রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ সংক্রান্ত অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একটি ওয়েবসাইট। লেখকের অনুমতি বাদে এই সাইট থেকে কোনো লেখা অন্য কোথাও আপলোড, পাবলিশ কিংবা ছাপাবেন না। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন লেখকের সাথে

মিয়ানমারে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কেন জরুরি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অতি সম্প্রতি ছাপা হয়েছে, যা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথম খবরটি এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।
মিয়ানমারে গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের জন্য সেখানে একটি গণ-আদালত গঠিত হয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামে এই আন্তর্জাতিক গণ-আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অং সান সু চি ও দেশটির সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নিপীড়নের তদন্তে যুক্ত বিশিষ্টজন ও খ্যাতনামা আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক প্যানেল এই রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন। আদালত ওই রায়ের আলোকে ১৭টি সুপারিশ করেন, যা কিনা জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পাঠানো হবে। দ্বিতীয় খবরটি এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ইরাকে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই টিমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা সেখানে কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সে ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করা ও ইরাক সরকারকে সাহায্য করা। ব্রিটেন প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

যারা আইএস কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুটা শান্তি দেওয়ার জন্যই এ অর্থ দেওয়া হবে! এখানে বলে রাখা ভালো, ২০১৪ সালে আইএসের জঙ্গিরা ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনজির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে; যাকে পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিল। ওই সময় শত শত যুবতী ইয়াজিদি মেয়েকে ধরে এনে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদের করুণ কাহিনি ওই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা হয়েছে, তা তদন্তে একটি তথ্যানুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।
ওপরে উল্লিখিত দুটি সংবাদ বিচ্ছিন্ন হলেও একটা মিল আছে। আর তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। মালয়েশিয়ার পিপিটির কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এটি সিম্বলিক, অর্থাৎ প্রতীকী আদালত। কিন্তু এর একটি প্রতিক্রিয়া আছে। এ ধরনের ঘটনায় একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠনে সহায়তা করে থাকে। রোম স্ট্যাটিটিউটে (১৯৯৮, কার্যকর ২০০২) এ ধরনের আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ইরাকে এ ধরনের আদালত ভবিষ্যতে গঠিত হবে এবং আমার ধারণা, আমরা যদি মিয়ানমারের গণহত্যার ঘটনা সত্যিকারভাবে আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরতে পারি, তাহলে মিয়ানমারের ব্যাপারে একটা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা সম্ভব।

হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বসনিয়া হার্জেগোভিনার কসাই হিসেবে পরিচিত সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের (যিনি ছিলেন সর্বশেষ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট) বিচারের কাহিনি সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। মুসলমানদের ব্যাপক গণহত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বহুল আলোচিত স্রেব্রেনিচা গণহত্যার কাহিনি (১১-১৩ জুলাই ১৯৯৫) অনেকে স্মরণ করতে পারেন। ওই গণহত্যায় একটি কমিশন প্রমাণ পেয়েছিল যে আট হাজার ৩৭৩ জনকে (যাদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান) হত্যা করা হয়েছে, যাদের মাঝে ছিল শিশু, মহিলা ও কিশোর। এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্লোবোদান মিলোসেভিচ। সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা গণহত্যার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই ট্রাইব্যুনালের অস্তিত্বকাল ছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মিলোসেভিচ কারাগারে মারা গেলে এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জাতিসংঘ কসোভো গণহত্যার জন্যও মিলোসেভিচকে অভিযুক্ত করেছিল। এবং উভয় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর বিচার শুরু হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গণহত্যার, জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের, হত্যার, বিনা অভিযোগে বন্দি করে রাখা ও নিপীড়ন করার। ট্রাইব্যুনাল তাঁর মৃত্যুতে কোনো রায় দেননি। কিন্তু মোট ৬৬টি ঘটনা, হত্যাকাণ্ড ও জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি। রুয়ান্ডায় গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে। পাঠক নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ওই সময়কার হুতু-তুতসি দ্বন্দ্ব ও গণহত্যার খবর। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত (৯৫৫) অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। রুয়ান্ডার গণহত্যার সময়ও পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ প্রথম দিকে নির্লিপ্ত ছিল। এমনকি জাতিসংঘ প্রথম দিকে সেখানে যে গণহত্যা হয়েছে, তা স্বীকারও করেনি (রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ গণহত্যার কথা বলেছে)। কেননা গণহত্যা স্বীকার করলে সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী পাঠাতে হয়। একমাত্র গণহত্যা বন্ধের পরই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে একটি তথ্য অনুসন্ধান টিম পাঠাতে রাজি হয়। জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের নামে সেখানে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। রুয়ান্ডায় হুতুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর তুতসি উপজাতির লোকেরা ছিল সংখ্যালঘু। আর সংখ্যালঘু তুতসিরাই গণহত্যা, ধর্ষণ আর জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হয়। প্রায় পাঁচ লাখ থেকে ৯ লাখ মানুষ এই জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানে (১৯৯৪) মারা গিয়েছিল। বিচারে ৬১ জন গণহত্যাকারীর বিচার হয়েছিল। তাদের মধ্যে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পল কাগামের (যিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে ফ্রান্সের একটি আদালতে এখন বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সুদানের দারফুরে (পশ্চিম সুদান) গণহত্যার কথাও আমরা উল্লেখ করতে পারি। ২০০৩ সালে এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। এ হত্যাকাণ্ডে সরকারি কর্মকর্তারা ও জানজাভেদ নামে একটি মিলিশিয়া গ্রুপ জড়িত ছিল। তারা দারফুরে বসবাসকারীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। মানুষজন হত্যা করেছিল। প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রায় ২৮ লাখ মানুষ নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। দারফুরের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (হেগে) গঠিত হয়েছিল এবং ২০০৯ সালের ৪ মার্চ আদালত সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বসিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে চীন ও রাশিয়া সুদানের ওমর আল বসিরকে সমর্থন করেছে। সুদানে এই দেশ দুটির যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। দারফুরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৭ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ২৬ হাজার শান্তিরক্ষী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এখানে আছে) সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু গণহত্যার জন্য কারো বিচার হয়েছেতেমনটি শোনা যায় না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর কোন কোন দেশে, যেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেখানে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গোতে ২০০৪ সালে, কম্বোডিয়ায় ২০০১ সালে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে যারা জড়িত, তাদের বিচার করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বিচারকার্য এখনো চলছে। আজ মিয়ানমারে যে জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান তথা গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তা খোদ বাংলাদেশেই নয়, বরং জাতিসংঘও একে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা জেইদ রাদ আল হুসেইন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এই পাশবিকতার ঘটনা পাঠ্যপুস্তকের জন্য জাতিগত নিমূর্লের একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। রয়টার্স হুসেইনের বক্তব্য উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস-এর এক প্রতিবেদনে (Myanmar, Cambodia, and the oppurtunity for the U.S. Congress, September 07, 2017) বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে জাতিসংঘের সিরিয়াসলি কিছু করা উচিত। প্রতিবেদনে সিনেটর ম্যাককেইন ও কংগ্রেসম্যান এডওয়ার্ড রয়েস অং সান সু চিকে যে সহিংসতা বন্ধে চিঠি লিখেছেন, তা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে মিয়ানমারে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি শুনানি করার আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। এই পাঁচ দফায় আছে(১) অবিলম্বে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, (২) জাতিসংঘের মহাসচিবের উচিত রাখাইনে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানো, (৩) মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, (৪) রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, (৫) কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর এ প্রস্তাবের ব্যাপারে অনেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত ও কার্যকর একটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো মিয়ানমারের সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরানি প্রেসিডেন্ট কিংবা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও আমরা একই সুর পেয়েছি। অর্থাৎ সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এর আগে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এগুলো অনেকটা এ রকম : ১. রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা, ২. একটি নিরাপদ এলাকা বা সেফ জোন প্রতিষ্ঠা করা, ৩. বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা যাতে নিজ বাসভূমে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করা, ৪. কফি আনান কমিশনের প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ৫. রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রপাগান্ডা বন্ধ করা, ৬. রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে না ফেরা পর্যন্ত তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। উভয় প্রস্তাবে মিল আছে যথেষ্ট। তবে আমি খুশি হতাম যদি ওই প্রস্তাবের সঙ্গে আরো একটি প্রস্তাব থাকত, যেখানে বাংলাদেশ গণহত্যার সুষুম তদন্ত দাবি করত। এটি একটি ন্যায্য দাবি। আমার ধারণা, ওআইসির দেশগুলো গণহত্যা বিচারের দাবিকে সমর্থন করবে।

আমরা বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। সেই বিচার এখনো চলছে। বিশ্বের যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, বাংলাদেশ তার সমলোচনা করেছে। এখন সু চি রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে ভুল তথ্য দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য খণ্ডন করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ তথ্য-প্রমাণসহ কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের রাখাইনে যাওয়ার দাবিও বাংলাদেশ করতে পারে। সেই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআর যাতে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করতে পারে সে ব্যাপারে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ জোর দিতে পারে।


বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ। এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করেছে। কিন্তু এটা যে একটা নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে থাকতে পারে না। এরই মধ্যে সু চি এক ভাষণে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। এখন এর প্রতিবাদই নয়, বরং এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্যও বাংলাদেশকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো তৎপর হতে হবে। আমাদের ব্যর্থতা রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য এ অঞ্চলে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিতে পারে, যা কিনা পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দিতে পারে ভবিষ্যতে। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এটি একটি পজিটিভ চিন্তাধারা। এখন রোহিঙ্গা প্রশ্নে শুধু মিয়ানমারের সঙ্গেই আলোচনা নয়, বরং বহুপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। খুব দ্রুত নয়াদিল্লি ও পেইচিংয়ে বিশেষ দূত পাঠানো উচিত। সনাতন কূটনৈতিক চ্যানেলের পাশাপাশি রাজনৈতিক চ্যানেলেও এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

0 comments:

Post a Comment