রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

ভারতীয় নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক কার্ড



অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়ে এবারের ভারতের লোকসভা নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক কার্ডটি ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্বাচনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি, কিংবা বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা মুসলমান তথা বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে আবার ভারতের মতো একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছেন। তাদের এই বক্তব্য খোদ ভারতেই, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো কিংবা খুলনা থেকে সিলেট পর্যন্ত জমি ফেরত চাওয়া (সুব্রামানিয়াম স্বামী)- বিজেপি নেতাদের এই বক্তব্য 'দাঙ্গা লাগানোর ফন্দি' হিসেবেই অভিহিত করেছেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মমতা মোদিকে এটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি যে তিনি নিজেও বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। এটা স্পষ্ট যে মোদি 'হিন্দুত্ব' কার্ডটি ব্যবহার করছেন শুধু ভোট পাওয়ার আশায়। ইতোমধ্যে শিক্ষক হিন্দু পরিষদের নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়ার বিরুদ্ধে এফআইআর (ঋওজ) দায়ের করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তোগাড়িয়া হিন্দু এলাকায় মুসলমানদের হিন্দু সম্পত্তি ক্রয় না করার হুমকি দিয়েছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে বিজেপির এ সাম্প্রদায়িক কার্ড দলটির জনপ্রিয়তা খুব একটা বাড়াতে পারেনি। ৫৪৩ আসনে সরকার গঠনের জন্য সরকার ২৭২টি আসন বিজেপি বা এনডিএ জোট তা পাচ্ছে না। তবে নিঃসন্দেহে বিজেপি জোট লোকসভায় অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। একমাত্র আঞ্চলিক দলগুলো যদি বিজেপিকে সমর্থন করে, তাহলেই বিজেপির পক্ষে সরকার গঠন করা সম্ভব। তবে এটা সত্য, বিজেপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বাবরী মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ ও কাশ্মীরকে দেয়া সংবিধানে বিশেষ অধিকার খর্ব করার ঘোষণা করায় ভারতে মুসলমানরা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছেন। ভারতে ১৮ কোটি মুসলমানের বাস। পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশ সর্বত্র মুসলমানরা মূল রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়। এখন স্বয়ং মোদির সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা তাদের এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেবে।
স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দু উগ্রবাদীরা ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উগ্রবাদী হিন্দুরা সেখানে তাদের কল্পিত দেবতা রামের মন্দির নির্মাণ করতে চায়। বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন সহস্রাধিক ব্যক্তি। এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল সারা মুসলিম বিশ্বে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এর প্রতিবাদে হরতাল হয়েছিল। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়ে এ ধরনের ঘটনাকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ভারতব্যাপী এর যে প্রতিবাদ হয়েছিল, তাতে ভারত সরকার তখন আরএসএস, ভজরং, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ইসলামী সেবক সংঘ ও জামায়াতে ইসলামীকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসীমা রাও। তিনি বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে পারেননি। মথুরার ঈদগা মসজিদ নিয়েও হিন্দুরা আদালতে মামলা ঠুকেছিল। আজ বিজেপি আবার রামমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এতদিন সেখানে যে স্থিতিশীলতা বজায় ছিল, তা একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিল। কাশ্মীরের প্রসঙ্গ তুলে অযথাই বিজেপি বিতর্ক সৃষ্টি করল। অনেকে মনে করতে পারেন ভারত সংযুক্তির সময় কাশ্মীরিদের একটি স্বতন্ত্র সত্তার মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব কখনই কার্যকর হয়নি। ধীরে ধীরে সংবিধানের সেই ধারা (ধারা ৩৭০) সংশোধন করা হয়েছিল। এখন বিজেপি এ ধারাটিও তুলে দিতে চায়।
বিজেপির ইশতেহারে যেসব উগ্রবাদী কথাবার্তা বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে বিজেপি ধর্মকে ব্যবহার করছে। তারা এটা বলেছে, বিজেপি ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চেয়েছে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি নেতাদের 'হিন্দু কার্ড' ব্যবহার করা, কিংবা বাংলাদেশ বিরোধী দু'একটি বক্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন। একটি বিজেপি জোট যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে এ সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নত হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ইতোমধ্যে। কেননা বেশকিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আটকে আছে। তিস্তার পানিচুক্তি ও সীমান্তচুক্তির ব্যাপারে বিজেপির অবস্থান আমরা মোটামুটি জানি। চূড়ান্ত বিচারে নরেন্দ্র মোদিকে যদি মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সরকার গঠনের প্রশ্নে কোনো 'কমপ্রোমাইজ' করতে হয়, তাহলে মোদি মমতার সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন না। এতে তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি চলে যাবে 'ডিপ ফ্রিজে'। আন্তঃনদী সংযোগের কথাও তিনি বলেছেন। সীমান্তচুক্তির ব্যাপারেও বিজেপির প্রচ- আপত্তি রয়েছে। বিজেপির বিরোধিতার কারণেই কংগ্রেস সরকারের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। চুক্তিটি ভারতীয় মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল। একটি বিল লোকসভায় উপস্থাপিতও হয়েছিল। কিন্তু বিজেপির আপত্তির কারণে এটা নিয়ে আর আলোচনা হয়নি। তখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে, এটা আমার মনে হয় না। এর বাইরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ট্রানজিট প্রশ্নে দু'দেশের মধ্যে আস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, সে ব্যাপারে নয়া সরকার কোনো উদ্যোগ নেবে বলে মনে হয় না। আমাদের পররাষ্ট্র সচিব মার্চের শেষের দিকে নয়া দিলি্ল গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নির্বাচনের আগে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব যখন নয়া দিলি্ল যান, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি যাচাই করছে। স্পষ্টই তিনি কোনো সুখবর নিয়ে আসতে পারেননি। এটা মোটামুটিভাবে আমরা সবাই জানি কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ বেশকিছু চুক্তি করেছে। ভারত গেল পাঁচ বছর বাংলাদেশের কাছ থেকে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সে অর্থে তেমন সুবিধা পায়নি। তখন নয়া দিলি্লতে সম্ভাব্য একটি মোদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের 'সম্পর্ক' কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়_ তা দেখার বিষয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করেই বলা যায় জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ভারতের নীতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যে খবর বের হয়েছে যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোর পেতে যাচ্ছে ভারত। অরুণাচল থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ যাবে বিহারে। একই সঙ্গে চলতি বছরেই বহুল বিতর্কিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারত। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং সম্ভাব্য একটি মোদি সরকার এসব প্রকল্প বাতিল করবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ এখন তার স্বার্থ আদায়ে কতটুকু উদ্যোগ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে চূড়ান্ত বিচারে মোদি ক্ষমতা পেলেও, অনেক কিছুই তার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। কেননা সরকার গঠন করতে হলে তাকে আঞ্চলিক দলগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো এক ধরনের 'চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স' হিসেবে কাজ করবে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেক কথা বলতে হয়। বিজেপিও বলেছে। ভারত একটি বিশ্বশক্তি হতে চলেছে। ২০৩০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান হবে দ্বিতীয়। ভারত জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের সদস্য হতে চায়।
ভারতের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিশ্বের জন্যই একটি মডেল। সুতরাং নরেন্দ্র মোদি ইচ্ছা করলেও অনেক কিছু করতে পারবেন না। তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ব্যাপারে ভারতের মনোভাবের পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। নানা কারণে মোদি ম্যাজিক ভারতব্যাপী একটি ঢেউ তুলেছে। এই ঢেউ শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদিকে নয়া দিলি্লর ৭ নাম্বার রেসকোর্স রোডে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবনে নিয়ে যায় কিনা, তাই দেখার বিষয় আমাদের। কিন্তু বিজেপির সাম্প্রদায়িক কার্ড আমাদের জন্য নতুন করে একটা শঙ্কা তৈরি করল।
গত প্রায় ১৫-১৬ বছর আমরা পুশব্যাকের ঘটনার সঙ্গে পরিচিত নই। অর্থাৎ তথাকথিত বাংলা ভাষীদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করার ঘটনা ঘটেনি। এখন নয়া দিলি্লতে একটি নয়া সরকার দায়িত্ব নিলে এ পুশব্যাকের প্রবণতা বাড়তে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে চলছে। সর্বশেষ আজ (১২ মে) শেষ দফার নির্বাচন। আজ উত্তরপ্রদেশে ভোটগ্রহণ হবে। লোকসভা নির্বাচনের জন্য উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। এখানে ৮০টি আসন। নরেন্দ্র মোদি এ উত্তরপ্রদেশের বারানসিতে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়েছেন। বোঝাই যায় হিন্দু মন্দির আর ধর্মীয় স্থানে তার প্রার্থী হওয়ার অর্থ তিনি 'হিন্দু কার্ড' তার স্বার্থে ব্যবহার করতে চান। যদিও ধারণা করা হচ্ছে তার আসনে আম আদমি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রার্থী হওয়ায় তার বিজয় তত সহজ হবে না। গেল নির্বাচনে বিজেপি উত্তরপ্রদেশে মাত্র ১১টি আসন পেয়েছিল। ১৬ মে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তখনই বোঝা যাবে কে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন সেখানে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে 'সাম্প্রদায়িক কার্ড' ভোটারদের কতটুকু প্রভাবিত করতে পারবে, তাই দেখার বিষয়। 

ইউক্রেন :পরাশক্তির 'প্রক্সিওয়ার'


ইউক্রেন সংকটকে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে এক 'ধরনের' প্রক্সিওয়ার' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ক্রিমিয়ায় গণভোট (১৬ মার্চ) কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযুক্তির পর ধারণা করা হয়েছিল, ইউক্রেন সংকটের সাময়িক অবসান হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তে একই ঘটনা ঘটল। রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পূর্বাঞ্চলের বেশ ক'টি শহর দখল করে নিয়েছিল। এরপর বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। ইউক্রেনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎখাতের জন্য সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া সীমান্তে হাজার হাজার সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে ও সীমান্তে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোতে ৬০০ সেনা পাঠিয়েছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে আগামী ২৫ মে ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ইউক্রেনের পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিল হচ্ছে। নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছে, যাকে অভিহিত করা হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ-২ হিসেবে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এই অঞ্চলে এক ধরনের উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ, বিশেষ করে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে ন্যাটোর সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এবং রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার সুদূরপ্রসারী মার্কিন চক্রান্তের কারণে এ অঞ্চলে উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ জর্জিয়া ও ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। ২০০৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার সীমিত যুদ্ধের (ওসেটিয়া প্রশ্নে) কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। 'ব্লাক সি'র অপর পাশের দেশগুলো (বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, রুমানিয়া) ইতিমধ্যে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে। তুরস্ক ও গ্রিস আগে থেকেই ন্যাটোর সদস্য। জর্জিয়া ও ইউক্রেন এখনও ন্যাটোর সদস্য নয়। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, ইউক্রেন সংকটের জন্ম হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের উৎখাতের মধ্য দিয়ে। গণঅভ্যুত্থানে তিনি উৎখাত হলেও অভিযোগ আছে, তার উৎখাতের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। রুশপন্থি এই নেতা ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তারপর ঘটল ক্রিমিয়ার ঘটনা। ক্রিমিয়ার ঘটনায় রাশিয়াকে জি-৮ থেকে বহিষ্কার ও দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নের সমাধান এখনও হয়নি, তা হচ্ছে রাশিয়াকে বয়কট করে পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাবে কীভাবে? সেনাবাহিনী পাঠিয়ে, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বটে, কিন্তু পুরো ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে? কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করার। কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে? পাঠক মাত্রেই জানেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে সমগ্র পূর্ব ইউরোপ, যে দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাবে ছিল, তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তারা পরিপূর্ণভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের রিজার্ভ হচ্ছে রাশিয়ায়। মূলত তিনটি পথে এই গ্যাস যায় ইউরোপে। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্লকে ছিল, তারাও এখন জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। তিনটি পাইপলাইন, নর্ড স্টিম পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বছরে ৫৫ বিলিয়ন কিউসেক মিটার (বিসিএম), বেলারুশ লাইনে সরবরাহ করা হয় ৩৬ বিসিএম, আর ইউক্রেন লাইনে সরবরাহ করা হয় ১০৭ বিসিএম। এখন ইইউর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া যদি এই সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়বে ইউরোপ। যদিও রাশিয়ার বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এই গ্যাস বিক্রি। এটা সত্য, রাশিয়া অত্যন্ত সস্তায় বেলারুশ ও ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দেশ দুটি আবার রাশিয়ার গ্যাসের রিজার্ভ গড়ে তুলে সরাসরি পশ্চিম ইউরোপে তা বিক্রি করে কিছু আলাদা অর্থ আয় করে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৯ সালে ইউক্রেন ও বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হয়েছিল 'গ্যাসওয়ার' অর্থাৎ গ্যাসযুদ্ধ। ইউক্রেনে অত্যন্ত সহজ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করত রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেন অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইউরোপে একটি সংকট তৈরি করে। শুধু গ্যাস নয়, রাশিয়া বেলারুশকে সস্তা দামে তেলও দেয়। ওই তেল আবার বেলারুশ অধিক মূল্যে ইউরোপে বিক্রি করে। Druzhba অথবা Friendship পাইপলাইনের মাধ্যমে এই গ্যাস ও তেল সরবরাহ করা হতো।

বেলারুশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়েছিল। তারা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। রাশিয়া পাইপলাইনে গ্যাস ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন আঙ্গিকে এই গ্যাসওয়ার শুরু হওয়ার একটি সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা 'গ্রাসপ্রোম' ইউক্রেনের কাছে পাবে ২ বিলিয়ন ডলার। এই টাকা ইউক্রেন পরিশোধ করতে পারছে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নামে আইএমএফের কাছ থেকে যে বিলিয়ন ডলার অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তাতে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে সমগ্র ইউরোপে (সমগ্র ইইউর গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ জোগান দেয় রাশিয়া। আর জার্মানির দেয় ৪০ ভাগ)। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের ২২ বছর পর নতুন করে আবার দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাশিয়া চায় এ অঞ্চলের ওপর তার যে পরোক্ষ প্রভাব তা বজায় রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে রাশিয়ার এই প্রভাব কমাতে। ফলে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন করে একটি প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা অর্থহীন। রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়েই ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ন্যাটোতে রাশিয়ার পরামর্শকের ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২৭ মে প্যারিসে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সেই সঙ্গে ন্যাটো সদস্যভুক্ত অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধানরাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়াকে একটি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অনেকটা সেই 'কনটেইনমেন্ট থিউরি'র মতো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণসাগর বা ব্লাক সির পশ্চিমে রুমানিয়ার মিখাইল কোগালনাইসেআনুতে রয়েছে ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। আফগানিস্তানে সেনা ও রসদ সরবরাহের জন্য এই বিমান ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। গত বছর কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই চাইছে জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগ দিক। এটা যদি হয় তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে মার্কিন সেনাবাহিনী। রাশিয়ার সমরনায়করা এটা মানবেন না। আজকে ইউক্রেনের পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, এ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন সবকিছুতে ক্রমশই মার্কিনি স্বার্থ স্পষ্ট হচ্ছে।

এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলকৃত পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেন সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। রাশিয়ার প্রবল আপত্তির মুখে এই অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৭ এপ্রিল সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুধু পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওডেসায় কমপক্ষে ৩৬ জন নিহত হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের আরেকটি শহর ক্রামাটোরস্কে ঘরে ঘরে লড়াই চলছিল। এই 'গৃহযুদ্ধ' শুধু যে ইউক্রেনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা বলা যাবে না। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন পর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা প্রক্সিওয়ারের জন্ম দিয়েছে। এই যুদ্ধে কোন পক্ষ জয়ী হবে, এটা আশা করাও ঠিক হবে না। বরং এই উত্তেজনা বিশ্বের অন্য দেশগুলোও আক্রান্ত হতে পারে।
Daily SOMOKAL
08.05.14

টিকফা, জিএসপি ও কিছু মৌলিক প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত যা প্রত্যাশা করেছিলাম, তা-ই হয়েছে। বহুল আলোচিত টিকফা ফোরামের প্রথম বৈঠকে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা দিলেন না মার্কিন কর্মকর্তারা। টিকফার ব্যাপারে বছরে একবার দুপক্ষ আলোচনায় বসবে এবং সেটাই হল। আলোচনা হল। আলোচনার কোনো এক পর্যায়ে জিএসপি নিয়ে কথা হল। কিন্তু তাতে সাড়া দিলেন না মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতারা। বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু ফলাফলটা শূন্যই রয়ে গেল। টিকফা নিয়ে একটি বিতর্ক বাংলাদেশে আছে। প্রথমত, গেল বছরের ২৫ নভেম্বর টিকফা স্বাক্ষরিত হয়। অথচ সেটা ছিল সরকারের শেষ সময়। সাধারণত সরকারের শেষ সময়ে এসে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। কিন্তু সরকার সেটা করেছিল। সুতরাং সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত, যাতে জাতি সবকিছু জানতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা জানতে পারলাম না টিকফার বিস্তারিত তথ্য। যদিও মার্কিন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত তথ্য আছে, কিন্তু তা বিস্তারিত নয়। তৃতীয়ত, টিকফা নিয়ে একটা বড় অভিযোগ হচ্ছে এ চুক্তিটি সংবিধান লংঘন করেছে। সংবিধানের ১৪৫ ধারার ক-তে বলা হয়েছে, বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে। সংসদে টিকফা পেশ করা হয়নি। যদি ধরে নেই জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু এ চুক্তিতে রয়েছে এবং সে কারণেই চুক্তিটি সংসদে পেশ করা হয়নি (?), তাহলেও একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। কেননা চুক্তিটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় এবং তাতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো রক্ষাকবচ আছে বলে আমার মনে হয়নি। তবে এটা সত্য, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে টিকফাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিল। এটি এখন কোন পর্যায়ে আছে, তা আমি বলতে পারব না। তবে এটা বলতেই হবে, সরকার খুব তড়িঘড়ি করে এ চুক্তিটি করেছে। এর পেছনে সরকারের কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একটি উদ্দেশ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শুল্ক সুবিধা আদায় করা। অর্থাৎ জিএসপি সুবিধা (তৈরি পোশাকে) নিশ্চিত করা। কিন্তু এ সুবিধা না পাওয়ায় এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম টিকফা ফোরামের প্রথম বৈঠকের পরও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেল। তাহলে কি প্রশ্ন উঠবে না যে, টিকফা স্বাক্ষর করে আমরা খুব লাভবান হইনি! যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মাঝে আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই ০.৫ ভাগ পণ্যে, অর্থের হিসাবে এর পরিমাণ ২৬ মিলিয়ন ডলার। আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, খেলনা প্রভৃতি পণ্যে। অথচ এসব সেক্টরে খুব কম পণ্যই আমরা যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করি। আমাদের পণ্যের বড় বাজার তৈরি পোশাকের। এ খাতে আমাদের রফতানি বেড়েছে ১২ ভাগ হারে। শতকরা ১৫ দশমিক ৬২ ভাগ হারে শুল্ক দিয়ে আমরা তৈরি পোশাকের বিশাল এক বাজার গড়ে তুলেছি যুক্তরাষ্ট্রে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ৫ বছরে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পে শুল্ক দেয়া হয়েছে ৩ মিলিয়ন ডলার। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে একটা তথ্য আমাদের দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তুলনামূলক বিচারে অন্যান্য শিল্পোন্নত তথা মধ্যম সারির উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি শুল্ক দেয়। যেমনÑ মার্কিন বাজারে পণ্য পাঠাতে ভিয়েতনাম শুল্ক দিচ্ছে ৮.৩৮, ইন্দোনেশিয়া ৫.৩০, তুরস্ক ৩.৫৭, চীন ৩.০৮, ফিলিপাইন ২.৯৭, ইতালি ২.৪৯, ভারত ২.২৯, থাইল্যান্ড ১.৭৯, স্পেন ১.৭৭ ভাগ ইত্যাদি। এখানেও এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। পোশাক শিল্পে ইন্দোনেশিয়া, চীন কিংবা ভিয়েতনাম, ভারত আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব দেশ যে পরিমাণ শুল্ক দেয় বলা হচ্ছে, তা কি শুধু পোশাক শিল্পের জন্য? নাকি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? সাংবাদিকরা এ প্রশ্ন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানিকে। তিনি বলেছেন, টিকফার আওতায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চীন, হংকং কিংবা ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি শুল্ক দেয়Ñ এটা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ চীনের মতো মোস্ট ফেভারড নেশন হিসেবে সুবিধা পায়। সমস্যাটা এখানেই। বাংলাদেশ কি তাহলে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে? ডিলানি কি ভুল তথ্য দিয়েছেন? আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তির খুঁটিনাটি বড় জটিল। এগুলো বোঝার ও ব্যাখ্যা দেয়ার বিশেষজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। যে সেলটি সেখানে কাজ করে, তারাও দক্ষ নয়। যতদূর জানি, প্রতিটি পণ্যের আলাদা আলাদা শুল্ক, এমনকি তৈরি পোশাকেও হাজারটা আইটেম আছে। সব আইটেম বাংলাদেশ তৈরি করে না, রফতানিও করে না। প্রতিটি আইটেমের শুল্ক আলাদা। এক্ষেত্রে আমাদের আলোচকরা সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছেন কি-না, আমার সন্দেহ হয়। তাই মাইকেল ডিলানির বক্তব্য উল্লেখ করেই বাংলাদেশের উচিত আরএমজি (তৈরি পোশাক) খাতে অতিরিক্ত শুল্কের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। জিএসপি সুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালের হংকংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার শর্ত কার্যকর করতে রাজি হয়েছিল। এতে করে একটা ধারণার জš§ হয়েছিল যে, অনুন্নত বিশ্ব পশ্চিমা উন্নত দেশে তাদের পণ্যের আওতা বাড়াতে পারবে। তবে একটা প্রশ্ন ছিল পণ্যের মান ও উৎস নির্ধারণ নিয়ে। এ দুটি বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে। হংকং সম্মেলনের দীর্ঘ ৮ বছর পর গত বছরের ৩-৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (মন্ত্রী পর্যায়ে)। বালি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বটে, কিন্তু বালি ঘোষণায় কোন পক্ষ কী পেল, কিংবা বাণিজ্য বৈষম্যের শিকার অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন হবে কি-না, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নগুলোই আবারও উত্থাপিত হয়েছে। আমাদের জিএসপি সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাকে কোনো জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে না। তারপরও অন্যান্য পণ্যে যতটুকু সুবিধা পেত বাংলাদেশ, তাও গত জুন (২০১৩) থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার সময় যুক্তরাষ্ট্র মূলত তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এক. শ্রমমান, দুই. শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ তদন্ত ও বিচার, তিন. ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র আকার-ইঙ্গিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ রুলস অব অরিজিনের কঠিন শর্তে আটকে আছে। ধনী দেশগুলো এটা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৬১.৩ ভাগ জিএসপি সুবিধার আওতায়। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে মোট রফতানির প্রায় ৬০ ভাগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে বাংলাদেশ। বলা ভালো, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৭৮ ভাগ তৈরি পোশাক। এর ৬০ ভাগ যায় ইউরোপে আর ২৫ ভাগ যুক্তরাষ্ট্রে। তৈরি পোশাক আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস হলেও এ খাতের সঙ্গে জড়িত নানা প্রশ্নের ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা ও বক্তব্য বাংলাদেশ উপস্থাপন করতে পারেনি। দরকষাকষিতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আমাদের আমলানির্ভর মন্ত্রণালয়ের আমলারা বিদেশ সফর, সম্মেলনে অংশগ্রহণ ইত্যাদিকেই প্রাধান্য দেন বেশি। এখানে দক্ষ জনশক্তির বড় অভাব। বিজিএমইএ-ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাদের গবেষণা সেলও শক্তিশালী নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে রুলস অব অরিজিন, অ্যান্টি ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা, প্রেফারেন্স ইরোসন, শ্রমমান ইত্যাদি ক্ষেত্রে নানা টেকনিক্যাল প্রশ্ন জড়িত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়ও আমরা এসব প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে যেতে পারিনি। ঢাকায় টিকফার প্রথম বৈঠক শেষ হল। এতে আমাদের প্রাপ্তির খাতটা শূন্য। জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কমিটমেন্ট নেই। যদিও ডিলানি বলেছেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমস্যার সমাধান করাই টিকফার লক্ষ্য। এটা একটা কূটনৈতিক জবাব। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা চুক্তির ১৬ অনুচ্ছেদের সবকটির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো বিভিন্ন মহলে এরই মধ্যে উঠেছে তার কোনো সুস্পষ্ট জবাব আমরা পাইনি। যেমনÑ ১. টিকফার আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের ট্যাক্স সুবিধা দেবে। তাতে আমরা কতটুকু সুবিধা পাব? ২. যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে বাংলাদেশ। তাতে আমাদের স্বার্থ কতটুকু অর্জিত হবে? ৩. যুক্তরাষ্ট্র টেলিকমিউনিকেশন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করবে। এতে করে এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। তাতে কি সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? সেবা খাত কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? ৪. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে থাকবে। শিক্ষাখাতে সরকারি বিনিয়োগ কমবে। স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারিকরণ বাড়বে। ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। ৫. শস্যবীজ, চাল, গম ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে। আমরা একরকম জিম্মি হয়ে যাব মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে। ৬. জিএমও ফুড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশে এটি সম্প্রসারিত হবে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকব আমরা। ৭. মেধাস্বত্ব আইনের দোহাই তুলে কৃষি, ওষুধ, কম্পিউটার ইত্যাদি একতরফাভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশেষ সুবিধা ভোগ করলেও এ শিল্প এখন ঝুঁকির মুখে থাকবে। ৮৭ দেশে আমরা সস্তায় ওষুধ সরবরাহ করি। পেটেন্ট ক্রয় করে বাংলাদেশ সস্তায় ওষুধ তৈরি করে। এটা এখন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ বাজারেও ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্লোন কম্পিউটার তৈরি বন্ধ হয়ে গেলে কম্পিউটারের দাম অনেকগুণ বেড়ে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এখন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি পূরণ করতে বাধ্য। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনায় আমরা জিএসপি সুবিধার দাবি, আর জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির কারণে বিশেষ সুবিধা দাবি করেছি। কিন্তু এটা এখন স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধাকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের শ্রমমান আর পশ্চিম ইউরোপের শ্রমমান যে এক নয়, তা আমরা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের ব্যর্থতা, আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে পারিনি। সীমিত পরিসরে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকলেও তা যে শ্রমিকদের স্বার্থে ব্যবহƒত হচ্ছে নাÑ এ বিষয়টিও আমরা স্পষ্ট করতে পারিনি। তত্ত্বগতভাবে টিকফার মূল স্পিরিট হচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো। এতে পুরো লাভটা যুক্তরাষ্ট্রের। কোনো উৎপাদন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যবহƒত হবে না। অর্থাৎ মার্কিন কোম্পানিগুলো কোনো কারখানা তৈরি করছে না। তারা উৎপাদনে যাচ্ছে না। বিনিয়োগ করে লাভ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তিটা খুব বেশি নয়। টিকফা থেকে তাই আমাদের বড় কিছু পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। Daily Jugantor 06.05.14

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে

ভারতে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন ও সম্ভাব্য একটি বিজেপি সরকারকে সামনে রেখে গত ৩ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গুরুত্বপূর্ণ একটি সেমিনার। 'ভারতের নির্বাচন ২০১৪ : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক' শীর্ষক ওই সেমিনারটির আয়োজন করেছিল ঢাকার 'ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ' নামের একটি সংগঠন, যার নির্বাহী পরিচালক হচ্ছেন একজন ডেভেলপার ও রিহাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। সেমিনারটির গুরুত্ব অনুধাবন করে একাত্তর টিভি এটি 'লাইভ সম্প্রচার' করে। উদ্যোক্তারা আমাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি ওই সেমিনারে উপস্থিত থাকতে পারিনি। ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের সরাসরি উপস্থিতি, স্কাইপিতে আনন্দবাজার সম্পাদক জয়ন্ত ঘোষাল কিংবা ভারতীয় সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রির (যিনি এখন মোদির অন্যতম উপদেষ্টা) অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে এই সেমিনারটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়া যেভাবে এই অনুষ্ঠানটি 'কভার' করেছে, তাতে সন্দেহাতীতভাবে সেমিনারের গুরুত্বটি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমার কাছে একাধিক কারণে এই সেমিনারের অসম্পূর্ণতা চোখে পড়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন বেশ কয়েকজন অধ্যাপক, গবেষক, বিশ্লেষক। তাঁদের কাউকেই আমি অনুষ্ঠানে দেখলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস বিভাগে বেশ কয়েকজন গবেষক রয়েছেন, যাঁরা ভারতের ভূমিকা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁদের কাউকেই আমার চোখে পড়েনি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটা অন্যতম ইস্যু (সেমিনার চলাকালীন সময়েই খবর এসেছে ভারতের আসামে ৩২ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে)। অথচ বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে যাঁরা কাজ করেন এবং দু-একটি থিংক ট্যাঙ্ক পরিচালনা করেন, তাঁরা সবাই ছিলেন অনুপস্থিত। ভারতে বিজেপি নেতা যখন তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেন, তখন একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিষয়টি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। এমনকি তাঁরা সঠিকভাবেই ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট-করিডর বিতর্কে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কতটুকু ঝুঁকির মুখে এর একটা পরিষ্কার ধারণা দিতে পারতেন। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনীতি একটি ইস্যু। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন ভারতের পঞ্চম বাজারে পরিণত হয়েছে, তখন এই অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকে আমরা কিভাবে বেরিয়ে আসতে পারি, আমাদের করণীয় কী, তার ব্যাখ্যা দিতে পারতেন অর্থনীতিবিদরা, যাঁরা বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিন্তু একমাত্র ড. খলীকুজ্জমান ছাড়া কাউকে দেখলাম না। এবং তাঁর মুখ থেকেও শুনলাম না এ বিষয়টি। চতুর্থত, 'সব জান্তা' কিছু ব্যক্তিকে দেখলাম, যাঁরা নিয়মিত টিভি টক শোতে যান এবং সব বিষয়েই তাঁরা 'অভিজ্ঞ'। নারীনীতি থেকে শুরু করে জঙ্গিবাদ- সব বিষয়েই তাঁরা টিভিতে 'বিশেষজ্ঞ' জ্ঞান দেন। তাঁরা অনুষ্ঠানে ছিলেন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে 'বিশেষজ্ঞ' জ্ঞান দিলেন। পঞ্চমত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিষয় একটিই- ভারতের 'মাইন্ড সেটআপ'। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কোনো একজন বক্তাও এ প্রসঙ্গটির অবতারণা করলেন না। ভারতে বিজেপি কেন, একটি 'তৃতীয় শক্তি'ও যদি ক্ষমতা নেয় (আঞ্চলিক দলগুলোর নেতৃত্বে), তাহলেও বাংলাদেশকে 'সমমর্যাদা না দেওয়ার' যে মানসিকতা, তাতে পরিবর্তন আসবে না। এমনকি একটি বড় দেশের পাশে একটি ছোট দেশ থাকলে, মেদভেদেভের (রাশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী), 'জোন অব প্রিভিলেজ ইন্টারেস্ট'-এর যে তত্ত্ব, সে ব্যাপারেও 'অধ্যাপক'রা কোনো কথা বললেন না। ষষ্ঠত, বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সিনিয়র কূটনীতিক রয়েছেন, যাঁরা এখন ঢাকায় অবসর জীবন যাপন করছেন। কেউ কেউ নিয়মিত কলাম লিখছেন। তাঁদের অনেকে ভারতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন মাত্র অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকের নাম দেখলাম। বাকিদের আমন্ত্রণ জানানো হলো না কেন? সপ্তমত, বিষয়টি যেহেতু দ্বিপক্ষীয়, উদ্যোক্তারা বর্তমান কিংবা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানানো যেত। অষ্টমত, ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমাদের স্ট্র্যাটেজি কী হওয়া উচিত, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেব, সে ব্যাপারেও সুস্পষ্ট কোনো কথা আমি শুনলাম না। নবমত, বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে রামমন্দির (বাবরি মসজিদের জায়গায়) নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এটা বাংলাদেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের একটা 'ভুল মেসেজ' পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু কোনো আলোচকই এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন না জোরালোভাবে। কুলদীপ নায়ার যদিও বলেছেন, 'মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেও, তা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হবে না'। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দশমত, আলোচকরা সবাই মোদির বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বলা উচিত ছিল, ভারতে বাংলা ভাষায় কথা বললেই তারা বাংলাদেশি নয়। তারা পশ্চিম বাংলার বাঙালি। বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাদেশে 'পুশব্যাক' করা যাবে না। একাদশত, তুলদীপ নায়ার দক্ষিণ এশিয়ায় 'অভিন্ন বাজার' চালুর কথা বলেছেন। কিন্তু 'সাফটা' কার্যকর হয়নি। সার্কের অনুন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কথা, তা বাংলাদেশ ভারতে পায় না। ট্যারিফ আর প্যারাট্যারিফের কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে বাজার পাচ্ছে না। অথচ চাহিদা আছে প্রচুর। এখন 'অভিন্ন বাজার' বা দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন হলে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় পণ্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতায় আমরা আমাদের পণ্য নিয়ে দাঁড়াতে পারব না। দ্বাদশত, একজন আলোচক দুই দেশের সম্পর্ককে 'শর্ট টার্ম, লং টার্ম ও মিডিয়াম টার্ম'-এ ভাগ করার কথা বললেন। অথচ তিনি ভুলে গেছেন সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'সীমিত বা দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত' বলে কিছু নেই। আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্থায়ী। এখানে মধ্যবর্তী কোনো সমাধান নেই। ত্রয়োদশত, আলোচনায় ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রসঙ্গ এসেছে। অথচ একজন আলোচকও বললেন না, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ (জনান্তিকে ১০ লাখ) ভারতীয় অবৈধভাবে কাজ করে (গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, আইটি সেক্টরে)। তারা বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভারতে পাঠায়, তাও অবৈধভাবে। চতুর্দশত, বাংলাদেশ-ভারত মধ্যকার ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা (১১১টি ভারতীয় যা বাংলাদেশে, ৫১টি বাংলাদেশি যা ভারতে) যে মানবেতর জীবনযাপন করছে ও ভারতীয় ক্যাবিনেটে হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনুমোদিত হলেও, শুধু বিজেপির বিরোধিতার কারণে তা ভারতীয় সংবিধানের অংশ হতে পারেনি। এই 'মানবাধিকার লঙ্ঘনের' বিষয়টি সেমিনারে উচ্চারিত হলো না। পঞ্চদশত, ভারত বর্তমানে জাপানকে হটিয়ে দিয়ে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তি (২০১১)। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারত দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তখন মাথাপিছু আয় গিয়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ডলার (বর্তমানে ৯৪০ ডলার)। বিশ্ব অর্থনীতিতে তখন ভারত অবদান রাখবে ১৭ শতাংশ। এ থেকে আমরাও উপকৃত হতে পারি। এ কথাটাও কোনো আলোচক বললেন না। ষষ্ঠদশত, ভারতে দরিদ্রতা একটা প্রধান সমস্যা। ২০১০ সালে দরিদ্রতার হার ছিল ৩৭.০৫ শতাংশ, অথচ ২০০৪ সালে ছিল ২৭.৫০ শতাংশ। অর্থাৎ দারিদ্র্য বেড়েছে। সুতরাং বাংলাদেশিদের ওই দেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না কাজের জন্য। আলোচকরা বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন কি না, সেটা প্রশ্ন হয়েই রইল। সপ্তদশত, তিস্তা ও ফারাক্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প (যা মোদি সমর্থন করেন এবং বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন) কিংবা ৫৪টি নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পেল না। নিঃসন্দেহে নির্বাচন-পরবর্তী ভারতীয় সরকারের দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। মোদি সরকার গঠন করতে পারবেন না (কুলদীপ নায়ার)- এ কথাটার পেছনে যেমন সত্যতা রয়েছে, ঠিক তেমনি ভোল পাল্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছেন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং) কিংবা জয়ললিতা যে মোদিকে সমর্থন করবেন না- এটাও স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তাই আলোচকরা যখন বলেন, 'পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক জোরদার করা যেতে পারে', 'তিস্তা সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত', 'রাজনৈতিক অবিশ্বাস রয়েছে', 'নিজের' স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে ভারতকে', তখন এটা দিব্যি দিয়েই বলা যায়, এসব বক্তব্য কাগজ-কলমেই থেকে যাবে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা আমাদের সব সময় আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। মনমোহন সিংয়ের মতো একজন প্রধানমন্ত্রী যখন কথা দিয়ে যান 'কোনো সীমান্ত হত্যা হবে না', সে কথার প্রতিও সম্মান দেখায়নি ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। ভারতীয় রাজনীতিবিদরা চাইলেও(?) ভারতীয় আমলারা বাংলাদেশকে সমমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেন না। তাঁরা বাংলাদেশ থেকে কিভাবে সুবিধা আদায় করে নেওয়া যায়, সেদিকেই দৃষ্টি দেন বেশি। অথচ ভারতীয় উন্নয়ন থেকে আমরাও উপকৃত হতে পারি। আমরাও হতে পারি ভারতের উন্নয়নের অংশীদার। কিন্তু ভারতের নীতিতে, মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে মোদি কেন, তৃতীয় শক্তি হিসেবে মমতা, জয়ললিতা, মুলায়ম সিং, যিনিই প্রধানমন্ত্রী হোন বা কেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এটাই হচ্ছে আসল কথা। আইসিএলডিএসের সেমিনারের অসম্পূর্ণতা এখানেই যে এ বিষয়টি জোরালোভাবে উচ্চারিত হলো না। Daily Kalerkontho 06.05.14

টিকফা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল

গত ২৮ এপ্রিল ঢাকায় টিকফা চুক্তির প্রথম বৈঠক শেষ হওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে- এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ আদৌ রক্ষিত হবে কি-না? বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবি মেনে নেবে। কিন্তু তা হয়নি। এমনকী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাণিজ্যে বাংলাদেশ যে সুবিধাটুকু চেয়েছিল, সে ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। যখন টিকফা চুক্তির ভবিষ্যৎ একটা প্রশ্নের মাঝে থেকে গেল, ধারণা করা হচ্ছে- এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফায়দা ওঠাবে বেশি। বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। বলা ভালো গত ২৫ নভেম্বর (২০১৩) ওয়াশিংটনে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। তারা সাধারণত নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকার টিকফার মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যদিও এটা ঠিক গত ১৭ জুন (২০১৩) মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই চুক্তিটি অনুমোদিত হয়েছিল। তারপরও সরকার ৫ মাস সময় পেয়েছিল এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে। প্রশ্নটা এই কারণেই উঠেছে যে, বিগত মহাজোট সরকার জুনে নীতিগতভাবে এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও তা ওই সময়ে স্বাক্ষর করল না কেন? কেনই বা একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য সরকার অপেক্ষা করল না? আরও অবাক করার বিষয় টিকফার মতো একটি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে আদৌ আলোচনা কেন হল না? সংগত কারণেই তাই টিকফা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকবে। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকাকে এখন একটি বড় প্রশ্নের মাঝে ঠেলে দিল। যদিও আমরা লক্ষ করেছি, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এই চুক্তিকে তখন স্বাগত জানিয়েছিলেন। এখানেও একটি প্রশ্ন আছে। বিএনপির এই নেতার ‘অভিমত’ কি ব্যক্তিগত নাকি দলীয় সিদ্ধান্ত, সে ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। কেননা বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনও সভায় এই চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এ তথ্য আমার জানা নেই। তবে ইতোমধ্যে বাম সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে। সিপিবি-বাসদ ঢাকায় এই চুক্তির প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিলও বের করেছিল। তাদের অভিমত, এই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। মজার কথা, বর্তমান ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দুটি বাম দলের প্রতিনিধিত্ব (জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি) থাকলেও টিকফা চুক্তির ব্যাপারে তাদের কোনও মন্তব্য চোখে পড়েনি। চুক্তিটি সম্পর্কে আমরা যা জানতে পেরেছি তা হচ্ছে- চুক্তিটিতে ১৬টি অনুচ্ছেদ আর ৭টি আর্টিকেল রয়েছে। প্রায় ৪২টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ রকম চুক্তি রয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আমাদের জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মোজীনা আমাদের জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০টি দেশের এ রকম চুক্তি রয়েছে। তবে চুক্তির নামকরণের ব্যাপারে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে চুক্তির সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট’ শব্দটি থাকলেও বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা ওঠায় ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ শব্দটি বদলে ফোরাম শব্দটি যুক্ত করা হয়। বিভিন্ন মহল থেকে চুক্তিটির সঙ্গে জিএসপির একটা যোগসূত্র আছে বলা হলেও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের আমাদের জানিয়েছিলেন টিকফার সঙ্গে জিএসপি বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কোনও যোগসূত্র নেই। তবে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধার দাবি অব্যাহত রাখবে- এ রকমটিই জানিয়েছেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের। বলতেই হবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় তা বিতর্কের মাত্রা বাড়িয়েছে। বলা হচ্ছে- এতে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। এটা সত্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদেরও টিকফা চুক্তির ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে তখন এমন আশাও ব্যক্ত করা হয়েছিল যে, টিকফা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তা পায়নি। বলা ভালো, যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন আগে (জুন ২০১৩) কিছু পণ্যের যে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) বাংলাদেশকে দিত, তা স্থগিত করেছে। স্থগিত হওয়ার পেছনে মূল কারণটি ছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোয় শ্রমমান নিশ্চিত করার ব্যর্থতা। এমনকী আশুলিয়ায় শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, তৈরি পোশাকশিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা না করার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট ছিল। ফলে একপর্যায়ে কংগ্রেস সদস্যদের চাপের মুখে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ সরকারের একটা প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়, টিকফা চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেবে। প্রকৃতপক্ষে এর সঙ্গে টিকফা চুক্তির কোনও যোগসূত্র নেই। দ্বিতীয় আরেকটি যে বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়বে না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা চেয়ে আসছে। কিন্তু তৈরি পোশাকে আমাদের কোনও জিএসপি সুবিধা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার হচ্ছে ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের। এর মাঝে মাত্র ০.৫ ভাগ পণ্য এই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। এর পরিমাণ মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার কর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনও তার পণ্য নিয়ে টিকে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় যেসব বাংলাদেশি পণ্যে এর মাঝে রয়েছে তামাক, সিরামিক, ফার্নিচার, প্লাস্টিক, খেলনা ইত্যাদি। এর খুব কম পণ্যই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাকে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা শতকরা ১৫ ভাগ হারে শুল্ক পরিশোধ করে বাজার ধরে রেখেছে। অথচ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তি অনুযায়ী একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে তার পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা দিচ্ছে না। এই সুবিধা উন্নত রাষ্ট্রগুলো পায়। তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দোহা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। সুতরাং তৈরি পোশাকে আমরা যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা না পাই, তাহলে এই জিএসপি সুবিধা রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনও বড় অবদান রাখতে পারবে না। আজ যদি জিএসপি সুবিধার আশ্বাসে আমরা টিকফা চুক্তি করে থাকি, তাতে আমাদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। টিকফা চুক্তির সঙ্গে তাই জিএসপি সুবিধাকে মেলানো যাবে না। জিএসপি সুবিধা একটি ভিন্ন বিষয়। ঢাকার প্রথম বৈঠকে এটি আবারও প্রমাণিত হল। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে টিকফা চুক্তি করে আমরা কতটুকু উপকৃত হব। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দেশে মার্কিনি বিনিয়োগ বাড়বে- এটা সত্য কথা। এতে আমাদের বাজার, সেবা খাত উন্মুক্ত হয়ে যাবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য। ব্যাপক প্রাইভেটাইজেশন ঘটবে, তাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যক্তিগত খাত। টিকফা চুক্তির আওতায় ৫ ও ১৯ ধারা মতে উভয় দেশ (বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র) বাণিজ্যে বেশ নমনীয় নীতিগ্রহণ করবে এবং ব্যাপক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে। ৮নং ধারায় ব্যাপক ব্যক্তিগত খাত প্রসারের কথা বলা হয়েছে। এই ধারায় একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন গঠন করার কথাও আছে। এদের কাজ হবে ব্যক্তিগত খাত কীভাবে আরও বিকশিত করা যায়, সে ব্যাপারে উভয় সরকারকে উপদেশ দেওয়া। ৯নং ধারায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে কিন্তু উৎপাদন খাতে জড়াবে না। অর্থাৎ কোনও পণ্য উৎপাদন করবে না। এখানে সমস্যা হবে অনেক। এক. যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে (বিশেষ করে সেবা খাতে)। এবং ওইসব কোম্পানিকে ট্যাক্স সুবিধা দিতে হবে। আইনে যদি কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশকে সেই আইন সংশোধন করতে হবে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা মার খাবে। তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। দুই. চুক্তির ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য থাকবে। জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর ব্যবহার, টেলিকমিউনিকেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে শিক্ষা খাত পণ্যে পরিণত হবে। বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যারা ধনী, তারা শিক্ষাগ্রহণ করবে আর যারা গরিব তারা শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। একই কথা প্রযোজ্য স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্য খাতে খরচ বেড়ে যাবে। এসব সেবামূলক খাত থেকে সাধারণ মানুষ যে ‘সেবা’ পেত তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে। সেবার জন্য সাধারণ মানুষকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ গ্রাহককে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস কিনতে হবে। সরকারি ভর্তুকির কোনও সুযোগ থাকবে না। তবে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকবে কৃষি ও আইটি সেক্টর। কৃষিতে যে সরকার ভর্তুকি দেয়, তা আর দিতে পারবে না। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার দোহা চুক্তিতে বলা হয়েছিল- স্বল্পোন্নত দেশগুলো কৃষিতে ৫ ভাগের বেশি ভর্তুকি দিতে পারবে না। টিকফা চুক্তির ১৮নং ধারায় বলা হয়েছে- কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে হবে। মজার ব্যাপার, যুক্তরাষ্ট্র নিজে কৃষিতে ভর্তুকি দেয় ৯ ভাগ। এখন বাংলাদেশে কৃষি সেক্টরে ভর্তুকি কমানো হলে কৃষিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। ফলে কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে চাল উৎপাদন হ্রাস পাবে। বাংলাদেশকে এখন চাল আমদানি করতে হয় না। কিন্তু উৎপাদন হ্রাস পেলে মার্কিন কৃষিপণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা গম ও চাল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে বাংলাদেশে। তিন. বলা হচ্ছে টিকফা চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার আদৌ কোনও সম্ভাবনা নেই। কেননা অত্যন্ত উচ্চ কর দিয়ে (১৫ দশমিক ৬২ ভাগ) বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত করেছে। অথচ চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়ে কম কর দেয়, মাত্র শতকরা ৩ ভাগ। অথচ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও টিকফা চুক্তিও নেই। চার. বাংলাদেশ বড় সমস্যায় পড়বে মেধাস্বত্ব আইন নিয়ে। টিকফা চুক্তি কার্যকর হলে এই মেধাস্বত্ব আইনের শক্ত প্রয়োগ হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর, ওষুধশিল্প ও কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা। কৃষক আর বীজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বীজ কিনতে বাধ্য করা হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একসময় জিম্মি করে ফেলবে আমাদের কৃষি সেক্টরকে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প উন্নয়নশীল দেশে নাম করলেও টিকফা চুক্তির পর এই শিল্প এক ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে। কেননা ওষুধ কোম্পানিগুলো প্যাটেন্ট কিনে কাঁচামাল আমদানি করে সস্তায় ওষুধ তৈরি করে। বিশ্বের ৬০টি দেশে এই ওষুধ রপ্তানি হয়। এখন এই টিকফা চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্যাটেন্ট ক্রয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগটি রয়েছে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে মার্কিন কোম্পানির লাইসেন্স কিনতে হবে। ওই লাইসেন্স দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে হবে। ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ওষুধ ক্রয় করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের কম্পিউটার সফটওয়্যার-শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কেননা এখন স্বল্পমূল্যে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে কম্পিউটার এ দেশেই সংযোজিত হয়। ফলে কম্পিউটারের দাম একটা ক্রয়সীমার মধ্যে আছে। কিন্তু টিকফা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে এই ‘কোন কম্পিউটার’ আমদানি বা সংযোজন বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশকে তখন ব্র্যান্ড কম্পিউটার আমদানি করতে হবে, যার মূল্য গিয়ে দাঁড়াবে অনেক। সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে তা চলে যাবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল যুগের’ কথা বলছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে তখন। ইতোমধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক দুর্বল হয়েছে। টিকফার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, বিনিয়োগের গ্যারান্টি, মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ ও শ্রমমান উন্নত করার প্রশ্নটি। এই চুক্তিতে জিএসপি সুবিধার প্রশ্নটি কোথাও উল্লেখ না থাকায় আগামীতেও এই চুক্তির আওতায় জিএসপি সুবিধা চাওয়া যাবে না। জিএসপি সুবিধা চাওয়ার বিষয়টি আলোচনা করতে হবে ভিন্ন ফোরামে। ঢাকায় প্রথম বৈঠকে এটা স্পষ্ট করে দিলেন মার্কিন প্রতিনিধিরা। বিদ্যমান চুক্তিতে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবে চুক্তির পর্যালোচনা করার সুযোগ আছে। টিকফায় বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হতে পারে, সে ব্যাপারে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আলোচনায় বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার কর্মকা-ে এবং চুক্তির ব্যাপারে যারা অভিজ্ঞ, সেসব বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আমলানির্ভর অদক্ষ প্রতিনিধিদল গঠন করে দরকষাকষিতে আমরা টিকফা থেকে সুবিধা নিতে পারব না। আগামী বছর ওয়াশিংটনে পরবর্তী রাউন্ড আলোচনা শুরু হবে। এখন থেকেই প্রস্তুতিটা নিতে হবে। টিকফার প্রথম বৈঠকে আমরা মার্কিনি মনোভাব বুঝে গেছি। সুতরাং এখন থেকেই সেই আঙ্গিকে প্রস্তুতি নিতে হবে। Daily Amader Somoy 05.05.14

উদ্বেগজনক একটি সংবাদ

মার্কিন সিনেটের প্রভাবশালী এক সদস্য এবং সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রবার্ট মেনেন্দেজের একটি বিবৃতি ছাপা হয়েছে শনিবারের পত্রপত্রিকায়। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, রানা প্লাজা ধসের এক বছর পরও তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার বাস্তবায়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও বিজিএমইএ যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। শিগগিরই যদি তা না নেয়, তবে এমন আরও দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। আর যদি তা হয়, তবে শ্রমিকদের রক্তেভেজা পোশাক আর কিনবে না পশ্চিমা বিশ্ব। এ বিবৃতিটি এলো এমন এক সময় যখন সারা জাতি রানা প্লাজা হত্যাকা-ের এক বছর পালন করেছে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১১১৩ জন পোশাক কর্মী। ওই দুর্ঘটনাকে অনেকেই অভিহিত করেছেন হত্যাকা- হিসেবে। রানা প্লাজার হত্যাকা- নিয়ে সরকার ও বিজিএমইএ'র কর্মকা-ে হতাশ প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এখানে বলা ভালো, রানা প্লাজায় পাঁচটি গার্মেন্ট থেকে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান ওয়াল মার্টসহ বিশ্বের নামিদামি ২৯টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পোশাক কিনত। প্রতি বছর তারা বিলিয়ন ডলারের পোশাক কিনত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রানা প্লাজায় যারা নিহত বা আহত হয়েছিলেন, তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি ফান্ড নিয়ে একটি বড় ফান্ড গঠিত হলেও নানা জটিলতায় তা আটকে আছে। যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসনও করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা প্রধান দুটি মামলা এবং নিহত এক শ্রমিকের স্ত্রীর দায়ের করা আরেকটি হত্যা মামলার বিচার শুরু তো দূরের কথা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত জমা দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ১৮ জানুয়ারির মধ্যে আদালত এসব মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিলেও তদন্তকারীরা দফায় দফায় আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন। ফলে বহির্বিশ্বেও রানা প্লাজার হত্যাকা- নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী একটি জনমত তৈরি হয়েছে। ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টিকে 'লজ্জাজনক' হিসেবে অভিহিত করেছে আইএলও। আর মার্কিন সিনেটের ক্ষমতাবান একজন সিনেটর বললেন, 'শ্রমিকদের রক্তেভেজা পোশাক আর কিনবে না পশ্চিমা বিশ্ব।' এটা আমাদের জন্য একটি এলার্মিং। এমনিতেই আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না নানা কারণে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যুতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এটা প্রকাশ্যেই বলেছেন মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। এমনকি সিনেটর মেনেন্দেজের বক্তব্য যখন ছাপা হয়, তখন অর্থমন্ত্রীর একটি বক্তব্যও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটন ঘুরে এসে প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বস্তিকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে সব শর্তই পূরণ করেছে। কিন্তু তাতে করে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট। 'সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন' এর দাবি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক দিনের। কিন্তু তা হয়নি। এখন এলো সিনেটর মেনেন্দেজের হুমকি। যদি সত্যি সত্যিই সিনেটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নিয়ে কোনো 'সিদ্ধান্ত' হয়, তা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বাজে সিগনাল পেঁৗছে দেবে। আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির আলোকে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা গুরুত্ব দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়। যেহেতু এ অঞ্চলে ভারত একটি শক্তি, সেহেতু ভারতকে সঙ্গে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে মার্কিন নীতি-নির্ধারক, বিশেষ করে সামরিক নীতি-নির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের আগ্রহটা আরও বেড়েছে। যে কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র একটি অক্ষ গড়ে উঠেছে। একদিকে চলতি ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে সেখানে যে 'শূন্যতার' সৃষ্টি হবে, মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন সেই 'শূন্যতা' পূরণ হতে পারে ভারতকে দিয়ে, যা চূড়ান্ত বিচারে তার স্বার্থকে রক্ষা করবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে ভারত, যার পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার। ভারত সেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করছে। প্রচুর হাইওয়ে তৈরি করছে ভারত। এখানে সীমান্তবর্তী পাকিস্তান বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। আর ভারতের এ বিনিয়োগ সম্ভব হয়েছে মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের সম্মতি দেয়ার পরই। ধারণা করছি, ২০১৪ সালে মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হলে ভারতের তথাকথিত একটি 'শান্তিরক্ষী' বাহিনী সেখানে অবস্থান নেবে। অথবা ন্যাটোর একটি এশীয় সংস্করণ দেখতে পাব আমরা ওই সময়, যেখানে ভারতের একটি অংশগ্রহণ থাকবে। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো যখন গঠিত হয়েছিল, তার প্রথম এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এ বাহিনী শুধু ইউরোপেই নিয়োজিত থাকবে। ন্যাটোর উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে 'ইউরোপের গণতন্ত্র'কে রক্ষা করা। ন্যাটোর সেই ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রথমবারের মতো আফগান যুদ্ধে ন্যাটো বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেহেতু ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা আর আফগানিস্তানে 'ঝুঁকি' নিতে চাচ্ছে না, সেহেতু এ অঞ্চলকে ঘিরে ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ (সেটা ভিন্ন নামেও হতে পারে) হবে এবং ভারত তাতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। এ 'প্রক্রিয়ায়' বাংলাদেশও জড়িত হবে। মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের সুবিধা এখানেই যে, বাংলাদেশ সরকার 'ভারতের এ ভূমিকাকে', যা যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সমর্থন করছে। সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে আরও দেখা যাবে, সম্প্রতি ভারত পারমাণবিক অস্ত্র বহনযোগ্য যে মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র (অগি্ন-৫) সাফল্যের সঙ্গে উৎক্ষেপণ করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নীতির ব্যাপারে যে নীতি গ্রহণ করেছে, ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র নীতির ব্যাপারে তার সেই নীতি পরস্পরবিরোধী। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তার মিত্র দেশগুলো ব্যবহার করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে এ কাজটি করছে না। বরং ভারতকে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে এ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে পারমাণবিক চুক্তি রয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অত্যাধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটাই_ আর তা হচ্ছে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। একজন ডেমোক্রেট বারাক ওবামা হোয়াইট হাউসে ক্ষমতাসীন হয়েও দু'দেশের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। এমনকি নয়া চীনা নেতা শি জিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরও কোনো কোনো ইস্যুতে দু'দেশের মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অতি সাম্প্রতিক ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে ছয়টি জাহাজ মোতায়েন করবে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। চীনের ওপর পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করা। চীন যাতে নৌশক্তিতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, যুক্তরাষ্ট্র সেটাই চায়। আর এটাকে সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সামরিক সখ্য গড়ে তুলছে। চীন এরই মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরে অন্যতম নৌশক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে আঘাত করছে। এটাকে বিবেচনায় নিয়েই গড়ে উঠছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ, যে অক্ষে বাংলাদেশও একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এ স্ট্র্যাটেজি কিংবা শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে গড়ে ওঠা 'Containtment theory'র কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ নীতি অবলম্বন করেছিল। এ কারণে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন। বাংলাদেশের সীমান্তে রয়েছে মিয়ানমার, যে দেশটির সঙ্গে চীনের কৌশলগত সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। চীনের সীমান্তবর্তী দেশ হচ্ছে মিয়ানমার। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে। সুচি এখন সংসদ সদস্য। অনেক পশ্চিমা দেশ এখন মিয়ানমারের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জেনারেল সেইন এখন তার সরকারকে একটি 'বেসামরিক অবয়ব' দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বাংলাদেশ ও ভারতকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে। এমনকি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালের পুরোটা সময়, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে এসেছিলেন মারিয়া ওটেরো (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়-সম্পর্কিত ডেস্ক), রবার্ট ও'বেস্নক (সহকারী পররাষ্ট্র সচিব, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া ডেস্ক), ভেন্ডি শেরম্যান (আন্ডার সেক্রেটারি, রাজনৈতিক বিষয়াদি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)। ১৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা শীর্ষক একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন সহকারী পররাষ্ট্র সচিব (রাজনৈতিক বিষয়াদি) টম কেলি। অত্যন্ত গোপনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিংবা কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা সংবাদপত্রে জানানো হয়নি। নিরাপত্তা বিষয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দু'দেশ আলোচনা করল, কিন্তু জাতি তা জানল না। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের কোনো মন্তব্যও আমার চোখে পড়েনি। তবে বাংলাদেশে মার্কিন সেনা মোতায়েনের একটি সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে! অনেকেরই মনে থাকার কথা, ২ মার্চ (২০১৩) সিনেটের এক অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিটের (বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত) কমান্ডার এডমিরাল রবার্ট উইলার্ড বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের 'বিশেষ বাহিনী' মোতায়েন রয়েছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশে গুঞ্জনের সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মজিনা এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কিছু সেনা রয়েছে, যারা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রশিক্ষণের জন্য আসে, আবার চলেও যায়। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, 'তথাকথিত সন্ত্রাসীদের মোকাবিলার' জন্য(?) ভিন্ন নামে ও ভিন্ন পরিচয়ে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর লোকজন বাংলাদেশে রয়েছে। এর একটা আইনি কাঠামো দেয়ার জন্যই ওই নিরাপত্তা শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও স্বীকার করে না যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উৎকণ্ঠা কম। যুক্তরাষ্ট্র যা চায়, তা হচ্ছে গণতন্ত্র এখানে শক্তিশালী হোক। একটি মুসলমান অধ্যুষিত দেশেও যে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে, বাংলাদেশ তার প্রমাণ রেখেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের যে মূল কথা, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ, তা হয়নি। দশম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু ওই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। তাই তোফায়েল আহমেদ যখন জিএসপি সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করেন, তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আবারও বলেন, গণতান্ত্রিক সমঝোতার জন্য সংলাপের কথা। এটা অনেকটা এখন স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে দ্রুত একাদশ সংসদের নির্বাচন করা, যেখানে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। কিন্তু একাদশ সংসদ নিয়ে সরকারি মহলে কোনো আলোচনা নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে তা মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধাটি প্রয়োজন। আর মার্কিন আস্থা ফিরে পেতে হলে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সংলাপ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই; কিন্তু সংলাপের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন; কিন্তু তারা মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের কতটুকু আশ্বস্ত করতে পেরেছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে নীতি-নির্ধারকরা যে মার্কিনি ভূমিকায় খুশি নন, তা তাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। বাণিজ্যমন্ত্রী স্বয়ং এ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। পদ্মা সেতুর 'কাহিনী' আমাদের সবার জানা। বিদেশে আমাদের যে 'ইমেজ' সঙ্কট রয়েছে, তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে বলে মনে হয় না। ঢাকায় ফিরে এসে ২৬ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশের বিরোধিতা করে আসছে। (যুগান্তর, ২৭ এপ্রিল)। রাজনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যে ভালো নয়, তা স্পষ্ট করেই তিনি আমাদের জানিয়েছেন ওই সংবাদ সম্মেলনে। অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য, কিংবা সিনেটর মেনেন্দেজের "হুমকি'র আগেও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি" নিয়ে মূল্যায়নপত্র, যেখানে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। তাই বিষয়টি উদ্বেগের। যদি আগামীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়, তা আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে। কেননা, বৈদেশিক বাণিজ্যের একটা বড় অংশ আসে এ তৈরি পোশাক থেকে। সুতরাং সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেবে_ এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। Daily ALOKITO BANGLADESH 04.05.14

তিস্তা লংমার্চ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

তিস্তা লংমার্চ শেষ হয়েছে ২৩ এপ্রিল। ৩০ ঘণ্টার এ লংমার্চ ডেকেছিল বিএনপি। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই লংমার্চের প্রাপ্তি কী? সরকারি দল আওয়ামী লীগ এ লংমার্চকে ‘গাড়ি মার্চ’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এতে কোনো বাধা দেয়নি। অতীতে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম লংমার্চ যখন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন ওই লংমার্চে বাধা দেয়া হয়েছিল। রাস্তায় এলোপাতাড়ি গাড়ি রেখে লংমার্চকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। এবার তিস্তার ক্ষেত্রে অবশ্য তেমনটি হয়নি। যদিও একটা অভিযোগ আছে, তিস্তা লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের রংপুরে রাতে থাকার জন্য হোটেলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু এটি কখনও বড় হয়ে দেখা দেয়নি। মির্জা ফখরুল তিস্তা হেলিপ্যাড পয়েন্টে আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতাও করেছেন। তবে পার্থক্যটি হল- এই লংমার্চে বেগম জিয়া ছিলেন অনুপস্থিত। এমনকি ১৯ দলের সিনিয়র নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি। তারপরও এ লংমার্চের গুরুত্ব একেবারে কম নয়। যখন তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় পানির পরিমাণ মাত্র ৫০০ কিউসেকে নেমে এসেছিল, তখনই বিএনপি এ লংমার্চের আয়োজন করে।
বিএনপির এ লংমার্চ সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচি ছিল না। এ মার্চের উদ্দেশ্য ছিল জনসম্পৃক্ত একটি বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং ভারতের কাছে আমাদের ন্যায্য হিস্যার দাবি জানানো। এটা একটা ভালো দিক। এ লংমার্চ অতীতে, ১৯৭৬ সালের মে মাসে, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ফারাক্কা লংমার্চের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বয়োবৃদ্ধ এ নেতা মৃত্যুর কিছুদিন আগে লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়ে রাজশাহীর কানসাটে গিয়েছিলেন। সেদিন সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। তবে সেদিনের ফারাক্কা লংমার্চের সঙ্গে আজকের তিস্তা লংমার্চের পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭৬ সালে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার পরোক্ষভাবে ওই ফারাক্কা লংমার্চকে সমর্থন করেছিল। আজকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। তারা তিস্তা লংমার্চের বিরোধিতা না করলেও তিস্তার পানি কমে যাওয়ার প্রশ্নে প্রচণ্ড নীরব।
তিস্তার লংমার্চকে কেন্দ্র করে দুটি ঘটনা ঘটেছে। এক. লংমার্চের শুরুর দিন হঠাৎ করেই তিস্তা ব্যারাজে পানির প্রবাহ তিন হাজার কিউসেকের উপরে চলে আসে (যেখানে এর আগের দু’সপ্তাহে পাওয়া গিয়েছিল গড়ে ৫০০ কিউসেক)। লংমার্চের পর এ প্রবাহ কমে এসে দাঁড়ায় এক হাজার ৮০০ কিউসেকে। এর অর্থ কী? উজানে বৃষ্টির কোনো খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়নি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব লংমার্চকারীদের খুশি করতেই অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়েছে ভারত? দুই. পানির প্রবাহ যখন বাড়ল, তখন সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি বলল, সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে ডালিয়া পয়েন্টে পানি বেড়ে গেছে। যদিও আমরা কেউ জানলাম না সরকার কোথায় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে! ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। এমনকি সর্বশেষ বিমসটেক সম্মেলনেও (২০১৪) মনমোহন সিং আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। ভারতের নয়া সরকারই এ সিদ্ধান্তটি নেবে। তাহলে আমাদের সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী এ ‘কূটনৈতিক তৎপরতার’ তথ্য কোথায় পেলেন? আর এখন যে পানির প্রবাহ আবার কমে গেল, এর ব্যাখ্যা তিনি কী দেবেন?
আমরা লক্ষ্য করছি, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমাদের একটা বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, আমরা দরকষাকষিতে শক্তভাবে আমাদের অবস্থান তুলে ধরতে পারি না। সাম্প্রতিককালে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অতিমাত্রায় ভারতকেন্দ্রিক। ভারত আমাদের কোনো কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়, সে রকম কোনো কাজ আমরা করতে চাই না। এটা যে তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তা নয়। বরং দেখা গেছে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা কোনো ‘শক্ত’ অবস্থানে যেতে পারিনি। ভারত আমাদের ভূমি ব্যবহার করছে তথাকথিত ‘কানেকটিভিটির’ নামে। কিন্তু কোনো ‘ফি’ প্রদান করছে না। উপরন্তু নেপাল কিংবা ভুটানও এ সুবিধা পাচ্ছে না। সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তার এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে (অরুনাচল থেকে বিহার) বিদ্যুৎ দেবে। এ ক্ষেত্রে ভারত আদৌ কোনো শুল্ক বা ফি দেবে কি-না, এটা স্পষ্ট নয়। তিস্তার ক্ষেত্রেও তাই সরকার খুব প্রতিবাদী নয়। খুব কঠোর অবস্থানেও যায়নি সরকার। শুধু সরকারের কথা কেন বলি? এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিও তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে কোনো জোরালো অবস্থানে যায়নি। অথচ জাতীয় পার্টির একটা বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে উত্তরবঙ্গে। এরশাদ নিজে রংপুরের বাসিন্দা। সরকারের অংশীদার জাসদ কিংবা ওয়ার্কার্র্স পার্টিরও কোনো ভূমিকা নেই। তবে বাসদ ও সিপিবি আলাদাভাবে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে লংমার্চ করেছে।
তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে আমাদের স্বার্থ রয়েছে। যেখানে ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হওয়ার কথা, সেখানে পানির অভাবে চাষাবাদ হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে। রোদে ওই শস্যও পুড়ে গেছে। পানির অভাবে একদিকে যেমন খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ, অন্যদিকে তেমনি বাড়ছে মরুকরণ প্রবণতা। উত্তরবঙ্গের মানুষ জানে পানির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। ১৯৭২ সালেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। মাঝখানে ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে ও ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিই হয়নি। এ নদীর পানি বণ্টন আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে হতে হবে। মমতার ‘একগুঁয়েমি’র জন্য পানি বণ্টন বন্ধ থাকতে পারে না। পানি দেয়া বা না দেয়ার সঙ্গে তার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। বাংলাদেশ পানি পাবে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে। আর পশ্চিমবঙ্গ যদি বাধা দেয়, তার দায়ভার গিয়ে বর্তাবে ভারত সরকারের ওপর। এতে করে আন্তর্জাতিক আসরে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে থাকবে। ভারত বিশ্বসভায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হতে চায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর প্রতি তার আচরণ যদি ন্যায়সঙ্গত না হয়, যা জাতিসংঘের আইনে বলা আছে, তাহলে তার ‘নেতৃত্ব’ প্রশ্নের মুখে পড়বে। এমনিতেই ভারতের আচরণ নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো এক ধরনের অস্বস্তিতে থাকে। এ ক্ষেত্রে তিস্তায় পানি না দিয়ে উজানে পানি প্রত্যাহার করা হলে তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে ঠেলে দেবে মরুময়তার দিকে। পানির অভাবে যে সংকটের সৃষ্টি হবে, তা বাংলাদেশকে ঠেলে দেবে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেন তাহলে এ দেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ একটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি এতে করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়বে। মনে রাখতে হবে, তিস্তার পানি প্রাপ্তি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক আইন আমাদের পক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তি থাকা বা না থাকাটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা এটা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত, তা নিশ্চিত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে বলা ভালো, সিকিম হয়ে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। ডিমলা থেকে চিলমারী পর্যন্ত এ নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে দু’দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। পরে ২০০৭ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এখন যুক্ত হয়েছে মমতার আপত্তি। বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারেই মমতার সম্মতি পাওয়া যায়নি। এখানে আরও একটা বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তিস্তার পানি বণ্টনে সিকিমকে জড়িত করারও প্রয়োজনীয়তা পড়েছে। কারণ সিকিম নিজে উজানে পানি প্রত্যাহার করে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে দিন দিন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কৃষকদের কাছে তিস্তার পানির চাহিদা বেশি। সেচ কাজের জন্য তাদের প্রচুর পানি দরকার। এটা মমতার জন্য একটি ‘রাজনৈতিক ইস্যু’।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন’কে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি তীরবর্তী রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানিসম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। কিন্তু এ ‘যুক্তি ও ন্যায়ে’র ভিত্তিটি উপেক্ষিত থাকে, যখন পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। তিস্তার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হয়নি। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘জলপ্রবাহ কনভেনশন’ নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করে। এ নীতিমালার ৬নং অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার’ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ব্যবহার, অর্থাৎ এককভাবে তিস্তার পানির ব্যবহার এ ‘যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতা’র ধারণাকে সমর্থন করে না। আমরা আরও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারব, যেখানে বাংলাদেশের অধিকারকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশসংক্রান্ত জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের ১৪নং অনুচ্ছেদ, জলাভূমিবিষয়ক রামসার কনভেনশনের ৫নং অনুচ্ছেদ- প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব এবং উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণের যে কথা বলা হয়েছে, তা রক্ষিত হচ্ছে না। এখানে সমস্যাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু কোনো রাজ্য (এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) এমন কিছু করতে পারে না, যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে। সমস্যাটা ভারতের। পশ্চিমবঙ্গকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমাদের পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই। তিস্তায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায়, বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকল।
তিস্তা লংমার্চ করে বিএনপি একটি জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় জনসভায় মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া তিস্তার পানি বণ্টন সম্ভব নয়।’ তারা এও জানিয়েছেন, ‘পানি ছাড়া ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নয়’ (যুগান্তর, ২৪ এপ্রিল)। স্পষ্টতই এটা ভারতীয় নেতাদের জন্য একটি মেসেজ। তবে ভয়টা হচ্ছে নয়াদিল্লিতে সরকার গঠনে মমতা যদি একটি ফ্যাক্টর হয়ে যান, তাহলে তিস্তা চুক্তি ঝুলে যাবে। মমতা এককভাবে পানি প্রত্যাহার করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে তা সেচ কাজে ব্যবহার করবেন। পানি সেখানকার রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর। এখন দায়িত্বটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্র সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। কারণ সিকিমও উজানে পানি প্রত্যাহার করে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এলাকায় ভারত ন্যূনতম ৮ থেকে ১০ জায়গায় বাঁধ দিয়েছে। ফলে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমছে। এখন বাংলাদেশ যদি শুধু ভারতের দিকে তাকিয়ে থেকে তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তির প্রত্যাশা করে, তাতে সময় ক্ষেপণ হবে মাত্র। ভারতকে চুক্তিতে বাধ্য করতে হলে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টির আন্তর্জাতিকরণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সরকার এখন এ কাজটি করবে কিনা, এটাই হচ্ছে আসল কথা। Daily JUGANTOR ২৯ এপ্রিল, ২০১৪

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

গত ২২ এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় নিরাপত্তা সংলাপ শুরু হয়েছে। এই সংলাপে আঞ্চলিক কৌশলগত সম্পর্ক, সামরিক সহযোগিতা, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। যে সময় এই নিরাপত্তা সংলাপটি অনুষ্ঠিত হলো, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ভারতে নির্বাচন হচ্ছে। মে মাসের শেষদিকে সেখানে একটি নয়া সরকার গঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা বেশি। যদি বিজেপির নেতৃত্বাধীন একটি জোট ক্ষমতায় আসে, তাহলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয় কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ব্যাপারে ভারতের মনোভাবের পরিবর্তন হয় কিনা, এটা জানা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে হামিদ কারজাইয়ের যুগ শেষ হতে চলেছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে কারজাই আর তৃতীয় বারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারেননি। সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন দ্বিতীয় পর্যায়ে গড়িয়েছে। সুতরাং যিনি আগামীতে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব বহন করুন না কেন, তার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়, এ বিষয়টাও জরুরি। কেননা, এ বছরের শেষ নাগাদ আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। কিন্তু তারপরও কিছু মার্কিন সৈন্য সেখানে থাকার কথা। নয়া আফগান প্রেসিডেন্ট বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন, সেই বিষয়টিও জরুরি। উপরন্তু রয়েছে ভারত মহাসাগর এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর সম্প্রসারিত ভূমিকা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরের ব্যাপারে নতুন করে তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন মিয়ানমার, যেখানে রয়েছে প্রচুর জ্বালানি সম্পদ; এবং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একটি অ্যালায়েন্স গড়ে তোলা। এই স্ট্র্যাটেজির আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গেও একটি কৌশলগত সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারই শেষ কথা নয়। বরং নতুন আঙ্গিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করব এ অঞ্চলে। পাকিস্তানে একটি নয়া সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও মার্কিন ড্রোন বিমান হামলা বন্ধ হয়নি। আগামীতে আফগানিস্তানে একজন মার্কিন সৈন্য না থাকলেও ড্রোন বিমান হামলা বন্ধ হবে না। এ অঞ্চলের কোনো একটি জায়গায় মার্কিন ঘাঁটি বসবে, যেখান থেকে ড্রোন হামলা পরিচালিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে তাদের যুদ্ধজাহাজ বাড়ানোর সিদ্ধান্তই শুধু নেয়নি, বরং চলতি সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি নৌ মহড়ার আয়োজন করছে, যাতে ভারতের নৌবাহিনী অংশ নিতে পারে। মালদ্বীপের সঙ্গেও একটি ঝঙঋঅ চুক্তি করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো ২০১০ সালে তার লিসবন সম্মেলনে ন্যাটোর সম্প্রসারিত ভূমিকা সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ন্যাটোর ঝঃৎধঃবমরপ ঈড়হপবঢ়ঃ সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তারা জানেন, এই ধারণাপত্রের মূল বিষয়টি হচ্ছে ন্যাটোর সম্প্রসারিত ভূমিকা। ন্যাটোর কর্মকা- এখন আর শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকা- ভারত মহাসাগর এলাকায় সম্প্রসারিত করেছে। আগামীতে মার্কিন ষষ্ঠ ফ্লিটের বেশ কয়েকটি জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রসীমায় মোতায়েন করা হবে। এ কারণে বাংলাদেশে সম্ভাব্য মার্কিনি ভূমিকা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। অনেকেরই জানার কথা, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই তথাকথিত 'অংশীদারিত্ব সংলাপ' চুক্তির আওতায় দৃশ্যত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ, শ্রমমান, পণ্যের শুল্ক ইত্যাদি বিষয়ে মতবিনিময় করলেও মূল বিষয় একটাই_ যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত নীতির ব্যাপারে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় যৌথ কর্মসূচি গ্রহণের আড়ালে এ অঞ্চলে আগামীতে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। বলা ভালো, প্রতি বছর একবার 'অংশিদারিত্ব সংলাপ চুক্তি'র আওতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিত হবে। প্রথম সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায় ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে। আর দ্বিতীয় পরবর্তী সংলাপ হয় ওয়াশিংটনে ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল। সংলাপ শেষে একটি ব্রিফিং করা হয় বটে, কিন্তু ভেতরের অনেক কথাই জানানো হয় না। বাংলাদেশ এর আগে ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তাই গুজবের ডালপালা বেড়েছে এবং আগামীতে তা আরো ছড়াবে। ২০১২ সালের ১৮ জুন ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়ায় একটি ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ন্যাটোর ২৫টি সদস্য দেশের বাইরেও মোট ৫৫টি দেশ অংশ নিয়েছিল। ওই সম্মেলনকে তারা বলছে ঝঃৎধঃবমরপ গরষরঃধৎু চধৎঃহবৎংযরঢ় ঈড়হভবৎবহপব। যারা সরাসরি ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র নয়, তারাও এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল। ন্যাটোর সঙ্গে কাজ করতে পারে, এমন দেশগুলোকে ন্যাটোর নীতিনির্ধারকরা মোট ৪ ভাগে ভাগ করেছেন_ যারা ন্যাটোর সদস্য নয়, তবে ন্যাটোর সহযোগী। যেমন, ইউরোপের ১২টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছে ঞযব চধৎঃহবৎংযরঢ় ভড়ৎ চবধপব। ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত আলজেরিয়া-তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে গবফরঃবৎৎরধহ উরধষড়মঁব গবসনবৎং। সৌদি আরব কিংবা ওমানের মতো দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ওংঃধহনঁষ ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ওহরঃরধঃরাব। অস্ট্রেলিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোকেও ন্যাটো 'চধৎঃহবৎং অপপৎড়ংং ঃযব এষড়নব'-এর ব্যানারে একত্রিত করেছে। আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানও এই ব্যানারে রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ন্যাটোর কোনো কর্মকা- নেই। এখন এল সালভাদর এবং কলম্বিয়ার মতো দেশও ন্যাটোর সঙ্গে জড়িত হতে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার, ইউরোপে ন্যাটোর কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্টাভরিভিস গেল বছর বলেছিলেন, তারা ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশকে নিয়ে ভাবছেন; এবং আশা করছেন, এই দেশ দুটি চধৎঃহবৎং অপপড়ৎংং ঃযব এষড়নব-এর ব্যানারে আগামীতে ন্যাটোর কর্মকা-ে শরিক হবে। ২০১০ সালে ন্যাটো লিসবন সম্মেলনে ন্যাটোর ঝঃৎধঃবমরপ ঈড়হপবঢ়ঃ গ্রহণ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রোয়েশিয়ান সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এর মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল, একুশ শতকে ন্যাটো নতুন এক কৌশলগত ধারণা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। ন্যাটোর ওই ভূমিকা, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শিক্ষকের মতো কর্তৃত্ব করার প্রবণতা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে প্রভাববলয়কে কেন্দ্র করে জন্ম হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের। আর ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে সেই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওয়ারশ সামরিক জোট ভেঙে দেয়া হয়নি। বরং এর সম্প্রসারণ ঘটেছিল। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ন্যাটো এবং ওয়ারশ জোটের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত হয়েছিল যে, ইউরোপে একাধিকবার 'পারমাণবিক যুদ্ধ'-এর সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই 'যুদ্ধ' হয়নি বটে, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর পুরোটা সময় এই দুই শক্তির মাঝে প্রতিযোগিতা বজায় ছিল। দুই পরাশক্তিই ইউরোপে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরই এই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। এর প্রধান কারণ ছিল একটি_ রাশিয়া এখন আর ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি নয়। দুটি আদর্শের (সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ) মাঝে যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেই দ্বন্দ্বেরও অবসান ঘটে, যখন রাশিয়া আদর্শ হিসেবে মুক্তবাজার ও পুঁজিবাদকে গ্রহণ করে। উপরন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার অনেক আগেই ১৯৮৮ সালে গরবাচেভ 'ওয়ারশ' সামরিক জোট ভেঙে দিয়েছিলেন। এ কারণে ইউরোপে রাশিয়ার উত্থান যুক্তরাষ্ট্র তথা ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি নয়। আর তাই নতুন করে এ অঞ্চলে স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টির সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এখন ভারত মহাসাগর হচ্ছে সম্ভাব্য ক্ষেত্র, যেখানে নতুন করে স্নাযুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে চীন। চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ও শঙ্কা এখন অনেক বেশি। প্রথমত, তত্ত্বগতভাবে চীন এখন আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। কিন্তু একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন এখন বিশ্বকে কর্তৃত্ব করছে। চীন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ায় তা এখন মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে নিজের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখছে। এটা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অনেকেরই অপছন্দের। গত ৮ জুন (২০১৩) নয়া চীনা প্রেসিডেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এই সফরে ওবামার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তারপরও বেশ কিছু ইস্যুতে বিরোধ রয়েছে। তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়ছে। এটা মার্কিনিদের চিন্তার কারণ। বিশেষ করে ভারত মহাসাগর ও আফগানিস্তানের ব্যাপারে তাদের আশঙ্কার কারণ রয়েছে যথেষ্ট। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য এবং সেই সঙ্গে সব বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে না। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। এ কারণেই তথাকথিত 'অংশীদারিত্ব চুক্তি' করছে যুক্তরাষ্ট্র; এবং ন্যাটোকে ব্যবহার করে এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। আর ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম এক ধরনের কর্মসূচি, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার উপস্থিতিকে নিশ্চিত করতে চায়। তাই যুক্তিসঙ্গত কারণেই ভারতকে প্রয়োজন রয়েছে ওবামা প্রশাসনের। স্মরণ করা প্রয়োজন, জাতিসংঘের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনে (২০১৩) যোগ দেয়া যে কয়জন সরকারপ্রধানকে ওবামা হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ভারত। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিং হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ভুলে গেলে চলবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে তার স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে হলে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন। ভারত উঠতি শক্তি। সামরিক তো বটেই, অর্থনৈতিক শক্তিও বটে। মার্কিন স্বার্থ বিঘি্নত হবে, যদি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র সেটা কখনোই চাইবে না। বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কখনো একক কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। এ ব্যাপারে মার্কিনি নীতি ভারতীয় মনোভাব দ্বারা প্রভাবান্বিত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা মতভিন্নতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই বর্তমান সরকারকে স্বীকার করে নিয়েছে। এ কারণে বর্তমান সংসদ নূ্যনতম দুই-তিন বছর থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে হঠাৎ করে জঙ্গিবাদের উত্থান, জেএমবি সদস্যদের পুলিশের হাত থেকে পলায়ন কিংবা আল-জাওয়াহিরির তথাকথিত অডিওবার্তা যে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের এতটুকুও বিচলিত করবে না, তা বলা যায় না। এর ওপর গত ২ মার্চ প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তথাকথিত ৯টি জঙ্গি সংগঠন 'স্বাধীন বাংলাদেশ কমিটি' নামে একটি কমিটির ব্যানারে সংগঠিত হয়েছে। এই সংবাদটির ব্যাপারে সত্যতা যা-ই থাকুক না কেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা সংবাদটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলেই আমার ধারণা। সুতরাং পুরো ২০১৪ সালটি বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বেগম জিয়া ঘোষণা করেছেন, উপজেলা নির্বাচনের পরপরই তিনি আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন। ফলে রাজনীতি আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বাংলাদেশের জঙ্গিরা এটা থেকে সুবিধা নিতে পারে। বিষয়টি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিটি 'ডেভেলপমেন্ট'-এর একটির সঙ্গে অপরটির একটি যোগসূত্র আছে। বাংলাদেশের জঙ্গিদের সঙ্গে আরব বিশ্বের ইসলামী জঙ্গিদের কতটুকু যোগসূত্রে আছে, তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালো বলতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে এসব জঙ্গির যে একটা যোগাযোগ থাকতে পারে বা ভবিষ্যতে হতে পারে, তা আশঙ্কা করা যায়। সুতরাং মার্কিন সৈন্যদের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারে যে 'শূন্যতার' সৃষ্টি হবে (ভ্যাকুয়াম থিওরি), তার সুযোগ নিতে পারে জঙ্গিরা। আর জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে ভারত মহাসাগরে যখন মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়বে, সঙ্গত কারণেই এর 'প্রতিবাদে' জঙ্গিদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলকে ঘিরে (বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার) নতুন এক 'সামরিক সমীকরণের' জন্ম হতে পারে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা এখন ব্যবহৃত হতে পারে মিয়ানমার সরকারের ওপর 'চাপ' প্রয়োগ করার স্বার্থে। তাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় নিরাপত্তা সংলাপের গুরুত্ব অনেক বেশি। Daily JAI JAI DIN 28.04.14

ইউক্রেন-সংকটের গভীরতা বাড়ছে

ইউক্রেন-সংকটের গভীরতা বাড়ছে। ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির পর ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। সেখানে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পূর্বাঞ্চলের বেশ কটি শহর দখল করে নিয়েছিল। ক্রিমিয়ার মতো এ শহরগুলোও রাশিয়ার সঙ্গে একত্রিত হতে চায়। সর্বশেষ ঘটনায় ইউক্রেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে শহরগুলো মুক্ত করার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে। সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫ বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছেন। এই অভিযানকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও আমেরিকা পরস্পর বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে। এর আগে গত ১৭ এপ্রিল জেনেভায় যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা এখন অকার্যকর। রাশিয়া ইতোমধ্যে পূর্ব ইউক্রেন সীমান্তে তাদের হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থে পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোয় ৬০০ সৈন্য পাঠিয়েছে। স্পষ্টতই ইউক্রেনের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। অনেকের দৃষ্টি এখন মলদোভার ট্রান্স দানিয়েস্টার অঞ্চলের দিকে। কেননা এ অঞ্চলে রাশান জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। পুতিন এ ক্ষেত্রে কী করবেন? ইউক্রেনে আগামী দিনে বসনিয়ার মতো পরিস্থিতির জন্ম হয় কি না- সে ব্যাপারেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন পুতিন রাশিয়ার সীমান্ত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানায় নিয়ে যেতে চান। আর এ লক্ষ্যেই রাশিয়া কাজাকিস্তান ও বেলারুশের সমন্বয়ে একটি ‘ইউনিয়ন স্টেট’ গঠন করেছে। এর মাধ্যমে এক ধরনের ‘কাস্টম ইউনিয়ন’ গঠন করে এ দুটো দেশের অর্থনীতি তথা বাণিজ্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। এ ‘ইউনিয়ন স্টেট’-এ এ অঞ্চলের আরও অনেক রাষ্ট্র আগামীতে যোগ দিতে পারে। সুতরাং রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযুক্তি ও পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ক্রিমিয়ার ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এশিয়া সফর করেছেন। এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনায় ক্রিমিয়ার বিষয়টি যে প্রাধান্য পেয়েছে, সেটা এক রকম নিশ্চিতই ছিল সবার। ইতোমধ্যে জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ন্যাটো রাশিয়ার সীমান্তবর্তী পোল্যান্ডে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। সব মিলিয়ে ক্রিমিয়ার ঘটনাবলি স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর সূচনা করলেও যে প্রশ্নের সমাধান এখনও হয়নি, তা হচ্ছে রাশিয়াকে ‘বয়কট’ করে পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাবে কীভাবে? সেনাবাহিনী পাঠিয়ে, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বটে, কিন্তু পুরো ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে? কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে? পাঠকমাত্রই জানেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে পুরো পূর্ব ইউরোপ, যে দেশগুলো একসময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাবে ছিল, তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তারা পরিপূর্ণভাবে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের রিজার্ভ হচ্ছে রাশিয়ায়। মূলত ৩টি পথে এই গ্যাস যায় ইউরোপে। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা একসময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্লকে ছিল, তারাও এখন জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। ৩টি পাইপলাইন, নর্ডস্টিম পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বছরে ৫৫ বিলিয়ন কিউসিক মিটার (বিসিএম), বেলারুশ লাইনে সরবরাহ করা হয় ৩৬ বিসিএম, আর ইউক্রেন লাইনে সরবরাহ করা হয় ১০৭ বিসিএম। এখন ইইউর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া যদি এই সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক বড় ধরনের জ্বালানি-সংকটে পড়বে ইউরোপ। যদিও রাশিয়ার বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এই গ্যাস বিক্রি। এটা সত্য, রাশিয়া অত্যন্ত সস্তায় বেলারুশ ও ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই দেশ দুটো আবার রাশিয়ার গ্যাসের রিজার্ভ গড়ে তুলে সরাসরি পশ্চিম ইউরোপে তা বিক্রি করে কিছু আলাদা অর্থ আয় করে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৯ সালে ইউক্রেন ও বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হয়েছিল ‘গ্যাস ওয়ার’ অর্থাৎ গ্যাসযুদ্ধ। ইউক্রেনে অত্যন্ত সহজ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করত রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেন অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইউরোপে একটি সংকট তৈরি করে। শুধু গ্যাস নয়, রাশিয়া বেলারুশকে সস্তা মূল্যে তেলও দেয়। ওই তেল আবার বেলারুশ অধিক মূল্যে ইউরোপে বিক্রি করে। উৎুঁযনধ অথবা ঋৎরবহফংযরঢ় পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই গ্যাস ও তেল সরবরাহ করা হত। বেলারুশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়েছিল। তারা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। রাশিয়া পাইপলাইনে গ্যাস ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন আঙ্গিকে ওই ‘গ্যাস ওয়ার’ শুরু হবে। ইউক্রেনের অংশ ক্রিমিয়া এখন রাশিয়ার অংশ হওয়ায় ইউক্রেন এটাকে ভালো চোখে দেখেনি। ক্রিমিয়ায় রাশিয়ান পতাকা উঠেছে। সেখানে যে ইউক্রেনের নৌঘাঁটি রয়েছে তা দখল করে নিয়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। ইউক্রেনের সব সম্পত্তি তাদের দখলে। সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে রাশিয়া তার ইউক্রেন পাইপলাইন বন্ধ করে দিতে পারে। আর এটা হলে বুলগেরিয়া, রুমানিয়া আর সার্বিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে এ তিন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা গ্যাসপ্রোম (এধংঢ়ৎড়স)-এর ইউক্রেনের কাছে পাওনা রয়েছে ২ মিলিয়ন ডলার। এ টাকা এখন ইউক্রেন কীভাবে শোধ করবে? এ সংকট এখানে যুদ্ধের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেনকে বাইপাস করে কৃষ্ণ সাগরের নিচ দিয়ে একটি পাইপলাইন তৈরি করছে। পুরো ইইউর গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ একা জোগান দেয় রাশিয়া। আর জার্মানির ৪০ ভাগ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ওই গ্যাস আগামী দিনে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর হবে ইউরোপের রাজনীতিতে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল, বিশেষ করে ইরাক ও লিবিয়ায়, তার পেছনের মূল কারণ ছিল তেল। ইরাক ও লিবিয়ার তেলের সহজলভ্যতার কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মদদে সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধে ইরাককে ধ্বংস করে দিয়ে এখন মার্কিন কোম্পানিগুলোই ওই তেল বিক্রির টাকায় ইরাক পুনর্গঠনের কাজ করছে। আর লিবিয়ার তেল ও গ্যাস যায় ইতালিতে। গাদ্দাফিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এ তেল-গ্যাসের কারণেই। সুতরাং রাশিয়ার গ্যাসের ওপর পুরো ইউরোপের নির্ভরতা, সেখানে নতুন করে ‘গ্যাসযুদ্ধ’-এর সূচনা করবে। তবে পার্থক্য একটাই- রাশিয়া ইরাক কিংবা লিবিয়া নয়। পুতিনের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। সুতরাং ওবামা এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে কোনও সুবিধা করতে পারবেন না। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো পশ্চিম ইউরোপ যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন এক পর্যায়ে পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ড মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ রাজনীতির এক নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। ব্রান্ড বুঝতে পেরেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাদ দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। আজ নতুন আঙ্গিকে এ প্রশ্নটিই উঠেছে- রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা অর্থহীন। রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়েই ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ন্যাটোতে রাশিয়াকে পরামর্শকের ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২৭ মে প্যারিসে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিনটন। সেই সঙ্গে ন্যাটো সদস্যভুক্ত অন্যসব দেশের সরকারপ্রধানরাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়াকে একটি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দেয়। অনেকটাই সেই ‘কনটেইনমেন্ট থিউরির’ মতো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণসাগর বা ব্লাক সির পশ্চিমে রুমানিয়ার মিথাইল কোগালনাইসেআনুতে রয়েছে ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। আফগানিস্তানে সেনা রসদ সরবরাহের জন্য এ বিমান ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। গত বছর কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই চাইছে জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগ দিক। এটা যদি হয়, তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে মার্কিন সেনাবাহিনী। রাশিয়ার সমর নায়করা এটা মানবেন না। আজকে ইউক্রেনের পরিস্থিতিও অনেকটা তেমনি। রাশিয়া মনে করে ইউক্রেনে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে উৎখাতের পেছনে ওয়াশিংটনের হাত রয়েছে। ইয়ানুকোভিচ ছিলেন রুশপন্থী এবং ইউক্রেনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। আগামী ২৫ মে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সঙ্গত কারণে রাশিয়া চাইবে রুশপন্থী একজন সেখানে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন। অন্যদিকে রাশিয়ার বিরোধীরা চাইবে তাদের পছন্দের কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোক। এ ক্ষেত্রে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ওলেকজান্ডার তুর্চিনভের সম্ভাবনা বেশি। এতে করে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার একটা বিরোধ থেকে গেল। এই বিরোধ এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে মাত্র এবং নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যে এ পরিস্থিতিকে স্নায়ুযুদ্ধ-২ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এখন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যদি ‘পরাজিত’ হয় এবং শহরগুলো যদি ইউক্রেনের সেনাবাহিনী দখল করে নেয়, তাতে করে সাময়িকভাবে হয়তো ইউক্রেনের ‘বিজয়’ হবে। কিন্তু এ অঞ্চল ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করবে। Daily Amader Somoy 28.04.14