরেকটি বিশ্বজিৎ’-এর ঘটনার জন্ম না দেয়। বিশ্বজিতের ঘটনায় খুনিদের চিহ্নিত ও ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারে। আমি খুশি হব যদি এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়। একাধিক মন্ত্রী আবরার হত্যাকাণ্ডের খুনিদের বিচার চেয়েছেন। আমরা দেখতে চাই এর বাস্তব প্রতিফলন। জনৈক ছোট মন্ত্রী আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজন খুনিকে প্রথমদিকে গ্রেপ্তার না হওয়ায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মাঝে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পেয়েছিলেন! এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্টের বিরোধী। মন্ত্রীদের সতর্ক হয়ে বক্তব্য দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও যখন সুস্থধারার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে হয়, তখন এর চেয়ে আর দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। রাজনীতির নামই তো জনকল্যাণ; কিন্তু যে রাজনীতি ‘খুনি’ তৈরি করে, খুনিদের সমর্থন করে, সে রাজনীতি জনকল্যাণের রাজনীতি হতে পারে না। আবরারের হত্যাকাণ্ড আমাদের রাজনীতিবিদদের যদি কিছু ‘শেখায়’, আমাদের প্রাপ্তিটা সেখানেই।
Daily Desh Rupantor
15.10.2019

চীনা প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ এশিয়া সফর

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার দক্ষিণ এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে ভারত সফর শেষ করেছেন গত ১২ অক্টোবর। এরপর তিনি যান নেপালে। এর আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠকে মিলিত হন। চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। এশিয়ার দুটি বড় অর্থনীতির দেশ ভারত ও চীনের নেতারা গত দুই বছর ধরে এভাবে 'অনানুষ্ঠানিক' বৈঠকে মিলিত হয়ে আসছেন। এর আগে চীনের উহানে ২০১৭ সালের গ্রীষ্ফ্মে দুই নেতা মিলিত হয়েছিলেন। বলা হচ্ছে 'Wuhan Spirit'-এর আলোকেই তামিলনাড়ূর মমল্লপুরমে দুই নেতা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হলেন। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে তার নেপাল সফরের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তবে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরকেও হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এই সফরটি অনুষ্ঠিত হলো এমন এক সময়ে, যখন কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে উত্তেজনা বাড়ছে; চীন-কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থন করছে এবং পাকিস্তানকে সব ধরনের সাহায্যের কথা বলছে। এ মুহূর্তে চীনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে চীন বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৬২ মিলিয়ন ডলার, যা চীনের কাসি (Kashi) থেকে বেলুচিস্তানের গাওদার গভীর সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করেছে। এই অর্থনৈতিক করিডোরটি (সড়ক ও রেল যোগাযোগ) পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের ওপর দিয়ে গেছে, যেখানে ভারত তার আপত্তি জানিয়ে রেখেছে। কাশ্মীর প্রশ্নে চীনের পাকিস্তানকে সমর্থক করার পেছনে কাজ করছে চীনের এই স্ট্র্যাটেজি। ফলে শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সময় সবার দৃষ্টি ছিল কাশ্মীর প্রশ্নে দুই নেতা কোনো কথা বলেন কি-না, তা দেখা। কিন্তু কাশ্মীর প্রশ্নে কোনো কথা হলো না। দুই প্রতিবেশী দেশ সিদ্ধান্ত নিল, বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ দমনে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে। আর বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তুলবে চীন ও ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেছেন, উহানের শীর্ষ সম্মেলন ভারত ও চীনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্ককে জোরদার করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। আর চেন্নাইয়ের ওই বৈঠকে (চেন্নাই কানেক্ট) দুই দেশই পারস্পরিক সম্পর্কে একটি নতুন যুগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্টও বলেছেন, 'নতুন যুগ শুরু হলো দুই দেশের সম্পর্কে।'
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অনানুষ্ঠানিক এই বৈঠকটি ছিল যথেষ্ট আন্তরিকতাপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী মোদি চীনা প্রেসিডেন্টকে অর্জুনের তপস্যা, কৃষ্ণের বাটারবল, পঞ্চরথ ও মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো ঘুরে দেখান। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, তামিলনাড়ূর সঙ্গে চীনের পারস্পরিক মতবিনিময় এবং সমুদ্র বাণিজ্য নিয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশ আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, আর তা এশীয় সভ্যতার পক্ষে নতুন গৌরবের হয় (আনন্দবাজার)। এখন যে প্রশ্নটি সঙ্গত কারণেই উঠবে তা হচ্ছে, এই যে সম্পর্কের 'নতুন পর্বের' কথা বলা হচ্ছে কিংবা 'এশীয় সভ্যতার পক্ষে নতুন গৌরবের' কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবে কতটুকু রূপ পাবে? কিংবা ভারত ও চীন তাদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে কতটুকু কাছাকাছি আসতে পারবে?

চীনের বিশ্বদর্শন কিংবা দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও ভারত এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছে। চীন তার 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড'-এর যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, ভারত তা সন্দেহের চোখে দেখছে। এর বিকল্প হিসেবে ভারতের নিজস্ব চিন্তাধারা হচ্ছে- প্রাচীন 'কটন রুট'কে পুনরুজ্জীবিত করা, সেই সঙ্গে 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি'তে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ভারত একই সঙ্গে Quadrilateral Security Dialogue (অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র অপর সদস্য) এরও অংশীদার। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের সামরিক অংশগ্রহণ চীনের প্রতি সরাসরি এক ধরনের চ্যালেঞ্জের শামিল। পর্যবেক্ষকরা অনেক দিন ধরেই ভারত মহাসাগরবর্তী অঞ্চলে এক ধরনের চীন-ভারত দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করে আসছেন। এ অঞ্চল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা যে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর আশঙ্কা করছেন, তা শুরু হতে পারে ভারত মহাসাগরে প্রভাববলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এ ক্ষেত্রে চীন অনেকটা একা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত মৈত্রী চীনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব কোনদিক যায়, সেদিকে লক্ষ্য আছে অনেকের। বলতে দ্বিধা নেই, বেশ কিছু ইস্যুতে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব বর্তমান। ২০১৭ সালের দোকলাম ঘটনায় এই দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে এই উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পায়। অরুণাচল প্রদেশের ওপর থেকে চীন তার দাবি পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেনি। কাশ্মীর প্রশ্নেও ভারতের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান। ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের অন্যতম দাবিদার। কিন্তু চীনের এখানে আপত্তি রয়েছে। ভারত পারমাণবিক শক্তি ও পারমাণবিক সাপ্লাইয়ার্স গ্রুপের সদস্য হতে চায়। এখানেও আপত্তি চীনের। ভারত-চীন বাণিজ্য সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়েছে; কিন্তু তা ভারতের প্রতিকূলে। অর্থাৎ চীন ভারতে রফতানি করে বেশি, ভারত থেকে আমদানি করে কম (চীনে ভারতের রফতানি ১৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার আর চীন থেকে আমদানি ৬৮.০৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭)। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনের প্রভাব ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। শ্রীলংকায় (হামবানতোতা গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি) কিংবা মালদ্বীপে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ভারত তার নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। এ কারণেই বাংলাদেশে সোনাদিয়ায় চীন যে গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তা ভারতের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত চুক্তিটি আর বাংলাদেশ সই করেনি। যদিও চীনের জন্য সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। চীন বিকল্প হিসেবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে Kyaukphyuতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা জ্বালানি তেল এই বন্দরে খালাস করে তা সড়ক ও রেলপথে ইউনান প্রদেশে নিয়ে যাচ্ছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মিত হলে চীন বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরটি (সড়কপথ) ব্যবহার করে তার পণ্যের রফতানি অতি দ্রুততার সঙ্গে এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারত। বাংলাদেশ পিছিয়ে যাওয়ায় বিসিআইএমের আওতায় যে সড়কপথ নির্মিত হওয়ার কথা ছিল, তাতেও এসেছে এক অনিশ্চয়তা। এদিকে নেপালে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ভারতকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ভারতের ওপর নেপালের নির্ভরশীলতা এবং এই নির্ভরশীলতা ভারত তার নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে নেপাল ধীরে ধীরে চীনের দিকে ঝুঁকছিল। ভারত অতীতে একাধিকবার নেপালে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে সংকট তৈরি করেছিল। নেপালের বিপুল অর্থনৈতিক চাহিদা নেপালকে চীন-নেপাল অর্থনৈতিক করিডোর গঠনে উৎসাহিত করেছিল। এই অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় লাসা (তিব্বত)-খাসা ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ভারতের ওপর থেকে নেপাল তার নির্ভরশীলতা অনেক কমাতে পারবে। আরেকটি পরিকল্পনা হচ্ছে- চীনের কিনঘি (Qinghi) প্রদেশের গলমুদের (Golmud) সঙ্গে তিব্বতের লাসা রেল সংযোগ স্থাপন। এতে করে তিব্বতকে চীনের অর্থনীতির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে নেপালও সুবিধা পাবে। চীন নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহায়তা করছে এবং দেশটিকে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাও দিয়েছে। নেপাল চীনের ওবিওআর (OBOR) মহাপরিকল্পনায়ও যোগ দিয়েছে। ভুটানেও চীনের প্রভাব বাড়ছে। চীনের সঙ্গে ভুটানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেখানে ভারতের প্রভাব বেশি। দোকলাম নিয়ে সীমান্ত সমস্যা (ভুটানের সঙ্গে) কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। এটা ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টরা খুব ভালো চোখে নেবেন না। সুতরাং একটা প্রশ্ন থাকবেই, 'চেন্নাই কানেক্ট' দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবে কি-না? নাকি শুধুই একটি 'ফটোসেশন'?
ভারত ও চীন দুটিই বড় অর্থনীতির দেশ। ২০৩০ সালে ২২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে চীনের (২০৫০ সালে পিপিপিতে এটা গিয়ে দাঁড়াবে ৫৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে)। তখন বিশ্বের ১ নম্বর অর্থনীতি হবে চীনের। অন্যদিকে ২০৩০ সালে ভারতের অর্থনীতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫.৬ ট্রিলিয়ন ডলার (তৃতীয়) আর পিপিপিতে ২০৫০ সালে এটা গিয়ে দাঁড়াবে ৪৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার (দ্বিতীয়)। পিপিপিতে (২০১৬) চীনের অবস্থান দেখানো হয়েছে প্রথম আর ভারতের তৃতীয়। যদিও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে চীন কিছুটা পিছিয়ে আছে। যেখানে (২০১৮) চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৯, সেখানে ভারতের ৭.৩। এই দুটি দেশে রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ভারত এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে কিছুটা। সুতরাং প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা বদলে দেবে পুরো বিশ্বকে।
কিন্তু দেশ দুটি যদি তাদের আগ্রাসী মনোভাব অব্যাহত রাখে, তাহলে সম্পর্ক উন্নত হবে না। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিয়ে এক ধরনের Containtment Policy অবলম্বন করছে। অর্থাৎ চীনকে দুর্বল করা। একসময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে এই Containtment Policyঅবলম্বন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন দৃশ্যপটে আছে চীন। এ ক্ষেত্রে ভারত বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার রয়েছে স্ট্রাটেজিক্যাল অ্যালায়েন্স। এই স্ট্র্যাটেজিক্যাল অ্যালায়েন্স যদি চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হয়, তাহলে চেন্নাই কানেক্ট কাজ করবে না। এখন দেখার পালা, এই সম্পর্ক আগামী দিনে কোন দিকে যায়
Daily Samakal
15.10.2019

একজন শিক্ষকের প্রতিবাদ

Image result for A teachers protest in Rajshahi University on 2 October


একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছবি ছাপা হয়েছে গত ৩ অক্টোবর দৈনিক দেশ রূপান্তরের পাতায়। হাতে লেখা একটি প্ল্যাকার্ড, তাতে লেখা ‘দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই। শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে থাকতে চাই।’ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. ফরিদ খান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাবও তিনি দেননি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ! সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য, কোটি টাকার ঈদ-সালামি, নারী কেলেঙ্কারি ইত্যাদি নিয়ে যখন পত্রিকার পাতাগুলো সরগরম, তখন ড. ফরিদ খানের এই নীরব প্রতিবাদ আমাকে অবাক করেনি। কেননা, আমি জানি এই নীরব প্রতিবাদ আদৌ কোনো ফল বয়ে আনবে না। ড. ফরিদ যখন নীরব প্রতিবাদ জানান, তখন একই সময় একাধিক ভিসি সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদ ছাপা হয়েছে। খোদ রাবির উপ-উপাচার্য সম্পর্কে নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে তার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, যেখানে উপ-উপাচার্যকে বলতে শোনা গেছে, ‘তোমরা কয় টাকা দেওয়ার জন্য রেডি এই বাক্যটি। উপ-উপাচার্য কথা বলছিলেন চাকরিপ্রত্যাশী জনৈক প্রার্থীর স্ত্রীর সঙ্গে। একটি সংবাদপত্র আমাদের জানাচ্ছে, ‘দুই লাখ টাকার ব্যাংক রসিদ উপ-উপাচার্যের ভাগনেকে পাঠান উক্ত চাকরিপ্রত্যাশী’ (আমাদের সময়, ৩ অক্টোবর)। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের  উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ করার অভিযোগ তুলেছেবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। তাদের অভিযোগ, উপাচার্য অবলীলায় ভর্তি-বাণিজ্যের কালিমা লেপন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ঢাকায় হস্তান্তর করেছেন এমন অভিযোগ শিক্ষক সমিতির (ডেইলি ক্যাম্পাস, ৩ অক্টোবর)। সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে একটি শ্বতপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ৫৩টি। নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদত্যাগ করেছেন এ খবর কিছুটা পুরনো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতাদের দুই কোটি টাকা ঈদ-সালামির অভিযোগ থাকলেও তা প্রমাণ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগটি অভিযোগ আকারেই রয়ে গেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১৪ জন ভিসির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে ইউজিসি (জাগো নিউজ, ২২ সেপ্টেম্বর)। এর মধ্যে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা, রোকেয়া ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী দেখে এদের মনোনয়ন দিয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়েছিল? এদের আয়-সম্পত্তির হিসাব কী এনবিআর খতিয়ে দেখবে? যুবলীগ নেতাদের যদি আমলনামা নেওয়া হয়, যদি তাদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত ভিসিদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হবে না কেন? দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাউকে তিনি ছাড় দেবেন না। একজন প্রধানমন্ত্রী কত সাহসী হলে নিজ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে র‌্যাবকে নির্দেশ দেন। অন্যায় আর দুর্নীতি, যারা যারা করবে তাদের কারও মাফ নেই। এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সর্বত্র পরিচালিত হোক। যারা ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে, দলের নাম ভাঙিয়ে দিব্যি আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন, তাদেরও আনা হোক আইনের আওতায়। আওয়ামী লীগ এই দুর্নীতিবাজদের ধারণ করতে পারে না। ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সবাই আজ অভিযোগের কাঠগড়ায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে মালয়েশিয়ায় ‘দ্বিতীয় হোম’ বানাবেন, ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে ঢাকায় বসে গার্মেন্ট ব্যবসা করবেন, এনজিও চালাবেন, সকালের ফ্লাইটে ক্যাম্পাসে গিয়ে বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসবেন এগুলোও অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ ধরনের অন্যায় করবেন, এটা সত্যিই দুঃখজনক। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিলে, এরা এভাবেই পার পেয়ে যান। দুঃখ লাগে যখন দেখি দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়া অধিকাংশবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন একটা সোচ্চার নন। শিক্ষকরা পদোন্নতির নীতিমালা নিয়ে যতটুকু সোচ্চার হয়েছেন, উপাচার্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা তেমন সোচ্চার হননি। শিক্ষকরা জাতীয় আদর্শ। তারা যদি তাদের সহকর্মীদের (উপাচার্যরা তো তাদের সহকর্মীই) বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হন, তাহলে ভবিষ্যতে তারা আর কোনো সম্মান নিয়ে সমাজে বাস করতে পারবেন না। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবলিক) সংখ্যা এখন ৪৫টি। শিক্ষামন্ত্রী তার নিজ জেলা চাঁদপুরে একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিত হয়েছে। আমার নিজের জেলা পিরোজপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলার মন্ত্রী। এসব বিশ্ববিদ্যালয় আদৌ শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারবে কি না এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তবে ভয়টা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ তথা নির্মাণকাজে যে দুর্নীতি হয়, তা আমরা বন্ধ করব কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এখন শতকোটি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকার এ ক্ষেত্রে উদার। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু  বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক ও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য হিসেবে আমি কিছু সুপারিশ রাখতে চাই, যা  বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় কর্মকাণ্ডে যিনি সম্পৃক্ত তাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করবে। সেখান থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। উপাচার্যরা হবেন শুধু এক টার্মের জন্য। নিজ বিশ^বিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের অলিখিত বিধান বদলাতে হবে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি করেই শিক্ষকরা উপাচার্য হন। ফলে শিক্ষক রাজনীতি করতে গিয়ে তারা একটা ‘বলয়’ তৈরি করেন। আর ওই বলয়ের কারণেই উপাচার্য ‘বিশেষ গোষ্ঠীর’ কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে যান এবং ওই সুবিধাভোগীদের স্বার্থে কাজ করেন। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির মতো একটি কমিশন গঠন করতে হবে। তিন পর্বের নিয়োগ প্রক্রিয়া সমর্থনযোগ্য। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা বোর্ড গঠন করতে হবে। ওই বোর্ডে একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। এই কমিশন ইউজিসির বাইরে কাজ করবে। অথবা ইউজিসির অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডার পেতে হবে। ওই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি থাকা মানেই হচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপের পক্ষ হয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের
কিছু কিছু শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো গবেষক প্রতিষ্ঠানে এবং টিভিতে, ‘পূর্ণকালীন’ কাজ করেন। পৃথিবীর কোথাও এমনটি চিন্তা করা য্বিশ বিশ্ববিশববিদ্যালয় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা এ কাজটি করেন। জাবির উপাচার্য সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপ-উপাচার্য  বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন এবং বেশি সময় দেন। এটা তিনি পারেন না। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। এটা তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়েরগুলো এক ধরনের ‘সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়ম ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে, যারা সরকারকে সুপারিশ করবে। ইউজিসির পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। তিনি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন। একজন সাবেক বিচারপতি এর নেতৃত্ব দেবেন। সাবেক উপাচার্য অথবা মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানরা এর সদস্য হতে পারেন। শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে তাতে তিনি সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যে অনুষ্ঠানে এই বক্ত ব্য দেন ওই অনুষ্ঠানে এমন একজন উপাচার্য বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা দিয়ে ধানমণ্ডিতে জমি কিনে উপাচার্য ভবন নির্মাণ করার দুর্নীতির অভিযোগে আছে। সরকারের অডিট আপত্তি উঠেছে বলে দৈনিক বণিক বার্তা আমাদের জানিয়েছিল। উপাচার্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের নানা অভিযোগ ড. ফরিদকে বিক্ষুব্ধ করে তুলবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি সবার মতো বক্তৃতা দিয়ে মাঠ গরম করেননি। আমার অবাক লাগল, যখন দেখলাম তার সহকর্মীরা কেউই তার পাশে এসে দাঁড়ালেন না! শিক্ষকরা নিজেদের মানমর্যাদা নিয়ে যখন সচেতন হন না, তখন এর চেয়ে আর দুঃখ কিছু থাকতে পারে না। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে মিডিয়ায়। তার মতে, ‘আলোর পরিবর্তে অন্ধকার নামছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়’ (দেশ-বিদেশে, ২৯ সেপ্টেম্বর)। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রধানমন্ত্রী তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন। তার এই বক্তব্য ধরে প্রধানমন্ত্রী কী কোনো উদ্যোগ নেবেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে? যেসব উপাচার্য আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেবেন? দলীয় কর্মীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে (ক্যাসিনোর ঘটনায়) তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অতীতে কেউ এমনটি করেননি। এখন সব উপাচার্যের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন।
এভাবে অভিযুক্ত ভিসিরা যদি পার পেয়ে যান, তাহলে আগামী দিনের ভিসিরাও এ ধরনের অন্যায় কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবেন। একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়কে ডেকে আনবে। এদিকে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, ‘জাবি ভিসির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি হচ্ছে না’ (ভোরের কাগজ, ৩ অক্টোবর)। যেখানে ভিসি নিজে চাচ্ছেন একটি তদন্ত কমিটি করে তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হোক, কিংবা যেখানে শিক্ষকরা তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে তার অপসারণ দাবি করেছেন, সেখানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। উপাচার্যের ব্যক্তিগত স্বার্থে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে এটি করা উচিত। তার বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছে কি না এটাও আমাদের জানা দরকার
Daily Desh Rupantor
10.10.2019