রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In his Office at UGC Bangladesh

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

During his stay in Germany

Prof Dr Tareque Shamsur Rahman

At Fatih University, Turkey during his recent visit.

Prof Dr Tareque Shamsur Rehman

In front of an Ethnic Mud House in Mexico

বাক স্বাধীনতা খর্ব করার নীতিমালা?

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ও গেজেট আকারে প্রকাশিত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ইতিমধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্পষ্টতই মিডিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তারাও এই নীতিমালা নিয়ে বিভক্ত। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নীতিমালা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের কেউ কেউ এ নীতিমালাকে স্বাগত জানালেও অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। মোটা দাগে যেসব বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, তা অনেকটা এ রকম : ১. নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ আছে। দ্রুত একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ও মালিকদের সুরক্ষার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি; ২. নীতিমালার প্রয়োজন আছে। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এই স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতা কারও স্বেচ্ছাচারিতায় নষ্ট হয়ে যাক, সেটা আমরা চাইব না; ৩. গণমাধ্যম খাঁচায় বন্দি করার ফিকির; ৪. সম্প্রচার নীতিমালা গণমাধ্যমকে সংকুচিত করবে না; ৫. এই নীতিমালার এতই ব্যাপ্তি যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায়-অবিচারের কোনো সমালোচনা করলেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি এ নীতিমালায় টকশোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে; ৬. এই নীতিমালার কারণে যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ না হয়, সেটা দেখা দরকার; ৭. সম্প্রচার নীতিমালা বাতিল করা উচিত। বাকশাল যুগে ফিরে যাওয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ।এ ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকে ধারণা করা স্বাভাবিক যে, এই নীতিমালা নিয়ে একটা বিভ্রান্তি আছে এবং নীতিমালাটি মিডিয়ার স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে। এমনকি জনপ্রিয় টকশোগুলোতে মন খুলে কথা বলা যাবে না, এমন আশংকাও আছে অনেকের। এটা ঠিক, একটা নীতিমালা দরকার ছিল। কারণ বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচারের কোনো নীতিমালা ছিল না। তবে এটা করতে গিয়ে সরকার বাক স্বাধীনতাকে খর্ব করবে কিনা কিংবা বেসরকারি চ্যানেলগুলোকে এক একটি বিটিভিতে পরিণত করবে কিনা, এটাই বড় প্রশ্ন এখন। বলা ভালো, এই নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের জন্য ২০১২ সালের নভেম্বরে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি খসড়া রিপোর্ট জমা দেয়ার পর গত বছর ৫ সেপ্টেম্বর এর ওপর মতামত নেয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এটি প্রকাশ করা হয়। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, সব ধরনের মতামত কমিশন গঠন করেছিল কিনা। যাদের নিয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তারা সরকারের লোক ও সরকারের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা এই নীতিমালায় প্রতিফলিত হওয়াই স্বাভাবিক।সম্প্রচার নীতিমালা অনুযায়ী ১৩টি বিষয়ে সম্প্রচার করা যাবে না অথবা সম্প্রচারের সময় কঠোরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সব বাহিনী বা দেশের আইনশৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত কোনো বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ, অবমাননা বা বিদ্রুপ করে কিছু প্রচার করা যাবে না বা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিস্মিত হতে পারে এমন সামরিক-বেসামরিক কোনো তথ্য প্রচার করা যাবে না। আইনশৃংখলা ভঙ্গের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে, এমন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না। কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের অনুকূলে যায়, অন্য কোনো বিদেশী রাষ্ট্র আঘাত পায় কিংবা বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে রকম কিছু প্রচারে বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতির জন্য ক্ষতিকর কোনো দৃশ্য প্রচার করা যাবে না। টকশোতে কোনো বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রচার পরিহার করতে হবে! ব্যক্তির গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু প্রচার করা যাবে না।যে কোনো বিবেচনায় এ ধরনের নীতিমালা মিডিয়াকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করার শামিল। গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এ নীতিমালা কার্যকর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল না। এর মধ্যে দিয়ে এখন মিডিয়ার ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বাড়ল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এই যুক্তি তুলে যে কোনো ব্যক্তি বা মিডিয়া এখন সরকারের রোষানলে পড়তে পারে। আইনশৃংখলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ, খুন, গুমের অভিযোগ অতীতে উঠেছে এবং একাধিক মামলাও হয়েছে। আগামীতেও এ ধরনের অভিযোগ উঠতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তখন মিডিয়া কি এসব দুর্নীতি বা গুমের কথা লিখতে পারবে? আর যদি মিডিয়া তা করে, তাহলে কি নীতিমালা লংঘিত হবে? যে কোনো প্রকাশিত সংবাদকে কিংবা টকশোতে বলা কোনো বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরকার আইনশৃংখলা ভঙ্গের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করার অভিযোগ আনতে পারে। তাহলে কি টকশোতে কোনো সমালোচনা করা যাবে না? দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় নীতির সমালোচনা করেন অনেকেই। এখন এই নীতিমালার আলোকে কোনো সমালোচনা করা যাবে কি? এমনকি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের নাগরিকদের হত্যা করলেও তা কি মিডিয়া প্রচার করতে পারবে? বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়- সরকার কি এ ধরনের অভিযোগ আনতে পারবে তখন? টকশোতে সরকার কিংবা কোনো কোনো মন্ত্রী বা নীতির মৃদু সমালোচনা করা হয় (আমি নিজেও করেছি অনেক সময়)। এখন কি সরকার বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্যের যুক্তি তুলে টকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে! টকশোতে কি তাহলে কোনো সরকারি নীতির (যেমন পররাষ্ট্রনীতি, বাজেট, আর্থিক খাত, দুর্নীতি) সমালোচনা করা যাবে না? কোনো সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতি প্রকাশিত হলে কি অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি গোপনীয়তা ক্ষুণ্নের জন্য ওই সংবাদপত্র বা প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবেন? এসব প্রশ্ন এখন বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে।আমি বেশ কিছু লেখায় বলার চেষ্টা করেছি, টকশোগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার বিকল্প মাধ্যম। যেহেতু সংসদ সঠিকভাবে কাজ করছে না। বিগত সংসদগুলোয় বিরোধী সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ একরকম ছিলই না। বর্তমান সংসদে (দশম) যারা বিরোধী দলে আছেন, তাদের ভূমিকা নিয়ে স্বয়ং দলীয় প্রধানই যুক্তি তুলে ধরেছেন। সংসদে বর্তমানে কোনো জাতীয় ইস্যু আমি আলোচিত হতে দেখিনি। কোনো জাতীয় ইস্যু নিয়ে যদি আলোচনা না হয়, তাহলে জাতি দিকনির্দেশনা পাবে কীভাবে? তাই টকশোগুলো জনপ্রিয়। সেখানে বিশেষজ্ঞরাই আলোচনায় অংশ নেন। বিভিন্ন ইস্যুতে মতামত দেন। সরকারের নীতির সমালোচনা করার অর্থ সরকারের ভুল-ত্র“টিগুলো ধরিয়ে দেয়া, যাতে সরকার সংশোধিত হতে পারে। এখন তো নীতিমালার নামে একটা খড়গ ঝুলিয়ে দেয়া হল! অনেক স্পন্সরই এখন আর টকশোতে বিনিয়োগ করবে না। তারা কেন ঝুঁকি নেবে? সরকার এতে লাভবান হতে পারে। কিন্তু জাতির ক্ষতি হবে অনেক। টকশোতে নিশ্চয়ই মানুষ কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, জন্মনিয়ন্ত্রণ, মৌ-চাষ ইত্যাদি বিষয়ে শুনতে চাইবে না। এজন্য বিটিভি আছে। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সম্প্রচার মাধ্যমকে একটি গতিশীল ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য এই নীতিমালা করা হয়েছে। এটা গণমাধ্যম জগতে নতুন দিন উন্মোচনকারী পদক্ষেপ। বিকাশমান সম্প্রচার জগৎ গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে। বহুবাদ ও বৈচিত্র্য বজায় থাকবে। এক সময়ের বিপ্লবী জাসদ নেতা এবং এখনও জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনুর এ বক্তব্য শুনে তার অতীত দিনের কথা মনে পড়ে গেল। সংবাদপত্রের সচেতন পাঠকমাত্রই জানেন মিডিয়ার স্বাধীনতার ব্যাপারে জাসদের কী বক্তব্য ছিল কিংবা জনাব ইনু কী বক্তব্য দিয়েছিলেন অতীতে।মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা কখনও কোনো ভালো কাজ হতে পারে না। সংবিধান সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গ্যারান্টার। ইতিমধ্যে সংবিধানে ১৫টি সংশোধনী আনা হয়েছে এবং আরও একটি সংশোধনী আনার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদটি যেভাবে ছিল, সেভাবেই রয়ে গেছে। এ অনুচ্ছেদের ১নং ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। এই অনুচ্ছেদের ৩৯(২) ক ও খ ধারা দুটি আরও স্পষ্ট। ক-তে বলা হয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের অধিকারের কথা এবং খ-তে রয়েছে সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল। অর্থাৎ সংবিধানের পুরো ৩৯নং ধারাটিতে একজন সংবাদকর্মীকে যেমন অধিকার দেয়া হয়েছে তার মত প্রকাশ করার, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র সংবাদপত্রকে অনুমতি দিয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে প্রকাশিত হওয়ার। সংবাদকর্মী তথা সংবাদপত্রের জন্য এ ধারাটি একটি রক্ষাকবচ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝেমধ্যে এ ৩৯নং ধারাটি লংঘিত হয়। আদালত অবমাননার অভিযোগে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যখন বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেদিন এ দেশের বিজ্ঞ আইনজীবীরা আদালতে ৩৯নং ধারার কথা বারবার উল্লেখ করেছিলেন। তারা বলার চেষ্টা করেছিলেন, ৩৯নং ধারাবলেই একজন সম্পাদক তার মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। এখন সম্প্রচার নীতিমালার কোনো কোনো ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই এবং উচ্চ আদালত এর ফয়সালা করে দিতে পারেন। নতুবা বারবার এ প্রশ্ন উঠতেই থাকবে।যে জন্য সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। সাধারণত সেনাবাহিনী কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনী নিয়ে নেতিবাচক কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয় না। বরং প্রশংসামূলক সংবাদই থাকে বেশি। সেনাবাহিনী বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, এ কথা হরহামেশাই আমরা টকশোতে বলি। তবে হ্যাঁ, প্রতিরক্ষা বা পুলিশ বাহিনীর দু-একজন সদস্যের অপকর্ম যখন সংবাদ হয়, যখন স্থানীয় অসন্তোষ বেড়ে যায় (নারায়ণগঞ্জের ঘটনা), তখন তা আলোচনারই দাবি রাখে। মিডিয়া তখন সে কাজটিই করে। অতীতেও করেছে। মিডিয়া সমাজের প্রতি, জাতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না। এক্ষেত্রে আইন করে মিডিয়ায় এসব সংবাদ প্রকাশ ও সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা সমাজে কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। তবে খুব সঙ্গত কারণেই মিডিয়ায়, বিশেষ করে টকশোতে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া কাম্য নয়। কেউ কেউ এ কাজটি করে থাকেন বটে, তবে এক্ষেত্রে তার ভুলটি শুধরে দেয়ার দায়িত্ব কিন্তু সঞ্চালকের। সঞ্চালক এ কাজটি করেন না। কোনো কোনো সঞ্চালককে দেখেছি গালে হাত দিয়ে দুই পক্ষের ঝগড়া উপভোগ করতে! এটা নিশ্চয়ই টকশোর উপস্থাপকের কাজ হতে পারে না। তবে সবাই এটা করেন না। অনেক সঞ্চালককে আমি দেখেছি রীতিমতো কাগজপত্র, ডকুমেন্ট নিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে। এটাই হওয়া উচিত। সঞ্চালকদের কারও কারও রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন আছে। তিনি বা তারা রাজনৈতিক সচেতন হতেই পারেন। কিন্তু কোনো বিতর্ক চাপিয়ে দেয়া কিংবা বিতর্কিত কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা কাম্য হতে পারে না। আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন- কোনো সংবাদপত্র, কোনো ব্যক্তি যদি মিডিয়ায় মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, অসত্য তথ্য দেন, সরকার সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা কিংবা ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারে। প্রেস কাউন্সিল আইনকে সরকার আরও শক্তিশালী করতে পারে। আইন পরিবর্তন করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে। এজন্য নতুন করে আইন করার প্রয়োজন নেই।সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) দেশে একদলীয় সরকার কায়েম হয়েছিল। চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সংবাদপত্রগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। আজও সংবাদপত্রের কর্মীরা ওই দিনটিকে কালো দিন হিসেবে পালন করেন। এবার সম্প্রচার নীতিমালা করে বিরোধীদের হাতে আরেকটা অস্ত্র তুলে দিল সরকার। কাকতালীয়ভাবে হলেও সত্য, ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগই বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সংবাদপত্র প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছিল। আজও সেই আওয়ামী লীগের আমলেই জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রবর্তন করা হল।একটি নীতিমালা হতেই পারে। কিন্তু তাতে যদি কথা বলার অধিকার খর্ব হয়, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়বেই। এর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। সঞ্চালক ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজকরাই পারেন টকশোতে যারা অসংলগ্ন, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে। এর জন্য আইন কেন? কোনো কোনো টকার যেমন নিজ স্বার্থ উদ্ধারে টকশোকে ব্যবহার করেন, তেমনি কেউ কেউ যুক্তিপূর্ণ তথ্য দিয়ে সরকারকে সুষ্ঠু নীতি প্রণয়নে সহায়তাও করেন। সুতরাং টকশো নিয়ন্ত্রণ করে সরকার খুব লাভবান হবে, এটা মনে করার কারণ নেই। মানুষ এটা পছন্দ করবে না।এখন একটি নীতিমালা হয়েছে। দেখা যাক এই নীতিমালা কতটুকু অনুসরণ করা হয় কিংবা সরকারের নিয়ন্ত্রণ মিডিয়ার ওপর কতটুকু থাকে। একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করাও জরুরি। তবে এতে যেন মুখচেনা সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবী কিংবা সাংবাদিক নেতারা না থাকেন। কিংবা এটা যেন পরিপূর্ণভাবে আমলানির্ভরও না হয়ে যায়। কাজটি সরকার ভালো করল না মন্দ করল, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। Daily JUGANTOR 14.08.14

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা

সম্প্রতি জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এই নীতিমালা নিয়ে অনেক কথা আছে। ইতোমধ্যে এই সম্প্রচার নীতিমালা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতিগতভাবেও এক ধরনের বিভক্তি আমরা লক্ষ করছি। বিএনপি এর বিরোধিতা করছে। সম্প্রচার নীতিমালা অনুযায়ী ১৩টি বিষয়ে সম্প্রচার করা যাবে না বা সম্প্রচারের সময় কঠোরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সব বাহিনী বা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কোনও বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ, অবমাননা বা বিদ্রƒপ করে কিছু প্রচার করা যাবে না বা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা যাবে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এমন সামরিক, বেসামরিক কোনও তথ্য প্রচার করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে, এমন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না। কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের অনুকূলে যায়, যাতে অন্য কোনও বিদেশি রাষ্ট্র আঘাত পায় কিংবা যাতে শত্রুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে রকম কিছু প্রচারে বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতির জন্য ক্ষতিকর কোনও দৃশ্য প্রচার করা যাবে না। টক শোতে কোনও বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রচার পরিহার করতে হবে। ব্যক্তির গোপনীয়তা ক্ষুণœ করে- এমন কিছু আর করা যাবে না। যদিও সম্প্রচার নীতিমালায় একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। যে-কোনও বিবেচনায় এ ধরনের নীতিমালা পরোক্ষভাবে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার শামিল। এখন গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এই নীতিমালা কার্যকর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল না। এর মধ্য দিয়ে এখন মিডিয়ার ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বাড়ল। অভিযোগ উঠেছে, এই নীতিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গত ৪৩ বছরে সংবিধানে মোট ১৫টি সংশোধনী আনা হয়েছে। সংবিধান ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে গেলেও কিছু ধারায় কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। যেমন সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদটি যেভাবে ছিল, তা রয়ে গেছে। সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদের ১নং ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এই অনুচ্ছেদের ৩৯ (২) ‘ক’ ও ‘গ’ ধারা দুটো আরও স্পষ্ট। ‘ক’তে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের কথা এবং ‘গ’তে রয়েছে, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ অর্থাৎ সংবিধানের পুরো ৩৯ নম্বর ধারাটিতে কোনও সংবাদকর্মীকে যেমন অধিকার দিয়েছে তার মত প্রকাশ করার, ঠিক তেমনি একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংবাদপত্রকেও অনুমতি দিয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে প্রকাশিত হওয়ার। সংবাদকর্মী তথা সংবাদপত্রের জন্য এ ধারাটি একটি রক্ষাকবচ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝে-মধ্যে ওই ৩৯ নম্বর ধারাটি লঙ্ঘিত হয়। আদালত অবমাননার অভিযোগে ‘আমার দেশ’-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যখন বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেদিন এ দেশের আইনজীবীরা আদালতে ৩৯ নম্বর ধারার কথা বারবার উল্লেখ করেছিলেন। বলার চেষ্টা করেছিলেন, ৩৯ নম্বর ধারাবলেই কোনও সম্পাদক তার মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যখন জন্ম হয়, তখন ওই সময়ের জাতীয় নেতৃবৃন্দ এটি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে এ দেশটিতে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। তাই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তারা সংবিধানে ৩৯ নম্বর ধারাটি জুড়ে দিয়েছিলেন। যদিও ৩৯ নম্বর ধারার সঙ্গে সংবিধানের ৩৬ ও ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদ দুটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপূরক। ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে চলাফেরার স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই ধারাবলে বাংলাদেশের যে কোনও নাগরিক এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া বা চলাচল করার অধিকার রাখেন। আর ৩৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে সমাবেশের স্বাধীনতার কথা। অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদে কোনও নাগরিককে জনসভা তথা শোভাযাত্রা করার অনুমতি দিয়েছে। সংবিধানের এই ৩৬, ৩৭ ও ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ যদি একসঙ্গে পড়ি, তাহলে দেখব- এখানেই নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রের স্পিরিট। অর্থাৎ গণতন্ত্রের বিকাশ ও স্থায়িত্বের বিষয়টি লুকিয়ে আছে এই অনুচ্ছেদগুলোর অন্তরালে। এর একটি যদি লংঘিত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের অনেক কর্মকা- গণতন্ত্রের এই বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটা স্বীকার করতেই হবে ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে ৩৯নং অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশিত থাকলেও ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা ৩৯নং অনুচ্ছেদে যে রক্ষাকবচ ছিল, তাতে ছুরি বসিয়েছিলাম। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র রেখে বাকি সংবাদপত্রগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি ৪০নং অনুচ্ছেদে যেখানে ‘পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল, তাও লংঘিত হয়েছিল। অনেক সংবাদপত্রকর্মীকে বেঁচে থাকার জন্য ভিন্ন পেশা বেছে নিতে হয়েছিল। যদিও বলা হচ্ছে, ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এটি করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।
সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) মাধ্যমে একদলীয় তথা রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে একদলীয় ব্যবস্থা রহিত করা হলেও রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে যায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে রাষ্ট্রপতি সরকারব্যবস্থা বহাল থাকে। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী এনে আমরা পুনরায় সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছি। যদিও বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতির বিকাশ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেও পরে আমরা তা বাতিল করেছি। এখন অনেকেই স্বীকার করবেন যে, গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চার জন্য স্বাধীন একটি মিডিয়া দরকার। স্বাধীন মিডিয়া থাকলে তা সরকারের ভুল-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেয়। সরকারি মিডিয়া যা কখনোই করে না। এখন সরকার একটি সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করে তা কার্যকর করল। এর প্রয়োজন ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু যদি মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যদি টক শোকে একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হয়, যার আলামত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, তা কিন্তু গণতন্ত্র চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করবে। একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এবং বিশেষজ্ঞদের ওই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে কমিশন কর্তৃক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করলে তা শোভন হত। কিন্তু এখন এই নীতিমালা প্রণয়ন করে মিডিয়াকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী করা হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী অতীতে সংবাদপত্রের তথা মিডিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু এখন তিনি কী বলবেন? যদিও তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রচার মাধ্যমকে একটি গতিশীল ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার জন্যই এই নীতিমালা করা হয়েছে।’ কিন্তু গণমাধ্যমের কর্মীরা মন্ত্রীর কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের অনেকেরই ধারণা এই সম্প্রচার নীতিমালা টিভি ও সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল না।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে সচেষ্ট রয়েছি। কিন্তু গণমাধ্যমের কর্মীরা যখন হত্যা কিংবা গুমের সম্মুখীন হন, তখন তা গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতদিন হয়ে গেল আমরা আজও জানতে পারলাম না কারা এবং কেন সাগর-রুনী সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করেছিল। সংবাদপত্রের কর্মীরা এই হত্যার বিচারের জন্য এখনও আন্দোলন করে যাচ্ছেন। সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীরা যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তখন গণতন্ত্রকে আর উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় না। আমরা তা চাই। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্ষমতাসীনরা বরাবরই নির্লিপ্ত। সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখে একটা ‘ভয়ের আবহ’ তৈরি করে আর যাই হোক, সত্যিকারের গণতন্ত্র বিনির্মাণ করা যাবে না। আমরা চাই সংবাদপত্র লিখুক, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশিত হোক, সরকারের দোষ-ত্রুটি ধরিয়ে দিক, সমাজে সব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হোক, তাহলেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং গণতন্ত্রকে আমরা আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অপব্যবহার হতেও আমরা দেখেছি। যে সংবাদ সমাজে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়, সংঘাত সৃষ্টি করে, তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে ছাপানো উচিত নয়। এখানে সংবাদপত্রের তথা সম্পাদকের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। তার পরও সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও অযৌক্তিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও একটা কথা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শুধু সংবাদপত্র কিংবা রেডিও, টেলিভিশন নয়, বরং অনলাইন সংবাদপত্রগুলোর জন্যও একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। ফেসবুক এখন যথেষ্ট জনপ্রিয়। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর জন্যও নীতিমালা করতে হবে, যাতে কেউ কারও নামে এসব যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর, অসংলগ্ন কথা লিখতে না পারেন। ইতোমধ্যে সরকার ২০১৪ নামে যে একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে, এই নীতিমালা শুধু রেডিও, টেলিভিশনের জন্য। ফেসবুকের তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য কোনও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। গণমাধ্যমের জন্য প্রায় ৪৩টি আইনের বিধি রয়েছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার পরও আরও একটি সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করা হল। সম্প্রচার কর্মীদের একটা অংশ এর বিরোধিতা করায় শুরুতেই এটি বিতর্কিত হল। সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪ বাতিলের দাবি ইতোমধ্যেই উঠেছে। এটি নিয়ে সংসদে আলোচনারও সুযোগ আছে। আমি মনে করি কিছু ধারায় সংশোধনী আনা যায়। বিশেষ করে ‘টক শোগুলোর ব্যাপারে যেসব কথা বলা হয়েছে, তাতে সংশোধনী আনা যেতে পারে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নীতিমালা মিডিয়ার মঙ্গল ডেকে আনতে পারে। অহেতুক পরোক্ষ বিধিনিষেধ আরোপ করে, ‘টক শো’গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে সরকার সাময়িক সুবিধা পাবে সত্য, কিন্তু গণতন্ত্র চর্চার জন্য তা কখনোই কোনও ভালো খবর নয়। Daily AMADER SOMO 12.08.14

আমাদের অর্জন কি আমরা ধরে রাখতে পারব?

ঈদের পর বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন বেগম জিয়া। ঈদের আগে বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে তিনি আন্দোলনের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে সবাইকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। তার এই আহ্বানে বারবারই জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যেখানে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশ কি এই অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে পারবে এখন? যখন বিরোধী দল আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, সেখানে অগ্রগতির ধারা রক্ষিত হবে তো? গত ২৪ জুলাই জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৪ সালের মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করেছে। বেশ কিছু বছর ধরে ইউএনডিপি এই সূচক প্রকাশ করে আসছে। এতে করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেক্টরে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়। এবার মোট ১৮৭ দেশের অগ্রগতি আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২ নম্বরে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। জাতিসংঘ ‘দ্রুত এগিয়ে চলা’ যে ১৮ দেশের কথা উল্লেখ করেছিল বাংলাদেশ এর মধ্যে একটি। বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশ তার অবস্থানকে আরো উন্নত করেছে। গেলবার (২০১৩) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩। এবার এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে গড় আয়ু বৃদ্ধি, সাক্ষরতা, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। ইউএনডিপি নিজস্ব গবেষকদের দ্বারাই এই সূচক প্রণয়ন করে। এখানে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা থাকে না। অর্থাৎ সূচক প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। সামগ্রিক বিচারে বিভিন্ন সোস্যাল সেক্টরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এবং উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সহিংসতার পরও বাংলাদেশ সোস্যাল সেক্টরে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। পরিসংখ্যানে দেখা যায় মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ বছর, জনপ্রতি গড়ে ৫ দশমিক ৮ বছরে শিক্ষাগ্রহণ, কিংবা মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ৭১৩ ডলারে উন্নীত হওয়া একটি বড় অগ্রগতির পরিচয় বহন করে। নিঃসন্দেহে এই যে অগ্রগতি তা আমাদের আশার কথা বলে। কিন্তু আন্দোলনের যে ধ্বনি আমরা শুনতে পাচ্ছি তা আমাদের এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা এখন জানি না, বিএনপির আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে আমাদের মনে শঙ্কা আরো বেড়েছে। যেখানে বিএনপি আরো একটি নির্বাচনের কথা বলেছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, আগাম নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি পরোক্ষভাবে বিএনপির আন্দোলন প্রতিহতেরও ঘোষণা দিয়েছেন। বলেছেন বিএনপির আন্দোলন মাঠেই প্রতিহত করবে আওয়ামী লীগ। এর প্রতিধ্বনি করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও। বলেছেন, ‘দেখব কার কত হিম্মত আছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে।’ এর আগে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সংকট নিরসনে আলোচনার আহ্বানে সাড়া না দিলে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ শুরু করা হবে।’ পরস্পরবিরোধী এই যে বক্তব্য, এই বক্তব্য আমাদের মনে একটা বড় ভয় ধরিয়ে দেয়-রাজনৈতিক সংকট বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশে-এ ধরনের একটি অভিমত দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সাময়িকী জেনস। জেনস সাময়িকীতে অতি সম্প্রতি বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জোরালো হবে বিরোধী আন্দোলন। এটা প্রত্যাশিত ছিল যে দুই পক্ষ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে। কিন্তু সেই সমঝোতার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। আসলে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দাতাগোষ্ঠী বারে বারে এই সমঝোতার কথা বলে আসলেও কোনো জট খুলছে না। সমঝোতাও হচ্ছে না। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ৬ দফার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের হাউস অব কমনসও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাপারে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সুনির্দিষ্টভাবে ৬টি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এগুলো হচ্ছে : ১. রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সরাসরি ও সত্যিকার অর্থে সংলাপ, ২. রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ, ৩. শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পথ সুগম করা, ৪. নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ৫. জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকোর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন, ৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা বন্ধ ও গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দেয়া। সিনেটে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সিনেটর মেনডেজ কর্তৃক দুই নেত্রীকে লেখা চিঠির কথাও আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। উক্ত চিঠিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, সহিংসতা বন্ধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছিল। সিনেটর রবার্ট মেনডেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান। সিনেটর মেনডেন কিংবা মার্কিন সিনেটে গৃহীত সিদ্ধান্তকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি জানি না সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন কি না? এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। ড. ইউনূস ইস্যুতে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল। তা আর ভালো হয়নি। তৈরি পোশাক শিল্প নিয়েও কথা আছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব শর্ত পূরণ করলেও জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ ফিরে পায়নি। এমনকি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নিজে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেও জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করতে পারেননি। মার্কিন সিনেটের পাশাপাশি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের হাউজ অব কমনসের সিদ্ধান্তটিও ছিল আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য-এই তিনটি দেশের তথা সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। এদের বাংলাদেশে যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং এই দুটি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা বিবেচনায় নেয়া আমাদের জন্য মঙ্গল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো গুরুত্বই দেয়নি।মোটা দাগে এই তিনটি প্রস্তাব যদি বিশ্লেষণ করি, তাতে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত একটি মিল খুঁজে পাই। এগুলো হচ্ছে, ১. অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন, ২. অবিলম্বে স্থগিত হয়ে যাওয়া সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করা, ৩. সহিংসতা বন্ধ। এখানে সবাই একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বললেও বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা কেউ বলেনি। তবে যে ভাষা তারা ব্যবহার করেছেন, তাতে ধারণা করা হয় এটা স্বাভাবিক যে দশম সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় এরা খুশি নন। সব দলের অংশগ্রহণ এতে হয়নি, এমন অভিমতও দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের হাউজ অব কমনস-এ গৃহীত সিদ্ধান্তে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছিল, যা অন্য কেউ বলেনি। এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘সন্ত্রাসে জড়িত দল নিষিদ্ধ করা উচিত’ বলে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল তাও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দেশকে বোঝানো হয়নি। তবে এটা তো ঠিক সহিংস ঘটনাবলির জন্য জামায়াত ও হেফাজত ইসলাম অভিযুক্ত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন উকি দেবে-ইউ’র ওই সিদ্ধান্ত কী জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? সরকার কি সিদ্ধান্তটি নেবে? সরকারের হাতে একাধিক ‘অপসন’ আছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার। কি করবে সরকার এখন যদিও তা স্পষ্ট নয়। সরকার জামায়াতের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় যাচ্ছে, এ ধরনের একটি গুজব বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা যখন এ ধরনের অভিযোগ আনেন, তখন সাধারণ মানুষ এ ধরনের গুজবকে গুরুত্ব দেয় বৈকী। জামায়াত নেতাদের, যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন করার প্রশ্নে ইতোমধ্যে গণজাগরণের মঞ্চ ভেঙেও গেছে। তবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সরকারের জন্য কঠিন কিছু নয়। বিশেষ করে আমাদের সংবিধানের ৩৮ (গ) ও (খ), রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭২, দ্যা পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮ এর ধারা, উপধারা বলে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ, কিংবা উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলার ফয়সালা করে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। আগামী নির্বাচনের জামায়াত নামে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনগত ও সাংবিধানিকভাবেই হওয়াই উচিত। সংলাপের পূর্বশত আরোপ করা উচিত নয়। তবে এটা তো ঠিক বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের কারো কারো মধ্যে এই উপলব্ধিবোধ এসেছে যে, বিএনপির জামায়াতকে পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। যদি সংলাপ হয়ও তাতে কি কোনো ‘ফল’ পাওয়া যাবে? সংলাপে মূল আলোচ্য বিষয় কি? একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন? তাতে সরকার এখন রাজি হবে না। কিংবা নির্বাচনটা হবে কোন সরকারের অধীনে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? সংবিধানে তো সে ভাবেই লেখা আছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই তো নির্বাচন হওয়ার কথা! বিএনপি তা কি মানবে? যদি এটা বিএনপিকে মানতেই হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিল না কেন? আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি-সংবিধানে বর্ণিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফর্মুলা বাদ দিয়ে (যেখানে শেখ হাসিনাই থেকে যাবেন সরকার প্রধান হিসেবে) অন্য যে কোনো ফর্মুলায় বিএনপি রাজি হবে। ফলে সংলাপ হলেও তা কোনো ফল দেবে না-আমার আশঙ্কা এখানেই। সরকার এখন চাইবে দশম সংসদকে পাঁচ বছর টেনে নিয়ে যেতে। এতে সরকার কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কতটুকু সংগঠিত করতে পারবে, তার ওপর। সম্ভবত বিএনপি তথা ২০ দলের স্ট্র্যাটেজি সঠিক ছিল না। এটা সত্য নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। একটি সংসদও আছে। তথাকথিত একটি বিরোধী দলও আছে। মানুষ ভোট দিক আর না দিক সংসদ গঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিএনপি এই প্রক্রিয়ার বাইরে। অর্থাৎ বড় দল হিসেবে বিএনপিকে প্রয়োজন ছিল। আমাদের আস্থার জায়গটা বারবার নষ্ট হয়ে যায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও এক সময় মনে করা হতো সরকার যেহেতু ‘নিয়ম রক্ষার্থে’ এই নির্বাচন আয়োজন করেছিল, সেহেতু সরকার অতি দ্রুত এটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে। কিন্তু ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর সরকার প্রধান এবং অমান্য নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সরকার ২০১৯ সালের আগে আর নির্বাচনের কথা ভাবছে না। শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ার পর ইতোমধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেছেন। জাপান, চীন ও ব্রিটেন। ধারণা করছি আগামী জানুয়ারিতে তিনি ভারত সফরে যাবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এই চারটি দেশই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মধ্যে দিয়ে সরকার প্রধান চেষ্টা করছেন বহির্বিশ্বে এক ধরনের ‘লেজিটেম্যাসি’ তৈরি করতে। তিনি পুরোপুরিভাবে এ ক্ষেত্রে সফল, তা বলা যাবে না। সর্বশেষ ব্রিটেন সফর নিয়েও একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটেন সফরের পর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ‘ব্রিটেন মনে করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এক অতীত।’ কিন্তু পরে জানা গেল দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্রিটেন এ ধরনের কোনো মনোভাব দেখায়নি। বরং বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নতুন করে আরেকটি নির্বাচনের কথা বলেননি বটে, কিন্তু একটি ‘মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ পক্ষে কথা বলেছিলেন। সরকার স্পষ্টতই শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা থাকুক, আর না থাকুক সরকার এটা নিয়ে আর ভাবছে না। সরকারের প্রায়োরিটি এখন দাতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং খুব সঙ্গতকারণেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথায় নেই। তাহলে? সরকার কি তাহলে দমন-নিপীড়ন চালিয়ে বিএনপির আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে? অতীতে বিএনপি তথা তৎকালীন ১৯ দল ঢাকা অবরোধ ডেকেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সরকার কঠোর হয়েছিল। সরকার আবারো সেদিকেই যাচ্ছে। ফলে একটা শঙ্কা, একটা ভয় থাকলই-কি হবে আগামী দিনে? আন্দোলন করে সরকারকে বাধ্য করা যাবে কি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে? এসব প্রশ্ন এখন বার বার আলোচিত হবে। অনেক ‘কিন্তু’ এবং ‘যদি’র মধ্যে ভবিষ্যৎ রাজনীতি আবর্তিত হবে। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এটা দিব্যি দিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের যে ‘অর্জন’ তা বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) যে লক্ষ্যমাত্রা, তাতে পৌঁছতে পারব না। ইউএনডিপির রিপোর্টে যে সাফল্যের কথা বলা হয়েছে তা ধরে রাখতে হলে সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক ধরনের ‘সমঝোতা’, ‘ঐক্য’ ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যত দ্রুত সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন, ততই আমাদের মঙ্গল। Daily Manobkontho 08.08.14

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কী

গাজায় ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসনের এক মাস পূর্ণ হল। ৮ জুলাই শুরু হওয়া এ সামরিক আগ্রাসন তথা ‘অসম যুদ্ধে’ ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১৯০০ ফিলিস্তিনি নাগরিক, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে। এ হামলায় এ পর্যন্ত ৪০০ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ‘যুদ্ধ’ বেশকিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে একটা প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিয়েছে। প্রথমত, এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে ইসরাইলি নেতারা পশ্চিমতীর নিয়ন্ত্রণকারী আল ফাতাহ গ্র“পের সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থানে যেতে রাজি থাকলেও গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসকে ইসরাইলের জন্য এক ধরনের ‘হুমকি’ বলে মনে করে। পশ্চিমতীর আর গাজা নিয়েই একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। ২০১২ সালে পিএলওকে জাতিসংঘের ‘নন মেম্বার অবজার্ভার স্ট্যাটাস’ দেয়া হয়েছে। ইসরাইল এ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।দ্বিতীয়ত, গাজায় ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুরা ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হলেও পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ এক্ষেত্রে পালন করেছে আশ্চর্য রকমের নীরবতা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে লন্ডনে আন্তর্জাতিক ‘গার্ল সামিট’ অনুষ্ঠিত হলেও একটিবারের জন্যও ওই সম্মেলনে ফিলিস্তিনি শিশু তথা কন্যাদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি আলোচিত হয়নি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেনে একটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া হুশিয়ারি তথা অর্থনৈতিক অবরোধের কথা বলা হলেও একটিও পশ্চিমা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবরোধের কথা বলা হয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা অবশ্য ন্যামের একটি কোর কমিটির বৈঠকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের কথা বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের যে ধারা, তা বাংলাদেশ অব্যাহত রাখল।তৃতীয়ত, সনাতন রাজতন্ত্রশাসিত মুসলিম বিশ্বে এ অসম যুদ্ধের ও গণহত্যার যে প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার দাবিদার সৌদি আরব, জর্ডান ও আরব আমিরাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসরাইলি এ আগ্রাসনকে সমর্থন করেছে। হামাসকে তারা তাদের নিজেদের ক্ষমতার প্রতি অন্যতম হুমকি বলে মনে করে। যদি হামাস এ যুদ্ধে ‘জয়ী’ হতে পারে, তাহলে হামাসের জনপ্রিয়তা এসব রাজতন্ত্রশাসিত দেশে বেড়ে যাবে। ফলে তা প্রকারান্তরে রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। আরব বিশ্বের শুধু কাতারকে এবং এর বাইরে তুরস্ককে হামাসকে সমর্থন করতে দেখা গেছে। যদিও তুরস্ক কোনো আরব রাষ্ট্র নয়। এ ক্ষেত্রে এরদোগানের ব্যক্তিগত স্বার্থ (তুরস্কের তিন টার্ম প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী) কিংবা কাতারের মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার অভিপ্রায় কাজ করেছে বলে স্ট্র্যাটেজিস্টদের ধারণা। বলা ভালো, হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা (খালেদ মিসেলসহ) অনেকেই এখন কাতারে বসবাস করেন। আরও একটা মজার কাহিনী এখানে উল্লেখ করার মতো। ইরাক ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হঠাৎ করে আবির্ভূত হওয়া ‘ইসলামিক স্টেট’-এর সুন্নি জঙ্গিদের হামাসবিরোধী অবস্থান। যেখানে তাদের জায়নবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামাসের সংগ্রামকে সমর্থন করার কথা, সেখানে তারা হামাসের বিরোধিতা করছে। এমনকি তারা ফিলিস্তিনি পতাকাও পুড়িয়েছে। এরা মনে করে, এ মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে গত জুনে বুগদাদী যে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছেন, তার পেছনে সব মুসলমানের দাঁড়ানো। মুসলমানদের এটাই প্রধান কাজ এখন, অন্য কিছু নয়!চতুর্থত, এই ‘যুদ্ধের’ মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে ইরানি প্রভাব বাড়বে। ইরান হামাসকে শুধু সমর্থনই করেনি বরং হামাসের অস্ত্রশস্ত্রের অন্যতম জোগানদাতা হচ্ছে ইরান।পঞ্চমত, আগামীতে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে কোনো শান্তি আলোচনা শুরু হলেও (?) আদৌ এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কেননা ১৯৭৩ সাল থেকেই এ শান্তি আলোচনা চলে আসছে। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলের ওই আগ্রাসী নীতির কাছে ফিলিস্তিনি স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না। বলা ভালো, পিএলও ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্স সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ পরিত্যাগ করা সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। পরে ১৯৯৩ সালে ইসরাইল ও পিএলও পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বড় ধরনের অগ্রযাত্রা শুরু করলেও শুধু ইসরাইলি আগ্রাসী নীতির কারণে এ শান্তি প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।ষষ্ঠত, একটি ‘টু-নেশন’ থিওরির কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে ইসরাইল, অন্যদিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। এটা একটা সমাধানের পথ হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসময় এই ‘টু-নেশন’ থিওরির পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইসরাইল এখন চাচ্ছে ‘থ্রি-নেশন’ থিওরি। অর্থাৎ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করা। একদিকে পশ্চিমতীরে প্রতিষ্ঠিত হবে আল ফাতাহর নেতৃত্বে একটি প্রশাসন, অন্যদিকে গাজায় প্রতিষ্ঠিত হবে আরেকটি প্রশাসন। তারা হামাসকে উৎখাত করে গাজায় একটি দুর্বল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাদের নিয়ন্ত্রণ করা ইসরাইলের পক্ষে সহজ হবে। এতে করে ইসরাইলের লাভ অনেক। তারা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে বিভক্ত করে সুবিধা নিতে চাইবে বেশি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এপ্রিল মাসে (২০১৪) হামাস ও আল ফাতাহ ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সরকার গঠন করার উদ্যোগ নিলে ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে গাজায় আগ্রাসন চালায়।সপ্তমত, গাজায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এটি স্বীকার করেছেন নাভি পিল্লাই স্বয়ং, যিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান। এখন এ যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ইসরাইলি নেতাদের যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার করা না যায়, তাহলে আইসিসি বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইতিমধ্যে বিচার হওয়া সব বিচার কর্মকাণ্ড প্রশ্নের মুখে পড়বে।অষ্টমত, হামাস প্রস্তাবিত ১০ দফাকে সামনে রেখে একটি শান্তি আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। গাজায় ইসরাইলি অবরোধ প্রত্যাহার, বিমান ও সমুদ্রবন্দর খুলে দেয়া এবং গাজায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন এ অঞ্চলে এক ধরনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যুদ্ধবিরতি। ইসরাইলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করাও জরুরি। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। একটি বৃহত্তর ইসরাইলি রাষ্ট্র গঠন কিংবা ফিলিস্তিনিদের এক ধরনের বস্তি জীবনযাপনে বাধ্য করা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মঙ্গলজনক নয়। একসময় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে ধ্বংস করার অঙ্গীকার করেছিল পিএলও। সেই অবস্থানে তারা এখন আর নেই। হামাসও একই অবস্থানে যাবে- এ জন্য দরকার আস্থা। ইসরাইলি নেতারা যদি হামাসের সঙ্গে এ আস্থার সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন, তাহলেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ফিলিস্তিনিদের উৎখাত, শিশু ও নারীদের হত্যার মধ্য দিয়ে কোনো সমাধান আসবে না। এতে করে বরং বহির্বিশ্বে হামাসের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। এ ‘যুদ্ধ’ গাজাকে একটি ধ্বংসের নগরীতে পরিণত করেছে, এটা সত্য। কিন্তু হামাস অনেক অংশেই লাভবান হয়েছে। Daily JUGANTOR 07.08.4

একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কি আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে?

গাজায় অব্যাহত ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং গণহত্যা ঠেকাতে জাতিসংঘ তথা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার পর যে প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে তা হচ্ছে, আদৌ কি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে কিংবা ইসরাইল কি তার সীমান্তে এ রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব মেনে নেবে? যারা এ অঞ্চলের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি মূলত আজকের নয়। এমনকি পশ্চিমা বিশ্ব নীতিগতভাবে এ দাবিটি মেনে নিলেও আজও এ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেকে স্মরণ করতে পারেন, একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অতীতে আল ফাতাহ এক ধরনের গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, ৭০ দশকের প্রথম দিকে বিমান ছিনতাই করে তা উড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আল ফাতাহ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধা লায়লা খালেদের কথা, যিনি বিমান ছিনতাই করে শুধু ইতিহাসই রচনা করেননি, বরং আজও ফিলিস্তিনি তরুণদের কাছে তিনি এক সংগ্রামের আদর্শ। তারপরও অনেক সময় পার হয়ে গেছে। সেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিএলও ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্স সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ পরিত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে পিএলও আর বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল না। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব পিএলওর এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে নেয়নি। শুধু তথাকথিত একটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে ফিলিস্তিনি জনগণকে সান্ত্বনা দিয়ে আসছে। সুতরাং আজ যখন ইসরাইলি গোলায় শত শত শিশু ও নারী মারা যাচ্ছে, তখন প্রশ্নটা উঠবেই যে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কি আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে? ফিলিস্তিন নিয়ে সমস্যা মূলত একটিই আর তা হচ্ছে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। পশ্চিমা বিশ্ব বার বার এ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শান্তি আলোচনা সেই ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু হলেও আজও এ শান্তি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৯৩ সালে ওয়াশিংটনে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৯৮ সালে ওয়াশিংটনের অদূরে 'উই রিভার' চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইসরাইলের ব্যাপারে পিএলও ও আরব রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন সময় কিছু কিছু নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করলেও ইসরাইল কখনোই তার একগুঁয়ে ও আগ্রাসী মনোভাব পরিত্যাগ করেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ ও ৩০৮ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরাইলের অধিকৃত আরব এলাকা ফিরিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু ইসরাইল নিরাপত্তা পরিষদের সেই সিদ্ধান্ত কখনোই কার্যকর করেনি। বরং একের পর এক বসতি স্থাপন করে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিরাপত্তা পরিষদও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কখনও উদ্যোগী হয়নি। অথচ ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগ বহুজাতিক সেনাবাহিনী গঠন করে সেখানে সেনা পাঠানো হয়েছিল ও ইরাককে বাধ্য করা হয়েছিল সেই সিদ্ধান্ত মানতে। সুতরাং আজ যখন গাজায় নিরীহ শিশুদের ইসরাইল হত্যা করছে, তখন এ কর্মকান্ড বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি জাতিসংঘ। তখনই এসে যায় মূল প্রশ্নটি- তা হচ্ছে, জাতিসংঘ মূলত পশ্চিমাদের স্বার্থেই পরিচালিত হয়! যুদ্ধ, মানবতা তাদের কাছে বড় কথা নয়। যখন গাজা একটি বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে, যখন ১০০-এর অধিক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে গাজায়- এ বিষয়টি প্রাধান্য পায়নি জাতিসংঘের কাছে। বরং নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউক্রেনে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায়। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভিপিল্লাই ইসরাইলের এ হামলাকে যুদ্ধাপরাধ পর্যায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন বটে; কিন্তু তা কোনো পরিবর্তনের কথা বলে না। যারা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন 'জিওনবাদের' বা ইহুদিবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা থিওডর হারজেল(Theodor Herzl) ১৯০৪ সালে একটি বৃহত্তর ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই রাষ্ট্রটির সীমানা হবে একদিকে নীলনদ, অন্যদিকে ফোরাত নদী। এ লক্ষ্যেই ১৯৮২ সালে ইনন পরিকল্পনা (Oded Yinon)প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ পরিকল্পনায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ধর্মীয় ও এথনিকভাবে ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হবে। ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হবে এবং তা ইসরাইলি রাষ্ট্রকে কোনো নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করবে না। আজকে ইরাকের দিকে তাকালে কিন্তু সেই 'ইনন ফর্মুলা'র বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। ইরাক আজ বাহ্যত তিন ভাগে বিভক্তির পথে-কুর্দি অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কুর্দিস্তান, শিয়া ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে একটি শিয়া রাষ্ট্র এবং সুন্নিরা আলাদা হয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্র। এ পরিকল্পনা এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কুর্দিরা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য একটি গণভোটের কথা বলছে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন, জো বাইডেন (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) ২০০৬ সালের ১ মে পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনেট কমিটিতে (তখন তিনি একজন সিনেটর) এক ভাষণে ইরাককে ভেঙে তিনটি রাষ্ট্র করার প্রস্তাব করেছিলেন। ২০০৭ সালে সিনেটে গৃহীত এক প্রস্তাবে (৭৫-২৩ ভোটে) সেই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। কুর্দিরা সেই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছিল। আজ যখন জো বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যান, তখন সঙ্গত কারণেই তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বলা ভালো, জো বাইডেন নিজে একজন ইহুদি। ওবামার ইহুদিপ্রীতির খবরও ইতিহাসে আছে। তরুণ সিনেটর হিসেবে প্রয়াত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ারের সঙ্গে দেখা, তার প্রশংসা করা ও চলতি জানুয়ারিতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শেরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে দুই ঘণ্টা বৈঠক-এসবই ছিল ইসরাইলের প্রতি তার ভালোবাসার প্রকাশ। এখানে আরও একটি কথা বলা দরকার, ১৯৬০ সাল থেকেই কুর্দি নেতারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে এবং সেখান থেকে সামরিক সাহায্য পেয়ে আসছে। চলতি জুন মাসে নেতানিয়াহু তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে স্বাধীন কুর্দিস্তানের পক্ষে কথা বলেছেন। ইতিহাসের কী অনিবার্য পরিণতি! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের দক্ষিণহস্ত বলে পরিচিত আইকম্যানের ফর্মুলা অনুযায়ী হিটলার ইহুদিদের বন্দি শিবিরে একত্রিত রাখা ও তাদের উচ্ছেদ অভিযানে নেমেছিলেন। গ্যাস চেম্বারে ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল। আজ এত বছর পর সেই ইহুদি নেতৃত্ব একই পন্থা অবলম্বন করে ফিলিস্তিনিদের এক ধরনের বস্তি জীবনযাপনে বাধ্য করছে। ইতিহাস থেকে ইহুদি নেতৃত্ব কোনো শিক্ষাই নেয়নি। এখানে ইনন ফর্মুলা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ওডেড ইনন (Oded Yinon)  মূলত একজন কট্টর ইহুদি স্ট্র্যাটেজিস্ট। তিনি মূলত একজন গবেষক ও শিক্ষক। বলা যেতে পারে, থিওডর হারজেল যে স্বপ্ন এক সময় দেখতেন, তার বাস্তব রূপ দিতেই ইনন সদূরপ্রসারী একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। আর তা বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ইনন হিব্রু ভাষায় একটি প্রবন্ধ লেখেন Kivunim নামে একটি কট্টরপন্থী ম্যাগাজিনে। আশির দশকের মাঝামাঝি ওই প্রবন্ধটি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে- 'A Strategy for Israel in the Nineteen Eightees'। লেবাননকে ভেঙে পাঁচটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করা কিংবা সিরিয়াকে ভেঙে একাধিক রাষ্ট্রে পরিণত করা- এসবই ছিল 'ইনন ফর্মুলা'র অন্তর্গত। ইসরাইলের কট্টরপন্থী নেতারা এ ফর্মুলা এখন ধারণ করেন। আজকে যদি আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, এ 'ইনন ফর্মুলা'ই এখন কার্যকর হচ্ছে। ইসরাইল মূলত ফাতাহ ও হামাসের ভেতরকার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাচ্ছে। মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট হলেও পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের কাছে হামাস গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমনকি খোদ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছেও হামাসের এ বিজয় নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে ওয়াশিংটন চুক্তি (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩) ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ওই শান্তি চুক্তির ফলে ইসরাইল অধিকৃত গাজা ও পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরে সীমিত স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি অপর একটি চুক্তির বিনিময়ে হেবরন শহরে ফিলিস্তিনি শাসন সম্প্রসারিত হয়। ওয়াশিংটন চুক্তির পরপরই যে ফিলিস্তিনি স্বশাসিত এলাকার সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। তবে ১৯৯৬ সালে ফিলিস্তিনি স্বশাসিত এলাকার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং আরাফাত প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৪ সালে আরাফাতের মৃত্যু ফিলিস্তিনি আন্দোলনের জন্য ছিল এক ছুরিকাঘাতের শামিল। জীবদ্দশায় আরাফাত 'একজন প্রেসিডেন্টের' সম্মান পেয়ে গেছেন; কিন্তু স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তিনি দেখে যেতে পারেননি। অভিযোগ আছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা 'মোসাদ' বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করেছিল। এরপর ২০০৫ সালে মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। কিন্তু হামাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনো পর্যায়েই ভালো ছিল না এবং দেখা গেল, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাঝে দুই কর্তৃপক্ষের জন্ম হয়েছে- একদিকে ফাতাহর নেতৃত্বে পশ্চিম তীরে একটি প্রশাসন, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহমুদ আব্বাস, অন্যদিকে গাজায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হামাসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এতে করে পুরো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্বল হয়েছে। ইসরাইলের সুবিধা এখানেই। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে যদি বিভক্ত রাখা যায়, তাহলে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুবিধা অনেক। তবে অতীতের সব হামলার চেয়ে এবারের ইসরাইলের আগ্রাসনের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। খুব সহসাই ইসরাইলি এ আগ্রাসন বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। ইসরাইলের স্ট্র্যাটেজি এখন স্পষ্ট-তারা হামাসের নেতৃত্বকে পুরোপুরিভাবে গাজা থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। প্রয়োজনে তারা সেখানে বিকল্প একটি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বও প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগ নেবে। কিন্তু এতে করে কি গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে? ইসরাইলি নেতৃত্বকে হামাসের সঙ্গেই সমঝোতায় যেতে হবে। কেননা হামাসকে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। জনগণ হামাসকেই চায়। সুতরাং ইসরাইলি নেতৃত্ব যদি হামাসকে উৎখাত করার উদ্যোগ নেয় এবং পশ্চিমা বিশ্ব যদি তাতে সায় দেয়, তাহলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা থেকে যাবে। কোনো দিনই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বলে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর আল ফাতাহর প্রভাব কমেছে। হামাসের প্রভাব বেড়েছে। ফলে হামাসকে সঙ্গে নিয়েই শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ওই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। হামাস যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে ভিত্তি করে আলোচনা শুরু হতে পারে। এ ১০ দফা মেনে নেয়া কঠিন কিছু নয়। একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা, ইসরাইলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের মুক্তি, গাজার সমুদ্র ও বিমানবন্দর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে খুলে দেয়া ইত্যাদি প্রস্তাব খুব সহজেই মেনে নেয়া যায়; কিন্তু ইসরাইল এ কাজটি করবে না। জাতিসংঘ যেখানে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে ব্যর্থ, সেখানে নাভিপিল্লাইয়ের বক্তব্যকে বিবেচনায় নিয়ে ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা সবাই জানি, হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে লাইবেরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট চার্লস টেলারের বিচার হয়েছে। বসনিয়ার কসাই হিসেবে পরিচিত মিলোসেভিচেরও বিচার হয়েছে। এমনকি কেনিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টেরও বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। কেনিয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সংঘটিত গণহত্যার জন্য তারা অভিযুক্ত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ওইসব গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার করতে পারে, তাহলে আজ 'ইসরাইলি কসাই' হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুরও বিচার হওয়া প্রয়োজন। না হলে দ্বৈত ভূমিকার জন্য জাতিসংঘ তথা পশ্চিমা বিশ্ব বার বার অভিযুক্ত হবে। পশ্চিমা বিশ্ব এ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন 'দানব' ইসরাইলকে সৃষ্টি করেছিল। ভুলে গেলে চলবে না, এ 'দানব' এক সময় পশ্চিমা স্বার্থের উপরও আঘাত করতে পারে। সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ ফিলিস্তিনে যুদ্ধ বন্ধ চায়। এ যুদ্ধ অনেকটাই একতরফা হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ যুদ্ধে শত শত মানুষ মারা গেছে। শিশু হত্যার যে মহোৎসব আমরা দেখছি, দুঃখজনক হলেও সত্য, সদ্য শেষ হওয়া 'লন্ডন গার্ল সামিটে' বিশ্বের কন্যাসন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলেও গাজার কন্যাসন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা কথাও বলা হলো না! এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি- পশ্চিমা বিশ্ব আসলে কী চায়? নাভিপিল্লাইয়ের বক্তব্য, কিংবা বান কি মুনের উদ্বেগ, এসব আসলে লোক দেখানো! ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্ব আদৌ আন্তরিক নয়। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। নেই কোনো সমাধান। জোর করে একটি জাতিকে বছরের পর বছর এক ধরনের বস্তি জীবনে বসবাস করতে বাধ্য করা, এ ২১ শতকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আজ তাই সময় এসেছে বিশ্বের শুভবুদ্ধির মানুষদের জেগে ওঠার। সময় এসেছে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার। আল ফাতাহ মূল ধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। আমার ধারণা, হামাসও আসবে। শুধু প্রয়োজন আন্তরিকতার ও হামাসকে আস্থায় নেয়ার। এটা না নেয়া হলে উত্তেজনা থাকবেই। আর তাতে করে ইসরাইলের খুশি হওয়ারও কোনো কারণ থাকবে না। সুতরাং ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ হওয়া, হামাসের ১০ দফা প্রস্তাবকে সামনে রেখে তাদের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা এবং 'দুই রাষ্ট্র' (ফিলিস্তিন ও ইসরাইল) ফর্মুলাকে সামনে রেখে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ইসরাইলি নেতারা যত তাড়াতাড়ি এটি উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল। Daily ALOKITO BANGLADESH 05.08.14

ইউক্রেনের পরিস্থিতি ও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা

প্রথমে ক্রিমিয়ার গণভোট ও পরবর্তী সময়ে ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি। এরপর ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সীমান্তে রাশিয়ার সেনা মোতায়েন। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে এখন ইউক্রেনে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। আর সর্বশেষ ঘটনায় একটি মালয়েশিয়ান বিমান (ফ্লাইট এমএইচ ১৭) ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ও ২৯৫ জন আরোহীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে এবং নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছে। বলা ভালো, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছিল ২৩ বছর আগে, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর। এরপর দীর্ঘ সময় চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও (ইরাক, আফগানিস্তান, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ইত্যাদি) কখনো পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু ইউক্রেনের পরিস্থিতিতে দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। ক্রিমিয়ার ঘটনার পরই নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এটা বাহ্যত পরিণত হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্বে। এখন এই দ্বন্দ্ব ক্রিমিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে, যেমনটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে জন্ম হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের। সেটা ছিল মূলত আর্দশিক দ্বন্দ্ব- একদিকে ছিল পুঁজিবাদ, অন্যদিকে সাম্যবাদ। একসময় ১৯৪৯ সালে এই সাম্যবাদের প্রভাব ঠেকাতেই পশ্চিম ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জন্ম হয়েছিল সামরিক জোট ন্যাটোর। অপরদিকে পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে নিয়ে ১৯৫৫ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেছিল সামরিক জোট ওয়ারশ। একপর্যায়ে সেখানে 'যুদ্ধের' আশঙ্কারও জন্ম হয়েছিল। যদিও যুদ্ধ হয়নি। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এই 'যুদ্ধে' জড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবসান ঘটে স্নায়ুযুদ্ধের। আজ প্রায় ২৩ বছর পর নতুন আঙ্গিকে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হচ্ছে! এখানে আদর্শিক দ্বন্দ্ব নেই বটে, কিন্তু প্রভাববলয় বিস্তারের এক ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতা আছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব করার যে প্রবণতা ও রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার ন্যাটোর যে স্ট্র্যাটেজি, তা রাশিয়ার সমরনায়কদের অজানা নয়। ভুলে গেলে চলবে না, ক্রিমিয়ার ব্যাপারে রাশিয়ার স্বার্থ ছিল অনেক। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণসাগর বা ব্ল্যাক সির পশ্চিম পাশে রুমানিয়ার মিহাইল কোগালনাইসেআনুতে রয়েছে ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। এই বিমান ঘাঁটির গুরুত্ব অনেক। আফগানিস্তানে সেনা ও রসদ সরবরাহের জন্য ট্রানজিট রুট হিসেবে এই বিমান ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণ সাগরের গুরুত্ব আরো একটি কারণে। এখানে অবস্থান রয়েছে ন্যাটোর জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ইস্টের। কৃষ্ণসাগরভুক্ত তিনটি দেশ রুমানিয়া, বুলগেরিয়া আর তুরস্ককে নিয়ে ন্যাটো গেল বছর তাদের তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছিল। এটা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের স্নায়বিক চাপ। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন থেকেই কৃষ্ণসাগরভুক্ত এলাকা সেই সঙ্গে কাসপিয়ান সাগরভুক্ত অঞ্চলকে 'হট এরিয়া', অর্থাৎ উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। সুতরাং ক্রিমিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাশিয়ানদের (জনসংখ্যার ৫৯ ভাগ, প্রায় ২০ লাখ) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে শুধু রাশিয়াই 'হস্তক্ষেপ' করেছিল, তা বিবেচনায় নিলে ঠিক হবে না। রাশিয়ায় 'নয়া জার' নেতৃত্ব রাশিয়ার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ক্রিমিয়ায় বসবাসকারী রাশিয়ানদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের নিজেদের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তার বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পুরো কৃষ্ণসাগরভুক্ত অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব করার জন্যই ন্যাটোর দরকার জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়া। তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে ন্যাটোর সেনাবাহিনী। এটা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ। রাশিয়ার সমরনায়করা এটা যে মেনে নেবেন না, এটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, গেল বছর কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে নেয়নি। ক্রিমিয়ার ঘটনার রেশ ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে। কার্যত ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে এখন আর ইউক্রেন সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব করে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা, যারা ক্রিমিয়ার মতোই রাশিয়ার অংশ হতে চায়। আর এই অঞ্চলেই মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের বিমানটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলো। তবে এই হামলা কারা চালিয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। অভিযুক্তদের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তারা অবশ্যই হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। ইউক্রেন সরকারকেও অভিযুক্ত করা হচ্ছে। মার্কিনি ভূমিকাও সন্দেহের বাইরে নয়। কেননা ন্যাটোর পূর্বমুখী যে সম্প্রসারণ, তার প্রধান উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই চাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দুটো দেশ- জর্জিয়া ও ইউক্রেন ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হোক। তাহলে ন্যাটোর তথা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এই দুই দেশে মোতায়েন করা যাবে। ফলে 'চাপের' মুখে রাখা যাবে রাশিয়াকে। শুধু তা-ই নয়, রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ, বিশেষ করে গ্যাসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হবে। তাই পুতিন যে এই মার্কিনি স্ট্র্যাটেজি বোঝেন না, এটা ভাবা ছিল ভুল। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়ার সঙ্গে 'সীমিত যুদ্ধে' জড়িয়ে পড়েছিল; উদ্দেশ্য ছিল একটাই- রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটোর উপস্থিতি রাশিয়া মেনে নেবে না। এর পরই ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া পরস্পর 'বাক্যুদ্ধে' অবতীর্ণ হয়। ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য ও আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেনকে রাশিয়া তার ইউক্রেন পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। আর এতে করে বুলগেরিয়া, রুমানিয়া আর সার্বিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এই তিন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা গ্যাসপ্রম (ধেংঢ়ৎড়স)-এর ইউক্রেনের কাছে পাওনা রয়েছে দুই বিলিয়ন ডলার। এ টাকা এখন ইউক্রেন কিভাবে শোধ করবে? এই সংকট এখানে যুদ্ধের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। রাশিয়া ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে বাইপাস করে কৃষ্ণসাগরের নিচ দিয়ে একটি পাইপলাইন তৈরি করছে। সমগ্র ইইউয়ের গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ একা জোগান দেয় রাশিয়া। আর জার্মানির ৪০ ভাগ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এই গ্যাস আগামী দিনে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর হবে ইউরোপের রাজনীতিতে। অনেকেই স্মারণ করতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল, বিশেষ করে ইরাক ও লিবিয়ায়, তার পেছনের মূল কারণ ছিল তেল। ইরাক ও লিবিয়ার তেলের সহজলভ্যতার কারণে মার্কিন তেল কম্পানিগুলোর মদদে সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধে ইরাককে ধ্বংস করে দিয়ে এখন মার্কিন কম্পানিগুলোই ওই তেল বিক্রির টাকায় ইরাক পুনর্গঠনের কাজ করছে। আর লিবিয়ার তেল ও গ্যাস যায় ইতালিতে। গাদ্দাফিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই তেল-গ্যাসের কারণেই। সুতরাং রাশিয়ার গ্যাসের ওপর পুরো ইউরোপের নির্ভরতা, সেখানে নতুন করে 'গ্যাসযুদ্ধ'-এর সূচনা করবে। তবে পার্থক্য একটাই, রাশিয়া ইরাক কিংবা লিবিয়া নয়। পুতিনের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। সুতরাং ওবামা এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে কোনো সুবিধা করতে পারবেন না। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন একপর্যায়ে পশ্চিমা জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করে 'পূর্ব-পশ্চিম' রাজনীতির এক নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। ব্রান্ট বুঝতে পেরেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাদ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি স্ব-উদ্যোগে প্রথমে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। সেই সম্পর্ককে পরবর্তী সময়ে একটি 'মডেল' হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। এমনকি গরবাচেভও চেষ্টা করেছিলেন 'কমন ইউরোপিয়ান হোম'-এর তত্ত্ব উপস্থাপন করে ইউরোপীয় সংস্কৃতির আদলে এক ইউরোপ গড়ে তুলতে। তিনি ১৯৮৮ সালেই ওয়ারশ সামরিক জোট ভেঙে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন ন্যাটোর কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়নি; বরং ন্যাটোকে এখন একটি বিশ্ব সংস্থায় পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একদিকে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর যেমনি সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং পূর্ব ইউরোপের প্রায় সব দেশ যখন ন্যাটোর সদস্য, ঠিক তখনই পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে আলাদা আলাদা সংস্থা গঠন করে ন্যাটোর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, দুটো বড় শক্তি রাশিয়া ও চীনকে নিয়ন্ত্রণে আনা ও দেশ দুটো থেকে স্বার্থ আদায় করা। তাই ইউক্রেন সংকট, সেখানে তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থানের নামে ইয়ানুকোভিচ সরকারের পতন ঘটানো এবং সর্বশেষ ঘটনায় বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি জড়িত হবে, তত বেশি রাশিয়া আগ্রাসী হবে। রাশিয়া সীমান্তে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। মনে থাকার কথা, ২০০৮ সালে রাশিয়া তার সীমান্তবর্তী জর্জিয়ার দুটো অংশ দখল করে নিয়েছিল। এখন জর্জিয়ার আবখাজিয়া (২০০৮), কিংবা ইউক্রেনের ক্রিমিয়ার পর মলদোভার ট্রান্স দায়িয়েস্টা ও অপর একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গাগাউজিয়াতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কাজাখস্তান ও আজারবাইজান নিয়েও রয়েছে একই প্রশ্ন। ইউক্রেনের পর রুশ বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাস করে কাজাখস্তানে। এসব অঞ্চলে রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। যেকোনো ধরনের ন্যাটোর আগ্রাসন, রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে উৎসাহিত করবে এসব অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে। তবে আমার ধারণা, ক্রিমিয়ার পর রাশিয়া একটা 'স্ট্যাটাস কো' অবলম্বন করছে। অর্থাৎ যে যেখানে আছে, সে সেখানে অবস্থান করবে। রাশিয়া এই মুহূর্তে তার সীমান্ত বাড়াবে না। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমা বিশ্বের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়াকে। বিশ্বের নবম অর্থনীতি হচ্ছে রাশিয়া। পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে রাশিয়াতে এখন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রাশিয়ার সম্পদ 'ফ্রিজ' করায় তা রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এটা কাটিয়ে উঠতে রাশিয়া এখন 'ব্রিকসভুক্ত' (ইজওঈঝ) দেশগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি অর্থনৈতিক ব্লক গড়ে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের বিকল্প একটি ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে 'ব্রিকস'। চীন ও ভারত এই 'ব্রিকস'-এর সদস্য। ক্রিমিয়া সংকটে চীন ও ভারত রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করেছিল। এই সংকট রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে আরো জোরদার করেছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালে 'ব্রিকস'-এর অর্থনীতি গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮ ট্রিলিয়ন ডলার (এক হাজার বিলিয়নে এক ট্রিলিয়ন), তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিমাণ দাঁড়াবে মাত্র ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে রাশিয়া চীনকে সঙ্গে নিয়ে 'সাংহাই কো অপারেশন অর্গানাইজেশন'কে শক্তিশালী করছে। আর সাবেক সোভিয়েত-বলয়ভুক্ত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট কালেকটিভ ট্রিটি অর্গানাইজেশন গঠন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটা হতে পারে ওয়ারশ জোটের পরিবর্তিত সংস্করণ। প্রেসিডেন্ট ওবামার ইউক্রেনকে সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করা ও সেখানে ন্যাটোর সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া পুরো ইউরোপকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে, সেখানে ইসলামী জঙ্গিরা তাদের অবস্থান শক্তিশালী করে সনাতন ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করার কথা ঘোষণা করেছে। সুতরাং 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' অনুযায়ী মালয়েশিয়ান বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একাধিক আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তাদের রিপোর্ট ও জাতিসংঘের ভূমিকার দিকে এখন তাকিয়ে থাকবে সারা বিশ্ব। তবে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা কারো জন্যই কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। Daily Kalerkontho 05.08.14

জিওনবাদ ও গাজার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

যারা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে ‘জিওনবাদ’ বা ইহুদিবাদ কোনও অপরিচিত নাম নয়। আজকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন যখন চার সপ্তাহ ছুঁইছুঁই করছে এবং যুদ্ধবাজ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যখন বলছেন- এই হামলা অব্যাহত থাকবে, তখন ‘জিওনবাদ’ ও একটি বৃহৎ ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠনের কথাটা বারবার এসে যায়। ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, একসময় ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব এলাকা থেকে উৎখাত করে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এক সময় এই অঞ্চল ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের আওতায়। দীর্ঘ চার শতকের অটোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে ১৯১৭ সালে, যখন এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণভার চলে যায় ব্রিটেনের হাতে। আর বেলফোর ঘোষণার (ইধষভড়ঁৎ ফবপষধৎধঃরড়হ) আলোকে ফিলিস্তিনি এলাকায় উদ্যোগ নেওয়া হয় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল গঠনের। সেটা ১৯২০ সালের কথা। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে ইহুদিরা এ অঞ্চলে আসতে শুরু করে। যদিও তৎকালীন আরব রাষ্ট্রগুলো বেলফোর এই ঘোষণা মেনে নেয়নি। ফলে ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে ১৯২০, ১৯২১, ১৯২৯ ও ১৯৩৬ সালে বড় ধরনের সংঘর্ষের। কিন্তু আরব-ইহুদি দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালে এ অঞ্চলকে দুভাগে (আরব ও ইহুদি রাষ্ট্র) ভাগ করার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর ১৯৪৮ সালে এ অঞ্চল থেকে ব্রিটেন নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে জন্ম হয় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের। তবে যে মতবাদের ওপর ভিত্তি করে এই রাষ্ট্রটির জন্ম, তা হচ্ছে ‘জিওনবাদ’ বা ইহুদিবাদ। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, ‘জিওনবাদের’ স্বপ্নদ্রষ্টা হচ্ছেন থিওডর হারজেল (ঞযবড়ফড়ৎ ঐবৎুষ)। ১৯০৪ সালে তিনি একটি বৃহত্তর ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই রাষ্ট্রটির সীমানা হবে একদিকে নীল নদ, অন্যদিকে ফোরাত নদী। এ লক্ষ্যেই ১৯৮২ সালে ইনন পরিকল্পনা (ড়ফবফ ুরহড়হ) প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ধর্মীয় ও প্রাথমিকভাবে ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হবে। ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হবে এবং তা ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে কোনও নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করবে না। আজকে ইরাকের দিকে তাকালে কিন্তু সেই ‘ইনন ফর্মুলা’র বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। ইরাক আজ বাহ্যত তিন ভাগে বিভক্তির পথে- কুর্দি অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কুর্দিস্তান, শিয়া, ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে একটি শিয়া রাষ্ট্র এবং সুন্নিরা আলাদা হয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্র। এই পরিকল্পনা এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কুর্দিরা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য একটি গণভোটের কথা বলছে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন জো বাইডেন (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট), ২০০৬ সালের ১ মে পররাষ্ট্র বিষয়ক সিনেট কমিটিতে (তখন তিনি একজন সিনেটর) এক ভাষণে ইরাককে ভেঙে ৩টি রাষ্ট্র করার প্রস্তাব করেছিলেন। ২০০৭ সালে সিনেটে গৃহীত এক প্রস্তাবে (৭৫-২৩ ভোটে) সেই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। কুর্দিরা সেই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছিল। আজ যখন জো বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যান, তখন সঙ্গত কারণেই তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বলা ভালো জো বাইডেন নিজে একজন ইহুদি। ওবামার ইহুদিপ্রীতির খবরও ইতিহাসে আছে। তরুণ সিনেটর হিসেবে প্রয়াত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ারের সঙ্গে দেখা ও তার প্রশংসা করা এবং চলতি জানুয়ারিতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্যারনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে দুঘণ্টা বৈঠক- এসবই ছিল ইসরায়েলের প্রতি তার ভালবাসার প্রকাশ। এখানে আরও একটা কথা বলা দরকার, ১৯৬০ সাল থেকেই কুর্দি নেতৃবৃন্দ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে এবং সেখান থেকে সামরিক সাহায্য পেয়ে আসছে। চলতি জুন (২০১৪) মাসে নেতানিয়াহু তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে স্বাধীন কুর্দিস্তানের পক্ষে কথা বলেছেন। ইতিহাসের কী অনিবার্য পরিণতি! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের দক্ষিণ হস্ত বলে পরিচিত আইসম্যানের ফর্মুলা অনুযায়ী হিটলার ইহুদিদের বন্দিশিবিরে একত্রিত রাখা ও তাদের উচ্ছেদ অভিযানে নেমেছিলেন। গ্যাস চেম্বারে ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল। আজ এত বছর পর সেই ইহুদি নেতৃত্ব একই পন্থা অবলম্বন করে গাজায় ফিলিস্তিনিদের এক ধরনের বস্তি জীবনযাপনে বাধ্য করছেন! ইতিহাস থেকে ইহুদি নেতৃত্ব কোনও শিক্ষাই নেননি।
এখানে ‘ইনন ফর্মুলা’ নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ওডেড ইনন (ড়ফবফ ুরহড়হ) মূলত একজন কট্টর ইহুদি স্ট্র্যাটেজিস্ট। তিনি মূলত একজন গবেষক ও শিক্ষক। বলা যেতে পারে থিওডোর হারজেল যে স্বপ্ন এক সময় দেখতেন, তার বাস্তবে রূপ দিতেই ইনন সদূরপ্রসারী একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। আর তা বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইনন হিব্রু ভাষায় একটি প্রবন্ধ লেখেন করাঁৎরস নামে একটি কট্টরপন্থী ম্যাগাজিনে। আশির মাঝামাঝি ওই প্রবন্ধটি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে- ‘অ ংঃৎধঃবমু ভড়ৎ ওংৎধবষ রহ ঃযব ঘরহবঃববহ ঊরমযঃববং’। লেবাননকে ভেঙে ৫টি রাষ্ট্রে বিভক্ত করা কিংবা সিরিয়াকে ভেঙে একাধিক রাষ্ট্রে পরিণত করা এসবই ছিল ‘ইনন ফর্মুলার’ অন্তর্গত। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতারা এই ফর্মুলা এখন ধারণ করেন। আজ যদি আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে এই ‘ইনন ফর্মুলাই’ এখন কার্যকর হচ্ছে। ইসরায়েল মূলত ফাতাহ ও হামাসের ভেতরকার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাচ্ছে। মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট হলেও পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের কাছে হামাস গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমনকী খোদ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছেও হামাসের (২০০৬) এই বিজয় নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে ওয়াশিংটন চুক্তি (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩) ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ওই শান্তি চুক্তির ফলে ইসরায়েল অধিকৃত গাজা ও পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরে সীমিত স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয়েছিল। পরে ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি অপর একটি চুক্তির বিনিময়ে হেবরন শহরে ফিলিস্তিনি শাসন সম্প্রসারিত হয়। ওয়াশিংটন চুক্তির পরপরই যে ফিলিস্তিনি স্বশাসিত এলাকার সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। তবে ১৯৯৬ সালে ফিলিস্তিনি স্বশাসিত এলাকার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং আরাফাত প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৪ সালে আরাফাতের মৃত্যু ফিলিস্তিনি আন্দোলনের জন্য ছিল এক ছুরিকাঘাতের শামিল। জীবদ্দশায় আরাফাত একজন প্রেসিডেন্টের সম্মান পেয়ে গেছেন, কিন্তু স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র তিনি দেখে যেতে পারেননি। অভিযোগে আছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করেছিল। এরপর ২০০৫ সালে মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। কিন্তু হামাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনও পর্যায়েই ভালো ছিল না এবং দেখা গেল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাঝে দুই কর্তৃপক্ষের জন্ম হয়েছে- একদিকে ফাতাহর নেতৃত্বে পশ্চিম তীরে একটি প্রশাসন, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহমুদ আব্বাস। অন্যদিকে গাজায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হামাসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এতে করে পুরো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্বল হয়েছে। ইসরায়েলের সুবিধা এখানেই। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বে বিভক্তি সৃষ্টি করে ইসরায়েলি নেতৃত্ব একটি বৃহত্তর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এর পেছনে রয়েছে পশ্চিমা গোষ্ঠীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন। অবাক করা সত্য কথা হচ্ছে, অনেক আরব রাষ্ট্রের পরোক্ষ সমর্থন পাচ্ছে ইসরায়েল। আমরা যদি সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি অভিযানের পেছনে সমর্থন রয়েছে মিসরের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল সিসির। বলা হচ্ছে জর্ডান ও সৌদি আরবও সমর্থন করছে হামাস উৎখাতে ইসরায়েলি সেনা অভিযানকে। হামাস এক ধরনের ‘র‌্যাডিকালিজমের’ জন্ম দিয়েছে। জর্ডান ও সৌদি আরবে রাজতন্ত্র রয়েছে। তাদের ভয়টা সেখানেই। এই ‘র‌্যাডিকালিজম’ এই দুটো দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তাতে করে রাজতন্ত্র উচ্ছেদও হতে পারে। তাই দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসরায়েলি হামলায় শত শত মানুষ মারা গেলেও, সৌদি আরবের কোনও প্রতিক্রিয়া এতে পাওয়া যায়নি। শুধু তুরস্ক ও কাতার সমর্থন করেছে হামাসকে। মনে রাখতে হবে কাতারে বর্তমানে বসবাস করছেন হামাসের শীর্ষ নেতা খালেদ মিশেল। অন্যদিকে তুরস্ক কোনও আরব রাষ্ট্র নয় এবং ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগান দীর্ঘদিন ধরে হামাসের পাশে আছেন এবং তিনি নিজে ইসরায়েলি এই বর্বরতাকে হিটলারের নির্যাতনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
গাজার বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে এটা স্পষ্ট যে, ইসরায়েল খুব সহসাই এই সামরিক স্ট্র্যাটেজি পরিত্যাগ করবে না। গাজার ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। গাজায় যারা বসবাস করেন, তাদের সেখানে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য করে পুরো গাজাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ইসরায়েল। তাদের এই স্ট্র্যাটেজি, অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের বসবাসকে ‘মবঃঃড়রংস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কেউ-কেউ। অর্থাৎ ‘ঘেটো’ বা বস্তিতে বসবাস করা। স্মরণ থাকতে পারে নাজিনেতা আইসম্যান ইউরোপে ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই ‘ঘেটো তত্ত্ব’ ব্যবহার করে ইহুদিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বসবাস করতে বাধ্য করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের পূর্ব যুগে কৃষ্ণাঙ্গদের মূল শহর থেকে সরিয়ে নিয়ে ১০টি ‘হোমল্যান্ডে’ বসবাস করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আজ নেতানিয়াহু সরকার অনেকটা সেই ‘ঘেটো’ বা ‘বস্তি তত্ত্ব’ই ব্যবহার করতে চায় গাজায়। কিন্তু ইতিহাস বলে কখনোই এসব উদ্যোগ সফল হয়নি। আইসম্যান সফল হননি। ১৯৬০ সালে আইসম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচারে তার ফাঁসি হয়েছিল। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওই ‘হোমল্যান্ড তত্ত্ব’ও ভেঙে পড়েছিল। ইসরায়েল আজ নিরীহ শিশুদের হত্যা করে মহা অন্যায় করেছে। এর বিচার হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাস মিলোসেভিচকে মুসলমানদের বসনিয়া থেকে উচ্ছেদের জন্য ক্ষমা করেনি। নেতানিয়াহুও ক্ষমা পাবেন না। মিলোসেভিচের বিচার হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে। আজ জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত স্কুলগুলোয় আশ্রয় নিয়েও যখন গাজার শিশুরা ইসরাইলি হামলা থেকে রেহাই পায় না তখন জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বৈকি! গাজায় এই মানবিক বিপর্যয় নিয়ে মুসলিম বিশ্বও আজ বিভক্ত ও নির্লিপ্ত। ইসরায়েল তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কোন সময়টা বেছে নিল, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। একদিকে ইরাকের মালিকি সরকারের অস্তিত্ব এখন কাগজ-কলমে। নিজেকে মুসলিম বিশ্বের ‘খলিফা’ দাবিকারী বুগদাদি ও তার জঙ্গি সেনারা ইরাকের প্রত্যন্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। বুগদাদি চরম সুন্নিদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি জঙ্গি গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি রাজধানী বাগদাদে অভিযান চালানোর কথা ঘোষণা করেছেন। ইসরায়েল একটি দুর্বল ইরাক চায় আর ‘ইনন ফর্মুলা’ অনুযায়ী ইরাক তিনটি রাষ্ট্রে ভাগ হোক- এ পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ইতোমধ্যে চুক্তি অনুযায়ী ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে এক সময় সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের যে ভয় ছিল, সেটাও আর নেই। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট আসাদ এক দুর্বল সিরিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সিরিয়া ভেঙে যাওয়া কিংবা চরম ইসলামপন্থীদের সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম বিচিত্র কিছু নয়। আর মিসরে আরব বসন্তে ইসলামপন্থী ইসলামিক ব্রাদারহুডের উত্থান এখন অতীত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা সেখানে ক্ষমতায় সিসিকে বসিয়েছে, যারা ইসরায়েলি স্বার্থরক্ষা করছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফির নেতৃত্ব উৎখাতের পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিবিয়া কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। লিবিয়া থেকে হুমকির আশঙ্কা এখন কমে আসছে। ফলে সময়টা এখন ইসরায়েলের অনুকূলে। তাই অনেকটা পরিকল্পনা করেই ইসরায়েল গাজা আক্রমণ করেছে। এর আগেও ইসরায়েল দু’দুবার গাজায় অভিযান চালিয়েছিল। একবার ২০০৮-২০০৯ সালে শীতের সময়, আর দ্বিতীয়বার ২০১২ সালে। কিন্তু এবারের আগ্রাসনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আর ১৮ লাখ মানুষ নিয়ে যে গাজা, এই ছোট্ট এলাকাটির ইসরায়েলের তেমন আগ্রহ নেই। ইসরায়েল গাজায় তার প্রভাব সম্প্রসারিত করবে এবং বৃহত্তর একটি ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। এটা কোনও সমাধান হতে পারে না। এটা ভুল স্ট্র্যাটেজি। এতে করে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এতে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বজায় থাকবে এবং দীর্ঘস্থায়ী এক অস্থিরতার জন্ম দেবে। আপাতত ৭২ ঘণ্টার এক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামাস ও ইসরায়েল আলোচনায় রাজি হয়েছে। কিন্তু গাজার অবরোধ যদি প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে আলোচনা কোনও ফল দেবে না। - See more at: http://www.dainikamadershomoy.com/details_news.php?id=159908&&%20page_id=%209#sthash.GcppAPGb.dpuf

আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায় বারবার

আস্থার জায়গাটা বারবার নষ্ট হয়ে যায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও এক সময় মনে করা হতো সরকার যেহেতু 'নিয়ম রক্ষার্থে' এ নির্বাচন আয়োজন করেছিল সেহেতু সরকার অতিদ্রুত একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে। কিন্তু ছ'মাস পার হয়ে যাওয়ার পর সরকারপ্রধান এবং অন্য নীতি-নির্ধারকদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সরকার ২০১৯ সালের আগে আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবছে না। শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ার পর ইতোমধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেছেন। জাপান, চীন ও ব্রিটেন। ধারণা করছি আগামী জানুয়ারিতে তিনি ভারত সফরে যাবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এই চারটি দেশই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মধ্য দিয়ে সরকারপ্রধান চেষ্টা করছেন এক ধরনের 'লেজিটেম্যাসি' তৈরি করতে। তিনি পুরোপুরিভাবে এ ক্ষেত্রে সফল তা বলা যাবে না। সর্বশেষ ব্রিটেন সফর নিয়েও একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটেন সফরের পর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, 'ব্রিটেন মনে করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এখন অতীত'। কিন্তু পরে জানা গেল দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্রিটেন এ ধরনের কোনো মনোভাব দেখায়নি। বরং বলা হয়েছে, 'যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।' যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নতুন করে আরেকটি নির্বাচনের কথা বলেননি বটে, কিন্তু একটি 'মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার' পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজেও ২৬ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'যুক্তরাজ্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেনি' (যায়যায়দিন)। তিনি বিএনপির আন্দোলনকে মাঠেই প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে সঙ্কট নিরসনে আলোচনার আহ্বানে সাড়া না দিলে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধের হুশিয়ারি দিয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ফলে একটি সমঝোতার যে সম্ভাবনা ছিল তা দৃশ্যত এখন আর নেই। গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত সরকার যেমনি থাকে ঠিক তেমনি থাকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলও। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা অন্যতম একটি শর্ত। বাংলাদেশে এটি নেই। এই আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে গণতন্ত্র বিনির্মাণ করা যায় না। বাংলাদেশে আমরা গণতন্ত্র চেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আর গড়ে না ওঠায় আমরা সবাই মিলে 'সকল দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ'-এর একটি আবহ তৈরি করতে পারলাম না। এখন দশম সংসদ নির্বাচন অতীত বটে, কিন্তু আমরা কীভাবে নির্বাচনকে মূল্যায়ন করব? ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। এর মধ্যে ১২৭ জন আওয়ামী লীগের, ওয়ার্কার্স পার্টির ২ জন, জাসদের ৩ জন, জাতীয় পার্টির ২০ জন, জেপির ১ জন। ১৪৭ আসনে যেখানে তথাকথিত নির্বাচন হয়েছে, সেখানে আরেক জায়গায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন 'বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের' প্রার্থীরাই। ওইসব আসনে ভোটার ছিল ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন। প্রার্থী ছিলেন ৩৯০ জন। মোট ১৮ হাজার ২০৮টি, ভোট কেন্দ্রের সবকটিতে সুষ্ঠু ভোটও হয়নি। ভোটারের উপস্থিতির হার সম্পর্কে ইসির ব্যাখ্যা ৪০ ভাগ। তবে অনেকেই তা মানতে নারাজ। আওয়ামী লীগ এখন নতুন করে 'দ্বিতীয় আরেকটি মহাজোট সরকার' গঠন করেছে এবং প্রয়োজনে ২৩৩টি আসন নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে সংবিধানে আরো ব্যাপক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। নবম সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল আওয়ামী লীগ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আবারো সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সংসদীয় রাজনীতির একটা বড় সৌন্দর্য হচ্ছে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা। কিন্তু দশম সংসদ নিয়ে ইতোমধ্যে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এই সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির এই সিদ্ধান্ত দলকে বিতর্কিত করেছে। কেননা জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশীদার। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় পার্টির মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ছিলেন একাধিক। ওই নির্বাচনে ২৭টি আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ছিল না। ফলে জাতীয় পার্টিকে কেন্দ্র করে গুজবের ডালপালা বাড়বেই। তবে জাতীয় পার্টি ও এর নেতা এইচএম এরশাদ ইতোমধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। 'অসুস্থ' হয়ে গলফ খেলে তিনি 'চিকিৎসা নিয়েছিলেন' সিএমএইচএ। আর এই গলফ খেলাটা ছিল নাকি তার চিকিৎসার অংশ। আমাদের দুর্ভাগ্য ওবায়দুল কাদেরের মতো লোকের কাছ থেকেও আমাদের এ ধরনের কথা শুনতে হয়েছিল। ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য যখন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তখন আস্থার জায়গাটা আর থাকে না। বলতে দ্বিধা নেই অতীতে ওবায়দুল কাদের তার বক্তব্য ও নেতৃত্বের গুণে নিজেকে একজন যোগ্য ও খাঁটি নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। যে কারণে দীর্ঘদিন তিনি মন্ত্রিসভায় না থাকলেও মহাজোট সরকারের শেষের দিকে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তিনি এখনো মন্ত্রী। যারা সংবাদপত্র নিয়মিত পাঠ করেন তারা দেখেছেন এই নির্বাচনকে ঘিরে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বাজে ধারণার জন্ম হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি রাশিয়া কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রভাবশালী কলকাতার বাংলা সংবাদপত্র আনন্দবাজার বলেছিল 'খুব দ্রুত একাদশ নির্বাচনের প্রস্তুতির পরামর্শ দিয়েছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন 'ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তালিকায় বাংলাদেশ'-এর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল। যে ১০টি দেশকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল তার মধ্যে বাংলাদেশের নামও আছে। কী দুর্ভাগ্য যেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দক্ষিণ সুদানে শান্তিরক্ষী পাঠাতে অনুরোধ করেন, সেই বাংলাদেশই কিনা এখন ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হলো। যে যুক্তি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের গবেষকরা উল্লেখ করেছেন তা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। অনেকেই জানেন প্রভাবশালী এ সাময়িকীটি মার্কিন নীতি-নির্ধারণে প্রভাব খাটায়। নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু 'সকল দলের অংশগ্রহণ' তাতে থাকল না। আমাদের দুঃখ এখানেই, আমাদের রাজনীতিবিদরা দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারেননি। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আস্থার সম্পর্কটা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। পশ্চিমা বিশ্বের যে উৎকণ্ঠা, সেই উৎকণ্ঠা ও উদ্যোগ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। কেননা বিএনপি বড় দল। দলটিকে আস্থায় না নিলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না। নির্বাচনে বিরোধী দল আসেনি। এর জন্য কে দায়ী, কে দায়ী নয়, সেই হিসাব নিয়ে আমরা যদি 'ব্যস্ত' থাকি তাহলে আমাদের এতদিনের অর্জন আরো বাধাগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যেই আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ আরো 'ক্ষতি' সহ্য করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে অর্থনীতির চাকা যদি না চলে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে এই অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা থেকেই যাবে। আর তা অর্থনীতিকে আঘাত করবে। যা আমাদের কারো জন্য কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। গত ২৪ জুলাই জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৪ সালের মানবোন্নয়ন সূচক প্রকাশ করেছে। বেশকিছু বছর ধরে ইউএনডিপি এ সূচক প্রকাশ করে আসছে। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেক্টরে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়। এবার মোট ১৮৭ দেশের অগ্রগতি আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২ নাম্বারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। জাতিসংঘ 'দ্রুত পর্যায়ে চলা' যে ১৮ দেশের কথা উল্লেখ করেছিল বাংলাদেশ এর মধ্যে একটি। বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ তার অবস্থানকে আরো উন্নত করেছে। গেলবার (২০১৩) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩। এবার একধাপ উন্নতি হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে তার মধ্যে রয়েছে গড় আয়ু বৃদ্ধি, সাক্ষরতা, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। ইউএনডিপি নিজস্ব গবেষকদের দ্বারাই এই সূচক প্রণয়ন করে। এখানে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা থাকে না। অর্থাৎ সূচক প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। Daily JAI JAI DIN 04.08.14

ইসরাইল কি আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে!

গাজায় গণহত্যা শুরুর তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই গণহত্যার শেষ কোথায়? পবিত্র ঈদের দিনেও ইসরাইল তার হামলা অব্যাহত রাখে। জাতিসংঘ কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার আহ্বান উপেক্ষা করে ইসরাইল গাজায় বেসামরিক স্থাপনার ওপর বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই হামলা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা না যেতেই ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লংঘন করায় নেতানিয়াহুর বক্তব্যেরই সত্যতা মিলল। আরও দুঃখজনক সংবাদ হচ্ছে, ইউক্রেনে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর যেখানে আরও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা এতটুকুও আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কথাও বলেনি বিশ্ব সম্প্রদায়।ইসরাইলি নেতৃবৃন্দ গাজায় গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত। এ হত্যাযজ্ঞকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সেনানায়কদের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার হবে, এটা চিন্তা করাও যায় না। আদৌ কোনো দিন এই বিচার হবে না। একাধিক কারণে এই বিচার করা যাবে না। প্রথমত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় গণহত্যা বা এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা, তা অনুসন্ধান করতে চাইলে তাতে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সম্মতির প্রয়োজন রয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এ সম্মতি এখনও দেননি। চলতি সপ্তাহে ১৭টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ) একটি খোলা চিঠিতে এই অনুমতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, আইসিসির চার্টারে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়া হয়নি। সুতরাং আইসিসি চাইলেও নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, ১২২টি দেশ আইসিসির সদস্য। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, সুদান রোম চার্টারে (যার মধ্য দিয়ে আইসিসির জন্ম) ২০০০ সালে স্বাক্ষর করলেও পরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে আইসিসির সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা দেখা কিংবা ওই রাষ্ট্রের কোনো ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কাজটি খুব সহজ হবে না। আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। চতুর্থত, আইসিসি তার সদস্য রাষ্ট্রের যে সংজ্ঞা দিয়েছে, তাতে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ওই সংজ্ঞায় পড়ে না। যদিও ২০১২ সালে জাতিসংঘ পিএলওকে নন-মেম্বার অবজার্ভার স্ট্যাটাস দিয়েছে। এখন যদি ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ আইসিসিতে যোগ দেয়, কেবল তাহলেই সম্ভব গাজায় মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার তদন্ত করা। পঞ্চমত, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ ধরনের গণহত্যার বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য আইসিসিকে নির্দেশ দিতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইহুদি লবির কারণে তা চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং আজ নাভি পিল্লাই যুদ্ধাপরাধের যে কথা বলেছেন, তা কাগজে-কলমেই থেকে যাবে। এবং প্রমাণিত হবে আইসিসি পশ্চিমাদের স্বার্থেই কাজ করে।সার্বিয়ার যুদ্ধবাজ নেতা মিলোসেভিচের বিচার হয়েছিল দ্য হেগে। বিচার হয়েছিল লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও যুদ্ধবাজ চার্লস টেলরের। এমনকি রুয়ান্ডায় হুতু-তুতসি হত্যাকাণ্ডে যারা অভিযুক্ত হয়েছিল, তাদেরও বিচার হচ্ছে। কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে যারা জড়িত, তাদেরও বিচার হচ্ছে। এমনকি ২০০৮ সালে কেনিয়ায় নির্বাচন পূর্বকালীন সময়ে সেখানে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তারও বিচার হচ্ছে। আর তাতে অভিযুক্ত হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট কেনিয়াত্তা ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভাইস প্রেসিডেন্টের বিচার শুরু হয়েছে, আর প্রেসিডেন্টের বিচার শুরু হওয়ার কথা আগামী মার্চে। কিন্তু ইসরাইলি নেতৃবৃন্দের বিচার হবে, এটা শুধু অসম্ভবই নয়, অকল্পনীয়ও বটে।এ পর্যন্ত সেখানে মৃতের সংখ্যা ১৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। গাজা এখন এক বিধ্বস্ত নগরী। হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়স্থলগুলোও ইসরাইলের হামলার বাইরে নয়। ইতিমধ্যে গাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করেছে ইসরাইল। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইসরাইলি হামলায় যারা মারা গেছেন, তাদের মাঝে সিভিলিয়ানের সংখ্যা শতকরা ৭৪ ভাগ। ১৮ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত গাজায় হামাস সদস্যের সংখ্যা মাত্র ১৫ হাজার। অথচ এই গাজা থেকে হামাস নেতৃবৃন্দকে উৎখাত করতে ইসরাইল অতীতে দু-দুবার সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল- একবার শীতকালে ২০০৮-২০০৯ সালে, আর দ্বিতীয়বার ২০১২ সালের নভেম্বরে। এর কারণ হামাসকেই এখন ইসরাইলি নেতৃবৃন্দ বড় হুমকি মনে করে। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সংসদের নির্বাচনে হামাস বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু ইসরাইল কোনোদিনই হামাস প্রতিনিধিকে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়নি। বরং আল ফাতাহ আর হামাসের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে হামাসকে উৎখাত করার উদ্যোগ নিয়েছে নেতানিয়াহু সরকার। আর এটা করা হয় এমন এক সময়ে যখন (এপ্রিল) আল ফাতাহ ও হামাস একটি ঐকমত্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। এই সরকার যাতে গঠিত না হয়, সেজন্যই এ সামরিক আগ্রাসন।ইসরাইলের এই সামরিক আগ্রাসন, গাজায় নিরীহ মানুষ বিশেষ করে শিশুদের হত্যা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ বরখেলাপ। কোনো যুক্তিতেই এই স্থল আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। ইসরাইলের যুক্তি ছিল তারা যা করছে, তা তাদের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার স্থার্থে এবং এই অধিকার তারা রাখে। এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ গাজা অনেক দিন থেকেই একটি ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চল। ২০০৬ সালে নির্বাচনে হামাসের বিজয়ের পরপরই ইসরাইল গাজা অঞ্চল ঘেরাও করে রাখে। পানি, বিদ্যুৎ, ওষুধ সরবরাহ- সবকিছু ইসরাইল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে। আর বিশ্বসংস্থা অনেক আগেই জানিয়েছিল, ইসরাইলের এই নিয়ন্ত্রণ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে গাজা ২০২০ সালের মধ্যে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারায় আত্মরক্ষায় সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাষ্ট্রকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা শুধু কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু গাজা একটি ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং গাজার কোনো সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত নয়, তাই জাতিসংঘের ৫১ ধারা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গাজার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে অধিকৃত অঞ্চল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন। এই আইনে বলা হয়েছে, অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে দখলকৃত রাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ইসরাইলের দায়িত্ব গাজার নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু উল্টো ইসরাইলি সেনাবাহিনী সাধারণ নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে। হেগ কনভেনশনের ৪৭ ও ৫৩ নম্বর ধারাও ইসরাইল লংঘন করেছে। অধিকৃত অঞ্চলের আকাশ, জলসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং সেই সঙ্গে জনগণের চলাচল ও নিত্যপণ্যের মুভমেন্ট এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরাইল। এটা অবৈধ। ৩ জন ইসরাইলি যুবকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইসরাইলি এই অভিযানও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা স্বয়ং ইসরাইলি পুলিশপ্রধান বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হামাস জড়িত নয়। এমনকি হামাসের রকেট হামলা নিয়েও প্রশ্ন আছে। দেখা গেছে, ইসরাইলি রকেট হামলা হয়েছে প্রথমে। প্রতিটি ইসরাইলি হামলা, বিশেষ করে চলতি গাজা অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম বরখেলাপ। ইসরাইলি সেনাবাহিনী মূলত দাহিয়া ডকট্রিন অনুসরণ করে জনবসতি ধ্বংস করছে, যা তারা লেবাননেও করেছিল। এই দাহিয়া ডকট্রিনের প্রবক্তা হচ্ছেন মেজর জেনারেল গাদি আইজেনকট। তিনি শীর্ষ ইসরাইলি সেনা স্ট্র্যাটেজিস্ট। এখন অবসরে। এই মতবাদের মূল বিষয় হচ্ছে, যেখান থেকে রকেট হামলা হবে, সেখানে পুরো এলাকাকে ধ্বংস করে দেয়া। ২০০৬ সালে ইসরাইল এই তত্ত্ব লেবাননে ব্যবহার করেছিল। হিজবুল্লাহ জঙ্গিরা জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে রকেট নিক্ষেপ করত। ইসরাইল ওই এলাকাকে সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে শত্র“ এলাকা ঘোষণা করে ওই এলাকা ধ্বংস করে দিত। এই মতবাদের কারণে লেবাননে প্রচুর বেসামরিক এলাকা ইসরাইলি সেনাবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ায় ২০০৯ সালে জাতিসংঘ লেবাননে বিচারপতি গোল্ডস্টোনের (দক্ষিণ আফ্রিকা) নেতৃত্বে একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি প্রেরণ করেছিল। ওই কমিটি, যা গোল্ডস্টোন কমিটি নামে পরিচিত, ইসরাইলকে বেসামরিক এলাকা ধ্বংসের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে ইসরাইলের কোনো বিচার হয়নি। হামাসের বিরুদ্ধে মানব ঢাল ব্যবহারের যে অভিযোগ রয়েছে, তারও কোনো সত্যতা নেই। বেসামরিক এলাকায় অস্ত্র রাখার হামাসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেই অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরাধ করেও ইসরাইল পার পেয়ে যাচ্ছে। লেবাননে গণহত্যা চালালেও কোনো ইসরাইলি সেনাকর্মকর্তার বিচার হয়নি। আজও যখন গাজায় দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার হবে- এই আস্থাটা রাখতে পারছি না। ইতিহাস বলে, ফিলিস্তিনি এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিএলও নেতৃবৃন্দ অনেক ছাড় দিয়েছেন। ১৯৮৮ সালে পিএলও আলজিয়ার্স সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ পরিত্যাগের কথা ঘোষণা করে। ১৯৯৩ সালে পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত হলেও শান্তি আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেখানে আজও রক্ত ঝরছে। নিরীহ শিশুদের হত্যা করে ইসরাইলি নেতৃবৃন্দ কোনো দিনই সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মন পাবে না। হামলায় বেঁচে যাওয়া শিশুরাই বড় হয়ে এক-একজন বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। হামাসের জন্ম ও গ্রহণযোগ্যতা এভাবেই বেড়েছে।ইসরাইল মূলত নতুন একটি মতবাদ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মূল বিষয় হচ্ছে, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে গাজায় যারা বসবাস করেন, তাদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ রেখে সেখানে তাদের বসবাস করতে বাধ্য করা। এটা কেউ কেউ মযবঃঃড়রংস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ ঘেটো বা বস্তিতে বসবাস। নাৎসি নেতা আইখম্যান ইউরোপে ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই ঘেটো তত্ত্ব ব্যবহার করে ইহুদিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বসবাস করতে বাধ্য করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের পূর্ব যুগে কৃষ্ণাঙ্গদের মূল শহর থেকে সরিয়ে নিয়ে ১০টি হোমল্যান্ডে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আজ নেতানিয়াহু সরকার অনেকটা সেই ঘেটো বা বস্তি তত্ত্বই ব্যবহার করতে চায় গাজায়! কিন্তু ইতিহাস বলে, এসব উদ্যোগ কখনোই সফল হয় না। আইখম্যান সফল হননি। ১৯৬০ সালে আইখম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিচারে তার ফাঁসি হয়। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওই হোমল্যান্ড তত্ত্বও ভেঙে পড়েছিল। ইসরাইল আজ নিরীহ শিশুদের হত্যা করে মহা অন্যায় করেছে। এর বিচার হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাস মিলোসেভিচকে মুসলমানদের বসনিয়া থেকে উচ্ছেদের জন্য ক্ষমা করেনি। নেতানিয়াহুও ক্ষমা পাবেন না।আজ জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত স্কুলগুলোয় আশ্রয় নিয়েও যখন গাজার শিশুরা ইসরাইলি হামলা থেকে রেহাই পায় না, তখন জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বৈকি। গাজায় এই মানবিক বিপর্যয় নিয়ে মুসলিম বিশ্বও আজ বিভক্ত ও নির্লিপ্ত। মিসরের সেনাবাহিনী ও সরকার স্পষ্টতই ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করেছে। জর্ডান ও সৌদি আরবের নীরবতাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরবের বড় ভয় হামাসকে নিয়ে। তাই বলা হচ্ছে, হামাস উৎখাত অভিযানে সৌদি রাজবংশের সমর্থন রয়েছে। তুরস্ক ও কাতার একটি উদ্যোগ নিলেও তা কাজ করছে না। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইসরাইল বাস্তবায়ন করছে না। সুতরাং গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।যুদ্ধ গাজাবাসীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ থেকে ইসরাইলের বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই অসম যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হবে না। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর তালিকায় ইসরাইলের অবস্থান ১১তম। উপরন্তু ইসরাইল অলিখিত পারমাণবিক শক্তিও বটে। কিন্তু মাত্র ১৫ হাজার সদস্য ও সমর্থক নিয়ে গঠিত হামাস আজ অনেক শক্তিশালী। বিশ্বের শুভবুদ্ধির মানুষ তাদের পক্ষে। ইতিমধ্যেই তারা বিজয় অর্জন করেছেন। এই যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। ইসরাইলি নেতৃবৃন্দ ও জনগণ যদি এটি উপলব্ধি করেন, তাহলেই মঙ্গল। নতুবা গাজার এই গণহত্যা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী একটি গেরিলা যুদ্ধের জন্ম দেবে, যার ফলে সৃষ্টি হবে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার Daily JUGANTOR 04.08.14

বিশ্বব্যাংকের সংস্কার ও ব্রিকস ব্যাংক

অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করার মতো। প্রথমটি হচ্ছে, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত। মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কর্তৃত্ব খর্ব করার উদ্দেশ্যেই গত ১৫-১৭ জুলাই ব্রাজিলের ফর্তালেজা শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ৫ জাতিভিত্তিক ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সংবাদটি হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত ও পরিচালনায় সংস্কার আনার তাগিদ দিয়েছে ভারত। ব্রিকস সম্মেলনে যখন ‘নতুন একটি বিশ্বব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ঠিক এর পর-পরই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম ছুটে যান ভারতে। বৈঠক করেন ভারতের নতুন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির সঙ্গে। অরুণ জেটলি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে জানান, ভারত মনে করে, বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ৫০ মিলিয়ন ডলার মূলধন নিয়ে ব্রিকস ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভারত এর প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে। ব্রিকস ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় হবে সাংহাইয়ে। ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই সিদ্ধান্ত যে বিশ্বব্যাংককে কিছুটা হলেও একটা দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর এর বড় প্রমাণ। এখানে বলা ভালো, গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল (ঔরস ড়’ ঘবরষষ) ২০০১ সালে নতুন অর্থনৈতিক ব্যাংক হিসেবে ইজওঈ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন)-এর কথা বলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা এই গ্রুপে যোগ দেয় ২০১০ সালে। তবে এটাও সত্য, ব্রিকের যে ধারণা তিনি দিয়েছিলেন, ২০০৯ সালে এসে এতে তিনি কিছু পরিবর্তন আনেন এবং নতুন এক অর্থনৈতিক ব্যাংকের কথা বলেন। গওকঞ নামে পরিচিত এই অর্থনৈতিক ব্লকে রয়েছে মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক। ২০১১ সালে এসে অধ্যাপক জিম ও’নেইল স্পষ্ট করেই বলেছেন, ব্রিকসকে কেন্দ্র করে যে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির কথা বলা হয়েছিল, এতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কেননা চীন ও রাশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হ্রাস পাবে এবং এই বয়স্ক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে চাপের মুখে রাখবে। অধ্যাপক জেক গোল্ডস্টোনও একই অভিমত পোষণ করেছিলেন। তবে সত্যিকার অর্থে ব্রিকসের অর্থনীতি কতটুকু দাঁড়াতে পারবে, সেটি ভবিষ্যতের ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই মুহূর্তে চীন ও ভারত বিশ্বের বড় অর্থনীতি। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের পরই এর স্থান। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রামের (আইসিপি) মতে, জাপানকে হটিয়ে দিয়ে ভারত ২০১১ সালে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। আইসিপি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাজ করে। অথচ ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল।আইসিপির রিপোর্ট থেকেই জানা গেছে, ২০১১ সালে বিশ্ব ৯০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে। তবে এর মোট উৎপাদনের অর্ধেকই নিম্ন ও মধ্য আয়ের অর্থনীতির দেশগুলো থেকে আসে। আইসিপির প্রধান পর্যবেক্ষণ হল, বিশ্বের ১২টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের ৬টিই মধ্য আয়ের অর্থনীতির দেশের অন্তর্গত। ১২টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ সম্মিলিতভাবে উৎপাদন করে বিশ্ব অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশ। আর বিশ্বের ৫৯ শতাংশ মানুষ এ ১২টি দেশে বসবাস করে বলে আইসিপি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। ক্রয়ক্ষমতার অসমতা (পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি- পিপিপি) অনুযায়ী বিশ্ব জিডিপি ৯০ হাজার ৬৪৭ মিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় বিনিময় হার অনুযায়ী বিশ্ব জিডিপি ৭০ হাজার ২৯৪ বিলিয়ন ডলার। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন থাকবে, মাত্র ৫টি দেশ নিয়ে গঠিত ব্রিকস কতদূর যেতে পারবে? ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দেশ অদূর ভবিষ্যতে ব্রিকসে যোগ দেবে কি না, তাও একটা প্রশ্ন।বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে উন্নয়নশীল বিশ্বে। বিশ্বব্যাংক সমাজসেবা করে না। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা যে সাহায্য দেয়, এটি তাদের বিনিয়োগ। সুদসহ তারা আসল বুঝে নেয়। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের ঋণ পলিসি নিয়ে নানা কথা আছে। যারা পল ব্যারেন, রাউল প্রোবিস, গ্রাহাম হেনকক, পল সুইজি, এজি ফ্রাংক কিংবা সামির আমিনের লেখার সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ঋণ কেন দেয়, তাদের স্বার্থ কী এবং ঋণের বিনিময়ে তাদের ‘প্রাপ্তি’ কী? তাই শুধু ভারত নয়, বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ কিছুদিন ধরেই বিশ্বব্যাংকের সংস্কার দাবি করে আসছে। অনেকের স্মরণে থাকার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৬৭তম অধিবেশনে (২০১৩) ভাষণ দিতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া ৬০ বছরের পুরনো ক্ষমতার সমীকরণের প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী যা বলতে চেয়েছেন, তা হচ্ছে বেটন উডস (১৯৪৪) সম্মেলনের পর অনেক দিন পার হয়ে গেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো উচিত। আজ প্রধানমন্ত্রীর ওই কথারই প্রতিধ্বনি করলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল বিশ্বকে আর্থিক সহায়তা দেয়- এটি সত্য। কিন্তু শর্ত থাকে। শুধু তা-ই নয়, তাদের কথা অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশেও বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা একেবারে বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে ফিরে আসবে বলা হলেও সংস্থাটি আর ফিরে আসেনি। বাংলাদেশ এখন নিজ উদ্যোগেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে।বিশ্বব্যাংকের ঋণের সঙ্গে কাঠামোগত সামঞ্জস্য বা ঝঃৎঁপঃঁৎধষ অফলঁংঃসবহঃ-এর একটি কথা শোনা যায়। বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে পরিচিত। এটা হচ্ছে একধরনের সুপারিশমালা। বিশ্বব্যাংক ঋণের শর্ত হিসেবে এই কাঠামোগত সামঞ্জস্যের কথা বলে থাকে। কাঠামোগত সামঞ্জস্যের নামে বিশ্বব্যাংক যেসব শর্ত আরোপ করে থাকে, তা হচ্ছে অনেকটা এ রকম- ১. গ্রহীতা দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ২. সরকারি ব্যয় হ্রাস, ৩. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যসহ সেবামূলক খাত ও কৃষি খাতে ভর্তুকি হ্রাস, ৪. প্রকৃতি মজুরি হ্রাস ও ঋণ সংকোচন, ৫. মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার, ৬. জনসেবামূলক খাত, কৃষি উপকরণ, বিদ্যুৎ, রেলওয়ে বেসরকারিকরণ, ৭. উঁচু কর ও সুদের হার বাড়ানো, ৮. আমদানি অবাধ করা, ৯. মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো এবং সমাজতন্ত্রের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এখন কাঠামোগত সামঞ্জস্যের আওতায় ঋণ পেয়ে থাকে। কিন্তু এতে কি ঋণগ্রহীতা দেশের অর্থনীতিতে তেমন পরিবর্তন এসেছে? কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে এর জবাব দেওয়া যেতে পারে। ১৯৭৭-৮৫ সালে পেরুতে বিশ্বব্যাংকের ফর্মুলা অনুযায়ী কাঠামোগত সামঞ্জস্যের শর্তাবলি গ্রহণ করা হয়। ফলে মাথাপিছু আয় শতকরা ২০ ভাগ কমেছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ ভাগে, ওই সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্ব। আরও একটা কথা। ঋণ দেওয়া হয় সাধারণত ধনতন্ত্র কায়েম এবং সমাজতন্ত্রের অগ্রগতিরোধ করতে। অনেক জাতীয়তাবাদী সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে শুধু তাদের কথামতো না চলার জন্য (ইরানে মোসাদ্দেক ১৯৫৩ সালে, গুয়েতেমালার আরবেনজ ১৯৫৪ সালে, ব্রাজিলে গাউলাট ১৯৬৪ সালে, ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ন ১৯৬৫ সালে, ঘানায় নক্রমা ১৯৬৬ সালে, মালিতে কাইটা ১৯৬৮ সালে, চিলিতে আলেন্দে ১৯৭৩ সালে)। ১৯৭২-৭৬ সালে আর্জেন্টিনায় পেরনিস্টরা কিংবা ব্রাজিলে গাউলাট বিশ্বব্যাংকের কোনও ঋণ পাননি। কেননা তাদের রাজনীতিতে পুঁজিবাদী বিশ্ব সন্তুষ্ট ছিল না। অথচ তারা যখন উৎখাত হন, তখন থেকেই ওই দুই দেশে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য বেড়ে যায়। শুধু ১৯৭৬ সালে এককভাবে আর্জেন্টিনা বিশ্বব্যাংক থেকে যত ঋণ পেয়েছে, এর আগের ২০ বছরেও এত ঋণ পায়নি। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয়- বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের জুলাই থেকেই সম্প্রসারিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির আওতায় কাজ করে যাচ্ছে। এতে সরকারের ৯টি ক্ষেত্রে (কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, সরকারি ব্যয়নীতি, বহির্খাত, অর্থ খাত সংশোধন, মানবসম্পদ ও দারিদ্র্য দূবীকরণ এবং পরিবেশনীতি) করণীয় কাজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। করণীয় কাজের মাধ্যে রয়েছে সেচ উপকরণ আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা সহজীকরণ, আমদানির ওপর আরোপিত শর্তাবলি তুলে দেওয়া ও রপ্তানি ভর্তুকি-ব্যবস্থা বাতিল করা, ভ্যাট প্রথা প্রবর্তন, পাট, বস্ত্র, রসায়ন, ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থাকে বেসরকারিকণ, রেলওয়ে ঘাটতি দূরীকরণ, প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হ্রাস, রপ্তানিকে বহুমুখিতা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ইত্যাদি বিষয়েও দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সুপারিশ রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশ এ থেকে কতটুকু উপকৃত হয়েছে? দরিদ্রতা কিংবা চরম দারিদ্র্যসীমায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমেনি। বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে কয়েক হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। রাষ্ট্রকে এই ঋণ পরিশোধ করতে হয় আর চক্রবৃদ্ধি হারে ওই ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে, ঋণ আর শোধ হয় না। ১৯৭২-৭৩ সালে যেখানে এক ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৮৮ টাকা, আজ সেখানে ৭৯ টাকা। ঋণের শর্ত হিসেবে আমরা টাকার মান নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু দরিদ্রতা কমেনি। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে বটে, কিন্তু এতে উপকৃত হয়েছে কতিপয় ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ। তথাকথিত কনসালটেন্সির নামে কয়েক বুদ্ধিজীবী তথা শিক্ষকের পকেট ভারী হয়েছে মাত্র।মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাংক থেকে একবার ঋণ নিলে সেখান থেকে আর বের হয়ে আসা যায় না। ব্রাজিল একবার ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ‘ডিফল্টার’ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক দেশটিকে আবারও ঋণ দিয়েছিল- যাতে ব্রাজিল ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারে। না হলে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিত। এ জন্যই ঋণের পরিমাণ বাড়লেও বিশ্বব্যাংক ঋণ দেওয়া অব্যাহত রাখে।আজ তাই বিশ্বব্যাংকের যে সংস্কারের কথা উঠেছে, এতে অযৌক্তিক কিছু নেই। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আদৌ সংস্কারের কোনও উদ্যোগ নেবে- এটা মনে হয় না। সঙ্গত কারণেই ব্রিকস ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকবে সবাই। কিন্তু কাজটি খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। এর ভবিষ্যৎ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। দুটি বড় অর্থনীতি চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক আগামী দিনে কোন পর্যায়ে গিয়ে উন্নত হয় কিংবা বড় অর্থনীতির দেখা হিসেবে চীনের ভূমিকা ব্যাংক পরিচালনায় কী হবে অথবা ঋণের ধরন কী হবে- এসবের ওপর ব্রিকস ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বলা ভালো, আপতত ১০ হাজার কোটি ডলার মূলধন নিয়ে ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করছে। এখানে চীন একাই দেবে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার। রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিল দেবে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার করে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা দেবে ৫০০ কোটি ডলার। ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্বের ৪০ শতাংশ জনগণ ও ২৫ শতাংশ এলাকা এই দেশগুলোর দখলে এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ এই দেশগুলোর। ব্রিকস দেশগুলো বর্তমানে বৈশ্বিক মুদ্রা রিজার্ভের ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং ব্রিকস ব্যাংকের ব্যাপারে একটা আগ্রহ থাকবেই। তবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ব্রিকস ব্যাংক কতটুকু দাঁড়াতে পারবে, সে প্রশ্ন থাকলই। Daily AMADER SOMOY 28.07.14

একটি সাক্ষাৎকার ও কিছু মৌলিক প্রশ্ন

আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন একটি জাতীয় দৈনিকে গত ২২ জুলাই ২০১৪ তারিখে। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তালপট্টি থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো বাংলাদেশ’ (সকালের খবর)। দীপু মনি আদালতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান এজেন্ট ছিলেন। তার ডেপুটি ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব পর্যায়ে কর্মরত রিয়ার এডমিরাল (অব.) খুরশীদ আলম। খুরশীদ আলম নেভিতে থাকার কারণে সমুদ্রসীমা, সমুদ্র আইন ইত্যাদি নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেছেন। মূলত তার এই অভিজ্ঞতার কারণেই তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার এই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দীপু মনির তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এ বিষয়ে তিনি পড়ালেখা করেছেন, এমন তথ্যও আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও একজন পূর্ণমন্ত্রী হয়ে তিনি আদালতে ছিলেন প্রধান এজেন্ট, যেখানে ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি যেসব কথা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ অনেকটা এ রকম : ১. তালপট্টি কোনো দ্বীপ ছিল না, ২. তালপট্টি থাকলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতাম, ৩. ১৯৮০ সালের পর ম্যাপে তালপট্টিকে ভারতের দিকে দেখানো হয়েছে, ৪. বাংলাদেশ সালিশি আদালতে ন্যায্য দাবি নিয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াত জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করেনি, ৫. মামলা করে আমরা ৮০ শতাংশ পেয়েছি, আর ভারত পেয়েছে ২০ শতাংশ। সুতরাং ভারত এটাকে বিজয় বলতেই পারে, ৬. ভারতের দাবিকৃত ১০টি ব্লকের সবই আমরা পেয়েছি। তিনটি ব্লকের সামান্য একটু অংশ ভারত পেয়েছে। এখন ইজারাদাররা আসবে। দীপু মনির এই বক্তব্য নিয়ে বলার কিছু নেই। ইতোমধ্যে এ নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছে। তার বক্তব্য অনেকটাই ‘রাজনৈতিক’ ও নিজের অবস্থানকে বড় করে দেখানো। তালপট্টি দ্বীপ ছিল কি-না, তা খুরশীদ আলমের নিজের লেখাতেই প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘নতুন গোল পোস্ট’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার আগে তিনি সমুদ্র আইন ও সমুদ্রসীমা নিয়ে লেখালেখি করেছেন। সেমিনারে বক্তব্যও রেখেছেন। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে এই সময় তার বক্তব্য বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। তালপট্টি দ্বীপের যে অস্তিত্ব ছিল, তা খুরশীদ আলমের লেখনীতেও আমরা পেয়েছি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের লেখনীতেও এটা স্পষ্ট হয়েছিল যে, তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটা ডুবে যেতে পারে, কিন্তু তার অস্তিত্ব নেই, এটা বলা যাবে না। গুগল আর্থে এখনো তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব দেখানো আছে। ওখানে তেল ও গ্যাসের রিজার্ভের বেশ সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের ডিফেন্স ফোরাম ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ভারত ২০০৬ সালে হাড়িয়াভাঙ্গার মুখের ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে। এখানে গ্যাসের সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে। কৃষ্ণ-গোদাবরি অঞ্চলে যে গ্যাস পাওয়া গিয়েছিল, তার পরিমাণ ছিল ৫০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ভারতের দৈনিক টেলিগ্রাফের ২৭ নভেম্বরের সংখ্যায়ও এই পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ একটি জাতীয় দৈনিকে গত ১৮ জুলাই (২০১৪) যে প্রবন্ধ লেখেন, তাতে তিনি এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তালপট্টি দ্বীপ যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে ২৮ ব্লকে এলাকাটিকে ভাগ করেছিল তার মাঝে ২১নং ব্লকে অন্তর্ভুক্ত ছিল দক্ষিণ তালপট্টি। হেগের সালিশি আদালতের রায় অনুযায়ী হাড়িয়াভাঙ্গা নদী বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, বাংলাদেশ এর আশপাশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালাতে উদ্যোগ নেবে কি-না, সেটাই একটা প্রশ্ন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ও টিভি টকশোতে (আরটিভি) অধ্যাপক হোসেন মনসুর (চেয়ারম্যান পেট্রোবাংলা) আমাকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ তালপট্টি এলাকায় জ্বালানি সম্পদ আছে (তেল ও গ্যাস), এ তথ্য তার জানা নেই। আমি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নই। ফলে কার বক্তব্য সত্য, এটা নিয় প্রশ্ন থাকবেই। ভারত বঙ্গোপসাগরের অন্যত্র ১০০ টিসিএফ গ্যাস ও বিলিয়ন ব্যারেল তেল আবিষ্কার করেছে। মিয়ানমার করেছে ৭.৭ টিসিএফ গ্যাস। ২০০৬ সালে ভারত সরকার তাদের ২৪টি গভীর সমুদ্র ব্লক টেন্ডার প্রদানের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এর মধ্যে ব্লক ডি ২৩ (৮৭০৬ বর্গকিলোমিটার) ও ব্লক ডি ২২ (৭৭৯০ বর্গকিলোমিটার) বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ১৯৯১ সালের ২১টি ব্লকের অনেক অংশ জুড়ে রয়েছে। এখন নয়া রায়ের ফলে দেখতে হবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্লকগুলোর কটি এখন পুনর্বিন্যাস করতে হবে। মহীসোপান নিয়েও একটা বিভ্রান্তি আছে। এমনকি ‘ধূসর এলাকা’ নিয়েও আছে প্রশ্ন।
তবে এটা বলতেই হবে এই রায়ে বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক সম্ভাবনা সৃষ্টি করল। বাংলাদেশের সালিশি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটিও ছিল সঠিক ও যুক্তি সঙ্গত। চূড়ান্ত মুহূর্তে ভারত আলাপ-আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই ১৯৭৪ সাল থেকেই আলোচনা চলে আসছিল। ফলাফল ছিল শূন্য। উল্লেখ্য, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বর্তমানে বলবৎ রয়েছে 3rd united Nations convention on the Law of Sea (UNCLOS 111)। এটি ১৯৮২ সালে গৃহিত এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর। ভারত ১৯৮৫ সালের ২৭ জুন ও মিয়ানমার ১৯৯৬ সালের ২১ মে UNCLOS 111 অনুমোদন করে। বাংলাদেশ অনুমোদন করে অনেক পরে ২০০১ সালের ২৭ জুলাই (অনুস্বাক্ষর ১৯৮২) নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে সমুদ্রসীমার দাবির স্বপক্ষে তথ্য, উপাত্ত উপস্থাপন করতে হতো। বাংলাদেশ ২০১১ সালের জুলাইয়ের পর তথ্য-উপাত্ত জমা দেয়ার পরই আদালত এই সিদ্ধান্ত নিল। তখন আদালতের এই রায় আমাদের জন্য যেমনি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করল, ঠিক তেমনি দায়িত্বও বেড়ে গেল। সমুদ্রে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। প্রচুর তেল-গ্যাস সম্পদের পাশাপাশি খনিজ ও মৎস্য সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে সমুদ্রে। যেহেতু মিঠা পানির মাছের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের আমিষের একটা সম্ভাবনা হলো সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ। এই সম্পদ আহরণে আমাদের পর্যাপ্ত আধুনিক ট্রলার নেই। ছোট ছোট নৌকা বা ছোট ট্রলারে করে মৎস্য আহরণ করা হয়। কিন্তু এগুলো গভীর সমুদ্রে যেতে পারে না। ফলে আমাদের এলাকা থেকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড ও ভারতীয় জেলেরা। বাংলাদেশ সরকারকে এখন উদ্যোগী হয়ে বড় বড় ট্রলার তৈরি ও মৎস্যজীবীদের মাঝে সমবায়ের ভিত্তিতে বিতরণ করতে হবে, যাতে এরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারেন। দক্ষ ও জনশক্তি আমাদের নেই। সমুদ্র নিয়ে গবেষণা হয় কম। বাংলাদেশ নেভি তাদের স্বার্থে কিছু গবেষণা করে। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। ঢাকায় ও চট্টগ্রামে দুটি সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ আছে। চট্টগ্রামে একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব সিদ্ধান্ত ভালো। বরিশাল ও পটুয়াখালী (যা সমুদ্রে এলাকায় অবস্থিত) বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে নেভির তথা সমুদ্র অধিদফতর থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের এসব বিভাগে নিয়োগ দিতে হবে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আইন অনুষদ আছে, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে সমুদ্র আইন সংক্রান্ত একটি বিষয় চালু করতে হবে। দীর্ঘদিন পর মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হলো। কিন্তু কাজ অনেক বাকি। সরকারের একটি বড় উদ্যোগের প্রতি তাকিয়ে থাকবে এখন সবাই। এখন বিজয় উৎসবের সময় নয়। এ নিয়ে কৃতিত্ব নেয়ারও কিছু নেই। আমরা ভারতের দৃষ্টান্ত দেখে শিখতে পারি। ভারতে এটা নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি। লেখালেখিও তেমন চোখে পড়েনি। একটা রায় হয়েছে এবং আমাদের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তখন দেখতে হবে এই ‘অধিকারকে’ আমরা কীভাবে ব্যবহার করি। আমরা দুটি রায়ই পেলাম। রায়ের আলোকে অতি দ্রুত সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে আমাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ জন্য সমুদ্র অধিদফতরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের UNCLOS ডেস্ককে আরো শক্তিশালী করাও জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরুণ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পাঠিয়ে এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে বঙ্গোপসাগর হচ্ছে ২.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটারের এক বিশাল এলাকা। এর মাঝে একটা সীমিত এলাকা আমাদের। তবে এখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। শুধু মৎস্য সম্পদ আহরণ করে আমরা আমাদের আমিষের ঘাটতি মেটাতে পারি। আগামী দিনে বঙ্গোপসাগরের স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব পড়বে। একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারত এ অঞ্চলে তাদের নৌ তৎপরতা বাড়াচ্ছে। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের শতকরা ৫০ শতাংশ পরিচালিত হয় এই রুট দিয়ে। আর চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের শতকরা ৬০ শতাংশ বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং আগামী দিনে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বাড়বে। এ জন্য আমাদের নৌ বাহিনী ও কোস্টাল গার্ডকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বহিঃসমুদ্রে টহল বাড়াতে হবে। বঙ্গোপসাগর নিয়ে গবেষণার পরিধি বাড়াতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় ‘বিস’ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘বিস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তবে এখানে বঙ্গোপসাগর নিয়ে কোনো কাজ হয় না। এখন হতে পারে। সিঙ্গাপুরের জমিন পূর্ব এশিয়ান ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও যৌথভাবে গবেষণা কর্ম পরিচালনা করা সম্ভব। আমরা একটা ‘রায়’ পেয়েছি বলে যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি, তাহলে আমরা ভুল করব। আমাদের কাজ আরো বাড়ল। আমাদের যেতে হবে অনেক দূর। মহীসোপানের বিষয়টিরও সমাধান হয়নি। এটা সমাধান করবে জাতিসংঘের অপর একটি সংস্থা। ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় মহীসোপান। উপরের অংশ, অর্থাৎ জলরাশি দিয়ে মহীসোপানের বিচার করা হয় না। মহীসোপানের বিচার করা হয় পানির নিচের অংশ দিয়ে, যেখানে তেল, গ্যাসসহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। মহীসোপানে আমাদের সীমানা নির্ধারিত হলেই আমরা মহীসোপানে অর্থাৎ সাগরের নিচে আমাদের কর্মকাণ্ড চালাতে পারব। এই মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণের জন্য আমাদের ন্যূনতম চার থেকে ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০ নটিক্যাল মাইলকে মহীসোপানের সীমানা ধরা হয়। বাংলাদেশ ২০১১ সালে তার মহীসোপানের দাবি জাতিসংঘে জমা দেয়। মোট ৫২টি দেশের আবেদনপত্র জাতিসংঘ বিবেচনা করছে। এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন সরকারকে এখন খুব দ্রুত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। রায়ের পর সরকার সময় পাবে ৫ বছর। নিয়মানুযায়ী কোনো দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর প্রথম ৫ বছর সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের জন্য ইন্টারন্যাশনাল সিবেড অথোরিটিকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না। কিন্তু ৫ বছরের পর থেকে আহহৃত মোট সামুদ্রিক সম্পদের একটা অংশ এই কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সমুদ্র অধিদফতরকে রেখেও একটি বৃহৎ পরিসরে পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নৌ বাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া সিনিয়র কর্মকর্তাদের এই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জড়িত করা প্রয়োজন। এর ফলে তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে আমরা কাজে লাগতে পারব। একজন অদক্ষ আমলাকে দিয়ে এই কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। একটা রায় পেয়েছি। এটা নিয়ে যদি আমরা বসে থাকি, আমরা অনেক বড় ভুল করব। আমাদের যেতে হবে অনেক দূরে। আমরা কি পেয়েছি, কি হারিয়েছি, এটা নিয়ে যত কম বিতর্ক করব, ততই আমাদের মঙ্গল। দীপু মনি তার সাক্ষাৎকারে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘ভূমিকা’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এটা অনভিপ্রেত। আমাদের এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। কোনোকিছুতেই আমরা অতীতকে টেনে আনি, বিরোধী পক্ষের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করি, এটা ঠিক নয়। সবাইকে নিয়েই দেশ। এখন সীমানা নির্ধারিত হলো এটাই বড় কথা। কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় করা যায় না। বড় হতে হয় কর্মে ও অভিজ্ঞতায়। মামলা করে আমরা ৮০ শতাংশ পেয়েছি এটার পুরোপুরিভাবে সঠিক নয়। সালিশি আদালতে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প ছিল না। কেননা তিন ভাগে সমুদ্র সীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক আদালত ও আরব্রিটাল ট্রাইব্যুনাল বা সালিশি আদালত। ভারত প্রথম দুটি কোর্টের ব্যাপারে তার আপত্তি আগেই দেয়ায় তৃতীয় বিকল্প অর্থাৎ সালিশি আদালতে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমা নির্ধারণে কিন্তু সালিশি আদালতে যায়নি। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এই বিবাদ মীমাংসিত হয়েছিল। তবে এটা সত্য, সালিশি আদালতে যাওয়ার পরও ভারত আলাপ-আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি। সুতরাং সমুদ্র সীমা নিয়ে আমরা আর কোনো বিতর্ক চাই না। এটা এখন মীমাংসিত বিষয়। Daily Manob Kontho 27.07.14